শ্রীঅক্ষয়কুমার সেন প্রণীত
শ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি সম্বন্ধে আচার্য শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দের অভিমত
শাঁকচুন্নীর১ বই এইমাত্র পড়লাম। তাকে আমার লক্ষ-লক্ষাধিক প্রেমালিঙ্গন দিবে। তার কণ্ঠে তিনি আবির্ভাব হচ্ছেন। ধন্য শাঁকচুন্নী। শাঁকচুন্নী ঐ পুঁথি সকলকে শোনাক। মহোৎসবে শাঁকচুন্নীর পুঁথি সকলের সামনে যেন পড়ে। পুঁথি অতি বড় যদি হয় তো চুম্বক চুম্বক করে যেন পড়ে। শাঁকচুন্নী একটাও আবোল-তাবোল তো লিখে নাই। আমি তার পুঁথি পড়ে যে কি আনন্দ পেয়েছি, তা আর কি বলব! শাঁকচুন্নীর পুঁথি যাতে খুব বিক্রি হয়, সকলে পড়ে (মিলে) চেষ্টা করবে। তারপর শাঁকচুন্নীকে গাঁয়ে গাঁয়ে প্রচার করতে যেতে বলো। বাহবা, সাবাস, শাঁকচুন্নী। সে তাঁর কাজ করছে। গাঁয়ে গাঁয়ে যাক, লোককে তাঁর কথা শোনাক — এর চেয়ে তার আর কি ভাগ্য হবে?... শশী, শাঁকচুন্নীর পুঁথি and শাঁকচুন্নী himself (নিজে) must electrify the masses (জনসাধারণে শক্তিসঞ্চার করবে)। আরে মোর শাঁকচুন্নী, তোকে প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করছি ভাই! প্রভু তোর কণ্ঠে বসুন, দ্বারে দ্বারে তাঁর নাম শুনাও। সন্ন্যাসী হবার আবশ্যক কিছুই নাই। শশী, mass (জনসাধারণ)-এর মধ্যে সন্ন্যাসী হওয়া উচিত নয়। শাঁকচুন্নী is the future apostle for the masses of Bengal (বাঙলার জনসাধারণের নিকট ভাবী বার্তাবহ)। শাঁকচুন্নীকে খুব যত্ন করবে। তার বিশ্বাস-ভক্তির ফল ফলেছে। শাঁকচুন্নীকে এই ক-টা কথা লিখতে বলো — তার তৃতীয় খণ্ডে, প্রচার খণ্ডে:
'বেদবেদান্ত, আর আর সব অবতার যা কিছু করে গেছেন, তিনি একলা নিজের জীবনে তা করে দেখিয়ে গেছেন। তাঁর জীবন না বুঝলে বেদবেদান্ত অবতার প্রভৃতি বোঝা যায় না-কেন না, He was the explanation (তিনি ব্যাখ্যাস্বরূপ ছিলেন)। তিনি যেদিন থেকে জন্মেছেন, সেদিন থেকে সত্যযুগ এসেছে। এখন সব ভেদাভেদ উঠে গেল, আচণ্ডাল প্রেম পাবে। মেয়ে-পুরুষ-ভেদ, ধনী-নির্ধনের ভেদ, পণ্ডিত-বিদ্বান-ভেদ, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-ভেদ সব তিনি দূর করে দিয়ে গেলেন। আর তিনি বিবাদভঞ্জন-হিন্দু-মুসলমান-ভেদ, ক্রিশ্চান-হিন্দু ইত্যাদি সব চলে গেল। ঐ যে ভেদাভেদে লড়াই ছিল, তা অন্য যুগের; এ সত্যযুগে তাঁর প্রেমের বন্যায় সব একাকার।'
এই ভাবগুলো তার ভাষায় বিস্তার করে লিখতে বলবে। যে তাঁর পূজা করবে, সে অতি নীচ হলেও মুহূর্তমধ্যে অতি মহান্ হবে — মেয়ে বা পুরুষ। আর এবারে মাতৃভাব-তিনি মেয়ে সেজে থাকতেন, তিনি যেন আমাদের মা-তেমনি সকল মেয়েকে মার ছায়া বলে দেখতে হবে। ভারতে দুই মহাপাপ-মেয়েদের পায়ে দলানো, আর 'জাতি জাতি' করে গরীবগুলোকে পিষে ফেলা। He was the Saviour of women, Saviour of the Masses, Saviour of all high and low.২ আর শাঁকচুন্নী ঘরে ঘরে তাঁর পূজা করাক। ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, মেয়ে বা পুরুষ — তাঁর পুজোয় সকলের অধিকার। যে ঘটস্থাপনা বা প্রতিমা করে তাঁর পূজা করবে — মন্ত্র হোক বা না হোক — যেমন করে যে-ভাষায় যার হাত দিয়ে হোক-খালি ভক্তি করে যে পূজা করবে, সেই ধন্য হয়ে যাবে। এই ডৌলে লিখতে বলো। কুছ পরোয়া নাই; প্রভু তার সহায় হবেন। কিমধিকমিতি
নরেন্দ্র
১ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি প্রণেতা অক্ষয়কুমার সেন মহাশয়কে স্বামীজী আদর করিয়া 'শাঁকচুন্নী' নামে ডাকিতেন। স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার সেনকে শ্যামপুকুরে 'শাঁকচুন্নী মাস্টার' আখ্যা দেন —
"জনে জনে আখ্যা দিলা নরেন্দ্র এখানে।
সৌভাগ্যবিদিত হৈনু শাঁকচুন্নী নামে ॥"
তাঁহার বর্ণ ছিল ঘনকৃষ্ণ এবং শরীর রুগ্ন ও মধ্যমাকৃতি-সমস্ত মিলিয়া প্রায় কদাকার বলিলেই হয়। স্বামীজী সম্ভবত এই জন্যই রহস্যপূর্বক তাঁহাকে এই নাম দিয়াছিলেন। কলকাতায় ঠাকুরদের বাড়িতে বালকদিগকে পড়াইতেন বলিয়া তাঁহার অপর নাম ছিল 'অক্ষয় মাস্টার'। 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণপুঁথি' রচনা করিয়া ইনি অক্ষয়কীর্তি লাভ করিয়াছেন।
এই 'পুঁথি'র প্রশংসায়
স্বামীজী শতমুখ
ছিলেন —"তাঁর কণ্ঠে তিনি আবির্ভাব হচ্ছেন। ধন্য শাঁকচুন্নী! ... আমি তাঁর
পুঁথি পড়ে যে কি আনন্দ পেয়েছি তা আর কি বলব! ... আরে মোর শাঁকচুন্নী, তোরে
প্রাণখুলে আশীর্বাদ করছি, ভাই! ... শাঁকচুন্নী বাঙলার জনসাধারণের ভাবী
বার্তাবহ।”
২
তিনি স্ত্রীজাতির উদ্ধারকর্তা,
ইতরসাধারণের উদ্ধারকর্তা, উচ্চ-নীচ সকলের উদ্ধারকর্তা।
তত্কালীন সংবাদপত্রে প্রকাশিত পর্যালোচনা
OPINIONS OF THE PRESS
Ramkrishna Paramhansa is a great character of the Ninteenth Century. His life is a life, worth to be studied by all. Therefore we take special interest in all the works that deal with his life and teachings. This RAMKRISHNA PUNTHI — the book which is now before us — is surely an excellent addition to his biographical literature. We heartly thank the author Babu Akshoy Kumar Sen, for his splendid work, and we hope our countrymen will not get the support of the public, and the work dies for want of funds, the disgrace will be ours and not of the author.
The book is not only interesting and instructive, but it
contains some lines here and there which might be called real poesy.
The author's language is often faulty, but he seems to be not a man of
letter, and writes out of inspiration. His ignorance of grammar and
rhetoric has given to his book the simplicity and the purity of nature;
and he has painted his GURU as perhaps he really was.
— THE QUEEN December 17th, 1894.
Babu Akshoy Kumar Sen has done a very valuable service, to the cause of Hinduism by undertaking to publish the story of Ramkrisna's life, of which the first part only has be given to the public. The book is being written in verse after the simple and elegant style of the great masters, Krittibas and Kasidas. We sincerely congratulate the writer on this happy choice of style. The subject cannot be rendered better in any other. Is it too much to expect that the sacredness of the subject matter combined with all the charms of expression with which it has been embellished will find an admirer, to say the least, in every nook and corner of Bengal, the land which has been hallowed with the birth and presence of the sweet should and simple saint the divine Ramkrisna.
— THE WEEKLY NEWS February 2nd, 1895.
The SRI SRI RAM KRISHNA PUNTHI is a metrical biography of Paramhansa Ram Krisna by Babu Akshay Kumar Sen. For Ram Krishna's sake at least this biography deserves public patronage.
— THE INDIAN MIRROR, November 24th, 1894.
ভগবান্ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের চরিতামৃত বা ভাগবত বর্ণনোদ্দেশে, শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার সেন, এই পুঁথি বা ভাগবত রচনা করিয়াছেন। পূজনীয় বৃন্দাবন দাস যেমন চৈতন্নভাগবত রচনা করিয়াছেন, পূজনীয় শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার সেনও সেইরূপ পুঁথি বা রামকৃষ্ণভাগবত রচনা করিয়াছেন। রামকৃষ্ণচরিত সামান্য মনুষ্য-চরিত নহে, এবং যিনি এই চরিত রচনা করিবার অধিকার লাভ করিয়াছেন, তিনিও সামান্য জীবশ্রেণীভুক্ত নহেন। যাঁহারা অবতারবাদ মানেন এবং যাঁহারা চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা আমাদের এই কথার তাৎপর্য্য বুঝিবেন।
বাবু অক্ষয়কুমার সেন সাধারণের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত। তাঁহার আকার ও অবস্থাদি দেখিলে সহসা কাহারও মনে হইবে না যে, রামকৃষ্ণ পুঁথির ন্যায় পুঁথি বা ভাগবত তাঁহার দ্বারায় কখন লিখিত হইতে পারে? কিন্তু ভগবানের লীলায় সকলই অলৌকিক। তিনি কাহার দ্বারায় যে কোন কার্য্য করান, তাহা সামান্য মনুষ্যবুদ্ধির সম্পূর্ণ অতীত। রামকৃষ্ণ পুঁথি লিখিবার পূর্ব্বে, অক্ষয় বাবু কখন দুই ছত্র কবিতা একত্র করিয়া লিখেন নাই, অথচ যখন লিখিলেন, তখন একেবারেই এই সুবৃহৎ গ্রন্থ অতিশয় সুললিত ছন্দে ও মধুর ভাষায় রচনা করিয়া ফেলেন। বিদ্যাবুদ্ধিহীন অক্ষয়কুমার পর্যায়ক্রমে বাল্য; মধ্য, প্রকাশ বা প্রচার এবং অন্ত এই চারি খণ্ডে রীতিমত রামকৃষ্ণপুঁথি লিখিয়া জগৎকে চমৎকৃত করিয়া দিলেন। সকলেই জানেন, রামায়ণরচয়িতা বাল্মীকিও প্রথমে মূর্খ নিষ্ঠুর দস্যু বলিয়া পরিচিত ছিলেন। শ্রীচৈতন্য লীলায় জগাই মাধাই এক মুহূর্তে সাধুত্তম হইইয়া গিয়াছিলেন। সেইরূপ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলায়ও বহুবিধ অলৌলিক ঘটনা ঘটিয়াছে। অক্ষয় বাবুর সম্বন্ধে আমরা যতদূর জানি, তাঁহাতেও ঠিক এইরূপ আশ্চর্য। অলৌকিক ব্যাপারই ঘটিয়াছিল বলিতে হইবে। তিনি যখন প্রথমে ঠাকুরের নিকটে গমন করেন, তখন তিনি একদিন কাতর হইয়া ঠাকুরকে বলেন যে, আমি কানা। ঠাকুর তাহাতে কেবল মাত্র আকাশের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দেন, আর কোন কথাই কহেন না। ঠাকুর তখন যে কি অর্থে সেরূপ উর্দ্ধে দেখাইয়া দেন, তাহা সামান্য মনুষ্যবুদ্ধির একেবারেই অগোচর। কিন্তু আজ সেই অক্ষয় বাবু যে কিরূপ কানা, তাহা তাঁহার পুঁথিই তাহার উপযুক্ত সাক্ষী দিতেছে। যাহা হউক, যে পুঁথি এবং যাঁহার পুঁথি তিনি লিখিয়াছেন, তাহা জগতে অতুলনীয়। অবতারবাদ মানিলে পূজনীয় বৃন্দাবন দাস পুনরায় ভগবানের লীলা বর্ণনা করিতে মর্ত্যধামে আসিয়াছেন, এ বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। শ্রীমদ্ভাগবত ও শ্রীচৈতন্য ভাগবত যে শ্রেণীর গ্রন্থ, পুঁথিও যে সেই শ্রেণীর গ্রন্থ, তাহা বলাই অত্বাক্তি মাত্র।
সংবাদ প্রভাকর, কলিকাতা ১৪ই পৌষ, শকাব্দ ১৮১৬।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি অর্থাৎ শ্রীশ্রীভগবান রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের চরিতামৃত। প্রথম খণ্ড শ্রীঅক্ষয়কুমার সেন কর্তৃক প্রণীত ও প্রকাশিত। এই খণ্ডে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বাল্যলীলা বর্ণিত হইয়াছে। অক্ষয় বাবু মহাকার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন! আজকাল লোকে চুটকী চটকেই আত্মহারা, নাটক নভেলেই জিয়ন্তে মরা ! দুট রসের কথাতেই প্রাণভর। এ বাজারে যদি এইরূপ মহাপুরুষদিগের জীবনী প্রকাশিত হয়, তাহা হইলে আমাদের বিশ্বাস এ বিপ্লবে অনেক বাধা পড়িবে, এ আবিল স্রোতের খর-প্রবাহ মন্দীভূত হইয়া আসিবে, আবার ধর্মভাব তৃণাচ্ছাদিত “ভায়লেট” কুসুমের ন্যায় ধীরে ধীরে মস্তক উত্তোলন করিয়া দেখা দিবে। অক্ষয় বাবু এ কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়া যথার্থই দেশের ও দশের উপকার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, এ জন্য তিনি অনাদের ধন্যবাদের পাত্র। পুঁথিখানি পদ্যে রচিত। কবি কৃত্তিবাস, কাশীদাসের প্রণালী অবলম্বন করিয়। অক্ষয় বাবু পয়ার ত্রিপদী প্রভৃতি বিবিধ সুললিত ছন্দে জীবনী প্রকাশ করিতেছেন, আমরা প্রথমখণ্ড পাঠ করিইয়া পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি, একে সাধক জীবনের অপূর্ব্ব মহিমা, তার উপর আবার রামকৃষ্ণ আমাদের মধ্যেই ছিলেন, কাজেই তাঁহার জীবনী যে সাধারণের পক্ষে আদরের হইবে, ইগাই আমাদের ধ্রুব বিশ্বাস। লেখার প্রণালী মধুর ও প্রাঞ্জল। বুঝিবার পক্ষে কোন কষ্ট নাই। ভরসা করি, হিন্দুমাত্রেই অক্ষয় বাবুর প্রণীত এই সাধক-জীবনী ক্রয় করিবেন, ইহাতে ঐহিক ও পারত্রিক উভয়ত্র মঙ্গল হইবে, পারত্রিক মঙ্গলেচ্ছ কোন হিন্দু ইহাতে বিরত হইবে?
সুলভ দৈনিক, কলিকাতা ৯ই অগ্রহায়ণ, শনিবার, ১৩০১ সাল।
রামকৃষ্ণাষ্টকম্ স্তোত্রম্
শ্রীমদভেদানন্দস্বামিনা বিরচিতম্
বিশ্বস্য ধাতা পুরুষস্তমাদ্যো-
ঽব্যক্তেন রূপেণ ততং ত্বয়েদম্।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ১ ॥
ত্বং পাসি বিশ্বং সৃজসি ত্বমেব,
ত্বমাদিদেবো বিনিহংসি সর্বম্।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং
কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ২ ॥
মায়াং সমাশ্রিত্য করোষি লীলাং,
ভক্তান্ সমুদ্ধর্তুমনন্তমূর্তে!
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৩ ॥
বিধৃত্য রূপং নরবত্ত্বয়া বৈ,
বিজ্ঞাপিতো ধর্ম ইহাতিগুহ্যঃ।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৪ ॥
তপোঽথ ত্যাগমদৃষ্টপূর্বং,
দৃষ্টা নমস্যন্তি কথং ন বিজ্ঞাঃ।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৫ ॥
তন্নাম শ্রুত্বাত্র ভবন্তি ভক্তা,
বরন্তু দৃষ্টাপি ন ভক্তিযুক্তাঃ।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৬ ॥
সত্যং বিভুং শান্তমনাদিরূপং,
প্রসাদয়ে ত্বামজমন্তশূন্যম্।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৭ ॥
জানামি তত্ত্বং নহি দৈশিকেন্দ্রং,
কিংবা স্বরূপং কথমেব ভাবম্।
হে রামকৃষ্ণ! ত্বয়ি ভক্তিহীনে,
কৃপাকটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্ ॥ ৮ ॥
ইতি শ্রীরামকৃষ্ণাষ্টকম্।
গুরু বন্দনা
জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছা-কল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান্ জগতের গুরু ॥ ১ ॥
জয় হে অনাথ-নাথ পতিত-পাবন ।
জয় জয় দীন-বন্ধু অধম-তারণ ॥ ২ ॥
কৃপাসিন্ধু দীনের ঠাকুর তুমি হরি ।
জয় রামকৃষ্ণ পরমহংস নামধারী ॥ ৩ ॥
পতিত পাবন জয় অগতির গতি ।
দীনশরণ তুমি দীনে রাখ প্রীতি ॥ ৪ ॥
ভুবন-পাবন জয় ভক্ত-গলহার ।
জগজন-তারক হারক ভবভার ॥ ৫ ॥
জয় হৃদি-রঞ্জক ভঞ্জক ভব-ভয় ।
করণ-কারণ কর্তা হয় স্থিতি লয় ॥ ৬ ॥
তুমি শিব তুমি শক্তি নারায়ণ তুমি ।
তুমি রাম তুমি কৃষ্ণ অখিলের স্বামী ॥ ৭ ॥
তুমিই সচ্চিদানন্দ পূর্ণব্রহ্ম হরি ।
জয় জয় রামকৃষ্ণ নর-রূপধারী ॥ ৮ ॥
নিরাকার সাকার সবার ঘটে স্থিতি ।
জর জয় রামকৃষ্ণ ব্রহ্মাণ্ডের পতি ॥ ৯ ॥
বেদের অগম্য তুমি বেদের অপার ।
জয় জয় রামকৃষ্ণ সর্বসারাৎসার ॥ ১০ ॥
অনন্ত তোমার শক্তি লোকবোধাতীত ।
না দেখালে কোন জনে না হয় প্রতীত ॥ ১১ ॥
করুণাসাগর তুমি জীব-হিতকারী ।
জয় জয় রামকৃষ্ণ দ্বিজবেশধারী ॥ ১২ ॥
জয় প্রেম-ভক্তিদাতা অজ্ঞান-নিবারী ।
জয় জয় রামকৃষ্ণ তিন-তাপ-হারী ॥ ১৩ ॥
সেবানন্দদাতা তুমি শুদ্ধ-বুদ্ধিদাতা ।
জ্ঞানের জনক তুমি
তুমি ভক্তি-মাতা ॥ ১৪ ॥
জীবদুঃখাতুর তুমি করুণা-নিদান ।
অধমে অভয় পদে যেচে দাও স্থান ॥ ১৫ ॥
দুঃখী দাসে বড় বাস বিনা প্রয়োজনে ।
দয়াল তোমার মত না দেখি ভুবনে ॥ ১৬ ॥
স্বার্থশূন্যে কর অন্যে কৃপারাশিদান ।
দ্বিতীয় কে বল তব সম দয়াবান্ ॥ ১৭ ॥
শুন রে
অবোধ মন কহি করজুড়ি ।
গাও গাও রামকৃষ্ণ দিবা-বিভাবরী ॥ ১৮ ॥
থাক মন অভয় কমল-পদে
তাঁর ।
উদ্ধারি আপনা কর আমায় উদ্ধার ॥ ১৯ ॥
জপ রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ নাম গাও ।
তরিয়া
আপনি আগে আমারে তরাও ॥ ২০ ॥
ভঙ্গ পূজ রামকৃষ্ণ সেই রূপ ধ্যান ।
তিনি সকলের সার এই
কর জ্ঞান ॥ ২১ ॥
ডাক রামকৃষ্ণে ছাড়ি কপট চাতুরী ।
জীব-হিত-সদাব্রত ভবের কাণ্ডারী ॥ ২২ ॥
ছি ছি মন
ছাড় ছাড় কামিনী-কাঞ্চন ।
অকিঞ্চিতে কেন কর বৃথা আকিঞ্চন ॥ ২৩ ॥
ছাড়ি পাদপদ্মে মধু
কেন মর বুলে ।
বিষময় সংসার কাঁটার কিয়াফুলে ॥ ২৪ ॥
গেছে পাখা তবু
শিক্ষা এখন না
হ'ল ।
মায়া অন্ধ কিয়া গন্ধ ভাবিছ কেবল ॥ ২৫ ॥
কিয়া-রেণু তোর তনু সর্বাঙ্গ
ব্যাপেছে ।
কণ্ঠশ্বাস প্রাণে আশ আর কিবা আছে ॥ ২৬ ॥
কর না বারেক
রামকৃষ্ণ-গুণ-গান ।
নাহি কিছু রামকৃষ্ণ-নামের সমান ॥ ২৭ ॥
পতিত-পাবন নাম গিয়াছেন
রেখে ।
দেখ ফল করে বল একবার ডেকে ॥ ২৮ ॥
অমৃত অপেক্ষা তাঁর নাম মিঠে লাগে ।
মূর্তিমান হয়ে নাম হৃদয়েতে জাগে ॥ ২৯ ॥
নাহি কিছু রামকৃষ্ণ-নামের উপমা ।
যে
করেছে সে মজেছে তারে আছে জানা ॥ ৩০ ॥
একে যদি খায় মিষ্ট অন্যে নহে মজা ।
অবিশ্বাসী হৃদয়ের ফল মাত্র সাজা ॥ ৩১ ॥
কোটিজন্মার্জিত পাপ হরে একবারে ।
কায়মনে
যদি রামকৃষ্ণ নাম করে ॥ ৩২ ॥
দয়াল ঠাকুর নিজে বলেছেন কথা
।
তিনি দায়ী তাঁর নামে
যাহার মমতা ॥ ৩৩ ॥
ভাবাবেশে উল্লাসে আশ্বাসি উচ্চরবে ।
পতিতপাবন নামে সকল সম্ভবে ॥ ৩৪ ॥
পাপ নাশ কিবা কথা সেবাভক্তি পায় ।
উপায় যে ভাবে মাত্র রামকৃষ্ণ পায় ॥ ৩৫ ॥
যাগ
যজ্ঞ যপ তপ না পায় সন্ধানে ।
কি দেন ঠাকুর মোর নিলে তাঁর নামে ॥ ৩৬ ॥
যে যা করে
দেখ মন কি কাজ বিচারি ।
গাও গাও রামকৃষ্ণ দিবা বিভাবরী ॥ ৩৭ ॥
দুবাহু তুলিয়া গাও
সরল পরাণে ।
তাজ ব্যাজ লোকলাজ সরম-ভরমে ॥ ৩৮ ॥
নিষ্ঠামনে ইষ্ট জনে কর সারাৎসার। ।
সর্ব্বশ্রেষ্ঠ রামকৃষ্ণ ঠাকুর আমার ॥ ৩৯ ॥
সাজাইতে বড় সাধ আমার অন্তরে ।
নাহি
অর্থ ধন-রত্ন সাজাতে তাঁহারে ॥ ৪০॥
স্বতই সুন্দর তিনি জন-মনোহর ।
ভুবন-মোহন
মূর্তি সুন্দর আকর ॥ ৪১ ॥
যেই মতে সাজাইত মুক্তা-লতা-বনে ।
দাম বসুদাম আদি সুবল
শ্রীদামে ॥ ৪২ ॥
সুদীর্ঘ মুকুতা-হার মুকুতার চূড়া ।
মুকুতা-বসন মুকুতার
গুঞ্জবেড়া ॥ ৪৩ ॥
মুকুতায় সাজাইত শ্রবণ-কুণ্ডলে ।
মুকুতা-নূপুর দিত বাঁধি পদতলে ॥ ৪৪ ॥
মুকুতার বালা করি পরাইত হাতে ।
সাজাত মুকুতা দিয়া সাজিত যেমতে ॥ ৪৫ ॥
মুকুতায়
সাজাইত মোহন বাঁশরী ।
সাজাইতে সেই মতে বড় সাধ করি
॥ ৪৬ ॥
ভুবন সাজান যিনি সাজাইতে তাঁরে ।
যামন হইয়া চাই চাঁদ ধরিবারে ॥ ৪৭ ॥
যদ্যপি করিতে প্রভু কর্মকার জেতে ।
বনাতাম সিংহাসন যেন আছে চিতে ॥ ৪৮ ॥
করিয়া কায়স্থ মোর হাতে দিলে কাঠি ।
দিবানিশি কাটি কাল কালি ঘাঁটি
ঘাঁটি ॥ ৪৯ ॥
পেটের জ্বালায় ঘুরি সাহেবের দ্বারে ।
জনমের মত দুঃখ রহিল অন্তরে ॥ ৫০ ॥
সাজাইতে
একমাত্র দিয়াছ চন্দন ।
ইহাতে বনাব যত সব আভরণ ॥ ৫১ ॥
কমল সহস্র দল থরে থরে আনি ।
মনোহর সিংহাসন বনাব অমনি ॥ ৫২ ॥
চন্দনের চূড়া চন্দনের মালা গলে ।
কিবা শোভা
মনলোভা চন্দনকুগুলে ॥ ৫৩ ॥
চন্দনের মুক্তালতা ঘেরা চারি পারে ।
চন্দনের
গুঞ্জবেড়া মন-প্রাণ হরে ॥ ৫৪ ॥
চন্দনের বানাইব বিচিত্র আসন ।
পরাব তোমারে প্রভু
চন্দন-বসন ॥ ৫৫ ॥
নানা জাতি সুগন্ধি কুসুম আনি তুলি ।
সাজাই ঠাকুর মোর প্রাণের
পুতুলি ॥ ৫৬ ॥
সুঘন দুধের ভোজা করিয়া যতনে ।
বারে বারে দিতে ভোগ বড় হয় মনে ॥ ৫৭ ॥
আরে
মন সমর্পণ সব কর পদে ।
প্রাণ মান আদি যত বৈভব সম্পদে ॥ ৫৮ ॥
শুদ্ধ তাঁরে সার কর
জান বৃদ্ধি বল ।
সম্পদ বিপদ সখা সহায় সম্বল ॥ ৫৯ ॥
কেন মন অকারণ অনিত্য সংসারে ।
বারে বারে মর ঘুরে ছাড়িয়া ঠাকুরে ॥ ৬০ ॥
ভাই বল বন্ধু বল কিবা সুত দারা ।
স্বার্থপর সব নর সময়েতে তারা ॥ ৬১ ॥
এখন সময় আছে কেন পাও কষ্ট ।
বল মন সর্বক্ষণ
হরে রামকৃষ্ণ ॥ ৬২ ॥
অগণ্য প্রভুর ভক্ত ইষ্ট গোষ্ঠী জান ।
নাহিক আপন কেহ তাঁদের সমান ॥ ৬৩ ॥
সযতনে দেখ মন ভক্তে রেখ ক্রীতি ।
আত্মীয়স্বজন তাঁরা তাঁরা বন্ধু জ্ঞাতি ॥ ৬৪ ॥
ভক্তমধ্যে ছোট বড় জ্ঞান হয় ভ্রম ।
সকলে আমার পূজ্য বুঝাবে এমন ॥ ৬৫ ॥
ছোট বড় বিচারেতে নাহি অধিকার ।
সকলে বুঝিবে রামকৃষ্ণ-পরিবার ॥ ৬৬ ॥
রামকৃষ্ণ-ভক্তে বুঝ জীবন-জীবন ।
ভাব মন দিবা নিশি তাঁদের চরণ ॥ ৬৭ ॥
গৃহস্থ সন্ন্যাসী ভক্ত এই দুই শ্রেণী ।
সকলের রজে আশে লুটাও অবনি ॥ ৬৮ ॥
ভক্ত বন্দনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
গললগ্ন-কৃতবাস ভক্তগণ আগে ।
সবার চরণ-রেণু অভাগিয়া মাগে ॥ ১ ॥
রামকৃষ্ণ-ভক্তসম নাহি কিছু আর ।
যাদের হৃদয়মধ্যে প্রভুর আগার ॥ ২ ॥
যাহা কিছু নাহি মিলে শাস্ত্র-আলাপনে ।
অনায়াসে হয় লভ্য ভক্ত-দরশনে ॥ ৩ ॥
ভক্তের অসাধ্য কিছু নাহিক সংসারে ।
পঙ্গুরে করিলে দয়া লঙ্ঘে গিরিবরে ॥ ৪ ॥
অন্ধেরে করিলে কৃপা দিব্যচক্ষু মিলে ।
সুমধুর গুপ্ত খেলা দেখে কুতুহলে ॥ ৫ ॥
শুষ্ক কাঠে যদি কৃপা-কণা দান করে ।
ফুল পত্র প্রসবিয়া তখনি মুঞ্জরে ॥ ৬ ॥
আচোট পাষাণে যদি দেখে আঁখি মিলে ।
দ্রবময়ী বারি হয়ে স্রোত বহি চলে ॥ ৭ ॥
সুমূর্খ উপরে যদি দয়া উপজয় ।
আগম নিগম বেদ হৃদয়ে উদয় ॥ ৮ ॥
ভক্তি বলি যেই বস্তু ভক্তি-শাস্ত্রে বলে ।
শাস্ত্র-অধ্যয়নে সেই ভক্তি নাহি
মিলে ॥ ৯ ॥
পঞ্জিকাতে যেন কত আড়া জল লেখা ।
নিঙ্গুড়িলে পাঁজি নাহি বিন্দু যায় দেখা ॥ ১০ ॥
সেইমত ভক্তি-শাস্ত্রে ভক্তি-বিবরণ ।
আছে মাত্র নাহি মিলে ভকতি-রতন ॥ ১১ ॥
সেই
ভক্তি লাভ ভক্ত-সেবনেতে হয় ।
সত্যাপেক্ষা অতি সত্য কহিনু নিশ্চয় ॥ ১২ ॥
প্রভুপদ
লভিতে যাহার আছে মন ।
আগে ভজ শ্রীপ্রভুর ভকত-চরণ ॥ ১৩ ॥
ভক্তের মহিমা-গানে
নাহিক শকতি ।
সুমূর্খ পামর আমি হীন-বুদ্ধি-মতি ॥ ১৪ ॥
প্রভুভক্ত সম পূজা আর কিবা
আছে ।
গুরুভক্ত-পদরজ অভাগিয়া যাচে
॥ ১৫ ॥
কৃপাবিন্দু ভক্ত-বৃন্দ কর মোরে দান ।
অধমেরে যুগল চরণে দেহ স্থান ॥ ১৬ ॥
পদরজ বিনে মম গতি নাহি আর ।
রজ-রত্ন দিয়া
হবে করিতে উদ্ধার ॥ ১৭ ॥
আর এক মাগি ভিক্ষা তোমা সবা ঠাঁই ।
দেহ শক্তি ঠাকুরের
লীলা কিছু গাই ॥ ১৮ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাগানে বড় অভিলাষ ।
কারণ তাহার নিয়ে করিনু প্রকাশ ॥ ১৯ ॥
শহরে চাকুরি করি পাড়াগাঁয়ে ঘর ।
অন্নকষ্ট হেতু চিরকাল দেশান্তর ॥ ২০ ॥
বৎসরান্তে যদি কিছু দিন ছুটি পাই ।
দেখিবারে সবে ঘরে দেশে চলে যাই ॥ ২১ ॥
নাহি পেলে অবসর যাওয়া নাহি হয় ।
স্নেহময়ী জননীর দুঃখ অতিশয় ॥ ২২ ॥
শিন্নি মানসিক মাতা করে সত্যপীরে ।
দিব পূজা সত্যপীর ছেলে এলে ঘরে ॥ ২৩ ॥
একবার ঘরে যবে জননী আমার ।
হাঁড়ি হাঁড়ি মোয়ালাড়ু করি স্তূপাকার ॥ ২৪ ॥
পূজা দেন সত্যপীরে শুভবার তিথি ।
পুরোহিতে করে পাঠ সত্যপীর পুঁথি ॥ ২৫ ॥
শুনিতে শুনিতে পুঁথি কেঁদে উঠে প্রাণী ।
কেন সত্যপীর পূজা কেন তায় সিন্নি ॥ ২৬ ॥
দয়াল ঠাকুর মোর পতিতপাবন ।
ক্ষণে ক্ষণে হৃদিমধ্যে হয় উদ্দীপন ॥ ২৭ ॥
সাধ এঁটে ফুটে উঠে অন্তর ভিতরে ।
রামকৃষ্ণ ঠাকুরের পুঁথি পেলে পরে ॥ ২৮ ॥
হেনরূপে নিমন্ত্রিয়া যত গ্রামবাসী ।
রাখিতাম প্রভু-প্রিয় জিলিপির রাশি ॥ ২৯ ॥
বসাইয়া সিংহাসনে ঠাকুর আমার ।
চন্দনে সাজায়ে দিতু গলে ফুলহার ॥ ৩০ ॥
আনি তুলে শতদল-পদ্ম অগণন ।
করিতাম চারিধারে কমল-কানন ॥ ৩১॥
আয়োজন নানা ভোজ্য যায়
তাঁর প্রীতি ।
আপনি করিতু পাঠ রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩২ ॥
এই উপজিল সাধ পুঁথি কিসে পাই ।
বিষম সমস্যা পুঁথি লিখি শক্তি নাই ॥ ৩৩ ॥
প্রভু সম প্রভু-ভক্ত অতুল শকতি ।
দয়ায় বনায়ে দেহ রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩৪ ॥
আমার অতীত সাধ্য নাই বুদ্ধি বল ।
তোমাদের পদরজ ভরসা সম্বল ॥ ৩৫ ॥
কৃপা-শক্তি দিয়া মোরে কর বলীয়ান্ ।
যেন পারি করিবারে প্রভু-লীলা গান ॥ ৩৬ ॥
লিখি পুরি লোকখ্যাতি নাহি আশা মনে ।
শুদ্ধমাত্র তাই পুঁথি পাঠের কারণে ॥ ৩৭ ॥
দেহ রামকৃষ্ণভক্তি আর পুঁথি তাঁর ।
তোমা সবা প্রভু-ভক্তে প্রার্থনা আমার ॥ ৩৮ ॥
নাহি চাই জপ তপ ধ্যান আচরণে ।
সাযুজ্য সালোক্য আদি
সামীপ্য নির্বাণে ॥ ৩৯ ॥
নাহি চাই সিদ্ধাই ঐশ্বর্য্য আদি যত ।
বিড়ম্বনা মাত্র বোধ নহে মনোমত ॥ ৪০ ॥
সাজাইব মনমত ঠাকুর আমার ।
অবিরত রব রত সেবাতে তাঁহার ॥ ৪১ ॥
মনে
মনে এই সাধ উঠে দিবারাতি ।
তাই মাগি তোমা ঠাঁই রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৪২ ॥
ইতি বন্দনা শেষ
প্রথম খণ্ড
শ্রীপ্রভুর জন্মকথা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
হুগলি জেলায় গ্রাম কামারপুকুর ।
সৎ
দ্বিজকুলে জন্ম হৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ১ ॥
চাটুয্যে শ্রীখুদিরাম জনক তাঁহার ।
তেজস্বী ব্রাহ্মণ অতি শুদ্ধ নিষ্ঠাচার ॥ ২ ॥
জাতিগত কর্ম যাহা সব আচরণ ।
রূপ তপ
ধ্যান পূজা তীর্থপর্যটন ॥ ৩ ॥
হইলে দূরস্থ তীর্থ নির্ভয় অন্তর ।
পায়ে হেঁটে
যান সেতুবন্ধ রামেশ্বর ॥ ৪ ॥
ন্যায়পরায়ণ তেঁহ ধার্মিক সুধীর ।
রামভক্ত শালগ্রাম
ঘরে রঘুবীর ॥ ৫ ॥
আর দুটি ঠাকুরের ঘরেতে বিরাজ ।
একটি শীতলামাতা অন্য ধর্মরাজ
॥ ৬ ॥
মূর্তিত্রয়ে পূজিবারে বড়ই পিরীত ।
সিদ্ধবাক্ দ্বিজবর দেশেতে খেয়াতি ॥ ৭ ॥
নানান কাহিনী তাঁর নানা জনে রটে ।
আজ্ঞায় বেলার গাছে নিত্য ফুল ফুটে ॥ ৮ ॥
প্রতিদিন প্রত্যুষেতে পূজার কারণে ।
বাহির হইলে তেঁহ কুসুম-চয়নে ॥ ৯ ॥
পশ্চাতে পশ্চাতে তাঁর যাইয়ে আপনি ।
আরাধ্যা শীতলামাতা বালিকারূপিণী ॥ ১০ ॥
আভরণে শোভে অঙ্গ পরিধেয় লাল ।
নুয়ায়ে ধরিত দ্বিজে কুসুমের ডাল ॥ ১১ ॥
যে ডালে অনেক ফুল আছয়ে ফুটিয়া ।
তুলিতেন দ্বিজবর আনন্দে পুরিয়া ॥ ১২ ॥
ব্রহ্মশক্তি-পরিপূর্ণ তেজপুঞ্জ কার ।
দেখিলেই শ্রদ্ধা-ভক্তি আপনি উজার ॥ ১৩ ॥
নির্ধন যদিও তাঁর ঘরে নাই অর্থ ।
সম্মুখে দাঁড়াতে কারো না ছিল সামর্থ্য ॥ ১৪ ॥
যে
পুকুরে নিতি নিতি হ'ত স্নান তাঁর ।
তাঁর আগে নামে জলে সাধ্য নাই কা'র ॥ ১৫ ॥
নিষ্ঠাচারে বড় আঁটা তেজস্বী ব্রাহ্মণ ।
শূদ্রদত্ত দ্রব্য নহে কখন গ্রহণ ॥ ১৬
॥
গেরুয়া বসনপরা গম্ভীর আকার ।
কোন কালে নহে যাওয়া ঘরে যার তার ॥ ১৭ ॥
গ্রামে জানে
পদ-রজে ব্যাধিনাশ হয় ।
পরশিতে পদদ্বয় কাঁপিত হৃদয় ॥ ১৮ ॥
গ্রাম-পথে যেতে নত লোক
সারি সারি ।
গললগ্নবাস লুটে দোকানী পসারী ॥ ১৯ ॥
এদিকে দয়াল হৃদি অতি মিষ্টভাষী ।
উদার সরল সমন্বিত গুণরাশি ॥ ২০ ॥
নিজে যেন সেই মত ভার্যা গুণবতী ।
মূর্তিমতী দয়া যেন গঠন আকৃতি ॥ ২১ ॥
ক্ষুধার্ত
যে কেহ গিয়া দাঁড়ালে দুয়ারে ।
যতনে দিতেন তিনি যা থাকিত ঘরে ॥ ২২ ॥
অন্তরেতে সরলতা এত দীপ্তিমান ।
উত্তর পূরব কিছু না ছিল গেয়ান ॥ ২৩ ॥
অবিদিত সাত পাঁচ পরহিতে রত ।
নিরুপম অলৌকিক গুণ কব কত ॥ ২৪ ॥
সামান্যা নহেন ইনি ব্রাহ্মণের ঘরে ।
ভূভার-হরণ প্রভু ধরেন উদরে ॥ ২৫ ॥
প্রভুর জননী হন আমাদের আই ।
অতঃপর এই আখ্যা দিয়া তাঁরে গাই ॥ ২৬ ॥
কোটি কোটি দণ্ডবৎ আইর চরণে ।
আক্ষেপ বড়ই তাঁয় না দেখি নয়নে ॥ ২৭ ॥
গলবাস করজোড়ে সকলের আগে ।
আইর চরণরেণু অভাগিয়া মাগে ॥ ২৮ ॥
তাঁহার ভাগ্যের কথা না যায় বাখানি ।
তিন পুত্র প্রসবেন আই ঠাকুরানী ॥ ২৯ ॥
শ্রীরামকুমার আগে, মাঝে রামেশ্বর ।
সবার কনিষ্ঠ প্রভু করুণা সাগর ॥ ৩০ ॥
কন্যাদ্বয় মধ্যে দেবী কাত্যায়নী জ্যেষ্ঠা ।
সর্বমঙ্গলা দেবী তাঁহার কনিষ্ঠা ॥ ৩১ ॥
জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামের অক্ষয় নন্দন ।
কৈশোর বয়সে দেহ ছাড়িল জীবন ॥ ৩২ ॥
মধ্যমের দুই পুত্র একটি নন্দিনী ।
রামলাল, শিবরাম, লক্ষ্মী ঠাকুরানী ॥ ৩৩ ॥
এই কয় মাত্র দেখি ইষ্টপরিবার ।
অসংখ্য প্রণাম করি শ্রীপদে সবার ॥ ৩৪ ॥
আইর যে গর্ভে জন্ম লইলেন প্রভু ।
আশ্চর্য কাহিনী হেন নাহি শুনি কভু ॥ ৩৫ ॥
একবার পিতা তাঁর গয়াধামে যান।
তথায় কিবা শুনহ আখ্যান ॥ ৩৬ ॥
একদিন দ্বিজবর দেখেন স্বপন ।
অতি সুমধুর কথা
আশ্চর্য কখন ॥ ৩৭ ॥
শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম চতুর্ভুজধারী ।
শ্যাামল উজ্জ্বল কার করজোর
করি ॥ ৩৮ ॥
পুত্র হ'য়ে জনমিব তোমার আগারে ।
হাসিয়া হাসিয়া কথা কন দ্বিজবরে ॥ ৩৯ ॥
উত্তরে কহেন দ্বিজ ওরে বাছাধন ।
কি খাওয়াব তোরে আমি দরিদ্র ব্রাহ্মণ ॥ ৪০॥
পুনশ্চ মুরতি কহে ব্রাহ্মণের ঠাঁই ।
আমার পোষণে ভার চিন্তা কিছু নাই ॥ ৪১ ॥
এত বলি নিমিষের মধ্যে অন্তর্ধান ।
অদর্শনে
ব্রাহ্মণের আকুল পরাণ ॥ ৪২ ॥
নিদ্রা-ভঙ্গে উঠিলেন ব্রাহ্মণ চমকি ।
এ ঘোর রজনীযোগে
একি রূপ দেখি ॥ ৪৩ ॥
আপনার মনে দ্বিজ করিয়া বিচার ।
অবগত হইলেন মর্ম কি ইহার ॥ ৪৪ ॥
হেথা আই ঠাকুরানী আপন ভবনে ।
কহিতেছিলেন কথা নারীত্রয় সনে ॥ ৪৫॥
শিবের মণ্ডপ এক
আছিল অদূরে ।
দেখিলেন আসে কিবা বায়ুরূপাকারে ॥ ৪৬ ॥
আসিয়া প্রবেশ কৈল গর্ভেতে
তাঁহার।
ভয়ার্ত হইল আই দেখিয়া ব্যাপার ॥ ৪৭ ॥
যে তিন নারীর সঙ্গে কথা হ'তেছিল ।
আই ঠাকুরানী তত্ত্ব ভাঙ্গিয়া কহিল ॥ ৪৮ ॥
নানা জনে নানা মতে নানা কথা কহে ।
অবাক
হইয়া আই দাঁড়াইয়া রহে ॥ ৪৯ ॥
নারীত্রয় মধ্যে এক ধনী কামারিনী ।
পশ্চাৎ গাইব আমি
তাঁহার কাহিনী ॥ ৫০ ॥
অতি ভাগ্যবতী এই কামারের মেয়ে ।
থাকিলে নিতাম তাঁর পদরজ
গিয়ে ॥ ৫১ ॥
প্রভুতে বাৎসল্য বড় আছিল তাঁহার ।
কত ভাগ্য এ সৌভাগ্য ঘটয়ে কাহার ॥ ৫২ ॥
ভুবনপাবন যিনি বাঞ্ছাকল্পতরু ।
অনাথের নাথ যিনি জগতের গুরু ॥ ৫৩ ॥
সম্বোধন করিতেন তাঁহারে মা বলি ।
এ অভাগা মাগে হেন জন পদধূলি। ॥ ৫৪ ॥
বিচার না করি কিছু
জাতিকুলাচার ।
রামকুকে যেবা 'বাসে পুজ্য সে সবার ॥ ৫৫ ॥
ব্রাহ্মণ হইয়া যদি প্রভুদ্বেষী হয় ।
চণ্ডাল হইতে নীচ মম মনে লয় ॥ ৫৬ ॥
গয়াধাম হইতে চাটুয্যে মহাশয় ।
করম সমাধা করি ফিরিলা আলয় ॥ ৫৭ ॥
সব নিবেদিলা তাঁরে আই ঠাকুরানী ।
যে দিনে যেখানে যাহা দেখিলেন তিনি ॥ ৫৮ ॥
স্বপনের কথা দ্বিজ স্মরিয়া অন্তরে ।
আইরে কহেন কথা না কবে কাহারে ॥ ৫৯ ॥
দিন দিন যায় যত গর্ভ তত বাড়ে ।
কান্তি দেখে অপরের ভ্রান্তি হয় তাঁরে ॥ ৬০ ॥
আইর লাবণ্যচ্ছটা অতি অপরূপ ।
স্বরূপ ঘুচিয়া হইল সুরূপ স্বরূপ ॥ ৬১ ॥
স্বভাব হৈল যেন ঠিক পাগলিনী ।
দেখে শুনে প্রতিবাসী করে কানাকানি ॥ ৬২ ॥
যেরূপ রূপের ছটা গর্ভিণীর গায় ।
বোধ হয় ব্রহ্মদৈত্য পেয়েছে উহায় ॥ ৬৩ ॥
কেহ কয় বহু বয়ঃ গর্ভ তায় হ'ল ।
বাঁচে কি না বাঁচে বুঝি এইবার গেল ॥ ৬৪ ॥
আইও কেমন হৈলা ভূতে পাওয়া মত ।
কখনও উল্লাস ত্রাস কথা নানা মত ॥ ৬৫ ॥
কখনও বলেন তিনি হৃদি অকপটে ।
পতিস্পর্শে গর্ভ নয় কি ঢুকেছে পেটে ॥ ৬৬ ॥
দেখেন শুনেন কত গর্ভ-অবস্থায় ।
অতি অসম্ভব কথা কহনে না যায় ॥ ৬৭ ॥
গর্ভ-অবস্থার কথা সুন্দর ভারতী ।
দেখেন কতই দেব-দেবীর মুরতি ॥ ৬৮ ॥
তিন চার মাস গর্ভ আইর যখন ।
একদিন ঘটে এক অদ্ভুত ঘটন ॥ ৬৯ ॥
অলসে অবশ তনু শুইয়া দুয়ারে ।
কপাট করিয়া বন্ধ আপনার ঘরে ॥ ৭০ ॥
হেনকালে শুনিলেন আই ঠাকুরানী ।
রুনুঝুনু নূপুরের সুমধুর ধ্বনি ॥ ৭১ ॥
কুতূহলে যত আই কান পাতি শুনে ।
ততই নূপুর বাদ্য বাজে ঘনে ঘনে ॥ ৭২ ॥
আশ্চর্য গণিয়া আই ভাবে মনে মন ।
নূপুরের বাদ্য ঘরে হয় কি কারণ ॥ ৭৩ ॥
কপাট করেছি বন্ধ শূন্য ঘর দেখি ।
বুঝি মোর অগোচরে কেহ গেছে ঢুকি ॥ ৭৪ ॥
এত ভাবি
কপাট খুলিয়া দেখে আই ।
ঠিক সেই শূন্য ঘর কেহ কোথা নাই ॥ ৭৫ ॥
কারে কিছু না কহিয়া
মৌন হয়ে রন ।
স্বামীরে কহিলা ঘরে আইলা যখন ॥ ৭৬ ॥
নূপুরের বাদ্য ঘরে কি কারণ হয় ।
বুঝি না কি হেতু, তাই হয়েছে বিস্ময় ॥ ৭৭ ॥
ব্রাহ্মণ বুঝিল তত্ত্ব ভার্যার কথায় ।
লয়ে তাঁরে সংগোপনে কতই বুঝায় ॥ ৭৮ ॥
এ অতি মঙ্গল কথা না করিবে ভয় ।
হইবে গোকুলচাঁদ ভবনে উদয় ॥ ৭৯ ॥
আর দিন নিদ্রাযোগে দেখেন স্বপন ।
কি সুন্দর শিশু কোলে করে আরোহণ ॥ ৮০ ॥
বুকে উঠে ছোট হাতে গলা ছেঁদে ধরে ।
জিনি শশী রূপরাশি সুহাসি অধরে ॥ ৮১ ॥
অস্পষ্ট কতই কথা ধীরে ধীরে বলি ।
অবশেষে বুক হ'তে পড়িল পিছলি ॥ ৮২ ॥
অমনি চমকি আই জাগিয়া উঠিলা ।
কোথা গেলি বলি আই কাঁদিতে লাগিলা ॥ ৮৩ ॥
স্বপনের কথা
পরে বুঝিয়া আপনে ।
সংবরিলা আঁখিজল আপন নয়নে ॥ ৮৪ ॥
কত কি দেখেন আই কব আমি ক'টা ।
ঘরের ভিতরে কোটি বিজলীর ছটা ॥ ৮৫ ॥
কোন দিন পাইতেন চন্দনের বাস ।
চন্দনের কাঠে
যেন নির্মিত আবাস ॥ ৮৬ ॥
কোন দিন দিব্য গন্ধ পাইতেন ঘরে ।
যেন কত পদ্মবন ঘেরা
চারি ধারে॥ ৮৭ ॥
এইরূপে আট নয় দশ মাস গত ।
আইর প্রসবকাল হৈল উপস্থিত ॥ ৮৮ ॥
প্রহরেক বেলা যাবে, ঠাকুরানী কন ।
বড়ই আসিছে মোর প্রসব-বেদন ॥ ৮৯ ॥
শুনিয়া চাটুষ্যে কন ইহা কও কিবা ।
এখন না হ'ল ঘরে রঘুবীর-সেবা ॥ ৯০ ॥
ঠাকুরের ভোগ রাগ হয়ে গেলে সব ।
তখন হইবে তুমি দিনান্তে প্রসব ॥ ৯১ ॥
যথা কথা দ্বিজ-আজ্ঞা দিবা অবসান ।
সন্ধ্যাকালে দ্বিতীয়ার চাঁদ দীপ্তিমান ॥ ৯২ ॥
প্রসবের স্থান নির্ধারিত ঢেঁকিশালে ।
প্রসব হইল আই কুশলে কুশলে ॥ ৯৩ ॥
সন বার বিয়াল্লিশ ছয়ই১ ফাল্গুনে ।
শুরু পক্ষ বুধবার দ্বিতীয়া সে দিনে ॥ ৯৪ ॥
রবি বৃষ চন্দ্র গ্রহ শুভ লগ্নে ধরি ।
ভূমিতলে অবর্তীর্ণ গোলকবিহারী ॥ ৯৫ ॥
রঙ্গময় রঙ্গপ্রিয় রঙ্গের কারণ ।
বারে বারে হয় তাঁর মর্ত্যে আগমন ॥ ৯৬ ॥
জন্মমাত্র রঙ্গের আরম্ভ হৈল তাঁর ।
তাজ্জব অদ্ভুত কথা বিস্ময় ব্যাপার ॥ ৯৭ ॥
ঢেঁকির লেজের তলে গর্ত এক থাকে ।
সদ্যোজাত ট্যাঁ করিয়া তথা গেছে ঢুকে ॥ ৯৮ ॥
ধনী কামারিনী ছিল অদূরে বসিয়ে ।
শিশুর রোদন শুনি উতরিল ধেয়ে ॥ ৯৯ ॥
মহানন্দে আসি ধনী ইতি উতি চায় ।
সূতিকা-আগারে শিশু দেখিতে না পায় ॥ ১০০ ॥
বিস্ময় মানিয়া ধনী খুঁজে চারিধারে ।
পায় শেষে ঢেঁকিলেজ-গর্তের ভিতরে ॥ ১০১ ॥
সুদীর্ঘ আকার শিশু পরম সুন্দর ।
শোভা পার গায় বর্ণ জিনি শশধর ॥ ১০২ ॥
চাটুয্যে মশায়ে ধনী ডাকে উভরায় ।
পরম সুন্দর শিশু দেখনা হেথায় ॥ ১০৩ ॥
ত্বরা করি আসি দ্বিজ করে নিরীক্ষণ ।
দিব্য সুলক্ষণ অঙ্গে শিশু সুশোভন ॥ ১০৪ ॥
পুলকে পূর্ণিত দ্বিজ গদ গদ কায় ।
নয়ন নিস্পন্দ নাহি নিমিখ্ তাহায় ॥ ১০৫ ॥
সংগোপনে রাখিবারে কহিলেন কথা ।
যেন কেহ নাহি শুনে এ সব বারতা ॥ ১০৬ ॥
জনক জননী
ভাসে আনন্দ-সাগরে ।
বাড়য়ে আহলাদ যত পুত্রমুখ হেরে ॥ ১০৭ ॥
সূতিকা-আগারে যেন পূর্ণ
চন্দ্রোদয় ।
যেই দেখে তার মনে এই মত লয় ॥ ১০৮ ॥
শুনি প্রতিবাসী আসে দেখিবারে ছেলে ।
ছেলে দেখে সবে যায় নিজ ছেলে ভুলে ॥ ১০৯ ॥
একবার মাত্র শিশু হেরিয়া নয়নে ।
দিবানিশি
দেখে আসি এই হয় মনে ॥ ১১০ ॥
প্রতিবাসিনীরা সব আসি একে একে ।
অপূর্ব আনন্দ পায়
চাঁদমুখ দেখে ॥ ১১১ ॥
অপরূপ আনন্দেতে সবে ভাসমান।
কেন এ আহলাদ কিছু না বুঝে
সন্ধান ॥ ১১২ ॥
নানা কথা নানা জনে করে কানাকানি ।
এমন সুন্দর ছেলে না দেখি না
শুনি ॥ ১১৩ ॥
কেমন এ ছেলে দেখে জীবন জুড়ায় ।
শুধু অঙ্গ তবু যেন মণি-রত্ন গায় ॥ ১১৪ ॥
দেখেছি তো কত ছেলে এ ছেলে কেমন ।
দিবানিশি ব'সে দেখি এই হয় মন ॥ ১১৫ ॥
নিকটস্থ
গ্রামে গ্রামে পড়ে গেল সাড়া ।
হয়েছে বাছনি মুখ চন্দ্রিমার পাড়া ॥ ১১৬ ॥
দলে দলে
মেয়ে ছেলে আসে দেখিবারে ।
অপূর্ব আনন্দ পায় চাঁদমুখ হেরে ॥ ১১৭ ॥
এ সময়ে চাটুয্যের
আর্থিক সঙ্গতি ।
দিন দিন যায় যত ততই উন্নতি ॥ ১১৮ ॥
বিষয়-সম্বলে দ্বিজ অতিশয় কমি ।
ভূসম্পত্তি
মাত্র তাঁর সাতপোয়া জমি ॥ ১১৯ ॥
'লক্ষ্মীজলা' জমিনের এই হয় নাম ।
বর্ষায় ব্রাহ্মণ অগ্রে তিন গোছা ধান ॥ ১২০ ॥
স্বহস্তে ঈশান কোণে দিতেন পুঁতিয়া ।
জয় জয় রঘুবীর ঠাকুর বলিয়া ॥ ১২১ ॥
এই অল্প ভূমিখণ্ডে যাহা কিছু ফলে ।
বছরের গুজরান সেই ধানে চলে ॥ ১২২ ॥
আর এক ছিল তাঁর আয়ের উপায় ।
ধনাঢ্য ব্রাহ্মণ যারা জানিত তাঁহায় ॥ ১২৩ ॥
শুদ্ধসত্ত্ব সদাচারী ধর্মপথে মন ।
মাসে মাসে কিছু দিত ব্যয়ের কারণ ॥ ১২৪ ॥
যে কোন ব্রাহ্মণে দিলে গ্রহণ না হ'ত ।
বিশেষতঃ যে ব্রাহ্মণে শূদ্র যজাইত ॥ ১২৫ ॥
ব্যয়ের নাহিক ত্রুটি অবস্থা যেমন ।
যেন
হোক দিনে রেতে খায় দশজন ॥ ১২৬ ॥
ছটি ছটি খান অন্ন ঘরে রঘুবীর ।
নিত্য নিত্য সমাগত
অতিথি ফকির ॥ ১২৭ ॥
প্রশস্ত পথের পাশে ব্রাহ্মণের ঘর ।
যে পথে অতিথি নাগা চলে
নিরন্তর ॥ ১২৮ ॥
সে পথে পুরুষোত্তমে যাত্রিগণ চলে ।
উঠে ব্রাহ্মণের ঘরে ক্ষুধা
তৃষ্ণা পেলে ॥ ১২৯ ॥
বড়ই দয়ার্দ্রচিত্ত গরীব ব্রাহ্মণ ।
সামান্য মাটির ঘর খড়-আচ্ছাদন ॥ ১৩০ ॥
তাও অতি ছোট ছোট নহে পরিসর ।
সংখ্যায় অনেক নয় তিনখানি ঘর ॥ ১৩১ ॥
তার মধ্যে একখানি ঢেঁকিশালা তাঁর ।
এখন যেখানে আছে ধানের হামার ॥ ১৩২ ॥
ভিটার ছপ্পর তাঁর বাহ্য দরশন ।
দেখিলেই মনে হয় দীন-নিকেতন ॥ ১৩৩ ॥
তথাপিহ হেন ভাব ভবন উপরে ।
দেখামাত্র দর্শকের মন প্রাণ হরে ॥ ১৩৪ ॥
চারি ধারে বৃক্ষ লতা অতি মনোরম ।
যেন মহা তপঃপর ঋষির আশ্রম ॥ ১৩৫ ॥
শুদ্ধসত্ত্বভাবময় শান্তিকর স্থান ।
ক্ষুধাতৃষ্ণাবারি দয়া সদা বিদ্ধমান ॥ ১৩৬ ॥
তৃষা দূর করিবারে পথিকনিচয় ।
উপনীত হলে পরে ব্রাহ্মণ-আলয় ॥ ১৩৭ ॥
অতি আনন্দিত তেঁহ মহা সমাদরে ।
না খাইয়ে শাক-অন্ন নাহি দেন ছেড়ে ॥ ১৩৮ ॥
আর্থিক উন্নতি এই অন্যে অন্ন-দান ।
কোথা হতে জুটে ঘরে না জানে সন্ধান ॥ ১৩৯ ॥
প্রভু পুত্র যার তার অভাব কিসের ।
লক্ষ্মী ঘরে আড়ি ধরা ভাণ্ডারী কুবের ॥ ১৪০ ॥
পিতা মাতা প্রতিবাসী বুঝিতে না পারে ।
শিশুরূপী ভগবান কত খেলা করে ॥ ১৪১ ॥
একদিন
আই ঠাকুরানী লয়ে ছেলে ।
সূর্য-তাপ দেন গায় শোয়াইয়া কোলে ॥ ১৪২ ॥
বিশ্বম্ভর আবেশ
হইল শিশু-গায় ।
কোলে ছেলে বড় ভারী আই টের পায় ॥ ১৪৩ ॥
অসহ্য দেখিয়া থোন কুলার উপরে ।
সশয্যা সে কুলাখান চড় চড় করে ॥ ১৪৪ ॥
কি হোল কি হোল বলি করেন রোদন ।
নিশ্চল
সুস্থির শিশু বিহীন স্পন্দন ॥ ১৪৫ ॥
কুলা হ'তে পুনঃ কোলে লইবার তরে ।
বার বার
ঠাকুরানী কত চেষ্টা করে ॥ ১৪৬ ॥
কোনমতে উঠাইতে না পারে বাছনি ।
তখন ব্যাকুল প্রাণে
কাঁদেন জননী ॥ ১৪৭ ॥
শুনিয়া রোদন-ধ্বনি যে যথায় ছিল ।
সন্নিধানে ত্বরান্বিত আসিয়া
জুটিল ॥ ১৪৮ ॥
আই ঠাকুরানী কন ছেলে কেন ভারি ।
কুলা হ'তে কোলে আর উঠাতে না পারি ॥ ১৪৯ ॥
অদূরে নিম্বের এক বড় বৃক্ষ আছে ।
তায় বাসা ব্রহ্মদ্বৈত্য শিশুরে ধরেছে ॥ ১৫০ ॥
মনে
এই অনুমান করি লোকজন ।
ভুতুড়িয়া আনিবারে পাঠায় তখন ॥ ১৫১ ॥
কাঁদুনি গাহিয়া মন্ত্র ভুতুড়িয়া বলে ।
হালকা হইল শিশু উঠাইল কোলে ॥ ১৫২ ॥
আর দিন ছেলে রাখি গৃহ কাজে যান ।
শয্যা-সন্নিকটে এক আছিল উনান ॥ ১৫৩ ॥
আগুন না ছিল তার ছিল মাত্র পাঁশ ।
তখন ছেলের বয়ঃ দুই তিন মাস ॥ ১৫৪ ॥
বিছানা হইতে ছেলে গিয়াছেন সরে ।
অর্ধেক উনান মধ্যে অর্ধেক বাহিরে ॥ ১৫৫ ॥
সুকান্তি শিশুর গায় চাঁদ হারে দেখে ।
লুটালুটি যায় ভূ'য়ে ধুলা ছাই মেখে ॥ ১৫৬ ॥
ছুটাছুটি আসে আই দেখিয়া ব্যাপার ।
পরাণ-পুতুলি যথা লুটায় তাঁহার ॥ ১৫৭ ॥
অতি চীৎকার করে উঠাইয়া কোলে ।
বলেন কি হেতু দেখি দ্বীর্ঘকায় ছেলে ॥ ১৫৮ ॥
এই শোয়াইয়া গেছি বিছানা উপর ।
কে বল ফেলিল লয়ে উনান ভিতর ॥ ১৫৯ ॥
কেমনে হইল ছেলে দীর্ঘতায় কায় ।
এই ছোট দেখে রেখে গেছি বিছানায় ॥ ১৬০ ॥
এতেক কহিয়া যবে কাঁদেন জননী ।
শুনি ধেয়ে উতরিল ধানী কামারিনী ॥ ১৬১ ॥
গরজিয়া কামারিনী বলিল বচন ।
মা হইয়া অমঙ্গল কহ কি কারণ ॥ ১৬২ ॥
দাও দাও ছেলে মোরে গা ঝাড়িয়া দিব ।
যদি কিছু হ'য়ে থাকে মন্তরে মারিব ॥ ১৬৩ ॥
এত বলি লয়ে করে মন্ত্র উচ্চারণ ।
তখনি হইল ছেলে পূর্বের মতন ॥ ১৬৪ ॥
কেবা ধনী কামারিনী নন্দরানী প্রায় ।
অদ্ভুত রমণী দেখি প্রভুর লীলায় ॥ ১৬৫ ॥
শিশুরূপী ভগবান চাটুয্যে-ভবনে ।
আরম্ভ করিলা বেলা যেন আসে মনে ॥ ১৬৬ ॥
বিচিত্র প্রভুর খেলা অবোধ্য আভাস ।
পিতামাতা প্রতিবাসী সবার তরাস ॥ ১৬৭ ॥
দিনে দিনে তিন চারি মাস হৈল গত ।
ঘটনা ঘটিল এক অতি অদ্ভুত ॥ ১৬৮ ॥
সংসারের কার্যে আই যান গৃহান্তরে ।
পঞ্চম মাসের শিশু শোয়াইয়া ঘরে ॥ ১৬৯ ॥
ফিরে আসি দেখে আই নিজ ছেলে নাই ।
মশারিপ্রমাণ আর জন তাঁর ঠাঁই ॥ ১৭০ ॥
উচ্চৈঃস্বারে ডাকে আই পতিরে সম্ভাষি ।
বিছানায় ছেলে নাই, দেখ না গো আসি ॥ ১৭১ ॥
এ কেবা রয়েছে শুয়ে অতি দীর্ঘকায় ।
দেখ কে লইল বল আমার বাছায় ॥ ১৭২ ॥
ব্রাহ্মণ ভয়ার্ত হয়ে যান তরান্বিতে ।
প্রবেশিলা সেই ঘরে ভার্যার সহিতে ॥ ১৭৩ ॥
দেখেন শুইয়া খেলে আপন বাছনি ।
তুলে কোলে দেন মাই আই ঠাকুরানী ॥ ১৭৪ ॥
বিস্ময়া
ভার্যায় দেখি দ্বিজবর ক'ন ।
যা দেখেছ সত্য, আছে তাহার কারণ ॥ ১৭৫ ॥
কদাচ এ সব কথা
না কবে কাহারে ।
অসম্ভব এ সব সম্ভব নহে নরে ॥ ১৭৬ ॥
শাবাশ মায়ার খেলা যাই বলিহারি ।
হৃদয়ে উদয় যাহা বর্ণিতে না পারি ॥ ১৭৭ ॥
ঐশ্বর্য ভুলিয়া গেল ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী ।
সস্নেহে দেখেন বারবার মুখখানি ॥ ১৭৮ ॥
ঘন ঘন দেন চুম্ব বদন-কমলে ।
নয়নের ধারা ব'য়ে পড়ে বক্ষঃস্থলে ॥ ১৭৯ ॥
শুভদিনে ষষ্ঠ মাসে মুখে ভাত পড়ে ।
আনন্দের নাহি সীমা ব্রাহ্মণের ঘরে ॥ ১৮০ ॥
গরীব ব্রাহ্মণবাড়ি কিন্তু আজি দিনে ।
চর্ব-চুষ্য-লেহ-পেয় পায় চারি বর্ণে ॥ ১৮১ ॥
গ্রামের ব্রাহ্মণ আর যতেক সজ্জাতি ।
বৈষ্ণব ভিখারী প্রতিবাসী জোলা তাঁতী ॥ ১৮২ ॥
সমভাবে সকলে উদর পুরি খায় ।
কুলের ঠাকুর রঘুবীরের কৃপায় ॥ ১৮৩ ॥
আজি আনন্দের স্রোত
তথা যাহা বহে ।
তিল-আধ সাধ্য কাহার বিবরিয়া কহে ॥ ১৮৪॥
এদিকে দেবান্নে তৃপ্তি হইল
উদর ।
অন্যদিকে মনের প্রাণের তৃপ্তিকর ॥ ১৮৫ ॥
পরম সুন্দর শিশু রূপের আধার ।
শোভে
অঙ্গরূপে জিনি মণি অলঙ্কার ॥ ১৮৬ ॥
নব বস্ত্র আভরণ সুশোভিত গায় ।
ভালে চন্দনের
রেখা হারায় শোভায় ॥ ১৮৭ ॥
কিবা শোভা পায় গায় চন্দনাভরণে ।
দীপ্তিহীন মণিরাজি তার
সন্নিধানে ॥ ১৮৮ ॥
একে তো সুন্দর তায় চন্দনে চর্চিত ।
যে দেখে স্বচক্ষে হয় সেই
মুগ্ধচিত ॥ ১৮৯ ॥
বিরিঞ্চিবাঞ্ছিত দৃশ্য বদনমণ্ডলে ।
কামারপুকুরবাসী দেখে ল'য়ে কোলে ॥ ১৯০ ॥
নাম রাখিবার কাল এল দিনে দিনে ।
কি নাম রাখিবে পিতামাতা ভাবে মনে ॥ ১৯১ ॥
গয়াধামে গদাধর করি দরশন ।
পাইলেন কোলে হেন কুমার রতন ॥ ১৯২ ॥
সেই হেতু রাখিলেন নাম গদাধর ।
ডাকেন গদাই বলি করিয়া আদর ॥ ১৯৩ ॥
গুরুদত্ত নাম রামকৃষ্ণ নাম খ্যাত ।
রামকৃষ্ণ পরমহংস ভুবনে বিদিত ॥ ১৯৪ ॥
জোড়া নামে গড়া নাম নামের মহিমা ।
বেদবিধি নাহি পারে করিবারে সীমা ॥ ১৯৫ ॥
জীবের
পরম ধন পরিণামে গতি ।
ভাগ্যবান নামে যার জনমে পিরীতি ॥ ১৯৬ ॥
রতি-মতি রামকৃষ্ণ
নামে এই চাই ।
কৃপা করি দেহ দীনে ঠাকুর গদাই ॥ ১৯৭ ॥
আর এক রূপা ভিক্ষা ওহে
লীলাপতি ।
ঊরহ হৃদয়ে কণ্ঠে লিখাইতে পুঁথি ॥ ১৯৮ ॥
১
পূর্ব সংস্করণে (১ম সংস্করণ) ১২৪১
সন ১০ই
ফাল্গুন লেখা হইয়াছিল; অভ্রান্ত 'লীলাপ্রসঙ্গে'র
মতে উহার পরিবর্তন করা হইল। — লেখক
ঐ গ্রন্থমতে জন্ম রাত্রি অর্থদণ্ড
অবশিষ্ট থাকিতে । — প্রঃ
প্রথম খণ্ড
শিবের আবেশ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুন মন সুন্দর প্রভুর বাল্যকথা ।
সুগুহ্য হইতে গুহ্য এ সব বারতা ॥ ১ ॥
বড়ই মধুর কথা বড়ই আশ্চর্য ।
জননীরে দেখাতেন কতই ঐশ্বর্য ॥ ২ ॥
মাঝে মাঝে শিবনেত্র সম হ'ত আঁখি ।
নিশ্চল সুস্থির প্রায় আই তাহা দেখি ॥ ৩ ॥
কাঁদিতেন কত নব শিশু করি কোলে ।
ব্রহ্মদৈত্য পাইয়াছে শৈশব ছাওয়ালে ॥ ৪ ॥
'মানসিক' দেবতায় করেন জননী ।
দু'নয়নে বারিধারা কতই না জানি ॥ ৫ ॥
ভূতপতি শিবনাম কাছে উচ্চারণ ।
করিলে হইত পরে আঁখি উন্মীলন ॥ ৬ ॥
অধরে মধুর হাসি চাহি মা'র পানে ।
ভুলাতেন জননীরে মাই মুখে টেনে ॥ ৭ ॥
এইরূপে দুই তিন বর্ষ গেলে পরে ।
সমান বয়স শিশু সঙ্গে খেলা করে ॥ ৮ ॥
লাহা নামে ধনাঢ্যবংশীয় সেই গ্রামে ।
যাওয়া আসা হয় তাঁর তাঁদের ভবনে ॥ ৯ ॥
নাম ধর্মদাস লাহা বড় কারবারি ।
বহু ধনেশ্বর বহু টাকা কড়ি ॥ ১০ ॥
আপনে করেন যত খাতায় লিখন ।
কত টাকা কারবারে হয় বিতরণ ॥ ১১ ॥
বিষয়ে বিষয়ী লোক ডুবে এক মনে ।
বিশেষে হিসাবকালে খাতা খতিয়ানে ॥ ১২ ॥
মনোযোগ সেই মত অন্য কিসে নয় ।
সেহেতু বিষয় বিষ ভক্তগণে কয় ॥ ১৩ ॥
কিন্তু ধর্মদাস খাতা খতিয়ান কালে ।
গদাধরে ঘরে তাঁর আসিতে দেখিলে ॥ ১৪ ॥
আর না হইত তাঁর হিসাবেতে মন ।
কি জানি কি করিতেন তাঁহে দরশন ॥ ১৫ ॥
বলিতেন ধর্মদাস শিশু গদাধরে ।
যাও বাপ খাও গিয়া কি রেখেছে ঘরে ॥ ১৬ ॥
পুত্রনির্বিশেষে বাসে লাহার গৃহিণী ।
কতই আদর করে না যায় বাখানি ॥ ১৭ ॥
যত্নে
পোষা কত গাই দুধ দেয় কত ।
নানাবিধ দুগ্ধদ্রব্য ঘরে জনমিত ॥ ১৮ ॥
খাওয়াতেন গদাধরে পরম যতনে ।
গদাই কতই ক'ন শুনিতেন কানে ॥ ১৯ ॥
আপন নন্দন
গয়াবিষ্ণু নাম খ্যাতি ।
সমবয়ঃ গদা'য়ের সঙ্গে বড় প্রীতি ॥ ২০ ॥
কর্তৃপক্ষ উভয়ের
পিরীতি দেখিয়ে ।
দিয়াছিলা পরস্পর সেঙ্গাত পাতায়ে ॥ ২১ ॥
সেঙ্গাতের নামান্তর সখা
কই যারে ।
কি সৌভাগ্য গয়াবিষ্ণু সখা পায় কারে ॥ ২২ ॥
অখিলের নাথ যিনি জগতের পিতা ।
সঙ্গে তাঁর গয়াবিষ্ণু করিল মিত্রতা ॥ ২৩ ॥
সঙ্গে নানারূপ খেলা বালকের সনে ।
সসঙ্গী কানাই যেন নন্দের অঙ্গনে ॥ ২৪ ॥
অগণ্য
গোধনেশ্বর গোকুল-মাঝারে ।
এবে ধর্মদাস লাহা কামারপুকুরে ॥ ২৫ ॥
কি বড় করিব বন্দি
যুগলচরণ ।
যার ঘরে খেলে পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ॥ ২৬ ॥
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশের সবার
উপর ।
ধরিয়া মায়িক ধর্ম নয়-কলেবর ॥ ২৭ ॥
গড়িলা নূতন ভেলা মহিমা অপার ।
করিবারে
পতিতেরে ভবসিন্ধু পার ॥ ২৮ ॥
প্রথম খণ্ড
অতিথির বেশধারণ ও ঐশ্বর্য-প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুন মন সুমধুর প্রভু বাল্যলীলা ।
শিশুরূপী ভগবান যে প্রকারে খেলা ॥ ১ ॥
করিলেন কামারপুকুরবাসী সনে ।
শুন শুন শুন
মন শুন একমনে ॥ ২ ॥
আর কত গ্রামের বালক সঙ্গে জুটে ।
নানা মত করে খেলা ঘরে পথে
মাঠে ॥ ৩ ॥
দেশদশা অনুসারে আই ঠাকুরানী ।
মনোমত করি বেশ সাজান বাছনি ॥ ৪ ॥
লাহাদের
ছিল বড় অতিথি সেবন ।
আসিত যাইত কত শত সাধুজন ॥ ৫ ॥
অতিথি-সেবার শালা ছিল
যেইখানে ।
গদাইর প্রীতি বড় যাইতে সেখানে ॥ ৬ ॥
কখন একাকী কভু সঙ্গিগণ সঙ্গে ।
ভজন
ভোজন আদি দেখিতেন রঙ্গে ॥ ৭ ॥
ভোজন-সময় অতিথিরা অতি প্রীতে ।
ঠাকুর প্রসাদ দিত গদা'য়ের হাতে ॥ ৮ ॥
মহাপ্রেমে
গদাধর লইয়া প্রসাদ ।
সঙ্গী সহ খাইতেন পরম আহলাদ ॥ ৯ ॥
একদিন নববস্ত্র ঠাকুরানী
আই ।
পরাইয়া সাজাইলা প্রাণের গদাই। ॥ ১০ ॥
আনন্দ অন্তর যেন বালকের রীতি ।
আসি
উপনীত হৈলা যথায় অতিথি ॥ ১১ ॥
ডোরকপ্নি-পরা দেখি যত সাধুজনে ।
সে বেশ লাগিল বড়
গদা'য়ের মনে ॥ ১২ ॥
যেন মনে হৈল সাধ কৌপীন পরিতে ।
নববস্ত্র খণ্ড খণ্ড করিয়া ত্বরিতে ॥ ১৩ ॥
অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ডেশ্বর সেই খণ্ড লয়ে ।
ডোরকপ্নি পরিলেন আনন্দিত
হ'য়ে ॥ ১৪ ॥
কৌপীন পরিয়া আনন্দের সীমা নাই ।
নেচে নেচে সমাগত জননীর ঠাঁই ॥ ১৫ ॥
কহেন মায়ের আগে নাচিয়া নাচিয়া ।
অতিথি হয়েছি মাগো দেখ না চাহিয়া ॥ ১৬ ॥
জননী দেখেন সেই নববস্ত্রখানি ।
ছিঁড়িয়া পরেছে নিজে এ ডোর-কৌপীনি ॥ ১৭ ॥
আরে অভাগীর বাছা কি কাজ করিলি ।
এখন করিতে বাপ বুদ্ধি কোথা পেলি ॥ ১৮ ॥
বস্ত্র ছিঁড়ি কৌপীন করিতে কে শিখালে ।
বলিতে বলিতে আই লইলেন কোলে ॥ ১৯ ॥
সন্ন্যাসীর বেশ অঙ্গে দেখিয়া নয়নে ।
শেলের সমান লাগে জননীর প্রাণে ॥ ২০ ॥
শ্রাবণের ধারা জিনি চোখে ঝরে জল ।
অনিমিখ্ চোখে দেখে বদন-কমল ॥ ২১ ॥
হেনকালে খেলার যতেক সঙ্গী ডাকে ।
তাড়াতাড়ি নামিলেন মা'র কোল থেকে ॥ ২২ ॥
নাচিয়া নাচিয়া মিলে তা'
সবার সনে ।
নানা রঙ্গে হয় খেলা বাড়ির প্রাঙ্গণে ॥ ২৩ ॥
খেলিতে দেখিয়া আই ভুলিলা
সকল ।
মোহ বিয়া ভগবান কি করেছে কল ॥ ২৪ ॥
আর দিন আই তাঁর হাতে টু কি দিয়া ।
খাইতে দিলেন মুড়ি গুড় মাখাইয়া ॥ ২৫ ॥
পাড়াগাঁয়ে বালকের যে প্রকারে রীতি ।
খেলিতে
খেলিতে খাওয়া বড়ই পিরীতি ॥ ২৬ ॥
খান মুড়ি গদাধর টুঁকি লয়ে হাতে ।
কি বুঝি হইল ভাব খাইতে খাইতে ॥ ২৭ ॥
বাম হাতে ধরা টুঁকি বালক গদাই ।
স্পন্দহীন হৈল কায় নড়াচড়া
নাই ॥ ২৮ ॥
অনিমেষ দুটি আঁখি মুখে নাই বাণী ।
হেনকালে দেখে এসে আই ঠাকুরানী ॥ ২৯ ॥
উচ্চৈঃস্বরে কাঁদেন গদাই করি কোলে ।
ব্রহ্মদৈত্য পায় তাই দুর্গা দুর্গা
বলে ॥ ৩০ ॥
আই না পারেন কিছু বুঝিতে ব্যাপার ।
রমণীসুলভ মাত্র শুধু চীৎকার ॥ ৩১ ॥
প্রকৃতিস্থ
গদাই হইলা কিছু পরে ।
দেখে শুনে কেহ বুঝিতে না পারে ॥ ৩২ ॥
কখন কখন যেতে মাঠের
আইলে ।
অবশ হইয়া অঙ্গ পড়িতেন ঢলে ॥ ৩৩ ॥
আর কত মত হ'ত নাহি যায় বলা ।
অগাধ জলধি
শিশু-শ্রীপ্রভুর খেলা ॥ ৩৪ ॥
আর দিন মুড়িভরা টুঁকি করি হাতে ।
শিশুসঙ্গে খেলিয়া বেড়ান মাঠপথে ॥ ৩৫ ॥
নাই কোন অন্তরাল চারিধার খোলা ।
নবীন নবীন
মেঘ শূন্যে করে খেলা ॥ ৩৬ ॥
বুঝি না কি ভাব তাঁর হৈল মনে মনে ।
বিভোর হৈল অঙ্গ
চেয়ে মেঘপানে ॥ ৩৭ ॥
বাহ্য জ্ঞান নাহি আর অনিমেষ আঁখি ।
বেঁকে হাত উপুড় হইয়া গেল
টুঁকি ॥ ৩৮ ॥
ভূতলে পড়িল মুড়ি যত ছিল তায় ।
শিশু গদা'য়ের লীলা না আসে কথার ॥ ৩৯ ॥
বলিবার নয় কথা বলিতে কি আছে ।
মহাভক্ত বেদব্যাস কোথা ভেসে গেছে ॥ ৪০ ॥
আমি
হীনবুদ্ধি মতি তুচ্ছ অতিশয় ।
কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত সমল-হৃদয় ॥ ৪১ ॥
শকতি কোথায় লীলা গাইব কেমনে ।
বুঝিয়াছে মন কিন্তু নাহি বুঝে প্রাণে ॥ ৪২ ॥
মম সম ক্ষিপ্ত কোথা প্রাণে যার আশ ।
বেলায় বালুকা লয়ে দেউল প্রয়াস ॥ ৪৩ ॥
মিঠে লোভে আঁটি গিলে
রটে জনশ্রুতি ।
ছাড়িতে না পারি মিষ্ট রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৪৪ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-কথা
বলে সাধ্য কার ।
যোগেশ বুঝিতে নারে মুই কিবা ছার ॥ ৪৫ ॥
দয়া কর দীনবন্ধু অগতির গতি ।
বড় সাধ লিখিবারে রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৪৬ ॥
প্রথম খণ্ড
রঘুবীরের মালাগ্রহণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর বাল্য-খেলা অতি সুললিত
।
গাহিলে শুনিলে প্রাণ অতি প্রফুল্লিত ॥ ১ ॥
বিশ্বাস-আকর কথা শ্রীপদে তাঁহার ।
গাব
দেহ শক্তি প্রভু শক্তির আগার ॥ ২ ॥
একদিন দেখিলেন জনক তাঁহার ।
অনুরাগে গাঁথে প্রাতে দিব্য ফুলহার ॥ ৩ ॥
চন্দন কুসুম কত আয়োজন করে ।
পূজিবারে রঘুবীর শালগ্রাম ঘরে ॥ ৪ ॥
পরম সুঠাম
শিলা রূপের পুতলি ।
শুন মন এ শিলার কথা কিছু বলি ॥ ৫ ॥
কর্ম-প্রয়োজনে একবার
দ্বিজবর ।
চলেন মেদিনীপুর দূরস্থ শহর ॥ ৬ ॥
দু'তিন দিনের পথ পশ্চিম-দক্ষিণে ।
কর্ম করে তথা এক তাঁহার ভাগিনে ॥ ৭ ॥
প্রথম দিবস গেল দ্বিতীয় আইলে ।
বসিলেন ক্লান্তকার এক বৃক্ষমূলে ॥ ৮ ॥
অলসে অবশ তনু করিলা শয়ন ।
অজ্ঞাতে অজ্ঞাতে তাঁর নিদ্রা-আকর্ষণ ॥ ৯ ॥
দেখেন আশ্চর্য কথা স্বপ্নে দ্বিজবর ।
এক নব দূর্বাদল-বর্ণ কলেবর ॥ ১০ ॥
সুঠাম কুমার-বয়ঃ হাতে ধনুর্বাণ ।
শিরেতে সুন্দর জটা ছলে লম্বমান ॥ ১১ ॥
কহিলেন দ্বিজবরে কাকুতি করিয়া ।
দেখ এক
সাধু মোরে গিয়াছে ফেলিয়া ॥ ১২ ॥
মাটির ভিতর আমি আছি ধানক্ষেতে ।
দিনান্তেও একবার নাহি পাই খেতে ॥ ১৩ ॥
লইয়া চল না তুমি আপন ভবন ।
যাইতে তোমার সঙ্গে বড় মম মন ॥ ১৪ ॥
ব্রাহ্মণ বলেন বাছা কি কহ আমার ।
গরিব কি আছে দিব খাইতে তোমার ॥ ১৫ ॥
শুনিয়া কুমার কহে কিছু নাহি চাই ।
যদি নিতি নিতি দুটি চটি অন্ন পাই ॥ ১৬ ॥
নিদ্রাভঙ্গে দ্বিজবর উঠিলা চমকি ।
এবা কিবা অপরূপ স্বপনেতে দেখি ॥ ১৭ ॥
সাত-পাঁচ ভাবি দ্বিজ ধানক্ষেতে যান ।
খুঁজেন
আগোটা ক্ষেত না পান সন্ধান ॥ ১৮ ॥
হতাশ হইয়া পরে ভাবে মনে মন ।
খুঁজিনু ক্ষেতেতে যেন দেখিনু স্বপন ॥ ১৯ ॥
মিথ্যা কি এ সত্য কথা পুনঃ নিদ্রা যাব ।
সত্য হ'লে পুনরায় দেখিতে পাইব ॥ ২০ ॥
এত ভাবি দ্বিজবর করিলা শয়ন ।
পূর্ববৎ কুমারের দেখেন স্বপন ॥ ২১ ॥
কুমার বলেন দুটো-ধান-গাছ-তলে ।
নিশ্চয় পাইবে তুমি পুনশ্চ খুঁজিলে ॥ ২২ ॥
নিদ্রাভঙ্গে দ্বিজবর ধান-ক্ষেতে যান ।
দুটো ধান গাছতলে দেখিবারে পান ॥ ২৩ ॥
পরম সুন্দর এক শিলা মনোহর ।
কিন্তু এক কাল ফণী তাহার উপর ॥ ২৪ ॥
স্বপনের বার্তা দ্বিজ স্মরিয়া অন্তরে ।
ফণীকে না করি ভয় শালগ্রাম ধরে ॥ ২৫ ॥
ধরামাত্র দেখিলেন ফণী নাই আর ।
ফিরিলেন মহানন্দে আপন আগার ॥ ২৬ ॥
সেই এই রঘুবীর প্রাণের পুতলি ।
নিত্যসেবা করে ঘরে বড় কুতূহলী ॥ ২৭ ॥
আজি সাজাইতে ফুলে ব্রাহ্মণের আশ ।
আয়োজন ফুলহার অন্তরে উল্লাস ॥ ২৮ ॥
সুন্দর কুসুম-মালা গাঁথা অনুরাগে ।
ভকতি-চন্দন তার দলে দলে লেগে ॥ ২৯ ॥
সেই মালা গদা'য়ের পরিতে বাসনা ।
কেমনে পরেন মালা করেন ভাবনা ॥ ৩০ ॥
অদ্ভুত, কথায় কিছু বলিবার নাই ।
শুনহ কেমনে মালা পরিল গদাই ॥ ৩১ ॥
চক্রীর বিষম চক্র কে বুঝিতে পারে ।
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশের বুদ্ধিবল হারে ॥ ৩২ ॥
পূজায় বসিলা পিতা দেখেন চাহিয়া ।
পূজোপকরণ যত সম্মুখে লইয়া ॥ ৩৩ ॥
ঠাকুরে করায়ে স্নান সোহাগে ব্রাহ্মণ ।
আঁখি মুদি রঘুবীরে করেন স্মরণ ॥ ৩৪ ॥
স্মরণ উদ্দেশ্য মাত্র ব্রাহ্মণের ছিল ।
স্মরণ গভীর ধ্যানে চক্রে গত হ'ল ॥ ৩৫ ॥
সুযোগ পাইয়া গদাধর হেনকালে ।
বতনের গাঁথা মালা পরিলেন গলে ॥ ৩৬ ॥
চন্দনে চর্চিত কৈলা অঙ্গ আপনার ।
তথাপি না ধ্যানভঙ্গ হইল পিতার ॥ ৩৭ ॥
রঙ্গ করি জনকেরে ডাক দিয়া কন ।
দেখ না গো রঘুবীর সেজেছে কেমন ॥ ৩৮ ॥
আমি সেই রঘুবীর দেখনাগো চেয়ে ।
কেমন সেজেছি মালা-চন্দন পরিয়ে ॥ ৩৯ ॥
অযোধ্যা-সদৃশ এই কামারপুকুর ।
যেইখানে বাল্যলীলা হৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ৪০ ॥
তথায় বসতি করে যত নরনারী ।
পশু পাখী তৃণ আদি গুল্ম লতা করী ॥ ৪১ ॥
শ্রীপাদ বন্দনা করি জুড়ি দুই করে ।
পদরজ দিয়া রাখ অধম পামরে ॥ ৪২ ॥
তোমাদের গুণ-গাথা মহিমা-বর্ণন ।
করিতে সক্ষম কভু নহে এ অধম ॥ ৪৩ ॥
কৃপা করি বারেক যদ্যপি দেখ হেরি ।
তবে কিছু গুণ-গান করিবারে পারি ॥ ৪৪ ॥
অধমের নাহি কোনমাত্র শক্তি-বল ।
তোমাদের কৃপাকণা ভরসা সম্বল ॥ ৪৫ ॥
গ্রামবাসী প্রতিবাসী নরনারীগণ ।
গদা'য়ে বুঝেন যেন জীবন-জীবন ॥ ৪৬ ॥
গদাই নিপুণ স্বতঃ সুমধুর স্বরে ।
শিব-শ্যামাবিষয়ক গান করিবারে ॥ ৪৭ ॥
অল্প বয়স শিশু অতি মিষ্ট স্বর ।
যে শুনিত জুড়াইত তাহার অন্তর ॥ ৪৮ ॥
নারী যত সমবেত লাডু দিয়া হাতে ।
বলিতেন গদাধরে গান শুনাইতে ॥ ৪৯ ॥
বিশেষে বিধবা যাঁরা গ্রামের ভিতরে ।
যা পেতেন রাখিতেন গদা'য়ের তরে ॥ ৫০ ॥
গদাধরে ধরে লয়ে যাইত ভবন ।
পথে ঘাটে যেইখানে হয় দরশন ॥ ৫১ ॥
কত কি খাইতে দেন পরম যতনে ।
সুতবেচা কড়ি দিয়া লাড্ডু কিনে এনে ॥ ৫২ ॥
গদা'য়ে খাওয়াতে হ'ত এতদূর সাধ ।
হতাশে গণিত হৃদে বিষম বিষাদ ॥ ৫৩ ॥
প্রহরেক না দেখিলে বিদরয়ে বুক ।
ব্রাহ্মণকুটিরে ছুটে দেখিবারে মুখ ॥ ৫৪ ॥
হায় কে এসব নর-নারী-বেশে হেথা ।
থাকিতে নয়ন খেনু নয়নের মাথা ॥ ৫৫ ॥
দয়া করে দেহ খুলে দুখানি নয়ন ।
জীবন সার্থক করি হেরিয়া চরণ ॥ ৫৬ ॥
প্রথম খণ্ড
হনুমানের সঙ্গে খেলা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বাল্যলীলা শ্রীপ্রভুর বড়ই সুন্দর ।
শুন মন কেমনে খেলেন গদাধর ॥ ১ ॥
বিশ্বপতি শিশুমতি শিশুর আকার ।
লীলা তাঁর ধরামাঝে বুঝা অতি ভার ॥ ২ ॥
সব অমানুষী কার্য সম্ভবে না নরে ।
দেখে লোকে তবু কিছু বুঝিতে না পারে ॥ ৩ ॥
যতই ঐশ্বর্য দেখে গ্রামবাসিগণ ।
গদা'য়ে ঈশ্বরভাব না আসে কখন ॥ ৪ ॥
নিকটে সরাইঘাটা যথা মায়াপুর ।
মামাবাড়ি সেই গ্রামে ছিল শ্রীপ্রভুর ॥ ৫ ॥
একবার মার সঙ্গে তথায় গমন ।
পথিমধ্যে জননীরে বলিলা বচন ॥ ৬ ॥
বস্ত্রে করি আচ্ছাদন কোলে কর মোরে ।
পথে যেতে কেহ যেন না দেখে আমারে ॥ ৭ ॥
যথা কথা মাতা করি বস্ত্রে আবরণ ।
গদায়ে করিয়া কোলে করেন গমন ॥ ৮ ॥
পথ-সন্নিকটে এক পীরের আস্থান ।
সুশীতল বৃক্ষতল মনোরম স্থান ॥ ৯ ॥
সন্ধান পাইয়া মায়ে কন ধীরে ধীরে ।
দেহ দেহ দেহ গো মা নামাইয়া মোরে ॥ ১০ ॥
বৃক্ষমূলে অধিষ্ঠিত যথা সত্যপীর ।
প'ড়ে কত হাতী ঘোড়া বানান মাটির ॥ ১১ ॥
তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গেলেন গদাধর ।
কি জানি কি ভাবে ভরে তাঁহার অন্তর ॥ ১২ ॥
গদাই বসিয়া তথা রহিলা অমনি ।
কানে না প্রবেশে যত ডাকেন জননী ॥ ১৩ ॥
কোনমতে তথা
হ'তে উঠিতে না চান ।
নিরখিয়া জননীর আকুল পরাণ ॥ ১৪ ॥
বুঝাইয়া নানামতে কোলে নিতে
তাঁয় ।
তবে কতক্ষণ পরে ভাব ভেঙ্গে যায় ॥ ১৫ ॥
বড়ই সুন্দর শিশু গদায়ের কথা ।
পুনরায়
দ্বিতীয় বিপদে পড়ে মাতা ॥ ১৬ ॥
পথে যেতে পূর্ববৎ গদাধর কোলে ।
উপনীত পথপ্রান্তে
কোন বৃক্ষতলে ॥ ১৭ ॥
ডালে মূলে মুখপোড়া অসংখ্য বানর ।
দেখিয়া বড়ই খুশী হৈলা
গদাধর ॥ ১৮ ॥
হাতে ছড়ি তাড়াতাড়ি গদাধর যান ।
যেখানে বসিয়া মুখপোড়া হনুমান ॥ ১৯ ॥
অতি
অল্পবয়ঃ শিশু ভয় নাহি মনে ।
তাড়া করিলেন গিয়া যত হনুমানে ॥ ২০ ॥
আপোষা বনের পশু
হনুমানগণ ।
গদা'য়ের প্রতি নাহি করে আক্রমণ ॥ ২১ ॥
নামিয়া আইল যারা বসেছিল ডালে ।
নানা রঙ্গে গদায়ের সঙ্গে তারা খেলে ॥ ২২ ॥
ছুটাছুটি খেলে কত যত হনুমান ।
তা
দেখিয়া জননীর আকুল পরাণ ॥ ২৩ ॥
হিংসা করে পাছে কোন বনের বানর ।
ঘন ঘন ডাকে তাঁয়
আয় গদাধর ॥ ২৪ ॥
সামান্য ঘটনা কথা বড় নয় বেশী ।
তথাপি সকল দেখ কার্য অমানুষী ॥ ২৫ ॥
বলিবার নহে
কথা বলিতে কি আছে ।
বনের বানর কোথা শিশুসনে নাচে ॥ ২৬ ॥
গাছে থাকে কাছে গেলে করে
আক্রমণ ।
কালিমাখা মুখেতে ভ্রূকুটি-প্রদর্শন ॥ ২৭ ॥
দেখ বিপরীত রীতি
শিশু-প্রভুসনে ।
পশুরূপী হনু সব চিনিল কেমনে ॥ ২৮ ॥
প্রভু অবতারে যত পশুপাখিগণ ।
গুল্ম লতা তরু কিংবা স্থাবর জঙ্গম ॥ ২৯ ॥
চেতন কি জড়-দেহ যে কোন আকার ।
জানি না কে কোন্ ভক্ত কোথা আছে তাঁর ॥ ৩০ ॥
অতএব
শুন মন প্রভু-অবতারে ।
হীনাধম তুচ্ছ জ্ঞান না কর কাহারে ॥ ৩১ ॥
জয় সংবুদ্ধিদাতা
দয়ার সাগর ।
ধরাধামে শিশুরূপী প্রভু গদাধর ॥ ৩২ ॥
গোচর তাহার যাবে সৎবুদ্ধি কর ।
হেন সৎবুদ্ধি মোরে দেহ দয়াময় ॥ ৩৩ ॥
নতুবা কে কোন্ জনা কি প্রকারে চিনি ।
ঘন
মায়া-ঘোরে আঁটা নয়ন দু'খানি ॥ ৩৪ ॥
প্রথম খণ্ড
গোচারণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বাল্য-লীলা শ্রীপ্রভুর গাইলে
শুনিলে ।
চির অন্ধজনে মন দিব্য আঁখি মেলে ॥ ১ ॥
দেখে চোখে লীলাখেলা হৃদি-কুতূহল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিত নিমেষে শীতল ॥ ২ ॥
গ্রামের বালক যত সবে ভালবাসে ।
দুই দণ্ড না দেখিলে ছুটে ছুটে আসে ॥ ৩ ॥
গদাই-বিহনে খেলা ভাল নাহি হয় ।
সাধ গদা'য়ের সঙ্গে রেতে দিনে রয় ॥ ৪ ॥
আপন আপন ঘর নাহি থাকে মনে ।
দিবানিশি খেলে বুলে গদা'য়ের সনে ॥ ৫ ॥
ঘরে আই ঠাকুরানী করিয়া রন্ধন ।
গদা'য়ের সহ যত বালকে ভোজন ॥ ৬ ॥
করাতেন নিতি নিতি আপন ভবনে ।
দেখিতেন বলে বসে ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণে ॥ ৭ ॥
আইর রন্ধনকথা অপূর্ব বিশেষ ।
গাইলে শুনিলে নাহি রহে দুখলেশ ॥ ৮ ॥
সামান্য
রাঁধিলে কভু ফুরাতে না চায় ।
মুষ্টিক তণ্ডুলে গোটা ত্রিভুবন খায় ॥ ৯ ॥
কিন্তু
শূন্য পাক-পাত্র আই খেলে পরে ।
মধুর আখ্যান শুন রন্ধন ভিতরে ॥ ১০ ॥
একদিন যায় দিন
আর বেলা নাই ।
নাহি খান অন্নজল ঠাকুরানী আই ॥ ১১ ॥
তাহার কারণ, যাহা খাবার না
খেলে ।
পাকিতে হইত তাঁর বন্ধ পাকশালে ॥ ১২ ॥
সেই দিন বারে বারে বহু লোক খায় ।
তাই
তাঁর খাইবার বেলা ব'য়ে যায় ॥ ১৩ ॥
আর নাই বেশী অন্ন হাঁড়ির ভিতরে ।
হেনকালে কয়জন
লোক আসে ঘরে ॥ ১৪ ॥
আগে বলিয়াছি এই ব্রাহ্মণের ঘর ।
জগন্নাথ যাইবার পথের উপর ॥ ১৫ ॥
নিত্য নিত্য সমাগত অতিথি ফকির ।
অসময়ে আজ দশ হইল হাজির ॥ ১৬ ॥
বেশী অন্ন নাই ঘরে দেখি ঠাকুরানী ।
অবিরল চোখে জল সভয় পরাণী ॥ ১৭ ॥
কম্পমান তনুখানি ভাবেন কি হবে ।
না পাইয়া অন্নজল সাধু ফিরে যাবে ॥ ১৮ ॥
তণ্ডুল নাহিক ঘরে রাঁধিবাবে ভাত ।
প্রাণে সারা শিরে যেন পড়ে বস্ত্রাঘাত ॥ ১৯ ॥
হেনকালে দেখিলেন আই ঠাকুরানী ।
নবম-বয়সী এক বালিকা-রূপিণী ॥ ২০ ॥
পশ্চাৎ দাঁড়ায়ে নাড়ে আপনার হাত ।
তাহে অফুরন্ত বাড়ে ব্যঞ্জনাদি ভাত ॥ ২১ ॥
সেদিন হইতে আই নিজে যতক্ষণ ।
অন্নব্যঞ্জনাদি নাহি করেন ভোজন ॥ ২২ ॥
পাকশালে কোন দ্রব্য ফুরাতে না চায় ।
যত আসে সকলেই খাইবারে পায় ॥ ২৩ ॥
নানাবিধ ব্যঞ্জনাদি অন্নসহ রাঁধি ।
বালক-ভোজন ঘরে হয় নিরবধি ॥ ২৪ ॥
তেলি বেণে জেতে এই বালকেরা যত ।
দুঃখী তাই গোচারণে নিত্য যেতে হ'ত ॥ ২৫ ॥
মাঝে মাঝে ল'য়ে যায় শিশু গদাধরে ।
রঙ্গে হয় নানা খেলা অন্তর প্রান্তরে ॥ ২৬ ॥
গদাই বড় খুশী তা সবার সনে ।
খেলে খেলে বুলিবারে গিয়া গোচারণে ॥ ২৭ ॥
বড়ই মধুর এই বাল্য-লীলা-গান ।
গাইতে শুনিতে করে মাতোয়ারা প্রাণ ॥ ২৮ ॥
শুন মন একমনে কহি পরে পরে ।
শুনেছি হইল যেমন কামারপুকুরে ॥ ২৯ ॥
সাধারণ বালকের খেলা যেই মত ।
সে খেলা খেলিতে তাঁর ভাল না লাগিত ॥ ৩০ ॥
প্রান্তরে অন্তর হ'য়ে কোন বৃক্ষমূলে ।
মনোমত খেলা ল'য়ে যতেক রাখালে ॥ ৩১ ॥
ব্রজ খেলা গদায়ের হয় যেন মনে ।
সেই সেই মত গেলা হয় সঙ্গী-সনে ॥ ৩২ ॥
সুবল হইত
কেহ, কেহ বা শ্রীদাম ।
কেহ হইতেন দাম, কেহ বসুদাম ॥ ৩৩ ॥
আপনি কানাই তাই
কানাইর বেশে ।
কাছে কত গরু গাই চ'রে চ'রে আসে ॥ ৩৪ ॥
কভু ছিঁড়ি দূর্বাদল খাওয়ান
গোধনে ।
কখন দোলেন ডালে বৃক্ষ-আরোহণে ॥ ৩৫ ॥
ডাঙ্গায় বসন রাখি নামিতেন জলে ।
গেলিতেন লয়ে যত রাখাল সকলে ॥ ৩৬ ॥
দূর মাঠে যেতে মানা করে পিতামাতা ।
গদাধর
কোনমতে না শুনেন কথা ॥ ৩৭ ॥
পথে ঘাটে চারিভিতে বালকের সহ ।
গেলিয়া বেড়ান গদাধর
অহরহ ॥ ৩৮ ॥
বড়ই মধুর কথা মাঠে গোচারণ ।
যতদূর জানি বলি শুন শুন মন ॥ ৩৯ ॥
পাড়াগেয়ে
রাখালের এই রীতি চলে ।
ছাড়ি গরু লয় মুড়ি আঁচলে আঁচলে ॥ ৪০ ॥
গ্রাম থেকে মাঠে কিবা বনে লয়ে যায় ।
একত্রে রাখালগণে জলপান খায় ॥ ৪১ ॥
আনন্দের এর যত না যায় বাখ্যান ।
খেতে খেতে নাচে কত, করে কত ধ্বনি ॥ ৪২ ॥
একদিন খায় মুড়ি যতেক রাখালে ।
গদাই লইয়া
সঙ্গে কোন বৃক্ষমূলে ॥ ৪৩ ॥
পরস্পর জলপান কাড়াকাড়ি করে ।
তাহা দেখি গদাইয়ের
ব্রজভাব স্ফুরে ॥ ৪৪ ॥
একেবারে ভবসিন্ধু উথলি উঠিল ।
ভাবাবেশে বাহ্যজ্ঞান এবে ছেড়ে
গেল ॥ ৪৫ ॥
দেখিয়া রাখালবৃন্দ চিন্তাকুল মন ।
গদাই গদাই বলি ডাকে ঘন ঘন ॥ ৪৬ ॥
সবে অতি শিশুমতি কিছুই না জানে ।
বৃদ্ধিপুঞ্জ দেখে অন্যে চেয়ে চারি পানে ॥ ৪৭ ॥
কেহ বা আনিয়ে জল কাপড় ভিজায়ে ।
সজল বসনে দেয় বন্ধন মুছায়ে ॥ ৪৮ ॥
মাঝে মাঝে গদাধরে ভূতে ধরে জানে ।
সেই হেতু রাম নাম বলে যত জনে ॥ ৪৯ ॥
কিছু পরে চাহিলেন চক্ষু দুটি মেলে ।
পরাণ পাইল দেখি রাখাল সকলে ॥ ৫০ ॥
সবে কহে কেন হেন হইল গদাই ।
চক্ষে জল অবিরল মুখে কথা নাই ॥ ৫১ ॥
হাত দুটি ঘন ঘন কেন কেঁপে উঠে ।
দেখে আমাদের বুদ্ধি নাহি রহে ঘটে ॥ ৫২ ॥
গরু চরাইতে আর আনিব না তোরে ।
একাকী থাকিও তুমি আপনার ঘরে ॥ ৫৩ ॥
পাইয়াছি লোকমুখে যেন পরিচয় ।
জন্মাবধি হ'তো মহাভাবের উদয় ॥ ৫৪ ॥
কোনখানে ঈশ্বরীয় চর্চা হ'লে পর ।
নিশ্চয় তথায় উপনীত গদাধর ॥ ৫৫ ॥
ভাগবত-কথা যাত্রা কীর্তনাদি যত ।
শুনিবারে গদাধর বড়ই 'বাসিত ॥ ৫৬ ॥
লইয়া সমান-বয়ঃ বালকের গণে ।
গমন না যার ফাঁক যা হয় সেখানে ॥ ৫৭ ॥
একবার মাত্র কিছু করিলে শ্রবণ ।
জনমের মত তাহা থাকিত স্মরণ ॥ ৫৮ ॥
সেই হেতু গোটা গোটা, পালা পালা গান ।
আগাগোড়া জানিতেন প্রভু ভগবান ॥ ৫৯ ॥
যতেক রাখালবৃন্দ গোচারণে জুটে ।
অপরূপ হয় যাত্রা দূরান্তর মাঠে ॥ ৬০ ॥
একদিন সঙ্গিসহ মাঠে গোচারণে ।
হঠাৎ মাথুর কথা পড়ে গেল মনে ॥ ৬১ ॥
বলেন রাখালগণে এস এস ভাই ।
মাথুর বিরহ-গান সবে মিলে গাই ॥ ৬২ ॥
সমস্বরে দিল সায় যত সাঙ্গগণ ।
বৃক্ষমূলে যাত্রারম্ভ হইল তখন ॥ ৬৩ ॥
অতি পুলকিত অঙ্গ গদাই আনন্দে ।
কাহারে করেন সখী কৈলা কারে বৃন্দে ॥ ৬৪ ॥
আপনে হইলা নিজ রাই কমলিনী ।
বিদগ্ধ বিরহ-গান ধরিল তখনি ॥ ৬৫ ॥
গাইতে গাইতে গীত বিহ্বল হইলা ।
পরাণ-বঁধুয়া বলি কাঁদিতে লাগিলা ॥ ৬৬ ॥
কোথা কৃষ্ণ, কই কৃষ্ণ, কৃষ্ণে দাও এনে ।
হায় কৃষ্ণ, হায় কৃষ্ণ, রব ঘনে ঘনে ॥ ৬৭ ॥
ভিজিল বসন গোটা নয়নের জলে ।
বাহ্যু জ্ঞান-বিহীন পতিত ধরাতলে ॥ ৬৮ ॥
ব্যাকুলপরাণ হৈল
যত সঙ্গিগণ ।
কি হ'ল কি হ'ল বলি করয়ে রোদন ॥ ৬৯ ॥
কেহবা আনিয়া জল দেয় চোখে-মুখে ।
কেঁদে কেঁদে কেহ বা গদাই বলি ডাকে ॥ ৭০ ॥
ভূতে যেন ধরে তাই মনে বিচারিয়া ।
রামনাম হরিনাম ডাকে উচ্চারিয়া ॥ ৭১ ॥
তার মধ্যে একজন কয় উচ্চরোলে ।
হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ ব'লে ॥ ৭২ ॥
প্রাণ-সঞ্চারিণী মন্ত্র কৃষ্ণনাম শুনি ।
কোথা কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি চাহিলা অমনি ॥ ৭৩ ॥
ঐ দাঁড়াইয়া কৃষ্ণ কৃষ্ণ প্রাণনাথ ।
আবেশে ধরিতে যান
প্রসারিয়া হাত ॥ ৭৪ ॥
কৃষ্ণ-নামে গদা'য়ের চৈতন্য দেখিয়া ।
সবে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে
চৌদিকে বেড়িয়া ॥ ৭৫ ॥
সুস্থিরপরাণ দেখি শিশু গদাধরে ।
ফিরাইল ধেনুপাল ফিরিবারে
ঘরে ॥ ৭৬ ॥
কোন কোন দিন মাঠে হ'ত সংকীর্তন ।
নাম-নাদে হ'ত ভেদ অখণ্ড গগন ॥ ৭৭ ॥
শিশুরূপী ভগবান শিশু সঙ্গে করে ।
কতই করিলা খেলা কামারপুকুরে ॥ ৭৮ ॥
গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে বাড়ুয্যে-বাগান ।
সেইখানে ছিল তাঁর গোচারণ স্থান ॥ ৭৯ ॥
অতি মনোরম স্কুল মাঠের মাঝারে ।
শিয়রে ভূতির খাল বয় ধীরে ধীরে ॥ ৮০ ॥
গ্রামের অনতিদূর বড়ই নির্জন ।
ছোট ছোট আম-গাছে বাগিচা শোভন ॥ ৮১ ॥
কাণ্ড-শাখা বক্রভাবে ঝোলা এত নীচে ।
অল্পবয়ঃ সেও পারে উঠিবারে গাছে ॥ ৮২ ॥
বালক সসঙ্গ প্রভু বালক যেমন ।
ছোট ছোট আম-গাছ বাগানে তেমন ॥ ৮৩ ॥
মহাভাগ্যবান সেই বাঁড়ুয্যে-সন্তান ।
বাল্য-লীলাম্বলী ছিল যাঁহার বাগান ॥ ৮৪ ॥
প্রভু খেলিবেন যেন আগে হ'তে জানি ।
বাগান করিয়াছিল বাগানের স্বামী ॥ ৮৫ ॥
কেবা এ বাড়ুয্যে যেবা করিল বাগান ।
শুন মন প্রভু তাঁয় কত কৃপাবান ॥ ৮৬ ॥
শ্রীমানিক নাম ভুরসুবা গ্রামে ঘর ।
কামারপুকুর হ'তে অনতি অন্তর ॥ ৮৭ ॥
ধনাঢ্য তালুকদার উদার-প্রকৃতি ।
অতিথি-সেবনে ছিল বড়ই পিরীতি ॥ ৮৮ ॥
ভগবৎপরে তাঁর ছিল অতি মন ।
প্রশান্ত-উদ্বার-চিত্ত দারিদ্র্য-মোচন ॥ ৮৯ ॥
পরহিতে সদা রত পর-উপকারী ।
জীবন যাপন মাত্র এই কর্ম করি ॥ ৯০ ॥
বিষয়ে তাঁহার যত জনমিত আয় ।
অতিথি-বৈষ্ণব-সেবা-কার্যে সব যায় ॥ ৯১ ॥
হরিপদলুব্ধচিত মহামতিমান ।
মানিক বাঁড়ুয্যে এই তাঁহার বাগান ॥ ৯২ ॥
বাল্য-লীলাস্থলী হবে বুঝি সমাচার ।
রচিয়া বাগান কৈল দেহ পরিহার ॥ ৯৩ ॥
প্রভুর কৃপার পাত্র বাঁড়ুয্যে তনয় ।
শুন মন ক্রমে ক্রমে কহি পরিচয় ॥ ৯৪ ॥
বাল্য-লীলা যে সময় কামারপুকুরে ।
কিছু আগে মানিক গিয়াছে দেহ ছেড়ে ॥ ৯৫ ॥
কেহ কয় তখন আছিল দেহ তাঁর ।
বলিতে নারিনু কিবা সত্য সমাচার ॥ ৯৬ ॥
পরে তাঁর সহোদর উত্তরাধিকারী ।
যেমন অগ্রজ তাঁর ধর্মে মন ভারী ॥ ৯৭ ॥
পরিবার যত তাঁর গড়া এক ছাঁচে ।
সবে ভক্ত, তর তম সাধ্য কার বাছে ॥ ৯৮ ॥
মানিকের বংশে যত মানিক সবাই ।
বারে বারে যার ঘরে গেলেন গদাই ॥ ৯৯ ॥
বড়ই শৈশব যবে জনকের সনে ।
রগড় করিয়া যান মানিক-ভবনে ॥ ১০০ ॥
মানিকের ঘরে যত রমণী
সকলে ।
অতিশয় আনন্দিত গদায়ে দেখিলে ॥ ১০১ ॥
পরম সুন্দর শিশু লম্বমান বেণী ।
ঝাঁপা
দিয়া সাজাতেন আই ঠাকুরানী ॥ ১০২ ॥
কোমরেতে আঁটা গোট বালা দুই হাতে ।
রঙ্গিন-বসন-পরা সুন্দর দেখিতে ॥ ১০৩ ॥
অপরূপ খেলে রূপ শ্রীবদন-মাঝে ।
চলিতে বেণীতে
বদ্ধ ঝুরি-ঝাঁপা বাজে ॥ ১০৪ ॥
অমিয়-বরধি বাক্য ক্ষরে আধা আধা ।
রসনার স্বভাবতঃ
জড়তায় বাঁধা ॥ ১০৫ ॥
কিবা সুধা ধরে সুধা মিষ্টতার গুণ ।
শিশুবাণী শুনে লাগে তিক্ত
শতগুণ ॥ ১০৬ ॥
শ্রবণ-বিমুগ্ধ বাক্য শিশুর বদনে ।
মুগ্ধচিত সেই তত যেই যত শুনে ॥ ১০৭ ॥
অন্তঃপুরবাসিনীরা সবে করে কোলে ।
অপার আহলাদ হৃদে স্রোত বহি চলে ॥ ১০৮ ॥
প্রভুর জনকে কহে যত নারীগণ ।
তোমার তনয়ে নাই মানব-লক্ষণ ॥ ১০৯ ॥
ভক্তিমতী মানিক-গৃহিণী একবার ।
গড়ায় মনের মত কত অলঙ্কার ॥ ১১০॥
অন্তঃপুরে গদাধরে দেয় সাজাইয়ে ।
একত্তরে
তাহাদের যত সব মেয়ে ॥ ১১১ ॥
গদাধরে মুগ্ধমন এত সবাকার ।
না দেখিলে কিছু দিন দেখিত
আঁধার ॥ ১১২ ॥
লোক পাঠাইয়া দিত কামারপুকুরে ।
আদরের গদাধর আনিবারে ঘরে ॥ ১১৩ ॥
নানাবিধ
খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া ।
প্রভুর বদনে দিত গল্প হৈয়া ॥ ১১৪ ॥
কখন মিষ্টান্ন
হাতে প্রত্যেক রমণী ।
গদাধরে বলিতেন কার লবে তুমি ॥ ১১৫ ॥
শিশুমতি গদাধার করি লম্ফ দান ।
হাতে করি সকলের মিষ্টি কাড়ি খান ॥ ১১৬ ॥
শুনিয়াছি ব্রজভূমে গোঠগোচারণে ।
ক্ষুধার্ত রাখালবৃন্দ হয় এক দিনে ॥ ১১৭ ॥
বিশুষ্ক-বন্ধন কহে কানাইর ঠাঁই ।
ক্ষুধায় কাতর প্রাণ কি খাইব ভাই ॥ ১১৮ ॥
তুমি রাখালের রাজা সম্বল সহায় ।
বিজন বিপিনে বাঁচি করহ উপায় ॥ ১১৯ ॥
শুনি বাণী কানু পাঠাইল সবাকারে ।
ব্রাহ্মণগণের যজ্ঞে অন্ন মাগিবারে ॥ ১২০ ॥
অবজ্ঞা করিয়া ব্রাহ্মণেরা নাহি দিল ।
যেখিয়া ব্রাহ্মণীগণ ব্যাকুলা হইল ॥ ১২১ ॥
থালে থালে ল'য়ে অন্ন লুকাইয়া চলে ।
বিরাজে কানাই যথা বেষ্টিত গোপালে ॥ ১২২ ॥
ব্রাহ্মণীগণের অনুরাগে ভরা দেখি ।
কানাই কহিলা যত সঙ্গিগণে ডাকি ॥ ১২৩ ॥
এস ভাই ওই অন্ন খাইব মিলিয়া ।
এত বলি থাল লয় কাড়িয়া কাড়িয়া ॥ ১২৪ ॥
আনন্দে ভোজন দেখে যতেক রমণী ।
ইহারা নিশ্চয় বটে সে সব ব্রাহ্মণী ॥ ১২৫ ॥
মানিক-আগার সত্য মানিক আগার ।
পদরজ সবাকার মাগি বার বার ॥ ১২৬ ॥
দয়া কর প্রভুপদে রহে যেন মতি ।
যত দিন বাঁচি লিখি রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১২৭ ॥
লীলা-গীতি লিখিবারে বাসনা প্রবল ।
তোমাদের কৃপাকণা কেবল সম্বল ॥ ১২৮ ॥
প্রথম খণ্ড
পাঠশালে অধ্যয়ন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বাল্যলীলা শ্রীপ্রভুর পূর্ণ মহিমায় ।
গাও মন স্মরি গুরু হৃদে যা যুয়ায় ॥ ১ ॥
বড়ই সুমিষ্ট কথা অমিয় পূরিত ।
বাল্যলীলা শুনে হয় মুখ সুপণ্ডিত ॥ ২ ॥
একদিন চাটুয্যে মহাশয় বলি ভাবে ।
গদা'য়ের হাতে খড়ি এবে দিতে হবে ॥ ৩ ॥
ক্রমশঃ হ'তেছে বড় শুধু বুলে খেলে ।
সঙ্গে ল'য়ে যত সব তেলী মালী ছেলে ॥ ৪ ॥
মা বাপের গদাধর আদরের ধন ।
তাহাতে আবার তার কনিষ্ঠ নন্দন ॥ ৫ ॥
স্বভাবতঃ শিশুগণে পাঠে দেখে বাঘ ।
তাতে নাই গদা'য়ের কোন অনুরাগ ॥ ৬ ॥
কহিলে পড়ার কথা মন হয় ভারি ।
ভুলাইয়া বাপ-মার হাতে দিলা গড়ি ॥ ৭ ॥
যান শিশু গদাধর পাত্তাড়ি বগলে ।
যেখানে অনেক ছেলে লিখে পাঠশালে ॥ ৮ ॥
বিদ্যা অধ্যয়নে বড় নাহি হয় মন ।
দিবানিশি নানা রঙ্গ ল'য়ে সঙ্গিগণ ॥ ৯ ॥
শিশুগণ ফুল্লমন সুখসীমা নাই ।
ছুটি পেলে খেলে বুলে লইয়া গদাই ॥ ১০ ॥
বিদ্যাভাসে গদা'য়ের নাহি তত মন ।
যেমতে আত্মীয়বর্গে করে আকিঞ্চন ॥ ১১ ॥
শিক্ষাদাতা গুরুমহাশয় পাঠশালে ।
গদা'য়ে দেখেন যেন আপনার ছেলে ॥ ১২ ॥
কর্কশ প্রয়োগে পায় হৃদয়ে বেদনা ।
করিতে না পারিতেন তাঁহার তাড়না ॥ ১৩ ॥
গদা'য়ের পাঠশালে যাওয়া-আসা সার ।
লেখাপড়া বড় বেশী নাহি হয় তাঁর ॥ ১৪ ॥
বড়ই মঞ্জুর কথা শুন শুন মন ।
বহু ছেলে পেয়ে খেলা বাড়িল দ্বিগুণ ॥ ১৫ ॥
পাঠশালে যত ছেলে সবে ভালবাসে ।
ছুটি পেলে গদা'য়ের সঙ্গে ঘরে মিশে ॥ ১৬ ॥
আড়ালে গদাই ল'য়ে বালক সকল ।
সুন্দর করেন গান যাত্রার নকল ॥ ১৭ ॥
অপরে সাজান নিজে সাজেন গদাই ।
ঠিক অবিকল যাত্রা কোন ভেদ নাই ॥ ১৮ ॥
বাল্যাবধি শ্রুতিধর ছিলেন এমন ।
বারেক শুনিলে কভু নহে বিস্মরণ ॥ ১৯ ॥
খোল-করতাল-বাদ্য-শিঙ্গার নিনাদ ।
বদনে ফুটিত সব নাহি যায় বাদ ॥ ২০ ॥
যাত্রার সং দাড়ি যথা যাহা প্রয়োজন ।
গদাই হইতে হয় সব সরঞ্জাম ॥ ২১ ॥
একাকী গদাই করে যত সমুদয় ।
নেহারিলে হরবোলা মানে পরাজয় ॥ ২২ ॥
পাঠশালে যত ছেলে সব গেল মেতে ।
দিনে যায় পাঠশালা যাত্রা করে রাতে ॥ ২৩ ॥
গুরুমহাশয় শুনিলেন কানে কানে ।
গদাই করেন যাত্রা ল'য়ে ছাত্রগণে ॥ ২৪ ॥
পুত্রনির্বিশেষ তাঁর ছাত্র গদাধর ।
সোহাগ-পূর্ণিত কথা কতই আদর ॥ ২৫ ॥
একদিন পাঠশালে শিক্ষাগুরু বলে ।
শুনাও কেমন যাত্রা কর সবে মিলে ॥ ২৬ ॥
এমন নিপুণ তুমি পূর্বে জানি নাই ।
এত শুনি যাত্রারম্ভ করেন গদাই ॥ ২৭ ॥
আপনি করেন গান মুখে বাদ্য বাজে ।
দুই হাতে যেন তাল পদদ্বয় নাচে ॥ ২৮ ॥
গীত
বাদ্য-নৃত্য তাঁর অতি পরিপাটি ।
মাঝে মাঝে সং দেওয়া কিছু নাহি ত্রুটি ॥ ২৯ ॥
হেসে
হেসে মরে গুরু সহ ছাত্রগণ ।
কতই আনন্দ তাঁর নাহি নিরূপণ ॥ ৩০ ॥
শুনি হাসি-রোল
যারা থাকিত নিকটে ।
তেয়াগিয়া কার্যকর্ম পাঠশালে জুটে ॥ ৩১ ॥
পাঠশালা হৈল ঠিক
রঙ্গশালা-মত ।
নিত্য প্রায় গদাা'য়ের যাত্রা তথা হ'ত ॥ ৩২ ॥
গুরু-ছাত্রগণ-মধ্যে
অন্য কথা নাই ।
কতক্ষণে আসিবেন লিখিতে গদাই ॥ ৩৩ ॥
সকলেই উদ্গ্রীব গদা'য়ের তরে ।
হেন শুরু-ছাত্র বন্দে অধম পামরে ॥ ৩৪ ॥
গদাই মুরতি চিন্তা করে যেই জন ।
ধরি শিরে
তা সবার যুগলচরণ ॥ ৩৫ ॥
কঠোর তপস্যা করি যে ধন না মিলে ।
কামারপুকুরবাসী তাই ল'য়ে
খেলে ॥ ৩৬ ॥
গোপপাড়া আগাগোড়া কামারপুকুরে ।
তা সবারে নরবুদ্ধি হীনবুদ্ধি করে ॥ ৩৭ ॥
কি বুঝ কি বুঝ মন অন্য কথা নয় ।
শিশুরূপী ভগবান সঙ্গে রঙ্গ হয় ॥ ৩৮ ॥
ভাবিয়া দেখিতে
গেলে হৃদয় মাঝারে ।
শরীর নিশ্চল কথা মুখে নাহি সরে ॥ ৩৯ ॥
কি হেতু শরীর স্থির
বুঝে দেখ মন ।
কেনই বা নাহি হয় বাক্য নিঃসরণ ॥ ৪০ ॥
কথার এ কথা নয় ভাব আঁখি মুদে ।
কহিতে নারিনু দুঃখ রয়ে গেল হৃদে ॥ ৪১ ॥
অদ্ভুত তাজ্জব অতি বিস্ময় ব্যাপার ।
জয়
শিশুরূপী প্রভু ভবকর্ণধার ॥ ৪২ ॥
জয় জয় চন্দ্রমণি জননী প্রভুর ।
জয় পিতা
ক্ষুদিরাম চাটুয্যে ঠাকুর ॥ ৪৩ ॥
শ্রীরামকুমার জয় জ্যেষ্ঠ সহোদর ।
জয় জয় মেজভাই নাম রামেশ্বর ॥ ৪৪ ॥
জয় ধনী কামারিনী পূজিত চরণ ।
জয় গদা'য়ের শিশু-সহচরগণ ॥ ৪৫ ॥
জয় জয় যত প্রতিবাসী শ্রীপ্রভুর ।
জয় গরীয়সী ভূমি-কামারপুকুর ॥ ৪৬ ॥
জয় জয় গ্রামবাসী যত নরনারী ।
জয় জয় বালক-বালিকা আদি করি ॥ ৪৭ ॥
জয় জয় পশু-পাখী গুল্ম লতাগণ ।
জয় পুণ্যভূমি রজ কলুষনাশন ॥ ৪৮ ॥
গুরুমহাশয় করে বিশেষ যতন ।
গদাই শিখেন যাতে লিখন-পঠন ॥ ৪৯ ॥
বিদ্যায় উদাস বড় না হয় উন্নতি ।
কিছুই না কন, তাঁর দেখিয়া প্রকৃতি ॥ ৫০ ॥
কাঠাকে পর্যন্ত শেষ, লোকমুখে শুনি ।
সরল বানান ক্ষম আমি ভাল জানি ॥ ৫১ ॥
তেরিজ পর্যন্ত অঙ্কে, যারে বলে যোগ ।
আর নাহি পারিলেন শিখিতে বিয়োগ ॥ ৫২ ॥
স্বভাবতঃ যোগে নন তাই যোগ হ'ল ।
অধম বিয়োগ, তাহে বুদ্ধি বেঁকে গেল ॥ ৫৩ ॥
পূর্ণ থেকে পূর্ণ গেলে পূর্ণ থাকে যাঁর ।
কেমনে বিয়োগে বুদ্ধি আসিবে তাঁহার ॥ ৫৪ ॥
এ বড় সুগূঢ় অঙ্ক, অঙ্ক-শাস্ত্রে নাই ।
বুঝিতে এ সব তত্ত্ব সৎবুদ্ধি চাই ॥ ৫৫ ॥
বাদ দিলে পূর্ণ-ব্রহ্ম, পূর্ণ-ব্রহ্ম হ'তে ।
তথাপিও সেই পূর্ণ ব্রহ্ম থাকে হাতে ॥ ৫৬ ॥
মহাব্যয়ে পুষ্টি-সৃষ্টি বিশ্ব চরাচর ।
জমায় বাকিতে তবু একরূপ দর ॥ ৫৭ ॥
জমারূপে পূর্ণ-ব্রহ্ম বিভু সনাতন ।
ব্যয়রূপে বিরাট মুরতি অগণন ॥ ৫৮ ॥
বাকিতলে তাই মিলে যেমন জমায় ।
সেহেতু বিয়োগবুদ্ধি না আসে মাথায় ॥ ৫৯ ॥
লোকে না বুঝিতে পারে এতেক খবর ।
বুঝে মাত্র শিখিতে না পারে গদাধর ॥ ৬০ ॥
হিসাব-নিকাশে বুদ্ধি আদতেই নাই ।
চোখে দিয়া ধূলা, খেলা খেলেন গদাই ॥ ৬১ ॥
অঙ্ক দিলে, তার ফেলে, প্রভু গুণধাম ।
তালপাতে লিখিতেন ঠাকুরের নাম ॥ ৬২ ॥
পাড়াগাঁয় পাঠশালে প্রচলিত রীতি ।
প্রহলাদ-চরিত্র আর দাতাকর্ণ-পুঁথি ॥ ৬৩ ॥
সরলবানানযুক্ত বাক্য সমুদয় ।
পড়িতে পড়িতে হয় বর্ণ-পরিচয় ॥ ৬৪ ॥
বর্ণপরিচয় হেতু গুরু পাঠশালে ।
প্রহলাদ-চরিত্র পুঁথি সকালে সকালে ॥ ৬৫ ॥
নিত্য নিত্য পড়াতেন শিশু গদাধরে ।
সমস্ত মুখস্থ তাঁর বার বার
প'ড়ে ॥ ৬৬ ॥
প্রহলাদের অনুরাগ ভগবান প্রতি ।
পড়িতে হইত তাঁর বড়ই পিরীতি ॥ ৬৭ ॥
সেই
হেতু পুঁথিপাঠ হ'ত অন্য স্থানে ।
মধু যুগী জেতে তাঁতী তাহার ভবনে ॥ ৬৮ ॥
পাঠশালে
ছুটি হ'লে শিশু গদাধর ।
পড়েন প্রহলাদ-কথা করিয়া আদর ॥ ৬৯ ॥
সুন্দর আখ্যান মন শুন
সাবধানে ।
শিশু গদাধর পুঁথি পড়েন কেমনে ॥ ৭০ ॥
অতি অনুরাগে পুঁথি হয় একদিন ।
কত
লোক নর-নারী যুবক-প্রাচীন ॥ ৭১ ॥
চারি ধারে ঘেরে তাঁরে শুনে ব'সে ব'সে ।
গদা'য়ের পুঁথিপাঠ পরম উল্লাসে ॥ ৭২ ॥
জন-মন-আকর্ষণী অতি মিষ্ট স্বর ।
তাহাতে
সবার প্রিয় শিশু গদাধর ॥ ৭৩ ॥
অগোচরে শুনে এক হনু কুতুহলে ।
নিকটে আমের গাছে ব'সে
তার ডালে ॥ ৭৪ ॥
শ্রবণে বিভোর প্রাণ ভাবের উচ্ছ্বাসে ।
গাছ হ'তে হনুমান নামে
অবশেষে ॥ ৭৫ ॥
নাহি ত্রাস মহোল্লাস শুনেছি যেমন ।
নিকটে বসিল ধরি শিশুর চরণ ॥ ৭৬ ॥
যতক্ষণ পাঠসাঙ্গ নাহি হয় তাঁর ।
হনুমান শুনে পুঁথি আনন্দ অপার ॥ ৭৭ ॥
পাঠান্তে উঠায়ে পুঁথি শিশু গদাধরে ।
পরশ করিয়া দিলা হনু-শিরোপরে ॥ ৭৮ ॥
শ্রীপদে প্রণমি হনুমান কর-পুটে ।
পুনরায় পূর্বেকার আমগাছে উঠে ॥ ৭৯ ॥
কেবা এই পশুরূপী ভক্ত হনুমান ।
কি বুঝি, চরণে তাঁর অসংখ্য প্রণাম ॥ ৮০ ॥
যত কিছু বিষ্ণুমান কামারপুকুরে ।
স্থাবর জঙ্গম কিবা জীবের আকারে ॥ ৮১ ॥
প্রভু অবতারে তাঁরা দেব-দেবী যত ।
প্রভুর আজ্ঞায় সব সঙ্গে সমাগত ॥ ৮২ ॥
দেখ দেখ সাবধান সাবধান মন ।
প্রাণান্তেও অন্য বুদ্ধি কর না কখন ॥ ৮৩ ॥
ভগবান তব লীলা সুমূর্খ পামরে ।
ভক্তিহীন বন্ধ-আঁখি কি গাইতে পারে ॥ ৮৪ ॥
ঘটেতে থাকিত বাধ কিছু ভক্তিধন ।
গাইতাম বাল্য-খেলা মনের মতন ॥ ৮৫ ॥
বড়ই মধুর প্রভু-বাল্য-খেলা-কথা ।
গাইব যেমন প্রভু পেয়েছি ক্ষমতা ॥ ৮৬ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভু তুমি সব তত্ত্ব জ্ঞাত ।
ধরি নররূপ খেলিতেছ নর-মত ॥ ৮৭ ॥
নর-মত রূপে বটে, কাজে কিন্তু নয় ।
অমানুষী অপরূপ খেলা সমুদায় ॥ ৮৮ ॥
নরবুদ্ধিগম্য প্রভু নহ কোন কালে ।
কি করিয়া বুঝা যায় এ বুদ্ধির বলে ॥ ৮৯ ॥
সত্যই দিয়াছ দুটি আঁখি জ্যোতিষ্মান ।
বিষম পরদা সম্মুখেতে লম্বমান ॥ ৯০ ॥
পাষাণে রচিত এই পরদা বিশেষ ।
ভেদ করি চালি দৃষ্টি নাহি শক্তি-লেশ ॥ ৯১ ॥
কেমনে দেখিব প্রভু তব কারবার ।
হীনদৃষ্টি ব্রহ্মা শিব, আমি কোন ছার ॥ ৯২ ॥
অবিদ্যা-মোহিত চিত মলিন মুকুর ।
কৃপা কর শিশুরূপী দয়াল ঠাকুর ॥ ৯৩ ॥
এখন কেবল বয়ঃ সাতের উপর ।
জনক তাঁহার ত্যজিলেন কলেবর ॥ ৯৪ ॥
পৈতার সময় প্রায় দেখিয়া আগত ।
ভ্রাতৃগণ শুভদিন করে নির্ধারিত ॥ ৯৫ ॥
ব্রাহ্মণ ব্যতীত ভিক্ষা অন্য কোন জাতি ।
না দেওয়ার সেই বংশে কুলোচিত রীতি ॥ ৯৬ ॥
সেই হেতু দ্বিজকন্যা গ্রামে যতজন ।
ভিক্ষা দিতে গদাধরে করে আকিঞ্চন ॥ ৯৭ ॥
হেথায়
গদাই কন ধনী কামারিনী ।
ভিক্ষা যদি দেয় তবে ভিক্ষা লব আমি ॥ ৯৮ ॥
কখন না লব
ভিক্ষা অপরের হাতে ।
না হয় না হবে পৈতা ক্ষতি নাই তাতে ॥ ৯৯ ॥
একি কথা গদাধর, কহে
ভ্রাতাগণ ।
কি লাগিয়া কুল প্রথা কর অতিক্রম ॥ ১০০ ॥
শূদ্রদান কখন গ্রহণ নাই কুলে ।
জানিয়া শুনিয়া কথা কেমনে বলিলে ॥ ১০১ ॥
কোন হেতু না শুনেন শিশু গদাধর ।
ধনী হবে
ভিক্ষামাতা একই রগড় ॥ ১০২ ॥
এত বলি মুখ ভারি ঘরে খিল দিয়া ।
রহিলেন গদাধর আবদ্ধ
হইয়া ॥ ১০৩ ॥
ক্ষুধার সময় যায় না খুলেন দ্বার ।
নরনারী আসে যত শুনে সমাচার ॥ ১০৪ ॥
যে
গদা'য়ে খাওয়াইয়া মহা সুখ মনে ।
সে গদাই অনাহারে আবদ্ধ ভবনে ॥ ১০৫ ॥
কেমনে গ্রামের
লোক চিত্তে রহে স্থির ।
বার্তা পেয়ে তাই ধেয়ে সকলে হাজির ॥ ১০৬ ॥
নাহিক উত্তর,
তাঁরে যে যত বুঝায় ।
যেন নাহি যায় কান কাহার কথায় ॥ ১০৭ ॥
যবে ভাই রামেশ্বর যাইয়া
আপনি ।
বলিলেন দিবে ভিক্ষা ধনী কামারিনী ॥ ১০৮ ॥
না হয় হইবে নষ্ট বংশকুলাচার ।
শুনি
বাণী তবে মুক্ত করিলেন দ্বার ॥ ১০৯ ॥
মরি কি সৌভাগ্য তব ধনী কামারিনী ।
ভিক্ষা
দিলে তাঁয়, বিশ্বে ভিক্ষা দেন যিনি ॥ ১১০ ॥
ত্রাতা, পাতা, তারক, পালক সবাকার ।
শিবময়, ইচ্ছাময়, ভবকর্ণধার ॥ ১১১ ॥
যদ্যপি থাকিতে তুমি অদ্যাপি বাঁচিয়া ।
ভাগ্য
মানিতাম পদ মাথার ধরিয়া ॥ ১১২ ॥
যে যে স্থানে পাতিয়াছ চরণ দু'খানি ।
সেখানের রেণু পাওয়া মহাভাগ্য গণি ॥ ১১৩ ॥
কার
অবতার তুমি কিছু শুনি নাই ।
বৎস-হারা গাভী যেবা বিহনে গদাই ॥ ১১৪ ॥
কি সাধ্য মহিমা গাই কি আছে শকতি ।
এতেক বাৎসল্য যাঁর ঘটে বলবতী ॥ ১১৫ ॥
মহা ভাগ্যবতী ধরাতলে
বিদ্যমান ।
বুঝি না জানি না কেবা তোমার সমান ॥ ১১৬ ॥
ক'ড়ে রাঁড়ী অপুত্রক ধনী কামারিনী ।
না বিইয়ে হৈল এবে রামের জননী ॥ ১১৭ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব ভক্তে তাঁর প্রাণ ।
ভক্তি জোরে, ভক্তে করে, তাঁহারে সন্তান ॥ ১১৮ ॥
অপার করুণা তাঁর ভকতের প্রতি ।
শুনহ অপূর্ব কথা রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১১৯ ॥
লীলা-গীতি শ্রীপ্রভুর অমিয়-পূরিত ।
শ্রবণ কীর্তনে পূত চিত্ত সুনিশ্চিত ॥ ১২০ ॥
প্রথম খণ্ড
পণ্ডিতগণের পরাভব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
মাধুর্যের রসে পূর্ণ বাল্য-লীলা
তাঁর ।
গাইতে সে সব খুলে কি সাধ্য আমার ॥ ১ ॥
শুনিতে বাসনা যদি থাকে তোর মন ।
এস
দুইজনে করি তাঁহারে স্মরণ ॥ ২ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু তিনি, ভক্তজনে রটে ।
যার যাহা হয়
সাধ কৃপাবলে মিটে ॥ ৩ ॥
জয় জয় দীননাথ কৃপার আকর ।
জয় জয় শিশুরূপী প্রভু গদাধর ॥ ৪ ॥
জয় যুগ-অবতার অন্ধের শরণ ।
কৃপা করি কর মুক্ত দুখানি নয়ন ॥ ৫ ॥
কাঠাকে পর্যন্ত
বিদ্যা বাহ্যেতে আভাস ।
অপার বিস্তার তত্ত্ব খেলায় প্রকাশ ॥ ৬ ॥
অদ্ভুত মহিমা
কথা শুন অতঃপর ।
লিখিবারে দেহ শক্তি প্রভু গদাধর ॥ ৭ ॥
জয় জয় সিদ্ধকাম সর্বসিদ্ধি-দাতা ।
জয় সর্বশক্তিমান অনন্ত বিধাতা ॥ ৮ ॥
গ্রামেতে
বর্ধিষ্ঠ গোষ্ঠী লাহা নামে খ্যাত ।
নানা কাজে অর্থব্যয় প্রচুর করিত ॥ ৯ ॥
একবার
শ্রাদ্ধক্রিয়া তাঁহাদের ঘরে ।
দেশের পণ্ডিত যত নিমন্ত্রণ করে ॥ ১০ ॥
কোন টোল নাহি
ফাঁক যে আছে যেখানে ।
আবাহন করিলেন পত্রিকা-প্রেরণে ॥ ১১ ॥
ঘটা পরিসীমা কিবা না হয় বর্ণন ।
ছাত্রসহ দলে দলে পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ॥ ১২ ॥
আসিয়া করিল সভা নির্ধারিত দিনে ।
যথাকালে বসিলেন শাস্ত্র-আলাপনে ॥ ১৩ ॥
কথার প্রসঙ্গে গোল উঠিল মহতী ।
টোলের পণ্ডিতদের যে-প্রকার রীতি ॥ ১৪ ॥
হউন বা না হউন নিপুণ বিচারে ।
প্রসারিয়া হস্তপদ গোলে মাত্র সারে ॥ ১৫ ॥
চতুর্দিকে রাষ্ট্র কথা হইয়াছে দেশে ।
যথাদিনে লোকজনে দেখিবারে আসে ॥ ১৬ ॥
শুনি গোল উচ্চ রোল আসিয়া জুটিল ।
মাঠে-ঘাটে কর্ম-কাজে যে যেথায় ছিল ॥ ১৭ ॥
সঙ্গী সনে রঙ্গ করি শিশু-গদাধর ।
উপনীত হইলেন সভার ভিতর ॥ ১৮ ॥
বিচার করেন সেই পণ্ডিতের দলে ।
প্রসঙ্গের গূঢ় গ্রন্থি সব দেন খুলে ॥ ১৯ ॥
শাস্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব বুঝা যাহা ভার ।
তাহাই গদাই ল'য়ে করেন বিচার ॥ ২০ ॥
বিচারের দেখি ঘুম সবে একে একে ।
আসিয়া বেড়িল শিশু-প্রভুকে চৌদিকে ॥ ২১ ॥
সপ্তরথিমধ্যে যেন অভিমন্যু-রণ ।
বিচারে আগুন ছুটে ন্যূন নাহি হন ॥ ২২ ॥
বড়ই তাজ্জব কথা অপার বিস্ময় ।
পণ্ডিত শিশুর কাছে পরাভব হয় ॥ ২৩ ॥
অল্প বয়স শিশু বুলে খেলে খেলে ।
শাস্ত্রের নিগূঢ় মর্ম কেমনে বুঝিলে ॥ ২৪ ॥
নানা জনে নানারূপ বলাবলি করে ।
অদ্ভুত শকতি দেখি শিশুর ভিতরে ॥ ২৫ ॥
একে ত সুন্দর শিশু বঙ্কিম নয়ন ।
শ্রীবয়ানে মাথা কান্তি শোভা নিরুপম ॥ ২৬ ॥
লম্বমান শোভে বেণী শিরের উপরে ।
পীযূষ-পুরিত কথা রসনায় ঝরে ॥ ২৭ ॥
আজানুলম্বিত বাহু-যুগ-প্রসারণে ।
মহাদন্তে শাস্ত্রালাপ ধীরগণ-সনে ॥ ২৮ ॥
অবাক্ হইয়া দেখে মহা অসম্ভব ।
নিরক্ষর সুপণ্ডিত শাস্ত্রজ্ঞ শৈশব ॥ ২৯ ॥
জিজ্ঞাসা করেন শেষে শিশুবর কার ।
এ হেন বয়সে করে শাস্ত্রের বিচার ॥ ৩০ ॥
যেসব
পণ্ডিত শাস্ত্রে আগুয়ান দূর ।
কহে আছে দৈবশক্তি নিশ্চয় শিশুর ॥ ৩১ ॥
পরিচিত-কাছে
তাঁর পরিচয় পেয়ে ।
সকলে আশিস করে আনন্দিত হ'য়ে ॥ ৩২ ॥
গ্রামবাসিমধ্যে কথা রাষ্ট্র হয় পরে ।
পণ্ডিতমণ্ডলী আজি পরাস্ত বিচারে ॥ ৩৩ ॥
গদাইর কাছে হৈল সবে পরাজয় ।
কি আশ্চর্য কি আশ্চর্য সকলেতে কয় ॥ ৩৪ ॥
আনন্দে উথলে হৃদি ছাড়িয়া আধার ।
প্রাণের স্বরূপ গদাধর সবাকার ॥ ৩৫ ॥
যে যেখানে ছিল ছুটে আসে দেখিবারে ।
কি পুরুষ কিবা মেয়ে গ্রামের ভিতরে ॥ ৩৬ ॥
বদন-চন্দ্রিমা হেরে তত্ত্ব যায় ভুলে ।
মহৈশ্বর্য শ্রীপ্রভুর বালকের ছলে ॥ ৩৭ ॥
ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যজ্ঞান নাহি এই দেশে ।
মহানন্দে মুগ্ধ-চিত মাধুর্যের রসে ॥ ৩৮ ॥
ভালবাসা মমতা কেবল বৃদ্ধি পায় ।
মধুর খেলার
ভিত্তি শৈশব-লীলায় ॥ ৩৯ ॥
গোকুলনগরে যেন কৃষ্ণ-অবতারে ।
আত্মহারা একমাত্র কৃষ্ণ-মুখ হেরে ॥ ৪০ ॥
অনুরূপে খেলা দেখি এখানেও তাই ।
ঐশ্বর্য-বিষয়াদির গন্ধমাত্র নাই ॥ ৪১ ॥
একে ত শৈশব বয়ঃ প্রভুর আমার ।
নয়ন বিনোদঠাম রূপের আগার ॥ ৪২ ॥
বিমোহন বাল্য-ভাব মাখা সর্ব গায় ।
দেখামাত্র মনপ্রাণ তাহাতে ডুবায় ॥ ৪৩ ॥
অপরূপ
শিশু কব কি তাঁর কাহিনী ।
অহরহঃ স্মর মন চরণ দু'খানি ॥ ৪৪ ॥
বাল্যলীলা শ্রীপ্রভুর অপূর্ব ভারতী ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৪৫ ॥
প্রথম খণ্ড
চিনুশাঁখারীর মিষ্টান্ন ও মালা গ্রহণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
অতীত বেদান্ত বেদ গীতাদি পুরাণ ।
তপ-জপ যাগ-যজ্ঞ কোটি অনুষ্ঠান ॥ ১ ॥
দরশনে চারিধামে যে ফল না ফলে ।
এক রামকৃষ্ণ-কথা গাইলে শুনিলে ॥ ২ ॥
অনায়াসে ফলে তায় লক্ষাধিক ফল ।
রামকৃষ্ণ-কথা হেন শ্রবণ-মঙ্গল ॥ ৩ ॥
ছার আমি মুঢ় কিবা প্রভু-কথা জানি ।
বিরচিত বিশ্ব যাঁর, অখিলের স্বামী ॥ ৪ ॥
ভেসে গেছে শুকদেব, মহাবেদব্যাস ।
আভাস-প্রকাশে লাগে অন্তরে তরাস ॥ ৫ ॥
কিবা রামকৃষ্ণ প্রভু কি তাঁর মহিমা ।
ক্ষুদ্র চিতে করিতে না পারি কোন সীমা ॥ ৬ ॥
সামান্য হৃদয় নহে অণুর আধার ।
প্রভু-লীলা সিন্ধুবৎ অকূল পাথার ॥ ৭ ॥
বিশাল তরঙ্গ তায় বিশ্ব-চূড়া ডুবে ।
ভাসে কত বিষ্ণু, বিধি, খাবি খায় শিবে ॥ ৮ ॥
অগণ্য ব্রহ্মাণ্ড নীচে বালুকার বন ।
সহস্র সহস্র তায় প্রকাণ্ড তপন ॥ ৯ ॥
দীপ্তিহীন ক্ষীণপ্রভা খাদ্যোতের প্রায় ।
বিলুপ্ত তরঙ্গে কভু কভু বাহিরায় ॥ ১০ ॥
জগৎ-গরাসী নাম মহান্ প্রলয় ।
সেই দেখে চমকে হৃদয়ে পায় ভয় ॥ ১১ ॥
অচিন্ত্য অসীম যদি এদিকে আবার ।
কৃপাময় রামকৃষ্ণ কৃপায় তাঁহার ॥ ১২ ॥
ইন্দ্রিয় অতীত যাহা বোধগম্য নয় ।
চোখে চোখে পলকে পলকে দৃষ্ট হয় ॥ ১৩ ॥
ঘুচে সন্দ, মন দ্বন্দ্ব করে পরিহার ।
আলোক উগারি নাশে নিবিড় আঁধার ॥ ১৪ ॥
বিষম
মায়ার বন্ধ সব টুটে যায় ।
তাই শ্রীপ্রভুর কথা না ফুটে কথায় ॥ ১৫ ॥
চিহ্ন নামে
একজন শাঁখারীর জাতি ।
দরিদ্র তাহাতে বৃদ্ধ, গ্রামেতে বসতি ॥ ১৬ ॥
ব্যবসায় অল্প আয়
কষ্টে গুজরান ।
কিন্তু তার গদাধরে ছিল বড় টান ॥ ১৭ ॥
গদাধর তার ঘরে যান নিতি
নিতি ।
সবে সুবিদিত দুঁহে বড়ই পিরীতি ॥ ১৮ ॥
গদাধরে সমাদরে বসার আসনে ।
মিষ্টান্ন
যা মিলে ভাল তাই দেয় এনে ॥ ১৯ ॥
ধীরে ধীরে খান প্রভু, চিনু বসি দেখে ।
দোকানে
খদ্দের এলে খাতির না রাখে ॥ ২০ ॥
প্রেমে গদগদ চিত চিনু ভক্তিমান ।
বিহ্বল এমন যেন শূন্য বাহ্যজ্ঞান ॥ ২১ ॥
কিবা বলে কিবা করে কোন বোধ নাই ।
না পাল্টি আঁখি দুটি দেখেন গদাাই ॥ ২২ ॥
একদিন চিনুর কি ভাব হৈল চিতে ।
চয়ন করিয়া ফুল দিব্য মালা গাঁথে ॥ ২৩ ॥
অনুরাগে
গাঁথা মালা পরিপাটি কত ।
হেনকালে গদাধর তথা উপনীত ॥ ২৪ ॥
হেরে তাঁরে চিনুর আনন্দ নাহি ধরে ।
মালা গাঁথা সাঙ্গ করি চলিল বাজারে ॥ ২৫ ॥
আনিল মিষ্টান্ন কিনি মনের মতন ।
স-মালা মিষ্টান্ন ক'রে কাপড়ে গোপন ॥ ২৬ ॥
ল'য়ে সঙ্গে গদাধর চিনু মাঠে চলে ।
অন্তর প্রান্তরে জনশূন্য বৃক্ষতলে ॥ ২৭ ॥
কেহ কোথা নাই চিনু চেয়ে চারিপানে ।
জানুপাতি করজোড়ে বৈসে চামুখানে ॥ ২৮ ॥
যতনের গাঁথা মালা বাহির করিয়ে ।
প্রভুর গলায় দেয় গদগদ হয়ে ॥ ২৯ ॥
মিষ্টান্ন খাওয়ান হাতে ধরি গদাধরে ।
শূন্য-বাক্ মুখ, আঁখি ঝরঝর ঝরে ॥ ৩০ ॥
দিনকর-কর লুপ্ত মেঘ অন্তরালে ।
লুকাইল আঁখি-দৃষ্টি নয়নের জলে ॥ ৩১ ॥
মিষ্টান্ন সহিত হাত পড়ে নানা স্থানে ।
কভু নাকে, কভু চক্ষে, কভু পড়ে কানে ॥ ৩২ ॥
আপনে চিনুর হাত করিয়া ধারণ ।
আনন্দে করিলা তার মিষ্টান্ন ভোজন ॥ ৩৩ ॥
ভোজন-সমাপ্তে চিনু আপনা-সম্বরি ।
প্রভুরে কহেন কত করজোড় করি ॥ ৩৪ ॥
আগত হয়েছে কাল জরাযুক্ত তনু ।
কত হবে লীলা-খেলা দেখিতে না পেনু ॥ ৩৫ ॥
বড়ই রহিল দুঃখ আমার অন্তরে ।
করুণ কটাক্ষে রেখ অধীন কিঙ্করে ॥ ৩৬ ॥
ধন্য ধন্য চিনু দুটি দেহ পদরেণু ।
যথার্থ তোমার নাম হইয়াছে চিনু ॥ ৩৭ ॥
চেনা কাজ বুঝ ভাল তাই চিনু নাম ।
তোমার চরণে করি অগণ্য প্রণাম ॥ ৩৮ ॥
বৃদ্ধ বটে চিনিবাস আঁটা-সোটা কায় ।
গায়েতে প্রচুর বল রোগ-নাই তায় ॥ ৩৯ ॥
প্রভুরে দেখিয়া চিহ্ন এত মত্ত হ'ত ।
কাঁধেতে চড়ায়ে তাঁয় প্রচুর নাচিত ॥ ৪০ ॥
বলরাম-অবতার ভক্ত চিনিবাস ।
দাদা শব্দে শ্রীপ্রভুর আছিল সম্ভাষ ॥ ৪১ ॥
দাদা ব'লে ডাকিলে গলিয়ে যেত চিনু ।
পরম উল্লাস মন গদগদ তনু ॥ ৪২ ॥
অচল ভকতি হৃদে সৎশাস্ত্রবিৎ ।
ভাগবতে চিনিবাস অতি
সুপণ্ডিত ॥ ৪৩ ॥
প্রভুর সহিত হয় নানা তর্কবাদ ।
কখন চটিত তর্কে, কখন আহলাদ ॥ ৪৪ ॥
শাস্ত্র লয়ে তর্কদ্বন্দ্ব কভু এত দূর ।
সপ্তম ছাড়িয়া রাগ উঠিত চিনুর ॥ ৪৫ ॥
উভয়ে
উভয়ে কথা কত মুখে মুখে ।
তুমূল বিবাদ দ্বন্দ্ব হয় মহা রোখে ॥ ৪৬ ॥
পুনশ্চ সাক্ষাৎ
নহে শপথ করিয়া ।
পলাইত নিজ ঘরে দুরু দুরু হিয়া ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর উত্তর কথা চিনুর
মতন ।
আমার সঙ্কল্প নহে পুনঃ দরশন ॥ ৪৮ ॥
হেন বিবাদের মাত্র দণ্ডেকের পর ।
উভয়েই
মহাখুশী পুনঃ একত্তর ॥ ৪৯ ॥
প্রায় হয় এই খেলা চিনিবাস-সাথ ।
পিতামহ পৌত্রে যদি
বয়সে তফাত ॥ ৫০ ॥
চরিত্রে চিনুর বহে বিছরের ধারা ।
ভক্তিতে বিভোর চিত্ত উন্মাদের
পারা ॥ ৫১ ॥
বিষয়সম্পত্তিহীন খেটে যেতে হয় ।
পোষ্যবর্গ আছে ঘরে একাকী সে নয় ॥ ৫২ ॥
সে
ভাবনা কখন না উদয় অন্তরে ।
মিষ্টান্ন খাওয়ান কিন্তু নিত্য গদাধরে ॥ ৫৩ ॥
সুন্দর
তাঁহার ভাব গদাইর সনে ।
দিবানিশি তাঁর চিন্তা বর্তমান মনে ॥ ৫৪ ॥
চিনিবাস
প্রভুদেবে বুঝেছিল ঠিক ।
যথার্থ বাসিত তাঁহে প্রাণের অধিক ॥ ৫৫ ॥
কেবা সম তাঁর যেবা 'বাসে গদাধরে ।
অধম পামর তাঁর রূপা ভিক্ষা করে ॥ ৫৬ ॥
শ্রীপ্রভুর বাল্যলীলা অমৃত ভারতী ।
এক মনে গাও রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ॥ ৫৭ ॥
প্রথম খণ্ড
বিশালাক্ষীর আবেশ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বাল্যকালে বাল্য-খেলা কত
শ্রীপ্রভুর ।
গাইলে শুনিলে হৃদে আনন্দ প্রচুর ॥ ১ ॥
অতি সুমধুর কথা শুন শুন মন ।
কামারপুকুরে প্রভু খেলিলা কেমন ॥ ২ ॥
অচিন্ত্য অব্যক্ত পূর্ণ ব্রহ্ম সনাতন ।
বেদ-বিধি তন্ত্র-মন্ত্র আগম-নিগম ॥ ৩ ॥
তপ-জপ যাগ-যজ্ঞ ক্রিয়াদির পার ।
মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয় অতীত সমাচার ॥ ৪ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু অখিলের পতি ।
কটাক্ষে প্রলয় হয় কটাক্ষেতে স্থিতি ॥ ৫ ॥
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড হয় কটাক্ষে পালন ।
অনাদি অনন্ত পরা দুঃসাধ্য সাধন ॥ ৬ ॥
এদিকে পতিত-বন্ধু কৃপার সাগর ।
অবতীর্ণ ধরাতলে ধরি কলেবর ॥ ৭ ॥
মানুষের মত ঠিক আকৃতি গঠন ।
শারীরিক ক্রিয়া-ধর্ম নরের মতন ॥ ৮॥
সঙ্গে নর খেলাপর তাহাদের সনে ।
সত্যই মানুষ যেন সাধ্য কার চিনে ॥ ৯ ॥
কি বড় মধুর কথা আছে এর পর ।
আকারে সচ্চিদানন্দ প্রভু সর্বেশ্বর ॥ ১০ ॥
নরনারী যত সব গ্রামেতে বসতি ।
সঙ্গে খেলিবারে বড় সবার পিরীতি ॥ ১১ ॥
আদরে খাওয়ায় তাঁয় ল'য়ে সংগোপনে ।
দেখা পেলে ধরে দেয় হাতে লাড্ডু কিনে ॥ ১২ ॥
গাঁথিয়া ফুলের মালা দেয় পরাইয়ে ।
মত্তচিত গ্রামে যত বিশেষতঃ মেয়ে ॥ ১৩ ॥
গদাই সবার বড় আদরের ধন ।
যা ইচ্ছা করেন কেহ না করে বারণ ॥ ১৪ ॥
বরঞ্চ আনন্দে ভরি হেরিত নয়নে ।
যখন যা খেলা হয় যাহার ভবনে ॥ ১৫ ॥
আগাগোড়া শ্রীপ্রভুর দেখি এই রীতি ।
যার সঙ্গে কথা বলে সেই পায় প্রীতি ॥ ১৬ ॥
মনোমোহনীয়া কথা নানা রসে ভরা ।
শ্রীবদনে গুপ্ত যেন সুধার ফোয়ারা ॥ ১৭ ॥
মোহন মুরতি কিংবা কার্য কোন তাঁর ।
কার সাধ্য ভুলে যদি দেখে একবার ॥ ১৮ ॥
দেখ যেন শ্রীপ্রভুর ভূমিষ্ঠ অবধি ।
ঈশ্বর-প্রসঙ্গে হয় মহান সমাধি ॥ ১৯ ॥
দর্শন-শ্রবণে হৃদি ভরে যেত ভাবে ।
ভাবময় মন ভাব-সিন্ধুনীরে ডুবে ॥ ২০ ॥
অচৈতন্য বাহ্যশূন্য আঙ্গিক বিকার ।
কভু আস্যে হাস্য কভু চক্ষে জলধার ॥ ২১ ॥
এহেন অবস্থা দেখে প্রথমে প্রথমে ।
ভূতে ধরে গদাধরে বুঝে লোকজনে ॥ ২২ ॥
অনেকের নাহি আর পূর্ব বোধ এবে ।
তারা জানে যান তিনি মহাভাবে ডুবে ॥ ২৩ ॥
মহাভারে নিমগন এই তার মানে ।
যখন যে দেব কিংবা দেবীমূর্তি মনে ॥ ২৪ ॥
আসিয়া উদয় হয় হৃদয়-মাঝারে ।
সেই দেব-দেবীভাব তাঁর তায় স্ফুরে ॥ ২৫ ॥
উপমায় কহি শুন দুই বিবরণ ।
প্রভু গদাইর লীলা অপূর্ব কখন ॥ ২৬ ॥
কামারপুকুর হ'তে নহে অতি দূর ।
সামান্য প্রান্তর অন্তে পাড়াগাঁ আনুড় ॥ ২৭ ॥
তথায় আছয়ে বিশালাক্ষী ঠাকুরানী ।
একদিন একত্রিতা অনেক রমণী ॥ ২৮ ॥
সঙ্গে শিশু গদাধর যান দরশনে ।
দেবী-আবির্ভাব গায় মাঠ-মধ্যস্থানে ॥ ২৯ ॥
অঙ্গ জড়বৎ বাহ্যুজ্ঞান নাই আর ।
আধমরা রমণীরা হেরিয়া ব্যাপার ॥ ৩০ ॥
হুলস্থুল কান্নারব অন্তর-প্রান্তরে ।
কহে কেন ল'য়ে আইলাম গদাধরে ॥ ৩১ ॥
কেনরে গদাই হেন হলি কি লাগিয়া ।
কি বলিব চন্দ্রমণি মায়ে ঘরে গিয়া ॥ ৩২ ॥
তেঁ সবার মধ্যে যেবা বুঝে শিশুবরে ।
দুই এক সঙ্গে নারী পাছু ছিল প'ড়ে ॥ ৩৩ ॥
ভক্তিমতী সেই নারী লাহার নন্দিনী ।
উতরিল ত্বরা করি যথায় সঙ্গিনী ॥ ৩৪ ॥
করে মহা কোলাহল ঘেরি গদাধরে ।
বুঝিল বিশেষ মহাতত্ত্ব, তাঁয় হেরে ॥ ৩৫ ॥
শান্ত করিবারে যত ব্যাকুলা-সঙ্গিনী ।
কহিতে লাগিল তেঁহ সুযোগ্য কাহিনী ॥ ৩৬ ॥
যেই বিশালাক্ষী যাইতেছি দেখিবারে ।
সেই দেবী এসেছেন শিশুর ভিতরে ॥ ৩৭ ॥
বিশালাক্ষী নাম তবে লয় নারীগণ ।
প্রাণসম গদা'য়ের মঙ্গল কারণ ॥ ৩৮ ॥
কর্ণমূলে দেবীনাম পশে বার বার ।
সহজ অবস্থা শিশু, ভাব নাহি আর ॥ ৩৯ ॥
দ্বিতীয় উপমা কথা অপূর্ব ভারতী ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৪০ ॥
বড়ই মধুর শ্রীপ্রভুর লীলা-গান ।
শ্রবণে পবিত্র চিত মঙ্গল আখ্যান ॥ ৪১ ॥
সাধন-ভজন কিংবা পুণ্যবল বলে ।
যে মহান হরিভক্তি কদাচিৎ মিলে ॥ ৪২ ॥
তাও অনায়াসে লাভ করে জীবগণে ।
এক রামকৃষ্ণ কথা কীর্তনশ্রবণে ॥ ৪৩ ॥
সাধ করি স্বগ্রামেতে নানা জাতি মিলে ।
বাঁধিল যাত্রার দল যুবক সকলে ॥ ৪৪ ॥
প্রাচীনের মধ্যে মাত্র চিনিবাস তার ।
মহা আম্বা আরম্ভেতে কহা নাহি যায় ॥ ৪৫ ॥
চিনিবাস বড় চিনে গদাই শিশুকে ।
না রহে গদাই যথা চিনু নাহি থাকে ॥ ৪৬ ॥
বড়ই সুমিষ্টকণ্ঠ শিশু গদাধর ।
দুই এক গানে যাঁর গরম আসর ॥ ৪৭ ॥
ভক্তি কি রঙ্গাদি রস হাস্য-প্রহসনে ।
সমকক্ষ কোন স্থানে না মিলে ভুবনে ॥ ৪৮ ॥
যদিচ অল্প বয়ঃ বারর উপর ।
সর্বরূপরসজ্ঞাত রসিকপ্রবর ॥ ৪৯ ॥
একবার শিবরাত্রি মহেশ-বাসরে ।
ভক্তবর সীতানাথ পাইনের ঘরে ॥ ৫০ ॥
নির্ধারিত হৈল হবে যাত্রা গোটা রাতি ।
মহেশ-বাসর হেতু নিদ্রা নহে রীতি ॥ ৫১ ॥
অর্থ বিনা পল্লীগ্রামে পর্বোৎসব বন্ধ ।
যদি হয় সবাকার বড়ই আনন্দ ॥ ৫২ ॥
যাত্রাকালে যাত্রাশালে যত নরনারী ।
কাতারে কাতারে বসে মহোল্লাস ভারি ॥ ৫৩ ॥
সাজঘর আসরের কিঞ্চিৎ তফাত ।
বেশকারী গয়াবিষ্ণু প্রভুর সেঙ্গাত ॥ ৫৪ ॥
নানা জনে নানাবেশে পাঠান আসরে ।
কেহ না দেখিতে পায় শিশু গদাধরে ॥ ৫৫ ॥
গদাধর সবাকার আদরের ধন ।
শ্রোতাগণ মনে মনে করে আন্দোলন ॥ ৫৬ ॥
যাত্রা প্রায় অর্ধসায় রাত্রি যায় ব'য়ে ।
তবু না আসেন তিনি আসরে সাজিয়ে ॥ ৫৭ ॥
আকুল তাঁহার জন্যে যত লোকজন ।
হেনকালে শিব-বেশে হৈল আগমন ॥ ৫৮ ॥
মহা শোভা পায় গায় মহেশের বেশ ।
চেনা দায় নাহি কায় স্বরূপের লেশ ॥ ৫৯ ॥
সুচিকন কেশগুচ্ছ তাহার বদলে ।
রুক্ষবর্ণ জটাভার লম্বমান দুলে ॥ ৬০ ॥
স্ববর্ণ সুবর্ণ জিনি চাপা হেরে যায় ।
বিভূতিতে আচ্ছাদিত মহাশোভা পায় ॥ ৬১ ॥
উপমায় কিবা গায় বর্ণজ্যোতি জ্বলে ।
শরৎ-চন্দ্রিমা শুভ্র মেঘের আড়ালে ॥ ৬২ ॥
ফটিক রুদ্রাক্ষমালা শোভিত গলায় ।
ঈষৎ আবেশ-বলে ঈষৎ দুলায় ॥ ৬৩ ॥
এক করে শিঙ্গা ধরা ত্রিশূল অপরে ।
বাঘাম্বর বিচিত্রিত বসন উপরে ॥ ৬৪ ॥
সর্বোপরি শোভমান শ্রীঅঙ্গে আবেশ ।
ধীরে ধীরে মত্ত-প্রায় আসরে প্রবেশ ॥ ৬৫ ॥
দর্শকেরা দেখে তাঁরে নহে গদাধর ।
আগত কৈলাস ছাড়ি কৈলাস ঈশ্বর ॥ ৬৬ ॥
পূর্ণ হইল শিবাবেশ বাহ্য গেল ছেড়ে ।
দুনয়নে বারিধারা অবিরল ঝরে ॥ ৬৭ ॥
মাটি নরমিয়া গেল ধারা বরিষণে ।
কে জানে কোথায় জল আছিল নয়নে ॥ ৬৮ ॥
শঙ্করের শিরে বাস জাহ্নবী আপনি ।
পরম ঈশ্বর প্রভু অখিলের স্বামী ॥ ৬৯ ॥
ব্রহ্মা-বিষ্ণু মহেশের সবার ঈশ্বর ।
প্রভুর শ্রীপাদপদ্ম জনমের ঘর ॥ ৭০ ॥
শঙ্কায় মাথায় নাহি পারে বসিবারে ।
শিবভাব প্রভু-অঙ্গে তাই চক্ষে ঝরে ॥ ৭১ ॥
জ্ঞানহারা দর্শকেরা দেখিয়া মূরতি ।
শিশু গদাধর-অঙ্গে মহেশ-প্রকৃতি ॥ ৭২ ॥
গরগর মহাভাব উঠেছে সপ্তমে ।
আপনার স্থানে নাহি নামে কোনক্রমে ॥ ৭৩ ॥
চিনে যারা চিনু আদি গ্রামবাসিগণ ।
তাড়াতাড়ি বিশ্বপত্র করিয়া চয়ন ॥ ৭৪ ॥
চরণে অর্পণ করে মহা অনুরাগে ।
মহেশ-সন্তোষ দিব্য নৈবেদ্য-সংযোগে ॥ ৭৫ ॥
হর হর দিগম্বর স্তুতি মুখে গায় ।
ধর ধর মহাভাব আপন ইচ্ছায় ॥ ৭৬ ॥
তবে ভেঙ্গে যায় ভাব অঙ্গে হয় লীন ।
কেহ বলে হেন ভাবে যায় তিন দিন ॥ ৭৭ ॥
ভাঙ্গিল সেদিন যাত্রা না হইল আর ।
প্রভু গদা'য়ের কথা তাজ্জব ব্যাপার ॥ ৭৮ ॥
আর কিবা আছে বল এত বড় মিঠে ।
গাইলে শুনিলে শুষ্ক গাছে রস ফুটে ॥ ৭৯ ॥
কথার এ কথা নয় সত্য এ সকল ।
রামকৃষ্ণ-কথা সত্য শ্রবণ-মঙ্গল ॥ ৮০ ॥
প্রথম খণ্ড
পুঁথি-লিখন
জয় শিশু গদাধর,
প্রভু পরম ঈশ্বর,
জয় জয় যত
ভক্তগণ ।
পদরজ সবাকার, মাগিতেছি বার বার,
ভক্তিহীন
পামর অধম ॥ ১ ॥
ক্রমে প্রভু বয়োধিকে, সাঙ্গ কেবল কাঠাকে,
অল্প অল্প
বর্ণ-পরিচয় ।
কিন্তু হস্তলিপি তাঁর,
গোটা গোটা দীর্ঘাকার,
পরিষ্কার
হৈল অতিশয় ॥ ২ ॥
পাঠশালে বিদ্যার্জন,
এই তক্ সমাপন,
উচ্চ
শিক্ষা নাই কোন কালে ।
বংশের যেমন রীতি,
ব্যাকরণ ন্যায় স্মৃতি,
শাস্ত্র
আদি শিক্ষা করা টোলে ॥ ৩ ॥
শুন মন অতঃপর,
কি করেন গদাধর,
পাঠশালা
করি পরিত্যাগ ।
রামকৃষ্ণায়ন-পুঁথি, লিখিবারে দিবারাতি,
অন্তরে
জনমে অনুরাগ ॥ ৪ ॥
এক পুঁথি লেখা তাঁর,
দীর্ঘাক্ষয়ে চমৎকার,
দেখিয়াছি
আপন নয়ন ।
সুবাহুর পালা সেটি,
লেখা অতি পরিপাটি,
হেলায়
পড়িবে অন্ধজনে ॥ ৫ ॥
সাঙ্গ দিন-নিরূপণ,
বার শ ছাপান্ন সন,
ঊনবিংশ
আষাঢ় মাহায় ।
প্রার্থনা করিয়া রামে, রাখিতে তাঁরে কল্যাণে,
শ্রীপ্রভুর স্বাক্ষর তাহায় ॥ ৬ ॥
কখন ভকতিভরে,
পুজা হয় রঘুবীরে,
নানা ফুলে
গাঁথি ফুলহার ।
কভু উচ্চে রামনাম,
গাইতেন অবিরাম,
প্রভুর
অঙ্কুর সাধনার ॥ ৭ ॥
রঙ্গ-রস-পরিহাসি, লয়ে যত প্রতিবাসী,
হাসিরাশি
প্রকাশি বয়ানে ।
শুনিতে কীর্তন যাত্রা,
সঙ্গিসহ হয় যাত্রা,
পল্লীগ্রামে যা হয় সেখানে ॥ ৮ ॥
অরুণ-উদয় আগে,
যেইরূপ পূর্বভাগে,
নানারাগে
রক্তিম বরণ ।
জগৎ-লোচন রবি,
কিরণ-আকর ছবি,
প্রায়াগত
প্রকাশে লক্ষণ ॥ ৯ ॥
বালক বালার্ক-রূপ,
তেমতি প্রভুর রূপ,
অপরূপ দিন
দিন উঠে ।
মর্মগ্রাহী সুচতুর,
প্রতিবাসী শ্রীপ্রভুর,
সময়
বুঝিয়া সঙ্গে জুটে ॥ ১০ ॥
হয় কথা ইশারায়,
অন্যে না বুঝিতে পায়,
বোবায়
বোবায় যেন ভাষ ।
শ্রী প্রভুর নরলীলা,
ধরায় বৈকুণ্ঠ মেলা,
লেখনীতে
না হয় প্রকাশ ॥ ১১ ॥
এবে নিকটস্থ গ্রামে,
গদাই ঠাকুরে ক্রমে,
চিনিতে
লাগিল লোকজন ।
গদাই বুঝিয়া স্থান,
গ্রাম গ্রামান্তরে যান,
বহুলোকে
করে আবাহন ॥ ১২ ॥
একে বয়ঃ সুকুমার, রূপ-লাবণ্য-আগার,
দীপ্তিমান
বয়ান সুন্দর ।
গুণটানা শরাসন,
অল্প বাঁকা দু'নয়ন,
ত্রিভুবন-জন-মনোহর ॥ ১৩ ॥
প্রশস্ত কপোল তলে,
সুদীর্ঘ কুন্তল খেলে,
মুখদ্যুতি
অর্ধ আবরণ ।
শতগুণে শোভা বাড়ে, যখন জলবে ঘেরে,
শরতের
চন্দ্রিমা কিরণ ॥ ১৪ ॥
নাসা অতি পরিপাটি, রক্তিম অধর দুটি,
সুবিশাল
বক্ষ মনোহর ।
বাহুযুগ সুললিত, দুলে আজানুলম্বিত,
মধ্যদেশ
বড়ই সুন্দর ॥ ১৫ ॥
কায়মত পদদ্বয়,
ভকত-লালসালয়,
হৃদিরত্ন
সেব্য কমলার ।
সৌন্দর্যের ছবিখানি,
কণ্ঠে ফুটে মিঠা বাণী,
মোহনত্ব
নহে বলিবার ॥ ১৬ ॥
শ্যাম-শ্যামা গুণগান, মধুর গদাই গান,
মনপ্রাণ
মুগ্ধ যেই শুনে ।
কভু না ভুলিতে পারে, থেকে থেকে মনে পড়ে,
কি ছিল
জানি না কিবা গানে ॥ ১৭ ॥
গ্রামের রমণীগণ,
গদাধরে মুগ্ধ মন,
রূপে গুণে
তন্ময় সকলে ।
হেরে তাঁরে সদা সাধ,
দারুণ হৃদে বিষাদ,
সাধে বাদ
জঞ্জাল ঘটিলে ॥ ১৮ ॥
প্রভুসঙ্গে তা' সবার,
কি প্রকার ব্যবহার,
বলিবার
কথা নহে মন ।
ভিতরে সুন্দর কাণ্ড, কাঁচা মন লণ্ডভণ্ড,
সেই হেতু
রাখিনু গোপন ॥ ১৯ ॥
আভাস সঙ্কেতে কই, মিষ্টিমাখা চিড়া-দই,
প্রভু বই
নাহি জানে আর ।
গোপনে অনেক নারী,
গড়িয়ে দিত বাঁশরী,
ভাঙ্গিয়া
গায়ের অলঙ্কার ॥ ২০ ॥
গুপ্তমুখ কুলবালা, গেঁথে দিত ফুলমালা,
যেন সাধ্য
মিষ্ট ভোজ্য কিনে ।
কেহ পুত্র নির্বিশেষে,
গদাধরে ভালবাসে,
সমাদরে
পরম যতনে ॥ ২১ ॥
ভগবৎ-ভক্ত যারা,
মহানন্দ পায় তারা,
শুনে কাছে
ঈশ্বর প্রসঙ্গ ।
হাস্য-রস সকৌতুক,
কিসে নহে পরাঙ্মুখ,
নানা রঙ্গ
রসের তরঙ্গ ॥ ২২ ॥
বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর,
শুনিয়াছি যতদূর,
যাওয়া আসা
ছিল নানা স্থানে ।
বিশেষে শিয়ড় গ্রাম,
যথা হৃদয়ের ধাম,
সম্পর্কেতে হৃদয় ভাগিনে ॥ ২৩ ॥
হৃদুসঙ্গে সম্মিলন,
এবে হ'তে বিলক্ষণ,
সংঘটন হইল
তাঁহার ।
পরস্পর বড় প্রীতি,
হৃদু ভাগ্যবান অতি,
পশ্চাৎ
গাইব সমাচার ॥ ২৪ ॥
প্রথম খণ্ড
কালীপূজা ও রমণীর বেশধারণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর বাল্যখেলা অতি মনোহর ।
বয়ঃবৃদ্ধি-সহ দেহে লাবণ্য সুন্দর ॥ ১ ॥
গ্রামের বালক যত তিলেক না ছাড়ে ।
দিবারাতি মহামেলা ব্রাহ্মণের ঘরে ॥ ২ ॥
ছোট বড় বয়সের সহচরগণ ।
পূর্ববৎ একসঙ্গে সময় যাপন ॥ ৩ ॥
নানা রঙ্গে ভ্রমে তারা শ্রীপ্রভুর সনে ।
সবার সর্দার প্রভু সকলেই মানে ॥ ৪ ॥
যখন যা হয় আজ্ঞা কভু নহে হেলা ।
মহন্তের মঠে যেন আজ্ঞাবহ চেলা ॥ ৫ ॥
কতই খেলেন প্রভু তা সবার সনে ।
অমানুষী সব কেহ তত্ত্ব নাহি জানে ॥ ৬ ॥
শ্রীরাম মল্লিক নামে গ্রামে একজন ।
প্রভুর সঙ্গেতে ভাব বড়ই তখন ॥ ৭ ॥
দিনে রেতে
এক সাথে আহার-বিহার ।
এক বিছানায় নিদ্রা নিত্য দোঁহাকার ॥ ৮ ॥
লোকে জনে উভয়ের পিরীতি দেখিয়া ।
পরিহাসে বলিতেন কৌতুক করিয়া ॥ ৯ ॥
বিবাহ হইত এ'দুয়ের পরস্পর ।
যদি কেহ হ'তো মেয়ে ইহার ভিতর ॥ ১০ ॥
কম বেশী সকলের সঙ্গে ভালবাসা ।
সঙ্গ-সহবাসে কারো না মিটে পিপাসা ॥ ১১ ॥
লয়ে আসা ভালবাসা অপার অতুল ।
যাহে গড়িলেন লীলা-খেলার দেউল ॥ ১২ ॥
গুণনিধি সর্বগুণ তাঁহাতে বিরাজে ।
কেহবা এগুণে কেহ অন্যগুণে মজে ॥ ১৩ ॥
গদাইর চিত্রকার্য এতই সুন্দর ।
হতবুদ্ধি যাহে বড় বড় চিত্রকর ॥ ১৪ ॥
অবাক হইয়া রহে চিত্র দেখে যারা ।
অনুরূপে ভাবে ঠামে প্রকৃত চেহারা ॥ ১৫ ॥
পঞ্চভূতে গড়া আগে এখন বিরাজে ।
গদাইর চিত্রলেখা পটের কাগজে ॥ ১৬ ॥
বিধাতা যাঁহার গড়া তাঁহার মহিমা ।
কে বল বর্ণিতে পারে তিল অণুকণা ॥ ১৭ ॥
মাটির প্রতিমা হাতে গড়ে গদাধর ।
সুন্দর হইতে তেহ অধিক সুন্দর ॥ ১৮ ॥
ভাবে রূপে সুঠামে সুন্দর অবিকল ।
দেখিলে না যায় চেনা মাটির নকল ॥ ১৯ ॥
চক্ষুদানে আঁখিতারা হেন দীপ্তিমান ।
মৃন্ময় মুরতি হয় জীবন্ত সমান ॥ ২০ ॥
নকলে আসল জ্ঞান চিত্রে হয় যাঁর ।
তিনি আদ্যাশক্তি নিজে শক্তির ভাণ্ডার ॥ ২১ ॥
যে শক্তির দেহে রহে সৃষ্টির আকুর ।
তাঁহারই ঘন মুর্তি গদাই ঠাকুর ॥ ২২ ॥
গড়েন গদাই হাতে দেবীর প্রতিমা ।
সঙ্গিগণ ল'য়ে হয় পুজা-আরাধনা ॥ ২৩ ॥
পুষ্পপত্র প্রয়োজন যেন লয় মনে ।
আজ্ঞামাত্র সংগ্রহ করয়ে সঙ্গিগণে ॥ ২৪ ॥
সঙ্গিগণে কেহ কিছু বুঝিতে না পারে ।
যা বলেন প্রভু, তারা তাই মাত্র করে ॥ ২৫ ॥
শ্রীপ্রভুর বাল্যখেলা অপূর্ব কথন ।
খেলাছলে মহাকার্য হয় সমাপন ॥ ২৬ ॥
গ্রামেতে পুরুষ-নারী বালক কি বালা ।
যার যেন সাধ তার সঙ্গে তেন খেলা ॥ ২৭ ॥
রঙ্গ বহু বিশেষতঃ নারীদের সনে ।
প্রভুরও রমণী ভাব ষোল আনা মনে ॥ ২৮ ॥
ফুটে মুখে মিঠা বাণী রমণীর প্রায় ।
প্রকৃতিস্থলভ ভাব কান্তিমাখা গায় ॥ ২৯ ॥
পরিচয়-হেতু কথা শুন শুন মন ।
অপরূপ প্রভুর বাল্য-বিবরণ ॥ ৩০ ॥
গ্রাম্য রমণীরা প্রভুদেবে এত 'বাসে ।
না দেখিতে পেলে পরে ঘরে খুঁজে আসে ॥ ৩১ ॥
বয়স ক্রমশঃ বেশী, নহে পূর্বতন ।
কৈশোরে প্রবেশ তায় ছিয়ালা-গড়ন ॥ ৩২ ॥
কূলবতী পক্ষে লজ্জা কুলের তরাস ।
শ্রীপ্রভুর সঙ্গে করে রঙ্গ পরিহাস। ॥ ৩৩ ॥
সরম না আসে মনে, যত কুলবতী ।
প্রভুরে দেখিত তারা তাহাদের জাতি ॥ ৩৪ ॥
দিবানিশি তাই খেলা সকলের সনে। ।
যুবক বালকবৎ বাল্যলীলা শুনে ॥ ৩৫ ॥
সুবর্ণবণিক জেতে গ্রামেতে বসতি ।
সেই বংশে চৌদ্দ বোন সবে রূপবতী ॥ ৩৬ ॥
ভগিনীগণের মধ্যে প্রধানা রুক্মিণী ।
অদ্যাপিহ বর্তমানা তাঁর মুখে শুনি১
॥ ৩৭ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রতি হৃদে ভালবাসা ভরা ।
নহেন একাকী, ঘরে যত সহোদরা ॥ ৩৮ ॥
প্রভু-দরশন হেতু এত লুব্ধ মন ।
গ্রামত্যাগাপেক্ষা ভাল বুঝিত মরণ ॥ ৩৯ ॥
শ্বশুরের ঘর তাই যাওয়া নাই হ'ত ।
প্রভু-দেবে তারা সবে এতই 'বাসিত ॥ ৪০ ॥
কেবা তাঁরা শ্রীপ্রভুরে এত 'বাসে প্রাণে ।
মহামতী ভাগ্যবর্তী প্রণতি চরণে ॥ ৪১ ॥
সাধ্য কার স্বরূপত্ব করিবে প্রকাশ ।
মূর্খ মুঢ়মতি করি পদরজ আশ ॥ ৪২ ॥
অতি রূপবান প্রভু নবীন বয়েস ।
ধরি অঙ্গে অপরূপ রমণীর বেশ ॥ ৪৩ ॥
দেশের চলন যেন মোটা আভরণ ।
শিরে ধরা বেণীগুচ্ছ বাঁধা সুশোভন ॥ ৪৪ ॥
পরিয়া কাপড় বড় পাড় পরিপাটি ।
আবরণ শ্রীবদন যান গুটি গুটি ॥ ৪৫ ॥
প্রকৃতি-সুলভ হাবভাবে অঙ্গভরা ।
কে পারে চিনিতে সাজা রমণী-চেহারা ॥ ৪৬ ॥
পুরুষেরা চিনে পাছে এই শঙ্কা ক'রে ।
খিড়্কি দিয়া ঢুকিতেন, বেনেদের ঘরে ॥ ৪৭ ॥
ধরা বেশ ঠিক যেন রমণীর প্রায় ।
আবরণে কোনক্রমে চেনা নাহি যায় ॥ ৪৮ ॥
নানা রঙ্গ করি প্রভু, ধরা দিলে পরে ।
যত বোন হয় খুন হেসে হেসে মরে ॥ ৪৯ ॥
দেবেশ-দুর্লভ যে প্রভুর দরশন ।
যোগেশ-আশায় করে দুস্তর সাধন ॥ ৫০ ॥
মহেশ প্রমত্ত-চিত-মাত্র নামে যাঁর ।
বিরিঞ্চি-বাঞ্ছিত পদ সেব্য কমলার ॥ ৫১ ॥
নারদাদি শুকদেব যত ঋষিগণ ।
সতত যাঁহার করে মহিমা-কীর্তন ॥ ৫২ ॥
আগম নিগম তন্ত্র বেদ গীতা আদি ।
না ফুরায় স্তোত্র গায় চিরকালাবধি ॥ ৫৩ ॥
বেদ-বিধি তপ-জপ সাধনার পার ।
ক্রিয়া-কাণ্ড লণ্ডভণ্ড আশয়ে যাঁহার ॥ ৫৪ ॥
কোন মতে কোন পথে নাহি মিলে যারে ।
সে জন সুলভ এত কামারপুকুরে ॥ ৫৫ ॥
ভক্তি-ভক্ত-ভাব নাহি গ্রামবাসী সনে ।
তাদের গদাই, তারা এই মাত্র জানে ॥ ৫৬ ॥
এখানে কেবল বেখি স্নেহের সম্ভাষ ।
প্রভুতে ভক্তির কথা, কথা উপহাস ॥ ৫৭ ॥
ভগ্নীগণে নানাবিধ খাইবারে দিত ।
দোলনা বাঁধিয়া ঘরে তাঁরে দোলাইত ॥ ৫৮ ॥
বাড়িতে যতেক নারী বসি একত্তর ।
শুনেন কতই কথা কন গদাধর ॥ ৫৯ ॥
বীণা জিনি কণ্ঠস্বর শুনিয়া সঙ্গীত ।
আনন্দ-তুফানে হয় সবে বিমোহিত ॥ ৬০ ॥
তুফান-সঙ্গিনী উচ্চ কলকল নাহ ।
অরসিক জনে গণে কানে পরমাদ ॥ ৬১ ॥
জটিলা-কুটিলা ভাবে ভরা যেই জন ।
মুরলীর গানে গণে কুলিশ-নিস্বন ॥ ৬২ ॥
বলাবলি করে দূরে সন্দেহ অন্তর ।
যুবতীর বলে কিবা করে গদাধর ॥ ৬৩ ॥
গৃহস্বামী সীতানাথ রুক্মিণীর পিতা ।
গদা'য়ে যে বুঝে ইষ্ট পরমদেবতা ॥ ৬৪ ॥
ভক্তিমান সুবিশ্বাসী তাঁয় গিয়া বলে ।
কি করেন গদাধর তাঁহার বাকুলে ॥ ৬৫ ॥
গালে হাত সীতানাথ কর হাসি হাসি ।
জান না কি গদাধর অকলঙ্ক শশী ॥ ৬৬ ॥
হেন তিনি যতক্ষণ থাকেন ভবনে ।
করে চিত আলোকিত আনন্দ-কিরণে ॥ ৬৭ ॥
বালক কেবল যেন বালক-আকার ।
পবিত্র মুরতি নানা গুণের আধার ॥ ৬৮ ॥
মত্ত হয়ে যে সময় গুণগাথা রটে ।
তখনি অমনি আর পাঁচজন জুটে ॥ ৬৯ ॥
সবে মিলে গুণগাথা করে আন্দোলন ।
শ্রুতি-মিঠে গদা'য়ের বাল্য-বিবরণ ॥ ৭০ ॥
কেহ কর মহাশয় আমাদের ঘর ।
গত মাসে তিন দিন ছিলা গদাধর ॥ ৭১ ॥
অমিয়-বরষী কথা শুনিয়া শ্রবণে ।
আছিলাম সুখে মত্ত নরনারীগণে ॥ ৭২ ॥
ব্যস্ত হয়ে অন্যে কহে মমালয়ে স্থিতি ।
গত পক্ষে ছিলা দুই দিন দুই রাতি ॥ ৭৩ ॥
আনন্দের পরিসীমা নহে বলিবার ।
যথায় গদাই বসে আনন্দ-বাজার ॥ ৭৪ ॥
অন্ধকার মোর ঘর
ফিরে এলে পরে ।
দিবারাতি কাঁদে প্রাণ গদা'য়ের তরে ॥ ৭৫ ॥
তৃতীয় ততই ব্যস্ত কহিতে
কাহিনী ।
গদা'য়ে পাইয়ে কিবা ভুগেছেন তিনি ॥ ৭৬ ॥
প্রিয়-দরশন গুণনিধি গদাধর ।
হেরিলে হরয়ে তাপ জুড়ায় অন্তর ॥ ৭৭ ॥
ধন-পুত্র-নাশ-শোক সন্তাপ ভীষণ ।
গদাই-দর্শনে করে সব নিবারণ ॥ ৭৮ ॥
দ্বেষিগণে কথা শুনে মহা লজ্জা পায় ।
উক্ত কথা পরিহাস বলিয়া উড়ায় ॥ ৭৯ ॥
আকারেতে গদাধর বালকের সাজ ।
নানা রঙ্গরসজ্ঞাত যেন রসরাজ ॥ ৮০ ॥
স্ত্রীলোকের যত খেলা জানিতেন তিনি ।
ঘুসিম খেলার সঙ্গী গুসি নাপিতিনী ॥ ৮১ ॥
স্ত্রীলোকের সঙ্গে খেলা হাস্য পরিহাস ।
প্রচুর প্রভুর তাহে আছিল উল্লাস ॥ ৮২ ॥
কভু বকুলের ফুলে আভরণ গাঁথি ।
দু'হাতে পইছা বাজু শিরে ধরা সিঁথি ॥ ৮৩ ॥
পরিধানে পাছাপেড়ে বসন সুন্দর ।
কাঁখেতে কলসী গতি বেনেদের ঘর ॥ ৮৪ ॥
দরজায় নারীগণে ডাকিতেন এঁটে ।
আর কে লো যাবি জলে সূর্য যায় পাটে ॥ ৮৫ ॥
নারীগণ ফুল্লমন দেখি গদাধর ।
একে একে কুড়ি দরে হয় একত্তর ॥ ৮৬ ॥
যে জনার প্রয়োজন কিছু নাই জলে ।
সেও কাঁখে কুম্ভ করি এসে মিশে দলে ॥ ৮৭ ॥
ধীরে ধীরে চলে জলে মাঝে গদাধর ।
প্রভুর বদন ঢাকা ঘোমটা ভিতর ॥ ৮৮ ॥
পুরুষেরা যত সব বসিয়া সদরে ।
জলে যেতে যেই পথ, তার দুই ধারে ॥ ৮৯ ॥
কেহ না চিনিতে পারে প্রভু গদাধর ।
জল-হেতু কাঁখে কুম্ভ যান সরোবর ॥ ৯০ ॥
এরূপ খেলেন প্রতিবাসিনীর সনে ।
ব্রজভাবোদয় হয় বাল্যলীলা শুনে ॥ ৯১ ॥
বৃন্দার-মা নামে এক ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
বড় প্রীতি ছিল তাঁর প্রভুরে খাওয়ায়ে ॥ ৯২ ॥
অন্ন-ব্যঞ্জনাদি তেহ করিয়া রন্ধন ।
হামেশা প্রভুরে করে ঘরে নিমন্ত্রণ ॥ ৯৩ ॥
বড়ই
সন্তোষ প্রভু তাঁহার রন্ধনে ।
যাচিতেন নিমন্ত্রণ না হ'ত যে দিনে ॥ ৯৪ ॥
যার যেন
সাধ তাঁরে তাই দেয় খেতে ।
বড় দুঃখ করে যারা অতি খাট জেতে ॥ ৯৫ ॥
খেতির-মা নামে এক, জাতি সূত্রধর ।
বড় সাধ ঘরে বসে খান গদাধর ॥ ৯৬ ॥
বলিতে নাহিক শক্তি প্রকাশিতে ভয় ।
গোপনে মনের কথা শঙ্করীরে কয় ॥ ৯৭ ॥
ভাগ্যবতী ভিক্ষামাতা ধনী কামারিনী ।
শঙ্করী আছিল তাঁর কনিষ্ঠা ভগিনী ॥ ৯৮ ॥
ভকত-বৎসল ভক্ত প্রিয় গদাধর ।
বুঝিলা অন্তরে কিবা ভিতরে খবর ॥ ৯৯ ॥
দেখামাত্র শঙ্করীরে কন সংগোপনে ।
কি বলে খেতির মাতা কিবা সাধ মনে ॥ ১০০ ॥
শঙ্করী বলেন সব বুঝেছ বারতা ।
কি খাইবে বল তবে এনে দিব হেথা ॥ ১০১ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন হেথা পথে কে খাইবে ।
ঘরে বসে খাব তার যাহা কিছু দিবে ॥ ১০২ ॥
ভক্তবৎসলতা-ভাব মরি কি সুন্দর ।
অনায়াসে যান খেতে ছুতারের ঘর ॥ ১০৩ ॥
শূদ্রদত্ত বস্তু যেই বংশে নাহি চলে ।
কুলাচার এত আঁটা জন্ম সেই কুলে ॥ ১০৪ ॥
একবার কুল রীতি করি অতিক্রম ।
শূদ্রদত্ত ভোজ্য আই করেন গ্রহণ ॥ ১০৫ ॥
পেয়ে তত্ত্ব ক্রুদ্ধচিত্ত উন্মত্তের প্রায় ।
শুদ্ধাচারী পতি তাঁর তাড়া কৈলা তাঁর ॥ ১০৬ ॥
কাঠের পাদুকা ল'য়ে যত গায় জোরে ।
দাঁড়ায়ে মারেন বৌলা পিঠের উপরে ॥ ১০৭ ॥
হেন বংশে ল'য়ে জন্ম প্রভু ভগবান ।
যে দেয়
আদর করি তার ঘরে খান ॥ ১০৮ ॥
জাতির খাতির মনে কিছুমাত্র নাই ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ঠাকুর গদাই ॥ ১০৯ ॥
শ্রীপ্রভুর বাল্যখেলা মধুর ভারতী ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১১০ ॥
১ বর্তমানে তিনি স্বর্গগতা — প্রঃ
প্রথম খণ্ড
খেলাছলে আসন-প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
দেখ মন যা খেলিলা বালক গদাই ।
বুঝিবারে বালকের কৃপাকণা চাই ॥ ১ ॥
না দেখিতে পেলে লীলা বুঝা বড় দায় ।
চাঁদের কিরণ যেন চাঁদেতে মিশায় ॥ ২ ॥
না হইলে চক্ষুষ্মান কে দেখিতে পারে ।
থালার মতন চাঁদ কত আলো ধরে ॥ ৩ ॥
দিন দিন যায় যত বাড়ে বয়ঃক্রম ।
দেখান সবারে খেলা নূতন নূতন ॥ ৪ ॥
কেহ না বুঝিতে পারে কি ভিতরে তাঁর ।
বিনা দুই-এক আর চিনু শঙ্খকার ॥ ৫ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেব না বলিয়া কারে ।
থাকিতেন দুই-চারি দিন স্থানান্তরে ॥ ৬ ॥
কোথায় গমন কিবা স্থান কোন্ খানে ।
সে তত্ত্ব সুগুপ্ত কেহ কিছু নাহি জানে ॥ ৭ ॥
লুপ্ত পূর্বকার ভাব নাহিক উল্লাস ।
চিন্তাতুর মুখভার উদাস উদাস ॥ ৮ ॥
শৈশব হইতে আজিতক নিরন্তর ।
রঙ্গ-রস-পরিহাস কতই রগড় ॥ ৯ ॥
বঞ্চিলেন আগাগোড়া যাহারের সনে ।
তারাও কহিলে কথা নাহি চান পানে ॥ ১০ ॥
বহু জেদ অনুরোধ করিবার পর ।
বিষাদিত ক্ষুব্ধচিতে দিতেন উত্তর ॥ ১১ ॥
বৃথা কাজে অনর্থক এত দিন গেল ।
সুন্দর সে হরি তাঁর তত্ত্ব না হইল ॥ ১২ ॥
বিষয়ে মলিন বৃদ্ধি তোমরা সকলে ।
কি মধুর হরি-কথা নাহি কও ভুলে ॥ ১৩ ॥
সকল সন্তাপহর হরি-আলাপনা ।
স্মরণ-মনন নানা সাধন-ভজনা ॥ ১৪ ॥
তাহে নাহি রুচি, রুচি হাস্য-পরিহাসে ।
এরূপে কাটিলে কাল কি হইবে শেষে ॥ ১৫ ॥
অনিত্য সংসার এই ভেবে দেখ ভাই ।
হরি বিনা মানুষের অন্য গতি নাই ॥ ১৬ ॥
হরি-কথা প্রভু যত কন সঙ্গিগণে ।
চেয়ে দেখে তাঁর কথা নাহি শুনে কানে ॥ ১৭ ॥
ভাগ্যবান সঙ্গিগণ হরি চায় নাই ।
বড় খুশী দিবানিশি পাইলে গদাই ॥ ১৮ ॥
ব্রহ্মানন্দ-সম্ভোগেতে যে সুখ উদর ।
প্রভু-সঙ্গ-সুখ সনে কিছুমাত্র নয় ॥ ১৯ ॥
মরি
কি মধুর নর-লীলা ধরাধামে ।
নরদেহে নিজে হরি মায়া-আবরণে ॥ ২০ ॥
মুগ্ধকর সহচর সদা সঙ্গে বাস ।
তাহারাও তিলমাত্র না পায় আভাস ॥ ২১ ॥
অমৃত সমান ক্ষীর মাতৃ-বক্ষে স্থান ।
খায় শিশু পায় পুষ্টি নাহি জানে নাম ॥ ২২ ॥
সেই মত শ্রীপ্রভুর যত সহচর ।
নাহি বুঝে পরানন্দ, ভুঞ্জে নিরস্তর ॥ ২৩ ॥
শ্রীপ্রভুর সঙ্গ-সুখ করে আস্বাধন ।
রুক্ষ হরি-কথা কেন করিবে শ্রবণ ॥ ২৪ ॥
সঙ্গ-সুখ-ভোগী যারা সঙ্গ-সুখ' চায় ।
প্রভু-সঙ্গ সুখানন্দ না আসে কথায় ॥ ২৫ ॥
যে ভুগেছে সে জেনেছে তাহার মরমে ।
উপমায় অলিকুল যেমন কুসুমে ॥ ২৬ ॥
মধু পেলে খায়, নৈলে নাহি খায় আর ।
উপবাসে যদি হয় জীবন-সংহার ॥ ২৭ ॥
চাতক ফটিক জলে যেমন পিয়াসে ।
যায় প্রাণ তবু নাহি জলাশয়ে বসে ॥ ২৮ ॥
সেই মত যে করেছে প্রভু-সহবাস ।
না করে কখন অন্য সুখ-অভিলাষ ॥ ২৯ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু গদাধর ।
যে ভক্তে যা চায়, দায় তাঁহার উপর ॥ ৩০ ॥
সঙ্গে
খেলিবারে চায় যত সঙ্গিগণ ।
করিবারে তাহাদের বাসনা পূরণ ॥ ৩১ ॥
রচিলা নূতন খেলা
সময়ের মত ।
অতি মনোহর প্রভু গদাই-চরিত ॥ ৩২ ॥
মোহিত বিমুগ্ধ-চিত যত সঙ্গিগণ ।
প্রভুর নূতন খেলা করি দরশন ॥ ৩৩ ॥
যোগাসন যতগুলি যোগিজনে জানা ।
প্রভুর
প্রচুরভাবে সব আছে জানা ॥ ৩৫ ॥
সুদীর্ঘজীবনযুক্ত ঋষি-মুনিগণ ।
সে আসন অভ্যাসেতে
আগোটা জীবন ॥ ৩৬ ॥
কাটায় অশেষ রূপ সুখ পরিহরি ।
ফল মূল জল কিংবা বাতাহার করি ॥ ৩৭ ॥
তবু নহে সিদ্ধকাম বৃথা শ্রম যায় ।
তাহাই করেন প্রভু কথায় কথায় ॥ ৩৮ ॥
যোগেশ-দুঃসাধ্য সেই অসাধ্য-সাধনা ।
স্বতঃসিদ্ধ শ্রীপ্রভুর সব ভাল জানা ॥ ৩৯ ॥
ঘরে
ভরা নানা নিধি আছয়ে যাঁহার ।
তখনি বাহির করে ইচ্ছা যবে তাঁর ॥ ৪০ ॥
অনন্ত রতনাগার
দেহ শ্রীপ্রভুর ।
দেবের দুর্লভ দ্রব্য প্রচুর প্রচুর ॥ ৪১ ॥
দেশের মানুষে কিবা
বুঝিবে আসন ।
চাষে খাটে মোটা লোক নিরক্ষর জন ॥ ৪২ ॥
ধর্মশাস্ত্র-অধ্যয়নে বৃদ্ধি
বিপরীত ।
ব্যাকরণে সন্ধি জানে সে অতি পণ্ডিত ॥ ৪৩ ॥
আসন কাহারে কয় কি আছে আসনে ।
কি ব্রাহ্মণ কি বৈষ্ণব কেহ নাহি জানে ॥ ৪৪ ॥
আসনের নাম দেশে এই বলবৎ ।
সংগ্রাম-কৌশল-কার্য কুস্তি কসরত ॥ ৪৫ ॥
হেনভাবে করিতেন আসন গোসাঁই ।
যে দেখে সে বুঝে যেন অঙ্গে অস্থি নাই ॥ ৪৬ ॥
দর্শকেরা বৃদ্ধিহারা পাষাণের প্রায় ।
বলেন গদাই হেন শিখিল কোথায় ॥ ৪৭ ॥
নিকটস্থ
গ্রামে গ্রামে পড়ে গেল সাড়া ।
কেহ নাহি কুস্তি-পটু গদাইর পারা ॥ ৪৮ ॥
সব তত্ত্ব
সুবিদিত ছিল চিনিবাস ।
বলিতেন প্রভুদেবে করিয়া সম্ভাস ॥ ৪৯ ॥
বুঝেছি বুঝেছি
তত্ত্ব ওরে গদাধর ।
এবারে উঠেছে তোর ভিতরেতে ঝড় ॥ ৫০ ॥
যাবি চলে লীলা-স্থলে না
রহিবি আর ।
তাই কর খেলা ছেড়ে বৈরাগ্য-বিচার ॥ ৫১ ॥
আগুসাঙ্গ চিনিবাস দৃষ্টি
বহুদূর ।
বুঝে সকলের সার গদাই ঠাকুর ॥ ৫২ ॥
যাহা দেখাইলা প্রভু কামারপুকুরে ।
খেলা ভিন্ন অন্য জ্ঞান কেহ নাহি করে ॥ ৫৩ ॥
বুঝাবুঝি পক্ষে যারা ছিল আগুয়ান ।
ভুলিত সকল দেখি প্রভুর বয়ান ॥ ৫৪ ॥
সেই ঈশ্বরীয় মায়া যে মায়ার বলে ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের বুদ্ধি যায় দুলে ॥ ৫৫ ॥
হেন মায়া ল'য়ে খেলা করে গদাধর ।
মায়াপতি মায়াতীত পরম ঈশ্বর ॥ ৫৬ ॥
ধরি নর-কলেবর মায়ায় মোহিত ।
রামকৃষ্ণ
শ্রীপ্রভুর বিচিত্র চরিত ॥ ৫৭ ॥
শ্রবণ-কীর্তনে নাশে মায়ার বন্ধন ।
স্মরণ-মননে হয়
তাপ-বিমোচন ॥ ৫৮ ॥
হয় আঁখি-উন্মীলন ঘুচে অন্ধকার ।
ভবসিন্ধু-গোস্পদ হেলায় হয়
পার ॥ ৫৯ ॥
ভেলায় বসিয়া দেখে তরঙ্গ-তুফান ।
রামকৃষ্ণ-কথা হেন মঙ্গল-নিদান ॥ ৬০ ॥
সায়
বাল্য-লীলাগীত শ্রুতি-সুমধুর ।
গাইব দ্বিতীয় খণ্ডে সাধনা প্রভুর ॥ ৬১ ॥
প্রথম
খণ্ড সমাপ্ত
দ্বিতীয় খণ্ড
অথ শ্রীমদ্ রামকৃষ্ণস্তবরাজঃ প্রারভ্যতে
ওঁ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়
ওঁকারবেদ্যুঃ
পুরুষঃ পুরাণো
বুদ্ধেশ্চ সাক্ষী নিখিলস্য জন্তোঃ ।
যো বেত্তি সর্বং ন চ যস্য বেত্তা
পরাত্মরূপো ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ১ ॥
ন বেদগম্যো ন চ যোগগম্যো
ধ্যানৈর্ন জাপৈর্ন তপোভিরুগ্রৈঃ ।
জ্ঞেয়ঃ কদাপীহ ততোঽবতীর্ণো
দয়ানিধে ত্বং ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ২ ॥
মোক্ষস্বরূপং তব ধাম নিত্যং
যথা তদাপ্নোতি বিশুদ্ধ-চিত্তঃ ।
তথোপদেষ্টাঽ খিল-তত্ত্ববেত্তা
ত্বং বিশ্বধাতা ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৩ ॥
ভক্তেস্তথা শুদ্ধজ্ঞানস্য মার্গো
প্রদর্শিতৌ দ্বৌ ভবমুক্তিহেতু ।
তয়োর্গতানাং ধ্রুবনায়কোঽসি
ত্বং মোক্ষসেতুর্ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৪ ॥
গতিস্বমেকা জগতাৎ জডানাৎ
পুরা বিসৃষ্টেশ্চিদখণ্ডরূপঃ ।
তদ্বল্লয়ে স্যা অধুনাসি তদ্বৎ
ত্বমাদিদেবো ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৫ ॥
বর্ণাশ্রমাচার-বিহীনশান্তাঃ
সন্ন্যাসিনো জ্ঞান-বিচিত্তাঃ ।
ধ্যায়স্তি যং নিত্যমভেদ-দৃষ্ট্যা
স এব হি ত্বং ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৬ ॥
তেজোময়ং দর্শয়সি স্বরূপং
কোষান্তরস্থং পরমার্থতত্ত্বং ।
সংস্পর্শমাত্রেপ্তঘৃণাং সমাধিং
বিধায় সন্তো ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৭ ॥
রাগাদিশূন্যাং তব সৌম্যমূর্তিং
দৃষ্টা পুনশ্চাত্র ন জন্মভাজঃ ।
স্থানে যদাদায় বিশুদ্ধসত্ত্বং
ইহাবতীর্ণো
ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৮ ॥
মহদ্বিচিত্রং মহদ্বালিকার্যং
লব্ধাঽপ্যধিষ্ঠানমনাদ্যনন্তং ।
করোতি নিত্যা প্রকৃতিস্তবাদ্যা
তদ্ব্রহ্ম সচ্চিদ্ ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ৯ ॥
কৃশানুষৎ-তাপ-বিদগ্ধচিত্তাঃ
সংসারিণঃ শান্তিনিকেতনং ত্বাং ।
সংপ্রাপ্য শান্তা হি ভবন্তি তেষাং
ত্বং
শান্তিদাতা ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ১০ ॥
ষড়ঙ্গযোগো ন যতঃ সুসাধ্যো
জ্ঞানাধিকারী সুলভো ন যস্মাৎ ।
গরীয়সী ভক্তিরতঃ কলো স্যাৎ
তজ্ জ্ঞাপকস্ত্বং ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ১১ ॥
নাকাদিলোকং সুখদঞ্চ দিব্যং
সুরম্যমৈশ্বর্যমহৎ ন যাচে ।
হৃদাসনে ত্বৎ রূপয়া সদা বৈ
বসেতি যাচে ভুবি রামকৃষ্ণঃ॥ ১২ ॥
য়ৎ ব্রহ্ম-বিষ্ণু-গিরিশচ্চ দেবাঃ
ধ্যায়স্তি গায়ন্তি নমন্তি নিত্যং ।
তৈঃ প্রার্থিতস্তস্য পরাবতারো
দ্বিবাহুধারী ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ১৩ ॥
বন্দে জগদ্বীজমখণ্ডমেকং
বন্দে সুরৈঃ সেবিত-পাদপীঠং ।
বন্দে ভবেশং ভবরোগবৈদ্যং
তমেব বন্দে ভুবি রামকৃষ্ণঃ ॥ ১৪ ॥
রামকৃষ্ণং চিদানন্দৎ যঃ স্তৌতি
ভক্তিমান্ সদা ।
তস্যা চিত্তং ভবেচ্ছুদ্ধং তত্ত্বজ্ঞানং স্বয়ং ততঃ ॥
শ্রীমদভেদানন্দ স্বামিনা বিরচিতম্।
দ্বিতীয় খণ্ড
কলিকাতায় শ্রীশ্রীপ্রভুর আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা শ্রবণ-মঙ্গল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিত শুনিলে শীতল ॥ ১ ॥
নিরমল সুবিমল হৃদয়-মুকুর ।
প্রতিভাত হয়
যথা রূপ শ্রীপ্রভুর ॥ ২ ॥
ছটার ঘটায় মুগ্ধ হয় প্রাণমন ।
নূতন জীবন উঠে যায় পুরাতন ॥ ৩ ॥
বিমোহিত পঞ্চভূত ইন্দ্রিয়নিচয় ।
লক্ষ মন যেই মন এক মন হয় ॥ ৪ ॥
ঘুচে সন্দ-অন্ধকার অজ্ঞানাবরণ ।
মায়াপাশ ফাঁস মহাত্রাস বিনাশন ॥ ৫ ॥
দেখিয়া প্রভুর লীলা সেও বসি কাঁদে ।
জগৎমোহন মায়া বিশ্বে ফেলে ফাঁদে ॥ ৬ ॥
এহেন লীলার সিন্ধু কথা শ্রীপ্রভুর ।
কলিকালে কূপে খেলে তরঙ্গ সিন্ধুর ॥ ৭ ॥
মজার ঠাকুর হেন না হয় শ্রবণ ।
দেথান নখের কোণে গোটা ত্রিভুবন ॥ ৮ ॥
দেখিবারে আঁখির সাহায্য নাহি লাগে ।
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা হৃদে যার জাগে ॥ ৯ ॥
কথার মাহাত্ম্য-কথা সাধ্য কার করে ।
হিয়ালি কহিনু এবে ভেঙ্গে দিব পরে ॥ ১০ ॥
গুপ্ত অবতার প্রভু অখিলের রাজ ।
গায়ে পরা নিরক্ষর ব্রাহ্মণের সাজ ॥ ১১ ॥
অলঙ্কার দীনাচার হীনতম জনে ।
সর্ব অগ্রে নমস্কার বিচারবিহীনে ॥ ১২ ॥
পরিচ্ছদ-বলে অন্য রূপ ধরে নরে ।
সে যেন আপুনি তেন ভিতরে ভিতরে ॥ ১৩ ॥
সন্দেহ হইলে, লৈলে বাস-আবরণ ।
পুনরায় তাই হয় সে নিজে যেমন ॥ ১৪ ॥
সে রূপ-ধরণ নহে
শ্রীপ্রভুর বেশ ।
ঠিক দীন-দুঃখী নাহি সন্দেহের লেশ ॥ ১৫ ॥
কায়মনোবাক্যে খেলে
বেশের মূরতি ।
সমরূপ-রঙ্গ-ঢঙ্গ স্বভাব-প্রকৃতি ॥ ১৬ ॥
জন্মাবধি মাতৃগর্ভে বেশের
গঠন ।
সে বুঝে মানুষে কিসে ব্রহ্মাদির ভ্রম ॥ ১৭ ॥
যে ঠাকুর এতদূর অবিকল সাজে ।
তিল আধ নাহি শক্তি নরে তারে বুঝে ॥ ১৮ ॥
কর্ম-কাণ্ড সেইমত মুরতি যেমন ।
মায়াপর
ক্ষুদ্র নর মুদিত নয়ন ॥ ১৯ ॥
সৎবুদ্ধিহীন ক্ষীণ আসক্তির দাস ।
কামিনীকাঞ্চন-সেবা
সদা অভিলাষ ॥ ২০ ॥
অন্তর্দৃষ্টি নাহি বাহে গত মন-প্রাণ ।
তৈলকার-যন্ত্রে বন্ধ বলদ
সমান ॥ ২১ ॥
কেমনে দেখিবে লীলা কি চিনিবে তাঁয় ।
মহাযোগেশ্বর যথা পাগল বনায় ॥ ২২ ॥
বালকের প্রায় বিষ্ণু ভাসে সিন্ধু নীরে ।
কি রহস্য চারি আস্বস্থ্য গাভী-বৎস হয়ে ॥ ২৩ ॥
মত্তবৎ শুকদেব বিহীন বসন ।
পুরাণ লিখিয়া ব্যাস তবু ক্ষুন্নমন ॥ ২৪ ॥
সর্ব
অঙ্গ ইন্দ্রিয়াদি একতানে ল'য়ে ।
শুদ্ধনাম অবিরাম নারদ গাইয়ে ॥ ২৫ ॥
না পাইয়া কোন তত্ত্ব উদাসীর প্রায় ।
সুকৌশল গণ্ডগোল করিয়া বেড়ায় ॥ ২৬ ॥
অনন্ত বদনে জপি না পেয়ে আভাস ।
অনন্ত মরমে কৈল পাতালেতে বাস ॥ ২৭ ॥
অগণন ফণা মাথা একত্র করিয়া ।
লজ্জায় ধরণী ধার রাখে আবরিয়া ॥ ২৮ ॥
দেবগণ বৃথা শ্রম অনর্থ যাতনা ।
বুঝিয়া বিহরে স্বর্গে লয়ে বারাঙ্গনা ॥ ২৯ ॥
কিবা হাসি যোগী ঋষি শ্রদ্ধার আস্পদ ।
আশায় গোঁয়ায় বনে ছাড়ি জনপদ ॥ ৩০ ॥
অনশনে একমনে ধ্যানে নিমগন ।
গত কত শত যুগ না যায় গণন ॥ ৩১ ॥
তবু নয় সিদ্ধকাম মরম অধিক ।
লুকায় লইয়া কায় সুদীর্ঘ বল্মীক ॥ ৩২ ॥
হেন তত্ত্বাতীত যাঁরে না মিলে সাধনে ।
মায়া-মত্ত-চিত নরে কি প্রকারে চিনে ॥ ৩৩ ॥
এ হেন ঠাকুর গুপ্ত অবতার সাজে ।
সঙ্গে আত্মগণ সাঙ্গ ধরণীর মাঝে ॥ ৩৪ ॥
নিজে যেন মহাগুপ্ত তেন আত্মগণ ।
খনিমধ্যে কাদামাখা মানিক যেমন ॥ ৩৫ ॥
দুর্বল সুগুপ্ত তবু সর্বশক্তিমান ।
দেখিবে, যে লবে প্রভু রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৩৬ ॥
শুনরে অবোধ মন লীলাকথা তাঁর ।
ভবব্যাধি-মহৌষধি শান্তির ভাণ্ডার ॥ ৩৭ ॥
শ্রীরামকুমার তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর ।
ভক্তিমান শাস্ত্রাধ্যায়ী পণ্ডিতপ্রবর ॥ ৩৮ ॥
সুশিক্ষিত টোলে তিনি এই শুনি কথা ।
টোল করিবারে আসিলেন কলিকাতা ॥ ৩৯ ॥
ঝামাপুকুরেতে টোল করিলা স্থাপন ।
সন্নিকটে দিগম্বর মিত্রের ভবন ॥ ৪০ ॥
জুটিলেন প্রভুদেব কিছু দিন পরে ।
একত্রে কাটেন কাল দুই সহোদরে ॥ ৪১ ॥
সর্বদা অগ্রজ করে অনুজে যতন ।
শিখিবারে কিছু কিছু শাস্ত্র-ব্যাকরণ ॥ ৪২ ॥
অধ্যয়নে অন্যমন বলেন উত্তরে ।
প্রভুদেব গদাধর জ্যেষ্ঠ সহোদরে ॥ ৪৩ ॥
সে বিদ্যায় বল দাদা কিবা উপকার ।
চাল কলা দুটামাত্র শেষ ফল যার ॥ ৪৪ ॥
হৃদয়ে
অবিদ্যা আনে যে বিদ্যা-অর্জনে ।
শিখিতে এমন বিদ্যা কহ কি কারণে ॥ ৪৫ ॥
হইলে
শিক্ষার কথা নাহি যেন কান ।
হেথা-সেথা যথা ইচ্ছা বেড়িয়া বেড়ান ॥ ৪৬ ॥
পল্লীমধ্যে
পরিচিত শ্রীরামকুমার ।
কেবল পাণ্ডিত্যে নহে বহুগুণ তাঁর ॥ ৪৭ ॥
সিদ্ধবাক্ স্বল্পে তুষ্ট অতি মিষ্টভাষী ।
সাধুর প্রকৃতিযুক্ত ঈশ্বরবিশ্বাসী ॥ ৪৮ ॥
দেবদ্বিজে
ভক্তিশ্রদ্ধা নিষ্ঠাপরায়ণ ।
যাহে হৈলা অনেকের ভক্তির ভাজন ॥ ৪৯ ॥
উপযুক্ত দেখি পাত্র পরম আহ্বলাদে ।
নিয়োজিত করে তাঁয় পুরোহিত-পরে ॥ ৫০ ॥
ক্রমে ক্রমে দেখাদেখি হইল সত্বর ।
সম্ভ্রান্ত অনেকগুলি যজমান-ঘর ॥ ৫১ ॥
প্রতিঘরে ঠাকুরের সেবা দুইবেলা ।
তদুপরি সাময়িক পূজা-ব্রতমালা ॥ ৫২ ॥
সারিয়া টোলের কাজ এ সব করিতে ।
বিশ্রামের কাল নাহি হয় কোনমতে ॥ ৫৩ ॥
অবিরাম শ্রমে হয় কষ্ট অতিশয় ।
সংসারে অভাব বহু না করিলে নয় ॥ ৫৪ ॥
এ হেন সময় তথা প্রভুর গমন ।
উদাসীন বিদ্যাভ্যাসে হইল না মন ॥ ৫৫ ॥
কাজেই অগ্রজ নিয়োজিত কৈলা তাঁয় ।
যজমান-ঘরে নিত্য ঠাকুর সেবায় ॥ ৫৬ ॥
মনোমত পেয়ে কর্ম অনুজ তখন ।
অগ্রজের অনুমতি করেন পালন ॥ ৫৭ ॥
শ্রীপ্রভুর স্বভাবেতে বহে অবিকল ।
কুসুমের
পরিমল কোমল শীতল ॥ ৫৮ ॥
জীব-মধুকর মত্ত বিভোর যাহায় ।
যে আসে যখন সেই ফুলের
সীমায় ॥ ৫৯ ॥
যজমান-ঘরে যত পুরুষ কি মেয়ে ।
সকলের মহানন্দ প্রভুরে পাইয়ে ॥ ৬০ ॥
বিশেষতঃ স্ত্রীলোকেরা হৃদয় সবলা ।
বয়োনিবিশেষে বৃদ্ধা যুবতী কি বালা ॥ ৬১ ॥
দুই বেলা যাওয়া-আসা তাহাদের ঘরে ।
দেখাশুনা আলাপনা ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৬২ ॥
ক্রমে পেয়ে পরিচয় গুণ শ্রীপ্রভুর ।
হইল দ্বিতীয় হেথা কামারপুকুর ॥ ৬৩ ॥
ফলমূল মিষ্টান্নাদি মনের মতন ।
সতত তাঁহাকে দিত করিয়া যতন ॥ ৬৪ ॥
না দেখিলে একদিন ব্যাকুল অন্তর ।
লইত যে কোনরূপে প্রভুর খবর ॥ ৬৫ ॥
শুনিত অমিয়-মাখা শ্রীমুখের গান ।
পুলকিত তাহে এত দ্র্রবিত পরাণ ॥ ৬৬ ॥
গানে তাঁর মহাশক্তি মিশান থাকিত ।
হউক পাষাণ তবু শুনিলে গলিত ॥ ৬৭ ॥
হইত তখনি আঁখি জলের ফোয়ারা ।
অবিরত বিগলিত দরদর ধারা ॥ ৬৮ ॥
মহাভাগ্যবান যেবা শুনিয়াছে কানে ।
আজীবন মাধুরী-ঝঙ্কার তুলে প্রাণে ॥ ৬৯ ॥
মোহনিয়া শ্রীবদনে গীত এত মিঠে ।
শুনিলে হৃদয়-তন্ত্রী নেচে নেচে উঠে ॥ ৭০ ॥
এতেক রূপের ছবি বাক্যে না বেরোয় ।
ভুবনমোহিনী মায়া দেখে মুগ্ধ যায় ॥ ৭১ ॥
তদুপরে গীতিস্বরে এতই মাধুরী ।
শ্রীকণ্ঠে
লুকান যেন মোহন বাঁশরী ॥ ৭২ ॥
সকলেই যুদ্ধচিত সঙ্গীত-শ্রবণে ।
কে বলিবে কি আনন্দ
দিব্য দরশনে ॥ ৭৩ ॥
যে বারেক দেখিয়াছে শুনিয়াছে গান ।
তার ঘরে আর নাহি থাকে মন
প্রাণ ॥ ৭৪ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা অপরূপ মিঠে ।
যত ধীরে যাবে তলে তত সুধা উঠে ॥ ৭৫ ॥
হৃদয়ের তৃপ্তিকর মধুর ভারতী ।
ধীরে ধীরে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৭৬ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
পুরী-প্রতিষ্ঠা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
দেখহ প্রভুর রঙ্গ কত সংগোপন ।
রঙ্গভূমে প্রথমে হাজির কোন জন ॥ ১ ॥
বৃহৎ করম-কাণ্ডে চাই টাকা-কড়ি ।
তাই চুপে চুপে জুটে দুজন ভাণ্ডারী ॥ ২ ॥
শিরে ধরি তাঁহাদের যুগল চরণ ।
যা লইয়া কৈলা প্রভু খেলার পত্তন ॥ ৩ ॥
ভাগ্যবতী ভাগ্যবান ভাণ্ডারী প্রভুর ।
রানী রাসমণি তাঁর জামাতা মথুর ॥ ৪ ॥
কেমনে আসরে নামে কিবা সংযোটন ।
চির অন্ধ শুনে পায় সুন্দর নয়ন ॥ ৫ ॥
রানী রাসমণি জানবাজার বসতি ।
নানা গুণে বিভূষিতা দেশে দেশে খ্যাতি॥ ৬ ॥
অতুল সম্পত্তি বহু টাকা কড়ি ঘরে ।
কুবের আবদ্ধ যেন কোষাগার-দ্বারে ॥ ৭ ॥
তাঁহার ভাগ্যের কথা না যায় বাখানি ।
ধনবতী যেন তেন ভক্তিমতী রানী ॥ ৮ ॥
শ্যামায় পিরীতি বড় শ্যামা ধ্যান-জ্ঞান ।
বড়ই বাসনা মনে যাবে কাশীধাম ॥ ৯ ॥
পূজা দিতে বিশ্বেশ্বরে অন্নপূর্ণা মায়ে ।
যেন তেন ভাবে নয় বিশেষ করিয়ে ॥ ১০ ॥
সেহেতু স্বতন্ত্র করে ধনের সঞ্চয় ।
করিতে পারেন যেন মনোমত ব্যয় ॥ ১১ ॥
সময় দেখিয়া তবে কৈল আয়োজন ।
দাস-দাসী কর্মচারী যাহা প্রয়োজন ॥ ১২ ॥
একশত নৌকা প্রায় পরিপূর্ণাধার ।
ধন অর্থ নানাবিধ দ্রব্যের সম্ভার ॥ ১৩ ॥
একত্তরে নৌকা সব বাঁধাইল ঘাটে ।
যেখানে বসতি তাঁর তার সন্নিকটে ॥ ১৪ ॥
যেদিনে যাত্রিক দিন হয় নির্ধারিত ।
তার পূর্বরাত্রে দেখে স্বপন বিস্মিত ॥ ১৫ ॥
সম্মুখে আসিয়া তাঁর ইষ্টদেবী কন ।
কাশীধামে যাইবার নাহি প্রয়োজন ॥ ১৬ ॥
পছন্দ করিয়া ক্রয় করহ সত্বরে ।
মনোরম স্থান এক ভাগীরথী-তীরে ॥ ১৭ ॥
পুরী বিনির্মিয়া তথা অতি শীঘ্রগতি ।
স্থাপনা করহ মোর পাষাণ-মুরতি ॥ ১৮ ॥
নিত্য পূজা-ভোগ-রাগ-ব্যবস্থা সহিত ।
আদেশে আমার তুমি না হবে কুণ্ঠিত ॥ ১৯ ॥
প্রতিষ্ঠিত মুরতিতে হয়ে অধিষ্ঠান ।
লইব তোমার পূজা না হইবে আন ॥ ২০ ॥
বিভোরা বিস্ময়ানন্দে অন্তর বিহ্বল ।
জাগিয়া নয়নে ঢালে অবিরল জল ॥ ২১ ॥
ত্বরান্বিতে ডাকি তবে কর্মচারিগণে ।
আজ্ঞা দিল উপযুক্ত স্থান-অন্বেষণে ॥ ২২ ॥
এখানে সেখানে দেখি কৈল নির্ধারিত ।
যেখানে হইল পুরে পুরী বিনির্মিত ॥ ২৩ ॥
শহরের তিন ক্রোশ উত্তর অঞ্চলে ।
শিয়রেতে সুরধুনী হেসে হেসে চলে ॥ ২৪ ॥
শ্যামালয়-বিনির্মাণে বহু অর্থব্যয় ।
যত লাগে দেয় রানী কাতর না হয় ॥ ২৫ ॥
যদিচ জাতিতে তেহ মাহিষ্য-রমণী ।
উদার প্রকৃতি তাঁর রাজরানী যিনি ॥ ২৬ ॥
সুন্দর
মন্দির ছটি পুরীর ভিতরে ।
এক রাধাশ্যাম অন্য শ্যামা মার তরে ॥ ২৭ ॥
আর বার শিবলিঙ্গ পশ্চিমে স্থাপন ।
চাঁদনি দক্ষিণে তার অতি সুশোভন ॥ ২৮ ॥
কব কত ঘরবাড়ি যথাযোগ্য স্থানে ।
দুই নহবতখানা উত্তর-দক্ষিণে ॥ ২৯ ॥
গঙ্গাগর্ভে বাঁধা ঘাট পুকুর
বাগান ।
যেইমতে সাজে পুরী সেমতে সাজান ॥ ৩০ ॥
খাজাঞ্চী দেওয়ান মসী-বৃত্তি ভৃত্য কত ।
বদ্ধ দ্বারে দ্বারবান অসি নিষ্কাশিত ॥ ৩১ ॥
অষ্টনায়িকার মধ্যে রানী একজন ।
প্রভু-অবতারে এবে ধরায় জনম ॥ ৩২ ॥
শ্যামাপদে অতি মন তাঁয় রতি-মতি ।
শ্যামা নামে
মত্তপ্রায় এতই পিরীতি ॥ ৩৩ ॥
শ্যামা-নাম সদা জপ, রূপ ধ্যান করে ।
বিষয়েতে হাত,
শ্যামা মনের ভিতরে ॥ ৩৪ ॥
ঠিক আত্মবৎ সেবা হইবে শ্যামার ।
প্রবল বাসনা হৃদে
রানীর সঞ্চার ॥ ৩৫ ॥
গুপ্ত কথা ব্যক্ত করি কহে সর্বজনে ।
আনিবারে শাস্ত্রবিৎ
পণ্ডিত ব্রাহ্মণে ॥ ৩৬ ॥
শাস্ত্রের বিধানে মত বলবৎ কিবা ।
কেমনে হইতে পারে
অন্ন-ভোগ-সেবা ॥ ৩৭ ॥
পণ্ডিতবর্গের হইল বিধান বিহিত ।
শূদ্রের ঠাকুরে নাহি
অন্নভোগ রীত ॥ ৩৮ ॥
বিধানে বিষন্ন রানী বুক ফেটে যায় ।
মায়ে অন্ন দিব কেন বিধি
নাহি তায় ॥ ৩৯ ॥
বিধিতে ভক্তিতে কত প্রভেদ দেখ না ।
বিধি-শাস্ত্রে বিধি মাত্র
বিধি-বিড়ম্বনা ॥ ৪০ ॥
কৈবর্ত কুলজা রানী ছোট জাতি কয় ।
বিধিবৎ ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মণনিচয় ॥ ৪১ ॥
এ দুয়ে প্রভেদ কত বচনে না সরে ।
থাক বিধিবিৎবর্গ বিধি ল'য়ে ঘরে ॥ ৪২ ॥
রানী না হইল বড় ভক্তি ঘটে যার ।
বলিহারি বিধি-দড়ি লোক দেশাচার ॥ ৪৩ ॥
ভক্তিবলে ভকতের বেডউল চাল ।
মহাব্যাধি বেদবিধি না পায় নাগাল ॥ ৪৪ ॥
হইলে অভক্ত দ্বিজ কি কহিব তাঁকে ।
নীচ জাতি উচ্চে স্থিতি ভক্তি যদি থাকে ॥ ৪৫ ॥
ভক্তির উচ্ছ্বাসে দেখ কি করম তাঁর ।
ধনরত্বে পরিপূর্ণ রানীর আগার ॥ ৪৬ ॥
অতুল সম্পত্তি উচ্চ ত্রিতল আলয় ।
মনোহরা দ্রব্যে ভরা বলিবার নয় ॥ ৪৭ ॥
কিছুই না লাগে ভাল ক্ষিপ্তপ্রায় বুলে ।
শাস্ত্রের বিধান বাণ এত হৃদি জ্বলে ॥ ৪৮ ॥
সদুপায় হেতু রানী ভৃত্যে আজ্ঞা করে ।
দেখহ যতেক টোল শহর ভিতরে ॥ ৪৯ ॥
স্থানান্তরে আছে যত অধ্যাপক জন ।
ভাষ-পত্রে সমাচার করহ প্রেরণ ॥ ৫০ ॥
যথা আজ্ঞা ভৃত্যগণ অগণন ছুটে ।
আনিতে বিধান গেল কিছু দিন কেটে ॥ ৫১ ॥
মনোমত বিধি কেহ দিতে নাাহি পারে ।
অবশেষে আসে রামকুমার-গোচরে ॥ ৫২ ॥
বড়ই শ্যামার ভক্ত শ্রীরামকুমার ।
বিধি-শাস্ত্র ভক্তি-শাস্ত্র বহু জানা তাঁর ॥ ৫৩ ॥
শ্যামা সানুকূল অতি শ্রীরামকুমারে ।
দেন দরশন তার ডাকিলে তাঁহারে ॥ ৫৪ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ যেমন তিনি তেন ভক্তিমস্ত ।
শ্যামা জিবে লিখে দেন জ্যোতিষের মন্ত্র ॥ ৫৫ ॥
সেই হেতু সিদ্ধবাক্ শ্রীরামকুমার ।
যে কোন কারণে বাক্য নহে টলিবার ॥ ৫৬ ॥
বিধান দিলেন তিনি বিধি-শাস্ত্র দেখি ।
দিলে পরে পুরীখানি দানপত্র লিখি ॥ ৫৭ ॥
কোন সৎবংশোদ্ভব ব্রাহ্মণের নামে ।
অন্নভোগ রীতি তবে শাস্ত্রের-বিধানে ॥ ৫৮ ॥
শুনি বিধি-অন্বেষক আনন্দ বিধান ।
রানীর নিকটে শীঘ্র করিল পয়ান ॥ ৫৯ ॥
আপনার মন্ত্রদাতা গুরুদেবে ডাকি ।
দিলা রানী তাঁর নামে দানপত্র লিখি ॥ ৬০ ॥
অন্নভোগ হেতু ব্রতী হবে যে ব্রাহ্মণ ।
করিতে বলিল রানী তার অন্বেষণ ॥ ৬১ ॥
যত
লবে মাহিয়ানা তত দিব তাঁর ।
তদুপরি মনোমত পাইবে বিদায় ॥ ৬২ ॥
রানীর বিদায় বড়
ছোটখাট নয় ।
ক্ষুদ্র যেটি তবু পাঁচশত টাকা ব্যয় ॥ ৬৩ ॥
দেশীয় ব্রাহ্মণ কেহ
স্বীকার না করে ।
কহে কেবা দিবে অন্ন কৈবর্ত-ঠাকুরে ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্রে বিধি আছে
তবু নাহি করে মত ।
শাস্ত্র চেয়ে দেশাচার এত বলবৎ ॥ ৬৫ ॥
চাল-কলা-লোভী যত কলির ব্রাহ্মণ ।
সকল করিতে পারে কড়ির কারণ ॥ ৬৬ ॥
শুক্র-মেদে জন্মে কন্যা বালিকা কুমারী ।
কসায়ের মত দেয় ল'য়ে টাকা-কড়ি ॥ ৬৭ ॥
ব্রাহ্মণ বর্ণের গুরু আছিল আখ্যান ।
কন্যার বিক্রয়ে এবে পাঁঠিবেচা নাম ॥ ৬৮ ॥
ছিটাফোঁটা কাটা গার গোসাঁই ব্রাহ্মণে ।
প্রণব সহিত মন্ত্র দেন বেশ্যাগণে ॥ ৬৯ ॥
এমন ব্রাহ্মণ যাঁর অর্থগত প্রাণ ।
তাঁহারাও নাহি দেন এ-কথায় কান ॥ ৭০ ॥
বিষম প্রভুর খেলা ভেঙ্গে দিব পরে ।
কোথায় নির্ঝর কোথা জল দেখ ঝরে ॥ ৭১ ॥
বিষম মরম খেদে রাসমণি বলে ।
হে মা শ্যামা দিলে
জন্ম হেন নীচ কুলে ॥ ৭২ ॥
আমার সম্পর্ক আছে এই সে কারণ ।
অন্ন-ভোগ দিতে নাহি
মিলিল ব্রাহ্মণ ॥ ৭৩ ॥
ভক্তিমতী রাসমণি বুঝিয়া উপায় ।
রামকুমারের কাছে বলিয়া পাঠায় ॥ ৭৪ ॥
আপুনি দিলেন বিধি তবু কি কারণ ।
পূজক পাচক কার্যে না মিলে ব্রাহ্মণ ॥ ৭৫ ॥
শাস্ত্র-বিধিমতে যদি আছে হেন রীতি ।
দয়া করি আপনারে হতে হবে ব্রতী ॥ ৭৬ ॥
শ্যামাপদে রত মন শ্রীরামকুমার ।
শ্যামার হবে না সেবা শুনি সমাচার ॥ ৭৭ ॥
স্বীকার করিলা কর্ম লইবেন হাতে ।
লৌকিক আচারে দোষ শুদ্ধ শাস্ত্রমতে ॥ ৭৮ ॥
এত বলি কি করিলা শুন অতঃপর ।
বলেছি গ্রামের নাম কোথায় শিয়ড় ॥ ৭৯ ॥
যেখানে হৃদুর বাড়ি প্রভুর ভাগিনে ।
কামারপুকুর হতে কিঞ্চিৎ পশ্চিমে ॥ ৮০ ॥
সেখানের ব্রাহ্মণ শহরে ছিল যত ।
সবাকারে পুরীতে করিলা নিয়োজিত ॥ ৮১ ॥
সৎকুল সমুদ্ভব সেবাত ব্রাহ্মণ ।
সেখানে রানীর ছিল বড় অনাটন ॥ ৮২ ॥
প্রয়োজন মত পেয়ে অতি আহলাদিত ।
ঠাকুর-প্রতিষ্ঠা-দিন কৈল নিরূপিত ॥ ৮৩ ॥
স্নানযাত্রা সেইদিন আষাঢ় মাহায় ।
বারশত উনষট্টি সাল গণনায় ॥ ৮৪ ॥
পুরী-প্রতিষ্ঠার দিন যত কাছে আসে ।
চারিদিকে নরনারী মহানন্দে ভাসে ॥ ৮৫ ॥
মহতী হইবে ঘটা দেখিবার আশ ।
ঘটা-পরিসীমা কথা না হয় প্রকাশ ॥ ৮৬ ॥
দৈর্ঘ্যে প্রস্থে পুরীখানি মহা পরিসর ।
আধলক্ষ লোক ধরে ইহার ভিতর ॥ ৮৭ ॥
সুন্দর শোভিত এই পুরীর সমান ।
কোন স্থলে গঙ্গাকূলে নাই বিদ্যমান ॥ ৮৮ ॥
মন-প্রাণ কোথা যায় পুরী-দরশনে ।
বলিতে নারিনু ভাব রয়ে গেল মনে ॥ ৮৯ ॥
দিব্যভাব-পরিপূর্ণ শান্তিময় স্থল ।
আজন্ম সন্তপ্ত চিত দেখিলে শীতল ॥ ৯০ ॥
আসিতে লাগিল কত শত শাস্ত্রবিৎ ।
ছাত্রসহ নিমন্ত্রিত টোলের পণ্ডিত ॥ ৯১ ॥
মহাভাগ্যবতী রানী ভুবন-মাঝার ।
শুভক্ষণে সমাগত শ্রীরামকুমার ॥ ৯২ ॥
সহোদর গদাধর আইলা সংহতি ।
ভুবন-পাবন ত্রাতা অখিলের পতি ॥ ৯৩ ॥
একত্রিত লোক কত সংখ্যা কেবা করে ।
এত বড় পুরীখান তাহে নাহি ধরে ॥ ৯৪ ॥
গণনায়
সংখ্যা তার নাহি হয় সীমা ।
যে দিনে সাজায় কৃষ্ণ কালীর প্রতিমা ॥ ৯৫ ॥
রজত-কাঞ্চনময় নানা আভরণ ।
পরায় শ্যামায় যত পুরীর ব্রাহ্মণ ॥ ৯৬ ॥
রজত সহস্রদল পদ্মের উপর ।
বিরাজিতা শ্যামামাতা পদতলে হর ॥ ৯৭ ॥
পরম সুঠাম হেন নাহি কোনখানে ।
শ্যাম কি শ্যামার মূর্তি সাধ্য কার চিনে ॥ ৯৮ ॥
অতুল উপমা রূপ কান্তি প্রতিমার ।
শ্যাম-অঙ্গে শোভে যেন শ্যামা-অলঙ্কার ॥ ৯৯ ॥
এ-সময় বহু কষ্টে প্রভু গদাধর ।
জনতা
ঠেলিয়া যান মন্দির ভিতর ॥ ১০০ ॥
প্রতিমা প্রতিমা বলি জ্ঞান নাহি হয় ।
দেখিলা যেমন
শ্যামা আপুনি উদয় ॥ ১০১ ॥
কৈলাস করিয়া শূন্য বিরাজ মন্দিরে ।
অপরূপরূপে গোটা
পুরী আলো করে ॥ ১০২ ॥
অন্নপূর্ণা ক্ষেত্রে যেন নাহি অনাটন ।
চর্ব্য-চুষ্য-লেহ্য-পেয়
খায় লোকজন ॥ ১০৩ ॥
আহূত কি অনাহূত দুঃখী ক্ষুধাতুর ।
সমভাবে পার সবে প্রচুর প্রচুর ॥ ১০৪ ॥
কিন্তু সেই দিনে প্রভু ভব-কর্ণধার ।
পুরীর সম্পর্ক ভোজ্য না কৈল স্বীকার ॥ ১০৫ ॥
এক পয়সার মাত্র মুড়কি আনাইয়া ।
কাটাইলা গোটা দিন তাহাই খাইয়া ॥ ১০৬ ॥
পলায়ে আসেন প্রায় বেলা-অবসানে ।
রামকুমারের টোল আছিল যেখানে ॥ ১০৭ ॥
উদ্বিগ্ন অগ্রজ কোথা গেল গদাধর ।
কার মুখে কোন কিছু না পান খবর ॥ ১০৮ ॥
খুঁজিতে সময় নাই যায় ছয় দিন ।
শ্যামার সেবায় রত সেবা-পরাধীন ॥ ১০৯ ॥
উদ্বিগ্ন অগ্রজ বুঝি আপনা অন্তরে ।
আপুনি আইলা প্রভু ছয় দিন পরে ॥ ১১০ ॥
সিদা লয়ে এ সময় শ্রীরামকুমার ।
পাক করি খান অন্ন হাতে আপনার ॥ ১১১ ॥
জ্যেষ্ঠ সহোদরে প্রভু গদাধর কন ।
যখন দিতেন তাঁয় করিতে ভোজন ॥ ১১২ ॥
ক্ষুন্নমন মলিন বদন ভারি করি ।
কৈবর্তের অন্ন দাদা খাইতে না পারি ॥ ১১৩ ॥
উত্তরে বুঝায়ে দিলা শ্রীরামকুমার ।
ছড়াইয়া গঙ্গাজল করহ আহার ॥ ১১৪ ॥
গঙ্গাজলে সব শুদ্ধ কিছু নাহি দোষ ।
এই বলি করিতেন প্রভুরে সন্তোষ ॥ ১১৫ ॥
পুনশ্চ বলিলা প্রভু তুমি কি কারণ ।
শূদ্র-দত্ত দান-দ্রব্য করহ গ্রহণ ॥ ১১৬ ॥
উত্তর-বচনে জ্যেষ্ঠ কন ধীরি ধীরি ।
শাস্ত্র যাহা বলে আমি তাই মাত্র করি ॥ ১১৭ ॥
লৌকিক আচারে দোষ নহে শাস্ত্রমতে ।
বাহির করিলা শাস্ত্র তাঁরে দেখাইতে ॥ ১১৮ ॥
শাস্ত্র দেখি বড় খুশী প্রভু গদাধর ।
তখন হইল তাঁর সুস্থির অন্তর ॥ ১১৯ ॥
দেখহ প্রভুর খেলা অপূর্ব কেমন ।
উপরে বাহ্যিক চক্ষে কত সংগোপন ॥ ১২০ ॥
জগৎ-জীবন বায়ু নয়নে না মিলে ।
জলে স্থলে স্বভাবেতে সমভাবে খেলে ॥ ১২১ ॥
কৌশলে গাঁথেন প্রভু হেন লীলাহার ।
মানুষে কে বুঝে সুতা মধ্যে আছে তার ॥ ১২২ ॥
পরম আচারী বংশে প্রভুর জনম ।
শূদ্রের প্রদত্ত নহে কখন গ্রহণ ॥ ১২৩ ॥
চাটুয্যে শ্রীক্ষুদিরাম এত আঁটা কুলে ।
দুঃখী তবু সম্মুখেতে সাধ্য কার চলে ॥ ১২৪ ॥
সকলের পিতামাতা প্রভু ভগবান ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু করুণানিদান ॥ ১২৫ ॥
সকল সমান তাঁর যেই জন ডাকে ।
জাতির খাতির
তাঁর কাছে কোথা থাকে ॥ ১২৬ ॥
ভাঙ্গিতে লাগিলা প্রভু কুলের বাঁধনী ।
আগে দেখাইলা পথ
ধনী কামারিনী ॥ ১২৭ ॥
তাঁর ছেলে জ্যেষ্ঠ ভাই শ্রীরামকুমার ।
শূদ্রের ঠাকুর সেবা করিলা স্বীকার ॥ ১২৮ ॥
ভক্ত-প্রিয় ভক্ত-প্রাণ তুমি হরি ঠিক ।
ভকতে সতত দেখ প্রাণের অধিক ॥ ১২৯ ॥
পুরীতে ভক্তের সাধ সব ফেল দূরে ।
আনাইলা কেমন কৌশলে সহোদরে ॥ ১৩০ ॥
গুপ্তভাবে কৈলা মুক্ত আপনার পথ ।
সফল করিতে রানী-ভক্ত-মনোরথ ॥ ১৩১ ॥
ধন্য ধন্য ভক্তিমতী রানী রাসমণি ।
ভক্তিজোরে পেলে ঘরে অখিলের স্বামী ॥ ১৩২ ॥
আজন্ম তপস্যা করি যোগী যার ধ্যানে ।
না পায় সে হেন ধন আনিলে ভবনে ॥ ১৩৩ ॥
সম ভাগ্যবতী নাহি দেখি ধরাতলে ।
তোমার চরণরেণু বহু ভাগ্যে মিলে ॥ ১৩৪ ॥
তব সম কোথাও শ্রবণে নাহি শুনি ।
পাষণ্ডে তোমায় কয় কৈবর্ত-রমণী ॥ ১৩৫ ॥
কি আখ্যা তোমারে দিব কিছুই না পাই ।
বারে বারে তোমার চরণরেণু
চাই ॥ ১৩৬ ॥
গরদ বসন অর্থ শ্রীরামকুমারে ।
দান করিলেন রানী অতি উচ্চদরে ॥ ১৩৭ ॥
আর বড় ভট্টাচার্য আখ্যা দিয়া তাঁয় ।
সমাদরে রাখে রানী শ্যামার সেবায় ॥ ১৩৮ ॥
হেথা রানী রাসমণি পুরীর ভিতরে ।
ঠাকুরের ভোগ-রাগ বহু আড়ম্বরে ॥ ১৩৯ ॥
আরম্ভ করিলা মনে হেন করি সাধ ।
যত লোক আসে পাবে ঠাকুর-প্রসাদ ॥ ১৪০ ॥
রাধাশ্যাম কালীমার ভোগ আলাহিদা ।
প্রসাদ বৈষ্ণবে শাক্তে না করিবে দ্বিধা ॥ ১৪১ ॥
কিন্তু রানী কৈবর্তজা ইহার কারণ ।
উচ্চ জাতি নাহি করে প্রসাদ গ্রহণ ॥ ১৪২ ॥
বন্দেজ মতন ভোগ ঠাকুরেতে দিয়া ।
প্রসাদ লইয়া দেয় গঙ্গায় ফেলিয়া ॥ ১৪৩ ॥
বিষাদে রানীর হৃদি দেখে ফেটে যায় ।
ঠাকুর-প্রসাদ উচ্চ জেতে নাহি খায় ॥ ১৪৪ ॥
হায় রানী রাসমণি না চিনে এখন ।
পুরীতে প্রসাদ পান প্রভু নারায়ণ ॥ ১৪৫ ॥
হর্তা কর্তা পিতামাতা পরম ঈশ্বর ।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশের সবার উপর ॥ ১৪৬ ॥
ইষ্টদেবী তোমার স্বপনে যাঁরে দেখা ।
প্রভুর পুরুষাধারে লীলাক্ষেত্রে ঢাকা ॥ ১৪৭ ॥
লইয়া ভাণ্ডারা যাঁর জন্যে আগুয়ান ।
যাঁর জন্মে কৈলে হেন পুরী বিনির্মাণ ॥ ১৪৮ ॥
আপনি হাজির ঠিক প্রতিষ্ঠার দিনে ।
দেখ না নেহারি দুঃখ অকারণ কেনে ॥ ১৪৯ ॥
ধন্য ধন্য পঞ্চভূত যাই বলিহারি ।
ঘরে পুরে দাও জোরে নাক ফুঁড়ে ডুরি ॥ ১৫০ ॥
কি ঘুমন্ত বদ্ধ জীব কিবা ভক্তিমান ।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশেরও নাহিক এড়ান ॥ ১৫১ ॥
ভগবান কর কৃপা এ দাসের প্রতি ।
চিনি বা না চিনি যেন পদে রহে মতি ॥ ১৫২ ॥
লয়ে অনুমতি প্রভু অগ্রজের স্থানে ।
ফিরিয়া আইলা দেশে আপন ভবনে ॥ ১৫৩ ॥
দেশে হইয়াছে রাষ্ট্র কথা বহু দূর ।
শ্রীরামকুমার সেবে কৈবর্ত-ঠাকুর ॥ ১৫৪ ॥
নিন্দাবাদ আন্দোলন করে সর্বজনে ।
কুলের কলঙ্ক কাজ করিল কেমনে ॥ ১৫৫ ॥
কথায় না দেন কান প্রভু গদাধর ।
ভিতরে অন্তরে তাঁর আনন্দ বিস্তর ॥ ১৫৬ ॥
তাঁর খেলা কেবা বুঝে একা তিনি বিনে ।
স্বভাব-সুলভ হাসি-খুশী সবা সনে ॥ ১৫৭ ॥
শিশুবয়ঃ গেছে প্রভু বয়স্ক এখন ।
শৈশব ভাবের পক্ষে নাই বৈলক্ষণ ॥ ১৫৮ ॥
বয়সের সঙ্গে শিশুভাব হয় বড় ।
এ কথা বুঝিতে মন-বুদ্ধি চাই বড় ॥ ১৫৯ ॥
সরল শৈশব-ভাব চন্দ্রিমা-কিরণ ।
কলার কলায় বাড়ে কভু নহে কম ॥ ১৬০ ॥
বয়স দেখিয়া কয় প্রতিবাসিগণে ।
এবে গদায়ের বিয়া হইবে কেমনে ॥ ১৬১ ॥
হইলে বিয়ার কথা প্রভু অতি খুশী ।
কথার উত্তর দেন মৃদুমন্দ হাসি ॥ ১৬২ ॥
মনোমত ঘটে
কন্যা মিটে মন-সাধ ।
হয় যেন গাছতলা কর আশীর্বাদ ॥ ১৬৩ ॥
অদ্ভুত ঘটনা বিয়া কব পরে মন ।
শিয়ড়ে চলিলা প্রভু হৃদুর ভবন ॥ ১৬৪ ॥
গীতপ্রিয় গৌড়বাসী সর্বজনে জানা ।
শিয়ড়েতে একদিন গায় কোন জনা ॥ ১৬৫ ॥
গায়কের কণ্ঠরব কানে যার উঠে ।
নরনারী ছেলে বুড়ো সবে আসে
ছুটে ॥ ১৬৬ ॥
হৃদয়-সসঙ্গ প্রভু বসি সেই স্থলে ।
আইলা রমণী এক কন্যা করি কোলে ॥ ১৬৭ ॥
অল্পবয়া কন্যা তিন বর্ষ পরিমাণ ।
যুগল চরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ১৬৮ ॥
জননী ঝিউড়ি সেইখানে বাপ-ঘর ।
হৃদয়ের প্রতিবাসী চেনা পরস্পর ॥ ১৬৯ ॥
শুধু মাত্র চেনা নয় আত্মীরতা অতি ।
নিকট সম্পর্ক দ্বিজবংশ সম জাতি ॥ ১৭০ ॥
গায়কের গীত সাঙ্গ হয়ে গেলে পর ।
শিশু মেয়ে লয়ে লোকে জুড়িল রগড় ॥ ১৭১ ॥
তার মধ্যে বালিকায় কহে একজন ।
দেখ না এখানে কত লোক সমাগম ॥ ১৭২ ॥
মনোমত কারে চাহ করিবারে বিয়া ।
দেখাইয়া দাও দেখি হাত বাড়াইয়া ॥ ১৭৩ ॥
এত শুনি তখনি বালিকা তুলি কর ।
নির্দেশ করিয়া দিলা প্রভু গদাধর ॥ ১৭৪ ॥
কেবা এ বালিকা আর কে জননী তাঁর ।
পরে মন বিশেষিয়া কব সমাচার ॥ ১৭৫ ॥
অতি প্রিয় শ্রীপ্রভুর হৃদয়-বসতি ।
এলে পরে হয় তথা বহুদিন স্থিতি ॥ ১৭৬ ॥
হরিভক্ত এইখানে বড়ই বিরল ।
সংসারী বিষয় 'বাসে বিষয়ী সকল ॥ ১৭৭ ॥
তা সবার মধ্যে মাত্র দুই একজন ।
ভগবৎ-তত্ত্ব-কথা করে আন্দোলন ॥ ১৭৮ ॥
প্রভু সনে হরি-কথা আলাপন করি ।
অন্তরে সবার খেলে আনন্দ-লহরী ॥ ১৭৯ ॥
কথোপকথন যার
সঙ্গে একবার ।
এমন মঞ্জুর আর নহে ভুলিবার ॥ ১৮০ ॥
বঞ্চি কিছু দিন তথা আসিলেন ফিরে ।
স্ববাসে শ্রীপ্রভুদেব কামারপুকুরে ॥ ১৮১ ॥
স্বদেশ না লাগে ভাল যেন ছিল আগে ।
গঙ্গাতীর দক্ষিণশহর মনে জাগে ॥ ১৮২ ॥
যেই স্থানে
শ্রীপ্রভুর আদি লীলা স্থল ।
আসিতে তথায় সাধ হইল প্রবল ॥ ১৮৩ ॥
আগমন সত্বর হইল
শ্রীপ্রভুর ।
শুন রামকৃষ্ণ কথা শ্রবণমধুর ॥ ১৮৪ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
পুরী প্রবেশ এবং রানী ও মথুরের সঙ্গে পরিচয়
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
সুকৌশলী যাদুকর প্রভু-নারায়ণ ।
কেমনে করেন ভক্ত মন আকর্ষণ ॥ ১ ॥
অলক্ষ্যেতে লীলার পত্তন সমুদয় ।
ক্রমে ক্রমে
শুন মন কহি পরিচয় ॥ ২ ॥
প্রভুর বিচিত্র খেলা কহনে না যায় ।
এবে বারশ-বাষ্টট্টি সাল
গণনায় ॥ ৩ ॥
শ্রীপ্রভুর বয়ঃ মাত্র উনিশ বৎসর ।
এক দিন শুভক্ষণে পুরীর ভিতর ॥ ৪ ॥
মহাভক্ত শ্রীমথুর নেহারিয়া তাঁরে ।
পরিচয় জিজ্ঞাসিল শ্রীরামকুমারে ॥ ৫ ॥
কে
নবীন ব্রহ্মচারী বয়ঃ সুকুমার ।
উত্তরে বলিলা তেঁহ, অনুজ আমার ॥ ৬ ॥
মথুর বলিল
মূর্তি প্রীতি-দরশন ।
পুরীমধ্যে রাখিবারে বড় লয় মন ॥ ৭ ॥
পুনশ্চ কহিলা তাঁয়
শ্রীরামকুমার ।
এখানে থাকিতে নাহি করিবে স্বীকার ॥ ৮ ॥
আর না বলিল কিছু মথুর সে
দিন ।
কিন্তু মনে জাগে মুগ্ধ মূরতি নবীন ॥ ৯ ॥
আকৃষ্ট মথুর মন টানে থেকে থেকে ।
মহা আকর্ষণী প্রভু চরণ-চুম্বকে ॥ ১০ ॥
এমন সময়
জুটে আসে সেইখানে ।
বিধির ঘটনা কিবা হৃদয় ভাগিনে ॥ ১১ ॥
অতি প্রিয় আত্মীয়স্বজন
শ্রীপ্রভুর ।
ধরাধামে ভাগ্যবান হৃদয় ঠাকুর ॥ ১২ ॥
হৃদয়ে পাইয়া নাহি প্রীতি সীমা
তাঁর ।
দুই জনে এক সঙ্গে আহার-বিহার ॥ ১৩ ॥
বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর ভালরূপে জানা ।
মাটিতে গড়িতে দেব-দেবীর প্রতিমা ॥ ১৪ ॥
রংগে-ঢংগে এতদূর মূর্তি অবিকল ।
মৃন্ময়
কে বলে যেন জীবন্ত সকল ॥ ১৫ ॥
শিল্পকর কারিকর প্রভুর মতন ।
শ্রবণে না শুনি চক্ষে
নহে দরশন ॥ ১৬ ॥
আপনার পূজার কারণ পরমেশ ।
যতনে গড়িলা গঙ্গা-মাটির মহেশ ॥ ১৭ ॥
ত্রিশূল
ডমরু আধি নাগ-আভরণ ।
শশী ফোঁটা শিরে জটা বলদ বাহন ॥ ১৮ ॥
ত্রিলোক-বিজয়ী বৃষ গড়া হেন ঠামে ।
হইলেও মুক্ত আখি দেখে পড়ে ভ্রমে ॥ ১৯ ॥
ভ্রমিতে ভ্রমিতে পুরীমধ্যে শ্রীমথুর ।
অবাক হইল দেখি, কীর্তি শ্রীপ্রভুর ॥ ২০ ॥
মাটির বানানো শিব সঠিকের প্রায় ।
কৈলাস হইতে যেন উদয় ধরায় ॥ ২১ ॥
কি দিয়া গড়িলা প্রভু কি দিলা ভিতরে ।
কি হেরিয়া দর্শকের মন প্রাণ হরে ॥ ২২ ॥
কি দেখিল দরশক বলিব কেমনে ।
আঁখি মুদি দেখ মন হৃদয়-দর্পণে ॥ ২৩ ॥
ভক্ত-মন-হর প্রভু কৌশলী-অপার ।
নর-বুদ্ধি দিয়া তাঁর কার্য বুঝা ভার ॥ ২৪ ॥
লইয়া মৃন্ময় মূর্তি মথুর আপনি ।
দ্রুত উত্তরিল যথা রানী রাসমণি ॥ ২৫ ॥
পুলকে পূর্ণিত হৃদে বিস্ময়ের ভার ।
কহে কারিকর যেন সমকক্ষ তাঁর ॥ ২৬ ॥
ভুবন-মাঝার কোথা আছে বিদ্যমান ।
কে তিনি গঠন যার মূরতি সুঠাম ॥ ২৭ ॥
ভাগ্যবলে কারিকর পুরীর ভিতর ।
শ্যামার পূজারী যিনি তাঁর সহোদর ॥ ২৮ ॥
নবীন বয়েস, বেশ ব্রহ্মচারী প্রায় ।
দরশনে মন-প্রাণ মুগ্ধ হয়ে যায় ॥ ২৯ ॥
মনে লয় তাঁর যদি কালীর সেবনে ।
পুরীমধ্যে রাখা যায় অতি অল্প দিনে ॥ ৩০ ॥
জাগরিত করিতে পারেন শ্যামা মায়ে ।
এমত
প্রতীত হয় তাঁহারে দেখিয়ে ॥ ৩১ ॥
প্রভুর নির্মিত শিব বৃষ দরশনে ।
উঠে মথুরের
ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ৩২ ॥
তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া শ্রীমথুর ।
দেখিলা অদূরে সহ হৃদয়
ঠাকুর ॥ ৩৩ ॥
ভ্রমিছেন প্রভুদেব আপনার মনে ।
পরস্পর নানাকথা প্রশস্ত উঠানে ॥ ৩৪ ॥
লোক দিয়া প্রভুস্থানে পাঠায় বারতা ।
বাসনা তাঁহার সঙ্গে কহিবেন কথা ॥ ৩৫ ॥
যাইতে না চান প্রভু মথুরের কাছে ।
পুরীতে থাকিতে তাঁয় জেদ করে পাছে ॥ ৩৬ ॥
মথুর
না ছাড়ে বার্তা প্রেরে বারবার ।
ততই করেন প্রভুদেব অস্বীকার ॥ ৩৭ ॥
অবশেষে সহোদর
শ্রীরামকুমারে ।
করে মহা অনুরোধ লয়ে যেতে তাঁরে ॥ ৩৮ ॥
রাখিয়া জ্যেষ্ঠের আজ্ঞা
প্রভু গুণধর ।
উপনীত হইলেন মথুর-গোচর ॥ ৩৯ ॥
বরাবর সঙ্গে আছে ভাগিনে হৃদয় ।
ঠিক
যেন বৃক্ষের পশ্চাতে ছায়া রয় ॥ ৪০ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুর প্রভুরে দেখিয়া ।
উঠিলেন
আপনার আসন ত্যজিয়া ॥ ৪১ ॥
সংগোপনে লইয়া কহেন ভক্তিভরে ।
পুরীতে পূজার কার্যে মত করিবারে ॥ ৪২ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন তুমি ইহা বল কিবা ।
এ বড় জঞ্জাল করা ঠাকুরের সেবা ॥ ৪৩ ॥
বল কে লইবে হেপাজত নিরবধি ।
ঠাকুরের মূল্যবান সেবার দ্রব্যাদি ॥ ৪৪ ॥
তবে যদি হৃদু সঙ্গে থাকয়ে আমার ।
যতই না হোক কষ্ট করিব স্বীকার ॥ ৪৫ ॥
যে আজ্ঞা বলিয়া
হৃদে আনন্দ প্রচুর ।
হৃদয়ে রাখিতে মত করিল মথুর ॥ ৪৬ ॥
স্থিতিমত স্থিরতর হইবার
পর ।
কি হইল ইতোমধ্যে শুনহ খবর ॥ ৪৭ ॥
সৃষ্টিছাড়া হীনদৃষ্টি ধরে যেই জন ।
সে কহিবে
এ সকল সামান্য কথন ॥ ৪৮ ॥
বাহ্য চোখে যে দেখিবে সে দেখিবে বাঁকা ।
আঁখি খুলে দেখা নয় আঁখি মুদে দেখা ॥ ৪৯ ॥
সামান্য তরঙ্গখেলা উপরে উপরে ।
ধন-রত্ন-মণি-খনি জলের ভিতরে ॥ ৫০ ॥
তুষ যেন তুচ্ছ বস্তু নাহি তার দর ।
ভিতরে যা ধরে তাই জীবন-শিকড় ॥ ৫১ ॥
সেইরূপ সামান্য ধরিয়া নারায়ণ ।
করিছেন লীলা-বৃক্ষ-বীজের রোপণ ॥ ৫২ ॥
একদিন পুরীমধ্যে এখানে সেখানে ।
ভ্রমিছেন প্রভু রানী দেখে শুভক্ষণে ॥ ৫৩ ॥
চমকি উঠিল প্রাণ দেখিয়া মুরতি ।
দিব্যভাবাপন্ন কায় দিব্য মুখজ্যোতি ॥ ৫৪ ॥
ব্রাহ্মণকুমার সুশ্রী ঈশদাঁখি বাঁকা ।
সুন্দর লাবণ্যকান্তি অঙ্গময় লেখা ॥ ৫৫ ॥
সুবিশাল বক্ষঃস্থল ললাট প্রশস্ত ।
সুশোভন নাসা বাহু আজানুলম্বিত ॥ ৫৬ ॥
অতি মনোহর ঠাম শোভার আগার ।
দেখিয়া হইল হৃদে ভক্তির সঞ্চার ॥ ৫৭ ॥
কেবল ভকতি নহে স্নেহ মিশামিশি ।
বারে বারে যত হেরে তত হয় খুশী ॥ ৫৮ ॥
ভক্তির আশ্চর্য খেলা শুনহ বারতা ।
কেমনে ভক্তের সঙ্গে প্রাণে প্রাণে কথা ॥ ৫৯ ॥
জীবের হৃদয়ে যাহা উপজে ভকতি ।
সে ভকতি নহে তার প্রভুর সম্পত্তি ॥ ৬০ ॥
ভক্তির আস্পদ প্রভু বিনা কেহ নয় ।
ভক্তি দিয়া ভগবান দেন পরিচয় ॥ ৬১ ॥
চুপে চুপে টানাটানি প্রাণের ভিতরে ।
চুম্বক লোহায় যেন পরস্পর করে ॥ ৬২ ॥
এ সময় ঘটে এক অদ্ভুত ঘটন ।
বিষ্ণুর পূজায় ব্রতী ছিল যে ব্রাহ্মণ ॥ ৬৩ ॥
শুভ দিন জন্মাষ্টমী পূজার সময় ।
ভাঙ্গিল বিষ্ণুর পদ ভীত অতিশয় ॥ ৬৪ ॥
কানে কানে
সবে শুনে পুরীর ভিতর ।
অবশেষে পশে বার্তা রানীর গোচর ॥ ৬৫ ॥
ভক্তিমতী রাসমণি মরে
মহাখেদে ।
বিষ্ণুর চরণভঙ্গ অশিব সংবাদে ॥ ৬৬ ॥
হুলস্থুল পড়ে গেল পুরীর ভিতরে ।
অগণন লোকজন কম্পমান ডরে ॥ ৬৭ ॥
বিশেষে পূজারী যেবা অনাবিষ্টমতি ।
পূজা বন্ধ
ভগ্ন-অঙ্গে পূজা নয় রীতি ॥ ৬৮ ॥
নূতন মূরতি তাই পূজার কারণ ।
বিধি দিল আনিবারে বিধিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ॥ ৬৯ ॥
শুনিয়া রানীরে প্রভু কহিলেন গিয়া ।
ভগ্ন-অঙ্গ মূর্তি ফেল কিসের লাগিয়া ॥ ৭০ ॥
বিধি বলি এ অবিধি দিল কোন্ জন ।
একত্রিত করে যত বিধিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ॥ ৭১ ॥
যাহা
আজ্ঞা শ্রীপ্রভুর শিরোধার্য করি ।
টোলে টোলে দিল বার্তা পুরী-অধিকারী ॥ ৭২ ॥
যথাদিনে সমাগত শাস্ত্রজ্ঞ সকল ।
শাস্ত্রবিধি লয়ে করে মহা কোলাহল ॥ ৭৩ ॥
শাস্ত্রে লেখা ভগ্ন-অঙ্গে পূজা বিধি নয় ।
এক মতে যত শাস্ত্রবিদগণে কয় ॥ ৭৪ ॥
শুন পরে কি হইল আশ্চর্য কাহিনী ।
চলিলেন প্রভু
যথা রানী রাসমণি ॥ ৭৫ ॥
কহিলেন জিজ্ঞাসিতে শাস্ত্রজ্ঞ সকলে ।
স্বামীর ভাঙ্গিলে পদ
কি করিতে বলে ॥ ৭৬ ॥
শাস্ত্রের বিধান কিবা হ'লে এ ব্যাপার ।
ফেলিতে সুযুক্তি কিবা
যুক্তি চিকিৎসার ॥ ৭৭ ॥
অতি সোজা সরল শ্রীবাক্য শ্রীপ্রভুর ।
স্বভাবে আপুনি যেন
সরল ঠাকুর ॥ ৭৮ ॥
সরলে দয়াল ভালবাসা সরলতা ।
সরলে সরল বড় রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৭৯ ॥
সরলে বুঝিল রানী প্রভুর বচন ।
সভায় করিল সেই প্রশ্ন উত্থাপন ॥ ৮০ ॥
ঘটনার সঙ্গে প্রশ্ন লাগে যে প্রকার ।
বুঝিয়া পণ্ডিতগণে দেখায়ে আঁধার ॥ ৮১ ॥
সোজা কথা অতি মূর্খ পারে বুঝিবারে ।
শুনিয়া বিধিজ্ঞদের মুণ্ডু গেল ঘুরে ॥ ৮২ ॥
যায় কেন মুণ্ডু ঘুরে ভেবে দেখ মন ।
সরল উত্তর যেন সরল কথন ॥ ৮৩ ॥
বিধিমতে কহি কথা ভাবে কিবা দায় ।
ধীরগণ পরস্পর মুখপানে চায় ॥ ৮৪ ॥
কাটা যায় দত্ত-বিধি শাস্ত্রসহ তার ।
যদি কয় স্বামী উপযুক্ত চিকিৎসার ॥ ৮৫ ॥
অথচ চরণভঙ্গ স্বামী দেয় ফেলে ।
ধরি নর-কলেবর, কি করিয়া বলে ॥ ৮৬ ॥
অবশেষে শাস্ত্র ছাড়ি দিতে হইল বিধি ।
পীড়িত পতির সেবা যুক্তি নিরবধি ॥ ৮৭ ॥
মীমাংসায় ভেসে যায় রানী সুখ-নীরে ।
চৌগুণ বাড়িল ভক্তি প্রভুর উপরে ॥ ৮৮ ॥
প্রভুরে জানিয়া কারিগর শিরোমণি ।
করপুটে প্রভুরে কহিল রাসমণি ॥ ৮৯ ॥
সারিবারে ভগ্ন পদ আপনার ভার ।
সায় দিয়া প্রভুদেব করিলা স্বীকার ॥ ৯০ ॥
ভগ্ন পদ সারিয়া দিলেন সেই দিনে ।
কোথায় ভাঙ্গিয়াছিল সাধ্য কার চিনে ॥ ৯১ ॥
অবাক হইল সবে পুরীর ভিতর ।
কিবা মহা সুকৌশলী প্রভু কারিগর ॥ ৯২ ॥
কি বুঝ আশ্চর্য মন, কথা, কথা ছাড়া ।
এ মহান্ বিশ্ব যাঁর সঙ্কেতেতে গড়া ॥ ৯৩ ॥
হয় রয় যায় সৃষ্টি যাঁহার আজ্ঞায় ।
সারিলেন ভগ্ন পদ কি বিচিত্র তায় ॥ ৯৪ ॥
তবে এবে নর দেহ নরের মতন ।
দীন-দুঃখী নিরক্ষর পরান্ন-ভোজন ॥ ৯৫ ॥
লইয়া ব্রাহ্মণ-বেশ খেলেন আপুনি ।
হর্তা কর্তা বিশ্বের বিধাতা চিন্তামণি ॥ ৯৬ ॥
মানুষে না চিনে নর-জ্ঞানে লয় তাঁরে ।
তাই লোকে অবাক করম তাঁর হেরে ॥ ৯৭ ॥
ভিতরে অসীম শক্তি শক্তির আধার ।
বাজে মাত্র সাজা বেশ ফল্গুর আকার ॥ ৯৮ ॥
সৎবুদ্ধিযুক্ত হরিলুব্ধ চক্ষুষ্মান ।
স্পষ্ট দেখে খেলে তাঁহে রসের তুফান ॥ ৯৯ ॥
তুষ্ট হয়ে ভক্ত রানী ভক্তিভরে তাঁয় ।
বলিলেন থাকিবারে বিষ্ণুর সেবায় ॥ ১০০ ॥
ধার্য করি শ্রীপ্রভুর মাসিক বেতন ।
ছোট ভট্টাচার্য আখ্যা করিল অর্পণ ॥ ১০১ ॥
বড় ভাই বড়
ভট্টাচার্য মহাশয় ।
শ্যামা-বেশকারী হ'ল ভাগিনে হৃদয় ॥ ১০২ ॥
গঙ্গাতীরে যেথা যত আছে দেবালয় ।
তুলনায় এ পুরীর সঙ্গে কেহ নয় ॥ ১০৩ ॥
পুরী দেখিবারে আসে কত লোকজন ।
ধনী-মানী-গুণী-দুঃখী সকল রকম ॥ ১০৪ ॥
কালী মায়ে রাধাশ্যামে যারা ধনবান ।
ভক্তিভরে অর্থ দিয়া করেন প্রণাম ॥ ১০৫ ॥
আগাগোড়া এই রীতি পুরীর ভিতরে ।
পূজারীর প্রাপ্য যাহা প্রণামীতে পড়ে ॥ ১০৬ ॥
প্রভুদেব টাকাকড়ি নাহি লন হাতে ।
বলিতেন দুঃখিগণে বিলাইয়া দিতে ॥ ১০৭ ॥
ত্যাগী অনাসক্ত প্রভু ছিলা আজীবন ।
যতই প্রণামী পড়ে সব বিতরণ ॥ ১০৮ ॥
ছয় মাস বিষ্ণুর মন্দিরে পূজা করি ।
পশ্চাৎ হইলা প্রভু শ্যামার পূজারী ॥ ১০৯ ॥
বিষ্ণুর সেবাতে হৈল অগ্রজের ভার ।
ইহাতে সন্তুষ্ট ভারি শ্রীরামকুমার ॥ ১১০ ॥
এইরূপে কিছুদিন গত হইলে পর ।
ত্যজিলেন শ্রীরামকুমার কলেবর ॥ ১১১ ॥
অগ্রজের লোকান্তরে শ্রীপ্রভু এখন ।
শ্যামার সেবায় দিল ষোল আনা মন ॥ ১১২ ॥
প্রভুর অপার কথা কে কহিবে ক'টি ।
কোটি-মুখে কহিলেও তবু ত্রুটি কোটি ॥ ১১৩ ॥
পড়ে দামামায় কাঠি আগুন রঞ্জকে ।
যে হ'তে আইলা প্রভু পুজিতে শ্যামাকে ॥ ১১৪ ॥
শ্যামায় পিরীতি বড় শ্যামা মনপ্রাণ ।
তপ-জপ-তন্ত্র-মন্ত্র ধন ধ্যান-জ্ঞান ॥ ১১৫ ॥
সুদৃশ্য রচেন বেশ প্রভু গুণধর ।
দেখামাত্র দর্শকের বিমোহে অন্তর ॥ ১১৬ ॥
নিত্যই
নূতন বেশ নাহিক উপমা ।
মুর্তিমতী ঠিক যেন চিৎময়ী শ্যামা ॥ ১১৭ ॥
বিবিধ কুসুম জবা শ্রীচরণে সাজে ।
অপরূপ শ্যামা-রূপ শ্রীমন্দির মাঝে ॥ ১১৮ ॥
উপজয়ে দিব্য ভাব পাষণ্ড-অন্তরে ।
একবার শ্যামা-রূপ নয়নেতে হেরে ॥ ১১৯ ॥
ঘোষণা হইল বার্তা কথায় কথায় ।
আছে বহু কালীমূর্তি এমন কোথায় ॥ ১২০ ॥
দলে দলে আসে লোক কত দিক হ'তে ।
নিরুপমা শ্যামা-মাতা এখানে দেখিতে ॥ ১২১ ॥
অতিথি-সেবন-শালা পুরীর ভিতরে ।
কত আসে যায় সাধু সংখ্যা কেবা করে ॥ ১২২ ॥
শ্যামা দেখি সর্বজনে সমস্বরে কন ।
কোথাও না করি হেন মূর্তি দরশন ॥ ১২৩ ॥
নব ভাবে মাতি সবে কহে উচ্চৈঃস্বরে ।
কি জানি কি আছে শ্যামা-প্রতিমা ভিতরে ॥ ১২৪ ॥
তড়িতের বার্তাবহ তারেতে যেমন ।
দ্রুতগতি ছুটে কথা বিদ্যুৎ-মতন ॥ ১২৫ ॥
সেরূপ সুঠাম শ্যামা প্রতিমা-কাহিনী ।
পরস্পর সাধু-মুখে ছুটিল অমনি ॥ ১২৬ ॥
অতিথি সন্ন্যাসী ভক্ত থাকে যে যেখানে ।
দক্ষিণেশ্বরের কথা শুনে কানে কানে ॥ ১২৭ ॥
সুগূঢ় প্রভুর কথা কি শকতি বলি ।
প্রচারিলা নিজ স্থান সাজাইয়া কালী ॥ ১২৮ ॥
আপনে রাখিলা গুপ্ত পূজারীর সাজে ।
নাহি দিলে ধরা-ছু'য়া সাধ্য কার বুঝে ॥ ১২৯ ॥
গুহ্য হ'তে অতি গুহ্য তাঁহার করম ।
মায়া-অন্ধ নরে কিবা বুঝিবে মরম ॥ ১৩০ ॥
মানুষ থাকুক দূরে দেবাদির শক্ত ।
কৃপায় যদ্যপি নাহি আঁখি হয় মুক্ত ॥ ১৩১ ॥
মায়া-ছানি-মুক্ত চক্ষু নহে যতক্ষণ ।
কদাচ না হয় তাঁর লীলা দরশন ॥ ১৩২ ॥
মানুষের খোল ল'য়ে আপনি শ্রীহরি ।
বিরাজেন পুরী-মধ্যে হইয়া পূজারী ॥ ১৩৩ ॥
যেখানে যখন হয় বিরাজের স্থান ।
দিব্য ভাব সদা তথা থাকে বিদ্যমান ॥ ১৩৪ ॥
পুরীতে আসিয়া লোকে এত প্রীতি পায় ।
সে কেবা এসেছে কোথা সব ভুলে যায় ॥ ১৩৫ ॥
নবভাব-আবির্ভাব এমন অন্তরে ।
ঠাকুর প্রসাদ পায় ভক্তি সহকারে ॥ ১৩৬ ॥
ব্রাহ্মণেও নাহি রাখে জাতির বিচার ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ১৩৭ ॥
ভকতবৎসল প্রভু ভক্তগত-প্রাণ ।
নাহি কেহ প্রিয় তাঁর ভক্তের সমান ॥ ১৩৮ ॥
রানীর
আছিল বড় হৃদয়ে বিবাদ ।
উচ্চবর্ণে তুচ্ছ করে ঠাকুর-প্রসাদ ॥ ১৩৯ ॥
সে বিষাদ একেবারে
করিবারে দূর ।
পুরী-মধ্যে প্রবেশিলা দয়াল ঠাকুর ॥ ১৪০ ॥
প্রসাদ আপনে পেয়ে
করুণা-নিদান ।
অভ্যাগত তথা যেবা তাহারে পাওয়ান ॥ ১৪১ ॥
নিষ্ঠাচারী তাহারাও বিচার
না করে ।
প্রসাদ উঠায়ে খায় অতি ভক্তিভরে ॥ ১৪২ ॥
শ্যামা-ভক্ত রাসমণি শ্যামা
ভালবাসে ।
দেখে শ্যামা নিরুপমা পরম হরিবে ॥ ১৪৩ ॥
কালীমাতা বিভূষিতা কবি দরশন ।
কত
যে আনন্দ তাঁর নাহি নিরূপণ ॥ ১৪৪ ॥
বেশকারী প্রভু বেশ তাঁহার রচিত ।
দেখিলেই হয়
মুগ্ধ মন-প্রাণ-চিত ॥ ১৪৫ ॥
জনমে রানীর ভক্তি প্রভুর উপরে ।
কি পরাণ-প্রতিমা
শ্যামা সুসজ্জিত হেরে ॥ ১৪৬ ॥
বুঝিল প্রভুর বেশ সেবা-অনুরাগে ।
পাষাণ-মুরতি শ্যামা
উঠিয়াছে জেগে ॥ ১৪৭ ॥
দিন দিন ভক্তি-প্রীতি অতি বৃদ্ধি পায় ।
শ্যামার সেবায় রত
শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১৪৮ ॥
ঈশ্বর-প্রসঙ্গ কভু হয় দুইজনে ।
কন প্রভু গুণধর ভক্ত রানী
শুনে ॥ ১৪৯ ॥
কখন কখন মিঠা শ্যামা-গুণগান ।
শুনিয়া রানীর হয় শীতল পরাণ ॥ ১৫০ ॥
শ্যাম-শ্যামা-গুণগান প্রভুর বদনে ।
কি মিঠা সে জানে যেবা শুনিয়াছে কানে ॥ ১৫১
॥
মধুর সুস্বর কিবা নহে বলিবার ।
পিক-অলি বীণা-বেণু একত্র ঝঙ্কার ॥ ১৫২ ॥
দিব্যভাব
পরিপূর্ণ মাখান ভিতরে ।
শুনিলে পাষাণ-মন দ্রবীভূত করে ॥ ১৫৩ ॥
কিবা আভা শোভা ফুল্ল বদনকমলে ।
আজন্ম পাষণ্ড যেবা সেও দেখে ভুলে ॥ ১৫৪ ॥
সঙ্গীতে রানীর নেশা হৈল অতিশয় ।
নিত্য নিত্য একবার না শুনিলে নয় ॥ ১৫৫ ॥
ত্রুটি নাহি সর্ব অঙ্গে পূজা সু-সুন্দর ।
পুজায় সেবায় যায় প্রহর প্রহর ॥ ১৫৬ ॥
ডুবিয়া যাইত যোল আনা মন-প্রাণ ।
কিছু না থাকিত তাঁর বাহ্যিক গিয়ান ॥ ১৫৭ ॥
কেবা কিবা
কয় কেবা কোথা আসে যায় ।
শুনা দেখা নাই এত প্রমত্ত পূজায় ॥ ১৫৮ ॥
মধুলুব্ধ মধুপ
যেমন ফুল্ল ফুলে ।
মত্ত হয়ে পিয়ে মধু মন-প্রাণ ভুলে ॥ ১৫৯ ॥
উলট-পালট খায় দলের
উপর ।
আপনার দেহ কোথা নাহিক খবর ॥ ১৬০ ॥
কোথা শক্তিধর পাখা সকলের মূল ।
নাই গ্রাহ্য
থাক যাক সুকোমল হুল ॥ ১৬১ ॥
টান দিয়ে শুষে চুষে বিভোর নেশায় ।
সেই মত প্রভুদেব
শ্যামার পূজায় ॥ ১৬২ ॥
এবে ঘোর কলিকাল যত জীবগণে ।
পূজিতে ভজিতে জানে
কামিনীকাঞ্চনে ॥ ১৬৩ ॥
দেবদেবী-পূজা সেবা আছি আরাধনা ।
জপ-তপ ক্রিয়া-কর্ম সাধন-ভজনা ॥ ১৬৪ ॥
একবারে লুপ্ত প্রায় গোটা ধরাতল ।
যাহা কিছু আছে মাত্র নাম সে কেবল ॥ ১৬৫ ॥
তাই প্রভু দয়াময় দয়ার সাগর ।
উপনীত ধরাধামে ধরি কলেবর ॥ ১৬৬ ॥
শিক্ষণ দিতে জীবগণে চিরহিতকারী ।
সাধন ভজন পূজা আপনে আচরি ॥ ১৬৭ ॥
প্রভুর পূজার কথা অমৃত ভারতী ।
কেমনে করেন শুন শ্যামার আরতি ॥ ১৬৮ ॥
সুবিদিত রাসমণি তাঁর দেবালয় ।
উপযুক্তমত বাদ্য আরতি-সময় ॥ ১৬৯ ॥
খোল করতাল বাদ্য বিষ্ণুর প্রাঙ্গণে ।
বাজে জোড়া নহবত উত্তর দক্ষিণে ॥ ১৭০ ॥
বাজে জোড়া কাঁসর দামামা-ঘড়ি বাজে ।
মা মা রব উচ্চে সব গায়ে পুরীমাঝে ॥ ১৭১ ॥
এখানে মন্দিরে প্রভুদেব ভগবান ।
তেজস্বী তপস্বী সম বর্ণ দীপ্তিমান ॥ ১৭২ ॥
মহাক্রমে বৃহৎ আরতি এক করে ।
গুরুভার ঘণ্টা প্রভু ধরিয়া অপরে ॥ ১৭৩ ॥
আলো করি শ্রীমন্দির করেন আরতি ।
দেখ মন এবে কিবা প্রভুর মূরতি ॥ ১৭৪ ॥
ভক্তগণ মনোলোভা শোভা নিরুপম ।
উপমায় কিছু নাই আঁকিতে অক্ষম ॥ ১৭৫ ॥
হয় ক্লান্ত কলেবর যত বাদ্যকরে ।
বাজাইতে বহুক্ষণ হাত গেল ভরে ॥ ১৭৬ ॥
শব্দ গেল স্তব্ধ সব ঘর্মে আদ্রকায় ।
প্রভুর আরতি ঘণ্টা তবু না ফুরায় ॥ ১৭৭ ॥
ঘোর ঘন ঘন শব্দে ঘণ্টা বেজে চলে ।
হেলে দুলে আরতি দক্ষিণ করে খেলে ॥ ১৭৮ ॥
অবিরাম চলিতেছে আরতি অতুল ।
বাহ্য নাহি প্রভু যেন কলের পুতুল ॥ ১৭৯ ॥
রক্তিম বরণ মুখমণ্ডলে বেড়ায় ।
উচ্চরবে মা মা রব পাগলের প্রায় ॥ ১৮০ ॥
অবশেষে জড়বৎ বাহ্য হারাইয়া ।
হৃদয় বাহিরে আনে যতনে ধরিয়া ॥ ১৮১ ॥
এই মত প্রার হয় আরতির কালে ।
না বুঝিয়া লোকে-জনে উন্মত্ততা বলে ॥ ১৮২ ॥
দিবাভাগে বলিলাম পুজার ধরন ।
সাধনা রাত্রিতে হয় শুন শুন মন ॥ ১৮৩ ॥
ভক্তভাবে অবতার প্রভু ভগবান ।
কুলহারা জীবে দিতে ধর্মের বিধান ॥ ১৮৪ ॥
ভক্তভাবী ভগবান তাঁহার বারতা ।
আমাদের সঙ্গে তাঁর বিপরীত কথা ॥ ১৮৫ ॥
এক ভগবান আর জীব অগণন ।
জীবভাবে জীবভাবে সদা সংমিলন ॥ ১৮৬ ॥
ভক্তভাবে জীবভাবে কখন না মিলে ।
তাই ক্ষেপা প্রভুদেব জীবগণে বলে ॥ ১৮৭ ॥
দেশে রাষ্ট্র হৈল কথা বড় পরমাদ ।
সবে কর হইয়াছে গদাই উন্মাদ ॥ ১৮৮ ॥
হেন পরমাদ কথা মনে হয় ডর ।
ইহার ভিতরে আছে বড়ই রগড় ॥ ১৮৯ ॥
বিয়া করিবার সাধ বড় তাঁর মনে ।
উন্মাদ প্রবাদে লোকে কন্যা দিবে কেনে ॥ ১৯০ ॥
শ্রীপ্রভুর বিবাহের সাধ অতিশয় ।
মানুষে যেরূপ করে সে প্রকারে নয় ॥ ১৯১ ॥
বালকস্বভাব প্রভু বালক-আচার ।
বয়সের সঙ্গে মাত্র বাড়িছে আকার ॥ ১৯২ ॥
বালকের ভাব খেলে বাক্যকায়মনে ।
স্মরণ রাখিও কথা শয়নে স্বপনে ॥ ১৯৩ ॥
সরল মধুর বড় রামকৃষ্ণ-কথা ।
বুঝিতে নারিবে যদি ভুলহ বারতা ॥ ১৯৪ ॥
শ্রবণান্দোলনে মন না করিবে হেলা ।
ভবসিন্ধু তরিবার একমাত্র ভেলা ॥ ১৯৫ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
বিবাহ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ক্রমে পরে শুনিলেন আই ঠাকুরানী ।
প্রভুর কারণে হৈলা আকুল পরাণী ॥ ১ ॥
ছেড়ে গেছে জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামকুমার ।
শোক-তাপানলে হৃদি দহে অনিবার ॥ ২ ॥
তাহার উপরে এ কি ভীষণ বারতা ।
বায়ুরোগে গদাই'র উন্মাদের কথা ॥ ৩ ॥
যতেক মমতা স্নেহ তাঁহার উপর ।
প্রাণের অধিক ছোট ছেলে গদাধর ॥ ৪ ॥
সংবরিতে নারে শোক কাঁদে উচ্চরোলে ।
তিতিল আগোটা বক্ষ নয়নের জলে ॥ ৫ ॥
তখন আইল ধেয়ে পুত্র রামেশ্বর ।
সংসারের ভার এবে যাঁহার উপর ॥ ৬ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে আই কহিলেন তাঁরে ।
ব্যবস্থা করিয়া ঘরে আন গদাধরে ॥ ৭ ॥
সান্ত্বনা করিয়া মায়ে কহে রামেশ্বর ।
রোদন সংবর তারে আনিব সত্বর ॥ ৮ ॥
অল্পদিন মধ্যে তেহ করিল তাহাই ।
আইর পরাণ
ঠাণ্ডা পাইয়া গদাই ॥ ৯ ॥
এখানে প্রভুর ভাব হইল স্বতন্তর ।
কখন সুস্থিরতর কভু বহে
ঝড় ॥ ১০ ॥
সুস্থিরেতে হাসিখুশী প্রতিবাসী সনে ।
হইত যেমন পূর্বে গ্রাম্য আলাপনে ॥ ১১ ॥
বহিলে অন্তরে ঝড় নীরব গদাই ।
সম্মুখে আসিলে কেহ কোন কথা নাই ॥ ১২ ॥
রাত্রিদিন উদাসীন আপনে আপন ।
ঘৃণা-লজ্জা-ভয়-হীন বাহ্য আচরণ ॥ ১৩ ॥
কানাকানি লোকজনে পরস্পর কয় ।
উপদেবতার কর্ম অন্ত কিছু নয় ॥ ১৪ ॥
সে হেতু আনিয়া ওঝা করে ঝাড়ফুক ।
বসিয়া বসিয়া প্রভু দেখেন কৌতুক ॥ ১৫ ॥
ওঝার টোটকা ব্যর্থে সবে মুহ্যমান ।
চণ্ড নামাইতে লোকে করিল বিধান ॥ ১৬ ॥
আসিয়া চণ্ডর ওঝা নির্ধারিত দিনে ।
দেখিবারে উপনীত গ্রাম্য লোকজনে ॥ ১৭ ॥
পূজাবলি লয়ে চণ্ড হৈল অধিষ্ঠান ।
যেইখানে দর্শকেরা আছে বিদ্যমান ॥ ১৮ ॥
ওঝারে ডাকিয়া চণ্ড বলিল এখনে ।
পূজাবলি দিলে তুমি যাহার কল্যাণে ॥ ১৯ ॥
দেহে তার ভূত-স্পর্শ কিংবা নাই ব্যাধি ।
অকারণ ঝাড়-ফুক অথবা ঔষধি ॥ ২০ ॥
সম্বোধিয়া প্রভুদেবে চণ্ডর বচন ।
ও গদাই, সাধু হ'তে এত যদি মন ॥ ২১ ॥
সুপারি ভক্ষণ কেন এত পরিমাণে ।
যাহাতে কামের বৃদ্ধি দেহমধ্যে আনে ॥ ২২ ॥
সুপারি ভক্ষণাভ্যাস অধিক তখন ।
চণ্ডর আদেশে প্রভু কৈলা বিসর্জন ॥ ২৩ ॥
জপ-পূজা-স্বস্ত্যয়ন কল্যাণের তরে ।
আচরেন আত্মীয়েরা প্রভু যাতে সারে ॥ ২৪ ॥
কিছুতেই নাহি হয় মনোমত হিত ।
তেকারণ সকলেই সর্বদা চিন্তিত ॥ ২৫ ॥
এখানেতে প্রভুদেব আপনার মনে ।
কখন ঠাকুরপূজা কখন শ্মশানে ॥ ২৬ ॥
কথন বসন থাকে শরীরে সংলগ্ন ।
কখন বসনহীন অঙ্গ গোটা নগ্ন ॥ ২৭ ॥
একত্রে আত্মীয়বর্গে যুক্তি স্থির করে ।
পারিলে বিবাহ দিতে হিত হ'তে পারে ॥ ২৮ ॥
বিবাহে বায়ুর কোপ নষ্ট হয় প্রায় ।
সংসারে পড়িবে মন মোহমমতায় ॥ ২৯ ॥
পূর্বাপর
আগাগোড়া ভাবিয়ে চিন্তিয়ে ।
বুঝে কিছু উপশম আগেকার চেয়ে ॥ ৩০ ॥
ত্বরিত বিহিত বিয়া পরম মঙ্গল ।
যদি পরে হয় রোগ পুনশ্চ প্রবল ॥ ৩১ ॥
তাই ভাই রামেশ্বর সাধিতে কল্যাণ ।
এখানে সেখানে করে পাত্রীর সন্ধান ॥ ৩২ ॥
আত্মীয়-স্বজন লক্ষ্মী মুখুয্যে আখ্যান ।
হৃদয়ের ভাই তাঁর শিয়ড়েতে ধাম ॥ ৩৩ ॥
ঘটকালিকার্য তাঁর হাতে দিয়া ভার ।
ভাই রামেশ্বর দেখে অপর যোগাড় ॥ ৩৪ ॥
হৃদয়
লক্ষ্মীর সঙ্গে বড় ভালবাসা ।
প্রভুর সতত তাই শিয়ড়েতে আসা ॥ ৩৫ ॥
প্রভুর বড়ই প্রীতি আছিল শিয়ড়ে ।
তাই সন্নিকটে পাত্রী অন্বেষণ করে ॥ ৩৬ ॥
অর্ধ ক্রোশ দূর মাত্র পূরব অঞ্চলে ।
ক্ষুদ্র গ্রাম নাম জয়রামবাটী বলে ॥ ৩৭ ॥
জয়রাম মুখুয্যে নামক তথাকার ।
কালী নামে কন্যা এক আছিল তাঁহার ॥ ৩৮ ॥
প্রথমে সম্বন্ধ হয় সে কন্যার সনে ।
ভেঙ্গে দিল জয়রাম পাত্র ক্ষেপা শুনে ॥ ৩৯ ॥
তাঁর খুল্লতাত ভাই মহাভাগ্যবান ।
মুখুয্যে শ্রীরামচন্দ্র ব্রাহ্মণের নাম ॥ ৪০ ॥
দশকর্মান্বিত দ্বিজ আছে যজমান ।
সংকীর্ণ অবস্থা চলে কষ্টে গুজরান ॥ ৪১ ॥
বাস উপযুক্ত মাত্র ছোট মেটে ঘর ।
আপনি ব্রাহ্মণ আর তিন সহোদর ॥ ৪২ ॥
একটি নন্দিনী তাঁর চারিটি নন্দন ।
সর্বসুলক্ষণা কন্যা জনমে প্রথম ॥ ৪৩ ॥
এবে কি হইল শুন ঘটকেরে লৈয়া ।
ব্রাহ্মণ সম্মত দিব
দুহিতার বিয়া ॥ ৪৪ ॥
বিবাহের সব কথা করি স্থিরতর ।
রামেশ্বরে পাঠাইয়া দিলেন খবর ॥ ৪৫ ॥
পুলক অন্তর তেহ শুভ সমাচারে ।
দিন করি স্থিরতর কুটুম্বের ঘরে ॥ ৪৬ ॥
পাঠাইল নিমন্ত্রণ লিখন করিয়া ।
আই ঠাকুরানী কন ঘরে ঘরে গিয়া ॥ ৪৭ ॥
প্রতিবাসী নর-নারী খুশী অতিশয় ।
সর্বাধিক খুশী প্রভু হবে পরিণয় ॥ ৪৮ ॥
আনন্দ সাগরে ভাসে গ্রামের রমণী ।
মহানন্দে আত্মহারা আই ঠাকুরানী ॥ ৪৯ ॥
মেজ ভাই রামেশ্বর বনিতা তাঁহার ।
প্রভুরে
দেখেন যেন পুত্র আপনার ॥ ৫০ ॥
বড় সাধ বিবাহেতে হয় বাদ্য-ঘটা ।
দৈবক্রমে কিন্তু না
ঘটিয়া উঠে সেটা ॥ ৫১ ॥
ঘরে ঘরে প'ড়ে গেল আনন্দের ঘুম ।
রাত্রিকালে কারো চোখে নাহি আসে ঘুম ॥ ৫২ ॥
ক্রমে বিবাহের দিন হৈল উপনীত ।
প্রতিবাসী রমণীরা সবে উপস্থিত ॥ ৫৩ ॥
পরম সুঠাম প্রভুদেবে সাজাইতে ।
কেহ বা চন্দন ঘষে কেহ মালা গাঁথে ॥ ৫৪ ॥
যতনে রচনা কৈল বেশ মনোহর ।
মন হরে হেরে পরা সুন্দর কাপড় ॥ ৫৫ ॥
গ্রাম্য রমণীরা করে মাঙ্গলিক ধ্বনি ।
আহলাদে কাঁদেন মেজ ভাজ-ঠাকুরানী ॥ ৫৬ ॥
বাদ্য-ঘটা না হইল বড় দুঃখ মন ।
অন্তরেতে বুঝিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ৫৭ ॥
সান্ত্বনা-কারণ তবে বলিলেন তাঁয় ।
দেখ শুন কিবা বাদ্য বাজিছে বিয়ায় ॥ ৫৮ ॥
এত বলি দেন মুখে বোল পরিপাটি ।
ডেলে গু ডেলে গু ডেলে ডেলে কাটি ॥ ৫৯ ॥
ঢোলের স্বরূপ
হাতে পাছা বাজাইয়া ।
বাজান ডোমের বাদ্য নাচিয়া নাচিয়া ॥ ৬০ ॥
মহারঙ্গকর প্রভু
অতুল ভুবনে ।
নকলে সুপটু হেন নাহি শুনি কানে ॥ ৬১ ॥
বাদ্যাপেক্ষা রঙ্গাধিক
প্রভুর বাজন ।
নাড়ী ফাটে হেসে লুটে দর্শকের গণ ॥ ৬২ ॥
কোনই সরম লজ্জা নাহি
শ্রীপ্রভুর ।
সরল সহজ সোজা গদাই ঠাকুর ॥ ৬৩ ॥
বিবাহেতে লজ্জাহীন যত হ'ক নর ।
তথাপি
সলজ্জ বাহ্যে জড় জড় স্বর ॥ ৬৪ ॥
প্রভুর দেখহ লজ্জা গন্ধ মাত্র নাই ।
বুঝিতে এ সব কথা বাল্যভাব চাই ॥ ৬৫ ॥
চাই দিব্য মুক্ত খোলা সরল নয়ন ।
সরল বিশ্বাস আর হরি লুব্ধ মন ॥ ৬৬ ॥
সুসরল মন স্বচ্ছ স্ফটিকের প্রায় ।
তার মধ্য দিয়া যত লীলা দেখা যায় ॥ ৬৭ ॥
যদ্যপি কালিমা ম'লা মনে গিয়া ধরে ।
আজন্মে বিগত হয় আঁধারে আঁধারে ॥ ৬৮ ॥
ভাঙ্গিয়া দিতাম কথা কলমেতে আঁকি ।
যত কর তিলমাত্র সব রবে বাকি ॥ ৬৯ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড অপরূপ খনি ।
পূর্ণিত সজ্জিত তায় নানা রত্ন-মণি ॥ ৭০ ॥
কথার এ কথা নয় কর দরশন ।
নীরবে লইয়া
সঙ্গে সুসরল মন ॥ ৭১ ॥
রঙ্গে মাতি বরযাত্রী জুটিয়া সকলে ।
আগে পাছে শ্রীপ্রভুর বিয়া দিতে চলে ॥ ৭২ ॥
শুনা কথা শিবের বিবাহ মনে পড়ে ।
উমা সহ যেইবার অচল-আগারে ॥ ৭৩ ॥
বিয়া দিতে যত ভূতে মহা মেতে চলে ।
যেতে পথে নানা মতে জাতি-খেলা খেলে ॥ ৭৪ ॥
মহারঙ্গী নন্দী ভৃঙ্গী ভৈরব বেতাল ।
দ্বৈতাদানা ধূর্তপনা ধরা আল্থাল্ ॥ ৭৫ ॥
ছুটাছুটি হুটপাট মাটি ফাটে দাপে ।
মহাফণী ত্রস্ত প্রাণী কোটি শিরে কাঁপে
॥ ৭৬ ॥
ভূতদলে আলো জ্বালে মুখের ভিতর ।
চারি ধারে যায় ঘেরে ষাঁড়ে দিগম্বর ॥ ৭৭ ॥
সেই মত
বরযাত্রী শ্রীপ্রভুর সাথে ।
খোলা পায় খোলা গায় ঠেঙ্গা লাঠি হাতে ॥ ৭৮ ॥
গামছা কাঁধেতে বাঁধা কোমরে চাদর ।
কৌতুক রহস্য মুখে হাজার রগড় ॥ ৭৯ ॥
যেতে পথে কত রঙ্গ কব আমি কটি ।
উতরিল সন্নিকটে জয়রামবাটী ॥ ৮০ ॥
জ্বালিয়া সাতাশ কাঠি বিবাহের কালে ।
ঘুরে যবে বরে ঘেরে রমণীসকলে ॥ ৮১ ॥
জ্বালা কাঠি লাগিয়া কি হৈল শুন কথা ।
পুড়ে গেল শ্রীপ্রভুর মাঙ্গলিক সুতা ॥ ৮২ ॥
হরিদ্রা-মাখান সুতা ছিল বাঁধা হাতে ।
অপূর্ব প্রভুর খেলা দেখিতে শুনিতে ॥ ৮৩ ॥
চিরশক্তি আপনার করিয়া গ্রহণ ।
ছলে পুড়াইয়া দিলা অবিদ্যা বন্ধন ॥ ৮৪ ॥
সমাপ্ত হইলে পরে শুভ পরিণয় ।
কন্যা-কর্তা হইলেন ব্যস্ত অতিশয় ॥ ৮৫ ॥
খাওয়াতে বরযাত্রী কন্যাযাত্রিগণে ।
প্রথম খাইতে বসে যতেক ব্রাহ্মণে ॥ ৮৬ ॥
দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভাগমত এক ঘর ।
রচিয়াছে নারীগণে তাহাতে বাসর ॥ ৮৭ ॥
ভোজনের ঠাঁই হয় তাহার দুয়ারে ।
দেখিয়া প্রভুর খেলা আত্মহারা করে ॥ ৮৮ ॥
বিশ্বরানী মাতা বিশ্বেশ্বর শ্রীগোসাঁই ।
জনম যাঁহার ঘরে তাঁর ঘর নাই ॥ ৮৯ ॥
জীবন উপায় মাত্র রকমে রকমে ।
গড়া হ'তে এত গুপ্ত সাধ্য কার চিনে ॥ ৯০ ॥
তথাপি সরলে কিছু নাহি লাগে ফের ।
যে না বুঝে নর-লীলা তার তর্ক ঢের ॥ ৯১ ॥
কিংবা যেবা বলে হরি বিরাট আকার ।
চৌদ্দপুরা আধারেতে নহে ধরিবার ॥ ৯২ ॥
আপদ বিপদ দুঃখ কেঁদে কেঁদে বুলে ।
জানে না সে লীলা তত্ত্ব লীলা কারে বলে ॥ ৯৩ ॥
সর্বশক্তিসান যিনি শক্তির আধার ।
প্রকাণ্ড সৃষ্টির সৃষ্টি সঙ্কেতে যাঁহার ॥ ৯৪ ॥
সিন্ধু-বিন্দুমধ্যে যাঁর বিরাজের ঠাঁই ।
আকার ধরিতে কহ কেন শক্তি নাই ॥ ৯৫ ॥
প্রমাণ-প্রয়োগে তত্ত্ব নহে বুঝিবার ।
বিশ্বাসে প্রত্যক্ষীভূত হন অবতার ॥ ৯৬ ॥
দেখান যাঁহারে তেঁহ পায় দেখিবারে ।
বিরাটেতে যেই বস্তু সেই সে আকারে ॥ ৯৭ ॥
সবিশ্বাসে লীলাকথা শুন তুমি মন ।
নিত্য লীলা দেখিবারে পাইবে নয়ন ॥ ৯৮ ॥
বাসরে দেখিয়া প্রভু অনেক রমণী ।
শুন কি হইল পরে অপূর্ব কাহিনী ॥ ৯৯ ॥
নানাবিধ রমণীর নানারঙ্গ হেরে ।
রঙ্গময়ী মার লীলা জাগিল অন্তরে ॥ ১০০ ॥
মা মা বলি
হৈলা প্রভু ভাবাবেশান্বিত ।
কোকিল জিনিয়া কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ১০১ ॥
যেমন কাঁদান গানে মোহিত নাগিনী ।
সেই মত স্তব্ধীভূত পুরুষ-রমণী ॥ ১০২ ॥
পাতে হাত মুখে ভাত খেতে যারা ছিল ।
পুতুলের প্রায় গান শুনিতে লাগিল ॥ ১০৩ ॥
বাসরে রমণীগণ মোহিত অবাকে ।
দেখে বরে নিরখিয়া অনিমিখ চোখে ॥ ১০৪ ॥
ছিল মনে কত মত রঙ্গ করিবারে ।
দেখে রঙ্গ রঙ্গ করা সব গেল উড়ে ॥ ১০৫ ॥
শ্যামাগুণগানে প্রভু এত মত্ততর ।
কোমরে কাপড় নাই প্রায় দিগম্বর ॥ ১০৬ ॥
বাসর সাজায়ে ছিল যতগুলি নারী ।
সবার চরণ-রজ মস্তকেতে ধরি ॥ ১০৭ ॥
মহাধন্যা পুণ্যবতী মহা পূজ্যতর ।
ল'য়ে হরগৌরী যারা সাজালে বাসর ॥ ১০৮ ॥
যে যুগল-দরশনে বিরিঞ্চি অক্ষম ।
আঁখির মিটায়ে সাধ কৈল দরশন ॥ ১০৯ ॥
তবে কিনা কি দেখিল না বুঝে ব্যাপার ।
বড় গুপ্ত এই বারে প্রভু অবতার ॥ ১১০ ॥
ব্রাহ্মণীর নাম শ্যামা প্রভুর শাশুড়ী ।
উদরে জনমে যাঁর জগত-ঈশ্বরী ॥ ১১১ ॥
বলিয়াছি কিছু আগে দেখ মনে ক'রে ।
একবার প্রভুদেব হৃদয়ের ঘরে ॥ ১১২ ॥
জনেক গায়ক তথা গায় একদিন ।
শুনে জুটে নর-নারী নবীন প্রাচীন ॥ ১১৩ ॥
নারীদের মধ্যে এক কন্যা করি কোলে ।
শুনে গান এক সঙ্গে নারীদের দলে ॥ ১১৪ ॥
একত্রিত যত সব চেনা পরস্পর ।
প্রতিবাসী কাছে দূরে সেই গ্রামে ঘর ॥ ১১৫ ॥
নিকটসম্বন্ধযুক্ত আপনা আপনি ।
তাই তথা সমবেত পুরুষ-রমণী ॥ ১১৬ ॥
অল্পবয়া শিশুমেয়ে কোলে ছিল যাঁর ।
গীত-সমাপনে এক আত্মীয় তাঁহার ॥ ১১৭ ॥
আদরে কহিলা বালিকায় সম্বোধিয়া ।
এত লোক কারে চাই করিবারে বিয়া ॥ ১১৮ ॥
অমনি দেখান বালা তুলি দুই করে ।
সন্নিকটে সমাসীন প্রভুগদাধরে ॥ ১১৯ ॥
এই বালা গুরুমাত ব্রাহ্মণ-কুমারী ।
জননী তাঁহার শ্যামা প্রভুর শাশুড়ী ॥ ১২০ ॥
ছিল জোড়া দিদি আই হেঁশেলের কাজে ।
জামায়ের মিঠা স্বর হৃদি মাঝে বাজে ॥ ১২১ ॥
শুনি মুরলীর গান যেমন গোপিনী ।
বাসরে আইল ধেয়ে দিদি ঠাকুরানী ॥ ১২২ ॥
দূর লাজ গেল খুলে মুখের বসন ।
আপনা হারায়ে হেরে জামাতা-রতন ॥ ১২৩ ॥
রূপের পুতুলি প্রভুদেব গদাধর ।
যৌবন-প্রারম্ভ প্রায় পঁচিশ বৎসর ॥ ১২৪ ॥
একেত মুখের ঢাকা গেছে দিদি আই ।
সামাল অঙ্গের বাস বিষম জামাই ॥ ১২৫ ॥
জগজন-মন-চোরা প্রভু ভগবান ।
গুপ্ত অবতার তাই পাইলে এড়ান ॥ ১২৬ ॥
কেবা সমভাগ্যবতী ভুবন-ভিতরে ।
উদরে ধরিলে যার ব্রহ্মাণ্ড উদরে ॥ ১২৭ ॥
জামাই অখিলপতি ব্রহ্ম সনাতন ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের পুজিত চরণ ॥ ১২৮ ॥
ধন্য ধন্য দিদি আই প্রভু অবতারে ।
ঈশ্বর বালিকাবেশে খেলে যাঁর ঘরে ॥ ১২৯ ॥
বসাইয়া
কোলে তাঁরে খাওয়াইলে মাই ।
হীনের কি আছে সাধ্য স্বরূপত্ব গাই ॥ ১৩০ ॥
জামাতা
দুহিতা তব তাঁদের চরণে ।
জন্ম জন্ম রহে মতি ভিক্ষা দেহ দীনে ॥ ১৩১ ॥
শ্বশুর শাশুড়ী
কিবা আত্মীয়-স্বজন ।
কারে নাহি ধরা-দু'য়া দিলা ভগবান ॥ ১৩২ ॥
মুগ্ধমন যতক্ষণ দেখে
শুনে তাঁয় ।
অন্তর হইলে পরে সব ভুলে যায় ॥ ১৩৩ ॥
ভুলিতে না পারে কিন্তু মুরতি
সুন্দর ।
পিক-পাখী-বীণা জিনি শ্রীকণ্ঠের স্বর ॥ ১৩৪ ॥
মরি কি মোহন কান্তি খেলে
শ্রীবয়ানে ।
বিশেষে ঈষৎ বাঁকা নয়নের কোণে ॥ ১৩৫ ॥
কি শোভা অধরে মৃদু সুহাসির খেলা ।
কিবা ঠাম ধীর পদ-সঞ্চালন বেলা ॥ ১৩৬ ॥
রূপের আকর প্রভু ঠাকুর গদাই ।
বিধাতার
তুলি-স্পর্শ শ্রীঅঙ্গেতে নাই ॥ ১৩৭ ॥
শিল্পকলা বিধাতার নাহি এতদূর ।
আপনারে
গঠিয়াছে আপনি ঠাকুর ॥ ১৩৮ ॥
ভুলাইতে জগজন তাদের কল্যাণে ।
বিমোহিত যারা তুচ্ছ
কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ১৩৯ ॥
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা অপূর্ব কথন ।
ভব-সিন্ধু তরিবারে বাঞ্ছা
যদি মন ॥ ১৪০ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
গুরুমাতা-বন্দনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
জয় জয় শ্রীশ্রীমাতা জগত জননী ।
গুণময়ী গুণাতীত ব্রহ্ম সনাতনী ॥ ১ ॥
অখণ্ডা অরূপা তুমি তুমি নিরুপমা ।
পুরুষ
প্রকৃতি তুমি তুমি মা প্রধানা ॥ ২ ॥
সৃষ্টির অঙ্কুর তুমি সকলের মূল ।
তুমি মা
চব্বিশ তত্ত্ব তুমি সূক্ষ্ম স্থুল ॥ ৩ ॥
তোমার ইচ্ছায় সৃষ্টি স্থিতিতে পালন ।
পুনঃ রাখ কোলে ল'য়ে করিয়া নিধন ॥ ৪ ॥
খেলার ডালি মা তোমার গোটা সৃষ্টিখানি ।
লীলাময়ী লীলাপরা লীলাস্বরূপিণী ॥ ৫ ॥
একা তুমি অদ্বিতীয়া আপন মায়ায় ।
ধরিয়াছ
বহুরূপ জগৎ লীলায় ॥ ৬ ॥
আপনার অখণ্ডতা করি খণ্ড খণ্ড ।
গঠেছ অগণ্য 'আমি' রচিতে
ব্রহ্মাণ্ড ॥ ৭ ॥
গুপ্তভাবে আপ্ত লীলা কর গো জননী ।
মায়ায় তোমার জীবে করে 'আমি
আমি' ॥ ৮ ॥
মা তোমার নরলীলা লীলাশ্রেষ্ঠ গণি ।
অযোধ্যায় সীতারূপে জনকনন্দিনী ॥ ৯ ॥
রামময় প্রাণ-ভাব প্রাণের আরাম ।
মন প্রাণ ধ্যান জ্ঞান দূর্বাদলশ্যাম ॥ ১০ ॥
আগোটা জনম দুঃখ সহিলে পরাণে ।
জনম-দুঃখিনী সীতা পুরাণে বাখানে ॥ ১১ ॥
বৃন্দাবনে
রাইরূপে কৃষ্ণ-পাগলিনী ।
শুদ্ধসত্ত্বে তনু মহাভাব-স্বরূপিণী ॥ ১২ ॥
উমারূপে
হিমালয়ে নগেন্দ্রনন্দিনী ।
করিলে কৈলাসে বাস হইয়া ঈশানী ॥ ১৩ ॥
জগত-জননীরূপে এখন লীলায় ।
পূর্ণিত অন্তরাধার স্নেহ-করুণায় ॥ ১৪ ॥
মহামন্ত্র মা
প্রণব করি উচ্চারণ ।
পদতলে নতশিরে পরশে চরণ ॥ ১৫ ॥
জানে না সে কি পাইল ভক্তি
নিরমল ।
কোটি কোটি জনমের সাধনার ফল ॥ ১৬ ॥
মা তোমার ধর মায়া দাও সরাইয়ে ।
দেখি মা
অভয়পদ নয়ন ভরিয়ে ॥ ১৭ ॥
করি চিত্র লীলাপট মনে বড় সাধ ।
মায়া যেন পথে নাহি ঘটায়
প্রমাদ ॥ ১৮ ॥
তুয়া পদ-প্রদর্শিকা তুমি গো জননী ।
হৃদয়ে আসিয়া ঊর কণ্ঠে বস তুমি ॥ ১৯ ॥
দাও খুলে তালা-আঁটা হৃদয়ের দ্বার ।
উঠুক রাগের বায়ু প্রসাদে তোমার ॥ ২০ ॥
পঞ্চমবর্ষীয়া এবে ব্রাহ্মণের বালা ।
মায়িক বালিকাবৎ করে ধূলাখেলা ॥ ২১ ॥
মানুষের
মত ঠিক গঠন-প্রণালী ।
মায়া-বিমোহিত মত নহে কার্যগুলি ॥ ২২ ॥
যে হও সে হও মাগো বিচারে কি কাজ ।
অভয় চরণ যেন জাগে হৃদি-মাঝ ॥ ২৩ ॥
মা হ'য়ে মা থাক তুমি করি নিবেদন ।
শ্রীপ্রভুর লীলারসে করি নিমগন ॥ ২৪ ॥
এক মর্মভেদী দুঃখ বড় বাজে প্রাণে ।
কেন এত দুঃখ হেন মাতা বিদ্যমানে ॥ ২৫ ॥
স্মরিলে দুঃখের কথা ফেটে যায় ছাতি ।
সিংহের শাবক খাই শিয়ালের লাথি ॥ ২৬ ॥
কি বল কি বল গো মা সহিতে কি পারি ।
বিশ্বেশ্বর প্রভুদেব তুমি বিশ্বেশ্বরী ॥ ২৭ ॥
নিরখি যখন মাগো চরণ-কমলে ।
অতি তুচ্ছ স্বর্গ ধরা ধরাতলে ॥ ২৮ ॥
যখন হৃদয়ে জাগে চরণ দুখানি ।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশেরে তৃণত্রয় গণি ॥ ২৯ ॥
ইঙ্গিতে জননী যদি তব আজ্ঞা পাই ।
উত্তরের হিমাচল দক্ষিণে বসাই ॥ ৩০ ॥
ভূতলে থাকিয়া ধরি গগনের চন্দ্র ।
হনুর সঙ্গেতে পারি করিবারে দ্বন্দ্ব ॥ ৩১ ॥
সকৃষ্ণ অর্জুন-রথ ফিরাইতে পারি ।
অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ড গোটা তোলপাড় করি ॥ ৩২ ॥
এদিকে করুণাময়ী ওদিকে আবার ।
পাষাণ হইতে শক্ত অন্তর তোমার ॥ ৩৩ ॥
আত্মপর নাই ভেদ অপরূপ কথা ।
মা হয়ে মা কাট তুমি সন্তানের মাথা ॥ ৩৪ ॥
মরিলে তরাস আসে গণেশ-কাহিনী ।
লোকে বলে মাথা তার উড়াইল শনি ॥ ৩৫ ॥
শনির কি সাধ্য আসে তাহার নিকটে ।
মা তুমি না বিলে সায় কেবা মাথা কাটে ॥ ৩৬ ॥
মা তুমি মারিলে কার সাধ্য করে ত্রাণ ।
তুমি মা কুপিলে নাই কাহারও এড়ান ॥ ৩৭ ॥
যে কালে হইল দক্ষ পিতা মা তোমার ।
তাঁর সনে কৈলে মা গো কিবা ব্যবহার ॥ ৩৮ ॥
ভূতে ডেকে মাথা কেটে পাড়াইলে ভূ'য়ে ।
মায়ের কি হবে কিছু না দেখিলে চেয়ে ॥ ৩৯ ॥
অমুণ্ড করিয়া তবু তুষ্টি নাই মনে ।
লোক-হাসি ছাগমুণ্ড দিলে গরদানে ॥ ৪০ ॥
ভকতে যতেক দয়া তাও ভাল জানি ।
লঙ্কা-রক্ষিকার বেশে যখন মা তুমি ॥ ৪১ ॥
দশানন আজীবন তপিল কিমতি ।
তাই কেহ না রহিল বংশে দিতে বাতি ॥ ৪২ ॥
এবে গুপ্ত অবতার এই অনুমানি ।
তাই কি এতেক কহ সহিতে জননী ॥ ৪৩ ॥
জপে তপে যোগী
যারে না পায় ধেয়ানে ।
সেই মাতা তুমি মা গো আঁখি বিদ্যমানে ॥ ৪৪ ॥
সম্মুখে পেয়েছি
এবে সব দুঃখ কব ।
মার ছেলে কেন কহ এতেব সহিব ॥ ৪৫ ॥
দেখি অসৎসারিগণে অতিশয় টান ।
গৃহীরা কি বানে-ভাসা পরের সন্তান ॥ ৪৬ ॥
তুমি তো করেছ গৃহী দিয়া মায়া-ঠুলি ।
ঘুরাতেছ ঘানি গাছে খাওয়ায়ে বিচালি ॥ ৪৭ ॥
ছুটে ছুটে মরি খেটে পেটে নাহি ভাত ।
তাহার উপরে মা তোমার কশাঘাত ॥ ৪৮ ॥
কি বিচার মা তোমার বুঝিবারে নারি ।
কোন ছেলে
কোলে কেহ ভূমে গড়াগড়ি ॥ ৪৯ ॥
মায়ের নিকট হেন শোভা নাহি পায় ।
এরূপ কোথায় করে কোন্
দেশী মায় ॥ ৫০ ॥
অমাতার ব্যবহার দেখে কত সই ।
কবে দিনু মুখুয্যের পাকা ধানে মই ॥ ৫১ ॥
ইচ্ছাময়ী মাতা তুমি জগৎ-পালিকা ।
নমো নমো শ্যামা-সুতা ব্রাহ্মণ-বালিকা ॥ ৫২ ॥
এক
নিবেদন মম চরণযুগলে ।
যত দুঃখ হোক যেন মন নাহি টলে ॥ ৫৩ ॥
নালিশ মায়ের কাছে যদি
মারে মায় ।
ছাওয়াল নিকটে কাঁদে অন্যত্রে না যায় ॥ ৫৪ ॥
তেমতি থাকিব মাগো এই
ভিক্ষা চাই ।
মা বলিয়া কাছে যেন কাঁদিয়া বেড়াই ॥ ৫৫ ॥
কি সুন্দর নরলীলা যাই
বলিহারি ।
হৃদয়ে উদয় যাহা আঁকিতে না পারি ॥ ৫৬ ॥
সাধ্যাতীত যদ্যপিহ প্রাণ নাহি
মানে ।
সতত প্রমত্ত মন লীলা-আন্দোলনে ॥ ৫৭ ॥
মায়ের সহিত হৃদে ঊরহ ঠাকুর ।
যেতে পথে
বাধাবিঘ্ন সব করি দূর ॥ ৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-কথা মধুর কথন ।
পরম আনন্দে শুন একমনে মন ॥ ৫৯ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
অনুরাগে কালীদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
কৃপা কর ইষ্টগোষ্ঠী ঠেকিয়াছি দায় ।
প্রভুর সাধন-কথা হৃদে না জুরায় ॥ ১ ॥
বড়ই সুগুহ্য কথা গুরুতম তত্ত্ব ।
সুমূর্খ পামর নহে বর্ণিবার পাত্র ॥ ২ ॥
বিষম সমস্যা ইহা বিশেষে আমার ।
কোথাও না পাই কিছু ঠিক সমাচার ॥ ৩ ॥
কার পর কি করিলা প্রভু ভগবান ।
চোখে দেখা যার সেও না বুঝে সন্ধান ॥ ৪ ॥
জগৎ-জননী সিদ্ধিদাত্রী শ্যামা-সুতা ।
লিখাইয়া দেহ মোরে সাধনার কথা ॥ ৫ ॥
অভয়ে অভয়-পদ বলে বাঁধি ছাতি ।
লিখি এ মহান কাণ্ড রামকৃষ্ণ পুঁথি ॥ ৬ ॥
থাকি কিছুদিন প্রভু কামারপুকুরে ।
উপনীত হইলেন দক্ষিণশহরে ॥ ৭ ॥
নিত্যকর্ম শ্যামা-সেবা করিতে করিতে ।
বহিতে লাগিল বেগ শ্রীপ্রভুর চিতে ॥ ৮ ॥
একাকী থাকেন প্রভু চিন্তায় মগন ।
কখন থাকেন বসি যথা নিরঞ্জন ॥ ৯ ॥
জাহ্নবীর তীরে কিংবা পঞ্চবটমূলে ।
সতত মানুষে যেই দিকে নাহি চলে ॥ ১০ ॥
নির্জনে ধ্যানের হেতু প্রভু নারায়ণ ।
রোপিয়াছিলেন আগে তুলসী-কানন ॥ ১১ ॥
গঙ্গাতীরে বিশ্বমূলে পুরীর ভিতর ।
এখন কাননে গাছ ডাগর ডাগর ॥ ১২ ॥
বেড়া দিয়া ঘেরিবারে হৈল তাঁর মন ।
করিবারে সেই স্থান অধিক নির্জন ॥ ১৩ ॥
বেড়ার যোগাড় কেবা করে হেন নাই ।
তে কারণ চিন্তামগ্ন আছেন গোসাঁই ॥ ১৪ ॥
হেনকালে কি হইল শুন শুন মন ।
প্রভু রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত কথন ॥ ১৫ ॥
অদ্ভুত প্রভুর লীলা নহে বলিবার ।
দেখিতে দেখিতে ডাকে গঙ্গাতে জুয়ার ॥ ১৬ ॥
সমাসীন প্রভুদেবে নিকটে দেখিয়া ।
সোহাগে চরণোদ্ভোবা উঠে উথলিয়া ॥ ১৭ ॥
প্রসারি সহস্র কর ঊর্মিমালা ছলে ।
আলিঙ্গিতে জন্মস্থান চরণযুগলে ॥ ১৮ ॥
রিক্তহস্ত নহে সঙ্গে কিবা উপহার ।
ভক্তিসহ শুন কথা বিশ্বাস-ভাণ্ডার ॥ ১৯ ॥
বসিয়া দেখেন প্রভুদেব বটমূলে ।
প্রয়োজন যাহা তাই ভেসে আসে জলে ॥ ২০ ॥
এক তাড়া রলা কাষ্ঠ আসিছে বন্যায় ।
ক্রমে অতি সন্নিকট প্রতিকূল যায় ॥ ২১ ॥
বাগানেতে কর্ম করে মালী একজন ।
ভর্তাভারী নাম তার প্রভুপরে মন ॥ ২২ ॥
হেনকালে সেইখানে হৈল উপনীত ।
অমৃত লহরী রামকৃষ্ণ লীলাগীত ॥ ২৩ ॥
শ্রীআজ্ঞা মালীরে তাড়া উঠাইতে কূলে ।
যেন আজ্ঞা ভক্তমালী নামে গিয়ে জলে ॥ ২৪ ॥
গোটা তাড়া টানিয়া আনিল তীরে মালী ।
দেখিল সমান মাপে কাটা রলাগুলি ॥ ২৫ ॥
পরিমাণে তিল আধ ছোট-বড় নাই ।
ঠিক যেন প্রয়োজন রলা ঠিক তাই ॥ ২৬ ॥
সংলগ্ন তাহাতে পুনঃ একতাল দড়ি ।
কিমাশ্চর্য সঙ্গে এক ছুরিকা কাটারি ॥ ২৭ ॥
যথা আজ্ঞা ভক্তমালী আনন্দিত মনে ।
বেঁধে দিল বেড়া সেই সব উপাদানে ॥ ২৮ ॥
কার্য সমাপনে কিবা বিস্ময় নেহারি ।
না
বাঁচিল এক তিল কাঠ কিবা দড়ি ॥ ২৯ ॥
এই বেড়া সুবেষ্টিত তুলসীর বন ।
তার মধ্যে করিলেন ধ্যানের আসন ॥ ৩০ ॥
রাত্রিকালে এই স্থলে করিতেন ধ্যান ।
কোনরূপে কেহ কিছু না জানে সন্ধান ॥ ৩১ ॥
ধ্যানের সময় কি দেখেন শুন মন ।
কুয়াসার মত হয় প্রথম দর্শন ॥ ৩২ ॥
দ্বিতীয় দর্শন
তাঁর অপূর্ব আখ্যান ।
খদ্যোৎমণ্ডিত বাসে সৃষ্টি শোভমান ॥ ৩৩ ॥
তৃতীয় দর্শন চন্দ্র দিনেশের কর ।
শেষ মনোহর দৃশ্য জ্যোতির সাগর ॥ ৩৪ ॥
যখন জ্যোতির মধ্যে হইতেন লীন ।
সে সময় জড়-অঙ্গ বাহ্যজ্ঞানহীন ॥ ৩৫ ॥
দেহ-ভাব-জ্ঞান-লোপ দেহে নাই মন ।
সিন্ধুর সিন্ধুর সঙ্গে যেন সমাগম ॥ ৩৬ ॥
এদিকে ভাবের রাজ্যে দরশন কত ।
শ্রীবয়ানে আনন্দের আভা বিভাসিত ॥ ৩৭ ॥
উন্মীলিত আঁখি কভু সহজের প্রায় ।
জীবন্ত প্রতিমা কত দেখে প্রভুরায় ॥ ৩৮ ॥
সম্বল রোদন বল প্রভু-অবতারে ।
লীলা অঙ্গীভূত যত সাধনা সমরে ॥ ৩৯ ॥
শুন অপরূপ লীলা প্রভু একদিন ।
পঞ্চবটীতলে গঙ্গাকূলে সমাসীন ॥ ৪০ ॥
চক্ষুর সীমায় যত সব নিরীক্ষণ ।
পঞ্চবট গঙ্গাতট বৃক্ষলতাগণ ॥ ৪১ ॥
পরিষ্কার নীলাকাশ প্রকৃতির খেলা ।
ধ্যানস্থ নহেন আছে আঁখি দুটি খোলা ॥ ৪২ ॥
এমন সময় হয় দৃষ্টির গোচর ।
অতি অনির্বচনীয় সর্বাঙ্গ সুন্দর ॥ ৪৩ ॥
জ্যোতির্ময়ী মানবী মুরতি নিরুপমা ।
জীবন্ত মন্থর গতি কনক-প্রতিমা ॥ ৪৪ ॥
আলোকিত করি স্থান বিজলী ভাতিয়ে ।
আসিছেন প্রভুদেব
যেখানে বসিয়ে ॥ ৪৫ ॥
অনিন্দ্য ভুবনে হেন নাহি উপমায় ।
বিষাদ কলঙ্ক কিন্তু মুখচন্দ্রিমায় ॥ ৪৬ ॥
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেব চিন্তে মনে মনে ।
কেবা ইনি কি কারণ
আসিছে এখানে ॥ ৪৭ ॥
এমন সময় কিবা আশ্চর্য কথন ।
উপ্ শব্দে হনু এক দিল দরশন ॥ ৪৮ ॥
নিপতিত
পদতলে হইল তাঁহার ।
কে যেন বলিল এই মুরতি সীতার ॥ ৪৯ ॥
মা বলিয়া কাছে প্রভু যাইতে
যাইতে ।
অমনি মিশিল আসি প্রভুর অঙ্গেতে ॥ ৫০ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা অতি বিচিত্র কথন ।
সাধনার আগে এই প্রথম দর্শন ॥ ৫১ ॥
এ গাছের গুঁড়ি নীচে ঊর্ধ্বদেশে মূল ।
সর্ব
অগ্রে ফল হয় তার পরে ফুল ॥ ৫২ ॥
আজীবন শ্রীপ্রভুর এত দুঃখ কেনে ।
মূল তার সীতা দেখা সবার প্রথমে ॥ ৫৩ ॥
জনমদুঃখিনী সীতা রামায়ণে গায় ।
স্ত্রীলোকের সীতা নাম নাহিক কোথায় ॥ ৫৪ ॥
শ্রীমুখে বলিয়াছিলা জগৎ-গোসাঁই ।
সীতা দেখি আগোটা জীবনে দুঃখ পাই ॥ ৫৫ ॥
আরে মন কথা কিবা কব শ্রীপ্রভুর ।
সাধের স্বদেশ তাঁর কামারপুকুর ॥ ৫৬ ॥
তালবনা তামলিপুকুর তার জল ।
জিনিয়াছে কাকচক্ষু এত নিরমল ॥ ৫৭ ॥
লম্বমান আলযুক্ত বটবৃক্ষ ঘাটে ।
সম্মুখে ভূতির খাল গোচারণ-মাঠে ॥ ৫৮ ॥
ঝোপ কত সুবেষ্টিত নিকটে শ্মশান ।
মধ্যস্থিত ক্ষুদ্র বট অতি শোভমান ॥ ৫৯ ॥
তুলসী-কানন ঘেরা আছে চারিধারে ।
বাঁড়ুয্যে বাগান তার কিঞ্চিং অন্তরে ॥ ৬০ ॥
ঋষির আশ্রম সম জনম জমীন ।
সুপ্রশস্ত লাহাবাটী পূরব-দক্ষিণ ॥ ৬১ ॥
মেয়ে-ছেলে মহাপ্রিয় বাল্যসহচর ।
ভিক্ষামাতা কামারিনী বেনেদের ঘর ॥ ৬২ ॥
মহাভক্ত আর যত নানাবিধ জাতি ।
ব্রাহ্মণ তামলি বেণে কর্মকার তাঁতি ॥ ৬৩ ॥
নাপিত ছুতার কিংবা প্রতিবাসী ডোম ।
সমভাবে সবে প্রিয় কেহ নহে কম ॥ ৬৪ ॥
ঘরে মাতা মহাপুজ্যা সবার উপর ।
ভক্তির আস্পদ দুই ধার্মিক সোদর ॥ ৬৫ ॥
হৃদয়ের ঘর প্রিয়তর অতিশয় ।
সাধের বিবাহ কাছে শ্বশুর-আলয় ॥ ৬৬ ॥
শ্বশুরের ঘরে যেতে সাধ ছিল অতি ।
কোঁচাইয়া রাখিতেন ধোপ-দেওয়া ধুতি ॥ ৬৭ ॥
অদ্যাবধি কত সাধ ছিল মনে মনে ।
কাটিবে জীবন গোটা সংসার-আশ্রমে ॥ ৬৮ ॥
শ্যামা-সেবা আচরণে কিন্তু অবশেষে ।
উঠিল বিষম ঝড় হৃদয়-আকাশে ॥ ৬৯ ॥
আঁধারিয়া দশদিশি এতই প্রবল ।
উড়াইল একেবারে বাসনাসকল ॥ ৭০ ॥
কোনদিন বিল্ব-জবা দিয়া মার পায় ।
কাঁদেন আকুল-প্রাণ ডাকিয়া শ্যামায় ॥ ৭১ ॥
কোনদিন মা মা রব কাতরে কাতরে ।
অবিরল আঁখিজল ধারা বেয়ে ঝরে ॥ ৭২ ॥
কোনদিন কর জুড়ি জানু পাতি ভূমে ।
কাঁদিয়া প্রার্থনা কত শ্যামা-সন্নিধানে ॥ ৭৩ ॥
নাহি চাহি লোক-খ্যাতি প্রতিপত্তি ধন ।
না চাই সিদ্ধাই অষ্ট অনর্থ ভীষণ ॥ ৭৪ ॥
লে মা তুই অহঙ্কার অজ্ঞান গেয়ান ।
লে মা তুই ভাল মন্দ মান অপমান ॥ ৭৫ ॥
লে মা তুই যত কিছু আছয়ে আমার ।
দে মা ভক্তিসহ তোর শ্রীচরণ সার ॥ ৭৬ ॥
অহং বুদ্ধি অহঙ্কার যাবে কোন্ দিন ।
দীনাপেক্ষা দীন হব হীনাপেক্ষা হীন ॥ ৭৭ ॥
কিরূপে করিলা প্রভু দীনতা সাধন ।
গাইলে শুনিলে করে তম বিনাশন ॥ ৭৮ ॥
পুরীতে অতিথিশালা মহাপরিসর ।
প্রচুর ভাণ্ডারা তথা বন্ধনী সুন্দর ॥ ৭৯ ॥
ভক্তিমতী যেন রানী তেমতি উদার ।
অতিথি সন্ন্যাসী নাগা হাজার হাজার ॥ ৮০ ॥
গণনায় নাহি পায় কত আসে যায় ।
ছত্রে খায় কত লোক দুপুর বেলায় ॥ ৮১ ॥
যতেক উচ্ছিষ্ট পাতা তারা যায় ফেলে ।
শ্রীহস্তে একত্র করি
শিরোপরি তুলে ॥ ৮২ ॥
গঙ্গাকুলে ফেলিতেন শ্রীপ্রভু আপনি ।
পশ্চাৎ মার্জন ঠাঁই ধরিয়া মার্জনী ॥ ৮৩ ॥
লম্বে প্রস্থে মস্ত পুরী বৃহৎ আকার ।
প্রত্যুষের পূর্বে প্রতিদিন পরিষ্কার ॥ ৮৪ ॥
নিঃশব্দে করম তাঁর গোপনে গোপনে ।
কে করেন পরিষ্কার কেহ নাহি জানে ॥ ৮৬ ॥
দেখে প্রাতে লোকে লাগে অপার বিস্ময় ।
দেব কি দৈত্যের কর্ম নানা কথা কয় ॥ ৮৭ ॥
কহিতে প্রভুর কথা হৃদয় বিদরে ।
সহিলা অসহ্য কত জীবের উদ্ধারে ॥ ৮৮ ॥
কেবা সে পাষাণ প্রাণ শাস্ত্র মধ্যে কর ।
অশনি হইতে শক্ত হরির হৃদয় ॥ ৮৯ ॥
শীতলত্ব কত ধরে ফটিকের জল ।
কোমলত্বে অতি তুচ্ছ কমলের দল ॥ ৯০ ॥
সুলভত্বে এতই সহজ সেই হরি ।
নাহি ধারে কোন ধার বরষার বারি ॥ ৯১ ॥
করুণার পরিণামে যায় রসাতল ।
সপ্তদ্বীপ-সুবেষ্টিত সাগরের জল ॥ ৯২ ॥
উজ্জ্বলত্বে কান্তি কিবা আছে তুলনায় ।
কোটি কোটি দিনমণি বানে ভেসে যায় ॥ ৯৩ ॥
মমতায় নাহি পায় মায় কোন ঠাঁই ।
এতই আত্মীয় তিনি জগৎ-গোসাঁই ॥ ৯৪ ॥
এই পূর্ণ কলিকাল কলির প্রতাপে ।
পুর্ণিত মানুষ-হৃদি মহা মহা পাপে ॥ ৯৫ ॥
দিবারাত্র করে নৃত্য হৃদে অহঙ্কার ।
মরে তবু নতশির নহে হইবার ॥ ৯৬ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে মত্ত আসক্তির দাস ।
অধর্ম-আচারী আত্মসুখ অভিলাষ ॥ ৯৭ ॥
বাঁকা আঁখি ঢাকা তার মহা আবরণে ।
পথছাড়া কুলহারা কুকর্ম কারণে ॥ ৯৮ ॥
রূপমুগ্ধ পোকা যেন নরকে তেমন ।
হেন অন্ধ বদ্ধ জীব উদ্ধার-কারণ ॥ ৯৯ ॥
নরদেহধারণ করিয়া ভগবান ।
নিজে সাজি দীন হীন জীবেরে শিখান ॥ ১০০ ॥
অতঃপর কি হইল শুন শুন মন ।
কল্যাণ-নিদান কথা শান্তিনিকেতন ॥ ১০১ ॥
কোন দিন মা মা বলি সম্বোধি শ্যামায় ।
কহেন কাকুতি করি হৃদি বেদনায় ॥ ১০২ ॥
বিদরিছে হিয়া মাগো তোমারে না হেরি ।
দুঃখী ছেলে কেঁদে বুলে দেখ দয়া করি ॥ ১০৩ ॥
রামপ্রসাদেরে কৃপা কেমনে করিলে ।
আমি কি কেহই নই সেই একা ছেলে ॥ ১০৪ ॥
কোন দিন পূজা সাঙ্গে শ্যামাগুণগান ।
করিয়া হইত তাঁর আকুল পরাণ ॥ ১০৬ ॥
ভাসিয়া যাইত বক্ষ নয়নের জলে ।
কাকুতি-মিনতি কত শ্যামা-পদতলে ॥ ১০৭ ॥
বিরহ-যাতনা এত কে করে কিনারা ।
অবশেষে হইতেন বাহ্যজ্ঞানহারা ॥ ১০৮ ॥
অদৃষ্ট অপূর্ব শ্যামা পূজার ব্যাপার ।
বিধি শাস্ত্র নাহি জানে কোন সমাচার ॥ ১০৯ ॥
হৃদয় সহিত যত ব্রাহ্মণে মিলিয়া ।
বাহিরে আনিত ধরি পীড়িত বুঝিয়া ॥ ১১০ ॥
দুই তিন ঘণ্টা কাল এ হেন ধরন ।
ক্রমশঃ হইত
পরে বাহ্যিক চেতন ॥ ১১১ ॥
সে সময়ে বোধ হয় তাঁহারে দেখিলে ।
ঠিক যেন কাঁচা-ঘুমে
তোলা শিশুছেলে ॥ ১১২ ॥
অবশ অবশ তনু না ধরে চরণ ।
শ্রীমুখে কেবলমাত্র মা মা
উচ্চারণ ॥ ১১৩ ॥
এ হেন অবস্থা দেখি কি বুঝিবে নরে ।
কি ভাবে এ ভাব তাঁর
হৃদয়-ভিতরে ॥ ১১৪ ॥
লোকের কি আছে সাধ্য বুঝে হেন ভাব ।
বুঝিবে আপনি ধরি যেমন স্বভাব ॥ ১১৫ ॥
উদয় বিবিধ ভাব হয় পূজাকালে ।
অশ্রুত অদৃষ্ট তাই লোকে ক্ষেপা বলে ॥ ১১৬ ॥
ভক্তিমতী রাসমণি জামাতা মথুর ।
বুঝিল পাগল ভাব হয়েছে প্রভুর ॥ ১১৭ ॥
কিন্তু তাঁরা
শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রভুদেবে করে ।
তার সঙ্গে ভালবাসা ভিতরে ভিতরে ॥ ১১৮ ॥
প্রভুর দু'হার প্রতি করুণা অপার ।
পাগল নহেন তিনি এই সমাচার ॥ ১১৯ ॥
বুঝাইয়া দিত স্বরূপত্ব প্রদর্শন ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত কথন ॥ ১২০ ॥
শ্রীবদনে শ্যাম-শ্যামা-বিষয়ক গীত ।
মিষ্টতার তুলনায় কি ধরে অমৃত ॥ ১২১ ॥
এত মিঠে একবার যেবা শুনে কানে ।
দিবারাতি গীত
শুনি এই হয় মনে ॥ ১২২ ॥
সঙ্গীত-শ্রবণে রানী মহাভাগ্যবতী ।
হৃদয় পুরিয়া পার অতুল পিরীতি ॥ ১২৩ ॥
একদিন প্রভুদেবে শ্যামার মন্দিরে ।
মিনতি করিয়া কয় গান গাইবারে ॥ ১২৪ ॥
প্রভুর মধুর কণ্ঠ পিক-কণ্ঠ জিনি ।
শ্যামা-বিষয়ক গীত ধরিলা অমনি ॥ ১২৫ ॥
শুনিতে শুনিতে রানী সচঞ্চলমনা ।
অনেক টাকার এক বড় মকদ্দমা ॥ ১২৬ ॥
উপস্থিত আদালতে নিষ্পত্তি না হয় ।
চিন্তা করে অন্তরেতে কেমনে হবে জয় ॥ ১২৭ ॥
সর্বঘটবার্তাবিৎ শ্রীপ্রভু ঈশ্বর ।
অন্যমনা জানি হানে রানীরে চাপড় ॥ ১২৮ ॥
অঙ্গুলি নির্দেশ করি দেখাইলা তায় ।
ঐ দেখ ঐ দেখ সাক্ষাৎ শ্যামায় ॥ ১২৯ ॥
সম্মুখে অতুলা মুর্তি প্রতিমা শ্যামার ।
একদৃষ্টে দেখে মুখে কথা নাহি আর ॥ ১৩০ ॥
দর দর অশ্রুধারা ঢালে দু নয়ন ।
কি জানি কি দেখি করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ১৩১ ॥
কি দেখাইলা প্রভুদেব হানিয়া চাপড় ।
বুঝিবে শুনহ কিবা হৈল অতঃপর ॥ ১৩২ ॥
চাপড়ের সঙ্গে হয় শকতি সঞ্চার ।
যাহাতে ফুটিল আঁখি রানীর এবার ॥ ১৩৩ ॥
হৃদিগত ভাব কভু নাহি থাকে চাপা ।
ভ্রম দূর বুঝে প্রভুদেব নহে ক্ষেপা ॥ ১৩৪ ॥
পুরীর ভিতরে যত অপর ব্রাহ্মণ ।
প্রভুদেবে দ্বেষহিংসা করে বিলক্ষণ ॥ ১৩৫ ॥
রানীরে হানিতে চড় বিলোকন করি ।
অন্তরে যতেক প্রভু-দ্বেষী খুশী ভারি ॥ ১৩৬ ॥
রানীরে চাপড় হানা সোজা কথা নয় ।
বড় বড় জমিদারে যারে করে ভয় ॥ ১৩৭ ॥
হুকুম জাহির যার কোম্পানির ঘরে ।
প্রতাপে বলদে বাঘে সঙ্গে পান করে ॥ ১৩৮ ॥
চাপড় হয়েছে হানা সে রানীর গায় ।
ব্রাহ্মণেরা সবে জানে সাজা দিবে তায় ॥ ১৩৯ ॥
এ ঘরের উলটা চাবি জানে না কারণ ।
চাল-কলা-কড়ি-লোভী কলির ব্রাহ্মণ ॥ ১৪০ ॥
লীলা-কথা শ্রীপ্রভুর শ্রবণ-মঙ্গল ।
শ্রীমথুরে বুঝাবারে করিলা কৌশল ॥ ১৪১ ॥
গঙ্গাগর্ভে একদিন শুন শুন মন ।
মথুর বসিয়া করে মুখপ্রক্ষালন ॥ ১৪২ ॥
সমাসীন প্রভুদেব ছিলা হেনকালে ।
কথঞ্চিৎ দূরে তার বকুলের তলে ॥ ১৪৩ ॥
বালকস্বভাব প্রভু সরলাতিশয় ।
লোকে জানে যাহা বলে করেন প্রত্যয় ॥ ১৪৪ ॥
মাথার বিকার
কথা রটে সর্বজনে ।
তাই চিন্তাকুল প্রভু বসিয়া নির্জনে ॥ ১৪৫ ॥
মথুরে দেখিয়া মনে
হইল তাঁহার ।
ধনবান শ্রীমথুর বড় জমিদার ॥ ১৪৬ ॥
অনেক সম্পত্তি ধন টাকাকড়ি ঘরে ।
বলিলে যদ্যপি কোন সদুপায় করে ॥ ১৪৭ ॥
মনে মনে উঠে কথা কথায় না কুটে ।
হঠাৎ কেমন ভাব হৈল তাঁর ঘটে ॥ ১৪৮ ॥
নিকটে পতিত ঢিল তুলি একখানি ।
মথুর মথুর বলি ছুড়িলা অমনি ॥ ১৪৯ ॥
ঢিল খেয়ে চম্বিত হইয়া পাছু চায় ।
বকুলের তলে প্রভু দেখিবারে পায় ॥ ১৫০ ॥
দুঃখিত অন্তর ভাব মলিন বদন ।
মথুর বুঝিল ঠিক পাগল-লক্ষণ ॥ ১৫১ ॥
বার বার নিরীক্ষণ
করি পরমেশে ।
যথায় শ্রীপ্রভু তাঁর সন্নিকটে আসে ॥ ১৫২ ॥
দীনতার ভাব পরিপূর্ণ
শ্রীবদন ।
বলিলা মথুরে আমি দরিদ্র ব্রাহ্মণ ॥ ১৫৩ ॥
সবে কয় হইয়াছে মাথার বিকার ।
যদি তুমি কর সদুপার চিকিৎসার ॥ ১৫৪ ॥
কথায় কথায় ঈশ্বরীয় উত্থাপন ।
একমনে শ্রীমথুর
করেন শ্রবণ ॥ ১৫৫ ॥
শ্রীপ্রভুর মহাবাক্যে শক্তি এত ধরে ।
অটল অচল ভেদ হয় তার জোরে ॥ ১৫৬ ॥
আঁতে আঁতে গাঁপা কথা মথুরের প্রাণে ।
মন্ত্রমুগ্ধ সর্পসম দাঁড়াইয়া শুনে ॥ ১৫৭ ॥
অবাক হইয়া কয় প্রভু-পদতলে ।
এমন আপুনি কিসে লোকে ক্ষেপা বলে ॥ ১৫৮ ॥
প্রাণ দিলে যদি ভাল হয় আপনার ।
অবশ্য করিব আমি করিমু স্বীকার ॥ ১৫৯ ॥
পূজায় বড়ই রঙ্গ দিনে দিনে বাড়ে ।
ভক্তি-প্রদাায়িনী কথা শুন ভক্তিভরে ॥ ১৬০ ॥
সচন্দন বিল্ব-জবা দিতে শ্যামা পায় ।
থুইতেন প্রভুদেব নিজের মাথায় ॥ ১৬১ ॥
শ্যামার সেবার হেতু যত আয়োজন ।
ভাবাবেশে করিতেন আপুনি ভক্ষণ ॥ ১৬২ ॥
একদিন প্রভুদেব যেন শুনা যায় ।
খাইবারে বড় জেদ করেন শ্যামায় ॥ ১৬৩ ॥
জনেক দাঁড়ায়ে পাশে প্রভুদেবে কন ।
পাষাণমুরতি শ্যামা জড় অচেতন ॥ ১৬৪ ॥
অকারণ কেন জেদ কর থাইবারে ।
শুনিয়া আবেশ অঙ্গে, বাহ্য গেল ছেড়ে ॥ ১৬৫ ॥
শ্রীমুখমণ্ডলে হাসি অপরূপ খেলে ।
আবেশে অবশ অঙ্গ পড়ে ঢলে ঢলে ॥ ১৬৬ ॥
ধরিলেন তুলা লয়ে শ্যামার নাসায় ।
দুলু দুলু কাঁপে তুলা নিঃশ্বাসের বায় ॥ ১৬৭ ॥
পুনরায় মহাজেদ করিতে ভক্ষণ ।
সম্মুখে সাজান ভোজ্য বিবিধ রকম ॥ ১৬৮ ॥
হাতে করি দিতে ভোজ্য বদনে শ্যামার ।
ভোজ্যসহ হাত আসি পড়ে মুখে তাঁর ॥ ১৬৯ ॥
শামার নৈবেদ্য কভু ভাবের বিহ্বলে ।
স্বহস্তে তুলিয়া দেন খাইতে বিড়ালে ॥ ১৭০ ॥
কখন কখন ভাবে বিভোর হইয়ে ।
নৈবেদ্যের নিবেদন পূজা না করিয়ে ॥ ১৭১ ॥
কখন আবেশভরে কহেন ফুকুরি ।
রোস্ রোস্ খাবি আগে নিবেদন করি ॥ ১৭২ ॥
কখন কহেন মৃদু-হাস্য সহকারে ।
ওমা তুই আগে খা গো আমি খাব পরে ॥ ১৭৩ ॥
কখন সেবার পরে শ্যামা-গুণগান ।
ভাবেতে বিভোর নাহি বাহ্যিক গেয়ান ॥ ১৭৪ ॥
শ্যামার মন্দিরে আছে খাট একখানা ।
মশারি বালিশ গদি মায়ের বিছানা ॥ ১৭৫ ॥
কখন কখন প্রভু ভাবাবেশে গায় ।
শুয়ে বসে থাকিতেন শ্যামার শয্যায় ॥ ১৭৬ ॥
পুরী-মধ্যে যতেক ব্রাহ্মণ এই হেরে ।
বিদ্বেষ করিয়া কত লাগায় মথুরে ॥ ১৭৭ ॥
মথুর উত্তর দিতে দেখিয়া ব্যাপার ।
তাঁহারে কহিতে শক্তি নাহিক আমার ॥ ১৭৮ ॥
শ্যামার
হয়েছে কৃপা তাঁহার উপরে ।
যাহা ইচ্ছা করিবেন পুরীর ভিতরে ॥ ১৭৯ ॥
বহু পুণ্যবলে
আমি পাইয়াছি তাঁয় ।
বাঁচিব যতেক দিন রাখিব মাথাায় ॥ ১৮০ ॥
এতেক শুনিয়া বুঝে পুরীর
বামুন ।
প্রভু করেছেন কিছু মথুরেরে গুণ ॥ ১৮১ ॥
সাধন-ভজন কত গোপনে গোপনে ।
করেন
শ্রীপ্রভুদেব কেহ নাহি জানে ॥ ১৮২ ॥
সাধন-ভজন জন্য আঙ্গিক বিকার ।
না বুঝিয়া লোকে
জনে কহে পীড়া তাঁর ॥ ১৮৩ ॥
যোগজ বিকার অঙ্গে কতরূপ হয় ।
পীড়া ব্যাধি সাধারণে
নানাবিধ কয় ॥ ১৮৪ ॥
বয়োজ্যেষ্ঠ খুল্লতাত ভাই হলধারী ।
পণ্ডিত সাধক ভক্ত পুরীতে
পূজারী ॥ ১৮৫ ॥
বৈষ্ণবের মতে পথে শ্রদ্ধা বিলক্ষণ ।
বেশ্যাসহ পরকীয়া প্রেমের সাধন ॥ ১৮৬ ॥
সিদ্ধবাক কাছে কেহ কিছু নাহি কয় ।
পাছে দেন অভিশাপ এই মনে ভয় ॥ ১৮৭ ॥
নির্ভীক
শ্রীপ্রভু তাঁয় কহিলা তখন ।
কি বলিয়া দশে করে কলঙ্ক কীর্তন ॥ ১৮৮ ॥
কোপে শাপ দিলা
দ্বারা প্রভু গুণধরে ।
যে মুখে কহিলা তাহে রক্ত যেন ঝরে ॥ ১৮৯ ॥
কি এক সাধনা প্রভু
করেন তখন ।
সিদ্ধান্তে বদনে হয় শোণিত-মোক্ষণ ॥ ১৯০ ॥
শিমের পাতার রসে বরণ যেমতি ।
সেইরূপ শোণিতের বরণ প্রকৃতি ॥ ১৯১ ॥
বিষণ্ণবয়ান প্রভু কন সকাতরে ।
শাপ দিলে দেখ
দাদা মুখে রক্ত ঝরে ॥ ১৯২ ॥
সজল নয়নে তবে কহে হলধারী ।
কুকর্ম করেছি ভাই অভিশপ্ত
করি ॥ ১৯৩ ॥
জানে না বুঝে না দাদা মায়ের কৌশল ।
প্রভুর হয়েছে শাপে পরম মঙ্গল ॥ ১৯৪ ॥
যোগজ দূষিত রক্ত না হলে বাহির ।
থাকিত না ঠাকুরের বিগ্রহ-শরীর ॥ ১৯৫ ॥
পরে পরে পাবে মন কত পরিচয় ।
যোগজ বিকার কত সাধনাতে হয় ॥ ১৯৬ ॥
আর এক উপসর্গ হৈল আচম্বিত ।
গাত্রদাহ গোটাদিন বিরাম রহিত ॥ ১৯৭ ॥
সূর্যোদয়ে দাহোদয় দাহর প্রকৃতি ।
তত বাড়ে যত সূর্য হয় ঊর্ধ্বগতি ॥ ১৯৮ ॥
দ্বিতীয় প্রহর যবে যন্ত্রণাতিশয় ।
মানুষের দেহে তাহা কখন না সয় ॥ ১৯৯ ॥
জাহ্নবীর জলে প্রভু অস্থির হইয়ে ।
থাকিতেন প্রহরেক অঙ্গ ডুবাইয়ে ॥ ২০০ ॥
ভিজাইয়া বস্ত্রখণ্ড মস্তকাবরণ ।
তথাপি তিলেক তার নহে নিবারণ ॥ ২০১ ॥
কভু অতি সুশীতল ঘরের মেঝায় ।
কোমল শ্রীঅঙ্গ গোটা গড়াগড়ি যায় ॥ ২০২ ॥
কখন কি ভাবে প্রভু বুঝা বড় ভার ।
কখন সাধনা আর কখন বিচার ॥ ২০৩ ॥
কেশরী বিক্রমবল এক লক্ষ্যে মন ।
বিচার আরম্ভ ল'য়ে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ২০৪ ॥
মূল পিশাচিনী দুটি বিষময় রূপ ।
মানযশাকাঙ্ক্ষা যত সঙ্গিনীস্বরূপ ॥ ২০৫ ॥
সঙ্গিনীরা দেহ-অঙ্গ মূলদ্বয় প্রাণ ।
মূল নষ্টে সব নষ্ট প্রত্যক্ষ প্রমাণ ॥ ২০৬ ॥
যেন উপসর্গগণ আপনিই থামে ।
রোগীর উৎকট মূলব্যাধি-উপশমে ॥ ২০৭ ॥
কামিনীরে লক্ষ্য করি করেন বিচার ।
এত দেখি অপরূপ ভৌতিক ব্যাপার ॥ ২০৮ ॥
দেহের কাঠাম-মাত্র অস্থিতে কেবল ।
মাংস-অংশে শিরা মধ্যে রক্ত-চলাচল ॥ ২০৯ ॥
কফ-পিত্ত-মল-মূত্র বৈভব ইহার ।
উপরে ছাউনি চালযুক্ত নব দ্বার ॥ ২১০ ॥
কোন দ্বারে যায় ভোগ্য শরীর রক্ষণ ।
কোন দ্বারে ভুক্ত-শেষ হয় নিগমন ॥ ২১১ ॥
ছোবান মলের তন্ত্র শিরখুলি ছাপা ।
তাই দিয়া বেনাইয়া বাঁধিয়াছে খোঁপা ॥ ২১২ ॥
এই কামিনী নামে কি আছে ইহায় ।
যাহাতে
আনন্দময়ী মায়ে পাওয়া যায় ॥ ২১৩ ॥
কামিনী রোগের গোড়া নাশের কারণ ।
ইহাতে আমার কিছু
নাহি প্রয়োজন ॥ ২১৪ ॥
অতঃপর কাঞ্চনের করেন বিচার ।
ধাতু-নামে জ্ঞাত লোকে মাটির
বিকার ॥ ২১৫ ॥
এক হাতে মাটি আর টাকা অন্য হাতে ।
গঙ্গাকূলে বসিলেন বিচার করিতে ॥ ২১৬ ॥
টাকা মাটি মাটি টাকা সমান তুলনে ।
কি হয় ইহাতে একা ডাল ভাত বিনে ॥ ২১৭ ॥
নাহিক এমন
মূল্য ইহার ভিতরে ।
যাহাতে আনন্দময়ী শ্যামা দিতে পারে ॥ ২১৮ ॥
এত বলি টাকা মাটি
উভয়ে লইয়ে ।
দূর গঙ্গাজলে প্রভু দিলেন ফেলিয়ে ॥ ২১৯ ॥
পুরী-মধ্যে রহে যারা শুনিয়া
বারতা ।
সঠিক বুঝিল সবে ঘোর উন্মত্ততা ॥ ২২০ ॥
বিশেষতঃ শ্রীপ্রভুর দাদা হলধারী ।
শাস্ত্রপাঠী বিবেচক সাধক আচারী ॥ ২২১ ॥
হৃদয়ে কহেন কথা বিষণ্ণ-বদনে ।
সদাই-তো থাক
তুমি গদাইর সনে ॥ ২২২ ॥
বুঝাইয়া দিতে তারে করহ বিহিত ।
জলে ফেলে দেওয়া টাকা
লক্ষ্মীছাড়া রীত ॥ ২২৩ ॥
বিবাহিত নহে আর একাকী এখন ।
ছেলেপুলে পিছে আছে লালন-পালন ॥ ২২৪ ॥
দাদার সঙ্গেতে রঙ্গ হয় বহুতর ।
পশ্চাৎ পাইবে মন যতেক খবর ॥ ২২৫ ॥
এ সময়ে শুনি এক কঠোর সাধন ।
সূর্যেতে সতত লগ্ন দুখানি নয়ন ॥ ২২৬ ॥
কম্পাসের কাঁটা
যেন সতত উত্তরে ।
তেন অনিমিখ আঁখি সূর্যের উপরে ॥ ২২৭ ॥
অবিরত ঘুরে দিনকর যেই দিকে ।
যতক্ষণ নহে অস্ত উদয়ের থেকে ॥ ২২৮ ॥
নিত্য নিত্য দিনত্রয় সাধনার পরে ।
আঁখি-আবরণ আর আদতে না পড়ে ॥ ২২৯ ॥
মুদিত কখন নহে দিনে রেতে খোলা ।
বলিতেন প্রভু একি হৈল এক জ্বালা ॥ ২৩০ ॥
ওমা শ্যামা দেখ, নাহি পড়ে আবরণ ।
আঁখির সম্মুখে হয় অঙ্গুলি-চালন ॥ ২৩১ ॥
তথাপি
আঁখির ঢাকা কিছুই না পড়ে ।
কি পীড়া হৈল বলি প্রভু চিন্তা করে ॥ ২৩২ ॥
দেখিয়া শুনিয়া এত তবু কহে লোকে ।
ভূতের ব্যাপার ভূতে পেয়েছে প্রভুকে ॥ ২৩৩ ॥
বালকস্বভাব তাঁর শিশুর মতন ।
সহজে বিশ্বাস যাহা কহে লোকজন ॥ ২৩৪ ॥
আরোগ্যের হেতু
যেন কথিত বিধান ।
কুক্কুট-শৃগাল-বিষ্ঠা করেন আঘ্রাণ ॥ ২৩৫ ॥
শ্যামার মন্দিরে
হেনকালে একদিন ।
বসিয়া আছেন মুখ বিষন্ন মলিন ॥ ২৩৬ ॥
অকস্মাৎ উপনীত সাধু একজন ।
মনোহর মুর্তিখানি বিশাল নয়ন ॥ ২৩৭ ॥
দেখিয়া তাঁহায় প্রভু করিলেন মনে ।
জিজ্ঞাসিব
কিবা পীড়া আঁখি-আবরণে ॥ ২৩৮ ॥
বলিবার অগ্রে কিবা কথা অতঃপর ।
প্রভুর নিকটে সাধু নিজে অগ্রসর ॥ ২৩৯ ॥
বিস্তার করিয়া
দুটি প্রফুল্ল নয়ন ।
বিশেষিয়া প্রভুদেবে করে নিরীক্ষণ ॥ ২৪০ ॥
প্রভুদেব বলিলেন পীড়ার ব্যাপার ।
সাধু কয় এতো নয় বিয়াধি তোমার ॥ ২৪১ ॥
লোচন-বিকার ইহা সাধনার ফলে ।
স্বভাবস্থ হবে চক্ষু ঢাকা যাবে খুলে ॥ ২৪২ ॥
মহা আনন্দিত প্রভু বচনে সাধুর ।
বিষন্নতা আতুরতা সব দুঃখ দূর ॥ ২৪৩ ॥
গোপনে সাধনা কেহ জানিতে না পায় ।
জগৎ সুষুপ্ত যবে রেতের বেলায় ॥ ২৪৪ ॥
কিছুকাল পরে তবে হৃদু টের পান ।
গভীর রজনী মধ্যে মামা যেথা যান ॥ ২৪৫ ॥
ঝোপ জঙ্গলেতে পূর্ণ দেখে লাগে ত্রাস ।
ভূত-প্রেত-শিবা সর্পকুলের আবাস ॥ ২৪৬ ॥
পরদিনে বুঝাইতে বলেন হৃদয় ।
মামা তব একি কর্ম? — উচিত না হয় ॥ ২৪৭ ॥
রাত্রিকালে ঝোপ
মধ্যে নিদ্রা নাই মোটে ।
দেহে দিলে এত কষ্ট পড়িবে সঙ্কটে ॥ ২৪৮ ॥
শ্রীপ্রভুর এক
লক্ষ্য লক্ষ্যে মন প্রাণ ।
কাজেই হৃদুর বাক্যে কেবা দিবে কান ॥ ২৪৯ ॥
শ্রীপ্রভুর
মনে প্রাণে বহে এক ধারা ।
যতদিন নাহি হয় কর্মের কিনারা ॥ ২৫০ ॥
এখানে চিন্তায় হৃদু
সতত অস্থির ।
নিবারণ-হেতু এক করিল ফিকির ॥ ২৫১ ॥
অন্তরীক্ষে দূরে থাকি
ভয়-প্রদর্শনে ।
ঢিল ছুঁড়ে নানাদিকে এখানে ওখানে ॥ ২৫২ ॥
ব্যাপার বুঝিতে তাঁর দেরি
নাহি হয় ।
ভূত-প্রেত নহে ঢিল ছু'ড়িছে হৃদয় ॥ ২৫৩ ॥
নির্ভয় হৃদয়ালয় মগন ধিয়ানে ।
চেষ্টা ব্যর্থ দেখি হৃদু চিন্তান্বিত মনে ॥ ২৫৪ ॥
মামার উপর তার আন্তরিক টান ।
সুস্থির থাকিতে নারে কাঁদে মন-প্রাণ ॥ ২৫৫ ॥
একদিন রেতে হৃদু সাধনার স্থানে ।
মমতার টানে যায় পণ করি প্রাণে ॥ ২৫৬ ॥
দূর থেকে দেখিলেন তথা গুণমণি ।
ভাব-ধরনের
কথা অপূর্ব কাহিনী ॥ ২৫৭ ॥
পরিত্যক্ত-যজ্ঞসূত্র বিহীন-বসন ।
একমনে মহাধ্যানে আছেন
মগন ॥ ২৫৮ ॥
কাছে যেতে ভয় মাত্র টানের সাহসে ।
ধীরগতিপদে হৃদু জঙ্গলে প্রবেশে ॥ ২৫৯ ॥
মনে
মনে করে মামা এসেছে কোথায় ।
বার বার ডাক দিয়া প্রভুরে জাগায় ॥ ২৬০ ॥
বলে মামা একি তব কর্ম গরহিত ।
উলঙ্গ অঙ্গেতে নাই যজ্ঞ-উপবীত ॥ ২৬১ ॥
নিবিড় আঁধার স্থান গভীর রজনী ।
চৌদিকে কতক দূর নাহি জনপ্রাণী ॥ ২৬২ ॥
বুঝিতে না পারি মর্ম কার্যের কৌশল ।
সত্য সত্য মামা তুমি হলে কি পাগল ॥ ২৬৩ ॥
ধীরে ধীরে কৈলা প্রভু হৃদয়ে উত্তর ।
ধিয়ানের পক্ষে স্থান বড়ই সুন্দর ॥ ২৬৭ ॥
একে গঙ্গাতীর তাহে আমলকী-তলা ।
জগৎ নীরব এবে সুষুপ্তির বেলা ॥ ২৬৮ ॥
বস্ত্র-যজ্ঞসূত্র আমি রাখিব কেমনে ।
দারুণ বন্ধন দুই মায়ের বিয়ানে ॥ ২৬৯ ॥
তুমি নাহি জান হৃদু শাস্ত্রেতে কথিত ।
পাশযুক্তে ধ্যানসিদ্ধ নহে কদাচিত ॥ ২৭০ ॥
যাইবার কালে দুই পরিব আবার ।
হৃদয় বিস্ময়ে শুনে বচন মামার ॥ ২৭১ ॥
হেথা রানী রাসমণি অতি ক্ষুণ্ণ মন ।
প্রভুর কারণে চিন্তা করে অনুক্ষণ ॥ ২৭২ ॥
বুঝিল একে তো প্রভু পাগলের প্রায় ।
তাহে পীড়া শক্ত মুখে শোণিত বেরোয় ॥ ২৭৩ ॥
তদুপরি সহোদর গেলেন ছাড়িয়া ।
সংগোপনে কন কথা মথুরে ডাকিয়া ॥ ২৭৪ ॥
ছোট ভট্চাযের শক্ত ব্যারাম নিশ্চিত ।
বিজ্ঞ চিকিৎসক আনি করহ বিহিত ॥ ২৭৫ ॥
দুহ হৃদে মমতা বাড়িল বিলক্ষণ ।
ভক্ত-ভগবানে খেলা দেখহ কেমন ॥ ২৭৬ ॥
কি ভাব হইল হৃদে খাইয়া চাপড় ।
এ হেন রানীর পায় লক্ষ লক্ষ গড় ॥ ২৭৭ ॥
শ্রীগঙ্গাপ্রসাদ কবিরাজ অতি খ্যাত ।
চিকিৎসা-কারণে তাঁয় করিলা নিযুক্ত ॥ ২৭৮ ॥
যথাসাধ্য পীড়ার নির্ণয় তেহ করি ।
মাখিতে দিলেন তেল খেতে দিল বড়ি ॥ ২৭৯ ॥
তেল-বড়ি-ব্যবহারে বহুদিন গেল ।
প্রতিকার সে পীড়ার কিসেও না হ'ল ॥ ২৮০ ॥
যত দেখে তত বাড়ে পীড়া দিনে দিনে ।
এত বড় কবিরাজ সচিন্তিত মনে ॥ ২৮১ ॥
একদিন প্রাতে প্রভু গেলা তাঁর ঠাঁই ।
চিকিৎসা আলয়ে উপস্থিত তাঁর ভাই ॥ ২৮২ ॥
করিতেন সেই ভাই যোগের সাধন ।
প্রভু দরশনে মনে কৈল নিরূপণ ॥ ২৮৩ ॥
হবে কোন যোগিবর
এই মহামতি ।
প্রত্যক্ষ শ্রীঅঙ্গে দেখি লক্ষণ তেমতি ॥ ২৮৪ ॥
পীড়া বলে তথাপিহ মূর্তি
মুগ্ধকারী ।
বিশেষিয়া জিজ্ঞাসিল সবিনয় করি ॥ ২৮৫ ॥
প্রভুর শ্রীমুখে শুনি
সকল-বারতা ।
চিকিৎসক সহোদরে কহিলেন কথা ॥ ২৮৬ ॥
এ পীড়ার শাস্তিদানে নিদান না পারে ।
আরোগ্য প্রয়াস মাত্র অন্ধজনে করে ॥ ২৮৭ ॥
যোগেশ-দুর্লভ পীড়া পীড়া ইহা নয় ।
সমুদিত
অঙ্গে পীড়া বহু ভাগ্যে হয় ॥ ২৮৮ ॥
তথাপিহ প্রতিকার কবিরাজে করে ।
বাড়িতে লাগিল
বেগ কিসেও না সারে ॥ ২৮৯ ॥
রানীর গুণের কথা না যায় বাখানি ।
মথুরে কহিল তাঁয় ডাকাইয়া আনি ॥ ২৯০ ॥
উপায়বিহীন দেখি কি করিবে কাজ ।
চিকিৎসায় উপশম না হন ভট্চাার্য ॥ ২৯১ ॥
পরস্পর নানা কথা যুক্তি স্থির করি ।
ভাগিনা হৃদয়ে কৈল শ্যামার পূজারী ॥ ২৯২ ॥
প্রভুর বেতন মুসহারা সম গণি ।
বন্ধনী করিয়া দিল ভক্তিমতী রানী ॥ ২৯৩ ॥
প্রভুদেবে রাখিলেন পরম যতনে ।
সুন্দর বন্ধনী করি সেবার কারণে ॥ ২৯৪ ॥
রাধাশ্যাম আর যেন কালীঠাকুরানী ।
তুল্যরূপে সেবি রাখে ভক্তিমতী রানী ॥ ২৯৫ ॥
প্রভুর কারণ দ্রব্য যখন যা লাগে ।
যোগায় অমনি রানী সকলের আগে ॥ ২৯৬ ॥
আজ থেকে নিত্যকর্ম শ্যামা পূজা গেল ।
কিন্তু শ্যামা-অনুরাগ চৌগুণ বাড়িল ॥ ২৯৭ ॥
বরষায় রক্তপদ্ম যেন সরোবরে ।
সেই মত রাঙ্গা আঁখি ভাসে আঁখিনীরে ॥ ২৯৮ ॥
এতই ঝরিত বারি আঁখি সরসিজে ।
ধারায় ধরায় পড়ি মাটি যেত ভিজে ॥ ২৯৯ ॥
কত যে কান্দিলা প্রভু ধরি কলেবর ।
ধরিতে পারিলে বারি হইত সাগর ॥ ৩০০ ॥
শিশুর রগড় যেন মা'র অদর্শনে ।
ধূলায় কাদায় লুটে ব্যাকুল পরাণে ॥ ৩০১ ॥
মাতা বিনা অন্তে আর কিসেও না ভুলে ।
সেইমত প্রভুদেব সুরধুনীকুলে ॥ ৩০২ ॥
পদ্মদল হেরে হারে সুকোমল কায় ।
দেখা দে মা কোথা বলি লুটালুটি যায় ॥ ৩০৩ ॥
গোটা দিন গত যবে সূর্য বসে পাটে ।
জিহ্বা ধরি টানিতেন বিরহের চোটে ॥ ৩০৪ ॥
বলিতেন এল সূর্য পুনঃ ঘর গেল ।
আমি যেন তাই শ্যামা আমার কি হ'ল ॥ ৩০৫ ॥
অসহ্য
যাতনাপ্রদ শির-রোগ যার ।
না জানে নিধানে কিবা আছে প্রতিকার ॥ ৩০৬ ॥
মস্তক লইয়া ব্যতিব্যস্ত অনুক্ষণ ।
যন্ত্রণা-জ্বালার করে জলে নিমগন ॥ ৩০৭ ॥
বিরহ-সন্তাপে সেইমত প্রভুরায় ।
মগ্ন করিতেন মাথা গঙ্গার কাদায় ॥ ৩০৮ ॥
আর্তনাদে হিয়া ভের পশে যার কানে ।
সে বুঝে সেরূপ তাঁর পীড়ার বেদনে ॥ ৩০৯ ॥
দিনে দিনে দিন যায় ক্ষুধা-তৃষ্ণা নাই ।
আত্মীয়-বান্ধব যত কাতর সবাই ॥ ৩১০ ॥
খাওয়াইয়া দিলে পরে ধরাধরি ক'রে ।
তবে কিছু যায় ভোজ্য উদর-ভিতরে ॥ ৩১১ ॥
দিবানিশি সম ধারা একরূপে যায় ।
কাঁদিয়া বেড়ান
মাত্র ডাকিয়া শ্যামায় ॥ ৩১২ ॥
জ্যেষ্ঠ খুল্লতাত ভাই হলধারী দাদা ।
পুরীতে পূজক
চিন্তা করেন সর্বদা ॥ ৩১৩ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ সাধক তেঁহ পণ্ডিতপ্রবর ।
আড়ালে প্রভুরে লয়ে বুঝান বিস্তর ॥ ৩১৪ ॥
মা মা বলি কেন কাঁদ বালকের প্রায় ।
শ্যামা মাত্র শুনা নাম কে পায় কোথায় ॥ ৩১৫ ॥
চাঁদ লাগি কাঁদে যেন শিশু অকারণ ।
শ্যামার লাগিয়া দেখি তোমার তেমন ॥ ৩১৬ ॥
ক্ষুধা-নিদ্রা নাই কেন কাঁদ দিনে রেতে ।
পাবার হইলে শ্যামা এত দিনে পেতে ॥ ৩১৭ ॥
কেঁদ না কাঁদিলে কিবা হবে অনিবার ।
কেমনে হইল হেন মাথার বিকার ॥ ৩১৮ ॥
এত বলি দাদা যত করেন সান্ত্বনা ।
ততই প্রভুর হয় শেলের যাতনা ॥ ৩১৯ ॥
শ্যামা সুদুর্লভ, শুনি ভীষণ বারতা ।
শতগুণে পায় বৃদ্ধি হৃদি-ব্যাকুলতা ॥ ৩২০ ॥
প্রবেশি অস্থির প্রাণে শ্যামার মন্দিরে ।
কাতরে কহেন শ্যামা-প্রতিমা-গোচরে ॥ ৩২১ ॥
কোথা শ্যামা, দেখা দে মা মোরে একবার ।
হলধারী বলে মোর মাথার বিকার ॥ ৩২২ ॥
যাতনায় যায় প্রায় দেহ ছাড়ি প্রাণী ।
তথাপি না দেয় দেখা নিদয়া পাষাণী ॥ ৩২৩ ॥
লইয়া শ্যামার খাঁড়া প্রভু অবশেষে ।
বসাইতে যান যবে নিজ গলদেশে ॥ ৩২৪ ॥
তখন সাক্ষাৎকার আইলা জননী ।
বলিলেন ডাকিলেই দেখা পাবে তুমি ॥ ৩২৫ ॥
থাক আপনার ভাবে আছ যেই মত ।
অচল অটল নাহি হবে বিচলিত ॥ ৩২৬ ॥
সে হইতে শ্যামাপদ যদি কোন জন ।
না মিলে দুর্লভ কথা করে উচ্চারণ ॥ ৩২৭ ॥
ভগবান প্রভুদেব বিশ্বাস-আকর ।
সদাবদ্ধ রাখিতেন শ্রবণ-বিবর ॥ ৩২৮ ॥
জীব-শিক্ষা-হেতু প্রভু সাধনার আগে ।
দেখাইলা শ্যামা মিলে কত অনুরাগে ॥ ৩২৯ ॥
অনুরাগ কারে বলে কি তার প্রকৃতি ।
সরল বুদ্ধিতে শুন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩৩০ ॥
রাগাত্মিকা ভক্তি যেবা সেই অনুরাগ ।
কিংবা ঈশ্বরের জন্য ষোল আনা ত্যাগ ॥ ৩৩১ ॥
একলক্ষ্য সিন্ধুমুখী স্রোতের প্রকৃতি ।
উগ্রতম একটানা অতি বেগবতী ॥ ৩৩২ ॥
অচল অটল সম গুরু অভিমান ।
যাবতীয় দ্বন্দ্বভাব অজ্ঞিয়ান জ্ঞান ॥ ৩৩৩ ॥
শারীরিক মানসিক যত সংস্কার ।
বাসনা কল্পনা আদি বাহ্যিক বিকার ॥ ৩৩৪ ॥
ঘৃণা লজ্জা ভয় আর জাতি কুল যান ।
সকলের প্রিয় দেহ প্রাণের সমান ॥ ৩৩৫ ॥
তৃণসম ভাসাইয়া লয়ে যায় বেগে ।
এই ধর্ম মর্ম বুঝ বহে অনুরাগে ॥ ৩৩৬ ॥
এ বেগের আতিশয্য হয় এত দূর ।
শুন কি প্রভাব তার অবস্থা প্রভুর ॥ ৩৩৭ ॥
হৃদয়ে বেদনা গাত্রদাহের জ্বালায় ।
লুটাপুটি যান ভূমে ধূলায় কাদায় ॥ ৩৩৮ ॥
কোমল গায়ের চর্ম কত যায় কাটা ।
বাঁধিল মাথার চুলে দীর্ঘ দীর্ঘ জটা ॥ ৩৩৯ ॥
দেহভ্রম বাহ্যহারা দেহ গোটা জড় ।
চড়াই আসিয়া বসে মাথার উপর ॥ ৩৪০ ॥
আহারীয়-অন্বেষণে চঞ্চু বিলিখনা ।
যদ্যপি জটায় পায় তণ্ডুলের কণা ॥ ৩৪১ ॥
বুঝ অনুরাগ কিবা লক্ষণ কি তার ।
পরিপকে ধরে মহাভাবের আকার ॥ ৩৪২ ॥
ব্যাস শ্রীরাধার অঙ্গে পুরাণে বাখানে ।
দুর্লভ উদর নহে যেখানে সেখানে ॥ ৩৪৩ ॥
বিনা ষোল আনা শুদ্ধ সত্ত্বের আধার ।
ভৌতিক আধারে বেগ নহে ধরিবার ॥ ৩৪৪ ॥
অবতার সেইখানে মহাভাব যেথা ।
জয় প্রভু
রামকৃষ্ণ ভাবের বিধাতা ॥ ৩৪৫ ॥
আইল বরষা ধরি ভীষণ আকার ।
মেঘে ঢাকে রবিকর দিন অন্ধকার ॥ ৩৪৬ ॥
গভীর গর্জন সহ ঢালে জলরাশি ।
নাহিক বিচার কিবা দিবা কিবা নিশি ॥ ৩৪৭ ॥
উথলিল ভাগীরথী গেরুয়াবসনা ।
জুয়ারে আনিল জ্বলে সাগরের লোনা ॥ ৩৪৮ ॥
ডুবাইল পঞ্চবটী সাধনার স্থল ।
জুয়ারের কালে উঠে আধ হাত জল ॥ ৩৪৯ ॥
প্রভুর অবস্থা কিবা কাদা কিবা মাটি ।
যেখানে আবেশ সেইখানে লুটাপুটি ॥ ৩৫০ ॥
ঘটি ঘটি লোনা জল পেটে গিয়া পড়ে ।
হইল এবারে পীড়া বিষম উদরে ॥ ৩৫১ ॥
পীড়িত বড়ই প্রভু পেটের পীড়ার ।
আত্মীয়েরা সঙ্গে লয়ে দেশে চলে যায় ॥ ৩৫২ ॥
নিরমল মিঠা জল দেশের পুকুরে ।
কিছুদিন পানে গেল একেবারে সেরে ॥ ৩৫৩ ॥
গ্রামবাসী সঙ্গে ভাব পূর্বের ধরন ।
কভু হাসিখুশী কভু রস আলাপন ॥ ৩৫৪ ॥
কখন নির্জনে যেথা লোকজন নাই ।
অনেকে বুঝিল ক্ষেপা হয়েছে গদাই ॥ ৩৫৫ ॥
গ্রামের পশ্চিম ভাগে নহে বহুদুর ।
চেতন জনম-ভিটা যথা শ্রীপ্রভুর ॥ ৩৫৬ ॥
আছয়ে শ্মশান এক ভয়ঙ্কর স্থান ।
শিয়রে ভূতির খাল ধীর বহমান ॥ ৩৫৭ ॥
সন্ধ্যা হ'লে একা যেতে সাধ্য কার নাই ।
সংগোপনে যাইতেন
জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩৫৮ ॥
নিরজনে সাধনা করেন কুতূহলে ।
ঝোপে সুবেষ্টিত এক বটবৃক্ষতলে ॥ ৩৫৯ ॥
ঘোর অন্ধকার আছে তুলসীর বন ।
তার ধারে করিতেন সাধনা-আসন ॥ ৩৬০ ॥
তুলসী-কানন করা শ্রীহস্তের তাঁর ।
এখন তথায় আছে দুই চারি ঝাড় ॥ ৩৬১ ॥
বিবিধ সাধনা তথা হয় রাত্রিকালে ।
দীপ্ দীপ্ দলে দলে ভূতে আলো জ্বালে ॥ ৩৬২ ॥
হাঁড়ি হাঁড়ি মিঠাই থাকিত
সঙ্গে শুনি ।
শূন্যে শূন্যে যেত উড়ে ঢালিলে অমনি ॥ ৩৬৩ ॥
ক্রমশঃ পাইল টের ভাই রামেশ্বর ।
শ্মশানে করেন কিবা গিয়া গদাধর ॥ ৩৬৪ ॥
না মানেন কোন মানা কর্ম মনোমত ।
মেজ ভাই সর্বদাই রহে সশঙ্কিত ॥ ৩৬৫ ॥
রাত্রি গত প্রহরেক হইলেক পর ।
দূরে থাকি ডাকিতেন ভাই রামেশ্বর ॥ ৩৬৬ ॥
আয়রে গদাই এবে খাবার সময় ।
কাছে যায় সাধ্য নাই অন্তরেতে ভয় ॥ ৩৬৭ ॥
ভূতে পাছে করে তাড়া এই ভাবি মনে ।
প্রভু বলিতেন দাদা এস না এখানে ॥ ৩৬৮ ॥
প্রভুর অন্তরে নাই কোনই তরাস ।
ক্রমে করিলেন পরে শ্মশানেতে বাস ॥ ৩৬৯ ॥
শ্মশানের পোড়া কাঠ করি আহরণ ।
না আসিয়া ঘরে হয় তথায় রন্ধন ॥ ৩৭০ ॥
লোকজন কাছে আসে দিনের বেলায় ।
সাধনার কর্মে বাধা বড় লাগে তায় ॥ ৩৭১ ॥
সেইস্থান পরিহার করি তেকারণে ।
চলিলেন আর এক দূরস্থ শ্মশানে ॥ ৩৭২ ॥
বুধইমোড়ল নাম অন্তর প্রান্তরে ।
অনেক গ্রামের মড়া সেইখানে পুড়ে ॥ ৩৭৩ ॥
ভীষণ শ্মশান লম্বা পূরব-পশ্চিমে ।
দিনের বেলায় গেলে ভয় লাগে মনে ॥ ৩৭৪ ॥
এইরূপে দেশে গিয়া করেন সাধনা ।
জীবিত তথায় বাস লোক-মুখে শুনা ॥ ৩৭৫ ॥
একদিন শ্রীপ্রভুর কি হইল মন ।
ভাবেতে বিভোর গোটা দিন অনশন ॥ ৩৭৬ ॥
সমাগত লোকজন বাড়ি পরিপূর্ণ ।
বিষাদিত সকলেই শ্রীপ্রভুর জন্য ॥ ৩৭৭ ॥
ভাগ্যবতী ভিক্ষামাতা ধনী কামারিনী ।
প্রভুর ভাবের ভাব বুঝিতেন তিনি ॥ ৩৭৮ ॥
সম্বোধিয়া সকলেই কহিল তখন ।
গদা'য়ে খাওয়াতে কিবা কার আছে মন ॥ ৩৭৯ ॥
সত্ত্বর আনহ হেথা সংগ্রহ করিয়ে ।
যা যার মনের
সাধ লহ মিটাইয়ে ॥ ৩৮০ ॥
এত শুনি গৃহমুখে চলিল সকল ।
কেহ মিষ্টি কেহ দুধ কেহ আনে ফল ॥ ৩৮১ ॥
যে যাহা পাইল তার মনের মতন ।
সম্মুখে যোগায়ে দিল ত্বরিত গমন ॥ ৩৮২ ॥
মূখে তুলে দেয় দ্রব্য মনোমত যার ।
ভাবাবেশে প্রভুদেব করেন আহার ॥ ৩৮৩ ॥
কতই খাইলা প্রভু নাহি বাহ্যোদয় ।
এখনও কে আছে বাকি ভিক্ষামাতা কয় ॥ ৩৮৪ ॥
যে হও সে হও নাহি ভয় নাহি মানা ।
আনিয়ে মিটায়ে লহ মনের বাসনা ॥ ৩৮৫ ॥
একজন ছিল ডোম ভাবিয়া না পায় ।
কি দ্রব্য আনিয়া দিবে প্রভুর সেবায় ॥ ৩৮৬ ॥
একে অতি দীন দুঃখী তাহে হীন জেতে ।
যায় গৃহ-অভিমুখে ভাবিতে ভাবিতে ॥ ৩৮৭ ॥
একমাত্র কুঁড়েঘর সম্পত্তির সার ।
কাঁঠালের গাছ আছে নিকটে তাহার ॥ ৩৮৮ ॥
এতই ঘরের কাছে চালে ঠেকে ডাল ।
দেখিল তাহাতে এক সুপক্ক কাঁঠাল ॥ ৩৮৯ ॥
আনন্দের সীমা নাই মাথার করিয়ে ।
প্রভুকে খাইতে দিল কাঁঠাল আনিয়ে ॥ ৩৯০ ॥
দীনবন্ধু প্রভুদেব দীনের সম্বল ।
উদর পুরিয়ে খান কাঁঠালের ফল ॥ ৩৯১ ॥
দীন-ভক্তদত্ত ফল করিলে ভক্ষণ ।
তবে না আসিল অঙ্গে বাহ্যিক চেতন ॥ ৩৯২ ॥
কাঙ্গাল-বৎসল প্রভু দীনের ঠাকুর ।
পূরায়ে দীনের সাধ দুঃখ কৈলা দূর ॥ ৩৯৩ ॥
শ্রীপ্রভু যাহার ফল খাইলা পিরীতে ।
ডোমরূপী দেব তিনি উচ্চতম জেতে ॥ ৩৯৪ ॥
দীনভাবে করে বাস গ্রাম-প্রান্তদেশে ।
দুয়ারেতে দীনবন্ধু দরশন আশে ॥ ৩৯৫ ॥
যে হও সে হও তুমি আমার ঠাকুর ।
পদধূলি দিয়া কর মোহ-তম দূর ॥ ৩৯৬ ॥
জাতিতে কায়স্থ আমি তুমি জেতে ডোম ।
তোমার তুলনে আমি অতি নীচতম ॥ ৩৯৭ ॥
ভক্তিহীনে মাখায়েছি জাতিতে অখ্যাতি ।
সেই জাতি-মুখ্য তুমি যেই জাতি ॥ ৩৯৮ ॥
কহিতে কাহিনী ব্যথা লাগে মোর বুকে ।
আমার প্রদত্ত প্রভু নাহি দিলা মুখে ॥ ৩৯৯ ॥
কি সুখের জাতি মম উচ্চ মাত্র নামে ।
যাহারে করিলা ঘৃণা পতিতপাবনে ॥ ৪০০ ॥
পতিত হইতে আমি সুপতিত অতি ।
পদরেণু দিয়া মোর খণ্ডহ দুর্গতি ॥ ৪০১ ॥
প্রভুর যে কুলে জন্ম জানি পরিচয় ।
যাহার তাহার দ্রব্য গ্রহণীয় নয় ॥ ৪০২ ॥
সে ধারা করিয়া নষ্ট প্রভু পরমেশে ।
খাইলা সবার নষ্টা দুষ্টা নির্বিশেষে ॥ ৪০৩ ॥
পাছে কেহ করে প্রশ্ন কুলের উপর ।
সে হেতু সন্ত্রস্ত চিত্ত দাদা রামেশ্বর ॥ ৪০৪ ॥
বুঝিয়া দাদার ভাব শ্রীপ্রভু অন্তরে ।
মানস করিলা ত্বরা আসিতে শিয়ড়ে ॥ ৪০৫ ॥
যে কোন অবস্থাপন্ন নাহি যায় বাদ ।
শ্রীপ্রভু করেন পূর্ণ সকলের সাধ ॥ ৪০৬ ॥
হালী যোত্রাপন্ন যারা বাসেতে বসতি ।
কায়দা করিয়া ঘরে রাখে কুলবতী ॥ ৪০৭ ॥
আসিতে না পায় শ্রীপ্রভুর দরশনে ।
ভিতরে গুমুরে মরে মরম-বেদনে ॥ ৪০৮ ॥
পিঞ্জরেতে সীমাবদ্ধ বিহগীর প্রায় ।
বাড়ির বাহির কভু হইতে না পায় ॥ ৪০৯ ॥
মধুর কাহিনী কথা শুন একমনে ।
বাঞ্ছাপূর্ণ তাহাদের হইল কেমনে ॥ ৪১০ ॥
তন্তুবায় জাতি এই গ্রামে এক ঘর ।
যোত্রাপন্ন লোকে জনে করে সমাদর ॥ ৪১১ ॥
সদর অন্দর দুই তিন প্রস্থ বাড়ি ।
আদবকায়দাবান পুরুষের ভারী ॥ ৪১২ ॥
কুলবতীগণে সব থাকে অন্তঃপুরে ।
উপায়বিহীনা আসে বাড়ির বাহিরে ॥ ৪১৩ ॥
বধুরা প্রভুর কথা শুনে মাত্র কানে ।
উগ্রতর প্রাণে সাধ প্রভু-দরশনে ॥ ৪১৪ ॥
অনুপায়হেতু দুঃখ প্রবল অন্তরে ।
ঠাকুর গদাই শুন কি করিলা পরে ॥ ৪১৫ ॥
একদিন কর্তৃপক্ষ যুবকের দলে ।
হাসিয়া হাসিয়া কন উপহাস-ছলে ॥ ৪১৬ ॥
কে
কেমন কৈলে বিয়ে দেখিতে না পাই ।
উপায় অবশ্য কিছু করিবে গদাই ॥ ৪১৭ ॥
শুন কিবা
করিলেন প্রভু গদাধর ।
প্রতিবাসীদের সনে কৌতুক সুন্দর ॥ ৪১৮ ॥
সপ্তাহে দুবার হাট বসে এই গ্রামে ।
খরিদ-বিক্রয় কাজে বহু লোক জমে ॥ ৪১৯ ॥
একদিন
হাট-দিনে রমণীর বেশে ।
সন্ধ্যায় হাজির সেই তাঁতির আবাসে ॥ ৪২০ ॥
দুহাতে পাঁইছা পরা
লালপেড়ে শাড়ি ।
আকণ্ঠ ঘোমটা লম্বা গতি ধীরি ধীরি ॥ ৪২১ ॥
ধরিলে প্রকৃতিবেশ সাধ্য
কার ধরে ।
সদর হইয়া পার পশিলা অন্দরে ॥ ৪২২ ॥
যেখানে অনেকগুলি ধানের মরাই ।
তার
পাশে ছদ্মবেশে ঠাকুর গদাই ॥ ৪২৩ ॥
আঁধারে দণ্ডায়মান যেন অনাগিনী ।
বাসে বেশ
আচ্ছাদন শ্রীবয়ান খানি ॥ ৪২৪ ॥
কুলবধূ সকলেই সন্নিকট হ'য়ে ।
কে তুমি কোথায় ঘর কি
জেতের মেয়ে ॥ ৪২৫ ॥
একে একে জিজ্ঞাসিল প্রভু গদাধরে ।
সতর্কে কহেন কথা শ্রীপ্রভু
উত্তরে ॥ ৪২৬ ॥
ফিরায়ে বদনখানি যেন লজ্জা কত ।
তেলীদের মেয়ে আমি বেচিবারে সুত ॥ ৪২৭ ॥
আসিয়াছিলাম হাটে সঙ্গীদের সনে ।
পাছু রাখি মোরে তারা গিয়াছে ভবনে ॥ ৪২৮ ॥
একাকিনী ঘরে যাই হেন শক্তি নাই ।
সন্ধ্যা তাহে তোমাদের ঘরে এনু তাই ॥ ৪২৯ ॥
বেশ বেশ বলিয়া বন্ধুরা সমাদরে ।
গুড় মুড়ি জল দিল খাইবার তরে ॥ ৪৩০ ॥
বধূগণে প্রভুদেব ধীরে ধীরে
কয় ।
পূর্ণোদর নাহি মোটে ক্ষুধার উদয় ॥ ৪৩১ ॥
খাইবার আবশ্যক কিছুমাত্র নাই ।
রাত্রিতে আশ্রয়-স্থান এই মাত্র চাই ॥ ৪৩২ ॥
এত বলি বসিলেন মরায়ের ধারে ।
বধূগণ তুষ্টমনে বসে গিয়ে ঘেরে ॥ ৪৩৩ ॥
স্ত্রীলোকের রীতি যেন নানা কথা কয় ।
কথোপকথনে প্রায় রাত্রি দণ্ড ছয় ॥ ৪৩৪ ॥
প্রভুর মিঠানী বাক্যে এত গেছে ভুলে ।
মনে নাই ঘুমায় শয্যায় শিশু ছেলে ॥ ৪৩৫ ॥
ব'য়ে গেছে পানের সময় বহুক্ষণ ।
ক্ষুধার জ্বালায় করে জাগিয়া রোদন ॥ ৪৩৬ ॥
তখন স্মরণ হয় ছাওয়াল কুধারে ।
চমকিয়া দ্রুতগতি ছুটে ঢুকে ঘরে ॥ ৪৩৭ ॥
মায়ে ল'য়ে কোলে ছেলে ক্ষুধায় আতুর ।
দুগ্ধপাত্রসহ কাছে বসিল প্রভুর ॥ ৪৩৮ ॥
শশব্যস্ত প্রভুদেব প্রসারিয়া কর ।
লইলেন শিশু ছেলে কোলের উপর ॥ ৪৩৯ ॥
সোহাগে মায়ের মত গঁদলে গঁদলে ।
উদর ভরিয়া দুধ খাওয়ান ছাওয়ালে ॥ ৪৪০ ॥
প্রভুর কোলেতে শিশু দুগ্ধ করে পান ।
কেবা মহাভাগ্যধর না পেনু সন্ধান ॥ ৪৪১ ॥
জননী তাহার সমতুল্য ভাগ্যবতী ।
প্রহর ছাড়িয়া ক্রমে ঊর্ধ্বে উঠে রাতি ॥ ৪৪২ ॥
সময় বুঝিয়া তবে বহু যায় চ'লে ।
রাত্রির ভোজনে ভাত বাড়িতে হেঁশেলে ॥ ৪৪৩ ॥
দেখেন শ্রীপ্রভু মুখে মৃদুমন্দ হাস ।
হেনকালে ঘরে পড়ে তাঁহার তল্লাস ॥ ৪৪৪ ॥
খাবার সময় তাই ব্যাকুল অন্তর ।
প্রতি ঘরে ঘরে খুঁজে দাদা রামেশ্বর ॥ ৪৪৫ ॥
কোনমতে কোথাও না মিলে অন্বেষণ ।
উপনীত শেষে সেই তাঁতির ভবন ॥ ৪৪৬ ॥
যার সঙ্গে হয় দেখা তাহাকেই পুছে ।
কে জান গদাই কাহাদের ঘরে আছে ॥ ৪৪৭ ॥
কেহই সন্ধান কিছু বলিতে না পারে ।
গদাই গদাই বলি ডাকে উচ্চৈঃস্বরে ॥ ৪৪৮ ॥
ছোট ভাই গদাধরে আন্তরিক টান ।
সকাতর রামেশ্বর আকুল-পরাণ ॥ ৪৪৯ ॥
শুনিতে পাইলা প্রভু মরায়ের ধারে ।
ডাকিছেন মেজোদাদা ভাত খাইবারে ॥ ৪৫০ ॥
তথা হতে ততোধিক উচ্চরবে কন ।
ওগো দাদা আমি হেথা কেন উচাটন ॥ ৪৫১ ॥
পলায়ন দ্রুতপদে যেমন উত্তর ।
মহারঙ্গকর প্রভুদেব গদাধর ॥ ৪৫২ ॥
ব্যাপার পড়িয়া গেল তাঁতিদের স্বরে ।
পুরুষ স্ত্রীলোক যত হেসে হেসে মরে ॥ ৪৫৩ ॥
ভবন
আনন্দময় রঙ্গেতে প্রস্তুর ।
শুন রামকৃষ্ণ লীলা শুতি সুমধুর ॥ ৪৫৪ ॥
এইবার শ্রীপ্রভুর শিয়ড়ে গমন ।
বড় পিয়ারের তাঁর হৃদুর ভবন ॥ ৪৫৫ ॥
কামারপুকুর আর
শিয়ড়ের স্থান ।
মাইল পাঁচেক পথ মধ্যে ব্যবধান ॥ ৪৫৬ ॥
একে কোমলাঙ্গ প্রভু তাহে
বরিষায় ।
গমনের সুব্যবস্থা হয় শিবিকার ॥ ৪৫৭ ॥
পল্লীগ্রামে মেঠো পথ তথাপি সুন্দর ।
প্রকৃতির চিত্র-লেখা আছে বহুতর ॥ ৪৫৮ ॥
মরি কি মধুর দৃশ্য আঁখি বিমোহন ।
নীলাম্বরাকাশ চন্দ্রাতপের মতন ॥ ৪৫৯ ॥
বিস্তৃত ধানের ক্ষেত্র হরিৎ শ্যামল ।
নবীন ধানের গাছ গুচ্ছাদি সকল ॥ ৪৬০ ॥
দোলাছলি কোলাকুলি আন্দোলিত বায় ।
ধীরে ধীরে গায় গীত তাদের ভাষায় ॥ ৪৬১ ॥
মাঝে মাঝে সরোবরে কাকচক্ষু জল ।
শোভে তাহে শত শত ফুল্ল শতদল ॥ ৪৬২ ॥
গন্ধবহ বহে গন্ধ কমল গৌরব ।
মধুকরে মত্ত করে গুনগুন রব ॥ ৪৬৩ ॥
ঊর্ধ্বে গতি বকপাঁতি অতীব বাহার ।
নীলিমা শূন্যের গলে মুকুতার হার ॥ ৪৬৪ ॥
প্রকৃতির প্রদর্শনী পল্লীর প্রান্তরে ।
দেখেন বসিয়া প্রভু শিবিকা ভিতরে ॥ ৪৬৫ ॥
হেনকালে শ্রীপ্রভুর অপূর্ব দর্শন ।
অপূর্ব ঠাকুর যেন অপূর্ব তেমন ॥ ৪৬৬ ॥
বিশ্বাগার দেহ-মধ্যে প্রভুর আমার ।
বাহিরে আসিল দুটি কিশোর কুমার ॥ ৪৬৭ ॥
নয়ন-বিনোদ মূর্তি সুঠাম সুন্দর ।
বয়ানে লাবণ্য-কান্তি জিনি শশধর ॥ ৪৬৮ ॥
শিবিকার বহির্ভাগে প্রমত্ত খেলায় ।
কভু মৃদুমন্দ কভু দ্রুতগতি যায় ॥ ৪৬৯ ॥
কভু ছুটাছুটি খেলা হাস্য পূর্ণাননে ।
কভু হুটোপাটি বন্ধু-ফুল-আহরণে ॥ ৪৭০ ॥
কখন প্রান্তরে মাঠে বহু দূরে যায় ।
কভু শিবিকার পাশে আসে পুনরায় ॥ ৪৭১ ॥
কভু বালকের মত বালক যেমন ।
হাস্য-পরিহাসসহ কথোপকথন ॥ ৪৭২ ॥
এইরূপে বাল-চেষ্টা করি বহুতর ।
প্রবেশিলা শ্রীপ্রভুর দেহের ভিতর ॥ ৪৭৩ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
তান্ত্রিক সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুন মন শ্রীপ্রভুর ভজন-সাধনা ।
এক মনে শুনে কিবা গায় যেই জনা ॥ ১ ॥
গেঁটে বাঁধে খাঁটি সোনা ভক্তি সমুজ্জ্বল ।
রামকৃষ্ণ-কথা হেন শ্রবণমঙ্গল ॥ ২ ॥
তন্ত্রমতে করিবারে ভজন-সাধনা ।
হইল এখন মনে প্রবল বাসনা ॥ ৩ ॥
সে সময়ে এক জনা আসে দ্বিজবর ।
শহরে বসতি মাত্র পাড়াগাঁয়ে ঘর ॥ ৪ ॥
তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ তেঁহ ভক্তিমান অতি ।
দেখিয়া তাঁহায় প্রভু করিলা যুকতি ॥ ৫ ॥
লইব শক্তির মন্ত্র ব্রাহ্মণের পাশ ।
গোপনে করিলা তারে মন্তব্য প্রকাশ ॥ ৬ ॥
মহাভাগ্যবান দ্বিজ ভাগ্যসীমা নাই ।
গুরুরূপে লৈলা যাঁরে জগৎ-গোসাঁই ॥ ৭ ॥
তুষ্ট চিতে দিলা সায় তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
দেখি পাঁজি শুভদিন হয় নির্ধারণ ॥ ৮ ॥
কেমনে লইলা মন্ত্র শুন অতঃপরে ।
দীক্ষাস্থান-নিরূপণ শ্যামার মন্দিরে ॥ ৯ ॥
আচরিয়া সংযমন যথাশাস্ত্র-রীতি ।
প্রবেশিলা শ্রীমন্দিরে দ্বিজের সংহতি ॥ ১০ ॥
দীক্ষাগুরু যেন মন্ত্র দিলা কর্ণমূলে ।
হুঙ্কারি বসিলা প্রভু হর বক্ষঃস্থলে ॥ ১১ ॥
শ্যামার শ্রীপদে লগ্ন যে শিব স্থাপন ।
শ্যামা সঙ্গে এক ঠাঁই কৈলা আরোহণ ॥ ১২ ॥
দীক্ষাগুরু দরশন করি মহাত্রাসে ।
বাপ বাপ ডাকিয়া পলার ঊর্ধ্বশ্বাসে ॥ ১৩ ॥
লীলাময় লীলা তব বুঝে সাধ্য কার ।
অচিন্ত্য অবোধ্য কার্য বিস্ময় ব্যাপার ॥ ১৪ ॥
প্রভুর রকম কেহ বুঝিতে না পারে ।
যা দেখে তাহায় তাঁরে ক্ষেপা জ্ঞান করে ॥ ১৫
॥
মানুষের হয় যদি উন্মাদ-লক্ষণ ।
ঔষধ তাহার পক্ষে নারী-সংঘটন ॥ ১৬ ॥
এমত ভাবিয়া যত আত্মীয়-স্বজনে ।
ভাগিনা হৃদয়ে ডাকি কহে সংগোপনে ॥ ১৭ ॥
রূপসী যুবতী এক করিয়া সংগ্রহ ।
তাঁহার সহিত শীঘ্র জুটাইয়া দেহ ॥ ১৮ ॥
হৃদয় সুযুক্তি বুঝে তাদের বচনে ।
আনিল রূপসী এক প্রভুর কারণে ॥ ১৯ ॥
রাত্রিকালে
থাকিতেন প্রভু যেই ঘরে ।
গোপনে থাকিয়া হৃদু পাঠায় তাহারে ॥ ২০ ॥
হাবভাব
প্রকাশিয়া রূপসী হেথায় ।
পাতিয়া মোহিনী-জাল প্রভু-পাশে যায় ॥ ২১ ॥
বিষভরা কাল সর্পী দেখি সন্নিকটে ।
ভয়ার্ত পথিক প্রাণ চমকিয়া উঠে ॥ ২২ ॥
প্রাণভয়ে যথাশক্তি পলাইয়া যায় ।
তেমতি হইলা প্রভু দেখিয়া তাহায় ॥ ২৩ ॥
প্রভুর মহিমা কথা শুন অতঃপর ।
রূপসীর কিবা ভাবে দ্রবিল অন্তর ॥ ২৪ ॥
বিশুদ্ধ হইল চিত প্রভু-দরশনে ।
গর্ভজাত শিশু যেন ভাবোদয় মনে ॥ ২৫ ॥
স্বকার্যে লজ্জিত কিন্তু দিব্যভাবোচ্ছ্বাসে ।
বাৎসল্য-পূর্ণিত হৃদি আঁখিজলে ভাসে ॥ ২৬ ॥
এমন রূপসীপদে কোটি নমস্কার ।
ভাগ্য মানি পদরজে কি ভাগ্য তাহার ॥ ২৭ ॥
প্রভু দেখি যে কেঁদেছে তিলেকের তরে ।
তার সনে তুল্য কার ভুবন-মাঝারে ॥ ২৮ ॥
ধন্য রূপসীর রূপ যে রূপের বলে ।
প্রভুতে বাৎসল্য-ভাব কুড়াইয়া পেলে ॥ ২৯ ॥
জয় জয় দয়াময় আমি মুঢ়মতি ।
কি গাব তোমার লীলা কি ধরি শকতি ॥ ৩০ ॥
সামান্য কড়ির আশে আইল রূপসী ।
কল্পতরুমূলে পায় মহারত্ন-রাশি ॥ ৩১ ॥
বালকস্বভাব প্রভু ইচ্ছাময় হরি ।
অভাগার ভাগ্যে মাত্র হৈল কড়াকড়ি ॥ ৩২ ॥
বড় কড়াকড়ি প্রভু কৈলে মম প্রতি ।
শ্রীপদ-সেবায় রব এই দেহ মতি ॥ ৩৩ ॥
পশ্চাৎ হৃদয়ে প্রভু কৈলা তিরস্কার ।
এদন কুবুদ্ধি কেন হইল তোমার ॥ ৩৪ ॥
তন্ত্রমতে ক্রিয়াকাণ্ড বাধন-ভজনা ।
করিবারে শ্রীপ্রভুর একান্ত বাসনা ॥ ৩৫ ॥
রঙ্গ বেগি ভঙ্গ দিল দীক্ষাগুরু তাঁর ।
কে করে এখন তন্ত্র-সাধনা যোগাড় ॥ ৩৬ ॥
তান্ত্রিক সাধক গত ছিল যে যেখানে ।
জুটে সবে এ সময় প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৩৭ ॥
দেখাইয়া দেন প্রভু তে সবারে পথ ।
অনতিবিলম্বে যাহে পুরে মনোরথ ॥ ৩৮ ॥
সাধনা-যোগাড় শ্রীপ্রভুর সোজা নয় ।
যে কোন মানুষ হ'তে কখন না হয় ॥ ৩৯ ॥
যোগাড়ে সাহায্য-হেতু অদ্ভুত কাহিনী ।
আসিয়া জুটিল এক অদ্ভুত ব্রাহ্মণী ॥ ৪০ ॥
একদিন দেখিলেন প্রভু লক্ষ্য করি ।
সুরধুনীকূলে বসি আছে এক নারী ॥ ৪১ ॥
হৃদয়ে বলিলা প্রভু ডাকিবারে তার ।
হৃদুর হৃদয় অতি বিস্ময় ইহায় ॥ ৪২ ॥
আকাশ পাতাল হৃদু ভাবে অনিবার ।
কামিনী নরক-কৃমি গিয়ান যাঁহার ॥ ৪৩ ॥
কেন তিনি অকস্মাৎ ডাকেন কামিনী ।
যেমন মানুষ-বুদ্ধি সন্দেহ অমনি ॥ ৪৪ ॥
ভাবিয়া চিন্তিয়া হৃদু গিয়া সন্নিধানে ।
কূলে উপবিষ্টা নারী ডাক দিয়া আনে ॥ ৪৫ ॥
কেবা নারী শুন মন সংক্ষেপ আখ্যান ।
ব্রাহ্মণনন্দিনী পূর্বদেশে জন্মস্থান ॥ ৪৬ ॥
জন্মাবধি সাধ কিসে ভগবান মিলে ।
দেহে নাই মন হরিচরণকমলে ॥ ৪৭ ॥
নিদ্রাযোগে একবিন স্বপনেতে হেরে ।
পরম পুরুষ এক সুরধুনী তীরে ॥ ৪৮ ॥
চমকি উঠিয়া চিন্তা করে অনুক্ষণ ।
কি করিয়া হয় স্বপ্নদৃষ্ট দরশন ॥ ৪৯ ॥
কুল-শীল-লাজ-ভয় বিসর্জন দিয়ে ।
অন্বেষণ করে তাঁর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ॥ ৫০ ॥
দিবস-যামিনী ভ্রাম্যমাণা নিরন্তর ।
শুভদিনে উপনীত দক্ষিণ শহর ॥ ৫১ ॥
আপন চিন্তায় মগ্ন ঘাটে বসি ছিল ।
প্রভুর আজ্ঞায় হৃদু ডাকিয়া আনিল ॥ ৫২ ॥
পুলকে পূর্ণিত তনু গদগদ স্বরে ।
মা বলিয়া প্রভুদেব সম্বোধিলা তাঁরে ॥ ৫৩ ॥
এ নহে সামান্যা নারী বহু গুণাকর ।
যেমন উপরে বাহ্য তেমতি ভিতর ॥ ৫৪ ॥
শ্রীহরিচরণ-আশে ত্যাগী সন্ন্যাসিনী ।
সাধন-ভজন কত করেছেন তিনি ॥ ৫৫ ॥
দেবভাষা-বিশারদা বিশেষ প্রকারে ।
সুগৃঢ় শাস্ত্রের বাক্য ভাল ব্যাখ্যা করে ॥ ৫৬ ॥
তত্ত্বান্বেষী একজন বৈষ্ণবচরণ ।
প্রসিদ্ধ পণ্ডিত পড়া শাস্ত্র অগণন ॥ ৫৭ ॥
পরাজয় মানে তাঁর পরিচয় পেয়ে ।
কে দেখেছে কে শুনেছে হেনরূপ মেয়ে ॥ ৫৮ ॥
লিখিতে তাঁহার কথা কি আছে শকতি ।
প্রভু বলিতেন চারিবেদ মূর্তিমতী ॥ ৫৯ ॥
তন্ত্র-গীতা-পুরাণাদি ভক্তি-গ্রন্থ যত ।
অক্ষর অক্ষর তাঁর সব কণ্ঠস্থিত ॥ ৬০ ॥
ব্রাহ্মণী তাঁহার আখ্যা হৈল এইখানে ।
সে হেতু ব্রাহ্মণী বলি সকলেই জানে ॥ ৬১ ॥
বিশ্বর-আনন্দ সহ কহিল ব্রাহ্মণী ।
তোমায় দেখেছি বাবা স্বপনেতে আমি ॥ ৬২ ॥
বিভোর বাৎসল্যভাবে করে নিরীক্ষণ ।
যেন প্রভুদেব তাঁর আপন নন্দন ॥ ৬৩ ॥
প্রভুও বালকবৎ দেন পরিচয় ।
অবস্থাভাবের কথা যে রকম হয় ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্রমতে মিলাইয়া দেখি একে একে ।
মহাভাবাবস্থাগত বুঝিল প্রভুকে ॥ ৬৫ ॥
মানুষে সম্ভব নহে হেন মহাভাব ।
হয় মাত্র নরহরি-অঙ্গে আবির্ভাব ॥ ৬৬ ॥
অবাকে ব্রাহ্মণী করে প্রভুকে দর্শন ।
বিরাজে শ্রীঅঙ্গে স্পষ্ট গৌরাঙ্গ-লক্ষণ ॥ ৬৭ ॥
ছিল এক শালগ্রাম ব্রাহ্মণীর ঠাঁই ।
অন্তরে জানিলা প্রভু জগৎ-গোসাঁই ॥ ৬৮ ॥
অগ্রে দিয়া ভোগ-রাগ পশ্চাৎ ব্রাহ্মণী ।
প্রসাদ পাইয়া তবে খান অন্নপানি ॥ ৬৯ ॥
হয়েছে ভোগের বেলা প্রভু তেকারণ ।
ভাগিনা হৃদয়ে ডাকি বলিলা বচন ॥ ৭০ ॥
মনের মতন সিধা দেহ আনাইয়া ।
সঙ্গে আছে শালগ্রাম তাঁহার লাগিয়া ॥ ৭১ ॥
পঞ্চবটতলে তবে সিদা লয়ে যায় ।
ভোগহেতু ডাল-লুচি ত্বরিতে বনায় ॥ ৭২ ॥
কি জানি কিভাবে তাঁর ঝুরে দুনয়ন ।
ভোগের কারণ লুচি বনায় যখন ॥ ৭৩ ॥
নিবেদন করে যবে মুদি দুটি আঁখি ।
ভোগসহ শালগ্রাম সম্মুখেতে রাখি ॥ ৭৪ ॥
এমন সময় প্রভুদেব ভগবান ।
চুপে চুপে গিয়া দুই হাতে লুচি খান ॥ ৭৫ ॥
ব্রাহ্মণী খুলিয়া আঁখি যে সময় চায় ।
প্রভুর স্বরূপ অঙ্গে দেখিবারে পায় ॥ ৭৬ ॥
তায় খান দত্ত ভোগ শ্রীমুখকমলে ।
ধেয়া ধেয়া নাচে মাগী পঞ্চবটতলে ॥ ৭৭ ॥
ধিয়ানে দেখিনু যাঁরে পাইলাম তাঁয় ।
এত বলি শালগ্রাম ফেলিল গঙ্গায় ॥ ৭৮ ॥
আনন্দের সীমা নাই তাঁহার অন্তরে ।
হেরিয়া দুর্লভ ধন প্রত্যক্ষগোচরে ॥ ৭৯ ॥
যাঁর জন্য ত্যাজিয়াছে আত্মীয়-স্বজন ।
সহি শীত তাপ কৈলা বিস্তর সাধন ॥ ৮০ ॥
ভবসুখে জলাঞ্জলি দিয়া যাঁর তরে ।
ক্ষুধাতৃষ্ণাতুরা অনাথিনী সম ঘুরে ॥ ৮১ ॥
সর্বস্ব রতন যাঁরে করিয়া সিদ্ধান্ত ।
অন্বেষণে ঘাঁটিয়াছে পুরাণাদি তন্ত্র ॥ ৮২ ॥
অর্জন-উপায় ভাবি সাধন ভজন ।
কত করে অনাহারে না যায় বর্ণন ॥ ৮৩ ॥
আঁখি-বারি অনিবার সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ।
দারুণ যন্ত্রণা বাক্যে না হয় প্রকাশ ॥ ৮৪ ॥
বিষম মরমভেদী হতাশ তাড়না ।
মুহূর্তে মুহূর্তে হৃদে শেলের বেদনা ॥ ৮৫ ॥
অকাতরে সহিয়াছে সে কোমল প্রাণে ।
দিয়া পাতি নিজ ছাতি ভবের তুফানে ॥ ৮৬ ॥
এ হেন সাগরছেঁচা নিধি পেলে করে ।
যে সুখ উদয়ে তাহা কে বর্ণিতে পারে ॥ ৮৭ ॥
আনন্দে
উন্মত্তা প্রায় ব্রাহ্মণী এখন ।
বাৎসল্যে হৃদয় ভরা চাহে ঘনে ঘন ॥ ৮৮ ॥
দেখিবারে
শ্রীপ্রভুর শ্রীমুখকমল ।
সাধে বাদী হৈল নিজ নয়নের জল ॥ ৮৯ ॥
ভক্তিমুখী ব্রাহ্মণী ভক্তির আচরণ ।
অবিরত ভক্তিশাস্ত্র করে অধ্যয়ন ॥ ৯০ ॥
একদিন সমাসীন প্রভুর গোচরে ।
অনুরাগে
ভক্তিগ্রন্থ পড়ে ভক্তিভরে ॥ ৯১ ॥
যথা অষ্টসাত্ত্বিক ভাবের বিবরণ ।
নানাবিধ অশ্রু আদি পুলক কম্পন ॥ ৯২ ॥
যবে যে ভাবের কথা পড়েন ব্রাহ্মণী ।
প্রভুর শ্রী অঙ্গে তাহা উদয় তখনি ॥ ৯৩ ॥
পড়ে গ্রন্থ আর প্রভু-অঙ্গ পানে চায় ।
বর্ণিত প্রত্যক্ষ দু'য়ে একত্রে মিলায় ॥ ৯৪ ॥
করতালি দিয়া মাগী নেচে নেচে বলে ।
এইতো গৌরাঙ্গদেব নিতায়ের খোলে ॥ ৯৫ ॥
হৃদয় আনন্দময় তাহার উচ্ছ্বাসে ।
যথা তথা পুরীমধ্যে এই বার্তা ঘোষে ॥ ৯৬ ॥
এই রামকৃষ্ণ সেই গৌর গুণধাম ।
সাব্যস্তে সহস্র দেয় শাস্ত্রের প্রমাণ ॥ ৯৭ ॥
প্রমাণ খণ্ডিতে কেহ নারে ধীরগণে ।
তথাপি বিশ্বাস কার নাহি হয় মনে ॥ ৯৮ ॥
মথুর বলেন ইহা কথা কি প্রকার ।
বার বিনা নাহি শুনি আর অবতার ॥ ৯৯ ॥
তবে এ স্বীকার্য কথা মানি শিরোপরে ।
কালীর হয়েছে কৃপা তাঁহার উপরে ॥ ১০০ ॥
অদ্যাবধি ভাব কিবা ভাব কারে বলে ।
কি ভাবে এমন ভাব কার অঙ্গে ফলে ॥ ১০১ ॥
কি ভাবের নাম কিবা কি তার লক্ষণ ।
এখানে বিদিত নাহি ছিল কোনজন ॥ ১০২ ॥
হইত প্রভুর অঙ্গে ভাব আগাগোড়া ।
কেহ বা বায়ুর কর্ম কেহ কয় পীড়া ॥ ১০৩ ॥
কেহ বলে ভূতে পেলে হয় এ প্রকার ।
কেহ বলে উন্মত্ততা মাথার বিকার ॥ ১০৪ ॥
যে বড় উন্নত আত্মা এইটুকু গায় ।
এমত অবস্থা তাঁর কালীর কৃপায় ॥ ১০৫ ॥
মথুর আমোদপ্রিয় বড়লোক কিনা ।
কৌতুক রহস্য কাজে খুশী ষোল
আনা ॥ ১০৬ ॥
সবিস্ময়ে মনে চিন্তা করে অনুক্ষণ ।
মানুষে ঈশ্বরাবেশ একথা কেমন ॥ ১০৭ ॥
কিছুই
না পারি আমি করিবারে স্থির ।
অকথ্য অবোধ্য তত্ত্ব অতীত বুদ্ধির ॥ ১০৮ ॥
সত্য কি এ
মিথ্যা তত্ত্ব করিতে নিশ্চয় ।
জন্মিল অন্তরে তার আগ্রহাতিশয় ॥ ১০৯ ॥
প্রভুও
নাছোড়বান্দা কন বারে বারে ।
সাধক শাস্ত্রজ্ঞ আনি সভা করিবারে ॥ ১১০ ॥
মথুর স্বীকার করি কৈল আয়োজন ।
যথা দিনে উপনীত পণ্ডিত সজ্জন ॥ ১১১ ॥
বৈষ্ণবচরণ তার মধ্যে এক জনা ।
বৈষ্ণবসমাজ-মধ্যে অতি খ্যাতনামা ॥ ১১২ ॥
গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণে মহামান্য করে ।
বিচারে মীমাংসা যাহা নতশিরে ধরে ॥ ১১৩ ॥
এখানেতে পুরীমধ্যে পাচক পূজারী ।
মথুরের দলবল যত কর্মচারী ॥ ১১৪ ॥
গণ্যমান্য নিকটের সবে সমুৎসুক ।
কুতুহলী দেখিবারে রহস্য কৌতুক ॥ ১১৫ ॥
তুলিয়া প্রসঙ্গ আগে বলিলা ব্রাহ্মণী ।
দেখাশুনা শ্রীপ্রভুর যাবৎ কাহিনী ॥ ১১৬
॥
অনুভূতি দর্শনাদি যোগজ বিকার ।
ভাবাবেশ সমাধ্যাদি প্রকৃতি আচার ॥ ১১৭ ॥
রাগাত্মিকা
ভক্তি মহাভাবের লক্ষণ ।
ভক্তিশাস্ত্র গ্রন্থে আছে যেরূপ লিখন ॥ ১১৮ ॥
মহাভাবস্বরূপিণী ব্রজে শ্রীরাধার ।
আর নবদ্বীপচন্দ্র গৌরাঙ্গ অবতার ॥ ১১৯ ॥
এ দু'হার অঙ্গে মহাভাবের উদর ।
ভক্তিগ্রন্থে লক্ষণাদি তার যেন কয় ॥ ১২০ ॥
সেই সব সুপ্রকাশ প্রভুর শরীরে ।
তাই অবতার-তনু বাখানি তাঁহারে ॥ ১২১ ॥
আসুন বিচার-রণে থাকে কেহ যদি ।
খণ্ডিব তাঁহার তর্ক হইলে বিরোধী ॥ ১২২ ॥
এত বলি তপস্বিনী ব্রাহ্মণী বাখানে ।
একত্রিত সমবেত সভাবিদ্যমানে ॥ ১২৩ ॥
বিপন্ন সন্তানে রক্ষা করিতে জননী ।
এখানেতে সেই ভাব ধরিল ব্রাহ্মণী ॥ ১২৪ ॥
ওজস্বিনী ব্রাহ্মণীর আমূল বর্ণন ।
একমনে শুনিলেন বৈষ্ণবচরণ ॥ ১২৫ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত তেঁহ ঘটে বহু গুণ ।
সত্যতত্ত্বান্বেষী তায় সাধনানিপুণ ॥ ১২৬ ॥
সাধনাজ স্বপ্নদৃষ্টিবল সহকারে ।
প্রভুরে দেখিয়া কয় সভার ভিতরে ॥ ১২৭ ॥
ধীরে ধীরে সুপণ্ডিত বৈষ্ণবচরণ ।
প্রসঙ্গ বিচারে নাহি দেখি প্রয়োজন ॥ ১২৮ ॥
শ্রীঅঙ্গে শাস্ত্রের লিপি দেখিবারে পাই ।
ব্রাহ্মণী বলেন যাহা আমি বলি তাই ॥ ১২৯ ॥
বালকস্বভাব প্রভু আনন্দ অন্তরে ।
হাসিতে হাসিতে কন বিস্মিত মথুরে ॥ ১৩০ ॥
কি কহে পণ্ডিত আমি কিছুই না জানি ।
শুনিয়া শীতল কিন্তু হইল পরাণী ॥ ১৩১ ॥
মনে করেছিনু আমি বিয়াধি আমার ।
অসাধ্য নিদান নাহি জানে প্রতিকার ॥ ১৩২ ॥
সভামধ্যে বিদ্যমান আছিলেন যাঁরা ।
স্তম্ভিত বিস্মিত সবে বাক্বুদ্ধিহারা ॥ ১৩৩ ॥
আজিকার সভাভঙ্গ হইল এখানে ।
চলিয়া গেলেন বাস যার যেইখানে ॥ ১৩৪ ॥
কাছে বিকশিত পুষ্প মধুকোষে পূর্ণ ।
কেহ না জানিতে পারে মধুকর ভিন্ন ॥ ১৩৫ ॥
প্রভুদেবে দেখি আজি বৈষ্ণবচরণ ।
সত্যতত্ত্বান্বেষী কিনা মহানন্দ মন ॥ ১৩৬ ॥
কর্তাভজা-সম্প্রদায়ভুক্ত বর্তমানে ।
বুঝিল পাইবে পথ প্রভু-সন্নিধানে ॥ ১৩৭ ॥
কৃপা-পরশনে হয় শক্তির সঞ্চার ।
যাহাতে সহজে সিদ্ধ ফল সাধনার ॥ ১৩৮ ॥
এত জানি আপনার দলবল লয়ে ।
প্রভু-দরশনে আসে সময়ে সময়ে ॥ ১৩৯ ॥
পরম পণ্ডিত তেঁহ তাঁহার স্বীকারে ।
অন্য কেহ প্রতিবাদ করিতে না পারে ॥ ১৪০ ॥
বৈষ্ণবে বড়ই কৃপা হইল প্রভুর ।
বুঝিতে এখন বাকি আছেন মথুর ॥ ১৪১ ॥
রঙ্গময় প্রভুদেব বুঝাইতে তাঁয় ।
পরে কব প্রভু কিবা করিলা উপায় ॥ ১৪২ ॥
অর্ধ হাত পরিমাণ জলের উপরে ।
হেলে দুলে খেলে পদ্ম পবনের ভরে ॥ ১৪৩ ॥
কভু কভু উচ্চে কভু পরশিছে জল ।
শিশুতে না
বুঝে ইহা কাহার কৌশল ॥ ১৪৪ ॥
তেমনি মথুর দোলে না বুঝে কারণ ।
খেলিছেন তাঁরে লৈয়া
প্রভু নারায়ণ ॥ ১৪৫ ॥
দিবানিশি কাছে কাছে তথাপি অদৃশ্য ।
শ্রীপ্রভুর লীলাখেলা
সুগূঢ় রহস্য ॥ ১৪৬ ॥
বিষন্ন মলিন ভারি করি শ্রীবয়ান ।
মথুর বিশ্বাসে কন প্রভু
ভগবান ॥ ১৪৭ ॥
বল কি হইল মম হেতু নাহি জানি ।
ভাবের লক্ষণ ইহা বলেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৪৮ ॥
ঈশ্বরত্বে শ্রীপ্রভুর শাস্ত্রীয় নজির ।
আর এক সাধারণে করিল জাহির ॥ ১৪৯ ॥
গাত্রদাহ-নিবারণে চেষ্টা নিরবধি ।
কত কবিরাজী তেল কতই ঔষধি ॥ ১৫০ ॥
অদ্যাবধি
দাহ-ব্যাধি হইল না খুন ।
সবার হয়েছে শূন্য উপায়ের তুণ ॥ ১৫১ ॥
সাধিকা ব্রাহ্মণী
তত্ত্ব কহিল সকলে ।
ঈশ্বরানুরাগে দাহ ব্যাধি কেবা বলে ॥ ১৫২ ॥
বিরহের দাহ ইহা শাস্ত্রে উল্লিখিত ।
মহাভাবে শ্রীরাধার শ্রীঅঙ্গে ফুটিত ॥ ১৫৩ ॥
গোপীজ্ঞাপ্য
রাগাত্মিকা গ্রন্থে হেন বিধি ।
চন্দন ফুলের মালা কেবল ঔষধি ॥ ১৫৪ ॥
ব্রাহ্মণীর কথা শুনি সবে উপহাস ।
বিশেষতঃ বর্তমানে মথুর বিশ্বাস ॥ ১৫৫ ॥
ব্রাহ্মণী বলেন উপহাস কি কারণ ।
দেখ তিন দিনে ব্যাধি করি নিবারণ ॥ ১৫৬ ॥
এত বলি চন্দন-মোক্ষণ অঙ্গে করে ।
গলায় ফুলের মালা দিয়া থরে থরে ॥ ১৫৭ ॥
সাধিকা ব্রাহ্মণী শুধু শাস্ত্রপাঠী নহে ।
সেই সেই মত হয় যখন যা কহে ॥ ১৫৮ ॥
তিন দিনে ব্যাধি নষ্ট হৈল শ্রীপ্রভুর ।
বিস্মিত সকলে রঙ্গে বিশেষে মথুর ॥ ১৫৯ ॥
শিশুভাবাপন্ন প্রভু বালকের প্রায় ।
সহজে বিশ্বাস তাঁর সবার কথায় ॥ ১৬০ ॥
শ্রীমথুরে কহিবারে শুনেছে গোসাঁই ।
বার বিনা আর অন্য অবতার নাই ॥ ১৬১ ॥
এদিকে ব্রাহ্মণী দিয়া শাস্ত্রের প্রমাণ ।
পণ্ডিতমণ্ডলীমধ্যে করেন বাখান ॥ ১৬২ ॥
এত তেজে খণ্ডিতে শকতি নাহি কার ।
প্রভুদেব শাস্ত্র বলে অসংখ্য অবতার ॥ ১৬৩ ॥
তাই প্রভু ভাবিছেন বটবৃক্ষতলে ।
গৌরাঙ্গ কি অবতার ব্রাহ্মণী যা বলে ॥ ১৬৪ ॥
হেনকালে কি হইল শুনহ বারতা ।
মহাতমবিনাশন রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ১৬৫ ॥
একদিন প্রভুদেব ভাগীরথী-তটে ।
শুনিলেন মহারোল কান যায় ফেটে ॥ ১৬৬ ॥
গঙ্গার মাঝারে উঠে দুফালিয়া জল ।
অগণন মাতোয়ারা কীর্তনের দল ॥ ১৬৭ ॥
গায়ক বাদক যত কার নাহি হুঁশ ।
নাচে গায় মাঝে দুটি সুন্দর পুরুষ ॥ ১৬৮ ॥
প্রভুদেব চিনিলেন প্রতি জনে জনে ।
লোক
যত একত্রিত আছিল কীর্তনে ॥ ১৬৯ ॥
উঠি তীরে তাঁহারে ঘেরিয়া কতক্ষণ ।
নেচে গেয়ে পুনঃ জলে হইল মগন ॥ ১৭০ ॥
জলবিম্ব উঠে যেন লয় হয় জলে ।
তেমতি ডুবিল দল গঙ্গার সলিলে ॥ ১৭১ ॥
গৌরাঙ্গাবতার কিনা শ্রীপ্রভুর মনে ।
অসম্ভব সন্দ সমুদিত হৈল কেনে ॥ ১৭২ ॥
বিশেষ কারণ আছে শুন শুন মন ।
বিশ্বগুরুরূপে প্রভু ব্রহ্ম সনাতন ॥ ১৭৩ ॥
জীবহিত এক ব্রত সতত অন্তরে ।
জৈবভাবে আচরণ জীবের উদ্ধারে ॥ ১৭৪ ॥
ভাবা চিন্তা করা কর্ম লীলার জীবনে ।
এক লক্ষ্য আপনার উদ্দেশ্য-সাধনে ॥ ১৭৫ ॥
স্বেচ্ছায় সন্দেহযুক্ত মনে আপনার ।
স্বেচ্ছায় করেন মুক্ত খেলিয়া আবার ॥ ১৭৬ ॥
যুক্ত মুক্তে যাহা হয় লীলা-আচরণ ।
তাহে করে জগতের সন্দেহ মোচন ॥ ১৭৭ ॥
অবতারে হেন শক্তি বর্তমান রহে ।
সৃষ্টি গোটা আজ্ঞা তাঁর নতশিরে বহে ॥ ১৭৮ ॥
কি চেতন কিবা জড় সকলে সমান ।
প্রভুর লীলায় পাবে বহুল প্রমাণ ॥ ১৭৯ ॥
সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক শক্তি আবর্তনে যার ।
ঘুরিতেছে চিরকাল সৃষ্টির সংসার ॥ ১৮০ ॥
সে হেতু আচার্যরূপী অবতারগণ ।
শিখিয়া শিখান জীবে উদ্ধার-কারণ ॥ ১৮১ ॥
বিনাশিতে তমঃ-সন্দ লোচন-আঁধার ।
চৈতন্য-আলোকে দেখে ইষ্ট আপনার ॥ ১৮২ ॥
প্রবল পাশ্চাত্য-শিক্ষা এবে বর্তমানে ।
জড়বাদী অবতার আদতে না মানে ॥ ১৮৩ ॥
রামে কৃষ্ণে যদ্যপি কাহারও কিছু ভক্তি ।
গৌরাঙ্গাবতারে করে ভীষণ আপত্তি ॥ ১৮৪ ॥
তাই লীলাছলে করি গৌরাঙ্গ-দর্শন ।
করিলেন জগতের সন্দেহ-ভঞ্জন ॥ ১৮৫ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
উপনিষদাদি বেদ ষড়-দর্শন ॥ ১৮৬ ॥
গীতা গাথা তন্ত্রমালা আঠার পুরাণ ।
জগতে যাবৎ শাস্ত্র উপায় বিধান ॥ ১৮৭ ॥
প্রভুর আসন কেহ পরশিতে নারে ।
এতদূর দূরান্তর মায়ার উপরে ॥ ১৮৮ ॥
জানি আমি শুনে লোকে কবে কথা নানা ।
যেমন লেখক তার মত মাথাখানা ॥ ১৮৯ ॥
বৃদ্ধি সাধ্য পারগতা গিয়ান ভাষায় ।
পরাধীন দাস্যবৃত্তি পেটের জ্বলায় ॥ ১৯০ ॥
মশা মারা দশা খানি চাপড়ে না টেকে ।
ভূত-প্রেত পায় লজ্জা মুর্তিখানা দেখে ॥ ১৯১ ॥
চঞ্চল মনের বৃত্তি কপি পরাজিত ।
কপি কবি কাব্য তার তেমতি রঞ্জিত ॥ ১৯২ ॥
কেবল রঞ্জিত নয় রঞ্জিতাতিশয় ।
পূজক ব্রাহ্মণে ব্রহ্ম সনাতন কয় ॥ ১৯৩ ॥
জানিয়াও ক্ষান্ত থাকি সাধ্যে না কুলায় ।
পাছু থাকি কেহ যেন প্রবৃত্তি, জন্মায় ॥ ১৯৪ ॥
প্রত্যক্ষেতে দেখা যাহা যাহা কিছু শুনা ।
যা বলে বলুক লোকে করিব বর্ণনা ॥ ১৯৫ ॥
রানীর জামাতা মধ্যে মথুরামোহন ।
নানা গুণে বিভূষিত বৃদ্ধি বিচক্ষণ ॥ ১৯৬ ॥
তাই রানী জামাতার সুযোগ্য দেখিয়ে ।
বিষয় ব্যবসা কর্ম দিল সমর্পিয়ে ॥ ১৯৭ ॥
বিপুল সম্পত্তি জমিদারি কারবার ।
রক্ষণাবেক্ষণ পর্যালোচনার ভার ॥ ১৯৮ ॥
কার্যতঃ মথুর এবে সম্পত্যধিকারী ।
আজ্ঞাবহ দাস-দাসী যত কর্মচারী ॥ ১৯৯ ॥
ধনের অভাব নাই বহুধন ঘরে ।
কাঞ্চনাকর্ষণ কিবা অজ্ঞাত অন্তরে ॥ ২০০ ॥
কামিনীর আকর্ষণ বুঝে ষোল আনা ।
বুদ্ধিভ্রষ্ট কর্মনষ্ট যদিও ঘটে না ॥ ২০১ ॥
প্রারম্ভ যৌবন প্রভু রূপ অঙ্গে ভরা ।
সুবলন সুগঠন সুন্দর চেহারা ॥ ২০২ ॥
একবারে কামবিরহিত কায়া কিনা ।
জানিতে বৃত্তান্ত হৈল একান্ত কামনা ॥ ২০৩ ॥
স্ত্রীমাত্রে জননী জ্ঞান শ্রীপ্রভুর মনে ।
আগাগোড়া শ্রীমথুর বিশেষিয়ে জানে ॥ ২০৪ ॥
দেখিছে উজ্জলোপমা হাজার হাজার ।
তথাপি না যায় সন্দ তামস-আঁধার ॥ ২০৫ ॥
পরীক্ষার হেতু যুক্তি কৈল মনে মনে ।
রূপসী যুবতী এক বেশ্যা-সংযোটনে ॥ ২০৬ ॥
এ বাজারে কে কেমন কার কোথা থানা ।
রসজ্ঞ শ্রীমথুরের বিশেষিয়ে জানা ॥ ২০৭ ॥
লছমন বাঈ বেশ্যা অতি রূপবতী ।
যোগীরে টলায় রূপে এতেক শকতি ॥ ২০৮ ॥
একে তো জাতিতে মোহনত্ব ষোল কলা ।
তদুপরি বেশ্যাবৃত্তি ব্যবসাকৌশলা ॥ ২০৯ ॥
তায় সঙ্গে মথুরের হইল মন্ত্রণা ।
সে যেমন তরতম আর যোল জনা ॥ ২১০ ॥
একত্রিত রাখিবারে তাহার ভবনে ।
প্রভুকে জোটনা করি দিবেন সেখানে ॥ ২১১ ॥
ভাঙ্গিয়া প্রভুর কথা সবিশেষ কয় ।
তেজোজ্জ্বল ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণতনয় ॥ ২১২ ॥
উত্তরে মথুরে কয় কুহকী মোহিনী ।
বড় বড় রথী টলে এতো তুচ্ছ গণি ॥ ২১৩ ॥
যথা দিনে সুরঙ্গিনী কিছু নাহি বাদ ।
পাতিল ভবনমধ্যে যত ছিল ফাঁদ ॥ ২১৪ ॥
ল'য়ে অকলঙ্ক চাঁদ প্রভু ভগবানে ।
সান্ধ্য ভ্রমণের হেতু তুলিল ফেটিনে ॥ ২১৫ ॥
মথুর করিল যাত্রা গড় অভিমুখে ।
পথের দুপাশে লোক দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ২১৬ ॥
একে মথুরের গাড়ি তাহে সুসজ্জিত ।
উচ্চৈঃশ্রবাসম জোড়া অশ্ব সংযোজিত ॥ ২১৭ ॥
শোভার কব কি কথা নাহি যায় ইতি ।
ছুটিল উদ্দেশ্য-পথে পবনের গতি ॥ ২১৮ ॥
মিনিটে এড়ায় আধ ঘণ্টাকের পথ ।
চক্রপাণি সঙ্গে যেন অর্জুনের রথ ॥ ২১৯ ॥
বিশাল গড়ের মাঠ চারিদিক খোলা ।
শীতল গাঙ্গেয় বায়ু রঙ্গে করে খেলা ॥ ২২০ ॥
সেবনে অশেষ তৃপ্তি মনের উল্লাস ।
সময় বুঝিয়া ফিরে মথুর বিশ্বাস ॥ ২২১ ॥
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী বুঝিয়া অন্তরে ।
পরীক্ষায় সুপ্রস্তুত ভকতের তরে ॥ ২২২ ॥
ভকতবৎসল তিনি ভক্ত তাঁর প্রাণ ।
যথা তথা ভক্তসঙ্গে রহে বিদ্যমান ॥ ২২৩ ॥
শ্মশানে মশানে কিবা অকূল পাথারে ।
জনশূন্য মরু কিবা হিমানী আগারে ॥ ২২৪ ॥
স্থানাস্থান কালাকাল বিচার-বিহীনে ।
সম্পদ বিপদ সখা সঙ্গে রেতে দিনে ॥ ২২৫ ॥
কখন অদৃশ্যভাবে নয়নাগোচর ।
কখন প্রত্যক্ষরূপে আঁখির উপর ॥ ২২৬ ॥
এবে পূণ্যময়ী বঙ্গে নব কলেবরে ।
লীলাপ্রিয় লীলাপর লীলার আসরে ॥ ২২৭ ॥
আজি দিন পরীক্ষার ভক্তের সহিত ।
লীলাছলে বেশ্যাগারে নিজে উপনীত ॥ ২২৮ ॥
প্রবেশিয়া দিয়া তাঁয় ভবন-ভিতরে ।
কৌশল করিয়া নিজে গেল স্থানান্তরে ॥ ২২৯ ॥
ভবনের সজ্জা কিবা দিব পরিচয় ।
দেবরাজ বাসবের যেন নৃত্যালয় ॥ ২৩০ ॥
রূপসী সতের জনা ভূষিতালঙ্কারে ।
দীপের আলোকে অঙ্গ ঝলমল করে ॥ ২৩১ ॥
দেখিয়া চাঁদের মালা চক্ষের উপর ।
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে হয় আবেশের ভর ॥ ২৩২ ॥
খসিল কটির বাস দিগম্বর তনু ।
রূপোজ্জ্বল কলেবর যেন বাল ভানু ॥ ২৩৩ ॥
মোহিনী-মোহিত কণ্ঠে শ্যামা-গুণ-গান ।
ভাবে স্বরে তালে লয়ে সর্বাঙ্গে সমান ॥ ২৩৪ ॥
সুগায়িকা বেশ্যাগণ স্তব্ধ গীত শুনি ।
বেদের বাঁশীর স্বরে যেমন নাগিনী ॥ ২৩৫ ॥
এদিকে কি চিত্র দেখ ভরিয়ে নয়ন ।
নবীন নবীন বয়ঃ প্রারম্ভ যৌবন ॥ ২৩৬ ॥
কাঞ্চন-বরণ অঙ্গে কান্তি সমুজ্জ্বল ।
লাবণ্য সৌন্দর্যমাখা শ্রীমুখমণ্ডল ॥ ২৩৭ ॥
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি বাল্যভাবে ভরা ।
নিরুপম আঁখি-রাজ্যে আঁখির চেহারা ॥ ২৩৮ ॥
তুলির না হয় শক্তি আঁকিতে সে ঠাম ।
ভাণ্ডারে অভাব বর্ণ নিজে বিধি বাম ॥ ২৩৯ ॥
ঈষৎ রক্তিমাধর অতি সুশোভিত ।
তাম্বুলের রাগে যেন স্বতই রঞ্জিত ॥ ২৪০ ॥
আছে কিবা তুলনা দিতে গঠন গ্রীবার ।
বেণু বীণা পিক জিনি স্বরের দুয়ার ॥ ২৪১ ॥
সুবিশাল বক্ষঃস্থল জানু মনোহর ।
কুর্মাঙ্গের ন্যায় লিঙ্গ দেহের ভিতর ॥ ২৪২ ॥
কোমলত্বে পরাজিত কমলের দল ।
প্রভুর চরণপদ্ম এতই কোমল ॥ ২৪৩ ॥
উঠে দিব্য পরিমল পরশ যেখানে ।
বিভোর যাহাতে এবে যত বেশ্যাগণে ॥ ২৪৪ ॥
দিব্যভাবে বেশ্যাগণ জাতিবুদ্ধিহারা ।
আঁকিতে নারিনু আজি চিত্রের চেহারা ॥ ২৪৫ ॥
কেন তথা একত্রিতা কিবা প্রয়োজন ।
কি কর্মসাধনে মর্ম নাহিক স্মরণ ॥ ২৪৬ ॥
বিশ্ববিমোহন মেয়ে মায়ার মুরতি ।
যোগেশের যোগ ভাঙ্গে এতেক শকতি ॥ ২৪৭ ॥
তায় হেথা বেশ্যা এরা শুধু পেঁচ ঘটে ।
মানুষে বানায় মেষ কৌশলের চোটে ॥ ২৪৮ ॥
আজি কিন্তু বুদ্ধিহারা মোহিনীর গণ ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা বিচিত্র কথন ॥ ২৪৯ ॥
সর্বমনোহর প্রভু মোহন আধার ।
ধীরে ধীরে শুন মন কই সমাচার ॥ ২৫০ ॥
শ্যামা-গীত গাইতে গাইতে শ্রীপ্রভুর ।
গভীরসমাধিগত বাহ্য গেল দূর ॥ ২৫১ ॥
অশ্রুত অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার দেখিয়ে ।
সশঙ্কিত চিত যত বারাঙ্গনা মেয়ে ॥ ২৫২ ॥
মূর্ছাগত দেখি যেন নিজের সন্তান ।
স্নেহময়ী জননীর আকুল পরাণ ॥ ২৫৩ ॥
সেই মত হইল যত বারাঙ্গনাগণে ।
সুশীতলজল কেহ সিঞ্চে শ্রীবদনে ॥ ২৫৪ ॥
কেহ বা ব্যজন করে ব্যাকুলা হইয়ে ।
বুদ্ধিশূন্যে অন্যে কেহ ডাকে ফুকুরিয়ে ॥ ২৫৫ ॥
মথুর শুনিয়া গোল আইল ত্বরায় ।
আসিলে কিঞ্চিৎ বাহ্য ফোটিনে উঠায় ॥ ২৫৬ ॥
বেগবান অশ্বে যোতা মথুরের গাড়ি ।
উত্তরিল পুরীমধ্যে অতি ত্বরা করি ॥ ২৫৭ ॥
এখানে কি কহে কথা শুনহ ব্রাহ্মণী ।
এক মুখে শত মুখ ধরিয়া আপুনি ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুর কাহিনী গায় সবার গোচরে ।
শ্রীগৌরাঙ্গ রামকৃষ্ণ অপর আধারে ॥ ২৫৯ ॥
একি বিপরীত কথা ব্রাহ্মণী বাখানে ।
প্রভু অন্তরূপে গোরা না কহিল কেনে ॥ ২৬০ ॥
প্রভু সকলের মূল এই মাত্র জানি ।
কৃষ্ণ রাম গোরা তাঁর অবতার গণি ॥ ২৬১ ॥
নর-রূপে অবতার যথায় যা হয় ।
শ্রীপ্রভুর রূপান্তর বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ২৬২ ॥
রূপান্তর অবতারে পূজা সেবা করি ।
রামকৃষ্ণ-রূপ মাত্র হৃদয়েতে ধরি ॥ ২৬৩ ॥
প্রভু ব্রহ্ম সনাতন সকলের মূল ।
নিরাকার সাকার সর্বজ্ঞ সূক্ষ্ম স্থূল ॥ ২৬৪ ॥
অযোধ্যায় প্রভু রাম শ্যাম বৃন্দাবনে ।
হিমাচলে দেবদেব গোরা নদে ধামে ॥ ২৬৫ ॥
নির্গুণ নিষ্ক্রিয় প্রভু বেদান্তেতে বলে ।
শক্তি নামে শাক্তগণ গায় কুতূহলে ॥ ২৬৬ ॥
বুদ্ধ বলি বৌদ্ধগণ প্রভুরে বাখানে ।
খ্রীষ্টানে যীশু গায় আল্লা মুসলমানে ॥ ২৬৭ ॥
যে রূপে যে নামে যেবা উদ্দেশি ঈশ্বরে ।
স্মরণ মনন কিংবা সংকীর্তন করে ॥ ২৬৮ ॥
ভজে পূজে রামকৃষ্ণ এই মনে করি ।
দয়াল ঠাকুর মোর ভবের কাণ্ডারী ॥ ২৬৯ ॥
দেবীমড়লের ঘাট পুরীর অদূরে ।
তাহার নিকটে বাসা দিলা ব্রাহ্মণীরে ॥ ২৭০ ॥
গোটা দিন পুরীমধ্যে কাটান ব্রাহ্মণী ।
বাসায় চলিয়া যান আইলে যামিনী ॥ ২৭১ ॥
অতি রূপবতী তেঁহ বয়স্কা এখন ।
বুঝে উচ্চবংশে জন্ম যে করে দর্শন ॥ ২৭২ ॥
সুন্দর গড়ন অঙ্গে কনক-বরণা ।
পবিত্র মুখের ভাব গেরুয়া-বসনা ॥ ২৭৩ ॥
অতি দীর্ঘ দীর্ঘ চুল পড়েছে এলায়ে ।
অযতনে ধূলা কুটি কত কি লাগিয়ে ॥ ২৭৪ ॥
সন্নিকটে প্রতিবাসী যত চারিধারে ।
আদর করিয়া তায় লয়ে যায় ঘরে ॥ ২৭৫ ॥
যত্ন করে অন্তঃপুরে রমণীর গণ ।
ভক্তিভরা প্রভুকণা করেন শ্রবণ ॥ ২৭৬ ॥
কিবা ধন প্রভুদেব কি চরিত তাঁর ।
এবে নররূপধারী হরি-অবতার ॥ ২৭৭ ॥
ভক্তিভরে নমস্কারে কিবা ফলে ফল ।
বারেক দর্শনে করে চিত নিরমল ॥ ২৭৮ ॥
পেলে অণুকণা রূপা জীবে কিবা পায় ।
ব্রাহ্মণী উন্মত্তা হয়ে প্রভু গুণ গায় ॥ ২৭৯ ॥
ধরে পায় ব্রাহ্মণীর রমণীর গণ ।
কি উপায়ে করে তারা প্রভুরে দর্শন ॥ ২৮০ ॥
দরশনলুব্ধমনা দেখি বামাদলে ।
ঊষায় আনিত সঙ্গে গঙ্গাস্নান ছলে ॥ ২৮১ ॥
এইরূপে ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় ।
ব্রাহ্মণী রমণীমন মজিয়া বেড়ায় ॥ ২৮২ ॥
মন দিয়া শুনিবারে যদি কর হেলা ।
বুঝিতে নারিবে মন শ্রীপ্রভুর লীলা ॥ ২৮৩ ॥
গিরিপদে বিন্দু বিন্দু মাত্র ঝরে জল ।
প্রণালী-আকার পরে ক্রমশঃ প্রবল ॥ ২৮৪ ॥
তৃণ ভাসে হেন স্রোত নাহিক প্রথমে ।
বলবতী স্রোতস্বতী সাগরসঙ্গমে ॥ ২৮৫ ॥
তেমনি বুঝিবে মন কার্য শ্রীপ্রভুর ।
সামান্য ধরিয়া উঠে যায় কত দূর ॥ ২৮৬ ॥
পাইয়া শ্রীমথুরের পত্র-নিমন্ত্রণ ।
পুরীমধ্যে উপনীত হৈল একজন ॥ ২৮৭ ॥
বহু বহু শাস্ত্র-পাঠে পণ্ডিত-প্রবর ।
ব্রাহ্মণের কুলে জন্ম ইন্দেশেতে ঘর ॥ ২৮৮ ॥
কাছে
কিবা দূরে বৈঠে যতেক পণ্ডিত ।
সকলের মধ্যে তাঁর নাম সুবিদিত ॥ ২৮৯ ॥
দিগ্বিজয়ী বিচারেতে সাধ্য টেকে কার ।
এমত আছিল তাহে শক্তি অম্বিকার ॥ ২৯০ ॥
তান্ত্রিক সাধক বল এত গায়ে ধরে ।
বাণী-পুত্র যদি তবু না পারে বিচারে ॥ ২৯১ ॥
সিদ্ধাইসম্ভূত শক্তি যেন তেন নয় ।
অসাধ্যকে সাধ্য করে নয়ে করে হয় ॥ ২৯২ ॥
বীরাচারী বীরভাব বীরমদে ভরা ।
বীরত্ব-প্রকাশ প্রিয় স্বভাবের ধারা ॥ ২৯৩ ॥
চলনে ধরনে হেন যেন মহাবীর ।
জীবনে না জানে করিবারে নতশির ॥ ২৯৪ ॥
গম্ভীর সিদ্ধাই রব হেরে রে রে রে রে ।
দেবীস্তোত্র একপদ তৎসহকারে ॥ ২৯৫ ॥
যথায় উচ্চারে শব্দ কানে শুনে যারা ।
তখনি তাহারা হয় বলবুদ্ধি-হারা ॥ ২৯৬ ॥
বলহারী বীরাচারী সিদ্ধাই ব্রাহ্মণ ।
শক্তিতে অন্যের করে বলের হরণ ॥ ২৯৭ ॥
অত্যাশ্চর্য তান্ত্রিকের বীরত্ব-কাহিনী ।
দর্শন দূরের কথা কানেও না শুনি ॥ ২৯৮ ॥
নিত্য পুজা অম্বিকার সমাপন পরে ।
সাজার মণেক কাষ্ঠ হাতের উপরে ॥ ২৯৯ ॥
করিবারে হোম-কার্য সহ দেবীস্তুতি ।
বাম হাতে জ্বালে কাঠ দক্ষিণে আহুতি ॥ ৩০০ ॥
অম্বিকা সেবক তেহ অম্বিকা ভরসা ।
সময় আগত তাই এইখানে আসা ॥ ৩০১ ॥
এখন প্রভুর কথা সর্বথাই চলে ।
হুলস্থুল পড়িয়াছে ব্রাহ্মণীর বোলে ॥ ৩০২ ॥
তান্ত্রিক করিল মনে শুনিয়া বারতা ।
যে হউন তিনি তাঁর হরিব ক্ষমতা ॥ ৩০৩ ॥
বাহু তালি রে রে বুলি তুলিয়া তান্ত্রিক ।
চলিল আছেন যেথা প্রভু অমায়িক ॥ ৩০৪ ॥
গোচরে পাইয়া তারে প্রভু গুণমণি ।
করিলেন উচ্চতর রে রে রে রে ধ্বনি ॥ ৩০৫ ॥
ততোধিক উচ্চরব করে দ্বিজবর ।
উচ্চতম রে রে রবে প্রভুর উত্তর ॥ ৩০৬ ॥
পুনঃ দ্বিজ কৈল শব্দ জলদ-গম্ভীর ।
প্রভুর উঠিল রব শ্রবণ বধির ॥ ৩০৭ ॥
পরাজিত হ'য়ে রবে বসিল ব্রাহ্মণ ।
বিস্ময়-স্তম্ভিতভাবে মলিন বদন ॥ ৩০৮ ॥
সিদ্ধায়ের বল নষ্ট হৈল এত দিনে ।
পণ্ডিত সমাজে খ্যাতি যাহার কারণে ॥ ৩০৯ ॥
শ্রীপ্রভু দয়ার সিন্ধু করুণা-নিদান ।
সিদ্ধাই অনর্থ হরি সাধিলা কল্যাণ ॥ ৩১০ ॥
সিদ্ধায়ে সাধকে
রাখে হানা দিয়া পথে ।
ঈশ্বরের দরশনে নাহি দেয় যেতে ॥ ৩১১ ॥
বিঘ্ন দূর শ্রীপ্রভুর
কৃপায় এখন ।
রেতে দিনে প্রভুদেবে করে দরশন ॥ ৩১২ ॥
কি জানি দেখিয়া কিবা কহে একদিন ।
আশ্রিত শরণাগত আমি দীনহীন ॥ ৩১৩ ॥
আপুনি পরমব্রহ্ম এবে অবতার ।
কৃপা করি কর মুক্ত নয়ন-আঁধার ॥ ৩১৪ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন ওহে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
আমাতে এখন তুমি কি পেলে লক্ষণ ॥ ৩১৫ ॥
অন্য পণ্ডিতের সঙ্গে করিয়া বিচার ।
সাব্যস্ত করিতে হবে সিদ্ধান্ত তোমার ॥ ৩১৬ ॥
এতবলি প্রভুদেব কহিলা মথুরে ।
বৈষ্ণবচরণে লিখ শীঘ্র আসিবারে ॥ ৩১৭ ॥
রঙ্গপ্রিয় শ্রীমথুর রঙ্গরস চায় ।
বৈষ্ণবে লিখিয়া দিল আসিতে ত্বরায় ॥ ৩১৮ ॥
যথাদিনে প্রভু সঙ্গে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
শ্যামার মন্দিরে করিলেন আগমন ॥ ৩১৯ ॥
টলটল গোটা অঙ্গ আবেশের ভরে ।
চরণ যেমন তনু ধরিতে না পারে ॥ ৩২০ ॥
মথুরের হেনকালে হৈল সংযোটন ।
উপনীত সেইক্ষণে বৈষ্ণবচরণ ॥ ৩২১ ॥
বিধির ঘটন কিবা যাই বলিহারি ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা অমৃতলহরী ॥ ৩২২ ॥
বৈষ্ণব দেখিয়া প্রভু হইলা কেমন ।
হুঙ্কারিয়া স্কন্ধে তাঁর কৈলা আরোহণ ॥ ৩২৩ ॥
তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ দেখে আঁখির উপরে ।
দেবী চড়িলেন যেন বৈষ্ণবের ঘাড়ে ॥ ৩২৪ ॥
পদে নিপীড়িত ধূলা তাহার আকৃতি ।
কালিমা আঁধার বর্ণ বারুদ যেমতি ॥ ৩২৫ ॥
অতিশক্তি ধরে কৈলে অগ্নি পরশন ।
প্রভুর পরশে তেন বৈষ্ণবচরণ ॥ ৩২৬ ॥
সচেতন গোটা সৃষ্টি চৈতন্যের জোরে ।
সাক্ষাৎ চৈতন্য সেই কাঁধের উপরে ॥ ৩২৭ ॥
হৃদয় চৈতন্যময় তাহার উচ্ছ্বাসে ।
রচিয়া নূতন স্তোত্র অনর্গল ভাষে ॥ ৩২৮ ॥
চিত্রিত না হয় এই বিচিত্র দর্শন ।
মহাভাবে সমাধিস্থ প্রভু নারায়ণ ॥ ৩২৯ ॥
উঠিছে জ্যোতির ছটা বদনমণ্ডলে ।
সে যে কি অপূর্ব রূপ সাধ্য কার বলে ॥ ৩৩০ ॥
ছটা করে ছটাময় ছুটে যতদূর ।
স্তম্ভিত বৈষ্ণব গৌরী আর শ্রীমথুর ॥ ৩৩১ ॥
বিস্ময়ে নীরব গৌরী তান্ত্রিক-ব্রাহ্মণ ।
নব সুরচিত স্তোত্র করিয়া শ্রবণ ॥ ৩৩২ ॥
দূর হৃদিতম দেখি প্রভুর ব্যাপার ।
দণ্ডবৎ হয়ে ভূমে লুটে বার বার ॥ ৩৩৩ ॥
শ্রীপ্রভুর ভাবাবেশ ভঙ্গ হলে পরে ।
হাসি হাসি শ্রীবয়ান কহিলা গৌরীরে ॥ ৩৩৪ ॥
শুনেছ ব্রাহ্মণী কিবা মোর কথা বলে ।
গৌরাঙ্গের অবতার নিতাইর খোলে ॥ ৩৩৫ ॥
উত্তর বচনে গৌরী কহে জোড় করে ।
তা বলিলে খাট করা হয় আপনারে ॥ ৩৩৬ ॥
যে শক্তিসম্পন্ন হ'লে অবতার গণি ।
আমি জানি আপনিই সে শক্তির খনি ॥ ৩৩৭ ॥
পুনশ্চ বলেন প্রভু কি কথা তোমার ।
যদ্যপি পণ্ডিত সঙ্গে করিয়া বিচার ॥ ৩৩৮ ॥
সাব্যস্ত করিতে পার যা বলিলে তুমি ।
তবে না তোমার কথা সত্য বলি আমি ॥ ৩৩৯ ॥
দেখহ পণ্ডিত উপনীত বিদ্যমানে ।
এত বলি দেখাইলা বৈষ্ণবচরণে ॥ ৩৪০ ॥
প্রভুর কৃপায় গেছে সিদ্ধাই তাহার ।
নাহি তর্কবুদ্ধি, তর্ক কে করিবে আর ॥ ৩৪১ ॥
বসেছে বিশ্বাস ঘটে ফুটেছে নয়ন ।
প্রভুদেবে বললেন তান্ত্রিক ব্রাহ্মাণ ॥ ৩৪২ ॥
বিচারে কি আছে কিছু বিচারের নাই ।
যাহা বলিলাম আগে পুনঃ বলি তাই ॥ ৩৪৩ ॥
এক প্রশ্ন করিবারে পার তুমি মন ।
যখন শ্রীপ্রভুদেব ব্রহ্ম সনাতন ॥ ৩৪৪ ॥
কি হেতু কাহার জন্য ধ্যান-আরাধনা ।
এতাধিক দেহকষ্ট সাধন-ভজনা ॥ ৩৪৫ ॥
ব্যাকুলতা অনুরাগে পূজক যখন ।
হইয়া গিয়াছে তাঁর কালী-বরশন ॥ ৩৪৬ ॥
নিরাকারাকারে আর সরাট বিরাটে ।
স্থূল সূক্ষ্ম চরাচর প্রতি ঘটে ঘটে ॥ ৩৪৭ ॥
তবে কেন পুনরায় সমুদিত মনে ।
তন্ত্রমতে যাবতীয় সাধন-ভজনে ॥ ৩৪৮ ॥
প্রথম প্রশ্নের কথা কহি শুন আগে ।
যখন পূজক বেশ সিদ্ধ অনুরাগে ॥ ৩৪৯ ॥
সাধারণে অনুরাগে কহে যে রকম ।
শ্রীপ্রভুর অনুরাগে বিভিন্ন ধরন ॥ ৩৫০ ॥
সাধারণে শব্দার্থেতে বুঝে সাদাসিধা ।
প্রভুর রাগের অর্থ-বস্তু আলাহিদা ॥ ৩৫১ ॥
ইতিপূর্বে কহিয়াছি এ রাগের কথা ।
এবে শুন বলি পুনঃ সংক্ষেপে বারতা ॥ ৩৫২ ॥
সতীর পতিতে টান মার যেন ছায়ে ।
বিষয়ীর টান যেন অর্থাদি বিষয়ে ॥ ৩৫৩ ॥
এ তিন টানের যোগে হয় যেই টান ।
তদপেক্ষা টান রহে রাগে মুর্তিমান ॥ ৩৫৪ ॥
একলক্ষ্য-মুখী টান রাগের প্রকৃতি ।
অদম্য অরোধনীয় অতি বেগবতী ॥ ৩৫৫ ॥
রাগের বেগের কথা নাহি বলা যায় ।
রূপ-রস-যুক্ত স্থূল জগতে ভাষায় ॥ ৩৫৬ ॥
ভাসে চিত্ত মন বৃদ্ধি সন্দেহ-আগার ।
গুরুর প্রগুরু ভাসে গুরু অহঙ্কার ॥ ৩৫৭ ॥
অস্তি নাস্তি দুই ভাসে আশ্চর্য ভারতী ।
সুদুর্লভ অনুরাগে বহে এই রীতি ॥ ৩৫৮ ॥
অনুরাগ নামে সেটি ষোল আনা ত্যাগ ।
আসক্তি-সম্বল জীবে সম্ভবে কি রাগ ॥ ৩৫৯ ॥
এ রাগের অণুকণা যদি কোথা থাকে ।
কলির নারদ ব্যাস শুক বলি তাঁকে ॥ ৩৬০ ॥
বায়ুবৎ সুক্ষ্ম রাগ চক্ষের অতীত ।
লক্ষণে জ্ঞাপন করে কোথা সমুদিত ॥ ৩৬১ ॥
স্বপ্নের দারুণ তেজ এত দেহে ধরে ।
দুর্বল মানবাধার ধরিতে না পারে ॥ ৩৬২ ॥
সাধনাদি স্থূল যদি ক্রিয়াকাণ্ড ঢের ।
তথাপিহ সাধ্য কিছু আছে মানুষের ॥ ৩৬৩ ॥
তাই প্রভু আচরিয়া সাধনা আপুনি ।
দুর্বলাবিশ্বাসী জীবে দিলা আশাবাণী ॥ ৩৬৪ ॥
অনুরাগে যেইমত কার্য সিদ্ধ হয় ।
সাধনেও সেইমত জানিবে নিশ্চয় ॥ ৩৬৫ ॥
দ্বিতীয় কারণ আর ইহার ভিতরে ।
শাস্ত্রের মর্যাদা-আদি রক্ষা করিবারে ॥ ৩৬৬ ॥
জগতে যতেক ধর্ম মত পথ রঙ্গ ।
প্রায় আছে প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ ॥ ৩৬৭ ॥
কোথাও কেবল ভোগ অন্য কিছু নাই ।
কোথাও বা ভোগ যোগ এক অঙ্গে ঠাঁই ॥ ৩৬৮ ॥
শেষাঙ্গেতে নাহি রবে অণুমাত্র ভোগ ।
অবিরাম একধারা শুদ্ধ একা যোগ ॥ ৩৬৯ ॥
কে কোন্ অঙ্গের যোগ্য হয় অধিকারী ।
শ্রীগুরু বাছিয়া দেন বিবেচনা করি ॥ ৩৭০ ॥
ভোগ ল'য়ে সাধকের প্রথম প্রবেশ ।
পশ্চাৎ যোগেতে হয় সাধনার শেষ ॥ ৩৭১ ॥
ভোগের নাহিক লেশ প্রভুর সাধনে ।
বড়ই মাহাত্ম্য-কথা শুন এক মনে ॥ ৩৭২ ॥
পরিণামশীল সৃষ্টিরূপ-রসে পূর্ণ ।
সূক্ষ্মদৃষ্টি-সহকারে করি তন্ন তন্ন ॥ ৩৭৩ ॥
দেখিয়া শুনিয়া প্রভু জ্ঞানাগ্নি জ্বালিয়ে ।
দিয়াছেন একেবারে আমূলে পুড়িয়ে ॥ ৩৭৪ ॥
সতত নিবৃত্তি-পথে এক যোগ সাথী ।
জন্ম থেকে গঠেছেন এ হেন প্রকৃতি ॥ ৩৭৫ ॥
ত্যাগ নিষ্ঠা একাগ্রতা একমনা গুণে ।
যখন সাধনা যাহা সিদ্ধ তিন দিনে ॥ ৩৭৬ ॥
যাবতীয় ধর্মমত জগজনে জানা ।
প্রতি মতে পথে প্রভু করিলা সাধনা ॥ ৩৭৭ ॥
দেখাইলা জগজনে কল্যাণ-নিদান ।
সব মত পথ সত্য কেহ নহে আন ॥ ৩৭৮ ॥
পথ মত ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যেকে প্রত্যেক ।
পরিণামে ফল যেটি সেটি কিন্তু এক ॥ ৩৭৯ ॥
দ্বাদশবার্ষিকব্যাপী করিয়া সাধন ।
ধর্মদ্বন্দ্ব জগতের করিলা ভঞ্জন ॥ ৩৮০ ॥
দৃষ্টি যদি থাকে রঙ্গ দেখহ প্রভুর ।
স্থানীয় জাতীয় নয় জগৎঠাকুর ॥ ৩৮১ ॥
মত পথ বিশেষের এক অঙ্গে ল'য়ে ।
যদি চলে কোন জন সাধনা করিয়ে ॥ ৩৮২ ॥
যথাশ্রম প্রাণপণ যথা অনুরাগে ।
তথাপি হইতে সিদ্ধ জন্ম জন্ম লাগে ॥ ৩৮৩ ॥
মহিমা মাহাত্ম্য দেখি প্রভুর এখানে ।
মনবুদ্ধি-হারা হই লীলা-আন্দোলনে ॥ ৩৮৪ ॥
শুন সাধনার কথা তান্ত্রিক আচারে ।
ভীষণ সাধনা এই সাধনা সংসারে ॥ ৩৮৫ ॥
যখন যে কাজে হয় শ্রীপ্রভুর মন ।
তখন তাহাতে হয় যাহা প্রয়োজন ॥ ৩৮৬ ॥
আপনি জুটিয়া আসে তাঁর সন্নিধানে ।
শশব্যস্ত সৃষ্টি যেন শ্রীআজ্ঞা-পালনে ॥ ৩৮৭ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-কথা মধুর কাহিনী ।
সমাগতা সময়েতে সাধিকা ব্রাহ্মণী ॥ ৩৮৮ ॥
তন্ত্রমতে যাবতীয় ভজন-সাধনা ।
সুকৌশলা ব্রাহ্মণীর বিশেষিয়া জানা ॥ ৩৮৯ ॥
নিরুপমা দেবীরূপে বিধাতার গড়া ।
প্রভুতে বাৎসল্য ভাব সন্তানের বাড়া ॥ ৩৯০ ॥
ছানা মাখনাদি মিষ্টি মাগিয়া ভিক্ষার ।
আনিয়া আপন হাতে প্রভুকে খাওয়ার ॥ ৩৯১ ॥
সখ্য-বাৎসল্যাদি পঞ্চভাব সুমধুর ।
ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব যাহে করে দূর ॥ ৩৯২ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু পরম ঈশ্বরে ।
বসায় আত্মীয়বৎ কোলের উপরে ॥ ৩৯৩ ॥
ব্রাহ্মণী ভুলিয়া গেছে ঐশ্বর্য এখন ।
মধুর বাৎসল্য-রসে মগ্ন প্রাণমন ॥ ৩৯৪ ॥
তান্ত্রিক সাধনে হয় পরম মঙ্গল ।
এই জ্ঞান সাধিকার হৃদে সমুজ্জ্বল ॥ ৩৯৫ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর মঙ্গল-কারণ ।
সহায়স্বরূপা হৈল প্রাণ করি পণ ॥ ৩৯৬ ॥
মুক্তিকা-আসন লাগে প্রথমে প্রথমে ।
আরাধনা পুজা জপ ধ্যানের কারণে ॥ ৩৯৭ ॥
গঙ্গাহীন প্রদেশের মুণ্ড প্রয়োজন ।
শ্রমে যত্ন করিল ব্রাহ্মণী আয়োজন ॥ ৩৯৮ ॥
বেদিকা-রচনা দুটি এক বিশ্ব-মূলে ।
তিন নরমুণ্ড পুতে আসনের তলে ॥ ৩৯৯ ॥
পঞ্চবট-মূলে হৈল বেদিকা অপর ।
তার তলে পঞ্চ মুণ্ড মৃত্তিকা-ভিতর ॥ ৪০০ ॥
এই পঞ্চ মুণ্ড নহে কেবল নরের ।
পাঁচ মুণ্ড ভিন্ন ভিন্ন বিভিন্ন জীবের ॥ ৪০১ ॥
পূজা-জপাদিতে এই তন্ত্র-সাধনার ।
দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য বস্তু যাহা দরকার ॥ ৪০২ ॥
সে সব ব্রাহ্মণী দিনে সংগ্রহ করিয়ে ।
রাত্রিতে বেদিকা ভূমে দেন যোগাইয়ে ॥ ৪০৩ ॥
পুরশ্চরণাদি জপ অঙ্গ সাধনার ।
প্রথমত চলে কোন ত্রুটি নাই তার ॥ ৪০৪ ॥
কখন যে আসে দিন কখন যে যায় ।
জ্ঞান নাই অতদূর মত্ত সাধনায় ॥ ৪০৫ ॥
প্রধান চৌষট্টিখানা তন্ত্রের ভিতরে ।
যতেক সাধনা সব সাঙ্গ পরে পরে ॥ ৪০৬ ॥
যে কোন সাধনা অঙ্গ করেন আরম্ভ ।
দিবসত্রয়ের মধ্যে নিরাপদে সাঙ্গ ॥ ৪০৭ ॥
অনুভূতি দর্শনাদি যোগজ বিকার ।
সময়ে কতই হয় সংখ্যা নাই তার ॥ ৪০৮ ॥
একবার হৈল হেন ক্ষুধা উগ্রতর ।
খাইলেও সৃষ্টি যেন ভরে না উদর ॥ ৪০৯ ॥
এইক্ষণে রাশি রাশি যদ্যপি ভক্ষণ ।
পরক্ষণে সেই ক্ষুধা হয় জাগরণ ॥ ৪১০ ॥
কাতরে শ্রীপ্রভুদেব কন ব্রাহ্মণীরে ।
সৃষ্টিগ্রাসী ক্ষুধা কিবা উদয় উদরে ॥ ৪১১ ॥
আশ্বাসিয়া সাধিকা বলেন কিবা ভয় ।
সাধনা-সাফল্য-হেতু এ রকম হয় ॥ ৪১২ ॥
তন্ত্রোক্ত উপায় বাবা আছে প্রতিকার ।
মথুর-সহায়ে কৈল সঠিক যোগাড় ॥ ৪১৩ ॥
ঘর পূর্ণ খাদ্যদ্রব্য না হয় গণন ।
সাধনাসম্ভূত ক্ষুধা শাস্তির কারণ ॥ ৪১৪ ॥
যখন তাহাতে দৃষ্টি পড়িল প্রভুর ।
কিঞ্চিং খাইলে তার ক্ষুধা হৈল দূর ॥ ৪১৫ ॥
বিভীষিকা তন্ত্রব্রত শুনে ভয় পায় ।
চিতাধুম-পানে কভু মত্ত প্রভুরায় ॥ ৪১৬ ॥
ছুটিতেন চারিদিকে ধূমের লাগিয়ে ।
চিতাধুম লক্ষ্য করি মুখব্যাদানিয়ে ॥ ৪১৭ ॥
কখন ত্রিশূল হস্তে করিয়া ধারণ ।
গঙ্গার কূলেতে হয় গম্ভীরে চলন ॥ ৪১৮ ॥
কখন কোমরে নারে ধরিতে বসন ।
চাদর থাকিত মাত্র গাত্র-আবরণ ॥ ৪১৯ ॥
বাহ্যহীন হইলে চাদর যার প'ড়ে ।
ব্রাহ্মণী যতনে দেয় শ্রীঅঙ্গেতে বেড়ে ॥ ৪২০ ॥
অপর উদ্দেশ্য নহে গাত্র-আবরণ ।
শ্রীঅঙ্গে বাহির হয় চাঁদের কিরণ ॥ ৪২১ ॥
পাছে কেহ লোকে দেখে এই অনুমানি ।
চাদরে ঢাকিয়া অঙ্গ রাখেন ব্রাহ্মণী ॥ ৪২২ ॥
সুন্দর অঙ্গের জ্যোতি চাদরে কি চাপে ।
শিখারূপে নির্গমন প্রতি লোমকূপে ॥ ৪২৩ ॥
কখন কখন হয় জ্যোতির্ময় কায়া ।
দাঁড়াইলে
রোদে নাহি পড়ে দেহছায়া ॥ ৪২৪ ॥
দেখিয়া জ্যোতির রাশি প্রভুদেব কন ।
প্রবেশহ দেহমধ্যে যতেক কিরণ ॥ ৪২৫ ॥
প্রবেশ অন্তরে মাগো বাহে ভয় বাসি ।
তবে না বিলয় দেহে কিরণের রাশি ॥ ৪২৬ ॥
ব্রাহ্মণী মায়ের চেয়ে সহায় সাধনে ।
সযতনে সচকিত রহে রেতে দিনে ॥ ৪২৭ ॥
অনুভূতি দর্শনাদি কতই যে হয় ।
সুমুর্খের সাধ্য কিবা দিবে পরিচয় ॥ ৪২৮ ॥
ছোট বড় কালী মূর্তি নাহি গণনায় ।
আগোটা ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে স্থান না কুলায় ॥ ৪২৯ ॥
দ্বিভুজা হইতে দশভূজার মুরতি ।
রূপোজ্জ্বলে পরাজিত চন্দ্রিমার ভাতি ॥ ৪৩০ ॥
ধরনে গমনে শোভা সৌন্দর্য অশেষ ।
কত মত কয় কথা দেয় উপদেশ ॥ ৪৩১ ॥
ষোড়শী ত্রিপুরা ধুতি কান্তি মনোহরা ।
তুলনায় সৌদামিনী মলিনা আঁধারা ॥ ৪৩২ ॥
ভৈরবাদি দেবযোনি বিবিধ প্রকার ।
বিভিন্ন স্বভাবযুক্ত বিভিন্ন আকার ॥ ৪৩৩ ॥
ত্রিকোণ-আকারা জ্যোতির্ময়ী ব্রহ্মযোনি ।
জগৎকারণ শক্তি সৃষ্টির জননী ॥ ৪৩৪ ॥
অনির্বচনীয়া তিনি প্রসূতি প্রকাণ্ড ।
পলে পলে প্রসবিছে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড ॥ ৪৩৫ ॥
অনাহত ধ্বনি অতি শ্রুতি-মুগ্ধকর ।
ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় একত্রিত স্বর ॥ ৪৩৬ ॥
কুলাগারে জগদম্বা নিজে অধিষ্ঠান ।
অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি অশিব-নিদান ॥ ৪৩৭ ॥
কুণ্ডলীর জাগরণ মূলাধার হোতে ।
ঊর্ধ্বগতি পদ্মে পদ্মে সুষুম্নার পথে ॥ ৪৩৮ ॥
তন্ত্রমতে বীরভাবে সাধনার শেষ ।
জীবের কি কথা যেথা সশঙ্ক-মহেশ ॥ ৪৩৯ ॥
বীরভাবে শ্রীপ্রভুর সাধনা-বারতা ।
গাইবারে পূর্বে আছে বলিবার কথা ॥ ৪৪০॥
স্ত্রীমাত্রেই মাতৃ-জ্ঞান আজন্ম ধারণা ।
সতী কি অসতী কিবা বেশ্যা বারাঙ্গনা ॥ ৪৪১ ॥
ভেদাভেদাবিরহিত অদ্বৈত গিয়ান ।
এই লক্ষ্যে সাধকের সাধনা-বিধান ॥ ৪৪২ ॥
জন্মাবধি স্বতঃসিদ্ধ পূর্ণজ্ঞান যাঁর ।
সাধনে হইতে সিদ্ধ কিবা তাঁর ভার ॥ ৪৪৩ ॥
প্রভু যে শ্রীপ্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
মায়াতীত মায়াযুক্তে লীলার আকর ॥ ৪৪৪ ॥
মায়া নাহি মোহে তাঁরে পুরুষপ্রধান ।
শুদ্ধ মনে শুন রামকৃষ্ণলীলা গান ॥ ৪৪৫ ॥
ঈশ্বরীয়
উদ্দীপনা স্ত্রীমূর্তি দেখিলে ।
জৈব ভাবে কামদৃষ্টি নাহি কোন কালে ॥ ৪৪৬ ॥
বিচিত্র ত্যাগের কথা না শুনি কখন ।
স্বপনেও নহে কভু প্রকৃতিগ্রহণ ॥ ৪৪৭ ॥
বহু জ্ঞান নাহি তাঁর এক জ্ঞান জ্ঞান ।
সবে একে একে সব সকলে সমান ॥ ৪৪৮ ॥
স্থূল দৃষ্টি নাহি কভু দেখেন অন্তর ।
একের অনন্ত মূর্তি সৃষ্টি চরাচর ॥ ৪৪৯ ॥
আবিলতা মলিনতা যেন জৈব ভাবে ।
লেশ গন্ধ নাহি তার প্রভুর স্বভাবে ॥ ৪৫০ ॥
আমাদের পক্ষে প্রভুদেবে বুঝা ভার ।
স্বার্থে কাম রুধিয়াছে দৃষ্টি সবাকার ॥ ৪৫১ ॥
প্রার্থনা করিয়া মুক্ত করহ লোচন ।
যাহাতে হইবে কিছু লীলা দরশন ॥ ৪৫২ ॥
বীরভাবে শ্রীপ্রভুর লীলা সাধনার ।
পূর্ববৎ ছিল ইচ্ছা নাহি গাইবার ॥ ৪৫৩ ॥
কিন্তু এবে দেখিতেছি বিচিন্তিয়া মনে ।
হবে মহা অঙ্গহীন শ্রীলীলা বর্ণনে ॥ ৪৫৪ ॥
মহতী মাহাত্ম্য আছে এই সাধনায় ।
শুন লীলা-গীত গাথা পূর্ণ মহিমায় ॥ ৪৫৫ ॥
শক্তি অগ্রহণে বীরভাবের সাধনা ।
হয় না হবার নয় কখন হবে না ॥ ৪৫৬ ॥
তাই কথা গাইবারে পরাণ বিকল ।
ধরিলেন মাছ প্রভু না ছুঁইয়া জল ॥ ৪৫৭ ॥
একদিন নিশাভাগে হাজির ব্রাহ্মণী ।
সঙ্গে ল'য়ে এক পূর্ণ যুবতী রমণী ॥ ৪৫৮ ॥
প্রভুদেবে বলিলেন দেবী জ্ঞান করি ।
পূজা করিবার তরে যুবতী সুন্দরী ॥ ৪৫৯ ॥
যথা কথা সমাপন সাধনার অঙ্গ ।
পশ্চাৎ ব্রাহ্মণী তাহে করিল উলঙ্গ ॥ ৪৬০ ॥
পরে উপদেশে কথা তপস্বিনী বলে ।
জপ কর বাবা বসি উলঙ্গার কোলে ॥ ৪৬১ ॥
অভিন্ন জননী-দৃষ্টি প্রভুর আমার ।
অঙ্কগত ছেলে যেন কোলে বসে মার ॥ ৪৬২ ॥
একেবারে সমাধিস্থ বাহ্য গেছে ছেড়ে ।
ব্রাহ্মণী দেখিয়া ভাসে সুখের সাগরে ॥ ৪৬৩ ॥
ভাঙ্গিলে সমাধি কহে আনন্দ অপার ।
উঠ বাবা কার্যসিদ্ধি হয়েছে তোমার ॥ ৪৬৪ ॥
একদিন মৎস্য রাঁধি শবের খর্পরে ।
তর্পণাস্তে প্রভুদেবে কহে খাইবারে ॥ ৪৬৫ ॥
সন্দ-ঘৃণা-বিরহিত সুসরল মন ।
উপদেশ মত কার্য কৈলা সমাপন ॥ ৪৬৬ ॥
গলিত মনুষ্য-মাংস এক দিন আনে ।
খাইবারে দিতে চায় প্রভুর বদনে ॥ ৪৬৭ ॥
এইখানে প্রভুদেব আজি বিচলিত ।
খাইতে নারেন মহামাংস বিগলিত ॥ ৪৬৮ ॥
চঞ্চল দেখিয়া তাঁয় কহিলা সাধিকা ।
সকল করিলে বাবা হেথা কেন বাঁকা ॥ ৪৬৯ ॥
এই দেখ খাই আমি এতেক বলিয়া ।
মাংসের আংশিক দিল বদনে ফেলিয়া ॥ ৪৭০ ॥
প্রত্যক্ষে সাধিকা-কৃত দেখিয়া ঘটনা ।
প্রচণ্ডা চণ্ডিকা-মূর্তি হয় উদ্দীপনা ॥ ৪৭১ ॥
মা মা রবে ভাবাবিষ্ট প্রভুকে দেখিয়ে ।
ব্রাহ্মণী দিলেন মাংস শ্রীমুখে ফেলিয়ে ॥ ৪৭২ ॥
চণ্ডিকার ভাবারোপে নাহি আর ঘৃণা ।
অবোধ্য অগম্য তত্ত্ব বুদ্ধিতে আসে না ॥ ৪৭৩ ॥
আর দিন আনি কোন প্রণয়ী-যুগলে ।
একত্রে সঙ্গম যবে প্রভুদেবে বলে ॥ ৪৭৪ ॥
দিব্যজ্ঞানে বাবা তুমি কর নিরীক্ষণ ।
জপ কর চঞ্চল না হয় যেন মন ॥ ৪৭৫ ॥
সম্ভোগে সুসংযতাবস্থা নরনারী দুয়ে ।
পুরুষ-প্রকৃতি-ভাব দিল দেখাইয়ে ॥ ৪৭৬ ॥
শিবশক্তি মিলিত প্রধানা যার নাম ।
কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তির ধাম ॥ ৪৭৭ ॥
বাহ্যহারা সমাধিস্থ প্রভু গুণমণি ।
পরে বাহ্য প্রাপ্তে তাঁহে কহিল ব্রাহ্মণী ॥ ৪৭৮ ॥
বলিতে না পারি আজি কি আনন্দ মনে ।
দেখিয়া তোমায় সিদ্ধ আনন্দ-আসনে ॥ ৪৭৯ ॥
তান্ত্রিক ব্যাপার হৈল এইখানে ইতি ।
কল্যাণ-নিদান রামকৃষ্ণলীলা গীতি ॥ ৪৮০ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
রামাৎ সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণলীলা-কথা শ্রবণমঙ্গল ।
গাইলে শুনিলে করে চিত নিরমল ॥ ১ ॥
ভীষণ ত্রিতাপ পাপ বিঘ্ন বাধা দূর ।
পায় সুশীতল জল যেবা তৃষাতুর ॥ ২ ॥
রামাৎ সাধনে মন করিলেন স্থির ।
দিবানিশি এক চিন্তা কোথা রঘুবীর ॥ ৩ ॥
রাম ধ্যান রাম জ্ঞান রাম রত্নরাশি ।
দূর্বাদলশ্যাম রাম কেবল প্রয়াসী ॥ ৪ ॥
রামনাম অবিরাম বদনে বেরায় ।
সচঞ্চল ভ্রাম্যমাণ হেথায় সেথায় ॥ ৫ ॥
রামনামে কণ্ঠরোধ চক্ষে ঝরে জল ।
বিরহযন্ত্রণা হৃদে এতই প্রবল ॥ ৬ ॥
রামভক্ত সন্নিকটে রহে যে যেখানে ।
সময় বুঝিয়া যান তা সবার স্থানে ॥ ৭ ॥
শ্রীকৃষ্ণকিশোর নাম চাটুয্যে ব্রাহ্মণ ।
দক্ষিণশহরে বাস রামপদে মন ॥ ৮ ॥
রামায়ণ-পাঠ ঘরে হয় নিতি নিতি ।
রামনাম জপে যায় গোটা গোটা রাতি ॥ ৯ ॥
শুনিয়া তাহার কথা প্রভু গুণাকর ।
আসা যাওয়া করিতেন ব্রাহ্মণের ঘর ॥ ১০ ॥
রামের পরম ভক্ত করি দরশন ।
করিলেন ব্রাহ্মণের চিত্ত আকর্ষণ ॥ ১১ ॥
ব্রাহ্মণ বড়ই খুশী পেয়ে তাঁয় ঘরে ।
অপার আনন্দ এত হৃদয়ে না ধরে ॥ ১২ ॥
নবীন যুবক বয়ঃ তিরিশ বৎসর ।
অনুরাগ কান্তি মাখা সর্বাঙ্গ সুন্দর ॥ ১৩ ॥
ঢলঢল বাঁকা আঁখি সুঠাম মুরতি ।
সমভক্তিমান তায় শ্রীরামের প্রতি ॥ ১৪ ॥
প্রাণেশ দিনেশ-করে কান্তি নিরমল ।
অবশ হইয়া ফুটে কলিকা কমল ॥ ১৫ ॥
ছড়াইয়া শতদল কেশরনিচয় ।
প্রভুকে দেখিয়া তেন দ্বিজের হৃদয় ॥ ১৬ ॥
কভু অনিমিখে আঁখি করে বরশন ।
অনুপম রূপাকর প্রভুর বদন ॥ ১৭ ॥
ভক্তিমতী ব্রাহ্মণী গৃহিণী ঘরে তাঁর ।
প্রভুরে করেন দোঁহে বাৎসল্য আচার ॥ ১৮ ॥
সুমিষ্ট ভোজনদ্রব্য যবে যাহা জুটে ।
প্রভুর কারণে অতি যতনে আকুটে ॥ ১৯ ॥
ভকতপরাণ প্রভুদেব দয়াময় ।
ব্রাহ্মণীরে হইলেন বড়ই সদয় ॥ ২০ ॥
যে বলে প্রভুরে চিনে রাম নারায়ণ ।
মহাভাগ্যবতী সতী আরাধ্যচরণ ॥ ২১ ॥
ব্রাহ্মণ যদ্যপি কভু মায়াবশে ভুলে ।
নরজ্ঞানে প্রভুদেবে কোন কথা বলে ॥ ২২ ॥
অমনি ব্রাহ্মণী কন আপন পতিরে ।
ভ্রান্ত এত কিবা কথা কও তুমি কারে ॥ ২৩ ॥
চিনিতে না পারিতেছ কেবা এই জন ।
বাহ্যরূপান্তরে সেই কৌশল্যা-নন্দন ॥ ২৪ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যবতী ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী ।
ভবনে বসিয়া পায় অখিলের স্বামী ॥ ২৫ ॥
কাতরে অধম করে মিনতি চরণে ।
প্রভুপদে রহে মতি ভিক্ষা দেহ দীনে ॥ ২৬ ॥
রাম লাগি প্রভুদেব চিন্তায় অস্থির ।
আহার বিরাম নাই কিসে রঘুবীর ॥ ২৭ ॥
পাইবেন এই চিন্তা মনে অনুক্ষণ ।
আরম্ভ করিলা এবে সাধন-ভজন ॥ ২৮ ॥
পুরীর উত্তরে এক বটবৃক্ষমূলে ।
জপ ধ্যান শ্রীপ্রভুর অবিরত চলে ॥ ২৯ ॥
দাস্য সখ্য নানা ভাবে করেন সাধন ।
যখন যেমন হয় হৃদে জাগরণ ॥ ৩০ ॥
দাস্যেতে হনুর ভাবে সতত বিভোর ।
মহাবেগে ভাবাবেগ দেহে করে জোর ॥ ৩১ ॥
প্রভুর শ্রীদেহে ধরে সৃষ্টিছাড়া রীতি ।
দেহ হয় ঠিক যেন মনের প্রকৃতি ॥ ৩২ ॥
যে ভাব যখন হয় মনেতে প্রবল ।
ঠিক তার অনুরূপে তনুর বদল ॥ ৩৩ ॥
বুঝনে না যায় কিছু প্রভুর গতিক ।
যেই চক্ষে ছয় মাস রহে অনিমিখ॥ ৩৪ ॥
সেই চক্ষু চঞ্চল পলক প্রতিপলে ।
এক লক্ষ্যে ধাবমান ভাবের প্রাবল্যে ॥ ৩৫ ॥
ধীর মন্দ পাদক্ষেপে যাঁহার গমন ।
এবে বর্তমানে গতি দিয়া উল্লম্ফন ॥ ৩৬ ॥
বস্ত্রের লাঙ্গুল-বাস বাহিরে বাহিরে ।
কভু হয় মুত্রত্যাগ বৃক্ষের উপরে ॥ ৩৭ ॥
এই দেখি হলধারী সর্বজনে কয় ।
বায়ুরোগে গদাধর উন্মত্ত নিশ্চয় ॥ ৩৮ ॥
ভাবাবেগে কর্ম তাঁর কে করিবে রোধ ।
লোকে জনে কবে কিবা কিছু নাই বোধ ॥ ৩৯ ॥
ক্ষুধা নিবারণে খোলা খোসা সহ ফল ।
তৃষ্ণায় ওষ্ঠের দ্বারা পান গঙ্গাজল ॥ ৪০ ॥
করজোড়ে জানু গেড়ে জয় রাম ধ্বনি ।
কাকুতি মিনতি শত লুটায়ে অবনী ॥ ৪১ ॥
দাস্যভাবে কিছুদিন হইলে বিগত ।
উদিল অপর ভাব ভরতের মত ॥ ৪২ ॥
এখন দেহের নাই পূর্ববৎ ধারা ।
সহজ যেমন দেখে লাগে চমৎকারা ॥ ৪৩ ॥
ভাব অনুমত হয় দেহের গড়ন ।
একরূপে বহুরূপী আশ্চর্য কথন ॥ ৪৪ ॥
কাঠের পাদুকা-সেবা এবে নিরন্তর ।
স্থাপিয়া পাদুকা দুটি খাটের উপর ॥ ৪৫ ॥
সচন্দন ফুলে পূজা অনুরাগাবেশে ।
দর দর চক্ষু জলে বক্ষ যায় ভেসে ॥ ৪৬ ॥
পাদুকা সহিত খাট করিয়া মাথায় ।
কাঁদিয়া কাঁদিয়া প্রভু বেড়িয়া বেরায় ॥ ৪৭ ॥
মুখে রাম কোথা রাম হা রাম যো রাম ।
কবে পাব অযোধ্যায় রাম প্রাণারাম ॥ ৪৮ ॥
বিরহ খেদোক্তি কত শুনে প্রাণ ফাটে ।
এইরূপে দুই তিন চারি দিন কাটে ॥ ৪৯ ॥
ধন্য নর-বেশে লীলা বুঝে কোন্ জনে ।
তুমি রাম তুমি সীতা তবু কাঁদ কেনে ॥ ৫০ ॥
কিসের লাগিয়া কাঁদ, কাঁদ কার তরে ।
নাহি বুঝি কি রহস্য ইহার ভিতরে ॥ ৫১ ॥
যদি বল জীবশিক্ষাহেতু আচরণ ।
জীবে দেখি রাম লাগি করিবে রোদন ॥ ৫২ ॥
নিবেদন আছে এক কহি তব ঠাঁই ।
করুণা করিয়া কহ জগৎগোসাঁই ॥ ৫৩ ॥
ধরা থেকে অতি দূর শূন্যের উপর ।
কেমনে জনমে জল ডাবের ভিতর ॥ ৫৪ ॥
কারিগর কহ কেবা শকতি কাহার ।
কি কলে কৌশলে ফলে জলের সঞ্চার ॥ ৫৫ ॥
তুমি বিনা এ কলের কর্তা কেহ নয় ।
হাতে কি লইয়া জল দিতে তায় হয় ॥ ৫৬ ॥
না কি জনময়ে জল কৌশলের জোরে ।
বিধিমতে শস্যে পূর্ণ ফলে করিবারে ॥ ৫৭ ॥
যদি এত কারিগুরি সঙ্কেতেই চলে ।
কেন জীবে না কাঁদিবে রাম রাম ব'লে ॥ ৫৮ ॥
যদি বল সশরীরে হই অবতরি ।
ধনরত্ন ভক্তি মুক্তি করি ছড়াছড়ি ॥ ৫৯ ॥
তবু এক নিবেদন আছে শ্রীচরণে ।
সকল ঝিনুকে মুক্তা না জনমে কেনে ॥ ৬০ ॥
সকলেই থাকে সেই সাগরের নীরে ।
কেহ মাংসময়গর্ভ কেহ মুক্তা ধরে ॥ ৬১ ॥
অবোধ্য অচিন্ত্য যেন তুমি নিজে হরি ।
লীলাখেলা কার্য তব সেই মত ধরি ॥ ৬২ ॥
অসীম অনন্ত তুমি বুঝে সাধ্য কার ।
বুঝাবুঝি কার্য নহে মম অধিকার ॥ ৬৩ ॥
চরণ সেবার রব এই সাধ করি ।
রতি মতি দেহ পদে কল্পতরু হরি ॥ ৬৪ ॥
রামরূপ-ধ্যান মুখে রামনাম-ধ্বনি ।
সমান ধারার যায় দিবস-যামিনী ॥ ৬৫ ॥
প্রভুর সাধনা হয় যে ভাবে যে কালে ।
সেই সে ভাবের সাধু জুটে দলে দলে ॥ ৬৬ ॥
রানীর অতিথিশালা সাধুরাজ্যে জানা ।
কত যে আসেন সাধু না হয় গণনা ॥ ৬৭ ॥
এবে রামাতের পালা বৈষ্ণব সাধক ।
রামমন্ত্রে উপদিষ্ট রাম-উপাসক ॥ ৬৮ ॥
তে সবার মধ্যে এক অনুরাগী জন ।
জটাধারী নাম ভক্ত রামপদে মন ॥ ৬৯ ॥
ভক্তিনিষ্ঠা ত্যাগে তেঁহ সাধকপ্রবর ।
প্রভুর পড়িল লক্ষ্য তাঁহার উপর ॥ ৭০ ॥
বাল রামচন্দ্র-মন্ত্রে আছিল দীক্ষিত ।
সেব্যর প্রতিমা সঙ্গে পিতলে গঠিত ॥ ৭১ ॥
সাধুর সোহাগে রাখা রামলালা নাম ।
সেই সে সাধুর ছিল গন মন প্রাণ ॥ ৭২ ॥
ভিক্ষালব্ধ যাহা কিছু যোগাড়ে পাইত ।
রেঁধে বেড়ে ঠাকুরের ভোগ লাগাইত ॥ ৭৩ ॥
লোকে যেন দেয় ভোগ এ ভোগ সে নয় ।
এ ভোগ সে ভোগ যাহে সেব্য সেবা হয় ॥ ৭৪ ॥
একনিষ্ঠা একমন একান্তানুরাগে ।
থাকিত ভক্তির ক্ষীর মাখামাখি ভোগে ॥ ৭৫ ॥
তার সঙ্গে সুমধুর বাৎসল্যের রস ।
যাহে ছিল ননীচোরা যশোদার বশ ॥ ৭৬ ॥
সাধুর নিকটে সেই ভাবে রামলালা ।
খায় দায় কাছে থাকে করে নানা খেলা ॥ ৭৭ ॥
এ দাও ও দাও বলি আবদার জোর ।
দেখিয়া আনন্দে সাধু থাকিত বিভোর ॥ ৭৮ ॥
ভাবরাজ্যেশ্বর প্রভু তাঁহার গোচর ।
রহিল না বাকি কিছু জানিতে খবর ॥ ৭৯ ॥
দিন রাত্রি এইখানে থাকেন ঠাকুর ।
রঙ্গ রহস্যাদি যত দেখেন সাধুর ॥ ৮০ ॥
বালরামও প্রভুদেবে দেখে নিরখিয়ে ।
পদ্মপলাশের মত আঁখি দুটি দিয়ে ॥ ৮১ ॥
সাধুর উপরে প্রভু অতি যত্নবান ।
সেবাযোগ্য ভাণ্ডারাদি দুবেলা যোগান ॥ ৮২ ॥
সুঠাম সে বালরাম দূর্বাদল বর্ণ ।
কনককুগুলে সুশোভিত দুটি কর্ণ ॥ ৮৩ ॥
গলায় মতির হার অঙ্গ সুশোভন ।
মধুময় বালচেষ্টা মনবিরঞ্জন ॥ ৮৪ ॥
অপার ভাবের ভাবী প্রভু ভাবময় ।
ব্যাপারে বাৎসল্যভাবে ভরিল হৃদয় ॥ ৮৫ ॥
বালরাম মন্ত্রদীক্ষা লইবার তরে ।
একদিন প্রভুদেব কহেন সাধুরে ॥ ৮৬ ॥
শুনি সাধু জটাধারী ভারি আনন্দিত ।
বালরাম মন্ত্রে কৈল প্রভুকে দীক্ষিত ॥ ৮৭ ॥
প্রভুর পড়িল প্রীতি সাধুর ঠাকুরে ।
পরস্পর ঘনিষ্ঠতা দিনে দিনে বাড়ে ॥ ৮৮ ॥
পাকিয়া পিরীত উঠে গেল এত দূর ।
প্রভুর ছাওয়াল হৈল সাধুর ঠাকুর ॥ ৮৯ ॥
সদা কাছে আগে পিছে কভু কোলে কাঁখে ।
সাধুর নিকটে নাহি পূর্ববৎ থাকে ॥ ৯০ ॥
খাবারও সময় সাধু ডাকিয়া না পায় ।
প্রভুর মন্দির থেকে ধরে নিয়ে যায় ॥ ৯১ ॥
না মানে নিষেধবাক্য শত তিরস্কারে ।
বরঞ্চ শুনিয়া কত মুখভঙ্গি করে ॥ ৯২ ॥
বলে আর তোমার নিকট নাহি রব ।
খেলাধুলা খাওয়া মাখা এখানে করিব ॥ ৯৩ ॥
ঠাকুরের প্রতি ছিল সাধুর যে প্রেম ।
যথার্থ খাদশূন্য যেন নিকষিত হেম ॥ ৯৪ ॥
খাঁটি ভালবাসা প্রেম নহে স্বার্থসুখ ।
প্রেমাস্পদে তাই দেয় যাহে তার সুখ ॥ ৯৫ ॥
প্রভুদেবে রামলালা করি সমর্পণ ।
বলে রহ রামলালা যাঁহা তোর মন ॥ ৯৬ ॥
বিরাগজনিত প্রেম ফুলের সৌরভ ।
ব্রজগোপিকার জ্ঞাপ্য অতীব দুর্লভ ॥ ৯৭ ॥
পেয়ে প্রভু রামলালে পরম সুন্দর ।
স্নেহেতে বিভোরচিত্তে সোহাগ আদর ॥ ৯৮ ॥
লালন-পালন যত্ন হয় দিবারাতি ।
ছাওয়ালে না পারে এত করিতে প্রসূতি ॥ ৯৯ ॥
সোহাগে দুরন্ত বড় হৈল রামলালা ।
রোধে ছুটে জল ঘাঁটে ধূলা মেখে খেলা ॥ ১০০ ॥
এ একপ্রকার জ্বালা এখানের নয় ।
ভাবরাজ্যের ভাবুকের ভাব-ক্ষেতে হয় ॥ ১০১ ॥
মজার জ্বালার মিষ্টি কি কব তোমাকে ।
ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম সূর্যমণির আলোকে ॥ ১০২ ॥
একে বহে দাহ্য গুণ পরাণ বিকল ।
মণির
আলোকে করে প্রাণ সুশীতল ॥ ১০৩ ॥
এখন প্রভুর নাই আরাম বিরাম ।
সর্বদাই ব্যতিব্যস্ত
লয়ে বালরাম ॥ ১০৪ ॥
এখন সমাধি নাই নাই ভাবাবেশ ।
স্বহস্তে করেন নারিকেলের সন্দেশ ॥ ১০৫ ॥
কত কথা কত রঙ্গ হয় তার সনে ।
কভু ক্রোধাবিষ্ট কভু সস্নেহ বচনে ॥ ১০৬ ॥
দেখিয়া শুনিয়া লোকে বুঝে তার মর্ম ।
বাতিক বায়ুর বেগ প্রাবল্যের ধর্ম ॥ ১০৭ ॥
আইও তাহাই কন আচার দেখিয়ে ।
ক্ষেপিলি কি সন্ন্যাসীর ঠাকুর লইয়ে ॥ ১০৮ ॥
কখন বলেন আই হৃদয়ের কাছে ।
গদায়ে আমার বুঝি পরীতে পেয়েছে ॥ ১০৯ ॥
প্রভু বিনা অন্য কেহ দেখিতে না পায় ।
রামলালা সঙ্গে তাঁর খেলিয়া বেড়ায় ॥ ১১০ ॥
এ এক রাজ্যের কথা এ রাজ্যের নয় ।
বিমানেতে স্থিতি ভিত্তি নিত্য নিত্য রয় ॥ ১১১ ॥
আলম্বনশূন্য সেটি ঝুলে আসমানে ।
হইলেও নিকটস্থ দূরবর্তী স্থানে ॥ ১১২ ॥
ভাবী বিনা অন্যে নাহি দেখিবারে পায় ।
বিষম হেঁয়ালি কথা না আসে মাথায় ॥ ১১৩ ॥
নাহি তথা বাহ্য রূপ-রসাদির গন্ধ ।
রোষ দ্বেষ আদি করি অরাতির দ্বন্দ্ব ॥ ১১৪ ॥
নাহি তথা স্থুল বাহ্য ভৌতিক
ব্যাপার ।
নাহি চন্দ্র নাহি সূর্য মালা তারকার ॥ ১১৫ ॥
আছে তথা ভাব লক্ষ্য সঙ্গে
এক মন ।
আছে সংস্কার অরি প্রতিদ্বন্দ্বিগণ ॥ ১১৬ ॥
রথ অস্ত্র বিনা আছে অনন্ত সমর ।
তার পারে পুরী আছে অতীব সুন্দর ॥ ১১৭ ॥
বিনা চন্দ্রে বিনা সূর্যে পুরী জ্যোতির্ময় ।
পুরীর শোভার কথা কহিবার নয় ॥ ১১৮ ॥
আছে এক রত্নবেদী অতি অলৌকিক ।
তদুপরি জ্বলে এক অমূল্য মানিক ॥ ১১৯ ॥
নানান বর্ণের জ্যোতি রূপ উঠে তার ।
এক এক বর্ণরূপে
বিভিন্ন আকার ॥ ১২০ ॥
দেখিলে সে কেহ আর পালটিতে নারে ।
ডুবে যায় অপরূপ রূপের
পাথারে ॥ ১২১ ॥
এ হেন রাজ্যের রাজ্যেশ্বর অবতার ।
অনুক্ষণ প্রিয় রাজ্যে বিলাস
বিহার ॥ ১২২ ॥
কেমনে বুঝিব মোরা এ রাজ্যের কথা ।
যে কবে বলিব তার বিকারের মাথা ॥ ১২৩ ॥
তাই প্রভু আমাদের দৃষ্টিতে কেবল ।
একজনা ঘোর বদ্ধ উন্মত্ত পাগল ॥ ১২৪ ॥
ধূলা দিয়ে জগতের চক্ষের উপর ।
রঙ্গভূমে করে রঙ্গ রঙ্গের ঈশ্বর ॥ ১২৫ ॥
অত্যাশ্চর্য ভাবরাজ্য প্রভুর বিদিতি ।
বালরামে লয়ে হৈল বাৎসল্যের ইতি ॥ ১২৬ ॥
সাধনাসহায়ে প্রভু দেখিবারে পান ।
এই বালকের অঙ্গে সৃষ্টি শোভমান ॥ ১২৭ ॥
বালরামময় সৃষ্টি আর নাহি কেহ ।
ভাবাতীত একা ভূমি সম্মিলনী গৃহ ॥ ১২৮ ॥
ভাবপঞ্চকের মধ্যে শেষ চতুষ্টয় ।
মথুরের কথা পাবে পরে পরিচয় ॥ ১২৯ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
হলধারীর
সঙ্গে রঙ্গ ও মথুরকে
শিবকালী-রূপ-প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
জ্যেষ্ঠ খুল্লতাত ভাই দাদা হলধারী
।
তাঁর সঙ্গে শ্রীপ্রভুর লীলা রঙ্গ ভারি ॥ ১ ॥
বড় রহস্যের কথা বড়ই রগড় ।
দীক্ষা শিক্ষা তাঁর মধ্যে অতীব সুন্দর ॥ ২ ॥
শুদ্ধাচারী হলধারী সাধক সজ্জন ।
ভাগবত গীতাদি অধ্যাত্ম রামায়ণ ॥ ৩ ॥
বেদান্তেরও ভাব-মর্ম ভালরূপে জানা ।
নানাবিধ দেবকার্যে বিজ্ঞ এক জনা ॥ ৪ ॥
বাল্যকাল এক সঙ্গে স্বদেশে যাপন ।
যৌবনে পূজক কর্মে এখানে মিলন ॥ ৫ ॥
পুরীতে কাটিল কাল সাত বর্ষ প্রায় ।
কতই ঘটনাবলী কহনে না যায় ॥ ৬ ॥
হইল প্রত্যক্ষীভূত লোচন-সকাশ ।
তথাপি প্রভুতে নাহি উপজে বিশ্বাস ॥ ৭ ॥
পরিচয়ে শুন কথা অতীব মধুর ।
ভাবাতীত ভক্ত ভাবী লীলার ঠাকুর ॥ ৮ ॥
বসিতেন স্বতঃসিদ্ধ অনুরাগভরে ।
জগমাতা অম্বিকায় পুজিবার তরে ॥ ৯ ॥
আপনে আপুনি প্রভু হইয়া বিভোর ।
বিগলিত দর ঘর নয়নেতে লোর ॥ ১০ ॥
আবেশেতে বাহ্যহারা জড়বৎ প্রায় ।
অপরূপ কান্তিছটা বদনে বেরায় ॥ ১১ ॥
প্রত্যক্ষ করিয়া হলধারী মনে করে ।
নিশ্চয় ঈশ্বরাবেশ ইহার ভিতরে ॥ ১২ ॥
হইলে ভাবের ভঙ্গ প্রভুদেবে কয় ।
এবারে তোমারে ভায়া বুঝেছি নিশ্চয় ॥ ১৩ ॥
এবারে গিয়াছে মোর আঁখি-ধাঁধা ভ্রম ।
ফাঁকি দিতে আর নাহি হইবে সক্ষম ॥ ১৪ ॥
দেখেছি ঈশ্বরাবেশ তোমার ভিতরে ।
এত শুনি প্রভুদেব কহিলা তাঁহারে ॥ ১৫ ॥
দেখা যাবে মতি স্থির রাখহ কেমনে ।
গোলযোগ আর যেন নাহি হয় ভ্রমে ॥ ১৬ ॥
অনন্তর দেবসেবা-কার্যাদির শেষে ।
বসিলেন হলধারী মনের হরিষে ॥ ১৭ ॥
অতি প্রিয় নখ্যপাত্র ল'য়ে আপনার ।
করিবারে শাস্ত্রাদির তত্ত্বের বিচার ॥ ১৮ ॥
হেনকালে প্রভুদেব উপনীত তথা ।
দাঁড়িয়া শুনেন তত্ত্ববিচারের কথা ॥ ১৯ ॥
কিছু পরে দাদারে কহেন গুণমণি ।
পড়েছ যে সব শাস্ত্র আমি তাহা জানি ॥ ২০ ॥
বিদ্যা অভিমানী দাদা নস্য নাকে দিয়ে ।
গ্রীবোন্নত সহ চক্ষু বিস্তার করিয়ে ॥ ২১ ॥
গরজি গম্ভীর স্বরে প্রভুদেবে কন ।
বুঝিস কি তুই গণ্ডমূর্খ একজন ॥ ২২ ॥
নিজ দেহ দেখাইয়া প্রভুর উত্তর ।
সে দেয় বুঝায়ে যে ইহার ভিতর ॥ ২৩ ॥
এই কিছুক্ষণ আগে তুমিই কহিলে ।
ঈশ্বরের আবির্ভাব আছে এই খোলে ॥ ২৪ ॥
অধিক গম্ভীরভাবে কহে আর বার ।
কল্কি ছাড়া কলিতে কি আছে অবতার ॥ ২৫ ॥
পাগল উন্মত্ত তুই হয়েছিস এবে ।
তাই নিস আপনাকে অবতার ভেবে ॥ ২৬ ॥
তবে মৃদুমন্দ হাসি শ্রীপ্রভুর বোল ।
এই যে বলিলে আর নাহি হবে গোল ॥ ২৭ ॥
বুঝেছ জেনেছ মোরে গেছে আঁখি-ভ্রম ।
তবে এবে অন্যরূপ কহ কি কারণ ॥ ২৮ ॥
তখন কে আর দেয় সে কথায় কান ।
সজোরে উঠেছে ঘটে বিদ্যা-অভিমান ॥ ২৯ ॥
দাস্যভাবে রামাৎ-সাধনে তারপর ।
বস্ত্রহীনে মুত্রত্যাগ গাছের উপর ॥ ৩০ ॥
দেখিয়া তখন দাদা বুঝেছ প্রমাদ ।
বায়ূরোগে গদাধর দুরন্ত উন্মাদ ॥ ৩১ ॥
অপর ঘটনা কিবা শুন দিয়া মন ।
শরৎ-পূর্ণিমা চাঁদ উজ্জ্বল কিরণ ॥ ৩২ ॥
গগনে উদয় হ'য়ে বিতরয়ে ভাতি ।
ধরিয়াছে ধরামাতা মোহন মুরতি ॥ ৩৩ ॥
রাতি কিবা দিনমান বুঝা নাহি যায় ।
দশদিক আলোময় কিরণমালায় ॥ ৩৪ ॥
এহেন সময়ে পূর্ণ জ্ঞানী প্রভুরায় ।
অমা কি পূর্ণিমা আজি পুছিলা দাদায় ॥ ৩৫ ॥
ঈষদ্ধাস্যে ব্যঙ্গভাবে হলধারী কয় ।
ভুবনে এমন মূর্খ দ্বিতীয় না হয় ॥ ৩৬ ॥
অমা কি পূর্ণিমা আজি তাও নাহি জানে ।
ইহাকে আবার দেশে দেশে গুণে মানে ॥ ৩৬ ॥
পূর্ণ জ্ঞানে একাকার নাহি রকমারি ।
আঁধার আলোক এক দিবা বিভাবরী ॥ ৩৭ ॥
প্রকৃতির বিচিত্রতা সব লোপ পায় ।
ভেদাভেদহীন তত্ত্ব আসে না মাথায় ॥ ৩৮ ॥
পূর্ণজ্ঞানী হ'য়ে প্রভু হইলা পাগল ।
জ্ঞানী গণ্য জ্ঞানহীন মানুষের দল ॥ ৩৯ ॥
অধীত-শাস্ত্রাদি দাদা মান্য একজনা ।
বিবেক বৈরাগ্য-হীনে দিনমানে কানা ॥ ৪০ ॥
ধারণা ছিল না কিছু শাস্ত্রমর্মে তাঁর ।
কাজেই শ্রীপ্রভু মূর্খ বিচারে দাদার ॥ ৪১ ॥
কৃপা কর মহামায়া চৈতন্যদায়িনী ।
জন্ম জন্ম রব মূর্খ নাহি তাহে হানি ॥ ৪২ ॥
ভুলি না জননী যেন মায়াবিনাশন ।
নিরুপমা রক্তোৎপল দুখানি চরণ ॥ ৪৩ ॥
একদিন বাল্যভাবী প্রভু অকপটে ।
উপনীত হলধারী দাদার নিকটে ॥ ৪৪ ॥
যে কালে আছিলা তেহ বিচারেতে মত্ত ।
আধ্যাত্মিক জগতের সূক্ষ্মতর তত্ত্ব ॥ ৪৫ ॥
শ্রীপ্রভু কহিলা তাঁয় জানিতে বারতা ।
ভাবযোগে ঈশ্বরীয় দর্শনের কথা ॥ ৪৬ ॥
তাহার উত্তরে দাদা হলধারী কয় ।
ভাবে যাহা দেখিয়াছ ঠিক তাহা নয় ॥ ৪৭ ॥
আমার এ নয় কথা শাস্ত্রের কথিত ।
ভাবরাজ্যপুরী ছাড়া তিনি ভাবাতীত ॥ ৪৮ ॥
সরল বিশ্বাসী প্রভু জন্মজাত গুণ ।
দাদার কথায় চিত্তে উঠিল আগুন ॥ ৪৯ ॥
বিষাদে কাতর নাদে কান্দিয়ে কান্দিয়ে ।
করুণ বিলাপে কন মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ৫০ ॥
একি শুনি ওমা শ্যামা কি তুই করিলি ।
দেখে মুখ্খু নিরক্ষর মোরে ফাঁকি দিলি ॥ ৫১ ॥
মর্মভেদী রোদনের কি কব কাহিনী ।
নয়নের নীরধারে তিতিল ধরণী ॥ ৫২ ॥
হেনকালে কি হইল শুন অতঃপর ।
নিবিড় কুয়াশাধূম নয়নগোচর ॥ ৫৩ ॥
তাহার ভিতর থেকে উঠে আচম্বিত ।
সুন্দর পুরুষ শ্মশ্রু আবক্ষ লম্বিত ॥ ৫৪ ॥
প্রভু প্রতি স্থির দৃষ্টি রাখি কিছুক্ষণ ।
"ভাব মুখে থাক্ তুই" কহি এ বচন ॥ ৫৫ ॥
বারত্রয় ঐ কথা উপদেশ দিয়ে ।
ধূয়ার মানুষ গেল ধুয়ায় মিলিয়ে ॥ ৫৬ ॥
তবে না হইল শান্ত প্রভুর হৃদয় ।
আর না দাদার বাক্যে করেন প্রত্যয় ॥ ৫৭ ॥
হলধারী একদিন কহে আর বার ।
তমোগুণময়ী দেবী কালিকা তোমার ॥ ৫৮ ॥
তাঁহাকে ভজিলে নাহি হবে কোন ফল ।
উন্নতির পথে কাঁটা দিতেছ কেবল ॥ ৫৯ ॥
বড়ই লাগিল কথা শ্রীপ্রভুর প্রাণে ।
বিশেষতঃ আপনার ইষ্টনিন্দা শুনে ॥ ৬০ ॥
তখন না কহি কিছু প্রভু গুণমণি ।
কালীর মন্দির মুখে চলিলা অমনি ॥ ৬১ ॥
মাতৃগতপ্রাণ প্রভু সজল নয়নে ।
কন মাতা অম্বিকায় কাতর বচনে ॥ ৬২ ॥
তুই কি তামসী দেবী হলধারী কয় ।
শেলের সমান কথা প্রাণে নাহি সয় ॥ ৬৩ ॥
সত্য তত্ত্ব কহ মোরে স্বরূপ তোমার ।
বুঝাইয়া দিলা শ্যামা ছাওয়ালে তাঁহার ॥ ৬৪ ॥
মায়ের বচন শুনি হ'য়ে উল্লসিত ।
দাদার সম্মুখে ত্বরা হইল উপনীত ॥ ৬৫ ॥
তখন বসিয়ে দাদা পূজার আসনে ।
বিষ্ণুর মন্দিরে বিষ্ণুপুজার কারণে ॥ ৬৬ ॥
সম্মুখেতে পুঞ্জীকৃত পূজোপকরণ ।
নৈবেদ্যাদি ফল মূল কুসুম চন্দন ॥ ৬৭ ॥
স্কন্ধে তাঁর আরোহণে বসিলা ঠাকুর ।
রুধিয়া গর্জিয়া কন সম্মুখে বিষ্ণুর ॥ ৬৮ ॥
কি বুঝিয়া কহ মাকে তামসী কালিকা ।
মা আমার সর্বেশ্বরী জগতপালিকা ॥ ৬৯ ॥
সৃষ্টিস্থিতিলয় কর্মে ত্রিগুণধারিণী ।
গুণাতীতে তিনি পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী ॥ ৭০ ॥
ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের স্কন্ধে আরোহণে ।
দাদার চৈতন্যোদয় পরশের গুণে ॥ ৭১ ॥
স্বীকার করিল তবে প্রভুর বচন ।
প্রভুতে কালিকাবেশ করে দরশন ॥ ৭২ ॥
সম্মুখস্থ কুসুমাদি চন্দনে মাখিয়ে ।
প্রভুর শ্রীপদে দেয় অঞ্জলি ভরিয়ে ॥ ৭৩ ॥
ভাবাবেশ-ভঙ্গে প্রভু ফিরিলা স্বস্থানে ।
আমূল বৃত্তান্ত হৃদু শুনিলেন কানে ॥ ৭৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে হৃদয় বিস্মিত ।
হলধারী যেথা তথা হয় উপনীত ॥ ৭৫ ॥
শ্রুত ঘটনাদি যত কহিল তাঁহাকে ।
তবে কেন বল পেয়েছে ভূতে মামাকে ॥ ৭৬ ॥
তদুত্তরে হলধারী হৃদয়েরে কন ।
গদায়ের ঈশ্বরাবেশ কৈনু দরশন ॥ ৭৭ ॥
কালীর মন্দিরে আমি যে সময়ে যাই ।
জানি না আমায় কিবা করেন গদাই ॥ ৭৮ ॥
বুঝিতে না পারি কিছু করিয়া বিচার ।
এ অতি বিচিত্র কাণ্ড বিচিত্র ব্যাপার ॥ ৭৯ ॥
কতই মা কৈল খেলা লীলার প্রাঙ্গণে ।
শ্রীপ্রভুর লীলারঙ্গ শ্রীপ্রভুই জানে ॥ ৮০ ॥
মথুরের সঙ্গে রঙ্গ শুন পরিচয় ।
সে আবার অন্যরূপ এরূপের নয় ॥ ৮১ ॥
একদিন পুরীমধ্যে হয় বিচরণ ।
মথুরের সঙ্গে নানা কথোপকথন ॥ ৮২ ॥
জানি না কি ভাবে প্রভু কহিলা মথুরে ।
মায়ের ঐশ্বর্যতত্ত্ব কে বুঝিতে পারে ॥ ৮৩ ॥
মহৈশ্বর্যময়ী কালী অনন্ত আধারা ।
অপার ঐশ্বর্য তাঁর না হয় কিনারা ॥ ৮৪ ॥
মায়ের সৃষ্টিতে দেখ ছোট বড় নাই ।
বড়টিও যেন বড় ছোটটিও তাই ॥ ৮৫ ॥
দেখ ঐ জবার গাছ সম্মুখে তোমার ।
বলিহারি কারিগরি কত কি ইহার ॥ ৮৬ ॥
ফুল পত্র কাণ্ড মূল বিচিত্র কেমন ।
কি কৌশল প্রত্যেকের বিভিন্ন বরণ ॥ ৮৭ ॥
শুধু মাত্র নহে ভিন্ন কেবল বরণে ।
প্রত্যেকের প্রভেদ গুণে প্রত্যেকের সনে ॥ ৮৮ ॥
আরক্ত বরণ জবা ফুটে গাছময় ।
সব লাল একটিরও সাদা বর্ণ নয় ॥ ৮৯ ॥
ইচ্ছা যদি হয় ইচ্ছাময়ী অম্বিকার ।
দেখিবে লালের গাছে উদ্ভব সাদার ॥ ৯০ ॥
মথুর কহেন বাবা কথা অসম্ভব ।
রক্তিম জবার গাছে সাদার উদ্ভব ॥ ৯১ ॥
শ্রীপ্রভু উত্তরে কন এ নহে আশ্চর্য ।
সৃষ্টীশ্বরী যিনি যাঁর সৃষ্টি মহৈশ্বর্য ॥ ৯২ ॥
যাহা ইচ্ছা তাই তিনি পারেন করিতে ।
সৃষ্টিখানি হাতে তাঁর তিনিই সৃষ্টিতে ॥ ৯৩ ॥
এখন দেশের রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া রানী ।
আইন বিধান কত করেছেন তিনি ॥ ৯৪ ॥
চলিত আইন যাহা আছে বর্তমানে ।
হইলে তাঁহার ইচ্ছা রদ পর দিনে ॥ ৯৫ ॥
তার স্থানে আর অন্য করেন নূতন ।
যখন যা হয় ইচ্ছা তখনি তেমন ॥ ৯৬ ॥
এখানেও সেই ধারা আছে বিদ্যমান ।
ইচ্ছাময়ী অম্বিকার ইচ্ছাতে বিধান ॥ ৯৭ ॥
মথুর বলেন বাবা আশ্চর্য কাহিনী ।
প্রকৃতির এক গতি চিরকাল জানি ॥ ৯৮ ॥
বুঝিব তোমার বাক্যে সত্যতত্ত্ব আছে ।
সাদা জবা ফুটে যদি রক্তিমের গাছে ॥ ৯৯ ॥
চলিত প্রসঙ্গ আজি এইগানে ইতি ।
শ্রী প্রভুর লীলারঙ্গ অপূর্ব ভারতী ॥ ১০০ ॥
মথুর সসঙ্গ প্রভু তার পর দিনে ।
বিহার করেন রঙ্গে সে সেই বাগানে ॥ ১০১ ॥
এখানে ওখানে ঘুরি উপনীত পিছে ।
রক্তিম জবার গাছ যেইখানে আছে ॥ ১০২ ॥
দেখিলেন সে গাছের কোন এক বঁটে ।
লাল সাদা জবা দুটি রহিয়াছে ফুটে ॥ ১০৩ ॥
বাহ্যিক বিস্ময় সহ শ্রীমথুরে কন ।
এক বঁটে লাল সাদা উভয় রকম ॥ ১০৪ ॥
ফুটেছে কেমন ফুল দেখ না গো চেয়ে ।
দাঁড়িয়ে মথুর দেখে অবাক হইয়ে ॥ ১০৫ ॥
নীরব মথুর মনে বাক্য নাহি আর ।
মনে মনে বুঝিলেন এ কার্য বাবার ॥ ১০৬ ॥
সে অবধি আর নাহি প্রতিবাদে কয় ।
যা বলেন বাবা করে তাহাতে প্রত্যয় ॥ ১০৭ ॥
আর দিন প্রভুদেব সুগভীর ধ্যানে ।
মথুর দেখেন চেয়ে রহি সংগোপনে ॥ ১০৮ ॥
প্রশান্ত গম্ভীর মূর্তি অটল অচল ।
বদনে উদয় জ্যোতিঃ পরম উজ্জ্বল ॥ ১০৯ ॥
বদনমণ্ডল গোটা ঝল মল করে ।
দিব্যময় ভাবোচ্ছ্বাসে হৃদয় মাঝারে ॥ ১১০ ॥
সতৃষ্ণ নয়নে দেখে পলকবিহীন ।
প্রভুর শ্রীদেহমধ্যে করিয়া বিলীন ॥ ১১১ ॥
যেন মহাদেব দেব যোগের আসনে ।
ধ্যানে মগ্ন জগতের কল্যাণ-সাধনে ॥ ১১২ ॥
মনে মনে ভাবিতেছে ভক্ত শ্রীমথুর ।
অমানবী যাবতীয় কাণ্ড শ্রীপ্রভুর ॥ ১১৩ ॥
উচ্ছ্বাসে উতলা হৃদি আনন্দের ভরে ।
চরণ ধরিয়া লুটে মনে মনে করে ॥ ১১৪ ॥
কষ্টেতে ধৈরয ধরি সম্বরে উচ্ছ্বাস ।
প্রভুর অধিক রঙ্গ দেখিবার আশ ॥ ১১৫ ॥
শ্রীপ্রভুর নানাবিধ রঙ্গ রূপ হেরে ।
শ্রীপদে বিশ্বাস ভক্তি দিনে দিনে বাড়ে ॥ ১১৬ ॥
মথুরের মত ব্যক্তি অতুল ভুবনে ।
বাহান্তর বিভূষিত বহু বহু গুণে ॥ ১১৭ ॥
শৌর্য বীর্য সহিষ্ণুতা সৌন্দর্য অতুল ।
মান্য গণ্য সুজনতা সম্পত্তি বিপুল ॥ ১১৮ ॥
ন্যায়নিষ্ঠ মিষ্টবাক্ উদার সরল ।
ইষ্টপদে ভক্তি প্রীতি ভুবনে বিরল ॥ ১১৯ ॥
একাধারে সমাবেশ নিরুপম গুণ ।
লীলায় মথুর যেন দ্বিতীয় অর্জুন ॥ ১২০ ॥
লীলায় ভাণ্ডারি-বেশে নরদেহে আসা ।
প্রভুর ও তাহার প্রতি প্রীতি ভালবাসা ॥ ১২১ ॥
শ্রীপদে অটলবৎ রাখিতে মথুরে ।
ইষ্টরূপে দরশন দিলেন এবারে ॥ ১২২ ॥
শ্রীপ্রভুর আবাস-মন্দির যেইখানে ।
তাহার কিঞ্চিৎ দূর পূর্বোত্তর কোণে ॥ ১২৩ ॥
আছয়ে বারাণ্ডা এক অতি সুশোভন ।
পূর্ব পশ্চিমেতে লম্বা দীর্ঘ আয়তন ॥ ১২৪ ॥
তদুত্তরে ফুলের বাগান মনোহর ।
নানাজাতি ফুটে ফুল সৌরভ বিস্তর ॥ ১২৫ ॥
তাহার পূরব ভাগে বাবুদের কুঠি ।
দক্ষিণে সোপানাবলী অতি পরিপাটি ॥ ১২৬ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুর বসিয়া সোপানে ।
নানাবিধ করে চিন্তা একাকী আপনে ॥ ১২৭ ॥
হেনকালে শ্রীমথুর দেখিবারে পায় ।
আপনে আপুনি মগ্ন প্রভুদেব রায় ॥ ১২৮ ॥
বারাণ্ডার পাদ চালি এধার ওধার ।
কাহারও উপরে লক্ষ্য মোটে নাহি তাঁর ॥ ১২৯ ॥
পশ্চিমাশ্যে যে সময় শ্রীপ্রভুর গতি ।
সে সময় দেবদেব মহেশ-মূরতি ॥ ১৩০ ॥
পূর্বাস্থ্যে যখন প্রভু ফিরেন আবার ।
তখন মোহিনী ঠামা প্রতিমা শ্যামার ॥ ১৩১ ॥
গড়ন আকৃতি ঠিক সমতুল সাথে ।
অবিকল যেন দেবী মন্দিরের মাঝে ॥ ১৩২ ॥
শিবকালী যুগ্মরূপ প্রভুর শরীরে ।
ভাগ্যবান শ্রীমথুর দেখে বারে বারে ॥ ১৩৩ ॥
মথুর প্রথমে বুঝে আঁখির বিকার ।
পূর্ববৎ তাই যত দেখে বারংবার ॥ ১৩৪ ॥
আনন্দ-উচ্ছ্বাস হৃদে এত বলবতী ।
মথুর হইল যাহে ধৈরয-বিচ্যুতি ॥ ১৩৫ ॥
দ্রুতগতি উপনীত প্রভুর নিকটে ।
ধরিয়া চরণপদ্ম কাঁদে আর লুটে ॥ ১৩৬ ॥
ঠাকুর বলেন হেন করিতে যে নাই ।
তুমি গণ্য মান্য বাবু রানীর জামাই ॥ ১৩৭ ॥
অপরে দেখিলে পরে কি কবে তোমায় ।
এত বলি সান্ত্বনা করেন প্রভুরায় ॥ ১৩৮ ॥
তখন কি শুনে কথা কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে ।
বারংবার পদদ্বয় ধরে জড়াইয়ে ॥ ১৩৯ ॥
তবে জিজ্ঞাসিল প্রভু হেন কি কারণ ।
বৃত্তান্ত খুলিয়া কহ করিব শ্রবণ ॥ ১৪০ ॥
মুখে না বেরায় বাণী গদ্গদ স্বরে ।
আমূল দর্শন যাহা কহিল গোচরে ॥ ১৪১ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন একি কথা কহ তুমি ।
কি জানি আমি তো বাবু কিছুই না জানি ॥ ১৪২ ॥
মথুর না শুনে কথা মুখপানে চায় ।
ধরিয়া অভয় পদ অবনী লুটায় ॥ ১৪৩ ॥
নানামতে বুঝাইতে তবে তারপর ।
ক্রমে ক্রমে ধীরে ধীরে শান্ত ভক্তবর ॥ ১৪৪ ॥
করজোড় করি কহে বুঝিনু সকল ।
সত্যই ফলিল মোর ঠিকুজির ফল ॥ ১৪৫ ॥
মথুরের ঠিকুজিতে লেখা হেন কথা ।
সশরীরে সঙ্গে রবে তার ইষ্ট মাতা ॥ ১৪৬ ॥
প্রত্যক্ষ করিয়া আজি ঠিকুজির ফল ।
শ্রীপদে উপজে ভক্তি বিশ্বাস অটল ॥ ১৪৭ ॥
দুঁহু সঙ্গে দোঁহাকার সম্বন্ধ মধুর ।
সেবক ভাণ্ডারী সখা মন্ত্রী শ্রীমথুর ॥ ১৪৮ ॥
প্রভুরও অপার কৃপা মথুরে প্রতি ।
ত্রাতা পাতা রক্ষাকর্তা দুকালের গতি ॥ ১৪৯ ॥
একদিন প্রভুদেব শিবের মন্দিরে ।
করেন মহিম্নঃস্তোত্র পাঠ ধীরে ধীরে ॥ ১৫০ ॥
মহেশ-মাহাত্ম্যগাথা স্তোত্র বিরচিত ।
তাহাতে শ্রীপ্রভুদেব হন ভাবান্বিত ॥ ১৫১
॥
তখন ভুলিয়া স্তব উচ্চৈঃস্বরে কন ।
ওগো মহাদেব তব মহিমা-কথন ॥ ১৫২ ॥
কেমনে কহিব
আমি কি শক্তি আমার ।
গণ্ড বেয়ে দুনয়নে বহে অশ্রুধার ॥ ১৫৩ ॥
শুনিয়া রোদন রোল যে
যেখানে ছিল ।
ব্যাপার জানিতে সেথা আসিয়া জুটিল ॥ ১৫৪ ॥
উন্মত্ত পাগল প্রভু
তাহাদের চোখে ।
রহস্য কৌতুকবৎ দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ১৫৫ ॥
নানাজনে কহে নানা উপহাস করি ।
কেহ কয় আজি বড় কাণ্ড বাড়াবাড়ি ॥ ১৫৬ ॥
কেহ কয় এমন কোথাও নাহি দেখি ।
কেহ বলে
শিবের ঘাড়েতে চড়ে নাকি ॥ ১৫৭ ॥
কেহ কর কাছে গিয়া সামালো সামালো ।
হাত ধ'রে
বাহিরেতে টেনে আনা ভাল ॥ ১৫৮ ॥
শুভ যোগ শ্রীমথুর আজি এইখানে ।
আসিছেন দ্রুতগতি
কোলাহল শুনে ॥ ১৫৯ ॥
সসম্ভ্রমে ভৃত্যগণে ছেড়ে দিল বাট ।
যেখানে জমিয়াছে মানুষের হাট ॥ ১৬০ ॥
দেখিল মন্দিরমধ্যে গুণাকর রায় ।
ভাবেতে বিভোর চিত্ত শিবমহিমায় ॥ ১৬১ ॥
মথুর দেখিয়া চিত্র মুগ্ধ অতিশর ।
নীরব আলেখ্যবৎ দাঁড়াইয়া রয় ॥ ১৬২ ॥
একজন কর্মচারী কহে যুক্তিমতে ।
টানিয়া আনিতে দেবে মন্দির হইতে ॥ ১৬৩ ॥
বিরক্তিব্যঞ্জক স্বরে কহেন মথুর ।
কার সাধ্য শ্রীঅঙ্গ পরশে শ্রীপ্রভুর ॥ ১৬৪ ॥
মাথার উপরে মাথা যে জনার আছে ।
সেই যেন এ সময় যায় ওঁর কাছে ॥ ১৬৫ ॥
পশ্চাতে আসিল বাহ্য ভাব-অবসানে ।
দেখেন লোকের হাট বসেছে পেছনে ॥ ১৬৬ ॥
তন্মধ্যে মথুরানাথ সবার অগ্রণী ।
বালকের মত ত্রস্ত হ'য়ে গুণমণি ॥ ১৬৭ ॥
কহিলেন মথুরের মুখপানে চেয়ে ।
করে কি ফেলেছি কিছু বেসামাল হ'য়ে ॥ ১৬৮ ॥
মথুর কহিল অগ্রে করিয়া প্রমাণ ।
তুমি তো করিতেছিলে শিবস্তুতি গান ॥ ১৬৯ ॥
না বুঝিয়া কর্ম মর্ম যদি কোন জনে ।
তোমারে বিরক্ত করে সেই সে কারণে ॥ ১৭০ ॥
সাবধানে সসতর্কে হেথা বহুক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া আছি আমি দ্বারীর মতন ॥ ১৭১ ॥
ধন্য ধন্য শ্রীমথুর ধন্য ধন্য তুমি ।
তোমার শাশুড়ী ধন্য রানী রাসমণি ॥ ১৭২ ॥
তোমার গৃহিণী ধন্য জগদম্বা নাম ।
তোমাদের যেহ কেহ সকলে প্রণাম ॥ ১৭৩ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
রাসমণি কর্তৃক পরীক্ষা
জয় রামকৃষ্ণ নাম অহেতুকী রূপাধাম
প্রাণারাম
পরাশান্তিদাতা ।
অপার করুণাসিন্ধু দুর্বল দীনের বন্ধু
পতিতপাবন
ত্রাতা পাতা ॥ ১ ॥
জয় জগৎজননী কৃপাময়ী নিস্তারিণী
ব্রাহ্মণ-নন্দিনী গুরুদারা ।
জয় ইষ্ট-গোষ্ঠিগণ শ্রীপ্রভুর প্রাণধন
অধমের করহ
কিনারা ॥ ২ ॥
না চাই সিদ্ধাই বল সপ্তদীপ ধরাতল
প্রতিপত্তি সম্পত্তি ধরায় ।
কর মোরে শক্তিদান গাব প্রভু-লীলাগান
শুনে যেন
মন ভুলে যায় ॥ ৩ ॥
শুন শুন ওরে মন মহাতম বিনাশন
পরীক্ষা
কখন অতি মিঠে ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীপ্রভু জগৎগুরু
যাহা দিলা
ভক্তের নিকটে ॥ ৪ ॥
বারে বারে শ্রীপ্রভুর পরীক্ষা কৈল মথুর
রাসমণি
শাশুড়ী এবারে ।
আনিয়া রূপসী দুটি
সাজাইল পরিপাটি
নানাবিধ
স্বর্ণ-অলঙ্কারে ॥ ৫ ॥
মুনি-মন মুগ্ধ করে বারেক আঁখিতে হেরে
পরমা
সুন্দরী দুই জন ।
রানীর সুযুক্তি মতে ধীরে ধীরে চলে রেতে
টলাইতে
শ্রীপ্রভুর মন ॥ ৬ ॥
এখানে পরীক্ষা তরে
শ্রীপ্রভুর শয়নাগারে
নিজভাবে
পতিত শয্যায় ।
কামিনী কুটিলমতি মোহনীয়া জাল পাতি
হাবভাবে
নিকটে দাঁড়ায় ॥ ৭ ॥
রঙ্গ কার কথা কয় রঙ্গিণী মোহিনীদ্বয়
নাহি ভয়
পাষাণ-অন্তরে ।
ক্রমে অগ্রসর হৈয়া শ্রীঅঙ্গ পরশে গিয়া
শ্রীপ্রভুর শয্যার উপরে ॥ ৮ ॥
অল্পবয়ঃ শিশুপ্রায় দেখিয়া বিকট কায়
শ্যামায়
ডাকেন মহাত্রাসে ।
বাহ্যহারা অচেতন প্রভুদেব নারায়ণ
কামিনীর
কলুষ পরশে ॥ ৯ ॥
প্রভু-অঙ্গ-পরশনে বারনারী দুইজনে
শুন কি
হৈল অতঃপরে ।
জনম-জনমার্জিত পাপে তাপে বিনির্মূক্ত
দিব্যভাব
উদয় অন্তরে ॥ ১০ ॥
অভয় চরণ ধরি ঢালে দু'হে আঁখি-বারি
অনিবার
বসি পদতলে ।
হ'য়ে মহা কৃপাবান উঠিলেন ভগবান
শ্রীবন্ধনে শ্যামা শ্যামা ব'লে ॥ ১১ ॥
দু'হে নমস্কার করি ত্রিতাপসন্তাপহারী
প্রভুদেব
কল্যাণবিধান ।
ভয়ে জড়সড় কায় বারনারী দুজনায়
করিলেন
অভয় প্রধান ॥ ১২ ॥
প্রভুর নাহিক রোষ রূপে গুণে আশুতোষ
শত দোষ
করিলে চরণে ।
তখন মার্জনা তাঁর দয়াময় অবতার
আগুসার
ভূভার-হরণে ॥ ১৩ ॥
জীবের দেখিয়া দুখ সদা বিদরিত বুক
অস্থির
মরম-বেদনায় ।
জ্বালায় যেতেন ছুটে নির্জন গঙ্গার তটে
অন্ধকার
বটের তলায় ॥ ১৪ ॥
শিবাগণ থেকে থেকে যখন প্রহরে ডাকে
সেই সঙ্গে
প্রভু নারায়ণ ।
সম্বোধিয়া শ্যামা মায় প্রাণাকুল যাতনায়
করিতেন
অশ্রু বিসর্জন ॥ ১৫ ॥
বলিতেন শ্যামা তুমি জীবের জনম-ভূমি
জগৎজননী
তব নাম ।
পাপে রত জীব প্রতি কৃপা কর কৃপাবতী
কৃপা বিনা
কি আছে কল্যাণ ॥ ১৬ ॥
হিতব্রত নিরবধি অহেতুক কৃপানিধি
বিধির
বিধান ছাড়া দয়া ।
আত্মসুখ-বিবর্জিত সাধন-ভজনে রত
জীবহেতু
মাত্র নর-কায়া ॥ ১৭ ॥
মজ মন মনসাধে এমন প্রভুর পদে
হৃদয় রতন
কমলার ।
ভজ পূজ সেব তাঁয় লুকায়ে রাখি হিয়ায়
ফলাফল না
করি বিচার ॥ ১৮ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
যোগ-সাধন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা শ্রবণমঙ্গল ।
গাইলে প্রফুল্ল হয় হৃদয়কমল ॥ ১ ॥
মন-ভূঙ্গ সুসৌরভে বসে গিয়া তায় ।
কমল-আসন গুরুচরণ-সেবায় ॥ ২ ॥
একদিন প্রভুদেব বসি বটমূলে ।
দেখিলা বসিয়া আছে পাখী দুটি ডালে ॥ ৩ ॥
একটি সুস্থির অন্য সচঞ্চল-কায় ।
হেলে দুলে নড়ে বুলে যেন ইচ্ছা যায় ॥ ৪ ॥
চঞ্চল
সুস্থির পানে চায় ঘনে ঘন ।
দেখিয়া সুস্থির করে বিস্তার বদন ॥ ৫ ॥
চঞ্চল ঢুকিল তার বদন বিবরে ।
হেন কালে চক্ষু বন্ধ করিল সুস্থিরে ॥ ৬ ॥
দেখিয়া প্রভুর হৈল চমকিত মন ।
এহেন ব্যাপার কিবা কিসের কারণ ॥ ৭ ॥
আত্মা-পরমাত্মা-তত্ত্ব হৃদয়ে উদয় ।
সচঞ্চল জীব আত্ম অন্য কিছু নয় ॥ ৮ ॥
সুখ দুঃখ হেতু মাত্র হেসে কেঁদে বুলে ।
সাক্ষী সব পরমাত্মা দেখিছে নিশ্চলে ॥ ৯ ॥
জীব আত্মাগত ধর্ম হেন রূপ রয় ।
সাধনা করিলে পরমাত্মে হয় লয় ॥ ১০ ॥
যো করি কিবা মর্ম হইতে বিদিত ।
অনুরাগী প্রভুদেব উৎকণ্ঠিত চিত ॥ ১১ ॥
ব্রাহ্মণী-সাহায্যে হইয়াছে সমাপন ।
তন্ত্রমতে যত কিছু সাধন-ভজন ॥ ১২ ॥
এবে যারে বলে পরব্রহ্ম নিরাকার ।
নির্গুণ নিষ্ক্রিয় জ্যোতি রূপাদির পার ॥ ১৩ ॥
আগোটা সৃষ্টির যেথা সত্তা হয় লয় ।
সে তত্ত্ব হইতে জ্ঞাত করিলা নিশ্চয় ॥ ১৪ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেব মানুষ-আকার ।
জৈব ভাবে আচরণ আহার বিহার ॥ ১৫ ॥
সাধন-ভজনে হয় গুরু প্রয়োজন ।
আপনি আসিয়া সঙ্গে হয় সংযোটন ॥ ১৬ ॥
এবে শুন বর্তমানে গুরুর বারতা ।
লীলারস-পরিপূর্ণ রগড়ের কথা ॥ ১৭ ॥
যোগসাধনার চিন্তা হয় দিবানিশি ।
হাজির এহেন কালে জনৈক সন্নাসী ॥ ১৮ ॥
হেথা কিবা প্রয়োজন এখানে কেমনে ।
উদ্দেশ্য যাইবে গঙ্গাসাগর-সঙ্গমে ॥ ১৯ ॥
অতিথিশালায় তাই পুরীর ভিতর ।
অদ্ভুত প্রভুর সঙ্গে মিলন খবর ॥ ২০ ॥
একদিন প্রভুদেব শ্যামার মন্দিরে ।
পূর্বমুখে সমাসীন প্রতিমা-গোচরে ॥ ২১॥
ভাবের আবেশভরে দেখিবারে পান ।
নামিয়া গঙ্গায় এক সাধু করে স্নান ॥ ২২ ॥
কৃতকর্ম যোগিবর তেজঃপুঞ্জকায় ।
প্রাচীন বয়স জটাসম্ভার মাথায় ॥ ২৩ ॥
কৌপীন নাহিক নেংটা উলঙ্গ-আচারী ।
যোগিজন-অগ্রগণ্য নাম তোতাপুরী ॥ ২৪ ॥
তোতায় দেখিয়া তাঁর বড় খুশী মন ।
অতিথিশালায় দু'হে হৈল সম্মিলন ॥ ২৫ ॥
তোতাও তেমতি প্রীত প্রভুদেবে হেরে ।
বাসনা প্রভুর সঙ্গে আলাপন করে ॥ ২৬ ॥
মনোমত মুর্তি শক্তি গায়ে করে খেলা ।
মনে সাধ পায় যদি করে তাঁর চেলা ॥ ২৭ ॥
তাই বলে প্রভুদেবে প্রফুল্লবদন ।
কি বাচ্চা করিবে কিছু সাধন ভজন ॥ ২৮ ॥
উত্তর বচনে প্রভু বলিলেন তাঁকে ।
পশ্চাৎ কহিব কথা জিজ্ঞাসিয়া মাকে ॥ ২৯ ॥
মাতৃগতপ্রাণ প্রভু জিজ্ঞাসিতে মায় ।
চলিলা মন্দিরমধ্যে প্রতিমা যেথায় ॥ ৩০ ॥
বালকের চেয়ে প্রভু বালক সরল ।
যতেক ঘটনা মায়ে কহিলা সকল ॥ ৩১ ॥
বালকবৎসলা মাতা অতি তুষ্ট মনে ।
দিলা আজ্ঞা ভাবাতীত অরূপ সাধনে ॥ ৩২ ॥
সেই সঙ্গে সমাগত সন্ন্যাসীর কথা ।
আমূল জীবনে তার যতেক বারতা ॥ ৩৩ ॥
সাধনার পথে কতদূর আগুয়ান ।
এখানে কেমনে এবে কিবা তার নাম ॥ ৩৪ ॥
মনোমত দ্রব্য পেয়ে মায়ের সকাশে ।
বালক যেমন মহা আনন্দেতে ভাসে ॥ ৩৫ ॥
তেমনি আনন্দমতি প্রভুদেব রায় ।
পালটিয়া চলিলেন অতিথিশালায় ॥ ৩৬ ॥
আগ্রহে সন্ন্যাসিবর উপবিষ্ট যেথা ।
গিয়াই বলেন নাম তোমারই কি তোতা ॥ ৩৭ ॥
বিস্ময়ে পূর্ণিতান্তর তোতা ভাবে মনে ।
আমার যে তোতা নাম জানিল কেমনে ॥ ৩৮ ॥
এদেশে কাহারও সঙ্গে নাই জানা শুনা ।
ত্রিরাত্রির বেশী কোথা কভু নহে থানা ॥ ৩৯ ॥
এ তীর্থে ও তীর্থে অবিরত ভ্রাম্যমাণ ।
কেমনে পাইল বাচ্চা নামের সন্ধান ॥ ৪০ ॥
যোগসিদ্ধ যোগিবর সবিস্ময় মন ।
বলিলেন পরে প্রভু করিব সাধন ॥ ৪১ ॥
তোতা কহে তিন দিন মাত্র আমি রব ।
তীর্থপর্যটনে ঘুরি তীর্থান্তরে যাব ॥ ৪২ ॥
সুকৌশলী প্রভু যেন হেন আর কোথা ।
সর্বদা তোতার সঙ্গে অরূপের কথা ॥ ৪৩ ॥
আহার বিরাম নাই এত মত্ততর ।
সপ্তাহ চলিয়া যায় নাহিক খবর ॥ ৪৪ ॥
প্রভুকে পাইয়া তোতা মহাতোষ পায় ।
তীর্থগমনের কথা না আসে মাথায় ॥ ৪৫ ॥
ত্রাসিতা ব্রাহ্মণী হেথা শুনিয়া বারতা ।
বেদান্ত-সাধনে শ্রীপ্রভুর ব্যাকুলতা ॥ ৪৬ ॥
মিষ্টভাষে প্রভুদেবে করে নিবারণ ।
অরূপ সাধনে আছে কিবা প্রয়োজন ॥ ৪৭ ॥
কখন না কর হেন ইহাতে কি কাজ ।
শক্তি-প্রতিবাদী ভক্তিহীন যোগিরাজ ॥ ৪৮ ॥
বিশুষ্ক জ্ঞানের কাণ্ডে ভক্তি হয় ক্ষয় ।
যথা তত্ত্ব ব্রাহ্মণী কহিল সমুদয় ॥ ৪৯ ॥
কোন কথা ব্রাহ্মণীর না হয় শ্রবণ ।
সন্ন্যাস লইয়া সাধ ব্রহ্মের সাধন ॥ ৫০ ॥
দক্ষিণ শহরে এবে আই ঠাকুরাণী ।
গদাধর-গতপ্রাণ গদাই-পরানী ॥ ৫১ ॥
প্রভুরও তেমতি ভক্তি মায়ের উপর ।
কোথাও না দেখি শুনি হেন পূর্বাপর ॥ ৫২ ॥
মায়ের চরণধূলি মাখিতেন গায় ।
ঈশ্বরীর জ্ঞানে ভক্তি মাগিতেন মায় ॥ ৫৩ ॥
সকল কর্মের আগে উঠি প্রাতঃকালে ।
প্রণাম করেন মায়ে ভক্তি দাও বলে ॥ ৫৪ ॥
জননীরে দিলে কোন মনের বেদনা ।
বলিতেন শ্যামা তার না শুনে প্রার্থনা ॥ ৫৫ ॥
ঈশ্বরের পদে ভক্তি কখনও না মিলে ।
যদি ভাগ্যদোষে মাতা আঁখিজল ফেলে ॥ ৫৬ ॥
মাতা তুষ্টে সব তুষ্ট তুষ্ট জগজন ।
যত দেবদেবী তুষ্ট তুষ্ট নারায়ণ ॥ ৫৭ ॥
পরম দুর্লভ ভক্তি মিলে অনায়াসে ।
আজন্ম যদ্যপি কেহ জননীরে তোষে ॥ ৫৮ ॥
মায়ের সন্তোষ আর মাতৃপদে মন ।
সাধনার মধ্যে তাঁর এ এক সাধন ॥ ৫৯ ॥
আর বলিতেন প্রভু জগৎগোসাঁই ।
বাপ মায়ে হরগৌরী-সমজ্ঞান চাই ॥ ৬০ ॥
মায়ের পরানধন প্রভু গদাধর ।
সংসারে বিরাগহেতু চিন্তা নিরন্তর ॥ ৬১ ॥
সন্ন্যাসগ্রহণ-কথা যদি ঢুকে কানে ।
শেলের সমান ব্যথা লাগিবে পরানে ॥ ৬২ ॥
এতেক
বুঝিয়া প্রভু যোগিবরে কত ।
সংগোপনে করিবেন সন্ন্যাস গ্রহণ ॥ ৬৩ ॥
কারণ হইয়া জ্ঞাত যোগিবর খুশী ।
বেশ বলি দিল সায় ব্রহ্মজ্ঞ সন্ন্যাসী ॥ ৬৪ ॥
গোপনে গ্রহণ কৈলে নাহি কিছু হানি ।
শুভদিন নির্ধারিত হইল তখনি ॥ ৬৫ ॥
দীক্ষাকাণ্ডে নানাবিধ দ্রব্য প্রয়োজন ।
বিধানানুমত শ্রাদ্ধ হোমের কারণ ॥ ৬৬ ॥
আয়োজন সর্বাঙ্গীণ হইল সকল ।
শুভক্ষণহেতু দুয়ে সতত বিকল ॥ ৬৭ ॥
বিকলতা শ্রীপ্রভুর স্বতঃ স্বাভাবিক ।
শিষ্যপ্রেমে মুগ্ধ তোতা তা হ'তে অধিক ॥ ৬৮ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে সুলক্ষণ প্রত্যক্ষ বিরাজ ।
যাহে বিমোহিত চিত এত যোগিরাজ ॥ ৬৯ ॥
শুভদিন সমাগত দীক্ষা অঙ্গ শেষ ।
পরে সাধনাঙ্গে দিলা বিধি উপদেশ ॥ ৭০ ॥
নামরূপ রাজ্য থেকে গুটাইয়া মন ।
ভাবাতীতে গুণাতীতে করিতে মিলন ॥ ৭১ ॥
আজীবন শ্রীপ্রভুর ভাবরাজ্যে বাস ।
ভাবময়ী জগমাতা চরণে প্রয়াস ॥ ৭২ ॥
মহোল্লাস ভাবেশ্বরী মায়েরে দেখিয়ে ।
মন নাহি চায় যেতে তাঁহারে ছাড়িয়ে ॥ ৭৩ ॥
যেখানেতে ভাবাতীত ব্রহ্মের বিহার ।
দেশকালহীন রাজ্য শূন্য একাকার ॥ ৭৪ ॥
কাজেই আসেন বাহ্যে ফিরিয়ে ফিরিয়ে ।
তা দেখি ব্রহ্মজ্ঞ শুরু উঠে গরজিয়ে ॥ ৭৫ ॥
সূচামের বিদ্ধ ভূমি অণুর ভিতর ।
প্রবেশিয়া দাও মন করি সূক্ষ্মতর ॥ ৭৬ ॥
প্রাণপণে প্রভু পুনঃ বসিলা ধিয়ানে ।
ক্রমে উপনীত ভাবময়ীর ভুবনে ॥ ৭৭ ॥
নিরুপমা মূর্তি মার নয়নগোচর ।
জ্ঞান-অসি দিয়া রূপ কাটিলা সত্বর ॥ ৭৮ ॥
রূপ নষ্টে দ্রুতগতি ধাবমান মন ।
সমরস হয়ে ব্রহ্মে হইল মিলন ॥ ৭৯ ॥
দীক্ষাগুরু ব্রহ্মবাদী নিকটে বসিয়ে ।
শিষ্যের অবস্থা দেখে বিশেষ করিয়ে ॥ ৮০ ॥
নির্বিকল্প সমাধির যতেক লক্ষণ ।
সুস্পষ্ট শ্রীঅঙ্গে করে সব নিরীক্ষণ ॥ ৮১ ॥
তথাপি সন্দেহ তাঁর বার বার মনে ।
চল্লিশ বৎসর গতে সিদ্ধ যে সাধনে ॥ ৮২ ॥
এখানে কেমনে তাহা একদিনে হয় ।
ব্রহ্মজ্ঞ না পারে কিছু করিতে নির্ণয় ॥ ৮৩ ॥
সন্দেহমোচনে পুনঃ বসে পরীক্ষায় ।
পূর্ববৎ লক্ষণাদি দেখিবারে পায় ॥ ৮৪ ॥
তখন অর্গলবদ্ধ করিয়া দুয়ারে ।
প্রহরিস্বরূপ গুরু রহিল বাহিরে ॥ ৮৫ ॥
একদিন দুইদিন তিনদিন গেল ।
তথাপি প্রভুর সাড়া-শব্দ না পাইল ॥ ৮৬ ॥
তখন কুটীরে গিয়া দেখিল গোস্বামী ।
যে ভাবে প্রথমে দেখা এখন তেমনি ॥ ৮৭ ॥
প্রাণের সঞ্চার দেহে নহে অনুমান ।
ভিতরের বায়ু-রোধ জড়ের সমান ॥ ৮৮ ॥
আসনস্থ দেহখানি অটল অচল ।
শ্রীবদনে ভাতে জ্যোতি অতীব উজ্জ্বল ॥ ৮৯ ॥
সমাধি করিতে ভঙ্গ যে ক্রিয়ার বিধি ।
তাই আচরিয়া এবে ভাঙ্গায় সমাধি ॥ ৯০ ॥
প্রভুর রকম দেখি তোতা বুদ্ধিহারা ।
বুঝিয়া না পারে কিছু করিতে কিনারা ॥ ৯১ ॥
শ্রীপ্রভু তোমার খেলা বুঝে সাধ্য কার ।
তুমি জগতের গুরু কে গুরু তোমার ॥ ৯২ ॥
ধরি নানারূপ কর নরবৎ রীতি ।
কার্যেতে প্রকাশ পায় অতুল শকতি ॥ ৯৩ ॥
যোগিজন-অগ্রগণ্য যোগসিদ্ধ তোতা ।
সেও না খুঁজিয়া পায় কিছুই বারতা ॥ ৯৪ ॥
সর্বদার ঘোল খায় মাথা যায় ঘুরে ।
কাছে যেতে কৈলে চেষ্টা পড়ে বহুদূরে ॥ ৯৫ ॥
তাই কহে মায়া সব সত্য কিছু নয় ।
শুন কি হইল পরে তার পরিচয় ॥ ৯৬ ॥
মা বলিয়া যবে প্রভু শ্যামায় সন্তাষে ।
শক্তিতে বিশ্বাস শুনি তোতাপুরী হাসে ॥ ৯৭ ॥
সাকার ভ্রান্তির কথা বৈদান্তিক স্থানে ।
মায়ার ব্যাপার কয় কিছু নাহি মানে ॥ ৯৮ ॥
শক্তির সাবস্তে প্রভু যথা কথা কন ।
তোতা তত প্রতিবাদ করে সমর্থন ॥ ৯৯ ॥
সকল মায়ার খেলা কিছু নয় সত্য ।
তোতার উত্তর এই প্রভু কন যত ॥ ১০০ ॥
কেমনে নরের হৃদে উপজে বারতা ।
উভয় সাকার নিরাকার এক কথা ॥ ১০১ ॥
একত্রিত বিপরীত ভাব এক ঠাঁই ।
সকল রঙের ভূমি জগৎ-গোসাঁই ॥ ১০২ ॥
প্রভুর কৃপায় যাহা হৃদয়ে আভাস ।
না পাই কথায় তার করিতে প্রকাশ ॥ ১০৩ ॥
সাকারেতে রূপরসগন্ধাদি আকার ।
নিরাকারে কিছু নাই খবর তাহার ॥ ১০৪ ॥
মহান তটিনী-স্রোতে ভাসমান তরী ।
আরোহী কতই দেখে প্রান্তর নগরী ॥ ১০৫ ॥
ফলে ফুলে পরিপূর্ণ বৃক্ষলতাগণ ।
উচ্চশৃঙ্গ গিরিবর বিপিন কানন ॥ ১০৬ ॥
মনোহরা ধরা পরা নানাবিধ সাজে ।
দিনেশ চন্দ্রিমা তারা গগনে বিরাজে ॥ ১০৭ ॥
পলকে পলকে উঠে ভাবের লহরী ।
কিন্তু যবে সিন্ধুগত হয় সেই তরী ॥ ১০৮ ॥
তখন কি দেখে দেখ আরোহীর গণ ।
কারিগুরি রকমারি অদৃশ্য এখন ॥ ১০৯ ॥
সকল মিশেছে জলে কিছু নাহি আর ।
যে দিকে নেহারে হেরে বারি একাকার ॥ ১১০ ॥
গেছে চন্দ্র গেছে সূর্য গেছে গিরিবর ।
বিপিন কানন গেছে গিয়াছে প্রান্তর ॥ ১১১ ॥
গেছে ফুল-ফল-ভরা বৃক্ষলতাগণ ।
মনোহরা সাজে পরা ধরা সুশোভন ॥ ১১২ ॥
ভাবের লহরী গেছে তাহার সংহতি ।
গেছে মন গেছে প্রাণ গেছে বুদ্ধি স্মৃতি ॥ ১১৩ ॥
গিয়াছে আরোহিগণ গিয়াছে তরণী ।
কি দেখে কি দেখে আর কিছু নাহি জানি ॥ ১১৪ ॥
নিরাকার কি প্রকার প্রভুর বচন ।
গেলে তথা নহে আর পুনরাগমন ॥ ১১৫ ॥
জল মাপিবারে গেলে নুনের মানুষে ।
গলে যায় ঠাণ্ডা বায় ফিরে নাহি আসে ॥ ১১৬ ॥
কিন্তু মন দেখিয়াছি প্রভু পরমেশ ।
ক্ষণে ক্ষণে ভ্রমিতেন এদেশ ওদেশ ॥ ১১৭ ॥
দেহাদিবিলুপ্তভাবে যদি এই ক্ষণে ।
কিছু পরে মা মা রব ফুটে শ্রীবদনে ॥ ১১৮ ॥
জীবে যদি গুরুবলে সপ্তমেতে যায় ।
আর কার নাহি সাধ্য তাহারে ফিরায় ॥ ১১৯ ॥
শ্রীপ্রভুর মহাশক্তি যে শক্তির বলে ।
এই স্থিতি অতি ঊর্ধ্বে এই অধস্তলে ॥ ১২০ ॥
হেন প্রভু মানুষের বুঝা বড় দায় ।
একঘেয়ে সিদ্ধযোগী কত ঘোল খায় ॥ ১২১ ॥
সাধন-ভজনে হয় গুরু-প্রয়োজন ।
আগাগোড়া চিরকাল তাঁহার নিয়ম ॥ ১২২ ॥
পালিবারে স্বকৃত নিয়ম ভগবান ।
লোকশিক্ষা হেতুমাত্র গুরুরে আনান ॥ ১২৩ ॥
জগতের শুরু যিনি হর্তা পাতা ত্রাতা ।
কে আবার গুরু তাঁর কেবা শিক্ষাদাতা ॥ ১২৪ ॥
যেবা মহাভাগ্যবান গুরুরূপে আসে ।
অমুল্য রতন পায় প্রভুর সকাশে ॥ ১২৬ ॥
দম্ভ ভারি তোতাপুরী না মানে সাকার ।
যা দেখে যা শুনে কয় কৌশল মায়ার ॥ ১২৭ ॥
একদিন যোগিবর ধুনি জ্বেলে ব'সে ।
হেনকালে জনেক আগুন নিতে আসে ॥ ১২৮ ॥
যেমন লইল অগ্নি তোতা দেখি তায় ।
রাগেতে চিমটা ধরি তাড়া করি যায় ॥ ১২৯ ॥
ক্রুদ্ধ দেখি যোগিবরে শালা শালা বলি ।
বাহ্য কুপি প্রভুদেব দিলা তায় গালি ॥ ১৩০ ॥
রূপ গুণ কার্য যদি মায়ার সৃজন ।
কারে তবে কর ক্রোধ কারে আক্রমণ ॥ ১৩১ ॥
সলজ্জবদন তোতা বাক্য নাহি সরে ।
শুদ্ধমাত্র ঠিক বাত ঠিক বাত করে ॥ ১৩২ ॥
বচনে মানিল মাত্র আপনার ভ্রম ।
হৃদয় যেমন তাই পূর্বের মতন ॥ ১৩৩ ॥
সাকার শক্তিতে নাই কোনই বিশ্বাস ।
বরঞ্চ শুনিলে কথা করে উপহাস ॥ ১৩৪ ॥
পঞ্চবটমূলে তোতা সাজাইত ধুনি ।
তথায় কাটিয়া যায় আগোটা রজনী ॥ ১৩৫ ॥
সচৈতন্য সিদ্ধস্থান পঞ্চবটতল ।
যে করে সাধনা তথা না হয় বিফল ॥ ১৩৬ ॥
ভৈরবে সে স্থান রক্ষা করে নিরন্তর ।
তোতা রেতে কি দেখিল শুন অতঃপর ॥ ১৩৭ ॥
বিকটদর্শন সেই ভৈরব-আকার ।
আগুনের কাছে বসে নিকটে তোতার ॥ ১৩৮ ॥
দেখি তোতা কহে তায় ত্রাসশূন্যকায়া ।
তুমিও মায়ার চিত্র আমি যেন মায়া ॥ ১৩৯ ॥
সমুঝে সকল মায়া যাহা দেখে শুনে ।
সাকার শক্তির কথা আদতে না মানে ॥ ১৪০ ॥
শক্তির সম্বন্ধে প্রভু যত কন তায় ।
মায়া মায়া বলি তোতা হাসিয়া উড়ায় ॥ ১৪১ ॥
যদি প্রভু কোন দিন না করেন ধ্যান ।
বলিতেন যোগিবর প্রভু-সন্নিধান ॥ ১৪২ ॥
নিত্য প্রথামত ধ্যান না করিলে পরে ।
পিতলের পাত্রসম মনে ম'লা ধরে ॥ ১৪৩ ॥
যোগিবরে শ্রীপ্রভুর উত্তর হইত ।
পাত্র যদি হয় শুদ্ধ সুবর্ণে গঠিত ॥ ১৪৪ ॥
কেমনে ধরিবে ম'লা ওহে যোগিবর ।
শুনি তোতা একেবারে মৌন নিরুত্তর ॥ ১৪৫ ॥
তথাপি না বুঝে তোতা প্রভু কোন্ জনা ।
একমনে শুন মন পশ্চাৎ ঘটনা ॥ ১৪৬ ॥
সন্ধ্যাকালে একদিন দিয়া করতালি ।
নাচেন শ্রীপ্রভু মুখে হরিবোল বলি ॥ ১৪৭ ॥
সন্ন্যাসীরা এইমত হাতে পিটি পিটি ।
থাবার কারণ গড়ে ময়দার রুটি ॥ ১৪৮ ॥
প্রভু প্রতি কহে তোতা উপহাসছলে ।
দেখি হাতে পিটি রুটি কেমন করিলে ॥ ১৪৯ ॥
ইহা শুনি প্রভুদেব বুঝিলা কেমন ।
দিনত্রয় না করিলা কথোপকথন ॥ ১৫০ ॥
গালি দিয়া ক্রুদ্ধ যারে প্রভু ভগবান ।
ধরায় তাহার মত নাহি ভাগ্যবান ॥ ১৫১ ॥
রুষ্টে তুষ্টে সমফল মঙ্গল-আকর ।
রামকৃষ্ণ অবতার দয়ার সাগর ॥ ১৫২ ॥
যোগিবরে সাকার শক্তির স্বরূপত্ব ।
বিধিমতে শিক্ষা দিতে কৈলা স্থিরীকৃত ॥ ১৫৩ ॥
শিখাবার সুকৌশল হেন দেখি নাই ।
যেন দেখিতেছি প্রভু শ্রীগুরুর ঠাঁই ॥ ১৫৪ ॥
কথায় না বুঝে যেবা শিক্ষা পায় কাজে ।
আজন্ম স্মরণ শিক্ষা হাড়ে হাড়ে ভিজে ॥ ১৫৫ ॥
তোতারে কেমন শিক্ষা দিলা ভগবান ।
অতি রগড়ের কথা রহস্য আখ্যান ॥ ১৫৬ ॥
দুই তিন দিন মধ্যে সিদ্ধ যোগিবর ।
হইলেন উদরের পীড়ায় কাতর ॥ ১৫৬ ॥
রক্ত-আমাশয় পীড়া জীর্ণ শীর্ণ কায় ।
যন্ত্রণায় ভূমিতলে গড়াগড়ি যায় ॥ ১৫৭ ॥
রকম রকম খায় কতই ভসম ।
কিসেও না হয় কিছু পীড়া-উপশম ॥ ১৫৮ ॥
হরদম ল'য়ে লোটা যায় ছুটে ছুটে ।
শরীর ধনুকখানি বাম হাত পেটে ॥ ১৫৯ ॥
যন্ত্রণায় একদিন বড়ই অস্থির ।
স্থিরতর কৈল দিবে ছাড়িয়া শরীর ॥ ১৬০ ॥
সুরধুনীজলে মগ্ন মরণ উপায় ।
জ্ঞানশূন্য সিদ্ধযোগী নামিল গঙ্গায় ॥ ১৬১ ॥
প্রভুর ইচ্ছায় যোগিবর যার যত ।
কোথাও না পায় জল ডুবিবার মত ॥ ১৬২ ॥
পাতালপরশী জল গঙ্গার মাঝারে ।
তোতার নাহিক উঠে হাঁটুর উপরে ॥ ১৬৩ ॥
ভিতরে কৌশল কিবা ভাবিয়া না পাই ।
কে বুঝিবে কিবা কল করিলা গোসাঁই ॥ ১৬৪ ॥
বিফল প্রয়াস দেখি সিদ্ধ যোগিবর ।
কাঁদিতে কাঁদিতে আসে প্রভুর গোচর ॥ ১৬৫ ॥
কহিল তাঁহারে কত করিয়া মিনতি ।
কেমনে আরোগ্য হই করহ যুকতি ॥ ১৬৬ ॥
দয়া করি প্রভুদেব উত্তরিলা তায় ।
আরোগ্য যদ্যপি কর প্রণাম শ্যামায় ॥ ১৬৭ ॥
শুনা মাত্র চলিলেন শ্যামার মন্দিরে ।
করজুড়ি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম তোতা করে ॥ ১৬৮ ॥
ফিরে আসি দেখিলেন আর নাহি ব্যাধি ।
শক্তিতে বিশ্বাস তার হৈল তদবধি ॥ ১৬৯ ॥
ব্যাপারে বিস্ময়াপন্ন তোতা যোগিরাজ ।
মুখে নাই কোন বাক্য কানে করে কাজ ॥ ১৭০ ॥
এতদিনে পূর্ণজ্ঞান হৈল তোতার ।
প্রাণে প্রাণে বুঝিলেন যিনি নিরাকার ॥ ১৭১ ॥
নির্গুণ অরূপা নাম অনন্ত অখণ্ড ।
তিনিই বিরাটরূপে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড ॥ ১৭২ ॥
ক্রিয়াহীনে ব্রহ্মবাচ্য ক্রিয়াযুক্তে শক্তি ।
একভাবে জ্ঞান রূপ অন্য ভাবে ভক্তি ॥ ১৭৩ ॥
একের অবস্থাভেদে বিপরীত রীতি ।
নির্গুণে পুরুষ আর সগুণে প্রকৃতি ॥ ১৭৪ ॥
নব চক্ষু পেয়ে গেছে সব সন্দ ঘুচে ।
একে দেখে লক্ষ কোটি মহানন্দে নাচে ॥ ১৭৫ ॥
রূপের কথায় আগে ছিল উপহাস ।
এখন যা কন প্রভু করেন বিশ্বাস ॥ ১৭৮ ॥
পুরীমধ্যে দিনত্রয় থাকিবার কথা ।
একাদশ মাস এবে গত হৈল হেথা ॥ ১৭৯ ॥
প্রভুর মাহাত্ম্যকথা কি কহিব মন ।
কহিলেও কোটি কোটি তবু কোটি কন ॥ ১৮০ ॥
বিশুষ্ক জ্ঞানের কাণ্ড কেবল বিচার ।
রীতি ধরা সুর সেই একই প্রকার ॥ ১৮১ ॥
গম্ভীর গম্ভীর গতি নীরস নীরস ।
তিল মাত্র নাই রাগ-রাগিণীর রস ॥ ১৮২ ॥
আছিল বিশুদ্ধ যোগী জ্ঞান প্রখরায় ।
এবে প্রভু সঙ্গগুণে প্রভুর কৃপায় ॥ ১৮৩ ॥
মধুর সরস এবে মিঠানি মিঠানি ।
হৃদয়বীণায় বাজে ভক্তির রাগিণী ॥ ১৮৪ ॥
একদিন বীণাকণ্ঠ প্রভু গুণধর ।
শ্যামাগুণ গীত গান তোতার গোচর ॥ ১৮৫ ॥
ভাবেতে বিভোর তোতাপুরী যোগিবর ।
গণ্ড বেয়ে অশ্রু ঝরে বক্ষের উপর ॥ ১৮৬ ॥
কোথায় আছিল তোতা এখন কোথায় ।
ভাবরাজ্যেশ্বর প্রভু তাঁহার কৃপায় ॥ ১৮৭ ॥
রামকৃষ্ণ-গুণগীতি শ্রবণমঙ্গল ।
শ্রবণ-কীর্তনে মিলে ভক্তি নিরমল ॥ ১৮৮ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
মধুরভাবে সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা গাইলে শুনিলে ।
সাধন-ভজনহীন হেন কলিকালে ॥ ১ ॥
অনায়াসে মিলে সুদুর্লভ ভক্তিধন ।
হেলায় টুটিয়া যায় ভবের বন্ধন ॥ ২ ॥
অকূল-সাগর-পার দেশদেশান্তরে ।
নিজ প্রয়োজনে যদি কোন জন ফিরে ॥ ৩ ॥
মন-মুগ্ধ বিজাতীয় দ্রব্যাদি রকম ।
নিত্যই কতই শত করে দরশন ॥ ৪ ॥
নূতন নূতন সঙ্গে দিবানিশি বাস ।
তথাপি বিদেশী দুঃখে সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ॥ ৫ ॥
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ছাড়ে বদন মলিন ।
ভাবে করে পাবে পুনঃ জনম-জমিন্ ॥ ৬ ॥
সেইরূপ প্রভুদেব নানা অবস্থায় ।
পতিত যদিও তবু না ভুলেন মায় ॥ ৭ ॥
নানান সাধনে নানা মূর্তি আরাধনা ।
সাধনান্তে সেই নাম শ্যামা শ্যামা শ্যামা ॥ ৮ ॥
শ্যামার আনন্দময়ী পরমা মুরতি ।
সমভাবে হৃদে তাঁর জাগে দিবারাতি ॥ ৯ ॥
মা মা বোল অবিরত ফুটে শ্রীবদনে ।
শ্যামা সকলের মূল ষোল আনা মনে ॥ ১০ ॥
কখন রমণীবেশ ধরিলা আপুনি ।
সখীভাবে সেবিতেন জগৎ-জননী ॥ ১১ ॥
কখন শ্যামায় হয় চামরব্যজন ।
কখন প্রদান পরে বিল্ব সচন্দন ॥ ১২ ॥
মনেতে উদয় তাঁর যে ভাব যখন ।
জীবের অবোধ্য সেইমত আচরণ ॥ ১৩ ॥
বুঝিতেন শ্যামা মায় সকলের সার ।
যাবতীয় মুরতির শ্যামাই আধার ॥ ১৪ ॥
শ্যামা তুষ্টে সব তুষ্ট তবে সিদ্ধ কাজ ।
সর্ব ঘটে এক শ্যামা করেন বিরাজ ॥ ১৫ ॥
সাকারা আকারহীনা অনন্ত অদ্ভুত ।
যত অবতার শ্যামা-সিন্ধুর বুদ্বুদ ॥ ১৬ ॥
কুলকুণ্ডলিনী শ্যামা দ্বার দিলে ছেড়ে ।
তবে জীব যেতে পারে ইষ্টের গোচরে ॥ ১৭ ॥
শ্যামা গৃহ শ্যামা গৃহী শ্যামা রাজা রানী ।
দ্বারিরূপে দ্বার রক্ষা করেন আপুনি ॥ ১৮ ॥
শ্যামা সুপ্রসন্না অগ্রে না হইলে পরে ।
নঙ্গর ফেলিয়া জীব দাঁড় টেনে মরে ॥ ১৯ ॥
মহাশক্তি রাখে যদি প্রচ্ছন্ন মায়ায় ।
কোন কালে কোন্ বলে কে চৈতন্য পায় ॥ ২০ ॥
বরাবর তাই প্রভু প্রভু অবতারে ।
নিজে ভজি দিলা শিক্ষা শক্তি ভজিবারে ॥ ২১ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড রত্নের আকর ।
নানা ধর্মভাব মর্ম ইহার ভিতর ॥ ২২ ॥
রুচিপ্রিয় যাবতীয় সকলই মিলে ।
একা রামকৃষ্ণলীলা-সাগরে ডুবিলে ॥ ২৩ ॥
অতুল ব্রজের ভাব অবোধ্য বারতা ।
সুরের অজ্ঞাত তত্ত্ব নরের কা কথা ॥ ২৪ ॥
মায়া-বিরহিত পরিশুদ্ধ নির্বিকার ।
স্বার্থগন্ধ-পরিশূন্য ভাব শ্রীরাধার ॥ ২৫ ॥
অতীব সুগূঢ় তত্ত্ব অতি দুরজ্ঞেয় ।
রাধাই আধার তার রাধাই আধেয় ॥ ২৬ ॥
রূপ-রস-গন্ধ-আদি বিষয়বিমুখ ।
নিত্যসিদ্ধ আত্মারাম ব্যাস-পুত্র শুক ॥ ২৭ ॥
ব্রহ্মর্ষি নারদ ঋষি আধি মুনিগণ ।
পুরাণে বহুলভাবে করেছে কীর্তন ॥ ২৮ ॥
আসক্তি-সম্বল জীব স্বার্থগতপ্রাণ ।
ধরিতে ইহাতে নারে কহে কি পুরাণ ॥ ২৯ ॥
শুদ্ধসত্ত্বাধারে প্রেমধন মূর্তি ধরি ।
জীবে দিতে পরতত্ত্ব নিজে ব্রজেশ্বরী ॥ ৩০ ॥
বার বার অবতীর্ণ লীলার প্রাঙ্গণে ।
সম্বল সমর্থ প্রেম সাধ্যের তোষণে ॥ ৩১ ॥
এই যে মধুরভাব নিজস্ব রাধার ।
ষোল আনা পরিপূর্ণ তাঁর অধিকার ॥ ৩২ ॥
অন্য অন্য গোপিকার চারি পাঁচ আনা ।
একান্ত সেবিকা যারা রাইগতপ্রাণা ॥ ৩৩ ॥
জগজনে যে প্রতিমা জানা রাধা নামে ।
বিবাহিতা আয়ানের বাস বৃন্দাবনে ॥ ৩৪ ॥
জটিলে কুটিলে যাঁর শাশুড়ী ননদী ।
কৃষ্ণ-বিরাগিণী কৃষ্ণনামে প্রতিবাদী ॥ ৩৫ ॥
কুলাদি সর্বস্বহারা কৃষ্ণের কারণ ।
কৃষ্ণকলঙ্কিনী নাম অঙ্গের ভূষণ ॥ ৩৬ ॥
মূল স্বরূপত্ব তাঁর না জানিলে পরে ।
অধিকারী নহে ব্রজলীলা শুনিবারে ॥ ৩৪ ॥
ভূতের যেখানে নাই প্রবেশাধিকার ।
রূপ-রস-সন্ধাধির সাগরের পার ॥ ৩৫ ॥
অতিন্দ্রিয় রাজ্য যাহা পুরাণে কীর্তিত ।
ব্রহ্মভাবচন্দ্র হয় সেখানে উদিত ॥ ৩৬ ॥
রূপ-রসে মত্ত মন অভাবে বিষাদ ।
শুনে যদি ব্রজলীলা করে অপরাধ ॥ ৩৭ ॥
অচ্যুতের লীলামৃত শ্রবণ-মঙ্গল ।
জৈবভাবাপন্ন শুনে পার হলাহল ॥ ৩৮ ॥
শ্রীকৃঞ্চ অদ্বৈতভাবে ক্রিয়াগুণ-হীন ।
কৃষ্ণশক্তি রাধা থাকে তাহাতে বিলীন ॥ ৩৯ ॥
দুঁহু সঙ্গে দোঁহাকার এত প্রেম প্রীতি ।
এক ভিন্ন দুই আর না হয় প্রতীতি ॥ ৪০ ॥
এই প্রেমপ্রীতি করিবারে আস্বাদন ।
এক হয়ে দুঁহু কৈলা লীলার পত্তন ॥ ৪১ ॥
বৃন্দাবনে প্রেমঘন মূর্তি দোঁহাকার ।
উভয়ে বিশুদ্ধ সত্ত্ব ত্রিগুণের পার ॥ ৪২ ॥
ইহা না জানিয়া ব্রজলীলা শুনে যদি ।
মঙ্গল দূরের কথা হয় অপরাধী ॥ ৪৩ ॥
নিষ্কাম নিঃস্বার্থ ভাব মধুরেতে ভোগ ।
তৈলধারাবৎ যেথা শ্রীকৃষ্ণেতে যোগ ॥ ৪৪ ॥
বাহ্যে কি অন্তরে একা কৃষ্ণের স্ফুরণ ।
কৃষ্ণ ভিন্ন অন্য নাহি হয় দরশন ॥ ৪৫ ॥
মধুরের অঙ্গে খালি নিষ্কামের খেলা ।
কালেতে করিল জীব ভোগ দিয়া ঘোলা ॥ ৪৬ ॥
জীবের কল্যাণে ভাব করিতে প্রচার ।
রাধাভাবে নদীয়ার গৌরাঙ্গাবতার ॥ ৪৭ ॥
এবে প্রভু লীলাকর ভাব-পরমেশ ।
ভাবের সাধনা কৈলা মধুরেতে শেষ ॥ ৪৮ ॥
অন্তরে উদয় যেন হইল বাসনা ।
সহে না তিলেক দেরি সাধিতে সাধনা ॥ ৪৯ ॥
মনের তীব্রতা তাঁর এতই প্রবল ।
সাধনানুরূপ দেহ সর্বাংশে বদল ॥ ৫০ ॥
পুংদেহে পুরুষোচিত বৃত্তি আর নাই ।
ললনাসুলভভাবে ভাবিত গোসাঞি ॥ ৫১ ॥
চলন বলন চেষ্টা কটাক্ষ ইঙ্গিত ।
অঙ্গ রঙ্গ হাসি আধি স্বভাব চরিত ॥ ৫২ ॥
ঠমক ঠমক ঠিক ঠিক ললনার প্রায় ।
স্ত্রী কি পুরুষ প্রভু চেনা নাহি যায় ॥ ৫৩ ॥
বসন ভূষণপক্ষে কিছু নাহি ত্রুটি ।
শিরে পরচুলা কেশপাশ পরিপাটি ॥ ৫৪ ॥
পরিধানে বারাণসী শাড়ী থাকে পরা ।
কখন বা পেশোয়াজ জরির কিনারা ॥ ৫৫ ॥
কাঁচলিতে আঁটা বুক ঢাকা ওড়নায় ।
সাঁচ্চার ঝালটা বলি ঝুলে কিনারায় ॥ ৫৬ ॥
অঙ্গভূষা এক সুট স্বর্ণ-অলঙ্কার ।
চরণ-শোভন হেতু নূপুর রূপার ॥ ৫৭ ॥
ধনবান মহাভক্ত সঙ্গে শ্রীমথুর ।
তখনি যোগায় যাহা লাগে শ্রীপ্রভুর ॥ ৫৮ ॥
এইরূপে প্রভুদেব ললনার বেশে ।
আচরিলা হাসী-সেবা রাধার উদ্দেশে ॥ ৫৯ ॥
তুলিয়া কুসুমরাশি গাঁথি দিব্য হার ।
সাজাতেন যুগ্ম-মূর্তি কৃষ্ণ-শ্রীরাধার ॥ ৬০ ॥
চামর ধরিয়া করে কখন ব্যজন ।
কখন প্রার্থনা-সহ আত্মনিবেদন ॥ ৬১ ॥
বিষ্ণুর মন্দির-মধ্যে সদা সর্বক্ষণ ।
শ্রীমদ্ভাগবত-পাঠ-শ্রবণ মনন ॥ ৬২ ॥
দিনেক মন্দিরাঙ্গনে পাঠের সময় ।
হইল বিচিত্র খেলা শুন পরিচয় ॥ ৬৩ ॥
জ্যোতির্ময় দড়া এক বিচিত্র রুচির ।
কৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গ থেকে হইল বাহির ॥ ৬৪ ॥
ক্রমশঃ বিস্তার দড়া হইতে লাগিল ।
পাঠকের গ্রন্থে আসি পরশ করিল ॥ ৬৫ ॥
পশ্চাৎ বিস্তারতর হ'য়ে অগ্রসর ।
আসিরা হইল যোগ প্রভুর ভিতর ॥ ৬৬ ॥
ভগবান-ভাগবত-ভক্ত এই ত্রয় ।
তিনে হয়ে এক বস্তু আলাহিদা নয় ॥ ৬৭ ॥
মধুরের এক রাই স্বত্বাধিকারিণী ।
মহাভাবময়ী মহাভাব-স্বরূপিণী ॥ ৬৮ ॥
যেই ভাব নেই কৃষ্ণ দুয়ে নহে আন ।
একে দুই দুয়ে হয় একের সমান ॥ ৬৯ ॥
ভাবশক্তি যেই বস্তু রাধা তাঁরে বলে ।
শক্তির করুণা বিনা কৃষ্ণ নাহি মিলে ॥ ৭০ ॥
প্রভুদেব সেই হেতু জগৎ-শিক্ষায় ।
সকলের অগ্রে ভজিলেন শ্যামা মায় ॥ ৭১ ॥
এখানে মধুরে সেই শক্তির সাধনা ।
এক চিন্তা কিসে হয় রাধার করুণা ॥ ৭২ ॥
কোথা রাই কিসে পাই শ্যাম-সোহাগিনী ।
মহাভাবময়ী মহাভাব-স্বরূপিনী ॥ ৭৩ ॥
দিয়া দেখা কেনাদাসী কর অভাগীরে ।
কিঙ্করী করুণাভিক্ষা মাগে সকাতরে ॥ ৭৪ ॥
আবেগের বেগেতে করুণ নিবেদন ।
কখন রাধার ধ্যানে গভীর মগন ॥ ৭৫ ॥
পরে হৈল দরশন পূরিল কামনা ।
কামগন্ধহীনা রাই কনকবরণা ॥ ৭৬ ॥
পুতোজ্জ্বলা রাধারূপ নহে বর্ণিবার ।
দেখিতে দেখিতে অঙ্গে মিশিল তাঁহার ॥ ৭৭ ॥
নিজাঙ্গে শ্রীমতী রাই করিলে প্রবেশ ।
শ্রীঅঙ্গেতে সমুদিত রাধার আবেশ ॥ ৭৮ ॥
রাধাতে প্রভুতে আর ভিন্নভেদ নাই ।
রাধাভাব-সাগরেতে নিমগ্ন গোসাঞি ॥ ৭৯ ॥
সেই হাব সেই ভাব সেই চেষ্টাবলী ।
রাগে প্রেমে ঠিক সেই শ্রীকৃষ্ণ-পাগলী ॥ ৮০ ॥
বিরহবিধুর ভাব শ্রীঅঙ্গে পূর্ণিত ।
দৈহিক ক্রিয়ায় ঘোষে লক্ষণ বিহিত ॥ ৮১ ॥
প্রকৃতির ভাবে প্রভু এতই তন্ময় ।
মাসে মাসে তিন দিন রজোদ্গম হয় ॥ ৮২ ॥
পুং-ইন্দ্রিয়ের উচ্চে দ্ব্যঙ্গুলি-প্রমাণ ।
লোমকূপদ্বারে রক্ত নির্গমের স্থান ॥ ৮৩ ॥
বস্ত্রদুষ্টনিবারণে ভাবিয়া উপায় ।
হৃদয় দিবসত্রয় কৌপীন পরায় ॥ ৮৪ ॥
আশ্চর্য শ্রীপ্রভু যেন আশ্চর্যচরিত ।
সখেদে কখন হয় বিরহের গীত ॥ ৮৫ ॥
প্রিয়তমা অনুচরীরূপে সম্বোধিয়ে ।
শিরে লগ্ন করদ্বয় কান্দিয়ে কান্দিয়ে ॥ ৮৬ ॥
শ্যামের লাগাল যদি না পাইনু সই ।
বল তবে কিবা সুথে ঘরে আর রই ॥ ৮৭ ॥
শ্যাম যে আমার সই নয়নের তারা ।
তিল আধ না দেখিলে হই দিশেহারা ॥ ৮৮ ॥
যদ্যপি হইত শ্যাম মস্তকের চুল ।
বাধিতাম বেণী দিয়া বকুলের ফুল ॥ ৮৯ ॥
সদা দরশন সাধে বিকল পরানী ।
ইতি উতি চাই যেন বনের হরিণী ॥ ৯০ ॥
এরূপে গাইতে গীত যায় বাহ্যজ্ঞান ।
তন্ময় হইয়া ঘটে গভীর ধিয়ান ॥ ৯১ ॥
দেহের সঙ্কটাবস্থা পূর্বের সাধনে ।
গিয়াছিল পুনরায় হয় বর্তমানে ॥ ৯২ ॥
কৃষ্ণ-দরশনাবেগ বাতিক পবন ।
ধরিয়া প্রবল গতি অতীব ভীষণ ॥ ৯৩ ॥
উঠিল প্রভুর হৃদি-আকাশের মাঝে ।
আধারিয়া দশ দিশি আপনার তেজে ॥ ৯৪ ॥
উলটপালট খায় দেহ-তরুবর ।
প্রভুর নাহিক আর দেহের খবর ॥ ৯৫ ॥
শ্রীদেহের যত্ন এবে দুজনার হাতে ।
ব্রাহ্মণী দিনের বেলা হৃদয় রাত্রিতে ॥ ৯৬ ॥
ব্রাহ্মণী সুতীক্ষ্ণা দৃষ্টি করে দরশন ।
শ্রীঅঙ্গেতে পুনঃ মহাভাবের লক্ষণ ॥ ৯৭ ॥
নিদারুণ দেহোত্তাপে জ্বালার যন্ত্রণা ।
দিবানিশি কিবা কষ্ট না যায় বর্ণনা ॥ ৯৮ ॥
শাস্ত্রের নির্দেশ মত ব্রাহ্মণী হেথায় ।
উপশমহেতু অঙ্গে চন্দন মাখায় ॥ ৯৯ ॥
উত্তাপের প্রবলতা এতই তখন ।
দিবারাত্র ধূলিবৎ আলেপ্য চন্দন ॥ ১০০ ॥
শ্রীদেহের যাবতীয় লোমকূপ দিয়ে ।
শোণিত-কণিকা যার বাহির হইয়ে ॥ ১০১ ॥
দেহস্থিত গ্রন্থিযন্ত্র শিথিল সবাই ।
নিজ নিজ কর্ম করে হেন শক্তি নাই ॥ ১০২ ॥
দেহপানি সংজ্ঞাশূন্য নিশ্চেষ্ট অচল ।
বিশের শিকারযুক্ত সব বিশৃঙ্খল ॥ ১০৩ ॥
কোন্ উপাদানে গড়া শ্রীপ্রভুর দেহ ।
জানি না সে কোন্ জন জানে যদি কেহ ॥ ১০৪ ॥
এতেক যন্ত্রণা যায় দেহের উপরে ।
তথাপিহ মনখানি কৃষ্ণ নাহি ছাড়ে ॥ ১০৫ ॥
বাহ্যজ্ঞানশূন্যে যুক্তে দুই অবস্থায় ।
প্রাণে মনে জাগিতেছে সাধ্য সর্বদায় ॥ ১০৬ ॥
ভাবিয়া দেখহ মন আপনার মনে ।
প্রভুর স্বরূপ কিবা প্রভু কোন্ জনে ॥ ১০৭ ॥
কিবা নাম কিবা বস্তু কোথায় বসতি ।
কোথায় আরম্ভ তাঁর কোথা তাঁর ইতি ॥ ১০৮ ॥
কোথা গতি এইখানে কিবা প্রয়োজন ।
নারায়ণ নিজে পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ॥ ১০৯ ॥
চিনিয়াও প্রভুদেবে নাহি গেল চেনা ।
পুঁথিতে প্রভুর নাম রহিল অচেনা ॥ ১১০ ॥
অচেনা ঠাকুর মোর অতি অপরূপ ।
তিনিই জানেন মাত্র তাঁহার স্বরূপ ॥ ১১১ ॥
সঙ্কট-অবস্থাপন্ন সাধনা সময় ।
ঘন ঘন অচেতন বাহ্য নাহি রয় ॥ ১১২ ॥
মথুর উৎকণ্ঠপ্রাণ তাহার কারণে ।
পাছে ঘটে অমঙ্গল যতন-বিহনে ॥ ১১৩ ॥
ধরা-মাঝে ধন্য ভক্ত মথুর বিশ্বাস ।
করজোড়ে পদরেণু মাগে ক্রীতদাস ॥ ১১৪ ॥
গুরুভক্তি মহারত্ন ভিক্ষা দেহ মোরে ।
দণ্ডবৎ পদানত অধম কিঙ্করে ॥ ১১৫ ॥
যত্নে রাখিবারে তাঁর এতেক ভাবিয়া ।
জানবাজারের ঘরে গেলেন লইয়া ॥ ১১৬ ॥
সদা সচকিত থাকে সহ পরিবারে ।
বাহিরে না রাখি তাঁর রাখিল অন্দরে ॥ ১১৭ ॥
যেমন মথুর ভক্ত সমযোগ্য তাঁর ।
ভক্তিমতী জগদম্বা ঘরে পরিবার ॥ ১১৮ ॥
কন্যাগণ বিলক্ষণ ভক্তি ঘটে ধরে ।
যেন পিতৃ-মাতৃ-রক্ত বহমান শিরে ॥ ১১৯ ॥
সকলে সমানভাবে যত্ন করে অতি ।
ভক্তের আকর ভক্ত মথুর-বসতি ॥ ১২০ ॥
দিনরাতি রাখে তাঁয় আঁখির উপরে ।
শয্যা রচে আপনার শয়ন-আগারে ॥ ১২১ ॥
প্রভুরে সরম লাজ নাহি আসে কার ।
স্ত্রীলোক দেখিত তাঁয় স্বজাতি তাহার ॥ ১২২ ॥
প্রভুরে পুরুষ জ্ঞান কভু না হইত ।
বর্ণে বর্ণে স্ত্রীলোকের স্বভাবে মিলিত ॥ ১২৩ ॥
পুরুষ-আকার প্রভু পুরুষ প্রধান ।
রমণী বলিয়া কেন রমণীর জ্ঞান ॥ ১২৪ ॥
সমস্যা বুঝিতে যদি সাধ হয় মন ।
বিরলে বসিয়া স্মর প্রভুর চরণ ॥ ১২৫ ॥
ক্ষীণ হীন নয়-বুদ্ধি হেয় অতিশয় ।
অবিরত স্বার্থে রত কুঞ্চিত-হৃদয় ॥ ১২৬ ॥
নীচমুখে মনোভাব দৃষ্টি অধস্তলে ।
কলুষ কামনা যত শিরে শিরে খেলে ॥ ১২৭ ॥
ইন্দ্রিয়ের বাহ্য ভোগে সংজ্ঞাহীন ঘুরে ।
যেন তৃণ ঘূর্ণিপাকে নদীর ভিতরে ॥ ১২৮ ॥
কাদা-মাখা পাঁকে মগ্ন তেজহীন মন ।
তার সঙ্গে লীলা দেখা না হয় কখন ॥ ১২৯ ॥
চাই শুদ্ধ সংবুদ্ধি যাহার গোচর ।
সত্যময় শুদ্ধময় পরম-ঈশ্বর ॥ ১৩০ ॥
তাই বলি স্মর প্রভু সরল পরাণে ।
যদি থাকে সাধ তাঁর লীলা-দরশনে ॥ ১৩১ ॥
অদ্ভুত এ লীলাখেলা বুঝে উঠা ভার ।
প্রকৃত রমণী প্রভু পুরুষ-আকার ॥ ১৩২ ॥
ভিতরে ঢুকিতে মন বুদ্ধি যায় ছলে ।
রমণীয় ভাব ধর্মসাধনার বলে ॥ ১৩৩ ॥
কায়মনোবাক্যে খেলে ভাবধর্ম-রীতি ।
কে চিনে পুরুষ প্রভু প্রকৃত প্রকৃতি ॥ ১৩৪ ॥
সৃষ্টি ছাড়া তাঁর কর্ম কিসে নরে বুঝে ।
বদলে ব্রহ্মার সৃষ্টি মহিমার তেজে ॥ ১৩৫ ॥
বিশেষিয়া বলিবারে না পারিছ মন ।
কলমে আঁকিতে চিত্র অধম অক্ষম ॥ ১৩৬ ॥
অদ্ভুত সাধনা কৈলা প্রভু পরমেশ ।
দিবারাতি এ সময় রমণীর বেশ ॥ ১৩৭ ॥
নারী বিনা নর-জান নাহি আসে মনে ।
ঘন ঘন বাহ্যহারা হয় এ সাধনে ॥ ১৩৮ ॥
বাহ্যহারা কারে বলে সে বা কি রকম ।
শুনিলে না রয় বাহ্য অকথ্য কথন ॥ ১৩৯ ॥
শুন মন
একমনে ভক্তিসহকারে ।
অনর্থের মূল বাহ্য ক্রমে যাবে ছেড়ে ॥ ১৪০ ॥
চোখে চোখে রাখে
তাঁরে যত পরিবার ।
একদিন শুন কিবা হইল ব্যাপার ॥ ১৪১ ॥
উপবিষ্ট একধারে প্রভু
পরমেশ ।
বিভোর বিভোর অঙ্গ ভাবের আবেশ ॥ ১৪২ ॥
বাহ্যিক চেতনহীন কেহ নাহি জানে ।
অতিশয় অনাবিষ্ট ভৃত্য এক জনে ॥ ১৪৩ ॥
অগ্নিবর্ণ গুলে ভরা কলিকা লইয়া ।
যাইতে যাইতে
দ্রুত সেই পথ দিয়া ॥ ১৪৪ ॥
ফেলে এক পোড়া-গুল রক্তিম বরণ ।
যেখানে প্রভুর পিঠ কাঁধে
সংলগন ॥ ১৪৫ ॥
বারে বারে কত যে সহেন নারায়ণ ।
পাপে রত ভ্রষ্ট জীব উদ্ধার কারণ ॥ ১৪৬ ॥
বিশেষতঃ আগাগোড়া কষ্ট এইবারে ।
জানি না পাষাণ কেবা সৃষ্টির ভিতরে ॥ ১৪৭ ॥
নাহিক
মমতা দয়া শুনিয়া সকল ।
সম্বরিতে পারে চক্ষে না ফেলিয়া জল ॥ ১৪৮ ॥
মায় যেন সয় কষ্ট
অকাতর-প্রাণে ।
সন্তানের এক তিল মঙ্গল-সাধনে ॥ ১৪৯ ॥
সাধন-ভজনে তেন প্রভু পরমেশ ।
জীবের মঙ্গল-হেতু সহিলা অশেষ ॥ ১৫০ ॥
কষ্টে নহে পরাঙ্মুখ নহে ক্ষুণ্ণ মন ।
বরঞ্চ
সন্তুষ্ট কষ্টে জীবের কারণ ॥ ১৫১ ॥
দুপুর বেলায় যেন ঘড়ির দুকাঁটা ।
তেমতি তাঁর মন
ব্রহ্মে সদা আঁটা ॥ ১৫২ ॥
সমাধি হইলে মন ব্রহ্মে হয় যোগ ।
সমাধির ফল
ব্রহ্মানন্দ-উপভোগ ॥ ১৫৩ ॥
তুচ্ছ করি তারে কৈলা জীবের কল্যাণ ।
অহেতুক রূপাসিদ্ধ
প্রভু ভগবান ॥ ১৫৪ ॥
শিবময় ধরাসর মঙ্গলস্বরূপ ।
জীবের কল্যাণ যাঁর ব্রত এইরূপ ॥ ১৫৫ ॥
ত্রাতা পাতা রক্ষাকর্তা করুণাসাগর ।
কেন তাঁর নাহি চায় জীব সুপামর ॥ ১৫৬ ॥
কিবা জীব হেন জীব জীব যেবা নামে ।
কে বল গড়িল তায় কোন উপাদানে ॥ ১৫৭ ॥
যে আদরে মারে তায় ফেলে মহাপাকে ।
যে মারে আদরে ধরি বুকে তায় রাখে ॥ ১৫৮ ॥
দূরে রাখে সুখ-দুখে সখা সেই জন ।
যত্ন করে রাঙ্গা লুড়ি দারা-পুত্র-ধন ॥ ১৫৯ ॥
পতিততারণ প্রভু সংবৃদ্ধি-দাতা ।
জ্ঞানের জনক সেবাপ্রেমাভক্তি-মাতা ॥ ১৬০ ॥
কৃপা কর কৃপাকর হর অন্ধকার ।
দেহি যে চৈতন্যরত্ন সকলের সার ॥ ১৬১ ॥
করিয়াছ কর জীব তাহে নাহি ক্ষতি ।
রাখিও অভয় পথে ষোল আনা মতি ॥ ১৬২ ॥
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে যেন ডাকিবারে পারি ।
অকূল পাথারে কোথা ভবের কাণ্ডারী ॥ ১৬৩ ॥
হেথা অগ্নিবর্ণ গুলে পিঠ পুড়ে যায় ।
চর্ম-দগ্ধ-গন্ধ সবে আঘ্রাণেতে পায় ॥ ১৬৪ ॥
সতর্ক নয়নে সবে দেখে চারি ধারে ।
বলে এত গন্ধ কিসে কি পুড়ে কি পুড়ে ॥ ১৬৫ ॥
কোনমতে কেহ কিছু না পায় সন্ধান ।
মথুর দেখিল বাহ্যহারা ভগবান ॥ ১৬৬ ॥
শ্রীপ্রভুর ভাব যেন শ্রীমধুর জানে ।
তাড়াতাড়ি আসিলেন তাঁর সন্নিধানে ॥ ১৬৭ ॥
বাহ্য আনিবারে কানে দেন কৃষ্ণনাম ।
কতক্ষণ পরে আসে কিঞ্চিৎ গিয়ান ॥ ১৬৮ ॥
এখন এমন যেন সিদ্ধ গেলে পরে ।
এই ক্ষণে আসে হুশ পরক্ষণে ছাড়ে ॥ ১৬৯ ॥
অবিরাম কৃষ্ণনাম দেন কর্ণমূলে ।
নাহি জানে শ্রীপ্রভুর পিঠ পুড়ে গুলে ॥ ১৭০ ॥
ক্রমশঃ প্রকাশ বাহ্য পরে পরে ।
প্রভুর নাহিক সাড়া পিঠ যায় পুড়ে ॥ ১৭১ ॥
প্রভুর সমাধি-কথা বল কে বুঝিবে ।
ছিল ঘেহভাব লুপ্ত সত্তা এল এবে ॥ ১৭২ ॥
দেহেতে নামিলে যন জড় জড় স্বরে ।
বলিলেন পিঠে কেন চিনচিন্ করে ॥ ১৭৩ ॥
পিঠ দেখি মথুরের পরান আকুল ।
ভিতরে ঢুকেছে অগ্নিবর্ণ লাল গুল ॥ ১৭৪ ॥
মুখে নাহি সয়ে কথা দেখিয়া ব্যাপার ।
অমনি টানিয়া আনে হাতে আপনার ॥ ১৭৫ ॥
বলে ভাল যত্ন হেতু আনিনু ভবনে ।
কি হ'ল কি হ'ল কালী রক্ষা কর দীনে ॥ ১৭৬ ॥
যত দিন দগ্ধ স্থান নাহি গেল সেরে ।
সবে মিলে ঘেরে তাঁরে রাখিল অন্দরে ॥ ১৭৭ ॥
মথুর দেখেন তার জীবন-জীবন ।
তৎক্ষণে তাই করে যে আজ্ঞা যখন ॥ ১৭৮ ॥
ভক্তিমতী জগদম্বা ভক্তি করে তাঁর ।
সাজাইত মনোমত ফুলের মালায় ॥ ১৭৯ ॥
প্রভুর তেমতি কৃপা তাঁদের উপর ।
ধরাধামে ধন্য শ্রীমথুর
ভক্তবর ॥ ১৮০ ॥
পরিবার সহ বাস ল'য়ে নরহরি ।
ভক্তবাঞ্চাকল্পতরু করুণাকাণ্ডারী ॥ ১৮১ ॥
ধন
জন দাস দাসী পুরবাসিগণ ।
ভক্তিমতী দারা যত নন্দিনী নন্দন ॥ ১৮২ ॥
আপনার বলিতে আছিল তার যত ।
প্রভুর সেবায় হয় সকল প্রদত্ত ॥ ১৮৩ ॥
কোটি কোটি দণ্ডবৎ মথুর-চরণে ।
মাগি রামকৃষ্ণভক্তি ভিক্ষা দেহ দীনে ॥ ১৮৪ ॥
লোহা
যেন সোনা হয় পরেশ-পরলে ।
মধুর হইল তেন প্রভু-সহবাসে ॥ ১৮৫ ॥
এবে সাধনার কথা শুন দিয়া মন ।
কিছু দিন পরে হইল কৃষ্ণ-দরশন ॥ ১৮৬ ॥
রাধা-মনোবিমোহন অপরূপ ঠাম ।
নবীন নীরদকান্তি ত্রিভঙ্গিম শ্যাম ॥ ১৮৭ ॥
মাথার মোহন চূড়া বামভাগে হেলা ।
মৃদু মন্দ সমীরণে চুলে করে খেলা ॥ ১৮৮ ॥
তিলকা-অলকাবলি কপালের তলে ।
কনক কুণ্ডল কানে দুলু দুলু দোলে ॥ ১৮৯ ॥
আকর্ণ পুরিয়া বাঁকা নয়নের টান ।
কটাক্ষ-হিল্লোলে ছুটে সম্মোহন বাণ ॥ ১৯০ ॥
তিলফুল জিনি দাসা গজমতি তায় ।
চঞ্চল আঁখির বেগে সুমন্দ দোলায় ॥ ১৯১ ॥
মুখামৃতে সিক্ত দুটি রক্তিম অধর ।
মনোবাসী হাসি যাহে খেলে নিরন্তর ॥ ১৯২ ॥
কাঞ্চন-বলয় হাতে মোহন বাঁশরী ।
রাধা রাধা গীত-স্বরে মন করে চুরি ॥ ১৯৩ ॥
ঘোলে গলে বনমালা সৌরভে আকুল ।
শুনু শুনু রবে গুজে মধুপের কুল ॥ ১৯৪ ॥
নীলাভবরণ বক্ষঃ অতি সুশোভিত ।
কুসুম-ভূষণসহ চন্দনে চর্চিত ॥ ১৯৫ ॥
কটিতটে গুঞ্জবেড়া পিঠে পীত ধটি ।
পীতবাস পরিধানে অতি পরিপাটি ॥ ১৯৬ ॥
কনক নূপুর শোভা করে রাঙ্গা পায় ।
সুমধুর রুনুঝুনু বাদ্য বাজে তায় ॥ ১৯৭ ॥
ভুবনমোহন রূপাকর কৃষ্ণরায় ।
উদিয়া প্রভুর অঙ্গে অমনি মিশায় ॥ ১৯৮ ॥
যখন যে মূর্তি হয় প্রভুর গোচর ।
শ্রীপ্রভুর দেহ যেন তাহাদের ঘর ॥ ১৯৯ ॥
আপনে আপনি প্রভু দেখেন এখন ।
তিনিই শ্রীকৃষ্ণ নিজে রাধিকারমণ ॥ ২০০ ॥
ভাবাযুক্তে ভাবাতীতে স্বগুণ নির্গুণে ।
সাধনা মধুরভাবে ইতি এইখানে ॥ ২০১ ॥
ব্রাহ্মণী উন্মত্তা এবে প্রভুর কৃপায় ।
নানা ভাব-বেগ হৃদে স্রোত ব'য়ে যায় ॥ ২০২ ॥
যখন যে ভাব হৃদে হয় জাগরণ ।
সেইমত হয় তার বাহ্য আচরণ ॥ ২০৩ ॥
যখন বাৎসল্যভাব হৃদয়ে সঞ্চার ।
প্রভুরে দেখিত ঠিক গোপাল তাঁহার ॥ ২০৪ ॥
ভিক্ষা মাগিবার তরে ঘরে ঘরে বায় ।
গোপাল গোপাল বলি কাঁদে উভরায় ॥ ২০৫ ॥
ভিক্ষা-লব্ধ বিনিময়ে মাখন নবনী ।
আনিয়া প্রভুর মুখে দিতেন ব্রাহ্মণী ॥ ২০৬ ॥
স্নেহে গর গর হৃদি মুখপানে চায় ।
কাছে রহে নাহি ইচ্ছা যাইতে কোথায় ॥ ২০৭ ॥
ভিক্ষায় না গেলে নয় তাই হয় যেতে ।
নবনী ছানার হেতু প্রভুরে খাওয়াতে ॥ ২০৮ ॥
গোঠেতে আটক বৎস গাভীর মতন ।
ব্রাহ্মণীর কোনখানে নাহি থাকে মন ॥ ২০৯ ॥
বিরহের গান গায় বিষম উচ্ছ্বাসে ।
চক্ষে ঝরে জলধারা বক্ষঃ যায় ভেসে ॥ ২১০ ॥
এমন হৃদয়-দ্রব ঠামে গীত গায় ।
মানুষ দূরের কথা পাষাণে গলায় ॥ ২১১ ॥
কেঁদে কেঁদে যার ভেসে সুখের সাগরে ।
বলিতে নারিনু কিবা ব্রজভাবে ধরে ॥ ২১২ ॥
প্রেম-ভক্তি-অনুরাগ সুদুর্লভ ধন ।
কোটির মধ্যেতে যদি পায় এক জন ॥ ২১৩ ॥
বৃথায় জনম বৃথা নরদেহ ধরা ।
কৃষ্ণ-অনুরাগে যদি না হইল হারা ॥ ২১৪ ॥
ব্রহ্মার বাঞ্ছিত ধন প্রভু-অবতারে ।
অহেতুক কৃপানিধি দিল মুঠা ভ'রে ॥ ২১৫ ॥
মানিক রতন নিধি মণি যার নাম ।
যে না চিনে তার কাছে আছে কিবা দাম ॥ ২১৬ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্ত বদ্ধ জীবগণ ।
বুঝে কৃষ্ণভক্তি তুচ্ছ তৃণের মতন ॥ ২১৭ ॥
প্রেমভক্তি-আস্বাদনে কিবা মিঠা লাগে ।
কি তার সুতার ভরা আছে অনুরাগে ॥ ২১৮ ॥
আদতেই বোধ নাই আসক্তির প্রাণে ।
সন্তুষ্ট বীষের কীট হলাহলপানে ॥ ২১৯ ॥
গুরুবাক্য মহামন্ত্র হৃদয়ের ক্ষেতে ।
রূপার জগৎ-গুরু দেন যার পুঁতে ॥ ২২০ ॥
আঁতে আঁতে গাঁথে তার বেড়াজাল মূল ।
বীজমন্ত্র দেয় তুলে অঙ্কুর অতুল ॥ ২২১ ॥
পুষ্টি-হেতু চারাগাছে দুখানি নয়ন ।
ধীরে ধীরে মূলে করে বারি বিসিঞ্চন ॥ ২২২ ॥
মজার রসের গাছ রসে রসে বাড়ে ।
প্রসারি প্রশাখা-শাখা ত্রিভুবন বেড়ে ॥ ২২৩ ॥
লোকে জানে হৃদিক্ষেত অল্প আয়তন ।
অলীক সে কথা তার মধ্যে ত্রিভুবন ॥ ২২৪ ॥
আঁখি ঢালে তত জল যত টানে মূল ।
ডগে ডগে ফুটে বিশ্ব-বিনোদিনী ফুল ॥ ২২৫ ॥
আকুল পরাণ এত সৌরভের বল ।
গাছের যে কাছে যায় সে হয় পাগল ॥ ২২৬ ॥
বিশ্বগন্ধা কুসুমের কণিকা ভিতরে ।
অনুরাগ ভক্তি প্রেম তিন ফল ধরে ॥ ২২৭ ॥
তিন রূপ ফল কিন্তু এক আস্বাদন ।
এক আস্বাদনে তবু বিবিধ রকম ॥ ২২৮ ॥
বিষম হেঁয়ালি মন কি দিব বুঝায়ে ।
আগাগোড়া ইক্ষুগাছা গোটা দেখ খেয়ে ॥ ২২৯ ॥
বড়ই সুন্দর গাছ কিবা কব তার ।
হলে ডগে চলে বেগে রসের জুয়ার ॥ ২৩০ ॥
কখন গম্ভীর স্থির ফুলপত্র পোষে ।
কখন হইয়া ফল ফলসঙ্গে মিশে ॥ ২৩১ ॥
অনুরাগে বেগবতী থামে ভক্তি হ'লে ।
সাগরসঙ্গমে প্রেম সঙ্গে যায় মিলে ॥ ২৩২ ॥
প্রেমে রসে মিশে গেছে ব্রাহ্মণী এখন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা মঙ্গলকথন ॥ ২৩৩ ॥
বহুদিন অদর্শন ছিল শ্রীপ্রভুর ।
ঘরে ল'য়ে গিয়াছিল ভকত মথুর ॥ ২৩৪ ॥
এবে পুরীমধ্যে তাঁর আগমন শুনি ।
আনন্দে পূর্ণিতান্তরা হইল ব্রাহ্মণী ॥ ২৩৫ ॥
দর দর বারিধারা বহে দুনয়নে ।
সবেগে বাৎসল্যভাব সমুদিত মনে ॥ ২৩৬ ॥
কতক্ষণে চন্দ্রাননে নবনী মাখন ।
প্রভুরে করিয়া কোলে করিবে অর্পণ ॥ ২৩৭ ॥
উচাটন মন স্থির কিসেও না আর ।
পরা বারাণসী
শাড়ি গায়ে অলঙ্কার ॥ ২৩৮ ॥
হাতে থাল পরিপূর্ণ ছানা ননী ক্ষীর ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে হইল বাহির ॥ ২৩৯ ॥
গায় কৃষ্ণ-বিচ্ছেদের প্রভাসের গান ।
ভাবেতে ব্রাহ্মণী নন্দরানীয় সমান ॥ ২৪০ ॥
পাগলিনী-সম গায় ভাসে আঁখিজলে ।
যে শুনে সে কাঁদে আর সঙ্গে এসে মিলে ॥ ২৪১ ॥
পুরীর ফটক-দ্বারে যবে উপনীতা ।
চারিধারে বামাদলে ব্রাহ্মণী বেষ্টিতা ॥ ২৪২ ॥
যেই দেখে শুনে হয় সেই বিমোহিত ।
গাইতে লাগিল নিম্নলিখিত সঙ্গীত ॥ ২৪৩ ॥
দ্বারে দাঁড়ায়ে আছে তোর মা নন্দরানী ।
তোরে নিতে আসি না দেখে যাব চাঁদ-বদনখানি ।
আয়রে কোলে দিব তুলে বদনে সর ননী ॥
তিল-আধ প্রাণ যদি থাকে তোর মন ।
ব্রাহ্মণীর হৃদি-ভাব কর বিলোকন ॥ ২৪৪ ॥
কোথায় গিয়াছে ভেসে কোণা তার প্রাণ ।
কি সুখলহরী মধ্যে এবে ভাসমান ॥ ২৪৫ ॥
কি আর রেখেছে দেখ আপনার ঘরে ।
মহাপ্রেমে গেছে গ'লে প্রেমের পাথারে ॥ ২৪৬ ॥
হায়রে তপস্বী মহাঋষি মুনিগণ ।
ত্রিভুবন সর্বজন আরাধ্যচরণ ॥ ২৪৭ ॥
আজীবন অনশন তরুতলে বাস ।
অবিরত নানা ব্রত কঠোর সন্ন্যাস ॥ ২৪৮ ॥
প্রয়াস কেবলমাত্র তুচ্ছধনহেতু ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ-ভয়ে হ'য়ে অতি ভীতু ॥ ২৪৯ ॥
যোগানন্দ ব্রহ্মানন্দ সুখদুঃখ পার ।
হ'ল না দেখিতে সাধ ব্রজের ব্যাপার ॥ ২৫০ ॥
তুলনায় কি আনন্দ যোগানন্দ ধরে ।
যে আনন্দ গোপিনীর এক বিন্দু নীরে ॥ ২৫১ ॥
ব্রজের রহস্য কথা পরম কৌতুক ।
সুখে দেখে সুখ নয় দুঃখে মহাসুখ ॥ ২৫২ ॥
কিছুই না পায় সুখ সহাস্ত বরনে ।
পরম আনন্দবোধ কেবল রোদনে ॥ ২৫৩ ॥
ঢালিয়া আখির জ্বল ব্রাহ্মণী দেখায় ।
সুবেষ্টিতা বামাদলে ধীরে ধীরে যায় ॥ ২৫৪ ॥
গায় প্রেমমাখা গান মুগ্ধ যেন শুনে ।
ভাব-বেগে বন্ধগতি মাঝে মাঝে থামে ॥ ২৫৫ ॥
একে রমণীর কণ্ঠ মিষ্টকণ্ঠা তায় ।
তদুপরি প্রেম-বেগ রাগে বাহিরায় ॥ ২৫৬ ॥
কিবা কান্তিমাখা গায় চেহারা কেমন ।
আঁকিতে নারিনু ধরি কাঠির কলম ॥ ২৫৭ ॥
সুপামর চিত্রকর চিত্রে নাই হাত ।
বর্ণহীন পুজিমাত্র কালির দুয়াত ॥ ২৫৮ ॥
অন্তর বুঝিয়া তুমি কর দরশন ।
কি ঠামে চলিয়া যায় ব্রাহ্মণী এখন ॥ ২৫৯ ॥
ফটক হইতে প্রায় দশ বিঘা দূর ।
যেখানে একত্রে প্রভু হৃদয় মথুর ॥ ২৬০ ॥
হৃদয় মথুর স্বর শুনিবার আগে ।
ব্রাহ্মণীর প্রেমমাখা গীত গিয়া লাগে ॥ ২৬১ ॥
মহাবেগে বাণসম প্রভুর শ্রবণে ।
বাহ্য গেল সমাধিস্থ হৈলা সেইক্ষণে ॥ ২৬২ ॥
পশ্চাৎ মথুর শুনি কহিল হৃদয়ে ।
কে বা গায় মিষ্ট গীত দেখ না এগিয়ে ॥ ২৬৩ ॥
হৃদয় একত্রে দেখে নারী কয় জনা ।
তার মধ্যে ব্রাহ্মণীরে নাহি যায় চেনা ॥ ২৫৪ ॥
আভরণে রঙ্গিন বসনে সজ্জা করা ।
লুকায়েছে তার মধ্যে তাহার চেহারা ॥ ২৫৫ ॥
ব্রাহ্মণী নিকটে আসি করে নিরীক্ষণ ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব নাহিক চেতন ॥ ২৫৬ ॥
ব্রাহ্মণীও অচেতন প্রায় ভূমে পড়ে ।
খাল সহ হৃদয় যাইয়া তার ধরে ॥ ২৫৭ ॥
কিছু পরে ব্রাহ্মণী সম্বিৎ পেয়ে উঠে ।
বিভোর শ্রীপ্রভুদেব নেশা নাহি ছুটে ॥ ২৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে বসিল ব্রাহ্মণী ।
অবিরল ঢালে জল নয়ন দুখানি ॥ ২৫৯ ॥
বাঞ্চাকল্পতরু প্রভু ভাবের বিহ্বলে ।
শিশুসম বসিলেন ব্রাহ্মণীর কোলে ॥ ২৬০ ॥
খালা থেকে ল'য়ে ননী হৃদয় আপনে ।
টুকু টুকু স্কুলে দেয় প্রভুর বদনে ॥ ২৬১ ॥
পঞ্চমবর্ষীয়-বয়ঃ বালক সমান ।
ব্রাহ্মণীর কোলে বসে ননী সর খান ॥ ২৬২ ॥
আসক্তির দাস মন দেখ আঁখি মেলে ।
কি ছাড় কাঞ্চন-নারী ল'য়ে আছ ভুলে ॥ ২৬৩ ॥
ব্রাহ্মণীর কোলে কিবা দৃশ্য করে গেলা ।
ধরিয়াছে ধরাতল বৈকুণ্ঠের মেলা ॥ ২৬৪ ॥
বিনা-পণে দরশনে না হইল সাধ ।
এবা কিবা নরবুদ্ধি অতি পরমাদ ॥ ২৬৫ ॥
দ্রবময়ী ব্রহ্মবারি জলাধারে ভরা ।
জীবের জীবনরস সুরম্য চেহারা ॥ ২৬৬ ॥
স্বভাব-সুলভ ভাবে সদা আছে গ'লে ।
উথলায় যেন তায় পবন হিল্লোলে ॥ ২৬৭ ॥
তেমনি রসের সিন্ধু প্রভু ভগবান ।
ভক্তভাব-বাতে তাহে তুলিছে তুফান ॥ ২৬৮ ॥
বিশেষতঃ শ্রীপ্রভুর বৈষ্ণব সাধনে ।
ব্রাহ্মণী ভকতিমুখী ভক্তি ভাল চিনে ॥ ২৬৯ ॥
বিষম রগড় বড় তুলেন ব্রাহ্মণী ।
একমনে শুন মন কহিব কাহিনী ॥ ২৭০ ॥
কখন গোপিনীবেশ সুন্দর দেখিতে ।
আনন্দলহরী ধরা আছে ডান হাতে ॥ ২৭১ ॥
মাতোয়ারা হ'য়ে গায় নীচে লেখা গান ।
যে শুনে তাহার হয় দ্রবীভূত প্রাণ ॥ ২৭২ ॥
আয় গো আর গোষ্ঠে, গোচারণে যাই ।
শুনচি নিধুবনে রাখালরাজা
হবেন রাই, হায় শুনতে পাই ।
পীতধড়া মোহন চূড়া রাইকে পরাবে,
হাতে বাঁশরি দিবে —
রাইকে রাজা
সাজাইয়ে, কোটাল হবে প্রাণ-কানাই ।
ললিতা বিশাখা আদি অষ্ট সখীগণ,
রাখাল হবে
পঞ্চজন —
তারা আবা দিয়ে যনে বনে,
ফিরাবে ধবলী গাই ॥
প্রভুর পুরুষের মত নাহি কোন লাজ ।
প্রিয় দরশন গায় বাউলের সাজ ॥ ২৭৩ ॥
কোমরেতে
বাঁধা ডুগি বাজে তালে তালে ।
গোরা গুণ-গীত গায় ভক্তি-রসে গ'লে ॥ ২৭৪ ॥
গৌর-প্রেমের ঢেউ লেগেছে গায় ।
তার হিল্লোলে পাষণ্ড দলন,
এ ব্রহ্মাণ্ড তলিয়ে
যায় ।
মনে কবি ডুবে তলিয়ে রই,
গৌরচাদের প্রেম-কুমীরে
গিলেচে গো সই ।
এমন বাখার ব্যথী কে আর আছে,
হাত ধরে টেনে তোলায় ॥
প্রভু হন বাহ্যহারা ব্রাহ্মণীর গানে ।
তখনি অমনি যেই ক্ষণে ঢুকে কানে ॥ ২৭৫ ॥
ভাবময়ী ভক্তিময়ী ব্রাহ্মণীর দেহ ।
মানবী-আকার কিন্তু মহাদেবী কেহ ॥ ২৭৬ ॥
অদ্ভুত অদ্ভুত নরনারী নানা বেশে ।
সময়েতে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে আসে ॥ ২৭৭ ॥
ভক্তিসহকারে মন শুন একমনে ।
কলিকাল সত্য সম প্রভুরাগমনে ॥ ২৭৮ ॥
বলে দলে ধরাতলে দেবদেবীগণ ।
ধরি নরদেহ করে প্রভু দরশন ॥ ২৭৯ ॥
পরিচিত ব্রাহ্মণীর কিছু আগেকার ।
চন্দ্র নাম বিষ্ণু-অংশে জনম তাঁহার ॥ ২৮০ ॥
রজভাবে ভরা ছবি ভোগের বাসনা ।
অঙ্গকান্তি পরিচ্ছদে মন ষোল আনা ॥ ২৮১ ॥
নয়নরঞ্জন মূর্তি সুন্দর গড়ন ।
বৈষ্ণব-বিভূতি তায় আছে বিলক্ষণ ॥ ২৮২ ॥
গোপনে লিখিয়া পত্র পাঠায় ব্রাহ্মণী ।
কোথার এখন কি বা পেয়েছেন তিনি ॥ ২৮৩ ॥
বিশেষিয়া বিবরিয়া শক্তি যতদূর ।
কিবা প্রভু রামকৃষ্ণ দয়াল ঠাকুর ॥ ২৮৪ ॥
আর অনুরোধ পত্রে করিল তাঁহারে ।
করা করি আসিবারে দক্ষিণশহরে ॥ ২৮৫ ॥
এখানেতে একদিন প্রভুর নিকটে ।
কথায় কথায় তাঁর নাম গেল উঠে ॥ ২৮৬ ॥
যেমন চন্দ্রের নাম করিল ব্রাহ্মণী ।
অমনি কহিলা প্রভু আমি তারে জানি ॥ ২৮৭ ॥
বিষ্ণু-অংশে জন্ম তার দেখিয়াছি তারে ।
বিষ্ণুচক্রযুক্ত এক শিলার ভিতরে ॥ ২৮৮ ॥
পুনশ্চ ব্রাহ্মণী কহে প্রভুর সাক্ষাৎ ।
একবার দেখিয়াছি তার চারি হাত ॥ ২৮৯ ॥
নানাবিধ কথোপকথন হৈলে সায় ।
ব্রাহ্মণী চলিয়া গেল নিজের বাসায় ॥ ২৯০ ॥
আছিল প্রভুর রীতি হৃদয়ের সনে ।
দেখিবারে ব্রাহ্মণীরে তাঁহার আশ্রমে ॥ ২৯১ ॥
যাইতেন প্রীতিভরে মাঝে মাঝে প্রায় ।
এবার না যান আর বহুদিন যার ॥ ২৯২ ॥
ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণীর পত্রমর্মে জানি ।
পরমদেবতা প্রভুদেবের কাহিনী ॥ ২৯৩ ॥
আইল সত্বর চন্দ্র ব্রাহ্মণীর ঠাঁই ।
না জানেন কোন বার্তা জগৎ-গোসাঁই ॥ ২৯৪ ॥
আপনার কাছে চন্দ্রে রাখিয়া গোপনে ।
ব্রাহ্মণী পাঠার বার্তা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ২৯৫ ॥
আসিবারে একবার আশ্রমে তাঁহার ।
বহুদিন গেল কেন নহে আসা আর ॥ ২৯৬ ॥
প্রভুর শ্রীমুখে আগে শুনেছে ব্রাহ্মণী ।
যে তোমার চন্দ্র আমি তারে ভাল চিনি ॥ ২৯৭ ॥
লেগেছে বিস্ময় বাক্যে ব্রাহ্মণীয় প্রাণে ।
আগে দেখা পরে চেনা না দেখে কে চেনে ॥ ২৯৮ ॥
দেখিতে রহস্য কিবা চন্দ্রে রাখি ঘরে ।
অন্নাদি ব্যঞ্জন রাঁধে বাহির দুয়ারে ॥ ২৯৯ ॥
হেনকালে উপনীত প্রভু নারায়ণ ।
দূর থেকে ঘরে চন্দ্রে করি নিরীক্ষণ ॥ ৩০০ ॥
এসেছ এসেছ চন্দ্র এতেক কহিয়া ।
ওহে চন্দ্র চন্দ্র বলি ডাকেন চেঁচিয়া ॥ ৩০১ ॥
নীরব ব্রাহ্মণী চন্দ্র নাহি দেয় সাড়া ।
এমন সময় প্রভু হৈলা বাহ্যহারা ॥ ৩০২ ॥
তাড়াতাড়ি এখন আসিয়া চন্দ্রনাথ ।
সবলে ধরিল তেড়ে শ্রীপ্রভুর হাত ॥ ৩০৩ ॥
ভাবভঙ্গে ঈষৎ আবেশ মাত্র গায় ।
বলিলেন এহে
চন্দ্র চিনেছি তোমায় ॥ ৩০৪ ॥
চন্দ্রনাথ কয় তাঁয় উত্তর বচনে ।
চিনিয়াছ? এতদিন ভুলে
ছিলে কেনে ॥ ৩০৫ ॥
ঈশ্বর-ইচ্ছায় প্রভু কৈলা প্রত্যুত্তর ।
চন্দ্র কহে অন্য কেবা
তুমিই ঈশ্বর ॥ ৩০৬ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন আমি এবে দেহধারী ।
ভুল হয় সদা ঠিক রাখিতে না
পারি ॥ ৩০৭ ॥
চন্দ্রের আছিল আর এক শক্তি গায় ।
অলক্ষ্যে যাইতে পারে বাসনা যেখায় ॥ ৩০৮ ॥
কামতৃপ্তি-হেতু করে শক্তির চালনা ।
বারে বারে প্রভু তার করিলেন মানা ॥ ৩০৯ ॥
শ্রীআজ্ঞার অনাবিষ্ট দেখিয়া তাহারে ।
টানিয়া লইলা শক্তি নিজের শরীরে ॥ ৩১০ ॥
চন্দ্র হৈল বিষহীন ভুজঙ্গের প্রায় ।
সরোদনে শ্রীচরণে লুটালুটি খায় ॥ ৩১১ ॥
রামকৃষ্ণলীলা অতি মধুর কথন ।
শুন অতঃপর
কিবা পশ্চাৎ সাধন ॥ ৩১২ ॥
সমকালে প্রচলিত কর্তাভজা মত ।
ভগবানে যাইবার এও এক পথ ॥ ৩১৩ ॥
পথটি বড়ই নোংরা উপমা তাহার ।
যেমন বাড়ির থাকে নানান দুয়ার ॥ ৩১৪ ॥
কোন দ্বার সদরেতে প্রবেশের তরে ।
কোন দ্বারে যাওয়া যায় অন্দর ভিতরে ॥ ৩১৫ ॥
মেথরের জন্য থাকে আলাহিদা পথ ।
সেইমত অবিশুদ্ধ কর্তাভজা মত ॥ ৩১৬ ॥
প্রকৃতি লইয়া সঙ্গে সাধনার প্রথা ।
দুর্বল জীবের পক্ষে মুস্কিলের কথা ॥ ৩১৭ ॥
বিশেষে এ কলিকালে মানুষের মন ।
স্বভাবতা কামিনীকাঞ্চনে নিমগন ॥ ৩১৮ ॥
মূর্তিমতী অবিদ্যা এতেক শক্তি তার ।
নরলোকে বসায়েছে ভেড়ার বাজার ॥ ৩১৯ ॥
এক ছত্রে ধরাতল করিছে শাসন ।
অধিকার করিয়া ধর্মের রত্নাসন ॥ ৩২০ ॥
প্রজাগণ ল'য়ে মন
প্রাণ বুদ্ধি স্মৃতি ।
যুক্তকরে দেয় কর তার দিবারাতি ॥ ৩২১ ॥
বিশেষে কামিনীকায়া না যার বাখানি ।
প্রকৃত সাগরস্থিত চুম্বকের খনি ॥ ৩২২ ॥
লৌহপাতে তলা মোড়া তরীরূপ নরে ।
পাইলে অমনি তায় ডুবায় পাথারে ॥ ৩২৩ ॥
প্রভুদেব বলিতেন মায়ারূপা মেয়ে ।
যাহা ছিল
ঘরে দিল সমুদায় খেয়ে ॥ ৩২৪ ॥
পদে পদে উপদেশ দিলা ভগবান ।
কামিনীকাঞ্চন যেথা রহ সাবধান ॥ ৩২৫ ॥
ঘুণ-রূপা কামিনী যদ্যপি গিয়া পশে ।
জ্বারা জ্বারা করে কাঁচা নররূপ বাঁশে ॥ ৩২৬ ॥
হেন মেয়ে ল'য়ে যেথা সাধনা উপায় ।
কোটির ভিতরে কটা লোকে রক্ষা পায় ॥ ৩২৭ ॥
প্রভু বলিতেন এই পথ নহে সোজা ।
কামিনী হিজড়া হবে, নর হবে খোজা ॥ ৩২৮ ॥
তবে হয় কর্তাভজা, না নইলে নয় ।
পথে পথে সাধকের পতনের ভয় ॥ ৩২৯ ॥
এই সম্প্রদায়ভুক্ত বৈষ্ণবচরণ ।
ভাগাতাচার্য ভক্ত প্রভুপদে মন ॥ ৩৩০ ॥
শহরের সন্নিকট কাছির বাগান ।
যেখানে তাদের গুপ্ত সাধনার স্থান ॥ ৩৩১ ॥
বৈষ্ণবচরণ ছিল আচার্য তথায় ।
সাধক সাধিকা বহু ভক্ত সম্প্রদায় ॥ ৩৩২ ॥
গোপনে গোপনে তথা হ'য়ে একত্রিত ।
আচার্যের দীক্ষামত সাধনা করিত ॥ ৩৩৩ ॥
মধুর-স্বভাবযুক্ত বৈষ্ণবচরণ ।
সত্য-তত্ত্বান্বেষী শুদ্ধ সুসরল মন ॥ ৩৩১ ॥
প্রভুর চরণাম্বুজে পাইয়া আত্মায় ।
মনে মনে উঠে তাঁয় উগ্রতর সাধ ॥ ৩৩২ ॥
তদাদিষ্ট সকলের মঙ্গল-কারণ ।
যদ্যপি আড্ডার হয় প্রভুর গমন ॥ ৩৩৩ ॥
শ্রীচরণ-পরশনে স্থান হবে শুদ্ধ ।
সাধন-ভজনে শিব মনোরথ সিদ্ধ ॥ ৩৩৪ ॥
যথাবৎ মনোবাঞ্ছা কহে একদিন ।
তখনি সম্মতি সায় দিলা ভক্তাধীন ॥ ৩৩৫ ॥
যথাযোগ্য আয়োজন নির্ধারিত দিনে ।
সসঙ্গ বৈষ্ণব যাত্রা কাছির বাগানে ॥ ৩৩৬ ॥
আড্ডা-মধ্যে রূপবতী সাধিকা বিস্তর ।
ছোট বড় তর তম কমল নিকর ॥ ৩৩৭ ॥
জগৎলোচন প্রভুদেবের উদয়ে ।
হৃদিপদ্ম তাহাদের উঠে বিকশিয়ে ॥ ৩৩৮ ॥
কমল সাবিকাদের হৃদয়কমল ।
অনুয়ে তুলিল এক দিব্য পরিমল ॥ ৩৩৯ ॥
আমোদিত গোটা আড্ডা দিব্যতম ভাবে ।
নেহারে নয়ন ভরি দিনেশ শ্রীদেবে ॥ ৩৪০ ॥
যত বল সূর্যালোক এত অতি কাছে ।
দেখিবারে দৃষ্টি শক্তিমান কেবা আছে ॥ ৩৪১ ॥
তদুত্তরে বলি শুন কিবা গূঢ় মর্ম ।
প্রভু দিনকরে ধরে মানিকের ধর্ম ॥ ৩৪২ ॥
দিনেশে দাহিকা-শক্তি প্রবল কেবল ।
মানিক-আলোক হৃদি আঁখি সুশীতল ॥ ৩৪৩ ॥
তদুপরি দিব্য ছটা বন্ধনে বিকালে ।
ভগবৎ-প্রেমোভূত ভাবের আবেশে ॥ ৩৪৪ ॥
ভাবে ভরা বাহ্যহারা মুদিত নয়ন ।
অদৃষ্ট অশ্রুতপূর্ব অপূর্ব দর্শন ॥ ৩৪৫ ॥
দেহ মন প্রাণখানি কতই বিকল ।
আঁকিবারে চিত্রখানি ঠিক অবিকল ॥ ৩৪৬ ॥
অক্ষমে হাঁপিরা মরি এত মহা দায় ।
যদিও প্রাণেতে ছবি না আসে ভাষায় ॥ ৩৪৭ ॥
ইন্দ্রিয়বিজয়ী প্রভু দেখি পরীক্ষায় ।
অটুট সহজ বলি বুঝিল তাঁহার ॥ ৩৪৮ ॥
কর্তাভজা মতে পথে সিদ্ধ যেই জনা ।
অটুট পহল নামে হন খ্যাতনামা ॥ ৩৪৯ ॥
দেহাধারে অধিষ্ঠান আলেক আপনি ।
শিষ্য-মধ্যে শুরুভাবে পুজনীয় তিনি ॥ ৩৫০ ॥
তাই তারা নিজ নিজ কল্যাণের আশে ।
কেহ বা ইন্দ্রিয় কেহ পদাঙ্গুলি চুষে ॥ ৩৫১ ॥
কেহ বা চরণতলে লুটালুটি যায় ।
মনোরগ-পূর্ণ-হেতু রুপা ভিক্ষা চায় ॥ ৩৫২ ॥
আবেশস্থ প্রভুদেব বাহ্য কিছু নাই ।
অত্যাশ্চর্য অদ্ভুত জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩৫৩ ॥
সবার ঠাকুর প্রভু ব্রহ্ম সনাতন ।
সকলে চরণ পার যে চায় চরণ ॥ ৩৫৪ ॥
রামকৃষ্ণ অবতার পরন দয়াল ।
হইলেও অতি ক্ষুদ্র সে পায় নাগাল ॥ ৩৫৫ ॥
ফল ভারে বৃক্ষ যেন নীচে নেমে পড়ে ।
সেইমত প্রভুদেব করুণার ভারে ॥ ৩৫৬ ॥
ঢালিয়া কৃপার ধারা সাধকের দলে ।
ফিরিলেন সেই দিন আপনার স্থলে ॥ ৩৫৭ ॥
শ্রীপ্রভু অপেক্ষা তাঁর করুণার বল ।
যাহায় করেছে তাঁয় পুকুরের জল ॥ ৩৫৮ ॥
অতি সোজা অনায়াসে সহজেই মিলে ।
উদয় গোলকচন্দ্র এখন ভূতলে ॥ ৩৫৯ ॥
দলে দলে মধুলুব্ধ মধুপের প্রায় ।
মহামত্ত গোটা কর্তাভজা-সম্প্রদায় ॥ ৩৬০ ॥
নানান অবস্থা ভুক্ত পুরুষ রমণী ।
দক্ষিণশহরে করে নিত্যই মেলানি ॥ ৩৬১ ॥
সাজাইয়া ফুলহারে মনের মতন ।
মাঝে রাখি প্রভুদেবে করিত বেষ্টন ॥ ৩৬২ ॥
এ হেন সময় আর এক কথা শুনি ।
গুপ্তমুখী কত শত কুলের কামিনী ॥ ৩৬৩ ॥
মিষ্টিসহ মিঠা ফল আনিয়া গোপনে ।
পরম সোহাগে দিত প্রভুর বদনে ॥ ৩৬৪ ॥
পরিপক হ'লে ফল গাছেতে যেঘন ।
বিবিধ স্বভাবযুক্ত বিবিধ বরণ ॥ ৩৬৫ ॥
অগণন বিহঙ্গম বাসা দূরদেশে ।
পাইয়া ফুলের গন্ধ ফল খেতে আসে ॥ ৩৬৬ ॥
যেমন উদর যার সেইমত গায় ।
ক্ষুধা মিটাইয়া পরে স্ববাসে পালায় ॥ ৩৬৭ ॥
ঠিক তাই নানা সম্প্রদায়ভুক্ত দল ।
প্রভু বাঞ্ছাকল্পগাছে গায় পাকা ফল ॥ ৩৬৮ ॥
এক গাছে যত ফল একই রকম ।
সমান আকার বর্ণ এক আস্বাদন ॥ ৩৬৯ ॥
সব বিহঙ্গম তৃপ্তি নাহি পায় তায় ।
বিজাতীয় ফল দেখি স্থানান্তরে যায় ॥ ৩৭০ ॥
কল্পগাছ তেন নয় এক গাছ বটে ।
ভিন্ন ভিন্ন ফল তার ভিন্ন ভিন্ন বটে ॥ ৩৭১ ॥
নানা আস্বাদন নানা মিষ্টরসে ভরা ।
এক জাতি কত শত কে করে কিনারা ॥ ৩৭২ ॥
কোন্ পাখী কটা খাবে পেটে কত বল ।
করবৃক্ষপ্রভু তাঁয় ধরে নানা ফল ॥ ৩৭৩ ॥
কখন সাধনা কিবা কৈলা ভগবান ।
কেহ নাহি জানে তার সঠিক সন্ধান ॥ ৩৭৪ ॥
মানুষে বুঝিতে নারে প্রভুর সাধনা ।
স্বচক্ষে যাহার দেখা সেও যেন কানা ॥ ৩৭৫ ॥
বাউল প্রভৃতি নবরসিকের মত ।
ভগবানে যাইবারে যত রূপ পথ ॥ ৩৭৬ ॥
সকল বিদিত প্রভু আদি থেকে অন্ত ।
গোকলে আরম্ভ শেষ লইয়া বেদান্ত ॥ ৩৭৭ ॥
শুনিয়াছি সাধা তাঁর অগণ্য সাধন ।
নিজে যেন গুপ্ত তেন সাধনা গোপন ॥ ৩৭৮ ॥
ঊনিশ রকম ভাব শ্রীঅঙ্গে খেলিত ।
শাস্ত্র ল'য়ে মিলাইয়া ব্রাহ্মণী দেখিত ॥ ৩৭৯ ॥
অপার মহিমার্ণব প্রভু ভগবান ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা সুধার সমান ॥ ৩৮০ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
ইসলাম-সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড লীলার আকর ।
যাবতীয় লীলারঙ্গ ইহা্র ভিতর ॥ ১ ॥
ভাবময়ী রঙ্গেশ্বরী লীলার প্রাঙ্গণে ।
এখন করিলা যাহা সকল এখানে ॥ ২ ॥
বীজতলা জগতের সকলই আছে ।
সমরসযুক্ত সব ঠাকুরের কাছে ॥ ৩ ॥
সর্বধর্মসমন্বয়ে অনর্থ-বিচার ।
একত্রিত অঙ্গীভূত স্বতই লীলার ॥ ৪ ॥
একে সব সবে এক শাস্তির নিষ্পত্তি ।
একমাত্র এ লীলার নিজস্ব সম্পত্তি ॥ ৫ ॥
চিরকাল ধর্মরাজ্যে দ্বেষ দ্বন্দ ভারি ।
অমৃতসাগরে যেন বিষের লহরী ॥ ৬ ॥
অদ্যাপিহ নিবারিতে পারিল না কেও ।
বরঞ্চ ক্রমশঃ বৃদ্ধি গরলের ঢেও ॥ ৭ ॥
নিরক্ষর দীনবেশে হ'য়ে অবতার ।
দুরন্ত তরঙ্গে গ্রন্থ করিলা নিবার ॥ ৮ ॥
কুলিশের গতিরোধ কুসুমের দলে ।
রক্ষজয়ী হতবল বালকের বলে ॥ ৯ ॥
একমাত্র তৃণে বদ্ধ প্রমত্ত বারণ ।
শৈবালের ধারে ব্রহ্ম-অস্ত্রের ছেদন ॥ ১০ ॥
নির্বাণ বাড়বানল ফটিকের জলে ।
কেমনে করিলা প্রভু লীলার কৌশলে ॥ ১১ ॥
দেখিতে যদ্যপি তোর সাধ হয় মন ।
বিশ্বখণ্ড লীলাকাণ্ড কর দরশন ॥ ১২ ॥
অসম্ভবে সম্ভব করিয়া কৈলা খেলা ।
শান্তির আকর শুন রামকৃষ্ণলীলা ॥ ১৩ ॥
ওরে মন ঠাকুরের লীলা-গুণগান ।
গুনিয়া আমার সাধ পরম কল্যাণ ॥ ১৪ ॥
কি ছার মিছার ত্যজি রূপ-রস-আশা ।
প্রভু-কল্পতরুতলে নিত্য কর বাসা ॥ ১৫ ॥
নিত্য নিত্য দাও নাড়া খাও মিঠা ফল ।
দুহাত তুলিয়া নাচ বাজায়ে বগল ॥ ১৬ ॥
জাতিতে ক্ষত্রিয় নাম শ্রীগোবিন্দ রায় ।
সন্নিকটে দমদমা বসতি তথায় ॥ ১৭ ॥
পারসী আরবী ভাষা বিশেষিয়া জানা ।
ঈশ্বরানুরাগী ভক্ত তত্ত্বান্বেষী জনা ॥ ১৮ ॥
নানা ধর্ম আলোচনা তত্ত্বলাভেচ্ছায় ।
নির্ণয় করিতে তার নিজের উপায় ॥ ১৯ ॥
নিত্যই কোরাণ গ্রন্থ-পাঠ মনোযোগে ।
সুফী দর্বেশের মত মিষ্টতর লাগে ॥ ২০ ॥
এ পথ
কেবলমাত্র ভক্তি-প্রেমে ভরা ।
ভাবিলে ভাবুক ফুটে ভাবের ফুয়ারা ॥ ২১ ॥
হিন্দু-মতে
পঞ্চভাবে যেন উপাসনা ।
ভাবের পসরা শিরে ভাব-বেচা-কেনা ॥ ২২ ॥
হেথাও ভাবের খেলা
সেই মত ঠিক ।
মনোমত গোবিন্দের গোবিন্দ প্রেমিক ॥ ২৩ ॥
তাই ইসলামীয় ধর্ম করিয়া
গ্রহণ ।
নিভৃতে নির্জনে করে তাহার সাধন ॥ ২৪ ॥
ঈশ্বরানুরাগী যারা তারা এফ জাতি ।
হইলেও বিভিন্ন ধর্ম একই প্রকৃতি ॥ ২৫ ॥
হোক না যে কোন ধর্ম জানিহ নিশ্চয় ।
ভক্তি-অনুরাগ বিনে কিছু নাহি হয় ॥ ২৬ ॥
ভক্তি
অনুরাগ যেন মহা ঝঞ্ঝাবাত ।
বিধি-নিষেধের থেকে অনেক তফাত ॥ ২৭ ॥
কুল-শীল-অভিমান কোথা যায় উড়ে ।
থাকে মাত্র এক লক্ষ্য চক্ষের উপরে ॥ ২৮ ॥
সরল বিশ্বাস সহ ভাবিয়া উপায় ।
যদ্যপি কখন কেহ ধর্মান্তরে যায় ॥ ২৯ ॥
তাহাতে তাহার নাহি হয় কোন ক্ষতি ।
বরঞ্চ চরমে করে পরম উন্নতি ॥ ৩০ ॥
দৈবের ঘটনা কিবা দক্ষিণশহরে ।
উপনীত শ্রীগোবিন্দ পুরীর ভিতরে ॥ ৩১ ॥
আনন্দের সীমা নাহি দেখি রম্য স্থান ।
দেবালয় সাধুশালা ফুলের বাগান ॥ ৩২ ॥
নিরজন পঞ্চবটী ভাগীরথী-কূল ।
একত্রিত যাবতীয় সাধনানুকুল ॥ ৩৩ ॥
ভিক্ষায় সহজ-সাধ্য রানীর ভাণ্ডারে ।
সবধর্মপন্থী পায় সমান আদরে ॥ ৩৪ ॥
গোবিন্দ করিল থানা দেখি মনোমত ।
আপনার কর্মে রহে নিরন্তর রত ॥ ৩৫ ॥
চুম্বকের সঙ্গে যেন সম্বন্ধ লোহার ।
সরল বিশ্বাসে তেন ঠাকুর আমার ॥ ৩৬ ॥
সরলতা বিশ্বাসে প্রিয় প্রভুরায় ।
আপুনি হাজির নিজে গোবিন্দ যেথায় ॥ ৩৭ ॥
প্রেমিক গোবিন্দ দেখি পরম আনন্দ ।
আলাপনে আলোচনা ধর্মের প্রবন্ধ ॥ ৩৮ ॥
ঠাকুর করেন চিন্তা আপনার মনে ।
ইসলামীর পথ এক পথের বিধানে ॥ ৩৯ ॥
ভাবেশ্বরী লীলাময়ী এই পথ দিয়ে ।
দেন কত সাধকের বাঞ্ছা পুরাইয়ে ॥ ৪০ ॥
মারের শ্রীপাদ-পদ্ম-লাভ এই পথে ।
কিরূপে কেমনে হয় মানস দেখিতে ॥ ৪১ ॥
এত বলি গোবিন্দকে দীক্ষা-শুরু করি ।
সাধনা করেন এপ্রভু ধর্মবিধি ধরি ॥ ৪২ ॥
একমাত্র আল্লা-মন্ত্র অহোরাত্র জপে ।
গমন না হয় মার মন্দির-তরফে ॥ ৪৩ ॥
দেব কি দেবীর নাম ফুটে না বদনে ।
বাহিরে বাহিরে বাস এখানে সেখানে ॥ ৪৪ ॥
পরিধান-ধুতি নাই কাছা আঁটা তায় ।
হাবভাব কথাবার্তা যবনের প্রায় ॥ ৪৫ ॥
যবন-বন্ধন-ঘ্রাণ আস্বাদনে সাধ ।
মথুর দেখিল একি হৈল পরমাদ ॥ ৪৬ ॥
নানামতে প্রভুরে বুঝান সংগোপনে ।
যবনের রান্না বাবা খাইবে কেমনে ॥ ৪৭ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন খানা রাঁধিবে যখন ।
সানকি বদনা ল'য়ে করিব ভক্ষণ ॥ ৪৮ ॥
পিয়াজ রসুন গন্ধ ছাড়িবে খানায় ।
পাইলে এমন গন্ধ তৃপ্তি হবে তায় ॥ ৪৯ ॥
পুনশ্চয় প্রভুদেবে বুঝাইয়া কন ।
ব্রাহ্মণে যদ্যপি করে সেরূপ রন্ধন ॥ ৫০ ॥
তাহাতে না হবে কোন ক্ষতি আপনার ।
ভাল বলি প্রভুদেব করিলা স্বীকার ॥ ৫১ ॥
তখনি আনায় এক পাচক ব্রাহ্মণ ।
যাবনিক সুপকর্মে বিজ্ঞ বিলক্ষণ ॥ ৫২ ॥
তফাতে দেখেন রান্না প্রভু ভগবান ।
হিন্দুমতে পাচকের ধূতি পরিধান ॥ ৫৩ ॥
মথুরে ডাকাইয়ে প্রভু কন অন্তরালে ।
ব্রাহ্মণে বলহ যেন রাঁধে কাছা খুলে ॥ ৫৪॥
প্রভুর সাধনা শিক্ষা বুঝা কেন ভার ।
বিশেষিয়া বলিবারে কি শক্তি আমার ॥ ৫৫ ॥
যত বার অবতার ভিন্ন ভিন্ন যুগে ।
হইলেন ভগবান এবারের আগে ॥ ৫৬ ॥
প্রতি বারে ভাব কর্ম একৈক রকম ।
রামকৃষ্ণ অবতারে সব বৈলক্ষণ ॥ ৫৭ ॥
যাবতীর জাগতিক বর্ণের মেলানি ।
একা দিনকয়-কর সকলের খনি ॥ ৫৮ ॥
যে বরণ দিনেশ-কিরণে নাহি মিলে ।
যে বরণ নামে সভা নাই কোন কালে ॥ ৫৯ ॥
সেইমত বুঝ প্রভুদেব অবতার ।
অদ্যাবধি যত রূপ সবার আধার ॥ ৬০ ॥
সব বর্ণ সব রূপ সমভাবে বহে ।
একরূপে বহুরূপী শ্রীপ্রভুর দেহে ॥ ৬১ ॥
যেবা হিন্দু-শিরোমণি ধর্ম যার প্রাণ ।
সে দেখে প্রভুরে তার হরি ভগবান ॥ ৬২ ॥
কেহ বা পুরুষ দেখে কেহ বা প্রকৃতি ।
বিভিন্ন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন মুরতি ॥ ৬৩ ॥
ধর্মান্তরে মুসলমান দেখে আলাহিদা ।
মহান্ পুরুষ তার ত্রাতা পাতা খোদা ॥ ৬৪ ॥
ভিন্নধর্ম-অবলম্বী খ্রীষ্টান যবন ।
দয়াময় সেই যীশু করে দরশন ॥ ৬৫ ॥
পশ্চাৎ পাইবে পূর্ণ পরিচয় তার ।
একাধারে প্রভু সর্ব রূপের আধার ॥ ৬৬ ॥
হেথায় হৃদয় আর ভক্ত শ্রীমথুর ।
বলে এবা কিবা ভাব হইল প্রভুর ॥ ৬৭ ॥
শ্যামা যাঁর ধিয়ান গিয়ান মন প্রাণ ।
দিনান্তেও একবার না করেন নাম ॥ ৬৮ ॥
যাবনিক হাবভাব প্রবল অন্তরে ।
কি বিষম পরমাদ হৃদয় বিদরে ॥ ৬৯ ॥
নিবারণোপায় বুঝি ভাগিনা হৃম্বর ।
তীব্র তিরস্কার-সহ প্রভুদেবে কয় ॥ ৭০ ॥
হেঁগা মামা একি তব দেখি আচরণ ।
যবন-আচার কেন হইয়া ব্রাহ্মণ ॥ ৭১ ॥
শুদ্ধাচারী নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ছেলে ।
কিবা কবে লোকজন এরূপ দেখিলে ॥ ৭২ ॥
কাছা খুলে ধুতি পরা কহিবারে লাজ ।
পৈতা দিলে ফেলে চাহ করিতে নমাজ ॥ ৭৩ ॥
ভীতচিত প্রভুদ্বেষ উত্তরিলা তায় ।
দেখ হৃদু কেবা যেন করায় আমায় ॥ ৭৪ ॥
নানা বুঝাইয়া হৃদু শান্ত করি তাঁরে ।
শ্যামাসেবা হেতু যায় শ্যামার মন্দিরে ॥ ৭৫ ॥
স্বভাবে যেখন প্রভু হৈল তেমন ।
মসজিদে নমাজ করিতে বড় মন ॥ ৭৬ ॥
প্রভুর বাসনা যেন সিন্ধুর জুয়ার ।
চোটে ছুটে নহে কোন বাধা মানিবার ॥ ৭৭ ॥
সৃষ্টিগ্রাসী বেগ কে দাঁড়ায় ছামুখানে ।
চলিলেন সন্নিকটে মসজিদ যেখানে ॥ ৭৮ ॥
এখানে ভাগিনা হৃদু খুঁজে চারিধারে ।
না পাইয়া প্রভুদেবে আপন মন্দিরে ॥ ৭৯ ॥
দ্রুতগতি ধাইলেন করিয়া সন্ধান ।
দেখিল নেমাজ করে প্রভু ভগবান ॥ ৮০ ॥
জানি না সে কোন্ ভক্ত মসজিদ যাহার ।
যেখানে নেমাজ কৈলা প্রভু অবতার ॥ ৮১ ॥
গরহিত কাজে রত বালক যেমন ।
অকস্মাৎ উপস্থিত যদি গুরুজন ॥ ৮২ ॥
দরশন করি সশঙ্কিত চিত হয় ।
হৃদয়ে দেখিয়া তেন প্রভুর হৃদয় ॥ ৮৩ ॥
হৃদয় তাঁহারে কিছু কহিবার আগে ।
সভরে বিনয়মাথা শ্রীবদনভাগে ॥ ৮৪ ॥
রসনা জড়িত যেন নাহি সরে ভাষ ।
দূরে থেকে হৃদয়েরে করেন সম্ভাষ ॥ ৮৫ ॥
নাহি দোষ মম, দেখ হৃদু বলি তোরে ।
কে যেন করিয়া জোর আনিল আমারে ॥ ৮৬ ॥
ভাষায় করুণ রস এতই প্রবল ।
কুলিশ শুনিলে হয় সহজেই জল ॥ ৮৭ ॥
এতো ভক্তহৃদয়, ভাগিনা পুনঃ তায় ।
হাতে ধ'রে সমাদরে মন্দিরে ফিরায় ॥ ৮৮ ॥
অদ্ভুত সাধনা নাহি আসে বুদ্ধিবলে ।
একদিন প্রভুদেব পঞ্চবটমূলে ॥ ৮৯ ॥
গঙ্গায়-জুয়ার দেখিছেন ব'সে ব'সে ।
পচা মরা গরু এক ভেসে ভেসে আসে ॥ ৯০ ॥
সন্নিকটে কূলে লাগে তরঙ্গ আঘাতে ।
আইল কুকুর এক লাগিল খাইতে ॥ ৯১ ॥
বুঝি না কি ভাবে মগ্ন হৈলা নারায়ণ ।
কুকুরের এক সঙ্গে আস্বাদনে মন ॥ ৯২ ॥
আরোপ করিলা নিজে তাহার শরীরে ।
যতক্ষণ আস্বাদন বাসনা না পূরে ॥ ৯৩ ॥
হিন্দুমতে সাধনায় দর্শন যেমন ।
নানাবিধ দেবদেবী-মূর্তি অগণন ॥ ৯৪ ॥
এখানেতে একমাত্র প্রথম দিবসে ।
জ্যোতির্ময় মূর্তি এক অপূর্ব পুরুষে ॥ ৯৫ ॥
অতিশয় দীর্ঘ শ্মশ্রু ঝুলে লম্বমান ।
লীলাকথা ঠাকুরের অমৃত সমান ॥ ৯৬ ॥
সগুণ নির্গুণ ভাবে শেষ অনুভূতি ।
যেখানেতে হয় তাঁর সাধনার ইতি ॥ ৯৭ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
খ্রীষ্টানী-সাধনা
জয় রামকৃষ্ণ জয়, জয় মঙ্গল-আলয়,
দয়াময়
সর্বসিদ্ধিদাতা ।
জয় জগৎ-জননী, প্রভুভক্তি প্রদায়িনী,
ব্রাহ্মণনন্দিনী শ্যামাসুতা ॥ ১ ॥
জয় ইষ্টগোষ্ঠিগণ, শ্রীপ্রভুর প্রাণ-ধন,
আরাধ্য
চরণ সবাকার ।
করুণ কটাক্ষ কর, প্রার্থনা করে কিঙ্কর,
হর হর
লোচন-আঁধার ॥ ২ ॥
কর মোরে শক্তি দান, গাব প্রভু লীলাগান,
শুনে যেন
মুগ্ধ হয় মন ।
যায় যেন হীন মতি, কামিনীকাঞ্চনাসক্তি,
দুরগতি
ভবের বন্ধন ॥ ৩ ॥
একাগ্র হইয়া মন, প্রভুর যিশু-সাধন,
শুন শুন
সুন্দর আখ্যান ।
জাতি সুবর্ণবণিক, নাম শ্রীযদু মল্লিক,
বিষয় অধিক
ধনবান ॥ ৪ ॥
বসতি মহাশহরে, গণ্যমান্য সবে করে,
ঘরে
মাসীমাতা ভক্তিমতী ।
প্রভুর পরকমলে, একটানে ভক্তি খেলে,
হিয়া যেন
ভক্তি-স্রোতস্বতী ॥ ৫ ॥
মাসীর ভক্তির কথা, কহিতে নাহি যোগ্যতা,
অনুরাগে
ব্যাকুলতা এত ।
যেই প্রভু ত্রিভুবনে, ইঙ্গিতে সকলে টানে,
তাঁরে
টেনে ভবনে আনিত ॥ ৬ ॥
পুরীর অত্যন্ত কাছে, যদু মল্লিকের আছে,
উদ্যাানভবন মনোরম ।
তথায় ভকতিভাবে, ল'য়ে যেত প্রভুদেবে,
তারা সবে
করি নিমন্ত্রণ ॥ ৭ ॥
নানা দ্রব্য সুরসাল, পরিপূর্ণ করি খাল,
মাসী দিত
খেতে পরমেশে ।
আপুনি বিউনি করে, ধীরে ধীরে পাখা করে,
প্রভু-অক্ষে পরম হরিষে ॥ ৮ ॥
নাহি জানি সমাচার, মাসী কার অবতার,
মেলা ভার
এমন রমণী ।
ষোল আনা জ্ঞান ঘটে, গন্ধ নাই সন্দ ছিটে,
প্রভুদেব
গোরা গুণমণি ॥ ৯ ॥
সে বাগানে এক দিন, প্রভুদেব ভক্তাধীন,
দেখিলেন
দিয়ালের গায়ে ।
পটে আঁকা অপরূপ, ক্রাইষ্টের প্রতিরূপ,
একভাবে
অনিমিখ হ'য়ে ॥ ১০ ॥
দেখিতে দেখিতে তায়, অতি জ্যোতি বাহিয়ায়,
মুরতির
গায় শুন মন ।
মিশিল সে জ্যোতিরাশি, প্রভুর শ্রীঅঙ্গে আসি,
তাহে
প্রভু হইলা কেমন ॥ ১১ ॥
উঠিল হৃদে তুফান, প্রিয় যিশু-গুণ গান,
দেবদেবী
নাম মাত্র নাই ।
হাবভাব খ্রীষ্টিয়ানি, গন্ধ নাই হিন্দুয়ানি,
বড় খেলা
করিলা গোসাঁই ॥ ১২ ॥
বসিয়া নিজ মন্দিরে, দেখিতেন গির্জাঘরে,
বড় বড়
সাহেব পাদরি ।
প্রভু হয়ে বাহ্যহারা, শুনেন গস্পেল্-পড়া,
তিন দিন
তিন বিভাবরী ॥ ১৩ ॥
দিনত্রয় গেলে পরে, ফিরিলা শ্রীপ্রভু ঘরে,
শ্রীবদনে
শ্যামা শ্যামা রব ।
অগণ্য সাধনা যাঁর, যত পথ একাকার,
বুঝে
তাঁরে কেমনে মানব ॥ ১৪ ॥
যে মানব এক পথে, জনমে না পারে যেতে,
হীনসৎবুদ্ধি-রতিমতি ।
কাঞ্চনের ক্রীতদাস, নারী-সেবা অভিলাষ,
মহোল্লাস
অবিদ্যা পিরীতি ॥ ১৫ ॥
তিলেক না করে মনে, পিতামাতা সনাতনে,
জীবহিতে
ব্রতী যেই জন ।
ত্রিতাপসন্তাপহর, সকল মঙ্গলকর,
সর্বেশ্বর
পতিতপাবন ॥ ১৬ ॥
কষ্টে নহে পরাঙ্মুখ, তাজিয়া যাবৎ সুখ,
পঞ্চভূতে গড়া দেহ ধরি ।
মর্ত্যধামে বারে বারে, পাপে রত জীবোদ্ধারে,
দ্বারে দ্বারে দিবা বিভাবরী ॥ ১৭ ॥
এই বারে সমাপান, যত সাধান-ভজন,
এক মহাকর্ম বাকি তাঁর ।
সে অতি শ্রুতিমঙ্গল, শ্রবণে অমূল্য ফল,
পশ্চাৎ গাইব সমাচার ॥ ১৮ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
বিবিধ ভাব প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
সমাপ্ত প্রভুর এবে সাধন-ভজন ।
সাধু-ভক্ত সনে কৈল খেলা আরম্ভন ॥ ১ ॥
এ সময় আসে এক পণ্ডিতপ্রবর ।
নারায়ণ শাস্ত্রী নাম জয়পুরে ঘর ॥ ২ ॥
বাল্যাবধি শাস্ত্র-পাঠে অনুরাগী মন ।
অস্ফুট বিরাগযুক্ত ব্রাহ্মণনন্দন ॥ ৩ ॥
গুরুগৃহে অবস্থান ব্রহ্মচারিবেশে ।
পঁচিশ বৎসর কাল আয়াস অশেষে ॥ ৪ ॥
ষড়দর্শনের মধ্যে পাঁচ কৈলা সায় ।
এখন কেবলমাত্র বাকি আছে ন্যায় ॥ ৫ ॥
পরস্পরা শুনিলেন শাস্ত্রজ্ঞ-সমীপে ।
প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক নবদ্বীপে ॥ ৬ ॥
তাই নবদ্বীপে হয় তাঁর আগমন ।
সাত বৎসরের মধ্যে ন্যায় সমাপন ॥ ৭ ॥
স্বদেশাভিমুখে যাত্রা মনে মনে আশা ।
ঘটনার চক্রে হৈল এইখানে আসা ॥ ৮ ॥
অতি মনোরম স্থান ভাগীরথী-তীর ।
সুন্দর পুরীতে দেবদেবীর মন্দির ॥ ৯ ॥
সেবা রাগাদির কত বন্দোবস্ত তায় ।
সদরে সন্ন্যাসী ত্যাগী অতিথিশালায় ॥ ১০ ॥
ভাণ্ডারেতে নানাদ্রব্য বহু পরিমাণে ।
প্রসাদার্থ দীন-দুঃখী লোকারণ্য দিনে ॥ ১১ ॥
শোভমান পুষ্পোদ্যান কত ফুল তায় ।
গন্ধবহ চারিদিকে সৌরভ ছুটায় ॥ ১২ ॥
সর্বোপরি শান্তিময় পঞ্চবটী তল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিত পরশে শীতল ॥ ১৩ ॥
দিব্যভাব-পরিপূর্ণ যোগীর লালসা ।
ধীর স্থির সুগম্ভীর বৈরাগ্যের বাসা ॥ ১৪ ॥
প্রভুর তপস্যা-তেজে সচৈতন্য স্থল ।
তিল-আশে কর্মে তথা তালবৎ ফল ॥ ১৫ ॥
অপার কৃপার সিন্ধু প্রভু ভগবান ।
জীবহিত সদাব্রত কল্যাণনিদান ॥ ১৬ ॥
পাপভারাক্রান্ত জীব-উদ্ধারের হেতু ।
সহিয়া অশেষ কষ্ট কৈলা কত সেতু ॥ ১৭ ॥
অকূল পাথার ভবজলধির মাঝে ।
হীনবল জীব পারে যাইবে সহজে ॥ ১৮ ॥
হেন সোজা পথে যেতে তবু যে অক্ষম ।
তার জন্যে কৈলা কল্পবৃক্ষের রোপণ ॥ ১৯ ॥
ওরে মন গুন কল্পবৃক্ষ কারে বলে ।
ভাই পায় যে যা চায় বসি যার তলে ॥ ২০ ॥
মূল কল্প-বৃক্ষ প্রভু বুঝিয়া আপনে ।
বহুদিন নরদেহে রহে ধরাধামে ॥ ২১ ॥
জীবের কল্যাণে করি সাধন-ভজন ।
কল্পবৃক্ষ পঞ্চবট করিলা রোপণ ॥ ২২ ॥
ঈশ্বরের তত্ত্ব-আশে যদি কোন জনে ।
সরল অন্তরে খুঁজে সজল নয়নে ॥ ২৩ ॥
এই পঞ্চবটতলে শ্রীহস্তে রোপিত ।
মনোরথ পূর্ণ তার হইবে নিশ্চিত ॥ ২৪ ॥
শাস্ত্র নহে শুধু শাস্ত্রপাঠী একজন ।
বৈরাগ্য তাহার সঙ্গে ছিল সংমিলন ॥ ২৫ ॥
শাস্ত্রস্থ ঈশ্বর তত্ত্ব প্রত্যক্ষানুভূতি ।
করিতে বাসনা মনে প্রাণে বলবতী ॥ ২৬ ॥
বিবেক-বৈরাগ্যবান ব্রাহ্মণের ছেলে ।
স্বতিব্রত আরম্ভিল পঞ্চবটতলে ॥ ২৭ ॥
ভকতবৎসল প্রভু আর নহে স্থির ।
শাস্ত্রীর সমীপে গিয়া হইলা হাজির ॥ ২৮ ॥
দোঁহে দোঁহাকার প্রতি সমাকৃষ্ট মন ।
পরম আনন্দে হয় তত্ত্ব-আলাপন ॥ ২৯ ॥
পাত্র দেখি হৈল কৃপা শাস্ত্রীর উপরে ।
দিন দিন যায় যত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৩০ ॥
সাধনাজ অনুভূতি দর্শননিচয় ।
ক্রমশঃ শ্রীপ্রভু তারে দিলা পরিচয় ॥ ৩১ ॥
তদুপরি চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ নিরবধি ।
আঙ্গিক লক্ষণ-সহ প্রভুর সমাধি ॥ ৩২ ॥
প্রথম ভূমিতে বায়ু হইয়া উদয় ।
ঘাটে ঘাটে উঠে হয় সপ্তমেতে লয় ॥ ৩৩ ॥
এতক্ষণে ধীরবর পায় দেখিবারে ।
বেদান্তের গুপ্ত রত্ন প্রভুর ভিতরে ॥ ৩৪ ॥
বেদান্তের বাগারণ্যে যে বস্তু নিহিত ।
তাহার লক্ষণ শ্রীঅঙ্গেতে সমুদিত ॥ ৩৫ ॥
স্তম্ভিত পণ্ডিতবর করে মনে মনে ।
জীবন্ত বেদান্ত হন প্রভু বিদ্যমানে ॥ ৩৬ ॥
প্রভুকে শ্রীগুরু করি প্রভুর কৃপায় ।
সাধিতে হইবে ব্রহ্ম-লাভের উপায় ॥ ৩৭ ॥
এত ভাবি দেশে প্রত্যাগতের কামনা ।
ত্যজিয়া প্রভুর কাছে করিলেন থানা ॥ ৩৮ ॥
একরূপ শ্রীপ্রভুর দেখি নিরন্তর ।
গুণ বর্তমান যেথা সেখানে আদর ॥ ৩৯ ॥
দয়া-গুণে দাতা কিবা পরহিতাচারী ।
সাধারণ মধ্যে যার যশ-মান ভারি ॥ ৪০ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ সাধক কিবা সাধু কিবা ভক্ত ।
যে কোন ভাবের কিবা সম্প্রদায়ভুক্ত ॥ ৪১ ॥
স্থানাস্থান মানামান বিচারবিহীনে ।
অযাচিত হইয়াও গমন সেখানে ॥ ৪২ ॥
লোকপরম্পরা প্রভু করিলা শ্রবণ ।
বিখ্যাত পণ্ডিত নাম শ্রীপদ্মলোচন ॥ ৪৩ ॥
সভাপণ্ডিতের পরে বর্ধমানে আছে ।
সসম্মানে তথাকার অধিপের কাছে ॥ ৪৪ ॥
দিগ্বিজয়ী বিচারেতে দেশ জুড়ে নাম ।
নাহিক পণ্ডিত কেহ তাঁহার সমান ॥ ৪৫ ॥
ন্যায়েতে পণ্ডিত হেন বেদান্তে তেমন ।
তদুপরি সাধনায় সিদ্ধ একজন ॥ ৪৬ ॥
বহুগুণে বিভূষিত প্রতিভা উজ্জ্বল ।
দীনে দয়া ইষ্টনিষ্ঠা উদার সরল ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর প্রবল ইচ্ছা হইল তখন ।
দেখিবারে দেশখ্যাত পণ্ডিত কেমন ॥ ৪৮ ॥
হেনকালে প্রভুদেব পাইলা খবর ।
পণ্ডিত অনুস্থাবস্থা পীড়ায় কাতর ॥ ৪৯ ॥
স্বাস্থ্যোন্নতি-হেতু বাস করে গঙ্গাতীরে ।
এড়েদহে এখানের অনতি অন্তরে ॥ ৫০ ॥
হৃদয় প্রেরিত হৈল জানিতে বারতা ।
কেমন পণ্ডিত আর আছে হেগা কোথা ॥ ৫১ ॥
অনুমতি মত হৃদু চলিল ত্বরিত ।
পণ্ডিতের কাছে গিয়া হয় উপনীত ॥ ৫২ ॥
পণ্ডিত হরষান্বিত বৃত্তান্ত শ্রবণে ।
হৃদয়ে আদর কত জানিয়া ভাগিনে ॥ ৫৩ ॥
পরে সবিনয় কয় ধীরশিরোমণি ।
শ্রীপ্রভুর দরশন ভাগ্য করি মানি ॥ ৫৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে হেথা ফিরিল হৃদয় ।
শ্রীগোচরে দিল আদি-অন্ত-পরিচয় ॥ ৫৫ ॥
যথাদিনে হৃদু সঙ্গে প্রভুর গমন ।
শ্রদ্ধায় পণ্ডিত কৈলা প্রভুকে গ্রহণ ॥ ৫৬ ॥
পরস্পর সম্মিলনে তুষ্ট অতিশয় ।
যেন পূর্বে পূর্বে কত ছিল পরিচয় ॥ ৫৭ ॥
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী সব সুবিদিত ।
বুঝিলা যতেক গুণে ভূষিত পণ্ডিত ॥ ৫৮ ॥
শ্রদ্ধা-ভক্তিযুক্ত ইষ্ট-দেবীর উপরে ।
বিভূতি সিদ্ধাই প্রাপ্ত অম্বিকার বরে ॥ ৫৯ ॥
তাই প্রভু বীণাকণ্ঠ মোহিতে পণ্ডিত ।
ধরিলেন কালিকার গুণগান-গীত ॥ ৬০ ॥
কি কব গীতের গতি ভূবন ভুলায় ।
কিবা কথা চেতনের পাষাণে গলায় ॥ ৬১ ॥
ভক্তিঘন শ্রীমুরতি বিনোদপ্রতিম ।
অদৃষ্ট অশ্রুতপূর্ব ভাব নিরুপম ॥ ৬২ ॥
তুলনার কথা মন তুল না তুল না ।
প্রভুর তুলনা মাত্র প্রভুই তুলনা ॥ ৬৩ ॥
বিধির গঠন হৈলে তুলনা পাইতে ।
আপনে গঠেছে প্রভু আপনার হাতে ॥ ৬৪ ॥
অপরূপ হোতে প্রভু অপরূপতর ।
রূপরসতন্মাত্রের অপার সাগর ॥ ৬৫ ॥
অনন্ত লহরী তার গেলে পলে পলে ।
যে আসে সকাশে তার হিল্লোলেতে টলে ॥ ৬৬ ॥
কিবা কব শ্রীপ্রভুর ঐশ্বর্যের কথা ।
পেয়ে তার বিন্দুমাত্র বিধাতা বিধাতা ॥ ৬৭ ॥
রূপরসযুপ্ত মন জীবের উদ্ধারে ।
অবতীর্ণ প্রভুদেব লীলার আসরে ॥ ৬৮ ॥
গীতে মুগ্ধ পণ্ডিতের অবস্থা এখন ।
বাক্ রুদ্ধ মন স্তব্ধ সজল নয়ন ॥ ৬৯ ॥
গাইতে গাইতে গীত ভাবের আবেশ ।
গভীর সমাধিমগ্ন পরে পরমেশ ॥ ৭০ ॥
বাহ্যেতে আসিলে প্রভু পণ্ডিত জিজ্ঞাসে ।
অনুভূতি দরশন কি হয় আবেশে ॥ ৭১ ॥
সমাধিতে উপলব্ধি কি প্রকার হয় ।
যাবতীয় আদি মধ্য অন্ত পরিচয় ॥ ৭২ ॥
তন্ন তন্ন বলিলেন প্রভু গুণমণি ।
প্রথম হইতে তার চরম কাহিনী ॥ ৭৩ ॥
চরমের উপলব্ধি প্রভুর কীর্তিত ।
বেদান্তের মধ্যে তাহা না পায় পণ্ডিত ॥ ৭৪ ॥
হেথা যে শ্রীপ্রভুদেব বেদান্তের পার ।
কেমনে বেদান্ত পাবে সমাচার তাঁর ॥ ৭৫ ॥
প্রভুর প্রকৃত তত্ত্ব দর্শন না জানে ।
এ হেন গোসাঞি এবে রামকৃষ্ণ নামে ॥ ৭৬ ॥
পণ্ডিতেরে হেথা ধাঁধা দিল মহামায়া ।
আলোকের মধ্যে যেন আধারের ছায়া ॥ ৭৭ ॥
আজি এই তক্ প্রভু ফিরিলা মন্দিরে ।
স্বস্থানে পণ্ডিতবর নানা চিন্তা করে ॥ ৭৮ ॥
বুদ্ধিশুদ্ধিহারা এবে ভাবে মনে মন ।
যা দেখিনু যা শুনিনু সত্য কি স্বপন ॥ ৭৯ ॥
মগ্ন চিত্ত দিবারাত্র ভাবিছে প্রভুকে ।
লোহার অবস্থা যেন টানিলে চুম্বকে ॥ ৮০ ॥
প্রকৃত সঠিক তত্ত্ব করিতে নির্ণয় ।
পণ্ডিত অস্থিরচিত্ত হৈল অতিশয় ॥ ৮১ ॥
পরস্পর দেখাশুনা হয় বারংবার ।
পণ্ডিতের প্রতি হৈল রূপার সঞ্চার ॥ ৮২ ॥
সত্যতত্ত্ব অন্বেষক উদার সরল ।
সন্দেহ-মোচনে প্রভু করিলা কৌশল ॥ ৮৩ ॥
শুন মন এক মনে তমঃ হবে দূর ।
মহীয়ান মহতী মহতি মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৮৪ ॥
পণ্ডিত দুনিয়াজানা বর্ধমানে বাসা ।
যবে যেথা উঠে কেন দুর্বোধ্য সমস্যা ॥ ৮৫ ॥
যথার্থ সিদ্ধান্ত কিবা মীমাংসার আশে ।
দিগ্ দিগন্তরবাসী কত লোক আসে ॥ ৮৬ ॥
মীমাংসায় বসিবার পূর্বে ধীরবর ।
আছিল তাহার এক রীতি স্বতন্তর ॥ ৮৭ ॥
জলপূর্ণ ঝারি এক গামছা সহিত ।
সর্বদা তাঁহার পাশে থাকিত স্থাপিত ॥ ৮৮ ॥
তাই ল'য়ে হাতে ইতস্ততঃ বিচরণ ।
পশ্চাতে তাহার হয় মুখপ্রক্ষালন ॥ ৮৯ ॥
বন্ধন-মোক্ষণ পরে গামছা দ্বারায় ।
ভবে তিনি বসিতেন প্রশ্ন-মীমাংসায় ॥ ৯০ ॥
এ হেন প্রক্রিয়া করি বসিলে বিচারে ।
কেহ নাহি দুনিয়ায় হারায় তাঁহারে ॥ ৯১ ॥
ইষ্টনিষ্ঠাবান-হেতু পণ্ডিতপ্রবর ।
ইষ্টদেবী সুপ্রসন্না দেন এই বর ॥ ৯২ ॥
অদ্যাপি এ সন্ধান কেহ নাহি জানে ।
সংগোপনে প্রাপ্ত যেন রক্ষা সংগোপনে ॥ ৯৩ ॥
জগতে যাবৎ সব বিদিত প্রভুর ।
ভাবমুখে অবস্থিত অচেনা ঠাকুর ॥ ৯৪ ॥
একদিন মীমাংসাতে কোন সমস্যার ।
বসিবার পূর্বে ঝারি গামছা তাঁহার ॥ ৯৫ ॥
লুকায়ে রাখেন প্রভু আপনার হাতে ।
সময়েতে দ্বিজবর খুঁজে চারি ভিতে ॥ ৯৬ ॥
ভৃঙ্গার গামছা তার ভেল্কির মূল ।
যথাস্থানে না পাইয়া চিন্তায় আকুল ॥ ৯৭ ॥
যাদুর আধার বিনা হারা বুদ্ধিবল ।
পশ্চাতে জানিল ইহা প্রভুর কৌশল ॥ ৯৮ ॥
ছুটিল সন্দেহ-তমঃ উদিল চেতন ।
প্রভু তাঁর ইষ্টদেবী করে নিরীক্ষণ ॥ ৯৯ ॥
পদপ্রান্তে উপবিষ্ট বিহ্বল আতুর ।
ইচ্ছা দেখে আনিভরে প্রেমের ঠাকুর ॥ ১০০ ॥
কিন্তু তার এবে নাহি পুরিল কামনা ।
অবিরল অশ্রুজল দিল তাহে হানা ॥ ১০১ ॥
আঁখি-দৃষ্টি রুদ্ধ দেখি পথপদ স্বরে ।
ইষ্টজ্ঞানে প্রভুদেবে স্তবস্তুতি করে ॥ ১০২ ॥
উচ্ছ্বাস-বিগতে পুনঃ কহে আর বার ।
আপুনি স্বয়ং সেই ঈশ্বরাবতার ॥ ১০৩ ॥
মুকতি যদ্যপি কভু পাই এ পীড়ায় ।
দেশেতে পণ্ডিত যত আছে যে যেথায় ॥ ১০৪ ॥
নিমন্ত্রিয়া তে সবারে সভা সাজাইব ।
ডাকিয়া হাঁকিয়া আমি সকলে কহিব ॥ ১০৫ ॥
এই রামকৃষ্ণ নামে নরদেহধারী ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ভবের কাণ্ডারী ॥ ১০৬ ॥
উদ্ধারিতে জীবকুল শোকন্তঃপাতুর ।
ধর্মদ্বন্দ্ব একেবারে করিবারে দূর ॥ ১০৭ ॥
দয়াল ঠাকুর অবতীর্ণ ধরাধামে ।
দেখিব আমার কথা খণ্ডে কোন্ জনে ॥ ১০৮ ॥
কি দেখা দেখিয়াছিল প্রভুর ভিতর ।
ধন্য দেব রামকৃষ্ণ ধন্য ধীরবর ॥ ১০৯ ॥
মধ্যে মধ্যে মথুরের সভাধিবেশন ।
বঙ্গীয় পণ্ডিতবর্গে করি নিমন্ত্রণ ॥ ১১০ ॥
সখ ও স্বভাব ছিল দেখি পূর্বাপর ।
বহু ব্যয় হইলেও না হয় কাতর ॥ ১১১ ॥
অন্ত কোন প্রয়োজনে মথুর এবার ।
করিতেছিলেন এক সভার যোগাড় ॥ ১১২ ॥
বলবতী ইচ্ছা পদ্মলোচনে আহ্বান ।
কিন্তু সাহসেতে নাহি হয় সংকুলান ॥ ১১৩ ॥
কারণ লোকের মুখে করেছে শ্রবণ ।
শূদ্রদত্ত পণ্ডিতের না হয় গ্রহণ ॥ ১১৪ ॥
সুযোগ বুঝিয়া এবে কন প্রভুয়ায় ।
যদি তাঁর অনুরোধে আসেন সভায় ॥ ১১৬ ॥
যথা কথা পণ্ডিতে কহিলা গুণমণি ।
উত্তরে প্রভুকে কয় ধীর শিরোমণি ॥ ১১৭ ॥
ইহা তো সামান্য কথা সঙ্গেতে তোমার ।
হাড়ির বাড়িতে পারি করিতে আহার ॥ ১১৮ ॥
ধন্য ধীরবর তব পাণ্ডিত্যও ধন্য ।
এ মহালীলায় খ্যাতি রাখিলে অক্ষুন্ন ॥ ১১৯ ॥
প্রাতঃস্মরণীয় তুমি তোমার ভারতী ।
প্রাতঃসন্ধ্যা যদি কেহ করেন আবৃত্তি ॥ ১২০ ॥
শ্রীপ্রভু নিশ্চয় তাঁহে করিবেন পায় ।
ভয়ঙ্কর ভবসিন্ধু অকুল পাথার ॥ ১২১ ॥
পণ্ডিতের যনঃসাধ মনেতে রহিল ।
দিনে দিনে অসুস্থতা বাড়িতে লাগিল ॥ ১২২ ॥
বিদায় লইয়া তবে অভয় চরণে ।
রক্ষা করিলেন দেহ গিয়া কাশীধাামে ॥ ১২৩ ॥
এ সময় কত লোক আসে দলে দলে ।
খেয়ে দুটি পাকা ফল পুনঃ যায় চলে ॥ ১২৪ ॥
একবার প্রভুদেবে যে করে দর্শন ।
কতই না কত গেঠে পায় রত্নধন ॥ ১২৬ ॥
এখন নানান ভাবে প্রভু গুণমণি ।
বিশেষিয়া শুন মন অপূর্ব কাহিনী ॥ ১২৭ ॥
কভু দিয়া করতালি হরি-গুণগান ।
কখন হুঙ্কার করি শ্যামায় আহ্বান ॥ ১২৮ ॥
আবেশে প্রবেশ কভু শ্যামার মন্দিরে ।
গান নানা ভাবে গীত সুমধুর স্বরে ॥ ১২৯ ॥
গাইতে গাইতে প্রভু এতই উন্মত্ত ।
নূপুর বাঁধিয়া পায় করিতেন নৃত্য ॥ ১৩০ ॥
কখন রমণীবেশে সখীর মতন ।
শ্রীঅঙ্গে শ্যামার হয় চামর-ব্যজন ॥ ১৩১ ॥
নবনী-মন্থন কভু লইয়া মন্থনী ।
কামার বদনে দেন সদ্যোজাত ননী ॥ ১৩২ ॥
কভু নানা রঙ্গ ঢঙ্গ বালকের প্রায় ।
শ্রীবদনে হাসিরাশি গালি দিয়া মায় ॥ ১৩৩ ॥
কখন বা বাজে গাল শিব-সন্নিধানে ।
ববম্ ববম্ বোল মুখে ঘনে ঘনে ॥ ১৩৪ ॥
কখন বা সমাধিস্থ যেন যোগেশ্বর ।
গভীর প্রশান্ত কান্তিযুক্ত কলেবর ॥ ১৩৫ ॥
যেন দিয়া আত্মসুখ দেহ মন প্রাণ ।
করিছেন জীবহিত বিশ্বহিত-ধ্যান ॥ ১৩৬ ॥
শিবময় দয়াময় মঙ্গলনিধানে ।
যে যেখে তখন তার এই হয় মনে ॥ ১৩৭ ॥
বিষ্ণুর মন্দিরে কভু ল'য়ে রাধা-শ্যাম ।
নানাবিধ ভাবে হয় নানাবিধ গান ॥ ১৩৮ ॥
শামের শ্রীঅঙ্গে শোভে যত অলঙ্কার ।
কাড়িয়া পরায়ে দেন শ্রীঅঙ্গে রাধার ॥ ১৩৯ ॥
কভু ল'য়ে পীতবাস মোহন বাঁশরী ।
নানা রঙ্গে রসভাব হয় ছড়াছড়ি ॥ ১৪০ ॥
কখন হইত তাঁর অপরূপ খেলা ।
পিতল-গঠিত মুর্তি ল'য়ে রামলালা ॥ ১৪১ ॥
রঘুবীর শ্রীপ্রভুর জীবন-জীবন ।
স্বরগ্রামে রামনাম কখন কখন ॥ ১৪২ ॥
কি মধুর রামনাম শ্রীবদনে তাঁর ।
তুলনায় কিছু নহে ভ্রমর-ঝঙ্কার ॥ ১৪৩ ॥
ভাগ্যবলে বারেক যে শুনিয়াছে কানে ।
হৃদিতন্ত্রী বাঁধা তার আছে রামনামে ॥ ১৪৪ ॥
কি প্রকার বাঁধা তন্ত্রী বলা বড় দায় ।
স্মরণে দেহের শিরা রামনাম গায় ॥ ১৪৫ ॥
জলে স্থলে জড় কি চেতন আছে যত ।
মনে হয় রামনাম গায় অবিরত ॥ ১৪৬ ॥
দশদিকে রামনাম সতত কেবল ।
শ্রীবদনে রামনাম শুনার এ ফল ॥ ১৪৭ ॥
কভু বৈদান্তিক সনে বেদান্ত-বিচার ।
কখন বা সমাধিস্থ জড়ের আকার ॥ ১৪৮ ॥
যতেক ইন্দ্রিয় কাজে দিয়েছে জবাব ।
সকলের মূল নাড়ী তাহারও অভাব ॥ ১৪৯ ॥
কিন্তু ফুল্ল মুখপদ্ম অতি সুশোভন ।
খেলে তায় শারদীয় চাঁদের কিরণ ॥ ১৫০ ॥
কভু বৈষ্ণবের সঙ্গে কৃষ্ণ-গুণ-গান ।
কখন ভাঙ্গিয়া কন গীতাদি পুরাণ ॥ ১৫১ ॥
গুণত্রয়-ভেদে ভক্তি-ভাবের পার্থক্য ।
কি ভাবে কাহার গতি কি হেতু অনৈক্য ॥ ১৫২ ॥
ভক্তি-পথে পঞ্চভাব লক্ষণ তাহার ।
সাধক ভজক অনুরাগী কি প্রকার ॥ ১৫৩ ॥
কখন বা হয় নৃত্য গৌরহরি বলি ।
তালে তালে দুই করে দিয়া করতালি ॥ ১৫৪ ॥
কভু পঞ্চনামী নবরসিক বাউল ।
সম্প্রদায়িগণ সনে কথা হুলস্থুল ॥ ১৫৫ ॥
আলেক্ সহজ রূপ-সাগরসম্বন্ধে ।
গাইতেন কত গীত মাতিয়া আনন্দে ॥ ১৫৬ ॥
কভু উক্তি-উপদেশ স্রোত বহি চলে ।
মত্তপ্রায় শ্রোতা তালে ভেসে ভেসে খেলে ॥ ১৫৭ ॥
সামান্য উপমা-সহ কথা নহে বড় ।
তাই দিয়া ভাঙ্গিতেন তত্ত্বকথা গূঢ় ॥ ১৫৮ ॥
মুখবিগলিত বাক্যে মহিমা অপার ।
সুমুর্খ শুনিবে বুঝে গুহ্য সমাচার ॥ ১৫৯ ॥
আগুন বারুদ বায়ু্ তিন সহকারে ।
নরম সীসার গোলা কামানের দ্বারে ॥ ১৬০ ॥
বাহিরায় যেন বেগে হেন শক্তি গায় ।
পলকে পাষাণ গিরি ইঙ্গিতে ফাটায় ॥ ১৬১ ॥
তেমতি প্রবাক্যে এত শক্তির উদয় ।
অনায়াসে ভেদ করে পাষণ্ড-হৃদয় ॥ ১৬২ ॥
উজ্জ্বলতা-গুণ বাক্যে এতই তাঁহার ।
তখনি উজ্জ্বল হৃদি যে ছিল আধার ॥ ১৬৩ ॥
তমসন্দ দূরীভূত আলো করে হৃদি ।
অপার আনন্দ ভুলে শ্রোতা-নিরবধি ॥ ১৬৪ ॥
কভু প্রভু ব্রহ্ম-জ্ঞানে হইয়া প্রমত্ত ।
যাবৎ বস্তুর আগে শ্রদ্ধায় প্রণত ॥ ১৬৫ ॥
ভাল মন্দ ভক্তাভক্ত সকলে প্রণাম ।
বলিতেন চোর সাধু উভয়েই রাম ॥ ১৬৬ ॥
পূর্ণভাবে ব্রহ্মজ্ঞান ঘটে বলবৎ ।
দেখেন জগতে তিনি তাঁহার জগৎ ॥ ১৬৭ ॥
একমনে শুন মন অতি মিষ্ট কথা ।
বিশ্বপ্রেম আত্মপ্রেম একই বারতা ॥ ১৬৮ ॥
মহাপ্রেম এই এর ওধারে গাঁ নাই ।
আধার আধেয় ভাবে ডুবেছে গোসাঁই ॥ ১৬৯ ॥
একদিন কোন জনে করি দরশন ।
চরণে ধলিয়া নবদুর্বাদলবন ॥ ১৭০ ॥
করিছেন বিচরণ উদ্যান-মাঝার ।
আর্তনাদে প্রভুর বিষম চীৎকার ॥ ১৭১ ॥
এ যে কিবা মহাপ্রেম নরবুদ্ধি ধরি ।
তিল আধ অণুকণা বুঝিতে না পারি ॥ ১৭২ ॥
কখন শাস্ত্রজ্ঞ-মুখে শাস্ত্রীয় শ্রবণ ।
পুরাণ চণ্ডীর গীত গীতা রামায়ণ ॥ ১৭৩ ॥
এইরূপ নানাভাব ভকতবিশেষে ।
দেখাইলা প্রভুদেব সাধনার শেষে ॥ ১৭৪ ॥
এইবারে মনে তাঁর হইল স্মরণ ।
যাবতীর সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদগণ ॥ ১৭৫ ॥
রোদন করেন কত বসিয়া নির্জনে ।
একে একে স্মরি যত অন্তরঙ্গগণে ॥ ১৭৬ ॥
সন্ধ্যাকালে শাক-ঘন্টা বাজিলে মন্দিরে ।
তাড়াতাড়ি উঠিতেন ছাদের উপরে ॥ ১৭৭ ॥
উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতেন প্রিয় ভক্তগণে ।
আয় কে কোথায় আমি আছি এইখানে ॥ ১৭৮ ॥
মথুর এতেক শুনি প্রভুদেবে কন ।
কই বাবা কোথা আছে তব ভক্তগণ ॥ ১৭৯ ॥
কেন নিত্য নিত্য ডাক এত কষ্ট করি ।
একা আমি হাজার ভক্তের বল ধরি ॥ ১৮০ ॥
যদি কেহ থাকে বাবা আনহ সত্বর ।
রাখিব পরম যত্নে মাথার উপর ॥ ১৮১ ॥
ভক্তগণে প্রভুর অদ্ভুত আকর্ষণ ।
টানে প্রিয় সখা বায়ু আগুন যেমন ॥ ১৮২ ॥
বাহ্যিক দর্শনে একা বহ্নিশিখা জ্বলে ।
গোপনে পবনে ডাকে কৌশলের কলে ॥ ১৮৩ ॥
সে কল কৌশলাঙ্গিত মানুষে না জানে ।
উপমায় চুম্বক লোহায় যেন টানে ॥ ১৮৪ ॥
অলক্ষ্যেতে আকর্ষণ দেখিবারে নাই ।
ভক্তগণে হেন টানে টানেন গোসাঁই ॥ ১৮৫ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব ভক্ত-অবতার ।
তেমতি সুগুপ্ত যত ভকত তাঁহার ॥ ১৮৬ ॥
কাদা-মাটি-মাখা দেখে মহা আবরণে ।
রেখেছেন প্রভুদেব পরম গোপনে ॥ ১৮৭ ॥
অদ্ভুত প্রভুর লীলা দেখে দুলে মন ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ডে পাবে বিবরণ ॥ ১৮৮ ॥
চন্দ্র-সূর্য প্রভু তারা যত ভক্তমনা ।
এত আলো তবু লোকে ঠিক যেন কানা ॥ ১৮৯ ॥
কেহ দৃষ্টিহীন যেতে কেহ দিনমানে ।
ধন্য মেঘমায়া ঢাকে সূর্যের কিরণে ॥ ১৯০ ॥
যাদুকর শিরোমণি প্রভু গুণধাম ।
জ্বালিয়া সূর্যের বাতি আঁধার দেখান ॥ ১৯১ ॥
চক্ষুষ্মান কেবল তাঁহার ভক্তগণ ।
সম্প্রদায়ী ভাব মম না বুঝিও মন ॥ ১৯২ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদ আত্মগণ তাঁর ।
জীব নহে ভক্ত মাত্র মানুষ আকার ॥ ১৯৩ ॥
ভক্তগণ তাঁর জন ভক্তদের তিনি ।
যাবে যাবে সঙ্গে যাওয়া-আসা মর্ত্যভূমি ॥ ১৯৪ ॥
গৃহিণী গৃহেতে যেন সাজায় ভাণ্ডার ।
তখনি আনেন হবে যাহা দরকার ॥ ১৯৫ ॥
তেমতি সাধান আছে ভক্ত শ্রীপ্রভুর ।
কেহ কিছু সন্নিকটে কেহ কিছু দূর ॥ ১৯৬ ॥
ফেলিলে প্রলোভী চার জলের ভিতরে ।
একবারে মৎস্যগণ নাহি আসে চারে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভুর প্রকট-কাল সন্নিকট প্রায় ।
চারের চৌদিকে ভক্ত ঘুরিয়া বেড়ায় ॥ ১৯৮ ॥
ভক্তিলোভী প্রভুভক্ত দিব্য চক্ষুষ্মান ।
অদম অন্ধেরে এবে দেহ চক্ষুদান ॥ ১৯৯ ॥
কেমন খেলিলা প্রভু ভক্তগণ লৈয়া ।
সাধারণ মানবের চক্ষে ধূলা দিয়া ॥ ২০০ ॥
বিবরিয়া
তৃতীয় খণ্ডেতে গাব গান ।
গাইবারে যদি শক্তি দেন ভগবান ॥ ২০১ ॥
জয় জগমুগ্ধকর ব্রাহ্মণ-মূরতি ।
পরম ঈশ্বর বিষ্ণু ব্রহ্মাণ্ডের পতি ॥ ২০২ ॥
অগতির গতি তুমি পতিতপাবন ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ-বিঘ্ন-বাধাবিনাশন ॥ ২০৩ ॥
ভবত্রাস মায়াপাশে করহ নিস্তার ।
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ ভবকর্ণধার ॥ ২০৪ ॥
লোচন-আঁধার দূর করহ গোসাঁই ।
যেন চোখে দেখে লীলা দিবারাতি গাই ॥ ২০৫ ॥
বাতে নহে বিচলিত শিখার মতন ।
অভয়-চরণে যেন মত্ত হয় মন ॥ ২০৬ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
স্বদেশ-যাত্রা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এবে বর্তমানে শুন লীলার খবর ।
যাবতীয় মতে পথে সাধনার পর ॥ ১ ॥
প্রিয়তর হৈল বড় অদ্বৈতের ভূমি ।
সেথায় বসতি ইচ্ছা দিবসযামিনী ॥ ২ ॥
বাসনা হইলে মনে রক্ষা আর নাই ।
অদ্বৈত-পাথারে মগ্ন হইলা গোসাঞি ॥ ৩ ॥
গুণহীন ক্রিয়াহীন দেশ-কাল-শূন্য ।
কিমাকার কি প্রকার শাস্ত্রের অগম্য ॥ ৪ ॥
বৃক্ষনীড়ে বাস যেন বিহঙ্গমগণে ।
কোথায় উড়িয়া যায় আহারান্বেষণে ॥ ৫ ॥
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব পরিহরি ঘর ।
চলিয়া গেছেন নাহি দেহের খবর ॥ ৬ ॥
সংজ্ঞাহীন জড়বৎ শ্রীদেহের বাসা ।
অহর্নিশা ঘোর নেশা নাহি ক্ষুধা তৃষা ॥ ৭ ॥
সপ্তাধিক একভাবে গত হয় প্রায় ।
তথাপি ফিরিয়া ঘরে না আইলা রায় ॥ ৮ ॥
হেনকালে শুন কিবা দৈবের ঘটন ।
অকস্মাৎ উপনীত সাধু একজন ॥ ৯ ॥
বিচিত্র শ্রীপ্রভু যেন সাধুও বিচিত্র ।
সাধুর চরিত্র যেন প্রভুর চরিত্র ॥ ১০ ॥
প্রভুই যেমন এই সাধুর আকারে ।
বৈদ্যবেশে মুর্তিমান হাজির গোচরে ॥ ১১ ॥
এবে যে ভূমিতে গত আছেন গোসাঞি ।
গোসাঞি ব্যতীত তত্ত্ব কেহ জানে নাই ॥ ১২ ॥
তন্ত্র-গীতা ছয় গোটা দর্শন না জানে ।
তবে এই সাধুবর বুঝিল কেমনে ॥ ১৩ ॥
নিরখিয়া প্রভুদেবে বুঝে সাধুবর ।
তত্ত্বাতীত তত্ত্বে মগ্ন প্রভু সর্বেশ্বর ॥ ১৪ ॥
যদি কোন উপায়ে আনিতে পারে নীচে ।
জগতের সুমঙ্গল ধ্রুব হবে পিছে ॥ ১৫ ॥
এত ভাবি উপবিষ্ট হইয়া সকাশে ।
দারুণ প্রহারারম্ভ করে পৃষ্ঠদেশে ॥ ১৬ ॥
বৃহদ্জগর যেন পর্বতের ধারে ।
গুরুভার দেহখানি নড়াতে না পারে ॥ ১৭ ॥
ভাঙ্গিয়া পড়িলে গায়ে আগোটা শিখর ।
তবে যেন আসে কিছু দেহের খবর ॥ ১৮ ॥
তেমনি প্রহার কৈলে প্রহরেক প্রায় ।
তবে না সামান্য বাহ্য সমুদিত গায় ॥ ১৯ ॥
বিজলির ছটা মেঘে রহে যতক্ষণ ।
অতি অল্পস্থায়ী মাত্র বাহ্যিক চেতন ॥ ২০ ॥
এই অবকাশে সাধু দেয় শ্রীবদনে ।
কিঞ্চিৎ পানীয় দুগ্ধ দেহ-সংরক্ষণে ॥ ২১ ॥
থাকিতে না চান প্রভু অধঃতে নামিয়ে ।
নামিলে তখনি পুনঃ যান পলাইয়ে ॥ ২২ ॥
স্বভাবতঃ প্রিয় তাঁর অদ্বৈতের ঘর ।
মানব-লীলার গায়ে ভক্তির চাদর ॥ ২৩ ॥
চক্ষে দেখা ভক্ত-সঙ্গে লীলা-অভিনয়ে ।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় যান অদ্বৈতে ছুটিয়ে ॥ ২৪ ॥
ধর্মমাত্রে সকলেরই সার পরিণাম ।
অমৃতসাগরবৎ অদ্বৈতগিয়ান ॥ ২৫ ॥
রূপ নাম রকমারি কিছু নাই যেথা ।
কেবল বিরাজে রাজ্যে সমতা একতা ॥ ২৬ ॥
যাবতীয় মতে পথে চরমে সবার ।
এক বস্তু
অদ্বিতীয় নিত্য নির্বিকার ॥ ২৭ ॥
এখন ধর্মের রাজ্যে ধর্মজ্ঞানহীন ।
ধর্মের
সমরভেরী বাজে রাত্র-দিন ॥ ২৮ ॥
ধার্মিকেরা ধর্মহারা ধর্মে ব্যভিচার ।
আনিয়া
তুলেছে ধর্মরাজ্যে হাহাকার ॥ ২৯ ॥
এক ভিন্ন অন্য ধর্ম না পাই খুঁজিয়ে ।
ঈশ্বরেতে
অনুরাগ মন-প্রাণ দিয়ে ॥ ৩০ ॥
ঈশপ্রেমে মগ্ন যেবা সেই ধর্মবান ।
হিন্দু মুসলমান
কিবা কিবা খ্রীষ্টিয়ান ॥ ৩১ ॥
প্রেমিকের এক লক্ষ্য একরূপ গতি ।
সকলেরই ত্যাগ-পথ
তারা এক জাতি ॥ ৩২ ॥
নিম্ন সাগরের ধারা তথা বিদ্যমান ।
সুধীর গম্ভীর নাই তরঙ্গতুফান ॥ ৩৩ ॥
মত পথ ধর্ম নহে মত মাত্র পথ ।
সরলে যে পথে ইচ্ছা পূরে মনোরথ ॥ ৩৪ ॥
রুচি-ভেদে মত পথ ভিন্ন স্বতন্তর ।
লক্ষ্যে কিন্তু সেই এক পরম ঈশ্বর ॥ ৩৫ ॥
তাই নানা মতে পথে সাধনা করিয়ে ।
দ্বন্দ-বিভঞ্জনে প্রভু দিলা দেখাইয়ে ॥ ৩৬ ॥
এখানে প্রভুর পাশে সাধু রাত্রি দিবা ।
পরম যতনে করে শ্রীদেহের সেবা ॥ ৩৭ ॥
যাহাতে কিঞ্চিৎ ভোজ্য প্রবেশে উদরে ।
এই লক্ষ্যে নানা ক্রিয়া নানা চেষ্টা করে ॥ ৩৮ ॥
এখন কিসেও আর নাহি মোটে মন ।
এক কর্ম এক চিন্তা শ্রীদেহ-রক্ষণ ॥ ৩৯ ॥
সাধন-ভজন যেন আয়াস-প্রয়াস ।
দুই এক নহে গেল গোটা ছয়মাস ॥ ৪০ ॥
তবে না আইল ঘরে প্রভু গুণমণি ।
ফুটিল অনিয়মাণা শ্রীমুখেতে বাণী ॥ ৪১ ॥
প্রভুর শ্রীদেহ গড়া কোন্ উপাদানে ।
জানি না জগতে কে সে যদি কেহ জানে ॥ ৪২ ॥
গোটা ছয় মাস কাল নাই নিদ্রাহার ।
মুখদ্যুতি পূর্ববৎ একই প্রকার ॥ ৪৩ ॥
দেব-মানবের ধারা একই আধারে ।
কখন না দেখি
শুনি সৃষ্টির ভিতরে ॥ ৪৪ ॥
প্রভুদেব না হইলে পরম ঈশ্বর ।
কেমনে সহিত এত কষ্ট
কলেবর ॥ ৪৫ ॥
দ্বাদশ-বৎসর ব্যাপী কঠোর সাধন ।
সর্বশক্তিমানত্বের ইহাই লক্ষণ ॥ ৪৬ ॥
যে হও সে হও প্রভু বিচারে কি কাজ ।
অভয় চরণ যেন জাগে হৃদিমাঝ ॥ ৪৭ ॥
শ্রীপদসেবায় দীনে কর অধিকারী ।
দীনবন্ধু দীননাথ করুণ কাণ্ডারী ॥ ৪৮ ॥
অতঃপর কি হইল শুনহ ঘটনা ।
দারুণ পেটের পীড়া দারুণ যন্ত্রণা ॥ ৪৯ ॥
মথুর ধনাঢ্য ভক্ত ব্যয় অকাতরে ।
আনায় প্রসিদ্ধ বৈদ্য চিকিৎসার তরে ॥ ৫০ ॥
কিছুই না বুঝা যায় গোসাঞির খেলা ।
এসময়ে বৈদান্তিক সাধুদের মেলা ॥ ৫১ ॥
কে জানে কোথায় ছিল এবে শ্রীগোচরে ।
আবাস মন্দির-মধ্যে আদতে না ধরে ॥ ৫২ ॥
সকলে বেদান্তমার্গী জ্ঞানীর আচার ।
অস্তি ভাতি প্রীতি করে ব্রহ্মের বিচার ॥ ৫৩ ॥
যেখানে বুঝিতে নারে দ্বন্দ্ব লাগে তায় ।
মৃদু মৃদু হাসে প্রভু বসিয়া খট্টায় ॥ ৫৪ ॥
সরল ভাবায় পরে দেন বুঝাইয়ে ।
সাধুগণে জুড়ে কর মহা তুষ্ট হ'য়ে ॥ ৫৫ ॥
এদিকে পেটের পীড়া না হয় আরাম ।
চলিছে ঔষধ-পথ্য পারে না ব্যারাম ॥ ৫৬ ॥
হৃদয়ে মথুরে তবে যুক্তি কৈল শেষে ।
প্রভুকে পাঠায়ে দিতে আপনার দেশে ॥ ৫৭ ॥
দেশের মিঠানি জল-বায়ু হিতকরী ।
পেটের পীড়ার পক্ষে মহৌষধ ভারি ॥ ৫৮ ॥
এত বলি শ্রীমধুর ভক্তচূড়ামণি ।
ভক্তিমতী জগদম্বা মথুর-গৃহিণী ॥ ৫৯ ॥
জানিয়া প্রভুর ঘর শিবের সংসার ।
কিছুই নাহিক থাকে সঞ্চয়-ভাণ্ডার ॥ ৬০ ॥
বস্তাদরে নানা দ্রব্য যাহা প্রয়োজন ।
সলিতা-খড়িকা আদি সব আয়োজন ॥ ৬১ ॥
দু'তিন মাসের মত প্রচুর প্রচুর ।
সহৃদয় দেশে যাত্রা হৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ৬২ ॥
ভগবৎ-পদলুব্ধা ত্যাগী সন্ন্যাসিনী ।
মায়ের মতন সঙ্গে চলিল ব্রাহ্মণী ॥ ৬৩ ॥
সর্বাগ্রে প্রেরণ পত্র হইয়াছে ঘরে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন কামারপুকুরে ॥ ৬৪ ॥
নিবিড় আঁধার নিশা হইলে বিগত ।
প্রত্যুষ পূরবভাগে হ'য়ে বিরজিত ॥ ৬৫ ॥
তপনাগমন-বার্তা
করিলে ঘোষণা ।
বিহঙ্গমগণে গায় কূজন-বন্দনা ॥ ৬৬ ॥
তেন প্রভুর আগমন-সুসংবাদ পেয়ে ।
দেশে যত গ্রামবাসী পুরুষ কি মেয়ে ॥ ৬৭ ॥
পূর্বস্মৃতি জাগাইয়ে প্রীতি-মমতায় ।
গদায়ের গুণগীতি দিবারাতি গায় ॥ ৬৮ ॥
বিশেষতঃ কৃপাপ্রাপ্ত ভক্ত স্ত্রীলোকেরা ।
যথাকালে আগে গিয়া পথে করে ঘেরা ॥ ৬৯ ॥
পাছে কেহ অন্তে দেখে সংগোপনে চলে ।
মিষ্টিসহ ফুলমালা লুকায়ে আঁচলে ॥ ৭০ ॥
প্রভুদেবে তারা কিবা বুঝে বুঝ মন ।
মিষ্টি-মাখা চিড়া-দই সুমিষ্ট যেমন ॥ ৭১ ॥
আন্তরিক ভালবাসা আন্তরিক টান ।
আন্তরিক স্নেহ-প্রীতি প্রাণের সমান ॥ ৭২ ॥
বাটীস্থ হইলে প্রভু কাতারে কাতারে ।
আসে যত গ্রামবাসী দেখিবার তরে ॥ ৭৩ ॥
শ্রীপ্রভু স্বদেশ ছাড়া আট বর্ষ প্রায় ।
স্নেহ-মমতার চক্ষে যুগান্ত দেখায় ॥ ৭৪ ॥
গঙ্গাকূলে শ্রীপ্রভুর এ আট বৎসরে ।
গিয়াছে অশেষ কষ্ট সাধন-সমরে ॥ ৭৫ ॥
কাহিনী শুনিয়া বুঝেছিলেন সবাই ।
গদাইয়ে এখন নাই তাঁদের গদাই ॥ ৭৬ ॥
বিকৃতমস্তিষ্ক মত পাগলের প্রায় ।
কভু হাসে কভু কাঁদে কভু নাচে গায় ॥ ৭৭ ॥
কখন বা আল্লা বলে কখন বা হরি ।
কভু ক্ষীণবল কভু বিক্রমে কেশরী ॥ ৭৮ ॥
কখন পিশাচ-ভুলা কদর্য আচার ।
কখন উলঙ্গ দেহ বাল্যব্যবহার ॥ ৭৯ ॥
সত্য কিনা মিথ্যা তত্ত্ব প্রত্যক্ষ করিয়ে ।
চক্ষু ও কর্ণের দ্বন্দ্ব যাবে মিটাইয়ে ॥ ৮০ ॥
আনন্দপূর্ণিতাস্তরে করে নিরীক্ষণ ।
পূর্বের গদাই যেন এখনও তেমন ॥ ৮১ ॥
সেই সে মোহন মূর্তি সেই সরলতা ।
সেই মিষ্ট সম্ভাষণ নাশে হৃদি-ব্যথা ॥ ৮২ ॥
সেই হাসি সেই খুশী চন্দ্রিম-বদন ।
সেই সে সুমিষ্ট দৃষ্টি মোহে যাহে মন ॥ ৮৩ ॥
সেই রঙ্গ-পরিহাস সেই সে উদ্দাম ।
সেই ভক্তি ভাবোচ্ছ্বাসে ঈশ্বরের নাম ॥ ৮৪ ॥
ছোট-বড়-নির্বিশেষে মধুর সম্ভাষ ।
কে কোথার কে কেমন কুশল তল্লাস ॥ ৮৫ ॥
দুঃখে সুখে পূর্ববৎ সহ অনুভূতি ।
পুরাণের মত কথা পুরাণ ভারতী ॥ ৮৬ ॥
উভয় পক্ষের স্মৃতি দেয় যোগাইয়ে ।
আনন্দের নাহি ওর বলিয়ে শুনিয়ে ॥ ৮৭ ॥
অতীত কালের যত কাহিনী-লহর ।
অধিক করিল ঘন প্রেম পরস্পর ॥ ৮৮ ॥
মধুর সম্বন্ধ কিবা প্রভুর এখানে ।
সদাক্বষ্ট পরস্পর মধুর বন্ধনে ॥ ৮৯ ॥
সাংসারিক প্রসঙ্গেও নানা উপদেশ ।
যাহাতে তাদের হয় মঙ্গল অশেষ ॥ ৯০ ॥
ভক্তিমতীদের মধ্যে অনেক উন্নতা ।
বুঝিতে সক্ষম আধ্যাত্মিক তত্ত্বকথা ॥ ৯১ ॥
অবসরমত আসে কুলবতীগণে ।
সঙ্গে কিছু ভোজ্য দ্রব্য গোপন বসনে ॥ ৯২ ॥
প্রভু-দরশন সাধ এত বলবতী ।
দুবেলা ঘরশন তাহে হোক যত ক্ষতি ॥ ৯৩ ॥
কিবা মোহনিয়া প্রভু মোহের পাথার ।
বারেক দেখিলে পরে রক্ষা নাহি আর ॥ ৯৪ ॥
নানা ছাঁদে নানা ভাবে করে কত রঙ্গ ।
রূপগুণবাক্যাদির মোহন তরঙ্গ ॥ ৯৫ ॥
কাহারও নিস্তার নাই পড়িলে তাহায় ।
মোহিয়া টানিয়া ল'য়ে পাথারে ডুবায় ॥ ৯৬ ॥
পল্লীগ্রামে সমাজের নিগুঢ় বন্ধন ।
বন্ধ যাহে কোমলাঙ্গী কুলবতীগণ ॥ ৯৭ ॥
তৃণের মতন তাহা ছেদিয়ে ছিড়িয়ে ।
প্রভু-দরশনে আসে সংসার ফেলিয়ে ॥ ৯৮ ॥
প্রভু দরশনে একি দেখি পরমাদ ।
যত দেখে তত বাড়ে দেখিবারে সাধ ॥ ৯৯ ॥
এ সাধের অবসাদ নহে কোন কালে ।
দরশন-ফল হয় দরশন-ফলে ॥ ১০০ ॥
দিনে রেতে অবিরত দ্বার থাকে খোলা ।
দরিদ্রব্রাহ্মণাবাসে সদানন্দ মেলা ॥ ১০১ ॥
আনন্দের উপরে আনন্দ বাড়াবাড়ি ।
যেইখানে শ্রীপ্রভুর শ্বশুরের বাড়ি ॥ ১০২ ॥
ইতিপূর্বে হয়েছিল সংবাদ প্রেরণ ।
স্বদেশেতে শ্রীপ্রভুর শুভ আগমন ॥ ১০৩ ॥
শুভদিন নির্ধারিয়া আত্মীয়েরা পরে ।
শ্রীশ্রীমাকে আনাইলা কামারপুকুরে ॥ ১০৪ ॥
চতুর্দশ-বয়ঃ পল্লীবালিকা যেমন ।
অস্ফুট অঙ্গের মধ্যে যুবতী-লক্ষণ ॥ ১০৫ ॥
জৈববুদ্ধি-বিরহিতা সরলারূপিণী ।
প্রভুর চরণপদ্ম-সেবা-বিলাসিনী ॥ ১০৬ ॥
মন প্রাণ দেহ গত প্রভুর চরণে ।
প্রভু-পদে মাত্র মন অন্য নাহি মনে ॥ ১০৭ ॥
একান্ত শরণাগত করি বিলোকন ।
সাদরে শিক্ষার্থিভাবে করিলা গ্রহণ ॥ ১০৮ ॥
নানাবিধ যেন শিক্ষা জীবন-গঠনে ।
আধ্যাত্মিকে সমুন্নতা হইবে কেমনে ॥ ১০৯ ॥
নিঃস্বার্থ আদর যত্ন দিব্য-সঙ্গ-বলে ।
অন্তরে সন্তোষ মা'র বাড়ে পলে পলে ॥ ১১০ ॥
অল্পকাল-মধ্যে মাতা কৈল অনুভব ।
হৃদয়-আধারে শান্তি-সিন্ধুর উদ্ভব ॥ ১১১ ॥
মায়ের শিক্ষায় যত্ন দেখিয়া ব্রাহ্মণী ।
অন্তরে অন্তরে হৈল অতি বিষাদিনী ॥ ১১২ ॥
মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনর্থ সম্ভবে ।
প্রভুর অথণ্ড ব্রহ্মচর্য নষ্ট হবে ॥ ১১৩ ॥
এত ভাবি সংগোপনে কহিলা প্রভুকে ।
উদাসীন প্রভু যেন কে কহে কাহাকে ॥ ১১৪ ॥
আপনার ভাবে প্রভু আপনি মগন ।
শ্রীশ্রীমার শিক্ষাদান কর্তব্য-পালন ॥ ১১৫ ॥
বড়ই হইল ক্ষুন্ন ব্রাহ্মণী অন্তরে ।
গম্ভীর গম্ভীর ভাব অভিমান-ভরে ॥ ১১৬ ॥
প্রথমতঃ ক্ষুন্ন পরে হৈল অভিমানী ।
পরিশেষে অহংকারে গর্বিতা ব্রাহ্মণী ॥ ১১৭ ॥
অহংকারে বুদ্ধিভ্রংশ শাস্ত্রের নির্ণীত ।
ছিলেন সাধিকা এবে কোথা উপনীত ॥ ১১৮ ॥
ইষ্টগোষ্ঠিবর্গে করে অযথা ব্যাভার ।
কার্কশ্যপ্রয়োগ প্রভু কভু তিরস্কার ॥ ১১৯ ॥
ঠাকুরের পরিবারে ঠাকুরের ধারা ।
শিষ্ট শান্ত সুবিনয়ী সুশীলা-আচারা ॥ ১২০ ॥
ব্রাহ্মণীকে প্রতিবাদে কিছু নাহি কয় ।
গুরুজন-জ্ঞানে তার তিরস্কার সয় ॥ ১২১ ॥
মাতাও সশ্রদ্ধাযুক্ত সতত হেথায় ।
আপনার পুজনীয়া শাশুড়ীর ন্যায় ॥ ১২২ ॥
প্রশ্রয় পাইয়া তবে সাধিকা এখন ।
প্রভুতে অবজ্ঞা-ভাব করে প্রদর্শন ॥ ১২৩ ॥
জটিল তত্ত্বের উত্থাপিত মীমাংসায় ।
প্রভুর নিকটে কেহ যেতে যদি চায় ॥ ১২৪ ॥
সমুন্নতা ফণা যেন ক্রুদ্ধ বিষধরী ।
নয়ন বিস্তারি কয় গরজন করি ॥ ১২৫ ॥
কিবা জানে রামকৃষ্ণ তত্ত্বের সন্ধান ।
আমি তো দিয়াছি ওগো তার চক্ষুদান ॥ ১২৬ ॥
কি হইল সাধিকার অবস্থা এখন ।
সশঙ্কিত চিত-বুদ্ধি জড়প্রায় মন ॥ ১২৭ ॥
তান্ত্রিক সাধনে যেবা প্রভুর সহায়া ।
চতুর্বেদ মুর্তিমতী নিজে যোগমায়া ॥ ১২৮ ॥
ছায়াসম শ্রীপ্রভুর কাছে অবিরত ।
প্রভু গৌরাঙ্গাবতার যদ্দ্বারা ঘোষিত ॥ ১২৯ ॥
স্তম্ভিত বিস্মিত যে কৈল ধীরগণে ।
বচনে কেবল নয় শাস্ত্রীয় প্রমাণে ॥ ১৩০ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে মহাভাব তাহার লক্ষণ ।
স্বচক্ষে দেখিয়া অন্তে কৈল প্রদর্শন ॥ ১৩১ ॥
মধুর-সাধনে অঙ্গ-দাহ শ্রীপ্রভুর ।
শাস্ত্রীয় উপায়ে যিনি করিলেন দূর ॥ ১৩২ ॥
বাৎসল্যে উচ্ছ্বাসান্তরে মাগিয়া ভিক্ষায় ।
নবনী মাখন আনি প্রভুরে খাওয়ায় ॥ ১৩৩ ॥
যোগজ দারুণ ক্ষুধা প্রভুর যখন ।
অদ্ভূত উপায়ে যেবা কৈল নিবারণ ॥ ১৩৪ ॥
তাহার অবস্থা হেন দেখে ভয় পায় ।
জীবশিক্ষা-হেতু মাত্র প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৩৫ ॥
অভিমান অহংকারে ঘটায় উৎপাত ।
গগনবিভেদী গিরিবর ভূমিসাৎ ॥ ১৩৬ ॥
সমুন্নত সাধকেরও নাই অব্যাহতি ।
ক্ষুরের ধারের জায় ধরমের গতি ॥ ১৩৭ ॥
পতিতপাবন প্রভু মোরে কর দয়া ।
রক্ষা কর দীন দাসে দিয়ে পদছায়া ॥ ১৩৮ ॥
দীনবন্ধু দয়াসিন্ধু জীবহিতকারী ।
ভয়ঙ্কর
ভবার্ণবে করুণ কাণ্ডারী ॥ ১৩৯ ॥
অতঃপর হৈল কিবা শুনহ আখ্যান ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা অমৃত সমান ॥ ১৪০ ॥
ব্রাহ্মণীর ব্যবহারে এখানে হৃদয় ।
প্রভুর ইচ্ছায় হৈল ক্রুদ্ধ অতিশয় ॥ ১৪১ ॥
মনের মালিন্য বৃদ্ধি পায় দিনে দিনে ।
প্রকাশ না হয় গুমুয়িরা রহে মনে ॥ ১৪২ ॥
বর্ষণের আগে যেন প্রকৃতির ধারা ।
নীরব নীরব ভাব সুস্থিরা গম্ভীরা ॥ ১৪৩ ॥
এখানে তেমতি ঠিক ব্রাহ্মাণী হৃদয়ে ।
নাহি ঐক্য নাহি বাক্য ক্রোধে ভারী দুয়ে ॥ ১৪৪ ॥
ভক্তবর শ্রীনিবাস শাঁখারীর জাতি ।
ভগবৎ-ভক্ত তেঁহ প্রভুপথে মতি ॥ ১৪৫ ॥
প্রভুপদে মতি-রতি ইষ্টের সমান ।
বাল্যখণ্ডে গাইয়াছি যতেক আখ্যান ॥ ১৪৫ ॥
দিনেকে ব্রাহ্মণাবাসে প্রভুর গোচর ।
উপনীত হৈল চিনু ভকত প্রবর ॥ ১৪৬ ॥
আজি তার মনে মনে উগ্রতর সাধ ।
পাইবে ঠাকুর রঘুবীরের প্রসাদ ॥ ১৪৭ ॥
প্রকাশ করিয়া কথা কহিল এখন ।
ইষ্টগোষ্ঠী সকলেই হরষিত মন ॥ ১৪৮ ॥
একে ভক্ত তাহে পুনঃ বৃদ্ধক বয়েস ।
তদুপরি প্রভুপদে পিরীতি অশেষ ॥ ১৪৯ ॥
ব্রাহ্মণ বাটীতে নাই আনন্দের ওর ।
ঈশ্বরীয় লীলারসে বিভোর বিভোর ॥ ১৫০ ॥
সদানন্দ প্রভু তথা সবার অগ্রণী ।
তত্ত্বরসামোদী সঙ্গে আছেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৫১ ॥
ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর আনন্দের হাট ।
না দেলিলে বুঝিবার নাহি মিলে বাট ॥ ১৫২ ॥
মরি কিবা শ্রীপ্রভুর মোহন মুরতি ।
মৃদুমন্দ হাস্য সহ শ্রীবদন-দ্যুতি ॥ ১৫৩ ॥
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি হিল্লোলে তাহার ।
ঈষৎ রক্তিমাধর কিবা চমৎকার ॥ ১৫৪ ॥
পীযূষ্পূরিত যাহে ভাতে পল্লীবুলি ।
প্রফুল্ল করিতে তত্ত্ব কুসুমের কলি ॥ ১৫৫ ॥
ভক্ত-অলি মত্ততর তার পরিমলে ।
আনন্দে বিভোর নিজ সত্ত্বা যায় ভুলে ॥ ১৫৬ ॥
তত্ত্বরস-মধু পান করে নিরন্তর ।
নীরব নীরব নাহি গুন্ স্বর ॥ ১৫৭ ॥
প্রভুর হাটের কথা নহে বর্ণিবার ।
যে যেখেছে ডুবেছে সে কে বলিবে আর ॥ ১৫৮ ॥
এখানেতে হইয়াছে ভোজনের ঠাঁই ।
সঙ্গে ভক্ত শ্রীনিবাস বসিলা গোসাঞি ॥ ১৫৯ ॥
প্রসাদের মর্মজ্ঞাত চিন্তু ভক্তবর ।
বাসনা মিটায়ে পূর্ণ করেন উদর ॥ ১৬০ ॥
পরে ঠাঁই পরিষ্কারে চিনুর উদ্দাম ।
সাধিকা ব্রাহ্মণী তাঁয় করে নিবারণ ॥ ১৬১ ॥
বলে
আমি নিজে হাতে উঠাইব পাতা ।
ভক্তীমতী জানে না তো পাড়াগেঁয়ে প্রথা ॥ ১৬২ ॥
শূদ্রোচ্ছিষ্ট মুক্ত করা ব্রাহ্মণ হইয়ে ।
উচিত না হয় যায় সমাজে বাধিয়ে ॥ ১৬৩ ॥
ভক্তি ভক্ত মতে পথে নাহি কোন ক্ষতি ।
বরঞ্চ তাহার করে বিশেষ উন্নতি ॥ ১৬৪ ॥
ব্রাহ্মণীর এক বোল আমি উঠাইব ।
হৃদয় বলেন তাহা করিতে না দিব ॥ ১৬৫ ॥
কতই বুঝায় তবু ব্রাহ্মণী না বুঝে ।
ত্যাগী সন্ন্যাসিনী কয় আপনার তেজে ॥ ১৬৬ ॥
তবে না কুপিত হৃদু কহে ব্রাহ্মণীরে ।
তা'হলে দিব না তোরে থাকিবারে ঘরে ॥ ১৬৭ ॥
সাধিকা উত্তর কৈল না দাও না দিবে ।
মনসা তখন শীতলার কাছে শোবে ॥ ১৬৮ ॥
বাটীস্থ অন্যান্য সবে মধ্যস্থ হইয়ে ।
গণ্ডগোল উভয়ের দিল মিটাইয়ে ॥ ১৬৯ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা শ্রবণমঙ্গল ।
ঝরণা কোথায় দেখ কোথা ঝরে জল ॥ ১৭০ ॥
শ্রীপ্রভু মঙ্গলময় তাঁহার নিকটে ।
মঙ্গল ব্যতীত নাহি অমঙ্গল ঘটে ॥ ১৭১ ॥
ব্রাহ্মণীরে অহংকারে করি অহৎকৃত ।
কেমন মঙ্গলোন্নতি করিল সাধিত ॥ ১৭২ ॥
শুন কহি শ্রীপ্রভুর মহিমা অপার ।
মঙ্গলনিদান কথা অতি চমৎকার ॥ ১৭৩ ॥
শ্রীশ্রীমায়ে শিক্ষাদানে প্রভু পরমেশ ।
দেখিয়া ব্রাহ্মণী কৈল নিষেধোপদেশ ॥ ১৭৪ ॥
কর্তব্যপালনে ত্রুটি হইবে বলিয়ে ।
ব্রাহ্মণীর কথা প্রভু দিলেন ঠেলিয়ে ॥ ১৭৫ ॥
মনঃক্ষুন্ন সাধিকার আদিম কারণ ।
যাহাতে জন্মিল ঝরণার প্রস্রবণ ॥ ১৭৬ ॥
ধীর মন্দগতি আগে তাহে অভিমান ।
মধ্যপথে অহংকার স্রোত বহমান ॥ ১৭৭ ॥
তরঙ্গ তুফান কিবা হৈল পরিশেষে ।
ভীষণ অবজ্ঞা-ভাব প্রভু পরমেশে ॥ ১৭৮ ॥
উজানে তুলিয়া পরে আনিলা ভাটায় ।
লীলাকার্য শ্রীপ্রভুর পূর্ণ মহিমায় ॥ ১৭৯ ॥
উত্তেজনা হইলেই আছে অবসাদ ।
সাধিকা বুঝিল তার যত অপরাধ ॥ ১৮০ ॥
অহংকারে করায়েছে তারে কিবা কাজ ।
বলিতে শুনিতে কিবা উভয়েই লাজ ॥ ১৮১ ॥
সাধিকা লজ্জিতা অতি অনুতপ্ত মনে ।
কাটায় কয়েক দিন প্রভুর সদনে ॥ ১৮২ ॥
আপনি শ্রীভগবান গৌরাঙ্গাবতার ।
ভিতরে শ্রীকৃষ্ণ বাহ্যে ভাব শ্রীরাধার ॥ ১৮৩ ॥
সেই সে ঠাকুর এবে রামকৃষ্ণ নামে ।
মূর্তিমান নরলোকে লীলার কারণে ॥ ১৮৪ ॥
স্বরূপ প্রকৃত রূপ করি দরশন ।
ভক্তিমতী সাধিকার উদিল চেতন ॥ ১৮৫ ॥
আহরণ নিজ হস্তে কুসুমসম্ভার ।
গাঁথিল মমের মত মনোহর হার ॥ ১৮৬ ॥
চর্চিত করিয়া তায় সুরভি চন্দনে ।
পরাইল প্রভুদেবে শ্রীগৌরাঙ্গ-জ্ঞানে ॥ ১৮৭ ॥
করজোড়ে অপরাধ মার্জনার তরে ।
নিবেদন বারংবার করে শ্রীগোচরে ॥ ১৮৮ ॥
বিদার লইয়া তবে অভয় চরণে ।
চলিলেন সন্ন্যাসিনী কাশী তীর্থধামে ॥ ১৮৯ ॥
ঠাকুরের সন্নিধানে জননীর ন্যায় ।
ছয়টি বৎসর গোটা কাটিয়া হেথায় ॥ ১৯০ ॥
সায় করি অভিনয়ে পালা আপনার ।
তৃণের সমান স্রোতে ভাসিল আবার ॥ ১৯১ ॥
দেখি নাই সাধিকারে নাহি পরিচয় ।
আত্মীয় স্বজন কত মনে মনে হয় ॥ ১৯২ ॥
বিদেশ-সমনে যাত্রা করিলে স্বজন ।
ব্যাকুল আকুলে যেন কাঁদে প্রাণ-মন ॥ ১৯৩ ॥
কাশীতীর্থ-প্রয়াগেতে এই সাধিকার ।
অন্তরের মাঝে যেন তীব্র হাহাকার ॥ ১৯৪ ॥
জানি না সম্বন্ধ কিবা ব্রাহ্মণীর সনে ।
চরণের রজ ভিক্ষা মাগে এ অধমে ॥ ১৯৫ ॥
দেশের মিঠানি জলে ঠাকুর এখন ।
সুস্থকায় সবলাঙ্গ পূর্বের মতন ॥ ১৯৬ ॥
বিভিন্নতা একস্থলে দেখিবারে পাই ।
পূর্বের লাবণ্যকান্তি দেহে কিন্তু নাই ॥ ১৯৭ ॥
গা ফেটে পড়িত রূপ সোনার বরণ ।
বিশেষ বিলয় তার মলিন এখন ॥ ১৯৮ ॥
বহু কাণ্ড বাকি আছে লীলা-অভিনয়ে ।
দক্ষিণশহরে ত্বরা আইলা
ফিরিয়ে ॥ ১৯৯ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা মঙ্গলনিধান ।
ভাগ্যবানে কয় আর শুনে ভাগ্যবান ॥ ২০০ ॥
মাতোয়ারা প্রভু যবে সাধনার চোটে ।
প্রভুর প্রমত্ত-কথা স্বদেশেতে রটে ॥ ২০১ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্বশুর শাশুড়ী শুনি কথা ।
মেয়ে পানে চেয়ে পান নিদারুণ ব্যথা ॥ ২০২ ॥
হৃদয়ের সঙ্গে দেশে দেখা হ'লে পরে ।
ঘটকের ভাই হৃদু তাই হেতু ধ'রে ॥ ২০৩ ॥
হেন বরে ঘটাইয়া কি মিটালে সাধ ।
এত বলি স্ত্রী-পুরুষে করেন বিবাদ ॥ ২০৪ ॥
রাখ প্রভু রাখ মাতা কিঙ্করজনাকে ।
যেন নহে অপরাধ লীলা-কথা লিখে ॥ ২০৫ ॥
ততখানি কয় যতখানি বোধ যার ।
দোষ নাই কে চিনিবে গুপ্ত অবতার ॥ ২০৬ ॥
চিরকাল দেখ মন মানিক রতন ।
দুর্লভ দুর্মূল্য যত তত সঙ্গোপন ॥ ২০৭ ॥
পাতালের কাছে নীচে মাটির ভিতর ।
অগাধ জলধিতল রতন-আকর ॥ ২০৮ ॥
সেইমত সার রত্ন দয়াল প্রভুকে ।
মহামায়া মহা মায়া-আবরণে ঢাকে ॥ ২০৯ ॥
আখির সম্মুখে তবু খুঁ'জিয়া না পাই ।
হাতের কনুই হাত বাড়াইলে নাই ॥ ২১০ ॥
পরমেশ-শক্তি মায়া ঈশের সমান ।
তাঁহারে রাখিলে বাদ কি আছে কল্যাণ ॥ ২১১ ॥
ঈশ্বর-দর্শন তার নহে কোন কালে ।
মহামায়া পরাশক্তি দ্বার না ছাড়িলে ॥ ২১২ ॥
সেই শক্তি মূর্তিমতী ব্রাহ্মণের ঘরে ।
জগৎ-জননী মাতা বালিকা-আকারে ॥ ২১৩ ॥
নাহি যেন বাপ মায় প্রবেশের দ্বার ।
রামকৃষ্ণ প্রভু এত শুপ্ত অবতার ॥ ২১৪ ॥
চাঁদের কিরণ যেন মেঘ হ'লে দূর ।
ব্যাধি-অন্তে কান্তি তেন উঠিল প্রভুর ॥ ২১৫ ॥
যেখিয়া হৃদুর বড় প্রফুল্লিত মন ।
প্রভুরে বলিল যাব এবারে ভবন ॥ ২১৬ ॥
শিয়ড় গ্রামেতে হয় হৃদয়ের ঘর ।
সেখান হইতে অষ্ট মাইল অন্তর ॥ ২১৭ ॥
জয়রামবাটী গ্রাম শিয়ড়ের কোলে ।
প্রভুর শ্বশুরবাড়ি হয় সেই স্থলে ॥ ২১৮ ॥
লইয়া প্রভুরে সাথে হৃদু যেতে চায় ।
প্রকাশ করিল কথা কথায় কথায় ॥ ২১৯ ॥
সার দিলা প্রভু তায় হরিষ অন্তর ।
বড়ই আনন্দ যেতে শ্বশুরের ঘর ॥ ২২০ ॥
এত আনন্দিত কেন প্রভু নারায়ণ ।
ভিতরে ইহার আছে বিস্তর কারণ ॥ ২২১ ॥
যে ভাবে আনন্দ উঠে মানুষের মনে ।
যাইবার আড়ম্বরে শ্বশুর-ভবনে ॥ ২২২ ॥
সে ভাবের গন্ধ নাই প্রভুর এ ভাবে ।
ধরিলে বালক-ভাব বুঝা যায় তবে ॥ ২২৩ ॥
বালকস্বভাব প্রভু সহজ অন্তর ।
দেখেন সকলে যায় শ্বশুরের ঘর ॥ ২২৪ ॥
নানাবিধ বেশভূষা আনন্দ অপার ।
খুশীর বিষয় ইহা নহে কিছু আর ॥ ২২৫ ॥
বাসনাবর্জিত প্রভু রিপুগণ মরা ।
ঘৃণা-লজ্জা-ভয়শূন্য বালকের পারা ॥ ২২৬ ॥
প্রভুর উপমা দিতে কি ধরে ধরণী ।
প্রভুর উপমা মাত্র প্রভুই আপুনি ॥ ২২৭ ॥
মেজ ভাই রামেশ্বর মহানন্দ মন ।
যোগাড় করিয়া দিলা যাহা প্রয়োজন ॥ ২২৮ ॥
গ্রামবাসী সবে খুশী শুনিয়া বারতা ।
রসভাষে হেসে হেসে কহে কত কথা ॥ ২২৯ ॥
উঠিল আনন্দরোল কামারপুকুরে ।
শুভদিন-নিরূপণ আসিবার তরে ॥ ২৩০ ॥
নির্ধারিত দিনে প্রাতে পুলকিত মন ।
প্রভুরে পরিতে দেয় সুন্দর বসন ॥ ২৩১ ॥
বহুবিধ মুল্যবান বসন প্রচুর ।
বস্তা বেঁধে দিয়াছেন ভকত মথুর ॥ ২৩২ ॥
লাল বারাণসী স্বর্ণ-জরি পাড় তায় ।
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে হৃদু যতনে পরায় ॥ ২৩৩ ॥
সমান উড়না তাঁর স্কন্ধদেশে ঝুলে ।
নাগরিয়া লাল জুতা চরণযুগলে ॥ ২৩৪ ॥
ঝলমল অঙ্গকান্তি এমন রকম ।
স্বচ্ছ কাচে প্রতিবিম্ব চাঁদের কিরণ ॥ ২৩৫ ॥
ভুবনমোহন মূর্তি বেশ হেন তার ।
যে দেখেছে ধরি তাঁর চরণ মাথায় ॥ ২৩৬ ॥
বাহিরে আইলা প্রভু হৃদু সঙ্গে জুটে ।
দেখিবারে প্রতিবাসী দলে দলে ছুটে ॥ ২৩৭ ॥
কুলির দুধারে সবে দাঁড়াইল আসি ।
আবাল হইতে বুদ্ধ যত গ্রামবাসী ॥ ২৩৮ ॥
রূপরাশি জিনি শশী আঁখি ভরি দেখে ।
কোণের বহুড়ি কেহ ঘোমটা না রাখে ॥ ২৩৯ ॥
ডোমপাড়া সন্নিকটে যবে আগুসার ।
ডোমেরা তফাতে পথে কাতার কাতার ॥ ২৪০ ॥
অস্পর্শীয় ছোট জাতি হৃদে ভয় বাসে ।
শ্রীপ্রভুর সম্মুখেতে কি প্রকারে আসে ॥ ২৪১ ॥
দুঃখী দাসে শ্রীপ্রভুর দয়া অতিশয় ।
তাহা না হইলে কেন কবে দয়াময় ॥ ২৪২ ॥
দয়ার দ্রবিল হিয়া দয়ার সাগর ।
পালটিয়া ফিরিলেন আপনার ঘর ॥ ২৪৩ ॥
সজ্জাসহ গড়াগড়ি যেন ভূমিতলে ।
কর্দম হইল ধূলা নয়নের জলে ॥ ২৪৪ ॥
কাদায় ভরিল অঙ্গ সুন্দর বসন ।
প্রভুরামকৃষ্ণ-কথা অদ্ভুত কথন ॥ ২৪৫ ॥
পরদিন চুপে চুপে অতি প্রাতে উঠি ।
প্রভুরে লইয়া যায় জয়রামবাটী ॥ ২৪৬ ॥
আনন্দের ওর নাই প্রতিবাসিগণে ।
গদাই জামাই আসিছেন বার্তা শুনে ॥ ২৪৭ ॥
এগিয়া যাইয়া পথে যত নারীগণ ।
বারে বারে বন্দি আমি সবার চরণ ॥ ২৪৮ ॥
আনিলেন আলয়েতে প্রভু গুণমণি ।
পথে পথে জলধারা সহ শঙ্খধ্বনি ॥ ২৪৯ ॥
জামাই আনিতে নাই দেশে হেন রীতি ।
জলধারা শঙ্খধ্বনি অদ্ভুত ভারতী ॥ ২৫০ ॥
কি ভাবে করিল হেন রমণীর গণ ।
প্রভুরাগমন দিনে বিধান নূতন ॥ ২৫১ ॥
ভক্তির মূলক নহে মঙ্গল-আচার ।
প্রভুদেব ক্ষিপ্তপ্রায় জ্ঞান সবাকার ॥ ২৫২ ॥
নাহি রামকৃষ্ণ-ভক্তি কিছুই এখানে ।
বিষয়ী বিষয়ে মত্ত চাষা যত গ্রামে ॥ ২৫৩ ॥
রক্ষা কর কৃপাময়ী জগৎজননী ।
তুমি মা লেখাও পুঁথি তাই লিখি আমি ॥ ২৫৪ ॥
মা তোমার জন্মভূমি মহাতীর্থধাম ।
জড় কি চেতন তথা সকলে প্রণাম ॥ ২৫৫ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যবতী নরনারীগণ ।
হেলায় দুবেলা দেখে অভয়চরণ ॥ ২৫৬ ॥
নাহি রামকৃষ্ণভক্তি নাম নাহি লয় ।
এবা কিবা ভাব ভেবে হয়েছি বিস্ময় ॥ ২৫৭ ॥
বিশুষ্ক হৃদয়ভাব ভাব-দরশনে ।
কি খেলা বুঝায়ে দেহ সুমূর্খ সন্তানে ॥ ২৫৮ ॥
জগতের চাঁদা মামা তাহার কিরণ ।
সমভাবে সকলের উপর পতন ॥ ২৫৯ ॥
পূজ্য হেয় স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
তেমতি আনন্দময় শ্রীপ্রভু যেখানে ॥ ২৬০ ॥
পূর্ণানন্দ নিজে প্রভু আনন্দ-আধার ।
যথায় উদর তথা আনন্দ-বাজার ॥ ২৬১ ॥
নারীগণে দরশনে রসভাষে তাঁর ।
প্রভু নাহি দেন কান কোনই কথায় ॥ ২৬২ ॥
মুখে শ্যামাগুণগান তালি দেয় কর ।
নৃত্য করে পদদ্বয় বড়ই সুন্দর ॥ ২৬৩ ॥
বরনমণ্ডলে শোভা অপরূপ খেলে ।
বুক বেয়ে কোঁচার কাপড় কাঁধে ঝুলে ॥ ২৬৪ ॥
দেখিয়া সকলে ভুলে কাছে যতক্ষণ ।
অন্তরালে গেলে বলে পাগল-লক্ষণ ॥ ২৬৫ ॥
প্রভুর শাশুড়ী হেথা দিদিঠাকুরানী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ২৬৬ ॥
ওগো বাছা বলি প্রভু সম্বোধনে তাঁয় ।
নানা রঙ্গ-পরিহাস কথায় কথায় ॥ ২৬৭ ॥
সলজ্জবদনা দিদি প্রভুর বোলে ।
কথা কহিতেন মুখ আধখানি খুলে ॥ ২৬৮ ॥
কোন কালে নাহি ছিল সম্পর্ক-বিচার ।
যেমন অল্পবয়ঃ শিশুর আচার ॥ ২৬৯ ॥
জনক জননী খুড়া সোদর মাতুল ।
শ্বশুর শাশুড়ী শালা সব সমতুল ॥ ২৭০ ॥
বাবু ভাই সম্পর্ক প্রভৃতি নাই জ্ঞান ।
আপন অপর কেবা সকলে সমান ॥ ২৭১ ॥
সংসার-সম্বন্ধে আছে যেরূপ ব্যাভার ।
ভিন্ন ভিন্ন জনে যেন বিভিন্ন আচার ॥ ২৭২ ॥
সে সব না ছিল কিছু শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
সর্বস্থানে সমরূপ
লজ্জা ভয় নাই ॥ ২৭৩ ॥
শ্রীপ্রভুর শাশুড়ীর সঙ্গে রঙ্গ হয় ।
শুনিয়াছি যেইরূপ শুন পরিচয় ॥ ২৭৫ ॥
প্রভু রামকৃষ্ণ-কথা বড়ই মজার ।
বাহিরে আছিল এক গাছ সজিনার ॥ ২৭৬ ॥
অবনত যত ডাল খোপা খোপা ফুলে ।
প্রসারিয়া শ্রীচরণ বসি তার তলে ॥ ২৭৭ ॥
মহানন্দে মুখে হাসি প্রভু ভগবান ।
শাশুড়ীরে লক্ষ্য করি গাইতেন গান ॥ ২৭৮ ॥
সজিনাতুল পাতার শাউড়ী তোর সনে ।
সজিনাফুলতলায় বসবো দুজনায়,
ফুরফুরে বাতাসে ফুল ঝোরে পোড়বে গায়,
আবার সজিনাফুলের খোপা ভেঙ্গে
পরায়ে দিব কানে ॥
হাসি হাসি দিদি আই বলিতেন তাঁরে ।
কে কোথা এমন কথা কহে শাশুড়ীরে ॥ ২৭৯ ॥
বলিতে কি আছে বাপ এখন বচন ।
আমি তো শাশুড়ী হই মায়ের মতন ॥ ২৮০ ॥
উত্তর-বচনেতে প্রভু বলিতেন তাঁয় ।
শাশুড়ী বলিয়া ছাপা আছে কি পাছায় ॥ ২৮১ ॥
বসনে চাকিয়া মুখ ছুটে দিদি আই ।
পাছু গাছু গীত গান প্রেমিক জামাই ॥ ২৮২ ॥
শাশুড়ী জামায়ে দেখ সম্পর্ক কেমন ।
বাহ্যে এক ভিতরে কি আছে সংগোপন ॥ ২৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর শাশুড়ীর ভাব পূর্বেকার ।
দিনে লয় হয় স্নেহের সঞ্চার ॥ ২৮৪ ॥
একদিন একত্র তথায় কত নারী ।
সবাকার পদরেণু মস্তকেতে ধরি ॥ ২৮৫ ॥
প্রভুদেব ল'য়ে হাতে কুসুম-চন্দন ।
সবার চরণতলে করেন অর্পণ ॥ ২৮৬ ॥
নারীগণ ত্রস্তমন শশব্যস্ত-প্রায় ।
পলায়ন করে মুখ ঢাকিয়া লজ্জায় ॥ ২৮৭ ॥
দেখি প্রভু বলিতেন সবে সম্বোধিয়ে ।
শ্যামার অৎশেতে জন্ম যত সব মেয়ে ॥ ২৮৮ ॥
মেয়ে-রূপে মহামায়া রূপে অগণন ।
তাই সমর্পিণু পদে কুসুম-চন্দন ॥ ২৮৯ ॥
পাড়াগেঁয়ে মোটা লোক বুঝিতে না পারে ।
অন্তরালে প্রভু খেপা বলাবলি করে ॥ ২৯০ ॥
আর দিন মনসার পূজা-আয়োজন ।
নৈবেদ্য সাজায়ে রাখে রমণীর গণ ॥ ২৯১ ॥
গাইতে গাইতে প্রভু শ্যামাগুণগীত ।
ভাবেতে বিভোর চিত তথা উপস্থিত ॥ ২৯২ ॥
দেখিয়া নৈবেদ্য থালে প্রভুদেব কন ।
নৈবেদ্য খাইতে কেন হইতেছে মন ॥ ২৯৩ ॥
খাও তবে নারীগণে কহিল তাঁহায় ।
অমনি বসিলা প্রভু নৈবেদ্য-সেবায় ॥ ২৯৪ ॥
ভাবাবেশে খাইতে লাগিলা গুণমণি ।
অনিমিখ আঁখি দেখে পাড়ার রমণী ॥ ২৯৫ ॥
অন্ত দিন প্রভুদেব শ্বশুরের ঘরে ।
ভোজন-সময় তাঁর ভোজনের তরে ॥ ২৯৬ ॥
করি ঠাঁই ডাকিয়া আনিল একজন ।
শুন কি হইল পরে অপূর্ব কখন ॥ ২৯৭ ॥
ডাকামাত্র প্রভুদেব প্রবেশিয়া ঘর ।
উপবিষ্ট হইলেন আসন উপর ॥ ২৯৮ ॥
শালী-সম্পর্কীয় এক হেঁশেলেতে যায় ।
অন্নব্যঞ্জনাদি ভোজ্য সাজাতে থালায় ॥ ২৯৯ ॥
ইতিমধ্যে শ্রীঅঙ্গেতে দিগম্বরাবেশ ।
উলঙ্গ ঘরের এক কোণে পরমেশ ॥ ৩০০ ॥
অদুরে পড়েছে খসি কটির বসন ।
দাঁড়ায়ে আছেন নাহি বাহ্যিক চেতন ॥ ৩০১ ॥
হেনকালে হাতে থালা শালী ঘরে যায় ।
ব্যাপার বেখিয়া ভয়ে ছুটিয়া পালায় ॥ ৩০২ ॥
বুঝ কি বিশেষ কাণ্ড শ্বশুর-ভবনে ।
উলঙ্গ দণ্ডায়মান আবাসের কোণে ॥ ৩০৩ ॥
লোকে জনে তত্ত্ব তাঁর কিছু বুঝে নাই ।
একবাক্যে কয় সবে উন্মত্ত জামাই ॥ ৩০৪ ॥
কোন না কারণে তথা হরি-কথা হ'লে ।
অমনি সমাধি হয় বাহ্য যায় চ'লে ॥ ৩০৫ ॥
পাড়াগেঁয়ে চাষা সবে মোটা লোকজন ।
চাষ করে থাকে ঘরে সামান্য জীবন ॥ ৩০৬ ॥
অবিদিত শাস্ত্র নাহি তত্ত্ব-আলাপনা ।
সমাধি ধিয়ান জপ কিছুই বুঝে না ॥ ৩০৭ ॥
প্রভুরে বুঝিবে কিসে তাহারা সকল ।
সে হেতু করিত তাঁর ভাবের নকল ॥ ৩০৮ ॥
অধিকাংশ দিন তাঁর কাটিত শিয়ড়ে ।
সেবক ভাগিনা হৃদু তাহাদের ঘরে ॥ ৩০৯ ॥
ধরাধামে ভাগ্যবান মুখুয্যে হৃদয় ।
সেবায় সন্তুষ্ট যার প্রভু অতিশয় ॥ ৩১০ ॥
জননী তাহার হেন করেছি শ্রবণ ।
চুলে মুছাইয়া দিত প্রভুর চরণ ॥ ৩১১ ॥
ছোট ভাই রাজারাম ছিল আজ্ঞাপর ।
তাই করে যবে যাহা প্রভুর রগড় ॥ ৩১২ ॥
প্রভুর যা প্রিয় খাদ্য জুটায় যতনে ।
যতই না হ'ক কষ্ট কিছু নাহি মানে ॥ ৩১৩ ॥
সাধনান্তে বলহীন পেটের পীড়ায় ।
পুষ্টিকর যাহা বুঝে ত্রিসন্ধ্যা যোগায় ॥ ৩১৪ ॥
জীবিত মাছের ঝোল প্রভুরে খাওয়াতে ।
ধরিত মাগুর কই নিদ্রা নাই রেতে ॥ ৩১৫ ॥
প্রাতে ল'য়ে কাঁধে জাল দূরান্তরে যায় ।
অবিরত নিয়োজিত প্রভুর সেবায় ॥ ৩১৬ ॥
পরম যতনে হৃদু প্রভুদেবে রাখে ।
খেতে শুতে পথে সদা প্রভু-সঙ্গে থাকে ॥ ৩১৭ ॥
হরিভক্ত তথা যথা এখানে সেখানে ।
আনিয়া করিত মেলা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৩১৮ ॥
প্রভুভক্ত কিবা ভাবে কে আছে কোথায় ।
কি প্রকারে শ্রীপ্রভুর দরশন পায় ॥ ৩১৯ ॥
কি মনুষ্য কিবা পশু জীবজন্তগণ ।
জলে স্থলে শূন্যে কিবা কোথা নিকেতন ॥ ৩২০ ॥
শ্রবণ করিলে হয় নিরমল চিত ।
মঙ্গলনিধান রামকৃষ্ণ-গুণ-গীত ॥ ৩২১ ॥
হৃদি-তম-বিনাশন হৃদয়-আরাম ।
শুনহ ভকত কর্তা মাছের আখ্যান ॥ ৩২২ ॥
গ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে হৃদয়ের ঘর ।
তাহার দক্ষিণে এক বৃহৎ প্রান্তর ॥ ৩২৩ ॥
প্রান্তর ধানের ক্ষেত পড়া ভূমি নয় ।
মাঝে মাঝে ছোট বড় বহু জলাশয় ॥ ৩২৪ ॥
জলপরিপূর্ণ এক পুকুরের পাড়ে ।
চলিলা শ্রীপ্রভু মলত্যাগ করিবারে ॥ ৩২৫ ॥
একাকী শ্রীপ্রভু প্রায় বেলা-অবসান ।
নিবারিলা সঙ্গে যেতে চায় রাজারাম ॥ ৩২৬ ॥
রাজারাম শ্রীপ্রভুরে জানে ভালমতে ।
রাখিয়া তাঁহায় লক্ষ্য থাকিত তফাতে ॥ ৩২৭ ॥
নালা দিয়া কলকল করি কোলাহল ।
পুকুরে পড়িছে নব বরিষার জল ॥ ৩২৮ ॥
এই জল মাছে লাগে সুধার মতন ।
যেথা পায় তথা যার মানে না মরণ ॥ ৩২৯ ॥
পুকুরের যেইখানে হয় নিপতিত ।
যাবতীয় মংস্যকুল সেথা একত্রিত ॥ ৩৩০ ॥
দাঁড়ায়ে দেখেন প্রভু গাছ-অন্তরালে ।
ছোট বড় নানা মাছ ধার জলে খেলে ॥ ৩৩১ ॥
ধীরে ধীরে পায় পায় গেলা প্রভুরায় ।
মাছের অত্যন্ত কাছে তবু না পলায় ॥ ৩৩২ ॥
দেখিয়া এতেক মাছ প্রভু কৈলা মনে ।
সঙ্কেত করিয়া তবে ডাকি রাজারামে ॥ ৩৩৩ ॥
অল্প জলে কত মাছ ধরিবে হেথায় ।
মাছের লাগিয়া তারা বহু কষ্ট পায় ॥ ৩৩৪ ॥
যেমন হইল মনে যুকতি তাঁহার ।
মোটা সোটা
কর্তা যেটা মাছের সর্দার ॥ ৩৩৫ ॥
যত জোর দিয়া লম্ফ পড়ে সেই ক্ষণে ।
দীনবন্ধু শ্রীপ্রভুর অভয় চরণে ॥ ৩৩৬ ॥
উলটপালট খায় চরণ নিকটে ।
যেন নাহি ছুঁয়ে পাছে পায়ে কাঁটা ফোটে ॥ ৩৩৭ ॥
বিপদনিবারী প্রভু দয়ার সাগর ।
দেখিয়া সর্দার মাছ অত্যন্ত কাতর ॥ ৩৩৮ ॥
শ্রীহস্ত বুলায়ে গায়ে কহেন গোসাঞি ।
ঘরে যা আর তোর কোন ভয় নাই ॥ ৩৩৯ ॥
এত বলি আশ্বাসিয়া দিলেন ফেলিয়ে ।
ছানা পোনা যেখা জ্বলে বেড়ায় খেলিয়ে ॥ ৩৪০ ॥
গভীর সলিলে গেল দলসহ তার ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃতভাণ্ডার ॥ ৩৪১ ॥
শিয়ড়েতে পড়িল বহুদিন গত হ'লে পর ।
প্রভুর প্রভুর মনে দক্ষিণশহর ॥ ৩৪২ ॥
বহুদূর তথা হ'তে দুদিনের পথ ।
পথের কাহিনী শুন শুনেছি যেমত ॥ ৩৪৩ ॥
হৃদুসঙ্গে পথিমধ্যে ভোজনের কালে ।
উপনীত হইলেন এক পান্থশালে ॥ ৩৪৪ ॥
স্নানান্তে খাওয়ায়ে জল প্রভুগুণধামে ।
হৃদয় রন্ধন করে পরম যতনে ॥ ৩৪৫ ॥
হৃদু ভাল জানে যাহা ভোজ্য রুচিকর ।
কে আর কোথায় হেন সেবক সুন্দর ॥ ৩৪৬ ॥
সামান্য সে চটি ভাল দ্রব্য নাহি জুটে ।
ভাল যা পাইল তাই আনিল আকুটে ॥ ৩৪৭ ॥
ভাত ভাল তরকারি হইল সকল ।
সর্বশেষে রাঁধে চুনা মাছের অম্বল ॥ ৩৪৮ ॥
প্রস্তুত করিয়া অন্ন হৃদু ডাকে তাঁরে ।
নাচিতে নাচিতে যান ভাত খাইবারে ॥ ৩৪৯ ॥
বালকস্বভাব প্রভু বালক প্রকৃত ।
যখন খেয়াল যেন কার্য সেইমত ॥ ৩৫০ ॥
অথচ সকলে আছে সুগুহ্য ব্যাপার ।
মম অধিকারে নাই সে সব বিচার ॥ ৩৫১ ॥
অম্বলেতে চুনা মাছ করি দরশন ।
বলিলেন আর মম হবে না ভোজন ॥ ৩৫২ ॥
পোনামাছ বিনা আজ ভাত নাহি খাব ।
বরঞ্চ আগোটা দিন উপবাস রব ॥ ৩৫৩ ॥
শিশু হ'তে শিশুসম বিষম রগড় ।
ধরিয়া শালার খুঁটি ঘুরে নিরন্তর ॥ ৩৫৪ ॥
প্রভুরে বুঝান হৃদু সাধ্য-অনুসারে ।
ততই ঘুরেন তিনি খুঁটি এটে ধ'রে ॥ ৩৫৫ ॥
ঘুরিতে ঘুরিতে মাঝে মাঝে হয় নাচ ।
সেই এক বোল মুখে খাব পোনামাছ ॥ ৩৫৬ ॥
খেয়াল না যাবে হৃদু বুঝিয়া আপনে ।
বাহির হইল পোনামাছ-অন্বেষণে ॥ ৩৫৭ ॥
সেবক হৃদুর মত খুঁজিয়া না পাই ।
এত আবদার যারে করেন গোসাঁই ॥ ৩৫৮ ॥
ভিক্ষুকের মত হৃদু দ্বারে দ্বারে ফিরে ।
শেষে উপনীত এক গৃহস্থের ঘরে ॥ ৩৫৯ ॥
বিয়া হেতু অনেক লোকের সমাগম ।
গৃহস্বামী যেবা তারে কৈল নিবেদন ॥ ৩৬০ ॥
সমস্ত বৃত্তান্ত শুনি গৃহী ভাগ্যবান ।
হৃদয়ে করিল এক গোটা মাছ দান ॥ ৩৬১ ॥
তুষ্ট হ'য়ে মাছ ল'য়ে ত্বরিত গমন ।
মনোমত পান্থশালে করিল রন্ধন ॥ ৩৬২ ॥
তাড়াতাড়ি ভোজন করিতে হৃদ্র কয় ।
দেরি হ'লে চ'লে যাবে গাড়ির সময় ॥ ৩৬৩ ॥
অতি সন্নিকটে তার রেল ইষ্টেশান ।
সময়ে না গেলে গাড়ি করিবে পয়ান ॥ ৩৬৪ ॥
কলিকাতা-অভিমুখে যেতে সেই দিনে ।
নাহিক দোসরা গাড়ি এক গাড়ি বিনে ॥ ৩৬৫ ॥
ঠিক সময়েতে যেতে না পারিলে তথা ।
সে দিন না হবে আর আসা কলিকাতা ॥ ৩৬৬ ॥
সেই হেতু প্রভুদেবে বিহিত বুঝান ।
স্বমনে ভোজন বাক্যে নাহি যায় কান ॥ ৩৬৭ ॥
বহু যত্নে সাঙ্গ যদি হইল ভোজন ।
পশ্চাৎ ঘটিল আর অদ্ভুত ঘটন ॥ ৩৬৮ ॥
অল্প দূর ব্যবধান ইষ্টেশানে যেতে ।
তার মধ্যে মলত্যাগে বসিলেন পথে ॥ ৩৬৯ ॥
কি এক কণ্টক তার নাম নাহি জানি ।
পুজিলে তাহায় বড় তুষ্ট শূলপাণি ॥ ৩৭০ ॥
মলভূমে অগণন কণ্টকনিচয় ।
নেহারিয়া শ্রীপ্রভুর প্রীতি অভিশয় ॥ ৩৭১ ॥
তাঁহার করম কার্য বুঝা মহাদায় ।
কণ্টক লইয়া মত্ত হইলা পূজায় ॥ ৩৭২ ॥
আবেশে মহেশ-পদে কণ্টক-প্রদান ।
দেখিয়া হৃদুর হয় আকুল পরাণ ॥ ৩৭৩ ॥
পূজার মরম-কথা হৃদু নাহি জানে ।
কত ডাকে মত্ত প্রভু কেবা ডাক শুনে ॥ ৩৭৪ ॥
এক সাধনেতে সিদ্ধ হইবার তরে ।
দীর্ঘবয়ঃ মহাঋষি বনের ভিতরে ॥ ৩৭৫ ॥
কাটায় জীবন গোটা সহি যত ঋতু ।
অশন গলিত পত্র প্রাণরক্ষা-হেতু ॥ ৩৭৬ ॥
তবু নহে সিদ্ধকাম শেষে ফেঁসে যায় ।
মরম অধিকে পঞ্চভূতেতে মিশায় ॥ ৩৭৭ ॥
তেমন দুষ্কর ব্রত কতই সাধন ।
হাতে হাতে অবহেলে যাঁর সমাপন ॥ ৩৭৮ ॥
প্রেমিক রসিকবর ভক্তির মুরতি ।
মাথায় প্রবাহ জ্ঞান-গঙ্গা দিবারাতি ॥ ৩৭৯ ॥
কামিনী-কাঞ্চন-যারা অবিস্থা মোহিনী ।
তুচ্ছ হেয় ঘৃণ্য যেন নরকের কৃমি ॥ ৩৮০ ॥
দিব্য পবিত্রতা-রূপ শুদ্ধসত্বময় ।
হরিতত্ত্ব দিবারাত্র হৃদয়ে উদয় ॥ ৩৮১ ॥
জীবহিত সদাব্রত কল্যাণ-আচার ।
মোহনীয়া ঠাম পরা পুরুষ-আকার ॥ ৩৮২ ॥
তিনি কেন শিশুসম মলভূমে ব'সে ।
কিবা বৃদ্ধিবলে বল বুঝিবে মানুষে ॥ ৩৮৩ ॥
ইতিমধ্যে সে দিনের নিরূপিত গাড়ি ।
চ'লে গেল যায় যেন ইষ্টেশান ছাড়ি ॥ ৩৮৪ ॥
যতক্ষণ পুজাসাঙ্গ না হইল তাঁর ।
উঠাতে না পারে হৃদু বড়ই বেজার ॥ ৩৮৫ ॥
কতক্ষণ পরে প্রভু আইলা আপনি ।
হৃদয় বলেন কোথা কাটাবে যামিনী ॥ ৩৮৬ ॥
গাড়ি চ'লে গেল আজ হইবে থাকিতে ।
কেবা হেথা আত্মজন কোথা রবে রেতে ॥ ৩৮৭ ॥
আপনে আছেন প্রভু না দেন উত্তর ।
হৃদয় আসিল ইষ্টেশানের ভিতর ॥ ৩৮৮ ॥
কর্মচারী জনৈকে জিজ্ঞাসে ব্যস্ত চিতে ।
আজ কি পাইব গাড়ি কলিকাতা যেতে ॥ ৩৮৯ ॥
প্রভুর আশ্চর্য খেলা কহিতে না পারি ।
নাহি অন্য গাড়ি আজ কহে কর্মচারী ॥ ৩৯০ ॥
তবে এক আলাহিদা গাড়ি স্বতন্তর ।
কাশী থেকে ছাড়িয়াছে তারের খবর ॥ ৩৯১ ॥
রেল কোম্পানীর এক চাকর-প্রধান ।
বড়ই মর্যাদাপন্ন অতুল সম্মান ॥ ৩৯২ ॥
কলিকাতা যাবে তেহ একা ল'য়ে গাড়ি ।
চেষ্টা পাব যদি তায় চড়াইতে পারি ॥ ৩৯৩ ॥
অপর যাত্রীর তাহে নাতি অধিকার ।
চেষ্টার না হবে ত্রুটি করিনু স্বীকার ॥ ৩৯৪ ॥
ও সদাচারী কর্মচারী গাড়ি এলে পরে ।
প্রভুরে উঠায়ে দিল তাহার ভিতরে ॥ ৩৯৫ ॥
ইচ্ছাময় প্রভুদেব ইচ্ছার তাঁহার ।
কোথা হ'তে কিবা হয় কে বুঝে ব্যাপার ॥ ৩৯৬ ॥
শুভাশুভ বোধে যারে তুমি ভাব মনে ।
কি ফল ঘটিবে তার ইচ্ছাময় জানে ॥ ৩৯৭ ॥
শ্রীপ্রভু মঙ্গলময় রাখি এই জ্ঞান ।
কর্ম যার ফল তার অমৃত-সমান ॥ ৩৯৮ ॥
ফল-আশে কৈলে কর্ম অবিদ্যা-ভুবনে ।
ফলে ফল হলাহল প্রাণ কাঁদে শুনে ॥ ৩৯৯ ॥
ফেরে ফেলে তারে গুটিপোকার মতন ।
কর্মসূত্র নাগপাশ নিগূঢ় বন্ধন ॥ ৪০০ ॥
মহাবিদ্যা প্রভু সনে কর কারবার ।
ছাড়িবে অবিদ্যা যাবে লোচন-আঁধার ॥ ৪০১ ॥
দেখিবে নূতন চক্ষে ঝরিবেক জল ।
প্রভু-হেতু কর্ম-গাছে ধরে প্রভু ফল ॥ ৪০২ ॥
আন্ কর্ম আন্ ফল দিয়া বিসর্জন ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা মধুর কথন ॥ ৪০৩ ॥
দ্বিতীয় খণ্ড
তীর্থ-পর্যটন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণলীলা-সিন্ধু অতলপরশী ।
মুকুতা মাণিক রত্ন মণি রাশি রাশি ॥ ১ ॥
বিভাতি বিশাল গর্ভ শোভে স্তরে স্তরে ।
নিগমন হও মন অমৃত-পাথারে ॥ ২ ॥
এখন বিপদ বড় মথুরের ঘরে ।
ভক্তিমতী জগদম্বা
প্রায় মরে মরে ॥ ৩ ॥
পরাজিত শহরের চিকিৎসকগণ ।
হতাশে মথুর এবে চিন্তাকুল মন ॥ ৪ ॥
প্রত্যাগত প্রভুদেব দক্ষিণশহরে ।
শুনিয়া মঞ্জুর ত্বরা আইল গোচরে ॥ ৫ ॥
উপায় কি হবে বলি কৈল নিবেদন ।
সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস অতি উচাটন মন ॥ ৬ ॥
ভক্ত-সখা দেখি ভক্তে অতীব কাতর ।
বহ্যহহীন আর নাহি দেহের খবর ॥ ৭ ॥
ভাবাবেশে বলিলেন ভক্ত শ্রীমধুরে ।
ভয় নাই জগদম্বা শীঘ্র যাবে সেরে ॥ ৮ ॥
প্রভুতে বিশ্বাস এত করিত মথুর ।
শুনিরা অমনি তার সব চিন্তা দূর ॥ ৯ ॥
ঘরে না যাইয়া রহে দক্ষিণশহরে ।
দিনে দিনে পার বার্তা জগদম্বা সারে ॥ ১০ ॥
একে তো মথুর ভক্ত ভক্তির আকর ।
প্রভুরে দেখিয়া পায় হাতে শশধর ॥ ১১ ॥
তদুপরি প্রিয়তমা প্রাণের সমান ।
প্রভুর কৃপায় মাত্র পাইলেন প্রাণ ॥ ১২ ॥
দেখিয়া মজিল এত প্রভুর চরণে ।
তিলেক না দেখি দেখে অন্ধকার দিনে ॥ ১৩ ॥
সুবৃহৎ কালীপুরী মহাপরিসর ।
মনোহর পুষ্পোদ্যান তাহার ভিতর ॥ ১৪ ॥
নানা জাতি ফুটে ফুল সৌরভে অতুল ।
যেখানে সেখানে গন্ধে করে প্রাণাকুল ॥ ১৫ ॥
বিশেষতঃ যূথী বেলা মালতী টগর ।
গোলাপ রজনীগন্ধা গন্ধ মনোহর ॥ ১৬ ॥
গাছভরা গন্ধরাজ পঞ্চমুখী জবা ।
চামেলী অপরাজিতা শোভমান কিবা ॥ ১৭ ॥
পদ্মগন্ধা বক পুষ্প রক্তিম রঙ্গন ।
চন্দ্রমুখী সূর্যমুখী বিবিধ বরণ ॥ ১৮ ॥
লাল সাদা পদ্মগন্ধ করবী অতুল ।
পরিসীমা নাই তথা কত ফোটে ফুল ॥ ১৯ ॥
মথুর করেন আজ্ঞা যত ভৃত্যগণে ।
প্রস্ফুটিত যাবতীয় কুসুম-চয়নে ॥ ২০ ॥
গাঁথিয়া ফুলের হার বিবিধ বরণ ।
সাজায় শ্রীপ্রভুরায় মনের মতন ॥ ২১ ॥
মন্দিরে সাধের শ্যামা-মুর্তি বিদ্যমান ।
দ্বাদশ-মহেশ-লিঙ্গ আর রাধাশ্যাম ॥ ২২ ॥
পুরী বিনির্মাণ হৈল যাঁদের লাগিয়া ।
সে সব মথুর এবে গিয়াছে ভুলিয়া ॥ ২৩॥
শ্যাম শ্যামা শিব রাম প্রভু ভগবান ।
মধুরের খাঁটি পাকা ষোল আনা জ্ঞান ॥ ২৪ ॥
সামান্য মথুর নয় বুদ্ধি বার আনা ।
আনা তার বুদ্ধি যার সেই এক জনা ॥ ২৫ ॥
বড় জমিদারি বর্ষে লক্ষ লক্ষ আয় ।
ঘরে ব'সে হেসে হেসে ইঙ্গিতে চালায় ॥ ২৬ ॥
ইহা বিষয়ের কথা তাহে এত দূর ।
কত উচ্চ ভক্তি পথে দেখহ মথুর ॥ ২৭ ॥
এতই পিরীতি তাঁর শ্যামার চরণে ।
সাত লক্ষ টাকা দেয় পুরী-বিনির্মাণে ॥ ২৮ ॥
যেমন অতিথিশালা ভাণ্ডার তেমন ।
ছত্রে খায় দিনে রেতে লোক অগণন ॥ ২৯ ॥
যেমন তেমন নয় যাহা ইচ্ছা যার ।
ভক্তাভক্ত ছোটবড় নাহিক বিচার ॥ ৩০ ॥
আবাসে দ্বাদশ মাসে পর্ব ত্রয়োদশ ।
অন্নবান বস্ত্রবান দেশজুড়ে যশ ॥ ৩১ ॥
স্বর্ণ রৌপ্য পাত্র দেয় বিদায় ব্রাহ্মণে ।
সম্বৎসরে বারে বারে হিসাব-বিহীনে ॥ ৩২ ॥
মূল্যবান পরিচ্ছদ গরব বসন ।
অকাতরে যারে তারে করে বিতরণ ॥ ৩৩ ॥
পথঘাট সুপ্রশস্ত কর্ম পরহিতে ।
তুলনায় কে দাঁড়ায় মথুরের সাথে ॥ ৩৪ ॥
এতই উন্নত আত্মা হয় যেই জন ।
মরি হরি একবার ভেবে দেখ মন ॥ ৩৫ ॥
বুদ্ধিহারা কিবা হেতু হয় এইখানে ।
গরীব ব্রাহ্মণবেশী শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ৩৬ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
দিনে দিনে নানারূপ তাঁহারে দেখান ॥ ৩৭ ॥
শ্রীপ্রভুর সেবা আর তাঁর আরাধন ।
মঞ্জুর বুঝিত এই সর্বোচ্চ করম ॥ ৩৮ ॥
আশ্বিনে অম্বিকা-পূজা মথুরের ঘরে ।
সুঠামা প্রতিমা-মূর্তি কারিগরে গড়ে ॥ ৩৯ ॥
যেমন তেমন নহে এই কারিগর ।
কর্ম দেখে বিশ্বকর্মা পায়ে করে গড় ॥ ৪০ ॥
হেন কারিগর নাহি মিলে দুনিয়ায় ।
মাটির প্রতিমা করে জীবন্তের প্রায় ॥ ৪১ ॥
তবু যতক্ষণ প্রভু নাহি তথা যান ।
কারিগরে নাহি দিতে পারে চক্ষুদান ॥ ৪২ ॥
শ্রীপ্রভুর চক্ষুদান এতই সুন্দর ।
দেখিয়া চরণে পড়ে হেন কারিগর ॥ ৪৩ ॥
কোন কাজে কেহ নাহি প্রভুর সমান ।
আগাগোড়া প্রভুলীলা তাহার প্রমাণ ॥ ৪৪ ॥
মহাপুজা তিন দিন মথুরের ঘরে ।
মথুর রাখিত তাঁয় নাহি দিত ছেড়ে ॥ ৪৫ ॥
বলিতেন শ্রীমধুর ভক্ত মহারাজা ।
তুমি না থাকিলে বাবা কার হবে পুজা ॥ ৪৬ ॥
কি হবে নৈবেদ্য সব দিব খালে থালে ।
কে খাইবে আর বাবা তুমি না খাইলে ॥ ৪৭ ॥
পূজাদিনে যথাকালে নানা উপচার ।
খালায় থালায় করে ব্রাহ্মণে যোগাড় ॥ ৪৮ ॥
সারি সারি প্রতিমার সম্মুখেতে রাখে ।
দাঁড়ায়ে মথুর নিজে স্বচক্ষেতে দেখে ॥ ৪৯ ॥
মনোমত সুসজ্জিত দেখি উপচার ।
বলিতেন আনিবারে বাবারে এবার ॥ ৫০ ॥
আসিবার আগে প্রভু প্রতিমা-মন্দিরে ।
পথেই যাইত প্রায় বাহ্যজ্ঞান ছেড়ে ॥ ৫১ ॥
যখন পশিত কানে পূজা-স্তুতি-পাঠ ।
বিভোর তখন আর নাহি পান বাট ॥ ৫২ ॥
ধরিয়া আনিয়া তাঁরে বসাইয়া দিত ।
যেইখানে নৈবেদ্যাদি রহে সুসজ্জিত ॥ ৫৩ ॥
যখন দুর্গায় ভোজ্য করে নিবেদন ।
ব্রতিরূপে নিয়োজিত পূজক ব্রাহ্মণ ॥ ৫৪ ॥
ভক্ষণ করেন প্রভু শ্রীহস্তে লইয়া ।
দেখিয়া ব্রাহ্মণগণে উঠে চমকিয়া ॥ ৫৫ ॥
অমনি মথুর কহে যতেক ব্রাহ্মণে ।
বুঝিনু সম্পূর্ণ পূজা বাবার গ্রহণে ॥ ৫৬ ॥
সার্থক হইল দুর্গাপুজা-আরাধন ।
নৈবেদ্য যখন বাবা করিলা গ্রহণ ॥ ৫৭ ॥
ভক্তিহীন ব্রাহ্মণেরা বুঝিতে না পারে ।
মনে করে বলে কিছু কিন্তু নারে ডরে ॥ ৫৮ ॥
কার সাধ্য প্রভুদেবে কহে রুক্ষ ভাষ ।
তখনি লইবে মাথা মথুর বিশ্বাস ॥ ৫৯ ॥
বাবার কৃপায় তাঁর অশঙ্কিত হৃদি ।
অটল বিশ্বাস ভক্তি খেলে নিরবধি ॥ ৬০ ॥
যেমন শ্রীপ্রভু ভক্ত মনোমত তাঁর ।
ধন্য তুমি নমো নমো কৈবর্তকুমার ॥ ৬১ ॥
ভাষায় না জুটে কথা গুণ বলিবারে ।
করুণ কটাক্ষ কর কায়স্থ-কিঙ্করে ॥ ৬২ ॥
অন্তরেতে নিদারুণ র'য়ে গেল ব্যথা ।
ভাগ্যে না হইল পদে লুটাইতে মাথা ॥ ৬৩ ॥
যেমন মথুর তাঁর মতন গৃহিণী ।
ভক্তিমতী জগদম্বা কৈবর্তনন্দিনী ॥ ৬৪ ॥
শ্যামাতে অতুল ভক্তি মায়ের মতন ।
আছয়ে সোদরা কেহ না হয় এমন ॥ ৬৫ ॥
মনোমত আর যত ঘরে পরিবার ।
ধরাধামে মথুরের সোনার সংসার ॥ ৬৬ ॥
নবমীপূজার দিনে পূজার সময় ।
অন্তঃপুরে মহাভাব শ্রীঅঙ্গে উদয় ॥ ৬৭ ॥
দুইজনে স্ত্রীপুরুষে ভাব দেখি গায় ।
নানাবিধ অলঙ্কারে শ্রীঅঙ্গ সাজায় ॥ ৬৮ ॥
সুন্দর রচিল বেশ অতি পরিপাটি ।
শেষে পরাইল লাল বারাণসী শাটী ॥ ৬৯ ॥
আবেশে অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ।
ধীরে ধীরে উপনীত প্রতিমা-গোচরে ॥ ৭০ ॥
সখীভাবে নিজ করে চামর-ব্যজন ।
মথুর পশ্চাতে থাকি করে নিরীক্ষণ ॥ ৭১ ॥
হেন ঠাম ধরিলেন প্রভু সেইক্ষণে ।
কে প্রতিমা কেবা প্রভু সাধ্য কার চিনে ॥ ৭২ ॥
কতই হইল খেলা মথুরের ঘরে ।
নানারূপ দেখাইয়া ধরা দিলা তারে ॥ ৭৩ ॥
প্রভু আর প্রভুভক্ত পদে রাখি মতি ।
ক্রমে ক্রমে শুন রামকৃষ্ণলীলা-গীতি ॥ ৭৪ ॥
একদিন সন্ধ্যাকালে মথুর-বনিতা ।
মানস যাইতে তীর্থে তুলিলেন কথা ॥ ৭৫ ॥
তীর্থযাত্রা ধর্ম-কর্ম পুণ্য-প্রদায়িনী ।
মথুর ভুলেছে পেয়ে প্রভু গুণমণি ॥ ৭৬ ॥
প্রভুদেব বিনা অন্যে নাহি জানে আর ।
সগোষ্ঠী একত্রে সেবে শ্রীচরণ তাঁর ॥ ৭৭ ॥
প্রভু বিনা শ্রীমথুর কিছু নাহি চায় ।
সে হেতু উত্তর কৈল আপন ভার্যায় ॥ ৭৮ ॥
পুছহ বাবায় ইহা আমি নাহি জানি ।
বাবায় ছাড়িয়া যেতে কাঁপে মোর প্রাণী ॥ ৭৯ ॥
অনর্থক অর্থনষ্ট কষ্ট কত হবে ।
বাবা যদি যান সঙ্গে যেতে পারি তবে ॥ ৮০ ॥
কাতর প্রভুরে কয় মথুর-গৃহিণী ।
যাওয়া হয় তীর্থে যদি যাও বাবা তুমি ॥ ৮১ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
ধরিলে ভকতে আর নাহিক এড়ান ॥ ৮২ ॥
ভালমন্দ স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
সম্পদ-বিপদ সখা রহে রেতে দিনে ॥ ৮৩ ॥
কি করেন প্রভুদেব দিলেন সম্মতি ।
মহা আস্বা জগদম্বা পুলকিত অতি ॥ ৮৪ ॥
লীলাময় প্রভু তাঁর কর্ম বুঝা ভার ।
মানুষ থাকুক দূরে অসাধ্য ব্রহ্মার ॥ ৮৫ ॥
কেহ বা কতই করে অসাধ্য সাধন ।
সহি শীতাতপ কত বিহীন-অশন ॥ ৮৬ ॥
কটিতে কৌপীন মাত্র তরুতলে বাস ।
সজল নয়নে ছাড়ে সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ॥ ৮৭ ॥
আত্মসুখ-বিবর্জিত ক্ষুধা-তৃষ্ণাহারা ।
জীর্ণ-শীর্ণ চর্মহীন হাড়ের চেহারা ॥ ৮৮ ॥
তথাপি তিলেক তরে না পায় দর্শন ।
কেহ সঙ্গে রঙ্গে করে জীবনযাপন ॥ ৮৯ ॥
যথা তথা ইচ্ছামত সঙ্গে ল'য়ে যায় ।
ভগবৎ-তত্ত্ব গুপ্ত ব্যক্ত মাত্র তাঁয় ॥ ৯০ ॥
তাঁর তত্ত্ব তিনি বিনা কে বুঝিতে পারে ।
ধূমাগার মাথা তার যে যার বিচারে ॥ ৯১ ॥
তীর্থে যেতে আয়োজন করেন মথুর ।
মনোমত ভৃত্য অর্থ প্রচুর প্রচুর ॥ ৯২ ॥
বস্তায় বস্তায় বাঁধা বিছানা বসন ।
যখা আজ্ঞা আয়োজন করে ভৃত্যগণ ॥ ৯৩ ॥
দক্ষিণশহরে এবে আই ঠাকুরানী ।
অতিবৃদ্ধা শুভ্রাকেশা প্রভুর জননী ॥ ৯৪ ॥
চরণ বন্দনা আর সম্মতিকারণে ।
আসিলেন প্রভুদেব তাঁর সন্নিধানে ॥ ৯৫ ॥
আইর সর্বস্ব রক্ত পুত্র গদাধর ।
তীর্থে যেতে ছেড়ে দিতে না মানে অন্তর ॥ ৯৬ ॥
হেথা প্রতিশ্রুত প্রভু মঞ্জুর-আবাসে ।
তাহাদের সঙ্গে যাওয়া হবে তীর্থবাসে ॥ ৯৭ ॥
না যাইলে বাক্যরক্ষা-পক্ষে হয় দোষ ।
গেলে পরে জননীর মনে অসন্তোষ ॥ ৯৮ ॥
উভয় রক্ষার হেতু করিলা উপায় ।
তীর্থবাসে সঙ্গে যেতে কহিলেন মায় ॥ ৯৯ ॥
পরিহরি গঙ্গাতীর তীর্থপর্যটনে ।
যাইতে আইর ভাল লাগিল না মনে ॥ ১০০ ॥
অগত্যা দিলেন সায় পুত্র গদাধরে ।
তীর্থ পর্যটন-শেষে ফিরিতে সত্বরে ॥ ১০১ ॥
শ্রীপ্রভুর তীর্থে যাত্রা হয় শুভদিনে ।
সঙ্গে যায় সেবাপর হৃদয় ভাগিনে ॥ ১০২ ॥
অপর ব্রাহ্মণ কতক দাসদাসীগণ ।
বস্তা বস্তা সজ্জা শয্যা বিবিধ রকম ॥ ১০৩ ॥
এর পূর্বে প্রয়াগ পর্যন্ত একবার ।
গিয়াছিলা প্রভু-সঙ্গে মথুর কুমার ॥ ১০৪ ॥
দ্বিতীর এবার তাঁর তীর্থ-পর্যটন ।
শুনিয়াছি যেই মত শুন বিবরণ ॥ ১০৫ ॥
কল্যাণনিধান কথা মথুর আখ্যান ।
গাইলে শুনিলে করে দুঃখে পরিত্রাণ ॥ ১০৬ ॥
পথিমধ্যে এক ঠাঁই বিস্তৃত প্রান্তরে ।
অনাথ দরিদ্র বহু লোক বাস করে ॥ ১০৭ ॥
পত্রের কুটার বাঁধা তাও দুলে যায় ।
তরুতলস্থিত সেই হেতু রক্ষা পায় ॥ ১০৮ ॥
অন্ন বিনা জীর্ণ-শীর্ণ রুগ্নকলেবর ।
অনায়াসে গোনা যায় বুকের পাঁজর ॥ ১০৯ ॥
পরিধেয় শতগ্রন্থি মলিন বসন ।
এত খাট তাও নহে লজ্জা-আবরণ ॥ ১১০ ॥
মূর্তিমান দরিদ্রতা তথা বিঘ্নমান ।
দেখিয়া দয়াল প্রভু করুণানিধান ॥ ১১১ ॥
রোদন করেন কত নাহিক অবধি ।
গদগদ স্বরে কন শ্যামার সম্বোধি ॥ ১১২ ॥
ত্রিলোকপালিনী তুমি তুমি বিশ্বেশ্বরী ।
কি বিচার না তোমার বুঝিতে না পারি ॥ ১১৩ ॥
তোমার কর্মের মর্ম বুঝা অতি ভার ।
কারও ভাতে দুধ চিনি নানা উপচার ॥ ১১৪ ॥
অন্ন বিনা কেহ শীর্ণ দড়িবাটে আঁতে ।
দিনান্তেও এক মুঠা নাহি পায় খেতে ॥ ১১৫ ॥
দীনবন্ধু প্রভুদেব কাঙ্গালের ধন ।
অহেতুক রূপানিধি দারিদ্র্যভঞ্জন ॥ ১১৬ ॥
অনাথের নাথ প্রভু দ্রবিয়া অন্তরে ।
ধীরে ধীরে বলিলেন ভক্ত শ্রীমথুরে ॥ ১১৭ ॥
কখন না দেখি শুনি কাঙ্গালী এমন ।
যথাসাধ্য কর অন্ন-বস্ত্র বিতরণ ॥ ১১৮ ॥
এদের মতন দুঃখী নাহি ত্রিসংসারে ।
বলিতে বলিতে জল দু'নয়নে ঝরে ॥ ১১৯ ॥
দুঃখী দীনে যদি তব না দ্রবে অন্তর ।
কি হেতু কহিবে জীবে দয়ার সাগর ॥ ১২০ ॥
জয় জয় দীনবন্ধু কাঙ্গালের হরি ।
যে দীনে উপজে ধরা তারে নমঃ করি ॥ ১২১ ॥
যে তোমার দয়াপাত্র সে কিসে কাঙ্গালী ।
সার্থক জীবন তার রত্নবান বলি ॥ ১২২ ॥
যে যে কাঙ্গালীকে দেখি শ্রীনয়নে বারি ।
জনে জনে তে সবার পদযুগ ধরি ॥ ১২৩ ॥
কাঙ্গালীর বেশমাত্র কাঙ্গালী কেমনে ।
ভাগ্যবান সুরপূজ্য এবে ধরাধামে ॥ ১২৪ ॥
অমূল্য শ্রীপাদপদ্ম দরশন-আশে ।
বিরলেতে করে বাস কাঙ্গালীর বেশে ॥ ১২৫ ॥
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ আজি শ্রীপ্রভু দুয়ারে ।
অন্ন-বস্ত্রধান-হেতু কহিলা মথুরে ॥ ১২৬ ॥
মথুর তাহাই করে যে আজ্ঞা যখন ।
জানি না এবারে তেহ বুঝিল কেমন ॥ ১২৭ ॥
উত্তরে প্রভুর প্রতি ভক্তবর কয় ।
কোথা পাব এত অর্থ বহু হবে ব্যয় ॥ ১২৮ ॥
দয়ালস্বভাব তুমি দয়ার সাগর ।
পরদুঃখে দ্রবে তব করুণ অন্তর ॥ ১২৯ ॥
এত দরিদ্রের দুঃখ করিতে মোচন ।
কোথায় পাইব বাবা রাশি রাশি ধন ॥ ১৩০ ॥
তুমি নাহি জান বাবা অর্থের মরম ।
তাই কহ করিবারে এ হেন করম ॥ ১৩১ ॥
ঠাকুর ঈষৎ কষ্টে কন আর বার ।
রাজেশ্বরী মাতা সৃষ্টি তাহার ভাণ্ডার ॥ ১৩২ ॥
নিজস্ব কাহারও নাই এক কড়া কড়ি ।
যার কাছে ধন সেই মায়ের ভাণ্ডারী ॥ ১৩৩ ॥
মায়ের ভাণ্ডারী মাত্র তুমি একজন ।
আজ্ঞা তাঁর কর অন্ন-বস্ত্র বিতরণ ॥ ১৩৪ ॥
ওরে শালা আমি তোর কাশী নাহি যাব ।
অনাথ কাঙ্গালী এরা এইখানে রব ॥ ১৩৫ ॥
এত শুনি শ্রীমথুর কহিল তখন ।
অবশ্য করাব বাবা কাঙ্গালী-ভোজন ॥ ১৩৬ ॥
অবিলম্বে পাঠাইল পত্রিকা ভবনে ।
প্রেরণ করিতে বস্ত্র বস্তা বস্তা কিনে ॥ ১৩৭ ॥
চর্ব্যয চূষ্য লেহ্য পেয় প্রচুর প্রচুর ।
আয়োজন করিলেন ভক্ত শ্রীমথুর ॥ ১৩৮ ॥
সপ্তাহ কাটিয়া যায় কাঙ্গালী-ভোজনে ।
দেখিয়া ঠাকুর মহাপরিতোষ মনে ॥ ১৩৯ ॥
অর্থসহ নব বস্ত্র শেষ দিনে দান ।
পশ্চাৎ হইল কাশীতীর্থেতে পয়ান ॥ ১৪০ ॥
জয় জয় ভাগ্যবান কাঙ্গালীর গণ ।
তোমাদের পদরজ মাগে এ অধম ॥ ১৪১ ॥
কিবা ভাগ্য তোমাদের বলিতে না পারি ।
দুয়ারে পাইলে ভবসিন্ধুর কাণ্ডারী ॥ ১৪২ ॥
অঘটন-সঙ্ঘটন কি ভাগ্যের বলে ।
ঋষি মূনি যোগী জনে কদাচিৎ মিলে ॥ ১৪৩ ॥
দীনতা যদ্যপি হয় কারণ তাহার ।
দেহ অণুকণা ভিক্ষা করি বার বার ॥ ১৪৪ ॥
তরণীতে যে সময় গঙ্গা-অতিক্রম ।
ভাবচক্ষে শ্রীপ্রভুর হয় দরশন ॥ ১৪৫ ॥
শিবপুরী বারাণসী সুবর্ণে নির্মিত ।
অন্নদানে অন্নপূর্ণা নিজে বিরাজিত ॥ ১৪৬ ॥
উতরিলে অন্য পারে ভাব ভেঙ্গে যায় ।
শিবিকায় সাবধানে ঠাকুরে উঠায় ॥ ১৪৭ ॥
নিরূপিত বাসাবাটী প্রাসাদের মত ।
দলেবলে শ্রীমথুর হয় উপনীত ॥ ১৪৮ ॥
পল্লীতে পড়িল সাড়া মহা আড়ম্বর ।
আচরণে শ্রীমথুর যেন রাজেশ্বর ॥ ১৪৯ ॥
রাজপথে দু পা যেতে সমারোহ কত ।
রজতে নির্মিত ছাতা চাকরে ধরিত ॥ ১৫০ ॥
অঙ্গ-রক্ষকের গণ আসাসোঁটা হাতে ।
সুন্দর পোশাক-পরা ঘেরা চারিভিতে ॥ ১৫১ ॥
দানকর্মে কর্ণ যেন মুক্তহস্তে ব্যয় ।
যেখানে যা লাগে দেয় কাতর না হয় ॥ ১৫২ ॥
বিশ্বনাথ-দরশনে পায়ে হেঁটে যায় ।
সঙ্গে রহে ভৃত্যগণ প্রভু শিবিকায় ॥ ১৫৩ ॥
হৃদয় শিবিকা-পার্শ্বে প্রভুর নিকটে ।
সতর্কে থাকেন কিবা কখন কি ঘটে ॥ ১৫৪ ॥
দেবদেবী-দরশনে শ্রীপ্রভুর ধারা ।
স্থানে যাইবার পূর্বে পথে বাহ্যহারা ॥ ১৫৫ ॥
এখানেও তাই পথে ইন্দ্রিয়াদি মন ।
করিয়াছে কোন্ রাজ্যে সবে পলায়ন ॥ ১৫৬ ॥
শিবিকার বাহ্যহারা ঠাকুর হেথায় ।
শ্রীদেহ ধরিয়া হৃদু মন্দিরে উঠায় ॥ ১৫৭ ॥
এখানে আবেশ-নেশা হৈল ঘনতর ।
জড়বৎ কায়াখানি প্রাণশূন্য ঘর ॥ ১৫৮ ॥
সাবধানে ল'য়ে তাঁরে সেই অবস্থায় ।
বলেবলে শ্রীমধুর ফিরিল বাসায় ॥ ১৫৯ ॥
দরশনে এই কাণ্ড নিত্য নিত্য হয় ।
তথাপিহ একবার না আসিলে নয় ॥ ১৬০ ॥
ঠাকুরের পরিচয় ঠাকুরে বিদিতি ।
বায়ুর প্রাবল্যে লিখি রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬১ ॥
বহুতর ধনেশ্বর বৈঠে নানা ঠাঁই ।
মথুরের মত দাতা হেন কেহ নাই ॥ ১৬২ ॥
উদারতা সরলতা স্বার্থশূন্যদানে ।
দ্বিতীয় ইহার মত মিলে না নয়নে ॥ ১৬৩ ॥
অর্জুন যেমন ছিল লঘুহস্ত বাণে ।
মথুর তেমতি হেথা মুক্তহস্ত দানে ॥ ১৬৪ ॥
বিশাল নগরী এই বারাণসীধাম ।
নানান দেশের লোকে জনাকীর্ণ স্থান ॥ ১৬৫ ॥
ইহাতে আছয়ে যত পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ।
শ্রীমথুর করিলেন সবে নিমন্ত্রণ ॥ ১৬৬ ॥
ভোজনায়োজন-কথা বাহুল্য বাখান ।
প্রতিজনে টাকা টাকা দক্ষিণার দান ॥ ১৬৭ ॥
আগাগোড়া দেখিতেছি প্রভুর প্রকৃতি ।
সাধুভক্ত দেখিবারে বড়ই পিরীতি ॥ ১৬৮ ॥
দেশজুড়ে খ্যাতি এক সাধু এইখানে ।
কারও সঙ্গে কথা নাই মৌনাবলম্বনে ॥ ১৬৯ ॥
বহুকাল কাশীতীর্থে লোকের রটনা ।
প্রকৃত উমের কত কারও নাহি জানা ॥ ১৭০ ॥
পানভোজনের চেষ্টা নাহিক তাঁহায় ।
খাওয়াইয়া দিলে কেহ তবে তেঁহ খায় ॥ ১৭১ ॥
শীতাতপে সমধারা নগ্ন কলেবর ।
আপনাতে মগ্ন নাহি দেহের খবর ॥ ১৭২ ॥
পরিচয় এই মহোন্নত অবস্থার ।
শ্রীমৎ ত্রৈলঙ্গ স্বামী নাম মহাত্মার ॥ ১৭৩ ॥
স্বামীজীরে দেখিবারে প্রভুর গমন ।
হৃদয় সর্বদা সঙ্গে ভুঙ্গীর মতন ॥ ১৭৪ ॥
যথাস্থানে উতরিয়া দেখে প্রভুঘর ।
শুইয়া আছেন তপ্ত বালির উপর ॥ ১৭৫ ॥
অবিকৃত মন দেহে নাহিক যাতনা ।
দুগ্ধফেন শয্যা তপ্ত বালির বিছানা ॥ ১৭৬ ॥
মহা আনন্দিত স্বাধী প্রভুকে দেখিয়ে ।
অভ্যর্থনা কৈল তাঁর নস্যদানী দিয়ে ॥ ১৭৭ ॥
বসিয়া স্বামীর পাশে পুছিলেন রায় ।
বাক্যের দুয়ারে নহে মাত্র ইশারায় ॥ ১৭৮ ॥
বল দেখি এক কিবা বহুল ঈশ্বর ।
তখনি সঙ্কেতে মৌনী করিল উত্তর ॥ ১৭৯ ॥
দেখা যায় এক তিনি ধ্যান-অবস্থায় ।
বহুল বহুল বোধ বিরাট লীলায় ॥ ১৮০ ॥
স্বামীর প্রশংসা প্রভু করিয়া বিস্তর ।
বলিলেন তাঁর খোলে নিজে বিশ্বেশ্বর ॥ ১৮১ ॥
পায়সান্ন ছিল সঙ্গে আদর করিয়ে ।
আপুনি ঠাকুর তাঁর দেন খাওয়াইয়ে ॥ ১৮২ ॥
দয়ানন্দ সরস্বতী আর একজন ।
সাধুদের মধ্যে তাঁর খ্যাতি বিলক্ষণ ॥ ১৮৩ ॥
দেবভাষা সংস্কৃত বিশেষিয়া জানা ।
উহাতেই কথাবার্তা তর্ক আলোচনা ॥ ১৮৪ ॥
জ্ঞানমার্গী বেদান্তের পথে মতে গতি ।
শিষ্য চেলা বহু আর্য-সমাজাধিপতি ॥ ১৮৫ ॥
ঠাকুরের রীতি সাধু-সন্তে মানদান ।
দয়ানন্দে একদিন দেখিবারে যান ॥ ১৮৬ ॥
অগ্রণী হইয়া তাঁর চেলা একজন ।
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা করে উত্থাপন ॥ ১৮৭ ॥
নামরূপ সাকারের প্রতিবাদী তিনি ।
রামনামে যেইমত হয় ভূতযোনি ॥ ১৮৮ ॥
ঠাকুরের সঙ্গে কথা সাকার লইয়ে ।
মারার ব্যাপার বলি দেয় উড়াইয়ে ॥ ১৮৯ ॥
বাক্বিতণ্ডায় সাধু অতি বিচক্ষণ ।
অনর্থ তর্কের দ্বন্দ্বে পক্ষ-সমর্থন ॥ ১৯০ ॥
তর্কবিদ্যা বিশারদ তর্কেতে চতুর ।
ততই খণ্ডন যত কহেন ঠাকুর ॥ ১৯১ ॥
বচনে হবে না কার্য এই অনুমানি ।
স্বরূপধারণ তবে কৈলা গুণমণি ॥ ১৯২ ॥
সুস্থির আছিল জল দুলাইল যায় ।
অর্ধবাহ্য আবেশেতে কহিলা তাহায় ॥ ১৯৩ ॥
এত যে করিনু আমি দিয়ে প্রাণমন ।
জগমাতা অম্বিকার সাধন-ভজন ॥ ১৯৪ ॥
তত্তৎভূত অনুভূতি দরশনাবলী ।
প্রতারণা প্রবঞ্চনা মিথ্যা কি সকলি ॥ ১৯৬ ॥
এত বলি এই দেখ দেহ দেখাইয়ে ।
সমাধিস্থ প্রভুত্বের উঠে দাঁড়াইয়ে ॥ ১৯৭ ॥
শ্রীচৈতন্য-ঘনমূর্তি প্রভুর আমার ।
প্রদর্শন যেইখানে প্রভাবে তাহার ॥ ১৯৮ ॥
তামস-বিনাশ বাতি চৈতন্য-তপন ।
উদয় হইয়া দেয় নবীন নয়ন ॥ ১৯৯ ॥
চৈতন্যপ্রসূত এই নধীন নয়নে ।
কি দেখে চৈতন্যবান অন্যে নাহি জানে ॥ ২০০ ॥
সেই সৃষ্টি সেই কাল সেই রাত্রি দিন ।
সব সেই পূর্বেকার তথাপি নবীন ॥ ২০১ ॥
আপনে আপনহারা বুদ্ধি হয় হত ।
বিস্ময়স্তম্ভিতাচল পর্বতের মত ॥ ২০২ ॥
কখন কখন হাসে কভু চোখে জল ।
কখন বা নাচে গায় আনন্দে বিহ্বল ॥ ২০৩ ॥
সীসার নির্মিত তার দড়ির মতন ।
ভারি যেন তেন লম্বা যোজন যোজন ॥ ২০৪ ॥
তড়িতের শক্তি যবে সঞ্চালিত তায় ।
আগাগোড়া থর থর তাহারে কাঁপায় ॥ ২০৫ ॥
সেইমত ঠাকুরের ভাবের প্রতাপে ।
ভাগ্যবান বৈদান্তিক উঠে কেঁপে কেঁপে ॥ ২০৬ ॥
জানি না শ্রীঅঙ্গে কিবা করি দরশন ।
ধরণী লুটায় ধরি প্রভুর চরণ ॥ ২০৭ ॥
নাহি দিলে ধরা নিজে সাধ্য কার ধরে ।
বিধির বিধান ছাড়া অচেনা ঠাকুরে ॥ ২০৮ ॥
শ্রীঅঙ্গে নাহিক কোন অঙ্কিত নিশান ।
নাসিকা কপালে কিবা ফোঁটা লম্বমান ॥ ২০৯ ॥
নাই অঙ্গে ভস্মমাখা জটা নাই শিরে ।
রুদ্রাক্ষ তুলসী-মালা গলায় কি করে ॥ ২১০ ॥
গায়ে নাই নামাবলী নাই বাঘাম্বর ।
ধুনি জ্বালা সঙ্গে চেলা মুখে হর হর ॥ ২১১ ॥
পরিধান একমাত্র সুতার বসন ।
প্রয়োজনমত মাত্র গাত্র-আবরণ ॥ ২১২ ॥
নাই শাস্ত্র-বেদ-পাঠ নিরক্ষর বেশ ।
পুরাণ কোরান ছাড়া গ্রন্থ পরমেশ ॥ ২১৩ ॥
মানুষের কথা কিবা ধাতা ফাঁকি পায় ।
নরলীলা ঈশ্বরের বুঝা মহাদায় ॥ ২১৪ ॥
বিশেষতঃ এ লীলায় বড়ই গোপন ।
আপুনি যেমন প্রভু সাঙ্গেরা তেমন ॥ ২১৫ ॥
এই তো চেলার কথা হেতা সরস্বতী ।
সাধক শাস্ত্রজ্ঞ যাঁর দেশময় খ্যাতি ॥ ২১৬ ॥
বেদ-বেদান্তালোচক নানা গুণ তাঁয় ।
দুনিয়ার লোকে কাছে তত্ত্ব আশে যায় ॥ ২১৭ ॥
পুণ্য-দরশন তেহ পুণ্যবান রটে ।
শিক্ষার্থী শিষ্যেরা বহু বাস করে মঠে ॥ ২১৮ ॥
সরল প্রাণেতে করে তত্ত্ব-অন্বেষণ ।
তাই আজি তাঁর কাছে প্রভুর গমন ॥ ২১৯ ॥
সরলতা যেথা হোক যে কোন পন্থীর ।
সেই শ্রীপ্রভুর প্রিয় তথায় হাজির ॥ ২২০ ॥
এই ধারা বরাবর দেখি শ্রীপ্রভুর ।
যেন তিনি জগতের সবার ঠাকুর ॥ ২২১ ॥
দয়ানন্দ অনিমিখে দেখি নিরখিয়ে ।
প্রভুর সমাধি বেশ বিশেষ করিয়ে ॥ ২২২ ॥
অবাক হইয়া কহে অন্তর সরল ।
বেদ-বেদান্তাদি মোরা পড়েছি কেবল ॥ ২২৩ ॥
কিন্তু তার ফল দেখি এই মহাজনে ।
সার্থক জীবন মহাত্মার দরশনে ॥ ২২৪ ॥
জীবন্তপ্রতিম যাহা বেদান্তে বাখান ।
দেখিয়া পাইমু আজি প্রত্যক্ষ প্রমাণ ॥ ২২৫ ॥
শাস্ত্র গাঁথা পণ্ডিতেরা করিয়া মন্থন ।
ঘোলাংশ কেবলমাত্র করে আস্বাদন ॥ ২২৬ ॥
সার অংশ মাখনের অধিকারী এঁরা ।
সচল বিগ্রহবেশী এই মহাত্মারা ॥ ২২৭ ॥
ঠাকুরের লীলা খেলা না যায় বাখানি ।
সঙ্গেতে মিলিলা হেথা সাধিকা ব্রাহ্মণী ॥ ২২৮ ॥
চৌষট্টি যোগিনী নামে পল্লীর মাঝার ।
নিবাসের বাসা-বাটী আছিল তাঁহার ॥ ২২৯ ॥
ঠাকুরের বারংবার তথা আগমন ।
সাধিকার পূর্ববৎ তুষ্ট যাহে মন ॥ ২৩০ ॥
হৃদয়-যাতনা যত একেবারে দূর ।
করিলেন নিজগুণে দয়ার ঠাকুর ॥ ২৩১ ॥
মণিকর্ণিকাদি পঞ্চতীর্থ দরশনে ।
একদিন তরীযোগে মথুরের সনে ॥ ২৩২ ॥
আগমন ঠাকুরের পরম হরিষে ।
উত্তরিল তরী মণিকর্ণিকার পাশে ॥ ২৩৩ ॥
সেস্থান হইতে প্রভু দেখিবারে পান ।
জনাকীর্ণ নগরীর প্রকাণ্ড শ্মশান ॥ ২৩৪ ॥
চিতায় পুড়িছে মড়া অগণ্য অগণ্য ।
নরদৃষ্টি-বিরোধিনী ধূমে পরিপূর্ণ ॥ ২৩৫ ॥
নৌকার ভিতর প্রভু ছিলা ধীর স্থির ।
হঠাৎ উৎফুল্লান্তরে হইলা বাহির ॥ ২৩৬ ॥
উপনীত একেবারে তরীর কিনারে ।
তরণীস্থ সবে যায় ধরিবার তরে ॥ ২৩৭ ॥
বাহ্যহারা সমাধিস্থ এবে প্রভুরায় ।
প্রসন্ন উজ্জ্বল জ্যোতি বন্ধনে বেরায় ॥ ২৩৮ ॥
দিগ্চর আলোময় ছটার প্রভাবে ।
মাঝি-মাল্লা তীর্থ-পাণ্ডা নেহারিছে সবে ॥ ২৩৯ ॥
নয়নে পলক নাই হৃদয় বিস্মিত ।
ভূতলে অতুল দৃশ্য না যার বর্ণিত ॥ ২৪০ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে ভাব ভেঙ্গে যায় ।
তীর্থকার্যে মথুরাদি নামিল ডাঙ্গায় ॥ ২৪১ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুরে কহেন তখন ।
ভাবের নয়নে কিবা হৈল দরশন ॥ ২৪২ ॥
ভাঙ্গিয়া অপূর্ব কথা কন প্রভুরায় ।
বলেন দেখিনু এক মূর্তি দীর্ঘকায় ॥ ২৪৩ ॥
পিঙ্গল-বর্ণের জটা শোভে শিরোপরে ।
অঙ্গেতে রজতকান্তি ত্রিশূল শ্রীকরে ॥ ২৪৪ ॥
ধীর মন্দ পদক্ষেপে গম্ভীর ধারায় ।
প্রত্যেক চিতার পাশে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ২৪৫ ॥
প্রত্যেক চিতায় প্রতি দেহীটিকে ভুলে ।
পরংব্রহ্ম-মন্ত্র তার দেন কর্ণফুলে ॥ ২৪৬ ॥
চিতার অপর পার্শ্বে দেখিনু আবার ।
নির্বাণদায়িনী মহাকালীর আকার ॥ ২৪৭ ॥
নিস্তারিণী আপনি মা সুন্দর সুঠামে ।
বিরাজিতা রয়েছেন শ্মশানের ধূমে ॥ ২৪৮ ॥
পুরুষের মন্ত্রপুত দেহীকে লইয়ে ।
যতেক বন্ধন তার দিতেছে খুলিয়ে ॥ ২৪৯ ॥
উন্মুক্ত করিয়া দ্বার আপনার করে ।
প্রেরিছেন সদ্য সদ্য অখণ্ডের ঘরে ॥ ২৫০ ॥
অদ্বৈতের ভূমানন্দ বহু তপস্যায় ।
গুহারণ্যবাসী ঋষি তপস্বী না পায় ॥ ২৫১ ॥
তাই দেন বিশ্বনাথ যে লহে শরণ ।
জীব হয় শিব যদি কাশীতে মরণ ॥ ২৫২ ॥
পশ্চাতে কহেন প্রভু আশ্চর্য ব্যাপার ।
যে শিবদর্শন পথে হৈল আমার ॥ ২৫৩ ॥
প্রথমেতে দেখিলাম তেঁহ অতি দূরে ।
সন্নিকটে অগ্রসর হৈল তার পরে ॥ ২৫৪ ॥
পরিশেষে স্পষ্টরূপে প্রত্যক্ষ হইল ।
আমার দেহের মধ্যে মিলাইয়া গেল ॥ ২৫৫ ॥
একেশ্বর প্রভু সৃষ্টিবাস সৃষ্টিস্বামী ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের নিকেতন-ভূমি ॥ ২৫৬ ॥
সৃষ্টি-হেতু তিন গুণে এই দেবত্রয় ।
ঠাকুরের আজ্ঞামত উদয় বিলয় ॥ ২৫৭ ॥
ঠাকুর শ্রীরাম মাত্র সকলের রাজা ।
তাঁহার পুজার হয় ত্রিলোকের পূজা ॥ ২৫৮ ॥
ত্রিলোক-নিবাস তেঁহ সবার ভিতর ।
স্থাবর জঙ্গমরূপে দৃষ্ট চরাচর ॥ ২৫৯ ॥
এক এক রূপে বিদ্যমান অহরহ ।
সৃষ্টির সমষ্টিখানি বিরাট বিগ্রহ ॥ ২৬০ ॥
নিত্যলীলা উভয়েতে ঠাকুর কেবল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভূবনমঙ্গল ॥ ২৬১ ॥
কাশীবাস কর্ম নাশে জীবে পায় ত্রাণ ।
জীব যত দিন দেহ দেহান্তে নির্বাণ ॥ ২৬২ ॥
এই মহা সত্য কথা বহুকাল শুনা ।
প্রভুর বাক্যে হৈল বিশ্বাস-স্থাপনা ॥ ২৬৩ ॥
এ এক অপূর্ব রঙ্গ শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
সকল প্রত্যয় হয় তাঁহার বচনে ॥ ২৬৪ ॥
শ্রীবাক্য জনমভূমে জন্মে যে প্রত্যয় ।
সেই সে প্রত্যয়খানি যেন তেন নয় ॥ ২৬৫ ॥
প্রত্যয় প্রত্যয়ী জনে দেয় দেখাইয়ে ।
কি চিত্র আঁকিলা প্রভু বর্ণাক্ষর দিয়ে ॥ ২৬৬ ॥
শ্রীমুখের প্রতিবাক্য প্রত্যেক অক্ষর ।
সিদ্ধ বীজ সিদ্ধ মন্ত্র অক্ষর অমর ॥ ২৬৭ ॥
হোক না পাষাণ ক্ষেত কঠিনাতিশয় ।
কালেতে অঙ্কুর তাহে তুলিবে নিশ্চয় ॥ ২৬৮ ॥
প্রত্যয়ের নামান্তর মাত্র ভগবান ।
যাহার ভিতরে তাঁর নিত্য অধিষ্ঠান ॥ ২৬৯ ॥
বিশ্বাস প্রত্যয় কিবা ভক্তি ভগবানে ।
ভিন্ন ভেদ কিছু নাই এক বস্তু তিনে ॥ ২৭০ ॥
অবিশ্বাস অপ্রত্যয় প্রমাদ ব্যাপার ।
তুলে অন্তঃসারশূক্ত অনর্থ-বিচার ॥ ২৭১ ॥
কলি-কর্ম দুই নষ্ট পরিণাম ফল ।
অসুরে মন্থনে যেন পার হলাহল ॥ ২৭২ ॥
মন্থনে উঠিল বটে বিবিধ জিনিস ।
প্রত্যয় পাইল সুধা তর্কে পার বিষ ॥ ২৭৩ ॥
ফলাশা বিচার তর্কে করে মুঢ় জন ।
বিশ্বাসে উপজে মহা অমূল্য রতন ॥ ২৭৪ ॥
ক'এ কেন ক কহিব কহে যদি ছেলে ।
বিদ্যালাভ নাহি তার হয় কোন কালে ॥ ২৭৫ ॥
বিচারে চিবিয়া খায় কাল কর্ম নাশে ।
সরমে গিলিয়া ফেলে প্রত্যয় বিশ্বাসে ॥ ২৭৬ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশন ভাবের নয়নে ।
মানুষে দেখিবে কিবা আভাস না জানে ॥ ২৭৭ ॥
আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মরাজ্য দুর্বোধ্যাতিশয় ।
রূপরস-যুদ্ধ চক্ষে দেখিবার নয় ॥ ২৭৮ ॥
ঈশ্বরানুরাগ-রূপ পরিলে অঞ্জন ।
তবে সেই দিব্য দৃশ্য হয় দরশন ॥ ২৭৯ ॥
রছে না সন্দেহ-তমঃ বিদূরিত ধাঁধা ।
কায়মনোবাক্যে যেথা এক সুরে বাঁধা ॥ ২৮০ ॥
ভাবেগর প্রভুদেব ভাবের আধার ।
ভাব ভাষাতীত রাজ্যে সতত বিহার ॥ ২৮১ ॥
পঞ্চভূত মরুতাদি তেজাকাশ ক্ষিতি ।
মন বুদ্ধি অহংকার নিকৃষ্ট প্রকৃতি ॥ ২৮২ ॥
ফুলের মালায় গুপ্ত সূতার মতন ।
প্রকৃষ্ট প্রকৃতি পরাশক্তি যে রকম ॥ ২৮৩ ॥
স্থূল সূক্ষ্মে ওতপ্রোত ব্যাপ্ত চরাচর ।
লীলাকারে খেলা করে সৃষ্টির ভিতর ॥ ২৮৪ ॥
দেখেন বসিয়া পলে পলে এক ঠাঁই ।
সত্বাধার সকলের যেমন গোসাঞি ॥ ২৮৫ ॥
এ হেন ঠাকুরে জীব বুঝিবে কেমনে ।
জ্ঞান-মন-বুদ্ধি-হারা কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ২৮৬ ॥
শাস্ত্র-মহাজন-বাক্যে বিশ্বাস কেবল ।
ভয়ঙ্করী ভবার্ণব পারের সম্বল ॥ ২৮৭ ॥
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ মানব-সূরতি ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু শক্তি-অধিপতি ॥ ২৮৮ ॥
ভাবমুখে অবস্থিত ভাবের ঠাকুর ।
যে ভূমি হইতে ফুটে সৃষ্টির আঁকুর ॥ ২৮৯ ॥
জয় জয় শূল-অসি ধনু-বেণুধারী ।
শক্তি-সঙ্গ সদারঙ্গ গুপ্তলীলাকারী ॥ ২৯০ ॥
দীন-হীন জগবন্ধু কাঙ্গাল-শরণ ।
শ্রীপদে বিশ্বাস-ভক্তি মাগে এ অধম ॥ ২৯১ ॥
এবে তীর্থবাস-লীলা করহ শ্রবণ ।
সসঙ্গ মথুর হয় প্রয়াগে গমন ॥ ২৯২ ॥
মস্তকমুণ্ডন দান যথাযোগ্য জনে ।
মথুর করিল সাঙ্গ বিধি-অনুক্রমে ॥ ২৯৩ ॥
বিধি-ছাড়া শ্রীশ্রীরায় বিধির বিধাতা ।
অবিধি তাঁহার পক্ষে মুড়াইতে মাথা ॥ ২৯৪ ॥
বুঝাইতে শ্রীমথুরে কহিলা তখন ।
আমাকে করিতে নাই মস্তক মুণ্ডন ॥ ২৯৫ ॥
দিনত্রয় মাত্র হেথা প্রয়াগে কাটিয়ে ।
পুনরায় কাশীধামে আসেন ফিরিয়ে ॥ ২৯৬ ॥
বৃন্দাবনে আগমন অতঃপর কথা ।
তীর্থবাস শ্রীপ্রভুর সুন্দর বারতা ॥ ২৯৭ ॥
বিশ্বাস-ভকতি বৃদ্ধি গাইলে ভারতী ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুথি ॥ ২৯৮ ॥
মথুরা হইয়া বৃন্দাবনধামে যেতে ।
অপূর্ব ঘটনা শুন কি হইল পথে ॥ ২৯৯ ॥
কংস-ত্রাসে বসুদেব কৃষ্ণ করি কোলে ।
যে ঘাটে যমুনা পার পলায় গোকুলে ॥ ৩০০ ॥
সেই ঘাটে আসা মাত্র প্রভু গুণমণি ।
দেখিলেন বসুদেব আকুল পরানী ॥ ৩০১ ॥
অন্ধকার যামিনী ভীষণা অতিশয় ।
কোলে কৃষ্ণ রূপে আলো করে দিক্চয় ॥ ৩০২ ॥
যায় পার যমুনার ছুটে ঊর্ধ্বশ্বাস ।
যেখিয়া প্রভুর মহাভাবের উচ্ছ্বাস ॥ ৩০৩ ॥
গভীর সমাধিযুক্ত কিসেও না ছুটে ।
অবিরাম কৃষ্ণনাম কর্ণ-মূলে রটে ॥ ৩০৪ ॥
দুই কানে দুই জনে হৃদয় মথুর ।
কিসেও না হুঁশ অঙ্গে আইল প্রভুর ॥ ৩০৫ ॥
মথুর দেখিয়া পরে অনন্ত-উপায় ।
প্রভুদেবে ল'য়ে যেতে শিবিকা আনায় ॥ ৩০৬ ॥
মহাভাবে ডুবে ডুবে প্রভু পরমেশ ।
নরযানে বৃন্দাবনে করেন প্রবেশ ॥ ৩০৭ ॥
দু তিন প্রহর কাল যায় এ রকম ।
তবে না উদয় বাহ্যজ্ঞানের লক্ষণ ॥ ৩০৮ ॥
পূর্ণভাবে এলে বাহ্য বৃন্দাবন দেখি ।
বর্ণিবার সীমা পার প্রভু এত সুখী ॥ ৩০৯ ॥
বিশেষ বিশেষ শ্রীকৃষ্ণের লীলাস্থলে ।
একবার শ্রীপ্রভুর নয়নে পড়িলে ॥ ৩১০ ॥
সকল বৃত্তান্ত তাঁর হয় উদ্দীপন ।
তখনি চলিয়া যায় বাহ্যিক চেতন ॥ ৩১১ ॥
মহাভক্ত শ্রীমথুর বিচারিয়া মনে ।
ভাগিনা হৃদয়ে বলিলেন সঙ্গোপনে ॥ ৩১২ ॥
নরযানে ল'য়ে যাবে যথা হয় মন ।
কি জানি কোথায় যায় বাহ্যিক চেতন ॥ ৩১৩ ॥
নয়যানে যেতে ইচ্ছা না হয় প্রভুর ।
হৃদয়ে বলেন কথা ভকত মধুর ॥ ৩১৪ ॥
যদি নাহি যান যানে সঙ্গে তুমি রবে ।
বাহকেরা ল’য়ে যান পাছু পাছু যাবে ॥ ৩১৫ ॥
সঙ্গেতে হৃদয় সহ কত লোকজন ।
চলিলেন দরশনে গিরি-গোবর্ধন ॥ ৩১৬ ॥
গোবর্ধন নাম শুনে হৃদয় যাঁহার ।
উথলিয়া হ'য়ে হয় অকূল পাথার ॥ ৩১৭ ॥
সেই লীলাস্থল গিরি চাক্ষুষ দর্শনে ।
কি ব্যাপার হবে হৃদু ভাবে মনে মনে ॥ ৩১৮ ॥
দেখামাত্র লীলাস্থল মনোহর গিরি ।
খেলা করে নানা ধারে ময়ূর ময়ূরী ॥ ৩১৯ ॥
ভাবের আবেগ অঙ্গে তুলিল তুফান ।
শ্রীঅঙ্গ হইল মহাবলের আধান ॥ ৩২০ ॥
কাহার না হয় শক্তি রাখিতে ধরিয়া ।
লম্ফদানে গোবর্ধনে উঠিলেন গিয়া ॥ ৩২১ ॥
পাণ্ডাগণ শ্রীপ্রভুর পাছু পাছু ধায় ।
অনেক যতনে তবে নীচেতে নামায় ॥ ৩২২ ॥
গোটা দিন একই রকমে যায় কেটে ।
বিবিধ উপায় হৈল নেশা নাহি ছুটে ॥ ৩২৩ ॥
শ্রীবঙ্কুবিহারী-মূর্তি-দরশন পরে ।
কৃষ্ণের অধিক শক্তি ইহার ভিতরে ॥ ৩২৪ ॥
দেখামাত্র হইলেন শ্রীপ্রভু অস্থির ।
মহাভাবাবস্থাগত সমাধি গভীর ॥ ৩২৫ ॥
সহজে নাহিক ছুটে ভাব শ্রীপ্রভুর ।
নরযানে কুঞ্জে ফিরে আনিল মথুর ॥ ৩২৬ ॥
কৃষ্ণের মুরতি যত আছে ব্রজধামে ।
মথুরে বলেন সবে ভোগ দেহ কিনে ॥ ৩২৭ ॥
যেখানে দেখেন যাহা সমাধিস্থ তথা ।
মূর্খ আমি কিবা কব ব্রজের বারতা ॥ ৩২৮ ॥
ভক্তভাবে কুলে কুঞ্জে বেড়িয়া বেড়ান ।
লইয়া গৌড়িয়া ভেক প্রভু ভগবান ॥ ৩২৯ ॥
কি সুন্দর মনোহর অক্ষে ভেক ধরে ।
মাধুকরী করিলেন দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৩৩০ ॥
একদিন নিধুবনে প্রভু গুণমণি ।
সাক্ষাতে পাইলা এক অপূর্ব রমণী ॥ ৩৩১ ॥
সৌন্দর্যে অপূর্ব নয় গুণ নিরুপম ।
অনুরাগ কান্তি মাখা হৃদি সুশোভন ॥ ৩৩২ ॥
বয়সে প্রাচীনা নাহি কটিতে বসন ।
একমাত্র আল্ফি গায় লজ্জা-আবরণ ॥ ৩৩৩ ॥
হৃদিখানি একেবারে গোপীভাবে ভরা ।
বয়স্কা যদিও ভাবে বালিকার পারা ॥ ৩৩৪ ॥
গলায় পুঁটুলি বাঁধা শালগ্রাম তায় ।
যেমন শ্রী প্রভুদেবে দেখিল তথায় ॥ ৩৩৫ ॥
আনন্দে বিভোর ডাকে দুই হাত তুলি ।
আইস আইস ঘরে দুলালী দুলালী ॥ ৩৩৬ ॥
কত ভাগ্য তোমার পাইনু দরশন ।
দুলালী দেখিয়া হৈল সার্থক জীবন ॥ ৩৩৭ ॥
কভু নহে পরিচিত শ্রীপ্রভুর সনে ।
বুঝ মন দুলালী বলিয়া ডাকে কেনে ॥ ৩৩৮ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
যেরূপ যে চায় তার সেরূপ দেখান ॥ ৩৩৯ ॥
আজীবন ব্রজে বাস দুলালী বাসনা ।
মহাভাবমরী রাই কনক-বরণা ॥ ৩৪০ ॥
সেই শ্রীরাধার মূর্তি প্রভু-অঙ্গে দেখে ।
হাত তুলি দুলালী বলিয়া তাই ডাকে ॥ ৩৪১ ॥
সকল বিস্তার পরিচয় দেওয়া চলে ।
পরীক্ষার্থী দেয় যেন পরীক্ষার স্থলে ॥ ৩৪২ ॥
গুরুদত্ত বিদ্যা নাহি আসে পরীক্ষায় ।
কি বলিবে কি লিখিবে কি আছে ভাষায় ॥ ৩৪৩ ॥
কি দেখান কি শিখান প্রভু নারায়ণ ।
কিরূপ আকার তার বরণ গঠন ॥ ৩৪৪ ॥
কিবা আস্বাদন কেহ বলিতে না পারে ।
আপনে করিয়া ভোগ আপনে পাসরে ॥ ৩৪৫ ॥
এ হেন নারীর কথা না হয় বর্ণন ।
রাধারূপে প্রভু যায়ে দিলা দরশন ॥ ৩৪৬ ॥
গঙ্গামাতা নাম তাঁর ছিল বৃন্দাবনে ।
তাঁরে খুশী ব্রজবাসী জনে জনে চিনে ॥ ৩৪৭ ॥
প্রভুরে দেখিয়া চক্ষু ঝরে অনিবার ।
দুলালী দুলালী বই বাক্য নাহি আর ॥ ৩৪৮ ॥
অবশ আগোটা অঙ্গ শক্তি নাহি চলে ।
প্রসারিয়া বাহু যায় করিবারে কোলে ॥ ৩৪৯ ॥
রবি শশী দেখি যেন উথলে জলধি ।
প্রভুরে পাইয়া তেন গঙ্গামার হৃদি ॥ ৩৫০ ॥
প্রভুও তেমতি প্রীত পেয়ে গঙ্গামাতা ।
ধন্য ধন্য শ্রীপ্রভুর ভক্তবৎসলতা ॥ ৩৫১ ॥
যাহার যেমন সাধ সে ভাবে মিটান ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ॥ ৩৫২ ॥
কোথা ভক্তচূড়ামণি মথুর বিশ্বাস ।
সসঙ্গ ব্রাহ্মণী কোথা নাহিক তল্লাস ॥ ৩৫৩ ॥
আছে কেহ অন্য আর কিছু নাহি মনে ।
গোটা দিন কেটে যায় মাইর আশ্রমে ॥ ৩৫৪ ॥
হৃদয় লইয়া অন্ন তথায় যোগায় ।
রাত্রি এলে প্রভুদেবে আনিত বাসায় ॥ ৩৫৫ ॥
মাইর উপরে তাঁর বড় হৈল টান ।
প্রত্যুষে উঠিয়া হয় আশ্রমে পয়ান ॥ ৩৫৬ ॥
মাই বিনা অন্য সব হইল অপর ।
আশ্রম হইল যেন আপনার ঘর ॥ ৩৫৭ ॥
অতি পুলকিত মাই বসাইয়া কোলে ।
নানাবিধ ভোজ্য দেন শ্রীবদনে তুলে ॥ ৩৫৮ ॥
উদর পূরায়ে তাঁরে করায়ে ভোজন ।
পশ্চাৎ করেন মহাপ্রসাদ গ্রহণ ॥ ৩৫৯ ॥
ভোজন করিয়া প্রভু মাইর আশ্রমে ।
ভ্রমিতেন হেথা সেথা হৃদয়ের সনে ॥ ৩৬০ ॥
নানা স্থানে ইচ্ছামত করিয়া ভ্রমণ ।
সেই আশ্রমেতে হয় পুনরাগমন ॥ ৩৬১ ॥
যমুনার তীরে একদিন ভগবান ।
পাছে পাছে আছে হৃদু সহ নরযান ॥ ৩৬২ ॥
যতেক লহরী জলে তত ভাব হৃবে ।
উন্মত্ত বিভোর প্রার পরম আহ্লাদে ॥ ৩৬৩ ॥
কালীয়াবরণ যেই কালিন্দীর জল ।
দেখিতে দেখিতে প্রাণ হইল বিহ্বল ॥ ৩৬৪ ॥
হেনকালে সেখানে রাখাল কয় জনা ।
গোপাল সহিতে পার হতেছে যমুনা ॥ ৩৬৫ ॥
ভাবে ভরা মাতোয়ারা প্রভু নারায়ণ ।
সঘনে ডাকেন কৃষ্ণে করিয়া রোদন ॥ ৩৬৬ ॥
নীরদবরণশ্যাম বাঁশী ধরা করে ।
হেলে দুলে শিখিপাখা শিরের উপরে ॥ ৩৬৭ ॥
অধরে মধুর হাসি নেচে নেচে যায় ।
মধুর নূপুর বাদ্য বাজে দুই পায় ॥ ৩৬৮ ॥
বেষ্টিত রাখালবলে লইয়া গোধনে ।
যায় পার যমুনার গোষ্ঠে-গোচারণে ॥ ৩৬৯ ॥
এই যায় ওই কৃষ্ণ মুরলী-বয়ান ।
এত বলি লক্ষ দিয়া ধরিবারে যান ॥ ৩৭০ ॥
ভাব দেখি হৃদয় ধরিল গিয়া তাঁয় ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব বাহ্য নাহি গায় ॥ ৩৭১ ॥
সহজে না ছুটে ভাব-আবেশ বিষম ।
নরযানে ল'য়ে হৃদু ফিরিল আশ্রম ॥ ৩৭২ ॥
জলধির গর্ভ যেন রতন-আকর ।
গঙ্গামাই দেখে প্রভু ভাবের সাগর ॥ ৩৭৩ ॥
নিত্যই নূতন ভাব সমুন্বিত গায় ।
ভাবান্তে বসায়ে কোলে বলেন তাঁহায় ॥ ৩৭৪ ॥
ভাবময়ী ব্রজেশ্বরী ভাবের পাথারে ।
দিনে রেতে মেতে মেতে উঠু ডুবু করে ॥ ৩৭৫ ॥
আর নাহি দিব ছেড়ে দুলালী তোমায় ।
রাখিব যতন করি থাকিবে হেথায় ॥ ৩৭৬ ॥
সহাস্য বদনে প্রভু গঙ্গামায়ে কন ।
আতপ তণ্ডুল তুমি করহ ভোজন ॥ ৩৭৭ ॥
সিদ্ধান্ন ভোজন মম মাছ তাহে গাই ।
মাছ ছাড়া সব দিব কহে গঙ্গামাই ॥ ৩৭৮ ॥
পেটের ব্যায়াম বড় মাঝে মাঝে হয় ।
কে বল করিবে মুক্ত কহিল হৃদয় ॥ ৩৭৯ ॥
গঙ্গামাতা বলে আমি নিকাইব হাতে ।
দুলালীর জন্যে প্রাণ পারি ছেড়ে দিতে ॥ ৩৮০ ॥
এইরূপে কিছু দিন যায় বৃন্দাবনে ।
মথুর প্রয়াস করে ফিরিতে ভবনে ॥ ৩৮১ ॥
প্রভু-পরিধানে ব্যক্ত কৈল অভিপ্রায় ।
কথায় নাহিক কোনমতে দেন সায় ॥ ৩৮২ ॥
বারে বারে করে জেদ ভকত মথুর ।
কোন গ্রাহ্য তাহাতে না আইসে প্রভুর ॥ ৩৮৩ ॥
বিপদে পড়িল বড় মথুর বিশ্বাস ।
প্রভুর দেখিয়া ভাব পাইল তরাস ॥ ৩৮৪ ॥
অনুমানি শ্রীপ্রভুর ভাবের বারতা ।
নাহি মন পুনরাগমনে কলিকাতা ॥ ৩৮৫ ॥
নাড়ী ছাড়া কায়া যেন করে হায় হায় ।
কেন এনু তীর্থবাসে নারীর কথায় ॥ ৩৮৬ ॥
স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী শাস্ত্রে কথা রটে ।
বুঝিতে নারিনু এত বুদ্ধি বল ঘটে ॥ ৩৮৭ ॥
তীর্থবাসে যার আশে আসে লোকজন ।
ভবনে আছিল রেতে দিনে সেই ধন ॥ ৩৮৮ ॥
কুমতি হইল তাঁয় তীর্থবাসে এনে ।
বৃন্দাবন-ধন বুঝি যায় বৃন্দাবনে ॥ ৩৮৯ ॥
সংগোপনে হৃদয়ে কহেন সকাতরে ।
করাও বাবার মত ফিরিবারে ঘরে ॥ ৩৯০ ॥
অন্যদিকে গঙ্গামাতা টানে অনিবার ।
প্রাণের দুলালী ছেড়ে নাহি দিব আর ॥ ৩৯১ ॥
বড় ফেরে পড়িলেন প্রভু গুণমণি ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত-কাহিনী ॥ ৩৯২ ॥
স্মরণে যাহার নাম বিপদে উদ্ধার ।
ভক্তের কারণে দেখ বিপদ কি তাঁর ॥ ৩৯৩ ॥
যে বা নিরাকারবাদী কি কব তাঁহাকে ।
না মানেন অবতার বুদ্ধির বিপাকে ॥ ৩৯৪ ॥
শুদ্ধমাত্র বুঝেছেন হরি নিরাকার ।
সর্বশক্তিমান পুনঃ করেন স্বীকার ॥ ৩৯৫ ॥
শক্তির আধার যেই এক নারায়ণ ।
আকার ধরিতে তিনি কি হেতু অক্ষম ॥ ৩৯৬ ॥
সর্বশক্তিমানত্ব আকারে লোপ নয় ।
স্বল্পাধারে ধরে তাঁর সব পরিচয় ॥ ৩৯৭ ॥
কাগজের মধ্যে দেখ অল্প আয়তন ।
পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কিত কেমন ॥ ৩৯৮ ॥
দীর্ঘ প্রস্থে আধ হাত আধারের মাঝে ।
তাহার খবর পায় যেই যাহা খুঁজে ॥ ৩৯৯ ॥
সেইমত পরিমিত আকার ভিতর ।
সোনার অক্ষরে লেখা সকল খবর ॥ ৩৯৪ ॥
আরে অবিশ্বাসী মন কি কব তোমারে ।
চরাচর সৃষ্টি স্থিতি বদন-বিবরে ॥ ৩৯৫ ॥
সৃজন পালন নাশ যে শক্তির কাজ ।
মুর্তিমান সদা করে শ্রীঅঙ্গে বিরাজ ॥ ৩৯৬ ॥
টলটল বসুন্ধরা পরণর কাঁপে ।
একবার শ্রী প্রভুর চরণের চাপে ॥ ৩৯৭ ॥
লীলাহেতু নররূপ আকার-ধারণ ।
আছে রোগ শোক তাপ নরের মতন ॥ ৩৯৮ ॥
যেমন মানুষ তাই কিন্তু নহে নর ।
লীলা মানে কিবা বুঝ খেলা নামান্তর ॥ ৩৯৯ ॥
সাজ কাজ অবিকল নরের মতন ।
ভিতরে সুগুপ্ত বিশ্বপতির লক্ষণ ॥ ৪০০ ॥
নগর-ভ্রমণে যথা নবাবের রীতি ।
রূপান্তর ছদ্মবেশ বণিক-প্রকৃতি ॥ ৪০১ ॥
উদ্দেশ্য সাধন নহে চিনিলে প্রজায় ।
ঈশ্বরের নরলীলা সেইরূপ প্রায় ॥ ৪০২ ॥
আনবুদ্ধি প্রতিবাদ সাকারে যে করে ।
শ্রীপ্রভুর বিড়ম্বনা কি কহিব তারে ॥ ৪০৩ ॥
মানুষের বুদ্ধি-বলাতীত ভগবান ।
লীলায় দুর্বল-বেশ কিন্তু শক্তিমান ॥ ৪০৪ ॥
বুঝেছ কি কথা মন বলী বলে কারে ।
বল সত্ত্বে বল যেবা সংবরিতে পারে ॥ ৪০৫ ॥
সর্বসহা ধরা ধর উপমা যেমন ।
ঈষৎ নাড়িলে অঙ্গ কি হয় ঘটন ॥ ৪০৬ ॥
অটল অচল-শৃঙ্গ গগন পরশি ।
খসিয়া পড়িয়া হয় ধুলারেণুরাশি ॥ ৪০৭ ॥
বলি এ ধরায় বলী বলের আধান ।
মাটি হ'য়ে প'ড়ে আছে মাটির সমান ॥ ৪০৮ ॥
ততোধিক কত বলী শ্রীপ্রভু আমার ।
কত লোকে কত বলে করে অত্যাচার ॥ ৪০৯ ॥
না কহেন কোন কথা সব সংবরণ ।
কখন না শুনি এক বর্ণ উচ্চারণ ॥ ৪১০ ॥
অত্যাচারী এই যায় করি অত্যাচার ।
পুনঃ দরশনে তারে আগে নমস্কার ॥ ৪১১ ॥
জয় জয় সর্বসহ জয় মানবমূরতি ।
সর্বশক্তিমান জয় অখিলের পতি ॥ ৪১২ ॥
জয় প্রভু দীনবেশ হীন-অহঙ্কার ।
সৃজন-পালন-লয়-শক্তির আধার ॥ ৪১৩ ॥
জয় বিদ্যাহীন প্রভু নিরক্ষর বেশ ।
মহাবিদ্যাপতি জয় হরি পরমেশ ॥ ৪১৪ ॥
জয় জয় প্রভুদেব ত্যাগিশিরোমণি ।
সকলের মূলাধার অখিলের স্বামী ॥ ৪১৫ ॥
বলের না থাকে কমি সাকার হইলে ।
সর্বদা স্মরণ রাখ নাহি যাবে ভুলে ॥ ৪১৬ ॥
নিরাকার সাকার সকল একেশ্বর ।
এ ভিন্ন যা অন্য নাই যাহার খবর ॥ ৪১৭ ॥
তাও সেই ঈশ্বর দোসর যার নাই ।
এই কথা বারে বারে বলিলা গোসাঁই ॥ ৪১৮ ॥
নিরাকারে রসগন্ধ কিছু নাহি জানি ।
সাকারেতে শ্রীপ্রভুর মধুর কাহিনী ॥ ৪১৯ ॥
সাকারে বিবিধ রস মিষ্ট আস্বাধন ।
ভক্তিসহ দাও প্রভু দেখিতে চরণ ॥ ৪২০ ॥
ভক্ত-ভগবানে খেলা বড়ই সুন্দর ।
বৃন্দাবনে কিবা হয় শুন অতঃপর ॥ ৪২১ ॥
প্রভুর না হয় মন গঙ্গামায় ছেড়ে ।
আসে মথুরের সঙ্গে দক্ষিণশহরে ॥ ৪২২ ॥
হেথায় মথুর করে নানান কৌশল ।
কিন্তু তাহে বিন্দুমাত্র নাহি ফলে ফল ॥ ৪২৩ ॥
প্রভুর স্বভাব শ্রমথুর ভাল জানে ।
সর্বদা যুকতি করে হৃদয়ের সনে ॥ ৪২৪ ॥
মাতৃভক্তি শ্রীপ্রভুর বুঝিয়া প্রবল ।
সংগোপনে কৈল এই যুকতি কৌশল ॥ ৪২৫ ॥
হৃদয়েরে বলিলেন কহিবারে তাঁয় ।
কেন অনর্থক দুঃখ দিবে বৃদ্ধা মায় ॥ ৪২৬ ॥
কত কাঁদিবেন তিনি শুনিলে বারতা ।
কি কারণ ফিরিয়া না যাবে কলিকাতা ॥ ৪২৭ ॥
যখাবৎ হৃদয় করিল নিবেদন ।
শিহরিলা প্রভু শুনি মায়ের রোদন ॥ ৪২৮ ॥
শশব্যস্তে বলিলেন চল তবে যাব ।
মার কাছে কলিকাতা হেথা নাহি রব ॥ ৪২৯ ॥
তেমনি উঠিল যেন কথা শ্রীগোসাঁই ।
করিব বলিলে তাঁর আর রক্ষা নাই ॥ ৪৩০ ॥
গঙ্গামাতা দেখিলেন প্রভু যান চলি ।
কাঁদিতে লাগিলা বলি দুলালী দুলালী ॥ ৪৩১ ॥
কোথায় যাইবে তুমি দুলালী আমার ।
এ হেন আশ্রম মম করিয়া আঁধার ॥ ৪৩২ ॥
রতনসর্বস্ব তুমি নয়নের তারা ।
পেয়ে কেন পুনঃ বল হব তোমা হারা ॥ ৪৩৩ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে মাই ধরিলেন হাতে ।
প্রভু না পারেন আর এক পদ যেতে ॥ ৪৩৪ ॥
যাত্রাকাল গত হবে এই অনুমানে ।
অন্য হাত ধরিয়া ভাগিনা হৃদু টানে ॥ ৪৩৫ ॥
বিষন বিভ্রাটে প্রভু হারা বৃদ্ধি বল ।
বালক-স্বভাব যেন রোদন সম্বল ॥ ৪৩৬ ॥
পরাণ দুলালী কাঁদে দেখি গঙ্গামাতা ।
অন্তরে লাগিল তাঁর নিদারুণ ব্যথা ॥ ৪৩৭ ॥
অমনি ছাড়িয়া দিল ধরা হাত তাঁর ।
হৃদয় লইয়া তাঁরে হৈল আগুসার ॥ ৪৩৮ ॥
তাড়াতাড়ি শ্রীমথুর ল'য়ে ভগবান ।
পুনরার কাশীধামে করিল পয়ান ॥ ৪৩৯ ॥
কথার কথায় প্রভু শুনিলেন কানে ।
একজন শ্রীমহেশ সরকার নামে ॥ ৪৪০ ॥
বীণা-বাদ্য বিশারদ আছেন তথায় ।
শ্রবণ-বিমুগ্ধ এত সুমিষ্ট বাজার ॥ ৪৪১ ॥
বালক স্বভাব প্রভু শুনিবারে মন ।
চলিলেন হৃদু সঙ্গে তার নিকেতন ॥ ৪৪২ ॥
সমাদরে বাদ্যকর বলাইয়া তাঁয় ।
বেঁধে তান তুলে প্রাণ রাগিণী বাজায় ॥ ৪৪৩ ॥
যেমন পশিল কানে বীণা বাজ-ধ্বনি ।
সেইক্ষণে সমাধিস্থ হৈলা গুণমণি ॥ ৪৪৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে বাহ্য সমুদিলে গায় ।
চমৎকার বীণকার পুনশ্চ বাজায় ॥ ৪৪৫ ॥
তবে প্রভু অম্বিকায় সম্বোধিয়া কন ।
হুঁশে রাখ বীণাবাদ্য করিব শ্রবণ ॥ ৪৪৬ ॥
কেবা প্রভু কে অম্বিকা বুঝা মহা ভার ।
একাত্ম লীলায় মাত্র বিভিন্ন আকার ॥ ৪৪৭ ॥
বাহ্যভূমে অবস্থান করিয়া ঠাকুর ।
শুনিলেন বীণাবাদ্য শ্রবণ-মধুর ॥ ৪৪৮ ॥
বিভীষিকাময়ী ধরা ঘোর অন্ধকার ।
অবিদ্যায় দিশেহারা গতি দুনিয়ার ॥ ৪৪৯ ॥
সতত ঘূর্ণায়মান দারুণ দুর্দশা ।
নিবারিতে শ্রীপ্রভুর ছদ্মবেশে আসা ॥ ৪৫০ ॥
জগৎকারণ প্রভু কপালমোচন ।
দীনবন্ধু দীনত্রাতা দুর্গতি-খণ্ডন ॥ ৪৫১ ॥
অহেতুক কৃপাসিন্ধু কল্যাণনিধান ।
অনুক্ষণ এক চিন্তা জীবের কল্যাণ ॥ ৪৫২ ॥
এই শিবপুরী মধ্যে অনেকেই
শৈবী ।
তান্ত্রিক সাধক বহু ভৈরব ভৈরবী ॥ ৪৫৩ ॥
বামাচারী বীরভাবে কঠিন সাধনা ।
পরে পদে পদের স্খলন সম্ভাবনা ॥ ৪৫৪ ॥
তম ধরি সত্ত্বে গতি বড়ই দুষ্কর ।
সিদ্ধিলাভ দু-একের পতনই বিস্তর ॥ ৪৫৫ ॥
বিশ্বগন্ধ শ্রীপ্রভুর গন্ধ মনোহর ।
যেখানে যে কেহ আছে ভক্ত মধুকর ॥ ৪৫৬ ॥
কালের কৌশল-চক্রে আঘ্রাণ পাইয়ে ।
গুনগুন রবে আসে ছুটিয়ে ছুটিয়ে ॥ ৪৫৭ ॥
প্রভু-দরশনে আসে তান্ত্রিকের গণ ।
সাধনা-সম্বন্ধে বহু কথোপকথন ॥ ৪৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর সাধনে সিদ্ধ অন্তরে ধারণা ।
করজোড়ে একদিন করিল প্রার্থনা ॥ ৪৫৯ ॥
করুণা করিয়া যদি করেন গমন ।
যেথা তারা করে চক্রে সাধন ভজন ॥ ৪৬০ ॥
কৃপাপরবশ প্রভু আনন্দিত মনে ।
চলিলা ভৈরবী-চক্রে তাহাদের সনে ॥ ৪৬১ ॥
শ্রীপ্রভু দেখেন গিয়া অপরূপ ছবি ।
প্রতি ভৈরবের সঙ্গে জনেক ভৈরবী ॥ ৪৬২ ॥
পরে যত ভৈরবীরা প্রভু গুণধরে ।
কারণ-পানের জন্য অভ্যর্থনা করে ॥ ৪৬৩ ॥
অস্বীকার কৈলে প্রভু তবু করে জেদ ।
শ্রীপ্রভু বলেন মাগো ইহাতে নিষেধ ॥ ৪৬৪ ॥
তখন করিয়া চক্র সবে একত্তরে ।
বসিল কারণপানে প্রথা অনুসারে ॥ ৪৬৫ ॥
জপ ধ্যান গেল উড়ে আনন্দে উন্মত্ত ।
পাইয়া আনন্দময়ে সবে করে নৃত্য ॥ ৪৬৬ ॥
মনোরথ পূর্ণ আমি সাধন সফল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা শ্রবণমঙ্গল ॥ ৪৬৭ ॥
মথুর মানস কৈল সাধু সন্ত জনে ।
বসন-বাসন-ধন-অর্থ-বিতরণে ॥ ৪৬৮ ॥
শুনি হরষিত অতি প্রভু গুণমণি ।
দানের ব্যবস্থা নিজে করিলা আপুনি ॥ ৪৬৯ ॥
মথুরের দানধর্ম শ্রীপ্রভুর পায় ।
তবে যে বানের ইচ্ছা প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ৪৭০ ॥
প্রার্থিগণে যে যা চায় তাই করে দান ।
বিতরণ অতিশয় প্রভুর বিধান ॥ ৪৭১ ॥
অতঃপর ঘরে ফিরিবার হয় কথা ।
তীর্থবাস শ্রীপ্রভুর অপূর্ব বারতা ॥ ৪৭২ ॥
মথুর করিল ইচ্ছা গয়ায় বাইতে ।
ভবনাভিমুখে তার ফিরিবার পথে ॥ ৪৭৩ ॥
প্রভুর নিকটে কথা করে উত্থাপন ।
অমনি মথুরে প্রভু কহিলা তখন ॥ ৪৭৪ ॥
গয়া থেকে আসিয়াছি যাই যদি গয়া ।
নিশ্চয় যাইবে নাহি রবে এই কায়া ॥ ৪৭৫ ॥
'গয়া থেকে আসিয়াছি' বুঝেছ কি মন? ।
প্রভুর জনমকথা করহ স্মরণ ॥ ৪৭৬ ॥
শিহরাঙ্গ শ্রীমপুর শুনিয়া বারতা ।
ল'য়ে তাঁয় সত্ববরে ফিরিল কলিকাতা ॥ ৪৭৭ ॥
আসামাত্র শ্রীমথুরে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
প্রচুর ভাণ্ডারা ত্বরা করহ যোগাড় ॥ ৪৭৮ ॥
মথুরের নাই ত্রুটি যে আজ্ঞা যখন ।
বড় খুশী ভাণ্ডারাকরিয়া নিরীক্ষণ ॥ ৪৭৯ ॥
পুনশ্চ কহিলা প্রভু ভকতরতনে ।
বিতর ভাণ্ডারা যত দীন-দুঃখিগণে ॥ ৪৮০ ॥
অতিথি সন্ন্যাসী নাগা ক্ষুধাতৃষাতুর ।
যুক্তহস্তে দাও সবে প্রচুর প্রচুর ॥ ৪৮১ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব ভাণ্ডারী তেমন ।
দিনে রেতে মুক্তহস্তে করে বিতরণ ॥ ৪৮২ ॥
প্রভু-আজ্ঞা-সম্পাদনে নাহি করে ভয় ।
তীর্থে শুনি পঁচাশি হাজার টাকা ব্যয় ॥ ৪৮৩ ॥
পুনরায় ঘরে এসে ভাণ্ডারা যোগাড় ।
খাতির নাহিক ব্যয় হাজার হাজার ॥ ৪৮৪ ॥
বৃন্দাবনে শ্যামকুণ্ড রাধাকুণ্ড দুটি ।
উভয় কুণ্ডের কিছু রজ আর মাটি ॥ ৪৮৫ ॥
আনিয়াছিলেন প্রভু সঙ্গে আপনার ।
এবে তাহে কি করিলা শুন সমাচার ॥ ৪৮৬ ॥
হৃদয়ে হইল আজ্ঞা ছড়াইয়া দিতে ।
পঞ্চবটতলে আর তার চারিভিতে ॥ ৪৮৭ ॥
বাকি অংশ প্রভু নিজে লইয়া শ্রীকরে ।
পুঁতিয়া দিলেন নিজ সাধনাকুটীরে ॥ ৪৮৮ ॥
আর কিবা বলিলেন শুন শুন মন ।
আজি থেকে এইস্থান হৈল বৃন্দাবন ॥ ৪৮৯ ॥
অতঃপর অনুমতি ভক্ত শ্রীমথুরে ।
মহোৎসব আয়োজন করিবার তরে ॥ ৪৯০ ॥
আনন্দ-উৎফুল্লান্তর মথুর এখন ।
বৈষ্ণব গোস্বামিবর্গে পাঠায় লিখন ॥ ৪৯১ ॥
কেহ না রহিল বাকি রহে যে যেখানে ।
দলে দলে উপনীত নির্ধারিত দিনে ॥ ৪৯২ ॥
বৈষ্ণব-ভোজনে হেথা কুবেরী ভাণ্ডারা ।
প্রচুর প্রচুর দ্রব্য ভাণ্ডারেতে ভরা ॥ ৪৯৩ ॥
পঞ্চবটমূলে হয় মহা মহোৎসব ।
মহানন্দে সংকীর্তনে প্রমত্ত বৈষ্ণব ॥ ৪৯৪ ॥
এই মহোৎসবে নাই আনন্দের ইতি ।
আনন্দে আরম্ভ যেন আনন্দে সমাপ্তি ॥ ৪৯৫ ॥
ঘটার উৎসব যেন তেমতি বিদায় ।
ষোল ষোল টাকা প্রতি গোস্বামী জনায় ॥ ৪৯৬ ॥
অন্যান্য বৈষ্ণব প্রতি এক এক টাকা ।
পরমার্থ কি পাইল বাহ্যে রৈল ঢাকা ॥ ৪৯৭ ॥
জীবের উপরে এত প্রভুর করুণা ।
বিস্তারে
গভীরে তার মিলে না তুলনা ॥ ৪৯৮ ॥
তুলা দিতে ভাণ্ডারেতে একমাত্র সিন্ধু ।
সে সিন্ধু তলিয়া গিয়া বোধ হয় বিন্দু ॥ ৪৯৯ ॥
দীনবন্ধু জগবন্ধু তাপিত নিস্তার ।
করুণার ঘন মূর্তি প্রভু অবতার ॥ ৫০০ ॥
এক চিন্তা জীবহিত জনম অবধি ।
প্রত্যক্ষে দেখিবে তিনি চক্ষু দেন যদি ॥ ৫০১ ॥
শ্যামাগত শ্রীপ্রভুর দেহ মন প্রাণ ।
যা কিছু তাঁহার তাঁয় সব সমর্পণ ॥ ৫০২ ॥
নিজের বলিতে কিছুমাত্র নাই তাঁর ।
শ্যামাপদ-সুধাহ্রদে মগ্ন অহংকার ॥ ৫০৩ ॥
দেহমধ্যে শ্রীপ্রভুর করিলে তল্লাস ।
দেখিবে শ্রীপ্রভুর স্থানে অম্বিকার বাস ॥ ৫০৪ ॥
তনুখানি ঠাকুরের যন্ত্রের মতন ।
যন্ত্রিরূপা কালিকার আবাস-ভবন ॥ ৫০৫ ॥
চলান বলান যেন তেন চলা বলা ।
শ্রীদেহ-আধারে মাত্র অম্বিকার খেলা ॥ ৫০৬ ॥
মায়ের অসংখ্য নাম কটা কব আমি ।
উমা শ্যামা কালী তারা শিবানী ভবানী ॥ ৫০৭ ॥
ইত্যাদি ইত্যাদি যত গোটা অভিধান ।
এইবারে এক বৃদ্ধি রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৫০৮ ॥
ভক্তিপথে সেবা পদে আত্মনিবেদন ।
জ্ঞানমার্গে ভাবাতীত ভূমে নিমগন ॥ ৫০৯ ॥
উভয়েই সমরসে অবস্থা সমান ।
রসজ্ঞ ব্যতীত অন্যে না জানে সন্ধান ॥ ৫১০ ॥
যাবতীয় দেবদেবী অবতারগণ ।
স্থূল সূক্ষ্ম ভূতাদি ইন্দ্রিয় সহ মন ॥ ৫১১ ॥
জগৎ-কারণরূপে শাস্ত্রে ব্যাখ্যা যাঁর ।
তিনি প্রভু রামকৃষ্ণ জননী সবার ॥ ৫১২ ॥
দর্শন স্পর্শন যেবা করিয়াছে রায় ।
ধন্য সে মানুষ তার কর্মকাণ্ড সায় ॥ ৫১৩ ॥
রাণাঘাট-ভুক্ত মহকুমা সাতক্ষীরে ।
তাহার নিকটে পল্লী নাম সোনাবেড়ে ॥ ৫১৪ ॥
নামে যেন সোনাবেড়ে কাজে তাই বটে ।
এইখানে মথুরের জন্মভূমি ভিটে ॥ ৫১৫ ॥
রামকৃষ্ণ-উপাসকে তীর্থের সমান ।
মহাভক্ত মথুরের জনমের স্থান ॥ ৫১৬ ॥
অন্যান্য অনেক গ্রাম তার সন্নিহিত ।
সেই সব মথুরের জমিদারিভুক্ত ॥ ৫১৭ ॥
প্রয়োজনহেতু ভক্তবর এই বার ।
পরিদরশনে করে যাত্রার যোগাড় ॥ ৫১৮ ॥
প্রভুকে ছাড়িয়া যেতে নাহি হয় মন ।
সঙ্গে যাইবার তরে করে নিবেদন ॥ ৫১৯ ॥
পরস্পর দোঁহে দোঁহা ভাব ভালবাসা ।
বড়ই মধুর নাই বর্ণিবার ভাষা ॥ ৫২০ ॥
কখন প্রভুতে ভাব ইষ্টের মতন ।
কখন স্নেহের ভাব সন্তানে যেমন ॥ ৫২১ ॥
কখন মিত্রের ভাবে জিজ্ঞাসেন হিত ।
কখন রক্ষকভাবে সতর্ক বিহিত ॥ ৫২২ ॥
কখন জনকভাবে পিতার মতন ।
সস্ত্রীক শয্যার মধ্যে একত্র শয়ন ॥ ৫২৩ ॥
কখন জ্যেষ্ঠের ভাবে সান্ত্বনার কথা ।
কখন আত্মীয়ভাবে সমতা মমতা ॥ ৫২৪ ॥
সপ্রেম সম্বন্ধ কিবা পঞ্চভাবে মাখা ।
যে জানে সে জানে চিত্র নাহি যায় আঁকা ॥ ৫২৫ ॥
যখনই যাইতে সঙ্গে ভক্তবর কয় ।
অমনি সানন্দে সায় তিল দেরি নয় ॥ ৫২৬ ॥
বাজিল আনন্দ-ডঙ্কা মথুরের ঘরে ।
লোকজন হলে বলে দেশে যাত্রা করে ॥ ৫২৭ ॥
সসজ্জা মথুর রাজরাজের মতন ।
সসঙ্গ ঠাকুর দেশে উপনীত হন ॥ ৫২৮ ॥
অন্যত্রে প্রভুর সঙ্গে একত্রে বিহার ।
কি আনন্দ মথুরের নহে বর্ণিবার ॥ ৫২৯ ॥
হৃদয় ভরিয়া তাহা ভোগের ইচ্ছায় ।
নৌকায় চূর্ণির খালে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ৫৩০ ॥
নিকটস্থ এক গ্রামে দারিদ্র্য প্রবল ।
অনাথ কাঙ্গাল দুঃখী সেখানে কেবল ॥ ৫৩১ ॥
করুণহৃদয় প্রভু দ্রবিয়া অন্তরে ।
অন্ন-বস্ত্রবানহেতু কহেন মথুরে ॥ ৫৩৪ ॥
মাথা ভরা তেল আর নূতন বসন ।
প্রতি জনে এক এক দিনের ভোজন ॥ ৫৩৫ ॥
মথুর করিল দান অনুমতিক্রমে ।
জন্মদাতা জন্ম মাত্র ধন বিতরণে ॥ ৫৩৬ ॥
মথুরের গুরুবংশ সন্নিকট গ্রামে ।
গমনের প্রয়োজন বিশেষ কারণে ॥ ৫৩৬ ॥
হৃদয় সহিত প্রভু হস্তীর উপর ।
আপুনি শিবিকামধ্যে চলে ভক্তবর ॥ ৫৩৭ ॥
ত্বরায় তথায় কার্য করি সমাপন ।
ফিরিয়া আইল কলিকাতার ভবন ॥ ৫৩৮ ॥
সঙ্গসুখ শ্রীপ্রভুর মত্ততর রস ।
রসজ্ঞে স্বতই করে তার পরবশ ॥ ৫৩৯ ॥
অতিরিক্ত বিমর্ষ অভাবে তাহার ।
উচাটন মন চিত্তে রোল হাহাকার ॥ ৫৪০ ॥
বিশেষ এখন এই মথুরের দশা ।
অতিরিক্ত পাশে বৃদ্ধি অতিরিক্ত আশা ॥ ৫৪১ ॥
উদাস বিষয়কর্মে লাগে জ্বালাতন ।
প্রভুসঙ্গরসপানে ইচ্ছা অনুক্ষণ ॥ ৫৪২ ॥
মনোমত কর্মকাণ্ডে বুদ্ধি শক্তি বল ।
উদ্যোগ উদ্দাম চেষ্টা উপায় সম্বল ॥ ৫৪৩ ॥
অভাব অভাব সদা পূর্ণিত ভাণ্ডার ।
সরল উদার চিত্তে বিমুগ্ধ দুয়ার ॥ ৫৪৪ ॥
ভক্তি-ধন-বিদ্যা-বল-ভাগ্য-গুণমান ।
অবনীতে অদ্বিতীয় একা অসমান ॥ ৫৪৬ ॥
দেখিয়াছি তুলা দিয়ে অর্জুনের সাথে ।
সে মাত্র খদ্যোৎবৎ রাখি চন্দ্রিমাতে ॥ ৫৪৭ ॥
অলঙ্কার অত্যুক্তির অস্পর্শ এখানে ।
কোটিতেও কোটি ত্রুটি রামকৃষ্ণায়নে ॥ ৫৪৮ ॥
লীলার আকর লীলা সমষ্টি লীলার ।
লীলা যেন সেই মত নায়ক ইহার ॥ ৫৪৯ ॥
সত্য বটে ভাসিল না সাগরের জলে ।
সুগুরু হইতে গুরু গুরুতর শিলে ॥ ৫৫০ ॥
বানরসহায়ে রগ রাক্ষস বিনাশ ।
দুর্জয় ধনুক হাতে ত্রিভুবন-ত্রাস ॥ ৫৫১ ॥
হইল না সত্য বটে ধরা গোবর্ধন ।
পুতনা প্রভৃতি কংস অসুর-নিধন ॥ ৫৫২ ॥
কালীয়দমন-কীর্তি কালিন্দীর জলে ।
আলোড়ন ত্রিভুবন স্বর্গ ধরাতলে ॥ ৫৫৩ ॥
পার্থসারথির বেশে অষ্টাদশ দিনে ।
অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা নষ্ট রণে ॥ ৫৫৪ ॥
বিরাট দ্বারকালীলা ঐশ্বর্যের সার ।
পঞ্চদশ হয় কোটি কৃষ্ণ পরিবার ॥ ৫৫৫ ॥
ইত্যাদি ইত্যাদি কত না আসে সংখ্যায় ।
তদধিক ততোধিক প্রভুর লীলায় ॥ ৫৫৬ ॥
ভাসা চোখে ভেসে যায় না হয় দর্শন ।
চতুর্বেদাধিক কিসে রামকৃষ্ণায়ন ॥ ৫৫৭ ॥
আধ্যাত্মিক ভাবরাজ্যে একক ঈশ্বর ।
নিরক্ষর বেশ প্রভু লীলার আকর ॥ ৫৫৮ ॥
এখানে মথুর কিবা করে শুন মন ।
তেমতি মথুরনাথ মথুর যেমন ॥ ৫৫৯ ॥
ব্রহ্মবারি প্রবাহিনী গঙ্গার উপর ।
ভাসাইল তরী এক অতীব সুন্দর ॥ ৫৬০ ॥
সর্বাঙ্গীণ সজ্জীভূত উপরে ভিতরে ।
ফল মূল ভোজ্যদ্রব্য রাখা স্তরে স্তরে ॥ ৫৬১ ॥
প্রাণতুল্য প্রভুদ্বেষে তুলিয়া তাহার ।
গঙ্গাবায়ু-সেবনেতে বিহারে বেড়ায় ॥ ৫৬৩ ॥
শীতল সলিলকণা সহ গন্ধবহ ।
সুখসেব্য অতিশয় বহে অহরহ ॥ ৫৬৪ ॥
দক্ষিণ দক্ষিণেতর দুই পাশ খোলা ।
অধঃ উর্ধ্ব দশদিকে প্রকৃতির খেলা ॥ ৫৬৫ ॥
এখানে তরণীমধ্যে ঠাকুর আপুনি ।
ভবসিন্ধু ভরি যাঁর চরণ দুখানি ॥ ৫৬৬ ॥
ভোগে যোগে পরিপূর্ণ মথুরের ন্যায় ।
কুত্রাপি কখন নাহি জন্মিল ধরায় ॥ ৫৬৭ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যেন চালিত ঠাকুর ।
প্রভুর ইচ্ছায় তেন এখানে মথুর ॥ ৫৬৮ ॥
নবদ্বীপ অভিযুগে চলিল তরণী ।
গৌরাঙ্গদেবের যেখা জন্মলীলাভূমি ॥ ৫৬৯ ॥
দিনরাত্রি অনুক্ষণ শয়নে স্বপনে ।
হৃষ্টান্তর ভক্তবর বাবার যতনে ॥ ৫৭০ ॥
মধুরসম্বন্ধ-রসে ভুলিয়াছে সব ।
উঠিতে বসিতে মাত্র বাবা বাবা রব ॥ ৫৭১ ॥
পবিত্রাণু ভাগীরথী আনন্দে উথলা ।
খেলিছে নাচিছে তনু তরঙ্গের মালা ॥ ৫৭২ ॥
বক্ষেতে ধরিয়ে সেই অভয় চরণ ।
জীব উদ্ধারিতে তাঁর যেখানে জনম ॥ ৫৭৩ ॥
ধীর মন্দ সমীরণ ধীরে বহে বারি ।
ধীরে দুলাইয়া অঙ্গ ধীর চলে তরী ॥ ৫৭৪ ॥
ধীর স্থির একবারে ঘাটের সমীপ ।
তীরস্থিত যেইখানে তীর্থ নবদ্বীপ ॥ ৫৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর পূর্বেকার আদিম ধারণা ।
সন্দেহ গৌরাঙ্গদেব অবতার কিনা ॥ ৫৭৬ ॥
পুরাণ কি ভাগবতে নাহি কোন তত্ত্ব ।
সন্দেহে দোলায়মান মিথ্যা কি এ সত্য ॥ ৫৭৬ ॥
নবদ্বীপ-আগমনে মিলিবে নিশ্চয় ।
দরশন গৌরাঙ্গের যদি সত্য হয় ॥ ৫৭৭ ॥
সেই হেতু বর্তমানে হেথা আগমন ।
এখানে সেখানে ধামে তত্ত্ব অন্বেষণ ॥ ৫৭৮ ॥
গৌরাঙ্গোপাসক বহু গোস্বামী এখানে ।
মতি রতি ভক্তি ভারি গৌরাঙ্গ-চরণে ॥ ৫৭৯ ॥
কাঠের বিগ্রহ মূর্তি মন্দিরে স্থাপনা ।
ভক্তিভরে সেবা রাগ পুজা উপাসনা ॥ ৫৮০ ॥
প্রতি গোস্বামীর ঘরে প্রভুর গমন ।
যদি কোথা মিলে দেবভাবের লক্ষণ ॥ ৫৮১ ॥
ক্ষুন্নমন প্রভুদেব বিফল প্রয়াসে ।
তরী যেখা উপনীত ফিরিত মানসে ॥ ৫৮২ ॥
কি আশ্চর্য শুন কথা অবাক কাহিনী ।
প্রতি আগমনে যবে ছাড়িল তরণী ॥ ৫৮৩ ॥
অদূরে গঙ্গার গর্ভে তরণী যখন ।
সে সময়ে খোলা চোখে হয় দরশন ॥ ৫৮৪ ॥
কিশোর বালকদ্বয় অপূর্ব মূরতি ।
সোনার বরণ অঙ্গে শিরে ভাতে জ্যোতি ॥ ৫৮৫ ॥
ঊর্ধ্বে হস্ত উত্তোলন সহাস্যয বদনে ।
শ্রীপ্রভুর মুখ চেয়ে আসিছে বিমানে ॥ ৫৮৬ ॥
তখন ঠাকুর কিবা ভাবেতে মাতিয়ে ।
এলোরে এলোরে বলি উঠিল চেঁচিয়ে ॥ ৫৮৭ ॥
বলিতে বলিতে কথা কিশোরের দ্বয় ।
ঠাকুরের শ্রীদেহেতে লীনরূপে লয় ॥ ৫৮৮ ॥
আপনে আপনি গত তখনি গোসাঞি ।
জড়বৎ সমাধিস্থ বাহ্য বোধ নাই ॥ ৫৮৯ ॥
বিরাট আলয় যেন ঠাকুরের দেহ ।
নামরূপ জগতের সম্মিলনা গৃহ ॥ ৫৯০ ॥
যাবতীয় দৃষ্ট রূপ দেহে লীন পায় ।
বিরাট বিগ্রহ তনু রামকৃষ্ণ রায় ॥ ৫৯১ ॥
মথুর চিনেছে ভাল প্রভু গুণধরে ।
দিনে রেতে গেতে শুতে সঙ্গ নাহি ছাড়ে ॥ ৫৯২ ॥
প্রভুর এ করুণা তেন তাঁহার উপর ।
কিবা হেন ভাগ্যবান অবনী ভিতর ॥ ৫৯৩ ॥
যথা ইচ্ছা সঙ্গে ল'য়ে করেন বিহার ।
ঘরেতে অচলা লক্ষ্মী পূর্ণিত ভাণ্ডার ॥ ৫৯৪ ॥
কামিনী-কাঞ্চন যাহা বিষের মতন ।
অণুরে অমৃত-ধারা করে বরিষণ ॥ ৫৯৫ ॥
ঘরে দারা জগদম্বা নন্দন নন্দিনী ।
প্রভুর শ্রীপদে ভক্তি কিবা ভাগ্য মানি ॥ ৫৯৬ ॥
মহাসাধ মিটাইল লইয়ে কাঞ্চনে ।
দীন দুঃখী দেব দ্বিজ সাধুর তোষণে ॥ ৫৯৭ ॥
পালন প্রভুর আজ্ঞা সকলের আগে ।
যোগায় যতনজরে যখন যা লাগে ॥ ৫৯৮ ॥
সুকোমল বারাণসী রেশমী বসন ।
কোমলাঙ্গ প্রভু যেন তাহার মতন ॥ ৫৯৯ ॥
বিবিধ বর্ণের পাড় শোভমান কত ।
সাজাইতে প্রভুদেবে কত আনাইত ॥ ৬০০ ॥
তখনি যোগায় তাহা যাহা ইচ্ছা হয় ।
খইর মোয়ায় করে শত তঙ্কা ব্যয় ॥ ৬০১ ॥
অবিদ্যারূপিণী এই কামিনী-কাঞ্চন ।
যাদুতে যাহার মুগ্ধ গোটা ত্রিভুবন ॥ ৬০২ ॥
কিবা বিশ্ববিমোহিনী শক্তি বল ধরে ।
বিমোহে শিবের মন জীবে রাখা দূরে ॥ ৬০৩ ॥
ভক্ত শ্রীমথুর কিন্তু প্রভুর কৃপায় ।
ভাই ল'য়ে ভাগে জলে জলে যে ডুবায় ॥ ৬০৪ ॥
যেখানে অবিদ্যা সেথা নাই ভগবান ।
কহিয়া সাধিয়া প্রভু দিলেন প্রমাণ ॥ ৬০৫ ॥
অধিক অনর্থকরী এ দোহা হইতে ।
নাহি কিছু অন্য আর ঈশ্বরের পথে ॥ ৬০৬ ॥
হরি-দরশন-সাধ বলবতী যার ।
পরিহার্য উভয়েই অবশ্য তাহার ॥ ৬০৭ ॥
নচেৎ না মিলে হরি হরির নিয়ম ।
কুপায় মথুর কৈল বিধি অতিক্রম ॥ ৬০৮ ॥
ভকতবৎসল প্রভু ভক্তপ্রাণ নাম ।
ভক্তের নিকটে নাই তাঁহার এড়ান ॥ ৬০৯ ॥
ভাঙ্গিয়া আপন বিধি নিরবধি র'ন ।
যেখানে মথুর সঙ্গে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৬১০ ॥
সন্ধ্যার প্রাক্কালে এবে প্রায় প্রতিদিন ।
নানা সাজে শ্রীমথুর সাজায় ফিটন ॥ ৬১১ ॥
সুন্দর ফিটন গাড়ি কি কব বারতা ।
উচ্চৈঃশ্রবা সম অশ্ব জোড়া জোড়া জোতা ॥ ৬১২ ॥
দেবাদির রূপ যেন দ্রুতগতি এত ।
চক্ষুর নিমিখ মধ্যে অদৃশ্য হইত ॥ ৬১৩ ॥
ফিটনের মধ্যভাগে প্রভুকে রাখিয়ে ।
নিজেই চালায় অশ্ব চাবুক ধরিয়ে ॥ ৬১৪ ॥
সুন্দর মধুর যেন সুন্দর ফিটন ।
কি সুন্দর প্রভুদেব তাহে সমাসীন ॥ ৬১৫ ॥
পবনের বেগে গাড়ি ছুটে ময়দানে ।
সাহেব মেমেরা সব ভ্রমে যেইখানে ॥ ৬১৬ ॥
না মানে সাহেব বিবি চাবুক চালায় ।
ফিটনের গতিরোধ বুঝেন যেথায় ॥ ৬১৭ ॥
দিনেক ভ্রমণ করি ময়দান মাঠে ।
উপনীত আদি ব্রাহ্মসমাজ নিকটে ॥ ৬১৮ ॥
জিজ্ঞাসিলা প্রভুদেব কি হয় এখানে ।
মথুর ভাঙ্গিয়া কয় প্রভু বিদ্যমানে ॥ ৬১৯ ॥
প্রভুর বালক ভাব ক'ন শ্রীমথুরে ।
দেখিব কিরূপ হয় ইহার ভিতরে ॥ ৬২০ ॥
উতরিয়া গাড়ি থেকে চলিল মথুর ।
সমাজ-মন্দিরে যেন শ্রীআজ্ঞা প্রভুর ॥ ৬২১ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেবে অল্প লোকে চিনে ।
কর্মে মত্ত আপনার অতি সংগোপনে ॥ ৬২২ ॥
সরল সহজ প্রভু স্বভাবে যেমন ।
শ্রীঅঙ্গে নাহিক কোন বাহ্যিক লক্ষণ ॥ ৬২৩ ॥
সমাসীন সংগোপনে সমাজ-মন্দিরে ।
সমথুর শ্রোতাদের সঙ্গে একধারে ॥ ৬২৪ ॥
ব্রাহ্মসমাজের কথা শুন কহি মন ।
নিরাকার অরূপের বক্তৃতা ভজন ॥ ৬২৫ ॥
দর্শনের অদর্শন তার গন্ধ নাই ।
যদিও বচনে আছে বেদান্ত দোহাই ॥ ৬২৬ ॥
শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন কেমন ।
অস্তি ভাতি প্রীতি কিবা বিচারান্দোলন ॥ ৬২৭ ॥
দেহাত্মবুদ্ধির নাশে নেতি নেতি বোল ।
ত্যাগ-নবনীত নাই আসক্তির ঘোল ॥ ৬২৮ ॥
উচ্চরোল গণ্ডগোল কালো নহে কটা ।
সাহেবালি ধরনেতে বক্তৃতার ঘটা ॥ ৬২৯ ॥
বক্তৃতার ঘটা আজি বিপুলায়োজনে ।
নয়ন মুদিয়া যত শ্রোতৃবর্গ শুনে ॥ ৬৩০ ॥
যেন কত ধ্যানে মগ্ন হয়েছে সবাই ।
ব্যাপার বিদিত সব হইলা গোসাঞি ॥ ৬৩১ ॥
অতি নিরমল স্বচ্ছ শ্রীপ্রভুর মন ।
সৃষ্টি গোটা জোড়া এক প্রকাণ্ড দর্পণ ॥ ৬৩২ ॥
যা কিছু যেথায় নহে তিলার্ধ তফাত ।
অবিকল ঘটনার হয় প্রতিভাত ॥ ৬৩৩ ॥
ধীরে ধীরে শ্রীমথুর পুছে প্রভুবরে ।
কি বাবা কেমনে হেথা দেখিছ কাহারে ॥ ৬৩৪ ॥
উত্তরিলা প্রভুদেব মৃদু মন্দ হাসি ।
দেখাইয়া শ্রীকেশবে অঙ্গুলি নির্দেশি ॥ ৬৩৫ ॥
তরুণ যুবক এই অনুরাগী জনা ।
হেলে দুলে নড়িতেছে ইহার ফাতনা ॥ ৬৩৬ ॥
অপর যতেক তুমি
দেখিছ চৌপাশে ।
ধিয়ানের নামমাত্র ভানে আছে বোসে ॥ ৬৩৭ ॥
শ্রীকেশব সেন অতি সরল আচার ।
অতঃপর সময়েতে কব সমাচার ॥ ৬৩৮ ॥
উপবিষ্ট এত শ্রোতা সমাজ-আসরে ।
কারও না পড়িল লক্ষ্য প্রভুর উপরে ॥ ৬৩৯ ॥
দেখা নাহি দিলে তাঁরে দেখে সাধ্য কার ।
প্রভুকে স্মরিয়া শুন চরিত তাঁহার ॥ ৬৪০ ॥
সরলতাপ্রিয় প্রভু সরলতাময় ।
সরলতা যেথা তথা আকর্ষণ হয় ॥ ৬৪১ ॥
শ্রীপ্রভুর আকর্ষণ কিরূপ প্রকার ।
আকৃষ্ট জানিতে না পারে সমাচার ॥ ৬৪২ ॥
অগণ্য যোজনান্তর বহু দূর দেশ ।
যেখানে আপনাসনে আছেন দিনেশ ॥ ৬৪৩ ॥
কোথায় ভবন তাঁর কোথা ধরাতল ।
কিসে টেনে তুলে শূন্যে জলধির জল ॥ ৬৪৪ ॥
সে কল কৌশল মাত্র দিবাকর জানে ।
আধার বিহীনে জল খেলিছে বিমানে ॥ ৬৪৫ ॥
অলক্ষ্যে শ্রীকেশবের আকর্ষিয়া মন ।
সমথুর করিলেন প্রতি আগমন ॥ ৬৪৬ ॥
সময়
এখন নয় কিছু আছে দেরি ।
কাঁটায় গাঁথিয়া তায় ছাড়িলেন ডুরি ॥ ৬৪৭ ॥
যে খেলা খেলিলা প্রভু কেশবের সনে ।
উপজে বিমল ভক্তি ভারতী-শ্রবণে ॥ ৬৪৮ ॥
রামকৃষ্ণলীলাগীতি অমৃত কথন ।
মত্ত হ'য়ে কর দ্বিবারাতি আন্দোলন ॥ ৬৪৯ ॥
চিরকেলে ভাষা কথা আছে বিশ্ববেড়া ।
নাড়িলেই লাডুগুলি পড়ে তার গুঁড়া ॥ ৬৫০ ॥
প্রভুর ভারতী অতি কল্যাণ-নিধান ।
সায় এই দ্বিতীয় খণ্ডের লীলাগান ॥ ৬৫১ ॥
তৃতীয় খণ্ডের কথা মঞ্জুর কথন ।
প্রচার প্রকাশ আর ভক্ত-সংজোটন ॥ ৬৫২ ॥
দ্বিতীয়
খণ্ড সমাপ্ত
তৃতীয় খণ্ড
প্রচার, প্রকাশ ও ভক্ত-সংযোটন-লীলা
অথ শ্রীমদ্রামকৃষ্ণাবতারস্তোত্রং প্রারভ্যতে
হৃদয়কমলমধ্যে রাজিতৎ নির্বিকল্পং
সদসদখিলভেদাতীতমেকস্বরূপম্ ।
প্রকৃতিবিকৃতিশূন্যং নিত্যমানন্দমূর্তিং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১ ॥
নিরুপমমতিসূক্ষ্মং নিষ্প্রপঞ্চং
নিরীহং
গগনসদৃশমীশং সর্বভূতাধিবাসম্ ।
ত্রিগুণরহিতসচ্চিদ্ব্রহ্মরূপং বরেণ্যং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ২ ॥
প্রলয়জলধিমগ্নং বেদরাশিং
দ্বিধীর্ষুঃ
দনুজমতিবিশালং হংসি শঙ্খং বিচিত্রম্ ।
তমপরিমিতবীর্যং মনরূপং দধানং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৩ ॥
অতুলবিপুলদেহে চিন্ময়ে কুর্মরূপে
বহসি সকলমেতদবিশ্বমাধারশক্ত্যা ।
তব খলু মহিমানং কোঽল্পধীর্বর্ণয়েত্ত্বাং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণৎ ভজামঃ ॥ ৪ ॥
দশনবিধৃতপৃথ্বীং শুকরং শ্বেতকায়ং
দলিতদিতিজরাজং দংষ্ট্রিণং চক্রপাণিম্ ।
অমিতবিভবশক্তিং পালকং দেবতানাং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৫ ॥
বিকটদশনবক্ত্রং লোলজিহ্বং
প্রচণ্ডং
গিরিবরসমকায়ং রক্তহস্তং নৃসিংহম্ ।
প্রশমিতসুরখেদং কোটিসূর্যপ্রকাশং
বিমলপরবহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৬ ॥
ছলয়িতুমব্তীর্ণো বামনস্ত্বং বলিং
বৈ
ত্রিচরণকমলেন ক্রামসি স্বভুর্বো ভূঃ ।
পরমপুরুষমাদিং কাশ্যপং বিশ্বরূপং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৭ ॥
নিশিতপরশুধারং ক্ষত্রসন্তানকেতুং
নবজলধরবর্ণং ভার্গবং ভীমবীর্যম্ ।
শমনসদৃশঘোরং জামদগ্ন্যং বিশালং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৮ ॥
রঘুকুলবরমীশং জানকীপ্রাণনাথং
সমরকুশলবীরং রাঘবং রাবণারিম্ ।
হনুমানুজসেব্যং ধার্মিকং সত্যপালং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ৯ ॥
হলধরমতিশুভ্রং নীলবস্ত্রং
সুরেন্দ্রং
দনুজদলনকার্যে পারগং মত্তসিংহম্ ।
যমমিব যমুনায়া ভীতিদং রৌহিণেয়ং
বিমলপরমহংলং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১০ ॥
ব্রজবিপিনবিহারে শ্যামলং বাসুদেবং
সুমধুররসকেলিং গোপিকাপ্রাণনাথম্ ।
মদনরমণবেশং কংসকালং কবীলং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১১ ॥
পশুবধমতিঘোরং চোদিতং বেদশাস্ত্রৈঃ
শময়িতুমবতীর্ণং জ্ঞানদং শাক্যসিংহম্ ।
প্রকটিতনবমার্গাদ্বৈতনির্বানকল্পং
বিমলপরমহংলং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১২ ॥
শ্রুতিনিগদিতমার্গস্থাপনায়াবতারং
জিননয়বহুবাদভ্রান্তিমুন্মূলয়ন্তম্ ।
ভুবনবিজয়খ্যাতিং শঙ্করং ভাষ্যকারং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১৩ ॥
মধুরসরলবাক্যৈরীশতত্ত্বং প্রকাশ্য
ক্রুশগতপরিশেষোঽপীশপুত্রোঽমৃতো যঃ ।
তমতিশয়পবিত্রং মেরিজং লোকবন্ধুং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১৪ ॥
কলিমলহরনাম্ন কীর্তনং ঘোষয়ন্তং
করধূতজলপাত্রং দণ্ডিনং হেমবর্ণম্ ।
ভবজলনিধিপোতং কৃষ্ণচৈতন্যরূপং
বিমল পরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১৫ ॥
বিতরিতুমবতীর্ণং
জ্ঞানভক্তিপ্রশান্তীঃ
প্রণয়গলিতচিত্তং জীবদুঃখাসহিষ্ণুম্ ।
ধৃতসহজসমাধিং চিন্ময়ং কোমলাঙ্গং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১৬ ॥
হরিহরবিধিদেবা মূর্তিভেদাস্তাবৈতে
নিরুপমবহুমূতির্মায়য়া কল্পয়ন্তম্ ।
অমিতগুণচরিত্রং দীনবন্ধুং দয়ালং
বিমলপরমহংসং রামকৃষ্ণং ভজামঃ ॥ ১৭ ॥
জয় জয় করুণাব্ধে মোক্ষসেতো
স্মরারে
জয় জয় জগদীশ জ্ঞানসিন্ধো স্বয়ম্ভো ।
জয় জয় পরমাত্মংস্ত্রাহি মাং ভক্তিহীনং
জয় জয় ভবহারিন রামকৃষ্ণ দ্বিবাহো ॥ ১৮ ॥
মূকোঽহং নাভিজানামি তব স্তুতিং জগদ্গুরো ।
তথাপি ত্বৎকৃপালেশাদ্ বাচালোহস্মি পুনঃপুনঃ ॥
ইত্যভেদানন্দ স্বামি-বিরচিতং
শ্রীমদ্রামকৃষ্ণাবতারস্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ।
তৃতীয় খণ্ড
পেনেটির মহোৎসবে আগমন এবং কলুটোলায় চৈতন্য-আসন-গ্রহণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
অপূর্ব প্রচার কৈলা প্রভু ভগবান ।
কুলহারা জীবে দিতে শিক্ষার বিধান ॥ ১ ॥
একমনে শুন মন যত্ন-সহকারে ।
ফুটিবে কমল-কলি হৃদয়মাঝারে ॥ ২ ॥
নামে চারি অংশে ভাগ করিয়াছি পুঁথি ।
প্রথমেতে বাল্যলীলা বালক-সংহতি ॥ ৩ ॥
দ্বিতীয়ে ভাগবতলীলা বিকাশ-যৌবন ।
সমাপন অগণন কঠোর সাধন ॥ ৪ ॥
তৃতীয়ে প্রকাশ আর ভক্তগণে টান ।
চতুর্থে বিবিধ ভাব অপূর্ব আখ্যান ॥ ৫ ॥
কিন্তু মন যদি দেখ করিয়া বিচার ।
জন্মাবধি শ্রীপ্রভুর কেবল প্রচার ॥ ৬ ॥
প্রচার বিবিধাকার নানাবিধ ভাবে ।
পুরাতে ভক্তের সাধ শিক্ষা দিতে জীবে ॥ ৭ ॥
এখন মথুর আর কারে নাহি মানে ।
সব সমর্পণ তাঁর প্রভুর চরণে ॥ ৮ ॥
প্রভু বিনা অন্যে আর নাহি তাঁর মন ।
বেদবাক্যাধিক বুঝে প্রভুর বচন ॥ ৯ ॥
পুণ্যহেতু ধর্ম কর্ম গেছে রসাতল ।
প্রভু তুষ্টে জ্ঞান তুষ্ট ত্রিলোক সকল ॥ ১০ ॥
আঁখি-অন্তরাল হ'লে তিলেকের তরে ।
দিনমানে দুনিয়া আঁধার ঘোর হেরে ॥ ১১ ॥
সদাই চঞ্চল তাঁর থাকে মন প্রাণ ।
মথুরচরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ১২ ॥
পানিহাটি নামে গ্রাম আছে গঙ্গাতীরে ।
মহোৎসব হয় তথা বৎসরে বৎসরে ॥ ১৩ ॥
নদীয়ায় যবে গৌরচন্দ্র অবতার ।
নিতাই করেন তাঁর মহিমা প্রচার ॥ ১৪ ॥
হরিনাম বিলাইয়া ফিরি স্থানে স্থানে ।
একথা আইলা এই পানিহাটি গ্রামে ॥ ১৪ ॥
অবধূত নাহি গেলা কার বাসস্থলে ।
কাটাইলা গোটা রাতি এক বটমূলে ॥ ১৫ ॥
হেথা যত ভক্তগণ খুঁজে চারিভিতে ।
নিতাই কোথার গেলা না পায় দেখিতে ॥ ১৬ ॥
উচাটন মনে ফিরে হেথায় সেখায় ।
পরদিনে বটমূলে দরশন পায় ॥ ১৭ ॥
মহানন্দে ভক্তবৃন্দে একত্র হইয়া ।
চিড়াভোগ দিল গৌরচাঁদে উদ্দেশিয়া ॥ ১৮ ॥
আর কৈল সংকীর্তন আনন্দ অপার ।
সমবেত লোক-জন হাজার হাজার ॥ ১৯ ॥
সে হ'তে বঙ্গেতে যত গৌরভক্তগণে ।
বর্ষে বর্ষে মহোৎসব করে সেই দিনে ॥ ২০ ॥
অদ্যাবধি চলিতেছে সেইরূপ ধারা ।
হলে দলে সংকীর্তন কে করে কিনারা ॥ ২১ ॥
প্রভুর আনন্দ বড় পানিহাটি যেতে ।
জলপথে তরীযোগে ভক্তগণ-সাথে ॥ ২২ ॥
বার বার শ্রীপ্রভুর তথা আগমন ।
হরিভক্ত কত শত চিনে বিলক্ষণ ॥ ২৩ ॥
প্রভুর দেখিইয়া ভাব দয়াল প্রকৃতি ।
সুমধুর কণ্ঠস্বর ভক্তিমাখা গীতি ॥ ২৪ ॥
মোহন মুরতি ঠাম তাহার উপরে ।
গোসাঁই মহান্ত ভক্ত কাতারে কাতারে ॥ ২৫ ॥
ভক্তিমন্ত ভাগ্যবান বসতি ধরায় ।
ভক্তিভরে লুটাইত শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ২৬ ॥
সর্পভাব স্বভাবেতে পাষণ্ডীর দল ।
মুখে ভরা নিন্দাবাদ হিংসা হলাহল ॥ ২৭ ॥
যুগে যুগে অবতার শ্রীপ্রভু যখন ।
নিশ্চয় লীলার আসি হয় সম্মিলন ॥ ২৮ ॥
দ্বেষহিংসাপূর্ণ হৃদি গায়ে নামাবলী ।
বিচিত্র চিত্রিত অঙ্গ হাতে ঝুলে ঝুলি ॥ ২৯ ॥
ঠসকেতে বাঁধা টিকি তুলসীর মালা ।
সরু মোটা কণ্ঠীদরে সুশোভিত গলা ॥ ৩০ ॥
জলে ডুবা শুষ্ক কাঠ নাহি তার রস ।
অভিমানে আছে ফুলে কিসে মিলে যশ ॥ ৩১ ॥
মূলে নাই গুরুপদ সাজমাত্র ভান ।
মানীর হানিয়া নিজে নিতে চায় মান ॥ ৩২ ॥
এমন গোসাই যারা গোঁড়া নামে খ্যাত ।
প্রভুদেবে দ্বেষ হিংসা বিশেষ করিত ॥ ৩৩ ॥
গণ্ডাদরে একত্তর হ'য়ে একবার ।
মানস প্রভুর অঙ্গে করে অত্যাচার ॥ ৩৪ ॥
ধিক্ ধিক্ ছার মান-যশের বাসনা ।
হিংলা দ্বেষ ক্রোধ লোভ কলুষ-কালিমা ॥ ৩৫ ॥
মহাপাপ-তাপরূপে নয়-হৃদে খেলে ।
ভীষণ নরকানন্ত মূর্তিমন্ত মূলে ॥ ৩৬ ॥
বুদ্ধিবোধে কর্মফলে অলঙ্কার ভাবে ।
সেই সব সৎমতিহীন বদ্ধ জীবে ॥ ৩৭ ॥
হেন বদ্ধ জীব আমি সুমূর্খ পামর ।
রক্ষা কর প্রভুদেব করুণাসাগর ॥ ৩৮ ॥
অগতির গতি সৎবুদ্ধি-মতিদাতা ।
দুর্বলের বল শক্তি দীন-হীন-ত্রাতা ॥ ৩৯ ॥
বিধির বিধাতা বিভু পতিতপাবন ।
বিঘ্নহর মহেশ্বর তমোবিনাশন ॥ ৪০ ॥
কৃপা ক'রে দেহ মোরে চৈতন্য এবার ।
আঁধার-বিনাশী বাতি হৃদি-অলঙ্কার ॥ ৪১ ॥
কথার কথায় উঠে মথুরের কানে ।
পাষণ্ডিগণের কি বাসনা মনে মনে ॥ ৪২ ॥
সেই হেতু এইবার গমন যখন ।
মহাবলী মারোয়াড়ী বীর চারিজন ॥ ৪৩ ॥
শ্রীঅঙ্গরক্ষার হেতু প্রভুর সংহতি ।
দিতে চায় শ্রীমথুর ভক্ত অধিপতি ॥ ৪৪ ॥
হাসি মাসি প্রভুদেব দিলেন জবাব ।
তীর্থস্থানে ইহা অতি রাজসিক ভাব ॥ ৪৫ ॥
আসবাব সঙ্গে অঙ্গরক্ষক সেনানী ।
কি কাজ রাখিবে মোরে জগৎ-জননী ॥ ৪৬ ॥
তরীযোগে জলপথে গঙ্গার উপর ।
কি ভাবে চলেন প্রভু শুনহ খবর ॥ ৪৭ ॥
অগণ্য কীর্তনবল গায় দলে দলে ।
মহা উৎসবের দিনে বটবৃক্ষমূলে ॥ ৪৮ ॥
শ্রবণ-বধির বোল না পারি কহিতে ।
পশিল প্রভুর কানে বহুদূর হ'তে ॥ ৪৯ ॥
অতুল আনন্দ তাঁর উঠে হৃদিমাঝে ।
যতই শুনেন খোল করতাল বাজে ॥ ৫০ ॥
বিভোরাঙ্গ প্রভুদেব ভাষের আবেশে ।
পুলকাশ্রু ঘন ঘন বদনে বিকাশে ॥ ৫১ ॥
যখন যে ভাব হয় প্রভুর অন্তরে ।
সলক্ষণে ফুটে উঠে বদন-মুকুরে ॥ ৫২ ॥
দিনেশকিরণে যেন সকল বরণ ।
নানাভাবময় তেন প্রভু নারায়ণ ॥ ৫৩ ॥
সাধ্য কার ব'লে উঠে ভাবের চেহারা ।
যত সন্নিকট স্থানে তত বাহ্যহারা ॥ ৫৪ ॥
তীরেতে সংলগ্ন তরী হৈল যেই কালে ।
লম্ফদানে প্রভুদেব উঠিলেন কূলে ॥ ৫৫ ॥
ভাবরূপে মহাশক্তি খেলে অঙ্গময় ।
কথায় আঁকিয়া ছবি দেখাবার নয় ॥ ৫৬ ॥
তীরগতি পশিলেন কীর্তনের দলে ।
গরজে কীর্তনম্বল হরি হরি ব'লে ॥ ৫৭ ॥
গায়ক বাদক যত ছিল সংকীর্তনে ।
দেখিয়া প্রভুর নৃত্য নাচে তাঁর সনে ॥ ৫৮ ॥
অপূর্ব প্রভুর নৃত্য নৃত্যের মাধুরী ।
দেখিলে কি ভাব হয় কহিতে না পারি ॥ ৫৯ ॥
শক্তিময় হরিনাম ফুটে শ্রীবদনে ।
সঙ্গে জুটে মিঠা স্বর পশে যার কানে ॥ ৬০ ॥
কি অধিক মিঠা জিনি শ্রীপ্রভুর স্বর ।
পাছু পড়ে বেণুরব যোজন অন্তর ॥ ৬১ ॥
এতদূর চিতহর সমরূপ তেজে ।
বারেক শুনিলে হৃদে জন্ম জন্ম বাজে ॥ ৬২ ॥
মাতোয়ারা হ'য়ে নৃত্য হয় নানা দলে ।
সঙ্গে যারা মাতোয়ারা নাচে হরি ব'লে ॥ ৬৩ ॥
অপার আনন্দ পায় কীর্তনিয়াগণ ।
লুটায় ধরণী ধরি প্রভুর চরণ ॥ ৬৪ ॥
দর্শকেরা জনতা ঠেলয়ে চারিপাশ ।
কখন শ্রীঅঙ্গে করে যতনে বাতাস ॥ ৬৫ ॥
হেথায় মথুর ঘরে নানাবিধ ভাবে ।
পাঠাইয়া প্রভুদেবে পেনেটি উৎসবে ॥ ৬৬ ॥
বড়ই ব্যাকুল প্রাণ প্রভুর কারণে ।
পাছে ঘটে অমঙ্গল যতনবিহনে ॥ ৬৭ ॥
সেই হেতু ভক্তবর ছদ্মবেশ গায় ।
দ্রুতগতি উত্তরিল শ্রীপ্রভু যথায় ॥ ৬৮ ॥
দেখিলা গোপনে প্রভু সংকীর্তনে নাচে ।
রীতিমত সাথী যত সন্নিকটে আছে ॥ ৬৯ ॥
অপরে শ্রীমূর্তি প্রযুতি দেখি হ'য়ে মুগ্ধমন ।
নানারূপে করিতেছে শ্রীঅঙ্গ সেবন ॥ ৭০ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুর মহাপ্রীত মনে ।
গোপনে গমন যেন ফিরিলা গোপনে ॥ ৭১ ॥
ধন্য ভক্ত শ্রীমথুর ভুবনমাঝারে ।
নাহিক ইয়ত্তা ভক্তি কত ঘটে ধরে ॥ ৭২ ॥
অগাধ ভকতি যদি না থাকিবে ঘটে ।
চিন্তামণি আপনি ভবনে কার জুটে ॥ ৭৩ ॥
এখানে প্রভুর নৃত্য হরিসংকীর্তনে ।
অগণন লোক তাঁর নাচে চারি পানে ॥ ৭৪ ॥
নরনারী ভক্তাভক্ত নাচিছে সকলে ।
যতেক পাষণ্ডী নাচে হরি হরি ব'লে ॥ ৭৫ ॥
দ্বেষ-হিংসাকারী যত গোসাঁয়ের দল ।
প্রভুর কৃপায় নাচে আনন্দে বিহ্বল ॥ ৭৬ ॥
মহোৎসবে উপনীত যত ভাগ্যবান ।
অতি দিব্যভাবানন্দে সবে ভাসমান ॥ ৭৭ ॥
না জানে আনন্দ এত কোথা হ'তে আসে ।
আনন্দ আকর প্রভু মহাগুপ্তবেশে ॥ ৭৮ ॥
অপূর্ব মধুর লীলা আকার ধারণে ।
ক্ষুদ্র অণুমাত্র জীব নাচে প্রভু সনে ॥ ৭৯ ॥
জয় জয় জয় যত দর্শকের গণ ।
পদরেণু সবাকার মাগে এ অধম ॥ ৮০ ॥
সংকীর্তনে মহাশ্রমে শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ।
স্বেদজল অবিরল ঝরিছে প্রচুর ॥ ৮১ ॥
সঙ্গে ভক্তগণ সবে ভীতচিত হৈয়া ।
বাহিরে আনিল তাঁর একত্রে ধরিয়া ॥ ৮২ ॥
জলাশয়ে বিকশিত কমলের বন ।
মধু-লুব্ধ মধুপ তথায় অগণন ॥ ৮৩ ॥
চয়ন করিয়া পদ্ম আনিলে তফাতে ।
আকুল মধুপকুল পাছু ছুটে পথে ॥ ৮৪ ॥
মত্ততর মধুপানে না মানে বারণ ।
প্রভুর পশ্চাতে তেন দর্শকের গণ ॥ ৮৫ ॥
হাতেতে মালসাভোগ প্রত্যেকের প্রায় ।
শ্রীপ্রভুর সেবাহেতু সম্মুখে যোগায় ॥ ৮৬ ॥
অহেতুক কৃপাসিন্ধু প্রভু নারায়ণ ।
পিরীতে মালসাভোগ করিলা গ্রহণ ॥ ৮৭ ॥
আপনে পাইয়া ভক্তে বিতরণ পরে ।
খাইল যাহার যত ধরিল উদরে ॥ ৮৮ ॥
হাস্য পরিহাস সেই সঙ্গে ভগবান ।
বাক্যছলে তুলিলেন অতুল তুফান ॥ ৮৯ ॥
উঠিতে লাগিল কত হাসির ফুয়ারা ।
অনুপম প্রেমে ভাসে দেখে শুনে যারা ॥ ৯০ ॥
পরম রসিকবর প্রভু গুণধর ।
বুঝিতেন কিসে দ্রবে কাহার অন্তর ॥ ৯১ ॥
এত পরিমাণে ঢালিতেন সেই রস ।
পান করি হ'ত যত মানুষ অবশ ॥ ৯২ ॥
মধুপানে মক্ষিকায় মহা মত্ত করে ।
নিকটে পদ্মের পাশে অবিরত ঘুরে ॥ ৯৩ ॥
মানুষেও সেইমত প্রভুবাক্যরসে ।
যত শুনে তত গুণে তায় গিয়া পশে ॥ ৯৪ ॥
মন-আকর্ষণী বিদ্যা কৌশলে চতুর ।
সৃষ্টির ভিতর কেবা যেমন ঠাকুর ॥ ৯৫ ॥
কেহ মোহনিয়া ঠামে মুগ্ধ হ'য়ে পড়ে ।
কেহ বা বিমুগ্ধ হয় শ্রীকণ্ঠের স্বরে ॥ ৯৬ ॥
কেহ বা দেখিয়া নৃত্য অতুল কীর্তনে ।
কেহ নানা রসে ভরা হাস্যরস শুনে ॥ ৯৭ ॥
কেহ বা দেখিয়া ঘটা ছটা দীপ্তিমান ।
ভাব-সমাধির বেগে প্রফুল্ল বয়ান ॥ ৯৮ ॥
কোন না কারণে কোন বারেক দেখিলে ।
কার হেন আছে সাধ্য আর তাঁয় ভুলে ॥ ৯৯ ॥
এইরূপে মজাইয়া দর্শকের মন ।
দক্ষিণশহরে হয় প্রতি-আগমন ॥ ১০০ ॥
লোকজন অগণন একত্র যেখানে ।
শ্রীপ্রভুদেবের তথা আগমন কেনে ॥ ১০১ ॥
আপনি বুঝিবে মন বলিতে না হবে ।
লীলার জলধি-জলে যাবে যবে ডুবে ॥ ১০২ ॥
শ্রবণে বুঝায় লীলা লীলার প্রকৃতি ।
ধীরে ধীরে শুনে চল রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১০৩ ॥
ক্রমশঃ প্রকাশ নাম হয় নানা স্থলে ।
কতক্ষণ রহে সূর্য মেঘের আড়ালে ॥ ১০৪ ॥
শহরের মধ্যস্থানে কলুটোলা নাম ।
তথায় আছয়ে হরিসভা বিদ্যমান ॥ ১০৫ ॥
ভাগবত-পাঠে ব্রতী বৈষ্ণবচরণ ।
প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ভক্ত প্রভু-পদে মন ॥ ১০৬ ॥
বৈষ্ণব গোউর-ভক্ত অনেক তথায় ।
জলন্ত প্রমাণ তার প্রভুর লীলায় ॥ ১০৭ ॥
আনন্দে একত্রীভূত হয়ে ভক্তগণ ।
সভাদিনে করে হরিনাম সংকীর্তন ॥ ১০৮ ॥
গোউরের আসন রাখিয়া মাঝখানে ।
বেষ্টন করিয়া নাচে যত ভক্তগণে ॥ ১০৯ ॥
এরূপ আছয়ে তথা মহোৎসব-রীতি ।
নিমন্ত্রণরক্ষাহেতু হৃদয়-সংহতি ॥ ১১০ ॥
উপনীত হৈলা প্রভু উৎসবের স্থলে ।
কীর্তনে যখন সবে নাচে হরি ব'লে ॥ ১১১ ॥
ভাবোন্মত্ত ভাবে পূর্ণ শুনি হরিনাম ।
দূর থেকে গেল চ'লে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ১১২ ॥
আবেশে অবশ অঙ্গ যত্নসহকারে ।
হৃদয় ধরিয়া যায় সভার ভিতরে ॥ ১১৩ ॥
হৃদয় আনন্দময় বৈষ্ণবচরণ ।
লুটায় ধরণী ধরি প্রভুর চরণ ॥ ১১৪ ॥
গণ্য মান্য সুপণ্ডিত শহর ভিতরে ।
সে লুটায় শ্রীপ্রভুর শ্রীচরণ ধ'রে ॥ ১১৫ ॥
দেখিয়া চমক প'ড়ে গেল সভাস্থানে ।
পরস্পর বলাবলি করে সংগোপনে ॥ ১১৬ ॥
মহান্ পুরুষ কেবা বটে এই জন ।
শ্রীঅঙ্গ নেহারি সবে করে নিরীক্ষণ ॥ ১১৭ ॥
এখন শ্রীঅঙ্গে ভাব অপরূপ খেলে ।
হাজার পাষণ্ড হোক তবু দেখে ভুলে ॥ ১১৮ ॥
অন্তরে অপার প্রেম প্রতিভাত তাঁর ।
শ্রীঅঙ্গ করেছে মহা শোভার আধার ॥ ১১৯ ॥
ধরা মাছে পুনঃ যেন জলে ছেড়ে দিলে ।
লম্ফদানে নিমগন অগাধ সলিলে ॥ ১২০ ॥
শক্ত আঁকা কিবা ভাব মীনের পরানে ।
পশিলা তেমতি প্রভু হরিসংকীর্তনে ॥ ১২১ ॥
অনুমানে কিবা আনে হৃদয়ের মাঝে ।
অপরূপ প্রভুরূপ ভাবোন্মত্ত সাজে ॥ ১২২ ॥
শ্রীপ্রভুর দেহ বটে পঞ্চভূতে গড়া ।
আছে অস্থি আছে মাংস রক্তভরা শিরা ॥ ১২৩ ॥
তবু হেন স্বচ্ছতার তাহে বিদ্যমান ।
যেন নহে পঞ্চভূত অল্প উপাদান ॥ ১২৪ ॥
সৎ শুদ্ধ পবিত্রতা শাস্তি নিরমল ।
অপার করুণা ভক্তি প্রেম সমুজ্জ্বল ॥ ১২৫ ॥
দিব্যজ্ঞান প্রশান্ততা কান্তি গুণাদির ।
একসঙ্গে শ্রীঅঙ্গেতে সর্বদা বাহির ॥ ১২৬ ॥
তদুপরি সংকীর্তনে যবে মত্ততর ।
বেগে উঠে ছটারাশি বড়ই সুন্দর ॥ ১২৭ ॥
কি বুঝিবে বদ্ধজীবে হরিভক্তিহীনে ।
গ্রন্থ কি রূপের ছবি হরিসংকীর্তনে ॥ ১২৮ ॥
প্রভুদেব পূর্ণবয়ঃ পুরুষ-আকৃতি ।
কঠোর সাধনোদ্ভব কাঠিন্য প্রকৃতি ॥ ১২৯ ॥
আঙ্গিক বিকার লুপ্ত সহজ এখন ।
সরল কোমল ক্ষীণ স্বভাবে যেমন ॥ ১৩০ ॥
কিছু ন্যূন চারি হস্ত সম্পূর্ণ আকার ।
মোহন সুঠানে চলে প্রেমের জুয়ার ॥ ১৩১ ॥
সুবিশাল বক্ষঃস্থল কৃপার আলয় ।
ধীন-হীন অনাথের আশার আশ্রয় ॥ ১৩২ ॥
জ্ঞান-সূর্য বিরাজিত ললাট প্রশস্ত ।
কল্পতরু করদ্বয় আজানুলম্বিত ॥ ১৩৩ ॥
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি ধনুকের মত ।
করুণ কটাক্ষ শরযুক্ত অবিরত ॥ ১৩৬ ॥
মনপাখী দিয়া ফাঁকি পালাতে না পারে ।
অনিবার্য শরাঘাত সন্ধানিলে কারে ॥ ১৩৭ ॥
ধনুশরে মারি আঁখিশরে রাখে প্রাণ ।
কি ধারা আঁকিতে নারি আঁখির সন্ধান ॥ ১৩৮ ॥
কি কব কমলাসেব্য শ্রীপদ দুখানি ।
ভবসিন্ধু তরিবার কেবল তরণী ॥ ১৩৯ ॥
শ্রীপদস্বরূপ কহি কি শকতি বল ।
শ্রীপদ-স্বরূপ মাত্র শ্রীপদ কেবল ॥ ১৪০ ॥
মনোমোহনিয়া ঠামে কি মিশান আর ।
নরভাষে নাহি আসে তিল বলিবার ॥ ১৪১ ॥
ভুবনমোহন প্রেম-লাবণ্যের ছটা ।
দেখেছে যে হৃদিমাঝে আছে তার আঁটা ॥ ১৪২ ॥
এ দেখা সে রেখা নয় বাহ্যিক নয়নে ।
সে দেখে দেখান যার কৃপা-বিতরণে ॥ ১৪৩ ॥
বলিতে নারিনু দেখা মরিলাম দেখে ।
কেহ ফুলে দেখে ফুল কেহ দেখে কাঁদে ॥ ১৪৪ ॥
সুকোমল বটে প্রেম তাহে এত বল ।
প্রভাবে মাতার স্বর্গ ধরা ধরাতল ॥ ১৪৫ ॥
পতঙ্গ যদ্যপি প্রেম-অণুকণা পায় ।
কৈলাস বৈকুণ্ঠ স্বর্গ পলে পলে যায় ॥ ১৪৫ ॥
ষোলআনা পূর্ণ প্রেমে প্রভু ভগবান ।
আপনি মাতিয়া সঙ্গে সকলে মাতান ॥ ১৪৬ ॥
নিজে ঘুরে ঘূর্ণিপাক তটিনীর জলে ।
টানে আনে রহে যাহা দূরস্থ অঞ্চলে ॥ ১৪৭ ॥
আপনার পাকে ঘূর্ণি নিজে পাক খায় ।
সীমাস্তস্থিত যত কিছু সকলে ঘুরায় ॥ ১৪৮ ॥
সেইমত প্রভুদেব আপনার বলে ।
প্রমত্ত হইয়া মত্ত করিলা সকলে ॥ ১৪৯ ॥
প্রভুসনে সঙ্কীর্তনে পেয়ে পরা রুচি ।
লোক জনে করে মনে আরো নাচি নাচি ॥ ১৫০ ॥
এইরূপে প্রভুদেব নাচি কতক্ষণ ।
ভাবাবেশে করিলেন আসন গ্রহণ ॥ ১৫১ ॥
যে আসন ছিল পাতা গোউর উদ্দেশে ।
নীরবে দেখয়ে সবে দাঁড়ায়ে চৌপাশে ॥ ১৫২ ॥
আপনাতে আপনার শক্তি-সংবরণ ।
করিতে লাগিলা ক্রমে প্রভু নারায়ণ ॥ ১৫৩ ॥
যতই সংবর তত আসে বাহ্যজ্ঞান ।
প্রীপ্রভুর লীলা-কথা অপূর্ব আখ্যান ॥ ১৫৪ ॥
প্রতিশ্রুত ছিলা প্রভু গৌর-অবতারে ।
নামিতে হইবে পুনঃ দুবার আসরে ॥ ১৫৫ ॥
গোপনে প্রথম বার এই আগমন ।
দীন দুঃখী দ্বিজবেশ করিয়া ধারণ ॥ ১৫৬ ॥
নমস্তে ব্রাহ্মণরূপী গুপ্ত অবতার ।
পতিত-পাবন ভবসিন্ধুকর্ণধার ॥ ১৫৭ ॥
নমস্তে শ্রীগদাধর চাটুয্যে-নন্দন ।
চন্দ্রমণি-গর্ভজাত অনাথশরণ ॥ ১৫৮ ॥
নমস্তে শ্রীরামকৃষ্ণ তাপহারী নাম ।
সংবৃদ্ধি-শান্তিদাতা কল্যাণনিধান ॥ ১৫৯ ॥
নমস্তে পরমহংস লীলা-আখ্যাধারী ।
পুরুষ-প্রধান বিভু বিপদ-নিবারী ॥ ১৬০ ॥
নমস্তে সাধনপ্রিয় ত্যাগিশিরোমণি ।
ভকভবৎসল ভক্ত-প্রাণ অন্তর্যামী ॥ ১৬১ ॥
নমস্তে সমস্ত ধর্মসমন্বয়কারী ।
ভক্তচিতবিরজন হৃদয়বিহারী ॥ ১৬২ ॥
নমস্তে সর্বজ্ঞ গুপ্ত নিরক্ষর বেশ ।
জ্ঞান-ভক্তি-প্রেম-যুক্তিদাতা পরমেশ ॥ ১৬৩ ॥
নমস্তে শ্রীগুরুরূপ পথপ্রদর্শক ।
ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাশ্রয়ী সবার নায়ক ॥ ১৬৪ ॥
নমস্তে সিদ্ধাত্মা যোগী তাপস-আচার ।
বাহিক-লক্ষণ-হীন সহজ আকার ॥ ১৬৫ ॥
নমস্তে শ্রীপ্রভুদেব বঙ্কিমনয়ন ।
দুর্লভ চৈতন্তদাতা তমো-বিনাশন ॥ ১৬৬ ॥
নমস্তে কোমল অঙ্গ সুঠাম মুরতি ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু দয়াল প্রকৃতি ॥ ১৬৭ ॥
নমস্তে মধুর-কণ্ঠ জিনি বাঁশীস্বর ।
জনমনোমোহনিয়া রলের সাগর ॥ ১৬৮ ॥
নমস্তে যুগাবতার ব্রহ্মসনাতন ।
লীলাপ্রিয় লীলাশক্তি শ্রীঅঙ্গে ধারণ ॥ ১৬৯ ॥
যে শক্তিতে বিমোহন ছিল দর্শকেরা ।
প্রভু-শক্তি সংবরণে হয় শক্তিহারা ॥ ১৭০ ॥
বুঝিল মানুষে হেন না হয় সম্ভব ।
শাস্ত্রজ্ঞ মর্মজ্ঞ ধারা আছিল নীরব ॥ ১৭১ ॥
সামান্য মনুষ্যাধারে নহে সাধ্য কার ।
করিবারে গোউরের আসনাধিকার ॥ ১৭২ ॥
ভাল মন্দ সদসৎ সর্বঠাঁই রহে ।
নিজ নিজ বুদ্ধিমত ভিন্ন কথা কহে ॥ ১৭৩ ॥
অভক্ত পাষণ্ডিদল গর্দভের মত ।
অজ্ঞান-রজক-ভার বহে অবিরত ॥ ১৭৪ ॥
সমাগত বহু ভক্ত হয় অবতারে ।
লোলুপ রূপসম ভক্তিহেতু ঘুরে ॥ ১৭৫ ॥
যদিও পাষণ্ড করে তার মধ্যে বাস ।
স্বভাবের মলিনতা কভু নহে নাশ ॥ ১৭৬ ॥
অঙ্গার করিলে ধৌত শতবার জলে ।
কালিমা বরণ নাহি যায় কোন কালে ॥ ১৭৭ ॥
অমাবস্যা রাত্রে যেন চাঁদ অসম্ভব ।
তেন পাষণ্ডীর হৃদে ভক্তির উদ্ভব ॥ ১৭৮ ॥
যেন দেখি কমলাখি জটাধারী রাম ।
একপক্ষে রুষে রক্ষ করিতে সংগ্রাম ॥ ১৭৯ ॥
তেমতি অভক্তদল প্রভু ভগবানে ।
সমাসীন দেখি তাঁহে গোউর-আসনে ॥ ১৮০ ॥
নিকটে বৈষ্ণব যত করিয়া শ্রবণ ।
নিন্দাবাদ প্রতিবাদ করে বিলক্ষণ ॥ ১৮১ ॥
প্রভু কিবা করিলেন শুন অতঃপর ।
রামকৃষ্ণ লীলাকথা সুধার সাগর ॥ ১৮২ ॥
যেই
বস্তু প্রভুদেব সেই গোরারায় ।
গোউরের হর নিন্দা প্রভুর নিন্দায় ॥ ১৮৩ ॥
এ নিগূঢ়
তত্ত্ববোধে বঞ্চিত যে জন ।
অর্থাৎ চিনে না কেবা প্রভু নারায়ণ ॥ ১৮৪ ॥
চৈতন্য-চরণে কিছু ভক্তি হৃদিমাঝে ।
জানে নাই তাই প্রভুদেবে নাহি ভজে ॥ ১৮৫ ॥
প্রভুর করিয়া নিন্দা করেছে প্রমাদ ।
অজ্ঞানজনিত দোষ মহা অপরাধ ॥ ১৮৬ ॥
জীবহিত সদাব্রত গুণের আকর ।
ক্ষমার সাগর যেন দয়ার সাগর ॥ ১৮৭ ॥
তাহাদের রক্ষার কারণে ভগবান ।
করিলেন শুন কিবা সুন্দর বিধান ॥ ১৮৮ ॥
মনোহর শ্রীপ্রভুর কার্যের কৌশল ।
ধরি মূলাধার স্থান টিপিলেন কল ॥ ১৮৯ ॥
বৈষ্ণবের শিরোমণি ভগবানদাস ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যভক্ত কালনায় বাস ॥ ১৯০ ॥
গোয়াধ্যান গৌরাজ্ঞান গোরাপদে মতি ।
বৈষ্ণবসমাজে বঙ্গে বড়ই খিয়াতি ॥ ১৯১ ॥
শান্ত দাস্ত ভক্তিমন্ত মহান্ত বিশেষ ।
তন্ত্রপরি ধরে বহু সদ্গুণ অশেষ ॥ ১৯২ ॥
অতি প্রতিপত্তি তাঁর বৈষ্ণবের স্থানে ।
আসন গ্রহণ-কথা শুনিলেন কানে ॥ ১৯৩ ॥
গৌরাঙ্গভকত তেঁহ গৌরাঙ্গে পিরীত ।
তে কারণে শুনি কথা হইলা কুপিত ॥ ১৯৪ ॥
চিনে না জানে না প্রভু কি রতন ধন ।
তাই কথা শুনে কহে অপ্রিয় বচন ॥ ১৯৫ ॥
শ্রীগৌরাঙ্গ মূল জ্ঞান ধরে যেই জনে ।
তাঁহার আসন অন্যে সে দিবে কেমনে ॥ ১৯৬ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা করহ শ্রবণ ।
কিরূপে করিলা অপরাধ বিমোচন ॥ ১৯৭ ॥
সসঙ্গ মথুর প্রভু নৌকা-আরোহণে ।
ভ্রমেন গঙ্গার বক্ষে এখানে সেখানে ॥ ১৯৮ ॥
একবার কালনাঘাটে লাগে তরণী ।
হৃদয় সহিত প্রভু নামিলা অমনি ॥ ১৯৯ ॥
কেন প্রভু নামিলেন কি মনে তাঁহার ।
হৃদয়ে বিদিত কৈলা পথে সমাচার ॥ ২০০ ॥
কোমলাঙ্গ প্রভু ধীর-পদ-সঞ্চালনে ।
উতরিলা ভগবানদাসের আশ্রমে ॥ ২০১ ॥
সে সময় বাবাজীর জপমালা করে ।
উপশিষ্য বৈষ্ণবেরা আছে চারিধারে ॥ ২০২ ॥
সামাজিক আলোচনা হিত-উপদেশ ।
দাঁড়ায়ে তফাতে দেখিছেন পরমেশ ॥ ২০৩ ॥
হৃদয় কহিল ভগবান বাবাজীরে ।
কি লাগি তোমার আর জপমালা করে ॥ ২০৪ ॥
উত্তর করিল ভগবান অভিযানে ।
মালা ধরি মাত্র জীব-শিক্ষার কারণে ॥ ২০৫ ॥
শুনিয়া বলিলা প্রভু আরে ভগবান ।
এখন এতেক তুমি রাগ অভিমান ॥ ২০৬ ॥
যেমন প্রয়োগ বাক্য করিলা গোসাঁই ।
অমনি সমাধিপর বাহ্য আর নাই ॥ ২০৭ ॥
হৃদয় ধরিল ভাবাবিষ্ট প্রভুদেবে ।
পায় তত্ত্ব ভগবান কৃপার প্রভাবে ॥ ২০৮ ॥
ভাগ্যবান ভগবান আশ্রমে যাঁহার ।
নিজে গিয়া করিলেন চৈতন্য-সঞ্চার ॥ ২০৯ ॥
মহাবীর ধনুধারী ধনু ল'য়ে করে ।
মূর্তিমান মন্ত্র পড়ি বাণ যদি ছাড়ে ॥ ২১০ ॥
দুরভেদ্য লক্ষ্য এত বাণ মানে হার ।
শ্রীপ্রভুর বাক্যবাণে হয় ছারখার ॥ ২১১ ॥
প্রভুবাক্যে কি শকতি কার সাধ্য বলে ।
বিষম মায়ার গড় ভেদ করি চলে ॥ ২১২ ॥
সার্থক জীবন যেবা খাইয়াছে বাণ ।
অব্যর্থ প্রভুর লক্ষ্য যেথায় সন্ধান ॥ ২১৩ ॥
বাবাজীর অভিমানে লক্ষ্য গুরুতর ।
অগ্নিবাণ ছাড়িলেন দয়ার সাগর ॥ ২১৪ ॥
ভস্মীভূত অভিমান তম আর নাই ।
চৈতন্ত-দিনেশ সমুন্বিত তার ঠাঁই ॥ ২১৫ ॥
আঁখি করি উন্মীলন প্রভুপানে চায় ।
স্বরূপ-বর্শনে পরে বাবাজী লোটায় ॥ ২১৬ ॥
নিন্দা-অপরাধ ক্ষমা চায় বারে বারে ।
অবিরল আঁখিজল ধারা বেয়ে পড়ে ॥ ২১৭ ॥
বৈষ্ণবদলের নেতা ভগবানদাস ।
তাঁহার খালাসে পায় অপরে খালাস ॥ ২১৮ ॥
সে অবধি প্রভুদেবে মহাভক্তি করে ।
যতেক বৈষ্ণব আছে বঙ্গের ডিভরে ॥ ২১৯ ॥
প্রভু অবতারে যা দেখিনু হেন কোথা ।
মহাতমোবিনাশন রামকৃষ্ণ কথা ॥ ২২০ ॥
দরশনে বাসনা যদ্যপি থাকে মন ।
এক মনে লীলাগীতি করহ শ্রবণ ॥ ২২১ ॥
তৃতীয় খণ্ড
হৃদয়ের দুর্গোৎসবে প্রভুর জ্যোতিঃপথে গমন
এবং মথুরের দেহত্যাগ
জয় জয়
রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় শ্রীশ্রীমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
সম্পদ-বিপদ সুখ-দুঃখ অগণন ।
ভাল-মন্দ জন্ম-মৃত্যু বিয়োগ-মিলন ॥ ১ ॥
উত্তাল তরঙ্গমালা সহিয়ে ভুগিয়ে ।
কালের প্রবাহে জীব চলিছে ভাসিয়ে ॥ ২ ॥
কোথায় আকর-ভূমি কবে কোন্ খানে ।
অবিরাম গতি কোথা কিছুই না জানে ॥ ৩ ॥
সচেতন অচেতন জাগিয়া ঘুমায় ।
শ্রীচৈতন্যময়ী মহামায়ার মায়ায় ॥ ৪ ॥
খুল মা চৈতন্যদ্বার চৈতন্য-রূপিণী ।
ত্রিগুণধারিণী তুমি ব্রহ্মসনাতনী ॥ ৫
॥
তুমি তম-বিনাশিনী মহাবিদ্যা নাম ।
অজ্ঞান-তিমির হরি দেহ চক্ষুদান ॥ ৬ ॥
ঊর মা কমলে কণ্ঠে ঊর একবার ।
বাজুক হৃদয়-বীণা উঠুক ঝঙ্কার ॥ ৭ ॥
বীণাবাদ্য-বিনোদিনী বেদময়ী তুমি ।
পুরাও মনের সাধ শ্রীবাগ্ বাদিনী ॥ ৮ ॥
বাসনা গাইব মনে রামকৃষ্ণ লীলা ।
সভক্তে শ্রীপ্রভুদেব কি করিলা খেলা ॥ ৯ ॥
ভাবমুখে অবস্থিত কেবা এ ঠাকুর ।
কেই বা সেবকদ্বয় হৃদয় মথুর ॥ ১০ ॥
বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর সঙ্গেতে হৃদয় ।
ছায়াবৎ পাছু পাছু দিবারাতি রয় ॥ ১১ ॥
বিশেষতঃ যে অবধি পুরীতে এখানে ।
দ্বাদশবৎসরব্যাপী সাধন-ভজনে ॥ ১২ ॥
দু-এক সাধন নহে দুস্তর বিস্তর ।
প্রভুর ছিল না যবে দেহের খবর ॥ ১২ ॥
অনুক্ষণ নিমগন অসাধ্য-সাধনে ।
শ্রীদেহের সত্তাবোধ লুপ্ত ক্ষণে ক্ষণে ॥ ১৩ ॥
কত যে করিল সেবা তখন হৃদয় ।
আঁকিবার লিখিবার কহিবার নয় ॥ ১৪ ॥
মানুষে অসাধ্য তেন সেবা-সমাধানে ।
বুদ্ধিতে না আসে তেঁহ করিল কেমনে ॥ ১৫ ॥
সুনিশ্চয় হৃদয়ের দেবাংশে জনম ।
নররূপে শ্রীপ্রভুর সেবার কারণ ॥ ১৬ ॥
লম্বা প্রস্থে দীর্ঘাকার বীর বলবান ।
শিরানদী মধ্যে রক্তস্রোত বহমান ॥ ১৭ ॥
সমবয়ঃ শ্রীপ্রভুর প্রখর যৌবন ।
দেহখানি সেইমত যেন প্রয়োজন ॥ ১৮ ॥
বাহুল্য বাখান নয় যদি তারে বলি ।
কল্পতরু শ্রীদেহের একমাত্র মালী ॥ ১৯ ॥
প্রভুর সঙ্গেতে ভাব সম্বন্ধ হৃদয় ।
আত্মীয়-মমতা-মাখা অতি সুমধুর ॥ ২০ ॥
ঠাকুরের সঙ্গে থাকে সেবা করে তাঁর ।
আপন আত্মীয়-সমতুল্য ব্যবহার ॥ ২১ ॥
সেই সে মানুষবেশে সমতন্ত্রধারী ।
কেবা এরা কোথাকার বুঝিতে না পারি ॥ ২২ ॥
বুদ্ধিতে বুঝিতে গেলে বোধ হয় হেন ।
জাগ্রতে নিদ্রিতাবস্থা স্বপ্ন দেখি যেন ॥ ২৩ ॥
ভাব ভাবাভীতে যিনি নিত্য বিদ্যমান ।
সৃষ্টি স্রষ্টা পাতা কর্তা সর্বশক্তিমান ॥ ২৪ ॥
স্থূল-সুক্ষ্মে সমধারা ইন্দ্রিয়-অতীত ।
কিমভূত কিমাকার বিচিত্র চরিত ॥ ২৫ ॥
সেই বস্তু নরদেহে নরের প্রকৃতি ।
নর-রঙ্গ নর-সঙ্গ নরবৎ গতি ॥ ২৬ ॥
অথচ নরের সঙ্গে সব বিপরীত ।
দেখিতে বুঝিতে নর-বুদ্ধির অতীত ॥ ২৭ ॥
হৃদয়ের ষোলআনা মনের ধারণা ।
প্রভুর ভাগিনে তেঁহ প্রভু তার মামা ॥ ২৮ ॥
যখনি চাহিবে তারে আধ্যাত্মিক ধন ।
তখনি পাইবে তাহা বিনা আকিঞ্চন ॥ ২৯ ॥
স্ত্রীবিয়োগে এইবার বৈরাগ্য-উদয় ।
ভাব-দরশন-হেতু প্রভুদেবে কয় ॥ ৩০ ॥
তদুত্তরে প্রভু তায় কন বুঝাইয়ে ।
কেন হৃদু কিবা হবে এ সব লইয়ে ॥ ৩১ ॥
দেখহ অবস্থা মোর কিবা সর্বদাই ।
পরনের ধুতি তাও ঠিক থাকে নাই ॥ ৩২ ॥
তুমিও যদ্যপি হও এ হেন প্রকার ।
বল দেখি মুখে জল কে দিবে কাহার ॥ ৩৩ ॥
থাক তুমি সেবাকর্মে আছ যেইমত ।
ইহাতেই সব কর্ম হইবে সাধিত ॥ ৩৪ ॥
এখন হৃদুর ঘটে আর একজনা ।
বরাবরি এক জেদ নাহি শুনে মানা ॥ ৩৫ ॥
সান্ত্বনা-স্বরূপ পুনঃ প্রভুদেব কন ।
মায়ের হইলে ইচ্ছা হইবে তখন ॥ ৩৬ ॥
আজি থেকে হৃদয়ের পূজা-কালিকার ।
চতুর্গুণ অনুরাগ-ভক্তি-সহকার ॥ ৩৭ ॥
পূজান্তে বিজন স্থানে প্রভুর মতন ।
যজ্ঞসূত্র-বস্ত্রত্যাগ ধ্যানের সাধন ॥ ৩৮ ॥
একদিন কালিকার পুজার সময় ।
বর্ণনানুভূতি ভাব অল্প স্বল্প হয় ॥ ৩৯ ॥
অর্ধবাহ্যদশাবস্থা বসিয়া আসনে ।
হেনকালে শ্রীমথুর হাজির সেখানে ॥ ৪০ ॥
নেহারি হৃদুর দশা প্রভুদেবে কন ।
ও বাবা হৃদয়ে কেন করিলে এমন ॥ ৪১ ॥
মায়ে চেয়েছিল বুঝি পাইয়াছে তাই ।
মথুরে উত্তর এই করিলা গোসাঞি ॥ ৪২ ॥
পুনরায় প্রভুদেবে ভক্তবর কয় ।
তোমার এ খেলা বাবা অন্য কার নয় ॥ ৪৩ ॥
মোদের কি কাজ ইথে মোরা কি করিব ।
নন্দিভৃঙ্গী দুঁহ মোরা সেবার থাকিব ॥ ৪৪ ॥
ভুক্তভোগী শ্রীমথুর তাই হেন কয় ।
আক্কেল পেয়েছে পূর্বে শুন পরিচয় ॥ ৪৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ আগে ঠাকুরের স্থানে ।
মথুরের নিবেদন ভাবের কারণে ॥ ৪৬ ॥
হৃদয়ের মত প্রভু কতই বুঝান ।
তথাপি প্রভুর বাক্যে নাহি দেন কান ॥ ৪৭ ॥
বারংবার মহাজেদে প্রভুদেব কন ।
মায়ের হইলে ইচ্ছা হইবে তখন ॥ ৪৮ ॥
হরষিত-চিত ভক্ত প্রভুর উত্তরে ।
ফিরিয়া আসিল জানবাজারের ঘরে ॥ ৪৯ ॥
দিনেকে আবেশভাব তারে ধরিয়াছে ।
উচ্চ ভূমিগত মন নাহি নামে নীচে ॥ ৫০ ॥
বিষয়-বাসনা ভোগ-লালসা বিস্তর ।
নিম্নদিকে আকর্ষণ করে নিরন্তর ॥ ৫১ ॥
ঢোঁড়ার মুষিক ধরা বিপদ যেমন ।
গিলিতে কি উগারিতে উভয় অক্ষম ॥ ৫২ ॥
তেমতি অবস্থাপন্ন মথুর এখানে ।
পাঠাইল বার্তা পরে প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৫৩ ॥
ভকতবৎসল প্রভু হইয়া বিদিত ।
স্বরায় মথুরাবাসে হৈলা উপনীত ॥ ৫৪ ॥
দেখিলেন অঙ্গ-মধ্যে ভাবের লক্ষণ ।
উচ্চে মন, মুখ-বক্ষ রক্তিম-বরণ ॥ ৫৫ ॥
ভাব-রাজ্যেশ্বরে ভক্ত পাইয়া গোচরে ।
অভয় চরণ দুটি জড়াইয়া ধরে ॥ ৫৬ ॥
বলে বাবা লহ ফিরে ভাবটি তোমার ।
না বুঝিয়া মেগেছিনু মাাগিব না আর ॥ ৫৭ ॥
যদ্যপি রাখহ তুমি এইরূপ ভাবে ।
বিষয়-সম্পত্তি বাবা সবি নষ্ট হবে ॥ ৫৮ ॥
মাগিয়াছিলাম ভাব, মর্ম নাহি বুঝে ।
এ ভাব কেবল বাবা তোমাকেই সাজে ॥ ৫৯ ॥
শ্রীহস্ত বুলাইয়া বক্ষে ভাঙ্গাইলা ভাব ।
মথুর বাঁচিল এবে পাইয়া স্বভাব ॥ ৬০ ॥
হেথা হৃদয়ের কথা শুন শুন মন ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীত অমৃত কথন ॥ ৬১ ॥
একদিন রাত্রিকালে প্রভু ভগবান ।
পঞ্চবটী অভিমুখে ধীরগতি যান ॥ ৬২ ॥
হৃদয় গামছা গাড়ু ল'য়ে নিজ হাতে ।
যদি হয় প্রয়োজন চলিছে পশ্চাতে ॥ ৬৩ ॥
হেনকালে হৈল এক দিব্য দরশন ।
দেখিল শ্রীপ্রভু স্থূলদেহধারী নন ॥ ৬৭ ॥
রক্তমাংস নাহি তায় জ্যোতিঃঘন তনু ।
জ্যোতির ছটার তেজে পরাজিত ভানু ॥ ৬৮ ॥
আলোকিত চারিদিকে সব দেখা যায় ।
অবিকল যেই মত দিনের বেলায় ॥ ৬৯ ॥
জ্যোতির্ময় তনুখানি চলে শূন্যপথে ।
দেহের বাহক পদ পড়ে না মাটিতে ॥ ৭০ ॥
এখানে দর্শক হৃদু মনে মনে খুশে ।
দেখিতেছি হেন বুঝি নয়নের দোষে ॥ ৭১ ॥
দোষ নষ্ট হেতু করে চক্ষুর মার্জন ।
যতবার দেখে, দেখে একই রকম ॥ ৭২ ॥
আপনার দেহে দৃষ্টি করিয়া চালনা ।
সে দেখে, সে
নয় আর অন্য এক জনা ॥ ৭৩ ॥
জ্যোতির্ময় দেহধারী দেব-অনুচর ।
চিরকাল দেবসঙ্গ দেব-সেবাপর ॥ ৭৪ ॥
দেবাংশ-সম্ভূত দেব-সেবার কারণ ।
স্বতন্ত্র শরীরমাত্র করে দরশন ॥ ৭৫ ॥
নিজের স্বরূপ তেঁহ হইয়া বিদিত ।
অন্তরে আনন্দস্রোত যেগে প্রবাহিত ॥ ৭৬ ॥
ভুলিলেন আপনারে, ভুলিল সংসার ।
ভুলিলেন ভালমন্দ যত কিছু আর ॥ ৭৭ ॥
অর্ধবাহ্য ভাবাবেশ উন্মত্তের ন্যায় ।
ধরিয়া প্রভুর নাম ডাকে উভরায় ॥ ৭৮ ॥
কহে আর নাহি মোরা স্থূলদেহধারী ।
চল যাই দেশে দেশে জীবোদ্ধার করি ॥ ৭৯ ॥
এত শুনি প্রভুদেব হৃদয়েরে কন ।
থাম্ হৃদু, কি হয়েছে কি হেতু এমন ॥ ৮০ ॥
যদি শুনে লোকজন আসিবে ছুটিয়ে ।
এখনই দিবে এক হাঙ্গামা বাধিয়ে ॥ ৮১ ॥
হৃদয় আপনহারা প্রভুদেবে কন ।
তুমি যেন রামকৃষ্ণ আমিও তেমন ॥ ৮২ ॥
তবে প্রভু নিজ বস্ত্র বাঁধিয়ে কোমরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত হৃদুর গোচরে ॥ ৮৩ ॥
হৃদয়ের বক্ষদেশে হাত বুলাইয়ে ।
বলিলেন থাক্ শালা জড়বৎ হয়ে ॥ ৮৪ ॥
তখনি হৃদ্বয় হৈল আছিল যেমন ।
প্রভুদেবে কহে তবে করিয়া ক্রন্দন ॥ ৮৫ ॥
চাহিয়া শ্রীমুখ-পানে করুণার স্বরে ।
বলে মামা কেন জড় করিলে আমারে ॥ ৮৬ ॥
বুঝাইয়া প্রভু তায় করিলেন শান্ত ।
বলিলেন কালে হবে এবে হও ক্ষান্ত ॥ ৮৭ ॥
ভাবানন্দ নষ্ট হেতু হৃদু ক্ষুণ্ণ-মন ।
গম্ভীর গম্ভীর ভাব কেমন কেমন ॥ ৮৮ ॥
তার সঙ্গে অভিমান উদয় অন্তরে ।
ভাবিল আনিব ভাব সাধনার জোরে ॥ ৮৯ ॥
এত বলি আরম্ভিল সাধন-ভজন ।
পঞ্চবট-মূলে কৈল স্থান নিরূপণ ॥ ৯০ ॥
প্রভুর সাধনাসন ছিল যেই স্থলে ।
সচৈতন্য সিদ্ধভূমি তপস্যার বলে ॥ ৯১ ॥
সেই সে আসনে বসা নরে অসম্ভব ।
পীঠরক্ষা-হেতু বৃক্ষে আছেন ভৈরব ॥ ৯২ ॥
যদ্যপি কখন কেহ বসিবারে যায় ।
ভৈরব ভীষণ চক্রে তখনি খেদায় ॥ ৯৩ ॥
একদিন রাত্রিকালে হৃদূর গমন ।
আসনেতে উপবিষ্ট ধ্যানের কারণ ॥ ৯৪ ॥
আচম্বিতে অকস্মাৎ উঠিল চেঁচিয়ে ।
ওগো মামা রক্ষা কর, মোলাম পুড়িয়ে ॥ ৯৫ ॥
শুনিয়া কাতরধ্বনি শ্রীপ্রভূ ত্বরিত ।
পঞ্চবটীতলে গিয়া হৈলা উপনীত ॥ ৯৬ ॥
হৃদয় ব্যাকুল প্রাণে কহিল তাঁহারে ।
ওগো রক্ষা কর মোরে অঙ্গ গেল পুড়ে ॥ ৯৭ ॥
ধ্যানেতে বসিয়া ছিনু মুদিয়া নয়ন ।
কি জানি অলক্ষ্যে থাকি কেবা একজন ॥ ৯৮ ॥
আগুন আমার অঙ্গে দিয়াছে চালিয়ে ।
ওগো মামা, রক্ষা কর, মোলাম জ্বলিয়ে ॥ ৯৯ ॥
সকল বিদিত প্রভু তবে না তখন ।
অঙ্গস্পর্শ করি কৈলা জ্বালা নিবারণ ॥ ১০০ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন, বাক্য করি অবহেলা ।
আপুনিই আনিতেছ আপনার জ্বালা ॥ ১০১ ॥
সাধনা তোমার কেন কি কাজ সাধনে ।
সেবা কর, সব হবে আমার সেবনে ॥ ১০২ ॥
এখানে রহস্য এক শুন শুন মন ।
যার জন্য কষ্টকর দুষ্কর সাধন ॥ ১০৩ ॥
সেই ধন মুর্তিমান চক্ষের উপর ।
তথাপি সাধনা-ইচ্ছা কেন করে নর ॥ ১০৪ ॥
অপ্রত্যয় অবিশ্বাস কারণ ইহার ।
রুপা বিনা অবতারে নহে ধরিবার ॥ ১০৫ ॥
নিত্যাপেক্ষা নরলীলা দুর্বোধ্যাতিশয় ।
ঘোল খায় নিত্যসঙ্গ ভাগিনে হৃদয় ॥ ১০৬ ॥
ঈশ্বরীর মহাশক্তি দিয়ে আবরণ ।
প্রত্যক্ষ ঈশ্বরে করে প্রত্যক্ষ গোপন ॥ ১০৭ ॥
যার অঙ্গোদ্ভবা মায়া তাঁহারে ঢাকায় ।
আশ্চর্য মহিমা মহামায়ার মায়ায় ॥ ১০৮ ॥
হাকিমের চেয়ে মন পিয়াদার জোর ।
ত্রিভুবন বিমোহন মায়ায় বিভোর ॥ ১০৯ ॥
এই দেখিলেন হৃদু প্রত্যক্ষ নয়নে ।
কেবা তিনি পুনঃ তিনি কাহার ভাগিনে ॥ ১১০ ॥
উভয়ের স্বস্বরূপ দুর্লভ দর্শন ।
অদ্ভুতানন্দানুভব সব বিস্মরণ ॥ ১১১ ॥
এবে বুঝিলেন তাঁর সাধ্য কতদূর ।
তাই করা শ্রেয়ঃ যাহা কহেন ঠাকুর ॥ ১১২ ॥
মনের বিষাদ কিন্তু কিসেও না যায় ।
বিরাগ উদাসভাব কালিকা-সেবায় ॥ ১১৩ ॥
আশ্বিনে অম্বিকাপুজা দেশে গিয়া ঘরে ।
প্রবল হৃদুর ইচ্ছা উদিল অস্তরে ॥ ১১৪ ॥
শ্রীগোচরে শ্রীপ্রভুর বাসনা জানায় ।
বুঝিয়া আপন মনে সায় দিলা রায় ॥ ১১৫ ॥
হৃদুও আপন মনে বুঝিল তখন ।
প্রভুও তাহার সঙ্গে করিবে গমন ॥ ১১৬ ॥
মথুর শুনিয়া তত্ত্ব কহিল অমনি ।
বাবায় পূজায় ছেড়ে নাহি দিব আমি ॥ ১১৭ ॥
পুজায় হৃদুর ঘরে যাহা হবে ব্যয় ।
সে সকল দিব আমি ভক্তরাজ কয় ॥ ১১৮ ॥
বাবায় দিব না কিন্তু এই মোর কথা ।
হৃদয় শুনিয়া পায় হৃদয়েতে ব্যথা ॥ ১১৯ ॥
ঘটনার পুনরুক্তি করিতে অক্ষম ।
হরিষে বিষাদ-হেতু হৃদু ক্ষুণ্ণমন ॥ ১২০ ॥
তাহারে সান্তনা-বাক্যে কহেন ঠাকুর ।
কি কারণ ক্ষুন্নমন দুঃখ কর
দূর ॥ ১২১ ॥
নিত্য নিত্য তোর পুজা দেখিবার তরে ।
স্বপ্নদেহে আবির্ভাব হইব মন্দিরে ॥ ১২২ ॥
পূজার দিবস-ত্রয়ে ক্ষণের সময় ।
দেখিতে পাইবি তুই অঙ্কে কিন্তু নয় ॥ ১২৩ ॥
এত বলি উপদেশ দিলেন পুজার ।
ব্রাহ্মণ-নিয়োগে যেবা হবে তন্ত্র্রধার ॥ ১২৪ ॥
উপাসনা করিয়া মধ্যাহ্নে কেবল ।
খাবি মিছরির পানা সহ গঙ্গাজল ॥ ১২৫ ॥
যেমত কহিনু আমি করিলে এমন ।
নিশ্চয় অম্বিকা পূজা করিবে গ্রহণ ॥ ১২৬ ॥
গুনিয়া প্রভুর বাক্য হৃদুর পরান ।
ঘরে গিয়া আজ্ঞাবত করে অনুষ্ঠান ॥ ১২৭ ॥
সপ্তমী-বিহিতা পুন্দা শাল্ব করি রেতে ।
নীয়াদন-কালে হৃদু পাইল দেখিতে ॥ ১২৮ ॥
জ্যোতির্ময় যেহে প্রভুদেব রামকৃষ্ণ ।
দাড়াইয়া প্রতিমার পাশে ভাবাবিষ্ট ॥ ১২৯ ॥
এইরূপে তিন দিন ক্ষণের সময় ।
শ্রীপ্রভুর আবির্ভাব দেখিল হৃদয় ॥ ১৩০ ॥
হায়রে মানুষ-বুদ্ধি ততোধিক মন ।
দেখিয়া শুনিয়া এত না হয় চেতন ॥ ১৩১ ॥
সতত আবদ্ধ তুমি আছ মূলাধারে ।
কখন বা লিঙ্গে আর কখন উদরে ॥ ১৩২ ॥
ঘুর বনে আগমনে দুঃখ হয় দূর ।
বারে বারে উপদেশে কহিলা ঠাকুর ॥ ১৩৩ ॥
জাগ মা চৈতন্তদেবী ঘুমাও না আর ।
প্রবেশিতে দূর বনে যেহ অধিকার ॥ ১৩৪ ॥
উর মা বিশুদ্ধ পদ্মে হও অধিষ্ঠান ।
মিটারে মনের সাধ গাই লীলা-গান ॥ ১৩৫ ॥
সমাপিয়ে পুজোৎসব আপনার ঘরে ।
ফিরিয়া আসিল হৃহ প্রভুর গোচরে ॥ ১৩৬ ॥
এল গেল শীত গ্রীষ্ম যেইমত হয় ।
দারুণ বরষাগত ভীষণাতিশয় ॥ ১৩৭ ॥
আবরি দিনেশ-কারা নীরদের দল ।
তর্জন গর্জনে ঢালে অবিরত জল ॥ ১৩৮ ॥
উথলিলা ভাগীরথী গেরুয়া-বসনা ।
উন্মাদিনী-বেশ সিন্ধুসঙ্গম-বাসনা ॥ ১৩৯ ॥
অতি বেগবতী গতি কুটি দু'ফালিয়ে ।
ব্যাকুল পরানে ছুটে দুকূল ভাসায়ে ॥ ১৪০ ॥
শীতল জলের কণা করিয়া ধারণ ।
পবনের বেগে ছুটে আপনি পবন ॥ ১৪১ ॥
স্বাস্থ্যভঙ্গ জীবগণে নানা রোগ ধরে ।
কালাগত শ্রীমথুর শয্যাগত জ্বরে ॥ ১৪২ ॥
দিন দিন বৃদ্ধি পীড়া ঔষধ না যানে ।
বিকারেতে পরিণত সাত আট দিনে ॥ ১৪৩ ॥
শহরেতে যাবতীয় চিকিৎসকগণ ।
বিফল প্রয়ালে হৈল হতাশ এখন ॥ ১৪৪ ॥
স্নেহের ভাজন এত যদিও মথুর ।
দেখিবারে একদিনও না গেলা ঠাকুর ॥ ১৪৫ ॥
হৃদয় প্রেরিত নিত্য মথুরের ঘরে ।
দিনের ঘটনা তত্ত্ব আনিবার তরে ॥ ১৪৬ ॥
সময়ের সঙ্গে রোগ হয় বাড়াবাড়ি ।
ক্রমে পরে বাক্রোধ গতিহীন নাড়ী ॥ ১৪৭ ॥
তাড়াতাড়ি আত্মীয়েরা সকলেই জুটে ।
তীরস্থ করিতে যায় ল'য়ে কালীঘাটে ॥ ১৪৮ ॥
শেষদিন মথুরের হইয়া বিদিত ।
হৃদয়েও প্রভু নাহি করিলা প্রেরিত ॥ ১৪৯ ॥
অপরাহ্ণ সমাগত হইল যখন ।
দুই তিন ঘণ্টা প্রভু ভাবে নিগমন ॥ ১৫০ ॥
দক্ষিণশহরে রাখি আপন শরীর ।
জ্যোতির্ময় পথে সূক্ষ্মে হইলা হাজির ॥ ১৫১ ॥
পরান-প্রতিম ভক্তে প্রেরণ-কারণে ।
আকাঙ্ক্ষিত দেবীলোকে রথ-আরোহণে ॥ ১৫২ ॥
ভাবভঙ্গে ঠাকুরের যবে বাহ্যজ্ঞান ।
সন্ধ্যা প্রায় সমাগত যায় দিনমান ॥ ১৫৩ ॥
হৃদয়ে ডাকিয়ে তবে প্রভুদেব কন ।
শ্রীশ্রীমাতা অম্বিকার অনুচরীগণ ॥ ১৫৪ ॥
মথুরে লইয়া রথে দেবীলোকে গেল ।
শুনিয়া স্তম্ভিত হৃদু দাঁড়িয়ে রহিল ॥ ১৫৫ ॥
পুরীতে চাকরি করে কর্মচারীগণ ।
গিয়াছিল কালীঘাটে বিষন্নবদন ॥ ১৫৬ ॥
নিশীথে ফিরিয়া আসি দিল সমাচার ।
সাধের মথুর নাহি ইহলোকে আর ॥ ১৫৭ ॥
দ্বাদশবৎসরব্যাপী শ্রদ্ধা সযতনে ।
ছিল ভক্ত অনুরক্ত প্রভুর সেবনে ॥ ১৫৮ ॥
সাধিয়া লীলার কর্ম যে জন্য জনম ।
স্বস্থানে পয়ান কৈল কালিকা-ভুবন ॥ ১৫৯ ॥
মথুর হৃদয় দোঁহে নন্দিভৃঙ্গীদ্বয় ।
মথুর সেবিল অর্থে সামর্থ্যে হৃদয় ॥ ১৬০ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত শান্তির আগার ।
গাহিতে গাহিতে চল ভবসিন্ধুপার ॥ ১৬১ ॥
তৃতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীমাতাদেবীর দক্ষিণেশ্বরে আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় মাতৃদেবী জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বৈরাগ্যানুরাগাকর তম-বিনাশন ।
বিশ্বাস-প্রত্যয়-ভক্তি-শান্তি-নিকেতন ॥ ১ ॥
ভবসিন্ধু তরিবারে অপরূপ ভেলা ।
শ্রবণ কীর্তন রামকৃষ্ণ-মহালীলা ॥ ২ ॥
এবে শ্রীশ্রীমাতাদেবী পিতার আলয়ে ।
বয়স সতর ছাড়ি গিয়াছে এগিয়ে ॥ ৩ ॥
যে গ্রামে জন্মিলা মাতাদেবী ঠাকুরানী ।
পুণ্যময়ী লীলা তীর্থধামে তারে গণি ॥ ৪ ॥
শ্রীপ্রভুর পদরেণু বিকীর্ণ যেখানে ।
বিধাতার সুদুর্লভ তপস্যা-সাধনে ॥ ৫ ॥
অন্তরঙ্গ শ্রীপ্রভুর ভক্তগণ যেথা ।
ভক্তিসহ বারে বারে লুটাইল মাথা ॥ ৬ ॥
কিন্তু কি অবাক কাণ্ড বুঝিতে না পারি ।
এখানের লোকজন আবদ্ধ সংসারী ॥ ৭ ॥
বিষয়েই বদ্ধদৃষ্টি বিভোর তাহায় ।
পরচর্চা দ্বেষবাদ কেবল কথায় ॥ ৮ ॥
ঈশ্বরীয় তত্ত্ব কিবা শাস্ত্র-আলোচনা ।
তাহাদের ঠিকুজিতে যেন আছে মানা ॥ ৯ ॥
ভক্তিভক্ত মতিপথে বুদ্ধি বিচলিত ।
শ্রীকামারপুকুরের ঠিক বিপরীত ॥ ১০ ॥
এদেশ ওদেশ নয় সন্নিকট স্থান ।
ক্রোশেক কেবলমাত্র মধ্যে ব্যবধান ॥ ১১ ॥
প্রভুতে বিশ্বাসভক্তি উপহাসকথা ।
যেন কয় শুনে হয় হৃদয়েতে ব্যথা ॥ ১২ ॥
পল্লীবাসী পুরুষেরা আর যত মেয়ে ।
উন্মত্ত পাগল প্রভু রেখেছে বুঝিয়ে ॥ ১৩ ॥
শ-কার ব-কার কয় জল্পনার কালে ।
শুনিয়া মায়ের প্রাণ দুঃখানলে জ্বলে ॥ ১৪ ॥
জননী বয়স্কা এবে বিচিন্তিতমনা ।
মনে মনে আপনার করেন ভাবনা ॥ ১৯ ॥
আগে তাঁরে দেখিয়াছি মনের মতন ।
সত্য কি এখন তিনি নাহিক তেমন ॥ ২০ ॥
যদ্যপি তাহাই হয় ইচ্ছায় ধাতার ।
এখানে বসতি নহে কর্তব্য আমার ॥ ২১ ॥
পাশেতে থাকিয়া তাঁর সেবিব চরণ ।
যাঁহার জন্যেতে জন্ম শরীর-ধারণ ॥ ২২ ॥
মনের বাসনা তাঁর রহে মনে মনে ।
লজ্জা অসুবিধা হেতু সরে না বচনে ॥ ২৩ ॥
সুযোগ সুবিধা এক হয় সংঘটন ।
স্বদেশবাসিনী বহু রমণীর গণ ॥ ২৪ ॥
জাহ্নবীতে স্নানহেতু আসিবে হেথায় ।
বর্ষপরে শুভযোগ দোল পূর্ণিমায় ॥ ২৫ ॥
শুনি তা সবারে কন মাতাঠাকুরানী ।
তিনিও জাহ্নবীস্নানে হবেন সঙ্গিনী ॥ ২৬ ॥
অনুমতিহেতু তারা তাঁহার পিতার ।
জিজ্ঞাসা করিল যদি যেন তিনি সায় ॥ ২৭ ॥
মুখুয্যে শ্রীরামচন্দ্র জনকের নাম ।
সংসার-ব্যাপারে বিজ্ঞ ভারি বুদ্ধিমান ॥ ২৮ ॥
নন্দিনীর মনোভাব বুঝিয়া অন্তরে ।
আপনিই চলিলেন সঙ্গে ল'য়ে তাঁরে ॥ ২৯ ॥
অতিশয় কষ্টকর জাহ্নবীতে স্নান ।
চারি দিবসের পথ মধ্যে ব্যবধান ॥ ৩০ ॥
একদিন দুইদিন তিনদিন গেল ।
চতুর্থে পথের মধ্যে বিপদ ঘটিল ॥ ৩১ ॥
অটনে অভ্যাস নাই দেহ বলহীন ।
তাহে অতি পথশ্রমে গত তিন দিন ॥ ৩২ ॥
চলিতে অক্ষম মাতা শরীর কাতর ।
উদয় হইল অঙ্গে ভয়ঙ্কর জ্বর ॥ ৩৩ ॥
ঘটনায় পিতা তাঁর বিপন্নাতিশয় ।
বিশ্রামের তরে লহে চটিতে আশ্রয় ॥ ৩৪ ॥
মাতাও নিমগ্ন হেথা বিষাদ-সাগরে ।
সংজ্ঞাহীন শয্যাগত নিদারুণ জ্বরে ॥ ৩৫ ॥
মনে ঐকান্তিক চিন্তা অত্যন্ত ভাবনা ।
শ্রীপদ-সেবনে সাধ আছিল বাসনা ॥ ৩৬ ॥
বিধি-বিড়ম্বনহেতু পুরিল না আর ।
কপালের দোষে, দোষ নহে বিধাতার ॥ ৩৭ ॥
হেন কালে হৈল এক অপূর্ব ঘটন ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃত কথন ॥ ৩৮ ॥
বেহুঁশ হইয়া মাতা যখন পড়িয়ে ।
আসিয়া পাশেতে তাঁর বসে এক মেয়ে ॥ ৩৯ ॥
গায়ের বরন কালো রূপে নিরুপম ।
অশ্রুত অদৃষ্টপূর্ব সুন্দর এমন ॥ ৪০ ॥
শীতল শ্রীকর-স্পর্শ গায়ে বুলাইয়ে ।
সেবা করিছেন মার পাশেতে বসিয়ে ॥ ৪১ ॥
নেহারিয়া মাতা তাঁরে করিলা জিজ্ঞাসা ।
তোমার কোথা হোতে হইয়াছে আসা ॥ ৪২ ॥
তনুত্তরে কালো মেয়ে কহিলা মাতায় ।
দক্ষিণশহর থেকে আইনু হেথায় ॥ ৪৩ ॥
অবাক হইয়া মাতা আর বার কন ।
আমারও যাইতে সেথা ছিল বড় মন ॥ ৪৪ ॥
সেবিব চরণ তাঁয় দেখিব নয়নে ।
মনের বাসনা সাধ রয়ে গেল মনে ॥ ৪৫ ॥
মাতা কহে বটে ঘটে তুমি মোর কে ।
কালো মেয়ে কহে আমি ভগিনী সম্পর্কে ॥ ৪৬ ॥
আটকে রেখেছি তাঁরে তোমার কারণে ।
তুমিও আরোগ্য হ'য়ে যাবে সেইখানে ॥ ৪৭ ॥
এইরূপে দুইজনে কথোপকথন ।
ক্রমে পরে শ্রীমাতার নিদ্রা-আকর্ষণ ॥ ৪৮ ॥
মুখুয্যে উঠিয়া প্রাতে দেখিল মাতার ।
ছাড়িয়া গিয়াছে জ্বর গায়ে নাহি আর ॥ ৪৯ ॥
চলিতে আরম্ভ কৈলা চটিতে না থাকি ।
শেষপ্রায় আর অতি অল্প পথ বাকি ॥ ৫০ ॥
সেদিনও স্বল্প জ্বর হইল উদয় ।
প্রবল পূর্বের মত আজি কিন্তু নয় ॥ ৫১ ॥
কষ্টেসৃষ্টে রাত্রিকালে নয় ঘটিকায় ।
উপনীত প্রভুদেব বিরাজে যেথায় ॥ ৫২ ॥
অকস্মাৎ সমাগতা পীড়ায় কাতর ।
দেখিয়া হইল প্রভু উদ্বিগ্ন-অন্তর ॥ ৫৩ ॥
আপন আবাস-গৃহে স্বতন্ত্র শয্যায় ।
পরম যতন-ভরে রাখিলেন তাঁর ॥ ৫৪ ॥
মথুরের সেবা যত্ন স্মরণ করিয়ে ।
কহিলেন প্রভুদেব মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ৫৫ ॥
এতদিন পরে তুমি আইলে যেখায় ।
আর কি মথুর আছে দেখিবে তোমায় ॥ ৫৬ ॥
রীতিমত চিকিৎসা ও পথ্যাদির গুণে ।
আরোগ্য হইলা মাতা তিন-চারি দিনে ॥ ৫৭ ॥
দেখি
তবে প্রভুদেব তাঁর সুস্থাবস্থা ।
করিলেন স্বতন্তরে বাসের ব্যবস্থা ॥ ৫৮ ॥
নহবৎঘরে যেথা আই ঠাকুরানী ।
তাঁর কাছে এক সঙ্গে রহিলা জননী ॥ ৫৯ ॥
তৃতীয় খণ্ড
ষোড়শীপূজা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় মাতৃদেবী জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুনিলে পবিত্র চিত,
রামকৃষ্ণ-লীলাগীত,
সুললিত
সুধার সমান ।
ভয়ারণ্য-দাবানলে, লীলা-সংকীর্তন ফলে,
অবহেলে
মিলে পরিত্রাণ ॥ ১ ॥
দুর্বলে উপজে শক্তি, অষ্টপাশে পায় যুক্তি,
মিলে
ভক্তি মহারত্ন-ধন ।
জাগে কুণ্ডলিনী সুপ্ত, মূলাধারে দ্বার মুক্ত,
সমুদিত
চৈতন্য-তপন ॥ ২ ॥
অধঃবায়ু হয় উর্ধ্ব, বিকশিত
হৃদিপদ্ম,
প্রতিঘাতে
মন মত্ত উঠে পরিমল ।
নয়নের শক্তি বৃদ্ধি, নিরমল
মন-বুদ্ধি,
চিত্তশুদ্ধি তপস্যার ফল ॥ ৩ ॥
এ অতি গম্ভীর লীলে, স্রোত বহে অন্তঃশীলে,
বাহু
চক্ষে মরুর আকার ।
না হইলে শুদ্ধ চিত্ত, এ লীলার সারতত্ত্ব,
বোধগম্য
নহে হইবার ॥ ৪ ॥
আধ্যাত্মিকে লীলাখেলা, বাক্যে নাহি যায় খোলা,
লীলা-রাজ্য বিমানে বিমানে ।
দেখে কানা, বলে মূক,
অন্তরে গম্ভীরে সুখ,
বদ্ধ-মুখ
হয় সে কারণে ॥ ৫ ॥
লীলার গোসাঞি যিনি, যাদুকর-শিরোমণি,
নিরক্ষর দীনতার বেশ ।
ভিতরে প্রতিভা-ছটা,
সলজ্জ দর্শন-ছটা,
পরাজিত
যোগেশ মহেশ ॥ ৬ ॥
যেখানে লীলার বাতি, দিনে তথা ঘোরা রাতি,
ফুটে ভাতি
দেশ-দেশান্তরে ।
সঙ্গীদের অঙ্গ ঢাকা, মণি যেন কাদামাখা,
স্বরূপত
সাধ্য কার ধরে ॥ ৭ ॥
লীলার সহায়া যিনি, শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী,
মায়াম্বরে
ঢাকা, চেনা ভার ।
যেখানে হইল জন্ম, সেথা যেন জন্ম জন্ম,
দিনে রেতে
দ্বারুণ-আঁধার ॥ ৮ ॥
বিধি বিপরীত ওমা, পূর্ণিমার ঘোর ক্ষমা,
বিজলি
প্রতিমা মেঘে ঢাকে ।
কনকে কালির বর্ণ, জনাকীর্ণে
মহারণ্য,
বলিহারি
লীলাময়ী মাকে ॥ ৯ ॥
ধরা যেত সসাগরা, স্বতঃ মাতা মায়াম্বরা,
তন্ত্রপরি
দারুণাবরণ ।
কেবল প্রভুর চেনা, কালাকালে জানাশুনা,
শুন কহি
অমৃত কথন ॥ ১০ ॥
শ্রীপ্রভু লীলার স্বামী, সঙ্গে
মাতাঠাকুরানী,
সনাতনী
সৃষ্টির আধার ।
বিভিন্ন মাত্র ভৌতিকে, এক আত্মা আধ্যাত্মিকে,
অভ্যন্তরে
দোঁহে একাকার ॥ ১১ ॥
দৈহিক সুখ সম্বন্ধ, প্রভু
অবতারে বন্ধ,
পরিণয়
মাত্র সংস্কার ।
কি বুঝিবে বন্ধ নয়, ইষ্টজ্ঞান
পরস্পর,
কে পূজ্য
পূজক বুঝা ভার ॥ ১২ ॥
ঠাকুরে শ্রীমায়ে বিয়ে, ছার জৈব বৃদ্ধি দিয়ে,
দেখিলে
পড়িবে মহাদায় ।
শুন কহি পরিচয়, দেহে দেহে বিয়ে নয়,
পরিণয়
আত্মায় আত্মায় ॥ ১৩ ॥
শ্রীগুরু শ্রীগুরুমাতা,
লীলাকাণ্ডে অভেদাত্মা,
আকারে
গড়নে ভিন্ন জাতি ।
সৃষ্টিলীলার কারণ,
এক বস্তু দুরকম,
ভিন্ন নাম
পুরুষ প্রকৃতি ॥ ১৪ ॥
বয়স্কা এবে জননী,
সঙ্গে আই
ঠাকুরানী,
নিবসতি
দক্ষিণশহরে ।
থাকেন ভিন্ন ভবনে, স্বতন্ত্র প্রভুর সনে,
এই
কালী-পুরীর ভিতরে ॥ ১৫ ॥
এখন কখন কভু,
ভাবাপন্ন হয়ে প্রভু,
বেশ ভূষা
করিয়া ধারণ ।
প্রবেশি শ্যামা-মন্দিরে, চামর লইয়া করে,
করিতেন
শ্যামায় ব্যজন ॥ ১৬ ॥
সখী ভাব এলে গায়,
বলিতেন গুরুমায়,
সাজাইয়া
দিতে সখীবেশে ।
মাতা কুতূহল হয়ে, বসন কাঁচলি দিয়ে,
সাজায়ে
দিতেন পরমেশে ॥ ১৭ ॥
অঙ্গে শোভে আভরণ,
ধীরে ধীরে আগমন,
শ্রীমন্দিরে প্রতিমা যেথায় ।
ভাবের আবেশে মত্ত,
আচরণ কত মত,
বিশেষিয়া
কহা নাহি যায় ॥ ১৮ ॥
এবে তাহা তিয়াগিয়ে,
মূর্তিমতী
গুরুমায়ে,
পুজিতে
প্রভুর হৈল মন ।
যথা বিধি উপচার, আজ্ঞা হইল তাহার,
করিবারে
ত্বরা আয়োজন ॥ ১৯ ॥
যখন যা ইচ্ছা আসে, জুটে তাহা
অনায়াসে,
ইচ্ছাময়
প্রভুর ইচ্ছায় ।
আয়োজন পরিপাটি, অণুমাত্র নাই ত্রুটি,
যাহা লাগে
যোড়শীপুজায় ॥ ২০ ॥
লইলেন তার সনে,
পূর্ব সাধনভজনে,
ব্যবহৃত
যাহা ছিল তোলা ।
বস্ত্র বিবিধ বরন,
সাজসজ্জা আভরণ,
সগোমুখী
রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ২১ ॥
বিল্বপত্রে নিজ নাম,
সাদরে
শ্রীগুণধাম,
লিখিয়া
লইলা হাতে তুলি ।
সর্বদ্রব্য সহযোগে, মায়ের চরণ আগে,
ভক্তিভরে
দিলেন অঞ্জলি ॥ ২২ ॥
বলিলেন বারবার,
যাগযজ্ঞ তপাচার,
সাধন ভজন
সমুদায় ।
করম-কাণ্ডের মালা, আজ হৈল শেষ খেলা,
সকল
সঁপিনু দুটি পায় ॥ ২৩ ॥
পূজার সময় হেথা,
সুস্থির নীরবে মাতা,
মহাপূজা
করিলা গ্রহণ ।
দেহখানি জড়প্রায়, বাহ্য চেষ্টা নাহি গায়,
মৃত্তিকার
প্রতিমা যেমন ॥ ২৪ ॥
পূজ্য পূজকেতে দু'য়ে,
ভাবরাজ্য তিয়াগিয়ে,
ভাবাতীতে
একত্রে মিলন ।
দেহ দু'টি প'ড়ে হেথা, মিলিয়া গিয়াছে সেথা,
বিয়ের
বারতা বুঝ মন ॥ ২৫ ॥
মা না হোলে মহাশক্তি, কার হেন
গায়ে শক্তি,
লইবেন
শ্রীপ্রভুর পূজা ।
প্রভু যে পরমেশ্বর,
ব্রহ্মাবিষ্ণু
মহেশ্বর,
সর্বেশ্বর
সকলের রাজা ॥ ২৬ ॥
প্রভু সঙ্গে এইবার,
জগমাতা অবতার,
সেই
পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী ।
কৃপাময়ী কলেবরে,
করুণার ধারা করে,
শান্তিমূর্তি মঙ্গলরূপিণী ॥ ২৭ ॥
শ্যামা নহে শ্যামাসুতা,
উগ্রভাব বিবর্জিতা,
মাতৃস্নেহে পূর্ণিত আধার ।
হিতে রতা মাতৃরীত,
পরতত্ব সুবিদিত,
শিক্ষাহেতু গার্হস্থ্য আচার ॥ ২৮ ॥
এ পূজা পূজার ইতি, আর দেবদেবী
মূর্তি,
কভু না
পুজিলা পরমেশ ।
যেন পুজা শ্রীশ্রীমার, পরম চরম সার,
পরিণাম
সকলের শেষ ॥ ২৯ ॥
এ দিকে মায়ের রীতি,
প্রভুপদে
নিষ্ঠাবতী,
শ্রীপ্রভুই এক ধ্যান-জ্ঞান ।
তাঁর চিন্তা দিবানিশি, তাঁর সেবা-অভিলাষী,
প্রভু যেন
পরান পরান ॥ ৩০ ॥
বুঝ মন ইশারায়, প্রভু আর শ্রীশ্রীমায়,
রূপে
দু'হু আত্মায় অভেদ ।
হৃদে চিত্তে প্রাণে মনে,
এক ঠাঁই দুই জনে,
তিলেকেও
নাহিক বিচ্ছেদ ॥ ৩১ ॥
অমিয় পুরিত কথা, রামকৃষ্ণলীলা-গাথা,
তাহে মত্ত
মগ্ন রহ মন ।
কি কাজ অপর হলে, এক রত্নাকর তলে,
যাবতীয়
মানিক রতন ॥ ৩২ ॥
তৃতীয় খণ্ড
দেশে আগমন
জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
স্বদেশের ভক্ত যত পুরুষ-রমণী ।
সর্বদা দক্ষিণেশ্বরে করয়ে মেলানি ॥ ১ ॥
দেখিবারে গুণমণি ঠাকুর গদাই ।
উচাটন মন ঘরে স্থির থাকে নাই ॥ ২ ॥
আ মরি, কি ভালবাসা তা সবার ঘটে ।
প্রভুরে দেখিতে যায় তিন দিন হেঁটে ॥ ৩ ॥
গেঁটে নাই রৌপ্য কিংবা তাম্রখণ্ড বল ।
চাল চিড়া মুড়ি দুটি পথের সম্বল ॥ ৪ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রীতিকর ভোজ্য কিছু তায় ।
দূরান্তর মাঠে পথে ছুটে ছুটে যায় ॥ ৫ ॥
ঋতুর তাড়না গায় কিছু নাহি মানে ।
তাত বাত বৃষ্টিপাত উড়ায় বিমানে ॥ ৬ ॥
উপায়বিহীন যারা না পাইত যেতে ।
মনস্তাপানলে দগ্ধ হয় দিনে রেতে ॥ ৭ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব ভক্ত তাঁর প্রাণ ।
কেহ নহে প্রিয়তর ভক্তের সমান ॥ ৮ ॥
ভক্ত-অঙ্গে অঙ্গ তাঁর ভক্তহৃদে বাস ।
ভক্ত-হাখে চুম্বী, ভক্ত-উল্লাসে উল্লাস ॥ ৯ ॥
পিতা মাতা ভাই ভক্ত, ভক্ত সহচর ।
ভক্তে তিনি, তাঁর ভক্ত অপরে অপর ॥ ১০ ॥
তাই হ'ত মাঝে মাঝে দেশে আগমন ।
তুষিতে স্বদেশে যত ভক্তদের মন ॥ ১১ ॥
স্বদেশের ভক্তসঙ্গে মধুর ব্যাভার ।
এ সময় হৈল দেশে আসা একবার ॥ ১২ ॥
সমাচার কানে যার একবার পশে ।
উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি দেখিবারে আসে ॥ ১৩ ॥
নর নারী, ছেলে বুড়া, যুবক যুবতী ।
কিবা উচ্চবংশোদ্ভব কিবা নীচ জাতি ॥ ১৪ ॥
মানা নাই কুলবধূ ষোড়শবয়সী ।
দেখিবারে প্রভুদেব অকলঙ্ক শশী ॥ ১৫ ॥
লজ্জা ভয় প্রভুদেবে কেহ নাহি করে ।
লজ্জা ভয় ঘৃণা তাঁর দরশনে হরে ॥ ১৬ ॥
শূন্য হাত নহে, ল'য়ে যা যায় বাসনা ।
যে আসে তাহার যেন কিছু চাই আনা ॥ ১৭ ॥
প্রতিবাসী অতি খুশী নিকটস্থ গ্রামে ।
আসে যার কত শত থাকে রেতে দিনে ॥ ১৮ ॥
জীব জয় কেহ তাঁয় ভয় নাহি করে ।
পাখী এসে উড়ে বসে শ্রীঅঙ্গ উপরে ॥ ১৯ ॥
সবাকার ত্রাসনাশ প্রভু ভগবান ।
উঠিল সবার হৃদে আনন্দ-তুফান ॥ ২০ ॥
রঙ্গরসে তত্ত্বকথা হয় অনিবার ।
কিবা দিন কিবা রাতি নাহিক বিচার ॥ ২১ ॥
বহুমূল্য বারাণসী পাটের বসন ।
সোনালী রূপালী পাড় বিবিধ বরন ॥ ২২ ॥
দিয়াছেন বস্তাদরে মথুর বাঁধিয়া ।
সাজায় হৃদয় অঙ্গ তাই পরাইয়া ॥ ২৩ ॥
শ্রীকরে কেরয়া ধরা, খড়ম শ্রীপদে ।
দেখিতে না পেনু সাজ মরিলাম খেদে ॥ ২৪ ॥
কিবা মোহনিয়া মাখা শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ।
বারেক দর্শনে করে সর্বদুঃখ দূর ॥ ২৫ ॥
দুঃখ দূর কিবা কথা এত সুখ মনে ।
কি ছার পদ্মের সুখ দিনেশ-দর্শনে ॥ ২৬ ॥
শ্রীবাক্য এতহ মিঠা এত শান্তিকর ।
নাহি কিছু তুলনায় ধরণীভিতর ॥ ২৭ ॥
আনন্দে বিভোর হৃদি দেখি শুনি তাঁয় ।
আত্মহারা সে চেহারা আঁকা নাহি যায় ॥ ২৮ ॥
দীন দুঃখী যারা জেতে বাগ্দী চুয়াড় ।
ক্ষেতে খাটে ঘরে নাই খাবার যোগাড় ॥ ২৯ ॥
মাঠে থাকে গোটা দিন শ্রম অবিরাম ।
পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কপালের ঘাম ॥ ৩০ ॥
বিশ্রাম নাহিক কাজে ক্রমাগত খাটে ।
যতক্ষণ দিনেশ না বলে গিয়া পাটে ॥ ৩১ ॥
সন্ধ্যায় পাইলে মুক্তি ঘরে যাবে কোণা ।
আসিত প্রভুর কাছে শুনিবারে কথা ॥ ৩২ ॥
এত বিমোহিত হ'ত প্রভুর বচনে ।
দুপ্রহর ডাকে রাত্রি ক্লান্তি নাহি জানে ॥ ৩৩ ॥
নিজ মনে বুঝ মন কি ছিল কথায় ।
দুরদৃষ্ট কথা মিষ্ট নাহি লাগে যায় ॥ ৩৪ ॥
বিশ্ববিমোহন বাণী শুনে বিশ্ব ভুলে ।
লীলাপুষ্টিহেতু মাত্র জটিলে কুটিলে ॥ ৩৫ ॥
কি করে অবস্থা মন্দ ঘরে নাহি খেতে ।
প্রত্যুষেতে পুনরায় যেতে হবে ক্ষেতে ॥ ৩৬ ॥
সেই সে কারণে মাত্র ঘরে যেতে হয় ।
অনিচ্ছা প্রভুকে ছাড়ে না ছাড়িলে নয় ॥ ৩৭ ॥
হেথা শুন কি করেন ঠাকুর গদাই ।
এমন দয়াল আর কোথা শুনি নাই ॥ ৩৮ ॥
প্রাতে উঠি আগমন তারা যথা খাটে ।
গ্রাম থেকে বহুদূর দূরান্তর মাঠে ॥ ৩৯ ॥
শুনাতেন মিঠে মিঠে বিবিধ কথন ।
তাহাদের হয় যায় পরিতুষ্ট মন ॥ ৪০ ॥
কাক-কাকী নিকটস্থ ব'সে বৃক্ষডালে ।
উভয় উভয় প্রতি কেবা কিবা বলে ॥ ৪১ ॥
সকল শুনেন প্রভু সহাস্য বন্ধন ।
পক্ষিভাষ বুঝিবারে বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ৪২ ॥
ভাঙ্গিয়া দিতেন পুনঃ কৃষাণের দলে ।
কাক-কাকী পরস্পর কে কি কথা বলে ॥ ৪৩ ॥
কেহ কেহ কথায় বিশ্বাস এত করে ।
শুনিয়া তাঁহার কথা মুণ্ডু যায় ঘুরে ॥ ৪৪ ॥
বিশ্বাসের নামান্তর ভক্তি শ্রীপ্রভুর ।
ত্রিতাপ সন্তাপ যার জোরে হয় দূর ॥ ৪৫ ॥
নিত্যবদ্ধ একেবারে জীবন্মুক্ত হয় ।
তিলমাত্র প্রভুদেবে যে করে প্রত্যয় ॥ ৪৬ ॥
অপার সংসার-সিন্ধু বেষ্টিত বিপদ ।
প্রভুতে বিশ্বাস যার তাহার গোষ্পদ ॥ ৪৭ ॥
বিশ্বাসে শ্রীপ্রভু মিলে অন্য হেতু নাই ।
শ্রীপদে বিশ্বাস দেহ জগৎগোসাঁই ॥ ৪৮ ॥
নাম গয়াবিষ্ণু লাহা, তামলীর জাত ।
যেই বংশে গয়াবিষ্ণু প্রভুর সেঙ্গাত ॥ ৪৯ ॥
বড় মানে গয়াবিষ্ণু প্রভু গদাধরে ।
শ্রীপদে বিশ্বাস তাঁর অটল অন্তরে ॥ ৫০ ॥
আশ্চর্য বিশ্বাস কথা শুন অতঃপর ।
একবার হৈল তাঁর তনয়ের জ্বর ॥ ৫১ ॥
বিকারসংশয়াপন্ন পরানে হতাশ ।
গোষ্ঠীবর্গ পিতামাতা পায় মহাত্রাস ॥ ৫২ ॥
নিকটে ডাক্তার কবিরাজ যত জনা ।
সমবেত দিনে রেতে প্রতিকার নানা ॥ ৫৩ ॥
সকলেই বিজ্ঞতম কেহ নহে কম ।
কেহ না করিতে পারে কিছু উপশম ॥ ৫৪ ॥
বিফল কৌশল যত সময় নিদান ।
পুত্রহেতু গঙ্গাবিষ্ণু আকুলপরান ॥ ৫৫ ॥
পরানসমান পুত্র প্রায় যায় ছেড়ে ।
কভু ভূমে গড়াগড়ি কভু মাথা খুঁড়ে ॥ ৫৬ ॥
দয়ার সাগর প্রভুদেব হেনকালে ।
উপনীত ভাবে অঙ্গ পড়ে ঢলে ঢলে ॥ ৫৭ ॥
বলিলেন নাহি দিবে বালকে ঔষধি ।
মায়ের কৃপায় হবে উপশম ব্যাধি ॥ ৫৮ ॥
যথা আজ্ঞা গঙ্গাবিষ্ণু দ্রুত ঘরে চলে ।
ঔষধ লইয়া ছুড়ে পুকুরের জলে ॥ ৫৯ ॥
দেশজুড়ে রাষ্ট্র কথা নিদান-বচন ।
যতক্ষণ শ্বাস আছে ঔষধ নিয়ম ॥ ৬০ ॥
তাহাতে বিকারযুক্ত প্রিয়তম ছেলে ।
ঔষধ অগ্রাহ্য করি কি বলেতে ফেলে ॥ ৬১ ॥
বিশ্বাস সংসারার্ণবে তরিবার তরী ।
শ্রীপদে বিশ্বাস দেহ কল্পতরু হরি ॥ ৬২ ॥
প্রভুর বচন যাহা কখন না টলে ।
দিনত্রয় মধ্যে সুস্থ হ'য়ে গেল ছেলে ॥ ৬৩ ॥
সম্পদ-বিপদ-সখা প্রভু বিশ্বপতি ।
শাস্তির ভাণ্ডার শুন রামকৃষ্ণ পুঁথি ॥ ৬৪ ॥
কিছুদিন থাকি প্রভু কামারপুকুরে ।
হৃদয়ের সঙ্গে গেলা তাহাদের ঘরে ॥ ৬৫ ॥
শিয়ড়ে হৃদুর ঘর নহে বহুদূর ।
সবে শুনে আগমন হ'য়েছে প্রভুর ॥ ৬৬ ॥
এখন নহেন আর আগেকার মত ।
যথা প্রভু তথা বহু জনাকীর্ণ হ'ত ॥ ৬৭ ॥
দরশন-আশে আসে কত লোকজন ।
বাউল বৈরাগী সাধু নানান রকম ॥ ৬৮ ॥
সংসারী যাহারা হরি-কথা ভালবাসে ।
কাতারে কাতারে থাকে শ্রীপ্রভুর পাশে ॥ ৬৯ ॥
শ্রীমুখে ঈশ্বরতত্ত্ব বারেক শুনিলে ।
এ জীবনে সাধ্য কার আর তাঁয় ভুলে ॥ ৭০ ॥
জনমনোমুগ্ধকর শ্রীমুখের ভাষ ।
যত শুনে তত উঠে অন্তরে উল্লাস ॥ ৭১ ॥
অমিয়-পূরিত কথা মহাশক্তিযোগে ।
শ্রবণবিবর দিয়া হৃদে গিয়া লাগে ॥ ৭২ ॥
মাঝে মাঝে ল'য়ে প্রভু গ্রামবাসিগণ ।
পথে পথে করিতেন নগর কীর্তন ॥ ৭৩ ॥
শ্রীপ্রভুর ভাব দেখি দু-একের হুঁশ ।
বুঝিত নহেন তিনি সামান্য মানুষ ॥ ৭৪ ॥
ভক্তিহীন অধিকাংশ তবু যতক্ষণ ।
হরি-কথা তাঁর মুখে করিত শ্রবণ ॥ ৭৫ ॥
বিমোহিত থাকিতেন আনন্দ অন্তরে ।
তথাপি বিশ্বাস-ভক্তি কেহ নাহি করে ॥ ৭৬ ॥
না দেখিলে মানুষেতে ঐশ্বর্য-ব্যাপার ।
কখন না হয় হৃদে বিশ্বাস-সঞ্চার ॥ ৭৭ ॥
অলৌকিক অধিক কতই দেখে লোকে ।
তথাপি যেমন তেন কিছু না চমকে ॥ ৭৮ ॥
কি ঘটিল শুন হন ঐশ্বর্য-আখ্যান ।
খানাকুল গণ্ডগ্রাম সুপ্রসিদ্ধ স্থান ॥ ৭৯ ॥
শত শত শাস্ত্রবিৎ জনের আকর ।
সুবিদিত সর্বলোকে দিগ্ দিগন্তর ॥ ৮০ ॥
এ সময় কয়জন পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ।
কার্য উপলক্ষে করে শিয়ড়ে গমন ॥ ৮১ ॥
একদিন শ্রী প্রভু-সনে দেখা শুনা ।
কথায় কথায় হয় শাস্ত্র-আলাপনা ॥ ৮২ ॥
শিরড়ীয় যতজন তর্কদ্বন্দ্ব শুনে ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিবাদ সিংহের বিক্রমে ॥ ৮৩ ॥
সুগূঢ় যে তত্ত্ব নাহি আইসে ব্যাখ্যায় ।
বুঝান শ্রীপ্রভু হেন সরল ভাষায় ॥ ৮৪ ॥
শত শত সরল উপমা-সহকারে ।
সুমূর্খ যে শুনে সেও বুঝিবারে পারে ॥ ৮৫ ॥
যে তত্ত্ব সুগুপ্ত মহাতিমিরাবরণে ।
উজ্জ্বল দিনের মত উপমাকিরণে ॥ ৮৬ ॥
প্রভুর শ্রীবাক্যে জ্যোতি নহে বলিবার ।
উদয় যথায় কভু না থাকে আঁধার ॥ ৮৭ ॥
শ্রীবাক্যে আছিল তাঁর এতদূর বল ।
তিলাধারে ধরে শুনে সাগরের জল ॥ ৮৮ ॥
হীন হেয় শির যার প্রভুর কৃপায় ।
সুগুঢ় ঈশ্বর তত্ত্ব হেসে বুঝে যায় ॥ ৮৯ ॥
প্রভুসনে পণ্ডিতেরা কহি শাস্ত্রকথা ।
বুঝিল যাহার নাহি জানিত বারতা ॥ ৯০ ॥
আশ্চর্য মানিয়া করে বাক্য-সংবরণ ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা মধুর কথন ॥ ৯১ ॥
শিয়ড়ীয়া প্রভুদেবে নিরক্ষর জানে ।
পণ্ডিতেরে পরাভব করিলা কেমনে ॥ ৯২ ॥
দেখিয়া বিস্ময় মানে আশ্চর্য ব্যাপার ।
তথাপি না হয় হৃদে বিশ্বাস-সঞ্চার ॥ ৯৩ ॥
অধিকাংশ লোকের নিকটে অপ্রকাশ ।
দু-এক লোকের মাত্র প্রভুতে বিশ্বাস ॥ ৯৪ ॥
নফর মুখুয্যে নাম মান্য একজন ।
গ্রামেতে বসতি ভক্তি ঘটে বিলক্ষণ ॥ ৯৫ ॥
সেখানে নাহিক কেহ তাঁহার সমান ।
প্রভুতে আছিল তাঁর ইষ্টদেবজ্ঞান ॥ ৯৬ ॥
বড়ই গোপন প্রভু রাখিলা তথার ।
এবে শুন লোকজনে করে হায় হায় ॥ ৯৭ ॥
অপরের কিবা কথা হৃদুও না জানে ।
কেবা মামা গদাধর সে কার ভাগিনে ॥ ৯৮ ॥
যেমন
উজান-ভাঁটা গঙ্গার সলিলে ।
এই কানেকান এই বয় গর্ভতলে ॥ ৯৯ ॥
জ্বলন্ত মহিমা কত হৃদয়ে দেখান ।
তথাপি বিশ্বাস নাহি চলে একটান ॥ ১০০ ॥
এ মামা যে চাঁদা মামা, মামা সকলের ।
কখন বুঝেন হৃদু কভু লাগে ফের ॥ ১০১ ॥
ভালবাসে প্রভুদেবে সেবে সযতনে ।
অদ্যাবধি হেন সেবা কেহ নাহি জানে ॥ ১০২ ॥
প্রভুর যখন যাহা সেবা ইচ্ছা যায় ।
সব কর্ম রাখি হৃদু সর্বাগ্রে যোগায় ॥ ১০৩ ॥
মধুর ভক্তির কথা নারিনু বুঝিতে ।
ভক্তি দিয়া বন্ধ প্রভু ভকতের হাতে ॥ ১০৪ ॥
ভক্ত-মনোমত কার্য ভক্তের কথায় ।
অসংখ্য প্রণাম করি হৃদয়ের পায় ॥ ১০৫ ॥
প্রভুর অপার কৃপা হৃদুর উপরে ।
তা না হ'লে তাঁর সেবা সাধ্য কার করে ॥ ১০৬ ॥
কার ঘরে আপুনি থাকেন বিদ্যমান ।
পিতামাতা বিধির বিধাতা ভগবান ॥ ১০৭ ॥
হৃদয়ে ঐশ্বর্য কত শ্রীপ্রভু দেখান ।
শুন হনুদত্ত কচি কুমুড়া-আখ্যান ॥ ১০৮ ॥
একদিন প্রভুদেব হৃদয়েরে কন ।
কচি কুমুড়ার আমি খাইব ব্যঞ্জন ॥ ১০৯ ॥
কচি কচি কুমুড়া না মিলে সে সময়ে ।
অকালের ফল সুদুর্লভ পাড়াগাঁয়ে ॥ ১১০ ॥
যেমন শ্রীআজ্ঞা করিলেন গুণধাম ।
অমনি হৃদয় চলে সঙ্গে রাজারাম ॥ ১১১ ॥
রাজারাম হৃদয়ের ছোট সহোদর ।
কুমুড়ার অন্বেষণে ফিরে ঘর ঘর ॥ ১১২ ॥
সঙ্গে আর অন্যজন সম্ভ্রান্ত গ্রামের ।
প্রতিবাসী মধ্যে তাঁর প্রতিপত্তি ঢের ॥ ১১৩ ॥
যে কোন কারণে প্রভুদেবে যেবা টানে ।
না হোক অধিক মাত্র তিল পরিমাণে ॥ ১১৪ ॥
তার সম ভাগ্যবান নহে কোন জন ।
ধন্য ধন্য জন্ম তাঁর সার্থক জীবন ॥ ১১৫ ॥
প্রভুসেবা প্রভুধ্যান প্রভুর ধারণা ।
লইয়া মানবজন্ম যাহার হ'ল না ॥ ১১৬ ॥
বিড়ম্বনা মাত্র প্রাণ অপদার্থ ছার ।
বিষয়ে আবদ্ধ জীব কেবল ঘৃণার ॥ ১১৭ ॥
কখন নাহিক তার দৃষ্টি উচ্চদিকে ।
উঠু ডুবু নিরন্তর নরকের দিকে ॥ ১১৮ ॥
সসাগরা ধরা সহ স্বর্ণসিংহাসন ।
পরিপূর্ণ কোষাগার মানিক রতন ॥ ১১৯ ॥
অতুল সম্পদ খ্যাতি যশের পতাকা ।
একছত্রে অধিকার ধরণীর একা ॥ ১২০ ॥
ইন্দ্র কিংবা ব্রহ্মপ্রস্থে প্রভুত্ব-স্থাপন ।
নিরন্তর যুক্তকর দেববেবীগণ ॥ ১২১ ॥
কিংবা গায় মহাবল না হয় প্রকাশ ।
স্বর্গ মর্ত্য রসাতল দেখে পায় ত্রাস ॥ ১২২ ॥
পদস্থ কিঙ্কর যম আজ্ঞাবহ থাকে ।
প্রবল হৃদয়ে তুলে পলকে পলকে ॥ ১২৩ ॥
কিংবা শ্রুতিকণ্ঠ হেন কণ্ঠ অগ্রে যার ।
মহাগুরু চারি বেদ বিদ্যার ভাণ্ডার ॥ ১২৪ ॥
শ্বেতাম্বুজ-বিহারিণী তাঁর
পুত্রপ্রায় ।
হীনপ্রভ দ্বিগ্বিজয়ী বিদ্যার ছটায় ॥ ১২৫ ॥
বিভূতি-প্রসূত যত ঐশ্বর্য উদ্ভব ।
প্রভু অবতারে এবে সুলভ সে সব ॥ ১২৬ ॥
বরষার বারিসম যেথা সেথা স্থিতি ।
একমাত্র সুদুর্লভ প্রভুসেবা মতি ॥ ১২৭ ॥
প্রভুসেবা সারকর্ম, কর্মে পড়ে ফাঁস ।
চরম বাসনা প্রভুসেবা অভিলাষ ॥ ১২৮ ॥
সেবাস্বাদ একবার হ'লে আস্বাদন ।
নিশ্চয় সে বুঝে সেবা কর্মের চরম ॥ ১২৯ ॥
সেবা বিনা অন্য কর্ম নাহি ভাল লাগে ।
আন কর্ম হয় লোপ সেবা-অনুরাগে ॥ ১৩০ ॥
প্রভুসেবা কিবা কর্ম বলিবার নয় ।
এক কর্মে করে যত অন্য কর্ম ক্ষয় ॥ ১৩১ ॥
আয়োজিলে অন্য কর্ম তাহে আন ফল ।
কাঠের ঘর্ষণে যেন জন্মে দাবানল ॥ ১৩২ ॥
বিষ-উদ্গীরণ যেন বাসুকিবর্ষণে ।
নালা কেটে বন্যাজল ঘরে টেনে আনে ॥ ১৩৩ ॥
এক কর্মে করে কোটি কর্মের সূচনা ।
আসে যার করে নাই করমের সীমা ॥ ১৩৪ ॥
কিন্তু প্রভুসেবাকর্মে বুঝ ফলে কিবা ।
চরণসেবনফল শ্রীচরণসেবা ॥ ১৩৫ ॥
স্বার্থে কিংবা স্বার্থশূন্যে সেবা-আচরণ ।
যেই জন করে তাঁর সার্থক জীবন ॥ ১৩৬ ॥
ধন্য ধন্য মহাধন্য হৃদু রাজারাম ।
কুমুড়ার অন্বেষণে ভ্রমে গোটা গ্রাম ॥ ১৩৭ ॥
পাতি পাতি করিয়া খুঁজিতে শেষকালে ।
দেখিল ফলের গাছ অনেকের চালে ॥ ১৩৮ ॥
নীচবংশোদ্ভবা সেই আবাস-স্বামিনী ।
কিবা জাতি কিবা নাম কিছু নাহি জানি ॥ ১৩৯ ॥
গাছে আছে এক ফল যেন প্রয়োজন ।
পুষ্টশস্য নহে, কচি সবুজ বরন ॥ ১৪০ ॥
অতি তুষ্টমন হৃদু ফল দেখি গাছে ।
মিষ্টভাবে কুমুড়াটি স্বামিনীরে যাচে ॥ ১৪১ ॥
পণ কিবা বিনা পণে যেন রুচি তার ।
কচি হেতু দিতে নাহি করিল স্বীকার ॥ ১৪২ ॥
যত জেদ করে হৃদু মাগী তত বাঁকা ।
বলে বড় হ'লে পরে দিব এক ফাঁকা ॥ ১৪৩ ॥
উপায়বিহীন হৃদু যায় স্থানান্তরে ।
যদি অন্য স্থানে মিলে অপরের ঘরে ॥ ১৪৪ ॥
সম্মুখে সামান্য মাঠ পার হ'য়ে যেতে ।
শুন কি অদ্ভুত কাণ্ড ঘ'টে গেল পথে ॥ ১৪৫ ॥
ধীরে ধীরে চলে হৃদু চিন্তায় মগন ।
মধ্যমাঠে অকস্মাৎ আশ্চর্য কথন ॥ ১৪৬ ॥
মুখপোড়া হনু এক গায়ে মহাবল ।
পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটে হাতে কচি ফল ॥ ১৪৭ ॥
বিকল-পরান যেন হতশ্বাস-প্রায় ।
সম্মুখে কুমুড়া রাখি অন্যত্রে পালায় ॥ ১৪৮ ॥
হৃদয় বিস্ময়ে ফল তুলে লয় হাতে ।
অদৃশ্য হইল হনু দেখিতে দেখিতে ॥ ১৪৯ ॥
কথায় কথায় পরে খবর পাইল ।
এটি সেই ফল, যাহা মাগী নাহি দিল ॥ ১৫০ ॥
জয় জয় প্রভুদেব অযোধ্যা-ঈশ্বর ।
জয় জয় কপিবেশী ভকত-প্রবর ॥ ১৫১ ॥
জয় দুই সহোদর হৃদু রাজারাম ।
অধম কাতরে যাচে দেহ চক্ষুদান ॥ ১৫২ ॥
যত অবতারে লীলা করিলা গোসাঁই ।
সবার আভাস এই অবতারে পাই ॥ ১৫৩ ॥
দিনকরে ধরে যেন যাবৎ বরন ।
প্রভু-অবতারে দেখি প্রকৃত তেমন ॥ ১৫৪ ॥
ভক্তগণ নানাদিকে নানান আকারে ।
আঁখিতে দেখিতে লীলা বুদ্ধি বল ছাড়ে ॥ ১৫৫ ॥
চেনা দায় কে কোথায় প্রভুর সেবনে ।
ছদ্মবেশী দিবানিশি ভ্রমে স্থানে স্থানে ॥ ১৫৬ ॥
দেহ সৎবুদ্ধি মুক্ত আঁখি ভগবান ।
ভক্ত-অপরাধে যাহে পাইব এড়ান ॥ ১৫৭ ॥
পুলক অন্তরে হেখা দুই সহোদর ।
লইয়া কুমুড়া কচি উতরিল ঘর ॥ ১৫৮ ॥
যাদু করে যেবা তার সঙ্গে যেবা থাকে ।
অদ্ভুত যেই যাদু অপরের চোখে ॥ ১৫৯ ॥
দেখিবারে সে কখন নাহি হয় রাজী ।
মনে ভাবে কি দেখিব এ ঘরের বাজি ॥ ১৬০ ॥
তেমতি প্রকৃত সহোদর দুই জনে ।
প্রভুর মহিমা দেখি বিস্ময় না মানে ॥ ১৬১ ॥
অপরের মুখে কথা বহুদূর ছুটে ।
প্রতাপ হাজরা এক এ সময় জুটে ॥ ১৬২ ॥
সন্নিকটে মড়াগেড়ে নামে ক্ষুদ্র গ্রাম ।
হাজরার ঘর তথা সদ্গোপ-সন্তান ॥ ১৬৩ ॥
নাটকের মধ্যে যেন বিদূষক প্রায় ।
তেমনি প্রতাপচন্দ্র প্রভুর লীলায় ॥ ১৬৪ ॥
বিশুদ্ধ হৃদয় নাহি বিশ্বাসের গন্ধ ।
দিনমানে পদে পদে আঁধারের সন্দ ॥ ১৬৫ ॥
জেতে চাষা ক্ষেতে খাটে খাবার বাসনা ।
না চায় যদ্যপি তার দেয় কোন জনা ॥ ১৬৬ ॥
পরমদয়াল বন্ধু অনায়াসে ঘরে ।
ষোলআনা ফসল যতন সহকারে ॥ ১৬৭ ॥
তার সঙ্গে প্রভুর রগড় অতিশয় ।
সময়ে গাইব সবিশেষ পরিচয় ॥ ১৬৮ ॥
প্রভুদেব খেলা কৈলা সহিতে যাহার ।
যে হউন সে হউন প্রণম্য আমার ॥ ১৬৯ ॥
হাজরা যুবক-বয়ঃ প্রভুদরশনে ।
ছুটিয়া ছুটিয়া আসে হৃদুর ভবনে ॥ ১৭০ ॥
বাল্যাবধি হরিপদে ছিল তাঁর মন ।
ডাকে তাঁর নাহি পায় তাঁর অন্বেষণ ॥ ১৭১ ॥
সেই হেতু একদিন প্রভুরে জিজ্ঞাসে ।
হরির যে আছে কান জানা যায় কিসে ॥ ১৭২ ॥
এত ডাকাডাকি করি নাহি পাই সাড়া ।
ভাবিয়া না পারি কিছু করিতে কিনারা ॥ ১৭৩ ॥
মৃদু হাসি প্রভুদেব করিলা উত্তর ।
কেন নাহি পাও সাড়া শুনহ খবর ॥ ১৭৪ ॥
ইক্ষু ক্ষেতে পুকুরের জল দিতে হ'লে ।
সিমনি লইয়া ছিঁচে কৃষাণেরা মিলে ॥ ১৭৫ ॥
নালায় নালায় জল চলে নিরন্তর ।
যে নালা পুকুর হ'তে ক্ষেত বরাবর ॥ ১৭৬ ॥
নালার মধ্যেতে যদি যোগ কোথা থাকে ।
ছোঁচা জল যত সব যায় সেই দিকে ॥ ১৭৭ ॥
মূল ক্ষেতে নাহি ভিজে এক দানা বালি ।
আগোটা পুকুর যদি ছিঁচে করে খালি ॥ ১৭৮ ॥
মধ্যপথে তেন যার ছিদ্র বিদ্যমান ।
ডাকা আর নাই-ডাকা উভয় সমান ॥ ১৭৯ ॥
পথে মারা যায় ডাক পঁহুছিতে নারে ।
যাঁহার উদ্দেশে ডাক তাঁহার গোচরে ॥ ১৮০ ॥
একি প্রভু দয়াময় উত্তর বচন ।
সম্মুখীন উভয়েতে কথোপকথন ॥ ১৮১ ॥
করিলেন উত্তর শুনিয়া তৎক্ষণে ।
তবে না পঁহুছে ডাক কহ কি কারণে ॥ ১৮২ ॥
শুনিয়া না শুন থাক বধিরের পারা ।
ধরাধরি এত তবু নাহি দাও ধরা ॥ ১৮৩ ॥
এবা কিবা বিড়ম্বনা অদৃষ্টের ফের ।
যত কাছে তত দূর নাহি পাই টের ॥ ১৮৪ ॥
মহাসোজা মহা বাঁকা বিশ্বাসবিহীনে ।
বিশ্বাস ভকতি দেহ অভয় চরণে ॥ ১৮৫ ॥
শিকলে শিকলে যেন পরস্পর টানে ।
সেইমত আসে কত প্রভুদরশনে ॥ ১৮৬ ॥
ক্রমে ক্রমে লোকের মেলানি হৃদু দেখে ।
প্রভুরে নির্জন ঘরে বন্ধ করি রাখে ॥ ১৮৭ ॥
দরশন বিনা ক্ষুণ্ণমন লোকজন ।
বসনে পাবক বাঁধা থাকে কতক্ষণ ॥ ১৮৮ ॥
শরৎ-জলদজাল আঁধার-বরন ।
বেগে যেন রেগে ঢাকে জগৎ-লোচন ॥ ১৮৯ ॥
পবনে খেদায় বাধা পর মুহূর্তেকে ।
দ্বিগুণ ছড়ায় সূর্য আপন আলোকে ॥ ১৯০ ॥
তেমতি শ্রীপ্রভু গুপ্ত থাকি কিছুক্ষণ ।
সমুদিত হইতেন যথা লোকজন ॥ ১৯১ ॥
বিতরি কিরণ-রূপা শতগুণ তেজে ।
ফুল্ল করি দর্শকের হৃদয়-সরোজে ॥ ১৯২ ॥
পূর্বপরিচিত এক মহাভাগ্যবান ।
শ্যামবাজারেতে ঘর ক্ষুদ্র পল্লীগ্রাম ॥ ১৯৩ ॥
নাম তাঁর নটবর গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
প্রভুদেবে পূজিতেন গুরুর মতন ॥ ১৯৪ ॥
চরণ-বন্দন তাঁর করি বারে বার ।
প্রভুর গমন একবার তাঁর ঘর ॥ ১৯৫ ॥
ভক্তিমান নিজে যেন আপনি ব্রাহ্মণ ।
ভবনেতে ভক্তিমতী গৃহিণী তেমন ॥ ১৯৬ ॥
ভক্তিভরে দারাসহ সেবা কৈল তাঁর ।
বড় মিষ্ট রাষ্ট্র কথা পটল ভাজার ॥ ১৯৭ ॥
পটলের ভাজি এত লেগেছিল মিঠে ।
মহাভক্ত মথুরের কানে ক্রমে উঠে ॥ ১৯৮ ॥
মথুরে বলিয়াছিলা আপনি গোসাঁই ।
মধুর এমন ভাজি কোথাও না খাই ॥ ১৯৯ ॥
কি দিয়া রাঁধিয়াছিল বামনের মেয়ে ।
তুষ্ট প্রভু রামকৃষ্ণ যে ভাজি খাইয়ে ॥ ২০০ ॥
অপুত্রক আছিলেন গোস্বামিপ্রবর ।
পুত্র-ভিক্ষা করিলেন প্রভুর গোচর ॥ ২০১ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভুদেব ভগবান ।
কৃপা করি দিলা বর হইবে সন্তান ॥ ২০২ ॥
যথাকথা প্রভুবাক্য নহে টলিবার ।
অচিরে পাইল এক সুন্দর কুমার ॥ ২০৩ ॥
সেই হেতু প্রভুপদে অটল ভকতি ।
দেশে আগমন শুনে আসে দ্রুতগতি ॥ ২০৪ ॥
একাকী নহেন সঙ্গে কীর্তনের দল ।
কৃষ্ণভক্ত তন্তুবায় তাহারা সকল ॥ ২০৫ ॥
বৈষ্ণব-আচার তাঁতী বহু সেই গ্রামে ।
বড় ভালবাসে সাধুভক্ত-দরশনে ॥ ২০৬ ॥
দেখিয়া প্রভুর মূর্তি লুটে পড়ে পায় ।
সংকীর্তনসহকারে গ্রামে ল'য়ে যায় ॥ ২০৭ ॥
প্রভুর বৈঠক হয় গোস্বামীর ঘরে ।
ভাণ্ডারা যোগায় দিন পিরীতের ভরে ॥ ২০৮ ॥
শ্রীপ্রভুর হয় ভিক্ষা গ্রামে স্থানে স্থানে ।
কত শত শত ভক্ত সেই ঠাঁই জমে ॥ ২০৯ ॥
প্রভুসহ সম্মিলনে পরাসুখ পায় ।
ছেড়ে তাঁরে ঘরে কেহ যেতে নাহি চায় ॥ ২১০ ॥
পায় মহাপ্রসাদ অবাধে পেট ভ'রে ।
দেখিয়া প্রভুর লীলা আত্মহারা করে ॥ ২১১ ॥
অবতারে ধরে ধরা অপরূপ ছবি ।
না চিনিনু সমাকার, কেবা দেব-দেবী ॥ ২১২ ॥
কেবা বৈকুণ্ঠের কেবা গোলোকের জাতি ।
কেবা কৈলাসের ধরা নরের আকৃতি ॥ ২১৩ ॥
পশু পাখী তৃণ লতা ছদ্মবেশ গায় ।
কি ভাবে কোথায় স্থিতি প্রভুর লীলায় ॥ ২১৪ ॥
খায় মহাপ্রসাদ কীর্তন সঙ্গে করে ।
না চিনি তাহারা কারা নরের আকারে ॥ ২১৫ ॥
তুলিয়া অতুলানন্দ প্রভু সেইখানে ।
ফিরিয়া আইল পুনঃ হৃদুর ভবনে ॥ ২১৬ ॥
এবারে অধিক দিন আর নহে তথা ।
হৃদয়-সহিত আসিলেন কলিকাতা ॥ ২১৭ ॥
রামকৃষ্ণ-কথা শুন অমৃত-লহরী ।
অপার সংসারসিন্ধু তরিবার তরী ॥ ২১৮ ॥
তৃতীয় খণ্ড
প্রভুদেবের সহিত শম্ভু মল্লিকের সংজোটন
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
মহালীলা শ্রীপ্রভুর অমৃত-কখন ।
ঐশ্বর্য যাবৎ এবে সব সঙ্গোপন ॥ ১ ॥
ব্যক্ত যাহা মহৈশ্বর্য হেন প্রকৃতির ।
ধরা বুঝা মানুষের অতীত বুদ্ধির ॥ ২ ॥
নিরক্ষর এবে কিন্তু সব শাস্ত্র জানা ।
যাবতীয় মতে পথে অসাধ্য সাধনা ॥ ৩ ॥
পুংদেহে প্রকৃতি ভাব বিধি বিপরীত ।
প্রবীণ বয়সে ভাসে বালক-চরিত ॥ ৪ ॥
জৈবধর্ম যাবতীয় অঙ্গে বিলিখন ।
যদিও ব্রহ্মজ্ঞ নিজে কারণ-কারণ ॥ ৫ ॥
এদিকে সংসারী পুরা সব বিদ্যমানে ।
মাতা দারা ভ্রাতুষ্পুত্র সোদর ভাগিনে ॥ ৬ ॥
পুত্র-কন্যারূপে ভক্ত হাজার হাজার ।
তথাপি সন্ন্যাসী ত্যাগী কল্পনার পার ॥ ৭ ॥
এক রূপে বিধিবদ্ধ সকল পালন ।
বার-তিথি ভালমন্দ সুক্ষণ কুক্ষণ ॥ ৮ ॥
অন্ত পক্ষে বিধিযুক্ত বিধির বিরোধ ।
অমা কি পূর্ণিমা শুভাশুভ নাহি বোধ ॥ ৯ ॥
শ্যামাগত মন-প্রাণ এদিকে আবার ।
তিল না দেখিলে মায়ে দুনিয়া আধার ॥ ১০ ॥
না জানে সকল, তিনি কেবল ছাওয়াল ।
এদিকেতে ভাবাতীত ছয়মাস কাল ॥ ১১ ॥
করু হাসে কভু কাঁধে কভু নাচে গায় ।
কখন বা ভূমিশয্যা কখন খট্টায় ॥ ১২ ॥
কখন বালক-ভাবে যুবক কখন ।
কখন পৌগণ্ডভাবে নানা আচরণ ॥ ১৩ ॥
কখন বা ত্রস্ত-চিত বালকের চেয়ে ।
কখন কেশরী ভীত বিক্রম দেখিয়ে ॥ ১৪ ॥
কভু গায় বেশভূষা কখন উলঙ্গ ।
কখন সভার মধ্যে কখন নিঃসঙ্গ ॥ ১৫ ॥
কথন বা দেহ ঘরে কখন বা নাই ।
কোথাকার কি ঠাকুর অপূর্ব গোসাঞি ॥ ১৬ ॥
অপরূপ শ্রীশ্রীদেব অতুল-প্রতিম ।
যাদৃশায় রামকৃষ্ণ তাদৃশায় নমঃ ॥ ১৭ ॥
ভক্তিভরে রাখি তাঁর পাদপদ্মে মতি ।
এক মনে শুন মন লীলার ভারতী ॥ ১৮ ॥
নানান ভাবের ভক্ত প্রভু অবতারে ।
কেহ কেহ চায় প্রভু একা ভোগিবারে ॥ ১৯ ॥
সহ ধন-জন-দারা-নন্দিনী-নন্দন ।
প্রকাশ-প্রচারে ইচ্ছা করে না কখন ॥ ২০ ॥
মথুর আছিল ভক্ত এ হেন প্রকার ।
মনোবাঞ্ছা প্রভুদেব পুরাইলা তাঁর ॥ ২১ ॥
চতুর্দশ-বর্ষ-ব্যাপী সেবিয়া প্রভুরে ।
মর্ত্যে রাখি পুণ্যতনু এবে কালীপুরে ॥ ২২ ॥
আর আর রূপ ভক্ত মধুকর জাতি ।
ফুলের সৌরভ-গন্ধ-প্রচার-প্রকৃতি ॥ ২৩ ॥
ক্রমে ক্রমে এ জাতির ভক্তগণ ফুটে ।
অপরূপ বিশ্বগন্ধ প্রভুর নিকটে ॥ ২৪ ॥
শ্রীশম্ভু মল্লিক নামে এক ভাগ্যবান ।
আসিয়া পড়িল এর প্রভু বিদ্যমান ॥ ২৫ ॥
সিন্দুরিয়াপটি পল্লী শহর ভিতর ।
সেইখানে মতিমান মল্লিকের ঘর ॥ ২৬ ॥
ভাগ্যবান যেন তেঁহ ধনবান তায় ।
আফিসে মুচ্ছুদ্দী কর্ম বহু টাকা আয় ॥ ২৭ ॥
নানাবিধ গুণরাজি হৃদয়ে বিরাজে ।
শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মার সুজন-সমাজে ॥ ২৮ ॥
উদার সরলাচার আর ভক্তিমান ।
স্বার্থশূন্যে দুঃখিগণে অকাতরে দান ॥ ২৯ ॥
ব্রাহ্মধর্ম প্রবর্তিত ধর্মপথে মতি ।
সরলতা ভাবে কিছু সাহেবী প্রকৃতি ॥ ৩০ ॥
পুরীর অনতিদূরে আছরে তাঁহার ।
দ্বিতল উত্থান বাটী অতি চমৎকার ॥ ৩১ ॥
শুভক্ষণে শ্রীপ্রভুর সঙ্গে পরিচয় ।
ঈশ্বর-সম্বন্ধে বহু কথাবার্তা হয় ॥ ৩২ ॥
মন মজানিয়া যেন ঠাকুর গোসাঞি ।
ভুবনে এমন আর কেহ কোথা নাই ॥ ৩৩ ॥
যেমন যাহার ভাব যে ভাবে যে তুই ।
যাহার যেমন রুচি যার যাহা মিষ্ট ॥ ৩৪ ॥
তাহাই প্রধান প্রভু করিয়া কৌশলে ।
আবদ্ধ করেন তাঁর স্নেহের শিকলে ॥ ৩৫ ॥
আস্বাদ পাইয়া শম্ভু প্রভুকে না ছাড়ে ।
বারবার দেখা শুনা ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৩৬ ॥
প্রভুসঙ্গগুণ কিবা কহিতে না পারি ।
অবিদ্যানুরাগী আমি আবদ্ধ সংসারী ॥ ৩৭ ॥
আধ্যাত্মিকে সমুন্নত মল্লিক যখন ।
বুঝিতে
পারিল মনে মনে বিলক্ষণ ॥ ৩৮ ॥
বিশ্বগুরু প্রভুদেব মনুষ্য আধারে ।
তাঁহারই কৃপার
মাত্র মনোবাঞ্ছা পুরে ॥ ৩৯ ॥
বসাইয়া গুরুরূপে হৃদি-সিংহাসনে ।
নিযুক্ত হইল শম্ভু
প্রভুর সেবনে ॥ ৪০ ॥
মল্লিক পণ্ডিত ভারি বহু আলোচনা ।
ইংরাজের বাইবেল ভালরূপে
জানা ॥ ৪১ ॥
প্রভু তার বিপরীত পুরা নিরক্ষর ।
কি প্রকারে যাবতীয় শাস্ত্রের ভিতর ॥ ৪২ ॥
প্রবেশিয়া সারতত্ত্ব করিলা উদ্ধৃত ।
দেখিয়া শুনিয়া শম্ভু বিস্ময়ে স্তম্ভিত ॥ ৪৩ ॥
মানুষে না পারে ইহা অসম্ভব নয়ে ।
সে হেতু প্রভুতে শম্ভু গুরুজ্ঞান করে ॥ ৪৪ ॥
দিনেকে রহস্যচ্ছলে প্রভুদেবে বলে ।
তোমার মতন রথী না দেখি ভূতলে ॥ ৪৫ ॥
নাহি
অস্ত্র-শস্ত্র নাহি চাল তরবার ।
তথাপিও তুমি শান্তিরাম সরদার ॥ ৪৬ ॥
কোনই
সম্পর্ক নাই শাস্ত্রাদির সনে ।
সারতত্ত্ব তে সবার মথিলে কেমনে ॥ ৪৭ ॥
রজোগুণাত্মক শম্ভু কর্ম ভালবাসে ।
বাসনা কেবল কর্ম পরের হিতাশে ॥ ৪৮ ॥
আশ্রম-প্রতিষ্ঠ-ইচ্ছা একান্ত প্রবল ।
যেখানে রোগি-দুঃখি-অনাথসকল ॥ ৪৯ ॥
আসিয়া আশ্রয় পার কষ্ট হয় নাশ ।
প্রভুর নিকটে করে মানস প্রকাশ ॥ ৫০ ॥
প্রভুদেব বুঝাইয়া তদুত্তরে কন ।
তুমি কি ভাবিছ ধরা সরার মতন ॥ ৫১ ॥
কি করিবে জীবহিত কি শক্তি তোমার ।
যাঁর সৃষ্টি রক্ষা-কাজে তাঁর আছে ভার ॥ ৫২ ॥
তুমি তো সকল বুঝ কি কহিব আমি ।
কর্মকামী না হইয়া হও ভক্তিকামী ॥ ৫৩ ॥
যে কর্মে ঈশ্বরলাভ মন দেহ তার ।
বিশ্বাস-প্রত্যয় ভক্তি লাভের উপায় ॥ ৫৪ ॥
সর্বাগ্রে পরমেশ্বরে কর্তব্য দর্শন ।
পশ্চাৎ করিও কর্ম যদি হয় মন ॥ ৫৫ ॥
যদি গুরু কল্পতরু আপনি ঈশ্বর ।
আসিয়া প্রত্যক্ষ হন তোমার গোচর ॥ ৫৬ ॥
কি বস্তু চাহিবে তুমি তাঁহার সকাশে ।
ভক্তি না কি সেবাশ্রম পরদুঃখ-নাশে ॥ ৫৭ ॥
ঈশ-পাদ-পদ্মে ভক্তি-বিশ্বাস-প্রত্যয় ।
এই মাত্র সারবস্তু অন্য কিছু নয় ॥ ৫৮ ॥
ভাবের আশ্রয় ধর এ তিনের বলে ।
ভাবের অভাবে কভু বস্তু নাহি মিলে ॥ ৫৯ ॥
বিশেষিয়া বিমোহিতে মল্লিকের প্রাণ ।
ধরিলেন পিককণ্ঠে প্রসাদের গান ॥ ৬০ ॥
মন কর কি তত্ত্ব তাঁরে, উন্মুক্ত আঁধার ঘরে ।
সে যে ভাবের বিষয়, ভাব ব্যতীত
অভাবে কি ধরতে পারে ॥
অগ্রে শশী বশীভূত কর তোমার শক্তিসারে ।
তোর ঘরের ভিতর চোর কুঠরি,
ভোর হলে চোর পলাবেরে ॥
ষড়দর্শনে দর্শন মিলে না, আগম-নিগম-তন্ত্রসারে ।
সে যে ভক্তি রসের রসিক,
সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ॥
সে ভাবলোভে পরম যোগী
যোগ করে যুগ-যুগান্তরে ।
কোলে সে ভাবের উদয়,
লয় সে যেন লোহাকে চুম্বক ধরে ॥
প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে ।
সেটা চত্বরে কি ভাঙ্গর হাঁড়ি,
বুঝ না রে মন ঠারে ঠোরে ॥
ভাবরাজ্যেশ্বর প্রভু ভাবের গোসাঞি ।
সঙ্গীতে শম্ভুর ভাবে করিলা পোষ্টাই ॥ ৬১ ॥
অমোঘ বচনবীজ প্রভুর আমার ।
উচ্চ হৃদয়ক্ষেত্রে পশিয়া শ্রোতার ॥ ৬২ ॥
তুলিল অঙ্কুর তাহে সহ কচি পাতা ।
পরে পরিণত তাহে ভকতির লতা ॥ ৬৩ ॥
ক্ষেত্র মধ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রভুর আসন ।
আশ্রয়-স্বরূপ লতা ধরিল চরণ ॥ ৬৪ ॥
প্রভুর সোহাগে ক্রমে লতিকা অতুল ।
প্রসব করিল
চিত্ত-বিনোদন ফুল ॥ ৬৫ ॥
সৌরভে হইয়া মত্ত মল্লিক ধীমান ।
একমাত্র প্রভুসে বা হইল
ধ্যান জ্ঞান ॥ ৬৬ ॥
পরিচয়ে এক মনে শুন তুমি মন ।
রামকৃষ্ণ-গুণগাথা অমৃত-কথন ॥ ৬৭ ॥
এখানে দক্ষিণেশ্বরে যেখানে উদ্যান ।
শহর হইতে বহুদুর ব্যবধান ॥ ৬৮ ॥
মল্লিকের যাতায়াত ছিল অশ্বযানে ।
সম্ভ্রান্ত লোকের এই ধারা বর্তমানে ॥ ৬৯ ॥
পূর্বরীতি পরিত্যক্ত মল্লিক এখন ।
পদব্রজে প্রায় করে গমনাগমন ॥ ৭০ ॥
দিনেকে শম্ভুর কোন পরিচিত জনা ।
পথিমধ্যে কহে তাঁর একি বিবেচনা ॥ ৭১ ॥
পায়ে হেঁটে এত দূর কি হেতু গমন ।
আপদ-বিপদ পথে আছে বিলক্ষণ ॥ ৭২ ॥
আরক্ত বদনে শম্ভু কয় তদুত্তরে ।
লইয়া তাঁহার নাম এসেছি বাহিরে ॥ ৭৩ ॥
বিপদ-বারণ নামে করিলে আশ্রয় ।
অকুল পাথার তর বিপদ না হয় ॥ ৭৪ ॥
পথেতে বিশ্বাস-ভক্তি ভাগ্যবানে পার ।
পরমার্থশালী শম্ভু প্রভুর কৃপায় ॥ ৭৫ ॥
শ্রীপদ-সরোজে পেয়ে ভক্তির আস্বাদ ।
দিনে দিনে বৃদ্ধি প্রভু সেবনের সাধ ॥ ৭৬ ॥
প্রভুকে লইয়া যায় উদ্যান-ভবনে ।
বিধিমতে সেবে তাঁর পরম যতনে ॥ ৭৭ ॥
শুনিয়াছি যে প্রকার যতন সেবার ।
প্রভুতে ধারণা তিনি সর্ব সারাৎসার ॥ ৭৮ ॥
এত ধনী মানী তাহে সাহেবী ধরন ।
স্বহস্তে মুছায়ে দেয় প্রভুর খড়ম ॥ ৭৯ ॥
স্বতন্ত্র বাসন-পত্র প্রভুর কারণে ।
নিজে হাতে পরিষ্কার রাখে অনুক্ষণে ॥ ৮০ ॥
আলাহিদা পায়খানা অতি পরিষ্কার ।
যেমন শয্যার ঘর উদ্যানে তাহার ॥ ৮১ ॥
যোগায় সেখানে জল আপনার হাতে ।
কখন না হয় আজ্ঞা অন্য জনে দিতে ॥ ৮২ ॥
সুমিষ্ট সুমিষ্ট ফল দুর্লভ বাজারে ।
তাই থাকে নানাবিধ সংগৃহীত ঘরে ॥ ৮৩ ॥
কতই যতন তাঁর প্রভুর উপর ।
সুন্দর কাহিনী কথা শুন অতঃপর ॥ ৮৪ ॥
একদিন প্রভুদেব অসুস্থ শরীর ।
অক্ষম না হয় শক্তি যাইতে বাহির ॥ ৮৫ ॥
মল্লিক অজ্ঞাত-বার্তা প্রভু কি কারণ ।
উদ্যান-ভবনে নাহি দেন দরশন ॥ ৮৬ ॥
প্রভু-সেবা অভিলাষী থাকিতে না পারে ।
অন্বেষণে উপনীত প্রভুর মন্দিরে ॥ ৮৭ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব ভকতপরান ।
শম্ভুকে দেখিয়া তাঁর টুটিল ব্যারাম ॥ ৮৮ ॥
তখনি উঠিয়া প্রভু মল্লিকের সনে ।
ধীরে ধীরে আগমন করিলা উদ্যানে ॥ ৮৯ ॥
সুমিষ্ট বেদানা ছিল মল্লিকের ঘরে ।
আপুনি ছাড়িয়ে দেন শ্রীপ্রভুর করে ॥ ৯০ ॥
খাইলেন প্রভুদেব যত ইচ্ছা তাঁর ।
অবশিষ্ট আলাহিদা বহে একধার ॥ ৯১ ॥
ঈশ্বর প্রসঙ্গ পরে হয় দুই জনে ।
প্রভু কন হিয়া মন ভক্তবর শুনে ॥ ৯২ ॥
পরে প্রভু বলিলেন নাই সুস্থকায় ।
আজিকার পরিচ্ছেদ এইখানে সায় ॥ ৯৩ ॥
ইতি উতি চায় শম্ভু দেখিল বেদানা ।
সঙ্গে কিছু লইবারে করিল প্রার্থনা ॥ ৯৪ ॥
আপনার জন্য আনা বেদানাসকল ।
কারে দিব কি হইবে হেন মিঠা ফল ॥ ৯৫ ॥
ভক্তবৎসল বুঝি অন্তর তাঁহার ।
লইলেন দুটি দুই হাতে আপনার ॥ ৯৬ ॥
বাহিরেতে আসিলেন ফটকাভিমুখে ।
পশ্চাৎ থাকিয়া শম্ভু দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ৯৭ ॥
যে উদ্যানে শ্রীপ্রভুর সকলই জানা ।
উচ্চ নীচ স্থান কোথা ভালরূপে চেনা ॥ ৯৮ ॥
আনাগোনা ন্যূনপক্ষে দিনে দুইবার ।
তথায় ঘটিল এক আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ৯৯ ॥
সদর দুয়ার আর চক্ষে নাহি পড়ে ।
এখানে সেখানে প্রভু ঘুরে চারিধারে ॥ ১০০ ॥
মল্লিক বুঝিতে নারে ইহার কারণ ।
ঘটনা যাবৎ কিন্তু করে নিরীক্ষণ ॥ ১০১ ॥
মনে মনে নানা চিন্তা হয় সমুদিত ।
অবশেষে শ্রীপ্রভুর কাছে উপনীত ॥ ১০২ ॥
দেখিলেন দিশাহারা পথিকের প্রায় ।
কিংবা যেন হর লোকে সিদ্ধির নেশায় ॥ ১০৩ ॥
সশঙ্কিত-চিত শম্ভু ধরি পরমেশে ।
ধীরে ধীরে ফিরাইল উদ্যান-আবাসে ॥ ১০৪ ॥
মল্লিক লইলে পরে হাতের বেগানা ।
তখন সহজাবস্থা আসিল ঠিকানা ॥ ১০৫ ॥
ত্রস্ত ব্যস্ত শম্ভু করে প্রভুকে জিজ্ঞাসা ।
আচম্বিতে কি কারণ হৈল হেন দশা ॥ ১০৬ ॥
উত্তর করিলা তাঁর প্রভু পরমেশ ।
গাঠরি না বাঁধে পাখী আর দরবেশ ॥ ১০৭ ॥
ত্যাগী দরবেশ জনে যদি ছাঁদা বাঁধে ।
নিশ্চয় পড়িতে হয় তাকে যেন ফাঁদে ॥ ১০৮ ॥
তিয়াগীর পক্ষে নহে কোনই সম্বল ।
ভ্রান্তে কি অভ্রান্তে দুয়ে সমরূপ ফল ॥ ১০৯ ॥
সম্বল থাকিলে পরে হয় লক্ষ্যহারা ।
বদ্ধদৃষ্টি ঘানিঘরে বলদের পারা ॥ ১১০ ॥
শুন মন শ্রীপ্রভুর ত্যাগের বারতা ।
এ নহে বিষয় কিংবা বিষয়ীর কথা ॥ ১১১ ॥
বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি তার কিবা বল ।
মমতা আসক্তি মাত্র যাহার সম্বল ॥ ১১২ ॥
বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি শুন কারে বুঝি ।
কামিনী কাঞ্চন যার এই দুটি পুঁজি ॥ ১১৩ ॥
নরে যেন জ্বারে চিন্তা আতপ বসনে ।
কি থাকে অপক্ক বাঁশে যদি ধরে ঘুণে ॥ ১১৪ ॥
সম্বলে তেমতি জ্বারে তিয়াগীর মন ।
গাঁঠরি বন্ধন নয় মনের বন্ধন ॥ ১১৫ ॥
উপার কেবল মন মনোমত হোলে ।
হরির চরণ-রত্ন যার বলে মিলে ॥ ১১৬ ॥
মনের প্রকৃতি মন কি কব তোমায় ।
মনে মুক্ত মনে বন্ধ মনের মায়ায় ॥ ১১৭ ॥
আখির উপরে কত না হয় দর্শন ।
একবার যদি কিছু নাহি বলে মন ॥ ১১৮ ॥
আছে যদি বলে তবে রক্ষা নাই আর ।
তখনি বিমানে রচে বিচিত্র সংসার ॥ ১১৯ ॥
সঙ্কল্প-বিকল্প লক্ষ পলকে পলকে ।
ঘুরার আগোটা বিশ্ব ঘুরুনিয়া পাকে ॥ ১২০ ॥
দৃষ্টির গোচর নহে যেমন পবন ।
কে জানে কোথায় থাকে কোথায় ভবন ॥ ১২১ ॥
কিন্তু যবে সঞ্চালন হয় নিজ বলে ।
উপাড়িয়া গিরি শির ফেলে ভূমিতলে ॥ ১২২ ॥
মনেতে বহিলে মন বাসনা-পবন ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদিগণে করে আন্দোলন ॥ ১২৩ ॥
মন যত ল'য়ে যায় যেথা ইচ্ছা তার ।
সুপথ কুপথ কিবা না করি বিচার ॥ ১২৪ ॥
সম্বল-আসক্ত মনে সুপথ না জানে ।
সতত কুপথে গতি অবিস্তার মনে ॥ ১২৫ ॥
আন পথে আগমনে আন কর্মফল ।
শেষে তুলে কর্মফলে মহা দাবানল ॥ ১২৬ ॥
বীজের বালির মত ক্ষুদ্র-আয়তন ।
প্রান্তরে পড়িলে পরে হয় তার বন ॥ ১২৭ ॥
সেই মত তিয়াগীর খালি মন-ক্ষেতে ।
অণুমাত্র আশ-বীজ যদি যায় পুঁতে ॥ ১২৮ ॥
কর্মফলে ক্রমে ক্ষেতে বন হ'য়ে যায় ।
প্রভুর আসন-হেতু স্থান নাহি পায় ॥ ১২৯ ॥
হারায়ে অমূল্য নিধি তুল্য যার নাই ।
সম্বলেতে নিঃসম্বল গেঁঠে বাঁধা ছাই ॥ ১৩০ ॥
তিলমাত্র তিয়াগীর গেঁঠে বাঁধা মানা ।
মনে যেন কোনমতে না উঠে বাসনা ॥ ১৩১ ॥
সত্য বটে বাসনা-বর্জিত নাহি মন ।
কর্ম করে দেহ-পুরে রহে যতক্ষণ ॥ ১৩২ ॥
কি কর্ম কর্তব্য শুন কর্মের বিধান ।
জীবের শিক্ষায় যা বলিলা ভগবান ॥ ১৩৩ ॥
তিয়াগী ঈশ্বরচিন্তা করিবে সর্বদা ।
তবে দেহ আছে তার আছে তৃষ্ণা-ক্ষুধা ॥ ১৩৪ ॥
কলিকালে অন্নগত জীবের পরান ।
অবশ্য
করিতে হবে অন্নের সন্ধান ॥ ১৩৫ ॥
যে দ্বারে ভরিবে পেট সেই ঠাই রবে ।
সম্বলের হেতু
নাহি দ্বারান্তরে যাবে ॥ ১৩৬ ॥
করিবে আপন কর্ম সাধন-ভজন ।
দিবারাতি যেন তার মগ্ন থাকে মন ॥ ১৩৭ ॥
কম্পাসের কাঁটা সম সতত উত্তরে ।
বিনাশে উল্লাস তবু তিল নাহি সরে ॥ ১৩৮ ॥
মনের সহস্র ধারা রোধিবে যতনে ।
কিংবা না দোলায় তার বাসনা-পবনে ॥ ১৩৯ ॥
বিষয়ে আসক্তি-হীন যে জন তিয়াগী ।
সম্বলে সে জন হয় কর্মফল-ভোগী ॥ ১৪০ ॥
প্রভুর সম্বলে দেখ কিরূপ চেহারা ।
সঙ্গলে করিল তাঁয় দৃষ্টিশক্তি-হারা ॥ ১৪১ ॥
পরিত্যক্ত হ'লে পরে হাতের বেদানা ।
তবে না আসিল দেহে বাহ্যিক ঠিকানা ॥ ১৪২ ॥
কায়মনোবাক্যে খেলে ত্যাগের মুরতি ।
শুন মন শ্রীপ্রভুর লীলার ভারতী ॥ ১৪৩ ॥
যে না বুঝে নিজ মন সে বুঝিবে কিসে ।
কি খেলিলা প্রভুদেব অবতারবেশে ॥ ১৪৪ ॥
বুঝিতে না পেলে ত্যাগ তাঁহার কৃপায় ।
ত্যাগের বরন ধর্ম বুঝা নাহি যায় ॥ ১৪৫ ॥
লীলা দরশনে যদি সাধ হয় মন ।
সর্বাগ্রে শ্রীপদে কর সর্বস্ব অর্পণ ॥ ১৪৬ ॥
যে জন তিয়াগী তিনি সর্বস্বাধিকারী ।
সম্বলেতে নিঃসম্বল পথের ভিখারী ॥ ১৪৭ ॥
ঘটস্থিত বল-বুদ্ধি যতেক শত্রুর ।
সহযোগে চালনার চলে যতদূর ॥ ১৪৮ ॥
সকল প্রয়োগ করি বায় বুঝিবারে ।
কি কহিলা প্রভুদেব কি মর্ম ভিতরে ॥ ১৪৯ ॥
গাঁঠরি বন্ধনে হয় দৃষ্টিহীন আঁখি ।
এ কিরূপ অপরূপ না শুনি না দেখি ॥ ১৫০ ॥
সেদিন না কহি কিছু অধিক তাঁহায় ।
আশ্চর্য হইয়া দিল প্রভুকে বিদায় ॥ ১৫১ ॥
নিঃসম্বলে লঘুদেহ গোলযোগ নাই ।
পথে পথে পুরীমধ্যে ফিরিলা গোসাঁই ॥ ১৫২ ॥
শুন মন কি হইল পশ্চাৎ বারতা ।
মহালীলা শ্রীদেবের সুমধুর কথা ॥ ১৫৩ ॥
অন্য একদিন প্রভু পেটের পীড়ায় ।
বড়ই কাতর শুয়ে আছেন শয্যায় ॥ ১৫৪ ॥
শুনে শম্ভু উদ্যান-ভবনে ল'য়ে গেল ।
সরিষা-প্রমাণ মাত্র অহিফেন দিল ॥ ১৫৫ ॥
উপশম হয় পীড়া আফিং খাইয়ে ।
নিতি নিতি তাই খান উদ্যানে আসিয়ে ॥ ১৫৬ ॥
মল্লিক শ্রীপ্রভুদেবে করে নিবেদন ।
নির্দিষ্ট সময়ে নিত্য কর্তব্য সেবন ॥ ১৫৭ ॥
সেহেতু কিঞ্চিৎ রাখ আপনার ঠাঁই ।
লইতে স্বীকৃত নাহি হইলা গোসাঞি ॥ ১৫৮ ॥
এখানে সেবন হয় তার নাহি হানি ।
গাাঠরি
বাধিয়া নিতে নাহি পারি আমি ॥ ১৫৯ ॥
সঙ্গেতে সম্বল করে হতবুদ্ধি বল ।
হোক না ঔষধ তবু ইহাও সম্বল ॥ ১৬০ ॥
তবে যবি পাঠাইয়া দেহ মোর ঠাঁই ।
তাহাতে আপত্তি মোর কিছুমাত্র নাই ॥ ১৬১ ॥
শম্ভু শিহরাঙ্গ শুনি ত্যাগের কাহিনী ।
এ যে সুবিষম ত্যাগ কখন না শুনি ॥ ১৬২ ॥
ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়ালোপ ছাঁদা যদি থাকে ।
শম্ভুর বাসনা পুনঃ পরীক্ষায় দেখে ॥ ১৬৩ ॥
এতেক ভাবিয়া শ্রীপ্রভুর অগোচরে ।
আফিং লইয়া কিছু পাতার ভিতরে ॥ ১৬৪ ॥
লুকায়ে রাখিল তাঁর পকেট-ভিতর ।
প্রভুদেব জ্ঞাত নহে কোনই খবর ॥ ১৬৫ ॥
স্বস্থানে গমন-কালে পূর্বের মতন ।
ফটক-দ্বারের নাহি পান অন্বেষণ ॥ ১৬৬ ॥
উদ্যান-মাঝারে হেথা সেথা ভ্রাম্যমাণ ।
দূরে থাকি দেখে শম্ভু শূন্য-বুদ্ধি-জ্ঞান ॥ ১৬৭ ॥
নাহি কথা, গিয়া তথা প্রভুর নিকটে ।
লইল যা রেখেছিল জামার পকেটে ॥ ১৬৮ ॥
অমনি ঘুচিল গোল সব পরিষ্কার ।
প্রত্যেক ইন্দ্রিয় করে কার্য আপনার ॥ ১৬৯ ॥
বিষম তিয়াগী প্রভু, লিপ্ত গন্ধ যেথা ।
অহংকার আমি-বুদ্ধি সম্বল-মমতা ॥ ১৭০ ॥
তথা নাই শ্রীগোসাঞি বিরাগ প্রবল ।
মূর্তিমান তিয়াগীর আদর্শের স্থল ॥ ১৭১ ॥
কায়মনোবাক্যে ত্যাগ যে ত্যাগের নাম ।
জানি না শুনি না হেন কোথা বিদ্যমান ॥ ১৭২ ॥
ঠাকুরের ত্যাগ দেখি বলবুদ্ধি ছাড়ে ।
মহেশের পুঁজি যাঁড় তাও শূন্যে উড়ে ॥ ১৭৩ ॥
কায়মনোবাক্যে ত্যাগ ত্যাগের মরম ।
নরবুদ্ধি-পার বুঝা বড়ই বিষম ॥ ১৭৪ ॥
ঠাকুরের তিয়াগের পাইয়া আভাস ।
শ্রীপদে শম্ভুর হৈল অটল বিশ্বাস ॥ ১৭৫ ॥
বুঝ এই কলিকাল নরনারীগণ ।
বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি চিনে মাত্র ধন ॥ ১৭৬ ॥
বিষয়-সম্পত্তি আসবাব মাল-চিজ ।
চাকি ফাঁকি রূপা সোনা অবিস্তার বীজ ॥ ১৭৭ ॥
মাতৃপয়োধরছিন্নমুখ শিশু ছেলে ।
পাইলে মোহিনী মুদ্রা মায়ে যার ভুলে ॥ ১৭৮ ॥
কোলশয্যা দুগ্ধপোষ্য সন্তান-রতন ।
তখনি অমনি দেয় যদি পার ধন ॥ ১৭৯ ॥
সতীত্বে বিদায় দেয় কুলবতী হেসে ।
মহারঙ্গময়ী অর্থ কাঞ্চনের আশে ॥ ১৮০ ॥
শোণিতে পালিত পুত্র অর্থের কারণ ।
শাণিত অসিতে করে পিতারে নিধন ॥ ১৮১ ॥
দ্বিজস্ব দেবস্ব চুরি চিরকালই হয় ।
ধনের সহিত ধর্মরত্ন বিনিময় ॥ ১৮২ ॥
কাঞ্চনের যেন কথা তেন কামিনীর ।
ত্রিপুর জুড়িয়া যার বিক্রম জাহির ॥ ১৮৩ ॥
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের বুদ্ধি যেথা দুলে ।
জীবের দূরের কথা তারে রাখ ঠেলে ॥ ১৮৪ ॥
এ বারতা ভক্ত শম্ভু বিশেষ বিদিত ।
দেখিল প্রভুকে দুয়ে আসক্ত-রহিত ॥ ১৮৫ ॥
বিষম বিরাগ তাঁর কামিনী-কাঞ্চনে ।
একে দুয়ে নহে তিনে কায়বাক্যমনে ॥ ১৮৬ ॥
পাইয়া নির্মল আঁখি হৈল স্থির জ্ঞান ।
নরতনু প্রভুদেব পুরুষপ্রধান ॥ ১৮৭ ॥
আফিস-মহলে শম্ভু গণ্যমান্য জনা ।
স্বার্থশূন্যে ভূরি দাানে সাধারণে জানা ॥ ১৮৮ ॥
বচনে বিশ্বাসাদর সকলেই করে ।
কিবা ধনী মানী গুণী শহর-ভিতরে ॥ ১৮৯ ॥
পাইলেই একত্তরে দুই-দশ জন ।
কথায় কথায় করে কথা-আন্দোলন ॥ ১৯০ ॥
বিনয়-আগ্রহ শ্রদ্ধা ভক্তি-সহকারে ।
মূর্তিমান বিশ্বগুরু মনুষ্য-আধারে ॥ ১৯১ ॥
কুতুহলাবিষ্ট শুনি শম্ভুর বচন ।
দরশনে
শ্রীপ্রভুর আসে লোকজন ॥ ১৯২ ॥
ভক্তিমান যেইমত মল্লিক আপুনি ।
অনুরূপ ভক্তিমতী তাহার ঘরণী ॥ ১৯৩ ॥
এখন দক্ষিণেশ্বরে মাতাঠাকুরানী ।
নহবতে বাস
যেখা প্রভুর জননী ॥ ১৯৫ ॥
মল্লিক-গৃহিণী তাঁয় ল'য়ে গিয়া ঘরে ।
পূজা করে পাদপদ্ম ষোড়শোপচারে ॥ ১৯৬ ॥
ঈশ্বরের কৃপা-দৃষ্টি পড়ে যেইখানে ।
রক্ত-মাংস কিবা ভক্তি উপজে পাষাণে ॥ ১৯৭ ॥
হায় প্রভু মম ভাগ্যে কেন এ প্রকার ।
যেমন আপুনি তেন পোষ্য পরিবার ॥ ১৯৮ ॥
ভক্তি-ভক্তে পরাঙ্মুখ এ কি কর্মফল ।
সাগরে নামিনু তবু না পাইনু জল ॥ ১৯৯ ॥
শ্রীপাদ-পরেশ স্পর্শ কৈনু বার বার ।
তথাপি কালিমা-বর্ণ গেল না আমার ॥ ২০০ ॥
ভক্তিপ্রার্থী যতদিন ভক্তি না পাইব ।
দুয়ারে তোমার প্রভু পড়িয়া থাকিব ॥ ২০১ ॥
নহবত ঘরখানি অল্প-পরিসর ।
দুজনের পক্ষে বাস অতি কষ্টকর ॥ ২০২ ॥
ভক্তবর সেই হেতু মায়ের কারণ ।
প্রস্তুত করিল এক স্বতন্ত্র ভবন ॥ ২০৩ ॥
যেমন এ মহালীলা লীলার প্রধান ।
আপুনি
স্বয়ং খোদ নিজে অধিষ্ঠান ॥ ২০৪ ॥
অংশ নহে কলা নহে পুরা ষোল আনা ।
শাস্ত্রের
বাক্যের পার অজ্ঞাত ঠিকানা ॥ ২০৫ ॥
সেই মত ভক্ত সাথী বীর বলবান ।
কোরান-পুরাণ-তন্ত্রে মিলে না সন্ধান ॥ ২০৬ ॥
মহা মহা দিগ্বিজয়ী সমর-কুশল ।
বিবেক-বিশ্বাস-ভক্তি-জ্ঞান-সমুজ্জ্বল ॥ ২০৭ ॥
শাস্ত্রজ্ঞান তত্ত্ববোধ আধ্যাত্মিকোন্নতি ।
ধিয়ান সমাধিরসজ্ঞত্ব গুরু
প্রীতি ॥ ২০৮ ॥
কাম-লোভ আন্-চর্চা দ্বেষ-নিন্দা-শূন্য ।
নানাবিধ গুণশর হৃদিতুণে
পূর্ণ ॥ ২০৯ ॥
বর্তমানে এই ভক্ত শম্ভু নামধারী ।
মহালীলা-সাগরের প্রধান ডুবুরী ॥ ২১০ ॥
বলিহারি তলস্পর্শী দিব্য চক্ষুষ্মান ।
কেমনে পাইল খুঁজে মায়ের সন্ধান ॥ ২১১ ॥
স্বতই আপুনি যাতা মায়া-আবরণে ।
যোগী যতি তপস্বীরা না পায় সাধনে ॥ ২১২ ॥
লীলার
প্রাঙ্গণে এবে শরীর ধারণ ।
মায়ার উপরে মায়া মহা আবরণ ॥ ২১৩ ॥
তদুপরি সংগোপিত
প্রভুর দ্বারায় ।
অদ্যাবধি কোন প্রাণী তত্ত্ব নাহি পায় ॥ ২১৪ ॥
মথুর এমন ভক্ত
সেবক-অধীপ ।
চতুর্দশ বর্ষাধিক প্রভুর সমীপ ॥ ২১৫ ॥
দিনে রেতে খেতে শুতে সঙ্গে
নিরন্তর ।
সেও না পাইল তিল মায়ের খবর ॥ ২১৬ ॥
নববিনির্মিত এই ভবন যেথায় ।
পুরীর
সান্নিধ্যে স্থান লাগালাগি প্রায় ॥ ২১৭ ॥
বাস উপযোগী যাহা যাহা প্রয়োজন ।
স্বচক্ষে দেখিয়া শম্ভু করে আয়োজন ॥ ২১৮ ॥
শুভদিনে শ্রীশ্রীমায়ে তথা ল'য়ে গেল ।
কার্যের সাহায্যে এক দাসী নিয়োজিল ॥ ২১৯ ॥
সতর্কে সযত্নে সন্ধা তত্ত্বাবধারণ ।
কখন মায়ের হয় কিবা প্রয়োজন ॥ ২২০ ॥
দিনমানে শ্রীপ্রভুরও গমন তথায় ।
মন্দিরে ফিরেন পুনঃ সন্ধ্যার বেলায় ॥ ২২১ ॥
এইরূপে এইখানে বিগত বৎসর ।
পেটের পীড়ার মাতা হইলা কাতর ॥ ২২২ ॥
চিকিৎসায় কথঞ্চিৎ হৈল উপশম ।
পিত্রালয়ে রোগারোগ্যে প্রতি আগমন ॥ ২২৩ ॥
দেশের উন্মুক্ত বায়ু মিঠানিয়া জল ।
এসব পীড়ার পক্ষে পরম মঙ্গল ॥ ২২৪ ॥
কুগ্রহের ফেরে হেখা ঘটে বিপরীত ।
শয্যাশায়ী মাতা পীড়া এতই বর্ধিত ॥ ২২৫ ॥
উৎকট অবস্থাপন্ন প্রাণের সন্দেহ ।
শরীর কঙ্কালসার অবসন্ন দেহ ॥ ২২৭ ॥
এখন জীবিত নাই জনক তাঁহার ।
আত্মীয় এমন নাই যত্ন লইবার ॥ ২২৮ ॥
জননী অবস্থাহীনা রোজা আনিবারে ।
ছোট ছোট ভাইগুলি যথাসাধ্য করে ॥ ২২৯ ॥
দেশের হাতুড়ে রোজা না পায় নাগাল ।
শেষেতে বাড়িয়া উঠে দারুণ জঞ্জাল ॥ ২৩০ ॥
সর্বৈব প্রকারে হ'য়ে নিরুপায় হেথা ।
সিংহবাহিনীর মাড়ে হত্যা দিলা মাতা ॥ ২৩১ ॥
সত্বরেই গ্রাম্যদেবী প্রসন্না হইয়ে ।
ব্যাধিনিবারণৌষধি দিলা নির্দেশিয়ে ॥ ২৩২ ॥
আরোগ্য হইল মাতা ঔষধসেবনে ।
সবলাঙ্গ পুষ্টদেহ হয় দিনে দিনে ॥ ২৩৩ ॥
এখানের গ্রাম্যদেবী সিংহবাহিনীকে ।
জানিত না আদতেই নিকটস্থ লোকে ॥ ২৩৪ ॥
যে অবধি শ্রীশ্রীমার বিয়াধি আরাম ।
গ্রাম-গ্রামান্তরেতে জাহির হৈল নাম ॥ ২৩৫ ॥
এবে দূরান্তর থেকে আসে লোকজন ।
পূজা কিংবা মানসিক শোধের কারণ ॥ ২৩৬ ॥
পুজা মানসিকে লোকে পায় মহা ঋদ্ধি ।
সর্পবিষ-বিনাশনে দেবিকা-প্রসিদ্ধি ॥ ২৩৭ ॥
মাড়ের মৃত্তিকা কিংবা তাঁর স্নানজল ।
সেবনে সাপের বিধে নিশ্চয় মঙ্গল ॥ ২৩৮ ॥
দংশিত প্রাণীর দেহে জীবন থাকিতে ।
মাটি কিংবা স্নানজল যদি পারে দিতে ॥ ২৩৯ ॥
নিশ্চয় আরোগ্য-লাভ অপূর্ব ব্যাপার ।
ঝাড় ঝুঁক জড়ি রোজা নহে দরকার ॥ ২৪০ ॥
কি আশ্চর্য এইখানে এত বিষধর ।
মনে হয় স্থান যেন বাসুকি-নগর ॥ ২৪১ ॥
লোকের কল্যাণহেতু তাই শ্রীমাতা ।
ঘুমন্ত দেবীকে এবে করিলা জাগ্রতা ॥ ২৪২ ॥
প্রভু জাগাইলা কালী দক্ষিণশহরে ।
এখানে জাগায় মাতা গ্রাম্যদেবিকারে ॥ ২৪৩ ॥
যেমন ঠাকুরদেব তেন ঠাকুরানী ।
এক বস্তু
ভিন্ন তত্ত্ব বিচিত্র কাহিনী ॥ ২৪৪ ॥
গদাই পরাণ যার বসতি স্বদেশে ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে ছুটে ছুটে আসে ॥ ২৪৫ ॥
গদা'য়ের আগেকার ভোজ্য প্রীতিকর ।
গোপনে বাঁধিয়া আনে বস্ত্রের ভিতর ॥ ২৪৬ ॥
সরু চিঁড়া চাল ভাজা ফুল ফুলা মুড়ি ।
ভেলা ভেলা ভিঁড়া গুড় কুমড়ার বড়ি ॥ ২৪৭ ॥
ঘরের গাভীর দুধে ভেলা চাঁছি পাতে ।
খানাকুলে খইমোয়া সুমিষ্ট খাইতে ॥ ২৪৮ ॥
দেশের লোকের মুখে ভাগিনা হৃদয় ।
সাংসারিক সমাচার পান পরিচয় ॥ ২৪৯ ॥
কথায় কথায় তিনি শুনিলেন পরে ।
এক বড় মকদ্দমা বাধিয়াছে ঘরে ॥ ২৫০ ॥
তাহার উপরে পুনঃ পাইল লিখন ।
লেখা তায় বিবাদের যত বিবরণ ॥ ২৫১ ॥
তে কারণে প্রভুদেবে কহে বারে বারে ।
অনুমতি দিতে তায় যাইবারে ঘরে ॥ ২৫২ ॥
কোনমতে শ্রীপ্রভুর মত নাহি হয় ।
দিন দিন তত জেদ করেন হৃদয় ॥ ২৫৩ ॥
বিষন্নবদন হৃদু কহে আর বার ।
কি কারণ অন্য মত কহ সমাচার ॥ ২৫৪ ॥
বুঝাইয়া প্রভুদেব বলিলেন তাঁরে ।
জানিতে পারিবে হেতু কিছুদিন পরে ॥ ২৫৫ ॥
নিষেধ না শুনি হৃদু ছুটির কারণ ।
পুরীর অধ্যক্ষে গিয়া কৈল নিবেদন ॥ ২৫৬ ॥
মনোমত পেয়ে ছুটি গোপনে গোপনে ।
ঘরে ল'য়ে যেতে হাটে নানা দ্রব্য কিনে ॥ ২৫৭ ॥
বাঁধিয়া প্রকাণ্ড বস্তা রাখে একধারে ।
শ্রীপ্রভুর একসঙ্গে শুয়ে যেই ঘরে ॥ ২৫৮ ॥
মধুর প্রভুর লীলা তমোবিনাশন ।
শুন কি হইল পরে আশ্চর্য ঘটন ॥ ২৫৯ ॥
সেই দিন প্রভুদেব সুরধুনীতটে ।
দিন যায় প্রায় সূর্য বসে গিয়া পাটে ॥ ২৬০ ॥
সিন্দুরনির্মিত ভাতি রক্তিম বরন ।
মেঘতলে রেখে চলে অগতলোচন ॥ ২৬১ ॥
কনকবরনকান্তি প্রতিবিম্বে খেলে ।
ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভাঁটাধরা গঙ্গার সলিলে ॥ ২৬২ ॥
একমনে তার পানে চেয়ে ভগবান ।
দাঁড়ায়ে আছেন যেন পুতুল-সমান ॥ ২৬৩ ॥
আচম্বিতে কিবা ভাব মনের ভিতরে ।
সন্ধ্যা এবে আইলেন আইর মন্দিরে ॥ ২৬৪ ॥
কোনদিকে কোন লক্ষ্য না করিয়া আর ।
নহবতে যেইখানে বসতি তাঁহার ॥ ২৬৫ ॥
জননীর শ্রীচরণে সর্বাগ্রে প্রণাম ।
পরে বসিলেন পাশে প্রভু গুণধাম ॥ ২৬৬ ॥
সদেশেতে প্রতিবাসী আছে যত জন ।
তাঁদের সম্বন্ধে হয় কথোপকথন ॥ ২৬৭ ॥
কার ঘরে ধন কত কার কটি ছেলে ।
স্বভাব কেমন কার কার কিসে চলে ॥ ২৬৮ ॥
কথায় কথায় রাতি প্রহরেক প্রায় ।
শ্রীপ্রভুর খাবার সময় ব'য়ে যায় ॥ ২৬৯ ॥
নিজের মন্দিরে আসি খাইবার তরে ।
মামা মামা বলি হৃদু ডাকাডাকি করে ॥ ২৭০ ॥
মত্ততর মার সঙ্গে কথোপকথনে ।
যাই যাই এইবার ফুটে শ্রীবদনে ॥ ২৭১ ॥
যাইতে না হয় মন জননীরে ছেড়ে ।
কিছুক্ষণ গৌণে পুনঃ হৃদু ডাকে তাঁরে ॥ ২৭২ ॥
বলিলেন প্রভুদেব উত্তর-বচনে ।
অগ্রভাগ রাখি মোর খাও দুইজনে ॥ ২৭৩ ॥
দায়ে পোয়ে এত কথা ফুরাতে না চায় ।
এখন এগার বাজে দুপ্রহর প্রায় ॥ ২৭৪ ॥
তখন গুয়ায়ে যায় প্রণমিয়া তাঁরে ।
ফিরিলেন প্রভুদেব আপন মন্দিরে ॥ ২৭৫ ॥
এখানে শয্যায় আছে ভাগিনা হৃদয় ।
এপাশ ওপাশ করে ঘুম নাহি হয় ॥ ২৭৬ ॥
গত উচ্চে উঠে রাতি তত উচাটন ।
কে যেন শয্যায় তাঁয় করিছে পীড়ন ॥ ২৭৭ ॥
অস্থির পরাণ কয় প্রভুপরমেশে ।
ও গো মামা আর না যাওয়া হ'ল দেশে ॥ ২৭৮ ॥
দড়ি দিয়া বাঁধিয়াছি গাঁঠরি যেমন ।
কে যেন তেমতি মোরে করিছে বন্ধন ॥ ২৭৯ ॥
প্রভুদেব কহিলেন উত্তরে তাঁহারে ।
কিনিয়াছ কত দ্রব্য ল'য়ে যেতে ঘরে ॥ ২৮০ ॥
না যাইলে হবে নষ্ট একি বিবেচনা ।
তাহার উপরে বাধিয়াছে মকদ্দমা ॥ ২৮১ ॥
হৃদয় পুনশ্চ কয় আমি নাহি যাব ।
গাঁঠরি বেঁধেছি নিজে এখনি খুলিব ॥ ২৮২ ॥
এত বলি কৈল মুক্ত বস্তার বন্ধন ।
তবে না হইল তাঁর সুস্থির জীবন ॥ ২৮৩ ॥
বলে বাঁচিলাম এবে গাঁঠরি খুলিয়া ।
তখনি ঘুমায় হৃদু নাক ডাকাইয়া ॥ ২৮৪ ॥
সুষুপ্তি-সঞ্চার যেন কষ্ট-অবসানে ।
নিদ্রাগত সেই মত হৃদয় ভাগিনে ॥ ২৮৫ ॥
আরে মন যেই মন মন বলি যারে ।
অলক্ষ্যেতে করে বাস জীবের শরীরে ॥ ২৮৬ ॥
ধরিবারে গেলে পরে নাহি যায় ধরা ।
কে জানে কিরূপ তার কেমন চেহারা ॥ ২৮৭ ॥
কুসুমের মধ্যে যেন সৌরভের বাস ।
কর্মগুণে দেখি দেহে তাহার প্রকাশ ॥ ২৮৮ ॥
স্বপ্ন হতে অতি সূক্ষ্ম সুস্বপ্ন গঠন ।
অশরীরী নাহি মিলে চক্ষে দরশন ॥ ২৮৯ ॥
শক্তিময় হেন শক্তি আর কার আছে ।
জগৎ ব্রহ্মাণ্ড যাঁর ইশারায় নাচে ॥ ২৯০ ॥
বেদিয়ার ডুরিবদ্ধ বানরের প্রায় ।
বিচিত্র করম কিবা কব তুলনায় ॥ ২৯১ ॥
এ হেন মনের মধ্যে বল চলে যাঁর ।
তিনি সর্বশক্তিমান্ শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২৯২ ॥
তাঁহার ইচ্ছায় মন শক্তি তাঁর লৈয়া ।
জীবেরে করায় কর্ম নাকে দড়ি দিয়া ॥ ২৯৩ ॥
কি কব প্রভুর লীলা কি শকতি আছে ।
ঘরে ভড় বেঁধে বস্তা পরে খুলে বাঁচে ॥ ২৯৪ ॥
যোগনিদ্রা শ্রীপ্রভুর রাতি যতক্ষণ ।
শয্যায় নিদ্রায় জয় ঘোর অচেতন ॥ ২৯৫ ॥
আইর আছিল ধারা সকলের আগে ।
প্রত্যুষের পূর্বে নিতি উঠিতেন জেগে ॥ ২৯৬ ॥
ভাগ্যবতী কালীর মা দাসী একজন ।
দুয়ারে বারাণ্ডায় সে করিত শয়ন ॥ ২৯৭ ॥
জাগায়ে দিতেন আগে উঠিয়া আপনি ।
আজ না উঠেন আর আই ঠাকুরানী ॥ ২৯৮ ॥
দিনকর সমুদিত আলোক দেখিয়া ।
আপনি উঠিল দাসী চমক খাইয়া ॥ ২৯৯ ॥
আইর দরজা বন্ধ দ্বারে দেয় ঠেলা ।
ভিতরে হাঁস্ক্বলে বন্ধ নাহি যায় খোলা ॥ ৩০০ ॥
অচেতন আই আর কেবা দিবে সাড়া ।
শুনিতে পাইল দাসী গলা ঘড়ঘড়া ॥ ৩০১ ॥
ব্যাকুল হইয়া তবে ডাকয়ে সঘনে ।
আসে হৃদু রামলাল বিবরণ শুনে ॥ ৩০২ ॥
আই আই বলি ডাকে কথা নাহি আর ।
কৌশল করিয়া কৈল বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৩০৩ ॥
রেখে আই অচেতন শয্যার উপরে ।
ফেনার মতন গাঁজ মুখের দুধার ॥ ৩০৪ ॥
তখনি আনিল রোজা এঁড়েদহে বাড়ি ।
হাত টিপে কহে গেছে দেহ ছেড়ে নাড়ী ॥ ৩০৫ ॥
এইরূপ ক্রমান্বয়ে দুই দিন চলে ।
তৃতীয়ে তীরস্থ কৈল বকুলের তলে ॥ ৩০৬ ॥
সন্ধ্যা প্রায় সমাগতা দিবসের শেষে ।
উঠে দ্বিতীয়ার চাঁদ পশ্চিম আকাশে ॥ ৩০৭ ॥
বারশ বিরাশী সাল এবে গণনায় ।
শুভক্ষণ শুরুপক্ষ ফাল্গুন মাহায় ॥ ৩০৮ ॥
সম্মুখে রাখিয়া পুত্ররত্ন গদাধর ।
ত্যজিলেন রত্নগর্ভা আই কলেবর ॥ ৩০৯ ॥
যে তিথি নক্ষত্রে পক্ষে যেই শুভ মাসে ।
ভূভারহরণ প্রভুদেব পরদেশে ॥ ৩১০ ॥
প্রসবিলা ধরাতলে উদরে দরিয়া ।
ঠিক সেই শুভযোগে ছাড়িলেন কায়া ॥ ৩১১ ॥
কিবা যোগাযোগ কিছু বুঝিতে না পারি ।
হীন ক্ষীণ সুমলিন নরবুদ্ধি ধরি ॥ ৩১২ ॥
ভবের কাণ্ডারী প্রভুদেশ নারায়ণ ।
কি করিলা সর্বশেষে শুন বিবরণ ॥ ৩১৩ ॥
বড়ই সুমিষ্ট কথা অমৃতলহরী ।
ভব-সিন্ধু তরিবার ঘাটে বাঁধা তরী ॥ ৩১৪ ॥
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে শ্রীআজ্ঞা প্রভুর ।
সত্বর আনিতে শ্বেত-চন্দন প্রচুর ॥ ৩১৫ ॥
প্রফুল্ল করবী শ্বেত, শ্বেত-কুন্দ ফুল ।
যোগাইল রামলাল পরাণ আকুল ॥ ৩১৬ ॥
গঙ্গাজলে পাখালিয়া আইর চরণ ।
মাখাইয়া দিলা প্রভু যাবৎ চন্দন ॥ ৩১৭ ॥
রোদন করেন ফুল সমর্পিয়া পায় ।
এইরূপ সকরুণে সম্ভাষিয়া মায় ॥ ৩১৮ ॥
"যে দেহ হইতে মম দেহের প্রকাশ ।
আজ দেখি মা গো সেই দেহের বিনাশ" ॥ ৩১৯ ॥
গৃহী যত একত্রিত ছিল সে সময় ।
অগ্নিক্রিয়া করিবারে প্রভুদেবে কয় ॥ ৩২০ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন কর্ম এ নহে আমার ।
অধিকারী ভ্রাতৃপুত্র তাহে দিনু ভার ॥ ৩২১ ॥
লইয়া চলিল দেহ কান্দুড়িয়াগণে ।
সঙ্গে রামলাল এ'ড়েদহের শ্মশানে ॥ ৩২২ ॥
এখানে শ্রী প্রভুদেব রাখিলা জ্বালিয়া ।
তুষের আগুন তার খুঁটে লোহা দিয়া ॥ ৩২৩ ॥
নিমপাতাসহ ঘট পাত্রে ভিজা ডাল ।
তার সঙ্গে কাঁচা গুড় তিন মুঠা চাল ॥ ৩২৪ ॥
কান্দুড়িয়াদের যাহা মঙ্গল আচার ।
তিল মাত্র নাহি ত্রুটি সকল যোগাড় ॥ ৩২৫ ॥
পরে প্রেততর্পণের বিধি পরদিনে ।
প্রভুর কর্তব্য ইহা কহে সর্বজনে ॥ ৩২৬ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন আমি কহিয়াছি আগে ।
এ কর্মে এ দেহ কোন কাজে নাহি লাগে ॥ ৩২৭ ॥
তথাপিহ জেদ তাঁরে করে লোকজন ।
শুনহ কেমন প্রভু করিলা তর্পণ ॥ ৩২৮ ॥
অমানীর মানদাতা প্রভু ভগবান ।
চলিলেন সবাকার রক্ষা করি মান ॥ ৩২৯ ॥
পাছু অগণন লোক দেখিবারে চলে ।
নামিলেন ধীরে ধীরে গঙ্গার সলিলে ॥ ৩৩০ ॥
জল লইবার কালে অঞ্জলি করিয়া ।
দেখয়ে দর্শকবর্গ অবাক হইয়া ॥ ৩৩১ ॥
ততক্ষণ বদ্ধাঞ্জলি যতক্ষণ জলে ।
ছড়ায়ে আঙ্গুল যায় উপরে আনিলে ॥ ৩৩২ ॥
আঙ্গুল কাঠির মত ক্রমশঃ বিস্তার ।
এক বিন্দু জল নাহি থাকে মধ্যে তার ॥ ৩৩৩ ॥
শুনিলে প্রভুর কথা লোকে লাগে ধাঁধা ।
কায়মনোবাক্য যাঁর একতানে বাঁধা ॥ ৩৩৪ ॥
মানুষের মনে মন দুই মন উঠে ।
এক মন তুলে কথা অন্য মন কাটে ॥ ৩৩৫ ॥
এক মনে দুই মন হয় কি প্রকার ।
উপমার বীণাযন্ত্রে তারের ঝঙ্কার ॥ ৩৩৬ ॥
শক্তির সঞ্চার তারে থাকে যতক্ষণ ।
এক তার বোধে বহু তারের মতন ॥ ৩৩৭ ॥
মনের এহেন রূপ যে সময় হয় ।
সন্দেহ তাহার নাম কোন স্থলে কয় ॥ ৩৩৮ ॥
হিতাহিত-শক্তি বলে অবস্থাবিশেষে ।
কখন কখন তায় বুঝি নামে ভাবে ॥ ৩৩৯ ॥
এক মন নানারূপে ধরে নানা নাম ।
স্কুলে বলে সমষ্টিরে অনিশ্চিত জ্ঞান ॥ ৩৪০ ॥
পিশাচস্বভাব মন নানা মায়া ধ'রে ।
নাচায় বৃহৎ কারা বিবিধ প্রকারে ॥ ৩৪১ ॥
শ্রীপ্রভুর মনে নাই এ মনের রীতি ।
কায়মনোবাক্য তিন একসঙ্গে স্থিতি ॥ ৩৪২ ॥
স্বভাবতঃ স্থিরবুদ্ধি সুনিশ্চিত জ্ঞান ।
কায়া করে তাই যাহা বাক্যের বিধান ॥ ৩৪৩ ॥
সরলে সরল যায় সহজেই বুঝা ।
অসরল তর্ক যার তার পক্ষে বোঝা ॥ ৩৪৪ ॥
ছাড়ি কূট তর্কবৃদ্ধি সুসরলে মন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা মঙ্গল-কথন ॥ ৩৪৫ ॥
প্রভু রামকৃষ্ণ-লীলা কে দেখাবে এঁকে ।
হাতে দিলে টাকা যেন হাত যায় বেঁকে ॥ ৩৪৬ ॥
সেই ধারা শ্রীপ্রভুর তর্পণের কালে ।
অবশেষে সমাধিস্থ গঙ্গার সলিলে ॥ ৩৪৭ ॥
হৃদয় আনিল কূলে ধরিয়া তাঁহায় ।
প্রহরেক গেলে পরে ভাব ভেঙ্গে যায় ॥ ৩৪৮ ॥
শ্রীপ্রভুর পথে রাখি ষোল আনা মতি ।
ধীরে ধীরে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩৪৯ ॥
প্রেম ভক্তি জ্ঞান মুক্তি ইহার ভিতর ।
রামকৃষ্ণ লীলাগীতি রতন-আকর ॥ ৩৫০ ॥
তৃতীয় খণ্ড
মাইকেল মধুসূদনের প্রভু-দর্শনে গমন
শুনিলে পবিত্রচিত,
রামকৃষ্ণলীলাগীত,
সুললিত
সুধার সমান ।
সহজে সরস হয়, যে ছিল বিশুষ্কময়,
রসে ভরে
আচোট পাষাণ ॥ ১ ॥
মহিমামাহাত্ম্যভরা, দৃষ্টিহীন দিশাহারা,
পথছাড়া
কুকর্মকারণে ।
অকূল ভবাব্ধিজলে, নিরন্তর ঘুরে বুলে,
অবহেলে পথ
পায় শুনে ॥ ২ ॥
প্রভুর প্রচার-গতি, ধীরমন্দ মন্দ অতি,
বসন্ত
অনিল সম গেলে ।
উজ্জ্বলত্বে দৃষ্টিহর, শরতের দিনকর,
যত কর
মেঘের আড়ালে ॥ ৩ ॥
মাঝে মাঝে মেঘ-ছায়া, আবরে দিনেশকারা,
কিন্তু
কান্তি ক্ষরে মধ্যে তার ।
কখন বা ফুটে ভাতি, আঁধার বিনাশবাতি,
সেইরূপ
প্রভুর প্রচার ॥ ৪ ॥
নানা ভাব এ লীলার, প্রকাণ্ড বিস্তারাকার,
বালিময়
মরুর মাঝারে ।
তৃষিত পথিকদল, বালি খুঁড়ে তুলে ফল,
রাশি জল
তাহার ভিতরে ॥ ৫ ॥
বালির ভিতরে ঢাকা, দূরে থেকে নহে দেখা,
অল্প রেখা
ফলের লক্ষণ ।
অত্যন্ত নিকটে গেলে, তবে না দৃষ্টিতে মেলে,
কচি পাতা
ক্ষুদ্র আয়তন ॥ ৬ ॥
লীলা তেমতি প্রভুর, দূরে থেকে বহু দূর,
বাহ্যদৃশ্যে মরুর চেহারা ।
স্থান যেন আঠাকাঠা, নাহি মিলে এক ফোঁটা,
দেখে শুনে
লাগে দিশাহারা ॥ ৭ ॥
কিন্তু শ্রীচরণতলে, দেখ যদি আখি মিলে,
বিশ্বখণ্ড
সম আয়তন ।
দেখিবে অগণ্য ফল, মধ্যে তৃষ্ণাবারি জল,
দরশনে
জুড়ায় জীবন ॥ ৮ ॥
প্রচারকৌশলকল, বনে যেন দাবানল,
মূল কোথা
সর্বাগ্রে দেখ না ।
বায়ুভরে কাঠে কাঠে, ঘষাঘষি হ'য়ে উঠে,
একমাত্র
আগুণের কণা ॥ ৯ ॥
শ্রীমধুসূদন নাম, হিন্দু, এবে খ্রীষ্টিয়ান,
মাইকেল
উপাধি তাঁহার ।
সরল আধারখানি, বঙ্গকবিচূড়ামণি,
বিদ্যাবল
গায়ে অলঙ্কার ॥ ১০ ॥
প্রথমে যৌবনকালে, উষ্ণ শোণিতের বলে,
ধর্ম ঠেলে
ধর্মান্তরে যায় ।
বাহ্যিক চটকে ভুলে, মিলিল খ্রীষ্টিয়ানদলে,
রূপমুগ্ধ
পতঙ্গের প্রায় ॥ ১১ ॥
এবে পূর্ণ কলিকাল, ধর্মরাজ্যে গোলমাল,
আলুথালু
আচার নিয়ম ।
আর্য-শিক্ষানীতি কোথা, বিপর্যয় পূর্বপ্রথা,
বিজাতীয়
ধরম করম ॥ ১২ ॥
হানে যত খ্রীষ্টিয়ান, চোখে প্রলোভন-বাণ,
হিন্দুয়ানি জ্বর-জ্বরকায় ।
বাজায়ে দুন্দুভি ভেরি, বড় বড় মিশনারি,
হাটে বাটে
যীশুগুণ গায় ॥ ১৩ ॥
কহে যার স্বর্গে বাস, করিবার অভিলাষ,
বিশ্বাস
কেবল কর তাঁরে ।
বারে বারে করি মানা, পুতুলের আরাধনা,
মিথ্যা
কেন করি পড় ফেরে ॥ ১৪ ॥
হেথা যত ব্রাহ্মগণ, মহাদম্ভে আস্ফালন,
সমর্থন
নিজ ধর্মে করে ।
বাখানে পামর অন্ধে, অথণ্ড সচ্চিদানন্দে,
পরিণত
করয়ে সাকারে ॥ ১৫ ॥
যদি কার থাকে মন, যেতে শান্তি-নিকেতন,
পরিহর
ভেদাদি বিচার ।
যত পুরুষ রমণী, সম্পর্কে ভাই ভগিনী,
এক ব্রহ্ম
তাঁর পরিবার ॥ ১৬ ॥
এদিকে হিন্দু-সন্তান, সাকার যাদের প্রাণ,
সেবাভক্তি-আচরণে মন ।
কেহ কহে ভজ কৃষ্ণ, সনাতন সর্বশ্রেষ্ঠ,
কষ্ট যাবে
জুড়াবে জীবন ॥ ১৭ ॥
কেহ বলে ভজ যায়, অনাদ্যাশক্তি শ্যামায়,
ভক্তিযুক্তিশান্তিপ্রদায়িনী ।
সকলের মূলাধার, এ বিচিত্র সৃষ্টি যাঁর,
দয়াময়ী
জগতজননী ॥ ১৮ ॥
কেহ কয় ভক্তিভাবে, ভজ বিশ্বগুরু শিবে,
কেহ কয় ভজ
গজানন ।
কেহ দিবাকরে কয়, সকল মঙ্গলালয়,
রোগশোকতাপনিবারণ ॥ ১৯ ॥
কেহ কহে ভজ রাম, নবদূর্বাদলশ্যাম,
গুণধাম
অগতির গতি ।
অপার তাঁর মহিমা, পদস্পর্শে কাষ্ঠ সোনা,
মানবিনী
পাষাণ-মুরতি ॥ ২০ ॥
কেহ উন্মত্তের পারা, বলে ভাই ভজ গোরা,
সঙ্গে ভাই
নিত্যানন্দ তাঁর ।
দয়াময় দুই ভায়ে, প্রেম দেন মার খেয়ে,
ভাল মন্দ
না করি বিচার ॥ ২১ ॥
বৈদান্তিকগণ হেথা,
মায়া শুনে নাড়ে মাথা,
জ্ঞানমার্গী বিশুল্কহৃদয় ।
আকার দেখিলে পরে, মায়া মায়া ডাক ছাড়ে,
অবিরাম
নেতি নেতি কয় ॥ ২২ ॥
এইরূপে সম্প্রদায়, নিজ নিজ মতে গায়,
সর্বশ্রেষ্ঠ সকলের সার ।
শুনে হয় জ্ঞানহারা, হরিপদলুব্ধ যারা,
ভেবে সারা
পাগল-আকার ॥ ২৩ ॥
ভাবে কোন্ পথে গেলে, হৃদ্বয়রতন মিলে,
কে হেন
সুহৃদ পাই কারে ।
ঝটিকা কুয়াশা ঠেলে, দেন ঠিক পথে তুলে,
কূলহীন
ভীষণ পাথারে ॥ ২৪ ॥
এমন বিপ্লবকালে, অবতীর্ণ ধরাতলে,
প্রভুদেব
নররূপ ধরি ।
জঞ্জাল করিলা দূর,
মহিমা কি শ্রীপ্রভুর,
সর্বধর্ম
সমন্বয় করি ॥ ২৫ ॥
অগণ্য সাধন-মত, ভিন্নাকার ভিন্ন পথ,
দেখাইলা
আচরি আপনে ।
স্বধর্মে সরলভাবে,
যে পথিক হবে যাবে,
সে পাবে
নিশ্চয় ভগবানে ॥ ২৬ ॥
সাকারে নাহিক খাদ, সাকারে না দিল বাদ,
সাকার সে
সবাকার মূল ।
ভিত্তি বনিয়াদ ছাড়ি, বল কি সম্বল করি,
রাগ ধরি
প্রকাণ্ড দেউল ॥ ২৭ ॥
বুঝিতে নারিনু মন, ধর্ম ছাড়া কি রকম,
নিজ ধর্ম
কেন দেয় ফেলে ।
পূর্বাপর দেখা যায়, সব ছেলে পুষ্টি পায়,
আপনার
জননীর কোলে ॥ ২৮ ॥
মার চেয়ে যার টান, সে ডাকিনী মূর্তিমান,
মার ধার
সে কিছু না ধারে ।
পুষ্টি কোন উপাদানে, গর্ভধারিণী জানে,
অন্য জনে
বুঝিতে না পারে ॥ ২৯ ॥
সব ধর্ম মার প্রায়,
কৃপাব্তী নিজছায়,
কাক ধর্ম
ধর্মে নাহি খেলে ।
ধর্ম নিত্য বিদ্যমান,
নামান্তরে ভগবান,
নাহি পোষে
অপরের ছেলে ॥ ৩০ ॥
সব ধর্ম একরূপ,
কিন্তু ভাবে নানারূপ,
এক হ'য়ে
স্বতন্ত্র আকার ।
ধর্মে ধর্ম সদা তুষ্ট,
ধর্মত্যাগে ধর্ম রুষ্ট,
ধর্মতত্ত্ব করহ বিচার ॥ ৩১ ॥
বিমাতা অপর ধর্ম, দেখিতে নহে দুষ্কর্ম,
মর্মামর্ম
বুঝ বিলক্ষণ ।
যাহে তুমি পুষ্টি পাবে, অপর হইতে লবে,
সার যাহা
করহ গ্রহণ ॥ ৩২ ॥
অঙ্কুর উদ্গম-আশে, বীজ দিলে ভরা চাষে,
গুপ্তভাবে
মাটির ভিতর ।
কিমাশ্চর্য অদ্ভুত, ঘেরে তারে পঞ্চভূত,
ওতপ্রোতভাবে নিরন্তর ॥ ৩৩ ॥
বীজ থাকে নিজে খাঁটি, ন হি হয় জল মাটি,
তেজের
সঙ্গেতে নাহি মিশে ।
কখন নহে বাতাস, কখন নহে আকাশ,
সকলের সার
মাত্র চুষে ॥ ৩৪ ॥
যে সব উপাদানে, প্রফুল্ল অঙ্কুরোদ্গমে,
উপযুক্ত
সহায়তা করে ।
নিজদেহ পুষ্টিকারী, তাহাই গ্রহণ করি,
বাদ বাকি
ফেলে দেয় ছুঁড়ে ॥ ৩৫ ॥
বাণিজ্যেতে দেশান্তরে, যেতে কেবা মানা করে,
অর্জন
করিতে রত্নধন ।
ল'য়ে মাল ডিঙ্গা ভরা,
চতুর বণিক যারা,
ত্বরা
ফিরে আপন ভবন ॥ ৩৬ ॥
নামে উঠে প্রেমরাশি, স্বর্গাদপি গরীয়সী,
জননী ও
জনমের স্থান ।
হৃদয় উথলে পড়ে, বারেক স্মরণে যাঁরে,
ছাড়ি
তাঁরে কি আছে কল্যাণ ॥ ৩৭ ॥
নামে মাত্র প্রাণ গলে,
দরশনে কিবা ফলে,
সম্ভোগে
উদর কিবা সুখ ।
কাঠতুলি কালিভরা, তাই দিরা সে চেহারা,
আঁকিতে
নারিনু রৈল দুখ ॥ ৩৮ ॥
প্রভুদেব অবতারে, নিজধর্ম পরিহারে,
কি বলিলা
শুন শুন মন ।
বুঝিয়া আপন ভ্রান্তি, হৃদে নাই কোন শাস্তি,
মাইকেল
শ্রীমধুসূদন ॥ ৩৯ ॥
শুনিয়া প্রভুর নাম, দয়াময় গুণধাম,
আসিলেন
কাতর অন্তরে ।
হৃদয়ে ভরসা করি, মিলে যদি শান্তিবারি,
তপ্ত চিত
জুড়াবার তরে ॥ ৪০ ॥
আপন মন্দিরে হেথা, শাস্ত্রী সঙ্গে তত্ত্বকথা,
কহিছেন
প্রভু নারায়ণ ।
উপনীত হেনকালে, আশা ভয় হৃদে খেলে,
মাইকেল
শ্রীমধুসূদন ॥ ৪১ ॥
কর জুড়ি নম্রভাবে, নিবেদিল প্রভুদেবে,
কহিবারে
হিত-উপদেশ ।
শুনিয়া বিনয়-উক্তি, সকাতর শ্রদ্ধাভক্তি,
কৃপাময়
প্রভু পরমেশ ॥ ৪২ ॥
দেখ প্রভুদেব হেথা, বলিবারে যান কথা,
শ্রীবদনে
নাহি পান বাট ।
কত চেষ্টা বারে বারে, কে যেন রসনা ধ'রে,
বন্ধ করে
অধর কপাট ॥ ৪৩ ॥
নীরবে ক্ষণেক গেলে, বলিলেন মাইকেলে,
তত্ত্বকথা
বলিবারে মন ।
কিন্তু তত্ত্ব নাহি জানি, অধরে না আসে বাণী,
মা আমারে
করে নিবারণ ॥ ৪৪ ॥
শুনি শাস্ত্রী বীরবর, প্রসারিয়া দুই কর,
জিজ্ঞাসিল
শ্রীমধুসূদনে ।
আপনি পণ্ডিতজন, বুঝ ধর্ম বিলক্ষণ,
স্বধর্ম
তিয়াগ কৈলে কেনে ॥ ৪৫ ॥
অনুতাপ সহকারে, মাইকেল কড়জোড়ে,
করিলেন
উত্তর তাঁহায় ।
বলিতে দলিছে প্রাণ, কেন হৈনু খ্রীষ্টিয়ান,
সুদ্ধমাত্র পেটের জ্বালায় ॥ ৪৬ ॥
সামান্য পেটের তরে, যে জন স্বধর্ম ছাড়ে,
তারে কোথা
প্রভুর করুণা ।
জগতজননী তাঁর, সব ধর্ম সৃষ্টি যার,
তিনি
তাঁরে করিলেন মানা ॥ ৪৭ ॥
অপার রূপার সিন্ধু, দীননাথ দীনবন্ধু,
শিবময়
মঙ্গলনিধান ।
দীন দুঃধী দ্বিজসাজ, পতিত-উদ্ধার কাজ,
অযাচকে
যেচে যার দান ॥ ৪৮ ॥
তাঁর ঠাঁই শুদ্ধ করে, ভিখারী বিমুখে ফেরে,
নাহি দেখি
না করি শ্রবণ ।
এই মাত্র এক জনা, মা যারে করিল মানা,
মাইকেল
শ্রীমধুসূদন ॥ ৪৯ ॥
রামকৃষ্ণলীলাগীতি, ভক্তিগ্রন্থ শাস্ত্র নীতি,
যাবতীয়
ইহার ভিতরে ।
পাবে তা যা অন্বেষণ, এবে তুমি দেখ মন,
কি ফল
স্বধর্ম-পরিহারে ॥ ৫০ ॥
তৃতীয় খণ্ড
পারায়ণপাঠ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
প্রচার-প্রকাশ-কথা মধুর কথন ।
গাইলে গুনিলে করে তম-বিনাশন ॥ ১ ॥
একমনে শুন মন দুই কান পাতি ।
প্রীযদু মল্লিক নাম শহরে বসতি ॥ ২ ॥
বড় ভক্তিমতী ঘরে মাসীমাতা তাঁর ।
অনেক পূর্বেতে কহিয়াছি সমাচার ॥ ৩ ॥
ভগবৎপদে মতি রতি বিলক্ষণ ।
উদ্যান-ভবনে বসাইল পারায়ণ ॥ ৪ ॥
শুন মন পারায়ণ-পাঠ বলে কারে ।
গোটা ভাগবত সায় সপ্তাহ ভিতরে ॥ ৫ ॥
শেষ দিনে বহু কার্য পাঠ-সমাপন ।
ঠাকুরের ভোগরাগ পরে সংকীর্তন ॥ ৬ ॥
অত্যল্প সময় ইহা মোটে সাত দিন ।
সর্ব-অঙ্গে সাঙ্গ করা বড়ই কঠিন ॥ ৭ ॥
সপ্তম দিবসে শুন কি হয় ঘটন ।
একত্রিত নিমন্ত্রিত কত লোকজন ॥ ৮ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ ভক্ত তত্ত্বান্বেষী জনা ।
বিষয়ী বৈভবশালী কে করে গণনা ॥ ৯ ॥
হেনকালে শ্রীপ্রভুর হৈল আগমন ।
পাছু পাছু সঙ্গে আছে শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ১০ ॥
শাস্ত্রীর নাহিক আর কোন মন টোলে ।
পাইলে প্রভুর সঙ্গ লব যায় ভুলে ॥ ১১ ॥
পাঠক যেখানে পাঠ করে পারায়ণ ।
তাঁর সন্নিকটে শাস্ত্রী লইল আসন ॥ ১২ ॥
গোস্বামী ব্রাহ্মণ এক তাঁহার সমীপ ।
বেনিয়াটোলায় ঘর নাম নবদ্বীপ ॥ ১৩ ॥
বড়ই খিয়াতি তাঁর বৈষ্ণবসমাজে ।
সোনার গোউর ঘরে ভক্তিভরে পুজে ॥ ১৪ ॥
স্বতন্ত্র আসন শ্রীপ্রভুর কিছু দূরে ।
পরিচিত শত শত ব'সে চারি ধারে ॥ ১৫ ॥
অতি বুদ্ধি সুপণ্ডিত পাঠক ব্রাহ্মণ ।
সমাপন হেতু করে দ্রুত অধ্যয়ন ॥ ১৬ ॥
যুদ্ধপ্রিয় সমধারা পণ্ডিত ব্রাহ্মণে ।
পরস্পর দেখা শুনা হইলে দুজনে ॥ ১৭ ॥
একবার রণ বিনা নাহিক বিরাম ।
টিকি নাড়া পৈতা ছেঁড়া তুমুল সংগ্রাম ॥ ১৮ ॥
যেইখানে পাঠ করে পাঠক ব্রাহ্মণ ।
ল'য়ে তার কোন অংশ শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ১৯ ॥
জিজ্ঞাসিল পাঠকেরে ব্যাখ্যা করিবারে ।
কিবা সূক্ষ্ম শাস্ত্র-মর্ম তাহার ভিতরে ॥ ২০ ॥
পাঠক পণ্ডিতবর যথা অর্থ জানা ।
বিশেষিয়া করিলেন ভাবের বর্ণনা ॥ ২১ ॥
শাস্ত্রী কহে ইহা নয়, ফাঁকি ধ'রে কাটে ।
পাঠক বলেন, এই ঠিক ব্যাখ্যা বটে ॥ ২২ ॥
এই হয়, এই নয়, কহে পরস্পর ।
এইরূপে দুইজনে তুমুল সমর ॥ ২৩ ॥
গজ-কচ্ছপের যুদ্ধ পর্বত উপরে ।
হার মানে দোহাকার মহারণ হেরে ॥ ২৪ ॥
বাদ-প্রতিবাদে দোঁহে কেহ নহে কম ।
নবদ্বীপ দেখিলেন ব্যাপার বিষম ॥ ২৫ ॥
বহু কর্ম আছে বাকি শেষ দিন এবে ।
তর্কযুদ্ধে যায় কাল কেমনে কি হবে ॥ ২৬ ॥
এই যত ভাবিছেন মন উচাটন ।
অন্তরেতে জানিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ২৭ ॥
মহাকার্য হয় ক্ষতি এতেক দেখিয়া ।
শাস্ত্রীরে থামিতে কন হাত নাড়া দিয়া ॥ ২৮ ॥
অতিশয় মেতে গেছে শাস্ত্রী নারায়ণ ।
তবু নহে ক্ষান্ত যদি প্রভুর বারণ ॥ ২৯ ॥
না মানে নিষেধ শাস্ত্রী তেড়ে তর্ক করে ।
সেই হেতু নবদ্বীপ কহিল তাঁহারে ॥ ৩০ ॥
শুন শুন ওহে শাস্ত্রী পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ।
শুন কি পরমহংস মহাশয় কন ॥ ৩১ ॥
শাস্ত্রী কহে দেখিয়াছি তাঁহার নিষেধ ।
কিন্তু এ শাস্ত্রিক তর্ক না মানিব জেদ ॥ ৩২ ॥
বিশেষ মীমাংসা নাহি হয় যতক্ষণ ।
কোনমতে না শুনিব কোন নিবারণ ॥ ৩৩ ॥
হায় শাস্ত্র-অধ্যয়নে কোটি নমস্কার ।
যাহাতে বসায় ঘটে অবিদ্যা-বাজার ॥ ৩৪ ॥
হীন হেয় ছার যশোমানের বাসনা ।
অহঙ্কার দাম্ভিকতা পাণ্ডিত্যগরিমা ॥ ৩৫ ॥
মহান্ অনর্থকর প্রতি পদে পদে ।
নিবিড় তমসজাল জ্ঞানসূর্য রোধে ॥ ৩৬ ॥
যেই প্রভুদেবে শাস্ত্রী সর্বেশ্বর জানে ।
না মানে তাঁহার আজ্ঞা বিদ্যা-অভিমানে ॥ ৩৭ ॥
মদে পূর্ণ মত্ততর শাস্ত্রীরে দেখিয়া ।
অমনি উঠিলা প্রভু আসন ত্যজিয়া ॥ ৩৮ ॥
সন্নিকটে গিয়া তাঁর ধরিয়া বদন ।
বলিলেন শুন শুন শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ৩৯ ॥
ভীষ্মার্জুনে দুই জনে যখন সমর ।
পাণ্ডবের তখন সারথি চক্রধর ॥ ৪০ ॥
চক্রে যার গোটা সৃষ্টি চক্রবৎ ঘুরে ।
কিছু নাহি বলিলেন ভীষ্ম বীরবরে ॥ ৪১ ॥
মহাজ্ঞানী ভীষ্মদেব কৃষ্ণ ভাল জানে ।
যত তাঁর উপদেশ কেবল অর্জুনে ॥ ৪২ ॥
জলে যেন নির্বাপিত হয় হুতাশন ।
স্তব্ধীকৃত সেইমত শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ৪৩ ॥
বিদ্যা-অভিমান বক্তি এতেক প্রবল ।
একবার শ্রীপ্রভূর পরশে শীতল ॥ ৪৪ ॥
যুকতি পাইয়া এবে পাঠক ব্রাহ্মণ ।
দ্রুতগতি কৈলাসাঙ্গ পাঠ-পারায়ণ ॥ ৪৫ ॥
নগরকীর্তনারম্ভ হৈল তার পরে ।
সমবেত বৈষ্ণবেরা নৃত্য গীত করে ॥ ৪৬ ॥
খোল করতাল কিবা শিঙ্গার-নিনাদ ।
শুনিলে প্রভুর উঠে আনন্দ অগাধ ॥ ৪৭ ॥
তার সঙ্গে মহাশক্তি অঙ্গময় গেলে ।
মহালম্ফে মিলিলেন কীর্তনের দলে ॥ ৪৮ ॥
পবন যেমন শক্তিধর উপমায় ।
আপুনি নাচিয়া পরে সকলে নাচায় ॥ ৪৯ ॥
সেইরূপ প্রভুদেব শক্তিসঞ্চালনে ।
করিলেন মাতোয়ারা যত লোক জনে ॥ ৫০ ॥
তার সঙ্গে সবে নাচে হরি বোল ব'লে ।
নাচেন গোস্বামী নবদ্বীপ বাহু তুলে ॥ ৫১ ॥
গায়কের দল নাচে মুখে উচ্চৈঃস্বর ।
খোল বাজাইয়া নাচে খোল-বাদ্যকর ॥ ৫২ ॥
দর্শকেরা মাতোয়ারা নেচে নেচে উঠে ।
প্রেমাবেশে কেহ কেহ ধরাতলে লুটে ॥ ৫৩ ॥
গায় নাচে সকলেই ছিল যত জন ।
দাঁড়ায়ে আছেন মাত্র পাঠক ব্রাহ্মণ ॥ ৫৪ ॥
বিমোহিয়া স্তব্ধীভূত জড়ের আকারে ।
দেখে শুনে কিন্তু কিছু বুঝিতে না পারে ॥ ৫৫ ॥
বরাবর প্রতিজ্ঞা আছিল তাঁর মনে ।
প্রাণান্তে কখন নাহি নাচিবে কীর্তনে ॥ ৫৬ ॥
কিন্তু এবে নাচি নাচি যত করে মন ।
ততই করেন তিনি বেগ সংবরণ ॥ ৫৭ ॥
কারণ না বুঝে এই বেগ বেগে কার ।
বিষম প্রভুর বেগ প্রলয়ী জুয়ার ॥ ৫৮ ॥
ব্রহ্মাণ্ড প্রকাণ্ডাকার মাহিক গণন ।
কোটি ব্রহ্মা কোটি বিষ্ণু কোটি পঞ্চানন ॥ ৫৯ ॥
কোটি পূর্ণ কোটি চন্দ্র বিশাল চেহারা ।
কোটি দেব কোটি দেবী মহাশক্তি ভরা ॥ ৬০ ॥
তেজস্বী তপস্বী কোটি কোটি ঋষিগণ ।
তপস্যা-প্রভায় গায় অতুল বিক্রম ॥ ৬১ ॥
বেগের সঙ্কেতে সবে হ'য়ে বাহ্যাহারা ।
অবিরত নাচে ঘুরে লাটিমের পারা ॥ ৬২ ॥
এ বা কেবা শক্তিমান পাঠক ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর এমন বেগ করে সংবরণ ॥ ৬৩ ॥
অদ্ভুত শকতি পঞ্চভূতে গড়া কায় ।
ভাগ্য মানি পদরজ পাইলে মাথায় ॥ ৬৪ ॥
জয় পাঠকের বেশে ব্রাহ্মণমুরতি ।
কেবা তুমি কি চিনিব আমি মুঢ়মতি ॥ ৬৫ ॥
কৃপায় মোচহ মম লোচন-আঁধার ।
দেখাও প্রভুর লীলা প্রকাশ-প্রচার ॥ ৬৬ ॥
শুন মন কি ঘটন হৈল হেনকালে ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব ভাবের বিহ্বলে ॥ ৬৭ ॥
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ আনন্দের ভরে ।
ভাবের উচ্ছ্বাস-ছটা খেলে তদুপরে ॥ ৬৮ ॥
শ্রীঅঙ্গ শিহরে কভু তাহায় কম্পন ।
কখন পুলক চোখে ধারা-বরিষণ ॥ ৬৯ ॥
কখন বা স্বেদজল অবিরল ঝরে ।
কখন অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ॥ ৭০ ॥
গোরাভক্ত নবদ্বীপ গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
বারে বারে বন্দী তাঁর দুখানি চরণ ॥ ৭১ ॥
কমলাসেবিত পদ প্রভুর ধরিয়া ।
প্রেমাবেশে ঢালে অশ্রু ঝরে গণ্ড দিয়া ॥ ৭২ ॥
বিষম কঠিন লোহা সুকঠিন কায় ।
সুতীক্ষ্ণ অসির ধার হাসিয়া উড়ায় ॥ ৭৩ ॥
সিদ্ধ বাক্য মহামন্ত্র, যে মন্ত্রের বলে ।
কঠোর কুলিশ যেবা সেও শুনে গলে ॥ ৭৪ ॥
তাও ঠেলে লোহা পায়, না হয় কোমল ।
কঠিনতা গুণ তায় এতই প্রবল ॥ ৭৫ ॥
কিন্তু যেন হেন লোহা কত শক্ত প্রাণ ।
আগুনের তেজে হয় ফেনের সমান ॥ ৭৬ ॥
শক্ত তেন জ্ঞানপন্থী পাঠক ব্রাহ্মণ ।
শ্রীপ্রভুর তেজ-বলে অকথ্য কথন ॥ ৭৭ ॥
দ্রবিয়া অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ।
জ্ঞানের কাঠিন্যভাব গেছে একেবারে ॥ ৭৮ ॥
ভয়লজ্জাহীন এবে নবদ্বীপে কয় ।
গোসাঁই বাধন তুমি প্রভুর তনয় ॥ ৭৯ ॥
জীবের মঙ্গল যদি তোমার কামনা ।
দেখাও পরমহংস বটে কোন জনা ॥ ৮০ ॥
কিরূপ স্বরূপ তাঁর কিরূপ চেহারা ।
আমি বৃদ্ধ অতিশয় দৃষ্টিশক্তিহারা ॥ ৮১ ॥
এতবলি যেমন বসিল দ্বিজবর ।
কুপাভরে কৃপাময় রূপার সাগর ॥ ৮২ ॥
দ্রুতগতি বায়ু যেন আর কেবা রাখে ।
দক্ষিণ চরণ দিলা ব্রাহ্মণের বুকে ॥ ৮৩ ॥
পরম সম্পদাস্পদ প্রভুর চরণ ।
পাইয়া তখনি উঠে পাঠক ব্রাহ্মণ ॥ ৮৪ ॥
সমুদিত চৈতন্য-দিনেশ সমুজ্জ্বল ।
রামকৃষ্ণ-স্তুতি গায় হইয়া বিহ্বল ॥ ৮৫ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর কৃপার চেহারা ।
হৃদয় আকাশে স্থির বিজলীর পারা ॥ ৮৬ ॥
করে করে সুধার কিরণ ক্ষরে তায় ।
সুশীতল সুখস্পর্শ জীবন জুড়ায় ॥ ৮৭ ॥
পরম আয়াস তবু অলস না আসে ।
মত্ত হ'য়ে মহানন্দে সিন্ধুনীরে ভাসে ॥ ৮৮ ॥
মহাবলে বলী এবে বৃদ্ধক ব্রাহ্মণ ।
সংকীর্তনে নৃত্য করে প্রকৃত যেমন ॥ ৮৯ ॥
রতিমদে মত্ত করী কমলের বনে ।
অতুল আনন্দময় অঙ্গ-সঞ্চালনে ॥ ৯০ ॥
প্রভুসনে সংকীর্তনে এত সুখ পায় ।
ইচ্ছা হয় যেন হেন কভু না ফুরায় ॥ ৯১ ॥
পারায়ণ-কার্য এবে নহে সমাপন ।
বুঝিয়া করিলা প্রভু শক্তি সংবরণ ॥ ৯২ ॥
প্রভু সংবরিলে শক্তি থামিল সকলে ।
কিন্তু উপভোগ্য সুখ হৃদিমাঝে খেলে ॥ ৯৩ ॥
সমভাবে তিল অণুকণা নহে কম ।
প্রভু-সঙ্গ-সুখ নহে কভু বিস্মরণ ॥ ৯৪ ॥
ক্রমশঃ মহিমা-কথা ছুটে দূরে পরে ।
প্রচার প্রকাশ শুন ভক্তিসহকারে ॥ ৯৫ ॥
বারুদের কারখানা মেগেজিন-ঘর ।
কোম্পানির
অধিকারে পুরীর উত্তর ॥ ৯৬ ॥
একচেটে ইংরাজের এই কারবার ।
শত শত শিখসৈন্য রক্ষা করে দ্বার ॥ ৯৭ ॥
শিখেরা নানক-পন্থী ধর্মে বড় টান ।
সাধুভক্ত পেলে করে অতুল সম্মান ॥ ৯৮ ॥
প্রভুর শুনিয়া নাম আসে দরশনে ।
কখন লইয়া তাঁয় যায় মেগেজিনে ॥ ৯৯ ॥
হৃদি বুঝি উপযুক্ত জ্ঞান উপদেশ ।
কৃপা করি শক্তিসহ দেন পরমেশ ॥ ১০০ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত বাক্য সিদ্ধমন্ত্র ।
বেদাদি পুরাণ গীতা স্তবস্তুতি তন্ত্র ॥ ১০১ ॥
ঈশ্বরের প্রমুখাৎ ঐশ বিবরণ ।
শক্তিবলে মুর্তিমান যাবৎ বচনে ॥ ১০২ ॥
এতই হইত খুশী প্রভুর বচনে ।
শুনে দণ্ডবৎ লুটে যুগল চরণে ॥ ১০৩ ॥
দেখিত প্রভুরে যেন বিশ্বগুরু প্রায় ।
অটল বিশ্বাস করে প্রভুর কথায় ॥ ১০৪ ॥
বুঝেছ বুঝেছ মন বুঝেছ কি এবে ।
সব সম্প্রদায় কেন তুষ্ট প্রভুদেবে ॥ ১০৫ ॥
বিবিধ ধরমপন্থী যত সম্প্রদায় ।
যে যথায় বিদ্যমান দেখা শুনা যায় ॥ ১০৬ ॥
পার সবে নিজ নিজ বিস্তর বিস্তর ।
বা তাহার প্রিয়ভোজ্য পুষ্টিরুচিকর ॥ ১০৭ ॥
শুন মন খুলে বলি লীলার বারতা ।
সরল সরস বড় রামকৃষ্ণকথা ॥ ১০৮ ॥
ধরাধামে লীলার কারণ যতবার ।
যুগে যুগে অবতীর্ণ প্রভু অবতার ॥ ১০৯ ॥
ভিন্ন ভিন্ন ভাব তাঁর ভিন্ন ভিন্ন বারে ।
বিভিন্ন বিভিন্ন কর্ম বিভিন্ন আধারে ॥ ১১০ ॥
একরূপে করেছেন এক ভাব পুষ্ট ।
পূর্বকৃত ধর্ম বিধি সব করি নষ্ট ॥ ১১১ ॥
এবারে দেখহ মন সহ সৎদৃষ্টি ।
একাধারে প্রভুদেব সবার সমষ্টি ॥ ১১২ ॥
সব ধর্ম সব মত সমভাবে বহে ।
একরূপে বহুরূপ শ্রীপ্রভুর দেহে ॥ ১১৩ ॥
সোনা-রূপা-রত্ন-মণি-হীরক-আকর ।
একাধারে ধরে সব উদর-ভিতর ॥ ১১৪ ॥
যা আছে ভারতে লেখা আছে বিধিমতে ।
নামে মাত্র সত্তাহীন যা নাই ভারতে ॥ ১১৫ ॥
তেন অবতারাকর প্রভুগুণমণি ।
পুরুষ-আকার নিজে জগতজননী ॥ ১১৬ ॥
সেই হেতু মাতৃভাবে প্রভুদেবরায় ।
আগাগোড়া ভজিলেন পূজিলেন মায় ॥ ১১৭ ॥
বিশ্বমাতা প্রভু লক্ষ্য সবার উপর ।
নানা ভাবরূপে পায় নানা পয়োধর ॥ ১১৮ ॥
সমভাবে পায় পুষ্টি যতেক সন্তান ।
কিবা হিন্দু কি যবন কিবা খ্রীষ্টিয়ান ॥ ১১৯ ॥
জগতজননী, তাঁয় সকলে উদ্ভব ।
জীবশিক্ষা হেতু তাই শ্যামা শ্যামা রব ॥ ১২০ ॥
প্রভুর কর্মের মর্ম কে করে ঠিকানা ।
শিক্ষা দিলা করিবারে শক্তি-আরাধনা ॥ ১২১ ॥
অগণ্য সাধনা তাঁর অগণন ভাবে ।
যে মূর্তি যে ভঙ্গে সেই ভঙ্গে প্রভুদেবে ॥ ১২২ ॥
যে রূপে যে নামে যেবা ডাকে ভগবানে ।
প্রভু গিয়া যেন সাড়া তার কানে কানে ॥ ১২৩ ॥
প্রভুর নিকটে নাই কোনই বিচার ।
জাতিধর্মভেদহীন সব একাকার ॥ ১২৪ ॥
রেণুবৎ লোমকূপ অল্প আয়তন ।
যদি কেহ কহে তার মধ্যে ত্রিভুবন ॥ ১২৫ ॥
শ্রোতা যেন কি ব্যাপার না পায় ঠিকানা ।
আপনার খোলা চোখে দরশন বিনা ॥ ১২৬ ॥
সেইমত আগাগোড়া লীলা শ্রীপ্রভুর ।
অত্যাশ্চর্য অপরূপ সরল মধুর ॥ ১২৭ ॥
না দেখালে কি দেখিবে জীবে দিশাহারা ।
প্রভুতে যে বহে বিশ্বজননীর ধারা ॥ ১২৮ ॥
অবতার বেদাদি যতেক দেখা যায় ।
প্রভুদেব তা সবার সূচীপত্র প্রায় ॥ ১২৯ ॥
সব রূপ সব ভাব শ্রীঅঙ্গেতে গেলে ।
অবহেলে বুঝা যায় প্রভুবে দেখিলে ॥ ১৩০ ॥
প্রভুর একাকী যেবা পাইবে সন্ধান ।
সে বুঝে যশবতার বেদাদি পুরাণ ॥ ১৩১ ॥
তন্ত্র গীতা কোরান গস্পেল গ্রন্থ নানা ।
অল্পকালে অবহেলে গুরুশিক্ষা বিনা ॥ ১৩২ ॥
সাধন ভজন বিনা দূরসাধ্য ফল ।
বিনা চাষে পায় বসে সুপক্ক ফসল ॥ ১৩৩ ॥
আনন্দকানন ঘরে রসে ভরা ক্ষেত ।
বিশ্বমনোহর ফুল ফল সমবেত ॥ ১৩৪ ॥
ফাঁকি দিয়া ধর্ম-কর্মে অনর্থক শ্রম ।
লুটিবারে রত্নাগার চাও যদি মন ॥ ১৩৫ ॥
প্রকাশ প্রচার শুন কেমন প্রভুর ।
ভক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী শ্রুতিসুমধুর ॥ ১৩৬ ॥
সসঙ্গ নারায়ণ শাস্ত্রী প্রভু একদিন ।
মহাপ্রীতে উপনীত যথা মেগেজিন ॥ ১৩৭ ॥
আপনি হাজির প্রভু করি দরশন ।
মহোল্লাসে পদে লুটে শিখ সৈন্যগণ ॥ ১৩৮ ॥
বসায়ে আসনে তাঁর বসে চারিধারে ।
জাতিগত উচ্চমান ভক্তিভরে করে ॥ ১৩৯ ॥
দয়াল শ্রীপ্রভুদেব স্বভাব যেমন ।
মনোমত তত্ত্বকথা কৈল উত্থাপন ॥ ১৪০ ॥
ইন্দ্রিয়াদি মন প্রাণ এক সঙ্গে লৈয়া ।
শুনে যত শিখ-সৈন্য নীরব হইয়া ॥ ১৪১ ॥
সন্নিকটে সমাসীন শাস্ত্রী হেন কালে ।
বলিলেন জ্ঞানতত্ত্ব উপদেশছলে ॥ ১৪২ ॥
শুনিয়া সৈন্যের দল উন্মত্তের প্রায় ।
উঠাইয়া তরবারি কাটিবারে যায় ॥ ১৪৩ ॥
সংসারীর মুখে জ্ঞানতত্ত্বের ব্যাখ্যান ।
শুনাইলে শিখদলে বুঝে অপমান ॥ ১৪৪ ॥
শাস্ত্রীরে কহিল তুমি আসক্ত সংসারী ।
জ্ঞানকথা-উপদেশে নহ অধিকারী ॥ ১৪৫ ॥
শাস্ত্র ঠেলি কি কারণ কহ হেন কথা ।
শাস্ত্রের অমান্য দোষে লব আজি মাথা ॥ ১৪৬ ॥
ভাগবত-শাস্ত্র আর ভক্ত ভগবান ।
তিনে এক তুল্য বস্তু হিন্দুর গিয়ান ॥ ১৪৭ ॥
সেইমত ধর্মশাস্ত্র শিখের সমাজে ।
যাঁর শাস্ত্র তাঁর তুল্য, নিত্য, নিত্য পূজে ॥ ১৪৮ ॥
কোপাবিষ্ট শিখে দেখি প্রভুনারায়ণ ।
মিষ্টভাষে তুষ্ট কৈলা তাহাদের মন ॥ ১৪৯ ॥
প্রভুদেবে শিখসৈন্য কত দূর মানে ।
মিলে রামকৃষ্ণভক্তি চরিত-শ্রবণে ॥ ১৫০ ॥
একদিন সৈন্যগণ সমরের সাজ ।
সঙ্গে আছে সৈন্নাধ্যক্ষ কাপ্তেন ইংরাজ ॥ ১৫১ ॥
অশ্বপৃষ্ঠে আগে আগে পশ্চাৎ সেনানী ।
চলিতেছে গড়মুখে অতি দ্রুতগামী ॥ ১৫২ ॥
হেনকালে পথিমধ্যে মথুরের সনে ।
আসিছেন প্রভুদেব সুন্দর ফিটনে ॥ ১৫৩ ॥
দরশন করি তাঁর যতেক সেনানী ।
জয় গুরু সম্ভাাষিয়া লুটায় অবনী ॥ ১৫৪ ॥
ফেলিয়া বন্দুক শস্ত্র ধরা করতলে ।
সামরিক রীতি প্রথা একেবারে ঠেলে ॥ ১৫৫ ॥
অধ্যক্ষের আজ্ঞা বিনা বড় পরমাদ ।
অস্ত্রত্যাগ সেনানীর মহা-অপরাধ ॥ ১৫৬ ॥
দেখি সেনাপতি কহে সৈনিকের বলে ।
অনুমতি বিনা হেন কি হেতু করিলে ॥ ১৫৭ ॥
উত্তরে অধ্যক্ষে কহে যত সৈন্যগণে ।
আমাদের এই রীতি গুরু-দরশনে ॥ ১৫৮ ॥
নাহি করি কোন গ্রাহ্য থাক্ যাক্ প্রাণ ।
দেখিলে করিব আগে গুরুরে প্রণাম ॥ ১৫৯ ॥
আশিস করিলা প্রভু ডানি হাত তুলে ।
অস্ত্রত্যাগী ধরাশায়ী সৈনিকের দলে ॥ ১৬০ ॥
শ্রীপ্রভুর কৃপাদৃষ্টে মহিমা অপার ।
সেনাপতি পুনরুক্তি না করিল আর ॥ ১৬১ ॥
জগজনমোহনিয়া দয়াল ঠাকুর ।
প্রচার প্রকাশ গুন বড়ই মধুর ॥ ১৬২ ॥
তৃতীয় খণ্ড
ডাকাত বাবার কথা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ কথা অতি শ্রবণমঙ্গল ।
ত্রিতাপ-তাপিত চিত শুনিলে শীতল ॥ ১ ॥
শ্রীগুরুমাতার কথা শ্রীপ্রভুর সনে ।
অবহেলে ভক্তি মিলে শুনে মাত্র কানে ॥ ২ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব তেমনি জননী ।
স্নেহময়ী দয়াময়ী মঙ্গলরূপিণী ॥ ৩ ॥
অন্য অন্য অবতারে গুপ্তে যেন বাস ।
প্রভু-অবতারে মাতা বড়ই প্রকাশ ॥ ৪ ॥
ফলবতী লতা যেন নত ফলভরে ।
স্নেহেতে জননী তেন জীবের উপরে ॥ ৫ ॥
বাসনা পূরাতে মাতা প্রভুর সমান ।
উপমার শত শত আছে উপাখ্যান ॥ ৬ ॥
গাইলে শুনিলে উঠে আনন্দ অপার ।
শুনহ নূতন কথা ডাকাত বাবার ॥ ৭ ॥
সুন্দর বারতা যেই মন দিয়া শুনে ।
নিশ্চয় পাইবে ভক্তি মায়ের চরণে ॥ ৮ ॥
কথার ভিতরে আছে এতদূর বল ।
শুনে উপজিবে হৃদে ভকতি অচল ॥ ৯ ॥
শুনিয়া সুন্দর কথা রে চঞ্চল মন ।
টুটাইয়া দেহ মোর ভবের বন্ধন ॥ ১০ ॥
পাড়াগায়ে মেয়েদের এই রীতি চলে ।
গঙ্গাস্নানে আসে কোন শুভযোগ হ'লে ॥ ১১ ॥
বল বেঁধে প্রতিবাসী পাড়ার পাড়ার ।
ব্রাহ্মণ কায়স্থ তেলী কামার কুমার ॥ ১২ ॥
একবার আসিবেন অনেক রমণী ।
শুনিলেন কানে কথা মাতাঠাকুরানী ॥ ১৩ ॥
তখনি বলিলা মাতা সবা সন্নিধানে ।
সঙ্গে ল'য়ে যাও যদি যাই গঙ্গাস্নানে ॥ ১৪ ॥
ভাল বলি দিল সায় যতেক রমণী ।
শুন কি হইল পরে পথে র কাহিনী ॥ ১৫ ॥
জগমাতা শ্যামাসুতা প্রভু-অবতার ।
আদ্যাশক্তি মহামায়া ব্রাহ্মণের ঘর ॥ ১৬ ॥
অপরূপ নরলীলা কে বুঝিতে পারে ।
দেবতার লাগে ধাঁধা কি বুঝিবে নরে ॥ ১৭ ॥
কে দেখিতে পারে প্রভু নাহি দেখাইলে ।
কিবা আঁকা লেখা আছে রাঙ্গা পদতলে ॥ ১৮ ॥
রক্তিম চরণ কথা শুনেছি পুরাণে ।
মা যদি সামান্যা তবে রাঙ্গাপদ কেনে ॥ ১৯ ॥
বাহির হইলা মাতা নারীগণসাথে ।
অপরূপ খেলা এক করিলেন পথে ॥ ২০ ॥
শ্রীকামারপুকুরের বহু পূর্বদিকে ।
উতরিতে গঙ্গাতীর তিন দিন লাগে ॥ ২১ ॥
মেয়েদের পক্ষে চ'লে আসা গঙ্গাতট ।
বড়ই বিষম কষ্ট বিষম সঙ্কট ॥ ২২ ॥
চলিতে অভ্যাস নাহি কিছু দূরে গেলে ।
বিষম যাতনা পায় যায় তার ফুলে ॥ ২৩ ॥
বিশেষতঃ জননীর চরণ কোমল ।
কোমলতে পরাভব মানে শতদল ॥ ২৪ ॥
প্রথম দিবসে মাতা সঙ্গীদের সনে ।
চলিয়া পাইলা ব্যথা কোমল চরণে ॥ ২৫ ॥
দ্বিতীয় দিবসে আর না চলে চরণ ।
তফাত হইয়া তাই পড়ে সঙ্গিগণ ॥ ২৬ ॥
সঙ্গীদের মধ্যে বহু আপনা আপনি ।
মধ্যম ভাসুরসুতা লক্ষ্মীঠাকুরানী ॥ ২৭ ॥
প্রভুর শ্রীমুখে কহা কাহিনী তাঁহার ।
মানবিনী-বেশে শীতলার অবতার ॥ ২৮ ॥
লক্ষ্মীও তাঁদের সঙ্গে হয়ে একত্রিতা ।
চলে গেছে মনে নাই মা গেলেন কোথা ॥ ২৯ ॥
সামান্য তফাত নয় গেছে বহুদূর ।
এখানে জননী একা চিন্তায় আতুর ॥ ৩০ ॥
চলিতে অশক্ত পথ না পান নাগাল ।
ক্রমশঃ হইল প্রায় বিগত বিকাল ॥ ৩১ ॥
আগতা যামিনী দেখি চিন্তান্বিতা মাতা ।
কেহ নাহি সঙ্গে একাকিনী যাব কোথা ॥ ৩২ ॥
বিষম প্রান্তর কেহ নাহিক কোথায় ।
সন্দ পথ বীরে ভয় দিনের বেলায় ॥ ৩৩ ॥
ভয়ে জননীর বারি ঝরে দুনয়নে ।
হেনকালে সঙ্গে জুটে অন্য দুই জনে ॥ ৩৪ ॥
স্ত্রী-পুরুষ দু'ই তারা ছিল অন্যস্থানে ।
এখন যেতেছে ফিরে নিজের ভবনে ॥ ৩৫ ॥
পুরুষ প্রকাণ্ডকার ভীষণ গড়ন ।
ডাকাতের সমাকৃতি ভয় দরশন ॥ ৩৬ ॥
মাথায় বাবুরি চুল গোঁফ ঝুল্পি কাটা ।
বরন বিকট কাল হাতে ধরা সোঁটা ॥ ৩৭ ॥
বৃহৎ রূপার বালা পরা দুই হাতে ।
সালুর উড়ানি লম্বা পাগ বাঁধা মাথে ॥ ৩৮ ॥
দ্রুতপদ-সঞ্চালনে সঙ্গেতে রমণী ।
জুটিয়া পড়িল যথা মাতা একাকিনী ॥ ৩৯ ॥
সভয় অন্তর মাতা কান্দিয়া কান্দিয়া ।
বলিলেন
দু'হে পিতা মাতা সম্বোধিয়া ॥ ৪০ ॥
রক্ষা কর তোমা দোঁহে আমি একাকিনী ।
পাছু ফেলে
গেছে চলে যতেক সঙ্গিনী ॥ ৪১ ॥
স্নেহময়ীরূপা দাতা স্নেহেতে গঠিত ।
মুখে বারে
স্নেহ-মাখা বাণী সেইমত ॥ ৪২ ॥
এত মিঠে কথা মার যে শুনে যে কালে ।
হোক না পাষাণহৃদি তখনিই গলে ॥ ৪৩ ॥
তদুপরি ভয়াতুরা আঁখিভরা জল ।
বদনে বিষাদ মাখা পরান বিকল ॥ ৪৪ ॥
জানি না দেখিয়া স্থির কে থাকিতে পারে ।
এমন কঠিন কেবা ভুবন ভিতরে ॥ ৪৫ ॥
এত মিঠে স্মৃতি মার হেরিলে নয়নে ।
মনে হয় আর কেহ নাহি মাতা বিনে ॥ ৪৬ ॥
হইয়া মায়ের ছেলে মার কাছে রব ।
সুখ দুখে সমভাবে মায়ে নিরখিব ॥ ৪৭ ॥
ভোগিব অসহ্য কষ্ট মায়ের কারণে ।
দিতে হয় দিব ছেড়ে তাঁর তরে প্রাণে ॥ ৪৮ ॥
দেখ মন আমি এত হীনবলাকার ।
নাই শক্তি পঞ্চ সের তুলিতে আমার ॥ ৪৯ ॥
কিন্তু যদি প্রয়োজন হয় মার হেতু ।
সাগরে বাঁধিতে পারি পাষাণের সেতু ॥ ৫০ ॥
বিভীষণ চক্র করি চক্রপাণি হাতে ।
পুরন্দর বজ্রসহ চড়ি ঐরাবতে ॥ ৫১ ॥
মহেশ পিনাকপাণি সুবিষম শূল ।
দেখিয়া যাঁহার ভয়ে ত্রিলোক আকুল ॥ ৫২ ॥
কালাগ্নি সমান বাণ আপন আপন ।
ল'য়ে যদি একত্রিত হয় দেবগণ ॥ ৫৩ ॥
যক্ষ রক্ষ নাগ আদি কিন্নরনিচয় ।
একপক্ষে সকলেই প্রতিবাদী হয় ॥ ৫৪ ॥
কাক লক্ষ সম গণি খেদাইতে পারি ।
অভয় মুরতি মার একবার স্মরি ॥ ৫৫ ॥
প্রান্তরে কাঁদেন মাতা প'ড়ে একাকিনী ।
যে দিন শুনেহি আমি এহেন কাহিনী ॥ ৫৬ ॥
সে দিন হইতে মোর গিয়াছে পিরীতি ।
কিবা ব্রহ্মা বিষ্ণু কিবা মহেশের প্রতি ॥ ৫৭ ॥
হয় তাঁরা হীনবল দুর্বল আকার ।
নচেৎ হয়েছে মাতা দেবত্ব সবার ॥ ৫৮ ॥
কিংবা সবে নিদ্রাগত নয় নাহি প্রাণ ।
নষ্টবল নিপতিত আছে মাত্র নাম ॥ ৫৯ ॥
ধন্যরে দেবত্বগিরি কি আছে দেবত্বে ।
জানিতে নারিল মাতা কাঁদিছেন পথে ॥ ৬০ ॥
কাজ নাই দেবত্বতে কিবা প্রয়োজন ।
মনে যেন জাগে মার অভয়চরণ ॥ ৬১ ॥
কি কাজ জানিতে যাতা জগৎ ঈশ্বরী ।
হর্ত্রী কর্ত্রী বিধায়িত্রী ব্রহ্মাণ্ড-উদরী ॥ ৬২ ॥
সৃজিকা পালিকা মহাশক্তির আধার ।
শ্যামা-সীতা রাধা সতী উমা অবতার ॥ ৬৩ ॥
করগত যড়ৈশ্বর্য সাধন সিদ্ধাই ।
হেন জ্ঞানে আরাধনে যেমন না চাই ॥ ৬৪ ॥
মায়ে রবে মাতা জ্ঞান কিছু না বিচারি ।
সামান্য সরল সাদা ব্রাহ্মণঝিয়ারী ॥ ৬৫ ॥
কি কাল পরমতত্ত্বে, ঈশ ঈশী দেখা ।
থাক মহা-আবরণে যেন আছে ঢাকা ॥ ৬৬ ॥
ভগবানে অন্বেষণে নাহি প্রয়োজন ।
থাকে যেন প্রভু আর মার পদে মন ॥ ৬৭ ॥
প্রভুর প্রসঙ্গ চেয়ে কিবা মিষ্টতর ।
শুনহ বারতা কিবা হৈল অতঃপর ॥ ৬৮ ॥
জননীর পয়োধর যোগেতে যেমন ।
পুষ্টিকর মুষ্টিযোগ দুধ-সঞ্চালন ॥ ৬৯ ॥
তেমনি মায়ের শ্রীবদন-বিনিঃসৃত ।
স্নেহপরিপূর্ণ বাণী জিনিয়া অমৃত ॥ ৭০ ॥
পিতামাতা সম্বোধন স্ত্রী-পুরুধ দোঁহে ।
শুনিয়া বাৎসল্য রলে মগ্ন হয় মোহে ॥ ৭১ ॥
মোহ ব'লে মোহ নয় আশ্চর্য কথন ।
ক্ষীরসম ঘন নহে দুধের মতন ॥ ৭২ ॥
দেখিয়া মাগীর হৃদি যায় উথলিয়ে ।
সঠিক গিয়ান যেন পেটেধরা মেয়ে ॥ ৭৩ ॥
আছিলেন এত দিন শ্বশুরের ঘরে ।
অকস্মাৎ আজ দেখা প্রান্তর-অন্তরে ॥ ৭৪ ॥
ভীতচিত দেখি মায়ে আশ্বাসিয়া কয় ।
আমরা রয়েছি মাগো কি তোমার ভয় ॥ ৭৫ ॥
নাহি জানি কিবা নাম জুটে কোথা হ'তে ।
নিজে মার মুখে শুনা বাগ্দী তারা জেতে ॥ ৭৬ ॥
লক্ষ লক্ষ দণ্ডবৎ চরণে তাঁদের ।
জাতির খাতির নয় নহে বিচারের ॥ ৭৭ ॥
মায়ে যারা বাসে যার পদে যার মন ।
হোক না চণ্ডাল সেই মুকুটি ব্রাহ্মণ ॥ ৭৮ ॥
জনমিয়া দ্বিজকুলে যদি দ্বেষী হয় ।
চণ্ডাল অধিক ছোট হেন মনে লয় ॥ ৭৯ ॥
কিবা উচ্চ জাতি দুঁহে কি বলিব বল ।
উচ্চতার উপমায় তাঁহারা কেবল ॥ ৮০ ॥
আশ্বাসিয়া জননীরে চলে গুটি গুটি ।
অধিক অন্তরে নয় নিকটেতে চটি ॥ ৮১ ॥
পান্থশালা নানান্তরে চটি বলে যায় ।
উতরিলা তথা ঠিক সন্ধ্যার বেলায় ॥ ৮২ ॥
বাগদিনী পাগলিনী আনন্দের ভরে ।
সেবা-শুশ্রূষার হেতু মহাযত্ন করে ॥ ৮৩ ॥
মা যে ব্রাহ্মণের মেয়ে তারা ছোট জেতে ।
এ গিয়ান মোটে নাই এত গেছে মেতে ॥ ৮৪ ॥
খেতে এনে দেয় যাহা ভাল কিছু পায় ।
বিচারবিহীন যেন মারে করে ছায় ॥ ৮৫ ॥
মাতাও গেছেন ভুলে জাতির বিচার ।
স্নেহভরে দেয় তাঁর করেন আহার ॥ ৮৬ ॥
ধন্যরে ভক্তের ভাব ভক্তির মহিমা ।
বলিতে না পাই খুঁজে কিছুই উপমা ॥ ৮৭ ॥
ব্রহ্মসনাতনী যিনি সর্বসারাৎসারা ।
তপে জপে যজ্ঞে যাঁরে না পায় কিনারা ॥ ৮৮ ॥
তন্ত্র বেদ ক্লান্তকার স্বরূপ গাইয়ে ।
আজ তিনি ভক্তিবশে বাগদীর মেয়ে ॥ ৮৯ ॥
মায়ের ধরিয়া নাম ডাকে বাগদ্বিনী ।
ঠিক ডাকে ডাকে যেন গরভধারিণী ॥ ৯০ ॥
বসনে বিছানা করি ঘরের ভিতরে ।
শুয়াইয়া রাখে মায় নিজে একধারে ॥ ৯১ ॥
মিন্সে মহারথী প্রায় বীরের আকার ।
হাতে সোঁটা রাত্রি গোটা রক্ষা করে দ্বার ॥ ৯২ ॥
মাঝে মাঝে আশ্বাসিয়া কহে জননীরে ।
কি ভয় ঘুমাও মাগো আমি আছি দ্বারে ॥ ৯৩ ॥
রাতি গেলে উবা এলে উঠায় মাতায় ।
স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গে ল'য়ে পথে চলে যায় ॥ ৯৪ ॥
কহে মায় বার বার মোরা সঙ্গে যাব ।
যথায় সঙ্গিনী সব জুটাইয়া দিব ॥ ৯৫ ॥
যদি তে-সবার সঙ্গে দেখা নাহি গাই ।
দক্ষিণশহর
যাব কোন চিন্তা নাই ॥ ৯৬ ॥
মায়ের কোমল অঙ্গ কোমল চরণ ।
পথশ্রমে অতিক্রান্ত
বিশুষ্ক বদন ॥ ৯৭ ॥
দুই চারি পাঁচ গণ্ড বেলা হ'লে গায় ।
রৌদ্রতাপে আরও মুখ
শুকাইয়া যায় ॥ ৯৮ ॥
নেহারি বসায় তাঁয় ছায়ায় বৃক্ষের ।
জলপান করিবার বেলা হ'ল ঢের ॥ ৯৯ ॥
এই বলি বিকলপরাণা বাগদিনী ।
মিন্সেরে কহিল কিছু এনে দেহ কিনি ॥ ১০০ ॥
যোগায় শীতল জল করি অন্বেষণ ।
শ্রমদূরে পরে পুনঃ পথে আগমন ॥ ১০১ ॥
পথশ্রমে ফাঁকি দিতে কহে বাগদিনী ।
মিন্সে বলি সম্ভাষিয়া আপনার স্বামী ॥ ১০২ ॥
কহিল গাইতে গান শুনাইতে মায় ।
সে অতি সুমিষ্টকণ্ঠ মিঠা গান গায় ॥ ১০৩ ॥
কালিয়দমনদলে বাসদেবি করে ।
তত্ত্বকথাগীত গায় অনুরাগভরে ॥ ১০৪ ॥
তার মধ্যে এক গান গায় যতগুলি ।
মায়ের শ্রীমুখে শুনা শুন শুন বলি ॥ ১০৫ ॥
"কেন কাঁদে প্রাণ তারই তরে ।
সে যে নহে অন্তরঙ্গ, ভুল করে যে ভঙ্গ,
সাধুর
ঘরে যেন চোরে চুরি করে ॥"
গাইল অনেক গীত তার মধ্যে কেনে ।
কেবল এ এক গান লাগে মার প্রাণে ॥ ১০৬ ॥
তাই আজি তক মনে গাঁথা আছে তাঁর ।
ভেবে মন দেখ গীতে কি আছে ব্যাপার ॥ ১০৭ ॥
হৃদয় প্রকাশে মিন্সে গেয়ে এই গান ।
কার জন্যে কেন তার কেঁদে উঠে প্রাণ ॥ ১০৮ ॥
বহু দুঃখে কহে তারে অন্তরঙ্গ নয় ।
কেন না ভাসায় জলে কুল করি ক্ষয় ॥ ১০৯ ॥
বড়ই নিদ্বয় করি হৃদিশান্তি চুরি ।
যে চায় কাঁদায় তায় দিবাবিভাবরী ॥ ১১০ ॥
কেবা সে নিদয় হেগা সাধু কোন জন ।
মরি শুরু প্রভুদেবে ভেবে দেখ মন ॥ ১১১ ॥
যখন গেয়েছে গীত কিবা ভাব মনে ।
ব্যথিত ব্যতীত ব্যাথা অন্যে নাহি জানে ॥ ১১২ ॥
গীতছলে বলিয়াছে মরণের ব্যাথা ।
কোমলপরানা মার মনে তাই গাঁথা ॥ ১১৩ ॥
জন্ম জন্ম মহাভক্ত মার এই দোঁহে ।
ধরিয়াছে নরদেহ বাগদীর গৃহে ॥ ১১৪ ॥
পদরজ দোঁহাকার আশ করে দীনে ।
থাকে যেন মতি রতি মায়ের চরণে ॥ ১১৫ ॥
ভগবানে ভক্ত বড় মিষ্টতম খেলা ।
হৃদে ফুটে যদি মুখে নাহি যায় বলা ॥ ১১৬ ॥
জগৎ-জননী যিনি বিশ্বের ঈশ্বরী ।
ব্রহ্মাণ্ডমোহিনী মায়া যাঁর সহচরী ॥ ১১৭ ॥
বালিকার খেলা-ডালি সম সৃষ্টি যাঁর ।
বুঝিতে যাহারে লাগে মহেশে আঁধার ॥ ১১৮ ॥
ভক্তসঙ্গে তাঁর খেলা এহেন রকন ।
মানুষ থাকুক দূরে ব্রহ্মাদির ভ্রম ॥ ১১৯ ॥
স্ত্রীপুরুষে মাগী-মিন্সে সঙ্গে ল'য়ে যায় ।
চক্ষে দেখে আপনার বালিকার প্রায় ॥ ১২০ ॥
জানিতে না পারে মাতা বটে কোন জন ।
লোহা সম টানে প্রাণে চুম্বকে যেমন ॥ ১২১ ॥
ধরি ধরি করে কিন্তু ধরিতে না পারে ।
মহা-আবরণ মায়া ঢাকে রবি-করে ॥ ১২২ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যবতী জনম ধরায় ।
যায় আয় ঘন ঘন মার পানে চায় ॥ ১২৩ ॥
বসায় ছায়ায় শুষ্ক হইলে বন্ধন ।
যে কোন প্রকারে পারে করে দূর শ্রম ॥ ১২৪ ॥
পূর্বকার দিন মত সেদিন কাটিল ।
প্রত্যুষে উঠিয়া পথে পুনশ্চ চলিল ॥ ১২৫ ॥
দশমীতে বিজয়ার প্রতিমা-বদন ।
বিষম বিষাদমাখা করি নিরীক্ষণ ॥ ১২৬ ॥
জনমন মগ্ন যেন হয় মহাক্লেশে ।
তেমতি দেখিয়া যায় দু'হু মাগী মিন্সে ॥ ১২৭ ॥
স্ত্রীপুরুষে ভাসে কেন নিরানন্দ-নীরে ।
মায়ের বা কেন হেন বিষাদ অন্তরে ॥ ১২৮ ॥
ভিতরে ইহার আছে ব্যাপার সুন্দর ।
শুন কি হইল পরে পথের খবর ॥ ১২৯ ॥
নানা মঠ নানা গ্রাম পার হয়ে গেলে ।
বৈদ্যবাটী-সন্নিকটে সঙ্গিগণে মিলে ॥ ১৩০ ॥
মিলিলা জননী হারা সঙ্গিদের সাথে ।
দেখি দোঁহাকার যেন বাজ পড়ে মাথে ॥ ১৩১ ॥
ছাড়িয়া যাইবে মাতা বড় দুঃখ হৃদে ।
অবিরল আঁখিজল স্ত্রীপুরুষে কাঁদে ॥ ১৩২ ॥
কোথা হ'তে এত স্নেহ এল দু'জনার ।
ধরায় ধরিয়া দেহ খেলা কি মজার ॥ ১৩৩ ॥
দুই দিন দেখা মাত্র হ'লে পরস্পরে ।
নাম নাহি থাকে মনে কিছুদিন পরে ॥ ১৩৪ ॥
এ কেমন সংমিলন জননীর সনে ।
জন্ম পরিচিত বোধ বারেক দর্শনে ॥ ১৩৫ ॥
পরিচিত মিথ্যা নয় কথা সত্য বটে ।
আছিল গোপনে কলি এবে গেল ফুটে ॥ ১৩৬ ॥
পাতালপরশ যে প্রকার প্রস্রবণ ।
দৈব ঘটনায় থাকে আবদ্ধ বদন ॥ ১৩৭ ॥
আইলে সময় তার আবরণ গেলে ।
ভিতরের যত জোর একেবারে খুলে ॥ ১৩৮ ॥
সেইমত স্নেহভক্তি ছিল আবরণে ।
মুক্তদ্বার দোঁহাকার মার দরশনে ॥ ১৩৯ ॥
জর জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ।
চতুর্বিধ-মুক্তি-ভক্তি-চৈতন্যদায়িনী ॥ ১৪০ ॥
ব্রহ্মসনাতনী গোটা সৃষ্টির আধার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪১ ॥
লজ্জাপটাবৃতা মাতা ব্রাহ্মণঝিয়ারী ।
বিশ্বকর্ত্রী জগদ্ধাত্রী পরম-ঈশ্বরী ॥ ১৪২ ॥
দেহে ভরা মঙ্গলরূপিণী অবতার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৩ ॥
যতনে গোপন আরক্তিম পদতল ।
ভক্তজন আকিঞ্চন লালসার স্থল ॥ ১৪৪ ॥
পরমসম্পদপদ রতন-আগার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৫ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-পুষ্টকারিণী জননী ।
রক্ষাকর্ত্রী জাগয়িত্রী কুলকুণ্ডলিনী ॥ ১৪৬ ॥
সিদ্ধিশাস্তিস্বরূপিণী করুণা অপার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৭ ॥
রতিমতিহীন জনে সুমতিদায়িনী ।
সৃষ্টিছাড়া কৃপাদৃষ্টি দুর্গতিনাশিনী ॥ ১৪৮ ॥
কায়মনোবাক্যে পতি সেধাভক্তি যাঁর ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৯ ॥
পবিত্রমূরতি সতী পতিতপাবনী ।
জীবের রক্ষার হেতু শিক্ষাবিধায়িনী ॥ ১৫০ ॥
লজ্জাশীলা কুলবালা ধরম-আচার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫১ ॥
জয় নারীরূপধরা ত্রিলোকপালিকা ।
ভক্তগতমনপ্রাণ ব্রাহ্মণবালিকা ॥ ১৫২ ॥
আত্ম কেবা পর কেবা নাহিক বিচার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫৩ ॥
দীনদয়াময়ীরূপা করুণারূপিণী ।
তন্ত্রমন্ত্রবেদাতীত চরণ দুখানি ॥ ১৫৪ ॥
ঠিক পাড়াগেঁয়ে মেয়ে জননী আমার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫৫ ॥
বাগ্দিনী বিষাদিনী আকুলপরান ।
মায়ের কারণে কিনে আনে জলপান ॥ ১৫৬ ॥
মটরের শুঁটিসহ ধরিয়া আঁচল ।
বেঁধে দেয় সযতনে চক্ষে ঝরে জল ॥ ১৫৭ ॥
মাতাও কাঁদেন তেন দোঁহামুখ চেয়ে ।
বিষম রগড় কাণ্ড পথে দাঁড়াইয়ে ॥ ১৫৮ ॥
মাগীরে দিলেন মাতা নিজের বসন ।
অবাক হইয়া রঙ্গ দেখে সঙ্গিগণ ॥ ১৫৯ ॥
সান্ত্বনাস্বরূপ কথা বলিলা দোঁহারে ।
যেখা হয়ে যাও যদি দক্ষিণশহরে ॥ ১৬০ ॥
মিষ্টভাবে করি তুই দোঁহাকার মন ।
দক্ষিণশহরপথে করিলা গমন ॥ ১৬১ ॥
মিন্সে মাগী কেবা দু'হে কিছু নাহি জানি ।
কন্যারূপে কৃপা যাবে করিলা জননী ॥ ১৬২ ॥
মহাপ্রিয় ভক্ত পূর্বে বরদান ছিল ।
কন্যা হ'য়ে ভাই মাতা সাধ মিটাইল ॥ ১৬৩ ॥
কোন্ ভক্ত কিবা রূপে আছে কোনখানে ।
গুপ্ত প্রভু-অবতারে সাধ্য কার চিনে ॥ ১৬৪ ॥
ভক্তগণ গুপ্ত এত চেনা মহাদায় ।
খনিমধ্যে মণি যেন কাদা মাখা গায় ॥ ১৬৫ ॥
প্রভুসনে মার লীলা মধুর ভারতী ।
সবিশ্বাসে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬৬ ॥
তৃতীয় খণ্ড
মোদকের বাঞ্ছা পূর্ণ ও স্বদেশে মহাসঙ্কীর্তন
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভকতবৎসল ।
সুদীন-দরিদ্র দুঃখী-দুর্বলের বল ॥ ১ ॥
কৃপাময় অবতার দয়ায় দ্রবিয়া ।
ভরসিন্ধুপারাবারে সদা দেন খেয়া ॥ ২ ॥
স্বার্থশূন্য নেয়ে নাহি লন দানকড়ি ।
যেই
যায় ঘাটে তার লয়ে দেন পাড়ি ॥ ৩ ॥
যে না জানে পারঘাট ডাক দেন তায় ।
সম্বলবিহীন কে রে পারে যাবি আয় ॥ ৪ ॥
অন্ধজনা চক্ষু বিনা দেখিতে না পেলে ।
প্রসারি শ্রীকরদ্বয় নায়ে নেন তুলে ॥ ৫ ॥
অপার কৃপার ধাম, কৃপার মুরতি ।
শুন মন একমনে রামকৃষ্ণ পুঁথি ॥ ৫ ॥
দিবারাতি মাতি নাতি শুন একমনে ।
দিয়া পাতি নিজ ছাতি ভবের তুফানে ॥ ৬ ॥
সংসারসাগর মহাতরঙ্গ-আলয় ।
ধন-জন দারা-পুত্র স্বার্থনাশ ভয় ॥ ৭ ॥
ভীষণ তরঙ্গচর ধর ছাতি পাতি ।
তবে না হইবে শুনা রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৮ ॥
এ সময় শ্রীপ্রভুর বেশে আগমন ।
সঙ্গে চলে সেবাপর আত্মীয়-স্বজন ॥ ৯ ॥
হৃদয় ভাগিনা আর মাতাঠাকুরানী ।
শুনহ অদ্ভুত কথা পথের কাহিনী ॥ ১০ ॥
ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু শ্রীপ্রভু কেমন ।
লীলায় বুঝিয়া দেখ অবিশ্বাসী মন ॥ ১১ ॥
অকপট হৃদে সাধ যেই যাহা করে ।
সর্বঘটবার্তাবিদ ঈশ্বরগোচরে ॥ ১২ ॥
প্রভু পূর্ণ করেন সহস্র গুণে তার ।
লীলায় প্রত্যক্ষ আছে উপমা হাজার ॥ ১৩ ॥
কল্পনার নয় কথা চাক্ষুষ নয়নে।
মেজে হয়ে দেখা সব আলোদয় দিনে ॥ ১৪ ॥
অবতার মূল গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডের স্বামী।
লজ্জাপটাবৃতা মাতা জগৎজননী ॥ ১৫ ॥
নাহি চাই পরংব্রহ্ম যিনি নিরাকার।
বড় মিষ্ট রামকৃষ্ণ ঠাকুর আমার ॥ ১৬ ॥
বার বার লীলাচ্ছলে খেলা ধরাধামে।
ধর্ম-সংরক্ষণ আর ভূভার-হরণে ॥ ১৭ ॥
শুনহ কেমন লীলা হইল প্রভুর।
শুনিয়াছি দেখিয়াছি আমি যতদূর ॥ ১৮ ॥
পথেতে দেয়ানগঞ্জ আছে গণ্ডগ্রাম।
নদীতটস্থিত তাই ব্যবসার স্থান ॥ ১৯ ॥
বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী সর্বলোকে জানে।
ধনাঢ্য ব্যবসাদার বহু সেই গ্রামে ॥ ২০ ॥
তাহাদের মধ্যে সাধু ভক্ত এক জন।
মহাভাগ্যবান বন্দি তাঁহার চরণ ॥ ২১ ॥
জাতিতে ময়রা তেঁহ গঞ্জে আদি বাস।
দ্বিজভক্ত সাধুপদে অটল বিশ্বাস ॥ ২২ ॥
পরিপাটী সুন্দর আবাস নিকেতন।
সাধ্যমত অর্থব্যয়ে বানায় নূতন ॥ ২৩ ॥
হেন ভাব পরিপূর্ণ আবাস ভিতরে।
দেখা মাত্র বোধ যেন লক্ষ্মী আছে ঘরে ॥ ২৪ ॥
দিব্য শুদ্ধ সত্ত্বভাব অবিরত খেলে।
রজস্তম কিবা তার গন্ধ নাহি মিলে ॥ ২৫ ॥
সাধু ভক্ত পেলে পরে মহা অনুরাগে।
যাহা থাকে দেয় নিজে ভোগিবার আগে ॥ ২৬ ॥
প্রকৃতিসুলভ তাঁর এইনত রীতি।
বানাইয়া বাড়ি তেঁর ভাবে দিবারাতি ॥ ২৭ ॥
যদি ভাগ্যবলে মিলে সাধু উদাসীন।
নূতন আবাসে তাঁরে
রাখি তিন দিন ॥ ২৮ ॥
করিয়া যেমন সাধ্য সেবা আদি তাঁর।
পশ্চাৎ আনিব দারা পুত্র পরিবার ॥ ২৯ ॥
এই আশে আছে ব'সে ভকত সজ্জন।
হেনকালে শ্রীপ্রভুর গ্রামে আগমন ॥ ৩০ ॥
ঝরে মেঘ ঝুরু ঝুরু দিবা-অবসান।
হৃদয় ভাগিনা করে বাসার সন্ধান ॥ ৩১ ॥
ভক্তিমান ময়রার কাছে এলে পরে।
সৌভাগ্য-উদয় মহা সহাদর করে ॥ ৩২ ॥
পরিচয় পাইয়া প্রণত বার বার।
বাসা দিল নূতন আবাসে আপনার ॥ ৩৩ ॥
ছিল সাধু-ভক্ত আশে দিলিল কি ঘরে।
সাধুভক্তগণ আশে ফিরে যাঁর তরে ॥ ৩৪ ॥
প্রভুর করুণা কত কহা নাহি যায়।
তালবৎ দেন তাঁরে তিল যেবা চায় ॥ ৩৫ ॥
সিদ্ধিদাতা ভবাব্ধির করুণ কাণ্ডারী।
হলাহল লয়ে দেন অমৃতের হাঁড়ি ॥ ৩৬ ॥
মোদকের ভাগ্যসীমা না যার বাখানি।
ঘরে যাঁর প্রভুসঙ্গে ত্রিলোকতারিণী ॥ ৩৭ ॥
ধরাধামে যে সময়ে হরি অবতার।
ছড়াছড়ি কৃপা যেন ধারা বরিষার ॥ ৩৮ ॥
প্রভুর মহিমা কই শক্তি নাই ঘটে।
আগমন হবে যথা মহানন্দ উঠে ॥ ৩৯ ॥
স্বভাবে সৌরভি পদ্ম যথা বিদ্যমান।
নিকটে যে থাকে পায় সুগন্ধ মহান ॥ ৪০ ॥
চরণ-সরোজ যেন প্রভুর আমার।
যথা ফুটে তথা উঠে আনন্দ অপার ॥ ৪১ ॥
তায় পূর্ণানন্দময়ী গুরুমাতা সাথে।
পাইয়া মোদক গেছে মহানন্দে মেতে ॥ ৪২ ॥
জানে না মোদক এঁরা বটে কোন্ জন।
কেবা
সেবাপর হৃদু আত্মীয় স্বজন ॥ ৪৩ ॥
পাইয়াও নাহি পায়, দেখেও না দেখে।
লীলা নিত্য উভয়েই ইন্দ্রিয়ে না ঢুকে ॥ ৪৪ ॥
মলিন মানুষবুদ্ধি লাগে কিবা কাজে।
মায়া-আঠা-মাখা রজ্জু জলে নাহি ভিজে ॥ ৪৫ ॥
হেন বৃদ্ধি ল'য়ে মহা গর্ব করে নর।
নাহি পায় হাতে যেবা হাতে নিরন্তর ॥ ৪৬ ॥
বাহ্যেন্দ্রিয় তার হয় বাহ্য-বস্তু-জ্ঞান।
ভিতরে না গেলে পরে কি আছে কল্যাণ ॥ ৪৭ ॥
চক্ষে দেখে আলোময় দিনের আকার ।
এই গাছ এই পাতা এই ত্বক তার ॥ ৪৮ ॥
এই মেঘ এই সূর্য এই পাখিগণ ।
এই আমি এই তুমি এই উপবন ॥ ৪৯ ॥
বাহ্যদৃশ্য ইহা কি ভিতরে দেখে তার ।
বলিবে ভিতরে গেলে আঁধার আঁধার ॥ ৫০ ॥
কেবল আধার নয় আধার নিবিড় ।
ইন্দ্রিয়াদি সহ মন একেবারে স্থির ॥ ৫১ ॥
হাসিয়া হাসিরা দেখে মহান রগড় ।
দৃষ্টিহীন দিনমণি আলোর আকর ॥ ৫২ ॥
আলোময় যেবা দেখে সে দেখে অলীক ।
আঁধার আঁধার দেখা এই দেখা ঠিক ॥ ৫৩ ॥
খুলিয়া বলিলে মন খাবে ভেবাচেকা ।
আঁখি মেলি দেখা নয় আঁখি মুদে দেখা ॥ ৫৪ ॥
মোদকের অন্য জ্ঞান কিছু নাই এবে ।
মহানন্দে গেছে মেতে পেয়ে প্রভুদেবে ॥ ৫৫ ॥
আনন্দে ডুবেছে তলে ইন্দ্রিয়াদি মন ।
আনন্দ-আধার কেবা করে অন্বেষণ ॥ ৫৬ ॥
কি পদ্ম কেমন পদ্ম কিবা গুণ ধরে ।
পেলে অলি পিয়ে মধু না যায় বিচারে ॥ ৫৭ ॥
এখানে সেখানে ছুটে দ্রব্য-আয়োজনে ।
গর্জিয়া ঝরিছে মেঘ বৃষ্টি নাহি মানে ॥ ৫৮ ॥
নাহি ত্রাস মহোল্লাস মোদক-অন্তরে ।
দ্রব্যহেতু ভ্রাম্যমাণ দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৫৯ ॥
জোত্রাপন্ন অর্থের অভাব নাহি তাঁর ।
তদুপরি হৃদিখানি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬০ ॥
পাড়াগায়ে যত দূর খাদ্যদ্রব্য জুটে ।
দুনো মূল্যে স্বরান্বিত আনিল আকুটে ॥ ৬১ ॥
রাত্রিকার মত সাধ্য হৈল যতদূর ।
যতনে মোদক সেবা কৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ৬২ ॥
ভকত মোদক প্রভু মোদকের ঘরে ।
দিয়াছেন মহামিষ্টি ছড়াছড়ি ক'রে ॥ ৬৩ ॥
খাইয়া মোদক মত না মুদে নয়ন ।
মাতোয়ারা প্রায় করে রাত্রি জাগরণ ॥ ৬৪ ॥
আঁখিতে না আসে ঘুম একমাত্র ভাবে ।
পুহাইলে রাতি কিবা দ্রব্য যোগাইবে ॥ ৬৫ ॥
উচ্চতম কর্মে তাঁর মজিয়াছে মন ।
দাস্যভাবে প্রভুর সেবা-আচরণ ॥ ৬৬ ॥
ভক্তবাঞ্ছাপূর্ণ কিসে শ্রীপ্রভুর রীতি ।
ভক্তপ্রিয় ভক্তপ্রাণ ভক্তপ্রীতে প্রীতি ॥ ৬৭ ॥
অন্তরে বুঝিয়া কিবা সাধ মোদকের ।
পূর্ণ কৈলা প্রভু কেহ না পাইল টের ॥ ৬৮ ॥
অদ্ভুত কৌশলী চক্রী প্রভু ভগবান ।
কেমনে অল্পধী নরে পাইবে সন্ধান ॥ ৬৯ ॥
উষ্ণরক্ত সে সময় ভাগিনা হৃদয় ।
প্রভুর উপরে করে জোর অতিশয় ॥ ৭০ ॥
ইচ্ছামত বলে করে না করি বিচার ।
সেবাধীন শ্রীপ্রভুর অগত্যা স্বীকার ॥ ৭১ ॥
যা বলে করিতে হয় ইচ্ছা যদি নাই ।
এমন অবস্থাপন্ন তখন গোসাঁই ॥ ৭২ ॥
সাধন ভজন পূর্ণ হ'লে সমুদয় ।
সংশয়পরান প্রায় পেটের পীড়ায় ॥ ৭৩ ॥
জীর্ণ-শীর্ণ কলেবর সে লাবণ্যহীন ।
সেবা-প্রয়োজন তাই হৃদুর অধীন ॥ ৭৪ ॥
প্রভুর সুযোগ্য সেবা হৃদয় জানিত ।
প্রভুর উপরে তাই প্রভুত্ব করিত ॥ ৭৫ ॥
যাঁহার শক্তিতে সেবা পায় জগজন ।
তাঁহার এখন সেই সেবা-প্রয়োজন ॥ ৭৬ ॥
প্রয়োজন কিবা কথা অধীন সেবায় ।
যা বলেন হৃদু তাহে শ্রীপ্রভুর সায় ॥ ৭৭ ॥
পরদিনে যদ্যপি থাকিতে করে মানা ।
পূর্ণ নহে মোদকের মনের বাসনা ॥ ৭৮ ॥
সেই হেতু মেঘ আর জল নাহি ছাড়ে ।
দিনে রেতে একরূপ অবিরাম ঝরে ॥ ৭৯ ॥
প্রত্যুষেতে উঠে মেতে মোদক সজ্জন ।
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর করিল বন্দন ॥ ৮০ ॥
মোদক মোদক বটে নিপুণ ভিয়ানে ।
মিষ্টি দিয়া তুষ্ট কৈল প্রভু ভগবানে ॥ ৮১ ॥
ভক্তিরসে গোল্লা করি তুষিল ঈশ্বর ।
হেন মোদকের পায় লক্ষ কোটি গড় ॥ ৮২ ॥
প্রাতে আয়োজিতে থাকে দ্রব্য সেবাদির ।
নানাবিধ ক্ষণমধ্যে করিল হাজির ॥ ৮৩ ॥
পাড়ায় পাড়ায় সাড়া গঞ্জে গেল প'ড়ে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন মোদকের ঘরে ॥ ৮৪ ॥
অনায়াসে এসে লোকে করে দরশন ।
বিশেষে বয়স্ক যারা গোসাই ব্রাহ্মণ ॥ ৮৫ ॥
অন্য জাতি কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণব সংসারী ।
শেষে প্রভু মিষ্টভাষী ঘুম করে ভারী ॥ ৮৬ ॥
প্রাণ-গলানিয়া বাণী প্রভুর বদনে ।
সাহস আশায় ভরা প্রাণ ফুলে শুনে ॥ ৮৭ ॥
কলিকালে দেখ মন মানুষনিকরে ।
সুখন কুয়াসা সম মায়ার ভিতরে ॥ ৮৮ ॥
বিষম মায়ায় ঘেরা দৃষ্টিচোরা ফাঁদ ।
যেখিতে না দেয় কৃষ্ণ জগতের চাঁদ ॥ ৮৯ ॥
আঁখিতে সতত গেলে মহাকালঘুম ।
কৃষ্ণকথা বুঝে যেন আকাশ-কুসুম ॥ ৯০ ॥
স্বপ্নবৎ ছায়াবাজি কথার এ কথা ।
নামে মাত্র কৃষ্ণ তাঁর কেবা পায় কোথা ॥ ৯১ ॥
কৃষ্ণ মিলে কলিকালে না করে প্রত্যয় ।
এত কৃষ্ণহারা ছাড়া নরের হৃদয় ॥ ৯২ ॥
দীক্ষাগুরু ব্যবসায় শবের মতন ।
শক্তিহীন মন্ত্র করে শিষ্যেরে অর্পণ ॥ ৯৩ ॥
ভোঁতা ছুরি কদলীর খোলা নাহি কাটে ।
কাজেই প্রণবমন্ত্র নাহি পশে ঘটে ॥ ৯৪ ॥
শত পুরশ্চরণে না ফলে কোন ফল ।
বিশ্বাস শিষ্যের হৃদে নাহি পায় স্থল ॥ ৯৫ ॥
অগ্নিবাণ মূর্তিমন্ত্র প্রভুর বচন ।
আঁধার নাহিক আর প্রক্ষেপ যখন ॥ ৯৬ ॥
কৃষ্ণময় বাক্য তাঁর বাক্যে কৃষ্ণ বাঁধা ।
শুনা মাত্র দুরীভূত অবিশ্বাস ধাঁধা ॥ ৯৭ ॥
চূড়াধড়াসহ কৃষ্ণ শ্রীবাক্যেতে খেলে ।
ব্রহ্মায় দুর্লভ যাহা প্রভুবাক্যে মিলে ॥ ৯৮ ॥
বুঝ মন কিবা শক্তি শ্রীবাক্যে প্রভুর ।
লোহার গোলায় কিসে গিরি করে চুর ॥ ৯৯ ॥
বুঝ মন লোকজন মোদকভবনে ।
কিবা দেখে শুনে প্রভু আগমনে ॥ ১০০ ॥
কিবা ভাবে মাতোয়ারা হয়েছে মোদক ।
প্রভু এবে ধরাধামে ভুলোক গোলোক ॥ ১০১ ॥
যত লোক গ'লে পড়ে প্রভুর কথায় ।
কেহ নাচে কেহ হরি-গুণ-গীতি গায় ॥ ১০২ ॥
হয়েছে আনন্দময় মোদকভবন ।
দিনে রেতে পরিপূর্ণ আছে লোকজন ॥ ১০৩ ॥
মোহকের বাঞ্ছা পূর্ণ করিতে কেবল ।
প্রভুর ইচ্ছায় হয় ত্রিরাত্র বাদল ॥ ১০৪ ॥
চতুর্থ দিবসে হয় পরিষ্কার দিন ।
শিয়ড়ে চলিলা বরাবর ভক্তাধীন ॥ ১০৫ ॥
এবারে না হইল যাওয়া কামারপুকুরে ।
বৃহৎ কারণ এক ইহার ভিতরে ॥ ১০৬ ॥
শিয়ড়ীরা বড় খুশী প্রভু আগমনে ।
দলে দলে এসে মিলে গ্রামবাসিগণে ॥ ১০৭ ॥
নফর বাঁড়ুয্যে গ্রামে উচ্চ ভক্ত তাঁর ।
সেবাদির জন্য করে বিবিধ যোগাড় ॥ ১০৮ ॥
দিনে রেতে সাথে সাথে তিলেক না ছাড়ে ।
সন্ধ্যা এলে ল'য়ে প্রভু সঙ্কীর্ত্তন করে ॥ ১০৯ ॥
আরে মন দেখ কিবা প্রভুর মহিমা ।
সকল প্রথমে হেথা শিয়ড়িয়া জনা ॥ ১১০ ॥
জানিতে না গোউর নিতাই কোন্ জন ।
কার ছেলে কোথায় বাড়ি কোথায় জনম ॥ ১১১ ॥
কত যে করিলা লীলা প্রভু অবতরি ।
বিতরি ভকতি প্রেম পাতকী উদ্ধারি ॥ ১১২ ॥
দেখিলে চৈতন্যভক্ত উচ্চ উপহাস ।
করিত সকলে তাড়া হাতে লাঠিবাঁশ ॥ ১১৩ ॥
গোউর নিতাই বলি যেথা সঙ্কীর্তন ।
কেড়ে ভেঙ্গে দিত খোল গ্রামবাসিগণ ॥ ১১৪ ॥
এবে সবে
শ্রীপ্রভুর করুণার জোরে ।
প্রতিদিন সন্ধ্যকালে সঙ্কীর্তন করে ॥ ১১৫ ॥
দু'নয়নে ঝুরে ডাকে চৈতন্যের নাম ।
চৈতন্যে গিয়ান করে কৃষ্ণ ভগবান ॥ ১১৬ ॥
গোরানাম উচ্চারে রোমাঞ্চ কলেবর ।
বৈষ্ণব ভকতে করে মহা সমাদর ॥ ১১৭ ॥
সঙ্কীর্তনে সবে ঘর এবে এইবার ।
মহাভক্ত শ্রীনফর দলের সর্দার ॥ ১১৮ ॥
প্রভুবে লইয়া পথে গ্রামের ভিতর ।
মাঝে মাঝে সঙ্কীর্তনে হয় মত্ততর ॥ ১১৯ ॥
শান্তিনাথ নামে এক শিবলিঙ্গ গ্রামে ।
জাগ্রত ঠাকুর সবে দেশজুড়ে জানে ॥ ১২০ ॥
পাষাণে বাঁধান গোটা মন্দির-প্রাঙ্গণ ।
সেইখানে বহু ক্ষণ হয় সঙ্কীর্তন ॥ ১২১ ॥
একদিন ভক্তগণ হয়ে মত্তচিত ।
সঙ্কীর্তনে ধরে নিম্নলিখিত সঙ্গীত ॥ ১২২ ॥
সঙ্কীর্তনে আমার গোরা নাচে ।
দেখো রে বাপ নরহরি ।
থেকো গোউরের কাছে,
সোনার বরন গোউর আমার,
ধুলায় পড়ে পাছে ॥
শুনিয়া শ্রীপ্রভু এই সংকীর্তন-গান ।
মহাভাবে হৈলা মহাবলের আধান ॥ ১২৩ ॥
সুবর্ণ-বরন কান্তি অঙ্গ ফেটে পড়ে ।
মহালম্ফে সংকীর্তন প্রাঙ্গন-উপরে ॥ ১২৪ ॥
বারে বারে এক ধুয়া যত ভক্ত গায় ।
তাহাতে হইলা প্রভু উন্মত্তের প্রায় ॥ ১২৫ ॥
নাহি আর বাহ্যুজ্ঞান কি ভাবে কে জানে ।
লুটালুটি যান গোটা মন্দির প্রাঙ্গনে ॥ ১২৬ ॥
পাষাণে প্রাঙ্গণ বাঁধা সুকর্কশ তায় ।
সুকোমল প্রভু অঙ্গ কত ছোড়ে যায় ॥ ১২৭ ॥
বিভ্রাট দেখিয়া ভক্তগণ একত্তরে ।
ধরিয়াও প্রভুদেবে নিবারিতে নারে ॥ ১২৮ ॥
মহাশক্তি অঙ্গে কেহ নাহি আঁটে বলে ।
মত্ততা ভাঙাতে মন্ত্র হৃদু কানে বলে ॥ ১২৯ ॥
কিসে জাগে কিসে ভাঙে মত্ততা প্রভুর ।
বিধিমতে জানিতেন হৃদয় ঠাকুর ॥ ১৩০ ॥
স্বদেশের লোক দেখে অদ্ভুত ব্যাপার ।
সে হ'তে সেখানে নহে সংকীর্তন আর ॥ ১৩১ ॥
শান্ত করি প্রভুদেবে যত ভক্তগণে ।
ফিরিলেন সেই দিন হৃদুর ভবনে ॥ ১৩২ ॥
কি ছিল হইল এবে শিয়ড়িয়াগণে ।
প্রভুপদে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ১৩৩ ॥
অদ্যাপি তুলসী কেহ না পরে গলায় ।
শুন কি করিলা প্রভু সুন্দর উপায় ॥ ১৩৪ ॥
একদিন হৃদয়ে হইল আজ্ঞা তাঁর ।
করিবারে এক কুড়ি মালার যোগাড় ॥ ১৩৫ ॥
যথা আজ্ঞা হৃদয় করিল আহরণ ।
মালা পেয়ে প্রভুদেব পরিতুষ্ট মন ॥ ১৩৬ ॥
শিয়ড়িয়া ভক্তজনা যবে একত্তর ।
তুলসী-মহিমা-কথা বিস্তর বিস্তর ॥ ১৩৬ ॥
বলিতে লাগিলা প্রভুদেব নারায়ণ ।
শ্রীবাক্যে স্বভাবে ভক্তি শক্তি-সঞ্চালন ॥ ১৩৭ ॥
শ্রবণে যতেক শ্রোতা ভক্তিসহকারে ।
উদ্দেশিয়া তুলসীরে নমস্কার করে ॥ ১৩৮ ॥
উত্তপ্ত হইলে ধাতু তবে না গঠন ।
কাল বুঝি তে-সবারে প্রভুদেব কন ॥ ১৩৯ ॥
এক এক মালা দিয়া প্রত্যেকের করে ।
নারায়ণ-শিলা আছে যাঁহাদের ঘরে ॥ ১৪০ ॥
উপদেশে বলিলেন সর্বাগ্রে প্রথমে ।
পরশি তুলসীমালা শিলার চরণে ॥ ১৪১ ॥
উচ্চারিয়া মহামন্ত্র গুরুদত্ত ধন ।
পশ্চাৎ করিবে সবে গলায় ধারণ ॥ ১৪২ ॥
প্রীতিভরে পালিবারে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
লবে গেল যেথা ঘরে শিলা আপনার ॥ ১৪৩ ॥
মালা হাতে একমাত্র বাঁড়ুয্যে নফর ।
বসে আছে একভাবে প্রভুর গোচর ॥ ১৪৪ ॥
সুন্দর শ্রীধর-শিলা তাঁহার ভবনে ।
নিত্য নিত্য সেবা-পূজা করে সযতনে ॥ ১৪৫ ॥
ভাগ্যবান যেন দ্বিজ ভক্তিদান তত ।
প্রভুতে বিশ্বাস ভক্তি চিতে অবিরত ॥ ১৪৬ ॥
হৃদি বুঝি প্রভুদেব রূপের আকর ।
দেখাইলা শ্রীনফরে সুঠাম সুন্দর ॥ ১৪৭ ॥
শ্রীধরের প্রতিমূর্তি অঙ্গে আপনার ।
শ্রীপ্রভুর লীলাখেলা অপূর্ব ব্যাপার ॥ ১৪৮ ॥
এই ঘোর কলিকাল ভক্তিহীন জীব ।
কামিনী-কাঞ্চন-আশে সদা উদ্গ্রীব ॥ ১৪৯ ॥
যেমন গোবর-পোকা জনমে গোবরে ।
সতত সুগুপ্ত কায় গোময়ভিতরে ॥ ১৫০ ॥
গোময়ে সুপুষ্ট দেহ বুঝে স্বাদ তার ।
তাহার গিয়ান ঠিক অমৃতভাণ্ডার ॥ ১৫১ ॥
তেমতি যতেক জীব অবিদ্যার তলে ।
মন প্রাণ গত তায় তাই ল'য়ে খেলে ॥ ১৫২ ॥
তদুপরি কিবা আছে নাহি কিছু জানা ।
শুনিলেও কৃষ্ণকথা না পায় ঠিকানা ॥ ১৫৩ ॥
অবিদ্যানেশায় মত্ত আঁখিভরা ঘুম ।
কামিনী-কাঞ্চনে ল'য়ে দিবানিশি ধুম ॥ ১৫৪ ॥
ঘোর অবিশ্বাসে কহে কৃষ্ণ কেবা পায় ।
কৃষ্ণ ভগবান মাত্র কেবল কথায় ॥ ১৫৫ ॥
কৃষ্ণকথা কৃষ্ণরূপ কৃষ্ণ মিলে কিসে ।
কি কৃষ্ণ আদতে তত্ত্ব হৃদে নাহি পশে ॥ ১৫৬ ॥
কুমিরের পিঠ যেন কঠিন মহান্ ।
শাণিত অসির ধার নাহি পায় স্থান ॥ ১৫৭ ॥
সেই মত মানুষের মনের উপর ।
রহিয়াছে মায়া শত পাষাণের গড় ॥ ১৫৮ ॥
ভক্তিহীনে গুরু দীক্ষা দিলে কর্ণমূলে ।
সুকঠিন বন্ধজীবে কিছুই না ফলে ॥ ১৫৯ ॥
কিন্তু মন দেখ হেন ভক্তিহীন কাল ।
কৃপাবলে শ্রীপ্রভুর পরম দয়াল ॥ ১৫৪ ॥
অবহেলে ব'লে মিলে সুদুর্লভ ধন ।
ব্রহ্মার বাঞ্ছিত কৃষ্ণ বঙ্কিমনয়ন ॥ ১৫৫ ॥
তাই বলি শ্রীপ্রভুর খেলা অপরূপ ।
নফর দেখেন অঙ্গে শ্রীধরের রূপ ॥ ১৫৬ ॥
তুমিই শ্রীধর বলি কাকুতি করিয়া ।
প্রভুর চরণে মালা দিল জড়াইয়া ॥ ১৫৭ ॥
সমাধিস্থ প্রভুদেব বাহ্য আর নাই ।
শ্রীদেহ ছাড়িয়া কোথা গেলেন গোসাঁই ॥ ১৫৮ ॥
পেয়ে তত্ত্ব শ্রীনকর পুলকিত মন ।
গলায় তুলসীমালা করিল ধারণ ॥ ১৫৯ ॥
প্রভুসনে সংকীর্তনে আস্বাদন পেয়ে ।
শিয়ড়ে অনেক লোক উঠেছে জাগিয়ে ॥ ১৬০ ॥
কভু কোথা কীর্তন বা হয় সংকীর্তন ।
সযতনে সবে মিলে করে অন্বেষণ ॥ ১৬১ ॥
নিকটে মেমানপুর শিয়ড়ের ধারে ।
দ্বাদশ উৎসব হয় বৎসরে বৎসরে ॥ ১৬২ ॥
উৎসব আরম্ভ তথা হয়েছে এখন ।
প্রসিদ্ধ গোপাল করে আসরে কীর্তন ॥ ১৬৩ ॥
জানি না মিশান কিবা গোপালের গানে ।
পাষাণে উপজে জল সংকীর্তন শুনে ॥ ১৬৪ ॥
দেশজুড়ে ব্যাপ্ত নাম সুধামাখা স্বর ।
এ দেশে বসতি নয় উত্তরেতে ঘর ॥ ১৬৫ ॥
বরষে বরষে আসে ব্যবসা কীর্তন ।
যেথা গায় তথা হয় মানুষের বন ॥ ১৬৬ ॥
দূর-দূরান্তর গ্রামে যাহাদের বাস ।
সময় বুঝিয়া রাখে তাহার তল্লাস ॥ ১৬৭ ॥
এখন মেমানপুরে গোপাল উদ্বয় ।
নিত্যই কীর্তন করে উৎসব সময় ॥ ১৬৮ ॥
সমাচার পেয়ে যত শিয়ড়িয়া জনা ।
এতেক আনন্দ নাই আনন্দের সীমা ॥ ১৬৯ ॥
মন্ত্রণা করিল পরস্পর সঙ্গোপনে ।
প্রভুদেবে ল'য়ে যাবে কীর্তনশ্রবণে ॥ ১৭০ ॥
দেখিবে পরমানন্দে মহাভাব গায় ।
যে ভাবে অপরানন্দ উদয় যেথায় ॥ ১৭১ ॥
আনন্দ-আকর প্রভু আনন্দ যেখানে ।
ভাবাবেশে উচ্চানন্দ যদি বল কেনে ॥ ১৭২ ॥
সুস্থির কমল প্রভু ভাবাবেশহীনে ।
আন্দোলিত ভাবাবেশে যেমন পবনে ॥ ১৭৩ ॥
আন্দোলনে বহু গুণে সৌরভ-বিস্তার ।
তাই লোক-জনে পায় আনন্দ অপার ॥ ১৭৪ ॥
সে আনন্দ আশা করি থাকে লোক জনে ।
কখন দোলায় তাঁয় আবেশ পবনে ॥ ১৭৫ ॥
সেই হেতু প্রভুদেবে শিয়ড়িয়া জনা ।
যাইতে মেমানপুরে করিল প্রার্থনা ॥ ১৭৬ ॥
শুনি কথা প্রভুদেব দিলেন উত্তর ।
হৃদুরে পাঠাও আগে জানিতে খবর ॥ ১৭৭ ॥
দেখে এসে হৃদু মোরে যেতে যদি কয় ।
তা হ'লে মেমানপুরে যাইব নিশ্চয় ॥ ১৭৮ ॥
শুন মন বলি তোরে পারি যতদূর ।
কার্যের কৌশল কিবা ছিল শ্রীপ্রভুর ॥ ১৭৯ ॥
কি কলে গোপালে হৈল শিয়ড়েতে আনা ।
পুরাইতে শিয়ড়ের লোকের বাসনা ॥ ১৮০ ॥
সন্ধ্যার প্রাক্কালে হয় হৃদুর গমন ।
প্রসিদ্ধ গোপাল যেথা করেন কীর্তন ॥ ১৮১ ॥
আসরে হৃদয় যবে হৈল সমাসীন ।
গোপাল কীর্তন ভঙ্গ কৈল সেই দিন ॥ ১৮২ ॥
প্রভুর প্রসিদ্ধ নাম গোপাল শুনিয়া ।
হৃদয়ের সঙ্গে চলে সঙ্গিগণ লৈয়া ॥ ১৮৩ ॥
উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি হৃদিভরা প্রীতি ।
এখন হইল প্রায় ছয় দণ্ড রাতি ॥ ১৮৪ ॥
নাহি মানে মেঠো পথ নাহি মানে রাত ।
পথে যবে অর্ধ ক্রোশ শিয়ড় তফাত ॥ ১৮৫ ॥
শব্দযোগে পাঠাইতে অগ্রে সমাচার ।
গোপালে বলিল হৃদু হেথা একবার ॥ ১৮৬ ॥
খোল-রণশিক্ষাসহ করহ বাজনা ।
অর্ধক্রোশ হ'তে হেন শব্দ যায় শুনা ॥ ১৮৭ ॥
এক খোল একমাত্র রণশিঙ্গারব ।
অর্ধক্রোশ পারে যায় ইহা অসম্ভব ॥ ১৮৮ ॥
যথাকথা যথাশক্তি গোপাল বাজায় ।
হেনকালে শুন কি করেন প্রভুরায় ॥ ১৮৯ ॥
আবেশেতে অবশাঙ্গ লোক চারিধারে ।
বলিলেন দেখ হৃদু আপিছে এবারে ॥ ১৯০ ॥
শুন বাজে গোল বাজে শিঙ্গা করতাল ।
হৃদয় আসিছে লৈয়া সঙ্গেতে গোপাল ॥ ১৯১ ॥
বিস্ময়ে আপন্ন গত লোক জন কয় ।
কিবা কথা অকস্মাৎ কহ মহাশয় ॥ ১৯২ ॥
এত লোকমধ্যে মোরা কেহ নাহি শুনি ।
আপনি পাইলা একা খোল-শিঙ্গাধ্বনি ॥ ১৯৩ ॥
স্তদ্ধীভূত একত্রিত যত লোকজন ।
পরস্পর সেই কথা করে আন্দোলন ॥ ১৯৪ ॥
বহুক্ষণ পরে যবে কিঞ্চিৎ তফাতে ।
কীর্তনিয়া সহ হৃদু আসিতেছে পথে ॥ ১৯৫ ॥
বাজাইতে হৃদয় বলিল পুনরায় ।
এইবারে লোক সবে শুনিবারে পায় ॥ ১৯৬ ॥
সমাধিস্থ প্রভুদেব নাহি বাহ্যজ্ঞান ।
গোপাল শ্রীপদে আসি করিল প্রণাম ॥ ১৯৭ ॥
ভাবভঙ্গে আরম্ভ হইল সংকীর্তন ।
ক্রমে ক্রমে জুটে গেল গ্রামবাসিগণ ॥ ১৯৮ ॥
প্রভুকে মধ্যেতে রাখি বসে তিন ভিত ।
গোপাল গাইতে থাকে গোরা গুণ-গীত ॥ ১৯৯ ॥
কিবা ভাব কিবা গান শুন শুন মন ।
গোপালের গানভঙ্গ হৈল কি কারণ ॥ ২০০ ॥
মধুর কীর্তন প্রভু করিলা আপনে ।
শ্রীচরণে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ২০১ ॥
গোপাল — ভুবনসুন্দর গোউর নদেয় কে আনিল রে ।
এমন রূপ বিধি বুঝি দেখে নাই,
(গঠেছে বটে) কিন্তু বিধি দেখে নাই,
দেখলে ছেড়ে দিত নাই − ইত্যাদি ॥
প্রভু — গোপাল রে তুই কি বল্লি রে,
গোরারূপ বিধির গড়া নয়,
স্বয়ং স্বপ্রকাশরূপ বিধির গড়া নয় − ইত্যাদি ॥
বিধির গঠিত রূপ গৌরাঙ্গের গায় ।
শ্রীগোপাল কীর্তনিয়া এই কথা গায় ॥ ২০২ ॥
যেই গোরাচাঁদ হয় বিধির বিধাতা ।
তাঁহাতে বিধির হাত এ কেমন কথা ॥ ২০৩ ॥
সেই হেতু প্রভুদেব আখরের ছলে ।
লইলেন গোপালের গীত নিজে তুলে ॥ ২০৪ ॥
উত্তরে গাইলা
প্রভুদেব ভগবান ।
কি কর গোপাল গোরারূপের বাখান ॥ ২০৫ ॥
স্বপ্রকাশ গোরারূপ
ভুবনমোহন ।
কখন না হয় ইহা বিধির গঠন ॥ ২০৬ ॥
এইরূপে গোরারূপ আখরে আখরে ।
গাইতে
লাগিলা প্রভু সুমধুর স্বরে ॥ ২০৭ ॥
মূর্তিমান প্রভুবাক্য রূপ-বিবর্ণনে ।
গড়ায়
গোউররূপ শ্রীবাক্যের সনে ॥ ২০৮ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবচনে গোরারূপ দেখা ।
নীহারে যেমন
সূর্য-কিরণের রেখা ॥ ২০৯ ॥
চক্ষু কর্ণ উভয়ের মিটাইয়া রণ ।
শতদলে একত্তরে যত
লোকজন ॥ ২১০ ॥
শ্রবণ দর্শনে মুগ্ধ গোরারূপখানি ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃতের খনি ॥ ২১১ ॥
নহে সায় না ফুরায় রূপের বর্ণন ।
ক্রমে রাতি উর্ধ্বগতি চলিছে কীর্তন ॥ ২১২ ॥
ভোজনের আয়োজন হৃদর ভবনে ।
ক্লান্তকায় সমুদয় কীর্তনিয়াগণে ॥ ২১৩ ॥
গোটা দিন
মহাশ্রমে হইয়াছে গত ।
অন্তরে শ্রীপ্রভুদেব হইয়া বিদিত ॥ ২১৪ ॥
আপুনি করিলা ভঙ্গ
আপনার গানে ।
নিরানন্দ শ্রোতৃবৃন্দ গীত-সমাপনে ॥ ২১৫ ॥
দণ্ডবৎ নিপতিত শ্রীপদে
গোপাল ।
হৃদয় জানায় ডেকে ভোজনের কাল ॥ ২১৬ ॥
অদ্যাপি শিয়ড়ে এই কীর্তনের কথা ।
দেখা
শুনা যাহাদের মনে আছে গাথা ॥ ২১৭ ॥
কি দেখেছে কি শুনেছে প্রভুর ভিতরে ।
সঠিক
চেহারা কেহ দিতে নাহি পারে ॥ ২১৮ ॥
স্মরণে অপার সুখ সমস্বরে কয় ।
আ মরি আ মরি কথা কহিবার নয় ॥ ২১৯ ॥
বার্তা পেয়ে আসে ধেয়ে ভক্ত নটবর ।
গোস্বামী ব্রাহ্মণ শ্যামবাজারেতে ঘর ॥ ২২০ ॥
ল'য়ে গেল প্রভুদেবে আপন ভবনে ।
সঙ্গে চলে সেবাপর হৃদয় ভাগিনে ॥ ২২১ ॥
যেমন
গোস্বামী তাঁর তেমতি ঘরণী ।
প্রভুর সেবায় রত দিবসযামিনী ॥ ২২২ ॥
প্রভুর পিরীতি
বুঝি কীর্তনশ্রবণে ।
সংবাদ পাঠায়ে দিল ধনু
দের১
স্থানে ॥ ২২৩ ॥
কাছে রামজীবনপুরেতে
তার ঘর ।
সকলেই জানে গায় কীর্তন সুন্দর ॥ ২২৪ ॥
সমযোগ্য বাদ্যকর শ্রীরাইচরণ ।
দুজনে কীর্তনে যদি হয় সম্মিলন ॥ ২২৫ ॥
মধুর কীর্তন হেন না ফুটে কপার ।
শুনিয়া
গাছের পাতা বিছার তলায় ॥ ২২৬ ॥
তত্ত্ব পেয়ে আইলেন ধনু যে সত্বর ।
সুন্দর আসর রচে
ভক্ত নটবর ॥ ২২৭ ॥
স্বতন্ত্র সর্বোচ্চাসন প্রভুর কারণে ।
নিজ হাতে বানাইল যথাযোগ্য
স্থানে ॥ ২২৮ ॥
দুই ধারে নীচে তার যে হয় আসন ।
উদ্দেশ্য বসিবে তায় পণ্ডিত
ব্রাহ্মণ ॥ ২২৯ ॥
সন্নিকটে পাণ্ডুগ্রাম নহে বহু দূরে ।
গোসাঁই ব্রাহ্মণ বহু তথা
বাস করে ॥ ২৩০ ॥
ভক্তিসহকারে পাঠাইল নিমন্ত্রণ ।
আসিতে ভবনে তাঁর শুনিতে কীর্তন ॥ ২৩১ ॥
এখানেতে যথাকালে বসিল আসর ।
সমাসীন প্রভু উচ্চ আসন উপর ॥ ২৩২ ॥
করিতেছে ধনু দে
সুমিষ্ট সংকীর্তন ।
হেনকালে দিল দেখা গোসাঁইর গণ ॥ ২৩৩ ॥
সমাদরে নটবর বসাইল কাছে ।
যে আসন পাতা ছিল শ্রীপ্রভুর নীচে ॥ ২৩৪ ॥
নাহি জানে গোসাঁইরা প্রভু কেবা বটে ।
উচ্চাসনে দেখি তাঁয় সবে গেল চটে ॥ ২৩৫ ॥
উঠে গেল এসেছিল যেন একত্তরে ।
গ্রামেতে
অনেক শিষ্য জনৈকের ঘরে ॥ ২৩৬ ॥
কহে তথা নটবরে অপ্রিয় বচন ।
কেমনে প্রভুরে দিল সর্বোচ্চ আসন ॥ ২৩৭ ॥
গোসাঁই
ব্রাহ্মণ মোরা থাকি ভক্তিপথে ।
কেবা উনি ব্রহ্মজ্ঞান অন্যবিধ জেতে ॥ ২৩৮ ॥
নাহি
তুলসীর মালা যজ্ঞসূত্র গলে ।
নাহি ছিটাফোঁটা কাটা নাকে কি কপালে ॥ ২৩৯ ॥
নাই
হরিনামলেখা নামাবলী গায় ।
জপমালাধার ঝুলি তাঁহার কোথায় ॥ ২৪০ ॥
গোসাঁই ব্রাহ্মণ
তুমি নিজে নটবর ।
উচ্চাসন হিয়া তাঁয় সাজালে আসন ॥ ২৪১ ॥
মোরা এত হীন কিসে কেন
নীচাসন ।
অপমান বুঝি কৈলে হেতু নিমন্ত্রণ ॥ ২৪২ ॥
ভালমত দিব সাজা নটবর তোরে ।
দেখিব কেমনে কেবা রক্ষা আজ করে ॥ ২৪৩ ॥
ভীতচিত নটবর ফিরিল ভবনে ।
হৃদয়ে কহিল কথা ডাকিয়া গোপনে ॥ ২৪৪ ॥
হৃদয়ে অকুতোভয় কর নটবরে ।
আছে কার সাধ্য কাছে আসিবারে পারে ॥ ২৪৫ ॥
চলিতেছে কীর্তন এখন নয় শেষ ।
অন্তরে বুঝিলা সব প্রভু পরমেশ ॥ ২৪৬ ॥
ভক্ত নটবরে বলিলেন কানে কানে ।
বিবাদ না পার শোভা মম বর্তমানে ॥ ২৪৭ ॥
কীর্তন করিয়া বন্ধ যাও শীঘ্রগতি ।
ডাকিয়া আনহ যেবা দল-অধিপতি ॥ ২৪৮ ॥
গোস্বামী ব্রাহ্মণদের সর্দার যে জন ।
নটবর কাছে তাঁর করিল গমন ॥ ২৪৯ ॥
টেনেছেন প্রভুদেব আর কেবা রাখে ।
উপনীত অধিপতি প্রভুর সম্মুখে ॥ ২৫০ ॥
অমানীর মানদাতা প্রভু নারায়ণ ।
নীচাসনে নামিলেন ত্যজি নিজাসন ॥ ২৫১ ॥
সর্দারের বদন মলিন গুরুভার ।
দেখি প্রভু করিলেন অগ্রে নমস্কার ॥ ২৫২ ॥
জানি না কি নমস্কারে আছিল প্রভুর ।
যার জোরে অভিমান-গিরি করে চুর ॥ ২৫৩ ॥
দল-অধিপতি করি প্রতিনমস্কার ।
লজ্জায় বদনখানি নাহি তুলে আর ॥ ২৫৪ ॥
প্রভুদেব করিবারে লজ্জা তার ভঙ্গ ।
বলিলেন কহ কিছু ঈশ্বর-প্রসঙ্গ ॥ ২৫৫ ॥
অধিপতি শাস্ত্রাধ্যায়ী বটে এক জনা ।
বেদান্ত কিঞ্চিৎ তাঁর ছিল পড়াশুনা ॥ ২৫৬ ॥
শ্রীঅঙ্গ লক্ষণশূন্যে ধারণা তাঁহার ।
ব্রহ্মজ্ঞানী প্রভু ভাল লাগে নিরাকার ॥ ২৫৭ ॥
সেই হেতু কহিতে লাগিল দ্বিজবর ।
বেদান্তে কি কয় নিরাকারের খবর ॥ ২৫৮ ॥
রূপহীন গুণহীন বিহীন আকার ।
আদ্যন্তক্রিয়াদিহীন ব্রহ্মসমাচার ॥ ২৫৯ ॥
গোসাঁইব্রাহ্মণমুখে বেদান্তের ভাব ।
শুনি প্রভু বাহ্য কোপ করিয়া প্রকাশ ॥ ২৬০ ॥
মধুর কর্কশ ভাবে মিশাইয়া তান ।
কহিলেন গোসাঁইরে সাকার-আখ্যান ॥ ২৬১ ॥
কৃষ্ণগতপ্রাণ যাঁরা গোসাঁইব্রাহ্মণ ।
নিরাকার তত্ত্বকথা কহ কি কারণ ॥ ২৬২ ॥
জাতিভ্রষ্ট পথছাড়া আপন করমে ।
উচিত না হয় তব মুখদরশনে ॥ ২৬৩ ॥
নিত্যই সাকার তিনি রূপের আধার ।
লীলাময় লীলাপ্রিয় গুণের ভাণ্ডার ॥ ২৬৪ ॥
ভক্তগতপ্রাণ ভক্তপরান-পুতলি ।
অখণ্ড আগোটা বিশ্ব তাঁর লীলাস্থলী ॥ ২৬৫ ॥
তেজোময় প্রভুবাক্য যাহে করে খেলা ।
শ্রীহরির রূপগুণ অবতারে লীলা ॥ ২৬৬ ॥
সেই বাক্যে প্রভুদেব করেন বর্ণন ।
বুঝাইতে দ্বিজবরে যাহা প্রয়োজন ॥ ২৬৭ ॥
একমনে গোসাঁই ব্রাহ্মণ কথা শুনে ।
বুঝ কিবা ভাবে এবে ঝুরে দুনয়নে ॥ ২৬৮ ॥
হেনকালে সেই স্থলে দিল দরশন ।
বংশে জাত দলভুক্ত অন্য যত জন ॥ ২৬৯ ॥
অধিপতি দেখিয়া সকলে সমাগত ।
বলিল শ্রীপ্রভুপদে হ'তে অবনত ॥ ২৭০ ॥
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কয় বিষম প্রমাদ ।
করেছি মহাত্মা জনে নিন্দা অপবাদ ॥ ২৭১ ॥
কাকুতি-মিনতি সবে করিলে বিস্তর ।
শাস্তি দিলা জনে জনে শান্তির সাগর ॥ ২৭২ ॥
যতেক ব্রাহ্মণে প্রভু ল'য়ে পরদিনে ।
তুলিলা অতুলানন্দ হরি-সংকীর্তনে ॥ ২৭৩ ॥
হেন কীর্তনের কথা কোথাও না শুনি ।
মহাসংকীর্তন নামে ইহারে বাগানি ॥ ২৭৪ ॥
পুণ্যবতী বঙ্গে যেন হেথা বার মাস ।
দিনে রেতে ষড়ঋতু প্রত্যহ প্রকাশ ॥ ২৭৫ ॥
সেই মত প্রভু রামকৃষ্ণ অবতারে ।
আছে সব যা হয়েছে যুগযুগান্তরে ॥ ২৭৬ ॥
গুপ্ত এবে সহজে না পাওয়া যায় দেখা ।
সোনার অক্ষরে লীলা-অঙ্গে আছে লেখা ॥ ২৭৭ ॥
দেখিবারে সাধ যদি থাকে তোর মন ।
বিরলে বসিয়া কর প্রভুর স্মরণ ॥ ২৭৮ ॥
সাত দিন সাত রাত্রি হয় সংকীর্তন ।
অবিরাম হরিনাম বিভেদি গগন ॥ ২৭৯ ॥
কোমল অঙ্কুরোদ্গম বীজে যেইমত ।
পরে ভক্তবরে তাই হয় পরিণত ॥ ২৮০ ॥
সে রকম সংকীর্তন আরম্ভন-কালে ।
কেবল কয়েকজন লোক মাত্র মিলে ॥ ২৮১ ॥
কিবা কব শ্রীপ্রভুর কীর্তনের কথা ।
যখন যেখানে তথা প্রচুর জনতা ॥ ২৮২ ॥
ভয়ঙ্করী রণকথা শুনে কাঁপে কায় ।
শিহরাঙ্গ মহাবীর জড়সড় প্রায় ॥ ২৮৩ ॥
কিন্তু রণবাদ্য যবে রণক্ষেত্রমাঝে ।
বিস্তারি কৌহিক-নাদ ঘর্ ঘর্ বাজে ॥ ২৮৪ ॥
শুনে সাজে হীনবলা কুলের অঙ্গনা ।
সম্মুখীন চতুরঙ্গ-বলে দিতে হানা ॥ ২৮৫ ॥
নাহি মানে কোন মানা মহা আস্ফালন ।
প্রভুর কীর্তনে তেন জুটে লোকজন ॥ ২৮৬ ॥
বলাকর হরিনামে হ'য়ে মত্ততর ।
এক পায়ে খোঁড়া নাচে প্রহর প্রহর ॥ ২৮৭ ॥
কি তাজ্জব জন্মমূক হরিনাম গায় ।
মুর্তিমান নাম অন্ধে দেখিবারে পায় ॥ ২৮৮ ॥
তাহে গেলে শক্তিসহ শ্রীকণ্ঠের স্বর ।
ঘৃণালজ্জাত্রাসনাশী মনোমুগ্ধকর ॥ ২৮৯ ॥
শ্রবণগোচর একবার হ'লে পরে ।
সাধ্য কার রাখে আর তাহারে অন্তরে ॥ ২৯০ ॥
প্রভুর মোহন নৃত্য হ'য়ে মাতোয়ারা ।
কভু অঙ্গে বাহ্যজ্ঞান কভু বাহ্যহারা ॥ ২৯১ ॥
অযুত উন্মত্ত করী সম গায় বল ।
শ্রীচরণ চাপে ধরা করে টলমল ॥ ২৯২ ॥
বাহ্যহারা যবে অঙ্গ জড়ের সমান ।
লোকে দেখে বুঝে যেন নাহি তার প্রাণ ॥ ২৯৩ ॥
তখনি কিঞ্চিৎ পরে করে দরশন ।
বিকশিত মুখপদ্মে চাঁদের কিরণ ॥ ২৯৪ ॥
মোহন নৃত্যন পুনঃ শতগুণে জোর ।
হুঙ্কারিয়া হরিনাম আনন্দে বিভোর ॥ ২৯৫ ॥
বারেক যে হেরে হেন শ্রীপ্রভুর ধারা ।
বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে হয় বুদ্ধিহারা ॥ ২৯৬ ॥
কহে হেন মানুষ কোথায় কে দেখেছে ।
এইক্ষণে হতপ্রাণ পরক্ষণে বাঁচে ॥ ২৯৭ ॥
পাড়াগেঁয়ে লোক সব বোধহীন জন ।
নাহি বুঝে ভাবাবেশ সমাধিলক্ষণ ॥ ২৯৮ ॥
আচরণ জাতিগত ধরম ব্যবসা ।
কামার কুমার বেনে তাঁতী তেলী চাষা ॥ ২৯৯ ॥
উচ্চ জাতি যদি কেহ কায়স্থ ব্রাহ্মণ ।
নামে মাত্র উচ্চ কিন্তু সমান রকম ॥ ৩০০ ॥
বুঝে না সাধনা আদি কিবা তায় ফলে ।
সৎশাস্ত্রপাঠে কিবা সাধুসঙ্গে মিলে ॥ ৩০১ ॥
কেন তীর্থপর্যটন উদ্দেশ্য কি তার ।
বিষয়ে মগন মন সংসারী আচার ॥ ৩০২ ॥
বৈষ্ণব সংজ্ঞায় যাঁরা হরিনাম করে ।
কোথা হরি কি সে হরি থাকে কার ঘরে ॥ ৩০৩ ॥
কি প্রকারে মিলে তাঁরে কিবা হয় গেলে ।
এসকল তত্ত্ব কভু চিত্তে নাহি খেলে ॥ ৩০৪ ॥
দেশ জুড়ে বার্তা বেড়ে পড়িল ঘোষণা ।
সমবেত কত লোক না হয় গণনা ॥ ৩০৫ ॥
অপার
বালুকা-মধ্যে সাগরবেলায় ।
তিল-পরিমাণে রত্ন দেখা নাহি যায় ॥ ৩০৬ ॥
তেমতি
জনতা-মধ্যে প্রভু নারায়ণ ।
সকলে না পায় তাঁয় করিতে দর্শন ॥ ৩০৭ ॥
দরশনে লুব্ধ মন
আসিয়াছে ছুটে ।
উপায়স্বরূপে লোকে চালে গাছে উঠে ॥ ৩০৮ ॥
গাছে উঠে এত লোক দেখিবারে
নাচ ।
গাছ গোটা বোধ যেন মানুষের গাছ ॥ ৩০৯ ॥
পরম আনন্দ পায় দেখিয়া মুরতি ।
পতিতপাবন প্রভু অখিলের পতি ॥ ৩১০ ॥
ধন্য ধন্য কলির
মানুষ ধন্য কলি ।
যে কালে হেলায় মিলে প্রভুপদধূলি ॥ ৩১১ ॥
অনায়াসে যেই কালে প্রভুদরশন ।
দেবের দুর্লভ বস্তু সাধনের ধন ॥ ৩১২ ॥
সমধারা জনতার
সাত দিন রাত ।
কেবা কোথা থাকে কেবা কোথা খায় ভাত ॥ ৩১৩ ॥
কিছুই নির্ণয় নাই কোথা হতে
আসে ।
করিবারে সংকীর্তন প্রভুসঙ্গে মিশে ॥ ৩১৪ ॥
ধরাবাসী নহে যেন লোকান্তরে ঘর ।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা নাহি দেহে অজর অমর ॥ ৩১৫ ॥
একমাত্র ক্ষুধা-তৃষ্ণা প্রভু-দরশন ।
ধরায় এসেছে ছেড়ে স্ব স্ব নিকেতন ॥ ৩১৬ ॥
এইরূপে সপ্তাহ আগত হ'লে পর ।
প্রভুর পড়িল লক্ষ্য শ্রীঅঙ্গ-উপর ॥ ৩১৭ ॥
এই কার্যে কার্য মম নহে সমাপন ।
অতএব আবশ্যক
শরীর-রক্ষণ ॥ ৩১৮ ॥
দেহ গেলে কি করিব বহু কর্ম বাকি ।
গোপনে আইলা প্রভু লবে দিয়া
ফাঁকি ॥ ৩১৯ ॥
কে বুঝিবে শ্রীপ্রভুর কর্মের কৌশলে ।
অলক্ষ্যেতে আগমন মলত্যাগ-ছলে ॥ ৩২০ ॥
টের পেয়ে পাছে লোকে ধরাধরি করে ।
একবারে গঙ্গাপার দক্ষিণশহরে ॥ ৩২১ ॥
তিলক কপালে নাকে হাতে থাকে ঝুলি ।
শ্রেষ্ঠ চিত্রাঙ্কিতকায় গায়ে নামাবলী ॥ ৩২২ ॥
ডাল রুটি হৃদ মিষ্টি একাদশী দিনে ।
চব্বিশ-প্রহরে জুটে নাচে সংকীর্তনে ॥ ৩২৩ ॥
এই বৈষ্ণবের সার পরিণাম-ফল ।
আরাধিলে কৃষ্ণ মিলে এ বোধ বিরল ॥ ৩২৪ ॥
সুদ্ধমাত্র পাড়াগাঁয়ে নহে এই রীতি ।
দুনিয়া জুড়িয়া এই নরের প্রকৃতি ॥ ৩২৫ ॥
কৃষ্ণ কোথা হেন কথা কেহ নাহি কয় ।
বিশ্বাসের গন্ধহীন মনুষ্যনিচয় ॥ ৩২৬ ॥
নিবিড় তমসপূর্ণ দিক্দিগন্তর ।
তবু নাহি লয় কেহ আলোর খবর ॥ ৩২৭ ॥
অবিদ্যা-ঠুলিতে ঢাকা নয়ন দুখানি ।
অন্ধকারে ঘুরে ঘুরে নেচে টানে ঘানি ॥ ৩২৮ ॥
খোল খেয়ে খুব খুশী চিনি গেছে ভুলে ।
নমস্তে অবিদ্যাশক্তি ডুরি দেহ খুলে ॥ ৩২৯ ॥
আঁখি মিলে একবার করি দরশন ।
কেমনে করেন প্রভু মহাসংকীর্তন ॥ ৩৩০ ॥
ক্রমে ক্রমে গুজব পড়িল গ্রামে গ্রামে ।
অদ্ভুত মানুষ নাচে এক সংকীর্তনে ॥ ৩৩১ ॥
এই আছে এই নাই বিস্ময়-কথন ।
সুন্দর মধুর মুর্তি সুঠাম গড়ন ॥ ৩৩২ ॥
বার্তা পেয়ে দ্রুত ধেয়ে নরনারী ছুটে ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অপরূপ মিঠে ॥ ৩৩৩ ॥
সে দেশে কীর্তনদল আছিল যেখানে ।
দলে দলে গেয়ে গেয়ে মিলে সংকীর্তনে ॥ ৩৩৪ ॥
রামকৃষ্ণনামে কিবা সৌরভ-শকতি ।
নিশ্চয় পাইবে শুন রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৩৩৫ ॥
একেবারে বিকশিত হ'লে পদ্মবন ।
মরুৎ চৌদিকে করে সৌরভ বহন ॥ ৩৩৬ ॥
যোজন যোজন দূরস্থিত চাকে বাস ।
মধুলুব্ধ মধুপের অপার উল্লাস ॥ ৩৩৭ ॥
গন্ধ পেয়ে যেন গুন্ গুন্ রবে ছুটে ।
তেন কীর্তনের দল সংকীর্তনে জুটে ॥ ৩৩৮ ॥
প্রকাশ প্রচার কথা শুন অতঃপর ।
স্বকরে প্রকাশ যেন পায় দিবাকর ॥ ৩৩৯ ॥
প্রভুর প্রকাশ তেন নিজ কর-বলে ।
মহাতম হয় নাশ প্রকাশ শুনিলে ॥ ৩৪০ ॥
বিরলে বসিয়া মন শুন কান পাতি ।
শান্তির আলয় রামকৃষ্ণ লীলাগীতি ॥ ৩৪১ ॥
১
ধনঞ্জয় দে
তৃতীয় খণ্ড
কেশবচন্দ্রে কৃপাদান
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
অদ্ভুত প্রভুর লীলা না যায় বর্ণন ।
বিশেষিয়া লিখিবারে অবোধ অক্ষম ॥ ১ ॥
গাইতে প্রভুর লীলা প্রয়াস দুরাশা ।
হীনবুদ্ধিমতি আমি পাড়াগেঁয়ে চাষা ॥ ২ ॥
প্রভুভক্ত-পদরজে মহিমা অপার ।
সেই বলে বলী, শক্তি এ নয় আমার ॥ ৩ ॥
অগাধ করুণাধার প্রভু দয়াময় ।
লীলার রয়েছে লক্ষ লক্ষ পরিচয় ॥ ৪ ॥
অকপট হৃদে আর সুসরল মনে ।
বারেক ডেকেছে যেবা বিভু সনাতনে ॥ ৫ ॥
সেই পাইয়াছে শ্রীপ্রভুর দরশন ।
হিন্দু কি মুসলমান শ্রীষ্টান যবন ॥ ৬ ॥
শুন মন মধুর আখ্যান তাঁর কই ।
কিছু না জানেন প্রভু কৃপাদান বই ॥ ৭ ॥
বরষার যেন ঘন জলদের দল ।
ডেকে হেঁকে শূন্যে ছুটে সতত কেবল ॥ ৮ ॥
অস্থির চঞ্চল মাত্র জল-বরিষণে ।
সেইমত প্রভুদেব জীবে কৃপাদানে ॥ ৯ ॥
বিফল পরান হেরা সেখা ধাবমান ।
প্রভুভক্ত বিনা কেহ না বুঝে সন্ধান ॥ ১০ ॥
গতিবিধি গ্রামে গ্রামে হয় এইবার ।
স্থানাস্থান মানামান নাহিক বিচার ॥ ১১ ॥
কালের গতিক এবে বিষম ধরার ।
ভগবৎভক্তি জীবে কেহ নাহি চায় ॥ ১২ ॥
দয়াময় ধরাধামে
দেখিয়া দুর্গতি ।
দুয়ারে দুয়ারে ভ্রাম্যমাণ দিবারাতি ॥ ১৩ ॥
আঁচল ভরিয়া লয়
মহারত্নধন ।
কে চায় ভিখারী কোথা তার অন্বেষণ ॥ ১৪ ॥
যে জন কিঞ্চিৎ পার হ'য়ে
মত্ততর ।
বারে বারে আসে ছুটে দক্ষিণশহর ॥ ১৫ ॥
আসিলে প্রভুর পাশে সামান্য আশায় ।
আশার অতীত বস্তু অনায়াসে পায় ॥ ১৬ ॥
বেলঘরিয়ায় জয় সেনের বাগান ।
একদিন প্রভুদেব
সেইখানে যান ॥ ১৭ ॥
সুবিখ্যাত ব্রাহ্ম শ্রীকেশব সেই দিনে ।
উপনীত তথা কত
শিষ্যগণসনে ॥ ১৮ ॥
স্নানের সময় বেলা প্ররহরেক প্রায় ।
হৃদু সঙ্গে প্রভুদেব গেলা
বাগিচায় ॥ ১৯ ॥
প্রভুকে না চিনে কেহ ব্রহ্মজ্ঞানিগণ ।
আপনার মনে তাঁর তথা আগমন ॥ ২০ ॥
আদর কি হতাদর কেহ নাহি করে ।
কত লোক দেখা সেথা বাগিচা ভিতরে ॥ ২১ ॥
একবারে যেথা শ্রীকেশব সমাসীন ।
ভাবাবেশে অঙ্গ টলে আধা বাহ্যহীন ॥ ২২ ॥
দীনের ঠাকুর মোর দীন-সাজ গায় ।
অতি দীনতমভাবে কহিলা তাঁহায় ॥ ২৩ ॥
আইনু হেথায় আমি বড় সাধ মনে ।
শুনিতে তাঁহার কথা তোমার সদনে ॥ ২৪ ॥
কি ছবি ধরিয়া অঙ্গে অগ্রে দেখ মন ।
কেশবের সন্নিকটে প্রভুর গমন ॥ ২৫ ॥
বাসনাবর্জিত যেন হৃদয়ের থলি ।
একমাত্র হরিকথা-শ্রবণ-কাঙ্গালী ॥ ২৬ ॥
ব্যাকুলতা একাগ্রতা দীনতা সংহতি ।
হরিগত মন প্রাণ তাঁয় স্থিতি গতি ॥ ২৭ ॥
ভক্তি প্রীতি এক মতি মূর্তির গঠন ।
দেখিয়া শ্রীকেশবের না সরে বচন ॥ ২৮ ॥
বাক্য গেল কেশব উত্তর করে প্রাণে ।
ভীষ্মার্জুনে যেন কথা শর-সঞ্চালনে ॥ ২৯ ॥
ধন্য শ্রীকেশব ব্রাহ্ম-অনুরাগী জন ।
অন্বেষণে যাঁর শ্রীপ্রভুর আগমন ॥ ৩০ ॥
সুন্দর আধার তাঁর সরলাতিশয় ।
শ্রদ্ধাভক্তি অনুরাগ গুণের আলয় ॥ ৩১ ॥
কেশবে পশ্চাতে কন মৃদু মন্দ ভাষে ।
এবারে তোমার লেজ প'ড়ে গেছে খসে ॥ ৩২ ॥
শুনি তাঁর চেলাগণ প্রভুপানে চায় ।
উপহাস-ছলে বাক্য হাসিয়া উড়ায় ॥ ৩৩ ॥
শ্রীপ্রভু অপরিচিত নাহি দেখা শুনা ।
দীনদুঃখিবেশ নাহি বাহ্যিক ঠিকানা ॥ ৩৪ ॥
বিলাতীয় হাবভাব বাতুলের প্রায় ।
তাহে কহিলেন হেন শুনে হাসি পায় ॥ ৩৫ ॥
সারা কথা মহা অর্থ কথার ভিতরে ।
সামান্য মানুষবৃদ্ধি প্রবেশিতে নারে ॥ ৩৬ ॥
জীবের কি আছে দোষ দোষ পাবে কিসে ।
হৃদিদ্বার পেঁচে আটা অন্তে নাহি পশে ॥ ৩৭ ॥
তুচ্ছ জীব সদা ভ্রমে এরণ্ডার বনে ।
কেমনে বুঝিবে প্রভুদেব-কল্পদ্রুমে ॥ ৩৮ ॥
ধর্ম ধর্ম করিলে না ধর্ম হয় মন ।
ধর্ম-অনুরাগে কর্মে ধর্ম-উপার্জন ॥ ৩৯ ॥
ধর্মের লক্ষণ বাহ্যে ধর্মজ্ঞান স্থূল ।
ধর্ম-উপলব্ধি হেতু অনুরাগ মূল ॥ ৪০ ॥
অনুরাগ তীক্ষ্ণ ইচ্ছা শ্রীহরিচরণে ।
মায়াবদ্ধ তবু মন কাঁদে রেতে দিনে ॥ ৪১ ॥
কামিনী-কাঞ্চন ঘরে ভাল নাহি লাগে ।
পরানপুতুলি যার হৃদিমাঝে জাগে ॥ ৪২ ॥
অনুরাগী জন যেন মায়াবদ্ধ শিব ।
যে ফিরে হুজুগে তারে বলি বন্ধজীব ॥ ৪৩ ॥
শ্রীকেশব অনুরাগী এত বল গায় ।
অগণনে ব্রহ্মনামে মাতায়ে উঠায় ॥ ৪৪ ॥
রেলের এঞ্জিন যেন কলে জোর ভারি ।
পাছু টেনে যায় শত ময়লার গাড়ি ॥ ৪৫ ॥
সেইমত সাধুজন কলের আকার ।
মলিন কুঞ্চিত চিত হাজার হাজার ॥ ৪৬ ॥
সবে নিয়ে যায় সৎপথ-অভিমুখে ।
এক সাধু এতদূর শক্তি ঘটে রাখে ॥ ৪৭ ॥
মলিন বিষয়ী বুদ্ধি ধরে যেই জন ।
বুঝা বোঝা তার পক্ষে প্রভুর বচন ॥ ৪৮ ॥
না
বুঝিয়া প্রভুবাক্য কৈল উপহাস ।
তথাপি সৌভাগ্য করে সাধুসঙ্গে বাস ॥ ৪৯ ॥
হীন হেয় ঘৃণ্য কীট ফুলদলগত ।
ভগবৎ-পাদপদ্মে পড়ে যেই মত ॥ ৫০ ॥
সেই ধারা সাধুসঙ্গে আছে সংলগন ।
হোক হীন কালে মিলে হরি-দরশন ॥ ৫১ ॥
বন্দি শিষ্যগণসহ কেশবচরণে ।
যাঁহাদের সঙ্গে প্রভু মিলিয়া বাগানে ॥ ৫২ ॥
শিষ্যদের অল্পবৃদ্ধি বুঝিয়া কেশব ।
তখনি বলিল সবে হইতে নীরব ॥ ৫৩ ॥
হাসির তো নয় কথা বুঝ কি কথায় ।
সহজে সাধুর বাক্য বুঝা নাহি যায় ॥ ৫৪ ॥
অবশ্য গভীর অর্থ আছে বর্তমান ।
ভালরূপে বিশেষিয়া কর প্রণিধান ॥ ৫৫ ॥
এত শুনি ভাঙ্গিয়া বলিল পরমেশ ।
এখন নাহিক বাহ্য অঙ্গে ভাবাবেশ ॥ ৫৬ ॥
বেঙাচির লেজ পিছে রহে যতক্ষণ ।
ডাঙ্গায় উঠিতে শক্তি না হয় তখন ॥ ৫৭ ॥
যে সময় লেজখানি যায় তার টুটে ।
শক্তিমন্ত অমনি ডাঙ্গায় লাফে উঠে ॥ ৫৮ ॥
লেজখানি একবার খ'সে গেলে পড়ে ।
জলে স্থলে দুই ঠাঁই সে থাকিতে পারে ॥ ৫৯ ॥
বেঙাচি দৃষ্টান্তে বলি যত জীবগণ ।
মায়ালেজ সহ থাকে সংসারে মগন ॥ ৬০ ॥
পরম দয়াল প্রভু তাঁহার প্রসাদে ।
মহামন্ত্ররূপবাক্য বেগে লাগে হৃদে ॥ ৬১ ॥
শক্তিময় প্রভুবাক্য লক্ষ্য যেইখানে ।
কাহার এড়ান নাই অব্যর্থ সন্ধানে ॥ ৬২ ॥
কি কব শক্তির কথা প্রভুবাক্য ধরে ।
পলকে দুর্ভেদ্য মায়া ছারখার করে ॥ ৬৩ ॥
দু অক্ষরে মায়া কথা অতীব ভীষণ ।
জগৎ জুড়িয়া ভিত্তি প্রকাণ্ড গঠন ॥ ৬৪ ॥
সুনীল গগনসহ লোক চতুর্দশে ।
অণুবৎ সে মায়ার নখ-কোণে ভাসে ॥ ৬৫ ॥
যে মায়ার পরিমাণ নাহি অনুমানে ।
তাহা তৎক্ষণে ভেদ প্রভুর বচনে ॥ ৬৬ ॥
মন আমি অতি মূঢ় সুমূর্খ বর্বর ।
বিশ্বমধ্যে সুদুর্লভ সমান দোসর ॥ ৬৭ ॥
তা না হ'লে কেন হবে প্রয়াস আমার ।
তৃণকুটি সম কথা ল'য়ে গড়িবার ॥ ৬৮ ॥
প্রকাণ্ড আকার যার নাই সমতুল ।
প্রভুরামকৃষ্ণলীলা বিচিত্র দেউল ॥ ৬৯ ॥
একটানা তটিনীর যেন স্রোতজলে ।
বিন্দু বিন্দু করি তার তেল দিলে ঢেলে ॥ ৭০ ॥
কোথা চলে যায় ভেসে না হয় ঠিকানা ।
কথার তেমতি লীলা না হয় বর্ণনা ॥ ৭১ ॥
অতি ক্ষুদ্র বটবীজ বালুকাপ্রমাণ ।
যদি কেহ ল'বে শিশু বালকে বুঝান ॥ ৭২ ॥
সুবিশাল বটবৃক্ষ আছে এই বীজে ।
শত বার বলিলেও বালকে না বুঝে ॥ ৭৩ ॥
সেইমত শ্রীপ্রভুর মহিমা অপার ।
বুঝে না অপরে তারে বুঝালে হাজার ॥ ৭৪ ॥
স্বপ্নতোয়াধার যেন ক্ষুদ্র সরোবরে ।
অগাধ সিন্ধুর জল কখন না ধরে ॥ ৭৫ ॥
তেন ক্ষুদ্র নরশিরে প্রভুর মহিমা ।
কদাচ করিতে নারে অণুকণা সীমা ॥ ৭৬ ॥
এবা কিবা অসম্ভব পুরাণে বর্ণনা ।
পাষাণী মানবী হয় কাষ্ঠতরী সোনা ॥ ৭৭ ॥
শিলা জলে ভাসমান রাবণ-নিধন ।
সামান্য ধনুর শরে রাক্ষস-পতন ॥ ৭৮ ॥
ধরে গিরি গোবর্ধন অঙ্গুলি উপরে ।
অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী পাণ্ডব সমরে ॥ ৭৯ ॥
নষ্ট অষ্টাদশ দিনে জনৈক না জাগে ।
গাছের পাতার মত বসন্তের আগে ॥ ৮০ ॥
শূন্যহস্তে ধ্বংস কংস-মথুরাধিকার ।
ত্রিপাদে ভুবনত্রয় বেষ্টন ব্যাপার ॥ ৮১ ॥
হরিনাম দিয়া পাপী কৈল পরিত্রাই ।
উদ্ধার পাষণ্ডিদ্বয় জগাই মাধাই ॥ ৮২ ॥
ষড়ভূজ হ'য়ে দেখা দিলা মালিনীরে ।
বিতরণ হরিনাম প্রতি ঘরে ঘরে ॥ ৮৩ ॥
বিষম বিদ্যার ছটা মহান পণ্ডিত ।
যেই জন সম্মুখীন সেই পরাজিত ॥ ৮৪ ॥
এক শব্দ হয় ব্যাখ্যা হাজার প্রকার ।
কঠোর সন্ন্যাস কভু বেদান্তবিচার ॥ ৮৫ ॥
এই সব অসম্ভব অন্য অবতারে ।
মহান মহিমা-ছটা পুরাণভিতরে ॥ ৮৬ ॥
প্রভুর মহিমা সঙ্গে করিলে তুলনা ।
বিন্দু যেন সিন্ধু সঙ্গে তিল অণুকণা ॥ ৮৭ ॥
দয়াল দীনের বেশ উপরে উপরে ।
কটাক্ষে কুলিশ বাজে জড়সড় ডরে ॥ ৮৮ ॥
জানি না জগৎমাঝে কি কঠিন হেন ।
দুর্দম্য অভেদ্য পাষণ্ডীর হৃদি যেন ॥ ৮৯ ॥
তাহাও গলিয়া পড়ে জলের সমান ।
কটাক্ষ হানিলে তাঁয় প্রভু ভগবান ॥ ৯০ ॥
দুর্বল আকারে প্রভু বলের আকর ।
যেন কুসুমের রেণু তড়িতের ঘর ॥ ৯১ ॥
আর এক শ্রীপ্রভুর হীনতমাচার ।
যে কেহ সম্মুখে আসে তারে নমস্কার ॥ ৯২ ॥
শ্রীপ্রভুর নমস্কারে ধরে কিবা বল ।
কথায় কি কব টলে অটল অচল ॥ ৯৩ ॥
মেঘভেদী গিরি-শৃঙ্গ অহঙ্কার মান ।
ভায়ে যায় সর্বসহা ধরা কম্পমান ॥ ৯৪ ॥
চূর্ণ চূর্ণ হ'য়ে পড়ে ধূলার সমান ।
হানিলে শ্রী প্রভুদেব নমস্কার-বাণ ॥ ৯৫ ॥
ভুবনমোহন স্বর শ্রীকণ্ঠে প্রভুর ।
ত্রিভাগের মহাতাপ শুনে হয় দূর ॥ ৯৬ ॥
সুমন্দ মধুর হাসি বন্ধনমণ্ডলে ।
ধন-জন-নাশত্রস্ত সেও দেখে' ভুলে ॥ ৯৭ ॥
গুণের সাগর প্রভু আশ্চর্যকথন ।
বারেক হেরিলে নহে কভু বিস্মরণ ॥ ৯৮ ॥
মানুষে দেখিয়া যুদ্ধ কি কারণ হয় ।
বলিতে নাহিক সাধ্য বলিবার নয় ॥ ৯৯ ॥
কেশবে কহিয়া আর কথা দুই চারি ।
ফিরিলেন সেই দিন মন করি চুরি ॥ ১০০ ॥
বেলঘরিয়ায় বহু লোকে প্রভুদেবে ।
পরিচিত
বিশেষতঃ মানে ভক্তিভাবে ॥ ১০১ ॥
তার মধ্যে মুখুয্যে গোবিন্দচন্দ্র নাম ।
সর্বাধিক
করিতেন প্রভুর সম্মান ॥ ১০২ ॥
ভাগ্যবান তাই প্রভু তাঁহার ভবনে ।
করিলেন সংকীর্তন
ভক্তগণ সনে ॥ ১০৩ ॥
যেইখানে শ্রীপ্রভুর পড়ে পদধূলি ।
সেই মহাপুণ্যধাম মহাতীর্থ
বলি ॥ ১০৪ ॥
এক কর্মে কোটি কর্ম হয় সমাধান ।
গমন করেন যেথা প্রভু ভগবান ॥ ১০৫ ॥
আরে মন
শুন শুন লীলার কৌশল ।
জ্ঞানভক্তি-প্রদায়িনী শ্রবণমঙ্গল ॥ ১০৬ ॥
তৃতীয় খণ্ড
দীনাচার
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুদেবের লীলা-জলধির তলে ।
যে যা চায় তাই পায় তলিয়া খুঁজিলে ॥ ১ ॥
নাহি হেন রত্নধন যাহা নাই তায় ।
কাজে কাজে দেখ মন কি কাজ কথায় ॥ ২ ॥
গঙ্গার অপর কূলে কোন্নগর গ্রাম ।
ভক্তিমন্ত সম্ভ্রান্ত লোকের বাসস্থান ॥ ৩ ॥
বার বার আগমন হয় সেই গ্রামে ।
গেলে পরে অগণন লোকজন জমে ॥ ৪ ॥
বলিয়াছি শ্রীবচন কিবা রসে ভরা ।
শুনিলে পরমানন্দে করে মাতোয়ারা ॥ ৫ ॥
মহানন্দে মত্ত হ'য়ে পিয়ে বাক্যরস ।
দেহ বহির্গত মন শরীর অবশ ॥ ৬ ॥
কৃপাবলে একবার পেলে আস্বাদন ।
মরিলেও দেহ-অস্তে নহে বিস্মরণ ॥ ৭ ॥
একদিন শ্রীপ্রভুর আগমন গ্রামে ।
দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন আসে কথা শুনে ॥ ৮ ॥
ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণসন্তান ।
অন্তরেতে পরিপূর্ণ বিদ্যা-অভিমান ॥ ৯ ॥
ব্রাহ্মণ বড়ই করে গরিমা বিস্তার ।
যেথা বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু অবতার ॥ ১০ ॥
দীনহীনাচারে পূর্ণ ধূলার সমান ।
যে বা চায় তায় হয় সেই বস্তু দান ॥ ১১ ॥
অহঙ্কারে
মহাভারি ব্রাহ্মণ কুমার ।
দেখা মাত্র অগ্রে প্রভু কৈলা নমস্কার ॥ ১২ ॥
প্রতিনমস্কার না করিয়া দ্বিজবর ।
উপবিষ্ট হইলেন প্রভুর গোচর ॥ ১৩ ॥
কহে দ্বিজ দম্ভভাবে নাহি জ্ঞানলেশ ।
আপনি কি ব্রাহ্মণের প্রণম্য বিশেষ ॥ ১৪ ॥
অর্থাৎ যদিও জন্ম ব্রাহ্মণের কুলে ।
হইয়াছে ভ্রষ্টাচার যজ্ঞসূত্র ফেলে ॥ ১৫ ॥
ব্রাহ্মণ করিলে পরে পৈতা পরিহার ।
ব্রাহ্মণের জাতি শক্তি নাহি থাকে আর ॥ ১৬ ॥
সাধন-ভজনে যবে বাহ্যজ্ঞানহারা ।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা-বিবর্জিত অঙ্গে নাহি সাড়া ॥ ১৭ ॥
ঘন ঘন সমাধিস্থ সতত গোঁসাই ।
তখন হইতে তাঁর যজ্ঞসূত্র নাই ॥ ১৮ ॥
কবে কোথা যায় প'ড়ে প্রভু নাই জানে ।
আছে কি না আছে পৈতা কিছু নাই মনে ॥ ১৯ ॥
অঙ্গে নাই যজ্ঞসূত্র হৃদয় দেখিলে ।
নূতন নূতন পৈতা পরাইত গলে ॥ ২০ ॥
অদ্যাপি জীবিত আছে ভাগিনা হৃদয় ।
এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিলে এইমত কয় ॥ ২১ ॥
বাহ্যহীনহেতু সূত্র কভু যেত প'ড়ে ।
কখন দিতেন তিনি আপনিই ছেড়ে ॥ ২২ ॥
নিজে কেন ছাড়িতেন তাহার কারণ ।
অবস্থা বিশেষে হ'ত অসহ্য বন্ধন ॥ ২৩ ॥
বিদ্যামদে অভিমানী সুকর্কশ ভাষা ।
করিলেন দ্বিজবর প্রভুরে জিজ্ঞাসা ॥ ২৪ ॥
আমার প্রণম্য কি না বটেন আপনি ।
দীনভাবে উত্তরিলা প্রভু গুণমণি ॥ ২৫ ॥
আমি সকলের বাস এই বোধগম্য ।
মম শ্রেষ্ঠ সকলেই আমার প্রণম্য ॥ ২৬ ॥
নিম্নতর কোন কিছু নাই ত্রিভুবনে ।
আমি নিম্ন সকলের এই জ্ঞান মনে ॥ ২৭ ॥
ফাঁকি সুকৌশল দ্বিজ কহে আর বার ।
উত্তর এ নহে ঠিক প্রশ্নের আমার ॥ ২৮ ॥
আমি যজ্ঞসূত্রযুক্ত আপনার নাই ।
আমার প্রণম্য কিনা সেহেতু সুধাই ॥ ২৯ ॥
সন্ন্যাস-আশ্রম যাঁরা করেন গ্রহণ ।
সূত্রত্যাগ তাঁহাদের ব্যবস্থা নিয়ম ॥ ৩০ ॥
সন্ন্যাসীর যজ্ঞসূত্র যদি নাই গলে ।
সবার প্রণম্য তবু শাস্ত্রে হেন বলে ॥ ৩১ ॥
আপনি কি লয়েছেন সন্ন্যাস-আচার ।
হীনতমভাবে প্রভু করিলা স্বীকার ॥ ৩২ ॥
মূল ছেড়ে শাস্ত্রপাঠে কিবা ফলে ফল ।
সমুদ্রমন্থনে পায় অসুরে গরল ॥ ৩৩ ॥
শাস্ত্রপাঠে দম্ভ জুটে ঘটা করে ভারি ।
নামে কয় ন্যায়রত্ন কাজে কানাকড়ি ॥ ৩৪ ॥
ন্যায়পাঠী দ্বিজবর নারিল বুঝিতে ।
হেন দ্বীনতার ভাব বহে কার চিতে ॥ ৩৫ ॥
এ ভাবের অণুকণা ভুবনে বিরল ।
এ দীনতা দীননাথে সম্ভব কেবল ॥ ৩৬ ॥
জর জর দীননাথ অনাথের হরি ।
শাস্ত্র করি করিয়াছ বড় কারিগরি ॥ ৩৭ ॥
নমস্কার শাস্ত্রপাঠে শাস্ত্র-আলোচনা ।
তৃণকুটিরাশি শাস্ত্র মাত্র বিড়ম্বনা ॥ ৩৮ ॥
কি চক্রে হে চক্রপাণি গড়িয়াছ শাস্ত্র ।
শাস্ত্র প'ড়ে আনে ঘরে কেবল অনর্থ ॥ ৩৯ ॥
নাই জানি মূল কাজে কি সহায় করে ।
কোথার খুলিবে পেঁচ আরও এঁটে ধরে ॥ ৪০ ॥
দেখ ফল হলাহল লাগে ভেবাচেকা ।
কে বলে সুমূর্খতর তসরের পোকা ॥ ৪১ ॥
দিব্যভাবশূন্যুহৃদে পূর্ণ অহঙ্কার ।
অভক্তলক্ষণ যত অভক্ত আচার ॥ ৪২ ॥
দাম্ভিক পুরুষকার ছায় প্রতিপত্তি ।
গণ্যমান্য জনমাঝে অসার সম্পত্তি ॥ ৪৩ ॥
সযতনে শাস্ত্রপাঠে এই হয় সার ।
বিষম কণ্টক হরিভক্তির সেবার ॥ ৪৪ ॥
সর্বশাস্ত্র-পাঠে হয় দোষ-আরোপণ ।
উদ্দেশ্য না হয় যদি তত্ত্ব-অন্বেষণ ॥ ৪৫ ॥
এ বিষয়ে শ্রীপ্রভুর শ্রীবদনে শুনা ।
বৈরাগ্যবিহীনে শাস্ত্রপাঠের উপমা ॥ ৪৬ ॥
শকুনী গৃধিনী পাখী যেন কর মনে ।
কত উচ্চ দূরে উড়ে সুনীল গগনে ॥ ৪৭ ॥
পাইত দেবেশপুরী উদ্দেশ্য থাকিলে ।
যত ঊর্ধ্বে থাকে তার কিছু ঊর্ধ্বে গেলে ॥ ৪৮ ॥
কিন্তু নাহি রহে লক্ষ্য স্বর্গের উপরে ।
আঁখি তথা যেথা আছে পচা কায়া প'ড়ে ॥ ৪৯ ॥
সেইমত শাস্ত্রপাঠী বহু শাস্ত্র পড়ে ।
হীন হেয় ধন-মান-উপার্জন তরে ॥ ৫০ ॥
আর যেবা পড়ে শাস্ত্র তত্ত্বের আশায় ।
জ্ঞান ভক্তি অনুরাগ পাতা ঘেঁটে পায় ॥ ৫১ ॥
ভগবৎপাদপদ্মলুব্ধ যেই জন ।
সেই শাস্ত্রপাঠে পায় শ্রীগুরুচরণ ॥ ৫২ ॥
প্রভেদ উদ্দেশ্যে মাত্র শাস্ত্রে কিছু নাই ।
কেহ পায় নিধিরত্ব কেহ পায় ছাই ॥ ৫৩ ॥
বিশেষিয়া বিবরণ বলিতে হইলে ।
সেই মাত্র সৎকর্ম গুরু যার মূলে ॥ ৫৪ ॥
যে জন শ্রীগুরুপদ-অন্বেষণ তরে ।
সৎশাস্ত্রপাঠ কর্ম পথরূপে হরে ॥ ৫৫ ॥
তাঁর পাঠ তাঁর কর্ম সতেতে গণনা ।
শুরু ছেড়ে শাস্ত্র পড়া মাত্র বিড়ম্বনা ॥ ৫৬ ॥
অভিমানী ন্যায়রত্ব শাস্ত্র করি পাঠ ।
বসায়েছে হৃদিমাঝে অবিদ্যার হাট ॥ ৫৭ ॥
বিদ্যায় কি আছে কাজ বিস্তায় কি করে ।
যে বিদ্যায় বিদ্যা যিনি তাঁরে রাখে দূরে ॥ ৫৮ ॥
কামিনীকাঞ্চনপূর্ণ অবিদ্যা-আপণে ।
ধন জন মান খ্যাতি অহঙ্কার ভানে ॥ ৫৯ ॥
বিজ্ঞা-অভিমানে মত্ততর অতিশয় ।
এবে ধরাধামে নরনারীর হৃদয় ॥ ৬০ ॥
শ্রীপ্রভু দেখিয়া এবে সময়ের গতি ।
হইলেন নিরক্ষর হয়ে বিদ্যাপতি ॥ ৬১ ॥
দীনহীনাচার হয়ে শক্তির আধার ।
জীবশিক্ষা-হেতু, হেতু নহে অন্য আর ॥ ৬২ ॥
বুদ্ধিনাশী মহে হেন মদ বর্তমান ।
ভীষে নাহি ছাড়ে তারে যতক্ষণ প্রাণ ॥ ৬৩ ॥
এখন সময় নয় প্রলয়ের কাল ।
ব্রহ্মগত শক্তি ঘুচে সৃষ্টির জঞ্জাল ॥ ৬৪ ॥
লীলা-হেতু অবতীর্ণ ধরি কলেবর ।
পূর্ণব্রহ্ম প্রভুদেব দয়ার সাগর ॥ ৬৫ ॥
শ্রীপ্রভু অদ্ভুত লীলা করিলা জাহির ।
নিজে দুয়ে দুয়াইলা মদমত্ত শির ॥ ৬৬ ॥
সন্ন্যাস-আচার কি না ন্যায়রত্ন যবে ।
ফাঁকি ধরি জিজ্ঞাসা করিল প্রভুদেবে ॥ ৬৭ ॥
হেন দীনতমভাবে প্রভু দিলা সায় ।
সন্ন্যাসিভাবের অহং-গন্ধ নাহি তায় ॥ ৬৮ ॥
আমি ভক্ত আমি ত্যাগী যোগতপাচারী ।
এ ভাব অন্তরে যার সেই অহংকারী ॥ ৬৯ ॥
বিষম মদের ফল ফল যেন বিষে ।
অহংকার অভিমানে ত্যাগ ভক্তি নাশে ॥ ৭০ ॥
কি কঠিন মদত্যাগ মদনত মন ।
কেমনে কহিব তোরে কি আছে বচন ॥ ৭১ ॥
লোহার কাঠিন্য কিবা থাকে দেখ তার ।
আগুনে গলিলে পরে সলিলের প্রায় ॥ ৭২ ॥
নাহি থাকে আপন স্বভাব ধর্ম-রীতি ।
তেন মন্ত্রহীনে হয় ত্যাগীর প্রকৃতি ॥ ৭৩ ॥
গুরুর কৃপায় পেলে ইহার আভাস ।
তথাপিহ তাহে থাকে আমিত্বের বাস ॥ ৭৪ ॥
শূন্যঘৃতকুম্ভবৎ যেন উপমায় ।
আগুনে পুড়িলে তবু গন্ধ নাহি যায় ॥ ৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর স্থিতি কোথা ভাব কি রকম ।
নরশিরে কখন না হয় নিরূপণ ॥ ৭৬ ॥
গন্ধাদি বর্জিত ভাব বুঝা মহাদায় ।
যে ভাগ সর্বদা বহে শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ৭৭ ॥
না যোগার বাক্যে দিতে আভাস তাহার ।
যে ভাবে সন্ন্যাসী প্রভু করিলা স্বীকার ॥ ৭৮ ॥
যাহার আভাসে ন্যায়রত্ন ভাগ্যবান ।
নুয়ায়ে উন্নত শির করিল প্রণাম ॥ ৭৯ ॥
প্রভুদেবে একবার প্রণামে কি কলে ।
অবশ্য পাইবে বার্তা চরিত শুনিলে ॥ ৮০ ॥
দেখিয়া অনন্যমন যত লোকজন ।
হিত-উপদেশ-উক্তি বিবিধ রকম ॥ ৮১ ॥
নানা রঙ্গরসে ভরা প্রচুর প্রচুর ।
সরল উপমাসহ শ্রুতিসুমধুর ॥ ৮২ ॥
কহিতে লাগিলা প্রভু হেন মিষ্ট ভাষে ।
দুর্বোধ্য যদিও মুর্খে বুঝে অনায়াসে ॥ ৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর দীনভাব দীনতম রীতি ।
উন্নত হইয়া এত সহজ প্রকৃতি ॥ ৮৪ ॥
উচ্চতম জ্ঞানতত্ত্ব সরল ভাষায় ।
বর্ণিবার মহাশক্তি যুক্ত রসনায় ॥ ৮৫ ॥
দেখিয়া শুনিয়া পায় গড়াইয়া পড়ে ।
আছিল একত্র যত সভার ভিতরে ॥ ৮৬ ॥
শ্রবণমঙ্গল শুন প্রভুর প্রচার ।
ফুটিবে চৈতন্য যাবে অজ্ঞান-আঁধার ॥ ৮৭ ॥
পাইবে শ্রীপ্রভুদেবে ধ্রুব কর্ণধার ।
অপার সংসারার্ণবে যাহে হবে পার ॥ ৮৮ ॥
তৃতীয় খণ্ড
লক্ষ্মী মাড়োয়ারীর অর্থদান-প্রার্থনা
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রবণে পবিত্র চিত প্রভুর কাহিনী ।
কলিকালে অবহেলে ভক্তি মিলে শুনি ॥ ১ ॥
কামিনী-কাঞ্চন মহা অবিদ্যা-বন্ধন ।
যায় টুটে হৃদে উঠে চৈতন্য-তপন ॥ ২ ॥
ভগ্নদন্ত ষড়রিপু বিষধরগণে ।
শক্তিমন্ত মহামন্ত্র লীলাকথা শুনে ॥ ৩ ॥
কালকূট-ত্রিতাপ-সন্তাপে পায় ত্রাণ ।
মহৌষধি শাস্তিবিধি প্রভুলীলাগান ॥ ৪ ॥
ধর্মের স্থাপন জীবশিক্ষার কারণে ।
বারে বারে অবতার প্রভু ধরাধামে ॥ ৫ ॥
কাল-পাত্র-আদি-ভেদে নূতন বিধান ।
শুন এবে কিবা শিক্ষা দিলা ভগবান ॥ ৬ ॥
এ সময় ধর্মলোপ প্রায় ধরাতল ।
কামিনীকাঞ্চনাসক্ত সকলে কেবল ॥ ৭ ॥
বড়ই বিরল ভগবৎ-লুব্ধ-প্রাণ ।
ধর্মচর্চা কথামাত্র ধার্মিকের ভান ॥ ৮ ॥
কামিনী-কাঞ্চন ধর্ম-আচরণমূলে ।
রতিমতিশূন্য গুরুচরণকমলে ॥ ৯ ॥
নিঃসন্দেহ এত অন্ধ গোটা বসুন্ধরা ।
আঁখিতে যেমন নাই দৃষ্টিশক্তি-তারা ॥ ১০ ॥
অন্ধকারে ভ্রাম্যমাণ দিবসযামিনী ।
আঁধারে গিয়ান যেন কিরণের খনি ॥ ১১ ॥
দিনমণি করাকর প্রকাশক কিনা ।
অন্তরে আদতে নাই তিলকণা আভা ॥ ১২ ॥
এইমত এবে যত মানুষ সবাই ।
পরমার্থ-বস্তু কিবা কোন বোধ নাই ॥ ১৩ ॥
ধরায় অবিদ্যা তুলিয়াছে মহামার ।
এ হেন সময় প্রভুদেব অবতার ॥ ১৪ ॥
অমানুষী ত্যাগ আচরিয়া ভগবান ।
বিষে ঘেরা জীবে দিলা শিক্ষার বিধান ॥ ১৫ ॥
কঠোর প্রভুর ত্যাগে হেন কোথাকার ।
কামিনী-কাঞ্চনে জ্ঞান বিষের ভাণ্ডার ॥ ১৬ ॥
কামিনী-সম্বন্ধে কত বলিয়াছি মন ।
এইবারে শুনহ কাঞ্চন-বিবরণ ॥ ১৭ ॥
এত ছটাঘটাপূর্ণ শ্রীপ্রভুর কাজ ।
অধোমুখ শরৎদিনেশ পেয়ে লাজ ॥ ১৮ ॥
ধরায় না পারে দেখাইতে মুখ খুলে ।
মাঝে মাঝে ঢুকে তাই মেঘের আড়ালে ॥ ১৯ ॥
প্রভুর মহিমাগাথা মহা জ্যোতিষ্মান ।
কেবল পাষণ্ডী কানা না পায় সন্ধান ॥ ২০ ॥
প্রভু দরশনে আসে কত লোকজন ।
একদিন সমাগত লক্ষ্মীনারায়ণ ॥ ২১ ॥
ধনী মহাজন তিনি জেতে মারোয়াড়ী ।
ধনেশ বিশেষ ঘরে বহু টাকা-কড়ি ॥ ২২ ॥
বেদান্তের পথে মতি জ্ঞানমার্গী জনা ।
তত্ত্বলাভে শ্রীগোচরে করে আনাগোনা ॥ ২৩ ॥
লেগেছে পিরীতি তার প্রভুর চরণে ।
মারোয়াড়ী জেতে বড় সাধুভক্ত মানে ॥ ২৪ ॥
কর্মকাণ্ডে রতিমতি বহু করে ব্যয় ।
সাধুসেবা রাতিদিবা বিরক্ত না হয় ॥ ২৫ ॥
শাস্ত্রের প্রসঙ্গে তর্ক করে প্রভুসনে ।
অচৈতন্য ঢাকা আঁখি অবিদ্যাবরণে ॥ ২৬ ॥
সরল-প্রকৃতি আর ধর্মতৃষাতুর ।
সেই হেতু কৃপা-চক্ষে দেখেন ঠাকুর ॥ ২৭ ॥
শ্রীপ্রভুর কৃপাকণা পায় যেই নরে ।
কৃপার পিপাসা তার শতগুণে বাড়ে ॥ ২৮ ॥
কি কৃপা প্রভুর কৃপা কি ভিতরে তার ।
যে পেয়েছে সে বুঝেছে নহে বলিবার ॥ ২৯ ॥
কহিতে আভাস তবু কথা নাহি জুটে ।
বাক্যবান হয় বোবা জোড়া লাগে ঠোঁটে ॥ ৩০ ॥
সসাগরা বসুন্ধরা কোষপূর্ণ নিধি ।
ব্রহ্মত্ব শিবত্ব কিবা বিষ্ণুত্ব অবধি ॥ ৩১ ॥
উপেক্ষা করিয়া পাছু ফেলি ছুটে যায় ।
যদি কেহ শ্রীপ্রভুর কৃপাকণা পায় ॥ ৩২ ॥
আস্বাদ পাইয়া লক্ষ্মী আসে ছুটে ছুটে ।
কৃপায় সাগর শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে ॥ ৩৩ ॥
ধন্য ধন্য পঞ্চভূত দুর্ভেদ্য নিগড় ।
যে উপাধানে গড়া নরকলেবর ॥ ৩৪ ॥
কিবা বলীয়ান্ যেন শ্রীপ্রভুর কৃপা ।
অলঙ্কৃত পঞ্চভূত তারে ফেলে ছাপা ॥ ৩৫ ॥
শক্তি নাই একেবারে ঢাকাইতে তারে ।
কৃপা-বল দেহঘটে উঠুডুবু করে ॥ ৩৬ ॥
ডুবিলে অবিদ্যা করে চিত্ত আকর্ষণ ।
উঠিলে মিলার পুনঃ শ্রীগুরু-চরণ ॥ ৩৭ ॥
বিধির নিয়ম কভু নহে টলিখার ।
দিনে রেতে খেলে ঘুরে আলোক-আঁধার ॥ ৩৮ ॥
যদি বল সর্বোপরি কৃপা বলীয়ান ।
বহু দূরে নীচে তার বিধির বিধান ॥ ৩৯ ॥
দীপ্তিমান কেন নাহি রবে দিবারাতি ।
একভাবে প্রভুকৃপা জ্যোতির্ময় বাতি ॥ ৪০ ॥
বড়ই সমস্যাকথা ইহার উত্তর ।
প্রভুর আজ্ঞায় গড়ে বিধি কারিগর ॥ ৪১ ॥
ধরাতল লীলাস্থল তাজ্জব আসরে ।
খাঁটিতে না হয় কাল তাই খাদে গড়ে ॥ ৪২ ॥
পাইয়া প্রভুর কৃপা লক্ষ্মী মারোয়াড়ী ।
অপার আনন্দ ভুলে দিবাবিভাবরী ॥ ৪৩ ॥
প্রভুর অভয় পদে বেড়েছে পিরীতি ।
পেতে শুতে মনে জাগে মোহন-মুরতি ॥ ৪৪ ॥
বিষয়ে বিমুগ্ধবুদ্ধি মানুষসকল ।
বিষয় বৈভব টাকা বুঝয়ে কেবল ॥ ৪৫ ॥
অর্থের অধিক প্রিয়তম তাহি আর ।
তুলনায় অতি তুচ্ছ পাঁজরের ছাড় ॥ ৪৬ ॥
তাই লক্ষ্মী মারোয়াড়ী করে মনে মনে ।
টাকা-কড়ি প্রভুদেবে দেয় কিছু এনে ॥ ৪৭ ॥
এদিকে কঠোর ত্যাগ দেখিয়া প্রভুর ।
বচনে গলিতে নারে চিন্তায় আতুর ॥ ৪৮ ॥
সুযোগ সুবিধা ছল করে অন্বেষণ ।
একদিন বলিবার পাইল কারণ ॥ ৪৯ ॥
ছিন্ন হেরি শ্রীপ্রভুর বিছানা-চাদর ।
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে লক্ষ্মী জোড়ি কর ॥ ৫০ ॥
ছিন্ন বস্ত্র ব্যবহার্য নহে আপনার ।
যোগাতে নূতন বস্তু কার আছে ভার ॥ ৫১ ॥
উত্তরিলা প্রভুদেব ভবের কাণ্ডারী ।
প্রয়োজন যাহা দেয় পুরী-অধিকারী ॥ ৫২ ॥
লক্ষ্মী তাঁর পুনরায় করে নিবেদন ।
এখানে জানে না লোকে সাধুর সেবন ॥ ৫৩ ॥
সাধুসেবাহেতু যাহা আবশ্যক লাগে ।
উচিত যোগান সব চাহিবার আগে ॥ ৫৪ ॥
আমাদের দেশে যত ধনী মহাজন ।
সাধুসেবাহেতু অর্থ দেয় বিলক্ষণ ॥ ৫৫ ॥
সাধুর সেবনে আছে রীতি প্রচলিত ।
রাখিবারে কিছু অর্থ করিয়া স্থগিত ॥ ৫৬ ॥
যত বারসংকুলান হয় তার আছে ।
চাহিতে না হয় কভু দ্রব্যের লাগিয়ে ॥ ৫৭ ॥
তেকারণ হইতেছে বাসনা এতেক ।
ন্যয়মত কিন্তু অর্থ হাজার দশেক ॥ ৫৮ ॥
কোম্পানিকাগজ কিনি রাখি স্থিত ক'রে ।
সুদে তার আপনার ব্যয় হবে পরে ॥ ৫৯ ॥
গরল কাঞ্চন কথা তাঁর মুখে শুনি ।
বিবষ বিরক্ত হৈলা প্রভু গুণমণি ॥ ৬০ ॥
বলিলেন কেন দাও অর্থ-প্রলোভন ।
সব অনর্থের মূল অবিদ্যা কাঞ্চন ॥ ৬১ ॥
কণ্টকস্বরূপ অর্থ পরমার্থ-পথে ।
কোন প্রয়োজন মম নাহি হেন অর্থে ॥ ৬২ ॥
চিত্তে যার তিলমাত্র অর্থ-ভাব থাকে ।
মহানন্দময়ী শ্যামা নাহি মিলে তাকে ॥ ৬৩ ॥
এমত অর্থের কথা না কহিবে আর ।
সর্বনাশী অর্থে কাজ নাহিক আমার ॥ ৬৪ ॥
শরীর রক্ষণহেতু আবশ্যক যায় ।
সময়ে সকল পাই শ্যামার ইচ্ছায় ॥ ৬৫ ॥
যতই বলেন প্রভু লক্ষ্মী নাহি শুনে ।
কথার উপর কথা হয় তাঁর সনে ॥ ৬৬ ॥
নিশ্চয় বুঝিল যবে লক্ষ্মীনারায়ণ ।
প্রভু নিজে না করিবা কাঞ্চন গ্রহণ ॥ ৬৭ ॥
তবু মারোয়াড়ী বহু জেদ করি পুছে ।
আপনার আত্মবন্ধু অনেকে তো আছে ॥ ৬৮ ॥
থাকিবে কাগজ কেনা অপরের নামে ।
শুনি প্রভু বলিলেন লক্ষ্মীনারায়ণে ॥ ৬৯ ॥
আত্মীয় বন্ধুর নামে যদি হয় রাখা ।
সময়ে হইবে মনে সে আমার টাকা ॥ ৭০ ॥
অবিদ্যার প্রতিমূর্তি কামিনী-কাঞ্চন ।
সামান্য পরশে জারে যোগেশের মন ॥ ৭১ ॥
বিষধরী সর্পী যদি অঙ্গ-অংশ কাটে ।
আগোটা শরীর নষ্ট হয় কালকুটে ॥ ৭২ ॥
সেইমত অণুকণা আসক্তি কাঞ্চনে ।
ক্রমশঃ জরায় বিষে যোল-আনা মনে ॥ ৭৩ ॥
অতেব গরল সম ভীষণ-কাঞ্চন ।
নাহি শক্তি কোনমতে করিতে গ্রহণ ॥ ৭৪ ॥
লক্ষ্মীর তথাপি জেদ উঠে থেকে থেকে ।
বাহির করিল নোট বাঁধা ছিল টেঁকে ॥ ৭৫ ॥
বলে আমি আনিয়াছি আপনার তরে ।
কি প্রকারে পুনরায় ল'য়ে যাই ঘরে ॥ ৭৬ ॥
করুন যা হয় ইচ্ছা হোক আপনার ।
কেমনে লইব দত্ত টাকা পুনর্বার ॥ ৭৭ ॥
দাঁড়ায়ে গন্তব্য পথে পিশাচিনী দেখে ।
কাঁদে যেন মহাভয়ে শৈশব বালকে ॥ ৭৮ ॥
জড়সড় ত্রস্ত-চিত আকুল-পরানী ।
ডাকে সর্বদুঃখহরা আপন জননী ॥ ৭৯ ॥
সেইমত প্রভু করি নোট দরশন ।
মামা বলি ডাক ছাড়ি করেন রোদন ॥ ৮০ ॥
বালকস্বভাব প্রভুদেব অবিকল ।
মামা বলি কান্না তাঁর কেবল সম্বল ॥ ৮১ ॥
কত যে কাঁদিলা নাই কান্নার অবধি ।
কাঁদিতে কাঁদিতে আসে গভীর সমাধি ॥ ৮২ ॥
ঘুচিল জঞ্জাল যত সুস্থির এক্ষণে ।
সরসীর জল যেন ঝঞ্ঝা-অবসানে ॥ ৮৩ ॥
প্রতিবিম্বে শ্রীবদনে খেলে অতঃপর ।
আনন্দ-কৌমুদী-ছটা পরম সুন্দর ॥ ৮৪ ॥
সমাধিস্থ ভাব যেন জননীর কোল ।
অতি নিরাপদ ঠাঁই নাই কোন গোল ॥ ৮৫ ॥
অর্থ দেখি ত্রস্ত প্রভু যত পরিমাণে ।
ততোধিক ত্রস্ত-চিত লক্ষ্মী এইখানে ॥ ৮৬ ॥
মনে গণে আপনার বিষম প্রমাদ ।
কেন হেন কৈনু কর্ম মহা অপরাধ ॥ ৮৭ ॥
যথাজ্ঞান ভাল কাজে বিপরীত ফল ।
হেন মহাত্মার যাহে চক্ষে ঝরে জল ॥ ৮৮ ॥
পরম মঙ্গল এই মনস্তাপে পায় ।
কুড়াইয়া নোটগুলি সেদিন পালায় ॥ ৮৯ ॥
মন তোর শিক্ষা-হেতু শুনাই ভারতী ।
কল্যাণনিদান রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ॥ ৯০ ॥
তৃতীয় খণ্ড
প্রভুদর্শনে দক্ষিণেশ্বরে কেশবের আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
সুধার সাগর সম রামকৃষ্ণকথা ।
মিঠায় কি পরিমাণে নাহয় ইয়ত্তা ॥ ১ ॥
যেন কথা-আন্দোলনে থাক সদা মন ।
স্মরি গুরু প্রভুদেব তমোবিমোচন ॥ ২ ॥
কেশব সেনের সঙ্গে লীলা যে প্রকার ।
গাইলে শুনিলে ভক্তি-চৈতন্য-সঞ্চার ॥ ৩ ॥
ব্রাহ্ম ব্রহ্মশক্তি সমতুল্য হয় জ্ঞান ।
সাকার সে নিরাকার এক ভগবান ॥ ৪ ॥
ব্রাহ্ম শ্রীকেশব সেন সর্বজনে জানা ।
অতিমান্য অগ্রগণ্য ধন্য এক জনা ॥ ৫ ॥
কবিরাজ বৈদ্যবংশে তাঁহার উদ্ভব ।
পিতা পিতামহগণ কৃষ্ণভক্ত সব ॥ ৬ ॥
বংশগত ধর্মে নাহি তাঁর রতিমতি ।
বাল্যাবধি কেশবের স্বতন্ত্র প্রকৃতি ॥ ৭ ॥
দেশেতে ইংরেজী বিদ্যা চলন এখন ।
উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজভাষা-অধ্যয়ন ॥ ৮ ॥
নিতি নিতি অধ্যয়নে বিদ্যা বেড়ে যায় ।
বিশেষ ব্যুৎপন্ন হৈল ইংরেজী ভাষায় ॥ ৯ ॥
ভাষার ধরন যেন তেন তাঁয় গড়ে ।
বাইবেল গ্রন্থ-পাঠে অনুরাগ পড়ে ॥ ১০ ॥
ছেড়ে গেল বিদ্যারাগ ধর্মপথে টান ।
সরল হৃদয়ে করে তাঁহার সন্ধান ॥ ১১ ॥
গ্রন্থের মধ্যেতে তত্ত্ব হয় অন্বেষণ ।
সেই হেতু দিবারাতি চলে অধ্যয়ন ॥ ১২ ॥
তার সঙ্গে কার্যগত হইল আচার ।
অসাত্ত্বিক খাদ্য যত যত্নে পরিহার ॥ ১৩ ॥
প্রার্থনা প্রাণের বস্তু বিভুর উদ্দেশে ।
সৎপথ সৎদৃষ্টি মিলে তাঁর কিসে ॥ ১৪
॥
মঙ্গল-আলর ভক্তপ্রিয় ভগবান ।
অলক্ষ্যে লাগাম ধরি কেশবে চালান ॥ ১৫ ॥
বাহ্য-অন্তে সরলতা সেই সে কারণে ।
নবীনে কেশবচন্দ্র সুপ্রবীণ জ্ঞানে ॥ ১৬ ॥
গম্ভীরতা স্থির বৃদ্ধি অকপট মতি ।
বক্রভাবাপন্নহীন সহজ প্রকৃতি ॥ ১৭ ॥
অল্পভাষী মিষ্টভাষ নির্জনপ্রিয়তা ।
অনুরাগে করে চর্চা ঈশ্বরের কথা ॥ ১৮ ॥
তেজপূর্ণ সূক্ষ্ম দৃষ্টি আপনা শাসনে ।
বিবেক-বৈরাগ্য বৃদ্ধি-চেষ্টা দিনে দিনে ॥ ১৯ ॥
ভাবী ফলশালী বৃক্ষ চারায় যেমন ।
লহ লহ কচি পাতা সবুজ বরন ॥ ২০ ॥
নূতন নূতন ফেলে প্রত্যেক সকালে ।
তেমতি কেশবচন্দ্র উঠে কুতুহলে ॥ ২১ ॥
সমাধ্যায়ী আয়বন্ধু সকলের পাশ ।
মনোগত ধর্মভাব করেন প্রকাশ ॥ ২২ ॥
প্রায় যায় উপহাসে কি করিয়া বুঝে ।
না হইলে কেশবের সমকক্ষ তেজে ॥ ২৩ ॥
নিহিত অন্তরে ঐশী শক্তির আবেশ ।
না হইলে জীবে কিসে করিবে প্রবেশ ॥ ২৪ ॥
ঘোর বৈরাগ্যের কথা বিবেককাহিনী ।
বিপরীত বুঝে যত জগতের প্রাণী ॥ ২৫ ॥
ঘুমন্ত কেশব নয় উন্মীলিত আঁখি ।
কতক্ষণ আগুন বসনে থাকে ঢাকি ॥ ২৬ ॥
বাহিরিল নিজ তেজে গতি কেবা রোধে ।
প্রচারিতে নিজ মত কর্তব্যানুরোধে ॥ ২৭ ॥
বলিতে বলিতে হেখা সেথা বার বার ।
বলিবার শক্তি ঘটে ফুটিল অপার ॥ ২৮ ॥
বক্তা নামে হৈল খ্যাত বীর বলবান ।
যে মাখা উন্নত তারে সহজে নুয়ান ॥ ২৯ ॥
ইংরাজীতে কেশবের বক্তৃতার চোটে ।
শ্বেতকায় মিশনারি চমকিয়া উঠে ॥ ৩০ ॥
হেন সুকৌশল তর্কে বাঁধা কথা তাঁর ।
প্রতিবাদে সম্মুখীন সাধ্য নহে কার ॥ ৩১ ॥
কর্কশস্বভাৰ কথা নহে কোন কালে ।
যদিও আগুন ছুটে যে সময় বলে ॥ ৩২ ॥
মূর্তিতে মিঠানি যেন তেমন কথায় ।
মনে হয় শুনি শুনি যেন না ফুরায় ॥ ৩৩ ॥
উচ্চভাবযুক্ত এত সরলে বাহির ।
মনে হয় বরপুত্র বাগ্বাদিনীর ॥ ৩৪ ॥
ভাবেতে যদিও কথা বাঁকা স্থানে স্থানে ।
ধরিতে নারিত কেহ বিদ্যাবল গুণে ॥ ৩৫ ॥
সরলতা-বল আর বিদ্যা-বল দুয়ে ।
কেশবে গৌরবী কৈল কেশব করিয়ে ॥ ৩৬ ॥
সত্ত্বগুণে সরলতা-লতা সুকোমল ।
ভক্তপ্রিয় ঈশ্বরের আদরের স্থল ॥ ৩৭ ॥
সতত বেষ্টিত লতা থাকে ভগবানে ।
প্রসবে মধুর ফল কুসুম উদ্যমে ॥ ৩৮ ॥
ক্রমশঃ কেশব এত সদ্গুণে ভূষিত ।
দেখিলেই সবে বুঝে ঈশ্বর-জানিত ॥ ৩৯ ॥
বিলাতে ইংলণ্ডদেশে যাত্রা একবার ।
গুণী মানী তথাকার হাজার হাজার ॥ ৪০ ॥
স্বভাবসুলভ নম্র বিনীতাচরণে ।
বিদ্যাবল-পরিচয় বক্তৃতা-শ্রবণে ॥ ৪১ ॥
আসিত আশ্রমে কত দেখিতে তাঁহায় ।
কেশবের এখন এতেক শক্তি গায় ॥ ৪২ ॥
ইংলণ্ডের রানী যিনি ভারত-ঈশ্বরী ।
সমান আসন যেন সমাদর করি ॥ ৪৩ ॥
প্রাসাদে আপন ঘরে ল'য়ে গিয়ে তাঁরে ।
বুঝ মন কত শক্তি শ্রীকেশব ধরে ॥ ৪৪ ॥
দেশে কি বিদেশে তুল্য সমাদর তাঁর ।
ক্রমশঃ ক্রমশঃ পরে পাবে সমাচার ॥ ৪৫ ॥
ধর্মভাব কেশবের শুনহ এখন ।
মহেশ গণেশ বিভু নিত্য নিরঞ্জন ॥ ৪৬ ॥
গুণময় সগুণ যে ব্রহ্ম নিরাকার ।
সৃজন পালন লয় শক্তির আধার ॥ ৪৭ ॥
পিতা পাতা সবাকার পুরুষপ্রধান ।
পূর্ণব্রহ্ম নিত্যানন্দ ব্যাপ্ত সর্বস্থান ॥ ৪৮ ॥
ইন্দ্রিয়বিহীন আছে ইন্দ্রিয়াদি স্থির ।
বিশাল সৃষ্টির মধ্যে বিক্রম জাহির ॥ ৪৯ ॥
অখণ্ড অনাদি ঈশ সর্বশক্তিমান ।
অক্ষয় অমর অন্তহীন গুণধাম ॥ ৫০ ॥
ন্যায়পরায়ণব্রত মঙ্গল-আচার ।
হেন নিরাকার ব্রহ্ম উপাস্য তাঁহার ॥ ৫১ ॥
সাকারে স্বীকার নহে খণ্ড বোধ হয় ।
প্রতিমা-পুতুল-পূজা পূজাযোগ্য নয় ॥ ৫২ ॥
আচারী বৈষ্ণব খ্যাত বৈদ্যকুলোদ্ভব ।
যেখানে পুত্রের নাম থুইল কেশব ॥ ৫৩ ॥
সে বৎশেতে নিরাকারবাদী জন্মে ছেলে ।
হাসিবে বৈষ্ণবকুল এ কথা শুনিলে ॥ ৫৪ ॥
হাসির তো নয় কথা লীলার খবর ।
বাহ্যে দেখিবার নয় দ্রষ্টব্য ভিতর ॥ ৫৫ ॥
শক্তিধর শ্রীকেশব ঈশ্বরের জানা ।
জীব নহে কর্মচারী ভাবে তাঁরে আনা ॥ ৫৬ ॥
কিবা কর্ম করাইলা ধর্মের কারণ ।
এই লীলামঞ্চ ধরা যাহার সৃজন ॥ ৫৭ ॥
সুন্দর কখন শুন লীলাদৃষ্টি হবে ।
বৈষ্ণবের চূড়ামণি কেশবে দেখিবে ॥ ৫৮ ॥
কোনরূপে কিবা পথে কোথা কার গতি ।
কোথার বিশ্রামশয্যা আনন্দ-সংহতি ॥ ৫৯ ॥
আনন্দে আনন্দময় পরিণাম ফল ।
একা ভাগবতীলীলা দেখিবার স্থল ॥ ৬০ ॥
সাকার শ্রীকেশবের শেষ পরিণাম ।
পরম আনন্দময় বিশ্রামের স্থান ॥ ৬১ ॥
নিরাকার পথে হবে কার্যহেতু গতি ।
শুনহ মধুর রামকৃষ্ণলীলা-গীতি ॥ ৬২ ॥
নানা জাতি ধর্ম এবে ভারতে প্রচার ।
বিধিংসম্প্রদায়ভুক্ত বিবিধ আচার ॥ ৬৩ ॥
সর্বশ্রেষ্ঠ তাঁর ধর্ম গায় জনে জনে ।
বহু হিন্দুবংশ মজায়েছে খ্রীষ্টিয়ানে ॥ ৬৪ ॥
ধর্মভাবে আত্মভাব মিলায়ে এখন ।
ব্রাহ্মধর্মে শ্রীকেশব হইল মিলন ॥ ৬৫ ॥
বহুভাষাশাস্ত্রদর্শী ব্রাহ্মণসন্তান ।
খ্যাত্যাপন্ন শ্রীরামমোহন রায় নাম ॥ ৬৬ ॥
ব্রাহ্মধর্ম-রীতি-নীতি-গঠন তাঁহার ।
বিদ্যা-বুদ্ধি-শক্তিবলে করিল প্রচার ॥ ৬৭ ॥
ধর্ম-অঙ্গে বেদান্তের অতি অল্প ছায়া ।
বাকি বাদ নিজে গ'ড়ে পুরাইল কায়া ॥ ৬৮ ॥
খ্রীষ্টিয়ান সম ধারা আচারেতে মিলে ।
হিন্দুধর্ম-অঙ্গ ইহা কেহ কেহ বলে ॥ ৬৯ ॥
কি ধর্ম কিসের ধর্ম ভিতরে কি তার ।
এ বিচারে কিছু মম নাহি অধিকার ॥ ৭০ ॥
রায়ের গঠিত ধর্মে উন্নতি প্রচুর ।
বর্তমান নেতা যার দেবেন্দ্র ঠাকুর ॥ ৭১ ॥
ভ্রষ্টাচার হেতু এঁরা পিরালী ব্রাহ্মণ ।
শহরেতে
গুণে মানে খ্যাতি বিলক্ষণ ॥ ৭২ ॥
সমর্থন ব্রাহ্মধর্ম হয় বিধিমতে ।
এমন সময় দিলে শ্রীকেশব পথে ॥ ৭৩ ॥
উত্তরের রথে যেন সারথি অর্জুন ।
তার তিল অণুরুণা কিছু নহে ঊন ॥ ৭৪ ॥
ব্রাহ্মধর্মে সেইমত হইল
কেশব ।
দিন দিন জয়বৃদ্ধি ভূরি ভূরি রব ॥ ৭৫ ॥
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা উচ্চ আখ্যাধারী ।
সৎকুলসমুত্তর গুণ মান ভারি ॥ ৭৬ ॥
ধনে জমিদার, কার উচ্চ পথে স্থান ।
ইংরেজরাজের ঘরে অতুল সম্মান ॥ ৭৭ ॥
নতশিরে হেন কত শত অগণন ।
কেশবের ধর্মব্যাখ্যা করিয়া শ্রবণ ॥ ৭৮ ॥
দলভুক্ত হয় তাঁর ল'য়ে পদধূলি ।
বংশগত জাতি গর্বে দিয়া জলাঞ্জলি ॥ ৭৯ ॥
কেশবের বলে ব্রাহ্মধর্ম সমুজ্জ্বল ।
দিন দিন বাড়ে কায়া যত বাড়ে দল ॥ ৮০ ॥
স্থানে স্থানে প্রচারক করেন প্রেরণ ।
হাটে বাটে উচ্চরবে পর্য-সংকীর্তন ॥ ৮১ ॥
দলগত ভক্ত যাঁরা তাঁদের আবাসে ।
মাঝে মাঝে মহোৎসব দিবসবিশেষে ॥ ৮২ ॥
ভজনার জন্য আদিসমাজ প্রধান ।
এখানে মঞ্জুর সহ প্রভু ভগবান ॥ ৮৩ ॥
আসিয়াছিলেন আগে বলিয়াছি সব ।
যে দিন প্রভুর চক্ষে পড়িল কেশব ॥ ৮৪ ॥
মহা অনুরাগে ভরা দেখি ভক্তজনা ।
বলিয়াছিলেন প্রভু নড়িছে ফাতনা ॥ ৮৫ ॥
এইবারে খাবে বড় মাছ টোপে তার ।
অপর যতেক দেখ আসক্তি আচার ॥ ৮৬ ॥
পরে পরস্পর দেখা বেলঘরিয়ায় ।
বলিলেন কেশবে বেঙাচি তুলনায় ॥ ৮৭ ॥
এখন সৌভাগ্য সূর্য উদয় তাঁহার ।
কেশবচরণে করি কোটি নমস্কার ॥ ৮৮ ॥
বিশ্বগুরু ঠাকুর আমার গুরুবেশে ।
যাচিয়া আপুনি গেলা কেশবের পাশে ॥ ৮৯ ॥
জল দিতে
ভক্তমনে তৃষার আঙুর ।
শুন রামকৃষ্ণকথা শ্রুতিসুমধুর ॥ ৯০ ॥
সরল অন্তরে চিন্তা যে করে হরির ।
শ্রীপ্রভু তাঁহার দড় শতত অস্থির ॥ ৯১ ॥
জাতিধর্মকর্মভেদ বিচারবিহীনে ।
সহস্র দৃষ্টান্ত পাবে লীলা-অন্বেষণে ॥ ৯২ ॥
প্রভুসনে সম্মিলনে ব্রাহ্মভক্তগণ ।
নূতন আনন্দ কি যে কৈল আস্বাদন ॥ ৯৩ ॥
তাঁদের কাগজে আছে লিপিবদ্ধ করা ।
যতদূর সাধ্যমত দিনের চেহারা ॥ ৯৪ ॥
বিশেষতঃ কেশবের আনন্দ প্রচুর ।
যাঁহার উপরে লক্ষ্য বিশেষ প্রভুর ॥ ৯৫ ॥
সর্বোপরি শ্রীকেশবে বেঙাচি তুলনা ।
সে শ্রীবাক্য হৃদে তাঁর জাগে ষোল আনা ॥ ৯৬ ॥
কি দেখিল কি পাইল প্রভুর বচনে ।
ভকত ব্যতীত তত্ত্ব কেহ নাহি জানে ॥ ৯৭ ॥
শ্রীমুখনির্গত বাক্য সুমিষ্ট কোমল ।
তবু ব্রহ্মবাণ জিনে এত ধরে বল ॥ ৯৮ ॥
বাণে যেন বাজে প্রাণে প্রাণ করে ক্ষয় ।
শ্রীপ্রভুর বাক্যবাণ সে ভাবের নয় ॥ ৯৯ ॥
রণক্ষেত্রে বীর যেন অন্ধকার-বাণে ।
টঙ্কারিয়া ধনুর্বাণ বিপক্ষেরে হানে ॥ ১০০ ॥
বাণধর্মবলে দশ দিক অন্ধকার ।
আঁখি সত্ত্বে শত্রু ধরে অন্ধের আকার ॥ ১০১ ॥
শ্রেষ্ঠতর হয় যদি প্রতিদ্বন্দী জন ।
সূর্যবাণে অন্ধকার করে নিবারণ ॥ ১০২ ॥
সেইমত কলিকালে রাজ্য অবিদ্যার ।
জুড়িয়া অজ্ঞানবাণ ধনুকে তাহার ॥ ১০৩ ॥
রাখিয়াছে জীবগণে নিজ অধিকারে ।
হৃদয় তিমিরখনি ভীষণ আঁধারে ॥ ১০৪ ॥
ভাগ্যবলে প্রভুদেব সুপ্রসন্ন যায় ।
অহেতুক রূপা-সিন্ধু দ্রবিয়া দয়ায় ॥ ১০৫ ॥
ছাড়েন বাক্যের বাণ সন্ধানিয়া স্থান ।
অমনি চৈতন্য তথা, পলায় অজ্ঞান ॥ ১০৬ ॥
কেশবের হৃদে বাক্যবাণ শ্রীপ্রভুর ।
অজ্ঞান-তিমির যাহা ছিল কৈল দূর ॥ ১০৭ ॥
চৈতন্য-অরুণ সমুদিত হৃদিমাঝে ।
মূর্তিমান হ'য়ে বাক্য নাচে মহাতেজে ॥ ১০৮ ॥
থেকে থেকে শ্রীকেশব উঠেন চমকি ।
ভাবে সাধুবাক্যে কিবা অপরূপ দেখি ॥ ১০৯ ॥
বিচারিয়া মনে মনে যুক্তি কৈল সার ।
দেখিতে হইবে কিবা ভিতরে ব্যাপার ॥ ১১০ ॥
অদ্ভুত বাক্য দেখি অদ্ভূত সাধু ।
না জানি আর কি ক্ষত আছে তাঁর মধু ॥ ১১১ ॥
সেই হেতু উপযুক্ত শিষ্য কয় জনে ।
পাঠান জানিতে তত্ত্ব শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ১১২ ॥
শিষ্যকয় দিনত্রয় দক্ষিণশহরে ।
বুঝিতে প্রভুর তত্ত্ব পাছু পাছু ফিরে ॥ ১১৩ ॥
অনন্ত ভাবের ভাবী শ্রীপ্রভু আপনি ।
কি বুঝিবে তাঁরে নরে অতিক্ষুদ্র প্রাণী ॥ ১১৪ ॥
কি সাধ্য নরের শিরে কতটুকু বল ।
অণুকণা তত্ত্বে যাঁর মহেশ পাগল ॥ ১১৫ ॥
অহর্নিশ চতুর্মুখ চারি মুখে গায় ।
তথাপি তিলেক তত্ত্ব খুঁজিয়া না পায় ॥ ১১৬ ॥
জপিয়া হাজার মুখে না পেরে তল্লাস ।
মহানাগ দুঃখে করে ক্ষিতিতলে বাস ॥ ১১৭ ॥
লজ্জায় মাটিতে ঢাকি অনন্তবয়ান ।
থেকে থেকে মাঝে মাঝে হয় কম্পমান ॥ ১১৮ ॥
বিফলপ্রয়াস দেব-ঋষি-মুনিগণ ।
আজন্ম আচরি মহা কঠোর সাধন ॥ ১১৯ ॥
হেন তত্ত্বাতীত যেথা ব্রহ্মা শিব হারে ।
সামান্য মানুষ দেখে কি বুঝিতে পারে ॥ ১২০ ॥
তদুপরি নাহি তাহে সাকারে বিশ্বাস ।
সেখানে প্রভুরে বুঝা মাত্র উপহাস ॥ ১২১ ॥
অপার খেলার খেলী শ্রীপ্রভু আপুনি ।
অব্যক্ত অচিন্তনীয় অখিলের স্বামী ॥ ১২২ ॥
তায় চোদ্দপোয়া মাপ নরদেহ ধরা ।
দীনহীন নিরক্ষর গুপ্ত সাজ পরা ॥ ১২৩ ॥
ধরাধামে সাধ্য কার ধরে প্রভুদেবে ।
যে যায় বুঝিতে যায় মহাসন্দে ডুবে ॥ ১২৪ ॥
ভগবানে জীবে ঠিক বিপরীত কথা ।
জীবে বুঝে বিপরীত হরির বারতা ॥ ১২৫ ॥
সে হেতু পাগল জ্ঞান জীবগণে করে ।
হেরিয়া হরির ভাব নরের আধারে ॥ ১২৬ ॥
প্রভুর দ্বিবিধ ভাব প্রতি ক্ষণে ক্ষণে ।
ভাবভেদে নানা কথা ফুটে শ্রীবদনে ॥ ১২৭ ॥
কভু গান হর হর শিব শিব নাম ।
কভু জয় রঘুপতি সীতাপতি রাম ॥ ১২৮ ॥
কভু রাধাকৃষ্ণ ব'লে আনন্দে বিহ্বল ।
কভু মত্ত হরিনামে চক্ষে ঝরে জল ॥ ১২৯ ॥
কখন উন্মত্তপ্রায় কালী কালী বলি ।
কখন মহিমাস্তব কভু কত গালি ॥ ১৩০ ॥
কভু ব্যাকুলিত চিতে শিশুর মতন ।
কোথা মা কোথা যা বলি কতই রোদন ॥ ১৩১ ॥
কখন গোউর বলি করতালি দিয়া ।
ভুঞ্জেন অপূর্বানন্দ নাচিয়া নাচিয়া ॥ ১৩২ ॥
মহান সমাধি কভু দেহভাব নাই ।
দেহ ছেড়ে যেন কোথা গেছেন গোসাঁই ॥ ১৩৩ ॥
কভু কালীকৃষ্ণে দুয়ে মিশাইয়া গান ।
প্রেমভক্তিভাবে ভরা শুনে ফুলে প্রাণ ॥ ১৩৪ ॥
কখন কাপড় পরা অঙ্গ-আচ্ছাদন ।
অল্পবয়ঃ শিশুসম উলঙ্গ কখন ॥ ১৩৫ ॥
কোমল শয্যায় কভু খাটের উপরি ।
কভু ধুলারাশি গায় ভূমে গড়াগড়ি ॥ ১৩৬ ॥
ভাগ্যবান কেশবের শিষ্য তিন জন ।
প্রভুর বিবিধ ভাব করি ঘরশন ॥ ১৩৭ ॥
পরস্পর বিচারিয়া করিলেন সার ।
প্রভু এক সাধু ভক্ত আশ্চর্য প্রকার ॥ ১৩৮ ॥
আশ্চর্য প্রকার কেন ঠিক নাই ভাবে ।
এহেন অবস্থা মাত্র শুরুর অভাবে ॥ ১৩৯ ॥
শুনে আসে হাসি তাই প্রভুদেবে কয় ।
শিষ্য-উপদেষ্টা কেশবের শিষ্যত্রয় ॥ ১৪০ ॥
আপনার দেখি সাধুভক্তের আচার ।
ভাল হবে উপদেশ করিলে স্বীকার ॥ ১৪১ ॥
আচার্য শ্রীকেশবের লউন শরণ ।
নিশ্চয় চতুরবর্গ ফল উপার্জন ॥ ১৪২ ॥
অজ্ঞানের গুনি কণা গুণের সাগর ।
নীচে লেখা গীত গেয়ে দিলেন উত্তর ॥ ১৪৩ ॥
আমার কি ফলের অভাব,
তোরা এলি একি ফল নিয়ে ।
পেয়েছি যে ফল জনম সফল,
রামকল্পতরু হৃদয়ে রোপিয়ে ।
শ্রীরাম-করাতর-বৃক্ষমূলে রই,
যে ফল বাঞ্ছা করি সে ফল প্রাপ্ত হই,
শুন ফলের কথা কই, ও ফল গ্রাহক নই,
যাব তোদের প্রতিফল যে দিয়ে ॥
গানে কিবা বুঝিলেন ব্রাহ্ম তিন জন ।
পালটি কেশবাচার্যে কহে বিবরণ ॥ ১৪৪ ॥
কেশব চৈতন্যবান চৈতন্যের তেজে ।
গুপ্তসার মধ্যে কিবা বার্তা পেয়ে বুঝে ॥ ১৪৫ ॥
ব্যাকুল পরান হৈল দরশন তরে ।
শিষ্যসহ আগমন দক্ষিণশহরে ॥ ১৪৬ ॥
অতি পুলকিত চিত দেখি
প্রভুদেবে ।
প্রভুও তেমতি খুশী পাইয়া কেশবে ॥ ১৪৭ ॥
নিরাকার সাকার ব্যতীত যাহা আর ।
সকলেতে প্রভু নিজে সর্বমুলাধার ॥ ১৪৮ ॥
সাকারের মধ্যে যত ভিন্ন ভিন্ন রূপ ।
সকলেই শ্রীপ্রভুর নিজের স্বরূপ ॥ ১৪৯ ॥
অকূল অপার যেন অসীম সাগরে ।
নানান দেশের নদী তাহে এসে পড়ে ॥ ১৫০ ॥
যেবা কেহ যেই রূপ যেই নাম ল'য়ে ।
ভজে পুজে সর্বেশ্বরে সরল হৃদয়ে ॥ ১৫১ ॥
সকল আসিয়া পড়ে শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
বিশ্বাধার বিশ্বশুরু জগৎগোসাঁই ॥ ১৫২ ॥
সর্বশক্তিমান প্রভু সকলের মূলে ।
যে চায় আশ্রয় পায় শ্রীচরণতলে ॥ ১৫৩ ॥
প্রভুর নিকটে নাই কোনই বিচার ।
হিন্দু কি মুসলমান সব একাকার ॥ ১৫৪ ॥
যেমন মহান বৃক্ষ বনমধ্যগত ।
অগণ্য প্রশাখা শাখা চৌদিকে ব্যাপৃত ॥ ১৫৫ ॥
ফলফুলপত্রে পরিপূর্ণ শোভমান ।
যেই পাখী এসে বসে সেই পায় স্থান ॥ ১৫৬ ॥
তেমতি আশ্রয়দাতা শ্রীপ্রভু আপনি ।
প্রসারিত কল্পতরু-চরণ দুখানি ॥ ১৫৭ ॥
যে কোন মানুষ আসে প্রভু-সন্নিধানে ।
সে কেমন কিবা ভাব কি হেতু সেখানে ॥ ১৫৮ ॥
কেমনে গঠন হবে কিবা প্রয়োজন ।
সব তত্ত্ব দেখা মাত্র হয় নিরূপণ ॥ ১৫৯ ॥
দয়াগার অহেতুক রূপাসিন্ধু প্রভু ।
এত রূপা কোন যুগে নাহি শুনি কভু ॥ ১৬০ ॥
ভজন পূজন কিছু নহে দরকার ।
করিলে প্রভুরে একমাত্র নমস্কার ॥ ১৬১ ॥
কি মিলে অমূল্য নিধি না যায় বর্ণন ।
জোরে যার ছিঁড়ে যায় ভবের বন্ধন ॥ ১৬২ ॥
চরণে শরণ ল'য়ে চরণে যে পড়ে ।
গড়ন না গড়ি প্রভু নাহি দেন ছেড়ে ॥ ১৬৩ ॥
বিশ্বকারিগর প্রভু কি গড়েন হাতে ।
তুচ্ছ আমি পরিচয় না পারিমু দিতে ॥ ১৬৪ ॥
কি গড়িলা প্রভুদেব কেশবে লইয়া ।
স্মরি গুরু দেখ মন নয়ন মুদিয়া ॥ ১৬৫ ॥
কেশবে কহিলা প্রভু দেখামাত্র তাঁরে ।
প্রফুল্ল মুখরবিন্দে হাসি নাহি ধরে ॥ ১৬৬ ॥
খুশী আজ শ্যামা বড় তোমার উপর ।
যাও গিয়ে শ্রীমন্দিরে মারে কর গড় ॥ ১৬৭ ॥
যখন যে ভাগ্যবান প্রভু দেখিবারে ।
আসিতেন ভক্তিসহ দক্ষিণশহরে ॥ ১৬৮ ॥
প্রায় অধিকাংশে বলিতেন ভগবান ।
শ্রীমন্দিরে কর অগ্রে মায়েরে প্রণাম ॥ ১৬৯ ॥
সেই আজ্ঞা শ্রীকেশবে মঙ্গললক্ষণ ।
ভক্তিভরে বন্দিবারে মায়ের চরণ ॥ ১৭০ ॥
শুনিয়া কেশব কন অতি ধীরে ধীরে ।
মন-প্রাণ সমর্পণ করেছি পিতারে ॥ ১৭১ ॥
ভাব বুঝি প্রভুদেব করিলা উত্তর ।
কহ কার খেয়ে মাই পুষ্ট কলেবর ॥ ১৭২ ॥
যদি মাতৃ-পয়োধরে হেন কান্তি কায় ।
বল তবে কেন নাহি মানিবে শ্যামায় ॥ ১৭৩ ॥
মা ধরিয়া বাপে চিনে জগজনে জানা ।
বুদ্ধিমান তুমি তবু কি হেতু বুঝ না ॥ ১৭৪ ॥
কেশব প্রভুরে পুনঃ কহে ভক্তিভরে ।
কেবা মাতা আপনার মা বলেন কারে ॥ ১৭৫ ॥
কিরূপ আকার তাঁর কিরূপ গঠন ।
বলুন বিশেষ করি কিছু বিবরণ ॥ ১৭৬ ॥
পাত্র বুঝি শ্রীকেশবে প্রভুর উত্তর ।
বিলাতে গিয়াছ তুমি দেখেছ সাগর ॥ ১৭৭ ॥
অনন্ত আকাশ যদি দেখেছ নয়নে ।
তবে মোর মা কেমন জিজ্ঞাসিছ কেনে ॥ ১৭৮ ॥
ব্রহ্মাণ্ড-উদরা মাতা জগৎজননী ।
ব্রহ্মময়ী শক্তি সিদ্ধিশান্তিস্বরূপিণী ॥ ১৭৯ ॥
নির্গুণ নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়ের পার ।
বিকারবিহীন যেন তেন নিরাকার ॥ ১৮০ ॥
তাঁহার উদ্ভব-শক্তি শক্তি প্রাণরূপ ।
শক্তিই আপনি সেই ব্রহ্মের স্বরূপ ॥ ১৮১ ॥
ব্রহ্ম যিনি ঠিক তিনি স্থিরসিন্ধু প্রায় ।
তরঙ্গস্বরূপ শক্তি খেলিছে তাঁহায় ॥ ১৮২ ॥
শক্তিতে জগৎ-সৃষ্টি শক্তি সর্ববল ।
শক্তিই কেবল মাত্র স্থিতির সম্বল ॥ ১৮৩ ॥
শক্তি আছে তাই আছি শক্তিই ধারণা ।
সেই শক্তিবলে করি সাধন-ভজনা ॥ ১৮৪ ॥
যে শক্তিতে লীলাকার্য তাঁরে শক্তি গাই ।
শক্তিহীনে সৃষ্টিশূন্য ব্রহ্ম নাই পাই ॥ ১৮৫ ॥
শক্তিই কেবল বল ব্রহ্মদরশনে ।
প্রতিবিম্বে বস্তুজ্ঞান যেমন দর্পণে ॥ ১৮৬ ॥
দর্পণস্বরূপা শক্তি সহায় না হ'লে ।
ব্রহ্মতত্ত্ব ব্রহ্মজ্ঞান কখন না মিলে ॥ ১৮৭ ॥
বিরাট মুরতিখানি চৌদ্দপোয়া নয় ।
সীমাবদ্ধ করা বুদ্ধি ভ্রান্তির আলয় ॥ ১৮৮ ॥
পুনঃ প্রশ্ন করিলেন কেশব সজ্জন ।
বিশাল বিরাট মূর্তি অনন্ত রকম ॥ ১৮৯ ॥
অতি ক্ষুদ্র নরশির তায় নাহি ধরে ।
তাঁরে কেন আনা হয় প্রতিমা-আকারে ॥ ১৯০ ॥
শুনি কথা কেশবের প্রভুর উত্তর ।
ধরা হ'তে বড়গুণে বড় দিবাকর ॥ ১৯১ ॥
কিন্তু মানুষের চক্ষে হয় দরশন ।
ঠিক যেন একখানি থালার মতন ॥ ১৯২ ॥
তেমতি বিরাট মূর্তি প্রতিমা-ভিতরে ।
সীমাবদ্ধ বোধ হয় দূরত্বানুসারে ॥ ১৯৩ ॥
আকারের হেতু ক্ষুদ্র কখনই নয় ।
বহু দূরস্থিত তাই ক্ষুদ্র বোধ হয় ॥ ১৯৪ ॥
বৃহতী যেমন তিনি তেমতি করুণা ।
ব্রহ্মময়ী মা বলিয়া তাঁহারে ডাক'না ॥ ১৯৫ ॥
এত কাল পিতা বলি কি কাজ করিলে ।
এই বার ডাক তুমি ব্রহ্মময়ী ব'লে ॥ ১৯৬ ॥
বারে বারে বন্দি শ্রীকেশবচন্দ্র সেনে ।
পিরীতি করিলা যায় শ্রীপ্রভু আপনে ॥ ১৯৭ ॥
মহামন্ত্র মা'র নাম দিলা কর্ণমূলে ।
ধন্য ধন্য ভাগ্যধর জনম ভূতলে ॥ ১৯৮ ॥
সিদ্ধবাক্য হৃদিমধ্যে পড়িল যেমন ।
তখনি অঙ্কুর তায় উঠে সুশোভন ॥ ১৯৯ ॥
সাধন-ভজন-চাষ নহে দরকার ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে এত শকতি অপার ॥ ২০০ ॥
আনন্দের তোড় এত কেশবের ঘটে ।
মনে নাই কিসে গেল দীর্ঘদিন কেটে ॥ ২০১ ॥
দিন যায় প্রায় শিষ্যগণ কহে তাঁরে ।
হইল আগত কাল ফিরিবারে ঘরে ॥ ২০২ ॥
শ্রীকেশব দীনদুঃখী বিনীতের প্রায় ।
করজোড়ে প্রভুদেবে মাগিল বিদায় ॥ ২০৩ ॥
মিষ্টিমুখ করাইয়া সহ শিষ্যগণে ।
কেশবে বিদায় প্রভু দিলেন সে দিনে ॥ ২০৪ ॥
দেহ ল'য়ে গৃহে গেল কেশব এখন ।
কিন্তু শ্রীপ্রভুর কাছে পাছু আছে মন ॥ ২০৫ ॥
প্রভুর বচন প্রেম-ভক্তিরসে ভরা ।
সপর্যায় সর্বদাই হয় তোলাপাড়া ॥ ২০৬ ॥
বিশেষতঃ শক্তির সম্বন্ধে কথা যত ।
নৃত্য করে হৃদে তাঁর শক্তিসমবেত ॥ ২০৭ ॥
শক্তিসহ বিনির্গত প্রভুর বচন ।
প্রবেশিয়া অন্তে করে আকার ধারণ ॥ ২০৮ ॥
ক্রমে পরে হেন কান্তি ভাতি উঠে তার ।
জীবেরে সামান্ত কথা শিবেরে নাচায় ২০৯ ॥
মুর্তিমতী শক্তি দেখি আনন্দের ভরে ।
আনন্দময়ীরে ডাকে সমাজ-মন্দিরে ॥ ২১০ ॥
মিষ্টি পেয়ে মা'র নামে প্রাণ খুলে গায় ।
যত ডাকে তত মিঠা তাহাতে বেরায় ॥ ২১১ ॥
মিষ্টির আকর প্রভু পাইয়া সন্ধান ।
দক্ষিণশহরে লোভে পুনশ্চ পয়ান ॥ ২১২ ॥
কারিগর প্রভুর মতন কেবা আছে ।
পিটিয়া গড়ন নয় গড়া তাঁর ছাঁচে ॥ ২১৩ ॥
সাধন-ভজন নাই কথায় কথায় ।
উচ্চতত্ত্ব মায়ামত্ত্ব জীবে বুঝা যায় ॥ ২১৪ ॥
যোজন যোজনান্তরে মেঘ শূন্যে বুলে ।
যে কল-কৌশলে তারে পাড়ে ভূমিতলে ॥ ২১৫ ॥
সেইরূপ শ্রীপ্রভুর কৌশলের ধারা ।
বুঝিতে জীবের বুদ্ধি হয় বুদ্ধিহারা ॥ ২১৬ ॥
কোথায় কেশব ছিল কোথা যায় চ'লে ।
স্মরিয়া শ্রীগুরু দেখ আড়ালে আড়ালে ॥ ২১৭ ॥
মহাবক্তা কেশবের বাক্য গেছে ছুটে ।
নিরক্ষর দীনবেশ প্রভুর নিকটে ॥ ২১৮ ॥
প্রভুবাক্যে কত দর বুঝিয়া আপনে ।
প্রতি বর্ণ প্রত্যক্ষর মন দিয়া শুনে ॥ ২১৯ ॥
ডুবাইয়া গোটা মন বাক্যে মাতোয়ারা ।
নব প্রস্ফুটিত ফুলে যেমন ভ্রমরা ॥ ২২০ ॥
হৃদয় বুঝিয়া তাঁর প্রভুদেব কন ।
সদ্য ভক্তিপ্রদায়িনী ভক্তিবিবরণ ॥ ২২১ ॥
জ্ঞান-ভক্তি এক যদি তবু দু'প্রকার ।
জ্ঞানমার্গ শুষ্কতর পুরুষ আকার ॥ ২২২ ॥
প্রখর
তপন তাপ আগুনের মত ।
তীব্রতেজী প্রলয়াগ্নি দেখে হয় ভীত ॥ ২২৩ ॥
হাতে খাঁড়া
জ্ঞানমার্গী তার মধ্যে ধায় ।
মহাবীর পরানের পানে না তাকায় ॥ ২২৪ ॥
সদর অন্দর আছে ঈশ্বরের ঘরে ।
জ্ঞানমার্গী সদর পর্যন্ত যেতে পারে ॥ ২২৫ ॥
ভকতি কোমলপ্রাণা স্ত্রীলোকের জাতি ।
সুশীতল ছায়াতলে মৃদু-মন্দ গতি ॥ ২২৬ ॥
অন্তঃপুরে যেতে পারে মানা নাহি তার ।
যথায় কমলাসহ হরির বিহার ॥ ২২৭ ॥
ভক্তিপথ আশ্রয় করিয়া তুমি থাক ।
পরানন্দময়ী ব্রহ্মময়ী মাকে ডাক ॥ ২২৮ ॥
ষট্চক্রভেদকথা শুনিয়াছ মন ।
গুরু বিনা বিশ্বে নাহি বুঝে কোন জন ॥ ২২৯ ॥
চক্রমধ্যে প্রবেশিতে শক্তি নাহি কার ।
শক্তি যাঁর তিনি ভবসিন্ধুকর্ণধার ॥ ২৩০ ॥
অকূলেতে ভ্রাম্যমাণ জীবরূপ তরী ।
উদ্ধারে নিরাশ যদি না মিলে কাণ্ডারী ॥ ২৩১ ॥
কাণ্ডারী জুটিলে হ'লে প্রতিকূল বাত ।
পলে লক্ষ নিদারুণ তরঙ্গ-আঘাত ॥ ২৩২ ॥
তথাপি উড়ায়ে পাল হেনভাবে চলে ।
ও পলে অকূলে যেবা এ পলে সে কূলে ॥ ২৩৩ ॥
যাহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করি ।
শ্রীপ্রভু কেমন হন কাহার কাণ্ডারী ॥ ২৩৪ ॥
দেখিবারে সাধ যদি হয় তোর মন ।
মন দিয়া লীলা-গীতি করহ শ্রবণ ॥ ২৩৫ ॥
কেশবে বলেন শুন ভক্তির বারতা ।
যে পায় ভকতি বল তার সম কোথা ॥ ২৩৬ ॥
ভক্তি বড় বাসে শ্যামা বশ ভক্তিবলে ।
ভক্তি দিয়া পূজ তাঁর চরণকমলে ॥ ২৩৭ ॥
মহামন্ত্ররূপী তাঁর শ্রীমূখের বাণী ।
বাক্যরূপে দিলা শক্তি ভক্তি-প্রসবিনী ॥ ২৩৮ ॥
ভক্তির স্বরূপ কিবা বর্ণনে না ফুটে ।
ইন্দ্রত্ব ব্রহ্মত্ব তুচ্ছ যাহার
নিকটে ॥ ২৩৯ ॥
হেন ভক্তি প্রভুবাক্যে পায় অনায়াসে ।
কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত কলির
মানুষে ॥ ২৪০ ॥
মহাশক্তি প্রভুবাক্যে মিশান থাকিত ।
পাষাণে পড়িলে তাহে ভকতি ফুটিত ॥ ২৪১ ॥
অতি গুহ্যতম তত্ত্ব প্রভুবাক্য তেজে ।
কৃপাপাত্র তিলমাত্র আভাসেতে বুঝে ॥ ২৪২ ॥
ঈশ্বরাবতার বিনা এ শক্তি কোথায় ।
প্রত্যক্ষ দূরের কথা শুনা নাহি যায় ॥ ২৪৩ ॥
এ শক্তির নামান্তর কৃপা বলি যারে ।
গাইতে মানস কিন্তু বাক্যে নাহি সরে ॥ ২৪৪ ॥
বোবার স্বপন যেন না হয় প্রকাশ ।
কৃপাতত্ত্ব ব্যক্তচেষ্টা মাত্র উপহাস ॥ ২৪৫ ॥
বিখ্যাত কেশব এত বিদ্যাবল ধরে ।
নূতন তর্কের সৃষ্টি মুহূর্তেকে করে ॥ ২৪৬ ॥
যথার্থ
সিদ্ধান্ত যত কাটে তর্ক করি ।
বদ্ধবাক্ শুনে বড় বড় মিশনারি ॥ ২৪৭ ॥
মহান্ত বিশেষ
লোক প্রশান্ত সুধীর ।
সরল আধার ক্ষেত্র সৎ-গুণাদির ॥ ২৪৮ ॥
অন্তর যেমন বাহ্যে
কান্তিমাখা তাঁর ।
ভারতে চৌদিকে চেলা হাজার হাজার ॥ ২৪৯ ॥
সমাজমন্দির কত বসে
স্থানে স্থানে ।
সে কেবল একমাত্র কেশবের গুণে ॥ ২৫০ ॥
এমন কেশব যাঁর শক্তি এত
ঘটে ।
প্রভুর নিকটে কেন বাক্য নাহি ফুটে ॥ ২৫১ ॥
শ্রীচরণতলে লুটে মুখে নাই সাড়া ।
লালায়িত দরশনে দীনহীন পারা ॥ ২৫২ ॥
কিবা বস্তু প্রভুদেব বলিতে না পারে ।
আপনে
দেখিয়া শুদ্ধ শ্রীশ্রীপদে পড়ে ॥ ২৫৩ ॥
আভাসেতে শুন ভক্তি কৃপার লক্ষণ ।
বক্তা
বোবা বন্ধ হয় যাবৎ বচন ॥ ২৫৪ ॥
কভু মত্ততর হ'য়ে বলিবারে যায় ।
কি বলি কি বলি করে
না আসে ভাষায় ॥ ২৫৫ ॥
হাসে কাঁদে করে নৃত্য আপনার ভাবে ।
পিতা মাতা নেতা ত্রাতা
দেখে প্রভুদেবে ॥ ২৫৬ ॥
শ্রীচৈতন্যদাতা প্রভু পতিতপাবন ।
নয়নাবরণ-মায়া-তমোবিমোচন ॥ ২৫৭ ॥
মর্ত্যে বাস মধুলুব্ধ মধুপ যেমন ।
বুলিতে বুলিতে যদি মিলে অন্বেষণ ॥ ২৫৮ ॥
পারিজাতকুসুম-কানন দৈব-বলে ।
নিতি নিতি তথা নাহি বসে অন্ত ফুলে ॥ ২৫৯ ॥
সেইমত শ্রীকেশব প্রভুর নিকটে ।
মত্তপ্রায় এখন তখন আসে ছুটে ॥ ২৬০ ॥
একদিন প্রভুদেব শ্রীকেশবে কন ।
দেখ না কেশব তুমি বক্তা একজন ॥ ২৬১ ॥
কতই না জান ভাল ধর্মের কাহিনী ।
ইচ্ছা আজ তোমার নিকটে কিছু শুনি ॥ ২৬২ ॥
বক্তাবর ভক্তবর জ্ঞানিজনগণ্য ।
ধীমান সদ্গুণবান কপটতাশূন্য ॥ ২৬৩ ॥
শিক্ষিত বিনয়যুক্ত সত্যতত্ত্বান্বেষী ।
স্বভাবসুলভধারা সুধাধারাভাষী ॥ ২৬৪ ॥
বিবেক-বৈরাগ্যমাখা শুদ্ধতর মতি ।
শ্রীকেশব ব্রাহ্মধর্ম-রথের সারথি ॥ ২৬৫ ॥
পদতলে সমাসীন কন ধীরে ধীরে ।
ছুঁচ বিক্রি কিবা কথা কামারের ঘরে ॥ ২৬৬ ॥
আরে মন যদি বুদ্ধি থাকে এক ফোঁটা ।
বুঝ কিবা কেশবের উত্তরের ঘটা ॥ ২৬৭ ॥
কি ছটা মিশান তাঁর ভিতরে ভিতরে ।
যে প্রভু জগৎমুগ্ধ তাঁরে মুগ্ধ করে ॥ ২৬৮ ॥
ভক্তিপ্রীতিভরা শুনি কেশবের বাণী ।
মহাসমাধিগত হইলা তখনি ॥ ২৬৯ ॥
ভাবভঙ্গে কেশবের হৃদি বুঝি কন ।
সদ্যভক্তিপ্রদায়িনী ভক্তি-বিবরণ ॥ ২৭০ ॥
দেখ ভাগবত ভক্ত আর ভগবান ।
তর তম নাহি তিনে বুঝিবে সমান ॥ ২৭১ ॥
কেশব চমকে শুনি শ্রীপ্রভুর কথা ।
মনে ভাবে এ কেমন নূতন বারতা ॥ ২৭২ ॥
প্রভুবাক্যে অবিশ্বাস সাহস না হয় ।
কিন্তু মনে সন্দেহের তরঙ্গ-উদয় ॥ ২৭৩ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব বুঝি নিজ মনে ।
কেশবে কহেন কিছু শক্তি-সঞ্চালনে ॥ ২৭৪ ॥
শুন শুন শ্রীকেশব ভাগবত পুঁথি ।
তাহাতে বর্ণিত মাত্র লীলার ভারতী ॥ ২৭৫ ॥
অক্ষরে লিখিত মাত্র কাগজ-উপরে ।
শুনে বর্ণে বর্ণে হরি উদ্দীপনা করে ॥ ২৭৬ ॥
শুধু উদ্দীপনা নয় ঈশ্বরীয় ভাব ।
গাইলে শুনিলে হয় হৃদে আবির্ভাব ॥ ২৭৭ ॥
ভাবরূপে হন হরি হৃদয়ে উদয় ।
ভাব-আনুকূল্যে পরে দরশন হয় ॥ ২৭৮ ॥
কানেতে শুনিয়া কথা চক্ষে দেখে হরি ।
সেই হেতু ভাগবতে হরি-জ্ঞান করি ॥ ২৭৯ ॥
পুনশ্চ দেখহ ভক্ত-হৃদয় মাঝারে ।
ভক্তপ্রিয় ভগবান সর্বদা বিহরে ॥ ২৮০ ॥
পুণ্য-দরশন ভক্ত করি দরশন ।
তখনি অমনি করে গুরু-উদ্দীপন ॥ ২৮১ ॥
ভক্ত-দরশন আর ভক্ত-সঙ্গ-বলে ।
ভবের কাণ্ডারী হরি অসাধনে মিলে ॥ ২৮২ ॥
প্রত্যক্ষ এ সব বাক্য না বুঝিবে আন ।
যারে ধরি মিলে হরি সে তাঁর সমান ॥ ২৮৩ ॥
অবাকে নীরব হেথা কেশব বসিয়া ।
কি কর দেখেন কিবা কলমে আঁকিয়া ॥ ২৮৪ ॥
কর্ণমূলে প্রভুবাক্য বাক্যরূপে পশে ।
অপূর্ব আকার ধরে অন্তরে প্রবেশে ॥ ২৮৫ ॥
কেশবের ভাগ্যসীমা নাহি যার বলা ।
শ্রীপ্রভু যেমন গুরু তাঁর মত চেলা ॥ ২৮৬ ॥
প্রভুদেবে গুরুরূপে পায় যেই জনা ।
মহাভাগ্যবান নাই সৌভাগ্যের সীমা ॥ ২৮৭ ॥
গুরুভাব পিতৃভাব কর্তাভাব আর ।
প্রভুর মনেতে নহে কখন সঞ্চার ॥ ২৮৮ ॥
অহংভাবহীন তিনি দ্বীনের মুরতি ।
কর্ণমুলে মন্ত্রদান কভু নহে রীতি ॥ ২৮৯ ॥
আপনারে গুরুজ্ঞানে অন্তে উপদেশ ।
নাহি ছিল এ ভাবের গন্ধমাত্র লেশ ॥ ২৯০ ॥
তথাপিহ সিদ্ধমন্ত্র ঝুড়ি ঝুড়ি পায় ।
যে আসে প্রভুর পাশে তাহার আশায় ॥ ২৯১ ॥
ভব-রোগ-বৈদ্য প্রভু পূর্ণ নাড়ী-জ্ঞান ।
রোগ অনুসারে হয় ঔষধ-বিধান ॥ ২৯২ ॥
মৃত্যুঞ্জয় শাস্তিরস পোষ্টাই কারণ ।
যখন তখন যারে তারে বিতরণ ॥ ২৯৩ ॥
কেশব যেমন বড় বড় বাই তাঁর ।
প্রাণান্তে সাকার কথা না করে স্বীকার ॥ ২৯৪ ॥
কেমনে সারিল বাই কৃপা-বড়ি জোরে ।
সুন্দর আখ্যান মন কব পরে পরে ॥ ২৯৫ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-গীতি মহৌষধি প্রায় ।
গাইলে শুনিলে নাহি বাই থাকে গায় ॥ ২৯৬ ॥
তৃতীয় খণ্ড
কেশবের শক্তিরূপ-দর্শন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রত্নাকর লীলাগীতি জলধির প্রায় ।
মথিলে চৈতন্য মিলে সন্দ নাহি তায় ॥ ১ ॥
যার জোরে মায়াঘোর হয় বিমোচন ।
হেলার টুটিয়া যায় অবিদ্যা-বন্ধন ॥ ২ ॥
শ্রীপ্রভুর শিখাবার কেমন কৌশল ।
শুনিলে উপজে ভক্তি শ্রীপথে কেবল ॥ ৩ ॥
বিশ্বগুরু প্রভু নিজে সবার উপরে ।
এ গিয়ান সবিশ্বাসে ঘটে বসে জোরে ॥ ৪ ॥
কই কথা শুন মন হইয়া নীরব ।
প্রভুর লীলায় নাই কোন অসম্ভব ॥ ৫ ॥
রূপহীন গুণময় ব্রহ্ম নিরাকার ।
এই জ্ঞান কেশবের ছিল আগেকার ॥ ৬ ॥
এখন নূতন তিনি প্রভুর কৃপায় ।
মহাবলে বলীয়ান উন্মত্তের প্রায় ॥ ৭ ॥
নয়ন-দুয়ার দুটি যুক্ত সমুজ্জ্বল ।
দেখেন মায়ের রূপ হইয়া বিহ্বল ॥ ৮ ॥
বদনে আনন্দময়ী বাক্য অনিবার ।
মহানন্দ অন্তরেতে আনন্দবাজার ॥ ৯ ॥
যখাদৃষ্ট মা'র রূপ কন শিষ্যগণে ।
সমাজমন্দির যথা প্রার্থনার স্থানে ॥ ১০ ॥
যে না দেখিয়াছে মার রূপের গঠন ।
আজি তক নহে তাঁর ব্রহ্ম-দরশন ॥ ১১ ॥
দেখ কি রূপের ছবি মায়ের চেহারা ।
দেখিয়া করিল মোরে পাগলের পারা ॥ ১২ ॥
বিশ্ব কিবা আলোময় রূপের কিরণে ।
যেমন রূপেতে রূপ সেই মত নামে ॥ ১৩ ॥
ভবনে ভবনে হবে মায়ের গমন ।
কান্তিরূপে যাবে ব্যাপি গোটা ত্রিভুবন ॥ ১৪ ॥
ইংরেজী পুস্তক পাঠ অনর্থের মূলে ।
বিশুদ্ধ হৃদয়-ভাব পতিত অকূলে ॥ ১৫ ॥
বরাভয়দাত্রী মাতা দিবেন কিনারা ।
সময়ে আনন্দরূপ ধরিবেন ধরা ॥ ১৬ ॥
না হয় না হোক আজি দশদিন পরে ।
রটিবে মায়ের নাম জগৎ-ভিতরে ॥ ১৭ ॥
দ্বেষপূর্ণ সম্প্রদায়ী ভাব অগণন ।
আনন্দময়ীর নামে হইবে নিধন ॥ ১৮ ॥
আর নাহি পুজ কারে পুজ সনাতনী ।
ভক্তি-প্রেম-জ্ঞান-দাত্রী জগতজননী ॥ ১৯ ॥
শুষ্ক পত্র কেবল কুড়ান ছিল মোর ।
মায়ের প্রসাবে আজি আনন্দে বিভোর ॥ ২০ ॥
শক্তি বলে শক্তি পেয়ে পাইনু সুপথ ।
মেতেছি যেমন মাতা মাতাও জগৎ ॥ ২১ ॥
হাবুডুবু খাই ভক্তি-রসের বন্যায় ।
এত দিন হেন দিন আছিল কোথায় ॥ ২২ ॥
সাধ যদি মৃত্যুকালে দেখিবারে পাই ।
ভেসে যায় বিশ্ব যেন নিজে ভেসে যাই ॥ ২৩ ॥
এস মা এস মা গুপ্ত না থাকিও আর ।
রূপেতে করহ যুক্ত লোচন-আঁধার ॥ ২৪ ॥
একবার আসিয়া দাঁড়াও মাঝখানে ।
মাব'লে ছাওয়ালে যত নাচি চারি পানে১
॥ ২৫ ॥
ভক্তিভরে মার নামে মত্ত অনুরাগে ।
ব্রাহ্মমধ্যে কভু নাহি ছিল এর আগে ॥ ২৬ ॥
ব্রাহ্মধর্ম শুদ্ধ ধর্ম কঠোর প্রকৃতি ।
বিবেক বৈরাগ্য মানে জ্ঞানপূর্ণ নীতি ॥ ২৭ ॥
ইন্দ্রিয়নিগ্রহ মানে জিতেন্দ্রিয়াচার ।
মানে শুরু-কায়া-পুণ্য জাতি একাকার ॥ ২৮ ॥
কেবল বিশুদ্ধ তর্কে ধর্মের গঠন ।
যে পারে করিতে তর্ক সেই এক জন ॥ ২৯ ॥
অনুরাগে যেন রীতি সাধন ভজনে ।
নির্ধারিত তিন স্থান কোণে মনে বনে ॥ ৩০ ॥
এ নহে সেরূপ ধারা সাহেবানি রঙ্গ ।
চান বা না চান বস্তু কথার তরঙ্গ ॥ ৩১ ॥
বস্তুগত প্রাণ নয় প্রাণেতে বৈভব ।
একা এবে বস্তুপ্রার্থী কেবল কেশব ॥ ৩২ ॥
তাঁর সঙ্গে আছে আর দুই দশ জন ।
এখন কলিকাবস্থা সৌরভ গোপন ॥ ৩৩ ॥
প্রফুল্লিত শ্রীকেশব সুগন্ধ প্রচুর ।
ভক্তিপুরে এইবারে কৃপার প্রভুর ॥ ৩৪ ॥
শুষ্ক শাখা ধরা ছিল দুই হাতে তাঁর ।
প্রভুর কুপায় হৈল রসের সঞ্চার ॥ ৩৫ ॥
কিবা রস কিবা মুল কিবা কান্তি তাঁর ।
উচ্চতম ভক্তিতত্ত্ব মন্দিরেতে গায় ॥ ৩৬ ॥
আঁখিতে তাঁহার দেখা কল্পনার নয় ।
বুদ্ধিদোষে আধ্যাত্মিকে শিষ্যগণে লয় ॥ ৩৭ ॥
অরূপ-অগুণ-ভাবে রূপ গুণ ফের ।
বড়ই গোলের কথা ব্রহ্মজ্ঞানীদের ॥ ৩৮ ॥
বাহ্যু দৃষ্টি হৃদয়-নিলয় নহে খোলা ।
নমস্য তথাপি কেন কেশবের চেলা ॥ ৩৯ ॥
কেশব দেশেতে এবে অগ্রগণ্য জন ।
সুন্দর স্বভাব-সহ বিদ্যা-আভরণ ॥ ৪০ ॥
জমাট পশার ভারি কোম্পানির ঘরে ।
বড়লোকে নতশির তাঁহার গোচরে ॥ ৪১ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর প্রচারের ধারা ।
নুয়াইয়া কি প্রকার সর্ব-উচ্চ চূড়া ॥ ৪২ ॥
নহে সাধারণ কথা কেশবের প্রায় ।
সমস্বরে ভারতে সুখ্যাতি যাঁর গায় ॥ ৪৩ ॥
সে লুটায় শ্রীপ্রভুর ধরিয়া চরণ ।
নিরক্ষর দীনসাজ দরিদ্র ব্রাহ্মণ ॥ ৪৪ ॥
শ্রীকেশব তত্ত্বান্বেষী সৎপথে মতি ।
অন্বেষণ করে সহ সরল প্রকৃতি ॥ ৪৫ ॥
যেই বস্তু সর্বশ্রেষ্ঠ আছিল গিয়ান ।
ভিখারীর সম যার জন্য ভ্রাম্যমাণ ॥ ৪৭ ॥
তার চেয়ে কত শত উচ্চ বস্তু হেরে ।
ছড়াছড়ি যায় পায় প্রভুর দুয়ারে ॥ ৪৮ ॥
আকাশকুসুম যেন শুধুমাত্র নামে ।
শক্তি ছাড়া ব্রহ্ম নাই ব্রহ্মের বিধানে ॥ ৪৯ ॥
নূতন শখের ব্রহ্ম মনুষের গড়া ।
যা নাই ডাকিলে তার কেবা দিবে সাড়া ॥ ৫০ ॥
চলে গেল এত কাল বৃথায় কাটিয়া ।
ফেলিরা নজর শুরু দাঁড় টানা দিয়া ॥ ৫১ ॥
শিক্ষাপথে গুরুত্বপা নহে যতক্ষণ ।
কার সাধ্য সত্যবস্তু করে উপার্জন ॥ ৫২ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর কৃপা করুণায় ।
এখন কেশবচন্দ্র ঠিক পথে যায় ॥ ৫৩ ॥
দেখিবারে পায় যার না জানিত কথা ।
উপাস্য ব্রহ্মের ছবি শক্তির বারতা ॥ ৫৪ ॥
প্রত্যেক দেবতা মাতা মনোহরা ঠাম ।
তিনে এক ভক্তিগ্রন্থ ভক্ত ভগবান ॥ ৫৫ ॥
নির্মল ভক্তির রস চু'লে ছুটে গাদ ।
তিক্ত কটূ তুলনায় সুধার আস্বাদ ॥ ৫৬ ॥
কেশব নানান বস্তু দেখিয়া এখন ।
ধরণী লুটায় ধরি প্রভুর চরণ ॥ ৫৭ ॥
চরণে পতিত দেখি সর্ব-উচ্চ চূড়া ।
স্থানে স্থানে রাষ্ট্র কথা প'ড়ে গেল সাড়া ॥ ৫৮ ॥
কাতারে কাতারে আসে দেখিবার তরে ।
মুক্তিদাতা কৃপাসিন্ধু দক্ষিণশহরে ॥ ৫৯ ॥
প্রভুর দীনতা ভক্তিভাব দরশনে ।
বড়ই লেগেছে মিষ্টি কেশবের প্রাণে ॥ ৬০ ॥
সেই ভাব শিষ্যগণে শিখাবার তরে ।
পাঠান ভিখারী-বেশে দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৬১ ॥
কভু শিষ্যে সমাবৃত হইয়া আপনে ।
খোল করতাল যেন বাজে সঙ্কীর্তনে ॥ ৬২ ॥
সেই ভক্তি ধারা ধরি পথে পথে গান ।
ভক্তিপ্রেমদায়িনী আনন্দময়ী নাম ॥ ৬৩ ॥
দেখ দৃশ্য বড়লোক কেশবের পারা ।
সুদৃশ্য যতেক শিষ্য সুন্দর চেহারা ॥ ৬৪ ॥
মাতোয়ারা ভক্তি ভরে শক্তিগুণ গায় ।
যেই আসে কাছে নামে তাহারে মাতায় ॥ ৬৫ ॥
ব্রাহ্মধর্মে হিংসা-দ্বেষ করে যেই জনা ।
আজন্ম হৃদয়ে রাখে অকপট ঘৃণা ॥ ৬৬ ॥
সেও শুনে এসে মিশে কেশবের কাছে ।
কুতূহলী করতালি মা বলিয়া নাচে ॥ ৬৭ ॥
কেশব পাইয়া ভক্তি-রসের সন্ধান ।
মরুতে তুলিল ভাল তাহার তুফান ॥ ৬৮ ॥
যেই বন্ধ ছিল শুষ্ক রসবিরহিত ।
প্রভুর কৃপায় তারে হেরে মঞ্জরিত ॥ ৬৯ ॥
উল্লসিত শ্রীকেশব হ'য়ে মত্ততর ।
ভক্তিভরে
যাইতেন দক্ষিণশহর ॥ ৭০ ॥
রসের আকর প্রভুদেব দরশনে ।
ভক্তি মিলে কেশবের অনুরাগ শুনে ॥ ৭১ ॥
চরণে তাঁহার মোর অসংখ্য প্রণাম ।
মাগি যেন জাগে হৃদে রামকৃষ্ণনাম ॥ ৭২ ॥
কি ছিল কেশব এবে হইল কেমন ।
গুরু বিনা জীবের দুর্গতি দেখ মন ॥ ৭৩ ॥
সদ্গুরু শ্রীহরি বিনা অন্য কেহ নয় ।
শ্রীগুরু চৈতন্যদাতা সর্ব শাস্ত্রে কয় ॥ ৭৪ ॥
চেতন-মুকতি ভক্তি করতলে যাঁর ।
তিনিই আপুনি ভবসিন্ধু-কর্ণধার ॥ ৭৫ ॥
হরি গুরু বিনা ঠিক পথে ল'য়ে যেতে ।
কেবা এত শক্তিমান আছেন জগতে ॥ ৭৬ ॥
মানুষ গুরুর কথা রাখ বহু দূরে ।
জানি না দেবতা গুরু কি করিতে পারে ॥ ৭৫ ॥
দুর্গম হৃদয়পুরে চৈতন্য-আগার ।
বিশ্বজয়ী সপ্তরথী রক্ষা করে দ্বার ॥ ৭৬ ॥
সর্দার জনেক তার চেলা ছয়জন ।
চেলার কতই চেলা না যায় গণন ॥ ৭৭ ॥
এক এক জন তার এত শক্তিধর ।
শমনের সম লাগে পবনের ডর ॥ ৭৮ ॥
উড়ায় ধূলার প্রায় শতশৃঙ্গধারী ।
পাতাল-পরশি-ভিত্তি হিমালয়-গিরি ॥ ৭৯ ॥
সামান্য ধানের ক্ষেত বানায় সাগরে ।
শুষিয়া যতেক জল নাসিকার দ্বারে ॥ ৮০ ॥
নখে চিরে খণ্ড করে অখণ্ড ধরণী ।
ধরায় যে ধরে তার দেখে কাঁপে প্রাণী ॥ ৮১ ॥
চন্দ্র-সূর্য-তারাসহ জ্যোতিষ্কমণ্ডল ।
পলকে নিবায়ে করে আঁধার প্রবল ॥ ৮২ ॥
বিভীষিকা কত শত নাহি যায় বলা ।
ভীষণা রাক্ষসীদ্বয় পথে করে খেলা ॥ ৮৩ ॥
মনমুগ্ধ কান্তি ছটা এত অঙ্গে ঝরে ।
হোক্ না বিরাগী যাত্রী তবু কাবু করে ॥ ৮৪ ॥
এ হেন দুর্গম পথ এড়াইলে পর ।
লক্ষ্যে আসে দেশ এক পরম সুন্দর ॥ ৮৫ ॥
অনন্ত বসন্ত-ঋতু তথা বর্তমান ।
তার পারে নিকেতন রতনে নির্মাণ ॥ ৮৬ ॥
একমাত্র দ্বার তার একমাত্র বাট ।
ফণীর আকার পেঁচে আবদ্ধ কপাট ॥ ৮৭ ॥
বিধির বিধানে নাই কোনই বিধান ।
যে বিধান বলে মিলে পেঁচের সন্ধান ॥ ৮৮ ॥
যাঁহার শকতি মধ্যে সেই তালা খোলে ।
তিনি শ্রীচৈতন্যদাতা গুরু তাঁরে বলে ॥ ৮৯ ॥
সেই গুরু নররূপে ঠাকুর আমার ।
পরম দয়াল ভবসিন্ধু কর্ণধার ॥ ৯০ ॥
ব্রাহ্মধর্ম বক্তা-শ্রেষ্ঠ কেশব এখন ।
যেখানে ধর্মের সভা তথা নিমন্ত্রণ ॥ ৯১ ॥
মন প্রাণ তুলে উচ্চরবে মেতে গায় ।
ভক্তিতত্ত্ব প্রাপ্ত যাহা প্রভুর কৃপায় ॥ ৯২ ॥
শক্তিমাখা সিদ্ধবাক্য প্রভুর নিকটে ।
শুনিয়া যেমন জোরে বসিয়াছে ঘটে ॥ ৯৩ ॥
সেইমত সভাস্থলে মহাবলে গায় ।
সভ্য মহাশোভাময় ভাবের ছটায় ॥ ৯৪ ॥
সাজান প্রভুর ভাব বাক্য অলঙ্কারে ।
যে শুনে তাহার মন হরে একবারে ॥ ৯৫ ॥
যাঁর ভাবে জন্মে ভাব তাঁহার মুরতি ।
আবির্ভাব হয় হৃদে ভাবের প্রকৃতি ॥ ৯৬ ॥
সেই হেতু ভক্তিগ্রন্থে ভক্তে করে জ্ঞান ।
যার ভক্তি গ্রন্থে লেখা সে তাঁর সমান ॥ ৯৭ ॥
ভক্তিমান শ্রীকেশব বক্তৃতার কালে ।
দেখেন প্রভুর মূর্তি মনে নেচে খেলে ॥ ৯৮ ॥
সবার গোচরে কহে আনন্দ অন্তর ।
বস্তু সাধ যার যাও দক্ষিণশহর ॥ ৯৯ ॥
পরম সুন্দর সাধু আছে সেইখানে ।
উচ্চজ্ঞান-ভক্তি মিলে তাঁর দরশনে ॥ ১০০ ॥
পুণ্য-দরশন হেন না মিলে কোথায় ।
মহাভার খেলে অঙ্গে গৌরাঙ্গের প্রায় ॥ ১০১ ॥
দরশনে কিবা ফল বলিবারে নারি ।
দুস্তর
ভবান্ধি-জলে তরিবার তরী ॥ ১০২ ॥
হুতাশের আশারূপ দুর্বলের বল ।
দীন-হীন-দুঃখী জনে উপায় সম্বল ॥ ১০৩ ॥
আধারে পথিক পক্ষে কর চন্দ্রমার ।
যষ্টিসম দৃষ্টিহীনে বাট খুঁজিবার ॥ ১০৪ ॥
নানান ভাবের ভাবী বুঝান না যায় ।
কভু জ্ঞানী ঋষি কভু ভক্তিভাব গায় ॥ ১০৫ ॥
বিবিধ সাকার ভাব ভাব নিরাকার ।
একাধারে সন্নিবেশ আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ১০৬ ॥
মণি অলঙ্কার বাল্য-ভাব-সর্বোপরি ।
ভাবের আধার হেন কখন না হেরি ॥ ১০৭ ॥
রটে নানা গুণকথা কব আমি কটি ।
প্রচারে কেশব দিল দামামায় কাটি ॥ ১০৮ ॥
পরিপাটি কহে যেন লিখে তেন চোটে ।
সমাচার-পত্রিকায় দেশে দেশে ছুটে ॥ ১০৯ ॥
হেন ভাবে লেখা বার্তা বোধ হয় দেখে ।
প্রভু-দরশনে যেন জগজনে ডাকে ॥ ১১০ ॥
কেশব মহান কলিকাতা হেন ঠাঁই ।
আছে যত বড়লোক সকলের চাঁই ॥ ১১১ ॥
নহে বড় অর্থবলে বিদ্যাবল এত ।
হোক না ধনেশ তবু তাঁর কাছে নত ॥ ১১২ ॥
সারগ্রাহী গুণগ্রাহী বিদ্বান যেমন ।
পরমার্থ-অনুরক্ত বীর একজন ॥ ১১৩ ॥
এত গুণে রূপে অঙ্গ বিভূষিত তাঁর ।
কথায় কাটিতে কথা সাধ্য নহে কার ॥ ১১৪ ॥
প্রতিদ্বন্দ্বী কেবা ঠেলে কলমে কলম ।
এতদূর কেশবের আসর গরম ॥ ১১৫ ॥
বিশ্বাস কথায় লোক এত করে তাঁর ।
না বুঝিলে তবু বুঝে বাক্যে আছে সার ॥ ১১৬ ॥
কেশবের হাতে মুখে পাইয়া খবর ।
দলে দলে আসে লোক দক্ষিণশহর ॥ ১১৭ ॥
ব্রাহ্মধর্ম সমুজ্জ্বল করিয়া কেশব ।
সাধিল অসাধ্য কর্ম নরে অসম্ভব ॥ ১১৮ ॥
দেশের অবস্থা এবে ধর্মের বাজারে ।
যা চলে ভাবিলে নাহি রক্ত চলে শিরে ॥ ১১৯ ॥
এক ছত্রে ইংরেজের দেশে অধিকার ।
কৌশলে কৌশলে করে কার্য আপনার ॥ ১২০ ॥
রাজনীতি সুকৌশল এ জাতির ন্যায় ।
কোনকালে ধরাতলে দেখা নাই যায় ॥ ১২১ ॥
অতি তিক্ত
কালমেঘ শর্করাবরণে ।
ভিষক যেমন দেয় শিশুর বদনে ॥ ১২২ ॥
সেইমত রাজধর্ম দশ্যে পাকা
ফল ।
হিন্দুধাতে করে যেন শোণিতে গরল ॥ ১২৩ ॥
কামিনীকাঞ্চনমিশ্র প্রলোভন চারে ।
চঞ্চল দেবের মন জীবে রাখ' দূরে ॥ ১২৪ ॥
তাই দিয়া প্রচার করেন খ্রীষ্টিয়ানি ।
মজাইয়া কত হিন্দু সংখ্যা নাহি জানি ॥ ১২৫ ॥
গলদেশে ডুরিলগ্ন মর্কটের প্রায় ।
দুটা
কলা কিংবা দুটা শশার আশায় ॥ ১২৬ ॥
বেদিয়ার পাছু ছুটে আনন্দ অন্তর ।
পিতা পিতামহ
যার বাঁধিল সাগর ॥ ১২৭ ॥
সেইমত মান খ্যাতি কাঞ্চনেতে ভুলি ।
হৃদিরত্ব জাতিধর্মে
দিয়া জলাঞ্জলি ॥ ১২৮ ॥
ক্ষিপ্তপ্রায় গোটা জাতি ইংরেজের পাছে ।
যেমন নাচিতে বলে
সেইরূপ নাচে ॥ ১২৯ ॥
হাবভাব সাহেবের করিতে নকল ।
অভ্যাসে হয়েছে পটু বাঙ্গালী সকল ॥ ১৩০ ॥
যা বলে ইংরেজ-তাই মনের মতন ।
তুলনায় অতি ছার বেদের বচন ॥ ১৩১ ॥
ধর্মের প্রসঙ্গ যদি ইংরেজী ভাষায় ।
সভামধ্যে বক্তৃতায় নাহি বলা যায় ॥ ১৩২ ॥
তবে সে প্রসঙ্গে কার না থাকে আদর ।
দেশেতে বসেছে হেন বিদেশী রগড় ॥ ১৩৩ ॥
আদি হিন্দু রীতি নীতি নিতে নাহি চায় ।
পরিত্যক্ত এ বাজারে গরলের প্রায় ॥ ১৩৪ ॥
জাতি-ভ্রষ্ট ধর্মভ্রষ্ট হিন্দুর সন্তানে ।
ভুলাইয়া ধীরে ধীরে আনিত ভবনে ॥ ১৩৫ ॥
প্রিয়কর রুচিকর যাহা প্রয়োজন ।
একা ব্রাহ্মধর্ম দেয় সব সরঞ্জাম ॥ ১৩৬ ॥
অভিনব ব্রাহ্মধর্ম সুদৃশ্য চেহারা ।
ভিতরে কালিমাবর্ণ উপরেতে গোরা ॥ ১৩৭ ॥
নানাদিক আলোময় জ্যোতি ঝরে তেজে ।
সগুণ ব্রহ্মের ভাব যাবনিক সাজে ॥ ১৩৮ ॥
বেদান্ত হিন্দুর বস্তু ছায়া আছে তার ।
খাদ্যাখাদ্য জাতি ভেদে নাহিক বিচার ॥ ১৩৯ ॥
অনেক লাগিল ভাল নব্য সভ্যদলে ।
আহার ঔষধ দুই এক পানে ফলে ॥ ১৪০ ॥
ভুরি ভুরি সমাজমন্দিরে এসে জুটে ।
বক্তৃতায় যেইখানে ব্রহ্মডিম্ব ফাটে ॥ ১৪১ ॥
কাল-পাত্র ভেদে হয় ধর্মের গড়ন ।
এ সময় ব্রাহ্মধর্ম অতি প্রয়োজন ॥ ১৪২ ॥
কালত্রয় ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান ।
প্রত্যক্ষ যাঁহার তিনি সর্বশক্তিমান ॥ ১৪৩ ॥
কল্যাণনিধান হরি পতিতপাবন ।
সময়ে উচিত যাহা করেন সৃজন ॥ ১৪৪ ॥
অন্য দিকে বৈজ্ঞানিক আর একদল ।
ঝড়ের প্রভাব বুঝে সৃষ্ট্যুৎপত্তি বল ॥ ১৪৫ ॥
স্বতঃসিদ্ধ শক্তিযুক্ত মূলভূতগণ ।
এই জ্ঞানে নাহি মানে বিভুর সৃজন ॥ ১৪৬ ॥
ভীষণ রাক্ষস প্রায় নাস্তিক আখ্যায় ।
নাম শুনি শরীরের শোণিত শুকায় ॥ ১৪৭ ॥
মানে না বিশ্বের রাজা পরম ঈশ্বর ।
মাথা নুয়াইয়া নাহি দিতে চায় কর ॥ ১৪৮ ॥
বাগ্মিবর ধীরবর পণ্ডিতপ্রধান ।
নানাবলে শক্তিমান কেশব ধীমান ॥ ১৪৯ ॥
দেখায়
বিদ্যার ছটা তাঁদের উপরে ।
সুযুক্তি সিদ্ধান্ত শাস্ত্রতর্ক সহকারে ॥ ১৫০ ॥
রোধিল প্রলয়ঙ্করী নাস্তিকের ধারা ।
ল'য়ে যে লইতে চায় গোটা বসুন্ধরা ॥ ১৫১ ॥
ব্রাহ্মধর্ম এ সময় হইয়া প্রবল ।
দেশের পক্ষেতে কৈল অপার মঙ্গল ॥ ১৫২ ॥
জয় জয় ব্রাহ্মধর্ম উচ্চমর্মে গতি ।
জয় জয় শ্রীকেশব সুযোগ্য সারথি ॥ ১৫৩ ॥
জয় জয় ব্রহ্মজ্ঞানী সহনেতা তাঁর ।
অধম পামর করে সবে নমস্কার ॥ ১৫৪ ॥
সশিষ্যে সপরিবারে কেশব এক্ষণে ।
দক্ষিণশহরে যান প্রভু-দরশনে ॥ ১৫৫ ॥
দেখা-শুনা ঘন ঘন ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ।
প্রভু না খাওয়ায়ে কিছু নাহি দেন ছেড়ে ॥ ১৫৬ ॥
সুধারস শান্তিরস শান্তিহেতু ঘটে ।
পুষ্টিহেতু মিষ্টিভরা রসগোল্লা পেটে ॥ ১৫৭ ॥
পেয়েছে না পাবে দিন এ হেন রকম ।
কেশব প্রভুরে করে ঘরে নিমন্ত্রণ ॥ ১৫৮ ॥
বলিহারি কলিকাল কালের প্রধান ।
সত্যও না পায় এর মহিমা-সন্ধান ॥ ১৫৯ ॥
কৃপার নিধান প্রভু কৃপার সাগর ।
বারে বারে অবতীর্ণ ধরি কলেবর ॥ ১৬০ ॥
সাধনে লোকের নাহি হয় প্রয়োজন ।
আবাসে বসিয়া হয় হরি দরশন ॥ ১৬১ ॥
কেশব মজিল বড় শ্রীপ্রভুর পায় ।
ইচ্ছা যেন গেতে শুতে ছাড়িতে না চায় ॥ ১৬২ ॥
ব্রাহ্মধর্মে যোগ দিয়া প্রভু ভগবান ।
তুলিলেন তাহে এক সুমধুর তান ॥ ১৬৩ ॥
করিবারে ইহারে অধিক মিষ্টতর ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা বড়ই সুন্দর ॥ ১৬৪ ॥
১
এইভাব গুরুবর কেশবচন্দ্রের কৃত
'জীবনবেদ' হইতে পাইয়াছি (৩৯-৪৬ পৃষ্ঠা) ।
তৃতীয় খণ্ড
মনোমোহন ও রামের মিলন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
দিনকর-কর যেন বরন-আকর ।
অগণ্য বরন আছে তাহার ভিতর ॥ ১ ॥
আঁখি মিলে গেলে পরে দেখিবার তরে ।
প্রখর করের তেজে দৃষ্টিশক্তি হরে ॥ ২ ॥
তবে বর্ণাকর সূর্য জানা যায় কিসে ।
চারুতনু রামধনু যখন বিকাশে ॥ ৩ ॥
তেমতি বিভুর কারা মহাজ্যোতিষ্মান ।
আঁখিতে না পারে নরে করিতে সন্ধান ॥ ৪ ॥
বর্তমান অপরূপ গুণ কিবা তাঁয় ।
যতদিন নরদেহে না আসে ধরায় ॥ ৫ ॥
পঞ্চভূতে গড়া দেহ পঞ্চভূত নয় ।
প্রতিবিম্বে খেলে যাহে গুণসমূদয় ॥ ৬ ॥
রূপে গুণে ষড়ৈশ্বর্যবান ভগবান ।
একা ভাগবত লীলা দেখিবার স্থান ॥ ৭ ॥
অপরূপ রূপ-গুণ ভুবনমোহন ।
দেখিবার সাধ যদি থাকে তোর মন ॥ ৮ ॥
একমনে-শ্রবণ করহ দিবারাতি ।
সৎদৃষ্টি জন্মে যায় রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৯ ॥
ষড়ৈশ্বর্যবান প্রভু রাজরাজেশ্বর ।
কখন একাকী নহে সঙ্গে সহচর ॥ ১০ ॥
নানা বেশে পারিষদ সাঙ্গোপাঙ্গগণ ।
সম সময়েতে লয় ধরায় জনম ॥ ১১ ॥
আপনি যেমন গুপ্ত সেইমত তাঁরা ।
শোক-দুঃখে পরিপূর্ণ নরের চেহারা ॥ ১২ ॥
পরিব্যাপ্ত নানা স্থানে নানান রকমে ।
সময় হইলে পরে এক ঠাঁই জমে ॥ ১৩ ॥
শ্রীমনোমোহন মিত্র কোন্নগরে ঘর ।
কার্যহেতু বাসাবাটী শহর ভিতর ॥ ১৪ ॥
ভক্তবর শ্রীপ্রভুর আত্মগণ তিনি ।
রত্নগর্ভা ভক্তিমতী তেমতি জননী ॥ ১৫ ॥
ভগিনীগণের মধ্যে সেজ যিনি তাঁর ।
ভক্তির গুণের কথা নহে বলিবার ॥ ১৬ ॥
সময়ে বলিব পরে পাবে পরিচয় ।
ধৈরযের কথা এ তো উতলার নয় ॥ ১৭ ॥
একদিন নিদ্রাযোগে শ্রীমনোমোহন ।
পরিবারসহশয্যা দেখেন স্বপন ॥ ১৮ ॥
অকূল পাথার জল
ভীষণ তুফান ।
কুটি ছিলে দুটি হয় এত তার টান ॥ ১৯ ॥
বানবেগে জলস্রোত অতি খরতর ।
ভাসে তাহে গাছ লতা অট্টালিকা ঘর ॥ ২০ ॥
ক্ষুদ্রতম বৃহত্তম জীব নানাজাতি ।
নিজে ভাসে তার মধ্যে আশ্রয়সংহতি ॥ ২১ ॥
কিছুদূরে গিয়া পরে দেখিবারে পান ।
জলের উপরে আগে অপূর্ব সোপান ॥ ২২ ॥
দুফালিয়া যায় জল তার অধোভাগে ।
এত টান ব্রহ্মবান কোন্ খানে লাগে ॥ ২৩ ॥
ভয়ঙ্কর স্থান হৈল পলকেতে পার ।
সে টান সোপান পারে কিছু নাই আর ॥ ২৪ ॥
সুস্থির গম্ভীর জল ঢল ঢল করে ।
হেনকালে পুত্র-কন্যা-দারা মনে পড়ে ॥ ২৫ ॥
কোথা পুত্র কোথা কন্যা উচ্চনাথে ডাকে ।
তখন কোথায় কেবা সাড়া দিবে কাকে ॥ ২৬ ॥
আকুল পরান শুনে কেহ কহে তাঁয় ।
অমিয়বরষী বাণী তুচ্ছ তুলনায় ॥ ২৭ ॥
বিশ্বাসভরসাভরা শুনে মন ভুলে ।
নাহি তব পুত্র-কন্যা ডুবে গেছে জলে ॥ ২৮ ॥
কেবল তোমার নয় গেছে পরিবার ।
ডুবেছে আগোটা বিশ্ব যাবৎ সংসার ॥ ২৯ ॥
উত্তরে কহেন মিত্র আমি কিবা করি ।
গেছে যদি লবে তবে আমি সুদ্ধ মরি ॥ ৩০ ॥
এত শুনি দৈববাণী কহে পুনর্বার ।
কি হেতু করিবে তুমি প্রাণ-পরিহার ॥ ৩১ ॥
সংসার কেবল মাত্র জলে ডুবে গেছে ।
ঠাকুরের ভক্ত যত সবে বেঁচে আছে ॥ ৩২ ॥
বিরাজেন ভক্তসহ যথা নারায়ণ ।
তোমার তাঁদের সঙ্গে হবে সম্মিলন ॥ ৩৩ ॥
অনতিবিলম্বে কাল সামান্য তফাত ।
হেনকালে গায়ে পড়ে তাঁর স্ত্রীর হাত ॥ ৩৪ ॥
তাহে সুখস্বপ্ন ভঙ্গ হইল তাঁহার ।
কে তুমি বলিয়া স্ত্রীকে করেন চীৎকার ॥ ৩৫ ॥
গভীর নিশীথে পেয়ে নন্দনের ধ্বনি ।
চমকিয়া উঠিলেন মিত্রের জননী ॥ ৩৬ ॥
ত্বরা করি আইলেন বেগার নন্দন ।
জিজ্ঞাসিলা পুত্রে বাপ হেন কি কারণ ॥ ৩৭ ॥
শ্রীমনোমোহন কন কে তোমরা হেথা ।
জননী কহেন পুত্রে আমি তব মাতা ॥ ৩৮ ॥
চারি ধারে স্তব্ধপ্রাণ যত পরিবার ।
অকস্মাৎ কেন হেন কহ সমাচার ॥ ৩৯ ॥
পুনশ্চয় পুত্র কয় কে আমার আছে ।
পুত্র-কন্যা-পরিবার জলে ডুবে গেছে ॥ ৪০ ॥
সব গেছে আছে ভক্তসহ ভগবান ।
কোথায় কেমনে পাই তাঁহার সন্ধান ॥ ৪১ ॥
গেলে দুই তিন ঘণ্টা তবে হয় ভোর ।
তখন না ছুটে তার স্বপনের ঘোর ॥ ৪২ ॥
দিন এলে বেলা হ'লে সুস্থির হৃদয় ।
স্বপনে অলীক জ্ঞান না হয় প্রত্যয় ॥ ৪৩ ॥
স্বপন-বারতা কহে যার তার ঠাঁই ।
শুনিলেন শেষে রাম মাসী-পুত্র ভাই ॥ ৪৪ ॥
রাম দত্ত আত্মগণ ভক্ত শ্রীপ্রভুর ।
শুন ভক্ত-সংজোটন কাণ্ড সুমধুর ॥ ৪৫ ॥
নবীন বয়েস রাম গোউর বরন ।
লম্বে
প্রস্থে চারুদৃষ্টি সুন্দর গড়ন ॥ ৪৬ ॥
প্রিয়দরশন ঠাম সরল হৃদয় ।
রসায়নশাস্ত্রে দক্ষ বিদ্যা-পরিচয় ॥ ৪৭ ॥
মেডিকেল কলেজে শহরে এইখানে ।
উচ্চপদে অভিষিক্ত বিদ্যাবল-গুণে ॥ ৪৮ ॥
জড়বস্তু সংযোগ-বিয়োগ-কর্ম করি ।
অন্তরেতে হইয়াছে নাস্তিকতা ভারি ॥ ৪৯ ॥
বিভুর অস্তিত্ব কথা না হয় বিশ্বাস ।
বড় তর্কপ্রিয় তর্কে পরম উল্লাস ॥ ৫০ ॥
তর্কেতে করেন তিনি হরির সন্ধান ।
তর্কাতীত হরি জড়ে খুঁজে নাহি পান ॥ ৫১ ॥
একদিন নিদ্রাযোগে দেখেন স্বপন ।
একমাত্র নন্দিনীর হ'য়েছে মরণ ॥ ৫২ ॥
হৃদয় হতেছে দগ্ধ এতই সন্তাপ ।
স্বপনেতে শোকাতুর বিবিধ বিলাপ ॥ ৫৩ ॥
মাথার বালিশ আর্দ্র নয়নের নীরে ।
আর্তনাদে ঘন ঘন করাঘাত শিরে ॥ ৫৪ ॥
এমন সময় ভঙ্গ হইল স্বপন ।
জাগিয়াও তবু রাম করেন রোদন ॥ ৫৫ ॥
নিরীক্ষণ নন্দিনীরে করেন নিকটে ।
তথাপিও স্বপ্নস্মৃতি আদতে না ছুটে ॥ ৫৬ ॥
কিছুকাল পরে মনে হইল উদয় ।
স্বপ্নতত্ত্ব সত্য যদি যথার্থই হয় ॥ ৫৭ ॥
তবে কি হইবে মম কি হইবে গতি ।
আত্মরক্ষাহেতু চিন্তা হয় দিবারাতি ॥ ৫৮ ॥
একদিন ক্ষুন্ন মন হৃদি-ভাবান্তরে ।
বেড়িয়া বেড়ান রাত্রে ছাদের উপরে ॥ ৫৯ ॥
উর্ধ্ব মুখে নীলাকাশ করি দরশন ।
অন্তরে উঠিল নব ভাবের গড়ন ॥ ৬০ ॥
উদাস উল্লাস মন চলে যায় কোথা ।
কিছু না পারেন তার বুঝিতে বারতা ॥ ৬১ ॥
বড়ই অশান্ত হৃদি সদা ক্ষুণ্ণ মন ।
শাস্ত্রবিৎ ধীর জনে করি আবাহন ॥ ৬২ ॥
শান্তিদাতা আছে কোথা শাস্তি মিলে কিসে ।
পথহেতু ভক্তি-ভরে তাঁহারে জিজ্ঞাসে ॥ ৬৩ ॥
প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ প্রাণে কহে ধীরবর ।
কহিতে না পারি কিছু ইহার উত্তর ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্র কহে কর কর্ম সফল হইলে ।
পশ্চাৎ তাহার ফল শান্তি তবে মিলে ॥ ৬৫ ॥
কর্মের বিধান-শাস্ত্রে বস্তু নাহি তায় ।
শুনিয়া রামের প্রাণ শুকাইয়া যায় ॥ ৬৬ ॥
রামের বাসনা বড় মাছ ধরিবারে ।
কার্যহেতু জাল ছিপ কিছু নাহি নেড়ে ॥ ৬৭ ॥
যন্ত্র ধরা বাড়া কথা না ছুঁইবে জল ।
অনায়াসে চান ব'সে সুপক্ক ফসল ॥ ৬৮ ॥
শ্রীমনোমোহন সনে হ'য়ে একত্তর ।
শান্তির উপায় চিন্তা করে নিরন্তর ॥ ৬৯ ॥
শ্রীমনোমোহন বড় রাম জন্মে পাছে ।
দুই ভায়ে বড় ভাব ঘর কাছে কাছে ॥ ৭০ ॥
বিশেষ এখন মিলে গেল দুই ভাই ।
ইনিও যা চান ঠিক উনি চান তাই ॥ ৭১ ॥
ভক্ত-ভগবানে খেলা অকথ্য কথন ।
যোল আনা মন দিয়া শুন শুন মন ॥ ৭২ ॥
বলিয়া শুনাব কত বলিব কেমনে ।
ভেঙ্গে বুঝ কোটি কোটি এক কথা শুনে ॥ ৭৩ ॥
ঘুম পাড়াইয়া ঘুম কেমনে ভাঙান ।
কোথা অশ্ব কোথা মুখ কোথায় লাগাম ॥ ৭৪ ॥
কোথা পৃষ্ঠে অশ্বারোহী কোথা তাঁর হাত ।
বিমানে অদ্ভূত কর্ম শূন্যে করাঘাত ॥ ৭৫ ॥
যন্ত্রণায় ঊর্ধ্ব মুখে ছুটে অশ্ববর ।
প্রভু-রামকৃষ্ণ-লীলা বড়ই সুন্দর ॥ ৭৬ ॥
শ্রীমনোমোহন রামে নানাদিকে ছুটে ।
শান্তির আস্পদ কোথা কি প্রকারে জুটে ॥ ৭৭ ॥
এ সময় 'সুলভসংবাদ' পত্রিকায় ।
শ্রীকেশব প্রভুমূর্তি আঁকিয়া তাহায় ॥ ৭৮ ॥
দিয়াছেন ছাপাইয়া গুণগাথা লিখি ।
দেখিয়া পড়িয়া দুইজনে ভারি সুখী ॥ ৭৯ ॥
পরস্পর যুক্তি স্থির কৈল নিরজনে ।
চল যাব দক্ষিণশহর-দরশনে ॥ ৮০ ॥
সংসার-অশান্তি-তাপে তাপিত জীবন ।
সাধু-সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞান মনে আকিঞ্চন ॥ ৮১ ॥
সেইহেতু দুইজনে দরশনে যান ।
চির শান্তিদাতা যেথা কল্যাণনিধান ॥ ৮২ ॥
উতরিয়া যথাস্থানে করে অন্বেষণ ।
কোথায় পরমহংস সাধু একজন ॥ ৮৩ ॥
লোকে দেখাইল পথ প্রভুর মন্দির ।
দ্বারদেশে এসে দোঁহে হইল হাজির ॥ ৮৪ ॥
আছিল কপাট বদ্ধ মন্দিরের দ্বারে ।
ঈষৎ আঘাত তায় ধীরে ধীরে করে ॥ ৮৫ ॥
মুক্ত দ্বার তখনি পরশ মাত্র তায় ।
আপনি করিয়া দিলা প্রভুদেব রায় ॥ ৮৬ ॥
যেন প্রত্যাশায় কত কপাটের ধারে ।
বসিয়াছিলেন প্রভু তাঁহাদের তরে ॥ ৮৭ ॥
যেখিবারে ভক্তদ্বয় বহুদিন ছাড়া ।
ভব-সিন্ধু-তরঙ্গে ত্রাসিত আশাহারা ॥ ৮৮ ॥
অন্তরে অপার সুখ প্রভু ভগবান ।
দেখিতে দেখিতে দুই ভক্তের বয়ান ॥ ৮৯ ॥
সোহাগে সম্ভাষ কত কতই আদর ।
বসাইলা আপনার খাটের উপর ॥ ৯০ ॥
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বিশ্ব ডরে দাপে ।
বসিতে সে বিছানায় খর থর কাঁপে ॥ ৯১ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদ আত্মগণ তাঁর ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি শ্রীপ্রভুর আপনার ॥ ৯২ ॥
ছাড়িবার নহে কেহ কারে নাহি ছাড়ে ।
বাহ্যে ছাড়াছাড়ি বোধ লীলার আসরে ॥ ৯৩ ॥
প্রভু যে পরমহংস যাঁর অন্বেষণে ।
এসেছেন দুই ভাই এখন না চিনে ॥ ৯৪ ॥
তাঁহাদের মনে মনে জানা চিরকাল ।
সন্ন্যাসী পরমহংস পরা বাঘছাল ॥ ৯৫ ॥
ভস্মমাখা গোটা অঙ্গ কাছে ধুনি জ্বলে ।
সম্মুখে চিমটা গাড়া বাস বৃক্ষমূলে ॥ ৯৬ ॥
মাথায় জড়ান জটা রুক্ষ কেশভার ।
গাঁজায় ধুয়ায় করে দুনিয়া আঁধার ॥ ৯৭ ॥
প্রভুর শ্রীঅঙ্গ সাধা লক্ষণবিহীন ।
আচারেতে সুধীন অপেক্ষা কত দীন ॥ ৯৮ ॥
পরিধান লালপেড়ে সুতার কাপড় ।
সুন্দর সুঠামে নাই কোন আড়ম্বর ॥ ৯৯ ॥
পরে পরিচয়ে বুঝিলেন দুইজনে ।
ইনি তিনি আসিয়াছি যার অন্বেষণে ॥ ১০০ ॥
অন্তর বুঝিয়া তবে প্রভুদেব কন ।
ভাগিনে হৃদয়ানন্দে করি সম্বোধন ॥ ১০১ ॥
জ্বরের পীড়ায় নীচে ছিল শয্যাগত ।
ওরে হৃদু এরা নহে ব্রাহ্মদলভুক্ত ॥ ১০২ ॥
শ্রীমনোমোহন কন প্রভু সন্নিকটে ।
বাল্যাবধি ব্রাহ্মধর্ম বুঝি সত্য বটে ॥ ১০৩ ॥
সমাজেতে যাওয়া আসা আছয়ে আমার ।
এত শুনি প্রভুদেব কন পুনর্বার ॥ ১০৪ ॥
যাহা যাও যাহা বুঝ ধর্মের বারতা ।
তুমি নহ ব্রাহ্মদের এই মোর কথা ॥ ১০৫ ॥
এত বলি কহিতে লাগিলা উপদেশ ।
অন্তর্যামী ভক্ত-প্রাণ প্রভু পরমেশ ॥ ১০৬ ॥
কল্পতরু বিশ্বগুরু অখিলের স্বামী ।
সাকার সম্বন্ধে উক্তি ভক্তি-প্রসবিনী ॥ ১০৭ ॥
শোলার গঠিত আতা করি দরশন ।
সত্যের গাছের আতা করে উদ্দীপন ॥ ১০৮ ॥
সেইরূপ দেবদেবীমূর্তি-দরশনে ।
লীলারূপ কিবা কার সব পড়ে মনে ॥ ১০৯ ॥
লীলাময় লীলারূপ বিভু ভগবান ।
সকল সম্ভবে কেন সর্বশক্তিমান ॥ ১১০ ॥
দু'ভায়ে গলিয়ে গেছে প্রভুর কথায় ।
সুমধুর মিষ্টভাষী প্রভুদেব রায় ॥ ১১১ ॥
শ্রীবাণীতে সুধাধারা এত বহে জোর ।
শুনিলে তরলে গলে অশনি কঠোর ॥ ১১২ ॥
এ তো চিরভক্ত তাঁর ধাত বাঁধা তায় ।
ঈষৎ আভাসে সুধাস্রোতে ভেসে যায় ॥ ১১৩ ॥
অপরূপ নরলীলা নরদেহ ধরি ।
না পারি বলিতে নাহি দেখাইতে পারি ॥ ১১৪ ॥
বড়ই সহজ নৈলে দেখা বুঝা ভার ।
হাতে আছে হাতে নাই আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ১১৫ ॥
ভক্ত বিনা খেলা কার না পড়ে নয়নে ।
চুম্বক কেবলমাত্র লোহা পেলে টানে ॥ ১১৬ ॥
স্বচ্ছ নিয়মল ভক্ত চিতের উপর ।
প্রতিভাত করে মাত্র চন্দ্রমার কর ॥ ১১৭ ॥
ভক্তের মিলন হৃদি যদি দেখা যায় ।
তথাপি দর্পণ-তুল্য ধূলারাশি গায় ॥ ১১৮ ॥
পরিষ্কারে নহে কষ্ট হয় অনায়াসে ।
ধীর মন্দ সমীরণ সামান্য বাতাসে ॥ ১১৯ ॥
ভাগবতলীলামধ্যে শুন কথা তার ।
প্রভু জিজ্ঞাসিলা রামে তুমি না ডাক্তার ॥ ১২০ ॥
নীচে শয্যাগত জ্বরে ভাগিনা হৃদয় ।
দেখাইয়া তাঁরে বলিলেন লীলাময় ॥ ১২১ ॥
নাড়ী টিপে দেখ দেখি আছে কি রকম ।
পরীক্ষা করিয়া ভক্ত রাম দত্ত কন ॥ ১২২ ॥
গুণী জানে সুগম্ভীর আপ্যায়িত স্বরে ।
এখন নাহিক জ্বর জ্বর গেছে ছেড়ে ॥ ১২৩ ॥
অপূর্ব মধুর খেলা ভক্ত-ভগবানে ।
দয়া কর প্রভু যেন দেখি রেতেদিনে ॥ ১২৪ ॥
সামান্য ঘটনা কথা অনতিবিস্তর ।
তবু তার ভাসে কত সাগর সাগর ॥ ১২৫ ॥
ভাসে বেদ বেদান্ত তন্ত্রাদি গীতা সার ।
ব্যসের পুরাণ ভাসে ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১২৬ ॥
ভাসে ব্রহ্মা ভাসে বিষ্ণু ভাসে মহেশ্বর ।
স্বজন-পালন-লয় শক্তির আকর ॥ ১২৭ ॥
ভাসিছে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীগণ ।
রাজর্ষি দেবর্ষি ভাসে তৃণের মতন ॥ ১২৮ ॥
কোথা ভাসে কিসে ভাসে ভাসে কি প্রকার ।
আঁকিয়া দেখাতে শক্তি নাহিক আমার ॥ ১২৯ ॥
প্রভু-ভক্ত পদরজ সার কর মন ।
ইনিও দেখিতে
পাবে মনের মতন ॥ ১৩০ ॥
যদি বল এ দর্শন স্বপনের দেখা ।
পড়িলে প্রভুর কুঁদে না থাকিবে বাঁকা ॥ ১৩১ ॥
শুন লীলা মনোযোগে প্রভুদেব কন ।
তুমি রাম দেহ-তত্ত্ব জান বিলক্ষণ ॥ ১৩২ ॥
বল দেখি বুঝাইয়া এবার আমারে ।
যা খাই কোথায় যায় উদর-ভিতরে ॥ ১৩৩ ॥
এত শুনি পাকস্থলী উদরে যেখানে ।
দেখাইল রাম প্রভু-অঙ্গ পরশনে ॥ ১৩৪ ॥
উপরের মধ্যভাগে পাকস্থলী-স্থান ।
শুনিয়া বিস্ময়ে কন প্রভু ভগবান ॥ ১৩৫ ॥
দেখ মম পাকস্থলী নহে মধ্যস্থানে ।
উদরের অধোদেশে সবাকার বামে ॥ ১৩৬ ॥
হাত দিয়া কর লক্ষ্য আমি খাই জল ।
হইবে প্রতীয়মান কথা অবিকল ॥ ১৩৭ ॥
যা বলিল প্রভুদেব তাই দেখে রাম ।
বাম ভাগে চলে যত প্রভু খান ॥ ১৩৮ ॥
দেখিয়া বিস্ময়ে ভরে শ্রীরামের মন ।
সৃষ্টিছাড়া শ্রীপ্রভুর দেহের গঠন ॥ ১৩৯ ॥
প্রায়াগত দেখি সন্ধ্যা কহে দুই জনে ।
ফিরিবারে ঘরে কিন্তু মন নাহি মানে ॥ ১৪০ ॥
প্রভুর মূরতি দেখি কথা শুনি তাঁর ।
উভয়ের মহানন্দ নহে বর্ণিবার ॥ ১৪১ ॥
সমস্ত অশান্তি যত ছিল এ জীবনে ।
দূরীভূত একেবারে প্রভু-দরশনে ॥ ১৪২ ॥
বিদায় মাগিতে প্রভু বলিলেন দুয়ে ।
যাবে যদি ঘরে আজি কিছু যাও খেয়ে ॥ ১৪৩ ॥
দুই ভায়ে মণ্ডাসহ ঠাণ্ডাজল খান ।
সম্মুখে দণ্ডায়মান প্রভু ভগবান ॥ ১৪৪ ॥
চিরকাল ভক্তের ঠাকুর প্রভুরায় ।
মহাসুখ দেখিয়া ভকতদ্বয় খায় ॥ ১৪৫ ॥
বিদায়ের কালে হয়ে লয় পদধূলি ।
বিদায় সে দিন হয় পুনঃ এস বলি ॥ ১৪৬ ॥
অন্তরীক্ষে উভয়ের চুরি করি মন ।
শুন রালকৃষ্ণ লীলা অমৃত-কখন ॥ ১৪৭ ॥
ঘরে যেতে গোটা পথে কহে পরস্পর ।
প্রভু কি দয়াল সাধু স্বভাব সুন্দর ॥ ১৪৮ ॥
হৃদিতত্ত্ববিৎ তেঁহ অপূর্ব কাহিনী ।
মুর্তি যেন রসনায় তেন মিঠা বাণী ॥ ১৪৯ ॥
আমি যে ডাক্তার তিনি জানিলেন কিসে ।
বলিলেন রাম দত্ত বিস্ময় বিশেষে ॥ ১৫০ ॥
দ্বিতীয় আশ্চর্য কথা দেহের গড়ন ।
সাধারণ যেন তাঁর স্বতন্ত্র রকম ॥ ১৫১ ॥
প্রিয়দরশন কিবা তৃতীয় সংবাদ ।
দেখিলে জনমে কত অন্তরে আহলাদ ॥ ১৫২ ॥
জন্মজন্মাজিত তাপ হরে একবারে ।
কি জানি কি আছে তাঁর মূর্তির ভিতরে ॥ ১৫৩ ॥
এইবারে পাইয়াছি যেন সাধ মনে ।
ত্রিতাপসন্তাপহর বিপদবারণে ॥ ১৫৪ ॥
মিত্রের জননী ঘরে মহা ভক্তিমতী ।
আগাগোড়া শুনিলেন প্রভুর ভারতী ॥ ১৫৫ ॥
উদ্দেশে প্রণতি করি কহিল নন্দনে ।
এ নহে অপর কেহ ভগবান বিনে ॥ ১৫৬ ॥
জন্মজন্মার্জিত পুণ্যে পেলে দরশন ।
নরদেহধারী হরি পতিতপাবন ॥ ১৫৭ ॥
বারুদে প্রস্তুত বোম ল'য়ে শত দরে ।
কারিগর সেইরূপ লঙ্কাগড় গড়ে ॥ ১৫৮ ॥
এক বোমে দিলে অগ্নি সব বোমে পায় ।
সুকৌশলী-কারিগর এমন সাজায় ॥ ১৫৯ ॥
সেই মত ভক্তগোষ্টিমধ্যে একজন ।
পরশিলে একদিন পতিতপাবন ॥ ১৬০ ॥
সংযোগে সংযোগে ছুটে আগুনের কণা ।
জাগায় আগোটা গোষ্টিমধ্যে যত জনা ॥ ১৬১ ॥
অন্তরঙ্গ আত্মগণ গুন্তির ভিতরে ।
এতেক কোথাও নহি প্রভু-অবতারে ॥ ১৬২ ॥
যত দেখি আছে লগ্ন এ দুয়ের সাথে ।
নিকট সম্বন্ধ সব তর তম জেতে ॥ ১৬৩ ॥
আত্মবন্ধু অধিকাংশ শ্রীপ্রভুর দাস ।
ভক্ত-সংজোটন কাণ্ডে ক্রমশঃ প্রকাশ ॥ ১৬৪ ॥
পূজ্যতম ভক্তদ্বয়ে করিয়া প্রণতি ।
শুন মন সুমধুর রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ আগে জুটেছে হেথায় ।
কনৌজ ব্রাহ্মণ বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ॥ ১৬৬ ॥
মহাভক্ত শঙ্করের জনক তাঁহার ।
ইংরেজ রাজের ফৌজে পদ সুবাদার ॥ ১৬৭ ॥
যুদ্ধবিদ্যা বিশারদ সুবিখ্যাত জনা ।
পাঁচশত টাকা মাসে মাসে মাহিয়ানা ॥ ১৬৮ ॥
মহেশে
অপার ভক্তি হেন নাহি শুনি ।
দেহে সমরের কাজ মনে শূলপাণি ॥ ১৬৯ ॥
একে খোলা তরবারি শিব অন্ত হাতে ।
যুদ্ধেরও সময় পূজা করে বিধিমতে ॥ ১৭০ ॥
নিত্যকর্ম শিবপূজা নহে যতক্ষণ ।
এক ফোঁটা জল নাহি করেন গ্রহণ ॥ ১৭১ ॥
বদনেতে বিশ্বনাথ নাম অবিরাম ।
তাই রাখে নন্দনের বিশ্বনাথ নাম ॥ ১৭২ ॥
ভক্তিমার্গী বিশ্বনাথ আচারী ব্রাহ্মণ ।
বাল্যাবধি জনকের স্বভাবে গড়ন ॥ ১৭৩ ॥
ভাগবত বেদ গীতা বেদান্তাদি শাস্ত্র ।
ছত্রে ছত্রে বর্ণে বর্ণে সকল কণ্ঠস্থ ॥ ১৭৪ ॥
ডুবুরিতে অবিকল ডুবে যে প্রকারে ।
অগম দরিয়া সিন্ধু জলের ভিতরে ॥ ১৭৫ ॥
উদ্ধৃত করিতে রত্ন-মুকুতা-নিকর ।
উপাধ্যায় তেন ডুবে শাস্ত্রের ভিতর ॥ ১৭৬ ॥
যতদূর সাধ্য তার যতন বিশেষে ।
শাস্ত্রে ব্যক্ত সত্য-তত্ত্ব জ্ঞানরত্ব আশে ॥ ১৭৭ ॥
তত্ত্বলাভে কর্মোপায় বিচারিয়া মনে ।
আরম্ভন হঠযোগ সাধন-ভজনে ॥ ১৭৮ ॥
ধর্ম-কর্ম-আচরণে রহে অবিরত ।
স্নানের সময় মন্ত্র পাঠ করে কত ॥ ১৭৯ ॥
নিয়মিত নিত্যকর্ম কর্মে মহাতেজা ।
আপুনি নিজেই করে ঠাকুরের পূজা ॥ ১৮০ ॥
সুমধুর স্তুতিপাঠ শ্রুতিমুগ্ধকর ।
কর্পূরের আরাত্রিক অতীব সুন্দর ॥ ১৮১ ॥
নয়নের ভাব কিবা পুজার সময় ।
বোলতার দংশনে যেইমত হয় ॥ ১৮২ ॥
নিজে যেন ভক্তিমান সেইমত দারা ।
হাঁড়িখানি যেই মত তার কত সরা ॥ ১৮৩ ॥
শুন কথা ভক্তিমতী ছিল কত দূর ।
গোপাল নামেতে পূজে আলাদা ঠাকুর ॥ ১৮৪ ॥
সেবা পূজা নিজে করে পরমানুরাগে ।
বানায় সুন্দর ভোগ যেন মনে লাগে ॥ ১৮৫ ॥
নিতি নিতি গীতাপাঠ গোপালের কাছে ।
আচারে স্বামীর মত শুদ্ধাশুদ্ধ বাছে ॥ ১৮৬ ॥
গৃহকর্মে সুনিপুণা এদিকে যেমন ।
নানারূপ সূপকর্মে বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ১৮৭ ॥
মহাভক্ত উপাধ্যায় বহু ভক্তি তাঁর ।
চালায় ভক্তির ভাবে বিদ্যার সংসার ॥ ১৮৮ ॥
জননীরে করে ভক্তি দেবীর মতন ।
নিজে নীচে জননীর উচ্চেতে আসন ॥ ১৮৯ ॥
সমাসনে কখন না বসে ভক্তবর ।
এতই আছিল ভক্তি মায়ের উপর ॥ ১৯০ ॥
পিতার মতন শিবে মায়ের বিশ্বাস ।
সেই হেতু মাঝে মাঝে হয় কাশীবাস ॥ ১৯১ ॥
কাশীবাসে জননীর যখন গমন ।
তিন গণ্ডা দ্বাস দাসী সেবার কারণ ॥ ১৯২ ॥
সঙ্গে দিয়া পাঠাইয়া দেন উপাধ্যায় ।
মাতৃভক্তি-প্রাবল্যের বেগ প্রেরণায় ॥ ১৯৩ ॥
ছেলেপুলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় তার ভারি ।
নেপালরাজের ঘরে সম্বল চাকরি ॥ ১৯৪ ॥
শহরের সন্নিকটে কাঠের আড়তে ।
রাজা দিয়া ভার
পাঠাইল বিশ্বনাথে ॥ ১৯৫ ॥
অতিশয় শ্রম তায় করি দিবারাতি ।
আয় বৃদ্ধি সহ তায় করিল
উন্নতি ॥ ১৯৬ ॥
বিপুল প্রশংসা পায় রাজদরবারে ।
বার বার পুরস্কার মাহিয়ানা বাড়ে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভু সঙ্গে সংমিলন হয় কি প্রকার ।
শুন ভক্ত সংজোটন অপূর্ব লীলার ॥ ১৯৮ ॥
উপাধ্যায় একদিন দেখেন স্বপন ।
কে এক পুরুষ তাঁরে করে আবাহন ॥ ১৯৯ ॥
তত্ত্বজ্ঞান
লইবারে কন বারে বারে ।
সুন্দর শ্রীমুখে কথা সুধা যেন ঝরে ॥ ২০০ ॥
হঠাৎ ভাঙ্গিল ঘুম
উঠিল চমকি ।
ভাবে ঘোর নিশাকালে কি স্বপন দেখি ॥ ২০১ ॥
অবিরত চিন্তাতুর ব্যাকুলিত
মন ।
স্বপন-কাহিনী হয় সর্বদা স্মরণ ॥ ২০২ ॥
দৈবযোগে একদিন দক্ষিণশহরে ।
উপনীত
উপাধ্যায় প্রভুর গোচরে ॥ ২০৩ ॥
স্বপ্নদৃষ্ট মহাজন দেখামাত্র চিনে ।
বারে বারে
বিলুণ্ঠিত প্রভুর চরণে ॥ ২০৪ ॥
বাসনা-অতীত জ্ঞান-তত্ত্ব তেহ পায় ।
শ্রীপ্রভুদেবের
সাদা সরল কথায় ॥ ২০৫ ॥
বেদপাঠী বিশ্বনাথ দেখে কুতুহলে ।
বেদবাক্যে প্রভুবাক্যে
সমভাবে মিলে ॥ ২০৬ ॥
অতীব আশ্চর্য বোধ হইল কেমন ।
প্রভুদরশনে আসে যখন তখন ॥ ২০৭ ॥
এইরূপে উপাধ্যায় কিছু দিন কাটে ।
একবার পড়িলেন দারুণ সঙ্কটে ॥ ২০৮ ॥
কি সঙ্কট কিবা
বলে পাইল উদ্ধার ।
পশ্চাৎ কহিব মন পাবে সমাচার ॥ ২০৯ ॥
রামকৃষ্ণ লীলা কিবা কহিবারে
পারি ।
অপার ভবাব্ধিজলে তরিবার তরী ॥ ২১০ ॥
তৃতীয় খণ্ড
কেশবকে বিশ্বপ্রেমের উপদেশ ও আত্মপ্রেম প্রদর্শন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
তৃতীয় খণ্ডের কথা অতি সুমধুর ।
গাইলে শুনিলে হয় মহাতম দূর ॥ ১ ॥
অনিবার্য ভবদুঃখে পেতে দিয়ে ছাতি ।
মহানন্দে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ২ ॥
সন্ন্যাসী পরমহংস সাধু ভক্ত যোগী ।
একমনে ভগবানে যাঁরা অনুরাগী ॥ ৩ ॥
থাকে দূরান্তর গৃহে কি বিজন বনে ।
সকলে প্রভুর নাম শুনে কানে কানে ॥ ৪ ॥
কি বুঝি কি আছে নামে কিসে নাম রটে ।
অগণনে দরশনে আসে ছুটে ছুটে ॥ ৫ ॥
অতিথি কখন যাঁরা না শুনেছে নাম ।
নানা দেশে নানা তীর্থে ভ্রমে অবিরাম ॥ ৬ ॥
ঘটনার চক্র কিবা জুটে পড়ে এসে ।
সাধনা-অতীত বস্তু প্রভুর সকাশে ॥ ৭ ॥
সাধনা হইতে আজি সাধুসমাগম ।
তিল অণুকণা তার কিছু নহে কম ॥ ৮ ॥
বিবিধসম্প্রদায়ভুক্ত নানাবিধ মত ।
কৃপায় সে সবাকার মিটে মনোরথ ॥ ৯ ॥
মনোরণ হয় পূর্ণ জানা যায় কিসে ।
সিদ্ধকামে মহাসুখ বদনে বিকাশে ॥ ১০ ॥
লুটাইয়া লম্বা জটা ধরে শ্রীচরণ ।
কি আর শুনিতে চাও বিশেষ লক্ষণ ॥ ১১ ॥
যে যাহা আশায় আসে সেই তাহা পায় ।
পূর্ণব্রহ্মসনাতন প্রভুর কৃপায় ॥ ১২ ॥
একদিন শ্রীকেশব শিক্ষগণসাথে ।
এসেছেন পূজ্যতম প্রভুরে দেখিতে ॥ ১৩ ॥
ভাব বুঝি নিজ ভাবে প্রভুদেব কন ।
জগতজননী শ্যামা প্রকাণ্ড কেমন ॥ ১৪ ॥
ব্রহ্মময়ীরূপ কিবা কিরূপ আকার ।
মিশায়ে তাঁহাতে আত্ম প্রেম-সমাচার ॥ ১৫ ॥
আত্মপ্রেম বিশ্বপ্রেম একই বারতা ।
সেখানে মিটেছে ভাল মন্দ দুটি কথা ॥ ১৬ ॥
ছোট-বড় লঘু-গুরু সুধা হলাহল ।
পাপ-পুণ্য পূর্ণ-শূন্য সমান সকল ॥ ১৭ ॥
জীবে শিবে সমাদর এক ঠাঁই মিশে ।
জড় কি চেতন সব বিশ্বপ্রেমে ভাসে ॥ ১৮ ॥
কহিতে কহিতে বিশ্বপ্রেমের খবর ।
নিজে তাহে ডুবিলেন প্রেমের সাগর ॥ ১৯ ॥
উথলিল মহাসিন্ধু উঠিল তুফান ।
প্রেমময় গোটা অঙ্গ নাহি অনন্ত জ্ঞান ॥ ২০ ॥
এমন সময় কিবা বিধির ঘটনা ।
দেখিলেন বৃক্ষশাখা কাটে কোন জনা ॥ ২১ ॥
দেখামাত্র আর্তনাদ হৃদি-বেদনায় ।
বদনে বলেন শুধু 'কাটে মোর মায়' ॥ ২২ ॥
বয়ষার ধারাসম দুনয়নে নীর ।
যন্ত্রণায় বিকলাঙ্গ পরান অস্থির ॥ ২৩ ॥
মাকে কাটে ব'লে নাই কান্নার অবধি ।
কাঁদিতে কাঁদিতে হৈল গভীর সমাধি ॥ ২৪ ॥
কোথায় গেলেন ডুবে বাহ্য নাহি আর ।
শ্রীকেশব সুনীরব দেখিয়া ব্যাপার ॥ ২৫ ॥
আভাস পাইল তাঁর জননী কেমন ।
আত্মপ্রেম বিশ্বপ্রেম কেমন রকম ॥ ২৬ ॥
কত প্রেমে ভরা প্রভু জননীর প্রতি ।
জগৎ ব্রহ্মাণ্ড অঙ্গ প্রেমের প্রকৃতি ॥ ২৭ ॥
তরুতে আঘাতে লাগে জননীর গায় ।
অস্থির পরান তাহে প্রভুদেব রায় ॥ ২৮ ॥
মার অঙ্গমধ্যে যেন তাঁর অঙ্গ ঢাকা ।
এ ব্যাপার কি প্রকার নাহি যায় আঁকা ॥ ২৯ ॥
পার যদি বুঝ মন এক কথা কই ।
আমার শরীর-মধ্যে আমি যেন রই ॥ ৩০ ॥
কেশব বুঝিল কিছু প্রভুরে এবার ।
চৌদ্দপোয়াধারে প্রেমে জগৎ-আকার ॥ ৩১ ॥
বুঝে নিরাকার কিসে সাকারে প্রমাণ ।
অণুকণা বিন্দু কিসে সিন্ধুর সমান ॥ ৩২ ॥
কেশবে করিলা তেন প্রভুদেব রায় ।
ছাই উড়াইয়া যেন আগুনে জাগায় ॥ ৩৩ ॥
দীপ্তিমান সমুজ্জ্বল ব্রাহ্মশিরোমণি ।
রটিতে লাগিল মেতে প্রভুর কাহিনী ॥ ৩৪ ॥
হাটে বাটে গায় তাঁর নাম সুমধুর ।
কোথাও লইয়া উক্তি কথিত প্রভুর ॥ ৩৫ ॥
সামান্য কথায় তাঁর এত বস্তু পায় ।
লিখে বলে ছয় মাস তবু না ফুরায় ॥ ৩৬ ॥
বহিরঙ্গে সারগ্রাহী কেশবের প্রায় ।
প্রভু-অবতারে আর দেখা নাহি যায় ॥ ৩৭ ॥
প্রভুবাক্যে কত দূর বুঝে বিলক্ষণ ।
সশিষ্যে সর্বদা করে প্রভু দরশন ॥ ৩৮ ॥
কখন লইয়া গিয়া আপনার ঘরে ।
দক্ষিণশহরে কভু প্রভুর মন্দিরে ॥ ৩৯ ॥
কেশবের ধর্মভাব যা ছিল প্রথমে ।
অন্তরূপ এবে মিলে শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৪০ ॥
দরশনে এলে পরে দক্ষিণশহরে ।
লইতেন ফল কিবা ফুল হাতে ক'রে ॥ ৪১ ॥
যথাভক্তিভরে দিতে শ্রীচরণে ডালি ।
সৌভাগ্য মিলিলে কেশবের পদধূলি ॥ ৪২ ॥
একদিন প্রভুদেব কেশবের ঘরে ।
ভক্তবর পুজা যত্ন যথাসাধ্য করে ॥ ৪৩ ॥
ভক্তিভরে প্রভুদেবে বলিলেন গিয়া ।
করুণা করুন বাড়ি-ভিতরে আসিয়া ॥ ৪৪ ॥
বসাইল মনোমত সুন্দর আসনে ।
রুচিপ্রিয়কর ভোজ্য খেতে দেয় এনে ॥ ৪৫ ॥
ব্রহ্মার দুর্লভ বস্তু দেখেন সকলে ।
গোষ্ঠিবর্গ পরিবার একত্রেতে মিলে ॥ ৪৬ ॥
সেবান্তে কেশবচন্দ্র প্রভুবে কন ।
আজি এক বিশেষ আমার নিবেদন ॥ ৪৭ ॥
ভবন কেমন মম দেখুন উঠিয়া ।
বাড়িমধ্যে যত ঘরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ॥ ৪৮ ॥
মনসাধ কেশবের বুঝি বিলক্ষণ ।
উঠিলেন প্রভুদেব ত্যজিয়া আসন ॥ ৪৯ ॥
কেশব কহেন আমি খাই এইখানে ।
পবিত্র করুন স্থান পরশি চরণে ॥ ৫০ ॥
স্থানান্তরে কহে পুনঃ শুই এই দেশে ।
পবিত্র করুন স্থান চরণ-পরশে ॥ ৫১ ॥
অন্য গৃহে ল'য়ে গিয়ে প্রভুরে দেখান ।
অতি নিরজন এই ধিয়ানের স্থান ॥ ৫২ ॥
পরম আনন্দ-ভোগ এখানে বসিয়া ।
পবিত্র করুন স্থান পদধূলি দিয়া ॥ ৫৩ ॥
এইরূপে প্রভুদেবে প্রতি ঘরে ঘরে ।
লইয়া কেশবচন্দ্র মনসাধে ফিরে ॥ ৫৪ ॥
কি বুঝা বুঝিয়াছিল ব্রাহ্মশিরোমণি ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ৫৫ ॥
যতগুলি জানি কেশবের ধর্মভাই ।
তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় গোসাঁই ॥ ৫৬ ॥
নবদ্বীপে গোস্বামী-বংশেতে জন্ম তাঁর ।
পূর্বপুরুষেরা সব বৈষ্ণব-আচার ॥ ৫৭ ॥
রাধাকৃষ্ণমূর্তিসেবা বার মাস ঘরে ।
বিজয়ের প্রীতি নহে জাতি দিল ছেড়ে ॥ ৫৮ ॥
বাল্যাবধি নিরাকারে বড় তাঁর টান ।
সাকারে বিকার-যুক্ত হয় মনপ্রাণ ॥ ৫৯ ॥
তাই ছাড়ি জাতিধর্ম ঠিক যুবাকালে ।
আসিয়া মিশিয়াছিল ব্রাহ্মদের দলে ॥ ৬০ ॥
প্রভুসনে কেশবের মিলন-সময় ।
প্রভুপদে ক্রমে মজে গোস্বামী বিজয় ॥ ৬১ ॥
পরিচয় বিশেষ করিয়া কব পরে ।
কি খেলিলা প্রভু তাঁয় লইয়া আসরে ॥ ৬২ ॥
দলের ভিতরে আর আছে কয়জন ।
প্রভুদেবে মাক্ত শ্রদ্ধা করে বিলক্ষণ ॥ ৬৩ ॥
একজন শ্রীমণি মল্লিক নাম তাঁর ।
দ্বিতীয় প্রতাপচন্দ্র বৈদ্য মজুমদার ॥ ৬৪ ॥
তৃতীয় ত্রৈলোক্য শর্মা চিরঞ্জীব নাম ।
অতিশয় মিষ্টকণ্ঠ সুমধুর গান ॥ ৬৫ ॥
তাঁর গানে শ্রীপ্রভুর বড়ই পিরীতি ।
বেণী পাল আর এক সিঁতিতে বসতি ॥ ৬৬ ॥
বড়ই ধনাঢ্য এক মিত্র কাশীশ্বর ।
ষষ্ঠ শ্রীগিরীশ সেন বঙ্গদেশে ঘর ॥ ৬৭ ॥
সপ্তম অমৃতলাল বসু মহাশয় ।
পবিত্রহৃদয় বহু গুণের আলয় ॥ ৬৮ ॥
প্রিয়পাত্র শ্রীপ্রভুর বড় দয়া তাঁয় ।
ভাগ্য মানি পররেণু পাইলে মাথায় ॥ ৬৯ ॥
অষ্টম যে জন সমরূপ পুণ্যবান ।
পরমপণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী নাম ॥ ৭০ ॥
ব্রাহ্মধর্মনেতা তিনি সাধক সজ্জন ।
বেদ্বোজ্জ্বলাবুদ্ধিযুক্ত প্রভুর বচন ॥ ৭১ ॥
অতিশয় উচ্চভাব প্রভুর উপরে ।
একদিন ভক্ত রাম জিজ্ঞাসিলা তাঁরে ॥ ৭২ ॥
কি প্রকার প্রভু, তাঁয় কি বুঝেন তিনি ।
উত্তরে কহিলা তাঁয় ব্রাহ্মচূড়ামণি ॥ ৭৩ ॥
সুন্দর পরমহংস হেন মহাজন ।
ধরার আইলে পরে বুঝিবে এমন ॥ ৭৪ ॥
চারি শত বর্ষাধিক এমন প্রভাব ।
জগতে না থাকে কোন ধর্মের অভাব ॥ ৭৫ ॥
সৎশুদ্ধবৃদ্ধিযুক্ত পণ্ডিতপ্রবর ।
বারে বারে বন্দি তাঁয়, কি দিলা উত্তর ॥ ৭৬ ॥
আর আর সম্ভ্রান্ত মানুষ বহু আছে ।
কেশবের সঙ্গে যান শ্রীপ্রভুর কাছে ॥ ৭৭ ॥
ব্রাহ্মধর্ম বঙ্গে এবে বড়ই প্রবল ।
মাতিয়াছে গুণী সানী যুবকের দল ॥ ৭৮ ॥
প্রভুসনে এত মিল হইল এখন ।
ব্রাহ্মেরা প্রভুরে বুঝে তাঁদের মতন ॥ ৭৯ ॥
তাহার কারণ শুন অপূর্ব কাহিনী ।
প্রভু যে আমার সেই অখিলের স্বামী ॥ ৮০ ॥
মহাভাবময় নানা ভাবের আধার ।
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে আছে যত অবতার ॥ ৮১ ॥
নানাবিধ না হইলে লীলার আসরে ।
এ লীলার রঙ্গ ভঙ্গ হয় একবারে ॥ ৮২ ॥
বহুবিধ ধর্মভাব প্রবল এখন ।
প্রভু-অবতারে ভাব সব সংরক্ষণ ॥ ৮৩ ॥
অন্যবারে এক ভেঙ্গে পুনঃ এক গড়া ।
এবার সকল ধর্ম সমন্বয় করা ॥ ৮৪ ॥
প্রভুর বচন ধর্ম যত বিদ্যমান ।
তেজে গুণে ধর্মে সত্যে সকলে সমান ॥ ৮৫ ॥
যতবিধ আছে ধর্ম এক এক মত ।
প্রত্যেকেই ভগবানে যাইবার পথ ॥ ৮৬ ॥
কেবল কথায় নয় দেখাইলা কাজে ।
প্রত্যক্ষ জলের মত সাধনার তেজে ॥ ৮৭ ॥
নানাভাবে অগণন সাধনা তাঁহার ।
সব ধর্ম সত্য কথা প্রত্যক্ষ ব্যাপার ॥ ৮৮ ॥
প্রভুর প্রতীত নহে চক্ষে না দেখিলে ।
প্রথমে প্রত্যক্ষ পরে উপদেশ চলে ॥ ৮৯ ॥
সে
হেতু লীলায় আগে সাধন-ভঞ্জন ।
প্রকাশ প্রচার পরে ভক্ত-সংজোটন ॥ ৯০ ॥
প্রভুর
প্রত্যক্ষ কিবা শুন তার ধারা ।
সাধন-ভজনে যবে উন্মত্তের পারা ॥ ৯১ ॥
পঞ্চবটতলে বসি সুরধুনি তীরে ।
বাসনা হইল দশভুজা পুজিবারে ॥ ৯২ ॥
দেবদেবী কোন মূর্তি এলে স্মৃতিপথে ।
সেইক্ষণে সেই মুর্তি আসিত সাক্ষাতে ॥ ৯৩ ॥
অলঙ্ঘ্য প্রভুর আজ্ঞা সব হাতে ধরা ।
অনাদি পুরুষ নিজে সকলের গোড়া ॥ ৯৪ ॥
লীলারূপে বিশ্বরূণ রূপের সাগর ।
উঠে ডুবে বিশ্বরূপে তাহে চরাচর ॥ ৯৫ ॥
সেই বস্তু প্রভু তাঁর আজ্ঞা কেবা ঠেলে ।
উঠলেন দশভুজা জাহ্নবীর জলে ॥ ৯৬ ॥
সমুখীন ক্রমে ক্রমে হ'য়ে অগ্রসর ।
দীনহীনবেশে যেথা লীলার ঈশ্বর ॥ ৯৭ ॥
মনোমত পুজিলেন প্রভু গুণমণি ।
নিজের গায়ের শক্তি জগতজননী ॥ ৯৮ ॥
পূজা সাঙ্গে গঙ্গাজলে উদয় যেমন ।
সেইমত দশভুজা হইল মগন ॥ ৯৯ ॥
বিষম সন্দেহোদয় হ'য়ে গেল চিতে ।
দেখা পূজা ভাবে কিবা দেখিনু সাক্ষাতে ॥ ১০০ ॥
ভাবিতে ভাবিতে হেন পান দেখিবারে ।
দেবীর চরণচিহ্ন ধূলার উপরে ॥ ১০১ ॥
তবে না সুস্থির প্রাণ হইল প্রভুর ।
প্রভুর প্রত্যক্ষ কথা শুন কত'দূর ॥ ১০২ ॥
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত কথা শুন শুন মন ।
পুজারী ব্রাহ্মণবেশে শ্রীপ্রভু যখন ॥ ১০৩ ॥
পূজা সেবা শ্যামার করেন শ্রীমন্দিরে ।
একদিন ভয়ঙ্কর সন্দেহ অন্তরে ॥ ১০৪ ॥
পাষাণ মুরতি শ্যামা পাষাণে গঠিত ।
জীবন্ত হইলে পরে চেতনা থাকিত ॥ ১০৫ ॥
শ্যামা মায়ে সচেতন করিব বিশ্বাস ।
যদ্যপি দেখিতে পাই নাসায় নিঃশ্বাস ॥ ১০৬ ॥
এত বলি তুলা ল'য়ে ধরিলা নাসায় ।
দুলু দুলু গুলে তুলা নিঃশ্বাসের বায় ॥ ১০৭ ॥
কার্যগত পরীক্ষা করিয়া এতদূর ।
তবে না বিশ্বাস হৃদে বসতি প্রভুর ॥ ১০৮ ॥
অগণ্য প্রত্যক্ষ তাঁর অগণ্য সাধনে ।
নাহি হেন কিছু যাহা প্রভু নাহি জানে ॥ ১০৯ ॥
প্রভুদেব মহাবিজ্ঞ কৃষাণের প্রায় ।
সে ভাবের কথা তথা যে ভাব যেথায় ॥ ১১০ ॥
নানাবিধ দ্রব্যে আছে উর্বরতা-বল ।
কার মূলে কিবা দিলে ফলিবে ফসল ॥ ১১১ ॥
কৃষাণ যেমন পাকা বিশেষ বুঝিতে ।
প্রভুদেব ঠিক তাই ধরনের ক্ষেতে ॥ ১১২ ॥
যেই ভাবরসে যারে করে পুষ্টিকর ।
সে মূলে ঢালেন তাই রসের সাগর ॥ ১১৩ ॥
সেই হেতু যত ধর্মপন্থী ভূমণ্ডলে ।
শ্রীপ্রভুদেবের সঙ্গে সকলের মিলে ॥ ১১৪ ॥
আপনা আপন পুষ্টিকর দ্রব্য পায় ।
শ্রীপ্রভুদেবের কাছে যে আসে আশার ॥ ১১৫ ॥
ধরা দিতে কিন্তু প্রভু বড়ই চতুর ।
তবু সবে বুঝে তিনি তাঁদের ঠাকুর ॥ ১১৬ ॥
প্রভুপদে যথাসাধ্য রাখি রতি মতি ।
শুন মন শ্রীপ্রভুর লীলাগুণ-গীতি ॥ ১১৭ ॥
সকলের কাছে তিনি আত্মীয় তাঁহার ।
কোথাও না দেখি হেন ঠাকুর মজার ॥ ১১৮ ॥
তৃতীয় খণ্ড
রামের দীক্ষা ও সুরেন্দ্র মিত্রের আগমন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এখানে ভবনে রাম শ্রীমনোমোহন ।
চিরগ্রভু শ্রীপ্রভুরে করি দরশন ॥ ১ ॥
এতদূর মুগ্ধ মন চিন্তে নিরন্তর ।
কবে হবে রবিবার পাব অবসর ॥ ২ ॥
দক্ষিণশহরে যাব প্রভু-দরশনে ।
সাক্ষাৎ ত্রিতাপহর পতিতপাবনে ॥ ৩ ॥
এত শশব্যস্ত কেন বুঝেছ কি মন ।
অন্তরঙ্গ চিরসঙ্গ ভক্তের লক্ষণ ॥ ৪ ॥
একবার দরশনে মন-প্রাণ মজে ।
অপরূপ শ্রীপ্রভুর চরণপঙ্কজে ॥ ৫ ॥
বুঝে নাহি মজে, মজে কিসে বলা দায় ।
যে মজে সে মজে মাত্র দর্শন-আশায় ॥ ৬ ॥
রবিবার এলে পরে পেলে অবসর ।
দু'ভায়ে করিল যাত্রা দক্ষিণশহর ॥ ৭ ॥
সমাদর করি প্রভু ভাই দুই জনে ।
বলাইতে যান খাটে নিজের আসনে ॥ ৮ ॥
একদিন দরশনে এত ভক্তি উঠে ।
নীচাসনে বসিলেন না বসিয়া খাটে ॥ ৯ ॥
বলিলেন রামচন্দ্র কথায় কথায় ।
ঈশ্বর আছেন যদি থাকেন কোথায় ॥ ১০ ॥
রামের নাস্তিক ভাব চিতে গাঢ়তর ।
কিছুতে স্বীকার নহে আছেন ঈশ্বর ॥ ১১ ॥
রসায়নবিদ্যাবিৎ তর্কেতে আগুন ।
বিশেষ বুঝেন জড় দ্রব্যাদির গুণ ॥ ১২ ॥
নানা কথা শুনি প্রভু করিলা উত্তর ।
আছেন কি কহ কথা প্রত্যক্ষ ঈশ্বর ॥ ১৩ ॥
যদ্যপিহ নাহি পাও তাঁহারে দেখিতে ।
নাই তিনি ব'ল তুমি কোন্ যুক্তিমতে ॥ ১৪ ॥
নক্ষত্র না হয় দৃষ্ট দিনের বেলায় ।
আকাশে নক্ষত্র নাই কহা মহাদায় ॥ ১৫ ॥
নবনীত আছে কত দুধের ভিতরে ।
সবে জানে, যদি কথা নাহি ঢুকে শিরে ॥ ১৬ ॥
দুধ ল'য়ে কর ক্রিয়া রীতি যে রকম ।
অবশ্য দেখিতে পাবে সুন্দর মাধম ॥ ১৭ ॥
বিষে ঘেরা অঙ্গ গোটা সর্পের দংশনে ।
এক পলে উড়ে যেন মন্তরের গুণে ॥ ১৮ ॥
তেমনি প্রভুর বাক্য মন্ত্র-মহৌষধি ।
উড়ায় রামের চির-নাস্তিকতা-ব্যাধি ॥ ১৯ ॥
জানি না কি গুণ খেলে প্রভুর কথায় ।
উজানে আছিল রাম পড়িল ভাটায় ॥ ২০ ॥
আগেকার অপেক্ষা সহস্রগুণ তোড়ে ।
সিন্ধু-মুখে বড় টান যবে ফিরে ঘরে ॥ ২১ ॥
বিশ্বাস প্রভুর বাক্যে এতই প্রবল ।
ঈশ্বর দেখিতে রাম হইল পাগল ॥ ২২ ॥
পুনশ্চয় প্রভুদেবে ভক্ত রাম কয় ।
কিছু না দেখিতে পেলে না হয় প্রত্যয় ॥ ২৩ ॥
সত্য আপনার কথা আমাদের ভ্রম ।
কি করি উপায় নাই বলহীন মন ॥ ২৪ ॥
প্রভুর উত্তর রোগী সন্নিপাতে ঘেরা ।
খেয়ালে কতই কয় পাগলের পারা ॥ ২৫ ॥
খাইবারে চায় হাঁড়ি হাঁড়ি ডাল ভাত ।
কবিরাজ-কথায় না করে কর্ণপাত ॥ ২৬ ॥
যদ্যপি বিষম জ্বর আজ ফুটে গায় ।
কাল কুইনাইনের ব্যবস্থা কোথায় ॥ ২৭ ॥
জ্বরের জ্বালায় যদি রোগী চায় খেতে ।
কাজে পাকা কবিরাজ নাহি দেয় দিতে ॥ ২৮ ॥
দিন গতে রস পাক হইলেক পর ।
সে ব্যবস্থা নিজে করে আপুনি ডাক্তার ॥ ২৯ ॥
শুন মন এইখানে বলি এক কথা ।
প্রভুদেব দেখ কি রকম শিক্ষাদাতা ॥ ৩০ ॥
যে বিষয় ভালরূপে আছে যার জানা ।
তাহাতেই যেন তিনি শিক্ষার উপমা ॥ ৩১ ॥
রামচন্দ্র সুন্দর ডাক্তার একজন ।
বড় দক্ষ বুঝিবারে শাস্ত্র রসায়ন ॥ ৩২ ॥
তাই প্রভু লইলেন কথোপকথনে ।
ভৈষজ্য ভিষক রোগী উপমার স্থানে ॥ ৩৩ ॥
ত্বরায় পশিবে যায় শিক্ষার্থীর মন ।
সৃষ্টিছাড়া শিক্ষাদাতা প্রভু নারায়ণ ॥ ৩৪ ॥
শ্রীপ্রভুর কাছে আসে যত শাস্ত্রবিৎ ।
তাঁর জানা-শাস্ত্রে কণা তাঁহার সহিত ॥ ৩৫ ॥
রামের হৃদয়ে উঠে অশান্তি জঞ্জাল ।
সদা ভাবে কবে পাবে হরির নাগাল ॥ ৩৬ ॥
প্রভুদেবে দরশন করিবার আগে ।
আছিল অশান্তি বড় ত্রিতাপের লেগে ॥ ৩৭ ॥
সেই অশান্তির মূর্তি পুনঃ জাগরণ ।
সুখার্থে পূর্বেতে, এবে হরির কারণ ॥ ৩৮ ॥
হাতে পায়ে করে কাজ মন হরি খুঁজে ।
কাজেই চঞ্চল চিত্ত সংসারের কাজে ॥ ৩৯ ॥
দু'ভায়ের সমাবস্থা রহে একত্তর ।
সংসারের কার্যান্তে পাইলে অবসর ॥ ৪০ ॥
দারা কন্যা পরিবারে নাহি বলে মন ।
ছিল যেন দোহাকার পূর্বের মতন ॥ ৪১ ॥
পাইলে ছুটির দিন যান ছুটে ছুটে ।
পরাশান্তিদাতা প্রভুদেবের নিকটে ॥ ৪২ ॥
আনন্দ
কতই তাঁর কাছে যতক্ষণ ।
বিষদ অশান্তি-বোধ আইলে ভবন ॥ ৪৩ ॥
ঘরে ঘরে কানাকানি করে মহাখেদ ।
প্রভুদরশনে নিবারণে করে জেদ ॥ ৪৪ ॥
একদিন শুন কিবা অবাক্ কাহিনী ।
মনোমোহনের এক পিসী ঠাকুরানী ॥ ৪৫ ॥
বুঝাইয়া নানামতে কহিল তাঁহারে ।
নিষেধি তোমার যেতে দক্ষিণশহরে ॥ ৪৬ ॥
এখন কথায় আর কার যায় কান ।
সময়ে হয়েছে হেথা শ্রীপ্রভুর টান ॥ ৪৭ ॥
এ টান বিষম টান বাধা নাহি মানে ।
সে বুঝেছে আঁতে আঁতে যে পড়েছে টানে ॥ ৪৮ ॥
পরদিনে শ্রীপ্রভুর দরশনে দেখে ।
ম্রিয়মাণ ভগবান বারিধারা চোখে ॥ ৪৯ ॥
ক্ষুব্ধপ্রাণে ভগবানে শ্রীমনোমোহন ।
কাতরে জিজ্ঞাসা করে কান্নার কারণ ॥ ৫০ ॥
জড়িত জড়িত ভাবে দয়ার সাগর ।
বলিলেন আর বাছা কি দিব উত্তর ॥ ৫১ ॥
প্রিয়তম ভক্ত কোন প্রাণের সমান ।
কখন কখন আসে মম বিদ্যমান ॥ ৫২ ॥
পিসী তার মহামার কত করে ঘরে ।
নিবারিতে ভক্তজনে হেথা আসিবারে ॥ ৫৩ ॥
তাই বাছা বড় দুঃখে ঝুরে দু'নয়ন ।
কি জানি যদি না আসে শুনিয়া বারণ ॥ ৫৪ ॥
ভক্তচূড়ামণি শুনি শ্রীবাণী প্রভুর ।
অন্তরে পাইল বড় যাতনা প্রচুর ॥ ৫৫ ॥
কথায় না খুলে কথা ভাবে মনে মনে ।
কি দয়া কাঁদেন প্রভু আমার কারণে ॥ ৫৬ ॥
বিশেষিয়া প্রাণপণে কর্তব্য প্রয়াস ।
বিকাইয়া শ্রীচরণে হ'তে হবে দাস ॥ ৫৭ ॥
সে দিন হইতে ভক্ত শ্রীমনোমোহন ।
বুঝিলেন বিধিমতে কে তাঁর আপন ॥ ৫৮ ॥
পরম আত্মীয় প্রভু এই মনে করি ।
ছিঁড়িতে লাগিল মনে সংসারের ডুরি ॥ ৫৯ ॥
এ দিকে পাগলসম ভক্ত দত্ত রাম ।
কোথায় কিরূপে মিলে হরির সন্ধান ॥ ৬০ ॥
সকাতরে একদিন প্রভুদেবে কম ।
সাক্ষাতে হরির কবে পাব দরশন ॥ ৬১ ॥
দেখ মন ধরা নাহি দিলে কিবা ঘটে ।
জলে আছে জল খায় পিপাসা না মিটে ॥ ৬২ ॥
সাধের গলার হার জড়ান গলায় ।
ভ্রমে বুলে ভূমণ্ডল খুঁজিয়া না পায় ॥ ৬৩ ॥
প্রভুদেব দেখি ভক্তে কাতর অন্তর ।
করিলেন শান্তিভরা করুণ উত্তর ॥ ৬৪ ॥
বড় বড় মাছে পূর্ণ সরসীর তীরে ।
মেছুয়াল যদি শুধু মাছ মাছ করে ॥ ৬৫ ॥
উচাটন মন যেন পাগলের পারা ।
তাহে না কখন হয় পনামাছ ধরা ॥ ৬৬ ॥
পনামাছ ধরিবার বাসনা হইলে ।
বসিতে হইবে তীরে চার জলে ফেলে ॥ ৬৭ ॥
দিন দিন কিছু দিন জলে দিলে চার ।
তবে না হইবে তথা মাছের সঞ্চার ॥ ৬৮ ॥
চারেতে বসিলে মাছ টোপ নাহি খায় ।
চারের চৌদিকে গন্ধে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ৬৯ ॥
কভু দেয় ফুট কভু পাক দিয়া বুলে ।
তা দেখিয়া চারে মাছ বুঝে মেছুয়ালে ॥ ৭০ ॥
একদৃষ্টে একমনে থাকে নিরখিয়া ।
ক্রম করি বড় ছিপ দু' হাতে ধরিয়া ॥ ৭১ ॥
সৌরভী সুন্দর টোপ গাঁথিয়া কাঁটায় ।
তবে কিছু পরে তার পনামাছ খায় ॥ ৭২ ॥
সেইরূপ সাধুবাক্যে করিয়া বিশ্বাস ।
প্রাণে গেঁথে নাম-টোপ করহ প্রয়াস ॥ ৭৩ ॥
হৃদি ভরা ধৈর্য ল'য়ে ভক্তি-চার দিবে ।
তবে না বৃহৎ মাছ শ্রীহরি ধরিবে ॥ ৭৪ ॥
এত শুনি প্রভুবাক্যে রাম মহামতি ।
চৈতন্যচরিতামৃত পড়ে নিতি নিতি ॥ ৭৫ ॥
পাঠ-সাঙ্গে করে হরি-সংকীর্তন ।
সব কাজে সঙ্গে দাদা শ্রীমনোমোহন ॥ ৭৬ ॥
চৈতন্তচরিত পাঠে হয় এই ফল ।
রাম দেখে শ্রীচৈতন্য প্রভু অবিকল ॥ ৭৭ ॥
সেকালে আছিল শ্রীচৈতন্য নাম রাষ্ট্র ।
এই অবতারে নাম প্রভু রামকৃষ্ণ ॥ ৭৮ ॥
বস্তুতে লীলাতে ভেদ না পড়ে নয়নে ।
আকারে প্রভেদ মাত্র আর ভেদ নামে ॥ ৭৯ ॥
চৈতন্যের নামে দেখে প্রভুর মুরতি ।
বার্তা না বুঝিতে পারে দত্ত মহামতি ॥ ৮০ ॥
আর
দিন রামচন্দ্র শ্রীমনোমোহনে ।
ডাকিলেন দ্বারদেশে তাঁহার ভবনে ॥ ৮১ ॥
প্রভু-দরশনে
যেতে দক্ষিণশহর ।
শুন মন কিবা কথা হৈল অতঃপর ॥ ৮২ ॥
মিত্রের ঘরণী বড় বিরক্ত তাঁহায় ।
নন্দিনীর জ্বর পীড়া ফুটিয়াছে গায় ॥ ৮৩ ॥
পতিরে নিষেধ তাই করে বারে বারে ।
যাইতে না পাবে আজি দক্ষিণশহরে ॥ ৮৪ ॥
বড়ই লাগিল কথা মিত্রের পরানে ।
বেদনায় বারিধারা ঝরে দু'নয়নে ॥ ৮৫ ॥
বেগবতী বলব্তী এতই তখন ।
বাহিরিল রমণীর না শুনি বারণ ॥ ৮৬ ॥
বরষার জলে ভরা তটিনীর প্রায় ।
বাঁধ ভেড়ি ভেঙ্গে চলে রাখা নাহি যায় ॥ ৮৭ ॥
তেমতি চলিল মিত্র সঙ্গে ভাই রাম ।
গোটা পথ চক্ষে জল ঝরে অবিরাম ॥ ৮৮ ॥
একাকী আমার নয় কেবল সংসারে ।
পতির দুর্গতি অতি প্রতি ঘরে ঘরে ॥ ৮৯ ॥
অবিদ্যারূপিণী নারী ধর্মমারা রীতি ।
শুধু খুঁজে আত্মসুখ থাক যাক্ পতি ॥ ৯০ ॥
প্রকৃতি স্বভাবে জাতি পিশাচী সমান ।
পতির শোণিতপানে পিপাসা মিটান ॥ ৯১ ॥
নাম সহধর্মিণী এমন রমণীর ।
জানি না কি গুণে কেবা করিল বাহির ॥ ৯২ ॥
ভরি ভরি ফাঁকি খাদে কথার গড়ন ।
বিনা বনিয়াদে করে দেউল রচন ॥ ৯৩ ॥
ধর্মনাশী কর্মনাশী কুহকের জোরে ।
গরল-আদানে হৃদিরত্নধন হরে ॥ ৯৪ ॥
চিরকাল তরে করে দাসী ব'লে দাস ।
শাবাশ মোহিনী তোরে শাবাশ শাবাশ ॥ ৯৫ ॥
কায়াগত মায়াশক্তি এত বহে জোর ।
পুরুষ পশুর প্রায় কুহকে বিভোর ॥ ৯৬ ॥
প্রার্থনা তা কর নারী মনে যেন শখ ।
পতির না হবে হরি পথের কণ্টক ॥ ৯৭ ॥
দেহ শক্তি প্রভুদেব বিপদ-বারণ ।
রমণীর হাতে যেন না হয় মরণ ॥ ৯৮ ॥
উভরিয়া দুই জনে শ্রীপ্রভু যথায় ।
বিষণ্ণবদন ভাবি দেখিল তাঁহায় ॥ ৯৯ ॥
অবিরল অশ্রুজল বক্ষ বিগলিয়া ।
রক্তিম নয়নন্বয় কাঁদিয়া কাঁদিয়া ॥ ১০০ ॥
করজোড়ে জিজ্ঞাসিল শ্রীমনোমোহন ।
কেন দেখি হেন প্রভু বিষণ্ণবদন ॥ ১০১ ॥
উত্তরিলা প্রভুদেব শোকার্ত বচনে ।
আর বাছা হেতু-কথা জিজ্ঞাসিছ কেনে ॥ ১০২ ॥
হরি-তত্ত্ব-পিয়াসী ভকত এক জন ।
আমার নিকটে আসে কখন কেমন ॥ ১০৩ ॥
যথা তথা মোর কথা ল'য়ে মত্ত থাকে ।
সে কারণে রমণী তাঁহারে ঘরে বকে ॥ ১০৪ ॥
কহিতে দুঃখের কথা ফেটে যায় ছাতি ।
ধরাধামে ধরনের বড়ই দুর্গতি ॥ ১০৬ ॥
ধর্মপথে পতি গেলে পত্নী দেয় হানা ।
অপরের কিবা দোষ যদি করে মানা ॥ ১০৭ ॥
পাছে বাছা রমণীর শুনে নিবারণ ।
তাই মনোবেদনার ঝুরে দু'নয়ন ॥ ১০৮ ॥
স্মরিরা প্রভুর মুর্তি দেখহ বুঝিয়া ।
কি করিলা প্রভুদেব আপনি কাঁদিয়া ॥ ১০৯ ॥
ধুয়াইলা একেবারে নয়নের জ্বলে ।
তত্ত্বের সংসারাসক্তি কূট হলাহলে ॥ ১১০ ॥
ভকত জীবন প্রভু ভক্তপ্রীতে প্রিয় ।
আত্মীয় অপেক্ষা তিনি পরম আত্মীয় ॥ ১১১ ॥
অকৃত্রিম স্নেহ বুঝে শ্রীমনোমোহন ।
ধরায় যদ্যপি কেহ আছয়ে আপন ॥ ১১২ ॥
মুখপানে চান যার মুখপানে চাই ।
ঠাকুর কেবল একা অন্য কেহ নাই ॥ ১১৩ ॥
চৈতন্য-চরিত-পাঠকালে ভক্ত রাম ।
শ্রীচৈতন্য প্রভুদেবে কৈলা অনুমান ॥ ১১৪ ॥
শুন
মন অনুমান কিলের কারণ ।
বিশ্বাস গুলিয়া দেয় সন্দেহ পবন ॥ ১১৫ ॥
আন্দোলন মনে কথা হয় নিরন্তর ।
ভক্ত-ভগবানে গেলা বড়ই সুন্দর ॥ ১১৬ ॥
একদিন রামচন্দ্র দক্ষিণশহরে ।
তাঁরে বলিলেন প্রভু নাহি যাবে ঘরে ॥ ১১৭ ॥
আমার মন্দিরে রাতি করহ যাপন ।
ভক্তের পরমানন্দ শুনি শ্রীবচন ॥ ১১৮ ॥
দিনান্তে আইল সন্ধ্যা অন্ধকার সাজে ।
পুরীমধ্যে আরতির শাঁক ঘণ্টা বাজে ॥ ১১৯ ॥
আপন মন্দিরে হেথা প্রভু ভগবান ।
উপবিষ্ট একধারে ভক্তবর রাম ॥ ১২০ ॥
প্রভুর প্রশান্ত কায়া সুঠাম সুন্দর ।
একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করে ভক্তবর ॥ ১২১ ॥
কিছু পরে বলিলেন শ্রীপ্রভু তাঁহারে ।
কিবা দেখিতেছ রাম এত লক্ষ্য ক'রে ॥ ১২২ ॥
দেখিতেছি আপনারে, রামের উত্তর ।
সুঠাম মোহন-যুতি পরম সুন্দর ॥ ১২৩ ॥
পুনশ্চ দ্বিতীয় প্রশ্ন হয় পরক্ষণে ।
আমারে দেখিয়া তুমি বুঝ কিবা মনে ॥ ১২৪ ॥
রাম বলিলেন প্রভু চৈতন্য আপনি ।
প্রভু বলিলেন হেন বলিত ব্রাহ্মণী ॥ ১২৫ ॥
শ্রীবাণী শুনিয়া রাম সে দিন হইতে ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিরূপ পাইলা দেখিতে ॥ ১২৬ ॥
প্রতিরূপ কি প্রকার কিরূপ বুঝিলে ।
চাঁদ যেন সরসীর তরঙ্গিত জলে ॥ ১২৭ ॥
দেখি দেখি ধরি ধরি দেখা ধরা যায় ।
দিনরাতি যায় যেখা ধরার আশায় ॥ ১২৮ ॥
যাবতীয় আছে প্রাণী সৃষ্টির ভিতর ।
সকলে সমান চক্ষে দেখেন ঈশ্বর ॥ ১২৯ ॥
যদিও প্রাণীর মধ্যে ভক্তগণ তাঁর ।
তবু নহে প্রাণী তাঁরা স্বতন্ত্র প্রকার ॥ ১৩০ ॥
সমভাবে সকলেই সৃজিত পালিত ।
জীয়ন্তে ঘুমন্ত প্রাণী ভক্ত জাগরিত ॥ ১৩১ ॥
বিশেষ বুঝিতে সাধ যদি থাকে মন ।
ভাগবতলীলাগ্রন্থ করহ শ্রবণ ॥ ১৩২ ॥
ভক্তসঙ্গে খেলা তাঁর বড়ই মধুর ।
স-মনে শুনিলে হয় তম-ঘুম দূর ॥ ১৩৩ ॥
আগে ছিল যেই রাম এবে তাই ঠিক ।
প্রভেদ নাস্তিক আগে এখন আস্তিক ॥ ১৩৪ ॥
আস্তিকের মধ্যে দেখ আছে দু'প্রকার ।
কেহ কেহ নিরাকার কেহ বা সাকার ॥ ১৩৫ ॥
রামের সাকার ভাব এতই প্রবল ।
দিবাবিভাবরী হরি ধরিতে পাগল ॥ ১৩৬ ॥
হরিও তেমতি ধরা না দেন পাগলে ।
লুকান জলের মধ্যে ফুট দিয়া জলে ॥ ১৩৭ ॥
চারেতে প্রত্যক্ষ মাছ দেখে ভক্ত রাম ।
কিন্তু কোনমতে নাহি পুরে মনস্কাম ॥ ১৩৮ ॥
শুন মন একমনে মধ্যে কি ব্যাপার ।
গুরুস্থানে দীক্ষা বাকি অদ্যাপিহ তাঁর ॥ ১৩৯ ॥
রামের প্রতিক্ষা দীক্ষা নহে কার ঠাঁই ।
লইব যদ্যপি দেন আপনি গোসাঁই ॥ ১৪০ ॥
প্রভুর না ছিল রীতি দীক্ষা দিতে কারে ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু পড়িলেন ফেরে ॥ ১৪১ ॥
ভক্তের বাসনা যেন পুরাইতে তাই ।
আপন আইনে বন্ধ আপনি গোসাঁই ॥ ১৪২ ॥
দুকূল বজায় বিধি ভাবি নিজ মনে ।
ভক্ত রামে দীক্ষা দিলা স্বপনে স্বপনে ॥ ১৪৩ ॥
আনন্দের ওর নাই ভক্ত-চূড়ামণি ।
প্রভুরে বিদিত কৈল স্বপন-কাহিনী ॥ ১৪৪ ॥
বলিলেন রামে তব ভাগ্যসীমা নাই ।
স্বপ্নসিদ্ধ যেই জন মুক্তি তার ঠাঁই ॥ ১৪৫ ॥
নিতি নিতি যথাকালে আদেশানুসারে ।
স্বপ্নে প্রাপ্ত মন্ত্র রামচন্দ্র জপ করে ॥ ১৪৬ ॥
প্রভুর প্রকটকাল বসন্তের প্রায় ।
ভক্তি লোভে ভক্ত-অলি গুঞ্জরিয়া ধায় ॥ ১৪৭ ॥
ঝাঁকে ঝাঁকে চারিদিকে সৌরভ পাইয়া ।
শ্রীসুরেন্দ্র মিত্র এক জুটিল আসিয়া ॥ ১৪৮ ॥
জাতিতে কায়স্থ তেঁহ গোউর বরন ।
বয়সে ত্রিদশ বর্ষ কিংবা কিছু কম ॥ ১৪৯ ॥
বিশেষ সঙ্গতিপন্ন মুচ্ছুদ্দী অফিসে ।
তিন-চারি শত টাকা আয় মাসে মাসে ॥ ১৫০ ॥
মহাবলীয়ান তিনি বীরের আকৃতি ।
সুরাপানে সুরেন্দ্রের বড়ই পিরীতি ॥ ১৫১ ॥
সহজে প্রতীয়মান চেহারা দেখিলে ।
মুর্তিমতী সরলতা যেন তার খেলে ॥ ১৫২ ॥
বাহ্যেতে কর্কশ কিছু, হৃদয় কোমল ।
মদমত্ত মাতঙ্গের মত মনে বল ॥ ১৫৩ ॥
ধর্মপথে মতিহীন অপক্ক বয়েস ।
সাধুভক্তে নাই এবে ভক্তিমাত্র লেশ ॥ ১৫৪ ॥
কালের ধরন যেন সেইরূপ ধারা ।
তথাপি অহিন্দু-জ্ঞানে নাহি যেত ধরা ॥ ১৫৫ ॥
প্রভু-ভক্ত তাঁর কোন পরিচিত জন ।
প্রসঙ্গে প্রভুর কথা কৈল উত্থাপন ॥ ১৫৬ ॥
শুনিয়া পরমহংস শ্রীপ্রভুর নাম ।
শ্রীসুরেন্দ্র উপহাস করিয়া উড়ান ॥ ১৫৭ ॥
বন্ধু তার বার বার করিয়া মিনতি ।
বলিলেন একবার দেখিতে কি ক্ষতি ॥ ১৫৮ ॥
গেল ত জীবন গোটা বিবিধ খেয়ালে ।
তাহাতে না হয় আর এক দিন দিলে ॥ ১৫৯ ॥
নানা মতে বুঝাইয়া করিল সম্মত ।
যাইবার দিন বন্ধু করে নির্ধারিত ॥ ১৬০ ॥
সুরেন্দ্রের এ সময় অবস্থা কেমন ।
বিশেষিয়া বিবরিয়া বলি শুন মন ॥ ১৬১ ॥
প্রজ্বলিত
মর্মান্তিক যাতনা অন্তরে ।
তাহার কারণ কিছু নারি কহিবারে ॥ ১৬২ ॥
জঠর-অনল-পাশে জীবের জনম ।
প্রাণান্তেও তাপের না থাকে কিছু কম ॥ ১৬৩ ॥
তার মধ্যে ছোট বড় রহে তুলনায় ।
সুরেন্দ্রের বড় দুঃখ প্রাণ যায় যায় ॥ ১৬৪ ॥
যাতনা হইতে পরিত্রাণের কারণ ।
বিষপানে প্রাণ নষ্ট করিয়াছে পণ ॥ ১৬৫ ॥
আয়োজন নানাবিধ ভিতরে ভিতরে ।
কেহ নাহি জানে কুড়ি কুড়ি লোক ঘরে ॥ ১৬৬ ॥
মরণ একান্ত পণ যায় যায় প্রাণ ।
এমন সময় হৈল শ্রীপ্রভুব টান ॥ ১৬৭ ॥
নির্ধারিত দিনে হেথা সঙ্গে বন্ধুবর ।
সুরেন্দ্র গমন করে দক্ষিণশহর ॥ ১৬৮ ॥
সাধুভক্তে ভক্তিহীন পথে করে মনে ।
ভূড়ি মেরে উড়াইবে প্রভু ভগবানে ॥ ১৬৯ ॥
উত্তরিল শুভক্ষণে নির্ভীক অন্তর ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু প্রভুর গোচর ॥ ১৭০ ॥
প্রভুরে প্রণাম নাই বসিলেন গিয়া ।
শ্রীমন্দিরে একধারে বুক ফুলাইয়া ॥ ১৭১ ॥
ঈষৎ আবেশ অঙ্গে প্রভু নারায়ণ ।
নানাবিধ ঈশ্বরীয় ভক্তি-কথা কন ॥ ১৭২ ॥
মোহন মুরতি দেখি উক্তি শুনি তাঁর ।
ঘুরে গেল সুরেন্দ্রর মন আগেকার ॥ ১৭৩ ॥
আস্ফালনে উচ্চারণে শক্তি নাহি ঘটে ।
মন্ত্রমুগ্ধসর্প সম নিশ্চল নিকটে ॥ ১৭৪ ॥
সঠিকের ন্যায় জাদু জাদুকর খেলে ।
যে না দেখিয়াছে জাদু সে যেমন বলে ॥ ১৭৫ ॥
সকল ধরিয়া দিব জাদুর কৌশল ।
কিন্তু দেখে হয় যেন হারা বুদ্ধিবল ॥ ১৭৬ ॥
তেমতি সুরেন্দ্রচন্দ্র বিমুগ্ধ এখন ।
পুতুলের সম নাই বদনে বচন ॥ ১৭৭ ॥
সর্বঘটবার্তাবিৎ প্রভু পরমেশ ।
ক্রমশঃ কহেন কত উক্তি উপদেশ ॥ ১৭৮ ॥
এক উক্তি সুরেন্দ্রের বড় প্রাণে লাগে ।
জীবনের গোটা স্রোত ফিরে সেই দিকে ॥ ১৭৯ ॥
কিবা উপদেশ ফল কি ফলিল তায় ।
বুঝিলে চৈতন্য খেলে পাষাণের গায় ॥ ১৮০ ॥
এ তো ভক্ত আপনার হৃদয় উর্বরা ।
লীলার আসরে আছে শক্তি বন্ধ করা ॥ ১৮১ ॥
প্রশ্ন নাই কন প্রভু আপনার মনে ।
মানুষে বিড়াল ছানা নাহি হয় কেনে ॥ ১৮২ ॥
বিড়াল-শাবকে কিবা স্বভাব সুন্দর ।
মায়ের উপরে করে সম্পূর্ণ নির্ভর ॥ ১৮৩ ॥
ভালমন্দ স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
সেখানে সে থাকে তার মা রাখে যেখানে ॥ ১৮৪ ॥
কিন্তু দেখি সকলের স্বেচ্ছাচার রীতি ।
বানর-শাবক সম স্বভাব প্রকৃতি ॥ ১৮৫ ॥
বানর-শাবকে রহে রীতি স্বতন্তর ।
সর্বদা স্বাধীন ভাব মায়ে নাই ভর ॥ ১৮৬ ॥
বড়ই পশিল উক্তি সুরেন্দ্রের প্রাণে ।
মা রাখে যেথার আমি রব সেইখানে ॥ ১৮৭ ॥
কেন বিষপানে প্রাণ দিব বিসর্জন ।
দেখি না মায়ের কাণ্ড রাখে কি রকম ॥ ১৮৮ ॥
অবসান সেই দিন সন্ধ্যাপ্রায় হয় ।
শহরে ফিরিতে হবে সুদূর আলয় ॥ ১৮৯ ॥
বন্ধুসহ শ্রীসুরেন্দ্র বিদায়ের কালে ।
পদধূলি ল'য়ে লুটে প্রভু-পদতলে ॥ ১৯০ ॥
পুনরায় এস বলি প্রভুদেব রায় ।
সেই দিনে দুইজনে দিলেন বিদায় ॥ ১৯১ ॥
বন্ধুসহ ঘরে গেল সুরেন্দ্র এখন ।
কিন্তু শ্রীপ্রভুর কাছে পাছু আছে মন ॥ ১৯২ ॥
আগাগোড়া দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর রীতি ।
ভক্তমন চুরি করা স্বভাব প্রকৃতি ॥ ১৯৩ ॥
সুস্থির সুরেন্দ্র নয় কহে বন্ধুবরে ।
সত্বর যাইতে হবে দক্ষিণশহরে ॥ ১৯৪ ॥
প্রভুর প্রসঙ্গে মত্ত রহে নিরন্তর ।
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী কহে বন্ধুবর ॥ ১৯৫ ॥
সকল বিদিত তাঁর যে যা ভাবে বলে ।
বাসনা যেমন যায় ঠিক তাই ফলে ॥ ১৯৬ ॥
পরীক্ষা করিয়া তত্ত্ব বুঝিবার তরে ।
প্রভুরে সুরেন্দ্র স্মরে আপনার ঘরে ॥ ১৯৭ ॥
কিছুক্ষণ পরে তিনি দেখিবারে পান ।
ভবনে হাজির তাঁর প্রভু ভগবান ॥ ১৯৮ ॥
এইরূপে তিনবার পরীক্ষার পর ।
সুরেন্দ্রের প্রভুপদে পড়িল নির্ভর ॥ ১৯৯ ॥
এখন তখন যান দক্ষিণশহরে ।
না দেখিয়া প্রভুদেবে থাকিতে না পারে ॥ ২০০ ॥
ক্রমে ক্রমে ভক্তবর গেল বড় মজে ।
সুধাভরা শ্রীপ্রভুর চরণপঙ্কজে ॥ ২০১ ॥
গেল পূর্বতন ভাব এখন উন্নতি ।
নিত্য পুজে ইষ্টদেবী কালীর মুরতি ॥ ২০২ ॥
মার নামে হৃদি ভরে ভক্তিভরে কাঁদে ।
পাইয়া পরম বস্তু প্রভুর প্রসাদে ॥ ২০৩ ॥
জন্ম জন্ম মাথা দিয়া করিলে ভজন ।
যেই মহাগোপ্য ভক্তি না হয় অর্জন ॥ ২০৪ ॥
দুই দিন এলে গেলে প্রভুর গোচর ।
তাই যেন প্রভুদেব না হন কাতর ॥ ২০৫ ॥
যারে যেন তিনি তাঁর আপনার জন ।
যেখানে সেখানে নহে ভক্তি-বিতরণ ॥ ২০৬ ॥
অগণন লোক যায় প্রভুর নিকটে ।
সকলের ভাগ্যে এই ভক্তি নাহি ঘটে ॥ ২০৭ ॥
যত্ন সহকারে মন রাখিবে স্মরণ ।
এই লীলা শ্রীপ্রভুর ভক্ত-সংজোটন ॥ ২০৮ ॥
শুনিয়াছি নিজে কানে কহিতে প্রভুরে ।
আমড়া নিকৃষ্ট জাতি ফলের ভিতরে ॥ ২০৯ ॥
সুমিষ্ট ফজলি আমে পরিণত তায় ।
তখনি অমনি হয় শ্যামার ইচ্ছায় ॥ ২১০ ॥
কিন্তু তাহে মায়ের কি আছে প্রয়োজন ।
ফজলি আমের কত রয়েছে কানন ॥ ২১১ ॥
বুঝ মন চিরকাল যে পায় সে পায় ।
নাম লেখা আছে তার প্রভুর খাতায় ॥ ২১২ ॥
সুরাসুর মধ্যে যেন দৃষ্টান্তের স্থল ।
সুরে সুধা অসুরে পাইল হলাহল ॥ ২১৩ ॥
জগাই মাধাই যথা চৈতন্যাবতারে ।
মহাপাপী দুই ভাই বিদিত সংসারে ॥ ২১৪ ॥
পাপিজ্ঞানে দুই জনে জানে যেই জন ।
সে জানে না সে বুঝে না চৈত্যচরণ ॥ ২১৫ ॥
লীলা দেখা আঁখি উন্মীলিত নহে এবে ।
দেখিয়াছে ভেসে নাহি দেখিয়াছে ডুবে ॥ ২১৬ ॥
জন্ম জন্ম প্রিয়ভক্ত ভাই দুইজন ।
জগাই-মাধাইরূপে এবারে জনম ॥ ২১৭ ॥
গোউর-নিতাই যেন, তাঁরা যেন তাঁরা ।
জগাই-মাধাই দুই ভক্তিপ্রেমে ভরা ॥ ২১৮ ॥
পাপাচার কিছুকাল লীলার আসরে ।
কাল যেন সেইমত জীব-শিক্ষা তরে ॥ ২১৯ ॥
ভকতে গোপনে হেন রাখে ভগবান ।
মায়া-অন্ধ জীবে দিতে শিক্ষার বিধান ॥ ২২০ ॥
ভক্ত বিনা অপরের সঙ্গে নহে খেলা ।
বড় সূক্ষ্ম নরলীলা নাহি যায় বলা ॥ ২২১ ॥
সম জাতি সঙ্গে মিল স্বভাবের রীতি ।
ভক্তি পেয়ে ভক্ত হয় ঈশ্বরের জাতি ॥ ২২২ ॥
ভাবাবেশে বলিতেন প্রভু নারায়ণ ।
ধরিলে ধরাই তারে নিজের বরন ॥ ২২৩ ॥
কাঁচপোকা ঠিক তার স্থল উপমার ।
ধরে যবে আরশলা বৃহত্তরাকার ॥ ২২৪ ॥
শিখিকণ্ঠ সম বর্ণ যে কাঁচের গায় ।
সেই বর্ণ আপনার ধৃতেরে ফলায় ॥ ২২৫ ॥
শাখা-প্রশাখাদি পত্র বৃক্ষের যেমন ।
ঈশ্বরের সম্বন্ধে তেমন ভক্তগণ ॥ ২২৬ ॥
যদি সবে নহে লগ্ন উপরে উপরে ।
হৃদয়ে সংযোগ আছে ভক্তিবহ তারে ॥ ২২৭ ॥
ভক্তি আছে যাঁর তিনি ঈশ্বরের জন ।
ঈশ্বরের যেবা তাঁর আছে ভক্তিধন ॥ ২২৮ ॥
ভক্তি যেথা তথা তাঁর চিরকাল বাস ।
কখন সুগুপ্তভাবে কখন প্রকাশ ॥ ২২৯ ॥
সেখানে নাহিক ভক্তি প্রভু যেথা বাঁকা ।
হৃদয়নিলয় শূন্য শূন্য সম ফাঁকা ॥ ২৩০ ॥
পুণ্যমূল ক্রিয়া-কর্ম-তপ-জপাচার ।
তাহাতেও হয় এক ভক্তির সঞ্চার ॥ ২৩১ ॥
সে ভক্তি বৈধেয় ভক্তি ভক্তি কহা যায় ।
স্বভাব স্বতন্ত্র নহে এ ভক্তির ন্যায় ॥ ২৩২ ॥
সাধারণ নাম ভক্তি ভক্তি ভিন্ন ভিন্ন ।
উভয় মিছরি শুড় মিষ্টিমধ্যে গণ্য ॥ ২৩৩ ॥
এ ভক্তি ভক্তের ভক্তি শুদ্ধা ভক্তি নাম ।
আগে হাতে শেষে তিনে এক পরিণাম ॥ ২৩৪ ॥
বিবিধ বিধানে নাই বিধি ছাড়া রীতি ।
কর্ম নহে শ্রীপ্রভুর চরণ-প্রসূতি ॥ ২৩৫ ॥
চাতকের প্রাপ্য যেন ফটিকের জল ।
শুদ্ধা ভক্তি পায় আত্মজনেরা কেবল ॥ ২৩৬ ॥
শ্রীপ্রভুর আত্মগণে ভক্ত বলা দায় ।
বলি কেন অল্প কথা নাহিক ভাষায় ॥ ২৩৭ ॥
আত্মগণে ভক্তে বহে প্রভেদ বিস্তর ।
যেমন নিকট আর অনেক অন্তর ॥ ২৩৮ ॥
কৃষ্ণ মূল গোপ গোপী অঙ্গ অবয়ব ।
আত্মগণ ব্রজবাসী ভকত উদ্ধব ॥ ২৩৯ ॥
এখানে সুরেন্দ্রচন্দ্রে আত্মগণ কই ।
যে আর থাকিতে নারে প্রভুদেব বই ॥ ২৪০ ॥
দরশনে লুব্ধ মন থাকে নিরন্তর ।
কখন প্রবল যেন দ্রুতগতি ঝড় ॥ ২৪১ ॥
আফিসে মুচ্ছুদ্দিগিরি কর্ম ছিল তাঁর ।
যাবতীয় তথ্য পরিদর্শনের ভার ॥ ২৪২ ॥
খাটেন আগোটা দিন একটানা মনে ।
তবু না ফুরার কাজ সিন্ধু-পরিমাণে ॥ ২৪৩ ॥
এখন কাজেতে নাই একটানা মন ।
মাঝে মাঝে শ্রীপ্রভুর হয় আকর্ষণ ॥ ২৪৪ ॥
স্মৃতিপথে মুরতি আইনে ক্ষণে ক্ষণে ।
সুস্থির থাকিতে নারে কাজের আসনে ॥ ২৪৫ ॥
একদিন শ্রীপ্রভুর দরশন লেগে ।
বড়ই চঞ্চল চিত্ত হইল আবেগে ॥ ২৪৬ ॥
আফিসে যে দিন কাজ গুরুতর হাতে ।
কি করেন রক্ষা নাই হইল যাইতে ॥ ২৪৭ ॥
কর্মদক্ষ হাত কর্মে হইল অচল ।
দরশনে ব্যাকুলতা এতই প্রবল ॥ ২৪৮ ॥
যা হবার হবে কর্ম করি পরিহার ।
দক্ষিণশহরমুখে হয় আগুসার ॥ ২৪৯ ॥
শ্রীমন্দিরে যাবা মাত্র দেখিবারে পান ।
কলিকাতা আসিতে সসজ্জ ভগবান ॥ ২৫০ ॥
বলিলেন ভাগ্যবান ভক্তে সম্বোধিয়া ।
যেতেছিনু কলিকাতা তোমার লাগিয়া ॥ ২৫১ ॥
প্রাতে হ'তে দেখিতে তোসার বড় সাধ ।
ভাল ভাল আসিয়াছ হইল আহ্লাদ ॥ ২৫২ ॥
সুধাংশুবদন ফুল্ল আনন্দের তরে ।
কররূপে অপার করুণারাজি ক্ষরে ॥ ২৫৩ ॥
বিশুদ্ধ প্রেমের বর্ণ মাখামাখি তার ।
ঝলকে ঝলকে ফুটে বদন-রেখায় ॥ ২৫৪ ॥
প্রেমে গলা প্রভু-মূর্তি এমন তরল ।
ঢল ঢল যেইমত কিরণের জল ॥ ২৫৫ ॥
ভকত-চকোর-জাতি চিত্ত মনোহর ।
মনোমোহনিয়া ঠাম পরম সুন্দর ॥ ২৫৬ ॥
বিভোরে সুরেন্দ্র দেখে মহাভাগ্যবান ।
প্রভু কি রূপের ছবি রূপের নিধান ॥ ২৫৭ ॥
ধন্য শ্রীসুরেন্দ্রচন্দ্র অন্তরঙ্গ জন ।
টল টল যাঁর ডাকে প্রভুর আসন ॥ ২৫৮ ॥
পদরজ দিয়া মোরে কর ক্ষমবান ।
মনেরে শুনাব রামকৃষ্ণ লীলাগান ॥ ২৫৯ ॥
অপার করুণাবলে সুরেন্দ্র এখন ।
পূজ্যতম প্রভুদেবে করে নিবেদন ॥ ২৬০ ॥
সুমিষ্ট বিনয়বাক্যে করজোড় করি ।
আপনারে যেতে হবে আমাদের বাড়ি ॥ ২৬১ ॥
গাড়ির মধ্যেতে লৈয়া ভব-কর্ণধার ।
চলিল সুরেন্দ্রচন্দ্র ঘরে আপনার ॥ ২৬২ ॥
বুঝ মন শ্রীসুরেন্দ্র বটে কোন ঘন ।
যাঁর প্রতি এত তুষ্ট প্রভু নারায়ণ ॥ ২৬৩ ॥
যদি সুরাপারী তবু ভক্তশিরোমনি ।
মিলিলে চরণ রেণু মহাভাগ্য গণি ॥ ২৬৪ ॥
শুন মন এক কথা কই এইখানে ।
প্রভু কি অভাপি তাঁরে সুরেন্দ্র না চিনে ॥ ২৬৫ ॥
যদি বল কি কারণে মজিয়াছে মন ।
চিরসঙ্গ অন্তরঙ্গ ভক্তের লক্ষণ ॥ ২৬৬ ॥
থাক বা না থাক ফল ফলে নাই আশা ।
গাছে থাকে বিহঙ্গম যাহে তার বাসা ॥ ২৬৭ ॥
শ্রীপ্রভুর সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদগণ ।
তাঁদের কখন নাই সাধন ভজন ॥ ২৬৮ ॥
বিধি কি অবিধি সত্যাসত্য পাপপুণ্য ।
হাসিয়া উড়ায় কভু নাহি করে গণ্য ॥ ২৬৯ ॥
ইচ্ছামত করে কর্ম বিচার না করি ।
ষোল আনা জানে ঘাটে বাঁধা আছে তরী ॥ ২৭০ ॥
সেই হেতু আত্মগণে বুঝা মহাভার ।
সাধারণ জন সম নরের আকার ॥ ২৭১ ॥
অন্য দিকে কই কথা শুন শুন মন ।
লোক ছাড়া লোক তারা সাঙ্গোপাঙ্গগণ ॥ ২৭২ ॥
মহাবীর বলীয়ান ধরা-জোড়া ছাতি ।
শ্রীপ্রভু হৃদয়রথে যাদের সারথি ॥ ২৭৩ ॥
তালে তালে নাচে তারা বেতালা না হয় ।
শ্রীহস্তে সংলগ্ন মুখরজ্জুসমুদয় ॥ ২৭৪ ॥
সতত রয়েছে টানা শ্রীপ্রভুর করে ।
পড়ি পড়ি করে কিন্তু পড়িয়া না পড়ে ॥ ২৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর কথিত উপমা শুন মন ।
পাড়াগেঁয়ে এক গ্রামে ব্রাহ্মণভোজন ॥ ২৭৬ ॥
গ্রামান্তরে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণসকলে ।
যার লম্বা মাঠ পার সঙ্গে শিশু ছেলে ॥ ২৭৭ ॥
মাঠের আইল-পথ কাদা জলে ডুবা ।
শিশুর ধরিয়া হাত রক্ষা করে বাবা ॥ ২৭৮ ॥
সাবধানে যায় পিতা গায়ে আছে বল ।
কখন না পড়ে যদি অঙ্গ টল টল ॥ ২৭৯ ॥
বিটল অনেক ছেলে উপদ্রবী ধাত ।
তাহারা নিজেরা ধরে জনকের হাত ॥ ২৮০ ॥
বিষম পিছল পথ অল্প শক্তি গায় ।
দুটি পা না যেতে যেতে ছুঁয়ে পড়ে যায় ॥ ২৮১ ॥
বালকে ধরিলে পড়ে হয় এ রকম ।
বাপ যারে ধরে তার নাহিক পতন ॥ ২৮২ ॥
কুপণ সুপণ যাহা কর অনুমান ।
সর্ব ঠাঁই হাতে ধ'রে থাকে ভগবান ॥ ২৮৩ ॥
যাহার আশ্রয় তিনি তার কিবা ভয় ।
শুন মন ভক্ত-সংজোটন-পরিচয় ॥ ২৮৪ ॥
সাধুত্তম সাধুশ্রেষ্ঠ সুরেন্দ্র এবারে ।
সুরাপানাভ্যাস কিন্তু আদতে না ছাড়ে ॥ ২৮৫ ॥
শুন তাঁর সুরা-পান করিবার ধারা ।
পানমত্ততায় পায় বীরের চেহারা ॥ ২৮৬ ॥
মত্ততা প্রযুক্ত বল মনে গিরা ঝরে ।
কোথা শ্যামা মা মা বলি কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে ॥ ২৮৭ ॥
বহিয়া সুন্দর গণ্ড পড়ে আঁখিনীর ।
শুনিলে পাষাণে জল তরলে বাহির ॥ ২৮৮ ॥
মত্ততার বেগ আগে কামিনী-কাঞ্চনে ।
এখন ফিরিল শ্যামা-মায়ের চরণে ॥ ২৮৯ ॥
হেন সুরাপানে দোষ বুঝি না কি ঘটে ।
নিন্দা অপবাদ মাত্র লোকাচারে রটে ॥ ২৯০ ॥
বন্ধু তার বার বার নানা জেদ করে ।
সুরাপান মহাদোষ পরিহার তরে ॥ ২৯১ ॥
এবে আর দেয় কান কে কার কথায় ।
অভ্যাস রয়েছে ঠিক স্বভাবের প্রায় ॥ ২৯২ ॥
একদিন মহাষ্টমী তরী-আরোহণে ।
সবান্ধবে আগমন প্রভু-দরশনে ॥ ২৯৩ ॥
যাইতে যাইতে পথিমধ্যে বন্ধু কয় ।
আর এই সুরাপান উচিত না হয় ॥ ২৯৪ ॥
স্বাস্থ্যের সম্বন্ধে ইহা অতি বিঘ্নকারী ।
সুরেন্দ্র বলেন সুরা ছাড়িতে না পারি ॥ ২৯৫ ॥
অকারণ কেন জেব কর বারে বারে ।
আমি নাহি খাই সুরা খেয়েছে আমারে ॥ ২৯৬ ॥
তবে এক সত্য কথা বলি তব ঠাঁই ।
তুমি না ভুলিবে কথা স্বেচ্ছায় গোসাঁই ॥ ২৯৭ ॥
আপনি বলেন যদি এমন বচন ।
অবশ্য ছাড়িব সুরা করিলাম পণ ॥ ২৯৮ ॥
সুরার প্রসঙ্গ তব উক্তিযোগ্য নয় ।
বারে বারে শ্রীসুরেন্দ্র বন্ধুবরে কয় ॥ ২৯৯ ॥
এত শুনি বন্ধুবর মনে মনে ভাবে ।
প্রভু যদি নাহি কন তবে কিবা হবে ॥ ৩০০ ॥
সর্বঘটবার্তাবিৎ শ্রীপ্রভু আপনি ।
বিধিমত পাকা জ্ঞানে আনিতেন তিনি ॥ ৩০১ ॥
একমনে ঘনে ঘনে প্রভুরে স্মরণ ।
করিতে লাগিল বন্ধু বন্ধুর কারণ ॥ ৩০২ ॥
এ হেন সুহৃদ বন্ধু কে পায় কাহাকে ।
বন্ধুর মঙ্গল আশে দীনবন্ধু ডাকে ॥ ৩০৩ ॥
পরম আত্মীয় ধরে বন্ধুর খিয়াতি ।
সম্পদের সহচর বিপদের সাথী ॥ ৩০৪ ॥
মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষা চিন্তা করে পলে পলে ।
যথাঘাটে তরণী লাগিল হেনকালে ॥ ৩০৫ ॥
প্রভুপদ বন্দিবারে শ্রীমন্দিরে যায় ।
শূন্য শ্রীমন্দির প্রভু নাহিক তথায় ॥ ৩০৬ ॥
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের উত্তর অঞ্চলে ।
দেখিতে পাইল তাঁয় বকুলের তলে ॥ ৩০৭ ॥
প্রণতি করিয়া দোঁহে শ্রীপদে লুটায় ।
শ্রীঅঙ্গেতে ভাবাবেশ বাহ্য নাহি তায় ॥ ৩০৮ ॥
ভুবনে ব্যাপেছে মন অঙ্গগোটা স্থির ।
বদনে বিকাশে ভাব প্রশান্ত গম্ভীর ॥ ৩০৯ ॥
যেন দেখিছেন একমনে নিরখিয়া ।
জগতে যাবৎ জীব সকলের ক্রিয়া ॥ ৩১০ ॥
শ্রীঅঙ্গে আসিলে মন কিছুক্ষণ পরে ।
নেশায় বিভোর যেন ফিরিলা মন্দিরে ॥ ৩১১ ॥
অতি ধীর মন্দ মন্দ চরণ-চালনে ।
ছায়াবৎ পাছু যায় বন্ধু দুইজনে ॥ ৩১২ ॥
আপন আসনে বসি খাটের উপর ।
বাক্যগুলি বিজড়িত কাটা কাটা স্বর ॥ ৩১৩ ॥
আপনে আপন মনে কন ভগবান ।
ইহা অতি অকর্তব্য ইচ্ছামত পান ॥ ৩১৪ ॥
সাধনা-বিধিতে হেন আছয়ে নিয়ম ।
কিঞ্চিৎ খাইতে হয় কারণ-কারণ ॥ ৩১৫ ॥
কুলকুণ্ডলিনী তাঁরে দিবে অল্পমত ।
না টলিবে পদ নহে মন বিচলিত ॥ ৩১৬ ॥
কারণ-স্বরূপ পানে যে আনন্দ হয় ।
তাহাকে কারণানন্দ শাস্ত্রে হেন কয় ॥ ৩১৭ ॥
কারণ-আনন্দে উঠে ভজন আনন্দ ।
নীরবে দাঁড়ায়ে কথা শুনেন সুরেন্দ্র ॥ ৩১৮ ॥
সে দিন হইতে তেঁহ বুঝিল নিশ্চিত ।
জগতে যাবৎ সব শ্রীপ্রভু বিদিত ॥ ৩১৯ ॥
সকল জানেন প্রভু জগৎ-গোসাঁই ।
কাছে তাঁর লুকাবার কোন কিছু নাই ॥ ৩২০ ॥
প্রভু-অবতারে তাঁর যত ভক্ত জানি ।
সুরেন্দ্র তাঁদের মধ্যে সমুজ্জ্বল মণি ॥ ৩২১ ॥
এখানেতে দত্ত রাম নিরন্তর ঘুরে ।
প্রভুদত্ত মন্ত্র-ফাঁদে হরি ধরিবারে ॥ ৩২২ ॥
যতই করেন আশা ততই বিফল ।
বিফলানুসারে হৃদে অশান্তি প্রবল ॥ ৩২৩ ॥
অশনে শয়নে সুখ কিছু আর নাই ।
ভাবে কবে কিসে হরি-দরশন পাই ॥ ৩২৪ ॥
বড়ই ব্যাকুল প্রাণ এক দিন রাম ।
জনৈক বন্ধুর সঙ্গে স্থানান্তরে যান ॥ ৩২৫ ॥
দুঃখের কাহিনী পথে করে পরস্পর ।
হরি বিনা জীবদের দুর্গতি বিস্তর ॥ ৩২৬ ॥
সর্বদুঃখহর হরি কি প্রকারে মিলে ।
কোথা তাঁয় পাওয়া যায় কোন্খানে গেলে ॥ ৩২৭ ॥
হেনকালে শ্যামকায় সহাস্যবদন ।
আসিয়া পুরুষ এক দিল দরশন ॥ ৩২৮ ॥
কহিলা বচনে সুধাধারা মিশাইয়ে ।
কেন এত ব্যস্ত থাক কিছু দিন স'য়ে ॥ ৩২৯ ॥
কথা শুনি চমকিয়া রাম ভক্তবর ।
থামিল দেখিতে তাঁরে কে দিল উত্তর ॥ ৩৩০ ॥
সুহৃদ প্রাণের বন্ধু প্রাণের মতন ।
অশান্তি অনল হৃদে জলে বিলক্ষণ ॥ ৩৩১ ॥
বুঝিয়া ঢালিয়া দিল আশা-রূপ বারি ।
দেব কি মানব তাঁরে আঁখি ভ'রে হেরি ॥ ৩৩২ ॥
এত ভাবি যেমন ফিরিল পাছুপানে ।
অদৃশ্য পুরুষ আর নাহি কোনখানে ॥ ৩৩৩ ॥
শহরের রাজপথ প্রশস্ত যেমন ।
সরল অবক্রভাব সুদীর্ঘ তেমন ॥ ৩৩৪ ॥
যত দূর চলে দৃষ্টি দেখে দত্ত রাম ।
কোথাও পুরুষবরে দেখিতে না পান ॥ ৩৩৫ ॥
হাওয়ার মানুষ ধরি স্বাকার যেমন ।
চকিতে বিদ্যুাৎবৎ দিয়া দরশন ॥ ৩৩৬ ॥
বরষিয়া শান্তিবারি সুধা-ধারা প্রায় ।
পলকে আড়ালে পুনঃ মিলিল হাওয়ায় ॥ ৩৩৭ ॥
বিদূরিত মেঘদল হইলে আকাশে ।
পূর্ণ করে শশধর ফুট হেসে হেসে ॥ ৩৩৮ ॥
তেমতি রামের হৃদে হতাশের জাল ।
অশান্তির ঘোরঘটা বিষম জঞ্জাল ॥ ৩৩৯ ॥
তমস আঁধার বেড় কর-চোরা ফাঁদ ।
দূরে গিয়া বাহিরিল আনন্দের চাঁদ ॥ ৩৪০ ॥
পুলকে পূর্ণিত ভক্ত পাগলের পারা ।
চারে দেখি শ্যামকায় মীনের চেহারা ॥ ৩৪১ ॥
বিধিমতে বুঝিলেন নিশ্চয় শ্রীহরি ।
নানাভাবে রূপে গেলে পুনঃ পেলে ধরি ॥ ৩৪২ ॥
পরদিনে দরশনে দক্ষিণশহরে ।
বৃত্তান্ত বিদিত কৈল প্রভুর গোচরে ॥ ৩৪৩ ॥
মৃদু হাসি প্রভুদেব লীলার ঈশ্বর ।
কত কি দেখিবে বলি দিলেন উত্তর ॥ ৩৪৪ ॥
ভক্তসঙ্গে খেলা তাঁর মধুর কেমন ।
যদ্যপি দেখিতে সাধ হয় তোর মন ॥ ৩৪৫ ॥
লও তবে ভক্তিভরে গাও অবিরাম ।
আঁখি-তম-বিমোচন রামকৃষ্ণনাম ॥ ৩৪৬ ॥
নামেতে সকল মিলে নাম কর সার ।
মধুর প্রভুর নামে মহিমা অপার ॥ ৩৪৭ ॥
তৃতীয় খণ্ড
বলরামের
প্রভুদর্শনে গমন
(নটবর গোস্বামী, প্রতাপ হাজরা, দীননাথ বসু, হরিনাথ, গঙ্গাদর,
গিরিশ্চন্দ্র)
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুন মন লীলাগীতি অতি সুললিত ।
দেশেতে ইংরাজি ভাষা এবে প্রচলিত ॥ ১ ॥
এবে সুশিক্ষিত যত বঙ্গ-যুবাদল ।
একমাত্র গণ্যমান্য সম্মানের স্থল ॥ ২ ॥
রাজদ্বারে সমাদরে উচ্চপদ পান ।
শিক্ষা বিনা ভিক্ষা মিলে নাহি হেন স্থান ॥ ৩ ॥
বক্তৃতা হইলে পরে ইংরাজি ভাষায় ।
বেদবাক্যাধিক বুঝে লোক সমুদায় ॥ ৪ ॥
যতক্ষণ গীতা নাহি যায় ভাষান্তরে ।
ততক্ষণ সভ্যদলে আদর না করে ॥ ৫ ॥
ছেড়ে গেছে আগেকার বাঙ্গালীর রীতি ।
চলা বলা খেলা সজ্জা সাহেবী প্রকৃতি ॥ ৬ ॥
ভজনা-প্রণালী তাও হয়েছে নকল ।
মন্ত্র লওয়া নাই এবে বক্তৃতা কেবল ॥ ৭ ॥
এই সম্প্রাদায়ভুক্ত কেশব এখন ।
বিশ্বাস তাঁহার বাক্যে করে বহু জন ॥ ৮ ॥
নব্য বঙ্গ-যুবাদলে প্রভুর প্রচার ।
একা মাত্র শ্রীকেশব মূলাধার তার ॥ ৯ ॥
নমস্কার কোটি কোটি কেশবের পায় ।
দুই পথে ধরিলেন প্রচার উপায় ॥ ১০ ॥
প্রধান বক্তৃতা তাঁর মহা সভাস্থলে ।
অর সমাচারপত্র ছুটে মফঃস্বলে ॥ ১১ ॥
কানে কানে মুখে মুখে যায় সমাচার ।
চারিদিকে আসে লোক হাজার হাজার ॥ ১২ ॥
সাধনভজন যবে পাগলের প্রায় ।
পুরীমধ্যে শাঁখ ঘণ্টা বাজিলে সন্ধ্যায় ॥ ১৩ ॥
ছাদের উপরে উঠি প্রভু ভগবান ।
দুনয়নে বারি-ধারা ব্যাকুলিত প্রাণ ॥ ১৪ ॥
ডাকিতেন অন্তরঙ্গ আত্মসঙ্গগণে ।
কে কোথায় আছ এস আমি এইখানে ॥ ১৫ ॥
এতদিন খবর না ছিল কোথাকার ।
একে একে জুটিতে লাগিল এইবার ॥ ১৬ ॥
মনোহর ভক্তবর বসু বলরাম ।
শহর অঞ্চলে বাগবাজারেতে ধাম ॥ ১৭ ॥
বৈষ্ণব-আচার-বংশে জনম তাঁহার ।
পিতা পিতামহগণ বৈষ্ণব-আচার ॥ ১৮ ॥
এখন চল্লিশ পার তাঁর বয়ঃক্রম ।
সরল আকৃতি অতি পাতলা গড়ন ॥ ১৯ ॥
গউর বরন অঙ্গ অকুঞ্চিত ঠাম ।
সুন্দর বক্ষেতে দুলে দাঁড়ি লম্বমান ॥ ২০ ॥
বাঙ্গালীর রীতি ছাড়া উচ্চ পাগ শিরে ।
বিনয়েতে সদা নত ভূমির উপরে ॥ ২১ ॥
হাসিমাথা ধীরি কথা কভু উচ্চ নয় ।
নানা গুণে অলঙ্কৃত হৃদয়-নিলয় ॥ ২২ ॥
ঘটে কত ভক্তিভরা নহে বলিবার ।
আপনি যেমন তিনি তেন পরিবার ॥ ২৩ ॥
কুমারকুমারীগণ গড়া সম ছাঁচে ।
ছোট বড় তর তম সাধ্য কার বাছে ॥ ২৪ ॥
ভক্তবর সাধু নামে ছোট সহোদর ।
শিশু ভ্রাতৃ পুত্র ভক্ত পরম সুন্দর ॥ ২৫ ॥
এইমত হয় তাঁর যারে দেন হরি ।
ভক্তিমান ভক্তিমতী শ্বশুর শাশুড়ী ॥ ২৬ ॥
তিনটি শ্যালকমধ্যে অনুজ যে জন ।
এবে তাঁর পনেরর মধ্যে বয়াক্রম ॥ ২৭ ॥
সুন্দর গড়ন হাসি সর্বদা বয়ানে ।
কৃষ্ণপদে রতি মতি অতুল ভুবনে ॥ ২৮ ॥
স্বভাব-সুলভ কিবা আঁখি ঠেরে কথা ।
পশ্চাতে সময়ে পাবে তাঁহার বারতা ॥ ২৯ ॥
শুনে রাগ মাত্র বাবুরাম নাম তাঁর ।
কৃপায় যাঁহার হয় ভক্তির সঞ্চার ॥ ৩০ ॥
ভক্তের বাজার ঠিক বস্তুর ভবন ।
শান্তিময় বৃহৎ দ্বিতল নিকেতন ॥ ৩১ ॥
লক্ষ্মী বিরাজিত গুপ্তভাবে সর্বদায় ।
ভারি ভারি জমিদারি আছে উড়িষ্যায় ॥ ৩২ ॥
রাজসিক-ভাবশূন্য যদি ধনপতি ।
নানাবিধ তীর্থমধ্যে বড়ই খিয়াতি ॥ ৩৩ ॥
মনোহর আশ্রম আছয়ে স্থানে স্থানে ।
বিশেষ পুরুষোত্তমে কাশী বৃন্দাবনে ॥ ৩৪ ॥
অতিশয় বৃদ্ধ পিতা কৃষ্ণ পদে অংশ ।
এখন তাঁহার হয় বৃন্দাবনে বাস ॥ ৩৫ ॥
প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ মূর্তি স্থানে স্থানে ।
বিশেষে মাহেশে কথা সকলেই জানে ॥ ৩৬ ॥
মাহেশের রথ বড় প্রসিদ্ধ এ দেশে ।
গণনায় হানি পায় কত লোক আসে ॥ ৩৭ ॥
এখানে স্বতন্ত্র মূর্তি আপনার ঘরে ।
দিন দিন ভোগরাগ নানা উপচারে ॥ ৩৮ ॥
ভাত খিচুরান্ন ভোগ ব্রাহ্মণেতে রাঁধে ।
কত ভক্ত তৃপ্তি পায় তাঁহার প্রসাদে ॥ ৩৯ ॥
সন্ধ্যাকালে নিতি নিতি হরি-সংকীর্তন ।
ভবনে ভক্তের কত নিত্য সমাগম ॥ ৪০ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলামধ্যে যত ভক্তে জানি ।
ভক্ত বলরামে এক অগ্রগণ্য মানি ॥ ৪১ ॥
ভক্তমধ্যে যদ্যপিহ ছোট বড় নাই ।
বেশী কৃপা যেইখানে তাঁরে বড় গাই ॥ ৪২ ॥
এক গাছে যেন লক্ষ লক্ষ ফল ধরে ।
সকলে না হয় বিক্রী একরূপ দরে ॥ ৪৩ ॥
যে যেমন সুরসাল সেমত যে গণ্য ।
লীলাহাটে ভক্তদের এই তারতম্য ॥ ৪৪ ॥
বক্তৃতায় পত্রিকায় উচ্চে বাঁধি তান ।
প্রভুর মাহাত্মা কথা শ্রীকেশব গান ॥ ৪৫ ॥
বলরাম উড়িষ্যায় রন এ সময় ।
সমাচারপত্র পাঠে অপার বিস্ময় ॥ ৪৬ ॥
শ্রীপ্রভুর চিরপ্রিয় ভক্ত বলরাম ।
যেমন ঢুকিল কানে শ্রীপ্রভুর নাম ॥ ৪৭ ॥
পরান অস্থির প্রায় প্রভু-দরশনে ।
কলিকাতা কবে যাব ভাবে রেতে দিনে ॥ ৪৮ ॥
বিষম বন্ধনে তথা তালুকের ভার ।
যাই যাই করিতে সপ্তাহ দশ পার ॥ ৪৯ ॥
ইতিমধ্যে শুন কিবা হইল ঘটন ।
বসু বাসে বাস রামদয়াল ব্রাহ্মণ ॥ ৫০ ॥
অল্পবয়ঃ নিষ্ঠাচারী সরল উদার ।
হরি-পথে রতি মতি বিলক্ষণ তাঁর ॥ ৫১ ॥
কেশবের সমাজেতে মাঝে মাঝে গতি ।
শুনিয়া প্রভুর তথা মাহাত্ম্য-ভারতী ॥ ৫২ ॥
যান তিনি দরশনে দক্ষিণশহরে ।
বিকাইল প্রভু-পার একদিন হেরে ॥ ৫৩ ॥
আনন্দের প্রতিমূর্তি প্রভুর আমার ।
দেখিয়াই বলরামে দিল সমাচার ॥ ৫৪ ॥
ছিল তপ্ত বসু ভক্ত কেশবের বোলে ।
পত্রে তার ব্রাহ্মণ আগুন দিল জ্বেলে ॥ ৫৫ ॥
কোথায় বিষয়কর্ম করি পরিহার ।
উত্তরিল কলিকাতা আবাসে তাঁহার ॥ ৫৬ ॥
দয়ালের মুখে শুনি মাহাত্ম্য প্রভুর ।
দরশনে ব্যাকুলতা বাড়িল বসুর ॥ ৫৭ ॥
উঠে পড়ে বলরাম চলে পর দিনে ।
দক্ষিণশহরে প্রভু বিরাজে যেখানে ॥ ৫৮ ॥
সেইদিনে শ্রীমন্দিরে ভকতের মেলা ।
গিয়াছেন শ্রীকেশব সঙ্গে বত চেলা ॥ ৫৯ ॥
নানাবিধ ঈশ্বরীয় কথোপকথন ।
ছুটে মুক্ত-দুখে আনন্দের প্রস্রবণ ॥ ৬০ ॥
একধারে উপবিষ্ট ভক্ত বলরাম ।
মহানন্দে ইন্দ্রিয়ের পিপাসা মিটান ॥ ৬১ ॥
অন্তর-বারতাবিৎ শ্রীপ্রভু আমার ।
জিজ্ঞাসিলা তারে কিবা জিজ্ঞাস্য তোমার ॥ ৬২ ॥
বলরাম বলিলেন এক নিবেদন ।
দেখুন আমার পিতা পিতামহগণ ॥ ৬৩ ॥
ভকত-স্বভাব সবে বৈষ্ণব-আচারী ।
কাটিলা জীবন শুধু হরি হরি করি ॥ ৬৪ ॥
অদ্যাবধি আমিও তাঁদের পিছু যাই ।
কিন্তু হরি কেহ কেন দেখিতে না পাই ॥ ৬৫ ॥
প্রভুদেব করিলেন তাহার উত্তর ।
ধন-পুত্রে যেইরূপ করহ কদর ॥ ৬৬ ॥
সেইমত প্রিয়ভাব হরিতে কি আছে ।
থাকিলে অবশ্য হরি আসিতেন কাছে ॥ ৬৭ ॥
অতুল টানের কিবা কথা পরিপাটী ।
শ্রবণমাত্রেই ভক্ত বুঝিলেন ত্রুটি ॥ ৬৮ ॥
কেমনে হরিতে হয় মমতা-সঞ্চার ।
শ্রীপ্রভু আপনি তার করিলা যোগাড় ॥ ৬৯ ॥
লীলায় বুঝিবে তত্ত্ব কহা অকারণ ।
শ্রবণ করিয়া লীলা কর দরশন ॥ ৭০ ॥
প্রভুসনে আর কথা নহে সেই দিনে ।
গোলযোগ হেতু বহু লোক-সমাগমে ॥ ৭১ ॥
দলে দলে এসেছেন কেশব সজ্জন ।
আজি তাঁর মুড়ি-ভোজনের নিমন্ত্রণ ॥ ৭২ ॥
দক্ষিণশহরে মুড়ি বড়ই খিয়াতি ।
মুড়িতে শ্রীকেশবের বড়ই পিরীতি ॥ ৭৩ ॥
কেমনে খাইলা মুড়ি শুন শুন মন ।
প্রথমে প্রাঙ্গণে পাতা পড়ে অগণন ॥ ৭৪ ॥
বসিল যতেক লোক আছিল তথায় ।
সর্বাগ্রে পড়িল মুড়ি পাতায় পাতায় ॥ ৭৫ ॥
বড় বড় কাঁচা লঙ্কা লবণ সহিতে ।
কুচিকরা নারিকেল আধা তার সাথে ॥ ৭৬ ॥
ঘিয়ে মাখা তার পর কলাইর ভাজা ।
মিষ্টিমুখ-হেতু পড়ে চৌকনিয়া গজা ॥ ৭৭ ॥
মুড়ি নহে শেষ লুচি গরম গরম ।
আলো করি গোটা পুরী দিল দরশন ॥ ৭৮ ॥
পাছু ছুটে তরকারি ডাল্নার আকার ।
দুটি কি তিনটি নহে বিবিধ প্রকার ॥ ৭৯ ॥
নাহি পায় ঠাঁই পাতে বৃহদায়তন ।
পড়িল বেগুন ভাজা ডঙ্গার মতন ॥ ৮০ ॥
মুড়ি থেকে বোঝায়ের হ'য়েছে পত্তন ।
পূর্ণ পেট আর নহে গলাধঃকরণ ॥ ৮১ ॥
রঙ্গসহ শ্রীকেশব প্রভুদেবে কয় ।
বড়ই সুন্দর মুড়ি খেনু মহাশয় ॥ ৮২ ॥
আর কেন যথেষ্ট হয়েছে এইবারে ।
রুদ্ধ পথ নাহি ফাঁক পেট গেছে ভ'রে ॥ ৮৩ ॥
প্রভুদেব বলিলেন হাসিয়ে হাসিয়ে ।
যা হয়েছে টুকু টুকু সব যাও খেয়ে ॥ ৮৪ ॥
দেখিতে দেখিতে এল চাটনি সুন্দর ।
প্রশস্ত করিতে পথ গলার ভিতর ॥ ৮৫ ॥
সঙ্গে সঙ্গে খবাদই পাতা চিনি দিয়ে ।
এতই পড়িল যেন বান যায় ব'য়ে ॥ ৮৬ ॥
তদুপরি বড় মণ্ডা দীর্ঘে প্রস্থে ভারি ।
দধিসিন্ধুমধ্যে যেন সন্দেশের গিরি ॥ ৮৭ ॥
কে আর করিতে পারে কতই ভোজন ।
খুরি-ভরা ক্ষীর দিয়া কার্য-সমাপন ॥ ৮৮ ॥
বহু দ্রব্য-আয়োজন অধিক অধিক ।
শুনেছি যোগাড়দাতা শ্রীযদু মল্লিক ॥ ৮৯ ॥
ভোজন-সমাপ্তে রাতি ক্রমে বেড়ে যায় ।
ঘরে ফিরিবারে মাগে প্রভুর বিদায় ॥ ৯০ ॥
বলিলেন প্রভু তাঁর সস্নেহ বচনে ।
ঘরে কেন যাবে আজি থাক এইখানে ॥ ৯১ ॥
করজোড়ে কেশব কহেন দীনতায় ।
সত্বর আসিব দরশনে পুনরায় ॥ ৯২ ॥
সহাস্যে করিয়া রঙ্গ প্রভু কন পরে ।
আঁইষ-চুবড়ি রেখে আসিয়াছ ঘরে ॥ ৯৩ ॥
নিদ্রা নাহি হবে হেখা দূরে রাখি তায় ।
মেছুনীর গল্প প্রভু কন উপমায় ॥ ৯৪ ॥
গুণদর যেন তেন সুরসিকবর ।
সর্বরস সুবিদিত রসের সাগর ॥ ৯৫ ॥
কিসে গলে কার প্রাণ কিসে শিক্ষা কার ।
বুঝিতে বড়ই পটু শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৯৬ ॥
রসে ভরা প্রভুবাক্য তবু এত জোর ।
দেখি জড়সড় লাজে অশনি কঠোর ॥ ৯৭ ॥
বড় প্রাণে সাধ আঁকি শ্রীবাক্য কেষন ।
কি
করি তুলিতে খুঁজে না পাই বরন ॥ ৯৮ ॥
সঙ্কেতেতে কই বাক্য ঠিক ডিম্ব-পারা ।
ভাঙ্গিয়া প্রসবে কাল জীবন্ত চেহারা ॥ ৯৯ ॥
শ্রীবাক্য সেরূপ নহে যেন শুনা যায় ।
হাওয়ায় হইয়া যেন হাওয়ার মিশায় ॥ ১০০ ॥
শুন মেছুনীর কথা প্রভুর উত্তর ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি স্বতই সুন্দর ॥ ১০১ ॥
শহর-অন্তরে জলা প্রান্তরের ধারে ।
মোছো-মেছুনীরা তথা বহু বাস করে ॥ ১০২ ॥
মেছো-মরদেরা মাছ ধরে রাত্রিকালে ।
মেছুনীরা একত্তরে সকালে সকালে ॥ ১০৩ ॥
শহরেতে আসে মাছ-বিক্রয়-কারণ ।
দিনান্তে কর্মান্তে করে ভবনে গমন ॥ ১০৪ ॥
একদিন দৈবযোগে পথে অকস্মাৎ ।
মুষলধারায় মেঘ ফুটে বৃষ্টিপাত ॥ ১০৫ ॥
সেখানে আশ্রয়হেতু নাহি অন্য স্থান ।
দুই ধারে শতদরে ফুলের বাগান ॥ ১০৬ ॥
মনোহর বাসাবাটী বাগিচা-ভিতরে ।
উদ্যান-রক্ষক মালী যত্নে রক্ষা করে ॥ ১০৭ ॥
কি করে মেছুনীদল প্রবেশিলা তার ।
প্রহরেক রাতি তবে বৃষ্টি ছেড়ে যায় ॥ ১০৮ ॥
তথা হ'তে বহুদূর তাহাদের ঘর ।
চক্ষে নাহি আসে বাট আঁধার প্রান্তর ॥ ১০৯ ॥
হেথা কি ঘটিল কথা শুন শুন বলি ।
ঠাণ্ডা বায়ে ফুটে যত কুসুমের কলি ॥ ১১০ ॥
উদ্যান চৌদিকে গাছ হাজার হাজার ।
মাতিয়া সকলে করে সৌরভ বিস্তার ॥ ১১১ ॥
আঁষটেগন্ধে মেছুনীর জন্মযাত বাঁধা ।
অষ্ট অঙ্গে আঁষটেগন্ধ যেন মৎস্যগন্ধা ॥ ১১২ ॥
বুঝে আঁইষের গন্ধ এত পরিমাণে ।
পারিজাত কুজাত দুর্গন্ধ তার সনে ॥ ১১৩ ॥
ফুলের সৌরভে আর নিদ্রা নাহি হয় ।
জঞ্জালে পড়িল বড় মেছুনীনিচয় ॥ ১১৪ ॥
মাছের বজরা ছিল তাহাদের কাছে ।
বাতাসে শুকায়ে তার গন্ধ ক'মে গেছে ॥ ১১৫ ॥
বুদ্ধি
করি তাড়াতাড়ি ছড়াইয়া জল ।
আঁইষের গন্ধ কিছু করিল প্রবল ॥ ১১৬ ॥
মেছুনীরা বজরায় মুখ
চাপা দিতে ।
তবে না হইয়া সুস্থ নিদ্রা যায় রেতে ॥ ১১৭ ॥
সেইমত তোমাদের আঁইষ-চুবড়ি ।
ঘরে রেখে এসে গোল করিয়াছ ভারি ॥ ১১৮ ॥
এখানে ফুটেছে গাছে বিবিধ কুসুম ।
সৌরভ-সুগন্ধে রেতে নাহি হবে ঘুম ॥ ১১৯ ॥
কামিনীর গন্ধ বিনা নিদ্রা হবে কেনে ।
শ্রীকেশব সলজ্জবদন কথা শুনে ॥ ১২০ ॥
এগুতে পেছুতে দুয়ে হৈল মহাদায় ।
এস এস বলি
প্রভু দিলেন বিদায় ॥ ১২১ ॥
আগাগোড়া শ্রীপ্রভুর দেখিয়া ব্যাপার ।
ফিরিল সে দিনে বসু আপন আগার ॥ ১২২ ॥
অন্তরঙ্গ-ভক্ত-মধ্যে প্রধান লক্ষণ ।
একবার শ্রীপ্রভুর পেলে দরশন ॥ ১২৩ ॥
নয়নমোহনরূপ দেখিবারে পায় ।
কি জানি কি খেলে রূপ শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ১২৪ ॥
সচঞ্চল প্রাণ প্রায় হ'য়ে নিজে হারা ।
তাঁর কথা তাঁর মূর্তি মনে তোলাপাড়া ॥ ১২৫ ॥
দর্শন-শ্রবণ-পথে যতেক গোচর ।
নিজ ভাবে বলরাম ভাবে নিরস্তর ॥ ১২৬ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশনে নাহি মিটে আশা ।
যত দেখে দেখিবার ততই পিপাসা ॥ ১২৭ ॥
কত অন্তরঙ্গ শুন ভক্ত বলরাম ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে আছে তাহার প্রমাণ ॥ ১২৮ ॥
একদিন গঙ্গাকূলে করেন ভাবনা ।
নদীয়ায় গৌরচন্দ্র অবতার কি না ॥ ১২৯ ॥
সত্য যদি অবশ্যই পাব দরশন ।
বলেছি অনেক আগে করহ স্মরণ ॥ ১৩০ ॥
ভাবিতে ভাবিতে হেন পঞ্চবটতলে ।
উঠিল কীর্তন-রোল গঙ্গার সলিলে ॥ ১৩১ ॥
শব্দ ধরি দেখিলেন প্রভুদেব চেয়ে ।
উঠে কীর্তনিয়া দল জল দুফালিয়ে ॥ ১৩২ ॥
পরে দরশনে প্রভু জগতগোসাঁই ।
প্রত্যক্ষে পাইলা দুই গোউর নিতাই ॥ ১৩৩ ॥
উন্মত্ত হইয়া নৃত্য করে দুই জনে ।
মাতোয়ারা সঙ্গে যারা নাচে সংকীর্তনে ॥ ১৩৪ ॥
যত লোক সংকীর্তনে ছিল বিদ্যমান ।
তার মধ্যে একজন ভক্ত বলরাম ॥ ১৩৫ ॥
স্বতন্ত্র আধার তাঁর ছিল নদেপুরে ।
এইবারে বলরাম প্রভু-অবতারে ॥ ১৩৬ ॥
অভ্যন্তরে এক বস্তু স্বতন্ত্র চেহারা ।
এ তত্ত্ব বিদিত নহে কেহ প্রভু ছাড়া ॥ ১৩৭ ॥
বলিতেন প্রভু চক্ষু জানালার প্রায় ।
এই দ্বারে যে ভিতরে তারে দেখা যায় ॥ ১৩৮ ॥
কথাটি সহজ দেখা কঠিন ব্যাপার ।
কে তিনি এ দরশনে অধিকার যাঁর ॥ ১৩৯ ॥
প্রভুর নিকটে তাই তাঁর আত্মগণ ।
নূতন হইয়া হয় বহু পুরাতন ॥ ১৪০ ॥
লীলাগীতি একমনে কর অবধান ।
ভক্তসনে সম্মিলনে পাইবে প্রমাণ ॥ ১৪১ ॥
কিবা শক্তি কব আমি প্রভুলীলা খুলে ।
যতই না কই কুটি সিন্ধুর সলিলে ॥ ১৪২ ॥
তাল দেখাইয়া বল কে বুঝিতে পারে ।
প্রকাণ্ড আকার গোল ধরা কিবা ধরে ॥ ১৪৩ ॥
মহাভক্ত বলরাম বৈষ্ণব লক্ষণে ।
প্রভু-অবতারে নয় অবতার ক্রমে ॥ ১৪৪ ॥
গোষ্ঠিবর্গ সবে ভক্ত কলমির ঢাক ।
বহু লতা সমাবৃত তিল নাহি ফাঁক ॥ ১৪৫ ॥
পাড়া জুড়ে আছে বেড়ে গায়ে গায়ে গাঁথা ।
ভক্ত বলরাম তার মধ্যে মূললতা ॥ ১৪৬ ॥
সতেজ সবল শক্ত সুকোমল প্রাণ ।
প্রথমে দিলেন প্রভু তারে ধরি টান ॥ ১৪৭ ॥
তার টানে গোটা চাক কিরূপ প্রকারে ।
ধীরে ধীরে যায় চ'লে প্রভুর গোচরে ॥ ১৪৮ ॥
পরে পরে কব মন ব্যস্ত ভাল নয় ।
পীযূষ-ভাণ্ডার সংজোটন-পরিচয় ॥ ১৪৯ ॥
প্রভুরে বড়ই মিষ্টি লেগেছে বস্তুর ।
এক দরশনে শুন কাণ্ড কতদূর ॥ ১৫০ ॥
ভাবে কত করিয়াছি তীর্থেতে পয়ান ।
দেখিয়াছি শত শত সাধকপ্রধান ॥ ১৫১ ॥
যোগী ত্যাগী জটাধারী মহাস্ত সজ্জন ।
শৈব শাক্ত বৈদান্তিক বৈষ্ণব-লক্ষণ ॥ ১৫২ ॥
শুনেছি ঈশ্বরকথা বিস্তর বিস্তর ।
কিন্তু কোথা না দেখিনু এমন সুন্দর ॥ ১৫৩ ॥
যেমন মুরতিখানি স্বভাব তেমন ।
ভক্তিমাখা উক্তি মুখে সুধা-বরিষণ ॥ ১৫৪ ॥
সঙ্গীতে বাঁশরী কণ্ঠ অতি মিষ্টি গান ।
শুনে প্রাণ ফুলে ধরে আনন্দে উজান ॥ ১৫৫ ॥
মহাজ্ঞানে বাল্যভাব অঙ্গ-আভরণ ।
রস-ভাবে কেবা দোষে কিছু নহে কম ॥ ১৫৬ ॥
ভক্তসেবা বিলক্ষণ ভক্তির সহিতে ।
পুলক পিরীতি অতি ত্যাগ রাগ চিতে ॥ ১৫৭ ॥
কান চক্ষু উভয়ের রুচি প্রীতিকর ।
রয়েছেন এত কাছে কে জানে খবর ॥ ১৫৮ ॥
পুনরায় যাব তাঁরে করিতে প্রণতি ।
পোহাইলে একবার আজিকার রাতি ॥ ১৫৯ ॥
পরদিনে দ্বিতীয় দর্শনে ভক্তবর ।
উপনীত হইলেন প্রভুর গোচর ॥ ১৬০ ॥
পরম পুলক ছবি প্রভুদেবে হেরে ।
প্রভুও তেমতি খুশী ভিতরে ভিতরে ॥ ১৬১ ॥
উপরেতে বাহ্যভাব ভিতরে তা নয় ।
লীলা কিনা তাই প্রভু লন পরিচয় ॥ ১৬২ ॥
কিবা নাম কোথা বাস কিবা হেতু আসা ।
নন্দন নন্দিনী কিবা বিষয়-ব্যবসা ॥ ১৬৩ ॥
গম্ভীর বয়ানে নহে হাস্যসহকারে ।
জেনে যে জিজ্ঞাসা ইহা সাধ্য কার ধরে ॥ ১৬৪ ॥
বড়ই মজার কথা বুঝেছ কি মন ।
কথায় কি আছে চিত্র কর দরশন ॥ ১৬৫ ॥
সাজা এ বড়ই মজা বুঝা যদি যার ।
মিষ্টিমাখা চিড়া-দই ক্ষুধার বেলায় ॥ ১৬৬ ॥
দু'চারি কথান্তে হেন কথোপকথন ।
যেন দোঁহে যুগান্তর পরিচিত জন ॥ ১৬৭ ॥
ঘনীভূত ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তা-ভরা ।
শুনিয়া বসুর নাই সুখের কিনারা ॥ ১৬৮ ॥
কি যে সুখ প্রভুসঙ্গে কথোপকথনে ।
বলিবার নহে তাহা যে জানে সে জানে ॥ ১৬৯ ॥
যবে যার হয় কথা শ্রীপ্রভুর সাথে ।
সে যেন গগনচাঁদ ধরা পায় হাতে ॥ ১৭০ ॥
সীমা ফেঁড়ে উঠে তেড়ে আনন্দ-লহরী ।
কি জানি কি ছিল তাঁর কথায় মাধুরী ॥ ১৭১ ॥
কি দিয়া গঠিত কিবা থাকে তাঁর মাঝে ।
গালি দিলে তবু যেন বীণা বাণী বাজে ॥ ১৭২ ॥
সদানন্দময় প্রভু সদানন্দে স্থিতি ।
যা কিছু জনমে তাঁয় আনন্দ-মুরতি ॥ ১৭৩ ॥
শ্রুতিরুচিকর এত কি কহিব তোরে ।
দেহ যদি যার তবু স্মৃতি নাহি ছাড়ে ॥ ১৭৪ ॥
অমিয়-মিশান হাসি শ্রীবদনে ভাতে ।
স্বভাব-সুলভ বাল্যভাবের সহিতে ॥ ১৭৫ ॥
বলিলেন বলরামে বালকের পারা ।
তোমার ভবনে আছে অনেক ভাণ্ডারা ॥ ১৭৬ ॥
দিবে কিছু পাঠাইয়া খাইবারে মন ।
সুখে ভাসে বলরাম গুনিয়া বচন ॥ ১৭৭ ॥
উঠে পড়ে আনিবারে লইয়া বিদায় ।
ত্বরাত্বরি চ'ড়ে গাড়ি বসু ঘরে যায় ॥ ১৭৮ ॥
নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য প্রভুর কারণ ।
পর দিনে বলরাম করে আয়োজন ॥ ১৭৯ ॥
বিবিধ মশলা মিষ্টি বেদানা মিছরি ।
নানাবিধ ডাল ঘৃত লবণাদি করি ॥ ১৮০ ॥
সাজাইয়া মনোমত ডালি সযতনে ।
চলিলেন বলরাম প্রভু দরশনে ॥ ১৮১ ॥
পরিমাণে প্রতি দ্রব্য প্রচুর ডালায় ।
একমাস গেলে তবু যেন না ফুরায় ॥ ১৮৪ ॥
ডালি দেখি বড় খুশী শ্রীপ্রভু আপনি ।
ধন্য ধন্য বলরাম ভক্ত-চূড়ামণি ॥ ১৮৫ ॥
প্রভুর ভাণ্ডারী এক ভক্ত বলরাম ।
মাসে মাসে এক ডালি প্রভুরে পাঠান ॥ ১৮৬ ॥
দক্ষিণশহরে এবে প্রতিদিন প্রায় ।
অগণন লোকজন আসে আর যায় ॥ ১৮৭ ॥
বিশেষতঃ রবিবারে হয় মহামেলা ।
প্রাতঃকাল হইতে নাগাদ সন্ধ্যাবেলা ॥ ১৮৮ ॥
নানা প্রকারের লোক না যায় বাখানি ।
সম্ভ্রান্তবংশজ সবে ধনী মানী গুণী ॥ ১৮৯ ॥
দীনদুঃখী তার যধ্যে তত্ত্ব-লাভে মন ।
গুজব শুনিয়া করে দেখিতে গমন ॥ ১৯০ ॥
বিবিধবাসনাযুক্ত আসে ঝাঁকে ঝাঁকে ।
এত লোক কহা দায় কে দেখে কাহাকে ॥ ১৯১ ॥
আলস্যবিহীন প্রভু আপন আসনে ।
গোটা দিন মহামত্ত ঈশ্বরীয় গানে ॥ ১৯২ ॥
যা যাহার শুনিবার মনে মনে মন ।
ভাবে প্রকাশিয়া নাহি করে নিবেদন ॥ ১৯৩ ॥
বুঝিবারে প্রভুর ঐশ্বর্য কতদূর ।
যার যেন তার কথা প্রচুর প্রচুর ॥ ১৯৪ ॥
আপনা আপনি কন প্রভু গুণমণি ।
সর্বঘটবার্তাবিৎ অখিলের স্বামী ॥ ১৯৫ ॥
এক এক বাক্যে তাঁর এত অর্থ থাকে ।
তাহার উত্তর তাই বুঝে প্রতিলোকে ॥ ১৯৬ ॥
ঠিক যেন ভিষকের ঔষধের খোলে ।
যে ব্যাধির যে ঔষধ তাহাতেই মিলে ॥ ১৯৭ ॥
এর মধ্যে সকলেই বাহিরের পাখী ।
সন্ধ্যা এলে চলে যায় দিনমানে থাকি ॥ ১৯৮ ॥
বাকি থাকে দুই এক কল্পতরু-তলে ।
গাছ দেখে মহাতুষ্ট আশা নাই ফলে ॥ ১৯৯ ॥
এ সময়ে এসেছে গোস্বামী নটবর ।
দেশে শ্যামবাজারে যাঁহার হয় ঘর ॥ ২০০ ॥
সসঙ্গ প্রতাপচন্দ্র উপাধি হাজরা ।
বিশ্বাসবিহীন হৃদি ডাঙ্গাজমি পারা ॥ ২০১ ॥
হৃদুর স্বদেশী দোঁহে কাছে কাছে ঘর ।
পরিচিত বিশেষ গোস্বামী নটবর ॥ ২০২ ॥
প্রভুর আনন্দ বড় দেখিয়া তাঁহায় ।
রাখেন আপন কাছে না যেন বিদায় ॥ ২০৩ ॥
প্রভুর সেবায় এবে ভাগিনা হৃদয় ।
বড়ই শিথিল আগেকার মত নয় ॥ ২০৪ ॥
অর্থলোভে হইয়াছে লোভীর আচার ।
পুজা না পাইলে করে শাস্তি যার তার ॥ ২০৫ ॥
লইয়া শ্রীপ্রভুদেবে পাণ্ডাগিরি করে ।
বিনা তঙ্কে প্রবেশিতে না দেয় মন্দিরে ॥ ২০৬ ॥
জানিতে পারিলে প্রভু করেন বারণ ।
তদুত্তরে কহে কটু অপ্রিয় বচন ॥ ২০৭ ॥
হৃদয় প্রথরমুখ হৈল অতিশয় ।
রতি মতি উগ্রতর শ্রীপ্রভুর ভয় ॥ ২০৮ ॥
কভু কভু কটু ভাষে এতই প্রবল ।
শুনেছি ঝরিত বেয়ে শ্রীনয়নে জল ॥ ২০৯ ॥
পাছে অশ্রু-বিসর্জনে অমঙ্গল ঘটে ।
বলিতেন সকাতরে মায়ের নিকটে ॥ ২১০ ॥
যে মা তাঁর মন প্রাণ ধন ধ্যান জ্ঞান ।
সম্বল সহায় এক আশ্রয়ের স্থান ॥ ২১১ ॥
দেখ মা দেখ মা হৃদু অজ্ঞানের প্রায় ।
রেগো না রেগো না তুমি তাহার কথায় ॥ ২১২ ॥
এতই করেছে সেবা মানুষে না পারে ।
যতই না কয় কটু ক্ষমা কর তারে ॥ ২১৩ ॥
বহুদিন পূর্ব হ'তে প্রভু নারায়ণ ।
হৃদয়েরে করেছেন জড় অচেতন ॥ ২১৪ ॥
বহু পূর্বে কহিয়াছি ইহার বারতা ।
শুন এই পুনঃ রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা ॥ ২১৫ ॥
একদিন প্রভু অগ্রে কিঞ্চিৎ তফাৎ ।
পঞ্চবট অভিমুখে হৃদয় পশ্চাৎ ॥ ২১৬ ॥
আঁখি পালটিয়া শুদু দেখিলেন পরে ।
জ্যোতির্ময় প্রভু অঙ্গ চলে শূন্যভরে ॥ ২১৭ ॥
নিজেকেও পরে তেঁহ দেখিবারে পায় ।
দেবাংশসম্ভূত অনুরূপ কান্তি গায় ॥ ২১৮ ॥
দরশনে কি হইল হৃদয়ের মন ।
করী যেন মত্ত দেখি কমলের বন ॥ ২১৯ ॥
লম্ফ ঝম্প মাতোয়ারা মহাবল গায় ।
লাফে লাফে পর-চাপে ধরণী কাঁপায় ॥ ২২০ ॥
উচ্চরোলে বারে বারে করে সেইক্ষণ ।
ওগো মামা তুমি যেমন আমিও তেমন ॥ ২২১ ॥
গলা ফেটে শব্দ উঠে এত উচ্চনাদ ।
প্রভু দেখিলেন হৃদু করিল প্রমাদ ॥ ২২২ ॥
পুনরার প্রভুদেব নিজমূর্তি ধরি ।
হৃদরে কহেন কথা ফুকুরি ফুকুরি ॥ ২২৩ ॥
ওরে হৃদু কেন হেন কহ কি কারণ ।
হৃদু বলে তুমি যেন আমিও তেমন ॥ ২২৪ ॥
পুনশ্চয় প্রভুদেব বলিলেন তারে ।
থাম হৃদু কিবা কথা কহু তুমি কারে ॥ ২২৫ ॥
পুরীমধ্যে করি বাস গরীব ব্রাহ্মণ ।
স্বপ্ন বলে তুমি যেন আমিও তেমন ॥ ২২৬ ॥
হৃদয়ে করিতে শান্ত চেষ্টা বারে বারে ।
হৃদু তত উগ্রতর উচ্চনাদ ছাড়ে ॥ ২২৭ ॥
তখন হইয়া ক্রুদ্ধ বলিলেন তায় ।
রাখিতে নারিলি অতি অল্প শক্তি গায় ॥ ২২৮ ॥
এত বলি জড়াইয়া কোমরে কাপড় ।
হৃদয়ের সন্নিকট হইয়া সত্বর ॥ ২২৯ ॥
দুই হাতে সাপুটিয়া তাহায় ধরিয়া ।
বলিলেন থাক তুমি জড়বৎ হৈয়া ॥ ২৩০ ॥
সে অবধি হৃদয়ের স্বতন্ত্র প্রকৃতি ।
কামিনী-কাঞ্চনে মন ধায় দিবারাতি ॥ ২৩১ ॥
যে সকল কার্য প্রভু কৈলা লীলাকালে ।
নিগূঢ় মরম তার সাধ্য কার বলে ॥ ২৩২ ॥
তিনিই জানেন তাঁর কার্যের কারণ ।
তদুপরি হস্তক্ষেপ করে মূঢ় জন ॥ ২৩৩ ॥
শিবময় নাম তাঁর পরম উজ্জ্বল ।
কার্যের মরম কিসে জীবের মঙ্গল ॥ ২৩৪ ॥
জীব-শিক্ষা হেতু মাত্র রীতি ভিন্ন ভিন্ন ।
রুষ্ট তুষ্ট উভয়েই একরূপ গণ্য ॥ ২৩৫ ॥
হৃদয়ের পক্ষে রুষ্ট তুষ্ট কিছু নাই ।
সেবায় সন্তুষ্ট যার জগৎগোসাঁই ॥ ২৩৬ ॥
প্রভুর নিজের হৃদু ছোটখাট নয় ।
দেব-আদি সর্ব পূজ্য বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ২৩৭ ॥
হৃদয় আত্মীয় কত কত সন্নিধান ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে শুন তাহার প্রমাণ ॥ ২৩৮ ॥
দীননাথ বসু বাগবাজারে বসতি ।
প্রভুদেবে সাধুজ্ঞানে করিত ভকতি ॥ ২৩৯ ॥
ত্রুটি নাই কোন অংশে পূজা সমাদরে ।
ল'য়ে যায় প্রভুদেবে বারে বারে ঘরে ॥ ২৪০ ॥
শ্রীপ্রভু যথায় যেন আছয়ে ব্যাপার ।
সমারোহ সমাগমে লোকের বাজার ॥ ২৪১ ॥
মিষ্টিমাখা কথাগুলি সকলের ভাল ।
যতদূর ছটা ছুটে ততদূর আলো ॥ ২৪২ ॥
শুনিলে আনন্দে হৃদি-তন্ত্রী উঠে নেচে ।
বিশেষ যতেক লোক ব'সে শুনে কাছে ॥ ২৪৩ ॥
হৃদয় সর্বদা সঙ্গে গমন যেখানে ।
সবে শুনে তাঁর কথা হৃদয় না শুনে ॥ ২৪৪ ॥
বারে বারে হৃদয়ের দেখি আচরণ ।
একদিন প্রভুদেবে কহে কোন জন ॥ ২৪৫ ॥
মহাশয় কথার ভিতরে আপনার ।
কি এমন আছে শক্তি নহে বর্ণিবার ॥ ২৪৬ ॥
যে আসে সে শুনে ব'সে হয়ে আত্মহারা ।
বসন্তে নবীন ফুলে যেমন ভ্রমরা ॥ ২৪৭ ॥
কিন্তু যিনি সঙ্গেতে আসেন আপনার ।
তাঁহার প্রকৃতি দেখি স্বতন্ত্র প্রকার ॥ ২৪৮ ॥
সুন্দর প্রসঙ্গে হেন নাহি পশে মন ।
বুঝিতে না পারি কিছু ইহার কারণ ॥ ২৪৯ ॥
পরম রসিক প্রভু রসের সাগর ।
করিলেন রসে ভরা সুন্দর উত্তর ॥ ২৫০ ॥
দেখিয়াছ বাজিকর বাজি যাহা করে ।
মেয়ে ছেলে আট দশ থাকে একত্তরে ॥ ২৫১ ॥
দুই তিন জনে খেলে বাজি হয় যথা ।
বাকিদের মধ্যে কেহ সারে ছেঁড়া কাঁথা ॥ ২৫২ ॥
কেহ বা কাহার দেখে মাথায় উকুন ।
কেহ গৃহান্তরে যায় আনিতে আগুন ॥ ২৫৩ ॥
এমন সুন্দর বাজি না দেখে নয়নে ।
যাহাতে রয়েছে মুগ্ধ শত শত জনে ॥ ২৫৮ ॥
বাজী দেখিবারে তারা নাহি হয় রাজি ।
মনে জানে কি দেখিব এ ঘরের বাজি ॥ ২৫৯ ॥
সেইমত হৃদু নিজে বুঝে মনে মনে ।
দেখা আছে সব বাজি যা খেলি যেখানে ॥ ২৬০ ॥
এই কথা ধরি নিজ মনে বুঝ মন ।
হৃদর প্রভুর কত আত্মীয়-স্বজন ॥ ২৬১ ॥
তাঁর পক্ষে রুষ্ট তুষ্ট কাটে একধারে ।
হৃদয় ঘরের লোক জন্ম জন্ম ঘরে ॥ ২৬২ ॥
তবে এ লীলার কাণ্ড লীলার বারতা ।
তুষ্টেতে বুঝিবে তুষ্ট রুষ্টে আছে ব্যথা ॥ ২৬৩ ॥
একে সুখ আরে কষ্ট জানা জগজনে ।
হৃদয়ে হইলা রুষ্ট জীবের কল্যাণে ॥ ২৬৪ ॥
জীবের মঙ্গলহেতু জীব-শিক্ষাতরে ।
বুঝাইলা এত বড় সেও যায় পড়ে ॥ ২৬৫ ॥
রামকৃষ্ণপন্থী মধ্যে এ ভয় বিষম ।
রাখ প্রভু নাহি কর হৃদুর মতন ॥ ২৬৬ ॥
হৃদরে পাড়িয়া বুঝাইলা সবাকারে ।
বধুর শিক্ষার যেন গিন্নী ঝিয়ে মারে ॥ ২৬৭ ॥
ভক্ত দিয়া কভু হয় শিক্ষার বিধান ।
কখন দেখান শিক্ষা নিজে ভগবান ॥ ২৬৮ ॥
শুন শুন মন তার বলি পরিচয় ।
স-মনে শুনিলে ঘুচে কামিনীর ভয় ॥ ২৬৯ ॥
একদিন প্রভুদেব সুরধুনীতীরে ।
হঠাৎ উঠিল কথা মনের ভিতরে ॥ ২৭০ ॥
দেখিনু আজন্ম গোটা
কামিনী কুৎসিত ।
সত্যই হয়েছি তবে কামরিপুজিৎ ॥ ২৭১ ॥
যেমন উদয় মনে আত্ম-অভিমান ।
অমনি বিন্ধিল অঙ্গে মদনের বাণ ॥ ২৭২ ॥
সন্ধান সুতীক্ষ্ণ এত কাঁপিল শরীর ।
আত্মহারা লজ্জাহারা পরাণ অস্থির ॥ ২৭৩ ॥
প্রভুর শ্রীমুখে শুনা বলিবারে ডরি ।
এড়ান না পেত এলে অতিবৃদ্ধ নারী ॥ ২৭৪ ॥
মা মা বলি কাঁদে প্রভু অতি উচ্চৈঃস্বরে ।
ছুটিয়া পশিলা আসি আপন মন্দিরে ॥ ২৭৫ ॥
তাড়াতাড়ি করিলেন আবদ্ধ দুয়ার ।
প্রবেশিতে সাধ্য যেন নাহি থাকে কার ॥ ২৭৬ ॥
অবিরত দিনত্রয় কেবল রোদন ।
তবে না শ্রীঅঙ্গ হ'তে ছুটিল মদন ॥ ২৭৭ ॥
এই দেখ দিনত্রয় কি যাতনা তাঁর ।
কার লাগি কি কারণ বুঝহ ব্যাপার ॥ ২৭৮ ॥
লীলায় লইয়া ভক্ত নিজে ভগবান ।
করায়ে করিয়ে দেন শিক্ষার বিধান ॥ ২৭৯ ॥
যাহোক তাহোক হৃদু প্রভুর স্বজন ।
বারে বারে বন্দি তাঁর দুখানি চরণ ॥ ২৮০ ॥
মহাসাধু দীননাথ বসু মহাশয় ।
শ্রীপ্রভুর শ্রীচরণে লইল আশ্রয় ॥ ২৮১ ॥
বাগবাজারের মধ্যে এই মতিমান ।
যখন তখন ঘরে প্রভুরে আনান ॥ ২৮২ ॥
প্রভুভক্ত-রত্নখনি যেন এক ঠাঁই ।
শহরে কোথায় হেন দেখিতে না পাই ॥ ২৮৩ ॥
একদিন শ্রীপ্রভুর হবে আগমন ।
প্রত্যাশায় আছে ব'সে কত লোকজন ॥ ২৮৪ ॥
প্রাচীন নবীন যুবা ছেলে দলে দলে ।
লোকারণ্য পরিপূর্ণ সদরমহলে ॥ ২৮৫ ॥
অন্তঃপুরে সেইমত মহিলা-বাজার ।
আত্মবন্ধু প্রতিবাসী নানান পাড়ার ॥ ২৮৬ ॥
তার মধ্যে কত লোক আছে দাঁড়াইয়ে ।
দ্বারদেশে অনিমিষে পথপানে চেয়ে ॥ ২৮৭ ॥
নিদাঘে তৃষায় যেন পরান বিকল ।
ফটিক আশায় থাকে চাতকের দল ॥ ২৮৮ ॥
হেনকালে শ্রীপ্রভুর হয় আগমন ।
আনন্দ ধ্বনিতে ভরে বসু নিকেতন ॥ ২৮৯ ॥
গাড়ির ভিতরে হেথা প্রভুদেব রায় ।
নাই প্রায় বাহ্যজ্ঞান ভাবাবেশ গায় ॥ ২৯০ ॥
কটিতে শিখিল বাস অচল শরীর ।
যতনে হৃদয় ধরি করিল বাহির ॥ ২৯১ ॥
মরি কি সুন্দর ছবি মুরতি মোহন ।
ভাবের লাবণ্য কান্তি অঙ্গে সুশোভন ॥ ২৯২ ॥
অস্থি মাংসে গড়া দেহ আনন্দের ভরে ।
এতই কোমল যেন ঢলে ঢলে পড়ে ॥ ২৯৩ ॥
কৃপার আধার তনু-পুরে নাই মন ।
বিশ্বহিতধ্যানে মগ্ন জীবের কারণ ॥ ২৯৪ ॥
উদিলে গগনে চাদ কৌমুদী-ছটায় ।
আধার নাশিয়া করে উজ্জ্বল ধরায় ॥ ২৯৫ ॥
তেমতি আনন্দময় প্রভু নারায়ণ ।
প্রফুল্লিত করিলেন সকলের মন ॥ ২৯৬ ॥
যথাযোগ্য আসনে বসিলা প্রভুবর ।
চারিধারে লোক যেন তারকানিকর ॥ ২৯৭ ॥
বাহ্যিকচেতনযুক্ত হইলে শ্রীঅঙ্গ ।
তুলিলেন প্রভুদেব ঈশ্বর-প্রসঙ্গ ॥ ২৯৮ ॥
হিতকর উপদেশ উক্তি সাথে সাথে ।
কখন উন্মত্ত শ্যামা-বিষয়ক গীতে ॥ ২৯৯ ॥
একে তো সুঠাম প্রভু জন-মনোহর ।
দেখিলে না চায় আঁখি ফিরিবারে ঘর ॥ ৩০০ ॥
তদুপরি মিঠা স্বর বাঁশির উপরে ।
ভক্তিপ্রেমময় গীতে ভক্তি প্রেম ঝরে ॥ ৩০১ ॥
অপূর্ব মধুর দৃশ্য ভুবন-মোহন ।
দেখে শুনে ভাগ্যবানে আনন্দে মগন ॥ ৩০২ ॥
কৃপাসিন্ধু শ্রীপ্রভুর যথা অধিষ্ঠান ।
কি উঠে তথায় এক অপরূপ টান ॥ ৩০৩ ॥
স্রোত বেয়ে ধায় লোক সে টানের জোরে ।
তটিনীর গতি যেন অকূল সাগরে ॥ ৩০৪ ॥
আজিকার স্রোতে আসি হইল উদয় ।
মহাবলীয়ান শ্রীপ্রভুর ভক্তত্রয় ॥ ৩০৫ ॥
প্রথম শ্রীহরিনাথ ব্রাহ্মণ-কুমার ।
বয়স বিশের মধ্যে নহে কৃতদার ॥ ৩০৬ ॥
বিবেকবিরাগযুক্ত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ।
প্রখর ত্যাগের বীজ অন্তরে নিহিত ॥ ৩০৭ ॥
দ্বিতীয় প্রহলাদপ্রায় বালক সুন্দর ।
ঘটক-উপাধিযুক্ত নাম গঙ্গাধর ॥ ৩০৮ ॥
বয়স দ্বাদশ বর্ষ ব্রহ্মচর্য করে ।
রুক্ষ রুক্ষ কেশগুচ্ছ শিরের উপরে ॥ ৩০৯ ॥
সংসারের হাবভাবে অতি ঘৃণ্য জ্ঞান ।
অল্প উমেরে এত উদাস পরান ॥ ৩১০ ॥
তৃতীয় যে জন তাঁর সব বিপরীত ।
দেশে দেশে জানা নাম সবে পরিচিত ॥ ৩১১ ॥
নানারঙ্গে গোলেলাল ধরাবেরা ছাতি ।
নির্ভয় হৃদয়ালয় ভৈরব প্রকৃতি ॥ ৩১২ ॥
নাটক-লেখক কবিকুলচূড়ামণি ।
শহরেতে রঙ্গালয়ে শিক্ষাদাতা তিনি ॥ ৩১৩ ॥
বিদ্যাবল যত তার চেয়ে বুদ্ধিবল ।
নঙ্গর ফেলিলে ঘাটে নাহি মিলে তল ॥ ৩১৪ ॥
কাছে না আসিতে পারে বৃহস্পতি ডরে ।
কঠিন তাঁহার তর্কে মেদিনী বিদরে ॥ ৩১৫ ॥
কিন্তু সরলতা হৃবে এতই প্রবল ।
কঠোর তার্কিকে করে পলকে তরল ॥ ৩১৬ ॥
শ্যামবর্ণ পুষ্টকায় দোহারা গড়ন ।
জেয়াদা বয়েস নহে চল্লিশের কম ॥ ৩১৭ ॥
এমন সুন্দর কাট তাঁহার বদনে ।
শতবর্ষ বাঁচিলেও বুড়াতে না জানে ॥ ৩১৮ ॥
রেতেদিনে মদ্যযপানে বড়ই সন্তোষ ।
হাটে বাটে রটা নাম শ্রীগিরিশ ঘোষ ॥ ৩১৯ ॥
সূর্য প্রায় যায় মেখে রেখে লাল রেখা ।
হেনকালে প্রভুর নিকটে দিল দেখা ॥ ৩২০ ॥
তার কিছু আগে হ'তে প্রভু গুণধাম ।
সমাধিস্থ মোটে নাই বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৩২১ ॥
আত্মগণ প্রিয়ভক্ত আসিবার পূর্বে ।
প্রায় প্রভু থাকিতেন মহাভাবে ডুবে ॥ ৩২২ ॥
এই ভাব শ্রীপ্রভুর ছিল পূর্বাপর ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি স্বতই সুন্দর ॥ ৩২৩ ॥
ধূসরবরনা সন্ধ্যা আগত হইলে ।
শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে বাতি দিল জ্বেলে ॥ ৩২৪ ॥
সন্ধ্যা-আরতির কাল যত সন্নিধান ।
ততই শ্রীঅঙ্গে আসে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৩২৫ ॥
এ সময়ে অধিকাংশ হুঁশ থাকে গায় ।
এধারা প্রভুর বরাবর দেখা যায় ॥ ৩২৬ ॥
দিনেরেতে মহাভাব অঙ্গে যাঁর ডাকে ।
সন্ধ্যায় নিশ্চয় অঙ্গে কেন নাহি থাকে ॥ ৩২৭ ॥
কারণ বুঝিতে যদি পারে ঠিক ঠিক ।
তখনি নাস্তিক হয় প্রকৃত আস্তিক ॥ ৩২৮ ॥
যেবা নিরাকারবাদী নাচে কুতুহলে ।
পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়া পুজে ক্ষুদ্রতনু শিলে ॥ ৩২৯ ॥
সাকার যাহার প্রাণ হাতে চাঁদ পায় ।
শ্রীপ্রভুর পদতলে অবনী লুটায় ॥ ৩৩০ ॥
আজ সন্ধ্যাকালে যবে অবস্থা এমন ।
ধীরে ধীরে বলিলেন প্রভুনারায়ণ ॥ ৩৩১ ॥
"দিনমান এবে কিবা হইয়াছে রাতি ।"
ঠিক নাই সম্মুখেতে জ্বলিতেছে বাতি ॥ ৩৩২ ॥
বসিয়া শুনিল কথা প্রভু বিদ্যমান ।
শ্রীগিরিশচন্দ্র ঘোষ তার্কিক-প্রধান ॥ ৩৩৩ ॥
মনে মনে আপনার বুঝিলেন সার ।
এ এক বুজরুকি বটে নূতন প্রকার ॥ ৩৩৪ ॥
হন্দ মন্দ সাধু এই ঘোর কলিকালে ।
ঠিক নাই সন্ধ্যাকাল কাছে বাতি জ্বলে ॥ ৩৩৫ ॥
পূর্ণ অবহেলা-ভাব প্রভুর উপরে ।
পয়ান করিলা ত্বরা আপনার ঘরে ॥ ৩৩৬ ॥
যত যিনি সমিধান বলিষ্ঠ যে যত ।
তাঁর সঙ্গে শ্রীপ্রভুর খেলা সেইমত ॥ ৩৩৭ ॥
খাইলে বৃহৎ মাছ শীঘ্র কেবা তুলে ।
গায় আছে বহু বল দিনভোর খেলে ॥ ৩৩৮ ॥
বীরভক্ত শ্রীগিরিশ চুনাপুঁটি নয় ।
প্রথম দর্শনে এইতক পরিচয় ॥ ৩৩৯ ॥
এখানে বেদজ্ঞ বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
মাঝে মাঝে দক্ষিণশহরে আসে যায় ॥ ৩৪০ ॥
শ্রীপ্রভুর মোহন মুরতি দরশনে ।
জ্ঞানগর্ভ সুধাভরা বচন-শ্রবণে ॥ ৩৪১ ॥
কতক ভুলেছে মন অধিকাংশ বাকি ।
আজিতক প্রভু-পদে নহে মাখামাখি ॥ ৩৪২ ॥
কেমন খেলিয়ে তাঁর সঙ্গে নারায়ণ ।
করিলেন অধিকাংশ আকর্ষণ মন ॥ ৩৪৩ ॥
ঘুচে শমনের ভয় শুনিলে ভারতী ।
ভব-ব্যাধি মহৌষধি লীলাগুণ-গীতি ॥ ৩৪৪ ॥
কাঠের আড়তে কাল উপাধ্যায় কাটে ।
মাসবৃত্তি খাইতে মাখিতে নাই আঁটে ॥ ৩৪৫ ॥
বিষম বিপদে তেঁহ পড়ে একবার ।
কি কারণ কি বিপদ শুন সমাচার ॥ ৩৪৫ ॥
ব্যবসার যত কাঠ রহে গঙ্গাকূলে ।
ভারী ভারী দামী সব ভেসে যায় জলে ॥ ৩৪৬ ॥
একবার দুইবার নহে বারে বারে ।
ব্যবসায় লোকসান বহু টাকা পড়ে ॥ ৩৪৭ ॥
পুরাতে শকতি নাই সামান্য বেতন ।
ডরে না পাঠায় বার্তা নৃপতি-সদন ॥ ৩৪৮ ॥
সশঙ্কিত চিতে চুপে চুপে কাটে কাল ।
হেনকালে গোয়েন্দায় তুলিল জঞ্জাল ॥ ৩৪৯ ॥
গোপনে খবর দিল নৃপতির কাছে ।
লুকাইয়া বিশ্বনাথ বহু কাঠ বেচে ॥ ৩৫০ ॥
তত্ত্ব পেয়ে গরজিয়া উঠে মহারাজে ।
হুজুরে হাজির জন্য পত্র দিল ভেজে ॥ ৩৫১ ॥
পেশ করিবার তরে হিসাব-নিকাশ ।
পত্র পেয়ে বিশ্বনাথ পায় বড় ত্রাস ॥ ৩৫২ ॥
বহু টাকা লোকসান জানে উপাধ্যায় ।
কি করিবে কি হইবে ভাবিছে উপায় ॥ ৩৫৩ ॥
নেপালের অধিপতি আপুনি স্বাধীন ।
স্বেচ্ছায় সকল কর্ম আজ্ঞাই আইন ॥ ৩৫৪ ॥
কাষ্ঠ নষ্টে রুষ্ট হয়ে যত-আজা দিবে ।
জান বাচ্ছা এক ঠাঁই সকলে গাড়িবে ॥ ৩৫৫ ॥
বিপদে ভরসা প্রভু ভূষি সারোদ্ধার ।
স্বরণ করিতে থাকে তাঁরে বার বার ॥ ৩৫৬ ॥
বিপদভজন প্রভু দুর্বলের আশা ।
স্বরণে দিলেন মনে নিস্তার ভরসা ॥ ৩৫৭ ॥
প্রভুর গোচরে উপনীত ক্ষুন্নমন ।
বয়ান যেগিয়া প্রভু পুছিলা কারণ ॥ ৩৬৮ ॥
আদ্যোপান্ত নিবেদন করে উপাধ্যায় ।
অভয়-প্রদানে প্রভু দিলেন বিদায় ॥ ৩৬৯ ॥
প্রভুর আশ্বাস-বাক্য মহাবলে ভরা ।
পলের ভিতরে মিলে অকূলে কিনারা ॥ ৩৭০ ॥
তরীরূপে খেলে বাক্য জলধি-মাঝার ।
তখনি তরায় তুলে কে ডুবায় আর ॥ ৩৭১ ॥
প্রভুর অভয়-পথে করিয়া নির্ভর ।
উপাধ্যায় করে যাত্রা নেপালনগর ॥ ৩৭২ ॥
হুজুরে হাজির হয়ে দরবারে কয় ।
আদ্যোপাত্ত সঠিক বৃত্তান্ত সমুদয় ॥ ৩৭৩ ॥
এক প্রভু নানারূপ নানা ঘটে খেলে ।
অনায়াসে দেখা যায় প্রভুরে দেখিলে ॥ ৩৭৪ ॥
একরূপে নৃপতি অপরে মন্ত্রিবর ।
কোথাও পেয়াদারূপে কোথা বা তস্কর ॥ ৩৭৫ ॥
মহা-জাদুকর প্রভু খেলা তাঁর কাণ্ড ।
এক হয়ে হইয়াছে অখিল ব্রহ্মাণ্ড ॥ ৩৭৬ ॥
তিনি ব্রহ্মা তিনি বিষ্ণু তিনি মহেশ্বর ।
দেবতা কিন্নর যক্ষ রক্ষ নাগ নর ॥ ৩৭৬ ॥
তিনি জগতের বীজ বীজাধার তিনি ।
স্থাবর প্রদয় গুণ অগণন প্রাণী ॥ ৩৭৭ ॥
সন্ধ্যারণে নিজে তিনি পূর্ণ-শশধর ।
তিনিই গ্রহাদি তারা উজ্জ্বল ভাস্কর ॥ ৩৭৮ ॥
তিনি তরু তিনি কাণ্ড অধোদেশে মূল ।
তিনিই প্রশাখা শাখা তিনি ফল ফুল ॥ ৩৭৯ ॥
অটল অচল তিনি তিনি নদ নদী ।
তিনিই প্রকাণ্ডকায় অপার জলধি ॥ ৩৮০ ॥
স্বররূপ শব্দরূপ রূপ-রসাকৃতি ।
মন প্রাণ বায়ু রূপ বিরাট মূরতি ॥ ৩৮১ ॥
কালরূপে সেই একা ব্যাপ্ত চিরকাল ।
প্রখর মধ্যাহ্নে সেই সকাল বিকাল ॥ ৩৮২ ॥
তিনি জ্যোতি তিনি অন্ধকারময়ী রাতি ।
আদি-মধ্য-অন্তহীন অবিরাম গতি ॥ ৩৮৩ ॥
নিরাকার মহাকার ধীর চুপু চলে ।
সৃষ্টি স্থিতি লয় যায় বিশ্ববৎ খেলে ॥ ৩৮৪ ॥
লীলাকারী হরি সেই লীলার ঈশ্বর ।
কভু নররূপ কভু ব্রহ্ম-পরাৎপর ॥ ৩৮৫ ॥
একমাত্র তিনি বস্তু তিনি বলি যাঁরে ।
সর্বময় সর্বরূপ রূপারূপ ধরে ॥ ৩৮৬ ॥
সেই তিনি কোন্ জন শুন শুন মন ।
এই রামকৃষ্ণ মোর পতিত-পাবন ॥ ৩৮৭ ॥
দরিদ্র ব্রাহ্মণবেশে লীলার আসরে ।
কৈবর্তের দেবালয়ে দক্ষিণশহরে ॥ ৩৮৮ ॥
শুন কথা সবিশ্বাসে যাহা আমি কই ।
বেসাত ভবের হাটে খেপা বোকা নই ॥ ৩৮৯ ॥
গিনি কিনি সোনা চিনি দড় পরীক্ষায় ।
মূর্খ বটি কান কাঠি ঠকাতে যে চায় ॥ ৩৯০ ॥
নন্দন-নন্দনীসহ প্রিয়তমা দারা ।
অন্নাভাবে রোগে যদি হই প্রাণে সারা ॥ ৩৯১ ॥
যদ্যপি সহিতে হয় তাদের বিচ্ছেদ ।
রোদনে আগোটা দিন যদি করি খেদ ॥ ৩৯২ ॥
সংসারের সুখ যদি সব হয় দূর ।
তবু কব পূর্ণব্রহ্ম আমার ঠাকুর ॥ ৩৯৩ ॥
জেদের ব্যাপার নয় সত্য এই কথা ।
তাড়না করিলে পরে তবু পিতা পিতা ॥ ৩৯৪ ॥
যে যা তারে তাই কয় জলে বলে জল ।
আকাশে আকাশ বলে অনবে অনল ॥ ৩৯৫ ॥
সেই বস্তু প্রভুদেব জগৎগোসাঁই ।
যাহার ওধারে আর কোন গ্রাম নাই ॥ ৩৯৬ ॥
নানা রূপে সবঘটে করেন বিরাজ ।
শুন বিশ্বনাথে কি করিল মহারাজ ॥ ৩৯৭ ॥
সত্য এজাহারে তুষ্ট হইয়া নৃপতি ।
সদয় হইল বড় বিশ্বনাথ প্রতি ॥ ৩৯৮ ॥
চৌগুণ বেতনবৃদ্ধি করিয়া তাঁহায় ।
রাজপ্রতিনিধি পরে বাঙ্গালা পাঠায় ॥ ৩৯৮ ॥
কাপ্তেন উপাধি দিল উচ্চমান সনে ।
প্রভুভক্তে সকলে কাপ্তেন নামে জানে ॥ ৩৯৯ ॥
খালাসে উল্লাস বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
উদ্দেশিয়া প্রভুপদ ধরণী লুটায় ॥ ৪০০ ॥
এমন সঙ্কটে যুক্ত তাহার উপরে ।
অর্থোন্ননি রাজপ্রীতি পদসহকারে ॥ ৪০১ ॥
আশাতীত মঙ্গলের কারণ কেবল ।
প্রভুর করুণা আর আশিসের ফল ॥ ৪০২ ॥
কাপ্তেনের এই জ্ঞান ধরিয়া মুরতি ।
মনে মনে নাচিতে লাগিল দিবারাতি ॥ ৪০৩ ॥
বিপদভঞ্জন প্রভু অনাথের ত্রাতা ।
বিশ্বনাথ বিলক্ষণ বুঝিল বারতা ॥ ৪০৪ ॥
কলিকাতা আসা মাত্র সবার প্রথম ।
অগ্র কর্ম শ্রীপ্রভুর চরণ-বন্দন ॥ ৪০৫ ॥
অন্তরে আনন্দ কত ফুটে না কথায় ।
কণ্ঠবোধ শ্রীপ্রভুর চরণে লুটায় ॥ ৪০৬ ॥
ধারা বেরে দুই চোথে আনন্দের জল ।
ভিজাইল শ্রীপ্রভুর চরণকমল ॥ ৪০৭ ॥
আঁখিবারি এক ফোঁটা শ্রীপ্রভুর পায় ।
ফেলিলে কি ধন মিলে বলা নাহি যায় ॥ ৪০৮ ॥
জানিবার ইচ্ছা যদি থাকে তোর মন ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি করহ শ্রবণ ॥ ৪০৯ ॥
বেদপাঠী বিশ্বনাথ সাধারণ নয় ।
বিদ্যাাগুণ-গরিমার বহু পরিচয় ॥ ৪১০ ॥
বেদমধ্যে বর্ণে বর্ণে পাতায় পাতায় ।
সাধু ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী আছে যে যথায় ॥ ৪১১ ॥
জ্ঞানার্জন-উপায়-বিধান জানা যেটি ।
সাব্যসত্ত্বে কোনমতে নাহি ছিল ত্রুটি ॥ ৪১২ ॥
সকল বিফল গেল দীর্ঘকাল কেটে ।
এখন বাসনা পূর্ণ প্রভুর নিকটে ॥ ৪১৩ ॥
শ্রীপ্রভুর
বরশনে দেখে দিনে দিনে ।
জগতে না মিলে যাহা মিলে শ্রীচরণে ॥ ৪১৪ ॥
পরম সম্পদাস্পদ চরণ দুখানি ।
ছড়াছড়ি আছে কাছে নানা রত্নমণি ॥ ৪১৫ ॥
রামের সহিত একদিন আলাপন ।
দক্ষিণশহরে নানা কথোপকথন ॥ ৪১৬ ॥
ভক্তবর ধীরবর বুঝিয়া বারতা ।
ভক্ত রাম জিজ্ঞাসিল শ্রীপ্রভুর কথা ॥ ৪১৭ ॥
আপনি বুঝেন কিবা প্রভুর সম্বন্ধে ।
শুনি ভক্ত উপাধ্যায় ফুলিল আনন্দে ॥ ৪১৮ ॥
প্রসারিয়া দুই হাত করেন উত্তর ।
যদ্যপিহ থাকে কেহ দুনিয়া ভিতর ॥ ৪১৯ ॥
তবে দেখি এই একা শ্রীপ্রভু কেবল ।
অপর যেখানে যত সকলে পাগল ॥ ৪২০ ॥
প্রসন্ন হইয়া প্রভু সদয় হইলে ।
বেদে যা না মিলে তাহা এ'র কাছে মিলে ॥ ৪২১ ॥
এখন কাপ্তেন গেছে অতিশয় মজে ।
মধুভরা শ্রীপ্রভুর চরণ-পঙ্কজে ॥ ৪২২ ॥
অবসর পাইলেই আসে দরশনে ।
কখন লইয়া যায় আপন ভবনে ॥ ৪২৩ ॥
ভক্তিভরে প্রভুবরে করায় ভোজন ।
গৃহিণী আপুনি করে স্বহস্তে রন্ধন ॥ ৪২৪ ॥
ঘৃতপক্ক ভোজ্যসহ নানা তরকারি ।
প্রসিদ্ধ তাঁহার হাতে পাঁঠার চচ্চড়ি ॥ ৪২৫ ॥
ভক্তির ফোড়ন তাই শ্রীপ্রভুর মিষ্ট ।
প্রভুদেব কাপ্তেনের সেবায় সন্তুষ্ট ॥ ৪২৬ ॥
যাহাতে না হয় কর লক্ষ্য সেইখানে ।
আঁচানর আয়োজন ভোজন যেখানে ॥ ৪২৭ ॥
দুইজনে স্ত্রী-পুরুষে ভোজনের পর ।
শ্রীঅঙ্গে ব্যজন করে আনন্দ অন্তর ॥ ৪২৮ ॥
একদিন মলত্যাগে গিয়া পাইখানা ।
ভাবস্থ ঠাকুর নাই বাহ্যিক ঠিকানা ॥ ৪২৯ ॥
কাপ্তেন জানিয়া তবে দ্রুত তথা যায় ।
যথা উপযুক্ত স্থানে প্রভুকে বসায় ॥ ৪৩০ ॥
মনে নাই কোন ঘৃণা আচারী ব্রাহ্মণ ।
অপরূপ প্রভুপদে ভক্তি আচরণ ॥ ৪৩১ ॥
মানামান নাই গ্রাহ্য প্রভুর সেবায় ।
শ্রীপদে এতেক মত্ত ভক্ত উপাধ্যায় ॥ ৪৩২ ॥
কেও-কেটা নয় বড় কাপ্তেন এখন ।
রাজদরবারে পায় উত্তম আসন ॥ ৪৩৩ ॥
মান্যগণ্য মধ্যে নাই মান্যের অবধি ।
বাঙ্গালায় নেপালের রাজ-প্রতিনিধি ॥ ৪৩৪ ॥
এখানে রাজার কাজে যাবতীয় ভার ।
ইংরেজ লাটের সঙ্গে করে দরবার ॥ ৪৩৫ ॥
সেজন কি হেতু হেথা শ্রীচরণে লুটে ।
বিচারিয়া দেখ যদি ভক্তি থাকে ঘটে ॥ ৪৩৬ ॥
জনাকীর্ণ রাজপথে প্রভুকে দেখিলে ।
দণ্ডবৎ প্রণিপাত লুটে পদতলে ॥ ৪৩৭ ॥
শিরে ছত্র শ্রীপ্রভুর নিজে হাতে ধরে ।
ভক্তির কাহিনী কথা কব পরে পরে ॥ ৪৩৮ ॥
হাতে না পাইয়া হরি ভক্তবর রাম ।
বড়ই অধীর চিত্ত অশান্তি পরান ॥ ৪৩৯ ॥
হাহাকার অবিরাম হৃদয়মাঝারে ।
কহিল দুঃখের কথা প্রভুর গোচরে ॥ ৪৪০ ॥
উত্তরে কহেন তাঁরে প্রভু গুণমণি ।
সকল হরির ইচ্ছা কি কহিব আমি ॥ ৪৪১ ॥
বিষম সঙ্কট রোগে স্বপ্ন নাড়ী বহে ।
ভিষক হতাশ বোল যদি তায় কহে ॥ ৪৪২ ॥
শুনিয়া রোগীর যেন বাকি নাড়ী যায় ।
তেমনি হইলা রাম প্রভুর কথায় ॥ ৪৪৩ ॥
অবশ কম্পিত জিহ্বা না হয় চালন ।
অতিকষ্টে কহে রোগী চরম বচন ॥ ৪৪৪ ॥
সেইরূপ প্রভু পরে দত্ত ভক্তবর ।
করিতে লাগিল অতি জড়সড় স্বর ॥ ৪৪৫ ॥
অনাথ-আশ্রয় প্রভু দুর্বলের বল ।
দরিদ্র কাঙ্গালে পথে সহায় সম্বল ॥ ৪৪৬ ॥
হতাশের আশারূপ পিপাসীর বারি ।
কাণা খোঁড়া পতিতের পারের কাণ্ডারী ॥ ৪৪৭ ॥
এই জ্ঞানে এত দিন করি যাতায়াত ।
এখন কি হেতু শিরে হেন ব্রজ্রাঘাত ॥ ৪৪৮ ॥
অধিক কর্কশে প্রভু কন পুনরায় ।
ইচ্ছা হয় এস নয় না এস হেথায় ॥ ৪৪৯ ॥
হইয়াছে এতখানি বয়স আমার ।
লই নাই কার কিছু খাই নাই কার ॥ ৪৫০ ॥
শুনে
শিহরাঙ্গ রাম উঠে কাঁপি কাঁপি ।
রুষ্ট বাক্য শ্রীপ্রভুর বাজে বজ্রাদপি ॥ ৪৫১ ॥
বাহিরে আসিয়া মনে করে বারে বারে ।
ধরণী বিদীর্ণ হও প্রবেশি ভিতরে ॥ ৪৫২ ॥
সন্নিকটে সুরধুনী ভাবে আর বার ।
সলিলে ডুবিব প্রাণ রাখিব না আর ॥ ৪৫৩ ॥
প্রাণবিসর্জনে রাম যুক্তি করি স্থির ।
ঘরে না ফিরিয়া রহে মন্দির বাহির ॥ ৪৫৪ ॥
সময় বিগতে প্রাণে আইল মমতা ।
মনে পড়ে স্বপ্নে প্রাপ্ত মন্তরের কথা ॥ ৪৫৫ ॥
বিচারিরা নিজ মনে করিলেন সার ।
মরি তো মরিব মন্ত্র দেখি একবার ॥ ৪৫৬ ॥
ভাগ্যবান স্বপ্নে মন্ত্র পায় যেই জন ।
অপর কাহার নয় প্রভুর বচন ॥ ৪৫৭ ॥
এত ভাবি জপিতে লাগিল প্রাণপণে ।
মরণপ্রতিজ্ঞ রাম মন্ত্র-সংগোপনে ॥ ৪৫৮ ॥
অতিশয় ঘোর নিশি নিশীথের কাল ।
চুপ ধরা গায়ে পরা আঁধারের জাল ॥ ৪৫৯ ॥
ঘুমন্ত জীবন্ত যত প্রাণান্তের প্রায় ।
কলনাদী কাছে গঙ্গা শব্দ নাহি তায় ॥ ৪৬০ ॥
সলিল-শয্যায় যেন ঘুমে অচেতন ।
পান্থশালে পরিশ্রান্ত পথিক যেমন ॥ ৪৬১ ॥
চিরকাল চলা বায়ু মহানিদ্রা যায় ।
সুকোমল সুশীতল গাছের পাতায় ॥ ৪৬২ ॥
গম্ভীর নীরব ভাব জড় কি চেতনে ।
শান্তিময়ী সুষুপ্তি বিরাজ সর্বস্থানে ॥ ৪৬৩ ॥
শান্তি নাই তাঁহে যিনি শাস্তির আকর ।
সর্বশান্তিদাতা প্রভু পরম ঈশ্বর ॥ ৪৬৪ ॥
দুগ্ধফেননিভ শয্যা প্রভুর আমার ।
ছটফট গোটা রাতি নিদ্রা নাহি আর ॥ ৪৬৫ ॥
মুহুর্মুহুঃ সচঞ্চল উচাটন মন ।
সিদ্ধমন্ত্র শ্রীরামের জপের কারণ ॥ ৪৬৬ ॥
থাকিতে না পারি আর হইলা বাহির ।
একবারে রাম যেথা তথায় হাজির ॥ ৪৬৭ ॥
বিষাদ-আশঙ্কা-নাশ ভরসায় ভরা ।
শ্রীপ্রভুর সুমধুর বাক্যের চেহারা ॥ ৪৬৮ ॥
তাহে বলিলেন রামে আপনার ঘরে ।
কিছু দিন ঈশ্বরের ভক্ত সেবিবারে ॥ ৪৬৯ ॥
সাধনাস্বরূপ ভক্ত-সেবা-আচরণ ।
আত্মগণ পক্ষে লাগে বিষম-বন্ধন ॥ ৪৭০ ॥
ভক্ত-সেবা একি বাবা ভাবে দত্ত রাম ।
এ আবার কিবা জ্বালা দিলা ভগবান ॥ ৪৭১ ॥
অর্থব্যয় অতিশয় জঞ্জাল দারুণ ।
যা হোক করিতে হবে প্রভুর হুকুম ॥ ৪৭২ ॥
অর্থাসক্তি বড়ই বিপত্তি ভক্ত জনে ।
ঈশ্বরে না হয় মতি যদি ইহা টানে ॥ ৪৭৩ ॥
তাই ভক্ত-সেবা-বিধি দিলা ভগবান ।
আসক্তি হইতে রামে করিবারে ত্রাণ ॥ ৪৭৪ ॥
সংসারীর বেশে রাম ছেলেপুলে বাড়ি ।
শরীর-শোণিত বুঝে এক কড়া কড়ি ॥ ৪৭৫ ॥
শুন মন কেমনে আসক্তি কৈলা দূর ।
ভবের কাণ্ডারী প্রভু দয়াল ঠাকুর ॥ ৪৭৬ ॥
প্রভু-ভক্তে প্রভু-ভক্তে পরস্পর টান ।
সে কি টান অন্যে কেহ জানে না সন্ধান ॥ ৪৭৭ ॥
সব যার রামকৃষ্ণ একমাত্র পুঁজি ।
সেই রামকৃষ্ণভক্ত ভক্তে তাঁরে রাজী ॥ ৪৭৮ ॥
সম্প্রদায়িভাবহীন সব ধর্ম মানে ।
যে পথে যে যায় তার বাঁকা নহে মনে ॥ ৪৭৯ ॥
সশঙ্কিতচিত যেথা কামিনী-কাঞ্চন ।
রামকৃষ্ণ-পন্থীদের বিশেষ লক্ষণ ॥ ৪৮০ ॥
এবে ধর্মসম্প্রদায়ের ভক্ত যাঁরা জানা ।
এক ধর্মপন্থী করে অন্য জনে ঘৃণা ॥ ৪৮১ ॥
সর্বশ্রেষ্ঠ তাঁর ধর্ম এই মনে করে ।
তুষ কুটি মাটি যাহা অপরে আচরে ॥ ৪৮২ ॥
বিপরীত ধর্মভাব সেই সে কারণ ।
রামকৃষ্ণপন্থী সঙ্গে না হয় মিলন ॥ ৪৮৩ ॥
অন্য সম্প্রদায়ে ভক্ত যাঁরা পরিচিত ।
রামের না হয় মেল তাঁদের সহিত ॥ ৪৮৪ ॥
খুঁজিয়া না পান ভক্ত সেবার কারণ ।
বাহিরের কার সঙ্গে নাহি লাগে মন ॥ ৪৮৫ ॥
ভাবি প্রস্ফুটিত ভক্তি প্রভুর চরণে ।
সামান্য আভাস বাহ্যে সব সংগোপনে ॥ ৪৮৬ ॥
হেন জন দরশনে মনোমত হয় ।
আদর করিয়া রাম আনেন আলয় ॥ ৪৮৭ ॥
সেই সঙ্গে প্রভুদেবে করি নিমন্ত্রণ ।
মহৎ উৎসব করে সহ সংকীর্তন ॥ ৪৮৮ ॥
মহোৎসবে পেয়ে রাম পরম পিরীতি ।
সেবা সহ সংকীর্তন করে নিতি নিতি ॥ ৪৮৯ ॥
ভকত-সেবায় বাড়ে দিন দিন টান ।
টাকায় না থাকে আর টাকার গিয়ান ॥ ৪৯০ ॥
চাকিরে দেখিল ফাঁকি ব্যবহারে ফল ।
দুই হাতে ব্যয় যেন পুকুরের জল ॥ ৪৯১ ॥
ভক্ত-সেবা এই শুরু রামের আগারে ।
বিস্তর হইল কথা কব পরে পরে ॥ ৪৯২ ॥
ভক্ত-সেবা ছিল এক মহা অন্তরাল ।
গেল সরে এইবার ফুটিবার কাল ॥ ৪৯৩ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেব ধরা দিলা তাঁরে ।
শুন কথা একদিন দক্ষিণশহরে ॥ ৪৯৪ ॥
একাধারে শ্রীমন্দিরে রাম সমাসীন ।
আর কত তত্ত্ব-লুব্ধ নবীন প্রাচীন ॥ ৪৯৫ ॥
ভক্তিমাখা হিত-উক্তি ফুটে শ্রীবদনে ।
সুবোধ্য অবোধ্য তত্ত্ব বলিবার গুণে ॥ ৪৯৬ ॥
মুগ্ধমনে সবে শুনে দিন গেল কেটে ।
ঘুরে ঘুরে দিবাকর প্রায় বসে পাটে ॥ ৪৯৭ ॥
গোধুলি ধূসর-বাসে ঢাকে দিবাকর ।
কে লয় এখন আর কালের খবর ॥ ৪৯৮ ॥
ভেবে হবে যেগ মন কি ছিল কথায় ।
প্রবণবিমুগ্ধ বাণী শুনিলে ভুলায় ॥ ৪৯৯ ॥
এল রাতি উর্ধ্বগতি হইল প্রহর ।
তখন ভাঙ্গিলা প্রভু আপনি আসর ॥ ৫০০ ॥
মেঘাচ্ছন্নহেতু অন্ধকারময় নিশি ।
আগে অরণ্য তারা নিশামাণি শশী ॥ ৫০১ ॥
ক্রমে ক্রমে লোকধন লইয়া বিদায় ।
যে দিকে যাহার ঘর সে দিকে সে যায় ॥ ৫০২ ॥
মন্দির জনতাশূন্য সব অন্তর্ধান ।
এই এক ভক্ত সঙ্গে কাছে আছে রাম ॥ ৫০৩ ॥
তিনিও অভয়পদে লইয়া বিদায় ।
আইলা বাহিরে মন্দিরের বারাণ্ডায় ॥ ৫০৪ ॥
প্রেমের যেমন রীতি পাছু চায় যেতে ।
রাম দেখিলেন প্রভু আসেন পশ্চাতে ॥ ৫০৫ ॥
পরম পুলকচিতে ফিরে আসি রাম ।
যুগলচরণে পুনঃ করিল প্রণাম ॥ ৫০৬ ॥
ধরি কল্পতরুরূপ প্রভু ভগবান ।
বলিলেন ভক্ত রামে কিবা চাও রাম ॥ ৫০৭ ॥
রূপেতে কি ফুটে রূপ কিরূপ কথায় ।
কিছুই আভাস তার কহা নাহি যায় ॥ ৫০৮ ॥
নন-বিমোহন ইষ্টরূপ তার খেলে ।
মোহিত ইন্দ্রিয় এত লুটে পদতলে ॥ ৫০৯ ॥
সুন্দর সুঠামে নাই রূপের ঠিকানা ।
সতত বিভোরে হেরে আঁখির কামনা ॥ ৫১০ ॥
সঙ্গে ল'য়ে যোলআনা মনখানি তা্র ।
যেন আঁখি-আবরণে আঁখি না ঢাকায় ॥ ৫১১ ॥
(কিবা চাও) বাক্যমধ্যে কিরূপ বাহির ।
নাশিল পশিয়া হবে আঁধার তিমির ॥ ৫১২ ॥
নূতন নয়ন দিয়া দেখাইলা রামে ।
বাক্য ধরে তত তেজ যত রূপ ঠামে ॥ ৫১৩ ॥
শ্রুতিপ্রীতিরুচিকর একই অধিক ।
বীণা বেণু তুলনায় যেন ধিক্ ধিক্ ॥ ৫১৪ ॥
শুন শ্রুতি মুগ্ধ অতি মিনতি প্রচুর ।
সদা যেন বাজে তাহে শ্রীবাণী প্রভুর ॥ ৫১৫ ॥
বিহ্বলে দেবেন রাম সৌভাগ্যে সুদিন ।
নাম-কাঁটা ভক্তি-টোলে ধরা দিলা মীন ॥ ৫১৬ ॥
আগে যেই আজ সেই প্রভুর মূরতি ।
তবু তাতে কিবা এক অভিনব ভাতি ॥ ৫১৭ ॥
যাহার প্রভাবে দেখি মনে বলে রাম ।
তুমি সেই বিশ্বশুরু হরি ভগবান ॥ ৫১৮ ॥
তোমার কারণে ফিরি তোমার নিকটে ।
কাঁধেতে কুড়ালি বন বেড়ানু হাঁকুটে ॥ ৫১৯ ॥
কি আর চাহিব প্রভু কহে ভক্ত রাম ।
আপুনি বলিয়া দেন করুণানিধান ॥ ৫২০ ॥
বলিলেন প্রভুদেব মৃদুমন্দ স্বরে ।
আমার প্রদত্ত মন্ত্র মোরে দেহ ফিরে ॥ ৫২১ ॥
সাধন-ভজন-জপে নাহি প্রয়োজন ।
সকল হইল আজ ক্রিয়া-সমাপন ॥ ৫২২ ॥
শুনি ভক্তচূড়ামণি ধরণী লুটায় ।
প্রত্যার্পণ কৈল মন্ত্র শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৫২৩ ॥
পদতলে বিলুপ্তিত ভকতের মাথা ।
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেবে পরম দেবতা ॥ ৫২৪ ॥
মহাভাবাবেশ গায় নাহিক চেতন ।
লুইলেন তালুদেশে দক্ষিণ চরণ ॥ ৫২৫ ॥
হেনভাবে কতক্ষণ গত হ'লে পর ।
আইল বাহ্যিক জ্ঞান শ্রীঅঙ্গ-উপর ॥ ৫২৬ ॥
সরাইয়া শ্রীচরণ কহেন ভক্তবরে ।
মিটাও দর্শন-সাধ দেখিয়া আমারে ॥ ৫২৭ ॥
আর এক কথা যবে আসিবে এখানে ।
এক পয়সার কিছু দ্রব্য এন কিনে ॥ ৫২৮ ॥
দুর্বোধ্য সাধনাতীত ব্যাপ্ত সর্বস্থান ।
বিশ্বাধার বিশ্বাধেয় সর্বশক্তিমান ॥ ৫২৯ ॥
সৃষ্টি-স্থিতি-লয় শক্তি ইশারায় যাঁর ।
অগণ্য ব্রহ্মাও নিত্য মাঠ খেলিবার ॥ ৫৩০ ॥
হাজার হাজার ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ।
ভৃত্যবেশে যুক্তকর থাকে নিরন্তর ॥ ৫৩১ ॥
লীলা নিত্যে দুয়ে যিনি সদা বিদ্যমান ।
অনাদি অনন্ত পরা পুরুষপ্রধান ॥ ৫৩২ ॥
মনাদি ইন্দ্রিয় যত সকলের পার ।
তিল শক্তি নাহি গায় তিল বুঝিবার ॥ ৫৩৩ ॥
লীলাশক্তি সঙ্গে সদা ক্রীড়া নিরন্তর ।
যত কিছু সৃষ্টিমধ্যে যাঁহার ভিতর ॥ ৫৩৪ ॥
জড় কি চেতন যত তাঁর মধ্যে খেলে ।
জলচর বিচরণ যেন করে জলে ॥ ৫৩৫ ॥
কোনকালে কার সত্তা থাকে না সে বিনে ।
এতদূর মাখামাখি কায়-বাক্য-মনে ॥ ৫৩৬ ॥
হাতে ধ'রে নিয়ে ঘুরে সঙ্গে হাসে কাঁদে ।
স্বাধীনে স্বাধীন বন্দী যদি কেহ বাদে ॥ ৫৩৭ ॥
ধ'রে আছে কিন্তু তাঁরে ধরিবারে গেলে ।
খুঁজিয়া না পাওয়া যায় কোথা যায় চলে ॥ ৫৩৮ ॥
দুনিয়া খুঁজিলে নাহি মিলে দরশন ।
যেমন সহজ পুনঃ দুর্লভ তেমন ॥ ৫৩৯ ॥
শুনিতে বড়ই সোজা অনায়াসে মিলে ।
ছাঁচায় ছাঁচায় জল বরিষার কালে ॥ ৫৪০ ॥
নিশ্ছিদ্র হইলে পাত্র জল ধরে তায় ।
সছিদ্রে এদিকে ঢুকে ওদিকে বেরায় ॥ ৫৪১ ॥
সোজা কথা ভগবান অবতার-কালে ।
সমভাবে দেখে শুনে মানুষসকলে ॥ ৫৪২ ॥
ভ্রান্ত কথা ইহা লীলা কর দরশন ।
সূক্ষ্মেতে যেমন দূর স্থলেতে তেমন ॥ ৫৪৩ ॥
নর-রূপে বড় ফের গুপ্ত সাজ গায় ।
ভোজের যাদুর সম জিয়াদা ভুলায় ॥ ৫৪৪ ॥
'এও বটে ওও বটে' শুন শুন মন ।
হাজার না থাক চাঁদে মেঘ-আবরণ ॥ ৫৪৫ ॥
মেঘভেদী কর ঢাকা কখন না পড়ে ।
নানা দিকে নানা ভাবে ধারা বেয়ে ঝরে ॥ ৫৪৬ ॥
তেমতি যদিও প্রভু মায়ার ভিতর ।
তবু অঙ্গে ফুটে কোটি চন্দ্রিমার কর ॥ ৫৪৭ ॥
হীনমতি মন তুমি কব কি আখ্যান ।
দুর্বলের বেশে প্রভু সর্বশক্তিমান ॥ ৫৪৮ ॥
অবিদ্যারূপিণী মায়া কামিনী-কাঞ্চনে ।
আধিপত্য দিবারাত্র করে জগজনে ॥ ৫৪৯ ॥
দেব কি কিন্নরজাতি কেহ নাহি ছাড়া ।
সকলে ঘুরায় দুয়ে লাটিমের পারা ॥ ৫৫০ ॥
এমন মায়ার বল হত যাঁর জোরে ।
তাঁহার অপেক্ষা বলী বল তুমি কারে ॥ ৫৫১ ॥
সর্বশক্তিমান প্রভু দীনের চেহারা ।
কৃপা করি ভক্ত রামে আজ দিলা ধরা ॥ ৫৫২ ॥
ভক্ত-সংজোটন-লীলাকাও বলিহারী ।
সংসার-জলধি-পারে যাইবার তরী ॥ ৫৫৩ ॥
তৃতীয় খণ্ড
কুমার
সন্ন্যাসী যোগীন্দ্র ও বহু অন্তরঙ্গের আগমন
(বহিরঙ্গের
আগমন ও হৃদয়ের বিদায়)
(উপেন্দ্র মজুমদার, নবাই চৈতন্য, ভবনাথ, লাট্টু, হরিশ, কেদার, মহিম, প্রাণকৃষ্ণ, গোপালের মা, দুর্গাচরণ, সুরেশ দত্ত, হৃদয়ের বিদায়, যোগীন-মা, গৌর-মা)
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রবণকীর্তনানন্দ প্রভুর ভারতী ।
স-মনে শুনিলে মিলে বন্ধনে মুকতি ॥ ১ ॥
মনোযোগসহ মন করিয়া শ্রবণ ।
টুটাইয়া দেহ মোর মায়ার বন্ধন ॥ ২ ॥
সমাচারপত্রিকায় মহিমা প্রভুর ।
লিখেন কেশবচন্দ্র সাধ্য যত দূর ॥ ৩ ॥
সুন্দর বর্ণনাসহ মনোমুগ্ধকর ।
ছটি পায়ে কেশবের লক্ষ কোটি গড় ॥ ৪ ॥
তিনিই কেবল মূল ভক্ত-সংজোটনে ।
ভক্তি মিলে কেশবের মুরতি-স্মরণে ॥ ৫ ॥
সারগ্রাহী গুণগ্রাহী সূক্ষ্ম দৃষ্টি তার ।
বহিরঙ্গে কেশবের মত মেলা দায় ॥ ৬ ॥
লীলা কব তুলনা বাসনা মম নয় ।
ন্যূন নহে পূজনীয় গোস্বামী বিজয় ॥ ৭ ॥
ভাবি প্রস্ফুটিত ফুলে সৌরভ গোপন ।
তেমতি বিজয় এবে কলিকা নূতন ॥ ৮ ॥
পরিচয় হইয়াছে শ্রীপ্রভুর সাথে ।
বড় সংকীর্তন-প্রিয় প্রভুর কৃপাতে ॥ ৯ ॥
মনে রেখ ব্রাহ্ম তিনি কেশবের দলে ।
সাকারে বেজার তাই কালি দিল কুলে ॥ ১০ ॥
খুলে কথা কব পরে যতেক তাঁহার ।
এবে তিনি ডেলা সোনা বাটের আকার ॥ ১১ ॥
মনোহর অলঙ্কার সুন্দর সজ্জিত ।
মণি মুক্তা-মরকতে করিয়া ভূষিত ॥ ১২ ॥
গঠিলা কেমনে তাঁরে প্রভু কারিগর ।
দেখিবে চতুর্থ খণ্ড পুঁথির ভিতর ॥ ১৩ ॥
পুড়ন পিটন এবে গড়নের কথা ।
ঘুচে যায় শুনিলে মনের মলিনতা ॥ ১৪ ॥
এখন কেশব ব্রাহ্মধর্মে রথী একা ।
গগন উপরে উড়ে যশের পতাকা ॥ ১৫ ॥
দেশ জুড়ে সকলেই নাম-গুণ গায় ।
বড় খুশী তাঁহার লিখিত পত্রিকায় ॥ ১৬ ॥
মনোযোগে ছেলে বুড়ো ঘরে ঘরে পড়ে ।
পত্রপাঠে ভক্ত এক আইলা আসরে ॥ ১৭ ॥
দক্ষিণশহরে ঘর ব্রাহ্মণ-কুমার ।
ষোড়শ-বৎসর বয়ঃ বাপ জমিদার ॥ ১৮ ॥
মুখখানি হাসিমাখা সরল গঠন ।
প্রফুল্ল বদনে শোভে সুন্দর নয়ন ॥ ১৯ ॥
নিরখি না হেন আঁখি লোকের ভিতরে ।
দেখিলে দেখিতে ইচ্ছা দিবারাতি করে ॥ ২০ ॥
কান দিকে যেই প্রান্ত ঊর্ধ্বে তার টান ।
ধনুকের মত করে ভুরুর সন্ধান ॥ ২১ ॥
সেই পথে চলে অশ্রু ঝরে যবে তাঁর ।
নিম্নগা জলের নাম জলেতে ভাসায় ॥ ২২ ॥
পরিচয়ে নিত্যযুক্ত লজ্জা আবরণ ।
ঈশ্বরকোটির থাকে১
প্রভুর বচন ॥ ২৩ ॥
একমাত্র লোকলজ্জা সাজের ভিতর ।
রিপুগণ গায়ে যেন মৃত বিষধর ॥ ২৪ ॥
কিংবা যেন টল-মূল বৃদ্ধের দশন ।
আদি নহে কাল যার নিশ্চয় পতন ॥ ২৫ ॥
শৈশবে শিশুর সঙ্গে খেলা যে সময় ।
শিশুর মতন খেলা প্রীতিকর নয় ॥ ২৬ ॥
ভেঙ্গে দিয়া খেলাশাল সঙ্গী পরিহরি ।
ক্ষুণ্ণ-মনে একপ্রান্তে দাঁড়াতেন ফিরি ॥ ২৭ ॥
কেন হেন সঙ্গিগণ জিজ্ঞাসিলে পরে ।
বলিতেন মুখ ভারি যত সহচরে ॥ ২৮ ॥
আমার খেলুনি আছে, আছে খেলা-ঘর ।
সে নয় এখানে আছে আছে সহচর ॥ ২৯ ॥
স্বতন্তর আছে কোথা দেখি দেখি বলি ।
দেখিতে দেখিতে যেন পুনরায় ভুলি ॥ ৩০ ॥
সুন্দর বড়ই তারা সকলেই ভাল ।
লতায় লতায় ঘর ফুলে ফুলে আলো ॥ ৩১ ॥
সে খেলা সে বেশ খেলা নয় হেন রীতি ।
সেথা বাই তোরা নোস খেলিবার সাথী ॥ ৩২ ॥
বলিতে দেখিতে হেন জাগিয়া স্বপন ।
নিজ মনে পথে পথে ঘরে আগমন ॥ ৩৩ ॥
শৈশব বয়স পরে কিছু বড় হ'লে ।
পাঠশিক্ষা-হেতু পিতা দিলা পাঠশালে ॥ ৩৪ ॥
তখন রজনীযোগে প্রায় প্রতি নিশি ।
শুইবার ঘরে তাঁর জ্বলে জ্যোতিঃরাশি ॥ ৩৫ ॥
গোটা ঘর জ্যোতির্ময় জ্যোতির ছটায় ।
ঘরে কোনখানে কিবা সব দেখা যায় ॥ ৩৬ ॥
এখন যোড়শ বর্ষ মাত্র বয়ঃক্রম ।
লেখা-পড়া শিখিবারে নাহি তত মন ॥ ৩৭ ॥
স্বভাবতঃ কামিনীতে অতিশয় ঘৃণা ।
ধর্মতত্ত্ব ব্যক্ত যাহে তাই পড়া শুনা ॥ ৩৮ ॥
আজি কালি কেশবচন্দ্রের পত্রিকায় ।
আগাগোড়া থাকে ভরা ধর্মের কথায় ॥ ৩৯ ॥
সে হেতু আদরে পত্রপাঠ নিতি নিতি ।
বারে বারে চোখে পড়ে প্রভুর ভারতী ॥ ৪০ ॥
প্রভুর
দর্শন-আশে লোলুপ হইয়া ।
পুরীতে আসেন ঘরে কিছু না কহিয়া ॥ ৪১ ॥
সভয়-অন্তর একা লজ্জা তাঁর খেলে ।
সঙ্গে নাই দাস-দাসী ধনাঢ্যের ছেলে ॥ ৪২ ॥
মন্দির বাহিরে হয় প্রভুর তল্লাস ।
প্রবেশিতে ভিতরে অন্তরে আসে ত্রাস ॥ ৪৩ ॥
অচেনা শ্রীপ্রভুদেব মূর্তি নাই চেনা ।
কে পরমহংস কিছু না পান ঠিকানা ॥ ৪৪ ॥
এইরূপে যাতায়াত হয় বারে বারে ।
দরশনে একদিন সুযোগ মন্দিরে ॥ ৪৫ ॥
ঘরভরা লোক দূরে ঠিক করা ভার ।
গঙ্গাপানে মন্দিরের বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৪৬ ॥
তফাতে দাঁড়ায়ে পথে হৈল অনুমান ।
এখানে আছেন যাঁর এতই সন্ধান ॥ ৪৭ ॥
কিবা ঈশ্বরীয় কথা হয় আলোচনা ।
দুই কান পাতি রহে যদি যায় শুনা ॥ ৪৮ ॥
হেনকালে অকস্মাৎ কোন এক জন ।
লয়ে গেল শ্রীমন্দিরে যথা নারায়ণ ॥ ৪৯ ॥
শ্রীমন্দিরে আজি ব্রাহ্মগণের বাজার ।
নাম জয়গোপাল উপাধি সেন তাঁর ॥ ৫০ ॥
আর আর সম্ভ্রান্ত অনেক লোক সাথে ।
এসেছেন পূজ্যতম প্রভুরে দেখিতে ॥ ৫১ ॥
কথোপকথন শেষ কাল ফিরিবার ।
বিদায়ান্তে প্রভুদেবে করে নমস্কার ॥ ৫২ ॥
একে একে যতগুলি সব গেল সরে ।
ব্রাহ্মণকুমার দেখে বসে একধারে ॥ ৫৩ ॥
যোগীন্দ্র ইহার নাম মহাভাগ্যবান ।
ধনাঢ্য নবীনচন্দ্র রায়ের সন্তান ॥ ৫৪ ॥
যোগীন্দ্র যেমন নাম তেন গুণযুক্ত ।
তেন মিতা যোগসিদ্ধ যেন নিত্যযুক্ত ॥ ৫৫ ॥
'আগে ফল পরে ফুল ফলে যে প্রকার ।'
সেইমত প্রভুভক্ত অঙ্গ যাঁরা তাঁর ॥ ৫৬ ॥
জৈব রূপে শৈব ভাব বৈভব গোপন ।
মহাধাঁধা অন্ধে লাগে বন্ধ যেই জন ॥ ৫৭ ॥
অগুদ্ধি জীবের বুদ্ধি কুঞ্চিত মলিনে ।
বংশ সম ঘুণে জয়া কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৫৮ ॥
হৃদয় প্রত্যয়হীন ক্ষীণ মন্দ গতি ।
উপহাস-যত্ন যার কৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ৫৯ ॥
স্ব স্ব জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ মানে অন্যে করে ঘৃণা ।
ধর্ম-আচরণ ভান যশের বাসনা ॥ ৬০ ॥
পরছিদ্র অন্বেষক পরনিন্দাপর ।
ধীনমতি নাই শক্তি দেখে নিজ ঘর ॥ ৬১ ॥
বুঝে না বুদ্ধির দোষে বিধির লিখন ।
সুধার আস্বাদ-হেতু বিষের জনম ॥ ৬২ ॥
নিজের যেমন তেন অপরের জ্ঞান ।
মত-ভেদ মাত্র পথে সকলে সমান ॥ ৬৩ ॥
এ গিয়ান ঘটে কভু নাহি খেলে তার ।
বিক্ ধিক্ জীববুদ্ধি কেবল ঘৃণার ॥ ৬৪ ॥
হীন হেয় যে জীবের বুদ্ধি এইরূপ ।
কেমনে সম্ভব দেখে প্রভুর স্বরূপ ॥ ৬৫ ॥
ভক্তগণ অঙ্গ তাঁর জীবের আধারে ।
নিত্যযুক্ত নিত্যসিদ্ধ মুক্তি দিতে পারে ॥ ৬৬ ॥
নবীনে প্রবীণ-বুদ্ধি না শিখে পণ্ডিত ।
বুঝিবে শুনহ রামকৃষ্ণলীলাগীত ॥ ৬৭ ॥
বড় খুশী প্রভু দেখি ব্রাহ্মণ কুমার ।
জিজ্ঞাসিলা কোথা ঘর কেবা পিতা তাঁর ॥ ৬৮ ॥
পরিচয়ে শ্রীপ্রভু অধিক আনন্দিত ।
বালকের পিতা তাঁর খুব পরিচিত ॥ ৬৯ ॥
সোহাগে ধরিয়া হাত পুনশ্চ জিজ্ঞাসা ।
কি মনে করিয়া আল এইখানে আসা ॥ ৭০ ॥
আমারে দেখিরা ধনে কি হয় তোমার ।
হৃদয়ে প্রত্যয় কিথা কহ সমাচার ॥ ৭১ ॥
সরলে যোগীন্দ্র কৈল উত্তর প্রদান ।
অন্য কেহ নই তুমি নিজে ভগবান ॥ ৭২ ॥
শুন ঘন
অল্পবয়ঃ বালকের কথা ।
কেমনে বুঝিলা বল নিগুঢ় বারতা ॥ ৭৩ ॥
কেমনে চিনিলা তাঁরে কি দেখিলা তাঁর ।
মহাগুণ আবরণ নরসাজ গায় ॥ ৭৪ ॥
মূর্খ আমি শাস্ত্র-গ্রন্থে বুদ্ধি বড় আন ।
শক্তি নাই দিতে অল্প লীলার প্রমাণ ॥ ৭৫ ॥
জানি রামকৃষ্ণ প্রভু ঠাকুর আমার ।
এ লীলায় প্রমাণেতে শ্রীবাক্য তাঁহার ॥ ৭৬ ॥
তন্ত্রগীতাবেদাপেক্ষা বহু গুরুতর ।
শ্রীবদন-বিগলিত যে কোন অক্ষর ॥ ৭৭ ॥
ফি বাক্যের প্রতিবর্ণ সিন্ধুর মতন ।
কে লবে কতই তার এত রত্ন ধন ॥ ৭৮ ॥
প্রমাণেতে শুন তবে প্রভুর বচন ।
একবার দরশনে চিনে কোন্ জন ॥ ৭৯ ॥
ঈশ্বরকোটীর থাকে অঙ্গের মতন ।
নিত্যশুদ্ধ নিতাযুক্ত নিত্য-সচেতন ॥ ৮০ ॥
যেথা সেথা সঙ্গে সঙ্গে কভু নহে ছাড়া ।
তাঁরাই দেখিবামাত্র ঠিক পান ধরা ॥ ৮১ ॥
বুঝ তবে এবে কেবা ব্রাহ্মণ-কুমার ।
চিনিলেন কিবা বলে প্রভু অবতার ॥ ৮২ ॥
পুনরায় প্রভুরায় পুছিলেন তারে ।
কেহ নাহি কহে হেন দক্ষিণশহরে ॥ ৮৩ ॥
কেমনে চিনিলে বা কি বুঝিলে প্রমাণ ।
কি হেতু আমারে তুমি কহ ভগবান ॥ ৮৪ ॥
শুন মন বালকের উত্তরের ছটা ।
লীলাগ্রন্থ পাতা মাত্র নাহি যার ঘাঁটা ॥ ৮৫ ॥
তথাপিহ লীলা যত বিধিমত জানা ।
স্মৃতিপথে যুথে যুথে করে আনাগোনা ॥ ৮৬ ॥
যোগীন্দ্র কহেন কথা কৃষ্ণ-অবতারে ।
জনম যখন হয় কংস-কারাগারে ॥ ৮৭ ॥
চারিধারে নিযুক্ত প্রহরী অগণন ।
তাহাদের মধ্যে ভক্ত দুই এক জন ॥ ৮৮ ॥
ভক্তিবলে জনম জানিয়া শ্রীকৃষ্ণের ।
চুপে চুপে জাগে অন্য নাহি পায় টের ॥ ৮৯ ॥
কেমনে পাইবে টের আঙুর নিদ্রায় ।
বিশ্বজনবিমোহিনী মায়ার মায়ায় ॥ ৯০ ॥
জেগে আছে দ্বারিদ্বয়ে তাহার কারণ ।
করিবারে আঁখিভরে কৃষ্ণ দরশন ॥ ৯১ ॥
বিলক্ষণ জানে বসুদেব পিতা তাঁর ।
যাবে চলে কৃষ্ণ কোলে যমুনার পার ॥ ৯২ ॥
সেইমত লোক যত দক্ষিণশহরে ।
দেখিবে কেমনে আছে মায়াতম ঘোরে ॥ ৯৩ ॥
জাগন্ত দু-এক জন দেখিবারে পায় ।
পুরীতে বিরাজে নিজে রামকৃষ্ণরায় ॥ ৯৪ ॥
কেবা এ যোগীন্দ্র পরে পাইবে বারতা ।
প্রথম দর্শনে আজি এইতক কথা ॥ ৯৫ ॥
সন্দহীন প্রভুলীলা সন্দে-গড়া মন ।
বিশ্বাসনাশক সন্দ তিমির-বরন ॥ ৯৬ ॥
এখানের লোক কেন না পায় সন্ধান ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে শুন তাহার প্রমাণ ॥ ৯৭ ॥
একদিন বহু ভক্ত শ্রীপ্রভু যেথায় ।
উঠিল এ কথা সেথা কথায় কথায় ॥ ৯৮ ॥
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে কোন ভক্তোত্তম ।
দক্ষিণশহরে লোক কেন এ রকম ॥ ৯৯ ॥
দূর-দূরান্তর হতে হাজার হাজার ।
আসিয়া পুরার আশা সাধ যেন যার ॥ ১০০ ॥
মৃদু হাসি প্রভুদেব উত্তরিলা তাঁরে ।
দেখ না গাভীর দশা গঙ্গার গহ্বরে ॥ ১০১ ॥
দড়িতে রয়েছে বাঁধা খোঁটায় নিকটে ।
পিপাসার প্রাণ যায় ছাতি যায় ফেটে ॥ ১০২ ॥
অতি সন্নিকটে জল স্রোত বয়ে যায় ।
যেতে নারে ছোট দড়ি আবদ্ধ গলায় ॥ ১০৩ ॥
দূরে যারা আছে ছাড়া আসে পালে পালে ।
পিপাসা মিটায় মুখ ডুবাইয়া জলে ॥ ১০৪ ॥
এখানে আটক লোক যদিও নিকটে ।
মোহিনী মায়ার বদ্ধ বলে নাহি আঁটে ॥ ১০৫ ॥
রামকৃষ্ণলীলাগীতি বড়ই মধুর ।
যতই শুনিবে তত তাপ হবে দূর ॥ ১০৬ ॥
ভক্তবর রাম আর শ্রীমনোমোহনে ।
মত্তবৎ ধরা পেয়ে প্রভু-নারায়ণে ॥ ১০৭ ॥
কলিতে অবাক্ কথা দীন-বেশ গায় ।
নর-সাজে বিরাজেন প্রভুদেবরায় ॥ ১০৮ ॥
সাজের বাঁধনি কিবা বিহীন লক্ষণ ।
পাঁশেতে পাবক ঢাকা নরে নারায়ণ ॥ ১০৯ ॥
আত্মহর রঙ্গ দেখি কহে দুই ভাই ।
আমাদের প্রভুদেব জগৎগোসাঁই ॥ ১১০ ॥
কে শুনে কাহার কথা বড়ই জঞ্জাল ।
বিশ্বাসবিহীন ধরা ঘোর কলিকাল ॥ ১১১ ॥
এতই কূপেতে মগ্ন মানুষের মন ।
কৃষ্ণ মিলে লক্ষে কথা কহে একজন ॥ ১১২ ॥
কাজেই রামের কথা কানে নাহি ঢুকে ।
বরঞ্চ পাগল বলি গালি দেয় লোকে ॥ ১১৩ ॥
নর-বেশ নারায়ণ চেনা অতি ভার ।
প্রভুর বচনে শুন প্রমাণ তাহার ॥ ১১৪ ॥
রাম-অবতারে রাম যবে যান বনে ।
চিনিতে পারিল মাত্র মুনি সাত জনে ॥ ১১৫ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন পুরুষ প্রধান ।
অবতীর্ণ ধরাতলে সীতাপতি রাম ॥ ১১৬ ॥
অপরে যতেক যত বুঝে বিলক্ষণ ।
দশরথ-সুত রাম নৃপতি নন্দন ॥ ১১৭ ॥
চির-চেনা না হইলে চেনা মহাযায় ।
নরদেহে সর্বেশ্বর বিহরে ধরায় ॥ ১১৮ ॥
ক্ষুদ্রতম আকারেতে বালির মতন ।
উপমায় ঠিক যেন বীজের গড়ন ॥ ১১৯ ॥
গোপনে নিহিত থাকে নাহি যায় দেখা ।
প্রকাও প্রকাণ্ড কাণ্ড অগণন শাখা ॥ ১২০ ॥
কত শত পত্র ফুল সৌরভ অতুল ।
নানারস-সমবেত সুন্দর মুকুল ॥ ১২১ ॥
নানাবিধ গুণ নানা বর্ণের চেহারা ।
কত কোটি কোটি ফল মিষ্ট রসে ভরা ॥ ১২২ ॥
এইমত ঋণ শক্তি ক্ষুদ্র তন্ন ধরে ।
বৃক্ষের সম্পত্তি যেন বীজের ভিতরে ॥ ১২৩ ॥
সত্যকথা অনায়াসে নহে দরশন ।
জীবে না বুঝিতে পারে শ্রীপ্রভু কেমন ॥ ১২৪ ॥
তথাপিহ ভক্ত রাম কন বারে বারে ।
জানা পরিচিত কিবা চোখে দেখে যারে ॥ ১২৫ ॥
অগণ্য লোকের মধ্যে অতি অল্প প্রায় ।
শুনে আসে প্রভুপাশে রামের কথায় ॥ ১২৬ ॥
আসে যাঁরা তার মধ্যে দ্বিবিধ প্রকার ।
প্রথম প্রভুর যাঁরা ভক্ত আপনার ॥ ১২৭ ॥
লীলার প্রথমকালে তফাতে তফাতে ।
প্রভুর নামের বীজ পোঁতা হৃদি-ক্ষেতে ॥ ১২৮ ॥
দ্বিতীয় মুমুক্ষু যার মুক্তি আকিঞ্চন ।
পূর্বজন্মে করিয়াছে সাধন-ভজন ॥ ১২৯ ॥
সমাপন এইবারে দড়ি যাবে কেটে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম কাছে আসে ছুটে ॥ ১৩০ ॥
কেবা কিবা নিজ মনে বুঝে লহ মন ।
আমার উদ্দেশ্য ইহা ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৩১ ॥
আইলা রামের মামা-শ্বশুর সম্পর্কে ।
উপেন্দ্র মজুমদার দণ্ডবৎ তাঁকে ॥ ১৩২ ॥
ধীর নম্র বিনয়ী বদনে মাখা রস ।
শ্রবণে করেন কাজ রসনা অবশ ॥ ১৩৩ ॥
দায়ে যদি কন কথা ফাঁকে না বেরায় ।
অধরে ফুটিয়া ভাবা অধরে মিশায় ॥ ১৩৪ ॥
কাছে কোন্নগরে মনোমোহনের ঘর ।
সেখানেও এ সময় লাগিল রগড় ॥ ১৩৫ ॥
বহু দিন আগে হতে এই গণ্ডগ্রামে ।
বাতায়াত শ্রীপ্রভুর অনেকেই জানে ॥ ১৩৬ ॥
প্রকট সমর শুনে জুটে ভক্তগণ ।
নবাইচৈতন্য এক আইল এখন ॥ ১৩৭ ॥
বয়স অধিক ধর্ম-উপার্জনে আঠা ।
সজ্জন সংসারী মনোমোহনের জ্যেঠা ॥ ১৩৮ ॥
জুটিলেন ভবনাথ পরম সুন্দর ।
বরাহনগর কাছে গঙ্গাতীরে ঘর ॥ ১৩৯ ॥
নবীন বয়স তেহ ব্রাহ্মণের ছেলে ।
উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠ হয় এই কালে ॥ ১৪০ ॥
আত্মবন্ধু
প্রতিবাসী করে উপহাস ।
শুনিয়া প্রভুর পদে তাঁহার বিশ্বাস ॥ ১৪১ ॥
দক্ষিণশহর সম সন্নিকট গ্রামে ।
সকলেই প্রায় প্রভুদেবে নাহি চিনে ॥ ১৪২ ॥
শুনিয়াছে নাম যারা বুঝে অবিকল ।
প্রভুদেব এক জনা উন্মাদ পাগল ॥ ১৪৩ ॥
বিফল হইল জন্ম কপালের ফেরে ।
বহুভাগ্যে জন্ম যদি প্রভু-অবতারে ॥ ১৪৪ ॥
কর্মফলে বিড়ম্বনা এ কি পরমাদ ।
সাধ নাই দেখিবারে অকলঙ্ক চাঁদ ॥ ১৪৫ ॥
চির-হৃদিতম যাঁর দরশনে হরে ।
ভবের বন্ধন গোটা কাটে একেবারে ॥ ১৪৬ ॥
জন্ম-জন্মার্জিত বিষময় কর্মফল ।
এক নমস্কারে তারে দেয় রসাতল ॥ ১৪৭ ॥
অগতির মিলে গতি মুক্তি এক পলে ।
অমৃত লহর রঙ্গ উজায় গরলে ॥ ১৪৮ ॥
দরশনে নমস্কারে যাঁরে এতদূর ।
বুঝ মন কিবা প্রভু দয়াল ঠাকুর ॥ ১৪৯ ॥
অনায়াসে হেসে হেসে ভবসিন্ধু পার ।
মানুষ-বুদ্ধিতে বড় লাগিল বেজার ॥ ১৫০ ॥
শাবাশ মানুষ-বুদ্ধি কি কহিব তারে ।
বলিহারী দাঁড়ী দেহ-তরীর উপরে ॥ ১৫১ ॥
স্বভাব পাথার-পথে দিবারাতি গতি ।
উড়ায়ে প্রলোভী পাল অবিদ্যার স্মৃতি ॥ ১৫২ ॥
স্মৃতি অতি বেগবতী শূন্য পথে উড়ে ।
কামিনী-কাঞ্চন-আশা-পবনের জোরে ॥ ১৫৩ ॥
যতক্ষণ অকূলে নাহিক ডুবে তরী ।
তাহার কি ক্ষতি মন ধোপাঘরে চুরি ॥ ১৫৪ ॥
অন্যে পরে ডুবাইতে জনম তাহার ।
সতত নীরবে করে কার্য আপনার ॥ ১৫৫ ॥
যতদিন অবিদিত থাকে তার বল ।
জীবের আদতে নাই তিলেক মঙ্গল ॥ ১৫৬ ॥
সাধনা-সাগর-ছেঁচা দুর্লভ রতন ।
জন্ম-জয়া-পাপ-তাপ-কলুষ-নাশন ॥ ১৫৭ ॥
জীবে যুক্তি দরশনে পরশনে যাঁর ।
অঙ্গহীনে দুঃখী দীনে দয়াল আচার ॥ ১৫৮ ॥
জীবের কল্যাণ-ব্রতে ব্রতী অনুক্ষণ ।
বিষবৎ আত্মসুখে দিয়া বিসর্জন ॥ ১৫৯ ॥
পতিত-পাবন-ভাব অগতির গতি ।
দয়াময় কায়াখানি দয়ার মূরতি ॥ ১৬০ ॥
স্থিতি গতি কর্মে মতি দয়ায় যাঁহার ।
দয়া বিনা দেহে কিছু নাহি অন্য আর ॥ ১৬১ ॥
শিবময় সনাতন পুরুষপ্রধানে ।
বৃদ্ধি-ঘোষে নাহি দিল দেখিতে নয়নে ॥ ১৬২ ॥
হেন বুদ্ধি হতে মুক্ত কর প্রভুবর ।
দীনবন্ধু দীননাথ দয়ার সাগর ॥ ১৬৩ ॥
পুনঃ এই বুদ্ধি লয়ে নরের উন্নতি ।
বিমানে উড়ায়ে রথ শূন্যে করে স্থিতি ॥ ১৬৪ ॥
বুদ্ধি-বলে পলে চলে যোজনের পথ ।
রাখে হাতে পঞ্চভূতে লিখাইয়া খৎ ॥ ১৬৫ ॥
ধরণীর দুই প্রান্তে বসি দুই জনে ।
পরস্পর কর কথা কত রেতে দিনে ॥ ১৬৬ ॥
অলঙ্ঘ্য সাগর-পারে করে অধিকার ।
জলের উপরে নীচে বিপণি বাজার ॥ ১৬৭ ॥
নানাবিধ ভাবা নানা শাস্ত্র-আলাপনা ।
দেশ-বিদেশেতে বেড়ে যশের ঘোষণা ॥ ১৬৮ ॥
নৃপতি মুকুটসহ স্বর্ণ-সিংহাসন ।
কোষাগার পূর্ণ নানা নিধি-রত্ন-ধন ॥ ১৬৯ ॥
নাম-দাপে কাঁপে যম তালপত্র প্রায় ।
কথায় মানুষে মারে বাঁচার কথায় ॥ ১৭০ ॥
বৃহত্তম-কার পণ্ড কথা শুনে চলে ।
বাঘে মৃগে এক সঙ্গে মহারঙ্গে খেলে ॥ ১৭১ ॥
কুরূপে সুরূপ মিলে অঙ্গ অঙ্গহীনে ।
বোবা যেবা কর কথা কালা শুনে কানে ॥ ১৭২ ॥
বৃদ্ধিতে কতই করে কহা মহাযায় ।
বিধির বিধান-লিপি সাগরে ডুবায় ॥ ১৭৩ ॥
ছার মান-খ্যাতি-ধনে প্রলোভিত করি ।
ডুবায় অকূল জলে মানুষের তরী ॥ ১৭৪ ॥
হেন বুদ্ধি হতে রক্ষা কর ভগবান ।
দুর্গতি-তারক প্রভু কল্যাণনিধান ॥ ১৭৫ ॥
এইখানে মন যদি প্রশ্ন কর মোরে ।
কি লয়ে চলিবে জীব বুদ্ধিবল ছেড়ে ॥ ১৭৬ ॥
শুন তবে কই কথা কথার উত্তর ।
অবিদ্যা-তোষিণী বুদ্ধি পায়ে তার গড় ॥ ১৭৭ ॥
ধন মান-যশ-আশা যে বুদ্ধিতে আনে ।
অবিদ্যা-তোষিণী বুদ্ধি তাহারে বাখানে ॥ ১৭৮ ॥
মহান্ ইহার শক্তি সৃষ্টির ভিতরে ।
ভগবান বিনা ইহা সব দিতে পারে ॥ ১৭৯ ॥
উজ্জ্বল ঐশ্বর্যে মুগ্ধ করে ত্রিভুবন ।
সৎপথ অন্তরালে রাখি আচ্ছাদন ॥ ১৮০ ॥
সদসৎ দুই এক বুদ্ধির ভিতর ।
সৎবুদ্ধি নাম যার পরম সুন্দর ॥ ১৮১ ॥
অসতে অবিদ্যা তুষ্ট করে দিবারাতি ।
সতে সদা জ্বালে হৃদে অনুরাগ-বাতি ॥ ১৮২ ॥
মহান্ আনন্দময় পরম ঈশ্বর ।
একমাত্র এই সৎ-বুদ্ধির গোচর ॥ ১৮৩ ॥
সৎবুদ্ধি বিনা পথে রক্ষা আশা নাই ।
মাগিয়া চাহিয়া লহ শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ॥ ১৮৪ ॥
এক বুদ্ধি কিসে হয় দ্বিবিধ প্রকার ।
জিজ্ঞাসিলে মন যদি শুন সমাচার ॥ ১৮৫ ॥
ফটিকের ধর্ম নষ্ট ধরা-পরশনে ।
পুনশ্চ ফটিক হয় ভাস্করের টানে ॥ ১৮৬ ॥
ধরায় কি শূন্যে দেখ সেই এক জল ।
গুণে ভিন্ন হেথা সেথা সমল বিমল ॥ ১৮৭ ॥
প্রভু-ভক্ত ভবনাথ সৎবুদ্ধিগুণে ।
পরের ব্যঙ্গোক্তি কানে আদতে না শুনে ॥ ১৮৮ ॥
থাকে আপনার ভাবে না হয় চঞ্চল ।
ভক্তের চরিত-কথা শ্রবণমঙ্গল ॥ ১৮৯ ॥
যেইখানে ভক্ত রাম ভকতির খনি ।
উঠিল তাহাতে এক সমুজ্জ্বল মণি ॥ ১৯০ ॥
প্রভুভক্ত-চূড়ামণি হিন্দুস্থানী জেতে ।
প্রবল অটল দাস্যভক্তিভাব চিতে ॥ ১৯১ ॥
ভৃত্যবেশে রামাবাসে কাদামাখা গায় ।
গুপ্ত ছিল এত দিন প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৯২ ॥
চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর অনাসক্ত জনা ।
দুঃখী তবু অবিদ্যায় অতিশয় ঘৃণা ॥ ১৯৩ ॥
উপরে ইক্ষুর মত কর্কশ আকার ।
ভিতরে মধুর ভক্তিরসের সঞ্চার ॥ ১৯৪ ॥
খর্বাকৃতি পুষ্টকায় বীর বলবান ।
সবল সকল শিরা লাটু তাঁর নাম ॥ ১৯৫ ॥
শ্রীপ্রভুর দাস সেবা-ভকতি অন্তরে ।
দাস্যভাবে হনু যথা রাম অবতারে ॥ ১৯৬ ॥
নিরক্ষর লাট্টু ভাই নাই বর্ণবোধ ।
বাগ্বাদিনীর সঙ্গে বিষম বিরোধ ॥ ১৯৭ ॥
কাজ কিবা বিদ্যাদেবী তোমার প্রসাদে ।
যদ্যপি তাহার রামকৃষ্ণভক্তি বাধে ॥ ১৯৮ ॥
নিরাপদে রাখ রুধে তোমার দুয়ার ।
রামকৃষ্ণনামে হব ভবসিন্ধু পার ॥ ১৯৯ ॥
বিদ্যার ছলনা কথা শুন শুন মন ।
বিদ্যাপক্ষে কি কহিলা প্রভু নারায়ণ ॥ ২০০ ॥
বিদ্যার আকার কিবা বিদ্যা বলে কারে ।
শুনিলে চলন্ত নাড়ী সঙ্গে সঙ্গে ছাড়ে ॥ ২০১ ॥
একদিন ভক্তবর্গে ঘেরা প্রভুরায় ।
উঠিল বিদ্যার কথা কথায় কথায় ॥ ২০২ ॥
বলিলেন প্রভু ভক্তগণে শুনাইয়া ।
দেখ আমি একদিন মায়ের দেখিয়া ॥ ২০৩ ॥
বলিলাম লোকজনে কহে পরম্পর ।
বিদ্যাবলহীন আমি মুর্খ নিরক্ষর ॥ ২০৪ ॥
জননী এতেক শুনি দেখাইলা মোরে ।
তখনি চকিতে ত্বরা তিলের ভিতরে ॥ ২০৫ ॥
দাঁড়াইয়া একধারে মৃদু মন্দ হাসি ।
পর্বত-প্রমাণ কত
ওঁচলার রাশি ॥ ২০৬ ॥
অঙ্গুলি-চালনে মাতা কহিলেন পরে ।
এসব বিদ্যার রাশি বিদ্যা বলে এরে ॥ ২০৭ ॥
এই জঞ্জালের রাশি বিদ্যা নামে জানা ।
নিতে হয় নাও তুমি নাহি মোর মানা ॥ ২০৮ ॥
দেখিয়া বিদ্যার দশা কহিনু তখন ।
এমন বিদ্যায় মা গো নাহি প্রয়োজন ॥ ২০৯ ॥
মরম বুঝিয়া তাই শ্রীপ্রভু আপনে ।
বলিতেন প্রায় অধিকাংশ ভক্তগণে ॥ ২১০ ॥
বিদ্যা-আলাপনে মনে বড় লাগে ধাঁধা ।
রঙ্গিল না করি তায় শুদ্ধ রাখ সাদা ॥ ২১১ ॥
মহাবিদ্যাপথে বিদ্যা বড়ই ভীষণ ।
দুর্গম কণ্টকময় কেতকীর বন ॥ ২১২ ॥
বিদ্যার্জনে যদি গুরু না থাকেন মূলে ।
সে বিদ্যা বিষের গাছ বিষফল ফলে ॥ ২১৩ ॥
অবিদ্যার প্রতিমূর্তি তারে দণ্ডবৎ ।
মোহিয়া খুলিয়া দেয় নরকের পথ ॥ ২১৪ ॥
উপমায় বলিতেন প্রভু-নারায়ণ ।
ভাল মন্দ কিসে শুন বিদ্যা-উপার্জন ॥ ২১৫ ॥
"কেহ বিদ্যা শিখে লিখে বেদান্ত পুরাণ ।
কেহ করে জালখত নরক-সোপান" ॥ ২১৬ ॥
একরূপ বটে বস্তু ভাবে ফলে ফল ।
অমৃত কাহার পক্ষে কাহার গরল ॥ ২১৭ ॥
মান খ্যাতি প্রতিপত্তি গোড়ায় যাহার ।
যতগুলি জীব-বুদ্ধি তাহার পোদ্দার ॥ ২১৮ ॥
সত্ত্বভাব পরিহরি তমে করে হুঁশ ।
চিবায় চাউল ফেলে খোসা ভুসি তুঁষ ॥ ২১৯ ॥
অবিদ্যা-মূলক বিদ্যা পথে যেতে মানা ।
লীলাকথা শুনে মনে করহ ধারণা ॥ ২২০ ॥
মহান্ ঐশ্বর্যশালী লক্ষ্মী সরস্বতী ।
কভু করে মুক্ত পথ কভু রোষে গতি ॥ ২২১ ॥
বিষ্ণু
মহেশ্বর ব্রহ্মা চতুর-আনন ।
আগোটা তেত্রিশ কোটা দেবদেবীগণ ॥ ২২২ ॥
অপার ক্ষমতা শক্তি প্রত্যেকের প্রায় ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ২২৩ ॥
ঐশ্বর্যে তোমার কিছু প্রয়োজন নাই ।
মাগ রামকৃষ্ণভক্তি সবাকার ঠাঁই ॥ ২২৪ ॥
প্রভুপদে ভক্তি রতি যাহে নাহি মিলে ।
দূরে করি নমস্কার রাখ তায় ঠেলে ॥ ২২৫ ॥
হোক্ ব্রহ্মা প্রজাপতি সৃষ্টিশক্তি যাঁর ।
হোক্ বিষ্ণু যাঁর কাছে পালনের ভার ॥ ২২৬ ॥
হোউক পিনাকপাণি যোগী ত্রিপুরারি ।
পরম নির্বাণদাতা ত্রিলোকসংহারী ॥ ২২৭ ॥
হোক্ না দেবেশ ইন্দ্র ত্রিদশ-ঈশ্বর ।
যে হয় সে হয় হোক্ কারে নাহি ডর ॥ ২২৮ ॥
সর্বেশ্বর প্রভু নিজে ঠাকুর আমার ।
এবারে আপনি খোদে নহে অবতার ॥ ২২৯ ॥
প্রভুর ওধারে আর নাহি কোন গ্রাম ।
অন্ত্যলীলামধ্যে পাবে ইহার প্রমাণ ॥ ২৩০ ॥
বিভূতিতে গিয়ান করিবে তুচ্ছ ছার ।
একা রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ২৩১ ॥
বিভূতি বিরোধী বড় প্রভুভক্তিপথে ।
সর্বদা
স্মরণ করি রাখিবে তফাতে ॥ ২৩২ ॥
লীলার শুনহ মন তাহার প্রমাণ ।
অমৃত-ভাণ্ডার রামকৃষ্ণ-লীলা গান ॥ ২৩৩ ॥
অতি ভক্তিমতী যদু মল্লিকের মাসী ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে বড়ই পিয়াসী ॥ ২৩৪ ॥
উদ্যান-ভবনে তাই যখন তখন ।
সভা করি প্রভুদেবে করে নিমন্ত্রণ ॥ ২৩৫ ॥
আজি সভামধ্যে প্রভু অখিলের পতি ।
উপনীত উপাধ্যায় কাপ্তেন-সংহতি ॥ ২৩৬ ॥
দর্শকগণের মধ্যে দুই শ্রেষ্ঠতর ।
প্রথম যে জন তেঁহ ধনের ঈশ্বর ॥ ২৩৭ ॥
বিদ্যাবল তত নহে যত তাঁর ধন ।
যতীন্দ্র ঠাকুর নাম পিরালী ব্রাহ্মণ ॥ ২৩৮ ॥
মহারাজ প্রাপ্ত আখ্যা কোম্পানির ঘরে ।
অতুলসম্মান খ্যাতি সাহেবেরা করে ॥ ২৩৯ ॥
পূর্বজন্মার্জিত পুণ্যে বহু ভাগ্যবান ।
অন্নাভাবী দীনদুঃখিগণে অন্নদান ॥ ২৪০ ॥
তাঁর ধনে অন্ন পুষ্টি পায় কত প্রাণী ।
তাই ঘরে অচঞ্চলা লক্ষ্মী ঠাকুরানী ॥ ২৪১ ॥
শুনিয়াছি শ্রীবদনে প্রভুর বচন ।
যাঁহার শক্তিতে বহু লোকের পোষণ ॥ ২৪২ ॥
ঈশ্বরের বহুশক্তি বর্তমান তাঁর ।
সামান্য জীবের মধ্যে নহে গণনায় ॥ ২৪৩ ॥
ভাগ্যবলে অবহেলে ঠাকুরে আমার ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন সেব্য কমলার ॥ ২৪৪ ॥
হরিহরবিধিপূজ্য সাধনের ধন ।
হেলায় শ্রদ্ধায় কিবা কৈল দরশন ॥ ২৪৫ ॥
প্রকৃতি সুলভে প্রভু দীনহীনাচার ।
নেহারিয়া মহারাজে অগ্রে নমস্কার ॥ ২৪৬ ॥
উচ্চ মান চান রাজা ঠাকুর পিরালী ।
মান-খ্যাতি কর্ণমূলে মানের কাঙ্গালী ॥ ২৪৭ ॥
সে মান না পেয়ে হেথা শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
পরম সুন্দর প্রভু লাগিল না মনে ॥ ২৪৮ ॥
ধনবান মহারাজ ভক্তি নাই তাঁর ।
লক্ষ্মীর কৃপায় বদ্ধ ভক্তির দুয়ার ॥ ২৪৯ ॥
ধনে রাজসিক ভাব ঐশ্বর্য উজ্জ্বল ।
নয়নে সুধার রীতি উদরে গরল ॥ ২৫০ ॥
কামিনীর সহোদরা ভীষণা কাঞ্চন ।
ছুঁইলে জারিয়া তুলে মানুষের মন ॥ ২৫১ ॥
ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষে যেইজন ভুলে ।
ভক্তির প্রসাদ তাঁয় কখন না মিলে ॥ ২৫২ ॥
অন্য জন কৃষ্ণদাস পাল জেতে চাষা ।
বড়ই বুঝেন তিনি ইংরেজের ভাষা ॥ ২৫৩ ॥
সূক্ষ্মবুদ্ধি সুনিপুণ রাজনীতিজ্ঞানে ।
বড় বড় সাহেবেরা অতিশয় মানে ॥ ২৫৪ ॥
হিন্দুপেটরিয়ট-পত্র করেন প্রকাশ ।
চোটে লেখা দেখে লাগে লাটের তরাস ॥ ২৫৫ ॥
লাটের কাটেন কথা খুঁট ধরি তায় ।
প্রশংসাভাজন তাই যথায় তথায় ॥ ২৫৬ ॥
কোথাও নাহিক ভয় লিখে বলে তেড়ে ।
অভিমানে ভরা হৃদি বিদ্যা-অহঙ্কারে ॥ ২৫৭ ॥
গর্বখর্বকারী প্রভু সর্বশক্তিমান ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃত-সমান ॥ ২৫৮ ॥
সভাস্থ সকলে বলিলেন প্রভুবরে ।
ঈশ্বরীয় কথা কিছু কহিবার তরে ॥ ২৫৯ ॥
স্থান পাত্র বিশেষ বুঝিয়া পরমেশ ।
বলিলেন বিবেক-বৈরাগ্য উপদেশ ॥ ২৬০ ॥
ধন মান বিদ্যা আদি বিষতুল্য যাতে ।
বিষম অনর্থকরী ঈশ্বরের পথে ॥ ২৬১ ॥
তীব্র বিরাগের কথা সৃষ্টি উড়ে শেষে ।
ধূলা বালি কুটি যেন কুলার বাতাসে ॥ ২৬২ ॥
একা ভগবান বিনা সকলি অসার ।
বিষয়বৃদ্ধিতে কথা নহে পশিবার ॥ ২৬৩ ॥
পঙ্কিল বিষয়বৃদ্ধি বড়ই সমল ।
কাদার গাদায় ঘোলা স্বল্প মাত্র জল ॥ ২৬৪ ॥
প্রখর যদিও বিবেকের কর ধরে ।
ঘোলা জলে প্রতিবিম্ব কখন না পড়ে ॥ ২৬৫ ॥
লইলা এমন বুদ্ধি গর্ব করে নয় ।
ধিক্ ধিক্ জীববৃদ্ধি পায়ে তার গড় ॥ ২৬৬ ॥
এই বৃদ্ধিযুক্ত পাল এত গরীয়ান ।
সভায় করিতে রক্ষা নিজের সম্মান ॥ ২৬৭ ॥
আগুয়ান হইলেন সাধ্য যতদূর ।
প্রতিবাদে বৈরাগ্যের কথা শ্রীপ্রভুর ॥ ২৬৮ ॥
সভায় পালের পোর গরম আসন ।
মনে জানে আপনারে অতি বিচক্ষণ ॥ ২৬৯ ॥
দম্ভসহ প্রতিবাদ উত্থাপন করে ।
পাতিয়া কথার জাল সভার ভিতরে ॥ ২৭০ ॥
বৈরাগ্য ভীষণ বড় উন্নতির পথে ।
পথের ভিখারী করে নাহি দেয় খেতে ॥ ২৭১ ॥
বৈরাগ্য বৈরাগ্য করি ভারতের জাতি ।
ধনরাজ্যচ্যুত খায় ইংরেজের লাথি ॥ ২৭২ ॥
স্বাধীনতা-সংরক্ষণে বিহীন বিক্রম ।
এ দেশের দুর্দশার ইহাই কারণ ॥ ২৭৩ ॥
জন্মভূমি-রক্ষা আর পর উপকার ।
নরের কর্তব্য কর্ম এই ধর্ম সার ॥ ২৭৪ ॥
বৈরাগ্যের যত বল সে সকল জানি ।
নামান্তরে কহে এরে দুঃখের জননী ॥ ২৭৫ ॥
অতি হীন পরাধীন যে বিরাগে আনে ।
যতনে অর্জনে তার উপদেশ কেনে ॥ ২৭৬ ॥
শুনিয়া পালের
কথা প্রভু গুণধর ।
অমৃত-বরণী বাণী তবু শক্তিধর ॥ ২৭৭ ॥
তুলনায় কিবা তেজ ইন্দ্র
অস্ত্র ধরে ।
দুর্ভেদ্য জীবের বুদ্ধি পলে ভেদ করে ॥ ২৭৮ ॥
হেন বাক্যসহকারে
কৃষ্ণদাসে কন ।
হীনবুদ্ধি তাই কহ বৈরাগ্যে এমন ॥ ২৭৯ ॥
বেদান্ত পুরাণ গীতা উচ্চে
গায় যারে ।
দেবতাদুর্লভ তুচ্ছ তোমার গোচরে ॥ ২৮০ ॥
যার বলে হরি মিলে তাহে নাহি সার ।
তোমার গিয়ান এই কি বুদ্ধি তোমার ॥ ২৮১ ॥
পুনরায় বলিলেন প্রভু নারারণ ।
পর-উপকার কিবা কর আস্ফালন ॥ ২৮২ ॥
কহ যারে উপকার বিধিমতে জানি ।
কিঞ্চিৎ একত্র অর্থ দুর্ভিক্ষনাশিনী ॥ ২৮৩ ॥
অথবা করিলে যাহে মন্দ গন্ধ হরে ।
এই পর-উপকার তোমার বিচারে ॥ ২৮৪ ॥
মানি কিছু পরিমাণে কিঞ্চিৎ মঙ্গল ।
মিছা ছেঁচা না ঝরিলে আকাশের জল ॥ ২৮৫ ॥
সৃষ্টিনাশা অনাবৃষ্টি হরির ইচ্ছায় ।
দেশ জুড়ে লোক মরে পেটের জ্বালায় ॥ ২৮৬ ॥
লয়ে বস্তা দশ চাল দিবে কার মুখে ।
সিন্ধুমুখী স্রোত কি বালির বাঁধে টেকে ॥ ২৮৭ ॥
কতই ঔষধালয় রহে বিশ্বমান ।
তথাপিহ জ্বরে কেন শূন্য করে গ্রাম ॥ ২৮৮ ॥
টাকায় ঔষধে কাজ কতটুকু করে ।
বাঁচায় কাহার সাধ্য হরি যদি মারে ॥ ২৮৯ ॥
গর্ব করে অহঙ্কারে জীব ক্ষুদ্রপ্রাণ ।
তিন কাজে মানুষের হাসে ভগবান ॥ ২৯০ ॥
প্রথম সোদরগণে হাতে মাপদড়ি ।
বিভাগে মাপিয়া নিতে ভিটা বাড়ি ॥ ২৯১ ॥
এ বলে এধার লব ও বলে এধার ।
ভগবান তখন হাসেন একবার ॥ ২৯২ ॥
দ্বিতীয় রাজায় যবে রাজ্য করি জয় ।
মহাদম্ভসহ ফিরে আপন আলয় ॥ ২৯৩ ॥
বাজায়ে দুন্দুভি ভেরি আনন্দ লক্ষণ ।
ভগবান আর বার হাসেন তখন ॥ ২৯৪ ॥
তৃতীয় অসাধ্য রোগে রোগী নাড়ীছাড়া ।
প্রায় কণ্ঠাগত প্রাণ দেহে নাহি সাড়া ॥ ২৯৫ ॥
উঠেছে কপালে ভাতিহীন চক্ষুদ্বয় ।
দেহ-বাড়ি পরিহরি চলিলেই হয় ॥ ২৯৬ ॥
তবু বাঁচাইতে কবিরাজে বড়ি মাড়ে ।
বচনে ভরসাভরা দম্ভসহকারে ॥ ২৯৭ ॥
হীনবুদ্ধি মানুষের করি দরশন ।
ভগবান আর বার হাসেন তখন ॥ ২৯৮ ॥
মানিনু না হয় আমি তোমার কথায় ।
হয় কিছু উপকার ঔষধ টাকায় ॥ ২৯৯ ॥
ক'টির করিবে হিত কোটি কোটি যেথা ।
সামান্য মানুষ তুমি কি আছে ক্ষমতা ॥ ৩০০ ॥
গঙ্গায় জনমে এত কাঁকড়ার ছানা ।
কেহ নহে ক্ষমবান করিতে গণনা ॥ ৩০১ ॥
তেন ক্ষুদ্র তুমি এক সৃষ্টির ভিতর ।
হিতের কি কথা কহ করিয়া গুমর ॥ ৩০২ ॥
মানুষ কেবল নয় একমাত্র প্রাণী ।
পশু পাখী কীট কত সংখ্যা নাহি জানি ॥ ৩০৩ ॥
বিশাল ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে কাতারে কাতারে ।
দৃশ্যাদৃশ্যভাবে যারা বিচরণ করে ॥ ৩০৪ ॥
ভাবিলে ঘটেতে বুদ্ধি নাহি থাকে আর ।
কহু তবে কিবা হিত করিবে কাহার ॥ ৩০৫ ॥
শ্রীপ্রভুর উত্তরের পাইয়া আভাস ।
পালের বদনে আর নাহি ফুটে ভাব ॥ ৩০৬ ॥
কার কাছে কাঁচা কথা কহিনু এমন ।
বুঝিয়া পরানে বড় পাইল সরম ॥ ৩০৭ ॥
মহাভাগ্যবান তাঁরে করি নমস্কার ।
যে কোন কারণে হোক ঠাকুরে আমার ॥ ৩০৮ ॥
দীনবন্ধু দীনত্রাতা পতিতপাবন ।
হেলায় শ্রদ্ধার কিবা কৈল দরশন ॥ ৩০৯ ॥
বিদ্যায় যদ্যপি নাহি অনুরাগ আনে ।
বুঝ মন কিবা কাজ সে বিদ্যা-অর্জনে ॥ ৩১০ ॥
বর্ণবোধহীন লাট্টু অনুরাগে ভরা ।
ভক্তিবলে কথা কয় নয় শাস্ত্র-ছাড়া ॥ ৩১১ ॥
ভকতি কেবল একা সকলের সার ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৩১২ ॥
সেবক হরিশ্চন্দ্র জুটে এ সময় ।
প্রভু-ভক্ত নিত্যযুক্ত এই পরিচয় ॥ ৩১৩ ॥
কৃতদার ভক্তিমতী ঘরে নারী তাঁর ।
নবীন বয়স নহে পঁচিশের পার ॥ ৩১৪ ॥
তিরস্কার করি তেহ নবীন যৌবনে ।
হইল শরণাপন্ন প্রভুর চরণে ॥ ৩১৫ ॥
কেমনে মিটিল সাধ কব পরে পরে ।
এখন কেবলমাত্র আইল আসরে ॥ ৩১৬ ॥
সরলস্বভাব সদা ভগবানে মন ।
অধম পামরে বন্দে তাঁহার চরণ ॥ ৩১৭ ॥
বলিয়াছি ব্রাহ্মধর্ম বড়ই প্রবল ।
কেশবের বক্তৃতায় বিশেষ উজ্জ্বল ॥ ৩১৮ ॥
দেশ জুড়ে বাড়ে দল বক্তৃতার চোটে ।
বক্তৃতা-বিমুগ্ধ বঙ্গ বহু লোক জুটে ॥ ৩১৯ ॥
হরিপদলুব্ধ যাঁরা শ্রীগুরুবিহনে ।
নিজের গন্তব্য-পথ কিছুই না চিনে ॥ ৩২০ ॥
আসিয়া মিশেন এই ব্রাহ্মদের দলে ।
আশায় ভরসা করি যদি কিছু মিলে ॥ ৩২১ ॥
ভুলে থাকে ব্যাপার দেখিয়া তথাকার ।
ভাবে বুঝি এই পথ ঘরে যাইবার ॥ ৩২২ ॥
কারে কোন্ পথে লয়ে যান ভগবান ।
তাঁহার গোচর জীবে না জানে সন্ধান ॥ ৩২৩ ॥
অনুরাগে যেই দিকে তাড়া করে ঠেলে ।
হোক না নিবিড় বন তাহে পথ মিলে ॥ ৩২৪ ॥
লীলা কথা শুন মন বুঝহ লক্ষণ ।
অন্ধের নয়ন এই ভক্ত সংজোটন ॥ ৩২৫ ॥
ইদানীং ব্রাহ্মধর্ম নামে যাহা জানা ।
বুঝিতে না পারি তার ভাবের ঠিকানা ॥ ৩২৬ ॥
আমি না বুঝিতে পারি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী ।
এ পক্ষে কহিলা কিবা শ্রীপ্রভু আপনি ॥ ৩২৭ ॥
মন দিয়া শুন মন বুঝহ বারতা ।
রামকৃষ্ণপুঁথি নহে বিবাদের কথা ॥ ৩২৮ ॥
বিবাদ-ভঞ্জনে শ্রীপ্রভুর আগমন ।
সব ধর্ম অতি
সত্য প্রভুর বচন ॥ ৩২৯ ॥
ধর্মমধ্যে ব্রাহ্মধর্ম নেজা-মুড়া ছাড়া ।
বিচিত্র দেউল
শূন্যে ভিত্তিহীনে গড়া ॥ ৩৩০ ॥
দুই রূপে ঈশ্বর সাকার নিরাকার ।
এ দুয়ের উর্ধ্বে আছে তৃতীয় প্রকার ॥ ৩৩১ ॥
জীবের নাহিক শক্তি তথা যাইবারে ।
বলিলেন এই কথা প্রভু বারে বারে ॥ ৩৩২ ॥
সাকার ও নিরাকার জ্ঞাতব্য জীবের ।
একে ছাড়ি অন্যে ধরা অদৃষ্টের ফের ॥ ৩৩৩ ॥
দ্বিতলে যাইতে যেন উপায় সোপান ।
নিরাকারে সেইমত সাকার-বিধান ॥ ৩৩৪ ॥
প্রভুত্বত্ত উপমাতে ধানুকী যেমন ।
কলাগাছে করে লক্ষ্য প্রথম প্রথম ॥ ৩৩৫ ॥
স্থূলেতে বসিলে লক্ষ্য স্বপ্নে যার পরে ।
টাকা-সিকি বিন্দুবৎ দাগের উপরে ॥ ৩৩৬ ॥
ধানুকী হইলে পাকা শেষ পরিণাম ।
না পায় সন্ধান কোথা করিবে সন্ধান ॥ ৩৩৭ ॥
নিরাকার নামান্তরে মহান আকার ।
আদি-মধ্য-অন্তহীন বৃহৎ ব্যাপার ॥ ৩৩৮ ॥
ভাষা থাকে ভাসা ভাসা ভাষায় কি রটে ।
স্বরাট হইতে কথা গমন বিরাটে ॥ ৩৩৯ ॥
বিরাটে অপার কাণ্ড মনের বিনাশ ।
সিন্ধুজলে ডুবে যেন অনন্ত আকাশ ॥ ৩৪০ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান কিবা বস্তু বলিবার নয় ।
প্রভুর বচনে শুন তার পরিচয় ॥ ৩৪১ ॥
কোন এক ব্রহ্মজ্ঞানী দিবস বিশেষে ।
উপনীত বিশ্বগুরু প্রভুর সকাশে ॥ ৩৪২ ॥
পেটভরা কথা পুঁজি বহু আড়ম্বরে ।
পাড়িল ব্রহ্মের কথা তর্কসহকারে ॥ ৩৪৩ ॥
হৃদয় বুঝিয়া তাঁর প্রভুর উত্তর ।
নিত্যলীলা ছয়ে সেই পরম ঈশ্বর ॥ ৩৪৪ ॥
অব্যক্ত সচ্চিদানন্দ নিত্য নাম যাঁর ।
তুলনায় তুচ্ছ সিন্ধু অকূল পাথার ॥ ৩৪৫ ॥
কূল কি কিনারা চোখে কোথাও না পাই ।
পড়িলে তাহাতে শুধু হাবুডুবু খাই ॥ ৩৪৬ ॥
লীলার ভিতরে যেই লীলাময় হরি ।
পাইলে তাঁহারে তবে কুল লাভ করি ॥ ৩৪৭ ॥
এই ধরি বুঝ মন কিবা ব্রহ্মজ্ঞান ।
কথায় কিছুই নাহি হয় অনুমান ॥ ৩৪৮ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান কিবা বস্তু বাক্যেতে না আসে ।
গেলে ব্রহ্মসিন্ধুকূলে নাহি ফিরে দেশে ॥ ৩৪৯ ॥
নুনের মানুষ যেন প্রভুর বচন ।
সিন্ধুজল মাপিবারে করিলে গমন ॥ ৩৫০ ॥
ভবনে ফিরিতে শক্তি নাহি থাকে গায় ।
গলে হয় জলবৎ সুশীতল বায় ॥ ৩৫১ ॥
ব্রহ্ম আর ব্রহ্মজ্ঞান একই বারতা ।
সিন্ধুতে মিশিলে বিন্দু সত্ত্ব থাকে কোথা ॥ ৩৫২ ॥
সেই হেতু বলিতেন প্রভু ভগবান ।
উচ্ছিষ্ট বেদাদি গীতা যাবৎ পুরাণ ॥ ৩৫৩ ॥
কেন না ইহারা সব মুখ-বিগলিত ।
মহাজ্ঞানী ভক্ত শুক ব্যাস বিরচিত ॥ ৩৫৪ ॥
ব্রহ্ম-বস্তু উচ্ছিষ্ট করিতে কেহ নারে ।
কে কবে যে যায় আর নাহি ফিরে ঘরে ॥ ৩৫৫ ॥
গুরুর ইচ্ছায় যেই জন ফিরে আসে ।
ব্রহ্ম কি যদ্যপি কেহ তাঁহারে জিজ্ঞাসে ॥ ৩৫৬ ॥
কহিতে না পারে কিছু কহে অবিকল ।
জলময় একাকার জল আর জল ॥ ৩৫৭ ॥
অন্য এক ব্রহ্মজ্ঞানী স্বভাব সুন্দর ।
পর-উপকার-ব্রতে মতি উগ্রতর ॥ ৩৫৮ ॥
বঙ্গদেশে বরিশালে বসতি তাঁহার ।
উপাধিতে দত্ত, নাম অশ্বিনীকুমার ॥ ৩৫৯ ॥
প্রভুদেবে
শ্রদ্ধাভক্তি যথাসাধ্য করে ।
একদিন তাঁর কাছে দক্ষিণশহরে ॥ ৩৬০ ॥
জিজ্ঞাসিল প্রাণে মনে উঠিল যেমন ।
ব্রাহ্মধর্মে হিন্দুধর্মে ভেদ কি রকম ॥ ৩৬১ ॥
উত্তর করিলা তাঁয় উপমা-সংহতি ।
দেখেছ সানাই বাঁশি বাজাবার রীতি ॥ ৩৬২ ॥
দু'জন সানাইয়ার বসে এক ঠাঁই ।
দুয়ের হাতেতে ধরা দুখানি সানাই ॥ ৩৬৩ ॥
একজনে পোঁ ধরিয়া সুর দিতে হয় ।
অপরে বাজায় রাগরাগিণীনিচয় ॥ ৩৬৪ ॥
পোঁ ধরা এ ব্রাহ্মধর্ম এক সুর তায় ।
হিন্দুয়ানি নানা রাগরাগিণী বাজায় ॥ ৩৬৫ ॥
বেদবাক্যাধিক উচ্চ প্রভুর বচন ।
সর্বশেষ কি কহিলা শুন শুন মন ॥ ৩৬৬ ॥
ঠিক এই শ্রীবচন প্রভুর আমার ।
"যতবিধ আছে ধর্ম সবে নমস্কার ॥ ৩৬৭ ॥
ইদানীং ব্রাহ্মধর্ম যাহা ছড়াছড়ি ।
ইহাকেও বার বার নমস্কার করি" ॥ ৩৬৮ ॥
বিশ্বগুরু প্রভু যারে দিলেন সম্মান ।
পামরের নম্য করি সহস্র প্রণাম ॥ ৩৬৯ ॥
ব্রাহ্মধর্মে আর যত ব্রহ্মজ্ঞানিগণে ।
অসংখ্য প্রার্থনা মোর কৃপার কারণে ॥ ৩৭০ ॥
গললগ্ন-কৃতবাসে এ অধম যাচে ।
দেহ রামকৃষ্ণ-ভক্তি যাহা কিছু আছে ॥ ৩৭১ ॥
ফুলের অকালে যেন মধুপের কুল ।
দিবানিশি উপবাসী ক্ষুধায় আকুল ॥ ৩৭২ ॥
গুনগুন রবে কাঁদি স্বভাব যেমন ।
মোদক-আলয়ে করে মধু অন্বেষণ ॥ ৩৭৩ ॥
সেইমত শ্রীপ্রভুর বহু আত্মগণে ।
মধুর আস্বাদ সাধ সংগোপন প্রাণে ॥ ৩৭৪ ॥
অ্যাবধি ফাঁকে ফাঁকে নহে দরশন ।
মধুভরা পদ্মন্বয় প্রভুর চরণ ॥ ৩৭৫ ॥
মধুর আশার মিশেছেন ব্রাহ্মদলে ।
শ্রীপ্রভুর উক্তি যথা শ্রীকেশব বলে ॥ ৩৭৬ ॥
ব্রাহ্মদলে পথহারা প্রভুর ভকত ।
কেমনে পাইলা তাঁরা গন্তব্য সুপথ ॥ ৩৭৭ ॥
যত্নসহকারে মন শুনহ বারতা ।
সুধার ভাণ্ডার এই রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৩৭৮ ॥
কেশবের বক্তৃতা অপর কিছু নয় ।
ব্রাহ্ম-পরিচ্ছদে তাঁর উক্তি কতিপয় ॥ ৩৭৯ ॥
অন্য সাজে যদি উক্তি কার্য করে ভাল ।
নিবিড় আঁধারে যথা চিকুরের আলো ॥ ৩৮০ ॥
দেখা যায় সুপথ কুপথ ডাঙ্গা জল ।
পথহারা পথিকের পরমমঙ্গল ॥ ৩৮১ ॥
প্রভুর শক্তিতে শ্রীকেশব শক্তিধর ।
উপমায় ঠিক যেন আতশীপাথর ॥ ৩৮২ ॥
পাবক-উদ্ভব-গুণ যাহা লক্ষ্য হয় ।
ভাস্করের শক্তি তাহা পাথরের নয় ॥ ৩৮৩ ॥
প্রভুর আতশী তিনি ধরিয়া তাঁহারে ।
প্রেমিক ভকত এক আইলা আসরে ॥ ৩৮৪ ॥
অদ্যাবধি ব্রাহ্মধর্মে ছিল তাঁর টান ।
পণ্ডিত বয়স বেশী ব্রাহ্মণ-সন্তান ॥ ৩৮৫ ॥
রসাল বয়ানখানি পরান উদ্বাস ।
হুগলির কাছে হালিশহরেতে বাস ॥ ৩৮৬ ॥
কোম্পানির ঘরে কাজ বালক অবধি ।
নাম শ্রীকেদারচন্দ্র, চাটুয্যে উপাধি ॥ ৩৮৭ ॥
শতদরে মাহিয়ানা শ্যামল বরন ।
রক্ত-পদ্ম সম দুটি রক্তিম নয়ন ॥ ৩৮৮ ॥
হেলে দুলে করে খেলা প্রভুদেবে হেরে ।
ভাসমান অশ্রুনীরে আঁখির আধারে ॥ ৩৮৯ ॥
উড়ে গেল ব্রাহ্মভাব ভাব নিরাকার ।
প্রভুপাশে মাগে ভিক্ষা পদ সেবিবার ॥ ৩৯০ ॥
প্রভু প্রভু বলে ধরে চরণ ছাঁদিয়া ।
দর দর আঁখিজল গণ্ড বিগলিয়া ॥ ৩৯১ ॥
বেদনা বলিতে ইচ্ছা শ্রীপ্রভুর পার ।
ভাব-বেগে কণ্ঠরোধ কথা না বেরায় ॥ ৩৯২ ॥
জন্ম জন্ম প্রভুভক্ত বহুদিন ছাড়া ।
হৃদিখানি প্রস্রবণ ভক্তিপ্রেমে ভরা ॥ ৩৯৩ ॥
না ছিল আবদ্ধ গতি লীলার প্রথমে ।
মুক্তমুখ এবে বেগে ঝরে দুনয়নে ॥ ৩৯৪ ॥
একবার দরশনে এইতক কথা ।
পশ্চাৎ কহিব ক্রমে পরের বারতা ॥ ৩৯৫ ॥
অন্তরঙ্গ আত্মগণ জুটিবার কালে ।
বহিরঙ্গ কত শত আসে দলে দলে ॥ ৩৯৬ ॥
নানাবিধ ধর্মপন্থী কাছে দূরে ঘর ।
নাম ধাম তাঁহাদের বিশেষ খবর ॥ ৩৯৭ ॥
কি খেলা খেলিলা প্রভু তাঁহাদের সাথে ।
অবিদিত তেকারণ নারিনু কহিতে ॥ ৩৯৮ ॥
প্রধান প্রধান যাঁরা বিশেষতঃ জানা ।
কতই প্রভুর কাছে কৈল আনাগোনা ॥ ৩৯৯ ॥
তথাপি না দিলা ধরা প্রভু নারায়ণ ।
সাধ্যমত কহি কথা শুন বিবরণ ॥ ৪০০ ॥
ব্রাহ্মণ জনৈক যুবা বিদ্যাবল ধরে ।
ভাগ্যবন্ত ধনবান ঘর কাশীপুরে ॥ ৪০১ ॥
বরানগরের কাছে সন্নিকটবর্তী ।
নাম তাঁর শ্রীমহিমচন্দ্র চক্রবর্তী ॥ ৪০২ ॥
গন্যমান্য লোকে করে অতুল সম্মান ।
বড়ই বেদান্তবাদী জ্ঞানমার্গে টান ॥ ৪০৩ ॥
সাকারে বিকার ধাত নাড়ী নাহি চলে ।
আগোটা ব্রহ্মাণ্ড-সৃষ্টি মায়া ছায়া বলে ॥ ৪০৪ ॥
মায়া যেবা ছায়া কিবা মিথ্যা ইহা নয় ।
প্রতিবাদ কৈলে যদি শুন পরিচয় ॥ ৪০৫ ॥
অব্যক্তরূপিণী মায়া কহা নাহি যায় ।
ঈশ্বরের শক্তি থাকে ঈশ্বরের গায় ॥ ৪০৬ ॥
কাজে দুই বস্তুগত দুয়ে এক কায়া ।
কে পারে বাছিতে পরমেশ কেবা মায়া ॥ ৪০৭ ॥
সৃজন-পালন কালে লীলার ভিতর ।
কার্যগত দেখা যায় যেন স্বতন্তর ॥ ৪০৮ ॥
শববৎ পরমেশ নিশ্চল আড়ালে ।
শক্তি তাঁর সৃষ্টি-স্থিতি-লয় লয়ে খেলে ॥ ৪০৯ ॥
যে শক্তিতে তুমি আমি শিব বিষ্ণু ধাতা ।
তাহারে অলীক কহা পাগলের কথা ॥ ৪১০ ॥
নামে দুটি বস্তুগত সেই কলেবর ।
তরঙ্গ সলিল দুই একই সাগর ॥ ৪১১ ॥
তুমিতো তোমার পুঁজি অগ্রে দেখ চেয়ে ।
তুমি হইয়াছ তুমি কি শকতি লয়ে ॥ ৪১২ ॥
মন-মূল-পঞ্চেন্দ্রিয় জ্ঞানের কারণ ।
বিবেক বৈরাগ্য গড়ে বুদ্ধিবৃত্তিগণ ॥ ৪১৩ ॥
এই
সব সমবেত যুক্তি কৈলে ঠিক ।
ইন্দ্রিয়গোচর সৃষ্টি যাবৎ অলীক ॥ ৪১৪ ॥
মিথ্যা যদি তুমি আমি যাবৎ সংসার ।
মিথ্যা যে তোমার সত্য কি প্রমাণ তার ॥ ৪১৫ ॥
তুমি যদি ভ্রান্তিমূল মায়ায় জনম ।
ভুলগাছে সত্যফল কথা কি রকম ॥ ৪১৬ ॥
দ্বিতীয় বক্তব্য অতি সত্য মানি মন ।
বস্তুর সত্তাতে হয় ছায়ার জনম ॥ ৪১৭ ॥
বস্তু যদি হয় সত্য তোমার বিচারে ।
ছায়া তবে মিথ্যা বস্তু কহ কি প্রকারে ॥ ৪১৮ ॥
নয়নেতে দেখি ছায়া দুই অবিকল ।
বসিলে শীতলতলে অঙ্গ সুশীতল ॥ ৪১৯ ॥
সেইতো ইন্দ্রিয় পুঁজি দেখি শুনি তার ।
বস্তুরে বুঝিলে সত্য অলীক ছায়ায় ॥ ৪২০ ॥
বস্তু যদি হয় বস্তু তোমার বিচারে ।
অলীক ছায়ার সত্তা হইতে না পারে ॥ ৪২১ ॥
আকারমাত্রেই যাঁর অলীক গিয়ান ।
উপহাস তথায় সাকার ভগবান ॥ ৪২২ ॥
এ নহে মোদের কার্য ঘরে চল মন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃতকথন ॥ ৪২৩ ॥
রাষ্ট্র রামকৃষ্ণনাম প্রায় প্রতি স্থানে ।
সাধু-ভক্ত-সমাগম বিশেষ যেখানে ॥ ৪২৪ ॥
দেবভাষা-বিশারদ পণ্ডিতপ্রবর ।
মহিম পাইয়া এবে প্রভুর খবর ॥ ৪২৫ ॥
সযতনে জুটিলেন শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
দক্ষিণশহরে যেথা বিরাজে গোসাঁই ॥ ৪২৬ ॥
কল্পতরুরূপ প্রভু শ্রীমন্দিরে বসে ।
তথায় তাহাই পায় যে আশে যে আসে ॥ ৪২৭ ॥
জ্ঞান-মার্গী শ্রীমহিম বীরের মতন ।
চান কর্ম জপ-তপ সাধন-ভজন ॥ ৪২৮ ॥
যোগ অনুরাগপর বাসনা অন্তরে ।
সন্ন্যাসীর রীতি যথা ঘরবাড়ি ছেড়ে ॥ ৪২৯ ॥
তীর্থপর্যটন-ব্রত সাধু সহবাস ।
স্বধর্মে সংযত মন সংসারে উদাস ॥ ৪৩০ ॥
বরাবর দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর যারা ।
যাহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ৪৩১ ॥
সেইহেতু কল্পতরু নামে তাঁরে জানি ।
বিশ্বরূপ বিশ্বভাবে সম্পূর্ণ আপনি ॥ ৪৩২ ॥
বিশ্বস্বামী অন্তর্যামী সকল তাঁহায় ।
ক্ষীরভয়া অগণন পয়োবর গায় ॥ ৪৩৩ ॥
অন্তরে জননী-ভাব পুরুষ আকার ।
কখন করেন নাই ভাব নষ্ট কার ॥ ৪৩৪ ॥
ভাব যেন তেন লাভ প্রভুর গোচরে ।
মহিম এখন মাত্র আইলা আসরে ॥ ৪৩৫ ॥
পরে যা হইল কথা পরে কব মন ।
কৃতবার শ্রীমহিম শুদ্ধাত্মা ব্রাহ্মণ ॥ ৪৩৬ ॥
জনৈক অদ্বৈতবাদী জনায়েতে ধাম ।
প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যে যে মহাত্মার নাম ॥ ৪৩৭ ॥
অতিশুদ্ধ নিষ্ঠাচারী পবিত্র ব্রাহ্মণ ।
জমিদার ঘরে বহু টাকাকড়ি ধন ॥ ৪৩৮ ॥
উপনীত এ সময় প্রভুর গোচর ।
কিরূপে কি আশে কথা শুন অতঃপর ॥ ৪৩৯ ॥
ভক্তবর বলরাম বৈষ্ণব-চরিত ।
প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যের পূর্বপরিচিত ॥ ৪৪০ ॥
একদিন দেখা শুনা হয় পরস্পর ।
কথায় কথার উঠে প্রভুর খবর ॥ ৪৪১ ॥
প্রীতিভরে সবিস্ময়ে বলরাম কন ।
অতীব আশ্চর্য সাধু পুণ্যদরশন ॥ ৪৪২ ॥
ভক্তিপ্রেমে ঢলঢল শ্রীমুরতিখানি ।
বিষম বৈরাগ্য কভু না ছোন কামিনী ॥ ৪৪৩ ॥
দ্বিতীয় আশ্চর্য যদি টাকা হাতে ঠেকে ।
তখনি অমনি হাত যায় এঁকেবেঁকে ॥ ৪৪৪ ॥
সঞ্চয় দূরের কথা পরশে এমন ।
কোথাও না দেখি শুনি সাধু এ রকম ॥ ৪৪৫ ॥
প্রাণকৃষ্ণ বিস্ময়ে আবিষ্ট কথা শুনে ।
বসু-সনে চলিলেন প্রভু-দরশনে ॥ ৪৪৬ ॥
দক্ষিণশহরে যেথা করুণা-আলয় ।
জাদু দেখিবার আশ তত্ত্ব-আশে নয় ॥ ৪৪৭ ॥
গুণগ্রাহী প্রভুদেব স্বভাবে যেমন ।
মোহিলা অজ্ঞাতসারে মুখুয্যের মন ॥ ৪৪৮ ॥
ক্রমে পরে বার বার যত যাতায়াত ।
শ্রীপ্রভু আপনে তত রাখেন তফাত ॥ ৪৪৯ ॥
জানিতে না দেন তিনি তিনি কি রকম ।
মেঘের আড়ালে যেন চাঁদের কিরণ ॥ ৪৫০ ॥
প্রভুদেবে মুখুজ্যের হইল ধারণা ।
প্রেমভক্তিপথে সিদ্ধ সাধু একজনা ॥ ৪৫১ ॥
জ্ঞানমার্গে জানা শুনা কিছু নাহি তাঁর ।
বিয়াতে হয়েছে নষ্ট জ্ঞানে অধিকার ॥ ৪৫২ ॥
সংসারীর নাহি হয় অদ্বৈতগিয়ান ।
তাই প্রভুদেব নীচে তিনি আগুয়ান ॥ ৪৫৩ ॥
ভক্তি হতে জ্ঞান বড় বুঝে প্রাণকৃষ্ণ ।
দ্বৈতজ্ঞান অদ্বৈতের অনেক নিকৃষ্ট ॥ ৪৫৪ ॥
নিজে বড় জ্ঞান-পন্থী ধারণা অন্তরে ।
কল্পতরুমূলে তাই দিন দিন বাড়ে ॥ ৪৫৫ ॥
স্বভাবরক্ষণে বড় শ্রীপ্রভু প্রবীণ ।
মুখুয্যেরে প্রভুদেব কন একদিন ॥ ৪৫৬ ॥
বড়ই কঠিন এই অদ্বৈতগিয়ান ।
জীবে না সহজে পায় ইহার সন্ধান ॥ ৪৫৭ ॥
অতি কষ্টে যদি কেহ পশিবারে পারে ।
সে কেবল একজন কোটির ভিতরে ॥ ৪৫৮ ॥
দেখিয়াছি নেংটা সাধু তোতাপুরী নাম ।
জ্ঞানমার্গে বহুদূর বটে আগুয়ান ॥ ৪৫৯ ॥
একবার এই জ্ঞানে অধিকার হলে ।
আঁচলে বাঁধিয়া যাও যথা ইচ্ছা চলে ॥ ৪৬০ ॥
তালে তালে পড়ে পদ বেতালা না হয় ।
অদ্বৈতজ্ঞানের এই সার পরিচয় ॥ ৪৬১ ॥
জ্ঞানের প্রাধান্যকথা প্রভুর বধনে ।
যত শুনে প্রাণকৃষ্ণ তত ফুলে প্রাণে ॥ ৪৬২ ॥
অভিমান আটক রাখিল একধারে ।
জানি-জানে প্রাণকৃষ্ণ পড়িলেন ফেরে ॥ ৪৬৩ ॥
আইলা এখন এক দেবীঠাকুরানী ।
প্রবীণা বয়স বেশী বৃদ্ধক-ব্রাহ্মণী ॥ ৪৬৪ ॥
গোপাল-জননীসম হৃষ্টপুষ্টকায় ।
দরশনে উদ্দীপন করে যশোদায় ॥ ৪৬৫ ॥
শুদ্ধাত্মা পবিত্রাচারে জীবন-যাপন ।
দিনে মাত্র একবার সাত্ত্বিক ভোজন ॥ ৪৬৬ ॥
ত্যাগি-সন্ন্যাসিনী-ধারা মোহছাড়া প্রাণ ।
গৃহীর গায়ের গন্ধ নরকসমান ॥ ৪৬৭ ॥
বালিকা বিধবা তিনি হরিপদে আশ ।
অঙ্গরাগবিবর্জিতা গঙ্গাকুলে বাস ॥ ৪৬৮ ॥
পটলডাঙ্গায় এক মহাপুণ্যবান ।
ধনেশ্বর ধার্মিক গোবিন্দ দত্ত নাম ॥ ৪৬৯ ॥
কামারহাটিতে তাঁর আছে দেবালয় ।
মাথায় বালিশ যেন শিরে গঙ্গা বয় ॥ ৪৭০ ॥
ব্রাহ্মণীর বসতির স্থান এইখানে ।
দিনে রেতে খেতে শুতে ডাকে ভগবানে ॥ ৪৭১ ॥
বিগত কদিন এবে সুদিন উদয় ।
প্রভুর হইল তাঁরে টান এ সময় ॥ ৪৭২ ॥
গুনিয়া প্রভুর নাম লোকপরস্পর ।
দরশনে আসিলেন দক্ষিণশহর ॥ ৪৭৩ ॥
সাধু-দরশন-আশ অন্য হেতু নয় ।
পরে কি হইল শুন বলি পরিচয় ॥ ৪৭৪ ॥
আপনার প্রিয়ভক্ত দেখি ভগবান ।
অন্তরে উঠেছে তাঁর সুখের তুফান ॥ ৪৭৫ ॥
আধরে শ্রীকরে ধরি মিষ্টান্ন সন্দেশ ।
বৃদ্ধারে খাইতে দিলা প্রভু পরমেশ ॥ ৪৭৬ ॥
শ্রীপ্রভুর পরিচয়ে বুঝেছে ব্রাহ্মণী ।
কৈবর্তের ব্রাহ্মণ শ্রীপ্রভু গুণমণি ॥ ৪৭৭ ॥
প্রভুদত্ত মিষ্টান্ন সন্দেশ তে কারণে ।
না খেয়ে অপরে দিল গোপনে গোপনে ॥ ৪৭৮ ॥
জানিয়াও প্রভু কিছু না কহিলা তাঁয় ।
সে দিনে ব্রাহ্মণী নিজ নিকেতনে যায় ॥ ৪৭৯ ॥
বহুকাল হইতে আছিল তাঁর ধারা ।
পূর্ণমনোযোগসহ মালাজপ করা ॥ ৪৮০ ॥
প্রভুরে দেখিয়া এবে মালাজপকালে ।
পড়িল বড়ই এক নূতন জঞ্জালে ॥ ৪৮১ ॥
জপে আর তিল মাত্র নাহি বসে মন ।
প্রভুর মূরতি হয় সতত স্মরণ ॥ ৪৮২ ॥
তত ইচ্ছা নাহি আসে শ্রীপ্রভুর কাছে ।
তথাপি থাকিতে নারে এলে তবে বাঁচে ॥ ৪৮৩ ॥
এইরূপে যাতায়াত হয় বার বার ।
ক্রমশঃ হইতে থাকে স্নেহের সঞ্চার ॥ ৪৮৪ ॥
কেবা ভক্তিমতী এই ব্রাহ্মণীর বেশ ।
সমাচার সময়ে পাইবে সবিশেষ ॥ ৪৮৫ ॥
বুঝিবে মানবী নয় দেবীর উপর ।
লীলায় ভক্তের নর-নারী কলেবর ॥ ৪৮৬ ॥
গুরু হতে লঘু কিসে অতি গুরুতর ।
ক্ষুদ্রাকার শিলা কিসে শৈলের উপর ॥ ৪৮৭ ॥
বলীর অপেক্ষা বলী বলহীন কিসে ।
কিসে হারে অহঙ্কারী দীনের সকাশে ॥ ৪৮৮ ॥
প্রভুর অপেক্ষা কিসে দাস বলবান ।
উন্নতের চেয়ে কিসে পতিতের মান ॥ ৪৮৯ ॥
দেখিবার বাসনা যদ্যপি থাকে মন ।
আইল ভকত এক কর দরশন ॥ ৪৯০ ॥
কৃষ্ণবর্ণ সে পুরুষ মাংস নাহি গায় ।
আছে খালি অস্থিগুলি সব গণা যায় ॥ ৪৯১ ॥
স্বভাবেতে যুক্তকর ধীর ধীর চলা ।
বক্র দেহ মাখাখানি মাটিপানে হেলা ॥ ৪৯২ ॥
আঁখি দুটি পরিপাটি অতি দীপ্তিমান ।
দৃষ্টিশক্তি পায় স্ফূর্তি শিখার সমান ॥ ৪৯৩ ॥
মূর্তিমান বহ্নি যেন ছাই মাখা গায় ।
উত্তপ্ত সমস্ত গাত্র কাছে ঘেঁষা দায় ॥ ৪৯৪ ॥
অঙ্গরাগে উদাসীন রুক্ষ চুল শিরে ।
লজ্জা-আবরণ বান তাঁহার বিচারে ॥ ৪৯৫ ॥
সাধ্বী সতী ভক্তিমতী পরমা সুন্দরী ।
বহুদূরে আছে ঘরে গুণবতী নারী ॥ ৪৯৬ ॥
বঙ্গদেশে দেওভোগ গ্রামে জন্মস্থান ।
নারায়ণগঞ্জ তার অতি সন্নিধান ॥ ৪৯৭ ॥
অর্জন-আশায় এই শহরেতে আসা ।
চিকিৎসক তিনি নিজে ঔষধ-ব্যবসা ॥ ৪৯৮ ॥
মাসে মাসে অল্প
আয় অতি কষ্টে চলে ।
জমাজমি বড় কম স্বদেশ অঞ্চলে ॥ ৪৯৯ ॥
কোনমতে মন্দ পথে নহে
রোজগার ।
যদি নাশে উপবাসে তথাপি স্বীকার ॥ ৫০০ ॥
স্বভাবতঃ মনোন্নত টলাতে না পারে ।
অবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্ব দিবারাতি করে ॥ ৫০১ ॥
নাম দুর্গাচরণ উপাধি নাগ তাঁর ।
কায়স্থ-কূলের আলো গোটা বাঙ্গলার ॥ ৫০২ ॥
চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর অতি আত্মজন ।
বারে বারে বন্দি তাঁর দুখানি চরণ ॥ ৫০৩ ॥
কেমনে মিলন হয় শ্রীপ্রভুর সনে ।
প্রভুপদে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ৫০৪ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানী বন্ধু এক শহরে বসতি ।
ধীমান সদ্গুণবান ধর্মে বড় মতি ॥ ৫০৫ ॥
সাকারের প্রতিবাদী সাকার না মানে ।
ব্রাহ্মদলভুক্ত তেঁহ কেশবের সনে ॥ ৫০৬ ॥
তীব্র ব্রহ্মজ্ঞানে ভরা হৃদয়-নিলয় ।
নর-গুরু কোনমতে করে না প্রত্যয় ॥ ৫০৭ ॥
এক ব্রহ্ম বিশ্ব-গুরু তাঁহার গিয়ান ।
শ্রীসুরেশচন্দ্র দত্ত মহাত্মার নাম ॥ ৫০৮ ॥
আজিতক সুরেশের নহে দরশন ।
মধুর মুরতি
মোর প্রভুর কেমন ॥ ৫০৯ ॥
নাম লীলাস্থান মাত্র কানে আছে শুনা ।
এইবারে দেখিবারে হইল
বাসনা ॥ ৫১০ ॥
এখন ধর্মের ঢাকে ধর্মের বাজারে ।
বেজেছে প্রভুর নাম অতি
উচ্চৈঃস্বরে ॥ ৫১১ ॥
পরস্পরে পরামর্শ করি দুই জনে ।
দক্ষিণশহরে চলে প্রভু-দরশনে ॥ ৫১২ ॥
হেথা শ্রীমন্দিরমধ্যে প্রভু নারায়ণ ।
হাজরার সঙ্গে হয় কথোপকথন ॥ ৫১৩ ॥
এমন সময় ভক্তদ্বয় উপনীত ।
দেখিয়া অন্তরে প্রভু অতি আনন্দিত ॥ ৫১৪ ॥
সমাদরে বসাইয়া নীচের আসনে ।
পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন দুইজনে ॥ ৫১৫ ॥
প্রথম দর্শনে মন এইতক কথা ।
পশ্চাৎ পাইবে যত অপর বারতা ॥ ৫১৬ ॥
হৃদয়ের সম ভাগ্যধর আছে কেবা ।
অদ্যাপিহ করিছেন শ্রীপ্রভুর সেবা ॥ ৫১৭ ॥
অনুরাগ তত নাই পূর্বের মতন ।
তুলনায় অধিকাংশ ঔদাস্য এখন ॥ ৫১৮ ॥
কাঞ্চনে প্রয়াস বড় হইল তাঁহার ।
লোভেতে করিল নষ্ট যত সদাচার ॥ ৫১৯ ॥
কবে কিবা করিলেন তাহার ভারতী ।
বলিবারে গেলে পরে বেড়ে যায় পুঁথি ॥ ৫২০ ॥
সঙ্কেতেতে এই মাত্র বুঝে লও মন ।
হৃদুরে করিল কাবু কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৫২১ ॥
নিবারণে প্রভুদেব কহিলে তাঁহারে ।
কটূক্তি করিত কত তখনি প্রভুরে ॥ ৫২২ ॥
কটূক্তি হৃদয়ের মুখে এত বাড়াবাড়ি ।
শুনিয়া ঝরিত তাঁর শ্রীনয়নে বারি ॥ ৫২৩ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে হয় ভাবাবেশ গায় ।
সেই ভাবে বলিতেন সম্বোধিয়া মায় ॥ ৫২৪ ॥
"ক্ষমা কর ওমা কালী বালকহৃদ্বয় ।
মোরে বড় ভালবাসে তাই হেন কয়" ॥ ৫২৫ ॥
যতই করেন ক্ষমা ক্ষমার সাগর ।
হৃদয় ততই রুষে প্রভুর উপর ॥ ৫২৬ ॥
একদিন এত গালি হৃদয়ের মুখে ।
শুনিলে হউক শত্রু কানে নাহি ঢুকে ॥ ৫২৭ ॥
কাঁদিতে লাগিলা প্রভু স্ত্রীলোকের প্রায় ।
সকরুণে এইমত সম্ভাষিয়া মায় ॥ ৫২৮ ॥
"পিতা গেল মাতা গেল গেল সহোদর ।
সহিনু পাইনু কষ্ট দুস্তর দুস্তর ॥ ৫২৯ ॥
তরিলাম সকলেতে তোমার ইচ্ছায় ।
এইবার হৃদয়ের হাতে প্রাণ যায়" ॥ ৫৩০ ॥
ভাগ্যবান যেন হৃদু তেন দুরদৃষ্ট ।
এত সেবা করি পরে দিল এত কষ্ট ॥ ৫৩১ ॥
এখন দক্ষিণেশ্বরে মাতাঠাকুরানী ।
যে ঘরে থাকিত আই সেই ঘরে তিনি ॥ ৫৩২ ॥
মায়ের বসতি হেন নিস্তব্ধ ধরনে ।
ঘরেতে আছেন মাতা সাধ্য কার জানে ॥ ৫৩৩ ॥
ছ মাস যদ্যপি তথা কেহ করে বাস ।
তথাপিহ না পাইবে তাঁহার তল্লাস ॥ ৫৩৪ ॥
মায়ের প্রকৃতি ঠিক প্রকৃতির ছাড়া ।
বিশ্বকারিগর বিধি নয় তার গড়া ॥ ৫৩৫ ॥
মায়েতে মায়ের ধারা সহ্য অতিশয় ।
যেন মায়ে বহু দুঃখ দিয়াছে হৃদয় ॥ ৫৩৬ ॥
একদিন মিষ্টভাবে বিনয় করিয়া ।
জলয়ে কহেন প্রভু মায়ে দেখাইয়া ॥ ৫৩৭ ॥
উনি যদি হন রুষ্ট রক্ষা নাহি আর ।
সাবধানে কর কর্ম মিনতি আমার ॥ ৫৩৮ ॥
কেবা শুনে কার কথা হয়েছে সময় ।
আপন স্বভাবে কর্ম করেন হৃদয় ॥ ৫৩৯ ॥
কত সহিবেন এত তাড়না প্রবল ।
স্বকর্মে হৃদয় পরে পায় প্রতিফল ॥ ৫৪০ ॥
একদিন মহাঘটা পুরীর ভিতরে ।
শ্যামাপূজা সেই দিন বহু আড়ম্বরে ॥ ৫৪১ ॥
পুরী-স্বামী এ সময় মথুর-নন্দন ।
ত্রৈলোক্য তাঁহার নাম বাবু এক জন ॥ ৫৪২ ॥
ভক্তিপথে বাপ যেন গন্ধ নাই তার ।
কালের ঢং এর বুঝা বিলাসি-আচার ॥ ৫৪৩ ॥
পুজাদিনে পুরীমধ্যে সঙ্গে লোকজন ।
দাসদাসী পরিবার নন্দিনী-নন্দন ॥ ৫৪৪ ॥
এখন হৃদয় ব্রতী চামার সেবায় ।
লজ্জীভূত পুজোপকরণ সমুদায় ॥ ৫৪৫ ॥
সমুখে যোগান সব আছে খালে খালে ।
পূজা-সেবা-হেতু হৃদু বলে যথাকালে ॥ ৫৪৬ ॥
দশমবর্ষীয়া এক ত্রৈলোক্যের মেয়ে ।
পূজা দেখিবারে আসে পুলকিত হয়ে ॥ ৫৪৭ ॥
নানাবিদ অলঙ্কারে অঙ্গ সুশোভন ।
পরিধান ঘোর লাল চেলির বসন ॥ ৫৪৮ ॥
পরমা সুন্দরী বালা মনোহরা ছবি ।
দেখিলেই বোধ হয় যেন বনদেবী ॥ ৫৪৯ ॥
মন্দির-দুয়ারে যবে হৈল আগুসার ।
হৃদয় করিতেছিল পূজার যোগাড় ॥ ৫৫০ ॥
জানি না কি ভাবে তারে করি দরশন ।
হৃদয় লইয়া দুই কুসুম-চন্দন ॥ ৫৫১ ॥
অর্পণ করিল সেই বালিকার পায় ।
পায়েতে চন্দন মাথা বালা ঘরে যায় ॥ ৫৫২ ॥
জননী দেখিয়া তার দু'পারে চন্দন ।
কি লেগেছে কি হয়েছে জিজ্ঞাসে কারণ ॥ ৫৫৩ ॥
কন্যার বচনে শুনি সঠিক কাহিনী ।
বুকে করাঘাত করে কান্দিয়া জননী ॥ ৫৫৪ ॥
একি অমঙ্গল কথা হইয়া ব্রাহ্মণ ।
বালিকার পায়ে দিল কুসুম-চন্দন ॥ ৫৫৫ ॥
পশ্চাৎ ত্রৈলোক্যনাথ পাইয়া খবর ।
ক্রোধে অঙ্গ জ্ঞানশূন্য কাঁপে কলেবর ॥ ৫৫৬ ॥
দ্বারবানে সেইক্ষণে হুকুম জাহির ।
হৃদয়ে করিয়া দিতে পুরীর বাহির ॥ ৫৫৭ ॥
আরও শুনি সেই সঙ্গে ক্রোধান্ধ হইয়া ।
বলিয়াছিলেন প্রভুদেবে উদ্দেশিয়া ॥ ৫৫৮ ॥
কেমনে হইবে তাঁর থাকা এইখানে ।
যথা আজ্ঞা কহে দ্বারী প্রভুনারায়ণে ॥ ৫৫৯ ॥
অমনি উঠিলা প্রভু আর কেবা রাখে ।
এক বস্ত্র পরিধান ফটকাভিমুখে ॥ ৫৬০ ॥
সাধের বেটুয়া খলি তাও সঙ্গে নয় ।
পথে যেতে ত্রৈলোক্যের সঙ্গে দেখা হয় ॥ ৫৬১ ॥
ফিরায় ত্রৈলোক্য তাঁর আপন মন্দিরে ।
বিনয়-নম্রতা-শ্রদ্ধা-ভক্তিসহকারে ॥ ৫৬২ ॥
আপনি যাবেন কোথা কহে পরমেশে ।
হৃদয় গিয়াছে যাক আপনার দোষে ॥ ৫৬৩ ॥
পরে বহু সকাতরে করে নিবেদন ।
অমঙ্গল বালিকার না হয় যেমন ॥ ৫৬৪ ॥
মঙ্গলনিধান প্রভু দিলেন অভয় ।
অমঙ্গল কিবা কথা মঙ্গল নিশ্চয় ॥ ৫৬৫ ॥
ঈশ্বরের লীলা-খেলা কি বলিব মন ।
যে হৃদয় শ্রীপ্রভুর আত্মীয়-স্বজন ॥ ৫৬৬ ॥
বাল্যাবধি এক সঙ্গে স্বদেশে বিদেশে ।
পরমসুহৃদ-সখা-বন্ধু-নির্বিশেষে ॥ ৫৬৭ ॥
কাটাইল এতদিন প্রভুর সেবায় ।
আজি কিবা কর্ম-ফলে তাঁহার বিদায় ॥ ৫৬৮ ॥
লীলা-মর্ম বলিবারে হই অতি ভীতু ।
সার অর্থ লীলা তাঁর জীব শিক্ষা-হেতু ॥ ৫৬৯ ॥
হৃদয়ের দুই পায়ে করিয়া প্রণতি ।
ভক্তিসহকারে শুন রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৫৭০ ॥
সমাগত ভক্ত যত সবে গেছে মজে ।
মধুভরা শ্রীপ্রভুর চরণ-পঙ্কজে ॥ ৫৭১ ॥
পুরী থেকে হৃদয়ের হইলে বিদায় ।
রহিল হরিশ লাটু প্রভুর সেবায় ॥ ৫৭২ ॥
দিনে রেতে থাকে সাথে সেবে সযতনে ।
এমন সুন্দর সেবা হৃদুও না জানে ॥ ৫৭৩ ॥
যোত্রাপন্ন ভক্ত যাঁরা দেন সরঞ্জাম ।
শ্রীপ্রভুর সেবাহেতু যাহা প্রয়োজন ॥ ৫৭৪ ॥
বিশেষ সুরেন্দ্র মিত্র আর দত্ত রাম ।
কখন কি লাগে রাখে সর্বদা সন্ধান ॥ ৫৭৫ ॥
ব্যয়কুণ্ঠ বলরাম অপবাদ আছে ।
তিনিও যতনে রন এ দুয়ের পাছে ॥ ৫৭৬ ॥
প্রভু যে আপনি নিজে রাজরাজেশ্বর ।
ভক্ত রামে বলরামে পেয়েছে খবর ॥ ৫৭৭ ॥
সেই হতে আত্মবন্ধু আছে যে যেখানে ।
সকলে লইয়া যান প্রভু-দরশনে ॥ ৫৭৮ ॥
একদিন বলরাম করিবে গমন ।
সুন্দর আত্মীয়া এক দিল দরশন ॥ ৫৭৯ ॥
আপনা আপনি মধ্যে সন্নিকটে বাড়ি ।
দশে জানা পিতা তাঁর করেন ডাক্তারি ॥ ৫৮০ ॥
জমিদার পতি তাঁর খড়দায় ঘর ।
বেশ্যা-সুরা-প্রিয় স্ত্রীরে করে না আদর ॥ ৫৮১ ॥
তেকারণ হয় বাস পিতার ভবনে ।
অন্তরে অপার ছাপ বহে রেতে দিনে ॥ ৫৮২ ॥
বসু-বাসে শ্রীপ্রভুর পাইয়া সন্ধান ।
দক্ষিণশহরে আজি দরশনে যান ॥ ৫৮৩ ॥
কিবা গুণ আছে লগ্ন প্রভু-দ্বরশনে ।
কে বুঝিবে শ্রীপ্রভুর চিরভক্ত বিনে ॥ ৫৮৪ ॥
ভব-জ্বালাপরিপূর্ণ যত ছিল ঘটে ।
একবার দরশনে সব গেল ছুটে ॥ ৫৮৫ ॥
হৃদি থলি হইল খালি তুম্বীর মতন ।
কৃপা করি দিলা প্রভু শুদ্ধাভক্তি-ধন ॥ ৫৮৬ ॥
স্বভাবতঃ শাস্তিমূর্তি অতুল ভুবনে ।
নিকটে কহিলে কথা নাহি ঢুকে কানে ॥ ৫৮৭ ॥
মাটিতে না পায় টের পা পাতিলে তার ।
গুণের আধার কত না আসে কথায় ॥ ৫৮৮ ॥
একে তাঁর স্বভাবতঃ স্বভাব এমন ।
সোনায় সোহাগা-যোগ প্রভু-দরশন ॥ ৫৮৯ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশন শুধু একা নয় ।
মাতার সঙ্গেতে এই সঙ্গে পরিচয় ॥ ৫৯০ ॥
গাছের তলায় দুয়ে একবারে পান ।
ভক্তিমতী যোগীন-মা এ দেবীর নাম ॥ ৫৯১ ॥
প্রভু আর মার পথে সমর্পিয়া মন ।
আজিকার মত ফিরে পিতার ভবন ॥ ৫৯২ ॥
ভক্তির আস্বাদ পেয়ে থাকিতে না পারে ।
সুযোগ পাইলে যান প্রভুর গোচরে ॥ ৫৯৩ ॥
করেন মায়ের সেবা পরম যতনে ।
ভক্তি কৃপা সিদ্ধি বৃদ্ধি হয় দিনে দিনে ॥ ৫৯৪ ॥
সাধন-ভজন যেবা উপযুক্ত তাঁর ।
পূজা-জপ-ধ্যান-ক্রিয়া নৈষ্ঠিক আচার ॥ ৫৯৫ ॥
প্রভুদেব এক দিন কৃপা-সহকারে ।
বুঝাইয়া বিধিমত দিলেন তাহারে ॥ ৫৯৬ ॥
পুরাতন কায়া গেল নূতন এখন ।
কভু জপে রত কভু ধিয়ানে মগন ॥ ৫৯৭ ॥
ভক্তিমতী আছে যত প্রভু-অবতারে ।
কাহারও নাহিক ঠাঁই ইঁহার উপরে ॥ ৫৯৮ ॥
একদিন প্রভুদেব তাঁরে উল্লেখিয়া ।
বলিলেন অন্তে যত ভক্তে সম্বোধিয়া ॥ ৫৯৯ ॥
"অতিশয় ভক্তিমতী সুন্দর আধার ।
ফুটিবে কতই ফুল হৃদয়ে তাঁহার" ॥ ৬০০ ॥
অদ্ভুত ধিয়ান তাঁর সমাধির মত ।
একেবারে বাহিক গিয়ান বিরহিত ॥ ৬০১ ॥
লীলা বুঝা শক্তি ঘটে ফুটে বিলক্ষণ ।
অন্তর্দৃষ্টিসহ সদা উচ্চে থাকে মন ॥ ৬০২ ॥
এত ভক্তি ঠিক যেন গড়া ভক্তি-ছাঁচে ।
মাইর চরণোদক অভাগিয়া যাচে ॥ ৬০৩ ॥
একেবারে গেল উড়ে আগেকার ধারা ।
দেখে শুনে বলরাম হয় বুদ্ধি-হারা ॥ ৬০৪ ॥
মনে ভাবে সৃষ্টিছাড়া প্রভু-নারায়ণ ।
আশ্চর্য যা শুনি তাহা করি দরশন ॥ ৬০৫ ॥
একবার দরশনে পরশনে যাঁর ।
বিশুদ্ধ ভকতি হয় হৃদয়ে সঞ্চার ॥ ৬০৬ ॥
অতিশয় বৃদ্ধ পিতা বাস বৃন্দাবনে ।
চলিলেন বলরাম আনিতে এখানে ॥ ৬০৭ ॥
মনে মনে বড় সাধ দেখাবেন তাঁয় ।
মনোহর কল্পতরু প্রভুদেবরায় ॥ ৬০৮ ॥
বৃন্দাবনে হাজির হইয়া গিয়া কয় ।
আঙ্গোপান্ত শ্রীপ্রভুর যত পরিচয় ॥ ৬০৯ ॥
দৈবের ঘটনা কার সাধ্য বলে উঠে ।
ভক্তিমতী নারী এক এই কুঞ্জে জুটে ॥ ৬১০ ॥
কৃষ্ণভক্তি অনুরাগ এত ঘটে তাঁর ।
কলিতে না শুনি কথা এ হেন প্রকার ॥ ৬১১ ॥
বয়সে নবীনা তিনি ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
সন্ন্যাসিনীসম বেশ কৃষ্ণের লাগিয়ে ॥ ৬১২ ॥
বসুর নিকটে শুনি প্রভুর কাহিনী ।
তাঁহারে দেখিতে নেচে উঠে সন্ন্যাসিনী ॥ ৬১৩ ॥
শ্রীপ্রভুর নামে কি মোহন শক্তি আছে ।
নহে যেবা পরিচিত সেও শুনে নাচে ॥ ৬১৪ ॥
অতি দুরদৃষ্ট যেবা আবদ্ধ অশুচি ।
তাহার কেবল নামে নাহি হয় রুচি ॥ ৬১৫ ॥
বদ্ধজীব তারে বলে যুক্তি নাহি চায় ।
সতত প্রমত্তচিত অবিদ্যা-সেবায় ॥ ৬১৬ ॥
নয়নাবরণ চোখে বাঁধা আছে ঠুলি ।
সময়ে দিবেন প্রভু অবশ্যই খুলি ॥ ৬১৭ ॥
অহেতুক কৃপাসিন্ধু প্রভু দয়াধাম ।
জীবদুঃখে দুঃখী তাঁর নাহিক আরাম ॥ ৬১৮ ॥
নানামতে রূপা দিতে করেন উপায় ।
নিজ করমের ফলে জীবে নাহি চায় ॥ ৬১৯ ॥
অবিদ্যার ধনে খেলে আনন্দ অন্তর ।
হায় জীববুদ্ধি তার পায়ে করি গড় ॥ ৬২০ ॥
আবার এমন দেখি মনুষ্য-আকারে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম মুগ্ধ হয়ে পড়ে ॥ ৬২১ ॥
ভূলোকের এরা নন, গোলোকের জাতি ।
রামকৃষ্ণ-অবতারে শ্রীপ্রভুর সাথী ॥ ৬২২ ॥
সন্ন্যাসিনী অনুরাগে খেপার সমান ।
সন্ন্যাস-আশ্রমে তাঁর গৌরদাসী নাম ॥ ৬২৩ ॥
প্রভু-অবতারে পরে ভক্তেরা সকলে ।
সম্বোধনে ডাকে তাঁয় গৌর-মাতা বোলে ॥ ৬২৪ ॥
সঙ্গে পিতা গৌরমাতা ভক্ত বলরাম ।
উতরিলা ত্বরা করি কলিকাতা ধাম ॥ ৬২৫ ॥
বসুর আছিল এই রীতি বরাবর ।
যেই দিনে যাইতেন দক্ষিণশহর ॥ ৬২৬ ॥
মেয়েছেলে গোষ্ঠিবর্গ প্রতিবাসী যত ।
বিচারবিহীনে সঙ্গে অনেকে থাকিত ॥ ৬২৭ ॥
আজি তরীযোগে হয় তাঁহার গমন ।
বিরাজেন যেথা প্রভু ভক্তের জীবন ॥ ৬২৮ ॥
ঘোমটার মধ্যে ঢাকা যতেক রমণী ।
প্রভুদেবে বন্দে সব লুটায়ে অবনী ॥ ৬২৯ ॥
প্রভুর নিকটে নাই কিছু অবিদিত ।
হাজার না থাক কেহ যত আবরিত ॥ ৬৩০ ॥
কার শক্তি তাঁর কাছে রাখে কিছু ঢাকি ।
ঘটে ঘটে স্থিত যাঁর সৃষ্টিময় আঁখি ॥ ৬৩১ ॥
অসীম গভীর জলে সাগর-ভিতরে ।
সুনীল গগনভেদী শৃঙ্গী গিরিবরে ॥ ৬৩২ ॥
পাতালে মেদিনীগর্ভে কিবা ভিন্ন লোকে ।
বিন্দুপরিমিত তনু যে যেথায় থাকে ॥ ৬৩৩ ॥
সকলে দেখেন প্রভু মুদিয়া নয়ন ।
ভূতপতি মায়াধীশ সৃষ্টির কারণ ॥ ৬৩৪ ॥
বিশ্বাধার বিশ্বাধেয় জগৎগোসাঁই ।
চরাচরব্যাপ্ত স্থূলদৃষ্টে এক ঠাঁই ॥ ৬৩৫ ॥
যতগুলি ভক্তনারী বসে একধারে ।
বসনে বদন গুপ্ত স্বভাবানুসারে ॥ ৬৩৬ ॥
আকার কি হৃদি-ভাব কি প্রকার কার ।
প্রভুদেব সুবিদিত সব সমাচার ॥ ৬৩৭ ॥
অঙ্গুলি-নির্দেশে দেখাইয়া গৌরমায় ।
বলরামে পুছিলেন প্রভুদেবরায় ॥ ৬৩৮ ॥
কেবা এই ভক্তিমতী কহ পরিচয় ।
গুপ্ত উপযুক্ত মুখ ইহার তো নয় ॥ ৬৩৯ ॥
লজ্জা-ঘৃণা-ভয়হারা ঘর-বাড়ি-ছাড়া ।
কৃষ্ণ-হেতু বিদেশিনী অনুরাগে ভরা ॥ ৬৪০ ॥
হবিসহযোগে যেন জ্বলন্ত পাবক ।
শতাধিক পরিমাণে হয় উদ্দীপক ॥ ৬৪১ ॥
সেইমত গৌরমার অনুরাগাগুনে ।
বহু গুণে কৈল বুদ্ধি প্রভুর বচনে ॥ ৬৪২ ॥
সেই কালে সঙ্গে জুটে উচ্ছ্বাস-পবন ।
উড়াইল একদিকে মুখের বসন ॥ ৬৪৩ ॥
ভক্ত ভগবানে আছে স্বতন্তর ভাষ ।
তাহে সন্ন্যাসিনী করে বেদনা প্রকাশ ॥ ৬৪৪ ॥
প্রভুদেব শান্ত কৈলা শান্তি-বারি দিয়া ।
দেখে ভক্ত বলরাম অবাক হইয়া ॥ ৬৪৫ ॥
সুখ্যাতি শুনিয়া তাঁর শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
বলরাম রাখে তাঁর নিজ নিকেতনে ॥ ৬৪৬ ॥
পরম যতনে মনে মনে এই জ্ঞান ।
মানবী কখন নয় দেবীর সমান ॥ ৬৪৭ ॥
এই সব ভক্ত লৈয়া প্রভু গুণমণি ।
কেমনে করিলা লীলা তাহার কাহিনী ॥ ৬৪৮ ॥
যথাশক্তি পরে পরে কব সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-পুঁথি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬৪৯ ॥
তৃতীয়
খণ্ড সমাপ্ত
১
থাকে — শ্রেণীভুক্ত ।
চতুর্থ খণ্ড
প্রভুর সহিত রাখালের মিলন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
অখিলের অধিপতি পরম ঈশ্বর ।
লীলাহেতু ধরায় ধরিয়া কলেবর ॥ ১ ॥
দীন-দুঃখী দ্বিজবেশ শুপ্ত সাজ গায় ।
কৈবর্তের পুরীমধ্যে প্রভুদেবরায় ॥ ২ ॥
সুন্দর সাকার লীলা অমৃত কথন ।
যোল আনা মন দিয়া শুন শুন মন ॥ ৩ ॥
সংসারের দুঃখে শোকে পেতে দিয়া ছাতি ।
ত্রিতাপ-সন্তাপহর মধুর ভারতী ॥ ৪ ॥
লীলা মানে খেলা তাঁর একাকী না হয় ।
সঙ্গে থাকে সাঙ্গোপাঙ্গ স্বগণনিচয় ॥ ৫ ॥
নিত্যাসদ্ধ নিত্যযুক্ত পারিষদগণ ।
ঈশ্বরকোটির তাঁরা প্রভুর বচন ॥ ৬ ॥
তাঁহাদের মধ্যে দেখি দুই শ্রেণীভুক্ত ।
তিয়াগী সন্ন্যাসী কেহ কেহ বা গৃহস্থ ॥ ৭ ॥
হইলে সংসারী তবু গুণ নাহি ছুটে ।
গোলাপ গোলাপ যদি কাঁটাবনে ফুটে ॥ ৮ ॥
অন্যবিধ জীবকোটি ভক্তগণ তাঁর ।
কেহ বা তিয়াগী কেহ করেন সংসার ॥ ৯ ॥
সামান্য জীবের মত নহে গণনায় ।
দেবদেবী সশরীরে আগত লীলায় ॥ ১০ ॥
তাঁদিকে লইয়া যাহা খেলিলা গোসাঁই ।
সেই ভাগবত খেলা লীলা নামে গাই ॥ ১১ ॥
ভক্তসঙ্গে খেলিতে বড়ই প্রীতি মনে ।
অবতারে শুধু খেলা ভকতের সনে ॥ ১২ ॥
লীলাস্বাদে মত্ত যেবা ভ্রমে লীলাস্থলী ।
তিনি তাঁর আপ্তজন ভক্ত তাঁরে বলি ॥ ১৩ ॥
স্বভাবতঃ যুক্ত আঁথি লীলা দেখিবারে ।
লীলাময় শ্রীপ্রভুর লীলার আসরে ॥ ১৪ ॥
আপ্তজন ভক্তগণ শুন পরিচয় ।
যাঁরা আছে তাঁরা আছে নূতন না হয় ॥ ১৫ ॥
ভিতরেতে সেই বস্তু একই প্রকৃতি ।
অবতারভেদে মাত্র বিভিন্ন মুরতি ॥ ১৬ ॥
প্রভুর বচনে শুন তাহার প্রমাণ ।
ভাবাবেশে একদিন কন ভগবান ॥ ১৭ ॥
আমড়া নিকৃষ্ট জাতি ফলের ভিতরে ।
সুমিষ্ট ফজলি তারে পারি করিবারে ॥ ১৮ ॥
কি হেতু করিব তাহা কিবা প্রয়োজন ।
ফজলি আমের মোর রয়েছে কানন ॥ ১৯ ॥
অবতারে শুদ্ধ তাঁর ভক্তসনে খেলা ।
সিন্ধুর যেমন রঙ্গ লয়ে ঊর্মিমালা ॥ ২০ ॥
বদ্ধজীবসঙ্গে রঙ্গে নহে কোন কালে ।
যে না জানে খেলা তার সঙ্গে কেবা খেলে ॥ ২১ ॥
চিরকাল বিদিত ভক্তের ভগবান ।
ভক্তিগ্রন্থে তাই থাকে ভক্তের আখ্যান ॥ ২২ ॥
লোকে
প্রায় লীলাবৃষ্টি-শক্তিবিরহিত ।
তাই কহে গ্রন্থে কেন ভক্তের চরিত ॥ ২৩ ॥
ভক্তের কথায় তাঁর মহিমা অপার ।
না বুঝিয়া লোকে তাই কহে অনন্ত আর ॥ ২৪ ॥
দেখিতে শকতি নাই দৃষ্টি নাহি চলে ।
ফল ফুল গুঁড়ি ছাড়া গাছ কোন্ কালে ॥ ২৫ ॥
ভক্তগণ-মধ্যে তাঁর সতত বিহার ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি শ্রীঅঙ্গের আপনার ॥ ২৬ ॥
শ্রীপ্রভুর যত রঙ্গ তাঁহাদের সনে ।
ভক্তে দিলে বাদ লীলা হইবে কেমনে ॥ ২৭ ॥
কেবল সুতায় ফুল করি পরিহার ।
কখন কে গাঁথে কিসে কুসুমের হার ॥ ২৮ ॥
এ লীলায় গুপ্ত ভক্ত প্রথম আসরে ।
শশিকলাসম বৃদ্ধি সঙ্গ পেয়ে পরে ॥ ২৯ ॥
কেমনে গোপন পরে কেমনে প্রকাশ ।
দৃষ্টিহীনে কখনই না মিলে আভাস ॥ ৩০ ॥
শ্রবণ কীর্তনে লীলা যত মাখামাখি ।
পূতচিত সুনিশ্চিত তবে খুলে আঁখি ॥ ৩১ ॥
ক্রমে পরে দরশন মিলয়ে লীলার ।
প্রাণসম ভক্তসনে সম্বন্ধ কি তাঁর ॥ ৩২ ॥
বড় দুঃখ ভোগে ভক্ত কথা সত্য অতি ।
সন্দ যদি হয় তবে শুনহ ভারতী ॥ ৩৩ ॥
স্বতন্ত্র প্রকৃতি তাঁর ভক্তে যাহা পায় ।
প্রভুসনে রঙ্গভূমে আসিয়া ধরায় ॥ ৩৪ ॥
জীবশিক্ষা একমাত্র তাহার কারণ ।
নাহি হরি যথা আছে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৩৫ ॥
নাহি হরি তথা সুখ-সম্পদ যেখানে ।
নাম কি আভাস গন্ধ তিল-পরিমাণে ॥ ৩৬ ॥
এ ঘরের উল্টা রীতি নীতি প্রতিকূল ।
অগ্রভাগ সর্ব নীচে ঊর্ধ্বদেশে মূল ॥ ৩৭ ॥
যতই উত্তরমুখে করিবে চয়ন ।
ততই দক্ষিণ দূর বিধির বিধান ॥ ৩৮ ॥
ইন্দ্রিয়ের প্রীতিকর সুখ যারে জানি ।
কোথা তায় সুখ সে তো গরলের খনি ॥ ৩৯ ॥
জিনিস কি চিনি চিনি রসনার আশ ।
উদরে কৃমির হেতু তিক্তে হয় নাশ ॥ ৪০ ॥
সম্পদে বিপদ
বড় বিপদেতে হিত ।
ভকতে রাখেন প্রভু বিপদে বেষ্টিত ॥ ৪১ ॥
বিপদের হেতু কোথা বিপদে
কি আনে ।
হইয়া প্রভুর দাস এ বিপদ কেনে ॥ ৪২ ॥
মনে প্রাণে বুঝে যেবা মহাভাগ্যবান ।
বিপদ সম্পদ তাঁর প্রাণের আরাম ॥ ৪৩ ॥
বিবেক-বিরাগ-মূল জ্ঞানের আকর ।
প্রেমভক্তি পায় দ্রুতি পরম সুন্দর ॥ ৪৪ ॥
দুঃখ
সুখে দুঃখ সুখ স্বভাবের ধারা ।
ভক্তের দুঃখেতে ধরে স্বতন্ত্র চেহারা ॥ ৪৫ ॥
শরতে
জলদজালে ভীষণ গর্জন ।
পরিণামে পুষ্টিকর বারি-বরিষণ ॥ ৪৬ ॥
অনুপম পরিমল বিপদের সাথী ।
অনুরাগে চারিদিকে ছুটে দ্রুতগতি ॥ ৪৭ ॥
চন্দনের সৌরভ যেমন বৃদ্ধি পায় ।
সবলে পিষিলে তারে কঠোর শিলায় ॥ ৪৮ ॥
কলঙ্ক-কালিমা চিহ্ন ভকতের গায় ।
সত্যই কতই স্থানে স্থানে দেখা যায় ॥ ৪৯ ॥
তাহার কারণ আছে শুন খুলে বলি ।
তাতে বাতে ফুটে ভক্ত-কুসুমের কলি ॥ ৫০ ॥
অভক্তে কুকর্ম করে নরকে পয়ান ।
ভকতে তাহাতে পড়ে বেদান্ত পুরাণ ॥ ৫১ ॥
ফুটে আঁখি নিরমল শতগুণবলে ।
বিবেক-বিরাগ-বৃদ্ধি প্রতি পলে পলে ॥ ৫২ ॥
কর্মস্মৃতি দ্রুতগতি বিরাগের বাটে ।
তুরঙ্গম যেইরূপ কষাঘাতে ছুটে ॥ ৫৩ ॥
মনোরথে
প্রভুদেব যাঁহার সারথি ।
শত জনমের পথে এক পলে গতি ॥ ৫৪ ॥
এইরূপ খেলা তাঁর ভকতের সনে ।
একই উদ্দেশ্য জীব-শিক্ষার কারণে ॥ ৫৫ ॥
ভক্তসনে খেলা দেখা অতি প্রয়োজন ।
করিবারে শ্রীপ্রভুর লীলা-আস্বাদন ॥ ৫৬ ॥
লবে ভক্তপদধূলি শিরে আপনার ।
কার্যাকার্য কিছু তাঁর না করি বিচার ॥ ৫৭ ॥
প্রভুর পাইয়া তত্ত্ব শ্রীমনোমোহন ।
প্রভু-দরশনে করে সর্বদা গমন ॥ ৫৮ ॥
সঙ্গে লয়ে পরিবার নন্দন-নন্দিনী ।
যতগুলি ভক্তিমতী তাঁহার ভগিনী ॥ ৫৯ ॥
রত্নগর্ভা জননী ভগ্নিপতিগণ ।
অন্ত কত প্রতিবাসী আত্মীয়-স্বজন ॥ ৬০ ॥
এইবারে তৃতীয় ভগিনীপতি যান ।
প্রভুর মানসপুত্র শ্রীরাখাল নাম ॥ ৬১ ॥
চৌদ্দ কি পনর বর্ষ বয়ঃক্রম তাঁর ।
বিষয়-সম্পত্তি ঘরে বাপ জমিদার ॥ ৬২ ॥
দোহারা গড়নখানি সরল মধুর ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেতে বহু সাদৃশ্য প্রভুর ॥ ৬৩ ॥
হারা ছেলে পুনরায় ফিরে এল ঘর ।
মহোল্লাসে ভাসে যেন পিতার অন্তর ॥ ৬৪ ॥
তাঁহারে দেখিয়া তেন প্রভুর আমার ।
উথলে আনন্দ হৃদে নাহি ধরে আর ॥ ৬৫ ॥
সম্বরেন সুখবেগ নিজে প্রভুরায় ।
একবারে ধরা কারে না দেন লীলায় ॥ ৬৬ ॥
লুকোচুরি খেলা কত হয় কি কারণ ।
বুঝেছ কি হেতু কিছু দৃষ্টিহীন মন ॥ ৬৭ ॥
এখন যদ্যপি আছ দৃষ্টিপথে কানা ।
একত্রে দুহাতে ধর দাড়িম্বের দানা ॥ ৬৮ ॥
ধীরে ধীরে দন্তের পেষণে খাও কারে ।
কারে কর উদরস্থ গিলে একবারে ॥ ৬৯ ॥
তবে না বুঝিবে মর্ম প্রভু কি কারণে ।
সহজে না যেন ধরা প্রথমে প্রথমে ॥ ৭০ ॥
শ্রীমনোমোহনে কন শ্রীপ্রভু আমার ।
দেখ এই রাখালের সুন্দর আধার ॥ ৭১ ॥
এখন শ্রীরাখালের বিদ্যার্জনকাল ।
লেখা-পড়া ছিল তার বড়ই জঞ্জাল ॥ ৭২ ॥
যা কিছু সামান্য যত্ন বিদ্যাভ্যালে ছিল ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে সেটুকুও গেল ॥ ৭৩ ॥
বিদ্যালয়ে নাহি মন যাওয়া মাত্র নামে ।
সে কেবল একমাত্র পিতার শাসনে ॥ ৭৪ ॥
কোন দিন বিদ্যালয়ে ছুটি পেলে পর ।
পুনরায় ফিরে নাহি যাইতেন ঘর ॥ ৭৫ ॥
বরাবর আসিতেন দক্ষিণশহরে ।
থাকিতেন দুই-তিন দিন একবারে ॥ ৭৬ ॥
হেন আচরণে ঘরে জনক তাঁহার ।
দেখা পেলে করিতেন কত তিরস্কার ॥ ৭৭ ॥
আটকে রাখেন তাঁয় আপনার ঘরে ।
আসিতে না পান যেন দক্ষিণশহরে ॥ ৭৮ ॥
হেথা অতি বিষাদিত প্রভু গুণমণি ।
রাখালের তরে চিন্তা দিবস-যামিনী ॥ ৭৯ ॥
উঠিল প্রবল টান সে টানের জোরে ।
বেগে গিয়া ঢুকিতেন কালীর মন্দিরে ॥ ৮০ ॥
প্রার্থনা হইত কত বারি দুনয়নে ।
বিদরে হৃদয় মা গো রাখাল-বিহনে ॥ ৮১ ॥
ভক্ত-প্রাণ ভক্ত-প্রিয় প্রভু ভগবান ।
সন্দেহ-মোচনে কব বহুল প্রমাণ ॥ ৮২ ॥
স্বার্থশূন্য প্রভুদেব কোন স্বার্থ নাই ।
ভক্ত-হেতু স্বার্থপর সর্বদা গোসাঁই ॥ ৮৩ ॥
যবে যা প্রার্থনা প্রভু করেন শ্যামায় ।
তখনি পূরণ হয় তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৮৪ ॥
শ্যামায় তাঁহায় মন কোন ভেদ নাই ।
একরূপে শ্যামারূপ অপরে গোসাঁই ॥ ৮৫ ॥
মনে প্রাণে ভাবে অঙ্গে দোঁহে ঠিক একা ।
দোঁহার মধ্যেতে দোঁহে পরস্পর ঢাকা ॥ ৮৬ ॥
দেখিতে যদ্যপি সাধ হয় তোর মন ।
সরলে স্মরহ প্রভু তম-বিমোচন ॥ ৮৭ ॥
শ্রীপ্রভুর ইচ্ছা যেন কি কল-কৌশলে ।
আনিয়া দিলেন কালী তাঁহার রাখালে ॥ ৮৮ ॥
স-মনে শুনিলে ঘুচে লোচন-আঁধার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত অমৃত ভাণ্ডার ॥ ৮৯ ॥
রাখালের জনকের বহুজমিজমা ।
বিষয় সম্বন্ধে এক উঠে মকদ্দমা ॥ ৯০ ॥
অতিশয় বিপদ হইলে পরাজয় ।
দিবানিশি ভেবে সারা অন্তরেতে ভয় ॥ ৯১ ॥
মিছিলের অবস্থার বড়ই দুর্দশা ।
পরপক্ষ বলবান্ নাহি জয়-আশা ॥ ৯২ ॥
কেহ নাহি কয় তাঁয় জিনিলে মিছিল ।
বড় বড় বিধিবিৎ কৌন্সলী উকিল ॥ ৯৩ ॥
অন্য চিন্তা নাই এই চিন্তা নিরন্তর ।
তন্ময়ত্ব তাহে নাই ঘরের খবর ॥ ৯৪ ॥
এ সময় অবসর পাইল রাখাল ।
পিতার জঞ্জালে তাঁর ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ৯৫ ॥
প্রভুর নিকটে তবে থাকেন এখন ।
দেখিয়াও পিতা নাহি করেন বারণ ॥ ৯৬ ॥
প্রভুর ইচ্ছায় কিবা হইল এমনি ।
জিনিবার নহে যাহা জিনিলেন তিনি ॥ ৯৭ ॥
মনে মনে বুঝিলেন জয়ের কারণ ।
সাধুর নিকটে যায় তাঁহার নন্দন ॥ ৯৮ ॥
সাধুর কৃপায় এই মকদ্দমা জিত ।
ষোল আনা পাকা জ্ঞানে ধারণা নিশ্চিত ॥ ৯৯ ॥
ঘুচিল পূর্বের ভাব মঙ্গল-লক্ষণ ।
রাখালে এখন নাই কোন নিবারণ ॥ ১০০ ॥
অবাধে কাটান কাল প্রভুর গোচরে ।
কর্ম তাঁর প্রভুসেবা ভক্তি-সহকারে ॥ ১০১ ॥
তদুপরি শ্রীপ্রভুর বাৎসল্য-সঞ্চার ।
সম্বোধিয়া ডাকিতেন 'গোপাল আমার' ॥ ১০২ ॥
রাখাল-বিহনে যেন গাভী বৎসহারা ।
হইল রাখাল দুটি নয়নের তারা ॥ ১০৩ ॥
গোপাল গোপাল বলি কতই আদর ।
আলিঙ্গন বসাইয়া কোলের উপর ॥ ১০৪ ॥
ভাবেতে কখন প্রভু এতই উন্মত্ত ।
কাঁধেতে করিয়া তায় করিতেন নৃত্য ॥ ১০৫ ॥
মরি কি মধুর খেলা কি কহিতে পারি ।
সাঙ্গোপাঙ্গ সহ লীলা নরদেহ ধরি ॥ ১০৬ ॥
নূতন
সম্পর্ক নয় আপ্তগণ সনে ।
চিরকাল বাঁধা না চিনালে কেবা চিনে ॥ ১০৭ ॥
হীন হেয় জীববুদ্ধি বড় পরমাদ ।
বুঝে না বীজের মধ্যে ফলের আস্বাদ ॥ ১০৮ ॥
আছে হেন বহু বুদ্ধি সৃষ্টির ভিতরে ।
পূর্ব-জন্ম পর-জন্ম স্বীকার না করে ॥ ১০৯ ॥
হায় কি বিষম বুদ্ধি যার বিবেচনা ।
কারণ বিহনে হয় কর্মের সূচনা ॥ ১১০ ॥
বিনা কর্মে ফল হয় কি প্রকারে ভাবে ।
মন-নাশ কর্ম-নাশ দেহের বিনাশে ॥ ১১১ ॥
ভাল মন্দ যার যাহা সঙ্গে সঙ্গে রয় ।
হোক না দেহের লক্ষ লক্ষ বার লয় ॥ ১১২ ॥
দেহান্তরে গুণান্তর কহে আহাম্মক ।
এখানেতে টক যেবা সেখানেও টক ॥ ১১৩ ॥
স্বভাবে স্বভাব থাকে স্বভাবের প্রথা ।
বীজের ভিতর যেন ফল ফুল পাতা ॥ ১১৪ ॥
সম্পর্কে সমানভাবে বাঁধা চিরকাল ।
এখন রাখাল যিনি পূর্বেও রাখাল ॥ ১১৫ ॥
ভবিষ্যতে তিনিই রাখাল পুনঃ পরে ।
রাখালের রাখালত্ব কিসেও না মরে ॥ ১১৬ ॥
প্রভুর গোপাল তাঁর গুণান্তর নাই ।
গোসাঁইর শ্রীরাখাল তাঁহার গোসাঁই ॥ ১১৭ ॥
ধীর নম্র বিনয়ী সংসারী ভক্তবর ।
বিভূষিত সর্বগুণে গুণের সাগর ॥ ১১৮ ॥
আস্যে মৃদু মন্দ হাস্য খেলে অবিরাম ।
মিতব্যয়ী সন্তোষ-অন্তর বলরাম ॥ ১১৯ ॥
গোপনে গোপনে আনে প্রভু ভগবানে ।
মহাপুণ্যময় তীর্থ নিজ নিকেতনে ॥ ১২০ ॥
ভবনে মহিমা কিবা না যায় বর্ণন ।
গৌর অবতারে যেন শ্রীবাস-প্রাঙ্গণ ॥ ১২১ ॥
জগন্নাথ প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ঘরে ।
ভোগ-রাগ নিতি নিতি অতি প্রীতিভরে ॥ ১২২ ॥
সেই মহাপ্রসাদে প্রভুর সেবা হয় ।
শ্রীপ্রভুর অন্ন-ভিক্ষা যথা তথা নয় ॥ ১২৩ ॥
ভাগ্যধর বলরাম যাঁর এই বাড়ি ।
তিনি একজন গোটা প্রভুর ভাণ্ডারী ॥ ১২৪ ॥
নহে অপরের কথা প্রভুর বচন ।
এখানে ভাণ্ডারী তাঁর মোটে কয় জন ॥ ১২৫ ॥
মথুর বিশ্বাস অগ্রে সবার প্রধান ।
দ্বিতীয় যে জন এই বসু বলরাম ॥ ১২৬ ॥
তৃতীয় বেনিয়া জেতে সদ্গুণ অধিক ।
খ্যাতনামা মহাদাতা শ্রীশম্ভু মল্লিক ॥ ১২৭ ॥
চতুর্থ সুরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র মহাশয় ।
আগাগোড়া লীলাপাঠে পাবে পরিচয় ॥ ১২৮ ॥
বলরাম জন্ম জন্ম ভক্ত অবতারে ।
অন্ন ভিক্ষা শ্রীপ্রভুর তাই তার ঘরে ॥ ১২৯ ॥
প্রভুর গমনে বহু আড়ম্বর তথা ।
অন্ন ব্যঞ্জনাদি রাঁধে ভামিনীর মাতা ॥ ১৩০ ॥
মহাভাগ্যবতী এই ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
বড় খুশী প্রভুদেব তাঁর রান্না খেয়ে ॥ ১৩১ ॥
বহু তুষ্ট প্রভুদেব ভক্ত বলরামে ।
ভোজনে নানান রঙ্গ হয় তাঁর সনে ॥ ১৩২ ॥
একদিন সংগোপনে বলরামে কন ।
অন্যে দিতে দ্রব্য যদি আনে কোন জন ॥ ১৩৩ ॥
সেই দ্রব্য দেয় যদি খাইতে আমারে ।
কখন না পারি তাহা স্পর্শ করিবারে ॥ ১৩৪ ॥
আমার কারণ যাহা আমাকেই দিবে ।
ঠাকুরের ভোজ্যদ্রব্য স্বতন্ত্র রাখিবে ॥ ১৩৫ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবচন সত্য কত দূর ।
দেখিবারে কুতূহল হইল বসুর ॥ ১৩৬ ॥
পরদিনে শ্রীপ্রভুর মিষ্টান্নের খালে ।
ঠাকুরের ভোজ্য যত নিজে হাতে তুলে ॥ ১৩৭ ॥
মিশাইয়া দিল লক্ষ্য রাখি বিলক্ষণ ।
বাসনা দেখিতে প্রভু বাছেন কেমন ॥ ১৩৮ ॥
অন্তঃপুরে শ্রীপ্রভুর ভোজনের স্থান ।
সদর মহলে হেথা প্রভু ভগবান ॥ ১৩৯ ॥
সেবাহেতু শ্রীপ্রভুরে ডাকে যথাকালে ।
জানা নাই কিবা রঙ্গ মিষ্টান্নের থালে ॥ ১৪০ ॥
ঠাকুরের ভোজ্যে লক্ষ্য বিশেষ করিয়া ।
সম্মুখেতে বলরাম আছে দাঁড়াইয়া ॥ ১৪১ ॥
অবাক কাহিনী তেঁহ দেখিল সাক্ষাৎ ।
ঠাকুরের ভোজ্য তাঁর না পড়িল হাত ॥ ১৪২ ॥
যদিও প্রভুর ভোজ্য সঙ্গে মিশামিশি ।
সামান্য মিষ্টান্ন তাঁর নয় খুব বেশী ॥ ১৪৩ ॥
বড়ই আশ্চর্য কার্য দেখিতে শুনিতে ।
ভোজন দূরের কথা না ঠেকিল হাতে ॥ ১৪৪ ॥
যে ভাজ্য নিজের তাঁর তাঁর নামে আনা ।
প্রত্যেকের লয়ে প্রায় দুই-এক দানা ॥ ১৪৫ ॥
খাইলেন প্রভুদেব ভরিল উদর ।
বুদ্ধিহারা বলরাম দেখিয়া রগড় ॥ ১৪৬ ॥
শুন মন খুলে বলি লীলার বারতা ।
সুমিষ্ট হইতে মিষ্ট রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ১৪৭ ॥
চিত্ত তাঁর বিশ্বব্যাপী দর্পণের প্রায় ।
প্রতিবিম্বে তাহে সব যা হয় যথায় ॥ ১৪৮ ॥
শ্রবণবিবর ব্যাপ্ত সকল ভুবন ।
কার্যে বাঁধা একসঙ্গে কায় বাক্য মন ॥ ১৪৯ ॥
বিরাজিত সৎবুদ্ধি মূর্তিমান জ্ঞান ।
কায়া করে তাই যাহা মনের বিধান ॥ ১৫০ ॥
আর এক শ্রীপ্রভুর শ্রীঅঙ্গের ধারা ।
দেখিতে প্রাকৃত বাহ্যে পঞ্চভূতে গড়া ॥ ১৫১ ॥
তা নয় চিন্ময় মোর শ্রীপ্রভুর তনু ।
অনুক্ষণ সচেতন প্রতি পরমাণু ॥ ১৫২ ॥
বার বার দেখিয়াছি প্রভুদেবরায় ।
গাঢ়তর নিদ্রাগত আছেন শয্যায় ॥ ১৫৩ ॥
এমন সময় যদি অস্পর্শীয় জন ।
গমন করিত কাছে ছুইতে চরণ ॥ ১৫৪ ॥
প্রসারিত মাত্র হাত পরশের আগে ।
শশব্যস্ত প্রভুদেব উঠিতেন জেগে ॥ ১৫৫ ॥
চাক্ষুষ দর্শকে এই হয় অনুমান ।
প্রতি লোমকূপ তাঁর যেন চক্ষুষ্মান ॥ ১৫৬ ॥
বলরামে একদিন কন ভগবান ।
দেখ গো রাখাল নামে অতি ভক্তিমান ॥ ১৫৭ ॥
পেয়েছি বালক এক সুন্দর প্রকৃতি ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তার ভগ্নীপতি ॥ ১৫৮ ॥
যাও যদি একবার দেখে এস তাঁয় ।
কাঁসারিপাড়ার কাছে থাকে সিমলায় ॥ ১৫৯ ॥
মহাভক্ত বলরাম স্থির-বুদ্ধি তাঁর ।
প্রতি বর্ণে শ্রীপ্রভুর বুঝে আছে সার ॥ ১৬০ ॥
যতনে পালন শ্রীবচন যথাকালে ।
যথা আজ্ঞা চলিলেন দেখিতে রাখালে ॥ ১৬১ ॥
পরস্পর দেখাশুনা মন-আকর্ষণ ।
শুভক্ষণে দু'হু জনে হইল মিলন ॥ ১৬২ ॥
নিকট সম্বন্ধে দোঁহে ভিতরে ভিতরে ।
দিন দিন যায় যত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ১৬৩ ॥
ভক্তপ্রিয় বলরাম বৈষ্ণব-আচারী ।
ভক্ত জনে পাইলেই যত্ন বাড়াবাড়ি ॥ ১৬৪ ॥
তাঁহার প্রকৃত ভাব নাই অহঙ্কার ।
মাৎসর্যবিহীন চিত্ত যদি জমিদার ॥ ১৬৫ ॥
সাধারণ রীতি ছাড়া সদা দীন মন ।
সুপ্রশস্ত সুন্দর দ্বিতল নিকেতন ॥ ১৬৬ ॥
কত ভক্ত আসে যায় তাঁহার ভবনে ।
যত্নবান সর্বদা সাদর-সম্ভাষণে ॥ ১৬৭ ॥
অতি পরিমিতব্যয়ী বুদ্ধিতে না আসে ।
হিসাব দেখিয়া লোকে ব্যয়কুণ্ঠ ঘোষে ॥ ১৬৮ ॥
সাদরে রাখেন তিনি রাখালে ভবনে ।
সৌভাগ্যবানের ঘরে রাখাল যে দিনে ॥ ১৬৯ ॥
প্রচারে উঠিল এক অভিনব ধারা ।
ভক্তের ভবনে শ্রীপ্রভুর ভিক্ষা করা ॥ ১৭০ ॥
কোন নির্ধারিত দিনে সহ ভক্তগণ ।
মহোৎসব নৃত্য গীত হরিসংকীর্তন ॥ ১৭১ ॥
জনায়ের প্রাণকৃষ্ণ শহরেতে বাড়ি ।
বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ তেহ পরম আচারী ॥ ১৭২ ॥
ব্রাহ্মণের রীতি নীতি সব আছে তাঁয় ।
দ্বিতীয় তাঁহার মত মেলা মহাদায় ॥ ১৭৩ ॥
সময়ে সময়ে প্রায় এখন তখন ।
তাঁহার ভবনে শ্রীপ্রভুর নিমন্ত্রণ ॥ ১৭৪ ॥
ভোজনের পরিপাটি হেন নাহি শুনি ।
সন্তুষ্ট যাহাতে অতি অখিলের স্বামী ॥ ১৭৫ ॥
ভক্তিভরে দ্বিজবর আতপ তন্ডুল ।
অতি মিহি অন্ন তাঁর যেন জুঁই ফুল ॥ ১৭৬ ॥
আনাতেন দেশ থেকে করিয়া যোগাড় ।
স্বদেশে সঙ্গতি খুব নিজে জমিদার ॥ ১৭৭ ॥
তণ্ডুলের রূপ গুণ না যায় বর্ণন ।
জনমে সুন্দর অল্প করিলে রন্ধন ॥ ১৭৮ ॥
আলো করে গোটা ঘর যথা রাখা যায় ।
আমোদিত চারিদিক গন্ধ হেন তায় ॥ ১৭৯ ॥
ফল ফুল পাল মূলে সাত্ত্বিক ব্যঞ্জন ।
বিবিধ আস্বাদযুক্ত বিবিধ রকম ॥ ১৮০ ॥
দধি-দুগ্ধ-ঘৃতাদিতে যা হয় তৈয়ার ।
যতনে ব্রাহ্মণ করে সকল যোগাড় ॥ ১৮১ ॥
শুদ্ধাচারে অন্তঃপুরে বাড়ির মেয়েরা ।
স্বহস্তে রন্ধন করে আপনারা তাঁরা ॥ ১৮২ ॥
দু'ইতে না দেয় কারে অপর মানুষে ।
কলঙ্ক যাদের হাত কখন আমিষে ॥ ১৮৩ ॥
স্বধর্মে আচারী যেবা তাঁরে ভগবান ।
দেখিলাম বরাবর বড় কৃপাবান ॥ ১৮৪ ॥
শত ছিদ্র বর্তমান যদি অন্য দিকে ।
তথাপি করুণা তাঁর রাশি রাশি তাঁকে ॥ ১৮৫ ॥
ধর্মপক্ষে তিলাদপি রহে যার টান ।
প্রভুর নয়নে লাগে গিরি-পরিমাণ ॥ ১৮৬ ॥
নিরবধি কৃপানিধি মূরতি প্রভুর ।
চিন্তা কিসে জীবের হইবে তম দূর ॥ ১৮৭ ॥
দিনে রেতে জীবহিতে ব্রতী প্রভুবর ।
ঈশ্বরের পথে কিসে হবে অগ্রসর ॥ ১৮৮ ॥
করুণায় প্রভুদেব সহায় কেমন ।
পিতৃবলে বালকের বক্ষে আরোহণ ॥ ১৮৯ ॥
দুর্বল শিশুর সাধ মাত্র উঠে গাছে ।
বাপ দেন পাছা ঠেলা দাঁড়াইয়া নীচে ॥ ১৯০ ॥
সৎপথে সদাচারে অল্পমতি যাঁর ।
দ্রুতগতি পূর্ণমতি কৃপায় তাঁহার ॥ ১৯১ ॥
তপে জপে যজ্ঞে কিবা সাধন-ভজনে ।
কীর্তনে মননে কিবা পূজা আরাধনে ॥ ১৯২ ॥
স্বধর্ম-আচারে কিবা বিবেক-বিরাগে ।
সৎশাস্ত্র-পাঠে কিবা ভক্তি-অনুরাগে ॥ ১৯৩ ॥
জ্ঞান কিবা ভক্তিযোগে যে যথায় রয় ।
সকলে আছেন প্রভু, প্রভু সর্বময় ॥ ১৯৪ ॥
এখানে স্বধর্মাচারে পবিত্র ব্রাহ্মণ ।
তাই তাঁর ঘরে শ্রীপ্রভুর আগমন ॥ ১৯৫ ॥
প্রভুর দয়ার্দ্র হৃদে করুণা কেবল ।
তিলবৎ কর্মে দেন তালবৎ ফল ॥ ১৯৬ ॥
শুদ্ধসত্ত্বময় প্রভু অখিল-ঈশ্বরে ।
তুহিলেন দ্বিজবর ভিক্ষা দিয়া ঘরে ॥ ১৯৭ ॥
শত শত দণ্ডবৎ ব্রাহ্মণের পায় ।
শুন রামকৃষ্ণ কথা অকিঞ্চনে গায় ॥ ১৯৮ ॥
চতুর্থ খণ্ড
দয়াময় রামকৃষ্ণ
কলি-কলুষ-নাশন, মহা তম-বিনাশন,
ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-ধাম ।
দীনহীনহিতকারী, ভব-জলধি-কাণ্ডারী,
দয়াময়
রামকৃষ্ণনাম ॥ ১ ॥
পুরুষ প্রধান প্রভু, পরম ঈশ্বর বিভু,
মায়াময়
মায়ার অতীত ।
গুণাতীত গুণময়, কার্য-কারণ-আলয়,
মহৈশ্বর্য
অঙ্গে বিরাজিত ॥ ২ ॥
একাধারে নানা মূর্তি, নানা ভাবে পায় স্ফুর্তি,
ভাবময়
ভাবের সাগর ।
যত ভাব তত রূপ, নরদেহে বিশ্বরূপ,
অগণন রসের
আকর ॥ ৩ ॥
চিন্ময় কোমল-অঙ্গ, নরদেহে লীলারঙ্গ,
সাঙ্গোপাঙ্গ-সঙ্গ-প্রিয় ভাব ।
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে, নানা লীলা নানা স্বাদে,
মহাশত্তি-সহ আবির্ভাব ॥ ৪ ॥
প্রভুদেব অবতারে,
জীবের শিক্ষার তরে,
একাধারে
সমষ্টি সবার ।
বিশ্ব-জননীর ন্যায়, সকল প্রকাশ পায়,
পূর্ণভাবে
যত অবতার ॥ ৫ ॥
নানা দ্রব্যে এক সৃষ্টি, গুণেতে নামের সৃষ্টি,
হের
দৃষ্টি করিয়া চালনা ।
গুণে কাজে যায় দেখা, শ্রীপ্রভুর অঙ্গে লেখা,
নানা
নাম অপার মহিমা ॥ ৬ ॥
নাম ভেদে নাহি ক্ষতি, যে নামে যাহার প্রীতি,
রতি-সতি
রাখি শ্রীচরণে ।
যখন যে ডাকে তাঁরে, প্রকাশ্যে কিবা অন্তরে,
উত্তর সে
পায় সেইক্ষণে ॥ ৭ ॥
জ্ঞান কিবা ভক্তিপথে, যার ইচ্ছা যেই মতে,
পথে যেতে
কারে নাহি মানা ।
প্রভু হলে অনুকূল, অকূলেতে মিলে কূল,
ধ্রুব
মিটে মনের বাসনা ॥ ৮ ॥
দয়াল বঙ্কিম-আঁখি, জীবের দুর্গতি দেখি,
ধরাধামে
করুণাবতার ।
বিশ্বাসবিহীন জনে, মত্ত কামিনী-কাঞ্চনে,
নিজগুণে
করিতে নিস্তার ॥ ৯ ॥
নিশ্চয় তাহার ত্রাণ, দেহেতে থাকিতে প্রাণ,
একবার
করিলে স্মরণ ।
যাহা না করিতে পারে, তপ জপ শুদ্ধাচারে,
অনাহারে
সাধন-ভজন ॥ ১০ ॥
এক প্রভু নানা ভাবে, কৃপা কৈল সর্বজীবে,
শুন কই
তাহার ভারতী ।
বিশ্ব-গুরু রূপ তাঁর, হরিতে ভবের ভার,
ধরিলেন
বিবিধ মুরতি ॥ ১১ ॥
কহিতে কিবা আশ্চর্য, বিবেক বিরাগৈশ্বর্য,
কোটি
সূর্য তেজে হারে তাঁয় ।
ক্ষীণপ্রভ হুতাশন, কুঞ্চিত মলিনানন,
মূর্তিমান
জ্ঞানের প্রভায় ॥ ১২ ॥
কঠোর সাধনে মত্ত, মন প্রাণ দেহ চিত্ত,
ষোল আনা
গত একবারে ।
পরমাত্মে নিত্য স্থিতি, বাহ্যহারা দিবারাতি,
পুত্তলির
সমান আকারে ॥ ১৩ ॥
কভু ভক্তি স্ফুর্তি পায়, যেন প্রভু গোরা রায়,
আবেশে অবশ
কলেবর ।
মধুর কান্তির রাশি, জিনিয়া গগন-শণী,
আস্যে
হাসি এতই সুন্দর ॥ ১৪ ॥
কভু ভক্তি উদ্দীপনি, মিষ্ট কণ্ঠে বীণা জিনি,
কৃষ্ণকালীলীলাগীত গান ।
কি আনন্দ হৃদে খেলে, গীতে নৃত্যে তালে তালে,
তার সম কি
তার সমান ॥ ১৫ ॥
কভু সহজের ন্যায়, বালক-স্বভাব গায়,
পরিধেয়
অঙ্গের বসন ।
বগলে শ্রীঅঙ্গে নাই, দিগম্বর শ্রীগোসাঁই,
এখানে
সেখানে বিচরণ ॥ ১৬ ॥
সারথি শ্রীকৃষ্ণ-বেশে, হিত-উক্তি উপদেশে,
যেন পাত্র
সেইমত কন ।
বেদ বেদান্ত পুরাণ, গীতাগাথা তত্ত্ব-জ্ঞান,
সকলের সার
বিবরণ ॥ ১৭ ॥
সামান্য সকল বাক্যে, সুবোধ্য মূর্খের পক্ষে,
ভাগবৎশক্তি সহকারে ।
হোক না অধমাধার, শুনে ছুটে অন্ধকার,
সদ্য সদ্য আলো
খেলে ঘরে ॥ ১৮ ॥
দেখাইলা নিজ তেজে, সামান্য ভাণ্ডের মাঝে,
ব্রহ্মাণ্ডের যতেক ব্যাপার ।
গুহ্যৃতত্ব সমবেত,
যা আছে শাস্ত্রে নিহিত,
একাধারে
যত অবতার ॥ ১৯ ॥
ক্রিয়া-করমের ফল,
সব গেল রসাতল,
প্রবল এতই
কৃপাকণা ।
ক্রিয়াকর্মাতীত তিনি, প্রভু অখিলের স্বামী,
বুঝে ভাল
প্রভুভক্ত জনা ॥ ২০ ॥
বেদ-বিধানেতে রটে, সুকাজে কুকাজ কাটে,
কাজ না
করিলে পরে নয় ।
মেঘে যেন মেঘ-ঠেলা, তবে কিরণের মেলা,
তমোনাশী
শশীর উদয় ॥ ২১ ॥
কিন্তু এ কালের গতি, সুকাজে কাহার মতি,
জীবের
দুর্গতি দুর্নিবার ।
কঠোর সাধন করে,
ফল দিলা জীবোদ্ধারে,
কৃপাময়
শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২২ ॥
সম্বলবিহীন জনে, দয়াময় ধরাধামে,
দয়া লয়ে
পড়িলেন দায় ।
দীন-সাজ অঙ্গে পরা, দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা,
তবু কেহ
নাহি চায় তাঁয় ॥ ২৩ ॥
অবিদ্যায় মত্ত হৃদি, জীবকুল নিরবধি,
কৃপা কিবা
চিনিতে না পারে ।
এঁঠেলি ফণীর গায়,
যদ্যপি অমৃত পায়,
তবু নাহি
ত্যজে বিষধরে ॥ ২৪ ॥
হাস্যরস পরিহাসে, প্রভু নন ন্যূন কিসে,
রসময়
রসিকপ্রবর ।
তার সঙ্গে সকৌতুকে, আসক্তি প্রবল লোকে,
দেন জ্ঞান
ভক্তির খবর ॥ ২৫ ॥
ভিষুক্ প্রবীণ জ্ঞানে, শর্করার আবরণে,
শিশুর
বদনে করে দান ।
প্রাণ-বিনাশক ব্যাধি, তার মত মহৌষধি,
তিক্ত
কালকূটের সমান ॥ ২৬ ॥
কামিনী-কুহক বলে, যতেক যুবকদলে,
মোহজালে
করে বিজড়িত ।
মোহিনী ছাঁদনি বাণী, অঙ্গ-ভঙ্গিমা কাহিনী,
প্রভুদেব
সব সুবিদিত ॥ ২৭ ॥
নকল করিয়া তার, হাবভাব সহকার,
দেখিলে
কখন নহে ভুলা ।
বুঝাতেন জীবগণে, অবিদ্যা-শক্তি কেমনে,
জীবসনে
রঙ্গে করে খেলা ॥ ২৮ ॥
আভাস-প্রকাশে যার, এক বেদ হৈল চার,
দর্শন হইল
গোটা ছয় ।
ক্ষান্ত তন্ত্র হারি মানি, শরবৎ শূলপাণি,
মহেশ্বর
যিনি মৃত্যুঞ্জয় ॥ ২৯ ॥
যাহে নাহি তত্ত্বগাথা, না হইতে হেন কথা,
বিগলিত
বদনে প্রভুর ।
যে ভাবে না হোক উক্ত, তত্ত্বসার তাহে গুপ্ত,
মূর্তিমান
জ্ঞানের আঁকুর ॥ ৩০ ॥
শ্রবণ-বিবর দিয়া, হৃদয়ে পড়িল গিয়া,
বাক্য-বীজ
কভু নষ্ট নয় ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি, শ্রবণ মধুর অতি,
শুদ্ধ
জ্ঞান-ভক্তির আলয় ॥ ৩১ ॥
একাধারে নানা লোকে, জাগাইতে জ্ঞানালোকে,
প্রভুসম কে কোথা
প্রবল ।
অপার মহিমা-কথা, সাদৃশ্য অপরে কোথা,
একা প্রভু
দৃষ্টান্তের স্থল ॥ ৩২ ॥
বেদাপেক্ষা গুরুতর, প্রতিবর্ণ প্রত্যক্ষর,
যাহা ফুটে
প্রভুর বদনে ।
শুনে কীট অতি তুচ্ছ, সুমেরু সমান উচ্চ,
গিরিবর
লঙ্ঘে লম্ফদানে ॥ ৩৩ ॥
জীবের পরম আয়ু, এক জল এক বায়ু,
এক তবু
অনন্ত প্রকার ।
স্থান কাল অনুসারে, ভিন্ন ভিন্ন গুণ ধরে,
পুষ্টি
যাহে জগৎ-সংসার ॥ ৩৪ ॥
যাহার যেমন ধাত, তার তেন তাত বাত,
সকলেতে
খাটে না সকল ।
কোনটি কাহার পক্ষে, কাল থেকে করে রক্ষে,
কার পক্ষে
তাহাই গরল ॥ ৩৫ ॥
বিশ্বগুরু প্রভুদেবে, লবে লোক তিন ভাবে,
এক
উপগুরুর সমান ।
পাল তুলে করুণার, ভব-জলদি অপার,
পারাপারে
করিবে প্রয়াণ ॥ ৩৬ ॥
অপর শ্রেণীর যাঁরা, শ্রেষ্ঠতর তেজে তাঁরা,
দিক্হারা
নাহি হবে আর ।
পথে যাবে মহা-তুষ্ট,
নিজ দেহ করি পুষ্ট,
ভাব ল'য়ে
প্রভুর আমার ॥ ৩৭ ॥
শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যবান, হৃদে যার পায় স্থান,
ভগবান
প্রভুরূপে হরি ।
ইষ্টজ্ঞানে ভজে পূজে, অখিলের মহারাজে,
সহ মাতা
জগৎ-ঈশ্বরী ॥ ৩৮ ॥
আদি-অন্ত-লীলাপাঠে, অবশ্য বসিবে ঘটে,
শ্রীপ্রভুর স্বরূপ-বারতা ।
এক মনে শুন মন, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণায়ন,
মহাতম-বিনাশন-কথা ॥ ৩৯ ॥
চতুর্থ খণ্ড
নিত্যনিরঞ্জনের
মিলন এবং সুরেন্দ্র, মনোমোহন
ও রাজেন্দ্রের ঘরে প্রভুর মহোৎসব
জয়
প্রভু
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বড়ই মধুর কাণ্ড ভক্ত-সংজোটন ।
আইল এখন এক ভকত-রতন ॥ ১ ॥
সুন্দর মূরতিখানি বালক বয়েস ।
রূপে গুণে তেজে যেন কুমার বিশেষ ॥ ২ ॥
সরলস্বভাবযুক্ত সরল গড়ন ।
বিখ্যাত কায়স্থকুলে তাহার জনম ॥ ৩ ॥
নির্ভয় হৃদয়ালয় বীরের আকৃতি ।
বাল্যাবধি অস্ত্রে শস্ত্রে স্বভাবতঃ প্রীতি ॥ ৪ ॥
নয়ন-রঞ্জন ঠাম প্রফুল্ল বয়ান ।
শ্রবণমধুর নিত্য নিরঞ্জন নাম ॥ ৫ ॥
পাইয়া তাঁহার প্রভু অতি আনন্দিত ।
আদর যেমন জন্ম জন্ম পরিচিত ॥ ৬ ॥
মিষ্টান্ন খাইতে দেন সোহাগের ভরে ।
পাতিয়া নয়ন দুটি বয়ান উপরে ॥ ৭ ॥
অনিমিখ আঁখি একদৃষ্টে নিরীক্ষণ ।
নয়ন-অঞ্জন যেন নিত্যনিরঞ্জন ॥ ৮ ॥
সোহাগ-সম্ভাষে নানা কথোপকথনে ।
কাটিল আগোটা দিন পরানন্দ প্রাণে ॥ ৯ ॥
অপরাহ্ণ যবে দিবা অবসান প্রায় ।
ভবনে ফিরিয়া যেতে নিরঞ্জন চায় ॥ ১০ ॥
থাকিতে প্রভুর জেদ হয় বার বার ।
নিরঞ্জন কোনমতে করে না স্বীকার ॥ ১১ ॥
সন্ধ্যার প্রাক্কালে ফিরিলেন সেই দিনে ।
শহরে যেখানে থাকা মাতুল-আশ্রমে ॥ ১২ ॥
কাঁটায় গাঁথিয়া মাছ যথা মেছোয়ালে ।
লোলে লোলে ছাড়ে ভুরি সরসীর জলে ॥ ১৩ ॥
নিজ বলে চলে মাছ স্ব-ভাবে মগন ।
যেমন তাহার নাই কোনই বন্ধন ॥ ১৪ ॥
এখানেতে মেছোয়াল বসিয়া ডাঙ্গায় ।
ধীরে ধীরে ধরি ডুরি মাছেরে খেলায় ॥ ১৫ ॥
কখন আনিয়া কাছে অতি অল্প জলে ।
কখন পুনশ্চ ডুরি ছাড়ে কুতূহলে ॥ ১৬ ॥
সেইমত ভক্তি-ডোরে বাঁধা নিরঞ্জন ।
তখন চলিয়া গেল মাতুল-আশ্রম ॥ ১৭ ॥
কিন্তু শ্রীপ্রভুর টানে কে থাকিতে পারে ।
দরশনে পুনর্বার আসিলেন ফিরে ॥ ১৮ ॥
প্রভুর নিজের লোক নিত্যনিরঞ্জন ।
ঈশ্বরকোটির থাকে লীলায় গোপন ॥ ১৯ ॥
নিত্যসিদ্ধ নিত্যমুক্ত দাগ নাহি গায় ।
মায়ের কোলের ছেলে কার্তিকের প্রায় ॥ ২০ ॥
ভরিল পুলকে চিত প্রভুর আমার ।
নিরঞ্জনে সন্নিধানে পেয়ে পুনর্বার ॥ ২১ ॥
নানা
ভাবে দিবাভাগে করেন যতন ।
রাতি হলে যায় নিদ্রা নিত্যনিরঞ্জন ॥ ২২ ॥
প্রভুর নয়নে নিদ্রা নাহি আসে মোটে ।
নিরখেন নিরঞ্জনে রাখিয়া নিকটে ॥ ২৩ ॥
নিশীথে উঠান তাঁয় গায়ে দিয়া হাত ।
হাসিখুশী বিবিধ কথায় কাটে রাত ॥ ২৪ ॥
এইভাবে তিন দিন থাকিয়া তথায় ।
ফিরিলেন নিরঞ্জন মামার বাসায় ॥ ২৫ ॥
মাতুল আকুল-প্রাণ ছিলেন ভবনে ।
নিরুদ্দেশ দিনত্রয় দেখি নিরঞ্জনে ॥ ২৬ ॥
হইল তাহার আজ্ঞা দাস-দাসী লোকে ।
হেতে দিনে নিম্নজনে রাখে চোখে চোখে ॥ ২৭ ॥
প্রভুর মহিমা কথ্য অপূর্ব আখ্যান ।
লীলা কথা ভক্ত তেন যেন ভগবান ॥ ২৮ ॥
সতর্কে থাকিতে আজ্ঞা যাদের উপরে ।
ত্রস্তচিত সকলেই পায় দেখিবারে ॥ ২৯ ॥
গোলক আকারে এক অপরূপ জ্যোতি ।
বেড়িয়ে থাকয়ে নিরঞ্জনে দিবারাতি ॥ ৩০ ॥
বুঝিতে না পারে কেহ ইহার কারণ ।
ভাবে পাছে যদি হয় অশিব লক্ষণ ॥ ৩১ ॥
নিরঞ্জনে নিবারণ আর নাহি করে ।
যথা ইচ্ছা তথা যায় ইচ্ছা অনুসারে ॥ ৩২ ॥
সোদরাদি কেহ নাই একা নিরঞ্জন ।
বৃদ্ধক জননী মাত্র সংসারে বন্ধন ॥ ৩৩ ॥
দিনে দিনে শ্রীপ্রভুর পুষ্টি হয় দল ।
সাঙ্গোপাঙ্গ ক্রমে ক্রমে আসিছে সকল ॥ ৩৪ ॥
এতদিন ছিল অপরের ঘরে থানা ।
কাকের বাসায় যেন কোকিলের ছানা ॥ ৩৫ ॥
এখন অনেকগুলি গোষ্ঠীর ভিতরে ।
প্রভুকে লইয়া প্রায় প্রতি শনিবারে ॥ ৩৬ ॥
করে
মহোৎসবানন্দ আপনা ভবনে ।
এ প্রকার প্রচার চলিছে বর্তমানে ॥ ৩৭ ॥
ভক্তের ভবনে ভিক্ষা বড়ই মধুর ।
শুনিলে গাইলে পূত চিত-অন্তঃপুর ॥ ৩৮ ॥
আজি একদিন ভিক্ষা সুরেন্দ্রের ঘরে ।
পরিচিত যত লোক নিমন্ত্রণ করে ॥ ৩৯ ॥
প্রভুর নিজের যাঁরা আপনার জন ।
নিমন্ত্রণ তাঁহাদের নহে প্রয়োজন ॥ ৪০ ॥
আপনে খবরে রাখে পরম হরিষে ।
কখন প্রভুর ভিক্ষা কাহার আবাসে ॥ ৪১ ॥
প্রভু যথা যাইবারে না ছিল কাহার ।
জাতি মান কুল শীল কোনই বিচার ॥ ৪২ ॥
উপনীত যথাকালে হইল কেশব ।
অতীব উন্নত ব্রাহ্মদলের গৌরব ॥ ৪৩ ॥
সঙ্গে তাঁর আপনার অনুচরগণ ।
পণ্ডিত সঙ্গীত-প্রিয় ভাবুক সজ্জন ॥ ৪৪ ॥
সমাগত প্রভু-ভক্ত হয় পরে পরে ।
হইল এতই লোক নাহি ধরে ঘরে ॥ ৪৫ ॥
এখনও
প্রভুর নহে তথা আগমন ।
নিরানন্দ ভক্তবৃন্দ মন উচাটন ॥ ৪৬ ॥
প্রভুতে মগন মন প্রতীক্ষার ভরে ।
বিলম্বের হেতু কিবা কহে পরস্পরে ॥ ৪৭ ॥
হতাশ প্রকাশ কেহ কেহ বা চিন্তিত ।
কেহ বা বিমর্ষ কেহ অতি বিষাদিত ॥ ৪৮ ॥
হেনকালে উপনীত প্রভু গুণধর ।
আনন্দ-আধার মূর্তি করুণা-সাগর ॥ ৪৯ ॥
নেহারিয়া শশধরে জলধি যেমন ।
ফুলকায় দ্রুত ধায় হরষিত মন ॥ ৫০ ॥
উথলিয়া অম্বুরাশি আলিঙ্গন-ছলে ।
তথা তেন ভক্তবৃন্দ প্রভু-পদতলে ॥ ৫১ ॥
মলিন বদন যত উঠিল ফুটিয়া ।
উঠিল আনন্দ রোল ভবন ভরিয়া ॥ ৫২ ॥
মাতিল
সৌরভে পুরী কুসুমের বাসে ।
আমোদিত চারিভিত সুমন্দ বাতাসে ॥ ৫৩ ॥
শোভিল দীপের মালা এক এক রবি ।
ধরায় উদয় নব গোলোকের ছবি ॥ ৫৪ ॥
মূল্যবান গালিচা বৃহৎ পরিসর ।
পাতা আছে লম্বে গ্রন্থে যেইরূপ ঘর ॥ ৫৫ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশনে সবার পিরীতি ।
কিবা ভণ্ড কি পাষণ্ড পাষাণ-প্রকৃতি ॥ ৫৬ ॥
ভ্রান্তে কি অভ্রান্তে কিবা ইচ্ছা অনিচ্ছায় ।
জান্তে কি অজান্তে কিবা হেলায় শ্রদ্ধায় ॥ ৫৭ ॥
যেবা করিয়াছে শ্রীপ্রভুর দরশন ।
নিশ্চয় বিযুক্ত ভার ভবের বন্ধন ॥ ৫৮ ॥
দর্শনে কি পায় কিবা কব সমাচার ।
পূর্ণব্রহ্ম খোদ নিজে শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৫৯ ॥
মন আমি অতি মূর্খ সুমূর্খ সমান ।
অধ্যয়ন কভু নাই ভারত পুরাণ ॥ ৬০ ॥
রামায়ণ ভক্তিগ্রন্থ চৈতন্য-চরিত ।
তন্ত্র গীতা ভক্তি-সূত্র ভকত-সঙ্গীত ॥ ৬১ ॥
ভাষায় দখল নাই ব্যাকরণে জ্ঞান ।
শ্রবণ ভাগবত লীলা ভক্তির আখ্যান ॥ ৬২ ॥
সাধন-ভজন কিবা পথের সম্বল ।
জানি মাত্র শ্রীপ্রভুর চরণ-যুগল ॥ ৬৩ ॥
মথিয়া শাস্ত্রের সার নহি ক্ষমবান ।
সমর্থিতে শ্রীপ্রভুর লীলার প্রমাণ ॥ ৬৪ ॥
লীলার প্রমাণে করি লীলা সমর্থন ।
সম্বল কেবল মোর প্রভুর বচন ॥ ৬৫ ॥
শ্রীবচনে আছে হেন আমার বিশ্বাস ।
নিহিত তাহাতে যত শাস্ত্রের আভাস ॥ ৬৬ ॥
কতই কহিলা প্রভু জগৎ-গোসাঁই ।
কিবা শাস্ত্র কিবা তত্ত্ব বাদ কিছু নাই ॥ ৬৭ ॥
অতীব সরল বাক্যে সামান্য কথায় ।
বোধগম্য সহজে সরল উপমায় ॥ ৬৮ ॥
বেদান্ত বেদাঙ্গ তন্ত্র দরশন ছয় ।
ন্যায় স্মৃতি গীতাগাথা শুনে লাগে ভয় ॥ ৬৯ ॥
প্রবেশ-দুয়ার যার প্রকাণ্ড পাণিনি ।
লক্ষ্যভেদ-পণে যেন পাঞ্চাল-নন্দিনী ॥ ৭০ ॥
তাহার ওপারে শাস্ত্র ভীমবেশে থাকে ।
বাজ-বাক্য আড়ম্বরে গরজিয়া ডাকে ॥ ৭১ ॥
শাস্ত্র-ধর্ম বোধগম্য আরও গুরুতর ।
তারপরে যোগ-কর্ম বিস্তর বিস্তর ॥ ৭২ ॥
এড়াইলে এই পথ তবে যায় দেখা ।
জ্যোতির্ময় হরি হর্ম্য-আলোকের রেখা ॥ ৭৩ ॥
ক্ষীণ-বল অল্প-আয়ুঃ জীবের এখন ।
কেমনে কিরূপে করে শাস্ত্র অধ্যয়ন ॥ ৭৪ ॥
সাধন-ভজন কিবা জপ-তপাচার ।
আয়ত্তে না আসে কর্ম অকূল-পাথার ॥ ৭৫ ॥
বিধির বিধানে এই বিধি প্রচলিত ।
ফল-আশে কর্ম পথে গমন বিহিত ॥ ৭৬ ॥
প্রভুর কৃপায় এই দুরগম্য পথ ।
ত্বরিতে গমন নাহি লাগে মেহনত ॥ ৭৭ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবচনে তাহার প্রমাণ ।
দুর্বলের বল আশা প্রভু ভগবান ॥ ৭৮ ॥
একদিন দয়ানিধি ভাবাবেশে কন ।
এইখানে আসিয়া যদ্যপি কোন জন ॥ ৭৯ ॥
হেলায় শ্রদ্ধায় কিবা করে নমস্কার ।
ভব-সিন্ধু-পারাপারে কি ভাবনা তার ॥ ৮০ ॥
দ্বিতীয় সকালে থাকে বিশ্বব্যাপী মন ।
সে সময়ে করে যদি আমারে স্মরণ ॥ ৮১ ॥
নিশ্চয় তাহার ত্রাণ হয় যথাকালে ।
এই ভব-জলধির অকূল সলিলে ॥ ৮২ ॥
তৃতীয় সাধনা কর্মে প্রয়োজন নাই ।
পূর্ণ-কাম হবে এলে গেলে মম ঠাঁই ॥ ৮৩ ॥
চতুর্থ অবস্থা হবে ফলবতী আশ ।
সরলে করিলে পরে আমায় বিশ্বাস ॥ ৮৪ ॥
পঞ্চম অক্ষম যদি কিছু করিবারে ।
আমায় বকল্মা দিয়া স্থির থাকে ঘরে ॥ ৮৫ ॥
ষষ্ঠ অতি কষ্টে ছাঁচ রেখেছি করিয়া ।
গড়ন গড়িয়া দিব তাহায় ফেলিয়া ॥ ৮৬ ॥
সপ্তম আমার কাছে আসিবে যে জন ।
হরি-পদ লাভ-আশা মনে আকিঞ্চন ॥ ৮৭ ॥
অবশ্য পূরণ হবে তাহার বাসনা ।
অনায়াসে সাধন-ভজন কর্ম বিনা ॥ ৮৮ ॥
অনাথ আশ্রয়হীন নিঃসম্বল জনে ।
তরিবারে হেন ভব-সিন্ধুর তুফানে ॥ ৮৯ ॥
সতত ব্যাকুল প্রভু অধীর পরান ।
নিরন্তর চিন্তা কিসে জীবের কল্যাণ ॥ ৯০ ॥
দুর্লভ জগতে কিছু নাহি যাঁর চেয়ে ।
দীন-দুঃখী-বেশে তিনি কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে ॥ ৯১ ॥
কোমলাঙ্গে সহ্য করি যাতনা অপার ।
দ্বারে দ্বারে করিবারে জীবের নিস্তার ॥ ৯২ ॥
কামিনী-কাঞ্চন-মুগ্ধ-জীব সমুদায় ।
দেখে না প্রভুরে, পথে আখি মুদে যায় ॥ ৯৩ ॥
বড় দায়গ্রস্ত প্রভুদেব অবতারে ।
দয়ার মুরতি ধরি আসিয়া সংসারে ॥ ৯৪ ॥
তাই বারিপূর্ণ চক্ষে আকুল পরান ।
মহাদুঃখে গাইতেন নীচে লেখা গান ॥ ৯৫ ॥
"এসে পড়েছি যে দায়
সে দায় বলবো কায় ।
যার দায় সে আপনি জানে
পর কি জানে পরের
দায় ।
হয়ে বিদেশিনী নারী,
লাজে মুখ দেখাতে নারি,
বলতে নারি, কইতে নারি,
নারী হওয়া একি দায়" ॥
বড়ই বিচিত্র লীলা হয় অবতারে ।
বুঝা বোঝা, আভাসেই বুদ্ধি-বল ছাড়ে ॥ ৯৬ ॥
সৃষ্টির ঈশ্বর যিনি সৃষ্টি যাঁর ভাণ্ড ।
প্রকাণ্ড হইতে যিনি পরম প্রকাণ্ড ॥ ৯৭ ॥
কোটি কোটি ব্রহ্মা বিষ্ণু কোটি মহেশ্বর ।
সব রজ তম গুণে কার্য স্বতন্তর ॥ ৯৮ ॥
যুক্ত-কর নিরন্তর শ্রীআজ্ঞা-পালনে ।
হয় রয় লয় পুনঃ কাল-অনুক্রমে ॥ ৯৯ ॥
মায়াতীত গুণাতীত মায়াধীশ যিনি ।
যাঁহার শকতি মায়া সৃষ্টির জননী ॥ ১০০ ॥
সেই মহা প্রকাণ্ড পুরুষ মহেশ্বর ।
মায়া-সঙ্গে ধরি চৌদ্দপুয়া কলেবর ॥ ১০১ ॥
মায়া সাজ মায়াধীন মায়ামাখা গায় ।
দায়-গ্রস্ত ধরাধামে আসিয়া লীলায় ॥ ১০২ ॥
দায়ের আলায় ঝরে দুনয়নে বারি ।
নিত্যের অপেক্ষা লীলা বহুগুণে ভারি ॥ ১০৩ ॥
কার সাধ্য কহে, লীলা-চিত্রপট আঁকে ।
সামান্য জীবের শির মাথায় না ঢুকে ॥ ১০৪ ॥
বিচিত্র লীলার কাণ্ড বড়ই মজার ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা লীলার ভাণ্ডার ॥ ১০৪ ॥
লীলার ভাণ্ডার কিসে শুন কই মন ।
যে দিন হইতে এই সৃষ্টির পত্তন ॥ ১০৫ ॥
সে অবধি ধরাধামে যত অবতার ।
জনমিয়া কৈলা লীলা বিবিধ প্রকার ॥ ১০৬ ॥
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে লীলা স্বতন্তর ।
সকল নিহিত এই লীলার ভিতর ॥ ১০৭ ॥
একাধারে রামকৃষ্ণ সমষ্টি সবার ।
তাই রামকৃষ্ণ-লীলা লীলার ভাণ্ডার ॥ ১০৮ ॥
মহোৎসব-ধারা তাঁর ভক্তের ভবনে ।
প্রমত্তে গমন তথা জনতা যেখানে ॥ ১০৯ ॥
কারণ ইহার কিছু নহে অন্য আর ।
তাপী পাপী সন্তাপীরে করিতে উদ্ধার ॥ ১১০ ॥
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে খেলে এমন মোহন ।
বিমোহিত নিকটে থাকিত যেই জন ॥ ১১১ ॥
হোক না মলিন কিবা সঙ্কুচিত প্রাণ ।
দ্বেষ-হিংসা পরিপূর্ণ নারকীয় স্থান ॥ ১১২ ॥
আজি মহোৎসব-দিন সুরেন্দ্র-আবাসে ।
পরিপূর্ণ জনাকীর্ণ বিবিধ মানুষে ॥ ১১৩ ॥
মহানন্দময়ী পুরী প্রভুর কৃপায় ।
ভালমন্দ ভক্তাভক্ত বেছে উঠা দায় ॥ ১১৪ ॥
সমাসীন সম্মুখে কেশব শ্রীপ্রভুর ।
ত্রৈলোক্য তাঁহার চেলা কণ্ঠে মিঠা সুর ॥ ১১৫ ॥
গাইতে লাগিল গান ভরা ভক্তিরসে ।
শুনিয়া শ্রীঅঙ্গ টলে ভাবের আবেশে ॥ ১১৬ ॥
ভাবাবেশে উঠে ঝড় অঙ্গ-আন্দোলন ।
সাগরে তরঙ্গ যবে প্রবল পবন ॥ ১১৭ ॥
মনোহরা এক ছড়া কুসুমের হার ।
সুরেন্দ্র করিয়াছিল যতনে যোগাড় ॥ ১১৮ ॥
পিরীতে প্রভুর গলে পরাইলে পরে ।
অমনি লইয়া মালা ফেলিলেন ছুঁড়ে ॥ ১১৯ ॥
বজ্রপাত কত বাজে কি যাতনা আনে ।
প্রভুর প্রক্ষেপে মালা যা বাজিল প্রাণে ॥ ১২০ ॥
অস্থির সুরেন্দ্র মিত্র ভক্ত মহাবলী ।
অভিমানে প্রভুদেবে মনে দেয় গালি ॥ ১২১ ॥
বাহিয় প্রদেশে গেল পরিহরি ঘর ।
মনস্তাপানলে জ্বলিতেছে কলেবর ॥ ১২২ ॥
এখানেতে ত্রৈলোক্যের গীত না ফুরায় ।
এক সাঙ্গ হলে অন্য ধরে পুনরায় ॥ ১২৩ ॥
বর্তমান গীতে হেন মাধুরী সুন্দর ।
শুনিয়া আকুল হৈলা প্রভু গুণধর ॥ ১২৪ ॥
উথলিল ভাব-সিন্ধু প্রভুর আমার ।
অদূরে প্রক্ষিপ্ত সেই কুসুমের হার ॥ ১২৫ ॥
ভুলে পরিলেন গলে দেখিতে সুন্দর ।
জন-মনোহর হরি নর-কলেবর ॥ ১২৬ ॥
নেচে নেচে গাইতে লাগিলা সেই গীত ।
ধরিয়া কুসুম-হার আপাদলম্বিত ॥ ১২৭ ॥
বিমোহিত শ্রোতা যত মুখে নাহি স্বর ।
মোহানিয়া মন্ত্রে মুগ্ধ যেন বিষধর ॥ ১২৮ ॥
যে না দেখিয়াছ চোখে এঁকে দেখ প্রাণে ।
অপরূপ রূপ কিবা শ্রীপ্রভুর ঠামে ॥ ১২৯ ॥
নয়ন-বিনোদ দেহে কি লাবণ্য খেলে ।
শান্তিময় কান্তি-ছটা বদনমণ্ডলে ॥ ১৩০ ॥
ছুটিছে চৌদিকে মিঠা কণ্ঠের মাধুরী ।
বৃন্দাবন-বনে যথা শ্যামের বাঁশরী ॥ ১৩১ ॥
প্রবেশিলে কানে আর ঘরে থাকা দায় ।
সরম ভরম লোক-লজ্জা ভেসে যায় ॥ ১৩৪ ॥
হতমান অভিমান ছুটিল সুরেন্দ্র ।
নিরখিইয়া প্রভুবরে পরম আনন্দ ॥ ১৩৫ ॥
প্রভুর গলায়
মালা দুলিয়া দুলিয়া ।
হইতেছে আন্দোলিত পদ পরশিয়া ॥ ১৩৬ ॥
জগতের চন্দ্র প্রভু
জগৎ-লোচন ।
জগৎ ব্যাপিয়া বাস জগৎ-জীবন ॥ ১৩৭ ॥
ফুলের মালায় বড় কি সাজিবে আর ।
শ্রীঅঙ্গেতে শোভে যাঁর জগচ্চন্দ্রহার ॥ ১৩৮ ॥
বুঝিয়া আপন মনে সুরেন্দ্র এখন ।
নয়নধারায় করে বারি বরিষণ ॥ ১৩৯ ॥
অতুল সুদৃশ্য দৃশ্য নয়ন-আরাম ।
ভক্তিভাবে মাতোয়ারা প্রভু গুণধাম ॥ ১৪০ ॥
প্রেমে মত্ত নৃত্য-গীত ক্ষণে না ফুরায় ।
ন্যূনপক্ষে একেবারে চারি দণ্ড যায় ॥ ১৪১ ॥
আঁকরে আঁকরে হয় বৃহদায়তন ।
শাখা-প্রশাখায় বড় বৃক্ষ যে রকম ॥ ১৪২ ॥
যত ফুল ফলের শাখাগ্রে যেন স্থান ।
এত মিঠা শ্রীপভুর গত বাড়ে গান ॥ ১৪৩ ॥
রসে ভরা মিঠা ফল ভাবের আবেশ ।
তখন অবশ অঙ্গ নৃত্য-গীত শেষ ॥ ১৪৪ ॥
লেশমাত্র নাহি বাহ্য শ্রীপ্রভুর গায় ।
পাথারে পশিলে আর কেবা খুঁজে পায় ॥ ১৪৫ ॥
মনহীন শ্রীঅঙ্গ ভকতে রক্ষা করে ।
ফিরিয়া আইলা প্রভু কতক্ষণ পরে ॥ ১৪৬ ॥
ক্রমে ক্রমে প্রকৃতিস্থ প্রভু ভগবান ।
সুরেন্দ্র প্রস্তুত কৈলা ভোজনের স্থান ॥ ১৪৭ ॥
ভোজনের পরিপাটী অতীব সুন্দর ।
চর্ব্য চষ্য লেহ্য পেয় বিস্তর বিস্তর ॥ ১৪৮ ॥
ভক্তসহ শ্রীপ্রভুর ভিক্ষা হলে সায় ।
যে যাহার আপনার ঘরে চলে যায় ॥ ১৪৯ ॥
অকূল পাথার দয়াসিন্ধু কলেবর ।
জীব-হিত ব্রত-বায়ে তুলে নিরন্তর ॥ ১৫০ ॥
শৈত্যময় প্রবল তরঙ্গ চারিভিত ।
পাষাণ পাথর জরে বহুদূরস্থিত ॥ ১৫১ ॥
দয়াময় কলেবরে কেবল করুণা ।
সাধ্য কার পরিমাণ করিবে ধারণা ॥ ১৫২ ॥
শুন কহি লীলা-কথা বড়ই মধুর ।
একদিন শ্রীমন্দিরে দয়াল ঠাকুর ॥ ১৫৩ ॥
দুনয়নে বারিধারা কাঁদেন বসিয়া ।
এই বলি তাপে তপ্ত জীবের লাগিয়া ॥ ১৫৪ ॥
"কি হইল ও মা কালি দেখ মম গায় ।
সতত অস্থির, বল মাত্র নাহি তায় ॥ ১৫৫ ॥
চলিতে অশক্ত পদ আদতে না চলে ।
কোথা পাই, চাই যান কোথা যেতে হোলে ॥ ১৫৬ ॥
কেবা দিবে গাড়িভাড়া নিত্যই আমায় ।
জীবের কল্যাণে বড় পড়িলাম দায় ॥ ১৫৭ ॥
নদীয়ায় গৌরচন্দ্র বীর বলবান ।
দ্বারে দ্বারে ফিরে কৈলা জীবের কল্যাণ ॥ ১৫৮ ॥
ব্যয়কুণ্ঠ জীবকুল আসক্ত কাঞ্চনে ।
কড়া ব্যয়ে ঘোড়া যায় এই ভাবে মনে" ॥ ১৫৯ ॥
জীবের কল্যাণে যাঁর শোক এতদূর ।
বুঝ মন কি দয়ার দয়াল ঠাকুর ॥ ১৬০ ॥
মহোৎসব যোত্রাপন্ন ভক্তের ভবনে ।
উপায়স্বরূপ কৈলা উদ্দেশ্য-সাধনে ॥ ১৬১ ॥
এইবারে উৎসবের করে আয়োজন ।
অভিমানী ভক্তবর শ্রীমনোমোহন ॥ ১৬২ ॥
নিমন্ত্রণ প্রেরণ করিল যথাকালে ।
যে যথায় ভক্ত তাঁর শহর-অঞ্চলে ॥ ১৬৩ ॥
যথাদিনে সন্ধ্যাকাল হইলে আগত ।
একে একে ক্রমান্বয়ে হয় উপনীত ॥ ১৬৪ ॥
মহা-আনন্দের দিন প্রভুর উৎসব ।
দলে বলে জুটিলেন প্রেমিক কেশব ॥ ১৬৫ ॥
ভক্তসমাগমসুখে ফেটে যায় বাড়ি ।
হেনকালে উত্তরিল শ্রীপ্রভুর গাড়ি ॥ ১৬৬ ॥
উঠিল আনন্দরোল বাহিরে ভিতরে ।
জনে জনে বন্দনা করিল প্রভূবরে ॥ ১৬৭ ॥
পূর্ণানন্দময় প্রভু অখিলের স্বামী ।
যেন সুখ দরশনে তেন শুনে বাণী ॥ ১৬৮ ॥
প্রত্যেক কথার প্রতি অক্ষরে অক্ষরে ।
সুধাধারাসম বয় শ্রবণ-বিবরে ॥ ১৬৯ ॥
জীবন্মুক্ত যত লোক কাছে যতক্ষণ ।
সঙ্কল্প-বিকল্পভাব-বিবর্জিত মন ॥ ১৭০ ॥
শ্রীপ্রভুর আগমন মিত্রের ভবনে ।
পবনের বেগে বার্তা ধায় কানে কানে ॥ ১৭১ ॥
দলে দলে আসে লোক ধরে না আবাসে ।
দীনবন্ধু দীনত্রাতা দরশন-আশে ॥ ১৭২ ॥
ভরিল ভবন আর নাহি ধরে তথা ।
পাশেতে প্রশস্ত পথে অত্যন্ত জনতা ॥ ১৭৩ ॥
মহোৎসবে রীতি যথা হরি-সংকীর্তন ।
আরম্ভ করিল তবে যত ভক্তগণ ॥ ১৭৪ ॥
মাতিলেন প্রভুদেব আর কেবা রাখে ।
নাচিতে গাহিতে বাহ্য যায় থেকে থেকে ॥ ১৭৫ ॥
কোথা তিনি কোথা বাস সরম ভরম ।
ঠিক নাই ভক্তে করে শ্রীঅঙ্গ রক্ষণ ॥ ১৭৬ ॥
সংকীর্তনে শ্রীপ্রভুর সংযোগ তেমতি ।
কমলের বনে যেন মদমত্ত হাতী ॥ ১৭৭ ॥
সুকোমল অঙ্গে বহে উচ্চতম বল ।
শ্রীচরণ-চাপে ধরা করে টলমল ॥ ১৭৮ ॥
যেন কত মহোল্লাসে সঙ্গে নৃত্য করে ।
কমলা-সেবিত পদ পেয়ে বক্ষোপরে ॥ ১৭৯ ॥
যদি বল জড় ধরা নাচিল কেমনে ।
সকল সম্ভব এই রামকৃষ্ণায়নে ॥ ১৮০ ॥
অবিশ্বাসী কাল যেন ঘোর অন্ধকার ।
তেন সর্বশক্তিমান শ্রীপ্রভু আমার ॥ ১৮১ ॥
আংশিক নহেন পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ।
দীন সাজে ভরা মহারাজের লক্ষণ ॥ ১৮২ ॥
সংকীর্তনে হাসেন কাঁদেন ভাবাবেশে ।
কখন বলেন বাস আছেন কটিদেশে ॥ ১৮৩ ॥
বদনে বুলান হাত কভু গুণমণি ।
বলেন রয়েছি এই আমি, আছি আমি ॥ ১৮৪ ॥
কখন বলেন হুঁশ আছয়ে আমার ।
কখন কহেন এটা ঘরের দুয়ার ॥ ১৮৫ ॥
এইমত বলিতে বলিতে কতক্ষণ ।
তবে না আইল তাঁর বাহ্যিক চেতন ॥ ১৮৬ ॥
অপূর্ব প্রভুর রঙ্গ জীব-বোধ্য নয় ।
চারিধারে দেখে লোক হইয়া বিস্ময় ॥ ১৮৭ ॥
দেবতুল্য গরীয়ান মনুষ্য-ভিতরে ।
মর্মগ্রাহী কেশব নীরব একধারে ॥ ১৮৮ ॥
ভোজন
প্রস্তুত করি শ্রীমনোমোহন ।
করজোড়ে করিল প্রভুকে আবাহন ॥ ১৮৯ ॥
দ্বিতল উপরে তাঁর ভোজনের ঠাঁই ।
সোপানে সোপানে ধীরে চলিলা গোসাঁই ॥ ১৯০ ॥
পাছু পাছু ভক্তিমতী মিত্রের জননী ।
এক হাতে পাত্রে জল অন্যে আছে কানি ॥ ১৯১ ॥
প্রভুর চরণ-রজঃ যেইখানে পড়ে ।
আর্দ্র বস্ত্রে হয় তোলা ভক্তিসহকারে ॥ ১৯২ ॥
হেন ভক্তিমতী ভক্ত অতুল ভুবনে ।
পদরজঃ করে আশ দীন অকিঞ্চনে ॥ ১৯৩ ॥
পরে নিমন্ত্রিত ভক্তে করান ভোজন ।
কমি নাই কিছুই, প্রচুর আয়োজন ॥ ১৯৪ ॥
মহোৎসবে ভোজনের অতি পরিপাটি ।
প্রভুর ইচ্ছায় নাহি হয় কোন ত্রুটি ॥ ১৯৫ ॥
উদর পুরিয়া খায় যত লোক আসে ।
নানা আস্বাদের দ্রব্য পরম হরিষে ॥ ১৯৬ ॥
শ্রীপ্রভুর ভিক্ষা-লীলা মঙ্গল-আলয় ।
স-মনে শুনিলে ঘুচে অন্ন-দুঃখ-ভয় ॥ ১৯৭ ॥
ভোজনান্তে প্রভুদেব আইলে সদরে ।
পুনরায় ভক্তবর্গ বসিলেন ঘেরে ॥ ১৯৮ ॥
জন-মন মুগ্ধকর প্রভু গুণধর ।
কাহারো না হয় ইচ্ছা ছেড়ে যায় ঘর ॥ ১৯৯ ॥
ভোজনের হয় কথা রঙ্গ-সহকারে ।
কেহ কহে এবার উৎসব কার ঘরে ॥ ২০০ ॥
রামের ইঙ্গিতে কথা কহেন কেশব ।
রাজেন্দ্র বাবুর ঘরে এবারে উৎসব ॥ ২০১ ॥
সম্পর্কেতে রাজেন্দ্র রামের মাসী-পতি ।
বাঙ্গলা দপ্তরে কর্ম লোকমাঝে খ্যাতি ॥ ২০২ ॥
পদস্থ লোকের মধ্যে তিনি একজনা ।
সাত আটশত টাকা মাসে মাহিয়ানা ॥ ২০৩ ॥
সৌভাগ্য গণিয়া তেঁহ করিল স্বীকার ।
রামের উপরে হয় সম্পাদন ভার ॥ ২০৪ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তমধ্যে রামদত্ত চাঁই ।
বড়ই দয়াল তাঁরে জগৎ-গোসাঁই ॥ ২০৫ ॥
দিন স্থির করি রাম প্রফুল্ল অন্তরে ।
উৎসবের আয়োজন বিধিমতে করে ॥ ২০৬ ॥
অর্থে নাই অনটন মনে যেন সাধ ।
চর্য্য চুষ্য লেহ্য পেয় বিবিধ আস্বাদ ॥ ২০৭ ॥
যথা দিনে শ্রীকেশব দিনের বেলায় ।
রাজেন্দ্র বাবুর কাছে বলিয়া পাঠায় ॥ ২০৮ ॥
মহোৎসবে যোগদান নাহি হবে আজি ।
নিরানন্দ ব্রাহ্মদল কেহ নহে রাজী ॥ ২০৯ ॥
শুনিয়াছি সেই নিরানন্দের কারণ ।
ব্রাহ্ম-সাধু অঘোরের লীলা-সংবরণ ॥ ২১০ ॥
সমাচার শুনিয়া রাজেন্দ্র বাবু ভাবে ।
না আসিলে কেশব উৎসবে কিবা হবে ॥ ২১১ ॥
ত্বরা করি ডাকি রামে কহেন রাজেন্দ্র ।
আজি উৎসবের দিন করিবারে বন্ধ ॥ ২১২ ॥
কথা শুনি রামচন্দ্র উঠিল রুষিয়া ।
প্রভুর উৎসব বন্ধ কিসের লাগিয়া ॥ ২১৩ ॥
প্রভুর উৎসব ইহা কেশবের নয় ।
সহস্র কেশব বিনা কিবা ক্ষতি হয় ॥ ২১৪ ॥
এক চন্দ্র জগতে অন্ধকার হরে ।
অগণ্য তারকামালা কি করিতে পারে ॥ ২১৫ ॥
প্রভুদেবে রাজেন্দ্রের ইহাই ধারণা ।
শ্রদ্ধেয় প্রণম্য মাত্র সাধু একজনা ॥ ২১৬ ॥
এই সাধারণ মত একা তাঁর নয় ।
এতদূর কূপে ডুবা মনুষ্যনিচয় ॥ ২১৭ ॥
এক
তিল প্রভুদেবে বুঝিতে যে পারে ।
নিশ্চয় তাঁহার ঠাঁই দেবতা উপরে ॥ ২১৮ ॥
এবে বঙ্গে কেশবের বড়ই খেয়াতি ।
না আসিলে উৎসবে কেমনে হবে প্রীতি ॥ ২১৯ ॥
তেকারণে যুক্তি করি রামের সহিতে ।
কেশবের ঘরে গেল কেশবে আনিতে ॥ ২২০ ॥
সঙ্গে চলে রাম আর শ্রীমনোমোহন ।
কেশব আবাসে গিয়া দিলা দরশন ॥ ২২১ ॥
আপ্যায়িত কেশব দেখিয়া সবাকারে ।
ব বসাইলা সমাদরে সমাজ-মন্দিরে ॥ ২২২ ॥
প্রভুর সম্বন্ধে কথা হৈল উত্থাপন ।
রাজেন্দ্র কেশবে কন প্রভু কি রকম ॥ ২২৩ ॥
প্রশ্ন শুনি কতক্ষণ থাকিয়া নীরব ।
উত্তর করিল পরে প্রেমিক কেশব ॥ ২২৪ ॥
উচ্চবস্তু মহাভাব নামে যাহা জানি ।
চৈতন্যচরিতে আছে তাহার কাহিনী ॥ ২২৫ ॥
এ ভাবে কি ভাব কেহ বুঝিতে না পারে ।
সমুদিত হইত গৌরাঙ্গ কলেবরে ॥ ২২৬ ॥
আর এই মহাভাব ক্রাইষ্টের গায় ।
অবিকল হইত ছবিতে দেখা যায় ॥ ২২৭ ॥
এত বলি ভাবগ্রস্ত যীশুর মুরতি ।
ছিল তাঁর দেখাইল ব্রাহ্ম-মহামতি ॥ ২২৮ ॥
এখন ইঁহার দেহে সেই ভাব খেলে ।
তাই এ'রে গৌরাঙ্গের অবতার বলে ॥ ২২৯ ॥
ইঁহার মতন লোক অতুল ভুবনে ।
শুনেছিনু গ্রন্থে এবে দেখিছ নয়নে ॥ ২৩০ ॥
স্বরূপত্ব তত্ত্ব কিবা কথায় না আসে ।
উচিত ইঁহারে রাখা গেলাসের কেসে ॥ ২৩১ ॥
ধূলা যেন নাহি লাগে যতনের ধন ।
কর্তব্য থাকিয়া দূরে মাত্র দরশন ॥ ২৩২ ॥
কেশবের মুখে শুনি এই পরিচয় ।
মনে মনে রাজেন্দ্রের লাগিল বিস্ময় ॥ ২৩৩ ॥
বিনয় সম্ভাষসহ কহিল কেশবে ।
এসেছি তোমায় নিতে তাঁহার উৎসবে ॥ ২৩৪ ॥
উত্তরে কেশব কন সম্মান সহিত ।
এ ব্যাপারে আমারে বিনয় অনুচিত ॥ ২৩৫ ॥
ধরাধামে ভাগ্যবান হয় যেই জন ।
তাহার কপালে ফলে তাঁর দরশন ॥ ২৩৬ ॥
যথাসাধ্য উদ্যম করিব যাইবারে ।
বিফল যদ্যপি পড়ি কপালের ফেরে ॥ ২৩৭ ॥
রাজেন্দ্র পুলক-অঙ্গ কেশবের বোলে ।
ফিরিয়া আইল গৃহে সকলেতে মিলে ॥ ২৩৮ ॥
মহোৎসাহে উৎসবের হয় আয়োজন ।
মুক্তহস্তে দেন অর্থ যত প্রয়োজন ॥ ২৩৯ ॥
তিমির-বসনা সন্ধ্যা এল, গেল বেলা ।
ক্রমে ক্রমে ফুটে ভক্ত-তারকার মালা ॥ ২৪০ ॥
পূর্ণচন্দ্র প্রভুদেব কিছুক্ষণ পরে ।
সমুদিত হইলেন রাজেন্দ্রের ঘরে ॥ ২৪১ ॥
মাতিল প্রমত্তভাবে যত ভক্তগণে ।
স্মৃতি মিষ্ট শ্রীপ্রভুর বাক্য সুধা-পানে ॥ ২৪২ ॥
কিবা শোভা ভক্তমধ্যে প্রভুর বিরাজ ।
বলিবার নহে তাহা দেখিবার কাজ ॥ ২৪৩ ॥
অপরূপ
রূপ অঙ্গ ফুটিয়া বেরায় ।
দেখিলে মানুষে কিবা মায়ারে ভুলায় ॥ ২৪৪ ॥
বিশ্ব-বিমোহিনী শক্তি বর্জিত তখন ।
যাহাতে মোহিত করি রাখে ত্রিভুবন ॥ ২৪৫ ॥
রূপময় প্রভুদেব রূপের সাগর ।
বিন্দু লয়ে গড়ে মায়া বিশ্ব চরাচর ॥ ২৪৬ ॥
সে বিন্দুর এক কণা কামিনী-কাঞ্চন ।
যাহাতে বিমুগ্ধচিত যত প্রাণিগণ ॥ ২৪৭ ॥
রূপে ডুবিবার সাধ যাহার অন্তরে ।
তিলে কেন, দাও ঝাঁপ রূপের সাগরে ॥ ২৪৮ ॥
ভাগ্যদোষে প্রভুদেব যাহারে বিরূপ ।
সেই না দেখিতে পায় শ্রীপ্রভুর রূপ ॥ ২৪৯ ॥
স্বরূপের একবিন্দু বিশ্বরূপে যাঁর ।
বুঝ কি রূপের ছবি শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২৫০ ॥
লোকে শুনি কবে কথা কূট তর্ক করি ।
যদ্যপি তাঁহাতে এত রূপের মাধুরী ॥ ২৫১ ॥
কেন না মজিল সবে দেখেছে অনেকে ।
এমন বচন যার দণ্ডবৎ তাকে ॥ ২৫২ ॥
গললগ্নীকৃতবাসে তাহারে উত্তর ।
বৃন্দাবনচন্দ্র কৃষ্ণ মুরলী অধর ॥ ২৫৩ ॥
ভুবন-মোহন রূপ বাঁশরীর গান ।
দেখিলে শুনিলে নাহি কাহারো এড়ান ॥ ২৫৪ ॥
গোপ-গোপী পশু পাখী-পুঞ্জ কুঞ্জবন ।
কালজল যমুনা পাষাণ গোবর্ধন ॥ ২৫৫ ॥
গোঠ মাঠ বৃক্ষলতা ভুলিল সকলে ।
কেবল গোকুলে বাকি জটিলে কুটিলে ॥ ২৫৬ ॥
জটিলে কুটিলে হেখা পাষণ্ডী সকল ।
মুখে ভরা নিন্দাবাদ হিংসা-হলাহল ॥ ২৫৭ ॥
লীলাপুষ্টিহেতু জন্ম হয় অবতারে ।
শ্রীচরণ দরশনে মুক্ত হয় পরে ॥ ২৫৮ ॥
গরলের বিনিময়ে সুধা পরে পায় ।
দয়ার সাগর প্রভু, তাঁহার কৃপায় ॥ ২৫৯ ॥
দয়া যেন তেন রূপ দয়াল প্রভুর ।
অমিয় বরধী বাণী কণ্ঠে মিঠা সুর ॥ ২৬০ ॥
শ্রবণ-মধুর সুর নহে বিস্মরণ ।
ভাগ্যবলে বারেক যে করেছে শ্রবণ ॥ ২৬১ ॥
গীত শুনিবার সাধ সকলের মনে ।
ফুটিয়া বলিতে নারে শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ২৬২ ॥
অন্তরে বুঝিয়া তবে প্রভু গুণমণি ।
(যশোদা নাচাতো) গীত ধরিলা অমনি ॥ ২৬৩ ॥
"যশোদা নাচাত গো মা বলে
নীলমণি ।
সে রূপ লুকালি কোথা করাল-বদনী ॥
(একবার নাচগো শ্যামা)
আমার মন কদম্ব-তরুমূলে,
(একবার নাচগো শ্যামা)
যশোদার সাজান বেশে,
(একবার নাচগো শ্যামা)
চরণে চরণ দিয়ে
(একবার নাচগো শ্যামা)
হাসি বাঁশী মিশাইয়ে
(একবার নাচগো শ্যামা)
কাল চুলে চূড়া বেঁধে
(একবার নাচগো শ্যামা) ।
তোর শিব বলরাম হোক
(একবার নাচগো শ্যামা)
অষ্ট নায়িকা অর্ধ সখী করে
(একবার নাচগো শ্যামা)
গগনে বেলা বাড়িত,
রানী ব্যাকুল হইত,
বলে ধর রে ধর রে ধর রে গোপাল
ক্ষীর সর ননী
এসায়ে চাঁচর কেশ রানী
বেঁধে দিত বেণী
শ্রীদামের সঙ্গে নাচিতে
ত্রিভঙ্গে, বাজে তাথেয়া তাথেয়া,
তাতা থেয়া থেয়া
বাজত নূপুর-ধ্বনি,
শুনতে পেয়ে, আসতো
খেয়ে ব্রজের রমণী" ॥
গীতের মাধুরী কিবা কহিবার নয় ।
আভাসে আভাসে শুন কিছু পরিচয় ॥ ২৬৪ ॥
সমাগত শ্রোতা যত ছিল সেই ভাবে ।
তেমতি রহিল তারা গীতের প্রভাবে ॥ ২৬৫ ॥
বাহ্যজ্ঞানহীন নাই জান্তব চেতন ।
জড়-পুত্তলিকাবৎ শরীর যেমন ॥ ২৬৬ ॥
অনিমিখ আঁথি লীন প্রভুর বদনে ।
নীরব সে তথা যেবা আছিল যেখানে ॥ ২৬৭ ॥
ক্ষুদ্র গীত আঁকর করিয়া সংজোটন ।
গোটা ঘণ্টা চলে তবু নহে সমাপন ॥ ২৬৮ ॥
শ্রীপ্রভুর গীতে বহে দুই মিষ্ট ধারা ।
সুমধুর স্বর এক, দ্বিতীয় চেহারা ॥ ২৬৯ ॥
গীত গাঁথা যেই ভাবে তাহার মতন ।
শক্তিময় বাক্যে করে আকার ধারণ ॥ ২৭০ ॥
মূর্তিমান চেহারা শ্রোতার চিত্তপটে ।
ডিম্বমধ্যে পাখীর শাবক যেন ফুটে ॥ ২৭১ ॥
শ্রীবদনে বিগলিত যে কোন অক্ষর ।
শুধু নহে কেবল শ্রবণ-রুচিকর ॥ ২৭২ ॥
নানাবিধ রূপ-গুণ তাহাতে নিহিত ।
স-মন ইন্দ্রিয় পঞ্চ শুনে বিমোহিত ॥ ২৭৩ ॥
উপমায় অবিকল প্রভুর সংগীত ।
মধুসহ গন্ধে যেন কুসুম জড়িত ॥ ২৭৪ ॥
যে সময়ে শ্রীপ্রভুর গীত সমাপন ।
সশিষ্য কেশব আসি দিল দরশন ॥ ২৭৫ ॥
ভক্তিভরে বন্দনা করিল প্রভুদেবে ।
প্রভুও অপার সুখী দেখিয়া কেশবে ॥ ২৭৬ ॥
শ্রীপ্রভুর গীতে আত্মহারা এত সব ।
ঠিক নাই আসিলেন এখন কেশব ॥ ২৭৭ ॥
দুনিয়া জুড়িয়া যাঁর যশঃ গুণ গায় ।
মহামান্য ধন্য গণ্য গোটা বাঙ্গালায় ॥ ২৭৮ ॥
লোকের অবস্থা বুঝি শ্রীপ্রভু আপনে ।
সমাদরে কেশবে বসান সন্নিধানে ॥ ২৭৯ ॥
ক্রমে পরে শ্রোতাগণ হইল সহজ ।
চায় এ অধম সবাকার পদরজঃ ॥ ২৮০ ॥
ব্রাহ্মদের মধ্যে যিনি বিশারদ গীতে ।
রাগ-রাগিণীতে গান লাগিল গাইতে ॥ ২৮১ ॥
কোনমতে
শ্রুতি-প্রীতি নহিল কাহার ।
শ্রীমুখে শুনেছে যেই প্রভুর আমার ॥ ২৮২ ॥
প্রভুর মধুর কণ্ঠ শুনিয়া প্রথমে ।
পরে যদি বীণা বাজে বাজ লাগে কানে ॥ ২৮৩ ॥
এমন
সময় হয় সবে আবাহন ।
প্রস্তুত গ্রন্থর ঠাঁই ভোজন-কারণ ॥ ২৮৪ ॥
ভক্তগণ পশ্চাতে সর্বাগ্রে প্রভুরায় ।
আজিকার ভিক্ষা-লীলা এই তক সায় ॥ ২৮৫ ॥
চতুর্থ খণ্ড
নরেন্দ্রের মিলন
জয়
প্রভু
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এবে বড় মত্ততর ভক্তবর রাম ।
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর পাইয়া সন্ধান ॥ ১ ॥
নানা স্থানে করিছেন মহিমা প্রচার ।
ভবনে বসান আছে ভক্তের বাজার ॥ ২ ॥
মুক্তহস্তে ব্যয় ভক্তসেবার কারণ ।
আপনি যেমতি তাঁর গৃহিণী তেমন ॥ ৩ ॥
আত্মীয় কুটুম্ব বন্ধু যে রহে যেখানে ।
সকলে লইয়া যান প্রভু-দরশনে ॥ ৪ ॥
এ সময়ে নিকট আত্মীয় একজন ।
বয়স বিংশতি বর্ষ কিংবা কিছু কম ॥ ৫ ॥
সুন্দর বালক যেন সুন্দর আকৃতি ।
বিশাল নয়নদ্বয় রাজর্ষি-মূরতি ॥ ৬ ॥
নয়ন-পিরীতি অতি অতি বুদ্ধিমান ।
রতি-মতি ভগবানে ধর্মপথে টান ॥ ৭ ॥
নরেন্দ্র তাঁহার নাম নরেন্দ্র-বিশেষ ।
আধারে অনেক গুণ গুণে নহে শেষ ॥ ৮ ॥
উজ্জ্বল জাতির কুল তাঁহার জনমে ।
কোর্টের উকিল পিতা বিশ্বেশ্বর নামে ॥ ৯ ॥
শহরেতে শিমলায় করেন বসতি ।
সমাজে লোকের মাঝে দোষে গুণে খ্যাতি ॥ ১০ ॥
জুটিলেন এইবার প্রভুর সদনে ।
শুনিয়া মোহন নাম রামের বদনে ॥ ১১ ॥
ভাবী মহাতরুবর ফল-ফুলে ভরা ।
সুশীতল ছায়াশালী বিস্তৃত চেহারা ॥ ১২ ॥
কত পত্র-শাখা-প্রশাখাদি অগণন ।
গোড়ায় চারায় ভাসে লক্ষণ যেমন ॥ ১৩ ॥
সেইমত নরবর নরেন্দ্রের গায় ।
বাল্যাবধি লক্ষণাদি স্পষ্ট দেখা যায় ॥ ১৪ ॥
মন দিয়া গুন কই তাঁহার ভারতী ।
জন্মাবধি দেখি তাঁর স্বতন্ত্র প্রকৃতি ॥ ১৫ ॥
অতিথি সন্ন্যাসী ত্যাগী আসিলে দুয়ারে ।
গোপনে দিতেন তিনি যা পেতেন ঘরে ॥ ১৬ ॥
নয়নে কখন ভাল না লাগে কামিনী ।
ঘৃণা তায় যেন কালকূটভরা ফণী ॥ ১৭ ॥
কামিনী যে ভালবাসে সেও ভাল নয় ।
স্বভাব-সুলভ ধর্ম শুন পরিচয় ॥ ১৮ ॥
পুতুল লইয়া খেলা শৈশবে যখন ।
রাম ও সীতার মূর্তি সুন্দর গড়ন ॥ ১৯ ॥
ছিল তাঁর খেলিবার যুগল-মুরতি ।
রচিয়া খেলার ঘর খেলা নিতি নিতি ॥ ২০ ॥
একদিন জিজ্ঞাসা করিলা কোন জনে ।
রামের সম্পর্ক কিবা জানকীর সনে ॥ ২১ ॥
রামের ঘরণী সীতা গুনিয়া উত্তরে ।
অমনি মুরতি দুটি ফেলিলেন ছুঁড়ে ॥ ২২ ॥
বিবাহে বিরূপ বড় ঘৃণা গুরুতর ।
তিয়াগী বিরাগী যথা তথায় আদর ॥ ২৩ ॥
যোগ তপাচার শিব-জটাভার শিরে ।
পিরীতি পড়িল পরে তাঁহার উপরে ॥ ২৪ ॥
ফুল দিয়া দিন দিন ভক্তিসহ পূজা ।
পাতা দিয়া কলিকায় টানা হয় গাঁজা ॥ ২৫ ॥
যাঁহার যেমন ভাব তাঁরে তেন গড়ে ।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই ধাত বাড়ে ॥ ২৬ ॥
নিত্যসিদ্ধ নিত্যমুক্ত প্রভু ভক্ত যাঁরা ।
সত্য বটে তাঁহাদের নরের চেহারা ॥ ২৭ ॥
স্বভাব-প্রকৃতি কিন্তু পূরা স্বতন্তর ।
জাগা জৈবভাবশূন্য প্রশান্ত অন্তর ॥ ২৮ ॥
বিবেক বিরাগ জ্ঞান ভক্তি প্রেম গায় ।
বুঝিতে জীবের বুদ্ধি ঘোল খেয়ে যায় ॥ ২৯ ॥
সাধারণ নিয়মের বহির্ভূত তাঁরা ।
প্রভুর বচনে লাউ কুমড়ার পারা ॥ ৩০ ॥
আগে গাছে ধরে ফল তার পরে ফুল ।
জগতে কাহার সঙ্গে নহে সমতুল ॥ ৩১ ॥
ভক্তের ভিতরে খেলে বিভূতি প্রভুর ।
শুন ভক্তসংজোটন কাণ্ড সুমধুর ॥ ৩২ ॥
নিত্য-সিন্ধ-মুক্ত প্রভুভক্ত যতজন ।
সর্বোপরি নরেন্দ্রের সর্বোচ্চ আসন ॥ ৩৩ ॥
গৃহীর কি আছে কথা আসক্তিতে জারা ।
বলিলেই চোরে চোর আধখানি মরা ॥ ৩৪ ॥
সময়েতে কব কথা সময়ের মত ।
নরেন্দ্র শৈশব, নহে দশম অতীত ॥ ৩৫ ॥
মুদিলে নয়নদ্বয় নিদ্রার সময় ।
স্থির শ্বেত জ্যোতিঃ হত কপালে উদয় ॥ ৩৬ ॥
ভিতরে ব্যাপার কিবা নাহি যায় বলা ।
জ্যোতিঃ ছটা লইয়া নিদ্রার কালে খেলা ॥ ৩৭ ॥
কখন করেন ছোট কভু বড় তায় ।
আপনার মনোমত আপন ইচ্ছায় ॥ ৩৮ ॥
ক্রমশঃ জ্যোতির রাশি এতই বিস্তার ।
জ্যোতিঃ বিনা কিছু বোধ থাকিত না আর ॥ ৩৯ ॥
নিদ্রার মতন বেগ তার কিছু পরে ।
আপনার সত্তা গত জ্যোতির ভিতরে ॥ ৪০ ॥
নিজে হারা একেবারে তাহায় ডুবিয়া ।
উভয় প্রভেদশূন্য অভেদ হইয়া ॥ ৪১ ॥
শৈশব ছাড়িয়া বয়ঃ যত উর্ধ্বতন ।
অনুরাগসহকারে বিদ্যা উপার্জন ॥ ৪২ ॥
শাস্ত্রগ্রন্থ অধ্যয়ন হয় তার সাথে ।
স্বভাবতঃ রতি মতি ধরমের পথে ॥ ৪৩ ॥
এখানে সেখানে হয় তত্ত্ব অন্বেষণ ।
স্বভাব দেখিয়া তার ভক্ত রাম কন ॥ ৪৪ ॥
আছেন মোদের প্রভু দক্ষিণশহরে ।
উচিত যাইতে তথা দরশন তরে ॥ ৪৫ ॥
উত্তর করিল রামে নরেন্দ্র আপনি ।
কেমন পরমহংস কি প্রকার তিনি ॥ ৪৬ ॥
কহে রাম আপনার চক্ষে না দেখিলে ।
বুঝা নাহি যায় কথা হাজার বুঝালে ॥ ৪৭ ॥
নরেন্দ্র বলেন আগে আমি নাহি যাব ।
জ্ঞান কাকা আছে ঘরে তারে পাঠাইব ॥ ৪৮ ॥
দেখিয়া আসিয়া যদি যাইবারে কয় ।
তা হইলে দরশনে যাইব নিশ্চয় ॥ ৪৯ ॥
এত বলি কাকারে কহিল গিয়া ঘরে ।
কেমন পরমহংস যাও দেখিবারে ॥ ৫০ ॥
সুযোগ বুঝিয়া কাকা একদিন যায় ।
দক্ষিণশহরে প্রভু বিরাজে যথায় ॥ ৫১ ॥
কেমনে বুঝিবে তাঁরে গায়ে কিবা বল ।
মানুষে যেমন বুঝে বুঝিল পাগল ॥ ৫২ ॥
কলুষ-কালিমা-মাখা নর-বুদ্ধি জীবে ।
মায়াধীশ ভগবানে কেমনে বুঝিবে ॥ ৫৩ ॥
বুদ্ধি যেন আপনার দেখিয়া তাঁহারে ।
মন্তব্য নরেন্দ্রে কয় পালটিয়া ঘরে ॥ ৫৪ ॥
ভাল সাধু দেখিবারে মোরে পাঠাইলে ।
কাকার সহিত ব্যঙ্গ অন্যে না পাইলে ॥ ৫৫ ॥
পাগল আচার তাঁর এইক্ষণে খাটে ।
পরক্ষণে অকারণ চলিলেন ছুটে ॥ ৫৬ ॥
দেখিয়া আইনু যাহা আপন নয়নে ।
তাহাতে সাধুত্ব-ভাব নাহি লাগে মনে ॥ ৫৭ ॥
কাকার কথায় কিবা বুঝিলেন তিনি ।
কহিতে নারিনু তত্ত্ব নাহি জানি আমি ॥ ৫৮ ॥
লীলা-দরশনে এই হয় অনুমান ।
সময় হইল এবে শ্রীপ্রভুর টান ॥ ৫৯ ॥
ভক্ত-ভগবানে খেলা নহে বলিবার ।
গোপনে গোপনে বাঁধা সম্বন্ধের তার ॥ ৬০ ॥
মজার ঝঙ্কার তার বাজে প্রাণে প্রাণে ।
হইলে নামের শক্তি সঞ্চালিত কানে ॥ ৬১ ॥
মধুর প্রভুর নাম-প্রভাবের তেজে ।
হৃদি-তন্ত্রী ভকতের মনোহর বাজে ॥ ৬২ ॥
ধরিয়া মোহন নাম ভক্ত মাতোয়ারা ।
দিগাদিগ্ জ্ঞানহত পাগলের পারা ॥ ৬৩ ॥
কার নাম কোথা তিনি দেখিবারে তাঁয় ।
সতত উদ্বিগ্ন-চিত্ত স্বভাবেতে ধায় ॥ ৬৪ ॥
ভক্তেন্দ্র ভকত-শ্রেষ্ঠ নরেন্দ্র উত্তম ।
রামকৃষ্ণপন্থি-মধ্যে আরাধ্য-চরণ ॥ ৬৫ ॥
বিবেক বিরাগ ত্যাগে ভরা হৃদিপুর ।
অতি উগ্র অনুরাগী সন্ন্যাসী ঠাকুর ॥ ৬৬ ॥
কণ্ঠে ভারি মিঠা সুর বর্ষে সুধা-ধারা ।
অন্তে আছে নাদ রাগ রাগিণীর গোড়া ॥ ৬৭ ॥
আধারে অপার গুণ চিত্ত মনোহর ।
পুণ্য-দরশন মূর্তি পরম সুন্দর ॥ ৬৮ ॥
নরবর নরেন্দ্র জনৈক বন্ধু সনে ।
মহানন্দে চলিলেন প্রভু-দরশনে ॥ ৬৯ ॥
এই বন্ধু সুরেন্দ্র অপর কেহ নয় ।
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর গুণের আলয় ॥ ৭০ ॥
পরিচয় নরেন্দ্রের প্রভুর নিকটে ।
সুরেন্দ্র বাখানি কন হৃদি অকপটে ॥ ৭১ ॥
অতি মিঠে কণ্ঠে সুর আছয়ে ইঁহার ।
গাইতে পারেন গীত অতি চমৎকার ॥ ৭২ ॥
রতি-মতি ধর্মপথে তাও বিলক্ষণ ।
সরল হৃদয়ে ধর্মতত্ব-অন্বেষণ ॥ ৭৩ ॥
এইমত গুণ-গাথা বিশেষ করিয়া ।
সুরেন্দ্র কহেন প্রভুদেবে সম্বোধিয়া ॥ ৭৪ ॥
প্রভু যেন অবিদিত কোনই বারতা ।
অবতারে লীলা-খেলা অপরূপ কথা ॥ ৭৫ ॥
নরদেহে নিজে ঢাকা মায়ার সংহতি ।
রোগ-শোক হাসা-কাঁদা আপনা বিস্মৃতি ॥ ৭৬ ॥
ছদ্মবেশে সঙ্গী সনে রঙ্গ-রসাস্বাদ ।
কখন আনন্দ-ভোগ কখন প্রমাদ ॥ ৭৭ ॥
বিদেশীর বেশে ভক্ত চিনিতে না পারে ।
চির চেনা আপনার পরম ঈশ্বরে ॥ ৭৮ ॥
সেই প্রভু সেই ভক্ত নহে স্বতন্তর ।
নিত্যাপেক্ষা লীলা তাঁর বড়ই সুন্দর ॥ ৭৯ ॥
মনোহর চিত্রপট বিচিত্র ধরায় ।
প্রভুর সৃজিত মায়া প্রভুরে ভুলায় ॥ ৮০ ॥
পরমা বিভূতি শক্তিমায়া যাঁরে জানি ।
ব্রহ্মময়ী জড়ময়ী জগত-জননী ॥ ৮১ ॥
শক্তি বিনা নাই লীলা লীলাময়ী নিজে ।
মাতৃরূপে ধরে গর্ভে নারীরূপে ভজে ॥ ৮২ ॥
পঞ্চভূতে গড়া দেহে যেবা বর্তমান ।
এক মায়া সকলের উদ্ভবের স্থান ॥ ৮৩ ॥
বিভুরও এড়ান নাই হোক মায়া তাঁর ।
ধরাধামে আসিবার একই দুয়ার ॥ ৮৪ ॥
মায়ার কেমন খেলা বিভুর উপরে ।
দেখিবার জন্য যার বাসনা অন্তরে ॥ ৮৫ ॥
ভক্তিসহ কর মহাশক্তি আরাধনা ।
প্রসন্না হইলে তবে পুরিবে কামনা ॥ ৮৬ ॥
নরেন্দ্রকে বলিলেন প্রভু ভগবান ।
তোমার সুমিষ্ট কণ্ঠ গাও গুনি গান ॥ ৮৭ ॥
প্রাণ-মন মিষ্ট কণ্ঠ করি একত্তর ।
গাইতে লাগিলা গীত নরেন্দ্র সুন্দর ॥ ৮৮ ॥
গীত শুনি শ্রীপ্রভুর সুখ-সীমা নাই ।
হইলা মগন ভাবে জগৎ-গোসাঁই ॥ ৮৯ ॥
আফুটা-কমল-কলি মধু-কোষে ভরা ।
দেখিয়া যেমন হয় বিভোর ভ্রমরা ॥ ৯০ ॥
প্রবেশিতে কোষমধ্যে প্রমত্ত কেবল ।
হুলে করি বিদারিত সুকোমল দল ॥ ৯১ ॥
সেইমত নরেন্দ্রের হৃদয়-আধার ।
বিবেক বিরাগ জ্ঞান প্রেমের ভাণ্ডার ॥ ৯২ ॥
দেখিয়া প্রভুর তাহে পশিবার মন ।
রঙ্গ-রস-ভঙ্গ-ভয়ে বেগ সংবরণ ॥ ৯৩ ॥
এত ত্বরা দিলে ধরা উচ্চ রস যায় ।
তাই সংবরেন শক্তি প্রভুদেবরায় ॥ ৯৪ ॥
চিরকাল শ্রীপ্রভুর মনচোরা নাম ।
ভক্তিগ্রন্থ পুরাণাদি তাহার প্রমাণ ॥ ৯৫ ॥
মন লয়ে খেলা তাঁর ভক্তগণ সনে ।
কি প্রকার মনে যার সেও নাহি জানে ॥ ৯৬ ॥
নাহি জানে জলাধার দেখিতে না পায় ।
রবি-করে তুলে তারে গগনে খেলায় ॥ ৯৭ ॥
জননী জানেন যেন বিশেষ প্রকার ।
কোন্ দ্রব্য অতিশয় তৃপ্তিকর কার ॥ ৯৮ ॥
যত্ন সহকারে তাঁর ব্যবস্থা তেমন ।
আদরে করাতে প্রিয় নন্দনে ভোজন ॥ ৯৯ ॥
সেইমত প্রভুদেব খুব সুবিদিত ।
কোন্ রসে কার প্রাণ হয় দ্রবীভূত ॥ ১০০ ॥
তাই দিয়া করিতেন এত তুষ্ট মন ।
শ্রীপদে যাহাতে হয় মনের বন্ধন ॥ ১০১ ॥
নরেন্দ্রের সুপ্রশস্ত হৃদয়-নিলয় ।
উচ্চজ্ঞান-প্রেম-ভক্তি-বীজের আশ্রয় ॥ ১০২ ॥
স্তুতি সুমধুর ভাষে প্রভু নারায়ণ ।
অন্তরে পরমানন্দ না যায় বর্ণন ॥ ১০৩ ॥
নরেন্দ্রে বলেন ডাকাইয়া অন্তরালে ।
কে তুমি জান কি এতদিন কোথা ছিলে ॥ ১০৪ ॥
বহুকাল এইখানে হইল যাপন ।
ত্যাগী অনাসক্ত আত্মা তোমার মতন ॥ ১০৫ ॥
না দেখিনু কভু চোখে মম বিদ্যমান ।
নেহারি তোমারে আজি জুড়াইল প্রাণ ॥ ১০৬ ॥
আলোকিত করি দিশি এই মর্ত্য ভূমি ।
আসিয়াছ যেই দিনে তাও জানি আমি ॥ ১০৭ ॥
দিন দিন তিল পল গণিয়া গণিয়া ।
বসিয়া রয়েছি পথপানে নিরখিয়া ॥ ১০৮ ॥
সতত উদ্বিগ্ন চিত পরাণ উদাস ।
আজি সিদ্ধ মনোরথ পূর্ণ মম আশ ॥ ১০৯ ॥
কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত মানুষের সনে ।
বাক্যালাপে পাইয়াছি বড় কষ্ট
প্রাণে ॥ ১১০ ॥
আয় আয় কাছে তোর সঙ্গে ক'য়ে কথা ।
করি দূর জীবনের যাবতীয় ব্যথা ॥ ১১১ ॥
নরেন্দ্র ভাবেন শুনি এতেক বচন ।
আমারে এমন কথা কন কি কারণ ॥ ১১২ ॥
মানুষবিশেষ আমি শিমলায় ঘর ।
নরেন্দ্র আমার নাম পিতা বিশ্বেশ্বর ॥ ১১৩ ॥
কি হেতু আমাতে উচ্চ দেবতার মান ।
পাগল শ্রীপ্রভুদেব হইল গিয়ান ॥ ১১৪ ॥
কাকার মন্তব্য সত্য বুঝিয়া নিশ্চয় ।
বন্ধুসহ সেই দিন ফিরিলা আলয় ॥ ১১৫ ॥
বালক নরেন্দ্রনাথ বয়সে কেবল ।
স্বতঃসিদ্ধ মুক্তভাব স্বভাবে প্রবল ॥ ১১৬ ॥
কহি যথাসাধ্য শক্তি শুন বিবরণ ।
সাকার সগুণে তাঁর তুষ্ট নহে মন ॥ ১১৭ ॥
অনাদি অনন্ত ব্রহ্ম অক্ষয় অব্যয় ।
অরূপ অগুণ যাহা বেদান্তেতে কয় ॥ ১১৮ ॥
নাই যাঁর আদি মধ্য অন্ত নিরাকার ।
সেই মাত্র একা সত্য জ্ঞাতব্য সবার ॥ ১১৯ ॥
মিথ্যা বিশ্ব-চরাচর যাহা দৃষ্ট হয় ।
মনের কল্পনা যার সত্য মোটে নয় ॥ ১২০ ॥
বেদান্ত এখন তাঁর নাহি পড়া-শুনা ।
কিন্তু তার সারমর্ম স্বভাবতঃ জানা ॥ ১২১ ॥
অনধীতে শাস্ত্র-তত্ত্ব বিদিত কেমন ।
কলিকায় কুসুমের সৌরভ যেমন ॥ ১২২ ॥
মহাবলী প্রভু-ভক্ত গুণের আধার ।
অন্তরে বাহিরে বহে শ্রীপ্রভুর ধার ॥ ১২৩ ॥
বিচার বিহীনে বস্তু গ্রাহ্য মোটে নয় ।
বিচারে সাব্যস্ত যাহা তাহাই প্রত্যয় ॥ ১২৪ ॥
প্রবীণের জ্ঞান ঘটে নবীন বয়সে ।
সমুজ্জ্বল ছটা তার বদনে বিকাশে ॥ ১২৫ ॥
সর্বদাই সৎ শুদ্ধ বুদ্ধি বিরাজিত ।
দয়া-ভক্তি-প্রেম-ত্যাগ-জ্ঞান-সমন্বিত ॥ ১২৬ ॥
বিকাশে যাইত জানা বিচারের কালে ।
বিভুর বিভূতি যত বুদ্ধি ঘটে খেলে ॥ ১২৭ ॥
সুন্দর বিচার-তর্ক মধুমাখা ভাষ ।
শ্রবণে জনমে হৃদে অপার উল্লাস ॥ ১২৮ ॥
বড় বড় শাস্ত্রবিৎ বুঝিতে না পারে ।
সুনিশ্চিত পরাভূত সম্মুখ সমরে ॥ ১২৯ ॥
স্বভাবে উন্নত মন সুকৌশলবান ।
বীরশ্রেষ্ঠ হাতে ধনু তূণ-পূর্ণ বাণ ॥ ১৩০ ॥
বিচার-সমরক্ষেত্রে যারে আক্রমণ ।
ত্বরায় বিলম্বে কিবা তাহার পতন ॥ ১৩১ ॥
প্রবল যতই যুদ্ধ উচ্চ যত দূর ।
কভু নহে ক্লান্ত কভু না হয় আতুর ॥ ১৩২ ॥
মধুরত্ব তত বাড়ে যত ঊর্ধ্বে গতি ।
সুধামাথা মিষ্ট ভাষাশ্রবণ-পিরীতি ॥ ১৩৩ ॥
বিপরীত গুণ কিবা একাধারে খেলে ।
সময়ে মধুর রস নাহি কোন কালে ॥ ১৩৪ ॥
পরাভূত প্রতিদ্বন্দ্বী তিল নাহি রোধ ।
হারিয়া আশিস করে হইয়া সন্তোষ ॥ ১৩৫ ॥
প্রভুভক্তে শ্রীপ্রভুর এতই বৈভব ।
সহজে সম্পন্ন করে যাহা অসম্ভব ॥ ১৩৬ ॥
সারথি শ্রীপ্রভুদের ভক্ত তাঁর যত ।
এক এক মহারথী পাণ্ডবের মত ॥ ১৩৬ ॥
নরেন্দ্র অর্জুনতুল্য সবার প্রধান ।
নিরন্তর রথে যাঁর প্রভু মূর্তিমান ॥ ১৩৭ ॥
যেমন নরেন্দ্র তেন শ্রীপ্রভু আমার ।
দেখ ভক্ত-ভগবানের রঙ্গ খেলিবার ॥ ১৩৮ ॥
এখন প্রকাশ নতে গোপন গোপন ।
আরম্ভ কেবল এই ভক্তসংজোটন ॥ ১৩৯ ॥
অমাবস্যা-নিশি অতি ঘোর অন্ধকার ।
পবন-নিঃস্বন বৃষ্টি প্রান্তর মাঝার ॥ ১৪০ ॥
বিপন্ন পথিক পথহীন দিশাহারা ।
তার সঙ্গে যেইরূপ চিকুরের ক্রীড়া ॥ ১৪১ ॥
প্রথমে তেমতি খেলা হয় ভক্তসনে ।
অকূল অপার ভবসিন্ধুর তুফানে ॥ ১৪২ ॥
কভু গুপ্ত কভু ব্যক্ত আলোক আঁধারে ।
নিত্যধাম পরিহরি ধরার আসরে ॥ ১৪৩ ॥
যে
রূপে করিলা লীলা লয়ে ভক্তগণ ।
জীবের উদ্ধারে আর শিক্ষার কারণ ॥ ১৪৪ ॥
সেই লীলা-আন্দোলন শ্রবণ-কীর্তনে ।
যে যা চায় তাই পায় যার যেন মনে ॥ ১৪৫ ॥
প্রেমভক্তি পায় স্ফূর্তি দেবেশ বাঞ্ছিত ।
হেন রত্নাকর রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত ॥ ১৪৬ ॥
ভগবান বহু বল অঙ্গে দেন যাঁর ।
তাঁহার উপরে পড়ে সেই মত ভার ॥ ১৪৭ ॥
আলোর আকর পূর্ব দীপ্তিমান অতি ।
ধরার চৌদিকে ঘুরে অবিরাম গতি ॥ ১৪৮ ॥
নাহি ক্ষুধা তৃষ্ণা নাই শয্যায় আরাম ।
কর্মমাত্র নানা লোকে আলোক-প্রদান ॥ ১৪৯ ॥
বালক বালার্ক এবে নরেন্দ্র এখানে ।
পাইয়া পরম বল প্রভু-সন্নিধানে ॥ ১৫০ ॥
প্রভু-ভক্তমধ্যে লয়ে সর্বোচ্চ আসন ।
ধরণীর চারিদিক করিয়া ভ্রমণ ॥ ১৫১ ॥
পরিহরি আত্ম-সুখ যশঃ খ্যাতি মান ।
তৃণাপেক্ষা অতি তুচ্ছ করি নিজ প্রাণ ॥ ১৫২ ॥
কেমনে পালন কৈলা কর্তব্য তাঁহার ।
সময়ে অবশ্য মন পাবে সমাচার ॥ ১৫৩ ॥
হৃদয়-আঁধার নাশ শ্রবণ-কীর্তনে ।
উপজে ভকতি প্রভু-ভক্তের চরণে ॥ ১৫৪ ॥
প্রভুদেবে নরেন্দ্রের পাগল গিয়ান ।
কিন্তু শ্রীচরণে স্মৃতি রহে মূর্তিমান ॥ ১৫৫ ॥
কি জানি কি আকর্ষণে উচাটন মন ।
দরখনে হয় আসা এখন তখন ॥ ১৫৬ ॥
এখানে প্রভুর মনে বড়ই উল্লাস ।
ফুটে না উচ্ছ্বাসে ভাসে বদনের ভাষ ॥ ১৫৭ ॥
প্রকাশ করিতে কথা আত্মগণমাঝে ।
এসেছে নরেন্দ্র এক মহাবলী তেজে ॥ ১৫৮ ॥
ভারি জানে লেখা-পড়া পণ্ডিত সুধীর ।
গিয়ানের ছবি যেন তেমতি ভক্তির ॥ ১৫৯ ॥
প্রশস্ত হৃদয়ালয় প্রকাণ্ড আধার ।
কণ্ঠে অতি মিঠা সুর নহে বলিবার ॥ ১৬০ ॥
করিতে করিতে হেন গুণের বাখান ।
সমাধিস্থ হইতেন প্রভু ভগবান ॥ ১৬১ ॥
ঈশ্বরকোটির থাকে যে যে ভক্ত তাঁর ।
প্রধান নরেন্দ্র কেন বলিষ্ঠ সবার ॥ ১৬২ ॥
সম্বন্ধ কিরূপ তাঁর শ্রীপ্রভুর সনে ।
বলিবার নহে বুঝ লীলা-কথা শুনে ॥ ১৬৩ ॥
শ্রীনরেন্দ্র শ্রীপ্রভুর পরান সমান ।
দেখিলে আনন্দ-হারা প্রভু ভগবান ॥ ১৬৪ ॥
রাখিবেন কোনখানে কি দেন খাইতে ।
ঠিক নাই এতদূর যাইতেন মেতে ॥ ১৬৫ ॥
পরদরশন কথা দক্ষিণশহরে ।
বড়ই সুমিষ্ট শুন ভক্তিসহকারে ॥ ১৬৬ ॥
একে সদানন্দ প্রভুদেব ভগবান ।
পাইয়া নরেন্দ্র তাঁয় উঠিল তুফান ॥ ১৬৭ ॥
প্রেমেতে বিহ্বল যেন ভোলা মহেশ্বর ।
অধীর চরণ টলটল কলেবর ॥ ১৬৮ ॥
সমুজ্জ্বল মুখদ্যুতি সুধাংশু লজ্জিত ।
আজানুলম্বিত দীর্ঘ কর প্রসারিত ॥ ১৬৯ ॥
ধরা তাহে রসগোল্লা সঞ্চয় যতনে ।
যথাশক্তি দ্রুতগতি চরণ-চালনে ॥ ১৭০ ॥
ভক্তগত-প্রাণ ভক্ত-প্রিয় ভগবান ।
অতি প্রিয় নরেন্দ্রের মুখে দিতে যান ॥ ১৭১ ॥
প্রভুর অভূতপূর্ব ভাব-দরশনে ।
ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রনাথ বুঝিলেন মনে ॥ ১৭২ ॥
মুখে মিষ্টি দেওয়া নয় কেবল ছলনা ।
উন্মত্ত শ্রীপ্রভু দন্তে দংশন-বাসনা ॥ ১৭৩ ॥
মিষ্টি হাতে অগ্রসর যত প্রভু হন ।
পশ্চাতে নরেন্দ্র তত করে পলায়ন ॥ ১৭৪ ॥
লীলার রহস্য কিবা দেখ নর-কায় ।
অঙ্গ-অংশ নিত্যসিদ্ধ মায়া তবু তাঁয় ॥ ১৭৫ ॥
কেন তাঁর মায়া-ঘোর যুক্ত যেই জন ।
জিজ্ঞাসা করিতে কথা পার তুমি মন ॥ ১৭৬ ॥
উত্তরে তাহার মোর এইমাত্র বলা ।
মায়া না থাকিলে সঙ্গে নাহি হয় খেলা ॥ ১৭৭ ॥
মুক্তাত্মা মায়ায় মুগ্ধ তাহার উপমা ।
বসনে নয়ন বাঁধা শিশু যেন কানা ॥ ১৭৮ ॥
চিনিতে না দেয় মায়া মাত্র আবরণ ।
সেই হেতু ভক্তে রহে মায়ার বন্ধন ॥ ১৭৯ ॥
চিনিলে না হয় লীলা খেলা ভেঙ্গে যায় ।
লীলা ঠিক যাত্রা করা মায়া-বেশ গায় ॥ ১৮০ ॥
যতক্ষণ চলে যাত্রা সাজ বেশ থাকে ।
আজ্ঞাকারী অধিকারী না ছাড়েন তাঁকে ॥ ১৮১ ॥
বেশহীন সবে যবে যাত্রা-সমাপন ।
না রহে আসরে যায় যার যথা মন ॥ ১৮২ ॥
তেন বিমোহিত না থাকিলে ভক্তচয় ।
লীলার আসরে খেলা কখন না হয় ॥ ১৮৩ ॥
একমাত্র লীলা-শক্তি লীলার কারণ ।
তণ্ডুলে না হয় গাছ ধান প্রয়োজন ॥ ১৮৪ ॥
হেন শক্তি মিথ্যা নয় নয় ভ্রান্তি ভুল ।
একভাবে ব্রহ্ম সূক্ষ্ম লীলাভাবে স্থূল ॥ ১৮৫ ॥
স্থূল বিনা সূক্ষ্মে দৃষ্টি না হয় কখন ।
বদন দর্শনোপায় যেমন দর্পণ ॥ ১৮৬ ॥
মায়া লয়ে লীলাখেলা ভক্ত ভগবানে ।
উপলব্ধি হয় লীলা শ্রবণ-কীর্তনে ॥ ১৮৭ ॥
নিত্য যেন তেন লীলা না হয় প্রকাশ ।
কলমে কালিতে তুলে কেবল আভাস ॥ ১৮৮ ॥
গ্রন্থের মধ্যেতে লীলা ফুটে কি রকম ।
মেঘ-অন্তরালে যেন রবির কিরণ ॥ ১৮৯ ॥
দ্বিতীয় যদিও মায়া ভক্তের ভিতরে ।
অনিষ্ট না হয় মায়া রক্ষা করে তাঁরে ॥ ১৯০ ॥
বদ্ধজীবে করে নষ্ট হানে তার প্রাণ ।
প্রভুর দৃষ্টান্তে শুন তাহার প্রমাণ ॥ ১৯১ ॥
মায়া বিড়ালীর জাতি একই দশন ।
মুষিকে ধরিলে পরে বিনাশে জীবন ॥ ১৯২ ॥
সেই দন্তে পুনশ্চ হইলে আবশ্যক ।
ধরিয়া লইয়া যায় আপন শাবক ॥ ১৯৩ ॥
অতি নিরাপদ স্থানে মমতানুরাগে ।
গলায় দাঁতের দাগ আদতে না লাগে ॥ ১৯৪ ॥
ভক্তদের মাতা মায়া সম্পর্ক এমন ।
যাঁরা আছে তাঁরা আছে না হয় নূতন ॥ ১৯৫ ॥
জীবের উদ্ধারে জীবশিক্ষার কারণে ।
রাখেন বিবিধ বেশে নানাবিধ স্থানে ॥ ১৯৬ ॥
মায়ার বাৎসল্য বড় ভক্তের উপর ।
ক্রমশঃ লইয়া যায় আপনার ঘর ॥ ১৯৭ ॥
জীবের গন্তব্য ভক্ত যান যেই দিগে ।
উতরিতে হরিপুর কষ্ট নাহি লাগে ॥ ১৯৮ ॥
দেখাইয়া পথ জীবে করিতে উদ্ধার ।
ভক্ত লয়ে ভগবান হন অবতার ॥ ১৯৯ ॥
হরিপুরে যাইবার যার হবে মন ।
পন্থাহেতু করিবেন লীলা অন্বেষণ ॥ ২০০ ॥
নানা পথ দেখাইলা প্রভু অবতারে ।
নানান ভাবের ভক্ত আনিয়া আসরে ॥ ২০১ ॥
এক এক প্রভু-ভক্ত প্রকটিত রবি ।
প্রত্যেক ভাবের প্রতিমূর্তিমান ছবি ॥ ২০২ ॥
অনন্ত ভাবের ভাবী প্রভু ভাবাকর ।
খেলেছেন কাল মত সাজায়ে আসর ॥ ২০৩ ॥
নানা সেতু কৈলা ভব-নদীর উপরে ।
বিবিধ জীবের জন্য পারে যাইবারে ॥ ২০৪ ॥
নৈয়ায়িক হয় যদি টোলের পণ্ডিত ।
যত ছাত্র সকলেই ন্যায়শাস্ত্রবিৎ ॥ ২০৫ ॥
অপর শাস্ত্রের শিক্ষা সেখানে না মিলে ।
সেরূপ ধরন নহে শ্রীপ্রভুর টোলে ॥ ২০৬ ॥
এক এক মত পথ যত আছে জানা ।
এক এক ছাঁচে গড়া প্রতি ভক্তজনা ॥ ২০৭ ॥
বিশেষতঃ বলীয়ান দীপ্তিমান বেশী ।
কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগে যাঁহারা সন্ন্যাসী ॥ ২০৮ ॥
তাঁদের গন্তব্য পথে গন্তব্য সবার ।
শুন লীলা-গীতি ভক্তি-জ্ঞানের ভাণ্ডার ॥ ২০৯ ॥
প্রভুভক্ত যে সকল সংসারীর বেশে ।
প্রভুর প্রসাদে তাঁরা ন্যূন নন কিসে ॥ ২১০ ॥
তবে কি না সংসারেতে আছে কাদা ঘাঁটা ।
কামিনী ও কাঞ্চনের আসক্তির লেঠা ॥ ২১১ ॥
ঘাঁটিয়া কর্দম পরে ধৌত করা বিধি ।
মঙ্গল কর্দম গায়ে নাহি লাগে যদি ॥ ২১২ ॥
ত্যাগ বিনা জ্ঞান ভক্তি হইবার নয় ।
তাই তিয়াগীর পথে প্রাধান্য নিশ্চয় ॥ ২১৩ ॥
প্রভু অবতারে তাঁর উদ্দেশ্য কেবল ।
যাহাতে জগতে হয় সবার মঙ্গল ॥ ২১৪ ॥
শ্রীকর-কমলে গড়া যত ভক্ত তাঁর ।
তাঁদের দৃষ্টান্তে হবে জীবের উদ্ধার ॥ ২১৫ ॥
পরে পরে পরিচয় পাবে তুমি যন ।
আরম্ভ কেবল এই ভক্ত-সংজোটন ॥ ২১৬ ॥
কোন্
ভক্ত ছিল কোথা কিবা অবস্থায় ।
গৃহী কি সন্ন্যাসী ত্যাগী প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ২১৭ ॥
প্রভুদেব কোন্ পথে লয়ে যান কারে ।
অবধান কর মন ভক্তিসহকারে ॥ ২১৮ ॥
নরশ্রেষ্ঠ শ্রীনরেন্দ্র নিজের প্রভুর ।
বিবেকী বিরাগী ত্যাগী সন্ন্যাসী
ঠাকুর ॥ ২১৯ ॥
প্রভুর নিকটে বার বার হয় আসা ।
প্রভুর উপর ক্রমে পড়ে ভালবাসা ॥ ২২০ ॥
আনাগোনা প্রেমে নহে অপর কারণে ।
ধর্মশিক্ষা কিংবা কোন উদ্দেশ্য সাধনে ॥ ২২১ ॥
ঈশ্বরীয় কথা যদি কন ভগবান ।
নরেন্দ্র তাহাতে বড় নাহি দেন কান ॥ ২২২ ॥
একদিন প্রভুদের করিলা জিজ্ঞাসা ।
না শুনিবে তত্ত্ব যদি কিবা হেতু আসা ॥ ২২৩ ॥
উত্তর করিলা তাঁরে প্রেমিক সন্ন্যাসী ।
ভালবাসি সেই হেতু দেখিবারে আসি ॥ ২২৪ ॥
যেমন পশিল কানে প্রেম মাখা বাণী ।
প্রেমেতে প্রফুল্ল মুখ শরদিন্দু জিনি ॥ ২২৫ ॥
বেড়িয়া শ্রীকরদ্বয় করি আলিঙ্গন ।
মহাভাবে প্রভুদেব হইলা মগন ॥ ২২৬ ॥
যেবা করিয়াছে সেই ছবি দরশন ।
বুঝিয়াছে দুইজনে নৈকট্য কেমন ॥ ২২৭ ॥
সাকার সম্বন্ধে প্রভু কন নিরবধি ।
নরেন্দ্র তাহাতে হন ততই বিরোধী ॥ ২২৮ ॥
অখণ্ড সচ্চিদানন্দ অখিল-ঈশ্বর ।
অতি তুচ্ছ পঞ্চভূত খাঁচার ভিতর ॥ ২২৯ ॥
কখন সম্ভব নয় হইতে না পারে ।
মানুষে ঈশ্বরজ্ঞান বলহীনে করে ॥ ২৩০ ॥
কিঞ্চিৎ শকতি যদি কেহ দেখে কার ।
সামান্য বুদ্ধিতে তাঁরে কহে অবতার ॥ ২৩১ ॥
কৃষ্ণ রাম গৌরাঙ্গাদি ভগবান নন ।
তর্কেতে করেন নিজ পক্ষ সমর্থন ॥ ২৩২ ॥
দুগ্ধপোষ্য শিশুসঙ্গে পিতা যে প্রকারে ।
হইয়া শিশুর শিশু মল্লযুদ্ধ করে ॥ ২৩৩ ॥
পরাজিত পরাভূত পতিত ধরায় ।
রঙ্গহেতু হন পিতা আপন ইচ্ছায় ॥ ২৩৪ ॥
ঈশ্বর প্রসঙ্গে তেন হয় দুইজনে ।
হারিয়া আনন্দ বড় শ্রীপ্রভুর মনে ॥ ২৩৫ ॥
প্রভুদেব বলেন নরেন্দ্র নরবর ।
ঘটি-বাটি আপনার সকলই ঈশ্বর ॥ ২৩৬ ॥
নিজ হস্ত নিজ বক্ষে করিয়া স্থাপন ।
দেখাইয়া আপনারে প্রভুদেব কন ॥ ২৩৭ ॥
এ দেহের
তত্ত্ব কিবা এখন না পাবে ।
সময় হইলে পরে আপনি বুঝিবে ॥ ২৩৮ ॥
একদিন প্রভুদেব আপন মন্দিরে ।
নরেন্দ্রের সঙ্গে কথা আনন্দের ভরে ॥ ২৩৯ ॥
কি জানি কি বুঝিলেন প্রভু নারায়ণ ।
আচম্বিতে পরিহরি নিজের আসন ॥ ২৪০ ॥
পরশ করিয়া দিলা আপনার কর ।
প্রিয়জন নরেন্দ্রের বক্ষের উপর ॥ ২৪১ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা কহা নাহি যায় ।
বলিতে হইয়া ব্রতী পড়িয়াছি দায় ॥ ২৪২ ॥
ভক্ত লয়ে কিবা লীলা করেন গোসাঁই ।
তিল অণুকণায় আভাস বোধে নাই ॥ ২৪৩ ॥
কথায় কেবল যাহা করিনু শ্রবণ ।
যেমন আমার সাধ্য কহি শুন মন ॥ ২৪৪ ॥
শক্তিময় শ্রীপ্রভুর শ্রীকর-পরশে ।
নরেন্দ্র অবস্থান্তর দেখিছেন বসে ॥ ২৪৫ ॥
উপবিষ্ট যেই ঘরে দিয়াল তাহার ।
ছাদাদি সহিত গেছে কিছু নাই আর ॥ ২৪৬ ॥
একাকার চারিদিকে এক সত্তা ভাসে ।
গুটিয়ে জগৎ যেন তার সঙ্গে মিশে ॥ ২৪৭ ॥
বাখানিয়া উপমায় বলিতে হইলে ।
ঊর্মিময়ী সৃষ্টি যেন ডুবিছে সলিলে ॥ ২৪৮ ॥
প্রলয়েতে যেন এই বিশ্ব চরাচর ।
আদি-অন্ত-বিহীন বিরাট কলেবর ॥ ২৪৯ ॥
অনন্ত অনন্ত কোটি নহে গণনায় ।
যাহাতে উদ্ভব যেন তাহাতে মিলায় ॥ ২৫০ ॥
অথবা যেমন জাল পাতি সূত্রোদর ।
পুনশ্চ গুটিয়ে পুরে পেটের ভিতর ॥ ২৫১ ॥
বিভীষণ প্রলয়ব্যাপার-দরশনে ।
ত্রাসিত নরেন্দ্রনাথ ব্যাকুল পরানে ॥ ২৫২ ॥
কাঁদিতে লাগিলা অতিশয় উচ্চৈঃস্বরে ।
ওগো ওগো মা বাপ আমার আছে ঘরে ॥ ২৫৩ ॥
কাতর দেখিয়া তাঁরে প্রভু নারায়ণ ।
শান্ত করিলেন পুনঃ করি পরশন ॥ ২৫৪ ॥
দেবেশ-বাঞ্ছিত দরশন সমুদায় ।
প্রভুর প্রসাদে ভক্তে অবহেলে পায় ॥ ২৫৫ ॥
এমন ভক্তের পদে রাখি রতি মতি ।
মন দিয়া শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ২৫৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভক্তসঙ্গে খেলা
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
নরাকারে বদ্ধজীব নামে জানা যারা ।
অতি হতভাগ্য প্রাণী রতি মতি হারা ॥ ১ ॥
পাশজালে বিজড়িত নাহিক নিস্তার ।
নিকটে ধীবর কাল করিতে সংহার ॥ ২ ॥
ভীষণ নরককুণ্ডে পরিণামে ঠাঁই ।
কারাদণ্ড দীর্ঘকাল যুগে আঁটে নাই ॥ ৩ ॥
জগৎ-গোসাঁই মোর করুণাসাগর ।
উদ্ধারিতে হেন জীবে ধরি কলেবর ॥ ৪ ॥
লয়ে রামকৃষ্ণ নাম হই অবতরি ।
কেমনে হইলা কূলহীনের কাণ্ডারী ॥ ৫ ॥
বিচিত্র মহিমাকথা শুনে তাপ হরে ।
এক মনে শুন মন ভক্তি সহকারে ॥ ৬ ॥
ভক্তসংজোটন কাণ্ডে দেখহ প্রমাণ ।
পতিতপাবন বেশে রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৭ ॥
ছুটিতেছে যত ভক্ত শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
একমাত্র হেতু নাম-মাহাত্ম্যের গুণে ॥ ৮ ॥
একবার শ্রবণে পশিলে পরে নাম ।
আপাদ মস্তকে জোরে ধরে এক টান ॥ ৯ ॥
অচল অপেক্ষা শুরু তনু অভিমানে ।
ভাষায় তাহায় যেন তৃণের তুফানে ॥ ১০ ॥
আহার-বিরাম নাই চলে নিরন্তর ।
করুণানিধান যথা প্রেমের সাগর ॥ ১১ ॥
নামে ভক্ত জুটাইয়া প্রভু গুণধাম ।
জীবের উদ্ধারে দিলা রামকৃষ্ণনাম ॥ ১২ ॥
চারি বর্ণ চারি বেদ নামের শরণ ।
লইলে অচিরে হয় তম-বিমোচন ॥ ১৩ ॥
আত্মজ্ঞান সমন্বিত চৈতন্য-সঞ্চার ।
জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষ নাহিক বিচার ॥ ১৪ ॥
সাধ-পথে মিলে নাম কড়ি নাহি লাগে ।
বারেক লইয়া দেখ ভক্তি অনুরাগে ॥ ১৫ ॥
প্রভু-অবতারে নব খেলিবার রীতি ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন প্রেমের মূরতি ॥ ১৬ ॥
ভাঙ্গা গড়া কোন ধর্মে কিছু না করিয়া ।
নূতন করিলা খেলা সব সংরক্ষিয়া ॥ ১৭ ॥
ধর্মে ধর্মে বিবাদ-বিদ্বেষ চিরকাল ।
মিটিল প্রভুর প্রেমে সে সব জঞ্জাল ॥ ১৮ ॥
বিশ্বব্যাপী শ্রীপ্রভুর প্রেমের জোয়ারে ।
ভাসিল সকলে কলি ডুবিল পাথারে ॥ ১৯ ॥
নানা জাতি নানা ধর্মে একত্রে মিলন ।
প্রেমে করিলেন প্রভু তাহার পত্তন ॥ ২০ ॥
ভেদাভেদ জাতি-ধর্মে উত্তম-অধমে ।
পুরুষে স্ত্রীলোকে কিবা চণ্ডালে ব্রাহ্মণে ॥ ২১ ॥
ধনাঢ্যে নির্ধনে কিবা ধীরে নিরক্ষরে ।
ধার্মিকাধার্মিকে কিবা ব্যাধে তপাচারে ॥ ২২ ॥
দূরীভূত এইবারে প্রেমে শ্রীপ্রভুর ।
একা কারও নন তিনি সবার ঠাকুর ॥ ২৩ ॥
গগনের চাঁদা মামা সবে পায় আলো ।
কাহারও নহেন মন্দ সকলের ভাল ॥ ২৪ ॥
সব ধর্মে সব মতে সাধনা করিয়া ।
ধর্মমাত্রে সত্য প্রভু দিলা দেখাইয়া ॥ ২৫ ॥
প্রভুর নিকটে ধর্ম সকল সমান ।
সকল ধর্মের মতে তাঁর অধিষ্ঠান ॥ ২৬ ॥
যত ধর্ম দেহ তাঁর ভাব যত রূপ ।
সকলের মধ্যে তিনি প্রাণের স্বরূপ ॥ ২৭ ॥
রামকৃষ্ণ-পন্থা যাহা সমষ্টি সহার ।
সকল জাতির তাহে সম অধিকার ॥ ২৮ ॥
এই ঠাঁই সকলের করি সম্মিলন ।
হইল প্রভুর নাম বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ২৯ ॥
রামকৃষ্ণ পূজার সেবায় আরাধনে ।
অধিকারী আপামর চণ্ডাল ব্রাহ্মণে ॥ ৩০ ॥
ঘটে কিবা পটে করি প্রভুর স্থাপনা ।
ভক্তি-সহকারে যে করিবে আরাধনা ॥ ৩১ ॥
যথাসাধ্য ভোজ্য যদি ভাল নাহি জুটে ।
ধরিলে সম্মুখে খুদ তাও তাঁর মিঠে ॥ ৩২ ॥
চন্দনে মাখিয়া ফুল হোক যে রকম ।
যে দিবে অঞ্জলি পায় করিয়া যতন ॥ ৩৩ ॥
যদি নাহি রহে মন্ত্র ছন্দে বাঁধা স্তুতি ।
নাহি হয় অঙ্গহীন নাহি কোন ক্ষতি ॥ ৩৪ ॥
স্ত্রীলোক পুরুষ হোক্ যেন অবস্থার ।
যবন ম্লেচ্ছ কি হিন্দু নাহিক বিচার ॥ ৩৫ ॥
শুচি কি অশুচি হোক অবস্থা-বিশেষে ।
পুজায় সেবায় দোষ নাহি হয় কিসে ॥ ৩৬ ॥
সমভাবে অধিকারী হয় সর্বজনা ।
রজস্বলা স্ত্রীলোকের তিন দিন মানা ॥ ৩৭ ॥
দীনের ঠাকুর প্রভু পতিত-পাবন ।
ত্রুটি-দোষ নাহি সাধ্য যাহার যেমন ॥ ৩৮ ॥
এ সবে
অক্ষম যেবা শরীরে দুর্বল ।
নাম লয়ে ফেরে যদি দুনয়নে জল ॥ ৩৯ ॥
তখনি হইবে ধন্য তিল নহে দেরি ।
দীনবন্ধু প্রভুদেব দীনের কাণ্ডারী ॥ ৪০ ॥
অধিকারী পূজায় সেবায় করিবারে ।
অগণ্য উপায় দিলা জীবের উদ্ধারে ॥ ৪১ ॥
ভক্তিসহকারে লয়ে নামের শরণ ।
যে পথে যে কাজে যেবা করিবে গমন ॥ ৪২ ॥
সেই পথ সেই কাজ পন্থা সেবা তাঁর ।
সহজ এতই পথ প্রভু ভজিবার ॥ ৪৩ ॥
দয়াময় রামকৃষ্ণ নামের প্রতাপে ।
পাপপুরে বাস তবু না ছুঁইবে পাপে ॥ ৪৪ ॥
লইলে শরণ পদে শ্রীপ্রভুর রীতি ।
শরণাপন্নের হন তখনই সারথি ॥ ৪৫ ॥
ইন্দ্রিয়াদিমত্ত অশ্ব মুখের লাগাম ।
শ্রীকরে ধরিয়া রথ শরীর চালান ॥ ৪৬ ॥
জীবে না
জানিতে পারে কোথা যায় রখ ।
কিন্তু যেই পথ যায় সেই তার পথ ॥ ৪৭ ॥
অবিদ্যা-প্রবল কাল জীব পাপমতি ।
সরলে লইলে নাম অবহেলে গতি ॥ ৪৮ ॥
জগৎ ভাসান প্রেমে প্রভু অবতার ।
সকলে পাইবে প্রেম রূপায় তাঁহার ॥ ৪৯ ॥
আজ নহে কাল নয় দুই দিন পরে ।
লইবে সকলে নাম শ্রীনামের জোরে ॥ ৫০ ॥
ভক্তিভাবে আরাধিবে প্রভুরে আমার ।
রামকৃষ্ণ অবতারে সব একাকার ॥ ৫১ ॥
একাকার ভক্তিগত জাতিগত নয় ।
ধর্ম-পন্থা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমন্বয় ॥ ৫২ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
কোন পূজা শ্রীপ্রভুর মনের মতন ॥ ৫৩ ॥
কেমন ধরন কিবা প্রয়োজন তায় ।
সন্তুষ্ট যাহাতে প্রভু রামকৃষ্ণ রায় ॥ ৫৪ ॥
প্রতিষ্ঠা করিয়া তাঁরে হৃদয়ের মাঝে ।
বিবেক বিরাগ দ্বয় ঝাঁজ-ঘণ্টা বাজে ॥ ৫৫ ॥
বিশুদ্ধ জ্ঞানের বাতি মনের ভিতর ।
ধূপ-ধুনা আত্মসুখ জ্বলে নিরন্তর ॥ ৫৬ ॥
সৌরভ সুগন্ধ যদি মন্দিরে ছুটায় ।
অনুকূল অনুরাগ-ব্যজনের বায় ॥ ৫৭ ॥
দয়া ধর্ম দাক্ষিণ্যাদি সদগুণ অতুল ।
চরণযুগলে হয় অঞ্জলির ফুল ॥ ৫৮ ॥
মাখামাখি ভক্তিরসে চন্দনের প্রায় ।
ঘন ক্ষীর-প্রেম যদি নৈবেদ্য থালায় ॥ ৫৯ ॥
স্তুতি মন্ত্র চারিবর্ণ রামকৃষ্ণ নাম ।
কায়মনোবাক্যে যদি রটে অবিরাম ॥ ৬০ ॥
দীনদুঃখী সুবিনীত ধরিয়া প্রকৃতি ।
যেই পথে প্রভুদেব অখিলের পতি ॥ ৬১ ॥
জীবের শিক্ষার হেতু হৈলা আগুসার ।
সে পথে গমন হয় উচ্চ পূজা তাঁর ॥ ৬২ ॥
গুরুহারা কাল এবে ঘোর অন্ধকার ।
সকলে কাঙ্গালী ধন-জন-প্রতিষ্ঠার ॥ ৬৩ ॥
বলিতেন দয়ানিধি মানুষনিকর ।
ঘোর তমাচ্ছন্ন কূপে ডুবে নিরন্তর ॥ ৬৪ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে মন মুগ্ধ একেবারে ।
কি গুরু কি হেতু গুরু বোধ নাহি শিরে ॥ ৬৫ ॥
হইল না ধন পুত্র বিষাদে ইহার ।
ঘটি ঘটি আঁখি-বারি ফেলে বার বার ॥ ৬৬ ॥
কিন্তু পরা-সখা গুরু বিপদের বন্ধু ।
তাঁহার অভাবে নাহি করে এক বিন্দু ॥ ৬৭ ॥
শখের
সাজান ধরা মনোহর স্থান ।
গুরুভক্তিহীনে যেন শ্মশান সমান ॥ ৬৮ ॥
লীলা-প্রিয় ভগবান পতিত ভরসা ।
একশেষ ধরণীর দেখিয়া দুর্দশা ॥ ৬৯ ॥
নর-দেহ ধরি আসা দ্রবিয়া দয়ায় ।
জীবে দিতে গুরু-তত্ত্ব ত্রাণের উপায় ॥ ৭০ ॥
শীলা-নিধি মথিয়া করহ প্রণিধান ।
বিশ্ব-গুরু-বেশে এবে প্রভু ভগবান ॥ ৭১ ॥
সার্বভৌম ভাব-কান্তি অঙ্গে করে খেলা ।
নিবারিতে ধর্মে ধর্মে বিবাদের জ্বালা ॥ ৭২ ॥
সার্বভৌম ভাবে হয় সব একাকার ।
ভবের হাটেতে খুলে প্রেমের বাজার ॥ ৭৩ ॥
জগৎ ডুবান এই ভাব সুবিশাল ।
বিধি বিষ্ণু মহেশ যা না পায় নাগাল ॥ ৭৪ ॥
রামে কি রমেশে কিবা দয়াল গোরায় ।
তেজপুঞ্জ কলেবর ঈশা কি মুশায় ॥ ৭৫ ॥
কভু না ফুটিল যাহা অবতারকালে ।
এবে প্রভু রামকৃষ্ণে পূর্ণভাবে খেলে ॥ ৭৬ ॥
কোন্ অবতারে ভাব এমন সুন্দর ।
সর্ব ধর্মে সব মতে সমান আদর ॥ ৭৭ ॥
রামে শ্যামে জ্যাকে জনে রহিমে খলিলে ।
সমান যতনে সমভাবে এক কোলে ॥ ৭৮ ॥
এই সার্বভৌম ভাব ভাবের বারতা ।
নানা ফুলে ফুল-হার এক সূত্রে গাঁথা ॥ ৭৯ ॥
দ্বেষ-হিংসা দ্বন্দ্ব-হীন প্রাণের আরাম ।
এই বিশ্বজনীন ধরম যার নাম ॥ ৮০ ॥
এই বিশ্বব্যাপী ভাব শিক্ষা দিতে জীবে ।
বিশ্বগুরু বিনা অন্যে কভু না সম্ভবে ॥ ৮১ ॥
কার সাধ্য দেখাইতে পারে এই পট ।
সুশীতল বটচ্ছায়া দেয় একা বট ॥ ৮২ ॥
সুবিশাল সার্বভৌম শ্রীপ্রভুর মত ।
নিশ্চয় অবশ্য কালে হবে বলবৎ ॥ ৮৩ ॥
কলির কলুষ তম ধ্রুব হবে দূর ।
জীবে পাবে গুরু-তত্ত্ব কৃপায় প্রভুর ॥ ৮৪ ॥
তাহার অমর বীজ করিতে রোপণ ।
রামকৃষ্ণ-অবতার বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ৮৫ ॥
আস্বাদ পাইয়া পরে সে তত্ত্বের তার ।
গুরুত্বে বরিবে সব প্রভুরে আমার ॥ ৮৬ ॥
জীবের ভরসা আশা প্রভু ভগবান ।
শ্রীবচনে শুন মন তাহার প্রমাণ ॥ ৮৭ ॥
ভাবাবেশে বলিতেন অখিলের রাজা ।
ক্রমে পরে ঘরে ঘরে হবে মোর পূজা ॥ ৮৮ ॥
অকাট্য প্রভুর বাক্য মহাশক্তিমান ।
পশ্চাতে ফুটিয়া হবে ছবি মূর্তিমান ॥ ৮৯ ॥
স্রোত আছে তাই নদী স্রোতস্বিনী নাম ।
বরষায় বেগে ভরা সিন্ধু-মুখে টান ॥ ৯০ ॥
অদ্ভূল পাখার সিদ্ধ অপার সলিলে ।
যত আসে দেয় স্থান আপনার কোলে ॥ ৯১ ॥
অটল অচল ভাবে নাহি হেমাদোলা ।
ধরণীর ভসে যেন প্রকৃতির মেলা ॥ ৯২ ॥
কিন্তু শ্রীপ্রভুর ভাবে হবে এত টান ।
জলধিত নাহি পাবে তাহাতে এড়ান ॥ ৯৩ ॥
গোউরের লীলা নহে খেলা নদীয়ায় ।
জোর ডুবে শান্তিপুর নদে ভেসে যায় ॥ ৯৪ ॥
বঙ্গ থেকে নীলাচলে কিছু কিছু টান ।
এইবারে অবতার প্রভু ভগবান ॥ ৯৫ ॥
প্রবল তুফানবেগ প্রলয়ের পারা ।
উলটপালট খাবে সসাগরা ধরা ॥ ৯৬ ॥
নিরক্ষর বেশে আসা তাহার কারণ ।
বিদ্যার করিতে গর্ব খর্ব বিলক্ষণ ॥ ৯৭ ॥
বিজ্ঞানিধি বিদ্যার সাগর যে যেখানে ।
হইবে শরণাপন্ন প্রভুর চরণে ॥ ৯৮ ॥
শ্রীপ্রভুর মহিমার পাইয়া আস্বাদ ।
ঘুচিবে বিদ্যার মদ অবিদ্যার গাদ ॥ ৯৯ ॥
জগৎ-ভাসান তাঁর প্রেমের প্রভাবে ।
ধর্মে ধর্মে রেষ হিংসা সকল ঘুচিবে ॥ ১০০ ॥
জেতা-জিতে দোঁহে মিলে এক গৃহে বাস ।
পরস্পর প্রণয়েতে প্রেমের সম্ভাষ ॥ ১০১ ॥
বাঘেতে বলদে খাবে এক ঘাটে জল ।
সাগরান্ত দেশ হবে স্বদেশ অঞ্চল ॥ ১০২ ॥
এই যে প্রেমের ভাব কল্পনার পার ।
জীবের বুদ্ধিতে কিসে হইবে সঞ্চার ॥ ১০৩ ॥
তত্ত্বান্বেশী শ্রীকেশর ব্রাহ্ম মতিমান ।
তাঁহার চরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ১০৪ ॥
প্রিয়জন শ্রীপ্রভুর তাহার কৃপায় ।
লীলা তত্ত্বাভাস মাত্র দেখিবারে পায় ॥ ১০৫ ॥
কতটুকু দরশন তাহার উপমা ।
অরুণ-উদয়ে যেন সূর্যোদয় জানা ॥ ১০৬ ॥
আভাসেই মত্তচিত্তে কেশব সজ্জন ।
ভিতরে প্রবেশ নাহি করি বিলক্ষণ ॥ ১০৭ ॥
নূতন ধর্মের এক শরীর নির্মাণ ।
সাজাইয়া দিল নববিধানের নাম ॥ ১০৮ ॥
যে ধর্মের যেই অংশ তাঁর মনোমত ।
পূজিতে ধর্মেতে তাহা কৈল সংযোজিত ॥ ১০৯ ॥
কেমন নূতন ধর্ম কেশবের গড়া ।
ঠিক যেন বিবিধ কুসুমে বাঁধা তোড়া ॥ ১১০ ॥
নববিধানের কথা তোড়া তুলনায় ।
সকল ধর্মের কিছু কিছু আছে তায় ॥ ১১১ ॥
মহাভাব শ্রীগৌরাঙ্গের প্রেমসমন্বিত ।
কৃষ্ণের প্রকট জ্ঞান গীতায় কথিত ॥ ১১২ ॥
সহিষ্ণুতা ক্রাইষ্টের নির্ভরতা বল ।
অপার করুণারাজি ভাব সমুজ্জ্বল ॥ ১১৩ ॥
বাল্যভাব শ্রীপ্রভুর পরা যত্নে রাখা ।
সন্তানের সমতুল্য মা বলিয়া ডাকা ॥ ১১৪ ॥
অন্য অন্য স্থানে যাহা বুঝিল সুন্দর ।
লইল তাহার কিছু করিয়া আদর ॥ ১১৫ ॥
আগাগোড়া দিয়া বাদ কণাংশ লইয়া ।
নববিধানের দেহ দিল সাজাইয়া ॥ ১১৬ ॥
নামে মাত্র দেহ চক্ষে দেখা নাহি ঘটে ।
আকাশকুসুমসম বস্তু নাই মোটে ॥ ১১৭ ॥
যথাশক্তি বুঝি ধর্ম বলিতে হইলে ।
নববিধানের গাছে ফল নাহি ফলে ॥ ১১৮ ॥
ফল ফলা অসম্ভব স্পষ্ট দেখা যায় ।
তোড়াতে ফুলের খেলা গাছ কোথা তায় ॥ ১১৯ ॥
পরম সুন্দর তোড়া দেখায় সম্প্রতি ।
মলিন কুসুম দল পোহাইলে রাতি ॥ ১২০ ॥
কল্পনাতে ঝুলে ধর্ম ধর্ম কল্পনার ।
বিশেষ বলিতে নহে মম অধিকার ॥ ১২১ ॥
অভিনয়ে নব ধর্ম প্রচারের শখ ।
নববৃন্দাবন নামে রচিল নাটক ॥ ১২২ ॥
এ সময়ে একদিন প্রভুর সহিত ।
প্রভু-প্রিয় শ্রীকেশব হইল মিলিত ॥ ১২৩ ॥
বদনে আনন্দছটা অন্তরে যেমন ।
কেশবে কহেন প্রভু বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ১২৪ ॥
আসিয়াছে মম পাশে এক মতিমান ।
শৌর্যে বীর্যে পরাক্রমে কেশরী সমান ॥ ১২৫ ॥
বিবেকী বিরাগী ত্যাগী জ্ঞানের মূরতি ।
বিশাল আধারে ধরে অপার শকতি ॥ ১২৬ ॥
সমুজ্জ্বল আঁখি-ভাতি তাহার প্রমাণ ।
নয়ন-পিরীতি অতি প্রভুর বয়ান ॥ ১২৭ ॥
নরেন্দ্র তাহার নাম বসতি শহরে ।
একদিন দেখাইব নিশ্চয় তোমারে ॥ ১২৮ ॥
একটি তোমার শক্তি প্রভাবে যাহার ।
স্বদেশে বিদেশে এত প্রশংসা-প্রচার ॥ ১২৯ ॥
ধনী মানী গুণী মধ্যে উপার্জিলে যশ ।
নরন্দ্রের হেন শক্তি আছে অষ্টাদশ ॥ ১৩০ ॥
বালক এমন শক্তি অন্তরে নিহিত ।
সময়ে সকলগুলি হবে বিকশিত ॥ ১৩১ ॥
ধরণী ধরিয়া দিলে এক প্রান্তে নাড়া ।
কম্পিত অপর প্রান্ত সবে পাবে সাড়া ॥ ১৩২ ॥
সুন্দর সুশ্রাব্য সুর কণ্ঠের দুয়ারে ।
গুনিলে শ্রবণ মুগ্ধ মন-প্রাণ হরে ॥ ১৩৩ ॥
সমাজ মন্দিরে তব প্রার্থনার স্থানে ।
লইয়া রাখিলে পাবে পরানন্দ প্রাণে ॥ ১৩৪ ॥
যথা আজ্ঞা শ্রীপ্রভুর করি শিরোধার্য ।
নরেন্দ্রে লইয়া যান কেশব আচার্য ॥ ১৩৫ ॥
মধুর সঙ্গীতে হয় মুগ্ধ যত জন ।
ব্রাহ্মদের সঙ্গে খুব হইল মিলন ॥ ১৩৬ ॥
এখন প্রভুর কাছে শুনহ কাহিনী ।
দিবারাতি হয় বহু লোকের মেলানি ॥ ১৩৭ ॥
বিশেষতঃ রবিবারে নহে গণনায় ।
ঈশ্বরীয় তত্ব-কথা শুনিবারে যায় ॥ ১৩৮ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা না যায় বর্ণন ।
করেন বিবিধ খেলা লয়ে লোকজন ॥ ১৩৯ ॥
জ্ঞানভক্তিপূর্ণ উক্তি হিত-উপদেশ ।
প্রমত্ত হইয়া কন প্রভু পরমেশ ॥ ১৪০ ॥
যে কথা
শুনিতে যার ইচ্ছা হয় ঘটে ।
শ্রীবদনে আপনিই সেই কথা ফুটে ॥ ১৪১ ॥
জিজ্ঞাসা করিতে
কারে কখন না হয় ।
মহাসুখে শুনে লোকে হইয়া বিস্ময় ॥ ১৪২ ॥
নানান শ্রেণীর লোক নানা
ভাব সহ ।
সকলেই পায় প্রীতি বাদ নাহি কেহ ॥ ১৪৩ ॥
নানাভাবে নানাভাব করেন প্রকাশ ।
যাহাতে সকলে পায় অপার উল্লাস ॥ ১৪৪ ॥
কখন কাহারে আজ্ঞা গাইবারে গান ।
শুনিয়া
সমাধিগত প্রভু ভগবান ॥ ১৪৫ ॥
কখন গাহিয়া গীত শ্রীপ্রভু আপনি ।
মত্তভাবে নৃত্য হয়
কতই না জানি ॥ ১৪৬ ॥
কখন রহস্যকথা হয় হেন চোটে ।
যে শুনে হাসিয়া তার পেট যায় ফেটে ॥ ১৪৭ ॥
শ্রীপ্রভু এমন সুরসিক চূড়ামণি ।
নীরসে আসিত রস রস-ভাব শুনি ॥ ১৪৮ ॥
তত্বালাপে ভক্তে ভক্তে বাদ-প্রতিবাদ ।
কখন হইত তাঁর শুনিবার সাধ ॥ ১৪৯ ॥
দুইপক্ষে ঘোর তর্ক রুষিয়া গর্জিয়া ।
নিরপেক্ষ প্রভুদেব দেখেন বসিয়া ॥ ১৫০ ॥
মৃদুমন্দ অধরে সুহাসি সুশোভন ।
রঙ্গসহ উত্তেজনা যুদ্ধ হুতাশন ॥ ১৫১ ॥
কৃতবিদ্য সুপণ্ডিত ধীর যেন দেখে ।
জিজ্ঞাসা পড়ায় মত্ত পড়ুয়া বালকে ॥ ১৫২ ॥
শ্রীপদপ্রাপ্তির আশে যাহার গমন ।
ভাবাবেশে হয় তাঁর চরণ অর্পণ ॥ ১৫৩ ॥
কোন আশে আসা নয় হেন দেখা যায় ।
কেহ বা পাইল কৃপা প্রভুর কৃপায় ॥ ১৫৪ ॥
সকলে সুবিদিত পুরী রম্য স্থান ।
গঙ্গাকূলে বরাবর ফুলের বাগান ॥ ১৫৫ ॥
সুন্দর বাঁধান ঘাটে চাঁদনিয়া খাসা ।
শ্যামা-বাটী পঞ্চবটী আঁখির লালসা ॥ ১৫৬ ॥
গঙ্গাতটে হেন পুরী নাহি কোন স্থানে ।
শুনিলে নিশ্চয় সাধ হয় দরশনে ॥ ১৫৭ ॥
রবিবারে বিশেষতঃ ভ্রমণকারণ ।
নবীন যুবক কত করে আগমন ॥ ১৫৮ ॥
তার মধ্যে বিশেষ যুবক কোন জনে ।
শ্রীপ্রভু ডাকিয়া তারে যান সংগোপনে ॥ ১৫৯ ॥
শ্যামা যথা শ্রীমন্দিরে করেন বিহার ।
অবহেলে দেন খুলে ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৬০ ॥
কি ভাবে কাহারে কৃপা করেন কখন ।
কি আছে শকতি করি নির্দেশ কারণ ॥ ১৬১ ॥
বালক-স্বভাব বটে শিশুবদাচার ।
কিন্তু মনে বহে পুরা জ্ঞানের জোয়ার ॥ ১৬২ ॥
ভোগা দিয়া লয় বস্তু কার সাধ্য নাই ।
শঠের উপরে শঠ শ্রীপ্রভু গোসাঁই ॥ ১৬৩ ॥
যেখানে সেখানে নহে কৃপা-বিতরণ ।
কাল পাত্র বুঝিবারে বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ১৬৪ ॥
বলিতেন প্রভুদেব ভাবের আবেশে ।
শেষ জন্ম যার সে আসিবে মম পাশে ॥ ১৬৫ ॥
তবে যারে তারে কৃপা তাও আছে তাঁর ।
কখন কি যাতে প্রভু বুঝা অতি ভার ॥ ১৬৬ ॥
কখন দয়ার বেগে এত মত্ততর ।
দুনয়নে বারি-ধারা ঝরে নিরন্তর ॥ ১৬৭ ॥
অশান্তির একমাত্র কারণ কেবল ।
কেমনে হইবে কিসে জীবের মঙ্গল ॥ ১৬৮ ॥
কখন বেষ্টিত প্রভু ভকতের দলে ।
ভ্রাম্যমাণ গুণধাম জাহ্নবীর কূলে ॥ ১৬৯ ॥
পানসি-জাহাজ তরী যত জলযান ।
কলনাদী তটিনীর লহরী উজান ॥ ১৭০ ॥
বিভিন্ন অবস্থাগত তরঙ্গের মালা ।
অনুকূল প্রতিকূল বায়ুসনে খেলা ॥ ১৭১ ॥
অগাধ সলিলে মাছ শুশুক নিচয় ।
উঠে ডুবে করে রঙ্গ সময় সময় ॥ ১৭২ ॥
সুনীল গগন-বক্ষে জলদ-সঞ্চার ।
কেহ গিরি-রূপ কেহ শিখর-আকার ॥ ১৭৩ ॥
অপরূপ নানা রূপ করিয়া ধারণ ।
নিরাশ্রয়ে খ-এ করে রঙ্গে বিচরণ ॥ ১৭৪ ॥
প্রসবি বিবিধ বর্ণ রবি অন্তপ্রায় ।
প্রতিভাতে মেঘ-জালে সুবর্ণ ফলায় ॥ ১৭৫ ॥
ছটায় হারায় কান্তিযুক্ত রত্ন মণি ।
বর্ণহীন শূন্যাকাশ সুবর্ণের খনি ॥ ১৭৬ ॥
প্রতিবিম্ব তে সবার জাহ্নবীর জলে ।
সোনার তরঙ্গমালা খেলায় সলিলে ॥ ১৭৭ ॥
তটস্থিত হর্ম্যরাজি অন্তপ্রায় রবি ।
যতনে সাদরে গঙ্গা হৃদে ধরে ছবি ॥ ১৭৮ ॥
যথা প্রভু তিন ধারে কুসুমের বন ।
পত্রে ফুলে কলিকায় অতি সুশোভন ॥ ১৭৯ ॥
আঁধার-বসনা নিশি আগত দেখিয়া ।
অতুল কুসুমকুল উঠিল ফুটিয়া ॥ ১৮০ ॥
সৌরভ সুগন্ধ যত গন্ধবহ বয় ।
জুটে মতে যুথে যুথে মধুপনিচয় ॥ ১৮১ ॥
মধুপানে অলিগণে উন্মতের প্রায় ।
অবশে ঢলিয়া পড়ে কলিকার গায় ॥ ১৮২ ॥
পবন-চালনে পত্র দুলে নিরন্তর ।
অলিদল যথা কুল্ল ফুলের উপর ॥ ১৮৩ ॥
হিংসা-দ্বেষ-পরবশ হইয়া যেমন ।
খেদাইতে অলিযুথে করে আক্রমণ ॥ ১৮৪ ॥
দিনমানে করি রাজ্য প্রচণ্ড প্রভায় ।
ক্লান্তকায় দিনমণি চলিল শয্যায় ॥ ১৮৫ ॥
দেখিয়া সুধাংশু মুখ উঁকি দিয়া তুলে ।
ভয়ে যেন ছিল ঢাকা মেঘের আড়ালে ॥ ১৮৬ ॥
সঙ্গে লয়ে আপনার ক্ষীণতর বল ।
মন্দভাতি হীন-জ্যোতিঃ তারকার দল ॥ ১৮৭ ॥
পাখী সব কলরব চারিদিকে করে ।
কেহ শূন্যে কেহ শাখায় কেহ বা নীড়ে ॥ ১৮৮ ॥
এই সব স্বভাবের পট দেখাইয়া ।
শ্রীপ্রভু দুর্বোধ্য তত্ত্ব দেন বুঝাইয়া ॥ ১৮৯ ॥
সরল মধুরবাক্যে প্রত্যক্ষ উপমা ।
গুনিয়া দেখিয়া যেবা অতি মূর্খ কানা ॥ ১৯০ ॥
সহজে বুঝিয়া যায় জলের সমান ।
যোগে তপে যাহা নাহি হয় প্রণিধান ॥ ১৯১ ॥
কখন লইয়া লুচি মিষ্টান্ন আপনে ।
ডাকিতেন শিবানী বলিয়া শ্রীবদনে ॥ ১৯২ ॥
মধুর প্রভুর স্বর শুনে কুতূহলী ।
নিকটে আসিত ছুটে শৃগাল-শৃগালী ॥ ১৯৩ ॥
অতি বৃদ্ধ কুকুর আছিল এক তাঁর ।
দিতেন প্রসাদ নিত্য করিতে আহার ॥ ১৯৪ ॥
কভু কোল সমাগত বালকে লইয়া ।
খেলিতেন শিশুসম উলঙ্গ হইয়া ॥ ১৯৫ ॥
অতিশয় আর্তভাবে কহেন কখন ।
ক্ষুধায় আকুল কিছু করিব ভোজন ॥ ১৯৬ ॥
অভাব কিছুই নাই নানা নিধি ঘরে ।
যোগান ভকতবর্গ ভক্তিসহকারে ॥ ১৯৭ ॥
অতি অল্প ভোজন করেন গুণমণি ।
দুই অঙ্গুলির অগ্রে ধরে যতখানি ॥ ১৯৮ ॥
এবে তাঁর আপ্তগণ সেবার কারণে ।
শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে রহে রেতে দিনে ॥ ১৯৯ ॥
নুতন কেহই নন যাঁরা চিরকাল ।
সেবক হরিশ লাট্টু, প্রাণের রাখাল ॥ ২০০ ॥
দাস্যভাব নহে তাঁর রাখালের সনে ।
সুন্দর সম্পর্ক পরস্পর দুইজনে ॥ ২০১ ॥
প্রভুর গোপাল তাঁরে কতই আদর ।
বসাইয়া আপনার কোলের উপর ॥ ২০২ ॥
আচার ব্যাভার দু'হে হয় কি রকম ।
কহি দুই-এক কথা শুন শুন মন ॥ ২০৩ ॥
রাখাল করিলে সেবা প্রীতি নহে তাঁর ।
প্রীতি অতি সেবিতে করিলে অস্বীকার ॥ ২০৪ ॥
আছে শারীরিক কষ্ট সেবা আচরণে ।
রাখালের কষ্টে তাঁর বাজ লাগে প্রাণে ॥ ২০৫ ॥
রাখালের সঙ্গে প্রভু রঙ্গ করিবারে ।
সহাস্য বদনে কম পান সাজিবারে ॥ ২০৬ ॥
রাখালের উত্তর 'সাজিতে নাহি জানি' ।
ততই করেন জেদ প্রভু গুণমণি ॥ ২০৭ ॥
এই ভাবরসাস্বাদ রাখালের সনে ।
পালনে অতুষ্ট তুষ্ট আজ্ঞা-অপালনে ॥ ২০৮ ॥
যেন
রাখালচন্দ্র তেন তাঁর দারা ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তাঁর সহোদরা ॥ ২০৯ ॥
অতি ভক্তিমতী সতী মিত্রের জননী ।
প্রভু ভক্ত যতগুলি নন্দন-নন্দিনী ॥ ২১০ ॥
দুর্লভ জগতে হেন ভক্ত-পরিবার ।
কিছুই অভাব নাই সোনার সংসার ॥ ২১১ ॥
একত্রেতে শ্রীপ্রভুর দরশন তরে ।
এখন তখন আসে দক্ষিণশহরে ॥ ২১২ ॥
উপযুক্ত উপদেশ যাহার যেমন ।
বিতরেন প্রভুদেব ভক্ত-বিনোদন ॥ ২১৩ ॥
নানান ভক্তের সঙ্গে নানাবিধ খেলা ।
বিশেষিয়া সবিশেষ সাধ্য নহে বলা ॥ ২১৪ ॥
বিদেশে ধরণীধামে আপনার জনে ।
আনিয়া আপন সঙ্গে লীলার কারণে ॥ ২১৫ ॥
রেখেছেন প্রভুদেব নানা অবস্থায় ।
সাধারণ জীবসম মোহিয়া মায়ায় ॥ ২১৬ ॥
ক্রমশঃ খুলেন ঠুলি লোচন-তমস্ ।
সম্ভোগিয়া মনোমত লীলারঙ্গরস ॥ ২১৭ ॥
সদ্গোপ প্রতাপচন্দ্র হাজরা উপাধি ।
প্রভুর নিকটে এবে রহে নিরবধি ॥ ২১৮ ॥
প্রভুতে বিশ্বাস হৃদে নাহি এক ভোলা ।
উপেক্ষিয়া শ্রীবচন শুধু জপে মালা ॥ ২১৯ ॥
অবিশ্বাসী ইহার সমান আর নাই ।
কত খেলা তাঁর সঙ্গে করেন গোসাঁই ॥ ২২০ ॥
তপে জপে হাজরার একান্ত বাসনা ।
লণ্ড ভণ্ড কাণ্ড করি প্রভু দেন হানা ॥ ২২১ ॥
করে লম্বে করমালা হাজরা যখন ।
করে ইষ্ট-মন্ত্র-রূপ মুদিয়া নয়ন ॥ ২২২ ॥
ধীর মন্ত্র-পদ-ক্ষেপে নিকটে যাইয়া ।
ছিনাইয়া মালা প্রভু যান পলাইয়া ॥ ২২৩ ॥
শ্রীমুখে সুন্দর হাসি মন-বিমোহন ।
হাজরা পশ্চাতে ধায় মালার কারণ ॥ ২২৪ ॥
জপ তপ বারণ করেন গুণমণি ।
অনর্থক কেন কার্য হইবে আপনি ॥ ২২৫ ॥
বিশ্বাস না হয় তাঁর প্রভুর কথায় ।
জপে বসিলেন মালা লয়ে পুনরায় ॥ ২২৬ ॥
করুণানিধান হেন প্রভুর মতন ।
বিশ্বমধ্যে কোথা কে করেছে দরশন ॥ ২২৭ ॥
সাধন-ভজন বিনা দেন পরা ফল ।
সকলের সার ইষ্ট-চরণকমল ॥ ২২৮ ॥
কৃপা কর প্রভুদেব তম-বিমোচন ।
যুগল চরণে যেন মগ্ন থাকে মন ॥ ২২৯ ॥
প্রভুর নিজের যারা শ্রীপ্রভুর দাস ।
তাঁর রূপে তাঁর পদে অটল বিশ্বাস ॥ ২৩০ ॥
তাঁহাদের নাহি কোন সাধন-ভজন ।
প্রভুর কৃপায় পান প্রভুর চরণ ॥ ২৩১ ॥
সেবক হরিশচন্দ্র গঙ্গা-উপকূলে ।
একদিন ধ্যানে মগ্ন পঞ্চবটতলে ॥ ২৩২ ॥
একেবারে বাহিক গিয়ান বিরহিত ।
হেনকালে প্রভুদেব তথা উপস্থিত ॥ ২৩৩ ॥
অধরে মধুর হাসি অতি সুশোভন ।
জাগাইলা বক্ষে করি কর পরশন ॥ ২৩৪ ॥
অমিয়বরযী বাক্যে কহিলেন তাঁয় ।
কার ধ্যান কর পঞ্চবটের তলায় ॥ ২৩৫ ॥
আইস আমার সঙ্গে মন্দির ভিতরে ।
দিব মিঠা পাকা আম খাবে পেট ভরে ॥ ২৩৬ ॥
সাধন ভজন কষ্টে কিবা প্রয়োজন ।
হেলায় পাইবে নিধি মানিক-রতন ॥ ২৩৭ ॥
অপার বিশ্বাস তাঁর প্রভুর কথায় ।
হরিষে হরিশ শ্রীপ্রভুর পাছু ধায় ॥ ২৩৮ ॥
হাজরায় স্বতস্তর রীতি বুদ্ধি আন ।
শ্রীবাক্য হৃদয়ে মোটে নাহি পায় স্থান ॥ ২৩৯ ॥
হাজরার মনে মনে ইহাই ধারণা ।
প্রভুর অপেক্ষা তিনি কর্মী একজনা ॥ ২৪০ ॥
শৌর্যে বীর্যে গুণেতে অধিক শ্রেষ্ঠতর ।
সেহেতু শ্রীবাক্যে নাহি উপজে আদর ॥ ২৪১ ॥
কল্পতরু প্রভুদেব তাঁহার নিকটে ।
যার যেন ভাব তার সেই মত জুটে ॥ ২৪২ ॥
কামারহাটির
সেই বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ২৪৩ ॥
বালিকা-বিধবা করে
গঙ্গাকূলে বাস ।
প্রভুদেবে অদ্যাপিহ না হয় বিশ্বাস ॥ ২৪৪ ॥
কৈবর্তের যাজক
শ্রীপ্রভু ভগবান ।
এই ছিল ব্রাহ্মণীর প্রকৃত গিয়ান ॥ ২৪৫ ॥
সেই হেতু প্রভুদত্ত প্রসাদ লইয়া ।
অন্যে লুকাইয়া দেন নিজে না খাইয়া ॥ ২৪৬ ॥
জানিয়াও যেন প্রভু অজ্ঞাত বারতা ।
শুন পরে কি হইল অপরূপ কথা ॥ ২৪৭ ॥
সন্নিকটে খড়দহ নামে এক গ্রাম ।
গঙ্গাকূলস্থিত সুবিদিত জনস্থান ॥ ২৪৮ ॥
বৈষ্ণব গোস্বামী বংশ করেন বসতি ।
ভক্তিরাগে পূজে এক বিগ্রহ মূরতি ॥ ২৪৯ ॥
পরম সুঠাম শ্যামসুন্দর আখ্যায় ।
নানান স্থানের লোক দরশনে যায় ॥ ২৫০ ॥
জাগ্রত বিগ্রহ অতি নয়ন-রঞ্জন ।
একদিন ব্রাহ্মণীর তথা আগমন ॥ ২৫১ ॥
তুষ্টচিত্তে পুরীমধ্যে বিগ্রহ দেখিয়া ।
বাহির প্রাঙ্গণে যবে আসেন ফিরিয়া ॥ ২৫২ ॥
দেখিলা বসিয়া তথা এক যোগিবর ।
বদনে বিকাশে ভাতি অতি মনোহর ॥ ২৫৩ ॥
কটাক্ষ করিয়া তেঁহ কহে ব্রাহ্মণীরে ।
পাইলে প্রসাদ খাবে ভক্তিসহকারে ॥ ২৫৪ ॥
পড়ে যদি কোন কথা হাজারের মাঝে ।
জনশ্রুতি যার কথা তারে গিয়া বাজে ॥ ২৫৫ ॥
গুনিয়া যোগীর কথা আশ্চর্য কাহিনী ।
চমকিয়া উঠিলেন বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ॥ ২৫৬ ॥
অমনি পড়িল মনে প্রভুর প্রসাদ ।
অবহেলি হইয়াছে বড় পরমাদ ॥ ২৫৭ ॥
উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি আইলা আবাসে ।
প্রভুর নিকটে ত্বরা আসিবার আশে ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুর কারণে ভোজ্য বাঁধিয়া পুঁটুলি ।
প্রভু যথা উৎরিল পায়ে ভরা ধুলি ॥ ২৫৯ ॥
দেখামাত্র প্রভুদেব কহিলেন তায় ।
কিবা আনিয়াছ দেহ আতুর ক্ষুধায় ॥ ২৬০ ॥
উথলিল ব্রাহ্মণীর বাৎসল্যের রস ।
পুঁটুলি খুলিতে নারে অঙ্গুলি অবশ ॥ ২৬১ ॥
ব্রাহ্মণীর মত ভাগ্য কোথা আছে কার ।
মিষ্টায় লইয়া প্রভু করেন আহার ॥ ২৬২ ॥
সেই দিন হইতে শ্রীপ্রভু ভগবান ।
গোপালের মা বলিয়া থুইলেন নাম ॥ ২৬৩ ॥
ভক্তমুখে শুনা বৃদ্ধা কৃষ্ণ-অবতারে ।
ফল বিক্রি করিতেন গোকুলনগরে ॥ ২৬৪ ॥
একদিন নন্দালয়ে যশোমতী রানী ।
প্রাঙ্গনে বেড়ান লয়ে কাঁখে নীলমণি ॥ ২৬৫ ॥
উপনীত বৃদ্ধা তথা হয় হেন কালে ।
বজরায় ভরা ফল বহিয়া কাঁকালে ॥ ২৬৬ ॥
ফল-লুব্ধ গোপাল কহেন যশোদারে ।
ফল খাব ফল খাব কিনে দেহ মোরে ॥ ২৬৭ ॥
এত শুনি নন্দরানী কিনিবারে যায় ।
কড়ি-বিনিময়ে বুড়ী দিতে নাহি চায় ॥ ২৬৮ ॥
হাত বাড়াইয়া বুড়ী কহিল গোপালে ।
কল দিব মা বলিয়া এস যদি কোলে ॥ ২৬৯ ॥
তখনি বুড়ীর কোলে উঠিল গোপাল ।
ভক্তপ্রিয় শিশুরূপ নন্দের দুলাল ॥ ২৭০ ॥
মহাভাগ্য-পুণ্যবতী মহানন্দ মনে ।
পাকা পাকা দেয় ফল কৃষ্ণের বদনে ॥ ২৭১ ॥
ফলবেচা বুড়ী যেই গোকুলনগরে ।
সেই এই ব্রাহ্মণী শ্রীপ্রভু অবতারে ॥ ২৭২ ॥
নানা খেলা করেন শ্রীপ্রভু তাঁর সনে ।
একদিন ব্রাহ্মণীর বসতি যেখানে ॥ ২৭৩ ॥
রন্ধনের কাজে বৃদ্ধা বিব্রত যখন ।
হেনকালে প্রত্যক্ষ করেন নিরীক্ষণ ॥ ২৭৪ ॥
শুষ্ক বৃক্ষ-পত্র শাখা দেন কুড়াইয়া ।
প্রভুদেব অল্পবয়ঃ বালক হইয়া ॥ ২৭৫ ॥
কভু খেলা শিশুসম স্বভাব চঞ্চল ।
ভাগ্যবতী ব্রাহ্মণীর ধরিয়া আঁচল ॥ ২৭৬ ॥
প্রভুর এতেক খেলা বুঝিয়া অন্তরে ।
ব্রাহ্মণী প্রভুর কাছে আসে বারে বারে ॥ ২৭৭ ॥
দেখিলেই ব্রাহ্মণীরে প্রভু নারায়ণ ।
বলিতেন কি এনেছ করিব ভোজন ॥ ২৭৮ ॥
ব্রাহ্মণী মিষ্টান্ন দেন পরম সাদরে ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীপ্রভুর করে ॥ ২৭৯ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন পুনঃ আসিবে যখন ।
মিষ্টান্ন বদলে এন রাখিয়া ব্যঞ্জন ॥ ২৮০ ॥
শুনিয়া প্রভুর কথা মহাভাগ্য মানি ।
আহলাদে গলিয়া বাসে ফিরিল ব্রাহ্মণী ॥ ২৮১ ॥
দুঃখিনী ব্রাহ্মণী নাই সন্তান-সন্ততি ।
নিকট আত্মীয় বন্ধু দেয় কড়িপাতি ॥ ২৮২ ॥
পরগৃহে স্থিতিবাস জাহ্নবীর তটে ।
যথাসাধ্য শাক-পাতি আনিল আকুটে ॥ ২৮৩ ॥
আপনে আপন ভাবে হইয়া মগন ।
আঁখি-জলে পাকশালে ভাসে দুনয়ন ॥ ২৮৪ ॥
শ্রীবয়ান সতত স্মরণ বারে বারে ।
রাঁধিল ব্যঞ্জন অতি সোহাগের ভরে ॥ ২৮৫ ॥
যথারীতি পুঁটুলিতে করিয়া বন্ধন ।
উত্তরিল যথা প্রভু ভক্ত বিনোদন ॥ ২৮৬ ॥
ব্যঞ্জন খাইতে শ্রীপ্রভুর মন ভারি ।
পুঁটুলি খুলিতে আর নাহি সয় দেরি ॥ ২৮৭ ॥
শ্রীবদনে ব্যঞ্জন লাগিল যেন ক্ষুধা ।
শুদ্ধমাত্র শাকে উচ্ছে আলু দিয়া রাঁধা ॥ ২৮৮ ॥
হেন ভক্তিমতী বিশ্বে কোথা বিদ্যমান ।
ভক্তিতে করিল তিক্তে সুধার সমান ॥ ২৮৯ ॥
কার দ্রব্যে তুষ্ট রামকৃষ্ণদেব রায় ।
বিচিত্র শ্রীলীলা তাঁর কহা নাহি যায় ॥ ২৯০ ॥
খোট্টা মাড়োয়ারী জেতে মস্ত মহাজন ।
বড়বাজারেতে গদি ত্রিতল ভবন ॥ ২৯১ ॥
সাধু ভক্ত সন্ন্যাসীর সেবায় পিরীতি ।
বংশপরম্পরা এই তাহাদের রীতি ॥ ২৯২ ॥
শুনিয়া প্রভুর নাম আসে কত শত ।
সঙ্গে লয়ে মোয়া মিষ্টি বজরাপুর্ণিত ॥ ২৯৩ ॥
সুপক্ক কাবুলি ফল বেদানা আঙ্গুর ।
বিষতুল্য লাগে তাহা নয়নে প্রভুর ॥ ২৯৪ ॥
ভোজনের কিবা কথা নহে পরশন ।
আঁখির সম্মুখে রহে তাও নহে মন ॥ ২৯৫ ॥
কেহ বা কিনিয়া দ্রব্য যবন-দোকানে ।
দেখিলে জনমে ঘৃণা অনাচারে আনে ॥ ২৯৬ ॥
তাও লাগে সুধাময় প্রভুর জিহ্বায় ।
ভক্তিমতী ব্রাহ্মণীর ব্যঞ্জনের প্রায় ॥ ২৯৭ ॥
কেহ ভারি কদাচারী যবন-বিশেষ ।
স্বধর্ম-তিয়াগী নাই ভকতির লেশ ॥ ২৯৮ ॥
ভক্তিহীন কৃপণ মমতা নাই মোটে ।
শ্রীপ্রভু মাগিয়া খান তাহার নিকটে ॥ ২৯৯ ॥
দীনের অধিক তাঁর মাগিবার ধারা ।
দেখিয়া শুনিয়া লীলা হয় বুদ্ধিহারা ॥ ৩০০ ॥
দয়ার সাগরে ঘৃণা লজ্জা ভয় নাই ।
জীবের মঙ্গলে সদা উন্মত্ত গোসাঁই ॥ ৩০১ ॥
কলিতে যেমন জীব পাতকী পামর ।
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব কৃপার সাগর ॥ ৩০২ ॥
শুনহ সুন্দর লীলা কর অবধান ।
শহরের মধ্যে আছে নন্দনবাগান ॥ ৩০৩ ॥
ধনবান একজন ব্রাহ্মধর্মে মতি ।
কাশীশ্বর মিত্র নামে তথায় বসতি ॥ ৩০৪ ॥
পরলোকে গেছে এবে নাহি ধরাধামে ।
উত্তরাধিকারিস্বত্বে রাখি পুত্রগণে ॥ ৩০৫ ॥
একবার ব্রহ্মোৎসব তাঁহার আগারে ।
প্রভুর গমন হেতু নিমন্ত্রণ করে ॥ ৩০৬ ॥
গুণের সাগর মোর প্রভুদেবরায় ।
ভাল ভাল বলিয়া দিলেন তাহে সায় ॥ ৩০৭ ॥
যা বলেন প্রভু তাহা অবশ্য পালন ।
যথাদিনে যথাকালে হইল গমন ॥ ৩০৮ ॥
পরিপূর্ণ প্রার্থনার স্থান সমুদয় ।
বেশভূষা মদ-মত্ত ব্রাহ্ম ব্রাহ্মিকায় ॥ ৩০৯ ॥
যথা প্রথা উৎসব হইলে সমাপন ।
ব্রাহ্মদের মহানন্দে চলিল ভোজন ॥ ৩১০ ॥
কিবা কথা প্রভুদের আরাধ্য সবার ।
বিরিঞ্চি-বাঞ্ছিত পদ সেব্য কমলার ॥ ৩১১ ॥
বিশ্বগুরু কল্পতরু বিধির বিধাতা ।
মহাসুখে চারি মুখে বন্দে যাঁরে ধাতা ॥ ৩১২ ॥
শমন কম্পিতকায় দুয়ারে প্রহরী ।
করজোড়ে দেবগণ কুবের-ভাণ্ডারী ॥ ৩১৩ ॥
আদ্যাশক্তি মহামায়া সৃষ্টির কারণ ।
সতত সতর্ক আজ্ঞা করিতে পালন ॥ ৩১৪ ॥
হেন দেব রামকৃষ্ণ প্রভু অবতার ।
বহুভাগ্যে ভবনে খবর নাহি তাঁর ॥ ৩১৫ ॥
দীনের ঠাকুর মোর পতিত-পাবন ।
উপবিষ্ট এক পাশে দীনের মতন ॥ ৩১৬ ॥
কাঙ্গাল-উদ্ধার যেন কাঙ্গালের বাড়া ।
অধরে অধর লগ্ন মুখে নাহি সাড়া ॥ ৩১৭ ॥
বসিয়া দেখেন ব্রাহ্মদের রঙ্গ-রীতি ।
পান-ভোজনেতে মত্ত অদ্ভুত
প্রকৃতি ॥ ৩১৮ ॥
অভুক্ত রাখিয়া তাঁরে সর্বাগ্রে আহার ।
অপরাধ যাহাদের এমন আচার ॥ ৩১৯ ॥
জীবহিতব্রত প্রভু করুণানিধান ।
জীবের মঙ্গলে যাঁর চিন্তা অবিরাম ॥ ৩২০ ॥
তাঁর
বিদ্যমানে হেন দোষের কারণ ।
কভু নহে কেন প্রভু পতিত-তারণ ॥ ৩২১ ॥
উচ্চকণ্ঠে
ফুকারিয়া লাগিলা ডাকিতে ।
ওগো আমি ক্ষুধাতুর দাও কিছু খেতে ॥ ৩২২ ॥
একবার দুইবার নহে বার বার ।
কেহ না উত্তর করে প্রভুরে আমার ॥ ৩২৩ ॥
সঙ্গেতে রাখালচন্দ্র গোপাল প্রভুর ।
ব্রাহ্মদের ব্যবহারে লজ্জিত প্রচুর ॥ ৩২৪ ॥
ধীরে ধীরে চুপে চুপে প্রভুদেবে কন ।
চল যাই ফিরে কেন ডাক অকারণ ॥ ৩২৫ ॥
রাখালে বলেন প্রভু জগৎ-গোসাঁই ।
জানি আমি গেঁটে তোর নাহি এক পাই ॥ ৩২৬ ॥
কেন তবে রোক কথা না পারি শুনিতে ।
অভুক্ত ফিরিলে হবে উপবাস রেতে ॥ ৩২৭ ॥
একবার আগেকার কথা স্মর মন ।
যে সময়ে শ্রীপ্রভুর সাধন-ভজন ॥ ৩২৮ ॥
মহারাগ-অনুরাগ ভাবের বিহ্বলে ।
মাস মাস অনাহারে কোথা গেছে চলে ॥ ৩২৯ ॥
আজি তাঁর একরাতি সহ্য নাহি হয় ।
প্রভুর দয়ার কথা কহিবার নয় ॥ ৩৩০ ॥
গৃহস্থের অমঙ্গল অভুক্ত ফিরিলে ।
ডাকিতে লাগিলা প্রভু পুনঃ উচ্চরোলে ॥ ৩৩১ ॥
ওগো আমি এত ডাকি না পাও শুনিতে ।
বড়ই পেয়েছে ক্ষুধা দাও কিছু খেতে ॥ ৩৩২ ॥
এবার গুনিয়া কথা কোন ব্রাহ্ম ভাই ।
প্রভুরে করিয়া দিল ভোজনের ঠাঁই ॥ ৩৩৩ ॥
ভোজনের ঠাঁই অতি কদাকার স্থান ।
কাছে এত জুতা যেন জুতার দোকান ॥ ৩৩৪ ॥
পাতায় পড়িল লুচি যেমন তেমন ।
জনৈক স্ত্রীলোক দিল আনিয়া ব্যঞ্জন ॥ ৩৩৫ ॥
অপবিত্র অঙ্গ তার অন্তর অশুচি ।
ব্যজনে প্রভুর আর হইল না রুচি ॥ ৩৩৬ ॥
লবন-সংযোগে লুচি একআধখানি ।
খাইয়া পরম তৃপ্ত প্রভু গুণমণি ॥ ৩৩৭ ॥
নানাস্থানে শ্রীপ্রভুর নানাবিধ ধারা ।
কারণ বুঝিতে গেলে হয় বুদ্ধি হারা ॥ ৩৩৮
॥
কোন স্থানে অগ্রভাগ অন্য জনে দিলে ।
তাহাতে ভোজন শ্রীপ্রভুর নাহি চলে ॥ ৩৩৯ ॥
পরভাগে এইখানে প্রভুর আহার ।
কখন কেমন প্রভু বুঝা অতি ভার ॥ ৩৪০ ॥
কব দুই-এক কথা কর অবধান ।
একদিন প্রভু-ভক্তবর দত্ত রাম ॥ ৩৪১ ॥
সঙ্গেতে সুরেন্দ্র মিত্র শ্রীমনোমোহন ।
দরশনে শ্রীপ্রভুর করেন গমন ॥ ৩৪২ ॥
অশাস্ত্রীয় রিক্ত হস্তে গুরুদরশন ।
ভোজ্যদ্রব্য সেহেতু একান্ত প্রয়োজন ॥ ৩৪৩ ॥
জিলাপি প্রভুর প্রিয় বিচারিয়া মনে ।
কিনিলেন এক ঠোঙ্গা মোদক-দোকানে ॥ ৩৪৪ ॥
ভাড়াটিয়া ঘোড়ার গাড়িতে আগমন ।
সেই কালে ভক্তত্রয় করে আরোহণ ॥ ৩৪৫ ॥
জনৈক অনাথ শিশু পাইল দেখিতে ।
ঠোঙ্গাভরা জিলাপি রামের আছে হাতে ॥ ৩৪৬ ॥
শিশুর স্বভাব যেন লোলুপ হইয়া ।
গাড়ির পশ্চাৎ ধায় জিলাপি মাগিয়া ॥ ৩৪৭ ॥
রাম বুঝিলেন মনে ভক্তির উচ্ছ্বাসে ।
এই খেলা শ্রীপ্রভুর বালকের বেশে ॥ ৩৪৮ ॥
সেহেতু জিলাপি লয়ে করিয়া আদর ।
বালকের হাতে দিল প্রসারিয়া কর ॥ ৩৪৯ ॥
এতেক হইল কাণ্ড পথের মাঝারে ।
যথাকালে উত্তরিল দক্ষিণশহরে ॥ ৩৫০ ॥
দেখিলেন প্রভুদেব অখিলের রাজ ।
নিজ ভাবে শ্রীমন্দিরে করেন বিরাজ ॥ ৩৫১ ॥
স্বভাবতঃ যেইমত কথোপকথন ।
সেমতে সময় গত হয় কিছুক্ষণ ॥ ৩৫২ ॥
শিশুসম শ্রীপ্রভুর আছে যেন ধারা ।
মাঝে মাঝে টুকটুক জল পান করা ॥ ৩৫৩ ॥
হইলে সময় প্রভু বলিলা আপনি ।
হইয়াছে ক্ষুধা মোরে দেহ কিছু আন ॥ ৩৫৪ ॥
এত শুনি খুশী বড় ভক্ত দত্ত রাম ।
থুইলা জিলাপিগুলি প্রভু-বিদ্যমান ॥ ৩৫৫ ॥
কিবা বুঝি কিবা ভাব হইল প্রভুর ।
বাম হাতে জিলাপি ভাঙ্গিয়া কৈলা চুর ॥ ৩৫৬ ॥
ভোজন দূরের কথা না লইলা বাস ।
শ্রীঅঙ্গে কিঞ্চিৎ ভাবাবেশের আভাস ॥ ৩৫৭ ॥
পাখালি দক্ষিণেতর কর পরমেশ ।
শ্যামার মন্দিরে গিয়া করিলা প্রবেশ ॥ ৩৫৮ ॥
ঝটিতি আইলা প্রভু আপন মন্দিরে ।
কি ভাবে থাকেন প্রভু কে বুঝিতে পারে ॥ ৩৫৯ ॥
রামের অন্তরে দুঃখ না যায় বর্ণন ।
শ্রীপ্রভুর হইল না জিলাপি-ভোজন ॥ ৩৬০ ॥
কোন কথা নাহি আর প্রভুর বদনে ।
স্বধামে আইলা রাম ফিরিয়া সে দিনে ॥ ৩৬১ ॥
দহিছে হৃদয় খেদে নিরানন্দ অতি ।
প্রবল আহুতি স্মৃতি দেয় দিবা রাতি ॥ ৩৬২ ॥
পর দরশনে যবে দক্ষিণশহরে ।
অধিক না হয় দেরি চারি দিন পরে ॥ ৩৬৩ ॥
নিজ মনে প্রভুদেব লাগিলা কহিতে ।
অগ্রভাগ দিলে অন্যে না পারি খাইতে ॥ ৩৬৪ ॥
আর দিন শুন কথা বিস্ময় ব্যাপার ।
কৃষ্ণানুরাগিণী গৌরমাতা নাম যাঁর ॥ ৩৬৫ ॥
বলরাম বসুর আবাসে এবে বাস ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে অপার উল্লাস ॥ ৩৬৬ ॥
মাঝে মাঝে দক্ষিণশহরে হয় গতি ।
ভোজ্যদ্রব্য নানাবিধ লইয়া সংহতি ॥ ৩৬৭ ॥
দারুময় জগন্নাথ বসুর ভবনে ।
ভোগরাগ নিতি নিতি করয়ে ব্রাহ্মণে ॥ ৩৬৮ ॥
একদিন গৌরমাতা ভোগের কারণ ।
করিলেন নানান দ্রব্যের আয়োজন ॥ ৩৬৯ ॥
অপর উদ্দেশ্য নয় মনে মনে সাধ ।
প্রভু-দরশনে যাবে লইয়া প্রসাদ ॥ ৩৭০ ॥
প্রসাদে বড়ই তুষ্ট প্রভু নারায়ণ ।
স্নানান্তে প্রসাদ অগ্রে পশ্চাৎ ভোজন ॥ ৩৭১ ॥
আজিকার প্রসাদে ঘটিল বৈলক্ষণ ।
কিবা বুঝি গৌর মার কি হইল মন ॥ ৩৭২ ॥
প্রসাদের অগ্রভাগ অন্যে খাওয়াইয়া ।
বাদ বাকি বাঁধিলেন প্রভুর লাগিয়া ॥ ৩৭৩ ॥
উতরিয়া যথাকালে দক্ষিণশহরে ।
ভোজ্য সহ যখন প্রবেশে শ্রীমন্দিরে ॥ ৩৭৪ ॥
লাগিল এমতি প্রভুদেবের নাসায় ।
অতি কটু দুর্গন্ধ মন্দিরে থাকা দায় ॥ ৩৭৫ ॥
কি ভাবে কখন প্রভু কে বুঝিতে পারে ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভক্তি সহকারে ॥ ৩৭৬ ॥
আগে কহিয়াছি ভক্ত যোগীন্দ্রের নাম ।
দক্ষিণশহরে বাস পিতা ধনবান ॥ ৩৭৭ ॥
নিত্যযুক্ত প্রখর বিরাগ ভরা মনে ।
হলাহলসম বোধ কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৩৭৮ ॥
শ্রীপদপঙ্কজে এবে মজিয়াছে মন ।
বড় খুশী প্রভুর নিকটে যতক্ষণ ॥ ৩৭৯ ॥
পুরীতে চাকরি কর্মে দাসী এক জনা ।
শ্রীপ্রভুর শ্রীমন্দির করিত মার্জনা ॥ ৩৮০ ॥
বুদ্ধিহীনা ক্ষুদ্রমতি কর্মফল গুণে ।
দিন দিন যোগীন্দ্রে কহয়ে সংগোপনে ॥ ৩৮১ ॥
ভিতরে প্রভুর ভাব সংসারীর ধারা ।
পুরীতে করেন বাস সঙ্গে আছে দারা ॥ ৩৮২ ॥
এ সময় গুরুমাতা দক্ষিণশহরে ।
বাস করিছেন হেথা পুরীর ভিতরে ॥ ৩৮৩ ॥
যেমন তাঁহার রীতি অতি সংগোপনে ।
নহবতখানায় স্বতন্ত্র নিকেতনে ॥ ৩৮৪ ॥
প্রভুর মন্দির হতে অনতি অন্তর ।
কত লোক আসে কেহ জানে না খবর ॥ ৩৮৫ ॥
সন্দেহ উদয় বড় যোগীন্দ্রের মনে ।
রিত মতি ভক্তিহীনা দাসীর বচনে ॥ ৩৮৬ ॥
একদিন নিশামণি বিস্তারি কিরণ ।
করিয়াছে ত্রিযামারে দিনের মতন ॥ ৩৮৭ ॥
তৃণ কুটি যথা যেটি কিছু নাহি ঢাকা ।
চারিদিকে আলোময় সব যায় দেখা ॥ ৩৮৮ ॥
উর্ধ্বগতি রাতি প্রায় অর্ধেকের পার ।
শয্যায় প্রকৃতিদেবী সুষুপ্তি-সঞ্চার ॥ ৩৮৯ ॥
শব্দ নাই ঝিমঝিম চলিছে যামিনী ।
হেনকালে মলভূমে যান গুণমণি ॥ ৩৯০ ॥
মায়ের আশ্রম যেই দিকে পথ তাঁর ।
যোগীন্দ্রের মনে মনে সন্দেহ অপার ॥ ৩৯১ ॥
অলক্ষ্যে পশ্চাৎ ভাগে ধীরে ধীরে যায় ।
জানিতে প্রভুর এবে গমন কোথায় ॥ ৩৯২ ॥
দেখিলে শ্রীযোগীন্দ্র প্রভু নারায়ণ ।
এড়াইয়া চলিলেন মায়ের আশ্রম ॥ ৩৯৩ ॥
বাহির দুয়ারে মাতা জগৎ-জননী ।
সমাধিতে বসিয়া আছেন একাকিনী ॥ ৩৯৪ ॥
প্রকাশ্য বদন আবরণ নাহি তায় ।
চন্দ্র সূর্য পবনে যা দেখিতে না পায় ॥ ৩৯৫ ॥
যে ভাবে আছেন মাতা প্রত্যাকৃতি তাঁর ।
জানি না আঁকিতে শক্তি জগতে কাহার ॥ ৩৯৬ ॥
লজ্জা-পরিপূর্ণ দেহে মোটে নাহি মন ।
বিশ্বহিত-ধিয়ানে যেমন নিমগন ॥ ৩৯৭ ॥
ফিরিলেন অবিলম্বে প্রভুদেবরায় ।
পায়ে চটি জুতা ফুট ফুট শব্দ তায় ॥ ৩৯৮ ॥
কোন দিকে কোন লক্ষ্য নাহি একবারে ।
উপনীত বরাবর নিজের মন্দিরে ॥ ৩৯৯ ॥
ক্ষণেকের ব্যাপার করিয়া নিরীক্ষণ ।
যোগীন্দ্রের যাবতীয় সন্দেহ-মোচন ॥ ৪০০ ॥
নিত্যমুক্ত ভক্তবর সন্দেহের স্থলে ।
পাইনা অচলা ভক্তি দুঁহু পদতলে ॥ ৪০১ ॥
অগণ্য প্রভুর ভক্ত রহে নানা ঠাঁই ।
কার সঙ্গে কিবা রঙ্গ করেন গোসাঁই ॥ ৪০২ ॥
সাধ্য নাই বলিবার তিল আধখানি ।
সাগর-সমান লীলা আমি ক্ষুদ্র প্রাণী ॥ ৪০৩ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তমুখে শুনা যতদূর ।
কহি শুন লীলা-কথা শ্রবণ-মধুর ॥ ৪০৪ ॥
প্রভুর শরণাপন্ন ভক্ত একজন ।
গুণবান পণ্ডিত শহরে নিকেতন ॥ ৪০৫ ॥
সুবর্ণবণিক জেতে মহাভাগ্যধর ।
উপাধি তাঁহার সেন নাম শ্রীঅধর ॥ ৪০৬ ॥
হাকিমী চাকরি করে কোম্পানির ঘরে ।
সরলস্বভাব সবে সমাদর করে ॥ ৪০৭ ॥
দেবভাষা সংস্কৃত বিশেষিয়া জানা ।
বিদ্যার স্বভাব যেন অন্তরে গরিমা ॥ ৪০৮ ॥
নিরক্ষর প্রভুদেব গিয়ান তাঁহার ।
অবিদিত দেবভাষা বিদ্যার ভাণ্ডার ॥ ৪০৯ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব অখিলের রাজ ।
সর্বভূতে বিধিমতে করেন বিরাজ ॥ ৪১০ ॥
পশু-পাখী ক্ষুদ্র কীট ভূচর খেচর ।
দেব কি দানব দৈত্য গন্ধর্ব কিন্নর ॥ ৪১১ ॥
সৃষ্টির মধ্যেতে করে বাস যে যথায় ।
অতি উর্ধ্বলোকে কিবা পাতাল-তলায় ॥ ৪১২ ॥
কি ভাষায় কয় কথা কিবা কার সনে ।
স্পষ্ট কি অপরিস্ফুট ইঙ্গিত বচনে ॥ ৪১৩ ॥
সকল বুঝেন প্রভু মঙ্গলনিধান ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু বিভু ভগবান ॥ ৪১৪ ॥
অদ্যাপি বিশ্বাস হেন অধরের নাই ।
শুন কি করিলা রঙ্গ জগত-গোসাঁই ॥ ৪১৫ ॥
শ্রীমহিম চক্রবর্তী কাশীপুরে ঘর ।
জমিদার তদুপরি পণ্ডিত প্রবর ॥ ৪১৬ ॥
শাস্ত্রালাপে অনুরাগ নানা শাস্ত্র পড়ে ।
রাখিয়া পণ্ডিত এক আপনার ঘরে ॥ ৪১৭ ॥
একদিন অধর তথায় উপনীত ।
যে সময়ে তন্ত্রপাঠ করেন পণ্ডিত ॥ ৪১৮ ॥
যেন তাঁহাদের ধারা ব্যাখ্যা সহকারে ।
ব্যাখ্যায় অধরচন্দ্র প্রতিবাদ করে ॥ ৪১৯ ॥
মহিম তাহাতে কৈল অন্যবিধ মানে ।
এইরূপে বিবাদে পড়িল তিন জনে ॥ ৪২০ ॥
কেহ নহে ন্যূন বলে সমান সোসর ।
নিজ পক্ষসমর্থনে বাক্যের সমর ॥ ৪২১ ॥
মীমাংসার হেতু সবে সেই ক্ষণে ছুটে ।
দক্ষিণশহরে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে ॥ ৪২২ ॥
আপনা অন্তরে হেথা প্রভু গুণমণি ।
সুবিদিত আদ্যোপান্ত যাবৎ কাহিনী ॥ ৪২৩ ॥
প্রভুরে জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করিবার পূবে ।
আপনি করেন ব্যাখা আপনার ভাবে ॥ ৪২৪ ॥
অবাক হইয়া শুনে দ্বন্দ্বী তিন জন ।
সে অংশে প্রভুর ব্যাখ্যা চতুর্থ রকম ॥ ৪২৫ ॥
প্রাণে প্রাণে সেই অর্থ পশিল সবার ।
ফুটিল আলোক গেল গরিমা বিদ্যার ॥ ৪২৬ ॥
অধরের মহাভ্রান্তি একেবারে দূর ।
চৌগুণ বিশ্বাস বাড়ে চরণে প্রভুর ॥ ৪২৭ ॥
অধর প্রভুর এক অন্তরঙ্গ জন ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা লীলার কারণ ॥ ৪২৮ ॥
বার বার মহোৎসব হৈল যার ঘরে ।
বেনিয়াটোলায় বাড়ি শহর ভিতরে ॥ ৪২৯ ॥
সুবর্ণবণিক জাতি সংসারী আচার ।
ইংরেজের আদালতে পদ ম্যাজিস্টর ॥ ৪৩০ ॥
নিরক্ষর প্রভুদেবে বুঝে যেই জনা ।
আঁখি সবে দুপুর বেলায় দিনে কানা ॥ ৪৩১ ॥
শুন কহি আর কথা কর অবধান ।
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভু মোর বিভু ভগবান ॥ ৪৩২ ॥
দিনেক ভকত বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
বেদপাঠ করেন শুনেন প্রভুরায় ॥ ৪৩৩ ॥
বর্ণাশুদ্ধি-হেতু পাঠাশুদ্ধি যেইখানে ।
অশনি-সমান লাগে শ্রীপ্রভুর কানে ॥ ৪৩৪ ॥
অসন্তোষে চীৎকার করেন গুণমণি ।
বেদপাঠ অশুদ্ধ ভক্তের মুখে শুনি ॥ ৪৩৫ ॥
তখনি থামেন তথা ভক্ত উপাধ্যায় ।
শুনিতে কি শুদ্ধ বাক্য কন প্রভুরায় ॥ ৪৩৬ ॥
নিজে নাহি কহি কথা প্রভু ভগবান ।
শুদ্ধ বাক্য পাঠকের বদনে বলান ॥ ৪৩৭ ॥
এই কি হইবে যবে কহে উপাধ্যায় ।
উল্লসিত হইয়া শ্রীপ্রভু দেন সায় ॥ ৪৩৮ ॥
প্রভুর মহিমা কথা কি কহিতে পারি ।
সংসারী সুমূর্খ তাহে জীব-বুদ্ধি ধরি ॥ ৪৩৯ ॥
ভক্তিমতী গৌরমার বাসনা অন্তরে ।
প্রভুদেব গোরারূপে নদীয়ানগরে ॥ ৪৪০ ॥
কি রঙ্গ করিয়াছিলা লয়ে ভক্তগণ ।
একবার বড় সাধ করি দরশন ॥ ৪৪১ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীপ্রভু গোসাঁই ।
ভক্তসনে খেলা বিনা অন্য কাজ নাই ॥ ৪৪২ ॥
পুরাতে ভক্তের বাঞ্ছা শ্রীপ্রভু আপনে ।
স্বতই পিরীতি তাঁর আপনার গুণে ॥ ৪৪৩ ॥
ভক্তপ্রাণ ভক্তপ্রিয় প্রভু পরমেশ ।
ভক্তের উপরে তাঁর করুণা অশেষ ॥ ৪৪৪ ॥
কেমনে করিলা বাঞ্ছাপূর্ণ গৌরমার ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ৪৪৫ ॥
কিছু দিন পরে রবিবারে একদিন ।
একত্রিত বহু ভক্ত নবীন প্রবীণ ॥ ৪৪৬ ॥
সেই দিন গৌরমাতা মায়ের মন্দিরে ।
রন্ধনশালায় রত ভকতির ভরে ॥ ৪৪৭ ॥
শ্রীপ্রভুর সেবা হেতু পরম যতন ।
খেচরান্ন ব্যঞ্জনাদি করেন রন্ধন ॥ ৪৪৮ ॥
মধ্যাহ্ন সময় এবে দিবা দু-প্রহর ।
উঠিয়াছে দিনমণি মাথার উপর ॥ ৪৪৯ ॥
এটি-ওটি রাঁধিতে এতেক হইল বেলা ।
শশব্যস্ত গৌরমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৪৫০ ॥
প্রভুর মন্দিরে করি ভোজন-আসন ।
ভোজ্যদ্রব্য আনিবারে করিল গমন ॥ ৪৫১ ॥
ভক্তগণ দরশন করেন বেড়িয়া ।
কেহ বা দণ্ডায়মান কেহ বা বসিয়া ॥ ৪৫২ ॥
আনন্দে পূর্ণিত হৃদি অন্তর খোলসা ।
জীবন-মুক্তির সম সকলের দশা ॥ ৪৫৩ ॥
সঙ্কল্প বিকল্প-ভাব মনের যেমন ।
সংসার-সুখের কাম কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৪৫৪ ॥
তিলেক
বিশ্রাম নাই সদা রেতে দিনে ।
সলিলে যেমন বিশ্ব পঙ্ক-বিলোড়নে ॥ ৪৫৫ ॥
ভক্তগণ যতক্ষণ প্রভুর নিকটে ।
মনের স্বভাব মনে আদতে না ফুটে ॥ ৪৫৬ ॥
চিত্তহর হেন রূপ প্রভু-অঙ্গে খেলে ।
চঞ্চল এমন মন সেও গেছে ভুলে ॥ ৪৫৭ ॥
সেহেতু জীবনমুক্ত রহে ভক্তগণ ।
মনোহর শ্রীপ্রভু কাছে যতক্ষণ ॥ ৪৫৮ ॥
সম্মুখে কেদারচন্দ্র চাটুয্যে উপাধি ।
ভক্তিপ্রেমে শ্রীপ্রভুর মগ্ন নিরবধি ॥ ৪৫৯ ॥
দেখিলেই প্রভুদেবে প্রায় বাক্যহারা ।
অবিরত বিগলিত দুনয়নে ধারা ॥ ৪৬০ ॥
ভাবেতে বিহ্বলহেতু এত চোখে পানি ।
জাহ্নবী যমুনা যেন নয়ন দুখানি ॥ ৪৬১ ॥
সন্নিকটে উপবিষ্ট প্রভুর আমার ।
শ্রীঅঙ্গেও কিছু কিছু ভাবের সঞ্চার ॥ ৪৬২ ॥
হেনকালে গৌরমাতা ভক্তি-অনুরাগে ।
থুইল ভোজন খাল শ্রীপ্রভুর আগে ॥ ৪৬৩ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব জগৎ-গোসাঁই ।
ভক্তের অধিক তাঁর আর কিছু নাই ॥ ৪৬৪ ॥
প্রাণসম ভক্তবর্গে একত্র দেখিয়া ।
অপার আনন্দে গেল উদর ভরিয়া ॥ ৪৬৫ ॥
দেখাইয়া গৌরমায় দেবীঠাকুরানী ।
বলিলেন কিছু তাঁর সংক্ষেপ কাহিনী ॥ ৪৬৬ ॥
শুনিয়া কেদারচন্দ্র মাতা সম্বোধিয়া ।
প্রণমিলা গৌরমায় শির নামাইয়া ॥ ৪৬৭ ॥
কেদারে করিতে মাই প্রতিনমস্কার ।
চারি চোখে দেখাদেখি হইল দোঁহার ॥ ৪৬৮ ॥
প্রেমাবেশে বিহ্বল কাঁদেন দুই জনে ।
আহা আহা বলেন শ্রীপ্রভু বদনে ॥ ৪৬৯ ॥
আপনে আপনি প্রভু হইয়া মগন ।
উঠিলেন পরিহরি নিজের আসন ॥ ৪৭০ ॥
কে আর আহার করে কেবা খায় ভাত ।
পাখলিয়া দিল ভক্তে অন্নমাখা হাত ॥ ৪৭১ ॥
কেহ দিল সম্মুখেতে তাম্বুল ধরিয়া ।
কেহ দিল হাতে হুঁকা তামাক সাজিয়া ॥ ৪৭২ ॥
ধরিয়া শ্রীহস্তে হুঁকা প্রভুদেবরায় ।
দাঁড়াইলা উত্তরদিকের বারাণ্ডায় ॥ ৪৭৩ ॥
যেইখানে বহু ভক্ত ছিল দাঁড়াইয়া ।
রঙ্গ দেখি শ্রীপ্রভুর অবাক হইয়া ॥ ৪৭৪ ॥
এখন শ্রীঅঙ্গে ভাব অতি মনোহর ।
সুন্দর হইতে দৃশ্য পরম সুন্দর ॥ ৪৭৫ ॥
আঁকিতে নাহিক শক্তি ভাবের চেহারা ।
আনন্দিত ভক্তবৃন্দ উন্মত্তের পারা ॥ ৪৭৬ ॥
ভাবেতে বিহ্বল বিষ্ণুভক্ত একজন ।
ভূমিতে পড়িল জড় যষ্টির যতন ॥ ৪৭৭ ॥
শ্রীমনোমোহন মিত্র উন্মত্তের প্রায় ।
হাসিয়া লুটিয়া পড়ে শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৪৭৮ ॥
আনন্দের বন্যা যেন হৃদি উথলিয়া ।
বদন দুয়ারে যায় বাহির হইয়া ॥ ৪৭৯ ॥
কাহার ভাবেতে অঙ্গ জড়ের মতন ।
কোথায় গিয়াছে মোটে দেহে নাই মন ॥ ৪৮০ ॥
কেহ অর্ধবক্র ঠিক ধনুকের প্রায় ।
কেহ বা পতিত ভূমে বাহ নাই গায় ॥ ৪৮১ ॥
কেহ বা ঢলিয়া অঙ্গে পড়য়ে কাহার ।
কেহ অনিমিখ আঁখি শবের আকার ॥ ৪৮২ ॥
নিকটে দণ্ডায়মান বুদ্ধি আলখাল ।
হাতেতে প্রভুর হুঁকা কাঁপেন রাখাল ॥ ৪৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-রঙ্গ নাহি যায় বলা ।
তিলেকে মন্দিরে হইল পাগলের মেলা ॥ ৪৮৪ ॥
আনন্দে উথলা হৃদি ভক্ত দত্ত রাম ।
উচ্চ নাদে গায় জয় রামকৃষ্ণনাম ॥ ৪৮৫ ॥
দশা দেখি সকলের প্রভু নারায়ণ ।
ভাব ভাঙ্গিবারে কৈলা অঙ্গ পরশন ॥ ৪৮৬ ॥
স্বভাবস্থ হয় সবে শ্রীহস্ত-পরশে ।
বলিবার নহে কথা ভাষা যায় ভেসে ॥ ৪৮৭ ॥
থালভরা প্রসাদ আছিল শ্রীমন্দিরে ।
ভক্তগণ খায় মহা আনন্দের ভরে ॥ ৪৮৮ ॥
প্রসাদে প্রসাদ জ্ঞান সমান সবার ।
একত্রে ভোজন নাই জাতির বিচার ॥ ৪৮৯ ॥
চতুর্থ খণ্ড
মহেন্দ্র মাস্টারের আগমন
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রঙ্গ দরশন-প্রিয় বালক যেমন ।
স্থানান্তরে নৃত্য গীত করয়ে শ্রবণ ॥ ১ ॥
অথবা খেলায় মত্ত অন্য শিশুসনে ।
তাত বাত বৃষ্টিপাত কিছুই না মানে ॥ ২ ॥
নাহি মনে কোথা মাতা কোথা রহে ঘর ।
যতক্ষণ নাহি জ্বলে ক্ষুধায় উদর ॥ ৩ ॥
শ্রীপ্রভুর তেমতি সংসারী ভক্তগণে ।
সংসারেতে ভ্রমণ করেন স্থানে স্থানে ॥ ৪ ॥
বিমোহিত হইয়া মায়ায় অনুক্ষণ ।
বিস্মরিয়া প্রভুদেবে সর্বস্ব রতন ॥ ৫ ॥
সাধারণ জন সম নাহিক চেতনা ।
যদবধি ত্রিতাপের না হয় তাড়না ॥ ৬ ॥
প্রবল ত্রিতাপানলে মহাকর্ম করে ।
দিশাহারা ভক্তগণে ফিরাইয়া ঘরে ॥ ৭ ॥
শুনিবে যদ্যপি তবে কর অবধান ।
মনোহর লীলা-তত্ত্ব মধুর আখ্যান ॥ ৮ ॥
সুন্দর সংসারী ভক্ত গুণের আধার ।
এইবারে উপনীত মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৯ ॥
বৈদ্য-কুলোদ্ভব গুপ্ত উপাধি তাঁহার ।
বয়স তিরিশ কিংবা কিছু তার পার ॥ ১০ ॥
কান্তিমাখা মুখখানি গঠন অতুল ।
যেন গরবেতে ফোটা গোলাপের ফুল ॥ ১১ ॥
পরিপাটি আঁখি দুটি ভাতি খেলে তায় ।
দীপ্তিমান বয়ানে পরম শোভা পায় ॥ ১২ ॥
মিষ্টিমাখা কোমলতা সর্বাঙ্গে বিরাজে ।
প্রকৃতি প্রকৃত যেন পুরুষের সাজে ॥ ১৩ ॥
গোউর বরনে দেহখানি শোভমান ।
মিষ্টকণ্ঠ বীণায় যেমন বাজে গান ॥ ১৪ ॥
রূপে কিংবা গুণে তাঁর নাহিক তুলনা ।
ইংরেজরাজের ভাষা বিশেষিয়া জানা ॥ ১৫ ॥
প্রখর গম্ভীর বুদ্ধি ঘটেতে বিরাজ ।
উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজ ॥ ১৬ ॥
শ'দরে আদরে মাসে মাসে মাহিয়ানা ।
শিক্ষক-শ্রেণীর মধ্যে গণ্য এক জনা ॥ ১৭ ॥
পরিচিত অনেকের আবাস শহরে ।
সংসারে অনেকগুলি বাস একত্তরে ॥ ১৮ ॥
সংসারের যেন রীতি সদা পরমাদ ।
পরস্পর অমিলন কলহ বিবাদ ॥ ১৯ ॥
এমন বিবাদ হয় একবার ঘরে ।
সাধ্য নহে এক তিল বাস তথা করে ॥ ২০ ॥
বড়ই অশান্তি মনে মাস্টার আপনি ।
রাত্রিকালে লয়ে সঙ্গে নন্দন নন্দিনী ॥ ২১ ॥
পরিহরি আপনার ভিটামাটি ঘর ।
চলিলা ভগিনী-বাড়ি বরাহনগর ॥ ২২ ॥
পরের আবাসে কার সুখ কোথা থাকে ।
তবে যে রহিলা খালি পড়িয়া বিপাকে ॥ ২৩ ॥
দিবারাতি দহে হৃদি শান্তির কারণ ।
বিকালে গঙ্গার কূলে করে বিচরণ ॥ ২৪ ॥
পরম আত্মীয় এক রহে সাথে সাথে ।
পরস্পরের কথাবার্তা কতই দোঁহাতে ॥ ২৫ ॥
একদিন বন্ধুবর কহিল তাঁহারে ।
দক্ষিণশহর গ্রাম অনতি অন্তরে ॥ ২৬ ॥
জাহ্নবীর তীরস্থিত মনোহর স্থান ।
সেইখানে আছে এক সুন্দর বাগান ॥ ২৭ ॥
পরিপাটি কালীবাটী তাহার ভিতরে ।
দরশনে প্রাণ মন মোহে একেবারে ॥ ২৮ ॥
জনৈক মহাত্মা তথা করিছেন বাস ।
সেইহেতু সেখানের গরিমা-প্রকাশ ॥ ২৯ ॥
সৎতত্ত্বালাপে তেঁহ মত্ত অনুক্ষণ ।
শুনিবারে কতই লোকের সমাগম ॥ ৩০ ॥
মন-বিমোহন মূর্তি আনন্দ আধার ।
এক মুখে মহিমা-কাহিনী কহা ভার ॥ ৩১ ॥
লোকেতে পরমহংস নামে তাঁরে কয় ।
শ্রীপ্রভুর এইমাত্র দিল পরিচয় ॥ ৩২ ॥
কানেতে পশিল যেন শ্রীপ্রভুর নাম ।
দেখিবারে অমনি অধীর হইল প্রাণ ॥ ৩৩ ॥
বন্ধুবরে বলিলেন মাস্টার অধীর ।
এইক্ষণে যাইবার দিন কর স্থির ॥ ৩৪ ॥
বিগত হইলে রাতি বন্ধুবর বলে ।
স্থিরতর যাইব যামিনী পোহাইলে ॥ ৩৫ ॥
বহুকষ্টে গেল রাতি অতি দীর্ঘতর ।
দিনমানে চলিলেন মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৩৬ ॥
ভুবনমোহন রূপ দেখিয়া প্রভুর ।
মনের অশান্তি যত সব গেল দূর ॥ ৩৭ ॥
নেহারিয়া ভক্তবরে প্রভুর আমার ।
অন্তরে বহিল জোরে সুখের জোয়ার ॥ ৩৮ ॥
লীলা-কাজে সাজা সাজ বাহ্যিক লক্ষণে ।
লুকায়ে রেখেছে তাঁয় সাধ্য কার চিনে ॥ ৩৯ ॥
অপরিচিতের মত প্রভুর জিজ্ঞাসা ।
নাম ধাম মাস্টারের কিবা কাজে আসা ॥ ৪০ ॥
সরল
বিনীত নম্র সদগুণাশ্রয় ।
ধীরে ধীরে মাস্টার দিলেন পরিচয় ॥ ৪১ ॥
মাস্টার নিজের তাঁয় বড় ভালবাসা ।
বিবাহ হয়েছে কি না দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ॥ ৪২ ॥
মৃদুস্বরে উত্তরে মাস্টার তাঁরে কয় ।
বহুদিন হইল হয়েছে পরিণয় ॥ ৪৩ ॥
তৃতীয় জিজ্ঞাসা প্রভু করিলেন পরে ।
বিদ্যা কি অবিদ্যা শক্তি বিয়া কৈলা যারে ॥ ৪৪ ॥
তাঁহার উত্তরে কন মাস্টার ধীমান ।
আমার বিদিত তেঁহ বড়ই অজ্ঞান ॥ ৪৫ ॥
প্রভুদেব মাস্টারের এই কথা শুনি ।
"তুমি বড় জ্ঞানবান” বলিলা অমনি ॥ ৪৬ ॥
শেষ বাক্য শ্রীপ্রভুর করিয়া শ্রবণ ।
পুনঃ আর মাস্টারের না সরে বচন ॥ ৪৭ ॥
কি জানি কি ভাবে মন ডুবিল তাঁহার ।
যাহাতে হইল বদ্ধ বাক্যের দুয়ার ॥ ৪৮ ॥
তীক্ষ্ণবুদ্ধি মাস্টারের হেন তেজ ধরে ।
অনায়াসে পশে গূঢ় তত্বের ভিতরে ॥ ৪৯ ॥
প্রখর অন্তর-দৃষ্টি সহকারে চলা ।
সাত চাল ভেবে তবে এক চাল চালা ॥ ৫০ ॥
মাস্টারের কথা মোরে যদি কেহ পুছে ।
উত্তর কেবল, আমি পশু তাঁর কাছে ॥ ৫১ ॥
পাইয়া স্বাতীর বারি ঝিনুক যেমন ।
গভীর অগাধ জলে হয় নিমগন ॥ ৫২ ॥
সেইমত ডুবিলেন মাস্টার এখানে ।
সহজে না ফুটে আর বচন বদনে ॥ ৫৩ ॥
অন্তরঙ্গ শ্রীপ্রভুর তাহার লক্ষণ ।
একবার দরশনে মুগ্ধ প্রাণ-মন ॥ ৫৪ ॥
বিশ্বাসের একটানা মহাবেগে ধায় ।
সেতু সন্দেহের গন্ধ না উঠিল তায় ॥ ৫৫ ॥
যেমন মাস্টার তার তেমতি ঘরণী ।
পাইলে চরণ-রজঃ মহাভাগ্য মানি ॥ ৫৬ ॥
ভক্তিমতী ভাগ্যবতী অতুল ভুবনে ।
মহাশক্তি সানুকূল যাঁহার স্মরণে ॥ ৫৭ ॥
আছে বহু ভক্তিমতী হেন কেহ নয় ।
জগৎ-জননী মাতা এতই সদয় ॥ ৫৮ ॥
অতি প্রিয় শ্রীপ্রভুর মাস্টার কেমন ।
ক্রমে ক্রমে পুঁখিতে পাইবে বিবরণ ॥ ৫৯ ॥
বিকাইয়া প্রাণ-মন প্রভুর চরণে ।
ফিরিলেন মাস্টার নিজের বাসস্থানে ॥ ৬০ ॥
প্রভুর অন্তরে হেথা আনন্দ না ধরে ।
অন্তরঙ্গ প্রিয়ভক্ত পাইয়া মাস্টারে ॥ ৬১ ॥
রাখাল নরেন্দ্র আদি যত ভক্তগণে ।
পাইয়া শ্রীপ্রভুদেব নিজ সন্নিধানে ॥ ৬২ ॥
জনে জনে বলিলেন মহোল্লাস মন ।
আদি অন্ত মাস্টারের যত বিবরণ ॥ ৬৩ ॥
এখানে মাস্টার ঘরে বড়ই চঞ্চল ।
পুনঃ প্রভু দরশনে বাসনা প্রবল ॥ ৬৪ ॥
ঘরে নাহি রহে মন উড়ু উড়ু করে ।
পরদিনে উপনীত প্রভুর গোচরে ॥ ৬৫ ॥
দেখিয়া তাঁহায় প্রভু ভক্তগণে কন ।
পুনরায় আজি আসিয়াছে সেই জন ॥ ৬৬ ॥
লুকাইয়া পা দুখানি ঢাকিয়া বসনে ।
বসিলা মাস্টার শ্রীপ্রভুর সন্নিধানে ॥ ৬৭ ॥
ভক্তমনোবিমোহন শ্রীপ্রভু আমার ।
খুলিয়া দিলেন তত্ত্বকথার ভাণ্ডার ॥ ৬৮ ॥
আপনার ভাবে প্রভু আপনে মোহিত ।
অবশেষে ধরিলেন সুমধুর গীত ॥ ৬৯ ॥
মোহনীয়া গানে ঝরে এতই মাধুরী ।
যাহাতে অজান্তে করে মন প্রাণ চুরি ॥ ৭০ ॥
যে শুনে যতই গান তত বাড়ে সাধ ।
ভাবে সুরে যুক্ত গীত মন-ধরা ফাঁদ ॥ ৭১ ॥
মাস্টারের মন-প্রাণ একেবারে হারা ।
দেহখানি লইয়া কেবল নাড়া-চাড়া ॥ ৭২ ॥
বাহিরে আইলা পরে ফিরিবারে ঘরে ।
যাই যাই চেষ্টা ঠাঁই ছাড়িতে না পারে ॥ ৭৩ ॥
কি দেখিনু কি শুনিনু তোলাপাড়া মনে ।
বিমোহিত বিচরণ করেন উদ্যানে ॥ ৭৪ ॥
সংগীত এতই দূর লাগিয়াছে মিঠে ।
পুনশ্চ শ্রবণে আশ যদি ভাগ্যে ঘটে ॥ ৭৫ ॥
প্রভুর নিকটে ধীরে ধীরে আর বার ।
উপনীত মুগ্ধমন মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৭৬ ॥
ভক্তিভাবে প্রভুদেবে কৈল অবধান ।
আজি কি হইবে আর আপনার গান ॥ ৭৭ ॥
এখানে হবে না আজি প্রভুর উত্তর ।
যাব কালি কলিকাতা শহর ভিতর ॥ ৭৮ ॥
বলরাম বসু এক তাঁহার ভবনে ।
বাগবাজারেতে বাস অনেকেই জানে ॥ ৭৯ ॥
শুনিতে পাইবে গীত যাইলে তথায় ।
এত শুনি লইলেন মাস্টার বিদায় ॥ ৮০ ॥
চরণ না চলে ঘরে ছাড়িয়া উদ্যান ।
পূর্ববৎ পুনরায় বাগানে বেড়ান ॥ ৮১ ॥
মনে মনে নানাবিধ করিয়া বিচার ।
প্রভুর নিকটে ফিরে আইল মাস্টার ॥ ৮২ ॥
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে যাইব কেমনে ।
জমিদার বলরাম বসুর ভবনে ॥ ৮৩ ॥
অভয়প্রদানে বলিলেন শ্রীগোসাঁই ।
দ্বারে প্রবেশিতে কোন ভয় বাধা নাই ॥ ৮৪ ॥
যথাকালে উপনীত হইলে তথায় ।
আপনি লইব আমি ডাকিয়া তোমায় ॥ ৮৫ ॥
পাইয়া অভয় এবে মাস্টার সজ্জন ।
সে দিনে ভবনে করিলেন আগমন ॥ ৮৬ ॥
যথা কথা মিলিলেন তার পরদিনে ।
মহাভক্ত বলরাম বসুর ভবনে ॥ ৮৭ ॥
অপূর্ব শ্রীপ্রভুদেবে হেরি বার বার ।
পাদপদ্মে মজিলেন মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৮৮ ॥
তন্ত্রমন্ত্র প্রভুবাক্য প্রভু ধ্যানজ্ঞান ।
শ্রুতিরুচিকর অতি প্রভুর আখ্যান ॥ ৮৯ ॥
প্রভু-সঙ্গ-সুখ-আশা চিত্তে নিরন্তর ।
কোথায় কখন প্রভু রাখেন খবর ॥ ৯০ ॥
কোথা কি করেন প্রভু কোথা কিবা কন ।
মত্তভাবে তত্ত্ব তার রাখা বিলক্ষণ ॥ ৯১ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত প্রত্যেক অক্ষর ।
বিশ্বাস গিয়ান বেদাপেক্ষা গুরুতর ॥ ৯২ ॥
অধর কপাট বন্ধ করিয়া আপনে ।
লিপিবদ্ধ করেন পরম সংগোপনে ॥ ৯৩ ॥
অতি প্রিয় শ্রীপ্রভুর অন্তরঙ্গ জন ।
ভাবে মুগ্ধাকৃতি ভক্ত প্রভুর বচন ॥ ৯৪ ॥
বিভূতির চাপরাস অঙ্গে আছে তাঁর ।
করিবারে শ্রীপ্রভুর মহিমা-প্রচার ॥ ৯৫ ॥
প্রভু-অবতারে তাঁর স্বভাব প্রকৃতি ।
বন্যহাত ধরা ভাব কুটুনিয়া হাতী ॥ ৯৬ ॥
অনেক আইল ভক্ত ধরিয়া তাঁহারে ।
লীলাপ্রিয় শ্রীপ্রভুর লীলার আসরে ॥ ৯৭ ॥
ক্রমে ক্রমে যথাসাধ্য কর সমাচার ।
ভক্ত-সংজোটন-লীলা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ৯৮ ॥
অদ্যাপি প্রভুর কাছে যত ভক্তগণ ।
কেহ নহে পুষ্ট এবে কেশব যেমন ॥ ৯৯ ॥
কিবা বস্তু প্রভুদেব অখিলের পতি ।
দরশনে পরশনে কি ধরে শকতি ॥ ১০০ ॥
ঈষৎ রক্তিমাধরদ্বয় বিলোড়নে ।
কি করে মধুর বাণী বিবিধ রকমে ॥ ১০১ ॥
কি নিগূঢ় তত্ত্বযুক্ত গভীরত্ব তার ।
কেশব কেবল উপযুক্ত বুঝিবার ॥ ১০২ ॥
সামান্য মানুষ নহে প্রভু-প্রিয় জনা ।
কর্মচারিভাবে অবতারে সঙ্গে আনা ॥ ১০৩ ॥
শুন কই কেশবের আত্মবিবরণ ।
ভক্ত-মুখে শুনা যেন প্রভুর বচন ॥ ১০৪ ॥
দিনেক শ্রীপ্রভু সুবেষ্টিত ভক্তগণে ।
কেশবের কন কথা কথা-উত্থাপনে ॥ ১০৫ ॥
একদিন গৃহমধ্যে দ্বার আছে আঁটা ।
হঠাৎ দেখিনু এক জ্যোতির্ময় ছটা ॥ ১০৬ ॥
আলো করে গোটা ঘর এমন উজ্জ্বল ।
অণু পরমাণু তথা প্রত্যক্ষ সকল ॥ ১০৭ ॥
দিয়ালের মধ্য দিয়া হয় দৃশ্যমান ।
বাহিরিল দেবী এক সুন্দর নির্মাণ ॥ ১০৮ ॥
পরে সেই জ্যোতিঃ করে ঘর আলোকিত ।
ক্রমশঃ হইতে থাকে অতি ঘনীভূত ॥ ১০৯ ॥
আকারেতে পরিণত অবশেষে হয় ।
সে আকার কেশবের অন্য কার নয় ॥ ১১০ ॥
দেখিয়া আমার মধ্যে হইল কেমন ।
এ অঙ্গ হইতে হৈল শিখা-নির্গমন ॥ ১১১ ॥
উজ্জ্বল সে সাদা শিখা পলকের ভরে ।
প্রবেশিল কেশবের দেহের ভিতরে ॥ ১১২ ॥
বুঝহ আপন মনে লীলার বারতা ।
ভক্তসহ শ্রীপ্রভুর অপরূপ কথা ॥ ১১৩ ॥
ভক্তের ভিতরে নিজে হয়ে অধিষ্ঠান ।
লীলারস-আস্বাদ করেন ভগবান ॥ ১১৫ ॥
মানুষ চামের থলি পঞ্চভূতে গড়া ।
বিকট কাঠামখানি হাড়ে মাংসে খাড়া ॥ ১১৬ ॥
ভিতরেতে নাড়ি ভুঁড়ি রক্ত মৃত মল ।
কফ পিত্ত এই মাত্র সম্পত্তি সম্বল ॥ ১১৭ ॥
তবে যে এমন দেহস্থিত রসনায় ।
সৎ শুদ্ধ পবিত্র প্রভুর গুণ গায় ॥ ১১৮ ॥
ইহার কারণ অন্য কিছু নহে আর ।
একমাত্র হরিভক্তি হৃদয়ে সঞ্চার ॥ ১১৯ ॥
লীলা-গ্রন্থে চিরকাল দেখহ প্রকাশ ।
হরির কৃপায় মিলে হরির আভাস ॥ ১২০ ॥
ভক্তিদানে ভক্তে দেন নিজের বারতা ।
দুগ্ধে যেন দেয় গাভী গাভীর মমতা ॥ ১২১ ॥
পিয়ে ক্ষীর মহাবীর কেশব যেমন ।
পরম সাদরে করে প্রভুর যতন ॥ ১২২ ॥
যতনের অনুরাগে জগতে জানায় ।
কত ভক্তি কেশবের শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১২৩ ॥
শুনিয়া তাঁহার কথা ঘৃণা ধরে প্রাণে ।
কোটি কোটি দণ্ডবৎ কেশব-চরণে ॥ ১২৪ ॥
ভক্তিভরে প্রভুদেব ভবনে নিজের ।
লয়ে যাওয়া প্রীতি সাধ ছিল কেশবের ॥ ১২৫ ॥
আনন্দমূরতি প্রভুদেবের আমার ।
উদয় যথায় তথায় আনন্দ-বাজার ॥ ১২৬ ॥
দলে দলে ব্রাহ্মগণ মত্ততর প্রায় ।
হৃষ্টমনে সমাগত শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ১২৭ ॥
লয়ে খোল করতাল সংকীর্তন করে ।
প্রভু-সঙ্গ-সুখে মগ্ন আনন্দের ভরে ॥ ১২৮ ॥
কহিয়াছি সংকীর্তনে কেমন গোসাঁই ।
বাজিলে মৃদঙ্গ খোল বাহ্য থাকে নাই ॥ ১২৯ ॥
দূরে থাক পরিধান-বাসের খবর ।
নাহি গ্রাহ্য আপনার অঙ্গ কলেবর ॥ ১৩০ ॥
সংকীর্তনে শ্রীপ্রভুর অপূর্ব নৃত্যন ।
ঘন ঘন সমাধিস্থ দেহ-ছাড়া মন ॥ ১৩১ ॥
লোকাতীত মহাভাব শাস্ত্রে যাহা শুনা ।
প্রত্যক্ষ দেখিতে করে সকলে বাসনা ॥ ১৩২ ॥
অনিমিখে যত লোকে করে নিরীক্ষণ ।
অপূর্ব প্রেমের ছবি মন বিমোহন ॥ ১৩৩ ॥
কেশবের তাহে মন নাহি রহে মোটে ।
শ্রীঅঙ্গ-রক্ষার হেতু সদা সন্নিকটে ॥ ১৩৪ ॥
বাহ্য নাই পড়িলে শ্রীঅঙ্গে হবে ব্যথা ।
সশঙ্কিত শ্রীকেশব শুধু সতর্কতা ॥ ১৩৫ ॥
মহাশ্রমে শ্রীঅঙ্গেতে যদি ঝরে ঘাম ।
প্রাণে লাগে কেশবের বাজের সমান ॥ ১৩৬ ॥
বসনে মুছান অঙ্গ পরান বিকল ।
পাখার বাতাসে করে শ্রীঅঙ্গ শীতল ॥ ১৩৭ ॥
শ্রীপ্রভুর কষ্ট তাঁর সহিত না প্রাণে ।
সংকীর্তনে নিবারণ প্রতি ক্ষণে ক্ষণে ॥ ১৩৮ ॥
প্রাণপণে শ্রম দূর চেষ্টা বারে বারে ।
বিজনে আনিয়া নিজে অঙ্গসেবা করে ॥ ১৩৯ ॥
ভক্তিমতী রত্নগর্ভা জননী তাঁহার ।
ভবনে যতনে করে সেবার যোগাড় ॥ ১৪০ ॥
খালে ভরা বেদানা আঙ্গুর মিঠা ফল ।
শিলেটের লেবু মিষ্টি সুশীতল জল ॥ ১৪১ ॥
স্বহস্তে কেশব নিজে বাছিয়া বাছিয়া ।
সাদরে শ্রীকরে দেন তুলিয়া তুলিয়া ॥ ১৪২ ॥
জলপানে অধরে যদ্যপি লাগে জল ।
বসনে মুছায়ে দেন বদনমণ্ডল ॥ ১৪৩ ॥
বিদায়ের কালে প্রভু হৈলে আগুসার ।
কেশবের কষ্টের নাহিক পারাপার ॥ ১৪৪ ॥
সদর দুয়ার যেথা ফটকের কাছে ।
বিষয় মলিন-মুখ ধায় পাছে পাছে ॥ ১৪৫ ॥
লইয়া শ্রীপদরজঃ ভকতির ভরে ।
প্রভুরে উঠায়ে দেন গাড়ির ভিতরে ॥ ১৪৬ ॥
প্রভুর পরম ভক্ত ব্রাহ্মশিরোমণি ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ১৪৭ ॥
ধার্মিক সাহেব যাঁরা রহে দূর দেশে ।
কেশবের সঙ্গে দেখা করিবারে আসে ॥ ১৪৮ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা বিশেষিয়া গায় ।
কাহারে লইয়া সঙ্গে দরশনে যায় ॥ ১৪৯ ॥
কখন-কাহার সঙ্গে কিবা খেলা হয় ।
পরে পরে বিবরিয়া বলিবার নয় ॥ ১৫০ ॥
শ্রীপ্রভুর কৃপায় যতেক দূর জানা ।
শুন মন একমনে করিব বর্ণনা ॥ ১৫১ ॥
একদিন ভক্তবর শ্রীমনোমোহন ।
গৃহী ভক্তদের মধ্যে গণ্য একজন ॥ ১৫২ ॥
সঙ্গেতে গিরীন্দ্র মিত্র সুরেন্দ্রের ভাই ।
তরীযোগে চলিছেন দেখিতে গোসাঁই ॥ ১৫৩ ॥
ব্রাহ্মভাব বলবৎ গিরীন্দ্রের মনে ।
সাকার ঈশ্বর কথা আদতে না মানে ॥ ১৫৪ ॥
ব্রাহ্মধর্মে মতি তাঁর কেশবের দলে ।
বদন বিকৃত হয় সাকার শুনিলে ॥ ১৫৫ ॥
তবে কেন প্রভুদেবে এতেক পিরীতি ।
সন্দেহ-ভঞ্জনে কই শুনহ ভারতী ॥ ১৫৬ ॥
রূপে গুণে প্রভুদেব ভুবনমোহন ।
বারেক দেখিলে কভু নহে বিস্মরণ ॥ ১৫৭ ॥
আপনার ঘরে মনে নাহি যায় রাখা ।
সৌন্দর্য শ্রীঅঙ্গময় এত ছিল মাখা ॥ ১৫৮ ॥
ভগবান-গিয়ানে কেহ না যায় কাছে ।
না দেখিলে মরে যেন দেখে তবে বাঁচে ॥ ১৫৯ ॥
প্রভুর এতেক স্নেহ ছিল সকলেরে ।
দিনেকে আপন যেবা ছিল বহু দূরে ॥ ১৬০ ॥
প্রেমময় দেহ তাঁর শুদ্ধ প্রেমে ভরা ।
প্রেমে মজে মত্ত লোক হয়ে আত্মহারা ॥ ১৬১ ॥
ভক্তদ্বয় অতিশয় পুলকিত মন ।
শ্রীমন্দিরে করিবারে প্রভু-দরশন ॥ ১৬২ ॥
প্রহরেক বেলা প্রায় আর নহে বেশী ।
যেথায় শ্রীপ্রভুদেব উতরিল আসি ॥ ১৬৩ ॥
আপন মন্দিরে হেথা প্রভুদেবরায় ।
পুলকে পুর্ণিত তনু দেখিয়া দোঁহায় ॥ ১৬৪ ॥
নিজ মনে মনোভাব বুঝিয়া দোঁহার ।
শুন কি করিলা খেলা শ্রীপ্রভু আমার ॥ ১৬৫ ॥
কথায় কথায় কহিলেন দুই জনে ।
বাসনা মাহেশে জগন্নাথ দরশনে ॥ ১৬৬ ॥
শ্রীমনোমোহন কন ঘাটে বাঁধা তরী ।
শ্রীপ্রভু বলেন তবে কেন আর দেরী ॥ ১৬৭ ॥
যেন কথা তেন কর্ম প্রভুর আমার ।
করিব বলিলে পরে রক্ষা নাই আর ॥ ১৬৮ ॥
ভ্রাতৃ-পুত্র রামলাল ভক্তদ্বয় সাথে ।
দ্রুতগতি চলে তরী অনুকূল বাতে ॥ ১৬৯ ॥
দেখিতে দেখিতে উতরিল যথাস্থানে ।
চলিলেন প্রভু জগন্নাথ-দরশনে ॥ ১৭০ ॥
নেহারিয়া জগন্নাথে ভাবাবেশ গায় ।
চলিতে চলিতে বলিলেন প্রভুরায় ॥ ১৭১ ॥
চলহ বল্লভপুরে বৃথা হর কাল ।
বিরাজেন যেইখানে দ্বাদশ-গোপাল ॥ ১৭২ ॥
দ্বাদশ গোপাল প্রভু করি দরশন ।
অন্নপূর্ণা দেখিতে অমনি হল মন ॥ ১৭৩ ॥
গঙ্গাতীরে রম্য পুরী অন্নপূর্ণা যেথা ।
স্থাপন করিলা রাসমণির দুহিতা ॥ ১৭৪ ॥
নাম তাঁর জগদম্বা মধুর গৃহিণী ।
ভক্তিমতী সেইরূপ যেমন জননী ॥ ১৭৫ ॥
বেলা দ্বিপ্রহর পার নাহিক ভোজন ।
তরীমধ্যে উঠিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ১৭৬ ॥
কেমন প্রভুর খেলা কহা নাহি যায় ।
চলে তরী ত্বরা করি প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৭৭ ॥
নামিয়া গঙ্গার ঘাটে প্রভু পরমেশ ।
ভাবাবেশে করিলেন পুরীতে প্রবেশ ॥ ১৭৮ ॥
আনন্দিত পুরীতে সকল লোকজন ।
নেহারিয়া প্রভুদেবে বঙ্কিম নয়ন ॥ ১৭৯ ॥
ত্বরান্বিতে সেবার করয়ে আয়োজন ।
অভুক্ত শ্রীপ্রভুদেব করিয়া শ্রবণ ॥ ১৮০ ॥
ভোজন-আসন করি নিরজন স্থানে ।
প্রভুদেবে যায় লয়ে পুরীর ব্রাহ্মণে ॥ ১৮১ ॥
হেথা এক দানা মুখে না উঠে প্রভুর ।
কারণ জিজ্ঞাসে তাঁরে হইয়া আতুর ॥ ১৮২ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন দেখ বাহিরেতে গিয়া ।
চাঁদ-মুখ বাছা তিন আছয়ে বসিয়া ॥ ১৮৩ ॥
গোটা দিন কাটে আছে সবে অনশনে ।
সেহেতু ভোজন মোর না উঠে বদনে ॥ ১৮৪ ॥
এত শুনি খালে ভোজ্য করিয়া যতন ।
উপনীত যেইখানে ভক্ত তিন জন ॥ ১৮৫ ॥
উদর পুরিয়া সেবা করেন সবাই ।
শুনিয়া দেখিয়া তুষ্ট হইলা গোসাঁই ॥ ১৮৬ ॥
সঙ্গে লয়ে ভক্তত্রয় কিছু তার পরে ।
তরীতে উঠিলা প্রভু ফিরিতে মন্দিরে ॥ ১৮৭ ॥
জলপথে নানাবিধ কথোপকথনে ।
হেনকালে পানিহাটি পড়িল নয়নে ॥ ১৮৮ ॥
করজোড়ে মস্তক নুয়ায়ে ভগবান ।
উদ্দেশেতে করিলেন গোউরে প্রণাম ॥ ১৮৯ ॥
তাহা দেখি শ্রীমনোমোহন হাস্য করে ।
হাসির কারণ প্রভু পুছিলা তাঁহারে ॥ ১৯০ ॥
কি হেতু করিলে হাস্য শ্রীমনোমোহন ।
বিশেষিয়া কহ বার্তা করিব শ্রবণ ॥ ১৯১ ॥
হাসিয়া হাসিয়া ভক্ত কহিলেন তাঁয় ।
প্রণাম করিলা যাঁরে সে হেথা কোথায় ॥ ১৯২ ॥
স্থান মাত্র আছে বস্তু নাই এইখানে ।
ইহাই বিশ্বাস মোর ষোল আনা মনে ॥ ১৯৩ ॥
পুনঃ তাঁরে বলিলেন শ্রীপ্রভু গোসাঁই ।
বল তবে কোথা আছে কোথা তিনি নাই ॥ ১৯৪ ॥
প্রত্যুত্তরে কহিলেন ভকত ধীমান ।
সর্বত্র সমানভাবে তাঁর অধিষ্ঠান ॥ ১৯৫ ॥
তাই যদি প্রভুদেব কহিলেন পরে ।
নাই কেন দেব-দেবী-মূর্তির ভিতরে ॥ ১৯৬ ॥
দেব কি দেবীর মূর্তি যেথা বিদ্যমান ।
সে নহে কখন এই সৃষ্টিছাড়া স্থান ॥ ১৯৭ ॥
পুনশ্চয় ভক্ত কয় প্রশ্নের উত্তর ।
সর্বময় তিনি যাঁর জ্ঞান স্থিরতর ॥ ১৯৮ ॥
সে কেন করিবে তবে শিরঃ অবনত ।
যেখা এক পাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ॥ ১৯৯ ॥
জগতে যেখানে যাহা আছে বর্তমান ।
সবে আছে তাঁর সত্তা সকল সমান ॥ ২০০ ॥
কোন এক বিশেষ মূর্তিতে তাঁর বাস ।
এ কথা হৃদয়ে মোর না হয় বিশ্বাস ॥ ২০১ ॥
প্রশংসা করিয়া ভক্তে প্রভু গুণমণি ।
বলিতে লাগিলা তত্ত্ব ভক্তিপ্রসবিনী ॥ ২০২ ॥
গুন গুন কহি ভক্তিতত্বের বারতা ।
সর্বত্রে সমান তিনি অতি সত্য কথা ॥ ২০৩ ॥
কিন্তু যেথা সে মূর্তিতে বহু ভক্ত জনা ।
ভক্তিভরে করে পূজা সেবা আরাধনা ॥ ২০৪ ॥
সেইখানে বিশেষিয়া তাঁর নিত্য পাট ।
উপমায় সেইরূপ পীঠ কালীঘাট ॥ ২০৫ ॥
নিরাকার বাষ্প যেন অতি ঠাণ্ডা বায় ।
জমিয়া কঠিন হয় প্রস্তরের প্রায় ॥ ২০৬ ॥
সেইমত ঠিক সর্বব্যাপী নারায়ণ ।
চিৎঘনরূপ হয় ভক্তের কারণ ॥ ২০৭ ॥
ভক্তির মহিমা কথা কি কব তোমাকে ।
তিনি তথা মূর্তিমান ভক্তে যেথা ডাকে ॥ ২০৮ ॥
তীর্থের মাহাত্ম্য তাই এত পরিমাণে ।
জাগরিত রহে তীর্থ ভক্ত-সমাগমে ॥ ২০৯ ॥
শত বর্ষ যে মূর্তিতে সেবা আরাধনা ।
সেই তীর্থ বিশেষ করিবে বিবেচনা ॥ ২১০ ॥
ঠিক যেন কালীঘাট ঝরণার প্রায় ।
অবিরত উঠে জল পিপাসুতে খায় ॥ ২১১ ॥
সর্বত্র সমানভাবে আছে ভগবান ।
অতি সত্য খুব সত্য না লাগে প্রমাণ ॥ ২১২ ॥
দেখ হিমালয় কোলে সুর-তরঙ্গিণী ।
জনমিয়ে যায় বয়ে পতিত-পাবনী ॥ ২১৩ ॥
এড়াইয়া কত শত দেশ-দেশান্তর ।
যেথায় মেদিনীবেড়া সুনীল সাগর ॥ ২১৪ ॥
পার কি কখন তুমি পান করিবারে ।
আগাগোড়া যত জল গঙ্গার গহ্বরে ॥ ২১৫ ॥
যদি তুমি
গঙ্গার মধ্যেতে কোন স্থলে ।
এক বিন্দু কর পান নামিয়া সলিলে ॥ ২১৬ ॥
তাহাই তোমার পক্ষে যথেষ্ট প্রচুর ।
পিপাসায় শান্ত প্রাণ কষ্ট হয় দূর ॥ ২১৭ ॥
আর সেও গঙ্গাজল অন্য কিছু নয় ।
মূর্তিতে করিতে হবে অবশ্য প্রত্যয় ॥ ২১৮ ॥
শক্তিমন্ত্র শ্রীপ্রভুর শ্রীমুখের বাণী ।
ধরয়ে অধিক বল মহামন্ত্র জিনি ॥ ২১৯ ॥
তখনি ঘুচিল সন্দ ছুটিল আঁধার ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ২২০ ॥
এঁড়েদের কোলে পাটবাড়ি পরিপাটি ।
গঙ্গার উপরে গ্রাম যেন পানিহাটি ॥ ২২১ ॥
সুবিদিত সাধারণে অতি রম্য ঠাঁই ।
মন্দিরে বিরাজে যেখা গোউর-নিতাই ॥ ২২২ ॥
দরশন করিতে প্রভুর হয় মন ।
মাঝি চালাইল তরী শ্রীআজ্ঞা যেমন ॥ ২২৩ ॥
যবে প্রভু উপনীত মন্দির-প্রাঙ্গণে ।
পাছু পাছু ধাবমান ভক্ত দুই জনে ॥ ২২৪ ॥
ভাবেতে আবেশ দেহ হইলা গোসাঁই ।
নেহারিয়া মূর্তিদ্বয় গোউর-নিতাই ॥ ২২৫ ॥
দুঁহু জনে কি করিলা শুনহ কাহিনী ।
সাষ্টাঙ্গ প্রণামসহ লুটায় অবনী ॥ ২২৬ ॥
পূর্বে এই দোঁহাকার না ছিল কখন ।
সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করি মূর্তি-দরশন ॥ ২২৭ ॥
ঝটিতি ব্যত্যয়-ভাব কেমন দোঁহার ।
প্রভুর মহিমা-কথা নহে বলিবার ॥ ২২৮ ॥
এইরূপ হয় রঙ্গ প্রতি ভক্তসনে ।
ভক্তিহীন কালে জীব-শিক্ষার কারণে ॥ ২২৯ ॥
দেখিতে বুঝিতে যদি সাধ থাকে মন ।
ভজ পূজ শ্রীপ্রভুর অভয়-চরণ ॥ ২৩০ ॥
দয়া কর প্রভুদেব অগতির গতি ।
অভয় চরণে যেন রহে রতি-মতি ॥ ২৩১ ॥
চতুর্থ খণ্ড
জনৈকা স্ত্রীলোকের বাঞ্ছাপূরণ
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভীম-দরশন ভব অকূল পাথার ।
ত্রিতাপ বাড়বানল জ্বলে অনিবার ॥ ১ ॥
নিবিড় আঁধারময় দৃষ্টি নাহি চলে ।
আতঙ্ক
ভরঙ্গাকুল অকূল সলিলে ॥ ২ ॥
পারাপারে যাইবারে অনন্যসম্বল ।
একমাত্র শ্রীপ্রভুর
চরণ কেবল ॥ ৩ ॥
আর পন্থা দেখাইলা প্রভু গুণমণি ।
যদ্যপি করেন কৃপা জগৎ-জননী ॥ ৪ ॥
অবতারে মাতৃরূপে ভকত-বৎসলা ।
শ্যামাসুতা গুরুমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৫ ॥
ভবব্যাধি-মহৌষধি করুণা তাঁহার ।
কৃপাদৃষ্টে ইষ্টসিদ্ধি নষ্ট ভব-ভার ॥ ৬ ॥
কহি
শুন সমাচার সাধ্য যতদূর ।
মহৎ মহিমা মার লীলা সুমধুর ॥ ৭ ॥
যেই বস্তু প্রভু সেই বস্তু মাতা ।
বিশ্বাসে রাখিও হৃদে অতি গুহ্য কথা ॥ ৮ ॥
একমাত্র কেবল প্রভেদ দৃষ্ট হয় ।
শ্রীপ্রভু সহজ যত মাতা তত নয় ॥ ৯ ॥
অপার করুণা বিনা কার সাধ্য ধরে ।
সেই আদ্যা মহাশক্তি মানবী আকারে ॥ ১০ ॥
অদ্যাপিহ প্রভুভক্ত অনেকের ভ্রম ।
যেমন শ্রীপ্রভুদেব মাতা তেন নন ॥ ১১ ॥
বলিলে না চলে কথা বলা মহাদায় ।
হৃদয়ে সন্দেহ মাত্র মায়ের মায়ায় ॥ ১২ ॥
রবির কিরণ কোথা মেঘজালে ঢাকে ।
কোথা বা উজ্জ্বলতম প্রবল আলোকে ॥ ১৩ ॥
অপার মহিমা-তত্ত্ব প্রত্যক্ষ যে সব ।
অন্তরে বাহিরে সদা হয় অনুভব ॥ ১৪ ॥
যুক্তি-তর্ক-কূটবুদ্ধি বিচারের পার ।
রসনায় নাহি পায় বাক্য বলিবার ॥ ১৫ ॥
গুরুমাতা বলিলে কি বুঝ তুমি মন ।
শুন শ্রীপ্রভুর সঙ্গে সম্বন্ধ কেমন ॥ ১৬ ॥
এক
বস্তু দুই রূপে ভিন্ন ভিন্ন দেহ ।
একাত্মা অভেদ নিত্য নাহিক সন্দেহ ॥ ১৭ ॥
প্রভু পিতা একরূপে মাতা অনুরূপ ।
স্বতন্ত্র আকার দুয়ে একের স্বরূপ ॥ ১৮ ॥
ভিতরেতে মিশামিশি যেন দুধে দুধে ।
ভেদ-বুদ্ধি ঘটে যার সেই পড়ে ফাঁদে ॥ ১৯ ॥
লীলায় অধিক বাদে তাহি যায় চেনা ।
আবরণ তুলে দেখ বুটের দুদানা ॥ ২০ ॥
একে হয়ে দুই ঠাঁই বিন্দু নহে দূর ।
সৃজিয়াছে মায়াশক্তি সৃষ্টির অঙ্কুর ॥ ২১ ॥
মায়াপারে একবস্তু দুটি ছটি নাই ।
গুরুমাতা সেই যিনি জগৎ-গোসাঁই ॥ ২২ ॥
প্রত্যক্ষ ঘটনা কথা শুন অতঃপর ।
আদ্যাশক্তি গুরুমাতা তাহার খবর ॥ ২৩ ॥
পুরীতে পুজারীবেশে কালীর সেবায় ।
নিয়োজিত যে সময় প্রভুদেবরায় ॥ ২৪ ॥
ভক্তিভরা আরাধনে তেমন পাষাণ ।
হইত চৈতন্তময়ী মায়ের সমান ॥ ২৫ ॥
প্রমাণে দেখিতে তুলা লইয়া নাসায় ।
ধরিতে ছলিত মন্দ নিঃশ্বাসের বায় ॥ ২৬ ॥
সেই প্রভু সেই ভাবে ভক্তিসহকারে ।
অঙ্গহীন কিছু নাই ষোড়শোপচারে ॥ ২৭ ॥
সাধনার নানাবিধ দ্রব্য যতগুলা ।
বেশ-ভূষা গোমুখাদি রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ২৮ ॥
রজতকাঞ্চনময় অলঙ্কারদাম ।
শেষে লিখে বিল্বপত্রে রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৯ ॥
এইসব দ্রব্যচয় করি এক ঠাঁই ।
মায়ের চরণে দিলা অঞ্জলি গোসাঁই ॥ ৩০ ॥
হেন পূজা শ্রীপ্রভুর নীরবে লইলা ।
শ্যামাসুতা গুরুমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৩১ ॥
কি বুঝ কি বুঝ মন শ্যামাসুতা মাকে ।
বিল্বপত্রে প্রভুদেব নিজ নাম লিখে ॥ ৩২ ॥
সমর্পণ করিয়া পুজিলা যাঁর পায় ।
কি গিয়ান কর মন হেন গুরুমায় ॥ ৩৩ ॥
লইতে প্রভুর পূজা সাধ্য হেন কার ।
বিনা সেই আদ্যাশক্তি সৃষ্টির আধার ॥ ৩৪ ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
এইবারে অবতারে ব্রাহ্মণনন্দিনী ॥ ৩৫ ॥
নিস্তারিণী বিপদবারিণী দুঃখহারা ।
হৃদয়বাসিনী হৃদি করুণায় ভরা ॥ ৩৬ ॥
চৈতন্তরূপিণী শিব-সিদ্ধি-প্রদায়িনী ।
কালাকাল-শূন্যা পূর্ণা জগত-ব্যাপিনী ॥ ৩৭ ॥
চৈতন্দ্রদায়িনী তন্ত্রমন্ত্রদেবাতীতা ।
মায়াস্বরূপিণী মহামায়ী মায়াবৃতা ॥ ৩৮ ॥
অনন্তরূপিণী তারা মহাশক্তিমতী ।
পিতামাতা দুই মাতা পুরুষ-প্রকৃতি ॥ ৩৯ ॥
মহালীলাবতী সতী সৃষ্টি-প্রসবিনী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥ ৪০ ॥
সন্তানে করহ রুপা করি শক্তিদান ।
মনেরে শুনাব রামকৃষ্ণ-লীলাগান ॥ ৪১ ॥
শুন গুন মন আজিকার ঘটনায় ।
আসিল রমণী এক শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ৪২ ॥
বিষণ্ণবদনা শোকে আকুল পরান ।
প্রভুদেবে সাধুভক্ত সন্ন্যাসী গিয়ান ॥ ৪৩ ॥
জনৈক আত্মীয় তার ভাবভ্রষ্ট হয়ে ।
সতভই ভ্রাম্যমাণ কুকাজে মাতিয়ে ॥ ৪৪ ॥
সুভাবে আনিতে সেই কদাচারী জনে ।
কিঞ্চিৎ ঔষধ মাগে শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ৪৫ ॥
সাধু কি সন্ন্যাসী ভক্ত ব্রহ্মচারী জনা ।
সকলের মহৌষধি আছে কত জানা ॥ ৪৬ ॥
দৈবশক্তিযুক্ত এই সাধারণী মত ।
দ্রষ্ট-নষ্ট-ব্যাধিগ্রস্ত-আরোগ্যর পথ ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে করি ঔষধের আশ ।
মনের বাসনা নারী করিল প্রকাশ ॥ ৪৮ ॥
শোকসন্তাপিত তেঁহ সরল-হৃদয়া ।
কৃপাময় শ্রীপ্রভুর উপজিল দয়া ॥ ৪৯ ॥
রঙ্গ করিবার তরে দেখাইলা তায় ।
নিকটে মন্দির মার বসতি যেথায় ॥ ৫০ ॥
দেখিতে পাইবে তথা নারী এক জনা ।
মনোমত মন্ত্রৌষধি আছে তাঁর জানা ॥ ৫১ ॥
পুরিবে বাসনা গিয়া জানাও তাঁহারে ।
আমি কিবা জানি তিনি আমার উপরে ॥ ৫২ ॥
শশব্যস্ত শোকগ্রস্ত চলিল রমণী ।
বিরাজেন যেইখানে জগৎ-জননী ॥ ৫৩ ॥
জীবে কি বুঝিবে লীলা অতি দুরগম ।
দিনমানে দরশনে দেবগণে ভ্রম ॥ ৫৪ ॥
লীলায় আঁধার বড় চেনা নাহি যায় ।
জীবেরে প্রচ্ছন্ন রাখে মোহিয়া মায়ায় ॥ ৫৫ ॥
শ্রীমন্দিরে উতরিয়া দেখিবারে পায় ।
জগত-জননী মাতা বসিয়া পূজায় ॥ ৫৬ ॥
প্রণমিয়া কহে তাঁয় যতেক খবর ।
প্রভুদেব পাঠাইলা তাঁহার গোচর ॥ ৫৭ ॥
রঙ্গ বুঝি শ্রীপ্রভুর বলিলা জননী ।
তিনি ঔষধজ্ঞ আমি কিছু নাহি জানি ॥ ৫৮ ॥
ত্বরা করি যাও ফিরি সান্নিধ্যে তাঁহার ।
পাইবে ঔষধ হবে রূপার সঞ্চার ॥ ৫৯ ॥
আজ্ঞামাত্র যায় নারী প্রভুর গোচরে ।
জননী কহিলা যাহা জানাইল তাঁরে ॥ ৬০ ॥
শুনিয়া মধুর আস্যে হাস্য সুমধুর ।
রঙ্গের তরঙ্গ বড় উঠিল প্রভুর ॥ ৬১ ॥
বিধিমতে বুঝাইয়া রমণীরে কন ।
বাসনা পুরিবে তথা হেথা অকারণ ॥ ৬২ ॥
যথা কথা ত্বরান্বিতা চলিলা রমণী ।
শ্রীমন্দিরে যেইখানে জগৎ-জননী ॥ ৬৩ ॥
বারত্রয় এইরূপে ফিরাফিরি পর ।
মায়ের হইল কৃপা নারীর উপর ॥ ৬৪ ॥
বিল্বপত্র দিয়া মাতা বলিলেন তাঁরে ।
বাসনা পুরিবে এই লয়ে যাও ঘরে ॥ ৬৫ ॥
দেবের দুর্লভ ধন লইয়া যতনে ।
আবাসে চলিল নারী আনন্দিত মনে ॥ ৬৬ ॥
মার সঙ্গে রঙ্গকথা বুঝ মনে মনে ।
রামকৃষ্ণলীলাকথা অমৃতকথন ॥ ৬৭ ॥
চতুর্থ খণ্ড
দেব্যাঃ স্তোত্রম্
প্রকৃতিং পরমামভয়াং
বরদাং
নররূপধরাং জনতাপহরাম্ ।
শরণাগতসেবকতোষকরীং
প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ॥ ১ ॥
গুণহীনসুতানপরাধযুতান্
কৃপয়াদ্য সমুদ্ধর মোহগতান্ ।
তরণীং ভবসাগরপারকরীং
প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ॥ ২ ॥
বিষয়ং কুসুমং
পরিহৃত্য সদা
চরণাম্বুরুহামৃতশাস্তিসুধাম্ ।
পিব ভৃঙ্গমনো ভবরোগহরাং
প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ॥ ৩ ॥
কৃপাং কুরু মহাদেবি
সুতেষু প্রণতেষু চ ।
চরণাশ্রয়দানেন কৃপাময়ী নমোঽস্তু তে ॥ ৪ ॥
লজ্জাপটাবৃতে নিত্যং
সারদে জ্ঞানদায়িকে ।
পাপেভ্যো নঃ সদা রক্ষ কৃপাময়ি নমোঽস্তু তে ॥ ৫ ॥
রামকৃষ্ণগতপ্রাণাং
তন্নামপ্রবণপ্রিয়াম্ ।
তদ্ভাবরঞ্জিতাকারাং প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ ॥ ৬ ॥
পবিত্রং চরিতং
যস্যাঃ পবিত্রং জীবনং তথা ।
পবিত্রতাস্বরূপিণ্যে তসৈ দেব্যৈ নমো নমঃ ॥ ৭ ॥
দেবীং প্রসন্নাং
প্রণতার্তিহন্ত্রীং
যোগীন্দ্রপূজ্যাং যুগধর্মপাত্রীম্ ।
তাং সারদাং ভক্তিবিজ্ঞানদাত্রীং
দয়াস্বরূপাং প্রণমামি নিত্যম্ ॥ ৮ ॥
স্নেহেন বধ্নাসি
মনোঽস্মদীয়ং
দোষানশেষান্ সগুণীকরোষি ।
অহেতুনা নো দয়সে সদোষান্
স্বাঙ্কে গৃহীত্বা যদিদং বিচিত্রম্ ॥ ৯ ॥
প্রসীদ মাতর্বিনয়েন
যাচে
নিত্যং ভব স্নেহবতী সুতেষু ।
প্রেমৈকবিন্দুং চিরদগ্ধচিত্তে
প্রদায় চিত্তং কুরু নঃ সুশাস্তম্ ॥ ১০ ॥
জননীং সারদাং দেবীং
রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম্ ।
পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ ॥ ১১ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে কথোপকথন
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শহরের মধ্যে স্থান বাদুড়বাগান ।
প্রসিদ্ধ পণ্ডিত তথা দেশজুড়ে নাম ॥ ১ ॥
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আখ্যায় ।
শ্রদ্ধাভক্তিসহকারে দশে গুণ গায় ॥ ২ ॥
বহুগুণে বিভূষিত দিব্য কলেবর ।
বিদ্যার সাগর যেন দয়ার সাগর ॥ ৩ ॥
স্বার্থশূন্য দয়া তাঁর অন্তরেতে ভরা ।
পরদুঃখবিমোচনে দেহখানি ধরা ॥ ৪ ॥
ঈশ্বর সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের জ্ঞান ।
চৈতন্যস্বরূপ নিরাকার ভগবান ॥ ৫ ॥
সাধনা বলিয়া নাই কোন কর্ম করা ।
স্বভাবসুলভ ধর্ম পরদুঃখহরা ॥ ৬ ॥
স্বার্থশূন্য শুদ্ধসত্ত্ব দয়াগুণ যায় ।
প্রভুর অপার কৃপা করুণা তাঁহায় ॥ ৭ ॥
সাক্ষীর স্বরূপ শম্ভু মল্লিক সজ্জন ।
বলিয়াছি বহু অগ্রে তাঁর বিবরণ ॥ ৮ ॥
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত এবে মুখুয্যে ঈশান ।
ঠনঠনিয়ায় যাঁর আবাসের স্থান ॥ ৯ ॥
তিন শতাধিক টাকা মাসে মাসে আয় ।
দরিদ্র অনাথে দিতে তাহে না কুলায় ॥ ১০ ॥
ফুরাইলে অর্থ করে পরান বিকলি ।
অবশেষে বাঁধা যায় গৃহিণীর রুলি ॥ ১১ ॥
পরদুঃখবিমোচন খ্যাতি সাধারণে ।
দুয়ারে দুঃখীর মেলা থাকে রেতে দিনে ॥ ১২ ॥
দয়ায় গঠিত হিয়া কোমল আচার ।
দিবারাতি চিন্তা কিসে পর-উপকার ॥ ১৩ ॥
দুর্গানামে অপার বিশ্বাস ভরা ঘটে ।
বড়ই আদর তাঁর প্রভুর নিকটে ॥ ১৪ ॥
বারে বারে ঈশানের ঘরে আগমন ।
করিলেন প্রভুদেব ভক্তবিনোদন ॥ ১৫ ॥
ঈশান নিজের জন টানাটানি প্রাণে ।
এ সম্বন্ধ নহে বিদ্যাসাগরের সনে ॥ ১৬ ॥
সঙ্কেতে বুঝহ সন্দ হয় যদি মন ।
নিরাকারবাদী বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণ ॥ ১৭ ॥
সাকার যাঁহার প্রাণে নাহি পায় স্থান ।
সে জনে কেমনে পাবে প্রভুর সন্ধান ॥ ১৮ ॥
সত্ত্বগুণী জনে তাঁর করুণা বিস্তর ।
তাই আজি যান প্রভু পণ্ডিতের ঘর ॥ ১৯ ॥
কৃতার্থ করিতে তাঁয় দিয়া দরশন ।
সঙ্গে চলে আত্মগণ ভক্ত কয়জন ॥ ২০ ॥
গতি মতি প্রভুপদে পিরীতি অপার ।
দলমধ্যে নেতা আজি মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ২১ ॥
যখন যেখানে যান প্রভু পরমেশ ।
প্রায় হয় পথিমধ্যে ভাবের আবেশ ॥ ২২ ॥
আজিও শ্রীঅঙ্গে ভাব হইল প্রভুর ।
বিদ্যাসাগরের ঘর নহে অতি দূর ॥ ২৩ ॥
কিছু পরে দুয়ারে শকট উপনীত ।
লইয়া চলিল তাঁরে যেথায় পণ্ডিত ॥ ২৪ ॥
সভক্তিতে শ্রদ্ধাচিত্তে আসন ছাড়িয়া ।
পণ্ডিত দণ্ডায়মান প্রভুরে দেখিয়া ॥ ২৫ ॥
করুণাসাগর তাঁয় করি নিরীক্ষণ ।
সমাধিস্থ মহাভাবে হইলা মগন ॥ ২৬ ॥
ভাঙ্গিলে ভাবের নেশা বাহ্য এলে পর ।
সমাসীন প্রভু দত্তাসনের উপর ॥ ২৭ ॥
পণ্ডিতে অপার কৃপা না যায় বর্ণনে ।
বুঝ লক্ষ কোটি গুণ এক বর্ণ শুনে ॥ ২৮ ॥
ভাবভঙ্গে শ্রীপ্রভুর রীতি আগাগোড়া ।
সামাজ শীতল জল কিছু পান করা ॥ ২৯ ॥
শিশুর সমান ভাব লজ্জা নাহি মোটে ।
তখনি বলেন তাই যাহা মনে উঠে ॥ ৩০ ॥
অকপটে বলিলেন প্রভু গুণমণি ।
পাইয়াছে পিপাসা পানীয় খাব আমি ॥ ৩১ ॥
পণ্ডিত শুনিয়া চলে বাড়ির ভিতর ।
ত্ব্বরা করি পাত্রে ভরি বিস্তর বিস্তর ॥ ৩২ ॥
বর্ধমান থেকে আনা ঘরে ছিল তাঁর ।
প্রসিদ্ধ মিঠাই মিষ্টি বড়ই সুতার ॥ ৩৩ ॥
শ্রদ্ধাসহ আনিলেন পণ্ডিতপ্রবর ।
তুষিবারে প্রভুবরে পরম ঈশ্বর ॥ ৩৪ ॥
গ্রহণ করিয়া ভোজ্য কৃপার লক্ষণ ।
পণ্ডিতের সঙ্গে হয় কথোপকথন ॥ ৩৫ ॥
প্রসাদ-বণ্টনকালে মাস্টারের হাতে ।
গুণব্যাখ্যা প্রভু তাঁর কৈলা বিধিমতে ॥ ৩৬ ॥
সুন্দর স্বভাবযুক্ত যুবক সজ্জন ।
দেখিতে প্রকৃত ফল্গুনদীর মতন ॥ ৩৭ ॥
বাহ্যিকে বালুকাবন বিশুষ্ক আকার ।
অদৃশ্য রসের স্রোত অন্তে অনিবার ॥ ৩৮ ॥
আরে মন কোটি কোটি দণ্ডবৎ তাঁয় ।
রতি মতি ভক্তি যাঁর শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৩৯ ॥
পণ্ডিতে সন্তাষে প্রভু রসের সাগর ।
এড়াইয়া খাল খানা বিস্তর বিস্তর ॥ ৪০ ॥
নদ নদী বিলা জলা ডোবা অগণন ।
ভাগ্যবলে হৈল আজি সাগরে মিলন ॥ ৪১ ॥
পণ্ডিত উত্তরে কন প্রভু গুণধরে ।
সাগরের লোনা জল লয়ে যান ঘরে ॥ ৪২ ॥
পণ্ডিতে পুনশ্চ শ্রীপ্রভুর প্রত্যুত্তর ।
লোনা কিসে নহে ইহা লবণসাগর ॥ ৪৩ ॥
অবিদ্যাসাগরে ধরে লবণের তার ।
ক্ষীরোদসাগর ইহা সাগর বিদ্যার ॥ ৪৪ ॥
কোমল-হৃদয় তুমি সত্ত্বগুণী জন ।
পরদুঃখনাশহেতু অর্থ-উপার্জ্জন ॥ ৪৫ ॥
সত্ত্বগুণে যদ্যপিহ রাজসের খেলা ।
স্বার্থশূন্য কর্মে নাই কর্মফলজ্বালা ॥ ৪৬ ॥
পালিলে দয়ার ধর্ম ভক্তি সহকারে ।
ক্রমশঃ লইয়া যায় ঈশ্বরের ঘরে ॥ ৪৭ ॥
দয়াতে হয়েছ তুমি কোমল নরম ।
অত্যুক্তি এ নহে তুমি সিদ্ধ একজন ॥ ৪৮ ॥
যেমন আগুনে সিদ্ধ করিলে পটল ।
আলু কি আনাজপাতি অন্য কোন ফল ॥ ৪৯ ॥
কোমল নরম হয় তাপ পেয়ে গায় ।
তোমায় করেছে তেন কোমল দয়ায় ॥ ৫০ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া এত প্রশংসা-কাহিনী ।
সবিনয়ে কহিল পণ্ডিতশিরোমণি ॥ ৫১ ॥
সত্য মানি সিদ্ধ আলু আনাজ পটল ।
স্বভাব ছাড়িয়া হয় অত্যন্ত কোমল ॥ ৫২ ॥
কিন্তু কলায়ের বাটা সিদ্ধ হলে পরে ।
নরম কোথায় অতি শক্ত গুণ ধরে ॥ ৫৩ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব অখিলের পতি ।
সুবিদিত যার যেন স্বভাব প্রকৃতি ॥ ৫৪ ॥
তুমি নহ তার জাতি স্বভাব সুন্দর ।
এই বলি দিয়া তাঁর কথার উত্তর ॥ ৫৫ ॥
বিশদে ভাঙ্গিয়া পরে কহেন গোসাঁই ।
তুমি নহ সে পণ্ডিত শাস্ত্রব্যবসাই ॥ ৫৬ ॥
উপমায় পঞ্জিকায় প্রকাশ সকল ।
অমুক সময়ে হবে এত আড়া জল ॥ ৫৭ ॥
কতই জলের কথা পঞ্জিকায় লেখা ।
নিঙ্গুড়িলে পাঁজি নাহি বিন্দু যায় দেখা ॥ ৫৮ ॥
সেইমত শাস্ত্রাধ্যায়ী পণ্ডিতের দল ।
বিজ্ঞান বেদান্ত ব্রহ্ম মুখেতে কেবল ॥ ৫৯ ॥
বাখানিছে যাঁর কথা সে বস্তু কেমন ।
আভাস না জানে বিনা দুই একজন ॥ ৬০ ॥
সেই বিদ্যা পরা বিদ্যা পরম সুন্দর ।
জানাইয়া দেয় যায় পরম ঈশ্বর ॥ ৬১ ॥
অন্যবিধ বিদ্যা যত স্মৃতি ব্যাকরণ ।
বিজ্ঞান পুরাণ ন্যায়শাস্ত্র অগণন ॥ ৬২ ॥
কোনই কাজের নয় নাহি তার সার ।
কেবল মনের মধ্যে জঞ্জালের ভার ॥ ৬৩ ॥
আগোটা গীতার পাঠে কিবা দরকার ।
বল দেখি মুখে গীতা মাত্র দশবার ॥ ৬৪ ॥
'গীতা' 'গীতা' উচ্চারণে 'ত্যাগী' 'ত্যাগী' হয় ।
গীতাপঠনের ফল তিয়াগ নিশ্চয় ॥ ৬৫ ॥
ধন-মান-যশ-আশা ইন্দ্রিয়ের সুখ ।
হইবে তিয়াগী জনে এ সবে বিমুখ ॥ ৬৬ ॥
সর্বসুখ পরিহার হরির কারণে ।
গীতার কেবল ইহা একমাত্র মানে ॥ ৬৭ ॥
হরিপদলাতে একা তিয়াগ সম্বল ।
গীতা অর্থে এক অর্থ তিয়াগ কেবল ॥ ৬৮ ॥
কায়মনে সকল করিবে পরিহার ।
প্রকৃত সন্ন্যাসী স্থানে ইচ্ছা হয় যার ॥ ৬৯ ॥
করিবে প্রত্যঙ্গে অঙ্গে কাজ সমুদায় ।
সমপিয়া কর্মফল শ্রীকৃষ্ণের পায় ॥ ৭০ ॥
প্রকৃত গৃহস্থ ত্যাগ রাখিবেন মনে ।
কর্মফল সমপিয়া ভক্তির কারণে ॥ ৭১ ॥
জীবগণে কহে গীতা সারার্থ ইহার ।
সর্বনাশি হরিপদ এক কর সার ॥ ৭২ ॥
যতনে হৃদয়ে ধরি বিবেক বিরাগ ।
কৃষ্ণের কারণে কর সকল তিয়াগ ॥ ৭৩ ॥
বুঝাইতে বিধিমতে তত্ত্ব উপমায় ।
দুজন সাধুর কথা কন প্রভুরায় ॥ ৭৪ ॥
শুন শুন ভক্তিতত্ব কেমন প্রভুর ।
একখানি পুঁথি ছিল জনৈক সাধুর ॥ ৭৫ ॥
কোন জন এক দিন জিজ্ঞাসিল তারে ।
কি পুঁথি কি আছে লেখা ইহার ভিতরে ॥ ৭৬ ॥
খুলিয়া সে পুঁথিখানি দেখাইল তায় ।
শুদ্ধ লেখা রামনাম প্রত্যেক পাতায় ॥ ৭৭ ॥
দ্বিতীয় সাধুর কথা আশ্চর্য কাহিনী ।
দাক্ষিণাত্যে যেইকালে গোরা গুণমণি ॥ ৭৮ ॥
দেখিলেন জনৈক পণ্ডিত কোনখানে ।
করিছেন গীতাপাঠ আপনার মনে ॥ ৭৯ ॥
সমাসীন পাশে তাঁর সাধু একজন ।
অবিরত করিতেছে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৮০ ॥
নাহি জানে লেখাপড়া নিরক্ষর বটে ।
বুঝিতে গীতার ভাষা শক্তি নাহি ঘটে ॥ ৮১ ॥
জিজ্ঞাসিন পরে তাঁরে কোন একজন ।
কহ তত্ত্ব কি বুঝিয়া করিছ ক্রন্দন ॥ ৮২ ॥
সবিনয়ে কহে সাধু হইয়া কাতর ।
সত্যই সত্যই আমি মূর্খ নিরক্ষর ॥ ৮৩ ॥
এক শব্দ বুঝিবারে শক্তি মোর নাই ।
কিন্তু গীতাপাঠকালে দেখিবারে পাই ॥ ৮৪ ॥
যেমন সুন্দর কৃষ্ণ ভুবনমোহন ।
পূততীর্থে কুরুক্ষেত্রে পুণ্যদরশন ॥ ৮৫ ॥
বলিছেন এই গীতা মধুর বচনে ।
তৃতীয় পাণ্ডব ভক্ত বান্ধব অর্জুনে ॥ ৮৬ ॥
যতক্ষণ শুনি আমি এই গীতাগীতি ।
আগাগোড়া দেখি কৃষ্ণ মোহনমূরতি ॥ ৮৭ ॥
আখ্যান কহিয়া বলিলেন প্রভুবর ।
পরাবিদ্যাপ্রাপ্ত এই সাধু নিরক্ষর ॥ ৮৮ ॥
সেই বিদ্যা যার বলে হয় দরশন ।
সকলের সার কৃষ্ণ তাঁহার চরণ ॥ ৮৯ ॥
সাকার-প্রসঙ্গে এই ভক্তির আখ্যান ।
ঈশ্বর পণ্ডিতে কন প্রভু ভগবান ॥ ৯০ ॥
প্রথমে সাকার কথা উত্থাপন কেনে ।
অর্থ তার পণ্ডিত সাকার নাহি মানে ॥ ৯১ ॥
পণ্ডিতের ভাব অগ্রে হয়েছে প্রকাশ ।
নিরাকারবাদী নাহি সাকারে বিশ্বাস ॥ ৯২ ॥
তবে যেন দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ৯৩ ॥
পরে ব্রহ্মতত্ব প্রভু লাগিলা কহিতে ।
ভাগ্যবান পুণ্যবান ঈশ্বর পণ্ডিতে ॥ ৯৪ ॥
বলিলেন প্রভুদেব অখিলের পতি ।
বলিতেছিলাম আমি বিদ্যার ভারতী ॥ ৯৫ ॥
বিদ্যায় লইয়া যায় ঈশ্বরের পথে ।
অবিদ্যা-তামস পথ না দেয় দেখিতে ॥ ৯৬ ॥
ব্রহ্ম ঠিক আবাসের ছাদের মতন ।
সংলগ্ন সোপানে হয় তথায় গমন ॥ ৯৭ ॥
ব্রহ্মে আগমন-পথ যে বিদ্যা উপায় ।
সেই বিদ্যা সর্ব উচ্চ সোপানের প্রায় ॥ ৯৮ ॥
উভয় অবিদ্যা বিদ্যা মায়ার ভিতরে ।
মায়ার অভীত তিনি ব্রহ্ম বলি যারে ॥ ৯৯ ॥
অনাসক্ত ব্রহ্ম নহে কাহার অধীন ।
ভালমন্দ উভয়েতে সম্বন্ধবিহীন ॥ ১০০ ॥
আলোর শিখার সম স্বভাব তাঁহার ।
যে যেমন বাসে করে তেন ব্যবহার ॥ ১০১ ॥
কেহ বা আলোতে পাঠ করে ভাগবত ।
কেহ পাপমতি ব্যক্তি লিখে জালখত ॥ ১০২ ॥
আর উপমায় ব্রহ্ম সাপের মতন ।
দশনের কসে ধরে গরল বিষম ॥ ১০৩ ॥
তাহায় হানি কি কষ্ট না হয় তাহার ।
অপরে দংশনে করে প্রাণের সংহার ॥ ১০৪ ॥
আর দেখ শোক দুঃখ পাপাদি নিচয় ।
মন্দ নামে জনে জানে যার পরিচয় ॥ ১০৫ ॥
সে সকল আমাদের জীবের সম্পত্তি ।
এখে নাহি লাগে তাঁর সর্ব-উচ্চে স্থিতি ॥ ১০৬ ॥
সৃষ্টিতে মন্দের বাস ব্রহ্মে নাহি ফুটে ।
সাপের যেমন বিষ সাপের নিকটে ॥ ১০৭ ॥
ব্রহ্মের স্বরূপ তত্ত্ব ব্রহ্মের বারতা ।
বলিতে সক্ষম জন সৃষ্টিমাঝে কোথা ॥ ১০৮ ॥
তন্ত্র মন্ত্র বেদান্ত পুরাণ বেদমালা ।
সুখবিনিঃসৃত সর্ব বদনেতে বলা ॥ ১০৯ ॥
তেকারণ উচ্ছিষ্ট শাস্ত্রাদি সমুদায় ।
ব্রহ্মবস্তু অনুচ্ছিষ্ট না ফুটে কথায় ॥ ১১০ ॥
নীরব পণ্ডিত ছিল কহিল এখন ।
ব্রহ্ম অনুচ্ছিষ্ট আজি শুনিনু নূতন ॥ ১১১ ॥
প্রভুদের পণ্ডিতের বাক্যে দিয়া সায় ।
বলিলেন ব্রহ্মবস্তু না ফুটে কথায় ॥ ১১২ ॥
সাগর
কেমন কেহ করিলে জিজ্ঞাসা ।
কি দিবে উত্তর তুমি কোখা পাবে ভাবা ॥ ১১৩ ॥
বর্ণনায়
ক্ষমবান যদি হও বেশী ।
বলিবে কতই শব্দ ঢেউ রাশি রাশি ॥ ১১৪ ॥
অকূল অগাধ খুঁজে কেবা
পায় তল ।
চারিদিকে জলময় জল আর জল ॥ ১১৫ ॥
শুকদেব সম মহাপুরুষের গুণ ।
বহুকষ্টে কেহ
করিয়াছে দরশন ॥ ১১৬ ॥
পরশন কাহার বা সেই ব্রহ্মসিন্ধু ।
কাহার কেবল পান বারি এক
বিন্দু ॥ ১১৭ ॥
স্বভাব প্রকৃতি হেন আছয়ে তাহার ।
নামিলে জলধিজলে ফিরা নাহি আর ॥ ১১৮ ॥
অপর দৃষ্টান্তে ব্রহ্ম চিনির পাহাড় ।
হিমালয় সম বড় প্রকাণ্ড আকার ॥ ১১৯ ॥
শুকদেব
সমান সাধক যত জনা ।
খাইয়াছিলেন মাত্র দুই এক দানা ॥ ১২০ ॥
লবণ গঠিত কায় নুনের পুতুল ।
যদি যায় মাপিবারে জলধি অকূল ॥ ১২১ ॥
ঠাণ্ডা বায় গলিয়া মিশিয়া যায় জলে ।
তেমতি জীবের দশা ব্রহ্মে যোগ হলে ॥ ১২২ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যদি ফিরে কোন জন ।
বলিতে না পারে ব্রহ্মসাগর কেমন ॥ ১২৩ ॥
বাখানিতে উপমায় প্রতু ভগবান ।
বলিলেন কোন এক জনের আখ্যান ॥ ১২৪ ॥
ছিল তার পুত্রদ্বয় শৈশব-সুন্দর ।
শিক্ষাহেতু পাঠাইল আচার্যের ঘর ॥ ১২৫ ॥
পুরাণ বেদান্ত বেদ ধর্মশাস্ত্র নানা ।
পড়িয়া বুঝিবে তত্ত্ব পিতার বাসনা ॥ ১২৬ ॥
যথা-আজ্ঞা গুরুগৃহে ভাই দুই জন ।
যতন সহিত শাস্ত্র করে অধ্যয়ন ॥ ১২৭ ॥
হেন রূপে কিছু দিন গত হলে পর ।
ডাকিল নন্দনদ্বয়ে আপন গোচর ॥ ১২৮ ॥
বেদান্তে ব্রহ্মের কথা কহে যে রকম ।
বলিলেন বিশেষিয়া করিতে কীর্তন ॥ ১২৯ ॥
ব্রহ্মের স্বরূপ তত্ত্ব করহ বর্ণনা ।
শুনিতে তোমার মুখে বড়ই বাসনা ॥ ১৩০ ॥
মিষ্টিভাষে কহে জ্যেষ্ঠ বেদান্তের ভাষ ।
পুঁথিতে যেমন ভাবে আছয়ে প্রকাশ ॥ ১৩১ ॥
অব্যক্ত অচিন্তনীয় মনাদির পার ।
ইত্যাদি ইত্যাদি তাহে আছে যে প্রকার ॥ ১৩২ ॥
শুনিয়াছি হও ক্ষান্ত করিয়া তাহারে ।
জিজ্ঞাসিল সেই প্রশ্ন কনিষ্ঠ কুমারে ॥ ১৩৩ ॥
শুনিয়া পিতার প্রশ্ন কনিষ্ঠ নন্দন ।
অধোমুখে রহে নহে বর্ণ উচ্চারণ ॥ ১৩৪ ॥
কিছু পরে কন তারে জনক তাহার ।
ব্রহ্মবস্তু উপলদ্ধি হয়েছে তোমার ॥ ১৩৫ ॥
অপার অনন্ত ব্রহ্ম সীমাহীন পারা ।
গুণাতীত জ্ঞানাতীত অব্যক্ত চেহারা ॥ ১৩৬ ॥
স্বরূপ বলিতে তাঁর সাধ্য কার পারে ।
মৌনী জনে কহে তত্ত্ব বাক্যবাণে নারে ॥ ১৩৭ ॥
যেথা পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান বাক্য তথা নাই ।
উপমা সহিত ব্যাখ্যা করেন গোসাঁই ॥ ১৩৮ ॥
উনানে বসান ঘৃত কড়ার ভিতর ।
ক্রমাগত দিলে তাহে জ্বাল নিরন্তর ॥ ১৩৯ ॥
যতক্ষণ থাকে কাঁচা চড় চড় করে ।
পাকিলে নীরব ঘৃত শব্দ যায় মরে ॥ ১৪০ ॥
বিচার বাক্যের দ্বন্দ্ব কাঁচা জ্ঞান যার ।
পূর্ণ জ্ঞানে বাক্যহারা কে করে
বিচার ॥ ১৪১ ॥
পাকা ঘিয়ে পুনরায় শব্দ সমুত্থিত ।
রসে ভরা কাঁচা লুচি হইলে নিহিত ॥ ১৪২ ॥
পাকা ঘৃতে
কাঁচা লুচি কথা উপমার ।
গুরু-শিষ্যে দুয়ে যবে তত্বের বিচার ॥ ১৪৩ ॥
শূন্য গাড়ু জলমধ্যে যেন অবিকল ।
করে ভুক ভুক্ শব্দ যত ঢুকে জল ॥ ১৪৪ ॥
পরিপূর্ণ গাড়ু
যবে শব্দ কোথা আর ।
বাক্য ছাড়ে সেইমত পূর্ণ জ্ঞান যাঁর ॥ ১৪৫ ॥
কামিনীকাঞ্চন মনে যতক্ষণ রয় ।
ব্রহ্মবস্তু উপলব্ধি হইবার নয় ॥ ১৪৬ ॥
শুদ্ধাত্মা হইলে পরে সাধ হয় পূর্ণ ।
চৈতন্য কেবল জানে কেমন চৈতন্য ॥ ১৪৭ ॥
এই ঠাঁই শ্রীগোসাঁই নিজের আভাস ।
পণ্ডিতের সন্নিকটে করিলা প্রকাশ ॥ ১৪৮ ॥
বিশেষিয়া বলিবারে নাহি প্রয়োজন ।
আপনার মনে তুমি বুঝে লও মন ॥ ১৪৯ ॥
পুনরায় কহিতে লাগিলা ভগবান ।
শঙ্করাচার্যের মতে অদ্বৈতগিয়ান ॥ ১৫০ ॥
অদ্বৈতগিয়ান সত্য দ্বৈতজ্ঞান ভুল ।
জীবের যে দ্বৈতজ্ঞান মায়া তার মূল ॥ ১৫১ ॥
মায়ারাজ্যে যতকাল হয় বিচরণ ।
জীবের অদ্বৈতজ্ঞান ফুটে না কখন ॥ ১৫২ ॥
জগতে যাবৎ বস্তু ঘটনানিচয় ।
মায়ায় দেখায় মাত্র সত্য কিন্তু নয় ॥ ১৫৩ ॥
শঙ্করের মতে যাঁরা এই করে ব্যাখ্যা ।
দ্বৈতপ্রতিবাদী তাঁরা জ্ঞানিনামে আখ্যা ॥ ১৫৪ ॥
ব্রহ্ম সত্য মায়া মিথ্যা এই বোধ ঘটে ।
মিথ্যা মানে এইখানে সত্তা নাই মোটে ॥ ১৫৫ ॥
মায়া মিথ্যা অবিকল গিয়ান হইলে ।
অহঙ্কার অহংজ্ঞান নাশ পায় মূলে ॥ ১৫৬ ॥
অহং-এর চিহ্ন দেহে নাহি রহে আর ।
প্রকৃত সমাধিপদে তবে অধিকার ॥ ১৫৭ ॥
নামিলে সমাধি থেকে নীচেকার ঘরে ।
মায়া করে নিজ কাজ অহংকার ধরে ॥ ১৫৮ ॥
তবে ইহা শুদ্ধ অহং হানি নয় কাজে ।
দেখায় অবিদ্যা বিদ্যা দুই মায়া নিজে ॥ ১৫৯ ॥
সমাধিতে বুঝিবারে বিজ্ঞানী নিপুণ ।
সেই ব্রহ্ম দুই রূপে সগুণ নির্গুণ ॥ ১৬০ ॥
সগুণে ঈশ্বর নাম সৃষ্টির কারণ ।
ব্রহ্মনামধারী তিনি নির্গুণ যখন ॥ ১৬১ ॥
চতুর্বিংশ তত্ত্ব তিনি জীব ও জগৎ ।
শক্তি মায়া নানা নাম গুণে বলবৎ ॥ ১৬২ ॥
গুণভেদে নামভেদ অন্য বুঝা ভুল ।
সেইমাত্র এক ব্রহ্ম সকলের মূল ॥ ১৬৩ ॥
সৃজন পালন লয়ে নানাবিধ কাজে ।
হয়েন বিবিধ রূপ সেই ব্রহ্ম নিজে ॥ ১৬৪ ॥
নানারূপে ভক্তের নিকটে ভগবান ।
আঁখিতে বিজ্ঞানিগণে দেখিবারে পান ॥ ১৬৫ ॥
চাক্ষুষ দেখিয়া জানা বিজ্ঞানের মানে ।
অনুমান, সন্দেহ নাহিক সেইখানে ॥ ১৬৬ ॥
শুদ্ধ-আত্মা এই সব বিজ্ঞানীর গণ ।
অন্তরে বাহিরে তাঁরে করে দরশন ॥ ১৬৭ ॥
পরম ঈশ্বর হেন দ্বিবিধ কারণে ।
দেখা দিয়া দেন তত্ত্ব মুনি-ঋষিগণে ॥ ১৬৮ ॥
উদ্ধারিতে জীবগণে প্রথম কারণ ।
দ্বিতীয় ভক্তের সাধ করিতে পূরণ ॥ ১৬৯ ॥
ক্রিয়াহীন তাঁর যবে দেখিবারে পাই ।
সৃজন পালন লয় কোন কাজে নাই ॥ ১৭০ ॥
লিপ্তশূন্য সম্পর্ক নাহিক সৃষ্টি সনে ।
তখন তাঁহারে আমি ডাকি ব্রহ্ম নামে ॥ ১৭১ ॥
সৃজন পালন লয়ে যবে তাঁর গতি ।
তখন সগুণ নাম প্রধানা প্রকৃতি ॥ ১৭২ ॥
যেই ব্রহ্ম সেই শক্তি ভেদ নাই দুয়ে ।
দৃষ্টান্তে ধরিয়া দেখ আগুন লইয়ে ॥ ১৭৩ ॥
আগুনের সনে তার প্রদাহিক গুণ ।
উভয়েতে একাধারে একত্রে আগুন ॥ ১৭৪ ॥
ধবলত্ব দুধের
দুধেতে যেন স্থিতি ।
সেইমত ব্রহ্মে রহে ব্রহ্মের শকতি ॥ ১৭৫ ॥
মণি আর তার জ্যোতিঃ
একই যেমন ।
ব্রহ্মের সঙ্গেতে শক্তি প্রকৃত তেমন ॥ ১৭৬ ॥
সাপের সঙ্গেতে তার
আঁকাবাঁকা গতি ।
ব্রহ্মের সহিত তেন তাঁহার শকতি ॥ ১৭৭ ॥
পূর্বোক্ত সগুণ ব্রহ্ম যাঁর পরিচয় ।
অবিরত হাতে তিন সৃষ্টি স্থিতি লয় ॥ ১৭৮ ॥
সেই
আদি মূল শক্তি প্রকৃতি প্রধানা ।
তিনিই দ্বিবিধা বিদ্যাবিদ্যা নামে জানা ॥ ১৭৯ ॥
সৃষ্টিতে অনন্ত জাতি অনন্ত রকম ।
কেহ ঊন কেহ দুনো কেহ বেশী কম ॥ ১৮০ ॥
তারতম্যে ছোট বড় নামে যায় বলা ।
সকল শক্তির কর্ম নানারূপে খেলা ॥ ১৮১ ॥
রকমারি সৃষ্টি করা শক্তির নিয়ম ।
সমরূপ দুই বস্তু না হয় কখন ॥ ১৮২ ॥
বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে বস্তু অনন্ত প্রকার ।
প্রত্যেকের ভিন্নরূপ অতি চমৎকার ॥ ১৮৩ ॥
এমন সময় কন পণ্ডিত ধীমান ।
বটে কেহ ক্ষীণবল কেহ বলবান ॥ ১৮৪ ॥
শক্তির প্রকৃতি যদি ঊনো দুনো গড়া ।
তবে কি তাঁহাতে আছে পক্ষপাতী ধারা ॥ ১৮৫ ॥
পণ্ডিতের উত্তর করিলা প্রভুরায় ।
জগতে ঘটনা যত যা হয় যেথায় ॥ ১৮৬ ॥
চিরকাল যেইরূপ সেইরূপ হয় ।
ইহা অতি সত্য কথা বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ১৮৭ ॥
কি হেতু করেন কেন কি তাঁর বিধান ।
মানুষে জানিতে নাহি দেন ভগবান ॥ ১৮৮ ॥
কারণ কি হেতু কিবা উদ্দেশ্য স্রষ্টার ।
জীবের জানিতে ইহা নাহি অধিকার ॥ ১৮৯ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু একক ঈশ্বর ।
সর্বভূতে সমভাবে সবার ভিতর ॥ ১৯০ ॥
ক্ষুদ্রকায় পিপীলিকা বালির সমান ।
তাহাতেও বিরাজিত রহে ভগবান ॥ ১৯১ ॥
তবে যে তাহার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রত্যেকে ।
কি শরীরে কিবা মনে কিবা আধ্যাত্মিকে ॥ ১৯২ ॥
শক্তিই তাহার মূল রকমারি গড়ে ।
অদ্ভুত শক্তির খেলা সৃষ্টির ভিতরে ॥ ১৯৩ ॥
বেদান্তের ব্রহ্ম কালী জননী আমার ।
সগুণে অনন্তরূপা বিরাট আকার ॥ ১৯৪ ॥
"কে জানে সে কালী কেমন ।
ষড় দর্শনে না পায় দরশন ॥
মূলাধারে সহস্রাবে যোগী যাঁরে করে মনন,
কালী পদ্মবনে হংসসনে
হংসীরূপে করে রমণ ॥
আত্মারামের আত্মা কালী
রামপ্রেয়সী সীতা যেমন,
শিব জেনেছে কালীর মর্ম,
অন্তে কে আর জানবে তেমন ॥
প্রসবে ব্রহ্মাণ্ড-অণ্ড প্রকাণ্ডতা বুঝ কেমন,
কালী সর্বঘটে বিরাজ করে,
ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা
যেমন ॥
রামপ্রসাদ বলে কুতূহলে সম্ভরণে সিন্ধু-গমন,
আমায় মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না,
ধরবে শশী হয়ে বামন ॥"
গেয়ে এই গীতখানি, সমাধিস্থ গুণমণি,
এ রাজ্য
ছাড়িয়া গেলা চলে ।
দ্রুতগতি উভরায়, চকিত চপলা প্রায়,
কোথায়
কাহার সাধ্য বলে ॥ ১৯৫ ॥
বীণা জিনি কণ্ঠস্বর, মিষ্ট হতে মিষ্টতর,
বদনবিবরে
নাহি আর ।
শ্রুতিদ্বয় শক্তিদ্বারা, শ্রীঅঙ্গ স্পন্দন ছাড়া,
পুত্তলিক
জড়ের আকার ॥ ১৯৬ ॥
স্থির মন স্থির চিত্ত, স্থিরতর দুটি নেত্র,
স্থিরভাবে
বসিয়া অটল ।
অন্তরের জ্যোতিঃ গুপ্ত, বাহিরে হইল ব্যক্ত,
প্রফুল্লিত বদনমণ্ডল ॥ ১৯৭ ॥
ভাবে যবে নিমগন, কোথা তিনি কি রকম,
বিবরণ
বুঝে উঠা ভার ।
লক্ষণ দেখিয়া জ্ঞান, কিংবা যাহা অনুমান,
কহি শুন
কাহিনী তাহার ॥ ১৯৮ ॥
অপার ভাবের ভাবী, একাধারে নানা ছবি,
ভাবময়
ভাবের নিদান ।
যে প্রসঙ্গে আবির্ভাব, শ্রীঅঙ্গেতে মহাভাব,
তাহাই
দেখেন মূর্তিমান্ ॥ ১৯৯ ॥
বিদ্যাসাগরের সনে, ব্রহ্মতত্ত্ব-উত্থাপনে,
কহিতেছিলেন গুণমণি ।
উপনিষদের ব্রহ্ম, আছে যার গুণ কর্ম,
তিনি তাঁর
জগৎজননী ॥ ২০০ ॥
ভক্তের আরাধ্য ধন, মিলে তাঁর দরশন,
কথোপকথন
হয় সাথে ।
বিশ্বময়ী কালী নাম, জগতের আত্মারাম,
সর্বদা
বিরাজ সর্বভূতে ॥ ২০১ ॥
একা নিতি একরূপে, বিরাটে ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপে,
ইচ্ছাময়ী
ইচ্ছায় তাঁহার ।
যাবৎ ঘটনামালা, ছোট বড় যত খেলা,
সৃষ্টি
স্থিতি প্রলয় সংহার ॥ ২০২ ॥
বলিতে বলিতে কথা, মনে বাড়ে ব্যাকুলতা,
দেখিবারে
স্বরূপ মূরতি ।
সঙ্গে লয়ে প্রাণ মন, মহাভাবে তেকারণ,
নিমগন
অখিলের পতি ॥ ২০৩ ॥
বুঝিতে পারিবে মন, কর লীলা-আলাপন,
আগাগোড়া
কাহিনী ধরিয়ে ।
প্রার্থনা করিয়া তাঁয়, হৃদে যেন স্ফূর্তি পায়,
কি করিলা
অবতার হয়ে ॥ ২০৪ ॥
ভাবে মগ্ন প্রভু এবে, মন প্রাণ গেছে ডুবে,
ভাবরূপ
অকূল পাথারে ।
জীবগণে উদ্ধারিতে, তত্ত্বের বারতা দিতে,
পুনঃ দেহে
আসিছেন ফিরে ॥ ২০৫ ॥
লক্ষণে উদিল আসি, বদনে মধুর হাসি,
সুধাধারা
সে হাসির ধারা ।
দরশনে ভাগ্য যাঁর, অতুল আনন্দ তাঁর,
আপনে আপন
হয় হারা ॥ ২০৬ ॥
হাসি দেখে যায় জানা, বাহ্যমাত্র দুই আনা,
চৌদ্দ আনা
আবেশের জোর ।
মা যেন জাগায় ঠেলে, নিদ্রাতুর শিশুছেলে,
নড়ে
কিন্তু নিদ্রায় বিভোর ॥ ২০৭ ॥
যবে সিকি ঘোর কাটে, তবে মুখে বাক্য ফুটে,
নহে
স্পষ্ট জড় জড় স্বর ।
নামা-উঠা করে মন, তাই জড় উচ্চারণ,
ধরে ছাড়ে
দিব্য দেহ-ঘর ॥ ২০৮ ॥
অর্ধেক আসিলে নীচে, জিহ্বার জড়তা ঘুচে,
বলিলেন
প্রভু গুণধাম ।
আমার জননী যিনি, নিরাকার ব্রহ্ম তিনি,
করে যাঁর
বেদান্তে বাখান ॥ ২০৯ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যার, নাশ হয় অহংকার,
সমাধিতে
সে দেখিতে পায় ।
গভীর ধিয়ানে মত্ত, ব্রহ্মের স্বরূপতত্ব,
বেদান্ত
যাঁহার কথা গায় ॥ ২১০ ॥
ফিরিলে দেখিয়া মাকে, তবু যে অহং থাকে,
সে অহং
শুদ্ধভাবাপন্ন ।
অবিদ্যা ধরে না তায়, মা-ই মনে স্ফূর্তি পায়,
মায়াঘোরে
করে না আচ্ছন্ন ॥ ২১১ ॥
সাকারা হইয়া মাতা, ভক্ত-সঙ্গে কন কথা,
ইচ্ছাময়ী
যেন ইচ্ছা তাঁর ।
কহেন সন্তানগণে, আমি ব্রহ্ম গুণহীনে,
গুণময়ী
হইয়া সাকার ॥ ২১২ ॥
এই যে সাকার কায়, যে সে না দেখিতে পায়,
দেখে
মাত্র শুদ্ধ-আত্মা জনা ।
শুদ্ধ-আত্মাখালি তাঁরা, তাঁর অংশে জন্মে যাঁরা,
ভাগবতীতনু
নামে জানা ॥ ২১৩ ॥
জ্ঞান ভক্তি একত্তরে, সামঞ্জস্য করিবারে,
বলিলেন
প্রভু গুণমণি ।
রামচন্দ্র একদিনে, বলিলেন হনুমানে,
আমায়
কিরূপ দেখ তুমি ॥ ২১৪ ॥
করজোড়ে হনুমান, কহে শুন শুন রাম,
কখন তোমায়
হেন হেরি ।
তোমা বিনা নাহি অন্য, তুমিই অনন্ত পূর্ণ,
স্বজন-পালন-লয়কারী ॥ ২১৫ ॥
শুন রাম কমলাঁখি, আমাকে তখন দেখি,
আমি আর নই
অন্ত জনা ।
আমাতে তোমার সত্ত্ব, দেবত্বমাখান গাত্র,
তোমারি
কেবল অংশ-কণা ॥ ২১৬ ॥
কখন তোমায় রামে, এইরূপ হয় মনে,
প্রভু
তুমি আমি তব দাস ।
শ্রীআজ্ঞাপালন কাজ, এই চিন্তা হৃদিমাঝ,
শ্রীচরণ-সেবনের আশ ॥ ২১৭ ॥
শুন শুন কহি রাম, নবদূর্বাদলশ্যাম,
আত্মারাম
সকলের সার ।
কখন দেখিতে পাই, আমি তুমি আমি নাই,
তুমি আমি
দুয়ে একাকার ॥ ২১৮ ॥
ভাঙ্গিয়া কহেন কথা শ্রীপ্রভু আমার ।
মনে কর সীমাহীন এক জলাধার ॥ ২১৯ ॥
নাহি তার পারাপার নাহি তার তল ।
অধঃ-উর্ধ্বে দশদিকে জল আর জল ॥ ২২০ ॥
সে জলের কোন অংশ শীতল পাইয়ে ।
জমাট বাঁধিয়া যায় বরফ হইয়ে ॥ ২২১ ॥
পুনঃ সে বরফখণ্ডে যদি তাপ পায় ।
গলিত হইয়া জল জলেতে মিশায় ॥ ২২২ ॥
জলাধাররূপ ব্রহ্ম যেই খণ্ড তার ।
ভক্তিরূপ শৈত্যে হয় বরফ-আকার ॥ ২২৩ ॥
সেই ভাগবতীতনু শুদ্ধ আত্মা নাম ।
স্বয়ং ব্রহ্মের দেহে তাঁহাদের ধাম ॥ ২২৪ ॥
উত্তাপ-স্বরূপ জ্ঞানবিচার কেবল ।
যাহাতে বরফ হয় পুনরায় জল ॥ ২২৫ ॥
যোগাসনে সমাধিতে যেই মহাজন ।
মহাভাগ্যবলে হইয়াছে নিমগন ॥ ২২৬ ॥
সন্দহীনে উপলব্ধি কেবল তাহার ।
বাহ্যজগতের স্রষ্টা জননী আমার ॥ ২২৭ ॥
তিনি নিরাকার ব্রহ্ম সগুণে সাকারা ।
তাও তিনি যাহা আছে এই দুই ছাড়া ॥ ২২৮ ॥
জীবদের আত্মারূপে তত্ত্বময়ী তিনি ।
পঞ্চভূতময়ী হয়ে সৃষ্টিস্বরূপিণী ॥ ২২৯ ॥
অদ্বৈতবাদীরা যেন মনে নাহি করে ।
সগুণে সাকার সৃষ্টি মিথ্যা একেবারে ॥ ২৩০ ॥
সাকার স্বরূপ তাঁর আর সৃষ্টি ঠিক ।
দুয়ের মধ্যেতে নহে কেহই অলীক ॥ ২৩১ ॥
দৃষ্টান্তে ভাঙ্গেন তত্ত্ব বিবাদ-ভঞ্জন ।
সরলে সরলে কথা করহ শ্রবণ ॥ ২৩২ ॥
সুমূর্খে সহজে বুঝে নাহি লাগে গোল ।
সরল উপমা দুধ নবনীত ঘোল ॥ ২৩৩ ॥
নিরাকার ব্রহ্ম ঠিক দুধের মতন ।
সগুণে নবনীরূপ আকার ধারণ ॥ ২৩৪ ॥
মন্থনাবশিষ্ট ঘোল সৃষ্টিরূপে তায় ।
ইহার মধ্যেতে মিথ্যা বলিবে কাহায় ॥ ২৩৫ ॥
প্রত্যক্ষ ঈশ্বরী কালী জননী আমার ।
জীবের আমিত্ব যায় রূপায় তাঁহার ॥ ২৩৬ ॥
আমিত্ব থাকিতে কভু সমাধি না হয় ।
সমাধি ব্যতীত ব্রহ্ম উপলব্ধি নয় ॥ ২৩৭ ॥
জ্ঞানমার্গে অহং নাশে উপায় সম্বল ।
বিবেক বৈরাগ্য জ্ঞান বিচার কেবল ॥ ২৩৮ ॥
বিজ্ঞানী জনেরা হারে জ্ঞানযোগ বলে ।
বড়ই কঠিন পথ এই কলিকালে ॥ ২৩৯ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান-আশে হইবারে সমাধিস্থ ।
নারদীয় ভক্তিভাব এ যুগে প্রশস্ত ॥ ২৪০ ॥
সেবাভক্তি আরাধনা গুণানুকীর্তন ।
এই হয় নারদীয় ভক্তির লক্ষণ ॥ ২৪১ ॥
শুদ্ধান্তরে নিরন্তর প্রার্থনা তাঁহায় ।
করিলে বাসনা পুরে মায়ের কৃপায় ॥ ২৪২ ॥
জ্ঞানপন্থিগণ ঘুরে যাহার আশায় ।
মিটে না বাসনা গোটা আয়ু কেটে যায় ॥ ২৪৩ ॥
ভকত-বৎসলা মাতা ভক্তি ভালবাসে ।
সন্তানস্বরূপ ভক্ত মায়ের সকাশে ॥ ২৪৪ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান কখন না চায় ভক্তজনা ।
মায়েরে দেখিতে করে মায়েরে প্রার্থনা ॥ ২৪৫ ॥
যদি কেহ সমাধির উচ্চ স্থানে যায় ।
নামিয়া আনেন তাঁরে মাতা পুনরায় ॥ ২৪৬ ॥
রাখিয়া আমির রেখা ঈষৎ অন্তরে ।
সে নহে এ কাঁচা আমি পাকা বলি তারে ॥ ২৪৭ ॥
কাঁচা আমি ঠিক যেন দড়ির মতন ।
যাহাতে জীবের হয় বিষম বন্ধন ॥ ২৪৮ ॥
পাকা আমি দগ্ধ দড়ি পুড়ে হয় ছাই ।
আকারে কেবল বাঁধে হেন শক্তি নাই ॥ ২৪৯ ॥
সা রে গা মা পা ধা নি এই সপ্তটি স্বর ।
নি অতি অত্যুচ্চ চূড়া সবার উপর ॥ ২৫০ ॥
গায়ক সতত নাহি পারে থাকিবারে ।
যে নি অতি উচ্চ স্বর তাহার ভিতরে ॥ ২৫১ ॥
তেমতি সমাধিস্থানে অবিরত যোগ ।
একুশ দিনের বেশী নাহি হয় ভোগ ॥ ২৫২ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানে সব নষ্ট সত্তালোপ পায় ।
মহাজলে জলবিম্ব যেমন মিশায় ॥ ২৫৩ ॥
তিক্ত লাগে ভক্তজনে রসনা বিস্বাদ ।
হইতে না চায় চিনি খাইবার সাধ ॥ ২৫৪ ॥
ভক্তিপ্রেম অন্তরেতে রাখি সঙ্গোপনে ।
মার সঙ্গে কবে কথা চায় ভক্তগণে ॥ ২৫৫ ॥
বিবিধ আকার মার ভুবনমোহন ।
রামরূপে অযোধ্যার নৃপতিনন্দন ॥ ২৫৬ ॥
কৃষ্ণরূপে বৃন্দাবনে নয়নের ফাঁদ ।
গোরারূপে মহাপ্রভু নদীয়ার চাঁদ ॥ ২৫৭ ॥
যে যেমন চায় মায় যেরূপে যে যাচে ।
ভকত-বৎসলা কালী তেন তার কাছে ॥ ২৫৮ ॥
যদি কোন ভক্তজনে চায় ব্রহ্মজ্ঞান ।
তখনি জননী করে তাঁহারে প্রদান ॥ ২৫৯ ॥
ভক্তি ভক্ত বড় ভালবাসেন জননী ।
এত বলি ভক্তি-তত্ত্ব কন গুণমণি ॥ ২৬০ ॥
ক্ষীণবল জ্ঞানযুক্তি কত শক্তি ধরে ।
একটানা বরাবর যাইতে না পারে ॥ ২৬১ ॥
গতিরোধ হয় পথে না চলে চরণ ।
বিশ্বাস ভক্তির শক্তি অকথ্য কথন ॥ ২৬২ ॥
পারাপার সীমাহীন অকূল জলধি ।
লাফ দিয়া হয় পার ভক্তি রহে যদি ॥ ২৬৩ ॥
সিন্ধুপারে যাইবারে রাবণ-নিধনে ।
বাঁধিতে হইল সেতু ধনুর্ধারী রামে ॥ ২৬৪ ॥
কিন্তু রামদাস হনু পবনকুমার ।
জয় রাম বলি লম্ফে যায় সিন্ধুপার ॥ ২৬৫ ॥
শিক্ষা দিতে জীবগণে রাম-অবতারে ।
যুক্তির অপেক্ষা ভক্তি কত বল ধরে ॥ ২৬৬ ॥
সাগর হইয়া পার আর এক জনে ।
যাইতে উপায় পুছে মিত্র বিভীষণে ॥ ২৬৭ ॥
কহে মিত্র রামভক্ত কি ভাবনা তায় ।
অবশ্য করিয়া দিব তাহার উপায় ॥ ২৬৮ ॥
এত বলি গোপনে তাহার অবিদিতে ।
লিখিল রামের নাম একখানি পাতে ॥ ২৬৯ ॥
সেই পত্র বিভীষণ সমর্পিয়া তায় ।
বলিলেন এই লহ পারের উপায় ॥ ২৭০ ॥
বাঁধিয়া রাখহ বস্ত্রে অতি সাবধানে ।
দেখিও না খুলে, হলে কুতুহল মনে ॥ ২৭১ ॥
যদি জলে পথিমধ্যে দেখ একবার ।
তখনি ডুবিবে জলে রক্ষা নাহি আর ॥ ২৭২ ॥
ভক্তিসহ ধরি শিরে মিত্রের সে বাণী ।
বসনে বাঁধিল এঁটে যা দিলেন তিনি ॥ ২৭৩ ॥
হৃদয়ে বিশ্বাস ভরা মহাবল গায় ।
নামিয়া সিন্ধুর জলে অবহেলে যায় ॥ ২৭৪ ॥
ঈশ্বরের বিড়ম্বনা কুতূহল প্রাণে ।
দেখিতে হইল সাধ কি বাঁধা বসনে ॥ ২৭৫ ॥
টলিল বিশ্বাস, শক্তি হইল হরণ ।
তখনি ডুবিল জলে খুলিল যেমন ॥ ২৭৬ ॥
সমাপন করি কথা কহিলা গোসাঁই ।
বিশ্বাসের সম শক্তি হেন আর নাই ॥ ২৭৭ ॥
প্রভুর মধুর কণ্ঠ বিশ্ববিমোহিত ।
এত বলি গান ভক্তি বিশ্বাসের গীত ॥ ২৭৮ ॥
(আমি) দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি ।
আখেরে এ দীনে না তার কেমনে,
জানা যাবে
গো শঙ্করী ॥
(যদি) নাশি গো ব্রাহ্মণ, হত্যা করি ভ্রূণ,
সুরাপান
আদি বিনাশি নারী,−
(আমি) এ সব পাতক না ভাবি তিলেক,
ব্রহ্মপদ
নিতে পারি ॥
একমাত্র বস্তু ভক্তি বিশ্বাস উপায় ।
কিংবা আত্মসমর্পণ ঈশ্বরের পায় ॥ ২৭৯ ॥
পুনরায় বলিলেন প্রভু ভক্তাধীন ।
কলিকালে জ্ঞানযোগ বড়ই কঠিন ॥ ২৮০ ॥
মৌন রহি কিছুকাল আপনার মনে ।
ধরিলেন অল্প গীত ভাব-সমর্থনে ॥ ২৮১ ॥
"মন কর কি তত্ত্ব তাঁরে ।
ওরে উন্মত্ত আঁধার ঘরে ।
সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত,
অভাবে কি ধরতে
পারে ॥
(মন) অগ্রে শশী বশীভূত,
কর তোমার শক্তিসারে ।
ওরে কোঠার ভিতর
চোরকুঠরী,
ভোর হলে সে লুকাবে রে ॥
ষড়দর্শনে দর্শন পেলে না,
আগম নিগম
তন্ত্রসারে ।
সে যে ভক্তিরসের রসিক,
সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ॥
সে ভাবলোভে
পরম যোগী,
যোগ করে যুগ-যুগান্তরে ।
হলে ভাবের উদয় লর সে যেমন,
লোহাকে
চুম্বকে ধরে ॥
প্রসাদ বলে মাতৃভাবে,
আমি তত্ত্ব করি যারে ।
সেটা চাতরে কি
ভাঙ্বো হাঁড়ি,
বুঝ না বে মন ঠারেঠোরে" ॥
স্থির মনে প্রভুদেব থাকি কতক্ষণ ।
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা কৈলা সমাপন ॥ ২৮২ ॥
অবশেষে বহু রসভাষের রগড় ।
যেমন প্রভুর ধারা দেখি পূর্বাপর ॥ ২৮৩ ॥
কারণ দিতেন তার প্রভু
নারায়ণ ।
মন প্রাণ যাহাদের কামিনীকাঞ্চন ॥ ২৮৪ ॥
ক্রমাগত শুনে তত্ত্ব নাহি হেন বল ।
তাই মাঝে মাঝে দিতে হল আঁষ্টে জল ॥ ২৮৫ ॥
তম-পরিধেয় সাজে আগত যামিনী ।
দেখিয়া বিদায় লন প্রভু গুণমণি ॥ ২৮৬ ॥
আপনি ধরিয়া বাতি পণ্ডিত এখানে ।
নিম্নতলে আনিলেন দুয়ার-প্রাঙ্গণে ॥ ২৮৭ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ আত্মগণ পাছু পাছু ধায় ।
ফটকাভিমুখে পথে শকট যেথায় ॥ ২৮৮ ॥
হেথা দুয়ারের পাশে জুড়ি দুই কর ।
দাঁড়াইয়া বলরাম ভকতপ্রবর ॥ ২৮৯ ॥
শুভ্র পরিচ্ছদ শিরে পাগ শোভা পায় ।
প্রভুর চরণতলে অবনী লুটায় ॥ ২৯০ ॥
দেখি তাঁয় পুলকিত প্রভু নারায়ণ ।
পরম সাদরে কৈলা প্রেম-সম্ভাষণ ॥ ২৯১ ॥
কি কারণ বলরাম দাঁড়ায়ে দুয়ারে ।
উত্তর করিল ভক্ত হাস্যসহকারে ॥ ২৯২ ॥
ভক্তিপ্রেমে মহানন্দে মাখামাখি ভাষে ।
দরশন বাসনায় আছি দ্বারদেশে ॥ ২৯৩ ॥
প্রবেশ না করি গৃহে দ্বারদেশে কেনে ।
জিজ্ঞাসা করিলা প্রভু পুনঃ বলরামে ॥ ২৯৪ ॥
উত্তরিল বলরাম করজোড় করি ।
এখানে আসিতে আজি হইয়াছে দেরী ॥ ২৯৫ ॥
পাছে হয় রসভঙ্গ কথোপকথনে ।
তেকারণ দাঁড়াইয়া আছি এইখানে ॥ ২৯৬ ॥
জমিদার বলরাম ঘরে কত ধন ।
দুয়ারে দণ্ডায়মান দীনের মতন ॥ ২৯৭ ॥
ভিখারীর চেয়ে ন্যূন
দীনহীন ভাবে ।
বাসনা কেবল দরশন প্রভুদেবে ॥ ২৯৮ ॥
ভক্তিদীনতার তত্ত্ব জীবগণে দিতে ।
মূর্তিমান বলরাম শ্রীপ্রভুর সাথে ॥ ২৯৯ ॥
পুণ্য দরশন দেহ ভক্তি প্রেমে মাথা ।
মহাপুণ্যে পায় অন্যে সঙ্গে তাঁর দেখা ॥ ৩০০ ॥
দিনান্তে বারেক তাঁর নাম উচ্চারণ ।
করিলে মিলয়ে রামকৃষ্ণভক্তিধন ॥ ৩০১ ॥
শকটে উঠিলা প্রভু স্বগণ-সহিত ।
করজোড়ে নমস্কার করেন পণ্ডিত ॥ ৩০২ ॥
অশ্বদ্বয় টানে গাড়ি শব্দ গড়্ গড়্ ।
ছুটিল উত্তরমুখে দক্ষিণশহর ॥ ৩০৩ ॥
যতদূর যায় দেখা দুয়ারে দাঁড়ায়ে ।
পণ্ডিত গাড়ির পানে রহে নিরখিয়ে ॥ ৩০৪ ॥
আশ্চর্য
গণিয়া মনে প্রভুরে আমার ।
কে এ প্রেমোন্মত্ত ব্যক্তি বালক-আচার ॥ ৩০৫ ॥
হৃদয়ে আনন্দ সদা ভাবে নিমগন ।
দেবতাসদৃশ চিত্র মনো-বিমোহন ॥ ৩০৬ ॥
ওরে মন শ্রীপ্রভুর মহিমা ভারতী ।
স-মনে শুনিলে হয় শ্রীচরণে মতি ॥ ৩০৭ ॥
'তত্ত্বমঞ্জরী'তে প্রকাশিত "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত" হইতে উদ্ধৃত ।
চতুর্থ খণ্ড
কালের
অবস্থাবর্ণন − হরমোহন ও উইলিয়মের আগমন
(২৫/৬/৮৫)
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ঘোর তমাচ্ছন্ন বিভীষিকাময়ী
রাতি ।
অবসানে মৃতপ্রায় সুন্দরী প্রকৃতি ॥ ১ ॥
সজীব হইয়া সঙ্গে সহচরীগণ ।
পিক পাখী নানা জাতি বিবিধ বরন ॥ ২ ॥
নীহারে ভূষিত অঙ্গ বৃক্ষলতাশ্রেণী ।
সুরভিকুসুমকুলশোভিতা ধরণী ॥ ৩ ॥
ফুল্লাননে ফুলমনে উঠে জাগরিয়ে ।
তমোহর প্রভাকর রবিরে দেখিয়ে ॥ ৪ ॥
সেইমত ধর্মদেবী কলির কলুষে ।
ম্রিয়মাণা শীর্ণকায়া বিমরষ বেশে ॥ ৫ ॥
আছিলেন এতদিন জাগিলা এখন ।
অঙ্গময় অলঙ্ক তা ভাব-আভরণ ॥ ৬ ॥
নিরখিয়া প্রভুদেবে প্রকটিত রবি ।
নয়ন-আনন্দকর মনোহর ছবি ॥ ৭ ॥
শুনহ কালের কথা তম হবে দূর ।
মহীয়ান মহৎ মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৮ ॥
হিন্দুয়ানী খ্রীষ্টানী মুসলমানী আর ।
এই তিন ধর্ম দেশে প্রধান সবার ॥ ৯ ॥
যখন আছিল বঙ্গ যবনাধিকারে ।
কলুষ-বাসনা-তৃপ্তি করিবার তরে ॥ ১০ ॥
যবন শমনসম ধরি তরবার ।
কত হিন্দুকুলে দিল কালিমা অপার ॥ ১১ ॥
যবন কঠোরহৃদি কুলিশের প্রায় ।
বেদের বদলে কল্মা প্রতাপে পড়ায় ॥ ১২ ॥
হিন্দুদের রীতিনীতি জাতি ধর্মে কুলে ।
কি করিল যবনেরা একমাত্র বলে ॥ ১৩ ॥
ইতিহাস ভাষাকথা সাক্ষ্য করে দান ।
বিশেষিয়া বলিতে পুঁথিতে নাহি স্থান ॥ ১৪ ॥
কণ্ঠাগতপ্রাণ
হিন্দুয়ানী সে সময় ।
হেনকালে গৌরচন্দ্র হইল উদয় ॥ ১৫ ॥
প্রাণ দিয়া হিন্দুধর্মে হন অন্তর্ধান ।
যবনের পরে দেশে ম্লেচ্ছ বলবান ॥ ১৬ ॥
ধন্যবাদ ম্লেচ্ছরাজ শত প্রণিপাত ।
হিন্দুধর্মে কুলে বলে নাহি দেন হাত ॥ ১৭ ॥
স্বভাব প্রবল কিন্তু না ছাড়ে কৌশল ।
করিবারে খ্রীষ্টিয়ানী রাজ্যেতে প্রবল ॥ ১৮ ॥
কত হিন্দু নব্যবয়ঃ জন্ম উচ্চ কুলে ।
কেহ বা কায়স্থ কেহ ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১৯ ॥
জলাঞ্জলি দিয়া ধর্মে করে আলিঙ্গন ।
ম্লেচ্ছধর্ম হেতু মূলে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ২০ ॥
এ হেন সময় প্রভুদেব-অবতারে ।
ধর্মমাত্রে যাবতীয় সবার উদ্ধারে ॥ ২১ ॥
প্রতিপন্ন কৈলা করি অগণ্য সাধন ।
ধর্মমাত্রে সব সত্য কেহ নহে ভ্রম ॥ ২২ ॥
যতবিধ আছে ধর্ম কালে বলবৎ ।
প্রত্যেকেই এক এক সুপ্রশস্ত পথ ॥ ২৩ ॥
স্বধর্মে সরলভাবে করিলে গমন ।
অবশ্য সময়ে হয় মানসপুরণ ॥ ২৪ ॥
নানা দেশে ইক্ষুগাছ নানা রূপে হয় ।
সকলের মিষ্ট রস তিক্ত কার নয় ॥ ২৫ ॥
তেন ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন দেশে ।
বরনে বিভিন্ন কিন্তু এক তার রসে ॥ ২৬ ॥
ধর্মসামঞ্জস্য ভাব এ হেন রকম ।
প্রভু-অবতারে এবে কেবল নূতন ॥ ২৭ ॥
এই ভাব কি প্রকারে দেশ জুড়ে রটে ।
বলিতে শকতি মোর বুদ্ধি নাহি ঘটে ॥ ২৮ ॥
বুঝি না কেমনে প্রভু কি করিলা কল ।
যাহাতে ভুবনে ভাব হয় সুপ্রবল ॥ ২৯ ॥
আপন আপন ধর্ম সবে এঁটে ধরে ।
প্রাণান্তেও পরধর্ম গ্রহণ না করে ॥ ৩০ ॥
হিন্দুধর্ম বঙ্গে এবে উঠে কি প্রকার ।
পুঁথিতে বলিতে উগ্র বাসনা আমার ॥ ৩১ ॥
জীর্ণ শীর্ণ হিন্দুধর্ম ছিল এতকাল ।
প্রভুর প্রভাবে এবে ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ৩২ ॥
ধীরে ধীরে বহে অগ্রে ধীর সমীরণ ।
ক্রমশঃ তুমুল ঝঞ্চা বহিয়া পবন ॥ ৩৩ ॥
সেইমত আর্যধর্ম ছিল হীনবল ।
প্রভুর ইচ্ছায় হয় ক্রমশঃ প্রবল ॥ ৩৪ ॥
ইংরেজ-রাজের রাজ্যে ইংরেজী ধরনে ।
ধর্ম-আচরণে কিবা অশনে বসনে ॥ ৩৫ ॥
বাঙ্গালী নকল-কর্মে পটু বিলক্ষণ ।
অবিকল তাই করে ইংরেজ যেমন ॥ ৩৬ ॥
গীর্জার সাদৃশ্য রাখি ব্রাহ্মেরা বসান ।
সমাজমন্দির নামে প্রার্থনার স্থান ॥ ৩৭ ॥
কেশবের আধিপত্য ভারতে এখন ।
নানান প্রদেশে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন ॥ ৩৮ ॥
বক্তৃতায় বাখানিয়া উচ্চকণ্ঠে গায় ।
শান্তিনিকেতন ধর্ম কেবা নিবি আয় ॥ ৩৯ ॥
ইংরেজ-রাজের সভা করিয়া নকল ।
স্থানে স্থানে হরিসভা বাঙ্গালীসকল ॥ ৪০ ॥
বসাইতে লাগিল পরম অনুরাগে ।
যোগাইয়া ব্যয় তার যাহা কিছু লাগে ॥ ৪১ ॥
স্থানে স্থানে শ্রীপ্রভুর নিমন্ত্রণ তায় ।
যোগদানে দেন কৃপা প্রভুদেবরায় ॥ ৪২ ॥
রাধাকৃষ্ণনামে বসে চব্বিশ প্রহর ।
হেথা সেথা কাছে দূরে হয় নিরন্তর ॥ ৪৩ ॥
বাউলের দল হয় পাড়ায় পাড়ায় ।
সখে হয়ে মত্ত লোকে তত্ত্বগীত গায় ॥ ৪৪ ॥
ভারি মজা কর্তাভজা বাড়ে তেজে তেজে ।
প্রলোভনে অগণনে নানা জেতে মজে ॥ ৪৫ ॥
সতীমার দল পুষ্ট দিনে দিনে হয় ।
কৌল শাক্ত এত ভক্ত কোনকালে নয় ॥ ৪৬ ॥
তীর্থ যত জাগরিত অবতারকালে ।
অবিরাম চারিধাম যাত্রিগণ চলে ॥ ৪৭ ॥
বৈষ্ণব মহান্ত ভক্ত উন্নত সাধনে ।
কতই পরমহংস দণ্ডী স্থানে স্থানে ॥ ৪৮ ॥
যাত্রারূপে রামশক কালিয়দমন ।
কতই কতই স্থানে নাই নিরূপণ ॥ ৪৯ ॥
তা সবার মধ্যে দুই অতি শ্রেষ্ঠতর ।
সাধক ভক্তির রসে মত্ত নিরন্তর ॥ ৫০ ॥
প্রথমে গোবিন্দ উপাধিতে অধিকারী ।
বৈষ্ণব বংশেতে জন্ম ভক্তি তাঁর ভারী ॥ ৫১ ॥
দ্বিতীয় তাঁহার ছাত্র নীলকণ্ঠ নাম ।
বীরভূম বিভাগেতে জনমের স্থান ॥ ৫২ ॥
ব্রাহ্মণসন্তান ভক্তি ঘটে বিলক্ষণ ।
বড়ই সদয় তাঁরে প্রভু নারায়ণ ॥ ৫৩ ॥
তোলপাড় করে বঙ্গ কৃষ্ণলীলাগানে ।
আগোটা বঙ্গেতে নাম সকলেই জানে ॥ ৫৪ ॥
ইংরেজের থিয়েটার করিয়া নকল ।
বিনিমিয়া রঙ্গমঞ্চ বাঙ্গালীসকল ॥ ৫৫ ॥
আরম্ভিল অভিনয় ইংরেজী ডউলে ।
পুরুষ রমণীগণ একত্তরে মিলে ॥ ৫৬ ॥
রমণীরা বারাঙ্গনা অভিনেত্রীগণ ।
মিষ্ট গীতে মুগ্ধ করে মানুষের মন ॥ ৫৭ ॥
নূতন ধরন দেশে সকলের সাধ ।
দেখিয়া মিটায় চক্ষুকর্ণের বিবাদ ॥ ৫৮ ॥
নরনারী ছেলেবুড়া দেখিবারে যায় ।
সুন্দর চিত্রিত দৃশ্য সুদৃশ্য হারায় ॥ ৫৯ ॥
'সমাচারপত্র' তাহা সুপ্রচার করে ।
সুদূর হইতে লোক আসে দেখিবারে ॥ ৬০ ॥
চুটকি নাটক বহি দেশ রুচিমত ।
প্রথমে প্রথমে তাহা হয় অভিনীত ॥ ৬১ ॥
ধর্মের প্রসঙ্গে এবে সকলের সখ ।
রাখিতে না পারে মঞ্চ নাটকে আটক ॥ ৬২ ॥
কালেতে করিয়া লোক রুচির বিচার ।
ভক্তিরসের সুরসিক কবি নাট্যকার ॥ ৬৩ ॥
ভক্তিমাখা হরিকথা অভিনয় তরে ।
ভক্তিরসাত্মক গ্রন্থ পাঠ করে ঘরে ॥ ৬৭ ॥
পুরাণ ভারত রামায়ণ গ্রন্থ নানা ।
চৈতন্তচরিতামৃত এবে আলোচনা ॥ ৬৮ ॥
জীবের দুঃখেতে গোরা আকুল পরান ।
শোকাতুর পথে পথে কাঁদিয়া বেড়ান ॥ ৬৯ ॥
অলৌকিক জীবে দয়া স্বার্থশূন্য মনে ।
মানুষে সম্ভব নয় অবতার বিনে ॥ ৭০ ॥
চিত্রে পটু নাট্যকার অতি বুদ্ধিমান ।
গোউর-লীলার ছবি দেখিবারে পান ॥ ৭১ ॥
জন্মাবধি ভক্তিরসে হৃদিখানি ভরা ।
নাটকে আঁকিল গোরালীলার চেহারা ॥ ৭২ ॥
নাস্তিকের ভাবে ঢাকা ছিল নাট্যকার ।
চৈতন্য-চরিত-পাঠে ছুটিল আঁধার ॥ ৭৩ ॥
যদ্যপি জিজ্ঞাসা কথা কর হেথা মন ।
নাস্তিকের জন্মাবধি ভক্তি কি রকম ॥ ৭৪ ॥
যাঁহারে করিবে ভক্তি তিনি নাই ঘটে ।
শিরোহীনে শিরঃপীড়া কি প্রকার বটে ॥ ৭৫ ॥
এ কথার একমাত্র কেবল উত্তর ।
পাষাণে বদন বন্ধ যেমন নির্ঝর ॥ ৭৬ ॥
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা মন পার করিবারে ।
মুক মুক্ত অকস্মাৎ কিসে একেবারে ॥ ৭৭ ॥
তদুত্তরে বলিবারে ভাষা মোর নাই ।
অবতারে অবতীর্ণ শ্রীপ্রভু গোসাঁই ॥ ৭৮ ॥
নাট্যকার ভক্ত তাঁর আপনার জন ।
সোনার অক্ষরে আছে লীলায় লিখন ॥ ৭৯ ॥
অতি গুপ্ত লীলাতত্ত্ব দুর্বোধ্যাতিশয় ।
ভাষা ভাসে আভাসেও বলিবার নয় ॥ ৮০ ॥
শূন্যে দুলে শূন্যে খেলে শূন্যে তার খানা ।
বোবা বলে কালা শুনে চক্ষে দেখে কানা ॥ ৮১ ॥
ঈশ্বরের
লীলাখেলা প্রত্যক্ষ যেমন ।
তেমনি প্রত্যক্ষ পুনঃ লীলায় গোপন ॥ ৮২ ॥
কারে কভু কি দশায় রাখেন ঈশ্বর ।
কেহ না জানিতে পারে তাহার খবর ॥ ৮৩ ॥
লীলা-ক্ষেত্রে চক্ষে যাহা মিলে দরশন ।
তাই মাত্র বলিবারে মানুষ সক্ষম ॥ ৮৪ ॥
অঙ্গার কিম্ভুতাকার কালির বরন ।
পরম উজ্জ্বল পরে আগুন যখন ॥ ৮৫ ॥
পুনশ্চ কুসুম-কলি গোপন পাতায় ।
রূপ-রস-গন্ধহীন সামান্যের ন্যায় ॥ ৮৬ ॥
পরদিন প্রাতে দিব্য সুন্দর চেহারা ।
সৌরভে বরনে রসে কায়াখানি ভরা ॥ ৮৭ ॥
মহাবলী বীর-ভক্ত প্রভুর আমার ।
শ্রীগিরিশ ঘোষ নামে এই নাট্যকার ॥ ৮৮ ॥
অপরূপ প্রভু যেন তেন ভক্তবর ।
রচিলা চৈতন্ত-লীলা বড়ই সুন্দর ॥ ৮৯ ॥
মুগ্ধকর গীতগুলি ভক্তি-প্রেমে ভরা ।
চিত্তহর অভিনয়ে শ্রোতা মাতোয়ারা ॥ ৯০ ॥
মঞ্চমধ্যে অভিনয় অবিকল হয় ।
অভিনয়ে অভিনয় না হয় প্রত্যয় ॥ ৯১ ॥
দেখিতে চৈতন্য-লীলা ব্যগ্র এত লোকে ।
পেটে না খাইয়া কড়ি দেখিবারে রাখে ॥ ৯২ ॥
ভক্তিমাখা লীলাগীত মঞ্চমাঝে গুনি ।
মত্ত-চিত্ত শ্রোতা যত দিবস যামিনী ॥ ৯৩ ॥
পুরুষ রমণী দোঁহে শুয়ে বিছানায় ।
গোউর-কথায় গোটা রজনী কাটায় ॥ ৯৪ ॥
বালক-বালিকাগণ পথে ঘাটে খেলে ।
চৈতন্যলীলার গীত গায় কুতুহলে ॥ ৯৫ ॥
মদ্যপানে মত্ত বেশ্যা নাগর সহিত ।
টপ্পার বদলে গায় গোউরের গীত ॥ ৯৬ ॥
দোকানে বণিক গায় জলযানে দাঁড়ী ।
দ্বারে দ্বারে ঘুরে গায় যতেক ভিখারী ॥ ৯৭ ॥
দূরদূরাঞ্চলে কথা এত রাষ্ট্র হয় ।
অনেকে দেখিতে আসে অর্থ করি ব্যয় ॥ ৯৮ ॥
গোউর-ভকতে উঠে আনন্দ অপার ।
শুনিয়া চৈতন্য-গীত মুখে যার তার ॥ ৯৯ ॥
ব্রজ বিদ্যারত্ব নামে ভক্ত একজন ।
নবদ্বীপে বাস জেতে গোস্বামী ব্রাহ্মণ ॥ ১০০ ॥
গোরা-ধ্যান গোরা-জ্ঞান গোরা-পদে মতি ।
গোউর-চরণ সেবে ঘরে দিবারাতি ॥ ১০১ ॥
মূরতি রাখিয়া ঘরে অতি ভক্তিভরে ।
মঞ্চে লীলা-অভিনয় শুনিলেন পরে ॥ ১০২ ॥
কহিল মথুরানাথে আপন নন্দনে ।
গোপ্য কথা সেই হেতু ডাকিয়া গোপনে ॥ ১০৩ ॥
সুখের বারতা কিবা পাই শুনিবারে ।
গৌরলীলা-অভিনয় মঞ্চের ভিতরে ॥ ১০৪ ॥
নিশ্চয় বুঝিবে মনে সন্দ নাহি তায় ।
পুনরায় গৌরচন্দ্র উদয় ধরায় ॥ ১০৫ ॥
সঙ্গে লয়ে সাঙ্গোপাঙ্গ যতেক তাঁহার ।
প্রচারিতে ভক্তিমূল লীলা আপনার ॥ ১০৬ ॥
বার্ধক্য প্রযুক্ত আমি যাইতে অক্ষম ।
জানিতে যথার্থ তত্ত্ব করহ গমন ॥ ১০৭ ॥
বিশ্বাস আশার ভরে মহাভক্তিমান ।
সকল সন্ধান দিয়া সন্তানে পাঠান ॥ ১০৮ ॥
জনক যেমন তাঁর তেমনি নন্দন ।
শহরে আসিয়া করে গোউরান্বেষণ ॥ ১০৯ ॥
সে তো পায় যে যা চায় সরল অন্তরে ।
সর্বাগ্রে গমন রণ মঞ্চের ভিতরে ॥ ১১০ ॥
অভিনয়ে শুনিয়া ভকতিমাখা গীত ।
ভক্তিমান ব্রাহ্মণ-সন্তান বিমোহিত ॥ ১১১ ॥
উথলে আনন্দে হিয়া পুলক অপার ।
দ্রুত ধায় দেখিবারে কেবা নাট্যকার ॥ ১১২ ॥
আত্মহারা গিরিশে করিয়া দরশন ।
বাসনা ধূলায় লুটে ধরিয়া চরণ ॥ ১১৩ ॥
শশব্যস্ত নাট্যকার কায়স্থের ছেলে ।
ধরিয়া দ্বিজের হাত উঠাইল তুলে ॥ ১১৪ ॥
আশিসিল হাত তুলি গিরিশে প্রচুর ।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ তোর করুন গোউর ॥ ১১৫ ॥
কায়মনোবাক্যে আমি করি আশীর্বাদ ।
পাইবে পরমগুরু পূর্ণ হবে সাধ ॥ ১১৬ ॥
এইখানে এক কথা কর অবধান ।
থাকিতে নারিনু নাহি করিয়া বাখান ॥ ১১৭ ॥
বটেন গিরিশ ঘোষ কায়স্থ-নন্দন ।
ব্রাহ্মণে উচিত নয় পরশে চরণ ॥ ১১৮ ॥
বিশ্বাস-ভকতি চিত্তে এতেক তাঁহায় ।
না লইয়া পদধূলি থাকা নাহি যায় ॥ ১১৯ ॥
ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ ফলিল কিমতি ।
বড়ই সুন্দর ক্রমে শুনিবে ভারতী ॥ ১২০ ॥
দক্ষিণশহরে এবে লোক-সমাগম ।
পূর্বেকার চেয়ে বেশী কভু নহে কম ॥ ১২১ ॥
তুলনায় অতি অল্প অতিথি সন্ন্যাসী ।
নানাবিধ সম্প্রদায় স্বদেশীয় বেশী ॥ ১২২ ॥
পুরীর মহিমা সবে এ প্রদেশে জানে ।
অনেকের আশা আসে কালী-দরশনে ॥ ১২৩ ॥
কেমনে মহিমা-কথা স্বদেশে প্রচার ।
বলিবার কোন শক্তি নাহিক আমার ॥ ১২৪ ॥
এক সমাচার কহি কর অবধান ।
সাগরের দিকে কিসে তটিনীর টান ॥ ১২৫ ॥
একদিন কিবা ভাবে প্রভুদেবরায় ।
বলিলেন ভাবাবেশে সম্বোধিয়া যায় ॥ ১২৬ ॥
অনেকেই কয় মোরে আমি সেই জন ।
বুঝিতে না পারি কেন কহে এ রকম ॥ ১২৭ ॥
তাই যদি হই আমি কেন না হেথায় ।
সমাগমে তত লোক যেন নদীয়ায় ॥ ১২৮ ॥
কোথা থাকে রহে কোথা অশন শয়ন ।
গৌরচন্দ্র অবতারে হইল যেমন ॥ ১২৯ ॥
যেন কথা নহে দেরী তারপর দিনে ।
জলে স্থলে নানাদিকে যান-আরোহণে ॥ ১৩০ ॥
সঙ্গতিবিহীন দুঃখী কড়ি নাই গেঁটে ।
পায়েতে হাঁটিয়া পথ আসে ছুটে ছুটে ॥ ১৩১ ॥
লোকে হয় লোকারণ্য পুরীর মাঝারে ।
এমন বৃহৎ পুরী তাহে নাহি ধরে ॥ ১৩২ ॥
ক্রমান্বয়ে দিনত্রয় এইরূপে যায় ।
তখন হইয়া ত্রস্ত প্রভুদেব রায় ॥ ১৩৩ ॥
সম্বোধিয়া শ্যামামায় বলিলেন কথা ।
মা তুমি এখন দাও কমায়ে জনতা ॥ ১৩৪ ॥
ক্রমশঃ কমিল লোক নাহি রহে আর ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৩৫ ॥
ইংরেজী শিক্ষার গুণে হিন্দুর যুবক ।
কিমত অবস্থাগত বলা আবশ্যক ॥ ১৩৬ ॥
আর্য-ধর্ম-কর্ম প্রায় কেহ নাহি মানে ।
দিবস-রজনী মত্ত ইন্দ্রিয়-সেবনে ॥ ১৩৭ ॥
মা-বাপে না পায় ভাত গায় উড়ে খড়ি ।
পরায় বামার অঙ্গে বারাণসী শাড়ি ॥ ১৩৮ ॥
জাতিগত আচার ব্যভার-বিসর্জন ।
পাকশালে কাজ করে অস্পৃশ্য যবন ॥ ১৩৯ ॥
ইংরেজের খায় খানা ইংরেজী হোটেলে ।
দেবদেবী গয়া গঙ্গা বিসর্জন জলে ॥ ১৪০ ॥
দোল-দুর্গোৎসবে নাই ব্রাহ্মণ-ভোজন ।
শ্বেতকায় সাহেবেরে করে নিমন্ত্রণ ॥ ১৪১ ॥
শাস্ত্রের প্রসঙ্গ কোথা কথা গেছে ভুলে ।
সায়েন্স-লজিকে মন নাটক-নভেলে ॥ ১৪২ ॥
ইংরেজী বহিতে যাহা লিখে শ্বেতকায় ।
তাহাই শ্রোতব্য পাঠ্য পুরাণের প্রায় ॥ ১৪৩ ॥
প্রভুর মহিমা কিবা কেমন কৌশল ।
কালের রুচিতে সভ্য সাহেবের দল ॥ ১৪৪ ॥
বুদ্ধিমান বিদ্যামান উচ্চমন যত ।
দেবভাষা-আলাপনে দিবারাতি রত ॥ ১৪৫ ॥
পুরাণে গীতায় বেদে পাইয়া আস্বাদ ।
ইংরেজী ভাষায় শাস্ত্র করে অনুবাদ ॥ ১৪৬ ॥
শাস্ত্রার্থে সুপথ পেয়ে সাধন-ভজন ।
ধ্যান-যোগ মূল থিয়োসফির চলন ॥ ১৪৭ ॥
আর্যশাস্ত্র মর্মব্যাখ্যা করে বক্তৃতায় ।
আসিয়া সাগরপারে এই বাঙ্গলায় ॥ ১৪৮ ॥
নাহি অঙ্গে হ্যাট কোট দেশের ধরন ।
নিরামিষ ভোজ্য পরে গেরুয়া বসন ॥ ১৪৯ ॥
মস্তক-মুণ্ডন পুনঃ টিকি দুলে তায় ।
পাদুকাবিহীন পায়ে পথে হেঁটে যায় ॥ ১৫০ ॥
গায় যীশু-গুণগীত অতি ভক্তিভরে ।
গৈরিক-বসনা মেম পাছু পাছু ফিরে ॥ ১৫১ ॥
নকলে নিপুণ বড় বাঙ্গালীর দল ।
যা করে ইংরেজ করে তাহাই নকল ॥ ১৫২ ॥
যা কহে সাহেব বুঝে বেদবাক্য প্রায় ।
তাই পড়ে অনুবাদ ইংরেজী ভাষায় ॥ ১৫৬ ॥
ভাবার্থে পাইয়া স্বাদ চেষ্টা করে পরে ।
অনুবাদ যার মূল গ্রন্থ পড়িবারে ॥ ১৫৭ ॥
নীরস বিশুষ্ক মাটি পাষাণের প্রায় ।
বাহ্যিকে উপরে, চক্ষে কে দেখিতে পায় ॥ ১৫৮ ॥
এই ধরা রসে ভরা ডগমগ রসে ।
কাণ্ড-শাখা-পত্র সহ তরুবরে পোষে ॥ ১৫৯ ॥
দিন-রাত্রি চলে রস বিশ্রাম কোথায় ।
গগনের সঙ্গে মিশা পাতায় পাতায় ॥ ১৬০ ॥
তেমতি বিভুর সৃষ্টি এই চরাচর ।
বাহ্যিক দর্শনে কিছু না মিলে খবর ॥ ১৬১ ॥
ঘটনা যখন ধ্রুব হেতু আছে তার ।
বিমানে চলিছে কল নহে দেখিবার ॥ ১৬২ ॥
অদৃশ্য বিমান পথে কার্য কিসে হয় ।
বুঝ মনে সাধ্য নাই দিতে পরিচয় ॥ ১৬৩ ॥
বাঙ্গালী ফিরিছে ঘরে স্বধর্মেতে মতি ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা মধুর ভারতী ॥ ১৬৪ ॥
আঁখি খোলে লীলা শুনে প্রভুর আমার ।
সাহেবের দলে নাম ক্রমশঃ প্রচার ॥ ১৬৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ আগে কেশবের সাথে ।
পাদরী সাহেব আসে প্রভুরে দেখিতে ॥ ১৬৬ ॥
ধর্ম-ব্যবসায়ী তিনি পণ্ডিতপ্রবর ।
প্রশান্ত-সাগর-পারে মারকিনে ঘর ॥ ১৬৮ ॥
এখানে পাদরী কত শহরের মাঝে ।
মিশনারী বিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজে ॥ ১৬৯ ॥
বিদিত প্রভুর নাম হেন সম্প্রদায় ।
সমাধিতে যাঁর নাহি বাহ রহে গায় ॥ ১৭০ ॥
ওয়ার্ডসওয়ার্থ নামে ভক্ত একজন ।
প্রাচীনকালের কবি বিলাতে জনম ॥ ১৭১ ॥
ঋষিসমতুল্য লোক উন্নত অবস্থা ।
তাঁহার কাব্যেতে আছে সমাধির কথা ॥ ১৭২ ॥
সমাধি কাহারে কয় কি তার লক্ষণ ।
কিমত অবস্থাপন্ন সমাধি যখন ॥ ১৭৩ ॥
দুর্বোধ্য চেহারা শিরে নাহি পায় স্থান ।
কে দেখেছে আকাশ-কুসুম সম নাম ॥ ১৭৪ ॥
উদয় হইত দশা শ্রীঅঙ্গে যীশুর ।
আর অবতার-কালে গৌরাঙ্গ প্রভুর ॥ ১৭৫ ॥
সঙ্গীবিত সেকালের কে আছে এখন ।
ভক্তের কর্তৃক বস্তু গ্রন্থেতে লিখন ॥ ১৭৬ ॥
ধন্য কাল ধন্য জীব প্রভু-অবতারে ।
ভাগ্যের ইয়ত্তা সীমা কে করিতে পারে ॥ ১৭৭ ॥
দেবেশ-লালসাবস্তু দেখিবারে পায় ।
অবহেলে সমুদিত শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ১৭৮ ॥
কেবল সমাধি নয় আরও দশা নানা ।
পূর্বকৃত শাস্ত্র-গ্রন্থে নাই যাহা জানা ॥ ১৭৯ ॥
অনাদি পুরুষ প্রভু প্রসূতি সবার ।
কলা-অংশ মাত্র তাঁর যত অবতার ॥ ১৮০ ॥
ছাত্রগণে বুঝাইতে সমাধির ধারা ।
উপায়-স্বরূপ বলিতেন শিক্ষকেরা ॥ ১৮১ ॥
জনৈক পরমহংস দক্ষিণশহরে ।
সতত সমাধি হয় দেখ গিয়া তাঁরে ॥ ১৮২ ॥
সুসংবাদে নব্যবয়ঃ বিস্তর বিস্তর ।
প্রভু-দরশনে আসে দক্ষিণশহর ॥ ১৮৩ ॥
পরম সুন্দর ভক্তবর একজন ।
নব্যবয়দের সঙ্গে করে অধ্যয়ন ॥ ১৮৪ ॥
জুটিলেন এ সময় কায়স্থ-কুমার ।
নাম হরমোহন উপাধি মিত্র তাঁর ॥ ১৮৫ ॥
ছুটিতে লাগিল দেশে শ্রীপ্রভুর নাম ।
দরশনে দক্ষিণশহরে অবিরাম ॥ ১৮৬ ॥
ভাগ্যবান পুণ্যবান করয়ে মেলানি ।
বিচারবিহীনে কিবা দিবস যামিনী ॥ ১৮৭ ॥
শ্রীমন্দিরে অবিরত প্রভু ভগবান ।
সচকিত যাহে হয় জীবের কল্যাণ ॥ ১৮৮ ॥
সকলে সমান জাতি প্রভুর নিকটে ।
খুঁজে যাঁরা হরি-তত্ব হৃদি অকপটে ॥ ১৮৯ ॥
জাতি-ধর্ম-অবস্থার না করি বিচার ।
শ্রীপ্রভু দেখান তাঁরে তিনি যেন তাঁর ॥ ১৯০ ॥
ধার্মিক সাহেব এক আসে এ সময় ।
ভকতির কথা তাঁর কহিবার নয় ॥ ১৯১ ॥
শ্রীপ্রভুর পরিচয় করিয়া শ্রবণ ।
একান্ত বাসনা চিত্তে করে দরশন ॥ ১৯২ ॥
নাম উইলিয়ম পণ্ডিত বাইবেলে ।
ধীর নম্র বিনয়ী জন্ম উচ্চ কুলে ॥ ১৯৩ ॥
পুরীতে প্রবেশ করি পাদুকা খুলিয়া ।
মন্দিরের বহির্ভাগে রহে দাঁড়াইয়া ॥ ১৯৪ ॥
অতি
দীনতম ভাবে অন্তরেতে ভয় ।
শ্রীপ্রভুর দরশন যদি নাহি হয় ॥ ১৯৫ ॥
হেথা শ্রীমন্দিরে প্রভু সর্বতত্ববিৎ ।
চারিধারে ভকতনিকরে সুবেষ্টিত ॥ ১৯৬ ॥
কহিতেছিলেন তত্ত্ব স্বভাব যেমন ।
হঠাৎ হইল তাঁর সচঞ্চল মন ॥ ১৯৭ ॥
কটিতি বহিরভাগে বিদ্যুতের প্রায় ।
উপনীত দাঁড়াইয়া সাহেব যেখায় ॥ ১৯৮ ॥
পরশ করিয়া তায় পরম সাদরে ।
বসাইলা লয়ে গিয়া আপন মন্দিরে ॥ ১৯৯ ॥
আহ্লাদের সীমা নাই সাহেবের মনে ।
লক্ষণে ফুটিল ভাতি প্রফুল্ল বদনে ॥ ২০০ ॥
শ্রীপ্রভু পরশমণি পরশনে যাঁর ।
জীবের জীবত্ব নষ্ট লোচন আঁধার ॥ ২০১ ॥
রাষ্ট্র রামকৃষ্ণনাম শহরে বাহিরে ।
কতই যে আসে লোক সংখ্যা কেবা করে ॥ ২০২ ॥
পুরুষের কথা নাহি দিনেরেতে মেলা ।
কালীদরশন-ছলে আসে কুলবালা ॥ ২০৩ ॥
অন্তঃপুর-নিবাসিনী রহে কায়দায় ।
দিনকরে নাহি যারে দেখিবারে পায় ॥ ২০৪ ॥
শুন দিনেকের কথা সুন্দর ভারতী ।
একদিন পুরীমধ্যে কোন ভাগ্যবতী ॥ ২০৫ ॥
স্বামীর স্বভাব দোষে হয়ে ক্ষুত্রমনা ।
প্রতিবাসিনীরা সঙ্গে আছে বহুজনা ॥ ২০৬ ॥
প্রভু দরশনে আসা কেবল আশায় ।
হৃদয়-বেদনা যত শ্রীপদে জানায় ॥ ২০৭ ॥
প্রভুর স্বভাব যেন শৈশবের বটে ।
লজ্জা ভয় নাহি হয় তাঁহার নিকটে ॥ ২০৮ ॥
অকপটে কর কথা মনে যেন যার ।
কি পুরুষ কিবা নারী নাহিক বিচার ॥ ২০৯ ॥
সরলে সরল প্রভু হৃদয়-বিহারী ।
বড় বাঁকা যেখানে ভাবের ঘরে চুরি ॥ ২১০ ॥
ভাগ্যবতী পতিব্রতা সতী সুলোচনা ।
জানাইল শ্রীচরণে মনের বেদনা ॥ ২১১ ॥
বেশ্যামদে মত্ত পতি অতি কদাচার ।
স্বপথে সুমতি হবে কিমতে তাঁহার ॥ ২১২ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব করিলা উত্তর ।
পতির কারণ বাছা হবে না কাতর ॥ ২১৩ ॥
তিল অণু বিন্দু চিন্তা না রাখিও মনে ।
এ ঘরের লোক তেঁহ আসিবে এখানে ॥ ২১৪ ॥
যিনি এ সতীর পতি মহাভাগ্যবান ।
তাঁহার চরণে মোর অসংখ্য প্রণাম ॥ ২১৫ ॥
বারতা পাইবে পাছু উপস্থিতে নয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত শাস্তির আলয় ॥ ২১৬ ॥
কলিকালে মনুষ্যের সচঞ্চল মন ।
সতত দোলায় দুই কামিনী-কাঞ্চন ॥ ২১৭ ॥
মত্ত খালি আত্মস্থখে স্বার্থপরতায় ।
পরমার্থে রতি-মতি মোটে না জুয়ায় ॥ ২১৮ ॥
প্রতিপত্তি অবিদ্যার হৃদয়মাঝারে ।
সাধন ভজন কর্ম সাধ্যাতীত নরে ॥ ২১৯ ॥
এ হেন জীবের পক্ষে মঙ্গল-নিধান ।
জীবহিতব্রত প্রভুদেব ভগবান ॥ ২২০ ॥
দেখ কি উপায় শিক্ষা দিলেন আসিয়া ।
তাঁহার রচিত লীলা মন্থন করিয়া ॥ ২২১ ॥
এত যে আসিছে লোক তাঁর বিজ্ঞমান ।
একমাত্র কারণ দেশেতে রাষ্ট্র নাম ॥ ২২২ ॥
বর্ণের ভিতরে ভগবান বর্ণময় ।
বর্ণ-সংযোজনে যাহা যাহা নাম হয় ॥ ২২৩ ॥
সকল কেবল তিনি বিভু পরমেশ ।
নামে ভগবানে নাই ইতর বিশেষ ॥ ২২৪ ॥
জ্ঞানযোগ কর্মযোগ শক্ত কলিকালে ।
দুর্বল কলির জীব নাহি আঁটে বলে ॥ ২২৫ ॥
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিকালে সদ্ ।
পূর্বেকার নিয়ম আইন এবে রদ ॥ ২২৬ ॥
উপমায় বলিতেন প্রভু গুণমণি ।
এখন দেশের যেন কর্ত্রী-মহারানী ॥ ২২৭ ॥
এ সনে করিলা যাহা আইন কানুন ।
পর সনে রদ পুনঃ করেন নূতন ॥ ২২৮ ॥
ভক্তিসহ তন্ত্রমতে কর্মপ্রথা এবে ।
বেদ কি পুরাণ গ্রন্থ কানেতে শুনিবে ॥ ২২৯ ॥
রোগবিশেষেতে যেন আছে হেন ধারা ।
দ্বিবিধ ঔষধ ঠিক ব্যবহার করা ॥ ২৩০ ॥
কাহারে মাখিতে হয় অঙ্গের উপর ।
কাহারে সেবনে শ্রেয় পেটের ভিতর ॥ ২৩১ ॥
স্মরণ মনন সেবা নাম-সংকীর্তন ।
ঈশ্বরের পথে এই কালের নিয়ম ॥ ২৩২ ॥
সন্ধ্যার সময় প্রভু করতালি দিয়া ।
হরি হরি বলিতেন নাচিয়া নাচিয়া ॥ ২৩৩ ॥
কখন আদেশ উপস্থিত ভক্তদলে ।
'হরি হরি হরি বোল হরি হরি বোলে' ॥ ২৩৪ ॥
সবে মিলে একত্তরে করিতে নর্তন ।
মাঝারে রাখিয়া তাঁরে করিয়া বেষ্টন ॥ ২৩৫ ॥
সংসারী গৃহস্থ ভক্তে আদেশ কখন ।
চৈতন্যচরিতামৃত করিতে পঠন ॥ ২৩৬ ॥
নিত্য নিত্য সংকীর্তন যেন হয় ঘরে ।
ভক্তের ভোজনকর্ম ভক্তিসহকারে ॥ ২৩৭ ॥
নাম-মাহাত্মোর পক্ষে প্রভু ভগবান ।
গাইতেন এইসব নীচে লেখা গান ॥ ২৩৮ ॥
"নামের ভরসা কালী করি গো তোমার ।
কাজ কি আমার কোশাকুশি
দেঁতর হাসি লোকাচার
।
নামেতে কাল-পাশ কাটে,
জটে তা দিয়াছে রোটে,
আমরা ত সেই জটের মুটে
হ'য়েছি,
আর হব কার ॥
নামেতে যা হবার হবে, মিছা কেন মরি ভেবে,
একান্ত ক'রেছি শিরে
শিবের বচন সার ॥"
"হরি নাম লইতে অলস করো না,
যা হবার তাই হবে ।
দুঃখ পেরেছ না আর পাবে ।
ঐহিকের সুখ হ'ল না বলে কি
ঢেউ দেখে না ডুবাবে ॥"
নাম বীজ নাম হেতু নাম আদি গোড়া ।
কলিতে কিছুই নাই এই নাম ছাড়া ॥ ২৩৯ ॥
ভজ নাম পুজ নাম নাম কর সার ।
মধুর প্রভুর নামে মহিমা অপার ॥ ২৪০ ॥
নাম-রূপ মহাডিম্ব আদরে যে জন ।
ভক্তির উত্তাপ দিয়া রাখে অনুক্ষণ ॥ ২৪১ ॥
সময়ে ফুটিয়া ডিম্ব দেখিবারে পায় ।
শাবক-স্বরূপ ইষ্ট তাহে বাহিরায় ॥ ২৪২ ॥
হৃদয়ে ভরিয়া নাম রাখ সযতনে ।
কিবা কাজ নেতি-ধৌতি সাধন-ভজনে ॥ ২৪৩ ॥
নামেতে মগন রহ দিবা-বিভাবরী ।
পতিত-তারণ নাম পারের কাণ্ডারী ॥ ২৪৪ ॥
গাও গাও গাও নাম কেন কালনাশ ।
দেবদেবী যত কেহ স্বর্গপুরে বাস ॥ ২৪৫ ॥
ত্যজিয়া ইন্দ্রিয়-সুখ-সম্ভোগের কাম ।
চারিবর্ণে মূর্তিমান রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৬ ॥
গাও গাও গাও মেতে মিটুক জঞ্জাল ।
গায়রে অনন্তফণা মাতায়ে পাতাল ॥ ২৪৬ ॥
কুতূহলে প্রেমানন্দে গাও অবিরাম ।
সুধামাখা সুমধুর রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৭ ॥
গাও মণিমুক্তাভরা নিধি-অধীশ্বর ।
সঙ্গে ল'য়ে রাজ্যগত যত জলচর ॥ ২৪৮ ॥
ত্রিতাপ-সন্তাপ হর প্রেমাভক্তিধাম ।
চারি বর্ণ চারি বেদ রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৯ ॥
দীর্ঘকায় সমুদায় ব্যাপ্ত ত্রিভুবন ।
তুমি অতি দ্রুতগতি প্রকাণ্ড পবন ॥ ২৫০ ॥
গভীর নিঃস্বনে গেয়ে পুর মনস্কাম ।
মাতোয়ারা রসে-ভরা রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৫১ ॥
সুনীল-বসনা শূন্য সুবর্ণের খনি ।
জগত-লোচন তমোহর দিনমণি ॥ ২৫২ ॥
প্রফুল্ল
তারকারাজি শূন্যমাঝে ধাম ।
বিভেদি গগন গাও রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৫৩ ॥
বসুমতী নিবসতি জড় কি চেতন ।
নর নারী আদি করি পশু পাখিগণ ॥ ২৫৪ ॥
গুল্ম-লতা-তরুরাজি যতেক ভূধর ।
গহন বিপিন নদী প্রান্তর কন্দর ॥ ২৫৫ ॥
সকলে অত্যুচ্চ স্বরে ভুলে সপ্তগ্রাম ।
নাচিয়া নাচিয়া গাও রামকৃষ্ণনাম॥ ২৫৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড
শশধর তর্কচুড়ামণি
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এ সময়ে শহরেতে হয় উপনীত ।
বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ এক পরম পণ্ডিত ॥ ১ ॥
তর্কচূড়ামণি আখ্যা নাম শশধর ।
পবিত্র সদ্বংশোদ্ভব বঙ্গদেশে ঘর ॥ ২ ॥
খালি শাহপাঠী নন প্রবৃত্ত সাধনে ।
হীরকের খণ্ড যেন মণ্ডিত কাঞ্চনে ॥ ৩ ॥
মাঝারি বয়স সুশ্রী সুন্দর গড়ন ।
গলায় রুদ্রাক্ষ মালা শাক্তের লক্ষণ ॥ ৪ ॥
অন্তে বাহে সমধারা মাখা সরলতা ।
মানুষের মধ্যে যেন মানুষ-দেবতা ॥ ৫ ॥
তেজ ভারি নিষ্ঠাচারী আপন ধরমে ।
গা ফুটে লাবণ্য উঠে সৎশুদ্ধ গুণে ॥ ৬ ॥
বাক্য সুকৌশল অতি বল রসনায় ।
শাস্ত্রের করেন ব্যাখ্যা বিবিধ সভায় ॥ ৭ ॥
শ্রুতিরুচিকর কথা মিষ্টভাষ-গুণে ।
দেশেতে প্রচার নাম হয় অল্প দিনে ॥ ৮ ॥
সমাচার-পত্র এবে দেশের চলন ।
সুযশ গৌরব বুকে করিয়া ধারণ ॥ ৯ ॥
বহিয়া লইয়া যায় দূর দূর দেশে ।
পাইয়া বারতা লোক অগণন আসে ॥ ১০ ॥
আসিতে না পারে যারা অবস্থার আড়ে ।
বক্তৃতা বিক্রয় হয় কিনে ঘরে পড়ে ॥ ১১ ॥
প্রভুর নিকটে লোকজনে বার বার ।
বিদিত করায় পণ্ডিতের সমাচার ॥ ১২ ॥
আগাগোড়া শ্রীপ্রভুর স্বভাব-প্রকৃতি ।
ধার্মিক পণ্ডিত জনে দেখিতে পিরীতি ॥ ১৩ ॥
অমনি প্রার্থনা হয় মায়ের নিকটে ।
দেখিব তাহায় যার দশে যশ রটে ॥ ১৪ ॥
যখন বাসনা
যাহা শ্রীপ্রভূর মনে ।
সকল কহেন তিনি মার সন্নিধানে ॥ ১৫ ॥
যিনি বিনে জগতে যাঁহার
কেহ নাই ।
কালীনামে মহামত্ত প্রমত্ত গোসাঁই ॥ ১৬ ॥
কি কহিব লীলাতত্ব প্রভুর আমার ।
নিজে প্রভু সেই মাতা বিশ্বের আধার ॥ ১৭ ॥
নিজে সেই মহাসিন্ধু অপার জলধি ।
বিশ্বের
সমান যাঁহে অবতার আদি ॥ ১৮ ॥
ক্ষণে উঠে ক্ষণে খেলে (ক্ষণে তারে কয়) ।
পুনরায়
ক্ষণমধ্যে সেই জলে লয় ॥ ১৯ ॥
বাহ্যিক শ্রীপ্রভুদেব পুরুষ চেহারা ।
প্রকৃতি-স্বভাবে
বহে জননীর-ধারা ॥ ২০ ॥
আত্মহারা হয় এই লীলা-দরশনে ।
গুপ্ত অবতারখেলা করেন গোপনে ॥ ২১ ॥
শিক্ষা দিলা জীবগণে বিশেষ করিয়া ।
ভজিবারে বিশ্বমায় আপনি ভজিয়া ॥ ২২ ॥
সকল কহেন প্রভু মায়ের নিকটে ।
সরল শিশুর সম হৃদি অকপটে ॥ ২৩ ॥
ভাষে ঘোষে সরলতা এতই প্রভুর ।
যখন প্রার্থনা যাহা তখনি মঞ্জুর ॥ ২৪ ॥
শশধরে দেখিবারে মায়ের ইচ্ছায় ।
ভক্তগণ-সহ যান প্রভুদেবরায় ॥ ২৫ ॥
কলিকাতা শহরেতে রহে শশধর ।
ঠন্ঠনিয়ায় যেথা ঈশানের ঘর ॥ ২৬ ॥
বরাবর চলিলেন ঈশানের ঘরে ।
ঈশান বিশ্বাসী বড় করুণা তাঁহারে ॥ ২৭ ॥
কেবা তিনি দেবশ্রেষ্ঠ কিবা তাঁরে বলি ।
ভবনে যাঁহার শ্রীপ্রভুর পদধূলি ॥ ২৮ ॥
যে সময় যেথা হয় শ্রীপ্রভুর পাট ।
তখনি তথায় বসে মানুষের হাট ॥ ২৯ ॥
ভাটপাড়ানিবাসী ব্রাহ্মণ কতিপয় ।
বার্তা পেয়ে যথাস্থানে উপনীত হয় ॥ ৩০ ॥
সংসার-আশ্রমে হয় উন্নতি কেমন ।
এই কথা ব্রাহ্মণেরা করে উত্থাপন ॥ ৩১ ॥
ঘটনা সহিত বলিলেন প্রভুরায় ।
সংসারেও সিদ্ধ লোক বহু দেখা যায় ॥ ৩২ ॥
প্রভুর বিরাম নাই অবিরত কন ।
লক্ষ্য করি শ্রোতাদের কিবা প্রয়োজন ॥ ৩৩ ॥
সকলে করিয়া তৃপ্ত ঈশানের ঘরে ।
উঠিলেন শশধরে দেখিবার তরে ॥ ৩৪ ॥
দ্বারে উপনীত গাড়ি যেথা শশধর ।
আগুয়ান আসে তেঁহ পাইয়া খবর ॥ ৩৫ ॥
নমস্কার করিয়া প্রভুরে ভক্তিভরে ।
বসাইলা যথাযোগ্য আসন-উপরে ॥ ৩৬ ॥
উদিল প্রভুর অঙ্গে আবেশের নেশা ।
মৃদু হাসি শশধরে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ৩৭ ॥
সরল শিশুর সম সরল কথায় ।
কিবা উপদেশ কথা কহ বক্তৃতায় ॥ ৩৮ ॥
উত্তর করিল তাঁয় তর্কচূড়ামণি ।
শাস্ত্রে আছে যেইমত তাই কহি আমি ॥ ৩৯ ॥
প্রভু বলিলেন তবে শাস্ত্রে কর্ম কয় ।
শাস্ত্রমত কর্মপ্রথা এ কালের নয় ॥ ৪০ ॥
ক্ষীণ মন স্বল্প আয়ু জীবের এখন ।
অতীব কঠিন করা কর্মের সাধন ॥ ৪১ ॥
কর্মক্ষম নহে জীব গায়ে নাহি বল ।
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিতে কেবল ॥ ৪২ ॥
আগেকার জ্বরে ছিল ঔষধ যেমন ।
কবিরাজী মতে দশমূলের পাচন ॥ ৪৩ ॥
এবে ম্যালেরিয়া জ্বরে কি কাজ তাহাতে ।
ফিবারমিকিশ্চার চাই ডাক্তারের মতে ॥ ৪৪ ॥
একান্ত যদ্যপি কর্ম দিতে হয় সাধ ।
কমাইয়া কর্মে দিবে নেজা-মুড়া বাদ্ ॥ ৪৫ ॥
কর্মমধ্যে কিবা তত্ত্ব নিহিত গোপনে ।
কখন প্রবেশে নাই সংসারীর প্রাণে ॥ ৪৬ ॥
পাষাণের সম শক্ত সংসারীর প্রাণ ।
পরমার্থতত্বকথা নাহি পায় স্থান ॥ ৪৭ ॥
পাথরে
পেরেক দিলে হয় যে প্রকার ।
অভেদ্য পাথরে মুড়ে পেরেকের ধার ॥ ৪৮ ॥
অস্ত্রাঘাতে
কিবা ফল কুম্ভীরের গায় ।
গাত্রচর্ম সুকঠিন পাষাণের প্রায় ॥ ৪৯ ॥
সাধুহস্তস্থিত
কমণ্ডলুর মতন ।
সংসারীর কভু নহে উন্নতি সাধন ॥ ৫০ ॥
ছড়াইয়া বেনাবনে মুকুতার দানা ।
আপনি পাইবে শিক্ষা পূরিবে কামনা ॥ ৫১ ॥
অনুর্বরা ক্ষেত্রে বীজ করিয়া বপন ।
অনভিজ্ঞ কৃষি-কাজে চাষারা যেমন ॥ ৫২ ॥
বিফলে সুফল শিক্ষা পরিণামে পায় ।
তেমতি
তোমার কর্মে করিবে তোমায় ॥ ৫৩ ॥
এত বলি প্রভুদেব অখিলের রাজ ।
আত্মারূপে সর্ব ঘটে
করেন বিরাজ ॥ ৫৪ ॥
কহিতে লাগিলা কথা করিয়া খোলসা ।
মনোভাব পণ্ডিতের উপস্থিত দশা ॥ ৫৫ ॥
উঠিলে গগনে আঁধি উগ্রতর বায় ।
কে অশ্বথ কেবা বট চেনা নাহি যায় ॥ ৫৬ ॥
তেন নব অনুরাগে তুমি নহ ক্ষম ।
বুঝিবারে ভক্তাভক্ত কেবা কোন্ জন ॥ ৫৭ ॥
সর্বজনে সমচক্ষে দেখ আপনার ।
প্রকৃত বিচারে শক্তি নাহিক তোমার ॥ ৫৮ ॥
বিশেষিয়া পরে পরে প্রভুদেব কন ।
কর্মযোগ কি প্রকার তার বিবরণ ॥ ৫৯ ॥
কেমন কঠিন পথ কোথা রোধে গতি ।
পরিণামে ফল কিবা উপমা-সংহতি ॥ ৬০ ॥
যতক্ষণ কর্মী নাহি সমাধিস্থ হয় ।
ততক্ষণ কর্ম কিন্তু সমাপন নয় ॥ ৬১ ॥
সমাধির কথা মুখে যেন উচ্চারণ ।
স্মরণ হইল সেই শান্তির আশ্রম ॥ ৬২ ॥
স্মরণে প্রত্যক্ষ ছবি সম্মুখে তখনি ।
সম্ভোগেতে সমাধিস্থ হইলা আপনি ॥ ৬৩ ॥
পশ্চাতে রাখিয়া জল পানের বাসনা ।
যা ধরিয়া পুনঃ পরে নিম্নভূমে নামা ॥ ৬৪ ॥
বাহ্যিক গিয়ান গেল একেবারে চলে ।
ফুটিল অতুল ভাতি বদনমণ্ডলে ॥ ৬৫ ॥
শ্রীপ্রভুর সমাধিস্থ মোহন মূরতি ।
দরশনে জীবগণে পায় পরাগতি ॥ ৬৬ ॥
পরশনে মিলে মুক্তি প্রেমাভক্তি আর ।
মনস্কাম সব পূর্ণ মনে যা যাহার ॥ ৬৭ ॥
কিছু পরে দেহপুরে ফিরিলা যখন ।
কহিলেন শশধরে করি সম্ভাষণ ॥ ৬৮ ॥
প্রয়োজন গায়ে বল তাহার কারণে ।
আরও হও অগ্রসর সাধন-ভজনে ॥ ৬৯ ॥
না উঠিয়া গাছে আগে করিয়াছ আশ ।
উচ্চ ডালে বড় ফল ধরিতে প্রয়াস ॥ ৭০ ॥
ব্যবহারে বুঝিয়াছি বিশেষ তোমার ।
উদ্দেশ্য কেবলমাত্র পর উপকার ॥ ৭১ ॥
এতেক বলিয়া নমস্কার সহকারে ।
প্রশংসিলা পণ্ডিত প্রবর শশধরে ॥ ৭২ ॥
হেনকালে ধর্মলিঙ্গধারী একজন ।
গেলাসে পানীয় জল কৈল আনয়ন ॥ ৭৩ ॥
আধার আধেয় দুই অতি পরিষ্কার ।
সে জন শ্রীপ্রভু কিন্তু কৈল অস্বীকার ॥ ৭৪ ॥
নিকটে নরেন্দ্রনাথ ভক্তের ঠাকুর ।
কি হেতু অগ্রাহ্য জল হইল প্রভুর ॥ ৭৫ ॥
মনে মনে নানা চিন্তা উদয় তাঁহার ।
কারণান্বেষণে পরে বুঝিল ব্যাপার ॥ ৭৬ ॥
প্রথমে যে আনে জল ধর্মলিঙ্গধারী ।
অপকর্মে দোষদুষ্ট আবিল আচারী ॥ ৭৭ ॥
কেমনে জানিলা প্রভু মাত্রৈক দর্শনে ।
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী বুঝিলেন মনে ॥ ৭৮ ॥
জ্ঞানমার্গী শ্রীনরেন্দ্র অত্যুচ্চ আধার ।
প্রমাণবিহীনে কিছু করে না
স্বীকার ॥ ৭৯ ॥
বিচার তাঁহার পথ বিচারেতে যায় ।
অবতার উপকথা হাসিয়া উড়ায় ॥ ৮০ ॥
তাই তাঁরে মধ্যে মধ্যে শ্রীপ্রভু দেখান ।
নরদেহে পরমেশ বিশ্বাসে প্রমাণ ॥ ৮১ ॥
জলপানে আজি যাহা হৈল সংঘটন ।
বেদ কেবল নরেন্দ্রের শিক্ষার কারণ ॥ ৮২ ॥
নরেন্দ্র নরেন্দ্র যদি প্রপূজ্য আমার ।
এখানে শ্রীপ্রভু প্রভু সৃষ্টির আধার ॥ ৮৩ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন বিশ্বের গোসাঞি ।
কতই নরেন্দ্র তাঁর আছে ঠাঁই ঠাঁই ॥ ৮৪ ॥
পণ্ডিতে কহেন যদি পাণ্ডিত্যের সাথে ।
না থাকে বৈরাগ্য তবে কি ফল তাহাতে ॥ ৮৫ ॥
শাস্ত্রধর্ম বক্ততার নহে কোন হানি ।
আদেশ করেন যদি জগৎ-জননী ॥ ৮৬ ॥
মায়ের আজ্ঞায় কর্মে ব্রতী যেইজন ।
কে তাহারে পারে জয়ী হয় ত্রিভুবন ॥ ৮৭ ॥
বাগবাদিনীর কাছে তাঁহার কৃপায় ।
যদি কেহ অণুকণা কৃপাবল পায় ॥ ৮৮ ॥
অগাধ ভাণ্ডার তার বলে ভরা হিয়া ।
হারায় ধীরেন্দ্রবৃন্দে কীটাণু গণিয়া ॥ ৮৯ ॥
মেঘাচ্ছন্নময়ী রেতে দীপ যেইখানে ।
কোটি কোটি কীট তথা বিনা আবাহনে ॥ ৯০ ॥
আদেশানুসারে কর্ম করে যেইজন ।
শ্রোতার অভাব তাঁর না হয় কখন ॥ ৯১ ॥
অগণ্য অগণ্য লোক আপনারা আসে ।
মহাত্মার আকর্ষণী শক্তির বিকাশে ॥ ৯২ ॥
ছুটে যথা লৌহচূর্ণ নহে গণনায় ।
অটল অচল ভাবে চুম্বক যেথায় ॥ ৯৩ ॥
তাই কহি চাপরাস আছে কি তোমার ।
মায়ের আদেশ-শক্তি কর্মে অধিকার ॥ ৯৪ ॥
ত্রস্তচিত শশধর শুনিয়া শ্রীবাণী ।
আদেশ কিছুই নাই কহিলেন তিনি ॥ ৯৫ ॥
প্রভু বলিলেন তবে কর্মে কিবা ফল ।
যদি না মায়ের কাছে পাইয়াছ বল ॥ ৯৬ ॥
দেখহ গৌরাঙ্গদের নিজে অবতার ।
জীবেশিক্ষা দিতে শক্তি কতই তাঁহার ॥ ৯৭ ॥
যে কর্ম করিলা জন্ম লয়ে নদীয়ায় ।
এখন কি আছে তার সব লোপ প্রায় ॥ ৯৮ ॥
আদেশ অপ্রাপ্ত যিনি অন্তরে দুর্বল ।
তাঁহার কর্মের বল কি হইবে ফল ॥ ৯৯ ॥
কর্তব্য কহিতে তবে প্রভু ভগবান ।
আবেশে বিভোর হয়ে ধরিলেন গান ॥ ১০০ ॥
"ডুব্ ডুব্ ডুব্
রূপসাগরে
আমার মন ।
তলাতল পাতাল খুঁজলে
পাবি রে
প্রেম-রত্নধন ॥
খুঁজ্ খুঁজ্ খুঁজ্
খুঁজ্লে
পাবি হৃদয়মাঝে বৃন্দাবন ।
দীপ্ দীপ্ দীপ, জ্ঞানের বাতি
হৃদে
জ্বল্বে সর্বক্ষণ ॥
ডেং ডেং ডেং ডাঙ্গায় ডিঙ্গা
চালায় বল
সে কোন জন,
কবীর বলে শুন্ শুন্ শুন্
ভাব গুরুর
শ্রীচরণ ॥"
ডুবিতে না কর ভয় কহি বারে বারে ।
সচ্চিৎ-আনন্দরূপ অমৃতসাগরে ॥ ১০১ ॥
ডুবিলে যেমন জলে মরণ নিশ্চয় ।
এখানে সেরূপ নাই প্রাণনাশ ভয় ॥ ১০২ ॥
যত পার তত ডুব দেখ তলাতল ।
পাইবে রতন ধন পরম সম্বল ॥ ১০৩ ॥
অতুল আনন্দে পরে দেখা তাঁর সনে ।
হইবে বাসনা পূর্ণ কথোপকথনে ॥ ১০৪ ॥
আজ্ঞাদেশ হয় যদি ইচ্ছায় তাঁহার ।
তখন বলিতে তত্ত্ব পাবে অধিকার ॥ ১০৫ ॥
এত বলি কহিলেন প্রভুদেবরায় ।
চিদানন্দে যাইবার ত্রিবিধ উপায় ॥ ১০৬ ॥
জ্ঞানযোগ কর্মযোগ ভক্তিযোগ আর ।
এ যুগে প্রথমোদয় কঠিন ব্যাপার ॥ ১০৭ ॥
সাধিতে দুর্বল জীবে না হয় ক্ষমতা ।
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিকালে প্রথা ॥ ১০৮ ॥
জুড়ি কর শশধর করে নিবেদন ।
কতদূর শ্রীপ্রভুর তীর্থপর্যটন ॥ ১০৯ ॥
প্রবেশিয়া পণ্ডিতের হৃদয়মাঝারে ।
প্রভু বলিলেন গিয়াছিনু কিছু দূরে ॥ ১১০ ॥
কিন্তু হৃদে ভক্তি বিনা তীর্থপর্যটন ।
সকল বিফল হয় বৃথা পণ্ডশ্রম ॥ ১১১ ॥
দেখ যেম্নি চিল শুক্নি অতি উচ্চে উড়ে ।
পাতিয়া নয়নদ্বয় সতত ভাগাড়ে ॥ ১১২ ॥
তেমনি আসক্ত চিত কামিনী-কাঞ্চনে ।
কি করিবে চারিধাম-তীর্থপর্যটনে ॥ ১১৩ ॥
যবে আমি কাশীধামে আশ্চর্য ব্যাপার ।
দেখিলাম গাছ ঘাস যত তথাকার ॥ ১১৪ ॥
আকারে বরনে গুণে সেই এক জাতি ।
এখানেতে যেইমত সেখানে তেমতি ॥ ১১৫ ॥
মন যেথা তথা তুমি বুঝহ বারতা ।
এখানে যাহার আছে তার আছে সেথা ॥ ১১৬ ॥
যখন তখন তত্ত্ব বুঝিবার নয় ।
উপলব্ধি হয় যবে সাপেক্ষ সময় ॥ ১১৭ ॥
হৃদয়ে ধৈরয ধরি হইবে থাকিতে ।
উতলা উচিত নয় উন্নতির পথে ॥ ১১৮ ॥
ত্রিবিধ ডাক্তার আছে শুন বিবরণ ।
অধম মধ্যম আর কেহ বা উত্তম ॥ ১১৯ ॥
অধম শ্রেণীর যিনি নাড়ি পরীক্ষিয়ে ।
ঔষধ লিখিয়া দেন রোগীর লাগিয়ে ॥ ১২০ ॥
ঔষধে অরুচি রোগী খাইতে না চায় ।
নাহি চেষ্টা ডাক্তারের রোগী যাতে খায় ॥ ১২১ ॥
সেইমত শিক্ষাদাতা ধর্মের বাজারে ।
কাজে কি হইল লক্ষ্য অধমে না করে ॥ ১২২ ॥
রোগীকে মধ্যম করে বহু অনুনয় ।
যাহাতে ঔষধ তার উদরস্থ হয় ॥ ১২৩ ॥
শিক্ষাদাতা দ্বিতীয় শ্রেণীর এক রকম ।
অধম অপেক্ষা করে কর্তব্যে যতন ॥ ১২৪ ॥
অত্যুচ্চ শ্রেণীর যিনি উত্তম আখ্যায় ।
বিফল যদ্যপি হয় সকল উপায় ॥ ১২৫ ॥
ছন্নমতি রোগীকে না করি পরিহার ।
প্রয়োগ করে বল যথাসাধ্য তাঁর ॥ ১২৬ ॥
বুকে দিয়া হাঁটুজাঁক ধরিয়া চিবুকে ।
উচিত ঔষধ দেন ঢুকাইয়া মুখে ॥ ১২৭ ॥
সেইমত শিক্ষাদাতা উচ্চতম যাঁরা ।
যদ্যপি দেখেন কারে রতিমতিহারা ॥ ১২৮ ॥
কথায় না দেন কান চলে নিজ মতে ।
সবলে ফিরায়ে দেন ঈশ্বরের পথে ॥ ১২৯ ॥
এই স্থলে শশধর তর্কচূড়ামণি ।
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে জুড়ি দুই পাণি ॥ ১২৩ ॥
এমন শিক্ষক যদি রহে বর্তমানে ।
সময়সাপেক্ষ কাজে কহিলেন কেনে ॥ ১২৪ ॥
উত্তর করিলা তবে প্রভু গুণমণি ।
সময়সাপেক্ষ কথা অতি সত্য মানি ॥ ১২৫ ॥
শিক্ষকের শিরোমণি আছে হেন বটে ।
ঔষধ রোগীর যদি নাহি ঢুকে পেটে ॥ ১২৬ ॥
ভিষক উপায় তবে ভাবে নিজ মনে ।
উপযুক্ত পাত্র হেতু ঔষধসেবনে ॥ ১২৭ ॥
বিশেষিয়া এইখানে প্রভুদেব কন ।
যাহা আসে মন পাশে শিক্ষার কারণ ॥ ১২৮ ॥
সর্বাগ্রে জিজ্ঞাসা করি কথা অবস্থার ।
কর্তৃপক্ষ সাপেক্ষ কে আছয়ে তাহার ॥ ১২৯ ॥
নিরাশ্রয় ঋণগ্রস্ত রহে যেইজন ।
কখন না হয় তার ভগবানে মন ॥ ১৩০ ॥
আজি সমাপন কথা পণ্ডিতের সাথে ।
পরে কি হইল কথা কহিব পশ্চাতে ॥ ১৩১ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভক্তদের
সঙ্গে রঙ্গ ও সংযোটন
[বেলঘরিয়ার তারক, সারদা, নারায়ণ, বিষ্ণু, নৃত্যগোপাল,
দেবেন্দ্র, ভূপতি, নবগোপাল, সাণ্ডেল, হরিশ মুস্তফি, পতু, কিশোরী ব্রাহ্মণ,
মহেন্দ্র, মুখুয্যে, গিরিশ, অক্ষয় মাস্টার]
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ত্যাগী কি সংসারী প্রভুদেব নারায়ণ
।
নিশ্চয় করিয়া কহা ব্যাপার বিষম ॥ ১ ॥
কঠোর তিয়াগ-ভাব ভাবের চেহারা ।
দেখিয়া শ্মশানবাসী শিব বুদ্ধিহারা ॥ ২ ॥
বিষের সমান জ্ঞান কামিনী-কাঞ্চনে ।
শ্রীঅঙ্গে বিকার যদি পরশন ভ্রমে ॥ ৩ ॥
গাঁটরি বন্ধন পক্ষে কঠোরাতিশয় ।
ভোজ্যের দূরের কথা ঔষধেও নয় ॥ ৪ ॥
এদিকে সংসারিধারা পাকা ষোল-আনা ।
কড়া ক্রান্তি তিল ধূলা করেন গণনা ॥ ৫ ॥
রঘুবীর শালগ্রাম জনমের স্থানে ।
শিয়ড়ে খরিদ জমি সেবার কারণে ॥ ৬ ॥
বরাবর আমাদের গুরুমাতা কাছে ।
ভরণপোষণে তাঁর সুবন্দেজ আছে ॥ ৭ ॥
এত দিন ছেলেপুলে নাহি ছিল তাঁর ।
এখন ক্রমশঃ উঠে বাড়িয়া সংসার ॥ ৮ ॥
ভক্ত-সংজোটন কাণ্ড সেই বিবরণ ।
বহু পরিবারী প্রভু ভক্তের জীবন ॥ ৯ ॥
নন্দন-নন্দিনী ভক্ত চিরকাল সাথে ।
বারে বারে লীলায় প্রমাণ বিধিমতে ॥ ১০ ॥
তাঁহাদের জন্য কষ্ট কতই প্রভুর ।
মথিয়া দেখহ লীলা সন্দ হবে দূর ॥ ১১ ॥
ভক্তের কারণে চিন্তা কতই যাতনা ।
কল্যাণমানসে হয় কালীরে প্রার্থনা ॥ ১২ ॥
জগতের স্বামী যিনি বিভু ভগবান ।
সৃষ্টিতে যতেক জীব সকলে সমান ॥ ১৩ ॥
তথাপি আপন পর স্পষ্ট দৃষ্ট হয় ।
ভকতে যেমন প্রিয় অন্যে তেন নয় ॥ ১৪ ॥
বিশেষিয়া বলিবার নাহিক শকতি ।
বুঝিবে সহজে তত্ত্ব শুন লীলা-গীতি ॥ ১৫ ॥
ভক্তমধ্যে নরেন্দ্রের সর্বোচ্চ আসন ।
বলিয়াছি কিছু কিছু পূর্বে বিবরণ ॥ ১৬ ॥
বাল্যাবধি নরেন্দ্রের বিপদ বিস্তর ।
স্বতই প্রমাণ কথা বড় গাছে ঝড় ॥ ১৭ ॥
মা-বাপের বড় ছেলে বড়ই স্নেহের ।
বয়স্থ দেখিয়া চেষ্টা হয় বিবাহের ॥ ১৮ ॥
শুনা মাত্র প্রভুদেব সমাচার কানে ।
শ্যামায় প্রার্থনা হয় আকুল পরানে ॥ ১৯ ॥
ওমা কালি! একি শুনি নরেন্দ্রের বিয়ে ।
বিপদে কর মা রক্ষা করুণা করিয়ে ॥ ২০ ॥
জীবন-সমান প্রিয় নরেন্দ্র তাঁহার ।
সতত রাখিতে চক্ষে চেষ্টা অনিবার ॥ ২১ ॥
সুপক্ক সুমিষ্ট ফল সুতার সন্দেশ ।
নিজে না খাইয়া প্রভুদেব পরমেশ ॥ ২২ ॥
পুঁটুলি বাঁধিয়া দেন পাঠাইয়া তাঁয় ।
আপনার ঘরে হেথা নরেন্দ্র যেথায় ॥ ২৩ ॥
কাকুতি সহিত বার্তা প্রেরণ তাঁহারে ।
আসিতে দিনেক জন্য দক্ষিণশহরে ॥ ২৪ ॥
আনন্দে নরেন্দ্র হেথা নিজ নিকেতনে ।
আপন স্বভাবে কথা নাহি দেন কানে ॥ ২৫ ॥
বিরহ অসঙ্গতর প্রভুর যখন ।
বিপন্নের মত হয় শহরে গমন ॥ ২৬ ॥
অন্বেষণ স্থানে স্থানে উন্মত্তের প্রায় ।
ঘরে পরে ব্রাহ্মদের সমাজ যেথায় ॥ ২৭ ॥
সাক্ষাৎ হইলে পরে পুলকিত কায় ।
সঙ্গে লয়ে মন্দিরে ফিরেন প্রভুরায় ॥ ২৮ ॥
পরম আনন্দে বাস নরেন্দ্রের সাথে ।
ছাড়িয়া না দিয়া তাঁয় রাখিতেন রেতে ॥ ২৯ ॥
পুলকে আকুল চক্ষে নিদ্রা নাহি পায় ।
কথোপকথনে গোটা রাত্রি কেটে যায় ॥ ৩০ ॥
নরেন্দ্রের মিষ্ট কণ্ঠে সুমধুর গীত ।
শুনিবারে শ্রীপ্রভুর বড়ই পিরীত ॥ ৩১ ॥
প্রত্যুষের পূর্বে গীত শ্রুতি-বিনোদন ।
শুনিয়া সমাধি-সুখে শ্রীপ্রভু মগন ॥ ৩২ ॥
কালে হয় কালে লয় প্রকৃতির ধারা ।
কিছু পরে নরেন্দ্রের পিতা গেল মারা ॥ ৩৩ ॥
ফেলিয়া আকূল জলে নন্দিনী-নন্দন ।
বহু ব্যয়ে সব নষ্ট উপার্জিত ধন ॥ ৩৪ ॥
জ্যেষ্ঠ পুত্র নরেন্দ্রের যৌবনসঞ্চার ।
পড়িল মাথায় যত সংসারের ভার ॥ ৩৫ ॥
বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যয়ন এবে ।
তাহাও হইল বন্ধ অর্থের অভাবে ॥ ৩৬ ॥
দিনে দিনে দরিদ্রতা হইল প্রবল ।
অতি কষ্টে কাটে দিন সংসার অচল ॥ ৩৭ ॥
দাস্যবৃত্তি ব্যবসায়ে প্রবৃত্তি না হয় ।
দশায় যদিও দুরবস্থা অতিশয় ॥ ৩৮ ॥
অল্পবয়ঃ সোদর-সোদরাগুলি ঘরে ।
দেখিয়া তাঁহার কষ্ট থাকিতে না পারে ॥ ৩৯ ॥
কাজেই চাকরি বিনা অনন্য-উপায় ।
স্বভাব-প্রভাবে কিন্তু কার্য রাখা দায় ॥ ৪০ ॥
বিবেক-প্রবল ধাত মনে নাহি ডর ।
দশার সঙ্গেতে হয় সতত সমর ॥ ৪১ ॥
সুতীক্ষ প্রখর শর দশা যত আড়ে ।
বিশাল বলিষ্ঠ বুক পাতা অকাতরে ॥ ৪২ ॥
কহিতাম দুই এক দশার আখ্যান ।
কিন্তু এ পুঁথির মধ্যে না কুলায় স্থান ॥ ৪৩ ॥
শিরোমণি শ্রীপ্রভুর হয় যেইজন ।
কি হেতু সংসারে তিনি বিপন্ন এমন ॥ ৪৪ ॥
জিজ্ঞাসিতে পার মন শুনহ ভারতী ।
কলিকালে জীবকুলে হীনবুদ্ধি-মতি ॥ ৪৫ ॥
কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত আত্মসুখে রত ।
ধন-জন-যশ-মানে সদা লালায়িত ॥ ৪৬ ॥
শিক্ষা দিতে কি প্রকারে ইহ সুখ-আশ ।
বিবেক-বিরাগে সবে করিয়া বিনাশ ॥ ৪৭ ॥
হৃদয়ে জ্ঞানের বাতি জ্বালি দিনে রেতে ।
ধাবিত হইতে হয় ঈশ্বরের পথে ॥ ৪৮ ॥
বিবেক কাহারে কয় শুন শুন মন ।
বিবেক কুলার মত প্রভুর বচন ॥ ৪৯ ॥
বিবেকের ভাবে বহে কুলচির ধারা ।
ভাল-মন্দ খোসা-দানা ভিন্ন ভিন্ন করা ॥ ৫০ ॥
বৈরাগ্য-সহায়ে শুদ্ধ দানা লয় তুলে ।
সারহীন ভুসি খোসা একদিকে ফেলে ॥ ৫১ ॥
নরেন্দ্রের এই ভাব এক ব্রহ্ম সার ।
ছায়া মায়া মিথ্যা এই জগৎ-সংসার ॥ ৫২ ॥
ভক্ত-সঙ্গে নরদেহ প্রভুর ধারণ ।
উদ্দেশ্য কেবল জীব-শিক্ষার কারণ ॥ ৫৩ ॥
প্রভুর প্রার্থনা কত হয় কালী মায়ে ।
কখন না হয় যেন নরেন্দ্রের বিয়ে ॥ ৫৪ ॥
পরম তিয়াগী তেঁহ কুমারসন্ন্যাসী ।
ভিক্ষায় কাটায় কাল এই মনে বাসি ॥ ৫৫ ॥
শ্রীপ্রভুর সন্ন্যাসী ভকত একজন ।
বহু পূর্বে কহিয়াছি তাঁর বিবরণ ॥ ৫৬ ॥
ঈশ্বরকোটির নাম যোগীন্দ্র তাঁহার ।
দক্ষিণশহরে-বাড়ি পিতা জমিদার ॥ ৫৭ ॥
তিয়াগ-প্রবল ধাত কামিনী-কাঞ্চনে ।
কামিনী সাপিনী-জাতি জন্মাবধি জ্ঞানে ॥ ৫৮ ॥
সর্বসাধারণে এই সার বুদ্ধি করে ।
হোক না অবস্থা যেন বধূ চাই ঘরে ॥ ৫৯ ॥
এখানেতে
যোগীন্দ্রের পিতা ধনবান ।
বয়স্থ পুত্রের এবে বিয়া দিতে চান ॥ ৬০ ॥
বিয়ায় বিরূপ পুত্র করেন বিরোধ ।
জনকের যত জেদ তত অনুরোধ ॥ ৬১ ॥
কি করেন পিতৃ-আজ্ঞা করিলা পালন ।
রোগীতে যেমন করে ঔষধ সেবন ॥ ৬২ ॥
অপকর্মে ক্ষুণ্ণ মন যেইরূপ হয় ।
যোগীন্দ্রের সেইমত করি পরিণয় ॥ ৬৩ ॥
মর্মান্তিক লজ্জা দুঃখ বড় লাগে মনে ।
প্রভুর নিকটে মুখ দেখাব কেমনে ॥ ৬৪ ॥
কায়বাক্যমনে যিনি পরমতিয়াগী ।
নেহারিয়া লজ্জাপর মহেশ্বর যোগী ॥ ৬৫ ॥
সংসারীর গাত্র-গন্ধ অসহ্য যাঁহার ।
কেমনে তাঁহার কাছে যাইব আবার ॥ ৬৬ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
প্রভুর বিবিধ মূর্তি বিবিধ বরন ॥ ৬৭ ॥
সংসারের কাছে জ্ঞানী সংসারীর বেশ ।
তাঁহাদের মত তত্ত্ব হিত-উপদেশ ॥ ৬৮ ॥
ভাবী ত্যাগীদের কাছে স্বতন্ত্র সেখানে ।
কঠোর ত্যাগের আজ্ঞা কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৬৯ ॥
যাহার যেমন ভাব রক্ষা করি তাই ।
উভয়ে করেন পুষ্ট জগৎ-গোসাঁই ॥ ৭০ ॥
যোগীন্দ্রের মনে প্রাণে তিয়াগের স্বাদ ।
যেহেতু বিবাহে এত মানসে বিষাদ ॥ ৭১ ॥
শান্তির উপায়-হেতু মনে বিচারিয়া ।
ছাড়ি বাড়ি দেশান্তরে গেলা পলাইয়া ॥ ৭২ ॥
শুনিয়া প্রভুর মোর চিন্তা নিরন্তর ।
কেমনে যোগীন্দ্র ত্বরা ফিরে আসে ঘর ॥ ৭৩ ॥
লিপির উপরে লিপি করিলে প্রেরণ ।
তবে হয় যোগীন্দ্রের ঘরে আগমন ॥ ৭৪ ॥
প্রভুর যতন ধন অতি প্রিয় জনা ।
স্বধাম হইতে সঙ্গে ধরাধামে আনা ॥ ৭৫ ॥
আনন্দের নাহি সীমা দেখিয়া তাঁহায় ।
সান্ত্বনার হেতু কথা কন প্রভুরায় ॥ ৭৬ ॥
সহায় যদ্যপি তব রহে এইখানে ।১
হইয়াছে বিয়া তাহে বিষাদিত কেনে ॥ ৭৭ ॥
একটা বিয়ার কথা অতি তুচ্ছ গণি ।
লক্ষটি করিলে তবু হইবে না হানি ॥ ৭৮ ॥
রহিবে না কামগন্ধ উভয়ের গায় ।
হইবে সময়ে হেন মায়ের ইচ্ছায় ॥ ৭৯ ॥
ভক্ত সংজোটনে বহে অমৃতের ধারা ।
জুটিতে লাগিল ক্রমে বাদবাকি যাঁরা ॥ ৮০ ॥
জুটিল এখন এক সুন্দর বালক ।
বেলঘরিয়ায় ঘর মুখুয্যে তারক ॥ ৮১ ॥
ঈশ্বরকোটির থাকে উচ্চতম জাতি ।
দার পরিগ্রহে পরে সংসারে বসতি ॥ ৮২ ॥
জুটিলা সারদা মিত্র কুমার সন্ন্যাসী ।
ষোড়শ বরষ বয়ঃ আর নহে বেশী ॥ ৮৩ ॥
তিয়াগিয়া পিতা-মাতা কায়স্থের ছেলে ।
মজিলেন শ্রীপ্রভুর চরণ কমলে ॥ ৮৪ ॥
জুটিল নারায়ণচন্দ্র ব্রাহ্মণনন্দন ।
সারদার সমবয়ঃ সুন্দরগড়ন ॥ ৮৬ ॥
ঘরেতে অনেক অর্থ অতি যোত্রমান ।
প্রভুর পরম প্রিয় পরান সমান ॥ ৮৭ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রতিবাদী কর্তৃপক্ষগণে ।
আসিতে প্রভুর কাছে নিবারে নারাণে ॥ ৮৮ ॥
বালক না মানে মানা মন টানে তাঁর ।
অবশেষে পায় শাস্তি বিষম প্রহার ॥ ৮৯ ॥
তথাপিহ দক্ষিণেশ্বরে আসেন নারাণ ।
চিরভক্ত প্রভুর পদে বাঁধা প্রাণ ॥ ৯০ ॥
প্রবল প্রেমের বেগ সাধ্য কার রোধে ।
রুদ্ধগতি কবে বন্যা বালুকার বাঁধে ॥ ৯১ ॥
আসিলে নারায়ণচন্দ্র প্রভু নারায়ণ ।
পুলকে বিকল বন্ধু না যায় বর্ণন ॥ ৯২ ॥
সর্ব-অগ্রে করাইয়া ভোজন তাঁহায় ।
পাথেয় সম্বল দিয়া করেন বিদায় ॥ ৯৩ ॥
জনরবে এ সময় রটিল অখ্যাতি ।
শ্রীপ্রভুর আছে এক ছেলে-ধরা রীতি ॥ ৯৪ ॥
এ সময় বিষ্ণু নামে ভক্ত একজন ।
বলিয়াছি বহু পূর্বে তাঁর বিবরণ ॥ ৯৫ ॥
বালক বয়সে তেহ এঁড়েদহে বাড়ি ।
নারাণের মত ঘরে করে কড়াকড়ি ॥ ৯৬ ॥
আসিতে না দেয় তাঁয় প্রভুর গোচরে ।
তালা দিয়া আটক করিয়া রাখে ঘরে ॥ ৯৭ ॥
কঠিনহৃদয় পিতা কঠোর-আচারী ।
জ্বালায় দিলেন বিষ্ণু, গলদেশে ছুরি ॥ ৯৮ ॥
ভক্তির উচ্ছ্বাসে দেখি বালকের কাজ ।
শরীরে রাখিতে প্রাণ মনে লাগে লাজ ॥ ৯৯ ॥
কেবল বিমল ভক্তি ঈশ্বরচরণে ।
একমাত্র সারবস্তু অতুল ভুবনে ॥ ১০০ ॥
অবনী লুটায়ে মাগ ভক্তদের ঠাঁই ।
যদ্যপি করেন পরে করুণা গোসাঁই ॥ ১০১ ॥
এবে নৃত্যগোপাল গোস্বামী একজন ।
উপনীত হইলেন প্রভুর সদন ॥ ১০২ ॥
বঙ্গদেশে ঢাকার মধ্যেতে তাঁর ঘর ।
মাঝারি বয়স বর্ণ বড়ই সুন্দর ॥ ১০৩ ॥
প্রসিদ্ধ বংশেতে জন্ম বৈদ্যকুলোদ্ভব ।
নিতাইর শিষ্য পূর্বপুরুষেরা সব ॥ ১০৪ ॥
বাল্যাবধি গোস্বামীর মতি ভগবানে ।
যৌবন প্রারম্ভে মত্ত সাধনভজনে ॥ ১০৫ ॥
কিছু নাহি হয় তার যায় কিছুকাল ।
হৃদয়ে উদয় বড় যাতনা-জঞ্জাল ॥ ১০৬ ॥
শান্তির উপায় চিন্তা বিচারিয়া মনে ।
জুটিলেন কিছু পরে ব্রাহ্মদের সনে ॥ ১০৭ ॥
সাকার যাঁহার প্রাণে প্রাণে প্রাণে খেলে ।
ব্রাহ্মদের সঙ্গে তাঁর শান্তি কিসে মিলে ॥ ১০৮ ॥
ভঙ্গ দিয়া ব্রাহ্মদলে কৈল পলায়ন ।
অন্তরে দ্বিগুণ বৃদ্ধি অশান্তি ভীষণ ॥ ১০৯ ॥
আকুল হইয়া পুছে দেখে যায় তায় ।
কে জান বলিয়া দাও শান্তির উপায় ॥ ১১০ ॥
কেহ তাহে কহিলেন এথিস্টের মত ।
ইহাই প্রকৃত শান্তিনিকেতন-পথ ॥ ১১১ ॥
অনুরাগে দিশাহারা সরল গোস্বামী ।
এথিস্টের দলভুক্ত হইলেন তিনি ॥ ১১২ ॥
চৌগুণ তাহাতে জ্বালা প্রাণ যায় যায় ।
ফেলিয়া কটির বস্ত্র গোস্বামী পলায় ॥ ১১৩ ॥
ভাবিতে ভাবিতে চিতে হইল উদয় ।
গুরু বিনা কোন কার্য হইবার নয় ॥ ১১৪ ॥
তবে কোথা পাই গুরু যাই কোথাকারে ।
হায় গুরু কোথা গুরু অন্বেষণ করে ॥ ১১৫ ॥
হেন কালে ঢাকায় হইল উপনীত ।
বিজয় গোস্বামী যাঁর প্রভুতে পিরীত ॥ ১১৬ ॥
প্রভুর মহিমা কিবা আশ্চর্য ঘটন ।
দিনেকে গোস্বামিদ্বয়ে হইল মিলন ॥ ১১৭ ॥
প্রথম জিজ্ঞাসা করে দ্বিতীয়ের ঠাঁই ।
করুণা করিয়া কহ গুরু কোথা পাই ॥ ১১৮ ॥
বিজয় সুদিনে কানে করিল প্রদান ।
শান্তিদাতা বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর নাম ॥ ১১৯ ॥
নামের বিষম টান মহাবল ধরে ।
প্রভু-দরশনে যাত্রা করিল সত্বরে ॥ ১২০ ॥
উপনীত তাই আজি প্রভুর গোচর ।
আহার করেন প্রভু সময় দুপর ॥ ১২১ ॥
আহলাদের নাই সীমা দেখিয়া তাহায় ।
অর্থাশনে সেদিন ভোজন হৈল সায় ॥ ১২২ ॥
আনন্দে অবশ অঙ্গ করিয়া শয়ন ।
গোস্বামীরে আজ্ঞা করে চরণ-সেবন ॥ ১২৩ ॥
অতুল সৌরভ যেন তুলে সমীরণ ।
ধীরে ধীরে কুসুমে যখন সঞ্চালন ॥ ১২৫ ॥
তেমতি পরমানন্দ ভক্তবর তুলে ।
দোলাইয়া শ্রীপ্রভুর চরণ-কমলে ॥ ১২৬ ॥
আনন্দে ভরিল হিয়া ভক্ত গোস্বামীর ।
আগণ্ড বহিয়া ঝরে দুনয়নে নীর ॥ ১২৭ ॥
ভক্তবরে প্রভুদেব কহেন তখন ।
সাধন-ভজনে নাহি কোন প্রয়োজন ॥ ১২৮ ॥
করিতে হবে না কিছু জপ তপ আর ।
তুড়ি দিয়া কার্য সিদ্ধ হইবে তোমার ॥ ১২৯ ॥
শনি কি মঙ্গলবারে এস এই ঠাঁই ।
হইবে বাসনা পূর্ণ কোন চিন্তা নাই ॥ ১৩০ ॥
যথা কথা করিলেন প্রভুদেবরায় ।
পূর্ণকাম হইয়া গোস্বামী দেশে যায় ॥ ১৩১ ॥
কায়াখানি-সঙ্গে মাত্র দেশে আগমন ।
কিন্তু শ্রীপ্রভুর পদে মগ্ন হেথা মন ॥ ১৩২ ॥
নিরন্তর উঠে তেজে বাসনা তাঁহার ।
প্রভুদরশনে ত্বরা আসে পুনর্বার ॥ ১৩৩ ॥
একদিন বিরহ অসহ্য গুরুতর ।
বদন মলিন অতি বিষণ্ণ অন্তর ॥ ১৩৪ ॥
শান্তির উপায় চিন্তা বিচারিয়া মনে ।
চলিলেন বিজন প্রান্তরে কোন স্থানে ॥ ১৩৫ ॥
গোরস্থান নাম তার ভয়ঙ্কর ঠাঁই ।
ঝোপে গাছে পরিপূর্ণ কোথা কেহ নাই ॥ ১৩৬ ॥
চিন্তায় আকুল উপবিষ্ট এক ধারে ।
উঠে ডুবে নানা ভাব মনের ভিতরে ॥ ১৩৭ ॥
হেন কালে এক জন উপনীত পাশে ।
বুলবুল পাখীধরা শিকারীর বেশে ॥ ১৩৮ ॥
গোস্বামীর চমক অঙ্গ করিল জিজ্ঞাসা ।
কে তুমি কি হেতু হেন নিরজনে আসা ॥ ১৩৯ ॥
বিদেশী অচেনা হাসি-মুখে কহে তাঁয় ।
পাখী ধরিবারে আমি আইনু হেথায় ॥ ১৪০ ॥
এই কথা বলিয়া শিকারী যায় চলে ।
ধীরি ধীরি সুড়িপথে অপর অঞ্চলে ॥ ১৪১ ॥
দীর্ঘ প্রস্থে গোরস্থান অতীব বৃহৎ ।
তার মধ্যে নানাদিকে সরু সরু পথ ॥ ১৪২ ॥
অনিমিখ আঁখিদ্বয়ে গোস্বামী হেথায় ।
কুতূহলে দেখেন শিকারী কোথা যায় ॥ ১৪৩ ॥
কিছু দূরে ফিরিয়া যখন আগুয়ান ।
মোড় ফিরে নিজ পথে করেন পয়ান ॥ ১৪৪ ॥
গোস্বামী দেখিল এক আশ্চর্য ভারতী ।
শিকারী সেখানে নাই প্রভুর মূরতি ॥ ১৪৫ ॥
দ্রুতগতি গোস্বামী হইল ধাবমান ।
অদৃশ্য মুরতি কারে দেখিতে না পান ॥ ১৪৬ ॥
পরান আকুল অতি উচ্ছ্বাসে অস্থির ।
বাক্যহীন রসনা নয়নে বহে নীর ॥ ১৪৭ ॥
প্রভুর বিচিত্র খেলা লয়ে ভক্তগণ ।
বড়ই মধুর কাণ্ড ভক্তসংজোটন ॥ ১৪৮ ॥
প্রেমিক ভকত এক জুটে হেন কালে ।
দেবেন্দ্র মজুমদার ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১৪৯ ॥
মাঝারি বয়স পূর্ব বরন সুন্দর ।
শহরে চাকুরি মাত্র যশোহরে ঘর ॥ ১৫০ ॥
প্রভুর সংসারী ভক্ত রহে যত জনা ।
দেবেন্দ্র তাঁহার মধ্যে সকলের চেনা ॥ ১৫১ ॥
বাল্যাবধি দেবেন্দ্রের ধর্মেতে পিপাসা ।
শুনিয়া প্রভুর নাম সেই হেতু আসা ॥ ১৫২ ॥
শুন মন এইখানে এক কথা বলি ।
ভক্ত যদি সংসারে থাকিলে লাগে কালি ॥ ১৫৩ ॥
প্রভুর বচনে শুন তাহার প্রমাণ ।
হোকনা মানুষ তেঁহ যতই সেয়ান ॥ ১৫৪ ॥
যদ্যপি করেন বাস কাজলের ঘরে ।
নিশ্চয় লাগয়ে দাগ আজি নয় পরে ॥ ১৫৫ ॥
যতই সেয়ান হোক সৎশুদ্ধমতি ।
টলে মন ধ্রুব সঙ্গে থাকিলে যুবতী ॥ ১৫৬ ॥
কলঙ্কবিহীন গায়ে রহে কোন্ জন ।
প্রভুর উপমা সহ শুন বিবরণ ॥ ১৫৭ ॥
খই ভাজিবার কালে দেখহ প্রমাণ ।
সকলেই খই হয় যতগুলি ধান ॥ ১৫৮ ॥
তবে যেটি ফুটিয়া তখনি ছুটে যায় ।
রহে না বহ্নির মত উত্তপ্ত খোলায় ॥ ১৫৯ ॥
কলঙ্ক তাহাতে আর পরশিতে নারে ।
দাগ তথা রহে যারা খোলার ভিতরে ॥ ১৬০ ॥
সংসার খোলার মত ত্রিতাপ-আগুনে ।
আগুনের মত তপ্ত করে রেতে দিনে ॥ ১৬১ ॥
ইহার মধ্যেতে বাস তবু যেই জন ।
অন্তরের সহ করে গুরু-অন্বেষণ ॥ ১৬২ ॥
তিনি ভক্ত শ্রীপ্রভুর চেনা মহাদায় ।
অধমের কোটি কোটি দণ্ডবৎ তাঁয় ॥ ১৬৩ ॥
প্রভুভক্ত আর এক ধারা স্বতন্তর ।
উপমায় ঠিক চকমকির পাথর ॥ ১৬৪ ॥
হাজার বৎসর বাস জলের মাঝারে ।
তুলিয়া আনিয়া সদ্য যদি ঠুক তারে ॥ ১৬৫ ॥
তখন আগুন-কণা ফিনকির প্রায় ।
নাহি দেরি সারি সারি কত বাহিরায় ॥ ১৬৬ ॥
তেমনি প্রভুর ভক্ত সংসারেতে যেবা ।
কামিনী-কাঞ্চনাসক্তি সাগরেতে ডুবা ॥ ১৬৭ ॥
শীতল শরীর গোটা বিহীন বরন ।
কিন্তু যদি হরিকথা করেন শ্রবণ ॥ ১৬৮ ॥
প্রেম অশ্রু ভাব ভক্তি রাগের উচ্ছ্বাস ।
বদনমণ্ডলে পায় তখনি বিকাশ ॥ ১৬৯ ॥
পুরীমধ্যে প্রবেশিয়া ব্রাহ্মণ নন্দন ।
অলৌকিক দিব্যভাবে হইল মগন ॥ ১৭০ ॥
বাহুল্য-বর্ণন স্থান-মহাত্ম্যের কথা ।
বিরাজিত সশরীরে প্রভুদেব যেথা ॥ ১৭১ ॥
দরশিয়া প্রভুদেবে করে প্রণিপাত ।
এখন ভাঙ্গিয়াছিল শ্রীপ্রভুর হাত ॥ ১৭২ ॥
নাম ধাম জিজ্ঞাসিয়া প্রভু-ভগবান ।
হাতের ঔষধ কিবা দেবেন্দ্রে শুধান ॥ ১৭৩ ॥
কৃপা করিবার ছলে কহেন তাঁহায় ।
পরশিয়া দেখ অগ্রে বেদনা যেথায় ॥ ১৭৪ ॥
ভাগ্যবান দ্বিজপুত্র অঙ্গ পরশিয়া ।
দেখেন বেদনা স্থান হাত বুলাইয়া ॥ ১৭৫ ॥
মহাবৈদ্য প্রভু ভবব্যাধি-বিনাশনে ।
দেবেন্দ্র ঔষধ কন ব্যথা-নিবারণে ॥ ১৭৬ ॥
ব্যথার ঔষধ হেন নাই আর কোথা ।
ব্যবহারে অচিরে আরাম হবে ব্যথা ॥ ১৭৭ ॥
আরোগ্যের কথা শুনি প্রভুদেবরায় ।
আনন্দে করেন নৃত্য বালকের প্রায় ॥ ১৭৮ ॥
প্রভুর প্রকৃতি দেখি ভক্তবর ভাবে ।
সরলস্বভাব হেন নরে না সম্ভবে ॥ ১৭৯ ॥
অন্তরে আনন্দস্রোত অবিরত বয় ।
এমন আনন্দ কভু জনমেও নয় ॥ ১৮০ ॥
সহাদরে ব্রাহ্মণেরে করান ভোজন ।
মধ্যাহ্নে একত্রে দোঁহে কথোপকথন ॥ ১৮১ ॥
ভাবেতে বিহ্বল হয়ে কথার ভিতর ।
ধরিলেন কৃষ্ণ-লীলাগীত মনোহর ॥ ১৮২ ॥
মধুর সংগীতখানি কীর্তনের সুরে ।
শুনিলে পাষাণ-হিয়া দ্রবীভূত করে ॥ ১৮৩ ॥
শ্রবণ-মধুর গীত মনোমুগ্ধকারী ।
শুনিয়া শ্রীদেবেন্দ্রের মন গেল চুরি ॥ ১৮৪ ॥
গীত সমাপনে প্রভু কহিলেন তারে ।
দেবালয়ে দেব-দেবী দরশন তরে ॥ ১৮৫ ॥
যেমন সুরম্য পুরী মন্দির তেমতি ।
সজ্জীভূত তেন দেব-দেবীর মূরতি ॥ ১৮৬ ॥
নিরানন্দ শ্রীদেবেন্দ্র প্রভুর আজ্ঞায় ।
ছাড়িয়া তাঁহারে আর যাইতে না চায় ॥ ১৮৭ ॥
কি করেন মহা-আজ্ঞা করিয়া পালন ।
দ্রুতগতি ফিরিলেন প্রভুর সদন ॥ ১৮৮ ॥
উপবিষ্ট প্রভুদেব খাটের উপর ।
হঠাৎ ভক্তের গায়ে সমুদিত জ্বর ॥ ১৮৯ ॥
থর থর অঙ্গ মুখে বাক্য নাহি সরে ।
শশব্যস্ত প্রভুদেব দেখিয়া তাহারে ॥ ১৯০ ॥
বাবুরামে বলিলেন বিষণ্ণ অন্তর ।
সত্বর পানসি আন ঘাটের উপর ॥ ১৯১ ॥
জুটিল পানসি এক কিন্তু তার মাঝি ।
সওয়া তঙ্কা ভাড়া বিনা নাহি হয় রাজি ॥ ১৯২ ॥
প্রভু বলিলেন সওয়া আনা যেইখানে ।
সওয়া তঙ্কা এত বেশী ভাড়া দিবে কেনে ॥ ১৯৩ ॥
এতেক বলিয়া উঠিলেন ভগবান ।
পানসির অন্বেষণে গঙ্গাপানে চান ॥ ১৯৪ ॥
দেখিলা পানসি এক আছে অন্য কূলে ।
বহুদুর ব্যবধান দৃষ্টি নাহি চলে ॥ ১৯৫ ॥
মাঝারে
তরঙ্গরাজি করি ভীম রোল ।
করিছে গঙ্গার বক্ষে মহাগণ্ডগোল ॥ ১৯৬ ॥
প্রবল পবন বয় সন সন ডাকে ।
শ্রবণবধির শব্দ ব্রজনাদ ঢাকে ॥ ১৯৭ ॥
মন্দিরের দ্বারে দাঁড়াইয়া লক্ষ করি ।
মাঝিরে ডাকেন ভবনিধির কাণ্ডারী ॥ ১৯৮ ॥
সুকৌশল ধানুষ্ক যেমন জুড়ি শর ।
মন্ত্রপূত করি ছাড়ে লক্ষ্যের উপর ॥ ১৯৯ ॥
বিভেদিয়া সপ্ততাল বাধা লাগে কিসে ।
কাটিয়ে পাড়য়ে লক্ষ্য চক্ষুর নিমিষে ॥ ২০০ ॥
সেইমত শক্তিময় শ্রীপ্রভুর বাণী ।
যেমন নির্গত মাঝি শুনিল অমনি ॥ ২০১ ॥
পানসি ছাড়িয়া দিল দেরি নহে আর ।
দ্রুতগতি উত্তরিল গঙ্গার এ-পার ॥ ২০২ ॥
মাঝিটি মানুষ ভাল সরল চেহারা ।
চুকিল তাহার সঙ্গে সওয়া-আনা ভাড়া ॥ ২০৩ ॥
বাবুরামে কহিলেন প্রভু গুণমণি ।
শহরেতে দেবেন্দ্রের সঙ্গে যাও তুমি ॥ ২০৪ ॥
মহাভক্ত বাবুরাম শ্রীআজ্ঞাপালনে ।
পানসিতে উঠিলেন দেবেন্দ্রের সনে ॥ ২০৫ ॥
প্রথম দর্শন দিনে এই তক কথা ।
পশ্চাৎ পাইবে মন পরের বারতা ॥ ২০৬ ॥
জুটিল ভূপতি ভাই ব্রাহ্মণ-কুমার ।
ভাষায় ভাণ্ডার নাই গুণ গাইবার ॥ ২০৭ ॥
বয়স বিশের মধ্যে সুন্দর বরন ।
নহে লম্বা নহে বেঁটে দোহারা গড়ন ॥ ২০৮ ॥
অধ্যয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সময় ।
বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা কথা কহিবার নয় ॥ ২০৯ ॥
ধীর শান্ত বিনয়ী মধুর মিষ্টভাষী ।
চারুশীল চিন্তাশীল বিজন-প্রয়াসী ॥ ২১০ ॥
গুণাদির মধ্যে এক অত্যন্ত প্রবল ।
ছনিয়ায় নাহি কেহ এমন সরল ॥ ২১১ ॥
প্রভুভক্ত মাত্রে আছে সরলতা মাখা ।
তুলনায় এ সরলে সে সরল বাঁকা ॥ ২১২ ॥
আঁকিতে নারিনু ছবি মনে রহে খেদ ।
পেটে মুখে ভূপতির নাহি কোন ভেদ ॥ ২১৩ ॥
সত্যপরায়ণ তাহে এত পরিমাণে ।
বিনা সত্য মিথ্যা কিবা আদতে না জানে ॥ ২১৪ ॥
কৃতদার এইখানে বসতি শহরে ।
ধর্মচর্চা হয় ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরে ॥ ২১৫ ॥
বিবেক-প্রাপ্তির হেতু ধর্ম আলোচনা ।
বিবেক অত্যুচ্চ বস্তু হৃদয়ে ধারণা ॥ ২১৬ ॥
শুনিয়া প্রভুর নাম-মাহাত্ম্য-ভারতী ।
দরশনে উপনীত হইল ভূপতি ॥ ২১৭ ॥
আশ্বাসিয়া আশ্বাস বাক্যতে ভগবান ।
চরণে শরণাপন্ন জনে দিয়া স্থান ॥ ২১৮ ॥
পাইয়া পরমাস্পদ শ্রীশ্রীপদে ঠাঁই ।
আসে যায় বারে বারে শ্রীভূপতি ভাই ॥ ২১৯ ॥
স্বভাবতঃ দ্রবীভূত কাঞ্চনের প্রায় ।
প্রভুর পরশে ক্রমে কান্তি বেড়ে যায় ॥ ২২০ ॥
প্রকৃতিতে ভূপতি অতীব মনোহর ।
সুন্দর অপেক্ষা তেহ পরমসুন্দর ॥ ২২১ ॥
ভক্তিরস হয় যদি চিত্রের বরন ।
বিবেক-বিরাগদ্বয় যুগল কলম ॥ ২২২ ॥
নয়নের ভাতি যদি জ্ঞান-সমুজ্জ্বল ।
হৃদয়েতে বহে যদি শাস্তি নিরমল ॥ ২২৩ ॥
কুমার-সন্ন্যাসী ভক্ত যদি চিত্রকর ।
তবে আঁকে কি সৌন্দর্যে ভূপতি সুন্দর ॥ ২২৪ ॥
একদিন মন্দিরের দুয়ারের ধারে ।
বিহ্বল হইয়া গায় অনুরাগভরে ॥ ২২৫ ॥
হৃদয়-বিভেদী ভাবে মরমের গান ।
গণ্ড বেয়ে ঝরে অশ্রু ধারার সমান ॥ ২২৬ ॥
গীতের ভাবার্থ এই শুন শুন মন ।
ভবসিন্ধুপাথারেতে শ্রীহরি যেমন ॥ ২২৭ ॥
দয়াল কাণ্ডারী হেন কেবা কোথা আর ।
চরণ-তরণী দিয়া করে পারাপার ॥ ২২৮ ॥
"হরি কাণ্ডারী যেমন
এমন কি আর
আছে নেয়ে ।
পার করে দীনজনে
অভয়
চরণ-তরী দিয়ে ॥
হৃদয়-বিহারী প্রভু ভক্ত-হৃদে বাস ।
দেখিয়া ভক্তের ভক্তিভাবের উচ্ছ্বাস ॥ ২২৯ ॥
দ্রুতগতি প্রকৃতি বিজলী যেন ছুটে ।
উপনীত ভাবাবেশে ভক্তের নিকটে ॥ ২৩০ ॥
এই লহ বলিয়া দক্ষিণ শ্রীচরণ ।
ভক্তের কোমল বক্ষে করিলা অর্পণ ॥ ২৩১ ॥
পরম সম্পদাস্পদ প্রভুর আমার ।
যোগিজন পূজ্য-পদ সেব্য কমলার ॥ ২৩২ ॥
বক্ষের উপরে যাঁর স্থাপন এখন ।
চরণের রেণু তাঁর মাগে এ অধম ॥ ২৩৩ ॥
সরসে বর্ষায় বিকশিত শতদলে ।
পাইয়া মধুর কোষ মুক্ত কুতূহলে ॥ ২৩৪ ॥
অলি যেন মধুপানে মহামতে মজে ।
তেমতি ভূপতি শ্রীশ্রীচরণ-সরোজে ॥ ২৩৫ ॥
ক্রমশঃ উদাস মন হয় অধ্যয়নে ।
সতত মানস রহে প্রভু-সন্নিধানে ॥ ২৩৬ ॥
প্রভুও তেমনি তাঁহে হইয়া সদয় ।
পরিপূর্ণ দেবগণে শ্রীঅঙ্গ-আলয় ॥ ২৩৭ ॥
দেখাইলা আর বার শুন বিবরণ ।
ভক্তি-প্রদায়িনী কথা ভক্ত-সংজোটন ॥ ২৩৮ ॥
একদিন প্রভুর সম্মুখে ভক্তবর ।
পাতিয়া নয়ন দুটি প্রভুর উপর ॥ ২৩৯ ॥
উপবিষ্ট যুক্তকরে স্বভাবে-মগন ।
হেনকালে বলিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ২৪০ ॥
দাঁড়াইয়া ভাবাবেশে ভাবের বিহ্বলে ।
দেখিতে এতই সাধ দেখ আঁখি মেলে ॥ ২৪১ ॥
দেবেশ-বাঞ্ছিত দৃশ্য দেখে ভক্তবর ।
বিরাজিত দেবত্রয় অঙ্গের ভিতর ॥ ২৪২ ॥
সকৌতুক চারিমুখ হংসের আসনে ।
সুদীর্ঘ ধবল বক্র গ্রীবা আন্দোলনে ॥ ২৪৩ ॥
প্রকাশে পুলক হংস হেলে ছলে মাথা ।
ধরিয়া ধবল পৃষ্ঠে সৃষ্টির বিধাতা ॥ ২৪৪ ॥
স্থানান্তরে খগেশ আসনে সমস্থিতি ।
পাতারূপে চারিভুজে নিজে লক্ষ্মীপতি ॥ ২৪৫ ॥
শোভা পায় এক পাশে যোগী মহেশ্বর ।
বেশ-ভূষা সজ্জীভূত বৃষের উপর ॥ ২৪৬ ॥
কি দেখ কি শুন মন বিচিত্র ভারতী ।
বিশ্বজননীর ভাবে অখিলের পতি ॥ ২৪৭ ॥
কোটি ব্রহ্মা কোটি বিষ্ণু কোটি মহেশ্বর ।
কোটি সৃষ্টি কোটি কোটি বিশ্ব চরাচর ॥ ২৪৮ ॥
একমাত্র লোমকূপে উঠে ডুবে খেলে ।
বিম্বের যেমন ধারা নীলাম্বুর জলে ॥ ২৪৯ ॥
হেন প্রভু রামকৃষ্ণ অনন্ত অনাদি ।
অব্যক্ত অচিন্তনীয় অপার জলধি ॥ ২৫০ ॥
জীবের উদ্ধারহেতু নর-কলেবর ।
সঙ্গে পারিষদগণ নিত্য অনুচর ॥ ২৫১ ॥
মূর্তিমান ষড়ৈশ্বর্য-বিভূতি বৈভব ।
লীলাপর ধরাধামে লীলা অভিনব ॥ ২৫২ ॥
অভিনব কেন কই শুন বিবরণ ।
প্রভু-অবতারে লীলা করি দরশন ॥ ২৫৩ ॥
ভাসে বল-বুদ্ধি ভাসে শাস্ত্র-অধ্যয়ন ।
অকূল সাগরে ভাসে সাধন-ভজন ॥ ২৫৪ ॥
ভাসে কর্ম ভাসে যোগ জপ-তপাচার ।
এক নমস্কারে জীবে ভবসিন্ধুপার ॥ ২৫৫ ॥
আর দিন প্রভুদেব কল্পতরুবেশে ।
দাঁড়াইয়া ভূপতির সম্মুখপ্রদেশে ॥ ২৫৬ ॥
ভাবেতে
বিভোর অঙ্গ করে টলটল ।
বলিলেন ভক্তবরে কি মাগিস্ বল ॥ ২৫৭ ॥
বিবেক সর্বোচ্চ বস্তু
ভূপতির জানা ।
তাহাই প্রভুর কাছে করিল প্রার্থনা ॥ ২৫৮ ॥
মৌন থাকি কিছুক্ষণ গৌণে কন তাঁরে ।
এত সাধ থাক তবে সপ্তমের ঘরে ॥ ২৫৯ ॥
ধন্য লীলা-প্রিয় ধন্য ধন্য ভক্তগণ ।
ধন্য ধন্য ধরাধাম লীলার আসন ॥ ২৬০ ॥
ধন্য ধন্য জীবকুল যদিও জ্বালায় ।
বুদ্ধিহারা দিশাহারা মোহিয়া মায়ায় ॥ ২৬১ ॥
কামিনী-কাঞ্চন ধন্য হরে ভক্তি চাঁদ ।
ধন্য শ্রীপ্রভুর শিক্ষা মায়া-মারা ফাঁদ ॥ ২৬২ ॥
সকলে বিমোহে মায়া বিমোহিতে নারে ।
জাগে রামকৃষ্ণভক্তি যাহার অন্তরে ॥ ২৬৩ ॥
মায়ার মোহিনী শক্তি প্রভুর প্রদত্ত ।
ভক্তাভক্ত সকলেই ইহার আয়ত্ত ॥ ২৬৪ ॥
এড়ান কাহার নাহি মায়ার প্রভাবে ।
ভক্তজন ভাসে
তায় ভক্তিহীনে ডুবে ॥ ২৬৫ ॥
কল্পতরুরূপে যবে অখিলের পতি ।
ইন্দ্রত্ব মাগিলে পরে
পাইত ভূপতি ॥ ২৬৬ ॥
কিন্তু আত্মসুখভোগে হইল না সাধ ।
বিবেক সুন্দর জ্ঞানে মাগিল
প্রসাদ ॥ ২৬৭ ॥
ঘরে জায়া যুবতী ভূপতি কৃতদার ।
পরান সমান ছিল এতদিন তাঁর ॥ ২৬৮ ॥
বন্ধন
শিথিল ক্রমে পায় দিনে দিনে ।
দিনে রেতে উঠে প্রীতি থাকিতে শ্মশানে ॥ ২৬৯ ॥
পরে কি হইল পরে কব বিবরণ ।
উপস্থিত ভূপতির কথা-সমাপন ॥ ২৭০ ॥
সমুদিত আসরে হইল এ সময় ।
প্রভুর পরম ভক্ত শুন পরিচয় ॥ ২৭১ ॥
বাদুড়বাগানে বাড়ি শহরের মাঝে ।
আফিসেতে উচ্চপদে অভিষিক্ত নিজে ॥ ২৭২ ॥
মাসে মাসে তিনশতাধিক টাকা আয় ।
ভাল জানে বহুজনে মানে গণে তায় ॥ ২৭৩ ॥
কৃষ্ণকায় লম্বে প্রস্থে দোহারা গড়ন ।
সতত অধরে হাসি বদন শোভন ॥ ২৭৪ ॥
যদিও বয়সাধিক চেহারার গুণে ।
রাখিয়াছে মূর্তি যেন নবীন প্রবীণে ॥ ২৭৫ ॥
বারে বারে এইবারে বিয়া তিনবার ।
পুরানে নূতনে ছেলে গণ্ডা দুই তাঁর ॥ ২৭৬ ॥
হাতে যিনি সর্বশেষ অতি ভক্তিমতী ।
শ্রীপ্রভুর শ্রীচরণে অচলা ভকতি ॥ ২৭৭ ॥
প্রকৃতি সুন্দর যদি জাতিতে কামিনী ।
শিরে ধরে পরাভক্তি সমুজ্জ্বল মণি ॥ ২৭৮ ॥
বারে বারে করি তাঁর চরণে প্রণতি ।
ভক্তির প্রভাবে যাঁর স্বামীর উন্নতি ॥ ২৭৯ ॥
পর-উপকারে স্বামী বড়ই সন্তোষ ।
নাম নবগোপাল উপাধি তাঁর ঘোষ ॥ ২৮০ ॥
কুলীন কায়স্থ এবে আইল আসরে ।
অভয়-চরণ প্রভু-বিভু দেখিবারে ॥ ২৮১ ॥
প্রথম দর্শন-দিনে বেশী রঙ্গ নয় ।
নাম ধাম এটা সেটা বাহ্য পরিচয় ॥ ২৮২ ॥
এক আজ্ঞা করিলেন প্রভু নারায়ণ ।
করিবারে নিত্য নিত্য ঘরে সংকীর্তন ॥ ২৮৩ ॥
বসিল প্রভুর বাক্য অন্তরে অটল ।
যতনে পালন করে আজ্ঞা অবিকল ॥ ২৮৪ ॥
খোল-করতাল-সহ হ'ল সংকীর্তন ।
সঙ্গে লয়ে অল্পবয়ঃ নন্দিনী-নন্দন ॥ ২৮৫ ॥
হরিশ মুস্তফি নামে ভক্ত একজন ।
জুটিলেন এ সময়ে প্রভুর সদন ॥ ২৮৬ ॥
গোউর বরন বয়ঃ চল্লিশের পার ।
লাটের অফিসে উচ্চপদে কাজ তাঁর ॥ ২৮৭ ॥
জাতিতে ব্রাহ্মণ তেঁহ দেবেন্দ্রের মামা ।
ধীর শান্ত নাহি হৃদে তিলার্ধ গরিমা ॥ ২৮৮ ॥
পাছু জুটে পুত্র তাঁর দণ্ডবৎ তাঁকে ।
মূল নাম হরিপদ পতু নামে ডাকে ॥ ২৮৯ ॥
দশ বরষের বয়ঃ ভক্তি বিলক্ষণ ।
প্রভুরে দেখিলে ক্ষরে অশ্রুবিসর্জন ॥ ২৯০ ॥
বসাইয়া বিছানায় প্রভু গুণমণি ।
বদনে মিষ্টান্ন তুলে দিতেন আপনি ॥ ২৯১ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব ভকত তেমতি ।
ধীরে ধীরে শুন রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ॥ ২৯২ ॥
জুটিল যুবক এক সাণ্ডেল বামুন ।
ভিতরেতে ভরা অনুরাগের আগুন ॥ ২৯৩ ॥
ক্ষিপ্তপ্রায় দ্রুত যেন বারুদের বাজি ।
প্রভুরে করুণা মাগে প্রভু নন রাজি ॥ ২৯৪ ॥
অন্তরে অকুতোভয় দস্যুর আচার ।
মানস ভাণ্ডার লুটে ভাঙ্গিয়া দুয়ার ॥ ২৯৫ ॥
প্রকৃতি দেখিয়া বড় আনন্দ প্রভুর ।
অচিরে করিলা কৃপা দয়াল ঠাকুর ॥ ২৯৬ ॥
বিটল বামুন আর পাছু দিল দেখা ।
কিশোরী তাঁহার নাম সাণ্ডেলের সখা ॥ ২৯৭ ॥
মাখান উপরে গায়ে ভিতরের ভাব ।
সরল এতই যেন তরলের পাব ॥ ২৯৮ ॥
যুবা-বয়ঃ লম্বা-দেহ শ্যামল-বরন ।
পাইল প্রভুর কৃপা আইল যেমন ॥ ২৯৯ ॥
ইহার অনেক আগে জুটে একজন ।
বাগবাজারেতে ঘর মুখুয্যে ব্রাহ্মণ ॥ ৩০০ ॥
মহেন্দ্র তাঁহার নাম পরম উদার ।
বয়স অধিক প্রায় গণ্ডা বার পার ॥ ৩০১ ॥
সুবলন ঠাম অঙ্গ চারু-দরশন ।
প্রভুর চরণে রতি মতি বিলক্ষণ ॥ ৩০২ ॥
একদিন প্রভুদেব কহিলেন তাঁরে ।
শহরের মধ্যে রঙ্গমঞ্চের ভিতরে ॥ ৩০৩ ॥
যাইয়া দেখিতে মোর সাধ অতিশয় ।
কেমন চৈতন্য-লীলা অভিনয় হয় ॥ ৩০৪ ॥
যে আজ্ঞা বলিয়া ঘরে ফিরিল ব্রাহ্মণ ।
নির্ধারিত দিনে করি যথা আয়োজন ॥ ৩০৫ ॥
আনিলেন প্রভুদেবে পরম আদরে ।
সঙ্গে কুতূহলাক্রান্ত ভকতনিকরে ॥ ৩০৬ ॥
আধিপত্য গিরিশের মঞ্চে ষোলআনা ।
প্রতিবাসী মহেন্দ্রের সঙ্গে জানা-শুনা ॥ ৩০৭ ॥
সমাচার পাঠাইল তাঁহার সদন ।
মঞ্চমধ্যে শ্রীপ্রভুর শুভ আগমন ॥ ৩০৮ ॥
এখন শ্রীগিরিশের সাধু ভক্তজনে ।
বিধি-প্রতিকূল ভাব উঠিয়াছে মনে ॥ ৩০৯ ॥
ভিতরে কারণ তার আছে বিলক্ষণ ।
পুঁথিতে বর্ণন করা নাহি প্রয়োজন ॥ ৩১০ ॥
অতিথি সন্ন্যাসী জটাধারী ভস্মমাখা ।
পাড়ায় কাহার সঙ্গে যদি হয় দেখা ॥ ৩১১ ॥
তখনি সুমিষ্টালাপ সহ সদাচার ।
ভীমসম ভীম দেশে ভীষণ প্রহার ॥ ৩১২ ॥
বিশেষে শ্রীপ্রভুদেব প্রথম দর্শনে ।
প্রতিবাসী দীনবন্ধু বস্তুর ভবনে ॥ ৩১৩ ॥
গিরিশের ভাব মনে হয় কি রকম ।
বলিয়াছি বহু পূর্বে করহ স্মরণ ॥ ৩১৪ ॥
মঞ্চমধ্যে আগমন সেই শ্রীপ্রভুর ।
শুনিয়া শ্রীগিরিশের ভক্তি কত দূর ॥ ৩১৫ ॥
হৃদয়মাঝারে এবে হয় উদ্দীপন ।
বুঝিয়াছি সহজেই বুঝিয়াছ মন ॥ ৩১৬ ॥
গিরিশ না দেন কান কাহার কথায় ।
বসিয়া দ্বিতলে নিজ আসন যেথায় ॥ ৩১৭ ॥
ভক্তগণে কহে পুনঃ গিয়া তাঁর কাছে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন দাঁড়াইয়া নীচে ॥ ৩১৮ ॥
সাদরে উপরে তাঁরে যতন সহিত ।
আনিয়া আসনদানে বন্দনা উচিত ॥ ৩১৯ ॥
অনুরোধে অনুকম্পা গিরিশের তবে ।
দ্বিতলে আনিতে আজ্ঞা কৈলা প্রভুদেবে ॥ ৩২০ ॥
স্বতন্ত্র আসন দিল দেখিবার স্থান ।
প্রভুরে ছাড়ান দিয়া রঙ্গমঞ্চদান ॥ ৩২১ ॥
দান টিকিটের দাম মঞ্চের উপায় ।
ভক্তদের কাছে সব করিল আদায় ॥ ৩২২ ॥
গিরিশ প্রভুর কাছে গিয়া একবার ।
নিরখিল প্রভুদেবে নাই নমস্কার ॥ ৩২৩ ॥
মনে মনে কিবা ভাব হইল তখন ।
নিযুক্ত করিয়া দিল লোক একজন ॥ ৩২৪ ॥
বৃহৎ তালের পাখা ধরা তার হাতে ।
শ্রীঅঙ্গে ব্যজন জন্য যতন সহিতে ॥ ৩২৫ ॥
এইতক কার্য আজি করি সমাপন ।
গিরিশ চলিয়া গেল আপন ভবন ॥ ৩২৫ ॥
সুন্দর বিচিত্র মঞ্চ কিবা শোভা পায় ।
নানাবিধ সাজসজ্জা যা সাজে যেথায় ॥ ৩২৬ ॥
অভিনব অভিনয় ইংরেজী ডউলে ।
মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যে দেখে সে ভুলে ॥ ৩২৭ ॥
তাহে গোউরের গান ভক্তিরসে ছোঁচা ।
চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর গিরিশের রচা ॥ ৩২৮ ॥
বামাগণে
গায় গীত কণ্ঠ সুমধুর ।
দেখিয়া শুনিয়া বড় আনন্দ প্রভুর ॥ ৩২৯ ॥
একবার হরিনাম-শ্রবণে যাঁহার ।
হৃদয়ে উথলে ভক্তি প্রেমের জোয়ার ॥ ৩৩০ ॥
ঘন ঘন সমাধিস্থ না থাকে চেতন ।
আপনি খসিয়া পড়ে কটির বসন ॥ ৩৩১ ॥
তাঁহার নিকট হেন সুর লয় তানে ।
উদ্দীপক লীলা-ছবি পট প্রদর্শনে ॥ ৩৩২ ॥
ভক্তিমাখা সংগীত শ্রবণে কিবা হয় ।
কার সাধ্য বলে ইহা বুঝিবারও নয় ॥ ৩৩৩ ॥
অভিনয়-সমাপনে ভকতনিকরে ।
ধরাধরি করিয়া আনিল শ্রীমন্দিরে ॥ ৩৩৪ ॥
পরদিন অবিরত এই কথা হয় ।
কেমন সুন্দর মঞ্চ কিবা অভিনয় ॥ ৩৩৫ ॥
গিরিশের কারখানা আশ্চর্য সকল ।
দেখিলে শুনিলে করে সহজে পাগল ॥ ৩৩৬ ॥
অভিনয়ে অভিনয় না হয় গিয়ান ।
আসরে গোউর নিজে যেন মূর্তিমান ॥ ৩৩৭ ॥
ঠিক ঠিক হইয়াছে যেখানে যেমন ।
নকলে আসল ঠিক কৈনু দরশন ॥ ৩৩৮ ॥
গিরিশের গুণবাদ হাজার হাজার ।
করেন শ্রীপ্রভুদেব সম্মুখে সবার ॥ ৩৩৯ ॥
গিরিশ গিরিশ করি মত্ত প্রভুরায় ।
যতই কহেন প্রভু তবু না ফুরায় ॥ ৩৪০ ॥
এবারে
গিরিশে হয় পূর্ণ আকর্ষণ ।
অমৃত-ভাণ্ডার কথা ভক্ত-সংজোটন ॥ ৩৪১ ॥
মঞ্চমধ্যে এখানে গিরিশ একদিন ।
কর্তব্যে মগন মন আছে সমাসীন ॥ ৩৪২ ॥
দেখিছেন চিত্র করে এক চিত্রকর ।
গোউর-লীলার পট সুন্দর সুন্দর ॥ ৩৪৩ ॥
পরস্পর কথাবার্তা ক্রমে ক্রমে হয় ।
চিত্রকর গোরা-ভক্ত দিল পরিচয় ॥ ৩৪৪ ॥
গোউর-মাহাত্ম্য-কথা বলিবার তরে ।
গিরিশ জিজ্ঞাসা কৈল সেই চিত্রকরে ॥ ৩৪৫ ॥
গোরাপদে মত্তমন চিত্রকর কয় ।
কি শক্তি গোরার গুণ কহি মহাশয় ॥ ৩৪৬ ॥
বড়ই সুন্দর গোরা দয়ালপ্রকৃতি ।
ভক্তিভরে রাখি ঘরে গোরার মূরতি ॥ ৩৪৭ ॥
দীন হীন দুঃখী আমি দিন খেটে খাই ।
সঙ্গতি এমত কিছু ঘরে মোর নাই ॥ ৩৪৮ ॥
খুদকুঁড়া যাহা পাই থালে সাজাইয়া ।
গোউরের কাছে রাখি গোউর বলিয়া ॥ ৩৪৯ ॥
কিছু পরে ভোজ্য-পাত্রে করি নিরীক্ষণ ।
দয়াময় গোউরের ভোজন-লক্ষণ ॥ ৩৫০ ॥
নাট্যকার শ্রীগিরিশ কবির প্রধান ।
কাব্যরসে ভক্তিরসে ডুবু-ডুবু প্রাণ ॥ ৩৫১ ॥
বড়ই বসিল ছবি প্রাণের ভিতর ।
গোউর-মাহাত্ম্য যাহা কহে চিত্রকর ॥ ৩৫২ ॥
ভাবিতে দেখিতে ছবি দ্রবিল হৃদয় ।
কার্য-সমাপনে ফিরে চলিলা আলয় ॥ ৩৫৩ ॥
আছিল গোপন ব্যথা প্রাণের ভিতরে ।
সমুদিয়া ঢালে জল নয়নের দ্বারে ॥ ৩৫৪ ॥
ছুটিল ভক্তির স্রোত তটিনী যেমন ।
বরষায় দ্রুত ধায় না মানে বারণ ॥ ৩৫৫ ॥
উঠিল প্রবল বায়ু বাসনা অন্তরে ।
ভগবানে যদি এনে আপনার ঘরে ॥ ৩৫৬ ॥
মনের মতন পারি খাওয়াইতে তাঁয় ।
তবে না প্রাণের জালা মর্মব্যথা যায় ॥ ৩৫৭ ॥
উপায়স্বরূপ যাহে ভগবান মিলে ।
সকালে উঠিয়া ডাকে কালী কালী বলে ॥ ৩৫৮ ॥
অতি অনুরাগভরে গেল প্যাঁচ খোলা ।
বড় মিঠা শ্রীপ্রভুর ভক্তসনে খেলা ॥ ৩৫৯ ॥
তবু অদ্যাপিহ মন ধরা ছুঁয়া নাই ।
অদৃশ্যে বিমানে খেলা খেলিছে গোসাঁই ॥ ৩৬০ ॥
মহা প্যাচে আটা প্যাঁচ খুলে যার কলে ।
তিনি গুরু পূর্ণব্রহ্ম শাস্ত্রে হেন বলে ॥ ৩৬১ ॥
গিরিশ কেমন লোক সকলেই জানে ।
আবাল-বনিতা-বৃদ্ধ যে রহে যেখানে ॥ ৩৬২ ॥
সুরাপানপ্রিয় তেঁহ সদা মত্ত তায় ।
রঙ্গিনী মোহিনী বেশ্যা লয়ে ব্যবসায় ॥ ৩৬৩ ॥
নিজে পুনঃ নটবর ধর্মছাড়া পথ ।
গিরিশের পক্ষে এই সাধারণ মত ॥ ৩৬৪ ॥
ভিতরে ভিতরে হেথা আশ্চর্য ব্যাপার ।
লীলা-তত্ত্ব ভাগবত বুঝা অতি ভার ॥ ৩৬৫ ॥
গুপ্ত নিজে নরবেশে ভক্ত তাঁর ন্যায় ।
যেখানে সেখানে কাদাকালিমাখা গায় ॥ ৩৬৬ ॥
চেনা দায় কি আকারে কে কোথায় রয় ।
পদে পদে সন্দ ভক্ত-অপরাধ-ভয় ॥ ৩৬৭ ॥
কিবা দিব পরিচয় এ হাটের কথা ।
মা ঈশ্বরী প্রভুদেব অনন্ত বিধাতা ॥ ৩৬৮ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ শিশুগণ এখানে সেখানে ।
ধরাধামে আছে রাখা অতি সংগোপনে ॥ ৩৬৯ ॥
মায়ে বাপে মায়ায় এখন বিস্মরণ ।
ধরায় বিবিধ বেশে জীবের মতন ॥ ৩৭০ ॥
অবিদ্যার ঘরে বহু খেলার সাজনি ।
বিচিত্র চামের চিত্র সুচারু কামিনী ॥ ৩৭১ ॥
চাকি ফাঁকি কাঞ্চন ভগিনী সঙ্গে তার ।
মনোহর শাখা-প্রশাখাদি দোঁহাকার ॥ ৩৭২ ॥
চমৎকার নানা বিদ্যা ওঁচলার রাশি ।
রঙ্গের সঙ্গীত বিদ্যা অবিদ্যার দাসী ॥ ৩৭৩ ॥
বিবিধ খেলনা লয়ে ভকতনিকরে ।
মোহজালে বিজড়িত মুগ্ধ একেবারে ॥ ৩৭৪ ॥
এখন লীলায় যাঁরে যেন প্রয়োজন ।
করিছেন প্রভুদেব তাঁর অন্বেষণ ॥ ৩৭৫ ॥
পূর্ব-স্মৃতিলোপ ভক্ত যাইতে না চায় ।
খেলনা লইয়া সবে প্রমত্ত খেলায় ॥ ৩৭৬ ॥
এতই উন্মত্ত সবে ক্রীড়ার প্রাঙ্গণে ।
কতই ডাকেন প্রভু নাহি শুনে কানে ॥ ৩৭৭ ॥
বিষম মায়ার নেশা ছাড়িতে না চায় ।
প্রভুর শ্রীবাক্য-মন্ত্র তাহারে উড়ায় ॥ ৩৭৮ ॥
অবশেষে টানাটানি হয় দুইজনে ।
কখন ধরিয়া অঙ্গ কভু প্রাণে প্রাণে ॥ ৩৭৯ ॥
তবু যদি না মানিয়া ভক্ত করে জুম ।
খেলাশাল দিলে ভেঙ্গে তবে ভাঙ্গে ঘুম ॥ ৩৮০ ॥
শয্যাগত হয় নারী অর্থ যায় উড়ে ।
মায়ার পুতুল-পুত্র-শোকে নাড়ী ছিঁড়ে ॥ ৩৮১ ॥
দূরবস্থা-সহ পড়ে বিপদের ভার ।
দিনের বেলায় দেখে দুনিয়া আঁধার ॥ ৩৮২ ॥
শোকে তাপে জরা কায়া প্রাণ লয়ে টানে ।
তখন শান্তির চিন্তা অভিলাষ মনে ॥ ৩৮৩ ॥
শান্তিদাতা প্রভুদেব দিয়া শান্তি-নীর ।
আয়ত্তে আনিয়া ভক্তে করেন সুস্থির ॥ ৩৮৪ ॥
সেই হেতু ভক্তদের বিপদ বিস্তর ।
শুন ভাগবত লীলা-মঞ্চের রগড় ॥ ৩৮৫ ॥
এখন গিরিশচন্দ্রে পূর্ণ আকর্ষণ ।
কেমনে আনেন ঘরে শুন শুন মন ॥ ৩৮৬ ॥
ভক্ত-সংজোটন কাণ্ড অতি সুমধুর ।
গাইলে শুনিলে হয় মায়া-তম দূর ॥ ৩৮৭ ॥
বাগবাজারেতে এক অতি ধনবান ।
ধার্মিক সুশীল শান্ত নন্দ বসু নাম ॥ ৩৮৮ ॥
প্রাসাদ-সদৃশ বাড়ি দশবিঘা ঘেরে ।
দশমহাবিদ্যার মূরতি ছবি ঘরে ॥ ৩৮৯ ॥
ভক্তের মুখেতে কথা করিয়া শ্রবণ ।
প্রভুর হইল বড় দেখিবারে মন ॥ ৩৯০ ॥
কতিপয় ভক্ত-সঙ্গে প্রভুদেবরায় ।
উপনীত একবারে হইলা তথায় ॥ ৩৯১ ॥
যখন যেখানে হয় শ্রীপ্রভুর পাট ।
তখন সেখানে বসে মানুষের হাট ॥ ৩৯২ ॥
কানে কানে শুনিয়া কতই লোক আসে ।
পতিত-পাবন প্রভু দরশন-আশে ॥ ৩৯৩ ॥
মনোবাঞ্ছা যাঁর যেন করিয়া পুরণ ।
উঠিলেন প্রভুদেব ভক্ত-বিনোদন ॥ ৩৯৪ ॥
মহাভক্ত বলরাম বসু জমিদার ।
আসিবেন তাঁর ঘরে বাসনা তাঁহার ॥ ৩৯৫ ॥
মহাপুণ্যময় বাটী নহে অতি দূর ।
সঙ্গেতে নারাণচন্দ্র ভকত প্রভুর ॥ ৩৯৬ ॥
ধরিয়া শ্রীহস্ত ধীরে চলে সাবধানে ।
যেন
নাহি লাগে ব্যথা প্রভুর চরণে ॥ ৩৯৭ ॥
কোমল প্রভুর তহ কোমল চরণ ।
কিঞ্চিৎ হাঁটিলে কষ্ট হয় বিলক্ষণ ॥ ৩৯৮ ॥
কোমলত্ব শ্রীঅঙ্গের নহে কহিবার ।
কমলের কোমলত্ব মিছার কি ছার ॥ ৩৯৯ ॥
কোমল শ্রীপদ দেখি জলজ কমলে ।
কণ্টকিত কায়ে ভাসে দরিয়ার জলে ॥ ৪০০ ॥
বলা কিছু বেশী নয় সত্য কথা মন ।
কোমল পদ্মের চেয়ে প্রভুর চরণ ॥ ৪০১ ॥
চরণের কোমলত্ব দিনু পরিচয় ।
হৃদয় কোমল কত কহিবার নয় ॥ ৪০২ ॥
তুলনাই নাই তার না দেখি না শুনি ।
আভাস কিঞ্চিৎ দেয় সদ্যোজাত ননী ॥ ৪০৩ ॥
অল্পতাপে জলবৎ হয় যে প্রকার ।
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব করুণাবতার ॥ ৪০৪ ॥
কাঙ্গালের কষ্টতাপ ঈষৎ দেখিলে ।
কোমল হৃদয়খানি একেবারে গলে ॥ ৪০৫ ॥
উথলিয়া জলরাশি চক্ষুর দুয়ারে ।
গণ্ডবুক বেয়ে ধারা ধরার উপরে ॥ ৪০৬ ॥
অবতারে শ্রীপ্রভুর এতই রোদন ।
কাঁদিবার তরে যেন ধরায় গমন ॥ ৪০৭ ॥
কেন তাঁর এত কষ্ট এতেক যাতনা ।
কামিনী-কাঞ্চনে যাঁর বিষ্ঠাবৎ ঘৃণা ॥ ৪১০ ॥
ছার যাঁর ধন-মান যশের পুঁটুলি ।
মানামান আত্মসুখ বাসনার থলি ॥ ৪১১ ॥
নাহি যাঁর তিলাদপি ভবের বন্ধন ।
পিতা মাতা ভাই বন্ধু নন্দিনী নন্দন ॥ ৪১২ ॥
নাহি যাঁর আদতেই রিপুর তাড়না ।
সুবিমল মনখানি মুক্ত ষোল আনা ॥ ৪১৩ ॥
নাহি
যাঁর শরীরেতে তিলার্ধ আদর ।
দেহে মনে রেতে দিনে রহে স্বতন্তর ॥ ৪১৪ ॥
কায়মনোবাক্য যাঁর এক তানে বাঁধা ।
কি হেতু তাঁহার দুঃখ ঘটি ঘটি কাঁদা ॥ ৪১৫ ॥
অপর কারণ মন নাহিক ইহার ।
অপার করুণা জীবে প্রভুর আমার ॥ ৪১৬ ॥
অবাক কাহিনী কথা শুন ঘটনায় ।
পুরীমধ্যে যেইখানে প্রভুদেবরায় ॥ ৪১৭ ॥
দুপুর বেলায় যেন বন্দেজ পুরীর ।
ক্ষুধাতুর দীন-দুঃখী প্রত্যহ হাজির ॥ ৪১৮ ॥
পায় মহাপ্রসাদ উদর পুরে খায় ।
সশরীরে প্রভুদেব তাঁহার কৃপায় ॥ ৪১৯ ॥
একদিন শুন এক বৃদ্ধা কাঙ্গালিনী ।
জরার দশায় প্রায় ব্যাকুল পরানী ॥ ৪২০ ॥
অবশ শিখিল অঙ্গ গায়ে উড়ে খড়ি ।
চরণ চালান হেতু হাতে ধরা ছড়ি ॥ ৪২১ ॥
হইল কিঞ্চিৎ দেরী আসিতে হেথায় ।
পুরীর মধ্যেতে ক্ষুধা তৃপ্তির আশায় ॥ ৪২২ ॥
ফটকের মুখে থাকে দ্বারীর বৈঠক ।
সময় অতীতে করে বৃদ্ধারে আটক ॥ ৪২৩ ॥
চিরকাল দ্বারবান নিষ্ঠুরাচরণ ।
ভিতর হইতে করে বৃদ্ধারে বারণ ॥ ৪২৪ ॥
ক্ষুধাতুর অনাথিনী পেটের জ্বালায় ।
কাকুতি সহিত মধ্যে প্রবেশিতে চায় ॥ ৪২৫ ॥
দ্বারবান দেখিয়া হুকুমে হতাদর ।
বৃদ্ধার পিঠেতে এক মারিল চাপড় ॥ ৪২৬ ॥
প্রহারে আকুলা হেথা কাঁদে কাঙ্গালিনী ।
প্রভুর মন্দির দূর অবাক কাহিনী ॥ ৪২৭ ॥
উপবিষ্ট প্রভুদেব আপনার স্থানে ।
পশিল রোদন-ধ্বনি শ্রীপ্রভুর কানে ॥ ৪২৮ ॥
চমকিত গুণমণি বিমরষ মন ।
বারতা জানিতে তত্ত্ব কৈলা অন্বেষণ ॥ ৪২৯ ॥
বিদিত হইয়া পরে ঘটনার মূল ।
শোকে সন্তাপেতে অতি হইয়া আকুল ॥ ৪৩০ ॥
দুনয়নে বারিধারা মাটি ভিজে পড়ে ।
কি বিচার মা তোমার কন উচ্চৈঃস্বরে ॥ ৪৩১ ॥
এক পাতা অন্ন মাত্র নহে কিছু আর ।
তাহার কারণে দিলি পিঠেতে প্রহার ॥ ৪৩২ ॥
এই বলি ডাক ছাড়ি শোকের ভাষায় ।
কাঁদিয়া অস্থির তনু প্রভুদেবরায় ॥ ৪৩৩ ॥
একি অমানুষী দয়া জীবদু খাতুর ।
জীবের অপেক্ষা বেশী যাতনা প্রভুর ॥ ৪৩৪ ॥
হৃদয়ের কোমলত্ব শুনিলে তো মন ।
এবে শুন কি জিনিসে অঙ্গের গড়ন ॥ ৪৩৫ ॥
তনুখানি সৃষ্টি-খনি সব আছে তায় ।
সাদৃশ্যেতে কোন বস্তু নাহিক ধরায় ॥ ৪৩৬ ॥
শ্রীদেহ কহিনু কেন সৃজনের খনি ।
কেননা তাঁহাতে সব সকলেতে তিনি ॥ ৪৩৭ ॥
ঘটনা ধরিয়া মন বুঝহ বারতা ।
এ সময়ে নহে ইহা আগেকার কথা ॥ ৪৩৮ ॥
শ্রীপ্রভুর সেবাকার্যে হৃদয় যখন ।
ভক্তদের মধ্যে দুই-একের মিলন ॥ ৪৩৯ ॥
একদিন পুরীমধ্যে জাহ্নবীর তটে ।
দাঁড়ী মাঝি দুইজনে বিসংবাদ ঘটে ॥ ৪৪০ ॥
ক্রমে ক্রমে কলহ হইল গুরুতর ।
ক্রোধভরে প্রবল দুর্বলে মারে চড় ॥ ৪৪১ ॥
প্রবল সবল যেন তেন তার রাগ ।
চড়ে পিঠে কুটে পাঁচ অঙ্গুলির দাগ ॥ ৪৪২ ॥
এখানেতে শ্রীমন্দিরে প্রভু নারায়ণ ।
পিঠেতে বুলান হাত বিমরষ মন ॥ ৪৪৩ ॥
বদনে বিষাদ মাখা বিপন্নের প্রায় ।
হেনকালে উপনীত হৃদয় তথায় ॥ ৪৪৪ ॥
হৃদয় জিজ্ঞাসা করে ক্ষুন্নের কারণ ।
মারিয়াছে আমারে কহিলা নারায়ণ ॥ ৪৪৫ ॥
হৃদয় দেখিল গিয়া প্রভুর নিকটে ।
পাঁচ অঙ্গুলির দাগ ফুলে আছে পিঠে ॥ ৪৪৬ ॥
হৃদয় ভৈরবাকার মহা বলবান ।
ক্রোধেতে ফুলিয়া হয় ভীমের সমান ॥ ৪৪৭ ॥
কহে মামা কহ তুমি এ কর্ম কাহার ।
এখনি পাঠাব তারে যমের দুয়ার ॥ ৪৪৮ ॥
এত শুনি বলিলেন প্রভুদেবরায় ।
গঙ্গাকূলে বাগানের বাঁধান পোস্তায় ॥ ৪৪৯ ॥
দাঁড়ী মাঝি দুজনে বিবাদ গুরুতর ।
একজন মারিয়াছে অন্যজনে চড় ॥ ৪৫০ ॥
প্রহারিত যেইজন দুর্বল-আকার ।
তার চড় পড়িয়াছে পিঠেতে আমার ॥ ৪৫১ ॥
যেমন নির্গত কথা শ্রীমুখে প্রভুর ।
দেখিতে কৌতুক মন হইল হৃদুর ॥ ৪৫২ ॥
গঙ্গাতটে গিয়া তেঁহ দেখিবারে পায় ।
করিতেছে গণ্ডগোল মাঝি দুজনায় ॥ ৪৫৩ ॥
দুর্বলের পিঠে হৃদু করে নিরীক্ষণ ।
পাঁচ আঙ্গুলের দাগ প্রভুর যেমন ॥ ৪৫৪ ॥
কি কহিব শ্রীপ্রভুর অঙ্গের বারতা ।
বিধি বিষ্ণু, মহেশ্বর বুদ্ধি হারে যেখা ॥ ৪৫৫ ॥
অতি বড় অন্ধ যেবা পায় দেখিবারে ।
জগতের দেহ যেন তাঁহার ভিতরে ॥ ৪৫৬ ॥
সুকোমল প্রভু যেন তেন কে কোথায় ।
তাই লয়ে ধীরে ধীরে শ্রীনারাণ যায় ॥ ৪৫৭ ॥
যষ্টির মতন কাছে অতি সাবধানে ।
পথিমধ্যে হয় দেখা গিরিশের সনে ॥ ৪৫৮ ॥
নিজ প্রয়োজনে তথা ছিলেন গিরিশ ।
দেখিয়া প্রভুর মনে পরম হরিষ ॥ ৪৫৯ ॥
করুণ কটাক্ষ ফাঁদ অতি মোহনিয়া ।
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি তাহাতে পাতিয়া ॥ ৪৬০ ॥
নিক্ষেপিলা প্রভুদেব কৌশলের ভরে ।
মন-পাখী গিরিশের ধরিবার তরে ॥ ৪৬১ ॥
অগম বনের পাখী উড়ে বনে বনে ।
ইচ্ছামত নাচে গায় আপনার মনে ॥ ৪৬২ ॥
গাছে ফল ক্ষুধায় তৃষায় স্রোতে জল ।
জানে না কি অধীনতা পায়ের শিকল ॥ ৪৬৩ ॥
প্রভুর বিচিত্র ফাঁদে বিশ্ব-বিমোহন ।
কেমনে পড়িল পাখী অকথ্য কথন ॥ ৪৬৪ ॥
কহিবারে বিবরণ কি সাধ্য আমার ।
যত পারি শুন কথা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ৪৬৫ ॥
প্রভুর কর্মেতে কিছু নাহি হয় গোল ।
আঁখিতে হইল কাজ মুখে নাহি বোল ॥ ৪৬৬ ॥
নিকটে গিরিশে প্রভু নমস্কার করি ।
চলিলা বসুর বাসে পুণ্যময়ী পুরী ॥ ৪৬৭ ॥
কুবেরের মত যদি কেহ ধনবান ।
ইন্দ্রের সমান যদি কেহ ধরে মান ॥ ৪৬৮ ॥
কার্তিকের সম যদি গড়ন সুন্দর ।
অর্জুনের সম যদি কেহ ধনুর্ধর ॥ ৪৬৯ ॥
যদি কেহ যোগী ত্যাগী শঙ্করের মত ।
তথাপি গিরিশ নহে কারও কাছে নত ॥ ৪৭০ ॥
নির্ভয় হৃদয়ালয় নাহি লজ্জা-ভয় ।
চিন্তাশীল গম্ভীর প্রকৃতি অতিশয় ॥ ৪৭১ ॥
বুদ্ধির ইয়ত্তা নাই ঘটেতে বিস্তর ।
চারি পাঁচ বেশী ষোল আনার উপর ॥ ৪৭২ ॥
ফিকির ফন্দির বুদ্ধি কত ঘটে খেলে ।
যেখানে চলেনা ছুঁচ বাঁশ তথা ঠেলে ॥ ৪৭৩ ॥
সুমেরু এড়িয়া গুরু তনু অভিমানে ।
যে হোক যতই বড় কাহারে না মানে ॥ ৪৭৪ ॥
কতই মোহন তাঁর মুখের কথায় ।
পুত্রের কাটিয়া মাথা পিতারে ভুলায় ॥ ৪৭৫ ॥
কিন্তু আজি হেন ফাঁদ পাতিলা গোসাঁই ।
গিরিশের পক্ষে আর কোন রক্ষা নাই ॥ ৪৭৬ ॥
দাঁড়ায়ে গিরিশচন্দ্র বারে বারে চায় ।
যেই পথে পয়ান করেন প্রভুরায় ॥ ৪৭৭ ॥
টানিতে লাগিল শ্রীপ্রভুর আকর্ষণ ।
যাইতে প্রভুর সঙ্গে গিরিশের মন ॥ ৪৭৮ ॥
প্রকৃতিসুলভ অভিমান সুপ্রবল ।
স্তম্ভিত হইয়া ভাবে চরণ অচল ॥ ৪৭৯ ॥
এমন সময় তথা উতরিল ধেয়ে ।
বালক নারাণচন্দ্র হাসিয়ে হাসিয়ে ॥ ৪৮০ ॥
অমৃত-বরযী ভাষে কহিল তাঁহায় ।
দেখিতে তাঁহারে ডাকিলেন প্রভুরায় ॥ ৪৮১ ॥
তিল নহে দেরি তেঁহ চলিল অমনি ।
মহামন্ত্রে বিমোহিত যেইরূপ ফণী ॥ ৪৮২ ॥
দ্রুতপদসঞ্চালনে পরম হরিষে ।
যেথা প্রভু গুণমণি বস্তুর আবাসে ॥ ৪৮৩ ॥
সম্মুখেতে শ্রীপ্রভুর বসিলেন গিয়া ।
প্রভুর পরমানন্দ গিরিশে দেখিয়া ॥ ৪৮৪ ॥
জিজ্ঞাসে গিরিশচন্দ্র প্রভুগুণধরে ।
শুরু কি প্রকার বস্তু গুরু বলে কারে ॥ ৪৮৫ ॥
উত্তর হইল ভক্তে চিরকেলে চেনা ।
গুরু কি কেমন জান যেমন কোট্না ॥ ৪৮৬ ॥
মিলাইয়া ইষ্ট গুরু নাহি রহে আর ।
তোমার হয়েছে গুরু কি চিন্তা তোমার ॥ ৪৮৭ ॥
শ্রীবাক্যে বিশ্বাস ভরা কহিলেন পিছে ।
তোমার মনেতে মাত্র এক বাঁক আছে ॥ ৪৮৮ ॥
গিরিশ বিস্মিত শুনি শ্রীবাক্য প্রভুর ।
সভয়ে জিজ্ঞাসে কিসে বাঁক হইবে দূর ॥ ৪৮৯ ॥
করুণ-ভাষায় তাঁরে কহিলা গোসাঁই ।
অচিরে হইবে দূর চিন্তা কিছু নাই ॥ ৪৯০ ॥
এতেক অবধি কথা শেষ অদ্যকার ।
ভক্তিভরে প্রভুদেবে করি নমস্কার ॥ ৪৯১ ॥
ঘরে ফিরে আপনার চলেন গিরিশ ।
অন্তরে আনন্দ ভরা পরম হরিষ ॥ ৪৯২ ॥
কভু নহে অনুভব এমন উল্লাস ।
শ্রীবাক্যে হইল এত অন্তরে বিশ্বাস ॥ ৪৯৩ ॥
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব ভক্তের আগারে ।
চলিতেছে ক্রমান্বয়ে প্রতি শনিবারে ॥ ৪৯৪ ॥
এইবারে আয়োজন করিলেন রাম ।
চাঁই-ভক্ত শ্রীপ্রভুর মহাভাগ্যবান ॥ ৪৯৫ ॥
ছুটিল চৌদিকে বার্তা তড়িতের ন্যায় ।
প্রভুভক্ত দূরে কাছে যে রহে যেখায় ॥ ৪৯৬ ॥
বীরভক্ত শ্রীপ্রভুর গিরিশ নুতন ।
পত্রের দ্বারায় তাঁরে ভক্ত কোন জন ॥ ৪৯৭ ॥
সংবাদ পাঠায় কোন ভক্তের আদেশে ।
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব রামের আবাসে ॥ ৪৯৮ ॥
যথাদিনে গিরিশের সচঞ্চল মন ।
যাই কি না যাই মনে করে আন্দোলন ॥ ৪৯৯ ॥
শ্রীপ্রভুর আকর্ষণ বড়ই প্রবল ।
ঠিক যেন এক টানা প্রলয়ের জল ॥ ৫০০ ॥
কার সাধ্য করে রোধ এ টানের চোটে ।
গেল দিন বসিলেন সূর্যদেব পাটে ॥ ৫০১ ॥
সন্ধ্যার পরেই যবে কিছু হয় রাতি ।
সে সময়ে শ্রীপ্রভুর উৎসবের রীতি ॥ ৫০২ ॥
গিরিশ চঞ্চল বড় মঞ্চের ভিতর ।
বাহিরে আসিয়া পথে ক্রমে অগ্রসর ॥ ৫০৩ ॥
ক্ষণে ক্ষণে যায় পুনঃ থামে ক্ষণে ক্ষণে ।
পূর্ণিত হৃদয়খানি মহা অভিমানে ॥ ৫০৪ ॥
নিজে গণ্য-মান্য লোক শহর ভিতর ।
স্বভাবে না জানে যেতে অপরের ঘর ॥ ৫০৫ ॥
প্রাণান্তেও নতশির কারো কাছে নয় ।
সমাজ-সম্পর্কে যদি গুরুজন হয় ॥ ৫০৬ ॥
তাহে
মহোৎসবে যাঁর ভবনে গোসাঁই ।
কখন তাঁহার সঙ্গে আলাপন নাই ॥ ৫০৭ ॥
ইতি উতি ভাবিতে ভাবিতে উপনীত ।
রামের আবাস যেথা তার সন্নিহিত ॥ ৫০৮ ॥
সুরেন্দ্রের সঙ্গে রাম বাহির-দুয়ারে ।
আসিছে গিরিশ ঘোষ পায় দেখিবারে ॥ ৫০৯ ॥
উভয়েই সকৌতুক দেখিয়া ঘটনা ।
নাট্যকার শ্রীগিরিশ সকলের চেনা ॥ ৫১০ ॥
বেশ্যা লয়ে ব্যবসায় সুরা করে পান ।
ধর্মবিবর্জিত ব্যক্তি সাধারণে জ্ঞান ॥ ৫১১ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশনে আসিছে সে জন ।
উভয় সুরেন্দ্র রামে সবিস্ময় মন ॥ ৫১২ ॥
যথাযোগ্য সম্ভাষণে গিরিশে লইয়া ।
বসাইয়া দিল রাম ভিতরেতে গিয়া ॥ ৫১৩ ॥
অতি অল্প পরিসর রামের প্রাঙ্গণ ।
যেইখানে প্রভুদেব ভক্ত-বিনোদন ॥ ৫১৪ ॥
করিছেন সংকীর্তন উন্মত্তের পারা ।
সেইমত মত্ত ভক্ত সঙ্গে আছে যারা ॥ ৫১৫ ॥
পূর্ণানন্দময়ে ঝরে আনন্দ কেবল ।
প্রতিভাতে যার ভক্তে আনন্দে বিহ্বল ॥ ৫১৬ ॥
হীরকের খণ্ড যথা ঝলমল করে ।
পাইয়া আলোর রেখা দেহের উপরে ॥ ৫১৭ ॥
ভবনে প্রবেশমাত্র গিরিশ মোহিত ।
দিব্য ভাবানন্দে হয় অন্তর পুরিত ॥ ৫১৮ ॥
অপূর্ব প্রভুর নৃত্য হয় সে সময় ।
নৃত্যের মাধুরী কথা কহিবার নয় ॥ ৫১৯ ॥
হুঙ্কারিয়া কভু নৃত্য সিংহের প্রতাপে ।
ধরা করে টল টল শ্রীচরণচাপে ॥ ৫২০ ॥
ভাবে ভরা মাতোয়ারা অতুল বিক্রম ।
মহাশ্রম তবু নহে অনুভব শ্রম ॥ ৫২১ ॥
যষ্টির মতন কভু শ্রীঅঙ্গ নিশ্চল ।
কভু কাঁপে পাণিদ্বয় কভু চক্ষে জল ॥ ৫২২ ॥
সুমন্দ মধুর হাসি কভু কভু খেলে ।
অপূর্ব লাবণ্যসহ শ্রীমুখমণ্ডলে ॥ ৫২৩ ॥
কভু খুলে পড়ে বাস সংজ্ঞা নাহি গায় ।
নিকটে সতর্ক ভক্ত কটিতে জড়ায় ॥ ৫২৪ ॥
কভু কাঁচা-ঘুমে-উঠা বালকের মত ।
বার আনা ঘোরে ঘোরে সিকি জাগরিত ॥ ৫২৫ ॥
বলেন সুদীর্ঘ ভাবে বাক্য জড় জড় ।
হুঁশ আছে এই বটে রয়েছে কাপড় ॥ ৫২৬ ॥
পুনরায় প্রভুরায় এই বাহ্যহারা ।
পরক্ষণে কখন বা উন্মত্তের পারা ॥ ৫২৭ ॥
মাতোয়ারা ভাবে নৃত্য লাফে কাঁপে মাটি ।
খোল করতাল বাজে তালে খুব খাঁটি ॥ ৫২৮ ॥
কভু অঙ্গ ঢলে এত ভাবের বিভোরে ।
পড়ি পড়ি ভাব কিন্তু ভূমে নাহি পড়ে ॥ ৫২৯ ॥
কখন
মধুর কণ্ঠে করেন কীর্তন ।
আখর রচিয়া তায় নূতন নূতন ॥ ৫৩০ ॥
কভু কোন মত্ত ভক্ত
ভূমিতে পড়িয়া ।
জাগায়ে উঠান তার বুকে হাত দিয়া ॥ ৫৩১ ॥
পরক্ষণে নৃত্যগীত পূর্বের
মতন ।
দেখিলে শুনিলে ধ্রুব মুগ্ধ প্রাণ মন ॥ ৫৩২ ॥
হইলেও সুকঠিন কুলিশের প্রায় ।
দ্রবিয়া গলিয়া পড়ে শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৫৩৩ ॥
নৃত্যগীতে জন্ম দেন নিজে নাট্যকার ।
বীণাকণ্ঠী অভিনেত্রী লয়ে থিয়েটার ॥ ৫৩৪ ॥
প্রিয়তম বরপুত্র কল্পনাদেবীর ।
চিত্তখানি আঁকাপট স্বভাব ছবির ॥ ৫৩৫ ॥
সামাজিক
রীতিনীতি পাতি পাতি পড়া ।
সমুজ্জ্বল বুদ্ধিবৃত্তি সাধারণ-ছাড়া ॥ ৫৩৬ ॥
অভিমানি-চূড়ামণি নির্ভয়-আচার ।
ধরা-বেড়া ছাতি হৃদে ভরা অহঙ্কার ॥ ৫৩৭ ॥
তীরের
স্বভাব নহে ধনুকের মত ।
মদ দেখি মূর্তিমান মদ পরাভূত ॥ ৫৩৮ ॥
এহেন গিরিশ ঘোষ বিনা
নিমন্ত্রণে ।
ত্রস্তচিত উপনীত রামের ভবনে ॥ ৫৩৯ ॥
বুদ্ধিহত একেবারে বিমোহিত মন ।
সংকীর্তন শ্রীপ্রভুর করি নিরীক্ষণ ॥ ৫৪০ ॥
মনে মনে করে আশ পরশন করি ।
অভয় চরণ-রজঃ
মস্তকেতে ধরি ॥ ৫৪১ ॥
অচল অপেক্ষা গুরু তনু অহংকারে ।
লোক-লজ্জা ভয়ে কাছে যাইতে না
পারে ॥ ৫৪২ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভকত-বৎসল ।
মোহিলা সকলে পাতি মোহনিয়া বল ॥ ৫৪৩ ॥
বিহ্বল সকলে যেন নেশায় আতুর ।
গিরিশ যেথায় নেচে আইলা ঠাকুর ॥ ৫৪৪ ॥
আবেশে বিভোর অঙ্গ পড়ে যেন ঢলে ।
খেলে অপরূপ কান্তি বদনমণ্ডলে ॥ ৫৪৫ ॥
গিরিশের সাধ পূর্ণ সময় পাইয়া ।
মাথায় ধরিল রজঃ পদ পরশিয়া ॥ ৫৪৬ ॥
চকিতের মধ্যে কার্য করি সমাধান ।
প্রাঙ্গণের মাঝে প্রভু করিলা পয়ান ॥ ৫৪৭ ॥
যেইখানে ভক্তগণ ভাবে মাতোয়ারা ।
করিতেছে নৃত্য-গীত প্রায় বাহ্যহারা ॥ ৫৪৮ ॥
বুঝিতে নারিনু কিছু শ্রীপ্রভুর কল ।
যে কলে ধরেন মাছ না ছুঁইয়া জল ॥ ৫৪৯ ॥
যার যেন সাধ পূর্ণ হয় সেই মত ।
হাটের মাঝেতে কর্ম লোকে অবিদিত ॥ ৫৫০ ॥
ভক্তমাত্রে সকলেই দেখিবারে পান ।
তাঁহার একার যেন প্রভু ভগবান ॥ ৫৫১ ॥
শত শত উপমা লীলায় তাঁর আছে ।
এক এক কৃষ্ণ প্রতি গোপিনীর কাছে ॥ ৫৫২ ॥
অন্যদিকে সম্প্রদায়ভেদে ভিন্ন লোকে ।
যে ভাবের যে যেমন সে তেমন দেখে ॥ ৫৫৩ ॥
ভক্তিপন্থিদলে দেখে মহাভক্ত তিনি ।
প্রতি বৈদান্তিক লোকে দেখে মহাজ্ঞানী ॥ ৫৫৪ ॥
যোগিশিরোমণি দেখে যোগমার্গে যারা ।
ত্যাগে দেখে অনুরাগ ত্যাগী বুদ্ধিহারা ॥ ৫৫৫ ॥
শাক্তগণে জনে জনে করে দরশন ।
শ্যামা-পদে শ্রীপ্রভুর সাঁপা প্রাণ মন ॥ ৫৫৬ ॥
বৈষ্ণববেরা বিধিমতে দেখিবারে পান ।
বৃন্দাবনচন্দ্রকৃষ্ণ-গত তাঁর প্রাণ ॥ ৫৫৭ ॥
রামাত আসিলে কাছে করে নিরীক্ষণ ।
দূর্বাদলশ্যাম রাম প্রভুর জীবন ॥ ৫৫৮ ॥
নবরসিকেরা দেখে রসিকশেখর ।
শৈব দেখে তাহাদের দলের ভিতর ॥ ৫৫৯ ॥
স্পষ্টভাবে দেখে তারা যারা কর্তাভজা ।
কর্তা-পদে শ্রীপ্রভুর মন প্রাণ মজা ॥ ৫৬০ ॥
বাউলে বাউল ভাবে প্রভুরে দেখিয়া ।
দরবেশী ভারি খুশী শ্রীপদে লুটিয়া ॥ ৫৬১ ॥
ঠিক সাঁই শ্রীগোসাঁই দেখে সাঁই যত ।
শিখেরা দেখিতে পায় নানকের মত ॥ ৫৬২ ॥
ব্রাহ্মদলে শ্রীকেশব সদা যুক্তকর ।
কোরানপাঠকে করে মহা সমাদর ॥ ৫৬৩ ॥
উন্নত পাদরী যত পথে আগুয়ান ।
ভক্তিভরে রাখে হৃদে প্রভুর সম্মান ॥ ৫৬৪ ॥
সকল পন্থার লোক দেখে সমভাবে ।
কামিনী-কাঞ্চনাসক্তিশূন্য প্রভুদেবে ॥ ৫৬৫ ॥
কঠোর তিয়াগ তাঁর বড়ই বিষম ।
চারি যুগে নাহি মেলে প্রভুর মতন ॥ ৫৬৬ ॥
কায়মনোবাক্যে ত্যাগ ষোল আনা খারা ।
দেখিয়া শ্মশানবাসী শিব বুদ্ধিহারা ॥ ৫৬৭ ॥
কোন দিকে বিন্দুমাত্র কিছু নাই ফাঁক ।
দেখিয়া প্রভুর খেলা হইনু অবাক ॥ ৫৬৮ ॥
এদিকে পুনশ্চ বহে সংসারীর ধারা ।
পোষ্যের পোষণে ঠিক সুবন্দেজ করা ॥ ৫৬৯ ॥
সংসারী ভাবের তবে শুন পরিচয় ।
সংসারীরা যে প্রকার সে প্রকার নয় ॥ ৫৭০ ॥
হাবাতে সংসারী সব যাহা সাধারণে ।
দেহ-জ্বারা মন-হারা কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৫৭১ ॥
প্রকৃত সংসারী লোক হয় যেই জন ।
স্থান নাহি পায় তায় কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৫৭২ ॥
কামিনী-কাঞ্চন বিনা সংসার না হয় ।
প্রশ্ন যদি কর তবে শুন পরিচয় ॥ ৫৭৩ ॥
মাছভোজী পানকৌড়ি দরিয়ার মাঝে ।
ডুবে খেলে ধরে মাছ ডানা নাহি ভিজে ॥ ৫৭৪ ॥
জলবিন্দু পদ্ম পাতে পশিতে না পায় ।
যেমন তেমন থাকে উপরে পাতায় ॥ ৫৭৫ ॥
দেহ-পুষ্টে তেল জল যেন প্রয়োজন ।
সংসারীর পক্ষে তেন কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৫৭৬ ॥
ক্ষতি নাই নৌকা যদি জলমধ্যে থাকে ।
হানি যদি নায়ের ভিতর জল ঢোকে ॥ ৫৭৭ ॥
প্রকৃত সংসারী আর প্রকৃত সন্ন্যাসী ।
কেন নহে কম কিছু কেহ নহে বেশী ॥ ৫৭৮ ॥
কর্মে নাহি লঘু গুরু কিংবা বেশী কম ।
শুভাশুভে ভালমন্দে সমান ওজন ॥ ৫৭৯ ॥
বিশেষিয়া বলিবারে নাহি অধিকার ।
শুন লীলা দু'হ জ্ঞান ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৫৮০ ॥
লীলা পাঠে আপনার কর্ম লহ বেছে ।
ভাণ্ডারে অভাব নাই চারি বেদ আছে ॥ ৫৮১ ॥
হেথা শ্রীগিরিশ ঘোষ আনন্দিত মন ।
বহুদিন পরে পেয়ে প্রভুর চরণ ॥ ৫৮২ ॥
বসনে নয়ন বাঁধা প্রভুর কৌশলে ।
এত দিন ছিল গেল এইবার খুলে ॥ ৫৮৩ ॥
সম্পর্ক প্রভুর সনে আছে চিরকাল ।
বুঝিল ঘুচিল ছিল যেসব জঞ্জাল ॥ ৫৮৪ ॥
প্রথমে বুঝিতে নারে প্রকৃতি লীলার ।
বুঝে ক্রমে যত যায় লোচন-আঁধার ॥ ৫৮৫ ॥
এখন যেমন বোধ নব পরিচিত ।
যদিও আছয়ে নাম খাতায় লিখিত ॥ ৫৮৬ ॥
ক্রমে ক্রমে লীলাপাঠে পাবে পরিচয় ।
সহজে লীলার মর্ম বোধগম্য নয় ॥ ৫৮৭ ॥
বিশেষতঃ ধরাধামে আসরে লীলার ।
যেইখানে ষোল আনা রাজত্ব মায়ার ॥ ৫৮৮ ॥
ঘোর তমে ডুবে জীব মোহিয়া তাহায় ।
সম্মুখে সৃষ্টির হেতু দেখিতে না পায় ॥ ৫৮৯ ॥
আকাশ-কুসুম হরি মনে মনে জানা ।
বিশ্বাসবিহীন রূপ রসের কামনা ॥ ৫৯০ ॥
অবিশ্বাসী হৃদয়ের প্রকৃতি কেমন ।
পানায় আচ্ছন্ন জল পুকুরে যেমন ॥ ৫৯১ ॥
সুখের কামনা ঠিক মরীচিকা-ধারা ।
দিগাদিগ জ্ঞানশূন্য উন্মত্তের পারা ॥ ৫৯২ ॥
ঘুরায়ে বেড়ায় লয়ে যত জীবগণে ।
বারিহীন ভব-মরু-বালুকার বনে ॥ ৫৯৩ ॥
চারিদিকে আগুনের মত ছুটে বালি ।
কুহকিত সজীব ইন্দ্রিয় যতগুলি ॥ ৫৯৪ ॥
প্রকৃত বিষয়বোধ না হয় কখন ।
বুদ্ধিহারা ইন্দ্রিয়ের মহারাজা মন ॥ ৫৯৫ ॥
সত্য বটে ছাড়ে ভূত সরিষা-পড়ায় ।
কিন্তু সেই সরিষায় ভূতে যদি পায় ॥ ৫৯৬ ॥
সরিষা-পড়ায় তবে কি হইবে কাজ ।
তেমতি এখানে মন ইন্দ্রিয়ের রাজ ॥ ৫৯৭ ॥
আপনিই হইয়াছে মায়া-বিমোহিত ।
কে করিবে বস্তু-বোধ প্রকৃত প্রকৃত ॥ ৫৯৮ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবদনে শুনা সমাচার ।
অযোধ্যায় সীতাপতি রাম অবতার ॥ ৫৯৯ ॥
পিত্রাজ্ঞা-পালনে যবে বনে যান তিনি ।
চিনিতে পারিল খালি বার জন মুনি ॥ ৬০০ ॥
অপর যেখানে যত জনসাধারণ ।
জানিত কেবল রাম নৃপতি-নন্দন ॥ ৬০১ ॥
এত কলিকাল কথা এতেক ত্রেতার ।
বার আনা তিন পোয়া রাজ্য অবিদ্যার ॥ ৬০২ ॥
তম বিনা অন্য গুণ নাহি যায় দেখা ।
কোটিতে একের যদি রাজসের রেখা ॥ ৬০৩ ॥
কেমনে চিনিবে কেবা প্রভু ভগবানে ।
কিংবা নরদেহধারী তাঁর ভক্তগণে ॥ ৬০৭ ॥
সমাপন হইলে প্রভুর সংকীর্তন ।
প্রভুর প্রস্তুত হয় ভোজন-আসন ॥ ৬০৮ ॥
অন্তঃপুরে দ্বিতলেতে ভোজনের ঠাঁই ।
ধীরে ধীরে চলিলেন জগৎগোসাঁই ॥ ৬০৯ ॥
ভক্তগণ ভোজন করিতে বসে পরে ।
দুজন মুসলমান ছিল এইবারে ॥ ৬১০ ॥
আবছল ওয়াজিদ নামে এক জন ।
দ্বিতীয় তাঁহার বন্ধু আত্মীয়-স্বজন ॥ ৬১১ ॥
উভয়েই মান্য গণ্য ধার্মিক-আচার ।
ওয়াজিদ ব্যবসায় সুবিজ্ঞ ডাক্তার ॥ ৬১২ ॥
ম্যাজিস্টার বন্ধু তাঁর উচ্চকুলোদ্ভব ।
প্রাসাদ সমান ঘরে অতুল বৈভব ॥ ৬১৩ ॥
এক সঙ্গে করি ঠাই রাম ভক্তবর ।
ভোজন করান দোঁহে করিয়া আদর ॥ ৬১৪ ॥
শুন মন বিশেষিয়া বলি এইখানে ।
বিরুদ্ধভাবের জাতি হিন্দু-মুসলমানে ॥ ৬১৫ ॥
একত্রে বসিয়া করে প্রসাদ গ্রহণ ।
প্রভু অবতারে এই প্রথম প্রথম ॥ ৬১৬ ॥
রামের কুটুম্ব এক সামাজিক জনা ।
করে কথা উত্থাপন দেখিয়া ঘটনা ॥ ৬১৭ ॥
সমাজবিরুদ্ধ রীতি অধর্মাচরণ ।
হিন্দু-মুসলমান দুয়ে একত্রে ভোজন ॥ ৬১৮ ॥
প্রভু-পদে-মজা মন রাম ভক্তবর ।
হাসিয়া হাসিয়া তাঁরে করিল উত্তর ॥ ৬১৯ ॥
ইহা
নহে সামাজিক কর্মের ব্যাপার ।
মা-বাপের শ্রাদ্ধ কিংবা বিয়া দুহিতার ॥ ৬২০ ॥
প্রভুর উৎসব ইহা বুঝ মনে মনে ।
একত্রে প্রসাদ পাবে জনসাধারণে ॥ ৬২১ ॥
নিষ্ঠা-ভক্তি-যুক্ত গৃহী ভক্তবর রাম ।
বিশ্বাস-শক্তির বলে মহা বলবান ॥ ৬২২ ॥
এক লক্ষ্যে প্রভু-পদে সদা তাঁর মন ।
মূল জ্ঞান একা প্রভু আরাধ্যের ধন ॥ ৬২৩ ॥
প্রভু ভিন্ন অন্য কিছু না জানেন আর ।
কোটি কোটি দণ্ডবৎ চরণে তাঁহার ॥ ৬২৪ ॥
ভোজনান্তে বৈঠকখানায় পুনঃ মেলা ।
ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর হয় রঙ্গ-লীলা ॥ ৬২৫ ॥
পরস্পর নানা কথা হয় নানা ভাবে ।
জিজ্ঞাসে গিরিশ এক কথা প্রভুদেবে ॥ ৬২৬ ॥
আমার যে আছে বাঁক যাবে কি নিশ্চয় ।
অবশ্য যাইবে বলিলেন দয়াময় ॥ ৬২৭ ॥
বিশেষ প্রত্যয়হেতু পুছে পুনরায় ।
অবশ্য যাইবে পুনঃ কন প্রভুরায় ॥ ৬২৮ ॥
আবার তৃতীয়বার কহিবার পরে ।
কোন ভক্ত রুষ্ট হয়ে ঘোষের উপরে ॥ ৬২৯ ॥
কর্কশ ভাষায় তাঁর উত্তরেতে কয় ।
বারেক বলিলে যাঁর প্রত্যয় না হয় ॥ ৬৩০ ॥
শতবার বলিলেও এক ফল তার ।
বলিলেন যাবে বাঁক কেন কথা আর ॥ ৬৩১ ॥
ধমকে চমক খেয়ে বুঝিল তখন ।
বুদ্ধিমান শ্রীগিরিশ আপনার ভ্রম ॥ ৬৩২ ॥
পুলকিতকলেবর ফিরিলেন ঘরে ।
প্রভুদেবে তোলাপাড়া মনে মনে করে ॥ ৬৩৩ ॥
এখানে উৎসব সাঙ্গ করি গুণমণি ।
দক্ষিণশহর দুখে চলিনা তখনি ॥ ৬৩৪ ॥
প্রভুদেব ভক্তগণে কহেন প্রত্যূষে ।
গিরিশের ভক্তিগাথা পরম উল্লাসে ॥ ৬৩৫ ॥
গিরিশ বিশ্বাসী বড় ভক্তিমান জনা ।
বুদ্ধিবল পাঁচসিকা আর এক আনা ॥ ৬৩৬ ॥
বলিতেন প্রভুদেব সবার নিকটে ।
গিরিশের পাঁচসিকা বুদ্ধিবল ঘটে ॥ ৬৩৭ ॥
মথুরের ছিল বুদ্ধি মাত্র বার আনা ।
বাদ-বাকি সাধারণে পাই অণু-কণা ॥ ৬৩৮ ॥
ভক্তগণে জানে কিন্তু বিপরীত তাঁয় ।
নেশা-সুরা-প্রিয় বেশ্যা লয়ে ব্যবসায় ॥ ৬৩৯ ॥
এখানেতে গিরিশের নিদ্রা নাই মোটে ।
এপাশ ওপাশ শুধু শয়নের খাটে ॥ ৬৪০ ॥
আছে এবে কিছু বুদ্ধি সবিস্ময় মন ।
অপরূপ শ্রীপ্রভুর দেখি সংকীর্তন ॥ ৬৪১ ॥
নয়ন-বিনোদ ঠাম প্রেমে মাতোয়ারা ।
দুর্দান্ত-পাষণ্ড-হৃদি বিমোহিত করা ॥ ৬৪২ ॥
বীণা জিনি বাণী-কণ্ঠে সুমধুর স্বর ।
দিব্য ভাবে পরিপূর্ণ দিব্য কলেবর ॥ ৬৪৩ ॥
মন-আকর্ষণ-শক্তি বহে মূর্তিমান ।
মানুষে সম্ভব নয় বিনা ভগবান ॥ ৬৪৪ ॥
আমি এ গিরিশ ঘোষ বিমোহিলা মোরে ।
শ্রীগুরু ব্যতীত শক্তি সাধ্য কার করে ॥ ৬৪৫ ॥
এত ভাবি শয্যা থেকে উঠিয়া সকালে ।
দক্ষিণশহর মুখে দ্রুতগতি চলে ॥ ৬৪৬ ॥
বিস্ময় কৌতুকানন্দে হৃদয় পুরিত ।
শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর হয় উপনীত ॥ ৬৪৭ ॥
গিরিশে দেখিয়া প্রভু সহরষে কন ।
সকালে তোমার কথা হয় উত্থাপন ॥ ৬৪৮ ॥
মাইরি হইতেছিল এইমাত্র সায় ।
তুমিও হাজির হেথা কালীর ইচ্ছায় ॥ ৬৪৯ ॥
আজিকার ঘটনায় প্রভুর মন্দিরে ।
বুদ্ধিমান শ্রীগিরিশ পারে বুঝিবারে ॥ ৬৫০ ॥
অন্য কেহ নন প্রভু পরম-ঈশ্বর ।
লীলা হেতু ধরাধামে নর-কলেবর ॥ ৬৫১ ॥
বন্দ ভগবান ইষ্টে,
বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণে,
ভক্তিভরে বন্দ গুরুমায় ।
বন্দ পারিষদগণে, আগত প্রভুর সনে,
লীলাহেতু এখানে ধরায় ॥ ৬৫২ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ আদি করি, কি সন্ন্যাসী কি সংসারী,
যেরূপে যে ভাবে যে যেথায় ।
অবনী লুটায়ে বন্দ, রামকৃষ্ণভক্তবৃন্দ,
পদরেণু ধরিয়া মাথায় ॥ ৬৫৩ ॥
বন্দ যত ভাগ্যবানে, জনমিয়ে ধরাধামে,
প্রভুর পাইল দরশন ।
অতিথি মহান্ত কিবা, যে আশ্রমভুক্ত যেবা,
কিবা হিন্দু
খ্রীষ্টান যবন ॥ ৬৫৪ ॥
যাঁহারা লীলায় হেথা, পশু পাখী তরুলতা,
কীট কি পতঙ্গ জলে স্থলে ।
কিবা জড় কি চেতন, পরশিল শ্রীচরণ,
বন্দ মন প্রত্যেক সকলে ॥ ৬৫৫ ॥
বন্দ ভক্ত-নিকেতন, সহ সাঙ্গোপাঙ্গগণ,
যেইখানে উৎসব প্রভুর ।
ছড়ায়ে চরণধূলি, করিলে তীর্থস্থলী,
অবতরি দয়াল ঠাকুর ॥ ৬৫৬ ॥
উৎসবের এইবারে, ঘটা ছটা ভারি করে,
কাশীপুরে মহিম ব্রাহ্মণ ।
শ্রদ্ধা-ভক্তিসমন্বিত, দিন করি নির্ধারিত,
ভক্তবর্গে করে নিমন্ত্রণ ॥ ৬৫৭ ॥
উৎসবের সমাচারে, ভক্তগণে মত্ত করে,
ঘরে নাহি রহে মন মোটে ।
পল যেন বর্ষপ্রায়, দিনে বেলা না ফুরায়,
সূর্য নাহি যেতে চায় পাটে ॥ ৬৫৮ ॥
উৎসব-আস্বাদ-প্রিয়, প্রভু-ভক্ত যাবতীয়,
আনন্দে পুরিত প্রাণ মন ।
সঙ্গেতে আত্মীয় বন্ধু, হেরিবারে দীনবন্ধু,
অপরাহে করেন গমন ॥ ৬৫৯ ॥
পুলকে অন্তর ভরি, আনাইয়া ঠিকা গাড়ি,
গৃহী ভক্ত দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
ধীরেন্দ্র তাঁহার সাখে, বাহির হইয়া পথে,
যাইবারে করেন উদ্যম ॥ ৬৬০ ॥
অধম এমন কালে, শ্রীপ্রভুর রূপাবলে,
উপনীত হইল তথায় ।
কাকুতি সহিত কাঁদে, দোঁহার চরণ ছেঁদে,
লয়ে যেতে শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ৬৬১ ॥
দয়ার্দ্র্র হৃদয় আজি, উভয়ে হইয়া রাজি,
দিলা সায় সঙ্গে যাইবারে ।
দ্রুতগতি গাড়ি ধায়, পথে চারি দণ্ড যায়,
উপনীত কাশীপুরে পরে ॥ ৬৬২ ॥
থামে গাড়ি অবশেষে, প্রশস্ত পথের পাশে,
যেইখানে মহিমের ঘর ।
উদ্যান-ভবন বাড়ি, গাছ-পাতা রকমারি,
চারিদিকে তাহার ভিতর ॥ ৬৬৩ ॥
সত্ত্বভাব-পরিপূর্ণ, লোকে তথা লোকারণ্য,
আনন্দ-সাগরে ভাসমান ।
এমন সুন্দর ঠাঁই, দেখা কিংবা শুনা নাই,
ধরায় কোথাও বিদ্যমান ॥ ৬৬৪ ॥
সদরে বাহিরে তথা, বৃহৎ বিছানা পাতা,
উপবিষ্ট শত শত জন ।
বেষ্টন করিয়া এঁকে, সব আঁখি তাঁর দিকে,
অনিমিখে করে নিরীক্ষণ ॥ ৬৬৫ ॥
দেবেন্দ্র ধীরেন্দ্র দু'য়ে, তাঁর পদপ্রান্তে গিয়ে,
প্রণমিয়ে পদ-রজ ধরে ।
অধম করিল তাই, রূপা সহ শ্রীগোসাঁই,
কৃপাদৃষ্টি করিলা আমারে ॥ ৬৬৬ ॥
করুণ-কটাক্ষপাতে, জানি না কি আছে তাতে,
বর্ণনায় নহে বর্ণিবার ।
শ্রীমুক্তি নয়নদ্বারে, প্রবেশি হৃদয়পুরে,
হৃদয় করিলা অধিকার ॥ ৬৬৭ ॥
মোহন মুরতি দেখি, তখনি মোহিত আঁখি,
প্রাণ মন মুগ্ধ তার সনে ।
বাকি যাহা ছিল ঘরে, না বলিয়া গেল সরে,
শ্রীপ্রভুর মিঠা বাণী শুনে ॥ ৬৬৮ ॥
বিমানে বিমানে খেলা, ডাকাতি দিনেরবেলা,
শত
তালা হৃদয়ের খুলি ।
কেহ না কিছুই জানে, স্থান পূর্ণ শত জনে,
চক্ষুর চক্ষুতে দিয়া ধূলি ॥ ৬৬৯ ॥
পূর্বের স্মরণ যত,
নিমিষে হইল হত,
নিজেকেই নিজে বিস্মরণ ।
আপনে আপন-হারা, বহিল নূতন ধারা,
সেই দেহে হইনু নূতন ॥ ৬৭০ ॥
সমাগত লোকজনে, মানুষ না হয় মনে,
ভবনে ভবন নয় জ্ঞান ।
কিছুই না পাই খুঁজে, যেন কোন নব রাজ্যে,
স্বপনে হয়েছি আগুয়ান ॥ ৬৭১ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা, হৃদয়ে রহিল গাঁথা,
ভাষা কোথা বর্ণিবারে তায় ।
সঙ্কেতে আভাসে চলে, আঁখি ঠারে আঁখি বলে,
বলাবলি বোবায় বোবায় ॥ ৬৭২ ॥
পূর্ণজ্ঞানে বাল্যভাব, অঙ্গে যাঁর আবির্ভাব,
স্বভাব তাঁহার কি রকম ।
শক্তির শকতি যিনি, বিশাল অখিলস্বামী,
নরদেহে দীনের মতন ॥ ৬৭৩ ॥
শ্রীঅঙ্গ এত কোমল, হেরে হারে শতদল,
অঙ্গুলি লুচির ধারে কাটে ।
সেই তনু সাধনায়, ভূমে লুটালুটি যায়,
নিরাশ্রয় জাহ্নবীর তটে ॥ ৬৭৪ ॥
দয়ায় পুরিত হিয়ে, নরম ননীর চেয়ে,
দূর্বাদলে দলিলে যাতনা ।
পুনঃ তাহা এত শক্ত, শুনিয়া শুকায় রক্ত,
দেহদগ্ধ-ধূমের বাসনা ॥ ৬৭৫ ॥
কামিনীকাঞ্চনত্যাগী, যোগেশ্বর চেয়ে যোগী,
সর্বত্যাগী শ্যামাগতপ্রাণ ।
এক দিকে ভক্তের তরে, চক্ষে বারিধারা ঝরে,
কল্যাণ-কামনা অবিরাম ॥ ৬৭৬ ॥
মিষ্টি মণ্ডা ফল মিঠে, আদতে না মুখে উঠে,
সঞ্চয় থাকিত সযতনে ।
মায়ের যেমন ধারা, না খেয়ে সঞ্চয় করা,
গর্ভে ধরা শিশুর কারণে ॥ ৬৭৭ ॥
বিচার-আচার মেলা, ত্র্যহস্পর্শ বারবেলা,
অন্ন নহে সর্বত্রে গ্রহণ ।
পুনশ্চ যবন যদি, ভক্তিতে আকুল হৃদি,
ভোজ্য দিলে অমনি ভোজন ॥ ৬৭৮ ॥
নারীতে জননী ভিন্ন, নাই যাঁর জ্ঞান অন্য,
কিমাশ্চর্য তাঁহার নিকটে ।
শুনিয়া রসের কথা, লাজে করে হেঁট মাখা,
অতি পটু পণ্ডিত লম্পটে ॥ ৬৭৯ ॥
না হেরিলে এক পল, যাঁর জন্যে চক্ষে জল,
চঞ্চল আকুল প্রাণ মন ।
এ দিকে সে জন যদি, নাহি রহে বর্ষাবধি,
নাহি তাঁর নাম উচ্চারণ ॥ ৬৮০ ॥
এমন স্বভাব যাঁর, তাঁর লীলা-অবস্থার,
আঁকিবার কি আছে শকতি ।
ভবসিন্ধু তরিবারে, স্মরণ করিয়া তাঁরে,
লীলা-আন্দোলনে লিখি পুঁথি ॥ ৬৮১ ॥
শুন তবে আজি দিনে, মহিমের নিকেতনে,
মহোৎসব প্রভুর কেমন ।
খোল করতাল লয়ে, ভক্তেরা একত্র হয়ে,
প্রাঙ্গণে জুড়িল সংকীর্তন ॥ ৬৮২ ॥
যেমন বাজিল খোল, উচ্চ রোলে হরিবোল,
গোলযোগ প্রভুর অন্তরে ।
মত্ত মাতঙ্গের পারা, প্রায় প্রভু বাহ্যহারা,
জুটিলেন দলের ভিতরে ॥ ৬৮৩ ॥
মিলিয়া শ্রীপ্রভুদেব ভক্তদের মাঝে ।
নীচে লেখা গীতখানি ধরিলেন নিজে ॥ ৬৮৪ ॥
"যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে,
ওরে তারা দুভাই এসেছে রে ।
যাদের সমান দয়াল আর কেহ নাই,
তারা তারা দুভাই এসেছে রে ।
যারা আপনা ভজে আপনা পূজে,
তারা তারা
দুভাই এসেছে রে ॥
যারা আপন পর আর বাছে না রে,
তারা যারা মার খেয়ে প্রেম
বিলায়,
তারা যারা দু ভাই কানাই বসাই,
তারা যারা জগাই মাধাই উদ্ধারিল,
তারা ... ইত্যাদি ।
প্রভুর মধুর কণ্ঠে ভক্তিমাখা গীত ।
তালে তালে নৃত্য সহ ভক্তের সহিত ॥ ৬৮৫ ॥
অতি অপরূপ দৃশ্য অতুল ভুবনে ।
দেখিলে এ দেহ গেলে তবু থাকে মনে ॥ ৬৮৬ ॥
শুন কই যথাসাধ্য থাকিতে না পারি ।
ভক্তসহ শ্রীপ্রভুর কীর্তন-মাধুরী ॥ ৬৮৭ ॥
মরি কি সুন্দর দৃশ্য মন-ধরা ফাঁদ ।
ভক্তবর্গে ঘেরা প্রভু অকলঙ্ক চাঁদ ॥ ৬৮৮ ॥
মাতোয়ারা মহাশক্তি শ্রীঅঙ্গেতে খেলে ।
নয়ন-বিনোদ ভাতি শ্রীমুখমণ্ডলে ॥ ৬৮৯ ॥
আজানুলম্বিত ভুজ তেন প্রসারণ ।
ধনুকেতে ছাড়ে বাণ ধানুকী যেমন ॥ ৬৯০ ॥
মনে গীতে দেহে বহে তেজ এক ধারা ।
নৃত্যে চরণের চাপে কাঁপে বসুন্ধরা ॥ ৬৯১ ॥
বারে বারে খুলে পড়ে কটির বসন ।
বাহ্যিক গিয়ান-হারা কখন কখন ॥ ৬৯২ ॥
কখন অচল-সম শ্রীঅঙ্গ সুস্থির ।
কভু কাঁপে পাণিদ্বয় কভু চক্ষে নীর ॥ ৬৯৩ ॥
তার সনে ক্ষরে হাসি মৃদু মন্দ বেগে ।
বৃষ্টির সময় যেন সৌদামিনী মেঘে ॥ ৬৯৪ ॥
চলে কভু তনু যেন ননীর গড়ন ।
শ্রীপ্রভুর অতি প্রিয় ভক্ত যেই জন ॥ ৬৯৫ ॥
পরম যতন ভরে ধরে তুলে তুলে ।
এ সময় যার তার স্পর্শ নাহি চলে ॥ ৬৯৬ ॥
পরশ করিলে কেহ অনাচারী জন ।
প্রভুদেব করিতেন চীৎকার বিষম ॥ ৬৯৭ ॥
সেই হেতু শুদ্ধ-আত্মা আপনার জন ।
নিকটে থাকিত অঙ্গরক্ষার কারণ ॥ ৬৯৮ ॥
ভাবে মত্ত বহু ভক্ত কীর্তনে হেথায় ।
কেহ হাসে কাঁদে কেহ ভূমিতে লুটায় ॥ ৬৯৯ ॥
বিজয় গোস্বামী ব্রাহ্ম শ্রীপ্রভুর কাছে ।
এই কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি বাহু তুলে নাচে ॥ ৭০০ ॥
কখন প্রভুর মত ভাবেতে বিহ্বল ।
টলে পড়ে গুরু তনু চক্ষে ঝরে জল ॥ ৭০১ ॥
লম্ফদানে বাদ্যকর মৃদঙ্গ বাজায় ।
হাত ফেটে পড়ে রক্ত গ্রাহ্য নাহি তায় ॥ ৭০২ ॥
জাদু-মুগ্ধ সম ধারা দর্শকের মালা ।
নীরব হইয়া সব দেখে রঙ্গলীলা ॥ ৭০৩ ॥
এইরূপে সংকীর্তন তিন দণ্ড প্রায় ।
ক্রমে সম্বরেন শক্তি প্রভুদেবরায় ॥ ৭০৪ ॥
বিভোর শ্রীঅঙ্গ ধরি ভক্তগণ লয়ে ।
স্থানান্তরে প্রভুবরে
বসাইল গিয়ে ॥ ৭০৫ ॥
কেহ বা করেন সেবা ব্যঞ্জনের বায় ।
কেহ বা শীতল জল আনিয়া যোগায় ॥ ৭০৬ ॥
প্রকৃতিস্থ কিছু পরে শ্রীপ্রভু যখন ।
মহিম প্রস্তুত কৈল ভোজন-আসন ॥ ৭০৭ ॥
ভক্তগণ কাছে পাশে বসিলা গোসাঁই ।
আয়োজন বলিবার কোন শক্তি নাই ॥ ৭০৮ ॥
ফল মূল আদি করি লুচি তরকারি ।
অগণন ব্যঞ্জন সুতার রকমারি ॥ ৭০৯ ॥
তাজা তাজা ভাজি কত নাহি ধরে পাতে ।
দেড় গণ্ডা রকমের অম্বল পশ্চাতে ॥ ৭১০ ॥
নানা জাতি মিষ্ট দধি ক্ষীর কটরায় ।
যাঁর যাহা রুচি-প্রিয় তাই দেন তাঁয় ॥ ৭১১ ॥
সৌরভ শীতল জল অতি তৃপ্তিকর ।
কতই মশলা ছাঁচি পানের ভিতর ॥ ৭১২ ॥
ভাগ্যবান মহিম প্রচুর আয়োজনে ।
ভগবানে ভিক্ষা দিল ভক্তগণ সনে ॥ ৭১৩ ॥
ভোজনান্তে প্রভুদেব স্বতন্তর ঘরে ।
উপবিষ্ট পাথরের আসন-উপরে ॥ ৭১৪ ॥
একে একে দর্শকেরা চলিল সবাই ।
না কুলায় সকলের বসিবার ঠাঁই ॥ ৭১৫ ॥
অনেকে দণ্ডায়মান আছেন দুয়ারে ।
যতনে পাতিয়া আঁখি প্রভুর উপরে ॥ ৭১৬ ॥
মোহনত্ব শ্রীপ্রভুর খেলে গোটা গায় ।
ছাড়িয়া তাঁহারে কেহ যাইতে না চায় ॥ ৭১৭ ॥
সুন্দর প্রভুর ঠাম মনোবিমোহন ।
রঙ্গ-রস-ভাষে হয় কথোপকথন ॥ ৭১৮ ॥
দেখিয়া শুনিয়া চক্ষু শ্রবণ মোহিত ।
পরে প্রভু ধরিলেন মিঠা কণ্ঠে গীত ॥ ৭১৯ ॥
কোকিল জিনিয়া কণ্ঠ গীত ভক্তি-ভরা ।
গীতের ভিতরে ফুটে ভাবের চেহারা ॥ ৭২০ ॥
বাক্যেতে প্রসবে ছবি তাহার কারণ ।
মহামন্ত্র অবিকল প্রভুর বচন ॥ ৭২১ ॥
সকলেই বাক্যে ছবি দেখিতে না পায় ।
যে দেখে সে দেখে মাত্র প্রভুর কৃপায় ॥ ৭২২ ॥
সকলেই কৃপা কেন নহে বিতরণ ।
জিজ্ঞাসিলে কথা যদি শুন তবে মন ॥ ৭২৩ ॥
কৃপা মানে এইখানে ভক্তিসমুজ্জ্বল ।
সাঙ্গোপাঙ্গদের মাত্র প্রাপ্তব্য কেবল ॥ ৭২৪ ॥
অতি গোপ্য বস্তু ভক্তি ভক্তগণ বিনে ।
স্বরূপ-আস্বাদ তার অন্যে নাহি জানে ॥ ৭২৫ ॥
অতি সংগোপনে রাখা প্রভুর ভাণ্ডারে ।
কভু নহে বিতরণ হয় যারে তারে ॥ ৭২৬ ॥
অবতারে বটে মুক্তি বরিষার ফোঁটা ।
ভক্তির সম্বন্ধে কিন্তু লক্ষ তালা আঁটা ॥ ৭২৭ ॥
লীলা-দরশনে তার পাবে পরিচয় ।
ভক্তি-দান শ্রীপ্রভুর যেথা সেথা নয় ॥ ৭২৮ ॥
ভক্তিপ্রার্থী ভক্তে দিতে উত্তর
বিহিত ।
কাতর হইয়া প্রভু গাইতেন গীত ॥ ৭২৯ ॥
"আমি ভক্তি দিতে কাতর হই ।
আমি মুক্তি দিতে কাতর নই রে ।
এক ভক্তি আমার ছিল
বৃন্দাবনে,
গোপ-গোপী বিনে অধ্যে নাহি জানে,
যাহার কারণে নন্দের ভবনে,
নন্দের বাধা আমি মাথায় করে বই ।
শুন চন্দ্রাবলী ভক্তির কথা কই,
মুক্তি মিলে
অনেক, ভক্তি মিলে কই,
আমি যে ভক্তির জন্যে পাতাল-ভূবনে
বলী রাজার দ্বারে
দ্বারী হয়ে রই ।"
শুনিয়া গীতের ভাব বুঝ তুমি মন ।
কিবা বস্তু ভক্তি কিবা তাহার লক্ষণ ॥ ৭৩০ ॥
ভক্তির সমান বস্তু আর কিবা আছে ।
ভক্তি দিয়া ভগবান বাঁধা যার কাছে ॥ ৭৩১ ॥
আর এক
প্রশ্ন মন পার করিবারে ।
লীলাহেতু ধরাধামে নর-কলেবরে ॥ ৭৩২ ॥
অবতারে প্রভুদেব
অখিলের স্বামী ।
যাঁহার শকতি মায়া সৃষ্টির জননী ॥ ৭৩৩ ॥
বিশ্ব-গুরু কল্পতরু
জগৎগোসাঁই ।
সৃষ্টিতে যাঁহার মোটে আত্মপর নাই ॥ ৭৩৪ ॥
অনেকেই দরশন করিল তাঁহায় ।
কেন তবে সকলেই ভক্তি নাহি পায় ॥ ৭৩৫ ॥
তদুত্তরে শুন মন কহিব বারতা ।
কল্পতরু
প্রভুদেব অতি সত্য কথা ॥ ৭৩৬ ॥
যে যে আশে পরমেশে কৈল দরশন ।
তাহাই মিলিল তার
প্রভুর সদন ॥ ৭৩৭ ॥
অবিদ্যায় মুগ্ধ মন এবে লোক প্রায় ।
সতত প্রমত্তচিত্ত তাহার
সেবায় ॥ ৭৩৮ ॥
কোটির মধ্যেতে যেবা অত্যুন্নত জন ।
রজোগুণে করে কর্ম সত্ত্ব খুব কম ॥ ৭৩৯ ॥
ধার্মিকের নামে তিনি লোকমধ্যে জানা ।
করে কর্ম মূলে ধন-মানের কামনা ॥ ৭৪০ ॥
পূর্ণমাত্র সত্ত্বগুণ নহে যতক্ষণ ।
হইবার নহে শুদ্ধ হরিপদে মন ॥ ৭৪১ ॥
ষোল আনা দিলে মন তবে বস্তু মিলে ।
মিলে না যদ্যপি বাকি রহে এক তিলে ॥ ৭৪২ ॥
হরিপদে পূর্ণ-মন নামে যাহা গাই ।
ভক্তির সঙ্গেতে তার ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ৭৪৩ ॥
পুনঃ যেখা ভক্তি সেথা হরি মূর্তিমান ।
পূর্ণ মন ভক্তি হরি তিনেই সমান ॥ ৭৪৪ ॥
সুদুর্লভ শুদ্ধ ভক্তি ঈশ্বরের পারা ।
ভক্তি দিয়া ভগবান ভক্তে দেন ধরা ॥ ৭৪৫ ॥
চিরকাল যিনি ভক্ত তিনিই এখন ।
যে আছে সে আছে ভক্ত না হয় নূতন ॥ ৭৪৬ ॥
ভক্তির সন্ধান জীবে কখন না পায় ।
বস্তুবোধ না থাকিলে বস্তু কেবা চায় ॥ ৭৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে যায় যত লোক জন ।
মাগে নানা দ্রব্য ইহ-সুখের কারণ ॥ ৭৪৮ ॥
গুরু-পদ ভিন্ন অন্য যতেক কামনা ।
অবিদ্যার রঙ্গ ভক্তজনে করে ঘৃণা ॥ ৭৪৯ ॥
সেই হেতু লোকজনে কাম্যবস্তু পায় ।
ভক্তি ছাড়া প্রভু-কল্পতরুর তলায় ॥ ৭৫০ ॥
আর কথা সত্য প্রভুদেব ভগবান ।
যে কেহ তাঁহার কাছে সকলে সমান ॥ ৭৫১ ॥
এল গেল লাখে লাখে প্রভুর নিকটে ।
কোথা শুকাইল কলি কোথা গেল ফুটে ॥ ৭৫২ ॥
কিরূপ ব্যাপার ইহা শুন বলি মন ।
পদ্মপাণি পদ্ম-বন্ধু জগতলোচন ॥ ৭৫৩ ॥
উদয় হইয়া নিজ কিরণমালায় ।
সমাদরে সরোবরে কমলে ফুটায় ॥ ৭৫৪ ॥
পুনশ্চ পুড়ায় তায় নহে বিমরয় ।
যদি নলিনীর মূলে শূন্য রহে রস ॥ ৭৫৫ ॥
ভক্তিরস যেইখানে হৃদি তথা ফুটে ।
নচেৎ না হয় কিছু প্রভুর নিকটে ॥ ৭৫৬ ॥
আর এক কথা বলি শুন তুমি মন ।
ঈশ্বরের সহচর পারষদগণ ॥ ৭৫৭ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ আদি যাহা ভক্ত নামে গাই ।
বিচিত্র তাঁহারা হেন দেখি শুনি নাই ॥ ৭৫৮ ॥
জনসাধারণ সম একই গড়ন ।
অস্থিমাংসে গড়া দেহ চর্ম-আবরণ ॥ ৭৫৯ ॥
শিরা রক্ত কফ পিত্ত ঐশ্বর্য বৈভব ।
উপরেতে সেই অঙ্গ সেই অবয়ব ॥ ৭৬০ ॥
ভিন্ন নাই সেই সব গড়া এক ছাঁচে ।
ভিতরেতে কারিগরি কিন্তু এক আছে ॥ ৭৬১ ॥
বিচিত্র বিভুর কার্য যাই বলিহারি ।
জীবের ভিতরে নাই ভক্তির কুঠরি ॥ ৭৬২ ॥
ভক্তের অন্তরে আছে অতি চমৎকার ।
কখন বা রুদ্ধ কভু মুক্ত থাকে দ্বার ॥ ৭৬৩ ॥
তাহার ভিতরে অতি বিচিত্র নির্মাণ ।
সুন্দর রতনবেদি যাহে ভগবান ॥ ৭৬৪ ॥
সর্বদা বিরাজমান করেন হরিষে ।
গোলোক বৈকুণ্ঠ লীলাপুরী নির্বিশেষে ॥ ৭৬৫ ॥
রুদ্ধ দ্বার কেন থাকে তাহার কারণ ।
জানিবার হেতু কর লীলা অন্বেষণ ॥ ৭৬৬ ॥
মূল কথা ছাড়িয়া পড়েছি বহুদূরে ।
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব মহিমের ঘরে ॥ ৭৬৭ ॥
এখানে শুনিছে সবে শ্রীমুখেতে গীতি ।
সবাকার শবাকার আপনা-বিস্মৃতি ॥ ৭৬৮ ॥
উর্ধ্বগতি দেখি রাতি প্রভু পরমেশ ।
সম্বরিয়া নিজ শক্তি গীত কৈলা শেষ ॥ ৭৬৯ ॥
শ্রোতাগণ দেহে মন ক্রমে ক্রমে পায় ।
মোহনিয়া মনোচোরা প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ৭৭০ ॥
ভিক্ষা লীলা করি সায় প্রভু গুণধর ।
গাড়িতে গমন কৈলা দক্ষিণশহর ॥ ৭৭১ ॥
১
'এইখানে' বলিয়া নিজের বক্ষদেশে
হস্তার্পণ করিয়া প্রভুদেব আপনাকেই দেখাইলেন ।
চতুর্থ খণ্ড
গৃহী
ও সন্ন্যাসী বিবিধ ভক্তের মিলন
[কালী মুখুয্যে, বিহারী, হরিপদ, হুট্কো-গোপাল, তেজচন্দ্র,
প্রমথ, পল্টন্ট, বিনোদ, সোম, যজ্ঞেশ্বর, ক্ষীরোদ, সুবোধ, চুনিলাল, নবগোপাল
কবিরাজ, তারক ঘোষাল, ছোট নরেন্দ্র, উপেন্দ্র, কিশোরী গুপ্ত, হারাণ, গোলাপ
সিং]
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর অবতারে মহিমা অপার ।
সুমূর্খ পামরে শক্তি নাহি বর্ণিবার ॥ ১ ॥
সার্বভৌম ভাব তাঁর বিশ্বগুরুবেশ ।
সর্বত্রে সমানভাবে করুণা অশেষ ॥ ২ ॥
এবারে তারক ব্রহ্ম রামকৃষ্ণনাম ।
পশ্চাতে লীলায় পাবে ইহার প্রমাণ ॥ ৩ ॥
মূর্তিমান রামকৃষ্ণ নামের কৃপায় ।
গুরুরূপে এই নাম ব্যাপিবে ধরায় ॥ ৪ ॥
প্রভুর পূজায় মত্ত হবে ঘরে ঘরে ।
ত্রাণের কারণ ভবজলধির নীরে ॥ ৫ ॥
বিনা রামকৃষ্ণনাম অনন্য-উপায় ।
প্রত্যক্ষ বুঝিবে তত্ত্ব পশ্চাৎ লীলায় ॥ ৬ ॥
বেগবতী যবে নদী বরিষার কালে ।
কত শত তৃণ কুটি ভেসে যায় জলে ॥ ৭ ॥
ভাসিয়া যাইতে নিজে তৃণ ভাল পারে ।
কিন্তু যদি ক্ষুদ্র পাখী তাহার উপরে ॥ ৮ ॥
আসিয়া আশ্রয় লয় বসিয়া তাহায় ।
অক্ষম ধরিতে ভার দু'য়ে ডুবে যায় ॥ ৯ ॥
সেই মত সাধু ভক্ত সিদ্ধ যেই জন ।
আপনি ভাসিয়া চলে তৃণের মতন ॥ ১০ ॥
অপরে লইয়া পৃষ্ঠে যাইতে না পারে ।
সিন্ধুমুখে বেগবতী তটিনীর নীরে ॥ ১১ ॥
কিন্তু বাহাদুরে মাজ দীর্ঘে প্রস্থে বড় ।
প্রতি পরমাণু গায়ে সবল সুদৃঢ় ॥ ১২ ॥
নদীর স্রোতেতে যায় ভাসিয়া যখন ।
তাহাতে আশ্রয় যদি লহে লোক-জন ॥ ১৩ ॥
অনায়াসে বহে ভার যায় অবহেলে ।
দ্রুতগতি তটিনীর বেগবতী জলে ॥ ১৪ ॥
সেইরূপ ভগবান যবে অবতারে ।
পদতরী দিয়া ভবসিন্ধু-পারাপারে ॥ ১৫ ॥
কতই লইয়া যান সংখ্যা নাহি তার ।
লাঘব করিয়া গুরু ধরণীর ভার ॥ ১৬ ॥
এবে অবতার প্রভু বিশ্বশুরু নিজে ।
সর্বশক্তিমান বিভু দীনতার সাজে ॥ ১৭ ॥
অপার করুণারাজি শ্রীঅঙ্গেতে ভরা ।
নিঃশব্দে লইয়া যান সসাগরা ধরা ॥ ১৮ ॥
এখন প্রত্যক্ষ চক্ষে নাহি যায় দেখা ।
লীলার ভিতরে কিন্তু স্পষ্টাক্ষরে লেখা ॥ ১৯ ॥
বিধিমতে সময়ে পাইবে সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা ইহা লীলার ভাণ্ডার ॥ ২০ ॥
রাম, কৃষ্ণ কিংবা অন্য অন্য অবতারে ।
হাঁক ডাক বাজে ঢাক বিষম সমরে ॥ ২১ ॥
এবে তবে শব্দহীনে প্রভুর গমন ।
কি কারণে জিজ্ঞাসিতে পার তুমি মন ॥ ২২ ॥
শুনহ কারণ তবে তোমারে শুনাই ।
গুপ্ত অবতার প্রভু জগৎ-গোসাঁই ॥ ২৩ ॥
গতিশব্দ নাহি থাকে বৃহৎ জাহাজে ।
যখন চলিয়া যায় দরিয়ার মাঝে ॥ ২৪ ॥
ছুটিল রেলের গাড়ি কত শব্দ তায় ।
ধরা ঘুরে গোটা ধরা কে জানিতে পায় ॥ ২৫ ॥
আপনি অলক্ষ্যে থাকি প্রভু নারায়ণ ।
ভক্তের দ্বারায় পরে উদ্দেশ্য-সাধন ॥ ২৬ ॥
ক্রমে পরে পরিচয় পাবে তুমি তার ।
ধৈরযের কর্ম ইহা নহে উতলার ॥ ২৭ ॥
যে যে ভক্তে সঙ্গে লয়ে কার্যের সাধন ।
হইতেছে তাহাদের ক্রমে সংজোটন ॥ ২৮ ॥
সংজোটন-লীলা যদি হৃদে পায় ঠাঁই ।
তখন বুঝিবে কিবা খেলিলা গোসাঁই ॥ ২৯ ॥
লীলা-দরশন-হেতু দৃশ্য ভক্তগণ ।
বদনদর্শনোপায় দর্পণ যেমন ॥ ৩০ ॥
হেন প্রভু-ভক্ত-পদে রাখি রতি মতি ।
শুন সংজোটন-লীলা মধুর ভারতী ॥ ৩১ ॥
প্রভুর প্রকট-কাল বসন্তের ন্যায় ।
ভক্তি-প্রেম ফুলকুল সৌরভ ছুটায় ॥ ৩২ ॥
পেয়ে গন্ধ অন্ধ হয়ে মত্ততর মন ।
যূথে যূথে ভক্ত অলি দিল দরশন ॥ ৩৩ ॥
জুটিল মুখুয্যে কালী মুখুয্যে বিহারী ।
নবীন যুবকদ্বয় উভয়ে সংসারী ॥ ৩৪ ॥
কৃষ্ণকায় হরিপদ জাতিতে ব্রাহ্মণ ।
ইজারা আছিল যাঁর প্রভুর চরণ ॥ ৩৫ ॥
পদ যদি সেবে পদ প্রভু তুষ্ট তায় ।
কেহ নহে হেন পটু চরণসেবায় ॥ ৩৬ ॥
বয়সে বালক পূর্ণ সরল গড়ন ।
হরিণের সম দুটি সুন্দর নয়ন ॥ ৩৭ ॥
জুটিল গোপাল হুট্কো মহাভাগ্যবান ।
কৃষ্ণ বর্ণ আর এক তেজচন্দ্র নাম ॥ ৩৮ ॥
আইল প্রমথচন্দ্র অতি চমৎকার ।
বালক বয়েস তাঁর বাপ মাজিস্টর ॥ ৩৯ ॥
গণ্য মান্য জানা নাম হেমচন্দ্র কর ।
শ্রদ্ধা ভক্তি ছিল বহু প্রভুর উপর ॥ ৪০ ॥
বালক বিনোদ সোম দেখা দিল আসি ।
বলরাম বসুর নিকট প্রতিবাসী ॥ ৪১ ॥
বয়েস তাঁহার
নহে উনিশের পার ।
উচ্চপদে অভিষিক্ত জনক তাঁহার ॥ ৪২ ॥
দমদমার মাস্টার জুটিল
যজ্ঞেশ্বর ।
বাঁকুড়া জেলার মধ্যে কাকিটায় ঘর ॥ ৪৩ ॥
ক্ষীরোদ সুবোধ দুটি অতি শিশু
ছেলে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম আসে হেনকালে ॥ ৪৪ ॥
ক্ষীরোদ সংসারী পরে বল নাহি বেশী ।
সুবোধের খোকা নাম কুমার-সন্ন্যাসী ॥ ৪৫ ॥
যে সব ভক্তের নাম হয় এই স্থলে ।
ভাগ্যবান সবে প্রায় কায়স্থের ছেলে ॥ ৪৬ ॥
জুটিলেন ভাগ্যবান বসু চুনিলাল ।
তার
পাছে কবিরাজ শ্রীনবগোপাল ॥ ৪৭ ॥
উভয়ে বয়েস প্রাপ্ত উভয়ে সংসারী ।
নন্দন-নন্দিনী
ঘরে শহরেতে বাড়ি ॥ ৪৮ ॥
বিদেশে প্রভুর নাম করিয়া শ্রবণ ।
জুটিলেন যুবা এক
ব্রাহ্মণ-নন্দন ॥ ৪৯ ॥
বাল্যাবধি ধর্মপথে আন্তরিক টান ।
কৃতদার তারক ঘোষাল তাঁর
নাম ॥ ৫০ ॥
জনক তাঁহার শ্রীপ্রভুর পরিচিত ।
শ্যামাভক্ত দ্বিজবর ভকত-পণ্ডিত ॥ ৫১ ॥
বৈরাগ্য প্রবল বড় তারকের মনে ।
দিনে দিনে বৃদ্ধি পায় প্রভুর সদনে ॥ ৫২ ॥
ঝটিতি
কাটিয়া যত সংসারবন্ধন ।
পশ্চাতে করিলা তেঁহ সন্ন্যাস গ্রহণ ॥ ৫৩ ॥
জুটিয়া নরেন্দ্র-ছোট এবে দিল দেখা ।
কায়স্থ-কুমার অঙ্গে সরলতামাখা ॥ ৫৪ ॥
গড়নে
সরল যেন অন্তরে সরল ।
ভিতরের ভাব বাহে ব্যক্ত সমুজ্জ্বল ॥ ৫৫ ॥
স্বতই প্রভুর
প্রতি ভক্তি হৃদে ভরা ।
প্রভুর সকাশে হয় বড়ই পিয়ারা ॥ ৫৬ ॥
শ্রীপ্রভুর সাঙ্গোপাঙ্গগণাদি
নিকর ।
ভক্ত-আখ্যা যাঁহাদের পুঁথির ভিতর ॥ ৫৭ ॥
দুই চারি উচ্চবয়ঃ প্রবীণ আকার ।
অবশিষ্ট অল্পবয়ঃ বালক কুমার ॥ ৫৮ ॥
কি হেতু এমন যদি জিজ্ঞাসিলে মন ।
ভিতরে সুন্দর তত্ত্ব শুন বিবরণ ॥ ৫৯ ॥
ভয়ানক কাল যবে প্রভু অবতার ।
ধরাধামে অবিদ্যার পূর্ণ অধিকার ॥ ৬০ ॥
তমাচ্ছন্ন দিশি পথ নাহি যায় দেখা ।
ধর্মের আলোক যেন বিজলীর রেখা ॥ ৬১ ॥
বিভীষিকাময়ী ধরা ঘেরা অবিদ্যায় ।
সভয়-অন্তর ভক্ত আসিতে না চায় ॥ ৬২ ॥
তাই প্রভু সর্ব অগ্রে আপনি আসরে ।
প্রভু-প্রিয়ভক্তগণ ক্রমে পরে পরে ॥ ৬৩ ॥
যদি প্রভু বিশ্বপতি সৃষ্টির কারণ ।
যদি
এই ভক্তবর্গ অন্তরঙ্গগণ ॥ ৬৪ ॥
তবে আসিবারে কেন সভয় অন্তর ।
জিজ্ঞাসিলে যদি তবে শুনহ উত্তর ॥ ৬৫ ॥
ধরায় সংসারাশ্রম সুবিষম ঠাঁই ।
ত্রিতাপ-অনলে তপ্ত লোহার কড়াই ॥ ৬৬ ॥
ভীষণ প্রবেশদ্বার কেবল যাতনা ।
তদুপরি শারীরিক রোগের তাড়না ॥ ৬৭ ॥
বিমল ভক্তের দেহ পবিত্র আধার ।
কি কারণে রোগ শোক তাপের সঞ্চার ॥ ৬৮ ॥
উত্তর-বহ্নির কাছে যেবা আগুয়ান ।
কোথায় কে পায় বল তাপের এড়ান ॥ ৬৯ ॥
বলিতেন প্রভুদেব বিধির বিধাতা ।
পাঁচভূতে এই দেহ রহে জোড়া গাঁথা ॥ ৭০ ॥
পঞ্চভূতময়
দেহ ফাঁদ সুবিষম ।
দেহ ধরি নিজে ব্রহ্মা করেন রোদন ॥ ৭১ ॥
হেন ধর্মযুক্ত দেহ
করিলে আশ্রয় ।
অনিবার্য রোগ শোক কর দিতে হয় ॥ ৭২ ॥
দেহের যে ধর্ম তাহা সর্বত্রে
সমান ।
দেহধারী যদি বিভু না যান এড়ান ॥ ৭৩ ॥
পাপময় ধরাপুরীমধ্যে ভক্তগণ ।
পাপমতি জীব সঙ্গে সদা বিচরণ ॥ ৭৪ ॥
সংসারীর পাপ-অন্ন করিয়া আহার ।
ভক্তের দেহেতে তাই তাপের সঞ্চার ॥ ৭৫ ॥
পারার স্বভাব পাপে, যদি পড়ে পেটে ।
ছাপা নাহি রহে দেহে রোগরূপে ফুটে ॥ ৭৬ ॥
ভক্তগণ সঙ্গে বিভু কেন আগুসার ।
উদ্দেশ্য করিতে লঘু ধরণীর ভার ॥ ৭৭ ॥
পাপ লয়ে অন্তরঙ্গগণ পারিষদ ।
পদে পদে প্রত্যেকের বিবিধ বিপদ ॥ ৭৮ ॥
লীলার ভিতরে আর দ্বিতীয় কারণ ।
অল্পবয়ঃ বালক কি হেতু ভক্তগণ ॥ ৭৯ ॥
শুন কই খুলে বলি লীলাতত্ব সার ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ড অমৃত
ভাণ্ডার ॥ ৮০ ॥
এখন কলির লোক করে মনে মনে ।
কামিনী-কাঞ্চনভোগ করিয়া যৌবনে ॥ ৮১ ॥
উপযুক্ত যবে পুত্র বার্ধক্যদশায় ।
বিষয়-সম্পত্তি আদি ভার দিয়া তায় ॥ ৮২ ॥
বন্দোবস্ত পোষ্যদের করি বিলক্ষণ ।
নিশ্চিন্ত হইয়া শেষে সাধন-ভজন ॥ ৮৩ ॥
সংসারীর আন্ বুদ্ধি বিধি-বিড়ম্বনা ।
যা হবার নহে করে তাহার বাসনা ॥ ৮৪ ॥
সবার প্রত্যক্ষ দেখা আছে চিরকাল ।
হাতে না মাখিয়া তেল ভাঙ্গিলে কাঁঠাল ॥ ৮৫ ॥
ফলেতে বিস্তর আঠা লাগে গোটা হাতে ।
অজ্ঞানে করিয়া কর্ম জঞ্জাল পশ্চাতে ॥ ৮৬ ॥
সেইমত জ্ঞান ভক্তি না করি অর্জন ।
বাহিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যেই জন ॥ ৮৭ ॥
সংসারে প্রবেশ করে মায়ার আঠায় ।
সুনিশ্চিত জড়ীভূত আপনা মজায় ॥ ৮৮ ॥
সংসার-সমরক্ষেত্রে ঢুকে যেই জনা ।
আগমনিগম তার দুই চাই জানা ॥ ৮৯ ॥
নিগমে অবিজ্ঞ জনে সংসারেতে আসা ।
ধ্রুব অভিমন্যুর মত হয় তার দশা ॥ ৯০ ॥
সেই হেতু বলিতেন প্রভু পরমেশ ।
সংসার বুঝহ অগ্রে পশ্চাৎ প্রবেশ ॥ ৯১ ॥
বালকের খেলা যথা ইহার উপমা ।
লুকোচুরি নামে যাহা সাধারণে জানা ॥ ৯২ ॥
বুড়ীকে ছুঁইয়া অগ্রে যেথা ইচ্ছা রয় ।
ছু'ইলেও তারে চোর চোর নাহি হয় ॥ ৯৩ ॥
সেইমত ভগবানে করি পরশন ।
সংসারে যেখানে যেবা করে বিচরণ ॥ ৯৪ ॥
নির্ভয় হৃদয় তার ধরা বেড়া ছাতি ।
ছুইলেও অবিদ্যায় নাহি হয় ক্ষতি ॥ ৯৫ ॥
বুঝ কেন বালক প্রভুর ভক্তগণ ।
বাল্যাবধি স্বভাবতঃ ভগবানে মন ॥ ৯৬ ॥
ভক্তে আচরিয়া ধর্ম শিক্ষা দিলা জীবে ।
ধর্ম-আচরণ-কর্ম শৈশবে শৈশবে ॥ ৯৭ ॥
বয়স্কে না হয় ধর্ম-সাধনা সংসারে ।
গলায় উঠিলে কাঁঠি পাখী নাহি পড়ে ॥ ৯৮ ॥
সহজে সুন্দর কার্য হয় বাল্যকালে ।
উপমা তাহার ননী তুলিলে সকালে ॥ ৯৯ ॥
যেমন সুন্দর উঠে মিঠা তার তায় ।
তেমন না হয় দুগ্ধ মথিলে বেলায় ॥ ১০০ ॥
বার্ধক্যে না হয় মোটে সাধনভজন ।
যখন হাজার ভাগ এক ফোঁটা মন ॥ ১০১ ॥
সকালে করিতে কর্ম শিখাবার তরে ।
বালক লইয়া লীলা প্রভু অবতারে ॥ ১০২ ॥
প্রবীণ বয়স তবে যাঁরা দুই চারি ।
কারণ তাঁহার তাঁরা প্রভুর ভাণ্ডারী॥ ১০৩ ॥
সুন্দর বালক এক জুটে এই কালে ।
উপেন্দ্র মুখুয্যে দুঃখী ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১০৪ ॥
অর্থ-আশে আসা শুনি প্রভু ভগবান ।
সময়ে করিলা তার পূর্ণ মনস্কাম ॥ ১০৫ ॥
জুটিল কিশোরী এবে মাস্টারের ভাই ।
বহুরঙ্গ তার সঙ্গে করিলা গোসাঁই ॥ ১০৬ ॥
আর এক যুবাবয়ঃ জুটে এই কালে ।
উপাধি তাঁহার দাস কৈবর্তের ছেলে ॥ ১০৭ ॥
কুলের তিলক গর্ব অতি ভক্তিমান ।
চিরভক্ত প্রভুর হারাণচন্দ্র নাম ॥ ১০৮ ॥
জনেক ব্রাহ্মণী জুটিলেন এ সময় ।
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর শুন পরিচয় ॥ ১০৯ ॥
অপার ভকতি ঘটে অবাক্ কাহিনী ।
ব্রাহ্মণীর বেশে এক দেবী ঠাকুরানী ॥ ১১০ ॥
বয়স চল্লিশ প্রায় দোহারা গড়ন ।
সংসারী যদিও তবু স্বতোন্নত মন ॥ ১১১ ॥
পরলোকে বহুকাল গিয়াছেন স্বামী ।
কোলে দিয়া ব্রাহ্মণীর একটি নন্দিনী ॥ ১১২ ॥
রাজরানী সেই কন্যা ঘরণী রাজার ।
সন্তান-সন্ততি এবে সোনার সংসার ॥ ১১৩ ॥
ব্রাহ্মণী থাকেন প্রায় নন্দিনীর ঘরে ।
জামাই মায়ের মত সমাদর করে ॥ ১১৪ ॥
পরম আনন্দে কাল কাটান ব্রাহ্মণী ।
কিছুই অভাব নাই দুধে ভাতে চিনি ॥ ১১৫ ॥
চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর ব্রাহ্মণী এখন ।
লীলায় সময় পূর্ণ হইল প্রয়োজন ॥ ১১৬ ॥
সংজোটন এখানে কেমনে হয় তাঁর ।
গাইলে শুনিলে কাটে বন্ধন মায়ার ॥ ১১৭ ॥
একমাত্র দুহিতাই ব্রাহ্মণীর ধন ।
আর কেহ নাই তার সংসার-বন্ধন ॥ ১১৮ ॥
প্রভুর দেখিয়া কার্য হয় বুদ্ধিহারা ।
রাজরানী নন্দিনী হঠাৎ গেল মারা ॥ ১১৯ ॥
কি হইল ব্রাহ্মণীর ভেবে দেখ মন ।
দুনিয়া আঁধার দিনে করে নিরীক্ষণ ॥ ১২০ ॥
লোকের সান্ত্বনা হৃদে নাহি পায় স্থল ।
দাবানলে কি করিবে এক বিন্দু জল ॥ ১২১ ॥
আখিবারি অনিবার দুনয়নে ঝরে ।
উন্মাদিনী সম ধারা দুহিতার তরে ॥ ১২২ ॥
ছাড়িয়া জামাতালয় আসিলেন ফিরে ।
বাগবাজারেতে তাঁর আপনার ঘরে ॥ ১২৩ ॥
যেখানে করেন বাস মহাভাগ্যবান ।
পরম বৈষ্ণব ভক্ত বসু বলরাম ॥ ১২৪ ॥
যোগীন-মাতার যেইখানে পিত্রালয় ।
পরস্পর প্রতিবাসী আছে পরিচয় ॥ ১২৫ ॥
ব্রাহ্মণীর শোকাতুরা দেখিয়া অবস্থা ।
সান্ত্বনার হেতু কয় ধরমের কথা ॥ ১২৬ ॥
এখানে ধর্মের কথা নাহি অন্য আর ।
একমাত্র শ্রীপ্রভুর মহামহিমার ॥ ১২৭ ॥
পূর্বাবধি মহন্নাম ছিল সংগোপনে ।
ব্রাহ্মণীর হৃদয়ের অতি গুপ্ত স্থানে ॥ ১২৮ ॥
ঢাকা ছিল মাত্র মহামোহে গৃহিতার ।
মেঘের আড়ালে যেন অঙ্গ চন্দ্রিমার ॥ ১২৯ ॥
উড়িল সে ঘন মেঘ দুহিতার কায়া ।
এখন কিঞ্চিং আছে একটুকু ছায়া ॥ ১৩০ ॥
বসিল সতেজে নাম প্রাণের ভিতর ।
দরশনে চলিলেন দক্ষিণশহর ॥ ১৩১ ॥
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
সময় আগত যেন পথ-পানে চেয়ে ॥ ১৩২ ॥
আছেন শ্রীপ্রভুদেব তাঁহার কারণ ।
সুমধুর কথা অতি ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৩৩ ॥
গুণমণি মন্দিরের বাহিরে বেড়ান ।
যে পথে ব্রাহ্মণী আসে আকুল পরান ॥ ১৩৪ ॥
ক্রমাগত বিলাপ করিয়া দুহিতার ।
মরিয়া গিয়াছে চণ্ডী কে আছে আমার ॥ ১৩৫ ॥
শুনিয়া বিলাপ বাক্য প্রভু গুণধর ।
হাসিয়া নাচিয়া কৈলা তাঁহারে উত্তর ॥ ১৩৬ ॥
আপনার বলিতে জগতে নাহি যার ।
তাঁহার আছেন হরি পারের কাণ্ডার ॥ ১৩৭ ॥
সর্পবিষে যেন রোগী গেছে ঢলে পড়ে ।
হঠাৎ জাগিয়া উঠে মন্তরের জোরে ॥ ১৩৮ ॥
সেইমত শোক-বিষে জ্বারা তনুখানি ।
ব্রাহ্মণী চমক্ অঙ্গ শুনিয়া শ্রীবাণী ॥ ১৩৯ ॥
ছুটিল শোকের জ্বালা শীতল অন্তরে ।
পাছু পাছু প্রবেশিল প্রভুর মন্দিরে ॥ ১৪০ ॥
বুঝিয়া ভক্তের দশা প্রভু ভগবান ।
ভাবেতে বিভোর অঙ্গ ধরিলেন গান ॥ ১৪১ ॥
"আপনাতে আপনি থেক মন
যেও নাকো কারো ঘরে ।
যা চাবি তা বসে পাবি,
খোঁজ নিজ
অন্তঃপুরে ॥
পরম-ধন ঐ পরশ মণি,
যা চাবি তা দিতে পারে ।
কত মণি পড়ে আছে,
চিন্তামণির নাচ-দুয়ারে ॥"
গীতের মাধুরী আর মর্মার্থ ইহার ।
শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর হৃদয়মাঝার ॥ ১৪২ ॥
তখনি বসিল এঁটে খুলে সাত তালা ।
তাড়াইয়া দুহিতার বিরহের জ্বালা ॥ ১৪৩ ॥
পাতালে মাটির নীচে লৌহময় ঘর ।
স্বপনেও যেথা নাই আলোর খবর ॥ ১৪৪ ॥
যেখানে কখন নাই পবন সঞ্চার ।
আধার আধার মাত্র নিবিড় আঁধার ॥ ১৪৫ ॥
দৈব ঘটনায় যদি সেইখানে হয় ।
জগৎ-লোচন সূর্যদেবের উদয় ॥ ১৪৬ ॥
তখনি পালায় তমঃ নাহি রহে আর ।
আলোকিত দশভিত যা ছিল আঁধার ॥ ১৪৭ ॥
তেমতি করিল হেথা গীতে শ্রীপ্রভুর ।
মায়াঢাকা ব্রাহ্মণীর অন্তরের পুর ॥ ১৪৮ ॥
ব্রাহ্মণী প্রার্থনা করে শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
যেমন মায়ার বাড়ি আর নাহি খাই ॥ ১৪৯ ॥
ভক্তি দিয়া কর রক্ষা আকুলা অধমে ।
হইনু শরণাপন্ন অভয়-চরণে ॥ ১৫০ ॥
ভক্তির প্রার্থনা শুনি প্রভু ভগবান ।
গাইতে লাগিলা গীত ভক্তির আখ্যান ॥ ১৫১ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
প্রভুর নিকটে এল গেল অগণন ॥ ১৫২ ॥
কিন্তু কেহ করিল না ভক্তির প্রার্থনা ।
নিজের কেবল তাঁর আপ্তগণ বিনা ॥ ১৫৩ ॥
প্রভুর গণের মধ্যে ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
ভক্তির কুঠরি তাঁর দিলেন খুলিয়ে ॥ ১৫৪ ॥
লীলায় এতেক কাল ছিল তালা আঁটা ।
এবারে ঘুচিল মায়া-জঞ্জালের লেঠা ॥ ১৫৫ ॥
আস্বাদ পাইয়া তাঁর চরণ-সরোজে ।
আসে যায় রহে মার কাছে মাঝে মাঝে ॥ ১৫৬ ॥
যোগীন-মায়ের মত মায়ের পিয়ারা ।
মার কাছে দোঁহে জয়া বিজয়ার পারা ॥ ১৫৭ ॥
মার আর প্রভুর চরণে গত মন ।
বারে বারে বন্দি দুই ভক্তের চরণ ॥ ১৫৮ ॥
ব্রাহ্মণীর পদদ্বয়ে অসংখ্য প্রণাম ।
প্রভুর সংসারে তাঁর গোলাপ-মা নাম ॥ ১৫৯ ॥
মার আর শ্রীপ্রভুর সেবা-ভক্তি আশা ।
সেবা-হেতু দোঁহাকার ধরাধামে আসা ॥ ১৬০ ॥
পশ্চাতে যতেক লীলা কৈলা গুণমণি ।
সেবা লয়ে সব ঠাঁই আছেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৬১ ॥
পরে পরে পাইবে যতেক সমাচার ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ড ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৬২ ॥
এখানে নরেন্দ্রনাথ ভক্তের প্রধান ।
শিরোমণি শ্রীপ্রভুর তাঁর বড় টান ॥ ১৬৩ ॥
টানের স্বভাব কিবা কহিবার নয় ।
শুনহ সংক্ষেপে কিছু কিছু পরিচয় ॥ ১৬৪ ॥
একদিন প্রভুদেব সুরধুনী-তটে ।
বিমরষ চাঁদনির অত্যন্ত নিকটে ॥ ১৬৫ ॥
দাঁড়ায়ে আছেন গঙ্গাপানে লক্ষ্য করি ।
এমন সময় ঘাটে লাগে এক তরী ॥ ১৬৬ ॥
সকৌতুকে সতৃষ্ণনয়নে প্রভুরায় ।
নেহারেন তরীযোগে কে আসে হেথায় ॥ ১৬৭ ॥
তরীতে নরেন্দ্রনাথ জীবন প্রভুর ।
দেখিয়া আনন্দে নৃত্য করেন ঠাকুর ॥ ১৬৮ ॥
বিমরষ অশান্তি সকল দূরীভূত ।
প্রফুল্ল শ্রীমুখ ফুল্ল-কমলের মত ॥ ১৬৯ ॥
ইহার পশ্চাতে যদি জাহ্নবীর জলে ।
জলযান পানসি কি তরণী দেখিলে ॥ ১৭০ ॥
বলিতেন প্রভুদেব এই অনুমানে ।
নরেন্দ্র ইহাতে বুঝি আসিছে এখানে ॥ ১৭১ ॥
প্রাণাধিক ভালবাসা অসীম মমতা ।
নরেন্দ্রের প্রতি যেন হেন নহে কোথা ॥ ১৭২ ॥
নরেন্দ্রে মমতা স্নেহ করে যেই জন ।
বড়ই সদয় তারে প্রভু নারায়ণ ॥ ১৭৩ ॥
হতাদর কিংবা নিন্দাবাদ যেবা করে ।
শ্রীপ্রভুর বিড়ম্বনা তাহার উপরে ॥ ১৭৪ ॥
কপালের ফের শুন এক বিবরণ ।
জনাইয়ের প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যে ব্রাহ্মণ ॥ ১৭৫ ॥
উচ্চপদে অভিষিক্ত বসতি শহরে ।
শ্রীপ্রভুর অন্ন-ভিক্ষা হৈল যার ঘরে ॥ ১৭৬ ॥
অহংকারে এইবার পড়িল প্রমাদে ।
প্রভুর নিকটে নরেন্দ্রের নিন্দাবাদে ॥ ১৭৭ ॥
শুনিয়া বিষাদে ফাটে শ্রীপ্রভুর বুক ।
দেখিতে না চান আর মুখুয্যের মুখ ॥ ১৭৮ ॥
দূরদৃষ্ট প্রাণকৃষ্ণ মহাভাগ্যবান ।
ভক্ত-অপরাধ দোষে না পায় এড়ান ॥ ১৭৯ ॥
বজরা সাজায়ে আম সুপক্ক ফজলি ।
ব্রাহ্মণ প্রভুর কাছে পাঠাইল ডালি ॥ ১৮০ ॥
প্রভুর নয়নে ডালি বিষের মতন ।
ফিরাইয়া দিলা তাহা আইল যেমন ॥ ১৮১ ॥
পরমাদে প্রাণকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি ছুটে ।
দক্ষিণশহরে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে ॥ ১৮২ ॥
উতরিয়া পুরীমধ্যে প্রাণ কাঁপে ডরে ।
প্রভুর মন্দিরে আর প্রবেশিতে নারে ॥ ১৮৩ ॥
বিচারিয়া মনে মনে ভাবিয়া উপায় ।
পুরীর খাজাঞ্চি যেবা তার কাছে যায় ॥ ১৮৪ ॥
কাকুতি সহিত কহে যতেক ঘটনা ।
অসন্তুষ্ট প্রভুদেব সেহেতু ভাবনা ॥ ১৮৫ ॥
জমিদার প্রাণকৃষ্ণ লোক জানা নাম ।
খাজাঞ্চি করিল তাঁর বিশেষ সম্মান ॥ ১৮৬ ॥
মধ্যস্থ স্বরূপ গিয়া শ্রীপ্রভুর কাছে ।
নিবেদিন প্রাণকৃষ্ণ কৃপাদৃষ্টি যাচে ॥ ১৮৭ ॥
আবেদনে শ্রীপ্রভুর অঙ্গে জ্বালাতন ।
অপরাধ কোনমতে না হয় ভঞ্জন ॥ ১৮৮ ॥
বাহুল্যে বাখান করে আগোটা পুরাণ ।
চিরকাল ভক্তের কেবল ভগবান ॥ ১৮৯ ॥
প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজি শ্রীপ্রভুর কাজে ।
ভক্তাবমাননা তাঁর বাজ সম বাজে ॥ ১৯০ ॥
প্রিয় যেবা শ্রীপ্রভুর নিন্দাবাদ তাঁর ।
নরেন্দ্র মাথার মণি প্রভুর আমার ॥ ১৯১ ॥
নরেন্দ্রের প্রভুদেব প্রভুর নরেন্দ্র ।
দুঁহু জনে পরস্পর বিচিত্র সম্বন্ধ ॥ ১৯২ ॥
প্রভুদেবে সম্মানসূচক সম্ভাষণ ।
করিলে নরেন্দ্র তাঁর তুষ্ট নহে মন ॥ ১৯৩ ॥
বলিতেন প্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
নরেন্দ্রের দেহে মোর শ্বশুরের ঘর ॥ ১৯৪ ॥
যেই পাত্রে রহে জল পদ-প্রক্ষালনে ।
নরেন্দ্র ছুঁইলে তাহা কোন প্রয়োজনে ॥ ১৯৫ ॥
শ্রীপ্রভুর ব্যবহার নাহি হয় আর ।
বুঝ মন কি সম্বন্ধ আছিল দোঁহার ॥ ১৯৬ ॥
অতি উচ্চ বস্তু তেঁহ কি বুঝিব তাঁয় ।
ধরিয়া সংসারী বুদ্ধি সতত মাথায় ॥ ১৯৭ ॥
যোগীন্দ্র দেবেন্দ্রাদির নরেন্দ্র দেবতা ।
নরেন্দ্রে নরেন্দ্র নাম অতি ক্ষুদ্র কথা ॥ ১৯৮ ॥
বিশ্বজন-পূজনীয় প্রভুভক্তগণ ।
পদরজ তাঁহাদের করিয়া ধারণ ॥ ১৯৯ ॥
গাইতে যখন লীলা লইয়াছি ব্রতী ।
শুন কই নরেন্দ্রের স্বরূপ ভারতী॥ ২০০ ॥
এক দিন বলিছেন প্রভু বাঁকা-আঁখি ।
নরেন্দ্র লীলায় আনা প্রয়োজন দেখি ॥ ২০১ ॥
হৃষ্টমনে অন্বেষণে নিজে আমি যাই ।
সপ্তর্ষিমণ্ডলে (?) তার যোগাসন ঠাঁই ॥ ২০২ ॥
দেখিলাম সমাধিস্থ মুখে ভাতি খেলে ।
মনখানি একেবারে সর্ব উচ্চে তুলে ॥ ২০৩ ॥
কাছে গিয়া বার বার করি আবাহন ।
কোনমতে নিম্নদেশে নাহি নামে মন ॥ ২০৪ ॥
তথাপি না ছাড়ি তায় ডাকি উচ্চৈঃস্বরে ।
নিরখিল একবার পলকের তরে ॥ ২০৫ ॥
গম্ভীর প্রশান্ত ভাব ভুবনে অতুল ।
রক্তিম বিশাল আঁখি যেন জবাফুল ॥ ২০৬ ॥
সমাধি প্রবল সাধ শান্তির আশ্রম ।
পূর্ববৎ পুনরায় ধিয়ানে মগন ॥ ২০৭ ॥
অতি প্রয়োজন তাঁয় ধরার আসরে ।
তাই তীক্ষ্ণ আকর্ষণ করিলাম পরে ॥ ২০৮ ॥
শক্তিমান যোগেশ্বর মহাতেজ গায় ।
আংশিক কেবলমাত্র আসিল ধরায় ॥ ২০৯ ॥
সেই অল্প অংশে এই নরেন্দ্র মূরতি ।
আসিলে আগোটা হত টলমল ক্ষিতি ॥ ২১০ ॥
নরেন্দ্রের মত হেন প্রকাণ্ড আধার ।
আসে নাই আসিবে না কভু পরে আর ॥ ২১১ ॥
তেজঃপুঞ্জকলেবর শক্তি রাশি রাশি ।
বিবেক বিরাগে ভরা প্রেমিক সন্ন্যাসী ॥ ২১২ ॥
বড়ই সুখের দিন নরেন্দ্র রাখাল ।
ভিক্ষায় মাগিয়া অন্ন কাটাইবে কাল ॥ ২১৩ ॥
নরেন্দ্রের কলেবরে সন্ন্যাসীর বেশ ।
দেখিতে বড়ই তুষ্ট প্রভু পরমেশ ॥ ২১৪ ॥
নরেন্দ্র ছিলেন যবে কেশবের দলে ।
নব-বৃন্দাবন বহি অভিনয়কালে ॥ ২১৫ ॥
সন্ন্যাসীর অভিনয়ে ভার ছিল তার ।
শুনিয়া অপারানন্দ প্রভুর আমার ॥ ২১৬ ॥
ভক্তগণে বলিলেন আনন্দ-অন্তর ।
অভিনয়-দরশনে চলহ সত্বর ॥ ২১৭ ॥
রঙ্গালয়ে যথাক্ষণে গমন হরিষে ।
দেখিবারে প্রিয়বরে সন্ন্যাসীর বেশে ॥ ২১৮ ॥
আসরেতে উপনীত নরেন্দ্র যখন ।
অঙ্গে সন্ন্যাসীর সাজ অতি সুশোভন ॥ ২১৯ ॥
সন্তোষের নাহি সীমা প্রভু ভগবান ।
লোকের দ্বারায় তাঁরে বলিয়া পাঠান ॥ ২২০ ॥
ত্বরান্বিতে তাঁহার সকাশে যেন আসে ।
নয়নরঞ্জন সাজ সন্ন্যসীর বেশে ॥ ২২১ ॥
শুনিয়া প্রভুর আজ্ঞা সজ্জা সহ গায় ।
আইল নরেন্দ্রনাথ শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ২২২ ॥
শ্রীবদনে মৃদু হাসি অপরূপ খেলে ।
নরেন্দ্রে করেন প্রীতি প্রেমের বিহ্বলে ॥ ২২৩ ॥
সুন্দর সন্ন্যাস-সাব্জ অঙ্গ আভরণ ।
ধর দেহে আর নাহি কর বিমোচন ॥ ২২৪ ॥
বলিয়াছি বার বার শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাঁহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ২২৫ ॥
ত্যাগী অনাসক্ত ভাব পোঁতা যাঁর ঘটে ।
প্রখর ত্যাগের তত্ত্ব তাঁহার নিকটে ॥ ২২৬ ॥
কাহার কি রসে হয় ভাব পুষ্টিকর ।
বুঝিতে সুপটু প্রভু রসের সাগর ॥ ২২৭ ॥
বাল্যকথা বলিয়াছি নরেন্দ্রের আগে ।
জন্মাবধি সাধ ত্যাগ বিবেক বিরাগে ॥ ২২৮ ॥
বিষয় ত্যাগের ভাব তাঁহার আধারে ।
প্রকৃতির প্রকৃতি যাহাতে শূন্যে উড়ে ॥ ২২৯ ॥
অষ্টাঙ্গে অপার বল বলময় মন ।
মূর্তিমান জঠরে বিরাজে হুতাশন ॥ ২৩০ ॥
মহাবলী পাকস্থলী এত শক্তি ধরে ।
সৃষ্টি-বিনাশক পাপে পরিপাক করে ॥ ২৩১ ॥
পাপেতে অর্জিত অর্থ করি বিনিময় ।
ভোজ্যদ্রব্য যদি তাহে কেহ করি ক্রয় ॥ ২৩২ ॥
প্রভুর নিকটে দেয় পাঠাইয়া ডালি ।
যতনে শ্রীপ্রভুদেব বাঁধিয়া পুটুলি ॥ ২৩৩ ॥
প্রেরণ করেন সব নরেন্দ্রের কাছে ।
পরিপাক করিবার শক্তি যাঁর আছে ॥ ২৩৪ ॥
হিন্দুমতে যেই দ্রব্য খাইতে বারণ ।
নরেন্দ্র প্রত্যহ তাহা করেন ভক্ষণ ॥ ২৩৫ ॥
একদিন একজন প্রভুর নিকটে ।
নরেন্দ্রের অনাচার-কথা গিয়া রটে ॥ ২৩৬ ॥
উত্তর তাহার কৈলা প্রভু গুণমণি ।
নরেন্দ্রের ইহাতে হবে না কোন হানি ॥ ২৩৭ ॥
নরেন্দ্রের সংসারের অবস্থা এমন ।
অর্থাভাবে অতি কষ্ট পায় পোষ্যগণ ॥ ২৩৮ ॥
উপার্জনে যদি চেষ্টা করেন নরেন্দ্র ।
মঙ্গল দূরের কথা তাহে বাড়ে মন্দ ॥ ২৩৯ ॥
অখিলের পতি প্রভুদেব ভগবান ।
নরেন্দ্র নিজের তাঁর পরান-সমান ॥ ২৪০ ॥
সেহেতু দিনেক কেহ প্রভুর নিকট ।
জানাইল নরেন্দ্রের অবস্থা-সঙ্কট ॥ ২৪১ ॥
অর্থাভাবে অতিশয় কষ্ট প্রতিদিন ।
নিরানন্দ মগ্ন সদা বদন মলিন ॥ ২৪২ ॥
তদুত্তরে প্রভুদেব বলিলেন তায় ।
মৃগেন্দ্র যদ্যপি নিত্য খাইবারে পায় ॥ ২৪৩ ॥
প্রবল প্রতাপে তার পরমাদ গণি ।
উলট্ পালট্ হবে গোটা অরণ্যানী ॥ ২৪৪ ॥
নরেন্দ্রের কলেবরে অপার শকতি ।
উদরে যদ্যপি অল্প পায় নিতি নিতি ॥ ২৪৫ ॥
ধরাতলে অবহেলে করিবে প্রচার ।
নিজের ইচ্ছায় ভাব ছত্রিশ প্রকার ॥ ২৪৬ ॥
আয়ত্তে রাখিতে অশ্বে অতি বলবান ।
মুখে যেন রহে জোড়া কাঁটার লাগাম ॥ ২৪৭ ॥
সেইমত নরেন্দ্রের অর্থাভাব ঘরে ।
আটকে রাখিতে তাঁয় সীমার ভিতরে ॥ ২৪৮ ॥
দিনেক প্রভুর কাছে বিষণ্ণ হইয়া ।
অর্থাভাব শ্রীনরেন্দ্র জানাইল গিয়া ॥ ২৪৯ ॥
উত্তরে কহেন প্রভু মলিন বদন ।
টাকা কিংবা ছেলে হবে ইহার কারণ ॥ ২৫০ ॥
প্রার্থনা কাহারও জন্যে মায়ের নিকটে ।
কহিতে না পারি মুখে বাক্য নাহি ফুটে ॥ ২৫১ ॥
প্রত্যুত্তরে প্রভুদেবে শ্রীনরেন্দ্র কন ।
নৈকট্য সম্বন্ধে তেজ গায়ে বিলক্ষণ ॥ ২৫২ ॥
পাদপদ্মে মগ্ন মন প্রেম সহকারে ।
কৃষ্ণ করিলেন পণ পাণ্ডব-সমরে ॥ ২৫৩ ॥
থাকিব সারথি-বেশে অর্জুনের রথে ।
কিন্তু কভু ধরিব না ধনুর্বাণ হাতে ॥ ২৫৪ ॥
জগতের সখা কৃষ্ণ কহিলে এমন ।
ক্রোধান্বিত-কলেবর রক্তিম-লোচন ॥ ২৫৫ ॥
প্রতিপণ করি ভীষ্ম তেজঃপুঞ্জ-তনু ।
সমরে বাঁশরীধরে ধরাইল ধনু ॥ ২৫৬ ॥
সেইমত প্রতিপণ করিনু হেথায় ।
কালীরে কহাব আমি তোমার দ্বারায় ॥ ২৫৭ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু নারায়ণ ।
ভক্তের নিকটে তাঁর নাহি রহে পণ ॥ ২৫৮ ॥
মৌন রহি কিছুক্ষণ বলিলেন পরে ।
ঝটিতি প্রবেশ কর কালীর মন্দিরে ॥ ২৫৯ ॥
মনের বাসনা যাহা জানাও তাঁহায় ।
অবশ্য হইবে পূর্ণ কালীর কৃপায় ॥ ২৬০ ॥
চলিলা নরেন্দ্রনাথ শুনিয়া শ্রীবাণী ।
যে মন্দিরে বিরাজেন জগৎ-জননী ॥ ২৬১ ॥
নিরখিয়া মায়ে দুঃখ ভুলিয়া সকল ।
ঢালিতে লাগিলা খালি দুনয়নে জল ॥ ২৬২ ॥
পশ্চাতে প্রার্থনা কৈলা অনুরাগভরে ।
বিবেক বৈরাগ্য মাতা ভিক্ষা দেহ মোরে ॥ ২৬৩ ॥
অশ্রুজলে মাথা আঁখি ফিরিলা সত্বর ।
তমোহর বিশ্বগুরু প্রভুর গোচর ॥ ২৬৪ ॥
কি মাগিলে প্রভুদেব জিজ্ঞাসিলে পরে ।
হৃদয়ে উচ্ছ্বাস ভরা বাক্য নাহি সরে ॥ ২৬৫ ॥
গদগদম্বরে কন প্রেমিক সন্ন্যাসী ।
বিবেক বৈরাগ্যদ্বয় যাহা ভালবাসি ॥ ২৬৬ ॥
বড় খুশী প্রভুদেব শুনিয়া উত্তর ।
করিতে লাগিল নৃত্য আনন্দ-অন্তর ॥ ২৬৭ ॥
যেন ভোলা যোগেশ্বর বাঘাম্বরধারী ।
ত্যাগ-যোগ-তত্ত্ব-তোষ চিতাস্থলচারী ॥ ২৬৮ ॥
ত্যাগী জনে বড় তুষ্ট প্রভু গুণধর ।
প্রাণের অধিক তাঁরে মমতা আদর ॥ ২৬৯ ॥
কহিতে ত্যাগের কথা খুশী প্রভুরায় ।
ত্যাগ-উপদেশ উক্তি কথায় কথায় ॥ ২৭০ ॥
বিশেষে সংসারী দ্বারা সংসার আশ্রমে ।
মহোল্লাসে করে বাস ত্রাস নাহি মনে ॥ ২৭১ ॥
সঙ্গে লয়ে সর্বদাই দিবা-বিভাবরী ।
কামিনী-কাঞ্চনদ্বয় কাল-বিষধরী ॥ ২৭২ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে খালি সংসার-আশ্রম ।
তিয়াগিয়া দূরে থাক সংসারে কেমন ॥ ২৭৩ ॥
জিজ্ঞাসিলে যদি কথা শুন সবিশেষ ।
উপায়-বিধান কিবা দিলা পরমেশ ॥ ২৭৪ ॥
অবিদ্যা লইয়া বাস সংসারের মাঝে ।
সাবধান যেন তাহে মন নাহি মজে ॥ ২৭৫ ॥
শ্রীগুরু-চরণে মগ্ন রাখি মনখানি ।
হাতে-পায়ে কর কর্ম হইবে না হানি ॥ ২৭৬ ॥
বিষয়ে ইন্দ্রিয়-যোগ ইন্দ্রিয়েতে মন ।
কর্ম হয় এই তিনে হইলে মিলন ॥ ২৭৭ ॥
বিষয় হইতে মন রাখিয়া পৃথক্ ।
কেমনে হইবে কর্মী কর্মেতে পারক ॥ ২৭৮ ॥
ইহার উত্তরে প্রভু দিলা দেখাইয়ে ।
চিড়া কুটে আটপিঠে ছুতরের মেয়ে ॥ ২৭৯ ॥
বাম হাতে ভাজে ধান খোলার উননে ।
দক্ষিণে করিছে কাজ ভয়ঙ্কর স্থানে ॥ ২৮০ ॥
পদে পদে যেইখানে আশঙ্কার লেঠা ।
গড়ের ভিতরে যেথা চিড়া যায় কুটা ॥ ২৮১ ॥
ধান চিড়ে তুলে পাড়ে যথাস্থানে রাখে ।
দুগ্ধপোষ্য ছাওয়ালেরে মাই দেয় মুখে ॥ ২৮২ ॥
বুকের মাঝেতে ছেলে কোলের শয্যায় ।
কাঁদিলে করিতে শান্ত কোলেতে নাচায় ॥ ২৮৩ ॥
সম্মুখে দণ্ডায়মান খদ্দেরনিচয় ।
চিড়ার হিসাব সব সেই সঙ্গে হয় ॥ ২৮৪ ॥
বলিহারি বাহাদুরি অভ্যাস কেমন ।
একসঙ্গে নানা কর্ম করে একজন ॥ ২৮৫ ॥
মনখানি কিছু কিছু সকল বিভাগে ।
গড়ের ভিতরে কিন্তু অধিকাংশ জাগে ॥ ২৮৬ ॥
পদে পদে যেই স্থলে আশঙ্কার লেঠা ।
পড়িলে মুণ্ডলি হাতে হাত যাবে কাটা ॥ ২৮৭ ॥
সেইমত সংসারীর অতি প্রয়োজন ।
শ্রীগুরুচরণে রাখি অধিকাংশ মন ॥ ২৮৮ ॥
অতি অল্পমাত্র রবে সংসারের কাজে ।
তাও যেন অবিদ্যায় কখন না মজে ॥ ২৮৯ ॥
সংসারী সতর্কভাবে রবে নিরবধি ।
মায়া মোহে মনে রক্ষা শ্রীপ্রভুর বিধি ॥ ২৯০ ॥
সংসারীর প্রাণাপেক্ষা প্রিয় টাকাকড়ি ।
বিষয়-সম্পত্তি মান কুমার-কুমারী ॥ ২৯১ ॥
দিবারাত্রি থাকি লিপ্ত সংসর্গে সবার ।
মায়ামোহ নষ্ট করা কঠিন ব্যাপার ॥ ২৯২ ॥
উপায়-বিধানে উক্তি বড়ই সুন্দর ।
শুন কই দিলা যাহা শ্রীপ্রভু ঈশ্বর ॥ ২৯৩ ॥
ধনাঢ্য লোকের ঘরে দাসীর মতন ।
যাহাকে অনেক কর্মে ভার সমর্পণ ॥ ২৯৪ ॥
হাটে বাটে যায় কিনে যাহা দরকার ।
লালে পালে মুনিবের কুমারী-কুমার ॥ ২৯৯ ॥
মায়ের মতন ঠিক যতনের ভরে ।
মল-মূত্র-পরিষ্কারে ঘৃণা নাহি করে ॥ ৩০০ ॥
কিন্তু জানে মনে মনে এই টাকাকড়ি ।
প্রাসাদের তুল্যমূল্য বালাখানা বাড়ি ॥ ৩০১ ॥
নন্দন-নন্দিনীগুলি দ্রব্য রাশি রাশি ।
তার নয় মুনিবের সে কেবল দাসী ॥ ৩০২ ॥
তেমতি সংসারী রবে সংসার আশ্রমে ।
ধনীর দাসীর মত নিরাসক্ত মনে ॥ ৩০৩ ॥
বিশেষিয়া বিচারিয়া যুক্তি করি সার ।
মালিক ঈশ্বর খালি কর্মে তার ভার ॥ ৩০৪ ॥
ত্যাগাভ্যাস সংসারীর অতি প্রয়োজন ।
আসক্তির ফাঁদে যেন নাহি পড়ে মন ॥ ৩০৫ ॥
ত্যাগাভ্যাসে একমাত্র বিচার সহায় ।
বিবেক-বিচার-বুদ্ধি অতি স্ফূর্তি পায় ॥ ৩০৬ ॥
বিবেক প্রশান্তভাবে পাইলে সুপথ ।
তখন স্বতন্ত্র দুটি হয় সদসৎ ॥ ৩০৭ ॥
বিবেক করিলে নিজ কার্য-সমাপন ।
বৈরাগ্য আসিয়া সঙ্গে হয় সম্মিলন ॥ ৩০৮ ॥
দ্রুতগতি পবন যেমন গিয়া জুটে ।
প্রজ্বলিত দীপ্তিমান বহ্নির নিকটে ॥ ৩০৯ ॥
বিবেক-বৈরাগ্য যবে হৃদে বলবৎ ।
তিয়াগ তখন পায় নিজ কর্মে পথ ॥ ৩১০ ॥
তস্কর রিপুর গণ চর অবিদ্যার ।
প্রবেশিতে নাহি পারে হৃদয়ের দ্বার ॥ ৩১১ ॥
যায় জ্বালা ত্রিতাপের বাবড়া-অনল ।
দ্বেষ-হিংসা-মদাদির ভীষণ গরল ॥ ৩১২ ॥
ইন্দ্রিয়ের সুখ-সেব্য কর্মের প্রয়াস ।
কনক-লতার ক্রমে অবিদ্যার ফাঁস ॥ ৩১৩ ॥
ধীর স্থির চিরশান্তি অবিরত খেলে ।
তাপহর তিয়াগের বিশ্বজয়ী বলে ॥ ৩১৪ ॥
ব্যাপিয়া ভুবন গোটা মন ধরে কায়া ।
সর্বভূতে সমজ্ঞান সর্বজীবে দয়া ॥ ৩১৫ ॥
ঐকান্তিক দৃঢ়ভক্তি শ্রীগুরুচরণে ।
ইহাই কেবলমাত্র তিয়াগের মানে ॥ ৩১৬ ॥
শিক্ষা দিতে জীবগণে ত্যাগের মরম ।
অবতারে নরেন্দ্রের ধরায় জনম ॥ ৩১৭ ॥
বিষম তিয়াগ তাঁর ঈশ্বরের তরে ।
ক্রমশঃ কহিব কথা পুঁথির ভিতরে ॥ ৩১৮ ॥
জলন্ত বিশ্বাস ত্যাগে পায় দীপ্তিমান ।
আলো করি হৃদয়ের অতি গুপ্তস্থান ॥ ৩১৯ ॥
বিশ্বাসেতে অন্ধকার-সন্দ-বিমোচন ।
বিভুর মোহন মূর্তি প্রত্যক্ষ তখন ॥ ৩২০ ॥
ঘৃণা-লজ্জা-ভয় লয় হয় সেইক্ষণে ।
সঙ্গে লয়ে অহঙ্কার অরাতি ভীষণে ॥ ৩৩০ ॥
একেবারে নহে নষ্ট শুন পরিচয় ।
কিছু কিছু থাকে দেহ যতক্ষণ রয় ॥ ৩৩১ ॥
আগুনেতে ভস্মীভূত রজ্জুর মতন ।
আকারেতে রহে মাত্র না চলে বন্ধন ॥ ৩৩২ ॥
অহঙ্কার যতটুকু রহে বর্তমান ।
তখন তাহার হয় পাকা আমি নাম ॥ ৩৩৩ ॥
পাকা আমি দাস আমি প্রভুর আমার ।
কাঁচা আমি — আমি আমি মদ অহঙ্কার ॥ ৩৩৪ ॥
বড়ই সুন্দর দাস আমির চেহারা ।
বহে আমি কিন্তু আমি জীবন্তেতে মরা ॥ ৩৩৫ ॥
মরা বটে কিন্তু তার গায় এত বল ।
লোমে লোমে তুলে বাঁধে অটল অচল ॥ ৩৩৬ ॥
শুষে জল জলধির কেবল গণ্ড যে ।
কিংবা হয় লক্ষে পার চক্ষুর নিমিষে ॥ ৩৩৭ ॥
নাসার নিঃশ্বাসে রোধে পবনের গতি ।
চরণে চাপিয়া করে টলমল ক্ষিতি ॥ ৩৩৮ ॥
বিদারিয়া ধরাখণ্ডে অনন্তে কাঁপায় ।
হাতে ধরি দিনকরে বগলে ঢাকায় ॥ ৩৩৯ ॥
জলে স্থলে আকাশের শূন্যমাঝে তুলে ।
ঘটায় প্রলয়কাণ্ড প্রকৃতির কোলে ॥ ৩৪০ ॥
বিনাশে বিধির বিধি বিধি বিপর্যয় ।
প্রভুর কর্মেতে যদি প্রয়োজন হয় ॥ ৩৪১ ॥
পাকা আমি দাস আমি কাজে কাজে লাগে ।
কাঁচাটি যেমন শূন্য অঙ্কের বাঁদিগে ॥ ৩৪২ ॥
প্রথমের এত বল ভয়ে কাঁপে ধরা ।
দ্বিতীয় মদেতে পূর্ণ কাজে কিন্তু মরা ॥ ৩৪৩ ॥
আমি অনর্থের মূল আবরে নয়ন ।
মুক্তির পথের কাঁটা বিষম বন্ধন ॥ ৩৪৪ ॥
তিয়াগিলে খালি আমি সব লেঠা যায় ।
মায়া-মুগ্ধ জীবে আমি ছাড়িতে না চায় ॥ ৩৪৫ ॥
এই আমি অহঙ্কার-ভ্রম-বিমোচনে ।
কি করিলা প্রভুদেব শুন সাবধানে ॥ ৩৪৬ ॥
সাধনভজনকালে যৌবন দশায় ।
পুরীমধ্যে দুপুরে যতেক লোক খায় ॥ ৩৪৭ ॥
সবার উচ্ছিষ্ট পাতা মাথায় তুলিয়া ।
দিন দিন গঙ্গাকূলে দিতেন ফেলিয়া ॥ ৩৪৮ ॥
ইহাতেও কর্ম তাঁর নহে সমাধান ।
অবশেষে করিতেন পরিষ্কার স্থান ॥ ৩৪৯ ॥
উচ্ছিষ্টভোজন-পাত্র সাধু-মহান্তের ।
মার্জনে সাধনা কর্ম করিলেন ঢের ॥ ৩৫০ ॥
পাইখানা পরিষ্কার করিলা আপনি ।
শ্রীকরকমলে নিজে ধরিয়া মার্জনী ॥ ৩৫১ ॥
ভাল-মন্দ উচ্চ-নীচ বিচার বিহনে ।
সর্ব অগ্রে নমস্কার প্রতি জনে জনে ॥ ৩৫২ ॥
সরল শিশুর ভাব লইয়া আপনি ।
চলিছেন শ্রীবদনে তুহু তুহু ধ্বনি ॥ ৩৫৩ ॥
প্রত্যক্ষ জননী তাঁর কল্পনার নয় ।
লীলাপাঠে বিশেষিয়া পাবে পরিচয় ॥ ৩৫৪ ॥
কালীর সঙ্গেতে তাঁর সম্পর্ক এমন ।
দুগ্ধপোষ্য শিশু যেন মায়ের সদন ॥ ৩৫৫ ॥
কালী সকলের মূল সৃষ্টি প্রসবিনী ।
তাঁহার সকলে তিনি জগৎ-জননী ॥ ৩৫৬ ॥
মঙ্গলরূপিণী আদ্যাশক্তির ইচ্ছায় ।
হইতেছে সব
কার্য যা হয় যেথায় ॥ ৩৫৭ ॥
মানুষ চামের থলি থলির আধারে ।
পাইয়া শক্তির শক্তি তবে
কার্য করে ॥ ৩৫৮ ॥
কুমোরের জোরে তার চাকের মতন ।
ঘুরে গড়ে রকমারি মাটির বাসন ॥ ৩৫৯ ॥
কালীর রাজ্যেতে নাহি অমঙ্গল ঘটে ।
অহঙ্কারে জীব-বুদ্ধি ভাল-মন্দ রটে ॥ ৩৬০ ॥
বড়ই বিচিত্র কথা কখন না শুনি ।
নন্দনের মন্দ ইচ্ছা করেন জননী ॥ ৩৬১ ॥
যদ্যপিহ কদাচার সন্তান-সন্ততি ।
মঙ্গলকামনা মার খালি দিবারাতি ॥ ৩৬২ ॥
প্রকৃত জননী কালী কিছু কম নয় ।
জীবের ইহাতে নাই তিলার্ধ প্রত্যয় ॥ ৩৬৩ ॥
বিশ্বাস-ভক্তির তত্ত্ব দিতে জীবগণে ।
কি লীলা করিলা প্রভু শুন এক মনে ॥ ৩৬৪ ॥
শ্রবণ-কীর্তনে লীলা করিলে মন্থন ।
পাইবে ঔষধি ভব-ব্যাধি বিনাশন ॥ ৩৬৫ ॥
একদিন প্রভুর নিকটে কোন জন ।
কথায় কথায় করি কথা উত্থাপন ॥ ৩৬৬ ॥
বলিলেন বিশ্বমাতা করুণায় ভরা ।
জীবের সুখের জন্য সৃষ্টিখানি গড়া ॥ ৩৬৭ ॥
তদুত্তরে বলিলেন প্রভুদেবরায় ।
মায়ের কর্তব্য কর্ম দয়া কিবা তায় ॥ ৩৬৮ ॥
আপনার ছেলেপুলে পালেন জননী ।
ইহাতে করুণাময়ী কি প্রকারে তিনি ॥ ৩৬৯ ॥
বেদবাক্য অল্প কথা বহু মানে তায় ।
তেমতি বৃহৎ অর্থ শ্রীবাক্যে হেথায় ॥ ৩৭০ ॥
বিশেষিয়া প্রভুদেব কন এইখানে ।
মা তোমার তুমি মার সন্দ তায় কেনে ॥ ৩৭১ ॥
ছেলের কল্যাণ চিন্তা আপন ইচ্ছায় ।
বলিতে না হয় কিছু নিজে করে যায় ॥ ৩৭২ ॥
জননীরে তিয়াগিয়া কিংবা রাখি দূরে ।
জীবের দুর্গতি মাত্র শুদ্ধ অহংকারে ॥ ৩৭৩ ॥
অতি হীনবল জীব সঙ্কীর্ণ-আধার ।
শক্তি নাই শ্রীপ্রভুর বাক্য বুঝিবার ॥ ৩৭৪ ॥
সেইহেতু বিশ্বগুরু প্রভু নারায়ণ ।
কাজে কিবা দেখাইলা শুন বিবরণ ॥ ৩৭৫ ॥
কি সুন্দর শ্রীপ্রভুর শিখাবার ধারা ।
স-মনে শুনিলে যায় অহংকার মারা ॥ ৩৭৬ ॥
কালীর উপরে হয় বিশ্বাস তখন ।
প্রত্যক্ষ উদরে-ধরা মায়ের মতন ॥ ৩৭৭ ॥
আছিল কুক্কুরী এক পুরীর ভিতরে ।
বড় প্রিয় শ্রীপ্রভুর দণ্ডবৎ তারে ॥ ৩৭৮ ॥
তদুপরি প্রভুদেব বড়ই সদয় ।
শিকায় হাঁড়িতে লুচি থাকিত সঞ্চয় ॥ ৩৭৯ ॥
শুন কি হইল পরে সুন্দর ঘটনা ।
কুক্কুরী প্রসব করি এক গণ্ডা ছানা ॥ ৩৮০ ॥
কালবশে সুকঠিন রোগের সঞ্চার ।
লোকান্তরে গেল দেহ করি পরিহার ॥ ৩৮১ ॥
অনাথ শাবকগুলি মায়ের বিহনে ।
অনাহারে এক ঠাঁই রহে রেতে দিনে ॥ ৩৮২ ॥
এক দিন সেই দিকে প্রভুদেবরায় ।
করিছেন আগমন আপন ইচ্ছায় ॥ ৩৮৩ ॥
নিরখি অনাথনাথে শাবকসকলে ।
ছুটিয়া আসিয়া লুটে শ্রীচরণতলে ॥ ৩৮৪ ॥
কাঁইকুই মুখে শব্দ অব্যক্ত ভাষায় ।
জঠর-যাতনা যেন শ্রীপদে জানায় ॥ ৩৮৫ ॥
তুষিয়া আশ্বাস-বাক্যে শাবক নিকরে ।
ধীরে ধীরে ফিরিলেন আপন মন্দিরে ॥ ৩৮৬ ॥
কিছুক্ষণ পরে তার কোন এক জন ।
প্রভুর নিকটে কহে সবিস্ময় মন ॥ ৩৮৭ ॥
কুক্কুরী মরিয়া গেছে প্রসবিয়া ছানা ।
আজি কিন্তু দেখি এক অদ্ভুত ঘটনা ॥ ৩৮৮ ॥
অপর কুক্কুরী এক তাহার মতন ।
তেমতি চেহারা মুখ তেমতি বরন ॥ ৩৮৯ ॥
আসিয়াছে কোথা হতে না জানি সন্ধান ।
শাবকেরা করিতেছে দুগ্ধ তার পান ॥ ৩৯০ ॥
শুনিয়া বড়ই তুষ্ট প্রভুদেবরায় ।
বলিলেন সব হয় শ্যামার ইচ্ছায় ॥ ৩৯১ ॥
জগতের যেখানেতে যতবিধ প্রাণী ।
সকলে সমানচক্ষে দেখেন জননী ॥ ৩৯২ ॥
কালের সৃষ্টির আগে কালীর খাতায় ।
বিধিমত আছে লেখা প্রত্যেক পাতায় ॥ ৩৯৩ ॥
যতেক ঘটনাবলী হয় সৃষ্টিতলে ।
ভূত বর্তমান কিবা ভবিষ্যৎ কালে ॥ ৩৯৪ ॥
সকলের মূল কালী জননী সবার ।
মঙ্গলরূপিণী মূর্তি সৃষ্টির আধার ॥ ৩৯৫ ॥
এমন আনন্দময়ী মায়ের চেহারা ।
দেখিতে না পায় জীবে পথে দিশাহারা ॥ ৩৯৬ ॥
দ্বিতীয় নাহিক হেতু এক হেতু তার ।
হীন অহংকার বুদ্ধি লোচন আঁধার ॥ ৩৯৭ ॥
অহংকার কর নষ্ট জগৎ-জননী ।
সম্বল কেবলমাত্র চরণ দুখানি ॥ ৩৯৮ ॥
সহজে না ছাড়ে জীবে অহংকার আমি ।
প্রভুর বচনে শুন তাহার কাহিনী ॥ ৩৯৯ ॥
হীন হেয় পশু-জন্ম প্রাণীর ভিতরে ।
সেও নাহি ত্যজে আমি, আমি আমি করে ॥ ৪০০ ॥
দৃষ্টান্তে বাছুর যেন হইয়া প্রসব ।
জনমিবা মাত্র করে হাম্বা হাম্বা রব ॥ ৪০১ ॥
বয়স হইলে বৃদ্ধি যৌবন-দশায় ।
ভয়াবহ কাজে করে নিযুক্ত চাষায় ॥ ৪০২ ॥
দিন রাত্রি খাটায় গলায় দিয়া রশি ।
ভোজ্যদ্রব্য চুনি খড় ঘাস খোল ভুসি ॥ ৪০৩ ॥
বার্ধক্যেও সেই শ্রম চলে অবিরাম ।
যতক্ষণ আছে প্রাণ না পায় ছাড়ান ॥ ৪০৪ ॥
দুরবস্থা একশেষ প্রায় প্রাণনাশ ।
আমিত্ব না যায় তবু দেহে করে বাস ॥ ৪০৫ ॥
মরিলে চামার তার চর্মখানি তুলে ।
সতেজ চুনের জল কষে দেয় ফেলে ॥ ৪০৬ ॥
পাকিয়া উঠিলে খাল তুলে পুনরায় ।
প্রখর সূর্যের তাপে সময়ে শুকায় ॥ ৪০৭ ॥
বিশুষ্ক নীরস যবে হয় একবারে ।
ধারাল বাদারি দিয়া খণ্ড খণ্ড করে ॥ ৪০৮ ॥
সবল আঘাতে চর্ম করি পরিসর ।
ছাউনি করিয়া বাঁধে ঢাকের উপর ॥ ৪০৯ ॥
ঢাকের বেতের কাঠি তাহার দ্বারায় ।
পিটিয়া যখন ঢাক বাজনা বাজায় ॥ ৪১০ ॥
তখন না যায় আমি আমি তায় থাকে ।
আঘাতে আঘাতে বাদ্য হাম্ হাম্ ডাকে ॥ ৪১১ ॥
তবে যবে চর্মকার লয়ে দু'ড়ি আঁত ।
পাক দিয়া করে দড়ি কহে যারে তাঁত ॥ ৪১২ ॥
সেই অতি শক্ত তাঁত ধুনুরী যখন ।
নিজে যন্ত্রে জ্যার মত করি সংযোজন ॥ ৪১৩ ॥
তদুপরি মুদার প্রহারে মুহুর্মুহুঃ ।
তখন ছাড়িয়া আমি বলে তুঁহু তুঁহু ॥ ৪১৪ ॥
ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমি যায় যার ।
তথাপিহ দেহ-পাত্রে গন্ধ থাকে তার ॥ ৪১৫ ॥
যে প্রকার উপমায় রশুনের বাটি ।
শতবার ধৌত তবু নাহি হয় খাঁটি ॥ ৪১৬ ॥
হাজার মরিলে আমি নিশানা না মুছে ।
ছাড়িলে তালের বাল্ক দাগ থাকে গাছে ॥ ৪১৭ ॥
দেহেতে থাকিতে হেন আমিত্বের বাসা ।
কাহারও কিছুই নাই কল্যাণের আশা ॥ ৪১৮ ॥
বিধিমতে দেখাইলা প্রভুদেবরায় ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা অকিঞ্চনে গায় ॥ ৪১৯ ॥
চতুর্থ খণ্ড
সিঁতির ব্রাহ্ম সমাজে প্রভুর গমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বেণীপাল ভাগ্যবান্, জনগণে খ্যাত নাম,
পল্লীগ্রাম সিঁতিতে বসতি ।
সুন্দর আবাস-গৃহ, ব্রাহ্মদল-ভুক্ত তেঁহ,
প্রভুপদে বড়ই পিরীতি ॥ ১ ॥
বর্ষে বর্ষে দুইবার, ব্রাহ্মোৎসব ঘরে তাঁর,
বহু ভক্ত করে নিমন্ত্রণ ।
আজি উৎসবের দিনে, সমাগত বহু জনে,
পরিপূর্ণ উদ্যান ভবন ॥ ২ ॥
ব্রাহ্মগণ শহরের, উৎসবে মিশেছে ঢের,
টের করা সহজে না যায় ।
সকলের মুখপাত, শাস্ত্রপাঠী শিবনাথ,
বিদ্যাবল বহু ধরে গায় ॥ ৩ ॥
সদবুদ্ধি সত্ত্বগুণে, প্রভুদেবে বড় মানে,
গুণগ্রাহী যুবক সজ্জন ।
স্বভাবতঃ তত্ত্বান্বেষী, সরল সুমিষ্টভাষী,
সৎপথে সদা বিচারণ ॥ ৪ ॥
উদার
সরল-চিত্ত,
ব্রহ্মগুণগানে মত্ত,
দিবারাত্র উন্মত্তের প্রায় ।
সঙ্গে ব্রাহ্মভ্রাতাগণ, উৎকণ্ঠিত প্রাণ-মন,
উপবিষ্ট আছেন সভায় ॥ ৫ ॥
ফটিক পিয়াস রাখি, যেমন চাতক পাখী,
ঘন ঘন ঘন-পানে চায় ।
তেমতি ভক্তের পাঁতি, নিরখে নয়ন পাতি,
যে পথে আসিবে প্রভুরায় ॥ ৬ ॥
পান করি কথামৃত, জুড়াবে ভূষিত চিত,
এই সাধ বলবৎ মনে ।
নিমন্ত্রণ আছে তাঁর, এই শুভ সমাচার,
সকলেই শুনিয়াছে কানে ॥ ৭ ॥
আশা সন্দ হেলে দুলে, সকল অন্তরে খেলে,
ক্ষণে ফুল ক্ষণে ক্ষুন্ন ধারা ।
এমন সময় তবে, শুনিতে পাইল সবে,
ফটকেতে শকটের সাড়া ॥ ৮ ॥
শকট হইতে নামি, দেখা দিলা গুণমণি,
বিশ্বস্বামী প্রভু গুণধাম ।
নয়ন-আনন্দকর,
কি মূরতি মনোহর,
হেরিলে হরয়ে মন-প্রাণ ॥ ৯ ॥
নয়নের প্রিয় রূপ, রূপহীনে অপরূপ,
স্বরূপ তুলনা তিনি নিজে ।
নাহি আর উপমায়, চাঁদই চাঁদের প্রায়,
সরোজত্ব কেবল সরোজে ॥ ১০ ॥
আঁখির লালসা ঠাম, নিরখিয়া মূর্তিমান,
বিদ্যমান যে ছিল তথায় ।
ত্বরান্বিতে চারিধারে, বন্দিয়া বেষ্টন করে,
ভক্তিভরে নমিয়া তাঁহায় ॥ ১১ ॥
প্রতি-অভ্যর্থনাদানে, প্রভুদেব জনে জনে,
পরিতোষ করেন সকলে ।
ঘর-বার পরিপূর্ণ, চারিদিকে
লোকাকীর্ণ,
জনতার কথা কেবা বলে ॥ ১২ ॥
প্রভুর মহিমাভরে, আনন্দ উথলি পড়ে,
আনন্দ-আধার তনুখানি ।
দুহাস্য-সহকারে, আসন গ্রহণ পরে,
করিলেন অখিলের স্বামী ॥ ১৩ ॥
রূপের ঠাকুরে দেখি, সেখানে যতেক আঁখি,
একবারে হয়ে বিমোহন ।
নিরখে শ্রীপ্রভুরায়, বিভোর চকোর ন্যায়,
নিশিনাথে করি দরশন ॥ ১৪ ॥
রূপের রসের খনি, অতুল শ্রীমুখখানি,
অন্যে কোথা শ্রীবয়ান বই ।
দেখিনু যা কর খাঁটি, মটা মেঠো মূর্খ বটি,
বাতিকে বাতুল কিন্তু নই ॥ ১৫ ॥
বহু ভক্ত সমাগমে, একত্রিত এক স্থানে,
নিরীক্ষণে লীলার ঈশ্বর ।
আনন্দে উতলা চিতে, সম্বোধিয়া শিবনাথে,
করিলেন পরম আদর ॥ ১৬ ॥
অমৃতবরর্ষী ভাষ, শ্রীমুখে মধুর হাস,
সম্ভাষে রসের ঢলাঢলি ।
রঙ্গসহ প্রভু কন, দেখিয়া ভক্তের গণ,
অন্তরে অপার কুতূহলী ॥ ১৭ ॥
গাঁজাখোরে গাঁজাখোরে, জুটে যদি একত্তরে,
পরস্পরে তুষ্ট যে রকম ।
তেমতি ভক্তের ধারা, পায় প্রীতি হৃদিভরা,
ভক্তসঙ্গে হইলে মিলন ॥ ১৮ ॥
সংসারে নিমগ্ন মন, দেখি যদি কোন জন,
পুরীমধ্যে দক্ষিণশহরে ।
দেখিতে তাহারে বলি, পুরীর মন্দিরগুলি,
উদ্দীপনা করিবার তরে ॥ ১৯ ॥
বদ্ধজীব সংসারীরা, কামিনী-কাঞ্চনে যারা,
সারা জ্বারা আসক্তির বিষে ।
তাদিকে লইতে নাম, বলিলে না পাতে কান,
কথার মধ্যেতে নাহি পশে ॥ ২০ ॥
গৌর নিতাই তাই, নদীয়ায় দুই ভাই,
যুকতি করিয়া সংগোপনে ।
হরিনাম লওয়াইতে, বিষয়ে প্রমত্ত চিতে,
প্রলোভন দিলা হরিনামে ॥ ২১ ॥
মাগুর মাছের ঝোল,
যুবতী মেয়ের কোল,
বল হরি হরি হরি বোল ।
সুন্দর বিধান জারি, দেখে সবে বলে হরি,
আর নাহি করে কোন গোল ॥ ২২ ॥
নামের মাহাত্ম্যজোরে, ক্রমশঃ বুঝিল পরে,
ঝোল কথা নয়নের বারি ।
যুবতীর কোল হেথা, ভূমেতে লুটায়ে মাথা,
তাহার উপরে গড়াগড়ি ॥ ২৩ ॥
নামের মাহাত্মারাশি, চৈতন্য জানেন বেশী,
বলিতেন প্রচারের কালে ।
হরিনাম যেই জন, মুখে করে উচ্চারণ,
সময়ে তাহার ফল ফলে ॥ ২৪ ॥
বীজ তোলা ছিল ঘরে, তাহার অনেক পরে,
ভূমিসাৎ হইলে ভবন ।
পেয়ে উপযুক্ত স্থল, খাঁটি মাটি তাপ জল,
বীজ করে অঙ্কুর-উদ্গম ॥ ২৫ ॥
পরে বৃক্ষে পরিণত, শাখাপ্রশাখাদি কত,
অতুল্য মুকুল-সহ ফল ।
হরিনামে তেন হয়, সদ্যাঙ্কুর যদি নয়,
কালে ফলে না হয় বিফল ॥ ২৬ ॥
ভক্তি-তত্ত্ব বিশেষিয়া, কন প্রভু বিবরিয়া,
মুগ্ধ মন ব্রাহ্ম-ভক্তগণে ।
ভক্তির লক্ষণ রীতি, এক ভক্তি তিন জাতি,
ভিন্ন করে সত্ব রজঃ তমে ॥ ২৭ ॥
সত্ত্বগুণে অতি গুপ্ত, বাহ্যে নাহি কিছু ব্যক্ত,
কর্মমালা গোপনে গোপনে ।
রজে আড়ম্বর মেলা, ছটার ঘটার খেলা,
জরাবরি ভারি তমোগুণে ॥ ২৮ ॥
তমেতে যদ্যপি জোর, ফিরাইয়া দিলে মোড়,
বেওজর ঈশ্বর সে পায় ।
জলন্ত বিশ্বাস তার, তাই করে বলাচার,
অপর নাহিক ভাবে তাঁয় ॥ ২৯ ॥
ভক্তের ঈশ্বর-লাভ শুনিয়া বর্ণনা ।
প্রভুদেবে প্রশ্ন করে ভক্ত এক জনা ॥ ৩০ ॥
সুমধুর শ্রীবচনে বিমুগ্ধ অন্তর ।
সাকার কি নিরাকার পরম ঈশ্বর ॥ ৩১ ॥
উত্তর-বচনে প্রভু কন তাঁর প্রতি ।
অপরূপ ঈশ্বরের নাহি হয় ইতি ॥ ৩২ ॥
জ্ঞানী যাঁরা যাঁহাদের প্রকৃত গিয়ান ।
আমি ও জগৎ মিথ্যা স্বপ্নের সমান ॥ ৩৩ ॥
জ্ঞান যেথা কিছু নাই একা ব্রহ্ম বিনে ।
ভগবান নিরাকার হন সেইখানে ॥ ৩৪ ॥
যেথা ভক্তে জানে আমি বস্তু স্বতন্তর ।
পৃথক্ জগৎ এই বিশ্বচরাচর ॥ ৩৫ ॥
সর্বশক্তিমান সেথা ভক্তের জীবন ।
সাকার হইয়া ভক্তে দেন দরশন ॥ ৩৬ ॥
বেদান্তবাদীরা যত জ্ঞানীর প্রকৃতি ।
বিচার-সম্বলে পথে করে নেতি নেতি ॥ ৩৭ ॥
বিচার-সহায়ে হয় জ্ঞান বলবৎ ।
আমিও যেমন মিথ্যা তেমতি জগৎ ॥ ৩৮ ॥
সাকার যেখানে সেথা যুক্তি-তর্ক রোধে ।
ব্রহ্মবস্তু-উপলব্ধি সে কেবল বোধে ॥ ৩৯ ॥
কোন্খানে নিরাকার সাকার কোথায় ।
বিবরিয়া প্রভুদেব কন উপমায় ॥ ৪০ ॥
বুঝহ সচ্চিদানন্দ জলধি অপার ।
কূল কি কিনারা সীমা কিছু নাহি তাঁর ॥ ৪১ ॥
সে জলের কোন অংশ ভক্তি-হিম পেয়ে ।
বরফ হইয়া যায় জমাট বাঁধিয়ে ॥ ৪২ ॥
জমাট বরফখণ্ড সাকার ধারণ ।
ভক্তজনগণে যাহা করে দরশন ॥ ৪৩ ॥
ভক্তির প্রকৃতিমধ্যে শীতলতা-গুণ ।
যাহাতে অখণ্ড হন সরূপ-সগুণ ॥ ৪৪ ॥
জ্ঞানেতে সূর্যের তেজ মহাতাপ তায় ।
জমাট বরফরূপ সাকার গলায় ॥ ৪৫ ॥
তখন ঈশ্বর ব্যক্ত আর নাহি রয় ।
রূপ গুণ হারাইয়া জলে হন লয় ॥ ৪৬ ॥
এমত প্রত্যক্ষ দৃষ্ট করে যেই জন ।
বলিতে না পারে কিবা করে দরশন ॥ ৪৭ ॥
কি বলিবে কে বলিবে দর্শন চেহারা ।
যে বলিবে সেই নাই তিনি আমি-হারা ॥ ৪৮ ॥
জীবে হয় আমি-হারা তার বিবরণ ।
উপমা সহিত প্রভু এইবারে কন ॥ ৪৯ ॥
অবিরত একমাত্র বিচারের জোরে ।
'আমি' টামি নাহি থাকে 'আমি' যায় উড়ে ॥ ৫০ ॥
এইখানে প্রভুর উপমা বড় খাসা ।
পিঁয়াজে পিয়াজ নাই ছাড়াইলে খোসা ॥ ৫১ ॥
পঞ্চভূতে গড়া এই শরীরধারণ ।
উপরে বিচিত্র চারু চর্ম-আবরণ ॥ ৫২ ॥
উন্মোচন কর যদি এই চর্মখানা ।
নীচে মাংস শিরা রক্ত দেখে লাগে ঘৃণা ॥ ৫৩ ॥
মাংস-অংশ দিলে বাদ কিবা রহে আর ।
নানাবিধ গঠনের কাঠামের হাড় ॥ ৫৪ ॥
মাঝে মাঝে তার মধ্যে বিবিধ কুঠরি ।
কাহে পিত্ত কাহে মূত্র কাহে নাড়ী-ভুঁড়ি ॥ ৫৫ ॥
একে একে এই সবে করিলে বাহির ।
কোথায় বা আমি আর কোথায় শরীর ॥ ৫৬ ॥
আমাকে খুঁজিতে গেলে শরীরের মাঝে ।
দেহ যায় আমি কোথা নাহি পাই খুঁজে ॥ ৫৭ ॥
অতুল উপমা-কথা 'আমি'-নিরূপণে ।
যদি কেহ ভক্তিভরে একমনে শুনে ॥ ৫৮ ॥
কথার মাহাত্ম্যগুণে হইবে তাহার ।
শুদ্ধচিত্ত পাশমুক্ত মায়ায় নিস্তার ॥ ৫৯ ॥
কথার প্রসঙ্গে প্রভু ক্রমে ক্রমে কন ।
আমি-হারা যেই জন তার বিবরণ ॥ ৬০ ॥
আমি হারাইয়া কিবা দেখে জ্ঞানী জনা ।
কেহ না করিতে পারে তাহার বর্ণনা ॥ ৬১ ॥
যে কহিবে সেই নাই গিয়াছেন গলে ।
নুনের পুতুল সম সাগরের জলে ॥ ৬২ ॥
পরে প্রভু কন পূর্ণ-জ্ঞানের লক্ষণ ।
হইলে গিয়ান পূর্ণ রহে না বচন ॥ ৬৩ ॥
আমি-রূপ নুনের পুতুল পূর্বাকারে ।
নামিয়া সচ্চিদানন্দ-সাগরের নীরে ॥ ৬৪ ॥
দ্রবিয়া হইয়া জ্বল জলে যবে মিশে ।
জলে গুনে ভিন্ন ভেদ রহে আর কিসে ॥ ৬৫ ॥
চাষা যবে ক্ষেতে আনে পুকুরের জল ।
নালায় জলের শব্দ করে কলকল ॥ ৬৬ ॥
ক্ষেত নালা পূর্ণ হলে পুকুরের সনে ।
কলরব সব নষ্ট পূর্ণতার গুণে ॥ ৬৭ ॥
আমির সম্বন্ধে কথা কন প্রভুরায় ।
হাজার বিচার কর আমি নাহি যায় ॥ ৬৮ ॥
তোমার আমার পক্ষে সেই সে কারণে ।
দাস আমি হওয়া শ্রেয়ঃ ভক্ত-অভিমানে ॥ ৬৯ ॥
ভক্তের সগুণ ব্রহ্ম স্বতন্তর দুয়ে ।
ভক্তজনে দেন দেখা আকার ধরিয়ে ॥ ৭০ ॥
সগুণে প্রার্থনা চলে তাঁহার গোচরে ।
নিরগুণে ব্যক্তি নাই কি কহিবে কারে ॥ ৭১ ॥
সমাজ-মন্দিরে কর যাঁহাকে প্রার্থনা ।
তিনিই সগুণ ব্রহ্ম এই নামে জানা ॥ ৭২ ॥
এত বলি প্রভুদেব ব্রাহ্মদের দলে ।
তাঁদের গন্তব্য পথ কন খুলে খুলে ॥ ৭৩ ॥
জগতের গুরু প্রভু অতি দয়াময় ।
যে আসে সকাশে তারে বড়ই সদয় ॥ ৭৪ ॥
জ্ঞানী কি বেদান্তবাদী যেন প্রকৃতির ।
তোমরা সেরূপ নহ ভকত জাতির ॥ ৭৫ ॥
নাহি ক্ষতি সাকার না লাগে যদি মনে ।
শুন তবে এক কথা কই এইখানে ॥ ৭৬ ॥
সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কারী সর্বশক্তিমান ।
এমন ঈশ্বর তিনি রহে যদি জ্ঞান ॥ ৭৭ ॥
প্রার্থনা করিলে তাঁরে করেন শ্রবণ ।
সর্বগুণে বিভূষিত ব্যক্তির মতন ॥ ৭৮ ॥
উদ্দেশ্যসাধনে ইহা যথেষ্ট প্রচুর ।
পরম দয়াল তিনি ভক্তির ঠাকুর ॥ ৭৯ ॥
যেবা যায় ভক্তি-পথ করিয়া আশ্রয় ।
সহজে ঈশ্বরলাভ তাহার নিশ্চয় ॥ ৮০ ॥
একজন ব্রাহ্মভক্ত পুছে হেনকালে ।
সত্যই কি ঈশ্বরের দরশন মিলে ॥ ৮১ ॥
যদ্যপি সাক্ষাৎকার হয় তাঁর সনে ।
আমরা দেখিতে তবে নাহি পাই কেনে ॥ ৮২ ॥
সায় দিয়া ব্রাহ্মভক্তে কন প্রভুরায় ।
সাধক সত্যই তারে দেখিবারে পায় ॥ ৮৩ ॥
কুতূহলী প্রশ্নকর্তা পুনঃ প্রশ্ন করে ।
কি করিলে তবে তাঁয় দেখা যেতে পারে ॥ ৮৪ ॥
প্রত্যুত্তর কি সুন্দর প্রভুর তাহায় ।
রোদন কেবলমাত্র দরশনোপায় ॥ ৮৫ ॥
ধনের জনের জন্য কাঁদে লোক-জনে ।
কে কোথায় কাঁদে দেখ হরির কারণে ॥ ৮৬ ॥
শিশু ছেলে চুষি লয়ে খেলে যতক্ষণ ।
মা করেন রান্না-বান্না ঘরের করম ॥ ৮৭ ॥
চুষিতে অখুশী যবে দূরে ছুঁড়ে তায় ।
মায়ের কারণ শিশু ধূলাতে লুটায় ॥ ৮৮ ॥
তখনি জননী ছুটে আসে যেথা ছেলে ।
মুছায়ে বদনখানি তুলে করে কোলে ॥ ৮৯ ॥
সেইমত ধন-জন-কামিনী-কাঞ্চন ।
বিষয় পিয়াস-আশা দিয়া বিসর্জন ॥ ৯০ ॥
যে জন রোদন করে তাঁহার কারণে ।
সেই জন সুনিশ্চয় পায় ভগবানে ॥ ৯১ ॥
প্রভুদেবে আর প্রশ্ন করে ভক্তবর ।
ঈশ্বরে লইয়া কেন এত মতান্তর ॥ ৯২ ॥
নানা মত নানা তর্ক নানান বিচার ।
কেহ বা সাকার কহে কেহ নিরাকার ॥ ৯৩ ॥
সাকারবাদীর মধ্যে আশ্চর্য কখন ।
ভিন্ন ভিন্ন রূপ কহে ভিন্ন ভিন্ন জন ॥ ৯৪ ॥
যে রূপে যে ভাবে তাঁরে প্রভুর উত্তর ।
সেরূপ সে মনে মনে করে নিরন্তর ॥ ৯৫ ॥
হইলে ঈশ্বর-লাভ ঈশ্বর আপনি ।
বুঝাইয়া দেন ভক্তে কি প্রকার তিনি ॥ ৯৬ ॥
কখন গেলে না তুমি সে পাড়ার ধারে ।
কেমনে তাঁহার তত্ত্ব বুঝাব তোমারে ॥ ৯৭ ॥
শুন এক গল্প কথা অতি মনোরম ।
মলত্যাগে কোন স্থানে যায় কোন জন ॥ ৯৮ ॥
দেখিল তথায় গাছে এক জানোয়ার ।
সুন্দর রক্তের মত লাল বর্ণ তার ॥ ৯৯ ॥
সবিস্ময় মন তেঁহ অন্য জনে কয় ।
সে বলিল সাদা সেটি লালবর্ণ নয় ॥ ১০০ ॥
বর্ণের বিবাদে দোঁহে লাল সাদা বলে ।
তৃতীয় জনৈক তথা জুটে হেনকালে ॥ ১০১ ॥
তার দেখা নীলবর্ণ জানোয়ার গাছে ।
উচ্চরবে কহে নীল, লাল সাদা মিছে ॥ ১০২ ॥
চতুর্থ পঞ্চম পরে উপনীত হয় ।
বেগুনে সবুজ বর্ণ তারা দোঁহে কয় ॥ ১০৩ ॥
পরস্পর মতান্তরে মহা গণ্ডগোলে ।
সকলেই উপনীত হইল তরুতলে ॥ ১০৪ ॥
দৈবযোগে সর্বজনে দেখিবারে পায় ।
জনৈক মানুষ সেই গাছের তলায় ॥ ১০৫ ॥
তত্ত্ব জানিবারে তারে করিল জিজ্ঞাসা ।
সে কহে আমার এই তরুতলে বাসা ॥ ১০৬ ॥
জানোয়ার কি প্রকার কিবা বর্ণ তার ।
বিশেষিয়া জানি আমি সব সমাচার ॥ ১০৭ ॥
যেবা যাহা বাখানিছ সব সত্য বটে ।
বেগুনে সবুজ সাদা লাল নীল মেটে ॥ ১০৮ ॥
বহুরূপী জানোয়ার বরনের খাঁই ।
ক্ষণে ক্ষণে ভিন্ন বর্ণ কভু কিছু নাই ॥ ১০৯ ॥
ঈশ্বরের চিন্তা যেবা দিবানিশি করে ।
স্বরূপ-বারতা তাঁর সে জানিতে পারে ॥ ১১০ ॥
ভাল
জানে সেইজন ঈশ্বর কেমন ।
নানা রূপে ভাবে যাঁরে দেন দরশন ॥ ১১১ ॥
অপরে জানিবে কিসে সত্য সমাচার ।
তাহাদের তর্ক দ্বন্দ্ব গণ্ডগোল সার ॥ ১১২ ॥
বলিতেন মহাভক্ত কবীর আপনি ।
নিরাকার পিতা তাঁর সাকার জননী ॥ ১১৩ ॥
সকলে বিদিত কথা লিখিত পুরাণে ।
রাম-রূপ ধরি কৃষ্ণ তুষে হনুমানে ॥ ১১৪ ॥
যে রূপ দেখিতে ভক্ত করয়ে কামনা ।
সে রূপ ধরেন তিনি রূপ তাঁর নানা ॥ ১১৫ ॥
বেদান্তের অনুসারে বিচার যেথায় ।
রূপ-গুণ নাহি রহে সব উড়ে যায় ॥ ১১৬ ॥
বিচারের পরিণাম এক ব্রহ্ম ঠিক ।
নাম-রূপযুক্ত এই জগৎ অলীক ॥ ১১৭ ॥
ভক্ত-অভিমান মনে রহে যতক্ষণ ।
ততক্ষণ ঈশ্বরের রূপ-দরশন ॥ ১১৮ ॥
উপলব্ধি হয় বটে বিচারের মুখে ।
ভক্ত-অভিমান ভক্তে দূরে কিছু রাখে ॥ ১১৯ ॥
কালী কিংবা কৃষ্ণ-রূপ চৌদ্দ পোয়া কেনে ।
দূরে তাই ক্ষুদ্র বোধ এই তার মানে ॥ ১২০ ॥
অন্তরে দেখায় সূর্যে থালার মতন ।
নিকটে যদ্যপি গিয়া কর দরশন ॥ ১২১ ॥
তখন দেখিবে হেন প্রকাণ্ড তাহায় ।
ধারণা করিতে শক্তি না রবে মাথায় ॥ ১২২ ॥
কালরূপ শ্যামরূপ শ্যাম বর্ণ কেনে ।
দূরত্ববশতঃ সেও অন্য নাহি মানে ॥ ১২৩ ॥
যেইরূপ দূরস্থিত দীঘির সলিল ।
কোখাও দেখায় কালো কোথাও বা নীল ॥ ১২৪ ॥
তুলিলে অঞ্জলিমধ্যে দেখিবারে পাই ।
অতি স্বচ্ছ নিরমল কোন বর্ণ নাই ॥ ১২৫ ॥
সেই সে কারণ এক দূর ব্যবধান ।
আকাশের নীলবর্ণ দৃশ্যমান ॥ ১২৬ ॥
প্রভুদেব এইখানে কন তত্ত্বসার ।
নিরগুণ ব্রহ্ম যেথা বেদান্ত-বিচার ॥ ১২৭ ॥
বলিবারে ব্রহ্মতত্ব বাক্য হয় রোধ ।
সমাধিস্থ জন তাঁরে বোধে করে বোধ ॥ ১২৮ ॥
তুমি সত্য যতক্ষণ জ্ঞান বলবৎ ।
নিশ্চয় বুঝিবে সত্য তেমতি জগৎ ॥ ১২৯ ॥
তার সঙ্গে ঈশ্বরের সত্য নানা রূপ ।
এও সত্য তাঁরে জানা ব্যক্তির স্বরূপ ॥ ১৩০ ॥
উপদেশে প্রভুদেব কন এইখানে ।
ভাগ্যবান পুণ্যবান ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ১৩১ ॥
ভক্তিপথ তোমাদের প্রশস্ত কেবল ।
যেই পথাশ্রয়ে ধ্রুব অচিরে মঙ্গল ॥ ১৩২ ॥
কি ফল জানিতে চেষ্টা অনন্ত ঈশ্বরে ।
পাদপদ্মে সঁপ মন ভক্তি সহকারে ॥ ১৩৩ ॥
এক ঘটি জলে যদি তৃষ্ণা দূরে যায় ।
পুকুরেতে কত জল কি ফল মাপায় ॥ ১৩৪ ॥
অর্ধেক বোতলে যদি কাৎ হও ভূমে ।
কত মণ আছে মদ শুড়ীর দোকানে ॥ ১৩৫ ॥
এ হিসাব করিবার কিবা প্রয়োজন ।
তুষ্ট থাক লয়ে তুমি নিজের মতন ॥ ১৩৬ ॥
জ্ঞানপথ কলিকালে কঠিনাতিশয় ।
দুর্বল জীবের পক্ষে গন্তব্যের নয় ॥ ১৩৭ ॥
বিষয়বুদ্ধির লেশ থাকিলে কিঞ্চিৎ ।
নাহি হয় সে গিয়ান বুঝিতে নিশ্চিত ॥ ১৩৮ ॥
কখন কেমন দশা হয় ব্রহ্মজ্ঞানে ।
বেদে আছে বিবরণ বিশেষ রকমে ॥ ১৩৯ ॥
শুন কই সাত ভূমি বেদের বচন ।
যে যে স্থলে কালে কালে বিচরয়ে মন ॥ ১৪০ ॥
লিঙ্গ গুহ্য নাভি এই তিনের ভিতরে ।
সংসারী লোকের মন অবিরত ঘুরে ॥ ১৪১ ॥
দিবানিশি চিন্তা যেথা কামিনী-কাঞ্চন ।
তিনের উপরে আর নাহি উঠে মন ॥ ১৪২ ॥
হৃদয় চতুর্থ ভূমি মন সেথা যার ।
করে জ্যোতিঃ দরশন অতি চমৎকার ॥ ১৪৩ ॥
প্রথম চৈতন্যোদয় হয় এই ঠাঁই ।
সংসারে নীচের দিকে মন নামে নাই ॥ ১৪৪ ॥
মনের পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ যারে কয় ।
সেখানে মনের মধ্যে অবিদ্যা না রয় ॥ ১৪৫ ॥
অতিপ্রিয় ঈশ্বরীয় শ্রবণ কীর্তন ।
আন কথা লাগে কানে বাজের মতন ॥ ১৪৬ ॥
ষষ্ঠ ভূমি কপালে যখন মন যার ।
ঈশ্বরের রূপ তেঁহ দেখে অনিবার ॥ ১৪৭ ॥
নিরুপম রূপে মুগ্ধ উন্মত্তের ন্যায় ।
প্রেমভরে পরশিয়া আলিঙ্গিতে যায় ॥ ১৪৮ ॥
ধরিতে ছুঁইতে কিন্তু না পারে তখন ।
তফাতে আটক রাখে এক আবরণ ॥ ১৪৮ ॥
কাঁচ-ব্যবধানে যেন লণ্ঠনের গায় ।
প্রজ্বলিত মধ্যে আলো ছোঁয়া নাহি যায় ॥ ১৪৯ ॥
হেন অবস্থায় যারে তুলে ভগবান ।
তথাপি তাহার কিছু রহে 'আমি'-জ্ঞান ॥ ১৫০ ॥
শিরোদেশ শেষ ভূমি সপ্তম আখ্যায় ।
এখানে উঠিলে বাহ্যু একেবারে যায় ॥ ১৫১ ॥
আদতে হুঁশের লেশ গন্ধ নাহি থাকে ।
গড়িয়া পড়িয়া যায় দুধ দিলে মুখে ॥ ১৫২ ॥
গভীর সমাধিযুক্ত এই ঠাঁই মন ।
প্রত্যক্ষ ব্রহ্মের রূপ করে দরশন ॥ ১৫৩ ॥
সমাধিস্থ অবস্থাতে অবিরত যোগ ।
একুশ দিনের বেশী নাহি হয় ভোগ ॥ ১৫৪ ॥
কহিনু জ্ঞানীর পথ কঠিনাতিশয় ।
তোমাদের ভক্তিপথ জ্ঞানমার্গ নয় ॥ ১৫৫ ॥
ভক্তিভরে কর ভক্তিপথে বিচরণ ।
এ পথ যেমন ভাল সহজ তেমন ॥ ১৫৬ ॥
পূজা জপ বিষয়াদি কর্মাবলী যত ।
সমাধিস্থ হইলে সকল হয় হত ॥ ১৫৭ ॥
করমের আড়ম্বর প্রথমে প্রথমে ।
সেদিকে এগুবে যত তত কর্ম কমে ॥ ১৫৮ ॥
অপর কর্মের কথা রাখ বহুদূরে ।
লীলা-গুণগান তাঁর তাও বন্ধ করে ॥ ১৫৯ ॥
দ্বিতীয় খণ্ডের কথা স্মর তুমি মন ।
আই করিলেন যবে দেহবিসর্জন ॥ ১৬০ ॥
তর্পণ করিতে প্রভু যান গঙ্গা-জলে ।
অঞ্জলি না হয় বদ্ধ জল পড়ে গলে ॥ ১৬১ ॥
হইলে ঈশ্বর-লাভ কর্মকাণ্ড নাশ ।
উপমা ধরিয়া তত্ত্ব করিতে প্রকাশ ॥ ১৬২ ॥
তর্পণের কথা তাঁর করিয়া স্মরণ ।
ব্রাহ্ম ভক্তগণে আজি করেন বর্ণন ॥ ১৬৩ ॥
ব্যাপার দেখিয়া তবে মহাচিন্তা জুটে ।
অঞ্জলিতে জলবিন্দু কেন নাহি উঠে ॥ ১৬৪ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত সেথা দাদা হলধারী ।
ভীতচিত্তে কারণ জিজ্ঞাসা তাঁয় করি ॥ ১৬৫ ॥
বৃত্তান্ত গুনিয়া তবে হলধারী কয় ।
ইহাই গলিত হস্ত শাস্ত্রের নির্ণয় ॥ ১৬৬ ॥
হইলে ঈশ্বরলাভ দরশনে তাঁর ।
তর্পণাদি কর্মকাণ্ড নাহি রহে আর ॥ ১৬৭ ॥
কর্মনাশ বিধানে কি যুক্তিমত নয় ।
স্বভাবতঃ কর্মনাশ আপনিই হয় ॥ ১৬৮ ॥
প্রয়াস করিলে পরে কর্ম করিবারে ।
অকর্মণ্য অঙ্গ কর্ম করিতে না পারে ॥ ১৬৯ ॥
বাখানিতে সারতত্ত্ব ধারণা-কারণ ।
উপমায় দেন প্রভু ব্রাহ্মণ-ভোজন ॥ ১৭০ ॥
হইচই কলরব প্রথমে প্রথমে ।
সম্মুখে পড়িলে পাতা বহু গোল কমে ॥ ১৭১ ॥
লুচি আন লুচি আন শব্দ তুলে খালি ।
ভোজন-লালসালুব্ধ ব্রাহ্মণমণ্ডলী ॥ ১৭২ ॥
লুচিগোছা তরকারি পাতায় যখন ।
পূর্বেকার কলরব বারো আনা কম ॥ ১৭৩ ॥
গোল কই পেলে দই প্রায় হয় চুপ ।
মুখেতে কেবল শব্দ রহে সুপ্ সুপ্ ॥ ১৭৪ ॥
ভোজন হইলে সাঙ্গ গলায় গলায় ।
একবার রবহীন বেহুঁশ নিদ্রায় ॥ ১৭৫ ॥
গৃহস্থের বধূ আর দ্বিতীয় উপমা ।
গর্ভবতী হইলে যখন যায় জানা ॥ ১৭৬ ॥
শাশুড়ীর মহানন্দ অন্তরের মাঝ ।
বধূর কমিয়া দেয় সংসারের কাজ ॥ ১৭৭ ॥
দশমাস পরিপূর্ণ হইল যখন ।
প্রায় নাহি রহে কর্ম যে থাকে সে কম ॥ ১৭৮ ॥
প্রসব হইলে কর্ম বন্ধ একেবারে ।
এক কর্ম কোলে ছেলে নাড়াচাড়া করে ॥ ১৭৯ ॥
দুর্বোধ্য নিগূঢ় তত্ত্বে সরল উপমা ।
কোথাও এমন আর নাহি যায় শুনা ॥ ১৮০ ॥
শ্রীবদনে বিগলিত হইল যেমতি ।
চির-অন্ধ জনে শুনে পায় আঁখিভাতি ॥ ১৮১ ॥
শুন রামকৃষ্ণ-পুঁথি মহিমা প্রভুর ।
নিশ্চয় হইবে তব চিরতমঃ দূর ॥ ১৮২ ॥
ক্রমে পরে ব্রাহ্মগণে কন প্রভুবর ।
দেহ নাহি রহে প্রায় সমাধির পর ॥ ১৮৩ ॥
কেহ কেহ দেহ-রক্ষা করেন কখন ।
উপমায় নারদাদি ঋষিরা যেমন ॥ ১৮৪ ॥
আর গৌরাঙ্গের মত অবতারগণে ।
সে কেবল একমাত্র জীবের কল্যাণে ॥ ১৮৫ ॥
স্বার্থশূন্য এইসব মহাপুরুষেরা ।
জীবের মঙ্গল-হেতু আত্মমুখহারা ॥ ১৮৬ ॥
দয়ায় পূরিত হিয়া সতত অস্থির ।
জীব-দুঃখ-বিনাশনে রাখেন শরীর ॥ ১৮৭ ॥
হইলে খনন কূপ কোন কোন জনে ।
রাখেন কোদাল ঝুড়ি পরম যতনে ॥ ১৮৮ ॥
লোক-উপকার মনে উদ্দেশ্য একক ।
যদ্যপি কখন কার হয় আবশ্যক ॥ ১৮৯ ॥
সামান্য আধার যার দুর্বলাতিশয় ।
লোকে শিক্ষা দিতে করে ভয়ঙ্কর ভয় ॥ ১৯০ ॥
যেমন হাবাতে কাঠ স্রোতের মাঝারে ।
আপনি কেবলমাত্র ভেসে যেতে পারে ॥ ১৯১ ॥
লঘুকায় পাখী যদি এসে বসে তায় ।
অক্ষম ধরিতে ভার জলে ডুবে যায় ॥ ১৯২ ॥
কিন্তু নারদাদি ঋষি মহাবলবান ।
ঠিক যেন বাহাদুরী কাঠের সমান ॥ ১৯৩ ॥
সহজে ভাসিয়া যায় স্রোতের মাঝারে ।
ধরিয়া অসংখ্য প্রাণী পিঠের উপরে ॥ ১৯৪ ॥
চলিত প্রসঙ্গ সাঙ্গ করিয়া এখন ।
ব্রাহ্মগণে উপদেশ প্রভুদেব কন ॥ ১৯৫ ॥
সম্বোধিয়া শিবনাথে শুদ্ধ-আত্ম জনা ।
প্রার্থনায় কেন কর ঐশ্বর্য বর্ণনা ॥ ১৯৬ ॥
মহৈশ্বর্যেশ্বর তিনি অখিলের স্বামী ।
লক্ষ্মী যাঁর পদ-সেবা করেন আপনি ॥ ১৯৭ ॥
অনন্ত তাঁহার সৃষ্টি ঐশ্বর্য অপার ।
তিল আধ বলিবারে শক্তি আছে কার ॥ ১৯৮ ॥
পরম আনন্দ হয় দেখিলে তাঁহায় ।
সেই সে কারণে মাত্র ভক্তে তাঁরে চায় ॥ ১৯৯ ॥
কত তাঁর ঘর-বাড়ি কত ধন-জন ।
ঐশ্বর্য গণনে নাহি কোন প্রয়োজন ॥ ২০০ ॥
নরেন্দ্রে
দেখিলে আমি সব ভুলে যাই ।
কার ছেলে কোখা বাড়ি কটি তার ভাই ॥ ২০১ ॥
কিবা কার্য করে বাপ কি তার ব্যবসা ।
ভ্রান্তেও কখন কিছু না হয় জিজ্ঞাসা ॥ ২০২ ॥
তাই বলি একেবারে দিয়া প্রাণ-মন ।
তাঁহার মাধুর্য-রস কর আস্বাদন ॥ ২০৩ ॥
তবে আর এক কথা কই এইখানে ।
একবার ঈশ্বরের রূপ-দরশনে ॥ ২০৪ ॥
অনুক্ষণ মনে মনে বাড়য়ে লালসা ।
অপরূপ লীলা তাঁর দেখিবার আশা ॥ ২০৫ ॥
রাবণবধের পর রাম পরমেশ ।
রাক্ষস-পুরীতে যবে করেন প্রবেশ ॥ ২০৬ ॥
রাবণ-জননী বৃদ্ধা নিকষা তখন ।
প্রাণভয়ে দ্রুতপদে করে পলায়ন ॥ ২০৭ ॥
নিরখি লক্ষ্মণ জিজ্ঞাসা করিল রামে ।
নিকষা সভয়ে এত ধায় কি কারণে ॥ ২০৮ ॥
পুত্রপৌত্রশোকাতুরা বৃদ্ধদশা তায় ।
তবু এত প্রাণভয় ছুটিয়া পলায় ॥ ২০৯ ॥
আশ্বাসে
বৃদ্ধারে করি অভয় প্রদান ।
কারণ জিজ্ঞাসা কৈলা রঘুপতি রাম ॥ ২১০ ॥
সবিশেষ কহে বুড়ী জুড়ি দুই কর ।
দুর্বাদলশ্যামবর্ণ রামের গোচর ॥ ২১১ ॥
শুন শুন ওহে রাম রঘুকুলমণি ।
এতদিন ছিনু বেঁচে মহাভাগ্য গণি ॥ ২১২ ॥
যাহাতে এতেক লীলা দেখিনু তোমার ।
আরো দেখিবার তরে সাধ বাঁচিবার ॥ ২১৩ ॥
লীলা-দরশন-সাধ প্রাণে গুরুতর ।
সেই সে কারণে করি মরণের ডর ॥ ২১৪ ॥
মধুর প্রভুর কথা উক্ত রসভাষে ।
শুনিয়া সকল লোকে মহানন্দে হাসে ॥ ২১৫ ॥
সম্বোধিয়া শিবনাথে কন রসময় ।
তোমারে দেখিতে ইচ্ছা অতিশয় হয় ॥ ২১৬ ॥
শুদ্ধাত্মা দেখিলে হেন হয় অনুভব ।
পূর্ব জনমের যেন বন্ধু তারা সব ॥ ২১৭ ॥
পূর্ব জনমের কথা করিয়া শ্রবণ ।
প্রভুদেবে প্রশ্ন করে ভক্ত একজন ॥ ২১৮ ॥
আনন্দে উথলা হৃদি সীমা নাহি তার ।
আপনি কি পূর্বজন্ম করেন স্বীকার ॥ ২১৯ ॥
তত্ত্ব-পিপাসুর প্রতি প্রভুর উত্তর ।
হাঁগো আমি শুনিয়াছি আছে জন্মান্তর ॥ ২২০ ॥
ঈশ্বরের কার্যকাণ্ড অনন্ত অপার ।
সামান্য বুদ্ধিতে শক্তি নহে বুঝিবার ॥ ২২১ ॥
জন্মান্তর স্বীকার করেন মহাজনে ।
তাহে আমি অবিশ্বাস করিব কেমনে ॥ ২২২ ॥
ঈশ্বরের লীলাকাণ্ড অবোধ্য কেমন ।
এই কথা-সমর্থনে প্রভুদেব কন ॥ ২২৩ ॥
তনুত্যাগে যবে ভীষ্ম শরশয্যা-বেশে ।
সকৃষ্ণ পাণ্ডবগণ দাঁড়াইয়া পাশে ॥ ২২৪ ॥
পাণ্ডবেরা বুদ্ধিহারা করে নিরীক্ষণ ।
পিতামহ করিছেন অশ্রু-বিসর্জন ॥ ২২৫ ॥
অর্জুন কহেন কৃষ্ণে এ কি চমৎকার ।
কহ কৃষ্ণ সমাচার শুনিব ইহার ॥ ২২৬ ॥
বীরশ্রেষ্ঠ ভীমবল ভীষ্মদেব যিনি ।
ধর্মপর সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় জ্ঞানী ॥ ২২৭ ॥
অষ্টবসুদের মধ্যে বসু একজন ।
আয়ুঃশেষে মায়াবশে করেন রোদন ॥ ২২৮ ॥
সেই কথা ভীষ্মে গিয়া কন চক্রধর ।
ভীষ্মদেব করিলেন তাহার উত্তর ॥ ২২৯ ॥
তুমি ভাল জান কৃষ্ণ আমি নহি ভীতু ।
চক্ষে জল নহে মম তনুত্যাগ হেতু ॥ ২৩০ ॥
তবে যবে দেখি ভাবি ওহে চক্রপাণি ।
তুমি হরি ভগবান অখিলের স্বামী ॥ ২৩১ ॥
মঙ্গল-কামনা সদা পাণ্ডবের তরে ।
সারথির বেশে রহ রথের উপরে ॥ ২৩২ ॥
তথাপিহ তাহাদের দেখিবারে পাই ।
অগণ্য বিপদ তার শেষ অন্ত নাই ॥ ২৩৩ ॥
তখন আমার মনে এই স্থির হয় ।
তোমার লীলার মর্ম বুঝিবার নয় ॥ ২৩৪ ॥
অবোধ্য তোমার লীলা তুমি যেন হরি ।
এই দুঃখে দুনয়নে বহে মোর বারি ॥ ২৩৫ ॥
উর্ধ্বগতি দেখি রাতি প্রহরেক প্রায় ।
আজিকার কথা সাঙ্গ কৈলা প্রভুরায় ॥ ২৩৬ ॥
সমাজ-ভবনে হৈল ভজনার কাল ।
বাজিয়া উঠিল বাদ্য খোল করতাল ॥ ২৩৭ ॥
পুণ্যবান ভাগ্যবান ব্রাহ্মভক্তগণ ।
জনে জনে বন্দি আমি সবার চরণ ॥ ২৩৮ ॥
লইয়া শ্রীপ্রভুদেবে বেড়িয়া আদরে ।
আনন্দে হইয়া মত্ত সঙ্কীর্তন করে ॥ ২৩৯ ॥
হরিবোল উঠে রোল ভেদিয়া ভবন ।
বড় খুশী প্রতিবাসী গ্রামবাসী জন ॥ ২৪০ ॥
দলে দলে সংজোটন উদ্যান-মাঝারে ।
বৃহৎ উদ্যানবাটী তাহে নাহি ধরে ॥ ২৪১ ॥
ভক্তসহ ভগবানে করি দরশন ।
সকলে হইল মহা আনন্দে মগন ॥ ২৪২ ॥
প্রভুর কৃপায় মুক্ত ভবের বন্ধনে ।
দরশনে কি ফলিল তারা নাহি জানে ॥ ২৪৩ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা অমৃত-লহরী ।
শুনিলে সহজে যায় ভবসিন্ধু তরি ॥ ২৪৪ ॥
চতুর্থ খণ্ড
শশী, শরৎ, মহেন্দ্র কবিরাজ ও বুড়া গোপালের সহিত ঠাকুরের মিলন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা অমৃত-কথন ।
মহাসুখে এতদিন শুনাইনু মন ॥ ১ ॥
এবে বলবুদ্ধিহারা পরান আকুল ।
মহতী জলধি-লীলা অপার অকূল ॥ ২ ॥
কিবা কহি কিবা গাই না পাই উপায় ।
ঠিক যেন দিশাহারা পথিকের ন্যায় ॥ ৩ ॥
এস বস কণ্ঠে প্রভু বলাও আমারে ।
কি লীলা করিলে তুমি আসিয়া আসরে ॥ ৪ ॥
মহৈশ্বর্যেশ্বর প্রভু কেমন আশ্চর্য ।
এবারে নাহিক অঙ্গে কোনই ঐশ্বর্য ॥ ৫ ॥
ধরিতে ছুঁইতে কোন দিকে নাহি তাঁয় ।
অথচ অদ্ভুত খেলা কৈলা প্রভুরায় ॥ ৬ ॥
গুপ্ত অবতার প্রভু ব্রহ্মসনাতন ।
প্রহরীর ছদ্মবেশে ভূপতি যেমন ॥ ৭ ॥
নগর ভ্রমণ করে দু'চারির চেনা ।
কাছে দূরে সঙ্গে ফিরে আপনার জনা ॥ ৮ ॥
প্রমাণের হেতু লীলা দেখহ বিশেষ ।
ঐশ্বর্যবিহীন বেশে প্রভু পরমেশ ॥ ৯ ॥
লোকে জনে অবিদিত ক্ষুদ্র পল্লীগ্রাম ।
পুণ্যভূমি কামারপুকুরে জন্মস্থান ॥ ১০ ॥
অতি দুঃখী পিতামাতা ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ।
সম্পত্তির মধ্যে মাত্র সাত পোয়া জমি ॥ ১১ ॥
গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ভিটা মাটি বাড়ি ।
প্রতিবাসী জোলাতাঁতী হীনজাতি হাড়ী ॥ ১২ ॥
মেঠস্থানে মেটে ঘর বাতাসেতে দুলে ।
কাঠাময়ে খালি বাঁশ কাঠের বদলে ॥ ১৩ ॥
কাঠে লাগি কড়িপাতি স্বল্পমূল্যে বাঁশ ।
তাই কোন্ বেশী ঘর কষ্টে চলে বাস ॥ ১৪ ॥
ভিটার মধ্যেতে নাই প্রস্তুতি-আগার ।
ঢেঁকিশালে জন্ম হয় প্রভুর আমার ॥ ১৫ ॥
আপনার বলিতে গ্রামেতে আছে কেবা ।
একা ধনী কামারিনী বালিকা-বিধবা ॥ ১৬ ॥
লালন-পালন কৈল আনন্দে বিহ্বলা ।
গ্রাম্য বালকের সঙ্গে গেল বাল্য-বেলা ॥ ১৭ ॥
পাঠশালে বিদ্যার্জন বয়স অধিকে ।
লেখাপড়া হৈল সাঙ্গ লিখিয়া কাঠাকে ॥ ১৮ ॥
স্পষ্ট বর্ণ-উচ্চারণে জিহ্বার জড়তা ।
তোতলা শ্রীপ্রভু মুখে কাটা কাটা কথা ॥ ১৯ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে নাই রূপ বিশেষ এমন ।
অবয়বে অতি অল্প স্বরূপলক্ষণ ॥ ২০ ॥
নয়ন দুখানি টানে ঈষৎ বঙ্কিম ।
বাটালিতে কাটা ঠোঁট ঈষৎ রক্তিম ॥ ২১ ॥
বাল্য গেল হৈল যবে আরম্ভ যৌবন ।
হীন দাস্যবৃত্তিবেশ পূজারী ব্রাহ্মণ ॥ ২২ ॥
পণ দিয়া হৈল বিয়া আশ্চর্য কখন ।
তিন শত টাকা নহে কানাকড়ি কম ॥ ২৩ ॥
পশ্চাতে প্রবল অনুরাগের ঝঞ্ঝায় ।
উন্মাদ প্রমাদ বাদ যেথায় সেথায় ॥ ২৪ ॥
সাধু-সন্ন্যাসীর চিহ্ন অঙ্গে মোটে নাই ।
সহজ হইতে অতি সহজ গোসাঁই ॥ ২৫ ॥
গুরু পিতা কর্তাভাব কিছু নাই মনে ।
চিরকাল শিক্ষাপ্রার্থী সকলের স্থানে ॥ ২৬ ॥
সকলেই যেন তাঁর শিক্ষকের যোগ্য ।
সকলের সন্নিকটে ভাবে অনভিজ্ঞ ॥ ২৭ ॥
শিশুর সমান রীতি সরলাতিশয় ।
যে যা বলে সকলের কথায় প্রত্যয় ॥ ২৮ ॥
শুন দুই এক কথা প্রত্যয়ের কই ।
নাহি কিছু মিষ্ট রামকৃষ্ণ-কথা বই ॥ ২৯ ॥
একদিন আহার করেন প্রভুবর ।
বেলা প্রায় কিছু কম আড়াই প্রহর ॥ ৩০ ॥
অর্ধেক আহার সাঙ্গ আর নয় বেশী ।
হেনকালে মূত্রবেগ দেখা দিল আসি ॥ ৩১ ॥
উঠিয়া অমনি প্রভু বরাবর যান ।
গঙ্গাকূলে যেইখানে ফুলের বাগান ॥ ৩২ ॥
বাঁধান পোস্তার কাছে নালা যেইখানে ।
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের কিঞ্চিৎ পশ্চিমে ॥ ৩৩ ॥
মুত্রত্যাগে বসিলেন আপনার ভাবে ।
বাঁ-পার অঙ্গুলি এক পিঁপড়ার ডোবে ॥ ৩৪ ॥
পিঁপড়ার স্বভাব আছয়ে যেরকম ।
কোমল অঙ্গুলির নীচে করিল দংশন ॥ ৩৫ ॥
শ্রীমন্দিরে প্রভুদেব ফিরিয়া আসিলে ।
অনুভব কৈলা জ্বালা অঙ্গুলির তলে ॥ ৩৬ ॥
শশব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা জনে জনে ।
অঙ্গুলে দংশন কিসে করেছে বাগানে ॥ ৩৭ ॥
না বুঝিয়া একজন করিল উত্তর ।
ওখানে অনেক সাপ ডোবের ভিতর ॥ ৩৮ ॥
শুনিয়া সে কথা প্রভু বুঝিলা তথন ।
তবে তো নিশ্চয় ইহা সাপের দংশন ॥ ৩৯ ॥
উপায়ের হেতু প্রভু কন সেই জনে ।
হইবে সাপের বিষ বিনষ্ট কেমনে ॥ ৪০ ॥
প্রত্যুত্তরে প্রভুদেবে কহিল তখন ।
বিষে হয় বিষ নষ্ট কহে সাধারণ ॥ ৪১ ॥
সেই হেতু প্রভুরায় বসিলেন গিয়া ।
পূর্ববৎ ডোবেতে অঙ্গুলি ঢুকাইয়া ॥ ৪২ ॥
পুনশ্চ দংশন এই মনে মনে আশ ।
যাহাতে হইবে গোটা বিষের বিনাশ ॥ ৪৩ ॥
খরতর ঢালে কর প্রচণ্ড তপন ।
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ মলিন বরন ॥ ৪৪ ॥
দুই তিন চারি দণ্ড এই মতে কাটে ।
হেন
কালে শ্রীমনোমোহন গিয়া জুটে ॥ ৪৫ ॥
না পাইয়া প্রভুদেবে আপন মন্দিরে ।
অন্বেষণহেতু তত্ত্ব করে চারিধারে ॥ ৪৬ ॥
অবশেষে গঙ্গাকূলে দেখিবারে পায় ।
প্রখর প্রচণ্ড রৌদ্রে প্রভুদেবরায় ॥ ৪৭ ॥
বদনে বিষাদমাখা আছেন বসিয়া ।
ডানি হাতে অন্নমাখা গেছে শুকাইয়া ॥ ৪৮ ॥
দ্রুতগতি উতরিয়া তাঁহার গোচর ।
কারণ জিজ্ঞাসা করে গৃহী ভক্তবর ॥ ৪৯ ॥
আদি অন্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া তিনি কন ।
পিঁপড়ার কর্ম, নহে সাপের দংশন ॥ ৫০ ॥
যেমন
পশিল কানে ভকতের বাণী ।
তখনি হইল সুস্থ প্রভু গুণমণি ॥ ৫১ ॥
শ্রীমুখ প্রফুল্ল মহা আনন্দের ভরে ।
প্রবেশিলা ভক্তসহ আপন মন্দিরে ॥ ৫২ ॥
শিশুর অধিক প্রভু সরলাতিশয় ।
সকলের বাক্যে তাঁর সমান প্রত্যয় ॥ ৫৩ ॥
সমাদরে সকলের সম্মান বিহিত ।
তৃণের অপেক্ষা লঘু স্বভাব চরিত ॥ ৫৪ ॥
কটু কথা অপরের অঙ্গ-আভরণ ।
প্রহার করিলে তবু নহে ক্ষুণ্ণ মন ॥ ৫৫ ॥
বলিতে বিদরে হৃদি এত সহ্যগুণ ।
মথুরের সময়েতে জনৈক বামুন ॥ ৫৬ ॥
কালীঘাটে করে বাস কালীর পূজারী ।
চণ্ডালের অপেক্ষায় অতি কদাচারী ॥ ৫৭ ॥
তুলনায় অতি মহাপাপী মানে হার ।
সহজে বুঝিবে মন শুন সমাচার ॥ ৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর মহিমার না হয় তুলনা ।
জীবের উপরে তাঁর অপার করুণা ॥ ৫৯ ॥
কোন অবতারে হেন নাহি দেখা যায় ।
শ্রীঅঙ্গ-আলয় শুধু পূর্ণ করুণায় ॥ ৬০ ॥
মথুর প্রভুর ভক্ত হইবার আগে ।
অতিশয় ভক্তি-প্রীতি-শ্রদ্ধা-অনুরাগে ॥ ৬১ ॥
যাইতেন কালীঘাটে এখন তখন ।
করিবারে ইষ্টমূর্তি-কালী দরশন ॥ ৬২ ॥
প্রতিবারে পুজারী পুরুত যেই জনা ।
পাইত বাসনাতীত পূজার লহনা ॥ ৬৩ ॥
টাকাকড়ি সোনা-দানা বিবিধ রকম ।
বৎসরে শতেকবার দুর্মূল্য বসন ॥ ৬৪ ॥
ভাগ্যবান মথুর পাইয়া প্রভুদেবে ।
কালীঘাটে যাওয়া কি মনেও না ভাবে ॥ ৬৫ ॥
অতি ক্ষতি পূজারীর কিছুই না পায় ।
অর্ধেক কমিয়া গেল বৎসরের আয় ॥ ৬৬ ॥
সেইহেতু প্রভুদেবে দ্বেষ চক্ষে দেখে ।
প্রতিশোধ লইবার সুচেষ্টায় থাকে ॥ ৬৭ ॥
বিরলে পাইয়া প্রভুদেবে একবার ।
শ্রীঅঙ্গ-পরশে করে নৃশংস আচার ॥ ৬৮ ॥
ধিক্ ভক্তি-বিবর্জিত নারকী অধম ।
ধিক্ রে চণ্ডালাচার নামের ব্রাহ্মণ ॥ ৬৯ ॥
ধিক্ তার জীববুদ্ধি কলুষের বাসা ।
শতাধিক ধিক্ তার কাঞ্চনের আশা ॥ ৭০ ॥
গুণের ঠাকুর মোর জীব-হিত-ব্রত ।
সুন্দর কোমল তনু ননীতে গঠিত ॥ ৭১ ॥
দীনাচার দীনবেশ কাঙ্গালের বাড়া ।
বিনয়াবনত-শির স্বভাবের ধারা ॥ ৭২ ॥
সরল শিশুর সম নয়ন-রঞ্জন ।
দেখিলে আপনি যাঁর পায়ে লুটে মন ॥ ৭৩ ॥
এমন প্রভুরে মোর ছুঁইল কেমনে ।
দ্বেষ-হিংসা-পরবশ চণ্ডাল ব্রাহ্মণে ॥ ৭৪ ॥
মমতা-বিহীনহৃদে তস্কর যেমন ।
বিজনে পথিকে করে পাপ আচরণ ॥ ৭৫ ॥
প্রভুর অপার কষ্ট নর-কলেবরে ।
অবতরি ধরাধামে জীবের উদ্ধারে ॥ ৭৬ ॥
বিশেষতঃ এইবারে বিহীন-ঐশ্বর্য ।
নিরবধি জন্মাবধি দুরসহ্য সহ্য ॥ ৭৭ ॥
জয় জয় দীননাথ পতিত-উদ্ধার ।
জয় জয় নররূপ গুপ্ত অবতার ॥ ৭৮ ॥
মধুর মূরতি জয় নয়ন-রঞ্জন ।
কমল জিনিয়া অতি কোমল চরণ ॥ ৭৯ ॥
ভকত-ভ্রমর-চিত্ত-বিমোহনকারী ।
ভবসিন্ধু-পারাপারে করুণ কাণ্ডারী ॥ ৮০ ॥
জয় জয় দীর্ঘবাহু আজানুলম্বিত ।
বিশাল বলিষ্ঠ বক্ষঃস্থল সুবিস্তৃত ॥ ৮১ ॥
জয় জয় বাঁকা আঁখি আঁখির লালসা ।
ভক্তমনবিমোহন কটাক্ষের বাসা ॥ ৮২ ॥
রক্তিম অধরদ্বয় পরম শোভার ।
জ্ঞানভক্তি-তত্ত্ব-উক্তি-বর্ষণের দ্বার ॥ ৮৩ ॥
জয় জয় দীননাথ কাঙ্গালের বাড়া ।
দীনতম দীনাচার দীনতায় ভরা ॥ ৮৪ ॥
জয় সকরুণ-হৃদি জীব দুঃখাতুর ।
কলুষ-নাশন কর্ম দয়াল ঠাকুর ॥ ৮৫ ॥
জয় জয় মহাবীর ধর্ম-সমন্বয়ে ।
সাধন ভজনকর্ম দীনের লাগিয়ে ॥ ৮৬ ॥
জয় জয় সত্য-তত্ত্ব-পথ প্রদর্শক ।
জয় জয় ধর্মদ্বন্দ্ব-প্রতিনিবারক ॥ ৮৭ ॥
জয় জয় বিশ্বগুরু সর্বজ্ঞ বিধাতা ।
যে যেমন পথপ্রিয় তার তেন নেতা ॥ ৮৮ ॥
জয় শ্রীচৈনন্যদাতা অজ্ঞাননিবারী ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু হৃদয়-বিহারী ॥ ৮৯ ॥
জয় জয় দয়ানিধি আমি মূঢ়মতি ।
প্রায় নিরক্ষর মূর্খ কিবা জানি স্তুতি ॥ ৯০ ॥
মিনতি অভয় পদে একমাত্র করি ।
যে যোনিতে দিও জন্ম তাহে নাহি ভরি ॥ ৯১ ॥
না হয় করিও কৃমি ইচ্ছা যদি মনে ।
কিন্তু যেন রহে মতি যুগল চরণে ॥ ৯২ ॥
ভক্তিহীন শ্রীচরণে করো না কখন ।
কলুষ-চরিত হেন যদিও ব্রাহ্মণ ॥ ৯৩ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্ত যজ্ঞসূত্রধারী ।
জপ-তপ পরিত্যক্ত পাশব-আচারী ॥ ৯৪ ॥
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ।
আদ্যাশক্তি গুরুদারা চৈতন্যদায়িনী ॥ ৯৫ ॥
সিদ্ধি-শান্তিস্বরূপিণী দয়াময়ী নিজে ।
সোনার অক্ষরে লেখা চরণ সরোজে ॥ ৯৬ ॥
লজ্জাশীলা দ্বিজবালা পবিত্র-জীবন ।
শ্রীপ্রভুর পাদপদ্মে গত-প্রাণমন ॥ ৯৭ ॥
তন্নাম-শ্রবণ-প্রিয়া লীলাপুষ্টিকরী ।
জীবের কল্যাণচিন্তা দিবাবিভাবরী ॥ ৯৮ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তগণে অপার করুণা ।
কায়মনোবাক্যে নিত্য মঙ্গলকামনা ॥ ৯৯ ॥
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ।
জীবে দিতে ভক্তি-তত্ত্ব আপনি ঈশানী ॥ ১০০ ॥
জগৎ-জননী-ভাব ভক্তে অতি স্নেহ ।
সমভাবে সবে পায় বাদ নাহি কেহ ॥ ১০১ ॥
মনোবাঞ্ছাপূর্ণকারী প্রভুর মতন ।
বিতরিতে জ্ঞানভক্তি পরম রতন ॥ ১০২ ॥
যত্বণত্ববোধহীন প্রায় নিরক্ষর ।
কুঞ্চিত মলিন আত্মা পরম পামর ॥ ১০৩ ॥
সব-অপকর্মকৃৎ নাহি কিছু বাদ ।
এমন যে আমি তারও পুরাইলে সাধ ॥ ১০৪ ॥
লিখাইয়া লীলাগীতি সুধার ভাণ্ডার ।
প্রচারিতে আপনার মহিমা অপার ॥ ১০৫ ॥
আদিম চরিত্র মোর হইয়া বিদিত ।
যদি কেহ পড়ে এই রামকৃষ্ণ-গীত ॥ ১০৬ ॥
সহজে বিশ্বাস তাঁর হইবে অন্তরে ।
গেয়েছিল রামনাম বনের বানরে ॥ ১০৭ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে অত্যাচার লীলা-আন্দোলনে ।
বড়ই বাজিল আজি বজ্রাধিক প্রাণে ॥ ১০৮ ॥
সেইহেতু শ্রীচরণে করি নিবেদন ।
পটেতে প্রভুর মূর্তি করি দরশন ॥ ১০৯ ॥
হেলায় শ্রদ্ধায় কিবা যে করিবে নতি ।
তার যেন হয় রামকৃষ্ণপদে মতি ॥ ১১০ ॥
এদিকে
যেমন জীব পাতকী পামর ।
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব করুণা-সাগর ॥ ১১১ ॥
অপরাধগ্রহণের না জানেন নাম ।
জীবের মঙ্গল-চেষ্টা চিন্তা অবিরাম ॥ ১১২ ॥
যে কর্ম করিল হেথা চণ্ডাল বামুন ।
মথুরে বলিলে পরে ছুটিত আগুন ॥ ১১৩ ॥
ঘুণাক্ষরে একবার ব্যাপার শুনিলে ।
কাটিয়া দ্বিজের মুণ্ড খণ্ড করি ফেলে ॥ ১১৪ ॥
যাহাতে কেহ এ কথা শুনিতে না পায় ।
শুন তবে কি করিলা প্রভুদেবরায় ॥ ১১৫ ॥
আদ্যোপান্ত কহি কথা ভাগিনা হৃদয়ে ।
বলিলা কব না কারে লহ বলাইয়ে ॥ ১১৬ ॥
ক্ষমার নাহিক সীমা দয়ার সাগরে ।
মান-অপমান-ভাবশূন্য একবারে ॥ ১১৭ ॥
সর্বশক্তিমানের কিছুই শক্তি নাই ।
এই ঐশ্বর্যের বেশে জগৎ-গোসাঁই ॥ ১১৮ ॥
তবে এত লোকে প্রভু বিমোহিলা কিসে ।
ঐশ্বর্যের বলে নয় মাধুর্য্যের রসে ॥ ১১৯ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে মধুরতা এত পরিমাণে ।
দেখিলেই মুগ্ধ মন হয় লোকজনে ॥ ১২০ ॥
ঐশ্বর্যের অবতারে সঙ্গে রহে ভয় ।
নিকটে যাইতে শঙ্কা জীবে অতিশয় ॥ ১২১ ॥
সে ভাব প্রভুর অঙ্গে লেশমাত্র নাই ।
দীনবেশে দীনভাবে খেলেন গোসাঁই ॥ ১২২ ॥
বিদ্যা কিবা ধনমদে মত্ত অহঙ্কারী ।
রাখাল বালক কিবা কাঙ্গাল ভিখারী ॥ ১২৩ ॥
কিবা যজ্ঞসূত্রধারী কুলের ব্রাহ্মণ ।
কিবা অতি হীন জাতি হাড়ী গুঁড়ি ডোম ॥ ১২৪ ॥
কিবা কর্মী কিবা ধর্মী তাপস-আচার ।
কিবা অতি মহাপাপী পাষণ্ড আকার ॥ ১২৫ ॥
কিবা নর কিবা নারী নানাবিধ জাতি ।
কি লম্পট কি কপট শঠের প্রকৃতি ॥ ১২৬ ॥
কিবা লজ্জাশীলা বালা কুলের ললনা ।
কিবা সমাজের হেয় বেশ্যা বারাঙ্গনা ॥ ১২৭ ॥
সকলেই সমভাবে জুড়ায় অন্তর ।
মাধুর্যের রসে ভরা প্রভুর গোচর ॥ ১২৮ ॥
এ যে কি মাধুর্যরস বিশ্ব-মনোহরা ।
কহিতে নারিনু মন ইহার চেহারা ॥ ১২৯ ॥
এই মহামিষ্ট রস কিছু বিতরণে ।
প্রভুদেব পুষ্ট কৈলা যত ভক্তগণে ॥ ১৩০ ॥
বিশেষিয়া দেখিবারে পাবে তুমি মন ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৩১ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তগণ আরাধ্য সবার ।
মানুষের কিবা কথা পূজ্য দেবতার ॥ ১৩২ ॥
সহজে না যায় বুঝা মাথায় না আসে ।
প্রভুভক্ত দেবতার পূজনীয় কিসে ॥ ১৩৩ ॥
আভাসেতে শুন কথা কই পরিচয় ।
বিভূষিত শ্রীপ্রভুর শ্রীঅঙ্গ-আলয় ॥ ১৩৪ ॥
যতবিধ দিব্যগুণ দিব্যভাব-রসে ।
দিয়া তার কিছু কিছু প্রতি ভক্তে পোষে ॥ ১৩৫ ॥
প্রমাণে প্রভুর বাক্য কর অবধান ।
বলিতেন যখন তখন ভগবান ॥ ১৩৬ ॥
বাহ্যিক-গিয়ান-শূন্য আবেশের ঘোরে ।
ধরাই নিজের বর্ণ আমি ধরি যারে ॥ ১৩৭ ॥
কাঁচপোকা আরশোলা ধরিয়া যেমন ।
ধরায় তাহার অঙ্গে নিজের বরন ॥ ১৩৮ ॥
কোন্ ভক্ত কিবা ভাবে কি রকমে গড়া ।
সে বুঝে স্বেচ্ছায় যাঁরে প্রভু দেন ধরা ॥ ১৩৯ ॥
প্রভুর করুণা যদি সাধ হয় মনে ।
জীবন সমান তাঁর ভক্তের চরণে ॥ ১৪০ ॥
সযতনে রাখিয়া ভকতি প্রীতি মতি ।
লুটাও অবনী, আশা হবে ফলবতী ॥ ১৪১ ॥
দ্বিবিধ ভক্ত প্রভুর সংসারী সন্ন্যাসী ।
উভয়েই সমস্থানে নাহি কম বেশী ॥ ১৪২ ॥
উভয়ে ভ্রমরজাতি একই লালসা ।
প্রভু-পাদপদ্ম-চক্রে যাহা করে বাসা ॥ ১৪৩ ॥
সংসার-আশ্রমে নাই করে কোন ক্ষতি ।
কেন না প্রভুর পদে অচলা ভকতি ॥ ১৪৪ ॥
ঈশ্বরকোটির
ভক্ত যে যে ভক্তিমান ।
শ্রীঅঙ্গেতে তাহাদের জনমের স্থান ॥ ১৪৫ ॥
বুঝহ কেমন মন কহি
উপমায় ।
মূল বৃক্ষে যেইরূপ কাণ্ড বাহিরায় ॥ ১৪৬ ॥
অত্যন্ত নিকট তাঁরা নিত্য সহচর ।
কোটি মানে এইখানে কাঁকাল কোমর ॥ ১৪৭ ॥
এমন শ্রেণীর ভক্ত প্রভু-অবতারে ।
দেখা যায় বিজড়িত আছেন সংসারে ॥ ১৪৮ ॥
কৃষ্ণসখা মহাবীর পাণ্ডব অর্জুন ।
তিয়াগী তপস্বী চেয়ে কিছু নহে ন্যূন ॥ ১৪৯ ॥
সেইহেতু ভক্তমধ্যে নাহি কম বেশী ।
সংসারীও সেই স্থানে যেখানে সন্ন্যাসী ॥ ১৫০ ॥
ভক্ত-সংজোটনে পাবে বিশেষ বারতা ।
আসিয়া মিলিবে এবে অপরূপ কথা ॥ ১৫১ ॥
নবীন বালক এক সুন্দর গড়ন ।
অঙ্গময় কান্তিমাখা চম্পক-বরন ॥ ১৫২ ॥
বয়স বিশের মধ্যে আর নয় বেশী ।
সেবা-ভক্তি-প্রিয় তেহ কুমার সন্ন্যাসী ॥ ১৫৩ ॥
ব্রাহ্মণের কুলে জন্ম শশী নাম তাঁর ।
শুদ্ধ সত্ত্ব দিব্যভাবে পুর্ণিত আধার ॥ ১৫৪ ॥
তেজে পূর্ণ শরীরের প্রতি পরমাণু ।
জৈবভাব-বিবর্জিত অকলঙ্ক তনু ॥ ১৫৫ ॥
দেহেতে ইন্দ্রিয়গণ সকলেই মরা ।
জিতেন্দ্রিয় সত্যবাদী স্বভাবের ধারা ॥ ১৫৬ ॥
উচ্চমতি ধর্মোন্নতি ন্যায়পরায়ণ ।
সরলতা সহকারে তত্ত্ব-অন্বেষণ ॥ ১৫৭ ॥
কর্মপ্রিয় কর্মক্ষম কর্মেতে চতুর ।
কর্ম আচরিয়া করে কর্মশ্রম দূর ॥ ১৫৮ ॥
বারুদ বহ্নির বলে বন্দুকে যেমন ।
সীসার নির্মিত গুলী হয় নির্গমন ॥ ১৫৯ ॥
সেইমত ন্যায়-সত্য-বল-সহকারে ।
সতত নির্গত বাক্য বদন-বিবরে ॥ ১৬০ ॥
ন্যায়ের সত্যের ধর্ম করিতে পালন ।
প্রাণান্তেও পরাঙ্মুখ না হয় কখন ॥ ১৬১ ॥
অন্ধেও দেখিলে তাঁয় অবহেলে বুঝে ।
মূর্তিমান ধর্মরাজ বালকের সাজে ॥ ১৬২ ॥
আধারে গুণের বন বিবেক বিরাগ ।
শ্রীগুরু-চরণাম্বুজে উগ্র অনুরাগ ॥ ১৬৩ ॥
সৎবুদ্ধি সহিষ্ণুতা তিতিক্ষা প্রখর ।
সারবান সব বৃক্ষ সতেজ সুন্দর ॥ ১৬৪ ॥
প্রফুর পল্লবমালা ডগমগ করে ।
মূলে ঢালে রস সেবাভক্তি নির্ঝরে ॥ ১৬৫ ॥
স্বভাবতঃ বিভূষিত বহুবিধ গুণে ।
উপনীত এইবার লীলার প্রাঙ্গণে ॥ ১৬৬ ॥
বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ হয় এ সময় ।
উন্নতির গতি কথা কহিবার নয় ॥ ১৬৭ ॥
প্রভুর গণের মধ্যে অত্যুচ্চ শ্রেণীর ।
দাস্যভাবে সেবাপ্রিয় সেবাকর্মে বীর ॥ ১৬৮ ॥
পাইয়া তাঁহায় প্রভু এত দূর খুশী ।
শশীর মিলনে হাতে গগনের শশী ॥ ১৬৯ ॥
শশীর জনমস্থান ঘাটালের কাছে ।
জনক-জননী দুই বর্তমান আছে ॥ ১৭০ ॥
পিতা শ্রীপ্রভুর প্রিয় খুব পরিচিত ।
ব্রাহ্মণ-আচার শক্তি ঋষির চরিত ॥ ১৭১ ॥
প্রশস্ত অবস্থা নয় মনের মতন ।
দুঃখে সুখে যায় দিন গৃহীর যেমন ॥ ১৭২ ॥
দেখি বন্যা কানে কান পূর্ণ আশা মনে ।
চাষা যেন চেয়ে থাকে হৈমন্তিক ধানে ॥ ১৭৩ ॥
সেই মত পিতা তার শশী জ্যেষ্ঠ ছেলে ।
পাঠপ্রিয় পাঠক্ষম বুদ্ধিমতাবলে ॥ ১৭৪ ॥
নেহারিয়া মনে মনে করিয়াছে আশা ।
সময়ে হইবে শশী সম্বল ভরসা ॥ ১৭৫ ॥
কেবা কার পিতামাতা কেবা কার ছেলে ।
কোথা হতে আসে আর কোথা যায় চলে ॥ ১৭৬ ॥
অবিরত তৃণবৎ ভাসিতে ভাসিতে ।
দিবারাতি সদা গতি সময়ের স্রোতে ॥ ১৭৭ ॥
কান্না-হাসি সাথে সাথে বিচ্ছেদ-মিলনে ।
নানাবিধ অবস্থার তরঙ্গ-পীড়নে ॥ ১৭৮ ॥
প্রত্যক্ষ দেখিতে যদি সাধ রহে মন ।
শ্রবণ-কীর্তন কর ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৭৯ ॥
জাতিতে
মধুপ অলি যদি অন্য স্থানে ।
জন্মাবধি রহে বদ্ধ দৈবের ঘটনে ॥ ১৮০ ॥
বিষম কারার বাসে
মুক্ত যবে কালে ।
অন্যত্রে কখন নয় বসে গিয়ে ফুলে ॥ ১৮১ ॥
সেইমত চিরভক্ত প্রভুর
আমার ।
সেবাভক্তিস্বাদপ্রিয় ব্রাহ্মণ-কুমার ॥ ১৮২ ॥
মায়িক মায়ের কোলে ছিল এতদিন ।
কালেতে পাইয়া পথ হইয়া স্বাধীন ॥ ১৮৩ ॥
মুখে রামকৃষ্ণনাম গুন গুন রবে ।
মজিলেন
প্রভুপদ-পঙ্কজ-আসবে ॥ ১৮৪ ॥
সেবাকর্মে সুনিপুণ শশীর মতন ।
কোথাও কখন নাহি হয় দরশন ॥ ১৮৫ ॥
পরিহরি আত্মসুখ কিবা রাতি-দিবা ।
ত্রুটি নাহি কোন অংশে সর্বাঙ্গীণ সেবা ॥ ১৮৬ ॥
দারুণ নিদাঘকাল খরতর রবি ।
ভয়ঙ্কর বেশ যেন প্রলয়ের ছবি ॥ ১৮৭ ॥
বরষে মধ্যাহ্ন বহ্নি দাবাগ্নি সমান ।
করে রণ সমীরণ জগতের প্রাণ ॥ ১৮৮ ॥
জলন্ত চিতার মত সমুত্তপ্ত
ধরা ।
প্রফুল্ল প্রকৃতি দেবী শবের চেহারা ॥ ১৮৯ ॥
প্রাণী সব সুনীরব আতুর পরাণে ।
ছায়াশ্রয় করি রয় নিভৃত আশ্রমে ॥ ১৯০ ॥
এমন সময় এই ব্রাহ্মণ-নন্দন ।
বীরের আকৃতি অঙ্গে রবির বরন ॥ ১৯১ ॥
লোহিত বদন-বর্ণ অরুণ জিনিয়া ।
একবারে দিনকরে জোরে উপেক্ষিয়া ॥ ১৯২ ॥
দাবাগ্নির মধ্যে যেন বিদ্যুতের বাণ ।
ধায় প্রায় যোজনেক নাহিক বিরাম ॥ ১৯৩ ॥
বসনে বরফখণ্ড বাঁধা সযতনে ।
সেবিবারে প্রভূবরে বিভু ভগবানে ॥ ১৯৪ ॥
কি জানি এ কোন্ দেব প্রভু-অবতারে ।
গায়ে মানুষের ছাল নারি চিনিবারে ॥ ১৯৫ ॥
আগত আসরে লয়ে সেবা আচরণ ।
জীবে দিতে সেবা-ভক্তি পরম রতন ॥ ১৯৬ ॥
শশীর মতন সেবা কেহ নাহি জানে ।
অল্প দেবদেবী যত যে রয় যেখানে ॥ ১৯৭ ॥
শশীর মাহাত্ম্য-কথা কি কহিতে পারি ।
সেবা-ভক্তি-ভাণ্ডারের একক ভাণ্ডারী ॥ ১৯৮ ॥
সেবা-ভক্তি শ্রীপ্রভুর যাহার কামনা ।
সে পাবে যদ্যপি করে শশীর সাধনা ॥ ১৯৯ ॥
কলিকালে একমাত্র সেবা আচরণ ।
জীবের প্রশস্ত পথ ত্রাণের কারণ ॥ ২০০ ॥
এখন যেমন জীব শরীরে দুর্বল ।
প্রভুর কৃপায় পথ তেমতি সরল ॥ ২০১ ॥
টাকাকড়ি নাহি লাগে প্রভুর সেবায় ।
এক পয়সার দ্রব্যে তুষ্ট প্রভুরায় ॥ ২০২ ॥
তাতেও কাতর হইত যেই জন ।
আজ্ঞা তারে আনিবারে ভাঙ্গিয়া দাঁতন ॥ ২০৩ ॥
হুঁকায় করিয়া নল বকুলপাতার ।
তামাক সাজিয়া দিলে সেবা গ্রাহ তাঁর ॥ ২০৪ ॥
ইহাতেও বদ্ধজীব স্বীকার না করে ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা নিস্তারের তরে ॥ ২০৫ ॥
জীবের শিক্ষার হেতু শ্রীপ্রভুর কাছে ।
সকল ভাবের লোক বিধিমতে আছে ॥ ২০৬ ॥
হাজরা প্রতাপচন্দ্র মহাভাগ্যবান ।
যেখানে সশরীরে প্রভু ভগবান ॥ ২০৭ ॥
মূর্তিমান অধিষ্ঠান রহে দিবারাতি ।
নিরন্তর সেইখানে করেন বসতি ॥ ২০৮ ॥
হাজরা জাতিতে চাষা বুদ্ধি বড় আন্ ।
নিজে জানে আপনারে অধিক সেয়ান ॥ ২০৯ ॥
প্রভুর নিকটে তেহ থাকে নিরন্তর ।
সেইহেতু দশ জনে করে সমাদর ॥ ২১০ ॥
আপনার গুণে মান বিচারিয়া মনে ।
নানা লোকে নানা আজ্ঞা করে অভিমানে ॥ ২১১ ॥
ভূপতির হালে বাস খায় মাখে থাকে ।
ভক্তি-ভক্ত-ভাব মোটে অন্তরে না রাখে ॥ ২১২ ॥
দিন
দিন আত্ম-সেবা-সুখ বৃদ্ধি পায় ।
তামাক খাইবে নিজে অপরে সাজায় ॥ ২১৩ ॥
তাহার মনের ভাব বুঝিয়া অন্তরে ।
একদিন রঙ্গপ্রিয় নিজ শ্রীমন্দিরে ॥ ২১৪ ॥
রঙ্গের কারণ রামকৃষ্ণদেবরায় ।
তামাক সাজিতে আজ্ঞা করিলেন তায় ॥ ২১৫ ॥
করজোড়ে কহে চাষা দীনতার ভানে ।
তামাক সাজিতে আজ্ঞা হইল অধমে ॥ ২১৬ ॥
এ অঙ্গ পরশ করি শক্তি মোর কিবা ।
যে-সকল দ্রব্যে হবে আপানার সেবা ॥ ২১৭ ॥
হাজরা সতর্ক ভাবে থাকে অনুক্ষণ ।
কে সাজে তামাক কভু প্রভুর কারণ ॥ ২১৮ ॥
বাঁ হাতে ধরিয়া হুঁকা গন্ধ পেয়ে ছুটে ।
শ্রীমন্দিরে প্রভুদেব তাঁহার নিকটে ॥ ২১৯ ॥
কিবা দোষ দিবে জীবে হীনবুদ্ধিমতি ।
হাজরার হেন ধারা নিত্য যেবা সাথী ॥ ২২০ ॥
তামাক খাইতে প্রভু পটু মোটে নন ।
দুইবার মাত্র টানা শিশুর মতন ॥ ২২১ ॥
খাইতে পিরীতি নাই তবে হেন কেনে ।
ইহার ভিতরে আছে অতি গূঢ় মানে ॥ ২২২ ॥
কহাইলে প্রভুদেব পরে কর কথা ।
এবে শুন ভক্তদের মিলন-বারতা ॥ ২২৩ ॥
কি সুন্দর ভক্ত সব সঙ্গেতে প্রভুর ।
আসিয়া জুটিল এবে শরৎ ঠাকুর ॥ ২২৪ ॥
সুন্দর যেমন শশী শরৎ তেমতি ।
বাল্যাবধি দুই জনে বড়ই পিরীতি ॥ ২২৫ ॥
উভয়েই লালিত পালিত এক ঠাঁই ।
পরস্পর খুল্লতাত জ্যেষ্ঠতাত ভাই ॥ ২২৬ ॥
শরৎ সুধীর শান্ত গম্ভীর চেহারা ।
যোগী-ঋষি-তপস্বীর বালকের পারা ॥ ২২৭ ॥
শশীর সমান বয়ঃ ধর্মের পিয়াসী ।
প্রভুর স্বগণমধ্যে কুমার সন্ন্যাসী ॥ ২২৮ ॥
উজ্জ্বল শ্যামল বর্ণ নয়ন-রঞ্জন ।
উচ্চতত্তোন্মত্ত ভাব নীচে নহে মন ॥ ২২৯ ॥
বিচিত্র হৃদয়-ক্ষেত্র বড়ই উর্বরা ।
বিবেক বিরাগ রাগে স্বভাবতঃ পুরা ॥ ২৩০ ॥
উপযুক্ত দেখি ক্ষেত্র প্রভু নারায়ণ ।
যতনে যোগের বীজ করিলা রোপণ ॥ ২৩১ ॥
ধ্যান-যোগ্যভ্যাস তাঁর বাড়ে দিনে দিনে ।
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর কৃপা-বারিদানে ॥ ২৩২ ॥
এখন প্রভুর কাছে হয় যাওয়া আসা ।
শ্রীমন্দিরে একবারে নিত্য হয় বাসা ॥ ২৩৩ ॥
ইহার অনেক পূর্বে জুটে এক জন ।
কবিরাজি চিকিৎসায় বুদ্ধি বিচক্ষণ ॥ ২৩৪ ॥
নানাবিধ ঔষধ বিদিত বিধিমতে ।
মহেন্দ্র তাঁহার নাম পাল উপাধিতে ॥ ২৩৫ ॥
পুরুষানুক্রমে এই চিকিৎসা-পদ্ধতি ।
সিঁথিতে বসত-বাটী সদেগাপের জাতি ॥ ২৩৬ ॥
শ্রীপ্রভুর কবিরাজ মহাভাগ্যবান ।
যুগল চরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ২৩৭ ॥
ব্যবসা চিকিৎসা কিন্তু সরল হৃদয় ।
তাঁহার ঔষধে বড় প্রভুর প্রত্যয় ॥ ২৩৮ ॥
ঠাকুরের ভারি কৃপা মহেন্দ্রের প্রতি ।
প্রভুতে প্রবলতর অচলা ভকতি ॥ ২৩৯ ॥
রামকৃষ্ণ বিনা তাঁর নাহি অন্য জ্ঞান ।
এই নাম তপ-জপ এই মূর্তি ধ্যান ॥ ২৪০ ॥
ঠাকুরের গুণগাথা-শ্রবণ-কীর্তনে ।
মত্ততর কবিরাজ রহে রেতেদিনে ॥ ২৪১ ॥
যেখানে যাহারে দেখে আত্ম কিবা পর ।
যত্নে আনে যেখা প্রভু রাজরাজেশ্বর ॥ ২৪২ ॥
শ্রীপ্রভুর কাছে তাঁর আখ্যা আধ গণ্ডা ।
প্রথমতঃ কবিরাজ দ্বিতীয়তঃ পাণ্ডা ॥ ২৪৩ ॥
রামকৃষ্ণভক্ত এক মহাভাগ্যবানে ।
হাজির করিয়া দিল প্রভু-বিদ্যমানে ॥ ২৪৪ ॥
গোপাল তাঁহার নাম উপাধিতে সুর ।
বয়েসেতে পঞ্চাশৎ নহে বহু দূর ॥ ২৪৫ ॥
কাগজের বিকিকিনি আয়ে গুজরান ।
চীনিয়াবাজারে এক নিজের দোকান ॥ ২৪৬ ॥
হালে হইয়াছে হারা পত্নী প্রিয়তমা ।
সংসারীর সার রত্ন পরাণ-প্রতিমা ॥ ২৪৭ ॥
সর্বদা উদাস-মন রহে দুঃখভরে ।
কবিরাজ এক দিন বলেন তাঁহারে ॥ ২৪৮ ॥
দক্ষিণশহরে আছে সাধু একজন ।
অবহেলে শান্তি মিলে কৈলে দরশন ॥ ২৪৯ ॥
গোপাল বিশ্বাসসহ আইলা দেখিতে ।
শান্তিদাতা রামকৃষ্ণ মহেন্দ্রের সাথে ॥ ২৫০ ॥
ধরা-ছুয়া কিছু নাহি দিলা ভগবান ।
গোপাল সে দিনে কৈল ভবনে পয়ান ॥ ২৫১ ॥
পথে কয় কবিরাজে হাস্য-সহকার ।
ভাল সাধু দেখাইলে ভুলিব না আর ॥ ২৫২ ॥
তদুত্তরে কবিরাজ কহেন তাহায় ।
একদিনে মহাজনে বুঝা নাহি যায় ॥ ২৫৩ ॥
কিছু কাল বার বার কৈলে দরশন ।
অবশ্য পাইবে বার্তা বুঝিবে তখন ॥ ২৫৪ ॥
পর দরশনে আর আসিতে না চায় ।
বহু জেদে কবিরাজ আনিল তাহায় ॥ ২৫৫ ॥
সে দিনে দেখিলা কিবা শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
মুগ্ধ মন যায় আসে বন্ধ আর নাই ॥ ২৫৬ ॥
পরিশেষে উদাসীন হইয়া সংসারে ।
শ্রীপদ-সেবনে রহে প্রভুর গোচরে ॥ ২৫৭ ॥
সেবা-ভক্তিপ্রিয় তাঁর চরণে প্রণাম ।
বয়স্ক সেহেতু বুড়ো গোপালের নাম ॥ ২৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব মহা আড়ম্বরে ।
চলিতেছে ক্রমাগত শহর ভিতরে ॥ ২৫৯ ॥
অধিকাংশ মহোৎসব ভক্তের ভবনে ।
কখন করেন নিজে কেশব আপনে ॥ ২৬০ ॥
মহাপূজ্য আমাদের ব্রাহ্মশিরোমণি ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ২৬১ ॥
কখন আদেশে তাঁর হয় অন্য স্থলে ।
শ্রদ্ধাবান যেবা কেহ কেশবের দলে ॥ ২৬২ ॥
শ্রীমণি মল্লিক এক মহাভাগ্যবান ।
বড়ই সদয় যারে প্রভু ভগবান ॥ ২৬৩ ॥
নিরাকারবাদী তেঁহ ব্রাহ্ম মাত্র নামে ।
বড়ই পিরীতি ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ২৬৪ ॥
দক্ষিণশহরে যাত্রা অবিরত তাঁর ।
একা নন সঙ্গে লয়ে যত পরিবার ॥ ২৬৫ ॥
নন্দিনী নন্দিনী নামে ঘটে ভক্তিভরা ।
প্রভুর কৃপায় হয় ধ্যানে বাহ্যহারা ॥ ২৬৬ ॥
মল্লিকের ভাগ্যসীমা কে বলিতে পারে ।
প্রভুর গমন যাঁর ঘরে বারে বারে ॥ ২৬৭ ॥
দ্বিতীয় যে জন ব্রাহ্ম বেণী পাল নাম ।
সিঁথিতে শহর-প্রান্তে বসতির স্থান ॥ ২৬৮ ॥
তৃতীয়ের নাম জ্ঞান উপাধি চৌধুরী ।
উচ্চপদে অভিষিক্ত গণ্যমান্য ভারি ॥ ২৬৯ ॥
ভিটাবাড়ি সিমুলায় শহর ভিতর ।
যেখানে করেন বাস রাম ভক্তবর ॥ ২৭০ ॥
ব্রাহ্মেরা যেখানে করে যখন উৎসব ।
ভক্তিসহকারে তথা আছেন কেশব ॥ ২৭১ ॥
শ্রীপ্রভুর মহিমায় অদ্ভুত ঘটনা ।
সযতনে শুন মন করিব বর্ণনা ॥ ২৭২ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-কথা অকূল-জলধি ।
শ্রবণ-কীর্তনে মন পাবে নানা নিধি ॥ ২৭৩ ॥
নিরাকারবাদী ব্রাহ্ম কেশব প্রথমে ।
যখন ধর্মের বীজ অঙ্কুরিত প্রাণে ॥ ২৭৪ ॥
ভক্তিবিবর্জিত ভাব বিশুষ্ক অন্তর ।
বহিত বদনে খালি বক্তৃতার ঝড় ॥ ২৭৫ ॥
না মানিয়া শক্তি যবে ব্রহ্মের সাধনা ।
সাকার স্বীকারে যবে ষোল আনা ঘৃণা ॥ ২৭৬ ॥
সোপানের আনুকূল্য করি পরিহার ।
ত্রিতলে গমন যবে প্রয়াস তাঁহার ॥ ২৭৭ ॥
শূন্যে মারিবারে বাণ প্রয়াস যখন ।
যা নাই পাইতে যবে করে পরাক্রম ॥ ২৭৮ ॥
না লিখিয়া দাগা মক্স না লিখিয়া পাতা ।
টানা লিখিবারে যবে উগ্র একাগ্রতা ॥ ২৭৯ ॥
বিষম ভ্রমের কথা ভ্রম করি দূর ।
দেখাইলা সত্য তত্ত্ব দয়াল ঠাকুর ॥ ২৮০ ॥
অহেতুক কৃপাসিন্ধু প্রভু গুণধরে ।
কতই করিলা কষ্ট কেশবের তরে ॥ ২৮১ ॥
স্মরণ করহ মন আগেকার কথা ।
অক্ষরে অক্ষরে সব হৃদে আছে গাঁথা ॥ ২৮২ ॥
কোথা বেলঘোরে জয় সেনের বাগান ।
হৃদয়ে লইয়া সঙ্গে প্রভুদেব যান ॥ ২৮৩ ॥
জানা-শুনা কিছু নাই কেশবের সনে ।
তথাপি চলিলা তথা কৃপা-বিতরণে ॥ ২৮৪ ॥
নিজে প্রভু বহুকাল নুয়াইয়া মাথা ।
শিখাইলা শ্রীকেশবে প্রণতির প্রথা ॥ ২৮৫ ॥
পীড়িত হইলে তেঁহ শ্রীপ্রভু অস্থির ।
ছুটাছুটি যাইতেন কমলকুটীর ॥ ২৮৬ ॥
মা-কালীরে মানসিক হয় ডাব-চিনি ।
যদবধি নহে সুস্থ আকুল পরানী ॥ ২৮৭ ॥
রাত্রিকালে নিদ্রা নাই কাতরে কাতরে ।
শ্যামায় প্রার্থনা কত আরোগ্যের তরে ॥ ২৮৮ ॥
কেশবের চিত্ত ছিল আগাছার বন ।
শ্রীপ্রভুর কৃষাণিতে নন্দন-কানন ॥ ২৮৯ ॥
ফুটিছে
এখন তাহে পারিজাত ফুল ।
রূপে গুণে পরিমনে সৌরভে অতুল ॥ ২৯০ ॥
সেই বিশ্বগন্ধা ফুল নিজ হাতে তুলি ।
কেশব প্রভুর পদে দেন পুষ্পাঞ্জলি ॥ ২৯১ ॥
একদিন যেই জন সাকার-অর্চনা ।
পৌত্তলিক ধর্ম বলি করিতেন ঘৃণা ॥ ২৯২ ॥
তিনিই এখন কিবা আশ্চর্য ব্যাপার ।
বিকি যান পদমূলে প্রভুর আমার ॥ ২৯৩ ॥
কঠিন তুষারখণ্ড হিমাদ্রির শিরে ।
পতিত পাষাণবৎ অবস্থানুসারে ॥ ২৯৪ ॥
পশ্চাতে হইয়া জল মিশে যেন জলে ।
বহু দূর-দূরান্তর সাগরের কোলে ॥ ২৯৫ ॥
সেইমত শ্রীকেশব হয়ে ভক্তিহীন ।
পাষাণের মত শক্ত ছিল এতদিন ॥ ২৯৬ ॥
ভক্তিতে তরল এবে প্রভুর কৃপায় ।
ধৌত করিবারে পড়ে শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ২৯৭ ॥
বিবরণে শুন কথা কেশব সজ্জন ।
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর সুসরল মন ॥ ২৯৮ ॥
শান্তিময় নিকেতন আপনার ধামে ।
কমলকুটীর নাম সর্বজন জানে ॥ ২৯৯ ॥
একদিন প্রভুদেবে পাইয়া তথায় ।
আপনার মনমত বাসনা পুরায় ॥ ৩০০ ॥
দ্বিতলে যেখানে তাঁর ধিয়ানের ঘর ।
পরিপাটি গৃহ সেটি অতি মনোহর ॥ ৩০১ ॥
নাহি কোন সাড়া-শব্দ বড়ই নির্জন ।
প্রভুকে লইয়া তথা করিলা গমন ॥ ৩০২ ॥
অতিশয় সংগোপনে কেহ নাহি জানে ।
বসাইল প্রভুদেবে সুন্দর আসনে ॥ ৩০৩ ॥
সন্নিকটে পাত্রে পূর্ণ আছে আয়োজন ।
বিবিধ জাতীয় ফুল মনের মতন ॥ ৩০৪ ॥
চন্দনে চর্চিত করি চক্ষে জল ঢালি ।
প্রভুর চরণে দেন অঞ্জলি অঞ্জলি ॥ ৩০৫ ॥
পরিশেষে যুক্তকরে প্রভুদেবে কন ।
এ কথা অপরে যেন করে না শ্রবণ ॥ ৩০৬ ॥
প্রভুর তেমন ভাব যেমন বালকে ।
পেটের ভিতরে কোন কথা নাহি থাকে ॥ ৩০৭ ॥
দক্ষিণশহরে পরে ফিরিলা যেমনি ।
দেখেন হাজির তথা বিজয় গোস্বামী ॥ ৩০৮ ॥
ফুকুরিয়া গুণমণি কহিলেন তাঁয় ।
শ্রীমুখে মৃদুল হাসি কিবা শোভা পায় ॥ ৩০৯ ॥
জানি না কেশব কেন পুজিল আমারে ।
কুসুম-চন্দন দিয়া পায়ের উপরে ॥ ৩১০ ॥
বুঝিতে প্রভুর লীলা বুদ্ধি হয় হারা ।
নিক্ষেপিয়া এক ঢিল লক্ষ পাখী মারা ॥ ৩১১ ॥
বারতা বুছিয়া কহে বিজয় গোস্বামী ।
পুজিয়া অভয় পদ জিনিলেন তিনি ॥ ৩১২ ॥
কিন্তু কর্ম আচরিয়া সংগোপনে অতি ।
অন্য পরে অনেকের করিলেন ক্ষতি ॥ ৩১৩ ॥
সত্যতত্ত্বরসাস্বাদে কেশবের প্রাণ ।
কিন্তু তাঁর দলে ছিল আসক্তির টান ॥ ৩১৪ ॥
এবে কেশবের দল ভেঙ্গে গেছে প্রায় ।
সভীত সতত পাছে যা আছে তা যায় ॥ ৩১৫ ॥
বিজয়ে কেশবে এবে ভারি মনান্তর ।
ইহার ভিতরে আছে কারণ বিস্তর ॥ ৩১৬ ॥
পুঁথিতে বর্ণন তাহা নহে প্রয়োজন ।
সংক্ষেপে উভয়ে নাই মনের মিলন ॥ ৩১৭ ॥
কেশবের মনে মনে সাধ উগ্রতর ।
বিহার প্রভুর সঙ্গে করে নিরন্তর ॥ ৩১৮ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত তত্ত্বসুধাপানে ।
চিত্তখানি মত্ত হয়ে রহে রাত্রিদিনে ॥ ৩১৯ ॥
ভবনে বাগানে কিবা হেথায় সেথায় ।
হৃদয়-রঞ্জন সঙ্গে বেড়ায়ে বেড়ায় ॥ ৩২০ ॥
গঙ্গায় জাহাজ লয়ে বিহার-কারণ ।
একবার কেশবের হয় আয়োজন ॥ ৩২১ ॥
সঙ্গে আছে শিষ্যগণ পরম পণ্ডিত ।
ইদানীং নব্য সভ্য সবে সুশিক্ষিত ॥ ৩২২ ॥
নামে তাঁরা ব্রহ্মজ্ঞানী সে জ্ঞান কোথায় ।
সকলে সংসারী মাত্র আমাদের ন্যায় ॥ ৩২৩ ॥
কামিনীকাঞ্চন প্রাণে জাগে নিরবধি ।
এই ভবসংসারের কারার কয়েদী ॥ ৩২৪ ॥
তবু মহা ভাগ্যবান কেশবের সাথে ।
প্রভুর দরশনে মুক্তি নিশ্চয় পশ্চাতে ॥ ৩২৫ ॥
আজি কেশবের সঙ্গে কথোপকথন ।
রামকৃষ্ণকথামৃতে আছে যে রকম ॥ ৩২৬ ॥
সেইমত কহি শুন আছে যেন দেখা ।
কথামৃত পূজনীয় মাস্টারের লেখা ॥ ৩২৭ ॥
মাস্টার বলিলে পরে অন্য কেহ নয় ।
একক মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয় ॥ ৩২৮ ॥
একজন ব্রাহ্ম ভক্ত প্রভুদেবে কন ।
পওহারী-বাবা নামে সাধু একজন ॥ ৩২৯ ॥
বড়ই মহাত্মা গাজিপুরে থানা তাঁর ।
ভক্তিভরে রাখে ঘরে ফটো আপনার ॥ ৩৩০ ॥
ঈষৎ আবেশ অঙ্গে প্রভুর এখন ।
এই কথা বার বার করিয়া শ্রবণ ॥ ৩৩১ ॥
শ্রীবয়ানে মৃদু হাস্য করিলা উত্তর ।
ফটো ছাপ শরীরের যাহা বিনশ্বর ॥ ৩৩২ ॥
তবে আছে এক কথা শুন পরিচয় ।
বিভুর বিরাজস্থান ভক্তের হৃদয় ॥ ৩৩৩ ॥
সত্য সর্বভূতে রাজে স্বতঃ ভগবান ।
ভক্তের হৃদয় তবু বিশেষতঃ স্থান ॥ ৩৩৪ ॥
উপমায় কন পরে যেন জমিদার ।
গোটা জমিদারিমধ্যে অনেক আগার ॥ ৩৩৫ ॥
তবু প্রীতি রহে তাঁর কোন এক স্থলে ।
সর্বদা যেখানে প্রায় দরশন মেলে ॥ ৩৩৬ ॥
সেইমত ভক্তদের হৃদয়ের স্থান ।
সদা বিরাজিত যেথা রন ভগবান ॥ ৩৩৭ ॥
এইখানে প্রভুদেব কহিলা সঙ্কেতে ।
যে রাখে প্রভুর মূর্তি ভক্তির সহিতে ॥ ৩৩৮ ॥
ঈশ্বরের আবির্ভাব সেই ঠাঁই রহে ।
কেন না বিরাজে প্রভু তাঁহার শ্রীদেহে ॥ ৩৩৯ ॥
শ্রীপ্রভুর দেহখানি দেখিবারে পাই ।
ঈশ্বরের বিলাসের সর্বোত্তম ঠাঁই ॥ ৩৪০ ॥
তাহার পশ্চাতে কন প্রভু গুণধাম ।
ভিন্ন ভিন্ন নাম গত সেই একা রাম ॥ ৩৪১ ॥
জ্ঞানিগণে ব্রহ্ম বলে আত্মা যোগিজনে ।
ভক্ত কহে ভগবান এক বস্তু তিনে ॥ ৩৪২ ॥
উপমায় একজন ব্রাহ্মণ যেমন ।
পুজারী উপাধিযুক্ত পূজায় যখন ॥ ৩৪৩ ॥
রাঁধুনি বামন নামে সবে ডাকে তারে ।
সেই সে ব্রাহ্মণ যবে পাককর্ম করে ॥ ৩৪৪ ॥
রুটি বিক্রি করে যদি শিরে লয়ে ডালা ।
তখন উপাধি রুটিবিস্কুটওয়ালা ॥ ৩৪৫ ॥
কার্য অবস্থার ভেদে নাম স্বতন্তর ।
কিন্তু সকলের মধ্যে সেই সে ঈশ্বর ॥ ৩৪৬ ॥
ভাঙ্গিয়া দিলেন হেথা প্রভু গুণমণি ।
সাকার কি নিরাকার সেই একা তিনি ॥ ৩৪৭ ॥
বিশেষিয়া বলিবারে কহেন এখন ।
জ্ঞানী যোগী ভক্ত এই তিনের লক্ষণ ॥ ৩৪৮ ॥
জ্ঞানী যিনি তাঁর মুখে নেতি নেতি রব ।
জীব ও জগতে কহে মিথ্যা এই সব ॥ ৩৪৯ ॥
নাম রূপ স্বপ্নবৎ ভ্রমাত্মক দৃশ্য ।
খালি সার বস্তু ব্রহ্ম সর্বস্ব উদ্দেশ্য ॥ ৩৫০ ॥
বিবেক বিরাগে শমে দমে জ্ঞানিবীর ।
বিচার-সহায়ে করে মনখানি স্থির ॥ ৩৫১ ॥
পশ্চাতে মনের লয়ে সমাধি যখন ।
উপলব্ধি ব্রহ্মজ্ঞান তাহার তখন ॥ ৩৫২ ॥
যোগিজনে নিরজনে স্থিরাসন করি ।
একমনে ধ্যান-চেষ্টা দিবাবিভাবরী ॥ ৩৫৩ ॥
বিষয় হইতে মন সংগ্রহকারণে ।
ধিয়ান উদ্দেশ্য তার অন্য নাহি মানে ॥ ৩৫৪ ॥
করগত যবে মন চেষ্টা পরে তার ।
পরম আত্মার সঙ্গে যোগ জীবাত্মার ॥ ৩৫৫ ॥
ভক্তগণ কি রকম শুন তবে কই ।
ভক্তেরা জানে না অন্যে ভগবান বই ॥ ৩৫৬ ॥
জীব ও জগৎ সত্য ভক্তদের মতে ।
জগতের স্রষ্টা তিনি জগৎ তাঁহাতে ॥ ৩৫৭ ॥
জীব জন্তু তরুলতা চন্দ্র সূর্য জল ।
চরাচর বিশ্ব তাঁর ঐশ্বর্য কেবল ॥ ৩৫৮ ॥
সকলেতে তিনি সব তাঁহার ভিতরে ।
অন্তরে বাহিরে তিনি ব্যাপ্ত চরাচরে ॥ ৩৫৯ ॥
শান্ত দাস্য নানা ভাবে ভক্ত ভুঞ্জে তাঁয় ।
চিনি না হইয়া চিনি আস্বাদিতে চায় ॥ ৩৬০ ॥
হইয়া একাগ্রমন ব্রাহ্মভক্তগণ ।
অমিয়বরযী কথা করিছে শ্রবণ ॥ ৩৬১ ॥
সুস্থির নীরব সবে মুখে নাই সাড়া ।
ফুলে মধুপানে মত্ত যেমন ভ্রমরা ॥ ৩৬২ ॥
নাহি মোটে আগেকার গুন গুন রব ।
বিশেষতঃ তার মধ্যে বিজয় কেশব ॥ ৩৬৩ ॥
পোতচক্র গঙ্গাবারি দুফালিয়া যায় ।
শুনে কানে তালা মারে এত শব্দ তায় ॥ ৩৬৪ ॥
কোথায় আছিল পোত এবে কোনখানে ।
অনিমিখে একাসনে কেহ নাহি জানে ॥ ৩৬৫ ॥
মোহিত দর্শকবৃন্দ দেখে প্রভূবরে ।
যাহার যেমন ভাব উদয় অন্তরে ॥ ৩৬৬ ॥
কেহ বা দেখিছে তাঁয় মহাত্যাগী যোগী ।
কেহ বা প্রেমানুরাগী প্রেমিক বৈরাগী ॥ ৩৬৭ ॥
কেহ দেখে মহাভক্ত প্রভু ভগবানে ।
কিছু না জানেন এক ভগবান বিনে ॥ ৩৬৮ ॥
ধন্য শ্রীকেশব ধন্য শিষ্যগণ তাঁর ।
সকলেরে ভক্তিভরে বন্দি বার বার ॥ ৩৬৯ ॥
পরে প্রভু গুণমণি প্রেমোন্মত্তে কন ।
ব্রহ্ম আর আদ্যাশক্তি তত্ত্বের কথন ॥ ৩৭০ ॥
সকল উড়িয়া যায় করিলে বিচার ।
অবস্তু জগৎ জীব ব্রহ্মবস্তু সার ॥ ৩৭১ ॥
কিন্তু এক কথা হেথা শুন বিবরণ ।
শক্তির রাজ্যেতে তুমি কর্মী যতক্ষণ ॥ ৩৭২ ॥
ধ্যান চিন্তা কর্ম আদি শক্তির ভিতরে ।
শক্তি বিনা কর্ম কেহ করিতে না পারে ॥ ৩৭৩ ॥
শক্তির এলাকা পারে তাহার গমন ।
মন লয়ে সমাধিস্ত হয় যেই জন ॥ ৩৭৪ ॥
শক্তির এলাকা তিন সৃষ্টি স্থিতি লয়ে ।
সেহেতু শক্তিতে ব্রহ্মে অভেদ উভয়ে ॥ ৩৭৫ ॥
শক্তি ছাড়া ব্রহ্ম ইহা হইতে না পারে ।
কিবা কথা দিনকর বাদ দিলে করে ॥ ৩৭৬ ॥
ভাবিলেই অগ্নি তার সঙ্গে দাহ্য গুণ ।
ছাড়িলে দাহিকা শক্তি রহে কি আগুন ॥ ৩৭৬ ॥
দোঁহে দোঁহা মিশামিশি একের মতন ।
শক্তিহীন ব্রহ্ম নাহি হয় কদাচন ॥ ৩৭৭ ॥
সৃষ্টি স্থিতি লয় এই তিন কর্ম যাঁর ।
লীলাময়ী আদ্যাশক্তি কালী নাম তাঁর ॥ ৩৭৮ ॥
শ্রীকেশব এইখানে পুছে প্রভুদেবে ।
কালী করিছেন লীলা কত মত ভাবে ॥ ৩৭৯ ॥
হাস্যাননে ভগবান করেন বাখান ।
মহাকালী নিত্যকালী তন্ত্রে যাঁর নাম ॥ ৩৮০ ॥
যখন ছিল না সৃষ্টি চন্দ্র সূর্য তারা ।
তখন আঁধারময়ী তিনি নিরাকারা ॥ ৩৮১ ॥
শ্যামাকালী তিনি যায় বরাভয় করে ।
ভক্তিভরে পূজে যাঁর গৃহস্থেরা ঘরে ॥ ৩৮২ ॥
ঘোর মন্বন্তর হয় ধরায় যখন ।
অতিবৃষ্টি মহামারী দুর্ভিক্ষ ভীষণ ॥ ৩৮৩ ॥
যে কালী করেন রক্ষা এমন দুস্তরে ।
রক্ষাকালী নাম তাঁর বিদিত সংসারে ॥ ৩৮৪ ॥
সংহারকারিণী যিনি ভীমা ভয়ঙ্করা ।
ডাকিনী-যোগিনী-ভূত-শিবা-সহচরা ॥ ৩৮৫ ॥
সর্বাঙ্গে রুধিরধারা মুণ্ডমালা গলে ।
নরহস্তকটিবন্ধ কটিদেশে ঝুলে ॥ ৩৮৬ ॥
শবারূঢ়া শব-প্রিয়া শ্মশানবাসিনী ।
তিনিই শ্মশানকালী ভীম-নিনাদিনী ॥ ৩৮৭ ॥
জান কি মায়ের কর্ম প্রলয়ের পরে ।
কুড়ায়ে সৃষ্টির বীজ আপনার করে ॥ ৩৮৮ ॥
যত্নসহকারে তিনি রাখেন আপনি ।
নানা বস্তু রাখে যেন ঘরের গৃহিণী ॥ ৩৮৯ ॥
ঘরে যিনি পাকা গিন্নী দূরদর্শী ভারি ।
তাঁর অধিকারে থাকে ন্যাতাক্যাতা হাঁড়ি ॥ ৩৯০ ॥
সহস্র পুটুলি তায় রহে দ্রব্য নানা ।
কোনটিতে বাঁধা আছে সমুদ্রের ফেনা ॥ ৩৯১ ॥
কোনটিতে নীলবড়ী মৃত্তিকার কুচি ।
কোনটিতে লাউ শশা কুমড়ার বিচি ॥৩৯২ ॥
সেইমত এইখানে মায়ের ধরন ।
সকল সঞ্চয় পুনঃ সৃষ্টির কারণ ॥ ৩৯৩ ॥
প্রসবিয়া জগৎ মা কালী পুনরায় ।
সদা বিরাজিত রহে জগতে হেথায় ॥ ৩৯৪ ॥
ঊর্ণনাভ বিস্তারিয়া জাল যেইমত ।
সেই সে জালের মধ্যে বসতি সতত ॥ ৩৯৫ ॥
সৃষ্টির ঈশ্বর যিনি সৃষ্টিখানি যাঁর ।
তিনিই সৃষ্টিতে দুই আধেয় আধার ॥ ৩৯৬ ॥
কালী ব্রহ্ম ব্রহ্ম কালী সেই এক জন ।
ব্রহ্মোপাধি তাঁর তিনি নিষ্ক্রিয় যখন ॥ ৩৯৭ ॥
সৃষ্টি-স্থিতি-লয়-কাজে থাকিলেই রত ।
তখন তিনিই কালী নামে অভিহিত ॥ ৩৯৮ ॥
দোঁহে দোঁহা এক তত্ত্ব বুঝিবে নিশ্চয় ।
অবস্থার ভেদ মাত্র অন্য কিছু নয় ॥ ৩৯৯ ॥
ব্রহ্ম আর ব্রহ্মশক্তি প্রভুদেবরায় ।
বুঝাইলা যেইরূপ সরল কথায় ॥ ৪০০ ॥
সহজ উপমা-সহ সহজে সরলে ।
এমন কোথাও নাই শুনি কোন কালে ॥ ৪০১ ॥
দুরবোধ্য তত্ত্ব জীবে হইবে বিদিতি ।
শ্রবণ-কীর্তনে রামকৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ৪০২ ॥
রামকৃষ্ণপুঁথি এই রতন-ভাণ্ডার ।
সে পাবে
তাহাই মনে কামনা যা যার ॥ ৪০৩ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভক্তের ভজনা ও অধরের ঘরে মহোৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার ভক্তের নিকর ।
সবার চরণরেণু মাগে এ কিঙ্কর ॥
অদ্যাবাধি যুগে যুগে যত অবতার ।
একা রামকৃষ্ণ প্রভু সমষ্টি সবার ॥ ১ ॥
দেশ-কাল-পাত্র-ভেদে অবতারগণ ।
প্রত্যেকে স্বতন্ত্র পথ কৈলা প্রদর্শন ॥ ২ ॥
কোন মতে মুক্তির কারণ একা জ্ঞান ।
মুক্তি-মূল ভক্তি কেহ করিলা বাখান ॥ ৩ ॥
দ্বৈতজ্ঞান ভ্রমাত্মক কহে কোনখানে ।
কোন মতে তাহে অতি শ্রেষ্ঠতর মানে ॥ ৪ ॥
কাহারও সিদ্ধান্ত মুক্তি কর্মের ভিতরে ।
কর্ম দিয়া কাট কর্ম নিস্তারের তরে ॥ ৫ ॥
মেঘ দিয়া মেঘ ঠেলি বন যেমন ।
প্রকাশে জলদে ঢাকা চাঁদের কিরণ ॥ ৬ ॥
কোথাও দিলেন শিক্ষা যত জীবগণে ।
কলিতে কেবল গতি খালি হরিনামে ॥ ৭ ॥
কোন অবতারে কহে একা আমি সার ।
আমার শরণে মাত্র জীবের উদ্ধার ॥ ৮ ॥
এরূপে বিভিন্ন ভাবে অবতার-দলে ।
প্রচলিত নানা মত কৈলা কালে কালে ॥ ৯ ॥
সর্বসামঞ্জস্যভাব প্রভুর মতন ।
কুত্রাপি কোথাও নাহি হয় দরশন ॥ ১০ ॥
এক ঠাঁই মিলে তাঁর শ্রীকৃষ্ণের সনে ।
যেখানে কহেন গীতা পাণ্ডব অর্জুনে ॥ ১১ ॥
ভক্তমুখে শুনা লেখা গীতার ভিতরে ।
যে যে ভাবে ভজে কৃষ্ণ তেন ভজে তারে ॥ ১২ ॥
প্রভুতে প্রফুল্লভাব সকল রকম ।
সেই তাই পায় যার বাসনা যেমন ॥ ১৩ ॥
দেহখানি শ্রীপ্রভুর সুরম্য বাগান ।
ফুলরূপে সব ধর্ম তাহে বিদ্যমান ॥ ১৪ ॥
বিশ্বজননীর বেশে তাঁর আবির্ভাব ।
বাহ্যিকে কোমল মৃদু প্রকৃতির ভাব ॥ ১৫ ॥
কিন্তু তাঁর ভিতরের আর অন্য রূপ ।
জ্ঞানানন্দ জ্ঞানময় জ্ঞানের স্বরূপ ॥ ১৬ ॥
ত্যাগীশ্বর যোগিবর পুরুষ-প্রধান ।
নিরৈশ্বর্যে ষড়ৈশ্বর্যবান ভগবান ॥ ১৭ ॥
ভাবমুখ প্রভুদেব ভক্তি-আবরণে ।
খেলিলেন কাল মত লীলার প্রাঙ্গণে ॥ ১৮ ॥
সৃষ্টিবেড়া মনখানি জ্ঞানের প্রভায় ।
ভক্তিতে গভীর এত পাতালে হারায় ॥ ১৯ ॥
জ্ঞানভক্তি দুই ভাবে সীমার অতীত ।
এদিকে মাধুর্যরসে বিশ্ব বিমোহিত ॥ ২০ ॥
নিজে ইষ্ট গুরুবেশে প্রকাশ লীলায় ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভক্তদাস গায় ॥ ২১ ॥
একদিন গিরিশ দেবেন্দ্র দুই জন ।
প্রভুর প্রসঙ্গকথা করে আন্দোলন ॥ ২২ ॥
ভক্তির উচ্ছ্বাসে দোঁহে অতি মাতোয়ারা ।
প্রভুপদপঙ্কজের নবীন ভ্রমরা ॥ ২৩ ॥
দেবেন্দ্র কহেন আমি শুনিয়াছি কানে ।
অপর কোথাও নয় প্রভুর সদনে ॥ ২৪ ॥
হরিনাম-মাহাত্ম্যের অতি উচ্চ ফল ।
লইলে সমল মন অচিরে নির্মল ॥ ২৫ ॥
শাস্ত্রেও ইহার আছে প্রচুর প্রমাণ ।
আগাগোড়া দেয় সাক্ষ্য আগোটা পুরাণ ॥ ২৬ ॥
বড়ই লাগিল কথা গিরিশের প্রাণে ।
বারেক হরির নাম লইয়া বদনে ॥ ২৭ ॥
কোথায় হইবে নামে অন্তর শীতল ।
এখানে ফলিল অতি সুবিমল ফল ॥ ২৮ ॥
প্রবেশিল হলাহল সাপের দংশনে ।
যেইমত জ্বলে দেহ তার শতগুণে ॥ ২৯ ॥
উঠিল অসহ্য জ্বালা গিরিশের গায় ।
বারেক বলিয়া হরিনাম রসনায় ॥ ৩০ ॥
গিরিশের একটানা প্রবল গিয়ান ।
ভবের
কাণ্ডারী গুরু যার বিদ্যমান ॥ ৩১ ॥
তদুপরি কেন তাঁর হরিনাম বলা ।
গুরুনামে অবিশ্বাস তাই গায়ে জ্বালা ॥ ৩২ ॥
গুরু ইষ্ট ভেদাভেদ জানিবার তরে ।
গমন দেবেন্দ্রসহ দক্ষিণশহরে ॥ ৩৩ ॥
বিরাজেন যেইখানে প্রভু নারায়ণ ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু সন্দেহমোচন ॥ ৩৪ ॥
তত্ত্বকথা-উত্থাপনে অতি মত্ততর ।
ভক্তবৃন্দে সুবেষ্টিত প্রভু গুণধর ॥ ৩৫ ॥
কহিছেন
জ্ঞানভক্তিযুক্তি প্রদায়িনী ।
নিগূঢ় তত্ত্বের সার মধুর কাহিনী ॥ ৩৬ ॥
বিশ্বাসে অটল গুরু সুমেরু সমান ।
সমুজ্জ্বলা গুরুভক্তি হৃদে মূর্তিমান ॥ ৩৭ ॥
গিরিশ যেমন হেন প্রভু অবতারে ।
দ্বিতীয় কেহই নাই ভক্তের ভিতরে ॥ ৩৮ ॥
আনন্দের সিন্ধু প্রভু বিশাল আধারে ।
তত্ত্ব-কথা-আন্দোলন পবন সঞ্চারে ॥ ৩৯ ॥
সুমন্দ খেলিতেছিল আনন্দ-লহরী ।
এবে প্রিয়তম ভক্ত শ্রীগিরিশে হেরি ॥ ৪০ ॥
উথলিয়া মহানন্দে সুবিস্তৃত কায় ।
প্রবল জুয়ার-বেগ বহিল তাহায় ॥ ৪১ ॥
সাদর সম্ভাষে দিয়া সন্নিকটে স্থান ।
বসাইলা প্রিয় ভক্তে প্রভু ভগবান ॥ ৪২ ॥
শ্রীমুখে শুনিতে কথা সন্দেহ-বিনাশে ।
ভক্তবর জিজ্ঞাসিল প্রভু পরমেশে ॥ ৪৩ ॥
আপনার প্রশ্ন যাহা যাহে মনে খেদ ।
গুরু ইষ্ট এক কিংবা তাহে আছে ভেদ ॥ ৪৪ ॥
সমভাবে সব প্রিয় শ্রীপ্রভুর কাছে ।
চলিত প্রসঙ্গে রস ভঙ্গ হয় পাছে ॥ ৪৫ ॥
সে সময়ে নাহি দিয়া উত্তর কথায় ।
একটানে কন কথা প্রভু দেবরায় ॥ ৪৬ ॥
সর্বমনোবিমোহন রসের সাগর ।
শ্রোতাদের মনোমত মনতৃপ্তিকর ॥ ৪৭ ॥
ক্রমে পেয়ে অবসর প্রসঙ্গমাঝারে ।
কহেন গিরিশচন্দ্রে কথার উত্তরে ॥ ৪৮ ॥
সুধীর মধুর স্বরে জগৎগোসাঁই ।
গুরু ইষ্ট এক বস্তু ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ৪৯ ॥
গুরু ইষ্ট স্বতন্তর সাধারণে জানে ।
মন্ত্রদাতা যিনি তাঁরে গুরু বলি মানে ॥ ৫০ ॥
মন্ত্ররূপে মন্ত্রমধ্যে নিবাস যাঁহার ।
তিনি ইষ্ট পরাবস্তু সকলের সার ॥ ৫১ ॥
কিন্তু এবে ভক্তবরে কহিলা গোসাঁই ।
যেই গুরু সেই ইষ্ট ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ৫২ ॥
ইহার কারণ কথা শুন কই মন ।
রামকৃষ্ণলীলাগাথা অমিয় কথন ॥ ৫৩ ॥
ভক্তগণ ঈশ্বরের জীবনজীবন ।
ভক্তের নিকটে তাঁর রহে না গোপন ॥ ৫৪ ॥
লীলায় করিয়া রঙ্গ ভক্তদের সনে ।
নিজের স্বরূপতত্ব দেন সাধারণে ॥ ৫৫ ॥
গিরিশের সঙ্গে প্রভু কহি এই কথা ।
জগতে দিলেন আজি স্বরূপ-বারতা ॥ ৫৬ ॥
সঙ্কেতে ইঙ্গিতে না প্রত্যক্ষ চাক্ষুষে ।
নিজে প্রভু সেই ইষ্ট শ্রীগুরুর বেশে ॥ ৫৭ ॥
গিরিশে দেখায়ে দিলা নিজের চেহারা ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা ভক্তে দিলা ধরা ॥ ৫৮ ॥
একে তো গিরিশ ঘোষ কারে নাহি ডর ।
ধরাবেড়া ছাতিখানি নির্ভীক অন্তর ॥ ৫৯ ॥
হইলেও অপকর্ম স্বেচ্ছামত করে ।
জনগণ সাধারণ সবার গোচরে ॥ ৬০ ॥
তদুপরি পাইয়া প্রভুর পরিচয় ।
ফিরিলা অপারানন্দে আপন আলয় ॥ ৬১ ॥
মদে মত্ত বীর ভক্ত ঢালে অনর্গল ।
পরম পিয়ারা সুরা বোতল বোতল ॥ ৬২ ॥
এবে অতি শোচনীয় সময়ের ধারা ।
সাধারণ জনগণ ভক্তিহীন যাঁরা ॥ ৬৩ ॥
অনেকে প্রভুর নামে করে উপহাস ।
রঙ্গসহ শ্রুতিকটু ব্যঙ্গপূর্ণ ভাষ ॥ ৬৪ ॥
ভাবী ভক্ত শ্রীপ্রভুর বহুমতিমান ।
লীলাধামে শ্রীপ্রভুর সঙ্গে আগুয়ান ॥ ৬৫ ॥
চিনিতে অক্ষম অদ্যাপিহ গুণধামে ।
তাঁহারাও নানা কথা কন নানা স্থানে ॥ ৬৬ ॥
গিরিশের ঘরে তার কনিষ্ঠ সোদর ।
অতুল তাহার নাম সরল-অন্তর ॥ ৬৭ ॥
কোর্টের উকিল তিনি পরম পণ্ডিত ।
এখন প্রভৃতে তাঁর ভাব বিপরীত ॥ ৬৮ ॥
গিরিশের মুখে শুনি প্রভুর বারতা ।
উপহাস-সহ তেঁহ কহে কত কথা ॥ ৬৯ ॥
ব্যঙ্গ করি প্রভুদেবে রাজহংস কয় ।
গিরিশের প্রাণে তাহা সহ্য নাহি হয় ॥ ৭০ ॥
অতুল প্রভুর ভক্ত এবে এই রীতি ।
পরে কি হইল পাবে অপূর্ব ভারতী ॥ ৭১ ॥
আমি অতিশয় মূর্খ জান তুমি মন ।
শাস্ত্র কিংবা গ্রন্থ পাঠ নাহিক কখন ॥ ৭২ ॥
ভক্তমুখে একমাত্র আছে মোর শুনা ।
ভক্তে করে ঈশ্বরের সাধন-ভজনা ॥ ৭৩ ॥
কিন্তু প্রভু-অবতারে দেখিবারে পাই ।
ভক্তের ভজনা কৈলা আপনি গোসাঁই ॥ ৭৪ ॥
ভক্ত বিনা যেন তাঁর কেহ নাহি আর ।
তিল অদর্শনে বোধ ত্রিলোক আঁধার ॥ ৭৫ ॥
অনিবার আঁখিবারি হয় বরিষণ ।
আখি দুটি বরিষার জলদ যেমন ॥ ৭৬ ॥
একদিন প্রভুদেব নিজের মন্দিরে ।
ঝরে অশ্রু, গণ্ড বেয়ে নরেন্দ্রের তরে ॥ ৭৭ ॥
প্রভুর অবশ বড় নরেন্দ্র এখন ।
নিকটে আসেন তাঁর যবে হয় মন ॥ ৭৮ ॥
শ্রীপ্রভুর ইচ্ছা রহে কাছে নিরন্তর ।
নরেন্দ্রের সঙ্গসুখ অতি সুখকর ॥ ৭৯ ॥
প্রাণাধিক ভালবাসা তাঁহার উপরে ।
বিচ্ছেদ-বেদনা তাই আঁখি দুটি ঝরে ॥ ৮০ ॥
বিষাদিত প্রভুদেবে বিশেষ দেখিয়া ।
হাজরা প্রতাপচন্দ্র সন্নিকটে গিয়া ॥ ৮১ ॥
জিজ্ঞাসা করিল তাঁয় সমাশ্চর্য মন ।
কিহেতু নয়নে হয় বারি-বরিষণ ॥ ৮২ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া সবিশেষ সমাচার ।
সান্ত্বনাস্বরূপে কহে প্রভুরে আমার ॥ ৮৩ ॥
আপনি পুরুষ মুক্ত বিহীন-বন্ধন ।
এর জন্য তাঁর জন্য কান্না কি কারণ ॥ ৮৪ ॥
সতত বিভোর হয়ে আপনা আপনে ।
নিশ্চিন্ত থাকুন বসে শাস্তির আসনে ॥ ৮৫ ॥
প্রভুর স্বভাব যেন শিশুমতি ছেলে ।
সহজে বুঝেন তাই যেবা যাহা বলে ॥ ৮৬ ॥
এত বলি পরিহরি নরেন্দ্রের খেদ ।
শ্রীদেহ হইতে নিজে হইয়া প্রভেদ ॥ ৮৭ ॥
আপনা আপনে কত করেন গমন ।
পঞ্চবটমূলে যেথা যোগের আসন ॥ ৮৮ ॥
কিছু পরে ধীরে ধীরে মন্দিরে ফিরিয়া ।
হাজরায় শালা বলি গালাগালি দিয়া ॥ ৮৯ ॥
বলিলেন প্রভুদেব সকোপ বচন ।
আত্মসুখ একেবারে করি বিসর্জন ॥ ৯০ ॥
আগোটা জীবনে কষ্ট সহিয়া অপার ।
যদি করিবারে পারি লোক-উপকার ॥ ৯১ ॥
তাহাও আমার পক্ষে অতীব উত্তম ।
দয়াময়ী মা আমায় কহিল এখন ॥ ৯২ ॥
এত বলি পুনঃ চক্ষে বহে অশ্রুনীর ।
নরেন্দ্রের জন্য প্রাণ বড়ই অস্থির ॥ ৯৩ ॥
ভক্তের ভজনা শ্রীপ্রভুর কি রকম ।
শুন মন কিছু তার কহি বিবরণ ॥ ৯৪ ॥
সাধ বলি কিন্তু মুখে নাহি যায় বলা ।
ভক্তসঙ্গে অবতারে অপরূপ লীলা ॥ ৯৫ ॥
বিচিত্র সম্বন্ধ তাঁর ভক্তদের সনে ।
কাহিনী যদ্যপি কেহ সবিশ্বাসে শুনে ॥ ৯৬ ॥
অবহেলে মিলে রামকৃষ্ণভক্তি তাঁর ।
রামকৃষ্ণলীলাগীত ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৯৭ ॥
সুহৃদ্ সোহাগা সঙ্গে সুবর্ণ যেমন ।
হয় ঢল ঢল কায় জলের মতন ॥ ৯৮ ॥
লাবণ্য-বরন-বৃদ্ধি শতগুণে তার ।
নরেন্দ্রে পাইলে তেন প্রভুদেবরায় ॥ ৯৯ ॥
ফুরাতে না চায় কথা নরেন্দ্রের সনে ।
প্রভুর বাসনা কথা চলে রেতেদিনে ॥ ১০০ ॥
রঙ্গের তরঙ্গমালা উঠে মাঝে মাঝে ।
শুন ভক্তে ভগবান কি প্রকারে ভজে ॥ ১০১ ॥
পূর্বজন্মে শ্রীনরেন্দ্র কে ছিলেন তিনি ।
স্বভাব-চরিত্র কিবা যাবৎ কাহিনী ॥ ১০২ ॥
বিবরিয়া প্রভুদেব করেন বাখান ।
নরেন্দ্র তাহাতে মোটে নাহি দেন কান ॥ ১০৩ ॥
প্রকাশিতে নিজলীলা প্রভু নারায়ণ ।
কথায় নরেন্দ্রনাথে দেখি অন্যমন ॥ ১০৪ ॥
কহেন
সুধীর স্বরে মধুরাতিশয় ।
তোরে না বলিলে কথা জ্বলে ওষ্ঠদ্বয় ॥ ১০৫ ॥
প্রভু প্রতি নরেন্দ্রের প্রত্যুত্তর-বাণী ।
স্বভাবে নাস্তিক মুই ঈশ্বর না মানি ॥ ১০৬ ॥
তোমার এ সব কথা শুনিতে না চাই ।
অন্তরে এ সব কথা নাহি পায় ঠাঁই ॥ ১০৭ ॥
এত বলি উঠিয়া চলিয়া যান ত্বরা ।
যেখানে তামাক খায় প্রতাপ হাজরা ॥ ১০৮ ॥
প্রভু না ছাড়েন তাঁরে পাছু ধাবমান ।
বলিতে বলিতে লীলাতত্বের আখ্যান ॥ ১০৯ ॥
দেখ কিবা ভালবাসা ভকতে প্রভুর ।
শুনিলে গাইলে লীলা তাপত্রয় দূর ॥ ১১০ ॥
সতত চিন্তিত প্রভু ভক্তের কারণে ।
সকলে রাখেন তিনি নয়নে নয়নে ॥ ১১১ ॥
কেবা রহে কোনখানে কেবা কিবা করে ।
আতঙ্কপুর্ণিত এই সংসার ভিতরে ॥ ১১২ ॥
একদিন শ্রীমন্দিরে প্রভু গুণমণি ।
উপবিষ্ট নিকটে গোলাপঠাকুরানী ॥ ১১৩ ॥
সম্বোধিয়া তাঁহারে শ্রীপ্রভুদেব কন ।
দেখ আমি দেখিতেছি যেন নিরঞ্জন ॥ ১১৪ ॥
পরম সুন্দর অঙ্গ তেজঃপুঞ্জ তনু ।
খেলিছে শিশুর সম হাতে শর-ধনু ॥ ১১৫ ॥
বলিতে বলিতে কথা বাহ্য গেল চলে ।
উদিল অপূর্ব ভাতি শ্রীমুখমণ্ডলে ॥ ১১৬ ॥
আদিত্য উদয়াচলে উদিলে যেমন ।
ভাসে দিশি ধরি এক অপূর্ব বরন ॥ ১১৭ ॥
গভীর ধিয়ানে গত ধীর স্থির চিত ।
যাহার প্রভাবে প্রভু সকলি বিদিত ॥ ১১৮ ॥
উন্মীলিত আঁখি যেন দৃষ্টিরোধ করে ।
মুদিলে বিশাল বিশ্ব চক্ষের উপরে ॥ ১১৯ ॥
কিছু পরে ধীরে ধীরে শ্রীদেহে যখন ।
আসিতে লাগিল তাঁর দেহ-ছাড়া মন ॥ ১২০ ॥
শ্রীঅঙ্গে স্পন্দন-চিহ্ন হইল প্রকাশ ।
রসনায় বাহিরায় জড় জড় ভাব ॥ ১২১ ॥
সেই আধজড় স্বরে কন গুণমণি ।
ধ্যানে দরশন যাহা তাহার কাহিনী ॥ ১২২ ॥
ক্রমে ক্রমে বহু পরে আইল চেতন ।
এমন সময় দেখা দিল নিরঞ্জন ॥ ১২৩ ॥
কুতূহলে গোলাপ-মা জিজ্ঞাসিল তাঁয় ।
নিরঞ্জন এতক্ষণ আছিল কোথায় ॥ ১২৪ ॥
সতত সহাস্যমুখ কহে ভক্তবর ।
খেলিতেছিলাম আমি লয়ে ধনুঃশর ॥ ১২৫ ॥
বহুদুরে নির্জনে একাকী উপবনে ।
অবাক্ গোলাপমাতা তাঁহার বচনে ॥ ১২৬ ॥
ঈশ্বর-কোটির ভক্ত নিত্যনিরঞ্জন ।
রামের অংশেতে জন্ম প্রভুর বচন ॥ ১২৭ ॥
লক্ষণ তাহার লেখা তাঁহার স্বভাবে ।
বড় প্রিয় অস্ত্রশস্ত্র সশর গাণ্ডীবে ॥ ১২৮ ॥
অপর যতেক পরে পাবে সমাচার ।
শুন ভক্ত-সংজোটন অমৃতভাণ্ডার ॥ ১২৯ ॥
আর দিন শ্রীমন্দির প্রভুদেবরায় ।
বড়ই চঞ্চল বেলা প্রহরেক প্রায় ॥ ১৩০ ॥
ইতি-উতি নিরীক্ষণ করেন আপনি ।
হেনকালে আইলা গোলাপ-ঠাকুরানী ॥ ১৩১ ॥
শ্রীপ্রভু কহেন তাঁর সমুৎসুক মনে ।
কাছে যদু মল্লিকের উদ্যানভবনে ॥ ১৩২ ॥
যাইতে প্রবল ইচ্ছা যাইব এখনি ।
একাকী কেমনে যাই সঙ্গে চল তুমি ॥ ১৩৩ ॥
দ্রুতপদ-সঞ্চালনে প্রভুর গমন ।
পাছুতে গোলাপ মাতা শ্রীআজ্ঞা যেমন ॥ ১৩৪ ॥
উতরিয়া দেখিলেন প্রভু গুণধর ।
নিরজন কক্ষে এক উদ্যানভিতর ॥ ১৩৫ ॥
পুজোপকরণ পূর্ণ আধারে আধারে ।
মল্লিকের মাসীমাতা শিবপূজা করে ॥ ১৩৬ ॥
ভক্তিমতী মাসীমাতা ধার্মিক-আচার ।
নিত্য কর্ম শিবপূজা সহ-উপচার ॥ ১৩৭ ॥
আশ্চর্য ঘটনা কিবা শুন পরিচয় ।
শিবপূজা সেইদিনে আর নাহি হয় ॥ ১৩৮ ॥
নিবেদিতে নৈবেদ্যাদি শিবের স্মরণে ।
কেবল প্রভুর মূর্তি খালি পড়ে মনে ॥ ১৩৯ ॥
হৃদয়-অন্তরযামী প্রভুদেবরায় ।
এমন সময় গিয়া হাজির তথায় ॥ ১৪০ ॥
চমকিয়া বৃদ্ধা তাঁয় করি দরশন ।
পরিহরি পূজা দিল বসিতে আসন ॥ ১৪১ ॥
আনন্দ মগন মন অতীব কৌতুকে ।
ধরিল নৈবেদ্য-থাল প্রভুর সম্মুখে ॥ ১৪২ ॥
শ্রীঅঙ্গে উঠিল তবে আবেশ-লক্ষণ ।
ধীরে ধীরে ক্রমে পরে নৈবেদ্য-ভক্ষণ ॥ ১৪৩ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু লীলার দেবতা ।
ভক্তসঙ্গে খেলা তাঁর সুমধুর কথা ॥ ১৪৪ ॥
সবিশ্বাসে বারতা শুনহ তুমি মন ।
ভক্তির ভাণ্ডার এই ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৪৫ ॥
কামারহাটির সেই বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ।
প্রভুর প্রদত্ত নাম গোপাল-জননী ॥ ১৪৬ ॥
গোপালের মা বলিয়া ভক্তগণে বলে ।
আজন্ম কাটিল যাঁর সুরধুনীকূলে ॥ ১৪৭ ॥
স্বভাবেতে তিয়াগিনী ঈশ্বরানুরাগে ।
সংসারীর গাত্রগন্ধ নারকীয় লাগে ॥ ১৪৮ ॥
সংসারীর দত্ত দ্রব্য বিষের মতন ।
অতি ঘৃণা-সহকারে করে বিসর্জন ॥ ১৪৯ ॥
মায়ের মন্দিরে হেথা পুরীর ভিতরে ।
ভক্তিমতী স্ত্রীলোকেরা রহে একত্তরে ॥ ১৫০ ॥
ভক্তিভক্তভাবে ভক্তি করে পরস্পর ।
বারেক গোলাপ-মাতা কিনিয়া কাপড় ॥ ১৫১ ॥
পরম যতনে দিল গোপালের মায় ।
ভক্তিভরে পদধূলা লইয়া মাথায় ॥ ১৫২ ॥
সংসারী গোলাপ-মাতা সেহেতু বসন ।
গোপনে ব্রাহ্মণী কৈল অন্যে বিতরণ ॥ ১৫৩ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব জানিয়া বারতা ।
শুন কি করিলা খেলা অপরূপ কথা ॥ ১৫৪ ॥
দিনেকে গোলাপ-মাতা সেবা কর্মে বীর ।
মাজ না করেন প্রাতে প্রভুর মন্দির ॥ ১৫৫ ॥
উপবিষ্ট খট্টায় শ্রীপ্রভু গুণমণি ।
হেনকালে দিল দেখা বৃন্ধক ব্রাহ্মণী ॥ ১৫৬ ॥
প্রভুর হৃদয়খানি অপার সাগর ।
ভাবের তরঙ্গ তাহে উঠে নিরন্তর ॥ ১৫৭ ॥
দেহি দোঁহে ভাবাবেশে হইয়া মগন ।
গোলাপ-মাতার স্কন্ধে কৈলা আরোহণ ॥ ১৫৮ ॥
অদূরে দণ্ডায়মানা বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ।
অবাক হইয়া দেখে আশ্চর্য কাহিনী ॥ ১৫৯ ॥
দিব্যকলেবরধারী দেবদেবীগণ ।
নৃত্য করে প্রভুদেবে করিয়া বেষ্টন ॥ ১৬০ ॥
শ্রীপ্রভুদেবের ভাবাবেশ-অবসানে ।
বাসলেন পুনঃ খাটে বিশ্রামের স্থানে ॥ ১৬১ ॥
ব্যাপার দেখিয়া চক্ষে বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ।
কাটে দিন মৌনভাবে মুখে নাহি বাণী ॥ ১৬২ ॥
সেদিনে গোলাপ-মাতা আহারে যখন ।
ব্রাহ্মণী নিকটে তাঁর করি আগমন ॥ ১৬৩ ॥
তাড়াতাড়ি প্রসাদ কাড়িয়া লয়ে খায় ।
দুনয়নে বারিধারা বক্ষ ভেসে যায় ॥ ১৬৪ ॥
উচ্ছ্বাস অন্তরে কহে গদগদস্বরে ।
যাবৎ ঘটনা দেখা প্রভুর মন্দিরে ॥ ১৬৫ ॥
সংসারিগিয়ানে ভক্তে করিয়াছে ঘৃণা ।
সেহেতু মাগেন অপরাধের মার্জনা ॥ ১৬৬ ॥
ঢিল দিয়া ঢিল ভাঙ্গা প্রভুর কেমন ।
শুন লীলা ভবসিন্ধুপারের কারণ ॥ ১৬৭ ॥
সন্ন্যাসী বলিলে মনে যেন হয় মন ।
ভস্মমাথা জটাধারী বাঘের আসন ॥ ১৬৮ ॥
ভিক্ষাবৃত্তি
অতিথি সতত ভ্রাম্যমাণ ।
শীতাতপে বরিষায় কষ্ট অবিরাম ॥ ১৬৯ ॥
কুমার-সন্ন্যাসী নামে গায় যাঁর পুঁথি ।
তাঁহাদের সঙ্গে নাই এ সব প্রকৃতি ॥ ১৭০ ॥
বালকবয়স সবে মা-বাপের কোলে ।
সামান্য সরল সাদা যেমন সকলে ॥ ১৭১ ॥
ভিতরেতে অলৌকিক ভাব বিপরীত ।
স্বভাবতঃ প্রভুপদে অপার পিরীত ॥ ১৭২ ॥
না দেখিয়া প্রভুদেবে থাকিতে না পারে ।
মাঝে মাঝে আসে তাই দক্ষিণশহরে ॥ ১৭৩ ॥
বিদ্যার্জনে উদাসীন ক্রমে ক্রমে হয় ।
তেকারণে পিতামাতা কত কটু কয় ॥ ১৭৪ ॥
প্রভুকেও কহে কটু আসিয়া নিকটে ।
ছেলেধরা রীতি তাঁর অপবাদ রটে ॥ ১৭৫ ॥
আবাসে আটকে কভু রাখে পুত্রগণে ।
করন প্রহার করে নিদারুণ প্রাণে ॥ ১৭৬ ॥
ভক্তদের পিতামাতা বিষয়ী সকলে ।
দিবারাতি এক চিন্তা ধন-মান-ছেলে ॥ ১৭৭ ॥
ধর্মের কেমন ভাব কালে প্রচলিত ।
সহজে বুঝিবে মন শুন লীলাগীত ॥ ১৭৮ ॥
হেন বংশে প্রভুভক্ত উপমার স্থল ।
গোময় কুণ্ডেতে যেন প্রফুল্ল কমল ॥ ১৭৯ ॥
ভক্তবংশে প্রভুভক্ত যাঁদের জনম ।
এমন প্রভুর ভক্ত অতিশয় কম ॥ ১৮০ ॥
একমাত্র বলরাম বসু জমিদার ।
দ্বিতীয় তাঁহার মত মেলা অতি ভার ॥ ১৮১ ॥
কুটুম্ব বান্ধব ভক্ত আত্মীয়-স্বজন ।
বহুপূর্বে বলিয়াছি যত বিবরণ ॥ ১৮২ ॥
প্রভুভক্তচূড়ামণি তাঁহার শ্যালক ।
বাবুরাম নামে খ্যাত বয়সে বালক ॥ ১৮৩ ॥
বাবুরামে প্রভুদেব আপনি গোসাঁই ।
ভিক্ষা মাগিলেন তাঁর জননীর ঠাঁই ॥ ১৮৪ ॥
ভক্তিমতী নিজে বুঝে ভক্তির মরম ।
নন্দনে আনন্দ-মনে কৈল সমর্পণ ॥ ১৮৫ ॥
আর এক ভক্তগোষ্ঠী কোন্নগরে ঘর ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র গৃহী ভক্তবর ॥ ১৮৬ ॥
রত্নগর্ভা জননীর ভক্তি হৃদে ভরা ।
সকলেই ভক্তিমতী যতেক কন্যারা ॥ ১৮৭ ॥
নন্দিনীগণের মধ্যে সর্ব উচ্চ স্থান ।
রাখাল-বনিতা যাঁর বিশ্বেশ্বরী নাম ॥ ১৮৮ ॥
অচলা ভকতি তাঁর প্রভুর চরণে ।
যখন তখন আসে প্রভু-দরশনে ॥ ১৮৯ ॥
রাখাল বিশাই দুয়ে নিজের প্রভুর ।
দিনেকে দুজনে পেয়ে লীলার ঠাকুর ॥ ১৯০ ॥
জিজ্ঞাসা করিলা দোঁহে সহাস্য আননে ।
কাহার বাসনা কিবা আছে মনে মনে ॥ ১৯১ ॥
দীন ক্ষীণ মৃদুভাবে কহিল বিশাই ।
হৃদয়ে বাসনা মোর কিছুমাত্র নাই ॥ ১৯২ ॥
জানিতে বারতা কিবা রাখালের মনে ।
প্রভুর কটাক্ষপাত হৈল তাঁর পানে ॥ ১৯৩ ॥
সঙ্কেতে অঙ্গুলি এক তুলিয়া তখন ।
প্রার্থনা করিলা এক পুত্রের কারণ ॥ ১৯৪ ॥
সত্বর পাইবে পুত্র পূর্ণ হবে সাধ ।
এত বলি ঠাকুর করিলা আশীর্বাদ ॥ ১৯৫ ॥
অবতারে এ লীলায় প্রভু নারায়ণ ।
অহেতুক প্রেম যেন কৈলা প্রদর্শন ॥ ১৯৬ ॥
উপমায় তার আর কোথাও না মিলে ।
প্রভাবে যাহার লোকে বাপ-মায় ভুলে ॥ ১৯৭ ॥
প্রেমের ঠাকুর প্রভু প্রেম বোল-আনা ।
লীলার বাজারে এক প্রেম বেচা-কেনা ॥ ১৯৮ ॥
একেবারে স্বার্থশূন্য শ্রীপ্রভুর প্রেম ।
ষোল আনা খাড়া যেন নিকষিত হেম ॥ ১৯৯ ॥
তাহার বেসাতে ঝরে মাধুর্যের রস ।
যে জুটে এ হাটে হয় শ্রীপ্রভুর বশ ॥ ২০০ ॥
গুরুত্বে কি বিশালত্বে রস-পরিমাণে ।
তুলনে অপর কিবা বিশ্বে রহে কোণে ॥ ২০১ ॥
পশ্চাৎ লীলায় পাবে পরিচয় তার ।
বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণ ঠাকুর আমার ॥ ২০২ ॥
বিশ্ব বিমোহিত প্রেমে একেবারে গলা ।
সার্বভৌম ভাবকান্তি অঙ্গে করে খেলা ॥ ২০৩ ॥
রামকৃষ্ণলীলাকথা শ্রবণমধুর ।
স-মনে শুনিলে হয় ধর্মদ্বেষ দূর ॥ ২০৪ ॥
ভক্তাবাসে ভিক্ষালীলা উৎসব সহিত ।
চলিতেছে ক্রমাগত না হয় স্থগিত ॥ ২০৫ ॥
ভক্তবর শ্রীঅধর সেন মাজিস্টার ।
উৎসব তাঁহার ঘরে হয় বার বার ॥ ২০৬ ॥
উৎসবে জনতা বহু লোকসমাগম ।
সামান্যে না হয় তার ব্যয় বিলক্ষণ ॥ ২০৭ ॥
ভাগ্যবান যেবা যারে শ্রীপ্রভু সদয় ।
তাহার ভবনে প্রভুচন্দ্রের উদয় ॥ ২০৮ ॥
সঙ্গে যাবতীয় ভক্ত তারকার মালা ।
অতীব আনন্দকর মহোৎসব-লীলা ॥ ২০৯ ॥
ভিক্ষালীলা শ্রীপ্রভুর লয়ে ভক্তগণ ।
রঙ্গছলে ভক্তসঙ্গে কথোপকথন ॥ ২১০ ॥
ইহার ভিতরে আছে উদ্দেশ্য লীলার ।
সযতনে শুন লীলা পাবে সমাচার ॥ ২১১ ॥
একবার মহোৎসব অধরের ঘরে ।
অনেক সম্ভ্রান্তবর্গে একত্রিত করে ॥ ২১২ ॥
ইদানীং নব্য সভ্য সবে পাশ করা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিপ্রাপ্ত তাঁরা ॥ ২১৩ ॥
চাটুয্যে বঙ্কিমচন্দ্র পদে মাজিস্টার ।
নব্য সভ্যদের মধ্যে ভারি নাম তাঁর ॥ ২১৪ ॥
সবান্ধবে উপনীত আজিকার দিনে ।
একদিকে সমাসীন ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ২১৫ ॥
তাঁহাদের মধ্যে বড় মিষ্ট-কণ্ঠ যিনি ।
ত্রৈলোক্য সান্যাল নামে সুবিদিত তিনি ॥ ২১৬ ॥
দলবল বাদ্যযন্ত্র সঙ্গেতে লইয়া ।
শ্রীপ্রভুর প্রতীক্ষায় আছেন বসিয়া ॥ ২১৭ ॥
এমন সময় প্রভু দিলা দরশন ।
সঙ্গে একা শ্রীপ্রভুর নিত্যনিরঞ্জন ॥ ২১৮ ॥
পূর্বাবধি রাখাল আছেন এইখানে ।
রাখালে অধরে ভারি ভাব দুই জনে ॥ ২১৯ ॥
এবে হইয়াছে প্রায় ছয় দণ্ড রাতি ।
তান্ত্রিক কর্মেতে শুভ অমাবস্যা তিথি ॥ ২২০ ॥
প্রভুর আছিল রীতি হেন শুভ দিনে ।
ক্রিয়াকাণ্ড-আচরণ তান্ত্রিক বিধানে ॥ ২২১ ॥
কি প্রকার ক্রিয়াকাণ্ড তাহে কিবা হয় ।
প্রকাশিতে না পারিনু তার পরিচয় ॥ ২২২ ॥
একবার এক ক্রিয়া প্রত্যক্ষেতে দেখা ।
নিকটে কেহই নাই আমি মাত্র একা ॥ ২২৩ ॥
আবশ্যক নাই বলা ক্রিয়া সে কেমন ।
কপালে সুরার ফোঁটা তাহে প্রয়োজন ॥ ২২৪ ॥
সেহেতু কারণ কিছু শিশির ভিতরে ।
রাখিতেন সেবকেরা আজ্ঞা অনুসারে ॥ ২২৫ ॥
এই দিনে বোতলে কারণ কিছু আছে ।
গাত্রবস্ত্র-আবরণে সেবকের কাছে ॥ ২২৬ ॥
শকট হইতে অবতীর্ণের সময় ।
বোতল গাড়িতে রবে নিরঞ্জন কয় ॥ ২২৭ ॥
প্রভু বলিলেন যদি জানে কোচয়ান ।
খাইয়া ফেলিবে নিজে সঙ্গে করে আন ॥ ২২৮ ॥
আজ্ঞামত নিরঞ্জন লুকায়ে বসনে ।
বগলে ধরিয়া রাখে অতি সাবধানে ॥ ২২৯ ॥
শ্রীপ্রভুর বেশভূষা-সজ্জা-নিরীক্ষণে ।
প্রথমে অবজ্ঞা-ভাব বঙ্কিমের মনে ॥ ২৩০ ॥
ধন-মান-বিদ্যামদে হয় যে রকম ।
অহঙ্কারে ধরাবোধ সরার মতন ॥ ২৩১ ॥
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী বুঝিয়া অন্তরে ।
সাদরেতে সম্ভাষণ করিলেন তাঁরে ॥ ২৩২ ॥
কি মধুর শ্রীপ্রভুর বাক্যের মাধুরী ।
বর্ণে বর্ণে খেলে তায় রসের লহরী ॥ ২৩৩ ॥
পরে জিজ্ঞাসিলা তারে গুণধররায় ।
মানুষের কার্য কিবা আসিয়া ধরায় ॥ ২৩৪ ॥
উত্তরে মার্জিত-বুদ্ধি কহিল বঙ্কিম ।
মৈথুন আহার আর নিদ্রা এই তিন ॥ ২৩৫ ॥
অতি ঘৃণা সহকারে প্রভু তাঁয় কন ।
সাজে না তোমার মুখে এহেন বচন ॥ ২৩৬ ॥
তুমি ভো ছেঁচড়া লোক হীনবুদ্ধি ভারি ।
যে কার্য করিতে চিন্তা দিবাবিভাবরী ॥ ২৩৭ ॥
কিংবা যেই কর্ম নিজে কর আচরণ ।
তাহাই সভায় তুমি কৈলে উচ্চারণ ॥ ২৩৮ ॥
উপমা সহিত পরে কহেন ঠাকুর ।
খাইলেই মূলা উঠে মূলার ঢেঁকুর ॥ ২৩৯ ॥
স্বভাব না থাকে চাপা স্বভাবের জোরে ।
উপরেতে উঠে তাই যেমন ভিতরে ॥ ২৪০ ॥
বঙ্কিমে দেখিয়া প্রভু সলজ্জবদন ।
ঈশ্বরীয় কথা পরে কৈলা উত্থাপন ॥ ২৪১ ॥
তত্ত্বকথা-আলাপনে কিছুক্ষণ যায় ।
ব্রাহ্মগণে সঙ্গীতে ইঙ্গিত কৈলা রায় ॥ ২৪২ ॥
একতারা খোল আর করতাল সনে ।
সঙ্গীত আরম্ভ কৈলা ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ২৪৩ ॥
একতানে ভক্তিভরে ব্রহ্মগুণগীত ।
ত্রৈলোক্যের মিষ্ট কণ্ঠে সকলে মোহিত ॥ ২৪৪ ॥
আবেশের ভরে পরে প্রভুর কীর্তন ।
সেই সঙ্গে দিল যোগ যত ভক্তগণ ॥ ২৪৫ ॥
জনমনবিমোহন নর্তন দেখিয়া ।
সকলে প্রভুর পানে আছে নিরখিয়া ॥ ২৪৬ ॥
নাচিতে নাচিতে সঙ্গে নিত্যনিরঞ্জন ।
হেনকালে শুন কিবা হইল ঘটন ॥ ২৪৭ ॥
সূরার বোতল ছিল তাঁহার বগলে ।
পিছলিয়া পড়িল সভার মধ্যস্থলে ॥ ২৪৮ ॥
লুকান লাজের হাঁড়ি ভেঙ্গে গেল হাটে ।
বোতলে কি দেখিবারে বহুলোক ছুটে ॥ ২৪৯ ॥
যে আসে জানিতে কাছে মনে করি সন্দ ।
সেই পায় ডি গুপ্তের পাচনের গন্ধ ॥ ২৫০ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড দেখ তুমি মন ।
চকিতে হইল সূরা গুপ্তের পাঁচন ॥ ২৫১ ॥
পরদিনে কথা ছুটে গেল কানে কানে ।
গিরিশ ঘোষের কাছে তাঁহার ভবনে ॥ ২৫২ ॥
যখন বসিয়া তেঁহ আনন্দে বিহ্বল ।
পান করিছেন কাছে মদের বোতল ॥ ২৫৩ ॥
বারতায় অবিশ্বাস হইল তাঁহার ।
যদ্যপিহ নিজে তিনি বিশ্বাসাবতার ॥ ২৫৪ ॥
সন্দেহ হৃদয়-মধ্যে হইল যেমন ।
শুন কি করিলা খেলা সন্দেহ-মোচন ॥ ২৫৫ ॥
বোতল হইতে তেঁহ যত পাত্র খায় ।
সকলেই ডি গুপ্তের গন্ধ বহে তায় ॥ ২৫৬ ॥
সে বোতল রাখিয়া খুলিয়া আর অন্য ।
তাহাতেও সেই গন্ধ কিছু নাই ভিন্ন ॥ ২৫৭ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ ইহা বুঝিয়া তখন ।
সে দিনের মত কৈলা পান-সমাপন ॥ ২৫৮ ॥
নানা খেলা মদ লয়ে গিরিশের সনে ।
করিলেন প্রভুদেব লীলার প্রাঙ্গণে ॥ ২৫৯ ॥
অপর ঘটনা একদিন শুন মন ।
অগ্র পাত্র প্রভুদেবে কৈল নিবেদন ॥ ২৬০ ॥
প্রসাদ-গ্রহণারম্ভ হয় তার পরে ।
বোতল হইল খালি নেশা নাহি ধরে ॥ ২৬১ ॥
অতি তীব্র তেজস্কর কারণ তাহায় ।
চারি আনা পানে অন্যে চেতন হারায় ॥ ২৬২ ॥
অতঃপর খুলিলেন দ্বিতীয় বোতল ।
তাহাও লাগিল যেন পুকুরের জল ॥ ২৬৩ ॥
তৃতীয়েও কোন কার্য হইল না আর ।
উদরে কেবলমাত্র জলের ভাণ্ডার ॥ ২৬৪ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ তবে বুঝিয়া তখন ।
সে দিনের মত কৈলা কর্ম-সমাপন ॥ ২৬৫ ॥
নানারঙ্গ শ্রীপ্রভুর ভক্তদের সনে ।
চৈতন্য-উদয় হয় শ্রবণ কীর্তনে ॥ ২৬৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড
বিচিত্র ঠাকুরের বিচিত্র লীলা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্ন
দৃষ্টিশক্তি-হীন ।
দারুণ অবিদ্যাশক্তি বুদ্ধি পরিক্ষীণ ॥ ১ ॥
দেহ-সরোবরস্থিত মন-রূপ জল ।
বাসনা-পবনবেগে সতত চঞ্চল ॥ ২ ॥
আঁকিতে মহতী লীলা না পাই উপায় ।
অসাধ্য সাধন সাধে পড়িয়াছি দায় ॥ ৩ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু তুমি ভাবেশ্বর ।
দয়াময় রামকৃষ্ণ লীলার সাগর ॥ ৪ ॥
লীলাময় লীলাপ্রিয় লীলার ঠাকুর ।
বিঘ্নবাধা কিঙ্করের সব কর দূর ॥ ৫ ॥
স্মরিয়া শ্রীপ্রভুদেবে কহি শুন মন ।
মহালীলা ঠাকুরের বিচিত্র কখন ॥ ৬ ॥
বিচিত্র ঠাকুর হেন কখন না শুনি ।
যেমন বলিবে তাঁয় সেইরূপ তিনি ॥ ৭ ॥
জানি না সৃষ্টিতে কেবা এই দেব ছাড়া ।
যে নামে যে ডাকে তাঁয় তাহে পায় সাড়া ॥ ৮ ॥
বিচিত্র অদ্ভুতকর্ম ভক্তজনে জানা ।
দেখিলেও আজীবন নাহি যায় চেনা ॥ ৯ ॥
একরূপে বহুরূপ লীলা সুমধুর ।
দেশীয় জাতীয় নহে বিশ্বের ঠাকুর ॥ ১০ ॥
বিচিত্র ভাবের বর্ণ কে করে নির্ণয় ।
শ্রীঅঙ্গ রঙ্গের ভূমে সমুদিত হয় ॥ ১১ ॥
কখন শ্রীঅঙ্গে হেন সমাধি গভীর ।
স-মন ইন্দ্রিয়-আদি প্রাণবায়ু স্থির ॥ ১২ ॥
শরীরবিজ্ঞানবিদ, দেহজ্ঞান ভারি ।
নানাবিধ পরীক্ষায় নাহি পায় নাড়ী ॥ ১৩ ॥
আঁখি-তারা অঙ্গুলির দ্বারা পরশন ।
তথাপি না হয় তাহে পলক-পতন ॥ ১৪ ॥
শারীরিক ক্রিয়াধর্ম লুপ্ত একেবারে ।
শরীর ব্যতীত কিছু থাকে না শরীরে ॥ ১৫ ॥
সমাধি দ্বিতীয় ধারা বিভিন্ন রকম ।
প্রাণের সঞ্চার দেহে রহে অনুক্ষণ ॥ ১৬ ॥
বদন প্রসন্নোজ্জ্বল চন্দ্রিমার পারা ।
অবিরত বিক্ষরিত আনন্দের ধারা ॥ ১৭ ॥
যেন কত প্রেমাস্পদ সঙ্গে আলিঙ্গন ।
অন্তরে উঠেছে তাই আনন্দ এমন ॥ ১৮ ॥
আনন্দ কেবলানন্দ আধেয় আধার ।
আনন্দপ্রতিম হেন নহে বর্ণিবার ॥ ১৯ ॥
আনন্দের ঘনমূর্তি করি দরশন ।
সান্নিধ্যে দর্শকবৃন্দে আনন্দে মগন ॥ ২০ ॥
কখন বা বাহ্যহীন নিদ্রিতের ন্যায় ।
দু-এক অস্ফুট বাণী বদনে বেরয় ॥ ২১ ॥
আদর আব্দার কভু কথোপকথনে ।
কোন্দল জগৎমাতা অম্বিকার সনে ॥ ২২ ॥
কখন বা অর্ধবাহ্যভূমে গুণমণি ।
'হুঁশ আছে হুঁশ আছে' বলেন আপনি ॥ ২৩ ॥
টলটল পা দুখানি আবেশ-বিহ্বলে ।
কভু গণ্ড বেয়ে ধারা পড়ে বক্ষঃস্থলে ॥ ২৪ ॥
কভু সাধারণ ভূমে মানুষের মত ।
ঈশ্বরীয় রঙ্গরস তত্ত্ব উক্তি কত ॥ ২৫ ॥
সুবেষ্টিত ভক্তবর্গে নানানপন্থীর ।
কখন চঞ্চল ভাব কখন গম্ভীর ॥ ২৬ ॥
সহজ সরল নগ্ন বালকের মত ।
পত্র-পতনের সরসর শব্দে ভীত ॥ ২৭ ॥
কখন কেশরী স্তব্ধ বিক্রম এমন ।
গম্ভীর গরজে ত্রস্ত কুলিশ-নিস্বন ॥ ২৮ ॥
কভু 'লোক পোক' জ্ঞানে পুরুষ উত্তর ।
কে জানে সে দিকপাল কিবা ক্ষিতীশ্বর ॥ ২৯ ॥
কখন বা দীনতায় তৃণ পরাজিত ।
ছোটবড়-নির্বিশেষে সম্মান বিহিত ॥ ৩০ ॥
তত্ত্ব-পিপাসুর পক্ষে পরম আত্মীয় ।
অন্তর বুঝিয়া তার যাহে হয় শ্রেয়ঃ ॥ ৩১ ॥
তাহাই প্রদান তায় পরম হরিষে ।
জাতি-বর্ণ-ধর্ম-পন্থা-ভাব-নির্বিশেষে ॥ ৩২ ॥
কখন বা উচ্চ-নীচ অভেদ-গিয়ান ।
যারে তারে সকলের সম্মান সমান ॥ ৩৩ ॥
সাদরে প্রদত্ত করে কারও গ্রহণ ।
কাহার অগ্রাহ্য তেঁহ যদিচ ব্রাহ্মণ ॥ ৩৪ ॥
কোথা বা গমন নহে সাধ্য-সাধনায় ।
কেহ বা বসিয়া ঘরে অনায়াসে পায় ॥ ৩৫ ॥
শত প্রার্থনায় কার কৃপা নাহি হয় ।
কোথাও বা অযাচকে পায় অতিশয় ॥ ৩৬ ॥
অন্তর্যামী এক পক্ষে পরম ঈশ্বর ।
বিভুরূপে সমভাবে সবার ভিতর ॥ ৩৭ ॥
অন্যপক্ষে ভেদাভেদ পাই দেখিবারে ।
ভাল-মন্দ তর-তম লীলার আসরে ॥ ৩৮ ॥
ভক্তজনে যত টান অন্যে তত নয় ।
বরাবর এই ধারা অবতারে বয় ॥ ৩৯ ॥
ভক্তগণ যেন তাঁর লীলারসে সাথী ।
তাঁরা যেন রথ তাহে প্রভু সারথি ॥ ৪০ ॥
ইহাদেরও মধ্যে দেখি দুইশ্রেণীভুক্ত ।
কাহারা বা নিকটের কাহারা দূরস্থ ॥ ৪১ ॥
কার্যেতে যদ্যপি দেখি দু প্রকার থাক ।
তথাপি একত্র যেন কলমির চাক ॥ ৪২ ॥
লক্ষ বুড়ি ডগা থাকে চাকের ভিতরে ।
একটিতে দিলে টান গোটা চাক নড়ে ॥ ৪৩ ॥
আর এক শ্রেণী আছে বহির্মুখ জাতি ।
পরিচয়ে শুন কহি তাঁদের প্রকৃতি ॥ ৪৪ ॥
বৃহদরণ্যানী মধ্যে মহা তরুবর ।
স্রষ্টার কৌশলে শিল্প সর্বাঙ্গসুন্দর ॥ ৪৫ ॥
নাহি আসে লক্ষ্যে শির গগন-বিভেদী ।
চৌদিকে বিস্তৃতি কাণ্ড শাখা-প্রশাখাদি ॥ ৪৬ ॥
অতিশয় ঘন পত্র বরন শ্যামল ।
যোজন-যোজন ব্যাপী ছায়া সুশীতল ॥ ৪৭ ॥
অপরূপ বৃক্ষে এক আশ্চর্য কৌশল ।
ভিন্ন ভিন্ন প্রশাখায় ভিন্ন ভিন্ন ফল ॥ ৪৮ ॥
আকারে বরনে ভাবে ভিন্ন ভিন্ন বটে ।
কিন্তু ফল সকলেই সমভাবে মিঠে ॥ ৪৯ ॥
তরুবর মুখরিত রহে দিনমানে ।
নানা জাতি বিহগের কূজনের গানে ॥ ৫০ ॥
কতই না আসে পাখী দূরান্তরে বাসা ।
এখানে কেবল পাকা ফলের লালসা ॥ ৫১ ॥
মুক্তকর তরুবর বিহঙ্গমগণে ।
অবিরত রুচিমত ফল-বিতরণে ॥ ৫২ ॥
যার যত ধরে পেটে পূর্ণোদরে খায় ।
ভরিলে উদর পরে স্ববাসে পলায় ॥ ৫৩ ॥
এইসব বিহগেরা বহির্মুখ জাতি ।
ফলের আশায় আসে না পোহায় রাতি ॥ ৫৪ ॥
প্রথমোক্তগণে নাহি ফলের পিয়াসা ।
সকাল বিকাল সম তরুবরে বাসা ॥ ৫৫ ॥
এই সব ভক্তবর্গ লীলার সহায় ।
যাদিগে লইয়া খেলা করিলেন রায় ॥ ৫৬ ॥
অবিহিত এই ভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গ নামে ।
চিরসঙ্গ পরিচিত শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৫৭ ॥
তবে যে অচেনাবৎ বাল্যলীলাসরে ।
লীলার যে অঙ্গমাত্র জীব-শিক্ষা তরে ॥ ৫৮ ॥
আর লীলারঙ্গরস বর্ধন কারণ ।
স্বেচ্ছায় করেন যত ঐশ্বর্য গোপন ॥ ৫৯ ॥
আস্বাদন কর রস বুঝিয়া ব্যাপার ।
কলম কালিতে তত্ত্ব নহে আঁকিবার ॥ ৬০ ॥
কালের কুটিল গতি অকথ্য কথন ।
বর্তমানে নাই পূর্বে আছিল যেমন ॥ ৬১ ॥
হিন্দুধর্মরীতি-নীতি সব হত-প্রায় ।
ইংরেজী ভাষার শিক্ষা-দীক্ষার প্রভায় ॥ ৬২ ॥
জড়
বিজ্ঞানের চর্চা বড়ই প্রবল ।
মত্ত যাহে নব্য সভ্য শিক্ষিতের দল ॥ ৬৩ ॥
স্থূল-যন্ত্র ইন্দ্রিয়াদি জনক জ্ঞানের ।
ইহাই কেবলমাত্র ধারণা তাঁদের ॥ ৬৪ ॥
মনোনীত সূক্ষ্মভূমি তাহার বারতা ।
গুনিলে শ্রবণে লাগে হিঁয়ালির কথা ॥ ৬৫ ॥
ত্যাগ-যোগ-তপস্যায় বুদ্ধি গোটা বাঁকা ।
রামায়ণ ভারতাদি কল্পনার লেখা ॥ ৬৬ ॥
ঈশ্বরের অবতারে পুরা অপ্রত্যয় ।
নরদেহে অখণ্ডের খণ্ডবোধ হয় ॥ ৬৭ ॥
ব্রাহ্মধর্ম-সমুজ্জ্বলে সব নিরাকার ।
সাকার-স্বীকারে বুঝে মাথার বিকার ॥ ৬৮ ॥
স্বল্পবয়ঃ সুকুমার সুকুমারী আদি ।
একতালে সকলেই নিরাকার-বাদী ॥ ৬৯ ॥
ঠাকুরের সাঙ্গেরাও তাঁহাদের সনে ।
কালধর্মে রঙিয়াছে সমান বরনে ॥ ৭০ ॥
চাঁই চাঁই ভক্ত যত নিরাকার-বাদী ।
কেশব বিজয় দুই সকলের আদি ॥ ৭১ ॥
শ্রীমহিম চক্রবর্তী চাটুয্যে কেদার ।
প্রভুর নরেন্দ্র যাঁর বিশাল আধার ॥ ৭২ ॥
হাজরা প্রতাপচন্দ্র নরেন্দ্রের মিতে ।
সখ্যতা সম্ভাবে হয়ে জড়িত পিরীতে ॥ ৭৩ ॥
জ্ঞানমার্গী উভয়েই নিরাকারে লক্ষ্য ।
সাকারে শ্রীনরেন্দ্রের বিষম কটাক্ষ ॥ ৭৪ ॥
মায়াবাদে মহাপতি অপার বিক্রমে ।
পণ্ডিত যদিও ভক্ত পরাজিত রণে ॥ ৭৫ ॥
শাস্ত্রীয় প্রমাণ ছাড়ে চোখা চোখা বাণ ।
প্রতিপক্ষ যদি প্রভু নাহিক এড়ান ॥ ৭৬ ॥
প্রথমাগমনকালে প্রভুর গোচর ।
জ্ঞান-ফণাযুক্ত এক এক বিষধর ॥ ৭৭ ॥
বিচিত্র ঠাকুর হেথা বিচিত্র কৌশল ।
জড়িগুণে উড়াইলা দারুণ গরল ॥ ৭৮ ॥
সমুন্নত ফণা আর নাহিক এখন ।
খোল-করতাল লয়ে হরি-সংকীর্তন ॥ ৭৯ ॥
কেহ মা মা কেহ কেহ কাঁদে হরিবোলে ।
সজল নয়নে লুটে প্রভু-পদতলে ॥ ৮০ ॥
ভাবের প্রাবল্যে কারও কণ্ঠ হয় রোধ ।
অঙ্গ কারও জড়বৎ নাহি বাহ্যবোধ ॥ ৮১ ॥
কারও বা খসিয়া পড়ে কটির বসন ।
কারও উচ্চহাসে হয় ভাব সংবরণ ॥ ৮২ ॥
অপরূপ প্রভু যেন অপরূপ খেলা ।
তিলেকে ভুলিয়ে দেন পাগলের মেলা ॥ ৮৩ ॥
প্রভুর আয়ত্তে যত মানুষের মন ।
সেইমত খেলে তিনি খেলান যেমন ॥ ৮৪ ॥
শক্তি-প্রতিবাদী-মধ্যে প্রধান কেশব ।
দুনিয়া জুড়িয়া যাঁর অশেষ গৌরব ॥ ৮৫ ॥
এবে তেঁহ দলে-বলে লয়ে মার নাম ।
পথে পথে সংকীর্তন করিয়া বেড়ান ॥ ৮৬ ॥
সত্যতত্ত্ব-অন্বেষক কেশব ধীমান ।
তদুপরি সেই হেতু শ্রীপ্রভুর টান ॥ ৮৭ ॥
বিবেক বৈরাগ্য ভক্তি দয়া সরলতা ।
নিষ্ঠা ত্যাগ অনুরাগ সাধুতা দীনতা ॥ ৮৮ ॥
যে আধারে বর্তমান সেই আপনার ।
হিন্দু কি যবন ম্লেচ্ছ নাহিক বিচার ॥ ৮৯ ॥
কেশবে সগুণ বহু তাহার প্রমাণ ।
কি বিষয়ী কিবা সাধু সবে দেয় মান ॥ ৯০ ॥
অপার
প্রভুর কৃপা তাঁহার উপর ।
কেশবের রোগে শোকে শ্রীপ্রভু কাতর ॥ ৯১ ॥
রোগার্ত কেশব এবে
জীবন-সংশয় ।
শুনিয়াই ঠাকুরের চিন্তা অতিশয় ॥ ৯২ ॥
দেখিতে গমন কৈলা পরান অস্থির ।
কেশব-ভবনে নাম কমল-কুটির ॥ ৯৩ ॥
অভ্যর্থনা করি তাঁর ব্রাহ্ম শিষ্যগণ ।
সদর মহলে দিল বসিতে আসন ॥ ৯৪ ॥
কিসেও নাহিক মন প্রভু একমনা ।
শ্রীকেশবে দেখিবারে কেবল বাসনা ॥ ৯৫ ॥
হেথা অন্তঃপুরে তেহ আছে শয্যাশায়ী ।
উঠিতে চলিতে দেহে শক্তি প্রায় নাই ॥ ৯৬ ॥
সেবাপর শিষ্যগণে প্রভুদেবে কয় ।
উঠিতে চলিতে তাঁর কষ্ট বড় হয় ॥ ৯৭ ॥
তদুত্তরে সমুৎসুকে কন প্রভুরায় ।
চল আমি নিজে যাই কেশব যেথায় ॥ ৯৮ ॥
হেন কালে ধীরে ধীরে কেশব হাজির ।
কলেবরে মাংস নাই কঙ্কালশরীর ॥ ৯৯ ॥
এখন ভাবস্থ প্রভু নাহি বাহ্য জ্ঞান ।
লুটাইয়া পদে করে কেশব প্রণাম ॥ ১০০ ॥
আজি নাহি কেশবের প্রণাম ফুরায় ।
যেন কি মিলেছে মিষ্টি শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১০১ ॥
ঠাকুরের সঙ্গে যবে প্রথম মিলন ।
জানিত না শ্রীকেশব প্রণাম কেমন ॥ ১০২ ॥
জ্ঞানি-অভিমানে শির উচ্চে নাই আর ।
প্রভুর প্রসাদে
এবে ভক্তির সঞ্চার ॥ ১০৩ ॥
ভাবেতে বিভোরচিত্ত প্রভু গুণমণি ।
বলিতে লাগিলা আদ্যাশক্তির কাহিনী ॥ ১০৪ ॥
সৃষ্টিরূপে আদ্যাশক্তি জীব ও জগৎ ।
চতুর বিংশতি তত্ত্ব নামে বলবৎ ॥ ১০৫ ॥
একমাত্র বস্তু ব্রহ্ম দুই ভাবে গতি ।
কখন পুরুষভাব কখন প্রকৃতি ॥ ১০৬ ॥
বিশেষ ভাঙ্গিয়া তত্ত্ব পুনঃ কন পিছে ।
থাকিলে পুরুষজ্ঞান মেয়েজ্ঞান আছে ॥ ১০৭ ॥
নির্গুণে পুরুষ আখ্যা পিতা নামে যিনি ।
সগুণে সৃষ্টিতে তেঁহ জগৎ-জননী ॥ ১০৮ ॥
মায়ের ধরম কর্ম লিপ্ত অনুক্ষণ ।
প্রসবাদি সযতনে লালন-পালন ॥ ১০৯ ॥
ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ যেবা যাহা চায় ।
মুক্তহস্তে বিতরণ করে সর্বদায় ॥ ১১০ ॥
জগমা নিজের মাতা নহে অন্যপর ।
মায়েতে সকল কর্ম ছেলের নির্ভর ॥ ১১১ ॥
মাতৃভাবে আত্মীয়তা অম্বিকার সনে ।
শেষ শিক্ষণ দেন প্রভু কেশব সজ্জনে ॥ ১১২ ॥
এ সময়ে বুঝেছেন সর্বজ্ঞ গোসাঞি ।
কেশবের দেহ রোগে রক্ষা পাবে নাই ॥ ১১৩ ॥
সেই হেতু ভক্তবরে আশ্বাসিয়া কন ।
অসুখে তোমার আছে বিশেষ কারণ ॥ ১১৪ ॥
ঈশ্বরীয় ভাব-হস্তী অতি মত্ততর ।
পীড়ন করেছে বহু দেহের ভিতর ॥ ১১৫ ॥
ক্ষীণতর দেহ-যন্ত্র গেছে ভাঙ্গা চুরা ।
তাহাই কেবল এই বিয়াধির গোড়া ॥ ১১৬ ॥
আগুন লাগিলে ঘরে হয় যে প্রকার ।
পুড়ায়ে কতক দ্রব্য করে ছারখার ॥ ১১৭ ॥
হৈ হৈ কাণ্ড এক তুলে তারপর ।
নিরানন্দ বিমরষ ভাব গুরুতর ॥ ১১৮ ॥
জ্ঞানাগ্নি তেমতি যার লাগে দেহঘরে ।
দেহবুদ্ধি সহ যত রিপুগণে মারে ॥ ১১৯ ॥
নষ্টশির অভিমান গুরু অহঙ্কার ।
পরিণামে দেহ মধ্যে তুলে মহামার ॥ ১২০ ॥
এই মহামারে দেহ-যন্ত্র বিশৃঙ্খল ।
ঈশ্বরীয় ভাবাদির প্রাবল্যের ফল ॥ ১২১ ॥
রবে না এ দেহ আর সঙ্কেতের তরে ।
বুঝাইতে প্রভুদেব প্রিয় ভক্তবরে ॥ ১২২ ॥
বসরাই গোলাপের উপমায় কন ।
কর্মদক্ষ উদ্যানের মালী যেরকম ॥ ১২৩ ॥
যাবতীয় গোলাপের গাছ খুঁড়ে তুলে ।
শীতের শিশিরে সিক্ত করিবারে মূলে ॥ ১২৪ ॥
যাহাতে পোষ্টাই বৃদ্ধি গাছের গৌরব ।
প্রফুল্ল কুসুম কালে করিবে প্রসব ॥ ১২৫ ॥
তাই বুঝি জগতের মালী ভগবান ।
ভাবাবেগে নষ্ট স্বাস্থ্য দেহ বর্তমান ॥ ১২৬ ॥
মূলসহ তুলিছেন পরম যতনে ।
ঘটাতে বিরাট কাণ্ড আগামী জনমে ॥ ১২৭ ॥
এইখানে এক প্রশ্ন পার করিবারে ।
প্রভুর পিরীতি এত যাহার উপরে ॥ ১২৮ ॥
মুক্তি না হইয়া তাঁর পুনর্জন্ম কেনে ।
কহি তার তত্ত্ব সার শুন এক মনে ॥ ১২৯ ॥
মানযশাকাঙ্ক্ষী বড় ছিলেন কেশব ।
দেশেতে যাহাতে উঠে নামের গৌরব ॥ ১৩০ ॥
শিষ্যদলবলপুষ্টি পরিণাম ফল ।
ইহাই বাসনা সাধ অন্তরে প্রবল ॥ ১৩১ ॥
বহু পূর্বে ঠাকুরের কেশবের সনে ।
নানাবিধ তত্ত্বালাপ কথোপকথনে ॥ ১৩২ ॥
বলিয়াছিলেন প্রভু প্রেমের গোসাঞি ।
গুরু কৃষ্ণ বৈষ্ণবেতে ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ১৩৩ ॥
শুনিয়াই শিহরাঙ্গ আচার্যাভিমানী ।
প্রভুকে বিনয়ে কন জুড়ি দুই পাণি ॥ ১৩৪ ॥
যদি আমি মানি এই কথা আপনার ।
দলবল কিছু নাহি থাকিবে আমার ॥ ১৩৫ ॥
এইখানে কেশবের মন বুঝ মন ।
আচার্যাভিমান মনে প্রবল কেমন ॥ ১৩৬ ॥
বাসনা না হৈলে ক্ষয় ব্রহ্মসিদ্ধ কোথা ।
তাই কেশবের পর জন্মের ব্যবস্থা ॥ ১৩৭ ॥
বাসনা বিষম ব্যাধি ইষ্ট-সিদ্ধি-পথে ।
নিয়ে আকর্ষণ ঊর্ধ্বে নাহি দেয় যেতে ॥ ১৩৮ ॥
ধরাতলে ভবরোগ এবে পরিপূর্ণ ।
চিকিৎসার জন্য প্রভু বৈদ্য অবতীর্ণ ॥ ১৩৯ ॥
শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায় কেশব এখন ।
ঈশ্বরীয় নামরূপভাবে নিমগন ॥ ১৪০ ॥
সহধর্মী কেশবের গোস্বামী বিজয় ।
এবে তাঁর অবস্থার শুন পরিচয় ॥ ১৪১ ॥
মহানৃত্য সংকীর্তনে নাচে হরিবোলে ।
ভাবেতে বিভোর কভু লুটান ভূতলে ॥ ১৪২ ॥
নিশিদিন হরিকথা ছাড়িতে না চায় ।
ধ্যানে লীলা-আন্দোলনে কালে না কুলায় ॥ ১৪৩ ॥
দেখিলে বিগ্রহ-মূর্তি সাষ্টাঙ্গ তখনি ।
গড়ইয়া গুরুদেহ লুটায় অবনী ॥ ১৪৪ ॥
দেশজুড়ে ব্যাপ্ত নাম ব্রাহ্ম মিশনারি ।
তাঁদের বেতন লয়ে করেন চাকরি ॥ ১৪৫ ॥
এবে তাঁর ভাবান্তর করি দরশন ।
নিন্দাবাদ করে যত ব্রাহ্মভ্রাতাগণ ॥ ১৪৬ ॥
সত্যতত্ত্ব-অন্বেষক ব্রাহ্মণ-সন্তান ।
ভ্রাতাদের প্রতিবাদে নাহি দেন কান ॥ ১৪৭ ॥
তত্বে মত্ত ধন-মানে নাহি আর মন ।
প্রভুর রূপায় লব্ধ অমূল্য রতন ॥ ১৪৮ ॥
নামরূপে মগ্ন মন অনুক্ষণ রহে ।
ভাবের আবেগে তত্ত্ব বক্তৃতায় কহে ॥ ১৪৯ ॥
দুনয়নে অশ্রুধারা বহে অনর্গল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৫০ ॥
রসিক-প্রবর প্রভু রসের আকর ।
ভক্তিরস লয়ে লীলা-খেলা নিরন্তর ॥ ১৫১ ॥
পাষাণ সরস যাহে স্বভাব ছাড়িয়ে ।
আজন্ম বিশুদ্ধ তর্ক উঠে মঞ্জরিয়ে ॥ ১৫২ ॥
বিচিত্র প্রসঙ্গ রঙ্গ বিচিত্র ব্যাপার ।
বিচিত্র কালের মত বিচিত্রাবতার ॥ ১৫৩ ॥
অযোধ্যা আশ্চর্য লীলা তত্ত্ব যে রকম ।
কৌতুকরহরঙ্গে কিছু নহে কম ॥ ১৫৪ ॥
অকর্তব্য একরূপে নহে বর্ণিবার ।
অন্যরূপে অপরূপ রসের ভাণ্ডার ॥ ১৫৫ ॥
সমুন্নত-ফণা যত জ্ঞানমার্গিগণে ।
ডমরু বাজায়ে প্রভু খেলান যেমনে ॥ ১৫৬ ॥
অভিনয় রঙ্গমঞ্চে বঙ্গের উপর ।
যেমন বিচিত্র তেন অতীব সুন্দর ॥ ১৫৭ ॥
লীলা-চিত্র দেখ মন ভাষার দুয়ারে ।
প্রথমে কানের কাজ নয়নের পরে ॥ ১৫৮ ॥
প্রথমাভিনয়ে
জ্ঞানমার্গী শ্রীমহিম ।
জ্ঞান-অভিমান-তেজে অপার অসীম ॥ ১৫৯ ॥
পঞ্চদশী বেদান্তের বুলি আউড়িয়া ।
দিতেন আগোটা মঞ্চ আঁধার করিয়া ॥ ১৬০ ॥
চলনে গম্ভীরভাব গম্ভীরে আসন ।
সমুন্নত শিরোদেশ বিভেদি গগন ॥ ১৬১ ॥
এবে তেঁহ অবনত প্রভুর চরণে ।
দিয়া তালি হরি বলি নাচে সংকীর্তনে ॥ ১৬২ ॥
লম্বে চারিহস্তপূর্ণ সুদীর্ঘ গড়ন ।
অনুরূপ অবয়ব তাহার মতন ॥ ১৬৩ ॥
গুরুতর কলেবর অপরূপ সাজে ।
নাচেন যখন তেঁহ কীর্তনের মাঝে ॥ ১৬৪ ॥
গিয়াছে পূর্বের ফণা বিচার-গরল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৬৫ ॥
এইবার শ্রীপ্রভুর নরেন্দ্রের কথা ।
অবতার মায়াবাদে খালি নাড়ে মাথা ॥ ১৬৬ ॥
মায়া-প্রতিবাদে ছিল প্রভুকে উত্তর ।
ঘটিবাটি আদি করি তোমার ঈশ্বর ॥ ১৬৭ ॥
ভৌতিক প্রপঞ্চ খেলা সত্য কোন খানে ।
জড়েতে চৈতন্য জ্ঞান করিব কেমনে ॥ ১৬৮ ॥
ঈশ্বরীয় রূপ যাহা কর দরশন ।
মনের তোমার তাহা সে কেবল ভ্রম ॥ ১৬৯ ॥
আশ্চর্য হইয়া প্রভু কন তদুত্তরে ।
তাহারা যে কথা কয় পাই শুনিবারে ॥ ১৭০ ॥
শাস্ত্রের সঙ্গেতে মিলে সেই সব বাণী ।
তোর প্রতিবাদ কভু শুনিব না আমি ॥ ১৭১ ॥
তার প্রতিবাদে ভক্ত কহিত তখন ।
শ্রবণও ভ্রমের কর্ম দর্শন যেমন ॥ ১৭২ ॥
অবতারবাদে তর্ক অতি ঘোরতর ।
ধরিয়া মানুষদেহ আসেন ঈশ্বর ॥ ১৭৩ ॥
একথা বিশ্বাস মুই করিব কেমনে ।
উপযুক্ত যুক্তিযুক্ত প্রমাণ বিহনে ॥ ১৭৪ ॥
প্রভুপক্ষ-সমর্থনে অন্য জন ভাষে ।
ঈশ্বরের অবতার কেবল বিশ্বাসে ॥ ১৭৫ ॥
ইহাতে প্রমাণ কিবা তর্ক কি বিচার ।
বিশ্বাসে প্রত্যক্ষীভূত হন অবতার ॥ ১৭৬ ॥
যতকিছু নামরূপে হেরি মহীতলে ।
সকলেরে বস্তু বলি বিশ্বাসের বলে ॥ ১৭৭ ॥
মাটিকে যে মাটি বলি জলে বলি জল ।
বিশ্বাস ইহাতে মাত্র প্রমাণ কেবল ॥ ১৭৮ ॥
সেইমত অবতারে অবতার-জ্ঞান ।
বিশ্বাসের বলে হয় বিশ্বাস-প্রমাণ ॥ ১৭৯ ॥
অবতারে নরবুদ্ধি হয় যে জনার ।
বুঝিতে হইবে হেতু বুদ্ধির বিকার ॥ ১৮০ ॥
স্বভাবে শর্করা মিষ্ট তিক্ত লাগে যদি ।
জলন্ত লক্ষণ তার রসনায় ব্যাধি ॥ ১৮১ ॥
তবে কথা হেন জনে এতেক সংশয় ।
বড় গাছে বড় ঝড় জনশ্রুতি কয় ॥ ১৮২ ॥
তীক্ষ্ণসূক্ষ্মবুদ্ধি-যুক্ত এই ভক্তবর ।
বুঝিতে নিগূঢ় তত্ত্ব অতীব তৎপর ॥ ১৮৩ ॥
নিরন্তর তীক্ষ্ণদৃষ্টি আছিল তাঁহার ।
কি হেতু প্রভুকে অন্যে কহে অবতার ॥ ১৮৪ ॥
বহু পরীক্ষার পর ধারণা এখন ।
প্রভুদেবে অমানুষী শক্তি বিলক্ষণ ॥ ১৮৫ ॥
ভাবি-দৃষ্ট প্রভু যাহা করেন বাখান ।
ঘটনায় মিলে পরে দেখিবারে পান ॥ ১৮৬ ॥
কাজেই আশ্চর্য হয়ে মনে মনে ভাবে ।
অবশ্বই ঐশী কিছু আছে প্রভুদেবে ॥ ১৮৭ ॥
কখন বিশ্বাস কভু অবিশ্বাস করে ।
সর্বদা দোলায়মান স্বভাবের জোরে ॥ ১৮৮ ॥
কৌশলে খেলিয়া তারে ধীরে ধীরে রায় ।
আনিছেন লীলা-কার্যে ভক্তির সীমায় ॥ ১৮৯ ॥
গিয়ান-বিচার-তর্ক বহু এবে গেছে ।
ঠাকুরের সঙ্গে ভাবে সংকীর্তনে নাচে ॥ ১৯০ ॥
দুনয়নে অশ্রু কভু বহে অনর্গল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৯১ ॥
অশ্রু দেখি ঠাকুরের পরম আনন্দ ।
বলিতেন আজি ভারি কেঁদেছে নরেন্দ্র ॥ ১৯২ ॥
প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ যত আছিলেন জ্ঞানী ।
ঠাকুরের শ্রীগোচরে করিত মেলানি ॥ ১৯৩ ॥
সকলেই ভক্তিপদে রসাইলা রায় ।
সংকীর্তনে সকলেই নাচে কাঁদে গায় ॥ ১৯৪ ॥
ভাবের প্রভাবে কেহ কেহ বা বিহ্বল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৯৫ ॥
আর এক ঠাকুরের শুন বিচিত্রতা ।
শ্রবণ-মঙ্গল রামকৃষ্ণ-গুণগাথা ॥ ১৯৬ ॥
যে কোন ভাবের ভক্ত আসে শ্রীগোচর ।
সরল অন্তর সহ শ্রদ্ধা ভক্তিপর ॥ ১৯৭ ॥
সকলেই সমভাবে দেখিবারে পায় ।
তাঁদের ভাবের লোক রামকৃষ্ণ রায় ॥ ১৯৮ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানিগণে দেখে প্রভু ব্রহ্মজ্ঞানী ।
বিষ্ণুভক্তে দেখেন বৈষ্ণব-চূড়ামণি ॥ ১৯৯ ॥
দেখেন পরমহংস বেদান্তবাদীরা ।
কৌল দেখে শাক্তগণ শক্তি ভজে যারা ॥ ২০০ ॥
বাউল বৈষ্ণবে দেখে তাহাদের সাঁই ।
কর্তাভজাগণ দেখে সহজ গোসাঞি ॥ ২০১ ॥
যীশুর প্রভাব চোখে দেখে খ্রীষ্টিয়ানে ।
শাস্ত্রের জ্বলন্ত মূর্তি দেখে শাস্ত্রিগণে ॥ ২০২ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ ভক্তগণে দেখিবারে পান ।
লীলাপর একেশ্বর বিভু ভগবান ॥ ২০৩ ॥
বিশ্বগুরু কল্পতরু স্বয়ম্ভু আপুনি ।
ভাবমুখে অবস্থিত সৃষ্টির জননী ॥ ২০৪ ॥
অদ্বৈত চৈতন্য নিত্যানন্দ একাধারে ।
দীনবন্ধু কর্ণধার ভবসিন্ধু-পারে ॥ ২০৫ ॥
করুণায় কি বিচিত্র প্রভু গুণমণি ।
একমনে শুন মন বিচিত্র কাহিনী ॥ ২০৬ ॥
তুলনা কি পরিমাণ নাহি করুণার ।
সাগর গোষ্পদ এত অকূল অপার ॥ ২০৭ ॥
লীলার পশরা-মধ্যে রূপা কানে কান ।
কৃপাঘন শ্রীমূরতি লোচনাভিরাম ॥ ২০৮ ॥
জলভারাক্রান্ত যেন ঘন বরিষার ।
হেঁকে ডেকে চারিদিকে ছুটে অনিবার ॥ ২০৯ ॥
জল দিতে অবনীতে বিশুষ্কাতিশয় ।
জীবে রূপাদানে তেন প্রভু দয়াময় ॥ ২১০ ॥
স্থানাস্থান নাই জ্ঞান সতত চঞ্চল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিতে করিতে শীতল ॥ ২১১ ॥
মনে নাই ক্ষুধা-তৃষা অশন-শয়ন ।
অহোরাত্র কর্মমাত্র রূপা-বরিষণ ॥ ২১২ ॥
ফুলহারা বসুন্ধরা বিচিত্র-নির্মাণ ।
লীলাপ্রিয় ঈশ্বরের খেলিবার স্থান ॥ ২১৩ ॥
মরুর সমান এবে কামের কল্মষে ।
অবিদ্যা যতেক রস লইয়াছে শুষে ॥ ২১৪ ॥
অবিদ্যা-সেবনে মত্ত দেখি জীবগণে ।
আগও তিতিয়ে অশ্রু ঝরে দুনয়নে ॥ ২১৫ ॥
নিত্যানন্দ নিরানন্দ পরান বিকল ।
দ্বাদশবৎসর-ব্যাপী সাধনার ফল ॥ ২১৬ ॥
জীবের কল্যাণে কৈলা সমস্ত প্রদান ।
শেষেতে বিগ্রহ বহু তাও বলিদান ॥ ২১৭ ॥
মাতৃগতপ্রাণ প্রভু অম্বিকার ছেলে ।
আহার বিহার খেলা অম্বিকার কোলে ॥ ২১৮ ॥
মায়ে পোয়ে এক হয়ে ভাবেতে বিভোর ।
বিকল পরান বহে তৃনয়নে জোর ॥ ২১৯ ॥
কৈলা কিবা অঙ্গীকার-সহ আশাবাণী ।
শুন সুধামাখা জগ-কল্যাণ-কাহিনী ॥ ২২০ ॥
"ও মা, যারা যারা সব আসিবে এখানে ।
একমাত্র আলম্বন আন্তরিক টানে ॥ ২২১ ॥
সরল অন্তর খোলা হৃদয়-নিলয় ।
তাহারা যেন মা সিদ্ধ সকলেই হয়” ॥ ২২২ ॥
ইহাতেও মনোমত তুষ্ট না হইয়ে ।
আবার কহেন প্রভু মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ২২৩ ॥
"ও মা, যারা যারা সব আসিবে এখানে ।
বিশ্বাস প্রত্যয় সহ সুসরল মনে ॥ ২২৪ ॥
অমনি চৈতন্ত্যোদয় হবে সবাকার ।
তপ-জপ-সাধনাদি নাহি দরকার" ॥ ২২৫ ॥
বিচিত্র ঠাকুর হেন দুর্লভ ভুবনে ।
ভবসিন্ধুপার যাঁর মাত্র দরশনে ॥ ২২৬ ॥
রতি-মতি শ্রীচরণে রাখি অনুক্ষণ ।
লীলা-গীতি সুমধুর কর আকর্ষণ ॥ ২২৭ ॥
করুণাপ্রতিম প্রভু বেদবিধি ছাড়া ।
করুণার উপাদানে মূর্তিখানি গড়া ॥ ২২৮ ॥
সান্ত নর-তনু কিন্তু অনন্ত আধার ।
সাগর গোষ্পদবৎ তুলনে তাহার ॥ ২২৯ ॥
প্রকাণ্ডতা পক্ষে নাহি আসে কল্পনায় ।
ডুবিলেও গোটা বিশ্ব তলাইয়া যায় ॥ ২৩০ ॥
এ হেন আধারে মোর প্রভুর আমার ।
আধেয় করুণা বই কিছু নাহি আর ॥ ২৩১ ॥
উত্তাল তরঙ্গ তাহে সদা উথলিত ।
শ্রীমুখ উৎসার দ্বারে করে অবিরত ॥ ২৩২ ॥
আবেগে আবেশভরে কহেন আপনে ।
সম্বোধিয়া কৃপাপ্রার্থী ভাগ্যবানগণে ॥ ২৩৩ ॥
এখানে নির্ভর আর বিশ্বাস করিলে ।
মা-কালী সাধিয়া দিবে কার্য অবহেলে ॥ ২৩৪ ॥
আবেশের ভরে আমি কহিলাম হেথা ।
মা সব করিয়া দিবে হবে না অন্যথা ॥ ২৩৫ ॥
করুণা কোমল কিন্তু তাহে এত বল ।
পরং ব্রহ্ম সনাতন যাহে টলমল ॥ ২৩৬ ॥
অটল সচ্চিদানন্দ চঞ্চল অস্থির ।
ধরায় আনিয়া তুলে ধরায়ে শরীর ॥ ২৩৭ ॥
এইখানে মানুষেরা বড় আলখাল ।
সকল কুবুদ্ধি ঘটে অতীব জঞ্জাল ॥ ২৩৮ ॥
কহে যে সান্তের মধ্যে অনন্তের সত্তা ।
ভাণ্ডেতে ব্রহ্মাও ইহা প্রলাপীর কথা ॥ ২৩৯ ॥
আরে মন দেখ দেখ বুদ্ধির বাহার ।
বিচার বিতর্কযুক্তি কিবা চমৎকার ॥ ২৪০ ॥
মীমাংসা-সিদ্ধান্ত শেষে এই হৈল ইতি ।
পুরাণাদি গীতা গাথা প্রলাপীর উক্তি ॥ ২৪১ ॥
শুক-ব্যাস-নারদাদি না পাইলা ঠাঁই ।
মরি মন লয়ে হেন বুদ্ধির বালাই ॥ ২৪২ ॥
এই সৃষ্টি সৃষ্টি যার নির্মাণ কৌশল ।
জীবের বুঝিতে তাঁয় কিবা আছে বল ॥ ২৪৩ ॥
ইহা না বুঝিয়া যেবা বুদ্ধি করে অন্য ।
সে জন মানুষ নয় পশুমধ্যে গণ্য ॥ ২৪৪ ॥
মায়ার অপার খেলা কে বুঝিতে পারে ।
যে চাবিতে খুলে তালা তাহে বন্ধ করে ॥ ২৪৫ ॥
ভক্তিহীনে ধরাতল রসাতলে গত ।
কুলাল-চক্রের ন্যায় মোহে বিঘূর্ণিত ॥ ২৪৬ ॥
দারুণ দুর্দশাগ্রস্ত দুঃস্থ অতিশয় ।
দেখিয়া করুণাকর প্রভু দয়াময় ॥ ২৪৭ ॥
সত্ত্বের ঐশ্বর্যে অবতীর্ণ ধরাদেশে ।
দীন-দুঃখী নিরক্ষর ব্রাহ্মণের বেশে ॥ ২৪৮ ॥
এবে সত্ত্ব প্রায় না মিলে আঘ্রাণ ।
তমে রজে তুলিয়াছে তুমুল তুফান ॥ ২৪৯ ॥
সত্ত্বের ঐশ্বর্য শুদ্ধ আধ্যাত্মিকে খেলা ।
জৈব বুদ্ধি কি বুঝিবে অবিজ্ঞায় ঘোলা ॥ ২৫০ ॥
তাই প্রভু বলিলেন করি উচ্চ রব ।
বারেক শ্রীকৃষ্ণ যেবা বারেকে রাঘব ॥ ২৫১ ॥
সেইজন অবতীর্ণ এবে ধরাধামে ।
জীবের উদ্ধার-হেতু রামকৃষ্ণ নামে ॥ ২৫২ ॥
পূর্ণ আবির্ভাব মোর এই অবতারে ।
অদ্বৈত চৈতন্য নিত্যানন্দ একাধারে ॥ ২৫৩ ॥
লক্ষণে বুঝিতে বস্তু কহিলেন রায় ।
যে আধার ভাসে ভক্তি প্রেমের বন্যায় ॥ ২৫৪ ॥
কখন পিশাচ কভু পাগলের পারা ।
কখন বা জড় কভু বালকের ধারা ॥ ২৫৫ ॥
হাসে নাচে কাঁদে গায় বিহ্বল-পরানী ।
বুঝে নিবে সে আধারে অবতীর্ণ তিনি ॥ ২৫৬ ॥
জন্মাবধি যত কর্ম পরার্থে কেবল ।
দেহ-দান যদি তাহে জীবের মঙ্গল ॥ ২৫৭ ॥
এতেক দেখিয়া যেবা পরিহার করে ।
সে নহে মানুষ-বাচ্য পশু বলি তারে ॥ ২৫৮ ॥
ভক্তিহীন কুলিশ কর্কশ এই কাল ।
ভক্তিরসে তাহে প্রভু করিলা রসাল ॥ ২৫৯ ॥
ধীরে ধীরে অলক্ষ্যেতে চালাইয়া কল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ২৬০ ॥
কি
মহিমা শ্রীরায়ের অমৃত কখন ।
শ্রীপদে উপজে ভক্তি করিলে শ্রবণ ॥ ২৬১ ॥
জ্ঞান কর্ম
ভক্তি এই ত্রিবিধ উপায় ।
তিনেরি জ্বলন্ত মূর্তি ঠাকুর শ্রীরায় ॥ ২৬২ ॥
কিন্তু ভক্তিপথে
কর্ম সাধিবার তরে ।
শুন কিবা উপদেশ দিলা বারে বারে ॥ ২৬৩ ॥
অন্তরযামিত্বরূপে প্রভু
বিশ্বপতি ।
নাম-রূপ-উপাধিতে বিরাট মূরতি ॥ ২৬৪ ॥
অন্তরে বাহিরে দুয়ে ব্যাপ্ত চরাচর ।
আধ্যাত্মিক রাজ্যের একক অধীশ্বর ॥ ২৬৫ ॥
কোথা কিবা আছে আর কোথা কিবা নাই ।
পুষ্প-অনুপুঙ্খরূপে বিদিত গোসাঞি ॥ ২৬৬ ॥
দেশকালপাত্র দেখি এবে ভগবান ।
জ্ঞান-কর্ম বাদে দিলা ভক্তির বিধান ॥ ২৬৭ ॥
জ্ঞানপক্ষে কি কহিলা শুন পরিচয় ।
কলিকালে জ্ঞানমার্গ কঠিনাতিশয় ॥ ২৬৮ ॥
স্বল্পায়ু মানুষ এবে অন্নগত প্রাণ ।
তদুপরি দেহবুদ্ধি ঘটে বলবান ॥ ২৬৯ ॥
দেহধর্মে ক্ষুধাতৃষ্ণা আছে বিলক্ষণ ।
দেহরক্ষা হেতু তাহা অবশ্য পালন ॥ ২৭০ ॥
অপালনে একুশ দিনের বেশী নয় ।
হইবে দেহের নাশ অতীব নিশ্চয় ॥ ২৭১ ॥
সে হেতু শরীরে 'নেতি' করিবে কেমনে ।
অগ্রাহ করিতে গ্রাহ্য নিষেধ গমনে ॥ ২৭২ ॥
দেহ নামধেয় দেখ এই যে শরীর ।
আশ্রয় আবাস নামে রোগের মন্দির ॥ ২৭৩ ॥
যন্ত্রণায় ছট ফট, ব্যাধির জ্বালায় ।
কি করিয়া 'নেতি নেতি' কহিবে তাহায় ॥ ২৭৪ ॥
দেহবুদ্ধি অহঙ্কার যাইবার নয় ।
তাই জ্ঞানমার্গে গতি কঠিনাতিশয় ॥ ২৭৫ ॥
জ্ঞানাপেক্ষা কর্মকাণ্ড আরও যে শক্ত ।
শুনিলে অসাধ্য বিধি শুষ্ক হয় রক্ত ॥ ২৭৬ ॥
ফলাকাঙ্ক্ষা না করিয়া কর্মের নিয়ম ।
জীবের অসাধ্য জ্ঞানপথের মতন ॥ ২৭৭ ॥
যতই না কর চেষ্টা নিষ্কামের বাটে ।
অলক্ষ্যে অজ্ঞাতে কাম স্বতঃ এসে জুটে ॥ ২৭৮ ॥
ক্রমশঃ কর্মের বৃদ্ধি যেখানে কামনা ।
চিঁড়ের বাইশ ফের না হয় গণনা ॥ ২৭৯ ॥
কর্মতরুবর অতি প্রকাণ্ড বিশাল ।
কর্মফল প্রসবয়ে যতকাল কাল ॥ ২৮০ ॥
কর্মফলে আনাগোনা জনম-মরণ ।
আগোটা কালেও নাহি হয় সংকুলন ॥ ২৮১ ॥
তাই কর্মকাণ্ড-বাটে হওয়া অগ্রসর ।
ক্ষীণ মন-প্রাণ জীবে অতীব দুষ্কর ॥ ২৮২ ॥
এবে ঘোরতর তমে মানুষ-নিকর ।
অজ্ঞান অবোধ নিম্নদৃষ্টি নিরন্তর ॥ ২৮৩ ॥
সতত প্রমত্তচিত্ত অবিদ্যা-সেবায় ।
দ্বেষ হিংসা প্রবঞ্চনা কর্ম ব্যবসায় ॥ ২৮৪ ॥
ধর্ম-পুণ্যশূক্ত পরিপূর্ণ হাহারোল ।
সুখের মুকুটধারী দুঃখে দেয় কোল ॥ ২৮৫ ॥
হীন হেয় পথে গতি মতি সর্বদায় ।
কোটি জনমেও নাহি নিস্তার-উপায় ॥ ২৮৬ ॥
জীবের দুর্গতি দেখি দুর্গতিবারণ ।
পাপতাপ কর্মফল কপালমোচন ॥ ২৮৭ ॥
দয়াকর সর্বেশ্বর দয়ায় অস্থির ।
অবতীর্ণ ধরাধামে ধরিয়া শরীর ॥ ২৮৮ ॥
দেশকালে বুঝিয়া জীবের দুরবস্থা ।
করিলেন নারদীয় ভক্তির ব্যবস্থা ॥ ২৮৯ ॥
রূপাকার রুচি মত যার যেন মন ।
স্মরণ-মননোপায় নাম সংকীর্তন ॥ ২৯০ ॥
ইহাতে জীবের হবে পরম কল্যাণ ।
জন্মজন্মার্জিত কর্মফলে পরিত্রাণ ॥ ২৯১ ॥
অব্যর্থ আশ্বাসবাক্য প্রভুর আমার ।
অচল টলিবে, বাক্য নহে টলিবার ॥ ২৯২ ॥
সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য ।
ছুটাইতে ধরণীতে ভকতির বন্যা ॥ ২৯৩ ॥
ভক্তিপ্রিয় বলিলেন নিজে বার বার ।
ঈশ্বরেতে ভালবাসা ভক্তিমাত্র সার ॥ ২৯৪ ॥
নামাইলা জ্ঞানমার্গী ভকতনিকরে ।
নাচিতে গাইতে ভক্তি কীর্তন-আসরে ॥ ২৯৫ ॥
দয়ার্ণব ঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভুবন-মঙ্গল ॥ ২৯৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড
নীলকণ্ঠের যাত্রাশ্রবণে প্রভুদেবের গমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
পতিত-পাবন বেশ,
পূর্ণ-ব্রহ্ম
পরমেশ,
প্রভুদেব অখিলের পতি ।
ধরি নর-কলেবর,
অবতীর্ণ ধরা'পর,
নিবারিতে জীবের দুর্গতি ॥ ১ ॥
প্রভুর যতেক কর্ম,
সকলেই গূঢ় মর্ম,
লীলাধর্ম তাহার ভিতরে ।
সহজে না বুঝা যায়, কি হেতু কি কৈলা রায়,
ভক্তসঙ্গে লীলার আসরে ॥ ২ ॥
সরল ঘটনা যেন,
কহি মন শুন শুন,
রামকৃষ্ণলীলা সুমধুর ।
যেখানে জনতা বেশী, যাইতে সেথায় খুশী,
আজি কালি লীলার ঠাকুর ॥ ৩ ॥
মাহেশ বল্লভপুরে,
রথযাত্রা দেখিবারে,
ফি বৎসরে প্রায় আগমন ।
ভক্তি-শ্রদ্ধা-অনুরাগে, পেনেটির চিড়া-ভোগে,
যেইখানে মহা সঙ্কীর্তন ॥ ৪ ॥
হরিসভা স্থানে স্থানে, শহরে কি
পল্লীগ্রামে,
ভিক্ষালীলা ভক্তের আবাসে ।
আনন্দে আকুল প্রাণ, ব্রাহ্মদলে যোগদান,
উৎসবে তাঁদের সঙ্গে মিশে ॥ ৫ ॥
যাত্রা কিবা সংকীর্তনে, যেই ভাবে যে রকমে,
হয় কোন ঈশ্বরীয় কথা ।
রঙ্গমঞ্চে থিয়েটার,
নাট্যশালা অবিদ্যার,
বেশ্যা লয়ে ব্যবসায় যেথা ॥ ৬ ॥
শহরেতে বারোয়ারি,
আড়ম্বর ধুম ভারি,
অগণন লোক যেথা জমে ।
যাত্রা নানাবিষয়ক,
কৃষ্ণলীলা রামশখ,
ক্রমান্বয়ে চলে রেতেদিনে ॥ ৭ ॥
স্থান হাটখোলা নামে, একবার
সেইখানে,
বারোয়ারি বিষম ঘটায় ।
চৌদিকে ছুটিল কণ্ঠ,
ভক্তিমান নীলকণ্ঠ,
মনোহর কৃষ্ণলীলা গায় ॥ ৮ ॥
গায়ক প্রভুর বরে, ধন্য ধন্য
এ সংসারে,
যাত্রা করে জগতে মোহিত ।
শুনিলে পাযাণে জল, শুষ্ককাষ্ঠে
উঠে কল,
অমনি সাপিনী ভুলে রীত ॥ ৯ ॥
সমাচার শ্রীগোচরে, হাজির
হইলে পরে,
শিশুমতি বালক যেমন ।
কণ্ঠের শুনিতে গান,
সচঞ্চল ভগবান,
ভক্তগণে বার বার কন ॥ ১০ ॥
পরদিনে প্রাতে যাত্রা, কণ্ঠের শুনিতে
যাত্রা,
বারোয়ারি শহরে যেখানে ।
আনন্দেতে আটখানা, সঙ্গে ভক্ত কয় জনা,
ভাড়াটিয়া গাড়ি আরোহণে ॥ ১১ ॥
সত্বর তড়িত চেয়ে, বারতা
ছুটিল ধেয়ে,
শহরের নানাবিধ স্থলে ।
প্রভুভক্তি ভক্ত-অলি, মত্ত অঙ্গ কৌতূহলী,
জুটিতে লাগিলা দলে দলে ॥ ১২ ॥
কেহ আসরেতে গিয়া, আলাদে আকুল হিয়া,
ভাগ্যবান নীলকণ্ঠ কয় ।
শ্রবণ-মঙ্গল-বার্তা, শুনিতে এখানে যাত্রা,
আসিয়াছেন প্রভু দয়াময় ॥ ১৩ ॥
ভক্তিমান গায়কের, ভাগ্যের নাহিক টের,
আনন্দে আকুল জড় স্বর ।
কহে করজোড় করি, এ যে স্থান বারোয়ারি,
জনাকীর্ণ ভীষণ আসর ॥ ১৪ ॥
নিঃশ্বাসে গরম স্থান, বহ্নি বহে মূর্তিমান,
চন্দ্রাতপে উর্ধ্ব আবরণ ।
প্রতি পরমাণু কষ্ট, কহে তাঁর হবে কষ্ট,
তিনি অতি যতনের ধন ॥ ১৫ ॥
এত বলি সেইক্ষণে, ডাকে কর্তৃপক্ষগণে,
সংগোপনে কহে বিবরণ ।
সম্ভাষি বিনয়াচারে, অতীব যতন ভরে,
করিবারে প্রভুর আসন ॥ ১৬ ॥
শুনিলে প্রভুর নাম, সকলের ফুল্ল প্রাণ,
কি জানি কি নামের ভিতর ।
তখনই রচিল গিয়া, লোকজনে সরাইয়া,
শ্রীপ্রভুর আসন সুন্দর ॥ ১৭ ॥
হেনকালে কোন ভক্ত, মধুর রসনা-যুক্ত,
দিল ঢালি অমেয় বারতা ।
গায়কের সন্নিধান, সমাগত ভগবান,
বাহিরে ফটক বাঁধা যেথা ॥ ১৮ ॥
আসর ত্যজিয়া চলে, বিষম জনতা ঠেলে,
তাড়াতাড়ি গায়ক ব্রাহ্মণ ।
শ্রীপ্রভুর পদধূলি, মাথায় লইল তুলি,
ভক্তিভরে করিয়া বন্দন ॥ ১৯ ॥
ভক্তসহ প্রভুরায়, আসরে লইয়া যায়,
নিজে করি বাট পরিষ্কার ।
এখন প্রভুর দশা, কিঞ্চিৎ ঈষৎ নেশা,
মৃচ্ছ মন্দ আবেশ সঞ্চার ॥ ২০ ॥
নিজাসনে উপবিষ্ট, প্রভুদেব রামকৃষ্ণ,
দুই ধারে ভকতনিকর ।
ধরণী পরম সুখে, ধরিল নিজের বুকে,
গোলোকের ছবি মনোহর ॥ ২১ ॥
ভাগ্যবান অগণন, উপস্থিত লোকজন,
দরশন অনিমেখে করে ।
পতিতপাবন হরি, ভবনিধির কাণ্ডারী,
দেহ ধরি ধরার আসরে ॥ ২২ ॥
পুরাণগ্রন্থেতে কয়, পুনর্জন্ম নাহি হয়,
বারেক ঈশ্বর-দরশনে ।
হাজার হাজার আজি, জিনিল জন্মের বাজি,
নিরখিয়া রাজীব-চরণে ॥ ২৩ ॥
প্রভু অবতীর্ণ কালে, যেথা সেথা মুক্তি ফলে,
পথে ঘাটে ছড়াছড়ি যায় ।
জলবিন্দু যে প্রকার, আদর নাহিক তার,
অনিবারে ঝরে বরিষায় ॥ ২৪ ॥
অবসানে বরিষার, এক বিন্দু মেলা ভার,
দুরসাধ্য না হয় অর্জন ।
তৃষ্ণা-নিবারণ তরে, কে জল খাইতে পারে,
করে করি সরসী খনন ॥ ২৫ ॥
মানুষ মায়ার ঘোরে, আসক্তি ছাড়িতে নারে,
নাহি চায় হইতে মোচন ।
বিষাধারে কুতুহলে, উঠে ডুবে নাচে খেলে,
বিষে জন্ম কীটের যেমন ॥ ২৬ ॥
ধন্য রে কালের জীব, প্রভুদরশনে শিব,
অবতীর্ণ দয়াল ঠাকুর ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-নিধি, মুক্তি মিলে মথে যদি,
হেলায় বন্ধন হয় দূর ॥ ২৭ ॥
লীলাকাণ্ড আজিকার, শুনে বহু ভাগ্য যার,
যাত্রাশালে লোক অগণন ।
শ্রীপ্রভুর আগমনে, যাত্রা নাহি কেহ শুনে,
ভগবানে করে নিরীক্ষণ ॥ ২৮ ॥
অন্তরে অপার সুখ, উচ্ছ্বাসে প্রফুল্ল মুখ,
লক্ষণ বদনমধ্যে খেলে ।
শ্রীপ্রভু আনন্দাধার, যেখানে উদয় তাঁর,
সবে ভাসে আনন্দ হিল্লোলে ॥ ২৯ ॥
গায়ক সাধক ভক্ত, প্রেমেতে হইয়া মত্ত,
সম্মুখে পাইয়া প্রভুবরে ।
ভক্তিমাখা সুরচিত, গায় কৃষ্ণলীলাগীত,
শ্রবণে মোহিত চিত করে ॥ ৩০ ॥
নিজাসনে উপবিষ্ট, ছিলা প্রভু রামকৃষ্ণ,
কৃষ্ণকথা করিয়া শ্রবণ ।
আবেশে অবশ হৈয়া, উঠিলেন দাঁড়াইয়া,
অঙ্গে নাহি বাহ্যিক চেতন ॥ ৩১ ॥
ননীর পুতলি জিনি, তখন শ্রীতনুখানি,
চরণ ধরিতে নারে আর ।
কাছে ভক্ত দুই জনে, ধরিলেন সযতনে,
ভাবে মত্ত প্রভুরে আমার ॥ ৩২ ॥
আ মরি কি মনোহর, সমাধিস্থ কলেবর,
নিশাকর বদনমণ্ডলে ।
অপরূপ শোভা পায়, কিরণ-হিল্লোল তায়,
ঝলকে ঝলকে যবে খেলে ॥ ৩৩ ॥
নিরখি শ্রীমুখ-ইন্দু, অন্তরের
প্রেমসিন্ধু,
আধার ছাড়িয়া ছুটে যায় ।
তোড়ে ভাসে তার জলে, বহু দূর দূরাঞ্চলে,
দুইকূলে যে রহে যেথায় ॥ ৩৪ ॥
কত পথ ছুটে ঢেউ, সন্ধান না জানে কেউ,
বিধির বিধান নাই খেলা ।
মায়া ঈশ্বরের শক্তি, অপার তাঁহার কীর্তি,
লীলার ভিতরে আছে ঢাকা ॥ ৩৫ ॥
কোথা সূর্য কত দূরে, কেমনে বিমানে করে,
লবণাম্বু লইয়া সিন্ধুর ।
বিমানে চালিয়ে কল, ফটিক নির্মল জল,
চাতকের তৃষা যাহে দূর ॥ ৩৬ ॥
ধরার জলধিমালা, শূন্যমার্গে করে খেলা,
ধরিয়া জলদ নামান্তর ।
এ বড় বিষম দায়, কিছু নাহি বুঝা যায়,
কেবা কিবা কোথা কার ঘর ॥ ৩৭ ॥
এক শক্তি মোটেমূলে, কার্যেতে ভিয়ান তুলে,
লক্ষ কোটি সৃষ্টি রকমারি ।
দুটি বস্তু সমরূপ, বিশ্বমধ্যে অপরূপ,
শক্তির শকতি বলিহারি ॥ ৩৮ ॥
একে নাহি মিলে অন্য, সকলে ভিন্ন ভিন্ন,
তারে গুণে গঠন বরনে ।
অবিনাশী যাবতীয়, বিশ্বে নাই শ্রেয়ঃ হেয়,
রূপান্তর গুণান্তর বিনে ॥ ৩৯ ॥
চতুর্মুখ হরি হর, যে শক্তির
আজ্ঞাপর,
হয় লয় যাহার ভিতরে ।
সেই শক্তি দিবানিশি, শ্রীপ্রভুদেবের দাসী,
যুক্তকরে লীলার আসরে ॥ ৪০ ॥
হেন প্রভু বিশ্বপতি, তাঁহার লীলার গতি,
সাধ্য কার করে নিরূপণ ।
আকাশ মাটির সনে, মিশে গেছে যেইখানে,
সে নয় তাদের আয়তন ॥ ৪১ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-রাজ্য, মহতী অব্যক্তাশ্চর্য,
আদি-অন্তবিহীন আভাস ।
অবিরত যুক্তকরে, যাবতীয় অবতারে,
নিরাপদে মধ্যে করে বাস ॥ ৪২ ॥
রাজ-রাজ রামকৃষ্ণ, সকলে বিচারে তুষ্ট,
বিবাদ-কলহ বিভঞ্জন ।
যার যাহা অধিকার, তিল নষ্ট নহে কার,
সমভাবে সকলে পালন ॥ ৪৩ ॥
গোকল বেদান্ত আদি, যেখানে যাবৎ বিধি,
যত পথ ব্যক্ত চিরকাল ।
সকলে ধরিয়া বক্ষে, সমান যতনে রক্ষে,
করিলেন প্রভু ধর্মপাল ॥ ৪৪ ॥
সমাধিস্থ অবস্থায়, কত কি বিকাশ পায়,
বিশ্বরূপ শ্রীদেহ-আধারে ।
জানি না সে কোন্ জনা, বুঝে যার অণুকণা,
কেবা কিবা কিবা বলে কারে ॥ ৪৫ ॥
বদনে অপূর্ব আভা, জনগণ-মনোলোভা,
শোভা তার না যায় বর্ণন ।
বারেক দেখিলে পরে, নয়নে মোহন করে,
মুক্ত আর নহে কদাচন ॥ ৪৬ ॥
আজি এই যাত্রাশালে, সেই ভাতি মুখে খেলে,
দেখিতে লোলুপ লোকজনে ।
মুখে মুখে কলরব, করিয়া
দাঁড়ায় সব,
পতিতপাবন-দরশনে ॥ ৪৭ ॥
দেখিবার গোলযোগে, যাত্রা যায় প্রায় ভেঙ্গে,
ভক্তিমান গায়ক প্রধান ।
আপনার দলে বলে, সহ খোল করতালে,
গায় যুগ্ম রাধাকৃষ্ণ নাম ॥ ৪৮ ॥
শুনিয়া যুগল নাম, নিম্নদেশে
ভগবান,
নামিতে লাগিলা ক্রমে ক্রমে ।
ভক্তগণে পুনরায়, বসাইয়া দিল
তাঁয়,
পূর্ববৎ নিজের আসনে ॥ ৪৯ ॥
যাত্রারম্ভ হলে পুনঃ, আজিকার লীলা শুন,
দুনো বলে পুনশ্চ আবেশ ।
কৃষ্ণপ্রেমে গাঢ়তর, বিকলাঙ্গ গুরুতর,
হইলেন প্রভু পরমেশ ॥ ৫০ ॥
আবেশ ইচ্ছার রীতি, ঠিক যেন মাতা হাতী,
দিগাদিগ না রহে গিয়ান ।
ইন্ধন বন্ধন খুঁটি, দেহ গেহ
পরিপাটী,
নষ্ট করি হয় ধাবমান ॥ ৫১ ॥
অতুল মুরতিখানি, ভক্তের জীবন প্রাণী,
পাছে তাহে হানি কিছু হয় ।
সেহেতু লইয়া তাঁয়, সত্বর বাহিরে যায়,
ভক্তগণে ভীত অতিশয় ॥ ৫২ ॥
সেবা শুশ্রূষার পরে, সুস্থ করি প্রভুবরে,
পলাইল শকটারোহণে ।
বাগবাজারেতে ধাম, ভক্ত বসু বলরাম,
ভাগ্যবান তাঁহার ভবনে ॥ ৫৩ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-গীত, যাহাতে সুধার রীত,
পূত চিত নিশ্চিত শ্রবণে ।
বিকার বাতিক লয়, অক্ষয় অমর হয়,
বিমোচন ভবের বন্ধনে ॥ ৫৪ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভক্তদের সঙ্গে নানা রঙ্গ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-কথা বুঝা মহাদায় ।
বিষয়ী মলিন বুদ্ধি ধরিয়া মাথায় ॥ ১ ॥
সরল সহজ লীলা বাঁকা বোধ কেনে ।
অন্তরেতে অবিশ্বাস এই তার মানে ॥ ২ ॥
উপমায় বিশেষিয়া দেখ তুমি মন ।
জল বাঁকা নহে, বাঁকা নদীর গঠন ॥ ৩ ॥
লীলাকথা-আন্দোলনে বাঁকা সোজা হয় ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা যাহার প্রত্যয় ॥ ৪ ॥
অখিল বিশ্বের স্বামী প্রভুদেব রায় ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা ভক্ত বলি যায় ॥ ৫ ॥
অবতার শ্রীপ্রভুর শ্রীঅঙ্গে জনমে ।
তবু কেন গাই তাঁয় অবতার নামে ॥ ৬ ॥
তাহার কারণ মন তোমারে শুনাই ।
ভাষায় প্রভুর বাচ্য প্রতিশব্দ নাই ॥ ৭ ॥
পুঁথিমধ্যে প্রভুদেবে অবতার লেখা ।
ঠিক যেন জলধিরে সরোবর আঁকা ॥ ৮ ॥
সেইমত প্রভু-ভক্তে দিয়া ভক্তনাম ।
দেখাইনু হিমাচলে বালির সমান ॥ ৯ ॥
প্রভু-ভক্ত করুণার করিলে কটাক্ষ ।
তখনি জনমে কত ভক্ত লক্ষ লক্ষ ॥ ১০ ॥
হেন বস্তু প্রভু হেন বস্তু ভক্ত তাঁর ।
ভক্তিভরে শুন লীলা ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১১ ॥
প্রভু ভক্ত পদে মতি রাখি বিলক্ষণ ।
চলিলে পাইবে রামকৃষ্ণভক্তি-ধন ॥ ১২ ॥
বৃথায় জনম নষ্ট বুঝিবে নিশ্চয় ।
প্রভু-ভক্ত-পদে যদি মতি নাহি হয় ॥ ১৩ ॥
সুদুর্লভ প্রভু ভক্তি মিলয়ে সহজে ।
এক পন্থা প্রভু-ভক্ত চরণের রজে ॥ ১৪ ॥
শুন তবে খুলে বলি মধুর কথন ।
রেলের কলের মত প্রভু-ভক্তগণ ॥ ১৫ ॥
এক এক ভক্ত এত শক্তি ধরে গায় ।
হাজার বোঝাই গাড়ি নিজে টেনে যায় ॥ ১৬ ॥
রঙ্গালয় থিয়েটার অতিশয় হীন ।
লম্পট বেশ্যার দল অন্তর মলিন ॥ ১৭ ॥
তথায় রাখিয়া প্রভু আপনার জন ।
লীলারঙ্গরসাস্বাদ করেন কেমন ॥ ১৮ ॥
পতিত-উদ্ধার নাম-মহিমা প্রচার ।
অনাথ অধম পাপী তাপীর উদ্ধার ॥ ১৯ ॥
গিরিশ তাঁহার জন অতিশয় তেজা ।
গৃহিভক্তচূড়ামণি বিশ্বাসের রাজা ॥ ২০ ॥
কে তিনি শুনহ কথা সন্দ হবে দূর ।
একদিন প্রভুদেব লীলার ঠাকুর ॥ ২১ ॥
কহিছেন আপনার অন্তরঙ্গগণে ।
কালীর মন্দিরে আমি আপনার মনে ॥ ২২ ॥
উপবিষ্ট হেনকালে দেখি নিরখিয়া ।
আইল মূরতি এক নাচিয়া নাচিয়া ॥ ২৩ ॥
বগলে বোতল দুটি চুলে বাঁধা ঝুটি ।
পুরুষের চিহ্ন যেন খেজুরের আঁটি ॥ ২৪ ॥
কেবা সে যখন আমি জিজ্ঞাসিনু তাঁয় ।
কহিল ভৈরব মুই আইনু হেথায় ॥ ২৫ ॥
কিবা প্রয়োজন তারে পুছিলে আবার ।
উত্তর করিল কার্য করিব তোমার ॥ ২৬ ॥
গিরিশ আমার কাছে আসিবার পর ।
দেখিনু ভৈরব সেই তাহার ভিতর ॥ ২৭ ॥
বলিয়াছি বারে বারে অপূর্ব কখন ।
কেহ দেব কেহ দেবী প্রভুভক্তগণ ॥ ২৮ ॥
সাধিতে লীলার কার্য প্রভুভক্ত যত ।
নানা বেশে নানা স্থানে প্রয়োজন মত ॥ ২৯ ॥
অবস্থিত ধরাধামে নানা অবস্থায় ।
লীলার ঈশ্বর প্রভু তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৩০ ॥
জীবের প্রকৃতি দিয়া ভক্তের ভিতর ।
লীলারসাস্বাদ করে লীলার ঈশ্বর ॥ ৩১ ॥
ভক্তি জ্ঞান শক্তি কিন্তু মাথা থাকে গায় ।
তিলেকে জাগিয়া উঠে তিলেকে ঘুমায় ॥ ৩২ ॥
দারুণ নিদাঘে যেন দিবসের কায়া ।
কভু খরতর কর কভু মেঘছায়া ॥ ৩৩ ॥
শুন কহি বিবরণ অমৃত বিশেষ ।
গিরিশ শৈশব যবে দিগম্বর-বেশ ॥ ৩৪ ॥
তখন উদয় মনে হইত তাঁহার ।
জগতের মূল শক্তি সৃষ্টি করা যাঁর ॥ ৩৫ ॥
শক্তির প্রভাবে যদি সৃষ্টির জনম ।
তবে এ শক্তিরে সৃষ্টি কৈল কোন্ জন ॥ ৩৬ ॥
হেন প্রশ্ন যে শিশুর স্বতঃ উঠে মনে ।
মায়ামুগ্ধ জীব তাঁয় কহিব কেমনে ॥ ৩৭ ॥
অবিশ্বাসী সাধারণ মানুষনিচয় ।
ঈশ্বরের লীলাকথা করে না প্রত্যয় ॥ ৩৮ ॥
বিপরীত কয় কথা মায়ায় মগন ।
যাবৎ জগতে দেখে নিজের মতন ॥ ৩৯ ॥
বিষ্ণুপদোদ্ভবা গঙ্গা ব্রহ্ম-বারি তাঁয় ।
হীন হেয় কত শত স্রোতে ভেসে যায় ॥ ৪০ ॥
তাহার মহিমা তাঁর কিছু নাহি কমে ।
জীবের মুকতি একবিন্দু-পরশনে ॥ ৪১ ॥
সেইমত ভক্তদের জীবনের স্রোতে ।
কলঙ্ক-কালিমামালা অগণ্য তাহাতে ॥ ৪২ ॥
নাহি হয় তিল হানি মহিমার বল ।
পদরজঃ-পরশনে পরম মঙ্গল ॥ ৪৩ ॥
পবিত্র চরিত চিত নিরমল মন ।
পরে ফুটে হৃদে রামকৃষ্ণভক্তিধন ॥ ৪৪ ॥
প্রভু-ভক্ত-মহিমার অপূর্ব বারতা ।
আপনি পাইবে মন শুন লীলাকথা ॥ ৪৫ ॥
কোন্ দেহে কোন্ দেব দেবী সমাগত ।
সর্ব সমাচার মোর প্রভুর বিদিত ॥ ৪৬ ॥
এক দিনে শ্রীপ্রভুর দরশন-আশে ।
ভক্তিমতী মহিলা কতকগুলি আসে ॥ ৪৭ ॥
সম্ভ্রান্ত বংশের তাঁরা কুলের কামিনী ।
তার মধ্যে একজন দেবীঠাকুরানী ॥ ৪৮ ॥
রমণীর বেশে বাস প্রভু-অবতারে ।
দেখামাত্র চিনিলেন শ্রীপ্রভু তাঁহারে ॥ ৪৯ ॥
সংসারেতে চারি পাঁচ সন্তান সন্ততি ।
তবু অঙ্গে কান্তি যেন নবীনা যুবতী ॥ ৫০ ॥
সাধারণে পরিচয় বলিতে বারণ ।
সেই হেতু পুঁথিমধ্যে রহিল গোপন ॥ ৫১ ॥
সেবাপর আপ্তজনে প্রভু দেবরায় ।
বলিলেন সংগোপনে দেখাইয়া তাঁয় ॥ ৫২ ॥
বাখানিয়া মৃদুস্বরে যত পরিচয় ।
মানুষের বেশে মাত্র মানবিনী নয় ॥ ৫৩ ॥
প্রত্যক্ষ দেখিতে সাধ যদি হয় মনে ।
গন্ধদ্রব্যসহ দাও কুসুম চরণে ॥ ৫৪ ॥
লীলা-দরশনে-প্রিয় ভকতের কুল ।
ধূপধুনাসহ তাঁর পায়ে দিল ফুল ॥ ৫৫ ॥
ঘোমটার মধো ঢাকা ছিল মুখখানি ।
চকিতের মধ্যে কিবা আশ্চর্য কাহিনী ॥ ৫৬ ॥
গভীরসমাধিযুক্ত অঙ্গ সংজ্ঞাহীনা ।
জনমেও ধ্যান যাঁর মোটে নাই জানা ॥ ৫৭ ॥
সঙ্গিনীরা বুদ্ধিহারা দেখিয়া ব্যাপার ।
সশঙ্কিত ত্রস্তচিত জড়ের আকার ॥ ৫৮ ॥
কাহার বদনে আর সরে না বচন ।
যাদু-মুগ্ধ যেন সবে যায় বহুক্ষণ ॥ ৫৯ ॥
নিম্নদেশে মন আর না আসে দেবীর ।
ইন্দ্রিয়াদিসহ অঙ্গ একেবারে স্থির ॥ ৬০ ॥
গভীর ধিয়ানে বাহ্য নাহি আসে গায় ।
তখন শ্রীপ্রভুদেব ডাকেন শ্যামায় ॥ ৬১ ॥
ও মা কালী কি হইল রক্ষা কর এবে ।
জানিতে পারিলে লোকে মন্দ কটু কবে ॥ ৬২ ॥
ভীতভাবে এ মতে ডাকিলে কালীমায় ।
তখন চেতন অঙ্গে তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৬৩ ॥
ধ্যানের বিষম নেশা তাহাতে আকুল ।
নয়ন দুখানি রাঙ্গা যেন জবাফুল ॥ ৬৪ ॥
পদক্ষেপে নাহি শক্তি অঙ্গ থর থর ।
সঙ্গিনীরা লয়ে তুলে গাড়ির ভিতর ॥ ৬৫ ॥
প্রভু আর প্রভুভক্ত বস্তু কি রকম ।
বিন্দুমাত্র জানিতে না হইনু সক্ষম ॥ ৬৬ ॥
ভক্তিসহ শ্রীপ্রভুর পদে রাখি মতি ।
ভক্তির ভাণ্ডার শুন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৬৭ ॥
প্রভু-ভক্ত সাধারণ নিয়মের পার ।
করিলেও পাপকর্ম পাপ নহে তাঁর ॥ ৬৮ ॥
প্রজার শাসনে যত রাজার আইন ।
রাজকুমারেরা নহে তাহার অধীন ॥ ৬৯ ॥
প্রভুর বচনে শুন তাহার প্রমাণ ।
একদিন শ্রীমন্দিরে নিজে ভগবান ॥ ৭০ ॥
বিমরষ মন ভক্ত বিষ্ণুর কারণে ।
আত্মহত্যা কৈলা যেবা পিতার তাড়নে ॥ ৭১ ॥
বহু পূর্বে কহিয়াছি বিশেষ খবর ।
বালক-বয়স বিষ্ণু এড়েদহে ঘর ॥ ৭২ ॥
সন্নিকটে উপবিষ্ট ভক্তগণে কন ।
বিষ্ণুর কারণে আজি মন উচাটন ॥ ৭৩ ॥
বিদ্যালয়ভুক্ত তেঁহ বালক কেবল ।
রতি-মতি ভগবানে বুদ্ধি নিরমল ॥ ৭৪ ॥
পাঠে অনুরাগ তার নাহি ছিল তত ।
এখানে আমার কাছে সর্বদা আসিত ॥ ৭৫ ॥
একবার ঘর ছাড়ি দূরদেশে যায় ।
পশ্চিম অঞ্চলে কোন আত্মীয় যেথায় ॥ ৭৬ ॥
সুরম্য সে স্থান বড় মনের মতন ।
সুন্দর প্রান্তর মাঠ কাছে আছে বন ॥ ৭৭ ॥
নানাবিধ বৃক্ষরাজিসহ শৈলমালা ।
অবিরত বিরাজিত প্রকৃতির খেলা ॥ ৭৮ ॥
যোগপ্রিয়
ধ্যানানন্দ মনোমত স্থানে ।
ধ্যানেতে বিভোর-চিত থাকিত সেখানে ॥ ৭৯ ॥
কহিত আমার
কাছে আনন্দ-মগন ।
কত হয় ঈশ্বরের রূপ-দরশন ॥ ৮০ ॥
মৌন রহি কিছুক্ষণ কন পুনর্বার ।
বোধ হয় এই জন্ম শেষ জন্ম তার ॥ ৮১ ॥
পূর্বজন্মে বহুবিধ কর্ম ছিল করা ।
এইবারে বাকিটুকু হয়ে গেল সারা ॥ ৮২ ॥
কথায় কথায় প্রভু বিধির বিধাতা ।
কহিতে লাগিলা জীবতত্ত্বের বারতা ॥ ৮৩ ॥
ভক্তিভরে স-মনে শুনিলে তুমি মন ।
জনম-মরণ-ভয়ে হইবে মোচন ॥ ৮৪ ॥
প্রভুর বচনে শুন সুন্দর কাহিনী ।
চারিযুগ অক্ষয় অমর যত প্রাণী ॥ ৮৫ ॥
পূর্ব জনমের যাবতীয় সংস্কার ।
স্বীকার্য উচিত করা সবার স্বীকার ॥ ৮৬ ॥
প্রকৃত ঘটনাসহ প্রভুদেব কন ।
শুনিয়াছি কোনকালে কোন একজন ॥ ৮৭ ॥
করে শব-সাধনা নির্জন বনে বসে ।
কালীর অভয় পদ দরশন আশে ॥ ৮৮ ॥
আসন শবের বুকে বনমধ্যে একা ।
সাধনায় নানাবিধ দেখে বিভীষিকা ॥ ৮৯ ॥
শুন কি ঘটনা পরে কালীর ইচ্ছায় ।
বাঘেতে ধরিয়া তারে লইয়া পলায় ॥ ৯০ ॥
নিকটে অত্যুচ্চ গাছে ছিল আর জনা ।
প্রত্যক্ষ দেখিল চক্ষে যাবৎ ঘটনা ॥ ৯১ ॥
বিবেচনা মনে মনে করিল তখন ।
শব-সাধনার দ্রব্য সব আয়োজন ॥ ৯২ ॥
যা আছে কপালে হবে বসিব আসনে ।
এত বলি গাছ থেকে ধীরে ধীরে নামে ॥ ৯৩ ॥
বসিয়া শবের বুকে বিশ্বাসের ভরে ।
মহামন্ত্র কালীনাম খালি জপ করে ॥ ৯৪ ॥
অতি অল্পক্ষণমধ্যে দেখিবারে পায় ।
সদয়া হইয়া শ্যামা প্রত্যক্ষ তথায় ॥ ৯৫ ॥
কহিলেন ভক্তবরে মাগহ সত্বর ।
প্রসন্ন হয়েছি দিব মনোমত বর ॥ ৯৬ ॥
লুটায়ে মায়ের পায়ে কহে সেইজন ।
মা তোমায় এক কথা জিজ্ঞাসি এখন ॥ ৯৭ ॥
তোমার নিকটে বর মাগিবার আগে ।
যে করিল আয়োজন তারে লৈল বাঘে ॥ ৯৮ ॥
জ্ঞান-ভক্তি-সাধন-ভজনহীন আমি ।
আমারে এতেক রূপা কি হেতু জননী ॥ ৯৯ ॥
হাসিয়া হাসিয়া মাতা কন সেইজনে ।
জনমান্তরের কথা নাহি তোর মনে ॥ ১০০ ॥
জনমে জনমে কত শত অগণন ।
মম আশে করিয়াছ সাধন-ভজন ॥ ১০১ ॥
অল্প বাকি ছিল তাহা শেষ এইবারে ।
মনোমত মাগ বর দিব আমি তোরে ॥ ১০২ ॥
শ্রীবাক্য শুনিয়া এবে বুঝ তুমি মন ।
হইলেও বার বার দেহের পতন ॥ ১০৩ ॥
কর্মফল-স্মৃতি আর কর্মের অভ্যাস ।
দেহের সঙ্গেতে নহে কখনই নাশ ॥ ১০৪ ॥
অসক্ষ্যে জীবের সঙ্গে চলে অবিরল ।
বস্তুর সহিত যেন ছায়া অবিকল ॥ ১০৫ ॥
এত বলি কোন ভক্ত প্রভুদেবে কয় ।
আত্মহত্যা শুনে কিন্তু মনে লাগে ভয় ॥ ১০৬ ॥
কথার উত্তরে কথা কন গুণমণি ।
আত্মহত্যা মহাপাপ বার বার মানি ॥ ১০৭ ॥
বারে বারে আসে যায় আত্মঘাতী জনা ।
ভুগিবারে সংসারের যাবৎ যাতনা ॥ ১০৮ ॥
তবে যদি ভগবানে করি দরশন ।
করে কেহ শরীরের স্বেচ্ছায় নিধন ॥ ১০৯ ॥
কোন দোষ নাহি তার হয় তনুত্যাগে ।
আত্মহত্যা অপরাধ তাহাকে না লাগে ॥ ১১০ ॥
ঈশ্বরে জানিয়া যাহা জ্ঞানলাভ হয় ।
তাহাকেই একমাত্র জ্ঞান-বস্তু কয় ॥ ১১১ ॥
সেই জ্ঞান লাভ করি যদ্যপি গিয়ানী ।
স্বেচ্ছায় তিয়াগে তনু নাহি হয় হানি ॥ ১১২ ॥
যেন
নহে কোন ক্ষতি যদি কোন জনা ।
ছাঁচেতে ঢালিয়া লয়ে সোনার প্রতিমা ॥ ১১৩ ॥
আপনার প্রয়োজন ইচ্ছা-অনুসারে ।
মাটির বানান সেই ছাঁচ নষ্ট করে ॥ ১১৪ ॥
অনেক দিনের কথা শুন অতঃপর ।
জনৈক গোপাল নাম স্বভাব সুন্দর ॥ ১১৫ ॥
বরাহনগরে ঘর আসিত হেথায় ।
বয়স অধিক নয় বিশ বর্ষ প্রায় ॥ ১১৬ ॥
হরিভক্তি অনুরাগ হৃদয়-আগারে ।
ভাবরূপকান্তি তার ফুটিত শরীরে ॥ ১১৭ ॥
অধীর অবশ অঙ্গ ভাবের সময় ।
বাহ্যিক গিয়ান মোটে তাহে নাহি রয় ॥ ১১৮ ॥
একদিন ভাবে কাছে কহিল আমার ।
সংসারে তিষ্ঠিতে আমি নাহি পারি আর ॥ ১১৯ ॥
আপনার বহু দেরি হবে লীলাধামে ।
সে হেতু বিদায় মাগি অভয় চরণে ॥ ১২০ ॥
আমিও ভাবের ঘোরে কহিলাম তায় ।
পুনরায় এখানে কি আসিবে ধরায় ॥ ১২১ ॥
আসিব আবার কহি কথার উত্তরে ।
সেদিন চলিয়া গেল আপনার ঘরে ॥ ১২২ ॥
তার কিছুদিন পরে পাইনু খবর ।
ত্যজিয়াছে যুবক নিজের কলেবর ॥ ১২৩ ॥
হরি দরশন করি মুক্ত হ'য়ে জীব ।
করিলে শরীর-ত্যাগ না হয় অশিব ॥ ১২৪ ॥
এত বলি প্রভুদেব বিধির বিধাতা ।
বিশেষিয়া বিবরিলা জীবের বারতা ॥ ১২৫ ॥
যাবৎ যতেক জীব চারিজাতিভুক্ত ।
বন্ধ মুক্ত মুমুক্ষু কেহ বা নিত্যমুক্ত ॥ ১২৬ ॥
মাছের মতন জীব সংসারের জালে ।
ঈশ্বর যাঁহার মায়া তিনি যেন জেলে ॥ ১২৭ ॥
যখন জেলের জালে পড়ে মৎস্যগণ ।
কেহ বা ছিঁড়িয়া জাল করে পলায়ন ॥ ১২৮ ॥
তারে কহে মুক্তজীব মহাবল গায় ।
মায়ায় হইয়া বদ্ধ থাকিতে না চায় ॥ ১২৯ ॥
মুমুক্ষুর খালি চেষ্টা জাল কিসে কাটে ।
ছিড়িতে না পারে জ্বাল বলে নাহি আঁটে ॥ ১৩০ ॥
মুমুক্ষু ও মুক্ত এই দু'শ্রেণীর জীবে ।
থাকিতে না চায় হেন ভব-কূপে ডুবে ॥ ১৩১ ॥
তেকারণে কেহ বা পাইয়া ভগবান ।
স্বেচ্ছায় করেন দেহনষ্টের বিধান ॥ ১৩২ ॥
মুকতি পাইয়া তনু-ত্যাগের বারতা ।
বড়ই কঠিন বহু সুদুরের কথা ॥ ১৩৩ ॥
সাবধানী নারদাদি নিত্যমুক্ত যাঁরা ।
সংসারের জালে কভু না পড়েন ধরা ॥ ১৩৪ ॥
বন্ধজীব সংসারেতে তাদের লক্ষণ ।
পড়িয়াছে জালে জানে নিশ্চয় মরণ ॥ ১৩৫ ॥
তবু নাহি হুঁশ জালে বদ্ধ অবস্থায় ।
কামিনী-কাঞ্চন-পাঁকে শরীর লুকায় ॥ ১৩৬ ॥
পলাইতে নাহি চেষ্টা করে কোন কালে ।
বড় ভুষ্ট আসক্তির পঙ্কিল সলিলে ॥ ১৩৭ ॥
কত সহে দাগা-দুঃখ-বিপদনিচয় ।
তথাপি না হয় কভু চৈতন্য-উদয় ॥ ১৩৮ ॥
যাহাতে এতেক তার শোকের উদ্ভব ।
পুনঃপুনঃ বদ্ধজীব করে সেই সব ॥ ১৩৯ ॥
আপনার হাতে নালা করিয়া খনন ।
লোনা সিন্ধুবারি করে ঘরে আনয়ন ॥ ১৪০ ॥
কাঁটা ঘাসে উট প্রিয় যত তেঁহ খায় ।
দর দর রক্ত-ধারা মুখে বাহিরায় ॥ ১৪১ ॥
তথাপি কেমন নেশা আসক্তি কেমন ।
নাহি ছাড়ে
কাঁটা ঘাস করিতে ভক্ষণ ॥ ১৪২ ॥
যদি কোন বন্ধজীবে বুঝিবারে পারে ।
অসার সংসারে সার
নাহি একেবারে ॥ ১৪৩ ॥
অধম আমড়া উপমায় পরিপাটি ।
সার শাঁসহীন খালি খোসা আর আঁটি ॥ ১৪৪ ॥
জানিয়াও ছাড়িতে না পারে কদাচন ।
সঁপিবারে ঈশ্বরের পাদপদ্মে মন ॥ ১৪৫ ॥
কেশবের খুড়া বয়ঃ বছর পঞ্চাশ ।
দেখিলাম একদিন খেলিছেন তাস ॥ ১৪৬ ॥
নাহি হইয়াছে যেন তখনো তাঁহার ।
উচিত সময় হরিনাম লইবার ॥ ১৪৭ ॥
বন্ধঙ্গীব মাত্রে এক বিশেষ লক্ষণ ।
সাধুসঙ্গ বুঝে যেন প্রকৃত মরণ ॥ ১৪৮ ॥
বিস্তার পোকার মত আনন্দ বিষ্ঠায় ।
খায় মাখে সেই বিষ্ঠা হৃষ্ট-পুষ্ট তায় ॥ ১৪৯ ॥
এত বলি কথা সায় কৈলা গুণমণি ।
ঠাকুরের কথা ঠিক অমৃতের খনি ॥ ১৫০ ॥
ভক্তদের সঙ্গে রঙ্গ নানারূপ হয় ।
বিশেষিয়া বিবরিয়া বলিবারে নয় ॥ ১৫১ ॥
রঙ্গমঞ্চে বার বার যান প্রভুরায় ।
মহাবলী
বীরভক্ত গিরিশ যেথায় ॥ ১৫২ ॥
অকুতঃসাহস তেঁহ আপনার ভাবে ।
মনে যেন আসে তেন কন
প্রভুদেবে ॥ ১৫৩ ॥
জ্বলন্ত বিশ্বাস হৃদে নিরভয় মন ।
তমোগুণী ভক্ত তিনি প্রভুর বচন ॥ ১৫৪ ॥
ডাকাতের সম ধারা প্রবল আচার ।
মার কাট বাঁধ লুট রতন-ভাণ্ডার ॥ ১৫৫ ॥
একদিন মঞ্চমধ্যে প্রভুর গমন ।
নিরখিয়া শ্রীগিরিশ পুলকিত মন ॥ ১৫৬ ॥
পতিতপাবন প্রভু পতিত-ভরসা ।
পতিত উদ্ধার কাজে মঞ্চমাঝে আসা ॥ ১৫৭ ॥
পাকা ষোল আনা জ্ঞান গিরিশের মনে ।
সেই হেতু রঙ্গালয়ে রহে যে যেখানে ॥ ১৫৮ ॥
কি লম্পট কি কপট হীন হেয় মন ।
বেশ্যা বারাঙ্গনাজাতি অভিনেত্রীগণ ॥ ১৫৯ ॥
আবাহন সকলেই বারে বারে করে ।
পদরেণু ঠাকুরের শিরে ধরিবারে ॥ ১৬০ ॥
অভিনেতা পুরুষেরা আসিয়া তথায় ।
অভয়-চরণরেণু ধরিল
মাথায় ॥ ১৬১ ॥
গিরিশের আশ্বাস-বচনে পেয়ে বল ।
উপনীত অবশেষে বারাঙ্গনাদল ॥ ১৬২ ॥
গণনায় ষোলজনা যুবতী প্রখরা ।
বসনে ভূষণে সজ্জা মুনিমনোহরা ॥ ১৬৩ ॥
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেব ভাবেভরা চিত ।
ধরিলা মোহন কণ্ঠে শ্যামা-গুণগীত ॥ ১৬৪ ॥
মধুর প্রভুর স্বর পিকপাখী জিনি ।
শ্রবণে মোহিতচিত যতেক রমণী ॥ ১৬৫ ॥
তার মধ্যে একজন বিনোদিনী নাম ।
মুর্ছিতা হইয়া পড়ে ধরায় অজ্ঞান ॥ ১৬৬ ॥
প্রসারিত ঠাকুরের শ্রীচরণতলে ।
দিব্য-ভাব সমুদিত অন্তর-অঞ্চলে ॥ ১৬৭ ॥
আজন্ম আচার যার বেশ্যার ব্যবসা ।
তরিবারে ভবসিন্ধু নাহি কোন আশা ॥ ১৬৮ ॥
আজি তার ভক্তিভাবে ভরিল অন্তর ।
নিরখিয়া দীনবন্ধু লীলার ঈশ্বর ॥ ১৬৯ ॥
পতিত কাঙ্গাল দীন-হীন হেয় জন ।
পাপেভরা প্রাণে সারা দুর্বল অক্ষম ॥ ১৭০ ॥
আশাহীন মনক্ষীণ ভবসিন্ধুকূলে ।
নাহি বন্ধু করে পার অকূল সলিলে ॥ ১৭১ ॥
কিবা ভয় পারাপারে পাইবে সম্বল ।
ফেলিয়া নয়নে মাত্র এক ফোঁটা জল ॥ ১৭২ ॥
গাও রামকৃষ্ণনাম হইয়া আতুর ।
ক্ষণমধ্যে হবে পার কাণ্ডারী ঠাকুর ॥ ১৭৩ ॥
ত্রিবিধ ভক্তের জাতি প্রভুর বচনে ।
গুণ-অনুসারে ভেদ সত্ব রজঃ তমে ॥ ১৭৪ ॥
সত্বমূলাত্মক ভক্তি যেখানে বিকাশ ।
বাহ আড়ম্বর তথা একেবারে হ্রাস ॥ ১৭৫ ॥
দীনতার আবরণে গোপন আকার ।
শিষ্ট শান্ত অমায়িক অলোভ আচার ॥ ১৭৬ ॥
রজোগুণে আড়ম্বর বহু ব্যক্ত পায় ।
গলায় রুদ্রাক্ষ দুলে তিলক নাসায় ॥ ১৭৭ ॥
পূজা-আরাধনা-কালে অঙ্গ সুশোভন ।
পরিধেয় পরিপাটি পাটের বসন ॥ ১৭৮ ॥
তমোগুণাত্মক ভক্ত লক্ষণ তাহার ।
জ্বলন্ত বিশ্বাস চিত্তে জ্বলে অনিবার ॥ ১৭৯ ॥
ঈশ্বর নিজের লোক এই ভাব মনে ।
তিল গ্রাহ্য নাহি করে কাহারে ভুবনে ॥ ১৮০ ॥
ভাঙ্গিয়া দুয়ার-ঘর আপনার জোরে ।
মনের মতন ধন লুঠে ধনাগারে ॥ ১৮১ ॥
ইচ্ছামত রাখে কাছে যেন যায় মন ।
অন্য পরে যারে তারে করে বিতরণ ॥ ১৮২ ॥
গিরিশ প্রভুর ভক্ত এমন শ্রেণীর ।
সবল সকল শিরা বিশ্বাসের বীর ॥ ১৮৩ ॥
ভক্তিভরে শুন তবে কহিব কাহিনী ।
আর দিন মঞ্চমধ্যে প্রভু গুণমণি ॥ ১৮৫ ॥
বিবিধ ভাবের ভক্ত প্রভুর পিয়ারা ।
আজিদিনে অনেকেই সঙ্গে আছে তাঁরা ॥ ১৮৬ ॥
উচ্চতর কাঠাসনে প্রভুর আসন ।
চারিদিকে বেড়িয়া তাঁহার ভক্তগণ ॥ ১৮৭ ॥
জানু গাড়ি গিরিশ বসিল গিয়া শেষে ।
নিম্নভাগে ঠাকুরের চরণের পাশে ॥ ১৮৮ ॥
সুরায় বিভোর অঙ্গ চিত্ত মাতোয়ারা ।
অকুতঃসাহস যেন ছাতি ধরাবেড়া ॥ ১৮৯ ॥
জনমের যত কষ্ট স্মরিয়া অন্তরে ।
পাড়িতে লাগিল খালি গালি প্রভুবরে ॥ ১৯০ ॥
খেঁউর পচাল ভাষা সুকটু বাখান ।
আদিরস নাহি জানে যাহার সন্ধান ॥ ১৯১ ॥
নাট্যকার নিজে তেহ কবির বদন ।
নুতন সৃজিয়া গালি করে বরিষণ ॥ ১৯২ ॥
নাহি বাদ মাসী পিসী জনক জননী ।
নীরবে শুনেন সব প্রভু গুণমণি ॥ ১৯৩ ॥
অবশেষে গিরিশ কহেন প্রভুদেবে ।
স্বীকার করহ মোর ছেলে হতে হবে ॥ ১৯৪ ॥
এতক্ষণে শ্রীবদনে ফুটিল বচন ।
উত্তরে গিরিশচন্দ্রে কহেন তখন ॥ ১৯৫ ॥
তুই শালা স্বেচ্ছাচারী বহুবেশ্যাগামী ।
কি কারণে ছেলে তোর হতে যাব আমি ॥ ১৯৬ ॥
পরম-পবিত্র-চিত বিশুদ্ধ-আচার ।
ক্রিয়াবান নিষ্ঠাবান জনক আমার ॥ ১৯৭ ॥
এইরূপে দ্বন্দ্ব-কথা হয় অনর্গল ।
অবাক হইরা শুনে ভকতের দল ॥ ১৯৮ ॥
কেহ কিছু কহে, নহে কাহারও শকতি ।
কিন্তু সবে মহারুষ্ট গিরিশের প্রতি ॥ ১৯৯ ॥
দয়ালপ্রকৃতি প্রভু বালক-আচার ।
স্বার্থশূন্যে কামনা জীবের উপকার ॥ ২০০ ॥
থিয়েটার কেবল লম্পট বেশ্যা লয়ে ।
তথা তিনি তাহাদের ত্রাণের লাগিয়ে ॥ ২০১ ॥
তাহা না বুঝিয়া মনে বিপরীত ডালি ।
পেটভরে পিয়ে সুরা কটুভাষে গালি ॥ ২০২ ॥
ভক্তির বারতা কিছু বুঝা নাহি যায় ।
নানাভাবে ভক্তিভাব বিকাশিত পায় ॥ ২০৩ ॥
ভক্তিভাব প্রত্যেক ভক্তের স্বতন্তর ।
একের ভাবেতে লাগে অপরের জ্বর ॥ ২০৪ ॥
সকল ভাবের ভাবী কিন্তু যেইজন ।
তাঁহার নিকটে সব সমান রকম ॥ ২০৫ ॥
গিরিশের ভাষা আজি প্রভু ভগবানে ।
বড়ই লাগিল কটু ভক্তদের কানে ॥ ২০৬ ॥
প্রভুর শ্রবণে কিন্তু স্তুতি ভক্তিময় ।
ভাবগ্রাহী একা প্রভু অন্য কেহ নয় ॥ ২০৭ ॥
ভাবের ঘরেতে চুরি না করি যে জন ।
ঘৃণা লজ্জা ভয় তিনে হইয়া মোচন ॥ ২০৮ ॥
আচরণ তাঁর সঙ্গে করে ঠিক ঠিক ।
তুষ্ট তাঁয় প্রভু সর্বরসের রসিক ॥ ২০৯ ॥
ভক্তির বিধান নহে অপরের পারা ।
বেডউল ভক্তিভাব বেদ-বিধি ছাড়া ॥ ২১০ ॥
লক্ষণ ধরিয়া তার না মিলে সন্ধান ।
এক চিহ্ন ভক্তে নাহি ছাড়ে ভগবান ॥ ২১১ ॥
অঙ্গে করে কর্ম কাজ মন নাহি সরে ।
কম্পাসের কাঁটা যেন সতত উত্তরে ॥ ২১২ ॥
প্রভুর চরণ-পদ্মে একটানা মন ।
ইহাই কেবল এক ভক্তের লক্ষণ ॥ ২১৩ ॥
অন্তর-জগৎ নামে যাহা যায় শুনা ।
লীলাই তাহার এক বিস্তৃত বর্ণনা ॥ ২১৪ ॥
উপমা ধরিয়া এই মাত্র যায় বলা ।
অন্তর-জগৎ মূল টাকা তার লীলা ॥ ২১৫ ॥
গালি দিয়া প্রভুদেবে গিরিশ এখানে ।
শিরে ধরি পদরেণু চলিল ভবনে ॥ ২১৬ ॥
পরিহরি সেইক্ষণে রঙ্গের আলয় ।
বিষন্ন কি ক্ষুণ্ণ মন তিলমাত্র নয় ॥ ২১৭ ॥
পরদিনে চারিদিকে ছুটিল বারতা ।
প্রভুর শরণাপন্ন যেবা আছে যেথা ॥ ২১৮ ॥
গিরিশের কটুভাষ মঞ্চের ভিতর ।
যে শুনে তাহার হয় বিষণ্ণ অন্তর ॥ ২১৯ ॥
শুন তুই দিন পরে এই ঘটনার ।
ঘুরে ফিরে এল পুনঃ শুভ রবিবার ॥ ২২০ ॥
কর্মবন্ধ ভক্তগণ অবসর পায় ।
সকলেই প্রভুদেবে দেখিবারে যায় ॥ ২২১ ॥
বিশেষতঃ আজিদিনে ভক্ত-সমাগম ।
শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর হইল বিষম ॥ ২২২ ॥
আন্দোলন এই কথা করে পরস্পরে ।
কেহ বা গোপনে কেহ প্রভুর গোচরে ॥ ২২৩ ॥
এমন সময় গিয়া উপনীত হয় ।
গৃহী-ভক্তচূড়ামণি রাম সদাশয় ॥ ২২৪ ॥
সেব্য-সেবকের ভাব বাঁধা একতানে ।
নিষ্ঠাবান ভক্তিমান প্রভুর চরণে ॥ ২২৫ ॥
সুন্দর মোহন মূর্তি গোউর-বরন ।
ভক্তির ছটায় ফুল সুচারু বদন ॥ ২২৬ ॥
পুণ্য-দরশন রাম আঁখির আরাম ।
মুক্তহস্ত মুক্ত আত্মা চাঁই ভক্ত রাম ॥ ২২৭ ॥
দেখিয়াই প্রভুদেব কহিলেন তায় ।
গিরিশ বড়ই গালি দিয়াছে আমায় ॥ ২২৮ ॥
ভূমিতে লুটিয়া বন্দি প্রভুর চরণ ।
দিলে গালি খেতে হবে ভক্তোত্তম কন ॥ ২২৯ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন যদি মারে অতঃপর ।
সহিতে হইবে তাহা রামের উত্তর ॥ ২৩০ ॥
যাহা দিয়াছেন যারে সেই দিবে তাই ।
কোথায় পাইবে দিতে তার যাহা নাই ॥ ২৩১ ॥
কালকূট একমাত্র ধন কালিয়ার ।
সে দিবে ধরিয়া বিষ যাহা আছে তার ॥ ২৩২ ॥
কি বুঝিয়া প্রভুদেব রামের বচনে ।
তখনি আনিতে গাড়ি আড্ডা হয় রামে ॥ ২৩৩ ॥
আজ্ঞাপর ভক্তবর আনিল সত্বর ।
যাত্রা যাহে করিলেন গিরিশের ঘর ॥ ২৩৪ ॥
কতিপয় ভক্তমাত্র প্রভুর সহিত ।
ত্বরান্বিত যথাস্থানে হইলা উপনীত ॥ ২৩৫ ॥
অন্দরে আরামশয্যা গিরিশ যেথায় ।
বার্তাবহ শুভ বার্তা তথা লয়ে যায় ॥ ২৩৬ ॥
পুলকে পূর্ণিত কায় প্রফুল্লিত যন ।
সদরে আসিয়া বন্দে প্রভুর চরণ ॥ ২৩৭ ॥
তড়িতের মত বার্তা ছুটে চারিধারে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন গিরিশের ঘরে ॥ ২৩৮ ॥
সন্নিকটে অনেক ভক্তের নিকেতন ।
ক্রমে ক্রমে বহু জন দিলা দরশন ॥ ২৩৯ ॥
ভরিল বৈঠকখানা অতি পরিসর ।
গালিচার গদি তার উপরে চাদর ॥ ২৪০ ॥
সুন্দর বিছানা পাতা তাকিয়ায় ঠেস ।
উপবিষ্ট রামকৃষ্ণ বিভু পরমেশ ॥ ২৪১ ॥
নানা রঙ্গে রসভাষ ভক্ত-ভগবানে ।
মঞ্চের ঘটনা মোটে নাহি কারো মনে ॥ ২৪২ ॥
গিরিশের ঘরে নাই কোন অনাটন ।
সেবার কারণে করে নানা আয়োজন ॥ ২৪৩ ॥
পরম বৈষ্ণব ভক্ত বন্ধু বলরাম ।
শুভ্র পরিচ্ছদ শিরে পাগ শোভমান ॥ ২৪৪ ॥
মহানন্দে মৃদুমন্দ আস্যে হাসিরেখা ।
গিরিশের আবাসে আসিয়া দিল দেখা ॥ ২৪৫ ॥
ভক্তিভরে প্রভুবরে দূরে প্রণমিয়া ।
করজোড়ে একধারে রহে দাঁড়াইয়া ॥ ২৪৬ ॥
প্রস্তুত প্রভুর ভোজ্য লুচি তরকারি ।
বিবিধ রকম ভাজি কত রকমারী ॥ ২৪৭ ॥
সন্দেশ সহিত মিষ্টি নানান প্রকার ।
আনিয়া থুইল যেথা শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২৪৮ ॥
উপবিষ্ট বিছানায় তাহার উপরে ।
গিরিশের কথামত ব্রাহ্মণ চাকরে ॥ ২৪৯ ॥
ভক্ত বন্ধু বলরাম বৈষ্ণব-আচার ।
লাগিল তাঁহার চক্ষে অতি কদাকার ॥ ২৫০ ॥
সেই হেতু চিন্তে তেঁহ আপনার মনে ।
বিছানায় ভোজ্য থাল ধুইল কেমনে ॥ ২৫১ ॥
বসুর অন্তর-কথা বুঝিয়া অন্তরে ।
হাসিয়া হাসিয়া প্রভু বলিলেন তাঁরে ॥ ২৫২ ॥
তোমার ভবনে যবে করিব ভোজন ।
এরূপে সে নহে, রবে স্বতন্ত্র আসন ॥ ২৫৩ ॥
যার যেন ভাব প্রভু তেন তাঁর কাছে ।
বিনা প্রভু সাধ্য কার ভক্তভাব বাছে ॥ ২৫৪ ॥
একরূপে বহুরূপ প্রভুপরমেশে ।
তার কাছে তেন রূপ যে যেমন বাসে ॥ ২৫৫ ॥
বিবিধ ভাবের ভক্ত লীলায় এবার ।
শুন ভক্তসংজোটন অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ২৫৬ ॥
ভকত প্রতাপচন্দ্র হাজরা উপাধি ।
প্রভুর নিকটে তেঁহ রহে নিরবধি ॥ ২৫৭ ॥
কর্মেতে পিয়ারা বড় কর্ম তার খেলা ।
কঠোর আচারসহ সদা জপে মালা ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুদেব তাঁহার স্বভাব সুবিদিত ।
শুদ্ধজ্ঞান-বিচারেতে পরম পণ্ডিত ॥ ২৫৯ ॥
মনোভাব হাজরার হৃদে বলবৎ ।
স্বপনের সম এই অলীক জগৎ ॥ ২৬০ ॥
পুজা সেবা আরাধনা ভক্তি-প্রকরণ ।
সকল কেবলমাত্র মনের ভরম ॥ ২৬১ ॥
আমি নিজে সেই বস্তু নিজের উপাস্য ।
স্বরূপচিন্তাই মাত্র একক উদ্দেশ্য ॥ ২৬২ ॥
প্রিয়পাত্র শ্রীপ্রভুর মহাভাগ্যধর ।
লীলার সহায় তেঁহ নিত্য সহচর ॥ ২৬৩ ॥
কতই হইল খেলা হাজরার সনে ।
পুতচিত সুনিশ্চিত ভারতী-শ্রবণে ॥ ২৬৪ ॥
হাজরা প্রতাপচন্দ্র ভক্তির বিরোধী ।
সেই সে করণে তাঁয় প্রভু গুণনিধি ॥ ২৬৫ ॥
রঙ্গপ্রিয় রঙ্গহেতু সবিনয়ে কন ।
করিবারে কিছু কাল চরণ-সেবন ॥ ২৬৬ ॥
এড়াইতে নারে বাক্য অনন্য উপায় ।
রোগীতে ঔষধ যেন অনিচ্ছায় খায় ॥ ২৬৭ ॥
সেইমত সেবে পদ অন্তরে অরুচি ।
ক্ষণে ক্ষণে করে মনে ছেড়ে দিলে বাঁচি ॥ ২৬৮ ॥
ঊর্ধ্ব গতি রাতি ক্রমে হয় অগ্রসর ।
হাজরা প্রভুর কাছে মাগে অবসর ॥ ২৬৯ ॥
প্রভু কন কোথা যাবে কি করিবে গিয়া ।
ধীরে ধীরে দেহ পায় হাত বুলাইয়া ॥ ২৭০ ॥
বিবিধ প্রসঙ্গ তার তুষ্টির কারণ ।
তাহাতে আদতে নাই হাজরার মন ॥ ২৭১ ॥
এই মতে রাতি যবে অবসান প্রায় ।
তখন ছাড়িয়া তারে দিলা প্রভুরায় ॥ ২৭২ ॥
পুনরায় পরদিনে মধ্যাহ্নের পর ।
ডাকেন সেবিতে পদ লীলার ঈশ্বর ॥ ২৭৩ ॥
আহারান্তে কিছুকাল আরাম-অভ্যাস ।
সম্ভোগে হাজরা নাহি পায় অবকাশ ॥ ২৭৪ ॥
এইমত দিন দিন কিছু দিন যায় ।
বিরক্ত হাজরা বড় হইল তাহায় ॥ ২৭৫ ॥
একদিন আহার করিয়া সমাপন ।
সংগোপন স্থানে গিয়া করিল শয়ন ॥ ২৭৬ ॥
রঙ্গপ্রিয় প্রভুদেব করিয়া সন্ধান ।
ধরিয়া শ্রীহস্তে হাঁকা ধীরে ধীরে যান ॥ ২৭৭ ॥
ডাকাডাকি কত তায় নাহি দেয় সাড়া ।
কপট নিদ্রার বেশ বস্ত্রে মুখ মোড়া ॥ ২৭৮ ॥
তবে প্রভু সুবাসিত তামাকের ধুম ।
নাকের নিকটে দেন ভাঙ্গাইতে ঘুম ॥ ২৭৯ ॥
সুন্দর রঙ্গের খেলা ভক্ত-ভগবানে ।
ভক্তির ভাণ্ডার কথা শুনে ভাগ্যবানে ॥ ২৮০ ॥
তখন মুখের বাস করি উন্মোচন ।
হাজরা হাসিতে থাকে তুষ্ট রুষ্ট মন ॥ ২৮১ ॥
কলিকা শ্রীপ্রভুদেব দিয়া তার করে ।
ধরিয়া আনিলা তবে নিজের মন্দিরে ॥ ২৮২ ॥
খাটের উপরে পরে বসাইয়া তায় ।
পূর্ববৎ নিয়োজিলা চরণ-সেবায় ॥ ২৮৩ ॥
অতঃপর শ্রীপ্রভুর কি হইল মন ।
হাজরায় নহে আজ্ঞা সেবিতে চরণ ॥ ২৮৪ ॥
সেই মহাকার্যে রত রহে রেতেদিনে ।
রাখাল হরিশ লাটু ভক্ত তিন জনে ॥ ২৮৫ ॥
হাজরার নামগন্ধ নাহি তথা আর ।
নরলীলা ঈশ্বরের বড়ই মজার ॥ ২৮৬ ॥
এক পক্ষাধিক প্রায় গত এরকমে ।
উপজিল সন্দ এক হাজরার মনে ॥ ২৮৭ ॥
স্বেচ্ছায় সেবিতে পদ একদিন যায় ।
অতীব নারাজ তাহে হৈলা প্রভুরায় ॥ ২৮৮ ॥
পরশিতে কোনমতে না দেন চরণে ।
ক্ষুণ্ণমন হইয়া ফিরিল নিজ স্থানে ॥ ২৮৭ ॥
পরদিনে মনে মনে যুক্তি কৈল সার ।
ছিনিয়া সেবিব ভাগ্যে যা হোক আমার ॥ ২৮৮ ॥
এত ভাবি ধীরে ধীরে মন্দিরে গমন ।
দেখিলা শয্যায় প্রভু আশ্চর্য কথন ॥ ২৮৯ ॥
কেহ নাহি সন্নিকটে শ্রীমন্দিরে একা ।
বালাপোশে পা হইতে বুকতক ঢাকা ॥ ২৯০ ॥
ভাগ্যবান পুণ্যবান প্রতাপ হাজরা ।
ধরি ধরি করে, প্রভু নাহি দেন ধরা ॥ ২৯১ ॥
পাটোয়ারী বুদ্ধি তাঁর ঘটে বিলক্ষণ ।
সেই হেতু নাহি হয় অভীষ্ট-সাধন ॥ ২৯২ ॥
কখন সন্দেহ করে কখন বিশ্বাস ।
এই দোষে নাহি আর পুরে অভিলাষ ॥ ২৯৩ ॥
এখন বিশ্বাস হৃদে বহে বলবতী ।
চরণ সেবিতে করে কাকুতি-মিনতি ॥ ২৯৪ ॥
কোনমতে প্রভুদেব না হন স্বীকার ।
হাজরা বুঝিল দেহে পাপের সঞ্চার ॥ ২৯৫ ॥
মহাপুরুষের দেহ পবিত্র পরম ।
পাপীর পরশ লাগে বিষের মতন ॥ ২৯৬ ॥
সেই হেতু নিবারণ শ্রীঅঙ্গ-পরশে ।
করিব উপায় আজি পাপের বিনাশে ॥ ২৯৭ ॥
গঙ্গামাটি-ভক্ষণ একাগ্র মনে জপ ।
এই দুই মহৌষধি বিনাশিতে পাপ ॥ ২৯৮ ॥
এত ভাবি মশারি খাটায়ে সেইক্ষণে ।
রচনা করিল শয্যা কম্বল-আসনে ॥ ২৯৯ ॥
শিয়রে মাটির তাল গুলি গুলি খায় ।
নয়ন মুদিয়া জপ করেন শয্যায় ॥ ৩০০ ॥
প্রতাপের জপে প্রভু ভকতবৎসল ।
শ্রীমন্দিরে বিছানায় হইয়া চঞ্চল ॥ ৩০১ ॥
নীরবে গোপনভাবে যান ধীরে ধীরে ।
প্রতাপ শুইয়া যেখা মশারির আড়ে ॥ ৩০২ ॥
বারে বারে মন্দ স্বরে ডাকেন তাঁহায় ।
রোকভরে করে জপ নাহি দেয় সায় ॥ ৩০৩ ॥
অভিমান বলবান ততই অন্তরে ।
যতই ডাকেন প্রভু পদ সেবিবারে ॥ ৩০৪ ॥
অবশেষে গরজিয়া মানভরে কয় ।
পদ সেবিবারে না পারিব মহাশয় ॥ ৩০৫ ॥
প্রত্যুত্তর সবিনয়ে প্রভুর আমার ।
বেশী নহে পরশিবে মাত্র একবার ॥ ৩০৬ ॥
অন্তরে অপার তুষ্ট বাহে কোপ করি ।
মন্দিরে প্রভুর পিছে যায় ধীরি ধীরি ॥ ৩০৭ ॥
সুভাগ্য হাজরা চাষা মহাপুণ্যধর ।
ঈশ্বরের সেবা করে খাটের উপর ॥ ৩০৮ ॥
ত্রিদশ-ঈশ্বর যাহা ছুইতে না পায় ।
হাজরার পদরজ এ অধম চায় ॥ ৩০৯ ॥
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে কন গুণমণি ।
পরিতৃপ্ত সেবায়
সন্তুষ্ট এবে আমি ॥ ৩১০ ॥
আপন শয্যায় তুমি করহ গমন ।
হাজরা বলেন নাহি ছাড়িব চরণ ॥ ৩১১ ॥
সত্য মানি আপনার পরিতৃপ্ত বটে ।
না হইলে মোর তৃপ্তি কোন্ শালা উঠে ॥ ৩১২ ॥
আঁটিয়া
চরণ দুটি করে আকর্ষণ ।
যতই করেন প্রভু তাঁরে নিবারণ ॥ ৩১৩ ॥
নরলীলা ঈশ্বরের অপূর্ব ভারতী ।
শুনিলে শ্রীপদে মিলে বিমল ভকতি ॥ ৩১৪ ॥
হাজরার সঙ্গে সদা খেলেন গোসাঁই ।
বিশ্বাস অন্তরে কিন্তু নাহি পায় ঠাঁই ॥ ৩১৫ ॥
উচ্চতম গৃহী ভক্ত প্রভুর আমার ।
শ্রীমনোমোহন রাম চাটুয্যে কেদার ॥ ৩১৬ ॥
দেবীপুত্র শ্রীসুরেন্দ্র সিমুলায় ঘর ।
কালীভক্ত ইষ্ট শ্যামা প্রভু গুরুবর ॥ ৩১৭ ॥
ইষ্ট গুরু অভিন্নাত্মা এই জ্ঞান সনে ।
মনপ্রাণগত তাঁর প্রভুর চরণে ॥ ৩১৮ ॥
দম্ভ মনে অগোচরে হাজরা এখন ।
তাঁহাদের নিন্দাবাদ করে বিলক্ষণ ॥ ৩১৯ ॥
ভক্ত-প্রিয় ভগবান ভক্তগত প্রাণ ।
লাগিল ভক্তের নিন্দা বাজের সমান ॥ ৩২০ ॥
প্রভুর বিষম শিক্ষা শিক্ষা দেন কাজে ।
আজন্ম স্মরণ শিক্ষা হাড়ে হাড়ে ভিজে ॥ ৩২১ ॥
ভক্তনিন্দাহেতু শিক্ষা দিতে জীবগণে ।
শুন কি করিলা প্রভু হাজরার সনে ॥ ৩২২ ॥
পরদিন প্রতাপের বুকের ভিতর ।
উঠিল শূলের ব্যথা অতি গুরুতর ॥ ৩২৩ ॥
সুস্থ-কলেবর তাহে শুদ্ধাচার রহে ।
হঠাৎ কি হেতু ব্যথা সঞ্চারিল দেহে ॥ ৩২৪ ॥
কিছুই বুঝিতে নারে চিন্তে অনুক্ষণ ।
ঔষধ উচিতমত করেন সেবন ॥ ৩২৫ ॥
উপশম কোন মতে নহে তিল আধ ।
বরঞ্চ বাড়িতে থাকে বিষম প্রমাদ ॥ ৩২৬ ॥
রুগ্নদেহ হৈল বুকে বেদনার বাসা ।
শ্রীপ্রভু কিছুই নাহি করেন জিজ্ঞাসা ॥ ৩২৭ ॥
কত কথা তার সঙ্গে হয় রোজ রোজ ।
এখন আদতে কিন্তু নাহি নেন খোঁজ ॥ ৩২৮ ॥
হাজরার এই কষ্ট মনের ভিতর ।
বুকের বেদনা চেয়ে হইল কষ্টকর ॥ ৩২৯ ॥
বিবিধ ভাবিয়া যুক্তি কৈলা মনে মনে ।
অন্ত্যত্রে গমন শ্রেয়ঃ প্রাতে পরদিনে ॥ ৩৩০ ॥
গোপনে গোপনে করে আয়োজন তার ।
অস্তরে বুঝিয়া তত্ত্ব শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৩৩১ ॥
শ্রীমুখেতে মধুর মৃদু হাস্যসহকারে ।
হাজির হাজরা যেথা তারে তুষিবারে ॥ ৩৩২ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত হাস্য সুমধুর ।
যে দেখে তাহার জন্ম জন্ম দুঃখ দূর ॥ ৩৩৩ ॥
দরশন নহে যার দূরদৃষ্ট দশা ।
বৃথা তার নরজন্ম ধরাধামে আসা ॥ ৩৩৪ ॥
অমিয়বরষী ভাষা সরল সরল ।
হাজরায় জিজ্ঞাসেন শরীর-কুশল ॥ ৩৩৫ ॥
ভুলিয়া সকল ব্যথা উত্তর তখন ।
পক্ষাবধি বক্ষঃস্থলে শূলের বেদন ॥ ৩৩৬ ॥
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে কন ডাক দিয়া ।
ঠাণ্ডা জলে দেহ কিছু চিনি ভিজাইয়া ॥ ৩৩৭ ॥
কিঞ্চিৎ লেবুর রস মিশাইয়া তায় ।
এখনি খাইতে তুমি দেহ হাজরায় ॥ ৩৩৮ ॥
পিয়ে পেয় সুশীতল শীতল যখন ।
বুঝাইয়া হাজরায় প্রভুদেব কন ॥ ৩৩৯ ॥
শূলের বেদনা বুকে বড় পরমাদ ।
বিয়াধির মূল-হেতু ভক্ত-অপরাধ ॥ ৩৪০ ॥
ভক্তদের নিন্দাবাদ করিয়া রটনা ।
আপনি এনেছ নিজে বুকের বেদনা ॥ ৩৪১ ॥
আরোগ্য উপায়ে এই আছে এক বিধি ।
ভক্তদের পদরজ পরম ঔষধি ॥ ৩৪২ ॥
কিছুক্ষণ পরে তেহ করে দরশন ।
উপনীত রাম আদি শ্রীমনোমোহন ॥ ৩৪৩ ॥
চকিতে উঠিয়া তবে প্রফুল্লিত মনে ।
শিরে ধরে ভক্ত-রজ লুটাইয়া ভূমে ॥ ৩৪৪ ॥
সেদিন হইতে আর বুকে নাহি ব্যথা ।
ভব-ব্যাধি-মহৌষধি রামকৃষ্ণকথা ॥ ৩৪৫ ॥
হাজরা মহিমা যত দেখে বার বার ।
কোনমতে নাহি হয় বিশ্বাস-সঞ্চার ॥ ৩৪৬ ॥
শুন তবে কই কথা অপূর্ব ভারতী ।
মিলে জ্ঞান-ভক্তি তার শুনে যেবা পুঁথি ॥ ৩৪৭ ॥
দিনেকে হাজরা কহে অতি সংগোপনে ।
ভকত রাখাল লাট্টু এই দুইজনে ॥ ৩৪৮ ॥
বৃথা কেনে এইখানে ছাড়ি ঘর-দ্বার ।
উন্নতি কিমন্ত আছে করিলে ইঁহার ॥ ৩৪৯ ॥
সাধন-ভজন কোথা ধ্যান-জপচয় ।
খাইয়া খেলিয়া নষ্ট করিয়া সময় ॥ ৩৫০ ॥
কেন নাহি কহ গিয়া উহার নিকটে ।
দিন পক্ষ মাস বর্ষ বৃথা যায় কেটে ॥ ৩৫১ ॥
অকপটহৃদয় প্রভুর ভক্তদ্বয় ।
বালকবয়স চিত্ত সরলাতিশয় ॥ ৩৫২ ॥
বুঝিলেন মিথ্যা নয় হাজরার কথা ।
মনঃক্ষুন্ন বিষন্নবদন যান সেথা ॥ ৩৫৩ ॥
যেইখানে শ্রীমন্দিরে প্রভুদেবরায় ।
আপনে আপনা-গত বসিয়া খট্টায় ॥ ৩৫৪ ॥
সকলেই বটে ভক্ত উনো দুনো নাই ।
সেই রামকৃষ্ণ কল্পতরুমূলে ঠাঁই ॥ ৩৫৫ ॥
প্রভুর পরমপ্রিয় যতনের ধন ।
কিন্তু ভাব-ভেদে সবে প্রত্যেক রকম ॥ ৩৫৬ ॥
লাট্টুর সেবক-ভাব সেব্য শ্রীগোসাঁই ।
কাছে গিয়ে কয় কথা হেন শক্তি নাই ॥ ৩৫৭ ॥
আজ্ঞাপর সেবাপর যুক্তকর দূরে ।
রাখাল ছেলের মত কোলের উপরে ॥ ৩৫৮ ॥
জানাইতে মনোভাব শ্রীপ্রভুর কাছে ।
সর্বাগ্রে রাখালচন্দ্র লাট্টু চলে পিছে ॥ ৩৫৯ ॥
কেশ-কণ্ডুয়নসহ জড়-জড় স্বর ।
রাখাল কহেন কথা প্রভুর গোচর ॥ ৩৬০ ॥
এতদিন এইখানে দিবাবিভাবরী ।
কি হইল ফল কিছু বুঝিতে না পারি ॥ ৩৬১ ॥
শুনি বাণী রাখালের প্রভু গুণধর ।
আতঙ্কে শিহরে অঙ্গ সভীত অন্তর ॥ ৩৬২ ॥
চমকিয়া উঠিয়া কহেন সেইক্ষণে ।
অনিমেষে নিরখিয়া রাখালের পানে ॥ ৩৬৩ ॥
কেবা দিল হেন শিক্ষা ভীষণ বারতা ।
এ নহে তোদের নিজ অন্তরের কথা ॥ ৩৬৪ ॥
নিরমল-চিত্ত তোরা অন্তর সরল ।
তাহে কে ঢালিয়া দিল ভীষণ গরল ॥ ৩৬৫ ॥
জড়-স্বরে শিরে হাত বুদ্ধি আলখাল ।
হাজরার শিক্ষা ইহা কহেন রাখাল ॥ ৩৬৬ ॥
গরজিয়া প্রভুদেব কেশরীর ন্যায় ।
দ্রুতপদে ধাইলেন হাজরা যেথায় ॥ ৩৬৭ ॥
কর্কশ-ভাষায় কত তিরস্কার তারে ।
পশ্চাৎ কহেন তুমি যাও স্থানান্তরে ॥ ৩৬৮ ॥
কৃত কষ্টে লালি-পালি ছাবাল আমার ।
বিনষ্ট কারণে দেহ শিক্ষা কদাকার ॥ ৩৬৯ ॥
লজ্জা-ভয়ে ত্রস্তচিত হাজরা তখন ।
কি দিবে উত্তর মুখে না সরে বচন ॥ ৩৭০ ॥
তপ-জপ ক্রিয়াকাণ্ড সাধন-ভজন ।
অবিরত যোগে রত ধ্যানে নিমগন ॥ ৩৭১ ॥
উচ্চতর কিসে কিছু না পাই ভাবিয়ে ।
কমলার সেব্য প্রভু সেবনের চেয়ে ॥ ৩৭২ ॥
বসনে নয়নবাঁধা মানুষ যেমন ।
সন্নিকটে বস্তু নাহি পায় দরশন ॥ ৩৭৩ ॥
তেমনি প্রতাপচন্দ্র মায়ার মায়ায় ।
এক ঘরে প্রভুদেব দেখিতে না পায় ॥ ৩৭৪ ॥
দেহ আঁখি ভগবান রাখ এ অধীনে ।
ভক্তি রহে যেন তব ভক্তের চরণে ॥ ৩৭৫ ॥
ভক্ত প্রতি ঠাকুরের অতিশয় টান ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা প্রাণের সমান ॥ ৩৭৬ ॥
বিপদসঙ্কুল এই ধরায় আনিয়া ।
সতত সতর্কভাবে আসেন বসিয়া ॥ ৩৭৭ ॥
শুন তবে কই অতি মধুর কখন ।
পুরীমধ্যে এসময় আসে একজন ॥ ৩৭৮ ॥
বাউল-সন্ন্যাসী তেহ মহাশক্তিধর ।
করতালসম চক্ষু ডাগর ডাগর ॥ ৩৭৯ ॥
দেখিতে আকার তার বুঝিলা ঠাকুর ।
সিদ্ধায়ের শক্তি ধরে শরীরে প্রচুর ॥ ৩৮০ ॥
সেই বলে নানা মঠে করিয়া ভ্রমণ ।
স্বভাব-সাধুর করে সাধুত্ব হরণ ॥ ৩৮১ ॥
ডাইনের মত কার্য কদর্য আচার ।
এক চিন্তা অমঙ্গল কিমতে কাহার ॥ ৩৮২ ॥
কালীর প্রসাদ খায় পুরীমধ্যে থাকে ।
কে কোথায় সাধু-ভক্ত সমাচার রাখে ॥ ৩৮৩ ॥
অবশেষে
দেখিতে পাইল বিচক্ষণ ।
সাধুত্বে মণ্ডিত যত প্রভু ভক্তগণ ॥ ৩৮৪ ॥
সুযোগ উপায় চেষ্টা
উদ্দেশ্যসাধনে ।
সযতনে অন্বেষণ করে রেতেদিনে ॥ ৩৮৫ ॥
সাধুর সঙ্গেতে বসি করিলে
আহার ।
সহজে সম্পূর্ণ হয় উদ্দেশ্য তাহার ॥ ৩৮৬ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর ভক্তদের সনে ।
কেমনে ভোজন রহে তাহার সন্ধানে ॥ ৩৮৭ ॥
সন্ন্যাসী আদতে তত্ত্ব না পায় সন্ধান ।
হরিতে যাঁহার শক্তি সদা চেষ্টাবান ॥ ৩৮৮ ॥
তাঁরা সবে-পোষাপাখী যতনের ভরে ।
নিরাপদে শ্রীপ্রভুর স্নেহের পিঞ্জরে ॥ ৩৮৯ ॥
স্পর্শ করে প্রভু-ভক্তে সাধ্য কার নাই ।
রক্ষাকর্তা নিজে হেথা জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩৯০ ॥
যৌবনে যখন মুই করিনু প্রবেশ ।
প্রভুর সংসারে এবে সাদা দাড়ি-কেশ ॥ ৩৯১ ॥
লেশমাত্র বুঝিতে নারিনু ভক্তগণে ।
কিবা বস্তু কোথাকার শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৩৯২ ॥
অপার মহিমারাজি অপরূপ বল ।
পদরজ অধমের পথের সম্বল ॥ ৩৯৩ ॥
শুন তবে কি হইল কথা অতঃপর ।
ভকত বৎসল প্রভু লীলার ঈশ্বর ॥ ৩৯৪ ॥
ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রনাথে কহেন বচন ।
কিবা সুমধুর আস্যে হাস্য সুশোভন ॥ ৩৯৫ ॥
ভিক্ষায় মাগিয়া দ্রব্য করিয়া যোগাড় ।
আপনি রাঁধিয়া দেহ করিব আহার ॥ ৩৯৬ ॥
ঠাকুরের প্রেমে মগ্ন ত্যাগী যোগীশ্বর ।
শ্রীআজ্ঞা ধরিয়া তবে শিরের উপর ॥ ৩৯৭ ॥
অন্তরে আনন্দ কত কহা নাহি যায় ।
আয়োজন কৈলা দ্রব্য মাগিয়া ভিক্ষায় ॥ ৩৯৮ ॥
পঞ্চবটীতলে হয় রন্ধনের স্থান ।
বাউল সন্ন্যাসী সব পাইল সন্ধান ॥ ৩৯৯ ॥
উদ্দেশ্যসাধনে দেখি সুন্দর উপায় ।
একসঙ্গে ভক্তদের খাইবার চায় ॥ ৪০০ ॥
অন্তর বুঝিয়া তারে প্রভুদেব কন ।
পুরীর ছত্রেতে গিয়া করহ ভোজন ॥ ৪০১ ॥
এইখানে ভোজনের নাহিক উপায় ।
শঠ ধূর্ত সন্ন্যাসী যাইতে নাহি চায় ॥ ৪০২ ॥
তবে প্রভুদেবরায় কন রুষ্ট ভাবে ।
কি তোর বুকের পাটা কিরূপ সাহসে ॥ ৪০৩ ॥
ভোজন-প্রয়াস ইচ্ছা কর এইখানে ।
এই সব শুদ্ধ-আত্মা ভক্তদের সনে ॥ ৪০৪ ॥
প্রয়াসে হতাশ হয়ে সন্ন্যাসী তখন ।
পরিহরি কালীপুরী কৈল পলায়ন ॥ ৪০৫ ॥
শুন রামকৃষ্ণায়ন তাপ হবে দুর ।
তিল সন্দ নাহি তার জামিন ঠাকুর ॥ ৪০৬ ॥
ভক্তগণ শ্রীপ্রভুর পরানের বাড়া ।
সদা সঙ্গে প্রভু নন এক তিল ছাড়া ॥ ৪০৭ ॥
সকলের জন্য তাঁর চিন্তা রেতেদিনে ।
কে কোথায় কিবা ভাবে রহে কি রকমে ॥ ৪০৮ ॥
লীলা-আন্দোলনে তত্ত্ব পাইবে সর্বথা ।
শুন ভক্ত সংজোটন অপরূপ কথা ॥ ৪০৯ ॥
শ্রীনবগোপাল ঘোষ কায়স্থের জাতি ।
পূর্বখণ্ডে বলিয়াছি তাঁহার ভারতী ॥ ৪১০ ॥
তিন বর্ষ পূর্বে তেঁহ কিশোরীর সনে ।
একদিন মাত্র আসা প্রভু-দরশনে ॥ ৪১১ ॥
সঙ্গে লয়ে অল্পবয়ঃ কুমারী কুমার ।
ভক্তিমতী পুণ্যবতী পত্নী আপনার ॥ ৩১২ ॥
এতাধিক কাল আর নাহি দেখাশুনা ।
প্রভুর অন্তরে তাই বড়ই ভাবনা ॥ ৩১৩ ॥
কিশোরীকে প্রভুদেব কন একদিনে ।
হেঁ রে সেই ঘর যার বাদুরবাগান ॥ ৩১৪ ॥
আফিসেতে উচ্চকাজ সদয়াল মন ।
দুঃখিগণে ঔষধ করয়ে বিতরণ ॥ ৩১৫ ॥
তোমার সঙ্গেতে হৈল তিন বর্ষ প্রায় ।
আসিয়াছিলেন তেঁহ এখন কোথায় ॥ ৩১৬ ॥
যদ্যপি তোমার সঙ্গে দেখা হয় তার ।
আসিতে বলিও মাত্র আর একবার ॥ ৩১৭ ॥
কিশোরী ভক্তের মধ্যে বড়ই বিটল ।
গড়ন যেমন তেন অন্তর সরল ॥ ৩১৮ ॥
জোরে জোরে কয় কথা প্রভুর সদনে ।
সর্বদা মেলানি করে প্রভু-দরশনে ॥ ৩১৯ ॥
রাখিয়া যুবতী ভার্যা শ্বশুরের ঘরে ।
যামিনী কাটায় হেথা প্রভুর মন্দিরে ॥ ৩২০ ॥
শ্বশুর ঘরের লোক পাইয়া সন্ধান ।
তাড়া করে শ্রীমন্দিরে যেথা ভগবান ॥ ৩২১ ॥
লোকবশীকরণের দিয়া নিন্দাবাদ ।
প্রভুর সঙ্গেতে করে তুমুল বিবাদ ॥ ৩২২ ॥
তার সঙ্গে শত শত কটু কথা কয় ।
সর্বসহ প্রভুদেব তাই তাঁর সয় ॥ ৩২৩ ॥
সংগোপনে কিশোরীকে কন প্রভুরায় ।
এখানে আসিতে করি নিষেধ তোমায় ॥ ৩২৪ ॥
অভিমানে যায় মাত্র থাকিতে না পারে ।
পুনঃ উপনীত দুই-তিন দিন পরে ॥ ৩২৫ ॥
প্রভুর বারতা লয়ে চলিল কিশোরী ।
বাদুড়বাগানে যেখা গোপালের বাড়ি ॥ ৩২৬ ॥
আজি কিবা শুভ দিন ভাগ্যে গোপালের ।
যোগী ঋষি ধ্যানে যাঁর নাহি পায় টের ॥ ৩২৭ ॥
প্রেরিত তাঁহার আজ্ঞা ভক্তের দ্বারায় ।
আসিতে প্রভুর কাছে দেখিতে তাঁহায় ॥ ৩২৮ ॥
সন্দেশ পশিবামাত্র গোপালের কানে ।
বিস্ময়ে আবিষ্ট চিত্ত চমকিত প্রাণে ॥ ৩২৯ ॥
মনে মনে ভাবে এ কি করুণা অপার ।
তিন বর্ষ পূর্বে সঙ্গে দেখা একবার ॥ ৩৩০ ॥
কত লোক দিন দিন আসে যায় কাছে ।
তথাপি অদ্যাপি মোরে মনে তাঁর আছে ॥ ৩৩১ ॥
অহেতুক দয়া স্নেহ দীনের উপর ।
এই বোধে গোপালের উথলে অন্তর ॥ ৩৩২ ॥
কানায় কানায় জল ছাপাইয়া পড়ে ।
বাহিরে গড়ায় শেষে চক্ষুর দুয়ারে ॥ ৩৩৩ ॥
আনন্দের সীমা নাই রবিবার দিনে ।
শুভযাত্রা করিলেন প্রভু-দরশনে ॥ ৩৩৪ ॥
সঙ্গে ভক্তিমতী সহধর্মিণী তাঁহার ।
ছোট বড় যতগুলি কুমারী কুমার ॥ ৩৩৫ ॥
উতরিয়া শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর পায় ।
জনে জনে শ্রীচরণে গড়াগড়ি যায় ॥ ৩৩৬ ॥
এত দিনে কেন আর নাহি ছিল আসা ।
স্নেহভরে গোপালেরে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ৩৩৭ ॥
গোপাল শ্রীপ্রভুদেবে করিল উত্তর ।
সুর-যোগে গেল মোর এ তিন বছর ॥ ৩৩৮ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন যোগ্য সাধন-ভজন ।
করিবার তোমার নাহিক প্রয়োজন ॥ ৩৩৯ ॥
বারত্রয় মাত্র তুমি আসিও হেথায় ।
বাসনা হইবে পূর্ণ মায়ের কৃপায় ॥ ৩৪০ ॥
সময় আগত দেখি প্রভু নারারণ ।
এইবারে গোপালেরে কৈলা আকর্ষণ ॥ ৩৪১ ॥
আকর্ষণে কিবা কাণ্ড নহে কহিবার ।
উপমায় বরিষায় গঙ্গার জুয়ার ॥ ৩৪২॥
কেমন লাগিল চক্ষে প্রভু গুণধরে ।
গোপাল থাকিতে আর নাহি পারে ঘরে ॥ ৩৪৩ ॥
প্রভুর মূরতি-চিন্তা দিবসযামিনী ।
অবসর পাইলেই গোচরে মেলানি ॥ ৩৪৪ ॥
একা কভু নয় সঙ্গে যত পরিবার ।
ভক্তিমতী সাথী দারা কুমারী কুমার ॥ ৩৪৫ ॥
কুমারদিগের মধ্যে সুরেশ যে জন ।
পাঁচ-ছয় বর্ষ মাত্র মোটে বয়ঃক্রম ॥ ৩৪৬ ॥
সুন্দর গড়নখানি নয়ন-বিনোদ ।
হৃদি-ঘটে ভক্তিভরা দেখিলেই বোধ ॥ ৩৪৭ ॥
শিশুবরে শ্রীপ্রভুর কৃপা অতিশয় ।
জননী রতনগর্ভা তার পরিচয় ॥ ৩৪৮ ॥
আশ্চর্য বালক কিবা হেন বয়ঃক্রমে ।
খোলেতে সঙ্গত করে কীর্তনের গানে ॥ ৩৪৯ ॥
জন্মাববি তাল-বোধ ভক্তিভরা ঘট ।
শিশুর আদর বড় প্রভুর নিকট ॥ ৩৫০ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যমতী জনক-জননী ।
পদরজ তাঁহাদের মহাভাগ্য গণি ॥ ৩৫১ ॥
গোপাল প্রভুর এক ভক্ত অন্তরঙ্গ ।
পরিচয় পাবে শুন লীলার প্রসঙ্গ ॥ ৩৫২ ॥
লীলা-রঙ্গালয়ে রঙ্গ লয়ে ভক্তগণে ।
এ তত্ত্ব না বুঝে অন্যে ভক্তগণ বিনে ॥ ৩৫৩ ॥
শুন কিবা ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর খেলা ।
একদিন শ্রীমন্দিরে ভকতের মেলা ॥ ৩৫৪ ॥
যারে তারে কৃপাদৃষ্টি হয় শ্রীপ্রভুর ।
কল্পতরুবেশে যেন কৃপার ঠাকুর ॥ ৩৫৫ ॥
ভাব দেখি ঠাকুরের রাম ভক্তবর ।
গোপনে গোপালে কহে সংবাদ সুন্দর ॥ ৩৫৬ ॥
এই বেলা যাও কাছে করহ প্রার্থনা ।
যা চাবে তাহাই পাবে পুরিবে কামনা ॥ ৩৫৭ ॥
সন্নিধানে যাইয়া গোপাল তবে কয় ।
আমরা সংসারী জাতি দুর্বলাতিশয় ॥ ৩৫৮ ॥
সাধন-ভজন করি শক্তি নাহি গায় ।
তবে প্রভু আমাদের কি হবে উপায় ॥ ৩৫৯ ॥
শুনিয়া ভক্তের কথা কন গুণনিধি ।
সাধন-ভজন-ধ্যানে শক্তি নাহি যদি ॥ ৩৬০ ॥
করো তবে এক কর্ম ধরহ বচন ।
দিনের মধ্যেতে মোরে বারেক স্মরণ ॥ ৩৬১ ॥
কথায় না আসে মন ঠাকুরের কথা ।
রহিল হৃদয়-পটে যাবতীয় গাঁথা ॥ ৩৬২ ॥
কহিবার নহে কথা কি কহিব তোরে ।
যা কহি কেবলমাত্র বাতিকের জোরে ॥ ৩৬৩ ॥
ভক্ত সঙ্গে করি খেলা জীবের শিক্ষায় ।
দয়া কলেবর দেশ রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৬৪ ॥
আশ্বাসিলা যাবতীয় জগতের জনে ।
কিবা ভয় ভব-পারাবারের তুফানে ॥ ৩৬৫ ॥
জীবনের মধ্যে মাত্র যদি একবার ।
স্মরণ করহ মোরে হইবে উদ্ধার ॥ ৩৬৬ ॥
ঘোর অবিশ্বাসী কাল ভক্তিবিবর্জিত ।
আগোটা হৃদয়াকাশ তমসে আবৃত ॥ ৩৬৭ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্ত প্রীতি অবিদ্যায় ।
দয়াল কাণ্ডারী যেন রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৬৮ ॥
কেহ নাহি চায় তাঁয় নাহি চায় পানে ।
কিনিবারে একবার স্মরণের পাণে ॥ ৩৬৯ ॥
কি দিব জীবের দোষ দোষ কিবা তার ।
বলিহারি কারিগার ডুবি অবিদ্যার ॥ ৩৭০ ॥
বিষম মায়ার মায়া দৃষ্টিচোরা ফাঁদ ।
ছানিতে না দেয় আছে অগতের চাঁদ ॥ ৩৭১ ॥
প্রভুর কৃপায় প্রাপ্ত দৃষ্টি যে জনার ।
যে দেখিতে পায় চক্ষে খেলা অবিদ্যার ॥ ৩৭২ ॥
ভৌতিক বিকারমার কাহিনীকাঞ্চন ।
যাহাতে বিমুগ্ধ-চিত জগতের জন ॥ ৩৭৩ ॥
ঘৃণা অস্পর্শীয় অতি কদাকার কারা ।
সমাদর ততক্ষণ যতক্ষণ মায়া ॥ ৩৭৪ ॥
বিভেদি যাহার ঘোর চাঁদ-দরশনে ।
যদ্যপি কাহার হয় এই সাধ মনে ॥ ৩৭৫ ॥
প্রবণ-কীর্তনে লীলা মিলিবে উপায় ।
জামিন তাহার অল্প রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৭৬ ॥
পূর্ণব্হ্মসনাতন প্রভু পরদেশ ।
জীবে দিতে গুরু-তত্ত্ব বিশ্বগুরুবেশ ॥ ৩৭৭ ॥
চতুর্থ খণ্ড
অতুল কালীপদ প্রভৃতি ভক্তগণের সম্মেলন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভাবের ভিতরে এক আছে রম্য স্থান ।
বলিহারি কি মাধুরী লীলপুরী নাম ॥ ১ ॥
যেখানে শ্রীপ্রভু করি ত্রিভাব ধারণ ।
লীলারস সতত করেন আস্বাদন ॥ ২ ॥
লীলা আন্দোলন তার দরশনোপায় ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা মুর্খবর গায় ॥ ৩ ॥
প্রিয়ভক্ত শ্রীপ্রভূর কালীপদ নাম ।
কায়স্থ উপারি ঘোষ মহাভাগ্যবান ॥ ৪ ॥
স্থূলকায় লম্বাচৌড়া প্রমাণ-আকার ।
বয়স তিরিশ কিংবা কিছু তার পার ॥ ৫ ॥
উজ্জ্বল শ্যামলবর্ণ বিশাল নয়ন ।
স্বভাবতঃ অবিরত প্রফুল্লবদন ॥ ৬ ॥
উপার্জনে টাকা-কড়ি যাহা হয় আয় ।
বেশ্যা-সুরাপ্রিয় হেতু সকল খোয়ায় ॥ ৭ ॥
গিরিশের সঙ্গে তাঁর বড়ই পিরীতি ।
রঙ্গালয়ে আগমন প্রায় নিতি নিতি ॥ ৮ ॥
প্রভুর মহিমা তথা করিয়া প্রবণ ।
দিনেক দক্ষিণেশ্বরে উপনীত হন ॥ ৯ ॥
ভক্তিসহ নহে এবে নাহিক বিশ্বাস ।
ব্যাপারে রহস্য কিবা দেখিবারে আশ ॥ ১০ ॥
বহু পূর্বেকার কথা করহ স্মরণ ।
একদিন ভক্তিমতী কুলবতীগণ ॥ ১১ ॥
পরস্পর প্রতিবাসী এক সঙ্গে আসে ।
কালীপুরীমধ্যে প্রভুদরশন-আশে ॥ ১২ ॥
তার মধ্যে একজন সরল-অন্তরা ।
জন্ম জন্ম প্রভুভক্তি হৃদয়েতে ভরা ॥ ১৩ ॥
লজ্জাভয়হীনচিত্তে শ্রীপদে জানায় ।
মঙ্গলনিধান প্রভু বুঝিয়া তাঁহায় ॥ ১৪ ॥
বিষাদে আতুরা সারা মরম-বেদনে ।
কদাচারী পতি তাঁর মঙ্গল-কামনে ॥ ১৫ ॥
লীলার ঈশ্বর তাহে করিলা উত্তর ।
পতির কারণে বাছা না হবে কাতর ॥ ১৬ ॥
কোন চিন্তা কোন দুঃখ না ভাবিও মনে ।
এখানের লোক তেঁহ আসিবে এখানে ॥ ১৭ ॥
সেই পতি কালীপদ আজি উপনীত ।
ধীরে ধীরে শুন রামকৃষ্ণলীলাগীত ॥ ১৮ ॥
ভক্ত-ভগবানে রঙ্গ মধুর আখ্যান ।
কালীপদ করিল না শ্রীপদে প্রণাম ॥ ১৯ ॥
শ্রীমন্দিরে অবস্থিতি করি কিছুক্ষণ ।
সেদিন ফিরিল তেহ আপন ভবন ॥ ২০ ॥
উচাটন ঘরে মন নাহি রহে আর ।
প্রভুর মূরতি মনে উঠে অনিবার ॥ ২১ ॥
প্রভুভক্তগণ যেথা তাঁর কথা কন ।
সেইখানে অনুক্ষণ যাইবার মন ॥ ২২ ॥
পুনঃ দরশনহেতু ভক্তগণ-সাথে ।
তরীযোগে আগমন হয় জল-পথে ॥ ২৩ ॥
ঘাটেতে রাখিয়া তরী গমন মন্দিরে ।
আছিলা নিদ্রিত প্রভু খাটের উপরে ॥ ২৭ ॥
দরশনোৎসুক ভক্ত আগমন ঘুম ।
আগে করিয়াছে ভঙ্গ শ্রীপ্রভুর ঘুম ॥ ২৮ ॥
এবে জাগরিতাবস্থা আছেন বসিয়া ।
সম্ভাষিতে ভক্তযুখে প্রতীক্ষা করিয়া ॥ ২৯ ॥
দরশ-পিয়াসী হেথা ভকতের গণ ।
নেহারিয়া শ্রীপ্রভুর বন্দিল চরণ ॥ ৩০ ॥
কিছুক্ষণ পরে প্রভু মনের হরিষে ।
নবাগত চিরভক্ত কালীপদ ঘোষে ॥ ৩১ ॥
আত্মীয় সম্ভাষ-ভাষে বলিলেন তায় ।
শহরে যাইতে আজি ইচ্ছা বড় যায় ॥ ৩২ ॥
মহানন্দে কহে কালী প্রভুর নিকটে ।
যে আজ্ঞা কি হেতু দেরী তরী বাঁধা ঘাটে ॥ ৩৩ ॥
লাটুকে লইয়া সঙ্গে শ্রীপ্রভু তখনি ।
উপনীত হইলেন যেথায় তরণী ॥ ৩৪ ॥
জলযানে তিনজনে শ্রীপ্রভু সহিত ।
গুন কি হইল কথা অতি সুললিত ॥ ৩৫ ॥
সুনিশ্চিত পুতচিত ভারতী-শ্রবণে ।
যাহা কভু নাহি হয় তপজপধ্যানে ॥ ৩৬ ॥
কালীকে প্রভুর প্রশ্ন প্রথম প্রথম ।
কোন্ দেবদেবী-মূর্তি মনের মতন ॥ ৩৭ ॥
উত্তর করিল ভক্ত মুখে মন্দ হাসি ।
যার নামে নাম মোর তারে ভালবাসি ॥ ৩৮ ॥
কালী ভালবাসে কালী শুনি প্রভুরায় ।
মহাতোষ ঘোষে প্রশ্ন কৈলা পুনরায় ॥ ৩৯ ॥
গুরুর নিকটে মন্ত্র লইয়াছ কি-না ।
উত্তর, লইব দিলে করিয়া করুণা ॥ ৪০ ॥
বরাবর দৃঢ়তর প্রতিজ্ঞা তাহার ।
যিনি সেই গুরু ভবসিন্ধুকর্ণধার ॥ ৪১ ॥
তিনি যদি দেন মন্ত্র নিজে কানে প্রাণে ।
তবেই লইব নয় শরীর-ধারণে ॥ ৪২ ॥
এইখানে দেখ মন আঁখি দুটি মিলে ।
কিবা বস্তু প্রভুভক্ত ভক্ত কারে বলে ॥ ৪৩ ॥
স্বভাবতঃ হৃদে ভরা গুরুভক্তি ধন ।
যে বলে দেখিলে চিনে গুরু কোন জন ॥ ৪৪ ॥
দুইদিন দেখামাত্র শ্রীপ্রভুর সনে ।
তিনি সেই হরিভক্ত চিনিলা কেমনে ॥ ৪৫ ॥
তাই কাছে চায় মন্ত্র ইষ্টদেবতার ।
ধন্য রামকৃষ্ণভক্ত মহিমা অপার ॥ ৪৬ ॥
একবার মাখিতে যদ্যপি পার মন ।
প্রভুভক্ত পদরজ বুঝিবে তখন ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে মন্ত্র লইবার আশ ।
গুনিয়াই শ্রীবদনে করি মন্দ হাস ॥ ৪৮ ॥
চাইয়া লাটুর পানে শ্রীগোসাঁই কন ।
এরা কারা কোথাকার সুন্দর কেমন ॥ ৪৯ ॥
মন্ত্রদান শ্রীপ্রভুর কোনকালে নাই ।
কৌশলে বাসনাপূর্ণ করিলা গোসাঁই ॥ ৫০ ॥
অতঃপর ভক্তবরে শ্রীআজ্ঞা তখন ।
রসনা বাহির কর দেখিব কেমন ॥ ৫১ ॥
অঙ্গুলির অগ্র দিয়া জিহ্বার উপর ।
কিবা লিখিলেন প্রভু তাঁহার গোচর ॥ ৫২ ॥
শ্রীপ্রভুর উচ্চ কৃপা তাহার লক্ষণ ।
অঙ্গুলির অগ্র দিয়া জিহ্বায় লিখন ॥ ৫৩ ॥
অথবা কোমল কর কমল জিনিয়া ।
কৃপার্থীর বক্ষোমধ্যে ঊর্ধ্ব দেশ দিয়া ॥ ৫৪ ॥
বার বার সঞ্চালন অতি ধীরে ধীরে ।
মহামন্ত্র কতিপয় বাক্যসহকারে ॥ ৫৫ ॥
অথবা কখন করি অঙ্গ-পরশন ।
কভু বা করায়ে কারে সেবা-আচরণ ॥ ৫৬ ॥
কখন বা আজ্ঞা উপদেশ-সহকারে ।
তিনদিন মাত্র জপ কালীর মন্দিরে ॥ ৫৭ ॥
কখন কখন আজ্ঞা হয় কার প্রতি ।
ধ্যান করিবার তরে ইষ্টের মুরতি ॥ ৫৮ ॥
কখন কখন আজ্ঞা কাহারে কাহারে ।
ধিয়াইতে তাঁর রূপ ভালবাসে যারে ॥ ৫৯ ॥
মণি মল্লিকের এক ভক্তিমতী মেয়ে ।
প্রভুতে বিশ্বাস বড় জিজ্ঞাসিল গিয়ে ॥ ৬০ ॥
কিরূপ কাহার রূপ করিব ধিয়ান ।
উত্তরে তাহারে কন প্রভু ভগবান ॥ ৬১ ॥
সর্বাগ্রে আমার কাছে কহ ঠিক ঠিক ।
কারে তুমি ভালবাস প্রাণের অধিক ॥ ৬২ ॥
প্রভু-প্রতি ভক্তিমতী কহিল তখন ।
শৈশব বালকে এক সোদর নন্দন ॥ ৬৩ ॥
ললনায় প্রভুরায় কহিলেন তবে ।
শিশুর করিও ধ্যান সাধ পূর্ণ হবে ॥ ৬৪ ॥
দেবদেবী-মূর্তিধ্যানে নহে মন যার ।
রতিমতি প্রভুপদে পিরীতি অপার ॥ ৬৫ ॥
হৃদয় বিহারী তিনি বুঝিয়া বারতা ।
ধিয়াইতে তাঁর রূপ আজ্ঞা হয় তথা ॥ ৬৬ ॥
কখন কাহার প্রতি হইত বিধান ।
এলে গেলে এইখানে পূর্ণ হবে কাম ॥ ৬৭ ॥
শনি কি মঙ্গলবারে প্রভুর নিকটে ।
আজ্ঞামত আগমনে সর্বসিদ্ধি ঘটে ॥ ৬৮ ॥
প্রশস্ত দিবসদ্বয় প্রভু-অবতারে ।
বরষিতে রূপারাশি জীবের উপরে ॥ ৬৯ ॥
হেতু নাহি জানি কই দেখিনু যেমন ।
এই তইদিন ভোগে মাছের ব্যঞ্জন ॥ ৭০ ॥
আত্মসুখ দেহসুখ মোটে নাই মনে ।
সুখমাত্র সুখত্যাগ গরল গিয়ানে ॥ ৭১ ॥
শরীরের সম প্রিয় হেন কিছু নাই ।
ত্যাগ অনুরাগে তাও ত্যজিলা গোসাঁই ॥ ৭২ ॥
হেন তিয়াগীতে কিবা আশ্চর্য কখন ।
তিয়াগীতে দয়া কভু হইল না মন ॥ ৭৩ ॥
দয়া বিনা দেহমধ্যে কিছু নাহি আর ।
সতত কেবল চিন্তা জীবে উপকার ॥ ৭৪ ॥
দয়ার ঠাকুর যিনি এহেন রকম ।
তাঁহার ভোজনে কেন মাছের ব্যঞ্জন ॥ ৭৫ ॥
সন্দনাশে শুন মন উত্তর সরল ।
বিষ নামে বস্তু নাই অমৃত সকল ॥ ৭৬ ॥
ভালমন্দ বিষামৃত খালিমাত্র নামে ।
এক বস্তু দুটি কথা লোকে কহে ভ্রমে ॥ ৭৭ ॥
সব শুভ সব ভাল মন্দভাব ভুল ।
কেন না মঙ্গলময় সকলের মূল ॥ ৭৮ ॥
মঙ্গলনিধান যিনি দয়াময় হরি ।
তাঁহার
কার্যেতে মন্দ বুঝিতে না পারি ॥ ৭৯ ॥
মন্দ নামে বস্তু-সত্তা হৃদয়েতে রাখা ।
ঠিক যেন মরুভূমে মরীচিকা দেখা ॥ ৮০ ॥
পরম দয়াল হরি বিষ্ণু ভগবান ।
জীবনে-মরণে দুয়ে করেন কল্যাণ ॥ ৮১ ॥
কারণ-বিচার-কার্যে অধিকার নাই ।
শুন মন রামকৃষ্ণলীলামৃত গাই ॥ ৮২ ॥
জাহ্নবীর বক্ষে তরী ধীরি ধীরি যায় ।
ভক্তসনে শ্রীপ্রভুর লীলারঙ্গ তায় ॥ ৮৩ ॥
শহরে আসিতে আজি প্রভুর বাসনা ।
কোথায় যাবেন তার নাহিক ঠিকানা ॥ ৮৪ ॥
ভক্তের বাসনা পূর্ণ করিবার তরে ।
কালীকে কহেন তুমি ল'য়ে চল ঘরে ॥ ৮৫ ॥
ভাগ্যবান প্রভুভক্ত মহানন্দ মনে ।
গাড়িতে তুলিয়া ল'য়ে বিষ্ণু ভগবানে ॥ ৮৬ ॥
ত্বরিতে চলিলা তাঁর আবাস যেথায় ।
বাসনা করিতে পূর্ণ ভিক্ষা দিয়া তাঁয় ॥ ৮৭ ॥
খেলা সাঙ্গ করি আজি লীলার ঈশ্বর ।
স্বমন্দিরে ফিরিলেন দক্ষিণশহর ॥ ৮৮ ॥
ভক্তসঙ্গে রঙ্গ যাহা কৈলা প্রভুরায় ।
গাইতে বাসনা কিন্তু হৃদে না জোয়ায় ॥ ৮৯ ॥
যতদূর সাধ্য কথা কই শুন মন ।
ভক্তির ভাণ্ডার এই ভক্ত সংজোটন ॥ ৯০ ॥
বড়ই দয়াল প্রভু প্রথমে প্রথমে ।
যেবা যাহা চায় তাই পায় ততক্ষণে ॥ ৯১ ॥
মহৈশ্বর্য প্রদর্শন বিধির প্রকার ।
রূপ জ্যোতি নিরুপম মূর্তি দেবতার ॥ ৯২ ॥
ভাবরূপে গাঢ় ধ্যান সমাধি সমান ।
লোকে জনে প্রতিপত্তি ধন-যশ মান ॥ ৯৩ ॥
নিদান-অসাধ্য মহাব্যাধি নিবারণ ।
অতিশয় দূরসাধ্য কার্যের সাধন ॥ ৯৪ ॥
প্রলোভে আকৃষ্ট মন যার শ্রীচরণে ।
বিপরীত ব্যবহার টানাটানি প্রাণে ॥ ৯৫ ॥
এক দেহ দশদিকে হয় দশখানা ।
উদরে না জুটে অন্ন কটিদেশে টেনা ॥ ৯৬ ॥
বিষম বিপদজাল চারিদিকে বেড়া ।
ক্রমে নষ্ট ধন মান পুত্র কন্যা দারা ॥ ৯৭ ॥
আসক্তির ক্রীড়াদ্রব্য সব অপচয় ।
সুশোভিত ধরাধাম সব শূণ্যময় ॥ ৯৮ ॥
ভীষণ তুফানস্রোতে সদা ভাসমান ।
ভাঁটায় ভাঁটায় পুনঃ উজানে উজান ॥ ৯৯ ॥
ভার নষ্টে দেহ লঘু ডুবিয়া না যায় ।
বাঁধা রহে মনখানি শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১০০ ॥
কোলে টানে দূরে কাছে খালি টানাটানি ।
ভক্তসঙ্গে হেন রঙ্গ দিবসযামিনী ॥ ১০১ ॥
এই রঙ্গ ঠিক যেন মন্থনের পারা ।
ভবাব্ধির জলে মন খুঁটিরূপে গাড়া ॥ ১০২ ॥
রজ্জুরূপে প্রভুশক্তি বেড়ে আছে তায় ।
দুই দিকে টানাটানি বিদ্যা-অবিদ্যায় ॥ ১০৩ ॥
ভীষণ হর্ষধ্বনি কলেবর কাঁপে ।
উঠে নানা নিধি-রত্ন মন্থনের চাপে ॥ ১০৪ ॥
শক্তিধর সহিষ্ণুতা তিতিক্ষা প্রখর ।
বিবেক বিরাগ তীব্র সোদর সুন্দর ॥ ১০৫ ॥
সর্বাঙ্গে লাবণ্যমাখা অনুরাগ-মণি ।
জ্ঞানের ছটায় ভাসে আগোটা অবনী ॥ ১০৬ ॥
সুধাকর
মনোহর কিবা ভক্তিনামে ।
প্রাণ-গলা প্রেমামৃত অমরত্ব পানে ॥ ১০৭ ॥
দেহসহ মনপ্রাণ বুদ্ধি আগেকার ।
সকল বদল পরে নূতন আকার ॥ ১০৮ ॥
কিছু না থাকিবে বাকি বুঝিবে সর্বথা ।
ভক্তিভরে শুন ধীরে রামকৃষ্ণকথা ॥ ১০৯ ॥
একদিন প্রভুদেব গিরিশের ঘরে ।
সুবেষ্টিত চারিদিকে দর্শকনিকরে ॥ ১১০ ॥
রঙ্গরসে রস-ভাষে কথোপকথন ।
হেনকালে সে সময়ে দিল দরশন ॥ ১১১ ॥
যেইখানে উপবিষ্ট ছিলেন গোসাঁই ।
উকিল অতুলকৃষ্ণ গিরিশের ভাই ॥ ১১২ ॥
গিরিশ পাইয়া এবে সুযোগ সময় ।
হাস্যসহ সম্বোধিয়া প্রভুদেবে কয় ॥ ১১৩ ॥
অতুল সোদর এই হাজির গোচরে ।
রাজহংস দিয়া নাম উপহাস করে ॥ ১১৪ ॥
রসিকের চুড়ামণি কহিলা গোসাঁই ।
এমন সুন্দর নাম কেহ দেয় নাই ॥ ১১৫ ॥
পরিহরি জলভাগ দুধ যেবা খায় ।
এই গুণযুক্ত যাতে হংস বলি তায় ॥ ১১৬ ॥
হেন হংসদের রাজা সবার উপর ।
অতি উচ্চতম আখ্যা বড়ই সুন্দর ॥ ১১৭ ॥
লজ্জা-অবনত মুখ উচ্চ করি তবে ।
উকিল অতুলকৃষ্ণ কহে প্রভুদেবে ॥ ১১৮ ॥
চাইয়া শ্রীমুখপানে হাসিয়া হাসিয়া ।
আপনার কিবা নাম ডাকি কি বলিয়া ॥ ১১৯ ॥
সুন্দর উত্তর প্রভু করিলেন তাঁয় ।
যে নামে ডাকিবে তুমি তাহে পাবে সায় ॥ ১২০ ॥
সরল সরল ভাষ শ্রীপ্রভুর বাণী ।
শক্তিময় শক্তিধর মহামন্ত্র জিনি ॥ ১২১ ॥
লক্ষ্য করি যার প্রতি হয় সঞ্চালন ।
তখনি অন্তরে তার উদয় চেতন ॥ ১২২ ॥
বুদ্ধিমান অতুল পণ্ডিত-চূড়ামণি ।
চমকিত-কলেবর শুনিয়া শ্রীবাণী ॥ ১২৩ ॥
যেন কিবা শক্তি এক অতি শক্তি গায় ।
খেলিয়া উঠিল দেহে সকল শিরায় ॥ ১২৪ ॥
আপনে আপনা-মধ্যে হইয়া মগন ।
ক্ষণের ঘটনা মনে করে আন্দোলন ॥ ১২৫ ॥
অকস্মাৎ বিস্ময় উদয় হয় ঘটে ।
বদনে আদতে আর বাক্য নাহি ফুটে ॥ ১২৬ ॥
কিবা হেতু বাক্যহারা তাহার কারণ ।
শ্রীপ্রভুর উপমায় শুন বিবরণ ॥ ১২৭ ॥
বিষহীন ঢোড়া সাপে যদি ভেক ধরে ।
কেঁও কেঁও শব্দ ভেক বহুক্ষণ করে ॥ ১২৮ ॥
জাতিসাপে ধরিলে অধিক নয় সোর ।
এক-দুই বার কিংবা তিন বার জোর ॥ ১২৯ ॥
ভক্তিভরে সবিশ্বাসে শুনহ বারতা ।
ভক্তির ভাণ্ডার ভক্ত-সংজোটন-কথা ॥ ১৩০ ॥
গোলাকার গেঁড়ু লয়ে বালকেরা খেলে ।
যে দিকে গড়ায় গেঁডু, সেই দিকে চলে ॥ ১৩১ ॥
তেমতি জীবের মন শ্রীগুরুর হাতে ।
যে পথে ছুটান তিনি ছুটে সেই পথে ॥ ১৩২ ॥
অতুল অতুলকৃষ্ণ ছুটিল এখন ।
বুঝিবারে নামময় প্রভু কোন জন ॥ ১৩৩ ॥
অতুলের মনে মনে করে তোলাপাড়া ।
যে নামে ডাকিলে পরে যিনি দেন সাড়া ॥ ১৩৪ ॥
ভগবান বিনে তিনি কেহ নহে আর ।
দেখিতে হইবে কিবা ভিতরে ব্যাপার ॥ ০১৩৫ ॥
কতিপয় দিন পরে মন উচাটনে ।
দক্ষিণশহরে যান প্রভুদরশনে ॥ ১৩৬ ॥
প্রভুর সুখের আর পরিসীমা নাই ।
দেখিয়া অতুলকৃষ্ণে গিরিশের ভাই ॥ ১৩৭ ॥
গিরিশ প্রভুর বড় পিয়ারের জন ।
এত রূপা পাত্রান্তরে নহে বরিষণ ॥ ১৩৮ ॥
সেই হেতু তাঁহার সম্বন্ধে যেবা আছে ।
অতি আদরের বস্তু শ্রীপ্রভুর কাছে ॥ ১৩৯ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি খুলে ।
গিরিশের কৃপায় প্রভুর কৃপা মিলে ॥ ১৪০ ॥
তিলমাত্র নাহি সন্দ সত্য একেবারে ।
অতি গোপনের কথা শ্রীপ্রভুর ঘরে ॥ ১৪১ ॥
প্রভুপদে এক ভিক্ষা মাগ দিবারাতি ।
তাঁহার ভক্তের পদে রহে যেন মতি ॥ ১৪২ ॥
আজিকার ঘটনায় দেখ তুমি মন ।
শ্রীপ্রভুর প্রিয় জনা গিরিশ কেমন ॥ ১৪৩ ॥
দেব-দেবী-মূর্তি যত পুরীর ভিতরে ।
পূততীর্থ পঞ্চবটী জাহ্নবীর তীরে ॥ ১৪৪ ॥
জাগা-ভূমি বিল্বতল সাধনার স্থান ।
অতুল সকলগুলি দেখিয়া বেড়ান ॥ ১৪৫ ॥
স্থানের মাহাত্ম্যগুণে প্রভুর কৃপায় ।
অতুল অতুলানন্দে দেখিয়া বেড়ায় ॥ ১৪৬ ॥
অবশেষে অপূর্ব দর্শন তেঁহ করে ।
দাঁড়াইয়া যে সময় জাহ্নবীর তীরে ॥ ১৪৭ ॥
গভীর সলিলমধ্যে গঙ্গার মাঝার ।
ত্রিতলপ্রমাণ এক বৃহৎ আকার ॥ ১৪৮ ॥
অপরূপ শিবলিঙ্গ তথা মূর্তিমান ।
ক্ষণেকের মধ্যে জলে হয় অন্তর্ধান ॥ ১৪৯ ॥
তখন অতুলকৃষ্ণ বুঝিল সহজে ।
রামকৃষ্ণনামধারী বিশ্বগুরু নিজে ॥ ১৫০ ॥
দীন দুঃখী দ্বিজ সাজে নর-কলেবর ।
নামময় নামরূপ পরম ঈশ্বর ॥ ১৫১ ॥
স্বরূপ-দর্শনে ত্যজি পূর্ব উপহাস ।
হইল অতুলকৃষ্ণ শ্রীচরণে দাস ॥ ১৫২ ॥
প্রভুর উৎসবে যেন মত্ত ভক্ত রাম ।
দ্বিতীয় কেহই নাই তাঁহার সমান ॥ ১৫৩ ॥
ধ্যান, জ্ঞান প্রভুদের সর্বস্ব-রতন ।
হৃদয় আনন্দকর নয়ন-রঞ্জন ॥ ১৫৪ ॥
দিবারাতি এক প্রীতি লীলা-আন্দোলনে ।
ভক্তের সতত মেলা রহে নিকেতনে ॥ ১৫৫ ॥
ভক্তগণে ভিক্ষা দেন যতন সহিত ।
যত আয় ব্যয়ে যায় রহে না কিঞ্চিৎ ॥ ১৫৬ ॥
অতিশয় মুক্তহস্ত হৃদয় কোমল ।
অর্থের আদর যেন পুকুরের জল ॥ ১৫৭ ॥
ধরম-করম তার মনের মতন ।
দাও অন্ন ক্ষুধাতুরে উলঙ্গে বসন ॥ ১৫৮ ॥
সামান্য সঞ্চয় হাতে হইত যখন ।
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব হয় আকিঞ্চন ॥ ১৫৯ ॥
উৎসবে করিয়া ব্যয় সাধ নাহি মিটে ।
উৎসব পিয়ারা বড় রামের নিকটে ॥ ১৬০ ॥
আজি ঘরে উৎসব আনন্দে আটখান ।
বিরাজিত ভক্তসহ প্রভু ভগবান ॥ ১৬১ ॥
হরিশ রাখাল লাট্টু শ্রীমনোমোহন ।
দেবেন্দ্র নরেন্দ্র ছোট নিত্যনিরঞ্জন ॥ ১৬২ ॥
ভুটে কালী বলরাম পাগবাঁধা শিরে ।
সুরেন্দ্র গোপাল ছোট হুট্কো বলে যারে ॥ ১৬৩ ॥
চাটুয্যে কেদারচন্দ্র ভক্তিরাগে ভরা ।
প্রভুকে দেখিলে যিনি কেঁদে হন সারা ॥ ১৬৪ ॥
বিজয় গোস্বামী যিনি ব্রাহ্মদল-ভুক্ত ।
স্মরণ না হয় আর প্রভুভক্ত কত ॥ ১৬৫ ॥
শ্রীবয়ানে সকলের নয়নের বাসা ।
লুব্ধমন শ্রীবচন-সুধাপান-আশা ॥ ১৬৬ ॥
কিন্তু আজি এক বিন্দু নহে বরিষণ ।
আপনি আনন্দময় বিমরষ মন ॥ ১৬৭ ॥
তাহার কারণ মন শুন সাবধানে ।
প্রাণের অধিক প্রিয় নরেন্দ্র বিহনে ॥ ১৬৮ ॥
এ সময় নরেন্দ্রের সংসার অচল ।
অবস্থা শুনিলে ঝরে পাষাণেতে জল ॥ ১৬৯ ॥
অতি কষ্টে যায় দিন দরিদ্রের বাড়া ।
পোষ্যবর্গ ভাই বোন এক ঘর ভরা ॥ ১৭০ ॥
খাতির নাহিক যদি এত অনাটন ।
ভগবানে একটানে ধাবমান মন ॥ ১৭১ ॥
দেহে মন কদাচন উদাস শরীরে ।
পথে যেতে নাহি হুঁশ গায়ে গাড়ি পড়ে ॥ ১৭২ ॥
তত্ত্বচিন্তাশীলতার প্রভাবে কেমন ।
নিদারুণ শিরঃপীড়া উদয় এখন ॥ ১৭৩ ॥
বড়ই যাতনা তার সহ্য নাহি হয় ।
নানা প্রতিকার তবু উপশম নয় ॥ ১৭৪ ॥
তত্ত্বচিন্তা মহাবায়ু প্রবল যখন ।
মন-ঘুড়ি পরিহরি শরীর-ভবন ॥ ১৭৫ ॥
অত্যুচ্চে উড়িয়া যায় আপনার মনে ।
গুরুতর শিরঃপীড়া তাহার কারণে ॥ ১৭৬ ॥
দ্বার বন্ধ করি ঘরে অবিরত বাস ।
বিষবৎ আন্-কথা আন্-সহবাস ॥ ১৭৭ ॥
বিমরষ মনে তাই শ্রীপ্রভু আমার ।
নরেন্দ্রবিহনে তাঁর সকল আঁধার ॥ ১৭৮ ॥
জনে জনে সকলেই কন প্রভুরায় ।
নরেন্দ্রের কাছে বাড়ি নরেন্দ্র কোথায় ॥ ১৭৯ ॥
একে আজ্ঞা শত ধায় যায় ছুটে ছুটে ।
আনিতে নরেন্দ্রনাথে প্রভুর নিকটে ॥ ১৮০ ॥
নরেন্দ্র নারাজ তায় কহেন উত্তরে ।
মাথায় বেদনা ইচ্ছা নাই যাইবারে ॥ ১৮১ ॥
বারতা আসিলে পরে প্রভুর গোচর ।
দুঃখের নাহিক সীমা বিষণ্ণ অন্তর ॥ ১৮২ ॥
কাকুতিপুরিত ভাষ বিষণ্ণ বয়ানে ।
প্রভুদেব পাঠাইয়া দিলা অন্য জনে ॥ ১৮৩ ॥
দৌত্যকর্মে এইবার নরেন্দ্রের গতি ।
দেবেন্দ্রে নরেন্দ্রে দুয়ে বড়ই পিরীতি ॥ ১৮৪ ॥
বুঝাইয়া বিধিমতে আনিলেন তাঁয় ।
রামের আবাসে যেথা প্রভুদেবরায় ॥ ১৮৫ ॥
আনন্দে উথলা হৃদি নরেন্দ্রে দেখিয়া ।
জিজ্ঞাসা করেন প্রভু হাসিয়া হাসিয়া ॥ ১৮৬ ॥
আইস নিকটে মোর দেখি কি রকম ।
মাখায় উদয় পীড়া যাতনা বিষম ॥ ১৮৭ ॥
এত বলি শিরোদেশ পরশন করি ।
মহৌষধি কৈলা দান ত্রিতাপনিবারী ॥ ১৮৮ ॥
পীড়ায় পাইয়া শান্তি কহেন তখন ।
আনাইয়া দাও কিছু করিব ভোজন ॥ ১৮৯ ॥
তখনি প্রেরণ বার্তা হয় অন্তঃপুরে ।
সেবা-আয়োজনে ব্যস্ত রামের গোচরে ॥ ১৯০ ॥
ভক্তিভরে ভক্ত রাম পাঠান সত্বর ।
থালে ভরা নানা দ্রব্য প্রভুর গোচর ॥ ১৯১ ॥
অঙ্গুলির অগ্রভাগে অগ্রভাগ ল'য়ে ।
দিলেন আগোটা থাল নরেন্দ্রে ডাকিয়ে ॥ ১৯২ ॥
এমন সময় কিবা হইল ঘটনা ।
প্রবেশিলা রামাবাসে বেশ্যা একজনা ॥ ১৯৩ ॥
কুরূপদর্শনা তেহ কালীর বরণ ।
বেশভূষাহীন অঙ্গ সামান্য বসন ॥ ১৯৪ ॥
একমাত্র আভরণ অতি মনোহর ।
মিষ্টকণ্ঠা গায় গীত শ্রুতিমুগ্ধকর ॥ ১৯৫ ॥
শুধু মিঠা সুর নয় গায় অনুরাগে ।
সুরেন্দ্র বারতা কয় শ্রীপ্রভুর আগে ॥ ১৯৬ ॥
প্রভুদেব বড় প্রিয় সঙ্গীত-শ্রবণে ।
বেশ্যায় বসিতে আজ্ঞা বাহির প্রাঙ্গণে ॥ ১৯৬ ॥
কিছুক্ষণ পরে প্রভু কহিলেন তায় ।
ওগো বাছা গাও গীত শুনাতে শ্যামায় ॥ ১৯৭ ॥
জানালার অন্তরালে শুনিয়া শ্রীবাণী ।
সুমধুর সুরে গীত ধরিল অমনি ॥ ১৯৮ ॥
আন্তরিক অনুরাগে গায় বারনারী ।
ভক্তির আবেগে বহে দুনয়নে বারি ॥ ১৯৯ ॥
কলমে না যায় আঁকা গায়িকার ধারা ।
শ্যামার কারণে যেন পাগলের পারা ॥ ২০০ ॥
ভাবে ভরা মাতোয়ারা প্রভু পরমেশ ।
বাহ্যিক-গিয়ানশূন্য ভাবের আবেশ ॥ ২০১ ॥
পরে যত ধীরে ধীরে সমাধি গভীর ।
তত বহে গায়িকার দুনয়নে নীর ॥ ২০২ ॥
কি জানি রমণী কেবা দেবীর সমান ।
মর্ত্যধামে করে বাস বারাঙ্গনা নাম ॥ ২০৩ ॥
তুষ্ট কৈলা প্রভুদেবে শুনায়ে সঙ্গীত ।
গভীর সমাধিপর হইয়া মোহিত ॥ ২০৪ ॥
হেন জনে বেশ্যা-আখ্যা পুঁথির ভিতরে ।
হীন মূঢ় এ অধম দিতে প্রাণে ডরে ॥ ২০৫ ॥
বারে বারে বন্দি তার চরণ দুখানি ।
পুঁথিতে থুইনু নাম কালপাগলিনী ॥ ২০৬ ॥
লীলায় কাহিনী বহু আছে গায়িকার ।
সময়ে সময়ে মন পাবে সমাচার ॥ ২০৭ ॥
সমাধি হইলে ভঙ্গ প্রভুদেবরায় ।
কৃপাসহকারে তাঁরে দিলেন বিদায় ॥ ২০৮ ॥
শুদ্ধ ল'য়ে দেহখানি পাগলিনী যায় ।
সমর্পিয়া প্রাণমন শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ২০৯ ॥
ভক্তি-বিশ্বাসের তত্ত্বে বড় তুষ্ট রায় ।
এ দুয়ের উপদেশ কথায় কথায় ॥ ২১০ ॥
বিশেষিয়া
সবিশেষ শুন তুমি মন ।
ভক্তির ভাণ্ডার এই রামকৃষ্ণায়ন ॥ ২১১ ॥
একদিন ভক্তগণে কহেন গোসাঁই ।
বিশ্বাস-ভক্তির মত হেন কিছু নাই ॥ ২১২ ॥
কাহিনী বাখান করি কন ভগবান ।
তিয়াগী সন্ন্যাসী এক সাধুর আখ্যান ॥ ২১৩ ॥
সাধুবর অবিরত ধামে ধামে ঘুরে ।
এইবার উপনীত পুরীর ভিতরে ॥ ২১৪ ॥
তাহায় দেখিয়া মোর হইল কেমন ।
মনে মনে হয় সঙ্গে করি আলাপন ॥ ২১৫ ॥
বৈঠক করিয়া সাধু বসে বটতলে ।
একমাত্র পুঁথি তার সম্পত্তি বগলে ॥ ২১৬ ॥
কি পুঁথি জিজ্ঞাসা আমি করিহ যখন ।
পুলকিতচিতে সাধু কহে রামায়ণ ॥ ২১৭ ॥
দৈবে একদিন সাধু স্থানান্তরে যায় ।
গোপনে রাখিয়া পুঁথি বৈঠক যেথায় ॥ ২১৮ ॥
সময় পাইয়া আমি করি নিরীক্ষণ ।
বাহির করিয়া পুঁথি বসনে গোপন ॥ ২১৯ ॥
যতই উলটাই পাতা পুঁথি বরাবর ।
সব সাদা নাই মোটে কালীর অক্ষর ॥ ২২০ ॥
একটি পাতার মধ্যে পরে গেল দেখা ।
এক ঠাঁই এক মাত্র রাম নাম লেখা ॥ ২২১ ॥
কাহিনী সমাপ্ত করি কন প্রভুরায় ।
মহাভক্ত সাধুবর ধন্য মানি তায় ॥ ২২২ ॥
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ কিবা শুন বিবরণ ।
পার্বতী-মহেশে দুয়ে কথোপকথন ॥ ২২৩ ॥
স্থান-হেতু সে সময় জাহ্নবীর জলে ।
ক্রমাগত শত শত নরনারী চলে ॥ ২২৪ ॥
সম্ভাষিয়া গঙ্গাধরে মহেশ্বরী কন ।
জীবের গঙ্গায় ভক্তি হের পঞ্চানন ॥ ২২৫ ॥
চলিতেছে অগণন নাহিক বিরাম ।
অতিভক্তি-সহকারে করিবারে স্নান ॥ ২২৬ ॥
হাসিয়া মহেশ তবে করেন উত্তর ।
ক'জনায় স্নানে যায় ইহার ভিতর ॥ ২২৭ ॥
গণনায় বহু যায় সত্য বিবরণ ।
দেখিবে রহস্য যদি ধরহ বচন ॥ ২২৮ ॥
শবাকারে গঙ্গাতীরে করিব শয়ন ।
পাশেতে বসিয়া তুমি করিও রোদন ॥ ২২৯ ॥
লোকজনে একত্তর হইলে সেখানে ।
জিজ্ঞাসা করিবে তুমি প্রতি জনে জনে ॥ ২৩০ ॥
মরিয়া গিয়াছে পতি ছাড়িয়াছে দেহ ।
শ্মশানে বহিয়া দেয় হেন নাহি কেহ ॥ ২৩১ ॥
একাকী বহিতে শক্তি নাহিক আমার ।
সাহায্য করিয়া কেহ কর উপকার ॥ ২৩২ ॥
এই সঙ্গে এক কথা বলো এক ঠাঁই ।
নিষ্পাপ শরীর যার হেন জন চাই ॥ ২৩৩ ॥
পাপযুক্ত দেহে কৈলে শবে পরশন ।
তখনি হইবে তার নিশ্চয় নিধন ॥ ২৩৪ ॥
পার্বতীর সঙ্গে যুক্তি করি গঙ্গাধর ।
সতীসঙ্গে গঙ্গাতীরে চলিল সত্বর ॥ ২৩৫ ॥
শববৎ শুইলেন শিব শূলপানি ।
শোকাকুলা সম কাঁদে ত্রিলোকতারিণী ॥ ২৩৬ ॥
পাষাণ দ্রবয়ে হেন করুণ রোদনে ।
চারিধারে গোলাকারে লোকজন জমে ॥ ২৩৭ ॥
কাকুতি সহিত সতী কন সবাকারে ।
শ্মশানে পতিকে দেহ সৎকারের তরে ॥ ২৩৮ ॥
ব্যাপারে মোহিয়া বহু হৈল অগ্রসর ।
বহন করিতে শবে শ্মশান ভিতর ॥ ২৩৯ ॥
তবে সেই সবে সতী কহেন তখন ।
পাপীতে ছুঁইলে হবে নিশ্চয় নিধন ॥ ২৪০ ॥
গুনিয়া সে সব লোক পাছু ফিরে বাট ।
জনমের আগাগোড়া কর্ম করে পাঠ ॥ ২৪১ ॥
অগণন পাপাচার উঠে মনে মনে ।
সাহস না করে আর শব-পরশনে ॥ ২৪২ ॥
হেনকালে সেইখানে আসে একজন ।
বেশ্যার আবাসে নিশি করিয়া যাপন ॥ ২৪৩ ॥
কলুষ-কলঙ্ক-কাণ্ডে আজীবন ভরা ।
যতবিধ পাপ-কর্ম সব সাঙ্গ করা ॥ ২৪৪ ॥
মূর্তিমান্ পাপাচার পাপের মুরতি ।
এই নামে জনে জনে ভুবনে বিদিতি ॥ ২৪৫ ॥
অগণন লোকজন দেখি একত্তর ।
বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা কৈলা সবার গোচর ॥ ২৪৬ ॥
অগ্রসর হয় তবে অকুতঃসাহসে ।
যেখানে বসিয়া সতী পতির সকাশে ॥ ২৪৭ ॥
পার্বতীরে কহে যেন বীরের আকার ।
শ্মশানে বহিয়া দিব ভাবনা কি তার ॥ ২৪৮ ॥
এত বলি ত্বরান্বিত দ্রুতপদে আসে ।
পতিতপাবনী যেথা দ্রবময়ীবেশে ॥ ২৪৯ ॥
ডুবিয়া গঙ্গার জলে ফিরিল সেথায় ।
আদ্র বস্ত্র ঝরে জল চুলের ডগায় ॥ ২৫০ ॥
সুদীর্ঘ সবল বাহু করি প্রসারণ ।
তুলিবারে মহেশ্বরে করে পরশন ॥ ২৫১ ॥
শবরূপী পরমেশ পরশের গুণে ।
সমুদিত দিব্যভাতি যুগল নয়নে ॥ ২৫২ ॥
যার বলে সেইক্ষণে করে দরশন ।
শবরূপধারী নিজে শূলী ত্রিলোচন ॥ ২৫৩ ॥
পাশে তাঁর নারীবেশে ঈশানী আপনি ।
সৃষ্টিস্থিতিলয়কর্ত্রী জগৎজননী ॥ ২৫৪ ॥
আখ্যান সমাপ্ত করি গুণমণি কন ।
গঙ্গায় বিশ্বাস করে এই এক জন ॥ ২৫৫ ॥
অটল ধারণা গঙ্গা বারেক পরশে ।
জনমের যত পাপ একেবারে নাশে ॥ ২৫৬ ॥
এমন গিয়ান যার অন্তরে ধারণ ।
ধরাধামে সেই ধন্য সার্থক জীবন ॥ ২৫৭ ॥
তৃতীয় প্রসঙ্গ কথা শুন তবে বলি ।
গঙ্গাকূলে প্রাতঃকালে ব্রাহ্মণমণ্ডলী ॥ ২৫৮ ॥
পরিপাটী বাহ্যাচার মহা আড়ম্বর ।
নামাবলী ছিটাফোঁটা অঙ্গের উপর ॥ ২৫৯ ॥
পরিধান পট্টবাস আসন ঠসক ।
লম্বা প্রস্থ দীর্ঘ দীর্ঘ নাসায় তিলক ॥ ২৬০ ॥
নাকটেপা করজপা প্রাতের করম ।
হেনকালে উপনীত জনেক ব্রাহ্মণ ॥ ২৬১ ॥
বৃদ্ধক বয়স তাঁর বেশ মোটামুটি ।
উদাসীন দেহে নাই কোন পরিপাটী ॥ ২৬২ ॥
ধুলি-ধূসরিত পদ পথ-পর্যটনে ।
দুছোটে পুটুলি বাঁধা ধরা সাবধানে ॥ ২৬৩ ॥
ঘাটেতে পুঁটুলি রাখি দ্রুততর পার ।
স্নান করিবারে বৃদ্ধ নামিল গঙ্গায় ॥ ২৬৪ ॥
কোন গ্রাহ্য নাহি তাঁর দেহ পরিষ্কারে ।
দিয়া একমাত্র ডুব উঠিল সত্ত্বরে ॥ ২৬৫ ॥
পুঁটুলিতে বাঁধা মুড়ি খুলিয়া তখন ।
তাড়াতাড়ি দ্বিজবর করেন ভক্ষণ ॥ ২৬৬ ॥
সমাপন মহাকর্ম ফুরায়ে পুঁটুলি ।
জাহ্নবীতে খান জল অঞ্জলি অঞ্জলি ॥ ২৬৭ ॥
স্নানে জলপানে করি পথশ্রম দূর ।
উঠিল চলিতে পথে ব্রাহ্মণঠাকুর ॥ ২৬৮ ॥
দেখিয়া তাঁহার ধারা ব্রাহ্মণমণ্ডলী ।
ক্রোধেতে আরক্ত আঁখি কপালেতে তুলি ॥ ২৬৯ ॥
কহিতে লাগিল দ্বিজে করি সম্বোধন ।
ও ঠাকুর তুমি না কি জাতিতে ব্রাহ্মণ ॥ ২৭০ ॥
স্নানান্তে দ্বিজের যাহা কর্তব্যানুষ্ঠান ।
তিলেক আহ্নিক জপ ইষ্টের ধিয়ান ॥ ২৭১ ॥
কিছু না করিলে তুমি অতি কদাচারী ।
হইয়া জাতিতে দ্বিজ যজ্ঞসূত্রধারী ॥ ২৭২ ॥
এত শুনি দ্বিজবর উত্তরিল তায় ।
প্রয়োজন যাহা মম হইয়াছে সায় ॥ ২৭৩ ॥
বাহ্যশুচি অবগাহে পবিত্র জীবনে ।
অন্তর হইল শুচি ব্রহ্মবারি-পানে ॥ ২৭৪ ॥
এত বলি প্রভুদেব কহেন তখন ।
যথার্থ বিশ্বাসী এই বৃদ্ধক ব্রাহ্মণ ॥ ২৭৫ ॥
চতুর্থ প্রসঙ্গ মন শুন ভক্তিভরে ।
ব্রাহ্মণ কয়েকজন যায় একত্তরে ॥ ২৭৬ ॥
প্রাতঃকৃত্য-সমাপনে সকালবেলায় ।
অঙ্গে কাটা ছিটাফোঁটা গঙ্গামৃত্তিকায় ॥ ২৭৭ ॥
সজ্জীভূত দ্বিজগণে করি নিরীক্ষণ ।
শুন কি করিল পরে আর এক জন ॥ ২৭৮ ॥
সন্নিকটে আঁস্তাকুড় পথের কিনারে ।
তুলিয়া মৃত্তিকা তার ছিটাফোঁটা করে ॥ ২৭৯ ॥
দ্বিজগণ কহে তারে দেখিয়া ঘটনা ।
অস্পর্শীয় মৃত্তিকায় তিলক-রচনা ॥ ২৮০ ॥
ব্রাহ্মণনিকরে তেঁহ কহিল তখন ।
অস্পর্শীয় মাটি কিসে কহ দ্বিজগণ ॥ ২৮১ ॥
বামনভিক্ষার কালে বামনাবতার ।
এক পদে ভূতল করিলা অধিকার ॥ ২৮২ ॥
দ্বিতীয়েতে দেবপুরী অমরনগর ।
তৃতীয় চরণ বলিরাজের উপর ॥ ২৮৩ ॥
পৃথিবী ব্যাপিয়া পদ পড়িল যখন ।
সকল স্থানেতে আছে তাঁহার চরণ ॥ ২৮৫ ॥
মৃত্তিকাতে শুদ্ধাশুদ্ধ বুঝি কিবা আর ।
মাটি নহে মাটি সব পদরেণু তাঁর ॥ ২৮৬ ॥
এত
বলি প্রভুরায় কহিলা তখন ।
যথার্থ বিশ্বাস-ভক্তি ধরে এই জন ॥ ২৮৭ ॥
পঞ্চম প্রসঙ্গ শ্রীপ্রভুর বড় খাসা ।
পাপী তাপী সন্তাপীর সাহস ভরসা ॥ ২৮৮ ॥
হতাশ প্রাণের আশা দুর্বলের বল ।
সাধনভজনহীন জনের সম্বল ॥ ২৮৯ ॥
আজীবন পাপাচারে করিয়া যাপন ।
দেহ-বিসর্জনকালে যদি সেই জন ॥ ২৯০ ॥
নয়নে ফেলিয়া খালি এক ফোঁটা জল ।
ঈশ্বরে প্রার্থনা করে অন্তর সরল ॥ ২৯১ ॥
তখনি করুণা তাঁয় করেন শ্রীহরি ।
ভবসিন্ধুপারাপারে হইয়া কাণ্ডারী ॥ ২৯২ ॥
শেষোক্ত প্রসঙ্গে প্রভু উপদেশে কন ।
বিশ্বাস-ভকতি যার ঘটে বিলক্ষণ ॥ ২৯৩ ॥
অনাচারে কিবা কোন অভক্ষ্য আহারে ।
কোন ক্ষতি নহে তাঁর ভবসিন্ধুপারে ॥ ২৯৪ ॥
বিশ্বাসবিহীন চিত্তে যদি কোন জন ।
সাচারে হবিষ্য-অন্ন করেন ভোজন ॥ ২৯৫ ॥
সেও নহে শ্রেয়ঃ হেয় ফল কিবা তায় ।
অবশ্য হবিষ্য তার অখাদ্যের প্রায় ॥ ২৯৬ ॥
আচরিলে কর্মকাণ্ড ভক্তিসহকারে ।
তাহাতে লইয়া যায় ঈশ্বরের দ্বারে ॥ ২৯৭ ॥
ভক্তিহীনে কর্মকাণ্ড খোঁড়ার মতন ।
দাঁড়াইতে হীনশক্তি অচল চরণ ॥ ২৯৮ ॥
কলিকালে জ্ঞানযোগ বহু কষ্টে হয় ।
ভক্তিপথ সহজ সরল অতিশয় ॥ ২৯৯ ॥
জীবে দিতে ভক্তি-শিক্ষা প্রভুদেবরায় ।
ভক্তির বিধান কার্য কথায় কথায় ॥ ৩০০ ॥
অরুণ উদয়-পূর্বে করি গাত্রোত্থান ।
উন্মত্তে করেন প্রভু ঈশ্বরের নাম ॥ ৩০১ ॥
শ্যাম শ্যামাবিষয়ক গীতের আবলি ।
তালে তালে নৃত্য কত সহ করতালি ॥ ৩০২ ॥
দেব-দেবীমূর্তি যত পুরীর ভিতরে ।
প্রদক্ষিণ প্রণাম করেন সবাকারে ॥ ৩০৩ ॥
গঙ্গায় শ্রীঅঙ্গ ধৌত স্নানের সময় ।
ব্রহ্মবারি জাহ্নবীতে ভক্তি অতিশয় ॥ ৩০৪ ॥
কদাচারে কিংবা কোন কদরভক্ষণে ।
দেখিলে সমল-চিত্ত কোন ভক্তজনে ॥ ৩০৫ ॥
তখনি প্রভুর আজ্ঞা হইত তাহারে ।
গঙ্গায় অঞ্জলিত্রয় জল খাইবারে ॥ ৩০৬ ॥
আপনি অখিলস্বামী প্রভুদেবরায় ।
তাঁর সৃষ্ট দেবদেবী যে আছে যেথায় ॥ ৩০৭ ॥
তথাপি আপনে করি নিকৃষ্ট গিয়ান ।
সমভাবে রক্ষা হয় সকলের মান ॥ ৩০৮ ॥
ঘটনা ধরিয়া মন শুন পরিচয় ।
একদিন গঙ্গাস্নানে যোগ অতিশয় ॥ ৩০৯ ॥
অনেক ভক্তের মেলা ছিল সেই দিনে ।
কেহ বা প্রভুর কাছে কেহ গঙ্গাস্নানে ॥ ৩১০ ॥
গিরিশ ভক্তের বীর বিশ্বাসে অটল ।
সার যাঁর শ্রীপ্রভুর চরণকমল ॥ ৩১১ ॥
অন্য যত ভক্ত প্রায় যান গঙ্গাস্নানে ।
গিরিশ বসিয়া আছে প্রভুর সদনে ॥ ৩১২ ॥
হৃদয়ে উদয় ভাব তাঁহার তখন ।
অখিল ঈশ্বর বিষ্ণু প্রভু নারায়ণ ॥ ৩১৩ ॥
গুরুবেশে কল্পতরু সম্মুখে বিরাজ ।
মহাযোগে গঙ্গাস্নানে কিবা মোর কাজ ॥ ৩১৪ ॥
শ্রীপ্রভু ভক্তের ভাব বুঝিয়া অন্তরে ।
গিরিশে করেন আজ্ঞা স্নানে যাইবারে ॥ ৩১৫ ॥
প্রভুদেবে ভক্তবর উত্তর বচনে ।
বলিলেন আসিয়াছি গুরু-দরশনে ॥ ৩১৬ ॥
কৃপায় তাঁহার করি তাঁরে দরশন ।
কিবা পুনঃ গঙ্গাস্নানে নাহি লয় মন ॥ ৩১৭ ॥
প্রত্যুত্তরে ভক্তবীরে কন ভগবান ।
তোমরা না দিলে তীর্থে কেবা দিবে মান ॥ ৩১৮ ॥
এইখানে বুঝ কিবা প্রভু গুণমণি ।
কিবা তাঁর ভক্তগণ কোথাকার প্রাণী ॥ ৩১৯ ॥
কোটি কোটি দণ্ডবৎ ভক্তের চরণে ।
গাব রামকৃষ্ণলীলা শক্তি দেহ দীনে ॥ ৩২০ ॥
গঙ্গাজলে অঙ্গধৌত করি প্রভুরায় ।
প্রদক্ষিণ দেবতা-মন্দির পুনরায় ॥ ৩২১ ॥
কালীর নিকটে প্রভু বালকের ধারা ।
মা মা রবে সম্বোধন বালকের পারা ॥ ৩২২ ॥
রামকৃষ্ণ-মূরতির কাছে ভাবান্তর ।
রসভাষ যেন কৃষ্ণ রসিকশেখর ॥ ৩২৩ ॥
স্বতন্তর ভাব শিবলিঙ্গ-প্রদক্ষিণে ।
সে ভাব দুঃসাধ্য আঁকা কাঠির কলমে ॥ ৩২৪ ॥
অঙ্গে নাই সংজ্ঞা বাহ্যহারা একেবারে ।
শিখিল কটির বাস রহে না কোমরে ॥ ৩২৫ ॥
সঙ্গেতে রাখালনাথ পাছু পাছু ধায় ।
যত বাস খসে তত কটিতে জড়ায় ॥ ৩২৬ ॥
বাহ্যহীন তনুখানি ভাবেতে আকুল ।
ঠিক যেন প্রভুদেব কলের পুতুল ॥ ৩২৭ ॥
অবিরত প্রদক্ষিণ নাহিক বিরাম ।
কার্য-অবসানে তবে ভাব-অবসান ॥ ৩২৮ ॥
তখন রাখালনাথ ধরিয়া তাঁহায় ।
ধীরে ধীরে শ্রীমন্দিরে লইয়া পালায় ॥ ৩২৯ ॥
ভাবেতে বিহ্বল তনু শ্রীপ্রভু যখন ।
যে কেহ করিতে নারে তাঁরে পরশন ॥ ৩৩০ ॥
নিত্যসিদ্ধ অনাসক্ত কামিনী-কাঞ্চনে ।
শুদ্ধ-আত্মা অন্তরঙ্গ ভক্তজন বিনে ॥ ৩৩১ ॥
এই যে রাখালনাথ কে বটেন তিনি ।
প্রভুর বচনে শুন তাঁহার কাহিনী ॥ ৩৩২ ॥
ভোজনান্তে একদিন প্রভুদেবরায় ।
গ্রীষ্মকালে বিশ্রাম করেন বিছানায় ॥ ৩৩৩ ॥
এমন সময় তথা উপনীত হন ।
কেশবের দলভুক্ত ব্রাহ্ম দুইজন ॥ ৩৩৪ ॥
অমৃত একের নাম ত্রৈলোক্য দ্বিতীয় ।
উভয়েই
শ্রীপ্রভুর বিশেষতঃ প্রিয় ॥ ৩৩৫ ॥
ত্রৈলোক্য মধুরকণ্ঠ বহুলোকে জানে ।
বিমোহন মন
যাঁর সঙ্গীত-শ্রবণে ॥ ৩৩৬ ॥
আজি দিনে শ্রীপ্রভুর মন নহে স্থির ।
হেতু তার রাখালের
অসুখ শরীর ॥ ৩৩৭ ॥
শ্রীপ্রভু আতুর প্রাণে জনে জনে কন ।
আরোগ্য-উপায় যদি জানে কোন জন ॥ ৩৩৮ ॥
নিরখিয়া রাখালের বয়ানের পানে ।
আপনি করেন প্রভু আরোগ্য-বিধানে ॥ ৩৩৯ ॥
ও রাখাল খা রে তুই যাবে পরমাদ ।
মহৌষধি জগন্নাথদেবের প্রসাদ ॥ ৩৪০ ॥
এই কথা বলিতে বলিতে ধীরে ধীরে ।
ডুবিলেন গুণমণি ভাবের পাথারে ॥ ৩৪১ ॥
ভাবাবেশে শ্রীপ্রভু করেন নিরীক্ষণ ।
রাখাল বালকবেশে নিজে নারায়ণ ॥ ৩৪২ ॥
প্রেমময় প্রেমচক্ষু প্রভুর আমার ।
রাখালের প্রতি হৈল বাৎসল্য-সঞ্চার ॥ ৩৪৩ ॥
ভাবাবেশে রাখালের স্বরূপ দেখিয়া ।
ডাকিতে থাকেন তাঁয় গোবিন্দ বলিয়া ॥ ৩৪৪ ॥
নিরখিয়া নীলমণি যশোদা যেমতি ।
সেইভাবে শ্রীপ্রভুর রাখালের প্রতি ॥ ৩৪৫ ॥
এতক্ষণ ভাবে ছিলা প্রভুগুণমণি ।
সেহেতু ফুটিতেছিল শ্রীমুখেতে বাণী ॥ ৩৪৬ ॥
দুইবার কেবল গোবিন্দ উচ্চারণে ।
কোথায় গেলেন ছাড়ি শরীর-ভবনে ॥ ৩৪৭ ॥
এইতো ছিলেন তিনি শরীর-ভিতরে ।
চকিতে গেলেন কোথা কে বলিতে পারে ॥ ৩৪৮ ॥
জড়বৎ অঙ্গে নাই বাহ্যিক চেতন ।
জবাব দিয়াছে কাজে ইন্দ্রিয়ের গণ ॥ ৩৪৯ ॥
নাসাগ্রে নয়ন স্থির শ্বাসহীন প্রায় ।
কোন্ দেশে গেলা এই ঘরে ছিলা রায় ॥ ৩৫০ ॥
এমন সময় তথা দেখা দিল আসি ।
গেরুয়া-বসন এক কপট সন্ন্যাসী ॥ ৩৫১ ॥
মলিন কুঞ্চিত চিত জন-আগমনে ।
নামিতে লাগিলা প্রভু নীচে ক্রমে ক্রমে ॥ ৩৫২ ॥
আটক ভাবের ঘরে হইয়া এখন ।
আপনি আপনে কথা প্রভুদেব কন ॥ ৩৫৩ ॥
ভাবস্থ অবস্থা বাহ্য লক্ষণ তাহার ।
কভু খুলে কভু আঁখি বন্ধ রাখে দ্বার ॥ ৩৫৪ ॥
ভাবের নেশায় চক্ষে ঘোর ঘোর রাখে ।
বাহ্যবস্তু-দর্শনের শক্তি নাহি থাকে ॥ ৩৫৫ ॥
ইন্দ্রিয় প্রত্যঙ্গ অঙ্গ অবশ সকলে ।
ঠিক যেন কাঁচা ঘুমে ভোলা শিশুছেলে ॥ ৩৫৬ ॥
ইহাতেও পূর্ণভাবে বিরাজে চেতন ।
যেখানে যা হয় হয় সব নিরীক্ষণ ॥ ৩৫৭ ॥
মুদিত নয়নে প্রভু পান দেখিবারে ।
গৈরিক-বসন কেবা পশিল মন্দিরে ॥ ৩৫৮ ॥
বাহ্যিক দর্শন নয় কেবল আকার ।
অন্তরের অভ্যন্তরে কিরূপ তাহার ॥ ৩৫৯ ॥
কপটতা-ভানে ভরা হৃদয়ের থলি ।
কিছু নাই সন্ন্যাসী যাহাতে তারে বলি ॥ ৩৬০ ॥
সেইহেতু ভাবাবেশে মুদিতনয়ন ।
উপদেশে সন্ন্যাসীরে কহেন বচন ॥ ৩৬১ ॥
গৈরিকবসনে নহ ব্যবহারযোগ্য ।
কোথা হৃদে পবিত্রতা বিবেক-বৈরাগ্য ॥ ৩৬২ ॥
অযোগ্য অবস্থাপন্নে গৈরিকবসন ।
মঙ্গল কখন নয় ক্ষতি বিলক্ষণ ॥ ৩৬৩ ॥
পরিহরি সন্ন্যাসীরে অখিলের পতি ।
কহিতে লাগিলা ব্রাহ্মভক্তদ্বয় প্রতি ॥ ৩৬৪ ॥
রাখাল প্রভৃতি এই বালকসকল ।
এরা সব নিত্যসিদ্ধ শুদ্ধাত্মার দল ॥ ৩৬৫ ॥
কামিনীকাঞ্চনে নহে কখন আসক্ত ।
চিরকাল জন্ম জন্ম ঈশ্বরের ভক্ত ॥ ৩৬৬ ॥
ভগবানে অনুরাগ ভক্তি বিলক্ষণ ।
প্রকৃত পাতাল-ফোঁড়া শিবের মতন ॥ ৩৬৭ ॥
সাধনা অজিত ভক্তি ইহাদের নয় ।
স্বভাবতঃ প্রেমভক্তি হৃদয়ে উদয় ॥ ৩৬৮ ॥
যারা সব নিত্যসিদ্ধ থাকের ভিতর ।
সাধারণ নয় তারা জাতি স্বতন্তর ॥ ৩৬৯ ॥
উপমায় স্বরূপ-লক্ষণ-পরিচয় ।
পাখীমাত্রে সকলের বাঁকা ঠোঁট নয় ॥ ৩৭০ ॥
ইহারা কখন নয় আসক্ত সংসারে ।
যেমন প্রহলাদ দৈত্যকুলের ভিতরে ॥ ৩৭১ ॥
সাধনভজন করে লোক সাধারণে ।
কখন বা করে ভক্তি হরির চরণে ॥ ৩৭২ ॥
আবার সংসারমধ্যে করিয়া প্রবেশ ।
কামিনীকাঞ্চনে হয় আসক্ত বিশেষ ॥ ৩৭৩ ॥
যেন ভেন্ভেনে মাছি এই আছে ফুলে ।
কখন বা মোদকের মিষ্টান্নের থালে ॥ ৩৭৪ ॥
বিষ্ঠাগন্ধ তখনি যদ্যপি কাছে পায় ।
পরিহরি মধু মিষ্ট বসে গিয়ে তায় ॥ ৩৭৫ ॥
এরা সব নিত্যসিদ্ধ মৌমাছির জাতি ।
ফুলমধু খাইবারে কেবল পিরীতি ॥ ৩৭৬ ॥
হরিরস-সুধাপানে সদা মত্ত থাকে ।
যেখানে বিষয়-গন্ধ না যায় সেদিকে ॥ ৩৭৭ ॥
ধ্যান জপ তপ পূজা সাধন-ভজনে ।
যেই ভক্তি লাভ করে সাধু ভক্তজনে ॥ ৩৭৮ ॥
সেই বিধিবাদীয় ভকতি নাম তার ।
ইহাদের ভক্তি নহে সেরূপ প্রকার ॥ ৩৭৯ ॥
ইহাদের রাগভক্তি প্রেমাভক্তি নাম ।
ভালবাসে পরমেশে স্বজন সমান ॥ ৩৮০ ॥
যাহাদের হেন ভক্তি সতত অন্তরে ।
বিধিতে রহে না তারা যায় বিধি ছেড়ে ॥ ৩৮১ ॥
বেদবিধি ছাড়া প্রেমাভক্তি বলে যায় ।
তাহা না পাইলে কেহ ঈশ্বরে না পায় ॥ ৩৮২ ॥
এই
প্রেমভক্তিযুক্ত নিত্যসিদ্ধগণ ।
প্রভুর সেবায় রত রহে অনুক্ষণ ॥ ৩৮৩ ॥
রাখাল প্রভৃতি কাছে সেবার কারণে ।
সেবাকর্মে সচকিত রহে রেতে দিনে ॥ ৩৮৪ ॥
শিবলিঙ্গ-প্রদক্ষিণে আবেশ-সঞ্চার ।
কিছু পরে অবসান হইলে তাহার ॥ ৩৮৫ ॥
যতনে ভকতবর্গ দেন যোগাইয়া ।
ভোজ্যদ্রব্য কথঞ্চিৎ প্রভুর লাগিয়া ॥ ৩৮৬ ॥
জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাত্র-কোণে ।
বিল্বপত্র তারকনাথের তার সনে ॥ ৩৮৭ ॥
সর্ব-অগ্রে শ্রীপ্রভুর প্রসাদ-গ্রহণ ।
পশ্চাতে বসেন অন্ন করিতে ভোজন ॥ ৩৮৮ ॥
ভোগান্ন-রন্ধন কিসে শুন কথা তার ।
মহাভক্ত বলরাম বসু জমিদার ॥ ৩৮৯ ॥
মাসে মাসে দেন ডালি সব আছে তায় ।
যাহা কিছু প্রয়োজন প্রভুর সেবায় ॥ ৩৯০ ॥
বসুদত্ত ভাণ্ডার থাকিত স্বতন্তর ।
আপনার হাতে নিজে প্রভু গুণধর ॥ ৩৯১ ॥
পরিমিত মত দ্রব্য সাজাইয়া খালে ।
ডাকিয়া পাচকে দেন প্রত্যহ সকালে ॥ ৩৯২ ॥
নিষ্ঠাবান ভক্তিমান পবিত্র-আচার ।
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে পাককর্মে ভার ॥ ৩৯৩ ॥
কভু আজ্ঞা হয় রামে পুরীর ব্রাহ্মণ ।
যার তার হাতে নহে ভোগান্ন-রন্ধন ॥ ৩৯৪ ॥
পবিত্র ব্রাহ্মণ বিনা রন্ধন না হয় ।
অন্ত্যে পরশিলে অন্ন ঘৃণা অতিশয় ॥ ৩৯৫ ॥
ভক্ত যদি অন্য জাতি তথাপি না চলে ।
বিনা যজ্ঞসূত্রধারী ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ৩৯৬ ॥
ভক্তদের মধ্যে মাত্র কায়স্থ-নন্দন ।
নরেন্দ্র ও বাবুরাম এই দুইজন ॥ ৩৯৭ ॥
ছুঁইতে ভোজন থাল ছিলা অধিকারী ।
কারণ ইহার কথা বলিতে না পারি ॥ ৩৯৮ ॥
বার তিথি বার বেলা সকল পালন ।
কথায় কথায় পাঁজি হয় প্রয়োজন ॥ ৩৯৯ ॥
শাস্ত্রের বিরুদ্ধ কর্মে অতিশয় ঘৃণা ।
দিবস-বিশেষে দ্রব্য খাইবারে মানা ॥ ৪০০ ॥
যার তার দত্ত দ্রব্য না হয় গ্রহণ ।
যেখানে সেখানে নহে রাজী নিমন্ত্রণ ॥ ৪০১ ॥
অপকর্মে কলঙ্কিত অঙ্গ যে জনার ।
সেজন ছুঁইলে দ্রব্য গ্রাহ্য নহে আর ॥ ৪০২ ॥
কলুষিত চিত্ত যার কুকর্মের যোগে ।
দেখিলে চিনেন তায় সকলের আগে ॥ ৪০৩ ॥
অন্তর্যামী বিশ্বস্বামী প্রভু সর্বেশ্বর ।
সহস্র দৃষ্টান্ত আছে লীলার ভিতর ॥ ৪০৪ ॥
কার্যাকার্য প্রভুদেব শুভ-অশুভানি ।
ভালমন্দ-বিচারে চতুর-চূড়ামণি ॥ ৪০৫ ॥
অঙ্গ
বৈলক্ষণ্য কিংবা লক্ষ্মীছাড়া রীতি ।
এ দুই লক্ষণ যেথা সেখানে অপ্রীতি ॥ ৪০৬ ॥
ভোজনান্তে শয্যায় আরাম হয় কোথা ।
অগণন জমে লোক শুনিবারে কথা ॥ ৪০৭ ॥
ক্লান্ত নয়
ওষ্ঠদ্বয় নিরন্তর ফুটে ।
যতক্ষণ দিনেশ না বসে গিয়া পাটে ॥ ৪০৮ ॥
অস্তাচলশায়ী যবে
জগৎ-লোচন ।
পুরীতে আরতি-বাদ্য ঘটা বিলক্ষণ ॥ ৪০৯ ॥
দেবদেবী দরশন করিবার তরে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন পুরীর ভিতরে ॥ ৪১০ ॥
ভাবে মত্ত প্রভু-অঙ্গ মনোহর ছবি ।
পূর্ববৎ
প্রদক্ষিণ প্রতি দেবদেবী ॥ ৪১১ ॥
প্রত্যাগত স্বমন্দিরে পুনশ্চ যখন ।
খালি হরি হরি
নাম মুখে উচ্চারণ ॥ ৪১২ ॥
ভাবে গদগদ তনু মত্ততার ভরে ।
করতালি দিয়া নৃত্য
মণ্ডল-আকারে ॥ ৪১৩ ॥
ক্রমে পরে রাতি যবে ঊর্ধ্বে উঠে যায় ।
ভক্তদের সঙ্গে কথা
ফুরাতে না চায় ॥ ৪১৪ ॥
দিনরাত্রি সমভাবে তত্ত্ব-আলাপন ।
বিশ্রাম প্রভুর দেহে জানে
না কখন ॥ ৪১৫ ॥
এই ঈশ তত্ত্বালাপ আচরি আপনে ।
জগতে দিলেন শিক্ষা যত জীবগণে ॥ ৪১৬ ॥
সেই
তত্ত্ব শুন মন পূর্ণ হবে কাম ।
মঙ্গলনিদান রামকৃষ্ণ-লীলা-গান ॥ ৪১৭ ॥
সংসারের সুখে দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
মথ রামকৃষ্ণ-লীলা পাবে পরাপ্রীতি ॥ ৪১৮ ॥
চতুর্থ খণ্ড
শ্যামাপদ ন্যায়বাগীশের দর্প চূর্ণ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
প্রভুর মহিমাকথা অমৃত কথন ।
গাইলে শুনিলে যায় অবিদ্যা-বন্ধন ॥ ১ ॥
উপজে অন্তরে ভক্তি শ্রীপ্রভুর পায় ।
ভবসিন্ধু-পারাপারে গমন হেলায় ॥ ২ ॥
পণ্ডিতের শিরোমণি জনৈক ব্রাহ্মণ ।
অধীত বিবিধ শাস্ত্র ন্যায় ব্যাকরণ ॥ ৩ ॥
ভাগবত গীতাগাথা পুরাণ অবধি ।
শ্যামাপদ নাম ন্যায়বাগীশ উপাধি ॥ ৪ ॥
ন্যায়শাস্ত্র ব্রাহ্মণের বিশেষিয়া জানা ।
বিদ্যামদপরিপূর্ণ হৃদে যোল-আনা ॥ ৫ ॥
বিদ্বৎ-মণ্ডলীমধ্যে সবে জানে তাঁয় ।
বাসস্থান আঁটপুরে হুগলী জেলায় ॥ ৬ ॥
ধনিগণে নানা কর্মে করে নিমন্ত্রণ ।
বিদ্যাবলে করে বহু অর্থ উপার্জন ॥ ৭ ॥
একবার জমিদার জয়কৃষ্ণ নাম ।
গঙ্গাতীরে উত্তরপাড়ায় তাঁর ধাম ॥ ৮ ॥
প্রয়োজনে আনাইল এই দ্বিজবরে ।
যজন-কাজের হেতু আপনার ঘরে ॥ ৯ ॥
একদিন জয়কৃষ্ণ সদরে বৈঠক ।
পড়িছেন উপন্যাস গল্পের পুস্তক ॥ ১০ ॥
হেনকালে দ্বিজবর হাজির তথায় ।
কি বহি করিছ পাঠ জিজ্ঞাসিল তাঁয় ॥ ১১ ॥
জমিদার জয়কৃষ্ণ করিয়া সম্মান ।
বলিলেন গুপ্ত-কথা পুস্তকের নাম ॥ ১২ ॥
হাসিয়া হাসিয়া দ্বিজ বলিলেন তাঁয় ।
দেখ গেল আজীবন আয়ু প্রায় সায় ॥ ১৩ ॥
আর কেন উপন্যাস গল্প কথা ছাড় ।
তত্ত্ব-কথা যাহে আছে হেন কিছু পড় ॥ ১৪ ॥
পড়িয়া
গ্রন্থাদি বহু জয়কৃষ্ণ কয় ।
বুঝিয়াছি কিসেতেও কিছু নাহি হয় ॥ ১৫ ॥
মন্ত্র-পুত বাণ যেন লক্ষ্য ভেদ করে ।
তেমতি পশিল বাক্য দ্বিজের অন্তরে ॥ ১৬ ॥
চমকিত হইয়া ভাবেন মনে মন ।
নিজে বহু করিলাম শাস্ত্র-আলাপন ॥ ১৭ ॥
কি ফল হইল তায় বুঝিতে না পারি ।
শাস্ত্রপাঠ মাত্র কিন্তু বস্তু নাহি হেরি ॥ ১৮ ॥
শাস্ত্রালাপে বস্তু নাই কি করি এখন ।
শক্তি নাই আচরিতে সাধনভজন ॥ ১৯ ॥
উদ্ধার উপায় তবে কিসে অতঃপর ।
বিষম চিন্তায় মগ্ন হৈল দ্বিজবর ॥ ২০ ॥
ভাবিতে ভাবিতে কথা স্মৃতিপথে আসে ।
শাস্ত্রে কয় বস্তু মিলে সাধু-সহবাসে ॥ ২১ ॥
তবে এবে সাধুজন পাই কোন্খানে ।
হেনকালে শ্রীপ্রভুর নাম পড়ে মনে ॥ ২২ ॥
দীনের সম্বল নাম প্রভুর আমার ।
শক্তিহীন গাইবারে নাম-মহিমার ॥ ২৩ ॥
নাম-বলে ধ্রুব মিলে পতিত-পাবনে ।
শত শত সাক্ষী তার ভক্ত-সংজোটনে ॥ ২৪ ॥
তার মধ্যে মুই এক মহাভাগ্যবান ।
দেবেন্দ্রের কাছে প্রাপ্ত রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৫ ॥
নামদাতা যেই জন গুরু বলি তাঁরে ।
পেয়ে নাম পূর্ণকাম হইল অচিরে ॥ ২৬ ॥
দেবেন্দ্র আমার গুরু প্রভু-ভক্ত তিনি ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দু'খানি ॥ ২৭ ॥
প্রভু-ভক্তে গুরুরূপে পায় যেই জন ।
ইষ্টলাভে দেরি তার না হয় কখন ॥ ২৮ ॥
যেই ভক্ত সেই প্রভু সেই তাঁর নাম ।
তিনে এক একে তিন প্রভুর বিধান ॥ ২৯ ॥
শ্রীপ্রভুর নামের তুলনা ধর যদি ।
ঠিক যেন এক টানা বরষার নদী ॥ ৩০ ॥
লয়ে যায় জীব-রূপ তৃণেরে সত্বর ।
মুর্তিমান প্রভু যেখা দয়ার সাগর ॥ ৩১ ॥
নদীতীরে, ভক্তবর্গ সদা ভ্রাম্যমাণ ।
দু'কূলে যা মিলে লয়ে তুফানে ভাসান ॥ ৩২ ॥
এই কর্মে ব্রতী হয়ে প্রভুভক্তগণে ।
ধরাধামে সমাগত শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৩৩ ॥
নাম সার নাম সার সারাৎসার নাম ।
যাহার শরণে মিলে নবঘনশ্যাম ॥ ৩৪ ॥
এই ঠাঁই এক কথা কহা প্রয়োজন ।
কৃষ্ণমন্ত্রে উপদিষ্ট আমি একজন ॥ ৩৫ ॥
ইষ্ট মোর কানু এবে সম্বন্ধেতে ভাই ।
মিষ্ট বড় তাই রামকৃষ্ণ-লীলা গাই ॥ ৩৬ ॥
সঙ্কেতে কহিনু মন কর অবধান ।
রামকৃষ্ণনামে পুরে সর্ব মনস্কাম ॥ ৩৭ ॥
এখানে আদত কথা দ্বিজের ভারতী ।
শান্তির ভাণ্ডার রামকৃষ্ণ-লীলা গীতি ॥ ৩৮ ॥
বহুপূর্বাবধি ছিল দ্বিজের শ্রবণ ।
শ্রীপ্রভু পরমহংস সাধু একজন ॥ ৩৯ ॥
অনেক
মহিমা-খ্যাতি নানা জনে রটে ।
বহুলোক সমাগম প্রভুর নিকটে ॥ ৪০ ॥
নহে অতি দূর পথ
গঙ্গার ওপার ।
কি ক্ষতি দেখিতে কিবা ভিতরে ব্যাপার ॥ ৪১ ॥
এতেক ভাবিয়া দ্বিজবর
ত্বরান্বিত ।
মন্দিরে মধ্যাহ্ন-গতে হৈল উপনীত ॥ ৪২ ॥
তখন প্রভুর কাছে বহু ভক্তগণ ।
পরম আনন্দে করে প্রভু দরশন ॥ ৪৩ ॥
ভক্ত বলিলেই যেন মনে মনে আসে ।
ভক্তগণ দীন হীন দরিদ্রের বেশে ॥ ৪৪ ॥
কটিতে কৌপীন তায় বহির-বসন ।
নেড়া মাখা ছেঁড়া কাঁথা অঙ্গ-আবরণ ॥ ৪৫ ॥
কাঁধে ঝুলি কণ্ঠে মালা তিলক নাসায় ।
গোমুখী দোলায়মান জপমালা তায় ॥ ৪৬ ॥
রঙ্গে ভঙ্গে রাধাকৃষ্ণ হরি হরি বলে ।
ভিক্ষালব্ধ উদরার বাস তরুতলে ॥ ৪৭ ॥
অথবা কুটির মধ্যে নিরজন স্থানে ।
আখড়ায় রহে কিংবা বুলে ধামে ধামে ॥ ৪৮ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তে নাহি সেরূপ ধরন ।
উপরে বাহ্যিকে যেন নৃপতি-নন্দন ॥ ৪৯ ॥
দ্বিতল ত্রিতলে বাস বহু ধন ঘরে ।
দেখিয়া গড়ন কান্তি সুকুমার হারে ॥ ৫০ ॥
সর্বদা সুবেশ সজ্জা জামাজোড়া পরা ।
অশক্ত চলিতে পথে চড়ে গাড়ি-ঘোড়া ॥ ৫১ ॥
সুতীক্ষ্ণ বিচার-বুদ্ধি বিবেক-বিরাগ ।
গাঢ়তর ভক্তি প্রেম ঈশ্বরানুরাগ ॥ ৫২ ॥
ত্যাগ রাগ তিতিক্ষাদি ভিতরে সকল ।
যেমন ফল্গুর ধারা তলে তলে জল ॥ ৫৩ ॥
প্রভুও তেমনি মোর রাজরাজেশ্বর ।
গদি আঁটা তক্তাপোশ মন্দির ভিতর ॥ ৫৪ ॥
আলিস রাখিতে চারি বালিশ তাহায় ।
সুন্দর মশারি তার উর্ধ্বে শোভা পায় ॥ ৫৫ ॥
দুগ্ধফেননিভ শয্যা অতি পরিষ্কার ।
পার্শ্বস্থিত ছোট খাট সদা বসিবার ॥ ৫৬ ॥
দক্ষিণে তাকিয়া পাতা শিয়রে যেখানে ।
লাগালাগি তক্তাপোশ কিঞ্চিৎ পশ্চিমে ॥ ৫৭ ॥
তলেতে পাপোশ পাতা পাপোশ আধার ।
বিরিঞ্চি বাসনা করে এক রেণু যার ॥ ৫৮ ॥
পরিচ্ছন্ন পরিষ্কার দেয়াল চৌধারে ।
চূণকামে পরিপাটি ধপ্ধপ্ করে ॥ ৫৯ ॥
নানা দেবদেবী-মূর্তি সজ্জীভূত তায় ।
দরশনে যার তার প্রাণ গলে যায় ॥ ৬০ ॥
দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে গঙ্গাজল-জ্বালা ।
পাশে পাটাতনে থাকে নানা ফল তোলা ॥ ৬১ ॥
স্বল্পমূল্য জলপাত্র অতি পরিষ্কার ।
পূর্বাঞ্চলে আল্না দুলে বস্ত্র রাখিবার ॥ ৬২ ॥
একধারে মিষ্টি মণ্ডা খাদ্য নানাজাতি ।
শিকায় হাঁড়িতে তোলা থাকে দিবারাতি ॥ ৬৩ ॥
নিতি নিতি ব্যবহারে যাহা প্রয়োজন ।
বিশেষ বিশেষ স্থানে রহে আয়োজন ॥ ৬৪ ॥
দেয়ালের গায়ে ঠাঁই হুঁকা রাখিবার ।
সজ্জীভূত মুখে নল বকুলপাতার ॥ ৬৫ ॥
ধূমপানে প্রিয় প্রভু কখনই নন ।
কভু টানা একবার শিশুর মতন ॥ ৬৬ ॥
নেশামাত্রে প্রভুদেবে বড় অসন্তোষ ।
বলিতেন তামাকেতে নাহি কোন দোষ ॥ ৬৭ ॥
যে যে বস্তু শ্রীপ্রভুর হয় ব্যবহার ।
অল্পমূল্য যাবতীয় কিন্তু পরিষ্কার ॥ ৬৮ ॥
মলিন কি ছিন্ন বস্ত্র তালিমারা তায় ।
দেখিলে অতুষ্ট বড় রামকৃষ্ণরায় ॥ ৬৯ ॥
লক্ষ্মীছাড়া উদরান্নে আতুর যে জন ।
কখন না হয় তার হরিপদে মন ॥ ৭০ ॥
বলিতেন এই কথা প্রভু বারবার ।
ভক্তে আজ্ঞা রাখে ঘরে ভাতের জোগাড় ॥ ৭১ ॥
নুতন যখন যেবা আসে সন্নিধানে ।
প্রভুর প্রথম প্রশ্ন হয় সেই জনে ॥ ৭২ ॥
ঘরে আছে কতগুলি পোষ্য পরিবার ।
জমিজমা বিষয় ব্যবসা কিবা তার ॥ ৭৩ ॥
কিঞ্চিৎ সঞ্চয় বিনা সংসারে সাধন ।
হইবার নহে ইহা না হয় কখন ॥ ৭৪ ॥
এ বিষয়ে শ্রীপ্রভুর সুন্দর তুলনা ।
শব-সাধনার ন্যায় সংসার-সাধন ॥ ৭৫ ॥
বসিয়া শবের বুকে সাধনা যে করে ।
মড়ার মাথার খুলি রাখে চারিধারে ॥ ৭৬ ॥
খুলির আধারে নানা দ্রব্য রহে ভরা ।
চাল ছোলাভাজা কিসে কিসেও বা সুরা ॥ ৭৭ ॥
শবাসনে মন্ত্র-জপ যবে গুরুতর ।
মুখ বেয়ে উঠে মড়া অতি ভয়ঙ্কর ॥ ৭৮ ॥
তখন লইয়া কিছু সাধক মহান্ত ।
মড়ার মুখেতে দিলে তবে হয় শান্ত ॥ ৭৯ ॥
নচেৎ সাধনা-জপ-কর্ম যায় মারা ।
জাপকে গিলিয়া ফেলে সাধনার মড়া ॥ ৮০ ॥
সেইমত সংসারেতে সাধনা যাহার ।
সঙ্গে পুত্র কন্যা দারা পোষ্য পরিবার ॥ ৮১ ॥
শবাকার সমরূপ শবের প্রকৃতি ।
আত্মসুখহেতু মাগে দ্রব্য নানা জাতি ॥ ৮২ ॥
তখনি অমনি শান্ত কিছু পেলে পরে ।
নচেৎ খাইয়া ফেলে মাঁস মজ্জা চিরে ॥ ৮৩ ॥
সেইহেতু শ্রীপ্রভুর আজ্ঞা বারবার ।
ঘরে যেন রহে কিছু সঞ্চয় ভাণ্ডার ॥ ৮৪ ॥
এদিকে শ্রীপ্রভুদেব তিয়াগীর বাড়া ।
সম্বল যোগাড় কিন্তু রহে আগাগোড়া ॥ ৮৫ ॥
পরিধান লালপেড়ে ছোট ছোট ধুতি ।
অল্প-মূল্য বটে কিন্তু পরিষ্কার অতি ॥ ৮৭ ॥
তেমতি পিরান জামা বসন যেমন ।
কখন শ্রীঅঙ্গে রহে বগলে কখন ॥ ৮৮ ॥
ভক্তের পরম ধন চরণযুগল ।
কোমলত্বে তুলনায় হারে শতদল ॥ ৮৯ ॥
নরম বুঝিয়া তাই দেন ভক্তগণে ।
কোমল কার্পেট-জুতা পরিতে চরণে ॥ ৯০ ॥
মূল্যবান বিনামা অথবা পরিধেয় ।
কখনই নহে মোর শ্রীপ্রভুর প্রিয় ॥ ৯১ ॥
তবে কভু ভক্তসাধ পুরাবার তরে ।
শ্রীঅঙ্গে ধরিতে হয় ভক্তে নাহি ছাড়ে ॥ ৯২ ॥
অহংকার অভিমান ভোগের লালসা ।
অথবা কিঞ্চিৎ কোন ইহসুখ-আশা ॥ ৯৩ ॥
তিল অণুকণা কিংবা আভাস তাহার ।
একেবারে নাহি মনে প্রভুর আমার ॥ ৯৪ ॥
অহংকার অভিমান সুখের সূচনা ।
যে কাজে তখনি তাহে প্রভু দেন হানা ॥ ৯৫ ॥
কুসুমের গুচ্ছ কিবা কুসুমের হার ।
যদি কোন ভক্তজনে দেন উপহার ॥ ৯৬ ॥
তখনি শ্রীপ্রভুদেব কহেন তাঁহায় ।
দেবাদির ভোগ্য ইহা কিহেতু আমায় ॥ ৯৭ ॥
ধর্ম ধামিকের চিহ্ন কভু অঙ্গে নাই ।
সরল সহজ অতি জগৎ-গোসাঁই ॥ ৯৮ ॥
নামেতে পরমহংস কহে লোকে জনে ।
দেখাইয়া নাহি দিলে সাধ্য কার চিনে ॥ ৯৯ ॥
তুলনাতে নহে প্রভু কাহারও মতন ।
তেমন শ্রীপ্রভুদেব শ্রীপ্রভু যেমন ॥ ১০০ ॥
শুন এবে মূল কথা হেথা দ্বিজবর ।
জুতাসহ প্রবেশিল মন্দির-ভিতর ॥ ১০১ ॥
অকুতঃসাহস হৃদে বীরের মতন ।
জিজ্ঞাসিল ভক্তগণে প্রভু কোন্ জন ॥ ১০২ ॥
আগন্তুক দ্বিজের দেখিয়া ধারা-রীতি ।
ভক্তগণ জড়বৎ স্তম্ভিত-প্রকৃতি ॥ ১০৩ ॥
বদনে না সরে ভাষ হতবুদ্ধি-প্রায় ।
ঘন ঘন শ্রীপ্রভুর মুখপানে চায় ॥ ১০৪ ॥
গরজিয়া দ্বিজ পুনঃ করিল জিজ্ঞাসা ।
কে বটে পরমহংস দেখিবারে আসা ॥ ১০৫ ॥
শ্রীমুখে সুমন্দ হাসি করি নিরীক্ষণ ।
প্রভুদেবে দেখাইয়া দিলা ভক্তগণ ॥ ১০৬ ॥
সরল সহজ ভাব বালকের প্রায় ।
খট্টায় আসীন এবে রামকৃষ্ণরায় ॥ ১০৭ ॥
শ্রীঅঙ্গে না হেরি কোন সাধুর লক্ষণ ।
জটা-ভস্ম বাঘছাল গৈরিকবসন ॥ ১০৮ ॥
ব্রাহ্মণ সামান্য জ্ঞান করিয়া তাঁহায় ।
একাসনে শ্রীপ্রভুর বসিল খট্টায় ॥ ১০৯ ॥
বিদ্যামদে দৃষ্টিহীন সকৌতুক মনে ।
ইতি উতি মন্দিরের চায় চারিপানে ॥ ১১০ ॥
যেখানে যা কিছু সব করি নিরীক্ষণ ।
পশ্চাতে শ্রীপ্রভুদেবে কহেন তখন ॥ ১১১ ॥
চাহিয়া শ্রীমুখপানে রহস্য-ভাষায় ।
তুমিই পরমহংস চেনা নাহি যায় ॥ ১১২ ॥
বড়ই মজায় ভাই আছ এইখানে ।
জমাট আসর হেন করিলে কেমনে ॥ ১১৩ ॥
আজন্ম ঘাঁটিয়া শাস্ত্র গ্রন্থ অগণন ।
না পারি করিতে পোড়া উদর-পোষণ ॥ ১১৪ ॥
লইয়া পরমহংস নাম মাত্র এক ।
কেমনে করিলে তুমি পসার এতেক ॥ ১১৫ ॥
কহিতে কহিতে হেন চারিপানে চায় ।
নেহারে যাবৎ দ্রব্য যাহা দেখা যায় ॥ ১১৬ ॥
দেখিতে না পায় যাহা নিজে দ্বিজবর ।
রঙ্গহেতু রঙ্গপ্রিয় লীলার ঈশ্বর ॥ ১১৭ ॥
অঙ্গুলিনির্দেশ করি দেন দেখাইয়া ।
প্রফুল্ল মুখারবিন্দে হাসিয়া হাসিয়া ॥ ১১৮ ॥
বসিয়া বসিয়া দেখে যত ভক্তগণ ।
প্রভুর দ্বিজের সঙ্গে রঙ্গ-আচরণ ॥ ১১৯ ॥
পরিশেষে দ্বিজবর দেখি ভক্তগণে ।
নিরখিয়া প্রত্যেকের বদনের পানে ॥ ১২০ ॥
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে উপহাস-ভাষে ।
এতগুলি লোকে তুমি বশ কৈলে কিসে ॥ ১২১ ॥
চেহারা সুবেশে বেশ হয় অনুমান ।
সম্ভ্রান্ত বংশের সব ভদ্রের সন্তান ॥ ১২২ ॥
নিজে হইয়াছ যাহা ক্ষতি নাহি তায় ।
পরের ছাওয়ালে নষ্ট শোভা নাহি পায় ॥ ১২৩ ॥
তবে পরে ভক্তবর্গে করি সম্বোধন ।
বিদ্যামদে পরিপূর্ণ পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ॥ ১২৪ ॥
কহিতে লাগিল ভারি পাণ্ডিত্যাভিমানে ।
শুনহ পরমহংস কহে কোন্ জনে ॥ ১২৫ ॥
এত বলি উচ্চারিয়া শাস্ত্রের বচন ।
বাখানে পরমহংস কি তার লক্ষণ ॥ ১২৬ ॥
পণ্ডিতের চূড়ামণি বিদ্যাবল ঘটে ।
বিশেষ করিল ব্যাখ্যা শাস্ত্রে যাহা রটে ॥ ১২৭ ॥
এইরূপে কিছুকাল রঙ্গ বিলক্ষণ ।
দিবা-অবসান দেখি উঠিল ব্রাহ্মণ ॥ ১২৮ ॥
প্রভুদেব বলিলেন বিনয়-বচনে ।
দিবা প্রায় যায় আজ রহ এইখানে ॥ ১২৯ ॥
সন্নিকটে নহে তবে দূরান্তরে ঘর ।
থাকিলে থাকিতে পারে সহ সমাদর ॥ ১৩০ ॥
বুঝি না বুঝিলা কিবা প্রভুর কথায় ।
থাকিব বলিয়া তবে দ্বিজ দিল সায় ॥ ১৩১ ॥
দিবা প্রায় যায় যায় কিছুক্ষণ পরে ।
সন্ধ্যা হেতু চলে তেঁহ জাহ্নবীর তীরে ॥ ১৩২ ॥
যেখানে বাঁধান ঘাট চাঁদনীর তলে ।
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের দক্ষিণ অঞ্চলে ॥ ১৩৩ ॥
এখানেতে প্রভুদেব ভক্তদের সনে ।
ইঙ্গিতে সঙ্কেতে নানা কথোপকথনে ॥ ১৩৪ ॥
মন্দির হইতে ক্রমে আসিয়া বাহিরে ।
উপনীত পুষ্পোদ্যানে জাহ্নবীর তীরে ॥ ১৩৫ ॥
মরি কি মধুর ছবি মুনিমনোহরা ।
আপনি অখিলপতি নর-সাজ পরা ॥ ১৩৬ ॥
লীলাহেতু ধরাধামে হইয়া আগত ।
সশরীরে মূর্তিমান ভকতে বেষ্টিত ॥ ১৩৭ ॥
মধুর প্রভুর ঠাম নয়ন-লালসা ।
দেখিলে না মিটে কার দেখিবার আশা ॥ ১৩৮ ॥
প্রভুদেবে পেয়ে কাছে জাহ্নবী আপনি ।
আহলাদ-সোহাগভরে হয়ে তরঙ্গিণী ॥ ১৩৯ ॥
উথলিয়া সন্নিকটে ক্রমে ক্রমে আসে ।
চরণ জনম-ঠাঁই আলিঙ্গন-আশে ॥ ১৪০ ॥
পদান্তরাগিণী গঙ্গা সদা বহে ধীর ।
পদদেশ করি ধৌত
আগোটা পুরীর ॥ ১৪১ ॥
দিন-অবসানে হে্থা জগৎ-লোচন ।
ভুবনাদ্যে গমনে নাহিক মোটে মন ॥ ১৪২ ॥
গাছের পাতার আড়ে লুকিয়া লুকিয়া ।
দেখিবারে প্রভুদেবে চায় উঁকি দিয়া ॥ ১৪৩ ॥
ভগবান অবতার হন যেইকালে ।
নানাবেশে নানাভাবে দেবদেবীদলে ॥ ১৪৪ ॥
বৃক্ষ লতা পশু পাখী শরীরধারণে ।
সাধিছে
লীলার কার্য শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ১৪৫ ॥
তরুলতা-বেশে ভক্ত বাগান ভিতরে ।
পাইয়া পরম ধন প্রভুদেবে ঘরে ॥ ১৪৬ ॥
নেহারিতে প্রেমময়ে লীলার কারণ ।
উন্মীলিত কৈল কোটি ফুলের নয়ন ॥ ১৪৭ ॥
সমীর ফুলের দূত নাচিল অমনি ।
নিরখিয়া প্রভুদেবে অখিলের স্বামী ॥ ১৪৮ ॥
সৌরভ-সুগন্ধসহ চৌদিকে জানায় ।
ফুলের উদ্যানে এবে রামকৃষ্ণরায় ॥ ১৪৯ ॥
মহাভক্ত অলিযূথ ভ্রমরী ভ্রমরা ।
সুন্দর সন্দেশ পেয়ে হয়ে মাতোয়ারা ॥ ১৫০ ॥
দ্রুতগতি উপনীত মঙ্গল-উৎসবে ।
তুলিয়া ঝঙ্কার-বাদ্য গুনগুন রবে ॥ ১৫১ ॥
সুবৃহৎ পঞ্চবট সন্নিকটে স্থিতি ।
শাখায় শাখায় যেথা পাখী নানা জাতি ॥ ১৫২ ॥
কলরবে তুলে সব প্রভুর বন্দনা ।
নিরখিয়া প্রেমময়ে সঙ্গে ভক্তজনা ॥ ১৫৩ ॥
উপনীত সন্ধ্যাকালে করিতে আরতি ।
যতনে গগনে উঁকি দেয় নিশাপতি ॥ ১৫৪ ॥
জ্বালিয়া অগণ্য বাতি কিরণ কোমল ।
সঙ্গে লয়ে আপনার তারকার দল ॥ ১৫৫ ॥
দয়াময় প্রভুদেব দয়ার সাগর ।
ভাব রূপ তরঙ্গ তাহাতে নিরন্তর ॥ ১৫৬ ॥
বুঝি না কি ভাবোদয় উদ্যান-মাঝার ।
শ্রীঅঙ্গে কিঞ্চিং যাহে আবেশ-সঞ্চার ॥ ১৫৭ ॥
টল টল তনুখানি প্রবেশি মন্দিরে ।
বসিলেন একবার খাটের উপরে ॥ ১৫৮ ॥
ভক্তদের মধ্যে কেহ মন্দিরে এখানে ।
কেহ বা দণ্ডায়মান বাহির প্রাঙ্গণে ॥ ১৫৯ ॥
অবিলম্বে ভাবাবেশে করি গাত্রোত্থান ।
করতালিসহকারে বেড়িয়া বেড়ান ॥ ১৬০ ॥
যেইখানে শোভযান সুন্দর দেয়ালে ।
নানা দেব-দেবীর মূরতিমালা দুলে ॥ ১৬১ ॥
শুন তবে হেথা কিবা করে দ্বিজবর ।
বসিয়া সন্ধ্যার কর্মে ঘাটের উপর ॥ ১৬২ ॥
প্রথমতঃ বাহ্য কার্য করি সমাপন ।
ইষ্টধ্যানে বসিলেন পণ্ডিতব্রাহ্মণ ॥ ১৬৩ ॥
ধিয়ানে ইষ্টের মূর্তি দেখিতে না পায় ।
হাজির যেখানে প্রভু রামকৃষ্ণরায় ॥ ১৬৪ ॥
বিচার করিয়া মনে বুঝিল তখন ।
পরমহংসের সঙ্গে কথোপকথন ॥ ১৬৫ ॥
বহুক্ষণ দেখা-শুনা সেই সে কারণে ।
কেবল তাঁহার মূর্তি আসিতেছে মনে ॥ ১৬৬ ॥
বিচার যুক্তিতে মূর্তি করিয়া অন্তর ।
পূর্ববৎ ইষ্টধ্যানে বসে দ্বিজবর ॥ ১৬৭ ॥
তথাপি ইষ্টের রূপ চিত্তে নাহি আসে ।
উদয় প্রভুর রূপ হৃদয়-আকাশে ॥ ১৬৮ ॥
আজীবন যেই ইষ্টদেবের মুরতি ।
স্মরণ-মনন-ধ্যান করে নিতি-নিতি ॥ ১৬৯ ॥
অন্তরের পটে আঁকা ছিল মূর্তিমান ।
আজি সে মূরতি দ্বিজ দেখিতে না পান ॥ ১৭০ ॥
সন্দ শঙ্কা বিস্ময় উদয় হৃদে নানা ।
ভাবিয়া না পারে কিছু করিতে ঠিকানা ॥ ১৭১ ॥
সত্যতত্ত্ব বুঝিবারে বসিল ব্রাহ্মণ ।
ধিয়াইতে ইষ্টরূপ মনের মতন ॥ ১৭২ ॥
নয়ন মুদিলে হৃদে ইষ্ট নাহি মিলে ।
কেবল প্রভুর মূর্তি তাহার বদলে ॥ ১৭৩ ॥
ক্রমাগত বার বার দেখিয়া এমন ।
তখন আপনি মনে বুঝিল ব্রাহ্মণ ॥ ১৭৪ ॥
চৈতন্য-উদয় এবে প্রভুর কৃপায় ।
ইষ্ট যিনি তিনি এই রামকৃষ্ণরায় ॥ ১৭৫ ॥
এত বুঝি ধ্যান ত্যজি ধায় দ্রুতবেগে ।
উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি মন্দিরের দিকে ॥ ১৭৬ ॥
বিরাজেন যেইখানে প্রভু গুণমণি ।
ভক্ত-অবতার সাজে অখিলের স্বামী ॥ ১৭৭ ॥
ভক্তগণ যাঁরা সব আছিলা বাহিরে ।
দ্রুতগতি আসে দ্বিজ পান দেখিবারে ॥ ১৭৮ ॥
সবে তাঁরে একদৃষ্টে করে নিরীক্ষণ ।
কোথা যায় কিবা করে বিটল ব্রাহ্মণ ॥ ১৭৯ ॥
বরাবর দ্বিজবর আপনার মনে ।
উপনীত ইইলেন প্রভুর সদনে ॥ ১৮০ ॥
ভক্তগণে সকৌতুক পাছু পাছু ধায় ।
দেখিবারে কিবা কাণ্ড ব্রাহ্মণ ঘটায় ॥ ১৮১ ॥
গম্ভীর নিস্তব্ধভাবে মন্দির ভিতর ।
নিরাসনে ভূমিদেশে বসে দ্বিজবর ॥ ১৮২ ॥
আপনার ভাবে তেঁহ হইয়া মগন ।
হেনকালে দ্রুতগতি তড়িৎ যেমন ॥ ১৮৩ ॥
হুঙ্কার সহিত প্রভু আবেশের ঘোরে ।
থুইলা দক্ষিণ পদ ব্রাহ্মণের শিরে ॥ ১৮৪ ॥
চরণের গুণ কিছু না যায় বর্ণন ।
হৃদয়ে কমলা যাহা করিয়া ধারণ ॥ ১৮৫ ॥
যতনে সেবন-সাধ দিবস-যামিনী ।
পরশনে কাষ্ঠ সোনা শিলা মানবিনী ॥ ১৮৬ ॥
সুরতরঙ্গিণী গঙ্গা উদ্ভব যাহায় ।
তপঃপর মুনি-ঋষি ধিয়ানে না পায় ॥ ১৮৭ ॥
যার তেজে ব্রজ-রজে এতেক মহিমা ।
পুরাণ মাহাত্ম্য নারে করিবারে সীমা ॥ ১৮৮ ॥
ভাগ্যবলে দ্বিজ আজি পাইয়া চরণ ।
সমাদরে শিরোদেশে স্থাপন এখন ॥ ১৮৯ ॥
দু'হাতে ধারণ করি গায় স্তব-স্তুতি ।
কণ্ঠে যেন মূর্তিমতী নিজে সরস্বতী ॥ ১৯০ ॥
দেহি মে চৈতন্য ভক্তি বার বার বলে ।
ভাসিয়া ভাসিয়া দুটি নয়নের জলে ॥ ১৯১ ॥
বিদ্যামদখর্বকারী নিরক্ষরবেশ ।
বালকসুলভভাব প্রভু পরমেশ ॥ ১৯২ ॥
তত্ত্ব-উপদেশে যাঁর হারে বেদ চারি ।
শাস্ত্র জ্ঞানাতীত সৃষ্টিস্থিতিলয়কারী ॥ ১৯৩ ॥
কৃপা করি দ্বিজবরে অর্পিয়া চরণ ।
কিবা দেখাইলা প্রভু শিক্ষার কারণ ॥ ১৯৪ ॥
বুঝিয়া আপন মনে করহ ধারণা ।
হীনবুদ্ধি করে যেবা বিদ্যার গরিমা ॥ ১৯৫ ॥
নিরক্ষর-সাজে এবে প্রভু অবতারে ।
এক হেতু বিদ্যামদ বিনাশন তরে ॥ ১৯৬ ॥
মাথায় ধরিয়া বিদ্যা অবিদ্যার গাদ ।
মাগ মন একমাত্র প্রভুর প্রসাদ ॥ ১৯৭ ॥
পরম যতন ধন শান্তির ভাণ্ডার ।
প্রভু-পদে মতি মিলে প্রভাবে যাহার ॥ ১৯৮ ॥
প্রত্যক্ষ ঘটনা দেখ চরণের গুণ ।
কিবা ছিল কি হইল পণ্ডিত বামুন ॥ ১৯৯ ॥
নিমিষে আলোকময় অন্তর-আগার ।
বিজ্ঞামদতমাচ্ছন্নে যে ছিল আঁধার ॥ ২০০ ॥
চরণ-পরশ পেয়ে চরণ মরম ।
কাকুতি-মিনতি-সহ অভয় চরণ ॥ ২০১ ॥
ধারণ করিয়া দ্বিজ করেন প্রার্থনা ।
কার্কশ্য প্রয়োগ-হেতু প্রভুর মার্জনা ॥ ২০২ ॥
অতঃপর ভক্তবর্গে করি সম্বোধন ।
বিনয়-সম্ভাষে কহে পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ॥ ২০৩ ॥
অবতারে ভগবান মানব-মূরতি ।
বিদ্যামদে অন্ধ নাই চক্ষে আঁখিভাতি ॥ ২০৪ ॥
অবজ্ঞা সহিত তাই কৈনু উপহাস ।
তিলমাত্র তাহাতে আমার নাহি ত্রাস ॥ ২০৫ ॥
হেতু তার ভবভারহারী যেইজন ।
পতিত-তারণ-কর্মে যাঁর আগমন ॥ ২০৬ ॥
জীবহিতব্রত যাঁর কায়বাক্যমনে ।
জীবে দিবে পরাগতি সাধন-বিহীনে ॥ ২০৭ ॥
তাঁহাতে না হয় কভু সম্ভব এমন ।
পামরের অপরাধ করিতে গ্রহণ ॥ ২০৮ ॥
কিন্তু আমি ভারি ডরি তোমা সবাকারে ।
অপ্রিয় প্রয়োগ-হেতু বিদ্যামদভরে ॥ ২০৯ ॥
দয়ালপ্রকৃতি ভক্ত শাস্ত্রের বর্ণনা ।
ব্রাহ্মণের অপরাধ করহ মার্জনা ॥ ২১০ ॥
পরে আর এক কথা কহেন ব্রাহ্মণ ।
এমন প্রভুর মত মহাত্মা যখন ॥ ২১১ ॥
জনম গ্রহণ করি আসেন ধরায় ।
সুদুর্লভ যেই মুক্তি ছড়াছড়ি যায় ॥ ২১২ ॥
খুঁজিতে না হয় মোটে মিলে অবহেলে ।
জলের ফোঁটার মত বরিষার কালে ॥ ২১৩ ॥
পাইয়া নূতন আঁখি তম-সন্দ দূর ।
ব্রাহ্মণ এখন দেখে মাহাত্ম্য প্রভুর ॥ ২১৩ ॥
এতই আনন্দরাশি উদয় অন্তরে ।
আধার ছাড়িয়া কত উথলিয়া পড়ে ॥ ২১৪ ॥
আশাতীত জ্ঞানাতীত বাসনা-পুরণ ।
অতি খুশী গোটা নিশি করিল যাপন ॥ ২১৫ ॥
পরদিনে প্রভুপদে মাগিয়া বিদায় ।
জনম সার্থক করি নিকেতনে যায় ॥ ২১৬ ॥
যে মানসে যেবা আশে আসে যেই জন ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভুর সদন ॥ ২১৭ ॥
শতাধিক গুণে পূর্ণ বাসনা তাহার ।
প্রভু-দরশন-ফল নহে বলিবার ॥ ২১৮ ॥
তার শতাধিক ফল মিলে জীবগণে ।
লীলাগীতি-আন্দোলন-শ্রবণ পঠনে ॥ ২১৯ ॥
সংসারের সুখে দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
এস মন মথি রামকৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ২২০ ॥
চতুর্থ খণ্ড
জনৈক ব্রাহ্মণকে অভয়দান, গিরিশের বকল্মাগ্রহণ ও বিবিধ উপদেশ-প্রদান
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভাবের ঘরেতে চুরি না করি যে জন ।
হোক হীন হোক দীন হোক অভাজন ॥ ১ ॥
হোক পাপী হোক তাপী হোক কদাচার ।
চরণে শরণ মাগে প্রভুর আমার ॥ ২ ॥
উদ্ধার তখনি তার তিল নহে দেরি ।
দীন-সখা রামকৃষ্ণ করুণ কাণ্ডারী ॥ ৩ ॥
তরিবারে পাপাতুরে হেন আর নাই ।
যেন প্রভু রামকৃষ্ণ দয়াল গোসাঁই ॥ ৪ ॥
পরিচয় শুন লীলা ভারতী মধুর ।
শ্রবণ-কীর্তনে ধ্রুব পাপ তাপ দূর ॥ ৫ ॥
দিনেকে কাঙ্গালনাথ ভকতে বেষ্টিত ।
শ্রীমন্দিরে দক্ষিণশহরে বিরাজিত ॥ ৬ ॥
হেনকালে শিশু-সঙ্গে বৃদ্ধ একজন ।
উদাসীন প্রাণ-মন জাতিতে ব্রাহ্মণ ॥ ৭ ॥
চলিতে অশক্ত পদ গতি ধীরে ধীরে ।
আসিয়া দিলেন দেখা মন্দির দুয়ারে ॥ ৮ ॥
ক্ষীণ মৃদু মন্দ স্বরে কহেন বচন ।
বাসনা পরমহংসদেবে দরশন ॥ ৯ ॥
দেখামাত্র দ্বিজোত্তমে হয় অনুমান ।
সমিভ্যারে শিশু তাঁর যষ্টির সমান ॥ ১০ ॥
বল সত্ত্বে বলহীন দূরবল গায় ।
মলিন বদনখানি চিন্তার জ্বালায় ॥ ১১ ॥
ভীষণ তপন-তাপে কথা উপমার ।
মূলে নাই বারিবিন্দু রসের সঞ্চার ॥ ১২ ॥
জীবন-শিকড় ধানগাছ যে রকম ।
পেটে খোড় প্রসবিতে না হয় সক্ষম ॥ ১৩ ॥
সেইমত চিন্তাতাপে ব্রাহ্মণের দশা ।
জীবের জীবনীশক্তি সাহস-ভরসা ॥ ১৪ ॥
মলিন লাবণ্যহীন প্রায় যায় যায় ।
চরণ না চলে কথা মুখে না বেরায় ॥ ১৫ ॥
কি হেতু দারুণ চিন্তা ব্রাহ্মণের মনে ।
প্রভুর সন্ধান আজি হয় কি কারণে ॥ ১৬ ॥
প্রভুর অপার লীলা যাই বলিহারি ।
শুনিলে অকূলে মিলে করুণ কাণ্ডারী ॥ ১৭ ॥
একদিনা দ্বিজোত্তম আপন ভবনে ।
বসিয়া আছেন একা নিরজন স্থানে ॥ ১৮ ॥
এমন সময় মনে অকস্মাৎ হয় ।
জনম যেখানে সেথা মরণ নিশ্চয় ॥ ১৯ ॥
শমনের অধিকার মরণের পরে ।
ভালমন্দ হয় গতি কর্ম অনুসারে ॥ ২০ ॥
তবে কিবা করিয়াছি লইয়া জনম ।
এত ভাবি দ্বিজবর আগোটা জীবন ॥ ২১ ॥
সঙ্গে লয়ে চিরসখা স্মৃতি আপনার ।
যত পড়ে তত হয় শবের আকার ॥ ২২ ॥
সুকৃতির নামগন্ধ লেখা নাহি তায় ।
শমন শাসনে যাহে পরিত্রাণ পায় ॥ ২৩ ॥
শিরে হাত ব্রাহ্মণের নিরখিয়া পট ।
বিষম করাল কাল শিয়রে নিকট ॥ ২৪ ॥
আয়ু প্রায় অবসান চাকি ডুবুডুবু ।
সাধনার নাহি কাল কলেবর কাবু ॥ ২৫ ॥
করি কি কোথায় যাই কি হবে উপায় ।
প্রাণেসারা বুদ্ধিহারা দারুণ চিন্তায় ॥ ২৬ ॥
যাহার যেখানে ব্যথা হাত সেথা তার ।
দিবারাতি এই চিন্তা মনে অনিবার ॥ ২৭ ॥
অকূলে আকুল প্রাণ সকলেরে পুছে ।
উপায় বিধান কিবা যাই কার কাছে ॥ ২৮ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু জীবহিতব্রতী ।
নিবারিতে একমাত্র জীবের দুর্গতি ॥ ২৯ ॥
নরদেহে মূর্তিমান মঙ্গলসাধনে ।
নানাভাবে নানারূপে যেখানে সেখানে ॥ ৩০ ॥
প্রভু অবতীর্ণ-কালে ত্রাণের উপায় ।
হেথা সেথা হাটেবাটে ছড়াছড়ি যায় ॥ ৩১ ॥
ব্রাহ্মণে জনৈক কেহ কহে এক দিনে ।
উপায় ইহার আছে প্রভুর সদনে ॥ ৩২ ॥
সেই হেতু দ্বিজ আজি প্রভুর গোচরে ।
অকূল সংসার-সিন্ধু তরিবার তরে ॥ ৩৩ ॥
কাতরে মাগিছে ভিক্ষা আকুল জীবন ।
কালভয়নিবারী প্রভুর দরশন ॥ ৩৪ ॥
কোথা তিনি আসিয়াছি তাঁরে দেখিবারে ।
বলিতে বলিতে দ্বিজ পশিল দুয়ারে ॥ ৩৫ ॥
অশক্ত প্রাচীন তাহে বিনীত প্রকৃতি ।
দীনতমাধিক স্বর চিত্তাকৃষ্ট অতি ॥ ৩৬ ॥
দয়ার্হ দেখিয়া ভক্তে দিলা দেখাইয়া ।
খাটের উপর প্রভু যেখানে বসিয়া ॥ ৩৭ ॥
ভক্তিভরে প্রভুবরে করিয়া প্রণাম ।
দাঁড়াইলা করজোড়ে মলিন বয়ান ॥ ৩৮ ॥
স্বভাব দেখিয়া তার দয়াল ঠাকুর ।
ভক্তে আজ্ঞা দিতে তাঁরে বসিতে মাদুর ॥ ৩৯ ॥
অন্তরনিবাসী প্রভু পরম-ঈশ্বর ।
পাতি পাতি করি পাঠ দ্বিজের অন্তর ॥ ৪০ ॥
বুঝিলেন ভব-ভয়ে ভয়ার্ত ব্রাহ্মণ ।
পরিত্রাণ-হেতু মাগে চরণে শরণ ॥ ৪১ ॥
করুণা-সাগর প্রভু জীবহিতব্রত ।
তাপীর সন্তাপ-দুঃখে হয়ে দ্রবীভূত ॥ ৪২ ॥
আপনে আপনা মগ্ন হইয়া এখন ।
কহিতে লাগিলা বহু আশ্বাস-বচন ॥ ৪৩ ॥
মহামন্ত্রাধিক মোর শ্রীপ্রভুর বাণী ।
ঠিক যেন মৃতদেহে প্রাণ-সঞ্চারিণী ॥ ৪৪ ॥
অবসন্ন কলেবর দ্বিজের এখন ।
শ্রীবাক্যের বলে উঠে জাগিয়া জীবন ॥ ৪৫ ॥
পরে সন্দ-বিনাশনে করজোড়ে বলে ।
আপনার ইতিহাস কৌশলে কৌশলে ॥ ৪৬ ॥
কেমন কৌশলে কহে শুন বিবরণ ।
অকূলেতে পায় কূল যে করে শ্রবণ ॥ ৪৭ ॥
ব্রাহ্মণ করিল প্রশ্ন প্রভুর গোচর ।
কি আছে প্রভেদ এই দুয়ের ভিতর ॥ ৪৮ ॥
এক জন পুণ্যবান পুণ্য কর্ম করে ।
তপজপপরায়ণ সাত্ত্বিক আচারে ॥ ৪৯ ॥
কর্মে
মাত্র অনুরাগ কর্ম সযতনে ।
কিন্তু কোথা ভগবান মোটে নাই মনে ॥ ৫০ ॥
হরির অভাবে নাহি অন্তরে ভাবনা ।
এক কর্ম সার বস্তু এই তার জানা ॥ ৫১ ॥
আর এক জন হেথা বহু পরিবারী ।
সংসার নির্বাহ করে ফেরেববাজ ভারি ॥ ৫২ ॥
যে কোন উপায়ে তেঁহ টাকাকড়ি আনে ।
ভাল-মন্দ দিগাদিক্ কিছুই না মানে ॥ ৫৩ ॥
কিন্তু পুড়ে মনাগুনে দিবাবিভাবরী ।
স্মরিয়া শ্রীহরি কোথা ত্রাণের কাণ্ডারী ॥ ৫৪ ॥
হরির কারণে তার যাতনা বিষম ।
সংগোপন স্থানে করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৫৫ ॥
এমন সময় কন প্রভু অন্তর্যামী ।
যে কাঁদে হরির তরে সেই জন তুমি ॥ ৫৬ ॥
এত শুনি উচ্চধ্বনি তুলিয়া ব্রাহ্মণ ।
করজোড় করি করে বিষম রোদন ॥ ৫৭ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে কহে কি হবে উপায় ।
আশ্বাস-বচনে তারে কন প্রভুরায় ॥ ৫৮ ॥
শুন শুন দ্বিজোত্তম সম্বর রোদন ।
পরম দয়াল সেই বিভু সনাতন ॥ ৫৯ ॥
যাপিয়া জীবন গোটা অবিদ্যা-সেবনে ।
ত্রাণের উপায়-হেতু যদি কোন জনে ॥ ৬০ ॥
পলক মুহূর্তকাল মরণের আগে ।
কাতর অন্তরে তাঁরে ত্রাণ-ভিক্ষা মাগে ॥ ৬১ ॥
তখনি আশ্রয় দিয়া করুণ কাণ্ডার ।
পদতরিযুগে করে ভবসিন্ধু পার ॥ ৬২ ॥
শ্রীবাক্য ভরসাভরা এমন প্রকার ।
শুনিলে হতাশে হয় আশার সঞ্চার ॥ ৬৩ ॥
তমোময় অন্তঃপুর প্রভায় উজ্জ্বল ।
পাষাণে প্রক্ষেপ যদি তাহে ঝরে জল ॥ ৬৪ ॥
চির শুল্ক কাঠে ফল পল্লব মুকুল ।
মনোহর পুষ্পগুচ্ছ সৌরভ অতুল ॥ ৬৫ ॥
পরম সুন্দর ফল মিষ্ট রসে ভরা ।
আস্বাদনে মনপ্রাণ করে মাতোয়ারা ॥ ৬৬ ॥
জলন্ত দৃষ্টান্ত তার এই দ্বিজবর ।
শুনিয়া প্রভুর বাক্য উল্লাস-অন্তর ॥ ৬৭ ॥
বিষাদিত বয়ানে উজ্জ্বল কান্তিভার ।
অবসন্ন কলেবরে আশার সঞ্চার ॥ ৬৮ ॥
ব্রাহ্মণে অভয় দিয়া প্রভু দয়াময় ।
বলিলেন ভবপারে না করিবে ভয় ॥ ৬৯ ॥
গিয়াছে জীবন যদি অবিদ্যা-সেবনে ।
তথাপীহ তিল চিন্তা ভাবিও না মনে ॥ ৭০ ॥
আঁধার কুটীর হৃদি দেখিয়া উজ্জ্বল ।
আনন্দে ব্রাহ্মণ ফেলে দুনয়নে জল ॥ ৭১ ॥
বারে বারে পদরেণু লইয়া প্রভুর ।
ভবনে গমন কৈল ব্রাহ্মণঠাকুর ॥ ৭২ ॥
অনাথের নাথ যেন প্রভু গুণমণি ।
কোথাও না দেখি হেন কোথাও না শুনি ॥ ৭৩ ॥
ভক্তসনে করি খেলা লীলার প্রাঙ্গণে ।
যে আশা ভরসা প্রভু দিলা জীবগণে ॥ ৭৪ ॥
একমনে শুন মন অপূর্ব ভারতী ।
শ্রবণ পঠনে লীলা মিলে পরাগতি ॥ ৭৫ ॥
দিনেকে গিরিশচন্দ্র ঘোষ ভক্তবর ।
হাটে বাটে জানা নাম বাঙ্গালা-ভিতর ॥ ৭৬ ॥
নেশায়
উন্মত্ত প্রায় মদিরিকা-পানে ।
উপনীত শ্রীমন্দিরে প্রভুর সদনে ॥ ৭৭ ॥
ভক্ত ভগবানে খেলা নহে বলিবার ।
দোঁহে দোঁহা নিরখিয়া উল্লাস অপার ॥ ৭৮ ॥
উপদেশ-ছলে প্রভু ভক্তোত্তমে কন ।
দিনে তিনবার মোরে করিও স্মরণ ॥ ৭৯ ॥
কথার উত্তর নাহি দিয়া ভক্তবর ।
আপনে আপনে কহে মনের ভিতর ॥ ৮০ ॥
নানা কর্মে থাকি পান-প্রিয় জন ।
স্মরণ করিতে যদি না হয় স্মরণ ॥ ৮১ ॥
তখন অন্তরযামী বুঝিয়া অন্তর ।
পুনরায় করিলেন তাঁহারে উত্তর ॥ ৮২ ॥
তিন বার স্মরণে যদ্যপি হয় ভার ।
ডাকিও দিনের মধ্যে তবে একবার ॥ ৮৩ ॥
তাহাতেও মনে মনে কহে ভক্তোত্তম ।
বারেক স্মরণে দেখি আমারে অক্ষম ॥ ৮৪ ॥
তবে প্রভু পরিশেষে কহিলেন তাঁরে ।
নিশ্চিন্ত থাকহ দিয়া ব-কলম মোরে ॥ ৮৫ ॥
পরম বিশ্বাসী ভক্ত অতুল ভুবনে ।
সব কৈলা সমর্পণ প্রভুর চরণে ॥ ৮৬ ॥
ভাল-মন্দ পাপ-পুণ্য কর্মাকর্ম যত ।
সকলে জামিন প্রভু জনমের যত ॥ ৮৭ ॥
গিরিশের কর্মে দিলা গিরিশেরে ছাড় ।
অথচ বাসনা পূর্ণ সর্বভাবে তাঁর ॥ ৮৮ ॥
গিরিশের চরিত্র সম্বন্ধে হৈলে কথা ।
বলিতেন প্রভুদেব বিধির বিধাতা ॥ ৮৯ ॥
সে লইবে দেবকন্যা নাগকন্যা সনে ।
পরম পুরুষ বিভু সীতাপতি রামে ॥ ৯০ ॥
যে যে কাজে অপরের পাপের আশ্রয় ।
সে কাজে ঘোষের কোন দোষ নাহি হয় ॥ ৯১ ॥
শুনিতে বড়ই সোজা সরল আরাম ।
চতুঃ-অক্ষরী এই ব-কলম নাম ॥ ৯২ ॥
বিধির বিধান নাই বিধিছাড়া কথা ।
উর্ধ্বে তে ইহার মূল নীচে কাণ্ড পাতা ॥ ৯৩ ॥
বিধানে দণ্ডক গুরু গ্রাহক শিষ্যেরা ।
হেথা ব-কলমে তার বিপরীত ধারা ॥ ৯৪ ॥
শিষ্যেতে গুরুর কর্ম শুরুতে শিষ্যের ।
সরলে সরলে বুঝে অসরলে ফের ॥ ৯৫ ॥
শ্রীগুরুর চেয়ে হেথা গুরুর কৃপায় ।
ধারণ করেন শিল্প বেশী বল গায় ॥ ৯৬ ॥
অপার সাগর লক্ষে পার হনুমান ।
শ্রীরামের হেতু সেতু হৈল বিনির্মাণ ॥ ৯৭ ॥
সাধারণ গুরুশিয্যে এ প্রকার নয় ।
লীলায় ইহার মাত্র মিলে পরিচয় ॥ ৯৮ ॥
ভক্তাধীন ভগবান প্রত্যক্ষ প্রমাণ ।
লীলায় করেন তিনি ভক্তে দিয়া মান ॥ ৯৯ ॥
নামান্তরে ব-কলম আত্মসমর্পণ ।
আমিত্ব রাহিত্যে হয় বিমুক্ত বন্ধন ॥ ১০০ ॥
সুখে দুঃখে অবিচল ঘুচে ভব-রোগ ।
শ্রীগুরু-চরণে সদা প্রেমেতে সংযোগ ॥ ১০১ ॥
শুভাশুভ ভালমন্দ কর্মফল ভারে ।
মুক্ত হয় প্রভুদেবে নির্ভর যে করে ॥ ১০২ ॥
যে পথে গমন করে সেই পথ তাঁর ।
মুখের লাগাম ধরা শ্রীকরে যাঁহার ॥ ১০৩ ॥
সবার আশ্রয়-দাতা প্রভু মহারাজ ।
চরণে শরাণাপন্নে না হন নারাজ ॥ ১০৪ ॥
প্রভুর দুয়ার খোলা মানা নাই কারে ।
প্রবেশিতে চায় যেবা সরল অন্তরে ॥ ১০৫ ॥
কপট-অন্তরযুক্ত হয় যেই জন ।
প্রভুর কখন নহে তারে আকর্ষণ ॥ ১০৬ ॥
চুম্বক টানিতে যেন পারে না লোহায় ।
থরে থরে কাদামাখা থাকে যদি তায় ॥ ১০৭ ॥
এই মলিনতা ধৌত করিবার তরে ।
জীবের মগন বিধি সাধন-সাগরে ॥ ১০৮ ॥
দয়াল শ্রীপ্রভু বিধি করিলা সরল ।
অনুতাপে এক বিন্দু নয়নের জল ॥ ১০৯ ॥
তাও দিয়া জীবগণে যাইতে না চায় ।
কল্পতরু শ্রীপ্রভুর চরণ ছায়ায় ॥ ১১০ ॥
পরম শীতল
যেথা তাপিত জীবন ।
সাধন ভজনশ্রম নহে প্রয়োজন ॥ ১১১ ॥
পাখার ব্যজন যেন নহে দরকার ।
স্বভাবতঃ যেইখানে সমীর-সঞ্চার ॥ ১১২ ॥
আর এক কথা হেথা বলি শুন মন ।
কল্পতরুতলে সত্য গেল বহুজন ॥ ১১৩ ॥
সেই সে শীতলতম করুণার বায় ।
সম ভাবে সঞ্চালন সকলের গায় ॥ ১১৪ ॥
ইচ্ছায় তাঁহার কিন্তু ফলিল দু ফল ।
বলিহারি কি চাতুরী পরম কৌশল ॥ ১১৫ ॥
কেহ বা পাইল মুক্তি দেহান্তে মোচন ।
কেহ বা পাইল গোপী-গোপ্য ভক্তিধন ॥ ১১৬ ॥
মলয় পবন যেন অরণ্য-মাঝারে ।
সমভাবে বহে সব বৃক্ষের উপরে ॥ ১১৭ ॥
কিন্তু সকলেতে নাহি জনমে কখন ।
কমলাপতির সেব্য সুরভি চন্দন ॥ ১১৮ ॥
শরীর থাকিতে মুক্তি জীবে নাহি পায় ।
কারণ মোহিত জীব সতত মায়ায় ॥ ১১৯ ॥
জ্ঞানভক্তিযুক্তে মায়া তফাতে তফাতে ।
কাঁঠালের আঠা যেন তেলমাখা হাতে ॥ ১২০ ॥
হরিদ্রা-মাখান অঙ্গে যে জনার রয় ।
তাহার না রহে যেন কুম্ভীরের ভয় ॥ ১২১ ॥
সেইমত জ্ঞান-ভক্তি যেখানে সহায় ।
থাকিলেও মায়া আর মোহে না তাহায় ॥ ১২২ ॥
মায়া নাহি রহে দেহ যতক্ষণ ।
জ্ঞানভক্তিমানে মায়া মায়ের মতন ॥ ১২৩ ॥
লালন-পালন করে সর্বথা প্রকারে ।
জ্ঞানভক্তিহীন জনে প্রাণে কিন্তু মারে ॥ ১২৪ ॥
প্রভুর বচনে মায়া বিড়ালের জাতি ।
বদন-বিবরে ধরে দশনের পাতি ॥ ১২৫ ॥
শাবকে মুষিকে সেই এক দন্তে ধরে ।
কোথাও লালন-কর্ম কোথাও সংহারে ॥ ১২৬ ॥
মাতা-বিমাতার রীতি মায়ার ভিতর ।
তাঁর অধিকারে এই বিশ্বচরাচর ॥ ১২৭ ॥
গিয়ান-ভক্তির রাজ্যে যতেক রিপুরা ।
রহে দেহে কিন্তু যেন জীবন্তেতে মরা ॥ ১২৮ ॥
সতত অশক্ত দ্বেষ হিংসা করিবার ।
উপমায় সুবর্ণের যেন তরবার ॥ ১২৯ ॥
আকৃতি আকারে তরবারের সমান ।
কাটা নাহি যায় খালি তরবার নাম ॥ ১৩০ ॥
যখন আছিল লোহা কাটা যেত তায় ।
এখন সে সোনা জ্ঞান-ভক্তির প্রভায় ॥ ১৩১ ॥
পরশমণির ধর্ম জ্ঞানভক্তি ধরে ।
লৌহময় পরশিয়া স্বর্ণময় করে ॥ ১৩২ ॥
জ্ঞানভক্তি প্রাপ্তে যেবা প্রকৃত প্রবীণ ।
ভালমন্দ হুয়ে তেহ সম্বন্ধবিহীন ॥ ১৩৩ ॥
কেমন সম্বন্ধহীন তাহার উপমা ।
পবনে ধরিলে পরে ঠিক যায় জানা ॥ ১৩৪ ॥
সুগন্ধ দুর্গন্ধ দুই বহয়ে বাতাসে ।
কিন্তু সে কাহারও সঙ্গে কখন না মিশে ॥ ১৩৫ ॥
জ্ঞানভক্তি-সম বস্তু কিছু নাহি আর ।
যার বলে জীবে পায় মায়ায় নিস্তার ॥ ১৩৬ ॥
ভবসিন্ধুপার এই নিস্তারের নাম ।
নাহি ডুবে জীব হোক যতই তুফান ॥ ১৩৭ ॥
জ্ঞানভক্তি দুই চাই কর্মের সাধনে ।
একে নহে কর্মসিদ্ধ অন্যের বিহনে ॥ ১৩৮ ॥
ঠিক যেন এক জানা সহায়ের ভরে ।
বিমানেতে বিহঙ্গম উড়িতে না পারে ॥ ১৩৯ ॥
জ্ঞানভক্তি এক খালি কাজে স্বতন্তর ।
যেইখানে থাকে রহে দুয়ে একত্তর ॥ ১৪০ ॥
জ্ঞানভক্তিসহ যদি দেহের নিধন ।
পুনরায় নাহি হয় তাহার জনম ॥ ১৪১ ॥
কিন্তু যদি মরে জীব জ্ঞানভক্তিহীনে ।
গোটা কল্প যায় তার জনমে মরণে ॥ ১৪২ ॥
উপমায় কাঁচা হাঁড়ি দেহ যেন তার ।
ভাঙ্গিলে পুনশ্চ তাহে বানায় কুমার ॥ ১৪৩ ॥
জ্ঞানভক্তিযুক্ত দেহ পোড়া-হাঁড়ি-প্রায় ।
ভাঙ্গিলে গড়ন নাহি চলে পুনরায় ॥ ১৪৪ ॥
জন্মাঙ্কুর-শক্তিনাশ পায় ভক্তি-জ্ঞানে ।
পুঁতিলে না হয় গাছ সিদ্ধ-করা ধানে ॥ ১৪৫ ॥
ভীষণ সংসারাসক্তি মৃত্যুর আকর ।
নষ্ট করে জ্ঞানভক্তি এত শক্তিধর ॥ ১৪৬ ॥
চাল-ধুয়ানির মত গাঁজার নেশায় ।
পড়িলে কিঞ্চিৎ পেটে নেশা নাশ পায় ॥ ১৪৭ ॥
তখন পাইয়া পথ চক্ষু আপনার ।
দেখিতে চিনিতে পারে মায়ার বাজার ॥ ১৪৮ ॥
ঈশ্বরের শক্তি মায়া অতি অলৌকিক ।
একবার যেবা তারে চিনে ঠিক ঠিক ॥ ১৪৯ ॥
প্রসন্না হইয়া তায় ছেড়ে যান চলে ।
শান্তিপুরে যাইবার পথ দিয়া খুলে ॥ ১৫০ ॥
শান্তির মা বাপ এই ভকতি গিয়ান ।
অবহেলা মিলে নিলে রামকৃষ্ণনাম ॥ ১৫১ ॥
মায়ামুগ্ধ বন্ধজীব সংসারীয়গণে ।
দয়াল শ্রীপ্রভুদেব নিজ শ্রীবচনে ॥ ১৫২ ॥
দিলা যাহা উপদেশ মন্ত্রগীতাবলী ।
জ্ঞানভক্তি পাবি মন শুন তোরে বলি ॥ ১৫৩ ॥
এখন কালের ভাব সংসারীর দল ।
কামিনীকাঞ্চন লয়ে প্রমত্ত কেবল ॥ ১৫৪ ॥
আপাদমস্তকে খালি বন্ধনের ডুরি ।
অবিদ্যা-প্রবল কালে বিদ্যাচর্চা ভারি ॥ ১৫৫ ॥
জড়বিজ্ঞানের চর্চা প্রবল এখন ।
বাখানে স্বভাব এই সৃষ্টির কারণ ॥ ১৫৬ ॥
ঈশ্বর কথার কথা কে দেখেছে তাঁয় ।
বিভুর স্বজন সত্তা হাসিয়া উড়ায় ॥ ১৫৭ ॥
হেন জনে উপদেশে প্রভুর বচন ।
হে জীব আকাশে আছে তারকার গণ ॥ ১৫৮ ॥
সূর্যের আলোকে দিনে ঢাকা থাকে তারা ।
তাই কি বলিবে নাই গগনেতে তারা ॥ ১৫৯ ॥
সময়ে অবশ্য তারা হইবে প্রকাশ ।
দেখিতে পাইবে কর কথায় বিশ্বাস ॥ ১৬০ ॥
যে যে সব সংসারীরা সত্তা তাঁর
মানে ।
কিন্তু খাঁটি যোল আনা মনে মনে জানে ॥ ১৬১ ॥
ঈশ্বর আছেন সত্য সৃষ্টির বিধাতা ।
দরশন মিলে তাঁর এ কথার কথা ॥ ১৬২ ॥
সর্বত্রে সমানভাবে যদি নারায়ণ ।
কেননা দেখিতে পাই কি তার কারণ ॥ ১৬৩ ॥
হেন স্কুলে প্রভুদেব দিলা দেখাইয়া ।
পুকুরের জল যেথা পানায় ঢাকিয়া ॥ ১৬৪ ॥
পাড়ে হাঁড়াইয়া জল নাহি যায় দেখা ।
পানায় পুকুরখানি সর্ব অংশে ঢাকা ॥ ১৬৫ ॥
সরাইয়া দিলে পানা বাহিরায় জল ।
এখানে ঈশ্বর ঢাকা মায়ায় কেবল ॥ ১৬৬ ॥
দূরীভূত কর মায়া অবিদ্যাবরণ ।
অবশ্যই ঈশ্বরের পাবে দরশন ॥ ১৬৭ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্তি ছলনা মায়ার ।
বাসনা পুরিবে কর তারে পরিহার ॥ ১৬৮ ॥
অবিদ্যার আধিপত্য রাজ্য ভয়ঙ্কর ।
তুমুল তুফান তথা অতিবড় ঝড় ॥ ১৬৬ ॥
সংকল্প-বিকল্প এই ঝড়ের আকার ।
উড়াইয়া লয়ে চলে জীবে অনিবার ॥ ১৬৭ ॥
ঈশ্বর বিরাজমান সবার ভিতর ।
দেখিতে না দেয় এই বাসনার ঝড় ॥ ১৬৮ ॥
সরসীর স্বচ্ছ জলে যেমন পবন ।
বহিয়া যদ্যপি তুলে তরঙ্গ ভীষণ ॥ ১৬৯ ॥
প্রতিভাত কভু নহে তাহার ভিতর ।
জগৎ-লোচন রবি আলোর আকর ॥ ১৭০ ॥
সরোবর-সম এই হৃদয়-নিলয় ।
সতত বাসনারাজি যদি তাহে বয় ॥ ১৭১ ॥
ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব নাহি উঠে তায় ।
এক কণা রূপে যাঁর সৃষ্টি ডুবে যায় ॥ ১৭২ ॥
ব্যাধিবিনাশনে বিধি ঔষধ-সেবন ।
ভবব্যাধি মহৌষধি সাধন-ভজন ॥ ১৭৩ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্তি অবিদ্যা-ছলনা ।
পৈত্তিক বাতিক রূপ ঐহিক কামনা ॥ ১৭৪ ॥
সব হত দূরীভূত ঈশ্বরের নামে ।
অকপটে করে যদি কোণে বনে মনে ॥ ১৭৫ ॥
করতালি দিলে যেন গাছের তলায় ।
উপবিষ্ট শাখিচূড় পাখী উড়ে যায় ॥ ১৭৬ ॥
সেইমত হরিনাম তালিসহকারে ।
করিলে পালায় মায়া দেহবৃক্ষ ছেড়ে ॥ ১৭৭ ॥
কামিনী-কাঞ্চন বিনা চলে না সংসার ।
উপদেশ নহে দুয়ে কর পরিহার ॥ ১৭৮ ॥
সহায়-স্বরূপ রাখ অতি সাবধান ।
অন্তরে তাহারা যেন নাহি পায় স্থান ॥ ১৭৯ ॥
ভাসমান সদা তরী জলের উপরে ।
তাহাতে তরীর কোন ক্ষতি নাহি করে ॥ ১৮০ ॥
কিন্তু যদি তরণীর মধ্যে ঢুকে জল ।
বুঝিবে তরীর তবে বিপদ প্রবল ॥ ১৮১ ॥
সাধন-ভজন-কর্মে জীবে লাগে ভয় ।
সংসারে সময় নাই এই কথা কয় ॥ ১৮২ ॥
তে সবারে প্রভুদেব দিলা দেখাইয়ে ।
কোলে ছেলে চিড়ে কুটে ছুতারের মেয়ে ॥ ১৮৩ ॥
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদিতে রত সংসারের কাজে ।
মন রবে ঈশ্বরের চরণ-সরোজে ॥ ১৮৪ ॥
নবনী দুধের সার সর্ব অগ্রে তুলে ।
যদ্যপীহ রাখে তায় ভাসাইয়া জলে ॥ ১৮৫ ॥
নষ্ট নাহি হয় ননী জলের সহিত ।
উঠে ডুবে খেলে তাতে না হয় মিশ্রিত ॥ ১৮৬ ॥
সেইমত শরীরের সার অংশ মন ।
সাধনভজন-বলে করিল মন্থন ॥ ১৮৭ ॥
রাখিলে তাহায় এই সংসারের জলে ।
হারাইয়া বর্ণ গুণ মিশে না সলিলে ॥ ১৮৮ ॥
অভ্যাস কেবলমাত্র সাধনভজন ।
অবিদ্যায় নহে রবে গুরুপদে মন ॥ ১৮৯ ॥
সাধনভজন ঠিক চাষের সমান ।
যেখানে আবাদ তার হৃদি-ক্ষেত নাম ॥ ১৯০ ॥
আসক্তির বীজ বহু প্রচ্ছন্নাবস্থায় ।
নানাভাবে নানারূপে পোতা আছে তায় ॥ ১৯১ ॥
জানা নাহি যায় কিছু শৈশবের কালে ।
বয়সের সঙ্গে বীজ উঠে মুখ তুলে ॥ ১৯২ ॥
যৌবন প্রারম্ভে হয় অঙ্কুর-উদগম ।
আসক্তির রসে তাহে পরে হয় বন ॥ ১৯৩ ॥
তখন কাটিয়া বন ক্ষেতের উদ্ধারে ।
মানুষের দুরসাধ্য করিতে না পারে ॥ ১৯৪ ॥
সাধন-ভজনে ধরে আবাদের রীত ।
অঙ্কুর-উদ্গমে চারা উঠান উচিত ॥ ১৯৫ ॥
পশ্চাতে যেমন ক্ষেতে জনমে না বন ।
তাই শ্রেয়ঃ বাল্যাবধি সাধনভজন ॥ ১৯৬ ॥
সুন্দর নবনী উঠে তুলিলে সকালে ।
বেলায় তেমন নাহি হয় কোন কালে ॥ ১৯৭ ॥
তাই শ্রেয়ঃ বাল্যকালে সাধনভজন ।
বিষয়ে যখন নাহি মজিয়াছে মন ॥ ১৯৮ ॥
সহজে নোয়ান যায় কচি কচি বাঁশ ।
পাকিয়া উঠিলে পরে অনর্থ প্রয়াস ॥ ১৯৯ ॥
তেমতি শৈশবে মন হয়ে অনায়াসে ।
অকর্মণ্য একেবারে অধিক বয়সে ॥ ২০০ ॥
বিষয়ের রসে মগ্ন সে সময়ে মন ।
তাই শ্রেয়ঃ বাল্যকালে সাধন-ভজন ॥ ২০১ ॥
স্বচ্ছ নিরমল জল যখন আধারে ।
যে বর্ণে ছোবাও তায় সেই বর্ণ ধরে ॥ ২০২ ॥
এক বর্ণ একবার করিলে ধারণ ।
ধরিতে অপর বর্ণ না হয় সক্ষম ॥ ২০৩ ॥
সেইমত বাল্যে যবে নিরমল মন ।
সহজে গ্রহণ করে ধর্মের বরন ॥ ২০৪ ॥
বিষয়ীর মন যেন পাষাণ কি ইট ।
কিংবা যেন অবিকল কুম্ভীরের পিঠ ॥ ২০৫ ॥
অস্ত্রাঘাত তদুপরি বৃথা অকারণে ।
ধর্মকথা বিষয়ীর নাহি পশে প্রাণে ॥ ২০৬ ॥
সংসারে বিষয় আছে কথা সত্য স্থির ।
বিষয়েতে নাহি দোষ দোষ আসক্তির ॥ ২০৭ ॥
সংসার-ভিতরে বাস বিষয় ছাড়িয়া ।
কেমনে থাকিবে জীব তাহার লাগিয়া ॥ ২০৮ ॥
উপমায় দিলা প্রভু জগত-গোস্বামী ।
ধনাঢ্য লোকের ঘরে যেন চাকরানী ॥ ২০৯ ॥
ধনাঢ্যের
সঙ্গে বাস দ্বিতলে-ত্রিতলে ।
মায়ের মতন পালে মনিবের ছেলে ॥ ২১০ ॥
টাকাকড়ি থাকে হাতে দিবসের ব্যয় ।
কর্তব্য কর্মেতে রহে প্রীতি অতিশয় ॥ ২১১ ॥
মনে মনে জানে কিন্তু ছেলে টাকাকড়ি ।
প্রাসাদের সমতুল্য বালাখানা বাড়ি ॥ ২১২ ॥
তার নয় মনিবের তিনি অধীশ্বর ।
সে কেবল দাসীমাত্র আজ্ঞার চাকর ॥ ২১৩ ॥
সংসারী দাসীর মত থাকিবে সংসারে ।
অভিমান অহঙ্কার পরিহরি দূরে ॥ ২১৪ ॥
সংসারে নির্লিপ্তভাবে দৃষ্টান্ত অপর ।
পেঁকালের বাস যেন পাঁকের ভিতর ॥ ২১৫ ॥
আবিল পঙ্কিলে রহে সেই পাঁক খায় ।
পাঁকে উঠুডুবু কিন্তু নাহি লাগে গায় ॥ ২১৫ ॥
পানকৌড়ী পাখী আর কথা উপমার ।
ডুবে ডুবে ধরে মাছ উপজীবিকার ॥ ২১৬ ॥
ভাসে খেলে জলমধ্যে মনে যেন শখ ।
কিন্তু কভু নাহি ভিজে গায়ের পালক ॥ ২১৭ ॥
তেমনি সংসারী যত রবে সাবধানে ।
বিষয়-আসক্তি যেন নাহি ঢুকে প্রাণে ॥ ২১৮ ॥
সংসারে নির্লিপ্তভাবে থাকা মহাদায় ।
তাহাতে উপায় কিবা দিলা প্রভুরায় ॥ ২১৯ ॥
মহামন্ত্র-রূপ উক্তি শক্তি হেন ধরে ।
শুনিলে আসক্তি-বিষ একেবারে উড়ে ॥ ২২০ ॥
মানুষের দুটি হাত দুই ঠাঁই রবে ।
হরির চরণ একে আঁটিয়া ধরিবে ॥ ২২১ ॥
সংসারের কর্ম যত করহ অপরে ।
যার জোর বেশী সেই টেনে লবে পরে ॥ ২২২ ॥
ঈশ্বরে ধরিয়া যেবা সংসারেতে রয় ।
কখন না থাকে তার পতনের ভয় ॥ ২২৩ ॥
অবলম্ব করি খুঁটি বালকে যেমন ।
আনিমানি খেলে কিন্তু পড়ে না কখন ॥ ২২৪ ॥
বড়ই সুন্দর স্থান সংসার-আশ্রম ।
কামিনী কাঞ্চনে যদি নাহি মজে মন ॥ ২২৫ ॥
সংসার কিল্লার মত নিরাপদ ঠাই ।
সাধনভজন কর্মে কোন বিঘ্ন নাই ॥ ২২৬ ॥
দেহরক্ষা-হেতু ঘরে রহে অন্ন-পানি ।
নাহি দোষ ছুইবারে নিজের রমণী ॥ ২২৭ ॥
পোষ্যগণে ধনে সেবা করে বিলক্ষণ ।
শরীরে যখন কোন রোগের জনম ॥ ২২৮ ॥
রমণীর কাছে ঋণ রহে ততকাল ।
যতদিন নাহি হয় যুগল ছাওয়াল ॥ ২২৯ ॥
সাবালক বালক যখন ক্রমে ক্রমে ।
পিতা আর নহে ঋণী ভরণপোষণে ॥ ২৩০ ॥
আদার ধরিতে পাখী হইলে সক্ষম ।
ধারী নাহি করে আর লালন-পালন ॥ ২৩১ ॥
বরঞ্চ তাড়না করে চঞ্চুর দ্বারায় ।
শাবক যদ্যপি আসে আদার-আশায় ॥ ২৩২ ॥
সংসারীতে ঈশ্বরের অপার করুণা ।
যত করে অপরাধ ততই মার্জনা ॥ ২৩৩ ॥
এক তিল সংসারীর সাধনভজন ।
তালবৎ ফল তাহে দেন নারায়ণ ॥ ২৩৪ ॥
সাধনা-সম্বন্ধে এই প্রভুর বচন ।
কলিতে কেবল এক নামের সাধন ॥ ২৩৫ ॥
স্মরণ-মনন তাঁর লীলা-গুণ গীতি ।
নারদীয়া-ভক্তিযোগ কালের পদ্ধতি ॥ ২৩৬ ॥
সাধনাতে সদগুরু প্রয়োজন ভারি ।
যে চায় জুটায়ে তায় নিজে দেন হরি ॥ ২৩৭ ॥
বিনা তর্কে
বাক্য-ব্যয়ে গুরু যেন কন ।
তেমতি তাঁহার আজ্ঞা করিবে পালন ॥ ২৩৮ ॥
কর্মে চাই
অনুরাগ ব্যাকুলিত প্রাণ ।
রোদন-সম্বলে মাত্র মিলে ভগবান ॥ ২৩৯ ॥
উপযুক্ত তিন স্থান
সাধন ভজনে ।
মানুষের অগোচরে কোণে বনে মনে ॥ ২৪০ ॥
গোপনে সাধন কেন শুন বিবরণ ।
চারাগাছ বেড়া বিনা না হয় কখন ॥ ২৪১ ॥
বেড়াহীন চারাগাছে বিস্তর বিপদ ।
মহিষ ছাগল গরু জন্তু চতুষ্পদ ॥ ২৪২ ॥
স্বভাবতঃ কচি পাতা খাইবার আশ ।
চিবিয়া চারায় করে একেবারে নাশ ॥ ২৪৩ ॥
বেড়ার সহায়ে চারা বৃহৎ যখন ।
সবল যতেক কাণ্ড শাখা অগণন ॥ ২৪৪ ॥
তরুরূপে পরিণত অতি পরিসর ।
ছায়াতলে এক বিঘা জমির উপর ॥ ২৪৫ ॥
তখন তাহার আর থাকে না জঞ্জাল ।
পশুগণ নাহি পায় পাতার নাগাল ॥ ২৪৬ ॥
এখানে অভক্ত যত বন্ধ-জীব যারা ।
আকারে কেবলমাত্র মানুষ চেহারা ॥ ২৪৭ ॥
কিন্তু তাহাদের হেন স্বভাব ধরন ।
অতি হীন অতি হেয় পশুর মতন ॥ ২৪৮ ॥
দ্বেষ-হিংসা পরবশ অতি ভয়ঙ্কর ।
বাল্য সাধকের পক্ষে মহাহানিকর ॥ ২৪৯ ॥
সাধক সতেজ-কায় নহে যতক্ষণ ।
তদবধি সংগোপনে কর্ম-প্রয়োজন ॥ ২৫০ ॥
প্রবল বিশ্বাস-ভক্তি হইলে অন্তরে ।
পাষণ্ডী পশুতে নষ্ট করিতে না পারে ॥ ২৫১ ॥
চুম্বকের গুণ নষ্ট যেন নাহি হয় ।
জলের ভিতর যদি কাদামাখা রয় ॥ ২৫২ ॥
কিংবা যেন পরশনে পরশমণির ।
পাইয়া আপনে লৌহ সোনার শরীর ॥ ২৫৩ ॥
জলে কি কাদায় রহে হাজার বচ্ছর ।
তথাপি না হয় আর তার গুণান্তর ॥ ২৫৪ ॥
ভক্তিমান লোক যদি সংসারের পাঁকে ।
যেই ভক্ত সেই ভক্ত চিরকাল থাকে ॥ ২৫৪ ॥
সাধুসঙ্গ সংসারীর অতি প্রয়োজন ।
আসক্তির রস যাহে হয় বিনাশন ॥ ২৫৫ ॥
ভিজাকাষ্ঠা যেইরূপ উনানের গায় ।
উত্তাপেতে রস শুষ্ক ক্রমে ক্রমে পায় ॥ ২৫৬ ॥
বিষয়ের রসে আর্দ্র মনে হেন গুণ ।
তাহাতে না ধরে অনুরাগের আগুন ॥ ২৫৬ ॥
অনুরাগী ভক্তে বিধি সাধু-সম্মিলন ।
রাখিবারে দীপ্ততর রাগ-হুতাশন ॥ ২৫৭ ॥
ঝিকিনা কাঠিতে যেন ঝাড়িলে উনান ।
আগুন উজ্জ্বল ভাবে হয় দীপ্তিমান ॥ ২৫৮ ॥
বিষয়ীর সহবাসে রাগ নাশ পায় ।
কোটি কোটি দণ্ডবৎ বিষয়ীর পায় ॥ ২৫৯ ॥
সত্যকথা সবার ভিতরে ভগবান ।
তথাপি মনুষ্য নহে সকলে সমান ॥ ২৬০ ॥
ভাল মন্দ শ্রেয়ঃ হেয় তারতম্য আছে ।
কাহারে আদর কারে দূরে ফেল বেছে ॥ ২৬১ ॥
যেমন জলের মধ্যে বিবিধ প্রকার ।
পাপে মুক্ত বিন্দুমাত্র পরশে কাহার ॥ ২৬২ ॥
কাহাতে কেবলমাত্র একমাত্র স্নান ।
শরীরে উদয় রোগ করে যদি পান ॥ ২৬৩ ॥
কোন জলে স্নান পান দুই কর্ম চলে ।
কেহ হেয় স্নান বিধি তাহারে ছুইলে ॥ ২৬৪ ॥
সংসারে প্রবেশ পূর্বে উচিত সবার ।
সুবিদিত হইবারে কেমন সংসার ॥ ২৬৫ ॥
না জানিয়া আগম যদ্যপি কোন জন ।
সংসারের চাকচিক্য করি দরশন ॥ ২৬৬ ॥
মুগ্ধমনে জ্ঞানহীনে প্রবেশে সংসার ।
দুর্গতির পরিসীমা নাহি রহে তার ॥ ২৬৭ ॥
বাহিরে আসিতে আর না হয় সক্ষম ।
ঘুনিতে পুঁঠির ঠিক দুর্দশা যেমন ॥ ২৬৮ ॥
আসক্তির আধিপত্য প্রবল সংসারে ।
জ্ঞানবলযুক্ত জনে পরাজিতে নারে ॥ ২৬৯ ॥
কাঁঠালের আঠা নাহি লাগে কোনমতে ।
যদি কেহ ভাঙ্গে তায় তেলমাথা হাতে ॥ ২৭০ ॥
রাজধানী অবিদ্যার সংসার-ভিতর ।
কামিনী-কাঞ্চন দুটি কুহকিনী চর ॥ ২৭১ ॥
বিদেশী পথিকে যদি করে দরশন ।
থাকিবার নাহি যার নিজের আশ্রম ॥ ২৭২ ॥
মোহন করিয়া তায় রত্ন-ধন তার ।
লুটিয়া পশ্চাতে করে প্রাণেতে সংহার ॥ ২৭৩ ॥
আপনার ধন-রত্ন নিরাপদ স্থানে ।
নির্বিঘ্নে রক্ষার স্থান করিয়া প্রথমে ॥ ২৭৪ ॥
আশ্রমে করিয়া দূর পথের যাতনা ।
দেখিবারে সংসার-শহর যেই জনা ॥ ২৭৫ ॥
সতত সতর্কভাবে বেড়িয়া বেড়ায় ।
অধিকারে তারে নাহি পায় অবিদ্যায় ॥ ২৭৬ ॥
লুকোচুরি ছেলেদের খেলা যে রকম ।
তাহাদের মধ্যে বুড়ী হয় এক জন ॥ ২৭৭ ॥
বুড়ীকে দু'ইয়া যে যে খেলুড়েরা রয় ।
তাহারা কখন আর চোর নাহি হয় ॥ ২৭৮ ॥
সেইমত কালী-বুড়ী করি পরশন ।
সংসারেতে নিবসতি করে যেই জন ॥ ২৭৯ ॥
ক্ষমবান সারবান চতুরাতিশয় ।
চোর হইবার তার আশঙ্কা না রয় ॥ ২৮০ ॥
বিহনে করমকাণ্ড সাধনভজন ।
কখনও নাহি মিলে বিভু নারায়ণ ॥ ২৮১ ॥
যেমন না হয় কার নেশা কোনকালে ।
যদ্যপি সে মুখে খালি সিদ্ধি সিদ্ধি বলে ॥ ২৮২ ॥
বাঁটিয়া গুলিয়া সিদ্ধি করিলে ভক্ষণ ।
তখন সিদ্ধির নেশা হয় বিলক্ষণ ॥ ২৮৩ ॥
সত্বরে ঈশ্বর-লাভ যদি নাহি হয় ।
সন্দেহে সাধন-কর্ম্ম ত্যাগযোগ্য নয় ॥ ২৮৪ ॥
এক ডুবে না মিলিলে মানিক-রতন ।
রত্নাকরে নাই রত্ন শিশুর বচন ॥ ২৮৫ ॥
অনুরাগে কর তুমি কর্ম আপনার ।
কৃপায় দিবেন তিনি বলের যোগাড় ॥ ২৮৬ ॥
উপমায় গাভী-বৎস বাছুর যেমন ।
প্রসূত হইবামাত্র দাঁড়াতে অক্ষম ॥ ২৮৭ ॥
উঠে পড়ে বার বার চেষ্টা নাহি ছাড়ে ।
সেইমত কর জীব সাধনা সংসারে ॥ ২৮৮ ॥
খানদানী চাষা যারা উদ্যম-তৎপর ।
উঠাউঠি অনাবৃষ্টি দ্বাদশ বৎসর ॥ ২৮৯ ॥
একমুঠা নাহি ধান পেটে উপবাসী ।
তথাপি চালায় চাষ চিরকেলে চাষী ॥ ২৯০ ॥
চাষখেতে দিতে জল চাষীরা যেমন ।
সর্বদা সতর্কে নালা করে নিরীক্ষণ ॥ ২৯১ ॥
নালায় পড়িলে ঘোগ নষ্ট সব জ্বল ।
যতেক উদ্যম শ্রম সকল বিফল ॥ ২৯২ ॥
নবীন সাধক তেন খুব সাবধান ।
আসক্তি অন্তরে যেন নাহি পায় স্থান ॥ ২৯৩ ॥
যদ্যপি মাখান থাকে স্বচ্ছ কাচে পারা ।
প্রতিবিম্ব পড়ে তবে বস্তুর চেহারা ॥ ২৯৪ ॥
সেইমত বীর্যবান ব্যক্তি যেই জন ।
সহিষ্ণুতা-সহ শুক্র করেন ধারণ ॥ ২৯৫ ॥
প্রতিমূর্তি ঈশ্বরের তবে চিত্তে তার ।
নচেৎ দর্শন-লাভ নহে হইবার ॥ ২৯৬ ॥
চাষের যেমন রীতি কালে কালে চাষ ।
তেমতি রমণী সঙ্গে নহে বার মাস ॥ ২৯৭ ॥
কাঞ্চনে কাঞ্চন-জ্ঞান জ্ঞান বিষময় ।
কাঞ্চন কেবল ভাত-ডালের সঞ্চয় ॥ ২৯৮ ॥
জগতে যাবৎ ধর্ম সকলে সমান ।
সকলের মধ্যে সেই এক ভগবান ॥ ২৯৯ ॥
ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নাম বিভিন্ন কেবল ।
বারি পানি ওয়াটার সেই এক জল ॥ ৩০০ ॥
যত মত পথমাত্র প্রশস্ত সকলে ।
অনুরাগসহ হৃদি সরলে সরলে ॥ ৩০১ ॥
রুচিমত পথ নাম করিয়া আশ্রয় ।
গমন করিলে তাঁরে মিলিবে নিশ্চয় ॥ ৩০২ ॥
কল্পনাতে নহে মিলে প্রত্যক্ষ দর্শন ।
তোমায়
আমায় যেন কথোপকথন ॥ ৩০৩ ॥
যে রূপে যে ভাবে তাঁরে যেইমত চায় ।
সেই রূপে সেই ভাবে
ভগবানে পায় ॥ ৩০৪ ॥
সাধন-ভজনে যেবা নহে ক্ষমবান ।
তাঁর পক্ষে বিধি দিলা প্রভু ভগবান ॥ ৩০৫ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু দয়ার সাগর ।
সবিশ্বাসে করিবারে তাঁহায় নির্ভর ॥ ৩০৬ ॥
বিনা চাষে যোল-আনা মিলিবে ফসল ।
প্রভু রামকৃষ্ণে করে যে জন সম্বল ॥ ৩০৭ ॥
ভজ পুজ
রামকৃষ্ণ কর তাঁরে সার ।
ছুটিবে অজ্ঞানতমঃ লোচন-আঁধার ॥ ৩০৮ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি শ্রবণ-মঙ্গল ।
স-মনে শুনিলে মিলে ভক্তি নিরমল ॥ ৩০৯ ॥
সংসারের সুখে দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
সযতনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩১০ ॥
চতুর্থ খণ্ড
প্রভুর সহিত কালীচন্দ্র, মণি গুপ্ত ও পূর্ণচন্দ্রের মিলন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা গীত,
সুমধুর সুললিত,
কথঞ্চিৎ না যায় বর্ণনে ।
অক্ষরে অক্ষরে তার, করে সুধা অনিবার,
অমরত্ব এক বিন্দু পানে ॥ ১ ॥
ঐহিকের সুখ-আশা, বাতিক বাসনা তৃষা,
কপটতা চোরা সান্নিপাত
।
অবিদ্যা-অম্বলে প্রীতি, মনের কুটিল গতি,
ক্ষণে ক্ষণে ক্ষীণ যাহে ধাত ॥ ২ ॥
আক্ষেপ রিপুর যোগ, বৃদ্ধি যাহে ভবরোগ,
মুষ্টিযোগ না জানে নিদান ।
বিনাশনে মহাব্যাধি, কেবল ঔষধ বিধি,
শ্রবণ-কীর্তন লীলা-গান ॥ ৩ ॥
পাইলে ব্যাধিতে মুক্তি, তবে দরশন-শক্তি,
দূরবর্তী লীলার দুয়ার ।
রত্নমণি পড়ে পথে, ছুটে ভাতি চারিভিতে,
বিনাশিয়া তমস আঁধার ॥ ৪ ॥
জিনি দেব-দেহধারী, দয়াল ভকত দ্বারী,
ঘন ঘন পথপানে চায় ।
লীলাপুরী-দরশনে, আসে কে কাতরপ্রাণে,
সকরুণে সম্ভাষিতে তায় ॥ ৫ ॥
আকর্ষণে সে দৃষ্টির, যাত্রী হয় যেন বীর,
তিলে চলে বৎসরের পথ ।
সাক্ষাতে পরশে পরে, প্রবেশিতে পায় পুরে,
যেইখানে পূর্ণ মনোরথ ॥ ৬ ॥
মনপ্রাণ-তৃপ্তিকরী, কি সুন্দর কি মাধুরী,
লীলাপুরী প্রভুর আমার ।
দেখিতে যাহার মন, করে যেন আকিঞ্চন,
ভক্ত-পদ-রজ লভিবার ॥ ৭ ॥
প্রভুভক্ত কিবা জাতি, বলিয়া না হয় ইতি,
দেবাদির আরাধ্যের ধন ।
সংজোটন পুরিবারে, উপনীত এইবারে,
বাদ বাকি ভক্ত তিন জন ॥ ৮ ॥
প্রথম বণিক-সুত,
বহুবিধ-গুণযুত,
স্বভাবতঃ বৈরাগ্য প্রবল ।
বিদ্যার্জনে পাঠ-প্রিয়, কুমার বালকবয়ঃ,
শিশুসম অন্তর সরল ॥ ৯ ॥
নবীনে প্রবীণ বুদ্ধি, জন্মাবধি চিত্ত-শুদ্ধি,
সাংসারিক ভাব নাই মনে ।
ঋষি-বালকের ধারা, যেন দু'দিনের পারা,
বাস করে সংসার-আশ্রমে ॥ ১০ ॥
কালীচন্দ্র তাঁর নাম, পিতা-মাতা বর্তমান,
জন্মস্থান আহিরিটোলায় ।
সময় আগত দেখি, বিদ্যার বাঁকা-আঁখি,
প্রভুদেব আকর্ষিলা তাঁয় ॥ ১১ ॥
এবা কিবা আকর্ষণ, বলিবার নহে মন,
প্রণিধান কর নিজ মনে ।
দেখ কেবা পায় টের, বারিরাশি সাগরের,
শূন্যে চলে বিমানে বিমানে ॥ ১২ ॥
আকর্ষিত যেই জনা, তাহারও নাহিক জানা,
অন্যে কে জানিবে সমাচার ।
কারণ ক্ষণিক চলে,
বিচার-বুদ্ধির বলে,
তারপরে অবোধ্য ব্যাপার ॥ ১৩ ॥
কারণের নাই ইতি,
কারণান্বেষণে গতি,
মূঢ়মতি করে যেইজন ।
তাহার না মিটে আশা, পরে ঘটে সেই দশা,
মাস্তুলের পাখীর যেমন ॥ ১৪ ॥
শ্রেয়ঃ প্রথমেতে বলা, ঈশ্বরের লীলা খেলা,
বল-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়াগোচর ।
কার্য করি দরশন,
বলিতে হইবে মন,
কার্যমূলে পরম-ঈশ্বর ॥ ১৫ ॥
ঈশ্বরের আকর্ষণ, যেথা সেথা নহে মন,
আকর্ষণ খালি ভক্তগণে ।
কি কব তাহার হেতু, লক্ষ বুড়ি গণ্ডাধাতু,
চুম্বক লোহাকে মাত্র টানে ॥ ১৬ ॥
যেবা শ্রীপ্রভুর জন, চির-বাঁধা তার মন,
স্বভাবতঃ প্রভুর চরণে ।
এমন প্রকৃতি ধরে, বারেক দেখিলে পরে,
চিনিবারে পারে ভগবানে ॥ ১৭ ॥
কিম্বা করি দরশন, অহেতুক
মুগ্ধ মন,
কারণান্বেষণ নাহি করে ।
জ্ঞান তার দিবানিশি, আত্মীয় হইতে বেশী,
চেনা-জানা জন্মজন্মান্তরে ॥ ১৮ ॥
দেব কি দেবতা তিনি, কিংবা অখিলের স্বামী,
নাহি করি এ হেন বিচার ।
সন্দহীনে নির্বিবাদে, বিকি যান নিরাপদে,
নিজ সাধে শ্রীপদে তাঁহার ॥ ১৯ ॥
মহাত্যাগী ভক্তবর,
কালীচন্দ্র গুণধর,
সম্মিলন শ্রীপ্রভুর সনে ।
পিতামাতা ঘরবাড়ি, ইহ-সুখ
পরিহরি,
মজিলেন প্রভুর চরণে ॥ ২০ ॥
অন্য এক সুকুমার, মণি গুপ্ত
নাম তাঁর,
মনোহর সুন্দর চেহারা ।
গোউর বরনখানি,
প্রছন্ন কুসুম জিনি,
ফুল্ল মুখে কান্তি ছটা ভরা ॥ ২১ ॥
সরল বালক-বেশ, চিকণ
চিকণ কেশ,
লম্বমান বালার মতন ।
নানাভাবে এঁকেবেঁকে, কুলে শিরে চারিদিকে,
বদনের শোভাসম্পাদন ॥ ২২ ॥
সুকোমল তনুগানি, পরাজয় মনে মানি,
বালকেতে বালিকার রীত ।
দেখে মনে হয় হেন, গোকুল-গোপিনী যেন,
শিশুবেশে প্রভুর সহিত ॥ ২৩ ॥
প্রভুভক্তে চেনা দায়, কিবা বেশে কে কোথায়,
পরিচয় স্বভাবে প্রবল ।
কে কি আগে কিবা হেথা, নিগূঢ়-বারতা-গাথা,
প্রভুবর বিদিত কেবল ॥ ২৪ ॥
অবতারে অবতারে, রূপান্তর বারে বারে,
ভাবান্তর না হয় কখন ।
সহজে বুঝিবে পরে, শুন মন ধীরে ধীরে,
ভক্তি-কাণ্ড ভক্ত-সংজোটন ॥ ২৫ ॥
সকলের শেষে যাঁর, লীলাসরে আগুসার,
কথা তাঁর অপূর্ব-ভারতী ।
চৌদ্দ বৎসরের ছেলে, জনম কায়স্থকুলে,
কলিকাতা শহরে বসতি ॥ ২৬ ॥
তাঁরে লয়ে কাণ্ড পূর্ণ, তাই তাঁর নাম পূর্ণ,
মহাপুণ্য নাম-উচ্চারণে ।
দরশনে কিবা হয়, কিবা দিব
পরিচয়,
পদরেণু আশা করে দীনে ॥ ২৭ ॥
নিজে শ্রীপ্রভুর বাণী, ঈশ্বর-কোটির তিনি,
বিষ্ণু অংশে জনম তাঁহার ।
নিজে সেই নারায়ণ, পুত্ররূপে জন্ম লন,
মা-বাপের ফল তপস্যার ॥ ২৮ ॥
দিনেক মানসে পুজি, বিশ্বপত্রে নহে রাজি,
তুষ্ট পরে তুলসী-চন্দনে ।
বুঝিনু না অণুকণা, কিবা প্রভুভক্ত জনা,
সাঙ্গোপাঙ্গ অন্তরঙ্গগণে ॥ ২৯ ॥
প্রভু-ভক্ত যে রাজ্যের, জীবে নাহি জানে টের,
ফের বুঝে শুনিলে কাহিনী ।
একমাত্র তার মানে, দৃষ্টিহীন
জীবগণে,
কামিনীকাঞ্চনগত প্রাণী ॥ ৩০ ॥
গ্রাম্য-সুখ পরিহরি,
দেখিবারে
লীলাপুরী,
জীবে সাধ না হয় কখন ।
যেমন ঘায়ের কৃমি, অমৃত-সমান
গণি,
রক্ত পুঁজে করে বিচরণ ॥ ৩১ ॥
জীবের না হয় ঋদ্ধি, যদবধি জৈব
বুদ্ধি,
একেবারে না হয় বিনাশ ।
তদবধি আরে মন,
নাহি হয় কদাচন,
তত্ত্বে ভক্তে ঈশ্বরে বিশ্বাস ॥ ৩২ ॥
জৈব বুদ্ধি নষ্ট যায়, তাহে মাত্র একোপায়,
ঈশ্বরের লীলা-আন্দোলন ।
কঠিন পাষাণে যদি, জল পড়ে নিরবধি,
কালে ক্ষয় তাহার যেমন ॥ ৩৩ ॥
আন-কথা ছাড়ি মন, কর লীলা-আন্দোলন,
কিবা ভক্ত শ্রীপ্রভুর সনে ।
বেদ-পাঠী ব্রহ্মচারী,
লক্ষ যজ্ঞসূত্রধারী,
বাস করে পূর্ণের বদনে ॥ ৩৪ ॥
নিজের প্রভুর পূর্ণ,
সমুজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণ,
ভাতিপূর্ণ বিশাল নয়ন ।
নহে লম্বা নহে বেঁটে, অঙ্গ আয়তনে মিঠে,
সুবলনি দোহারা গড়ন ॥ ৩৫ ॥
আপনার শ্রীমন্দিরে, শ্রীপ্রভু পাইলে তাঁরে,
স্নেহভরে করান ভোজন ।
পরে দিয়া গাড়িভাড়া, ফিরাইয়া দেন ত্বরা,
যেইখানে বসতি-ভবন ॥ ৩৬ ॥
কর্তৃ পক্ষ ঘরে যত, ক্রোধে হয় অন্ধ-মত,
শুনিলে এসব সমাচার ।
তাই যাত্রা সংগোপনে, শ্রীপ্রভুর সন্নিধানে,
লীলা শুনে লাগে চমৎকার ॥ ৩৭ ॥
কে জানে এ কেবা ছেলে, কিছুদিন না দেখিলে,
বিকল অন্তর গুণমণি ।
বগলে পুটুলি ধরা, মিষ্টি
মিঠা ফলে ভরা,
আসিতেন শহরে আপনি ॥ ৩৮ ॥
গোপনে দাঁড়ায়ে পথে,
অন্য কোন ভক্ত-সাখে,
ত্রস্ত চিতে পূর্ণর কারণ ।
তাহার সান্নিধ্য-স্থানে,
পূর্ণচন্দ্র যেইখানে,
বিদ্যালয়ে করে অধ্যয়ন ॥ ৩৯ ॥
বলিতেন শ্রীগোসাঁই,
যখন শহরে যাই,
একা এই শিশু-ভক্ত বিনে ।
কারণ নাহিক জানা, আছে এত জানা-শুনা,
কাহারেও নাহি পড়ে মনে ॥ ৪০ ॥
শ্রীপ্রভুর অবতারে,
যদ্যপি সন্দেহ ধরে,
দেখ লীলা সন্দ হবে দূর ।
ভক্তনামে যাঁরে গাই, তার সঙ্গে কিছু নাই,
ঐহিকেতে সম্বন্ধ প্রভুর ॥ ৪১ ॥
অথচ সম্বন্ধ বিনে, ভালবাসা
কোন্খানে,
কখনই না হয় কাহার ।
শুন সবিশেষ তত্ত্ব, দেহ যেথা
সেথা স্বার্থ,
স্বার্থই স্নেহের মূলাধার ॥ ৪২ ॥
এই ধন জন মান, যে
প্রভুর বিষজ্ঞান,
যিনি মহাত্যাগী যোগিবর ।
সম্বন্ধ কি স্বার্থ স্নেহ,
বন্ধন মমতা মোহ,
কেন তাঁর অন্যের উপর ॥ ৪৩ ॥
প্রভু প্রভু-ভক্তবৃন্দে,
স্মরিয়া পরমানন্দে,
আপনার কর্ম কর মন ।
বুচিবে সকল জ্বালা, টুটিবে
মনের মলা,
সন্দ দ্বন্দ হবে বিমোচন ॥ ৪৪ ॥
চতুর্থ খণ্ড
অবতারবাদ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
ভক্তপ্রিয় রামকৃষ্ণ ভকত বৎসল ।
ভক্তের কারণে সদা যেমন পাগল ॥ ১ ॥
নয়নের তারা তাঁর ভকতনিচয় ।
অদর্শনে দিনমান অন্ধকারময় ॥ ২ ॥
লোকালয় ঠিক বোধ শ্মশানের পারা ।
বিরহ-সন্তাপে ঝরে চক্ষে বারিধারা ॥ ৩ ॥
রাত্রিকালে নিদ্রা নাই শয্যায় যাতনা ।
দুঃখ দূর হেতু হয় শ্যামায় প্রার্থনা ॥ ৪ ॥
অল্পবয়ঃ ভক্তগণ নিজ নিজ ঘরে ।
মা-বাপের তাড়নায় আসিতে না পারে ॥ ৫ ॥
সেইহেতু দেখিবারে ভকতের দলে ।
আকুল অন্তরে যান শহর-অঞ্চলে ॥ ৬ ॥
প্রধান বৈঠক হয় আসিয়া শহরে ।
মহাভক্ত বলরাম বসুর মন্দিরে ॥ ৭ ॥
গৌর-অবতারে যেন শ্রীবাস-অঙ্গন ।
এবে তেন বলরাম বসুর ভবন ॥ ৮ ॥
আজি একদিন তথা উপনীত রায় ।
ভক্তের বিরহ-দুঃখ দূরের আশায় ॥ ৯ ॥
আর এক লালসায় রঙ্গ করিবারে ।
নররূপে যে কারণ লীলার আসরে ॥ ১০ ॥
একত্রিত করিবারে প্রিয় ভক্তগণে ।
সমাদেশ করিলেন বন্ধু বলরামে ॥ ১১ ॥
নিমন্ত্রণ করিবারে পরম আনন্দে ।
ভবনাথ শ্রীরাখাল ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রে ॥ ১২ ॥
আর পূর্ণচন্দ্র নামে শিশু-কলেবর ।
বদনে যাঁহার লক্ষ ব্রাহ্মণের ঘর ॥ ১৩ ॥
ঈশ্বর-কোটির ছোট-নরেন্দ্র যে জন ।
তার সঙ্গে বালক-বয়স নারায়ণ ॥ ১৪ ॥
বিশেষিয়া কন প্রভু ভক্ত বলরামে ।
ঈশ্বরের সেবা হয় এদের সেবনে ॥ ১৫ ॥
ইহারা সামান্য নয় মহা-অনুভব ।
জন্মিয়াছে ঈশ্বরের অংশে এরা সব ॥ ১৬ ॥
ভবিষ্য মঙ্গল তব শুন সংগোপনে ।
ব্রতী যদি হও তুমি এদের সেবনে ॥ ১৭ ॥
প্রভু আজ্ঞা শিরোধার্য করি বলরাম ।
জনে জনে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠান ॥ ১৮ ॥
তৃতীয় প্রহর যবে গগনেতে বেলা ।
বসুর ভবনে হৈল ভকতের মেলা ॥ ১৯ ॥
পরিপূর্ণ নিকেতন নাহি মিলে বাট ।
প্রেমের বেসাত খালি আনন্দের হাট ॥ ২০ ॥
ভক্তগণ-সহ যেথা প্রভুর মেলানি ।
গোলোক বৈকুণ্ঠ চেয়ে সেইখানে গণি ॥ ২১ ॥
স্থানের
মহিমা কিবা কহিবার নয় ।
দরশনে জীবের শিবত্ব-পদ হয় ॥ ২২ ॥
ধ্রুব লয় জৈব ভাব সেবা-ভক্তি মিলে ।
দুর্লভ চৈতন্যধন-প্রাপ্তি অবহেলে ॥ ২৩ ॥
ভক্তসঙ্গে রঙ্গে যাহা কথোপকথন ।
তার বহু নীচে বেদ আগম নিগম ॥ ২৪ ॥
উচ্চ হিমালয়-চূড়ে যেমন উঠিলে ।
নিরীক্ষণ হয় তাঁর বহু নিম্নতলে ॥ ২৫ ॥
বিবিধ আকারযুক্ত জলদের মালা ।
স্বভাবে গগনবক্ষে রঙ্গে করে খেলা ॥ ২৬ ॥
কথোপকথনে নাই ভাষার চলন ।
কেবল কটাক্ষে হাস্যে আশ্চর্য রকম ॥ ২৭ ॥
সঙ্কেতে বুঝহ তত্ত্ব নহে বলিবার ।
বুঝে ভক্তে অন্যে লাগে নিবিড় আধার ॥ ২৮ ॥
জ্ঞান-ভক্তি ঈশতত্ব জীব-শিক্ষা হেতু ।
মত-পথ ভবসিন্ধু-পারাপারে সেতু ॥ ২৯ ॥
বাখানিয়া দেখাইলা প্রভু যতগুলি ।
একমনে শুন মন যা বলান বলি ॥ ৩০ ॥
উদ্দেশ্য কেবল এবে প্রভু-অবতারে ।
অভিনব যুগধর্ম-প্রচারের তরে ॥ ৩১ ॥
জীবের হিতার্থে মাত্র একক কারণ ।
আচরিয়া যাবতীয় সাধন-ভজন ॥ ৩২ ॥
জাতীয় স্থানীয় নহে প্রকৃতি ধর্মের ।
সার্বভৌম অধিকার আছে সকলের ॥ ৩৩ ॥
যুগধর্ম বিশ্ববপু এক কলেবর ।
অলঙ্কৃত নানা বর্ণে পরম সুন্দর ॥ ৩৪ ॥
নানা বর্ণ ধর্ম খণ্ড রুচির বিশেষে ।
সমভাবে সবে পুষ্ট অনুরাগ-রসে ॥ ৩৫ ॥
দ্বন্দ্ব দ্বেষ বিসংবাদ হিংসা নাই তথা ।
বিরাজিত পূর্ণ শান্তি সমতা একতা ॥ ৩৬ ॥
যাহার ঈশ্বরলাভে বাসনা প্রবল ।
অনুরাগে আত্মহারা সদা চক্ষে জল ॥ ৩৭ ॥
ক্ষুধা নাই তৃষ্ণা নাই ক্ষিপ্ত রাত্রিদিন ।
শীতাতপে বরিষায় আশ্রমবিহীন ॥ ৩৮ ॥
হুঁশ নাই আছে কিনা লজ্জা-নিবারণ ।
স্পর্শ-শক্তি বোধ-রোধ পাগল-লক্ষণ ॥ ৩৯ ॥
হেন জন লভি যদি পরম-ঈশ্বরে ।
যুগধর্ম কিবা সাধ করে দেখিবারে ॥ ৪০ ॥
মুক্ত আঁখি দরশনে অধিকার তাঁর ।
সম্প্রদায়ীদের পক্ষে নিবিড় আঁধার ॥ ৪১ ॥
গোঁড়া-সম্প্রদায়ী নামে যাহাদের আখ্যা ।
বিচিত্র চরিত মুখে ধর্ম করে ব্যাখ্যা ॥ ৪২ ॥
ব্যাখ্যাই কেবলমাত্র নয়নে বদনে ।
ধর্ম-মূল হরি কোথা মোটে নাই প্রাণে ॥ ৪৩ ॥
অনুরাগহীন চিত্ত ভক্তি নাহি মোটে ।
ঈশ্বরের বিড়ম্বনা অবিদ্যার মুটে ॥ ৪৪ ॥
ঈশ-লাভ ঈশতত্ব ঈশ-অনুরাগ ।
ভক্তি প্রেম জ্ঞান শিক্ষা বিবেক বিরাগ ॥ ৪৫ ॥
অহংকার-বিবর্জিত দীনাধিকাচার ।
এই সব শিক্ষা দিতে প্রভু অবতার ॥ ৪৬ ॥
রূপরস ভোগ-ইচ্ছা যাহাদের মনে ।
হেন জনে নাহি ঠাঁই প্রভুর চরণে ॥ ৪৭ ॥
শ্রীবদনে বলিতেন প্রভু ভগবান ।
ঈশ্বরলাভেতে যার ব্যাকুলিত প্রাণ ॥ ৪৮ ॥
স্থান তার সমাদরে আমার সদন ।
ধনপুত্র প্রার্থনা এখানে অকারণ ॥ ৪৯ ॥
কেমনে ঈশ্বরলাভ প্রাণে সাধ যাঁর ।
প্রভুর মন্দিরে তাঁর বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৫০ ॥
শরণ লইলে পদে ঈশ্বরের তরে ।
মনসাধ পূর্ণ প্রভু করেন অচিরে ॥ ৫১ ॥
কিবা বস্তু প্রভুদেব দেখ মন ঘটে ।
ভুবন-মোহিনী মায়া অবিদ্যার হাটে ॥ ৫২ ॥
পূর্ণব্রহ্মসনাতন অকূল-কাণ্ডারী ।
দীনবেশে অবতার নরদেহ ধরি ॥ ৫৩ ॥
চেনা দায় নর-রূপে যবে ভগবান ।
জীবের কি সাধ্য শিব ব্রহ্মা ঘোল খান ॥ ৫৪ ॥
জীবের অবোধ্য বিভু সব অবস্থায় ।
স্বরাটে বিরাটে কিবা নিত্য কি লীলায় ॥ ৫৫ ॥
অবোধ্য অবোধ্য যেবা বোধের অতীত ।
অবস্থার তারতম্যে না হয় আয়ত্ত ॥ ৫৬ ॥
সৃষ্টিরূপে নিজে স্রষ্টা পরম ঈশ্বর ।
সত্ত্বা তার প্রতি অণু-রেণুর ভিতর ॥ ৫৭ ॥
যদি কহ অংশমাত্র বিরাজ তাঁহার ।
শিরোধার্য কথা মুই করিনু স্বীকার ॥ ৫৮ ॥
পদতলে দলি অতি তুচ্ছ দূর্বাদল ।
বল দেখি বুঝিবারে আছে কার বল ॥ ৫৯ ॥
পূর্ণ অবস্থায় যাঁর অবোধ্য চরিত ।
অংশতেও সেই মত বুঝিবে নিশ্চিত ॥ ৬০ ॥
অনন্ত অখণ্ড যিনি অনাদি চেহারা ।
সীমাবদ্ধ আধারেও যোল-আনা খাড়া ॥ ৬১ ॥
তত্ত্বের মীমাংসা-হেতু ভক্তদের সনে ।
অবতারবাদে কথা কথোপকথনে ॥ ৬২ ॥
শ্রীবদনে বলিলেন যাহা গুণমণি ।
শুন তবে কহি কথা অমৃতের খনি ॥ ৬৩ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর রঙ্গ এই দিন ।
সমাগত বহু ভক্ত নবীন প্রবীণ ॥ ৬৪ ॥
তত্ত্বকথা-গাঁথা গাথা চলিছে কেবল ।
যাহাতে প্রমত্ত-চিত্ত ভকত সকল ॥ ৬৫ ॥
অতঃপর লীলা-কথা ভক্তদের সনে ।
শ্রীবদনে বিগলিত হৈল আজি দিনে ॥ ৬৬ ॥
যতন সহিত মন কর অবধান ।
শ্রবণে কীর্তনে লীলা পরম কল্যাণ ॥ ৬৭ ॥
পাঁচসিকা বুদ্ধিযুক্ত গিরিশ ধীমান ।
পরম বিশ্বাসী ভক্ত মহাভাগ্যবান ॥ ৬৮ ॥
উত্থাপন কৈলা কথা প্রভুর গোচর ।
নরেন্দ্র বলেন যেই পরম-ঈশ্বর ॥ ৬৯ ॥
অনন্ত অখণ্ড তিনি একমাত্র সার ।
কখন তাঁহার খণ্ড নহে হইবার ॥ ৭০ ॥
হেন উত্থাপন কেন শুনহ বিহিত ।
গিরিশে নরেন্দ্রে হয়ে মত বিপরীত ॥ ৭১ ॥
বিশ্বাসী গিরিশচন্দ্র মানে অবতার ।
নরেন্দ্র তাহাতে নাহি করেন স্বীকার ॥ ৭২ ॥
পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী তর্কদ্বন্দ
করে ।
উভয়েই মহাবীর সোসর সমরে ॥ ৭৩ ॥
মীমাংসার হেতু সেই তত্ত্ব গুরুতর ।
গিরিশ তুলিল তাই প্রভুর গোচর ॥ ৭৪ ॥
প্রভুর উত্তর তবে কর অবধান ।
যতই হউন বড় বিষ্ণু ভগবান ॥ ৭৫ ॥
সারবস্তু তাঁর ধ্রুব সমুদিতে পারে ।
চৌদ্দপোয়া পরিমিত নর-কলেবরে ॥ ৭৬ ॥
নরদেহে
অবতারে আসেন ধরায় ।
উপমা ধরিয়া তাহা বুঝান না যায় ॥ ৭৭ ॥
তুলনায় কিঞ্চিৎ আভাস-প্রাপ্তি হয় ।
অনুভব প্রত্যক্ষের গোচর বিষয় ॥ ৭৮ ॥
অনন্ত ঈশ্বর গাভী উপমা এখানে ।
পদ শৃঙ্গ কিবা তার অন্য কোন স্থানে ॥ ৭৯ ॥
পরশন কর যদি বুঝিবে নিশ্চয় ।
সেই এক গাভীকেই পরশন হয় ॥ ৮০ ॥
অনন্ত হইতে যেইমত অবতার ।
অবতার-স্পর্শে হয় পরশ তাঁহার ॥ ৮১ ॥
গাভীর সাংরাংশ দুধ জানা চরাচরে ।
লেজে শৃঙ্গে নহে, মিলে বাঁটের দুয়ারে ॥ ৮২ ॥
সেইরূপ অনন্তের তত্ত্ব-পরিচয় ।
মিলে মাত্র অবতারে অন্যত্রেতে নয় ॥ ৮৩ ॥
প্রাণ-কুতূহলী বুলি শুনি শ্রীবদনে ।
গিরিশ পুনশ্চ কন প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৮৪ ॥
ঈশ্বর অনন্তাপার নরেন্দ্রের মতে ।
সমস্ত ধারণা নাহি হয় কোনমতে ॥ ৮৫ ॥
ইহার উত্তরে কথা বলিলা গোসাঁই ।
সমস্ত ধারণা তাঁর আবশ্যক নাই ॥ ৮৬ ॥
ঈশ্বরের বড় ভাব অবোধ্য যেমন ।
অতিশয় ক্ষুদ্র যেটি সেটিও তেমন ॥ ৮৭ ॥
তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করা প্রয়োজন অতি ।
ধরায় উদয় যবে ধরিয়া মূরতি ॥ ৮৮ ॥
অবতার-বেশে তিনি অবতীর্ণ হন ।
অবতার-দরশনে ঈশ্বর-দর্শন ॥ ৮৯ ॥
অবতারে ঈশ্বরেতে ভিন্ন কিবা আর ।
যে বস্তু ঈশ্বর সেই বস্তু অবতার ॥ ৯০ ॥
সাগরের এক বিন্দু বারি-পরশনে ।
সাগরেই স্পর্শ হয় বুঝে দেখ মনে ॥ ৯১ ॥
অগ্নিতত্ব সত্য বটে সব জায়গায় ।
কাঠেতে যেমন বেশী এমন কোথায় ॥ ৯২ ॥
ঈশ্বরের তত্ত্ব যদি করে কোন জন ।
নরদেহে উচিত তাহার অন্বেষণ ॥ ৯৩ ॥
নরদেহে অধিকাংশ বিকাশ তাঁহার ।
অগ্নি-তত্ত্ব বেশী কাঠে যেমন প্রকার ॥ ৯৪ ॥
যে আধারে প্রেমভক্তি উথলিয়া পড়ে ।
ঈশ্বরের জন্যে যেবা ক্ষিপ্ত প্রায় ঝুরে ॥ ৯৫ ॥
অদর্শনে ঈশ্বরের দিক দেখে শূন্য ।
সেই সে আধারে তিনি নিজে অবতীর্ণ ॥ ৯৬ ॥
তবে আর এক কথা শুনহ এখন ।
কোথাও প্রকাশ বেশী কোথাও বা কম ॥ ৯৭ ॥
কোথাও বা পূর্ণভাবে আবির্ভাব তাঁর ।
বিশ্বপতি ঈশ্বর শক্তির অবতার ॥ ৯৮ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
অবতারবাদে যাহা প্রভুর বচন ॥ ৯৯ ॥
লক্ষণ ধরিয়া তার দেখ ঘটে তুমি ।
রামকৃষ্ণ প্রভু মোর অখিলের স্বামী ॥ ১০০ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন পূর্ণ অবতার ।
ভাসে বেদ সাক্ষ্য দিতে মহামহিমার ॥ ১০১ ॥
"আচণ্ডালে প্রেম দিতে যতন সতত ।
লোকাতীত করুণায় জীবহিতব্রত ॥ ১০২ ॥
প্রাণবন্ধু জানকীর তুল্য নাহি যাঁর ।
তিনি এবে রামকৃষ্ণ পূর্ণ অবতার ॥ ১০৩ ॥
স্তব্ধকরী হুহুঙ্কার কুরুক্ষেত্র-রণে ।
সদ্যোজাত মহামোহ নিধন-কারণে ॥ ১০৪ ॥
সুগম্ভীর গীতোক্তিতে সিংহনাদ যাঁর ।
তিনি এবে রামকৃষ্ণ পূর্ণ অবতার১"
॥ ১০৫ ॥
বিশ্বাসী গিরিশচন্দ্র উৎফুল্লাতিশয় ।
মহোল্লাসে পরমেশে পুনরায় কয় ॥ ১০৬ ॥
নরেন্দ্র বলেন সেই পরম ঈশ্বর ।
বাক্য-মন-ইন্দ্রিয়াদিগের অগোচর ॥ ১০৭ ॥
তাহার উত্তরে কথা কন প্রভুরায় ।
এ মনে বুঝিতে তাঁরে মিলা মহাদায় ॥ ১০৮ ॥
কিন্তু যদি হয় পরে শুদ্ধ বুদ্ধি মন ।
ঈশ্বর গোচর তবে তাহার তখন ॥ ১০৯ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্তি দূর পরিহারে ।
মন-বুদ্ধি দোঁহাকেই শুদ্ধতম করে ॥ ১১০ ॥
অবিদ্যার আধিপত্য হৃদে যতক্ষণ ।
শুদ্ধ হইবার নহে বুদ্ধি কিবা মন ॥ ১১১ ॥
মন বুদ্ধি দুটি বস্তু নামে কহা যায় ।
দুয়ে মিলে এক হয় শুদ্ধ অবস্থায় ॥ ১১২ ॥
বিশুদ্ধ অবস্থা যবে দুয়ে নয় ভিন্ন ।
উভয়ের এক নাম তখন চৈতন্য ॥ ১১৩ ॥
চৈতন্য হইলে কিবা ব্যাপার সুন্দর ।
চৈতন্যের বলে হয় চৈতন্য গোচর ॥ ১১৪ ॥
ভক্তি জ্ঞান বস্তুদ্বয়ে রক্ষা করে পথে ।
মহাবিদ্যা বিরোধিনী অবিদ্যার হাতে ॥ ১১৫ ॥
অকূল অবিদ্যা-সিন্ধু উত্তীর্ণের হেতু ।
এক ভক্তি-পারাবারে একমাত্র সেতু ॥ ১১৬ ॥
তরঙ্গ-তুফানে সেতু হয় নাড়াচাড়া ।
তখন পথিকে রক্ষা করে শক্ত-বেড়া ॥ ১১৭ ॥
জ্ঞান নামে এই বেড়া হয় অভিহিত ।
সতত সংলগ্ন সেই বেড়ার সহিত ॥ ১১৮ ॥
নিশ্চিত বুঝিবে তত্ত্ব কর অবধান ।
যেথা রহে ভক্তি সেথা জ্ঞান বিদ্যমান ॥ ১১৯ ॥
উপমা ধরিয়া তবে শুন বিবরণ ।
বহ্নির সতত সঙ্গে পবন যেমন ॥ ১২০ ॥
এই বেশে প্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
অন্তে জ্ঞান বাহ্যে গায়ে ভক্তির চাদর ॥ ১২১ ॥
হাতীর দ্বিবিধ দন্ত যেন উপমায় ।
ভিতরে গোপন দন্তে ভোজ্যদ্রব্য খায় ॥ ১২২ ॥
মনোহর শুভ্রতর
যুগল বাহিরে ।
সাধারণে সে কেবল প্রদর্শন তরে ॥ ১২৩ ॥
জ্ঞান-ভক্তি বুঝাইতে মঙ্গল-নিধান ।
শুন কিবা পিক-কণ্ঠে গাইলেন গান ॥ ১২৪ ॥
গীত
"যতনে
হৃদয়ে রেখো
আদরিণী
শ্যামা মাকে ।
মন, তুমি
দেখ আর আমি দেখি
আর যেন
তাঁয় কেউ না দেখে ॥
কামাদিয়ে
দিয়ে ফাঁকি
আয় মন
বিরলে দেখি
রসনারে
সঙ্গে রাধি
সে যেন মা
বলে
ডাকে ॥
কুরুচি
কুমন্ত্রী যত
নিকট হোতে
দিও নাকো
জ্ঞান-নয়নে প্রহরী রেখো
সে যেন
(খুব) সাবধানে থাকে ॥
দেবেশ-দুর্লভ জ্ঞান-ভক্তি-প্রার্থী যেবা ।
একোপায়
তাঁহার প্রভুর পদসেবা ॥ ১২৫ ॥
শ্রীপদসেবনে পুরে পূর্ণ মনস্কাম ।
চরণ-দুখানি
কল্পতরু মূর্তিমান ॥ ১২৬ ॥
১
'বীরবাণী' ২য় স্তোত্র − স্বামী
বিবেকানন্দ
চতুর্থ খণ্ড
প্রভুর জন্মোৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এদিকে তিয়াগী যোগী প্রভুদেবরায় ।
তিয়াগ তিয়াগ রব কথায় কথায় ॥ ১ ॥
দেখিলে প্রভুর মোর ত্যাগের চেহারা ।
অতি বড় ত্যাগিবরে লাগে দিশাহারা ॥ ২ ॥
জনক-জননী কেবা কেবা সহোদর ।
কোথা পুণ্যময়ী ভূমি যেথা ছিল ঘর ॥ ৩ ॥
গ্রামবাসী প্রতিবাসী আত্মীয়-স্বজন ।
ভুলেও বদনে কভু নাহি উচ্চারণ ॥ ৪ ॥
বিষের সমান জ্ঞান কামিনী-কাঞ্চনে ।
গাঁঠরি সঞ্চয়-ভাব মোটে নাই মনে ॥ ৫ ॥
তৃণসম তুচ্ছ বোধ দেহে আপনার ।
এক ঈশ্বরের চিন্তা জীবনেতে সার ॥ ৬ ॥
প্রতিদ্রব্যে বাক্যে শব্দে ঈশ্বরোদ্দীপন ।
কোন দ্রব্যে কোন জনে নাহি প্রয়োজন ॥ ৭ ॥
বিশুদ্ধ শর্করা যবে মিছরির পাগ ।
গুড়স্থিত গাদ তার নাহি পায় লাগ ॥ ৮ ॥
সেইমত নিরমল পরিশুদ্ধ মন ।
সংকল্প বিকল্প তাহে উঠে না কখন ॥ ৯ ॥
সুখ মাত্রে বিসর্জন স্বভাবের রীতি ।
প্রভুতে কেবলমাত্র প্রভুর প্রকৃতি ॥ ১০ ॥
কি প্রকার সে প্রকৃতি আভাস তাহার ।
একবারে নরশিরে নহে বুঝিবার ॥ ১১ ॥
সুস্থির প্রকৃতি যবে গোটা সৃষ্টি উড়ে ।
সৃষ্টি সৃষ্টি কোটি কোটি যখন সে নড়ে ॥ ১২ ॥
শ্রী প্রভু জানেন তাঁর প্রকৃতি-কাহিনী ।
প্রকৃতি শকতি মায়া সৃষ্টির জননী ॥ ১৩ ॥
সহস্র সাগরাধিক প্রকৃত্যায়ন ।
অবোধ্য অচিন্তনীয় অপ্রভু যেমন ॥ ১৪ ॥
অন্য দিকে শুন কথা বিচিত্র ব্যাপার ।
একা কোখা প্রভু তাঁর বহু পরিবার ॥ ১৫ ॥
আসক্তির শিরোমণি আসক্তিতে যোগ ।
একমাত্র পরাপ্রীতি আসক্তির ভোগ ॥ ১৬ ॥
পণ্ডিত শ্রীপ্রভুদেবে করি দরশন ।
হতবুদ্ধি আত্মহারা সবিস্ময় মন ॥ ১৭ ॥
কল্পনারও পক্ষে কভু নাহি আসিয়াছে ।
জীবন্ত সচল হেন কল্পতরু আছে ॥ ১৮ ॥
শাস্ত্রের কথিত তত্ত্বফল-সমন্বিত ।
ডালে ডালে খোলো খোলো ঝুলে বিলম্বিত ॥ ১৯ ॥
প্রকাণ্ড বিস্তৃত ছায়া ত্রিতাপীয় ত্রাণ ।
বসিলেই তলে হয় সুশীতল প্রাণ ॥ ২০ ॥
এই চিন্তা দিবানিশি করি অনুক্ষণ ।
পুনঃ দরশনে হয় সমুৎসুক মন ॥ ২১ ॥
প্রথম দর্শন তার তিন দিন পরে ।
চলিলেন চূড়ামণি দক্ষিণশহরে ॥ ২২ ॥
প্রভুর নিকটে অগ্রে গিয়াছে খবর ।
পুনঃ দরশনে হেথা আসে শশধর ॥ ২৩ ॥
সভয় অন্তর প্রভু কন ভক্তগণে ।
তারা যেন সকলেই থাকে সন্নিধানে ॥ ২৪ ॥
বালক-স্বভাব প্রভু বালকের মত ।
সাধারণ ভাবভূমে সদা সশঙ্কিত ॥ ২৫ ॥
উপনীত হেনকালে হইল পণ্ডিত ।
ভাবস্থ ঠাকুর আস্যে হাস্য-সমন্বিত ॥ ২৬ ॥
এখন অভয়চিত্ত শঙ্কা আর নাই ।
কেশরী-বিক্রমে কথা কহেন গোসাঁই ॥ ২৭ ॥
জ্ঞানমার্গিচূড়ামণি গতি নিরাকারে ।
গিয়াছে জীবন গোটা বিশুদ্ধ বিচারে ॥ ২৮ ॥
খালি তর্ক বাক্যব্যয় বিচারে বিচার ।
চিত্তে নাই ভক্তিতত্ব রসের সঞ্চার ॥ ২৯ ॥
তাই প্রভু আজিকার প্রথমালাপনে ।
বিজ্ঞানীর ভাব কন আপামর জনে ॥ ৩০ ॥
অখণ্ড সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম নামে যিনি ।
সগুণে চব্বিশতত্ব তিনিই আপুনি ॥ ৩১ ॥
একেরই কেবল খেলা নিত্য লীলা দুয়ে ।
উভয়ে প্রভেদশূন্য অভেদ হইয়ে ॥ ৩২ ॥
"জ্ঞানিগণে ব্রহ্ম কয় আত্মা যোগী জনে ।
শ্রীগুরু শ্রীভগবান বলে ভক্তগণে" ॥ ৩৩ ॥
পণ্ডিতের শুষ্ক হৃদি মরুর মাঝার ।
করিবারে ভক্তিতত্ব রসের সঞ্চার ॥ ৩৪ ॥
আপনার ভাবে প্রভু হইয়া পুরিত ।
ধরিলেন ভক্তিভরা শ্যামা গুণ গীত ॥ ৩৫ ॥
একে বীণাজিনি কণ্ঠ তাহাতে আবার ।
মগ্নচিত্ত প্রেমোন্মত্ত ভাবের ঝঙ্কার ॥ ৩৬ ॥
নাই শব্দ সবে মুগ্ধ মন্দির-ভিতর ।
ক্রমান্বয়ে চারি গীত হৈল পর পর ॥ ৩৭ ॥
একভাব যাবতীয় গীতের ভিতরে ।
নিরাকার যিনি ব্রহ্ম তিনিই সাকারে ॥ ৩৮ ॥
বিমোহিত শশধর সঙ্গীত শুনিয়ে ।
বিশুষ্ক হৃদয় গেছে সরস হইয়ে ॥ ৩৯ ॥
ভক্তিরসাস্বাদ পেয়ে সবিনয়ে কয় ।
পুনরায় যদি তাঁর লীলা-গীত হয় ॥ ৪০ ॥
ভক্তিভক্ত-প্রিয় প্রভু কিছুক্ষণ পরে ।
গন্ধর্ব-নিন্দিত কণ্ঠে তাল লয় সুরে ॥ ৪১ ॥
ভাবেতে বিভোর চিত্ত সহ মন প্রাণ ।
ধরিলেন কালীনাম-মাহাত্ম্যের গান ॥ ৪২ ॥
তারপর শুদ্ধ নিষ্ঠা ভক্তির কাহিনী ।
রসজ্ঞ কেবল যার ব্রজের গোপিনী ॥ ৪৩ ॥
ত্রিলোক-বিজয়ী শক্তি যে ভক্তিতে রয় ।
যাহাতে গোকুলচন্দ্র নন্দবাধা বয় ॥ ৪৪ ॥
পণ্ডিত আকুল গীত করিয়া শ্রবণ ।
দুনয়নে বারিধারা করে বিসর্জন ॥ ৪৫ ॥
বর্তমানে পণ্ডিতের অবস্থা বুঝিয়া ।
গল্পচ্ছলে উপদেশ কন বিশেষিয়া ॥ ৪৬ ॥
অপার শাস্ত্রের গাথা শুনহ বারতা ।
তাহাতে ঈশ্বর নাই আছে তাঁর কথা ॥ ৪৭ ॥
শাস্ত্রের সারাংশমর্ম করিয়া গ্রহণ ।
কর্তব্য তপস্যা-কর্ম সাধন-ভজন ॥ ৪৮ ॥
শাস্ত্রেতে ঈশ্বর নাই তপস্যায় আছে ।
তপস্যা-হিসাবে খালি শাস্ত্র ঘাঁটা মিছে ॥ ৪৯ ॥
ঈশ্বরে পাইলে আর রহে না বিচার ।
দেখ কিবা হয় ভাব মধুমক্ষিকার ॥ ৫০ ॥
শুনগুন রব তার ছুটে একেবারে ।
প্রবেশিলে মধুভরা ফুলের ভিতরে ॥ ৫১ ॥
তারপর শশধরে কন প্রভুরায় ।
জ্ঞানী বিজ্ঞানীর কথা সরলোপমায় ॥ ৫২ ॥
ঈশ্বরের সত্তাবোধ জ্ঞানীর কেবল ।
কাঠেতে নিশ্চিত যেন আছেন অনল ॥ ৫৩ ॥
ঈশ্বরানুভূতি মাত্র বিজ্ঞানীর নয় ।
বিজ্ঞানী করেন তাঁর সঙ্গে পরিচয় ॥ ৫৪ ॥
নহে খালি পরিচয় সহ আলাপনা ।
সম্ভোগ মনের মত যেমন বাসনা ॥ ৫৫ ॥
কাঠেতে বাহির করি গুপ্ত হুতাশন ।
রুচিপ্রিয় খাদ্যদ্রব্য করিয়ে রন্ধন ॥ ৫৬ ॥
ভোজনান্তে হৃষ্টপুষ্ট করে কলেবর ।
তিনিই বিজ্ঞানী নামে পুরুষপ্রবর ॥ ৫৭ ॥
বিজ্ঞানী যে জন তিনি দুই অবস্থায় ।
নিত্য লীলা উভয়েই সমরূপ পায় ॥ ৫৮ ॥
খুলিলে মুদিলে আঁখি একই রকম ।
সর্বদাই সর্বঠাঁই ঈশ্বর দর্শন ॥ ৫৯ ॥
জ্ঞান-বিজ্ঞানের তরে কহে চূড়ামণি ।
বুঝিবারে এই তত্ত্ব না পারিনু আমি ॥ ৬০ ॥
এত শুনি বিশ্বগুরু অতি তুষ্ট হয়ে ।
কহেন নিগূঢ় তত্ত্ব দৃষ্টান্ত দেখায়ে ॥ ৬১ ॥
নেতি নেতি রবে পথে জ্ঞানিগণ যায় ।
যতক্ষণ অখণ্ডের ঘরে না পৌঁছায় ॥ ৬২ ॥
সমাধিতে ভূমানন্দে যারা হয় লয় ।
জ্ঞানী নামে প্রতিপন্ন জ্ঞানী তারে কয় ॥ ৬৩ ॥
মুনের পুতুল যেন সাগরে নামিলে ।
হারায় নিজের সত্তা জ্বলে যায় গলে ॥ ৬৪ ॥
যদ্যপি পুতুল হয় পাথরের গড়া ।
যে কথন সিন্ধু-জলে নহে সত্তাহারা ॥ ৬৯ ॥
পূর্ণজ্ঞানে ভূমানন্দে দেখে জলবৎ ।
যিনি ব্রহ্ম তিনি নিজে জীব ও জগৎ ॥ ৭০ ॥
ব্রহ্মই চব্বিশ তত্ত্ব জগৎ-লীলায় ।
ধাঁর নিত্য তাঁর লীলা অন্য সন্দ যায় ॥ ৭১ ॥
বিজ্ঞানীরা পাথরের পুতুলের প্রায় ।
ভক্তের আমিত্ব রাগে গ'লে নাহি যায় ॥ ৭২ ॥
ইহারা রাখেন 'আমি' সম্ভোগের তরে ।
যাঁর নিত্য তাঁর লীলা সর্বত্রই হেরে ॥ ৭৩ ॥
বিজ্ঞানী সর্বোচ্চ ভূমে অতি চমৎকার ।
দেখে যাঁর নিরাকার তাঁরই সাকার ॥ ৭৪ ॥
উপমা ধরিয়া তত্ত্ব বুঝহ এখন ।
দুধেতে পাতিয়া দধি করিলে মন্থন ॥ ৭৫ ॥
এই প্রক্রিয়ায় দেখ দুটি বস্তু মিলে ।
একের মাখন নাম অন্যে ঘোল বলে ॥ ৭৬ ॥
এখন বুঝিতে তত্ত্ব নাহি কোন গোল ।
যে দ্রব্য মাখন হৈল তার এই ঘোল ॥ ৭৭ ॥
থাকিলে মাখন যেন ঘোল আছে তার ।
সেই মত তারই লীলা নিত্যে সত্তা যার ॥ ৭৮ ॥
মাখনাংশে নিত্য যেন ঘোল-অংশে লীলা ।
বিজ্ঞানী দেখেন দুয়ে একেরই খেলা ॥ ৭৯ ॥
ভ্রম দূর লীলা নিত্যে একবস্তু হেরে ।
যে পথে গমন পুনঃ সেই পথে ফিরে ॥ ৮০ ॥
নেতি নেতি পথে যারে অগ্রাহ প্রথমে ।
তাহারে করিয়া গ্রাহ্য লীলাভূমে নামে ॥ ৮১ ॥
এই সব বিজ্ঞানীরা ঈশ্বর-কোটির ।
জীবের কল্যাণ জন্য রাখেন শরীর ॥ ৮২ ॥
অতি উচ্চ তত্ত্ব ইহা দুর্বোধ্যাতিশয় ।
এতক্ষণে বুঝিলাম চূড়ামণি কয় ॥ ৮৩ ॥
পণ্ডিতের ধাত বুঝি শ্রীশ্রীরায় কন ।
কালের মতন পরাভক্তি-বিবরণ ॥ ৮৪ ॥
অশেষ ঐশ্বর্যবান পরম ঈশ্বর ।
নিজে ধাতা খুঁজে কিছু না পায় খবর ॥ ৮৫ ॥
মোদের কি প্রয়োজন ঐশ্বর্যের জ্ঞানে ।
যেরূপে ঈশ্বর-লাভ উদ্দেশ্য জীবনে ॥ ৮৬ ॥
জ্ঞানের কঠিন পথ সে পথে না যেও ।
কলিকালে নারদীয় ভক্তিমার্গ শ্রেয়ঃ ॥ ৮৭ ॥
ভাব ধরি ভক্তিপথ করিলে আশ্রয় ।
সহজে ঈশ্বরলাভে ইষ্টসিদ্ধি হয় ॥ ৮৮ ॥
বিবেক-বৈরাগ্য ঈশ্বরানুরাগ তায় ।
ইহাই ঈশ্বর-লাভে প্রকৃষ্ট উপায় ॥ ৮৯ ॥
ভক্তি-আচরণ পথে শ্রাদ্ধান্ন-ভোজন ।
ইহাতে ভক্তের ক্ষতি করে বিলক্ষণ ॥ ৯০ ॥
সংসারে থাকিবে নষ্ট স্ত্রীলোকের প্রায় ।
দেহে সাংসারিক কর্ম মনে রবে তাঁয় ॥ ৯১ ॥
স্মরণ-মনন সদা ঈশ্বর-চরণে ।
মঙ্গল উপায় এই ভক্তির বিধানে ॥ ৯২ ॥
পণ্ডিতের নরদেহ কৃপায় প্রভুর ।
বিচারাভিমান-গিরি ধূলিবৎ চুর ॥ ৯৩ ॥
ভূমিষ্ঠ প্রণাম করে মহা আনন্দিত ।
শ্রীপদে বিদায় আসি যাচিল পণ্ডিত ॥ ৯৪ ॥
পুনরায় আসিবার লয়ে নিমন্ত্রণ ।
স্বস্থানে পয়ান কৈল পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ॥ ৯৫ ॥
অনতিবিলম্বে মাত্র তিন দিন পরে ।
প্রভুর গমন বলরামের মন্দিরে ॥ ৯৬ ॥
মহাভক্ত বলরামে কোটি প্রণিপাত ।
ভক্তিভরে দেবে স্মরে শ্রীশ্রীজগন্নাথ ॥ ৯৭ ॥
আজি দিনে উলটারথে করি নিমন্ত্রণ ।
এনেছেন প্রভুদেবে ভকত উত্তম ॥ ৯৮ ॥
বার্তা পেয়ে জুটিয়াছে বহু ভক্তগণ ।
মহানন্দময় আজি তাঁহার ভবন ॥ ৯৯ ॥
প্রশস্ত বৈঠকখানা অতি পরিসর ।
সবেষ্টিত ভক্তগণে প্রভু গুণধর ॥ ১০০ ॥
অপরূপ প্রভু যেন অপরূপ সাজে ।
শশধর যেইমত তারকার মাঝে ॥ ১০১ ॥
নানা ঈশ্বরীয় কথা কন ক্রমান্বয়ে ।
বৈষ্ণব শাক্তের দ্বন্দ্ব ধর্ম-সমন্বয়ে ॥ ১০২ ॥
রঙ্গরস-সহকারে পাঁচালির সাজে ।
তত্ত্ব যাহে শ্রোতাগণ অনায়াসে বুঝে ॥ ১০৩ ॥
সকলেই সেই বস্তু পথ রকমারি ।
যে করেছে সমন্বয় তারই বাহাদুরি ॥ ১০৪ ॥
বেদে তন্ত্রে পুরাণেতে একেরই বাখান ।
স্বতন্ত্র যে জন বুঝে বুদ্ধি তার আন ॥ ১০৫ ॥
উপদেশ পথৌষধি নানাবিধ ছাঁদে ।
শ্রোতারা কখন হাসে কখন বা কাঁদে ॥ ১০৬ ॥
কখন বা সুগম্ভীর বিস্মিত কখন ।
স্পন্দন-বিহীন দেহ অচঞ্চল-মন ॥ ১০৭ ॥
কথোপকথনে খুলে কতই বারতা ।
শ্রবণেতে দূরে যায় দেহের মমতা ॥ ১০৮ ॥
পূর্বাপর দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর রীতি ।
ধরিলে কাহারে তার নাহিক নিষ্কৃতি ॥ ১০৯ ॥
যত দিন নাহি হয় গড়ন তাঁহার ।
সে ছাড়িলে প্রভুদেব নহে ছাড়িবার ॥ ১১০ ॥
সম্বন্ধ বন্ধন সঙ্গে একবার দিলে ।
সে খুলিলে প্রভুদেব নাহি দেন খুলে ॥ ১১১ ॥
ভুলিলে তাঁহার তিনি ভুলিবার নন ।
টলাইলে স্থির ধীর অচল যেমন ॥ ১১২ ॥
গুণব্যাখ্যা পণ্ডিতের করিতে করিতে ।
উপনীত শশধর বন্ধুদ্বয় সাথে ॥ ১১৩ ॥
সমাদরে সম্ভাষণ করিলেন তাঁয় ।
পণ্ডিত বসিল কাছে প্রণমিয়া রায় ॥ ১১৪ ॥
জ্ঞানের লক্ষণ শান্ত হত অভিমান ।
তোমাতে লক্ষণদ্বয় আছে বর্তমান ॥ ১১৫ ॥
এত ললি প্রশংসিয়া পণ্ডিতপ্রবরে ।
বিজ্ঞানীর ভাব কিবা কন ধীরে ধীরে ॥ ১১৬ ॥
জ্ঞানের প্রসঙ্গ মিষ্ট তত নহে আর ।
চলিয়াছে ভক্তিপথে পণ্ডিত এবার ॥ ১১৭ ॥
অপরূপ ঠাকুরের অপরূপ ধারা ।
মানুষের মন লয়ে নিত্য খেলা করা ॥ ১১৮ ॥
প্রতি দেহে বাস করে এক এক মন ।
দেহ যার সেও তত্ত্ব জানে না কেমন ॥ ১১৯ ॥
জানা তো দূরের কথা আভাসও না পায় ।
গুরুভার দেহরথ কে তারে চালায় ॥ ১২০ ॥
অপূর্ব ঠাকুরে কিন্তু দেখি পূর্বাপর ।
এক আধিপত্য যত মনের উপর ॥ ১২১ ॥
সৃষ্টি-মধ্যেতে মন যে যেখানে আছে ।
ঠাকুর নাচান যেন সেইমত নাচে ॥ ১২২ ॥
মনগুলি ডুরিবদ্ধ হাতে আছে ধরা ।
যেমন ফেরান তিনি সেই মত ফেরা ॥ ১২৩ ॥
কিংবা যেন মনগুলি তাল মৃত্তিকার ।
ইচ্ছা-অনুযায়ী ভাঙ্গে গড়ে কুম্ভকার ॥ ১২৪ ॥
তেমতি প্রভুর হাতে প্রাণীদের মন ।
যখন যেমন উচ্ছা তেমন গড়ন ॥ ১২৫ ॥
তর্কপথে যে পণ্ডিত জনম-অভ্যস্ত ।
আজি তিনি ভক্তি-তত্ত্ব শুনিবারে ব্যস্ত ॥ ১২৬ ॥
সাতদিন পূর্বে হৃদি আছিল পাষাণ ।
আজি তাহে অন্তঃশীলা রস বিদ্যমান ॥ ১২৭ ॥
শশব্যস্ত শশধর জিজ্ঞাসে প্রভুকে ।
কিরূপ ভক্তি দ্বারা পাওয়া যায় তাঁকে ॥ ১২৮ ॥
শ্রীগুরু সন্তুষ্ট হয়ে তদুত্তরে কন ।
সদ্য ভক্তি-প্রদায়িনী ভক্তি-বিবরণ ॥ ১২৯ ॥
জলন্ত বিশ্বাস-ভক্তি নামের উপর ।
সাধনা তপস্যা যার জানে না খবর ॥ ১৩০ ॥
ভক্তিপথে ভক্তে যাহা অনায়াসে পায় ।
জ্ঞান কিবা কর্মে তাহা মেলা মহাদায় ॥ ১৩১ ॥
উপমা সহিত ভক্ত-জীবন কাহিনী ।
কত যে কহিলা দেব না যায় বাখানি ॥ ১৩২ ॥
শুনিয়া শ্রীমুখে ভক্তি-মাহাত্ম্য কীর্তন ।
মুগ্ধমন শ্রোতা করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ১৩৩ ॥
প্রভুর মাহাত্ম্য-কথা কহনে না যায় ।
কোথায় পণ্ডিত ছিল এখন কোথায় ॥ ১৩৪ ॥
কোমল কোমল দেখি পণ্ডিতের হিয়া ।
রহস্যের ছলে কন আশিস করিয়া ॥ ১৩৫ ॥
শুনগো পণ্ডিত কথা শুনগো আমার ।
মা আমার দেখায়েছে তুমি কি প্রকার ॥ ১৩৬ ॥
গিন্নী যবে হেঁশেলের কর্ম করি সায় ।
খাওয়াইয়া সকলে স্নানে যবে যায় ॥ ১৩৭ ॥
শত ডাকে সে সময় নাহি ফিরে আর ।
তেমতি অবস্থা পরে হইবে তোমার ॥ ১৩৮ ॥
শুন গো পণ্ডিত তুমি ভবিষ্যৎ তত্ত্ব ।
দেশে দশে বোলে কোয়ে ঈশ্বর-মাহাত্ম্য ॥ ১৩৯ ॥
মিটায়ে বাসনা সাধ আছে যেন মনে ।
ফিরিবে না আর এই অশান্তির স্থানে ॥ ১৪০ ॥
পণ্ডিত পুলকান্তর আনন্দিত হয়ে ।
শ্রীচরণ-রজ লয় শ্রীপদ ধরিয়ে ॥ ১৪১ ॥
এখানেতে বলরাম ভক্ত-চূড়ামণি ।
রথযাত্রা হেতু করে রথের সাজানি ॥ ১৪২ ॥
জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা মাঝারে ।
মনোমত সজ্জীভূত বস্ত্র-অলঙ্কারে ॥ ১৪৩ ॥
বিবিধ বর্ণের ফুলে মালা শোভে তায় ।
ক্ষুদ্র রথখানি আনি রাখে বারাণ্ডায় ॥ ১৪৪ ॥
নরহরি প্রভুদেব করি নিরীক্ষণ ।
দারুহরি যেথা রথে করিলা গমন ॥ ১৪৫ ॥
যাবতীয় ভক্তবর্গ পাছু পাছু যান ।
বস্তুর পশ্চাতে যেন ছায়া ধাবমান ॥ ১৪৬ ॥
শ্রীকরে ধরিয়া রজ্জ, টান দিলা রথে ।
সংকীর্তন সহ প্রভু নাচিতে নাচিতে ॥ ১৪৭ ॥
ভক্তগণ যোগ দিলা সঙ্গেতে প্রভুর ।
প্রেমেভরা প্রেমোন্মত্ত প্রেমের ঠাকুর ॥ ১৪৮ ॥
সভক্তে প্রভুর লীলা অতি মনোহর ।
অবাক হইয়া কাছে দেখে শশধর ॥ ১৪৯ ॥
সাঙ্গ করি রথোৎসব আসিলে বাহিরে ।
বসিল দর্শকবর্গ পুনরায় ঘেরে ॥ ১৫০ ॥
পরম প্রসাদ পেয়ে হেথা শশধর ।
বিদায় লইয়া যায় আনন্দ-অন্তর ॥ ১৫১ ॥
আজিকার লীলা সাঙ্গ হইল এখানে ।
ভাগ্যবানে করে গীত ভাগ্যবানে শুনে ॥ ১৫২ ॥
আসক্তি জীবন-শক্তি অন্তরে বাহিরে ।
উঠু ডুবু দিবারাত্রি আসক্তি-সাগরে ॥ ১৫৩ ॥
ভক্তদের উপরে আসক্তি অতিশয় ।
একমনে শুন মন কহি পরিচয় ॥ ১৫৪ ॥
সাধন ভজন-কাণ্ডে স্মরহ ভারতী ।
একভাবে একমনে জপে দিবারাতি ॥ ১৫৫ ॥
কখনও বা আসে রাতি কবে দিনমান ।
বুঝিতে না ছিল যবে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ১৫৬ ॥
শব্দময়ী প্রকৃতির অবিরত রোল ।
শ্রবণে পশিতে নাহি পারে এক বোল ॥ ১৫৭ ॥
খালিমাত্র সন্ধ্যায় বাজিলে ঘণ্টা ঝাঁজ ।
নহবত দামামাদি আরতি আওয়াজ ॥ ১৫৮ ॥
শ্রবণবিবরে প্রবেশিত শ্রীপ্রভুর ।
ভাবেভরা মাতোয়ারা বিহ্বল ঠাকুর ॥ ১৫৯ ॥
ছাদের উপরে উঠি উচ্চকণ্ঠে রায় ।
ডাকিতেন ভক্তগণে কে কোথায় আয় ॥ ১৬০ ॥
ব্যাকুলতা আতুরতা একতায়-ভরা ।
আঁকিতে অক্ষম সেই আর্তির চেহারা ॥ ১৬১ ॥
প্রাণের অধিক যেন ভকতের গণ ।
তাঁদের ধিয়ানে যেন আছিলা মগন ॥ ১৬২ ॥
লীলায় ভক্তেরা সাথী প্রধান সহায় ।
তাঁহাদের পাছু পাছু ছায়াসম রায় ॥ ১৬৩ ॥
বুঝিতে নারিনু ভক্তে পরান প্রভুর ।
ভক্তের ভকত-দাস সে মোর ঠাকুর ॥ ১৬৪ ॥
ভক্তেতে পিরীতি তাঁর অত্যন্ত প্রবল ।
ভক্তসঙ্গে লীলা-কথা শ্রবণ-মঙ্গল ॥ ১৬৫ ॥
কোথা ভক্ত রাখালের পিতার মিছিল ।
জিতিবার নহে কহে যাবৎ উকিল ॥ ১৬৬ ॥
কি প্রকারে হয় জয় সেই মকদ্দমা ।
তাহার কারণে মোর প্রভুর ভাবনা ॥ ১৬৭ ॥
বহু পূর্বেকার কথা শুন বলি মন ।
শিয়ড়েতে প্রভুদেব আছিলা যখন ॥ ১৬৮ ॥
বাল্য-সঙ্গী ভাগিনেয় হৃদয়ের ঘরে ।
হৃদু আর রাজারাম দুই সহোদরে ॥ ১৬৯ ॥
সেবা করে শ্রীপ্রভুর যতন-সংহতি ।
শ্রীঅঙ্গ অসুস্থ তাই শিয়ড়ে বসতি ॥ ১৭০ ॥
দৈবযোগে একদিন দুই সহোদরে ।
প্রতিবাসী জনৈকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করে ॥ ১৭১ ॥
ক্রোধে অন্ধ দুই ভাই মারিল তাহায় ।
প্রবল আঘাত হেন মাথা ফেটে যায় ॥ ১৭২ ॥
বিষ্ণুপুরে আদালত রাজ মহকুমা ।
আহত যেখানে রুজু কৈলা মকদ্দমা ॥ ১৭৩ ॥
দণ্ডার্হ মিছিল কহে মোক্তারের গণ ।
ভয়েতে হইল কাঁটা ভাই দুইজন ॥ ১৭৪ ॥
ভবনে ফিরিয়া ধরি শ্রীপ্রভুর পায় ।
কাঁদে আর মাগে ভিক্ষা মুক্তির উপায় ॥ ১৭৫ ॥
অপকর্মে তিরস্কার করি গুণমণি ।
বিচারের দিনে সঙ্গে চলিলা আপনি ॥ ১৭৬ ॥
সন্নিকটে নহে স্থান তের ক্রোশ দূর ।
এই সব কাজে রত ভক্তের ঠাকুর ॥ ১৭৭ ॥
কোন্ ভক্ত কোনখানে কে কি কষ্ট পায় ।
প্রার্থনা কালীর কাছে মঙ্গল-ইচ্ছায় ॥ ১৭৮ ॥
কখন কাহার জন্য চক্ষে ঝরে জল ।
দিনেরেতে নাহি সুখ পরান বিকল ॥ ১৭৯ ॥
শিকায় কাহারও জন্য মিষ্টি তোলা আছে ।
সর্বদা যতন যেন নাহি যায় পচে ॥ ১৮০ ॥
কখন্ আসিবে কেবা আহার-কারণে ।
পায়সের বাটি আছে লুকান গোপনে ॥ ১৮১ ॥
পথপানে কান স্থির ব্যাকুল আতুর ।
অন্তরালে প্রতিশব্দে চমক প্রভুর ॥ ১৮২ ॥
কখন কাহার জন্য এত উচাটন ।
শহর ভিতরে হেথা সেথা অন্বেষণ ॥ ১৮৩ ॥
কোমল শ্রীঅঙ্গে কষ্ট সহিয়া অপার ।
নাহি শীত নাহি রৌদ্র বৃষ্টির বিচার ॥ ১৮৪ ॥
নিকটে আসিতে যেবা শরীরে দুর্বাল ।
কিংবা নাই যান-ভাড়া পথের সম্বল ॥ ১৮৫ ॥
তাহাদের জন্য আছে সঞ্চয় প্রভুর ।
সম্বলীর শিরোমণি ভক্তের ঠাকুর ॥ ১৮৬ ॥
আয়ের অধিক কার ব্যয় হয় ঘরে ।
শ্যামায় প্রার্থনা যাহে বৃত্তি তার বাড়ে ॥ ১৮৭ ॥
ইচ্ছায় ভক্তের মালা আছিলা গোপন ।
এখন প্রকট কাল সব সংজোটন ॥ ১৮৮ ॥
কিবা লীলা করিলেন শুন অতঃপর ।
রামকৃষ্ণায়ন-কথা শান্তির আকর ॥ ১৮৯ ॥
একদিন এক ঠাঁই বহু ভক্তগণ ।
এক সঙ্গে শ্রীপ্রভুর কথোপকথন ॥ ১৯০ ॥
হেনকালে শ্রীসুরেন্দ্র মিত্র ভক্তবর ।
করিলেন উত্থাপন সবার গোচর ॥ ১৯১ ॥
জন্মতিথি শ্রীপ্রভুর রক্ষণ করিবারে ।
যথাবিধি মাঙ্গলিক বিধিসহকারে ॥ ১৯২ ॥
মঙ্গল-বিধান-কাজে আনন্দ সবার ।
নিজব্যয়ে করিলেন সুরেন্দ্র যোগাড় ॥ ১৯৩ ॥
জন্মোৎসব শ্রীপ্রভুর প্রভু অবতারে ।
প্রধান উৎসব এই সবার উপরে ॥ ১৯৪ ॥
দ্বাদশ বিঘায় ছায়া দেয় যেই তরু ।
আদিতে বালির মত বীজ তার সুরু ॥ ১৯৫ ॥
ক্রমে পরে জন্মোৎসব প্রভুর আমার ।
যেমন আনন্দ তেন বিরাট ব্যাপার ॥ ১৯৬ ॥
দরশনে অশান্তির শান্তি-নিকেতন ।
সুরেন্দ্র করিলা তার বীজ সংরোপণ ॥ ১৯৭ ॥
শ্রদ্ধাসহকারে এই মহোৎসবে যোগ ।
যে করে নিশ্চয় তার ছাড়ে ভব-রোগ ॥ ১৯৮ ॥
ধন্য ধন্য শ্রীসুরেন্দ্র অতুল ভুবনে ।
ত্রাণের নূতন পন্থা দিলা জীবগণে ॥ ১৯৯ ॥
উৎসব প্রথম বর্ষে হইল কেমন ।
অবিদিত সেই হেতু বলিতে অক্ষম ॥ ২০০ ॥
পর বৎসরের কথা কর অবধান ।
জন্মোৎসব
শ্রীপ্রভুর মাঙ্গলিক গান ॥ ২০১ ॥
প্রভুভক্ত রাম দত্ত দলের সর্দার ।
উৎসব-পিয়ারা
হেন কেহ নহে আর ॥ ২০২ ॥
প্রচারে প্রথম জন মাহাত্ম্য প্রভুর ।
উদ্যম উৎসাহ শক্তি
শরীরে প্রচুর ॥ ২০৩ ॥
অকুতোসাহস তেজ ধরে হৃদিমাঝ ।
যাহাতে একাকী করে সহস্রের কাজ ॥ ২০৪ ॥
উচ্চকণ্ঠে জনে জনে হাটে বাটে গায় ।
জীর্ণ-শীর্ণ-দুর্বলের ত্রাণের উপায় ॥ ২০৫ ॥
কে কোথায় আয় আর নাহি কর দেরি ।
মূর্তিমান রামকৃষ্ণ পারের কাণ্ডারী ॥ ২০৬ ॥
জানা কি অজানা জনা যেথা পান যারে ।
ধরিয়া লইয়া যান দক্ষিণশহরে ॥ ২০৭ ॥
কাকুতি মিনতি কত প্রভুর সদনে ।
আগন্তুকগণে কিছু কৃপাকণাদানে ॥ ২০৮ ॥
আবদার বড় তাঁর নিকটে প্রভুর ।
প্রার্থনা করিলে প্রায় তখনি মঞ্জুর ॥ ২০৯ ॥
লীলার সকল কাজে রাম আগুয়ান ।
উৎসব যেখানে সেথা রামের বিধান ॥ ২১০ ॥
রামকৃষ্ণোৎসবানন্দ রামের মতন ।
দোসর লীলায় নাই হয় দরশন ॥ ২১১ ॥
প্রভুকে লইয়া লোক একত্রিত করা ।
রামের প্রকৃতি এই দেখি আগাগোড়া ॥ ২১২ ॥
ভবনে উৎসবে ব্যয় ভয় নাহি প্রাণে ।
সংসারেতে নিরাসক্ত কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ২১৩ ॥
স্বার্থশূন্যে কর্মমালা সমুদায় প্রাণ ।
হেন আর কেহ নাই রামের সমান ॥ ২১৪ ॥
ভবনে ভক্তের মেলা আছে অনিবার ।
সেবা-আয়োজন তেন প্রীতি যাঁহে যাঁর ॥ ২১৫ ॥
ভক্তিমতী বিদ্যাশক্তি ভবনে ঘরণী ।
উচ্চমতি সেইমত যেইমত স্বামী ॥ ২১৬ ॥
পতির পশ্চাতে সদা ছায়ার মতন ।
আহারার্থী প্রভুভক্তে মায়ের যতন ॥ ২১৭ ॥
পদরেণু দোঁহাকার আশ করে দীনে ।
ভিক্ষা মতি রহে যেন ভক্তের চরণে ॥ ২১৮ ॥
প্রভুর জনমোৎসবে পেয়ে আস্বাদন ।
পর বরষেতে করে রাম আয়োজন ॥ ২১৯ ॥
সাহায্য করিলা কার্যে অর্থ করি দান ।
অন্ত অন্য গৃহী ভক্ত যাঁরা যোত্রমান ॥ ২২০ ॥
ভক্তেন্দ্র সুরেন্দ্র মিত্র চাটুয্যে কেদার ।
অতুল গিরিশ আর বসু জমিদার ॥ ২২১ ॥
দেবেন্দ্র মজুমদার বঙ্গজ ব্রাহ্মণ ।
শ্রীনবগোপাল ঘোষ শ্রীমনোমোহন ॥ ২২২ ॥
মুখুয্যে শ্রীকালিদাস কালীপদ ঘোষ ।
উদারতা-গুণে যাঁরে প্রভুর সন্তোষ ॥ ২২৩ ॥
বাসন্তী ফাল্গুনে শুক্লপক্ষ দ্বিতীয়ায় ।
যেই শুভ তিথিযোগে জন্মিলেন রায় ॥ ২২৪ ॥
উৎসবের দিন স্থির করিযা তখন ।
দ্রব্য আদি আয়োজনে রামের উদ্যম ॥ ২২৫ ॥
ঘোষণা করেন বার্তা শহরে বাহিরে ।
প্রভুভক্ত যে যেথায় কাছে কিবা দূরে ॥ ২২৬ ॥
শ্রীমন্দিরে পুরীমধ্যে যেখানে গোসাঁই ।
শুভকর্ম-সম্পাদনে নির্ধারিত ঠাঁই ॥ ২২৭ ॥
জন্মোৎসব শ্রীপ্রভুর ভক্তদের দ্বারা ।
প্রথম আরম্ভ-পক্ষে সুরেন্দ্রই গোড়া ॥ ২২৮ ॥
ক্রমে পরে লীলা-ক্ষেত্রে প্রভু ভগবান ।
সভক্তে ধরায় যদবধি মূর্তিমান ॥ ২২৯ ॥
অন্য অন্য ভক্তদের পাইয়া সাহায্য ।
একা রাম করিতেন যাবতীয় কার্য ॥ ২৩০ ॥
যেমন সুন্দর রাম তেন ভক্তিবল ।
বুদ্ধি স্থির সুগম্ভীর দলের মোড়ল ॥ ২৩১ ॥
ল'য়ে প্রভু ভগবানে আপনার ঘরে ।
কত মহোৎসব রাম কৈল বারে বারে ॥ ২৩২ ॥
মহাতীর্থ সম গণি রামের প্রাঙ্গণ ।
স্বগণ সহিত যেথা প্রভুর কীর্তন ॥ ২৩৩ ॥
দুর্লভ প্রভুর ভক্তি অনায়াসে পায় ।
রামের প্রাঙ্গণ-রেণু যে ধরে মাথায় ॥ ২৩৪ ॥
শুভ জন্মোৎসবদিনে হেথা ভক্তবর ।
নানা দ্রব্য পরিমাণে বিস্তর বিস্তর ॥ ২৩৫ ॥
বোঝাই করেন নৌকা অতি প্রাতঃকালে ।
আয়োজনে কোন ত্রুটি নাহি এক তিলে ॥ ২৩৬ ॥
যথাকালে উপনীত দক্ষিণশহর ।
যেখানে বিরাজে প্রভু পরম ঈশ্বর ॥ ২৩৭ ॥
গগনে যখন বেলা প্রহরেক প্রায় ।
স্নানক্রিয়া সমাপন শেষ কৈলা রায় ॥ ২৩৮ ॥
অতি অল্প জলপান কর্ম তার পরে ।
শুনিবারে সংকীর্তন বসিলা আসরে ॥ ২৩৯ ॥
উত্তরের বারাণ্ডায় ঠাঁই পরিসর ।
ভক্তগণে যেইখানে সাজান আসর ॥ ২৪০ ॥
খোল-করতাল-সহ কীর্তনের গান ।
শুনামাত্র শ্রীপ্রভুর উঠিল তুফান ॥ ২৪১ ॥
লীলারসাস্বাদে প্রেমে অন্তর বিহ্বল ।
কীর্তনে আখর যোগ করেন কেবল ॥ ২৪২ ॥
আখরের কি মাধুরী নহে কহিবার ।
ক্রমশঃ আবেশ অঙ্গে প্রভাবে যাহার ॥ ২৪৩ ॥
বিশেষ প্রকৃতি এক আবেশের ধারা ।
শক্তি ছুটে মত্ত যাহে হয় দর্শকেরা ॥ ২৪৪ ॥
সংক্রামক সেই শক্তি বড়ই প্রখরা ।
সকলে আকৃষ্ট হয় কাছে রহে যারা ॥ ২৪৫ ॥
আবেশের পরে মহা সমাধি গভীর ।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি-সহ ইন্দ্রিয়াদি স্থির ॥ ২৪৬ ॥
এখন শ্রীঅঙ্গে কিবা মাধুরী উদয় ।
উপলব্ধি দরশনে বলিবার নয় ॥ ২৪৭ ॥
চাঁদের কিরণমালা বদন কমলে ।
কখন বা ঘন কভু মন্দ মন্দ খেলে ॥ ২৪৮ ॥
গোটা অঙ্গে কান্তি-ছটা ভুবনে অতুল ।
যেমন শ্রীপ্রভুদেব রূপের পুতুল ॥ ২৪৯ ॥
অপরূপ রূপ সেই রূপের তুলনা ।
সৃষ্টিতে কোথাও তার নাই অণুকণা ॥ ২৫০ ॥
বিশ্ববিমোহিনীরূপ রূপ উপমায় ।
আগোটা সৃষ্টির রূপ সে রূপে লুকায় ॥ ২৫১ ॥
ভাগ্যবান যেবা রূপ নেহারে নয়নে ।
যতদিন রহে হেথা দেহের ধারণে ॥ ২৫২ ॥
পারে না ভুলিতে রূপ কখনই আর ।
অন্য যত রূপে বুঝে তিমির আঁধার ॥ ২৫৩ ॥
চর্মচক্ষু-শক্তিযোগে সে রূপ কে দেখে ।
যদি না দেখিতে জানে হৃদয়ের চোখে ॥ ২৫৪ ॥
ঠামে রূপে অপরূপ প্রভুর গড়ন ।
রক্ত-মাংস-গড়া দেহে না দেখি এমন ॥ ২৫৫ ॥
একরূপ শ্রীপ্রভুর নয়নের কোণে ।
সে অতি আশ্চর্য রূপ রূপের বিধানে ॥ ২৫৬ ॥
জালের প্রকৃতি ঠিক সে রূপের ধারা ।
যে দেখে জন্মের মত সেই পড়ে ধরা ॥ ২৫৭ ॥
আর এক কিবা রূপ তুলা নাহি তার ।
যেরূপ রক্তিমাধরে প্রভুর আমার ॥ ২৫৮ ॥
আধারের শোভা বৃদ্ধি হাসি তাহে যবে ।
যে দেখে জন্মের মত একেবারে ডুবে ॥ ২৫৯ ॥
এখন সমাধি-বেগে বাহ্যজ্ঞান দূর ।
রূপময় কলেবর রূপের ঠাকুর ॥ ২৬০ ॥
সুযোগ সময় ভক্তে পাইয়া এখন ।
পরাইল প্রভুদেবে সুন্দর বসন ॥ ২৬১ ॥
অতি মিহি দেশী ধূতি নয় হস্ত প্রায় ।
আরক্ত বরণ ঘোর লাল পাড় তায় ॥ ২৬২ ॥
সুন্দর চাঁপার বর্ণে ছোবান সেখানি ।
ছোবাইয়া দিয়াছেন রামের ঘরণী ॥ ২৬৩ ॥
মনোহর ফুলহার পরাইল গলে ।
শ্বেত চন্দনের বিন্দু ললাটে কপালে ॥ ২৬৪ ॥
সুবিশাল বক্ষঃস্থলে কিরূপ শোভন ।
চরণযুগলে পরে করিল লেপন ॥ ২৬৫ ॥
চরণে চন্দন-রেখা কিবা শোভমান ।
নয়নের মনোলোভা শোভার নিদান ॥ ২৬৬ ॥
কুসুমের হার আর চন্দন ঘষিয়ে ।
গৌর মা আনিয়াছিল প্রভুর লাগিয়ে ॥ ২৬৭ ॥
রূপের শোভার প্রভু একে তো আপনি ।
তাহার উপরে ভক্তে করিলা সাজনি ॥ ২৬৮ ॥
রূপময় ঠাম এবে রূপের উপর ।
অপরূপ দেখে যত ভকতনিকর ॥ ২৬৯ ॥
আনন্দে বিভোর ফুল মন প্রাণ চিত্ত ।
দু-হাত তুলিয়া কেহ কেহ করে নৃত্য ॥ ২৭০ ॥
ভীমভাবে-নাচে কেহ করতালি দিয়া ।
রোলসহ লম্ফে কেহ মাটি কাঁপাইয়া ॥ ২৭১ ॥
প্রেমেতে বিহ্বল কেহ ধরণী লুটায় ।
কেহ বা ঢলিয়া পড়ে অপরের গায় ॥ ২৭২ ॥
কেহ বা বদনে ভুলে হাসির ফোয়ারা ।
কেহ বা স্তম্ভিত যেন পুতুলের পারা ॥ ২৭৩ ॥
কীর্তন নাহিক আর সংকীর্তন সায় ।
সবে মিলে খালি মাত্র এক ধুয়া গায় ॥ ২৭৪ ॥
গগন
করিয়া ভেদ উচ্চরোল উঠে ।
খুলীর আঙ্গুল ফোলে চাপড়ের চোটে ॥ ২৭৫ ॥
দেখিয়া তুমুল কাণ্ড প্রভু নারায়ণ ।
করিলেন আপনার শক্তি সম্বরণ ॥ ২৭৬ ॥
প্রভু সম্বরিলে শক্তি নিজের ভিতর ।
প্রকৃতিস্থ ক্রমে ক্রমে ভকতনিকর ॥ ২৭৭ ॥
প্রভুর অবস্থা কিবা শুনহ এখন ।
শ্রীঅঙ্গেতে সমুদিত বাহ্যিক চেতন ॥ ২৭৮ ॥
শ্রীপ্রভু গলার মালা ধরিয়া দুহাতে ।
ছিন্ন ছিন্ন করি তায় ফেলিলা তফাতে ॥ ২৭৯ ॥
মুছিলা বসন দিয়া চন্দনের রেখা ।
ললাটে কপালদেশে যত ছিল লেখা ॥ ২৮০ ॥
কিন্তু প্রভু মুছিবারে না পাইলা লাগ ।
চরণযুগলে যত চন্দনের দাগ ॥ ২৮১ ॥
শুন তবে বলি কথা কারণ তাহার ।
শ্রীপদে প্রভুর নাই কোন অধিকার ॥ ২৮২ ॥
শ্রীঅঙ্গের সঙ্গে রহে শ্রীপ্রভুর সনে ।
চিরকাল ভক্তদের তাঁর মাত্র নামে ॥ ২৮৩ ॥
গুপ্ত-অবতার প্রভু বড় রূপ-চোরা ।
ভক্তের নিকটে কিন্তু অবিরত ধরা ॥ ২৮৪ ॥
চন্দনালঙ্কার রক্ষা করিয়া শ্রীপায় ।
অবিশ্বাসী জীবে সাক্ষা দিলা প্রভুরায় ॥ ২৮৫ ॥
শুন গীত গায় মূর্খে মহাভাগ্যবান ।
রামকৃষ্ণায়ন কথা অমৃত-সমান ॥ ২৮৬ ॥
সংকীর্তনে
লীলারস করি আস্বাদন ।
ভক্তসহ প্রকৃতিস্থ এবে নারায়ণ ॥ ২৮৭ ॥
এখন অনেক বেলা প্রভুর ভোজনে ।
দেখিয়া ভকতবর্গ চমকিত মনে ॥ ২৮৮ ॥
ছাড়িয়া কীর্তনাসর ত্বরান্বিত যান ।
করিবারে শ্রীমন্দিরে ভোজনের স্থান ॥ ২৮৯ ॥
থরে থরে পাত্রে পাত্রে দ্রব্য নানা জাতি ।
কত তার তালিকায় নাহি হয় ইতি ॥ ২৯০ ॥
অগ্রভাগ সকলের একপাত্রে যোগ ।
লইয়া জনৈক ভক্ত সাজাইলা ভোগ ॥ ২৯১ ॥
সকলে রাখিয়া অগ্রে করিতে ভোজন ।
শ্রীপ্রভুদেবের নহে কোনকালে মন ॥ ২৯২ ॥
সেই হেতু কাছে দূরে লয়ে ভক্তগণে ।
প্রভুদেব রামকৃষ্ণ বসিলা ভোজনে ॥ ২৯৩ ॥
একত্তরে সবে কিন্তু স্বতন্তর স্থান ।
বর্ণভেদ রক্ষা করা প্রভুর বিধান ॥ ২৯৪ ॥
ভোজনের সঙ্গে নানা কথোপকথন ।
রঙ্গ রসভাষ হাস্য না যায় বর্ণন ॥ ২৯৫ ॥
চতুর্বিধ রসে যেন পরিতৃপ্তোদর ।
সেইমত চক্ষু কর্ণ ইন্দ্রিয়নিকর ॥ ২৯৬ ॥
সমভাবে সকলের তৃপ্তি দিয়া রায় ।
বরষের জন্মোৎসব করিলেন সায় ॥ ২৯৭ ॥
রহিতে নারিনু মুই না করি বাখান ।
পরবর্ষে জন্মোৎসবে মুই ভাগ্যবান ॥ ২৯৮ ॥
প্রভুর কৃপায় কিবা কৈনু দরশন ।
অবধান ভক্তিসহ কর তুমি মন ॥ ২৯৯ ॥
উৎসবের কাজে যেন বৎসর বৎসর ।
উদ্যোগের রহে ভার রামের উপর ॥ ৩০০ ॥
বর্তমান বরষের রামে আছে ভার ।
সাধারণ ব্যয়ে আয়োজনের যোগাড় ॥ ৩০১ ॥
ধামায় ধামায় মুড়্কি প্রতুল প্রতুল ।
রসেতে প্রস্তুত যেন সাদা জুঁই ফুল ॥ ৩০২ ॥
হাঁড়িতে হাঁড়িতে দধি চিনি দিয়া পাতা ।
বর্ণিবার নাহি তার আস্বাদের কথা ॥ ৩০৩ ॥
হাঁড়ি হাঁড়ি রসমুণ্ডি বাটুল আকার ।
বিস্তর বিস্তর মণ্ডা সন্দেশ ছানার ॥ ৩০৪ ॥
কাঁদি কাঁদি চাঁপা কলা সেরা বাজারের ।
এ কয়েক দ্রব্য খালি পরিমাণে ঢের ॥ ৩০৫ ॥
শ্রীপ্রভুর উপযুক্ত ভোগের কারণ ।
রামের কর্তৃক যাহা দ্রব্য আয়োজন ॥ ৩০৬ ॥
পাতি তার কি তুলিব দুঃখী জনা আমি ।
পণদরে
তাহাদের নাম নাহি জানি ॥ ৩০৭ ॥
মিঠা ফল মিষ্টি মেওয়া নানাবিধ তার ।
শহরেতে যাহা মিলে কিছু কিছু তার ॥ ৩০৮ ॥
স্বতন্তর পাত্রে পাত্রে বিভিন্ন আধারে ।
শ্রীমন্দিরে রাখিবার স্থানে নাহি
ধরে ॥ ৩০৯ ॥
ক্রমে ক্রমে পরে পরে প্রভুভক্তগণ ।
একে একে যথাকালে দেন দরশন ॥ ৩১০ ॥
তার
সঙ্গে দলে দলে আসে একত্তরে ।
শ্রদ্ধা ভক্তি রাখে যারা প্রভুর উপরে ॥ ৩১১ ॥
প্রভুর
চরণপ্রিয় প্রভুভক্ত যারা ।
আজি দিনে সকলেই অতি মাতোয়ারা ॥ ৩১২ ॥
ভাবে গদগদ তনু না সরে বচন ।
পরস্পরে পরস্পরে কথোপকথন ॥ ৩১৩ ॥
হেসে হেসে ঠারে-ঠোরে নয়ন-হিল্লোলে ।
সোনা সোহাগার সঙ্গে যেন পড়ে গলে ॥ ৩১৪ ॥
মন্দিরাভ্যন্তরে তার বাহির প্রাঙ্গণে ।
আনাগোনা পাছু পাছু শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৩১৫ ॥
প্রভু সঙ্গে সবে যবে মত্ততর মন ।
আসিয়া গিরিশ ঘোষ দিলা দরশন ॥ ৩১৬ ॥
নানা রসে সুরসিক বুদ্ধি সুগম্ভীর ।
ভক্তির প্রেমের রাজা বিশ্বাসের বীর ॥ ৩১৭ ॥
নয়ন-বিনোদ-ঠাম আনন্দোদ্দীপক ।
তাঁর সঙ্গ-সম্ভোগেতে সকলের সখ ॥ ৩১৮ ॥
ভক্ত-সমাগম-স্থলে উচ্চতর রঙ্গ ।
গিরিশের সম্মিলনে উত্তাল তরঙ্গ ॥ ৩১৯ ॥
যেমন কলের তরী আসিয়া জুটিলে ।
কানে কান জাহ্নবীর জোয়ারের জলে ॥ ৩২০ ॥
টলমল সকলেই দেখিয়া তাহায় ।
আনন্দে উথলা-হৃদি হইলেন রায় ॥ ৩২১ ॥
পূর্বাস্যে শ্রীপ্রভুদেব লীলার ঈশ্বর ।
দাঁড়াইয়া পূর্বদিকে দ্বারের উপর ॥ ৩২২ ॥
ঠামে ভাবে শ্রীঅঙ্গের প্রকৃতি তখন ।
সুসরল-মতি এক বালক যেমন ॥ ৩২৩ ॥
দেখিয়া গিরিশচন্দ্র হাসি ভরা মুখে ।
উপনীত ত্বরান্বিত প্রভুর সম্মুখে ॥ ৩২৪ ॥
রঙ্গের কারণে প্রশ্ন করিলেন রায় ।
গিরি ধরে কৃষ্ণচন্দ্র এত শক্তি গায় ॥ ৩২৫ ॥
কিন্তু যবে নন্দরানী সোহাগের ভরে ।
গোপালে কহেন পিঁড়ি আনিবার তরে ॥ ৩২৬ ॥
লঘুকলেবর পিঁড়ি কাঠের তৈয়ারি ।
যেবা ধরে গোবর্ধন তার পক্ষে নুড়ি ॥ ৩২৭ ॥
ভক্তপ্রিয় ভগবান নন্দের দুলাল ।
যশোদার কাছে ঠিক দুধের গোপাল ॥ ৩২৮ ॥
বাৎসল্যে পুরিতান্তরা নন্দরানী মায় ।
পিঁড়ি দিতে কৃষ্ণচন্দ্র হেন ভাবে যায় ॥ ৩২৯ ॥
রঙ্গে ভঙ্গে চারিদিকে হেলিয়ে হেলিয়ে ।
ভারি যেন কাঠাসন গোবর্ধন চেয়ে ॥ ৩৩০ ॥
গিরিশের কথা শুনি প্রভু গুণধর ।
ভক্তবরে করিলেন তাহার উত্তর ॥ ৩৩১ ॥
সুমধুর হাস্যসহ কিবা অপরূপ ।
এই ঠিক কথা এবে চুপ শালা চুপ ॥ ৩৩২ ॥
ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর লীলার প্রসঙ্গ ।
কিংবা লীলা-রসাস্বাদে দোঁহাকার রঙ্গ ॥ ৩৩৩ ॥
লিখিয়া কাহিনী তার কার সাধ্য বলে ।
আভাস প্রকাশ খালি ঠারে-ঠোরে চলে ॥ ৩৩৪ ॥
এক ঠারে এক বর্ণে এত বিবরণ ।
তুলনায় কোটি বেদ কোটি কোটি কম ॥ ৩৩৫ ॥
উপস্থিত ঘটনাতে মুই ভাগ্যবান ।
প্রভুর কৃপায় ক্ষেত্রে ছিন্ন বিদ্যমান ॥ ৩৩৬ ॥
কানে যা শুনিনু চক্ষে কৈনু দরশন ।
হৃদয়ের পটে তাহা রহিলা লিখন ॥ ৩৩৭ ॥
তিল তার বলিবার ক্ষমতায় মরা ।
কে কবে স্মরিলে হই আপনারে হারা ॥ ৩৩৮ ॥
ভিতরে রহিল বাহ্যে না ফুটিল কথা ।
এবে শুন উৎসবের পশ্চাৎ বারতা ॥ ৩৩৯ ॥
স্নানের অধিক বেলা হইল যখন ।
বসিলেন গুণমণি শুনিতে কীর্তন ॥ ৩৪০ ॥
উত্তরের বারাণ্ডায় যেখানে আসর ।
লম্বে প্রস্থে আয়তনে স্থান পরিসর ॥ ৩৪১ ॥
কিঞ্চিৎ উত্তরে তার ফুলের বাগান ।
বিবিধ ফুলের গাছে অতি শোভমান ॥ ৩৪২ ॥
নিকটে পথের পাশে গণ্ডাদরে ঝাড় ।
বড় বড় গন্ধরাজ ফুলের সর্দার ॥ ৩৪৩ ॥
বড় ছোট বেলফুল দুই কাঠা প্রায় ।
গাছভরা ফুলকুল ফুটে আছে তায় ॥ ৩৪৪ ॥
বসন্তের সহচর অনিল শীতল ।
আমোদিত করে স্থান লয়ে পরিমল ॥ ৩৪৫ ॥
জনৈক বালকবয়ঃ মহাভাগ্যবান ।
কীর্তন গায়ক তেঁহ নরোত্তম নাম ॥ ৩৪৬ ॥
মিষ্ট গায় কৃষ্ণবর্ণ গায়ের বরণ ।
গেঁড়াপানা গোলমুখ উজ্জ্বল নয়ন ॥ ৩৪৭ ॥
তেথরি তুলসী-মালা গলদেশে করা ।
জাতিতে বৈষ্ণব তাই কীর্তন-ব্যবসা ॥ ৩৪৮ ॥
কালের গায়ক-মধ্যে সকলের শ্রেষ্ঠ ।
খুলীও বৈষ্ণব যেতে নাম তার গোষ্ঠ ॥ ৩৪৯ ॥
মধুর বাজায় খোল খোলে তুলে বুলি ।
যেমন গায়ক ঠিক তার মত খুলী ॥ ৩৫০ ॥
গায়কের সম্বন্ধেতে প্রভুর বচন ।
এই নরোত্তমে দেখি সেই নরোত্তম ॥ ৩৫১ ॥
বায়েনের সম্বন্ধেতে শ্রীপ্রভুর সায় ।
খোলে সিদ্ধ এই গোষ্ঠ খোল যে বাজায় ॥ ৩৫২ ॥
আগাগোড়া আজি ক্ষেত্রে দেখিবারে পাই ।
মহোৎসবে রাজসিক ভাব মোটে নাই ॥ ৩৫৩ ॥
কিন্তু যদি প্রভুদত্ত চক্ষু কেহ পায় ।
দেখিতে পাইবে ধ্রুব প্রভুর কৃপায় ॥ ৩৫৪ ॥
সমুদিত উৎসবে ঐশ্বর্য কোটি কোটি ।
তুলনায় যার সঙ্গে মহৈশ্বর্য মাটি ॥ ৩৫৫ ॥
আপনি আসরে প্রভু অখিল-ঈশ্বর ।
সঙ্গে পারিষদ-সাঙ্গ-উপাঙ্গ-নিকর ॥ ৩৫৬ ॥
ছদ্মবেশে সশরীরে দেবতার গণ ।
উৎসবেতে উপনীত শুনিতে কীর্তন ॥ ৩৫৭ ॥
প্রেমিক গায়ক এক বৈষ্ণবের ছেলে ।
যে জন বায়েন গোষ্ঠ সিদ্ধ তেঁহ খোলে ॥ ৩৫৮ ॥
ব্রহ্মবারিবাহী সুরতরঙ্গিণী-তীর ।
পুণ্যময়ী ভূমি যেথা বৈঠক পুরীর ॥ ৩৫৯ ॥
মরি কি মাধুরী তার না যায় বর্ণন ।
ধরার মাঝারে যেন গোলক ভুবন ॥ ৩৬০ ॥
যেইখানে সংগোপনে রাজা মহারাজ ।
শক্তিসহ লীলাপর প্রভুর বিরাজ ॥ ৩৬১ ॥
নরপুরে নররূপে নরের মতন ।
চিনিবার সাধ্যকার ব্রহ্মাদির ভ্রম ॥ ৩৬২ ॥
আগোটা সৃষ্টির চক্ষে নিক্ষেপিয়া ধুলা ।
সংগোপনে কালমত সুমধুর লীলা ॥ ৩৬৩ ॥
এবে উৎসবের কাণ্ড করহ শ্রবণ ।
মিষ্ট কণ্ঠে নরোত্তম ধরিল কীর্তন ॥ ৩৬৪ ॥
প্রেমিকের মুখে শুনি লীলা-গুণ-গান ।
আবেশাঙ্গ হইলেন প্রেমের নিধান ॥ ৩৬৫ ॥
কীর্তনে আখর যোগ আবেগের ভরে ।
যাহে কীর্তনের কায়া বৃদ্ধি পরে পরে ॥ ৩৬৬ ॥
লীলা-রস-সুধা পানে মত্ত ভক্তগণ ।
দর্শকেরা বুদ্ধিহারা মানুষ যেমন ॥ ৩৬৭ ॥
যে যেখানে সেইভাবে সে সেখা তেমতি ।
মুগ্ধপ্রাণমনে হেরে প্রভুর মূরতি ॥ ৩৬৮ ॥
অতুল আনন্দভোগ করে সর্বজন ।
নরেন্দ্র এহেন কালে দিলা দরশন ॥ ৩৬৯ ॥
নয়ন বিনোদ ঠাম বালক বয়সে ।
আসরে বসিলা আসি শ্রীপ্রভুর পাশে ॥ ৩৭০ ॥
ষোলকলা পূর্ণ চাঁদে করি নিরীক্ষণ ।
রতন-আকর নিজে সাগর যেমন ॥ ৩৭১ ॥
ফুলাইয়া জলকায়া মহান্ উল্লাসে ।
আপনার জলে যায় আপনিই ভেসে ॥ ৩৭২ ॥
সেইমত প্রভুদেব প্রেমের সাগর ।
নিরখিয়া নরেন্দ্র নয়নানন্দকর ॥ ৩৭৩ ॥
প্রেমের উত্তাল ঊর্মি তুলিয়া প্রবল ।
লক্ষ দিয়া উঠিলেন হৃদয় বিহ্বল ॥ ৩৭৪ ॥
নরেন্দ্রের ঊরুদেশে দক্ষিণ চরণ ।
শ্রীকরকমলদ্বয়ে কুন্তল ধারণ ॥ ৩৭৫ ॥
সমাধিস্থ ভগবান মনোহর ঠামে ।
প্রেমের পুতুল যেন গলে পড়ে প্রেমে ॥ ৩৭৬ ॥
শ্রীবয়ানে সেই কান্তি লাবণ্য উজ্জ্বল ।
কাঞ্চনে যেমন বর্ণ যখন তরল ॥ ৩৭৭ ॥
অরূপে রূপের ছবি সুন্দর এমন ।
কভু নাহি দেখি শুনি শ্রীপ্রভু যেমন ॥ ৩৭৮ ॥
বিরাজে শ্রীঅঙ্গে রূপ পরম সুন্দর ।
তেন ভাবে ঊর্মি যেন জলের উপর ॥ ৩৭৯ ॥
স্থির অঙ্গ যবে রূপ দেখা নাহি মিলে ।
উঠিলে ভাবের বায় তবে অঙ্গে খেলে ॥ ৩৮০ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে রূপরাশি বহে সংগোপন ।
জ্বলদের মধ্যে রাজে বিজলি যেমন ॥ ৩৮১ ॥
রূপের পার্থক্য ভাব শ্রীঅঙ্গের সনে ।
সে বুঝে স্বেচ্ছায় তিনি দেখান যে জনে ॥ ৩৮২ ॥
বাহ্যিকে না মিলে রূপরাশির সন্ধান ।
পুঁথি দিল শ্রীপ্রভুর রূপ-চোরা নাম ॥ ৩৮৩ ॥
রূপচোরা বাঁকা-আঁখি রক্তিম-অধর ।
এই তিন নাম গান পুঁথির ভিতর ॥ ৩৮৪ ॥
ভুবনমোহনরূপ লীলার প্রাঙ্গণে ।
দেখাইয়া দেন ধরা নিজ জনগণে ॥ ৩৮৫ ॥
মায়ায় মোহিত সবে ইচ্ছায় তাঁহার ।
কখন আলোকমালা কখন আঁধার ॥ ৩৮৬ ॥
শরতের মেধছায়া দুপুর বেলায় ।
বৃহৎ প্রান্তর মধ্যে যেন দেখা যায় ॥ ৩৮৭ ॥
আনন্দের ধ্বনি তুলে ভকতের মালা ।
নিরখিয়া শ্রীপ্রভুর অপরূপ লীলা ॥ ৩৮৮ ॥
সেই প্রভু সেই তাঁরা আপনার জন ।
লীলাহেতু নররূপে ধরায় এখন ॥ ৩৮৯ ॥
বুঝিয়া আপন মনে রসাস্বাদ করে ।
রঙ্গরসভাষসহ ভকতনিকরে ॥ ৩৯০ ॥
হেথা
মত্তভাবে করে নরোত্তম গান ।
কিছু পরে শ্রীপ্রভুর ভাব-অবসান ॥ ৩৯১ ॥
প্রকৃতিস্থ হইয়া বসিলা নিজ স্থানে ।
পুনঃ প্রভু ভাবাবেশে কীর্তন শ্রবণে ॥ ৩৯২ ॥
পরিতৃপ্ত ভক্তবর্গ হইয়া যখন ।
নরোত্তম করিলেন গীত সমাপন ॥ ৩৯৩ ॥
শান্তি শান্তি পরিতৃপ্ত হইলা আসরে ।
চলিলেন রূপ-চোরা আপন মন্দিরে ॥ ৩৯৪ ॥
ভোজনের কার্য পরে ল'য়ে ভক্তগণ ।
মহানন্দে বাঁকা আঁখি করিলা ভোজন ॥ ৩৯৫ ॥
ভোজনান্তে অলসাঙ্গ কখনই নাই ।
ভক্তগণে ল'য়ে পুনঃ বসিলা গোসাঁই ॥ ৩৯৬ ॥
কথোপকথনে কত ঈশ্বরীয় কথা ।
কত অতি গুহাতর তত্ত্বের বারতা ॥ ৩৯৭ ॥
রামকৃষ্ণায়নে লীলা শ্রীপ্রভুর কথা ।
শ্রবণ-কীর্তনে ঘুচে মন-মলিনতা ॥ ৩৯৮ ॥
প্রেম-ভক্তি-দাতা প্রভু জগতের গুরু ।
মহারাজ দীন-সাজ বাঞ্ছাকল্পতরু ॥ ৩৯৯ ॥
প্রভুর দরজা খোলা যে লয় শরণ ।
পূর্ণভাবে মনসাধ করেন পুরণ ॥ ৪০০ ॥
অদ্ভুত ঘটনা কিবা হৈল অতঃপর ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা শান্তির আকর ॥ ৪০১ ॥
বয়স্কা রমণী এক মহাভাগ্যবতী ।
রতি মতি প্রভুপদে অপার ভকতি ॥ ৪০২ ॥
প্রশস্ত অবস্থা নহে দুঃখীর ধরন ।
ঘরে নাই কড়িপাতি মনের মতন ॥ ৪০৩ ॥
আজি শুভ জন্মোৎসবে প্রভুর কারণে ।
বাটিতে চারিটি মাত্র রসগোল্লা আনে ॥ ৪০৪ ॥
জনাকীর্ণ শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভু হেথায় ।
পশিতে নারিল নারী জাতীয় লজ্জায় ॥ ৪০৫ ॥
সেইহেতু বাটিসহ চলিল তখনি ।
যেখানে বিরাজমানা জগৎ-জননী ॥ ৪০৬ ॥
জন্মোৎসব দেখিবারে মন্দিয়ে মায়ের ।
উপনীতা
ভক্তিমতী কুলনারী ঢের ॥ ৪০৭ ॥
কাতর অন্তরে নারী নিবেদিল যায় ।
পাঠাইতে রসগোল্লা
শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ৪০৮ ॥
মাতা না কহিতে কথা উত্তর বচনে ।
উত্তর করিল তায় অন্য এক জনে ॥ ৪০৯ ॥
নানাবিধ দ্রব্যসহ প্রভুর ভোজন ।
হইয়া গিয়াছে আজি দিনের মতন ॥ ৪১০ ॥
পাঠাইলে রসগোল্লা তাঁহার সদনে ।
গ্রহণ হইবে কিনা সন্দ লাগে মনে ॥ ৪১১ ॥
এতই পাইল ব্যথা শুনিয়া সে বাণী ।
অন্তরে মাথায় যেন পড়িল অশনি ॥ ৪১২ ॥
কাতরে আকুলা নারী স্মরে প্রভুরায় ।
দাঁড়াইয়া আধোমুখে চিত্রার্পিত-প্রায় ॥ ৪১৩ ॥
এখানে অন্তরযামী ভক্তদের সনে ।
মহামত্ত ঈশ্বরীয় তত্ত্ব-আন্দোলনে ॥ ৪১৪ ॥
নারীর মরম-ব্যথা বুঝিয়া অন্তরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত মায়ের মন্দিরে ॥ ৪১৫ ॥
যেখানে মিষ্টির বাটি ধরিয়া রমণী ।
দাঁড়াইয়া যেন জড় দেহে নাহি প্রাণী ॥ ৪১৬ ॥
শ্রীকরকমলে বাটি লইয়া তখন ।
রমণীর মনসাধ করিতে পুরণ ॥ ৪১৭ ॥
প্রভুদেব হেনভাবে রসগোল্লা খান ।
অনাহারে যেন তাঁর গেছে দিনমান ॥ ৪১৮ ॥
কোটি কোটি দণ্ডবৎ রমণীর পায় ।
মিষ্টিতে যাঁহার তুষ্ট রামকৃষ্ণরায় ॥ ৪১৯ ॥
কেবা মানবিনী-বেশে দেবীঠাকুরাণী ।
নাম-ধাম এখানের কিছু নাহি জানি ॥ ৪২০ ॥
রমণীর বাঞ্ছা পূর্ণ করি প্রভুরায় ।
ভক্তসঙ্গে তত্ত্বালাপে বসিলা খট্টায় ॥ ৪২১ ॥
বিশ্বাস-ভক্তির বীর গিরিশ এখানে ।
প্রভুর বিচিত্র লীলা নেহারি নয়নে ॥ ৪২২ ॥
জানিতে বিশেষ তত্ত্ব চিত্ত সবিস্ময়ে ।
জিজ্ঞাসিলা এক কথা রূপচোরা রায়ে ॥ ৪২৩ ॥
ভাব তার তুমি প্রভু অধিল-ঈশ্বর ।
লীলা হেতু দীনবেশে ধরার উপর ॥ ৪২৪ ॥
হেন জন্মোৎসবে আজি রবে ত্রিভুবন ।
তাহা না হইয়া কেন এই কয় জন ॥ ৪২৫ ॥
তদুত্তরে ভক্তবরে উত্তরিলা রায় ।
কিঞ্চিৎ প্রকাশ বাক্যে বেশী ইশারায় ॥ ৪২৬ ॥
অর্থ তার ভবিষ্যতে এই জন্মোৎসবে ।
শিরভূয়া কতলোক এখানে আসিবে ॥ ৪২৭ ॥
অতিশয় গণ্যমান্ত খ্যাত্যাপন্ন তেজে ।
লুটাইতে ভক্তিভরে এখানের রজে ॥ ৪২৮ ॥
পরিহরি লীলা-ভূমি ধরার উপর ।
নিত্যধামে গিয়াছেন লীলার ঈশ্বর ॥ ৪২৯ ॥
ত্রয়োদশ বর্ষ মাত্র আর বেশী নয় ।
উৎসবে এখন আধ লক্ষ লোক হয় ॥ ৪৩০ ॥
গণ্যমান্য সবে কেহ রাজ-অধিরাজ ।
মার্কিন-বিলাতবাসী সাহেব ইংরাজ ॥ ৪৩১ ॥
যেখানে যে ভাবে যা বলিলা গুণমণি ।
পরে ঘটিবার কথা ভবিষ্যৎ বাণী ॥ ৪৩২ ॥
কেহ এবে প্রস্ফুটিত সহ শতদল ।
সঙ্গে বিশ্ব-বিনোদিনী গন্ধ পরিমল ॥ ৪৩৩ ॥
কেহ বা অর্ধেক ফুটা কেহ প্রায় ফুটে ।
কেহ জগমগে কলি মৃণালের বাঁটে ॥ ৪৩৪ ॥
কেহ বা পাঁকের কাছে অঙ্কুরে কেবল ।
যাহার উপরে ঢাকা বিশ বাঁশ জল ॥ ৪৩৫ ॥
লীলাক্ষেত্রে শক্তিরসে বীজ-সংরোপণ ।
বিশ্বের নিধনে নাই বীজের নিধন ॥ ৪৩৬ ॥
শুন রামকৃষ্ণায়ণ বিশ্বাসের ভরে ।
অন্ধকার তিরোহিত হইবে অচিরে ॥ ৪৩৭ ॥
নয়নগোচরে লীলা দেখিবে প্রত্যক্ষ ।
প্রভুর ইচ্ছায় কাজে সময়-সাপেক্ষ ॥ ৪৩৮ ॥
মাঙ্গলিক উৎসবের কথা হৈল সায় ।
পুণ্যবানে গুনে কথা ভক্তিমানে গায় ॥ ৪৩৯ ॥
সংসাসের দুঃখে সুখে পেতে দিয়া ছাতি ।
দিবানিশি মথ মন লীলাগুণগীতি ॥ ৪৪০ ॥
চতুর্থ খণ্ড
নবগোপাল ঘোষের বাড়িতে প্রভুর উৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
অদ্যাবধি ধরাধামে যত অবতার ।
প্রভু রামকৃষ্ণরায় সমষ্টি সবার ॥ ১ ॥
নানা ভাবে নানা মতে শিক্ষা নানা জনে ।
সব ধর্ম পথ মত তাঁহার বিধানে ॥ ২ ॥
ধর্ম-দ্বন্দ্ব নিবারণ ধর্মের সমতা ।
ধর্ম-সামঞ্জস্য ভাব ধর্মের একতা ॥ ৩ ॥
এই অভিনব পন্থা করিতে প্রচার ।
অবতীর্ণ ধরাধামে শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৪ ॥
কৃষ্ণ-অবতারে কথা প্রকাশ গীতায় ।
যে রূপে যে ভজে তিনি তেন ভজে তায় ॥ ৫ ॥
কথায় কথিত মাত্র লইল তখন ।
করমেতে কিঞ্চিন্মাত্র নহে প্রদর্শন ॥ ৬ ॥
কারণ জিজ্ঞাসা মন যদি কর তার ।
শুন কহি অতিশয় গুহ্য সমাচার ॥ ৭ ॥
বার বার বলিলেন প্রভু নারায়ণ ।
সময় সাপেক্ষ কর্মে অতি প্রয়োজন ॥ ৮ ॥
যখন তখন কার্য হইবার নয় ।
কার্য তবে উপযুক্ত আসিলে সময় ॥ ৯ ॥
শাস্ত্রের প্রমাণ আর স্বরূপনির্ণয়ে ।
এক অবতারে কথা রাখেন বলিয়ে ॥ ১০ ॥
ভবিষ্যবাণীর ন্যায় পরের বারতা ।
ভাবী অবতরণের কারণের কথা ॥ ১১ ॥
পূর্বকথামত কর্ম করিয়া পশ্চাৎ ।
লীলার প্রমাণ দেন অখিলের নাথ ॥ ১২ ॥
বলবৎ এত ধর্ম ছিল না তখন ।
কৃষ্ণ-অবতারে যবে কথার পত্তন ॥ ১৩ ॥
পশ্চাতে বিবিধ ধর্ম নানা পথ মত ।
তুলিবে প্রবল ভাবে ঝড় বলবৎ ॥ ১৪ ॥
বুঝিয়া জানিয়া তত্ত্ব বিশেষ প্রকারে ।
আভাস দিলেন তার গীতার ভিতরে ॥ ১৫ ॥
দেখ এবে নানাবিধ ধর্ম সম্প্রদায় ।
সকলে আপন ধর্মে শ্রেষ্ঠতম গায় ॥ ১৬ ॥
মহান্ কলহ-দ্বন্দ্ব বাদ-প্রতিবাদ ।
তত্ত্ব-অন্বেষক জনে ঘোর পরমাদ ॥ ১৭ ॥
কেবা সত্য কেবা মিথ্যা যায় কোন্ পথে ।
সন্দেহ-আতুর চিন্তা দিবারাতি চিতে ॥ ১৮ ॥
সত্যপথ প্রদর্শিতে তত্ত্বান্বেষী জনে ।
আর ধর্মরাজ্যে ধর্ম-দ্বন্দ্ব-বিভঞ্জনে ॥ ১৯ ॥
কালমত প্রভু রামকৃষ্ণ অবতার ।
করিলেন সার্বভৌম মতের প্রচার ॥ ২০ ॥
সার্বভৌম মতে তার বিশ্ব-বেড়া বেড় ।
স্থানীয় জাতীয় নহে গোটা জগতের ॥ ২১ ॥
ধর্মমাত্রে সকলেই পথ বাস্তবিক ।
কোনটি অলীক নহে সকলেই ঠিক ॥ ২২ ॥
এই ধর্ম প্রচারিলা প্রভু নারায়ণ ।
কার্যেতে আচরি সহ সাধনভজন ॥ ২৩ ॥
যে যে রূপে ভাবে নামে আরাধেন তাঁয় ।
সেই রূপে ভাবে নামে সেই তাঁরে পায় ॥ ২৪ ॥
ভাবে রূপে নামে নানা বস্তুগত নয় ।
উপমা ধরিয়া তত্ত্ব দিলা পরিচয় ॥ ২৫ ॥
বাপি কূপ তড়াগাদি সাগর নিচয় ।
হ্রদ নদী খাল বিল সব জলাশয় ॥ ২৬ ॥
আকারে গঠনে নামে প্রভেদ কেবল ।
কিন্তু সকলের মধ্যে সেই এক জল ॥ ২৭ ॥
বালিশ শয্যার সজ্জা অপর উপমা ।
আকারে গঠনে বর্ণে বাস্তবিক নানা ॥ ২৮ ॥
ব্যবহার বিশেষেতে নাম স্বতন্তর ।
কিন্তু সেই এক তুলা সবার ভিতর ॥ ২৯ ॥
তেন এক ভগবান সকলের মাঝে ।
বিকাশে বিবিধ নাম নানাবিধ সাজে ॥ ৩০ ॥
যত ধর্ম তত পথ জগতে প্রকাশ ।
সকলেতে সেই এক বস্তুর বিকাশ ॥ ৩১ ॥
রামকৃষ্ণপন্থিগণে বুঝেন বারতা ।
লীলাধর্ম শ্রীপ্রভুর ধর্মের সমতা ॥ ৩২ ॥
এইখানে এক কথা কর অবধান ।
ধর্মমাত্রে ভেদ নাই সকলে সমান ॥ ৩৩ ॥
কিন্তু ভাব-বিশেষেতে আছয়ে পার্থক্য ।
ধর্মে এক কিন্তু ভাবে নাহি হয় ঐক্য ॥ ৩৪ ॥
প্রত্যেকের মধ্যে ভাবে আলাহিদা রয় ।
তাহাতে কখন কার ক্ষতি নাহি হয় ॥ ৩৫ ॥
বরঞ্চ পোষ্টাই করে প্রত্যেক ভাবীকে ।
গোপনে আপন ভাব যেবা করে রক্ষে ॥ ৩৬ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর উপমার কথা ।
পল্লীতে রাখালদের গোচারণ-প্রথা ॥ ৩৭ ॥
জল খাইবার বেলা গগনে যখন ।
নিজ নিজ গরু ছাড়ে রাখালের গণ ॥ ৩৮ ॥
ক্রমে পরে একত্তরে সকলেই জমে ।
বৃহৎ প্রান্তর মাঠ গোচারণ-ভূমে ॥ ৩৯ ॥
তখন পার্থক্য ভাব নাহি রহে আর ।
সব পাল সঙ্গে মিলে হয় একাকার ॥ ৪০ ॥
কিন্তু ঘরে ফিরিবারে সময় যখন ।
পৃথক করিয়া আনে নিজের গোধন ॥ ৪১ ॥
ধর্মমেলা যেইখানে সেথা একত্তরে ।
ভাবেতে পার্থক্য শ্রেয়ঃ আপনার ঘরে ॥ ৪২ ॥
এই ভাব-সমর্থনে শ্রী প্রভুর গীত ।
অবধান কর তত্ত্ব বুঝিবে নিশ্চিত ॥ ৪৩ ॥
প্রভুর অভয় পদ ধরিয়া অন্তরে ।
অটল অচল রহ আপনার ঘরে ॥ ৪৪ ॥
গীত
"আপনাতে আপনি থেক' মন যেও নাকো কার ঘরে,
যা চাবি তা বসে পাবি খোঁজ নিজ
অন্তঃপুরে ।
পরম ধন সে পরশমণি, যা চাবি তা দিতে পারে,
কত মণি পড়ে আছে আমার
চিন্তামণির নাচদুয়ারে ॥"
একেশ্বর যদবধি না হয় ধারণা ।
তদবধি তত্ত্ববোধে রহে মহা হানা ॥ ৪৫ ॥
সাধন-ভজন-কর্মে নাহি অধিকার ।
এক-জ্ঞান ভিন্ন রহে বহু-জ্ঞান যাঁর ॥ ৪৬ ॥
উপদেশে বলিলেন প্রভু ভগবান ।
সর্বাগ্রে আঁচলে বাঁধি অদ্বৈতগিয়ান ॥ ৪৭ ॥
পশ্চাতে করহ কর্ম যেন লয় মন ।
বে-তালে কখনও পদ হবে না পতন ॥ ৪৮ ॥
অদ্বৈতগিয়ান মানে এক-জ্ঞান সার ।
লক্ষ বুড়ি রকমারি বিকাশ তাহার ॥ ৪৯ ॥
ব্রজগোপিনীর বাক্যে বুঝহ বারতা ।
যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে কৃষ্ণ ঘুরে সেথা ॥ ৫০ ॥
বেদান্তের বাক্যে আর ভাবে গোপিকার ।
ভিন্ন নাই উভয়েই একই প্রকার ॥ ৫১ ॥
নানা মতে পথে ঠিক একই প্রকৃতি ।
বিচ্ছেদ-যাতনাতুরা কহেন শ্রীমতী ॥ ৫২ ॥
আপনে শ্রীকৃষ্ণজ্ঞানে সহচরীগণে ।
কোথা চূড়া বাঁশি মোর ত্বরা দেহ এনে ॥ ৫৩ ॥
আর কথা বলিলেন প্রভু ভগবান ।
বহুজ্ঞান অজ্ঞান গিয়ান এক-জ্ঞান ॥ ৫৪ ॥
এক-জ্ঞান একেশ্বর অথিলের রাজ ।
নানা ভাবে নামে রূপে সর্বত্রে বিরাজ ॥ ৫৫ ॥
দেখাইলে প্রভুদেব দেখিবে সুস্পষ্ট ।
সকলের মূলে মোর প্রভু রামকৃষ্ণ ॥ ৫৬ ॥
একমাত্র বস্তু তিনি জগতে কেবল ।
সকলেতে তিনি আর তাঁহাতে সকল ॥ ৫৭ ॥
সকল ধর্মের ভাব আছে এ লীলায় ।
ধর্ম-দ্বেষী জনে তুষ্ট নন প্রভুরায় ॥ ৫৮ ॥
লীলা দেখিবারে সাধ যদি রহে মনে ।
যেরূপ যে নামে যেবা ভজে ভগবানে ॥ ৫৯ ॥
সাকারে কি নিরাকারে যেন রুচি তার ।
তে সবার পদে করি কোটি নমস্কার ॥ ৬০ ॥
শ্রদ্ধা ভক্তি ভালবাসা ভক্তি সহকারে ।
চলিলে বাসনা পূর্ণ হইবে অচিরে ॥ ৬১ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা লীলার আকর ।
সকল লীলার তত্ত্ব ইহার ভিতর ॥ ৬২ ॥
যেইরূপ রত্নাকর জলধির মাঝ ।
যাবতীয় রত্নরাজি সবার বিরাজ ॥ ৬৩ ॥
কতিপয় ভক্ত-সঙ্গে লীলার আসরে ।
যাহা করিলেন প্রভু লীলা কই তারে ॥ ৬৪ ॥
শুন সেই লীলা-কাণ্ড প্রভুর আমার ।
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬৫ ॥
বিবিধ প্রভুর ভাব এবার লীলায় ।
বিশেষিয়া বিবরণ বলা বড় দায় ॥ ৬৬ ॥
কেমনে কহিব খুঁজে নাহি পাই পথ ।
ভাবের স্বভাবে দেখি দুটি বলবৎ ॥ ৬৭ ॥
প্রথম প্রকাশ্যভাবে জীবের মতন ।
দীনহীন দ্বিজবেশে কঠোর সাধন ॥ ৬৮ ॥
সর্ব ঠাঁই শিক্ষাপ্রার্থী বিনীত-আচার ।
যারে তারে সকলেরে আগে নমস্কার ॥ ৬৯ ॥
সীমাহীন সহিষ্ণুতা অনন্তের চেয়ে ।
বসুন্ধরা লাজে মাটি তিতিক্ষা দেখিয়ে ॥ ৭০ ॥
একবারে আত্মসুখমাত্রে বিসর্জন ।
আজীবন প্রাণপণে সত্যের পালন ॥ ৭১ ॥
জননীর প্রতি ভক্তি অতুল জগতে ।
ত্যজি মান মান-দান শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতে ॥ ৭২ ॥
উচ্চ শ্রদ্ধা-প্রদর্শন সাধু-ভক্ত জনে ।
পদে পদে দয়া ক্ষমা বিচারবিহীনে ॥ ৭৩ ॥
পূর্ণাবতারের ভাবে রাজরাজেশ্বর ।
দাসী সম শক্তি-সঙ্গে সদা আজ্ঞাপর ॥ ৭৪ ॥
প্রতিবাক্যে প্রতিপদে মহৈশ্বর্য ফুটে ।
অবিদ্যা কম্পিতকায়া আসিতে নিকটে ॥ ৭৫ ॥
সরল শরণাপন্নে দয়ার নিধান ।
যে যা চায় তাই তায় তৎক্ষণে দান ॥ ৭৬ ॥
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর দুয়ারে প্রহরী ।
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ যেথা ছড়াছড়ি ॥ ৭৭ ॥
ন্যায়বান দয়াবান রতন-আসনে ।
দেখি দূরে দাসে যাঁর কম্পমান যমে ॥ ৭৮ ॥
উচ্চতম তত্ত্বজ্ঞান সদা শ্রীবদনে ।
লোলুপ অর্জ্জন যার বর্ণেক-শ্রবণে ॥ ৭৯ ॥
গভীর সমাধিপর কথায় কথায় ।
বাহ্যহারা নাড়ী-ছাড়া জড় পারা রায় ॥ ৮০ ॥
শুনিয়াছি শ্রীবদনে প্রভু সেই ভাবে ।
খেলিতেন মীনবৎ সিন্ধুনীরে ডুবে ॥ ৮১ ॥
এ সকল সিন্ধু যেন খালি ভরা জলে ।
পরিপূর্ণ সেই সিন্ধু কারণ-সলিলে ॥ ৮২ ॥
অনন্ত শয্যায় যেখা ভাসে নারায়ণ ।
পদপ্রান্তে লক্ষ্মী করে চরণ সেবন ॥ ৮৩ ॥
ঈষৎ আমিত্ব তাঁর রহে এ সময়ে ।
পুনরাগমন হয় যাহার আশ্রয়ে ॥ ৮৪ ॥
যাবতীয় ভাবে রূপে প্রভু অলঙ্কৃত ।
প্রভুভক্ত বিনে নহে অপরে বিদিত ॥ ৮৫ ॥
প্রভুভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গ পূজ্য সবাকার ।
যাঁহাদের সঙ্গে খেলা হৈল এইবার ॥ ৮৬ ॥
হেন প্রভুভক্তপদে রাখি রতি মতি ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৮৭ ॥
বাদুড়বাগানে ঘর শ্রীনবগোপাল ।
প্রায় পঞ্চাশের কাছে স্বভাবে ছাবাল ॥ ৮৮ ॥
সরল অন্তর যেন সেই মত মন ।
সর্বদা সহাস্য মুখ তাহার লক্ষণ ॥ ৮৯ ॥
সোনার সংসার ঘরে ভার্যা গুণবতী ।
যাঁহার ভক্তির বলে পতির উন্নতি ॥ ৯০ ॥
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব ভক্তের ভবনে ।
প্রায় প্রতি রবিবারে এখানে সেখানে ॥ ৯১ ॥
মহাভাগ্যবান তেঁহ জনম ধরায় ।
সভক্তে ভবনে যাঁর ভিক্ষা কৈলা রায় ॥ ৯২ ॥
গোপালের মনের সাধ হৈল এইবারে ।
করিবারে মহোৎসব আপনার ঘরে ॥ ৯৩ ॥
প্রভুর কৃপায় কিছু নাহি অনটন ।
টাকাকড়ি রাগ-ভক্তি সুসরল মন ॥ ৯৪ ॥
মনের বাসনা ব্যক্ত প্রভুর নিকটে ।
একদিন গোপাল কহিলা করপুটে ॥ ৯৫ ॥
আনন্দে মগন মন প্রভুদেব রায় ।
ভাল ভাল বলিয়া গোপালে দিলা সায় ॥ ৯৬ ॥
মহামহোৎসবপ্রিয় রাম ছিলা কাছে ।
শুনিয়া আনন্দে মত্ত ধিয়া ধিয়া নাচে ॥ ৯৭ ॥
উৎসবের দিন স্থির করিয়া তখন ।
ভক্তবর্গে চারিদিকে বারতা প্রেরণ ॥ ৯৮ ॥
এই মহোৎসবে যাহা করিলা গোসাঁই ।
এমন কোথাও আমি চক্ষে দেখি নাই ॥ ৯৯ ॥
কথা তার বলিবার শক্তি মম কিবা ।
বলিতে করিলে চেষ্টা আগে হই বোবা ॥ ১০০ ॥
বুদ্ধিহারা আঁকিবার প্রয়াস যখন ।
স্ব-অঙ্গে অঙ্গুলি হয় কাঠির মতন ॥ ১০১ ॥
লীলার মাহাত্ম্যখেলা অব্যক্ত ব্যাপার ।
নয়নের ভোগ্য যোগ্য নহে রসনার ॥ ১০২ ॥
ঘটনাতে বর্ণনীয় যত দূর হয় ।
একমনে শুন মন বলি পরিচয় ॥ ১০৩ ॥
গোপাল আনন্দভরে মনের মতন ।
মহোৎসব হেতু করে দ্রব্য আয়োজন ॥ ১০৪ ॥
পরিবারবর্গমধ্যে দেখে কেবা ধুম ।
রাত্রিতে কাহার চক্ষে নাহি আসে ঘুম ॥ ১০৫ ॥
প্রতিবাসী জনে জনে শুনিল সবাই ।
গোপালের আবাসেতে আসিবে গোসাঁই ॥ ১০৬ ॥
সচকিতে রহে সবে কুতুহল মনে ।
শ্রীপ্রভুর চরণারবিন্দ-দরশনে ॥ ১০৭ ॥
কি পুরুষ কিবা নারী হোক যে রকম ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে সকলের মন ॥ ১০৮ ॥
কি জানি কি মোহনত্ব শ্রীনামেতে রয় ।
শুনিলে শ্রবণে সাধ দরশনে হয় ॥ ১০৯ ॥
প্রভুদরশনে-সাধ নহে যে জনার ।
লইয়া মানব-জন্ম বৃথা জন্ম তার ॥ ১১০ ॥
নির্ধারিত দিন তবে আসিল যখন ।
বেলাবেলি ভক্তবর্গ দেন দরশন ॥ ১১১ ॥
মহা-উৎসবের ঠাঁই বাহির প্রাঙ্গণে ।
ভাগবত করে পাঠ জনেক ব্রাহ্মণে ॥ ১১২ ॥
শত শত জনে পরিপূর্ণ নিকেতন ।
ভাগবতলীলাপাঠ করেন শ্রবণ ॥ ১১৩ ॥
শ্রবণ কেবল নামে মন নাহি তায় ।
সবে ভাবে কতক্ষণে আসিবেন রায় ॥ ১১৪ ॥
কেহ কেহ পথপানে আছে নিরখিয়া ।
পরিহরি পাঠস্থান দ্বারে দাঁড়াইয়া ॥ ১১৫ ॥
প্রভু বিনা কারও না হয় মন স্থির ।
কি পুরুষ কিবা নারী সকলে অধীর ॥ ১১৬ ॥
মন মোহনিয়া হেন প্রভুর মতন ।
জগতে কোথাও নাহি হয় দরশন ॥ ১১৭ ॥
কিবা মোহনত্ব-শক্তি ভিতরে তাঁহার ।
তিল আধ তত্ত্বশক্তি নাহি বর্ণিবার ॥ ১১৮ ॥
গুণযুক্ত নামহীন সেই বস্তুখানি ।
আপনার কলেবরে ধরে দিনমণি ॥ ১১৯ ॥
নলিনী প্রভাবে যার হইয়া মোহিত ।
বিকাশি কেশর-দল হয় প্রফুল্লিত ॥ ১২০ ॥
গুণমণি গুণের ঠাকুর প্রভুরায় ।
গুণ করি খুন কৈলা যে দেখিল তাঁয় ॥ ১২১ ॥
মোহনত্ব-গুণ নহে কেবল শরীরে ।
নামেরও সহিত গুণ ছায়াবৎ ঘুরে ॥ ১২২ ॥
শ্রবণ-বিবরে নাম প্রবেশের দ্বার ।
পশিলে অন্তরে করে জোর অধিকার ॥ ১২৩ ॥
চক্ষু কিবা কর্ণ হোক যে পথে গমন ।
একমাত্র ধর্ম কর্ম চুরি-করা মন ॥ ১২৪ ॥
কানের দুয়ারে যেথা জোর সেথা ভারি ।
শতগুণে বৃদ্ধি গুণ মন করে চুরি ॥ ১২৫ ॥
ছাদের উপরে হেথা পথের দু-ধারে ।
নরনারী কত শত সংখ্যা কেবা করে ॥ ১২৬ ॥
দাঁড়াইয়া মহোৎসুকে কুতুহল মন ।
দেখিবারে প্রভুবরে পতিতপাবন ॥ ১২৭ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু বিশ্বগুরু রায় ।
উপনীত হেনকালে হইলা তথায় ॥ ১২৮ ॥
ভাসিল আগোটা পল্লী আনন্দের নীরে ।
নয়ন আনন্দকর প্রভুবরে হেরে ॥ ১২৯ ॥
চকোর ভকতবৃন্দ পরম উল্লাসী ।
নেহারিয়া প্রভুদেবে অকলঙ্ক শশী ॥ ১৩০ ॥
কথক একাকী ধরি শতেকের বল ।
করিতে লাগিল পাঠশ্রবণমঙ্গল ॥ ১৩১ ॥
পাঠেতে তথাপি কারও নাহি বসে মন ।
পিপাসী নয়নে করে রায়ে নিরীক্ষণ ॥ ১৩২ ॥
শ্রীমুরতি-দরশনে সকলের তৃপ্তি ।
কথক করিল তবে পাঠের সমাপ্তি ॥ ১৩৩ ॥
বনয়ারি নামেতে বৈষ্ণব একজন ।
দলে দলে ধরিলেন মাথুর-কীর্তন ॥ ১৩৪ ॥
কীর্তনে আখর-যোগ শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাহা ক্রমে প্রভু হন নিজে মাতোয়ারা ॥ ১৩৫ ॥
ঘন
ঘন ভাবাবেশ সমাধি গভীর ।
ইন্দ্রিয়াদিসহ একেবারে স্থির ॥ ১৩৬ ॥
সংক্রামকতা-শক্তি এক প্রভুর আবেশে ।
ভক্ত অভিভূত সব রহে যাঁরা পাশে ॥ ১৩৭ ॥
ঘূর্ণিপাক জলের স্বভাব উপমায় ।
যে আসে সকাশে ধ্রুব তাহায় ঘুরায় ॥ ১৩৮ ॥
প্রভুর ভাবের বেগে হইয়া মগন ।
ভাবস্থ হৈলা তবে ভক্ত কয়জন ॥ ১৩৯ ॥
বিষম লাটুর ভাব উদয় প্রবল ।
নখ দিয়া বিদারণ করে বক্ষঃস্থল ॥ ১৪০ ॥
কৃষ্ণেতে মধুর ভাব দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
উপলক্ষ গুরু মোর আরাধ্য-চরণ ॥ ১৪১ ॥
সখী নামে জানা তিনি ভক্তের ভিতরে ।
মগন হইলা ভাবে কালিয়া-পাথারে ॥ ১৪২ ॥
অল্পবয়ঃ মণি গুপ্ত বালক বয়েস ।
বাহ্যহীনে শ্যামকুণ্ডে করিল প্রবেশ ॥ ১৪৩ ॥
আর কেহ কাঁদে কেহ ভাবোন্মত্তপ্রায় ।
তিলেকে তুমুল কাণ্ড ঘটাইল রায় ॥ ১৪৪ ॥
বুদ্ধিহারা দর্শকেরা করে নিরীক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া জড়বৎ যষ্টির মতন ॥ ১৪৫ ॥
এখন প্রবল ভাব শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ।
যাহাতে উঠিল কণ্ঠে শ্রুতিমোহ সুর ॥ ১৪৬ ॥
আপনার ভাবে নিজে হইয়া মোহিত ।
ধরিলেন একখানি কীর্তনের গীত ॥ ১৪৭ ॥
বড়ই মধুর প্রাণ-মাতানিয়া গান ।
একত্রে ভক্তেরা তাহে কৈল যোগদান ॥ ১৪৮ ॥
সঙ্গে পেয়ে সাঙ্গোপাঙ্গ আপনার ঠাঁই ।
অধিক প্রমত্ততর হইলা গোসাঁই ॥ ১৪৯ ॥
গীতের সহিত নৃত্য সিংহের বিক্রম ।
লম্ফে ধরা কম্পমান ভীষণ গর্জন ॥ ১৫০ ॥
তাহার মধ্যেতে কভু কলেবর স্থির ।
বাহিক-গিয়ানশূন্য সমাধি গভীর ॥ ১৫১ ॥
কভু কান্তিময় মুখ চন্দ্রিমার পারা ।
কখন নয়নে বহে বরিষার ধারা ॥ ১৫২ ॥
কখন সঘনে পাণি কাঁপে ঘনে ঘন ।
কখন খসিয়া পড়ে কটির বসন ॥ ১৫৩ ॥
স্বরের জড়তা কভু বাক্য নাহি ফুটে ।
কখন বা উচ্চরব রসনায় উঠে ॥ ১৫৪ ॥
কভু পুনঃ ভীম নৃত্য পূর্বের মতন ।
একাধারে নানাবিধ ভাব-প্রদর্শন ॥ ১৫৫ ॥
ভক্তগণ কি রকম এমন সময় ।
শুন মন যথাসাধ্য কহি পরিচয় ॥ ১৫৬ ॥
কেহ বা অচল-পদ বাহ্য নাহি গায় ।
কেহ বা অর্ধেক বাঁকা ধনুকের প্রায় ॥ ১৫৭ ॥
কেহ বা উন্মক্ত আঁখি স্থির আঁখি-তারা ।
দাঁড়াইয়া একধারে বুদ্ধিবলহারা ॥ ১৫৮ ॥
কেহ পাগলের পারা ভীম হাস্য করে ।
সরোদনে লুটে কেহ ধরার উপরে ॥ ১৫৯ ॥
নাচিয়া নাচিয়া কেহ বলে হরি হরি ।
কেহ শ্রীচরণতলে যায় গড়াগড়ি ॥ ১৬০ ॥
রঙ্গের তুফান বৃদ্ধি ক্রমশই পায় ।
লীলারঙ্গরসপ্রিয় প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৬১ ॥
ভক্তগণ অনেকে অধীর-কলেবর ।
দলে দলে খালি পড়ে ভূমির উপর ॥ ১৬২ ॥
কদলীর ঝাড় যেইরূপ উপমায় ।
এক মুখে ধরাসাৎ হয় ঝঞ্ঝাবায় ॥ ১৬৩ ॥
প্রভুরায় কি করিলা শুন বিবরণ ।
যেখানে ভক্তের মালা ধুলায় পতন ॥ ১৬৪ ॥
প্রসারি দক্ষিণ পদ সেব্য কমলার ।
তদুপরি সমাধিস্থ হইলা আবার ॥ ১৬৫ ॥
প্রত্যাকৃতি ছবিখানি কি কহিব লিখে ।
যেমন দক্ষিণা-কালী মহেশ্বর বুকে ॥ ১৬৬ ॥
শ্রীঅঙ্গ পশ্চাতে হেলা পাছে পড়ে ছুঁয়ে ।
সেহেতু দু-জন ভক্ত ধরিলেন গিয়ে ॥ ১৬৭ ॥
এবে অপরূপ কিবা শ্রীমুখ প্রভুর ।
ঢলঢল ঝলমল যেমন মুকুর ॥ ১৬৮ ॥
কোমল
প্রশান্ত মূর্তি ধীরে ধীরে খেলে ।
নয়নের মনোলোভা দেখিলেই ভুলে ॥ ১৬৯ ॥
অন্তরালে ভক্তিমতী কুলবতীগণ ।
বারে বারে বন্দি আমি তাঁদের চরণ ॥ ১৭০ ॥
ভুবনমোহনরূপ নেহারি নয়নে ।
করিতে লাগিল শঙ্খ-নাদ ঘনে ঘনে ॥ ১৭১ ॥
বাহিরে কাঁসর-ঘণ্টা তার সঙ্গে বাজে ।
গোলোকের ছবি আজি অবনীর মাঝে ॥ ১৭২ ॥
ধন্য ধন্য নরসাজে লীলা ভাগবত ।
ধন্য ধন্য সাঙ্গোপাঙ্গ যতেক ভকত ॥ ১৭৩ ॥
ধন্য ধন্য জীবগণ কলিকাল ধন্য ।
যেই কালে রামকৃষ্ণরায় অবতীর্ণ ॥ ১৭৪ ॥
প্রভুর সমাধি-ভঙ্গ হৈলে ক্রমে ক্রমে ।
উপবিষ্ট হইলেন নিজের আসনে ॥ ১৭৫ ॥
প্রাঙ্গণে অত্যুচ্চাসন কোমল তেমন ।
কোমল কমলাদপি শ্রীঅঙ্গ যেমন ॥ ১৭৬ ॥
বসিয়া যখন প্রভু আসন-উপরে ।
শ্রীনবগোপাল তাঁয় পান দেখিবারে ॥ ১৭৭ ॥
মনোহর মূর্তিখানি আঁখি-বিমোহন ।
ঝলকে ঝলকে খেলে চাঁদের কিরণ ॥ ১৭৮ ॥
পরম সুন্দর রূপ ভুবনে অতুল ।
গোপাল দেখিয়া বুঝে নয়নের ভুল ॥ ১৭৯ ॥
সেইহেতু সকলের মুখপানে চায় ।
বিদ্যমান যাবতীয় আছিল সেথায় ॥ ১৮০ ॥
কাহারও বদনে নহে লাবণ্য তেমন ।
শ্রীমুখমণ্ডলে যাহা করে দরশন ॥ ১৮১ ॥
তথাপিও আঁখি ভ্রান্তি বিবেচনা করি ।
নয়নে সিঞ্চন করে সুশীতল বারি ॥ ১৮২ ॥
পাখালিয়া আঁথিদ্বয় হয় নিরীক্ষণ ।
শ্রীমুখমণ্ডলে ভাতি পূর্বের মতন ॥ ১৮৩ ॥
তখন হইয়া তেঁহ বিমুক্ত-সংশয় ।
সোদরে ডাকিয়া অতি ধীরে ধীরে কয় ॥ ১৮৪ ॥
বিস্ময়ে আবিষ্ট চিত্ত কর দরশন ।
প্রভুর মুখারিবিন্দে চাঁদের কিরণ ॥ ১৮৫ ॥
রূপচোরা ভক্তের ঠাকুর প্রভুরায় ।
ভক্তবিনা রূপ অন্যে দেখিতে না পায় ॥ ১৮৬ ॥
বার বার সহোদর চায় তাঁর পানে ।
দেখিতে না পায় রূপ প্রভুর বয়ানে ॥ ১৮৭ ॥
গোপালেরে কহিলেন সোদর তাঁহার ।
শ্রীবয়ানে কোনখানে রূপ চন্দ্রিমার ॥ ১৮৮ ॥
রূপ কি লাবণ্য ভাতি বদনমণ্ডলে ।
গন্ধ কি আভাস মোর নয়নে না মিলে ॥ ১৮৯ ॥
শুনি সোদরের কথা গোপাল তখন ।
প্রেমে করে দুনয়নে বারি বরিষণ ॥ ১৯০ ॥
ত্বরান্বিত অগ্রসর প্রভুর নিকটে ।
ধরিয়া যুগলপদ ধরাতলে লুটে ॥ ১৯১ ॥
প্রভুর স্বরূপ আজি করি দরশন ।
গোপাল বুঝিলা বেশ প্রভু কোন্ জন ॥ ১৯২ ॥
স্বার্থক জনম তাঁর ধরণীর তলে ।
ভক্তিমতিযুক্ত যেবা চরণকমলে ॥ ১৯৩ ॥
প্রহরেক প্রায় রাতি দেখিয়া এখন ।
ভোজনের কৈল ঠাই প্রভুর কারণ ॥ ১৯৪ ॥
সুন্দর দ্বিতলে এক ঘরের ভিতর ।
যেখানে করেন বাস মহিলা নিকর ॥ ১৯৫ ॥
এত কুলবতী আজি গোপালের ঘরে ।
সুবৃহৎ অন্তঃপুর তাহাতে না ধরে ॥ ১৯৬ ॥
প্রভুর দরশ-আশে গিয়াছে জুটিয়ে ।
আত্মীয়-কুটুম্বদের যাবতীয় মেয়ে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভুর অন্তরে বহে কি ভাব কখন ।
নাহিক কাহার সাধ্য করে নিরূপণ ॥ ১৯৮ ॥
অন্তঃপুরে আজি ভাব দেখিবারে পাই ।
পদ পরশিতে কারে না দিলা গোসাঁই ॥ ১৯৯ ॥
যদি পরশন-আশে কেহ কাছে যায় ।
মা বলিয়া সমাধিস্থ তখনই রায় ॥ ২০০ ॥
গুটাইয়া পদদ্বয় কোলের ভিতরে ।
শঙ্কায় সান্নিধ্যে কেহ যাইতে না পারে ॥ ২০১ ॥
ব্যাপার দেখিয়া তবে গোপাল ঘরণী ।
প্রার্থনা করেন মনে জুড়ি দুই পাণি ॥ ২০২ ॥
কৃপাসিন্ধু দীনের ঠাকুর তুমি রায় ।
শ্রীচরণরেণু আজি কাঙ্গালিনী চায় ॥ ২০৩ ॥
ভক্তিমতী ভাগ্যবতী সরল-অন্তরা ।
পদরজ-হেতু ভক্তে দেখিয়া কাতরা ॥ ২০৪ ॥
অন্তরে
অন্তরে প্রভু দিলা তাঁরে সায় ।
গ্রহণ করহ রজ ইচ্ছা যেন যায় ॥ ২০৫ ॥
গৃহিণী আশ্বাস-বাক্য পাইয়া তখন ।
লইল চরণ-রজ ধরিয়া চরণ ॥ ২০৬ ॥
কিবা ভাগ্য গৃহিণীর পরিসীমা নাই ।
যাঁহারে এতেক কৃপা করিলা গোসাঁই ॥ ২০৭ ॥
শুন তার পরে কি হইল পরিচয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি শান্তির আলয় ॥ ২০৮ ॥
অটল বিশ্বাস-ভক্তি পাইয়া এখন ।
প্রকাশ্যে প্রার্থনা করে প্রভুর সদন ॥ ২০৯ ॥
পুরাইয়া দেহ সাধ বড় মনে মনে ।
নিজ হাতে দিব ভোজ্য তুলিয়া বদনে ॥ ২১০ ॥
বচনে উত্তর কিছু নাহি দিলা রায় ।
অন্তরে প্রদান কৈলা অনুমতি তাঁয় ॥ ২১১ ॥
তখন গৃহিণীদেবী মহানন্দমনে ।
স্বহস্তে তুলিয়া ভোজ্য দিলেন বদনে ॥ ২১২ ॥
পুলকে আকুল-চিত্ত চক্ষু ভাসে জলে ।
প্রভুদেবে জ্ঞান যেন পেটে-ধরা ছেলে ॥ ২১৩ ॥
ভক্তির মধুর তত্ত্ব কি কহিতে পারি ।
সামান্য মানুষ মুই নরবুদ্ধি ধরি ॥ ২১৪ ॥
ইচ্ছাময় সনাতন হরি তথা বশ ।
উদয় যেথায় ভক্তি-মাধুর্যের রস ॥ ২১৫ ॥
ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব একেবারে নাশ ।
যেখানে তাঁহার শুদ্ধাভক্তির বিকাশ ॥ ২১৬ ॥
ষড়ৈশ্বর্যবান বিষ্ণু ভক্তির নিকটে ।
জড়সড় আজ্ঞাপর সদা করপুটে ॥ ২১৭ ॥
ভক্তির মাধুর্য-রস আস্বাদন-হেতু ।
সর্বশক্তিমান সদা সশঙ্কিত ভীতু ॥ ২১৮ ॥
ভক্তির কোমল হাতে বাঁধা ভগবান ।
অখণ্ড সচ্চিদানন্দ শিশুর সমান ॥ ২১৯ ॥
বেদবিধি কর্মকাণ্ড কিছু নাহি রয় ।
ভক্তির সৌরভ যেথা অণুকণা বয় ॥ ২২০ ॥
গোপ-গোপী বিনা এই ভক্তির সন্ধান ।
সম্ভোগ সুদূর কারও নহে অনুমান ॥ ২২১ ॥
আজি সেই ভক্তিরস-আস্বাদের তরে ।
মূর্তিমান ভগবান গোপালের ঘরে ॥ ২২২ ॥
মানবিনী বেশে কেবা গোপাল-ঘরণী ।
সাধ্য নাই চিনি তাঁয় দৃষ্টিহীন আমি ॥ ২২৩ ॥
প্রভুভক্তপদে ভিক্ষা মাগি বারবার ।
রজ দিয়া কর মুক্ত লোচন-আঁধার ॥ ২২৪ ॥
একমাত্র শুদ্ধাভক্তি বলে যায় জানা ।
প্রভুর সমান প্রভু-ভক্তের মহিমা ॥ ২২৫ ॥
লীলা-গীতি ঈশ্বরের সে বুঝে কেবল ।
ভক্তপদরেণু যার সহায় সম্বল ॥ ২২৬ ॥
প্রেমাভক্তি শুদ্ধাভক্তি ভক্তে করি দান ।
ভক্তির আস্বাদে মত্ত হন ভগবান ॥ ২২৭ ॥
নিম্নতলে যেইখানে ভকতের দল ।
ভক্তির ঠাকুর হয়ে ভাবেতে বিহ্বল ॥ ২২৮ ॥
দেবেন্দ্র প্রভৃতি সাঙ্গ-অন্তরঙ্গে কন ।
ভক্তিমতী গোপালের গৃহিণী কেমন ॥ ২২৯ ॥
বলিবারে বিবরণ বিশেষ প্রকারে ।
বিহ্বল এতই মুখে বাক্য নাহি সরে ॥ ২৩০ ॥
রসনার দ্বারে পথ না পেয়ে তখন ।
অধরে নয়নে চিত্র কৈলা প্রদর্শন ॥ ২৩১ ॥
ভক্তি-সম্ভোগের তত্ত্ব নিগূঢ় বারতা ।
ভাষায় প্রকাশে তায় হেন শক্তি কোথা ॥ ২৩২ ॥
সম্ভোগীর বদনের হাবভাবে কয় ।
আভাস কেবলমাত্র পরিচয় নয় ॥ ২৩৩ ॥
তরঙ্গ কোথায় বল প্রকাশিতে পারে ।
কত বড় সিন্ধু কিংবা কি তার ভিতরে ॥ ২৩৪ ॥
এই ভক্তি ভক্তের হৃদয়ে করে বাস ।
ভক্তের যে জন ভক্ত মুই তাঁর দাস ॥ ২৩৫ ॥
শুনি গৃহিণীর ভক্তি প্রভুর বদনে ।
নমস্কার উদ্দেশে করেন ভক্তগণে ॥ ২৩৬ ॥
এখানে গোপাল দেখি রাতি উর্ধ্বতন ।
ভক্তদের করিলেন ভোজন-আসন ॥ ২৩৭ ॥
চর্ব চুষ্য লেহ্য পেয় চতুর্বিধ রসে ।
গোপাল করিল তুষ্ট ভক্তগণে শেষে ॥ ২৩৮ ॥
ত্রুটি নাই আয়োজনে বহু আমদানি ।
ভক্তিমতী লক্ষ্মীরূপে ঘরের গৃহিণী ॥ ২৩৯ ॥
আজিকার ভিক্ষা-লীলা এইখানে সায় ।
ভক্তিমানে শুনে কথা ভক্তিমানে গায় ॥ ২৪০ ॥
রামকৃষ্ণকথা অতি শ্রবণ-মঙ্গল ।
স-মনে শুনিলে ফুটে হৃদয়-কমল ॥ ২৪১ ॥
চতুর্থ খণ্ড
শ্রীদেবেন্দ্রের গৃহে প্রভুর উৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভক্তি-বিবর্জিত স্থল,
এবে এই ধরাতল,
ধরাতল যেন রসাতলে ।
বিবেকী বিরাগী ভক্ত, বিশ্বাসে ঈশ্বরাসক্ত,
কোটিতে জনেক নাহি মিলে ॥ ১ ॥
ধনধান্যে রত্বে ভরা, হাহাকার বসুন্ধরা,
দিশাহারা যত জীবগণ ।
মত্তচিত্ত নিরবধি, দ্বেষ-হিংসা পূর্ণ-হৃদি,
কামিনী-কাঞ্চনময় মন ॥ ২ ॥
নিকেতন দেহ পুরে, বন্ধ মন লিঙ্গোদরে,
নাহি উঠে নাভির উপর ।
আত্মসুখে অতিপ্রিয়, শ্রেয়োজ্ঞান যেবা হেয়,
নারকীয় রুচি প্রীতিকর ॥ ৩ ॥
হেনকালে কি বিচিত্র, প্রভুসঙ্গে
প্রভুভক্ত,
নরদেহ করিলা ধারণ ।
দিগ্ দিগন্তর থেকে, ক্রমে ক্রমে একে একে,
লীলাসরে দিলা দরশন ॥ ৪ ॥
প্রভু-ভক্ত যাঁরা যাঁরা, সকলেই বর্ণ-চোরা,
চেনা ধরা বড়ই বিষম ।
ছদ্মবেশে নরতনু, ভিতরে গোপন ভানু,
মায়ায় বরন আবরণ ॥ ৫ ॥
স্বতন্তর প্রকৃতিতে, মিলে না জীবের সাথে,
কর্মে ভাসে তাহার লক্ষণ ।
সাধ যদি দেখিবারে, লীলাগীতি ধীরে ধীরে,
ভক্তিভরে কর আন্দোলন ॥ ৬ ॥
প্রভু-পদে অনুরক্ত, দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ভক্ত,
অন্তরঙ্গ প্রভুর আমার ।
সখীভাব বলবতী, শ্রীকৃষ্ণের বুঝেন পতি,
ভারতী শুনহ চমৎকার ॥ ৭ ॥
স্বভাব সংরক্ষণ করা, প্রভুর প্রকৃতি-ধারা,
আগাগোড়া প্রত্যক্ষ লীলায় ।
তেই দেবেন্দ্রের সনে, সঙ্কেতে নয়ন-কোণে,
রসভাষ কথায় কথায় ॥ ৮ ॥
কিবা রঙ্গ মধুরের, জীবে নাহি জানে টের,
সে ভাব দুর্বোধ্য অতিশয় ।
সুগোপ্য কাহিনী তার, শক্তি নাহি বুঝিবার,
রিপুগ্রস্ত অন্তরাতিশয় ॥ ৯ ॥
গোপীভাব বুঝা শক্ত, গোপীগণে ভাব গুপ্ত,
গোপী-অঙ্গ রঙ্গ-স্থল তার ।
যেমন দামিনী-দ্যুতি, মেঘমধ্যে অবস্থিতি,
খেলে দুলে মেঘের সঞ্চার ॥ ১০ ॥
রহস্য কি বুঝা যায়, ব্রজগোপী নরকায়,
লয়ে শিরে ভাবের পশরা ।
অবতীর্ণ প্রভুসনে, লীলাঙ্গনে ধরাধামে,
কৃষ্ণ-প্রেমে চিত্ত মাতোয়ারা ॥ ১১ ॥
অধমে সদয় হয়ে, চরণে আশ্রয় দিয়ে,
লইয়া গেলেন যেই জন ।
যেইখানে গুণমণি, অনন্ত অখিলস্বামী,
এই সেই দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ॥ ১২ ॥
করুণা করিয়া যাঁর, হইবেন
কর্ণধার,
ধ্রুব তাঁর কৃষ্ণদরশন ।
অকুতঃসাহস প্রাণে, সাক্ষ্য দিব জনে জনে,
প্রভুদেবে করিয়া স্মরণ ॥ ১৩ ॥
লীলার ভারতীগুণে, সহজে বুঝিবে মনে,
দেবেন্দ্র আরাধ্য দেবতার ।
যশোদার নীলমণি, বৃন্দাবনচন্দ্র যিনি,
পরম হৃদয়-বন্ধু তার ॥ ১৪ ॥
ব্রাহ্মণ অযোত্রমান, দাস্যবৃত্তে গুজরান,
আয়ের অধিক প্রায় ব্যয় ।
দুঃখসুখে কাটে দিন, কখন ছাড়ে না ঋণ,
খরচে কাতর কিন্তু নয় ॥ ১৫ ॥
অভাবে আটক নয়, নানা কাজে নানা ব্যয়,
এবে সাধ অন্তরে উদ্ভব ।
আয়ে হোক হোক ঋণে, সভক্তে প্রভুরে এনে,
ভবনে করেন মহোৎসব ॥ ১৬ ॥
শ্রীচরণে জুড়ি কর, নিবেদিলা
ভক্তবর,
পুরাইতে মনের বাসনা ।
শুনি কন বিশ্বস্বামী, গরীব
ব্রাহ্মণ তুমি,
তোমারে একাজে করি মানা ॥ ১৭ ॥
বাক্যে মাত্র নিবারণ, কিন্তু যাহে হয় মন,
লক্ষণ প্রকাশে হাস্যাননে ।
ঋণ করি ঘৃত খাই, রহস্য করি গোসাঁই,
সায় দিলা উৎসবায়োজনে ॥ ১৮ ॥
আনন্দে উথলাচিত, দিন করি নির্ধারিত,
প্রত্যাগত আবাসে ব্রাহ্মণ ।
দ্রব্যজাত ধারে ঋণে, সাধ্যমত নিলা কিনে,
ভক্তগণে কৈলা নিমন্ত্রণ ॥ ১৯ ॥
রামকৃষ্ণোৎসবানন্দ, চাঁই ভক্ত রামচন্দ্র,
উৎসবের খবর পাইয়া ।
উল্লাসে উথলাচিত্ত, ধিয়া ধিয়া করে নৃত্য,
উর্ধ্ব দেশে দু-বাহু তুলিয়া ॥ ২০ ॥
উৎসবপিয়ারা হেন, ভক্তোত্তম রাম যেন,
এমন কেহই নহে আর ।
নিকেতনে দেবেন্দ্রের, যথা দিনে উৎসবের,
সকলের অগ্রে আগুসার ॥ ২১ ॥
ক্রমশঃ অপরে সবে, যোগ দিতে মহোৎসবে,
জুটিয়া পড়িল যথা ঠাঁই ।
সন্দেশ এমন কালে, উপনীত ভক্তদলে,
প্রায়াগত প্রেমের গোসাঁই ॥ ২২ ॥
মহানন্দময় ঠাম, যেই স্থলে
মূর্তিমান,
মহানন্দে ভাসে সেই স্থল ।
যেখানে ছিলেন যিনি, সবে দিয়া জয়-ধ্বনি,
হইলেন হরষে চঞ্চল ॥ ২৩ ॥
যেন নিধুকুঞ্জবনে, শাখিচুড়ে
বিহঙ্গমে,
উল্লাসে কুজন গীত গায় ।
দেখিয়া পুরবে শোভা, প্রত্যুষে অরুণ-আভা,
বিরঞ্জিত সুন্দর ছটায় ॥ ২৪ ॥
কেহ যান অগ্রে ছুটি, পরিহরি গৃহ বাটী,
তুষিবারে সতৃষ্ণ নয়নে ।
কাছে প্রতিবাসী যত, আড়ি পেতে অবস্থিত,
নেহারিতে অতুল চরণে ॥ ২৫ ॥
কিবা সবে ভাগ্যবান, হেলায় দেখিতে পান,
ভগবান নরদেহধারী ।
সৃষ্টিস্থিতিলয় যাঁর,
কটাক্ষেতে একবার,
বিধি বিষ্ণু শিব আজ্ঞাকারী ॥ ২৬ ॥
কেহ না চিনিল বটে, কাল-দড়ি গেল কেটে,
এড়াইল জঠর-জনমে ।
বিশ্বাসে পুরাণ কয়, পুনর্জন্ম
নাহি হয়,
বারেক শ্রীমুখ-দরশনে ॥ ২৭ ॥
দরশনে কিবা ফল,
নষ্ট ধর্মকর্মফল,
জন্ম জন্ম জন্মে পায় ত্রাণ ।
করুণার সঙ্গে সিন্ধু, উপমায় এক বিন্দু,
দীনবন্ধু অতি সত্য নাম ॥ ২৮ ॥
মুক্তি ত্রাণ বলে কারে, ব্যাপার ধরে না শিরে,
শুন অর্থ মধ্যে কত দূর ।
তুলনায় বুঝ কাণ্ড,
জন্ম জন্ম কারাদণ্ড,
হেলায় খালাস বেকসুর ॥ ২৯ ॥
দ্রবিয়া করুণ রসে, দীন সাজ ছদ্মবেশে,
আপনি আগত ভগবান ।
ন্যায়ের নিয়ম ছেড়ে, পাপী তাপী যাবে ভারে,
অকাতরে দিতে মুক্তিদান ॥ ৩০ ॥
হেথা উৎসবের স্থলে, প্রভুদেব প্রবেশিলে,
ভক্তবর্গ চরণে লুটান ।
প্রভুর অপার সুখ,
উল্লাসে প্রফুল্লমুখ,
জনে জনে কুশল শুধান ॥ ৩১ ॥
নিজাসনে উপবিষ্ট, ভক্ত-প্রাণ
রামকৃষ্ণ,
পশ্চিমাস্যে ঘরের ভিতর ।
নিদাঘ আগতপ্রায়, ব্যজন করিয়া
গায়,
সেবা করে ভকতনিকর ॥ ৩২ ॥
ভক্তসহ ভগবান, যেইখানে বিদ্যমান,
মহিমা-মাহাত্ম্য তথাকার ।
কন শুক বেদব্যাস, বর্ণনে বিফল আশ,
তাহে কি কহিব মুই ছার ॥ ৩৩ ॥
বিদ্যায় বর্ণের ফলা, কামিনীকাঞ্চন মালা,
পেটের জ্বালায়
দাস্যগিরি ।
অর্থ চিন্তা অনুক্ষণ, অবিদ্যা-মোহিত মন,
এ অধম দারুণ সংসারী ॥ ৩৪ ॥
হৃদয়ে মলার ভার, অভিমান অহঙ্কার,
রাগ-লোভ-রিপুর অধীন ।
আত্ম-সুখহেতু ঘুরি, দিবা কিবা বিভাবরী,
তম-অন্ধে অন্তর মলিন ॥ ৩৫ ॥
দেহি প্রভু দীননাথ, বিশ্বগুরু ভক্তসাথ,
দৃষ্টিপাত করি এ অধমে ।
শুদ্ধভক্তি শুদ্ধমতি, যাহে পাব আঁখি-ভাতি,
মাহাত্ম্য মহিমা দরশনে ॥ ৩৬ ॥
শ্রীপদে বিশ্বাস সহ, শুদ্ধ বুদ্ধি মন দেহ,
যাহার গোচর তুমি রায় ।
অনুরাগে গাব নাম, বাহ্যহীনে অবিরাম,
লুটাইয়া চরণ-তলায় ॥ ৩৭ ॥
দেবেন্দ্র-মন্দিরে আজ, জগতের মহারাজ,
বিরাজে গোপনে ভক্তসনে ।
কিবা বিষ্ণু কিবা ধাতা, কিবা শিব মুক্তিদাতা,
বারতা কেহই নাহি জানে ॥ ৩৮ ॥
কিবা বস্তু প্রভু-ভক্ত,
মহিমা স্বরূপ-তত্ত্ব,
কারা এঁরা কোথাকার জন ।
এত দিন পাছু পাছু, তিল না বুঝিনু কিছু,
তোমারে কহিব কিবা মন ॥ ৩৯ ॥
শুনিয়াছি শ্রীবদনে,
এই ভক্তগণ বিনে,
দিনে প্রভু দেখেন আঁধার ।
পরিচয়ে গুণ মন,
কি অধিক বিবরণ,
শ্রবণ করিবে তুমি আর ॥ ৪০ ॥
আজিকার লীলাগীত, সুমধুর
সুললিত,
শুদ্ধচিত নিশ্চিত শ্রবণে ।
তিল ক্রান্তি নাহি সন্দ, অন্তরে অপারানন্দ,
রতিমতি ভক্তের চরণে ॥ ৪১ ॥
উৎসবে কীর্তন-গীতি, ইহাই আছিল রীতি,
সম্প্রতি গায়ক একজন ।
দোঁহার নাহিক তার, এক খুলি বাজন্দার,
দোঁহে মিলি ধরিল কীর্তন ॥ ৪২ ॥
দলে নৈলে আট দশ, কীর্তনে না হয় রস,
দুই জনে কি করিবে গান ।
সেহেতু দোঁহার হয়ে, স্বরে স্বর মিলাইয়ে,
ভক্ত রাম কৈলা যোগদান ॥ ৪৩ ॥
ঠিক যেন পাঠশালে, যাবতীয় ছাত্র মিলে,
ষট্কে কড়া ঘোষে সমস্বরে ।
বুদ্ধিমান ঠিক কয়, বোকা যারা অতিশয়,
খালি তারা গণ্ডা-কড়া করে ॥ ৪৪ ॥
হেথা কিন্তু পরমেশ, তাহাতেই ভাবাবেশ,
হরিনাম শ্রবণে শুনিয়া ।
হেনকালে মহাতেজা, গিরিশ বিশ্বাসে রাজা,
উপনীত দিক্ বিজলিয়া ॥ ৪৫ ॥
নেহারিয়া ভক্তবরে, আনন্দ উঠিল
বেড়ে,
মোহন মুরতিাখনি তার ।
অল্প স্থান ছিল ঘরে, তাড়াতাড়ি সবে সরে,
দিলা তাঁরে ঠাঁই বসিবার ॥ ৪৬ ॥
আলো করি গোটা ঘর, উপবিষ্ট
ভক্তবর,
ভক্তিবলে অটল বিশ্বাসে ।
হেমকালে শুন রঙ্গ,
কীর্তন হইল ভঙ্গ,
প্রভু কিন্তু আছেন আবেশে ॥ ৪৭ ॥
গিরিশ করেন মনে, কল্পতরু
বিদ্যমানে,
হেন আর রব কত কাল ।
ভৈরবের আবস্থায়, ভূত প্রেত
কহে যায়,
এ তো বড় বিষম জঞ্জাল ॥ ৪৮ ॥
আবেশে হৃদয়চারী,
ভক্তপ্রাণ নরহরি,
উত্তর করিলা তাঁর প্রতি ।
আশ্চর্য হইবে লোকে, সময়ে তোমায় দেখে,
এত হবে তোমার উন্নতি ॥ ৪৯ ॥
যেন প্রভু ভাবাবেশে, প্রাণসম শ্রীগিরিশে,
দেখিতেছিলেন এতক্ষণ ।
নয়নে পলক আছে, সাধে বাজ পড়ে আছে,
সেই হেতু মুদিয়া নয়ন ॥ ৫০ ॥
পরম প্রসাদ-বাণী,
শুনি ভক্তচূড়ামণি,
অমনি প্রসারি দুই হাত ।
অতুল আনন্দভরে, অতি প্রীতি-সহকারে,
শ্রীচরণে কৈলা প্রণিপাত ॥ ৫১ ॥
কাটিছে আবেশ-নেশা, গায়ে বাহ্য ভাসা ভাসা,
অর্ধ-জাগা অর্থ-নিমগন ।
হেনকালে উপনীত,
অঙ্গে চিহ্ন চিত্রাঙ্কিত,
কর জনা গোসাঁই-ব্রাহ্মণ ॥ ৫২ ॥
মন্ত্র-ব্যবসায়ী তাঁরা, কটা
কটা আঁখি-তারা,
ছিটাফোঁটা অঙ্গে ভারি ভারি ।
শ্রীপ্রভুর ভক্তগণ,
দিয়া যোগ্য সম্ভাষণ,
বসাইলা নমস্কার করি ॥ ৫৩ ॥
কি ছিল তাদের মনে,
সুগোচর ভগবানে,
অনুমানে কি কহিব মন ।
এখানে প্রভুর দশা, শ্রীঅঙ্গে
আবেশ-নেশা,
ভক্তজনমন বিমোহন ॥ ৫৪ ॥
কহিলেন শ্রীগোসাঁই, আর লুচি
খাব নাই,
মধ্যে কিবা গূঢ়ার্থ ইহার ।
এত ভক্ত মহারাধ্য,
তখন বুঝিতে সাধ্য,
বুদ্ধিতে না আসিল কাহার ॥ ৫৫ ॥
গিরিশের বুদ্ধি মেলা, তেঁহ না পাইব তলা,
শুন কাই তাহার কারণ ।
এখন বুঝায়ে দিলে, ভেঙ্গে যায় গোটা লীলে,
সেই হেতু যতনে গোপন ॥ ৫৬ ॥
স্বভাব-সুলভ ধারা,
ভক্তমন চুরি করা,
মোহনিয়া মূরতি মধুর ।
করিলেই দরশন,
ঘরে না থাকিত মন,
আকর্ষণ শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ॥ ৫৭ ॥
কিবা অর্থ শ্রীবাক্যের, তখন কে করে টের,
কান্তি-রূপে মন গেছে গাড়া ।
অপার-জলধি-নীরে,
মগন হইলে পরে,
দূরে রহে তরঙ্গের সাড়া ॥ ৫৮ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গগণ যাঁরা, শ্রীবাক্যে কি ভাব
ভরা,
বুঝিতে অক্ষম সেইকালে ।
বাক্যের গুরুত্ব-গুণে, সতেজে প্রবেশি
কানে,
রহে গিয়া অন্তরের তলে ॥ ৫৯ ॥
শ্রীবাক্যে শ্রীপ্রভুদেবে, আভাস দিলেন এবে,
ভবিষ্যৎ লীলার ঘটনা ।
লীলা-নিধি যেবা মথে, সে দেখিবে বিধিমতে,
রতন মানিক মণি নানা ॥ ৬০ ॥
গোসাঁই-ব্রাহ্মণ হেথা,
শ্রীমুখে লুচির কথা,
বারবার করিয়া শ্রবণ ।
উঠিয়া চলিল ঘরে,
এই মনে মনে করে,
ভাল সাধু প্রভু নারায়ণ ॥ ৬১ ॥
কিছুক্ষণ পরে দেখি, উন্মীলিত
দুটি আঁখি,
প্রফুল্লিত কমল-বয়ান ।
নাহি আর ভাবাবেশ, সহজের মত
বেশ,
পূর্ণভাবে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৬২ ॥
দেবেন্দ্রের নিকেতনে, আজি উৎসবের দিনে,
লোকসংখ্যা অতিশয় কম ।
সেগুলি কেবল খালি, চিরসঙ্গ
যারে বলি,
উপ-অঙ্গ পাঁচ ছয় জন ॥ ৬৩ ॥
বিকালে পড়িল বেলা, যায় প্রায় রৌদ্র-জ্বালা,
তাপে তনু ঘর্মাক্ত সবার ।
হেনকালে ভগবানে, কুলপি দিলেন
এনে,
আস্বাদনে অতীব সুতার ॥ ৬৪ ॥
দ্রব্যটি প্রস্তুত কিসে,
মালাই নেবুর রসে,
মিশ্রিত তাহার মধ্যে চিনি ।
বরফে জমাট করা, টিনের
পাত্রেতে ভরা,
পরশিলে সুশীতল প্রাণী ॥ ৬৫ ॥
স্নিগ্ধকর দ্রব্য ঢের,
আছে বহু নিদাঘের,
ইহার মতন কেহ নয় ।
যতনে যোগাড় করি, করপদ্মে
দিয়া ধরি,
দিলা ভক্ত নিজ পরিচয় ॥ ৬৬ ॥
একেতো সুমিষ্ট দ্রব্য,
রসনার সুখসেব্য,
যেন প্রভু যোগ্য তাঁর মত ।
তাহে ভক্তিরসে মাখা, যেমন শ্রীচক্ষে
দেখা,
গুণমণি পুলকে পুর্ণিত ॥ ৬৭ ॥
উদর পুরিল দেখে, কিঞ্চিত
চাখিয়া মুখে,
ভক্তমধ্যে আজ্ঞা বিতরণ ।
দেবেন্দ্র লইয়া হাতে,
শ্রীপ্রভুর আজ্ঞামতে,
কৈলা মহাপ্রসাদ বণ্টন ॥ ৬৮ ॥
অতি অন্তরঙ্গ গণি,
মহেন্দ্র মাস্টার যিনি,
প্রভুপদপঙ্কজে ভ্রমরা ।
উলট পালট কোষে, মধু পিয়ে
শুষে শুষে,
মুখে নাই গুন্ গুন্ সাড়া ॥ ৬৯ ॥
কুলপি-প্রসাদে আজি,
সুমধুর কণ্ঠরাজি,
'এঙ্কোর' 'এঙ্কোর' রব করে ।
এঙ্কোরার্থ এই বটে,
প্রসাদ বড়ই মিঠে,
পুনরায় দাও কিছু মোরে ॥ ৭০ ॥
দেবেন্দ্র এমন কালে, হাসিয়া হাসিয়া বলে,
শ্রীগোচরে প্রভুর আমার ।
বেলা আর বড় নাই,
প্রস্তুত ভোজন ঠাঁই,
গাত্রোত্থান করুন এবার ॥ ৭১ ॥
শুনিয়া ভক্তের বাণী,
উঠিলেন গুণমণি,
চিন্তামণি ভক্তের ঠাকুর ।
ধীরে ধীরে গতিপথে, দেবেন্দ্র আছেন সাথে,
যেথায় দ্বিতলে অন্তঃপুর ॥ ৭২ ॥
প্রতিবাসী ললনারা, তৃষিত
চাতকী পারা,
বাড়ি ভরা আছেন তথায় ।
প্রভুদেবে নিরখিয়ে, একে একে যত মেয়ে,
প্রণাম করিলা রাঙ্গা পায় ॥ ৭৩ ॥
দেবেন্দ্র-ঘরণী যিনি, পতি
সেবাপরায়ণী,
পবিত্রচরিতা পতিব্রতা ।
পতিভক্তি চিতে পূর্ণ,
ইহসুখ-আশাশূন্য,
মহাপুণ্য শুনিলে বারতা ॥ ৭৪ ॥
ধ্যান পতি জ্ঞান পতি, ইষ্টভাব
পতি প্রতি,
দিবারাতি পতির সেবন ।
পতি বিনা নাহি জানা, দেবদেবী-আরাধনা,
কিংবা কোন ধরম করম ॥ ৭৫ ॥
বস্ত্রাবৃতা গোটা পায়,
প্রণমিলে রাঙা পায়,
তখন জানিলা অন্তর্যামী ।
স্বরূপ মূরতি তাঁর,
চিরদাসী আপনার,
লীলাপুরে দেবেন্দ্র-ঘরণী ॥ ৭৬ ॥
ভক্তিভরে দ্বিজকন্যে, করেছে প্রভুর
জন্যে,
নানাবিধ দ্রব্য ভোজনের ।
যাহে দিলা পরিচয়, এ কন্যা সামান্যা নয়,
এ সময় ঘরে মানুষের ॥ ৭৭ ॥
খাইতে খাইতে ভোজ্য, বিধিবিষ্ণু শিবপূজ্য,
ষড়ৈশ্বর্যবান গুণমণি ।
দেবেন্দ্রে ডাকিয়া কন, এ যে বাউলে ধরন,
ভক্তিমতী তোমার ঘরণী ॥ ৭৮ ॥
আহা কি সরলান্তরা, হৃদয় খোলার পারা,
ভোগ-আশা নাহি হৃদিপুরে ।
দিনেক সঙ্গেতে করি, লয়ে যেও কালীপুরী,
শ্রীমন্দিরে দক্ষিণশহরে ॥ ৭৯ ॥
ভক্তিপ্রিয় ভক্তবশ,
কহিতে ভক্তের যশ,
পুরিল উদর ভক্তিরসে ।
ভোজ্যমাত্র পাত্রে দেওয়া, হইল না আর খাওয়া,
গাত্রোত্থান হরিষে হরিষে ॥ ৮০ ॥
এখানে ব্যাকুল হয়ে, পথপানে আছে চেয়ে,
চিরভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গগণ ।
আসি পুনঃ কতক্ষণে,
কথামৃত বরিষণে,
করিবেন তৃপ্ত প্রাণমন ॥ ৮১ ॥
শ্রীবাক্য এতই মিঠে, শুনিয়া আশা না মিটে,
যত শুনে তত বাড়ে তৃষা ।
কর্মফলে বাড়ে কর্ম,
তেমতি কথার ধর্ম,
শুনিলে শ্রুতির বৃদ্ধি আশা ॥ ৮২ ॥
শুন কি হইল পরে, ভক্তদের সেবা
তরে,
ভোজন-আসন পাতা করি ।
দেবেন্দ্র সহাস্যানন, সবে কৈলা আবাহন,
অন্তরে আনন্দ বাড়াবাড়ি ॥ ৮৩ ॥
হেথা প্রভু বাঁকা-আঁখি, বালিশে আলিস রাখি,
পূর্বদিকে করিয়া শিয়র ।
বিশ্রামের তরে মাত্র,
উন্মীলিত দুটি নেত্র,
এক প্রান্তে গৃহের ভিতর ॥ ৮৪ ॥
সকলে যাইলে পরে, শ্রীঅঙ্গে কে সেবা করে,
সেইহেতু দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
করুণার নাহি ওর, চির
ইষ্টাকাঙ্ক্ষী মোর,
আমারে করিলা আবাহন ॥ ৮৫ ॥
বাহিরে আছিনু দূরে, হাতে পাখা দিয়া জোরে,
লইয়া চলিলা প্রভু-পাশ ।
প্রণিপাত দ্বিজোত্তমে, কত কৃপা এ অধমে,
শ্রীঅঙ্গেতে করিতে বাতাস ॥ ৮৬ ॥
ভক্তবর্গ কুতূহলে, অন্তঃপুরে
প্রবেশিলে,
পদ-প্রান্তে দুই শ্রীপ্রভুর ।
আর এক ভাগ্যবান, ছিল তথা বিদ্যমান,
নাম তাঁর উপেন্দ্র ঠাকুর ॥ ৮৭ ॥
ভয়ে মুই ভেবাচেকা, ডানি হাতে করি পাখা,
ধীর ধীর সুমন্দ চালনে ।
পাছে বায়ু বেশী বয়, শ্রীঅঙ্গে নাহিক
সয়,
কোমল এতই পরিমাণে ॥ ৮৮ ॥
ভক্তের করুণা-বলে, যা না মিলে তাই মিলে,
আজি মুই বসিয়া কোথায় ।
শ্রীচরণতলে তাঁর,
বিধি পঞ্চানন যাঁর,
যোগাসনে মূরতি ধিয়ায় ॥ ৮৯ ॥
শুনা ছিল গ্রন্থে গায়,
ভক্তের ঠাকুর রায়,
প্রত্যক্ষ করিহ বিলোকন ।
কৃপা যদি ভক্ত করে,
দুর্লভ পরমেশ্বরে,
মিলে বিনা সাধনভজন ॥ ৯০ ॥
কল্পতরু প্রভু কিসে, শুন কহি সবিশেষে,
পদ-প্রান্তে পাখা করি তাঁয় ।
বাসনা হইল মনে, সেবিবারে
শ্রীচরণে,
স্বেচ্ছায় যদ্যপি দেন রায় ॥ ৯১ ॥
তখনি দক্ষিণেতর,
শ্রীপদ শ্রীগুণধর,
প্রসারণ কৈলা মম কোলে ।
কমলার সেব্য পাদ, সেবিয়া মিটান্ন সাধ,
জনম সফল ধরাতলে ॥ ৯২ ॥
করি শ্রীচরণসেবা, দেখিনু
পাইনু কিবা,
তোমারে কি দিব পরিচয় ।
প্রত্যক্ষে হইল ঐক্য, পুরাণাদি ঋষি-বাক্য,
তন্ত্রগ্রন্থ বেদান্তনিচয় ॥ ৯৩ ॥
সেবা করি সমাপন, নিম্নতলে
ভক্তগণ,
দরশন দিলা দলে দলে ।
দিবা প্রায় অবসান, পাটে দিনকর
যান,
রক্তিম তিলক নভোভালে ॥ ৯৪ ॥
আনন্দ সুখের ক্ষণ, দ্রুত করে
পলায়ন,
সন্ধ্যার হইল আগমন ।
তিমিরে ঢাকিতে দিশি, দিন না আলোকরাশি,
বিকাশিয়া উজ্জ্বল কিরণ ॥ ৯৫ ॥
শোভে শূন্যে তারকারা, উজ্জ্বল হীরার পারা,
কিবা কান্তি না যায় বাখানি ।
আলোক বসন পরা,
মাটির বনান ধরা,
মনোহরা ধরিল সাজনি ॥ ৯৬ ॥
সুশীতল সমীরণ, ধীর মন্দ সঞ্চালন,
অনুক্ষণ সুখকর বয় ।
আগোটা প্রকৃতিদেবী, মরি কি সুরম্য
ছবি,
যেন নব পূর্বেকার নয় ॥ ৯৭ ॥
লীলাপ্রিয় নরহরি, উৎসব সমাধা করি,
প্রভুদেব লীলার ঈশ্বর
।
ঘোড়াগাড়ি আরোহণে, সেবাপর ভক্ত সনে,
চলিলেন দক্ষিণশহর ॥ ৯৮ ॥
পশ্চাতে নিজের কথা, হৃদয়ে রহিল গাঁথা,
তোমাকেও কহিবার নয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলামৃত,
পান
কর অবিরত,
ক্রমে পরে পাবে পরিচয় ॥ ৯৯ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভদ্রকালীগ্রামে প্রভুর আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
আকর্ষণী শক্তি এক প্রভুর কেমন ।
অসাধ্য বাহুল্যে বলি তার বিবরণ ॥ ১ ॥
কহিতে কিঞ্চিৎ পারি ঘটনা ধরিয়া ।
মানুষের মন বাঁধা আছে ডুরি দিয়া ॥ ২ ॥
সে ডুরির এক প্রান্ত তাঁর হাতে আছে ।
সে দূরে যেখানে লোল টানে আসে কাছে ॥ ৩ ॥
পুতুলের নাচ যেন জানা সবাকার ।
ঈশ্বরের লীলা-রাজ্যে তেমতি ব্যাপার ॥ ৪ ॥
দেখিতে বুঝিতে মাত্র পারে সেই জন ।
প্রভুর কৃপায় যার বিমুক্ত লোচন ॥ ৫ ॥
শুন অপরূপ লীলা বিচিত্র ভারতী ।
অমৃতভাণ্ডার রামকৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ৬ ॥
এ হাটের লীলাকথা বড়ই মধুর ।
ভ্রাতৃ-পুত্র রামলাল নিকটে প্রভু ॥ ৭ ॥
ভ্রাতৃ-পুত্রে ভ্রাতৃ-পুত্রবোধ মোটে নাই ।
এতেক তিয়াগী প্রভু জগৎ-গোসাঁই ॥ ৮ ॥
পূর্ণভাবে বালকের ভাব অঙ্গে খেলে ।
যেখানে থাকেন ঘর ভূত যান ভুলে ॥ ৯ ॥
বাল্যসহচরবর্গে আর নাহি মনে ।
পরম আত্মীয় যারা এবে সন্নিধানে ॥ ১০ ॥
রামলাল এক দিন নিবেদন করে ।
পাঁচালি হইবে কল্য আলমবাজারে ॥ ১১ ॥
প্রাতূষে জুড়িয়া গান ছাড়িবে বেলায় ।
শুনিতেছি সুগায়ক মিঠা গীত গায় ॥ ১২ ॥
শুনিতে যাইব মনে ইচ্ছা অতিশয় ।
যাইবারে পারি যদি অনুমতি হয় ॥ ১৩ ॥
বেশ বেশ বলিয়া শ্রীপ্রভু দিলা সায় ।
পর দিনে রামলাল শুনিবারে যায় ॥ ১৪ ॥
সেদিন গায়ক গাইতেছে রামায়ণ ।
হনুর অশোকবনে সীতা-অন্বেষণ ॥ ১৫ ॥
সন্ধান পাইয়া হনু অলক্ষ্য অন্তরে ।
অন্তরে হরষ ভারি রামনাম করে ॥ ১৬ ॥
সুধামাখা রামনাম অশোকের বনে ।
শ্রবণে সীতার ভাব বাখানিছে গানে ॥ ১৭ ॥
গীত
এমন
অমূল্য শ্রীরামনাম কে শুনালি আমার কর্ণে
আজ কে এমন শোকনিবারণ,
কোরলে অশোক-অরণ্যে ।
বিনে সে ধন, মনের বেদন, কে জানিবে অন্যে ।
সে ধন বিনে,
এ দুর্দিনে হ'য়ে আছি দৈন্যে ॥
বোলে
কি জানাব আমি, জানেন সব অন্তর্যামী,
শ্রীরামচন্দ্র স্বামী পেয়েছিলাম অনেক পুণ্যে।
আমি দাসী, বনে আসি দুটি চরণ সেবার জন্যে,
তাহে বিধি হয় বিবাদী, হারাই নিখি, সে নীলবর্ণে ॥
ভক্তিমান রামলাল হৃদয় নরম ।
যেই কুলে শ্রীপ্রভুর সে কুলে জনম ॥ ১৮ ॥
স্বভাবতঃ রামমূর্তি হৃদে আছে গাঁথা ।
মূর্তিমান রঘুবীর কুলের দেবতা ॥ ১৯ ॥
রামনাম যাঁহাদের সদা রসনায় ।
শোণিতের সম চলে শিরায় শিরায় ॥ ২০ ॥
রামপদে রতিমতি রামগতপ্রাণ ।
রামনামে বংশগত সকলের নাম ॥ ২১ ॥
মানিকরামের পুত্র ক্ষুদিরাম নাম ।
প্রভুর জনক যাঁর রঘুবীর প্রাণ ॥ ২২ ॥
তাঁর পুত্র শ্রীরামকুমার রামেশ্বর ।
পরে প্রভু রামকৃষ্ণ আগে গদাধর ॥ ২৩ ॥
রামলাল শিবরাম মধ্যমের ছেলে ।
দিবারাত্র করে নৃত্য রামনাম বলে ॥ ২৪ ॥
আজি রামলাল হেথা সংগীত শুনিয়া ।
কাঁদে জনতার মধ্যে আকুল হইয়া ॥ ২৫ ॥
বিশেষতঃ ছন্দে ভাবে মরমের গীত ।
শুনিলেই অশ্রুধারা নয়নে নিশ্চিত ॥ ২৬ ॥
ভাবের আবেগে হয়ে বুদ্ধি গোলমাল ।
কিছু পরে পুরীমধ্যে ফিরে রামলাল ॥ ২৭ ॥
দেখিয়া তাহারে তবে প্রভুদেব কন ।
শুনিলি পাঁচালি বল হইল কেমন ॥ ২৮ ॥
মুগ্ধমন রামলাল করিল উত্তর ।
কখন না শুনি হেন সঙ্গীত সুন্দর ॥ ২৯ ॥
কি জানি কি মধুরত্ব আছে তার গানে ।
গীতাংশ বলিল মাত্র ছিল যাহা মনে ॥ ৩০ ॥
গীতাংশ শুনিয়া তবে কন গুণমণি ।
লিখে না আনিলি কেন গোটা গানখানি ॥ ৩১ ॥
আবেশেতে আপসোসে কহিলেন তবে ।
সংগ্রহ সঙ্গীতখানি এইখানে হবে ॥ ৩২ ॥
কিছুদিন পরে তার অবাক্ কাহিনী ।
পাঁচালি-গায়ক নিজে হাজির আপনি ॥ ৩৩ ॥
সঙ্গে আছে দলবল যন্ত্রাদি সহিত ।
মানস শ্রীপ্রভুদেবে শুনাইবে গীত ॥ ৩৪ ॥
আশ্চর্যপূর্ণিত হৃদে আনন্দ উত্তাল ।
প্রভুদেবে সম্বোধিয়া কহে রামলাল ॥ ৩৫ ॥
পাঁচালি-গায়ক এই অতি মিঠা স্বর ।
শিবু ভট্টাচার্য নাম অন্য দেশে ঘর ॥ ৩৬ ॥
শুনামাত্র শ্রীপ্রভুর পুলকিত মন ।
রামলালে আড্ডা দিতে বসিতে আসন ॥ ৩৭ ॥
প্রভুর না সহে দেরি কন গায়কেরে ।
বারেক সঙ্গীতখানি গাইবার ভরে ॥ ৩৮ ॥
সুর-লয়ে বাদ্যযন্ত্রে করি এক তান ।
গায়ক ভক্তির ভরে আরম্ভিল গান ॥ ৩৯ ॥
চিতান ছাড়িয়া যবে ধরিলেন কলি ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব রাম রাম বলি ॥ ৪০ ॥
রামনাম শ্রীবদনে অতি মনোহর ।
শতদল-দলে যেন গুঞ্জরে ভ্রমর ॥ ৪১ ॥
সমাধিতে প্রভুদেব লয়ে প্রাণমন ।
করিতে লাগিলা রাম-রূপ দরশন ॥ ৪২ ॥
এখানে গায়ক গীত বারবার গায় ।
তথাপি ফিরিয়া ঘরে না আসেন রায় ॥ ৪৩ ॥
বহুক্ষণ পরে যবে গীত-সমাপন ।
তবে দেখা দিল অঙ্গে বাহ্যিক চেতন ॥ ৪৪ ॥
প্রকৃতিস্থ হইয়া শ্রীপ্রভু কন পরে ।
শুনিতে না পেনু গীত পুনঃ গাও ফিরে ॥ ৪৫ ॥
যথা-আজ্ঞা গায়ক আরম্ভ করে গান ।
পূর্ববৎ ভাবগ্রস্ত হৈলা ভগবান ॥ ৪৬ ॥
রামনাম শুনামাত্র মহাভাব উঠে ।
যতবার হয় গীত শুনা নাহি ঘটে ॥ ৪৭ ॥
তবে আজ্ঞা রামলালে উদ্বেগ সহিত ।
সত্বর লিখিয়া রাখ আগোটা সঙ্গীত ॥ ৪৮ ॥
গায়কে অপার কৃপা করিলেন রায় ।
গায়ক সে দিন গেল লইয়া বিদায় ॥ ৪৯ ॥
উত্তরপাড়ার কাছে ভদ্রকালী গ্রামে ।
গায়ক চলিল তথা শ্বশুরের ধামে ॥ ৫০ ॥
শ্বশুর সরলমতি মহাভাগ্যবান ।
জামাতা কহিল তাঁকে প্রভুর আখ্যান ॥ ৫১ ॥
শুনে নাম অবিরাম প্রাণখানি নাচে ।
বাসনা প্রবল আসে শ্রীপ্রভুর কাছে ॥ ৫২ ॥
পঞ্জিকা দেখিয়া করি শুভদিন স্থির ।
জামাতা সহিত দ্বিজ হইল হাজির ॥ ৫৩ ॥
প্রভুর মূরতি দেখি মিঠা বাণী শুনে ।
গলিয়া পড়িল তেঁহ প্রভুর চরণে ॥ ৫৪ ॥
জামাতার চেয়ে হৈল শ্রীচরণে টান ।
বড়ই সদয় তারে হৈল ভগবান ॥ ৫৫ ॥
বেশীদিন অদর্শনে থাকিতে না পারে ।
বারবার দ্বিজোত্তম যাওয়া-আসা করে ॥ ৫৬ ॥
বর্ণের ব্রাহ্মণ তিনি লোকমুখে শুনি ।
ফুলের মুখুটি চেয়ে মুই তাঁরে গণি ॥ ৫৭ ॥
শ্রীপ্রভুর পদাম্বুজে মজে যাঁর মন ।
ক্ষত্রিয় ন-শূদ্র তেঁহ ন-বৈশ্য ব্রাহ্মণ ॥ ৫৮ ॥
দেবাদি অপেক্ষা পূজ্য একরূপ জাতি ।
লোকান্তরে ঘর নয় ধরায় বসতি ॥ ৫৯ ॥
অন্ধ আমি মোরে কৃপা কর প্রভু রায় ।
ভক্তি হয় যেন হেন ব্রাহ্মণের পায় ॥ ৬০ ॥
প্রশস্ত অবস্থা নয় গরীব ব্রাহ্মণ ।
বিষয় সম্পত্তি ঘরে অতিশয় কম ॥ ৬১ ॥
ছোট ছোট মেটে ঘর মাত্র কয়খানি ।
মাটির দেয়াল গোলপাতার ছাউনি ॥ ৬২ ॥
বহির্দেশে আছে এক পূজার দালান ।
সেটিও মাটির, নীচে সামান্য উঠান ॥ ৬৩ ॥
নিমন্ত্রিত লোকজন বসে সেই ঠাঁই ।
হইলে বাদল-বৃষ্টি কর্ম চলে নাই ॥ ৬৪ ॥
ভক্তিমান পুণ্যবান এই দ্বিজবর ।
দেবপুজা-অর্চনায় অতি সমাদর ॥ ৬৫ ॥
লোকজনে নিমন্ত্রণে বড়ই বাসনা ।
অর্থাভাব নিবন্ধন পথে দেয় হানা ॥ ৬৬ ॥
শ্রীপ্রভুর পাদপদ্ম হৃদে দিয়া ঠাঁই ।
ব্রাহ্মণের মনসাধ আশা মিটে নাই ॥ ৬৭ ॥
উপজিল মহাসাধ দ্বিজের অন্তরে ।
যথাসাধ্য আয়োজিত ভোজ্য উপচারে ॥ ৬৮ ॥
ভিক্ষা দিতে প্রভুদেবে ঘরে আপনার ।
এই চিন্তা অবিরত মনে মনে তাঁর ॥ ৬৯ ॥
কেমনে হইবে কিছু বুঝিতে না পারে ।
অন্তরের খেদ তেঁহ সম্বরে অন্তরে ॥ ৭০ ॥
সহসা বলিতে নারে সকাশে প্রভুর ।
কখন বা ভয় কভু লজ্জায় আতুর ॥ ৭১ ॥
সাহসে করিয়া ভর কহে একবার ।
হৃদয় বুঝিয়া প্রভু করিলা স্বীকার ॥ ৭২ ॥
করুণ অমৃতমাখা শুনিয়া উত্তর ।
নির্ধারিত দিন তবে করি স্থিরতর ॥ ৭৩ ॥
সত্বর সেদিন লয়ে শ্রীপদে বিদায় ।
আনন্দে উথলা হৃদি ঘরে চলে যায় ॥ ৭৪ ॥
যদিও এদিগে তেঁহ গরীব ব্রাহ্মণ ।
গুণে তাঁর গণ্যমান্য করে দশ জন ॥ ৭৫ ॥
ভিক্ষা-আয়োজন হেতু নানাদিকে ছুটে ।
জুটিবার নহে যাহা তাও তাঁর জুটে ॥ ৭৬ ॥
অল্পদিনে নানাবিধ কৈলা আয়োজন ।
ধনী জনে নহে যাহে সহজে সক্ষম ॥ ৭৭ ॥
নিমন্ত্রণ কৈলা যত কীর্তনিয়াগণে ।
গ্রামমধ্যে যেবা কেহ আছিল যেখানে ॥ ৭৮ ॥
নির্ধারিত দিনে তবে জাহ্নবীর ঘাটে ।
সুন্দর ফটক বাঁধে পাতা দিয়া এঁটে ॥ ৭৯ ॥
চারিখানি পানসির করিল যোগাড় ।
কানে কানে গ্রামে কথা হইল প্রচার ॥ ৮০ ॥
দলবল লয়ে তেঁহ তরীর ভিতর ।
ফুল্লচিতে দিল পাড়ি দক্ষিণশহর ॥ ৮১ ॥
শ্রীপ্রভু মন্দিরে হেথা সাঙ্গোপাঙ্গ সাথে ।
আনন্দের ধ্বনি এক উঠিল তফাতে ॥ ৮২ ॥
ব্যগ্রচিতে কেহ কেহ গঙ্গাপানে চান ।
দলেবলে আসি দ্বিজ দেখিবারে পান ॥ ৮৩ ॥
দ্রুতপদে শ্রীগোচরে দিলা সমাচার ।
আনন্দ-লহরী বাজে অন্তরে সবার ॥ ৮৪ ॥
শ্রীপ্রভুদেবের সঙ্গে উৎসবে গমন ।
বড় আনন্দের কথা শুনে ফুলে মন ॥ ৮৫ ॥
তরণী হইতে অবতরি দলবল ।
পরশিল শ্রীপ্রভুর চরণযুগল ॥ ৮৬ ॥
দারুণ নিদাঘকাল তপন প্রচণ্ড ।
বিশেষ মধ্যাহ্নে করে প্রলয়ের কাণ্ড ॥ ৮৭ ॥
সেইহেতু প্রভুদেবে করে নিবেদন ।
যাহাতে সভক্তে হয় সত্বর গমন ॥ ৮৮ ॥
আনিয়া দিলেন রামলাল তাঁর জন্যে ।
পরিধেয় বসন ছোবান পীত বর্ণে ॥ ৮৯ ॥
শুনিয়াছি এই বস্ত্র সুন্দর বাহার ।
দিয়াছিল বলরাম বসু জমিদার ॥ ৯০ ॥
স্বতই মোহন প্রভু বিনোদ চেহারা ।
তাহে পুনঃ পীতাম্বর ফুলমালা পরা ॥ ৯১ ॥
এই বেশে পরমেশে দরশে যে জন ।
কেবা আর তুল্য তার স্বার্থক জীবন ॥ ৯২ ॥
পরিত্রাণ কিবা কথা জনম-মরণে ।
মিলে অতি বড় ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ৯৩ ॥
উঠিলেন প্রভুদেব ত্বরিতে তরীতে ।
আগন্তুক সাঙ্গোপাঙ্গ পাছু পাছু সাথে ॥ ৯৪ ॥
গঙ্গাকূলে ঘাট যেখা ভদ্রকালী গ্রামে ।
উপনীত হইল তরী তথায় প্রথমে ॥ ৯৫ ॥
সুন্দর ফটক বাঁধা গঙ্গার উপর ।
যেখানে শ্রীপ্রভু সেথা সকল সুন্দর ॥ ৯৬ ॥
সুন্দর মানুষ সব আছে দাঁড়াইয়া ।
সুন্দর নিন্দিত রায়ে অপেক্ষা করিয়া ॥ ৯৭ ॥
কি সুন্দর কীর্ত্তনীয়া সুন্দর কণ্ঠায় ।
আরম্ভিলা সংকীর্ত্তন সম্ভাষিতে রায় ॥ ৯৮ ॥
সুন্দর ব্যাপার কিছু বুঝিতে না পারি ।
কারা এরা জুটিতে লাগিল নরনারী ॥ ৯৯ ॥
সুন্দর কেমন ভাব সুন্দর নয়ন ।
অনিমিষে করে যাহে প্রভু দরশন ॥ ১০০ ॥
কীর্তনিয়াগণের মাঝারে প্রভুরায় ।
লোকজনে শ্রীচরণে বাতাসা ছড়ায় ॥ ১০১ ॥
ধামায় ধামায় ভরা ধরা আছে হাতে ।
চৌদিকে আনন্দময় সবে গেছে মেতে ॥ ১০২ ॥
কিবা শিক্ষা ভক্তি-পথে বুঝহ বারতা ।
চিরকাল আছে নহে অভিনব কথা ॥ ১০৩ ॥
ছিল বটে আছে বটে ওষ্ঠাগত প্রাণ ।
মুমূর্ষু অবস্থা গঙ্গাযাত্রীর সমান ॥ ১০৪ ॥
জিজ্ঞাসিতে এক কথা পার তুমি মন ।
তবে প্রভু ইহাতে কি করিলা নূতনত ॥ ১০৫ ॥
তদুত্তরে আর এক শুনহ ভারতী ।
অপরূপ কথা রামকৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ১০৬ ॥
দিবারাত্র এত যে কহিলা প্রভুবর ।
সকল নিহিত আছে শাস্ত্রের ভিতর ॥ ১০৭ ॥
শাস্ত্রছাড়া কোন কথা শ্রীমুখে না সরে ।
প্রভুর অপূর্ব শ্রদ্ধা শাস্ত্রের উপরে ॥ ১০৮ ॥
শাস্ত্রে যেন শাস্ত্রজ্ঞতে সম্মান সমান ।
প্রভু অবতার দিলা সর্ব ঠাঁই মান ॥ ১০৯ ॥
শাস্ত্রের বৃহদাকার প্রকাণ্ড বিষম ।
তত্ত্বসার সংগ্রহতে মানুষ অক্ষম ॥ ১১০ ॥
স্বল্পআয়ু স্বল্পবুদ্ধি মলিনাতিশয় ।
প্রয়াস পিয়াসহীন ক্ষণানন্দে রয় ॥ ১১১ ॥
তাহে কিবা করিলেন প্রভুদেবরায় ।
ভাঙ্গিলা বৃহৎ তত্ত্ব সামান্য কথায় ॥ ১১২ ॥
গ্রাম্য ভাষা সরল উপমাসহকারে ।
অনায়াসে লোকে যাহা বুঝিবারে পারে ॥ ১১৩ ॥
যদি বল তত্ত্ব তত্ত্ব দুর্বোধ্যাতিশয় ।
সহজেতে মানুষের বুঝিবার নয় ॥ ১১৪ ॥
না হয় বলিলা প্রভু সরল ভাষায় ।
কি বলে পশিল তত্ত্ব জীবের মাথায় ॥ ১১৫ ॥
উত্তরে তাহার মন শুনহ কাহিনী ।
শ্রীপ্রভুর মহাবাক্য বেদবাক্য জিনি ॥ ১১৬ ॥
ভিতরে নিহিত তার অপরূপ বল ।
যে দিকে গমন করে সে দিক উজ্জ্বল ॥ ১১৭ ॥
অন্ধকার তিরোহিত স্পষ্ট দৃশ্যমান ।
কি তত্ত্বের ছবি বাক্যে শ্রীপ্রভু দেখান ॥ ১১৮ ॥
বহু কথা জীবে এবে শুনিতে না চায় ।
নেজামুড়াবাদে সার কহিলেন রায় ॥ ১১৯ ॥
সেইহেতু অপ্রভুর উক্তি-উপদেশ ।
এবে মানুষের পক্ষে পুরাণ বিশেষ ॥ ১২০ ॥
প্রভুর সংক্ষিপ্তসারে পেয়ে আস্বাদন ।
আদি মূল শাস্ত্র লোকে করে অধ্যয়ন ॥ ১২১ ॥
এক কর্মে দুই কর্ম হৈল এইবার ।
জীব-শিক্ষা এক আর শাস্ত্রের উদ্ধার ॥ ১২২ ॥
আর এক নূতনত্ব প্রভু-অবতারে ।
সকলে করিলা রক্ষা বাদ নাই কারে ॥ ১২৩ ॥
সমতা একতা ভাব লীলার প্রাঙ্গণে ।
হেন নাই দেখা যায় অন্য কোন স্থানে ॥ ১২৪ ॥
ধনাঢ্যে পণ্ডিতে রয় অভিমান ভারি ।
তে সবারে রূপাদান গিয়া বাড়ি বাড়ি ॥ ১২৯ ॥
অতি বড় দীনহীন কাঙ্গালের বেশে ।
একমাত্র মানুষের মঙ্গল-মানসে ॥ ১৩০ ॥
এদিকে দীনের বেশে মহাবল গায় ।
যে হোক যতই বড় গ্রাহ্য নাহি তায় ॥ ১৩১ ॥
ভক্তি ভক্ত শাস্ত্রবাক্য রক্ষার কারণে ।
কিংবা কোন জিজ্ঞাস্যের সদুত্তরদানে ॥ ১৩২ ॥
কিংবা কোন কর্মে যাহে জীবের কল্যাণ ।
সেখানে শ্রীপ্রভু মহাবলের আধান ॥ ১৩৩ ॥
রাজরাজেশ্বর যদি বিপক্ষে দাঁড়ায় ।
তৃণ-জ্ঞানে সেইখানে হানা দেন রায় ॥ ১৩৪ ॥
জীবে শিক্ষা নহে মাত্র কথায় বলিয়া ।
হৃদয়ে আঁকিয়া দেন কাজে দেখাইয়া ॥ ১৩৫ ॥
অগণ্য প্রকারে অলৌকিক দেন শিক্ষে ।
তারে সেটি যেটি উপযুক্ত তার পক্ষে ॥ ১৩৬ ॥
প্রতিজনে দেন শিক্ষা প্রত্যেক রকম ।
প্রভু অবতারে ইহা অতীব নূতন ॥ ১৩৭ ॥
কখনই কোন কর্ম নাহি অকারণে ।
সেথা হাতুড়ির বাড়ি বাঁকা যেইখানে ॥ ১৩৮ ॥
বিশ্বগুরু অন্তর-নিবাসী ভগবান ।
লীলা-গীতি পদে পদে তাহার প্রমাণ ॥ ১৩৯ ॥
পথে পথে সংকীর্ত্তনে হরিগুণগান ।
পূর্বপ্রথা ভক্তিভাব ছিল ম্রিয়মাণ ॥ ১৪০ ॥
সর্ব ঠাঁই সেই প্রথা করি আচরণ ।
জাগাইয়া দিলা তাহে পুনশ্চ জীবন ॥ ১৪১ ॥
শুল্ক ভাব ব্রাহ্মগণে ছিল চিরকাল ।
এবে সংকীর্তনে বাজে খোল করতাল ॥ ১৪২ ॥
পথে পথে সংকীর্ত্তন করে কুতূহলে ।
মহামান্যগণ্য বড়মনুষ্যের ছেলে ॥ ১৪৩ ॥
লীলাতত্বে যাত্রা-গীত হৈল বারে বারে ।
কমলকুটির নামে কেশবের ঘরে ॥ ১৪৪ ॥
ভক্তিশিক্ষা শ্রীপ্রভুর এত ধরে বল ।
ডাঙ্গায় ফুটিল যাহে ফুল শতদল ॥ ১৪৫ ॥
ইহার অধিক তুমি কি শুনিবে আর ।
মহান্ মহিমাকথা প্রভুর আমার ॥ ১৪৬ ॥
আগমনোদ্বেগ-ভাব পুরাণ-শ্রবণে ।
লীলাতত্ত্বে যাত্রা-গীত হয় যেইখানে ॥ ১৪৭ ॥
হরিসভা দেখিবারে মহোল্লাস ভারি ।
কোথা বালী কালাচাঁদ মুখুয্যের বাড়ী ॥ ১৪৮ ॥
কোথায় পটলডাঙ্গা কোথা কোন্নগরে ।
কোথা জানবাজার কোথায় বেলঘোরে ॥ ১৪৯ ॥
দুয়ারে দুয়ারে ভ্রাম্যমাণ নানাস্থানে ।
একমাত্র ভক্তি-উদ্দীপনার কারণে ॥ ১৫০ ॥
হেথা ভদ্রকালীগ্রামে কীর্ত্তন সহিত ।
ব্রাহ্মণ-ভবনে
ক্রমে হৈল উপনীত ॥ ১৫১ ॥
পূর্বে বলিয়াছি ভিটা কত পরিসর ।
দালানের সম্মুখেতে উঠানে আসর ॥ ১৫২ ॥
ভক্তসহ শ্রীপ্রভুর চরণ-পরশে ।
হাসিয়া উঠিল যেন পরম উল্লাসে ॥ ১৫৩ ॥
ব্রহ্মব্রত সামধ্যায়ী নামে একজন ।
পরম পণ্ডিত শাস্ত্রে পটু বিলক্ষণ ॥ ১৫৪ ॥
তার্কিকের শিরোমণি শাস্ত্রপাঠ-বলে ।
সেইখানে উপনীত হৈল হেনকালে ॥ ১৫৫ ॥
শ্রীপ্রভুর সঙ্গে তাঁর মনের বাসনা ।
কিছুক্ষণ করিবেন শাস্ত্র আলাপনা ॥ ১৫৬ ॥
অন্তরে বুঝিয়া ভাব প্রভু বিশ্বপতি ।
সন্নিকটে আসীন মহিম চক্রবর্তী ॥ ১৫৭ ॥
বিদ্যাবুদ্ধিমান শাস্ত্রপাঠী এক জনা ।
শ্রীআজ্ঞা করিতে তত্ত্বকথা আলোচনা ॥ ১৫৮ ॥
কেবা কি করিল প্রশ্ন কি কার উত্তর ।
ঠিক জানা নাই শুন মোটের উপর ॥ ১৫৯ ॥
দ্বৈতাদ্বৈতভাব ল'য়ে উঠিল বিচার ।
সামধ্যায়ী দ্বৈতভাব করে অস্বীকার ॥ ১৬০ ॥
সেব্য-সেবকের ভাব ভক্তিভাব মতে ।
সমূলে তর্কেতে চান উড়াইয়া দিতে ॥ ১৬১ ॥
প্রতিপক্ষ প্রতিবাদে যত কথা কন ।
তার্কিক তর্কেতে করে সকল খণ্ডন ॥ ১৬২ ॥
বাদ-প্রতিবাদ আধ ঘণ্টার উপর ।
পরাভূত মহিম পশ্চাতে নিরুত্তর ॥ ১৬৩ ॥
অতঃপর কি হইল শুনহ কাহিনী ।
মহিমের পক্ষ প্রভু লইলা আপনি ॥ ১৬৪ ॥
অধিক রুষিয়া তবে তার্কিক তখন ।
তর্ক-বলে করে নিজ পক্ষ সমর্থন ॥ ১৬৫ ॥
তর্কে সুকৌশল তেঁহ তর্কে কেবা আঁটে ।
যত কথা কন প্রভু তর্ক দিয়া কাটে ॥ ১৬৬ ॥
বাক্য নাহি ফুটে আর প্রভুর বদনে ।
রামলালে হয় আজ্ঞা ছিলা সন্নিধানে ॥ ১৬৭ ॥
মূত্রত্যাগে যাইব আইস মোর সাথে ।
ঝারিসহ রামলাল চলিল পশ্চাতে ॥ ১৬৮ ॥
মূত্রত্যাগে বসিয়া কহেন নিজে রায় ।
"ওমা ই শালা তো দেখি তার্কিক বেজায় ॥ ১৬৯ ॥
জানি না জননী কিবা কহিলা উত্তরে ।
সত্বর উঠিলা প্রভু আবেশের ভরে ॥ ১৭০ ॥
ঝারি-স্পর্শ মনে নাই প্রভু পরমেশ ।
দ্রুতপদে অভ্যন্তরে করিলা প্রবেশ ॥ ১৭১ ॥
কোন দিকে নাহি দৃষ্টি একেবারে যান ।
যেথা অভিমানভরে তার্কিক-প্রধান ॥ ১৭২ ॥
করে করি করস্পর্শ নাড়া দিয়া কন ।
আর বার বল কি বলিলে এতক্ষণ ॥ ১৭৩ ॥
শ্রীপ্রভুর পরশনে বলবুদ্ধিহারা ।
তর্ক করা দূরে থাক মুখে নাই সাড়া ॥ ১৭৪ ॥
অবাক্ হইয়া যেন করে দরশন ।
কি দেখান প্রভু তাঁরে করি পরশন ॥ ১৭৫ ॥
দেখিতে দেখিতে বস্তু কহেন তার্কিক ।
কি বলিব বলিলেন যাহা তাই ঠিক ॥ ১৭৬ ॥
বুঝিত না যাহা তাহা বুঝিল তখনি ।
কি পেঁচ ঘুরায়ে দিলা প্রভু গুণমণি ॥ ১৭৭ ॥
সমান ঘটনা আর শুন অতঃপর ।
ব্রহ্মচারী আসে এক প্রভুর গোচর ॥ ১৭৮ ॥
শ্রীশ্রীরামচন্দ্র নাম ধীর-শিরোমণি ।
শাস্ত্রপাঠ বিধিমতে অদ্বৈত-গিয়ানী ॥ ১৭৯ ॥
দ্বৈতবাদ ঘোর রণ শ্রীপ্রভুর সনে ।
সেব্য-সেবকের ভাব আদতে না মানে ॥ ১৮০ ॥
ভক্তি-পথে কোন মতে যাইতে না চায় ।
শক্তি-সঞ্চালন-যুক্তি পরে কৈলা রায় ॥ ১৮১ ॥
শালা বলি দিয়া গালি যবে পরশন ।
ঝটিতে উঠিল তার নবীন নয়ন ॥ ১৮২ ॥
যার জোরে ক্ষণমধ্যে পাইলা দেখিতে ।
সেব্য সেবকের ভাব কিবা ভক্তিমতে ॥ ১৮৩ ॥
পরম আনন্দে হৃদি উথলিয়া যায় ।
ভাবে গলে পদতলে অবনী লুটায় ॥ ১৮৪ ॥
মহিমা-বাখান আর প্রমাণের তরে ।
লিখিয়া গিয়াছে নিজে দেয়াল-উপরে ॥ ১৮৫ ॥
"শ্রীশ্রীরামচন্দ্র ব্রহ্মচারী অদ্য হইতে
স্বামিবাক্যে
(অর্থাৎ
প্রভুর বাক্যে) সেবা-সেবক ভাব প্রাপ্ত হইল ।"
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের পুরব অঞ্চলে ।
দেখিতে পাইবে লেখা দালান-দেয়ালে ॥ ১৮৬ ॥
অদ্যাপিহ স্পষ্টভাবে আছে লেখাখানি ।
কেবা জানে কত যে খেলিলা গুণমণি ॥ ১৮৭ ॥
লক্ষাংশের এক অংশ জানা নাহি কার ।
মহালীলা ছদ্মবেশে গুপ্ত-অবতার ॥ ১৮৮ ॥
ধরা-ছু'য়া মোটে নাই অবতার-কালে ।
বিনা ডাকে বিদ্যুৎ হানিয়া গেল চলে ॥ ১৮৯ ॥
হুজুগের গোড়া রাম দত্ত ভক্তবর ।
সকলে কহেন প্রভু পরম ঈশ্বর ॥ ১৯০ ॥
এমত কহিলে কেহ বলিতেন রায় ।
'বিছে বিছে বলিলে সে পলাইয়া যায়' ॥ ১৯১ ॥
ঈশ্বর বলিলে বড় সকাতর প্রাণে ।
গুপ্ত রাখিবারে কন অন্তরঙ্গগণে ॥ ১৯২ ॥
একদিন শ্রীগোচরে ভক্ত রাম কয় ।
তত্ত্বসারে লিখি কথা আজ্ঞা যদি হয় ॥ ১৯৩ ॥
'তত্ত্বসার' গ্রন্থখানি রামের রচনা ।
শুনিয়াছি প্রভু তাহে করিলেন মানা ॥ ১৯৪ ॥
নিবারণ না শুনিয়া তবু লিখি রাম ।
শ্রীপ্রভুর লীলাভাব সংক্ষেপ আখ্যান ॥ ১৯৫ ॥
ইহাতে বিশ্বাস মোর হয় এ রকম ।
রামের মতন ভক্ত অতিশয় কম ॥ ১৯৬ ॥
মানাসত্বে তথাপি যে লীলার আভাস ।
তত্ত্বসার গ্রন্থমধ্যে করিলা প্রকাশ ॥ ১৯৭ ॥
ইহাতে প্রতীয়মান স্পষ্টভাবে পায় ।
রামের ইচ্ছায় নহে প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৯৮ ॥
তাঁহার শক্তিতে কর্ম হয় লীলাধামে ।
ইচ্ছাময় ভগবান ভক্ত মাত্র নামে ॥ ১৯৯ ॥
কখন কি ভাবে রন প্রভু গুণমণি ।
আপনে প্রকাশ কভু করেন আপনি ॥ ২০০ ॥
প্রধান সেবক শশী সেবকাগ্রগণ্য ।
একদিন শ্রীমন্দিরে সেবিবার জন্য ॥ ২০১ ॥
নিকটে দণ্ডায়মান প্রভু তাঁরে কন ।
আমি সেই তুমি যার কর অন্বেষণ ॥ ২০২ ॥
এক প্রশ্ন এইখানে পার করিবারে ।
ভক্তেরা যদ্যপি নাহি চিনে প্রভুবরে ॥ ২০৩ ॥
তবে তাঁহে ভক্তি-প্রীতি কিসের কারণ ।
কি ফলপ্রাপ্তির আশে করে আকিঞ্চন ॥ ২০৪ ॥
বারান্তরে বলিয়াছি ইহার বারতা ।
একমনে শুন মন পুনঃ কহি কথা ॥ ২০৫ ॥
অন্তরঙ্গ ভক্ত যাঁরা পরিষদগণ ।
চিরকাল সেই তাঁরা না হয় নূতন ॥ ২০৬ ॥
আকারে বিভিন্নমাত্র বিভিন্ন লীলায় ।
স্বভাবতঃ লগ্ন-মন শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ২০৭ ॥
অলির স্বভাব ভক্তে চিরকাল ধরে ।
পেলে পদ্ম পিয়ে মধু না যায় বিচারে ॥ ২০৮ ॥
দ্বিতীয় ফলের কথা শুন তবে মন ।
অন্তরঙ্গ ফলাকাঙ্ক্ষী না হয় কখন ॥ ২০৯ ॥
গাছের বিহগ তারা গাছে করে বাসা ।
গাছেই পিরীতি নাই কলের পিয়াসা ॥ ২১০ ॥
জন্ম-ভূমে অন্নকষ্ট যদি অতিশয় ।
তথাপিহ পরিত্যাগে মন নাহি লয় ॥ ২১১ ॥
স্বভাবে আসক্তি তায় নাহি যায় ছাড়া ।
মোহন মূরতিখানি স্বরগের বাড়া ॥ ২১২ ॥
কল্পবৃক্ষ প্রভুদেব মন-বিমোহন ।
বিহঙ্গম-রূপে তাহে অন্তরঙ্গগণ ॥ ২১৩ ॥
ডালে বিজড়িত সাঙ্গ ঠিক যেন লতা ।
উপাঙ্গেরা উর্ধ্ব দেশে প্রশাখাদি পাতা ॥ ২১৪ ॥
প্রভু আর প্রভুভক্তে সদা একঠাই ।
উভয়ে উভয়মধ্যে ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ২১৫ ॥
কখন প্রভুর মধ্যে ভক্তদের স্থান ।
কভু ভক্তদের মধ্যে রন ভগবান ॥ ২১৬ ॥
আর প্রশ্ন করিবারে পার হেথা তুমি ।
কোথায় তাঁহার ভক্ত ভক্তে কোথা তিনি ॥ ২১৭ ॥
বিষম সমস্যাতত্ত্ব শুন অতঃপর ।
অবিচ্ছিন্নভাবে তিনি ভক্তের ভিতর ॥ ২১৮ ॥
তবে যবে স্বরাট মূর্তিতে ভগবান ।
লীলায় স্বতন্ত্র দেহে হন অধিষ্ঠান ॥ ২১৯ ॥
তখন ভক্তেরা তাঁর মধ্যে বাস করে ।
গাছের যেমন পাখী গাছের উপরে ॥ ২২০ ॥
পরে লীলা-অবসানে যবে অন্তর্ধান ।
স্বরাট শরীরধারী সেই ভগবান ॥ ২২১ ॥
ভক্তদের হৃদয়েতে করিয়া বসতি ।
এক হয়ে নানা রূপ বিরাট মূরতি ॥ ২২২ ॥
এক হয়ে বহু পুনঃ কেমনে সম্ভবে ।
অতুল তাঁহার শক্তি শক্তির প্রভাবে ॥ ২২৩ ॥
ছোটবড় উনো-দুনো নানাভাবে খেলে ।
দু'টি বস্তু একরূপ জগতে না মিলে ॥ ২২৪ ॥
এক-বহু তবে কি এ খণ্ড হয় তাঁর ।
খণ্ডে ও অখণ্ডে তিনি বিচিত্র ব্যাপার ॥ ২২৫ ॥
রাসলীলা গোপিনীর ইহার প্রমাণ ।
নৃত্যগীতে যবে সবে সুখে ভাসমান ॥ ২২৬ ॥
প্রত্যেক গোপিনী তথা দেখে তাঁর কাছে ।
ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম কৃষ্ণ বাম ভাগে নাচে ॥ ২২৭ ॥
যত গোপী তত কৃষ্ণ যেমন প্রকার ।
খণ্ডেও অখণ্ড তিনি চলে না বিচার ॥ ২২৮ ॥
চতুর্দশ বর্ষ আজি প্রভু অন্তর্ধান ।
প্রতি প্রভুভক্তে রাজে ইহার প্রমাণ ॥ ২২৯ ॥
ভক্তি রাখি শ্রীপ্রভুর ভক্তের চরণে ।
বুঝিতে পারিবে চলো লীলা-গীতি শুনে ॥ ২৩০ ॥
প্রভুর বচনে শুন ইহার ভারতী ।
ঈশ্বরীয় অবস্থার নাহি হয় ইতি ॥ ২৩১ ॥
এটি তিনি ওটি নন্ এমত বলিলে ।
সীমাবদ্ধ করা হয় তাঁরে এই স্থলে ॥ ২৩২ ॥
খণ্ডাখণ্ড সব তিনি অব্যক্ত প্রকার ।
নাহি
চলে কোন কথা কথায় তাঁহার ॥ ২৩৩ ॥
শীতলা মাকাল যষ্ঠী সকলেই মানা ।
একে একে কৈল
প্রভু সকল সাধনা ॥ ২৩৪ ॥
ইহাতে সাব্যস্ত কৈলা লীলার ঈশ্বর ।
সেই এক ভগবান সবার
ভিতর ॥ ২৩৫ ॥
সাধনা হইলে সিদ্ধ সেই বস্তু মিলে ।
একেতে যাহার খেলা তারই সকলে ॥ ২৩৬ ॥
কালী কৃষ্ণ সাধনায় সেই সে জিনিস ।
প্রভেদ কিছুই নাহি কুড়ি কি উনিশ ॥ ২৩৭ ॥
বেদান্তের সাধনায় সেই বস্তু সার ।
সাকার যাহার রূপ তিনি নিরাকার ॥ ২৩৮ ॥
রূপ নাম প্রভেদেতে নাহি হয় হানি ।
আগাগোড়া এই কথা কন গুণমণি ॥ ২৩৯ ॥
সব সামঞ্জস্যভাব প্রভুর মতন ।
কোনকালে কোথাও না হয় দরশন ॥ ২৪০ ॥
ধর্ম-বাদ-বিবাদের নাহি তথা ত্রাস ।
যেখানে হৃদয়ে প্রভু-বাক্যের বিশ্বাস ॥ ২৪১ ॥
নীরব বিশাল ভাব শান্তি-নিকেতন ।
তাই শ্রীপ্রভুর নাম বিবাদভঞ্জন ॥ ২৪২ ॥
সারবস্তু ভগবান যেবা চায় তাঁরে ।
তাঁর কার্য বস্তু খোঁজা কি কাজ বিচারে ॥ ২৪৩ ॥
বাক্যের বিচারে নাই বস্তু ভগবান ।
তাঁর অন্বেষণে মিলে তাঁহার সন্ধান ॥ ২৪৪ ॥
হারাইলে শিশু ছেলে জনক যেমন ।
শিশুর কেবল নাম করি উচ্চারণ ॥ ২৪৫ ॥
বিকল পরান খোঁজে দুয়ারে দুয়ারে ।
বন-উপবন কিবা সরসীর তীরে ॥ ২৪৬ ॥
ভাগ্যবলে যায় মিলে কোন একজনে ।
যে দেখেছে শিশুছেলে খেলে কোন্খানে ॥ ২৪৭ ॥
অথবা যেখানে শিশু প্রমত্ত খেলায় ।
বাবা ডাকিছেন তারে শুনিবারে পায় ॥ ২৪৮ ॥
পরিহরি খেলাস্থান দ্রুত পায় ছুটে ।
যেখানে জনক তার কোলে গিয়া উঠে ॥ ২৪৯ ॥
সেই
মত ধর এঁটে ঈশ্বরের নাম ।
আকুল পরানে উচ্চে ডাক অবিরাম ॥ ২৫০ ॥
অবশ্য পাইবে গুরু পথে আপনার ।
বলিয়া দিবেন কোথা ঈশ্বর তোমার ॥ ২৫১ ॥
কিংবা গুরুরূপে তাঁর পথে পাবে দেখা ।
যদি শুদ্ধ মনে হয় ঠিক ঠিক ডাকা ॥ ২৫২ ॥
গুরু চাই, − বস্তু নাহি মিলে গুরু বিনে ।
সতত রাখিবে কথা জাগরিত প্রাণে ॥ ২৫৩ ॥
সাধের ঈশ্বর তাঁয় মিলে সাধপণে ।
আবশ্যক নাহি হয় রতনে কি ধনে ॥ ২৫৪ ॥
সখের সে ভগবান তাঁহে যার সখ ।
সথরূপে পায় নাহি ধনে আবশ্যক ॥ ২৫৫ ॥
ঈশ্বর কেবলমাত্র একমাত্র ধন ।
তুষ ভূসি অন্য যাহে কর আকিঞ্চন ॥ ২৫৬ ॥
যদি কিছু নাহি ধন ঈশ্বরের বাড়া ।
কি হেতু মানুষে তাহে হৈল মতিছাড়া ॥ ২৫৭ ॥
শুন তবে কহি কথা ইহার বাখানে ।
বসাইয়া প্রভুরায় হৃদয়-আসনে ॥ ২৫৮ ॥
অনর্থের মূল গোড়া খালি অহংকার ।
ইহসুখ-অভিলাষ বাতিক বিকার ॥ ২৫৯ ॥
ব্যাধির মূলেতে রস ঢালে অনুক্ষণ ।
বিষ-বিনিন্দিত বিষ কামিনীকাঞ্চন ॥ ২৬০ ॥
মূল ব্যাধি এই শাখা-প্রশাখাদি আছে ।
পল্লব মুকুল কুল পত্র কত গাছে ॥ ২৬১ ॥
দেহগুলি মানুষের বিয়াধির বাসা ।
অনিবার গাত্র-দগ্ধে কেবল পিপাসা ॥ ২৬২ ॥
ক্ষণিক আরাম-হেতু খায় সেই জল ।
যাহে হইয়াছে হেন বিয়াধি প্রবল ॥ ২৬৩ ॥
বিরাম বৃদ্ধির নাই বৃদ্ধি ক্রমে ক্রমে ।
অবিনাশী রহে ব্যাধি জনমে জনমে ॥ ২৬৪ ॥
ভীষণ ব্যাধির ধারা অভূতেতিহাস ।
দেহের বিনাশে নাই ব্যাধির বিনাশ ॥ ২৬৫ ॥
চতুর্বিধ আছে দেহ দেহে বিদ্যমান ।
পঞ্চভূতে যেই দেহ স্থূল তার নাম ॥ ২৬৬ ॥
মন বুদ্ধি চিত্ত আর এক অহংকার ।
এই চতুষ্টয়ে সূক্ষ্মদেহ নাম যার ॥ ২৬৭ ॥
সূক্ষ্মদেহে যবে জীব করে বিচরণ ।
কামিনীকাঞ্চনে তার নাহি রহে মন ॥ ২৬৮ ॥
তৃতীয় কারণ দেহে করিলে বসতি ।
ঈশ্বরদর্শনানন্দ-ভোগ দিবারাতি ॥ ২৬৯ ॥
নাহি আসে ফিরে আর চতুর্থে যে যায় ।
পাইয়া পরম মুক্তি ঈশ্বরে মিশায় ॥ ২৭০ ॥
স্থূল দেহ যার নাম পঞ্চভূতে গড়া ।
প্রাণ কৈলে পলায়ন সেই হয় মড়া ॥ ২৭১ ॥
স্থূলের বিনাশে অন্য তিন নাহি মরে ।
ব্যাধির লইয়া বীজ যায় জন্মান্তরে ॥ ২৭২ ॥
এই ব্যাধিগ্রস্ত-হেতু যত মানুষেরা ।
হয়েছে পরম ধনে রতিমতি-হারা ॥ ২৭৩ ॥
এমন বিয়াধি তবে কিসে মারা যায় ।
জিজ্ঞাসিলে যদি মন শুনহ উপায় ॥ ২৭৪ ॥
এ ব্যাধির প্রতিকার জানে না নিদান ।
প্রতিকারী একজনা হরিবৈদ্য নাম ॥ ২৭৫ ॥
মৃত্যুঞ্জয় চতুর্মুখ যার গড়া বড়ি ।
চতুর্দশ লোকময় গোটা বিশ্ব বাড়ি ॥ ২৭৬ ॥
কেমনে বৈদ্যের তবে দেখা পাওয়া যায় ।
তাহার বিধানে শুন কি কহিলা রায় ॥ ২৭৭ ॥
সময়ে সময়ে হন ঈশ্বরাবতার ।
ধরাধামে ধরি নিজে মনুষ্য-আকার ॥ ২৭৮ ॥
নিশ্চয় তাঁহার তুমি পাবে দরশন ।
মানুষের মধ্যে যদি কর অন্বেষণ ॥ ২৭৯ ॥
মানুষ অনেক তাঁহে চিনিব কেমনে ।
প্রভুদেব কহিলেন তাহার লক্ষণে ॥ ২৮০ ॥
যেখানে ঊর্জিতা ভক্তি সদা বিদ্যমান ।
প্রেম ও ভক্তির বন্যা বহে কান কান ॥ ২৮১ ॥
সেই সে আধারধারী বুঝিবে নিশ্চিৎ ।
মহাবৈদ্য নিজে ভবরোগবিদ্যাবিৎ ॥ ২৮২ ॥
আর কথা যে হরির আবির্ভাব আছে ।
লীলা-সমাপনে তাঁর অন্তর্ধান পিছে ॥ ২৮৩ ॥
কেমনে পাইব দেখা হৈলে অন্তর্ধান ।
তখন উপায় কিবা কর অবধান ॥ ২৮৪ ॥
অন্তর্ধানে ভগবান বিরাট মূরতি ।
ভক্তের হৃদয় মধ্যে করেন বসতি ॥ ২৮৫ ॥
সদা বিরাজিত থাকি ভক্তের ভিতরে ।
লীলার প্রচার-কর্ম নানাভাবে করে ॥ ২৮৬ ॥
যেই ভগবৎভক্ত সেই ভগবান ।
ভক্তের নিকটে কর ঔষধ সন্ধান ॥ ২৮৭ ॥
পাইবে ঔষধি ব্যাধি দূর হবে তায় ।
লীলা-গীতি বলি সেই ভক্তের আজ্ঞায় ॥ ২৮৮ ॥
তাহার উপরে আজ্ঞা দিয়াছে জননী ।
আদ্যাশক্তি শ্যামাসুতা গুরুদারা যিনি ॥ ২৮৯ ॥
গুপ্তভাব শ্রীপ্রভুর কহিতে কহিতে ।
আসিয়া পড়েছি হেথা আর এক পথে ॥ ২৯০ ॥
ফটো
প্রতিমূর্তি তাঁর তুলিবার তরে ।
আকিঞ্চন ভক্তগণ অনুক্ষণ করে ॥ ২৯১ ॥
কোনমতে তাহাতে প্রভুর নহে মন ।
বিধিমতে ফটো নিতে করেন বারণ ॥ ২৯২ ॥
যখন সমাধিযুক্ত বাহ্যজ্ঞানহারা ।
তখন লইল তুলে প্রভুর চেহারা ॥ ২৯৩ ॥
এখানেতে প্রভুদেব ব্রাহ্মণের ঘরে ।
পরিপূর্ণ লোকজন আছে চারিধারে ॥ ২৯৪ ॥
তত্ত্বালাপ-সমাপন তার্কিকের সনে ।
রঙ্গরসে অন্য কথা কথোপকথনে ॥ ২৯৫ ॥
পরে দ্বিজোত্তম করি ভোজন-আসন ।
ভিক্ষা দিলা ভগবানে সহ ভক্তগণ ॥ ২৯৬ ॥
চরণ-বন্দনা তাঁর করি বারে বারে ।
ভাগ্যবান পুণ্যবান অবনী মাঝারে ॥ ২৯৭ ॥
রামকৃষ্ণ লীলাগীতি অমৃত-ভাণ্ডার ।
শ্রবণ-কীর্তনে জীবে ভবসিন্ধুপার ॥ ২৯৮ ॥
চতুর্থ খণ্ড
বিবিধ তত্ত্বকথা
('শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' হইতে সংগ্রহ)
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
বেদান্তে আত্মায় কহে নির্লিপ্তের
রীত ।
দুঃখে সুখে পাপপুণ্যে সম্বন্ধরহিত ॥ ১ ॥
তবে দেহ অভিমান রাখে যেই নরে ।
অনিবার্য কষ্ট তার বিবিধ প্রকারে ॥ ২ ॥
বুঝিবারে সূক্ষ্ম তত্ত্ব ধূম উপমায় ।
দেয়ালে কলঙ্কী করে যদি লাগে তায় ॥ ৩ ॥
কিন্তু সীমাহীন শূন্য খ-এর উপরে ।
কালিমা কলঙ্ক-দাগ দিতে নাহি পারে ॥ ৪ ॥
দেহে যার অভিমান আছে তার হানি ।
মুক্ত-অভিমান অতি মঙ্গলদায়িনী ॥ ৫ ॥
আমি মুক্ত আমি মুক্ত মুখে যেবা বলে ।
নিশ্চিত মুকতি তার মিলে এককালে ॥ ৬ ॥
আমি পাপী আমি পাপী জিহ্বা যার কয় ।
ভবের বন্ধন তার চিরকাল রয় ॥ ৭ ॥
পাপী পাপী কথা কভু করিলে শ্রবণ ।
লাগিত তাঁহার কানে বাজের মতন ॥ ৮ ॥
শুন কই বিবরণ তাহার ব্যাখ্যায় ।
একদিন শ্রীমন্দিরে প্রভুদেব রায় ॥ ৯ ॥
প্রিয় ভক্ত শ্রীনরেন্দ্র আছেন সদনে ।
মহানন্দ উভয়ের কথোপকথনে ॥ ১০ ॥
এমন সময় তথা উপনীত হন ।
শহরে বসতি করে ব্রাহ্ম কয় জন ॥ ১১ ॥
স্থানের মহিমা আর প্রভু-দরশনে ।
পাইল হৃদয়ে শান্তি মহানন্দ মনে ॥ ১২ ॥
অজ্ঞাতে গিয়াছে দিন মনে নাই তায় ।
এবে প্রায় অবসান বেলা যায় যায় ॥ ১৩ ॥
আবাসে ফিরিতে আজি নাহি হয় মন ।
প্রভুদেবে কহে রাতি করিবে যাপন ॥ ১৪ ॥
সকলে সন্তুষ্ট সদা শ্রীপ্রভু আমার ।
ব্রহ্মদের আবেদনে সানন্দে স্বীকার ॥ ১৫ ॥
সন্ধ্যা এল গেল তার পশ্চাৎ কিঞ্চিৎ ।
কুতুহল ব্রাহ্মদল ধরিল সঙ্গীত ॥ ১৬ ॥
গীতখানি নাহি জানি মর্ম এই তার ।
পাপী মোরা পিতা তুমি করহ উদ্ধার ॥ ১৭ ॥
একসঙ্গে উচ্চরোলে এই গীত গায় ।
শুনিয়া অনেকক্ষণ স্তব্ধবৎ রায় ॥ ১৮ ॥
ছাড়িতে না চায় গীত গায় বারবার ।
তখন শ্রীপ্রভুদেব করিয়া চীৎকার ॥ ১৯ ॥
সন্নিকটে গিয়া ছুটে রুষ্ট ভাষে কন ।
কেন পাপী পালী সদা কর উচ্চারণ ॥ ২০ ॥
পাপী কেবা পাপী পাপী কহ কি কারণে ।
এ ঠাঁই ছাড়িয়া যাও গাও অন্য স্থানে ॥ ২১ ॥
ঈশ্বরের নামে ধর বিশ্বাস অটল ।
তাঁহার অপেক্ষা তাঁর শ্রীনামের বল ॥ ২২ ॥
পাপ কি বন্ধন কিছু থাকিতে না পারে ।
বারেক যে ডাকে নাম জনম-ভিতরে ॥ ২৩ ॥
ঈশ্বরে দয়াল গুণ করিলে আরোপ ।
তাহাতেও দেখিয়াছি শ্রীপ্রভুর কোপ ॥ ২৪ ॥
অবধান কর কথা শুন বিবরণ ।
একদিন পুরীমধ্যে শিখসৈন্যগণ ॥ ২৫ ॥
মা কালীর শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর কাছে ।
কহিল ঈশ্বর সম কে দয়াল আছে ॥ ২৬ ॥
ধন ধান্য ফল ফুলে অবনী এমন ।
ক্ষিতি জল বহ্নি আদি আকাশ পবন ॥ ২৭ ॥
দিয়াছেন ভগবান
নিজ দয়া-গুণে ।
একমাত্র আমাদের ভোগের কারণে ॥ ২৮ ॥
এত শুনি গুণমণি করিলা উত্তর ।
কি কহ দয়াল বড় পরম ঈশ্বর ॥ ২৯ ॥
লালন-পালন-হেতু আপন ছাবালে ।
প্রয়োজনমত
ভোজ্যদ্রব্য আদি দিলে ॥ ৩০ ॥
তাহাতে কি আছে দয়া কর্তব্য পিতার ।
পালিবে কি অন্য জনে তাঁর পরিবার ॥ ৩১ ॥
তাঁহার নিজের ভার লালনপালনে ।
আমরা ছাবাল মাত্র যত জীবগণে ॥ ৩২ ॥
মোরা ঈশ্বরের তিনি মোদের ঈশ্বর ।
হেন আত্মীয়তা-ভাব ঈশ্বরের সনে ॥ ৩৩ ॥
প্রভু অবতার শিক্ষা দিলা জীবগণে ।
পিতা অপরাধ নাহি লন ছাবালের ॥ ৩৪ ॥
নৈকট্য-সম্বন্ধ নাহি তিলেক অন্তর ।
তবে কেন পাপকথা পাপ বা কিসের ॥ ৩৫ ॥
বালকে পালন করা কর্তব্য পিতার ।
কর্তব্য-পালনে তবে দয়া কিবা তাঁর ॥ ৩৬ ॥
বারেবারে বলিলেন প্রভু গুণমণি ।
প্রারব্ধ যাহারে কয় অতি সত্য মানি ॥ ৩৭ ॥
যদ্যপিহ সদা সঙ্গে রন ভগবান ।
তথাপি নাহিক কর্মফলের এড়ান ॥ ৩৮ ॥
কর্মফল ভক্তকেও কখন না বাছে ।
ধরিলেই দেহখানি দুঃখ-সুখ আছে ॥ ৩৯ ॥
জাজ্বল্য প্রমাণ-কথা শুন কালুবীর ।
কৃপামাত্র বরপুত্র নিজে ঈশ্বরীর ॥ ৪০ ॥
তবু তাঁর কারাবাস হৈল কালক্রমে ।
পতিতপাবনী-স্পর্শে পাপ-বিমোচন ॥ ৪১ ॥
বুকে পাষাণের চাপ কর্মফলগুণে ।
সিংহলে মশানে দেখ খুল্লনানন্দন ॥ ৪২ ॥
কর্মফল অনিবার্য না হয় খণ্ডন ।
শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী চতুর্ভুজে ॥ ৪৩ ॥
সাক্ষাৎ দেবকীদেবী দেখিলেন নিজে ।
জগতের নাথ কৃষ্ণ তাঁহার জননী ॥ ৪৪ ॥
কর্মফলে কারাবাস অদ্ভুত কাহিনী ।
মধুর উপমা প্রভু দিলা এইখানে ॥ ৪৫ ॥
কানার তুলনা কানা গেল গঙ্গাস্নানে ।
কিন্তু কানা চক্ষু তার রহিল তেমন ॥ ৪৬ ॥
যতই না সুখ-দুঃখ ভক্তজনে পায় ।
ভক্তির ঐশ্বর্য-জ্ঞান কভু না হারায় ॥ ৪৭ ॥
ঈশ্বরে বিশ্বাসসহ জ্ঞান-দীপ্তি হৃদে ।
অটল হইয়া রয় সম্পদে বিপদে ॥ ৪৮ ॥
সতত চৈতন্তবান পাণ্ডুপুত্রগণে ।
কিবা রাজ্যভোগে কিবা নির্বাসন বনে ॥ ৪৯ ॥
জীবের বিষয়াসক্তি যত হয় ইতি ।
ততই তাহার বাড়ে ঈশ্বরেতে মতি ॥ ৫০ ॥
কৃষ্ণের নিকটে রাই যত আগুয়ান ।
ততই তাঁহার নাকে কৃষ্ণের আঘ্রাণ ॥ ৫১ ॥
যে যত সান্নিধ্যে যায় তার তত ঋদ্ধি ।
মনোহর কি সুন্দর ভাবভক্তি বৃদ্ধি ॥ ৫২ ॥
যেমন জুয়ার ভাটা উভয়েই খেলে ।
সিন্ধুর সম্মুখবর্তী তটিনীর জলে ॥ ৫৩ ॥
জুয়ার ভাটায় ভক্ত হাসে কাঁদে গায় ।
কখন জলের তলে ডুব দিয়া যায় ॥ ৫৪ ॥
কখন উপরিভাগে করে সম্ভরণ ।
কখন সিন্ধুর সঙ্গে বিলাসাস্বাদন ॥ ৫৫ ॥
ভক্তের জুয়ার ভাটা গিয়ানীর নয় ।
গিয়ানীতে একটানা দিবানিশি রয় ॥ ৫৬ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানে একটানা পোঁ ধরিয়া যায় ।
সাকারবাদীরা রাগ-রাগিণী বাজায় ॥ ৫৭ ॥
একটানা কি প্রকার শুন বিবরণ ।
জ্ঞানী কহে সৃষ্টি গোটা স্বপ্নবৎ ভ্রম ॥ ৫৮ ॥
সচ্চিৎ-আনন্দময় ব্রহ্মনামে যিনি ।
সর্বদা স্বরূপে নিজে অবস্থিত তিনি ॥ ৫৯ ॥
বেদান্তের সারমর্ম দুর্বোধ্যাতিশয় ।
রাজষি মহর্ষি যোগী তপস্বিনিচয় ॥ ৬০ ॥
প্রণিধানে বহ্বায়াস কঠোর সাধনা ।
যুগযুগান্তর রত কষ্ট-ব্রত নানা ॥ ৬১ ॥
নির্জনে নৈমিষারণ্যে মত্ত জল্পনায় ।
সেই কথা আব্জি খুলে কন প্রভুরায় ॥ ৬২ ॥
সরল উপমাসহ মিঠে গ্রাম্যভাষা ।
গল্পচ্ছলে শুন এক গ্রামে ছিল চাষা ॥ ৬৩ ॥
মেঠ বটে মাঠে খাটে আটপিঠে চাষে ।
পরম ধার্মিক জ্ঞানী সবে ভালবাসে ॥ ৬৪ ॥
অপুত্রক ছিল কিন্তু কালে এইবার ।
বয়স অভীতে পরে হইল কুমার ॥ ৬৫ ॥
হারু নাম দিল তার নামের সময় ।
মা বাপের উভয়ের প্রিয় অতিশয় ॥ ৬৬ ॥
দৈবের ঘটনা তেঁহ একদিন ক্ষেতে ।
জনেক আসিল তথা সমাচার দিতে ॥ ৬৭ ॥
ওলাউঠাগ্রস্ত হারু জীবনসংশয় ।
শুনিয়া আসিল ত্বরা আপন আলয় ॥ ৬৮ ॥
চিকিৎসার নাহি ত্রুটি যত্নসহকারে ।
বিফল সকল গেল বাছাধন মরে ॥ ৬৯ ॥
পরিবারবর্গে সবে শোকেতে অধীর ।
চাষার নয়নে নাহি একবিন্দু নীর ॥ ৭০ ॥
বরঞ্চ সান্ত্বনা করে শোকাকুল জনে ।
কর্মহেতু চলে মাঠে তার পর দিনে ॥ ৭১ ॥
ক্ষেতের যতেক কর্ম করি সমাপন ।
ঘরেতে আসিয়া দেখে কাঁদে সর্বজন ॥ ৭২ ॥
চাষা কিন্তু আছে খাসা চিন্তা শোক দূর ।
গৃহিণী কহিল তারে তুমি কি নিঠুর ॥ ৭৩ ॥
সবে ধন নীলমণি হারু ছেড়ে গেল ।
একবিন্দু আঁখিবারি চক্ষে না পড়িল ॥ ৭৪ ॥
এত শুনি গৃহিণীকে করিল উত্তর ।
নামে মাত্র জেতে চাষা জ্ঞানে জ্ঞানিবর ॥ ৭৫ ॥
শুন শুন কেন তবে করি না রোদন ।
গত রাত্রিকালে এক দেখেছি স্বপন ॥ ৭৬ ॥
যেন হইয়াছি আমি রাজা কোন স্থলে ।
মহাসুখে কাটে কাল কোলে আট ছেলে ॥ ৭৭ ॥
এমন সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল মোর ।
জাগিয়া হয়েছি এবে চিন্তায় বিভোর ॥ ৭৮ ॥
কি মোর কর্তব্য কিছু বুঝিতে না পারি ।
হারুর কি এ আটের জন্য শোক করি ॥ ৭৯ ॥
চাষার অদ্বৈতজ্ঞান ষোল আনা পাকা ।
বুঝে নিত্য সত্য সেই পরমাত্মা একা ॥ ৮০ ॥
অপর যা দেখি স্বপ্নে সুপ্তে জাগরণে ।
সকল অলীক মিথ্যা সত্য কয় ভ্রমে ॥ ৮১ ॥
কহিতে কহিতে তত্ত্ব কথায় কথায় ।
মায়াবাদে উপনীত হইলেন রায় ॥ ৮২ ॥
বিধিমতে এইখানে কহেন গোসাঁই ।
আমার সকল গ্রাহ্য বাদ কিছু নাই ॥ ৮৩ ॥
যেমন তুরীয় গ্রাহ্য এক ব্রহ্মে লীন ।
তেমতি জাগ্রত স্বপ্ন সুষুপ্ত্যাদি তিন ॥ ৮৪ ॥
ব্রহ্ম যেন সত্যবোধ তেন মায়া তাঁর ।
জীব ও জগৎ দুই স্বীকার্য আমার ॥ ৮৫ ॥
জীব ও জগৎ-যুক্ত ব্রহ্ম একজন ।
দুয়ে দিলে বাদ কমে ব্রহ্মের ওজন ॥ ৮৬ ॥
বেলের মতন ব্রহ্ম ধর উপমায় ।
শস্য বীজ আঠা আর খোসা আছে তায় ॥ ৮৭ ॥
শস্য রাখি অন্য সবে করিলে বর্জন ।
বেলের নাহিক মিলে প্রকৃত ওজন ॥ ৮৮ ॥
মায়াশক্তি-বলে জীবজগৎ উদ্ভব ।
নিত্য লীলা উভয়েই একের বৈভব ॥ ৮৯ ॥
বুঝাইতে মায়াতত্ব কন তুলা দিয়ে ।
ব্রহ্ম আর ব্রহ্মশক্তি অভেদ উভয়ে ॥ ৯০ ॥
উপমায় জ্যোতিঃসহ মণি যেইরূপ ।
সেইমত শক্তিসহ ব্রহ্মের স্বরূপ ॥ ৯১ ॥
ভাবিলেই মণিখানি জ্যোতিঃ আছে তায় ।
উপলব্ধি হয় মণি জ্যোতির প্রভায় ॥ ৯২ ॥
পুনরায় জ্যোতিঃ যেথা মণি বিদ্যমান ।
ছাড়াছাড়ি নাহি দুয়ে একের সমান ॥ ৯৩ ॥
দোঁহে দোঁহা বিদ্যমান অবিচ্ছিন্নভাবে ।
ব্রহ্মের ওজন যায় সৃষ্টির অভাবে ॥ ৯৪ ॥
একাকী সচ্চিদানন্দ অদ্বিতীয় তিনি ।
শক্তি-ভেদে আখ্যা-ভেদ নানা নামে জানি ॥ ৯৫ ॥
বিশেষিয়া কন প্রভু শক্তির বাখানে ।
সৃষ্টিস্থিতিলয় যেথা শক্তি সেইখানে ॥ ৯৬ ॥
যেই বলে চলে কর্মশক্তি বলি তারে ।
শক্তির বিচিত্র খেলা সৃষ্টি চরাচরে ॥ ৯৭ ॥
লীলাস্বরূপিণী আদ্যাশক্তি নামে কয় ।
শক্তিই সচ্চিদানন্দ আর কেহ নয় ॥ ৯৮ ॥
উপমা ধরিলে তত্ত্ব হইবে সরল ।
মনে কর পূর্ণব্রহ্ম ঠিক যেন জল ॥ ৯৯ ॥
যদি সেই জলমধ্যে হয় সমুখিত ।
ভীষণ তরঙ্গমালা বিশ্বসমন্বিত ॥ ১০০ ॥
জলেতে তরঙ্গবিম্ব উঠে যে সকল ।
অপর কিছুই নয় সেই এক জল ॥ ১০১ ॥
শক্তির প্রভেদে মাত্র বিবিধ আকার ।
কাহার তরঙ্গ নাম বুদ্বুদ কাহার ॥ ১০২ ॥
আকারে নামেতে মাত্র বিভিন্ন কেবল ।
বস্তুগত সকলেই সেই এক জল ॥ ১০৩ ॥
স্বরাটে বিরাটে নিত্যে সাকার লীলায় ।
তিনিই একক মাত্র বুঝা মহাদায় ॥ ১০৪ ॥
নিত্য থেকে কত লীলা উঠে চিদাকাশে ।
ইচ্ছামত করি কর্ম পুনঃ তায় মিশে ॥ ১০৫ ॥
প্রভুর উপমা চিৎসাগর যেমন ।
তাহে যদি গুরু-বস্তু হয় নিপতন ॥ ১০৬ ॥
তখনি তরঙ্গ তুলে নাহি দেরি আর ।
কায়াবৃদ্ধিসহ সিন্ধু-সলিলে বিস্তার ॥ ১০৭ ॥
তরঙ্গের যদবধি সত্তা রহে জ্বলে ।
ইহাকেই নিত্য থেকে লীলান্তর বলে ॥ ১০৮ ॥
পুনশ্চ তরঙ্গ যবে জলে হয় লয় ।
তখন তাহাকে লীলা-থেকে-নিত্যে কয় ॥ ১০৯ ॥
মায়ালীলা বাদ-দেয়া জ্ঞানীদের আছে ।
ভক্ত লয় উভয়েই অতো নাহি বাছে ॥ ১১০ ॥
ঠিক ঠিক ভক্ত যেবা তাহার লক্ষণ ।
বেদান্তবিচারে কভু নাহি টলে মন ॥ ১১১ ॥
স্বপ্নবৎ মিথ্যা মায়া সাব্যস্ত বিচারে ।
হাজার গুনাও তবু ফিরে আসে ঘরে ॥ ১১২ ॥
জ্ঞান-বিচারেতে যদি ভক্তি প্রেম কমে ।
দুনো গুণে বেগে পুনঃ আসে কালক্রমে ॥ ১১৩ ॥
পরে অবতারবাদ কন ধীরে ধীরে ।
পীযূষপুরিত ভাষ শুনে প্রাণ হরে ॥ ১১৪ ॥
চৌদ্দপুয়া নরাধারে অখিলের পতি ।
থলির ভিতর যেন ঐরাবত হাতী ॥ ১১৫ ॥
জীবের বুদ্ধিতে লাগে অসম্ভব কাণ্ড ।
কেন না অত্যন্ত ক্ষুদ্র ধারণার ভাণ্ড ॥ ১১৬ ॥
বৃহতে অবোধ্য যেন পরম ঈশ্বর ।
তেহতি অবোধ্য তিনি অণুর ভিতর ॥ ১১৭ ॥
নরাকারে ঐশ্বর্যাদি সমভাবে রাজে ।
বৃক্ষের সম্পত্তি যেন অতি ক্ষুদ্র বীজে ॥ ১১৮ ॥
অসীম অনন্ত সত্য অদ্বিতীয় তিনি ।
পরমেশ পরাৎপর অখিলের স্বামী ॥ ১১৯ ॥
কিন্তু যদি ইচ্ছা তাঁর হয় মনে মনে ।
অবজ্ঞারবেশে এই মর্ত্যে আগমনে ॥ ১২০ ॥
সংশয়-সন্দেহশূন্য বুঝিবে বারতা ।
আসিতে পারেন হেন ধরেন ক্ষমতা ॥ ১২১ ॥
আসিতে পারেন আর আসেন ধরায় ।
মানুষের মত বেশে ধীর নর-কায় ॥ ১২২ ॥
সঙ্গে ল'য়ে আপনার সারবস্তু সব ।
মহৈশ্বর্য শক্তি আদি যাবৎ বৈভব ॥ ১২৩ ॥
অবতারে হন তিনি মানব-আকার ।
উপমা সহিত তাহা নহে বুঝিবার ॥ ১২৪ ॥
তিনিই তাঁহার মাত্র উপমার স্থল ।
অনুভব-প্রত্যক্ষের বিষয় কেবল ॥ ১২৫ ॥
উপমায় কিঞ্চিৎ আভাস মাত্র মিলে ।
দুগ্ধবতী গাভী গরু তুলা এই স্থলে ॥ ১২৬ ॥
যে অংশ গাভীর তুমি কর পরশন ।
লেজ খুর শৃঙ্গ কিবা সেইখানে মন ॥ ১২৭ ॥
ইহা অতি সত্য কথা মনে জানা স্থির ।
অঙ্গাংশে পরশ হয় পরশ গাভীর ॥ ১২৮ ॥
সেই মত অনন্তের সার বস্তু রহে ।
সীমাবদ্ধ চৌদ্দপুয়া অবতারদেহে ॥ ১২৯ ॥
করুণায় নরমূর্তি বিভু ভক্তিবশ ।
অবতারস্পর্শে হয় অনন্তে পরশ ॥ ১৩০ ॥
গাভীর সারাংশ দুধ অতিশয় মিঠে ।
লেজে খুরে নাহি মিলে মিলে মাত্র বাঁটে ॥ ১৩১ ॥
সেই মত ঈশ্বরের ভক্তি-প্রেম সার ।
অন্যত্রে না মিলে মিলে যেথা অবতার ॥ ১৩২ ॥
সেই হেতু পূর্ণব্রহ্ম বিভু সনাতন ।
ইচ্ছাময় শিবময় পতিত-পাবন ॥ ১৩৩ ॥
ধারণ করিয়া দেয় আসেন ধরায় ।
ভক্তিহীন জ্ঞানহীন জীবের শিক্ষায় ॥ ১৩৪ ॥
আগুনের সত্তা বটে আছে সব ঠাঁই ।
বেশী যেন কাঠে হেন অন্যত্রেতে নাই ॥ ১৩৫ ॥
সেইমত ঈশ-তত্ত্ব যত অবতারে ।
এতেক কিসেও নাই সৃষ্টির ভিতরে ॥ ১৩৬ ॥
ঈশ্বরের তত্ত্ব কিবা বিবরণ তাঁর ।
যদ্যপি কাহার হয় ইচ্ছা জানিবার ॥ ১৩৭ ॥
সে যেমন অন্বেষণ সযতনে করে ।
অন্যত্রেতে নয় মাত্র মনুষ্য-আধারে ॥ ১৩৮ ॥
নরবপু-অবতারে শক্তি বেশী রয় ।
কভু কভু পূর্ণভাবে তিল কম নয় ॥ ১৩৯ ॥
এত বলি কন প্রভু অখিলের রাজ ।
অবতারে কি লক্ষণ করয়ে বিরাজ ॥ ১৪০ ॥
আধারে উর্জিতা ভক্তি বিকশিত পায় ।
প্রেমভক্তি উভয়ের বন্যা বয়ে যায় ॥ ১৪১ ॥
দিবা কিবা বিভাবরী প্রেমেতে বিহ্বল ।
ভাবেভরা মাতোয়ারা যেমন পাগল ॥ ১৪২ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু পরম-ঈশ্বর ।
অক্ষম ধরিতে তেঁহ নরকলেবর ॥ ১৪৩ ॥
এমত কহিলে বড় কথা হয় আন ।
সীমাবদ্ধ শক্তি নহে সর্বশক্তিমান ॥ ১৪৪ ॥
কাজেই জীবের পক্ষে পরম মঙ্গল ।
সাধু-মহাত্মার বাক্যে বিশ্বাস কেবল ॥ ১৪৫ ॥
পুরাণাদি ভক্তিগ্রন্থ শ্রদ্ধাসহকারে ।
শ্রবণ-কীর্তন-কর্ম সরল অন্তরে ॥ ১৪৬ ॥
হীন হেয় কূটবুদ্ধি বিষয় কপটী ।
মারপেচে সুকৌশল পেটে মুখে দুটি ॥ ১৪৭ ॥
ধনমান বিজ্ঞ্যামদে যেন ভিজা শোলা ।
পদে পদে সংশয় সন্দেহ মনে মলা ॥ ১৪৮ ॥
পাটোয়ারী বিষয়-বুদ্ধিতে সুপণ্ডিত ।
হেন জনে সরলতা রহে না নিশ্চিত ॥ ১৪৯ ॥
সরলতা বিহনে বিশ্বাস নাহি হয় ।
সেই ভক্তি যার নাম বিশ্বাস প্রত্যয় ॥ ১৫০ ॥
সরলতা কহে কারে তাহার লক্ষণ ।
উপমা ধরিয়া দেখ বালক যেমন ॥ ১৫১ ॥
শিশুসম সরলতা যে আধারে থাকে ।
কৃপানিদানের কৃপা অধিক তাহাকে ॥ ১৫২ ॥
ঈশ্বর প্রত্যক্ষ প্রাপ্য দৃঢ় জ্ঞান সহ ।
অনুরাগভরে তাঁরে খুঁজে যদি কেহ ॥ ১৫৩ ॥
হোক অবতারবাদী কিংবা বিপরীত ।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ তাঁর সময়ে নিশ্চিত ॥ ১৫৪ ॥
নিরাকার সাকার সে এক ভগবান ।
রুচি-অভিমত পথে করহ পয়ান ॥ ১৫৫ ॥
পরিণামে এক বস্তু এক ফল জুটে ।
যে দিকে সন্দেশ খাও সেই দিকে মিঠে ॥ ১৫৬ ॥
সাকার ও নিরাকার দোঁহে সমতুল ।
লাভের উপায় এক অনুরাগ মূল ॥ ১৫৭ ॥
সর্ববিধভাবযুক্ত অখিলের পতি ।
ঈশ্বরীয় অবস্থার নাহি হয় ইতি ॥ ১৫৮ ॥
অটল অচলবৎ আপনার ভাবে ।
অনুরাগবেগে যেবা সিন্ধুনীরে ডুবে ॥ ১৫৯ ॥
দুর্লভ মানিক রত্ন লাভ হয় তার ।
জলের উপরিভাগে বিফল সাঁতার ॥ ১৬০ ॥
ঈশ্বরের সাধনায় সাধনা-বিধান ।
পূজা জপ ধ্যান আর নাম গুণগান ॥ ১৬১ ॥
বিনা কর্মে নাহি ফল কর্মের জীবনে ।
কর কর্ম ভগবানলাভের কারণে ॥ ১৬২ ॥
সিদ্ধি সিদ্ধি বলিয়া তুলিলে উচ্চ ভাষা ।
কোথায় কাহার কভু হইয়াছে নেশা ॥ ১৬৩ ॥
আনিয়া সিদ্ধির পাতা বাটিয়া তাহারে ।
পানীয় প্রস্তুতে যদি উদরস্থ করে ॥ ১৬৪ ॥
তখন তাহাতে নেশা হয় সুনিশ্চিত ।
অনুরাগ-নেশা হেতু সাধনা বিহিত ॥ ১৬৫ ॥
সাধনার স্থান বিধি অতি নিরজনে ।
জন-মানবেতে যেন কেহ নাহি জানে ॥ ১৬৬ ॥
যুক্তি যুক্ত বেড়া বাঁধা কচি চারাগাছে ।
কারণ পশুতে তাহে নষ্ট করে পাছে ॥ ১৬৭ ॥
কালে যবে মোটা বৃক্ষ গুঁড়ি কাণ্ড ভারি ।
তখন বাঁধিলে তাহে মদমত্ত করী ॥ ১৬৮ ॥
হেলায় আটক রাখে অনিষ্ট বিহনে ।
তেন ধারা যাবতীয় সাধকের গণে ॥ ১৬৯ ॥
প্রথমে গোপনে কর্ম সমুচিত হয় ।
যদবধি হরিপদে ভক্তি-লাভ নয় ॥ ১৭০ ॥
বিশ্বাস বিমল ভক্তি-বলে বাঁধি ছাতি ।
সংসারে প্রবেশে পরে নাহি কোন ক্ষতি ॥ ১৭১ ॥
মনরূপ দুধে পাতি দধি নিরজনে ।
মন্থন করিয়া জ্ঞান-ভক্তির মাখনে ॥ ১৭২ ॥
ভাসাইয়া রাখ যদি সংসারের নীরে ।
মিশিবে না ভাসিবেক তাহার উপরে ॥ ১৭৩ ॥
কিন্তু এই মন-দুধে দুধ অবস্থায় ।
সংসারের জলে কেহ যদ্যপি ভাসায় ॥ ১৭৪ ॥
দুধে নাহি রহে দুধ যায় মিশাইয়া ।
আপনার রূপগুণ বর্ণ হারাইয়া ॥ ১৭৫ ॥
সাধন-ভজনকর্মে যেবা শক্তিহীন ।
সংসারের গুরুভারে দেহ জীর্ণ ক্ষীণ ॥ ১৭৬ ॥
তারে বিধি দিলা প্রভু দয়ার সাগর ।
আম্মোক্তারনামা দিতে হরির উপর ॥ ১৭৭ ॥
অবিকল রীতি যথা বিড়ালশাবকে ।
মিউ রবে রহে সেথা মা যেথায় রাখে ॥ ১৭৮ ॥
অন্যত্রে যাইতে কভু চেষ্টা নাহি তার ।
যদ্যপি সেখানে হয় জীবন-সংহার ॥ ১৭৯ ॥
ভার সমপিয়া মায় করিলে বিশ্বাস ।
নিশ্চয় সময়ে হয় পূর্ণ মন আশ ॥ ১৮০ ॥
আছয়ে ত্রিবিধ সিদ্ধ শুন সমাচার ।
নিত্যসিদ্ধ কর্মসিদ্ধ কৃপাসিদ্ধ আর ॥ ১৮১ ॥
নিত্যসিদ্ধ নিত্যমুক্ত বেদবিধিছাড়া ।
স্বভাবতঃ রাগাত্মিকা ভক্তি-প্রেমে ভরা ॥ ১৮২ ॥
চিরভক্ত ঈশ্বরের অঙ্গেতে জনম ।
উপমা পাতাল-ফোঁড়া শিবের মতন ॥ ১৮৩ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে নাহি রাখরে পিরীতি ।
স্বভাবতঃ তে-সবার মৌমাছির রীতি ॥ ১৮৪ ॥
ঈশ্বরের পদাম্বুজে ঘুরিয়া বেড়ান ।
হরি-রস রূপ মধু শুধু করে পান ॥ ১৮৫ ॥
সাধ্য-সাধনায় সিদ্ধ যেবা ভাগ্যবান ।
অপর শ্রেণীর তেঁহ কর্মসিদ্ধ নাম ॥ ১৮৬ ॥
অনেক কষ্টের কর্ম বহু শ্রম তায় ।
ঘুরে ঘুরে নদী পার যেন বরিষায় ॥ ১৮৭ ॥
কৃপাসিদ্ধ যেই জন ধন্য রূপাবল ।
অনায়াসে ঘরে বসে খায় পাকা ফল ॥ ১৮৮ ॥
সাধন ভজন নাহি আবশ্যক তার ।
যেখানেতে ঈশ্বরের কৃপার সঞ্চার ॥ ১৮৯ ॥
যেমন বিউনি হাতে নাহি প্রয়োজন ।
বহে যদি সুশীতল মলয় পবন ॥ ১৯০ ॥
বিবেক বিরাগ বিনা শাস্ত্র-আলোচনা ।
সে কেবল অবিদ্যার মাত্র বিড়ম্বনা ॥ ১৯১ ॥
হাজার থাকিলে শক্তি শাস্ত্র ব্যাখ্যা করা ।
তাঁহাতে না দিলে ডুব নাহি পায় ধরা ॥ ১৯২ ॥
শাস্ত্রেতে উল্লেখ মাত্র লাভের উপায় ।
বিশেষ বুঝিয়া দেখ পত্র উপমায় ॥ ১৯৩ ॥
পত্রে লেখা পাঠাইতে সন্দেশ কাপড় ।
পাঠান্তে পত্রের আর রহেনা আদর ॥ ১৯৪ ॥
সারমর্ম সন্দেশ কাপড় রাখি মনে ।
পত্র ফেলে দিয়ে যায় বস্তুর সন্ধানে ॥ ১৯৫ ॥
সন্ধান যে করে তাঁয় ব্যাকুল অন্তরে ।
নিশ্চয় তাহায় তাঁর কৃপাদৃষ্টি পড়ে ॥ ১৯৬ ॥
যে কৃপার বলে মিলে হরিদরশন ।
দরশন পরে রঙ্গে কথোপকথন ॥ ১৯৭ ॥
মনে কল্পনায় নহে প্রত্যক্ষ চাক্ষুষে ।
তোমায় আমায় যেন এক ঠাঁই বসে ॥ ১৯৮ ॥
এত বলি খেদসহ কহিলেন রায় ।
কারে বলি কেবা করে বিশ্বাস কথায় ॥ ১৯৯ ॥
সাধনা শাস্ত্রের সার প্রভুর বচন ।
সন্তপ্ত চিত্তের সুখ-শান্তির আশ্রম ॥ ২০০ ॥
সাহস-ভরসাভরা অক্ষরে অক্ষরে ।
দীন
দুঃখী দুর্বলের ভবনদীপারে ॥ ২০১ ॥
আসক্তির কূপে মগ্ন যত জীবগণ ।
দারা-পুত্র-ধন-মানে গত প্রাণমন ॥ ২০২ ॥
শুনিলে ত্যাগের কথা রোমাঞ্চিত কায় ।
কানেতে অঙ্গুলি দিয়া ছুটিয়া পলায় ॥ ২০৩ ॥
দয়ায় কাতর হিয়া প্রভু নারায়ণ ।
পতিত-উদ্ধার-কাজে মর্ত্যে আগমন ॥ ২০৪ ॥
বিবিধ উপায় কৈলা বিবিধ বিধান ।
যাহে জীব হরি-পথে হয় আগুয়ান ॥ ২০৫ ॥
সন্নিধানে আসে যারা সময়-বিশেষে ।
গেঁটে বেঁধে দেন রত্ন বারেক পরশে ॥ ২০৬ ॥
যোগেশে মুনীশে যাহা বহ্বায়াসে পায় ।
কাহার প্রাপ্তির আসে আয়ু কেটে যায় ॥ ২০৭ ॥
মানের কাঙ্গালী গৃহী যারা আসে কাছে ।
নমস্কার সর্বাগ্রে আসন-দান পিছে ॥ ২০৮ ॥
সুমধুর সম্ভাষণে কুশল-জিজ্ঞাসা ।
সবিশেষ পরিচয় কি কারণ আসা ॥ ২০৯ ॥
হইলে মধ্যাহ্নকাল আহারের খোঁজ ।
নানা দ্রব্য শ্রীমন্দিরে আসে রোজ রোজ ॥ ২১০ ॥
রসাল সুমিষ্ট ফল তাকে গাদা করা ।
শিকায় মিষ্টির হাঁড়ি দিনেরেতে ভরা ॥ ২১১ ॥
সর্বানুপ্রবিষ্ট প্রভু সর্বভূতে বাস ।
লৌকিকে কেবলমাত্র কথায় তল্লাস ॥ ২১২ ॥
সর্বজ্ঞত্বগুণে কিন্তু সব আছে জানা ।
কে কি কোথা কেন কার কিরূপ বাসনা ॥ ২১৩ ॥
যে রসে মজিবে মন যাহে পুষ্টিকর ।
তারে দেন সেই রস রসের সাগর ॥ ২১৪ ॥
যাহাতে যাহার রুচি তাই দিয়া তায় ।
হরি পথে আকৃষ্ট করেন প্রভুরায় ॥ ২১৫ ॥
নাহি যায় সংসারীর আসক্তি সংসারে ।
অথচ মঙ্গল নাই যদি নাহি ছাড়ে ॥ ২১৬ ॥
সেই হেতু সংসারীর মঙ্গল বিধায়ে ।
কি বলিলা প্রভুদেব শুন মন দিয়ে ॥ ২১৭ ॥
সাধনভজন পক্ষে সংসার-আশ্রম ।
অতি নিরাপদ ঠাঁই কিল্লার মতন ॥ ২১৮ ॥
কামিনীকাঞ্চন তথা আছে মূর্তিমান ।
নিরাসক্তভাবে রবে সদা সাবধান ॥ ২১৯ ॥
সবিচারে উভয়েরে করিলে ব্যাভার ।
সাধন-সময়ে করে মহা উপকার ॥ ২২০ ॥
প্রকৃত সংসারী যেবা তাহার লক্ষণ ।
সংসারে কেবল দেহ হরিপদে মন ॥ ২২১ ॥
নিষ্কাম নির্লিপ্তভাবে সংসারের কাজ ।
মনখানি হরিপদে করিবে বিরাজ ॥ ২২২ ॥
নির্লিপ্ত কেমনে হবে তাহার উপায় ।
শুন কি বিধান তাহে দিলা প্রভুরায় ॥ ২২৩ ॥
সংসারীর উপযুক্ত নিরজনে বাস ।
অধিকন্তু বৎসরেক ন্যূনে এক মাস ॥ ২২৪ ॥
ঈশ্বরচিন্তায় কালে রবে অবিরত ।
প্রার্থনা করিবে তাঁয় হয়ে ব্যাকুলিত ॥ ২২৫ ॥
মনে মনে জানাইয়ে পরম-ঈশ্বরে ।
হে হরি আমার কেহ নাহি ত্রিসংসারে ॥ ২২৬ ॥
যাহাদিগে বলি আমি আপনার জন ।
তাহারা কেবল দিন দুয়ের মতন ॥ ২২৭ ॥
তুমি হরি একমাত্র সর্বস্ব আমার ।
বিষম সংসার সিন্ধু পারের কাণ্ডার ॥ ২২৮ ॥
পথহারা জনে দাও বলিয়া উপায় ।
কেমন করিয়া আমি পাইব তোমায় ॥ ২২৯ ॥
যত দিন সাবালক নহে পুক্রগণ ।
তদবধি সমুচিত লালনপালন ॥ ২৩০ ॥
পতিপ্রাণা রমণী যদ্যপি রহে তার ।
ভরণপোষণে রবে বিহিত যোগাড় ॥ ২৩১ ॥
ধর্ম-উপদেশ-শিক্ষা সর্বথা প্রকারে ।
যতদিন রবে প্রাণ দেহের ভিতরে ॥ ২৩২ ॥
সঞ্চয় রাখিবে কিছু তাহার কারণ ।
তোমার বিগতে হবে ভরণপোষণ ॥ ২৩৩ ॥
কিন্তু যদি হয় তেহ অসতী-আচার ।
রাখিতে হবে না কিছু ভবিষ্য যোগাড় ॥ ২৩৪ ॥
জ্ঞানী গৃহী জনে যোগ্য এই সব পালা ।
জানোন্মাদে খণ্ডে বটে পোষ্যভার-জ্বালা ॥ ২৩৫ ॥
গৃহীর কর্তব্য তবে হয় হস্তান্তর ।
পোয্যের পোষণে চিন্তা করেন ঈশ্বর ॥ ২৩৬ ॥
নাবালক রেখে যদি মরে জমিদার ।
তখনি কোম্পানী লয় বালকের ভার ॥ ২৩৭ ॥
পাঠাইয়া অছি এক আপনার জন ।
বালকে বিষয়ে করে রক্ষণাবেক্ষণ ॥ ২৩৮ ॥
জনক বশিষ্ঠ ব্যাস নির্লিপ্ত সংসারী ।
দুই হাতে ঘুরাতেন দুই তরবারি ॥ ২৩৯ ॥
একখান জ্ঞান আর কর্ম একখান ।
জ্ঞানহীন সংসারীতে জানে না সন্ধান ॥ ২৪০ ॥
অস্ত্রশস্ত্রে অঙ্গরক্ষা জ্ঞানে আত্মা রাখে ।
জ্ঞানী জনে ভগবানে চোখে চোখে দেখে ॥ ২৪১ ॥
যতক্ষণ নহে জ্ঞান ততক্ষণ তিনি ।
জ্ঞান-রত্ন-লাভে হয় সেই তিনি ইনি ॥ ২৪২ ॥
সতত হৃদয়মধ্যে হরি-দরশন ।
এই হয় ঠিক ঠিক জ্ঞানীর লক্ষণ ॥ ২৪৩ ॥
অপর লক্ষণ কিবা শুন পরিচয় ।
দেহাত্মবুদ্ধির হয় একেবারে লয় ॥ ২৪৪ ॥
স্বতস্তর বোধ হয় দেহেতে আত্মায় ।
শুভজল খোড়ো নারিকেল উপমায় ॥ ২৪৫ ॥
শস্যের সঙ্গেতে মালা ভিন্ন হয় কালে ।
খটখট করে শব্দ হাতে নাড়া দিলে ॥ ২৪৬ ॥
আর এক তাহার ভুলনা পরিপাটি ।
দুই তিন বৎসরের শুদ্ধ আম আঠি ॥ ২৪৭ ॥
দেহেতে আত্মায় যার ভিন্ন হয়ে যায় ।
সে হয় জীবন-মুক্ত বেড়িয়ে বেড়ায় ॥ ২৪৮ ॥
জীবনযুক্তের দশা বুঝিয়ে নিশ্চিত ।
দেহ-সুখে দুঃখে তেঁহ সম্বন্ধর হিত ॥ ২৪৯ ॥
জ্ঞানীর লক্ষণে আর শুনহ প্রমাণ ।
যখন সে শুনে কানে ঈশ্বরের নাম ॥ ২৫০ ॥
তখনি পুলক অঙ্গে চক্ষে বহে নীর ।
নিজে হারা প্রাণে সারা রোমাঞ্চশরীর ॥ ২৫১ ॥
আসক্তি গিয়াছে তাঁর কামিনীকাঞ্চনে ।
মনোরথ সিদ্ধ পূর্ণ হরি-দরশনে ॥ ২৫২ ॥
বিষয়ের রসে মন বিশুষ্ক যেথায় ।
হরি-উদ্দীপনা তাঁর কথায় কথায় ॥ ২৫৩ ॥
উপমা ইহাতে এক অতি পরিপাটি ।
যেমন বিশুদ্ধ দিয়াশলায়ের কাঠি ॥ ২৫৪ ॥
ঘষিলেই একবার জ্বলে উঠে ভাল ।
বিদূরিত তমোজাল ঠাঁই করে আলো ॥ ২৫৫ ॥
বিষয়ের আসক্তিতে আস্ত্র যেথা মন ।
সে মনে না হয় কভু হরি উদ্দীপন ॥ ২৫৬ ॥
ভিজা মন শুকাইতে কেবল উপায় ।
ব্যাকুল অন্তরে খালি ডাকা শ্যামা-মায় ॥ ২৫৭ ॥
মায়ের যদি হয় বোধ মায়ের মতন ।
তিলেকে বিষয়-রসে শুষ্ক হয় মন ॥ ২৫৮ ॥
আসন্ন সময়ে যাহে মনে পড়ে মায় ।
জীবের উচিত চিন্তা তাহার উপায় ॥ ২৫৯ ॥
অন্তিমে স্মরিয়া তাঁরে ছাড়ে যে জীবন ।
পুনরায় নহে আর জঠরে জনম ॥ ২৬০ ॥
ঈশ্বরের নামে পদে রাখিয়া বিশ্বাস ।
উপায়ের হেতু নিত্য করিবে অভ্যাস ॥ ২৬১ ॥
আচার্যগিরির কর্ম কঠিনাতিশয় ।
মায়ের আদেশ-শক্তি বিনা নাহি হয় ॥ ২৬২ ॥
সামান্য মানুষ গায়ে কিবা বল তার ।
যাহাতে করিতে পারে জীবের উদ্ধার ॥ ২৬৩ ॥
উদ্ধার মুক্তির নাম বন্ধনে মোচন ।
যাহাতে না হয় আর পুনশ্চ জনম ॥ ২৬৪ ॥
ভুবনমোহিনী মায়া যাঁর হাতে গড়া ।
কাহার শকতি দেয় মুক্তি তিনি ছাড়া ॥ ২৬৫ ॥
একা সে সচ্চিদানন্দ গুক কর্ণধার ।
তাঁহার ইচ্ছায় মাত্র মায়ায় নিস্তার ॥ ২৬৬ ॥
সৎ-গুরু পায় যদি কোন ভাগ্যবান ।
সত্বর উদ্ধার সর্ব পাশে পায় ত্রাণ ॥ ২৬৭ ॥
উপমায় ভেক যেন বেশী নাহি ডাকে ।
বিষধর ভুজঙ্গমে ধরিলে তাহাকে ॥ ২৬৮ ॥
বিষহীন ঢোঁড়ায় ধরিলে কিন্তু তায় ।
নিরন্তর ডাকে তেঁহ মর্ম-বেদনায় ॥ ২৬৯ ॥
নিরন্তর রব কেন শুন বিবরণ ।
গিলিতে ছাড়িতে ঢোঁড়া উভয়ে অক্ষম ॥ ২৭০ ॥
সেইমত সৎগুরু ধরেন যাহায় ।
দুই তিন ডাকে তার অহংকার যায় ॥ ২৭১ ॥
এই অহংকার মায়া ঘন-আবরণ ।
লুকায়ে যে রাখে কৃষ্ণ মুরলী-বদন ॥ ২৭২ ॥
যেবা পড়ে কাঁচা-গুরু-চোড়ার পাল্লায় ।
ভবের বন্ধনে মুক্তি কখন না পায় ॥ ২৭৩ ॥
গুরু শিষ্য উভয়ের দারুণ যন্ত্রণা ।
কানার কি হবে যদি নেতা হয় কানা ॥ ২৭৪ ॥
মায়া অহংকার কিবা ঘন-আবরণ ।
বাখানিয়া এইখানে প্রভুদেব কন ॥ ২৭৫ ॥
মেঘ যেন ঢাকে সূর্যে জগতলোচনে ।
মায়ায় লুকায়ে তেন রাখে ভগবানে ॥ ২৭৬ ॥
নিকটে ঈশ্বর জীব দেখিতে না পায় ।
মায়া আবরিয়া রাখে তাঁহার মায়ায় ॥ ২৭৭ ॥
আড়াই হাতের দূরে রামচন্দ্র যান ।
মায়া রূপা সীতাদেবী মধ্যে ব্যবধান ॥ ২৭৮ ॥
সেহেতু লক্ষ্মণ জীব দেখিতে না পায় ।
দুর্বাদলশ্যাম রাম কাছে আগে যায় ॥ ২৭৯ ॥
ঈশ্বর সান্নিধ্যে কত ঈশ্বর কোথায় ।
বিধিমতে বাখানিয়া কন প্রভুরায় ॥ ২৮০ ॥
জীব তো সচ্চিদানন্দ তাঁহার স্বরূপ ।
মায়ায় উপাধি-ভেদে ভুলিয়াছে রূপ ॥ ২৮১ ॥
মায়া উপাধির ভেদে যত জীবগণ ।
নানাভাবে নানারূপে বিভিন্ন রকম ॥ ২৮২ ॥
মায়া অহংকারে ভিন্ন কি প্রকার সেটি ।
জলের উপরিভাগে ঠিক যেন লাঠি ॥ ২৮৩ ॥
এক জল তাহে লাঠি ফেলার কারণ ।
দুভাগে বিভক্ত জল হয় দরশন ॥ ২৮৪ ॥
হেথা লাঠি অহংকার উপাধি কেবল ।
দেখিবে লইলে তুলে খালি এক জল ॥ ২৮৫ ॥
এই অহংকারোপাধি করিলে বর্জন ।
তখনি তোমাতে হবে তব দরশন ॥ ২৮৬ ॥
গিয়ানে হইতে পারে অহংকারহীন ।
কিন্তু সেই জ্ঞানলাভ বড়ই কঠিন ॥ ২৮৭ ॥
ধ্রুব নষ্ট অহংকার সমাধিস্থ জনে ।
মন যবে সহস্রার সপ্তমের ভূমে ॥ ২৮৮ ॥
জীবে বন্ধ যে আমি বা অহংকারে করে ।
সে আমি বজ্জাত আমি কাঁচা বলি তারে ॥ ২৮৯ ॥
এই আমি ভবপাশে বন্ধনের গোড়া ।
ইহারে না মারা যায় যোন আনা খাড়া ॥ ২৯০ ॥
একান্ত যদ্যপি এই আমি নাহি মরে ।
দাস আমি হয়ে রহ তাঁহার গোচরে ॥ ২৯১ ॥
দাস আমি আমি বটে কিন্তু সেটি পাকা ।
জলের উপরে নহে লাঠি মাত্র রেখা ॥ ২৯২ ॥
প্রধান উদ্দেশ্য ইহা লইয়া জনম ।
যে কোন উপায়ে করা হরিদরশন ॥ ২৯৩ ॥
হরিপুরে যাইবারে হরিদরশনে ।
সহজ ভক্তির পথ হালের আইনে ॥ ২৯৪ ॥
দরশন যেন তেন ভক্তিতে না পায় ।
প্রেমাভক্তি রাগভক্তি দরশনোপায় ॥ ২৯৫ ॥
প্রেমে অনুরাগে এই ভক্তির গঠন ।
মনের প্রকৃতি সেখা প্রমত্ত বারণ ॥ ২৯৬ ॥
বারণ না মানে ধায় পরান বিহ্বল ।
ছিন্ন করি জাতিকুল শীলের শিকল ॥ ২৯৭ ॥
মনে নাই আছে কিনা আছে দেহখানি ।
কৃষ্ণের লাগিয়া যেন ব্রজের গোপিনী ॥ ২৯৮ ॥
আর এক আছে ভক্তি বৈধী নামে জানা ।
ধর্ম যার খালি কর্ম ধ্যান-আরাধনা ॥ ২৯৯ ॥
বহুকাল
জপপুজা কৈলে আচরণ ।
ক্রমে ফুটে রাগাত্মিকা ভক্তিরত্নধন ॥ ৩০০ ॥
শাস্ত্র-বিধি সব
যায় রাগাত্মিকা এলে ।
শুল্ক পত্র তৃণ যেন উড়ায় ভিড়লে ॥ ৩০১ ॥
কর্ম-বৃক্ষ-উৎপাটন সহ
শক্ত গোড়া ।
প্রেমিকের ভিন্ন গতি বেদবিধিছাড়া ॥ ৩০২ ॥
বিশ্বগুরু কল্পতরু প্রভু গুণধাম ।
প্রতি ধর্মপন্থিমাত্রে আশ্রয়ের স্থান ॥ ৩০৩ ॥
শাক্ত শৈব কর্তাভজা বহুল বহুল ।
নবরসিকের মতে সাধক বাউল ॥ ৩০৪ ॥
পঞ্চনামে উপাসক বৈষ্ণবের দল ।
রামাৎ সন্ন্যাসী সাধু অতিথিসকল ॥ ৩০৫ ॥
দ্বিবিধ বেদান্তবাদী জ্ঞানমার্গে যাঁরা ।
শিখজাতি অবিহিত নানকপন্থীরা ॥ ৩০৬ ॥
ইদানীং ব্রহ্মজ্ঞানী নূতন ধরন ।
দরবেশি আল্লাভজা জাতিতে যবন ॥ ৩০৭ ॥
আর আর বহুবিধ বাহুল্য বাখান ।
রাজধর্ম-অবলম্বী ম্লেচ্ছ খ্রীষ্টিয়ান ॥ ৩০৮ ॥
সহস্র সহস্র কত ধর্মহীন জনা ।
কোন্ মতে পথে যাবে জানে না ঠিকানা ॥ ৩০৯ ॥
এ ছাড়া গাছের পাখী প্রভুপদে মন ।
অন্তরঙ্গ বহিরঙ্গ সাঙ্গোপাঙ্গগণ ॥ ৩১০ ॥
সুবিখ্যাত শাস্ত্রবেত্তা দেশে সুবিদিত ।
ইন্দেশের গৌরী ন্যায়ে পরম পণ্ডিত ॥ ৩১১ ॥
ধীর একে তাহে সিদ্ধ তান্ত্রিক সাধনে ।
হীরকের খণ্ডে যেন মণ্ডিত কাঞ্চনে ॥ ৩১২ ॥
নৈয়ায়িক নারায়ণ শাস্ত্রী গুণধর ।
কাটিলা যে বহুকাল প্রভুর গোচর ॥ ৩১৩ ॥
চতুর্বেদ মূর্তিমতী ব্রাহ্মণী যে জন ।
শ্রীপ্রভু করেন যবে সাধনভজন ॥ ৩১৪ ॥
হঠাৎ আসিয়া যেবা প্রভুর নিকটে ।
গৌরাঙ্গাবতার প্রভু পুরীমধ্যে রটে ॥ ৩১৫ ॥
তোতাপুরী প্রভুদেবে দিলা যে সন্ন্যাস ।
কাটাইলা পুরীমধ্যে একাদশ মাস ॥ ৩১৬ ॥
বর্ধমান-অধিপের সভার পণ্ডিত ।
নানাশাস্ত্রতত্ত্ববেত্তা খ্যাতি-সমন্বিত ॥ ৩১৭ ॥
নাম পদ্মলোচন ধীরেন্দ্র এক জনা ।
প্রভু-দরশনে যাঁর সফল বাসনা ॥ ৩১৮ ॥
দয়ানন্দ সরস্বতী বৈদান্তিক জন ।
কাশীর মঠের তাঁর চেলা অগণন ॥ ৩১৯ ॥
শ্রীপ্রভুর সমাধিস্থ অবস্থা দেখিয়া ।
বিস্ময়ে কহিলা যেবা আক্ষেপ করিয়া ॥ ৩২০ ॥
শাস্ত্রপাঠিগণে করে ঘোলের ভক্ষণ ।
মহাপুরুষেরা খান কেবল মাখন ॥ ৩২১ ॥
মহাভক্ত শশধর তর্কচূড়ামণি ।
প্রভুরে দেখিয়া হৈলা বাক্যহারা যিনি ॥ ৩২২ ॥
ব্রাহ্মভক্তচূড়ামণি কেশব সজ্জন ।
গোপনে পূজিলা যেবা প্রভুর চরণ ॥ ৩২৩ ॥
দীনবন্ধু ন্যায়রত্ব কোন্নগরে ঘর ।
যে মাগিল পরাজয় প্রভুর গোচর ॥ ৩২৪ ॥
শ্যামাপদ ন্যায়রত্ব খ্যাত সাধারণে ।
লুটাইলা যেবা মোর প্রভুর চরণে ॥ ৩২৫ ॥
কুঁচাকূলে খ্যাতনাম শ্রীরাম পণ্ডিত ।
প্রভু ভগবান যাঁর ধারণা নিশ্চিত ॥ ৩২৬ ॥
এইসব ধীরবর্গ সাধু ভক্তগণে ।
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা কথোপকথনে ॥ ৩২৭ ॥
শ্রীবদনে যাবতীয় কহিলা গোসাঁই ।
তার মধ্যে শাস্ত্র-গ্রন্থ কিছু বাদ নাই ॥ ৩২৮ ॥
সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে অদ্যাবধি যত ।
যাবৎ ঘটনাবলী সকল কথিত ॥ ৩২৯ ॥
সরল ভাষায় আর সংক্ষেপ প্রকারে ।
শিশু বালকেও যেন বুঝিবারে পারে ॥ ৩৩০ ॥
পরিহরি নিদ্রাহার জগতগোসাঁই ।
কত যে কহিলা তার লেখাজোখা নাই ॥ ৩৩১ ॥
কষ্টসাধ্য নানাবিধ সাধনভজনে ।
গিয়াছে গায়ের বল শারীরিক শ্রমে ॥ ৩৩২ ॥
শ্রীঅঙ্গের অস্থি-মাংস কোমল এমন ।
ননীতে গঠিত যেন এতই নরম ॥ ৩৩৩ ॥
এখন কেবল মাত্র রসনায় জোর ।
হিত-উক্তি-উপদেশে সতত বিভোর ॥ ৩৩৪ ॥
কহিতে কহিতে প্রভু অবসন্নপ্রায় ।
ভাবাবেশে বলিতেন সম্বোধিয়া মায় ॥ ৩৩৫ ॥
একা আমি কত কব না যায় কথনে ।
শক্তি দেহ বিজয়ে গিরিশে আর রামে ॥ ৩৩৬ ॥
আর আর ভক্তিমান দুই-এক-জন ।
পুঁথিমধ্যে নামোল্লেখ তাঁদের বারণ ॥ ৩৩৭ ॥
জীবহিতব্রত প্রভু মঙ্গলনিদান ।
জীবের কল্যাণে কৈলা আপনারে দান ॥ ৩৩৮ ॥
আপনারে দান কিসে শুন মন দিয়া ।
সাধন ভজন সব জীবের লাগিয়া ॥ ৩৩৯ ॥
সাধনায় ভগ্নস্বাস্থ্য শারীরিক বল ।
দেহেতে আছিলা মাত্র পরান কেবল ॥ ৩৪০ ॥
তাও এবে ওষ্ঠাগত রচনা-চালনে ।
পরে একেবারে দান জীবের কল্যাণে ॥ ৩৪১ ॥
কহিতে দারুণ কথা বিদরে হৃদয় ।
লীলাগীতি শুনে পরে পাবে পরিচয় ॥ ৩৪২ ॥
কণ্ঠই পঞ্চম ভূমি বেদের বচন ।
যেই ঠাঁই অবস্থিতি কৈলে পরে মন ॥ ৩৪৩ ॥
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা একমাত্র স্ফুরে ।
অবিরত দিবারাত্র রসনার দ্বারে ॥ ৩৪৪ ॥
এই ঠাঁই শ্রীগোসাঁই অধিক সময় ।
জীবে দিতে ঈশতত্ত্ব বহুবাক্যব্যয় ॥ ৩৪৫ ॥
সেই হেতু শ্রীকণ্ঠের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে ।
সামান্য বেদনাবোধ হইল এক্ষণে ॥ ৩৪৬ ॥
পশ্চাতে ভীষণ হেন বলিবার নয় ।
যাহার যাতনা কষ্টে পরানসংশয় ॥ ৩৪৭ ॥
এতেক প্রভুর কষ্ট জীবের কারণে ।
তবু না চাহিল জীব শ্রীচরণপানে ॥ ৩৪৮ ॥
হয় প্রভু জীব নামে মোরা কিবা জীব ।
দেখিয়া জীবের বুদ্ধি বাহিরায় জিব ॥ ৩৪৯ ॥
জীবত্রাতা শিবময় তুমি সনাতন ।
পাপতাপহারী হরি পতিত-পাবন ॥ ৩৫০ ॥
কৃপাসিন্ধু দীনবন্ধু বিভু পরমেশ ।
অজ্ঞানতিমিরনাশ বিশ্বগুরুবেশ ॥ ৩৫১ ॥
সচ্চিৎ-আনন্দময় মানবমুরতি ।
পূর্ণব্রহ্ম লীলা-প্রিয় অগতির গতি ॥ ৩৫২ ॥
রতি মতি দিয়া পদে করুণানিদান ।
অধমে শরণাপন্নে কর পরিত্রাণ ॥ ৩৫৩ ॥
আরম্ভ হইল এই গলদেশে ব্যথা ।
পরে কি হইল পাবে পশ্চাতে বারতা ॥ ৩৫৪ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা অমৃত-সমান ।
শ্রবণ-কীর্তনে হয় পরম কল্যাণ ॥ ৩৫৫ ॥
সংসারের সুখে দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩৫৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড
ভক্তের ঠাকুর
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
সুমধুর লীলাকথা অতি সুললিত ।
অক্ষরে অক্ষরে তাহে বরষে অমৃত ॥ ১ ॥
নিশ্চিত শীতল প্রাণ শ্রবণ কীর্তনে ।
প্রেমভক্তি পায় স্ফুর্তি ভারতীর গুণে ॥ ২ ॥
আজ্ঞামত শ্রীপ্রভুর দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
যাইতে দক্ষিণেশ্বরে কৈলা আয়োজন ॥ ৩ ॥
সঙ্গে ল'য়ে ভক্তিমতী সরলা গৃহিণী ।
আর তাঁর পক্ককেশা বৃদ্ধক জননী ॥ ৪ ॥
বিহারী মুখুজ্যে এক আপনার জন ।
কৌল শাক্ত প্রভুপদে ভক্তি বিলক্ষণ ॥ ৫ ॥
যার প্রতি দেবেন্দ্রের পড়ে কৃপা-কণা ।
সেখানে নিশ্চয় হয় প্রভুর করুণা ॥ ৬ ॥
স্বচক্ষে লীলার হাটে কৈনু দরশন ।
প্রভু রাজি রাজি যেথা দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ॥ ৭ ॥
বিহারী গরীব বড় বাহারিতে ঘর ।
অর্থ-উপার্জনে আসে শহর-ভিতর ॥ ৮ ॥
দৈবযোগে দেবেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় ।
সন্তানের সম গণি দিলেন আশ্রয় ॥ ৯ ॥
পাত্র দেখি পুত্রাপেক্ষা করেন যতন ।
চাকরি করিয়া দিলা মনের মতন ॥ ১০ ॥
অর্থ-পরমার্থে দু'য়ে পূর্ণ অভিলাষ ।
জনশ্রুতি কহে সৎসঙ্গে কাশীবাস ॥ ১১ ॥
দেবেন্দ্রের কৃপায় তাহারে কৃপাবান ।
ভক্তাধীন ভক্ত-প্রিয় প্রভু ভগবান ॥ ১২ ॥
প্রভুদেব একদিন দেবেন্দ্রকে কন ।
বিহারী প্রকৃত সিদ্ধ কৌল একজন ॥ ১৩ ॥
শুন দিনেকের কথা কহি তোরে মন ।
সরস্বতী পূজা করে বিহারী ব্রাহ্মণ ॥ ১৪ ॥
প্রত্যক্ষ দর্শন মূর্তি মাটি দিয়া গড়া ।
হেলে দুলে খেলে যেন জীবন্তের পারা ॥ ১৫ ॥
বিহারীর পূজা এত ভক্তি সহকারে ।
চিন্ময়ীর আবির্ভাব মৃন্ময়-আধারে ॥ ১৬ ॥
সেই সে বিহারী আজি মহাভাগ্যবান ।
দেবেন্দ্রের সঙ্গে প্রভু-দরশনে যান ॥ ১৭ ॥
বহু অগ্রে শুনেছেন দেবেন্দ্রের মাতা ।
পুরীর মধ্যে তো আছে অনেক দেবতা ॥ ১৮ ॥
সেহেতু দেবতাদের পূজার কারণে ।
গুড়ের বাতাসা কিছু আনাইলা কিনে ॥ ১৯ ॥
সেগুলি পুঁটুলিমধ্যে করিল বন্ধন ।
এ বিষয়ে স্ত্রীজাতির ব্যবস্থা যেমন ॥ ২০ ॥
ব্যাপার গোপনে রহে কেহ নাহি জানে ।
দেবেন্দ্র মিষ্টান্ন লন প্রভুর কারণে ॥ ২১ ॥
তরী-আরোহণে হয় গমন তথায় ।
যেখানে বিরাজমান রামকৃষ্ণরায় ॥ ২২ ॥
নিদাঘের কাল ইহা অতি ভয়ঙ্কর ।
প্রচণ্ড মার্তণ্ড জ্বলে মাথার উপর ॥ ২৩ ॥
আড়াই প্রহর বেলা গগনে এখন ।
ছোট খাটে উপবিষ্ট প্রভু নারায়ণ ॥ ২৪ ॥
একে একে প্রণাম করিলা সবে তাঁয় ।
বুড়ী খালি শ্রীপ্রভুর মুখপানে চায় ॥ ২৫ ॥
বাৎসল্য উদয় হৈল প্রভুর উপরে ।
অকল্যাণ হবে তাই প্রণমিতে নারে ॥ ২৬ ॥
অন্তর বুঝিয়া তবে উঠিয়া ত্বরিতে ।
বালকের মত প্রভু ধরিলেন হাতে ॥ ২৭ ॥
মাতৃবৎ সম্ভাষণ করিয়া তাঁহায় ।
বুড়ীরে বসান প্রভু নিজের খট্টায় ॥ ২৮ ॥
শিশুসম এক পাশে আপনি বসিয়ে ।
কথোপকথন কত যেন মায়ে পোয়ে ॥ ২৯ ॥
বুড়ীর আনন্দ এত নাহি লেখাজোখা ।
বাতাসার পুঁটুলি বগলে রাখে ঢাকা ॥ ৩০ ॥
বগলে পুঁটুলি আছে মোটে নাই মনে ।
ঘন ঘন চান খালি শ্রীমুখের পানে ॥ ৩১ ॥
শিশুসম ভায়ে প্রভু কহেন তখন ।
বাতাসা খাইতে মোর হয় বড় মন ॥ ৩২ ॥
নানা দ্রব্য মন্দিরেতে সাধ নহে তায় ।
বাসনা হইল মাত্র গুড়ে বাতাসায় ॥ ৩৩ ॥
দেবেন্দ্র দিলেন মূল্য বিহারীর হাতে ।
আলমবাজারে গিয়া বাতাসা আনিতে ॥ ৩৪ ॥
সন্নিকটে দোকান নাহিক তথাকার ।
সিকিক্রোশ দূর এই আলমবাজার ॥ ৩৫ ॥
উর্ধ্বশ্বাসে দ্রুতপদে চলিল বিহারী ।
বাতাসার জন্য প্রভু ব্যাকুলিত ভারি ॥ ৩৬ ॥
বাতাসা বাতাসা প্রভু ক্ষণে ক্ষণে কন ।
অবিকল অল্পবয়ঃ শিশুর মতন ॥ ৩৭ ॥
মায়ের নিকটে যেন অতি শিশু ছেলে ।
দ্রব্যের কারণে টানে ধরিয়া আঁচলে ॥ ৩৮ ॥
ঠিক তেন প্রভুদেব করি আলিগুলি ।
বাহির করিলা ঢাকা বুড়ীর পুঁটুলি ॥ ৩৯ ॥
তাড়াতাড়ি খুলিয়া দেখেন প্রভুরায় ।
যা খুঁজেন সেই দ্রব্য বাঁধা আছে তায় ॥ ৪০ ॥
আনন্দের সীমা নাই দেন শ্রীবদনে ।
দেবেন্দ্র কহেন তুমি বলিলে না কেনে ॥ ৪১ ॥
সুন্দর বাতাসা হেথা তোমাদের কাছে ।
বিহারীকে অত দূর পাঠাইলে মিছে ॥ ৪২ ॥
কৃপা করি কহ প্রভু তত্ত্ব সুবিশেষে ।
গুড়ের বাতাসা এত মিঠে হৈল কিসে ॥ ৪৩ ॥
শ্রীমন্দিরে নানা দ্রব্য পাত্রে পাত্রে ভরা ।
টাকা-সের সন্দেশ পাওয়া ছানাবড়া ॥ ৪৪ ॥
চন্দ্রপুলি ক্ষীরপুলি মনোহরা গজা ।
বর্ধমেনে সীতাভোগ মতিচুর তাজা ॥ ৪৫ ॥
রকমারি ফল-মূল সহজে না মিলে ।
গুড়ের বাতাসা মিষ্ট এ সকল ফেলে ॥ ৪৬ ॥
কি দ্রব্য মিশান ছিল বাতাসা-ভিতর ।
অণুকণা দেহ তার দয়ার সাগর ॥ ৪৭ ॥
বড়ই দারুণ দুঃখ রৈল মনে মনে ।
মম স্পর্শ ভোজ্য নাহি উঠিল বদনে ॥ ৪৮ ॥
অন্য কোন বস্তু প্রভু নাহি প্রয়োজন ।
বিনা তব সেবা-ভক্তি সেবার কারণ ॥ ৪৯ ॥
দেহ যার লাগিল তোমার সেবনে ।
মিছার জনম তার কি ছার জীবনে ॥ ৫০ ॥
মহা ভাগ্যবান এই দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর কৃপায় কত দিব্য দরশন ॥ ৫১ ॥
ভাবানন্দে মগ্ন মন রহে নিরন্তর ।
সংসারে থাকিতে লাগে গায়ে যেন জ্বর ॥ ৫২ ॥
পরিহরি গৃহবাস সন্ন্যাস-কামনা ।
তাহায় শ্রীরায় দেন বারংবার হানা ॥ ৫৩ ॥
দিনেকে দারুণ খেদ মর্ম দুঃখযুত ।
দণ্ডবৎ লম্বমান শ্রীপদে পতিত ॥ ৫৪ ॥
করদ্বয়ে পদদ্বয় করিয়া ধারণ ।
আর্তনাদে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদেন ব্রাহ্মণ ॥ ৫৫ ॥
ভক্তের অন্তর বুঝি প্রভু ভগবান ।
আপনার ভাবে তবে ধরিলেন গান ॥ ৫৬ ॥
ভাবে রসে গীতখানি সুন্দর কেমন ।
যেমন অবস্থাগত তাহার মতন ॥ ৫৭ ॥
গীত
কেন নদে ছেড়ে সোনার গোউর দণ্ডধারী হবি ।
ও তোর ঘরে বহু বিষ্ণুপ্রিয়া তার দশায় কি করবি ॥
একে বিশ্বরূপের শোকে শক্তিশেল রয়েছে বুকে ।
তুইও কি অভাগী মাকে অকূলে ডুবাবি ॥
উঠাইয়া শ্রীদেবেন্দ্রে বিশ্বশুরু
কন ।
শ্রীবাসাদি গৌরাঙ্গের যত ভক্তগণ ॥ ৫৮ ॥
কোন অংশে নহে কম সন্ন্যাসীর চেয়ে ।
বলিতেছি রহ ঘরে কি কাজ ছাড়িয়ে ॥ ৫৯ ॥
মহামন্ত্ররূপবাক্য সান্তনা প্রভুর ।
শুনিয়া সুস্থিরচিত্ত দেবেন্দ্র ঠাকুর ॥ ৬০ ॥
এহেন ভক্তের পদে মম নিবেদন ।
কৃপা কর ছুটে যেন সংসার-বন্ধন ॥ ৬১ ॥
কি সুন্দর ভক্ত সব এবার লীলায় ।
চরিত-শ্রবণে ভক্তি হয় প্রভুরায় ॥ ৬২ ॥
শুন কই আর এক ভক্তের কাহিনী ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তাঁহার জননী ॥ ৬৩ ॥
এখন বিধবাবস্থা পতি দেহছাড়া ।
পতিপ্রাণা সতীদেবী পাগলের পারা ॥ ৬৪ ॥
রুক্ষ কেশ রুক্ষ বেশ দেহে অযতন ।
জীর্ণ শীর্ণ কলেবরে কেবল জীবন ॥ ৬৫ ॥
আহারে আচারে ঠিক ঠিক সন্ন্যাসিনী ।
এহেন অবস্থাপ্রাপ্ত স্বভাবতঃ তিনি ॥ ৬৬ ॥
লৌকিক শাস্ত্রিক বিধি করিতে পালন ।
বাধ্য যেন হয় অন্যে কিন্তু নাহি মন ॥ ৬৭ ॥
এখানে তেমন নয় গুন সমাচার ।
ভক্তের করমকাণ্ড শাস্ত্রবিধিপার ॥ ৬৮ ॥
স্বভাবতঃ হয় কর্ম স্বভাবের বশে ।
বুঝিতে না পারে ভাব অভাগা মানুষে ॥ ৬৯ ॥
পতিভক্তি-অলঙ্কার বিভূষিত গায় ।
কঠোর আচার মহাত্যাগিনীর ন্যায় ॥ ৭০ ॥
কিন্তু না তিয়াগ কৈলা দিনেকের তরে ।
সুবর্ণ-বলয় আর শাড়ি লালপেড়ে ॥ ৭১ ॥
বিপরীত রীতি ইহা হিন্দু বিধবার ।
বিধবা হইলে পরা শাড়ি অলঙ্কার ॥ ৭২ ॥
তাই প্রতিবাসিনীরা করে কানাকানি ।
কি ধারা ধরিল দেহে মিত্রের জননী ॥ ৭৩ ॥
প্রবল নিজের ভাব অন্তরেতে বয় ।
কখন কাহারো বাক্যে কর্ণপাত নয় ॥ ৭৪ ॥
একদিন শ্রীমন্দিরে প্রভুদরশনে ।
সমাগতা মিত্র মাতা কন্যাগণ সনে ॥ ৭৫ ॥
সেই সঙ্গে আসিয়াছে প্রতিবাসিনীরা ।
তাঁহার আচারে করে দোষারোপ যারা ॥ ৭৬ ॥
কথার প্রসঙ্গে কথা কন গুণমণি ।
স্ত্রীজাতির ধর্ম কিবা তাহার কাহিনী ॥ ৭৭ ॥
প্রাণপণে পতিসেবা ধর্ম স্ত্রীজাতির ।
আজীবন পতি-পদে মতি রবে স্থির ॥ ৭৮ ॥
এ নহে আমার কথা শাস্ত্রের বাখান ।
সতীর পতিতে পঞ্চভাব বিদ্যমান ॥ ৭৯ ॥
সধবা বিধবা এই দুই অবস্থায় ।
সমভাবে রবে সতী পতির চিন্তায় ॥ ৮০ ॥
পতির দেহান্তে সতী বুঝে স্থিরতর ।
আছিল নশ্বর পতি এখন অমর ॥ ৮১ ॥
এত বলি বিশেষিয়া কন ভগবান ।
কোন এক রাজরানী তাঁহার আখ্যান ॥ ৮২ ॥
যতদিন সশরীরে ছিলেন রাজন ।
পরিত না অঙ্গে রানী কোন আভরণ ॥ ৮৩ ॥
সধবা লক্ষণ-রক্ষা পতির মঙ্গল ।
সেহেতু দু-খানি রুলি দু-হাতে কেবল ॥ ৮৪ ॥
বিধবা হইলে পরে শুন পরিচয় ।
তিয়াগিয়া রুলি পরে সুবর্ণ-বলয় ॥ ৮৫ ॥
কারণ জিজ্ঞাসা তাঁরে করে কোন জন ।
বৈধব্য দশায় কেন স্বর্ণ আভরণ ॥ ৮৫ ॥
উত্তর করিল তারে রানী ভক্তিমতী ।
সশরীরে নশ্বর ছিলেন মম পতি ॥ ৮৬ ॥
এখন ত্যজিয়া ভূতময় কলেবর ।
নিজরূপে অবস্থিত অজর অমর ॥ ৮৭ ॥
এত কহি অঙ্গুলিনির্দেশে গুণমণি ।
দেখাইয়া দিলা যেথা মিত্রের জননী ॥ ৮৮ ॥
অতিশয় উচ্চভাব সুন্দর কেমন ।
রানীর অন্তরে যেন ইহারও তেমন ॥ ৮৯ ॥
যেমন শ্রীপ্রভু সঙ্গে তেন ভক্তমালা ।
মনোহর শুন মন রামকৃষ্ণলীলা ॥ ৯০ ॥
আর দিনেকের কথা শুন বিবরণ ।
মিত্র জননীকে প্রভু কৈলা নিমন্ত্রণ ॥ ৯১ ॥
প্রসাদ পাইতে হেথা প্রভুর মন্দিরে ।
নন্দন নন্দিনী যত সব সমিভ্যারে ॥ ৯২ ॥
মিত্রের জননী মহা সৌভাগ্য গণিয়ে ।
যথাদিনে উপনীত পুত্রকন্যা ল'য়ে ॥ ৯৩ ॥
আনন্দের সীমা নাই প্রভুর অন্তরে ।
নেহারিয়া একত্তর ভক্ত-পরিবারে ॥ ৯৪ ॥
এক সঙ্গে বসাইয়া ভোজনকালীনে ।
খাওয়াইতে দিয়া ভার যথাযোগ্য জনে ॥ ৯৫ ॥
নিজের ভোজন-ঠাই কিঞ্চিৎ অন্তর ।
দেওয়ালের ব্যবধান মন্দির-ভিতর ॥ ৯৬ ॥
প্রভুর কি হৈল ভাব ভোজনের কালে ।
থালায় মাছের মুড়া লইলেন তুলে ॥ ৯৭ ॥
সত্ত্বর ফেলিয়া তাহা দিলা গুণমণি ।
যে পাতে ভোজন করে মিত্রের জননী ॥ ৯৮ ॥
মহাভাগ্যবতী তবে অসঙ্কোচ মন ।
গোটা মুড়া সেইক্ষণে করিলা ভোজন ॥ ৯৯ ॥
নন্দন পালটি পরে আসিলে ভবনে ।
মায়ে জিজ্ঞাসিল মুড়া খাইলে কেমনে ॥ ১০০ ॥
শুনিয়া জননী সবে করিল উত্তর ।
প্রসাদ না হয় কভু দ্রব্যের ভিতর ॥ ১০১ ॥
প্রসাদ প্রসাদ মাত্র প্রসাদ জিনিস ।
ফল নয় মিষ্টি নয় না অন্ন আমিষ ॥ ১০২ ॥
প্রসাদের ব্যাখ্যা কিবা গুন গুন মন ।
বুঝ যে করিলা ব্যাখ্যা সে জন কে জন ॥ ১০৩ ॥
বেদবাক্যাধিক গুরু ভক্তে যাহা কয় ।
প্রভুর বিরাজ-স্থান যাঁদের হৃদয় ॥ ১০৪ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্ত-পদে রাখি রতি মতি ।
শুন ভাগবত রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি ॥ ১০৫ ॥
ভক্তের যাতনা দুঃখ লাগে ভগবানে ।
বাহ্যিকে বাহ্যিকে নয় পরানে পরানে ॥ ১০৬ ॥
প্রত্যক্ষ প্রমাণে লীলা শুন অতঃপর ।
ভক্ত-ভগবানে নাই তিলেক অন্তর ॥ ১০৭ ॥
গলায় বেদনা এই প্রথম প্রথম ।
কোনদিন বাড়ে আর কোনদিন কম ॥ ১০৮ ॥
একদিন বলিল গোলাপ ঠাকুরানী ।
জনেক ডাক্তার আছে আমি তারে জানি ॥ ১০৯ ॥
অতি বিচক্ষণ তেহ সর্বজনে রটে ।
যেখানে জামাই বাড়ি তাহার নিকটে ॥ ১১০ ॥
সরল প্রভুর ধারা বালকের ন্যায় ।
বলিলেন ভাল কালি যাইব তথায় ॥ ১১১ ॥
পরদিন প্রত্যুষে উঠিয়া গুণমণি ।
সঙ্গে লাটু কালী ও গোলাপ ঠাকুরানী ॥ ১১৪ ॥
চলিলেন শহরেতে তরী-আরোহণে ।
গঙ্গার উপরে নানা কথোপকথনে ॥ ১১৫ ॥
এই কালী কালীচন্দ্র বালক বয়েস ।
মা-বাপ ছাড়িয়া রহে যেথা পরমেশ ॥ ১১৬ ॥
প্রভুর সেবায় রত দিবস-যামিনী ।
মার কাছে যেমন গোলাপ ঠাকুরানী ॥ ১১৭ ॥
মহাভক্তিমতী এই ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
পুঁথিতে রহিল নাম 'ভক্ত-মা' বলিয়ে ॥ ১১৮ ॥
ভক্তিতে অকুতোবল লজ্জা ঘৃণা নাই ।
ঘর যেথা মাতা আর জগৎ-গোসাঁই ॥ ১১৯ ॥
প্রভুর কৃপায় ভক্তি বিশ্বাসের জোরে ।
আকারে প্রকৃতি কিন্তু পুরুষ আচারে ॥ ১২০ ॥
প্রথমে সংসারী যবে আছিলা নন্দিনী ।
এখন স্বভাব ধারা যেন উদাসিনী ॥ ১২১ ॥
মায়ায় বিমুক্ত মন প্রভুপদে নাচে ।
নির্ভয়ে গমন সঙ্গে ডাক্তারের কাছে ॥ ১২২ ॥
কুমারটুলির ঘাটে উতরিল তরী ।
নামিলেন এইখানে করিবারে গাড়ি ॥ ১২৩ ॥
লাটু, ডাকিলেন গাড়ি শ্রীপ্রভুর লেগে ।
বসিলেন ভক্ত-মা ঠাকুর একদিকে ॥ ১২৪ ॥
অন্যদিকে লাটু, কালীকুমার দুজন ।
এইখানে বুদ্ধিহারা এইবারে মন ॥ ১২৫ ॥
কি ভাবের কোন্ ভক্ত কেবা কোন্ জনা ।
ব্যাভার আচার দৃষ্টে আভাসেতে চেনা ॥ ১২৬ ॥
পরম তিয়াগী প্রভু এবার লীলায় ।
স্ত্রীজাতির গাত্রগন্ধ অসহ্য নাসায় ॥ ১২৭ ॥
পরশে শ্রীঅঙ্গখানি যায় এঁকে যেঁকে ।
কাঞ্চনে যেমন ধারা তেমন স্ত্রীলোকে ॥ ১২৮ ॥
আজি ভক্ত-মার সঙ্গে একাসনে যান ।
বুঝিবারে শুদ্ধ বুদ্ধি দেহ ভগবান ॥ ১২৯ ॥
লীলা দেখিবার তরে কর যুক্ত আঁখি ।
জীবনে কামনা এবে একমাত্র রাখি ॥ ১৩০ ॥
পূর্ণ কর কৃপাসিন্ধু বাঞ্ছাকল্পতরু ।
তমো-বিনাশন বিভু জগতের গুরু ॥ ১৩১ ॥
বিষম সমস্যা তত্ত্ব শুন শুন মন ।
আকারে দর্শন নহে বস্তুর দর্শন ॥ ১৩২ ॥
আকারে বস্তুতে দোঁহে বিভিন্ন প্রকার ।
আকার কেবল মাত্র বস্তুর আধার ॥ ১৩৩ ॥
যেন তেন চক্ষে বস্তু দেখিবার নয় ।
বস্তু যাঁর তাঁর কাছে জানা পরিচয় ॥ ১৩৪ ॥
বস্তুগত বস্তুমধ্যে সবে এক আতি ।
আকারে পুরুষ কেহ কেহ বা প্রকৃতি ॥ ১৩৫ ॥
বস্তু নিরখিয়ে প্রভু করেন নির্ণয় ।
কেবা কিবা কার সঙ্গে সম্বন্ধ কি হয় ॥ ১৩৬ ॥
সম্বন্ধ ধরিয়া হয় আচার ব্যাভার ।
শুন তবে কহি তার কিছু সমাচার ॥ ১৩৭ ॥
একদিন ঘোড়াগাড়ি করি আরোহণ ।
নরেন্দ্র প্রভৃতি সঙ্গে শহরে গমন ॥ ১৩৮ ॥
দিনকর খরতর কররাজি ঢালে ।
শশীর সঙ্গেতে পথে দেখা হেনকালে ॥ ১৩৯ ॥
তাড়াতাড়ি ছুটে গাড়ি নাহিক বিরাম ।
সেবকাগ্রগণ্য শশী পাছু পাছু ধান ॥ ১৪০ ॥
গাড়ির মধ্যেতে স্থান আছে বসিবার ।
নরেন্দ্র তাঁহারে ডাকে করিয়া চীৎকার ॥ ১৪১ ॥
প্রভুদেব বারবার মানা তাহে করে ।
শশীর নাহিক ঠাঁই গাড়ির ভিতরে ॥ ১৪২ ॥
নরেন্দ্র শ্রীপ্রভুদেবে কৈল প্রত্যুত্তর ।
ক্ষতি কি যদ্যপি বসে ছাদের উপর ॥ ১৪৩ ॥
তাহাতেও নারাজ হইয়া প্রভু কন ।
হাঁটিয়া হাঁটিয়া শশী আসিবে এখন ॥ ১৪৪ ॥
শুন মন কার সঙ্গে বহে কিবা ভাব ।
লীলাদৃষ্টি নহে ভাবে থাকিলে অভাব ॥ ১৪৫ ॥
অকলঙ্ক-কলেবর ব্রাহ্মণ-নন্দন ।
স্বভাবতঃ মায়া-মুক্ত প্রভুপদে মন ॥ ১৪৬ ॥
তারে পরশিতে গাড়ি না দিলা গোসাঁই ।
এখানে ভক্ত-মা পায় একাসনে ঠাঁই ॥ ১৪৭ ॥
প্রত্যেক ভক্তের সঙ্গে ভাব স্বতন্তর ।
শুন লীলাকথা পরে বুঝিবে রগড় ॥ ১৪৮ ॥
হেথা উপনীত গাড়ি ডাক্তারখানায় ।
তিনজনে লয়ে সঙ্গে নামিলেন রায় ॥ ১৪৯ ॥
ডাক্তারের যশোরাশি জানা সবাকার ।
সুবিখ্যাত নাম দুর্গাচরণ ডাক্তার ॥ ১৫০ ॥
দরশন দিয়া তাঁয় কহেন তখন ।
পীড়ার প্রকৃতি-আদি যত বিবরণ ॥ ১৫১ ॥
বিচক্ষণ চিকিৎসক মনে বিচারিয়ে ।
ঔষধ প্রদান কৈল এক টাকা লয়ে ॥ ১৫২ ॥
পাল্টিয়া প্রভুদেব ভক্তদের সনে ।
পথে পথে উপনীত বিডনবাগানে ॥ ১৫৩ ॥
শহরের মধ্যে ইহা সুন্দর বাগান ।
সেখানেতে ভক্ত-মায়ে তিলক দেখান ॥ ১৫৪ ॥
রকমারি বৃক্ষ লতা ইহার ভিতরে ।
সিমেন্টে তিলক-চিত্র আঁকা চারিধারে ॥ ১৫৫ ॥
একে একে নিরখিতে তিলকের মালা ।
ক্রমশঃ গগনে হৈল অতিশয় বেলা ॥ ১৫৬ ॥
ধীরে ধীরে গঙ্গাতীরে যবে অগ্রসর ।
তখন অতীত প্রায় আড়াই প্রহর ॥ ১৫৭ ॥
জলস্পর্শ নাই করে সব অনাহারে ।
তরী আরোহণ কৈলা ফিরিতে মন্দিরে ॥ ১৫৮ ॥
কিছুদুর অগ্রসর আসিলে তরণী ।
ক্ষুধায় আকুল হৈল সকলের প্রাণী ॥ ১৫৯ ॥
পেট যেন তপ্ত খোলা নাড়ী জলে চুঁয়ে ।
উপবাসী যেন কত মাসাদি ধরিয়ে ॥ ১৬০ ॥
কিছু কেহ মুখে কিন্তু বলিতে না পারে ।
জঠরের জ্বালা খালি জঠরে সম্বরে ॥ ১৬১ ॥
ভক্তদের পানে চেয়ে কন প্রভুরায় ।
বড়ই পেয়েছে ক্ষুধা পেট জ্বলে যায় ॥ ১৬২ ॥
সহিতে না পারি আর ভকত-বৎসল ।
জিজ্ঞাসিলা কার কাছে কি আছে সম্বল ॥ ১৬৩ ॥
লাটু কালী শূন্য-থলি এক বস্ত্র সার ।
প্রভুর নিকটে থাকে সেবা করে তাঁর ॥ ১৬৪ ॥
ভক্ত-মা বিশুষ্ককণ্ঠ বাক্য নাহি ফুটে ।
বলিলেন এক আনা পুঁজি আছে গেঁঠে ॥ ১৬৫ ॥
বরানগরের ঘাটে বাঁধিয়া তরণী ।
গ্রামের ভিতরে কালী চলিল অমনি ॥ ১৬৬ ॥
ক্ষুধায় না চলে পদ লাগে পায় পায় ।
কিছু পরে রসমণ্ডি আনিল ঠোঙ্গায় ॥ ১৬৭ ॥
গুন্তিতে অনেকগুলি প্রায় চারিগণ্ডা ।
দেখিয়াই সবাকার প্রাণ হৈল ঠাণ্ডা ॥ ১৬৮ ॥
প্রসাদ পাবার আশা সকলের মনে ।
মিষ্টিমুখে উদর পুরাবে জলপানে ॥ ১৬৯ ॥
সে গুড়ে পড়িল কিন্তু বালি সবাকার ।
ভক্তের সঙ্গেতে খেলা মধুর ব্যাপার ॥ ১৭০ ॥
শ্রীকরে ধরিয়া ঠোঙ্গা মুদিয়া নয়ন ।
একে একে সব প্রভু করিলা ভোজন ॥ ১৭১ ॥
পশ্চাতে চাটিয়া পাতা দিলা ভক্ত মায় ।
নিজে হাতে পাতাখানি ফেলিতে গঙ্গায় ॥ ১৭২ ॥
ভক্ত-মা সঙ্কেত মত পাতা দিয়া ফেলে ।
প্রভুকে খাওয়ান জল অঞ্জলিতে তুলে ॥ ১৭৩ ॥
নিত্যাপেক্ষা নরলীলা দুর্বোধ্যাতিশয় ।
সামান্য জীবের শিরে ধারণা হয় ॥ ১৭৪ ॥
নিরাকারে যেমন দুর্বোধ্য ভগবান ।
সাকারে সেইমত অন্ধে দেখে আন ॥ ১৭৫ ॥
আঁকিতে ক্ষমতা নাই রৈল মনে মনে ।
কারে বা দেখাব চিত্র কে বুঝিবে প্রাণে ॥ ১৭৬ ॥
ভাগ্যবান যেবা কৃপাপ্রাপ্ত ঈশ্বরের ।
বুঝিতে তাঁহার পক্ষে যা কহিনু ঢের ॥ ১৭৭ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবচনে শুন শুন মন ।
পিত্রাজ্ঞায় রঘুমণি যবে যান বন ॥ ১৭৮ ॥
সাত জন ঋষি মাত্র চিনেছিল তাঁরে ।
সেই পূর্ণব্রহ্ম রাম নর-কলেবরে ॥ ১৭৯ ॥
সাধিতে লীলার কার্য অরণ্যে গমন ।
অপরে দেখিল রামে নৃপতি-নন্দন ॥ ১৮০ ॥
সেই কথা এইখানে নহে ধারণার ।
দীন-দুঃখী-বেশে রামকৃষ্ণ অবতার ॥ ১৮১ ॥
জগৎ পালনে যিনি পরম ঈশ্বর ।
গলায় বেদনা আজি ক্ষুধায় কাতর ॥ ১৮২ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে নাহি তাঁর এক তিল বল ।
শ্রীকরে তুলিয়া খেতে জাহ্নবীর জল ॥ ১৮৩ ॥
সঙ্গে যাঁরা তেন তাঁরা এক বস্ত্র পুঁজি ।
কখন বা পান অন্ন কখনও বা কাঁজি ॥ ১৮৪ ॥
কেমনে বুঝিবে নরে এই সেই জন ।
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের নিদান কারণ ॥ ১৮৫ ॥
লীলায় অগাধ গণ্ড কেবা পায় তল ।
শ্রীপ্রভু হইলা বাঁকা হইয়া সরল ॥ ১৮৬ ॥
আজিকার লীলাকথা শুন অতঃপর ।
জলপানে শ্রীপ্রভুর ভরিল উদর ॥ ১৮৭ ॥
প্রভুর তৃপ্তিতে পূর্ণ তৃপ্ত ভক্তগণে ।
দেখিয়া রঙ্গের কাণ্ড হাসে তিন জনে ॥ ১৮৮ ॥
পরস্পর মুখপানে চায় বারে বারে ।
আনন্দ উথলে পড়ে হৃদয় আধারে ॥ ১৮৯ ॥
প্রভুও তাঁদের সঙ্গে হাসি মিশাইয়া ।
উত্তাল তরঙ্গ আরো দিলা উথলিয়া ॥ ১৯০ ॥
কেবা চিত্রকর হেন সৃষ্টির ভিতরে ।
এ বিচিত্র রঙ্গ-চিত্রে বর্ণ দিতে পারে ॥ ১৯১ ॥
লীলাকরে আছে বর্ণ প্রতিবিম্ব তার ।
পড়ে মাত্র ভক্ত-চিত্ত মুকুরমাকার ॥ ১৯২ ॥
কিছুক্ষণ করি খেলা চিত্তের প্রাঙ্গণে ।
পুনঃ গিয়া মিশে যায় জনমের স্থানে ॥ ১৯৩ ॥
সূর্যের বরন যেন তার সঙ্গে রয় ।
অস্তে অস্ত পুনরায় উদয়ে উদয় ॥ ১৯৪ ॥
এ চিত্রের একমাত্র লীলাকরে থানা ।
বোবা বলে কালা শুনে চক্ষে দেখে কানা ॥ ১৯৫ ॥
দর্শন শ্রবণ আর বাগিন্দ্রিয় যায় ।
শ্রীপ্রভুর দীপ্তিমান বর্ণের প্রভায় ॥ ১৯৬ ॥
অমৃত-ভাণ্ডার রামকৃষ্ণলীলাগীতি ।
ধীরে ধীরে শুন এই রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৯৭ ॥
পুত্র-পৌত্রে ভক্তিলাভ শ্রবণ-কীর্তনে ।
বড়ই দয়াল প্রভু সংসারীর গণে ॥ ১৯৮ ॥
চতুর্থ খণ্ড
সভক্তে প্রভুর পানিহাটী মহোৎসবে গমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বন্দ দুঁহু শুরু
ইষ্ট,
বিশ্বপতি
রামকৃষ্ণ,
পুরুষের শ্রেষ্ঠ প্রভুরায় ।
বন্দ জগত-জননী, এবে গুরুদারা
যিনি,
আদ্যাশক্তি আগত লীলায় ॥ ১ ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ, দোঁহাকার ভক্তবৃন্দ,
সাঙ্গোপাঙ্গ লীলার সহায় ।
বন্দ সেই গঙ্গাতট, যেথা রাজে পঞ্চবট,
তপ-জপ যাহার তলায় ॥ ২ ॥
বন্দ সেই বিরতলা, যেখানে সাধন-লীলা,
দ্বাদশ বৎসর নিরন্তর ।
হইয়া সর্বস্বত্যাগী, জীবের কল্যাণ লাগি,
করিলেন দয়ার সাগর ॥ ৩ ॥
বন্দ সেই কালীবাটী, পাবন চেতন মাটি,
কোটি কোটি বন্ধ লোকজন ।
বারেক নমিয়া মাথা, মুকুতি পাইল যেথা,
পরশিয়া প্রভুর চরণ ॥ ৪ ॥
বন্দ সে মন্দির মেলা, লয়ে যেথা ভক্তমালা,
খেলা কৈলা লীলার ঈশ্বর ।
বন্দ সে যুগল পাট, ছোট বড় দু'টি
খাট,
শয্যারাম যাহার উপর ॥ ৫ ॥
মহালীলা শ্রীপ্রভুর,
গাইলে গুনিলে দূর,
পাপ তাপ মন-মলিনতা ।
খুঁটিনাটি তিয়াগিয়া,
কায়মনপ্রাণ
দিয়া,
শুন মন রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৬ ॥
গলায় বেদনা প্রায়, দিন দিন বৃদ্ধি পায়,
আরোগ্যের উপায়বিধানে ।
অন্তরঙ্গ ভক্তগণ, একসঙ্গে
সংজোটন,
প্রভুর মন্দিরে এক দিনে ॥ ৭ ॥
গিরিশ দেবেন্দ্র রাম, ভক্ত বসু বলরাম,
কুমার নরেন্দ্রনাথ আর ।
চক্ষুতে চশমাযুক্ত, সুন্দর
সুরেন্দ্র মিত্র,
মহাভক্ত মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৮ ॥
আর কত ঘরভরা, মনে নাই কারা তাঁরা,
মিশামিশি চেনা-অচেনায় ।
ভক্তের মেলানি দেখি, মহাতুষ্ট বাঁকা-আখি,
পূর্ব আস্যে বসিয়া খট্টায় ॥ ৯ ॥
ভক্তাধীন ভগবান, ভক্তপ্রিয়
ভক্তপ্রাণ,
পাইয়া সম্মুখে ভক্তপাতি ।
বেদনার কষ্ট যত, যাবতীয় তিরোহিত,
প্রভু যেন সহজপ্রকৃতি ॥ ১০ ॥
ভক্তি-প্রিয় রামকৃষ্ণ, ভক্তিতে অতুল তুষ্ট,
তাই তুলি ভক্তির তরঙ্গ ।
ভক্তগণ সঙ্গে হেথা, রঙ্গরসে কম কথা,
ভক্তিমাখা গোউর প্রসঙ্গ ॥ ১১ ॥
জ্ঞান ভক্তি দুই মত, শেষোক্ত প্রশস্ত পথ,
এই শিক্ষা দিতে জীবগণে ।
জ্ঞানেতে অন্তর পূর্ণ, কর্মেতে ভক্তির চিহ্ন,
আচরিলা শ্রী্রভু আপনে ॥ ১২ ॥
ভক্তি-শিক্ষা আচরণ, গুণ-গান-সংকীর্তন,
জপ পূজা নামের মহিমা ।
ভোগরাগ বেশ ভূষা, সেবা অনুরাগ নেশা,
রূপ ধরি ধ্যানের গরিমা ॥ ১৩ ॥
অর্চনাদি দেবাদির, ষষ্ঠী মাকালাদি পীর,
মতি স্থির সকলেতে তিনি ।
সর্বত্রে তাঁহার সত্তা, তিনি জগতের কর্তা,
দেহে তাঁর গোটা সৃষ্টিখানি ॥ ১৪ ॥
প্রার্থনা গোচরে তাঁর, দাসবৎ রাখিবার,
আজ্ঞাধীন চাকর যেমন ।
আমি কি আমার শব্দ, একেবারে যেথা স্তব্ধ,
অগ্নি-দগ্ধ রজ্জুর মতন ॥ ১৫ ॥
বেদান্তের ভাষ্যকার, শঙ্কর শিবাবতার,
ভাষ্যে যিনি করিলা বাখান ।
এক ব্রহ্ম সার সত্তা, জীব ও জগৎ মিথ্যা,
মায়া ছায়া অলীক সমান ॥ ১৬ ॥
ইহাতে কেবল সায়, কই দিলা প্রভুরায়,
বলিলেন উত্তর বচনে ।
জীব ও জগৎ ছেড়ে, ব্রহ্ম থেকে দিলে পরে,
ব্রহ্মের ওজন যায় কমে ॥ ১৭ ॥
জীব ও জগৎ নামে, ত্রিভুবনে যারে জানে,
ব্রহ্মের সে শক্তির বিকাশ ।
শক্তি সৃষ্টিস্বরূপিণী, যাহে ধরি ব্রহ্মে জানি,
শক্তি-বলে ব্রহ্মের প্রকাশ ॥ ১৮ ॥
ধানের তণ্ডুল সার, মানি কথা
বারবার,
ত্যাগ করি তুষ আবরণ ।
ক্ষেতে যদি যায় পোঁতা, জনমে আঁকুর কোথা,
শক্তিহীন ব্রহ্মও তেমন ॥ ১৯ ॥
শক্তিতে জনমে সৃষ্টি, খাই মাখি পাই পুষ্টি,
হাসি কাঁদি অবস্থার গুণে ।
দেখি শুনি দিবানিশি, ভুগি সুখ-দুঃখরাশি,
মিথ্যা তাহে বলিব কেমনে ॥ ২০ ॥
যাঁর নিত্য তাঁর লীলা, উভয়েই একের খেলা,
নিত্যবৎ সত্য লীলাখানি ।
দোঁহাধরি দোঁহা পাই, উনো দুনো কেহ নাই,
তাও বটে তাও বটে মানি ॥ ২১ ॥
বাক্যমন-অগোচর, বটেন
অখিলেশ্বর,
ক্রিয়াকাণ্ড তপাদির পার ।
পুনঃ শুদ্ধ বুদ্ধিবলে, প্রত্যক্ষ তাঁহারে মিলে,
লীলা তাঁর বিচিত্র প্রকার ॥ ২২ ॥
অসম্ভব কিছু নাই, বারে বারে শ্রীগোসাঁই,
বলিলেন বিশেষ প্রকারে ।
শুন মন সাবধানে, এখে নাই অন্য মানে,
ভক্তিকে প্রশস্ত রাখিবারে ॥ ২৩ ॥
প্রভু অবতারে মত,
প্রশস্ত ভক্তির পথ,
দুর্বল কালের জীবপক্ষে ।
আগাগোড়া সমভাবে, চাক্ষুষ দেখিতে পাবে,
ভক্তিপথে শ্রীপ্রভুর শিক্ষে ॥ ২৪ ॥
গোউর-লীলার কথা, বলিতে বলিতে হেথা,
বিভোরাঙ্গ হইয়া আপনে ।
প্রভুপদে মজা প্রাণ, ভক্তিপথে আগুয়ান,
জিজ্ঞাসিলা দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণে ॥ ২৫
॥
গঙ্গাতটে বিদ্যমান, পানিহাটি নামে গ্রাম,
মনোহর স্থান অতিশয় ।
সুবিদিত লোকে সব, চিঁড়াভোগ মহোৎসব,
বৎসর বৎসর তথা হয় ॥ ২৬ ॥
জুটে কত লোকজন, সংখ্যা নাই অগণন,
সংকীর্তন করে দলে দলে ।
মরি কি মাধুরী আহা, তুমি কি দেখেছ তাহা,
চল যাই একসঙ্গে মিলে ॥ ২৭ ॥
বলিলে করিব কাজ, আর নাহি সহে ব্যাজ,
একতানে কায়বাক্যমন ।
এত বলি ভক্তরামে, আজ্ঞা হৈল সেই ক্ষণে,
করিতে তরীর আয়োজন ॥ ২৮ ॥
আজ্ঞা শুনি ভক্তবর, প্রসারিয়া
যুক্তকর,
হাসিমুখে করেন উত্তর ।
পেনেটির মহোৎসবে, কেমনে গমন হবে,
গলায় বেদনা তাই ডর ॥ ২৯ ॥
নিষেধে বদনে হাসি, এদিকে অন্তরে খুশী,
কারণ করহ অবধান ।
প্রভুদেবে ল'য়ে সাথে, ইচ্ছা বুলে মেতে পথে,
হুজুগ-পিয়ারা ভক্ত রাম ॥ ৩০ ॥
বালক স্বভাব রায়, প্রত্যুত্তরে কৈলা
তাঁয়,
গলায় ব্যথায় নাহি হানি ।
পেনেটির মহোৎসবে, যেমতে যাইতে হবে,
যাব বলে বলিয়াছি আমি ॥ ৩১ ॥
সত্যপ্রিয় সত্যপ্রাণ,
সত্যরূপে ভগবান,
গিয়ান প্রভুর আজীবন ।
সত্য স্থিতি সত্য মতি, সত্যে চিরকাল গতি,
প্রাণপণে সত্যের পালন ॥ ৩২ ॥
ভালমন্দ মানামান, পাপপুণ্য জ্ঞানাজ্ঞান,
শুচি ও অশুচি বলি দিয়া ।
রাখিয়া সযত্নে কাছে, দুটি বস্তু বেছে বেছে,
শুদ্ধভক্তি সত্যেরে ধরিয়া ॥ ৩৩ ॥
প্রকৃতি বুঝিয়া রাম, তখন অমনি
যান,
জলযানে মাঝিরা যেখানে ।
ভাড়া করি চারি তরী, তখনি আইলা ফিরি,
গোচর করিলা শ্রীচরণে ॥ ৩৪ ॥
পানসীর মাঝে দাঁড়, শ্রীপদে ভকতি ভারি,
চৌধারে যতেক গঙ্গাতটে ।
উৎসবের ধার্যদিনে, সকালে বাঁধিল এনে,
চারি তরী পুরীর নিকটে ॥ ৩৫ ॥
হেথা বহু ভক্তগণ, ক্রমে ক্রমে সংযোটন,
হইতে লাগিল শ্রীমন্দিরে ।
আনন্দের ঠিক চিত্র, আঁকিবার তিলমাত্র,
শক্তি নাহি আমার ভিতরে ॥ ৩৬ ॥
আনন্দের সিন্ধু রায়, দুলিয়া লীলার বায়,
কানায় কানায় সমুখিত ।
নানাবিধ রঙ্গে ভঙ্গে, তরঙ্গ তুলিয়া সঙ্গে,
আপনে আপনি আন্দোলিত ॥ ৩৭ ॥
ভক্তযূথ তাহে গিয়া, পড়ে অঙ্গ ভাসাইয়া,
লহরে লহরে করে খেলা ।
সরসীর স্বচ্ছ জলে, নানাভাবে হেলে ছলে,
যেইরূপ রাজহংসমালা ॥ ৩৮ ॥
জলময় কলেবর, সেইরূপ সরোবর,
শ্রীপ্রভু-সাগরে এইখানে ।
আহা মরি কি মাধুরী, আনন্দ-কারণ-বারি,
সুধা তিক্ত যাহার তুলনে ॥ ৩৯ ॥
স্বর্গবাসী দেবতারা, অজর অমর যাঁরা,
সূক্ষ্মদেহে বিমানে বেড়ান ।
অতুল শকতিযুত, তাঁহারাও অবিদিত,
প্রভু-সিন্ধু-বারির সন্ধান ॥ ৪০ ॥
নারদাদি ঋষিবর,
শুকদের তপঃপর,
কেবল করিল পরশন ।
গণ্ডুষেক পিয়ে পানি, শববৎ
শূলপানি,
অবাক কাহিনী শুন মন ॥ ৪১ ॥
হেথা প্রভু-ভক্তগণ,
উঠু-চুবু-সন্তরণ,
অনুক্ষণ সেই জলে করে ।
সমস্যা বিষম শক্ত, বুঝিবারে প্রভুভক্ত,
কেবা তাঁরা নরকলেবরে ॥ ৪২ ॥
বুঝিতে নাহিক শক্তি, ভক্তপদে মাগি ভক্তি,
যোজন অন্তরে মুক্তি রাখি ।
একমাত্র অভিলাষ, হইয়া
দাসানুদাস,
চরণসেবায় যেন থাকি ॥ ৪৩ ॥
এই সব ভক্তপাতি, সঙ্গে লয়ে বিশ্বপতি,
প্রভুদেব লীলার ঈশ্বরে ।
আনন্দে মগন মন,
করিলেন আরোহণ,
ঘাটে বাঁধা তরীর উপরে ॥ ৪৪ ॥
কাছে কাছে চারি তরী, চালাইল ধীরি ধীরি,
ব্রহ্ম বারি-বাহিনী গঙ্গায় ।
ইষ্টমন ভক্তগণে,
মধ্যে লয়ে ভগবানে,
আনন্দে আনন্দ-গীত গায় ॥ ৪৫ ॥
গীত
প্রেমের বাজারে আনন্দের মেলা ।
হরি
ভক্তসঙ্গে রসরজে আনন্দে করে খেলা ।
ইত্যাদি ।
এখানে শুনিয়া গান, বাহ্যহারা ভগবান,
শুন তাহে কি হইল ফল ।
সেই সিন্ধু আনন্দের, বাড়িয়া উঠিল ঢের,
আধার উথলে পড়ে জল ॥ ৪৬ ॥
ছদ্মবেশে শ্রীগোসাঁই, চিনে অন্যে সাধ্য নাই,
চিনে মাত্র সহচরগণে ।
ভক্তিতে অভূলতেজা, তাঁহারা লুটিল মজা,
এই মহালীলার প্রাঙ্গণে ॥ ৪৭ ॥
নরচক্ষে দিয়া ধূলা, এবারে
প্রভুর খেলা,
অপরে না পাইল সন্ধান ।
নিত্যধাম পরিহরি, ব্রহ্মাণ্ডের অধিকারী,
সকায় ধরায় মূর্তিমান ॥ ৪৮ ॥
ভাগ্যে যদি কেহ শুনে, তত্ত্ব নাহি পশে প্রাণে,
বরঞ্চ উত্তরে তর্কে কয় ।
করিয়া ভীষণ কোপ, মনুষ্যে ঈশ্বরারোপ,
অসম্ভব কে করে প্রত্যয় ॥ ৪৯ ॥
পণ্ডিতে অধিক ধোঁকা, কথা কয় চোখাচোখা,
বিপরীত তর্ক-সহকারে ।
প্রমাণে সাকার নাই, বিশ্বাস-প্রত্যয়ে পাই,
বোধ উপলব্ধির দুয়ারে ॥ ৫০ ॥
স্বরাটে বিরাট যিনি, মায়াময় মায়াস্বামী,
সর্বাহপ্রবিষ্ট বিশ্বকায় ।
সর্বজ্ঞ সর্বগশক্তি, সদা যাঁর
আজ্ঞাবর্তী,
যুক্তিতে কি বুঝিবে তাঁহায় ॥ ৫১ ॥
বিন্দুতে যে সিন্ধুময়, অণুতে যে হিমালয়,
ব্যয়ে যাঁর ক্ষয় মোটে নাই ।
অঙ্কপাতে দিয়া ঠিক, কি তাঁয় করিবে ঠিক,
অঙ্ক যাঁর নাহি পায় খেই ॥ ৫২ ॥
সাকারে ও নিরাকারে, সমভাবে খেলা করে,
সমকালে অবিচ্ছিন্নভাবে ।
নাহি যেথা কথারব, কিংবা কিছু অসম্ভব,
কথায় কি তাঁহারে বুঝিবে ॥ ৫৩ ॥
মানুষের মাথাগুলি, যেমন শামুক খুলি,
বিন্দু বুদ্ধি আধারের স্থল ।
আছে যদি একফোঁটা, তাঁহাতে অনেক লেঠা,
ঠিক যেন কাদা-ঘাঁটা জল ॥ ৫৪ ॥
জলে নাহি জলাকার, তাহে নহে ভাতিবার,
চন্দ্রমার প্রতিবিম্বখানি ।
দর্পণ ধূলায় মাখা, নাহি যায় মুখ দেখা,
মলিনতা-আবরণে হানি ॥ ৫৫ ॥
পরাবিদ্যা বলি তাকে, কায়মনোবাক্যে একে,
গুরুবাক্যে কেবল প্রত্যয় ।
তাহে যার স্থিতি গতি, গিরিবৎ স্থিরমতি,
সুপণ্ডিত সেই জনে কয় ॥ ৫৬ ॥
হৃদয়ে বিশ্বাস-খুঁটি, ভক্তি-ডোরে বাঁধ আঁটি,
পদ দুটি প্রভুর আমার ।
চল যাই দুই জনে, লীলা-গীতি আন্দোলনে,
কুলহীন ভবসিন্ধুপার ॥ ৫৭ ॥
এখানে দেখহ রঙ্গ,
ভগবান ভক্তসঙ্গ,
আনন্দের তুলিয়া তুফান ।
ধূলা জগতের চক্ষে, পুততোয়া গঙ্গাবক্ষে,
সগণে আপনে ভাসমান ॥ ৫৮ ॥
ভাবভঙ্গে প্রভুরায়, বাহ্যচেঁঠা এলে গায়,
আঁখি হাসি দুয়ের দুয়ারে ।
এত কথা ইশারায়, ভাষা নাহি কূল পায়,
ভেসে যায় অকূল-পাথারে ॥ ৫৯ ॥
উল্লাসে হৃদয় নাচে, পানিহাটি যত কাছে,
দূরে থেকে পশিল শ্রবণে ।
উচ্চ আনন্দের রোল, বাজে শত শত খোল,
করতাল রণশিক্ষা সনে ॥ ৬০ ॥
দ্রুতগতি তরী চলে, আসিয়া লাগিল কূলে,
মহোৎসব হয় যেইখানে ।
প্রভুপদে মন আঁটা, নবাই চৈতন্য জেঠা,
আগত উৎসব-দরশনে ॥ ৬১ ॥
তরীতে দেখিয়া রায়, আছাড় কাছাড় খায়,
লুটাপুটি যায় ধরাতলে ।
কভু ধরিবারে তরী, বীরডম্ফে লম্ফ মারি,
ঝাঁপ দিতে যান গঙ্গাজলে ॥ ৬২ ॥
শ্রীচরণ-দরশনে, দিগ্বিদিক্
নাহি মানে,
ঠিক যেন উন্মাদের প্রায় ।
সত্বর ডাঙ্গায় গিয়া, অঙ্গে হাত বুলাইয়া,
শান্ত তাঁরে করিলেন রায় ॥ ৬৩ ॥
পরে প্রভু ভক্তাধীন, বটবৃক্ষ
প্রদক্ষিণ,
কৈলা যত লয়ে ভক্তগণ ।
যেই বটবৃক্ষমূলে, গৌরাঙ্গের মূল লীলে,
মহোৎসব যাহার কারণ ॥ ৬৪ ॥
গৌরভক্ত এক জন, বন্দি তাঁর শ্রীচরণ,
নিতাই মল্লিক নামে তিনি ।
শুভ সমাচার পেয়ে, সত্বর আইল ধেয়ে,
যেখা প্রভু অখিলের স্বামী ॥ ৬৫ ॥
প্রভুপদে ভক্তিমতি, যুক্ত এই মহামতি,
ভক্তিমাখা বিনয় বচনে ।
প্রভুকে প্রার্থনা করে, সভক্তে গমন তরে,
সন্নিকটে তাঁর নিকেতনে ॥ ৬৬ ॥
গোউর-নিতাই ঘরে, ভক্তিভরে সেবা করে,
ভক্তি বড় গৌরাঙ্গের পায় ।
ভক্তগণ সহ লয়ে, প্রেমে পুলকিত হয়ে,
বসাইলা বৈঠকখানায় ॥ ৬৭ ॥
মন্দিরের পাছুবর্তী, গোরা-নিতায়ের মৃতি,
বিজ্ঞমান আছয়ে যেখানে ।
কীর্তনীয়া দলে দলে, নাচে গায় কুতুহলে,
এই মহা উৎসবের দিনে ॥ ৬৮ ॥
কিছুক্ষণ হৈলে গত, মল্লিক দু-করযুক্ত,
নিবেদন কৈলা শ্রীগোচরে ।
ভিতরে প্রবেশ করি, যেখানে ঠাকুরবাড়ি,
বিগ্রহের দরশন তরে ॥ ৬৯ ॥
স্থানে গমনের আগে, শ্রীঅঙ্গে আবেশ লাগে,
পথিমধ্যে ক্ষণের ভিতরে ।
প্রভুর প্রকৃতি জ্ঞাত, ভক্তগণ
সচকিত,
আছে অঙ্গ রক্ষা করিবারে ॥ ৭০ ॥
ঘোরে আবেশের নেশা, ভিতরে যখন আসা,
দালানের প্রাঙ্গণ উপর ।
কীর্তনীয়া দলে দলে, বেড়িল সকলে মিলে,
ভাবে ভরা মূর্তি মনোহর ॥ ৭১ ॥
পুলকে আকুল গাত্র, কেশরি-বিক্রমে নৃত্য,
দেখি নেত্রে লাগে চমৎকার ।
স্থান হৈল পরিপূর্ণ, চারিদিকে লোকারণ্য,
দেখিবারে নৃত্যের বাহার ॥ ৭২ ॥
নেহারিতে শ্রীগোসাঁই, নীচে যে না পায় ঠাঁই,
দরশন-পিয়াসের চোটে ।
ছাদের উপরে ধায়, কেহ উচ্চস্থানে যায়,
কেহ কেহ গাছে গিয়ে উঠে ॥ ৭৩ ॥
কীর্তনে প্রভুর নৃত্য, কি শক্তি আঁকিব চিত্র,
নৃত্যে মোর শ্রীপ্রভুর কর ।
আকর্ণ পুরিত টানে,
যেইরূপ ধনুগুণে,
ধানুকী ছাড়িতে যায় শর ॥ ৭৪ ॥
বাম হস্ত প্রসারিত,
সরল সরের মত,
দক্ষিণ বুকের দিকে মোড়া ।
ঠিক যেন আধাআধি, গলা কিংবা কণ্ঠাবধি,
বক্ষে লগ্ন অঙ্গুলির গোড়া ॥ ৭৫ ॥
ধরে অঙ্গে মহাবল, পদচাপে
ধরাতল,
অবিকল হেলাহেলি করে ।
কভু অঙ্গ এত ঢলে, পড়ে যেন ভূমিতলে,
পড়ি পড়ি কিন্তু নাহি পড়ে ॥ ৭৬ ॥
ভক্তগণে পায় ডর, এ যে নৃত্য
ভয়ঙ্কর,
পাছে বাড়ে বেদনা গলায় ।
শান্ত করিবার তরে, বিধিমতে চেষ্টা করে,
কিন্তু হয় বিফল উপায় ॥ ৭৭ ॥
ভিতিভাব ভক্তদের, অন্তরে পাইয়া টের,
হইলা আপনি শাস্ত নিজে ।
তখন লইয়া তাঁয়, ভক্তেরা বাহিরে যায়,
অঙ্গবাস ঘামে গেছে ভিজে ॥ ৭৮ ॥
মল্লিক সোনার বেনে, সত্য সত্য সোনা চিনে,
কাতরে দাঁড়ায়ে একধারে ।
যোগাইছে যাহা লাগে, প্রভুর সেবায় লেগে,
অতি ভক্তি যত্ন সহকারে ॥ ৭৯ ॥
প্রভু যবে প্রকৃতিস্থ, হয়ে
তেঁহ শশব্যস্ত,
যুক্তকরে করিয়া কাকুতি ।
প্রভু ভক্তগণে কন, জলযোগ আয়োজন,
আগমন করুন সম্প্রতি ॥ ৮০ ॥
রাঘবের ঘাট হেথা, মূল মহোৎসব যেথা,
তথাকার গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর বারতা পেয়ে, গোচরে আসিয়া ধেয়ে,
আগমনে কৈলা নিবেদন ॥ ৮১ ॥
তথায় যুগল-ঠাম, মনোহর
রাধাশ্যাম,
রাঘব সেবক ছিল যার ।
রাঘব পণ্ডিত যিনি, গৌরাঙ্গের গণ তিনি,
জন্ম যবে গৌরাঙ্গাবতার ॥ ৮২ ॥
গোস্বামীরে শ্রীগোসাঁই, কহেন কেমনে যাই,
গলায় বেদনা অতিশয় ।
শ্রীবাক্য না শুনে কানে, শ্রীহস্তধরিয়া টানে,
সহ স্মৃতি মিনতি বিনয় ॥ ৮৩ ॥
ভক্তিপ্রিয় ভগবান, ভক্তিতে দিয়াছে টান,
ভক্তিমান গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
থাকিতে না পারি আর, হইলেন আগুসার,
ছায়াবৎ পাছু ভক্তগণ ॥ ৮৪ ॥
ভাবে ভরা অনিবার, কি ভাব কখন তাঁর,
ধারাবৎ নিরন্তর কয় ।
সঙ্গে যাঁরা অহরহ, তাঁরাও বুঝে না কেহ,
একবাক্যে সকলেই কয় ॥ ৮৫ ॥
অবোধ্য যাঁহার নাম, বিশ্বনাথ বিশ্বধাম,
অবোধ্য সকল অবস্থায় ।
সাকারেও বোধাতীত, নিরাকারে যেই মত,
সীমাবদ্ধ কেবা বলে তাঁয় ॥ ৮৬ ॥
থাকিয়া দেহের ঘরে, যে প্রভু জানিতে পারে,
ব্রাহ্মাণ্ডের যাবৎ বারতা ।
হয়েছে কি হবে পরে, কার্যাবলী স্তরে স্তরে,
সীমাবদ্ধ তিনি কিবা কথা ॥ ৮৭ ॥
হেথা একে অন্যে পিটে, দাগ শ্রীপ্রভুর পিঠে,
সহ গাত্রে প্রহার-যাতনা ।
কাছে কিবা লোকান্তরে, তিনি পান দেখিবারে,
কোথা কিবা কি হয় ঘটনা ॥ ৮৮ ॥
একদিন গঙ্গাকূলে,
ঠিক পঞ্চবট মূলে,
বসিয়া আছেন প্রভুরায় ।
গভীর ভাবেতে মগ্ন, অঙ্গে বাহ্যচেঁঠাশূন্য,
জড়বৎ পুত্তলিকা প্রায় ॥ ৮৯ ॥
অঙ্গবাস আলখাল, সঙ্গে আছে রামলাল,
ভ্রাতৃ-পুত্র নিজের প্রভুর ।
অকস্মাৎ হেনকালে, হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ
বলে,
হাত তুলে উঠিলা ঠাকুর ॥ ৯০ ॥
রামলাল কিছু পরে, জিজ্ঞাসা করিল তাঁরে,
কহিবারে কিবা বিবরণ ।
তবে কন গোসাঁই, প্রত্যক্ষ দেখিতে পাই,
দেশে এক পুজারী ব্রাহ্মণ ॥ ৯১ ॥
ঢুকিল ঠাকুরঘরে,
সেবিবারে রঘুবীরে,
ঘটিতে খাঁ পুকুরের জল ।
জলমধ্যে মাটি মলা, ঘোলের মতন ঘোলা,
জল-পোকা তাহাতে কেবল ॥ ৯২ ॥
সেই জল পাত্রে ধরে, নাওয়াইতে রঘুবীরে,
পূজারীর উত্তম বাসনা ।
তে কারণে ব্রাহ্মণেরে, বলিয়া দিলাম তারে,
ব্যবহারে হেন জল মানা ॥ ৯৩ ॥
হেথা জাহ্নবীর তীর, কোথা দেশে রঘুবীর,
দূর স্থান দু-দিনের পথ ।
কি কব অধিক আর, কর রামকৃষ্ণ
যার,
ত্বরায় পুরিবে মনোরথ ॥ ৯৪ ॥
গোটা বিশ্বরাজ্য ব্যাপে, দেব কি দানবরূপে,
যেরূপ যেখানে আছে যিনি ।
শ্রীপ্রভুর করগত,
প্রকৃত কলের মত,
শুন এক মহিমা-কাহিনী ॥ ৯৫ ॥
পূর্বাস্যে পুরীর বামে, ইংরাজের মেগাজিনে,
গোলাগুলি-বারুদের ঘর ।
ইচ্ছামত কোম্পানির, বারেক করিল স্থির,
দক্ষিণে করিতে পরিসর ॥ ৯৬ ॥
প্রবেশিয়া কালী বাটী, যতদূর
পঞ্চবটি,
ইংরাজ মাপিয়া কয় পরে ।
ল'য়ে উপযুক্ত পণ,
স্থান কর সমর্পণ,
নচেৎ লইব কিন্তু জোরে ॥ ৯৭ ॥
পুরীতে পাইয়া ভয়, আসিয়া প্রভুকে কয়,
কি উপায় হয় এই স্কুলে ।
মহান্ বিপদ শুনি,
নিজমনে গুণমণি,
চলিলেন পঞ্চবটী তলে ॥ ৯৮ ॥
কহেন আসিয়া ফিরে, পঞ্চবটী রক্ষা করে,
মহান্ পুরুষ একজন ।
আমি কহিয়াছি তাঁয়, পেঁচ যাহে ঘুরে যায়,
নাহি আর ভয়ের কারণ ॥ ৯৯ ॥
যে প্রভুর এই সাধ্য, কিসে তাঁরে কবে বোধ্য,
বটে চৌদ্দপুয়ার আধারে ।
নিত্যতেও যে প্রকার, কিমভূত কিমাকার,
লীলার ওপার নিরাকারে ॥ ১০০ ॥
কত আর কব মন, নিজ মনে আন্দোলন,
কর রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ।
কহি যদি পুনর্বার, বলা কথা
পূর্বেকার,
অনর্থক বেড়ে যায় পুঁথি ॥ ১০১ ॥
হেথা রাঘবের পাটে, পথে যেতে ভাব উঠে,
হেন ভাব কখন না শুনি ।
তাকায়ে আকাশপানে, দক্ষিণ-পূরব কোণে,
বাহ্যজ্ঞানহীন গুণমণি ॥ ১০২ ॥
কোথায় ধাইব চেঁঠা, স্পন্দহীন অঙ্গগোটা,
জড়বৎ অচল শরীর ।
এই ছিলা এই নাই, কোথা গেলা শ্রীগোসাঁই,
সাধ্য কার কে করিবে স্থির ॥ ১০৩ ॥
বদনমণ্ডলে ফুটে, চন্দ্রিমার জ্যোতিঃ মিঠে,
ঝলমল শ্রীবয়ানখানি ।
তাহাতে নীলিমা-রেখা, মাঝেমাঝে দেয় দেখা,
অপরূপ প্রভুর কাহিনী ॥ ১০৪ ॥
এরূপে সমাধি ঘোর, গত প্রায় ঘণ্টাভোর,
নিম্নে মন আসিতে না চায় ।
সেই হেতু ভক্তগণে, শ্রীপ্রভুর কানে কানে,
বীজ-বাক্য প্রণব শুনায় ॥ ১০৫ ॥
বীজমন্ত্র শ্রুতিমূলে, সমাধি সময়ে দিলে,
হয় মহাভাব-অবসান ।
হেথা রাঘবের পাটে, সে বিধান নাহি খাটে,
ভক্তবর্গে সভীত পরাণ ॥ ১০৬ ॥
ভক্তের যে ভগবান,
শুনহ তার প্রমাণ,
ভক্তগণে ভয়ার্ত দেখিয়া ।
সপ্তম হইতে নীচে, ক্রমে ক্রমে পিছে পিছে,
আসিলেন আপনি নামিয়া ॥ ১০৭ ॥
আবেশের ঘোরে তাঁয়, উঠায়ে লইলা নায়,
ধরাধরি করি পরস্পর ।
মাঝিগণে অনুমতি, পাড়ি দেহ দ্রুতগতি,
একবারে দক্ষিণশহর ॥ ১০৮ ॥
রামকৃষ্ণায়ন কথা, শ্রুতি-সুমধুর গাথা,
শ্রবণ করিলে একমনে ।
ভবভয় করি নষ্ট, বিশ্বরাজ রামকৃষ্ণ,
স্থান দেন অভয় চরণে ॥ ১০৯ ॥
চতুর্থ খণ্ড
প্রভুর মাহেশের রথে আগমন
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
আগাগোড়া দেখ লীলা ভক্তিসহকারে ।
দয়া বিনা কিছু নাই প্রভুর শরীরে ॥ ১ ॥
মহামত্ত
দিবারাত্র বিভোর দয়ায় ।
বলবতী এত মন রহে না কায়ায় ॥ ২ ॥
বরিষার কালে যেন জলদের
দল ।
হেঁকে ডেকে শূন্যে ছুটে ঢালিবারে জল ॥ ৩ ॥
ভালমন্দ স্থানাস্থান বিচার
বিহীনে ।
সেইমত প্রভুদেব কৃপা-বিতরণে ॥ ৪ ॥
দিনে দিনে গলার বেদনা বৃদ্ধি পায় ।
তিল গ্রাহ নাহি হেন কঠিন পীড়ায় ॥ ৫ ॥
পীড়ার বারতা রাষ্ট্র হৈল সর্ব স্থানে ।
দলে দলে ভক্ত যত আসে দরশনে ॥ ৬ ॥
দরশে অলস বহুকাল যেই জন ।
তিনিও আসিয়া দেখা
দিলেন এখন ॥ ৭ ॥
বিশেষিয়া আকৃষ্ট করিতে ভক্তদল ।
গলার বেদনা যেন প্রভুর কৌশল ॥ ৮ ॥
নিরখিয়া ভক্তপ্রিয় ভকতের মালা ।
একেবারে বিস্মরণ বেদনার জ্বালা ॥ ৯ ॥
পূর্ববৎ একভাব বহে অবিরাম ।
রঙ্গ-রসে কথা নাই তিলেক বিশ্রাম ॥ ১০ ॥
ভাবের
আবেগবৃদ্ধি কথোপকথনে ।
সহজে ধরিয়া প্রভু পড়েন তুফানে ॥ ১১ ॥
প্রভুতে যখন উঠে প্রভূত তুফান ।
ভক্তদের সঙ্গে প্রভু নিজে ভেসে যান ॥ ১২ ॥
কুটিকাটাসহ যেন অকুল সাগর ।
তরঙ্গ তুলিয়া ভাসে নিজের ভিতর ॥ ১৩ ॥
সাগর-সলিলে ভরা আনন্দ হেথায় ।
প্রভু-সিন্ধুমধ্যে ঊর্মি তুলে ভাব-বায় ॥ ১৪ ॥
সিন্ধুর আধারে যেন সলিল আধেয় ।
শ্রীপ্রভু-সাগরে খালি আনন্দের তোয় ॥ ১৫ ॥
সেখানে পবনে তুলে তরঙ্গের মালা ।
এখানে লইয়া ভাব শ্রীপ্রভুর খেলা ॥ ১৬ ॥
কুটিকাটা ভাসমান সাগরে যেমন ।
শ্রীপ্রভু-সাগরে ভাসে ভকতের গণ ॥ ১৭ ॥
এহেন অবস্থাপত্রে খোঁজ নাহি রহে ।
কে গেছে দেখিতে কিংবা পীড়া কোন দেহে ॥ ১৮ ॥
এমতে করিয়া রঙ্গ অন্তরঙ্গ সনে ।
যে ছিল অন্তরে তাঁরে আনিলেন টেনে ॥ ১৯ ॥
অন্তরঙ্গ-বাছাই এ কাণ্ডের প্রকৃতি ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা মধুর ভারতী ॥ ২০ ॥
আষাঢ়ে রথের দিনে শহরে গমন ।
ভক্ত বসু বলরাম তাঁহার ভবন ॥ ২১ ॥
তাঁহার মন্দিরে জগন্নাথের মূরতি ।
অন্নভোগরাগসহ সেবা নিতি নিতি ॥ ২২ ॥
সমারোহ নহে কিন্তু পর্ব সব হয় ।
এবার আষাঢ়ে এই রথের সময় ॥ ২৩ ॥
শ্রীপ্রভুর আগমন শুনিয়া বারতা ।
ভক্ত-সমাগমে হৈল বিষম জনতা ॥ ২৪ ॥
বাহিরের শত শত লোক আসে যায় ।
ভিতরে না ধরে মোটে রহে বারাণ্ডায় ॥ ২৫ ॥
চৌদিকে বারাণ্ডারাজি বাহির প্রদেশে ।
দক্ষিণের বারাণ্ডায় রহে যারা আসে ॥ ২৬ ॥
অন্তরঙ্গ ভক্তগণ প্রায় উপস্থিত ।
কভু ঈশতত্বে মত্ত কভু হয় গীত ॥ ২৭ ॥
প্রভু-সঙ্গ-সুখে সবে মগ্ন নিরবধি ।
মনে নাই শ্রীপ্রভুর গলায় বিয়াধি ॥ ২৮ ॥
প্রভুর আনন্দ তেন ভক্তসহবাসে ।
মহামত্ত দিবারাত্র পরম হরষে ॥ ২৯ ॥
সুকণ্ঠ নরেন্দ্রে আজ্ঞা করিলেন রায় ।
শুনিতে সঙ্গীত তোর ইচ্ছা বড় যায় ॥ ৩০ ॥
যথাআজ্ঞা ভক্তবর তুলি মনপ্রাণ ।
ডুগি বাজাইয়া নিজে ধরিলেন গান ॥ ৩১ ॥
গীত
কখন কি রঙ্গে থাক মা শ্যামা সুধাতরঙ্গিণী ।
তুমি রঙ্গে ভঙ্গে অপাঙ্গে অনঙ্গে ভঙ্গ দাও জননী ॥
লম্ফে ঝম্পে কম্পে ধরা অসিধরা করালিনী ।
তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা ভয়ঙ্করা কালকামিনী ॥
ভকতের বাঞ্ছা পূর্ণ কর নানারূপধারিণী ।
তুমি কমলের কমলে নাচ মা পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী ॥
সেই সঙ্গে দিলা যোগ আর কয়জনে ।
বিভোরাঙ্গ গুণমণি সঙ্গীত-শ্রবণে ॥ ৩২ ॥
বসিয়া মণ্ডলাকারে গায় ভক্তগণ ।
দাঁড়াইয়া তার মধ্যে প্রভুর নৃত্যন ॥ ৩৩ ॥
প্রেমিক নরেন্দ্রনাথ ভক্তের প্রধান ।
কলির শেষাংশগুলি বারে বারে গান ॥ ৩৪ ॥
বিশেষিয়া "পূর্ণব্রহ্ম-সনাতনী" ভাগে ।
মাতিয়া উঠিল গীত ভক্তি-রস-রাগে ॥ ৩৫ ॥
ভক্ত-ভগবানে রঙ্গ অপূর্ব ব্যাপার ।
শ্রোতাগণ মুগ্ধমন বাক্য নাহি কার ॥ ৩৬ ॥
নরলীলা ঈশ্বরের যাই বলিহারি ।
কি দেখিনু কি শুনিহ বলিতে না পারি ॥ ৩৭ ॥
নৃত্য-গীত রসভাষ কথোপকথন ।
বিবিধপ্রকৃতিযুক্ত নরনারীগণ ॥ ৩৮ ॥
কতই দেখিনু জন্ম লইয়া ধরায় ।
হেন নহে কোথা যেন প্রভুর সভায় ॥ ৩৯ ॥
কিবা দিব্য ভাবধারা ইহার ভিতর ।
গন্ধে স্পর্শে জীবের যাহাতে গুণান্তর ॥ ৪০ ॥
বদলে বিধির লেখা কপালমোচন ।
আসক্তির নেশা নষ্ট পাশবদ্ধ ভ্রম ॥ ৪১ ॥
সৃষ্টি দৃষ্টি বালকের যেন খেলাশাল ।
লোচন-আঁধার উড়ে মায়ার জঞ্জাল ॥ ৪২ ॥
আত্মীয় অপরিচিত ঘর হয় পর ।
স্বদেশী বিদেশী বোধ রগড় সুন্দর ॥ ৪৩ ॥
নাগপাশাধিক শক্ত সংসার-বন্ধন ।
বহ্নিযোগে দগ্ধরজ্জু প্রকৃত তেমন ॥ ৪৪ ॥
অশঙ্কিত চিত্ত নষ্ট যাবতীয় ত্রাস ।
হরষে প্রত্যক্ষ করে আপনার নাশ ॥ ৪৫ ॥
নানা বর্ণে নানা গুণে নানান আকারে ।
জীব ও জগৎ-যুক্ত সৃষ্টি চরাচরে ॥ ৪৬ ॥
বলিহারি রকমারি ফুলের সাজনি ।
ছুটি নহে একমাত্র তাহার গাঁথনি ॥ ৪৭ ॥
জ্ঞানী যোগী সাধকেরা শেষে যাহা পায় ।
মিলে রামকৃষ্ণ কল্পতরুর তলায় ॥ ৪৮ ॥
কল্পতরু প্রভুদেব বিধির বিধাতা ।
অন্তরঙ্গ সাঙ্গোপাঙ্গ কাণ্ড শাখা পাতা ॥ ৪৯ ॥
গীত সমাপনে বসিলেন গুণমণি ।
হেথা করে বলরাম রথের সাজনি ॥ ৫০ ॥
অতিশয় ক্ষুদ্র রথ কাঠের নির্মিত ।
দ্বিতলের বারাণ্ডায় টানিবার মত ॥ ৫১ ॥
শোভে রথ বিবিধ বর্ণের পতাকায় ।
পাশের চৌদিকে প্রতি প্রজায় ধ্বজায় ॥ ৫২ ॥
সুন্দর ফুলের মালা দিলা মাঝে মাঝে ।
সেখানে তেমন ধারা যেখানে যা সাজে ॥ ৫৩ ॥
সুরঞ্জিত রথরজ্জু করিয়া বন্ধন ।
ঠাকুর আনিতে চলে পূজারী ব্রাহ্মণ ॥ ৫৪ ॥
বাজে বাদ্য ঝাঁজ ঘণ্টা মনে কুতূহলী ।
ঘন ঘন কীর্তনীয়া খোলে দিল তালি ॥ ৫৫ ॥
তার সঙ্গে করতাল উঠিল বাজিয়া ।
পূজারী ঠাকুর আনে জলধারা দিয়া ॥ ৫৬ ॥
বসাইল জগন্নাথে রথের উপর ।
বাদ্যের উঠিল তবে রোল উচ্চতর ॥ ৫৭ ॥
তখন কে রাখে আর প্রভু গুণধরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত রখের গোচরে ॥ ৫৮ ॥
শ্রীকরে রথের রজ্জু করি আকর্ষণ ।
মত্তভাবে ধরিলেন মধুর কীর্তন ॥ ৫৯ ॥
ভক্তগণ সেই সঙ্গে কৈল যোগদান ।
মাঝে মাঝে রথের দড়িতে পড়ে টান ॥ ৬০ ॥
কভু রজ্জু পরিহরি প্রমত্ত কীর্তনে ।
অপূর্ব প্রভুর লীলা ভক্তগণ সনে ॥ ৬১ ॥
তালে তালে বাঘ রোল উঠে অনিবার ।
প্রভুর নৃত্যন তাহে করিয়া হুঙ্কার ॥ ৬২ ॥
মদমত্ত করী যেন গায়ে মহাবল ।
সঙ্গে সঙ্গে নাচে যত ভকতের দল ॥ ৬৩ ॥
ভক্ত বসু বলরাম মাথায় পাগড়ি ।
নাচেন প্রভুর পাশে দোলাইয়া দাড়ি ॥ ৬৪ ॥
কৃষ্ণকায় তেজচন্দ্র বস্তু চুনিলাল ।
অমনোমোহন রাম দেবেন্দ্র রাখাল ॥ ৬৫ ॥
কৃতদার হরিপদ হরিণনয়ন ।
সুন্দর শরৎ শশী কুমার দু'জন ॥ ৬৬ ॥
বারাণ্ডা কাঁপায়ে নাচে অভিমানিবর ।
বিশ্বাসী গিরিশ ঘোষ গুরুকলেবর ॥ ৬৭ ॥
নাচেন সুরেন্দ্রনাথ ভক্তের প্রধান ।
সাকার হৃদয়ে যাঁর
নাহি পায় স্থান ॥ ৬৮ ॥
অতি অল্পপরিসর ছোট বারাণ্ডায় ।
দাঁড়াইতে ভক্তদের ঠাঁই না কুলায় ॥ ৬৯ ॥
এইরূপে রখলীলা লয়ে ভক্তগণ ।
সন্ধ্যার কিঞ্চিৎ পূর্বে রঙ্গ-সমাপন ॥ ৭০ ॥
নিজাসনে
প্রভুদেব বসিলা সাদরে ।
চৌদিকে ভক্তের মালা বেড়িলা তাঁহারে ॥ ৭১ ॥
প্রভুতে মোহিত এত ভক্ত সমুদয় ।
তিলেক ছাড়িয়া কেহ যাইতে না চায় ॥ ৭২ ॥
পরম বৈষ্ণব ভক্ত বস্তু মহামতি ।
আগত দেখিয়া সন্ধ্যা জ্বলাইল বাতি ॥ ৭৩ ॥
দীনতাপুরিত কথা সুধা ঝরে তায় ।
আনন্দে প্রফুল্ল মুখ কিবা শোভা পায় ॥ ৭৪ ॥
করজোড়ে মিনতি করেন জনে জনে ।
কিছু কিছু ঠাকুরের প্রসাদধারনে ॥ ৭৫ ॥
বারাণ্ডায় পাতা পাতা ভাঁড় ঘুরি ধারে ।
বসাইলা ভক্তবর্গে পিরীতের ভরে ॥ ৭৬ ॥
আয়োজনে ত্রুটি নাই লুচি তরকারি ।
সুঘন ছোলার ডাল ভাজি রকমারি ॥ ৭৭ ॥
পাঁপড় মোহনভোগ গজা মালপুয়া ।
বড় বড় রসগোল্লা লাল পানতুয়া ॥ ৭৮ ॥
রসের চাটনি মিঠা কিশমিশে করা ।
দধি ক্ষীর পরিপূর্ণ কটরা কটরা ॥ ৭৯ ॥
রসনায় তৃপ্তিকর মনের মতন ।
নানা দ্রব্যে কৈলা বন্ধু প্রসাদ বণ্টন ॥ ৮০ ॥
সুন্দর মন্দিরখানি প্রভুর ভাণ্ডারা ।
কিছুই অভাব নাই লক্ষ্মী আড়ি ধরা ॥ ৮১ ॥
তীর্থে তীর্থে যাত্রীদের আশ্রয়কারণ ।
সুন্দর বন্দেজ সহ সুন্দর আশ্রম ॥ ৮২ ॥
বংশেতে সকলে ভক্ত বংশপরম্পরা ।
পিতা পিতামহ আদি পূর্বপুরুষেরা ॥ ৮৩ ॥
নাহি হেন ভক্তগোষ্ঠী প্রভু অবতারে ।
লক্ষ-ভক্ত-পদধূলি যাহার দুয়ারে ॥ ৮৪ ॥
বলরাম নাম যেবা উচ্চারে বদনে ।
ধ্রুব তার হয় ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ৮৫ ॥
এই রথে কি হইল শুনাইছ মন ।
পর রথে কি হইল করহ শ্রবণ ॥ ৮৬ ॥
মাহেশ নামেতে গ্রাম গঙ্গাকূলে স্থিতি ।
অনেক লোকের বাস নানাবিধ জাতি ॥ ৮৭ ॥
এই মহাভাগবত বন্ধু বলরাম ।
তাঁর পূর্ব-পুরুষদিগের কীর্তিধাম ॥ ৮৮ ॥
সুন্দর মন্দিরে জগন্নাথের মুরতি ।
ভোগরাগ সহ হয় সেবা নিতি নিতি ॥ ৮৯ ॥
বিশেষে আষাঢ়ে মহাসমারোহ হয় ।
বৃহৎ কাঠের রথ উচ্চ অতিশয় ॥ ৯০ ॥
জনতার কথা কহা বাহুল্য কেবল ।
সুবিদিত সাধারণে আগোটা অঞ্চল ॥ ৯১ ॥
বড়ই পিরীতি পায় মাহেশের রথে ।
কাতারে কাতারে লোক আসে নানা পথে ॥ ৯২ ॥
জলে স্থলে নানা যানে বিবিধ উপায় ।
বেশ্যা লম্পটের সংখ্যা অধিকাংশ প্রায় ॥ ৯৩ ॥
প্রতিবর্ষে শ্রীপ্রভুর প্রায় আগমন ।
পাপী তাপী সন্তাপীর নিস্তার-কারণ ॥ ৯৪ ॥
দরশন শ্রীপ্রভুর কৈলে একবার ।
জঠর-জনম-কষ্ট নাহি হয় আর ॥ ৯৫ ॥
জন্ম জন্মাজিত পাপে মুক্ত তৎকালে ।
শ্রীচরণ-দরশন বারেক করিলে ॥ ৯৬ ॥
নিষাদের বাণ যথা জীব-বিনাশন ।
পরশে-পরশে ধরে কাঞ্চন-বরন ॥ ৯৭ ॥
জীবহিতব্রত প্রভু করুণাসাগর ।
মাহেশে যাইতে আজি সাধ উগ্রতর ॥ ৯৮ ॥
করিব বলিলে কর্ম দেরি নাহি আর ।
যদ্যপি তাহাতে হয় বিপদ হাজার ॥ ৯৯ ॥
মাহেশে চলিল সঙ্গে ভক্ত কয় জন ।
কৃষ্ণবর্ণ হরিপদ হরিণ নয়ন ॥ ১০০ ॥
ফকির ব্রাহ্মণ এক পরম আচারী ।
মূলনাম যজ্ঞেশ্বর নির্ভাবান ভারি ॥ ১০১ ॥
ভক্তিমতী 'ভক্ত-মা' গোলাপ ঠাকুরাণী ।
আর আর ছিল কেবা নাম নাহি জানি ॥ ১০২ ॥
শ্রীপ্রভুর সঙ্গে যাত্রা মহানন্দ মন ।
তরীযোগে যথাদিনে মাহেশে গমন ॥ ১০৩ ॥
যথাযোগ্য বাসাবাটী মন্দিরের কাছে ।
প্রয়োজন মত দ্রব্য সকলই আছে ॥ ১০৪ ॥
নানাবিধ ভোজ্য দ্রব্য প্রচুর প্রচুর ।
ত্রিতলে আসন ঠাঁই হইল প্রভুর ॥ ১০৫ ॥
খেচরার শ্রীপ্রভুর ভোগের কারণ ।
ত্বরান্বিতে করিলেন ভক্ত-মা রন্ধন ॥ ১০৬ ॥
ভোজনে প্রভুর কিন্তু সুখ নাহি হয় ।
গলার বেদনা আজি বৃদ্ধি অতিশয় ॥ ১০৭ ॥
ক্ষুন্নমন ভক্তগণ হন তেকারণে ।
শ্রীপ্রভুর সেবা করে রহে সাবধানে ॥ ১০৮ ॥
মনে ভয় অতিশয় করয়ে ভাবনা ।
রথে যদি যান প্রভু বাড়িবে বেদনা ॥ ১০৯ ॥
মুখে নাই সাড়াশব্দ ভকতের দলে ।
রথের বাজনা উচ্চে বাজে হেনকালে ॥ ১১০ ॥
দারুময় ঠাকুরের মূর্তি সাজাইয়া ।
পূজারী ব্রাহ্মণে দিলা রথে উঠাইয়া ॥ ১১১ ॥
লোকে লোকারণ্য স্থান মহাকোলাহল ।
শুনিয়া শ্রীপ্রভুদেব হইলা চঞ্চল ॥ ১১২ ॥
ধীর সমীরণ-ভাব বহিল অন্তরে ।
দ্বিতলের বারাণ্ডায় নামিলেন ধীরে ॥ ১১৩ ॥
ক্রমশঃ আবেগ-বৃদ্ধি অঙ্গ টলমল ।
পবন সঞ্চারে যেন সরসীর জল ॥ ১১৪ ॥
প্রবল আবেশ পরে পরে বৃদ্ধি পায় ।
যার জোরে বহির্ভারে উপনীত রায় ॥ ১১৫ ॥
পাছু পাছু ধাবমান ভকতের গণ ।
সাহস না হয় করে গতি নিবারণ ॥ ১১৬ ॥
মত্ত মাতঙ্গের মত অঙ্গে ধরে বল ।
আবেশের ভার যবে অধিক প্রবল ॥ ১১৭ ॥
এবে যদি রথ-রজ্জু যত যাত্রিগণে ।
ঘর্ ঘর্ শব্দেতে বৃহৎ রথ টানে ॥ ১১৮ ॥
প্রভুরও হইল মন রথ টানিবারে ।
দ্রুতপদে প্রবেশিলা জনতা ভিতরে ॥ ১১৯ ॥
উপনীত একেবারে বিষম সঙ্কট ।
রথের ঘূর্ণায়মান চক্রের নিকট ॥ ১২০ ॥
মহাভাবগ্রস্ত এবে বাহু মোটে নাই ।
আপনে আপনহারা জগৎ-গোসাঁই ॥ ১২১ ॥
ভাবের প্রভাবে কান্তি লাবণ্য বদনে ।
সমুজ্জ্বল চাঁদ যথা নিজের কিরণে ॥ ১২২ ॥
ভক্তগণ পাছু হেথা আছেন পড়িয়া ।
শক্তি নাই সঙ্গে আসে জনতা ঠেলিয়া ॥ ১২৩ ॥
হেনকালে শুন কিবা অপূর্ব কাহিনী ।
ভাবে যেথা বাহ্যহারা প্রভু গুণমণি ॥ ১২৪ ॥
সেখানে ধরিয়া রজ্জু ছিল যত জন ।
গুন্তিতে অনেক নহে পঞ্চাশের কম ॥ ১২৫ ॥
অবিদিত কোথা ঘর উপনীত রথে ।
গুনা কথা গোউর গোয়ালা তারা জেতে ॥ ১২৬ ॥
নিরখিয়া প্রভুদেবে নিকটে চাকার ।
সকলে রথের রজ্জু করি পরিহার ॥ ১২৭ ॥
উচ্চরবে কহে হয়ে শঙ্কায় আতুর ।
আরে সেই আমাদের দয়াল ঠাকুর ॥ ১২৮ ॥
এত বলি দলবদ্ধে ঘেরিয়া দাঁড়ায় ।
পাছে কোন ঘটে বিঘ্ন ইহার শঙ্কায় ॥ ১২৯ ॥
স্থগিত চলিত রথ দেখি একবারে ।
যাত্রিগণ কি কারণ অন্বেষণ করে ॥ ১৩০ ॥
গুজব পড়িয়া গেল শ্রীপ্রভুর কথা ।
দরশনে আসে লোক ঠেলিয়া জনতা ॥ ১৩১ ॥
আগে পিছে দরশন করে সর্বজনে ।
ভাবাবেশে বাহ্যহারা প্রভু ভগবানে ॥ ১৩২ ॥
এক কথা জিজ্ঞাসিতে পার তুমি মন ।
যিনি নিজে সেই পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ॥ ১৩৩ ॥
বিভু পরমেশ যিনি যড়ৈশ্বর্য গুণে ।
আদ্যাশক্তি মায়া যাঁর আজ্ঞার অধীনে ॥ ১৩৪ ॥
সৃষ্টি স্থিতি লয় তিনি যিনি বিদ্যমান ।
ইচ্ছাময় শিবময় মঙ্গলনিদান ॥ ১৩৫ ॥
জীব-হিত-ব্রত যিনি দয়ার সাগর ।
জীবের কল্যাণে যাঁর তপ উগ্রতর ॥ ১৩৬ ॥
পরিহরি আত্মসুখ এখানে সেখানে ।
ভাবময় তাঁর পুনঃ ভাবাবেশ কেনে ॥ ১৩৭ ॥
শুন কহি লীলা-তত্ত্ব অতীব মধুর ।
শ্রবণ পঠনে আন্দোলনে তমঃ দূর ॥ ১৩৮ ॥
যখন
যে মূর্তি নেহারিয়া মহাভাব ।
সেই যে মূরতি হয় তাঁহে আবির্ভাব ॥ ১৩৯ ॥
হেন আবেশের কালে যদি কোনজন ।
ভাগ্যবলে শ্রীপ্রভুর পায় দরশন ॥ ১৪০ ॥
তাঁর দরশনে দরশন সুনিশ্চয় ।
আবির্ভূত মূর্তি প্রভুতে উদয় ॥ ১৪১ ॥
আজিকার মহাভাবে প্রভু পরমেশ ।
জগন্নাথ জগবন্ধু তাঁহার আবেশ ॥ ১৪২ ॥
এমন আবেশ যেবা দরশন পায় ।
তার নাহি রহে জন্ম মরণের দায় ॥ ১৪৩ ॥
প্রভুর সৃষ্টিতে আছে দেবদেবী যত ।
আবেশে প্রভুর অঙ্গে হয় আবির্ভূত ॥ ১৪৪ ॥
প্রভু মোর মূলবৃক্ষ প্রকাণ্ড বিশাল ।
অবতার যত কেহ কাণ্ড শাখা ডাল ॥ ১৪৫ ॥
অন্তরঙ্গ পারিষদ অবতার শ্রেণী ।
এইবারে প্রভুদেব নিজে খোদে তিনি ॥ ১৪৬ ॥
মহালীলা অপ্রভুর লীলার প্রধান ।
ভক্তবেশে অবতার দলে আগুয়ান ॥ ১৪৭ ॥
ঈশ্বরকোটীর ভক্ত যতগুলি সনে ।
এক এক অবতার দেখা যায় গুণে ॥ ১৪৮ ॥
রামকৃষ্ণসাগরের খণ্ডাংশ প্রত্যেকে ।
কেবল নরেন্দ্রনাথ অখণ্ডের থাকে ॥ ১৪৯ ॥
বলিতেন প্রভুদেব করহ শ্রবণ ।
নরেন্দ্রে দেখিলে যায় অখণ্ডেতে মন ॥ ১৫০ ॥
ঈশ্বরকোটীর ভক্তে নিরীক্ষণ করি ।
মাঝে মাঝে হইতেন আবেশস্থ ভারি ॥ ১৫১ ॥
কোন্ ভক্ত কেবা আর কার অবতার ।
আবেশে প্রত্যক্ষ সব হইত তাঁহার ॥ ১৫২ ॥
মূল-নাম উচ্চারিয়া আবেশাবস্থায় ।
সমাদরে স্তুতি পুজা করিতেন রায় ॥ ১৫৩ ॥
বুঝা কি প্রত্যক্ষ তত্ত্ব না হয় কখন ।
বিনা শুদ্ধবুদ্ধি আর বিমল লোচন ॥ ১৫৪ ॥
প্রভু প্রভু-ভক্তে হৃদে রাখি একাসনে ।
কায়মনোবাক্যে যেবা মহালীলা শুনে ॥ ১৫৫ ॥
শুদ্ধ বুদ্ধি শুদ্ধ মন মিলয়ে তাহার ।
যাহাতে প্রত্যক্ষীভূত নিশ্চয় লীলার ॥ ১৫৬ ॥
যাত্রীদের জনতা দেখিয়া দরশনে ।
কোমরে গামছা বাঁধা গোয়ালার গণে ॥ ১৫৭ ॥
এক এক জন যেন এক এক রথী ।
শ্রীঅঙ্গ বেড়িয়া রহে যতন সংহতি ॥ ১৫৮ ॥
পরে গিয়া ভক্তগণ জুটিল তথায় ।
মহাভাবে বাহ্যহারা যেথা প্রভুরায় ॥ ১৫৯ ॥
গোয়ালারা জনতা ঠেলিয়া পথ করে ।
ভক্তবর্গ ধরি রায়ে আনিল বাহিরে ॥ ১৬০ ॥
তখাপি না ছাড়ে লোক পাছু পাছু ধায় ।
আত্মহারা একেবারে সংখ্যায় সংখ্যায় ॥ ১৬১ ॥
মকরন্দ-গন্ধে অন্ধ হইয়া যেমন ।
চাতকের পাড়ু পাছু ছুটে ভৃঙ্গগণ ॥ ১৬২ ॥
ভীতচিত ভক্তবর্গ মনে মনে করে ।
ঠাকুরে লইয়া ত্বরা প্রবেশে মন্দিরে ॥ ১৬৩ ॥
কিন্তু পথে ঘন ঘন ভাবের প্রবল ।
ঠাঁই ঠাঁই শ্রীগোসাঁই অটল অচল ॥ ১৬৪ ॥
এই অবকাশে লোকে করে দরশন ।
জন-মন-বিমোহন অতুল আনন ॥ ১৬৫ ॥
প্রেমমাখা মুখমণ্ডল দ্যুতিমান ।
মন-পাখী-ধরা বাঁকা-আঁখির সন্ধান ॥ ১৬৬ ॥
ঈষৎ-রক্তিমাধর সুন্দরের বাড়া ।
সহজেই বোধ নয় বিধাতার গড়া ॥ ১৬৭ ॥
তায় বিশ্বমোহনিয়া হাসির খেলনি ।
বর্ণে বর্ণে বরিষণ সুধামাখা বাণী ॥ ১৬৮ ॥
দেখা শুনা যার নাহি হইল জীবনে ।
চক্ষু কর্ণ বৃথা তার চক্ষু কর্ণ নামে ॥ ১৬৯ ॥
বিনা পণে অবহেলে খালি করুণায় ।
দেহ ধরি অবতরি আসিয়া ধরায় ॥ ১৭০ ॥
জীব-হিত-ব্রত রায় কল্যাণ-নিদান ।
এক কর্ম জীবে কিসে পায় পরিত্রাণ ॥ ১৭১ ॥
এত দয়াসাগর গোষ্পদ উপমায় ।
দেহ-ধরা দেহরক্ষণ কেবল দয়ায় ॥ ১৭২ ॥
আজিকার দিনে কত জীবে মুক্তিদান ।
প্রভু বিনা অন্যে কেহ জানে না সন্ধান ॥ ১৭৩ ॥
পথের মধ্যেতে ভাব অতি গুরুতর ।
প্রতিপদে প্রায় প্রভু যেন বিশ্বস্তর ॥ ১৭৪ ॥
অর্থ তার অন্ত্য নয় বুঝিবে বুঝিলে ।
জীবে দিতে পরাগতি দরশনছলে ॥ ১৭৫ ॥
বহুক্ষণ হেন রঙ্গ করি প্রভুরায় ।
আজি রথযাত্রা-লীলা করিলেন সায় ॥ ১৭৬ ॥
দিনমান যায় প্রায় ভাব-অবসান ।
সঙ্গেতে ভকতবর্গ ব্যাকুলিত প্রাণ ॥ ১৭৭ ॥
ধীরে ধীরে মন্দিরের উপরে লয়ে যায় ।
বহুগুণে হৈল বৃদ্ধি বেদনা গলায় ॥ ১৭৮ ॥
পরদিন দক্ষিণশহরে শ্রীগোসাঁই ।
শয্যাগত উঠিবার শক্তি দেহে নাই ॥ ১৭৯ ॥
বেদনায় রক্তস্রাব হয় এইবারে ।
দারুণ যন্ত্রণাভোগ গলার ভিতরে ॥ ১৮০ ॥
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ বিশুদ্ধ আকার ।
তরল পদার্থ বিনা চলে না আহার ॥ ১৮১ ॥
সমাচার পাইয়া সভীত ভক্তগণ ।
ত্বরায় আইলা ধেয়ে প্রভুর সদন ॥ ১৮২ ॥
বেদনায় পরিশুদ্ধ শ্রীবয়ানখানি ।
প্রফুল্লিত ক্রমে দেখি ভক্তের মেলানি ॥ ১৮৩ ॥
বিস্মরণ গলায় বেদনা একেবারে ।
উপবিষ্ট হইলেন খাটের উপরে ॥ ১৮৪ ॥
পূর্ববৎ রঙ্গ-রস কথায় কথায় ।
ভক্তবর্গ এইবারে ভুলিল না তায় ॥ ১৮৫ ॥
আনিয়া রাখালদাস ঘোষ ডাক্তারেরে ।
নিযুক্ত করিয়া দিল চিকিৎসার তরে ॥ ১৮৬ ॥
রাখালের চিকিৎসায় নহে উপশম ।
কোন দিন রোগবৃদ্ধি কোন দিন কম ॥ ১৮৭ ॥
বিবিধ উপায় কৈল না হয় সুফল ।
ক্রমশঃ হইতে থাকে শরীর দুর্বল ॥ ১৮৮ ॥
কেবল তরল ভোজ্য চলিছে এখন ।
ভাত ভাল নাহি হয় গলাধঃকরণ ॥ ১৮৯ ॥
ভক্তেরা সভীত প্রাণ দিবানিশি ভাবে ।
কি উপায়ে সমারোগ্য করে প্রভুদেবে ॥ ১৯০ ॥
দিনেকে গিরিশ ঘোষ বিশ্বাসের বীর ।
প্রহরেক বেলা হৈলা মন্দিরে হাজির ॥ ১৯১ ॥
আবদার সহ কন প্রভুর গোচরে ।
আজি অন্ন খাইতে হইবে আপনারে ॥ ১৯২ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন অন্ন কি করিয়া খাই ।
আহার তরল দ্রব্য তবু কষ্ট পাই ॥ ১৯৩ ॥
গিরিশ প্রভুকে কন শ্রীগুরুর বলে ।
তোমার যেমন কেহ নাই তিনকুলে ॥ ১৯৪ ॥
আমার সেরূপ নহে আছে একজন ।
সশঙ্কিত নামে যার পুরন্দর যম ॥ ১৯৫ ॥
তাঁহার শক্তিতে আমি হেন শক্তি ধরি ।
সামান্য বেদনা ছুঁয়ে উড়াইতে পারি ॥ ১৯৬ ॥
এত বলি এই মন্ত্র কন মনে মনে ।
তুমি বাঞ্ছাকল্পতরু গুরু বিদ্যমানে ॥ ১৯৭ ॥
তোমারে প্রার্থনা যেন তোমার কৃপায় ।
আরোগ্য গলার ব্যাধি মুহূর্তেকে পায় ॥ ১৯৮
॥
উচ্চারিয়া এই মন্ত্র প্রভু ভক্তবর ।
ফুঁক দিলা তিন বার গলার উপর ॥ ১৯৯ ॥
বেদনার স্থানে হাত বুলায়ে গোসাঁই ।
বলিলেন কি আশ্চর্য ব্যথা আর নাই ॥ ২০০ ॥
এমন দারুণ ব্যথা গেলা কোথাকারে ।
এ কেবল গিরিশের মন্তরের জোরে ॥ ২০১ ॥
এত শুনি শ্রীমন্দিরে আনন্দের রোল ।
রাঁধিতে চলিল অন্ন মাগুরের ঝোল ॥ ২০২ ॥
অবিলম্বে ভোজ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া ।
প্রভুর গোচরে দিলা মন্দিরে আনিয়া ॥ ২০৩ ॥
মহানন্দে ভক্তবর্গ করে দরশন ।
বহুদিন পরে পুনঃ প্রভুর ভোজন ॥ ২০৪ ॥
দিবা-অবসানে যত ভকতনিকরে ।
সেদিন চলিয়া গেল আপনার ঘরে ॥ ২০৫ ॥
এইতক সমাপন দিনের ঘটনা ।
পর দিনে পূর্ববৎ প্রবল বেদনা ॥ ২০৬ ॥
এই অন্নভোগ হৈল অন্নভোগ সায় ।
দারুণ যন্ত্রণা এত গলার ব্যথায় ॥ ২০৭ ॥
প্রায় তিন মাস পূর্বে শুরু এই রোগ ।
তখন হইতে আগে বন্ধ লুচিভোগ ॥ ২০৮ ॥
যেই দিন মহোৎসব দেবেন্দ্রের ঘরে ।
স্মরণ করহ কথা আবেশের ভরে ॥ ২০৯ ॥
কিবা বলিলেন প্রভু বিশ্বের গোসাঁই ।
ভবিষ্যৎ বাক্য আর লুচি খাব নাই ॥ ২১০ ॥
তখন অবোধ্য কিবা ভাবার্থ বাক্যের ।
লীলাসমাপনে তবে মর্ম হৈল টের ॥ ২১১ ॥
তর্কচূড়ামণি যিনি নাম শশধর ।
প্রভু-দরশনে আসে দক্ষিণশহর ॥ ২১২ ॥
অন্তর বিষন্ন ভারি মলিন বদন ।
প্রভুর গলায় ব্যথা তাহার কারণ ॥ ২১৩ ॥
আরোগ্য-উপায়ে তেহ কন শ্রীগোচরে ।
বর্ণনা আছয়ে হেন শাস্ত্রের ভিতরে ॥ ২১৪ ॥
সমাধি যাঁহার হয় যদি সেই জন ।
সমাধিস্থ হন দিয়া ব্যাধিস্থানে মন ॥ ২১৫ ॥
সেই সে তাঁহার পক্ষে পরম ঔষধি ।
ক্ষণেকে আরোগ্যলাভ নাহি রহে ব্যাধি ॥ ২১৬ ॥
এত শুনি মৃদু হাস্য করি প্রভুবর ।
ধীরবর শশধরে করিলা উত্তর ॥ ২১৭ ॥
সমাধিতে যবে করি দরশন তাঁয় ।
তুচ্ছ এই দেহ পচা কুমড়ার ন্যায় ॥ ২১৮ ॥
আছে কিনা আছে মোর রহে না স্মরণ ।
কেমনে সম্ভব দিব ব্যথাস্থানে মন ॥ ২১৯ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া হেন কথার উত্তর ।
বাক্যহীন বিস্ময়ে আবিষ্ট শশধর ॥ ২২০ ॥
মনে মনে ভাবে তেঁহ প্রভু কোন্ জন ।
ব্রহ্মানন্দভোগী দিয়া দেহ বিসর্জন ॥ ২২১ ॥
শাস্ত্রে আর প্রভুবাক্যে প্রভুর ক্রিয়ায় ।
শশধর ষোল আনা মিলাইয়া পায় ॥ ২২২ ॥
তথাপি বুঝিতে না পারিল মাসা রতি ।
প্রভু যে পরমেশ্বর অখিলের পতি ॥ ২২৩ ॥
শিরে ধরি শাস্ত্রপাঠ নাহি প্রয়োজন ।
নিরন্তর প্রভুকে প্রার্থনা কর মন ॥ ২২৪ ॥
দেহ রামকৃষ্ণ রায় ভিক্ষা মাগে দীনে ।
শুদ্ধাভক্তি সহ মতি চরণসেবনে ॥ ২২৫ ॥
এইখানে চতুর্থ খণ্ডের কথা সায় ।
সুমূর্খে গাইল গীত মায়ের আজ্ঞায় ॥ ২২৬ ॥
চতুর্থ খণ্ড সমাপ্ত
পঞ্চম খণ্ড
প্রভুর চিকিৎসার্থ কলিকাতায় আগমন ও বাস
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
প্রথম খণ্ডেতে বাল্য-লীলা সুমধুর ।
শ্রবণ-কীর্তনে স্বচ্ছ হৃদয় মুকুর ॥ ১ ॥
সমুজ্জ্বল প্রতিভাত তাহার উপর ।
শ্রীপ্রভুর অপরূপ রূপ মনোহর ॥ ২ ॥
দ্বিতীয় খণ্ডের লীলা সাধন-ভজন ।
বিশ্বাসের সহ যেবা করে আন্দোলন ॥ ৩ ॥
নিশ্চয় বিমুক্ত তার লোচন-আঁধার ।
পশিতে রতনাগারে চৈতন্যের দ্বার ॥ ৪ ॥
তৃতীয় চতুর্থ খণ্ডে ভক্ত-সংজোটন ।
মহিমা-প্রচার ধর্ম-দ্বন্দ্ব-বিভঞ্জন ॥ ৫ ॥
স্বরূপত্ব-প্রদর্শন দীনহীনসাজে ।
শ্রবণ কীর্তনে মন মজে পদাম্বুজে ॥ ৬ ॥
পঞ্চম শেষের খণ্ড পুঁথি যাহে সায় ।
একমনে যদি কেহ শুনে কিংবা গায় ॥ ৭ ॥
বড়ই মধুর ফল হাতে হাতে ফলে ।
প্রেমাভক্তি পরাধন চরণকমলে ॥ ৮ ॥
ব্যাধির বিক্রম ভারি বৃদ্ধি এইবার ।
প্রদাহ যন্ত্রণা কত কষ্ট অনিবার ॥ ৯ ॥
মধ্যে মধ্যে রক্তস্রাবে দেহ শীর্ণ-প্রায় ।
এই মতে শ্রাবণের আধাআধি যায় ॥ ১০ ॥
ক্ষুণ্ণমন ভক্তগণ বুঝিতে না পারে ।
প্রভুর আরোগ্য-হেতু কি উপায় করে ॥ ১১ ॥
একদিন রাম আর দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
কালীপদ গিরিশ প্রভৃতি কয়জন ॥ ১২ ॥
একত্র বসিয়া যুক্তি কৈল স্থিরতর ।
প্রতিকারে উপযুক্ত ইংরাজ ডাক্তার ॥ ১৩ ॥
পরদিন প্রাতঃকালে ভক্ত চারিজন ।
অনুমতি-হেতু চলে প্রভুর সদন ॥ ১৪ ॥
বিশুষ্ক-বদন প্রভু দেখিলেন গিয়া ।
উঠিবার শক্তি নাই আছেন শুইয়া ॥ ১৫ ॥
হেন বিমরয ভাব কখন না শুনি ।
রসনা রহিত রস নাহি ফুটে বাণী ॥ ১৬ ॥
সদানন্দময়ে হেন নিরানন্দ ধারা ।
দেখি ভক্তচতুষ্টয়ে প্রায় প্রাণহারা ॥ ১৭ ॥
মুখে নাহি সরে কথা প্রভুর যেমন ।
জিজ্ঞাসা করিতে তাঁরে আছেন কেমন ॥ ১৮ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে সম্বরি আপনে ।
বলিলেন বড় কষ্ট গেছে গত দিনে ॥ ১৯ ॥
এক পুয়া রক্তস্রাব যন্ত্রণা সহিত ।
গলনালিমধ্যে দাহ বিয়াধির রীত ॥ ২০ ॥
ঘোর বরিষার কাল শ্রাবণের শেষ ।
গেরুয়া-বসনা গঙ্গা বিরাগিনী বেশ ॥ ২১ ॥
নীল-কলেবর সিন্ধু-সঙ্গম-আশায় ।
কূল দিয়া ভাসাইয়া তীব্র বেগে ধায় ॥ ২২ ॥
পুরীমধ্যে পুষ্পোদ্যান জাহ্নবীর কূলে ।
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের পশ্চিম অঞ্চলে ॥ ২৩ ॥
ছয় হস্ত পরিমিত দূরত্ব কেবল ।
মাটি নাহি যায় দেখা তদুপরি জল ॥ ২৪ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর মন্দিরাভ্যন্তর ।
অতিশয় জলে সিক্ত রহে নিরন্তর ॥ ২৫ ॥
এদিকে বিশালাকাশে জলদেব দল ।
ঝুরু ঝুরু ফেলিতেছে বৃষ্টি অবিরল ॥ ২৬ ॥
জলকণা মাখি অঙ্গে বায়ু বহমান ।
আর্দ্র করে অবিরত আশ্রয়ের স্থান ॥ ২৭ ॥
হেন ঠাঁই শ্রীগোসাঁই করিলে বসতি ।
স্বাস্থ্যের সম্বন্ধে তাঁর হবে বহু ক্ষতি ॥ ২৮ ॥
এত ভাবি ভক্তগণে কৈলা নিবেদন ।
শহরে বসতি করা এবে প্রয়োজন ॥ ২৯ ॥
উপযুক্ত বাসস্থান অনুমতি দিলে ।
নির্ধারিত করি গিয়া শহর অঞ্চলে ॥ ৩০ ॥
অবিকল শিশুছেলে বালক যেমন ।
ভালবাসা মাখা ভাষা করিয়া শ্রবণ ॥ ৩১ ॥
সহাস্ত-আননে কন বাড়ি দেখ তবে ।
বাগবাজারের কাছে গঙ্গাতীর হবে ॥ ৩২ ॥
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে বলেন ডাকিয়া ।
যাত্রাদিন কর স্থির পঞ্জিকা দেখিয়া ॥ ৩৩ ॥
সুন্দর যাত্রিক দিন পর শনিবারে ।
আজি বৃহস্পতি আর একদিন পরে ॥ ৩৪ ॥
সানন্দে ভকতবর্গ উঠিল সত্বর ।
অন্বেষণ করিবারে আজ্ঞামত ঘর ॥ ৩৫ ॥
আনন্দ কি হেতু যদি জিজ্ঞাসিলে মন ।
তদুত্তরে কহি শুন তাহার কারণ ॥ ৩৬ ॥
প্রভু-দরশন-প্রিয় ভকতনিকর ।
ক্রোশত্রয় দূরে এই দক্ষিণশহর ॥ ৩৭ ॥
সহজে এখানে আসা ঘটে না কাহার ।
সপ্তাহে বারেক কেহ পক্ষে একবার ॥ ৩৮ ॥
কিন্তু এবে কৈলে প্রভু শহরে বসতি ।
দরশন শুভযোগে হবে দিবা রাতি ॥ ৩৯ ॥
মনে মনে সকলের স্থিরতর জানা ।
দু-দিনের চিকিৎসায় সারিবে বেদনা ॥ ৪০ ॥
সেইহেতু ভক্তবর্গ হরষিত মন ।
কে জানে ঘটিবে পরে বিপদ ভীষণ ॥ ৪১ ॥
বাগবাজারের কাছে গঙ্গা সন্নিহিত ।
নুতন আবাস বাটী করি নির্ধারিত ॥ ৪২ ॥
সমাচার পাঠাইলা প্রভুর সাক্ষাতে ।
উপনীত প্রভুদেব শনিবার প্রাতে ॥ ৪৩ ॥
নিরখিয়া বাসাবাটী জানি না কারণ ।
বসতি করিতে তথা হইল না মন ॥ ৪৪ ॥
পরিহরি সেই বাটী ত্বরিত-গমনে ।
উপনীত হইলেন বসুর ভবনে ॥ ৪৫ ॥
বসুর ভাগ্যের কথা নাহি হয় ইতি ।
যাঁহার ভবনে এত প্রভুর পিরীতি ॥ ৪৬ ॥
শ্রী প্রভুর আগমন বসুর ভবনে ।
সাধারণে রাষ্ট্র কথা হৈল কানে কানে ॥ ৪৭ ॥
লোকারণ্য হৈল লোকে ভবন-ভিতরে ।
অগণন সাধ্য কার সংখ্যা ভার করে ॥ ৪৮ ॥
মঙ্গল-উৎসব-ধ্বনি উঠে দিবারাত্র ।
বসুর ভবন ঠিক জগন্নাথ-ক্ষেত্র ॥ ৪৯ ॥
প্রভু যে পীড়িত এত কেহ নাহি ভাবে ।
দরশনে সবে মহানন্দ-নীরে ডুবে ॥ ৫০ ॥
পূর্ববৎ সমভাবে ব্যাধির বিক্রম ।
কখন কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি কভু কিছু কম ॥ ৫১ ॥
ইংরাজ ডাক্তারে দিতে চিকিৎসার ভার ।
ঠাকুর তাহাতে নাহি করিলা স্বীকার ॥ ৫২ ॥
চিকিৎসার ভার তবে হইল পশ্চাতে ।
প্রতাপ মজুমদার ডাক্তারের হাতে ॥ ৫৩ ॥
শহরের একজন সুবিজ্ঞ ডাক্তার ।
হোমিওপ্যাথিক মতে চিকিৎসা তাঁহার ॥ ৫৪ ॥
যথাসাধ্য বিয়াধির নিরূপণ করি ।
খাইতে দিলেন ছোট ছোট সাদা বড়ি ॥ ৫৫ ॥
প্রভুর বালকাপেক্ষা শরীর দুর্বল ।
ঔষধসেবনে ঘটে বিপরীত ফল ॥ ৫৬ ॥
প্রতাপ প্রতাপান্বিত যশ দেশ জুড়ে ।
এখানের প্রতিকারে বুদ্ধি যায় মুড়ে ॥ ৫৭ ॥
কিছুতেই কোনমতে কিছু নহে ফল ।
প্রতিকারে রোগ করে দুনো গুণে বল ॥ ৫৮ ॥
ইহাতেও তিল নাই প্রভুর বিশ্রাম ।
তত্ত্বকথা নৃত্য গীত চলে অবিরাম ॥ ৫৯ ॥
দরশনে আসে যেবা যে কোন আশায় ।
আশার অতীত কভু অনায়াসে পায় ॥ ৬০ ॥
একদিন শুন এক শ্রীপ্রভুর খেলা ।
গগনে কেবল বাকি প্রহরেক বেলা ॥ ৬১ ॥
গৌরাঙ্গ-ভকত এক ব্রাহ্মণ-নন্দন ।
নামাবলী ছিটাফোঁটা অঙ্গে সুশোভন ॥ ৬২ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা লোকমুখে শুনে ।
আসিতেন পথে পথে কভু দরশনে ॥ ৬৩ ॥
আসিতে আসিতে করে মনে আন্দোলন ।
প্রভুর মহিমা-কথা-শ্রবণ যেমন ॥ ৬৪ ॥
সরল বিশ্বাসে তেঁহ পাইল দেখিতে ।
গৌরাঙ্গ-চরিতখানি প্রভুর চরিতে ॥ ৬৫ ॥
বিস্ময় সহিত নানাবিধ চিন্তা মনে ।
অবশেষে উপনীত বসুর ভবনে ॥ ৬৬ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু অখিলের রাজ ।
সদর মেলার মধ্যে করেন বিরাজ ॥ ৬৭ ॥
বৈষ্ণবের বেশভূষা অঙ্গে দেখি তার ।
শ্রীপ্রভুর রীতি যেন অগ্রে নমস্কার ॥ ৬৮ ॥
ব্রাহ্মণ-নন্দন করি প্রণিপাত পরে ।
ভক্তিরীতে বসিলেন প্রভুর গোচরে ॥ ৬৯ ॥
একরে ধরিয়া এক বিউনি তখন ।
আপনে আপনি প্রভু করেন ব্যজন ॥ ৭০ ॥
ব্রাহ্মণের মনে মনে উপজিল আশ ।
পাইলে বিউনি করে শ্রীঅঙ্গে বাতাস ॥ ৭১ ॥
হৃদয় নিবাস প্রভু বুঝিয়া অন্তরে ।
সমর্পণ কৈলা পাখা ব্রাহ্মণের করে ॥ ৭২ ॥
মিটাইয়া মনসাধ ব্রাহ্মণ তখন ।
পরম আহ্লাদে করে শ্রীঅঙ্গে ব্যজন ॥ ৭৩ ॥
কলা-পরবশ প্রভু স্বভাবের গুণে ।
সেবায় হইয়া তুষ্ট ব্রাহ্মণনন্দনে ॥ ৭৪ ॥
কমলার সেব্য সেই অমূল্য চরণ ।
ভাবাবেশে বক্ষে তাঁর করিলা অর্পণ ॥ ৭৫ ॥
পুলকে পুণিত হিয়া দ্বিজ ভাগ্যবান ।
পথে যা ভাবিলা তাই দেখে বিদ্যমান ॥ ৭৬ ॥
প্রবল প্রাণান্ত পীড়াভোগ অবিরাম ।
তথাপি তিলেক নাই খেলায় বিশ্রাম ॥ ৭৭ ॥
তৃণতুল্য জ্ঞান দেহে খেলা নিরবধি ।
যত দিন যায় তত বৃদ্ধি পায় ব্যাধি ॥ ৭৮ ॥
পরাভূত কবিরাজ ডাক্তারের গণে ।
এক পক্ষ হৈল গত বসুর ভবনে ॥ ৭৯ ॥
এখানে অধিক দিন স্থিতি নহে যোগ্য ।
স্বতন্তর স্থান চেষ্টা করে ভক্তবর্গ ॥ ৮০ ॥
শ্যামপুকুরের মধ্যে বাড়ী হৈল স্থির ।
যাহার পশ্চিমে এক শিবের মন্দির ॥ ৮১ ॥
দ্বিতল মহল বাড়ি মাস ভাড়া ধার্য ।
গৃহস্বামী নামজাদা শিবু ভট্টাচার্য ॥ ৮২ ॥
শ্রীপ্রভুর মহাভক্ত কালীপদ ঘোষ ।
নিকটে তাঁহার বাড়ি বড়ই সন্তোষ ॥ ৮৩ ॥
যে বাড়িতে শ্রীপ্রভুর হবে আগুসার ।
অগ্রণী হইয়া কর্মে কৈলা পরিষ্কার ॥ ৮৪ ॥
দেবদেবীমূর্তি-আঁকা পট ক্রয় করি ।
চৌদিকে দেয়ালে আঁটাইল সারি সারি ॥ ৮৬ ॥
জালা হাঁড়ি খুন্তি বেড়ি মাদুর আসন ।
চাল ডাল দ্রব্যাদি যতেক প্রয়োজন ॥ ৮৭ ॥
এইসব আয়োজন করিবার তরে ।
লইল সকল ভার নিজের উপরে ॥ ৮৮ ॥
ব্যয় তার যত হয় সকলে যোগান ।
গিরিশ সুরেন্দ্র মিত্র বসু বলরাম ॥ ৮৯ ॥
হরিশ মুস্তফী নবগোপাল কেদার ।
চাঁই ভক্ত রাম দত্ত মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৯০ ॥
কালীপদ দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ভক্তগণ ।
এবে যাঁরা সন্ন্যাসীরা বালক তখন ॥ ৯১ ॥
যোগাইতে টাকাকড়ি পাইবে কোথায় ।
যাহা ছিল দেহপ্রাণ সঁপিল সেবায় ॥ ৯২ ॥
রাখাল যোগীন লাটু নিত্যনিরঞ্জন ।
বাবুরাম কালী শশী এই কয়জন ॥ ৯৩ ॥
সেবাপর অবিরত রহে রেতে দিনে ।
'ভক্ত-মা' গোলাপ-মাতা একাকী রন্ধনে ॥ ৯৪ ॥
এখন নরেন্দ্রনাথ প্রভুতে পিরীত ।
দু-গণ্ডা প্রহর গোটা প্রায় উপস্থিত ॥ ৯৫ ॥
কোথাও ক্ষণেক জন্য হইলে বাহির ।
ঘুরিয়া ঘুরিয়া পুনঃ স্বস্থানে হাজির ॥ ৯৬ ॥
এইবার আগেকার কথা স্বর মনে ।
কতই ঘুরিলা প্রভু নরেন্দ্রান্বেষণে ॥ ৯৭ ॥
কোথা তাঁর খেলাস্থান কোথা তাঁর ঘর ।
সমাজ-মন্দির কোথা দক্ষিণশহর ॥ ৯৮ ॥
ঋতুর তাড়না গ্রাহ্য তিলাদপি নাই ।
নরেন্দ্রের জল্প যেন পাগল গোসাঁই ॥ ৯৯ ॥
সহিলা কহিলা কত তাঁহার বিচ্ছেদে ।
এখন নরেন্দ্রনাথ শ্রীপ্রভুর ফাঁদে ॥ ১০০ ॥
শরীরে ধরিয়া পীড়া এখন গোসাঁই ।
করিছেন অন্তরঙ্গগণের বাছাই ॥ ১০১ ॥
ভক্তি-প্রাণ-ভালবাসা প্রাণাধিক টান ।
এই কয় গুণে অন্তরঙ্গের প্রমাণ ॥ ১০২ ॥
পীড়ার প্রাবল্য যত হয় দিন দিন ।
কান্তিময় তনুখানি জীর্ণ শীর্ণ ক্ষীণ ॥ ১০৩ ॥
তত অন্তরঙ্গদের বাড়য়ে আসক্তি ।
প্রাণের অধিক টান ভালবাসা ভক্তি ॥ ১০৪ ॥
যেন দেহ-বিনিময়ে দেহে লয়ে রোগ ।
করিছেন ভক্তদের ভক্তির সম্ভোগ ॥ ১০৫ ॥
একদিন ভক্তবর্গে হয়ে একতর ।
ভাবিয়া চিন্তিয়া যুক্তি কৈলা স্থিরতর ॥ ১০৬ ॥
শহরের মধ্যে যে উৎকৃষ্ট চিকিৎসক ।
হউক যতই ব্যয় তারে আবশ্যক ॥ ১০৭ ॥
ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারোপাধি ।
হোমিওপ্যাথিক মতে চিকিৎসার বিধি ॥ ১০৮ ॥
প্রতিকারে নির্বাচিত হইলেন তিনি ।
ষোল টাকা প্রতিবারে বেতন দর্শনী ॥ ১০৯ ॥
রাজভাষা-বিশারদ পাঠপ্রিয় ধারা ।
যতগুলি আছে পাশ সবগুলি করা ॥ ১১০ ॥
অগণ্য করিয়া পাশ বন্ধ মহাপাশে ।
বিশেষিয়া পরিচয় পাবে পরিশেষে ॥ ১১১ ॥
সরল অন্তরাধারে দয়া বলবান ।
রসনা কর্কশ বড় বাক্য যেন বাণ ॥ ১১২ ॥
যে কার্য করিলা তেহ প্রভুর লীলায় ।
বহি যদি শিরে জুতা শোধ নাহি যায় ॥ ১১৩ ॥
রামকৃষ্ণপন্থী মাত্র তাঁর কাছে ঋণী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ১১৪ ॥
পুজনীয় প্রভুভক্ত মহেন্দ্র মাস্টার ।
ডাক্তার আনিতে কর্মে লইলেন ভার ॥ ১১৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ পূর্বে ডাক্তার-ভবনে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন ব্যাধি নিরূপণে ॥ ১১৬ ॥
জানা-শুনা ইহার অধিক পূর্বে আর ।
মথুরে চিকিৎসা করেন যখন ডাক্তার ॥ ১১৭ ॥
মথুরের মনমত ইহার চিকিৎসা ।
সেহেতু দক্ষিণেশ্বরে ছিল যাওয়া আসা ॥ ১১৮ ॥
সে জানা কেমন জানা শুন পরিচয় ।
মথুর-পোষ্য লোকে পরমহংস কয় ॥ ১১৯ ॥
যেন অতিশয় মূর্খ ব্রাহ্মণের ছেলে ।
পূজাকার্যে ব্রতী তাই ভট্টাচার্য বলে ॥ ১২০ ॥
সেইমতে ডাক্তারের প্রভুদেবে জানা ।
সে ঠকে অধিক নিজে যে বুঝে সিয়ানা ॥ ১২১ ॥
হেথা পথপানে চেয়ে আছে ভক্তবৃন্দ ।
কখন মহেন্দ্রে ল'য়ে আসেন মহেন্দ্র ॥ ১২২ ॥
হেনকালে ডাক্তার হইল উপনীত ।
ভকতনিকরে প্রভুদেব সুবেষ্টিত ॥ ১২৩ ॥
প্রভুদেবে দেখিয়াই সবিস্ময় মনে ।
ডাক্তার প্রভুকে কন তুমি যে এখানে ॥ ১২৪ ॥
দেখাইয়া সম্মুখীন ভকতনিকরে ।
উত্তর—এনেছে এরা চিকিৎসার তরে ॥ ১২৫ ॥
শ্রীপ্রভুর বিছানার উপর বসিয়া ।
রোগ পরীক্ষিয়া দিল ঔষধ কহিয়া ॥ ১২৬ ॥
নূতন দেখিনু আমি এতদিন পরে ।
প্রভু ভিন্ন অন্যে তাঁর শয্যার উপরে ॥ ১২৭ ॥
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে উঠিল ডাক্তার ।
উপনীত নীচে যেথা বাহির দুয়ার ॥ ১২৮ ॥
ডাক্তারের কাছে গিয়া মাস্টার অগ্রণী ।
সচেষ্ট তাঁহারে দিতে বেতন দর্শনী ॥ ১২৯ ॥
হাতে না লইয়া টাকা পুছিল ডাক্তার ।
যে বাড়িতে আসিয়াছি এ বাড়ি কাহার ॥ ১৩০ ॥
গুনিয়া ডাক্তারে কৈলা মাস্টার উত্তর ।
শ্রীপ্রভুর ভক্তদের ভাড়া লওয়া ঘর ॥ ১৩১ ॥
ইহার চিকিৎসা মাত্র উদ্দেশ্য ইহাতে ।
দক্ষিণশহর দূর শহর হইতে ॥ ১৩২ ॥
উহার আবার ভক্ত ভক্ত কি রকম ।
অধিক বিশ্বয়াপন্ন হইয়া তখন ॥ ১৩৩ ॥
জিজ্ঞাসা করিল তবে জানিতে আখ্যান ।
ভক্ত সব কারা তাঁরা কি তাঁদের নাম ॥ ১৩৪ ॥
ভক্তদের নাম শুনি অবাক ডাক্তার ।
দর্শন-গ্রহণে তবে কৈলা অস্বীকার ॥ ১৩৫ ॥
ডাক্তার হৃদয়বান ধীমান পণ্ডিত ।
ধর্ম তাঁর একমাত্র সাধারণহিত ॥ ১৩৬ ॥
প্রভুদেব হিতাকাঙ্ক্ষী সাধারণ জনে ।
বিশেষ ধারণা দৃঢ় হৈল মনে মনে ॥ ১৩৭ ॥
মনোভাব বাক্যেতে প্রকাশ করি তিনি ।
অস্বীকার করিলেন লইতে দর্শনী ॥ ১৩৮ ॥
মহেন্দ্র মাস্টার পুনঃ বুঝাইয়া কন ।
যদিও ভক্তেরা নহে ধনাঢ্য এমন ॥ ১৩৯ ॥
তথাপি অক্ষম নহে দর্শনী-প্রদানে ।
গ্রহণ করুন এথে অস্বীকার কেনে ॥ ১৪০ ॥
মুখমন ডাক্তার কহেন তদুত্তরে ।
আমাকেও কর গণ্য পাঁচের ভিতরে ॥ ১৪১ ॥
পরম যতন সহ উহারে দেখিব ।
যতবার আবশ্যক আপনি আসিব ॥ ১৪২ ॥
সুহৃদের মত তেঁহ বলিলেন পিছে ।
ইহাতে নিজের মোর বহু স্বার্থ আছে ॥ ১৪৩ ॥
শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায় স্বার্থ আছে তাঁর ।
সুগভীর অর্থ দেখি ভিতরে ইহার ॥ ১৪৪ ॥
গূঢ় কথা বড় হেথা কহিলা ডাক্তার ।
লক্ষ কোটি নমস্কার চরণে তাঁহার ॥ ১৪৫ ॥
বহুদূরদর্শিতার ভাব এ কথায় ।
ডাক্তার—ডাক্তার নহে জনৈক লীলায় ॥ ১৪৬ ॥
অতিশয় প্রিয়তম শ্রীপ্রভুর জন ।
প্রভুর ইচ্ছায় এবে অবস্থা এমন ॥ ১৪৭ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ যত ডাক্তারের সনে ।
আলোচনা করিলে বুঝিবে অন্ধ জনে ॥ ১৪৮ ॥
শহরেতে শ্রীপ্রভুর কেন আগমন ।
উদ্দেশ্য তাহার সঙ্গে সপ্রেম মিলন ॥ ১৪৯ ॥
বহুদূরদর্শিতার শকতির গুণে ।
ডাক্তার বিশেষরূপে বুঝিলা আপনে ॥ ১৫০ ॥
আপনার অবস্থা দেখিয়া পান টের ।
প্রভুর চিকিৎসা নয় চিকিৎসা নিজের ॥ ১৫১ ॥
ডাক্তার বড়ই চাপা অন্তঃশীলা বয় ।
দেড়গণ্ডা তালা আঁটা হৃদয়-নিলয় ॥ ১৫২ ॥
মনোগত ভাব কভু প্রকাশ না করে ।
স্বেচ্ছায় এ নয় তাঁর স্বভাবানুসারে ॥ ১৫৩ ॥
মানুষের সঙ্গে কি খেলেন ভগবান ।
মানুষে না দেন তিনি জানিতে সন্ধান ॥ ১৫৪ ॥
মায়ায় মোহিতচিত অবিরত রয় ।
অহঙ্কারে আমি করি এই মত কয় ॥ ১৫৫ ॥
জাগাইয়া রায় সঙ্গে খেলেন ঈশ্বর ।
সে খেলার অন্য ধারা বর্ণ স্বতন্তর ॥ ১৫৬ ॥
সেখানে মায়ার তালা খোলা একেবারে ।
আমিতে অকর্তা-বোধ তুমি তুমি করে ॥ ১৫৭ ॥
ডাক্তারের ধর্ম-রোগ শুনহ এখন ।
পরম পণ্ডিত বৈজ্ঞানিক এক জন ॥ ১৫৮ ॥
তর্ক-বিদ্যাবলে পক্ষ সমর্থন করে ।
প্রাণান্তে স্বীকার নয় সাকার ঈশ্বরে ॥ ১৫৯ ॥
এ রোগ ইহার নহে একাকী কেবল ।
রোগগ্রস্ত এবে প্রায় সব নব্যদল ॥ ১৬০ ॥
সাকারের প্রতিবাদী সংখ্যা কেবা করে ।
ম্যালেরিয়া রোগী যেন প্রতি ঘরে ঘরে ॥ ১৬১ ॥
সকলে বিদিত হেতু বলাই বাহুল্য ।
ব্রাহ্মধর্ম প্রাবল্যেতে রোগের প্রাবল্য ॥ ১৬২ ॥
বিজ্ঞানের দেশে দেশে উন্নতি সাধন ।
বুদ্ধিবল কলবল দ্বিতীয় কারণ ॥ ১৬৩ ॥
সাকার না লাগে ভাল দোষ নাহি তায় ।
দোষমাত্র প্রতিবাদে সাকার কথায় ॥ ১৬৪ ॥
সর্বশক্তিমানত্বের ভাব ভগবানে ।
আকার ধরিতে তবে শক্তি নাই কেনে ॥ ১৬৫ ॥
সর্বশক্তিমানত্ব প্রত্যক্ষ দেখা যাঁর ।
সে বুঝে সাকার যিনি তিনি নিরাকার ॥ ১৬৬ ॥
যত দূর ধারণা করিতে পারে জীবে ।
অসম্ভব কিবা তায় সকলি সম্ভবে ॥ ১৬৭ ॥
বার বার বলিলেন প্রভু ভক্তপতি ।
ঈশ্বরীয় অবস্থার নাহি হয় ইতি ॥ ১৬৮ ॥
ভক্তপতি শ্রীপ্রভুর নাম এইখানে ।
নূতন কহিনু শুন কিবা তার মানে ॥ ১৬৯ ॥
ভক্ত সাধারণী নাম ভক্ত কয় তাঁরে ।
ভক্তিভরে ঈশ্বরের ভজনা যে করে ॥ ১৭০ ॥
শাক্ত শৈব গাণপত্য রামাইৎ বৈষ্ণব ।
বাউল নানকপন্থী কর্তাভজা সব ॥ ১৭১ ॥
নবরসিকের দল জানা সর্বজনে ।
নিরাকার-উপাসক সগুণ নির্গুণে ॥ ১৭২ ॥
অঘোরপন্থী কি বৌদ্ধ কিবা পঞ্চনামী ।
দরবেশ আল্লাভজা কিবা খ্রীষ্টিয়ানি ॥ ১৭৩ ॥
যে মতে যে পথে যেবা ভজে ভগবানে ।
ভক্ত অর্থে এক করি সাধারণী মানে ॥ ১৭৪ ॥
এই সব পন্থীদের প্রভু অধিপতি ।
বারে বারে বলিয়াছি ইহার ভারতী ॥ ১৭৫ ॥
যে মত পথের ভক্ত প্রভু বিদ্যমান ।
সবে পায় আপনার পথের সন্ধান ॥ ১৭৬ ॥
যাবতীয় মতে পথে করিয়া সাধনা ।
পথঘাট শ্রীপ্রভুর সব ভাল জানা ॥ ১৭৭ ॥
উপায়ের হেতু কাছে আসিলে সাধক ।
ঘুচিয়া দিতেন তার যেখানে আটক ॥ ১৭৮ ॥
উপদেশ তার মত তাহার ভাষায় ।
সে কথা অন্যের পক্ষে বুঝা মহাদায় ॥ ১৭৯ ॥
ভক্তমাত্রে হয়ে মুগ্ধ চরিতে প্রভুর ।
সকলে বুঝিত তিনি তাঁদের ঠাকুর ॥ ১৮০ ॥
ইহার বিশেষ মর্ম বিশেষিয়া জানে ।
ইদানীং সমুন্নত ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ১৮১ ॥
সকলের উপদেষ্টা প্রভু ভগবান ।
পুঁথি তাই জানে তাঁর ভক্তপতি নাম ॥ ১৮২ ॥
ডাক্তার বোঝেন সেই পরম-ঈশ্বর ।
অরূপ আকারহীন বুদ্ধির উপর ॥ ১৮৩ ॥
মানুষ কখনও গুরু হইতে না পারে ।
মানুষ মানুষ মাত্র কিবা শক্তি ধরে ॥ ১৮৪ ॥
মানুষের পদধূলি গ্রহণীয় নয় ।
ঈশ্বর মহান কিবা মনুষ্য নিচয় ॥ ১৮৫ ॥
অসীম অখণ্ডেশ্বর মনুষ্য-আধারে ।
হইবার নহে কভু হইতে না পারে ॥ ১৮৬ ॥
কেমনে হইবে যাহা নহে হইবার ।
ভাব কি সমাধি ইহার মাথার বিকার ॥ ১৮৭ ॥
দুধ খেয়ে মলত্যাগ যেই জন করে ।
কেমনে ঈশ্বরারোপ করিব তাঁহারে ॥ ১৮৮ ॥
বিজ্ঞতর বৈজ্ঞানিক মার্জিতাগ্রগণ্য ।
ধনে গুণে যশে কাজে সাধারণে মান্য ॥ ১৮৯ ॥
এহেন উন্নতশীল মানুষ যে জন ।
ঈশ্বর সমাধি ব্যাখ্যা করিল কেমন ॥ ১৯০ ॥
যাহে বেদ তন্ত্র গীতা পুরাণনিচয় ।
সাধন-ভজনকর্ম সব হয় লয় ॥ ১৯১ ॥
বিশেষিয়া এইখানে বুঝ তুমি মন ।
হালের মার্জিতবুদ্ধি লোকের লক্ষণ ॥ ১৯২ ॥
হায়! আমি কি কহিব অতি অর্বাচীন ।
পাড়াগেঁয়ে মেঠো লোক বিদ্যাবুদ্ধিহীন ॥ ১৯৩ ॥
চেহারায় মূর্ছা যায় গেছো ভূত দেখে ।
বরনে লজ্জায় কালি দোয়াতেতে ঢুকে ॥ ১৯৪ ॥
পেটভরা ভাত মুড়ি কোথা দু-বেলায় ।
হীন দাস্যবৃত্তি কাজে আয়ু কেটে যায় ॥ ১৯৫ ॥
এঁরা
সব বড়লোক চড়ে গাড়ি ঘোড়া ।
সুগঠন সুবসন বেশ জামাজোড়া ॥ ১৯৬ ॥
লুচি চিনি দুধ মিষ্টি ইচ্ছামত খায় ।
দ্বিতলে ত্রিতলে নিদ্রা কোমল শয্যায় ॥ ১৯৭ ॥
দাস দাসী খানসামা চাকর বেহারা ।
ভোজপুরী বংশধারী দরজাতে খাড়া ॥ ১৯৮ ॥
বড় বড় সাহেবেরা মহামান্য করে ।
হকুমেতে মানুষের মাথা যায় উড়ে ॥ ১৯৯ ॥
এহেন অবস্থাপন্ন লোকের তুলনে ।
আমি ক্ষুদ্র পিপীলিকা ডোবে এক কোণে ॥ ২০০ ॥
কিন্তু রামকৃষ্ণজীর কৃপাদৃষ্টিবলে ।
বড় লোকে দেখি যেন দুগ্ধপোষ্য ছেলে ॥ ২০১ ॥
বলিল কেমনে কথা ফুটিল বদনে ।
এত সব মহা মহা ভক্তদের স্থানে ॥ ২০২ ॥
ভাব কি সমাধি ইহা মাথার বিকার ।
শক্তিহীন ভগবান ধরিতে আকার ॥ ২০৩ ॥
তবে দূরদর্শিতার ভাব তাহে কিসে ।
কেবল চাঁদের আলো প্রভুর পরশে ॥ ২০৪ ॥
রক্ষা কর রামকৃষ্ণ নরতনু-বেশ ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন বিচ্ছু পরমেশ ॥ ২০৫ ॥
অনাদি অখণ্ড সীমাহীন বিশ্বস্বামী ।
নিরাকার সাকার উভয় রূপে তুমি ॥ ২০৬ ॥
তোমার কৃপায় প্রভু দূরীভূত ধাঁধা ।
প্রার্থনা চরণে যেন মন রহে বাঁধা ॥ ২০৭ ॥
নিঃস্বার্থে প্রভুতে শ্রদ্ধা রাখি যেইজন ।
রোগ-প্রতিকারে করে বিশেষ যতন ॥ ২০৮ ॥
যে কেহ হউন তিনি আরাধ্য আমার ।
যুগল চরণ তাঁর বন্দি বার বার ॥ ২০৯ ॥
ডাক্তার নিঃস্বার্থপর কি হেতু এখানে ।
শুনিতে বাসনা যদি শুন এক মনে ॥ ২১০ ॥
দেখিতে পাইলা তেঁহ প্রভুর ইচ্ছায় ।
মোহনীয়া শক্তি এক শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ২১১ ॥
যাহার প্রভাবে বহু কদাচারী জন ।
কুতূহলে করিতেছে সুপথে গমন ॥ ২১২ ॥
সেইহেতু স্বার্থহীন পর-উপকারে ।
আরোগ্য বিবিধোপায় যত্নসহকারে ॥ ২১৩ ॥
ক্রমে ক্রমে যাবতীয় পাবে সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি সুধার পাথার ॥ ২১৪ ॥
ডাক্তারের সদাচার শ্রীপ্রভুর সদনে ।
চিকিৎসা করিবে তেঁহ কড়িপাতি বিনে ॥ ২১৫ ॥
ভক্তের মণ্ডলী মধ্যে রাষ্ট্র হইল কথা ।
ধন্য ধন্য সবে করে নুয়াইয়া মাথা ॥ ২১৬ ॥
পরদিনে বহু ভক্ত একত্র হেথায় ।
আগোটা গৃহেতে আর ঠাঁই না কুলায় ॥ ২১৭ ॥
প্রভুর সভায় আজি শোভা কি সুন্দর ।
ছদ্মবেশে পরমেশ রাজরাজেশ্বর ॥ ২১৮ ॥
ঐশ্বর্যাদি কান্তিভাব ভিতরে গোপনে ।
পূর্ণিমার কররাজি ঘন আবরণে ॥ ২১৯ ॥
সঙ্গে অন্তরঙ্গগুলি গড়া সেই ছাঁচে ।
কাদামাখা মণিমালা সাধ্য কার বাছে ॥ ২২০ ॥
আজিকার নবধারা অপূর্ব ধরন ।
ফিকে ফিকে লঘু বর্ণ ঘন-আবরণ ॥ ২২১ ॥
মনোহর কান্তি-কর ফুটে শ্রীবদনে ।
দীপ্তিমান মণিরাজি যাহার কিরণে ॥ ২২২ ॥
গোপনে মোহন মেলা নয়নানন্দকর ।
রঙ্গরসে লীলাতত্ত্বকথা পরস্পর ॥ ২২৩ ॥
ডাক্তার এমন কালে হইল হাজির ।
শ্রীবয়ানাকাশে পুনঃ উদিল তিমির ॥ ২২৪ ॥
ভক্তবর্গ নমস্কার কৈলা জনে জনে ।
বসিল ডাক্তার গিয়া প্রভুর আসনে ॥ ২২৫ ॥
পরীক্ষিয়া ব্যথা-স্থান ঔষধ-বিধান ।
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে কৈলা সমাধান ॥ ২২৬ ॥
নেহারিয়া চারিদিক দেখেন ডাক্তার ।
আজি দিনে বহু ভক্ত পরিপূর্ণ ঘর ॥ ২২৭ ॥
সুবেশ সুন্দরমূর্তি যুবকের দল ।
ভক্তির ছটায় করে মুখ ঝলমল ॥ ২২৮ ॥
চমকিত আনন্দিত হৃদয়-নিলয় ।
গিরিশের সঙ্গে আজি শুভ পরিচয় ॥ ২২৯ ॥
ঈশ্বরীয় কথা পরে কথায় কথায় ।
বাদপ্রতিবাদে তিন ঘণ্টা কেটে যায় ॥ ২৩০ ॥
বাক্বিতণ্ডায় তেহ বুঝিল নিশ্চিত ।
সভাস্থ ভকতবর্গ পরম পণ্ডিত ॥ ২৩১ ॥
অত্যুচ্চ বর্ণের সব নহে মালা জেলে ।
অধিকাংশ ব্রাহ্মণ ও কায়স্থের ছেলে ॥ ২৩২ ॥
মিষ্টভাষী সদালাপী বিনীত-আচার ।
অঙ্গে শোভে নানাবিধ গুণ-অলঙ্কার ॥ ২৩৩ ॥
দেখিয়া শুনিয়া সভা আনন্দ-অন্তর ।
অধিক বাড়িল শ্রদ্ধা প্রভুর উপর ॥ ২৩৪ ॥
শিলা দেখি শৈলের বারতা কিছু পেয়ে ।
বিদায় লইয়া গেলা সে দিন চলিয়ে ॥ ২৩৫ ॥
পঞ্চম খণ্ড
সুরেন্দ্রের গৃহে অম্বিকাপূজা, প্রভুর অলক্ষ্যে আবির্ভাব এবং ডাক্তারের সঙ্গে বিবিধ তত্ত্বালাপ
বন্দ
রামকৃষ্ণরায় বিশ্বস্বামী যিনি ।
বন্দ মাতা শ্যামা-সুতা জগৎ-জননী ॥
গৃহস্থ সন্ন্যাসী ভক্ত বন্দ দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
আশ্বিনে অম্বিকাপুজা উৎসব প্রধান ।
বঙ্গবাসী জনে জনে সুখে ভাসমান ॥ ১ ॥
কিবা যুবা কি যুবতী বৃদ্ধ কিবা মাগী ।
ধনী কি নির্ধন কিবা শোকী তাপী রোগী ॥ ২ ॥
বিশেষতঃ কলিকাতা প্রধান নগরী ।
ধনরত্বে পরিপূর্ণ অট্টালিকা বাড়ি ॥ ৩ ॥
সর্ব অঙ্গে সুচিকন কিবা শোভা পায় ।
ঘরে ঘরে অম্বিকার প্রতিমা সাজায় ॥ ৪ ॥
চেনা নাহি যায় কেবা জড় কি চেতন ।
আগোটা প্রকৃতি দেবী সহাস্যবদন ॥ ৫ ॥
হেথা বিপরীত ধারা প্রভুর সংসারে ।
ম্রিয়মাণ ক্ষুণ্ণমন ভকতনিকরে ॥ ৬ ॥
জবাব দিয়াছে চিকিৎসকের নিচয় ।
প্রভুর অসাধ্য ব্যাধি আরোগ্যের নয় ॥ ৭ ॥
মায়া লয়ে লীলাখেলা মায়ার ভিতর ।
হাসি কান্না সুখ দুঃখ সঙ্গে নিরন্তর ॥ ৮ ॥
এইখানে এক কথা কর অবহিত ।
প্রভুর নিকটে ভক্ত নহে বিষাদিত ॥ ৯ ॥
হাজার পীড়িত তাঁরে নয়নে দেখিছে ।
তবু নাই কোন দুঃখ যতক্ষণ কাছে ॥ ১০ ॥
বরঞ্চ আনন্দে হৃদি পড়ে উথলিয়া ।
যে কোন অবস্থাপন্ন প্রভুরে দেখিয়া ॥ ১১ ॥
পরিহরি অগোচর আসিলে বাহিরে ।
দুঃখতাপ বিষণ্ণতা আক্রমণ করে ॥ ১২ ॥
কি হেতু এমন হয় হেতু শুন তার ।
শ্রীপ্রভু আনন্দময় কারণ ইহার ॥ ১৩ ॥
যেখানে শ্রীপ্রভুদেব আনন্দ সেখানে ।
কোথায় আঁধার রহে চাঁদ বিদ্যমানে ॥ ১৪ ॥
অহঙ্কার তাপ শোক সব রহে দূর ।
বিরাজিত যেইখানে লীলার ঠাকুর ॥ ১৫ ॥
প্রভুর লীলায় শত সহস্র প্রমাণ ।
তর্ক বুদ্ধি বিজ্ঞামদ তাঁর সন্নিধান ॥ ১৬ ॥
দূরীভূত একেবারে মুক্ত মহাফাদে ।
শেষে ধরি শ্রীচরণ প্রেমানন্দে কাঁদে ॥ ১৭ ॥
এইমত কত শত পণ্ডিত ধীমান ।
অপ্রভুর প্রসাদেতে পাইলেন ত্রাণ ॥ ১৮ ॥
হরষ বিষাদ দিয়া লীলার ঠাকুর ।
লীলা-অবসানকাল নাহি বেশী দূর ॥ ১৯ ॥
সম্মিলিত করিছেন অন্তরঙ্গগণে ।
ভবিষ্য প্রচারকার্যে লীলার প্রাঙ্গণে ॥ ২০ ॥
প্রভুকে পীড়িত দেখি পীড়িত সবাই ।
পীড়ায় প্রভুর কিন্তু কোন গ্রাহ্য নাই ॥ ২১ ॥
সদানন্দময় তাঁর পীড়া নাই মনে ।
সর্বদা খেলায় রত ভক্তদের সনে ॥ ২২ ॥
কখন কাহার বক্ষে হস্ত পরশিয়া ।
মুচকি হাসেন তায় ধ্যানস্থ করিয়া ॥ ২৩ ॥
কভু বিদেশস্থ যেবা বহু দূরান্তরে ।
এখানে থাকিয়া সেথা দেখা দেন তাঁরে ॥ ২৪ ॥
কভু দাঁড়াইয়া মধ্যে ভক্তদের কন ।
হরিবোল দিয়া নাচ করিয়া বেষ্টন ॥ ২৫ ॥
কভু গিয়া গৃহান্তরে ভকতের দলে ।
করিয়া দেখিয়া রঙ্গ প্রহরেক চলে ॥ ২৬ ॥
সুরেন্দ্রের ঘরে হেথা সপ্তমী পূজায় ।
শুন কি করিলা রঙ্গ প্রভুদেবরায় ॥ ২৭ ॥
প্রতিবর্ষ দুর্গোৎসবে সুরেন্দ্রের ঘরে ।
সভক্তে শ্রীপ্রভুদেবে নিমন্ত্রণ করে ॥ ২৮ ॥
ভক্তগণে সঙ্গে লয়ে ভক্তপ্রিয় রায় ।
যাইতেন তাঁর ঘরে অম্বিকা পূজায় ॥ ২৯ ॥
শয্যায় পীড়িত এবে প্রভু গুণমণি ।
নিরানন্দ ভক্তবৃন্দ আকুল পরানী ॥ ৩০ ॥
পূর্ব আনন্দের মেলা করিয়া স্মরণ ।
বীরভক্ত শ্রীপ্রভুর সুরেন্দ্র এখন ॥ ৩১ ॥
দাঁড়াইয়া প্রতিমার সম্মুখ প্রদেশে ।
দুনয়নে অশ্রুধার গণ্ড যায় ভেসে ॥ ৩২ ॥
এবে প্রায় ন্যূনাধিক ছয় দণ্ড রাতি ।
নিকেতনে চারিদিকে জ্বলিতেছে বাতি ॥ ৩৩ ॥
রাতি নাহি জানা যায় বাতির আলোকে ।
নিমন্ত্রণরক্ষাহেতু আসে যায় লোকে ॥ ৩৪ ॥
সুরেন্দ্র সমান ভাবে আছে দাঁড়াইয়া ।
প্রভুর মোহন মূর্তি মনে ধিয়াইয়া ॥ ৩৫ ॥
এমন সময় তেহ দেখিবারে পান ।
প্রতিমার মধ্যে প্রভু নিজে অধিষ্ঠান ॥ ৩৬ ॥
এখানেতে প্রভুদেব ভক্তদের কন ।
সুরেন্দ্রের বাড়ীতে যাইতে হৈল মন ॥ ৩৭ ॥
বাসনা-উদয় যেন অন্তর মাঝারে ।
দেখিতে পাইনু আমি তিলের ভিতরে ॥ ৩৮ ॥
জ্যোতির্ময় পথ এক অতি পরিসর ।
এখান হইতে যেথা সুরেন্দ্রের ঘর ॥ ৩৯ ॥
তার মধ্যে প্রবেশিয়া দেখিনু সেখানে ।
আবির্ভাব অম্বিকার পূজার দালানে ॥ ৪০ ॥
কি সুন্দর প্রতিমার ভাতি উঠে গায় ।
ক্ষীণপ্রভা দীপমালা তাহার প্রভায় ॥ ৪১ ॥
তোমরা সকলে যাও মিলে একত্তরে ।
প্রতিমার দরশনে সুরেন্দ্রের ঘরে ॥ ৪২ ॥
এইরূপ নানা খেলা ভক্ত-সহকারে ।
বিশেষিয়া বিবরণ নহে বলিবারে ॥ ৪৩ ॥
শ্রীবদন বিগলিত তত্ত্বসুধাপানে ।
ডাক্তার উন্মত্তবৎ রহে রেতে দিনে ॥ ৪৪ ॥
প্রতিদিন উপনীত প্রভুর সদন ।
শুনিবারে সুধামাখা প্রভুর বচন ॥ ৪৫ ॥
আগত রজনী আজি গত দিনমান ।
ঘর পরিপূর্ণ লোকে নাহি পায় স্থান ॥ ৪৬ ॥
ভক্তি-মুখ প্রভুদেব ভক্তি-আচরণ ।
ভক্তি-পথে জীব-শিক্ষা তাহার কারণ ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে নাই জাতির বিচার ।
যেখানে দেখেন ভক্তি সেই আপনার ॥ ৪৮ ॥
প্রাণ-তুল্য-প্রাণাধিক প্রাণাপেক্ষা প্রিয় ।
আত্মীয় হইতে তিনি পরম আত্মীয় ॥ ৪৯ ॥
ধর্মী কর্মী মহাদানী মুখুয্যে ঈশান ।
সম্মুখে দেখিয়া তাঁরে কন ভগবান ॥ ৫০ ॥
ঈশ্বরের পদাম্বুজে রাখিল ভকতি ।
যে জন সংসারাশ্রমে রহে স্থিরমতি ॥ ৫১ ॥
সেই জন সেই বীর বলিহারি তায় ।
কেমন সে জন পরে কন উপমায় ॥ ৫২ ॥
শিরে দু-মণের ভার-বোঝারী যেমন ।
পথিমধ্যে আড়ে আড়ে করে নিরীক্ষণ ॥ ৫৩ ॥
যায় বর সজ্জীভূত বিবাহের তরে ।
সমারোহে বাদ্যভাণ্ডঘটা সহকারে ॥ ৫৪ ॥
বিশেষ বীরত্ব শক্তি না থাকিলে গায় ।
কেহ না করিতে পারে দু-কূল বজায় ॥ ৫৫ ॥
এহেন সংসারী জনে অনাসক্ত রীত ।
পাঁকাল মাছের মত বুঝিবা নিশ্চিত ॥ ৫৬ ॥
অবিরত রহে মাছ পুকুরের পাঁকে ।
গায়ে নাহি লাগে পাঁক পরিষ্কার থাকে ॥ ৫৭ ॥
অনাসক্ত হইবার যাহার বাসনা ।
তাহাতে উপায় বিধি সাধন ভজনা ॥ ৫৮ ॥
সাধনার স্থান বিধি অতি নিরজনে ।
জন-মানবেতে যেন কেহ নাহি জানে ॥ ৫৯ ॥
নির্জনে আকুল প্রাণে করিবে প্রার্থনা ।
পাইলে ভকতি তবে পুরিবে কামনা ॥ ৬০ ॥
জ্ঞানভক্তি-লাভ, অগ্রে পশ্চাৎ সংসার ।
যাহাতে আটক রাখে বন্ধন মায়ার ॥ ৬১ ॥
যে জ্ঞানে জীবনমুক্ত আছিলা জনক ।
কঠোর সাধনা সেই জ্ঞানের জনক ॥ ৬২ ॥
সাধকে দুঃসাধ্য এবে কঠোর সাধনা ।
ক্ষীণ মন বিঘ্ন বাধা পথে দেয় হানা ॥ ৬৩ ॥
সেহেতু ভক্তির পথ সুপ্রশস্ততর ।
যে পথে সহজে লভ্য পরম ঈশ্বর ॥ ৬৪ ॥
বহু পূর্বেকার প্রশ্ন উঠিল আবার ।
ঈশ্বর সাকার কিবা তিনি নিরাকার ॥ ৬৫ ॥
প্রভুর উত্তর তিনি দুই অবস্থায় ।
বিষম সমস্যা ইহা বুঝা মহাদায় ॥ ৬৬ ॥
কাঁচা মনে এই তত্বে প্রবেশিতে নারে ।
যে করে
ঈশ্বর চিন্তা সে বুঝিতে পারে ॥ ৬৭ ॥
ধনবিদ্যাহেতু হৃদে অহঙ্কার যার ।
ঈশ্বরদর্শন তার নহে হইবার ॥ ৬৮ ॥
রাবণের রজোগুণ কুম্ভকর্ণ তমে ।
বিভীষণ সত্ত্বগুণী লিখিত পুরাণে ॥ ৬৯ ॥
এইবারে বলিলেন মহেন্দ্র ডাক্তার ।
ইন্দ্রিয়সংযম করা কঠিন ব্যাপার ॥ ৭০ ॥
তাহার উত্তরে কন বিশ্বগুরু রায় ।
যদি কেহ ঈশ্বরের কৃপাকণা পায় ॥ ৭১ ॥
কিংবা যদি পায় কেহ দরশন তাঁর ।
অথবা সাক্ষাৎকার যদ্যপি আত্মার ॥ ৭২ ॥
তখন এ ষড়রিপু মৃতের মতন ।
বিষহীন বীর্যহীন যেন ভুজঙ্গম ॥ ৭৩ ॥
বুদ্ধিহারা বৈজ্ঞানিক ডাক্তার এখানে ।
শ্রীপ্রভুদেবের ভক্তিতত্ত্বের বাখানে ॥ ৭৪ ॥
ডাক্তারের জ্ঞান অগ্রে ইন্দ্রিয়-সংযম ।
পশ্চাতে সাধনে হয় ঈশ্বর-দর্শন ॥ ৭৫ ॥
সেইহেতু বলিলেন প্রভু পরমেশে ।
ঈশ্বর কি লভ্য হন বিনা রিপুবশে ॥ ৭৬ ॥
তবে বুঝাইতে প্রভু বৈজ্ঞানিকে কন ।
তুমি যাহা করিতেছ স্বতন্ত্র রকম ॥ ৭৭ ॥
ইহাকে বিচার-পথ জ্ঞান-পথ বলে ।
জ্ঞানমার্গী যারা তারা এই মতে চলে ॥ ৭৮ ॥
তার কহে চিত্তশুদ্ধি অগ্রে দরকার ।
পশ্চাতে সাধনে হয় জ্ঞানের সঞ্চার ॥ ৭৯ ॥
এ দিকে সহজে পুনঃ সেই বস্তু মিলে ।
ভক্তি যদি হয় তাঁর চরণ-কমলে ॥ ৮০ ॥
ঈশ্বরের গুণগানে চিত্তে যদি রস ।
আপনি ইন্দ্রিয় মরে রিপু হয় বশ ॥ ৮১ ॥
যেমন বাছলে পোকা আলো-দরশনে ।
থাকিতে না পারে আর অন্ধকার স্থানে ॥ ৮২ ॥
ভক্ত তেন রিপুবর্গ ইন্দ্রিয় সহিত ।
ঝাঁপ দেয় রূপে তাঁর হইয়া মোহিত ॥ ৮৩ ॥
বৈজ্ঞানিক এইখানে কন আর বার ।
যদ্যপি পুড়িয়া মনে তাহাও স্বীকার ॥ ৮৪ ॥
বিধিমতে বুঝাইতে প্রভুর বচন ।
ভক্তে নাহি হয় দগ্ধ পোকার মতন ॥ ৮৫ ॥
যে আলোতে পোকা পড়ে দাহ্য গুণ ভায় ।
কাজেই পড়িলে পোকা জীবন হারায় ॥ ৮৬ ॥
ভক্তগণ যাহে পড়ে সে আলো মণির ।
আগুনের সঙ্গে ইহা ভিন্ন প্রকৃতির ॥ ৮৭ ॥
ঈশ্বরে মণির রূপ সমুজ্জ্বলতর ।
তখালীহ সুশীতল সুখশান্তিকর ॥ ৮৮ ॥
জ্ঞানমার্গাশ্রয়ে কিংবা বিচারের বলে ।
সত্য ঈশ্বরের লাভ দরশন মিলে ॥ ৮৯ ॥
কিন্তু এই কলিকালে সে পথাতিক্রম ।
দুর্বল জীবের পক্ষে বড়ই বিষম ॥ ৯০ ॥
মন নহি বুদ্ধি নহি নহি দেহখানি ।
ইন্দ্রিয় রিপুর নহি বশীভূত আমি ॥ ৯১ ॥
রোগ শোক সুখ দুঃখ অতীত সবার ।
আমি সে সচ্চিদানন্দ সকলের পার ॥ ৯২ ॥
বড়ই সহজে বলা মুখের কথায় ।
ধারণা বড়ই শক্ত করা মহাদায় ॥ ৯৩ ॥
কাঁটায় কাটিছে হাত রক্তধারা বয় ।
অথচ বলিছে মুখে কৈ কিছু নয় ॥ ৯৪ ॥
মরে তবু মুখে বলে বেশ আছি হেথা ।
সাজে কি যদ্যপি কেহ কহে হেন কথা ॥ ৯৫ ॥
অনেকে করেন মনে বিনা অধ্যয়ন ।
জ্ঞান কিংবা বিদ্যা নাহি হয় উপার্জন ॥ ৯৬ ॥
কিন্তু অধ্যয়নাপেক্ষা শুনা শ্রেয়স্কর ।
দর্শন শ্রবণাপেক্ষা হয় শ্রেষ্ঠতর ॥ ৯৭ ॥
সংসারী মলিন-বুদ্ধি আসক্ত বিষয়ে ।
ত্যাগীরা নির্মল-আঁখি সংসারীর চেয়ে ॥ ৯৮ ॥
চক্ষুষ্মান বুদ্ধিমান বহু পরিমাণে ।
একমাত্র নিরাসক্ত শকতির গুণে ॥ ৯৯ ॥
সংসারী সংসারে খেলে উন্মত্তের প্রায় ।
আপনার ঠিক চাল দেখিতে না পায় ॥ ১০০ ॥
ত্যাগীজন মুক্ত-আঁখি বাহিরে থাকিয়ে ।
সুন্দর দেখিতে পায় সংসারীর চেয়ে ॥ ১০১ ॥
সতরঞ্চ দাবাবোড়ে খেলায় যেমন ।
সে খেলে না তত ভাল খেলুড়ে যে জন ॥ ১০২ ॥
সুন্দর তাহার চাল বুঝ বিধিমতে ।
যে বলে উপর-চাল থাকিয়া তফাতে ॥ ১০৩ ॥
নীতিগর্ভ তত্ত্বসার চিত্ত-আকর্ষণী ।
অমৃত-পুরিত যত শ্রীমুখের বাণী ॥ ১০৪ ॥
গুনিয়া
ডাক্তার এবে বিমোহিত প্রাণে ।
কহিলেন সন্তাষিয়া সমাসীনগণে ॥ ১০৫ ॥
পুস্তকাধ্যয়ন-বিদ্যা হইলে প্রভুর ।
হইত না অধিকার জ্ঞান এত দূর ॥ ১০৬ ॥
ডাক্তারে পুনশ্চ তবে প্রভুদেব কন ।
পঞ্চবটমূলে যবে সাধন-ভজন ॥ ১০৭ ॥
নিপতিত মৃত্তিকায় বলিতাম মাকে ।
এই তিন বস্তু মাগো দেখাও আমাকে ॥ ১০৮ ॥
কর্মবলে কর্মী যাহা কৈল উপার্জন ।
যোগবলে যোগীর যতেক দরশন ॥ ১০৯ ॥
জ্ঞানপথে জ্ঞানমার্গী করিয়া বিচার ।
অবগত হইলেন যাহা তত্ত্বসার ॥ ১১০ ॥
কতই দেখিনু আমি মায়ের কৃপায় ।
ঘুমে পাড়াইলে ঘুম ঘুম যায় যায় ॥ ১১১ ॥
এত বলি অবস্থার আভাষ সহিত ।
বীণা-বিনিন্দিত কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ১১২ ॥
"ঘুম ভেঙ্গেছে আর কি ঘুমাই
যোগে যাগে
জেগে আছি ।
এখন যোগনিদ্রা তোরে পেয়ে মা
ঘুমেরে
ঘুম পাড়ায়েছি ।"
গীত সমাপনে কন শ্রীপ্রভু আমার ।
অধ্যয়ন নাই করি খালি নাম মার ॥ ১১৩ ॥
দানী শম্ভু আমাকে বলিয়াছিল তাই ।
শান্তিরাম সিংহ ঢাল তরবারি নাই ॥ ১১৪ ॥
ঈশানে কহেন প্রভু লীলার ঈশ্বর ।
অবতার অস্বীকার করেন ডাক্তার ॥ ১১৫ ॥
প্রভুর আজ্ঞানুসারে কহেন ঈশান ।
ডাক্তারে করিয়া লক্ষ্য অবতারাখ্যান ॥ ১১৬ ॥
আমাদের হৃদয়ে বিশ্বাস বড় কম ।
অহঙ্কার একমাত্র তাহার কারণ ॥ ১১৭ ॥
কাকভূষণ্ডীর কথা অতি চমৎকার ।
সেইকালে সূর্যবংশে রাম অবতার ॥ ১১৮ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সেই রাম কৌশল্যা নন্দনে ।
স্বীকার করে না কাক প্রথমে প্রথমে ॥ ১১৯ ॥
পরে যবে নানালোক করিয়া ভ্রবণ ।
সর্ব ঠাঁই সেই রাম কৈল দরশন ॥ ১২০ ॥
তখন চৈতন্যোদয় চূর্ণ অহঙ্কার ।
বুঝিতে পারিল রামে রাম অবতার ॥ ১২১ ॥
দেখিতে কেবলমাত্র নর-কলেবর ।
কিন্তু গোটা সৃষ্টি তাঁর উদর-ভিতর ॥ ১২২ ॥
ডাক্তারের প্রতি প্রভু এইখানে কন ।
স্বরাট-বিরাটরূপে সেই এক জন ॥ ১২৩ ॥
নিত্য যাঁর লীলা তাঁর একের খেলায় ।
বিষম সমস্যা ইহা বুঝা মহাদায় ॥ ১২৪ ॥
সৃষ্টির ঈশ্বর মায়াধীশ ভগবান ।
সকল সম্ভবে তাঁয় সর্বশক্তিমান ॥ ১২৫ ॥
ক্ষুদ্র-বুদ্ধি মোরা সবে বলিতে কি পারি ।
আসিতে নারেন হরি নররূপ ধরি ॥ ১২৬ ॥
ঈশ্বরের কার্যাবলী বুদ্ধ্যাদির পার ।
ধারণা না হয় শিরে নহে বুঝিবার ॥ ১২৭ ॥
সেহেতু ঈশ্বরলাভে উপায় সম্বল ।
সাধু মহাত্মার বাক্যে বিশ্বাস কেবল ॥ ১২৮ ॥
সরলতা বিনা তাঁরে বিশ্বাস না হয় ।
বিষয়-বুদ্ধিতে বহু সন্দেহ উদয় ॥ ১২৯ ॥
সাধুসঙ্গ সর্বদাই অতি প্রয়োজন ।
বৈদ্যের প্রকৃতি ধরে সাধু মহাজন ॥ ১৩০ ॥
ভবরোগ-বিনাশনে জানে মহৌষধি ।
সমারোগ্য করিবারে বিষয়ীর ব্যাধি ॥ ১৩১ ॥
মহেন্দ্র মাস্টার নামে প্রভুভক্ত যিনি ।
যতখানি জমি তাঁর বুদ্ধি ততখানি ॥ ১৩২ ॥
আট চাল ভাবিয়া চালেন এক চাল ।
মানুষে সহজে তাঁর না পায় নাগাল ॥ ১৩৩ ॥
জন্ম গুঁয়াইলে কাছে নাহি যায় চেনা ।
লীলা-দরশনে শক্তিযুক্ত এক জনা ॥ ১৩৪ ॥
বিজ্ঞতম বৈজ্ঞানিকে মাস্টার হেথায় ।
নিরখিয়া বিমোহিত প্রভুর কথায় ॥ ১৩৫ ॥
তাই মৃদুস্বরে তাঁরে কহেন তখন ।
এখানে প্রহরাতীত হইল এখন ॥ ১৩৬ ॥
আরো বহু আছে রোগী আপনার হাতে ।
কখন যাবেন তবে তা সবে দেখিতে ॥ ১৩৭ ॥
আনন্দে মগন মন ডাক্তার কহিল ।
পাইয়া পরমহংস সব মাটি হ'ল ॥ ১৩৮ ॥
হাসিতে লাগিল সবে শুনিয়া বচন ।
সুমধুর লীলা-গীতি শুন তুমি মন ॥ ১৩৯ ॥
তদুত্তরে ডাক্তারের প্রতি কন রায় ।
আছে এক নদী কর্মনাশা বলে তায় ॥ ১৪০ ॥
তার জলে ডুব দিলে যাবতীয় কর্ম ।
সকল বিনষ্ট হয় হেন তার ধর্ম ॥ ১৪১ ॥
প্রভুর বচন যেন সুধার আচার ।
শুনি ভক্তগণে তবে কহেন ডাক্তার ॥ ১৪২ ॥
অন্তরে অতুলানন্দ নাহি যার টের ।
মোরে ভাবিও না পর আমি তোমাদের ॥ ১৪৩ ॥
পরিশেষে বৈজ্ঞানিকে কন পরমেশ ।
অমৃত তোমার ছেলে ছেলেটিও বেশ ॥ ১৪৪ ॥
অবতারবাদে কিন্তু বিপরীত কয় ।
তাহে কোন ক্ষতি কিংবা হানি নাহি হয় ॥ ১৪৫ ॥
সাকার কি নিরাকারে যার যাহে মন ।
বিশ্বাস শরণাগত এই প্রয়োজন ॥ ১৪৬ ॥
পুত্রের খিয়াতি শুনি ডাক্তার কহিলা ।
অমৃত আমার পুত্র তোমারি তো চেলা ॥ ১৪৭ ॥
তদুত্তরে বলিলেন জগৎ-গোসাঁই ।
জগতে আমার চেলা কোন শালা নাই ॥ ১৪৮ ॥
আমি চেলা সকলের তলে সবাকার ।
সকলে তাঁহার দাস আমিও তাঁহার ॥ ১৪৯ ॥
সবে ঈশ্বরের ছেলে মুই একজন ।
গুরু মাত্র ভগবান অন্য কেহ নন ॥ ১৫০ ॥
অভিমানশূন্য প্রভু জীবের শিক্ষায় ।
শুন মহালীলা গাই মায়ের আজ্ঞায় ॥ ১৫১ ॥
তাহার সঙ্গেতে ভক্তদের আশীর্বাদ ।
প্রত্যেকের পদ-রেণু পরম প্রসাদ ॥ ১৫২ ॥
পঞ্চম খণ্ড
মহেন্দ্র ডাক্তারের সঙ্গে রঙ্গ ও তাঁহাকে বিবিধ উপদেশ
('তত্ত্বমঞ্জরী' মাসিক পত্রে প্রকাশিত 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' হইতে সংগ্রহ)
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
এবে আশ্বিনের শেষ মাস প্রায় যায় ।
তিনমাস গোটা প্রভু পীড়িতাবস্থায় ॥ ১ ॥
বড় বড় কবিরাজ ডাক্তারের গণ ।
দেখিতেছে বিয়াধির আরম্ভ যখন ॥ ২ ॥
প্রাণপণে যত্ন-চেষ্টা আরোগ্যের তরে ।
বিফল সকল গেল ব্যাধি খুব বেড়ে ॥ ৩ ॥
এখন হতাশ সবে একমতে কয় ।
কঠিন বিয়াধি ইহা আরোগ্যের নয় ॥ ৪ ॥
হরিষ-বিষাদে কাল কাটে ভক্তগণ ।
কভু হাসে কভু করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৫ ॥
কভু বা তারকনাথে হত্যা দিতে যায় ।
কভু দৈব কর্মে জন্মপত্রিকা দেখায় ॥ ৬ ॥
কান্তিময় দেহখানি বিশুদ্ধ নিরস ।
আহার কেবলমাত্র সুজির পায়স ॥ ৭ ॥
এত পীড়া তবু লোকে দলে দলে আসে ।
বাঞ্ছাকল্পতরু-প্রভু-দরশন-আশে ॥ ৮ ॥
একবার দরশনে শোকতাপ দূর ।
অহেতুক কৃপাসিন্ধু দয়াল ঠাকুর ॥ ৯ ॥
দয়ার ইয়ত্তা নাই করুণানিদান ।
সদা চেষ্টা কিসে হয় লোকের কল্যাণ ॥ ১০ ॥
জীবনের একোদ্দেশ্য জগতের হিত ।
সকলের সঙ্গে কথা আদর সহিত ॥ ১১ ॥
কথার বিরাম নাই নাই তার ইতি ।
প্রাতঃকালাবধি প্রায় প্রহরেক রাতি ॥ ১২ ॥
কণ্ঠার চালনা হেতু কণ্ঠার পীড়ায় ।
ডাক্তার করিল মানা বাক্যব্যয়ে তাঁয় ॥ ১৩ ॥
লোকের মেলানি বন্ধ ভক্তগণ করে ।
শ্রীগোচরে যাইতে না দেয় যারে তারে ॥ ১৪ ॥
ঔষধের
বিধানাদি করিয়া ডাক্তার ।
আসিতে বিদায় মাগে প্রভুর গোচর ॥ ১৫ ॥
সুধামাখা বাক্যে তাঁরে কন ভগবান ।
কি হেতু সত্বর আজি শুনিবে না গান ॥ ১৬ ॥
নরেন্দ্রের গীতে মন মুগ্ধ সবাকার ।
গানের শুনিয়া কথা বসিল ডাক্তার ॥ ১৭ ॥
করে ধরা তানপুরা কিবা শোভা পায় ।
সসঙ্গে সতীশচন্দ্র মৃদঙ্গ বাজায় ॥ ১৮ ॥
বসিলা নরেন্দ্রনাথ সংগীত পিরীত ।
শ্রীপ্রভুর আজ্ঞামতে গাইবারে গীত ॥ ১৯ ॥
গীতের মাধুরী যেন তেমনি কণ্ঠের ।
শুনিলে বারেক ইচ্ছা শুনি ফের ফের ॥ ২০ ॥
গীত
নিবিড় আধারে মা তোর চমকে ও রূপ রাশি ।
তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরিগুহাবাসী ॥
অনন্ত আঁধার-কোলে, মহানির্বাণ হিল্লোলে ।
চিরশান্তি-পরিমল অবিরত যায় ভাসি ॥
মহাকালীরূপ ধরি, আঁধার-বসন পরি,
সমাধি মন্দিরে ওমা কে তুমি গো একা বসি,
অভয় পদকমলে, প্রেমের বিজলী জ্বলে,
চিন্ময় মুখমণ্ডলে শোভে অট অট্ট হাসি ॥
গীত সমাপনে কন মাস্টারে ডাক্তার ।
এ গীত প্রভুর পক্ষে অতি ভয়ঙ্কর ॥ ২১ ॥
শুনিলে সংগীত হেন হইবে সমাধি ।
যাহাতে সম্ভব খুব বৃদ্ধি হবে ব্যাধি ॥ ২২ ॥
করিতে করিতে এই কথা-আন্দোলন ।
শ্রীপ্রভু গভীর ধ্যানে হইল মগন ॥ ২৩ ॥
স্পন্দহীন গোটা অঙ্গ শ্রবণ বধির ।
কাঠপুত্তলিকাতুল্য দু-নয়ন স্থির ॥ ২৪ ॥
বাহ্যজ্ঞানশূন্য দেহে দেহের অসুখ ।
মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার অন্তর্মুখ ॥ ২৫ ॥
প্রভুকে ভাবস্থ দেখি নরেন্দ্র আবার ।
ধরিলেন অন্য গীত পিক-কণ্ঠে তাঁর ॥ ২৬ ॥
গীত
কি সুখ জীবনে মম ওহে নাথ দয়াময় হে ।
যদি চরণ-সরোজে পরান মধুপ চিরমগন না রয়
হে ।
অগণন ধনরাশি তায় কিবা ফলোদয় হে,
যদি লভিয়ে সে ধনে পরম যতনে যতন না করয় হে,
সুকুমার কুমারমুখ দেখিতে না চাই হে,
যদি সে চাঁদবয়ানে তব প্রেমমুখ দেখিতে
না পাই হে,
কি হার শশাঙ্কজ্যোতিঃ দেখি আঁধারময় হে,
যদি সে চাঁদপ্রকাশে তব
প্রেমচাঁদ নাহি উদয় হয় হে ।
সতীর পবিত্র প্রেম তাও মলিনতাময় হে,
যদি সে প্রেমকনকে তব প্রেমমশি
নাহি জড়িত রয় হে ।
তীক্ষ্ণবিষ ব্যাল সম সতত সংশয় হে,
যদি মোহ-পরমাদে নাথ তোমাতে ঘটায় সংশয় হে ।
কি আর বলিব নাথ বলিব তোমায় হে,
তুমি আমার হৃদয়রতন মণি আনন্দ নিলয় হে
॥
এই গীতে বিমোহিত হইয়া ডাক্তার ।
দু-নয়নে বরিষণ করে অশ্রু ধার ॥ ২৭ ॥
ইতিমধ্যে প্রভুদেব আসিলেন ফিরে ।
ধীরে ধীরে
আপনার আবাস-মন্দিরে ॥ ২৮ ॥
মরি কি প্রভুর শোভা মনোহর ছবি ।
আবাসে উদয় যেন কত শশী
রবি ॥ ২৯ ॥
মুগ্ধ-মন লোকজন নীরব সভায় ।
নাই শব্দ সবে স্তব্ধ ভাবে ভেসে যায় ॥ ৩০ ॥
কোথায় কঠিন পীড়া শ্রীঅঙ্গে এখন ।
বিন্দুমাত্র বিয়াধির নাহিক লক্ষণ ॥ ৩১ ॥
শ্রীমুখ প্রফুল্ল কিবা কান্তি উঠে তায় ।
হেরিলে আপনি মায়া নিজে মোহ যায় ॥ ৩২ ॥
একদৃষ্টে সকলেই চেয়ে মুখপানে ।
পুনরায় মনে আশা কথামৃত-পানে ॥ ৩৩ ॥
ভক্ত-বাঞ্ছাকল্পতরু বুঝিয়া অন্তরে ।
কন কথা সম্বোধিয়া মহেন্দ্র ডাক্তারে ॥ ৩৪ ॥
লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন করি পরিহার ।
গাও ঈশ্বরের নাম মুখে এইবার ॥ ৩৫ ॥
ডাক্তারের মনে মনে ষোল আনা জানা ।
তিনি খুব সুপণ্ডিত বৈজ্ঞানিক জনা ॥ ৩৬ ॥
বিজ্ঞানশাস্ত্রেতে পটু বুদ্ধি বিচক্ষণ ।
সেই তমোবিনাশনে প্রভুদেব কন ॥ ৩৭ ॥
বিজ্ঞান কাহারে বলে লক্ষণ কি তার ।
যার বলে ফুটে চক্ষু নষ্ট অহংকার ॥ ৩৮ ॥
জ্ঞান-অজ্ঞানের পারে যায় যেই জন ।
সেই সে বুঝিতে পারে ঈশ্বর কেমন ॥ ৩৯ ॥
সে জন অজ্ঞান নানা জ্ঞান আছে যার ।
কিংবা যার মনোমধ্যে পাণ্ডিত্যাহঙ্কার ॥ ৪০ ॥
ঈশ্বর সকল ভূতে রন বিদ্যমান ।
ইহাতে নিশ্চয় বুদ্ধি তার নাম জ্ঞান ॥ ৪১ ॥
যে বুদ্ধি বিশেষরূপে ভগবানে জানে ।
সেই বুদ্ধি সুবিদিত বিজ্ঞানের নামে ॥ ৪২ ॥
ভগবান জানাজ্ঞান এ দুয়ের পার ।
সযতনে উভয়েই কর পরিহার ॥ ৪৩ ॥
পায়েতে ফুটিলে কাঁটা কাঁটা দিয়ে ভুলে ।
পশ্চাতে উভয় কাঁটা দূরে দেয় ফেলে ॥ ৪৪ ॥
প্রথমে অজ্ঞান-কাঁটা তুলিবার তরে ।
জ্ঞান-কাঁটা যেটি তার আবশ্যক করে ॥ ৪৫ ॥
বিদ্ধ কাঁটা উঠাইয়া যুক্তি এই সার ।
সমভাবে উভয়েরে কর পরিহার ॥ ৪৬ ॥
বাখানিয়া প্রভুদেব কন এইখানে ।
লক্ষণ জিজ্ঞাসা কৈল সীতাপতি রামে ॥ ৪৭ ॥
বশিষ্ঠদেবের মত হেন জ্ঞানী জন ।
অধীর পুত্রের শোকে করেন রোদন ॥ ৪৮ ॥
তদুত্তরে লক্ষ্মণেরে কহিলেন রাম ।
জ্ঞান আছে যেথা আছে সেখানে অজ্ঞান ॥ ৪৯ ॥
জানাজ্ঞান পাপপুণ্য ধর্ম কি অধর্ম ।
শুচি কি অশুচি এই যাবতীয় কর্ম ॥ ৫০ ॥
সকলের পারে পাবে সেই ভগবান ।
এত বলি পিক-কণ্ঠে ধরিলেন গান ॥ ৫১ ॥
গীত
আয় মন বেড়াতে যাবি ।
কালীকল্পতরুমূলে বসে চারি কল কুড়ায়ে পবি ॥
প্রযুক্তি নিবৃত্তি জায়া তার নিবৃত্তিরে সঙ্গে নিবি ।
বিবেক নামে তার বেটা তত্ত্বকথা তায় শুধাবি ॥
প্রথম ভার্যার সন্তানেরে দূর হ'তে বুঝাইবি ।
যদি না মানে প্রবোধ কালীসিন্ধুনীরে ডুবাইবি ॥
শুচি-অশুচিরে ল'য়ে দিব্য ঘরে কবে শুবি ।
ভাদের দুই সতীনে পিরীত হ'লে
তবে শ্যামা-মাকে পাবি ॥
ধর্মাধর্ম দুটা অজা তুচ্ছ খুঁ'টার বেঁধে খুবি ।
তাদের জ্ঞানখড়্গে বলি দিয়ে উভয়ে কৈবল্য দিবি ॥
অহংকার অবিদ্যা তোর পিতামাতার তাড়িয়ে দিবি ।
যদি মোহগর্ভে টেনে লয় ধৈর্যখুঁটা ধ'রে র'বি ॥
প্রসাদ বলে এমন হ'লে তবে কালের কাছে
জবাব দিবি ।
তবে বাপু বাহা বাপের ঠাকুর মনের মত মন হবি ॥
হেনকালে কোনজন জিজ্ঞাসে প্রভুকে ।
দুটি কাঁটা-তিয়াগের পর কিবা থাকে ॥ ৫২ ॥
জানাজ্ঞান-পরিহারে পরের খবর ।
"নিত্যশুদ্ধবোধরূপ” প্রভুর উত্তর ॥ ৫৩ ॥
তাহার
স্বরূপ কথা বলিবার নয় ।
সেই বস্তু একমাত্র তার পরিচয় ॥ ৫৪ ॥
সচ্চিদানন্দের সঙ্গে ক্রীড়া কি রমণ ।
অবক্তব্য কথা ইহা না যায় বর্ণন ॥ ৫৫ ॥
ডাক্তারে করিয়া লক্ষ্য প্রভু পুনঃ কন ।
জ্ঞান জন্মে অহংকার হইলে নিধন ॥ ৫৬ ॥
অজ্ঞানেতে আমি ও আমার লোকে কয় ।
তুমি ও তোমার-বোধে জ্ঞানের উদয় ॥ ৫৭ ॥
সর্বেশ্বর ভগবান অন্য কেহ নন ।
আপনে অকর্তাবোধে জ্ঞানের লক্ষণ ॥ ৫৮ ॥
পুস্তকাধ্যয়নে ভারি বাড়ে অহংকার ।
তৃণবৎ তুচ্ছ দেখে জগৎ-সংসার ॥ ৫৯ ॥
ভক্তিকে বুঝিয়া সার এঁটে ধর খুঁটি ।
তিয়াগিয়া কূট তর্ক আন্ কুটিনাটি ॥ ৬০ ॥
পাপ পুণ্য আছে কিনা কাহে কিবা রয় ।
কে করে করায়, কর্ম কাহে কিবা হয় ॥ ৬১ ॥
ঈশ্বরের বৈষম্য দোষ এই যাবতীয় ।
কথার প্রসঙ্গে কিছু নাহি হয় শ্রেয়ঃ ॥ ৬২ ॥
একমাত্র সারবস্তু ভক্তি পরাধন ।
ঈশ্বরে প্রার্থনা কর ভক্তির কারণ ॥ ৬৩ ॥
খাইয়া শূকর মাংস ঈশ্বর-চরণে ।
ভক্তি যদি হয় তাও শ্রেয়ঃ লক্ষগুণে ॥ ৬৪ ॥
হবিষ্য করিয়া যদি আসক্তি সংসারে ।
সে নহে মানুষ বলি নরাধম তারে ॥ ৬৫ ॥
বিশেষিয়া কন প্রভু ডাক্তারের প্রতি ।
সপ্রেম সম্ভাষ ভাষে বিনয় সংহতি ॥ ৬৬ ॥
এতকাল সম্ভোগিলে বহু পরিমাণ ।
টাকাকড়ি প্রতিপত্তি অতুল সম্মান ॥ ৬৭ ॥
এইবার দাও মন ঈশ্বর-চরণে ।
উদ্দীপনা হেতু তুমি আসিও এখানে ॥ ৬৮ ॥
কিছুক্ষণ পরেতে ডাক্তার ভাগ্যবান ।
বিদায় লইয়া তবে কৈলা গাত্রোত্থান ॥ ৬৯ ॥
হেনকালে দরশন দিলেন গিরিশ ।
যাহে হৈল হরিষের উপরে হরিষ ॥ ৭০ ॥
প্রভুর চরণরেণু করিয়া গ্রহণ ।
উপবিষ্ট হইলেন হরষিত মন ॥ ৭১ ॥
ডাক্তার প্রেমের ভরে সম্ভাষিয়া তাঁয় ।
আসন গ্রহণ তেঁহ কৈলা পুনরায় ॥ ৭২ ॥
শ্রীপ্রভুর পদরজ লইতে দেখিয়া ।
ডাক্তার গিরিশে কন উপদেশ দিয়া ॥ ৭৩ ॥
আর সব কর যাহা যুক্তিযুক্ত হয় ।
ঈশ্বরের পূজা ওরে দেওয়া ভাল নয় ॥ ৭৪ ॥
এমন সুন্দর লোক এর হয় হানি ।
সেইহেতু নিবারণ করিতেছি আমি ॥ ৭৫ ॥
গুরুপদে স্থির মতি গৃহী ভক্তবর ।
বিশ্বাসী গিরিশ তাঁরে করিল উত্তর ॥ ৭৬ ॥
অকূল পাথার ভীম সন্দেহ-সাগরে ।
উত্তীর্ণ কৃপায় যাঁর কিবা দিব তাঁরে ॥ ৭৭ ॥
উচ্চ পুজা উপযুক্ত তাঁহার চরণে ।
তাঁর বিষ্ঠা বিষ্ঠাবৎ নাহি লয় মনে ॥ ৭৮ ॥
প্রত্যুত্তরে প্রতিবাদ বলেন ডাক্তার ।
আমার কথার ইহা কথা স্বতন্তর ॥ ৭৯ ॥
আমি কি পারি না নিলে 'লিচ্চি' এই বলি ।
ডাক্তার গ্রহণ কৈলা প্রভুপদ-ধূলি ॥ ৮০ ॥
গিরিশ তখন কন উল্লাসের ভরে ।
করিছে ত্রিদিববাসী ধন্য আপনারে ॥ ৮১ ॥
রজবলে ডাক্তারের আলোকিত হৃদি ।
উচ্ছ্বাসের ভরে কন গিরিশে সম্বোধি ॥ ৮২ ॥
পদধূলি গ্রহণেতে কার্য কিবা ভার ।
এখন লইতে পারি রজ সবাকার ॥ ৮৩ ॥
এত বলি ভক্তদের পদ পরশিয়া ।
লইলা চরণ-রেণু মাথায় ধরিয়া ॥ ৮৪ ॥
মঙ্গল-নিদান প্রভু এখানে প্রমাণ ।
কেমনে সাধেন দেখ জীবের কল্যাণ ॥ ৮৫ ॥
সভক্তে শ্রীপদরেণু পরম মঙ্গল ।
লওয়াইলা ডাক্তারে করিয়া কৌশল ॥ ৮৬ ॥
চকিতের কার্য যত নরেন্দ্র দেখিয়া ।
ডাক্তারের প্রতি কন তাঁরে সম্ভাষিয়া ॥ ৮৭ ॥
বিস্ময়-আহলাদ-কুতূহল সমন্বিত ।
ইহাকে আমরা দেখি ঈশ্বরের মত ॥ ৮৮ ॥
সে কেমন বুঝাইতে কহিলেন পিছে ।
উদ্ভিদ শ্রেণীর মধ্যে হেন বস্তু আছে ॥ ৮৯ ॥
যেই বস্তু-দরশনে বুঝা নাহি যায় ।
উদ্ভিদ বলি কি আমি প্রাণী বলি তায় ॥ ৯০ ॥
তেন নরলোক দেবলোকের মাঝারে ।
হেন বস্তু আছে মোরা পাই দেখিবারে ॥ ৯১ ॥
যাঁর গুণধর্মদৃষ্টে বুঝা বড় ভার ।
নর কি ঈশ্বর নাম কিবা দিব তাঁর ॥ ৯২ ॥
প্রতিবাদে বৈজ্ঞানিক যত কথা কন ।
সব ভাসে বন্যাজলে কুটীর মতন ॥ ৯৩ ॥
পরে বৈজ্ঞানিক কন প্রভু পরমেশে ।
কি কারণ কহ তুমি ভাবের আবেশে ॥ ৯৪ ॥
ভাল মন্দ কিছু নাহি বিচার করিয়া ।
অপরের গায়ে দাও চরণ তুলিয়া ॥ ৯৫ ॥
এ কথায় গিরিশের সঙ্গে বাধে রণ ।
বাদ প্রতিবাদ দোঁহে হৈল কিছুক্ষণ ॥ ৯৬ ॥
অবশেষে বৈজ্ঞানিক হার মানি তাঁয় ।
গিরিশের পদধূলি লইলা মাথায় ॥ ৯৭ ॥
আজিকার সভা ভঙ্গ করি এইখানে ।
পুজ্যপাদ বৈজ্ঞানিক চলিলা ভবনে ॥ ৯৮ ॥
রামকৃষ্ণায়ন-কথা অমৃত-ভাণ্ডার ।
শ্রবণ-কীর্তনে জীবে ভবসিন্ধুপার ॥ ৯৯ ॥
সংসারের সুখে দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
এক মনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১০০ ॥
পঞ্চম খণ্ড
ডাক্তারকে ভাবের বাজার প্রদর্শন ও শ্রীপ্রভুর কালীপূজা
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
বড়ই সুমিষ্ট রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত ।
ইন্দ্রিয়াদি সহ মন শুনিলে মোহিত ॥ ১ ॥
বিমল পবিত্র চিত চৈতন্য-সঞ্চার ।
লীলা-দরশন যদি ভাগ্যে ঘটে কার ॥ ২ ॥
কেমন ঠাকুর কিবা সহচরগণ ।
অপরূপ প্রকৃতির বিচিত্র ধরন ॥ ৩ ॥
সহজেই বুঝা যায় দেখিলে চরিত ।
সর্ব-অংশে মানুষের ঠিক বিপরীত ॥ ৪ ॥
অনায়াসে প্রণিধানে হইবে সক্ষম ।
একমনে মহালীলা করিলে শ্রবণ ॥ ৫ ॥
বিজয় গোস্বামী যিনি ব্রাহ্মদের দলে ।
জনম গৌরাঙ্গভক্ত অদ্বৈতের কুলে ॥ ৬ ॥
মিলন প্রভুর সঙ্গে বহুকালাবধি ।
এখন নাহিক আর নিরাকারবাদী ॥ ৭ ॥
কেশবের মত এবে পিরীতি সাকারে ।
কালী-কৃষ্ণ-রাম নামে দু'নয়ন ঝরে ॥ ৮ ॥
কোথায় বিজয় ছিল এখন কোথায় ।
একমাত্র বিশ্বগুরু প্রভুর কৃপায় ॥ ৯ ॥
কার কোন্ পথ কিসে কাহার আরাম ।
সব জ্ঞাত প্রভু তাই বিশ্বগুরু নাম ॥ ১০ ॥
প্রভুর মতন নেতা ঈশ্বরের পথে ।
জানি নাই শুনি নাই কোথা কে জগতে ॥ ১১ ॥
ব্রাহ্মধর্ম-প্রচারক বিজয় এখন ।
নানা দেশ নানা তীর্থ করিয়া ভ্রমণ ॥ ১২ ॥
উপনীত এবে তেঁহ শহর ভিতরে ।
আজি হেথা শ্রীপ্রভুর দরশন তরে ॥ ১৩ ॥
প্রভুর সাজান ঘর অপূর্ব ভাণ্ডার ।
অমূল্য মাণিক এক এক ভক্ত তাঁর ॥ ১৪ ॥
জ্বলিতেছে সারি সারি বিজলিয়া ঠাঁই ।
তার মধ্যে জগচ্চন্দ্র জগৎ-গোসাঁই ॥ ১৫ ॥
বিজয়ে বেজায় কৃপা প্রভুর আমার ।
সেহেতু ঈশ্বর-পথে উচ্চাবস্থা তাঁর ॥ ১৬ ॥
প্রভুর শ্রীপদমূলে বিজয় আসিয়া ।
চরণবন্দনা কৈল ভূমিষ্ঠ হইয়া ॥ ১৭ ॥
বিজয়ে দেখিয়া চিত্তে হয়ে মহাপ্রীতি ।
সম্ভাষিয়ে বলিলেন অন্যান্যের প্রতি ॥ ১৮ ॥
সুন্দর-অবস্থাগত বিজয় এখন ।
দেখিলে সহজে যায় বুঝা বিলক্ষণ ॥ ১৯ ॥
ঘাড় ও কপাল দৃষ্টে বেশ যায় জানা ।
অবস্থা পরমহংসের হইয়াছে কিনা ॥ ২০ ॥
পরে প্রভু বলিলেন ঈশ্বরের ঘর ।
বিজয়ের হইয়াছে নয়নগোচর ॥ ২১ ॥
কাশ্মীরাধিপতির যেমন নিকেতন ।
পর্বতান্তরালে দূরে হয় দরশন ॥ ২২ ॥
শ্রীমহিম চক্রবর্তী কহিলা বিজয়ে ।
আসিলেন নানাবিধ তীর্থ পর্যটিয়ে ॥ ২৩ ॥
কোথায় কি দরশন হৈল আপনার ।
শুনিব বলুন যাবতীয় সমাচার ॥ ২৪ ॥
মহিমে উত্তর দিলা বিজয় গোসাঁই ।
এখানে প্রভুতে যাহা দেখিবারে পাই ॥ ২৫ ॥
পরিপূর্ণ পূর্ণভাবে যোল-আনা ধারা ।
এমন কোথাও নাই মিছামিছি ঘোরা ॥ ২৬ ॥
মহিমও বারেক গি'ছিল পর্যটনে ।
ফিরিয়া ঘুরিয়া পুনঃ হাজির এখানে ॥ ২৭ ॥
করজোড়ে প্রভুদেবে শ্রীবিজয় কন ।
বুঝেছি না দিলে ধরা ধরে কোন্ জন ॥ ২৮ ॥
একদিন নিরজনে ঢাকায় যখন ।
আপনারে সশরীরে কৈনু দরশন ॥ ২৯ ॥
এত বলি চক্ষে বারি প্রেমে গদ হয়ে ।
অভয়-চরণ-মূলে পড়িলা লুটিয়ে ॥ ৩০ ॥
নিরখিয়া তাহা প্রভু হইয়া কেমন ।
বিজয়ের বক্ষে দিলা দক্ষিণ চরণ ॥ ৩১ ॥
এখন ঈশ্বরাবেশে বাহ আর নাই ।
পুত্তলিকাবৎ জড় জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩২ ॥
মরি কি মোহন মূর্তি এখন প্রভুর ।
শ্রীমুখমণ্ডলে যেন ঝলসে চিকুর ॥ ৩৩ ॥
প্রেমের ঠাকুর প্রেমে ঢলা গলা কায় ।
উপমায় দেখাইতে কি আছে ধরায় ॥ ৩৪ ॥
ভক্তগণ উপস্থিত ছিল যাঁরা ঘরে ।
কেহ কাঁদে কেহ কেহ স্তবস্তুতি করে ॥ ৩৫ ॥
যাহার যেমন ভাব সে দেখে তেমন ।
কেহ বা পরম ভক্ত কেহ সাধু জন ॥ ৩৬ ॥
কেহ কেহ বুদ্ধিহারা হয়ে একেবারে ।
যা দেখে তা দেখে কিছু বুঝিতে না পারে ॥ ৩৭ ॥
কেহ বা দেখিতে পায় মুক্ত আঁখি যাঁর ।
সাক্ষাতে শ্রীদেহধারী ঈশ্বরাবতার ॥ ৩৮ ॥
মহিম সজল-আঁখি কহে উচ্চৈঃস্বরে ।
দেখ কি প্রেমের ছবি অবনী-ভিতরে ॥ ৩৯ ॥
অনুমান হয় তাঁর শুনিয়া বচন ।
যেন তেঁহ করিছেন বিচিত্র দর্শন ॥ ৪০ ॥
ভবনে কি ভাব হৈল কহা নাহি যায় ।
একে একে নানা জনে নানা গীত গায় ॥ ৪১ ॥
যে যেমন দেখে তাঁর গীতে ছবি তার ।
তিলেকে হইল যাহা নহে বর্ণিবার ॥ ৪২ ॥
শুন তুই এক গীত কহি এইখানে ।
জ্ঞান-ভক্তি মিলে লীলা-শ্রবণ-কীর্তনে ॥ ৪৩ ॥
গীত
চিদানন্দ-সিন্ধুনীরে
প্রেমানন্দ-লহরী ।
মহাভাব রাসলীলা কি মাধুরী মরি মরি,
বিবিধ বিলাস রঙ্গ-প্রসঙ্গ কত অভিনব ভাবতরঙ্গ,
উঠিছে পড়িছে করিতে রঙ্গ নবীন
রূপ ধরি ।
মহাযোগে সমুদায় একাকার হইল,
দেশ-কাল-ব্যবধান ভেদাভেদ ঘুচিল ।
আশা পুরিল রে আমার সকল সাধ মিটে গেল,
এখন আনন্দে মাতিয়া দুবাহু তুলিয়া
বলরে মন হরি হরি ।
টুটল ভরম ভীতি,
ধরম করম নীতি,
দূর ভেল
জাতি-কুলমান ।
কাঁহা হায় কাঁহা হরি,
প্রাণমন
চুরি করি,
বঁধুয়া
করিলা পয়ান ।
ভাবেতে হওল ভোর,
অবহি
হৃদয়মোয়,
নাহি যাত আপনা পসান ।
প্রেমদাস কহে হাসি,
শুন সাধু
জগবাসী,
অ্যায়সা-হী নূতন বিধান ॥
ধরিয়া বৈকুণ্ঠমেলা ভবের ভিতরে ।
প্রকৃতিস্থ প্রভুদেব বহুক্ষণ পরে ॥ ৪৪ ॥
শ্রীপ্রভু কহেন পেয়ে বাহ্যিক গিয়ান ।
শাস্ত্র বেদ তন্ত্রাদির পার ব্রহ্মজ্ঞান ॥ ৪৫ ॥
যতক্ষণ একখানা হাতে থাকে বই ।
হইলেও জ্ঞানী তাঁরে রাজ-ঋষি কই ॥ ৪৬ ॥
আমার গিয়ানে বলি ব্রহ্মর্ষি তাঁহাকে ।
অঙ্গেতে যাঁহার কোন চিহ্ন নাই থাকে ॥ ৪৭ ॥
এই উপমায় প্রভু করিলা বিচার ।
ব্রহ্মজ্ঞান বেদ তন্ত্র শাস্ত্রাদির পার ॥ ৪৮ ॥
পরে অবতারবাদ কন ধীরে ধীরে ।
ঈশ্বরের আবির্ভাব মানব-আধারে ॥ ৪৯ ॥
নরদেহে না আসিলে পরম-ঈশ্বর ।
কেমনে পাইবে জীবে তাঁহার খবর ॥ ৫০ ॥
বাসনা অপূর্ণ রহে অবতার বিনে ।
সেহেতু আসেন তিনি শরীরধারণে ॥ ৫১ ॥
এত বলি উপমায় দেন বুঝাইয়া ।
অবতার প্রয়োজন কিসের লাগিয়া ॥ ৫২ ॥
নিরাকার সাকার সম্বন্ধে বারবার ।
এত যে কহিলা প্রভু হেতু শুন তার ॥ ৫৩ ॥
হালের উন্নতিশীল নব্য সভ্যগণে ।
সাকারের প্রতিবাদী সাকার না মানে ॥ ৫৪ ॥
ইংরাজী শিক্ষার গুণে প্রায় এই ফল ।
তদুপরি ব্রাহ্মধর্ম দেশেতে প্রবল ॥ ৫৫ ॥
তন্ত্রগীতাপুরাণাদি গেছে রসাতলে ।
ইংরাজি বিজ্ঞানশাস্ত্র তাদের বদলে ॥ ৫৬ ॥
এহেন মার্জিতবুদ্ধি উদ্ধারের তরে ।
শ্রীপ্রভুর আবির্ভাব লীলার আসরে ॥ ৫৭ ॥
পাণ্ডিত্যের অভিমান চূর্ণ কৈলা ভেজে ।
নিরক্ষর দীন-দুঃখী দুর্বলের সাজে ॥ ৫৮ ॥
নয়নরঞ্জন মুর্তি মহেন্দ্র ডাক্তার ।
প্রফুল্লিত চিত্তে দেখা দিল এইবার ॥ ৫৯ ॥
আসন গ্রহণ করি প্রভুদেবে কন ।
অবিরত হয় চিন্তা তোমার কারণ ॥ ৬০ ॥
গত রেতে রাত্রি যবে তৃতীয় প্রহর ।
ঘুম নাই এই চিন্তা খালি নিরন্তর ॥ ৬১ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর কেমন কৌশল ।
চিন্তাই ধিয়ান মাত্র পরম মঙ্গল ॥ ৬২ ॥
সাকারের প্রতিবাদী ডাক্তার এখানে ।
আকার-ধিয়ান-কথা শুনিবে না কানে ॥ ৬৩ ॥
শ্রীঅঙ্গে বিয়াধি ধরি মঙ্গলনিদান ।
কৌশলে করান তাঁরে তাঁহার ধিয়ান ॥ ৬৪ ॥
স্মরণ-মনন ধ্যান লীলার প্রসঙ্গ ।
কীর্তন-শ্রবণ-আদি সাধনার অঙ্গ ॥ ৬৫ ॥
এই সব কর্মে হয় পথে আওয়ান ।
তাহাই ডাক্তারে প্রভু কৌশলে করান ॥ ৬৬ ॥
জান্তে কি অজান্তে এই কর্ম আচরণ ।
সমভাবে এক ফল প্রভুর বচন ॥ ৬৭ ॥
ডাক্তার হৃদয়বান দয়া স্বতঃ ঘটে ।
প্রভুর কৃপায়
এবে ভক্তি গেছে জুটে ॥ ৬৮ ॥
ঈশ্বরীয় তত্ত্বালাপ-শ্রবণ কীর্তনে ।
প্রভুর সভায় তাঁর
ভক্তদের সনে ॥ ৬৯ ॥
এখন বড়ই মুগ্ধ মজিয়াছে মন ।
ডাক্তার ডাক্তার নাই পূর্বের মতন ॥ ৭০ ॥
বৈজ্ঞানিক গম্ভীরাত্মা প্রশস্ত আধার ।
সহজে না মিলে টের মনোভাব তাঁর ॥ ৭১ ॥
প্রমাণে প্রত্যক্ষ বস্তু যতক্ষণ নয় ।
ডাক্তার কখন তাহা করে না প্রত্যয় ॥ ৭২ ॥
প্রত্যয় যা হয় তাও চেপে রাখে তেজে ।
জানিতে না দেন ভাব অপরে সহজে ॥ ৭৩ ॥
এখানেতে বিশ্বগুরু সর্বশক্তিধর ।
পরম কৌশলী চক্রী লীলার ঈশ্বর ॥ ৭৪ ॥
এড়ান নাহিক তার ধরেন যাহাকে ।
বিষম ভীষণ কুঁদে বাঁক নাহি থাকে ॥ ৭৫ ॥
অবতারে লীলাখেলা অতীব রঙ্গের ।
যে বুঝে সে বুঝে যে না বুঝে তার ফের ॥ ৭৬ ॥
পুরাণ বেদান্ত বেদ তন্ত্রের নিকর ।
সাধন-ভজন সব লীলার ভিতর ॥ ৭৭ ॥
লীলা-দরশনে হয় সব দরশন ।
লীলাদৃষ্টি শক্তি যাঁর বিমল নয়ন ॥ ৭৮ ॥
লীলারূপে ভগবান লীলার ভিতর ।
লীলা-দরশনে মিলে সকল খবর ॥ ৭৯ ॥
যত মত যত পথ যত ভবে আছে ।
যাবতীয় যায় দেখা লগ্ন লীলা-গাছে ॥ ৮০ ॥
লীলায় ঈশ্বরে নাই তিল ভিন্ন ভেদ ।
স্বভাবে উভয় এক নাহি অবিচ্ছেদ ॥ ৮১ ॥
কথায় না বুঝা যায় যদিও সরল ।
বোধ উপলব্ধি বস্তু-প্রত্যক্ষে কেবল ॥ ৮২ ॥
শ্রবণ-কীর্তনে লীলা ক্রমে দেখা যায় ।
যদ্যপি করেন কৃপা প্রভুদেবরায় ॥ ৮৩ ॥
পাইবে বিমল আঁখি বুঝিবে নিশ্চিত ।
ভক্তিভরে শুনে চল মহালীলাগীত ॥ ৮৪ ॥
বিজ্ঞানশাস্ত্রের পাঠে বুঝেন ডাক্তার ।
সমাধি কি মহাভাব মাথার বিকার ॥ ৮৫ ॥
এই ভ্রম-বিনাশনে কি করিলা রায় ।
শুন সুমধুর লীলা অকিঞ্চন গায় ॥ ৮৬ ॥
সঙ্গীত শ্রবণপ্রিয় ডাক্তার এখন ।
বিণা-বিনিন্দিত-কণ্ঠ শ্রীনরেন্দ্রে কন ॥ ৮৭ ॥
কখন শুনাবে গীত গাও এইবারে ।
শুনিতে তোমার গান ইচ্ছা বড় করে ॥ ৮৮ ॥
বিশাল নয়নে ভাতিযুক্ত ভক্তবর ।
পরম সুঠাম মূতি সর্বাঙ্গ সুন্দর ॥ ৮৯ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রাণাধিক নরেন্দ্র তখন ।
কাছে ছিল তানপুরা করিলা ধারণ ॥ ৯০ ॥
করে ধরা তানপুরা দৃশ্য মনোহর ।
পরম সন্ন্যাসী যেন বাল মহেশ্বর ॥ ৯১ ॥
তেজঃপুজকলেবর ভাব উদাসীন ।
ঈশ্বরের পাদপদ্মে প্রাণমন লীন ॥ ৯২ ॥
ঝঙ্কারিলা চারি তার একতানে তেজে ।
মৃদঙ্গ তাহার সঙ্গে ঘন ঘন বাজে ॥ ৯৩ ॥
উঠিলা বিচিত্র ধারা ভবনে এখন ।
স্তব্ধীভূত একত্রিত দর্শকের গণ ॥ ৯৪ ॥
উদিল বিচিত্র ভাব চিত্তে সবাকার ।
প্রাণ-মন-ইন্দ্রিয়াদি সবে একাকার ॥ ৯৫ ॥
সংসার সবার ভুল কিছুই নাই মনে ।
খালি লুব্ধ শ্রুতিযুদ্ধ সঙ্গীত-শ্রবণে ॥ ৯৬ ॥
গীত-আরম্ভের পূর্বে সকলে মোহিত ।
পশ্চাতে মধুর কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ৯৭ ॥
গীত
সুন্দর
তোমার নাম দীনশরণ হে,
বরিষে অদ্ভুতবারা, জুড়ায় শ্রবণ হে ।
এক তব নামখন অদ্ভুত-ভবন হে,
অমর হয় সেই জন যে করে কীর্তন হে ।
গভীর বিষাদরাশি নিমিষে বিনাশে,
যখান তব নাম সুখা শ্রবণে পরশে ।
হৃদয় মধুময় তব নামগানে,
হয় যে হৃদয়নাথ চিদানন্দঘন হে ।
সঙ্গীত শুনার আগে যার যাহা ছিল ।
এখন শুনিয়া গীত তাও তার গেল ॥ ৯৮ ॥
শ্রোতাদের ভাব দেখি নরেন্দ্র আবার ।
ধরিলেন অল্প গীত সুধার আধার ॥ ৯৯ ॥
গীত
আমায়
দেমা পাগল ক'রে
আর কাজ নাই জ্ঞান বিচারে ।
তোমায় ও প্রেমের সুরা, পানে
কর নাতোয়ারা
ও মা ভক্তচিত্তহরা, ডুবাও প্রেমসাগরে ।
তোমার এ পাগলা-গারদে,
কেহ হাসে কেহ কাঁদে
কেহ নাচে আনন্দের ভবে
ঈশা মুশা শ্রীচৈতন্য তাঁরা প্রেমের ঘোরে অচৈতন্য
কবে আমি হব মা ধন্য মিশে তার ভিতরে ॥
গীতের ভিতরে প্রভু কি করিলা কল ।
গুনিয়া উন্মত্ত সবে যেমন পাগল ॥ ১০০ ॥
পাণ্ডিত্যাভিমানী যিনি পাণ্ডিত্যাহংকার ।
একদিকে তিয়াগিয়ে করেন চীৎকার ॥ ১০১ ॥
দিগাদিগজ্ঞানশূন্য আকুল হইয়া ।
"বিচারে কি কাজ দে মা পাগল করিয়া" ॥ ১০২ ॥
বিজয় দণ্ডায়মান সকলের আগে ।
প্রভুর কৃপায় প্রাপ্ত ভাবের আবেগে ॥ ১০৩ ॥
পরে প্রভু দাঁড়াইলা ভাবের গোসাঁই ।
কঠিন বিয়াধি অঙ্গে কিছু মনে নাই ॥ ১০৪ ॥
আপনে আপন ভাবে মহা নিমগন ।
ডাক্তারেরা হুঁশ নাই প্রভুর যেমন ॥ ১০৫ ॥
এদিকে দক্ষিণ কক্ষে বুকে হাত দিয়া ।
ভাবে সমাধিস্থ লাটু আছে দাঁড়াইয়া ॥ ১০৬ ॥
তার পাশে মণিগুপ্ত বালক বয়েস ।
গৌরবর্ণ লম্বা লম্বা সুচিকন কেশ ॥ ১০৭ ॥
হাতে ধরা জপমালা বামে হেলা শির ।
পুত্তলিকা মত অঙ্গ ভাব সুগভীর ॥ ১০৮ ॥
ডাক্তারের সন্নিকটে পুরব অঞ্চলে ।
ভক্ত ছোট-নরেন্দ্র গিয়াছে বাহ্য ভুলে ॥ ১০৯ ॥
মুদিত নয়ন স্থটি জড়বৎ অঙ্গ ।
ক্ষণেকের মধ্যে প্রভু কি করিলা রঙ্গ ॥ ১১০ ॥
বিজ্ঞতম বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত প্রধান ।
ভাবের বাজারে আর কূল নাহি পান ॥ ১১১ ॥
দেখেন অবাক হয়ে ভাবগ্রস্ত জনে ।
কাহারো নাহিক বাহ্য সবে স্পন্দহীনে ॥ ১১২ ॥
ভাব-উপশমে কারো কান্না কারো হাসা ।
লাটুর না ছুটে ভাব-সমাধির নেশা ॥ ১১৩ ॥
তখন শ্রীপ্রভুদেব ভাবের সাগর ।
বসাইয়া দিলা তাঁর স্কন্ধে দিয়া ভর ॥ ১১৪ ॥
ভূমিতলে উপবিষ্ট শ্রীলাট্টু যখন ।
প্রভু করিলেন তাঁর স্কন্ধে আরোহণ ॥ ১১৫ ॥
দলিতে লাগিলা বক্ষঃ বামপদভরে ।
লাটুর আইল বাহ্যচেঁঠা কিছু পরে ॥ ১১৬ ॥
রঙ্গ-সমাপনে পরে রঙ্গের ঈশ্বর ।
বসিলেন আপনার শয্যার উপর ॥ ১১৭ ॥
ডাক্তারের প্রতি তবে প্রভুদেব কন ।
কেমন সমাধিভাব দেখিলে এখন ॥ ১১৮ ॥
অপরের চক্ষে নয় স্বচক্ষে দেখিলে ।
তোমার বিজ্ঞানশাস্ত্রে ইহাকে কি বলে ॥ ১১৯ ॥
সায়েন্সেতে সমাধিকে কিবা নামে কয় ।
ঢং কি যথার্থই ইহা প্রতীতি কি হয় ॥ ১২০ ॥
ডাক্তার উত্তরে কন প্রভু ভগবানে ।
অনেকের হতেছে ঢং বলিব কেমনে ॥ ১২১ ॥
চূর্ণ আজি ডাক্তারের পাণ্ডিত্যাহংকার ।
যথার্থ সমাধিভাব করিল স্বীকার ॥ ১২২ ॥
ডাক্তারের সঙ্গে রঙ্গ হইল বিস্তর ।
দিন দিন অভিনব তত্ত্বের সমর ॥ ১২৩ ॥
মহাভাগ্যবান তেঁহ জন্ম ধরাতলে ।
তাঁহার চরণরেণু মহাভাগ্যে মিলে ॥ ১২৪ ॥
যেমন ডাক্তার তাঁর তেমতি নন্দন ।
অমৃত তাঁহার নাম প্রিয়দরশন ॥ ১২৫ ॥
প্রভুর অপার কৃপা অমৃতের প্রতি ।
কৃপার সম্বন্ধে আছে অপূর্ব ভারতী ॥ ১২৬ ॥
শ্রীগোচরে ভক্ত মেলা রহে রেতেদিনে ।
ভক্তিমতী পুরনারী প্রভু-দরশনে ॥ ১২৭ ॥
আসিতে না পায় তাই রহে ক্ষুণ্ণমনা ।
এক দিন উপনীত এক বারাঙ্গনা ॥ ১২৮ ॥
গিরিশের রঙ্গমঞ্চে অভিনেত্রী যত ।
সকলেই প্রভুদেবে ভকতি করিত ॥ ১২৯ ॥
তাহাদের মধ্যে যেবা বিনোদিনী নামে ।
বিশেষ তাহার ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ১৩০ ॥
কি হবে হইলে বেশ্যা ভক্তি আছে যার ।
যে হোক সে হোক তেঁহ নমস্য আমার ॥ ১৩১ ॥
প্রভুর কঠিন পীড়া লোকমুখে শুনি ।
অন্তরে দুঃখিতা বড় বেশ্যা বিনোদিনী ॥ ১৩২ ॥
পরমা
যুবতী তেঁহ রূপবতী তায় ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে আসিতে না পায় ॥ ১৩৩ ॥
প্রবল বাসনা সাধ হৃদয়-মাঝারে ।
তিলেকের জন্য তাঁয় দরশন করে ॥ ১৩৪ ॥
নিরুপায়ে উপায় ভাবিয়া কৈলা মনে ।
ধরিয়া পুরুষ-বেশ যাব দরশনে ॥ ১৩৫ ॥
এক দিন সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে ।
চারি পাঁচ দণ্ড রাতি ইহার ভিতরে ॥ ১৩৬ ॥
যুবকের পরিচ্ছদে হাজির হেথায় ।
বিরাজে যেখানে বাঞ্ছাকল্পতরু রায় ॥ ১৩৭ ॥
অনেকের সঙ্গে দেখা পথের মাঝারে ।
কেহই চিনিতে নাহি পারিল তাহারে ॥ ১৩৮ ॥
কিন্তু শ্রীগোচরে যেই মুহূর্তেকে আসা ।
চিনিয়া শ্রীপ্রভু তারে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ১৩৯ ॥
কি রে তুই হেথা হেন বেশে কি কারণ ।
উত্তরে কহিল প্রভু মাত্র দরশন ॥ ১৪০ ॥
বিশেষ আশিস কৃপা করিয়া তাহায় ।
অনতিবিলম্বে দিলা তখনি বিদায় ॥ ১৪১ ॥
রঙ্গমঞ্চে বীরভক্ত রাখিয়া গিরিশে ।
বেশ্যার উদ্ধার এত স্তম্ভিতে না আসে ॥ ১৪২ ॥
তার সঙ্গে অভিনেতা লম্পটের দল ।
পরশিল শ্রীপ্রভুর চরণ-কমল ॥ ১৪৩ ॥
স্বভাব ছাড়িতে নারে গাঁজা মদ খায় ।
গুরুর মতন কিন্তু ভক্তি করে রায় ॥ ১৪৪ ॥
অদ্যাবধি সেই ধারা দিনে দিনে বাড়ে ।
প্রভুর মূরতি রাখে মঞ্চের ভিতরে ॥ ১৪৫ ॥
বিশেষতঃ সাজঘরে সাজে যেইখানে ।
সাজঘর অতিশয় গোপনীয় স্থানে ॥ ১৪৬ ॥
রঙ্গদিনে পরিপাটি ফুলের মালায় ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিমূর্তি সুন্দর সাজায় ॥ ১৪৭ ॥
যতবার রঙ্গস্থানে করে আগমন ।
বাহির না হয় বিনা চরণবন্দন ॥ ১৪৮ ॥
শুনি এবে অভিনেত্রী অনেকের ঘরে ।
প্রভুর মূরতি আছে পূজা সেবা করে ॥ ১৪৯ ॥
গিরিশে রাখিয়া মঞ্চে প্রভুর মহিমা ।
বেশ্যা লম্পটের মধ্যে ভক্তির সূচনা ॥ ১৫০ ॥
শ্রীগিরিশে গুরুতুল্য সকলেই মানে ।
রঙ্গমঞ্চমধ্যে যেবা যে আছে যেখানে ॥ ১৫১ ॥
বারে বারে গিরিশ বলিল শ্রীচরণে ।
কত দিন রব বেশ্যা-লম্পটের সনে ॥ ১৫২ ॥
ভগবান রাখ মোরে সেবায় এবারে ।
না হয় অধিক দিন বৎসরের তরে ॥ ১৫৩ ॥
উত্তরে কহিলা তাঁরে অখিলের রাজ ।
থাক তুমি রঙ্গালয়ে বহু হবে কাজ ॥ ১৫৪ ॥
বেশ্যা কি লম্পট প্রভুপদে ভক্তি যার ।
তে সবায় করি কোটি কোটি নমস্কার ॥ ১৫৫ ॥
বিষয়ীরে ঘৃণা নাই তিলেকের তরে ।
দরশন দিলা প্রভু গিয়া ঘরে ঘরে ॥ ১৫৬ ॥
করুণাবতার প্রভু সকলে করুণা ।
বিষয়ী লম্পট বেশ্যা কারে নাই ঘৃণা ॥ ১৫৭ ॥
সরল অন্তরে যেবা চায় ভগবানে ।
সেই সেই আসিয়া জুটে প্রভুর সদনে ॥ ১৫৮ ॥
শুন এক শ্রীপ্রভুর মহিমা বাখান ।
এক দিন তৃতীয় প্রহর দিনমান ॥ ১৫৯ ॥
আসিয়া জুটিল এক ত্যাগী যোগিবর ।
শ্যামল বরন চক্ষু ডাগর ডাগর ॥ ১৬০ ॥
কোট পেণ্টুলন পরা টুপি আছে শিরে ।
চাপ দাড়ি হাতে ছড়ি সুহাসি অধরে ॥ ১৬১ ॥
ভিতরে কৌপীন তাঁর বাসে আচ্ছাদন ।
বাহ্যিক দেখিতে এক বাবুর মতন ॥ ১৬২ ॥
স্বভাবে চরিতে কিন্তু যোগীর আচার ।
উপাধিতে মিশ্র তিনি প্রভু নাম তাঁর ॥ ১৬৩ ॥
পিতামহ খ্রীষ্টিয়ান জন্ম সেই কুলে ।
মূলে কিন্তু কনোজিয়া ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১৬৪ ॥
মিশ্রের আচারে এক অপরূপ রীত ।
না হিন্দু না খ্রীষ্টিয়ান অপূর্ব চরিত ॥ ১৬৫ ॥
জীবে দয়া জিতেন্দ্রিয় নাহি হিংসা দ্বেষ ।
মারিলে চাপড় গালে হেসে করে শেষ ॥ ১৬৬ ॥
জান্তব আহার নাই হিংসা হয় জীবে ।
প্রাণিমাত্রে পীড়া দিতে মৃত্যুতুল্য ভাবে ॥ ১৬৭ ॥
যদ্যপি অপরে তাঁরে খেতে দেয় বিষ ।
রাজায় কি ভগবানে করে না নালিশ ॥ ১৬৮ ॥
জাতির বিচার নাই যার তার খায় ।
পরমা সুন্দরী দ্বারা নিরাশক্ত তায় ॥ ১৬৯ ॥
যাহা না হইলে নয় তাহার কারণ ।
দিলে কেহ টাকাকড়ি করেন গ্রহণ ॥ ১৭০ ॥
অধিক পাইলে পরে কিনিয়া ঔষধি ।
সযতনে দুঃখীদের দূর করে ব্যাধি ॥ ১৭১ ॥
সাধন-ভজন-প্রিয় যোগপরায়ণ ।
ভালবাসে গিরিগুহা বিজন কানন ॥ ১৭২ ॥
ঈশ্বরের জ্যোতির্ময় মূর্তি দরশনে ।
এই আশে যোগাশ্রয় উদ্দেশ্য জীবনে ॥ ১৭৩ ॥
একবার গিরিগুহে ধিয়ানে মগন্ ।
দেখিতে পাইল কিবা শুন বিবরণ ॥ ১৭৪ ॥
অপরূপ কলনাদী তটিনীর কূলে ।
সুন্দর বাগান এক পরিপূর্ণ ফুলে ॥ ১৭৫ ॥
তার পাশে সমাধিস্থ সুন্দর চেহারা ।
জ্যোতির্ময় মূর্তি নয় পঞ্চভূতে গড়া ॥ ১৭৫ ॥
হৃদয়-অঙ্কিত ছবি সদা জাগে মনে ।
আর না দেখিতে পায় বসিলে ধিয়ানে ॥ ১৭৬ ॥
সময়ানুক্রমে একে আসিয়া শহরে ।
শুনিল প্রভুর নাম লোক পরস্পরে ॥ ১৭৭ ॥
দরশন-পিয়াসে আজি হাজির হেথায় ।
এখানে করিলা কিবা শুন প্রভুরায় ॥ ১৭৮ ॥
আগন্তুক অগোচরে আসিবার আগে ।
প্রভু বলিলেন আমি যাব মলত্যাগে ॥ ১৭৯ ॥
এত বলি প্রবেশিলা পাইখানা ঘর ।
ভাবে দেখিলেন এক আসে যোগিবর ॥ ১৮০ ॥
মহাবীর বলবান বলিষ্ঠ আকার ।
কোমরেতে বাঁধা আছে পাঁচ হেতিয়ার ॥ ১৮১ ॥
আগাগোড়া হৈল জ্ঞাত যত বিবরণ ।
নব অভ্যাগত কেবা অনুরাগী জন ॥ ১৮২ ॥
দ্বিতলে এখানে যেথা প্রভুর আসন ।
উপনীত হয়ে মিশ্র দিল দরশন ॥ ১৮৩ ॥
ভক্তগণ দিলা তাঁরে বসিবারে ঠাঁই ।
ফিরিলেন হেনকালে জগত-গোসাঁই ॥ ১৮৪ ॥
যোগিবরে প্রভুরায় করি নিরীক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া সমাধিতে হইলা মগন ॥ ১৮৫ ॥
অনিমষ-আঁখি মিশ্র দেখিবারে পায় ।
ধ্যানে দেখা সেই স্মৃতি এই প্রভুরায় ॥ ১৮৫ ॥
আরে অবিশ্বাসী মন কি কব তোমাকে ।
চিরকাল মগ্ন তুমি সন্দেহের পাঁকে ॥ ১৮৬ ॥
না হয় বিশ্বাস তোর মোর কিবা ক্ষতি ।
মুই জানি প্রভু মোর অখিলের পতি ॥ ১৮৭ ॥
ত্রাতা পাতা নেতা পথে হৃদয়বিহারী ।
সংসার-জলধি-জলে পারের কাণ্ডারী ॥ ১৮৮ ॥
রতন মাণিক মম প্রাণ বুদ্ধি বল ।
সম্পদ-বিপদ-সখা সহায় সম্বল ॥ ১৮৯ ॥
ঐশ্বর্য দেখিয়া তত্ত্ব করিতে নির্ণয় ।
তোর মত সন্দ যেন মোর নাই হয় ॥ ১৯০ ॥
হউন শ্রীপ্রভুদেব পূজারী-ব্রাহ্মণ ।
পরগৃহে বাস কিংবা পরান্নে পালন ॥ ১৯১ ॥
না হয় হউন তিনি নিরক্ষর-বেশ ।
অরূপ অগুণ কিংবা উন্মত্ত অশেষ ॥ ১৯২ ॥
না হয় হউন পঞ্চভূতদেহধারী ।
দীনহীন দুঃখাতুর অতি কদাচারী ॥ ১৯৩ ॥
ভূষণবসনহীন বালকের ন্যায় ।
জীর্ণ শীর্ণ কলেবর বেদনা গলায় ॥ ১৯৪ ॥
যত কিছু থাক তাঁয় না করি বিচার ।
ভজিব পূজিব প্রভু ঠাকুর আমার ॥ ১৯৫ ॥
চাহ তুমি বেশ ভূষা ঐশ্বর্য দর্শন ।
অঙ্গে কান্তি নবপূর্বাদলের বরন ॥ ১৯৬ ॥
রতন
কুণ্ডল কানে লম্ববান বেণী ।
বিজড়িত মুকুটেতে নানা রত্নমণি ॥ ১৯৭ ॥
পদে পদে অশ্ব গজ রথ ধাবমান ।
পৃষ্ঠদেশে তৃণ হাতে ধরা ধনুর্বাণ ॥ ১৯৯ ॥
কনক-বরনা বামে সীতাঠাকুরানী ।
হরধনুভঙ্গলব্ধ জনক-নন্দিনী ॥ ২০০ ॥
আরে মন নিরৈশ্বর্য্য দেখে পেলি ধোঁকা ।
সেই রাম এই রামকৃষ্ণরূপে ঢাকা ॥ ২০১ ॥
চাহ তুমি দেখিবারে শিরে শিখিপাখা ।
শোভিত সুন্দর ভালে অলকা তিলকা ॥ ২০২ ॥
দুলু দুলু গজমতি অতুল নাসায় ।
চন্দ্রিমা-কিরণ-জিনি কৌস্তুভ গলায় ॥ ২০৩ ॥
নয়ন দুখানি বাঁকা আকর্ণ পূরিত ।
নীল কলেবরখানি চন্দনে চর্চিত ॥ ২০৪ ॥
মনোহর পীতবাস জড়িত তড়িতে ।
ভুবনমোহন বেণু ঠামে ধরা হাতে ॥ ২০৫ ॥
শ্রীরাধার প্রেমে বাঁকা ত্রিভঙ্গিম ঠাম ।
জগমনবিরঞ্জন নটবর শ্যাম ॥ ২০৬ ॥
ছলে গলে বনমালা আপাদলম্বিত ।
পীতধড়া গুঞ্জবেড়া অঙ্গে সুশোভিত ॥ ২০৭ ॥
কনক নূপুর পায় রুনু ঝুনু রব ।
রকতকমল জিনি চরণ-সৌষ্ঠব ॥ ২০৮ ॥
পায়ে পায়ে প্রস্ফুটিত কমল-আবলী ।
মকরন্দগন্ধে ছুটে ঝাঁকে ঝাঁকে অলি ॥ ২০৯ ॥
আরে মন নিরৈশ্বর্য দেখে পেলি ধোঁকা ।
সেই কৃষ্ণ এই রামকৃষ্ণরূপে ঢাকা ॥ ২১০ ॥
সেই রাম সেই কৃষ্ণ রামকৃষ্ণ-সাজে ।
লীলান্তরে রূপান্তর আপনার কাজে ॥ ২১১ ॥
রূপান্তর মাত্র কিন্তু গুণান্তর নয় ।
রামকৃষ্ণ মহালীলা তার পরিচয় ॥ ২১২ ॥
যখন যেরূপ সজ্জা হয় দরকার ।
সেরূপে যে সাজে আবির্ভাব অবতার ॥ ২১৩ ॥
সমভাবে সেই শক্তি বিরাজিত কার্যে ।
ঐশ্বর্যবানেতে যেন তেন নিরৈশ্বর্যে ॥ ২১৪ ॥
এবারে স্বরূপ কিবা প্রভুর আমার ।
আরো কিছু পরে তুমি পাবে সমাচার ॥ ২১৫ ॥
দৃষ্টি-শক্তিহীন তোর বল অবিশ্বাস ।
কামিনী-কাঞ্চন-মুগ্ধ অবিদ্যার দাস ॥ ২১৬ ॥
কুঞ্চিত মলিন বুদ্ধি হেয় পথে মতি ।
ভাল ছেড়ে মন্দ ধরা স্বভাব প্রকৃতি ॥ ২১৭ ॥
না শুনিব তোর কথা স্থিরমতি রব ।
প্রভু রামকৃষ্ণ মুই ভজিব পূজিব ॥ ২১৮ ॥
এখানেতে প্রভুদেব মিশ্রে তুষ্ট হয়ে ।
বেদানার ফল দিলা প্রসাদ করিয়ে ॥ ২১৯ ॥
ভক্তবর্গে কিছু কিছু করিয়া বণ্টন ।
প্রসাদ পাইলা মিশ্র আনন্দিত মন ॥ ২২০ ॥
প্রভুর পীড়ায় হেথা যত যায় দিন ।
ততই শ্রীঅঙ্গখানি ক্রমে হয় ক্ষীণ ॥ ২২১ ॥
রীতিমত পরিচর্যা কিছু নাহি ত্রুটি ।
ঔষধসেবন কালে পথ্য পরিপাটি ॥ ২২২ ॥
বয়োধিক যোগ্য যাঁরা নেন সমাচার ।
ত্রুটি কিসে কিংবা করে কিবা দরকার ॥ ২২৩ ॥
একদিন কন প্রভু গোপনে গোপনে ।
অপর কাহাকে নয় খালিমাত্র রামে ॥ ২২৪ ॥
উচ্ছিষ্ট স্থানেতে হয় ভোজনের ঠাঁই ।
সেহেতু ভোজন পক্ষে কষ্ট বড় পাই ॥ ২২৫ ॥
সেবায় শুনিয়া ত্রুটি রাম ক্রোধান্বিত ।
বাহিরে চলিলা তার করিতে বিহিত ॥ ২২৬ ॥
অপরাধী জনে করে অতি তিরস্কার ।
বারেক রাগিলে রাম রক্ষা নাই আর ॥ ২২৭ ॥
ভবিষ্যতে হেন ত্রুটি যাহাতে না হয় ।
উপায়-বিধানে তবে বুঝিল নিশ্চয় ॥ ২২৮ ॥
গুরুদারা জগন্মাতা তাঁহে আনিবারে ।
এখন আছেন তিনি দক্ষিণশহরে ॥ ২২৯ ॥
তত্ত্বাবধারণে তথ্য আছে রামলাল ।
আর এক গৃহী ভক্ত মুরুব্বী গোপাল ॥ ২৩০ ॥
মনোগত ভাব রাম প্রভুদেবে কয় ।
প্রভুর সম্মতি তাহে আদতে না হয় ॥ ২৩১ ॥
বুঝাইতে প্রভুদেব কন ভক্ত রামে ।
হংস হংসী এক ঠাঁই কবে লোকজনে ॥ ২৩২ ॥
প্রবোধ না মানে রাম তবু জেদ করে ।
অনুমতি হেতু হেথা মায়ে আনিবারে ॥ ২৩৩ ॥
ভক্তের নিকটে তাঁর কথা থাকে কোথা ।
অগত্যা সম্মতি মায়ে আনাইলা হেথা ॥ ২৩৪ ॥
মাতার নাহিক ঘুম অশন শয়ন ।
দিবারাত্র শ্রীপ্রভুর সেবা-আয়োজন ॥ ২৩৫ ॥
অলস নাহিক তাঁর দিবা কি যামিনী ।
সহায়তা হেতু কাছে গোলাপ ব্রাহ্মণী ॥ ২৩৬ ॥
ভক্ত-মা যাঁহার নাম ভক্তিমতী মেয়ে ।
সর্বস্বত্যাগিনী যিনি প্রভুর লাগিয়ে ॥ ২৩৭ ॥
বড় আশ্চর্যের কথা একমাত্র বাড়ি ।
উপরে দ্বিতলে মাত্র পাঁচটি কুঠুরী ॥ ২৩৮ ॥
তার মধ্যে একখানি অতি অল্প স্থান ।
বৈঠক হইতে দরমায় ব্যবধান ॥ ২৩৯ ॥
সেবা
আয়োজনে তথা আছেন জননী ।
পাক-ক্রিয়া নিজে হাতে করেন আপনি ॥ ২৪০ ॥
দরমার অন্তরালে প্রভুদেবরায় ।
জনসমাগম এত নহে গণনায় ॥ ২৪১ ॥
অবিরত নহে ক্ষান্ত আসে দরশনে ।
আছে মাতা হেথা বার্তা কেহ নাহি জানে ॥ ২৪২ ॥
বার্তা পাওয়া থাক দূরে অদ্ভুত ঘটন ।
দরমা ওপারে নাই বসতি-লক্ষণ ॥ ২৪৩ ॥
বিন্দু-নিবাসিনী মাতা শুনা ছিলা কানে ।
কৃপায় তাঁহার এবে দেখিনু নয়নে ॥ ২৪৪ ॥
চিকিৎসকে দেয় যেন সেবার বিধান ।
সেই মত কালে কালে হয় সরঞ্জাম ॥ ২৪৫ ॥
বিক্রম করিতে কিন্তু নাহি ছাড়ে ব্যাধি ।
পরাভব হৈল সব পথ্যাদি ঔষধি ॥ ২৪৬ ॥
ঔষধে আরোগ্য করা দেখিয়া বিফল ।
ভক্তগণে অন্বেষণ করে দৈববল ॥ ২৪৭ ॥
কভু সংযমেতে থাকে দিনের বেলায় ।
মঙ্গলের হেতু ধ্যানে রজনী কাটায় ॥ ২৪৮ ॥
একদিন প্রভুদেব কহে সকলেতে ।
আপুনি তো কথা কন মা-কালীর সাথে ॥ ২৪৯ ॥
আপনারে জিজ্ঞাসিতে হইবে তাঁহারে ।
অন্নাদি ভোজন যাহে প্রবেশে উদরে ॥ ২৫০ ॥
তদুত্তরে কহিলেন সর্বেশ্বর রায় ।
আঁট নাহি হবে মোটে আমার কথায় ॥ ২৫১ ॥
তথাপিহ মহা জেদ করে ভক্তগণে ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিবাদ না শুনিব কানে ॥ ২৫২ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে বলিলেন রায় ।
আমি বলিলাম মাকে তোদের কথায় ॥ ২৫৩ ॥
উত্তরে মা-কালী তবে কহিলা আমাকে ।
আমার ভোজন হয় লক্ষ লক্ষ মুখে ॥ ২৫৪ ॥
এক মুখে যদি আমি না করি ভোজন ।
তাহে কিবা আছে ক্ষতি জেদ কি কারণ ॥ ২৫৫ ॥
উত্তর শুনিয়া হেন সরমে পড়িনু ।
আর তাঁরে কোন কথা বলিতে নারিনু ॥ ২৫৬ ॥
ভক্তবর্গে দেখিলেই বিষণ্ণ আতুর ।
মায়ায় ভুলায়ে দেন লীলার ঠাকুর ॥ ২৫৭ ॥
করেন আপন মনে কর্ম পরমেশ ।
এবে প্রায় কার্তিকের আধা আধি শেষ ॥ ২৫৮ ॥
কেবা কালী কেবা প্রভু না পারি বুঝিতে ।
কালীতে কেবল তিনি মা-কালী তাঁহাতে ॥ ২৫৯ ॥
পরিচয়ে লীলাকথা শুন এক মনে ।
সংসার-জলধিপার শ্রবণকীর্তনে ॥ ২৬০ ॥
কালীপূজা কাছে কাছে আসিয়াছে প্রায় ।
ডাকাইয়া মাস্টারেরে কহিলেন রায় ॥ ২৬১ ॥
অমাবস্যা-যোগে কালীপূজা প্রয়োজন ।
যুক্তিযুক্ত লয় মনে কর আয়োজন ॥ ২৬২ ॥
মাস্টার মহেন্দ্রনাথ পরম উল্লাসে ।
সেই কথা বলিলেন কালীপদ ঘোষে ॥ ২৬৩ ॥
তত্ত্ববধায়ক কালী এখানে বাসায় ।
প্রয়োজন যাহা হয় অনিয়া যোগায় ॥ ২৬৪ ॥
প্রভুদেব আখ্যা তাঁর দিলা ম্যানেজার ।
নরেন্দ্র দিলেন পরে দানা নাম তাঁর ॥ ২৬৫ ॥
জনে জনে আখ্যা দিলা নরেন্দ্র এখানে ।
সৌভাগ্য বিদিত হৈনু শাঁকচুন্নী নামে ॥ ২৬৬ ॥
আনন্দেতে কালীপদ আটখানা হয়ে ।
পূজার জোগাড় করে দিন পানে চেয়ে ॥ ২৬৭ ॥
যথা নির্ধারিত দিনে সন্ধ্যার বেলায় ।
আলোকিত কৈলা বাড়ি দীপের মালায় ॥ ২৬৮ ॥
হেথা ভক্তিমতী ঘরে গৃহিণী তাঁহার ।
ভোজ্যাদি নিজের হাতে করেন তৈয়ার ॥ ২৬৯ ॥
ফুলকা ফুলকা লুচি সুজির পায়েস ।
নূতন খেজুর গুড়ে গোল্লা সন্দেশ ॥ ২৭০ ॥
সাদা সন্দেশাদি আর মিষ্টান্ন বহুল ।
বিল্বপত্র গঙ্গাজল ধূপ দীপ ফুল ॥ ২৭১ ॥
যাবতীয় দ্রব্যাদি জোগাড় করি ঘরে ।
শুভক্ষণে দিলা আনি প্রভুর গোচরে ॥ ২৭২ ॥
অপর দ্রব্যাদি কালী আনিলা আপনি ।
সুজির পায়েস আনে তাঁহার গৃহিণী ॥ ২৭৩ ॥
কোচলা গামছা এক করি পরিধান ।
গৃহিণীর ভক্তি এত না যায় বাখান ॥ ২৭৪ ॥
দুইটি মোমের বাতি দিলা দুই পাশে ।
আসনে শ্রীপ্রভুদেব বসিলেন শেষে ॥ ২৭৫ ॥
পরিপূর্ণ গোটা ঘর অন্তরঙ্গগণে ।
অনিমিখে চেয়ে সবে শ্রীপ্রভুর পানে ॥ ২৭৬ ॥
এইখানে এক কথা শুন তুমি মন ।
এতগুলি মহাভক্ত বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ২৭৭ ॥
কাহারো আদতে এটি আসিল না মনে ।
ঘট কিংবা পট কি প্রতিমা আনয়নে ॥ ২৭৮ ॥
অথচ সকলে জানে প্রভু গুণমণি ।
কালীপুজা করিবেন আপনিই তিনি ॥ ২৭৯ ॥
মহারঙ্গ ঠাকুরের গুন মন দিয়ে ।
আসনে বসিয়ে প্রভু স্থির ভাব হয়ে ॥ ২৮০ ॥
ভাবে মগ্ন নন বাহ্য চেঠা আছে গায় ।
এইরূপে বহুক্ষণ গত হয়ে যায় ॥ ২৮১ ॥
তখন গিরিশে কন রাম পেয়ে টের ।
প্রভুর এ পূজা নয় পুজা আমাদের ॥ ২৮২ ॥
আমাদের পূজা প্রভু লইবার তরে ।
অপেক্ষায় উপবিষ্ট আসন উপরে ॥ ২৮৩ ॥
'বল কি' বলিলা শ্রীগিরিশ মহাবলী ।
জয় মা বলিয়া দিলা পায়ে পুষ্পাঞ্জলি ॥ ২৮৪ ॥
কালীর আবেশে মগ্ন তখনি গোসাঁই ।
বরাভয় করদ্বয় অঙ্গে বাহু নাই ॥ ২৮৫ ॥
ক্রমে পরে যাবতীয় মহাভাগ্যবান ।
পুষ্পাঞ্জলি শ্রীচরণে করিল প্রদান ॥ ২৮৬ ॥
কেহ হাসে কেহ নাচে উন্মত্ত হইয়া ।
বীরদম্ভে লক্ষে কেহ ছাদ কাঁপাইয়া ॥ ২৮৭ ॥
আনন্দময়ীর ভাবে প্রভুদেবরায় ।
মহা আনন্দের শ্রোত ঘরে বয়ে যায় ॥ ২৮৮ ॥
কিছুক্ষণ পর হৈল ভাব অবসান ।
দশ-বার আনা প্রায় অঙ্গে বাহ্যজ্ঞান ॥ ২৮৯ ॥
কোন ভক্ত দেখি তাঁর উন্মীলিত নেত্র ।
শ্রীমুখে ধরিল তুলে পায়সের পাত্র ॥ ২৯০ ॥
পাত্রেতে আধেয় ছিল ছয় সের প্রায় ।
আবেশে ভক্ষণ সব করিলেন রায় ॥ ২৯১ ॥
সন্দেশ খাইয়া পরে বহুল বহুল ।
সর্বশেষে মুঠাভরা সুমিষ্ট তাম্বুল ॥ ২৯২ ॥
ভক্তেরা করিলা মনে ব্যথা গেছে সেরে ।
আজি অঙ্গে মা কালীর আবেশের ভরে ॥ ২৯৩ ॥
আনন্দের স্রোতেতে আনন্দ বাড়াবাড়ি ।
সকলে প্রসাদ লয়ে করে কাড়াকাড়ি ॥ ২৯৪ ॥
শ্রীপদে অঞ্জলি দেয়া কুসুমের হার ।
কেহ উঠাইয়া গলে পরে আপনার ॥ ২৯৫ ॥
কেহ বা সঞ্চয় হেতু বাঁধিল বসনে ।
কেহ বা গরবভরে পরে তুই কানে ॥ ২৯৬ ॥
কেহ বা চলিয়া পড়ে অপরের গায় ।
হৃদয়ে আনন্দ এত ধরে না তাহায় ॥ ২৯৭ ॥
কি রঙ্গ হইল দৃশ্য কার সাধ্য কয় ।
চক্ষে দেখা তবু তিল বর্ণিবার নয় ॥ ২৯৮ ॥
মধুর কখন রামকৃষ্ণ-লীলা গীতি ।
রামকৃষ্ণভক্তবৃন্দ পদে মাগি মতি ॥ ২৯৯ ॥
রামকৃষ্ণপুঁথি মহাশান্তির ভাণ্ডার ।
শ্রবণকীর্তনে ভব-জলধিতে পার ॥ ৩০০ ॥
পঞ্চম খণ্ড
পাষণ্ডীর প্রতি প্রভুর করুণা
দরশনে শ্রীপ্রভুর,
নির্মল
চিত-মুকুর,
বিকশিত হৃদয়কমল ।
জীবত্বে দেবত্ব উঠে, লোচন-আঁধার ছুটে,
কঠিন পাষাণে করে জল ॥ ১ ॥
শুষ্ক কাঠ মঞ্জরিত,
মুকুল পল্লবযুত,
সহ ফুল্ল কুসুমনিচয় ।
কথা নয় কাল্পনিক, চক্ষে দেখা বাস্তবিক,
শুন কহি তার পরিচয় ॥ ২ ॥
শহরেতে একজন, প্রভুদ্বেষী আজীবন,
পুরজন পাষণ্ডী প্রধান ।
স্বতঃ রীতি স্বতন্তর, নরাকৃতি
বিষধর,
বাক্য যেন বিষ মাখা বাণ ॥ ৩ ॥
বুঝিতে নারিনু মন, সে মন কেমন মন,
রসনা-চালনে যার সাধ ।
প্রভু অকলঙ্ক শশী, গুণযুত রাশি রাশি,
তাহার করিতে নিন্দাবাদ ॥ ৪ ॥
একে তো সুন্দর কায়, মাধুর্য লাবণ্য তায়,
হেরিলে হরষে প্রাণমন ।
বাকি যাহা রহে ঘরে, তাও যায় ক্রমে পরে,
মিঠা বাণী করিলে শ্রবণ ॥ ৫ ॥
বালকের ভাব গায়, মরি কিবা শোভা পায়,
রত্ন মণি মরকত জিনি ।
স্বতঃ সরলাতিশয়,
সতত আনন্দময়,
ভাবে ভোর দিবস রজনী ॥ ৬ ॥
তাহে বিনয়াবনত, কোমল
প্রকৃতিযুত,
যারে তারে অগ্রে নমস্কার ।
জীবের কল্যাণ লাগি, স্বার্থশূন্য সর্বত্যাগী,
নেত্রে ধারা ঝরে অনিবার ॥ ৭ ॥
জন্মাবধি আজীবন, তত্ত্বালাপে
মত্ত মন,
সাধনভজন তার সনে ।
আনাসক্ত যোল-আনা, কামিনী-কাঞ্চনে ঘৃণা,
দেহ ধরা জীবের কল্যাণে ॥ ৮ ॥
শিবসিদ্ধিময় নাম, ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম,
উচ্চারণে পরিণাম ফল ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ হরে, ভব-জলধির নীরে,
পারাপারে দুর্বলের বল ॥ ৯ ॥
নিবিড় সংসারারণ্যে, পথভ্রান্তদের জন্মে,
স্বার্থশূন্যে সম্বল সহায় ।
অজ্ঞান-তিমির-হর, যিনি তেজে দিনকর,
চক্ষুহীন জনের উপায় ॥ ১০ ॥
নামে যদি এত বল, নিন্দুকের কিবা ফল,
সেও তো লইল রসনায় ।
শুন মন তদুত্তরে, সেও যাবে ভবপারে,
করুণ নামের মহিমায় ॥ ১১ ॥
আগুনে অজ্ঞানে হাত, যদি পড়ে আচম্বিত,
সেও পোড়াতে নাহি ছাড়ে ।
আগুনের ধর্ম ধারা, পরশিলে দগ্ধ করা,
ভালমন্দ না যায় বিচারে ॥ ১২ ॥
বহ্নি না বিচারে যায়, যারে পায় তারে খায়,
তাই তার নাম সর্বভুক ।
সেইমত এইখানে,
প্রভুর নামে গুণে,
পরিত্রাণ পাইবে নিন্দুক ॥ ১৩ ॥
ফুলে ফুল-কীট যেন, নিন্দুক লীলায় তেন,
অবতারে লক্ষ অনুক্ষণ ।
নিন্দার বন্দনা গায়, যাহে তেঁহ সুখ পায়,
শ্রীপ্রভুর সৃজন যেমন ॥ ১৪ ॥
সম-দরশন রায়, স্তুতি-নিন্দা
সম তাঁয়,
সৃষ্টীশ্বর কল্যাণনিদানে ।
নিন্দুকের কথা শুন, নিন্দা করে পুনঃপুনঃ,
অকলঙ্কী প্রভু ভগবানে ॥ ১৫ ॥
সময়ানুক্রমে তার, প্রিয়
পুত্র সুকুমার,
শয্যাগত হইল পীড়ায় ।
কবিরাজ ডাক্তারাদি, আনাইয়া নিরবধি,
প্রাণাধিক নন্দনে দেখায় ॥ ১৬ ॥
নাহি হয় উপশম, পীড়া ক্রমে করে ক্রম,
দিনে দিনে দেহ জেরবার ।
ব্যাধির জ্বলন গায়, গড়াগড়ি বিছানায়,
যাতনায় করয়ে চীৎকার ॥ ১৭ ॥
প্রাণের নাহিক আশ, পরিবারবর্গে ত্রাস,
অনিবার ভাসে আঁখিনীরে ।
হাহাকার গোটা বাড়ি, আদতে নাচড়ে হাঁড়ি,
মগ্ন সবে অকূল পাথারে ॥ ১৮ ॥
নিন্দুকের আশা মনে, মহেন্দ্রডাক্তার আনে,
নন্দনের চিকিৎসা কারণ ।
এখন ডাক্তার হেথা, প্রভুর সুতায় গাঁথা,
ব্যবসায় মোটে নাই মন ॥ ১৯ ॥
অন্য রোগী দেখিবার, প্রয়াস না হয় আর,
কত লোক যায় ফিরে ফিরে ।
যদি কেহ দেখা পায়, দুনো দাম দিতে চায়,
তথাপিহ স্বীকার না করে ॥ ২০ ॥
শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায়, দিবসযামিনী যায়,
এখানে আসিলে মাতামাতি ।
রাত্রিকালে নিকেতনে, চিন্তা করে মন প্রাণে,
শ্রীপ্রভুর পীড়ার প্রকৃতি ॥ ২১ ॥
কখনো বা মগ্ন মন, ব্যাধিশাস্ত্র অধ্যয়ন,
উপায়-বিধান-অন্বেষণে ।
পাঁচশ টাকার বহি, ক্রয়ে কৈল জলসহি,
একমাত্র প্রভুর কারণে ॥ ২২ ॥
নিন্দুক কাতর স্বরে, ডাক্তারে কাকুতি করে,
যাইবারে তাহার ভবনে ।
ডাক্তার না শুনি তায়, চড়ি গাড়ি উভরায়,
উপনীত প্রভুর সদনে ॥ ২৩ ॥
নিন্দুকের প্রাণফাটে, গাড়ির পশ্চাতে ছুটে,
উর্ধ্ব শ্বাসে আকুল পরাণ ।
অবশেষে উপনীত, ভক্তবর্গে সুবেষ্টিত,
বিরাজেন যেথা ভগবান ॥ ২৪ ॥
লজ্জা ভয় মনে হেথা, সাধ্য নাই কয় কথা,
একধারে দাঁড়াইয়া রয় ।
শ্রীপ্রভুর ব্যথার ব্যথী, সম্পদ-বিপদ-সাথী,
হৃদয়-নিবাস দয়াময় ॥ ২৫ ॥
অন্তরে পাইয়া টের, হৃদি-ব্যথা নিন্দুকের,
জিজ্ঞাসা করিলা বিবরণ ।
কাকুতি কাতর স্বরে, নিবেদিল শ্রীগোচরে,
মৃত্যতুল্য শয্যায় নন্দন ॥ ২৬ ॥
নিন্দুকের কথা শুনি, আকুল প্রভুর প্রাণী,
ধারা জিনি ঝরে দু'নয়ন ।
কহেন সজল চোখে, আমি এত বয়োধিকে,
গলদেশে সামান্য বেদন ॥ ২৭ ॥
যাতনা অনুপমেয়, সে যে শিশু অল্পবয়ঃ,
নাহি জানি কত কষ্ট পায় ।
এত বলি ডাক্তারেরে, বলিলেন যাইবারে,
পীড়িত শিশুর চিকিৎসায় ॥ ২৮ ॥
প্রভুর দেখিয়া দয়া, নিন্দুকের শক্ত হিয়া,
দ্রবিয়া তখন হৈল হুঁশ ।
ভাবে আরে নিন্দা কার, করিয়াছি বারবার,
এ যে মহা প্রেমিক পুরুষ ॥ ২৯ ॥
স্তুতি করে মনে মনে, বারি ধারা দু'নয়নে,
ধিক্কার সহিত আপনারে ।
প্রার্থনা তাহার সনে, সরল আকুল প্রাণে,
অপরাধ ক্ষমিবার তরে ॥ ৩০ ॥
চক্ষে দেখা অবিকল, পাষাণে করিল জল,
নিরমল হৃদয়-মুকুর ।
চির অন্ধকারালয়, পলকে আলোকময়,
মহতী মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৩১ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি, কীর্তনে বাসনা অতি,
বলিতে নারিনু কিন্তু সে কি ।
শতদল কণিকার, সাধ্য নাই বর্ণিবার,
অবাক্ হইয়া বসে দেখি ॥ ৩২ ॥
কিসে কব লীলা আর, বাকশক্তি রসনার,
নয়ন হরিল একেবারে ।
রূপেতে নয়ন টেনে, বিমোহিত করি প্রাণে,
ডুবাইল অকূল পাথারে ॥ ৩৩ ॥
পঞ্চম খণ্ড
কাশীপুরে স্থানপরিবর্তন ও অন্তরঙ্গ-বাছাই
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
প্রভুর প্রকৃতিখানি বিচিত্র
প্রকার ।
নিয়ম বিধান শাস্ত্র সকলের পার ॥ ১ ॥
সীমাতীত বিধাতার কার্যে কি শরীরে ।
আগাগোড়া লীলাগীতি সাক্ষ্য দান করে ॥ ২ ॥
নরদেহে বিগ্রহের ইহাই লক্ষণ ।
যে দেহে ধাতার নাই মাত্র পরশন ॥ ৩ ॥
শ্রীপ্রভুর তনুখানি যে যে উপাদানে ।
সৃষ্টিছাড়া যে সকল ধাতাও না জানে ॥ ৪ ॥
ব্যাধি-বিনাশনে বিধি নাগাল না পায় ।
দিনে দিনে বৃদ্ধি পুনঃ বেদনা গলায় ॥ ৫ ॥
উদরে না যায় ভোজ্য ক্ষীণ অঙ্গখানি ।
এইবার স্বরভঙ্গ কষ্টে সরে বাণী ॥ ৬ ॥
যে কণ্ঠের স্বর শুনে বীণার সরম ।
সেই স্বর এইবারে কৈল পলায়ন ॥ ৭ ॥
সশঙ্কিত-চিত এবে ডাক্তার প্রধান ।
স্থান-পরিবর্তনের দিলেন বিধান ॥ ৮ ॥
যে যা বলে তাই করে অন্তরঙ্গগণে ।
সত্বর চলিল রাম বাড়ি-অন্বেষণে ॥ ৯ ॥
তিয়াগিয়া কর্ম-কাজ চারিদিকে ধায় ।
মনের মতন বাড়ি কোথাও না পায় ॥ ১০ ॥
ক্লান্ত-কলেবর তেঁহ ঘুরিয়া ঘুরিয়া ।
কোথা যাই কোথা যাই ভাবেন বসিয়া ॥ ১১ ॥
হেনকালে মনে মনে হৈল সমুদিত ।
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব সকল বিদিত ॥ ১২ ॥
কোথায় বৈঠক হবে আছে তাঁর জানা ।
জিজ্ঞাসা করিব তাঁয় মিছার ভাবনা ॥ ১৩ ॥
এত ভাবি শ্রীগোচরে রাম ভক্তবর ।
নিবেদিলা একে একে যতেক খবর ॥ ১৪ ॥
পশ্চাতে জিজ্ঞাসা কৈলা কাকুতি করিয়া ।
কোন্দিকে পাব বাড়ি দেন দেখাইয়া ॥ ১৫ ॥
শুনিয়া রামের কথা শ্রীমুখেতে হাস ।
যেখানে মিলিবে বাড়ি দিলেন আভাস ॥ ১৬ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রদর্শিত দিক্ অনুসারে ।
উপনীত রাম হৈলা কাশীপুরে ॥ ১৭ ॥
মহিমের কাছে রাম পাইলা সন্ধান ।
সন্নিকটে আছে এক বিরাট বাগান ॥ ১৮ ॥
সুন্দর দ্বিতল বাড়ি তাহার ভিতরে ।
ফুলের ফলের গাছ বহু চারিধারে ॥ ১৯ ॥
সুন্দর সরসীদ্বয় শানে বাঁধা ঘাট ।
শোভমান পুষ্পোদ্যানে মাঝে মাঝে বাট ॥ ২০ ॥
কোম্পানির বড় পথ বাগানের পাশে ।
চারি কুড়ি টাকা ভাড়া ধার্য মাসে মাসে ॥ ২১ ॥
বাগানের অধিকার যে দিনে হইল ।
সেই দিনে শ্রীপ্রভুর বৈঠক উঠিল ॥ ২২ ॥
ভারি খুশী হৈলা রায় দেখিয়া বাগান ।
ভক্তসঙ্গে চারিদিকে বেড়িয়ে বেড়ান ॥ ২৩ ॥
পাছু পাছু আসিলেন মাতা ঠাকুরানী ।
স্বতন্ত্র মহলে বাসা লইলেন তিনি ॥ ২৪ ॥
ভক্ত-মা সঙ্গেতে আছে ছায়ার মতন ।
দোঁহাকার পাদপদ্মে মগ্ন যাঁর মন ॥ ২৫ ॥
প্রভু আর মায়ে ভিন্ন অন্যে নাহি জানে ।
কুল-শীল জলাঞ্জলি যাদের কারণে ॥ ২৬ ॥
একপাশে পাকশালা বেড়ায় আটক ।
মায়ের মহল পূর্বে রহিল পৃথক ॥ ২৭ ॥
এখানে দ্বিতলভাগে প্রভুর আসন ।
তার নিম্নতলে রহে অন্তরঙ্গগণ ॥ ২৮ ॥
মাঝে মাঝে ডাক্তার আসেন এইখানে ।
চিকিৎসায় শ্রীপ্রভুর ঔষধ-বিধানে ॥ ২৯ ॥
দিনে দিনে কমে পীড়া স্বাস্থ্যের উন্নতি ।
ভক্তবর্গে ডাক্তার সহিত পান প্রীতি ॥ ৩০ ॥
পূর্বাপেক্ষা অঙ্গে হৈল বলের সঞ্চার ।
উদ্যানে নামিয়া নীচে করেন বিহার ॥ ৩১ ॥
অবিরত আনন্দের উচ্চরোল উঠে ।
গীত-বাদ্যে গোটা বাড়ি যেন পড়ে ফেটে ॥ ৩২ ॥
এক এক দিন রঙ্গ যতেক ঘটনা ।
লিখিলেও জন্ম জন্ম না যায় বর্ণনা ॥ ৩৩ ॥
এ সময়ে শ্রীপ্রভুর সেবার কারণ ।
গৃহত্যাগ একেবারে কৈলা কয়জন ॥ ৩৪ ॥
নরেন্দ্র রাখাল কালী নিত্যনিরঞ্জন ।
যোগীন শরৎ শশী এ তিন ব্রাহ্মণ ॥ ৩৫ ॥
ভক্ত বসু বলরাম শ্যালক তাঁহার ।
মহাভক্ত বাবুরাম বয়সে কুমার ॥ ৩৬ ॥
মুরব্বী গোপাল যাঁর সিঁতিগ্রামে ঘর ।
লাটু নহে এ দেশীয় আছে বরাবর ॥ ৩৭ ॥
তারক ঘোষাল তেঁহ ছিলা অন্য স্থানে ।
এইখানে মিলিলেন ইহাদের সনে ॥ ৩৮ ॥
তিয়াগিয়া ঘরবাড়ি একটানে থাকে ।
কানেও না শুনে যত আত্মীয়েরা ডাকে ॥ ৩৯ ॥
শ্রীপদে অটল রাগ দেখি হৃদিবাস ।
অন্তরে ঢালিয়া দিলা অপার বিশ্বাস ॥ ৪০ ॥
দিবস বিশেষে আজ্ঞা কখন কাহারে ।
এখানে আসিয়া হেথা দক্ষিণশহরে ॥ ৪১ ॥
পঞ্চবটমূলেতে রচিয়া যোগাসন ।
করিবারে ধ্যানজপ সাধন ভজন ॥ ৪২ ॥
তপাচারে জোর আজ্ঞা নরেন্দ্রের প্রতি ।
বীরশ্রেষ্ঠ অঙ্গে যাঁর অপার শকতি ॥ ৪৩ ॥
মধুর ভারতী কহি শুন এক মনে ।
কিবা প্রভু কিবা তাঁর অন্তরঙ্গগণে ॥ ৪৪ ॥
প্রভুদেব নিজে পূর্ণব্রহ্মসনাতন ।
তাঁর শক্তি অংশ যত অবতারগণ ॥ ৪৫ ॥
অবতারদিগের প্রভুর অঙ্গে ধাম ।
সেইহেতু শ্রীপ্রভুর অবতরী নাম ॥ ৪৬ ॥
অবতরী মানে যাঁর আবির্ভাব-কালে ।
অন্তরঙ্গ-বেশে আসে অবতার দলে ॥ ৪৭ ॥
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি এই অবতারগণ ।
ঈশ্বর-কোটির তাঁরা প্রভুর বচন ॥ ৪৮ ॥
কোন্ কোন্ ভক্ত শুন ঈশ্বর-কোটির ।
শ্রীপ্রভুর আবির্ভাবে লীলায় হাজির ॥ ৪৯ ॥
নিরঞ্জন বাবুরাম ছোট শ্রীনরেন্দ্র ।
শ্রীরাখাল শ্রীযোগীন আর পূর্ণচন্দ্র ॥ ৫০ ॥
বরাহনগরে বাড়ি ভবনাথ আর ।
শ্রীতারক বেলঘোরিয়ায় ঘর যাঁর ॥ ৫১ ॥
প্রায় সবে কৃতদার হইলা ইঁহারা ।
নিরঞ্জন বাবুরাম এই দুই ছাড়া ॥ ৫২ ॥
যোগীনের নামে বিয়া বিয়ায় অসুখ ।
রমণীর কোনকালে দেখিলা না মুখ ॥ ৫৩ ॥
প্রভুর নরেন্দ্র যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ।
ঈশ্বর-কোটির থেকে অত্যুচ্চ শ্রেণীর ॥ ৫৪ ॥
বলিতেন প্রভুদেব অখিলবিহারী ।
একাকী নরেন্দ্রেনাথ জ্ঞানে অধিকারী ॥ ৫৫ ॥
জ্ঞানী যিনি জ্ঞানে যাঁর আছে অধিকার ।
জগৎ জগদীশ্বর সে দুয়ের পার ॥ ৫৬ ॥
মায়ার রাজ্যের মধ্যে এ দুয়ের গতি ।
মায়ার উপরে কিন্তু গিয়ানীর স্থিতি ॥ ৫৭ ॥
মায়ার সঙ্গেতে জ্ঞানী সম্বন্ধ না রাখে ।
সেইহেতু জ্ঞানী যিনি অথণ্ডের থাকে ॥ ৫৮ ॥
অখণ্ড শ্রেণীর লোক নরেন্দ্র বিদিত ।
ভূবনমোহিনী মায়া তাহার অতীত ॥ ৫৯ ॥
মায়ার অতীত বস্তু হন যেইজন ।
তাঁহারে ভুলাতে নারে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৬০ ॥
মায়ার অন্তরগত বস্তু যাবতীয় ।
জ্ঞানীতে সে সবে দেখে অতিশয় হেয় ॥ ৬১ ॥
আগাগোড়া দেখিতেছি কায়বাক্যমনে ।
নরেন্দ্রের ভারি ঘৃণা কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৬২ ॥
অর্থের অভাবে কষ্ট পান নিরন্তর ।
ভবনেতে অল্পবয়ঃ সোদরা সোদর ॥ ৬৩ ॥
নিজে জ্যেষ্ঠ যোগ্য তায় অর্থ-উপার্জনে ।
তথাপি না হয় মন সংসার-সেবনে ॥ ৬৪ ॥
প্রবল বাসনা মনে সাধ উগ্রতর ।
বিবেক-বৈরাগ্য কিসে হইবে প্রখর ॥ ৬৫ ॥
নিরন্তর প্রীতিকর তপ যোগ যাগ ।
সংসারের কর্মকাণ্ডে অতি বীতরাগ ॥ ৬৬ ॥
অনুরাগ একমাত্র ব্রহ্মনিরাকারে ।
অরূপ অগুণ যিনি মায়ার ওপারে ॥ ৬৭ ॥
প্রকৃতি বুঝিয়া তাঁর তাই প্রভুরায় ।
ধ্যানে তপে জোর আজ্ঞা করিলেন তাঁয় ॥ ৬৮ ॥
শ্রীপ্রভুর আজ্ঞামত করিয়া সাধন ।
হইত না নরেন্দ্রের পরিতৃপ্ত মন ॥ ৬৯ ॥
আবেদন শ্রীগোচরে হইত কেবল ।
বলিলেন যেমন কৈন্তু কি হইল ফল ॥ ৭০ ॥
তদুত্তরে বলিতেন লীলার ঈশ্বর ।
মুই কৈনু ষোল-আনা তুই সিকি কর ॥ ৭১ ॥
খানদানী চাষা যার চাষে গুজরান ।
দশ বর্ষ অনাবৃষ্টি নাহি পায় ধান ॥ ৭২ ॥
তথাপিহ কৃষিকর্ম ছাড়িতে না পারে ।
দুনো বলে দেয় হাল মাটি কাঁপে ডরে ॥ ৭৩ ॥
যদ্যপিহ নাহি পায় হাতে হাতে ফল ।
সময়ে সকল কর্ম মিলিবে ফসল ॥ ৭৪ ॥
ত্যাগিবর যোগিবর সাধকপ্রধান ।
স্বভাবে সাধনা-প্রিয় বীর বলবান ॥ ৭৫ ॥
অঙ্গভূষা শ্রীপ্রভুর নরেন্দ্র এখানে ।
গোটা রাতি ধুনী পাশে রহেন ধিয়ানে ॥ ৭৬ ॥
ভস্মমাখা গোটা অঙ্গে কৌপীনধারণ ।
পাতা আছে বাঘছাল যাহাতে আসন ॥ ৭৭ ॥
নিত্যনিরঞ্জন কালী শরৎ ও যোগীন ।
সকলেই নরেন্দ্রের আজ্ঞার অধীন ॥ ৭৮ ॥
মনে প্রাণে মাখামাখি ভাব পরস্পরে ।
প্রত্যেকেই ঠাঁই ঠাঁই তপ ধ্যান করে ॥ ৭৯ ॥
সাধনভজনে সাধ নাহিক শরীর ।
কিবা রাত্রি কিবা দিন সেবায় হাজির ॥ ৮০ ॥
সুস্থাবস্থা শ্রীপ্রভুর করি দরশন ।
সোৎসাহে সকলে করে সাধন-ভজন ॥ ৮১ ॥
পুলকিত অতিশয় মহেন্দ্র ডাক্তার ।
ভাবিলা সম্যগারোগ্য শ্রীপ্রভু এবার ॥ ৮২ ॥
অন্তরে ভরসা আশা গৃহী ভক্তগণে ।
যোগায় সকল ব্যয় সেবার কারণে ॥ ৮৩ ॥
সংসারী বিষয়কর্মে রহে নিরস্তর ।
প্রভু-দরশনে আসে যবে অবসর ॥ ৮৪ ॥
বিশেষতঃ রবিবারে সেবার মেলানি ।
নৃত্য-গীত রঙ্গ-রস কতই না জানি ॥ ৮৫ ॥
মাসাধিক কাল প্রায় এমতে কাটিন ।
ইংরাজের নববর্ষ এখন পড়িল ॥ ৮৬ ॥
আঠারশ ছিয়াশির সাল গণনায় ।
বিশেষতঃ দিন ইহা প্রভুর লীলায় ॥ ৮৭ ॥
প্রথম দিবস আজি নব বরষেতে ।
একাদশী তিথি আজি হিন্দুদের মতে ॥ ৮৮ ॥
প্রভুর প্রতিজ্ঞা ছিল শুন বিবরণ ।
হাটেতে ভাঙ্গিব হাঁড়ি যাইব যখন ॥ ৮৯ ॥
সেই হাঁড়ি-ভাঙ্গা রঙ্গ আজিকার দিনে ।
কি ভাবে ভাঙ্গিলা হাঁড়ি শুন এক মনে ॥ ৯০ ॥
প্রভুর বিচিত্র কার্য যেন তাঁর দেহ ।
হাটেতে ভাঙ্গিলা হাঁড়ি জানিল না কেহ ॥ ৯১ ॥
বিশাল জাহাজ যবে জলে চলে যায় ।
তিল বিন্দু সাড়া শব্দ নাহি রহে তায় ॥ ৯২ ॥
তেমতি প্রভুর খেলা হাঁকডাক নাই ।
গুপ্তবেশে মহালীলা করিলা গোসাঁই ॥ ৯৩ ॥
নববর্ষে অপরূপ রূপে পরমেশ ।
ভবনে বিরাজমান কল্পতরুবেশ ॥ ৯৪ ॥
হরিশ মুস্তফী নামে ভক্ত একজন ।
দেবেন্দ্রের মামা তিনি বঙ্গজ-ব্রাহ্মণ ॥ ৯৫ ॥
মহাভাগ্যবান হৈলা হাজির গোচরে ।
দ্বিতলে শ্রীপ্রভু যেথা দরশন তরে ॥ ৯৬ ॥
নিকটে ডাকিয়া তাঁরে করুণানিদান ।
দেবেশবাঞ্ছিত কৃপা করিলেন দান ॥ ৯৭ ॥
শ্রীপ্রভুর কৃপা কিবা কি কহিব মন ।
কৃপার গোচর মাত্র কৃপা কিবা ধন ॥ ৯৮ ॥
যে পায় কিছুই সেও বলিতে না পারে ।
কি ছিল না কি পাইল কৃপার দুয়ারে ॥ ৯৯ ॥
পরম পুলকে খালি ঝরে দু'নয়ন ।
প্রভুর কৃপার এই বাহ্যিক লক্ষণ ॥ ১০০ ॥
কৃপারূপে নিজে প্রভু লীলার ঈশ্বর ।
আপনি বিরাজমান কৃপার ভিতর ॥ ১০১ ॥
হরিষে হরিশচন্দ্র মুখে মাত্র স্ফুরে ।
কৃপায় আনন্দ কিবা হৃদয়ে না ধরে ॥ ১০২ ॥
কৃপা নহে কড়ি পাতি নহে রাজ্যধন ।
কিংবা নহে মনোহর কামিনী-কাঞ্চন ॥ ১০৩ ॥
সুস্বাস্থ ভোজন নয় নয় গাঁজা সুরা ।
নহে মাদকীয় কিছু ক্ষণানন্দধারা ॥ ১০৪ ॥
তথাপি কৃপার মধ্যে হেন বস্তু আছে ।
তুলনায় যাবতীয় রাজ্যধন মিছে ॥ ১০৫ ॥
কৃপায় আনন্দরাশি বহে শতধার ।
ধন্য সে আধার যাহে কৃপার সঞ্চার ॥ ১০৬ ॥
একজনে কৃপাবারি করি বিতরণ ।
উথলিল কৃপাসিন্ধু প্রভুর এখন ॥ ১০৭ ॥
দীন দুঃখী কানা খোঁড়া যে ছিল বাগানে ।
একে একে তা সবারে পড়ে গেল মনে ॥ ১০৮ ॥
অন্তরঙ্গ ভক্ত তাঁর দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
দ্বিতলে ডাকিয়া তাঁয় প্রভুদেব কন ॥ ১০৯ ॥
স্থিরতর কর কথা তোমরা সকলে ।
রাম কি কারণে মোরে অবতার বলে ॥ ১১০ ॥
এ কথার অর্থ কেহ বুঝিতে নারিল ।
কথার সুগৃঢ় মর্ম কথায় রহিল ॥ ১১১ ॥
কি কব প্রভুর লীলা হৃদে রইল গাঁথা ।
পরে কি হইল শুন মধুর বারতা ॥ ১১২ ॥
গগনে যখন বেলা তৃতীয় প্রহর ।
নিম্নতলে নামিলেন কৃপার সাগর ॥ ১১৩ ॥
ভবন হইতে পরে উদ্যানের পথে ।
সেবাপর ভক্তগণ পাছু পাছু সাথে ॥ ১১৪ ॥
বাগানে ভ্রমেন প্রভু শুনিয়া বারতা ।
নিকটে জুটিল সবে যেবা ছিল যেথা ॥ ১১৫ ॥
আমরা ক-জনে ছিনু গাছের উপর ।
খেলিতেছিলাম ডালে বানর বানর ॥ ১১৬ ॥
দ্রুতপদে উপনীত হইনু সে ঠাঁই ।
সভক্তে বিহারে যেথা জগৎ-গোসাঁই ॥ ১১৭ ॥
দাঁড়াইনু একধারে প্রভুর পশ্চাতে ।
জহরিয়া চাঁপা দুটি ছিল দুই হাতে ॥ ১১৮ ॥
মহাভক্ত শ্রীগিরিশ কাছে শ্রীপ্রভুর ।
সঙ্গে তাঁর কন কথা লীলার ঠাকুর ॥ ১১৯ ॥
আজি মনোহর বেশ প্রভুর আমার ।
বারেক দেখিলে কভু নহে ভুলিবার ॥ ১২০ ॥
পরিধান লালপেড়ে সুতার বসন ।
গায়ে বনাতের জামা সবুজ বরন ॥ ১২১ ॥
সেই কাপড়ের টুপি কর্ণমূল ঢাকা ।
মোজা পায়ে চটি জুতা লতাপাতা আঁকা ॥ ১২২ ॥
শ্রীঅঙ্গের মধ্যে খোলা বদনমণ্ডল ।
কান্তিরূপে লাবণ্যেতে করে ঝলমল ॥ ১২৩ ॥
দারুণ বিয়াধি-ভোগে শীর্ণ কলেবর ।
কিন্তু বয়ানেতে কান্তি বহে নিরন্তর ॥ ১২৪ ॥
মনে হয় অঙ্গ-বাস সব দিয়া খুলি ।
নয়ন ভরিয়া দেখি রূপের পুতুলি ॥ ১২৫ ॥
হঠাৎ দাঁড়াইয়া পথে শ্রীগিরিশে কন ।
তোমরা কি দেখ মোরে কিবা লয় মন ॥ ১২৬ ॥
গিরিশ পাতিয়া জানু বসি পদমূলে ।
করজোড়ে সম্ভাষিয়া প্রভুদেবে বলে ॥ ১২৭ ॥
আমি ছার কি বলিব আপনার কথা ।
শুক ব্যাস বিবরণে পরাভব যেথা ॥ ১২৮ ॥
উত্তর গুনিয়া তবে লীলার ঈশ্বর ।
দাঁড়াইয়া সমাধিস্থ পথের উপর ॥ ১২৯ ॥
পদপ্রান্তে গিয়া মুই এমন সময়ে ।
তোলা দুটি চাঁপা ফুল দিমু দুটি পায়ে ॥ ১৩০ ॥
কিছু পরে বাহ্যচেঁঠা উদিলে শ্রীগায় ।
ভক্তগণে আশীর্বাদ করিলেন রায় ॥ ১৩১ ॥
তুলিয়া দক্ষিণ হস্ত বলিলেন তিনি ।
চৈতন্য হউক আর কি বলিব আমি ॥ ১৩২ ॥
পরে প্রভু ফিরিলেন ভবনের পথে ।
দাঁড়িয়ে আছিনু মুই অনেক তফাতে ॥ ১৩৩ ॥
দূরে থেকে সম্ভাষিয়া কি গো বলি মোরে ।
পরশিয়া হস্ত দিয়া বক্ষের উপরে ॥ ১৩৪ ॥
কানে কিবা বলিলেন আছয়ে স্মরণে ।
মহামন্ত্রবাক্য তাই রাখিনু গোপনে ॥ ১৩৫ ॥
কি দেখিনু কি শুনিনু নহে কহিবার ।
মনোরথ পূর্ণ আজি হইল আমার ॥ ১৩৬ ॥
প্রভুর মহিমা মন কি কব তোমায় ।
রামকৃষ্ণনাম গেয়ে দিন যেন যায় ॥ ১৩৭ ॥
শ্রীনবগোপালে রূপা হৈল তারপর ।
আজি কল্পতরুরূপ লীলার ঈশ্বর ॥ ১৩৮ ॥
উপেন্দ্র মজুমদারে করি পরশন ।
লোহার তাঁহার তনু করিলা কাঞ্চন ॥ ১৩৯ ॥
পরে কৃপা হইল ভ্রাতৃপুত্র রামলালে ।
পরে গিরিশের ভাই অতুল অভুলে ॥ ১৪০ ॥
এ সময়ে ভক্তবৃন্দ উন্মত্ত হইয়া ।
করে আনন্দের ধ্বনি শূন্য বিভেদিয়া ॥ ১৪১ ॥
বিশেষতঃ রামচন্দ্র ভক্ত মহাবলী ।
শ্রীচরণে দেন ফুল অঞ্জলি অঞ্জলি ॥ ১৪২ ॥
পাশেতে দণ্ডায়মান শ্রীহরমোহন ।
প্রভুর সম্মুখে রাম কৈলা আনয়ন ॥ ১৪৩ ॥
বক্ষঃ পরশিয়া তাঁর প্রভুদেব রায় ।
আজি থাক বলিয়া ছাড়িয়া দিল তাঁয় ॥ ১৪৪ ॥
এখানে গিরিশচন্দ্র উন্মত্ত অধিক ।
কে কোথা খুঁজিতে দ্রুত ছুটে চারিদিক ॥ ১৪৫ ॥
পাকশালে গিয়া দেখে রাঁধুনী ব্রাহ্মণ ।
রুটি বেলিবার তরে করে উপক্রম ॥ ১৪৬ ॥
উপাধি গাঙ্গুলী তাঁর নাম নাহি জানি ।
গিরিশ আনিতে তাঁরে করে টানাটানি ॥ ১৪৭ ॥
ভাগ্যবান শ্রীগোচরে হইল আগত ।
পাইল প্রভুর কৃপা আশার অতীত ॥ ১৪৮ ॥
রাশি রাশি কৃপা ঢালি প্রভু ভগবান ।
উপরে দ্বিতলভাগে করিলা পয়ান ॥ ১৪৯ ॥
নিম্নতলে ভক্তদের আনন্দের খেলা ।
এখানে শ্রীঅঙ্গে ওঠে নিদারুণ জ্বালা ॥ ১৫০ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে জ্বালা কেন শুন বিবরণ ।
যে যে পাপীদের আজি করিলা মোচন ॥ ১৫১ ॥
তে সবার জীবনের যত পাপভার ।
সকল লইলা প্রভু অঙ্গে আপনার ॥ ১৫২ ॥
সন্নিকটে রামলালে কন প্রভুরায় ।
শালাদের পাপ লয়ে অঙ্গ জ্বলে যায় ॥ ১৫৩ ॥
করেছে কতই পাপ কিছু নাহি বাকি ।
দে রে এনে গঙ্গাজল সর্ব অঙ্গে মাখি ॥ ১৫৪ ॥
গঙ্গাজলে অঙ্গধানি করিলে মোক্ষণ ।
তবে না হইল পরে জ্বালা-নিবারণ ॥ ১৫৫ ॥
গলায় দারুণ ব্যাধি অন্য কিছু নয় ।
জীবের মোচনকর্মে পাপের সঞ্চয় ॥ ১৫৬ ॥
জগতের পাপরাশি লইয়া গোসাঁই ।
আপনার শ্রীঅঙ্গের মধ্যে দিলা ঠাঁই ॥ ১৫৭ ॥
করুণানিদান হেন কোথা কেবা আর ।
জপ-তপ রামকৃষ্ণপদ কর সার ॥ ১৫৮ ॥
হাজরা প্রতাপচন্দ্র এখন এখানে ।
দিবা রাত্র উপস্থিত আছেন বাগানে ॥ ১৫৯ ॥
কিন্তু যে সময়ে হেথা প্রভু ভগবান ।
দীন হীন কানা খঞ্জে কৈলা কৃপাদান ॥ ১৬০ ॥
অন্যত্রে তখন তেহ গিয়াছে চলিয়া ।
অবিরত বিশ্রামের উদ্যান ছাড়িয়া ॥ ১৬১ ॥
যেমন ঘটনা সাঙ্গ আইল হেথায় ।
শুনিয়া দিনের রঙ্গ করে হায় হায় ॥ ১৬২ ॥
হাজরা তপস্বী এক পিরীত-সাধনে ।
বড়ই সম্ভাব তাঁর নরেন্দ্রের সনে ॥ ১৬৩ ॥
সেইহেতু প্রভুদেবে শ্রীনরেন্দ্র কন ।
হাজরারে করিবারে কৃপাবিতরণ ॥ ১৬৪ ॥
উত্তরে কহিলা রায় এবে নাহি হবে ।
সময়সাপেক্ষ কাজ শেষেতে পাইবে ॥ ১৬৫ ॥
এইমতে মাসাধিক হইল যাপন ।
পুনশ্চ পূর্বের চেয়ে ব্যাধির বিক্রম ॥ ১৬৬ ॥
কিছু দিন ছিল রোগ সাম্য-অবস্থায় ।
এবে সুদে মূলে কর করিল আদায় ॥ ১৬৭ ॥
সবার ভরসা আশা এইবারে দূর ।
হৃদয়ে উদয় হইল যাতনা প্রচুর ॥ ১৬৮ ॥
বৈজ্ঞানিক চিকিৎসক মহেন্দ্র ডাক্তার ।
বিফল-প্রয়াস জ্ঞানে হতাশ এবার ॥ ১৬৯ ॥
ক্ষুণ্ণ মনে ক্ষুণ্ণ প্রাণে ভক্তগণে কন ।
করিলাম যথাসাধ্য অসাধ্য এখন ॥ ১৭০ ॥
যতক্ষণ শ্বাস আশা ততক্ষণ প্রাণে ।
যুক্তি করি পরস্পর অন্যজনে আনে ॥ ১৭১ ॥
বহুবাজারেতে ঘর সুবিজ্ঞ ডাক্তার ।
উপাধিতে দত্ত, নাম রাজেন্দ্র তাঁহার ॥ ১৭২ ॥
ব্যাধিবিৎ কবিরাজ ডাক্তার প্রভৃতি ।
আশে পাশে চারিদিকে শহরে বসতি ॥ ১৭৩ ॥
কতই আসিল তার সংখ্যা নাহি হয় ।
করিতে নারিল কেহ রোগের নির্ণয় ॥ ১৭৪ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব শাস্ত্রাদির পারে ।
তেমতি নিদানাতীত বিয়াধি শরীরে ॥ ১৭৫ ॥
রাজেন্দ্র করিল বটে আরম্ভ চিকিৎসা ।
মনে জানে আরোগ্যের নাহি কোন আশা ॥ ১৭৬ ॥
গলার ভিতরে ছিল বাসা বিয়াধির ।
এখন বহিরভাগে হইল বাহির ॥ ১৭৭ ॥
প্রভুর দারুণ ব্যাধি দারুণ যন্ত্রণা ।
তথাপি তাঁহার নাই তিলেক ভাবনা ॥ ১৭৮ ॥
হাস্যাননে সঙ্গ কষ্ট নহে বিমরষ ।
দেহেতে অসুখভোগ মনেতে হরষ ॥ ১৭৯ ॥
রঙ্গের বিরাম নাই চলে অবিরল ।
শুন রামকৃষ্ণকথা শ্রবণমঙ্গল ॥ ১৮০ ॥
প্রত্যক্ষে কি অন্তরীক্ষে প্রভু ভগবান ।
সতত ভক্তের সঙ্গে বেড়িয়া বেড়ান ॥ ১৮১ ॥
প্রত্যক্ষ আগোটা লীলা রামকৃষ্ণায়ন ।
অন্তরীক্ষে কিবা খেলা করহ শ্রবণ ॥ ১৮২ ॥
অনেক ফলের বৃক্ষ উদ্যানভিতরে ।
উদ্যান-স্বামীর সব আছে অধিকারে ॥ ১৮৩ ॥
প্রত্যেক ফলের গাছ বাগানে অনেক ।
কিন্তু খেজুরের গাছ খালি মাত্র এক ॥ ১৮৪ ॥
সেই গাছে এ সময়ে দিয়েছিল তাড়ি ।
বিকালে ঝুলায়ে দিত মেথিদেশে হাঁড়ি ॥ ১৮৫ ॥
গোটা রাতি জমে রস হাঁড়ির ভিতরে ।
নামাইয়া লয় মালি খুব ভোরে ভোরে ॥ ১৮৬ ॥
জিরান-কাটের রস তৃপ্তি রসনায় ।
বড়ই সুমিষ্ট তার বড়ই সুতার ॥ ১৮৭ ॥
নিরঞ্জন একদিন সঙ্গীদের সনে ।
পরামর্শ করিলেন গোপনে গোপনে ॥ ১৮৮ ॥
নিশীথ অতীতে হাঁড়ি লইবে পাড়িয়া ।
পান করিবে রস সকলে মিলিয়া ॥ ১৮৯ ॥
রাত্রিকালে সবে মিলি যান একত্তরে ।
গাছের নিকটে রস চুরি করিবারে ॥ ১৯০ ॥
নিজের মহলে হেথা মাতাঠাকুরানী ।
জাগিয়া থাকেন প্রায় আগোটা যামিনী ॥ ১৯১ ॥
যোগাইতে দ্রব্যচয় সময়ের আগে ।
প্রভুর সেবার হেতু কখন কি লাগে ॥ ১৯২ ॥
দেখিতে পাইলা মাতা জগৎজননী ।
নিরঞ্জনাদির সঙ্গে শ্রীপ্রভু আপনি ॥ ১৯৩ ॥
শরীরে দারুণ ব্যাধি নাহি কোন ডর ।
বেড়িয়া বেড়ান গোটা উদ্যান-ভিতর ॥ ১৯৪ ॥
কিন্তু প্রভুদেব হেথা নিজের শয্যায় ।
অন্য ভক্তদ্বয় কাছে হাজির সেবায় ॥ ১৯৫ ॥
এখানেতে নিরঞ্জন সঙ্গীদের সনে ।
আগোটা বাগান ঘোরে বৃক্ষ অন্বেষণে ॥ ১৯৬ ॥
সেই সে বাগান যার প্রতি ঠাঁই জানা ।
খেজুর গাছের আজি না পান ঠিকানা ॥ ১৯৭ ॥
ঘুরিয়া ঘুরিয়া সবে ক্লান্ত-কলেবর ।
পশ্চাতে বুঝিল ইহা প্রভুর রগড় ॥ ১৯৮ ॥
পীড়াতেও নাহি ক্ষান্ত রঙ্গ অবিরাম ।
গুন রামকৃষ্ণলীলা প্রাণের আরাম ॥ ১৯৯ ॥
কাল-পাগলিনী যিনি বারনারী জেতে ।
প্রভুকে ভঙ্গিতে চায় মধুর ভাবেতে ॥ ২০০ ॥
এবে তেঁহ উন্মাদিনী প্রভুর লাগিয়া ।
উদ্যানের মধ্যে আসে ছুটিয়া ছুটিয়া ॥ ২০১ ॥
আশা মনে একমাত্র প্রভুদরশন ।
তাড়া করে লাঠি হাতে নিত্যনিরঞ্জন ॥ ২০২ ॥
চরণ ছাঁদিয়া তাঁর কাল-পাগলিনী ।
কাকুতি মিনতি করে লুটায়ে অবনী ॥ ২০৩ ॥
কোনমতে নিরঞ্জন নাহি দেন যেতে ।
বরঞ্চ প্রহার করে ধরিয়া ঝুটিতে ॥ ২০৪ ॥
কোম্পানির পথে দিলা করিয়া বাহির ।
দাঁড়াইয়া রহে বহে দুনয়নে নীর ॥ ২০৫ ॥
মরি কিবা অনুরাগ প্রভুর চরণে ।
এ জনার পদরেণু ভিক্ষা করে দীনে ॥ ২০৬ ॥
তখন অবজ্ঞা-ভাব করিয়া তাহারে ।
জনমের মত খেদ রাখিনু অন্তরে ॥ ২০৭ ॥
যে হোক সে হোক যার প্রভুপদে মতি ।
সার্থক জীবন তাঁর চরণে প্রণতি ॥ ২০৮ ॥
হোক বেশ্যা বারাঙ্গনা হীন হেয়াচার ।
রামকৃষ্ণ-ভক্তি যেথা আরাধ্য আমার ॥ ২০৯ ॥
ভক্তের ভজনা কর ভক্তি মাত্র ধন ।
ভজ ভক্ত পূজ ভক্ত ভক্তির কারণ ॥ ২১০ ॥
ভক্ত
মাত্রে এক জাতি সামাজিকে নানা ।
সুবর্ণ অধম অঙ্গে তবু তাহা সোনা ॥ ২১১ ॥
ভক্তির আধার পাত্র প্রভুর আলয় ।
শ্রদ্ধেয় প্রপূজনীয় যেখানে না রয় ॥ ২১২ ॥
রমণী নামক বেশ্যা দক্ষিণশহরে ।
বাৎসল্যের চক্ষে দেখে প্রভু গুণধরে ॥ ২১৩ ॥
মা বলিয়া তাহারে সন্তাষে প্রভুবর ।
ব্রাতা পাতা জগতের অখিল-ঈশ্বর ॥ ২১৪ ॥
কি বড় ভাগ্যের কথা বুঝে দেখ মন ।
বিশ্বে ভাগ্যবতী হেন আছে কয়জন ॥ ২১৫ ॥
চাউল-কলাই-ভাজা লুকায়ে বসনে ।
রমণী প্রভুর হাতে দিত সযতনে ॥ ২১৬ ॥
ফুল্লমনে পদ্মাননে হাস্যসহকার ।
সাদরে গ্রহণ প্রভু কৈলা কতবার ॥ ২১৭ ॥
কার সঙ্গে রমণীর তুল্য ত্রিভুবনে ।
চরণের রেণু আশ করে এ অধমে ॥ ২১৮ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি অমৃত-ভাণ্ডার ।
শ্রবণ-কীর্তনে ভব-জলধিতে পার ॥ ২১৯ ॥
সংসারের সুখ দুঃখে পেতে দিয়া ছাতি ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ২২০ ॥
পঞ্চম খণ্ড
প্রভু কর্তৃক অন্তরঙ্গগণের বাসনাপূরণ ও ভক্তগণ কর্তৃক মঠস্থাপন
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
প্রভুর দারুণ ব্যাধি শরীরের মাঝে ।
তালে টানে মন কিন্তু বাঁধা আছে কাজে ॥ ১ ॥
অবিরত মহালীলা চলিছে কেবল ।
বরষায় দিনেরেতে করে যেন জল ॥ ২ ॥
এই জল রহে লীলা ক্ষেত্র-সরোবরে ।
যাহাতে প্রচারাবাদ হইলেক পরে ॥ ৩ ॥
ছদ্মবেশ অবতার বড়ই গোপন ।
জানিতে না দেন কারে তিনি কোন্ জন ॥ ৪ ॥
মায়া-পরিচ্ছদে ঢাকা স্বরূপত্ব আছে ।
তিলে তিলে ভয় তার জানে কেহ পাছে ॥ ৫ ॥
আপনে প্রচারে হাত নাহি দিলা রায় ।
পশ্চাতে প্রচার কৈলা ভক্তের দ্বারায় ॥ ৬ ॥
সেই মহা কর্মে যাহা যাহা প্রয়োজন ।
তাহার উদ্যোগ প্রভু করেন এখন ॥ ৭ ॥
অপরে বুঝিতে তত্ত্ব লাগে মহা ধাঁধা ।
সে বুঝে যাহার মন ভক্ত-পদে বাঁধা ॥ ৮ ॥
পূর্বে বলিয়াছি আমি প্রভুর সেবায় ।
যা লাগে সংসারী ভক্তে সকল যোগায় ॥ ৯ ॥
সংসারীর যতই না থাক ঘরে ধন ।
ব্যয়েতে কাতর সদা হয় বিলক্ষণ ॥ ১০ ॥
সংসারীর টাকাকড়ি বুকের শোণিত ।
কাণাকড়ি-ব্যয়ে হয় বড়ই ক্ষোভিত ॥ ১১ ॥
প্রভুর সেবায় রত যে যে ভক্তগণ ।
সকলের চেয়ে ঘরে সুরেন্দ্রের ধন ॥ ১২ ॥
বাদ বাকি অন্য সবে হাতে পেটে খায় ।
সঞ্চয় রাখিবে কিবা ব্যয় না কুলায় ॥ ১৩ ॥
জীবিকা নির্বাহ শ্রমে নাহি জমিদারি ।
কমিয়ে ঘরের ব্যয় হেথা দেয় কড়ি ॥ ১৪ ॥
সংসার-তিয়াগী যাঁরা প্রভুর সেবনে ।
সেবা-হেতু শ্রীপ্রভুর কাছে রেতেদিনে ॥ ১৫ ॥
প্রভু বিনা যাঁহাদের আর কিছু নাই ।
খরচের টাকা থাকে তাঁহাদের ঠাই ॥ ১৬ ॥
সকলে কুমারবয়ঃ তিয়াগ-প্রকৃতি ।
মোটেই জানে না কিবা সংসারের রীতি ॥ ১৭ ॥
বিষয়-বুদ্ধির গন্ধ জানে না কেমন ।
কোলে ছিল মা-বাপের সেবায় এখন ॥ ১৮ ॥
কোন কোন বিষয়ে অধিক ব্যয় করে ।
সংসারীরা সহ্য তাহা করিতে না পারে ॥ ১৯ ॥
উদ্যানেতে ব্যয়াধিক্য দেখিয়া গৃহীরা ।
একত্তরে পরামর্শ করে যোগ্য যাঁরা ॥ ২০ ॥
রামচন্দ্র কালীপদ সুরেন্দ্র এ তিনে ।
বলিলেন সেবাপর কুমারের গণে ॥ ২১ ॥
করিতেছ অপব্যয় শোভা নাহি পায় ।
হিসাব রাখিতে হবে তুলিয়া খাতায় ॥ ২২ ॥
হুট্কো গোপাল প্রায় উদ্যানেতে থাকে ।
কথামত ব্যয়ের হিসাব-পত্র রাখে ॥ ২৩ ॥
গৃহীরা আসিয়া দেখে সময় সময় ।
কোন্ মাসে কোন্ কর্মে কত হয় ব্যয় ॥ ২৪ ॥
এইবার ব্যয় দেখে হয় হুলস্থূল ।
মূল তার হিসাবেতে ঠিকে ছিল ভুল ॥ ২৫ ॥
সেই হেতু কালীপদ দানা আখ্যা যাঁর ।
হুট্কো গোপালে করে মিষ্ট তিরস্কার ॥ ২৬ ॥
তুমুল হইল দ্বন্দ্ব ক্রমে পরিশেষে ।
নরেন্দ্রে বিদিত তাহা কৈল পরমেশে ॥ ২৭ ॥
নরেন্দ্রে দেখিয়া ক্ষুণ্ণ কন প্রভুরায় ।
চল্ আমি যাব তোরা যাইবি যেথায় ॥ ২৮ ॥
যেখানে থাকিবি তোরা সেইখানে রব ।
যেমন রাখিবি মোরে তেমতি থাকিব ॥ ২৯ ॥
নরেন্দ্র বলেন স্কন্ধে তোমায় লইয়া ।
রাখিব খাওয়াব ভিক্ষা দুয়ারে মাগিয়া ॥ ৩০ ॥
এত শুনি গুণমণি কন আর বার ।
গৃহীদের টাকাকড়ি লইও না আর ॥ ৩১ ॥
টানিয়া লইব না কি ইন্দ্রনারায়ণে ।
প্রচুর সম্পত্তি ধন তাহার ভবনে ॥ ৩২ ॥
কিছুক্ষণ বিচারিয়া পুনঃ প্রভু কন ।
কাজ নাই করে ইন্দ্র যবনী-গমন ॥ ৩৩ ॥
তারপর বলিলেন হৃদয়বিহারী ।
ডাকিয়া আনহ সেই খোট্টা মারোয়াড়ী ॥ ৩৪ ॥
খোট্টা মারোয়াড়ী এক ধনের ঈশ্বর ।
বড়বাজারেতে তার অট্টালিকা ঘর ॥ ৩৫ ॥
বহু কাল হইতে বাসনা মনে মনে ।
যোগাইতে অর্থপাতি প্রভুর সেবনে ॥ ৩৬ ॥
ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু প্রভু ভগবান ।
পুরাতে বাসনা তাঁর করিলেন নাম ॥ ৩৭ ॥
খবর পাইয়া সেই খোট্টা মারোয়াড়ী ।
গোচরে হাজির সঙ্গে লয়ে টাকাকড়ি ॥ ৩৮ ॥
সম্মুখে দেখিয়া টাকা প্রভুদেব কন ।
আমি না করিব তব কাঞ্চন গ্রহণ ॥ ৩৯ ॥
করজোড়ে কহে তেঁহ বিনয়বচনে ।
আনিয়াছি মহারাজ তোমার কারণে ॥ ৪০ ॥
ফিরিয়া লইয়া যাই শক্তি নাই গায় ।
এত বলি টাকা রাখি ফিরিয়া পালায় ॥ ৪১ ॥
সম্মুখে টাকার গাদা দেখি প্রভূবর ।
ভক্তগণে আজ্ঞা শীঘ্র কর স্থানান্তর ॥ ৪২ ॥
যথা আজ্ঞা সেবকেরা চলিলা সত্ত্বরে ।
রাখিয়া আসিল কাছে মহিমের ঘরে ॥ ৪৩ ॥
ব্যয়ের কি হবে তবে বিচারিয়া মনে ।
গিরিশে ডাকিতে আজ্ঞা হৈল সেইক্ষণে ॥ ৪৪ ॥
মহাভক্ত শ্রীগিরিশ বিশ্বাসের বীর ।
বারতা পাইয়া হৈল গোচরে হাজির ॥ ৪৫ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া তবে সব বিবরণ ।
প্রভুর সম্মুখে তেঁহ করিলেন পণ ॥ ৪৬ ॥
একা যোগাইব ব্যয় ভয় কিবা তায় ।
নহি ভীত যদি মোর ভিটামাটি যায় ॥ ৪৭ ॥
গিরিশের বাক্যে হয়ে সাহসে পূর্ণিত ।
সেই সঙ্গে কৈলা পণ সেবকেরা যত ॥ ৪৮ ॥
গৃহিগণে দরশনে আসিতে না দিব ।
লাঠি-সোটা লয়ে দ্বারে প্রহরী থাকিব ॥ ৪৯ ॥
যুক্তিমত পর দিনে নিত্যনিরঞ্জন ।
বসিলেন দ্বারদেশ রক্ষার কারণ ॥ ৫০ ॥
মহাবীর বলবান লাঠি-সোটা হাতে ।
মাথায় পাগড়ী বাঁধা সুন্দর দেখিতে ॥ ৫১ ॥
চিরুণি আরশি সঙ্গে রামায়ণপুঁথি ।
ভোজপুরী দ্বারীদের যে প্রকার রীতি ॥ ৫২ ॥
দ্বিতলে যাইতে আর নাহি দেন কারে ।
দরশনে আসে যারা সবে যায় ফিরে ॥ ৫৩ ॥
ক্রমান্বয়ে তিন দিন ফিরিল সুরেন্দ্র ।
কতবার ফিরিলেন ভক্ত রামচন্দ্র ॥ ৫৪ ॥
অতুল ফিরিয়া গেলা গিরিশের ভাই ।
ছোটখাট কত ফিরে সংখ্যা সীমা নাই ॥ ৫৫ ॥
শ্রীঅতুল অভিমানে করিলেন পথ ।
আটক করিল দ্বারে নিত্যনিরঞ্জন ॥ ৫৬ ॥
যদি তেঁহ আপনি আসিয়া মোর ঘরে ।
ডাকিয়া লইয়া যায় প্রভুর গোচরে ॥ ৫৭ ॥
তবে যাব নৈলে আর এ জনমে নয় ।
এই দৃঢ় পণ মোর রহিল নিশ্চয় ॥ ৫৮ ॥
রাম ও সুরেন্দ্রের দুয়ে বিষাদিত মন ।
সুরেন্দ্র নির্জনে করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৫৯ ॥
গম্ভীরাত্মা রামচন্দ্র ভিতরে গুমরে ।
মনোদুঃখ সহসা প্রকাশ নাহি করে ॥ ৬০ ॥
অন্তরে বুঝিয়া তত্ত্ব প্রভু ভক্ত-প্রাণ ।
ডাকাইলা উভয়ে আপন সন্নিধান ॥ ৬১ ॥
সামঞ্জস্য করিয়া দিলেন পরস্পর ।
গৃহি সন্ন্যাসীতে এই থেকে মনান্তর ॥ ৬২ ॥
কেমন কৌশলচক্র দেখহ প্রভুর ।
ভক্তমাত্রে সকলের সমান ঠাকুর ॥ ৬৩ ॥
স্মরণ করহ কিবা প্রভুর বচন ।
চাঁদামামা সকলের একা কারও নন ॥ ৬৪ ॥
গৃহী সন্ন্যাসীতে দুয়ে সমান আদর ।
মধ্যে বাধাইয়া দ্বন্দ্ব করিলা রগড় ॥ ৬৫ ॥
এই দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে প্রচারে পোষ্টাই ।
প্রভুর মতন চক্রী ত্রিভুবনে নাই ॥ ৬৬ ॥
এখানে অতুলকৃষ্ণ ঘরে অভিমানে ।
এক দিন কন কভু নিত্যনিরঞ্জনে ॥ ৬৭ ॥
যাও তুমি একবার গিরিশের ঘরে ।
অতুলে ডাকিয়া আন হাত দেখিবারে ॥ ৬৮ ॥
নাড়ীজ্ঞান ব্যাধিজ্ঞান এত অতুলের ।
যেন তেঁহ ধন্বন্তরি বেশে মানুষের ॥ ৬৯ ॥
আজ্ঞামাত্র ধাইলেন নিত্যনিরঞ্জন ।
শুনিয়া অতুলকৃষ্ণ পুলকিত-মন ॥ ৭০ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ কিবা বুঝিয়া অন্তরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত হইলা গোচরে ॥ ৭১ ॥
ভিতরের কাণ্ড কিবা নিজে বুঝ মন ।
বেদাধিক গুরুতর রামকৃষ্ণায়ন ॥ ৭২ ॥
মুরুব্বী গোপাল সিঁতিগ্রামে ঘর যাঁর ।
চীনেবাজারেতে যাঁর ছিল কারবার ॥ ৭৩ ॥
সন্তানাদি বনিতার বিয়োগের পরে ।
মহেন্দ্র আনিলা তাঁয় প্রভুর গোচরে ॥ ৭৪ ॥
দরশনে শ্রীচরণে বাঁধা পড়ে মন ।
সন্নিধানে রহে করে প্রভুর সেবন ॥ ৭৫ ॥
হাতে ছিল টাকাকড়ি ইচ্ছা এবে মনে ।
বস্ত্র কিনে বিতরণ করে সাধুজনে ॥ ৭৬ ॥
গঙ্গাসাগরীয় যাত্রী বহু এইকালে ।
অতিথি সন্ন্যাসী নাগা শহর অঞ্চলে ॥ ৭৭ ॥
সেই সবে নব বস্ত্র দানের ইচ্ছায় ।
অনুমতি-হেতু তেঁহ কহিলেন রায় ॥ ৭৮ ॥
প্রভুদেব দেখাইয়া সেবকের গণে ।
বলিলেন দাও যদি দাও এইখানে ॥ ৭৯ ॥
এমন সুন্দর সাধু ভুবনে বিরল ।
অকলঙ্ক তনু ঘটে ভরা গঙ্গাজল ॥ ৮০ ॥
শুনিয়া গোপাল তবে প্রভুর বচন ।
কিনিয়া আনিল বস্ত্র মনের মতন ॥ ৮১ ॥
গেরুয়ার রঙে বস্ত্র সব ছোবাইলা ।
সেই সঙ্গে ছড়া রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ৮২ ॥
বস্ত্র মালা একত্রেতে গোপাল এখানে ।
হাজির করিয়া দিলা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৮৩ ॥
সন্ন্যাসের উপযুক্ত যে যে ভক্তগণ ।
প্রত্যেকে বসন মালা কৈলা বিতরণ ॥ ৮৪ ॥
একখানি বস্ত্র বাকি থাকে অবশেষে ।
পর দিনে দান কৈলা শ্রীগিরিশ ঘোষে ॥ ৮৫ ॥
গিরিশ সংসারী যদি মনে ত্যাগ তাঁর ।
সংসারে আছেন নাই অন্তরে সংসার ॥ ৮৬ ॥
শ্রীগিরিশ সত্য মিথ্যা উভয়ের পারে ।
প্রভুর আশিস এই তাঁহার উপরে ॥ ৮৭ ॥
একবার কন প্রভু কথোপকথনে ।
গিরিশের আছে যোগ এ দেহের সনে ॥ ৮৮ ॥
যোগী ভোগী দুই তেঁহ অপূর্ব-প্রকৃতি ।
গিরিশে না পাওয়া যায় মানুষের রীতি ॥ ৮৯ ॥
কোথাকার এই সব ভক্তনামধারী ।
সদা সঙ্গে অদ্যাপিহ বুঝিতে না পারি ॥ ৯০ ॥
হায় প্রভু কবে মোর ফুটাবে নয়ন ।
পুজা করি ভক্ত-পদ জুড়াব জীবন ॥ ৯১ ॥
গৃহী কি সন্ন্যাসী দু য়ে দীনের মিনতি ।
তোমা সবাকার পদে রহে যেন মতি ॥ ৯২ ॥
প্রভুর অবস্থা এবে বর্ণনার নয় ।
তেমন সুন্দর তনু দিনে দিনে ক্ষয় ॥ ৯৩ ॥
এ সময়ে দুগ্ধমাত্র কেবল আহারে ।
এক পোয়া দিলে যায় ছটাক উদরে ॥ ৯৪ ॥
বদনের কান্তি কিবা মনের আনন্দ ।
তিলেকের তরে নাই এক তিল বন্ধ ॥ ৯৫ ॥
বিয়াধি অসাধ্য কেহ কহিলে গোচরে ।
উত্তর প্রভুর এই আনন্দের ভরে ॥ ৯৬ ॥
"পীড়া জানে দেহ জানেরে আমার মন ।
অবিরত রহ তুমি আনন্দে মগন" ॥ ৯৭ ॥
দেহাতীত মনখানি প্রভুর আমার ।
অনুগত বশীভূত ইচ্ছামত তাঁর ॥ ৯৮ ॥
জীবের কল্যাণে মাত্র দেহেতে কদর ।
দয়াতে রাখেন দেহ দয়ার সাগর ॥ ৯৯ ॥
মহানন্দময় নিজে আনন্দের খনি ।
প্রভুর বারতা প্রভু জানেন আপনি ॥ ১০০ ॥
বিষণ্ণ হইতে তিনি নাহি দেন কারে ।
দেখিলে আনন্দ তাঁর বহে শতধারে ॥ ১০১ ॥
ভকত-রঞ্জন ভাব প্রাবল্যের বলে ।
ভক্তবর্গ ভাসে সদা আনন্দ-সলিলে ॥ ১০২ ॥
আনন্দে নরেন্দ্রনাথ সহচর সনে ।
কাটেন রজনী গোটা সাধন-ভজনে ॥ ১০৩ ॥
দিনমানে গীত-বাদ্য অবিরত চলে ।
সতত আনন্দে মগ্ন প্রভুর কৌশলে ॥ ১০৪ ॥
প্রভুর গলার হার অন্তরঙ্গগণে ।
তাঁহারাও চিরদাস প্রভুর চরণে ॥ ১০৫ ॥
প্রাণে প্রাণে টানাটানি প্রেম-সমন্বিত ।
পরস্পর পরস্পরে বিরামরহিত ॥ ১০৬ ॥
আঁখির আড়ালে যদি তিলেকের তরে ।
তাহাও বিরহ হেন ভাব পরস্পরে ॥ ১০৭ ॥
গৃহীরা সংসারকর্মে রহে স্থানান্তর ।
মনখানি কিন্তু হেথা প্রভুর গোচর ॥ ১০৮ ॥
অহেতুক ভালবাসা কর্ম স্বার্থহীনে ।
প্রত্যক্ষ দেখিহ আগে শুনা ছিল কানে ॥ ১০৯ ॥
আগোটা লীলার মধ্যে প্রভু অবতারে ।
দেখা শুনা হৈল যাহা উদ্যান ভিতরে ॥ ১১০ ॥
অতিশয় গুহ তত্ত্ব কহিবার নয় ।
অবাক হইনু দেখে এমন কি হয় ॥ ১১১ ॥
যে সকল এ ধরার নহে কারখানা ।
একমাত্র ভক্তে আর ভগবানে জানা ॥ ১১২ ॥
দেন প্রভু ভুঞ্জে ভক্ত প্রেমানন্দরোল ।
অন্তরে অন্তরে স্রোত বাহে নাহি গোল ॥ ১১৩ ॥
লোকের বাজার নাই এখন গোচরে ।
দেখিয়া দারুণ ব্যাধি সবে গেছে সরে ॥ ১১৪ ॥
সন্দেহ উদয় মনে তাঁদের এবার ।
দারুণ বিয়াধি কেন যদি অবতার ॥ ১১৫ ॥
নানা জনে নানা ভাবে নানা কথা কয় ।
গুনিলে স্মরিলে পরে বিদরে হৃদয় ॥ ১১৬ ॥
কলুষ-মানুষ বুদ্ধি দোষ কিবা তায় ।
এসেছিল দূরে গেল প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১১৭ ॥
লীলা-অবসান-কাল দেখিয়া গোসাঁই ।
করিলেন অন্তরঙ্গগণের বাছাই ॥ ১১৮ ॥
তে সবারে একত্তরে লইয়া নির্জনে ।
নিগঢ় ঈশ্বর-তত্ত্ব কন সঙ্গোপনে ॥ ১১৯ ॥
অন্তরঙ্গের মধ্যে দ্বিবিধ প্রকৃতি ।
কেহ কেহ ত্যাগী কেহ গৃহস্থের জাতি ॥ ১২০ ॥
ভাব-ভেদে উভয়ের ভিন্ন উপদেশ ।
যাহে হবে উভয়ের মঙ্গল অশেষ ॥ ১২১ ॥
প্রভুর কৌশল এক ইহার ভিতরে ।
জানিতে না দেন কিবা উপদেশ কারে ॥ ১২২ ॥
তাঁরে দেন সেই রস লীলার ঈশ্বর ।
যে রস যাহার পক্ষে পরিপুষ্টকর ॥ ১২৩ ॥
কাহারে বা দেন ধরা সময়-বিশেষে ।
রূপান্তর-প্রদর্শন সন্দেহ-বিনাশে ॥ ১২৪ ॥
শুন দিনেকের কথা অপূর্ব কাহিনী ।
শ্রীঅতুল গিরিশের সহোদর যিনি ॥ ১২৫ ॥
নাড়ীজ্ঞান বড় তাঁর সেই সে কারণে ।
প্রভুর প্রবল পীড়া দেখি এক দিনে ॥ ১২৬ ॥
সেবাপর ভক্তগণে কহিলেন তাঁয় ।
থাকিতে প্রভুর কাছে রেতের বেলায় ॥ ১২৭ ॥
দিবাভাগে এই কথা করিয়া স্বীকার ।
অতুল চলিয়া যান ঘরে আপনার ॥ ১২৮ ॥
পান-ভোজনাদি কর্ম রাজির মতন ।
ঝটীতি ভবনে সব কৈলা সমাপন ॥ ১২৯ ॥
অতীত হইলে রাত্রি প্রহরেক প্রায় ।
উদ্যানাভিমুখে আসে শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ১৩০ ॥
পথিমধ্যে ভক্তবর করে মনে মনে ।
শুভ রাত্রি যাবে আজি প্রভুর সেবনে ॥ ১৩১ ॥
মহাভাগ্যবান বিনা ভাগ্যে ঘটে কার ।
বিশ্বপতি শ্রীপ্রভুর সেবা-অধিকার ॥ ১৩২ ॥
এতেকাভিমান মনে উল্লাস সহিত ।
আন্দোলন করিতে করিতে উপনীত ॥ ১৩৩ ॥
যেখানে শ্রীপ্রভুদেব উদ্যান-ভিতরে ।
রাত্রি বেশী তালাবন্ধ ফটকের দ্বারে ॥ ১৩৪ ॥
দুয়ার হইতে তেঁহ করেন চীৎকার ।
সব স্তব্ধ সাড়া শব্দ নাহি মিলে কার ॥ ১৩৫ ॥
দারুণ মাঘের শীতে হিমানী বিস্তর ।
ঠাণ্ডা বায়ে শ্রীঅতুল কাঁপে থর থর ॥ ১৩৬ ॥
পূর্বেকার সুখ আশা সব হৈল দূর ।
তাহার বদলে হৃদে যাতনা প্রচুর ॥ ১৩৭ ॥
নানাবিধ চিন্তা ভাবে আকাশ-পাতাল ।
মাঝে মাঝে ডাকে ডাক না পায় নাগাল ॥ ১৩৮ ॥
হেনকালে শুন কিবা কৌশল প্রভুর ।
বাহির হইতে এক আসিল কুকুর ॥ ১৩৯ ॥
দ্রুতগতি ফটকের সরু ছিদ্র দিয়া ।
তিলেকের মধ্যে গেল উদ্যানে ঢুকিয়া ॥ ১৪০ ॥
অতুল চৈতন্যবান প্রভুর কৃপায় ।
সুপণ্ডিত ঘটনা পঠন-শক্তি গায় ॥ ১৪১ ॥
উদ্দেশিয়া প্রভুরায় মরম-বেদনা ।
জানাইয়া সেইক্ষণে করেন প্রার্থনা ॥ ১৪২ ॥
অধম হইনু প্রভু কুকুর হইতে ।
সে গেল ভিতরে মুই দাঁড়াইয়া পথে ॥ ১৪৩ ॥
হাজার ধিকার হেন দিয়া আপনাকে ।
দ্বার মুক্ত-হেতু এই শেষ ডাক ডাকে ॥ ১৪৪ ॥
শুনিতে পাইয়া তাহা মুরুব্বী গোপাল ।
ফটক খুলিয়া দিল ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ১৪৫ ॥
উদ্যানে প্রবেশ করি যান ধীরে ধীরে ।
প্রভুর যেখানে শয্যা দ্বিতল-উপরে ॥ ১৪৬ ॥
দেখিলেন মহাভক্ত শ্রীশশী ঠাকুর ।
দাঁড়াইয়া করে পাখা শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ॥ ১৪৭ ॥
মাছি মশা চালাইতে পাখার চালনা ।
শীত ঋতু এবে নাই গ্রীষ্মের তাড়না ॥ ১৪৮ ॥
আর এক পাশে লাটু ঘুমে অচেতন ।
গোটা রাতি জ্বলে বাতি গরম ভবন ॥ ১৪৯ ॥
অতুলে দেখিয়া শশী পাখা দিয়া তাঁয় ।
বিশ্রামের হেতু নীচে লইলা বিদায় ॥ ১৫০ ॥
শয্যায় শ্রীপ্রভুদেব নাহি নড়াচড়া ।
আপাদ-মস্তক গোটা বালাপোষে মোড়া ॥ ১৫১ ॥
কিছু পরে শ্রীঅতুল করে দরশন ।
প্রভুর গা ফুটে উঠে উজ্জ্বল কিরণ ॥ ১৫২ ॥
গাত্র আবরণখানি স্বচ্ছ নিরমল ।
দেখা যায় গোটা অঙ্গ করে ঝলমল ॥ ১৫৩ ॥
কিরণে উত্তপ্ত গৃহ হইল বহুল ।
শীতবস্ত্র জোড়া শাল খুলিল অতুল ॥ ১৫৪ ॥
খুলিয়া রাখিতে শাল সময় ক্ষণেকে ।
অন্য দিকে গেল দৃষ্টি ছাড়িয়া প্রভুকে ॥ ১৫৫ ॥
এই অবসরমধ্যে শুন বিবরণ ।
কি হইল শ্রীঅঙ্গের পটের বর্তন ॥ ১৫৬ ॥
শ্রীপ্রভুর এক অঙ্গ ভাগে আধা আধা ।
দক্ষিণাঙ্গে কৃষ্ণরূপ বাম অঙ্গে রাধা ॥ ১৫৭ ॥
কৃষ্ণাঙ্গে নীলিমাকান্তি নয়ন-রঞ্জন ।
রাধা অঙ্গ ঢল ঢল সোনার বরন ॥ ১৫৮ ॥
তখন অতুলকৃষ্ণ নিরখি ব্যাপার ।
বুঝিলেন এ আমার মাথার বিকার ॥ ১৫৯ ॥
মস্তিষ্কে প্রবল ঊনপঞ্চাশের বাই ।
মনে করে এইবারে লাটু কে উঠাই ॥ ১৬০ ॥
ভয়ে দেহে ঝরে ঘাম অন্তর সভীত ।
হেনকালে শরৎ উপরেতে উপনীত ॥ ১৬১ ॥
অমনি শ্রীপ্রভুদেব লীলার ঈশ্বর ।
নাড়া দিয়া খুলিলেন মুখের কাপড় ॥ ১৬২ ॥
অতুলে দেখিয়া তবে করেন জিজ্ঞাসা ।
তুমি যে গো এখানে কখন হৈল আসা ॥ ১৬৩ ॥
নীচে গিয়া বিশ্রাম করহ এইবারে ।
শরৎ আমার নিকট থাকিবে উপরে ॥ ১৬৪ ॥
মরি কি প্রভুর রঙ্গ স্বগণসহিত ।
সুধার-আসার রামকৃষ্ণ লীলা-গীত ॥ ১৬৫ ॥
একদিন গৃহত্যাগী ভক্তগণে কন ।
তোদের ভিক্ষার অন্ন ভোজনেতে মন ॥ ১৬৬ ॥
স্নেহ-প্রেমপরিপূর্ণ শ্রীবাক্য শুনিয়া ।
নাচিতে লাগিলা সবে উল্লাসে ভরিয়া ॥ ১৬৭ ॥
প্রধান নরেন্দ্রনাথ বাল মহেশ্বর ।
পরদিন প্রাতঃকালে সঙ্গে সহচর ॥ ১৬৮ ॥
আনন্দ-অন্তর তবে সাজিলা ভিক্ষায় ।
প্রথমে মাগিয়া ভিক্ষা গুরুদারা মায় ॥ ১৬৯ ॥
জগৎপালিকা দেবী জগৎ-জননী ।
ভিক্ষাপাত্রে যোল-আনা দিলেন আপনি ॥ ১৭০ ॥
উদ্যান হইতে পরে বাহির হইয়া ।
দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা আনিলা মাগিয়া ॥ ১৭১ ॥
তামা-রূপা তণ্ডুলাদি ভিক্ষার জিনিস ।
নয়নে দেখিয়া প্রভু পরম হরিষ ॥ ১৭২ ॥
সেই তণ্ডুলের মণ্ড তরল তরল ।
খাইয়া বলেন প্রভু পরান শীতল ॥ ১৭৩ ॥
ঈশ্বরের নরলীলা যাই বলিহারী ।
শুক ব্যাস ভাগবত বর্ণনাধিকারী ॥ ১৭৪ ॥
কি করিতে পারি মুই অতি তুচ্ছ ছার ।
বিদ্যা-বুদ্ধিহীন হেয় দাস অবিদ্যার ॥ ১৭৫ ॥
রাজেন্দ্র ডাক্তার করে চিকিৎসা এখন ।
উপশম নহে ব্যাধি পূর্বের মতন ॥ ১৭৬ ॥
দিন দিন তনু ক্ষীণ আকার বিকার ।
ভক্তগণে আনাইলা সাহেব ডাক্তার ॥ ১৭৭ ॥
ব্যাধি পরীক্ষিয়া তেঁহ শ্রীগোচরে কয় ।
বাড়িয়া গিয়াছে আর আরোগ্যের নয় ॥ ১৭৮ ॥
সাহেব চলিয়া গেল ছেড়ে দিয়ে হাল ।
অতঃপর আসিলেন শ্রীনবীন পাল ॥ ১৭৯ ॥
সুবিজ্ঞ ডাক্তার তেঁহ দেহে বহু গুণ ।
ব্যবসায়ে পক্ককেশ চিকিৎসা-নিপুণ ॥ ১৮০ ॥
যুক্তি-পরামর্শ করি রাজেন্দ্রের সনে ।
চিকিৎসা আরম্ভ কৈলা ব্যাধি-বিনাশনে ॥ ১৮১ ॥
আইলা ফাগুন মাস এবে দোল-লীলা ।
ঘরে ঘরে করে লোক আবিরের খেলা ॥ ১৮২ ॥
শ্রীপ্রভুদেবের যত অন্তরঙ্গগণে ।
একত্রিত হইলেন ফাগুয়ার দিনে ॥ ১৮৩ ॥
এইখানে আবিরের করি আয়োজন ।
আরম্ভিল নৃত্য-গীত আনন্দে মগন ॥ ১৮৪ ॥
বসনাদি সহ সব ভক্তে লালে লাল ।
উচ্চরোল বাজে তালে খোল করতাল ॥ ১৮৫ ॥
অবশেষে মাতোয়ারা ভক্ত যুথে যুথে ।
বাহিরে আইলা হেথা উদ্যানের পথে ॥ ১৮৬ ॥
যে মন্দিরে প্রভুদেব চারিধারে তার ।
সুন্দর সড়ক পথ অতি পরিষ্কার ॥ ১৮৭ ॥
সেই পথে উপনীত হয়ে ভক্তগণ ।
নাচে গায় শ্রীমন্দির করিয়া বেষ্টন ॥ ১৮৮ ॥
মহৎ প্রভু ভগবান লীলার ঈশ্বর ।
উঠিতে শকতি নাই অঙ্গ থর থর ॥ ১৮৯ ॥
দ্বিতলে দেওয়াল ধরি পথে গবাক্ষের ।
দাঁড়ায়ে দেখেন নৃত্য-গীত ভক্তদের ॥ ১৯০ ॥
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ করে ঝলমল ।
ভক্তমন-বিমোহন আনন্দের স্থল ॥ ১৯১ ॥
ভক্তদের লক্ষ্য হৈল প্রভুর উপরে ।
প্রেমানন্দ-বিবর্ধন গবাক্ষের ধারে ॥ ১৯২ ॥
নিরখি আনন্দময় সবে মাতোয়ারা ।
অন্তরে ছুটিল যেন শতেক ফোয়ারা ॥ ১৯৩ ॥
শরীর হইল মহাবলের আধান ।
আনন্দের ধ্বনি করি ফাটায় বাগান ॥ ১৯৪ ॥
গিরিশের সহোদর অতুল যে জন ।
গুরুকায় প্রায় দুই মণের ওজন ॥ ১৯৫ ॥
পাঁচ ছয় জন মিলে একত্র হইয়া ।
নাচিতে লাগিলা তাঁরে শূন্যে উঠাইয়া ॥ ১৯৬ ॥
পাকশাঠ দিয়া কভু লুফে আস্মান ।
লক্ষে ঝম্পে পদচাপে ধরা কম্পমান ॥ ১৯৭ ॥
কেহ কেহ শ্রীপ্রভুর মুখ নিরখিয়া ।
ভূমে যায় গড়াগড়ি লুটিয়া লুটিয়া ॥ ১৯৮ ॥
কেহ বা আবির লয়ে মুঠায় মুঠায় ।
শূন্যে ছুঁড়ে বরিষণ করে ভক্তগায় ॥ ১৯৯ ॥
অবিরল লাল রেণু চারিদিকে ছুটে ।
সড়ক হইল রাঙ্গা ফাগুয়ার চোটে ॥ ২০০ ॥
শ্রীপদে প্রণাম করি পরে ভক্তগণ ।
দোলখেলা আজিকার কৈল সমাপন ॥ ২০১ ॥
নিরঞ্জনে একদিন কন প্রভুরায় ।
হ্যাঁ রে যদি ব্যাধি মোর ভাল হয়ে যায় ॥ ২০২ ॥
কি কর্ম করিবি তুই কি করিতে মন ।
এত শুনি কহে তবে নিত্যনিরঞ্জন ॥ ২০৩ ॥
বাগানের যত গাছ টান দিয়া তুলে ।
সমূলে উপাড়ি ফেলি জাহ্নবীর জলে ॥ ২০৪ ॥
শ্রীমুখে মধুর হাস্যে কন আর বার ।
তা তুই পারিস নহে অসাধ্য তোমার ॥ ২০৫ ॥
শ্রীপ্রভুর মহালীলা কি কহিতে পারি ।
দীনদুঃখী দ্বিজ-সাজে নিজে অবতরি ॥ ২০৬ ॥
সেই সে মহান বস্তু অকূল অপার ।
অন্তরঙ্গগণ এক এক অবতার ॥ ২০৭ ॥
প্রভুর বিচিত্র রঙ্গ নরেন্দ্র দেখিয়া ।
মনসন্দ-বিনাশনে জিজ্ঞাসিল গিয়া ॥ ২০৮ ॥
তুমি সিদ্ধ কিংবা তাহা ছাড়া কিছু আর ।
করিয়া সংশয় মুক্ত করহ আমার ॥ ২০৯ ॥
প্রভু বলিলেন যেই রাম সেই কৃষ্ণ ।
ইদানীতে এ আধারে সেই রামকৃষ্ণ ॥ ২১০ ॥
জীবনের গুপ্ত কথা কন প্রকাশিয়া ।
লীলা-অবসান-কাল নিকটে দেখিয়া ॥ ২১১ ॥
একদিন শ্রীনরেন্দ্র সংগোপনে কন ।
করিবারে কিছুদিন রামের সাধন ॥ ২১২ ॥
বৃক্ষমূলে রাত্রিকালে জ্বালাইয়া ধুনী ।
রামের ধিয়ানে রহে আগোটা রজনী ॥ ২১৩ ॥
দিনের বেলায় যত সঙ্গীত সহিত ।
বাদ্যযন্ত্রসহ হয় রাম-গুণ-গীত ॥ ২১৪ ॥
একদিন বেলা প্রায় আড়াই প্রহর ।
একত্রিত বহু ভক্ত ভবন-ভিতর ॥ ২১৫ ॥
মধ্যেতে নরেন্দ্রনাথ মহাত্যাগী যোগী ।
করে ধরা তানপুরা সঙ্গে বাজে ডুগী ॥ ২১৬ ॥
সমস্বরে এক সঙ্গে লয়ের সহিত ।
গাইছেন রাম-গুণ মধুর সংগীত ॥ ২১৭ ॥
গীত
সীতাপতি রামচন্দ্র রঘুপতি রঘুরাই ।
ভজলে অযোধ্যানাথ দোসরা ন কোঈ ॥
হসন বোলন
চতুর চাল অয়ন বয়ান দৃগ-বিশাল ।
ভ্রূকুটি-কুটিল তিলক-ভাল নাসিকা সোহাঈ ॥
মোতিনকো কণ্ঠমাল, তারাগণ ঊর বিশাল ।
শ্রবণকুণ্ডল ঝলমলাত রতিপতি ছবি ছাঈ ॥
সখা সহিত সরযূতীর বিহরে রঘুবংশবীর ।
তুলসীদাস হরষ নিরখি চরণরজ পাঈ॥
গীতে গরগরচিত্ত যত ভক্তগণ ।
ধ্বনিতে ফাটিয়া পড়ে আগোটা ভবন ॥ ২১৮ ॥
সংগীতের রাগে ভাবে বিভোর সকলে ।
ঘুরে-ফিরে গীতখানি ঘণ্টা ভোর চলে ॥ ২১৯ ॥
দ্বিতল উপরে হেথা প্রভু ভগবান ।
রাগমাখা গীত শুনি সুখে ভাসমান ॥ ২২০ ॥
রঙ্গ-হেতু বাহ্যে রুষ্ট ভাবপ্রদর্শনে ।
সেবাপর ভক্ত যারা ছিল সন্নিধানে ॥ ২২১ ॥
তে সবারে কহিলেন প্রভু অবতরি ।
কেহ প্রাণে মরে কেহ বলে হরি হরি ॥ ২২২ ॥
অতুল বলেন তবে মানা করি গিয়ে ।
প্রভু কন, না—শালারা লিগ্ মোরে দুয়ে ॥ ২২৩ ॥
একত্রেতে পুলকে আনন্দে গীত গায় ।
হইবেক রসভঙ্গ কি কাজ মানায় ॥ ২২৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে নরেন্দ্র আপনি ।
দ্বিতলে হাজির যেথা প্রভু গুণমণি ॥ ২২৫ ॥
নিরখিয়া তাঁহে প্রভু পুলকিত মন ।
প্রভুর নরেন্দ্রনাথ জীবন-জীবন ॥ ২২৬ ॥
ভক্তবরে
গুণমণি কহিলেন পিছে ।
যে গীত গাইছ তার আরো কলি আছে ॥ ২২৭ ॥
এত বলি সেই কলি গান আউরিয়া ।
জনেক তখনি নিল কাগজে লিখিয়া ॥ ২২৮ ॥
গীতাংশ
কেশরকো তিলক ভাল মানরবি প্রাতঃকাল ।
শ্রবণকুণ্ডল ঝলমলাত রতিপতি ছবিছাঈ ॥
নিম্নতলে পুনঃ সবে হয়ে একত্রিত ।
গাইতে লাগিলা সেই আগোটা সংগীত ॥ ২২৯ ॥
নরেন্দ্র না মানে মোটে সাকারের কথা ।
প্রভুর মোহনে মত্ত রামনামে হেথা ॥ ২৩০ ॥
নরেন্দ্র সাধক-শ্রেষ্ঠ রামের সাধনে ।
একদিন দরশন কৈলা হনুমানে ॥ ২৩১ ॥
তাহাতে কেমন ভাব হইল তাঁহার ।
ভাগবত লীলা-তত্ত্ব বুঝা অতি ভার ॥ ২৩২ ॥
ভাবের প্রবলবেগে শরীর অস্থির ।
হাতেতে ধরিয়া লাঠি ঘুরে শ্রীমন্দির ॥ ২৩৩ ॥
একেবারে মত্ততুল্য নাহি বাহ্যজ্ঞান ।
মন্দির বেষ্টন করি ঘুরিয়া বেড়ান ॥ ২৩৪ ॥
ভাব দেখি বিশ্বাস প্রতীত হয় মনে ।
যেন
তাঁর প্রভুদেব মানিকরতনে ॥ ২৩৫ ॥
পাছে কেহ লয়ে যায় করিয়া হরণ ।
সেহেতু প্রহরিভাবে
মন্দির বেষ্টন ॥ ২৩৬ ॥
রামকৃষ্ণ-গত-প্রাণ প্রেমিক বৈরাগী ।
প্রভুর কারণে যেবা
সর্বস্ব-তিয়াগী ॥ ২৩৭ ॥
মাতা-ভ্রাতা ঘরবাড়ি সব বিসর্জন ।
আত্মীয় বান্ধৰ আদি দেহ প্রাণমন ॥ ২৩৮ ॥
এহেন সন্ন্যাসী যিনি শ্রীনরেন্দ্রনাথ ।
বন্দিতে চরণ তাঁর কোটি প্রণিপাত ॥ ২৩৯ ॥
যোগিবর ত্যাগিবর অবিদ্যা বিজিত ।
নানাভাষাবিদ্যাবিদ শাস্ত্রাদি অতীত ॥ ২৪০ ॥
বালমহেশ্বর মূর্তি তেজঃপুঞ্জ-তনু ।
অবিরত দীপ্তিমান শিরে জ্ঞান-ভানু ॥ ২৪১ ॥
অন্তরের ঘটমধ্যে বহে কল্ কল্ ।
প্রেম-ভক্তি-জাহ্নবীর নিরমল জল ॥ ২৪২ ॥
গন্ধর্ব-নিন্দিতকণ্ঠ নয়ন বিশাল ।
জন-মনবিমোহন হৃদয় দয়াল ॥ ২৪৩ ॥
এহেন সন্ন্যাসী যিনি শ্রীনরেন্দ্রনাথ ।
বন্দিতে চরণ তাঁর কোটি প্রণিপাত ॥ ২৪৪ ॥
দিন দিন দেহ ক্ষয় দেখিয়া প্রভুর ।
অন্তরে নরেন্দ্রনাথ বড়ই আতুর ॥ ২৪৫ ॥
প্রভুদেবে একদিন খেদভরে কন ।
নিজ স্থানে পলাইবে করিছ উদ্যম ॥ ২৪৬ ॥
মুই তিয়াগিনু সব তোমার কারণে ।
কি করিলে মোর কিবা হবে পরিণামে ॥ ২৪৭ ॥
নীরবে শুনিলা সব লীলার ঈশ্বর ।
সে দিনে না দিলা কোন কথার উত্তর ॥ ২৪৮ ॥
দিবস কয়েক পরে আর নয় বেশী ।
হঠাৎ ধিয়ানে মগ্ন প্রেমিক সন্ন্যাসী ॥ ২৪৯ ॥
গভীর ধিয়ানে যেন তনুখানি জড় ।
শ্রীগোচরে সমাচার চলিলা সত্বর ॥ ২৫০ ॥
ভক্তের ঈশ্বর প্রভু হাস্যাননে কন ।
"পশ্চাতে ভাঙ্গিব-ভোগ করুক এখন" ॥ ২৫১ ॥
চৌদিকে দণ্ডায়মান আছে ভক্তশ্রেণী ।
বহুক্ষণ পরে দিলা অঙ্গ নাড়া ধ্যানী ॥ ২৫২ ॥
কিছু পরিমাণে যবে আইল চেতন ।
তখন হইল তাঁর দেহের স্মরণ ॥ ২৫৩ ॥
সমাধিতে দেহী দেহে ছিল স্বতন্তর ।
এবে টেঠা তাই দেহী চান দেহ-ঘর ॥ ২৫৪ ॥
দেহ কোথা দেহ কোথা বলিয়া এখন ।
হাতড়িয়া দেহের করেন অন্বেষণ ॥ ২৫৫ ॥
শয্যাগত রোগী যেন অন্ধকার ঘরে ।
হামা দিয়া কোন বস্তু অন্বেষণ করে ॥ ২৫৬ ॥
প্রভুকে বিদিত কৈল ভকতনিচয় ।
ধ্যানীর অবস্থা কিবা মুখে কিবা কয় ॥ ২৫৭ ॥
আজ্ঞামত ভক্ত-বর্গে ধরিয়া ধ্যানীরে ।
উপরে লইয়া যান প্রভুর গোচরে ॥ ২৫৮ ॥
বাহ্য চেঁঠা দিয়া তারে কন ভগবান ।
এই সেই বস্তু যার করহ সন্ধান ॥ ২৫৯ ॥
দেহভাববিলুপ্ত সমাধি নাম এর ।
অপরের কথা কি দুর্লভ যোগেশের ॥ ২৬০ ॥
"সমাধির ঘর এবে রৈল আঁটা তোলা ।
আগে কর কর্ম মোর পরে পাবে খোলা" ॥ ২৬১ ॥
কর্ম মানে এইখানে প্রচার প্রভুর ।
এ কাজে সুযোগ্য জন নরেন্দ্রঠাকুর ॥ ২৬২ ॥
প্রভুর অধিক শক্তি ইহার ভিতরে ।
সবিশেষ পরিচয় ক্রমে পাবে পরে ॥ ২৬৩ ॥
প্রচারেতে শক্তিপ্রাপ্ত অগ্রে কয়জন ।
পূর্বেকার কথা এবে কহি শুন মন ॥ ২৬৪ ॥
পীড়াগ্রস্ত হইবার কিছুকাল আগে ।
একদিন প্রভুদেব আবেশের বেগে ॥ ২৬৫ ॥
বলিলেন মা কালীকে সম্বোধন করি ।
মা আমি কহিব কত আর নাহি পারি ॥ ২৬৬ ॥
বিজয় মহেন্দ্র রাম গিরিশ কেদার ।
এই কয়জনে কর শক্তির সঞ্চার ॥ ২৬৭ ॥
শিখাইয়া বুঝাইয়া অন্য লোকজনে ।
চাষ দিয়া হৃদি ক্ষেত্রে আনিবে এখানে ॥ ২৬৮ ॥
আমি মাত্র একবার করি পরশন ।
তাদের করিয়া দিব কার্য সমাপন ॥ ২৬৯ ॥
কি তোরে কহিব মন প্রভুদেব কেবা ।
বাঞ্ছাপূর্ণ ধ্রুব কর ভক্ত-পদসেবা ॥ ২৭০ ॥
অন্তরঙ্গ সঙ্গে রঙ্গ এই মত করি ।
অতীত হইল প্রায় মাস তিন চারি ॥ ২৭১ ॥
এখন দেখিলে তাঁরে চেনা নাহি যায় ।
এমত অবস্থাপন্ন হইলেন রায় ॥ ২৭২ ॥
তথাপি ভরসা আশা সকলের করে ।
পীড়াতে বিমুক্ত প্রভু হইবেন পরে ॥ ২৭৩ ॥
একদিন প্রভুদেব নিরঞ্জনে কন ।
"দেখরে অবস্থা এক এসেছে এখন ॥ ২৭৪ ॥
যে কেহ দেখিবে মোরে হেন অবস্থায় ।
সে হবে জীবন-যুক্ত মায়ের ইচ্ছায় ॥ ২৭৫ ॥
কিন্তু সেই সঙ্গে কথা বুঝিও নিশ্চয় ।
পরমায়ু অধিক হইবে মোর ক্ষয়" ॥ ২৭৬ ॥
শ্রীবাণী শুনিয়া তবে নিত্যনিরঞ্জন ।
হাতে লাঠি দ্বারদেশে বসিল তখন ॥ ২৭৭ ॥
দিনেরেতে সতত সতর্কভাবে থাকে ।
আসিতে না দেন কোন বাহিরের লোকে ॥ ২৭৮ ॥
অবোধ্য যে জন তাঁর অবোধ্য সকল ।
অতলের কোনকালে কেবা পায় তল ॥ ২৭৯ ॥
সিন্ধুর তরঙ্গরাজি বিন্দুর আধারে ।
কর্মকাণ্ড দেখিয়া ধাতার ধাতু ছাড়ে ॥ ২৮০ ॥
এত যে আসিল লোক প্রভুর নিকটে ।
ষোল আনা পাঁচসিকা বুদ্ধি-বল ঘটে ॥ ২৮১ ॥
নানাশাস্ত্রবিদ্যাবিদ সিদ্ধ সাধনায় ।
কেহই বুঝিতে কিছু পারিল না তাঁয় ॥ ২৮২ ॥
অদ্ভুত যেমন প্রভু অদ্ভুত তেমন ।
নিজে যেন সেইমত অঙ্গের গঠন ॥ ২৮৩ ॥
কার্যাদি তদনুরূপ বুঝিবার নয় ।
সরল হইয়া হৈলা বাঁকা অতিশয় ॥ ২৮৪ ॥
কঠিন যেমন তেন আবার কোমল ।
গাম্ভীর্যে সুমেরু শিশু-সমান চঞ্চল ॥ ২৮৫ ॥
ন্যায়পরায়ণতায় নিক্তির ওজন ।
দয়ায় জীবের তরে প্রাণ সমর্পণ ॥ ২৮৬ ॥
বিধানে বিধানাতীতে পূর্ণত্ব সমান ।
বিশ্বের মঙ্গলে একা মঙ্গলনিদান ॥ ২৮৭ ॥
দেহের গড়নে নাই সাধারণ রীত ।
বুঝিতে নারিল এল এতো ব্যাধিবিৎ ॥ ২৮৮ ॥
পাইল না নাগাল কেহই বিয়াধির ।
সুদূরে সাহস কাছে দেখে বুদ্ধি স্থির ॥ ২৮৯ ॥
এখন দেহের দশা আছে মাত্র প্রাণী ।
কঙ্কালবিশিষ্ট তাহে চামের ছাউনি ॥ ২৯০ ॥
প্রবল ব্যাধির ক্রম ইহার উপরে ।
দেখিলেই দর্শকের নাড়ীধাতু ছাড়ে ॥ ২৯১ ॥
ব্যাধির বিক্রম কথা না যায় বর্ণন ।
এক দিন এ সময়ে শোণিত-বমন ॥ ২৯২ ॥
মুখ বেয়ে রক্তস্রাব বিস্তর বিস্তর ।
নরেন্দ্র ধরেন তাহা লইয়া ডাবর ॥ ২৯৩ ॥
এক পাত্র হৈল পূর্ণ অন্য পাত্র ধরে ।
বাহিরে আসিল রক্ত যা ছিল শরীরে ॥ ২৯৪ ॥
নীচেতে বাগানে শশী মাটির ভিতর ।
শোণিত পুঁতিয়া খালি করেন-ডাবর ॥ ২৯৫ ॥
বুঝা নাহি যায় এই জীর্ণ শীর্ণ কায় ।
বমন এতেক রক্ত — আছিল কোথায় ॥ ২৯৬ ॥
ইহাতেও হ্রাস নাহি কান্তি বদনের ।
কিংবা কিছু চিন্তা ত্রাস শ্রীপ্রভুদেবের ॥ ২৯৭ ॥
সর্বৈব প্রকারে প্রভু অবোধ্য সবার ।
দেবেশ যোগেশ কিবা শিবাদি ব্রহ্মার ॥ ২৯৮ ॥
অন্তরঙ্গগণে প্রভু আভাসেতে কন ।
নিত্যধামে এইবারে করিব গমন ॥ ২৯৯ ॥
বুঝিয়াও কেহ কিন্তু বুঝিতে না পারে ।
মায়ায় ভুলায়ে দেন কিছুক্ষণ পরে ॥ ৩০০ ॥
একদিন মাস্টারের সঙ্গে কথা হয় ।
এ দেহ অধিক দিন আর নাহি রয় ॥ ৩০১ ॥
মাস্টার উত্তরে কন অন্তরে বিষাদ ।
আমাদের কিন্তু কিছু মিটিল না সাধ ॥ ৩০২ ॥
প্রত্যুত্তরে বলিলেন প্রভুদেবরায় ।
এই সাধ ভক্তদের কভু না ফুরায় ॥ ৩০৩ ॥
বাহুল্যে ইহার অর্থ কহি শুন মন ।
আদর্শাবতারে প্রভু আসেন যখন ॥ ৩০৪ ॥
ভক্তসঙ্গে ধরাধামে খেলিবার তরে ।
বুঝিতে সক্ষম ভক্ত অন্য কেহ নারে ॥ ৩০৫ ॥
আদর্শাবতারে হয় বিচিত্র লেখনী ।
লাখে লাখে বদ্ধজীব হয় উর্ধ্বগামী ॥ ৩০৬ ॥
লাখে লাখে বন্ধ মুক্ত দয়ার কারণ ।
অপার সংসারার্ণবে সেতুর বন্ধন ॥ ৩০৭ ॥
তাড়িতে বারতা বহে লোক চতুর্দশে ।
দিবারাতি গতিবিধি ভূতলে আকাশে ॥ ৩০৮ ॥
অশরীরী দেবদেবী শরীর সহিত ।
নানাবেশে লীলাধামে রহে বিরাজিত ॥ ৩০৯ ॥
তীর্থ যত জাগরিত পাপক্ষয়ে হয় ।
গোলক মরুত দিব্য অনুক্ষণ কয় ॥ ৩১০ ॥
সংসার মরুতে ধরে বৃন্দাবন-রীত ।
সহ পুঞ্জ কুঞ্জরাজি চৌদিকে ব্যাপিত ॥ ৩১১ ॥
মূর্তিমান ভগবান নিজে কল্পদ্রুম ।
ঘরে ঘরে ঈশ্বরে অর্চনার ধূম ॥ ৩১২ ॥
বিবেকবিরাগদ্বয় ঝাঁজ ঘণ্টা বাজে ।
গোটা ধরা আলোময় চৈতন্যের তেজে ॥ ৩১৩ ॥
চমকিত নিদ্রাতুর জগবাসী জনে ।
অশ্রুত অভূতপূর্ব পটদরশনে ॥ ৩১৪ ॥
সত্ত্বগুণে রতি মতি স্বচ্ছ নিরমল ।
স্বধর্মানুরাগবৃত্তি স্বভাবে প্রবল ॥ ৩১৫ ॥
গুরুজনে শ্রদ্ধা-ভক্তি বৈধি আচরণ ।
শাস্ত্রে রাগ শাস্ত্রবাক্যপালনে যতন ॥ ৩১৬ ॥
আদর্শাবতারে এই ভাবাদি সকল ।
সহজে জীবেতে হয় স্বতই প্রবল ॥ ৩১৭ ॥
অন্তরঙ্গে এই সব করে দরশন ।
অপরে দেখিতে তাহা না পায় কখন ॥ ৩১৮ ॥
স্বতন্তর খেলা তাঁর অন্তরঙ্গ সনে ।
যাহাতে প্রমত্ত চিত্ত রহে ভক্তগণে ॥ ৩১৯ ॥
লীলা-রঙ্গরস-পানে হয় মত্ততর ।
ভক্ত বিনা অন্যে যার জানে না খবর ॥ ৩২০ ॥
লীলার প্রাঙ্গণে লীলা-রসের আস্বাদ ।
যতই না ভোগে ভক্ত নাহি মিটে সাধ ॥ ৩২১ ॥
মাস্টারের কাছে প্রভু বলিলেন তাই ।
এই সাধ ভক্তদের কভু মিটে নাই ॥ ৩২২ ॥
এবে শ্রাবণের মাস প্রায় শেষ হয় ।
আট নয় দিন বাকি আর বেশী নয় ॥ ৩২৩ ॥
একদিন শ্রীযোগীনে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
পঁচিশে হইতে পাঠ কর পঞ্জিকার ॥ ৩২৪ ॥
দিন তারিখের তিথি নক্ষত্র যেমন ।
সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রভু করিলা শ্রবণ ॥ ৩২৫ ॥
পয়লা ভাদ্রের কথা আরম্ভে গোসাঁই ।
বলিলেন থাক আর পাঠে কাজ নাই ॥ ৩২৬ ॥
আর দিন বিধিমত ক্রিয়া সমাপনে ।
সন্ন্যাস দিলেন প্রভু ভক্ত দশজনে ॥ ৩২৭ ॥
নরেন্দ্র যোগীন লাটু নিত্যনিরঞ্জন ।
বাবুরাম কালীচন্দ্র বণিকনন্দন ॥ ৩২৮ ॥
সুন্দর শরৎ শশী ও তারক ঘোষাল ।
শেষ জন নাম যাঁর মুরুবিব গোপাল ॥ ৩২৯ ॥
রাখাল না ছিলা আজি গিয়াছিলা ঘরে ।
পশ্চাতে সন্ন্যাস প্রাপ্ত আইলে গোচরে ॥ ৩৩০ ॥
এই একাদশে আজ্ঞা দিলা গুণমণি ।
যার তার খাস তোরা হইবে না হানি ॥ ৩৩১ ॥
এ সময় কিছু দিন ক্রমান্বয়ে প্রায় ।
ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রনাথে কন প্রভুরায় ॥ ৩৩২ ॥
"দেখ কি আশ্চর্য এক করি দরশন ।
সুবিশাল ময়দানে শিশু একজন ॥ ৩৩৩ ॥
নানাবিধ রত্ন মণি গাদা চারিধারে ।
যারে যারে ইচ্ছা তায় বিতরণ করে" ॥ ৩৩৪ ॥
এই সব মহাবাক্যে কিবা গূঢ় মানে ।
সহজে
বুঝিবে লীলা শ্রবণ-কীর্তনে ॥ ৩৩৫ ॥
আর দিন শশীকে কহেন প্রভুরায় ।
ডাকিয়া আনিতে গুরু-দারা জগন্মায় ॥ ৩৩৬ ॥
বুদ্ধিমতী তিনি তাঁরে করিতে জিজ্ঞাসা ।
কি উপায় হইবে হইল হেন দশা ॥ ৩৩৭ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানে অবিরত এবে প্রভুরায় ।
ব্রহ্মজ্ঞানে তত্ত্বকথা কথায় কথায় ॥ ৩৩৮ ॥
দেখ গো জানি না মোর কহ কি কারণে ।
সর্বদাই ব্রহ্মভাব-উদ্দীপনা মনে ॥ ৩৩৯ ॥
দেহে মন ছাড়া ছাড়া দেহে উদাসীন ।
সংগোপনে দেবেন্দ্র কহেন একদিন ॥ ৩৪০ ॥
প্রবল বাসনা সদা উঠিছে অন্তরে ।
সমাধিস্থ হয়ে থাকি সপ্তমের ঘরে ॥ ৩৪১ ॥
একত্রিশে সংক্রান্তিতে শ্রাবণ মাহার ।
বারশ তিরানববই সাল রবিবার ॥ ৩৪২ ॥
বড় বিপদের দিন অতি ভয়ঙ্কর ।
নিত্যধামে যাইবেন লীলার ঈশ্বর ॥ ৩৪৩ ॥
পরিহরি লীলাধামে সাঙ্গোপাঙ্গগণে ।
শ্রীপ্রভুর মহালীলাপ্রচার-কারণে ॥ ৩৪৪ ॥
দিনমান গেল এল বিকালের বেলা ।
উদ্যানের মধ্যে বহু ভক্তদের মেলা ॥ ৩৪৫ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে জ্বালা আজি বর্ণন-অতীত ।
ক্ষয়-নাড়ী মাঝে মাঝে চালনা রহিত ॥ ৩৪৬ ॥
উপনীত চিকিৎসক হৈল হেনকালে ।
ভক্তেরা লইয়া তাঁরে চলিলা দ্বিতলে ॥ ৩৪৭ ॥
ডাক্তার নবীন পাল নাড়ী পরীক্ষিয়া ।
বুঝিতে নারিল কিছু বিশেষ করিয়া ॥ ৩৪৮ ॥
দিনের অবস্থা তাঁরে কন প্রভুরায় ।
দেখ গো আমার যেন প্রত্যেক শিরায় ॥ ৩৪৯ ॥
চলিতেছে গরম জলের পিচকারী ।
অতিশয় অঙ্গ জ্বলে সহিতে না পারি ॥ ৩৫০ ॥
নাড়ীর পরীক্ষা আজি অনেকে করিল ।
প্রকৃত অবস্থাখানি বুঝিতে নারিল ॥ ৩৫১ ॥
একাকী অতুলকৃষ্ণ ক্ষয়নাড়ী কয় ।
এমত অবস্থাপন্নে পরান-সংশয় ॥ ৩৫২ ॥
ভবনে গমন-কালে কন ভক্তগণে ।
সচকিত থাকিতে প্রভুর সন্নিধানে ॥ ৩৫৩ ॥
সন্ধ্যার অলপ আগে প্রভু ভগবান ।
বোধ করিলেন বুকে হাঁপানির টান ॥ ৩৫৪ ॥
দেখাইয়া সেবাপর ভক্তদের দলে ।
বলিলেন ইহাকেই নাভি-শ্বাস বলে ॥ ৩৫৫ ॥
বিশ্বাস না হৈল কার প্রভুর কথায় ।
আনিল সুজির বাটি খাওয়াইতে তাঁয় ॥ ৩৫৬ ॥
নরেন্দ্রের আজ্ঞামত মুই আজি দিনে ।
রাত্রির মতন ছিনু সেবার কারণে ॥ ৩৫৭ ॥
এমন সময় ডাক হইল আমায় ।
দেখিনু শয্যার পাশে বসিয়া শ্রীরায় ॥ ৩৫৮ ॥
সুজি খাওয়াতে চেষ্টা ভক্তগণে করে ।
মুখ বেয়ে পড়ে ছুঁয়ে না যায় উদরে ॥ ৩৫৯ ॥
অতি অল্প পরিমাণে গলাধঃকরণ ।
জঠরে যেমন ক্ষুধা রহিল তেমন ॥ ৩৬০ ॥
মুখ পাখালিয়া পুনঃ মুছায়ে বসনে ।
বিছানায় শুইয়া দিল সাবধানে ॥ ৩৬১ ॥
পদ-প্রসারণে শক্তি নাহিক প্রভুর ।
বালিসে মেলায়ে দিলা শ্রীশশীঠাকুর ॥ ৩৬২ ॥
বিরাট তালের পাখা দিয়া মোর হাতে ।
বলিলেন কোমলাঙ্গে ব্যজন করিতে ॥ ৩৬৩ ॥
সেইমত আর পাখা শাণ্ডেলের করে ।
তিনিও চালান পাখা শক্তি অনুসারে ॥ ৩৬৪ ॥
দেখিতে দেখিতে মাত্র চকিত ভিতর ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব তনুখানি জড় ॥ ৩৬৫ ॥
স্বাভাবিক সমাধির মত ইহা নয় ।
বৈলক্ষণ্য-গুণে সবে সভীত হৃদয় ॥ ৩৬৬ ॥
সংশয়-সংযুক্তে অঙ্গে নাড়িয়া প্রভুর ।
কাঁদিতে লাগিলা কাছে শ্রীশশীঠাকুর ॥ ৩৬৭ ॥
ত্বরিত গমনে যুক্তি কহিলা আমারে ।
সংবাদপ্রদানহেতু গিরিশের ঘরে ॥ ৩৬৮ ॥
গিরিশ ও রামে দিনু সংবাদ যাইয়া ।
এখন দুডণ্ড রাত্রি প্রহর ছাড়িয়া ॥ ৩৬৯ ॥
প্রভুর সমাধি ভঙ্গ দুপুরের পর ।
বলেন ক্ষুধায় মোর জ্বলিছে উদর ॥ ৩৭০ ॥
সেবাপর ভক্তগণে পাইয়া পরানী ।
শ্রীবদনে শ্রীপ্রভূর শুনিয়া শ্রীবাণী ॥ ৩৭১ ॥
উঠিয়া বসিলা প্রভু শয্যার উপর ।
খাইলেন সব সুজি ভরিয়া উদর ॥ ৩৭২ ॥
এক তোলা যার পক্ষে দুস্কর ভোজন ।
কি কব আশ্চর্য কথা এবে সেইজন ॥ ৩৭৩ ॥
পাত্র পরিপূর্ণ সুজি খান অবহেলে ।
গলায় বিয়াধি যেন নাই কোনকালে ॥ ৩৭৪ ॥
ভোজনান্তে শান্তি বোধে কন ভগবান ।
উদর-তৃপ্তিতে হৈল শীতল পরান ॥ ৩৭৫ ॥
প্রভুর ভোজন হেন বহুদিন পরে ।
দেখিয়া আনন্দে মগ্ন ভকতনিকরে ॥ ৩৭৬ ॥
নরেন্দ্র শ্রীপ্রভুদেবে কহেন তখন ।
নিদ্রায় আরাম চেষ্টা উচিত এখন ॥ ৩৭৭ ॥
এত শুনি গুণমণি লীলার ঈশ্বর ।
বহুকালাবধি কণ্ঠে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বর ॥ ৩৭৮ ॥
আজি পূর্ণকণ্ঠে নাহি বিয়াধি যেমন ।
তিনবার কালী কালী কৈলা উচ্চারণ ॥ ৩৭৯ ॥
মা কালী জীবন তাঁর ডাকিয়া তাঁহারে ।
ধীরে
ধীরে শুইলেন শয্যার উপরে ॥ ৩৮০ ॥
নানামতে সেবা করে ভকতনিকর ।
শ্রীপাদসেবায় শ্রীনরেন্দ্র নরবর ॥ ৩৮১ ॥
বিধিমতে সেবাচেষ্টা করে ভক্তশ্রেণী ।
যাহে হন নিদ্রাগত ঠাকুর আপনি ॥ ৩৮২ ॥
প্রভুকে সুস্থির দেখি নরেন্দ্র তখন ।
বিশ্রামের হেতু নীচে করেন গমন ॥ ৩৮৩ ॥
ইতিমধ্যে কি হইল শুন অতঃপর ।
কণ্টকিত চকিতে প্রভুর কলেবর ॥ ৩৮৪ ॥
নাসিকার অগ্রভাগে আঁখিদৃষ্টি স্থির ।
সুশোভন হাস্যানন সমাধি গভীর ॥ ৩৮৫ ॥
এই সমাধিতে হইল সমাধি মহান্ ।
লীলাধামে ফিরে না আইলা ভগবান ॥ ৩৮৬ ॥
ভক্তগণে সমাধির অবস্থা দেখিয়া ।
প্রাণে-সারা বাক্য-হারা রহিল বসিয়া ॥ ৩৮৭ ॥
একটা বাজিয়া মাত্র দুমিনিট পার ।
মহাসমাধিস্থ যবে শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৩৮৮ ॥
ইহারই কিঞ্চিত পরে আইল বাগানে ।
ভক্ত রামচন্দ্র আর গিরিশ দুজনে ॥ ৩৮৯ ॥
আদি-অন্ত শুনিয়া সকল বিবরণ ।
বুঝিতে না পারে কিবা কর্তব্য এখন ॥ ৩৯০ ॥
উপায়-বিধান কিছু করিবারে স্থির ।
সভীত বসিয়া বাঁধাঘাটে সরসীর ॥ ৩৯১ ॥
যুকতি-উপায় স্থির যে বুদ্ধির বলে ।
ব্যাপার দেখিয়া গেছে সেই বুদ্ধি টলে ॥ ৩৯২ ॥
যে প্রভুর বিদ্যমানে দিবা কি যামিনী ।
গগন ভেদিয়া উঠে আনন্দের ধ্বনি ॥ ৩৯৩ ॥
বিপরীত ভাব আজি সবে ম্রিয়মান ।
অকূল পাখারে মগ্ন আগোটা উদ্যান ॥ ৩৯৪ ॥
কৃষ্ণা প্রতিপদে চাঁদে পূর্ণিমার সাজ ।
ছটা ঘটা-সহকারে গগনে বিরাজ ॥ ৩৯৫ ॥
সোনার বরন কর ঢালে রাশি রাশি ।
কর বিতরণে যেন কল্পতরু শশী ॥ ৩৯৬ ॥
মণ্ডল-আকার এক রেখা সুশোভন ।
চাঁদের চৌদিকভাগে দিল দরশন ॥ ৩৯৭ ॥
বিচিত্র আসন যেন পাতিল সভায় ।
বসাইতে দেবদলে আগত তথায় ॥ ৩৯৮ ॥
হরষে উৎফুল্ল মন দেবতার পতি ।
সম্ভাষিতে প্রভুরায় পোহাইলে রাতি ॥ ৩৯৯ ॥
নিত্যধামে গমনে উদ্যত লীলেশ্বর ।
সমাধি-আশ্রমে ত্যজি নর কলেবর ॥ ৪০০ ॥
কেহ হাসে কেহ কাঁদে লীলার যে রীত ।
হেথা অন্তরঙ্গগণে শোকে আকুলিত ॥ ৪০১ ॥
ইতি-উতি ভাবিতে চিন্তিতে রাতি গেল ।
অরুণ উদয় ক্রমে প্রভাত হইল ॥ ৪০২ ॥
হেথা গত রেতে কালীপুরীর ভিতর ।
অদ্ভুত ঘটনা কিবা শুন অতঃপর ॥ ৪০৩ ॥
রাত্রিকালে মা কালীর লুচিভোগ রীত ।
যে কোন কারণে তাহা হয়েছে স্থগিত ॥ ৪০৪ ॥
পুরীতে পূজারী বহু ব্রাহ্মণ সজ্জন ।
সুন্দর বন্ধানি সত্ত্বে এরূপ ঘটন ॥ ৪০৫ ॥
অতি আশ্চর্যের কথা কারণ ইহার ।
নিজ মনে আন্দোলনে পাবে সমাচার ॥ ৪০৬ ॥
এখানে শহর-মধ্যে ঘটনা রাত্রির ।
দ্রুতগতি ছুটে যেন মন্ত্রপূত তীর ॥ ৪০৭ ॥
ভক্ত উপভক্ত যেবা আছিল যেখানে ।
জুটিতে লাগিল ক্রমে এখানে বাগানে ॥ ৪০৮ ॥
ভক্তিমতী কুলবতী কুলের ললনা ।
দর্শনলোলুপ ঘরে নাহি মানে মানা ॥ ৪০৯ ॥
চরিদিকে উঠে খালি হাহাকার রব ।
যে গুনে সে হয় যেন জীবস্তের শব ॥ ৪১০ ॥
ভক্তগণ এখনো আছেন প্রত্যাশায় ।
যদ্যপি ফিরিয়া ঘরে আসেন শ্রীরায় ॥ ৪১১ ॥
বিশ্বনাথ উপাধ্যায় কাপ্তেন যে জন ।
আট বাজে বাগানে দিলেন দরশন ॥ ৪১২ ॥
সমাধির ধারা তাঁর বিশেষিয়া জানা ।
অবস্থা বুঝিতে কৈল ক্রিয়ার সূচনা ॥ ৪১৩ ॥
শ্রীপৃষ্ঠের শিরদাঁড়া তাহার উপর ।
গব্যঘৃত মালিস করেন নিরন্তর ॥ ৪১৪ ॥
কিছুপরে লক্ষণে বুঝিয়া নির্ধারিত ।
এখনো সমাধিদেহ আছয়ে জীবিত ॥ ৪১৫ ॥
এই দেহে যদি কেহ অগ্নি-ক্রিয়া করে ।
ব্রহ্মহত্যা-মহাপাপ তাহার উপরে ॥ ৪১৬ ॥
এত বলি নীরব হইয়া উপাধ্যায় ।
বসিয়া রহিল হস্ত স্থাপিয়া মাথায় ॥ ৪১৭ ॥
দুপুর
হইয়া প্রায় ঘণ্টা অতীত ।
হেনকালে মহেন্দ্র ডাক্তার উপনীত ॥ ৪১৮ ॥
পরীক্ষা করিয়া কন বিষাদে বিভোর ।
দেহত্যাগ হইয়াছে আধঘণ্টা জোর ॥ ৪১৯ ॥
ভক্তবর্গ ভর দিয়া কথায় তাঁহার ।
শেষকর্ম সম্পাদনে করেন যোগাড় ॥ ৪২০ ॥
সুন্দর শয্যার সহ মূল্যবান খাট ।
ধূপ-ধুনা গন্ধ-দ্রব্য চন্দনের কাঠ ॥ ৪২১ ॥
প্রয়োজনাতীত ঘৃত বসন সুন্দর ।
বিস্তর ফুলের গোড়ে মালা মনোহর ॥ ৪২২ ॥
দিবসের শেষভাগে নাবাইয়া রায় ।
চন্দনে চর্চিত কৈলা রাখিয়া খট্টায় ॥ ৪২৩ ॥
ফুলের মালায় বিভূষিত তনুখানি ।
এ সজ্জা ভীষণতর না যায় বাখানি ॥ ৪২৪ ॥
অতি বিষাদিত-চিত্ত মহেন্দ্র ডাক্তার ।
বলিলেন শ্রীপ্রভু হেন অবস্থার ॥ ৪২৫ ॥
ফটো রাখিবার আছে অতি প্রয়োজন ।
দশ টাকা দিনু এর ব্যয়ের কারণ ॥ ৪২৬ ॥
এত বলি টাকা রাখি করিল পয়ান ।
ভক্তবর্গে ফটোর করিল সরঞ্জাম ॥ ৪২৭ ॥
দিনমান গতপ্রায় তৃতীয় প্রহর ।
প্রভুদেবে সঙ্গীভূত খাটের উপর ॥ ৪২৮ ॥
লইয়া চলিল সবে জাহ্নবীর তটে ।
বরাহনগরে পরামানিকের ঘাটে ॥ ৪২৯ ॥
পাছু পাছু ভক্তবর্গ শোকাকুল যায় ।
পথের দুপাশে লোকে করে হায় হায় ॥ ৪৩০ ॥
ঘাটের ঘটনা কথা না যায় বাখানি ।
এখানে থাকিতে নাহি জুয়ায় পরানী ॥ ৪৩১ ॥
প্রহরেক রাত্রি সবে ক্রিয়া-সমাপনে ।
প্রাণহীন দেহ যেন ফিরিয়া বাগানে ॥ ৪৩২ ॥
কলের পুতুল সম মুখে নাহি স্বর ।
লইয়া দেহাবশিষ্ট কলসী ভিতর ॥ ৪৩৩ ॥
সে সুখের বাগান নাহিক আজি আর ।
আঁধারের চেয়ে অতি নিবিড় আঁধার ॥ ৪৩৪ ॥
পাষাণে বাঁধিয়া বুক সন্ন্যাসীর গণে ।
শুদ্ধাচারে কলসীটি থুইল যতনে ॥ ৪৩৫ ॥
এখানে উদ্যানমধ্যে মাতাঠাকুরানী ।
আদ্যাশক্তি গুরুদারা-ভক্তের জননী ॥ ৪৩৬ ॥
শোকেতে আকুলচিত্ত প্রভুর বিহনে ।
সান্ত্বনা করেন তায় ভক্তিমতীগণে ॥ ৪৩৭ ॥
সেবাহেতু সর্বদাই কাছে আছে তাঁর ।
প্রভুর চরিত যেন তেমতি মাতার ॥ ৪৩৮ ॥
শুন এক কথা হেথা শোক হবে দূর ।
মহীয়ান মহতী মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৪৩৯ ॥
পরদিনে যথারীতি মাতাঠাকুরানী ।
একে একে
অলঙ্কার খুলেন আপনি ॥ ৪৪০ ॥
পরিশেষে শ্রীহস্তের সুবর্ণ বলয় ।
টান দিয়া খুলিতে উদ্যত যে সময় ॥ ৪৪১ ॥
সশরীরে প্রভুদেব আসিয়া তখন ।
খুলিতে হাতের বালা কৈলা নিবারণ ॥ ৪৪২ ॥
অদ্যাবধি সেই বালা মায়ের দুহাতে ।
তিলেক নাহিক ছাড়া আছে দিনেরেতে ॥ ৪৪৩ ॥
অতিক্ষুদ্র লালপেড়ে সুতার বসন ।
প্রভুর নিষেধ অঙ্গে বৈধব্য-লক্ষণ ॥ ৪৪৪ ॥
এখানে সন্ন্যাসিগণে যুক্তি করি সার ।
শ্রীপ্রভুর ভোগ-রাগ পূজা সহকার ॥ ৪৪৫ ॥
আজি হতে আরম্ভ করিল নিয়মিত ।
শয্যায় শ্রীমূর্তি এক করিয়া স্থাপিত ॥ ৪৪৬ ॥
রামকৃষ্ণ-মহালীলা সুবিশাল তরু ।
লীলাক্ষেত্রে প্রভুদেব জগতের গুরু ॥ ৪৪৭ ॥
হরিহর-বিধি-পূজ্য সৃষ্টির আধান ।
রোপিয়া তাহার কাজ হৈলা অন্তর্ধান ॥ ৪৪৮ ॥
অন্তর্ধান মানে ইহা উফে যাওয়া নয় ।
রামকৃষ্ণ বলে ডাক পাবে পরিচয় ॥ ৪৪৯ ॥
প্রয়োজন মত কালবিগ্রহের রূপে ।
বিরাটমূর্তি এবে গোটা বিশ্ব ব্যাপে ॥ ৪৫০ ॥
সরাটে বিগ্রহ দেহে আছিল আলয় ।
এখন হইল সৃষ্টি রামকৃষ্ণময় ॥ ৪৫১ ॥
বিগ্রহমূর্তিও আছে পূর্বেকার ঠামে ।
প্রত্যেক ভক্তের প্রতি হৃদয়ের ধামে ॥ ৪৫২ ॥
ভক্তের হৃদয় তাঁর বৈঠকের খানা ।
ঠিক ঠিক ভক্তমাত্রে সকলের জানা ॥ ৪৫৩ ॥
এক এক ভাবে প্রভু এক এক ঠাঁই ।
ভক্তের সমষ্টিমধ্যে আগোটা গোসাঁই ॥ ৪৫৪ ॥
অবিরত খেলা তাঁর লয়ে ভক্তগণ ।
প্রত্যক্ষ আছিল এবে অলক্ষ্য এখন ॥ ৪৫৫ ॥
ভাবরূপে ভক্তের হৃদয়মধ্যে খেলা ।
ভক্তের করান কর্ম নিজে দিয়া ঠেলা ॥ ৪৫৬ ॥
লীলাবৃক্ষ তুলিবারে কি করিলা কল ।
শুন রামকৃষ্ণ-গীতি শ্রবণমঙ্গল ॥ ৪৫৭ ॥
প্রভুর বিরহে মাত্র দিনত্রয় খেদ ।
পরে গৃহী-সন্ন্যাসীতে লাগিল বিচ্ছেদ ॥ ৪৫৮ ॥
শ্রীঅস্থি সমাধিগত সপ্তাহ ভিতরে ।
এই বিধি শাস্ত্রমধ্যে শাস্ত্রকার করে ॥ ৪৫৯ ॥
শ্রীঅস্থি কলসী-মধ্যে আছয়ে এখন ।
ইহার সমাধি কথা হৈল উত্থাপন ॥ ৪৬০ ॥
নিরূপিত ঠাঁই আর ঠিক নাহি হয় ।
সচিন্তিত ভক্তবর্গ অবিরত রয় ॥ ৪৬১ ॥
সব কর্মে সদাশয় রাম আগুয়ান ।
কাঁকুড়গাছিতে আছে তাঁহার বাগান ॥ ৪৬২ ॥
সেইখানে বহুপূর্বে প্রভুর গমন ।
মনের মতন স্থান অতি নিরজন ॥ ৪৬৩ ॥
তুলসীকানন এক তাহার ভিতর ।
দেখিয়া বড়ই খুশী প্রভু গুণধর ॥ ৪৬৪ ॥
ভূমিষ্ঠ হইয়া সেই ঠাঁই বারবার ।
স্থানের মাহাত্ম্য-গুণে কৈলা নমস্কার ॥ ৪৬৫ ॥
সেই কথা রামের পড়িয়া গেল মনে ।
প্রকাশ করিয়া কন সবা-সন্নিধানে ॥ ৪৬৬ ॥
রাম কহে তুলসী-কানন অংশ যত ।
সমাধির তরে দিব হইনু স্বীকৃত ॥ ৪৬৭ ॥
সন্ন্যাসীরা রহে যদি বাগানভিতর ।
সমর্পণ করিব আছয়ে এক ঘর ॥ ৪৬৮ ॥
কিন্তু যেইমত তথা নিয়ম-আইন ।
থাকিতে হইবে সবে তাহার অধীন ॥ ৪৬৯ ॥
সে কথা শুনিয়া কহে সন্ন্যাসী সকলে ।
চাই সমাধির ঠাঁই জাহ্নবীর কূলে ॥ ৪৭০ ॥
বানাইয়া দাও মঠ অবশ্যই থাকিব ।
স্বাধীন সন্ন্যাসী নাহি আইন মানিব ॥ ৪৭১ ॥
গৃহীদের মধ্যে একা কার্যকারী রাম ।
মুক্তহস্ত চাঁই ভক্ত সবার প্রধান ॥ ৪৭২ ॥
সব কর্মে অগ্রসর কর্তৃত্বাভিমানে ।
অন্য যত সহকারী রামের পেছনে ॥ ৪৭৩ ॥
রাম কহে
গঙ্গাতীরে কিনিবারে জমি ।
কোথায় এতেক টাকা-কড়ি পাব আমি ॥ ৪৭৪ ॥
বাদ-প্রতিবাদ এইরূপে দুই দলে ।
চারি পাঁচ দিবস ক্রমশঃ গেল চলে ॥ ৪৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর গৃহী ভক্ত আছে এতগুলি ।
কিন্তু এই কর্মে বেশী রামের বিকুলি ॥ ৪৭৬ ॥
সন্ন্যাসী বালকবর্গে বুঝায়ে বিহিত ।
কাঁকুড়গাছিতে মত কৈল স্থিরীকৃত ॥ ৪৭৭ ॥
সমাধি-দিনের ঠিক পূর্বেকার রেতে ।
কলসী পাইল তবে আপনার হাতে ॥ ৪৭৮ ॥
ভবনে লইয়া হাতে ভক্তবর রাম ।
যার জন্য ছয়দিন তুমুল সংগ্রাম ॥ ৪৭৯ ॥
পরদিন প্রাতে সংকীর্তনের সহিত ।
গৃহী ও সন্ন্যাসী সবে হইয়া মিলিত ॥ ৪৮০ ॥
কলসী ধরিয়া শিরে সহ সংকীর্তনে ।
চলিল কাঁকুড়গাছি রামের বাগানে ॥ ৪৮১ ॥
তুলসীকানন যেথা স্থান মনোহর ।
কলসী সমাধিত গর্তের ভিতর ॥ ৪৮২ ॥
তবে তদুপরি করি বেদির সূচনা ।
ক্রমশঃ হইল পরে মন্দির স্থাপনা ॥ ৪৮৩ ॥
নিত্য নিত্য ভোগ রাগ যেইমত বিধি ।
কালে কালে পর্বোৎসব হয় অদ্যাবধি ॥ ৪৮৪ ॥
এখানের কাজকর্ম যত হয় ব্যয় ।
একাকী যোগায় রাম আর কেহ নয় ॥ ৪৮৫ ॥
সমাধির পরে নানা ঘটনার জন্য ।
রামে সন্ন্যাসীতে হয় মনের মালিন্য ॥ ৪৮৬ ॥
নাহি হয় রাজী তাঁরা থাকিতে এখানে ।
কর্তৃত্বাভিমানী রাম তাঁহার অধীনে ॥ ৪৮৭ ॥
প্রভুর কৌশল কিবা শুন অতঃপরে ।
সুরেন্দ্র প্রভুর ভক্ত বহু অর্থ ঘরে ॥ ৪৮৮ ॥
শ্রীনরেন্দ্রজীকে তেঁহ কন সংগোপনে ।
মঠ বানাইব যদি থাক সেইখানে ॥ ৪৮৯ ॥
এত বলি গঙ্গাতীরে বরাহনগরে ।
মঠের পত্তন কৈলা ভাড়াটিয়া ঘরে ॥ ৪৯০ ॥
অতি পরিসর বাড়ী উত্তর দক্ষিণে ।
মুন্সিদের ভাঙ্গা বাড়ী সাধারণে জানে ॥ ৪৯১ ॥
শ্রীপ্রভুর ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সকল ।
শয্যা বস্ত্র পাদুকাদি হুকাসহ নল ॥ ৪৯২ ॥
সাজাইয়া যথাস্থানে যত্নসহকারে ।
শ্রীমূর্তিসহিত শশী নিত্যসেবা করে ॥ ৪৯৩ ॥
এক্ষণে সন্ন্যাসিগণে হেথা এইবার ।
কুলগত নাম আখ্যা কৈলা পরিহার ॥ ৪৯৪ ॥
আশ্রমাভিভুক্ত নব নামের ধারণ ।
কার কি হইল নাম শুন বিবরণ ॥ ৪৯৫ ॥
শ্রীনরেন্দ্রজী — স্বামী বিবেকানন্দ
শ্রীরাখালজী — স্বামী ব্রহ্মানন্দ
শ্রীযোগীনজী — স্বামী যোগানন্দ
শ্রীনিত্যনিরঞ্জনজী — স্বামী নিরঞ্জনানন্দ
শ্রীবাবুরামজী — স্বামী প্রেমানন্দ
শ্রীশশীজী — স্বামী শ্রীরামকৃষ্ণানন্দ
শ্রীশরৎজী — স্বামী সারদানন্দ
শ্রীলাট্টুজী — স্বামী অদ্ভুতানন্দ
শ্রীকালীজী — স্বামী অভেদানন্দ
শ্রীতারকজী — স্বামী শিবানন্দ
মুরুব্বী শ্রীগোপালজী — স্বামী অদ্বৈতানন্দ
এই সব পূজ্যপাদ সন্নাসিনিকর ।
প্রভুর কৃপায় তেজপুঞ্জ কলেবর ॥ ৪৯৬ ॥
সার করি প্রভুপদ বিসর্জিয়া সব ।
রটিতে লাগিল প্রভু-মাহাত্ম্য-গৌরব ॥ ৪৯৭ ॥
আরাধ্য বিবেকানন্দ বিশেষতঃ একা ।
অচিরে উড়িল যাঁর যশের পতাকা ॥ ৪৯৮ ॥
ভূখণ্ডের চারিদিকে সাগরের পার ।
প্রভুর মাহাত্ম্য-গীতি করিয়া প্রচার ॥ ৪৯৯ ॥
বেলুড়ে তুলিয়া মঠ জাহ্নবীর তীর ।
মনোহর শ্রীপ্রভুর দ্বিতল মন্দির ॥ ৫০০ ॥
কীর্তি-স্তম্ভ স্বামীজীর অতুল ভুবনে ।
সাগরান্ত দেশে চেলা বিশেষে মার্কিনে ॥ ৫০১ ॥
বারে বারে বন্দি আমি তাঁহার চরণ ।
ভুবন-বিজয়-খ্যাতি পুণ্য-দরশন ॥ ৫০২ ॥
অনুকরণীয়ভাব পবিত্র-চরিত ।
স্বতঃ প্রকৃতিতে জৈব-ভাব-বিবর্জিত ॥ ৫০৩ ॥
বিজিত ইন্দ্রিয় মন অকলঙ্ক তনু ।
মাগি রামকৃষ্ণ-ভক্তি সহ পদরেণু ॥ ৫০৪ ॥
মম সঙ্গে স্বামীজীর সম্বন্ধ আচার ।
সংক্ষেপে শুনহ মন কহি সমাচার ॥ ৫০৫ ॥
দেবেন্দ্রের আজ্ঞাক্রমে গ্রন্থারম্ভ হয় ।
যে সময়ে লিখি বাল্যলীলা পরিচয় ॥ ৫০৬ ॥
স্বামীজী শুনিয়া কথা লোকপরস্পরে ।
ডাকাইয়া লইলেন মঠের ভিতরে ॥ ৫০৭ ॥
বরাহনগরে মঠ নূতন এখন ।
মুন্সীদের ভাঙ্গা বাড়ি দ্বিতল ভবন ॥ ৫০৮ ॥
লীলাংশ করিয়া পাঠ বিনা প্রতিবাদ ।
বৃহৎ হইবে পুঁথি কৈলা আশীর্বাদ ॥ ৫০৯ ॥
পশ্চাতে ইহাই বলি আশিসিলা মোরে ।
তুমি মাত্র অধিকারী পুঁথি লিখিবারে ॥ ৫১০ ॥
তখন আমার ঘটে কোন বোধ নাই ।
স্বামীজী কহিলা কিবা না পাইনু খাঁই ॥ ৫১১ ॥
প্রেমিক সন্ন্যাসী তিনি দূরদৃষ্টিমান ।
নিরমল মুক্ত-আঁখি অতি জ্যোতিষ্মান ॥ ৫১২ ॥
সিদ্ধবাক্ নিত্যসিদ্ধ দয়াল প্রকৃতি ।
নিরাপদে লিখাইতে রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৫১৩ ॥
বলিলেন অন্য যত সব সন্ন্যাসীরে ।
চলহ ইহারে লয়ে যাই গঙ্গাতীরে ॥ ৫১৪ ॥
বেলুড়ে আছেন যেথা জগৎ-জননী ।
তাঁরে শুনাইলে কৃপা করিবেন তিনি ॥ ৫১৫ ॥
শ্রবণাস্তে মাতা তবে কৈল আশীর্বাদ ।
নির্বিঘ্নে সমাধা পুঁথি পূর্ণ হবে সাধ ॥ ৫১৬ ॥
স্বামীজী সঁপিয়া মোরে মায়ের চরণে ।
নিরুদ্দেশ হইলেন তীর্থ-পর্যটনে ॥ ৫১৭ ॥
মায়ের কৃপার স্বাদ পাইয়া এখন ।
পাছু পাছু রহি মার স্বদেশে যখন ॥ ৫১৮ ॥
কামারপুকুরে মাতা যবে একবার ।
বড়ই পাইনু কৃপা কৃপায় মাতার ॥ ৫১৯ ॥
শুন তবে কহি কথা মাতা একদিন ।
ডাকাইলা গ্রাম্য মেয়ে প্রাচীন প্রাচীন ॥ ৫২০ ॥
শ্রীপ্রভুর সময়ের কৃপাপ্রাপ্ত তাঁর ।
শুনিবারে লীলা-পুঁথি প্রভুর আমার ॥ ৫২১ ॥
সে দিনের লীলা-পুঁথি করিয়া শ্রবণ ।
জানি নাই জননীর কি হইল মন ॥ ৫২২ ॥
আশিস করিলা মোরে দুই হাত তুলি ।
যত ইচ্ছা লিখ পুঁথি এই কথা বলি ॥ ৫২৩ ॥
বারবার কত কৃপা করিলা জননী ।
বাহুল্য বর্ণন করা সে সব কাহিনী ॥ ৫২৪ ॥
লীলা-গীতি-বিরচনে যে শকতি ছাপা ।
সে নহে সম্পত্তি মোর জননীর কৃপা ॥ ৫২৫ ॥
যে যে সব ভক্তদের অপার করুণা ।
যে বলে পাইনু পুঁথি মিটিল বাসনা ॥ ৫২৬ ॥
বন্দনা করিয়া তে সবার শ্রীচরণ ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি করি সমাপন ॥ ৫২৭ ॥
প্রথমতঃ গুরুরূপে দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
যাঁহার কৃপায় হইল প্রভু দরশন ॥ ৫২৮ ॥
লীলাগীতি গ্রন্থারম্ভ তাঁহার আজ্ঞায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫২৯ ॥
দ্বিতীয় গিরিশচন্দ্র ঘোষ ভক্তবর ।
দিলা যেবা গুহ্য গুহ্য লীলার খবর ॥ ৫৩০ ॥
অন্তরে অন্তরে ভালবাসিয়া আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩১ ॥
তৃতীয়তঃ যোগানন্দ প্রেমিক সন্ন্যাসী ।
আমার উপরে যাঁর কৃপা রাশি রাশি ॥ ৫৩২ ॥
করুণ
প্রার্থনা যেবা কৈলা বারে বারে ।
জননীর কাছে মোর মঙ্গলের তরে ॥ ৫৩৩ ॥
স্বার্থশূন্য প্রীতি স্নেহ কৈলা যে আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৪ ॥
চতুর্থ যে জন তিনি নিত্য নিরঞ্জন ।
সদা আস্যে হাস্যরাশি সুসরল মন ॥ ৫৩৫ ॥
পবিত্র করিলা যেবা মম জন্মস্থলী ।
বিতরিয়া সুদুর্লভ চরণের ধূলি ॥ ৫৩৬ ॥
সার্থক জীবন মম যাঁহার কৃপায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৭ ॥
শেষে রামকৃষ্ণানন্দ শ্রীশশী ঠাকুর ।
সতত উন্মত্ত যিনি সেবায় প্রভুর ॥ ৫৩৮ ॥
লীলাতত্ত্ব সিন্ধুতীরে দিলা যে আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৯ ॥
সায় এইখানে রামকৃষ্ণলীলা-গান ।
বদনে সকলে বল রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৫৪০ ॥
পঞ্চম খণ্ড সমাপ্ত
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি সমাপ্ত