সংগীত সংগ্রহ

Sangeet Sangraha is a cherished compilation of devotional songs in Bengali. Perfect for spiritual seekers, it offers melodies to uplift the heart and deepen one's sadhana. Immerse yourself in this inspiring collection.

ভূমিকা

ভূমিকা

রোমাঁ রোলাঁ তাঁর অপূর্ব “Musiciens D'autre fois " (“পুরাকালের সঙ্গীতকার”) বইটিতে লিখেছেন : “Le spectacle de cette etrenelle floraison de la musique est un bienfait

moral. C'est un repos au milieu de l'agitation universelle" অর্থাৎ

যুগে যুগে নামে আকাশ-গঙ্গা উছলি' চিরন্তনী

ফুটায়ে তমসা-তন্দ্রার তটে সঙ্গীত-জাগরণী।

আনে সে কান্তি-বরাভয় :

ঘোষি' অশান্তি-পরাজয় :

ভ্রান্তিবিধুর ভুবনে ঝলকি' ধ্বনি চিন্ময় মণি ।

সবাই জানেন এ-সঙ্গীতের দুটি বৈ ধারা নেই ঃ কণ্ঠসঙ্গীত আর যন্ত্রসঙ্গীত! এ-দুয়ের মধ্যে কণ্ঠসঙ্গীতের ধারা এক হিসেবে বেশি বিচিত্র, যেহেতু কণ্ঠসঙ্গীতে ধ্বনিশ্রীর ঐ আকাশগঙ্গার সঙ্গে এসে মিলল

ধরিত্রীর ভাবযমুনা। এহেন শুভসঙ্গমে মানবমনোভূমি হয়ে উঠেছে এক অদৃষ্টপূর্ব সৌন্দর্যনন্দন। উর্বরতার পরম পরিণতিতে এ-লীলাকানন হয়ে উঠল পুণ্যতীর্থ-ভক্তির মন্দাকিনী সিঞ্চনে। এই তীর্থেরই প্রচলিত স্বীকৃত নাম ‘ভজন’। হিন্দিতেই এ শব্দটির বেশি চল। বাংলায় ভজন নামটির প্রতিশব্দ ‘কীর্তন’—যদি কীর্তন শব্দটিকে তার উদারতম অর্থমূল্য দেওয়া যায়। এ যদি-টুকুর অবতারণা করছি এইজন্যে যে, বিশেষজ্ঞরা অনেক সময়েই তাঁদের অতিসূক্ষ্মদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে খানিকটা একদেশদর্শী হয়ে পড়েন বলে যথাযথ পরিপ্রেক্ষণিকা—perspective—হারিয়ে বসে থাকেন। পাছে তাঁরা ‘কীর্তন' বলতে শুধু বঙ্গজাত বৈষ্ণব-পদাবলী বোঝেন সেই ভয়েই একথা বলে রাখা দরকার মনে করলাম, যেহেতু আসলে কীর্তন বলতে শুধু বৈষ্ণব-পদাবলীই বোঝায় না, দাক্ষিণাত্যে বিখ্যাত ত্যাগরাজের কীর্তন তেলুগুতে বহুসমাদৃত—আমাদের দেশে ও কালী-কীৰ্তনবর্গীয় গান কে না শুনেছেন? আমি তাই ভক্তিসঙ্গীত বলতে এ-ভূমিকায় ‘কীর্তন' শব্দটি ভজন-অর্থেই প্রয়োগ করব।

   কিন্তু মনে রাখতে হবে—‘কীর্তন’-সঙ্গীতের উদ্ভব হতে অনেক সময় লেগেছে। সাবেক কালে ‘তৌর্যত্রিক’ কথাটির চল ছিল। তৌর্যত্রিক মানে গীত, বাদ্য, নৃত্য। এর মধ্যে গীতকেই বলা হলো শ্রেষ্ঠ, কেননা সঙ্গীতরত্নাকর বলছেন লাখকথার এক কথা—

নৃত্যং বাদ্যানুগং প্রোক্তং বাদ্যং গীতানুবৃত্তি চ 

অতো গীতং প্রধানত্বাদত্রাদাবভিধীয়তে। 

অর্থাৎ যেহেতু নৃত্য মেনে চলে বাদ্যকে, বাদ্য মেনে চলে গানকে; সেহেতু গানই জ্যেষ্ঠ তথা শ্রেষ্ঠ।

  সব গান নয় অবশ্য, যে গানে সুর ও কাব্যের সঙ্গমে গ'ড়ে উঠেছে কাব্য সঙ্গীতের সুখতীর্থ, তাকেই বলছি সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ বিকাশ, ওরফে গান।

  কিন্তু এ-তীর্থও কিছু দুদিনে গ'ড়ে ওঠে না। ‘সাঙ্গীতিকী' বইটিতে ‘বৈদিক পর্ব' অধ্যায়ে লিখেছি : “প্রথম অবস্থায় সব সঙ্গীতই হয় আবৃত্তি পথচারী—কি না কয়েকটি মাত্র স্বর নিয়েই সে শুরু করে

কারবার। আমাদের বৈদিক যুগে স্তোত্রপাঠ—সমগান, ওরফে hymnology—ছিল এই জাতীয় সঙ্গীত।” 

  এ-সঙ্গীতকে আমি ‘উপসঙ্গীত' বলেছি কীর্তনের সঙ্গে তুলনায়। কারণ কীর্তনের সঙ্গে স্তোত্রগাথা-বর্গীয় সঙ্গীতের তুলনা করলে দেখা যাবে যে বৈদিক স্তবসঙ্গীত খতিয়ে আবৃত্তির কোঠায়ই পড়ে—যাকে বলে chanting ঃ ক্রমে এ-সঙ্গীতেরও একটু আধটু বিকাশ হয়-কণ্ঠস্বরের একটু আধটু ‘উদাত্ত অনুদাত্ত’ কি না ‘ওঠা-পড়া’, কখনো হয়ত বা অল্পস্বল্প ‘স্বরিত’ কি না মিড়ের হাওয়া লেগে। ‘সাঙ্গীতিকী’র বৈদিক

পর্ব অধ্যায়ে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি, এখানে সে সবের পুনরুক্তি বাহুল্য হবেও বটে, খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকও হবে হয়ত—যেহেতু আমাদের আলোচ্য হচ্ছে কীর্তন। তাছাড়া অত বিস্তারিত আলোচনার স্থানও নেই এখানে।

  সে যাই হোক, এই বৈদিক উপসঙ্গীতই যে কীর্তনের পূর্বপুরুষ—জন্মদাতা একথা ভুললে চলবে না। ঐ উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিতের ক্রমবিকাশের ফলেই গাথা স্তবস্তোত্রাদি খাঁটি সঙ্গীতের কোঠায় এসে পড়ে—রাগসঙ্গীতের ছোঁয়াচে। কীর্তনের ভাবসৈকতে তাই রাগসঙ্গীতের নানা রঙচঙ রসরূপের বান ডাকিয়ে ঢেউ তুলে জাগালো এক নবলাবণ্যের সুরধুনী। এ-মিলনপ্রবাহে শুধু ভাব বা রাগের রঙই নয়- কাব্যছন্দের দীপ্তিও আনলো আলোর ঝিকিমিকি। ফলে হৃদয়ের নানা অনুভব—যারা শুধু কাব্যেই আশ্রয় পেত, এসে আসর জমালো— ক্ৰমে গড়ে তুলল কীর্তনের স্বপ্ননীড়। ভাব ডাক দিল সুরকে, বলল ঃ

তোমারি লহরে তরণী আমার দোলে

রাগিণী-মলয়ে ছন্দের কল্লোলে।

  ফলে বঁধুকে খুঁজল বৈষ্ণব—গাইল ঃ

ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণী অবনী বহিয়া যায় ঃ

  প্রভুকে খুঁজল দাসী—সাধল ঃ

অব ছোড়া ক্যো বনে প্রভুজী ? – চরণকে পাস বুলাবো ।

মীরা দাসী জনম জনম কি অঙ্গসুঁ অঙ্গ লগাবো ঃ

  মনের মানুষকে খুঁজল বাউল—কাঁদল ঃ

দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা

তারে ধরি ধরি মনে করি, (মন) ধরতে গিয়ে আর পেল না।

  আরও কত আদর, কত আকুলতা, কত অশ্রু, কত আবেশ, কত মধু, কত বেদনা, কত বিরহ, কত ঢেউ যে উছলে উঠল রঙে ঢঙে, রূপে রসে, আলোয় ছায়ায়, অশ্রুতে হাসিতে, তার অনেক খবরই পাওয়া যাবে এই বইটির নানান গানে। মানুষ তার এই অচিন চেনা বঁধুকে নিয়ে কত ভাবের রসলীলাই যে করেছে তার প্রেমের বৈকুণ্ঠে, আনন্দের বৃন্দাবনে, আলোর তীর্থে—সে ইতিহাসের বহু বিচিত্র পরিচয়

মিলবে এ-বইটিতে। ভজন কীর্তনের এত ঐশ্বর্য অন্য কোনো ভাষায় আছে বলে আমার জানা নেই। ভগবানকে এত ভাবে কল্পনা করেনি আর কোনো জাতি—এমন অফুরান বর্ণ, গন্ধ, স্বপ্ন, ছন্দের রঙিন

আবেশে। য়ুরোপীয় সঙ্গীত যথার্থ বড় ওদের হার্মনি বা স্বর-সঙ্গতিলোকে। সেখানে কাউন্টারপয়েন্ট যোগে গির্জাসঙ্গীতে গানের এক সুমহৎ বাণী রূপপরিগ্রহ করেছে এ-ও মানি, কিন্তু ভারতীয় কীর্তনের

অজস্রতা, অন্তর্মুখিতা ও বৈচিত্র্য নিয়ে কখনই নয়। একই আলো যুগে যুগে দেশে দেশে নেমেছে হাজারো গুণীর কণ্ঠে, কিন্তু দেশ কাল ও ক্ষেত্রভেদে তার ছন্দ ও তালের হয়েছে রকমফের রঙবদল। ওদের

দেশে তাই সাঙ্গীতিক মহিমা নিজেকে সবচেয়ে জানান দিয়েছে ওদের যন্ত্রসঙ্গীতে, আমাদের দেশে—আমাদের কণ্ঠসঙ্গীতে—আর সে সঙ্গীতের গাঢ়তা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে এই কীর্তনে ওরফে ভক্তিসঙ্গীতে !

  তর্ক উঠতে পারে রাগসঙ্গীত নিয়ে। রাগকোবিদ মুখ ভার করে বলতে পারেন—রাগসঙ্গীত কিসে কম। এতে কি নেই সাঙ্গীতিক বিভূতি ? 

  আছে বইকি! ভারতীয় সঙ্গীতলোকে রাগসঙ্গীতের স্থান খুবই উঁচুতে—না মানবে কে? কণ্ঠের কতরকম সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা যে রাগসঙ্গীতকে আশ্রয় করে মূর্ত হয়ে উঠেছে ভাবতে গৌরব বোধ হয় বইকি। কিন্তু সব বলা হয়ে গেলেও তবু বলতেই হবে যে রাগসঙ্গীত তার নিজকীয় ক্ষেত্রে অপরূপ হলেও তার মূল ভঙ্গিটি—এযাবৎ―হয়ে এসেছে সুর-সর্বস্ব। অর্থাৎ, কণ্ঠের স্বকীয় ভাষা সে-নাটমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করে নিন-

যেহেতু কাব্য সেখানে গৌণ। তাই রাগশিল্পীরা আসলে ‘গান করেন' না, করেন ‘কণ্ঠবাদন'। একথা আমার সাঙ্গীতিকীতে নানাভাবে বিশদ করে বলেছি—এখানে সেসব যুক্তির পুনরুক্তি করতে চাই না। তবু যে এখানে রাগসঙ্গীতের যন্ত্রভঙ্গীম হওয়ার উল্লেখ করলাম, সে শুধু এই কথায় উপরে জোর দিতে যে কণ্ঠসঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ বিকাশ নিশ্চয়ই ভক্তিসঙ্গীতে—যেখানে ফুটল তার হৃদয়ের গভীরতম স্বপ্নের অজস্র মুকুল, ছুটল তার নিবিড়তম উচ্ছ্বাসের সহস্র ধারা, রটল পরমতমের আবাহন—ভাব-ধ্বনি-ছন্দের ত্রিবেণীসঙ্গমে।

  আমাদের বৈষ্ণব-পদাবলীর রসবৈকুণ্ঠের নৃত্যলোকে ছলকে উঠেছে প্রেম ভক্তির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী বহুরূপী দীপ্তি। এ-চয়নিকাটিতে সে আনন্দের পরিবেষণ করা হয় নি। এর উদ্দেশ্য এমন একটি সংগ্রহ প্রকাশ করা, যার মধ্যে মিলবে বাংলাদেশের ভক্ত-হৃদয়ের একটি বহুমুখী ভাবঘন পরিচয়। বলাই বেশি যে, এ পরিচয় কোনো চয়নিকাতেই সম্পূর্ণ হতে পারে না—তার জন্যে একটি নব গীতি-বিশ্বকোষের প্রণয়ন করতে

হয়। এ-বইটির সঙ্কলক-সংসদ বহুযত্নে চয়ন করেছেন বাংলাদেশে যেসব কীর্তনের চল আজো আছে—মাঠে, ঘাটে, মুখে, ছড়ায়, যাত্রায়, থিয়েটারে এমনকি গ্রামোফোনেও, এজন্যে এ-নির্বাচক পরিষদকে যে

কি বিপুল শ্রম স্বীকার করতে হয়েছে সেটা কল্পনীয়। প্রথমত এসব গানের পদ নির্ভুল পাওয়াই কঠিন। দ্বিতীয়ত মুখে মুখে এসবের এত পাঠান্তর কায়েম হয়ে গেছে যে ঠাহর পাওয়া ভার কোন্ গানের কোন্ পদটি শুদ্ধ, কোটি প্রক্ষিপ্ত। মীরাবাঈয়ের ‘চাকর রাখো জি' গানটিতে এ-কথার পরিচয় পাওয়া যায় বিশেষ করে—আমরা কেউই এ গানটির এত পাঠান্তর শুনিনি। অন্য অনেক গানেও নানা পাঠান্তর আছে—না

থাকাই আশ্চর্য। মানুষের স্মৃতিশক্তি বড় বেশি চলে তার ভাব-আবেগের হুকুমে। তৃতীয়ত বহু ভালো চলিত গানেরও সমাবেশ অসম্ভব—নির্বাচন করতেই হয়। এখানেও মুশকিল কম নয়। ধরা যাক রামপ্রসাদের গান বা কমলাকান্তের গান। সব গান তো নেওয়া চলে না—স্থানাভাব। অতএব বাছাই করা ছাড়া পথ নেই। কিন্তু তখন আরও মুশকিল, কোন্‌গুলি নেব আর কোনগুলি ছাড়ব! কমলাকান্ত ও রামপ্রসাদের অনেকগুলি উৎকৃষ্ট গান বাদ পড়েছে? কিন্তু এখানেই তো এসে পড়ে সেই রুচির তর্ক—riddle of the sphinx, মনালিসার হাসি। কোনও চরম সমাধানই নেই এই রুচির বিতণ্ডায় ।

  তাহলে কর্তব্য কি? শুধু সঙ্কলকদের রুচির পরেই বরাত দিয়ে বসে থাকা? কিন্তু সেখানেই বা কোন্ মুশকিল আসান কূল মিলিয়ে দেবেন চিরন্তন রুচিসংকটের অকূল-পাথারে? এই সব ভেবেই সঙ্কলকেরা এমন অনেক গানকে ঠাঁই দিয়েছেন যাদেরকে—অনেকের মতে—বাদ দিলেই ছিল ভালো। বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি অপরের রুচিকে খানিকটা খাতির করতে হলো বলে। তাই তো অনেক ভক্তসাধকের কাছে যেসব গান খুব প্রিয় সেসব গানকেও তাঁরা এমন সাদরে পংক্তি-ভোজনে ডেকেছেন। না ডেকে উপায়? কোন্ অভ্রান্ত দিশারির রুচিকৌলিন্য হদিশ দেবে সাঙ্গীতিক অস্পৃশ্যতার? মনে রাখতে হবে এ বইটির কাছে আদরণীয় শুধু গীতির উৎকর্ষ নয়—তাদের লোকপ্রিয়তাও বটে, অধ্যাত্মভাব-সম্পদও বটে।

  তাছাড়া এখানে আরো একটা´ কথা আছে। বক্তব্যটি এমনি যে সংক্ষেপে বলা শক্ত—আমার ‘সাঙ্গীতিকীতে’ এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি—কিন্তু তবু এখানে সে-আলোচনার কিছু আভাস না দিলেও এ বইটির একটি গোড়াকার কথাই না-বলা থেকে যাবে। কথাটা এই যে, গানের প্রকৃত বিচার শুধু তার কাব্যবিচার নয়—সুর ও কাব্য দুয়ের সহযোগে তবেই গড়ে ওঠে তার হরিহরমূর্তি। তাই তো অনেক সময়েই দেখা যায় যে কবিতা হিসাবে শিখরিণী না হলেও অনেক পদাবলী, বাউল, ভজন, গজল গান হিসাবে হলো রসোত্তীর্ণ। যেমন ধরা যাক রামপ্রসাদের—

প্রসাদ বলে ভবার্ণবে বসে আছি ভাসিয়ে ভেলা

জোয়ার এলে উজিয়ে যাব ভাটিয়ে যাব ভাটার বেলা

মানুষের অন্তরের একটি শাশ্বত কামনা হলো এই যে সে চায় কোনো পরম নির্ভরের অচল প্রতিষ্ঠা। এ জগতের অকূল পাথারে পূর্ণ শান্তি পায় মানুষ কখন? না, যখন সে হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের তনুমনপ্রাণের তরণীকে রাখে সেই কাণ্ডারীর চরণাশ্রয়ে, যাঁর প্রসাদে ‘নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং... গচ্ছতি'—যাঁর করুণা পেলে তুফানেও হয় না ভরাডুবি—যাঁর অভয়বাণী কানে শুনলে আসুক না জোয়ার-ভাটা, উঠুক

না ঝড়, ডাকুক না বান—ভেলা পৌঁছবেই সেই বন্দরে যেখানে ওর শান্তির—সর্বলাভের পরম কৃতার্থতা। এই ভাবের ব্যঞ্জনা; সাধককবি ফুটিয়ে তুললেন ঐ ছোট্ট চরণে অপার সিন্ধু-বুকে অসহায় খেয়ার একটি মাত্র উপমার ছবিতে। এই-ই হলো গানের একটি পরম রসগভীর যাদু। আর এই সরল সহজ গভীর দোলা সে জাগায় তার ছন্দের তালে, ভাবের আলোয়, সুরের হাওয়ায়।

  কিন্তু সুরের জন্য অনেকখানি ফাঁক রয়েছে এখানে—না থাকলে এ চরণ দুটি এত সহজে গান হয়ে উঠত না। আরো একটি দৃষ্টান্ত দিই ঃ

ধরা যাক অতুলপ্রসাদের-

কী আর চাহিব বলো হে মোর প্রিয়?

(শুধু)তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও ।

বলিব না—“রেখো সুখে”,

চাহো যদি—রেখো দুখে,

তুমি যাহা ভালো বোঝ তাই করিও।

(শুধু) তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও ৷

যে পথে চালাবে নিজে

চলিব—চা'ব না পিছে

আমার ভাবনা প্রিয় তুমি ভাবিও

(শুধু) তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও ৷

এখানে ‘তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও' চরণে এ অপূর্ণ (ত্রয়োদশী) পয়ারের ছন্দপতন নিশ্চয়ই হয়েছে—কাব্যছন্দের বিচারে। কিন্তু সুর যে এর গায়ে ঠেকাল তার স্পর্শমণি—তাই না এর রস হয়ে উঠল দীপ্ত, নিটোল—এমন কি ছন্দও হয়ে উঠল ধন্য, সুন্দর। ছন্দের কথা এতটা টেকনিকাল ভঙ্গিতে বলতে বাধ্য হলাম এই জন্যে যে অনেক কাব্যানুরাগীই গানের ছন্দকে তালে পড়েন—সুরে শোনেন না। গান যে বিশেষ করেই সুর-সঙ্গতে শুনবার জিনিস। কাব্যও আসলে শ্রবণীয়ই বটে কিন্তু গান যেন কাব্যেরও কাব্য—বাচোঽবাচম্। আর এ পরম রূপান্তর সে লাভ করে সুর ও কাব্যের যুগলমিলনে। অতুলপ্রসাদের এ গানটির মধ্যে হৃদয়ের যে গভীর নিখুঁৎ আত্মসমর্পণের প্রার্থনা ফুটে উঠেছে বাংলা গীতিলোকে তার জুড়ি কমই আছে। প্রতি কথাটি যেন উৎসারিত হয়েছে সর্বহারা হৃদয়ের অপার আত্মোৎসর্গের তৃষা-উৎস থেকে। কিন্তু এ গানটির রসগ্রাহী হতে হলে কান পেতে শুনতে হবে শুধু এর ভাবভঙ্গিমাকে না—ডুবতে হবে এর অতলে ঃ অর্থাৎ সুরলোকে। এই জন্যেই গানের প্রকৃত বিচার কাব্যবিচারের চেয়েও এক হিসাবে কঠিন—কেন না গানকে চিনতে হলে শোনা চাই আরো গভীর শ্রুতির পথে। গান যে গান—সে তো শুধু কবিতা নয়—কবিতার যা দেয়, গানের দেয় যে তার চেয়ে অনেক বেশি। কবিতার কোথায় সে সুরের পাখা—সে পৌঁছে দেবে কেমন করে সে নীলিমায় যেখানে গান স্বচ্ছন্দে বিহার করে তার সহজ গগনচারিণী প্রতিভায় ?

  এই ভাবে দেখলে—এই ভঙ্গিতে শুনলে তবেই এ বইটির অনেক গানের মর্ম বোঝা যাবে! যেমন

নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে ও রূপরাশি,

তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরি গুহাবাসী !

বাগেশ্রীর স্বকীয় গাম্ভীর্য-গরিমায় শুনতে হবে একে—নইলে এ গানটি ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিতে' চাইলেও পারবে কেন ?

  কিন্তু এখানে যেন আমাকে ভুল বোঝা না হয়। অনেক গান সুরযোগে তবে প্রকৃত গান হয়ে ওঠে একথা বলার মানে এই নয় যে সব গানই গান। তা হতেই পারে না, যেহেতু ভালো কাব্য বিরল, কিন্তু আরো বিরল ভালো সুর। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে গানের বিচার শুধু তার কাব্যের বিচারে পর্যবসিত হলে চলবে না।

  এই বিচারেও বলা চলে বৈকি যে এ-চয়নিকায়ও অনেক গান বাদ দেওয়া চলত। তাছাড়া মরমিয়া কবিদের আরো অনেকগুলি হিন্দি গান এতে থাকলে নিশ্চয়ই ভালো হতো—হারীন্দ্রনাথ, শ্রীমতী রাহানা,

অজদ, আবুল অসর জলন্ধরী প্রমুখ কবিদের অনেক সুন্দর হিন্দুস্থানী ভজনও এ বইটির অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। সহজ সরল কয়েকটি ভাবোজ্জ্বল গজল নিলে বইটি আরো সমৃদ্ধ হতো। আশা করি ভবিষ্যৎ সংস্করণে অনেক নিষ্প্রভ গান বাদ দিয়ে এতে এমনি ভাবোজ্জ্বল গানেরই স্থান করা হবে! কিন্তু সে ভাবিকালের জল্পনা-কল্পনা রেখেও বলা চলে এ-সংস্করণে যে সব উৎকৃষ্ট গান সন্নিবিষ্ট হলো তাদের

সমাদর হওয়া আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের যথেষ্ট আনুকূল্য করবে—যেহেতু ভক্তির ভাবঘন স্পন্দন সবচেয়ে সহজে সক্রিয় হয়ে ওঠে কীর্তনে।

  পরিশেষে বক্তব্য এই যে এ-বইটির বহু গানে বাঙালির এই ভাবঘন হৃদয়ের স্বপ্ন ও আবেশ যেভাবে বহুরঙা ফুলের মতনই ফুটে উঠেছে তাদের সৌরভ যদি সব সময়ে সূক্ষ্ম সুন্দর নাও হয় তবুও একথা নিশ্চয়

যে তাদের আনন্দমূলে নিবিড় হয়ে রয়েছে আশীর্বাদ, যিনি “শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং, মনসো মনঃ, বাচো হ বাচং, প্রাণস্য প্রাণঃ, চক্ষুষশ্চক্ষুঃ”—যার ধ্যানে যুগে যুগে “ধীরাঃ প্রেত্যাস্নাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি” ঃ

“শ্রবণে যিনি শ্রুতির শ্রুতি, মনের মন মানসে,

প্রাণের প্রাণ হৃদয়ে যিনি, আঁখির আঁখি নয়নে,

বচনে যিনি মন্ত্রসম—যাঁহার আলো পরশে

গরল তরি' পথিক হয় ধন্য সুধা মিলনে।”

        শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম                                                         শ্রীদিলীপ কুমার রায়                                                                                                                                           

        আশ্বিন, ১৩৪৬                                                            পণ্ডিচেরি                                                                                                            






























  




সঙ্গীত সম্বন্ধে

সঙ্গীত সম্বন্ধে

(সঙ্গীতসম্রাট শ্রীগোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের অভিমত)

“সচ্চিদানন্দবিভবাৎ সকলাৎ পরমেশ্বরাৎ, আসীচ্ছক্তিস্ততো নাদস্তস্মাদ্বিন্দু সমুদ্ভবঃ”— পরমেশ্বরের সম্পূর্ণ সচ্চিদানন্দ বিভব হইতে এক শক্তির উদ্ভব হয়, সেই শক্তি হইতে নাদ এবং সেই নাদ হতে বিন্দু উদ্ভূত হইয়াছে। নাদ—পূর্ণব্রহ্মস্বরূপ। বিষ্ণুপুরাণ বলেন, “কাব্যালাপাশ্চ যে কেচিদ্ গীত কান্যখিলানি চ, শব্দমূর্তিধরস্যৈতে বিষ্ণোরংশা মহাত্মনঃ।” সকল গীতিকা শব্দমূর্তিধর বিষ্ণুর অংশ। বেদের উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্গীতের সৃষ্টি। সঙ্গীতশাস্ত্রকারগণ সঙ্গীতকে ভগবৎ সাধনার প্রধান উপায় বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভাবোদ্দীপনায় সঙ্গীতের তুল্য শক্তিশালী আর দ্বিতীয় কিছুই নাই। সঙ্গীতের স্বরলহরী অন্তর্নিহিত ভাবকে কোমল সরস স্পর্শে সজীব করিয়া তুলে। সঙ্গীতের মধুর ও গম্ভীর স্বর-তরঙ্গ যখন ধর্মভাবের আবেগ উঠায় তখন হৃদয়ের সকল বৃত্তি ঈশ্বরাভিমুখিনী হয়। হর্ষ-বিষাদ, অনুরাগ-বৈরাগ্য, উল্লাস- নৈরাশ্য প্রভৃতি বিভিন্ন ভাব বিভিন্ন সুরের মধ্যে ব্যক্ত হয়। মানব হৃদয়ের সকল ভাবের উপর সঙ্গীতের সমান আধিপত্য থাকিলেও ধর্ম ভাবই সঙ্গীতের প্রধান আশ্রয় ভূমি। বৈদিক যুগে আর্য ঋষিগণ সামগানে পরম দেবতার আরাধনা করিতেন। এ-যুগেও শ্রীচৈত্যন্যদেব সঙ্গীতের দ্বারাই তাঁহার প্রেমধর্ম প্রচার করিয়া দেশকে মাতাইয়াছিলেন। তানসেন, বৈজু, গোপাল প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ গায়ক-কবিগণের গান অধিকাংশই ভক্তিরসাত্মক। জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিগণের গীত সুমধুর সুর-লহরী দেশবাসীকে ভগবৎ প্রেমে দীক্ষা দিয়াছিল। যে সকল শিল্পদ্বারা মানুষের চিত্ত আকৃষ্ট হয় তন্মধ্যে সঙ্গীত শ্রেষ্ঠ, কারণ সঙ্গীত অর্থাৎ গীত বলিতে আমরা কাব্য ও সঙ্গীত উভয়েরই সমন্বয় দেখি। শ্রেষ্ঠ কবিতা ও শ্রেষ্ঠ সুরের মিলনে যে অপরূপ ভাবের সৃষ্টি হয়, তাহার তুলনা জগতে বিরল। ব্রহ্ম—আনন্দস্বরূপ—সঙ্গীতের দ্বারা আমরা সেই পরম আনন্দ লাভ করি। জগতে মানুষ আনন্দের জন্য লালায়িত। সকল অবস্থাতেই এবং সকল সময়েই মানুষ ‘আনন্দ' খুঁজিয়া বেড়ায়। সাধারণ মানুষ দৈহিক আনন্দ অর্থাৎ সাংসারিক ভোগবিলাস সন্ধানে উন্মত্ত থাকে এবং যাঁহারা সাধক তাঁহারা আধ্যাত্মিক আনন্দকে উপলব্ধি করিতে ব্যাকুল হন। পারমার্থিক আনন্দকে উপলব্ধি করিতে হইলে যে সকল সাধনার পন্থা আছে—তন্মধ্যে সঙ্গীত অন্যতম ৷ সঙ্গীতসাধনা ব্রহ্মসাধনার তুল্য। রাগরাগিণীর যথার্থ স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে বহুবর্ষব্যাপী কঠোর সাধনা আবশ্যক। রাগরাগিণীর যথার্থ মর্ম উপলব্ধি করিলে যে আনন্দ গায়ক অনুভব করেন তাহার তুলনা জগতে বিরল। সঙ্গীতের প্রকৃত নির্মল আনন্দ রাগরাগিণীর পূর্ণ বিকাশের উপরেই নির্ভর করে।

  গীতের প্রতিষ্ঠা হয় ছন্দ, তাল, লয় প্রভৃতি দ্বারা এবং তাহার বিকাশ হয় রাগের অলঙ্কার বা বিস্তার দ্বারা। ‘সঙ্গীত রত্নাকর’ বলেছেন-

“তালস্তল প্রতিষ্ঠায়ামিতি ধাতোর্মঞি স্মৃতঃ

গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং যতস্তালে প্রতিষ্ঠিতম্”

যে স্বরের যে রূপ গতি বা স্থিতি, তাহা তদনুরূপ তালে বিভক্ত। তাল দ্বারা গীতের প্রতিষ্ঠা হয় এবং উহা গীতের সংযম, শৃঙ্খলা ও সৌষ্ঠব সংরক্ষিত করে। সুরালাপ তাল ব্যতীত হইতে পারে কিন্তু কণ্ঠসঙ্গীতকে নানারূপ ছন্দে পরিণত করিতে হইলে তালের একান্ত প্রয়োজন। আর্যঋষিগণ কল্পিত ঋতু ও সময় অনুযায়ী রাগরাগিণীর বিভাগ ভারতীয় সঙ্গীতের একটি বৈশিষ্ট্য। এরূপ কল্পনা অন্যান্য দেশের সঙ্গীতে অতি বিরল। রাগের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরিকল্পনা এরূপ গভীরভাবে কোন দেশের সঙ্গীতজ্ঞ করেন নাই। পুরাকালে ঋষিগণ প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে কাব্য, সঙ্গীত এবং আনুষঙ্গিক শিল্পকলার দ্বারা উপলব্ধি করেছেন। অনেকের ধারণা গীতের সুরসংযোজনা ইচ্ছামত করিলেই চলে, কিন্তু ইহা ভুল। গীতের ভাব অনুযায়ী সুর সংযোজন বিধেয়; যেমন শব্দের ছন্দ অনুযায়ী তাল বিভাগ হয় সেইরূপ গীতের ভাব অনুযায়ী সুর-সংযোজনা প্রকৃত গীতরচয়িতার কার্য। যে গীত সুরে, ছন্দে, ভাবে, ভাষায় শ্রেষ্ঠ তাহাই শ্রোতার মনে প্রভাব বিস্তার করিতে পারে। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তানসেন, বৈজু নায়ক, গোপাল প্রভৃতির রচিত গীতগুলি উৎকৃষ্ট কাব্য বলা যায় । তুলসীদাস, সুরদাস, কবীর, মীরাবাঈ প্রভৃতি রচিত গীত ভজনাঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বাঙলাদেশে সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত রচিত গীত বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাঁদের রচিত গীতগুলিকে ভক্তের আত্মনিবেদন বলা যায়। যাঁর সাধনায় তাঁহারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর গুণগান গেয়ে তাঁহারা ধন্য হয়ে গেছেন! ভক্তের রচিত ভক্তিমূলক গীত স্বভাবতই মানুষকে মুগ্ধ করে।

  হিন্দুস্থানী সুরের ঢংয়ে প্রথম বাঙলাদেশে যে সকল বাঙলা গান রচিত ও প্রচলিত হয় তাহা প্রধানত হিন্দুর দেবদেবী বিষয়ক। সে গীতগুলি রচনা করা এবং নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা সঙ্গীত ও সাহিত্য প্রেমিকের কর্তব্য। কারণ সেগুলির উপযুক্ত চর্চা দ্বারা আমাদের অন্তর ভক্তিরসে আপ্লুত হয় এবং তাহাতে উচ্চাঙ্গ সুরসংযোজনা থাকায় সঙ্গীত রুচি উন্নত ও পরিমার্জিত হয়। এরূপ উচ্চশ্রেণির গান চিরকাল নূতন থাকে। যুগে যুগে সে সকল গান বিভিন্ন গায়কের মুখে নব নব রূপে প্রকাশ পায়। আমাদের দেশের সাধক কবিগণ রচিত গানগুলিরও ভাব, সুর এবং বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে যে প্রেরণা আমাদের হৃদয়ে আনে তাহা অন্যান্য গানে বিরল। যে কাব্য বা যে সঙ্গীতের মধ্যে অন্তরের গভীর অনুভূতি নাই তাহা মর্মস্পর্শী হইতে পারে না। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি বা জয়দেবের পদাবলী এত চিত্তাকর্ষক কেন? ইহা তাঁহাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁহার অসংখ্য কবিতা ও গানের মধ্যে যে গভীর ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন তাহার তুলনা নাই। তাঁহার রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতগুলি যেমন শ্রেষ্ঠ উপাসনাসঙ্গীত, তেমনি অন্যান্য বিষয়ে রচিত গীত বাঙলার সঙ্গীতে এক অমূল্য ভাণ্ডার। পুরাতন ভক্তিমূলক গীতগুলির প্রচলন হওয়া বিশেষ আবশ্যক, কারণ সেগুলির চর্চা মানুষের ধর্মপ্রবৃত্তি জাগাইয়া তুলিতে বিশেষ সহায়তা করে। দেশের উপযুক্ত শিক্ষার অভাবের জন্যই অনেক সময়ে সাধারণের রুচি বিকৃত হইতে দেখা যায়। সঙ্গীত এবং সাহিত্যের প্রকৃত মর্ম বুঝিতে হইলে রীতিমত

শিক্ষার প্রয়োজন। বিকৃত রুচির সঙ্গীত ও কাব্য মানবের মনপ্রবৃত্তিকে অধোগামী করে। যেমন উচ্চ বিদ্যাশিক্ষায় মানুষের রুচি পরিমার্জিত হয়, সঙ্গীত শিক্ষায়ও তদ্রূপ।

  দেবদেবী বিষয়ক বাংলা গানের পুস্তক আমাদের দেশে অতি অল্পই আছে। ‘সঙ্গীতরাগকল্পদ্রুম’, ‘গীতবাদ্যসার সংগ্রহ' এবং ‘বাঙালির গান' প্রভৃতি পুস্তকে অন্যান্য গানের সহিত বাঙলা গানও সন্নিবেশিত আছে। দেশবাসীর অনুরোধে আমি ১৩৩০ সালে ‘গীত-মালা' নামক স্বরলিপি গ্রন্থ প্রণয়ন করি। এ গ্রন্থে পুরাতন কবিগণ রচিত হিন্দুর দেবদেবী বিষয়ক গান স্বরলিপিসমেত প্রকাশিত আছে। 

  ‘সঙ্গীত-সংগ্রহের প্রকাশক মহাশয় যে সকল নির্বাচিত গান উক্ত পুস্তকে সন্নিবেশিত করিয়াছেন তাহা বাঙালির প্রচলিত উচ্চাঙ্গ ধর্মসঙ্গীতের মধ্যে অন্যতম। এ পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ায় আমি অতিশয় আনন্দ অনুভব করিতেছি। এরূপ পুস্তকের বহুল প্রচার প্রত্যেক দেশবাসীর কাম্য। স্বামী জ্যোতীরূপানন্দ মহোদয় আমাকে এই পুস্তকের ভূমিকা লিখিতে বলিয়াছেন, সেইজন্য আমি গৌরব অনুভব করিতেছি। এই পুস্তকের গানগুলি স্বরলিপি সমেত ভবিষ্যতে প্রকাশ করিবার জন্য প্রকাশক মহাশয়ের নিকট আমার অনুরোধ জ্ঞাপন করিলাম।


২ কার্তিক, ১৩৫০

বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া                                                                শ্রীগোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়                                                                                      

স্বরলিপিগ্রন্থের তালিকা

এই গ্রন্থে উল্লিখিত স্বরলিপিগ্রন্থের তালিকা :


১। সাধন সঙ্গীত

:

শ্রীরামকৃষ্ণ শতবার্ষিকী প্রকাশন, ১৯৩৬, রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ,

দেওঘর

২। দিব্যগীতি

:

স্বামী বিবেকানন্দ শতবার্ষিকী প্রকাশন, রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ, দেওঘর, ১৯৬৩

৩। আনন্দলহরী

:

উদ্বোধন কার্যালয়, দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ, ১৪০৫

৪। সুরবিতান

:

রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, নরেন্দ্রপুর, ১৪০৪

৫। বাঙালীর গান

:

সম্পাদনা—দুর্গাদাস লাহিড়ী, ৩৮/২, ভবানীচরণ দত্ত স্ট্রীট, কলকাতা

প্রথম প্রকাশ : ১৯০৫ (ইং), ১৩১২(বাং), দ্বিতীয় প্রকাশ : ২০০১

প্রকাশক : পশ্চিমবঙ্গ বাঙ্গালা একাদেমি, ১/১ আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস রোড, কলকাতা-৭০০ ০২

৬। ভজন সঙ্গীত

:

প্রকাশক–মাতৃমন্দির, জয়রামবাটী, বাঁকুড়া

৭। শত ভজনমালা

:

নার্থ ব্রাদার্স, ৯ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলকাতা-৭৩, সম্পাদনা-শম্ভুনাথঘোষ, প্রথম প্রকাশ : ১৩৮৮

৮। শ্রেষ্ঠ দ্বিজেন্দ্র স্বরলিপি

:

দ্বিজেন্দ্র স্বরলিপি (অধুনা) হরফ প্রকাশনী, সম্পাদনা—নিতাই ঘটক, এ, ১২৬, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলকাতা-৭, প্রকাশ : ১৯৭৩

৯। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

:

প্রকাশক, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, গোলপার্ক, কলকাতা

১০। কাকলি

:

অতুল প্রসাদ সেন, প্রকাশক—সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, ২১১, বিধান সরণি, কলকাতা-৬, প্রথম প্রকাশ ঃ ১৩৬২

১১। ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি

:

সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, ২১১ বিধান সরণি, কলকাতা : ৬, প্রথম প্রকাশ : ১৩৫৮


ত্রয়োদশ সংস্করণের প্রকাশকের নিবেদন

ত্রয়োদশ সংস্করণের প্রকাশকের নিবেদন


সঙ্গীত জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সর্বদেশ ও সর্বজাতির উপাসনার অঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে সঙ্গীত। তাছাড়া ভক্তি ও ভাব মিশ্রিত সঙ্গীত তান-লয়ে যথাযথ গীত হলে

আবালবৃদ্ধ বণিতা সকলেরই মন হরণ করে একথাও কারো অবিদিত নয়।

  আমাদের এই বিদ্যাপীঠেও প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় ছাত্র সকল উপাসনার অঙ্গরূপেই ভজন পরিবেশন করে থাকে। এই নাতিবৃহৎ পুস্তকটি মূলত ঐ উদ্দেশ্যে সংকলিত হলেও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরনের গান এখানে সংকলন করার উদ্দেশ্যে বইখানিকে সর্বসাধারণের উপযোগী করে তোলা। সেই লক্ষ্যে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। সঙ্গীত-কলা পারদর্শী একাধিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী বেশ কিছু নতুন গান এই পরিবর্ধিত সংস্করণে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। আর রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে প্রচলিত কিছু প্রাচীন গানও এই সংস্করণে পুনঃসন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। রাগ-রাগিণী সময় ও ঠাট্-এর বিবরণটিকে যথাসাধ্য. নির্ভুল এবং ব্যবহারোপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

  এই গ্রন্থের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এক, সঙ্গীত-সম্রাট শ্রীগোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের লেখাটি। দুই, সুপণ্ডিত দিলীপকুমার রায়ের সুচিন্তিত ভূমিকা। তিন, সঙ্গীত বিষয়ে স্বামী প্রেমেশানন্দজী মহারাজের পত্রাংশ। প্রত্যেক গানের শেষে রচয়িতার নামের উল্লেখ থাকায় সূচীপত্রে পৃথকভাবে রচয়িতাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং সূচীপত্রে (*) এবং (**) চিহ্নের দ্বারা কোন্ গানটি শ্রীরামকৃষ্ণ-গীত (শ্রীরামকৃষ্ণ অনুমোদিত) এবং কোন্ গানটি স্বামী বিবেকানন্দ রচিত/গীত/ উল্লেখিত/অনুমোদিত দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সঙ্গীত-সাধকের কাছে এটি একটি বড় প্রাপ্তি বলেই আমাদের বিশ্বাস । এই ত্রয়োদশ সংস্করণের কাজে যাঁরা হিতাকাঙ্ক্ষী ও সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছেন, যেমন কলকাতা নিবাসী নিত্যরঞ্জন মণ্ডল প্রমুখ সকলকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। উদ্বোধন কার্যালয়ের সন্ন্যাসী ও কর্মিবৃন্দের সক্রিয় সহযোগিতা না পেলে এই নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভব হতো না ।

  পরিশেষে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল সঙ্গীত সাধকের উদ্দেশে আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করি।


শুভ কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী                                                                                                    বিনীত,

১৪১৩                                                                                                                         প্ৰকাশক

স্বামী প্রেমেশানন্দজী মহারাজের পত্রাংশ

স্বামী প্রেমেশানন্দজী মহারাজের পত্রাংশ



শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম ।

গ্রাম সারগাছি,

পোঃ মহুলা, জেলা মুর্শিদাবাদ ।

............................১৩৫


  মানুষের শান্তিলাভের উপায় ভক্তি; আর, ভক্তি লাভের সর্বোত্তম উপায় ভগবানের নামগুণকীর্তন।

  সঙ্গীত ইন্দ্রিয় তৃপ্তির হেতুরূপে বিষয়াসক্তি বৃদ্ধি করে; কিন্তু ভগবানের ভজন রূপে তাহাই আবার বিষয়াসক্তি নাশ করে।

  ভজনসঙ্গীত ভগবানের পরমদয়ার দান। এই বঙ্গদেশে, ভজনকীর্তনে ভববন্ধন বিমোচন একটি সর্বজন বিদিত পথ।

  হরি সংকীর্তন যে করে, যে করায়, যে শুনে, যে শুনায়, উভয়-ই-ধন্য ; কারণ—

        আততং ভুবি গৃণন্তি যে ভুরিদা জনাঃ।

  ভগবদ্ ভজনের সহায়তার জন্য, তোমরা পুস্তক প্রকাশ করিতেছ জানিয়া আমরা বড় আনন্দিত। শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ তোমাদের শিরে বর্ষিত হউক। ইতি—

শুভানুধ্যায়ী

প্ৰেমেশানন্দ


বৈদিক শান্তিপাঠ

বৈদিক শান্তিপাঠ

ঋগ্বেদীয় শান্তিপাঠ

ওঁ বাঙ্মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা, মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্,

আবিরাবীর্ম এধি, বেদস্য ম আণীস্থঃ, শ্ৰুতং মে মা প্ৰহাসীঃ

অনেনাধীতেনাহোরাত্রান্ সন্দধামি, ঋতং বদিষ্যামি,

সত্যং বদিষ্যামি, তন্মামবতু, তদ্বক্তারমত্ববতু মাম্।

অবতু বক্তারমবতু বক্তারম্ ॥ 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

                

 

শুক্লযজুর্বেদীয় শান্তিপাঠ

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদুচ্যতে।

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

                

 

কৃষ্ণ-যজুর্বেদীয় শান্তি পাঠ

ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনত্তু, সহবীর্যং করবাবহৈ!

তেজস্বিনাবধীতমস্তু, মা বিদ্বিষাবহৈ 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ 

                

 

তৈত্তিরীয়োপনিষদের বিশেষ শান্তিপাঠ

ওঁ শং নো মিত্রঃ শং বরুণঃ । শং নো ভবত্বর্যমা।

শং ন ইন্দ্ৰো বৃহস্পতিঃ। শং নো বিষ্ণুরুরুক্রমঃ ।

নমো ব্ৰহ্মণে। নমস্তে বায়ো। ত্বমেব প্রত্যক্ষং ব্রহ্মাসি।

ত্বামেব প্রত্যক্ষং ব্রহ্ম বদিষ্যামি। ঋতং বদিষ্যামি,

সত্যং বদিষ্যামি, তন্মামবতু। তদ্বক্তারমবতু। অবতু মাম্।

অবতু বক্তারম্। 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥

                


সামবেদীয় শান্তিপাঠ

ওঁ আপ্যায়ত্ত মমাঙ্গানি, বাক্ প্রাণশ্চক্ষুঃ

শ্রোত্রমথোবলমিন্দ্রিয়াণি চ সর্বাণি।

সর্বম্ ব্রহ্মৌপনিষদম্। মাহহং ব্রহ্ম নিরাকুর্যাং,

মা মা ব্রহ্মনিরাকরোদনিরাকরণমস্ত, অনিরাকরণং মেহস্তু,

তদাত্মনি নিরতে য উপনিষৎসু ধর্মান্তে ময়ি সন্তু, তে ময়ি সন্তু 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

                


অথর্ববেদীয় শান্তিপাঠ

ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবা

ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভিৰ্যজত্ৰাঃ ৷

স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্ট্র বাংসস্তুপূভির্বশেম দেবহিতং যদায়ুঃ ॥

স্বস্তি নঃ ইন্দো বৃদ্ধশ্রবাঃ। স্বস্তি নঃ পুষা বিশ্ববেদাঃ ।

স্বস্তি নস্তাক্ষোঽরিষ্টনেমিঃ। স্বস্তি নো বৃহস্পতিদধাতু ॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

                


গীতা

ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্মহবিব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্।

ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকৰ্মসমাধিনা ॥

                


সংজ্ঞানসূক্তম্

সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্ ॥

দেবা ভাগং যথা পূর্বে সংজানানা উপাসতে ॥

সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্ ॥

সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি ॥

সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।

সমানমস্তু বো মনো

যথাঃ বঃ সুসহাসতি।

                


গীতাধ্যানম্

যং ব্রহ্মাবরুণেন্দ্ররুদ্রমরুতঃ স্বন্বত্তি দিব্যৈঃ স্তবৈ-

বৈদৈঃ সাঙ্গপদক্রমোপনিষদৈর্গায়ন্তি যং সামগাঃ।

ধ্যানাবস্থিত তদ্‌গতেন মনসা পশ্যন্তি যং যোগিনো

যস্যান্তং ন বিদুঃ সুরাসুরগণা দেবায় তস্মৈ নমঃ ॥





শ্রীশ্রীগুরু সঙ্গীত

যস্য দেবে পরাভক্তিৰ্যর্থ দেবে তথা গুরৌ


“যস্য দেবে পরাভক্তিৰ্যথা দেবে তথা গুরৌ।

তস্যৈতে কথিতহ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ॥”

ধ্যান

ওঁ ধ্যায়েচ্ছিরসি শুক্লাব্জে দ্বিনেত্রং দ্বিভুজং গুরুম্

শ্বেতাম্বর-পরিধানং শ্বেত-গন্ধানুলেপনম্,

বরাভয়করং শান্তং করুণাময়-বিগ্রহং

বামেনোৎপল-ধারিণ্যা শক্ত্যালিঙ্গিত-বিগ্রহম্

স্মেরাননং সুপ্রসন্নং সাধকাভীষ্ট-দায়কম্॥

প্রণাম

ব্রহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমূর্তিং

দ্বন্দ্বাতীতং গগনসদৃশং তত্ত্বমস্যাদিলক্ষ্যম্।

একং নিত্যং বিমলমচলং সর্বধীসাক্ষিভূতং

ভাবাতীতং ত্রিগুণরহিতং সদ্গুরুং তং নমামি॥

ভ্রূমধ্যে হের দ্বিদলে

ভৈরব-তেওরা


ভ্রূমধ্যে হের দ্বিদলে।

ত্রিতাপহর পরমানন্দকর গুরু চরণ কমলে।

শুক্লাম্বর কটি বিশাল বক্ষ মাঝে, সচন্দন শুক্ল ফুলমালা সাজে

রকত-বাসা বামে শকতি রাজে, শত চাঁদ নিন্দি শ্রীমুখ উজলে॥

ভকতবৎসল বাঞ্ছা-কল্পতরু অহেতুক কৃপাসিন্ধু শ্রীগুরু,

প্রসন্ন দীন প্রতি ধরি দিব্যাকৃতি শ্ৰীসচ্চিদানন্দ লীলাছলে।

শান্ত মনোহর মধুর মূরতি স্নিগ্ধ শুভ্র শুদ্ধ জ্যোতি,

আব্রহ্ম সর্ব পিতা প্রসূতি করুণা বীক্ষণ নয়ন যুগলে

— স্বামী তপানন্দ

নমন করুঁ ম্যয় সদ্গুরু চরণা

খাম্বাজ-তিনতাল


নমন করুঁ ম্যয় সদ্গুরু চরণা।

সব দুঃখ হরণা ভব নিস্তরণা॥

শুদ্ধ ভাব ধর ঔন্তঃ করণা।

সুর-নর-কিন্নর বন্দিত চরণা॥

অজ্ঞাত

ভব-সাগর তারণ-কারণ হে

শ্রীগুরু স্তবাষ্টক*


গৌড় সারঙ্গ—কাওয়ালী

ভব-সাগর তারণ-কারণ হে, রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে,

শরণাগত কিঙ্কর ভীতমনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে ॥

হৃদিকন্দর-তামস-ভাস্কর হে, তুমি বিষ্ণু প্রজাপতি শঙ্কর হে,

পরব্রহ্ম পরাৎপর বেদ ভণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।

মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে, নরত্রাণ তরে হরি চাক্ষুষ হে,

গুণগান-পরায়ণ দেবগণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে ॥

কুলকুণ্ডলিনী-ঘুম-ভঞ্জক হে, হৃদি-গ্রন্থি-বিদারণ-কারক হে,

মম মানস চঞ্চল রাত্রদিনে, গুরুদেব দয়াকর দীনজনে ৷৷

রিপু-সূদন মঙ্গল-নায়ক হে, সুখ শান্তি বরাভয় দায়ক হে,

ত্রয় তাপ হরে তব নামগুণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।

অভিমান-প্রভাব-বিমর্দক হে, গতিহীন জনে তুমি রক্ষক হে,

চিত শঙ্কিত বঞ্চিত ভক্তি ধনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।

তব নাম সদা শুভ-সাধক হে, পতিতাধম-মানব-পাবক হে,

মহিমা তব গােচর শুদ্ধ মনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে ॥

জয় সদ্গুরু ঈশ্বর-প্রাপক হে, ভব-রােগ-বিকার-বিনাশক হে,

মন যেন রহে তব শ্রীচরণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে ॥

— দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


* স্বরলিপি ও সাধন সঙ্গীত দ্রষ্টব্য

মোরি লাগি লটক গুরু চরণন কী

কাফি-কাহর্বা*


মোরি লাগি লটক গুরু চরণন কী।

গুর চরণ বিনা মোহে কছু নহি ভাবে।

ঝুট মায়া সব স্বপনন কী ॥

ভব-সাগর সব সুখ গয়া হ্যয়

ফিকর নহি মুঝে তরণন কী,

মীরাকে প্রভু গিরিধর নাগর

উলট ভয়ী মোরে নয়নন কী ॥

-মীরাবাঈ

*স্বরলিপিঃ শত-ভজন-মালা দ্রষ্টব্য

গুরুনাথ সওয়নকে নিতসুমরে

ভৈরব-তিনতাল


গুরুনাথ সওয়নকে নিতসুমরে মন জীবিত ছিন ভঙ্গুর

জো চাহে তুঁ চতুর সুখ-সম্পদ, মঙ্গল নাম কমল মুখ সোঁ বদ,

জাকি কৃপা সব পূরত কাম (গুরু নাথ)।

নমন করুঁ ম্যায় সদ্গুরু চরণা

হাম্বীর—তিনতাল


নমন করুঁ ম্যায় সদগুরু চরণা

ভব-ভয়-হরণা বন্দিত-চরণা,

তরণা প্রণত-জন-সুশরণা॥

কলিমল-হরণা সবসুখ-করণা

অভয়-বিতারণা জগদুদ্ধরণা, পাতক-হরণা॥

অজ্ঞাত

গুরু বিনা কৌন বতাবে বাট

হাম্বীর—তিনতাল


গুরু বিনা কৌন বতাবে বাট; বড়া বিকট আম ঘাট।

ভ্রান্তি কী পহাড়ী, নদিয়াঁ-বীচমেঁ অহংকার কী লাট॥

মদ-মৎসর কা মেহা বরসত্, মায়া-পবন বহে দাট।

কহত কবীর শুননা ভাই সাধো, ক্যেওঁ তরণা য়হ ঘাট॥

-কবীর

চল গুরু দুজন যাই পারে

বাউল সুরে গীত


চল গুরু দুজন যাই পারে।

আমার একলা যেতে ভয় করে॥

পার ঘাটাতে মাল্লা ছয়জনা

সহী বিনে তারা আমায়-পার করে দেয় মা,

মাঝি বলে পার করে দি

মাল্লারা নিষেধ করে॥

এ দেহ ছিল শ্মশানের সমান।

গুরু এসে মন্ত্র দিয়ে করল ফুলবাগান॥

ও তার সৌরভেতে আকুল করে

মুনি ঋষির মন হরে॥*

অজ্ঞাত


* অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীর বাউল সংক্রান্ত পুস্তক থেকে সংগৃহীত

শ্ৰীশ্ৰীগায়েত্রী সঙ্গীত

ওঁকার


“সর্বে বেদা যৎপদমামনন্তি তপাংসি সর্বাণি চ যদ্ বদন্তি।

যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্যং চরন্তি তত্তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীম্যোমিত্যেতৎ ॥”

আবাহন


আয়াহি বরদে দেবি এ্যক্ষরে ব্রহ্মবাদিনি।

গায়ত্রি ছন্দসাং মাতর্‌ব্রহ্মযোনি নমোহস্তুতে॥

স্বরূপে আপন আছ সর্বক্ষণ

ঝিঁঝিট খাম্বাজ-একতাল


স্বরূপে আপন আছ সর্বক্ষণ অন্য কিছু নাহি আর।

নীরব নিঃস্পন্দ সচ্চিদানন্দ নিরালম্ব নিরাকার॥

এক অদ্বিতীয় লীলার ছলনে, কতই ছন্দে কত স্পন্দনে,

কেন হও তুমি না জানি কেমনে সগুণ বহু সাকার॥

বেদ যাঁরে মন্ত্রে করে আমনন, যাঁর লাগি যত তপ আচরণ,

ব্রহ্মচর্য যাঁহারই কারণ তুমি সেই ওঁকার॥

স্বামী তপানন্দ 



প্রাতঃসন্ধ্যা

ভৈরব-জলদ একতাল


টুকটুকে লাল কে মা তুমি সকালবেলা হাঁসে বসে।

রাঙ্গা রবির মাঝখানে ঐ একাকিনী দূর আকাশে

কমণ্ডলু বাম করে, অক্ষসূত্র ধরি অপরে,

কচি মেয়ে কার মরিরে রাঙ্গা ঠোঁটে মৃদু হাসে

গায়ত্রীনাম কে তোর দিলে, এত সুন্দর কে সাজালে,

বুকে ধরে’ আপন করে সাধ হয় রাখি ভালবেসে;

মা তুই আমার মন বলে, নেমে আয় মা আমার কোলে

তোরে ডেকে তোরে দেখে আনন্দে রই দোঁহে মিশে॥

স্বামী তপানন্দ

শ্রীশ্রীগণপতি সঙ্গীত

ধ্যান


ওঁ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্র-বদনং লম্বোদরং সুন্দরং,

প্রস্যন্দন্মদ-গন্ধ-লুব্ধ-মধুপ-ব্যালোল-গণ্ডস্থলম্।

দন্তাঘাত-বিদারিতারি-রুধিরৈঃ সিন্দুর-শোভাকরং

বন্দে শৈলসুতাসুতং গণপতিং সিদ্ধিপ্রদং কামদম্ ॥

প্রণাম

কেদারা-ঝাপতাল


যতো বুদ্ধিরজ্ঞাননাশো মুমুক্ষো-

র্যতঃ সম্পদো ভক্তসন্তোষিকাঃ স্যুঃ।

যতো বিঘ্ননাশো যতঃ কার্যসিদ্ধিঃ

সদা তং গণেশং নমামো ভজামঃ॥

বিঘন হরণ গৌরীকে নন্দন

ললিত—তিনতাল


বিঘন হরণ গৌরীকে নন্দন, পূরণ করণ সকল মন কাজ।

এক দন্ত দয়া বন্ত চতুর্ভুজ, হমারী অর্জ শুননা মহারাজ ।

-অজ্ঞাত

তুম হো গণপত দেব

ভৈরব চৌতাল*


তুম হো গণপত দেব, বুধদাতা, শীষ ধরে গজশুণ্ড॥

জোই জোই ধ্যাবত, সোই সোই ফল পাবত,

চন্দন লেপ কিয়ে ভুজদণ্ড॥

সিদ্ধেশ্বর নাম তুহারি, কহিয়ত জো বিদ্যাধর,

তিন লোক মধ সপ্তদ্বীপ নবখণ্ড;

তানসেন তুমকো নিত সুমরত

সুর-নর-মুনি-গুণী গন্ধর্ব পণ্ডিত॥

মিঞা তানসেন


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

গণেশ গজমুখ সিদ্ধি বিধায়ক

ভৈরব—ঝাপতাল


গণেশ গজমুখ সিদ্ধি বিধায়ক, গিরীন্দ্র নন্দিনী নন্দন নায়ক

জিনি নবারুণ সিন্দুর শোভন, লম্বোদর তনু জগজন মোহন।

অভীষ্ট দায়ক বিঘ্ন বিনাশক প্রাতঃ স্মররে দেব বিনায়ক॥

স্বামী বেদানন্দ

গাইয়ে গণপতি জগবন্দন

ভূপালি—[কাওয়ালী] ত্রিতাল*


গাইয়ে গণপতি জগবন্দন, শংকর সুঅন ভবানীনন্দন।

সিদ্ধি-সদন গজ-বদন বিনায়ক, কৃপাসিন্ধু সুন্দর ভবনায়ক।

মোক প্রিয় মুদমঙ্গল দাতা, বিদ্যাবারিধি বুদ্ধিবিধাতা॥

মাঁগত তুলসীদাস করজোরি, বসহিঁ রামসিয়া মানস মোরে

তুলসীদাস


* স্বরলিপি : দিব্যগীতি দ্রষ্টব্য


গণেশ, গণ-নায়ক, করীন্দ্রবদন

বাগেশ্রী—একতাল


গণেশ, গণ-নায়ক, করীন্দ্রবদন।

সুরাসুর-শিরোরত্ন-চুম্বিত-চরণ॥

বিঘ্ন বিনাশক        প্রণত-জন-পালক

জ্ঞানাধার, জ্ঞানদাতা, মূষিক-বাহন॥

কুমার, ত্রিলোক-ত্রাতা         বিনায়ক, সিদ্ধিদাতা,

একদন্ত, গণপতি, মুনীন্দ্র বন্দন;

তরুণ-অরুণ-কান্তি,         নাশ প্রভো! মনোভ্রান্তি,

অজ্ঞান-নাশক, মম মানস-রঞ্জন

অজ্ঞাত

গণপতি গণেশ গণনায়ক সিদ্ধিদাতা

বাগেশ্রীতেওরা


গণপতি গণেশ গণনায়ক সিদ্ধিদাতা বিঘ্ননাশন সকল জন মন

মোহিত।

মূষিক-বাহন করীন্দ্র-বদন, সুরাসুর নর মুনি বন্দন,

রুদ্র কুমার ত্রিলোক পূজিত॥

অরুণ-কিরণ-নিন্দিতবরণ ফণী মণি মুকুট শোভন,

অঙ্গে ঝলসিছে রত্ন অগণন, তোমারি গুণ তুলনাতীত।

গোপেশ্বর যেন ও রাঙ্গা চরণে, নিশিদিন মগন থাকে একমনে,

কাতর-তারণ দয়ানিধে, যাচিহে তব পাশে নিয়ত॥

গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

লম্বােদর গজানন, গিরিজাসুত গণেশ

ভৈরব-চৌতাল


লম্বোদর গজানন, গিরিজাসুত গণেশ,

এক-রদন প্রসন্ন বদন অরুণ-বেশ।

নরনারী গুণী গন্ধর্ব, কিন্নর যক্ষ তম্বুর মিলি,

ব্রহ্মা বিষ্ণু আরতি পূজত মহেশ॥

অষ্ঠসিদ্ধ নববিধ মূষিক বাহন বিদ্যাপতি

তোহি সুমরত তিন কো নিত শেষ।

তানসেনকে প্রভু তুমহি কুঁ ধ্যাবে

অবিঘন রূপ বিনায়ক রূপ স্বরূপ আদেশ॥*

মিঞা তানসেন


* পাঠান্তর : “সমরত তিনকে শেষ-অস্তুত করত তানসেন.

            আয়ে ভায়ে হেরম্ব বিঘ্নহরণ,

            বিনায়ক রূপস্বরূপ অশেষ।”     [‘বাঙালির গান’ গ্রন্থ অনুযায়ী]

শ্রীশ্রীসূর্য সঙ্গীত

ধ্যান

“ব্রহ্মদৃষ্টিরুকৰ্ষাৎ”-ব্রহ্মসূত্র।


ওঁ রক্তাম্বুজাসনমশেষগুণৈকসিন্ধুং

ভানুং সমস্ত জগতামধিপং ভজামি।

পদ্মদ্বয়াভয়বরান্ দধতং করাব্জৈর্মাণিক্য-

মৌলিমরুণাঙ্গরুচিং ত্রিনেত্রম্॥

প্রণাম


জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।

ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতােঽস্মি দিবাকরম্ ॥

আদিত্য গােলকে পরম পুলকে হের নিত্য নিরঞ্জন

ভৈরব-একতাল


আদিত্য গােলকে পরম পুলকে হের নিত্য নিরঞ্জন।

প্রভায় যাঁহার বুদ্ধি অহঙ্কার ভাতে ইন্দ্রিয় মন॥

ভূর্ভুবঃ স্বঃ সর্ব চরাচরে ওতপ্রােত ব্যাপ্ত অন্তরে বাহিরে।

বুদ্বুদের প্রায় যাহে হয়, যায় বিশ্বসৃষ্টি অগমন॥

এই অহং, বুঝ ইহা কিসে রয়, নিরালম্বে সর্ববৃত্তি কর লয়।

জ্ঞানানন্দময় আমি যে অদ্বয় সত্যমুক্ত সনাতন॥

স্বামী তপানন্দ

শ্রীশ্রীনারায়ণ সঙ্গীত

সহস্ৰশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ


“সহস্ৰশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।

স ভূমিং বিশ্বতাে বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্ ॥”

ধ্যান


ওঁ ধ্যেয়ঃ সদা সবিতৃমণ্ডল-মধ্যবর্তী নারায়ণঃ সরসিজাসনসন্নিবিষ্টঃ।

কেয়ূরবান্ কনককুণ্ডলবান্ কিরীটীহারী হিরন্ময়বপুর্ধৃতশঙ্খচক্রঃ॥

প্রণাম


নমাে ব্ৰহ্মণ্য-দেবায় গাে-ব্রাহ্মণ-হিতায় চ।

জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গােবিন্দায় নমাে নমঃ ॥

অজ্ঞান তমাে বারণ

যােগীয়া ভৈরব-কাওয়ালী


অজ্ঞান তমাে বারণ সগুণ চিজ্জ্যোতি ঘন।

নবীন নীরদ অঙ্গে ক্ষরে কত সুধাকর অগণন

রকত শতদল জিনি আনন্দখনি,

ভকত মনােহর চরণ দুখানি,

তাহে মধুর ধ্বনি রতন শিঞ্জিনী পীতাম্বর স্রগ্বিভূষণ

আয়ত-পদ্মপলাশ-লােচন,

বিম্বাধরে মৃদুহাস অতুলন,

দানব-দলন ত্রিদশ-পালন নমাে নমাে নারায়ণ॥

স্বামী তপানন্দ

প্রিয় সুখময় হিরণ্ময় তনু

ঝিঁঝিঁট খাম্বাজ—একতালা


প্রিয় সুখময় হিরণ্ময় তনু মরি কিবা সাজে।

কমলাসনে নারায়ণ তপন মণ্ডল মাঝে

শঙ্খচক্র শ্রীকর কমলে,

কেয়ূর বাহুমূলে হার গলে,

কনক কুণ্ডল শ্রবণযুগলে শিরে কিরীট বিরাজে॥

স্বামী তপানন্দ

শ্রীশ্রীশিব সঙ্গীত

ধ্যান


ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজত-গিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসম্

রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশু-মৃগ-বরাভীতি-হস্তং প্রসন্নম্।

পদ্মাসীনং সমম্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্র-কৃত্তিং বসানম্॥

বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিল-ভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্

প্রণাম


নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়-হেতবে।

নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতিঃ পরমেশ্বর॥

ডিমিকি ডিমিকি ডিমি

মালকোষ—কাওয়ালী*


ডিমিকি ডিমিকি ডিমি, ডিমিকি ডিমিকি ডিমি

নাচে ভোলা নাথ।

নাচে ভোলা নাথ (চারবার)॥

মৃদঙ্গ বোলে শিব শিব শিব ওম্,

ডমরু বোলে হর হর বোম্ বোম্‌;

বীণা বোলে হরি ওম্ হরি ওম্

নাচে ভোলা নাথ (চারবার)॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপি: আনন্দ লহরী দ্রষ্টব্য

শিবাষ্টকস্তোত্রম্

গৌড় সারঙ্গ—তিনতাল


প্রভুমীশমনীশমশেষ গুণং, গুণহীনমহেশগরাভরণম্।

রণনির্জিতদুর্জয়দৈত্যপুরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥১

গিরিরাজসুতান্বিতবামতনুং, তনুনিন্দিতরাজিতকোটিবিধুম্।

বিধিবিষ্ণুশিরোধৃতপাদযুগং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥২

শশলাঞ্ছিতরঞ্জিতসন্মুকুটং কটিলম্বিতসুন্দরকৃত্তিপটম্

সুরশৈবলিনীকৃতপূতজটং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৩

নয়নত্রয়ভূষিতচারুমুখং, মুখপদ্মপরাজিতকোটিবিধুম্।

বিধুখণ্ডবিমণ্ডিতভালতটং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৪

বৃষরাজনিকেতনমাদিগুরুং, গরলাশনমাজিবিষাণধরম্।

প্রমথাধিপসেবকরঞ্জনকং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৫

মকরধ্বজমত্তমাতঙ্গহরং, করিচর্মগনাগবিবোধকরম্।

বরমার্গণশূলবিষাণধরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৬

জগদুদ্ভবপালননাশকরং, ত্রিদিবেশশিরোমণিখৃষ্টপদম্।

প্রিয়মানবসাধুজনৈকগতিং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥ ৭

অনাথং সুদীনং বিভো বিশ্বনাথ পুনর্জন্মদুঃখাৎ পরিত্রাহি শম্ভো।

ভজতোঽখিলদুঃখসমূহহরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥ ৮

আজু শম্ভুহর নাচত ডমরু করে

খাম্বাজ—সুরফাক্তা 


আজু শম্ভুহর নাচত ডমরু করে,

বজাবত গজবদন লম্বোদর মৃদঙ্গ আনন্দ ভরে।

পঞ্চানন অনাদি নাদ আলাপ করে,

গাবত সুরগণ সমবেত ভঈরী,

রঙ্গনাথ নিরখ মোহন বিগলিত রূপম বিরাজে ৷৷

যদুনাথ ভট্টাচার্য

ত্রাণ করো, হে শঙ্কর

ভৈরবী-চৌতাল


ত্রাণ করো, হে শঙ্কর।

আশুতোষ নাম, গুণে গুণ-ধাম, হর মম দুঃখ হরো হর॥

বিপদ কাণ্ডারী, প্রভু ত্রিপুরারি, বিখ্যাতগুণ ত্রিপুর।

পাপে হয়ে ভারী, ভবে ডুবে মরি, ওহে গঙ্গাধর! ধরো ধরো।

ওহে ত্রিনয়ন ত্রিতাপহারী, ত্রিপুরান্তক ত্রিশূলধারী

ত্রিজগৎ-পাপ-তাপ নিবারি, কৃপানয়নে হেরো।

কি করি শঙ্কর শমন কিঙ্কর বাঁধে কর হে! কি করো?

করো শত্রু জয়, ওহে মৃত্যুঞ্জয়! দাশরথি কাঁপে থর থর॥

দাশরথি রায়

পীত জটা শিরে গঙ্গা উমঙ্গত

ভৈরব—ঝাঁপতাল


পীত জটা শিরে গঙ্গা উমঙ্গত ভাল বিশাল শশাঙ্ক বিরাজত।

লোচন তিন লসত দুঃখ মোচন, আনন কানন কুণ্ডল শোভিত

অঙ্গে বিভূতি ধরে অহিভূষণ, শূল লিয়ে করে ডমরু বাজত;

রূপ অনুপ সদা শিব মুরত, ভৈরব রাগ মহা ছবি ছাজত॥

-হরবল্লভ রায়

হর হর হর শশাঙ্কশেখর

ভৈরব—তেওরা


হর হর হর শশাঙ্কশেখর শম্ভু শঙ্কর পিনাকধারী।

দেব ত্রিলোচন বৃষভবাহন জয় মহাকাল কাল-ভয়হারী॥

রজতশিখর শিরে জটাজুট গলে হাড়-মালা কণ্ঠে কালকূট,

ভালে বিভাবসু-নিভা পরিস্ফুট ধক্ ধক্ ধক্ জ্বলে অনিবার॥

শিরে সুরধুনী করে কুলু কুলু, ভাঙ্গ ধুতুরায় আঁখি ঢুলু ঢুলু,

নাচে সঙ্গে রঙ্গে ভূত প্রেতকুল, করে শূল দেব দেব ত্রিপুরারি॥

বিভূতি-ভূষণ, অঙ্গে ভুজঙ্গম, কটিতে শার্দুলচর্ম মনোরম,

পঞ্চমুখে সদা বম্ বম্ বম্, জয় ব্যোমকেশ শ্মশানবিহারী॥

অজ্ঞাত

শশী-ভাল শোভে, সুরেশ্বরী শিরপর বিরাজত

শ্রীরাগ—ঝাঁপতাল


শশী-ভাল শোভে, সুরেশ্বরী শিরপর বিরাজত,

অরধ নয়ন, রুণ্ডমাল, দিগম্বর, ঈশ্বর।

বিভূতিভূষণ অঙ্গ, ঔর বৃষবাহন,

করে ত্রিশূল ধারণ, উমাপতি শঙ্কর।

মহাদেব, দেবেশ, মৃত্যুঞ্জয়, গণেশ,

বিশ্বম্ভর, মহাযোগী, মহেশ্বর;

তেঁহারি চরণ ধ্যান করত গোপেশ,

দরশ দীজে দয়াল, শম্ভু শিব হর হর॥

                                              গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

শশধর-তিলক-ভাল গঙ্গা জটাপর

ভৈরব—ঝাঁপতাল*


শশধর-তিলক-ভাল গঙ্গা জটাপর,

করে লিয়ে ত্রিশূল রুদ্র বিরাজে।

ভস্ম অঙ্গ ছায়ি, গলে রুণ্ডমালা,

ভৈরব ত্রিলোচন হর যোগী সাজে॥

আসন-বাহন-বৃষ, বসন মৃগ ছালে,

কালকূট কণ্ঠে ভরা, তিমির লাজে;

গাবত হরিগুণ শ্রবণে অতি মধুর,

ধ্যাবত তান রাগে সদা হৃদি মাঝে

যদুনাথ ভট্টাচার্য (যদু ভট্ট)


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


যোগাসনে মহা ধ্যানে মগ্ন যোগীবর

ভৈরব—ঝাঁপতাল*


যোগাসনে মহা ধ্যানে মগ্ন যোগীবর,

অনন্ত তুষারে যেন অনন্ত শেখর॥

প্রলয়-নীরব মাঝে,         একাকী পুরুষ রাজে,

ভয়ে অগ্নি ভস্ম সাজে ঢাকে কলেবর॥

শিশু শশী নাহি আর,         অন্ধকার নিরাকার,

এক, নাহি দুই আর, প্রকৃতি নিথর।

কাল বদ্ধ বর্তমানে,         ব্যোমকেশ ব্যোম পানে,

নিত্য সত্য পূর্ণ জ্ঞানে, পূর্ণ মহেশ্বর॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত


শঙ্কর শিব পিনাকী গঙ্গাধর

ইমন-কল্যাণ—সুরফাক্তা*


শঙ্কর শিব পিনাকী গঙ্গাধর, বিষধর বামদেব, ঈশ্বর ডমরুকর।

ভস্ম-অঙ্গ সোহে ভুজঙ্গ ভাল-চন্দ্র, শিঙ্গী ফুঁকত হ্যয় ভোলা দিগম্বর॥

তিলক-ললাট গলে রুণ্ডমাল, ত্রিনয়ন বরদাতা গৌরীসঙ্গ ত্রিশূলধর।

পশুপতি বিশ্বনাথ মৃত্যুঞ্জয়, জপ মহাদেব নাম হর হর॥

বুধপ্ৰকাশ


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত



শম্ভু শিব মহেশ, আদি ত্রিলোচন

ছায়নট—সুরফাক্তা*


শম্ভু শিব মহেশ, আদি ত্রিলোচন

ভবভয়হর ভবেশ, দীননাথ দানবদলন দীনেশ্বর

জটাজূট পিনাকী, ভস্ম রুণ্ডমালা গরল গলেধর হর, ওঢ়ে বাঘাম্বর॥

নাচত চন্দ্ৰভাল বম্ বম্ বাজে ঘন ঘন,

অতি অপূর্ব হরিগুণ গাওয়ত ত্রিপুরেশ্বর;

বীরচন্দ্র নরপতি প্রকাশ করণ বেশ।

অধরে ধরে তাল তান সুমধুর॥

রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহদুর


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

ডমরু হর করে বাজে বাজে

বসন্ত—তেওরা*


ডমরু হর করে বাজে বাজে।

ত্রিশূল-ধর-অঙ্গ ভসম ভূষণ, ব্যালমালা গলে বিরাজে৷৷

পঞ্চবদন পিনাকধর শিব, বৃষভবাহন ভূতনাথ,

রুণ্ড মুণ্ড গলে বিরাজিত অজর অমর দিগম্বর রে৷৷

বিহারীলাল দুবে


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

হর হর হর ভূতনাথ পশুপতি

কানাড়া—সুরফাক্তা*


হর হর হর ভূতনাথ পশুপতি,

যোগীশ্বর মহাদেব শিব পিনাকপাণি॥

ঊর্ধ্ব জ্বলত জটাজাল, নাচত ব্যোমকেশ ভাল,

সপ্তভুবন ধরত তাল টলমল অবনী

স্বামী বিবেকানন্দ


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

জপত মন আনন্দ শিব শিব

বেহাগ—তেওরা


জপত মন আনন্দ শিব শিব;

জাহী সুমিরত, বিঘ্ন বিনাশত, কাটত যম কে ফন্দ।

তিন লোক দয়াল, দাতা, হরত দুঃখ ঔর দ্বন্দ্ব

বৃষভবাহন, রুচি ধুতুরা শিবকে ভোজন ভাঙ্গ৷

ওঢ়না বাঘাম্বর, শির জটা-রমণিত গঙ্গ॥

রুণ্ডমাল-ত্রিশূল-ডমরু-ভসম-শোভিত-অঙ্গ।

তিন নেত্র, বিশাল মূরতি, তিলক-রাজিত-চন্দ্ৰ

ভূত প্রেত পিশাচ ভৈরব যোগিনী জিনকে সঙ্গ।

পার্বতীপতি চরণ কী রতি জপত ব্রহ্মানন্দ॥

ব্রহ্মানন্দ

শম্ভু শিব শঙ্কর হর

খাম্বাজ—চৌতাল


শম্ভু শিব শঙ্কর হর         শৈলরাজ-তনয়া-বর

চন্দ্রচূড় ত্রিপুর-মথন, স্মরহর শিব মৃত্যুঞ্জয়।

শ্মশান-বিভূতি-বিভূষিতাঙ্গ,         প্রখর প্রমথ পঞ্চ সঙ্গ,

শিরসি গঙ্গা গতি-তরঙ্গ, চরণ-শরণ-জন-কৃপাল॥

অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

শিব শঙ্কর বম্ বম্ ভোলা

খাম্বাজ—তিনতাল


শিব শঙ্কর বম্ বম্ ভোলা কৈলাসপতি মহারাজ রাজ।

ওঢ় মৃগছাল লাল লোচন বিশাল, পহন বাঘছাল অরধ চন্দ্র ভাল

বিরাজ।

রুণ্ডমাল গলমে বৃষভ বাহন, করমে ত্রিশূল ভৈরব বেতাল দেখত

দেব সমাজ।

পিশাচ ভূতদৈত্য ঔর প্রমথগণ বোলত হর হর, বাম ভবানী অপরূপ

রূপ সাজ।

কহে দাস নিজামী কর জো জোর, দেও দান মান রাখ মোর

কৃপা কীজে চরণ দেহুঁ মোহে আজ।

সৈয়দ নিজামী

 


গৌরাঙ্গ অরধাঙ্গ গঙ্গা তরঙ্গে

আড়ানা—ঝাঁপতাল


গৌরাঙ্গ অরধাঙ্গ গঙ্গা তরঙ্গে, যোগী মহাযোগ কা রূপ রাজে।

বাঘছাল মুণ্ডমাল শশীভাল করতাল,

তাঁ ডেক্ ডিমি ডিমিক ডিমি ডমরু বাজে।

অম্বর বাঘাম্বর দিগম্বর জটাজূট, ফণিধর ভুজঙ্গেশ অঙ্গ বিভূতি ছাজে।

বাণী বিলাস তুয়া ধাতা বিধাতা, জাতা সকল দুখ সদাশিব বিরাজে॥

অজ্ঞাত

আনন্দবন গিরিজাপত নগরী

ঝিঁঝিঁট খাম্বাজ—*


আনন্দবন গিরিজাপত নগরী, মন কেঁও নহি বাস লগাওয়তরে।

কাশী সমান নহি দ্বিতীয় পুরী, ব্রহ্মাদি কে মন ভাওয়তরে॥

মুক্তি প্রবাহ বহত যহাঁ গঙ্গা, সুরনরমুনি হর গাওয়তরে।

কীট পতঙ্গাদি নানা জীব, সব কি মুক্তি করাওয়তরে॥

সাঁজ সবেরে জগাওয়ে ভবানী, ডমরু শিঙ্গা বজাওয়তরে।

অন্তসময়ে শম্ভুসদাশিব, তারক ব্রহ্ম মন্ত্র সুনাওয়তরে॥

ঐ সা কাশী কেঁও নহি সেবে শিব শম্ভু সদা ভাওয়তরে।

তুলসীদাস ভজ গাওয়ে মহাদেব, কাশী পরম পদ পাওয়তরে॥

তুলসীদাস


* গানখানি স্বামী তুরীয়ানন্দজীর প্রিয় ছিল।

কে বৃষপরে, বম্ বম্ করে

ইমন—তেওরা


কে বৃষপরে, বম্ বম্ করে, বিমল কমলে চরণ দুখানি।

ত্রিশূলধারী, জটাজুট শিরে গরজে ফণী৷৷

হাড়মাল গলেতে লম্বিত, ইন্দু ভালে বিভূষিত,

আজানুলম্বিত বাহু সুললিত, জটাতে শোভিছে মা সুরধনী৷৷

অজ্ঞাত

শিবময় এ সংসার

সাহানা—ঝাঁপতাল


শিবময় এ সংসার ওরে জীব কি জান না।

প্রকৃতি প্রভাবে শিবে করিছ জীব কল্পনা॥

যেই শিব সেই জীব,         যেই জীব সেই শিব

শিব ভিন্ন নহে জীব, যথা জলে বিম্ব ফেণা॥

শিব হতে এই জীব,         এই জীব হয় শিব,

শিবপদ পায় জীব, শিব ভাবিয়ে।

অতএব ওরে জীব,         সদা ভাব সদাশিব,

আছ জীব হবে শিব কি আর বল ভাবনা॥

অজ্ঞাত


নাচে বাহু তুলে, ভোলা ভাবে ভুলে

সিন্ধুমিশ্র—একতাল


নাচে বাহু তুলে, ভোলা ভাবে ভুলে, বববম্ বববম্ বাজে গালে।

(কিবা) রজতভূধর নিন্দি কলেবর, শশাঙ্ক সুন্দর শোভে ভালে॥

প্রেমধারে ত্রিনয়ন ছল ছল, ফণী ফন্ন জাহ্নবী কল কল,

জটা জলদজাল মাঝে॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


আশুতোষ শিব শঙ্কর ভোলা

ইমন-কল্যাণ—কাওয়ালী*


আশুতোষ শিব শঙ্কর ভোলা।

আধ চাঁদ ভালে, কপোলে কুণ্ডল কণ্ঠে হলাহল ফণীন্দ্ৰ দোলা॥

বিভূতিভূষণ বৃষভবাহন,         বাঘাম্বরধর ডমরুবাদন,

বববম্ বববম্ উথলে ঘন রোল, ফণীমণিউজল জটা জলদজাল,

কল কল খল খল উথলে গঙ্গা॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

ভাঙ্গ খেয়ে বিভোর ভোলানাথ

ঝিঝিট—দাদরা*


ভাঙ্গ খেয়ে বিভোর ভোলানাথ ভূতগণ সঙ্গে নাচিছে।

(সদা) কালী কালী কালী বলে মধুর ডমরু বাজিছে॥

শিরেতে শোভিছে জটাজুটফণী, ললাটে শোভিছে দেবী মন্দাকিনী;

চরণ প্লাবিয়া ভূধর ধরণী, কুলুকুলু ধ্বনি করিছে॥

বামেতে শোভিছে ভুবনমাতা,         কী কব রূপ, কী কব কথা,

চারিপাশে হেমলতা তড়িত জড়িত রয়েছে॥

কর্ণেতে শোভিছে ধুতুরার ফুল, ধুতুরা পানে আঁখি ঢুলু-ঢুল,

কালী ধ্যানে ব্যাঘ্রচর্ম খসিয়া খসিয়া পড়িছে॥

প্যারিমোহন কবিরত্ন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা

কর্ণাটি—একতাল*


তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা, বম্ বব বাজে গাল।

ডিমি ডিমি ডিমি ডমরু বাজে, দুলিছে কপাল মাল॥

গরজে গঙ্গা জটামাঝে,         উগরে অনল ত্রিশূল রাজে,

ধক্ ধক্ ধক্ মৌলিবন্ধ, জ্বলে শশাঙ্কভাল॥
     —স্বামী বিবেকানন্দ


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি


নাচে পাগলা ভোলা

ভৈরবী-দাদরা


নাচে পাগলা ভোলা বাজে বম্ বম্ বম্;

শিঙ্গা বাজিছে ভোঁ ভোঁ ভোঁ ভম্ ভম্ ভম্॥

শিরে করিছে গঙ্গা কল্ কল্ কল্, চরণ চাপেতে ধরা টল্ টল্ টল্,

মৃদঙ্গ ধরে তাল তাথম্ তাথম্॥

ডিমি ডিমি ডিমি ডিমি ডমরু বাজে, ফন্ ফন্ ফন্ ফন্ ফণী গরজে,

নাদ উঠিছে সোঽহং সোঽহং॥
          —স্বামী তপানন্দ


যোগী হে, যোগী হে

আলাহিয়া—একতাল*


যোগী হে, যোগী হে, কে তুমি হৃদি আসনে।

বিভূতি-ভূষিত শুভ্র দেহ, নাচিছ দিক্-বসনে॥

মহা আনন্দে পুলক কায়, গঙ্গা উথলি উছলি ধায়,

ভালে শিশু-শশী হাসিয়া চায়, জটাজুট ছায় গগনে ॥
          —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান—২০


বিশ্বেশ্বর বিশ্বপাবন

ভীমপলশ্রী—একতাল


বিশ্বেশ্বর বিশ্বপাবন ভব ভব-ভয়-ভঞ্জন,

মৃত্যুঞ্জয় মদন-দমন, মরণ-জনম-নিবারণ॥

চরণ সরোজে নবারুণ ছটা,         তাহে বিল্বদল চন্দনের ছিটা,

শার্দূল ছালে কটিতট আঁটা, যোগীজন-মনোমোহন

গলে হাড়মালা দল দল দোলে,     বব বব বম্ বাজে ঘন গালে,

বাজায়ে ডমরু নাচে তালে তালে, নাচে সাথে ভূত অগণন॥

পন্নগভূষা পিনাকপাণি,         ঝলমল ভালে জ্বলে নিশামণি,

কুলু কুলু শিরে বহে মন্দাকিনী, ঢুলু ঢুলু প্রেমে দুনয়ন॥

সৃষ্টিলয়কারী জগৎ পিতা,     জ্ঞানময় প্রেম ভকতিদাতা,

এ দীন সন্তানে ভুলে আছ কোথা, নিজ গুণে দাও দরশন।
                —স্বামী তপানন্দ


জয় শিব শঙ্কর হর ত্রিপুরারি

কেদারা—তিনতাল*


জয় শিব শঙ্কর হর ত্রিপুরারি, পাশী পশুপতি পিনাকধারী।

শিরে জটাজুট, কণ্ঠে কালকূট, সাধক-জন-গণ-মানস-বিহারী

ত্রিলোকপালক ত্রিলোকনাশক, পরাৎপর প্রভু মোক্ষবিধায়ক।

করুণা নয়নে হেরো ভকত জনে, লয়েছি শরণ চরণে তোমারি॥

   —গিরিশচন্দ্র ঘোষ


* স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত/ আনন্দলহরী

জয় পরমেশ্বর পরম ভিখারী

কেদারা—তিনতাল


জয় পরমেশ্বর পরম ভিখারী,        কল্পমেরু গুরু যোগ আচারী।

তরুতল আলয়, বসন দিশাচয়,    ভীত-নিরাশ্রয়-ভবভয়হারী।

হর করুণাকর বরদাভয়কর,        মদন-মান-হর শিব শুভকারী ৷৷

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


‘শিব শিব’ বল জীব

কেদারা—ঝাঁপতাল


‘শিব শিব’ বল জীব,         ঘুচিবে অশিব সব,

শিব নাম ভরসা করি         বিশ্ব পালেন কেশব।

বিরিঞ্চি করেন সৃষ্টি,         শিব পদে রাখি দৃষ্টি,

কালচক্র গ্রহ রিষ্টি,         শিব নামে পরাভব ॥

শিব এ বিশ্বের সার,         জ্ঞান-গুরু বিশ্বাধার,

শিব বিনা নাহি আর,         নিস্তার-কারণ,

অতএব শিব নাম,         গান কর অবিরাম,

পাইবে পরম ধাম         নামের গুণ কি কব ৷৷

অজ্ঞাত


গঙ্গাধর মহাদেব শুন পুকার মেরী

ঝিঁঝিট—দাদরা


গঙ্গাধর মহাদেব শুন পুকার মেরী।

দীজিয়ে ম বেগী নাথ কাহে করত দেরী ॥

চন্দ্ৰ ভাল কৃপা নিহাল, মেটো ভ্ৰম মোহজাল।

কাশীমে বসাও নাথ, কৃপা দৃষ্টি ফেরি ॥

দেবীকে সহায় সদা, সেবক তেরো কহায় ।

আনন্দবন বাস আশ যাচত করজোড়ী

দেবীসহায়

শঙ্কর মহাদেব দেব সেবক সুর জাকে

ঝিঁঝিট—একতাল


শঙ্কর মহাদেব দেব সেবক সুর জাকে।

ভস্ম অঙ্গ শীষ গঙ্গ বয়ল বাহন অতি প্রচণ্ড

গৌরী অরধঙ্গ সঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গ জাকে।

লপটি ঝপটি জাও ব্যাল ঔর ওঢ় বাঘছাল,

রুণ্ডমাল চন্দভাল দৃগ বিশাল জাকে।

পাবত নহী পার শেষ নারদ সারদ সুরেশ,

গাবত গুণীগণ গণেশ ব্রহ্মাদিক জাকে।

ধ্যাবত দ্বিজ তুলসীদাস গৌরী-পতি চরণ আশ

ঐসো হর ভেখ ধরহী ভকতি হেতু জাকে॥

তুসলীদাস

হর শঙ্কর, শশী-শেখর, পিনাকী ত্রিপুরারে

ঝিঁঝিট—একতাল


হর শঙ্কর, শশী-শেখর, পিনাকী ত্রিপুরারে।

বিভূতিভূষণ, দিক্‌বসন, জাহ্নবী জটাভারে॥

অনল ভালে মদন-দমন,     তরুণ-অরুণ-কিরণ-নয়ন,

নীলকণ্ঠ রজত বরণ, মণ্ডিত ফণীহারে।

উক্ষারূঢ় গরল ভক্ষ্য,         অক্ষমালা-শোভিত বক্ষ,

ভিক্ষা লক্ষ্য, পিশাচ পক্ষ, রক্ষক ভবপারে ॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


বেল পাতা নেয় মাথা পেতে

মিশ্র ছায়ানট—কাহারবা*


বেল পাতা নেয় মাথা পেতে, গাল বাজালে হয় খুশি।

মান অপমান সমান তো তার, তার কাছে নয় কেউ দোষী॥

এত তো ভুলে থাকে, নেচে আসে যে তায় ডাকে,

‘বম ভোলা’ বোল ব’লে কেন লও না যেচে যা খুশি;

যা ফেলে দেছে, নেয় সে বেছে, ভাল মন্দ নাই হুঁশ্ই॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


* স্বরলিপি: আনন্দ লহরী

বম্ বম্ বম্ হর হর

মালকোষ—একতাল


বম্ বম্ বম্ হর হর।

বৃষভবাহন বিশালবদন ত্রিপুরনাশন ঈশ্বর॥

পাদ-কমলে শোভে শতদল,         ত্রিনয়নে আছে শোভিত ভাল,

গলে বিলম্বিত হাড়মাল, জয় জয় শিব শঙ্কর

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


শিব শঙ্কর বম্ বম্ ভোলা

খাম্বাজ—কাওয়ালী


শিব শঙ্কর বম্ বম্ ভোলা

বিভূতিভূষণ, দেব ত্রিলোচন, বৃষরাজরাজে বামে গিরিবালা;

রাজরাজেশ্বর দেবাদিদেব হর ঢুঁড়ে শ্মশান ঘোরে যোগীরাজবর

জটাজুটধর, বাস বাঘাম্বর, করে শূল, গলে হাড়মালা॥

প্রেমানন চারু, ভাবে ঢল ঢল, আঁখি ছল ছল, ভকতবৎসল,

করুণা নয়নে, হেরি ভকতজনে, হরিছে ভবেশ ভবজ্বালা

গিরিশচন্দ্র ঘোষ

শিব ঘুচাও আমার মনের ভ্ৰম

বাউল—আড়খেমটা


শিব ঘুচাও আমার মনের ভ্ৰম,     বম্ বম্ বম্, ববম্ বম্ ।

(আমি) তোমা বিনে হয়ে আছি বাঁশ-বাগানের কানা ডোম ॥

শিরে ঢালি গঙ্গাবারি,        খুশি হবেন ত্রিপুরারি,

ঘুচিবে ভববারি, ঘোড়ার ডিম করবে যম ॥
    —গিরিশচন্দ্র ঘোষ


তুআ চরণ-কমল-পর মন ভ্রমর

আশোয়ারী—কাওয়ালী


তুআ চরণ-কমল-পর মন ভ্রমর, ভাল-ভানু! জ্যোঁ চন্দ্র চকোর।

জিমি চাতক বুঁদ স্বাতিকো, জলজ ভান ঘন মৌর॥

জৈসে কুমুদিনী হিমকর চাহত, চকই চাহত-ভোর;

জ্ঞান ধ্যান তুআ ভক্তি চাহত হ্যায়, শ্রীআনন্দকিশোর

আনন্দকিশোর

আজু মম ভবন যোগী আওয়ে

ভৈরব—[কাওয়ালী] চৌতাল*


আজু মম ভবন যোগী আওয়ে।

কর লিয়ে বীণা হরিগুণ গাওয়ে।

অঙ্গ বভূত কাণমে কুণ্ডল,

শীষ জটাপর ফণীগণ শোহে

-অজ্ঞাত

হর হর হর বম্ বম্ বম্

রামকেলী—দাদরা


হর হর হর বম্ বম্ বম্ বামে শোভে গৌরী।

বাবা পাগলা ভোলা ত্রিপুরারি॥

আনিগে জবা তুলে,         মাকে সাজাব ফুলে

বাবাকে পূজবো দু'টো বিল্বদলে;

বাবা ভক্তিতে ভোলে—মা ভক্ত নেহারে

গিরিশচন্দ্র ঘোষ

জয় গঙ্গাধর শশাঙ্ক শেখর

রামকেলী—কাওয়ালী


জয় গঙ্গাধর শশাঙ্ক শেখর ত্রিপুর অসুর বিনাশ কারণ,

রজত ভূধর বরবপু-ধর বিভূতি লেপিত কিবা সুশোভন;

ভূজঙ্গ-ভূষণ জটা-বিভূষণ, পবিত্র জাহ্নবী শিরে রাজমান॥

বাস বাঘছাল গলে হাড়-মাল, কপালে কুণ্ডল জ্বলে হুতাশন;

হর দিগম্বর শিঙ্গা করে ধর, শ্মশান নিবাসী ডমরু-বাদন॥

অজ্ঞাত

হর শশাঙ্ক শেখর

আশা-ভৈরবী—কাওয়ালী


হর শশাঙ্ক শেখর, দয়া কর, বিভূতি ভূষিত কলেবর।

তরঙ্গ ভঙ্গিত ভূজঙ্গ রঙ্গিত কপর্দ বর্ধিত জটাধর;

গণেশ শৈশব বিভূতি বৈভব, ভবেশ ভৈরব দিগম্বর ॥

ভূজঙ্গ কুণ্ডল পিশাচ মণ্ডল মহাকুতূহল মহেশ্বর,

রাজ প্রভায়ত পদাম্বুজানত সুদীন ভারত শুভঙ্কর ॥

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর


ভূতনাথ ভব ভীম বিভোলা

ইমন-ভূপালী—কাওয়ালী


ভূতনাথ ভব ভীম বিভোলা,         বিভূতিভূষণ ত্রিশূলধারী।

ভূজঙ্গ ভৈরব বিশাল ভীষণ,         ঈশান শঙ্কর শ্মশানচারী।

বামদেব শিতিকণ্ঠ উমাপতি,         ধূর্জটি পশুপতি রুদ্র পিনাকী,

মহাদেব মৃড় শম্ভু বৃষধ্বজ,         ব্যোমকেশ ত্র্যম্বক ত্রিপুরারি॥

স্থাণু কপর্দী শিব পরমেশ্বর,         মৃত্যুঞ্জয় গঙ্গাধর স্মরহর,

পঞ্চবক্ত্র হর শশাঙ্কশেখর,         কৃত্তিবাস কৈলাসবিহারী॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ

মৃড় চন্দ্রচূড় হর ভোলা

ভৈরব—কাওয়ালী


মৃড় চন্দ্রচূড় হর ভোলা।

ভূতনাথ ভব, বোম্ বব বোম্ বব নিনাদ ভৈরব, অম্বু উথলা॥

মন্মথ-শাসন, নয়ন হুতাশন, ফণীমাল গলে দলদল দোলা॥

তমাল-নিন্দিত কণ্ঠে হলাহল, জলদজাল জিনি জটাজূটদল,

কল কল ঢল ঢল গঙ্গা বিলোলা

গিরিশচন্দ্র ঘোষ

হর হর শঙ্কর, শম্ভু শুভঙ্কর

মল্লার মিশ্র — কাওয়ালী


হর হর শঙ্কর, শম্ভু শুভঙ্কর, ধূর্জ্জটি স্মর-হর, পিনাকধারী।

চলে প্রমথনাথ, ভূত ভৈরব সাথ, ভাবে ভোলা ভাঙ্গবিভোলা, শ্মশানচারী॥

ববম্ ববম্ বম্ বাজিছে বিষাণ ভাল, হর হর শঙ্কর গাহিছে প্রমথ পাল,

সঙ্গে বেতাল তাল, রঙ্গে দিতেছে তাল, জটাজালে কল কল জাহ্নবী বারি॥

সোহং সোহং রবে ভৈরব ডমরু বাজে, শিব শিব শঙ্কর, গরজে ভুজগরাজে,

রাজ রাজাধিরাজে, শম্ভু যোগীর সাজে, যোগেশ্বর দিগম্বর, মন্মথ-বারী॥

অজ্ঞাত

তুঁহি জগত গুরু তুঁহি পরমেশ্বর

ইমন-কল্যাণ—ঝাঁপতাল


তুঁহি জগত গুরু তুঁহি পরমেশ্বর,

আদি অনাদি পিনাকধর শঙ্কর।

তুঁহি ভরণ পোষণ কর, সবকো তারণ,

সৃজন প্রলয় তুসে হোয়ে, বিশ্বেশ্বর॥

ভাল চন্দ রুণ্ড মাল শোভিত

বৃষভ বাহন ঔর জগ অঘ হর।

জটাজূট মাঝ গঙ্গা বিরাজিত

ধন্য ধন্য মহাদেব তুঁহি যোগেশ্বর॥

গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু

মালকোষ—তেওরা


গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু।

নাচিছে সুন্দর নাচে স্বয়ম্ভু।

সে-নাচ হিল্লোলে জটা আবর্তনে

সাগর ছুটে আসে গগন-প্রাঙ্গণে।

আকাশে শূল হানি, শোনাও নব বাণী,

তরাসে কাঁপে প্রাণী, প্ৰসীদ শম্ভু৷৷

ললাট-শশী টলি জটায় পড়ে ঢলি,

সে-শশী-চমকে গো বিজুলি ওঠে ঝলি।

ঝাঁপে নীলাঞ্চলে মুখ দিগঙ্গনা,

মুরচ্ছে ভয়ভীতা নিশি নিরঞ্জনা

আঁধারে পথ-হারা চাতকী কেঁদে সারা,

যাচিছে বারিধারা ধরা নিরম্বু৷৷

কাজী নজরুল ইসলাম


হর হর শঙ্কর, শশাঙ্কশেখর

ইমন ভূপালী—ঢিমে তেতালা


হর হর শঙ্কর, শশাঙ্কশেখর, ভবধব ভোলা, শিব মহেশ্বর।

ফণীন্দ্র ভূষণ, নগেন্দ্র-শাসন, উপেন্দ্র-মোহন, যোগী দিগম্বর॥

অনাদি অশেষ, পরেশ মহেশ, শেষ বিষপানে অজর অমর,

বববম্ বববম্, গাল বাদ্যকর, দৃমিকি দৃমিকি দৃমি, বাজাবে ডম্বুর;

‘তাতাথৈ’ ‘তাতাথৈ’ তালে নাচে মহেশ্বর,

‘অগড়, বস্’ ‘অগড় বস্’ সদা বাজে তম্বুর॥

অজ্ঞাত

সুমর মন শঙ্কর গিরিজাপতি হর

ছায়ানট—ঝাঁপতাল


সুমর মন শঙ্কর গিরিজাপতি হর,

জাকে জটাজুটমে পাবনী গঙ্গা।

গজ চর্ম অম্বর আসন বাঘাম্বর,

অব কোন রাজশ্রী বিষধর উমঙ্গ॥

ধরে শশী ভালে আউর লিয়ে রুণ্ডমালা,

নখসে ধূৰ্জ্জটী ভস্ম তন মন তরঙ্গ।

পূজে সুরাসুর পাবত সকল বর,

কর পুর রঙ্গ ঢঙ্গ লছমন উমঙ্গ

গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

সদা শিব ভজমনা নিশদিন

ইমন—তিনতাল


সদা শিব ভজমনা নিশদিন।

রিধ-সিধ-দায়ক, বিনত সহায়ক, নাহক ভটকত, ফিরত অনবরত।

শংকর ভোলা পারবতী রমণ,

সিত তন-পৌণগ-ভূষণ, অনুপম কাহে ন সুমরত, ভটকত তুঁ ফিরত।

অজ্ঞাত

অব শিব পার করো মেরী নৈয়া

আলাহিয়া-বিলাবল—তিনতাল*


অব শিব পার করো মেরী নৈয়া।

অউ ঘট ঘাট অগাধ জলধি, বল্লী লাগে ন খেওইয়া॥

বারি বরোবর বারি রহো হ্যয়, তা’ পর অতি পূরবৈয়া।

থর থরওয়ত কম্পত হিয়া মেরো, শিব কি দেত দুহৈয়া।

দেবী সহায় প্রভাত পুকারত, শিব পিতু গিরিজা মৈয়া॥

দেবী সহায়


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

যোগী শিব শঙ্কর ভোলা দিগম্বর

আড়ানা—ঝাঁপতাল


যোগী শিব শঙ্কর ভোলা দিগম্বর,

ত্রিলোচন দেবাদি দেব ধ্যানে সদা মগন

চিরশ্মশানচারী অনাদি সমাধি-ধারী,

স্তব্ধ ভয়ে চরণে তাঁরি প্রণতি করে গগন

ত্রিশূল বিষাণ রহে পড়িয়া পাশে,

ললাটে শশী নাহি হাসে;

গঙ্গা তরঙ্গ হারা ভীতভুবন৷

ত্রাহি হে শম্ভু শিব, ত্রাসে কাঁপে জড় ও জীব

ভোল এ ভীষণ তপ গাহিছে হে সঘন॥

কাজী নজরুল ইসলাম

নেচেছে প্রলয়-নাচে, হে নটরাজ! নটরাজ!

মেঘমল্লার—সুরফাক্তা


নেচেছে প্রলয়-নাচে, হে নটরাজ! নটরাজ!

তাথৈ তাথৈ বাজে গাল ববম্ ববম্, হাতে বাজে ডমরু ঐ।

অতীতের হাড়মালা বিরাটের বুকে দোলে,

নাচনের তালে জটা সে জটিল বাঁধ খোলে;

আজি এই মুক্তি হারার নয়নের ভীতি ভেঙেছে॥

নয়নের বহ্নিশিখা অসহায় সৃষ্টি নাশি,

ললাটে আশার আলো ঐ শিশু-শশীর হাসি;

প্রলয় লীলার মাঝখানেতে ডাকে মাভৈঃ, ডাকে মাভৈঃ, মা ভৈঃ॥

অজ্ঞাত

প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে

মিশ্ৰএকতাল*


প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে’

হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে॥

জাহ্নবী তাই মুক্তধারায়,     উন্মাদিনী দিশা হারায়,

সঙ্গীতে তার তরঙ্গদল উঠল দুলে’॥

রবির আলো সাড়া দিল আকাশ পারে,

শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে।

আপন স্রোতে আপনি মাতে,         সাথী হোল আপন সাথে,

সব-হারা সে সব পেল তার কূলে কূলে॥
             —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান—৫৭

জয় শিবওঁকারা, হরশিব ওঁকারা

(আরাত্রিক ভজন) কার্যা


জয় শিবওঁকারা, হরশিব ওঁকারা (ধ্রুবপদ)

ব্রহ্মা-বিষ্ণু-সদাশিব, অর্দ্ধাঙ্গী ধারা॥

চতুরানন, গজানন, পঞ্চাননরাজে;

হংসাসন গরুড়াসন বৃষবাহন সাজে॥

ভুজচার, চতুর্ভুজ, দশভুজ তে সোহে;

তীনোঁ রূপ নিরখতা ত্ৰিভুবন জন মোহে

অক্ষমালা, বনমালা, ব্যালমালাধারী;

চন্দনমৃগমদ সোহে, ভোলে শুভকারী॥

শ্বেতাম্বর, পীতাম্বর, বাঘাম্বর অঙ্গে;

ব্রহ্মাদিক সনকাদিক প্রেতাদিক সঙ্গে॥

করকেবীচ কমণ্ডল, চক্র-ত্রিশূলধরতা;

জগকর্তা, সংহর্তা, জগপালন করতা

ব্রহ্মা-বিষ্ণু-সদাশিব জানত অবিবেকা;

প্রণব সবকে মধ্যে তীনোঁ হি একা

ত্রিগুণ আরতি শিবকী, জো কোই গাবে;

সো পাবত শিব-আনন্দ সুখ-সম্পতি পাবে

অজ্ঞাত

শিব-বর্ণনা

ঝুমুর-সঙ্গীত

ঝুমুর বলিতে আমরা সাধারণত সাঁওতাল, বাউরি প্রভৃতি নিম্নশ্রেণির লোকদিগের দ্বারা গীত অশ্লীল সঙ্গীতই বুঝিতাম। কিন্তু শ্রীশ্রী বৈদ্যনাথের প্রধান পাণ্ডা সদুপাধ্যায় শ্রীশ্রীভবপ্রীতানন্দ ওঝা মহাশয় দেবদেবী-বিষয়ক ও আধ্যাত্মিক-ভাব-সম্বলিত বহু ভক্তি রসাত্মক ঝুমুর গান রচনা ও প্রচার করিয়া ইহাকে উচ্চাঙ্গের ভজন-সঙ্গীতে পরিণত করিয়াছেন। আমরা তাঁহার অনুমতিক্রমে তৎপ্রণীত “বৃহৎ ঝুমুর রসমঞ্জরী” নামক পুস্তক হইতে একটি গান সংগ্রহ করিয়া দিলাম।



শিব-বর্ণনা

ভাদ্রমাসের ঝুমুর

বন্দি শিব ত্রিদশে     ত্রিলোচন অম্বিকেশ

ত্রিলোকেশ ত্রিলোকে ত্রিতাপবারী

হর ত্রিপুরারি! ত্রিনেত্র ত্রিগুণ হে ত্রিশূলধারী॥ (রং)

শঙ্কর শম্ভু সুরেশ     সদানন্দ ব্যোমকেশ

ভূতেশ ভৈরব ভীম ভয়হারী॥ (রং)

বৃষকেতু পঞ্চানন     পাৰ্ব্বতীর প্রাণধন

পতিতপাবন শম্ভু শুভকারী॥ (রং)

গঙ্গাধর গণধাতা         তুমি হে গণেশ-পিতা

তুমি ভবপ্রীতার হৃদিবিহারী॥ (রং)

ভবপ্রীতানন্দ ওঝা

শ্রীশ্রীজয়দুর্গা সঙ্গীত

ধ্যান


“অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং চিকীতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্।

তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশয়ন্তীম্॥”

দেবীসূক্ত


ধ্যান

ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুল-ভয়দাং মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং

শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্ৰিশিখমপিকরৈরুদ্বন্তীং ত্রিনেত্রাম্

সিংহস্কন্ধাধিরূঢ়াং ত্রিভুবনমখিলং তেজসা পূরয়ন্তীং

ধ্যায়েদ্দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ

প্রণাম


জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।

দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে॥

ধেয়াও জয়দুর্গায় হিয়ায়

সাহানা—কাওয়ালী


ধেয়াও জয়দুর্গায় হিয়ায়।

কালাভ্রা শরীরাভা যোগীশ্বর-মনোলোতা,

কটাক্ষ হেরি যাঁর সভয়ে অরি পলায়!!

সিংহস্কন্ধে রূপে ত্রিভুবন আলো করে,

শঙ্খ, চক্র, অসি, ত্রিশূল করে ধরে,

ত্রিনয়নে স্নেহে হেরে, ভালে শিশু শশী ক্ষরে,

অজাদি সুরনিকরে স্তুতি করে যোড় করে,

চতুর্বর্গ হেলে পায় সেবি যাঁর পায়॥

স্বামী তপানন্দ

জয় মা অম্বিকে ত্রিলোকপালিকে

সুরাট মল্লার – চৌতাল


জয় মা অম্বিকে ত্রিলোকপালিকে,

কিংশুকমালিকে হরমনোমোহিনী;

চরণকমলে তপন উজলে, ভক্তহৃদে রঙ্গে পীযূষদায়িনী॥

দশভুজে কিবা আয়ুধ ধরা,

সিংহবাহিনী দৈত্যদর্পহরা;

শমনত্রাস কর বিনাশ, লটপট বেণী কালভুজঙ্গিনী॥

সব্যে সাম্যে শোভে সারদা কমলা,

শতদলে যেন সুস্থিরা চপলা;

গুহ গজানন, শোভিছে নন্দন, আনন্দমগনা নগেন্দ্ৰনন্দিনী॥

ভব-ঘোর-ভয়-হরা ভবরানী,

ললাটলোচনা ভৈরবী ভবানী;

রাখ রাঙ্গা পায় আমি নিরুপায়, নমো নমো দুর্গে দুর্গতিনাশিনী॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

শ্রীশ্রী সরস্বতী সঙ্গীত

ধ্যান

ওঁ বাণীং পূর্ণনিশাকরোজ্জ্বলমুখীং কর্পূরকুন্দপ্রভাং

চন্দ্ৰাৰ্ধাঙ্কিতমস্তকাং নিজকরৈঃ সংবিভ্রতীমাদরাৎ।

বীণামক্ষগুণং সুধাঢ্যকলসং বিদ্যাঞ্চ তুঙ্গস্তনীং

দিব্যৈরাভরণৈবিভূষিত-তনুং সহংসাধিরূঢ়াং ভজে॥

প্রণাম


সরস্বতি মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তু তে॥

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা

ঝিঁঝিট—ধামার


শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।

শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা

শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচৰ্চিতা।

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা॥

বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্বৈরচিতাসুরদানবৈঃ,

পূজিতা মুনিভিঃ সর্বৈঃ ঋষিভিঃ স্তয়তে সদা;

স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীং

যে স্মরন্তি ত্রিসন্ধ্যায়াং সর্বাং বিদ্যাং লভন্তে তে॥

যা কুন্দেন্দু-তুষার-হার-ধবলা যা শুভ্র বস্ত্রাবৃতা

ইমন-কল্যাণ—চৌতাল


যা কুন্দেন্দু-তুষার-হার-ধবলা যা শুভ্র বস্ত্রাবৃতা,

যা বীণা-বরদণ্ড-মণ্ডিতকরা যা শ্বেত-পদ্মাসনা।

যা ব্রহ্মাচ্যুত-শঙ্কর-প্রভৃতিভিদেবৈঃ সদা বন্দিতা,

সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ-জাড্যাপহা॥

ভারত কাব্য নিকুঞ্জে

ভৈরবী—কাওয়ালী


ভারত কাব্য নিকুঞ্জে,

জাগো সুমঙ্গলময়ি মা!

মঞ্জুরি’ তরু, পিক গাহি',

করুক প্রচারিত মহিমা।

তুলে লহ নীরব বীণা,

গীত-হীনা, অতি দীনা;

হে ভারত, চির-দুখ-শয়ন-বিলীনা;

নীতি-ধর্ম-ময় দীপক-মন্দ্রে

জীবিত কর সঞ্জীবন-মন্ত্রে,

জাগিবে রাতুল চরণ-তলে,—

যত লুপ্ত পুরাতন গরিমা॥

রজনীকান্ত সেন

স্নিগ্ধ-শুভ্র-কমল-দল-বাসিনী

মালগুঞ্জ—তিনতাল


স্নিগ্ধ-শুভ্র-কমল-দল-বাসিনী (কিবা)।

বীণা করে শোভে বাগ্ বাদিনী

থির সুধাকর নিমেষ হারা,

ধরণী বুকে ঢালে রজত ধারা

অসীমে মিলায় শত রাগ রাগিণী॥

জ্ঞান বিদ্যা যাচি তব চরণে,

গীতি-সুধা আন মর জীবনে

তোমার আসন তলে লুটাক এ পরাণখানি॥

নিশিকান্ত চক্রবর্তী

সারদা বিদ্যাদানী, দয়ানী, জগজননী, দুখহরণী

ভৈরবী—কাওয়ালী


সারদা বিদ্যাদানী, দয়ানী, জগজননী, দুখহরণী;

জ্বালামুখী, মাতা সরস্বতী

দীজে কৃপাদৃষ্টি সেবকপর আপনে, নারায়ণি;

শ্বেতকমলাসনী, শ্বেত-অঙ্গনী, শ্বেত-অম্বরী॥

শিবগোপাল রাও

সরস্বতী বাগ্বাণী ব্রহ্মাণী দয়া কর্ দীজে

পরজ—চৌতাল


সরস্বতী বাগ্বাণী ব্রহ্মাণী দয়া কর্ দীজে

সপ্ত সুর তিন গ্রাম শুধু বাণী।

আরোহী অবরোহী অস্থায়ী সঞ্চারী,

শ্রুতি মূর্ছনাকে ভেদ দে ভবানি

রাগরঙ্গ মুদ্রা শুধু সঙ্গত কী তান লয়ে,

গুরু বিচার কিয়ো দূর সোই কণ্ঠাণী;

আনন্দ কর্ দীজে মাতঃ শ্রীআনন্দকিশোর কো,

নাদ ভেদ পাবে সো কহাবে জ্ঞানী ॥

আনন্দ কিশোর

এসো মা এসো মা বীণাপাণি

মালকোষ—ত্রিতাল*


এসো মা এসো মা বীণাপাণি,

এসো মাগো এসো, হৃদাসনে ব’স, জগজন-মনোমোহ-নিবারিণী।

যুগ-যুগান্ত-সঞ্চিত তামস, চরণপরশে নাশো গো মা নাশো।

হৃদি শতদলে আবার প্রকাশ, শারদে শুভদে মা সিতবরণী॥
            —স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

প্রথম প্রণতি বাগ্ দেবী বীণাপাণি

মিশ্র পূরবী—সুরফাক্তা


প্রথম প্রণতি বাগ্ দেবী বীণাপাণি।

শ্বেত শতদল শুভ্রা শ্বেতমরালবাহিনী॥

অজ্ঞান মহাঘোরে জ্ঞান-বিভা-বিধায়িনি,

সুরাসুর-নর-মোহ-মুক্তি-প্রদায়িনী,

কিঙ্করে কৃপানেত্রে নেহার নারায়ণি॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্বেতবরণী সরোজবাসিনী ভুবন আলো রূপের ছটায়

মিশ্র—দাদরা


শ্বেতবরণী সরোজবাসিনী ভুবন আলো রূপের ছটায়

জিনি শতদল ও পদকমল, আয় সবে নমি ও-রাঙ্গাপায়॥

তুলিয়ে কুসুম যতন করে, সাজাব মায়ে আদর করে;

বীণার তানে মজিয়ে প্রাণে, লহর উজান বহিয়ে যায়।

গুঞ্জরে অলি পড়ে ঢলি ঢলি আশে মায়ের চরণে লুটায়॥

অজ্ঞাত

মরাল-বাহিনী মরাল-গামিনী এসো মা মরতে নামিয়া

গান্ধারী-একতাল


মরাল-বাহিনী মরাল-গামিনী এসো মা মরতে নামিয়া,

বীণা-নিনাদিনী বিদ্যাদায়িনী বসো মা হৃদয়ে হাসিয়া;

কমল-বদনি কমল-বরণী দেবনর-হৃদে জ্ঞান-দায়িনী,

মোহতিমির-নাশিনী জননী, চাহ মা করুণা করিয়া॥

কত যুগ ধরি তমোবিভাবরী রেখেছে ভারত-বদন আবরি,

তুমি আসি পুনঃ দিলে দরশন দুঃখনিশি যাবে কাটিয়া॥

উদিলে মা তুমি ভারত-গগনে, জগতের তম যাবে এই ক্ষণে,

‘জয় বাণী’ ধ্বনি গগনে সঘনে উঠিবে বিশ্ব ভেদিয়া

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় বাণি বীণাপাণি বাগ্‌বাদিনী নারায়ণি

কল্যাণ—চৌতাল


জয় বাণি বীণাপাণি বাগ্‌বাদিনী নারায়ণি।

মরালবাহিনী জগততারিণী অজ্ঞান বিনাশিনী॥

বিশ্বভারতী পরমা প্রকৃতি, অমল, ধবল মধুর মূরতি।

চতুর্বেদ-করে জননী বিরাজ সত্য সনাতনি

অনাদি অক্ষরা পরাৎপরা, সারদে বরদে শুভঙ্করা

মানস-কালিমা-সন্তাপ-হরা সর্বসিদ্ধি জ্ঞানদায়িনী।

যোগীঋষি তুমি আরাধ্যা, সত্য গুণরূপিণী বিদ্যা,

ত্রিলোক-বন্দিতা অমর-বাঞ্ছিতা, নমামি চরণে ব্রহ্মবাদিনী

স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ

পীযূষ-সিঞ্চিত-সমীর-চঞ্চল

মিশ্র সোহিনী—কাওয়ালী*


পীযূষ-সিঞ্চিত-সমীর-চঞ্চল             কাঞ্চন-অঞ্চল দোলে রে।

সংশয় নিরসন ধীস্মৃতি-বিতরণ         চরণে, জনমন ভোলে রে।

চম্পক-অঙ্গুলী সকরুণ-পরশে         বীণা পঞ্চমে বোলে রে;

জ্যোতিষ-দরশন-বেদ-গণিত-কবিতা     শোভে কোমল কোলে রে॥

শুভ্র রজত-গিরি কিরণ-বিকীরণে         অন্ধ নয়নযুগ খোলে রে।

মাতিল ত্রিভুবন, বাক্য-বিধায়িনী,         বাণীর জয়-রব বোলে রে॥

রজনীকান্ত সেন


* রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে এই গানটি ‘প্রার্থনা সঙ্গীত’। রামকৃষ্ণ মিশন সারদাপীঠ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকাকে অনুসরণ করে গাওয়া হয়। বর্তমান গ্রন্থে আমরা রজনীকান্তের স্বরচিত গানের মূল সঙ্কলন গ্রন্থ থেকে গানটি গ্রহণ করেছি।


শুধু সঙ্গীত দীজিয়ে বাণি

খাম্বাজ—কাওয়ালী


শুধু সঙ্গীত দীজিয়ে বাণি, সকল বিদ্যা তুঁ সৃজনকারিণী।

অমর অসুর নর মুনি গুণী কিন্নর যক্ষ রক্ষ গন্ধর্ব-বৃন্দ মিল,

নিত করত তুআ গুণ বাখানী॥

ত্রিভুবন কারয তুম্‌বিন ন হোয় তুআ কৃপাসে নর হোবে জ্ঞানী।

তুআ গুণ অনন্ত অন্ত ন পাবত, জগমে কোই উপমা নহি দেখত,

ধন-পুস্তক-বীণা ধারিণী ॥

অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়


এসো মানস সরোবর-বাসিনী

মল্লার—ঢিমা কাওয়ালী*


এসো, মানস সরোবর-বাসিনী।

ঢল ঢল নীরে,         শতদল শিরে,

সুন্দর সুবিমল-হাসিনী॥

মল্লার সুরে,         ঝঙ্কার ধীরে,

রুনু রুনু ঝুনু ঝুনু চরণ নূপুরে

এস এস ধীরে         হৃদয়েরি তীরে,

বীণা-বিনিন্দিত-ভাষিণী

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী


কমল আসনে ধবল বসনে

মালকোষ—ধামার


কমল আসনে ধবল বসনে, ত্রিতার করেতে ধরি,

এস মা অভয়া শিবের তনয়া, সেবকে করুণা করি।

আমরা তোমার অবোধ সন্তান, জানিনা জননী, পূজার বিধান,

বিরূপ হ’য়োনা চরণে ঠেল না, শিরে ঢাল কৃপাবারি॥

অধম আমরা নাহিক সম্বল,         সেবিতে তোমার চরণকমল,

ঝরিছে সতত তাই আঁখিজল, আর কিছু দিতে নারি;

অভয় দানিতে আসিও আবার, বরষ পরেতে সম্মুখে সবার,

হাসিয়া খেলিয়া মনের হরষে, যেন গো পূজিতে পারি

-অজ্ঞাত


মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে

ইমন কল্যাণ—কাহারবা*


মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে॥

নিভৃত-বাসিনী বীণাপাণি অমৃতমূরতিমতী বাণী

হিরণকিরণ ছবিখানি পরাণের কোথা সে বিরাজে॥

মধুঋতু জাগে দিবানিশি পিককুহরিত দিশি দিশি।

মানসমধুপ পদতলে মুরছি পড়িছে পরিমলে।

এসো দেবী, এসো এ আলোকে, একবার তোরে হেরি চোখে,

গোপনে থেকো না মনোলোকে ছায়াময় মায়াময় সাজে॥

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান—১০

বাণীচরণারবিন্দে মজ মজ মজ মজরে মন

ভৈরব—একতাল


বাণীচরণারবিন্দে মজ মজ মজ মজরে মন।

জ্বালা জুড়াইবে অমৃতত্ব পাবে হইবে সমূহ বাসনা পূরণ॥

ঢল ঢল সুধাসিন্ধু সলিলে

হেলিছে দুলিছে আনন্দহিল্লোলে

(মায়ের) রাঙ্গা শতদল চরণযুগল আহা মরি মরি ভুবনমোহন

অন্ধ মানস দেখিতে না পাও

কি সুখ-লালসে ইতি উতি ধাও

কর পদ ধ্যান, গাও মায়ের গান, কর মধুপান হইয়ে মগন।

গর গর ভাবে হয়ে মাতোয়ারা

হের রে অদূরে বাণী বেদধরা

সৌম্য হতে কিবা ছবি সৌম্যতরা আহা মরি মরি দেখিনি এমন।

স্বামী তপানন্দ


বর দে বীণা বাদিনী বরদে

দেশ—তিনতাল


বর দে। বীণা বাদিনী, বরদে!

প্রিয় স্বতন্ত্র-রব অমৃত-মন্ত্র নব ভারত মে ভর দে।

কাট অন্ধ-উর কে বন্ধন-স্তব; বহা জননী, জ্যোতির্ময় নির্ঝর,

কলুষ ভেদ-তম হর প্রকাশ ভর জগমগ জগ কর দে।

নবগতি, নবলয়, তালছন্দ নব, নবল কণ্ঠ, নব জলদ-মন্দ্র রব;

নব নভ কে নব বিহগ বৃন্দ কো, নব পর, নব স্বর দে!

সূর্যকান্ত ত্রিপাঠি 'নিরালা’


শ্বেত শতদলে সারদা রাজে

বসন্ত—তেওরা*


শ্বেত শতদলে সারদা রাজে

অতি সুশীতল কান্তি বিমল, নেহারি নয়ন মোহিল রে॥

শ্রবণে কুণ্ডল গলে গজমতি,         অচলা দামিনী জিনিয়া মূরতি

বীণারঞ্জিত পুস্তক করে, জয় জয় দেবী প্রণমামি তে

অয়ি মা! ভারতি, বেদমূরতি,        পরমা শকতি, শিবের কন্যা;

ঋষি-আরাধিতা, অমর-পূজিতা, বিশ্ববন্দিতা, ত্রিলোকধন্যা;

অজ্ঞাননাশিনী বিজ্ঞানদায়িনী,         তুমি নারায়ণী বাগ্‌বাদিনী;

(যেন) বীণার ঝঙ্কার গুঞ্জে নিরন্তর মোদের অন্তর মাঝে॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

সরস্বতী শারদা

ভৈরবী—ত্রিতাল


সরস্বতী শারদা।

বিদ্যাদানী দয়ানী দুখ হরণী, জগত জননী জ্বালামুখী মাতা॥

কীজে সুদৃষ্টি সেবক জানি (ইতনো) আপনো কর বক্ষ দীজে

তাল তাল কর সুহাগ বুধ, অলংকার। বাগ্‌বাদিনী মাতা॥

বুধপ্ৰকাশ


চরণ কমলে প্রণমি জননী

ইমণ-কল্যাণ — ঢিমে-কাওয়ালী


চরণ কমলে প্রণমি জননী।

মোহিনী মূরতি হেরি আঁখি পালটিতে নারি,

শ্বেত সরোজ’ পরে শ্বেত বসন ধরি, (আ মরি,)

কি নব সাজে সেজেছ মা নিস্তারিণী॥

তুমিই দিয়াছ মাগো অপূর্ব এ দেহ বীণা,

মূলাধারে সহস্রারে ত্রিতন্ত্রী করি যোজনা,

পরম নাদ তত্ত্ব করিছে তায় আনাগোনা,

বীণার ভিতরে দিবা রজনী॥

অজ্ঞাত

ফুল্ল কমল’ পরে পদতল অমল ধবল বরণী

আলাহিয়া — জলদ একতাল

ফুল্ল কমল’ পরে পদতল, অমল ধবল বরণী।

কমল আসন কমল ভূষণ, বিমল-কমল-হাসিনী

ভুবন ভরিল বীণার ঝঙ্কারে,         সুরাসুরনর বন্দে তোমারে,

গুঞ্জি মধুপ ধায় পদতলে, কে তুমি বীণাবাদিনী॥

এস মা বস মা হৃদয়কমলে,        পূজিব চরণ প্রেম অশ্রুজলে,

কি আছে আমার দিব উপহার, বাল্মীকি-ব্যাস-জননী

অজ্ঞাত


আবার ভারতে ভারতীর বীণা ঐ শুন গাহে মধুর তান

ইমন-কল্যাণ মিশ্র—একতাল*


আবার ভারতে ভারতীর বীণা ঐ শুন গাহে মধুর তান।

মরণ-সুপ্তি-মগন-পরাণে আবার করিছে চেতনা দান॥

এস মা ভারতী বরষের পরে নিরানন্দ এই আঁধার কুটীরে,

অশ্রু-সলিল-সিক্ত, রিক্ত, দুরিত-পূরিত শোকেতে ম্লান;

দৈন্য-বেদনা আছে শুধু মাগো পূজা-উপহার করিতে দান॥

শুভ্র আলোকে পুলকিত করি নিরাশা জড়তা লহ লহ হরি,

এস মা হৃদয়-কমল আসনে সঁপিনু চরণে এ মন প্রাণ,

হুঙ্কার রবে ঝঙ্কারি বীণা শঙ্কিতে কর অভয় দান

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

শােভিত অতি সুন্দর মনােহর বেশে

আড়ানা — সুরফাক্তা


শােভিত অতি সুন্দর         মনােহর বেশে

ভবানী বাগ্‌ দেবী         সৌদামিনী হাসে।

কটিতটে কিঙ্কিণী             আলম্বিত বেণী

বাগবাদিনী বীণাপাণি।

চরণ কমল শ্বেত শতদল

মদ অলিকুল ব্যাকুল শ্বেত প্রকাশে।

কান্তি আভর বিরাট শশধর

মলিন দীন হীন ক্ষীণ ত্রাসে

উদয়নারায়ণ ভট্টাচার্য

বাগ্‌ বাদিনী মাতঃ ভবানী

বাহার-ঝাঁপতাল


বাগ্‌ বাদিনী মাতঃ ভবানী।

নারায়ণী বুদ্ধি দেনী॥

চরণসরােজ পর, কত (কোটি) চন্দ্র শােভত;

যাচে অচলা ভক্তি চরণে তারিণী।

-অজ্ঞাত


আগমনী সঙ্গীত

গিরি, প্রাণ গৌরী আনাে আমার

কেদারা — একতালা*


গিরি, প্রাণ গৌরী আনাে আমার।

উমা বিধুমুখ,         না দেখি বারেক,

এঘর লাগে অন্ধকার॥

আজিকালি করি দিবস যাবে,

প্রাণের উমারে আনিবে কবে?

প্রতিদিন কি হে আমারে ভুলাবে,

এ কি তব অবিচার

সােনার মৈনাক ডুবিল নীরে,

যে শােকে রয়েছি পরাণ ধরে;

ধিক হে আমারে,         ধিক্ হে তােমারে,

জীবনে কি সাধ আর।

কমলাকান্ত কহে নিতান্ত

কেঁদো নাকো রানি, হও গাে শান্ত।

কে পাইবে তােমার উমার অন্ত,

তুমি কি ভাব অসার

-কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

দিন গণি গণি বরষ যাপিনু

বেহাগ-খাম্বাজতেতালা


দিন গণি গণি বরষ যাপিনু কত আর সহে মায়ের প্রাণে,

কিরূপে আছ হরে সঁপি সে গৌরীরে নিশ্চিন্ত অন্তরে এ হিমভবনে

যুগে যুগে কত ঘাের তপফলে ত্রিলােক ধন্যা কন্যা পেনু কোলে

কিসে হেন ধনে রহি বল ভুলে সদা হৃদি জ্বলে সে মুখ স্মরণে॥

কিভাবে কৈলাসে আছে উমা-জামাই, বহু দিন গত তত্ত্ব নাহি পাই

আনিতে প্রের দূত নতুবা নিজে যাই, করহে অনুমতি মিনতি চরণে

স্বামী তপানন্দ

কবে যাবে বল গিরিরাজ, গৌরীরে আনিতে

ভৈরবী—জলদ তেতালা


কবে যাবে বল গিরিরাজ, গৌরীরে আনিতে।

ব্যাকুল হয়েছে প্রাণ, উমারে দেখিতে, হে

গৌরী দিয়ে দিগম্বরে,         আনন্দে রয়েছ ঘরে,

কি আছে তব অন্তরে না পারি বুঝিতে

কামিনী করিল বিধি,         তেঁই হে তােমারে সাধি,

নারীর জনম কেবল যন্ত্রণা সহিতে

সতিনী সরলা নহে,         স্বামী সে শ্মশানে রহে,

তুমি হে পাষাণ, তাহে না কর মনেতে

কমলাকান্তের বাণী,         শুন হে শিখর মণি,

কেমনে সহিবে এত মায়ের প্রাণেতে॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

আনিবে কবে ভবনে মাের উমাধনে

সিন্ধু-খাম্বাজতেতালা


আনিবে কবে ভবনে মাের উমাধনে।

সব জ্বালা সুশীতল হবে আঁধার হৃদয় আলাে

গৌরীর সেই নিরমল মুখচন্দ্র দরশনে॥

রুক্ষ জটা হয়েছে সে সুকুঞ্চিত কৃষ্ণ কেশে;

মসি-বর্ণ কষিত সে স্বর্ণকান্তি তপঃক্লেশে,

উন্মনা একা কৈলাসে বিজনে ভৈরবী-বেশে

হেরিনু রয়েছে বসে রজনী-শেষে স্বপনে॥

আকুলা বিহুলা হয়ে ডাকিনু “মা উমা” বলে

ধেয়ে গিয়ে অপর্ণারে অমনি করিনু কোলে

অশ্রুভরা দুনয়নে সােহাগে অতি যতনে

চুমিতে বদনে নিদ টুটিল বিহগ গানে॥

স্বামী তপানন্দ

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী

গুণকিরি—একতাল


যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে

দেখেছি স্বপন, নারদ বচন, উমা মা মা বলে কেঁদেছে॥

সোনার বরণী গৌরী আমার, ভাঙড় ভিখারী জামাই তোমার,

মায়ের বসন ভূষণ সব আভরণ তাও বেচে নাকি ভাঙ্গ খেয়েছে।

                     -অজ্ঞাত


কুস্বপন দেখেছি গিরি উমা আমার শ্মশানবাসী

আলাহিয়া—একতাল


কুস্বপন দেখেছি গিরি, উমা আমার শ্মশানবাসী।

অসিত-বরণা উমা, মুখে অট্ট অট্ট হাসি॥

এলােকেশী বিবসনা, উমা আমার বাসনা,

ঘােরাননা ত্রিনয়না, ভালে শােভে বালশশী॥

যােগিনীদল-সঙ্গিনী, ভ্ৰমিছে সিংহবাহিনী,

হেরিয়া রণরঙ্গিণী, মনে বড় ভয় বাসি।

উঠ হে, উঠ অচল, পরাণ হােল বিকল,

ত্বরায় কৈলাসে চল, আন উমাসুধারাশি।

গিরিশচন্দ্র ঘােষ


তােমারি কারণে কঠিন পরাণে

সিন্ধুমিত্রএকতালা


তােমারি কারণে কঠিন পরাণে সম্বৎসর ভুলে আছি হে মায়ের।

যাব পিতৃঘর শুন প্রাণের অনুমতি কর দিনত্রয় তরে॥

সবেমাত্র ভ্রাতা ডুবে সিন্ধুতলে, কত করে আমায় পেয়েছে মা কোলে।

তিল আধ আহা! অদর্শন হলে সারা হ’ত মাতা উমা উমা করে

অচল পিতা নিতে আসিতে না পারে, মাতা জীবন্মৃতা আছেন অন্তরে।

দেখেছি স্বপনে সহেনা সহেনা কর হে করুণা যাচি জোড় করে

স্বামী তপানন্দ

গিরি এবার আমার উমা এলে

পিলু-বাহার—যৎ


(গিরি) এবার আমার উমা এলে, আর উমায় পাঠাব না।

বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না

যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়, উমা নেবার কথা কয়,

মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া, (তারে) জামাই বলে মানব না॥

দ্বিজ রামপ্রসাদ কয়, এ দুঃখ কি প্রাণে সয়,

(জামাই-শিব) শ্মশানে মশানে ফিরে, ঘরের ভাবনা ভাবে না॥

রামপ্রসাদ


নিদ্রা নাহি আসে, উঠে আর বসে

(ষষ্ঠী রাত্রে মেনকার উদ্বেগ)

ললিত—একতাল


নিদ্রা নাহি আসে, উঠে আর বসে,

চেয়ে দেখে নিশি পােহাল কি না।

যা শুনে শ্রবণে সবই হয় মনে ঐ বুঝি উমা এসে ডাকে মা॥

কভু তন্দ্রাঘােরে স্বপনেতে হেরে, আসিতেছে সিংহ আরােহণ করে

গৌরী বলে ধেয়ে কোলে নিতে গিয়ে

জেগে দেখে চেয়ে কোথাও কিছু না॥

কভু বা দু আঁখি ফিরায় যেদিকে, দশদিকে শুধু উমাময় দেখে,

বুঝাইলে মনে প্রবােধ না মানে, বলে সখি! একি হ’ল গাে বলনা॥

সখি বলে স্থির হও গিরিরাণী! দুখহারা দুর্গা আসিবে এখনি

প্রভাত প্রায় নিশা, হ’ল ব’লে উষা, করি বেশভূষা আনিবে চলনা॥

স্বামী তপানন্দ

শারদে জাগাে শরতে গাে শিবে

মনােহরসাহী—একতাল


শারদে জাগাে শরতে গাে (শিবে)

নিদ্রা পরিহরি জাগাে শুভঙ্করী আয় মা বিল্বমূলে কৈলাস-বাসিনী॥

অকাল বােধনে জাগ কাত্যায়নী, পূর্বেতে জাগিয়া যেন মা আপনি।

কাত্যায়ন মুনি তুষিলে জননী, দেখা দিলে সাজি মহিষমর্দিনী॥

রাবণ বিনাশে শ্রীরামে রাখিতে, অকাল বােধনে বিরিঞ্চি যেমতে।

বােধিলা তােমারে, আমি ভক্তিভরে আনন্দ অন্তরে বােধি মা তেমনি॥

ষষ্ঠী সন্ধাকালে এই বিল্বমূলে এস ভূমণ্ডলে দেব চতুর্দোলে।

অথবা কেশরী পৃষ্ঠে বিশ্বেশ্বরী সাজি স্বর্ণগৌরী পূর্ণ চন্দ্রাননী॥

(ওমা) যে পদ পূজিয়া মহেন্দ্র-বৃত্ৰারি রিপু বধি নিলা রাজ্য মহেশ্বরী।

ভবপ্রীতা ভণে তেমনি এক্ষণে পূজি সযতনে সে পদ দুখানি॥

ভবপ্রীতানন্দ ওঝা

গা তােল গা তােল বাঁধ মা কুন্তল

জয়জয়ন্তী—একতাল


গা তােল, গা তােল, বাঁধ মা কুন্তল,

ঐ এল পাষাণী, তাের ঈশানী।

ল’য়ে যুগল শিশু কোলে মা কৈ, মা কৈ,” বলে,

ডাকিছে মা তাের ঐ শশধর-বদনী॥

মা, মা গাে ত্রিভুবনে মান্যে, ত্রিভুবনে ধন্যে,

তাের মেয়ে সামান্যে নয় গাে রানি।

আমরা ভাবতেম ভবের প্রিয়ে, মা নাকি তাের মেয়ে,

তিনি নাকি ভবের ভয়-হারিণী॥

ধরলি রত্ন উদরে, তাের মত সংসারে,

রত্নগর্ভা এমন নাই রমণী।

মা তােমার ঐ তারা, চন্দ্রচূড়-দারা, চন্দ্র-দর্পহরা চন্দ্রাননী।

এমন রূপ দেখি নাই কারাে, মনের অন্ধকার

হরে মা, তাের হর-মনােমােহিনী॥

দাশরথি রায়


এলাে গিরিনন্দিনী লয়ে

বিভাস-যােগিয়া—জলদ তেতালা


এলাে গিরিনন্দিনী লয়ে, সুমঙ্গল ধ্বনি ঐ শুন ওগাে রানি।

চল, বরণ করিয়ে উমা আনি যেয়ে, কি কর পাষাণ-রমণী গাে!

অমনি উঠিয়ে পুলকিত হয়ে, ধাইল যেন পাগলিনী।

চলিতে চঞ্চল, খসিল কুন্তল, অঞ্চল লােটায় ধরণী॥

আঙ্গিনার বাহিরে, হেরিয়ে গৌরীরে, দ্রুত কোলে নিল রানি।

অমিয় বরষি উমা মুখ-শশী, চুম্বয়ে যেন চকোরিণী।

গৌরী কোলে করি মেনকা সুন্দরী ভবনে লইল ভবানী।

কমলাকান্তের পুলকে অন্তর হেরি ও বিধুমুখখানি॥

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য

গিরি গণেশ আমার শুভকারী

মনােহরসাহী—একতালা *


গিরি গণেশ আমার শুভকারী।

পূজে গণপতি পেলাম হৈমবতী

চাঁদের মালা যেন চাঁদ সারি সারি॥

বিল্ববৃক্ষমূলে পাতিয়া বােধন,

গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন,

ঘরে আনব চণ্ডী, কর্ণে শুনব চণ্ডী,

কত আসবে দণ্ডী জটাজুটধারী

মেয়ের কোলে মেয়ে দুটি রূপসী,

লক্ষ্মী সরস্বতী শরতের শশী,

সুরেশ কুমার গণেশ আমার,

তাদের না হেরিলে ঝরে নয়ন বারি

দাশরথি রায়


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

করী অরি পরে আনিলে হে কারে

ভূপালি—একতাল


করী অরি পরে আনিলে হে কারে, কৈ গিরি মন নন্দিনী,

আমার অম্বিকা দ্বিভুজা বালিকা, এ যে দশভুজা ভুবন মােহিনী।

কিবা সে দক্ষিণে গজেন্দ্র-বদন, প্রকাশিত যেন প্রভাতী তপন,

ষড়ানন স্ববামেতে সুশােভন, কমলা ভারতী সহকারিণী।

দক্ষিণাঙ্গ রাখি মৃগেন্দ্র পরেতে আর পদ আরােপিয়ে অসুরেতে,

দাঁড়িয়ে আছেন কিবা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গীতে জ্ঞান হয় পূর্ণ ব্রহ্মসনাতনী।

শুনেছি পুরাণে ওহে গিরিবর, এই রূপ আরাধিয়ে রঘুবর,

বরদার বরে জয়ী লঙ্কেশ্বর, উদ্ধারিয়েছিলেন জনকনন্দিনী।

তারাচাঁদ কহে শুন গিরিরাণী, এই সেই তােমার পরাণ ঈশানী।

নাশিতে ভূভার দশভুজাকার মহিতে মহিষাসুরমর্দিনী।

তারাচাঁদ

ভিখারী হরের ঘরে কি সুখে থাক শঙ্করী

সাহানা—ঝাপতাল


ভিখারী হরের ঘরে কি সুখে থাক শঙ্করী ?

শুনেছি সে পাগল ভােলা, আছে গঙ্গা শিরে করি।

অঙ্গে তার নাহি বাস, কৈলাসে সতত বাস,

নিত্য করে উপবাস, সন্ন্যাসী সে জটাধারী।

ভস্মমাখা কলেবর দিক হয়েছে অম্বর

নেশাতে সদা বিভাের, অঙ্গে ফণী বিষধরী।

মুখে না হাসে মধুর, কিন্তু দেখি ভাব উদার,

তাও শুনেছি, সুরাসুর করে আরাধনা তারি।

রসিক চন্দ্র রায়

আর জাগাস্ নে মা জয়া

ভৈরবী—একতালা*


আর জাগাস্ নে মা জয়া,         অবােধ অভয়া,

কত করে উমা এই ঘুমাল।

উমা জাগিলে একবার,         ঘুম পাড়ান ভার,

মায়ের চঞ্চল স্বভাব আছে চিরকাল॥

কাল উমা আমার এল সন্ধ্যাকালে,

কি জানি কি রূপে ছিল বিল্বমূলে,

বিল্বমূলে স্থিতি করিয়ে পার্বতী,

জাগিয়ে যামিনী পােহাল

উপরােধ উমা এড়াতে না পেরে,

সারাদিন বেড়ায় প্রতি ঘরে ঘরে,

সন্ধ্যাবেলা অবশ হ’ল ঘুমের ঘােরে,

মায়ের মুখের পান মুখে রহিল

উমার সঙ্গে জয়া যদি করবি খেলা,

খেলবি গাে জয়া জাগিলে মঙ্গলা,

দ্বিজ রাধিকায় বলে, উমা না জাগিলে,

জগতে কে জাগিবে বল

দ্বিজ রাধিকাপ্রসন্ন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

কেমন করে হরের ঘরে ছিলি উমা বল মা তাই

সাহানা—ঝপতাল


কেমন করে হরের ঘরে, ছিলি উমা বল মা তাই

কত লােকে কতই বলে শুনে প্রাণে মরে যাই॥

মার প্রাণে কি ধৈর্য ধরে,     জামাই নাকি ভিক্ষা করে

এবার নিতে এলে বলব উমা আমার ঘরে নাই॥

চিতাভস্ম মাখি অঙ্গে,         জামাই ফিরে নানা রঙ্গে,

তুই নাকি মা, তারি সঙ্গে তাের সােনার অঙ্গে মাখিস্ ছাই।

গিরিশচন্দ্র ঘােষ


১ পাঠান্তরঃ পরের

উমা আমার কেমন ছিলে হরেরি ঘরে

আলহিয়া—আড়াঠেকা*


(উমার প্রতি মেনকা)

উমা আমার কেমন ছিলে হরেরি ঘরে।

শুনেছি ঈশান নাকি শ্মশানেতে বাস করে।

সত্য কি মা অন্নবিনা, উপবাসী থাকো উমা

দিনান্তে অন্ন জোটে না জামাই নাকি ভিক্ষা করে॥

গঙ্গা নামে সতীনেরে সতত রাখিয়া শিরে,

শুনেছি পিনাকী নাকি, অধিক যতন করে॥

ছাই-ভস্ম মাখে গায় শ্মশানে নেচে বেড়ায়

ভাঙ্গ ও ধুতুরা খায় অহি সদা শির-পরে॥

রাজার নন্দিনী তুমি, কেন ক্লেশ সহ শুনি,

শুনগাে ঈশানী বাণী আর না পাঠাব তােরে॥

অম্বিকাচরণ গুপ্ত


* ‘বাঙালির গান’ গ্রন্থে কিঞ্চিৎ পাঠান্তর লক্ষ্য করা যায়।

এলি কি গাে উমা হর-মনােরমা

ভৈরবী—একতাল


এলি কি গাে উমা,         হর-মনােরমা,

কৈলাস-চন্দ্রমা হলি কি উদয়।

মা বলে একবার,     আয় কোলে আমার,

না হেরে সংসার হেরি শূন্যময়

প্রাণের প্রাণ উমা, তুই যে প্রাণ-পাখি,

হেরিলে তােরে ঝরে দুটি আঁখি,

একবার আয় আয় দেখি, উমা চন্দ্র-মুখি।

তুই যে আমার সর্ব সুখের নিলয়

নৈশ-নীলাম্বরে নিরখি যখন,

চন্দ্রমার ছবি ভুবন-মােহন,

মনে পড়ে মা, তাের ও চন্দ্র-বদন

শত ধারে চক্ষে বারিধারা বয়॥

দীনেশশরণ বসু

এস ঘরে নয়নতারা হারানিধি মাের

(অরুণােদয়ে উমার আগমনে মেনকার সম্ভাষণ)

ভৈরবী-যুৎ


এস ঘরে নয়নতারা হারানিধি মাের।

আশে শুধু বেঁচে আছি পথ চেয়ে তাের।

দুখিনী জননী ফেলে ভাল তাে মা ছিলি ভুলে,

পাষাণ নন্দিনী বলে এতই কঠোর

সুধামাখা হাসিমুখে, জুড়াও পরাণ মা ডেকে,

সব দুখ ভুলি হই আনন্দে বিভাের।

মুখ হেরি আঁখি ভরি, স্নেহভরে বুকে ধরি,

শান্ত হ’ক চুমি অধর, এ চিত চকোর॥

স্বামী তপানন্দ

কি আনন্দের কথা উমে

মনােহর সাহী—একতাল*


কি আনন্দের কথা উমে।

লােকমুখে শুনি সত্য বল শিবানী,

অন্নপূর্ণা নাম তাের কি কাশীধামে?

অপর্ণে তােমায় যখন অৰ্পণ করি,

ভােলানাথ ছিলেন মুষ্টির ভিখারি।

এখন নাকি তার দ্বারে আছে দ্বারী,

দেখা পায়না তার ইন্দ্র চন্দ্র যমে

ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপা আবার ল্ দিগম্বরে,

গঞ্জনা সয়েছি কত ঘরে পরে।

এখন নাকি তিনি রাজা কাশীপুরে,

বিশ্বেশ্বরী তুই বিশ্বেশ্বরের বামে॥

হিমালয়ে বাস হর করিয়াছে,

ভিক্ষায় দিন রক্ষা এমন দিন গেছে।

এখন কুবের ধনেতে কাশীনাথ হয়েছে,

ফিরেছে কি কপাল তাের কপাল ক্রমে॥

বিষয় বুদ্ধি বটে বুঝিলাম মনে,

তা না হলে গৌরীর এত “গৈরব” কেনে।

আপন সন্তানে না দেখে নয়নে,

মুখ বাঁকায়ে থাকে দাশরথির নামে॥

দাশরথি রায়


* শ্রীশ্রীমায়ের প্রিয় গান। ভিখারি বাউলের কণ্ঠে মা শুনেছিলেন। মায়ের জীবনের সঙ্গে এই গানের কথার অদ্ভুত মিল আছে বলে গােলাপ-মা প্রমুখেরও এই গানটি খুব প্রিয় ছিল।

তুমি তাে মা ছিলে ভুলে

সাহানা—ঝাপতাল


তুমি তাে মা ছিলে ভুলে, আমি পাগল নিয়ে সারা হই,

হাসে কাঁদে সদাই ভােলা, জানে না সে আমা বই॥

ভাঙ খেয়ে মা সদাই আছে,

থাকতে হয় মা কাছে কাছে;

ভাল মন্দ হয় গাে পাছে, সদাই মনে ভাবি ওই॥

দিতে হয় মা মুখে তুলে, নয়তাে খেতে যায় গাে ভুলে,

ক্ষেপার দশা ভাবতে গেলে, আমাতে আর আমি নই॥

ভুলিয়ে যখন এলাম ছলে,

(ওমা)     ভেসে গেল নয়ন জলে,

একলা পাছে যায়গাে চলে, আপন হারা এমন কই॥

গিরিশচন্দ্র ঘােষ

আজ আগমনীর আবাহনে কি সুর উঠেছে বেজে

ভীমপলশ্রী—দাদরা


আজ আগমনীর আবাহনে কি সুর উঠেছে বেজে।

দোয়েল শ্যামা ডাক দিল তাই বরণের এয়াে সেজে

ভরা ভাদরের ভরা নদী কুলু কুলু ছােটে নিরবধি।

সে সুর গীতালি দেয় করতালি, নাচে তরঙ্গ দোলনে যে

পূরব দীপক আরতির দীপ শত ছটা মেঘ জালে,

দিক্বালা তায় আলতা গুলেছে রক্ত আকাশ থালে।

ঘাসের বুকেতে শিশির নীর ধােয়াবে ও রাঙ্গা চরণ ধীর,

সবুজ আঁচলে মুছে নেবে বলে ধরণী শ্যামলা সেজেছে যে॥

হীরেন্দ্রকুমার বসু

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও

মিশ্র আসােয়ারী—দাদরা*


(আজি) শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে।

সপ্তসিন্ধু কল্লোল রোল বেজেছে সপ্ত তারে

সুর সপ্তক তুলেছে তান সপ্ত ঋষির গানে,

সপ্ত স্বর্গে দুন্দুভি ঘোষে সপ্ত গ্রহের টানে;

অন্তরে আজ সপ্ত সুরের নব জাগরণ সুরে॥

সাতরাঙ্গা রবি রামধনু হাতে মরণের বাণ হানে,

সপ্তকোটি সুসন্তান বিজয়মাল্য আনে

সপ্ততীর্থ একসাথ হয় হৃদি মন্দির দ্বারে

জননী এসেছে দ্বারে

তুলে নাও বুকে তারে॥

গঙ্গানারায়ণ


স্বরলিপিঃ সুরবিতান

তােরা আজ গারে আগমনী

ভাটিয়ালী–কাহারবা


তােরা আজ গারে আগমনী

গেয়ে যা প্রাণ ভরেরে, আসে দুর্গা-রানী

সারাটি বরষ ধরি, আঁধার এ গিরিপুরী;

সব দুঃখ দূরে যাবে আসিলে শিবানী॥

আসে ঐ গণপতি, লক্ষ্মী, সরস্বতী,

কার্তিক আসে ঐ চড়িয়া ময়ূরী;

ঐ শােন কেশরী, গরজে হরষে মরি রে!

সাজা তােরা ফুলের সাজি (আমার) আসে হৃদয়রানী

নিশিকান্ত চক্রবর্তী

তব চরণ ধােয়াবে শারদ শিশির

খাম্বাজ মিশ্র—একতালা


তব চরণ ধােয়াবে শারদ শিশির

শেফালি অর্ঘ্য দেবে।

ধরণী শ্যামল আসন বিছাবে

তুমি মা আসিবে যবে॥

রক্ত ঊষাতে সিন্দুরের টিপ

পরাবে মা তাের ভালে।

চাঁদিমা আরতি দিয়ে যাবে মাগাে

সুনীল গগনতলে॥

কত শত শত কমল কুমারী

তােমারে পূজিতে চাহে,

দিকে দিকে তব আগমনগীতি

দোয়েল শ্যামা গাবে॥

নিশিকান্ত চক্রবর্তী

আজু মন্দিরে ও মা

বেহাগজলদ তেতালা


আজু মন্দিরে ওমা!         শঙ্করী-শঙ্কর পেয়ে।

পূজয়ে ভকত বৃন্দ,         জবা সচন্দন দিয়ে॥

আনন্দিত নর-নারী,         সবে পুলকিত হিয়ে।

মগন ভকতগণ,             সদা ডাকে মা বলিয়ে॥

সুরাসুর নাগ নর,         নাচে উল্লসিত হয়ে ।

দিবানিশি নাহি জ্ঞান,         তব মুখ নিরখিয়ে॥

মহাপাপী দুরাচারী,         নিস্তারিল নাম ল’য়ে ।

পতিত কমলাকান্ত,         রহিল চরণ চেয়ে ॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

কে নাম দিয়েছে ত্রিগুণধারিণী

সুরট—একতালা


কে নাম দিয়েছে ত্রিগুণধারিণী, কে নাম রেখেছে নিস্তারিণী,

বল মা হতে উমা, কার কাছে এত মা, হয়েছ তুমি আদরিণী॥

(আমি) সাধ করে উমা নাম রেখেছিলাম,

মা গাে আমি আজ তাে শুনিলাম;

ভবের সবে নাকি রেখেছে তাের নাম, ভব-ভয়-হারিণী॥

সুখের তরে তােরে হরে সঁপিলাম, দুঃখে দুঃখে কাল হর অবিরাম,

কে রেখেছে তাের দুঃখ-হরা নাম, আমি তাে জানি দুঃখিনী॥

সদানন্দের ঘর অন্ন শূন্য সদা, কে রেখেছে তাের নামটি অন্নদা,

দাশরথি যদি ভয়ে কঁপে সদা কে নাম দিল ভয়হারিণী।

দাশরথি রায়

বলিস দুদিন থাকতে হেথায় কালকে ভােলা নিতে এলে

পরজ মিশ্র—যৎ ঝাঁপতাল


বলিস দুদিন থাকতে হেথায়, কালকে ভােলা নিতে এলে।

ক্ষতি কি তায়, বল্‌গাে আমায় থাকবে ঘরে ঘরের ছেলে

বুঝিয়ে দুটো মিষ্টি করে, ভুলিয়ে তাকে রাখিস ধরে।

মনের মতন পেলে পরে থাকবে ভুলে নেচে খেলে॥

সিদ্ধি বাটব আপন হাতে, শুনেছি সে তুষ্ট তাতে।

গঙ্গা জল আর বেলপাতাতে, নিত্য মাথায় দেব ঢেলে

ঝি জামাই তাে আনে সবাই, আমার মনে সে সাধ কি নাই?

কেমন করে আনব জামাই তাের দেখা পাই বছর গেলে

গিরিশচন্দ্র ঘােষ

(ওগাে) নবমী নিশি তুমি আর যেন পােহায়াে না

সিন্ধু খাম্বাজ—যৎ


(ওগাে) নবমী নিশি তুমি আর যেন পােহায়াে না,

তুমি গেলে আমার উমা যাবে এ দুঃখীর প্রাণ আর বাঁচবে না।

সপ্তমী অষ্টমীতে আমি ছিলাম মনের সুখেতে

ওরে নবমী তুই মাথা খেতে কেন এলি বল্ না॥

অজ্ঞাত

বল গাে উমা কোন্ প্রাণে তােমা পাঠাইব আজ হরেরি ঘরে

কীর্তন ভাঙ্গা—একতালা


বল গাে উমা কোন্ প্রাণে তােমা পাঠাইব আজ হরেরি ঘরে।

থাকে সে শ্মশানে ভূতগণসনে লাজ-ভয় নাই ভবের অন্তরে॥

রাখি আমি তােরে নয়নে নয়নে

পলকে প্রলয় হেরি তােমা বিনে।

মা-ডাক শুনিলে ও চাঁদবদনে চাহি না কিছুই এ তিন সংসারে॥

বিঁধে যদি কাটা তাের রাঙ্গা পায়,

বাজে মাের বুকে কে বুঝিবে তায়,

মােরে ফেলে তুই যাইবি কোথায় প্রাণহীন প্রাণে বাঁচিব কি করে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্ৰীশ্ৰী মাতৃ সঙ্গীত

সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে, সর্বার্থসাধিকে


সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে, শিবে, সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে, ত্র্যম্বকে, গৌরি, নারায়ণি নমােহস্তু তে॥

সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।

গুণাশ্রয়ে, গুণময়ে, নারায়ণি নমােহস্তু তে

শরণাগত-দীনার্ত-পরিত্রাণ পরায়ণে।

সর্বস্যার্তিহরে দেবি নারায়ণি নমােহস্তুতে

জয় নারায়ণি নমােহস্তু তে, জয় নারায়ণি নমােহস্তু তে।

জয় নারায়ণি নমােহস্তু তে, জয় নারায়ণি নমােহস্তু তে

চণ্ডী

ত্বং অপারা বিশ্বসারা

জয়জয়ন্তীচৌতালা


ত্বং অপারা, বিশ্বসারা, বিশ্বাধারা বিশ্বরঞ্জিনী;

সবর্ভূত-আত্মভূত, সর্ববিভূতি-প্রবিধায়িনী॥

ত্বং অনল ক্ষিতি-অনিল, ব্যোম-সলিল-সংরূপিণী;

তুমি অমেয়া মহেশজায়া, ভাে অভয়া ভয়বারিণি॥

বিরাজিতা শব-আসনে, কভু প্রমত্তা আসব পানে,

কভু যুক্তা শিব সনে, শিবে গাে শিবানি;

ওমা ত্রিগুণধারিণি, গুণাতীতা ত্রিনয়নি,

প্রেমিকের ত্রিতাপের তাপ সংহর হর-মােহিনি

প্রেমিক

(মহেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, আন্দুল কালীকীর্তন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা)

নীলবরণী নবীনা রমণী

খাম্বাজ-চৌতালা


নীলবরণী, নবীনা রমণী, নাগিনীজড়িত জটাবিভূষিণী;

নীল নলিনী জিনি ত্রিনয়নী, নিরখিলাম নিশানাথ-নিভাননী

নিরমল-নিশাকর-কপালিনী, নিরুপমা ভালে পঞ্চরেখাশ্রেণী,

নৃকর চারুকর-সুশােভিনী, লােলরসনা করালবদনী

নিতম্বে বেষ্টিত শার্দুলছাল, নীলপদ্ম করে, করেকরবাল,

নৃমুণ্ড-খর্পর অপর দ্বিকরে, লম্বােদরী লম্বােদর প্রসবিনী;

নিপতিত পতি শবরূপে পায়, নিগমে ইহার নিগূঢ় না পায়;

নিস্তার পাইতে শিবের উপায়, নিত্যসিদ্ধা তারা নগেন্দ্ৰনন্দিনী॥

শিবচন্দ্র রায় (মহারাজ)

এমা কালভয়বারিণী কপালিনী

দেশ মল্লার-তেওরা*


(এমা) কালভয়বারিণী কপালিনী, কালরূপিণী,

শম্ভুভামিনী, নিশুম্ভঘাতিনী, সমরবাসিনী, সুরবন্দিনী॥

পুর-হর-মনোমোহকারিণী, সত্যবাদিনী;

তত্ত্বদায়িনী, ত্ৰাসনাশিনী, ত্রাণকারিণী; তিমিরবরণী॥

ত্রিগুণধারিণী, ত্রিদেবজননী, ত্রিলোকেশী, তেজরূপিণী,

অন্নদায়িনী, অমরপালিনী, অসুরদলনী, আদিকারিণী,

আশুতোষ-হৃদিবিলাসিনী, আত্মরূপিণী॥

আশুতোষ দেব

(সাতুবাবু)


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

আহা মরি মরিরে কীরূপ মাধুরী ও বামা কে আসে

জয়জয়ন্তী-ধামার*


আহা মরি মরিরে,             কীরূপ মাধুরী, ও বামা কে আসে

হাসিতে হাসিতে ঘনবরণী

বিবসনা নবীনা রমণী,             এলায়ে পড়েছে বেণী,

চরণে নূপুর কটিতে কিঙ্কিণী, আসব-আবেশে লোহিত-লোচনী॥

(বামার) ভালে শিশুশশী, সীমন্তে সিন্দুর, পীযূষপূর্ণ পীন পয়োধর,

অসিমুণ্ডধরা বরাভয়া মুণ্ডমালিনী;

সাধক হৃদয় ভাবেতে ধন্য,             নিরূপমা নারী নহে সামান্য,

ত্রিতাপহারিণী শিবের কামিনী বিশ্বপ্রসবিনী ভুবনমোহিনী॥

                          -সাধক


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

জগৎ-জননী জাগিয়াছে আজি

খাম্বাজতালফের

(চৌতাল, সঞ্চারী-ধামার)


জগৎ-জননী জাগিয়াছে আজি জয় মা তারিণী গাও রে,

বাজাও ডঙ্কা নাহিকো শঙ্কা ঘুচে গেছে ভবভয় রে॥

নেহারি দানব-নিপীড়িত ধরা, দানব-দলনী পাগলের পারা,

মুখে অট্টহাস ত্রিভুবন-ত্রাস বুঝি বা সৃষ্টি যায় রে॥

ডাকিনী যোগিনী নাচিছে সঙ্গে, গ্রাসিছে দানব কত না রঙ্গে,

রুধির লেগেছে সকল অঙ্গে পদভরে ধরা টলে রে।

দানব নাশিতে অসিমুণ্ডধরা, ভকতের তরে বরাভয়করা,

রুদ্র মধুরে অপরূপ তারা, হেরিলে প্রাণ জুড়ায় রে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


তুমি শ্যামা হররমা

জয়জয়ন্তী—চৌতাল


তুমি শ্যামা হররমা উমা রমা মনোমোহিনী,

তুমি পরা বিশ্বাধারা বরাননী বরবর্ণিনী।

যোগীবর হৃদয়কন্দর জ্ঞানভাস্কর প্রবিধায়িনী

সতী সাবিত্রী জগদ্ধাত্রী, মুক্তিদাত্রী ভোগদায়িনী॥

বিবসনী তুমি কৃপাণী, গলদ্রুধির শিরোমালিনী,

বরাভয়া ত্রিনয়নী, ত্রিবর্গদায়িনী;

ওমা ভূধরনন্দিনী, দনুজ-দল-দলনি,

প্রেমিকের ভব ভয় হর হর মা হররানি॥

প্রেমিক

বামা কেরে এলো চিকুরে

ইমন-কল্যাণ—ধামার*


বামা কেরে এলো চিকুরে!

বিহরে আনন্দময়ী শবহৃদি’ পরে

বসন নাহিক গায়,         পদ্মগন্ধে অলি ধায়,

চলে যেতে ঢলে পড়ে আসব ভরে॥

যে ঠেকেছে রাঙ্গা পায়,         হত-দিতি-সুতচয়,

স্পর্শমাত্র শিব হয় সমর মাঝারে;

কমলাকান্তের ভাষী,         সর্বনাশি, ধরে অসি

করিলি সব কাশীবাসী জনমের তরে॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


*  স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত




1

কেরে বামা ভুবনমোহিনী

তিলক কামোদ—–সুরফাক্তা


কেরে বামা ভুবনমোহিনী, করালিনী রঙ্গিণী,

রণ-মাঝারে আলো করি, কিবা বিহরে নিবিড় নীরদবরণী।

বিকশিত-চারু-দশনা, ঘোর-লোহিত-লোচনা, অট্টহাসি-আননা,

বিবসনা শব-আসনা দানব-দৃপ্ত-দলনী॥

ভীম মধুর কান্তি, নাশে মানস ভ্রান্তি, দরশনে চিরশান্তি,

যাচে হৃদয় আকুল অভয় শ্রীপদতরণী॥

নীরদ রঞ্জন মজুমদার

কে গো আমার মা কি এলি

প্রসাদী, লুম্-ঝিঁঝিট—একতালা


কে গো আমার মা কি এলি।

আয় মা মনের কথা বলি (ওমা শোন মা, দুটি কথা)॥

এত দুঃখ দিয়ে শ্যামা যদি দয়া প্রকাশিলি,

তবে মা হয়ে মায়ের মত ছেলের কথা শোন্ মা কালী॥

দাঁড়া গো মা হৃৎকমলে, পূজি মানসকুসুম তুলি,

ভক্তিচন্দন মাখাইয়ে পদে দিব পুষ্পাঞ্জলি॥

করিব সুমহৎ হোম চিৎকুণ্ডে অনল জ্বালি,

পূর্ণাহুতি দিব তাহে ‘জয় কালী, জয় কালী’ বলি

প্রাণান্ত এ দক্ষিণান্ত, কর্মফল মা তুই সকলি,

মায়ের ছেলে প্রেমিক এখন, যার কাছে কাল কৃতাঞ্জলি

প্রেমিক

কে এল এলোকেশে

মিশ্র বাহার চৌতাল*


কে এল এলোকেশে ন্যাংটা বেশে রণেতে,

নাচে শবে, নাশে সবে, শিবা সব সঙ্গেতে

অধরে রুধিরধারা,             সর্বাঙ্গ শোণিত ভরা,

শাণিত কৃপাণধরা, কাঁপে ধরা ভয়েতে॥

শব দোলে কর্ণমূলে,             নরশির শোভে গলে,

অনল জ্বলিছে ভালে, কালফণী কাঁধেতে;

প্রেমিক বলে ওমা কালি,         ভূভার হরিলি খালি,

করলিনে ভার আমার খালি, পারি না ভার বহিতে।

প্রেমিক


* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

আমার অন্তরে আনন্দময়ী

জংলা—একতালা


আমার অন্তরে আনন্দময়ী     সদা করিতেছেন কেলি।

আমি' যেভাবে সেভাবে থাকি, নামটি কভু নাহি ভুলি।

আবার দু-আঁখি মুদিলে দেখি, অন্তরেতে মুণ্ডমালী

বিষয়বুদ্ধি হইল হত, আবার পাগল বোল বলে সকলি৷

আমায় যা বলে তা বলুক তারা, অন্তে যেন পাই পাগলী

শ্রীরামপ্রসাদ বলে, মা বিরাজে শতদলে,

আমি শরণ নিলাম চরণ তলে অন্তে না ফেলিও ঠেলি

রামপ্রসাদ সেন

দীনতারিণী দূরিতহারিণী

খাম্বাজ—চৌতাল


দীনতারিণী দূরিতহারিণী, সত্ত্বরজস্তম ত্রিগুণধারিণী,

সৃজন-পালন-নিধন-কারিণী, সগুণা নির্গুণা সর্বস্বরূপিণী॥

ত্বং হি কালী তারা পরমাপ্রকৃতি, ত্বং হি মীন কূর্ম বরাহ প্রভৃতি,

ত্বং হি স্থল জল অনল অনিল, ত্বং হি ব্যোম ব্যোমকেশ-প্রসবিনী

সাংখ্য পাতঞ্জল মীমাংসক ন্যায়, তন্ন তন্ন জ্ঞানে ধ্যানে সদা ধ্যায়,

বৈশেষিক বেদান্ত, ভ্ৰমে হ’য়ে ভ্রান্ত,

তথাপি অদ্যাপি জানিতে পারেনি

নিরুপাধি আদিঅন্তরহিত, করিতে সাধক জনার হিত,

গণেশাদি পঞ্চরূপে কালবঞ্চ, ভবভয়হরা ত্রিকালবর্তিনী॥

সাকার সাধকে তুমি যে সাকার, নিরাকার উপাসকে নিরাকার,

কেহ কেহ কয় ব্রহ্মা জ্যোতির্ময়, সেই তুমি নগতনয়া জননী;

যে অবধি যার অভিসন্ধি হয়, সে অবধি সে পরব্রহ্ম কয়,

তৎপরে তুরীয়, অনির্বচনীয় সকলি মা তারা ত্রিলোকব্যাপিনী॥

শিবচন্দ্র রায় (মহারাজ)

সিংহচারী খপথ ধাওয়ে

ইমন কল্যাণ—তেওরা


সিংহচারী খপথ ধাওয়ে, অসুর-সুরগণ গগনে ছাওয়ে

রক্ত-বীজ-মারী করে রুধির ধারে॥

ইন্দ্র চন্দ্র করত ধ্যান, ভয়ে ধরণী কম্পমান,

আওয়ে হরি শঙ্খ নাদে সকল চরণ পাওয়ে॥

ব্রহ্মা হরি হর ধরণী অম্বর, সিদ্ধ কিন্নর সজল জলধর,

জ্যোতিঃ সঞ্চারে॥

অজ্ঞাত

ও মা কালী চিরকালি সঙ সাজালি এ সংসারে

পরজ বাহার—ঝাঁপতাল


ও মা কালী চিরকালি সঙ সাজালি এ সংসারে।

এ সংসারে নাইকো মজা, সাজা পাই মা অন্তরে

(ওমা) কভু ভূতলে অনিলে, কভু ব্যোম রসাতলে,

কভু বারিধি-সলিলে সাজাও নানা আকারে

(আমি) ভ্ৰমিয়া অশেষ দেশ ধরিলাম অশেষ বেশ,

তবুও না হোল শেষ, বলিহারি মা তোমারে॥

প্রেমিক বলে আমার মন যে পাজী, তাইতো প্রলোভনে মজি,

নইলে তোমার এ কারসাজি খাটতো কি মা বারেবারে

প্রেমিক

ঢলিয়ে ঢলিয়ে কে আসে

বাগেশ্রী-ধামার*


ঢলিয়ে ঢলিয়ে কে আসে, গলিত চিকুর আসব-আবেশে,

বামা রণে দ্রুতগতি চলে, দ’লে দানব-দলে,

ধরে করতলে, গজ গরাসে;

কালীর শরীরে রুধির শোভিছে, কালিন্দীর জলে কিংশুক ভাসে,

নীলকমল শ্রীমুখমণ্ডল, অর্ধচন্দ্র ভালে প্রকাশে॥

নীলকান্ত মণি নিতান্ত, নখরনিকর তিমির নাশে,

রূপের ছটায় তড়িত ঘটায়,         ঘন ঘোর রব উঠে আকাশে,

দিতিসুতচয়, সবার হৃদয়, থর থর থর কাঁপে হুতাশে।

(মাগো) কোপ করো দূর, চলো নিজপুর, নিবেদে শ্রীরামপ্রসাদ দাসে

                      —রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

দ্যাখনা চেয়ে ন্যাংটা মেয়ে করতেছে কি কারখানা

বাহার—ধামার


দ্যাখনা চেয়ে     ন্যাংটা মেয়ে,     করতেছে কি কারখানা,

হাস্য করে,         আস্যে পোরে,     মত্ত মাতঙ্গ সেনা॥

আসব পানে মত্ত মন         রোষে আরক্ত নয়ন,

নৃত্য করে অনুক্ষণ, সঙ্গে পিশাচ দানা॥

রুধির ধরে উদরে,         কাঁপে ধরা পদ ভরে,

হুহুঙ্কার রব করে, সদাই লোল রসনা;

(যত) ভীষণ আকার ধর,         ভীত নহে এ অন্তর,

অন্তে হ’য়ো না অন্তর প্রেমিকের এই বাসনা॥

প্রেমিক


সে মা কি এমনি মায়ের মেয়ে

জংলা—একতাল


সে (মা) কি এমনি মায়ের মেয়ে।

যার নাম জপিয়ে মহেশ বাঁচেন হলাহল খাইয়ে॥

সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় যার কটাক্ষে হেরিয়ে।

সে যে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড রাখে উদরে পুরিয়ে॥

যে চরণে শরণ লয়ে দেবতা বাঁচেন দায়ে।

দেবের দেব মহাদেব যাঁর চরণে লুটায়ে॥

প্রসাদ বলে রণে চলে রণময়ী হয়ে।

শুম্ভ নিশুম্ভকে বধে হুঙ্কার ছাড়িয়ে

রামপ্রসাদ সেন

বড় ধূম লেগেছে, হৃদিকমলে

সুরট-মল্লার—তেওড়া


বড় ধূম লেগেছে, হৃদিকমলে।

মজা দেখিছে আমার মন-পাগলে॥

হতেছে পাগলের মেলা ক্ষেপাতে-ক্ষেপিতে মিলে,

আনন্দেতে সদানন্দে আনন্দময়ী পড়ছে ঢলে॥

দেখে অবাক         লেগেছে তাক্         ইন্দ্রিয় আর রিপুদলে,

পেয়ে সুযোগ         এই গোলযোগ         জ্ঞানের কপাট গেছে খুলে

প্রেমিক পাগল         বলে সকল         তাবলে আমার মন কি টলে,

(যার) পিতামাতা         বদ্ধ পাগল,         ভাল হয় কি তাদের ছেলে॥

শোন্ মা তারা         ভূভারহরা             এই বেলা মা রাখছি বলে

(যখন) ভাসব’ জলে     অন্তকালে             তনয় ব’লে করিস কোলে॥

প্রেমিক

জগতজননী আমায় তরাও গো মা তারা

আড়ানা——চৌতাল*


জগতজননী, আমায় তরাও গো মা তারা।

জগতকে তরালে আমাকে ডুবালে, আমি কি জগত ছাড়াগো মা তারা॥

দিবা অবসান রাত্রিকালে, দিয়েছি সাঁতার শ্রীদুর্গা বলে,

মম জীর্ণ তরী মা আছে কাণ্ডারী, (তবু) ডুবিল ডুবিল ডুবিল ভরা॥

রামপ্রসাদ ভাবিয়ে সারা, মা হ’য়ে পাঠালি মাসীর পাড়া,

কোথায় গিয়েছিলি এ ধর্ম শিখিলি, মা হ’য়ে সন্তান ছাড়া গো তারা?

রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

আমি জানি না তন্ত্র সাধনা

প্রসাদী—একতালা


আমি জানি না তন্ত্র সাধনা।

কেবল কালী-নামটি ডাক রসনা

কালী-কল্পলতায় ফলে, চতুর্বর্গ তা জান না?

(ও মন) নামের গুণে পূরায় মনের শবাসনা সব বাসনা।

মায়ের নামে সুধা ঝরে, ভবক্ষুধা তো থাকে না;

ডাকলে যারা সারাৎসারা পায় না রে যম-যাতনা

(যার) অন্তরেতে মুক্তকেশী, মুখে দুর্গানাম রটনা;

গয়া গঙ্গা বারাণসী, ঘরে বসি পায় সে জনা॥

ভবপ্রীতা কাতরে কয়, (মা), ঘুচাও মনের দুর্ভাবনা,

অজপান্তে পদপ্রান্তে স্থান দিবি গো ত্রিনয়না

ভবপ্রীতানন্দ ওঝা

ওরে সুরা পান করি না আমি সুধা খাই জয় কালী বলে

পিলু-বাহার—যৎ


ওরে সুরা পান করি না আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে,

মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতলে মাতাল বলে।

গুরদত্ত গুড় লয়ে, প্রবৃত্তি তায় মশলা দিয়ে মা;

আমার জ্ঞান শুঁড়ীতে চোঁয়ার ভাটি, পান করে মোর মন-মাতালে।

মূল মন্ত্র যন্ত্রভরা, শোধন করি বলে তারা মা;

রামপ্রসাদ বলে এমন সুরা খেলে চতুর্বর্গ মেলে।

রামপ্রসাদ সেন

পঙ্কজ বনে রাত্রদিনে কি রঙ্গ করিছ শিবা

কামোদ—চৌতাল*


পঙ্কজ বনে রাত্রদিনে, কি রঙ্গ করিছ শিবা,

সদা শিবসঙ্গে আনন্দে, আনন্দময়ী॥

তুমি একা হয়েছে দ্বিধা, পরমপুরুষ প্রকৃতিনারী;

কতই নামে কতই রূপ ধরি কত লীলা কর, লীলাময়ী॥

সকল আকারে আছ মা অন্তরে, জানিতে না পারে জীব তোমারে,

তুমিই নিত্যা নিরাকারা চিদানন্দ-ব্রহ্মময়ী;

তুমি কৃপা কর যারে সেই তোমারে জানিতে পারে,

প্রসীদ প্রসীদ প্ৰসীদ, দেবেশি,

সাধকের হৃদিপদ্মে প্রকাশ, করুণাময়ি

সাধক


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

গয়া-গঙ্গা-প্রভাসাদি কাশী-কাঞ্চী কেবা চায়

পরজ-বাহার—ঝাঁপতাল*


গয়া-গঙ্গা-প্রভাসাদি কাশী-কাঞ্চী কেবা চায়,

কালী কালী কালী বলে, অজপা যদি ফুরায়॥

ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়

সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে, কভু সন্ধি নাহি পায়

কালী নামের এত গুণ কেবা জানতে পারে তায়,

দেবাদিদেব মহাদেব যাঁর পঞ্চমুখে গুণ গায়

দান ব্রত যজ্ঞ আদি, আর কিছু না মনে লয়;

মদনের যাগ যজ্ঞ ব্রহ্মময়ীর রাঙ্গা পায়

                    —মদন


* স্বরলিপিঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত (রামকৃষ্ণ মিশন, গোলপার্ক)

ওমা ভবভয়বারিণী এলাম ভবে দেখা দে গো জননী

ইমন-কল্যাণ—চৌতাল*


ওমা ভবভয়বারিণী, এলাম ভবে দেখা দে গো জননী,

দিও না যাতনা ত্রিনয়না, দিবানিশি ভাসি দুঃখে গো তারিণী॥

তব পদে এই মিনতি, না জানি জননী তোমার স্তুতি,

গতিহীনের অতি মূঢ়মতি, কর দীনে ত্রাণ, ত্রাণকারিণী॥

দাসের দোষ হর হর-মনোরমা, তনয়েরে ঘৃণা ক’র না গো উমা,

এ পাপাঙ্গে গো অপাঙ্গে, কর কৃপা শ্যামাঙ্গিনী,

এ রঙ্গভূমির রঙ্গ, কালস্রোতে হ’লে ভঙ্গ,

প্রেমিকের না হয় আতঙ্ক, কর কৃপা কপালিনী॥

প্রেমিক


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

দয়াময়ী হ'য়ে গো মা নিদয়া হয়ো না শ্যামা

পরজ বাহার—সুরফাঁক্তা*


দয়াময়ী হ’য়ে গো মা নিদয়া হ’য়ো না শ্যামা।

ও হরললনা, বুঝিতে পারি না, এ কেমন তোমার ছলনা

ভেবেছিলাম ভবে ভবজায়া ভেবে করব ভবব্যাধি সান্ত্বনা,

আমার আশা সকল করিলি বিফল সফল ভ্ৰমণ হ’ল না

প্রপঞ্চ জগতে পরিজন ভূতে লঙ্ঘাইয়া দিচ্ছে যাতনা,

খেতে শুতে যেতে     ফেরাস তাদের মতে

স্বাধীনতা প্রেমিক পেলে না;

এত যে চাতুরী করিবি শঙ্করী, স্বপনেও তা জানি না,

(এখন) কর মা উপায় দিয়ে স্থান ও পায় বৃথা জনম যেন যায় না॥

প্রেমিক


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

সমরে নাচে রে শ্যামা শিব-সীমন্তিনী

খাম্বাজ—কাওয়ালী


সমরে নাচে রে শ্যামা শিব-সীমন্তিনী।

আলো করে কালো রূপে করালবদনী॥

রোষেতে লোচন লাল, রুধিরে চরণ লাল;

রাঙ্গা পায়ে জবা লাল, মরালগামিনী॥

অপরূপ তনু কালো, কালো সে চিকুর-জাল;

দশন ঝলকে যেন মেঘেতে দামিনী॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে নাচে সমরে বামা তিমিরবরণী

খাম্বাজ—যৎ 


কে নাচে সমরে বামা তিমিরবরণী?

শোণিত সায়রে যেন ভাসিছে নীল নলিনী॥

কেরে ঘূর্ণিত লোচনী ত্রিনয়নী দিগম্বরী?

পদভরে ধরাধর অধীরা ধরণী;

তাই ভেবে শ্রীচরণে পড়ে আছেন শূলপাণি।

অজ্ঞাত

শ্যামা মন-ছাঁচে তোমাকে ফেলে

সুরট মল্লার–তেওরা


শ্যামা, মন-ছাঁচে তোমাকে ফেলে,

মনোময়ী মূর্তি আজ ল’ব তুলে॥

মন যে আমার খাদে ভরা,         তোমার ভাবে কৈ মা গলে,

ভাবরূপিণী হও তারিণী, গ’লে আমার ভাব অনলে॥

দেখিব রূপ তোমার স্বরূপ,         যে রূপেতে ভোলা ভোলে,

পুরাও আশা, কৃত্তিবাসা দিয়ে দেখা হৃদিকমলে

গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা,         কি হবে মা বনফুলে,

কি দিয়ে পূজিব তোমায় ভাবছি ব’সে তাই বিরলে ॥

আমি আমার নই জননী,         আমার নাই কিছুই ভূতলে,

এ ব্রহ্মাণ্ড তোমার সৃষ্টি, দৃষ্টিহীনে আমার বলে

প্রেমিক বলে শোনরে যুক্তি         যথাশক্তি ভক্তিজলে,

ধু’য়ে দে মা’র রাঙ্গা চরণ, মনফুল দে পদতলে

প্রেমিক



তিলেক দাঁড়া ওরে শমন বদন ভরে মাকে ডাকি

ঝিঁঝিট—একতালা


তিলেক দাঁড়া ওরে শমন, বদন ভরে মাকে ডাকি।

আমার বিপদ কালে ব্রহ্মময়ী, আসে কি না আসে দেখি॥

লয়ে যাবি সঙ্গে করে, তার এত ভাবনা কিরে

তবে তারা নামের কবচমালা, বৃথা আমি গলায় রাখি॥

মহেশ্বরী আমার রাজা, আমি খাস তালুকের প্রজা

আমি কখন নাতান, তখন সাতান, কখন বাকীর দায়ে না ঠেকি॥

প্রসাদ বলে মায়ের লীলা, অন্যে কি জানিতে পারে।

যাঁর ত্রিলোচন না পেল তত্ত্ব, আমি তাঁর অন্ত পাব কি॥

রামপ্রসাদ সেন

দুরিতবারিণি ও মা হররানি

আড়ানা—তাল ফেরতা

(চৌতাল, সঞ্চারী—ধামার)


দুরিতবারিণি ও মা হররানি ডাকিছে কাতরে এ দীন সন্তান,

করিয়া যতন কমল আসন পেতেছি হৃদয়ে কর অধিষ্ঠান॥

শিখাইয়া দাও তুমি মা ভবানি,         কেমনে পূজিব চরণ দু’খানি,

ভজন পূজন কিছুই না জানি, তাই ভাবি কিসে পাব পদে স্থান

ভরসা কেবল করুণা তোমার         তাই এ সন্তান ডাকে বার বার,

নাশ মা তাহার অজ্ঞান-আঁধার তনয়ে তোমার দাও দিব্য জ্ঞান;

যেন নাহি ভুলি চরণ দু’খানি         এই মতি দাও তনয়ে জননি,

অকূল পাথার কিসে হই পার, ভব দুঃখ যেন হয় অবসান॥

অজ্ঞাত

মনরে কালী বলে ডাক

রামপ্রসাদী—একতাল


মনরে কালী বলে ডাক।

আমার কথা শোন কথা রাখ, তুমি ঘরের বাহির হয়ো নাকো

ভবের যাতনা যত         দেহ তাদের অনুগত

দেহ জানে আর দুঃখ জানে, মন তুমি আনন্দে থাক

ঘরে আছে দু’জন কুজন, তাদের সঙ্গী হয়োনা মন,

(কেবল) রসনা রঙ্গিয়া ওঠে         যত্নে তায় স্ববশে রাখ

ভবেরি যাতনা যত দেহ তাদের অনুগত

দেহ জানে আর দুঃখ জানে, মন তুমি আনন্দে থাক

কমলাকান্তের হৃদি        কমলের আনন্দ-নিধি

(আমি) সাধ করে মন তোমায় দিলাম তুমি জ্ঞান-চক্ষু খুলে দেখ॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

এমন দিন কি হবে মা তারা

কাফিসিন্ধু—যৎ 


এমন দিন কি হবে মা তারা।

(যবে) ‘তারা’ ‘তারা’ ‘তারা’ বলে (দুনয়নে) তারা বেয়ে পড়বে ধারা॥

হৃদি পদ্ম উঠবে ফুটে, মনের আঁধার যাবে ছুটে।

(তখন) ধরাতলে পড়বো লুটে, ‘তারা’ বলে হবো সারা

ত্যাজিব সব ভেদাভেদ, ঘুচে যাবে মনের খেদ।

ওরে, শত শত সত্য বেদ, তারা আমার নিরাকারা॥

শ্রীরামপ্রসাদ রটে, মা বিরাজে সর্বঘটে।

ওরে, আঁখি অন্ধ, দেখরে মাকে, তিমিরে তিমির হরা

রামপ্রসাদ সেন

অন্তরে জাগিছ গো মা অন্তরযামিনী

সুরট মল্লার—ঝাঁপতাল*


অন্তরে জাগিছ গো মা অন্তরযামিনী,

কোলে করে আছ মোরে, দিবস যামিনী

অধম সুতের প্রতি,         কেন এত স্নেহ প্রীতি,

প্রেমে আহা! একেবারে যেন পাগলিনী॥

কখনো আদর করি,         কখনো সবলে ধরি

পিয়াও অমৃত, শুনাও মধুর কাহিনী;

নিরবধি অবিকারে         কত ভালবাস আমারে,

উদ্ধারিছ বারে বারে, পতিতোদ্ধারিণী॥

বুঝেছি এবার সার,         মা আমার আমি মার,

চলিব সুপথে সদা শুনি তব বাণী;

করি মাতৃস্তন্য পান,        হব বীর বলবান,

আনন্দে গাহিব জয় ব্ৰহ্মসনাতনী

ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল


* স্বরলিপি: শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত


কার কামিনী মরালগামিনী

আলাইয়া—একতাল


কার কামিনী মরালগামিনী নীরদবরণী দামিনী বিহরে।

অরুণ কিরণ চমকে চরণে দশ সুধাকর জড়িত নখরে॥

নব ইন্দিবর ত্রিনয়নে শোভে, উড়ে অলিকুল পরিমল-লোভে,

এলোথেলো কেশ, পাগলিনী-বেশ, শোণিতের ধারা বহিছে অধরে॥

গলে দোলে কিবা নরশিরহার, নরকরশ্রেণী কিঙ্কিণী বামার,

করাল বদনা বিকট-দশনা দেখে হয় ত্রাস, অন্তর শিহরে॥

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

যখন যেরূপে মাগো রাখিবে আমারে

কাফি—ঝাঁপতাল*


যখন যেরূপে মাগো রাখিবে আমারে।

সকলই সফল যদি না ভুলি তোমারে॥

জনম করম দুঃখ, সুখ করি মানি,

জলদ-বরানি যদি নিবাখি অন্তরে শ্যামা॥

বিভূতি ভূষণ কিংবা রতন মণি-কাঞ্চন,

তরুতলে বাস কিংবা রাজসিংহাসন;

কমলাকান্ত উভয় মম সাধন, জননি,

নিবাস যদি হৃদয় মন্দিরে, গো মা॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* গান খানি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব এবং শ্রীমাতাঠাকুরানী যেমন গাইতেন উপরে তেমনি দেওয়া হলো; গানখানি মায়ের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন ক্ষীরোদবালা রায় এবং স্বামী চণ্ডিকানন্দকে দেন। কিন্তু মূলগানখানি অন্যরকম আছে। ব্রহ্মসঙ্গীত গ্রন্থে কমলাকান্তের রচিত এরকম একটি গান রয়েছে।

কালী কপালিনী পূর্ণ সনাতনী

কানাড়া—চৌতাল


কালী কপালিনী পূর্ণ সনাতনী, কলুষনাশিনী কৈবল্যদায়িনী,

জ্ঞান-ভক্তি-প্রদায়িনী, পতিত জন-পাবনী॥

কাতরে ডাকে মা অকৃতি সন্তান, কৃপা করি তারে দাও পদে স্থান

দাও সেই জ্ঞান যাহে পায় ত্রাণ এ ভব-সাগরে, জগতজননী॥

যে জন তোমার রাঙ্গা চরণ হৃদয়ে সতত করে মা স্মরণ,

ভবভয় তার হয় নিবারণ অন্তে শান্তিধামে যায় সে তখনি;

তুমি বিনা আর কে আছে আমার, মাগি গো শরণ শ্রীপদে তোমার

করো না নিরাশ হও মা প্রকাশ, দাও দরশন করুণারূপিণী॥

অজ্ঞাত

অন্ন দে মা অন্নপূর্ণে

কেদারা—ধামার*


অন্ন দে মা অন্নপূর্ণে         অন্ন দে মা অন্নদে!

সারদে হৃদয়পদ্মে         জ্ঞানং দেহি মে জ্ঞানদে॥

ধন্য কাশী শিব ধন্য         সুরধুনী অবতীর্ণ।

বিরাজিতা অন্নপূর্ণা         অঞ্জলি করে ভবদে॥

হ’য়েছে মা ক্ষুধাব্যাধি         দে মা গো সুধা-ঔষধি,

অন্তে চরণে সমাধি         মোক্ষং দেহি মে মোক্ষদে॥

মহারাজ রামকৃষ্ণ




স্বরলিপিঃ সাধনসঙ্গীত

দুর্গে দলনী দুঃখ দারিদ্র্যদহনী দুষ্ট-বিদারিণী হর-শম্ভু-জায়া

আড়ানা—ঝাঁপতাল


দুর্গে দলনী দুঃখ, দারিদ্র্যদহনী, দুষ্ট-বিদারিণী হর-শম্ভু-জায়া॥

অসুর-সংহারিণী, রক্তবীজ-নাশিনী, দীন-অভয়বরা-সুর-নর-পায়া॥

সংসার-তারিণী, তারা তরণীতে, উদ্ধরে কৃপালী, যো পরমা মায়া;

সপ্তদ্বীপ নব খণ্ড ত্রৈলোক্য-ব্যাপিত যাচে সুযশ চারু আনন্দ-দায়া॥

অজ্ঞাত

মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ’ল মহাকালী

দুর্গা—তেওরা


মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ’ল মহাকালী।

শ্মশান চিতার ভস্ম মেখে ম্লান হ’ল মার রূপের ডালি

তবু মায়ের রূপ কি হারায়।

(সে যে) ছড়িয়ে আছে চন্দ্রতারায়।

মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য-প্রদীপ জ্বালি॥

উমা’ হ’ল ভৈরবী হায়, বরণ করে ভৈরবেরে,

হেরি শিবের শিরে জাহ্নবীরে শ্মশানে মশানে ফেরে;

অন্ন দিতে ত্রিজগতে,

অন্নদা মোর বেড়ায় পথে,

ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজদুলালী॥

নজরুল

ঈশ্বরী পরমা নির্গুণা ত্রিগুণা একা হও নানা

মালকোষ—ধামার


ঈশ্বরী পরমা নির্গুণা ত্রিগুণা একা হও নানা;

অচিন্ত্য অতুলনা তুমিই আমার মা॥

জগত জীব ঈশ ভিন্ন ব্যবহারে লীলা কর সৃজন পালন সংহারে।

এ মায়া সরায়ে স্বরূপ মহামায়ে দেখাও সচ্চিদানন্দময়ি! শুদ্ধা ভূমা॥

স্বামী তপানন্দ

কে ও ললনা নলিনী-বদনা

দরবারী কানাড়া—চৌতাল


কে ও ললনা         নলিনী-বদনা         দানব-দলনা         বল রে আমায়,

মরি কি মাধুরী         যেন স্বর্ণগিরি         রবিশশী হারি         পতিত পায়॥

গলিত চিকুরে         শ্রীঅঙ্গপ্রভা             নব নীলঘনে         চপলারি আভা

কপোল-কমলে         অনিল-হিল্লোলে,         অলকার ছলে         মধুপ ধায়॥

রাজে মৃগরাজে         সাজে অপরূপ,         আসব-আবেশে         সুধায় লোলুপ

হুহুঙ্কার ধ্বনি         কাঁপিছে অবনী,         চরণে শরণ         বিপিন লয়॥

অজ্ঞাত

শিব সঙ্গে সদা রঙ্গে আনন্দ-মগনা

সাহানা—ঝাঁপতাল*


শিব সঙ্গে সদা রঙ্গে আনন্দ-মগনা,

সুধা পানে ঢল ঢল ঢলে কিন্তু পড়ে না॥

বিপরীত রতাতুরা পদভরে কাঁপে ধরা,

উভয়ে পাগলের পারা লজ্জা ভয় আর মানে না॥

রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপিঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

মদমত্ত-মাতঙ্গিনী উলঙ্গিনী নেচে ধায়

সাহানা—ঝাঁপতাল


মদমত্ত-মাতঙ্গিনী             উলঙ্গিনী নেচে ধায়,

নিবিড় কুন্তলদল             বিজড়িত পায় পায়॥

নখরে অরুণ ছুটে         পদচিহ্নে পদ্ম ফুটে,

মকরন্দ-গন্ধ-অন্ধ         ভৃঙ্গবৃন্দ গুঞ্জি ধায়।

অট্টহাস্য অবিরত         তড়িত প্রকট কত,

উজল ঝলকে আলো         কালবরণ ঘটায়

গিরিশচন্দ্র ঘোষ

অভয়ার অভয়পদ কর মন সার

গৌড়সারঙ্গ—ঝাঁপতাল*


অভয়ার অভয়পদ কর মন সার,

ভবভয় সব দূরে যাবে রে তোমার॥

অকর্মজনিত ভয়, যদি ভোগাধীন হয়,

ভয়হরা তারা নামে পাইবে নিস্তার

ভ্রান্তিযুক্ত শ্রান্তিহীন, হেলায় হারালে দিন,

এখনো কর বিধান মনরে আমার;

আদিভূতা-সনাতনী-চরণ কররে ধ্যান,

না হইও অকিঞ্চন আকিঞ্চনে বদ্ধ আর॥

রঘুনাথ রায় (দেওয়ান)


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

পাবি না ক্ষেপা মায়েরে ক্ষেপার মতো না ক্ষেপিলে

পরজ-বাহার—ঝাপতাল*


পাবি না ক্ষেপা মায়েরে ক্ষেপার মতো না ক্ষেপিলে,

সেয়ান পাগল বুঁচকিবগল, কাজ হবে না ওরূপ হ’লে॥

শুনিসনে তুই ভবের কথা,         ও যে বন্ধ্যার প্রসবব্যাথা,

সার করে শ্রীনাথের কথা, চোখের ঠুলি দে না খুলে॥

মায়া মোহ ভোগ তৃষ্ণা         দেবে তোরে যতই তাড়া,

বোবার মতো থাকবি বসে, সে কথায় না দিয়ে সাড়া॥

নিবৃত্তিরে লয়ে সাথে         ভ্রমণ করো তত্ত্বপথে,

নৃত্য করো প্রেমে মেতে, সদা কালী কালী বলে॥

মজা আছে এ পাগলে,         জানবি আসল পাগল হ’লে,

‘আয় রে পাগল ছেলে’ ব’লে, ঐ পাগলী মায়ে নেবে কোলে;

ফুরাবে পাগলের মেলা         ঘুচিবে ত্রিতাপের জ্বালা,

শান্তিধামে করবি লীলা এ যুক্তি প্রেমিক বলে॥

প্রেমিক


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

মরি কি রূপমাধুরি

মল্লার—একতাল


মরি কি রূপমাধুরি, (আহা মরি মরি)॥

ভুবন-আভা মানস-লোভা কিবা শোভা নেহারি।

বিহরে সমর—সাজেরে শিবানী শঙ্করী॥

অধরে মৃদু হাসির রেখা,         যেন গো দামিনী গগনে আঁকা,

ভকত-হৃদয়ে বিতরে আলো মোহ-তিমির নিবারি॥

শ্রবণে কুণ্ডল করে ঝলমল,         গলে দোলে মণি মুকুতা-মালা

লোচন বিশাল কুন্তল-দল, নিবিড় নীরদ যায় হারি॥

অনিলবরণ রায়

আর কাজ কি আমার কাশী

জংলা—একতাল


আর কাজ কি আমার কাশী।

মায়ের পদতলে পড়ে আছে; গয়া গঙ্গা বারাণসী

হৃৎকমলে ধ্যানকালে,        আনন্দ সাগরে ভাসি,

(ওরে) কালীর পদ কোকনদ, তীর্থ রাশি রাশি

কালী নামে পাপ কোথা     মাথা নাই তার মাথাব্যথা

(ওরে) অনলে দহন যথা হয়রে তুলারাশি

গয়ায় করে পিণ্ডদান,         বলে পিতৃঋণে পাব ত্রাণ,

(ওরে) যে করে কালীর ধ্যান, তার গয়া—শুনে হাসি

কাশীতে ম’লেই মুক্তি,         এ বটে শিবের উক্তি,

(ওরে) সকলের মূল ভক্তি, মুক্তি হয় তার দাসী॥

নির্বাণে কি আছে ফল,         জলেতে মিশায় জল,

(ওরে) চিনি হওয়া ভাল নয় মন, চিনি খেতে ভালবাসি॥

কৌতুকে প্রসাদ বলে,         করুণানিধির বলে,

(ওরে) চতুর্বর্গ করতলে, ভাবিলে রে মন এলোকেশী

রামপ্রসাদ সেন

ওমা দীন তারিণী তারা

মালকোষ—একতাল


(ওমা) দীন তারিণী তারা!

দিনে দিনে দিন কেটে গেল মাগো আর কতদিন রব তোমা ছাড়া

পাঠালি যদি মা এ ভব সংসারে

(কেন) চির পরাধীন করিলি আমারে;

পরাধীনতার সহে না যাতনা, নে মা কোলে তুলে ওমা দুখহরা॥

রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

নমামি ত্বং তারিণী

মালকোষ—একতাল


নমামি ত্বং তারিণী

নমামি ত্বং তারিণী

ত্বং হি ব্রহ্মাণী, ত্বং হি রুদ্রাণী, মহেশ্বরী নারায়ণী

বারাহী নারসিংহী অপরাজিতা কৌমারী

অষ্টশক্তি রূপিণী

নমামি ত্বং তারিণী!

বিকট শ্মশান করেছ আলয়,

আসন করেছ ঈশান হৃদয়

এলায়ে দিয়েছ চিকুর জাল

লোল রসনা বিকট দশনা শোণিত মেখেছ অঙ্গে

ভীষণ আহবে ভীম হুঙ্কারে সেজেছ দানব দলনী।

নমামি ত্বং তারিণী,

করেতে শোভিছে বরাভয় আর,

শাণিত কৃপাণ নরশবশির

কণ্ঠে দুলিছে মুণ্ডালী।

কটিতে বদ্ধ বিকট কাঞ্চী নরশবকর নিকরে

গগন চুম্বিছে উজল কিরীট চরণে বাজিছে কিঙ্কিণী

নমামি ত্বং তারিণী

তুমি ভূমি ব্যোম তুমিই সলিল

তুমিই অনিল তুমি বৈশ্বানর

তুমিই মনোবুদ্ধি

অহঙ্কার তোমার বিকার চিদানন্দ রূপিণী

তোমা ছাড়া কিছু নাহি আর

বিপুল বিশ্বব্যাপিনী।

নমামি ত্বং তারিণী॥

স্বামী নির্বেদানন্দ

মা তুমি কে কেউ জানে না

প্রসাদী—একতাল


(মা তুমি কে কেউ জানে না,—সুর)

ডাক দেখি মন মনে মনে, মা যে মনের কথাই আগে শুনে

ভাল মন্দ কাজ কি বুঝে, ভার দে না মা’র শ্রীচরণে,

(তুই) নির্ভাবনায় থাকতে পাবি, কি চিন্তা মরণে রণে॥

ঘুম ভাঙ্গাতে হবে, মা’ যে ঘুমে আছেন পদ্মবনে,

(তিনি) জাগ্‌লে খেতে দিবেন সুধা, ভবের ক্ষুধা যাবে ক্ষণে॥

দীন-তারিণী দীনভাবে ডাক, ময়লা যেন রয় না মনে,

চাঁদের দেখা পায় কে কোথা মেঘ যদি থাকে গগনে;

চোখের জলে ধুয়ে মুছে (মাকে) বসতে দে হৃৎ-সিংহাসনে।

(তুই) ভক্তি মন্ত্রে মা বলে ডাক্, কাজ নাই অন্য আয়োজনে॥

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

দেবী দুঃখ হারিণী তারিণী দুর্গা

কেদারা—সুরফাক্তা


দেবী দুঃখ হারিণী, তারিণী দুর্গা

দুরিত-বারিণী মাতঃ, তুমি জগদম্বা।

আগম নিগমে শুনি, তুমি প্রাণ স্বরূপিণী

জীবগতি-বিধায়িনী মোক্ষদা রুদ্রা॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ডাক দেখি মন ডাকার মতো কেমন শ্যামা থাকতে পারে

প্রসাদী—একতাল


ডাক দেখি মন ডাকার মতো কেমন শ্যামা থাকতে পারে।

কেমন শ্যামা থাকতে পারে, কেমন কালী থাকতে পারে।

মন যদি একান্ত হও, জবা বিল্বদল লও,

ভক্তি চন্দন মিশাইয়ে (মা-র), পদে পুষ্পাঞ্জলি দাও॥

অজ্ঞাত

সকলি তোমার ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী তারা তুমি

মনোহরসাহী—ঝাঁপতাল*


সকলি তোমার ইচ্ছা             ইচ্ছাময়ী তারা তুমি।

তোমার কর্ম তুমি করো মা,         লোকে বলে করি আমি॥

পঙ্কে বদ্ধ করো করী             পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি।

কারে দাও মা ব্রহ্মপদ             কারে করো অধোগামী॥

আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী,             আমি ঘর তুমি ঘরণী।

আমি রথ তুমি রথী,             যেমন চালাও তেমনি চলি॥

রামদুলাল নন্দী (দেওয়ান)


স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত।  'সঙ্গীত সন্দর্ভ' নামক পুস্তকে নরচন্দ্রের রচনা বলে প্রকাশিত। কিন্তু আসলে এটি রামদুলালের গান।

শ্যামাপদ আকাশেতে মন ঘুড়িখান উড়িতেছিল

কীর্তন—ঝাঁপতাল*


শ্যামাপদ আকাশেতে মন ঘুড়িখান উড়িতেছিল।

কলুষের কুবাতাস পেয়ে গোপ্তা খেয়ে পড়ে গেল

মায়া কান্নি হল ভারি,                আর আমি উঠাতে নারি।

দারাসুত কলের দড়ি,                 ফাঁস লেগে সে ফেঁসে গেল।

জ্ঞান-মুণ্ড গেছে ছিঁড়ে,                 উঠিয়ে দিলে অমনি পড়ে।

মাথা নাই সে আর কি উড়ে,             সঙ্গের ছয় জন জয়ী হ’ল॥

ভক্তি ডোরে ছিল বাঁধা,             খেলতে এসে লাগল ধাঁধা,

নরেশচন্দ্রের হাসা কাঁদা,             না আসা এক ছিল ভাল॥

নরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করো সন্তানে তব আজ

ইমন-কল্যাণ—একতাল


অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করো সন্তানে তব আজ।

আশীর্বাদের বর্ম পরাও ঘুচায়ে দৈন্য সাজ॥

তপ্ত করো মা হৃদয়-রুধির, দূর করে দাও ভীতি অশ্রুনীর,

দাঁড়াই আমরা মা তোরে ঘিরিয়া বিশ্ব-সভার মাঝ॥

মানুষ আমরা, নহি তো মা হীন, তুই যার মা সে কি কভু দীন?

তবে কেন মিছে, পড়ে থাকা পিছে, কেন এ অলীক লাজ?

এসো এসো এসো, এসো মা আমার, দশপ্রহরণ-ধারিণী,

হাসো মা অট্ট অট্ট হাস্য ভূলোক-দ্যুলোক-নাদিনী,

(মোরা) করি বিদূরিত স্বার্থ দ্বন্দ্ব সাধিয়া তোমার কাজ॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


মাকে দেখব বলে ভাবনা কেউ ক’রো না আর

ভীমপলশ্রী—কাওয়ালী*


মাকে দেখব বলে ভাবনা কেউ ক’রো না আর।

সে যে তোমার আমার মা শুধু নয়, জগতের মা সবাকার॥

মা যদি নিদয়া হত,         তবে কি আর প্রসবিত,

পৃথিবী শুকায়ে যেত, অন্ন বিনা হাহাকার

অস্পৃশ্য চণ্ডাল হ’তে         ব্রাহ্মণাদি সকল জেতে,

মা বলে ডাকিলে কভু হয় না নিষ্ফল তার॥

অঙ্গে দরদর ধারে,         যবে স্বেদবিন্দু ঝরে,

বায়ুরূপে কে তোমারে বাতাস করে অনিবার

ছেলের মুখে ‘মা’, ‘মা’ বাণী শুনবেন বলে ভবরানী,

আড়াল থেকে শুনেন পাছে দেখিলে না ডাকে আর॥

রামলাল দাসদত্ত


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

মন গরিবের কি দোষ আছে মা

সিন্ধু খাম্বাজ—যৎ


মন গরিবের কি দোষ আছে মা।

তুমি বাজীকরের মেয়ে শ্যামা, যেমনি নাচাও তেমনি নাচে॥

তুমি কর্ম ধর্মাধর্ম, মা, মর্ম কথা বুঝা গেছে,

ওমা তুমি ক্ষিতি, তুমি জল, ফল ফলাচ্ছ ফলা গাছে॥

তুমি শক্তি, তুমি ভক্তি, তুমিই মুক্তি, শিব বলেছে।

ওমা, তুমি দুখ, তুমি সুখ, চণ্ডীতে তা লেখা আছে॥

প্রসাদ বলে, কর্মসূত্র, সে সূতার কাটনা কেটেছে,

ওমা, মায়া সূত্রে বেঁধে জীব ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপি খেল খেলিছে॥

রামপ্রসাদ সেন

আমার মাকে কি দেখেছিস তোরা

জংলা-দাদরা


আমার মাকে কি দেখেছিস তোরা বল সত্যি করে।

মায়ের নব নব নবরূপে ভুবন-মন হরে

মা তো আমার নয় রে কল্পনা,     ঐ দেখ চিন্ময়ী হাস্যবদনা,

মায়ের স্নেহচক্ষে প্রেমবক্ষে অমিয় ঝরে॥

হাসিমুখে করে ভুবন আলো,         মায়ের কোলে শোভে ভক্তদল,

মায়ের প্রসারিত প্রেমবাহু আমাদের তরে॥

আয় রে আয় ও জগৎবাসী,         তোরা দেখে যা একবার আসি,

মোদের জননীর ও রূপরাশি পরাণ ভরে।

(ও রূপ) যে দেখেছে সে-ই মজেছে জনমের তরে॥

       -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

মা প্রসীদ গুণময়ী প্ৰপন্নে

খাম্বাজ—কাওয়ালী


মা প্রসীদ গুণময়ী প্ৰপন্নে।

বিরিঞ্চি-শরণ্যে ত্রিলোক-মান্যে,

অনন্য গতি মম ত্বং বিনে।

ত্বমেকা প্রকৃতি ব্ৰহ্ম আচ্ছাদনী,

মহামায়া রূপে ত্রিজগত মনোমোহিনী

সৃজন-পালন-নিধন কারিণী দেহি পদাশ্রয় এ জঘন্যে

ত্বং সর্বং নহি কিঞ্চিদস্তি ত্বদন্যৎ, ত্বং পরাৎ পরতরং

ত্বঞ্চ বিদ্যা মহাবিদ্যা জ্ঞানদা সুমতিদায়িনী মা, মতি হীনে॥

অজ্ঞাত

আয় মা সাধন সমরে

মুলতান—একতাল


আয় মা সাধন সমরে।

দেখব মা হারে কি পুত্র হারে॥

আরোহণ করি পুণ্য মহারথে,

ভজন পূজন দুটো অশ্ব জুড়ি তাতে,

(দিয়ে) জ্ঞান-ধনুকে টান, ভক্তি-ব্রহ্মবাণ, বসে আছি ধরে॥

ওমা, দেখব আজি রণে, শঙ্কা কি মরণে, ডঙ্কা মেরে লব মুক্তিধন।

আমার রসনা ঝঙ্কারে তারা নাম হুঙ্কারে কার সাধ্য আমার সনে রণ॥

বারে বারে তুমি দৈত্যরণজয়ী, এবার আমার রণে এস ব্রহ্মময়ি,

দ্বিজ রসিকচন্দ্রে বলে মা তোমারি বলে, জিনিব আমি তোমারে

রসিকচন্দ্র রায়

অপার সংসার, নাহি পারাবার

গারা ভৈরবী—ঠুংরী


অপার সংসার, নাহি পারাবার।

ভরসা শ্রীপদ, সঙ্গের সম্পদ,

বিপদে তারিণী, কর গো নিস্তার॥

যে দেখি তরঙ্গ অগাধ বারি,

ভয়ে কাঁপে অঙ্গ, ডুবে বা মরি।

তারো কৃপা করি, কিঙ্কর তোমারি,

দিয়ে চরণ তরী, রাখ এইবার॥

বহিছে তুফান, নাহিক বিরাম,

থর থর অঙ্গ কাঁপে অবিরাম।

পুরাও মনস্কাম, জপি তারা নাম

তারা তব নাম সংসারের সার॥

কাল গেল কালী হলো না সাধন,

প্রসাদ বলে গেল বিফলে জীবন।

এ ভব বন্ধন, কর বিমোচন,

মা বিনে তারিণী কারে দিব ভার

রামপ্রসাদ সেন

ডেকে ডেকে তারা হলাম জ্যান্তে মরা

টোড়ী ভৈরবী—একতালা


ডেকে ডেকে তারা হলাম জ্যান্তে মরা

তবু না জাগিল কুল-কুণ্ডলিনী৷

দীনে কর দয়া, জাগো যোগমায়া, এত ঘুম ভাল নয় গো জননী॥

সার্ধ ত্রিবলয়াকারে মূলাধারে বামাবর্ত্তে বেড়িয়াছ স্বয়ম্ভুরে,

হয়ে ভুজঙ্গিনী, বিদ্যুত-বরণী, যোগনিদ্রাগতা শাস্ত্রে এই শুনি;

কোথা সে সুষুম্না, কোথা মূলাধার, নয়ন মুদিলে হেরি মা আঁধার,

খুলে দে মা আঁখি, প্রাণ ভরে দেখি—

জ্ঞান দে জ্ঞানদে, মহেশমোহিনী॥

খুলে দিয়ে মম সূক্ষ্ম ব্রহ্মদ্বার, ফণা তুলি ঊর্ধ্বে উঠ মা আমার,

ক্রমে ধীরে ধীরে আসি সহস্রারে শিবসঙ্গে মিশ ত্রিগুণধারিণী;

সর্বতত্ত্ব যথা মহাশূন্যে লয়, নিরুদ্ধ সর্বচিত্তবৃত্তিচয়,

ত্যজি নামরূপ ব্রহ্মানন্দময় সিন্ধু-অঙ্গে যথা মিশে তরঙ্গিণী॥

স্বামী তপানন্দ

মূর্ত্ত আজিকে মৃত্যুরূপিণী নৃত্য করিছে রঙ্গে

কানাড়া—একতাল


মূর্ত্ত আজিকে মৃত্যুরূপিণী নৃত্য করিছে রঙ্গে।

অট্ট হাসিছে দানব নাশিছে ডাকিনী যোগিনী সঙ্গে

প্রলয় অনল জ্বলে ত্রিনয়নে, রুদ্র ঝঞ্ঝা গরজে সঘনে;

দৈত্যদলনী অমরপালিনী, ত্রাহি মে চির-প্রপন্নে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কালী কালী বল রসনা

বসন্ত-বাহার—একতাল


কালী কালী বল রসনা।

কর পদধ্যান, নামামৃত পান,

যদি হতে ত্রাণ থাকে বাসনা॥

ভাই বন্ধু সুত, দারা পরিজন,

সঙ্গের দোসর নহে কোন জন।

দুরন্ত শমন, বাঁধিবে যখন,

বিনে ঐ চরণ, কেহ কারো না।

দুর্গা নাম মুখে বলো একবার,

সঙ্গের সম্বল দুর্গানাম আমার

অনিত্য সংসার নাহি পারাপার,

সকলি অসার, ভেবে দেখ না৷

গেল গেল কাল, বিফলে গেল,

দেখ না কালান্ত নিকটে এল।

প্রসাদ বলে ভালো, কালী কালী বলো,

দূর হবে কাল-যম-যন্ত্ৰণা॥

রামপ্রসাদ সেন

কালীনাম জপ রে মন

আড়ানা—একতালা


কালীনাম জপ রে মন (ভব) যাতনা সব যাবে দূরে॥

যে নামের গুণে কত জনগণে তারিলে অনায়াসে।

কেন রে মন বিষয় বিষে মত্ত হয়ে রয়েছ ব’সে

এ সব ত্যজিয়ে সদা ভাব হৃদে, ও পদ পাবে কিসে

গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

হের হর-মনোমোহিনী কে বলে রে কাল মেয়ে

শঙ্করা—একতাল


হের* হর-মনোমোহিনী কে বলে রে কাল মেয়ে।

(আমার) মায়ের রূপে ভুবন আলো, চোখ থাকে তো দেখনা চেয়ে

বিমল হাসি ক্ষরে শশী,         অরুণ পড়ে নখে খসি,

এলোকেশী শ্যামা ষোড়শী;

কমলভ্রমে ভ্রমর ভ্রমে, বিভোর ভোলা চরণ পেয়ে॥

গিরিশচন্দ্র ঘোষ


* দ্যাখো অর্থে ‘হের’, তাই উচ্চারণ হয় ‘হ্যারো’ হর মনমোহিনী

নবীনা নীরদ বরণী ত্রিনয়নী সনাতনী

ইমন-কল্যাণ—সুরফাক্তা


নবীনা নীরদ বরণী ত্রিনয়নী সনাতনী

সমর বাসিনী শ্যামা এলোরে রণে॥

অট্ট হাস্য মুখরা,         শাণিত কৃপাণ ধরা

লোহিত লোচনী তারা         আসব পানে বিভোরা,

বিবসনা এলোকেশী, দৃপ্ত-দানবত্রাসি চলে গজ গমনে

কম্পিত ত্রিভুবন, শঙ্কিত সুরগণ

মুর্ছিত ত্রিলোচন, নিপতিত চরণে।

শিব সীমন্তিনী         অশিব বিনাশিনী

জীব গতি বিধায়িনী         ব্রহ্মাণী করালিনী;

বিনাশি ষড় অসুরে নিবস হৃদয়পুরে প্রসীদ প্ৰপন্নে

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

হৃৎ-কমল-মঞ্চে দোলে করালবদনী শ্যামা

গারা ভৈরবী—আড়া


হৃৎ-কমল-মঞ্চে দোলে করালবদনী শ্যামা।

মন-পবনে দুলাইছে দিবস রজনী ওমা॥

ইড়া পিঙ্গলা নামা, সুষুম্না মনোরমা।

তার মধ্যে গাঁথা শ্যামা, ব্রহ্ম সনাতনী ওমা॥

আবির রুধির তায়, কি শোভা হয়েছে গায়।

কাম আদি মোহ যায়, হেরিলে অমনি ওমা॥

যে দেখেছে মায়ের দোল, সে পেয়েছে মায়ের কোল।

রামপ্রসাদের এই বোল, ঢোলমারা বাণী ওমা॥

রামপ্রসাদ সেন

নামেরি ভরসা কেবল শ্যামা গো তোমার

কীৰ্তন—ঝাঁপতাল*


নামেরি ভরসা কেবল শ্যামা গো তোমার।

কাজ কি আমার কোশাকুশি, দেঁতোর হাসি লোকাচার॥

নামেতে কাল-পাশ কাটে,         জটে তা দিয়েছে রটে,

আমি তো সেই জটের মুটে, হয়েছি আর হব কার॥

নামেতে যা হবার হবে,         মিছে কেন মরি ভেবে,

নিতান্ত করেছি শিবে, শিবেরি বচন সার॥

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি


আমার মা ত্বং হি তারা, তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা

ভৈরবী—একতাল*


আমার মা ত্বং হি তারা, তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা।

আমি জানি মা ও দীনদয়াময়ী, তুমি দুর্গমেতে দুখহরা॥

তুমি জলে তুমি স্থলে, তুমি আদ্যমূলে গো মা,

আছ সর্বঘটে অক্ষপুটে, সাকার আকার নিরাকারা॥

তুমি সন্ধ্যা তুমি গায়ত্রী, তুমি জগদ্ধাত্রী গো মা,

তুমি অকূলের ত্রাণকর্ত্রী, সদা শিবের মনোহরা॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত; শ্রীশ্রীঠাকুর স্বামীজীকে প্রথম এই মাতৃসঙ্গীত শিখাইয়াছিলেন।

দীন-তারিণী বলে মা, ডাকি গো তোরে

ছায়ানট—ত্রিতাল


দীন-তারিণী বলে মা, ডাকি গো তোরে।

তবে কেন দীনের প্রতি নিদয়া হইলি শ্যামা॥

যদি পুণ্যফলে তারা তরে যায় মা ভবদারা,

তারা নাম দুখ-হরা ভবে আর কে কবে গো মা॥

অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

ভবানী দয়ানী মহাবাক্‌বাণী

ভৈরব—ঝাঁপতাল


ভবানী দয়ানী মহাবাক্‌বাণী

সুর-নর-মুনি-জন মানি সকল বুধজ্ঞানী।

জগজননী জগজানি মহিষাসুর-মরদনী।

জ্বালামুখী চণ্ডী অমরপদ-দানী॥

অজ্ঞাত

শ্রীদুর্গা নাম ভুল’না ভুল’না ভুল’না

সিন্ধু ভৈরবী—একতাল*


শ্রীদুর্গা নাম ভুল’না ভুল’না ভুল’না।

শ্রীদুর্গা শরণে সমুদ্রমন্থনে, বিষপানে বিশ্বনাথ ম’লনা

যদ্যপি কখনও বিপদ ঘটে,         শ্রীদুর্গা স্মরণ করিও সঙ্কটে,

তারায় দিয়ে ভার সুরথ রাজার,     লক্ষ অসিঘাতে প্রাণ গেল না

বিভু নামে এক রাজার ছেলে,     যাত্রা করেছিলে শ্রীদুর্গা ব’লে

আসিবার কালে সমুদ্রের জলে ডুবেছিল তবু মরণ হ’ল না॥

রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

একবার গাল ভরা মা ডাকে

বাউল—দাদরা*


একবার গাল ভরা মা ডাকে।

(তোরা) মা ব’লে ডাক, মা ব’লে ডাক, মা ব’লে ডাক মাকে॥

ডাক এমনি করে, আকাশ ভুবন সেই ডাকে যাক ভ’রে;

আর ভা’য়ে ভা’য়ে এক হ’য়ে যাক যেখানে যে থাকে॥

দুটি বাহু তুলে নৃত্য ক’রে ডাকরে মা মা বলে,

আর নেচে নেচে আয়রে মায়ের ঝাঁপিয়ে পড়ি কোলে।

মায়ের চরণ দুটি জড়িয়ে ধ’রে আনরে মায়ে লুটে,

ছেলের শুনলে সে ডাক দেখব সে মা কেমন ক'রে থাকে॥

দিয়ে করতালি ‘মা মা’ বলি’ ডাকরে এমনি ভাবে,

উঠে প্রবল বন্যা ভাবে ভুবন ভাসিয়ে দিয়ে যাবে;

মায়ের বুকের উপর আছড়ে পড়ে চক্ষু দুটি মুদে,

আমার গান ভেসে যাক প্রাণ ভেসে যাক, দেখি শুধুই মাকে॥

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়


* স্বরলিপিঃ শ্রেষ্ঠ দ্বিজেন্দ্র স্বরলিপি


কালী নামের গণ্ডী দিয়া আছিরে দাঁড়াইয়ে

ললিত বিভাস—আড়খেম্‌টা


কালী নামের গণ্ডী দিয়া আছিরে দাঁড়াইয়ে।

শোরে শমন তোরে কই, আমি তো আটাশে নই,

তোর কথা কেন রব সয়ে।

ছেলের হাতের মোওয়া নয় যে, খাবে হুলকে দিয়ে।

কটু বল্‌বি, সাজাই পাবি, মাকে দিব কয়ে।

সে যে কৃতান্ত দলনী শ্যামা, বড় ক্ষেপা মেয়ে॥

শ্রীরামপ্রসাদ যেন কয়, শ্যামা গুণ গেয়ে।

আমি ফাঁকি দিয়ে চলে যাব, চক্ষে ধূলা দিয়ে॥

রামপ্রসাদ সেন

ও দুটি চরণ সার! দীনের শরণ নাহি গো আর

আশাবরী—একতাল


ও দুটি চরণ সার! দীনের শরণ নাহি গো আর।

কলুষ ক্লেশ-হারিণী, তারিণী, হর মা মোর মোহ-আঁধার॥

অট্টহাস্যে শাণিত কৃপাণে

কাট পাশ নাশ অভিমানে।

পতিতপাবনী, জানি গো সন্তানে অহেতুক তব কৃপা অপার।

মন-সর-নীর সমল চঞ্চল

কর ধীর স্থির প্রশান্ত নির্মল;

বিকাশ যুগল চরণ কমল জনম সফল কর আমার॥

স্বামী তপানন্দ


মা আমি কি আটাশে ছেলে

প্রসাদী—একতাল


মা আমি কি আটাশে ছেলে।

আমি ভয় করিনে চোখ রাঙ্গালে

সম্পদ আমার ও রাঙ্গাপদ শিব ধরেন যা হৃদকমলে৷

আমার বিষয় চাইতে গেলে বিড়ম্বনা কতই ছলে

শিবের দলিল সই রেখেছি হৃদয়েতে তুলে

এবার করব নালিশ নাথের আগে, ডিক্রি লব এক সওয়ালে॥

জানাইব কেমন ছেলে মোকদ্দমায় দাঁড়াইলে।

যখন গুরুদত্ত দস্তাবিজ, গুজরাইব মিছিল চালে

মায়ে পোয়ে মোকদ্দমা, ধূম হবে রামপ্রসাদ বলে।

আমি ক্ষান্ত হব যখন আমায় শান্ত করে লবে কোলে

রামপ্রসাদ সেন

মন শরণ লওরে রাঙ্গা পায়

ভৈরবী—জলদ একতাল


মন শরণ লওরে রাঙ্গা পায়। ভাল মন্দ হয় হবে ব্রহ্মময়ীর দায়॥

দুর্গা দুর্গা দুর্গা স্মরি, ভাসায়ে দে জীর্ণ তরী;

মা আমার আছেন কাণ্ডারী, কি ভাবনা তায়॥

কালী নামের পাল তুলিয়ে বেলাবেলি চলরে বেয়ে;

ঢেউ কাটিয়ে যাই উজিয়ে ত্রিবেণী যথায়।

তথা প্রেম তরঙ্গে খেলে হংস সনে হংসী মিলে;

কি আনন্দ তথায় বলে বুঝান না যায়

স্বামী তপানন্দ


দিবানিশি ভাব রে মন অন্তরে করালবদনা

ঝিঁঝিট—একতালা


দিবানিশি ভাব রে মন অন্তরে করালবদনা।

নীল কাদম্বিনী রূপ মায়ের, এলোকেশী দিগ্বসনা॥

মূলাধারে সহস্রারে বিহারে সে, মন জান না।

সদা পদ্মবনে হংসীরূপে আনন্দরসে মগনা॥

আনন্দে আনন্দময়ীর হৃদয়ে কর স্থাপনা

জ্ঞানাগ্নি জ্বালিয়া কেন ব্রহ্মময়ী রূপ দেখ না

প্রসাদ বলে, ভক্তের আশা,

পূরাইতে অধিক বাসনা।

সাকারে সাযুজ্য হবে, নির্বাণে কি গুণ বল না

রামপ্রসাদ সেন

জগত-জননী জগদম্ব ভবানী

মারোয়া—ত্রিতাল


জগত-জননী জগদম্ব ভবানী;

কিরূপা-করণী, দুখ-হরণী, সুখ-করণী, প্রণতজন-শরণী ভব-জলধী-তরণী

ম্যয় পতিত সেবক চরণকো মু পর্ কিরূপা দৃষ্টি অব্ কীজে

মহামায়া যোগিনী শিবানী, প্রণতজন-শরণী, ভব-জলধি-তরণী॥

অজ্ঞাত

মা যার আনন্দময়ী সে কি নিরানন্দে থাকে

সিন্ধু খাম্বাজ—যত্


মা যার আনন্দময়ী সে কি নিরানন্দে থাকে।

ইহকালে পরকালে মা তারে আনন্দে রাখে।

সদানন্দময়ী তারা সদানন্দের মনোহরা

এই মিনতি করি তারা ঐ পদে যেন মতি থাকে॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


আমরা মায়ের ছেলে

ইমন-ভূপালী—খেম্‌টা*


আমরা মায়ের ছেলে, আমরা মায়ের ছেলে।

আমরা কি কম, আসুক না যম, জিনব অবহেলে॥

পথের’ পরে বিপদ পেলে, দলতে পারি পদতলে।

(মোদের) হুঙ্কারেতে সাগর শুকায়, পাহাড় পড়ে ঢ’লে॥

চন্দ্র সূর্য গ্রহতারা, মায়ের কথায় ঘুরছে তারা।

এমন মায়ের ছেলে মোরা দুর্বল কে বলে॥

মোদের আবার পাপ কোথায়, স্বর্গ নরক কে বল চায়?

কাজ ফুরালে সন্ধ্যাবেলায় মা করিবে কোলে

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী


জয় জয় জগবন্দিনী

ভৈরবী—একতাল*


জয় জয় জগবন্দিনী।

দেবি, দুঃখহারিণী তারিণী মহেশ-হৃদয়বাসিনী

সুরাসুরনর সবার পূজিতা আগম নিগমে সৃজনকারিণী,

জ্ঞানদা বরদা সুখদা মোক্ষদা তুমি মা অন্নদা জয়পরায়ণী।

ভৈরবী ভবানী নগেন্দ্রনন্দিনী, নাগ-নাগ পাশা ঘোরনিনাদিনী,

জ্ঞানেন্দ্র উপেন্দ্র যোগেন্দ্রাদি কত চরণে পড়িয়া দিবস রজনী॥

গুরুমুখে শুনি তুমি মা ভবানী, আদ্যাশক্তি শিবে সবার জননী,

মা মা বলে ডাকে মা তোমারে, তাই তো তোমারে মা বলিয়ে জানি

রামলাল দাসদও


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

আশাবাসা ঘোর-তমোনাশা

বেহাগ—কাওয়ালী*


আশাবাসা ঘোর-তমোনাশা, বামা কে (মোহিনী)।

ঘোর ঘটা কান্তিছটা, ব্ৰহ্মকটা ঠেকেছে।

রূপসী শিরসি শশী, হরোরসি এলোকেশী,

মুখজ্বালা সুধাঢালা কুলবালা নাচিছে॥

দ্রুত চলে আস্য টলে, বাহু বলে দৈত্যদলে;

ডাকে শিবা কব কিবা, নিশি দিবা ক’রেছে

ক্ষীণ-দীন ভাগ্যহীন, দুষ্টচিত্ত সুকঠিন;

রামপ্রসাদে কালীর বাদে কি প্রমাদে ঠেকেছে॥

রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত


জয় জয় জগজননী দেবী

সিন্ধু-খাম্বাজ—জলদ একতাল


জয় জয় জগজননী দেবী         সুর-নর-মুনি-অসুর-সেবী,

ভক্ত-ভূতি দায়িনী ভয়হরণী কালিকা।

মঙ্গল-মুদ-সিদ্ধি-সদনী,         পর্ব-শর্বরীশ-বদনী,

তাপ-তিমির-তরুণ-তরণী কিরণমালিকা

বর্ম-চর্ম কর কৃপাণ,         শূল-শৈল-ধনুষ-বাণ

ধরণী-দলনী দানব-দল-রণ করালিকা।

পূতনা পিশাচ প্রেত,         ডাকিনী শাকিনী সমেত,

ভূতগ্রহ বেতাল খগ মৃগালি জালিকা॥

জয় মহেশ-ভামিনী,         অনেক রূপ-নামিনী,

সমস্ত লোক স্বামিনী হিম-শৈল-বালিকা।

রঘুপতি-পদ পরম-প্রেম,         তুলসী চাহে অচল নেম,

দেহু হয়ো প্রসন্ন পাহি প্ৰণতপালিকা

তুলসীদাস

রণবেশে হেসে হেসে ঐ বামা এসেছে

মিশ্র বেহাগ—কাওয়ালী*


রণবেশে হেসে হেসে ঐ বামা এসেছে।

করে অসি পদে শশী কি রূপসী সেজেছে॥

নয়নে অনল জ্বলে,         নরশির শােভে গলে,

দলিতে দনুজদলে ঢলে ঢলে চলেছে॥

রুধির লেগেছে গায়, নীল জলে জবা প্রায়,

আঁখি না ফিরিতে চায়, কি সুখেতে মজেছে।

আ মরি কি রূপ হায়,         অরূপ উথলে তায়,

সাধে কিরে ঐ পায় পশুপতি পড়েছে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

রণে নেমেছে রে কার বামা ওকে দেখতে যাবি

বাউল—দাদরা*


রণে নেমেছে রে কার বামা ওকে দেখতে যাবি;

(তােরা) দেখতে যাবি, দেখতে যাবি, রূপ দেখলে অবাক হ’বি॥

মায়ের মাথার মুকুট গগনে ঠেকে গলায় নরশির-হার,

পদভার সইতে নারে, ধরা হ’ল ভার॥

(মায়ের) রূপ তাে নয়, আ মরে যাই, কাজল জিনেও কাল,

(আবার) কি অদ্ভুত মূর্তি ধরে, ভুবন করে আলাে॥

অজ্ঞাত


কার বামা রণে নাচিছে

পরজ—আড়া


কার বামা রণে নাচিছে।

সুধাপানে ঢল ঢল ঢ’লে পড়িছে॥

একে তাে নীরদ-কায় ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা তায়,

কালিন্দী-সলিলে যেন জবা ভাসিছে।

রঘুনাথ রায় (দেওয়ান)


ধিয়া তাধিয়া নরমালী

কানাড়াটিমে ত্রিতাল


ধিয়া তাধিয়া নরমালী।

ঘাের আননা, রক্তদশনা, রণাঙ্গনা মা করালী॥

অট্ট অট্ট হাস, ত্রিপুর ত্রাস, প্রলয়-জলধী-ঘন-গভীর ভাষ;

দম্ভ বিনাশ, অসুর ত্রাস, কোটি অরুণ ছটা চরণে বিকাশ।

মানস সকাশ আশ্রিত আশ, যামিনী-রূপিণী, অম্বে, জগদম্বে,

জয়ন্তে, জয়দে মা কালি, অম্বিকে ত্র্যম্বক কামিনী করালি॥

গিরিশচন্দ্র ঘােষ


সমরে নাচে রে কার এ রমণী

খাম্বাজ-আদ্ধা-কাওয়ালি


সমরে নাচেরে         কার এ রমণী,

নাশিছে তিমিরে         তিমিরবরণী॥

হুহুঙ্কার রবে         মগনা তাণ্ডবে,

চমকে দমকে         যেন রে দামিনী

অট্ট অট্ট হাসি         সমর উল্লাসি,

দিতিসুত নাশে         দনুজদলনী॥

অসুরে সংহারে         অসির প্রহারে,

বরাভয় করে         সৃজন-পালিনী

বামা ভয়ঙ্করা         ভীষণা মধুরা,

হরমনোহরা         মানসমোহিনী

সংসার-অরণ্যে         অনন্যশরণ্যে,

শ্রীরামপ্রসন্নে         শরণদায়িনী॥

রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

দনুজদলনী, নিজজন-প্রতিপালিনী শ্রীকালী

খাম্বাজ-একতাল


দনুজদলনী, নিজজন-প্রতিপালিনী শ্রীকালী।

চণ্ড মুণ্ড খণ্ড খণ্ডি,         মহিষাসুর ছিন্দি ভিন্দি,

শুম্ভ নিশুম্ভ সভট সমরে নিমেষে মহাকালী॥

ধ্যাওত তুয়া পাওত,         ইন্দ্রাদিক-সুর অষ্টসিদ্ধি

অর্থাদিক চতুরবর্গ তুয়া কৃপা মৃড়ানী;

মাঙ্গে কুঁঝে অচলা ভকতি         দীজে নিজ দাস জানি,

সদা ভক্তবৎসল হে মাতঃ তু কৃপালী॥

-অজ্ঞাত


নব-সজল-জলধর-কায়

বারোঁয়া—খেমটা


নব-সজল-জলধর-কায়।

শ্যামারূপ হেরিলে, কালীরূপ হেরিলে, প্রাণ গলে যায়

কপালে সিন্দুর,         কটিতে ঘুঙ্গুর,         রতন-নূপুর পায় (মায়ের);

হাসিতে হাসিতে,         দানব নাশিতে         রুধির লেগেছে গায় (মায়ের)॥

চরণ যুগল,         অতি সুশীতল,         প্রফুল্ল কমল প্রায় (আ মরি);

কমলাকান্তের         মন নিরন্তর,         ভ্রমর হইতে চায় (ও পদে)

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


দেখনা সমর আলাে করে কার কামিনী

মল্লার—একতাল


দেখনা, সমর আলাে করে কার কামিনী।

কেরে, সজল জলদ জিনিয়া কায়, দশনে প্রকাশে দামিনী

এলায়ে চাঁচর চিকুর পাশ, সুরাসুর মাঝে না করে ত্রাস,

অট্টহাসে দানব নাশে, রণ প্রকাশে রঙ্গিণী॥

কিবা শােভা করে শ্রমজ বিন্দু, ঘনতনু ঘেরি কুমুদবন্ধু,

অমিয় সিন্ধু হেরিয়া ইন্দু, মলিন এ কোন্ মােহিনী

এ কি অসম্ভব ভব পরাভব, পদতলে শবসদৃশ নীরব,

কমলাকান্ত কর অনুভব, কে বটে ও গজগামিনী॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

কত চাঁদ শ্রীপদ-নখ

সাহানা—কাওয়ালী


কত চাঁদ শ্রীপদ-নখ—ফাঁদে সুধা আশে, 

অরুণ কিরণে নব-নীল-নলিনী হাসে॥

উলঙ্গ রক্তাক্ত কায়,         এলােকেশী ভীমা ধায়,

বিধি-হরিহর কাপে ত্রাসে;

হাসি ভাষে স্নেহ ভরে         বামা বরাভয় করে,

তনয় হৃদয় সুখে ভাসে॥

ঘাের শ্মশান ভিতরে,         শিবা ঘাের রব করে,

সুখে মহাকাল সহবাসে;

বসি শব-শিব-বুকে         সুপ্রসন্ন হাসি মুখে,

বিপরীত রতি-রসােল্লাসে॥

রবি শশী এক ঠাই,         হেন কভু শুনি নাই,

কঠোরে কোমলে একাবাসে;

অদ্ভুত মরি মরি,         এ তত্ত্ব বুঝিতে নারি,

ভয়ঙ্করী তবু ভয় নাশে॥

স্বামী তপানন্দ


জীব সাজ সমরে, রণবেশে কাল প্রবেশে তাের ঘরে

ভীমপলশ্রী—একতাল*


জীব সাজ সমরে, রণবেশে কাল প্রবেশে তাের ঘরে।

ভক্তিরথে চড়ি, লয়ে জ্ঞান তূণ,         রসনাধনুকে দিয়ে প্রেমগুণ,

ব্রহ্মময়ীর নাম-ব্রহ্ম অস্ত্র, তাহে সন্ধান করে॥

আর এক যুক্তি রণে, চাই না রথরথী, শত্রুনাশে জীব হবে সুসঙ্গতি

রণভূমি যদি করে দাশরথি, ভাগীরথীর তীরে॥

দাশরথি রায়


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


লম্বিত গলে মুণ্ডমাল

কানাড়া—একতাল


লম্বিত গলে মুণ্ডমাল দম্ভিতা ধনি-মুখ-করাল,

স্তম্ভিত পদে মহাকাল, কম্পিতা ভয়ে মেদিনী॥

দিগ্বসনা চন্দ্র-ভাল,         এলায়ে পড়েছে কেশজাল,

শোভিত অসি করে কপাল প্রখরা শিখরি-নন্দিনী॥

চারিদিকে কত দিক্পাল,     ভৈরবী শিবা তাল বেতাল,

অতি অপরূপ রূপ বিশাল কালী কলুষনাশিনী

দাশরথি রায়


শতকোটি-শশী হাসে (মায়ের) চরণ নখরে

ভৈরবী/ঝাঁপতাল*


শতকোটি-শশী হাসে (মায়ের) চরণ নখরে।

আলাে করে কালােরূপ (মায়ের), হৃদয় কন্দরে॥

প্রীতির সাগর উছলে নয়নে, উজ্জ্বল কপােল প্রসন্ন বয়ানে।

মনে হয় রাখি নয়নে নয়নে।

(বাঁধি) হৃদি কারাগারে, তারে চিরদিন তরে॥

বাঞ্ছা বাধা পড়ে হৃদয় মাঝারে, কোটি মনােহর হর মনােহরে,

উরু চারু অতি চরণ যুগল, হৃদি বিয়াকুল করে।

(তাহে) চাহে মিশিবারে॥

এস এস অয়ি ভুবন মােহিনী সর্বস্ব আমার, আমার জননী।

(মাগাে) ফিরে চাও যদি        কৃপা কর যদি

পড়ুক অশনী শিরে-(আমি) লব সাধ করে।

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* পূরবী—একতাল-এও অনেকে এই গান গেয়ে থাকেন।

আহা তাই শিবের নয়ন ভুলেছে

কালাংড়া—একতাল


(আহা) তাই শিবের নয়ন ভুলেছে,

অনুপম রূপ চিকণ কাল হেরিয়ে॥

তা না হলে ত্রিলােচন         পরম যতনে কেন,

শ্রীচরণ হৃদে ধরেছে

চাঁদ ভ্রমে চকোরিণী         ঘন ভ্রমে চাতকিনী,

নলিনী ভরমে ভ্ৰমরিণী এসেছে;

হারাইয়ে নিজ মণি,         ব্যাকুলা হইয়ে ফণী,

ওরূপ নেহারি রয়েছে

হারাইয়ে ফুলধনু,         অভিমানে ত্যজি তনু

বিরহিণী হৃদয়ে শরণ লয়েছে;

ও রূপ-আনন্দ-নিধি,         কমলাকান্তের হৃদি

সরােজে প্রকাশ করেছে

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

কামিনী যামিনী-বরণে বামা কে এল রণে

খট ভৈরবী—একতাল


কামিনী যামিনী-বরণে বামা কে এল রণে।

উলঙ্গ এলােকেশী, বাম করে ধরে অসি, উল্লাসিতা দানব নিধনে

পদভরে বসুমতী সভীতা কম্পিতা অতি,

তাই দেখি পশুপতি পতিত চরণে রণে।

শ্রীরামপ্রসাদে কয়, তবে আর কি রে ভয়

অনায়াসে যম জয়, জীবনে মরণে॥

রামপ্রসাদ সেন


বলরে বল শ্রীদুর্গা নাম

পাঁচালী


বলরে বল শ্রীদুর্গা নাম।

(ওরে আমার মন রে)

‘দুর্গা’ দুর্গা’ ‘দুর্গা’ ব’লে পথে চলে যায়।

শূল হস্তে শূলপাণি রক্ষা করেন তায়॥

তুমি দিবা তুমি সন্ধ্যা তুমি সে যামিনী।

কখন পুরুষ হও মা কখন কামিনী

তুমি বল ছাড় ছাড় আমি না ছাড়িব।

বাজন নূপুর হয়ে মা চরণে বাজিব

মীন হয়ে রব জলে নখে তুলে লবে।

শঙ্করী হইয়ে মাগাে গগনে উড়িবে

নখাঘাতে ব্রহ্মময়ী যখন যাবেগগা পরাণী।

কৃপা করে দিও রাঙ্গা চরণ দুখানি

দাশরথি রায়

দোষ কারাে নয় গাে মা

ভীমপলশ্রী—একতাল*


দোষ কারাে নয় গাে মা,

আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।

ষড়রিপু হ’ল কোদণ্ডস্বরূপ         পুণ্যক্ষেত্রমাঝে কাটিলাম কূপ;

সে কূপে বেড়িল কালরূপ জল, কাল-মনােরমা॥

আমার কি হবে তারিণী, ত্রিগুণধারিণী, বিগুণ করেছে সগুণে;

কিসে এ বারি নিবারি, ভেবে দাশরথির অনিবার বারি নয়নে;

ছিল বারি চক্ষে, ক্রমে এল বক্ষে, জীবনে জীবন কেমনে হয় মা রক্ষে,

আছি তাের অপিক্ষে, দে মা মুক্তি ভিক্ষে, কটাক্ষেতে করে পার॥

দাশরথি রায়


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


একি বিকার শঙ্করী, কৃপা-চরণ-তরী পেলে ধন্বন্তরি

বাগেশ্রী—একতাল


একি বিকার শঙ্করী, কৃপা-চরণ-তরী পেলে ধন্বন্তরি।

অনিত্য গৌরব সদা অঙ্গেদাহ,

‘আমার আমার’ একি হল পাপ মােহ,

(তায়) ধনুজনতৃষ্ণা না হয় বিরহ, কিসে জীবন ধরি॥

ওমা, অনিত্য আলাপ, কি পাপ প্রলাপ, সতত সর্বমঙ্গলে;

মায়া-কাকনিদ্রা সদা দাশরথির নয়ন যুগলে;

হিংসারূপ তাহে সে উদরে কৃমি,

মিছে কাজে ভ্রমি, সেই হয় ভূমি,

এ রােগে বাঁচি কি না বাঁচি, তন্নামে অরুচি, দিবস শর্বরী॥

দাশরথি রায়

রাখ মা আমায় কোলে করে ও প্রেমরূপিণী

জয়জয়ন্তী—একতাল


রাখ মা আমায় কোলে করে ও প্রেমরূপিণী,

আমার আর কে আছে, রাখবে কাছে, তুই বিনে জননী

আমি ঘুমাইলে রাখ কোলে করে,

(আবার) জাগিলে নয়ন মেলে কোথা যাও জননী॥

অবােধ শিশু ছেলে ডাকে মা মা বলে,

আমি কারে ডেকে কা’র মুখ দেখে রইব গাে জননী

আমায় (আর) ভুলাইও না, ভুলে থেক না,

তুমি থাক আমার কাছে কাছে দিবস রজনী

অজ্ঞাত

মা তুমি কে কেউ জানে না

ঝিঝিট-খাম্বাজ-একতাল


মা তুমি কে কেউ জানে না।

তােমায় নানা লােকে বলছে নানা।

বেদাগমে পুরাণেতে বলে গেছে নানাখানা,

তাই যে তােমার ঠিক মহিমা একথা তাে কেউ বলে না।

বেদান্তে যে আছে অন্ত তাতাে কভু যায় না জানা,

সাংখ্য পাতঞ্জল মীমাংসায় মীমাংসা কিছুই হল না

অনন্তরূপিণীর অন্ত বৈশেষিকেতেও মিলে না,

চিদাকাশে যার যা ভাসে তাই তাদের বােধের সীমানা॥

প্রেমিক বলে গােলেমালে সেরে গেছে সব ক’জনা,

ব্রহ্মা বিষ্ণু শূলপাণি (তােমার) স্বরূপ দেখতে সবাই কানা

প্রেমিক

আমার মন যদি যায় ভুলে

ভৈরবী—একতাল*


আমার মন যদি যায় ভুলে।

(তবে) বালির শয্যায় কালীর নাম দিও কর্ণমূলে॥

এ দেহ আপনার নয় রে, সদা রিপু সঙ্গে চলে।

(তবে) আনরে ভােলা জপের মালা, (দেহ) ভাসাই গঙ্গা জলে

ভয় পেয়ে রাজা রামকৃষ্ণ ভােলাপ্রতি বলে।

(আমার) ইষ্ট প্রতি দৃষ্টি খাট, কি আছে কপালে॥

মহারাজা রামকৃষ্ণ


* স্বরলিপিঃ দিব্যগীতি

জয় কালী জয় কালী বলে, যদি আমার প্রাণ যায়

বাহার—ঝাপতাল*


জয় কালী জয় কালী বলে, যদি আমার প্রাণ যায়।

শিবত্ব হইব প্রাপ্ত, কাজ কি বারাণসী তায়॥

অনন্তরূপিণী কালী, কালীর অন্ত কেবা পায়,

কিঞ্চিৎ মাহাত্ম্য জেনে, শিব পড়েছেন রাঙ্গা পায়

মহারাজা রামকৃষ্ণ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


কখন কি রঙ্গে থাক মা, শ্যামা সুধাতরঙ্গিণী

ছায়া-খাম্বাজ-একতাল

(শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় গান)


কখন কি রঙ্গে থাক মা, শ্যামা সুধাতরঙ্গিণী

তুমি রঙ্গে ভঙ্গে অপাঙ্গে অনঙ্গে ভঙ্গ দাও জননী॥

লম্ফে ঝম্ফে কম্পে ধরা, অসিধরা করালিনী।

(তুমি) ত্রিগুণা ত্রিপুরা তারা ভয়ঙ্করা কালকামিনী॥

সাধকের বাঞ্ছা পূর্ণ কর নানা-রূপ-ধারিণী॥

(কভু) কমলের কমলে নাচ মা পূর্ণব্রহ্ম-সনাতনী॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

কেন মা তাের পাগলিনী বেশ

বারোয়া—ঠুংরী


কেন মা তাের পাগলিনী বেশ।

পাগলিনী বেশ মা তাের এলােথেলাে কেশ

এলায়ে পড়েছে বেণী যেন কালভুজঙ্গিনী,

কটিতে কিঙ্কিণী বাজে, চরণে মহেশ॥

অজ্ঞাত


সদানন্দময়ী কালী

মনােহরসাহী ঝাপতাল*


সদানন্দময়ী কালী, মহাকালের মনােমােহিনী গাে মা।

তুমি আপনি নাচ আপনি গাও আপনি দাও মা করতালি

আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশী-ভালী।

ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি॥

সবে মাত্র তুমি যন্ত্রী, যন্ত্র আমরা তন্ত্রে চলি।

তুমি যেমন রাখ তেমনি থাকি (মা), যেমনি বলাও তেমনি-বলি

অশান্ত কমলাকান্ত দিয়ে বলে গালাগালি।

এবার সর্বনাশী, ধরে অসি, ধর্মাধর্ম দুটোই খেলি

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

তারা তরণী নাম জগমে তরয় কো

আশােয়ারী—ঝাপতাল


তারা তরণী নাম জগমে তরয় কো।

য়্যা জগমে জপু মূঢ় হরে তাপ তন কো॥

আগম নিগম বেদ ব্রহ্মা বখানত।

সংকটহরণি মাত হরে পাপ জনকো॥

জোই জোই ধ্যাবত ইচ্ছাফল পাবত।

আবত ন এহি জগমে পুনরাগমন কো॥

তানতরঙ্গ তুয়া ঘট ঘট বিরাজত।

য়্যাসী অরী মাত কৃপা করন কো॥

তুলসীদাস

তুলে নে রাঙ্গা কমল

ছায়ানট—খেমটা


তুলে নে রাঙ্গা কমল, মায়ের পায়ে সাজবে ভালাে।

চল ত্বরা, পূজব তারা, থাকবে না মনের কালাে॥

নাচবে শ্যামা হৃদকমলে        ধােব চরণ নয়ন জলে,

বদন ভরে ডাকবাে ওমা! মায়ের রূপে জগৎ আলাে

গিরিশচন্দ্র ঘােষ


পাঠান্তর — রাঙা

ভাব কি! ভেবে পরাণ গেল মায়ের

প্রসাদী—একতাল


ভাব কি! ভেবে পরাণ গেল (মায়ের)।

(যাঁর) নামে হরে কাল, পদে মহাকাল, তার কেন কাল রূপ হল।

কালাে রূপ অনেক আছে, এ বড় আশ্চর্য কালাে,

(যাঁকে) হৃদমাঝারে রাখলে পরে, হৃদয়পদ্ম করে আলাে

নামে কালী রূপে কালী কালাে হতেও অধিক কালাে,

(ও রূপ) যে দেখেছে সেই মজেছে, অন্যরূপ লাগে না ভালাে

প্রসাদ বলে কুতূহলে, এমন মেয়ে কোথায় ছিল,

না দেখে নাম শুনে কানে, মন গিয়ে তায় লিপ্ত হ’ল॥

রামপ্রসাদ সেন

আমি দুর্গা দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি

ভীমপলশ্রী—একতাল*


আমি দুর্গা’, ‘দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি।

আখেরে এ দীনে, না তারাে কেমনে, জানা যাবে গাে শঙ্করী॥

নাশি গাে ব্রাহ্মণ, হত্যা করি জ্বণ, সুরাপান আদি বিনাশি নারী।

এ সব পাতক, না ভাবি তিলেক, ব্রহ্মপদ নিতে পারি॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী


বিফলে দিন যায় মা শ্যামা

মিশ্র বেহাগআদ্ধা*


বিফলে দিন যায় মা শ্যামা

কবে দীনে দয়া হবে।

দীন বলে কি দয়াময়ী

চিরদিন দীন পড়ে রবে॥

অভাগা সন্তান যদি,

মা কভু নয় তারে বাদী,

তবে কেন নিরবধি,

একাঙ্গাল পড়ে রবে॥

ষড়রিপু ভীষণ অরি,

পরবশ হয়ে যে মরি,

দে মা শ্যামা চরণ-তরী

ডােবে পুত্র ভবার্ণবে॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

শ্যামা মা কি আমার কাল রে

মিশ্র মল্লার—একতাল*


শ্যামা মা কি আমার কাল রে।

কালরূপে দিগম্বরী         হৃদিপদ্ম করে আলাে রে।

লােকে বলে কালী কাল, আমার মন তাে বলে না কাল রে॥

কখনও শ্বেত কখনও পীত, কখনও নীল লােহিত রে,

(আমি) আগে নাহি জানি কেমন জননী, ভাবিয়ে জনম গেল রে॥

কখনও পুরুষ কখনও প্রকৃতি, কখনও শূন্যরূপা রে,

(মায়ের) এভাব ভাবিয়ে কমলাকান্ত, সহজে পাগল হ’ল রে

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ দিব্যগীতি, স্বামী বিবেকানন্দ শেষ দিনে এই গান গেয়েছিলেন।


ভেবে দেখ মন কেউ কার নয়

কীর্তনঝাপতাল


ভেবে দেখ মন কেউ কার নয়, মিছে ভ্রম ভূমণ্ডলে।

ভুলােনা দক্ষিণাকালী বদ্ধ হ’য়ে মায়াজালে॥

যার জন্য মর ভেবে, সে কি তােমার সঙ্গে যাবে।

সেই প্রেয়সী দিবে ছড়া, অমঙ্গল হবে বলে

দিন দুই তিনের জন্য ভবে, কর্তা বলে সবাই মানে!

সে কর্তারে দেবে ফেলে কালাকালের কর্তা এলে

শ্রীরামপ্রসাদ বলে, শমন যখন ধরবে চুলে,

তখন ডাকবি কালী কালী বলে, কি করিতে পারবে কালে

রামপ্রসাদ সেন

আমি ঐ খেদে খেদ করি

প্রসাদী—একতাল*


আমি ঐ খেদে খেদ করি।

তুমি মাতা থাকতে আমার জাগা ঘরে চুরি॥

মনে করি তােমার নাম করি, আবার সময়ে পাসরি।

আমি বুঝেছি জেনেছি, আশয় পেয়েছি, এ সব তােমারি চাতুরি॥

কিছু দিলে না, পেলে না, নিলে না, খেলে না, সে দোষ কি আমারি।

যদি দিতে পেতে, নিতে খেতে, দিতাম, খাওয়াইতাম তােমারি॥

যশ, অপযশ, সুরস কুরস, সকল রস তােমারি।

(ওগাে) রসে থেকে রসভঙ্গ, কেন করাে রসেশ্বরী॥

প্রসাদ বলে মন দিয়েছ, মনেরে আঁখি ঠারি।

(ওমা) তােমার সৃষ্টি দৃষ্টি পােড়া মিষ্টি বলে ঘুরি॥

রামপ্রসাদ সেন


*ভৈরবী রাগেও গাওয়া হয়।


এমনি মহামায়ার মায়া, রেখেছে কি কুহক করে

(মনােহরসাহী) কীর্তন—ঝাঁপতাল*


এমনি মহামায়ার মায়া, রেখেছে কি কুহক করে।

ব্রহ্মা বিষ্ণু অচৈতন্য, জীবে কি তা জানতে পারে

বিল করে ঘুনি পাতে, মীন প্রবেশ করে তাতে।

যাওয়া আসার পথ আছে, তবু মীন পালাতে নারে

গুটিপােকায় গুটি করে, কাটিলে সে ত কাটতে পারে।

মহামায়ায় বদ্ধ গুটি, আপনার নালে আপনি মরে॥

কুমার নরচন্দ্ররায়


স্বরলিপিঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

এবার কালী তােমায় খাব

প্রসাদী—একতাল


এবার কালী তােমায় খাব (খাব খাব গাে দীন দয়াময়ী)।

খাব খাব বলি গাে মা উদরস্থ না করিব।

এই হৃদিপদ্মে বসাইয়ে, মনােমানসে পূজিব॥

(তারা গণ্ডযােগে জন্ম আমার)

গণ্ডযােগে জনমিলে সে হয় মা-খেকো ছেলে।

এবার তুমি খাও কি আমি খাই মা, দুটার একটা ক’রে যাব॥

হাতে কালী মুখে কালী, সর্বাঙ্গে কালী মাখিব।

যখন আসবে শমন বাঁধবে কষে, সেই কালী তার মুখে দিব॥

যদি বল কালী খেলে, কালের হাতে ঠেকা যাব।

আমায় ভয় কি তাতে, কালী বলে কালেরে কলা দেখাব॥

ডাকিনী যােগিনী দিয়ে, তরকারী বানায়ে খাব।

মুণ্ডমালা কেড়ে নিয়ে অম্বলে সম্বরা চড়াব॥

কালীর বেটা শ্রীরামপ্রসাদ ভালমতে তাই জানাব।

তাতে মন্ত্রের সাধন, শরীর পাতন, যা হবার তাই ঘটাইব॥

রামপ্রসাদ সেন


পাঠান্তর — জন্ম হলে

মন বলি, ভজ কালী, ইচ্ছা হয় তাের যে আচারে

কালেঙড়া—কাহারবা


মন বলি, ভজ কালী, ইচ্ছা হয় তাের যে আচারে

মুখে গুরুদত্ত মহামন্ত্র দিবানিশি জপ করে॥

শয়নে প্রণাম জ্ঞান,         নিদ্রায় কর মাকে ধ্যান;

নগর ফের মনে কর প্রদক্ষিণ শ্যামা মারে॥

চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় যত রস এ সংসারে।

আহার কর মনে কর আহুতি দিই শ্যামা মারে॥

যত শােন কর্ণপুটে,         সবই মায়ের মন্ত্র বটে;

কালী পঞ্চাশৎ বর্ণময়ী, বর্ণে বর্ণে নাম ধরে॥

আনন্দে রামপ্রসাদ রটে,     মা বিরাজেন সর্বঘটে;

ঘটে ঘটে যতরূপ, মা আমার সে রূপ ধরে॥

রামপ্রসাদ সেন

মজলাে আমার মন-ভ্রমরা শ্যামাপদ নীল কমলে

সিন্ধু-খাম্বাজ—যৎ*


মজলাে আমার মন-ভ্রমরা শ্যামাপদ নীল কমলে।

(শ্যামাপদ নীল কমলে, কালীপদ নীল কমলে)

যত বিষয়-মধু তুচ্ছ হ’লাে কামাদি কুসুম সকলে॥

চরণ কালাে, ভ্রমর, কালাে,         কালােয় কালাে মিশে গেল,

পঞ্চতত্ত্ব, প্রধান মত্ত, রঙ্গ দেখে ভঙ্গ দিলে

কমলাকান্তের মনে,         আশা পূর্ণ এত দিনে,

(তার) সুখ দুখ সমান হ’ল আনন্দ-সাগর-উথলে।

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

কে জানে মা তব মায়া মহামায়ারূপিণী

মিশ্র আলাহিয়া—ঝাঁপতাল


কে জানে মা তব মায়া মহামায়ারূপিণী!

বিরাজিত সর্বঘটে, মা তুমি বিশ্বব্যাপিনী॥

প্রথমেতে মহাকালী, দ্বিতীয়েতে তারা;

তৃতীয়ে ষােড়শীরূপা, তুমি মা ত্রিপুরা।

চতুর্থে ভুবনেশ্বরী, অপরূপ মাধুরী;

হ’লে মা বিচিত্র নারী হর মনমােহিনী॥

পঞ্চমে পরমেশ্বরী, ভৈরবী আকারা,

বিভূতি ভূষিত অঙ্গে, শিরে জটাভারা;

কি দেখিলাম মা অদ্ভুত, ভূতনাথ আবির্ভূত,

চিত্ত ভীত সশংকিত, হর শূলপাণি (মা)॥

যষ্ঠে ছিন্নমস্তা রূপ ধারণ করিলে,

নিজ মুণ্ড কেটে মাগাে, করেতে রাখিলে।

রক্ত ওঠে মা তিন ধার, এক ধার করে আহার;

আরাে অন্য দুই ধার পিয়ে দুই ডাকিনী॥

সপ্তমেতে ধূমাবতী, অষ্টমে বগলা,

নবমে মাতঙ্গী রূপা, দশমে কমলা,

কি দিয়ে বর্ণিব মাগাে, তুমি বর্ণমালা,

কৃপা করি এ দাসেরে

তারাে গাে মা হররাণী॥

অজ্ঞাত

ডুব দেরে মন কালী বলে

প্রসাদী—একতাল*


ডুব দেরে মন কালী বলে; হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে।

রত্নাকর নয় শূন্য কখন, দু’চার ডুবে ধন না পেলে।

তুমি দম সামর্থে এক ডুবে যাও, কুলকুণ্ডলিনীর কূলে॥

জ্ঞান-সমুদ্রের মাঝে রে মন, শান্তিরূপা মুক্তা ফলে।

তুমি ভক্তি ক’রে কুড়ায়ে পাবে, শিবযুক্তি মত চাইলে॥

কামাদি ছয় কুন্তীর আছে, আহার-লােভে সদাই চলে।

তুমি বিবেক-হলদি গায় মেখে যাও, ছোঁবে না তার গন্ধ পেলে॥

রতন মাণিক্য কত, পড়ে আছে সেই জলে।

রামপ্রসাদ বলে, ঝম্প দিলে, মিলবে রতন ফলে ফলে॥

রামপ্রসাদ সেন


*স্বরলিপিঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

ঘুচিয়ে দে মা ভবের বাসা

প্রসাদী—একতাল


ঘুচিয়ে দে মা ভবের বাসা।

করতে পারিনা আর যাওয়া আসা॥

সুখে শুয়ে সুখের কোলে দেখলাম কত সুখের আশা।

এখন সে আশা নিরাশাপূর্ণ, ঠিক যেন মা মৃগের তৃষা

মায়ায় ভুলে মায়ার বলে করিলাম যাদের ভরসা।

ও মা ইহকালে পরকালে তারাই আমার কর্মনাশা

পেয়ে এমন সােনার জমি সময়ে হল না চষা।

ও মা ভুলিয়ে দিলে আমায় তখন গােল ক’রে পাঁচ বেটা চাষা

প্রেমিক বলে ঠেকে ঠুকে কেটেছে মা মায়ার নেশা,

এখন কৃপা কর কৃপাময়ি করেছি ও পদ ভরসা

প্রেমিক


ক্ষেপার হাট-বাজার, মা তােদের ক্ষেপার হাট-বাজার

প্রসাদী—একতাল


ক্ষেপার হাট-বাজার, মা তােদের ক্ষেপার হাট-বাজার।

(গুণের কথা কব কার, মা)

তােরা দুই সতীনে কেউ বুকে কেউ মাথায় চড়ি তার॥

কর্তা যিনি ক্ষ্যাপা তিনি ক্ষ্যাপার মূলাধার।

(আবার) চাকলা-ছাড়া চেলা দুটো সঙ্গে অনিবার॥

গজ বিনে গাে আরােহণে ফিরিস্ কদাচার।

মণি মুক্তা ফেলে পরিস্ গলে নরশির হার॥

শ্মশানে মশানে ফিরিস্ কার বা ধারিস্ ধার।

এবার রামপ্রসাদকে ভবঘােরে করতে হবে পার॥

রামপ্রসাদ সেন

কাজ কি মা সামান্য ধনে

প্রসাদী—একতাল


কাজ কি মা সামান্য ধনে।

(ও কে) কাদছে গাে তাের ধন বিহনে॥

সামান্য ধন দিলে তারা, পড়ে রবে ঘরের কোণে।

যদি দাও মা আমায় অভয় চরণ, রাখি হৃদি পদ্মাসনে॥

গুরু আমায় কৃপা করে মা যে ধন দিলেন কানে কানে।

এমন গুরু-আরাধিত মন্ত্র, তাও হারালেম সাধন বিনে॥

প্রসাদ বলে কৃপা যদি মা, হবে তােমার নিজগুণে।

আমি অন্তিমকালে জয় দুর্গা বলে, স্থান পাই যেন ঐ চরণে॥

রামপ্রসাদ সেন


সুখের বাসনা কর আর কদিন

সুরট-মল্লার—একতাল


সুখের বাসনা কর আর কদিন।

ত্যজি অন্য বােল,     ‘কালীকালী’ বল,         মানব জনম যদিন॥

পাবে ব্রহ্মপদ,         অক্ষয় সম্পদ,         স্মরণ করিবে এ দীন।

সৃষ্টি স্থিতি লয়,         যা হইতে হয়,         সে হবে তােমার অধীন॥

যখন যেমন,         বিধির লিখন,         সেইরূপে যাবে সেদিন।

ভাবিলে বিষাদ,         ঘটিবে প্রমাদ,         কালী না বলিবি যেদিন॥

কমলাকান্ত,         হইয়ে ভ্রান্ত,         ভুলেছ নমাস নদিন।

বারে বারে আসি,     দুঃখ রাশি রাশি,         যাতনা সবে আর কদিন॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

কালী সব ঘুচালি লেঠা

প্রসাদী—একতাল*


কালী সব ঘুচালি লেঠা।

শ্রীনাথের বচন আছে যেমন মানবি কি না মানবি সেটা॥

শ্মশান পেলে ভালবাস মা তুচ্ছ করি মণিকোঠা।

আপনি যেমন ঠাকুর তেমন ঘুচল না আর সিদ্ধিঘোঁটা॥

তুমি যারে কৃপা কর মা, অপূর্ব তার রূপের ছটা।

(তার) কটিতে কৌপিন জোটে না, গায়ে ছাই আর মাথায় জটা॥

ভূতলে আনিয়ে মাগাে করলি আমায় লােহা পেটা।

তবু কালী বলে ডাকি মা শাবাশ আমার বুকের পাটা॥

সুখে রাখ দুখে রাখ মা, কি করিব দিয়ে খোঁটা।

আমি সাধ করে পরেছি এখন পুঁছতে নারি সাধের ফোঁটা

চাকলা জুড়ে নাম রটেছে প্রসাদ ব্রহ্মময়ীর বেটা।

মায়ে পােয়ে এমন ব্যবহার, মর্ম ইহার বুঝবে কেটা

রামপ্রসাদ সেন


* ‘বাঙালির গান’ গ্রন্থে কমলাকান্তের অনুরূপ একটি গান পাওয়া যায়।


অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি

প্রসাদী—একতাল


অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি।

আমি আর কি যমের ভয় রেখেছি॥

কালীনাম কল্পতরু, হৃদয়ে রােপণ করেছি

(আমি) এ দেহ বেচে ভবের হাটে, দুর্গানাম কিনে এনেছি॥

দেহের মধ্যে সুজন যে জন, তাঁর ঘরেতে ঘর করেছি।

এবার শমন এলে হৃদয় খুলে, দেখাব ভেবে রেখেছি॥

সারাৎসার তারা নাম, আপন শিখাগ্রে বেঁধেছি।

রামপ্রসাদ বলে, দুর্গা ব’লে, যাত্রা করে বসে আছি॥

রামপ্রসাদ সেন


যতনে হৃদয়ে রেখাে, আদরিণী শ্যামা মাকে

কাংড়ালে—ঝাঁপতাল*


যতনে হৃদয়ে রেখাে, আদরিণী শ্যামা মাকে।

মন তুই দেখ আর আমি দেখি, আর যেন কেউ নাহি দেখে॥

কামাদিরে দিয়ে ফাঁকি            আয় মন বিরলে দেখি

রসনারে সঙ্গে রাখি, সে যেন মা ব’লে ডাকে॥

কুরুচি কুমন্ত্রী যত,         নিকট হ’তে দিও নাক,

জ্ঞান নয়নে প্রহরী রেখ, সে যেন সাবধানে থাকে।

কমলাকান্তের মন         ভাই আমার এক নিবেদন,

দরিদ্রে পাইলে ধন, সে কি অযতনে রাখে॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

১ পাঠান্তরঃ আদর করে হৃদে রাখাে

মন কি তত্ত্ব কর তাঁরে, যেন উন্মত্ত আঁধার ঘরে

প্রসাদী, লুম-ঝিঝিট—একতাল


মন কি তত্ত্ব কর তাঁরে, যেন উন্মত্ত আঁধার ঘরে।

সে যে ভাবের বিষয়, ভাব ব্যতীত, অভাবে কি ধরতে পারে॥

অগ্রে শশী বশীভূত কর তব শক্তিসারে।

ওরে কোঠার ভিতর চোরকুঠরী, ভাের হলে সে লুকাবে রে॥

ষড়দর্শনে না পায় দরশন, আগম নিগম তন্ত্রসারে।

সে যে ভক্তিরসের রসিক, সদানন্দে বিরাজ করে পুরে॥

সে ভাব লাগি পরম যােগী, যােগ করে যুগ যুগান্তরে।

হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন, লােহাকে চুম্বকে ধরে॥

প্রসাদ বলে মাতৃভাবে, আমি তত্ত্ব করি যাঁরে।

সেটা চাতরে কি ভাঙ্গবাে হাঁড়ি, বােঝ না রে মন ঠারে-ঠোরে॥

রামপ্রসাদ সে

মন রে কৃষি কাজ জান না

প্রসাদী—একতাল*


মন রে কৃষি কাজ জান না।

এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলতাে সােনা॥

কালী নামে দাওরে বেড়া, ফসলে তছরূপ হবে না।

সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁসে না॥

অদ্য কিম্বা শতাব্দান্তে, বাজাপ্ত হবে জান না।

এখন আপন একতারে, (মনরে) চুটিয়ে ফসল কেটে নে না॥

গুরুদত্ত বীজ রােপণ করে, ভক্তিবারি সেচে দে না।

ওরে একা যদি না পারিস মন, রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না॥

রামপ্রসাদ সেন


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

পাঠান্তর: গুরু রােপণ করেছেন বীজ, ভক্তিবারি তায় সেঁচ না।


আমায় দে মা পাগল করে

বাউল—জলদ একতাল (ত্রিমাত্রিক ছন্দ)*


আমায় দে মা পাগল করে (ব্রহ্মময়ী)।

আর কাজ নাই মা জ্ঞান বিচারে ৷

তােমার প্রেমের সুরা         পানে কর মাতােয়ারা,

ওমা ভক্তচিত্তহরা ডুবাও প্রেমসাগরে॥

তােমার এ পাগলা গারদে,         কেহ হাসে কেহ কাদে,

কেহ নাচে আনন্দ ভরে।

ঈশা মুসা শ্রীচৈতন্য,         ওমা প্রেম ভরে-অচৈতন্য,

হায় কবে হব মা ধন্য, (ওমা) মিশে তার ভিতরে॥

স্বর্গেতে পাগলের মেলা,         যেমন গুরু তেমনি চেলা,

প্রেমের খেলা কে বুঝতে পারে।

তুমি প্রেমে উন্মাদিনী,         ওমা পাগলের শিরােমণি,

প্রেমধনে কর মা ধনী, কাঙ্গাল প্রেমদাসেরে॥

ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল


* স্বরলিপিঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত


আপনাতে আপনি দেখ, যেও নাকো মন কারাে ঘরে

সিন্ধু-খাম্বাজ—যৎ*


আপনাতে আপনি দেখ, যেও নাকো মন কারাে ঘরে।

যা চাবি এইখানে তা বসে পাবি, খোঁজ নিজ অন্তঃপুরে॥

পরম ধন ঐ পরশ মণি, যে অসংখ্য ধন দিতে পারে।

এমন মণি পড়ে আছে চিন্তামণির নাচ দুয়ারে

তীর্থ-গমন দুঃখ ভ্রমণ মন! উচাটন হয়াে না রে,

(তুমি) আনন্দ-ত্রিবেণীর স্নানে শীতল হও না মূলাধারে।

কী দেখ কমলাকান্ত মিছে বাজী এ সংসারে,

ওরে! বাজীকরে চিনলে নারে, (সে যে) তােমার ঘটে বিরাজ করে

কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত / দিব্যগীতি

শ্যামা মা কি এক কল করেছে

মনােহরসাহীঝাঁপতাল


শ্যামা মা কি এক কল করেছে।

কালী মা কি এক কল করেছে।

এই চোদ্দ পােয়া কলের ভিতরি, কত রঙ্গ দেখাতেছে।

আপনি থাকি কলের ভিতরি, কল ঘুরায় ধরে কল ডুরি,

কল বলে আপনি ঘুরি, জানে না কে ঘুরাতেছে।

যে কলে জেনেছে তাঁরে, কল হতে হবে না তারে,

কোন কলের ভক্তি ডােরে, আপনি শ্যামা বাঁধা আছে।

অজ্ঞাত*


* কোন বইতে রচয়িতা কমলাকান্ত বলে উল্লিখিত হয়েছে।


শ্যামা মা উড়াচ্ছে ঘুড়ি

প্রসাদী—একতাল


শ্যামা মা উড়াচ্ছে ঘুড়ি (ভব সংসার বাজার মাঝে)।

(ঐ যে) মন-ঘুড়ি, আশা বায়ু বাঁধা তাহে মায়া দড়ি॥

কাক গণ্ডি মণ্ডি গাঁথা, তাতে পঞ্জরাদি নাড়ি।

ঘুড়ি স্বগুণে নির্মাণ করা, কারিগরি বাড়াবাড়ি॥

বিষয়ে মেজেছে মাঞ্জা, কর্কশা হয়েছে দড়ি।

ঘুড়ি লক্ষে দুটা একটা কাটে, হেসে দেও মা হাত চাপড়ি॥

প্রসাদ বলে, দক্ষিণা বাতাসে, ঘুড়ি যাবে উড়ি।

ভবসংসার সমুদ্র পারে, পড়বে গিয়ে তাড়াতাড়ি॥

রামপ্রসাদ সেন

গাে আনন্দময়ী হয়ে মা আমায় নিরানন্দ কোরাে না

ললিত—একতাল*


গাে আনন্দময়ী হ’য়ে মা আমায় নিরানন্দ কোরাে না।

(ওমা) ও দুটি চরণ বিনে আমার মন, অন্য কিছু আর জানে না॥

তপন-তনয়, আমায় মন্দ কয়, [কি বলিব তায় বল না।]

ভবানী বলিয়ে, ভবে যাব চলে, মনে ছিল এই বাসনা।

অকূল পাথারে, ডুবাবি আমারে (ওমা) স্বপনেও তাতাে জানি না॥

আমি অহর্নিশি শ্রীদুর্গানামে ভাসি, দুঃখ রাশি তবু গেল না।

এবার যদি মরি, ও হর-সুন্দরী, (তাের) দুর্গানাম আর কেউ লবে না॥

গৌরমােহন রায়


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

পাঠান্তর: কি দোষে তাও জানি না






আয় মন, বেড়াতে যাবি

প্রসাদী—একতাল


আয় মন, বেড়াতে যাবি।

কালীকল্পতরুমূলে রে (মন) চারি ফল কুড়ায়ে খাবি॥

প্রবৃত্তি নিবৃত্তি জায়া, (তার) নিবৃত্তিরে সঙ্গে লবি।

ওরে বিবেক নামে তার বেটারে তত্ত্বকথা তায় শুধাবি॥

প্রথম ভার্যার সন্তানেরে দূরে রইতে বুঝাইবি।

যদি না মানে প্রবােধ, জ্ঞানসিন্ধু মাঝে ডুবাইবি॥

শুচি অশুচিরে লয়ে দিব্য ঘরে কবে শুবি।

যখন দুই সতীনে পিরিত হবে, তবে শ্যামা মাকে পাবি॥

ধর্মাধর্ম দুটো অজা, তুচ্ছ খোঁটায় বেঁধে থুবি

যদি না মানে নিষেধ, তবে জ্ঞান ড়্গ বলি দিবি॥

অহঙ্কার অবিদ্যা তাের, পিতামাতায় তাড়িয়ে দিবি।

যদি মােহ গর্তে টেনে লয়, ধৈর্য-খোঁটা ধ’রে র’বি॥

প্রসাদ বলে, এমন হ’লে, কালের কাছে জবাব দিবি।

তবে বাপু বাছা বাপের ঠাকুর, মনের মত মন হবি॥

রামপ্রসাদ সেন


ভাবিলে ভাবের উদয় হয়

প্রসাদী—একতাল


ভাবিলে ভাবের উদয় হয়।

যেমন ভাব তেমনি লাভ মূল সে প্রত্যয়।

কালীর ভক্ত জীবন্মুক্ত নিত্যানন্দময়॥

কালীপদ সুধাহ্রদে চিত্ত ডুবে রয়।

যাগ যজ্ঞ পূজা বলি কিছুই কিছু নয়॥

রামপ্রসাদ সেন

মন, তাের এমন মা থাকিতে ঘুরে মর এ ভ্রম কেমন

সিন্ধুযৎ


মন, তাের এমন মা থাকিতে ঘুরে মর এ ভ্রম কেমন।

শব হয়ে শিব সার ভেবে যাঁর হৃদে ধরেন রাঙ্গা চরণ॥

ব্রহ্মানন্দ চাও যদি         ভাব শ্যামায় নিরবধি,

আলাে হবে আঁধার হৃদি, জ্ব’লে উঠবে জ্ঞান-তপন॥

মা মা ব’লে সকল ভুলে ডাক দেখি রে হৃদয় খুলে।

লবেন আসি কোলে তুলে স্নেহময়ী করি যতন॥

স্বামী তপানন্দ

জাগ জাগ জননী

মূলতানী—একতাল


জাগ জাগ জননী,

মূলাধারে নিদ্রাগত কতদিন গত হল কুলকুণ্ডলিনী।

স্বকার্য সাধনে চল মা শির মধ্যে,

পরম শিব যথা সহস্রদল পদ্মে,

করি ষড়চক্র ভেদ পুরাও মনের খেদ, চৈতন্যরূপিণী।

ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্না, চিনতে পারি এ তিন নাড়ী

ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর শিবরূপে দেবতারা,

নিয়ত জপে তারা, তারা গাে।

তােমার অধিষ্ঠান হয়ে স্বাধিষ্ঠান পরে,

চিন্তাহরা, চলে চিন্তামণিপুরে,

জীবাত্মা যে স্থানে অনাহত চক্রে

দীপ-শিখার ন্যায় জ্বলে দিবা রজনী॥

এই দেহ-বিশ্বচক্রে, যে বিশুদ্ধ ষােলাে দল

কমল শােভা পায় তাহে অর্ধ নাভি সরে,

সদা সেবা করে শাকিনী নামে শক্তি

তথা ওগাে কুণ্ডলিনি।

করাে গাে গমন আদ্য অক্ষর মধ্যে

দ্বিদল পদ্মে মন করে ষটচক্র ভ্রমণ

কৃষ্ণধনকে সাধন করাও মা সর্বাণি।

দাশরথি রায়

জাগাে জাগাে কুলকুণ্ডলিনী

তিলক-কামােদ—কাওয়ালী*


জাগাে জাগাে কুলকুণ্ডলিনী।

আদি শকতি পরাবিদ্যা নারায়ণী, ব্রহ্মসনাতনী, বাগ্-বাদিনী

ত্রিভুবন-মােহিনী, ত্রিজগত-জননী, কোটিবিজলী প্রভা জীবগতি-দায়িনী,

আধারপদ্মে ত্রিকোণপীঠে স্বয়ম্ভ-হর-বেষ্টিনী

(ষড়) চক্রভেদিনী, সহস্রারগামিনী, শিবসঙ্গ-বিলাসিনী জয় জয় যােগিনী,

অকুল সাধকে তুমি কুলদায়িনী, পরমকলা কুলীনা কুলকামিনী

স্বামী অম্বিকানন্দ


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

উঠ গাে করুণাময়ী, খােল গাে কুটীর দ্বার

পিলু—যৎ


উঠ গাে করুণাময়ী, খােল গাে কুটীর দ্বার,

আঁধারে হেরিতে নারি, হৃদি কাঁপে অনিবার॥

তারস্বরে ডাকিতেছি তারা তােমায় কতই বার,

দয়াময়ী হয়ে আজি একি হেরি ব্যবহার॥

সন্তানে রাখি বাহিরে, আছ শুয়ে অন্তঃপুরে,

‘মা’‘মা’ বলে ডেকে মাের অস্থি চর্ম হ’ল সার॥

ধ্বনি-বর্ণ-তাল-লয়ে তিন গ্রাম বসাইয়ে,

এত ডাকি তবু নিদ্রা ভাঙ্গে না কি মা তােমার॥

খেলায় মত্ত ছিলেম বলে, বুঝি মুখ বাঁকাইলে,

একবার চাও মা বদন তুলে, খেলিতে যাবনা আর॥

দীন রাম বলে ওমা, কার কাছে যাব আর,

মা বিনে কে লবে আর অকৃতী অধমের ভার॥

— রামলাল দাসদত্ত

জাগ মা কুলকুণ্ডলিনী, জাগাে মা তুমি নিত্যানন্দ-স্বরূপিণী

ভৈরবী—একতাল*


জাগ মা কুলকুণ্ডলিনী,             জাগাে মা তুমি নিত্যানন্দ-স্বরূপিণী

তুমি ব্রহ্মানন্দ-স্বরূপিণী, প্রসুপ্ত ভুজগাকারা, আধার-পদ্মবাসিনী।

ত্রিকোণে জ্বলে কৃশানু,             তাপিতা হইল তনু,

মূলাধার ত্যাজ শিবে স্বয়ম্ভু-শিব-বেষ্টিনী

গচ্ছ সুষম্নার পথ,         স্বাধিষ্ঠানে হও উদিত,

মণিপুর অনাহত বিশুদ্ধাজ্ঞা সঞ্চারিণী

শিরসি সহস্রদলে,         পরম শিবেতে মিলে,

ক্রীড়া কর কুতূহলে সচ্চিদানন্দদায়িনী॥

— অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

বারে বারে যত দুঃখ দিয়েছ দিতেছ তারা

খাম্বাজ—যৎ


বারে বারে যত দুঃখ দিয়েছ দিতেছ তারা।

সে কেবল দয়া তব, জেনেছি মা দুঃখহরা॥

সন্তান মঙ্গল তরে জননী তাড়না করে।

(ওমা) তাই বহিতেছি শিরে সুখদুঃখেরি পসরা॥

জিনি অমূল্য রতন, ব্রহ্মময়ী-নাম-ধন,

তারা বলে ডাকি যখন, হই গাে আপনহারা॥

তুমি মা দীন তারিণী, শরণাগত-পালিনী,

আমি ঘাের পাতকী বলে তােমায় হয়েছি হারা॥

আমি মা তাের পােষা পাখী, যা শিখাও মা তাই শিখি,

(ওমা) শিখায়েছ তারা বুলি তাই ডাকি মা তারা তারা॥

— রামলাল দাসদত্ত

আমার নাই আঁধারের ভয়

মিশ্র দেশ—একতাল


আমার নাই আঁধারের ভয়—

কালাে মায়ের রূপে আলাের

ঝরণা-ধারা বয়॥

সকল জ্ঞানের অতীত যে মা,     তাই তাে কালাে আমার শ্যামা,

জ্ঞানরূপী শিব চরণে তাঁর     লুটিয়ে পড়ে রয়

তাের কালাে রূপের পর্দাখানার     আড়াল দিয়ে কালী,

নিভিয়ে দে মা ত্রিতাপ-জ্বালা     দহনে জ্বলি

আলাের জ্বালায় জ্বলি যত,     আঁধার কালী স্নিগ্ধ তত

ঐ শীতলে নে মা তুলে     আলাের করি ক্ষয়॥

— নজরুল ইসলাম

ওমা তাের কোলে লুকায়ে থাকি

বেহাগ-খাম্বাজ—ঠুংরী


ওমা তাের কোলে লুকায়ে থাকি।

চেয়ে চেয়ে মুখ পানে মা,     মা, মা, বলে ডাকি

ডুবি চিদানন্দ রসে মহাযােগ নিদ্রাবশে,

হেরি তােমায় অনিমেষে নয়নে নয়ন রাখি

দেখে শুনে ভয় করে, হৃদি কেঁপে উঠে ডরে,

রাখ আমায় বুকে করে স্নেহের অঞ্চলে ঢাকি॥

— ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল

ভবে সেই সে পরমানন্দ

গৌরী—একতাল*


ভবে সেই সে পরমানন্দ।

যে জন পরমানন্দময়ীরে জানে॥

যে জন না যায় তীর্থপর্যটনে         কালী ছাড়া কথা না শুনে কানে,

সন্ধ্যা পূজা কিছু না মানে, যা করেন কালী সেই সে জানে॥

কালীর চরণ যে করেছে স্থূল, সহজে হয়েছে বিষয়েতে ভুল,

ভবার্ণবে পাবে সে কূল, মূল হারাবে সে কেমনে॥

রামকৃষ্ণ কয় এমন জনে,         লােকের নিন্দা না শুনে কানে।

আঁখি ঢুলু ঢুলু রজনী দিনে কালী নামামৃত-পীযূষ পানে॥

 মহারাজ রামকৃষ্ণ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


শ্যামা ধন কি সবাই পায়

পরজ—একতাল*


শ্যামা ধন কি সবাই পায়, রে কালী ধন কি সবাই পায়,

অবােধ মন! বুঝ না একি দায়।

শিবেরও অসাধ্য সাধন, মন! মজানো রাঙ্গা পায়

ইন্দ্রাদি সম্পদসুখ তুচ্ছ যে ভাবে মায়।

সদানন্দ সুখে ভাসে, শ্যামা যদি ফিরে চায়॥

যােগীন্দ্র মুনীন্দ্র ইন্দ্র, যে চরণ ধ্যানে না পায়।

নির্গুণ কমলাকান্ত তবু সে চরণ চায়

— কমলাকান্ত চক্রবর্তী


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত


কেন রে মন ভাবিস এত, দীনহীন কাঙ্গালের মত

সিন্ধু খাম্বাজ—যৎ


কেন রে মন ভাবিস এত, দীনহীন কাঙ্গালের মত,

আমি যে পেয়েছি মায়ের অক্ষয় ধন অভয়পদ।

একবার যদি মা বলে, ডাকি তাঁরে হৃদয় খুলে,

তখন মা ল’য়ে কোলে, মুখে তুলে দেয় অমৃত।

আমার মা ব্রহ্মাণ্ডেশ্বরী, দয়াময়ী ক্ষেমঙ্করী,

সুদর্শনচক্র ধরি, (ধন ধান্য হাতে করি)

আছেন কাছে নিয়ত।

শােরে মন তােরে বলি, আমি মায়ের বলে বলী,

দেহ মন প্রাণ সকলি, তাহারি অন্নে পালিত।

অন্য ধনে কি প্রয়ােজন, পরশমণি মায়ের চরণ,

হৃদয়ে রাখিয়ে সে ধন, কর সুখে কাল গত॥

ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল

মা আছেন আর আমি আছি, ভাবনা কি আর আমার

লগ্নী-খাম্বাজ—কাহারবা


মা আছেন আর আমি আছি, ভাবনা কি আর আমার?

আমি মায়ের হাতে খাই পরি, মা লয়েছেন সকল ভার

পড়ে সংসার-পাকে ঘাের বিপাকে দেখিয়াছি অন্ধকার;

সেই ঘাের আঁধারে মা আমারে (মাভৈ) বাণী শুনায় বারে বার

এসে ছয়জনাতে একই সাথে পথ ভুলায় যে কতবার;

সেই বিপদ হতে ধরে হাতে মা যে করিছে উদ্ধার॥

আমি ভুলে থাকি, তবু দেখি ভােলে না মা একটিবার;

এমন স্নেহের আধার কে আছে আর?

মা যে আমার আমি মা’র

— মনােমােহন চক্রবর্তী

আর কারে ডাকব শ্যামা ছাওয়াল কেবল মাকে ডাকে

ঝিঝিট—পােস্তা


আর কারে ডাকব শ্যামা ছাওয়াল কেবল মাকে ডাকে।

আমি তেমন ছেলে নই মা তােমার ডাকব গাে ‘মা’ যাকে তাকে

মা বইত শিশু জানে না, মা বইত কিছু বােঝে না,

মা ছাড়া কভু থাকে না; (আমি) থাকব গাে মা লয়ে কাকে

মা যদি সন্তানে মারে,         (তবু) শিশু কাঁদে মা মা করে,

ঠেলে দিলে গলা ধরে ছাড়ে না মা যতই বকে॥

জগতজননী হও,         পুত্রভার মাগাে লও,

কত আব্দার ছেলের সও, তাইতে তনয় তােমায় ডাকে

মহারাজ মহাতাচাঁদ

আছে কার মা এমন দয়াময়ী আমাদের মা তুমি যেমন

সিন্ধু-খাম্বাজ—যৎ


আছে কার মা এমন দয়াময়ী আমাদের মা তুমি যেমন।

তুমি সঙ্গে থাক দিবানিশি চোখের আড় কর না কখন

পরীক্ষার অনল জ্বেলে,         আপনি দাও মা তাতে ফেলে;

আপনি দাও মা উপায় বলে, যে ভাবে যার বাঁচে জীবন।

তুমি ভালবাস যেমন,         আমি ত বাসিনা তেমন,

ভালবাসা শিখাও আমায় (তুমি) আমায় ভালবাস যেমন॥

কালিশঙ্কর কবিরাজ

দেহি পদতরণী, জননী

কাফি-সিন্ধু — কাওয়ালী


দেহি পদতরণী, জননী।

দিন দিন যায় দিন, আসে মাগাে সেই দিন

দিনে রেতে তাই তােরে ডাকি দীনতারিণী

জানিনা কি বলে আমি ডাকিব গাে মা তােমায়,

শিখায়েছ মা বলিতে মা বলিয়ে ডাকি তাই,

কুপুত্র যদিও হয়, কুমাতা কখনও নয়,

চরণে শরণ তাই লয়েছি নিস্তারিণী

সংসার-প্রান্তরে শ্মশান-বাহিনী কূলে,

এ দীন পথিক বসে বিষয়-পাদপ মূলে,

আসে ঐ কাল-ফণী, দংশিতে মােরে জননী,

ত্রাসিত পরাণে তাই ডাকি মা ত্রিনয়নী

মায়া মায়াবিনী মােরে কুপথেতে লয়ে যায়,

দেখাও সুপথ মােরে সদা জ্বলি সে জ্বালায়,

যায় যায় প্রাণ যায়, তাই ডাকি মা তােমায়,

অকূলে কর মা কোলে ওমা কুলদায়িনী॥

রামলাল দাসদত্ত

আর কিছু নাই সংসারের মাঝে, কেবল শ্যামা সার রে

ছায়ানট — কাওয়ালী


আর কিছু নাই সংসারের মাঝে, কেবল শ্যামা সার রে।

ধ্যান কালী জ্ঞান কালী প্রাণ কালী আমার রে॥

আসিয়ে ভুবনে এ তনু ধারণে যাতনা না হয় কার রে।

(একবার) হেরিলে ও কায়, সব দুঃখ যায়, এই গুণ শ্যামা মার রে॥

এ ভবে এসেছে, কেহ সুখে আছে, পেয়ে শিরে রাজ্যভার।

(আমার) দরিদ্রের দন, ও রাঙা চরণ, গলায় করেছি হার রে॥

কমলাকান্ত, হইয়ে ভ্রান্ত, যাওয়া আসা বারম্বার রে।

(মায়ের) অভয় চরণ, লহরে শরণ, অনায়াসে পাবি পার রে॥

কমলাকান্ত চক্রবর্তী

ভজরে শ্যামা পদ পঙ্কজরাজ

কেদার — ঢিমে ত্রিতাল


ভজরে শ্যামা পদ পঙ্কজরাজ,

পিও, পিও, পিও মধু হয়ে মাতােয়ারা॥

মা, মা, মা ঝঙ্কার মন-মধুকর,

ঝরুক অবিরল অখণ্ড অমৃত ধার;

অহর্নিশি অনিমেষে মার মুখ নেহার,

তারা তারা, তারা বলে হয়ে যাও হারা॥

স্বামী তপানন্দ

একবার বিরাজ গাে মা হৃদি কমলাসনে

মিশ্র ছায়ানট — দাদরা*


একবার বিরাজ গাে মা হৃদি কমলাসনে।

তােমার ভুবন-ভরা রূপটি একবার দেখে লই মা নয়নে॥

তুমি অন্নপূর্ণা মা, শ্মশানে শ্যামা, কৈলাসেতে উমা, তুমি বৈকুণ্ঠে রমা,

ধর বিরিঞ্চি-শিব-বিষ্ণুরূপ সৃজন-লয়-পালনে

তুমি পুরুষ কি নারী, বুঝিতে নারি, স্বয়ং না বুঝালে তা কি বুঝিতে পারি,

তুমি আধা রাধা আধা কৃষ্ণ সাজিলে বৃন্দাবনে॥

তুমি জগতের মাতা, যােগীজনানুগতা, অনুগত জনে কৃপা কল্পলতা,

তােমায় মা বলে ডাকিলে নাকি কোলে নাও ভক্তজনে

দুঃখ-দৈন্যহারিণী, চৈতন্যকারিণী, অন্য কিছু চাই না বিনা চরণ দুখানি,

আমি প্রেম-সরােজে সাজাব পদ বাসনা মনে মনে

পরিব্রাজক ভিখারী সাধ মনেতে ভারী, মধুহাসিমাখা মার মুখখানি হেরি,

বসে মায়ের কোলে মা মা ব’লে মাতিব যােগধ্যানে॥

স্বামী কৃষ্ণানন্দ


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

মাতিয়ে দে মা আনন্দময়ী, একেবারে মেতে যাই

ঝিঝিট — একতাল


মাতিয়ে দে মা আনন্দময়ী, একেবারে মেতে যাই,

তেমনি করে মাতিয়ে দে মা, যেমন মেতেছিলেন রাই॥

দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে, তব নামসুধা পানে,

ওমা মাতুক যত নরনারী দেখে শুনে প্রাণ জুড়াই॥

নামসুধা-রস পান করিলে ভব ক্ষুধা যায় মা দূরে,

হয় যে মহাভাবের উদয়, সে সুধা পান করতে চাই॥

অজ্ঞাত

এবার আমি ভাল ভেবেছি, ভাল ভাবীর কাছে ভাব শিখেছি

প্রসাদী — একতাল


এবার আমি ভাল ভেবেছি, ভাল ভাবীর কাছে ভাব শিখেছি॥

যে দেশে রজনী নাই, সেই দেশের এক লােক পেয়েছি।

আমি কিবা দিবা, কিবা সন্ধ্যা, সন্ধ্যারে বন্ধ্যা করেছি॥

ঘুম ছুটেছে, আর কি ঘুমাই, যুগে যুগে জেগে আছি।

এবার যার ঘুম তারে দিয়ে, ঘুমেরে ঘুম পাড়িয়েছি॥

সােহাগা গন্ধক মিশায়ে, সােনাতে রং ধরিয়েছি।

মণি-মন্দির মেজে দেব, মনে এই আশা করেছি॥

তােমার পদ তােমায় দিয়ে তােমাতে তােমায় সঁপেছি।

ভবের হাটে এসে এবার, বেচা কেনা সব করেছি॥

প্রসাদ বলে, ভুক্তি মুক্তি উভয়ে মাথায় রেখেছি।

(আমি) কালী ব্ৰহ্ম জেনে মর্ম, ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি॥

রামপ্রসাদ সেন

ফিরিয়ে নে তাের বেদের ঝুলি

লুম-ঝিঝিট — একতাল


ফিরিয়ে নে তাের বেদের ঝুলি।

ওমা মজাসনে আর আমায় কালী॥

ভবের খেলা খেলতে ভবে আমাকে একলা পাঠালি।

কি ভাব ভেবে বলনা শিবে, ভানুমতীরে জুটিয়ে দিলি

মায়ায় মজে বেদে সেজে বারে বারে যতই খেলি।

(মা তাের) এমনি অধঃপেতে ঝুলি খেলার জিনিস হয় না খালি

মনে করি খেলব না আর, ভানুমতীরে ছাড়তে বলি।

(ওমা) এমনি কুহকিনীর কুহক আবার তার কুহকে ভুলি

এমন সর্বনেশে মায়া, মহামায়া, কোথায় পেলি।

(আমি) আর যে পারি না শ্যামা, ব’লতে আত্মারামের বুলি

প্রেমিক বলে, কি বলে মা তনয়ে বেদে সাজালি।

(ওমা) দয়াময়ি! ‘দয়াময়ী’র নামে কালী কালি দিলি

প্রেমিক

এবার আমি বুঝব হরে

প্রসাদী — একতাল


এবার আমি বুঝব হরে।

(মায়ের) ধরব চরণ লব জোরে।

ভােলানাথের ভুল ধরেছি, বলব এবার যারে তারে।

সে যে পিতা হ’য়ে মায়ের চরণ হৃদে ধরে কোন বিচারে॥

পিতাপুত্রে এক ক্ষেত্রে, দেখা মাত্র বলব তারে।

মায়ের চরণ করে হরণ মিছে মরণ দেখায় কারে॥

মায়ের ধন সন্তানে পায়, সে ধন নিলে কোন্ বিচারে।

আপন ভাল চায় যদি সে চরণ ছেড়ে দিক্‌ আমারে॥

শিবের দোষ বলি যদি বাজে আপন গা’র উপরে।

রামপ্রসাদ বলে ভয় করিনে, (মার) অভয়চরণের জোরে

রামপ্রসাদ সেন

মােরে দেহি দেবী দরশন

কাফি-সিন্ধু — কাওয়ালী


মােরে দেহি দেবী দরশন।

আর দুঃখ দিও না দীনে দীন-দয়াময়ী!

দনুজদলনী দেবী, দেব-আরাধ্য ধন

জানি মা তব চরণ অপারের সুখতরী,

কি জানি শেষের দিনে পাছে ও পদ পাসরি,

তাই মা আকুল প্রাণে তােমার তরে নেহারি,

লুকায়ে থেকোনা কর দ্রুত পদে আগমন

দীন-তারিণী, মম দিন আগত দেখি,

দিনে রাতে তাই তােরে এত পরিত্রাহি ডাকি,

জানিনা জননী আর কদিন বা আছে বাকি,

এই বেলা কর আসি দীনের দুঃখমােচন॥

সভয়ে ডাকি অভয়ে কর মা অভয় দান,

ভব ভয় হ’তে দীন রামে কর পরিত্রাণ,

তুমি না করিলে দুঃখ কে করিবে অবসান,

কুপুত্র হয় মা যদি কুমাতা নহে কখন।

রামলাল দাসদত্ত

কোন হিসাবে হরহৃদে দাঁড়ায়েছ মা পদ দিয়ে

কাফি — ঠুংরী


কোন হিসাবে হরহৃদে দাঁড়ায়েছ মা পদ দিয়ে।

সাধ ক’রে জিভ বাড়ায়েছ মা, যেন কত ন্যাকা মেয়ে॥

জেনেছি জেনেছি তারা,         তারা গাে তাের এমনি ধারা,

তাের মা কি তাের বাবার বুকে দাঁড়িয়েছিল এমনি করে

অজ্ঞাত

জানি গো জননী, তুমি কেমন লোকের মেয়ে মা

ভৈরবী — ঝাঁপতাল


জানি গো জননী, তুমি কেমন লোকের মেয়ে মা।

পাষাণকুলে জন্ম তোমার পাষাণ তোমার হিয়ে মা॥

অন্নপূর্ণা নাম ধর,             অন্নেতে পূর্ণিত কর,

তবে কেন বিশ্বেশ্বর বেড়ায় গরল খেয়ে মা॥

অজ্ঞাত

হর ঊরে কেন অভয় চরণ, মম শিরে মাগো দাওনা

ঝিঁঝিট খাম্বাজ — একতাল


হর ঊরে কেন অভয় চরণ, মম শিরে মাগো দাওনা।

ভোলাই শুধু কি তোর এত আপনার, আমি কি তোমার কেউ না

শব হয় শিব শ্রীপদপরশে, তবে আমি মাগো এতই ঘৃণ্য কিসে,

চিদানন্দময়ী স্নেহভাষে হেসে, চাও চাও ফিরে চাও না॥

তমোময়ী, অমানিশা ভালবাস,         আঁধার হৃদয়ে স্বরূপ প্রকাশ,

মহামায়ে মায়ামোহতমো নাশ, দাও জ্ঞান সুধা পিয়াও না

লহ লহ জিহ্বা করিয়া বিস্তার,         এস, ধর, পিও হৃদি রক্ত-ধার,

দেহ প্ৰাণ মন সকলি তোমার, নিজ গুণে এসে লও না॥

বিধি বিষ্ণু শিব নাহি পান যাঁয়, আমি ক্ষুদ্র কিসে তুষিব তোমায়

না হলে করুণা, কেবা তোমা পায়, তনয়ে সদয়া হও না।

স্বামী তপানন্দ

কি উপায় শংকরী! বল কি করি

কাফি-সিন্ধু — কাওয়ালী


কি উপায় শংকরী! বল কি করি?

অসংখ্য এ বৃত্তিগণে বল নিবারি কেমনে,

সুতীব্র বৈরাগ্য দাও, শকতি দাও পদ স্মরি॥

রসনা স্ববশে আনি রুচি দাও নাম গানে,

ইন্দ্রিয় সকলে টেনে ফিরায়ে লও তব পানে।

বিনাশ সব বিঘ্ন ধেয়ানে, মজাও মন,

প্রকাশ আনন্দ ঘন স্বরূপ হৃদয়ে ধরি

দাশরথি রায়

দেখা যদি নাহি দিবে কেমনে থাকিব তবে

মিশ্র ভৈরবী — ঢিমে তেতালা


দেখা যদি নাহি দিবে কেমনে থাকিব তবে

মরু সম এই ভবে বল ওগো জননী।

দিন যায়, মাস যায়, বরষও নিঃশেষ-প্রায়

এখনও না দিলি দেখা কেন ওগো ভবানী॥

জীবনপ্রভাতে হায়, কত আশা নিয়ে বুকে

চেয়েছিনু মুখ-পানে ভাবিনু পাইব তোকে;

এবে দেখি সব মিছে, মরীচিকা-সম মায়া

মম দরশন-আশ মিটিল না শিবানী॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

নাম ধরেছ ‘সর্বনাশী’ ডাকব তোরে কি আর বলে

বেহাগ — ঝাঁপতাল


নাম ধরেছ ‘সর্বনাশী’ ডাকব তোরে কি আর বলে।

মা বলতে সাধ হয় না তোমা, মার ব্যাভার তো নাইক মূলে

কে শুনেছে এমন কথা                 হাতে কেটে ছেলের মাথা,

কোন মাতা পরেছে কোথা ছেলের মাথার মালা গলে॥

নাম অভয়া, ভয়ঙ্করী,                 একি ধারা বুঝতে নারি,

ভয়ে যম যায় না কাছে, পালায় ছুটে নাম শুনিলে।

শুভঙ্করী বলে সবে,                 কার শুভ করেছ কবে?

নাম নিলে সার ঝুলি কাঁথা, সাক্ষী শিব ঐ চরণতলে॥

বুঝতে নারি তোর মর্ম,                 নাই কো মা তোর ধর্মাধর্ম,

প্রসবি গ্রাসিছ বিশ্ব, কি রহস্য কোন্ ছলে॥

আগম নিগম তন্ত্রসারে,                 গুণের কথায় সবাই হারে,

সৃষ্টি ছাড়া কি বেয়াড়া, জোড়া তোর নাইকো মিলে ৷

অপরের কি কব কথা,                 ভাঙ্গড় ভোলা বৃদ্ধ পিতা,

তোর তরে সার ঝুলি কাঁথা, ভয়ে লুটায় চরণতলে॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


তাই কালোরূপ ভালবাসি

প্রসাদী — একতাল


তাই কালোরূপ ভালবাসি,         জগমন্মোহিনী মা এলোকেশী।

কালোর গুণ ভাল জানে, শুক শম্ভু দেব ঋষি।

যিনি দেবের দেব মহাদেব, কালোরূপ তাঁর হৃদয়বাসী॥

কালো বরণ ব্রজের জীবন, ব্রজাঙ্গনার মন উদাসী

হলেন বনমালী কৃষ্ণকালী, বাঁশী ত্যজে করে অসি॥

যতগুলি সঙ্গী মায়ের, তারা সকল এক বয়সী

ঐ যে তার মধ্যে কেলে মা মোর, বিরাজে পূর্ণিমার শশী॥

প্রসাদ ভণে অভেদ জ্ঞানে, কালোরূপে মেশামেশি

ওরে একে পাঁচ পাঁচেই এক, মন করো না দ্বেষাদ্বেষি

রামপ্রসাদ সেন

আমার মনের কালী অঙ্গে মেখে হলি মা’ তুই কালী

মিশ্র — রাগ


আমার মনের কালী অঙ্গে মেখে হলি মা’ তুই কালী

তাই বুঝি মা মলিন হ’লো     অমন রূপের ডালি।

অশান্ত এই ছেলের তরে শান্তি বুঝি নেই মা ঘরে,

ওমা কেশ এলিয়ে শ্মশানে তুই     বেড়াস রাজ-দুলালী।

কালো ছেলের মা বলে তুই     আপনি হলি কাল বরণ

আমার অনুরাগের রং লেগে মা     রাঙ্গা হল যুগল চরণ।

এবার মোর অশ্রুজলে     মা তোর কালি যাক মা গলে

তোর রূপের দেউল করবো উজল     ভক্তি প্রদীপ জ্বালি॥

প্রণব রায়

রাঙা জবা দিতে গিয়ে মরি আমি লজ্জা পেয়ে

মিশ্র — রাগ


রাঙা জবা দিতে গিয়ে মরি আমি লজ্জা পেয়ে

তোর চরণ যে মা আরও রাঙ্গা বনের জবা ফুলের চেয়ে।

এমন রাঙ্গা জবার ডালি কোন্ বনে পাব মা কালী,

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি শুধু ধারা বহে নয়ন বেয়ে।

নৃত্য কালীর রূপে মাগো নৃত্যে যখন উঠিস মেতে

পাছে তোর চরণে ব্যথা বাজে শিব দিল তাই হৃদয় পেতে।

ওই চরণে ওমা শ্যামা সন্তানে তোর ঠাঁই দে না মা

মায়ার বাঁধন মুক্ত করে মুক্তকেশী কালো মেয়ে॥

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

ভয়ঙ্করী তোরে কালী, কে বলে মা তারা

মিশ্র — রাগ


ভয়ঙ্করী তোরে কালী, কে বলে মা তারা

তোর অভয় চরণ ছুঁয়ে মা মোর ভয় হ’ল সব হারা॥

রুদ্রাণী তোর নাচন তালে প্রলয় যখন এগিয়ে চলে,

হয় সেই প্রলয়ের অন্তরালে নূতন ভুবন গড়া॥

মায়া মোহে মত্ত হয়ে জীব যদি রয় ভুলে,

মরণ ছলে তুই মা তারে নিস্ গো কোলে তুলে॥

ভবভয়ে ও শঙ্করী আমি যে মা ভয়ে মরি,

আয় মা হ’য়ে ভয়ঙ্করী ভাঙতে পাষাণ কারা॥

মঃ সুলতান

মন, তোর এত ভাবনা কেনে

প্রসাদী


মন, তোর এত ভাবনা কেনে।

একবার কালী ব’লে ব’স রে ধ্যানে॥

জাঁকজমকে করলে পূজা, অহঙ্কার হয় মনে মনে।

তুমি লুকিয়ে তাঁরে করবে পূজা, জানবে না রে জগজ্জনে॥

ধাতু পাষাণ মাটির মূর্তি, কাজ কি রে তোর সে গঠনে।

তুমি মনোময় প্রতিমা করি, বসাও হৃদি-পদ্মাসনে

আলো চাল আর পাকা কলা, কাজ কীরে তোর আয়োজনে।

তুমি ভক্তিসুধা খাইয়ে তাঁরে, তৃপ্তি করো আপন মনে

ঝাড়-লণ্ঠন বাতির আলো, কাজ কীরে তোর সে রোশনায়ে,

তুমি মনোময় মানিক্য জ্বেলে দেও না জ্বলুক নিশি দিনে

মেষ ছাগল মহিষাদি, কাজ কী রে তোর বলিদানে।

তুমি জয় কালী জয় কালী বলে, বলি দেও ষড় রিপুগণে

প্রসাদ বলে ঢাক ঢোল, কাজ কীরে তোর সে বাজনে।

তুমি জয় কালী বলি দেও করতালি, মন রেখো সেই শ্রীচরণে॥

রামপ্রসাদ সেন

মা মা বলে আর ডাকব না

গৌরী-গান্ধার — একতাল


মা মা বলে আর ডাকব না।

ও মা, দিয়েছ দিতেছ কতই যন্ত্ৰণা॥

ছিলেম গৃহবাসী, করিলি সন্ন্যাসী,

আর কি ক্ষমতা রাখ এলোকেশী,

ঘরে ঘরে যাব, ভিক্ষা মেগে খাব,

মা ব’লে আর কোলে যাব না

ডাকি বারে বারে মা মা বলিয়ে,

মা কি রয়েছে চক্ষুকর্ণ খেয়ে,

মা বিদ্যমানে, এ দুঃখ সন্তানে,

মা ম’লে কি আর ছেলে বাঁচে না॥

ভণে রামপ্রসাদ মায়ের কি এ সূত্র,

মা হয়ে হলি মা সন্তানের শত্রু,

দিবানিশি ভাবি, আর কি করিবি,

দিবি দিবি পুন জঠর-যন্ত্রণা॥

রামপ্রসাদ সেন

ঘোর অমানিশি কে ঐ ষোড়শী চলিতে চরণ টলেরে

কেদারা—একতাল


ঘোর অমানিশি কে ঐ ষোড়শী চলিতে চরণ টলেরে।

মরি হায় হায়! নব ঘন কায় কতই বিজলি ঝলেরে॥

নিপতিত পশুপতি পদতলে, হাসি অসি-করে দলে রিপুদলে।

জিহ্বা লহ লহ রুধিরাক্ত দেহ মাভৈঃ মাভৈঃ বলেরে॥

কটিতে অসুর-কর-মেখলা আজানুলম্বিত গলে মুণ্ডমালা।

উলঙ্গিনী বালা এলোকুন্তলা, আসব আবেশে চলেরে॥

আয়ত ত্রিনেত্র অরুণ বরণ, স্নেহ ঢল ঢল প্রেম প্রস্রবণ।

মদন-মথন মনোবিমোহন হেরি প্রাণ মন গলেরে॥

উল্লাসে রসনা মা মা ভাষে, অবশ অন্তর অপূর্ব আবেশে।

ধর্মাধর্ম জ্ঞানাজ্ঞান যায় ভেসে আনন্দ সাগর জলেরে

স্বামী তপানন্দ

লুকাবি কোথায় মা কালী

বাগেশ্রী—দাদরা


(আর) লুকাবি কোথায় মা কালী।

বিশ্বভুবন আঁধার ক’রে তোর রূপে মা সব ডুবালি।

সুখের গৃহ শ্মশান করে বেড়াস মা তুই আগুন জ্বালি।

(আমায়) দুঃখ দেওয়ার ছলে মা, তোর ভুবন ভরা রূপ দেখালি॥

পূজা করে পাইনি তোরে (মাগো) এবার চোখের জলে এলি।

বুকের ব্যথায় আসন পাতা বস মা সেথা দুখ-দুলালী॥

নজরুল ইসলাম

বলরে জবা বল

মিশ্র-খাম্বাজ—একতাল


বলরে জবা বল—

কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল?

মায়া তরুর বাঁধন টুটে

মায়ের পায়ে পড়লি লুটে,

মুক্তি পেলি, উঠলি ফুটে আনন্দবিহ্বল।

তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল॥

কোটি গন্ধ কুসুম ফুটে বনে মনোলোভা—

কেমনে মার চরণ পেলি তুই তামসিক জবা;

তোর মত মার পায়ে রাতুল

হ’ব কবে প্রসাদী ফুল,

কবে উঠবে রেঙে—

ওরে মায়ের পায়ের ছোঁয়া লেগে উঠবে রেঙে, 

কবে তোরই মত রাবে রে মোর মলিন চিত্তদল॥

নজরুল ইসলাম

তুমিই তবে শ্যামা, কঠিনা কেন মা

ঝিঁঝিট খাম্বাজ—একতাল


তুমিই তবে শ্যামা, কঠিনা কেন মা, মা তো কভু কারও এমন নয়।

বরং এই রীতি, কুসন্তান প্রতি জননীর প্রীতি অধিকই হয়॥

অবিরত কত আকুল অন্তরে, কাতরে কাঁদি মা মা মা স্বরে,

শুনেও শুন না, চাহ না তো ফিরে, বল না বেদনা কতই সয়।

দুর্দৈবে মজিনু খেলা ছলে ভুলে,

সুখে আছি ভেবে ফেলে গেছ চলে,

এস এস কালি, নাও কোলে তুলে, থেকো নাক ভুলে ডাকে তনয়।

ছেড়ে তো দেব না এবার তোমায় পেলে,

সোহাগ জড়ায়ে রব তব গলে,

স্নেহসিন্ধু জলে ডুবে সব ভুলে আমি গ’লে হব আনন্দময়

স্বামী তপানন্দ


ভুবন ভুলাইলি মা, ভবমোহিনী

ভৈরবী—তিনতাল*


ভুবন ভুলাইলি মা, ভবমোহিনী।

মূলাধারে মহোৎপলে, বীণাবাদ্য-বিনোদিনী॥

শরীর শারীর যন্ত্রে,         সুষুম্নাদি ত্রয় তন্ত্রে

গুণ ভেদে মহামন্ত্রে, তিনগ্রাম-সঞ্চারিণী॥**

আধার ভৈরবাকার,         ষড়দলে শ্রীরাগ আর,

মণিপুরেতে মল্লার বসন্তে হৃদপ্ৰকাশিনী॥

বিশুদ্ধ হিন্দোল সুরে,         কর্ণাটক আজ্ঞাপুরে,

তান-মান-লয়-সুরে ত্রিসপ্ত-সুরভেদিনী॥

মহামায়া মোহপাশে,             বদ্ধ কর অনায়াসে,

তত্ত্ব লয়ে তত্ত্বাকাশে স্থির আছে সৌদামিনী।

শ্রীনন্দকুমার কয়,         তত্ত্ব না নিশ্চয় হয়,

তব তত্ত্ব গুণত্রয় কাকীমুখ-আচ্ছাদিনী॥

মহারাজ নন্দকুমার


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

** পাঠান্তর: গুণ ত্রয়বিভাগিনী

কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন

জৌনপুরী—দাদরা


কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।

মায়ের রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব, যাঁর হাতে মরণ বাঁচন॥

কালো মায়ের আঁধার কোলে শিশু রবি শশী দোলে,

(মায়ের) একটুখানি রূপের ঝলক—স্নিগ্ধ বিরাট নীল গগন॥

পাগলী মেয়ে এলোকেশী নিশিথিনীর দুলিয়ে কেশ,

নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার যে তাঁর নাইক শেষ॥

সিন্ধুতে মার বিন্দু খানিক, ঠিকরে পড়ে রূপের মাণিক,

বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না, মা আমার তাই দিবসন॥

নজরুল ইসলাম

রূপ যদি তোর এতই ভালো মুণ্ডমালা কেন গলে

শঙ্করা—মিশ্র-রাগ


রূপ যদি তোর এতই ভালো মুণ্ডমালা কেন গলে।

দয়াময়ী নাম যদি মা শিব কেন তোর চরণ তলে॥

যার রূপে হয় ভুবন আলো তার কেন হায় বরণ কালো।

যার করুণায় বিশ্ব মাতায় খড়্গ তাহার করতলে॥

যোগী ঋষি তোমার লীলা পায় না আজও ধ্যানের মাঝে।

অভয়া তোর চরণ ছায়া রাখিস আমার হৃদয় মাঝে

কাঁদলো তোরই ছেলে মেয়ে শ্যামা মা তোর পথ চেয়ে।

পূজার ডালা সাজিয়েছি মা ব্যথায় ভরা নয়ন জলে

ফটিকচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়


ভুলিস্‌নে ভুলিস্‌নে ওমা

খট্ ভৈরবী—যৎ


ভুলিস্‌নে ভুলিস্‌নে ওমা

আমি যে তোর অবোধ ছেলে,

আমি যদি থাকি ভুলে,

নিস্ মা কোলে ছেলে ব’লে॥

যে-বাঁধনে বাঁধা থাকি,

হয় না মনে বারেক ডাকি,

(ওমা) দয়াময়ী দিস্নে ফাঁকি,

ভুলিস্‌নে মা দিন ফুরালে

খেলাঘরে ধুলো-খেলা,

যতই খেলি ততই জ্বালা,

ডাকি তোরে বিপদ-বেলা,

চরণ দিস্ মা মরণকালে॥

কালীপদ ঘোষ


দুর্গে দুখহারিণী শুম্ভ ঘাতিনী ভবানী বিপদ ভয়বারিণী

দুর্গা—সুরফাকতাল*


দুর্গে দুখহারিণী; শুম্ভ ঘাতিনী ভবানী, বিপদ ভয়বারিণী

বিশ্ব জননী শারদে, শুভদে অভয়া বরদে।

দনুজদলনী শিবানী, জগজন প্ৰতিপালিনী॥

শূলখড়্গ ধারিণী, দৈত্যদর্পদারিণী।

সর্বব্যাপিনী চণ্ডিকে,     মহামায়া মোহনাশিনী

প্রজ্ঞানানন্দ


*স্বরলিপি: দিব্যগীতি

পড়িয়ে ভবসাগরে, ডুবে মা তনুর তরী

সরফর্দা—ঝাঁপতাল*


পড়িয়ে ভবসাগরে, ডুবে মা তনুর তরী।

মায়াঝড়, মোহ-তুফান ক্রমে বাড়ে গো শংকরী

একে মন-মাঝি আনাড়ী, তাহে ছ'জন গোঁয়ার দাঁড়ি;

কুবাতাসে দিয়ে পাড়ি, হাবুডুবু খেয়ে মরি

ভেঙ্গে গেল ভক্তির হাল, ছিঁড়ে পড়ল শ্রদ্ধার পাল,

তরী হ’ল বানচাল, উপায় কি করি?

উপায় না দেখি আর, অকিঞ্চন ভেবে সার,

তরঙ্গে দিয়ে সাঁতার, দুর্গা নামের ভেলা ধরি॥

রঘুনাথরায় (দেওয়ান)


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

এস ভীমা ভবানি ভৈরবভামিনি

কেদারা—কাওয়ালী


এস ভীমা ভবানি ভৈরবভামিনি, এস মা, আজি এ শ্মশানে।

এস শোণিতসিক্ত শাণিত অসি নিয়ে, এস মা লোহিত-লোচনে॥

এস অয়ি জননি প্রলয়রূপিণী হয়ে,

দৈত্য-দন্তনাশী বিকট হাসি লয়ে,

খর্পর করে, নরশির ধ’রে, দামিনী জ্বালিয়া দশনে॥

নাচ শব পরে, বাজুক দামামা, নাশ গো অসুরে, মৃত্যুরূপিণী মা,

আমি যাব সঙ্গে, মরিতে রঙ্গে, গাহিয়া ‘জয় মা’ সঘনে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে জানেরে কালী কেমন, ষড়দর্শনে না পায় দরশন

রামপ্রসাদী—একতাল*


কে জানেরে কালী কেমন, ষড়দর্শনে না পায় দরশন,

কালী পদ্মবনে হংসসনে, হংসীরূপে করে রমণ।

তাঁকে মূলাধারে সহস্রারে, সদা যোগী করে মনন॥

আত্মারামের আত্মা কালী, প্রমাণ প্রণবের মতন,

তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন॥

মায়ের উদরে ব্রহ্মাণ্ড-ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা’ জান কেমন।

মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম, অন্যে কেবা জানে তেমন॥

প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধুতরণ,

আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না, ধরবে শশী হয়ে বামন॥

রামপ্রসাদ সেন


*স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত


কোথা ভবদারা দুর্গতিহরা, কতদিনে তোর করুণা হবে

দরবারী—একতাল


কোথা ভবদারা দুর্গতিহরা, কতদিনে তোর করুণা হবে?

কবে দেখা দিবি কোলে তুলে নিবি, সকল যাতনা জুড়াবে?

মায়ার সংসারে কর্ম কোলাহলে, শ্রীপদ দু’খানি রয়েছি গো ভুলে;

বিবেক-বৈরাগ্য তুমি নাহি দিলে মোহ-ভ্রান্তি কিসে টুটিবে?

আয়ু সূর্য মোর বসিতেছে পাটে, কোথা ব্রহ্মময়ী এস তুমি ছুটে;

তনয়ে তারো মা এ ঘোর সংকটে তুমি বিনে কে আর তারিবে?

অজ্ঞাত


এস মা এস. মা, ও হৃদয় রমা, পরাণ-পুতলী গো

ই-পূরবী—একতাল*


এস মা এস. মা, ও হৃদয় রমা, পরাণ-পুতলী গো,

(এস মা, পাপীতাপীর গতি কর গো)

(মম) হৃদয়-আসনে একবার হও মা আসীন, নিরখি তোমারে গো।

আছি জন্মাবধি তব মুখ পানে চেয়ে, ধরি এ জীবন যে যাতনা সয়ে;

(তা’তো তুমি জান মা, অবোধ সন্তানের দুঃখ )

একবার হৃদয় কমল বিকাশ করিয়ে, প্রকাশ তাহাতে গো।

পুণ্ডরীকাক্ষ মুখোপাধ্যায়


স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত


মা আমাদের এসেছে আজ, আর মোরা ভয় করি কারে

কানাড়া—একতাল


মা আমাদের এসেছে আজ, আর মোরা ভয় করি কারে।

দুঃখ-বিপদ তুচ্ছ করি চলব মোরা এ সংসারে॥

মা’র পায়ে যে শরণ লয়, তার কি থাকে মরণ-ভয়?

শিব হয়েছেন মৃত্যুঞ্জয় মায়ের চরণ হৃদে ধরে॥

এই মিনতি ও মা তারা, হই না যেন দিশেহারা,

তোমার কাজে বাঁচবো মোরা, মরিব তোমারি তরে

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


কত ভালবাস গো মা মানব সন্তানে

খাম্বাজ—একতাল*


কত ভালবাস গো মা মানব সন্তানে, (পাপী)

মনে হলে প্রেমধারা বহে দুনয়নে গো মা।

তব পদে অপরাধী, আছি আমি জন্মাবধি,

তবু চেয়ে মুখ পানে প্রেমনয়নে, ডাকিছ মধুর বচনে,

মনে হলে প্রেমধারা বহে দুনয়নে।

বার বার প্রেমভরে ডাকিছ গো মা!

(প্রেম-বাহু প্রসারিয়ে, স্নেহে বিগলিত হয়ে, আয় আয় আয় বলে,

অপরাধ ক্ষমা করে, হাসিমুখে প্রেমভরে, ও মা আনন্দময়ী,

জীবের দশা মলিন দেখে, ডাকিছ গো মা!)

আমাদেরই জন্যে স্বর্গ-নিকেতনে গো মা,

কত সুখ শান্তি, অতুল সম্পত্তি, রেখেছ যতনে,

নিত হাতে সাজাইয়ে বিবিধ বিধানে গো মা!

তোমার প্রেমের ভার, বহিতে পারি না গো আর,

প্ৰাণ উঠিছে কাঁদিয়া, হৃদয় ভেদিয়া, তব স্নেহ দরশনে,

লইনু শরণ মা গো তব শ্রীচরণে গো মা॥

ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল


* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি—৭

অম্ব অন্নপূর্ণে, আবিরেহি ভো ভবানী

(অন্নপূর্ণা)

মিশ্র-খাম্বাজ—জলদ একতাল


অম্ব অন্নপূর্ণে, আবিরেহি ভো ভবানী!

নমো কিংকর, মোহ ঘোর হর আসি কাশীরানি।

বিশ্বেশ্বর হর ত্রিপুরারি মাগো তব আগে সাজি ভিখারী;

কেন মোরা দীন মা মহেশ্বরি যাদের হেন কল্যাণী?

পীযূষ সিঞ্চি পদনখকোণে শকতি সঞ্চার নারী-নর প্রাণে,

আনন্দ দাও নাশ রিপুগণে রাখগো পরমেশানী!

ধন, ধর্ম, অন্ন, বিদ্যা, বুদ্ধি, বল, সকল ভারতে করি সমুজ্জ্বল,

দে মা সমদৃষ্টি, প্রেম নিরমল, সবে কর মহাজ্ঞানী॥

স্বামী তপানন্দ

সত্য তুমি মৃত্যুরূপা কালী

বাগেশ্রী—ত্রিতাল*


‘সত্য তুমি মৃত্যুরূপা কালী’ -মা তোমার মায়ার ছায়া সুখবনমালী

‘বিষকুম্ভ ভরি বিতরিছ জনে জনে';

‘মহামারী’ হয়ে তুমি বিনাশিছ জীবগণে,

কম্পিত সুরনর তব ভীম গরজনে ভীষণ হইতে তুমি ভয়ালী

সমর উল্লাসে নাচ সুজন-পালন লয়ে,

তবু ‘শুধু দয়াময়ী’ তোমারে বলি মা ভয়ে।

ভেঙ্গে দাও সুখ-আশ, কাট মা করম-পাশ লহ লহ এ জীবন-ডালি॥

স্বামী চণ্ডীকানন্দ


* স্বরলিপিঃ শ্রীমাতৃমন্দির, জয়রামবাটী কর্তৃক প্রকাশিত ‘ভজন সঙ্গীত’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য


জাগো, ওগো দয়াময়ি জননি

ইমন মিশ্র—কাওয়ালী


জাগো, ওগো দয়াময়ি জননি,

তব মন্দির দ্বারে আজি, মিলিত তব সন্তানগণ॥

দেশ দেশান্তর করি অনুসন্ধান কুসুম চন্দন,

আজি এনেছি জননি, পূজিতে তব চরণ॥

তব মঙ্গল মন্ত্রে তোমারি সন্তান, বিস্মৃত-গর্ব-ভেদ-অভিমান;

নব আশায় পুলকিত প্রাণ,

দেহ শিক্ষা নব দীক্ষা, জননি, মেলি করুণা-নয়ন॥

করে আশীষ তুলি পুণ্য পাণি, শুনাও সন্তানে অভয় বাণী;

শত বিষাদ দৈন্য সরম মানি পড়ুক সরিয়া;

(আজি) দিকে দিকে তব বিজয়শঙ্খ উঠুক বাজিয়া বাজিয়া,

পুলক-উৎসবে, হোক পরিপুরিত মম দীন ভবন

অজ্ঞাত

ঘোর তামসী মোহনিশি মাগো কবে হবে অবসান

বেহাগ—একতালা


ঘোর তামসী মোহনিশি মাগো কবে হবে অবসান।

(কবে) ঊষার আলোকে পরম পুলকে গাহিব তোমারি গান

তৃষিত চাতক প্রায়,

তব কৃপাকণা বরিষণ আশে ডাকিব শুধু তোমায়;

নবঘনরূপে এসে, স্নিগ্ধ করিবে আনন্দ সিঞ্চনে তপ্ত হৃদয়াকাশে,

শীতল শান্তি সমীরে অলসে ঢেলে দিব মনপ্ৰাণ॥

হ’য়ে তব ভাবে ভোর, চরণ-নখর-শশধর-সুধা লভি এ চিত চকোর,

অহরহ মাতোয়ারা, পরাণ ভরিয়া করিব পান অবিরল সুধাধারা,

হাসি হাসি আসি কালী এলোকেশী, করিবে অভয় দান।

সুধায় ডুবিব সুধাময় হব সুধায় করিব স্নান॥

স্বামী তপানন্দ

কবে সমাধি হবে শ্যামা চরণে

ভৈরবী—আড়াঠেকা


কবে সমাধি হবে শ্যামা চরণে।

অহংতত্ত্ব দূরে যাবে সংসার বাসনা সনে।

উপেক্ষিয়ে মহত্তত্ত্ব, ত্যজি চতুর্বিংশ তত্ত্ব।

সর্বতত্ত্বাতীত তত্ত্ব, দেখি আপনে আপনে।

জ্ঞানতত্ত্ব ক্রিয়াতত্ত্বে, পরমাত্মা আত্মতত্ত্বে,

তত্ত্ব হবে পরতত্ত্বে, কুণ্ডলিনী জাগরণে।

শীতল হইবে প্রাণ, আপনে পাইব প্রাণ,

সমান উদান ব্যান, ঐক্য হবে সংযমনে।

কেবল প্রপঞ্চ পঞ্চ, ভূত পঞ্চময় তঞ্চ।

পঞ্চে পঞ্চেন্দ্রিয় পঞ্চ, বঞ্চনা করি কেমনে।

করি শিবা শিবযোগ, বিনাশিবে ভব রোগ,

দূরে যাবে অন্য ক্ষোভ, ক্ষরিত সুধার সনে।

মূলাধারে বরাসনে, ষড়দল ল’য়ে জীবনে,

মণিপুরে হুতাশনে, মিলাইবে সমীরণে।

কহে শ্রীনন্দকুমার, ক্ষমা দে হরি নিস্তার,

পার হবে ব্রহ্মদ্বার, শিবশক্তি আরাধনে॥

দেওয়ান নন্দকুমার

শ্রীশ্রী হরি সঙ্গীত

সুমিরণ করলে মেরে মনা

মিশ্র কেদারা—কার্ফা


সুমিরণ করলে মেরে মনা, তেরী বীত উমর হরি নাম বিনা,

কূপ নীর বিনা, ধেনু ক্ষীর বিনা, ধরতী মেহ বিনা।

জ্যাম্সে, তরুবর ফলবিনা হীনা, ত্যয়সে প্রাণী হরি নাম বিনা ৷৷

দেহ নয়না বিনা, রৈনা চন্দ বিনা, মন্দির দীপ বিনা,

জ্যসে পণ্ডিত বেদ হীনা, ত্যয়সে প্রাণী হরি নাম বিনা ৷৷

কাম-ক্রোধ-মদ-লোভ-নিহারো ছোড় বিরোধ তু সন্ত জনা।

কহে নানক শা, সুন ভগবন্ত ইয় জগমে নহি কোই আপনা ৷৷

-নানক

ধীর সমীরে গাও রে গভীরে পরাণ


খাম্বাজ—একতালা

ধীর সমীরে গাও রে গভীরে পরাণ ভরিয়ে হরি-গুণ-গান ।

মাতিবে, মাতাবে, এ বিশ্বে মোহিবে, দেহে সঞ্চারিবে নব নব প্রাণ ॥

জীবের দুর্গতি হেরিয়ে নয়নে আনিয়াছে গোরা এ নাম ভুবনে;

রোগে-শোকে-আদি সংসারদহনে পাবে শান্তি, কর নামসুধা পান ৷

ভবতাপে, যার হৃদি জ্ব’লে যায়, জুড়াইবে হৃদি এ-নামসুধায়,

অশান্তি-অনল দূরে চলে যায়, খুলে যায় প্রাণে অমৃতধাম ৷৷

—অজ্ঞাত

হরি হে তুমি আমার সকল হবে কবে

মিশ্র সাহানা—দাদরা*


হরি হে, তুমি আমার সকল হবে কবে?

আমার মনের মাঝে, ভবের কাজে মালিক হ’য়ে র’বে—কবে?

আমার সকল সুখে সকল দুখে তোমার চরণ ধরব বুকে;

কণ্ঠ আমার সকল কথায় তোমার কথাই ক’বে।

কিন্তু যাহা ভবের হাটে, আনব তোমার চরণ-বাটে;

তোমার কাছে, হে মহাজন, সবই বাঁধা র’বে—কবে?

আমি স্বার্থ-প্রাচীর ক’রে খাড়া, গড়ব যবে আপন কারা

বজ্র হ’য়ে তুমি তারে ভাবে ভীষণ রবে ৷

পায়ে যখন ঠেল্‌বে সবাই, তোমার পায়ে পাইব ঠাঁই;

জগতের সকল আপন হ’তে আপন হবে—কবে?

শেষে ফিরব যখন সন্ধ্যাবেলা সাঙ্গ ক’রে ভবের খেলা,

জননী হ’য়ে তখন কোল বাড়ায়ে ল’বে ॥

                              

—অতুলপ্রসাদ সেন



* স্বরলিপি : কাকলি—১

হরি হরি বলরে বীণে

দেওগিরি—একতাল


হরি হরি বলরে বীণে

শ্রীহরির চরণ বিনে পরম তত্ত্ব আর পাবিনে ৷৷

হরিনামে তাপ হরে, মুখে বল হরে কৃষ্ণ হরে,

হরি যদি কৃপা করে তবে ভবে আর ভাবিনে।

বীণে একবার হরি বল, হরি নাম বিনে নাহি সম্বল,

দাস গোবিন্দ কয়, দিন গেল, অকূলে যেন ভাসিনে ৷

—গোবিন্দ রায়

ঠাকুর তুম্ দরশনমে আয়া

মানড-কাহারবা


ঠাকুর, তুম্ দরশনমে আয়া।

উতর গয়াে মেরে মনকা সংশয়, জব তেরা দরশন পায়া।

অনবােলত মেরী বিরথা জানি, আপনা নাম জপায়া ॥

দুঃখ নাসে সুখ সহজ সমায়ে, আনন্দ আনন্দ গুণ গায়া ৷৷

বাঁহ পকড় লীনি জানি জন, অপনাে গেহ অন্ধকূপতে মায়া।

কহ নানক গুরু বন্ধন কাটে, বিছুরত আন মিলায়া ।

-নানক

কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব

বেহাগ-কাওয়ালী


কবে, তৃষিত এ মরু, ছাড়িয়া যাইব, তােমারি রসাল নন্দনে,

কবে, তাপিত এ চিত করিব শীতল, তােমারি করুণা-চন্দনে।

কবে তােমাতে হয়ে যাব আমার আমি হারা,

তােমার নাম নিতে নয়নে ব’বে ধারা,

এ দেহ শিহরিবে ব্যাকুল হবে প্রাণ বিপুল পুলক-স্পন্দনে ৷

কবে, ভবের সুখ দুঃখ চরণে দলিয়া

যাত্ৰা করিব গাে, শ্রীহরি বলিয়া,

চরণ টলিবে না, হৃদয় গলিবে না, কাহারাে আকুল-ক্রন্দনে ॥

-রজনীকান্ত সেন

কতদিনে হবে প্রেমের সঞ্চার

সুরট-মল্লার—একতাল*


কতদিনে হবে প্রেমের সঞ্চার।

হয়ে পূর্ণকাম, বলব হরি নাম, নয়নে বহিবে প্রেম অশ্রুধার ।

কবে হবে আমার শুদ্ধ প্রাণমন, কবে যাব আমি প্রেমের বৃন্দাবন,

সংসার বন্ধন হইবে মােচন, জ্ঞানাঞ্জনে যাবে লােচন আঁধার।

কবে পরশমণি করি পরশন, লৌহময় দেহ হইবে কাঞ্চন,

হরিময় বিশ্ব করিব দর্শন, লুটাইব ভক্তি পথে অনিবার।

কবে যাবে আমার ধরম করম, কবে যাবে জাতি কুলের ভরম,

কবে যাবে ভয় ভাবনা সরম, পরিহরি অভিমান লােকাচার ।

মাখি সর্ব অঙ্গে ভক্ত পদ ধূলি কাঁধে লয়ে চির বৈরাগ্যের ঝুলি,

পিব প্রেম বারি দুই হাতে তুলি, অঞ্জলি অঞ্জলি প্রেম যমুনার।

প্রেমে পাগল হয়ে হাসিব কাদিব, সচ্চিদানন্দ সাগরে ভাসিব,

আপনি মাতিয়ে সকলে মাতাব, হরিপদে নিত্য করিব বিহার ।

-নীলকণ্ঠ মুখােপাধ্যায




়* স্বরলিপি : শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

হরি রস মদিরা পিয়ে মম মানস

কীর্তন—একতাল **


হরি-রস-মদিরা পিয়ে মম মানস, মাত রে।

(একবার) লুটহ অবনীতল, হরি হরি বলি কঁাদ রে ॥

গভীর নিনাদে হরি নামে গগন ছাও রে

নাচো হরি বলে, দু বাহু তুলে, হরি নাম বিলাও রে।

হরি-প্রেমানন্দ-রসে অনুদিন ভাস রে,

গাও হরিনাম, হও পূর্ণকাম, নীচ বাসনা নাশ রে ॥

—পুণ্ডরীকাক্ষ মুখােপাধ্যায়



** স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

১ গতি কর বলে।

২ লােকের দ্বারে দ্বারে


হৃদি বৃন্দাবনে বাস যদি কর কমলাপতি

কীর্তনের সুর-ঝাঁপতাল*


হৃদি বৃন্দাবনে বাস যদি কর কমলাপতি।

ওহে ভক্তিপ্রিয়, আমার ভক্তি হবে রাধাসতী ॥

মুক্তি কামনা আমারি, হবে বৃন্দে গােপনারী,

দেহ হবে নন্দের পুরী, স্নেহ হবে মা যশােমতী ॥

আমায় ধর ধর জনার্দন, পাপভার গােবর্ধন,

কামাদি ছয় কংসচরে, ধ্বংস কর সম্প্রতি;

বাজায়ে কৃপা বাঁশরী, মন-ধেনুরে বশ করি,

তিষ্ঠ হৃদি-গােষ্ঠে পুরাও ইষ্ট এই মিনতি।

প্রেমরূপ যমুনা কূলে,

আশা বংশী বট মূলে,

স্বদাস ভেবে সদয় ভাবে সতত কর বসতি।

যদি বল রাখাল প্রেমে,

বন্দী থাকি ব্রজ ধামে,

জ্ঞানহীন রাখাল তােমার, দাস হবে হে দাশরথি |

—দাশরথি রায়



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

হরি বিন তেরা কৌন সহাই

আশােয়ারী—কাওয়ালী


হরি বিন তেরা কৌন সহাই।

হরি বিন কা কী মাতপিতাসুত বনিতা কো কা কো ভাই।

ধন ধরণী অরু সম্পদ নগরী জো মান্যো আপনাই।

তন ছুটে কছু সৌন্স ন চলে কহাঁ তাহি লপটাই ।

-অজ্ঞাত

আমি মুক্তি দিতে কাতর নই

মনােহরসাহী—ঝাঁপতাল


আমি মুক্তি দিতে কাতর নই,

শুদ্ধা ভক্তি দিতে কাতর হই (গাে)।

আমার ভক্তি যেবা পায়, তারে কেবা পায়,

সে যে সেবা পায়, হয়ে ত্রিলােক জয়ী ॥

শুন চন্দ্রাবলী ভক্তির কথা কই,

মুক্তি মিলে কভু ভক্তি মিলে কই।

ভক্তির কারণে পাতাল ভবনে,

বলির দ্বারে আমি দ্বারী হয়ে রই ।

শুদ্ধা ভক্তি এক আছে বৃন্দাবনে,

গােপ গােপী বিনে অন্যে নাহি জানে।

ভক্তির কারণে নন্দের ভবনে,

পিতা জ্ঞানে নন্দের বাধা মাথায় বই।

—অজ্ঞাত

খেলার ছলে হরি ঠাকুর গড়েছেন এই জগৎখানা

মিশ্র খাম্বাজ-একতাল


খেলার ছলে হরি ঠাকুর গড়েছেন এই জগৎখানা ।

চারদিকে সব খেলার মেলা, খেলা শুধু 'আনাগােনা ।

খেলতে খেলা ভবের পাশে, কোখেকে সব মানুষ আসে,

খানিক খেলে খেলা ফেলে কোথায় যে যায় যায়না জানা।

-অজ্ঞাত

কেন বঞ্চিত হব চরণে

মিশ্র খাম্বাজ-একতাল*


কেন বঞ্চিত হব চরণে?

আমি, কত আশা করে বসে আছি, পাব জীবনে, না হয় মরণে।

আহা, তাই যদি নাহি হবে গাে,

পাতকী-তারণ-তরীতে তাপিত আতুরে তুলে না লবে গাে;

হয়ে পথের ধূলায় অন্ধ, এসে দেখিব কি খেয়া বন্ধ ?

তবে পারে বসে ‘পার কর’ বলে, পাপী কেন ডাকে দীন-শরণে?

আমি শুনেছি, হে তৃষা-হারি!

তুমি, এনে দাও তারে প্রেম-অমৃত, তৃষিত যে চাহে বারি;

তুমি, আপনা হইতে হও আপনার, যার কেহ নাই, তুমি আছ তার;

এ কি সব মিছে কথা? ভাবিতে যে ব্যথা বড় বাজে, প্রভু, মরমে ।

—রজনীকান্ত সেন


* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৫

এমন মধুমাখা হরিনাম নিমাই

কীর্তন—একতাল


এমন মধুমাখা হরিনাম নিমাই কোথা হতে এনেছে।

নাম একবার শুনে হৃদয়বীণে অমনি বেজে উঠেছে।

বহুদিন শ্রবণে শুনেছি ঐ নাম, কভু ত এমন করেনি পরাণ,

আজ কি যেন কি এক নব ভাবােদয়, হৃদয় মাঝারে হতেছে ।

কেটে গেছে বিষয় নয়নের ঘাের, গলে গেছে কঠিন হৃদয় মাের,

আজ কি যেন কি এক উজল জগতে, আমায় নিয়ে চলেছে।

আজ হ’তে নিমাই তাের সঙ্গে রব, জ্ঞানের গরব আর না করিব,

আজ সব ছেড়ে দিয়ে হরি হরি বলে, নাচিতে বাসনা হতেছে ।

কে যেন কহিছে মাের কানে কানে, পারের উপায় হল এতদিনে,

আজ প্রেমের পসরা ধরি নিজ শিরে, প্রেমের ঠাকুর এসেছে ।

—স্বামী সচ্চিদানন্দ

সুমরণ হরিকো করােরে যাসে হােবে ভবপার

পূরিয়া-সরফক্তা


সুমরণ হরিকো করােরে যাসে হােবে ভবপার,

রহ শিক জান মান কহ্যো হ্যায় পুরাণ, মাে ভগবান আপ করতার ।

দীনবন্ধু দয়াসিন্ধু, পতিতপাবন, আনন্দক-তােসে-কহত হুঁ পুকার;

তানসেন কহে নিরমল সদা রহিয়ে, নর দেহ ন হাে বার বার ।

--মিঞা তানসেন

ও হে হরি দিন তাে গেল সন্ধ্যা হল

বাউল—একতাল


ও হে (হরি), দিন তাে গেল, সন্ধ্যা হল, পার কর আমারে।

তুমি পারের কর্তা, শুনে বার্তা, ডাকি হে তােমারে ৷

আমি আগে এসে, ঘাটে রইলাম বসে,

(ও হে আমায় কি পার করবে না হে; আমি অধম বলে)

যারা পাছে এল, আগে গেল, আমি রইলাম পড়ে ।

যাদের পথের সম্বল, আছে সাধনার বল,

(তারা পারে গেল, আপন আপন বলে হে)

আমি সাধনহীন, তাই র’লেম র’লেম পড়ে হে)

তারা সাধন-বলে গেল চলে অকূল পারাবারে ||

শুনি কড়ি নাই যার, তারেও কর তারে পার,

(আমি সেই কথা শুনে, ঘাটে এলাম হে)

(দয়াময় নামে ভরসা বেঁধে হে)

আমি দীন ভিখারী, নাইকো কড়ি, দেখ ঝুলি ঝেড়ে।

আমার পথের সম্বল, দয়াল নামটি কেবল,

(তাই দয়াময় বলে ডাকি তােমায় হে; অধমতারণ বলে)

অধম কেঁদে আকুল, পড়ে আকূল পাথারে, সাঁতারে ||

—হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল ফিকির চাদ)

কবে তব দরশনে হে প্রেমের হরি

আলেয়া-জয়জয়ন্তী—ঝাঁপতাল


কবে তব দরশনে হে প্রেমের হরি।

কবে উথলিবে হৃদিমাঝে চিদানন্দলহরী ।

(সে দিন আমার কবে হবে ইত্যাদি)

তনু হবে রােমাঞ্চিত,

প্রাণমন পুলকিত,

ভাবরসে বিবশ হয়ে

নয়নে বহিবে বারি (ওরূপমাধুরী হেরি) ।

তােমার প্রেমমূরতি, নিরমল মুখ-জ্যোতি,

নিরখিব প্রাণ ভরি (ভাবে প্রেমে মগ্ন হয়ে)।

সব সাধ মিটাইব, স্পর্শ আলিঙ্গন করি।

—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল

হরি বল হরি বল হরি বল ভাইরে

কীর্তন—ঝাঁপতাল


হরি বল, হরি বল, হরি বল ভাইরে ॥

হরিনাম তরণী বিনে, অন্য গতি নাই রে ॥

অপবিত্র পবিত্র বা যে ভাবে যে থাক,

হৃদয় খুলে বাহু তুলে হরি বলে ডাক,

আছে যত পাপরাশি, নাম তরঙ্গে যাবে ভাসি,

উদয় হবেন জ্ঞান-শশী, অন্ধকার যাবে দূরে ॥

হরে কৃষ্ণ হরে রাম মুকুন্দ মুরারে, মাধব মধুসূদন, মধুকৈটভারে

গােপাল গােবিন্দ রাম,

কেশব করুণাধাম,

বল বল বল অবিরাম, (আয় ভাই)

হরি নাম সুধারসে তাপিত প্রাণ জুড়াই রে ॥

—অজ্ঞাত

চিন্তয় মম মানস হরি

কীর্তন—একতাল*


চিন্তয় মম মানস হরি চিদঘন নিরঞ্জন।

কিবা, অনুপম ভাতি, মােহন মূরতি, ভকত-হৃদয়-রঞ্জন।

নবরাগে রঞ্জিত, কোটি শশী বিনিন্দিত,

কিবা বিজলী চমকে, সেরূপ আলােকে, পুলকে, শিহরে জীবন।

হৃদি-কমলাসনে,

ভাব তার চরণ,

দেখ শান্ত মনে, প্রেম নয়নে, অপরূপ প্রিয়-দর্শন।

চিদানন্দ-রসে, ভক্তিযােগাবেশে, হও রে চির মগন ।

—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত।

আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে

পিলু-দাদরা**


আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাই।

দু’জন যদি হত আপন, হত না মাের আপন সবাই।

নিত্য আমি অনিত্যরে, আঁকড়ে ছিলাম রুদ্ধ ঘরে,

কেড়ে নিলে দয়া করে, তাই হে চির, তােমারে চাই।

সবাই যেচে দিত যখন, গরব করে নিই নি তখন,

পরে আমায় কাঙাল পেয়ে ব’লত সবাই, নাই গাে নাই।

তােমার চরণ পেয়ে হরি, আজকে আমি হেসে মরি।

কী ছাই নিয়ে ছিলাম আমি, হায় রে, কী ধন চাহি নাই ।

—অতুলপ্রসাদ সেন

** স্বরলিপি : কাকলি—১

আয়রে আয় জগাই মাধাই

কীর্তন—একতাল


আয়রে আয় জগাই, মাধাই, জয় হরি বলে।

জয় হরি বলে, রে মাধাই, জয় হরি বলে।

এমন মধুমাখা নাম,

নিলে জুড়ায় তাপিত প্রাণ,

হউক না কেন পাষাণ হৃদয় নামেতে যাবে গলে।

নামের মহিমা অপার

তাতে নাইকো জাতৃ-বিচার,

গােলােক হতে গৌর নিতাই এনেছে রে ভূতলে ।

এমন দয়াল কে আছে,

বিনামূল্যে প্রেম যাচে,

তােরা নেচে নেচে আয়রে দু’ভাই নামের নিশান তুলে।

—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা

মিশ্র—দাদরা


আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা, আমি যে পথ চিনি না।

তােমারি উপর করিনু নির্ভর, তােমা বই কারও জানি না।

আজ হতে তুমি হৃদয়ের রাজা, তােমারেই আমি করিব গাে পূজা।

সন্দেহের কণা কিছু রাখিবনা, কারও কথা আমি মানি না।

—ধীরেন চট্টোপাধ্যায়

দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতর

ঝিঝিট—একতাল


দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু  কৃপাবিন্দু বিতর

(মম) হৃদি-বৃন্দাবনে কমল-আসনে প্রাণমন সনে বিহর ।

নয়ন মুদি বা চাহিদা থাকি, অথবা যে দিকে ফিরাই আঁখি

ভিতরে বাহিরে যেন হে নিরখি তব রূপ মনােহর।

এই কর হরি দীন-দয়াময় তুমি আমি যেন দুটি নাহি রয়,

জলের তরঙ্গ জলে কর লয়, চিৰ্ঘন শ্যামসুন্দর ।

ঐ পদে, ‘পরিব্রাজকের’ গতি যেন ভাগীরথীর সাগর-সংহতি,

জীব শিব দোঁহে অভেদ মূরতি, জীব নদী, তুমি সাগর ।

—স্বামী কৃষ্ণানন্দ

হরি বলরে আনন্দে সবে

কীর্তন—লােফা


হরি বলরে আনন্দে সবে বল্ হরি বল্।

এ নাম কোথায় ছিল, কে অনিল, বল্ হরি বল্ ৷৷

এ নাম ব্রহ্মা জপেন চতুর্মুখে বল্ হরি বল্।

এ নাম শিব জপেন পঞ্চমুখে বল্ হরি বল্ ॥

এ নাম নারদ জপেন বীণাযন্ত্রে ব

এ নাম গােলকে গােপনে ছিল বল্ হরি বল্।

এ নাম যতই বলাে ততই ভাল বল্ হরি বল্।

নামে যেদিন গেল সেদিন ভাল বল্ হরি বল্ ॥

—অজ্ঞাত

অভেদ সঙ্গীত

ধবল তুষার জিনি সিত শুভ্র কলেবর

ভৈরবী-ধামার


ধবল তুষার জিনি

সিত শুভ্র কলেবর,

কনক বরণী সনে নেহার হে দিগম্বর ।

ফণীমালা মণিমালা ঝলকে উজ্জ্বল জ্বালা

রাজীব চরণ দল, ক্ষরে তাহে রবিকর ।

দুগ্ধময়ী বারি মাঝে, মকরবাহিনী রাজে

নলিনী ভূষিতা ঐ বরাভয়া বামা হের ॥

—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

বনফুল ভূষণ শ্যাম মুরলীধর

দেশ-কাওয়ালী


বনফুল-ভূষণ        শ্যাম মুরলীধর

গােপিনী-রঞ্জন        বিপিনবিহারী ॥

বিভূতিছাদন            বিষাণবাদন,

ঈশান ভীষণ        শ্মশানচারী ॥

দুকুল চোরা            রাসরসিকবর,

উলঙ্গ ভৈরব        ধূর্জটি স্মর-হর ॥

রুনুরুনু ঝুনুঝুনু মঞ্জির গুঞ্জন,

ডমরু ডিমি ডিমি তাণ্ডব নর্তন।

মনােন্মাদিনী রঙ্গিণী

গােপিনী মােহন মান ভিখারি

মৃড় চন্দ্রচূড়        হাড়মাল গল,

জটা-তরঙ্গিত জাহ্নবী বারি ॥

—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

জাননা রে মন পরম কারণ

ঝিঝিট-খাম্বাজ—একতাল


জাননা রে মন, পরম কারণ,

কালী কেবল মেয়ে নয়।

মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ, কখন কখন পুরুষ হয় ।

হয়ে এলােকেশী, করে লয়ে অসি, দনুজ-তনয়ে করে সভয়,

(কভু) ব্রজপুর আসি, বাজাইয়া বাঁশি ব্রজাঙ্গনার মন হরিয়ে লয় ৷

কভু বাঁধে ধড়া কভু বাঁধে চূড়া ময়ূরপুচ্ছ শােভিত তায়।

কখন পার্বতী, কখন শ্ৰীমতী, কখন রামের জানকী হয় ।

ত্রিগুণ ধারণ করিয়ে কখন

করয়ে সৃজন পালন লয়।

(কভু) আপনার মায়ায় আপনি বাঁধা, যতনে এ ভব যাতনা সয় ।

যে রূপে যে জনা করয়ে ভাবনা সেইরূপে তার মানসে রয়;

কমলাকান্তের হৃদি-সরােবরে কমলে-কামিনী উদয় হয় ।

—কমলাকান্ত চক্রবর্তী

আজ কেন কালী কদম্বের মূলে

সুরট-মল্লার—একতাল


আজ কেন কালী কদম্বের মূলে

নরশির হার লুকালি কোথায়, বনফুল মালা কে দিল গলে ।

রঙ্গিনী সঙ্গিনী ডাকিনী যােগিনী কোথায় লুকালে,

বামকরে অসি, শ্যামা মুক্তকেশী, মােহন চূড়া বাঁশী রাধা রাধা বলে ।

—অজ্ঞাত

যশােদা নাচাতাে গাে মা বলে নীলমণি

পিলু-একতাল*


যশােদা নাচাতাে গাে মা বলে নীলমণি;

সে রূপ লুকালে কোথা করালবদনী (শ্যামা)?

একবার নাচ গাে শ্যামা,

হাসি বাঁশী মিশাইয়ে নাচ গাে শ্যামা, (মুণ্ডমালা ছেড়ে, বনমালা পরে),

(অসি ছেড়ে বাঁশি লয়ে), (আড়নয়নে চেয়ে চেয়ে),

(গজমতি নাসায় দুলুক);

মা যশােদার সাজানাে বেশে, অলকা আবৃত মুখে,

অষ্টনায়িকা অষ্ট সখা হােক;

যেমন করে রাসমণ্ডলে নেচেছিলি,

হৃদি-বৃন্দাবন-মাঝে, ললিত ত্রিভঙ্গ-ঠামে,

চরণে চরণ দিয়ে, গােপীর মন-ভুলানাে বেশে একবার নাচ গাে শ্যামা,

তেমনি তেমনি তেমনি করে;

(দেখে নয়ন সফল করি) বড় সাধ আছে মনে;

তাের শিব বলরাম হােক্, (হেরি নীলগিরি আর রজতগিরি)

একবার বাজা গাে মা—সেই মােহন বেণু,

যে বেণুর রবে ধেনু ফিরাতিস

যে বেণুরবে যমুনা উজান বয়;

(বাজুক তাের বেণু বলায়ের শিঙ্গে।)

শ্রীদামের সঙ্গে নাচিতে ত্রিভঙ্গে গাে মা;

তাথেইয়া তাথেইয়া, তা তা থেই থেই বাজত নূপুর-ধ্বনি।

শুনতে পেয়ে, আসতাে ধেয়ে যত ব্ৰজের রমনী ।। (গাে মা)

গগনে বেলা বাড়িত, রাণীর মন ব্যাকুল হতাে,

বলে, ধর ধর, ধর ধর রে গােপাল, ক্ষীর সর ননী’

এলায়ে চঁাচর কেশ, রাণী বেঁধে দিত বেণী গাে মা।

—কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন

(পরবর্তী কালে স্বামী কৃষ্ণানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণের সমসাময়িক)


*কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত শাক্ত পদাবলী (চয়ন) অনুযায়ী গানখানির রচয়িতা রামপ্রসাদ সেন, কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন নয়।

কালী হলি মা রাসবিহারী

জংলা-একতাল *


কালী হলি মা রাসবিহারী নটবর বেশে বৃন্দাবনে এসে।

পৃথক প্রণব নানা লীলা তব, কে বুঝে একথা বিষম ভারী।

নিজ তনু আধা,

গুণবতী রাধা,

আপনি পুরুষ, আপনি নারী।

ছিল বিবসন কটি এবে পীত ধটী, এলােচুল চূড়া বংশীধারী।

আগেতে কুটিল নয়ন অপাঙ্গে মােহিত করেছ ত্রিপুরারি।

এবে নিজে কাল, তনু রেখা ভাল, ভুলালে নাগরী নয়ন ঠারি ।

ছিল ঘন ঘন হাস্, ত্রিভুবন ত্রাস, এবে মৃদুহাস, ভুলে ব্রজকুমারী ॥

(আগে) শােণিত-সায়রে নেচেছিলে শ্যামা, এবে প্রিয় তব যমুনাবারি ।

প্রসাদ হাসিছে, সরসে ভাসিছে, বুঝেছি জননী মনে বিচারি—

মহাকাল কানু, শ্যামা শ্যাম-তনু, একই সকল, বুঝিতে নারি ।

—রামপ্রসাদ সেন




* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

বংশীধর পিনাকধর গঙ্গাধর গিরিধর

শ্রী-চৌতাল


বংশীধর, পিনাকধর, গঙ্গাধর, গিরিধর।

জটাধর, মুকুটধর, রাজত হরিহর।

চন্দনধর, ভস্মধর, পীতাম্বর, মৃগচর্মাম্বর।

চক্রধর, ত্রিশূলধর, মূরহর, শঙ্কর ৷

সুধাধর, বিষধর, গরুড়াসন, বৃষবাহন।

মানধর, পরমেশ্বর, ঈশ্বর ৷৷

কহে মিঞা তানসেন তুম দ্বৌ স্বরূপ এক,

মুঝে কৃপা কর শির পর অভি কর ।

—মিঞা তানসেন

শ্রীশ্রীরামচন্দ্র সঙ্গীত

ধ্যান

ওঁ নব-তৃণদল-বৰ্ণং পঙ্কজাক্ষং স্মিতাস্যং

করধৃত-শরচাপং    রত্ন-সিংহাসনস্থম্ ।

শিরসি মুকুট-শােভং জানকীবামভাগং

হৃদয়-সরসিরুহে ভাবয়েদ্রামরূপম্ ॥

শ্রীনাথে জানকীনাথে অভেদঃ পরমাত্মনি।

তথাপি মম সর্বস্ব রামঃ কমললােচনঃ।

প্রণাম

রামায় রামচন্দ্রায়        রামভদ্রায় বেধসে।

    রঘুনাথায় নাথায়        সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ ॥

ভজ মন রাম

দুর্গা-ঝাঁপতাল


ভজ মন রাম।

সুন্দর শ্যামলরূপ মনােহর গুণধাম।

সকল রিপু-নাশন, ধনুধারী নারায়ণ,

যােগী ভােলা নৃত্য করে গাহে রাম রাম ।


—নিশিকান্ত চক্রবর্তী

ওরে কুশীলব করিস কি গৌরব

খট ভৈরবী—একতাল


ওরে কুশীলব! করিস কি গৌরব, বাঁধা না দিলে কি পারিতে বাঁধতে।

ভব-বন্ধন বারণ-কারণ, শােন বিবরণ রে জ্ঞানহীন;

আমি অনেক দিন বাঁধা আছি, মা জানকীর চরণ প্রান্তে।

ভবচিন্তাহারী প্রতি আমি রত, প্রাণ দিয়েছি পদ প্রান্তে অবিরত,

আমি চিন্তামণির প্রিয়সুত, ওরে চিন্তমণিসুত, পারােনা চিনতে ।


—দাশরথি রায়

গুরু কৃপাঞ্জন পায়াে মেরে ভাই

পিলু-বারােয়া—যৎ*


গুরু কৃপাঞ্জন পায়াে মেরে ভাই, রাম বিনা কছু জানত নাহী।

অন্তর রাম বাহির রাম, জঁহা দেখাে সব রামহী রাম ।

জাগত রাম, সােবত রাম, স্বপনমে দেখাে রাজা রাম।

এক জনার্দন ভাবহী নীকা, জো দেখাে সসা রাম সরীখা ।


-একনাথ


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

ভজু মন রাম চরণ দিন রাতি

সােহিনী—কাওয়ালী


ভজু মন রাম চরণ দিন রাতি।

রসনা কস ন ভজো কুঁ হরিপদ সুমিরত কুঁ অলসাতি।

জাকে কহত দহত দুঃখ দারুণ, সুনত্রয়তাপ বুঝতি।

সুনত সুযশ সুশীল সাে হরিজন, দেত সুলাহ সােহাতি ।

রামচন্দ্রকে নাম অমিয় রস, সাে রস কাহে ন খাতি।

তুলসীদাস য়হ বিনয় করতু হৈ, প্রথম আরজ কী পাতি ।


—তুসলীদাস

সীতাপতি রামচন্দ্র রঘুপতি রঘুরাঈ

ঝিঝিট—একতাল*


সীতাপতি রামচন্দ্র,

রঘুপতি রঘুরাঈ।

ভজলে অযােধ্যানাথ

দুসরা ন কোঈ ।

রসনা রস নাম লেত, সন্তনকো দরশ দেত।

বিসিত মুখচন্দ্র বিন্দু

সুন্দর সুখ দাই।

হসন বােলন চতুর চাল, অয়ন বয়ান দৃগ-বিশাল।

কুটি-কুটিল তিলক-ভাল

নাসিকা সুহাই।

কেশরকো তিলক ভাল, মানাে রবি প্রাতঃকাল।

মানাে গিরি শিখর ফোড়ি, সুরসরি বহিরাঙ্গ ।

মােতিনকো কণ্ঠমাল, তারাগণ উর বিশাল।

শ্রবণ-কুণ্ডল ঝলমলাত, রতি-পতি ছবি ছাঈ৷৷

সখা সহিত সরযূতীর, বিহরে রঘুবংশ বীর।

তুলসীদাস হরষ নিরখি চরণ রজ পান ।


—তুলসীদাস


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

জয় রঘুনন্দন রাম নিরঞ্জন

গৌড়-সারঙ্গ—কাওয়ালী


জয় রঘুনন্দন,

রাম নিরঞ্জন, জনতা রতিকান্ত

সুর-নর-বানর, খেচর নিশাচর, যছুগুণ গাবে অনন্ত;

দূর্বাদল নব,

শ্যামল সুন্দর,

কঞ্জ-নয়ন রণ-ধীর!

বামে ধনুর্ধর, দক্ষে নিশিত শর, জলধি-কোটি-গম্ভীর

ধর ভরতানুজ, চামর ছত্র নাে ধারী।

শিব চতুরানন,

সনক সনাতন,

শতমুখ রহ করজোড়ী

ভকত-আনন্দন, মারুত-নন্দন, চরণ কমল করু সেবা।

গােবিন্দদাস,

হৃদয় নিবাস,

হরি নারায়ণ দেবা।


—গােবিন্দদাস

শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু ভজু মন

ইমন-কল্যাণ তেওরা


শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু ভজু মন, হরণ-ভব-ভয়-দারুণ।

নব-কঞ্জ-লােচন, কঞ্জ মুখ-কর, কঞ্জ-পদ কঞ্জারুণম্ ॥

কন্দর্প অগণিত অমিত ছবি নব নীল-নীরজ-সুন্দর।

পট পীত মান তড়িত রুচি শুচি নৌমি জনক-সুতাবরম্ ।

ভজ দীনবন্ধু দীনেশ দানব-দৈত্য বংশ-নিকনম্ ॥

রঘুনন্দ আনন্দ-কন্দ কৌশল-চন্দ্র দশরথ-নন্দন ॥

শির মুকুট কুণ্ডল তিলক চারু উদার অঙ্গ-বিভূষণম্।

আজানু-ভুজ শর-চাপ-ধর, সংগ্রাম-জিত খর-দূষণম্ ।

ইতি বদত তুলসীদাস শঙ্কর-শেষ-মুনিমনরঞ্জন

মম হৃদয়-কুঞ্জ নিবাস কুরু কামাদি-খল-দল-গঞ্জনম্ ।


—তুলসীদাস

চল ভাই ভার ল’য়ে যাই অযােধ্যায়

পিলু-বারোঁয়া—পােস্তা*


চল ভাই ভার ল’য়ে যাই অযােধ্যায় রাম রাজা হবে।

দিব তার চরণে ভার, রাম বিনে ভার কে আর লবে ।

দিয়ে ভার লয়ে শরণ, বলব তার ধরে চরণ,

এবার ভার লইলাম যেমন হরি সে ভার দিও না ভবে ।

ত্রিতাপে জীবন ভারি, আর ভার সইতে নারি,

না ভজে ভূভারহারী, ভার হ’ল ভার বইতে ভবে ।


—[গিরিশচন্দ্র ঘােষ]

দাশরথি রায়

(সঙ্গীত কল্পতরু অনুযায়ী)


* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

জয় জয় রাম সিয়া রাম সিয়া রাম

কীর্তন (ঝুমুর)—গড়-খেম্টা


জয় জয়, রাম সিয়া, রাম সিয়া, রাম সিয়া রাম।

সিয়া রামহী আধার, জানে সারা সংসার,

দেখাে দিল মে বিচার ॥

উনকি মহিমা অপার, কোই পাবে না পার,

গুণ গাবে হাজার ॥

হরণ ধরণীকে ভার, লিয়ে নর কে অবতার,

নমাে দশরথকুমার।

কানে কুণ্ডল বিশাল,

তিলক-শােভে জাকে ভাল,

লটপট পাগিয়া রসাল ॥

শ্রীদশরথ কে লাল, কোশল-পালক কৃপাল,

রাজীব লােচন বিশাল ॥


—অজ্ঞাত

ঠুমকি চলত রামচন্দ্র বাজত পজৈনিয়া

ঝিঝিট-খাম্বাজ—একতাল*


ঠুমকি চলত রামচন্দ্র বাজত পজৈনিয়া

কিলকিলাই উঠত ধায়, গিরত ভূমি লটপটায়;

ধায়ী মাতু গােদ লেত দশরথকী রানিয়া।

তুলসীদাস অতি আনন্দ, হেরত মুখারবিন্দ;

রঘুবরকী ছবি সমান রঘুবর ছবি বাণিয়া ।

অঙ্গ রজঃ অঙ্গলাই,

বিবিধ ভাতি সোঁ দুলার।

তন মন ধন বার বার কহত মৃদু বাণিয়া ॥

                            

—তুলসীদাস


* স্বরলিপি ঃ শত-ভজন-মালা

ইতনী মিনতি রঘুনন্দন সে

সিন্ধু-খাম্বাজ—কাওয়ালী


ইতনী মিনতি রঘুনন্দন সে দুঃখ-দ্বন্দ্ব হামারা মিটাও জী;

অপনে পদ-পঙ্কজ-পিঞ্জরমে চিত-হংস হামারা বৈঠাও জী ॥

তুলসীদাস কহে কর জোড়ি ভব-সাগর পার উতারোজী ॥


—তুলসীদাস

মঙ্গল মূরতি মারুত নন্দন

গৌরী—কাওয়ালী * 


মঙ্গল মূরতি মারুত নন্দন, সকল অমঙ্গল-মূল-নিকন্দন।

পবন-তনয় সত্তন-হিতকারী, হৃদয় বিরাজিত অওধবিহারী ॥

মাতু-পিতা-গুরু-গণপতি শারদ, শিবাসমেত শম্ভু-শুক-নারদ;

চরণ বন্দি বিনবোঁ সব কাহু, দেও ম-পদ নেহ নিবাহু;

বন্দৌ রাম-লক্ষণ-বৈদেহী, যে তুলসীকে পরম সনেহী ॥


—তুলসীদাস



* স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত

সুমরণ কীজে রামচন্দকো

ইমন্—তিনতাল


সুমরণ কীজে রামচন্দকো, ত্রিভুবন বন্দন করত হ্যায় জাকো।

রঘুবর সুন্দর রাজ রাজেশ্বর, গুণ বরণন কর ক্যাসেকে তাকো ৷৷


—সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাম রাম জপুজীহ সদা সানুরাগ রে

ঝিঁঝিট-খাম্বাজ—একতাল


রাম রাম জপুজীহ, সদা সানুরাগ রে।

কলি ন বিরাগ যোগ জাগ তপ ত্যাগ রে ॥

রাম নাম সুমরণ, সব বিধিহী কো রাজ রে।

নাম কো বিসারিবো, নিষেদ শিরতাজ রে।

রাম নাম কামতরু দেত ফল চার রে।

কহত পুরাণ বেদ, পণ্ডিত পূরবি রে ॥

রাম নাম মহামণি, ফণী জগ জাল রে ॥

মনি বিনু ফণী জিয়ে, ব্যাকুল বিহাল রে |

রাম নাম প্রেম পরমারথ কো সার রে।

রাম নাম তুলসী কো জীবন-আধার রে ॥


—তুলসীদাস

অরে মন সমঝ সমঝ পগ ধরিয়ে

আশোয়ারী—তিনতাল


অরে, মন সমঝ সমঝ পগ ধরিয়ে;

অরে মন ইস জগমেঁ নহিঁ অপনা কোঈ ৷

পরছাঈ সোঁ ডরিয়ে ৷

দৌলত দুনিয়া কুটুম কবীলা।

ইনসোঁ নেহন কবহু ন করিয়ে;

রামনাম সুখধাম জগত ম্যে

সুমরণ সোঁ জগ তরিয়ে ॥

—অজ্ঞাত

ভজ মন রাম চরণ সুখদায়ী

ভৈরবী—তিনতাল


ভজ মন রাম চরণ সুখদায়ী।

জিহি চরণসে নিকসী সুরসরী শঙ্কর জটা সমাই।

জটা শঙ্করী নাম পরো হ্যয়, ত্রিভুবন তারণ আই।

জিন চরণকী চরণ পাদুকা ভরত রহ্যো লব লাই।

সোই চরণ কেবট ধোই লীনে তব হরি নাও চলাই ॥

সোই চরণ সন্তন জন সেবত সদা রহত সুখদাই।

সোই চরণ গৌতম-ঋষি-নারী পরশি পরম পদ পাই।

দণ্ডক বন প্রভু পাবন কিন্‌হো ঋষিয়ণ ত্রাস মিটাই।

সোই প্রভু ত্রিলোককে স্বামী কনক মৃগা সঙ্গ ধাই ॥

কপি সুগ্রীব বন্ধু-ভয়-ব্যাকুল তিন জয়-ছত্র ফিরাই।

রিপুকো অনুজ বিভীষণ নিশিচর পরশত লঙ্কা পাই ৷৷

শিব সনকাদিক অরু ব্রহ্মাদিক শেষ সাহস মুখ গাই।

তুলসীদাস মারুত-সুতকী প্রভু নিজ মুখ করত বড়াই ॥


—তুলসীদাস

আমার কি ফলের অভাব

খাম্বাজ—তিনতাল*


আমার কি ফলের অভাব? তোরা এলি বিফল ফল যে ল’য়ে।

পেয়েছি যে ফল জনম সফল, মোক্ষফলের বৃক্ষ রাম হৃদয়ে ৷৷

শ্রীরাম চরণ কল্পতরুমূলে ব’সে রই,

(যখন) যে ফল বাঞ্ছা করি সেই ফল প্রাপ্ত হই,

ফলের কথা কই (ধনি লো,) ও ফল গ্রাহক নই,

যাব তোদের প্রতিফল বিলায়ে ॥


—দাশরথি রায়




স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত

ভজ মন রাম নাম সুখ দাঈ

গৌড়-সারঙ্গ—তিনতাল


ভজ মন রাম নাম সুখ দাঈ;

ঘড়ি ঘড়ি পল পল অওধ বিতত সব,

ফির পাছে পতাঈ;

ভাই বন্ধু সব কুটুম কবীলা,

দেখতে জীয়া ললচাই;

অন্ত সমে কোঈ কাম ন আওয়ত,

চক্র কহে সমঝাঈ ॥


—চক্রদাস

রাম নাম জপত হ্যয় শ্মশানমেঁ শঙ্কর

ইমন—চৌতাল


রাম নাম জপত হ্যয় শ্মশানমেঁ শঙ্কর।

পঞ্চ বদন পিনাকপাণি তারক ব্রহ্ম নাম ৷৷

চন্দ্র সূর্য আদি তারাগণ

জিনকে প্রতাপসে হোত চলন।

সৃজনপালন লয় কারণ, সোই রাম নিরঞ্জন ॥

শুক সনক সনাতন,

বশিষ্ট বাল্মীকি গৌতম,

নারদ তুম্বুরু সুর ব্রহ্ম গাবে তব গুণ গান।

সুরদাস মন উল্লাস

রামচন্দ্রকে চরণ আশা,

যুগ যুগ হো ম্যয় দাস গাওয়ত নাম রাম রাম রাম ৷৷


—সুরদাস

রঘুবর তুমকো মেরী লাজ

পিলু—তিনতাল


রঘুবর তুমকো মেরী লাজ।

সদা সদা ম্যয় সরণ তিহারো তুহি গরীব নিওয়াজ ॥

পতিত-উধারণ বিরদ তুমহারো।

স্রবণ সুনি আওয়াজ।

হ্যায় তো পতিত পুরাতন কহিয়ে, পার উতারো জাহাজ ৷

অঘ-খণ্ডন দুঃখ-ভঞ্জন জনকে,

ইয়হী তিহারো কাজ।

তুলসীদাস পর কিরূপা কীজ ভতি দান দেহু আজ ॥


—তুলসীদাস

রামচন্দ্র গুণধাম আমারি

দেশ-মিশ্র—তিনতাল


রামচন্দ্র গুণধাম আমারি!

নব-দূর্বাদল কান্তি উজল হৃদি মন্দির মঙ্গলকারী বিহারী ॥

সর্বারাধ্য হে দেব দেব শ্রীঅযোধ্যা পুরজন-তাপ-নিবারী;

কৌশল্যাসুত দশরথ-নন্দন নট সুন্দর সরযূ তটচারী ॥

কমলনেত্র বিমল মুখমণ্ডল তরুণারুণ ভাতি গণ্ডে,

বক্ষ পীন কটি ক্ষীণ অসীম শক্তি সুবলিত ভুজ দণ্ডে।

রম্ভা-তরু-উরু চরণে উদিত চারু চন্দ্র নখর দ্বৌ সারি,

শীর্ষে প্রখর কোটি ভানু করোজ্জ্বল ঝলমল মুকুট করে ধনুধারী ॥

                            

বিশ্বরূপ গোস্বামী

জগৎ দেখনা চেয়ে যাচ্ছি বেয়ে সোনার তরণী

মিশ্র—দাদরা


জগৎ দেখনা চেয়ে যাচ্ছি বেয়ে সোনার তরণী।

তরীর উপর শ্যাম কলেবর রাম রঘুমণি ॥

যিনি ভবের জলে অবহেলে করেন জীবে পার।

আজকে তারে নিচ্ছি বেয়ে হ’য়ে কর্ণধার।

`(মোরা) পারের কড়ি চেয়ে নেব চরণ দুখানি ৷৷


—রাজকৃষ্ণ রায়

মনোয়া ভজলে সীতারাম

ভৈরব—কারফা


মনোয়া ভজলে সীতারাম!

ভজলে সীতারাম মনোয়া কাহে ন জপতে নাম।

দিন দিয়া জী হরি গুণ গাওয়ে গুরু দিয়া যো নাম।

রাম গড়কে বৈঠে রামজী, সবকী মজরা লীজে।

যো য্যায়সা নক্রী করেগা, উন্‌কো ত্যায়সা দীজে ৷৷

লেড়কাবালা লালন পালন তিনকো দুধ পিলাওয়ে।

মরণ কালমে শরণ লেকে, বাবা কর বোলাওয়ে ৷৷

এক্ নর্ ভুলে দু নর্ ভুলে, ভুলে জগৎ সংসার।

জান্ শুন্‌কে যো নর্ ভুলে, উন্‌কে নেহি পার্ ॥


—তুলসীদাস

জয় সীতাপতি সুন্দর তনু প্রজারঞ্জনকারী

খাম্বাজ-একতাল


জয় সীতাপতি সুন্দর তনু প্রজারঞ্জনকারী।

রাঘব রামচন্দ্র জয়তু সত্য-ব্রত-ধারী ৷৷

ধরণী পূত চরণ-পরশে, পুরবাসিগণ মগ্ন হরষে;

আকাশ হইতে নিত্য বরষে দেবতা কৃপাবারি ॥


—অজ্ঞাত

বিহরে রঘুবংশবীর

ভূপালী—ধামার


বিহরে রঘুবংশবীর জানকী সহিত সরযূতীরে,

আরতি করে কুসুমভারে, দেব মানব ভকতি ভরে।

পরম আনন্দ রাজে, অযোধ্যা নগরী মাঝে,

ধন্য জীবন দরশনে শ্রীরামগুণাধারে ॥


—স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ

নাম জপন্‌ ক্যোঁ ছোড় দিয়া

বেহাগ—তিনতাল


নাম জপন্‌ ক‍্যোঁ ছোড় দিয়া?

রাম নাম জপন্ ক্যোঁ‍ ছোড় দিয়া?

ক্রোধ না ছোড়া ঝুঠ না ছোড়া

সৎবচন ক্যোঁ ছোড় দিয়া?

ঝুঠে জগ্‌মে দিল লচা কর,

অসল রতন ক্যোঁ ছোড় দিয়া?

কৌড়ীকো তো খুব সম্হালা,

লাল রতন ক্যোঁ ছোড় দিয়া?

জিঁহি সুমিরন্ তে অতি সুখ পাওয়ে

সো সুমিরন্ ক্যোঁ ছোড় দিয়া?

খালস এক ভগবান ভরোসে

তন মন্ ধন্ ক্যোঁ না ছোড় দিয়া?


–খালস

জিনকে হৃদিমে শিরি রাম বসে

দরবারী কানাড়া—ঢিমে তিনতাল*


জিনকে হৃদিমে শিরি রাম বসে—

উন সাধন ঔর কিয়ে ন কিয়ে।

জিন সন্ত চরণ রজ কো পরসা,

উন তীরথ নীর পিয়ে ন পিয়ে ৷

সব ভূত দয়া জিনকে চিতমে,

উন কোটন দান দিয়ে ন দিয়ে।

জিন রামরূপ জো ধ্যান ধরে।

উন রামনাম ন লিয়ে ন লিয়ে ৷৷


—কবীর


* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

জয়তী সীতাপতি রাবণারি

বসন্ত—তেওরা


জয়তী সীতাপতি রাবণারি!

আশ্রিত-ভয়-হর ত্যাগী নৃপবর

সত্যপালক ভূভার-হারী।

অমর-বন্দিত অরাতি-ত্রাস শুর

নিষাদসেবিত লোকনাথ;

নীতিরক্ষিত

মুনি-মানস-মোহনকারী ॥


—বিনোদেশ্বর দাশগুপ্ত

রামনামরস পীজে মনুয়াঁ

দুর্গা –তিনতাল


রামনামরস পীজে মনুয়াঁ, রাম নাম রস পীজে।

ত্যজ কুসংগ সৎসংগ বৈঠ নিত, হরি চর্চা সুন লীজে।

কাম ক্রোধ মদ লোভ মোহ কো, বহা চিত্ত সেসাঁ দীজে।

মীরাকে প্রভু গিরিধর নাগর, তাহিকে রংগমে ভীজে।


—মীরাবাঈ

মেরো মন রাম হি রাম রটে রে

নটকুরন্ধিকা—তিনতাল


মেরো মন রাম হি রাম রটে রে ॥

রাম নাম জপ লীজে প্রাণী, কোটিক পাপ কটেরে।

জনম জনম কে খত জো পুরাণী, নাম হি লেত ফটেরে ॥

কনক কটোরে অমৃত ভরিও, পীবত কৌন নটে রে,

মীরা কে প্রভু হরি অবিনাশী, তনমন তাহে পটেরে ৷৷


—মীরাবাঈ

সুনারে মন অমৃত ভরা হ্যায় রামচন্দ্র কা নাম

ভজন—কাহারবা


সুনারে মন অমৃত ভরা হ্যায়, রামচন্দ্র কা নাম, (মনুয়া)

সীতারাম, সীতারাম, বোল মন, বোল বোল সীতারাম,

জনম জনম ভর রাম ভজনকর, পূরত মন কা কাম;

সীতারাম সীতারাম, বোল বোল সীতারাম, (মনুয়া)

নারায়ণ নর রূপ বনাওয়ে রাজপুত্র বন জগমেঁ আওয়ে;

অপার লীলা জগকো দিখাওয়ে, ভজতে রহো ওহী নাম,

সীতারাম সীতারাম, বোল বোল সীতারাম (মনুয়া) ৷৷


-অজ্ঞাত

বৈষ্ণব জন তো তেনে কহিয়ে জে

(গুজরাতী—ভজন)

কৌশিকি খাম্বাজ—কাওয়ালী


বৈষ্ণব জন তো তেনে কহিয়ে, জে পীড় পরাঈ জানে রে।

পর দুঃখে উপকার করে তোয়ে, মন অভিমান ন আনে রে ॥

সকল লোক মাঁ সহুনে বন্দে, নিন্দা ন করে কেনী রে।

বাচ কাছ মন নিশ্চল রাখে, ধন ধন জননী তেনী রে ॥

সমদৃষ্টি নে তৃষ্ণাত্যাগী পরস্ত্রী জেনে মাতর।

জিহ্বা থকী অসত্য ন বোলে, পরধন নব ঝালে হাথ রে ॥

মোহ মায়া ব্যাপে নহি জেনে, দৃঢ় বৈরাগ্য জেনা মন্‌সা রে।

রাম নাম শুঁ তালী লাগী, সকল তীরথ তেনা তনমাঁ রে ৷৷

বন লোভীনে কপট রহিত ছে, কাম-ক্রোধ নিবার্যা রে।

ভণে নরসৈয়োঁ তেঁনু দরশন করতা, কুল্ একোতের তার্যা রে ॥


—নরসিঁ মেহেতা

ইক নীর হায়্ গঙ্গাজী ইক নাম হায়্ রাম

পিলু—কাহারবা


ইক নীর হায়্ গঙ্গাজী, ইক নাম হায়্ রাম।

ইক চন্দ্র হ্যম্ ইক সুরজ, নির্বলকে বল রাম।

জগতমে কোই নহি সজন আপনা, সদা রাম নাম জপনা রসনা।

কহত নানক ঝুঠ হায়্ জগ সব, সচ্চা দশরথ নন্দন রাম।


-নানক

প্রেম মুদিত মনসে কহো রাম রাম

মিশ্রসুর—কাহারবা


প্রেম মুদিত মনসে কহো রাম রাম রাম!

শ্রীরাম রাম রাম, শ্রীরাম রাম রাম।

পাপ কাটে, দুঃখ মিটে, লেত রাম নাম।

ভব সমুদ্র সুখদ নাব এক রাম রাম ৷

পরম শান্তি সুখ নিধান নিত্য রাম-নাম।

নিরাধারকো আধার এক রাম নাম ৷৷

পরম গোপ্য পরম ইষ্ট মন্ত্র রাম নাম ৷

সন্ত হৃদয় সদা বসত এক রাম নাম ৷৷

মহাদেব সতত জপত দিব্য রাম নাম।

কাশী মরত মুক্ত করত কহত রাম নাম ৷৷

মাতা পিতা, বন্ধু সখা, সবহি রাম নাম।

ভক্ত জনন জীবন ধন এক রাম নাম ৷


—শ্রীহনুমান প্ৰসাদ পোদ্দার

পায়োজী ম্যয়নে রাম রতন ধন পায়ো

মাণ্ড—কাৰ্যা


পায়োজী ম্যয়নে রাম রতন ধন পায়ো৷

বস্তু অর্মোলক দী মেরে সদ্গুরু কিরূপা করি অপনায়ো।

জনম জনম কি পুন্জী পাঈ, জগমে সবহি খোয়াও।

খরচে নহি কোই চোর না লুটে দিনদিন বঢ়ত সবায়ো।

সতর্কী নাও, খেওটিয়া সদ্গুরু, ভবসাগর তর আয়ো ||

মীরা কে প্রভু গিরিধর নাগর হরখ হরখ যশ গায়ো ॥


—মীরাবাঈ

সুনে রী ম্যয়নে নির্বলকে বল রাম

শিবরঞ্জনী—কাহারবা


সুনে রী ম্যয়নে নির্বলকে বল রাম।

পিছলি সাঁখ ভরু সন্তান কী আড়ে সঁবারে কাম

জব লগ গজবল আপনো বয়ত্যা নেক সরো নহি কাম।

নির্বল হয়ে বলরাম পুকারো আয়ে আধে নাম।

দ্রুপদ সুতা নির্বল ভঈ তা দিন গহ লায়ে নিজধাম ৷৷

দুঃশাসনকী ভূজা থকিত ভঈ বসনরূপ ভয়ে শ্যাম ॥

অপবল তপবল ঔর বাহুবল চৌথা বল হায়্ দাম।

‘সুর’ কিশোর কৃপাসে সব বল, হারে কো হরনাম ॥


—সুরদাস

কব্ দেখুঁ মেরে রাম সনেহী

ভজন—কাহারবা


কব্ দেখুঁ মেরে রাম সনেহী

জা বিন্ দুখ পাওয়ে মেরী দেহী

হুঁ তেরা পন্থনিহারুঁ স্বামী

কীরে মিলহুতো অভয় জামী।

জেইসে জল বিন মীন তলপে,

এইসে হরি বিন মেরা জিয়ারা কলপে ॥

নিস্ দিন্ হরি বিন্ নীঁদ ন আওয়ে,

দরস্ পিয়ারী রাঁম ক‍্যুঁ সচু পাওয়ে ৷

কহে কবীর অব্ বিলম্ব না কীজে,

আপনও জাঁনি মোহি দরশনদীজে ৷৷


—কবীর দাস

শ্রীরামনাম সঙ্কীর্তন

শ্রীরামনামসঙ্কীর্তনম্*

শ্রীরামনামসঙ্কীর্তনম্*


শ্রীনাথে জানকীনাথে অভেদঃ পরমাত্মনি।

তথাপি মম সর্বস্বঃ রামঃ কমললোচনঃ ॥

ওঁ শ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ


স্তবঃ

বর্ণানামর্থসঙ্ঘানাং রসানাং ছন্দসামপি।

মঙ্গলানাঞ্চ কর্তারৌ বন্দে বাণীবিনায়কৌ ॥১॥

ভবানীশঙ্করৌ বন্দে শ্রদ্ধাবিশ্বাসরূপিণৌ।

যাভ্যাং বিনা ন পশ্যন্তি সিদ্ধাঃ স্বান্তঃস্থমীশ্বরম্ ॥২॥

বন্দে বোধময়ং নিত্যং গুরুং শঙ্কররূপিণম্।

যমাশ্রিতো হি বক্রোঽপি চন্দ্ৰঃ সর্বত্র বন্দ্যতে ৷৩৷৷

সীতারামগুণগ্রাম-পুণ্যারণ্যবিহারিণৌ।

বন্দে বিশুদ্ধবিজ্ঞানৌ কবীশ্বরকপীশ্বরৌ ॥৪॥

উদ্ভবস্থিতিসংহারকারিণীং ক্লেশহারিণীম্।

সর্বশ্রেয়স্করীং সীতাং নতোঽহং রামবল্লভাম্ ॥৫॥

যন্মায়াবশবর্তি বিশ্বমখিলং ব্রহ্মাদিদেবাসুরা

যৎসত্ত্বাদমূষৈব ভাতি সকলং রজ্জৌ যথাহেভ্রমঃ।

যৎপাদঃ প্লবমিব ভাতি হি ভবাম্ভোধেস্তিতীর্ষাবতাম্

বন্দেহহং তমশেষকারণপরং রামাখ্যমীশং হরিম্ ॥৬॥

প্রসন্নতাং যা ন গতাভিষেকত স্তথা ন মম্লৌ বনবাসদুঃখতঃ।

মুখাম্বুজশ্রীরঘুনন্দনস্য মে সদাস্তু সা মঞ্জুলমঙ্গলপ্ৰদা ॥৭॥

নীলাম্বুজশ্যামলকোমলাঙ্গং সীতাসমারোপিতবামভাগম্।

পাণৌ মহাসায়কচারুচাপং নমামি রামং রঘুবংশনাথম্ ॥৮॥

মূলং ধর্মতরোবিবেকজলধেঃ পূর্ণেন্দুমানন্দদম্

বৈরাগ্যাম্বুজভাস্করং ত্বঘহরং ধ্বান্তাপহং তাপহম্।

মোহাম্ভোধরপুঞ্জপাটনবিধৌ খে সম্ভবং শঙ্করং

বন্দে ব্রহ্মকুলকলঙ্কশমনং শ্রীরামভূপপ্রিয়ম্ ॥৯॥

সান্দ্রানন্দপয়োদসৌভগতনুং পীতাম্বরং সুন্দরং

পাণৌ বাণশরাসনং কটিলসস্তূণীরভারং বরম্।

রাজীবায়তলোচনং ধৃতজটাজুটেন সংশোভিতং

সীতালক্ষ্মণসংযুতং পথিগতং রামাভিরামং ভজে ৷৷১০৷৷

কুন্দেন্দীবরসুন্দরাবতিবলৌ বিজ্ঞানধামাবুভৌ

শোভাঢ্যৌ বরধন্বিনৌ শ্রুতিনুতৌ গোবিপ্ৰবৃন্দপ্রিয়ৌ।

মায়ামানুষরূপিণৌ রঘুবরৌ সদ্ধর্মবন্তৌ হিতৌ

সীতান্বেষণতৎপরৌ পথিগতৌ ভক্তিপ্রদৌ তৌ হি নঃ ॥১১৷৷

ব্রহ্মান্তোধিসমুদ্ভবং কলিমলপ্ৰধ্বংসনং চাব্যয়ং

শ্রীমচ্ছম্ভুমুখেন্দুসুন্দরবরে সংশোভিতং সর্বদা।

সংসারাময়ভেষজং সুমধুরং শ্রীজানকীজীবনং

ধন্যাস্তে কৃতিনঃ পিবন্তি সততং শ্রীরামনামামৃতম্ ॥১২৷৷

শান্তং শাশ্বতমপ্রমেয়মনঘং নির্বাণশান্তিপ্রদং

ব্রহ্মাশম্ভুফণীন্দ্রসেব্যমনিশং বেদাত্তবেদ্যং বিভুম্।

রামাখ্যং জগদীশ্বরং সুরগুরুং মায়ামনুষ্যং হরিং

বন্দেঽহং করুণাকরং রঘুবরং ভূপালচূড়ামণিম্ ॥১৩৷৷

কেকিকণ্ঠাভনীলং সুরবরবিলসবিপ্রপাদাজচিহ্নং

শোভাঢ্যং পীতবস্ত্রং সরসিজনয়নং সর্বদা সুপ্রসন্নম্

পাণৌ নারাচচাপং কপিনিকরযুতং বন্ধুনা সেব্যমানম্

নৌমীড্যং জানকীশং রঘুবরমনিশং পুষ্পকারূঢ়রামম্ ॥১৪৷

আর্তানামার্তিহত্তারং ভীতানাং ভয়নাশনম্।

দ্বিষতাং কালদণ্ডং তং রামচন্দ্রং নমাম্যহম্ ॥১৫৷৷

শ্রীরাঘবং দশরথাত্মজমপ্রমেয়ং সীতাপতিং রঘুকুলান্বয়রত্নদীপম্।

আজানুবাহুমরবিন্দদলায়তাক্ষং রামং নিশাচরবিনাশকরং নমামি ৷১৬৷৷

বৈদেহীসহিতং সুরক্রমতলে হৈমে মহামণ্ডপে

মধ্যে পুষ্পক-আসনে মণিময়ে বীরাসনে সংস্থিতম্।

অগ্রে বাচয়তি প্রভঞ্জনসুতে তত্ত্বং মুনীদ্রৈঃ পরম্

ব্যাখ্যাতং ভরতাদিভিঃ পরিবৃতং রামং ভজে শ্যামলম্ ॥১৭৷৷



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত। স্বামী ব্রহ্মানন্দ এই রামনাম সংকীর্তন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে

প্রথম প্রচলন করেন।

প্রার্থনা

প্রার্থনা


নান্যা স্পৃহা রঘুপতে হৃদয়েঽস্মদীয়ে

সত্যং বদামি চ ভবান্ অখিলান্তরাত্মা।

ভক্তিং প্রযচ্ছ রঘুপুঙ্গব নির্ভরাং মে

কামাদিদোষরহিতং কুরু মানসঞ্চ ৷৷

শ্রীরামনামসঙ্কীর্তনম্

শ্রীরামনামসঙ্কীর্তনম্


ওঁ শ্রীসীতালক্ষ্মণভরতশত্রুঘ্নহনুমৎসমেত

শ্রীরামচন্দ্রপরব্রহ্মণে নমঃ।


বালকাণ্ডঃ

১। শুদ্ধব্রহ্মপরাৎপর         রাম

২। কালাত্মকপরমেশ্বর         রাম

৩। শেষতল্পসুখনিদ্রিত         রাম

৪। ব্রহ্মাদ্যমরপ্রার্থিত         রাম

৫। চণ্ডকিরণকুলমণ্ডন         রাম

৬। শ্রীমদ্দশরথনন্দন         রাম

৭। কৌশল্যাসুখবর্ধন         রাম

৮। বিশ্বামিত্রপ্রিয়ধন         রাম

৯। ঘোরতাটকাঘাতক         রাম

১০। মারীচাদিনিপাতক         রাম

১১। কৌশিকমখসংরক্ষক     রাম

১২। শ্রীমদহল্যোদ্ধারক         রাম

১৩। গৌতমমুনিসংপূজিত     রাম

১৪। সুরমুনিবরগণসংস্তুত     রাম

১৫। নাবিকধাবিতমৃদুপদ     রাম

১৬। মিথিলাপুরজনমোহক     রাম

১৭। বিদেহমানসরঞ্জক         রাম

১৮। ত্র্যম্বককার্মকভঞ্জক     রাম

১৯। সীতার্পিতবরমালিক     রাম

২০। কৃতবৈবাহিককৌতুক     রাম

২১। ভার্গবদর্পবিনাশক         রাম

২২। শ্রীমদযোধ্যাপালক     রাম


অযোধ্যাকাণ্ডঃ

২৩। অগণিতগুণগণভূষিত     রাম

২৪। অবনীতনয়াকামিত     রাম

২৫। রাকাচন্দ্রসমানন         রাম

২৬। পিতৃবাক্যাশ্রিতকানন    রাম

২৭। প্রিয়গুহবিনিবেদিতপদ     রাম

২৮। তৎক্ষালিতনিজমৃদুপদ     রাম

২৯। ভরদ্বাজমুখনন্দক         রাম

৩০। চিত্রকূটাদ্রিনিকেতন     রাম

৩১। দশরথসম্ভতচিন্তিত     রাম

৩২। কৈকেয়ীতনয়ার্থিত     রাম

৩৩। বিরচিতনিজপিতৃকর্মক রাম

৩৪। ভরতার্পিতনিজপাদুক     রাম


অরণ্যকাণ্ডঃ

৩৫। দণ্ডকবনজনপাবন     রাম

৩৬। দুষ্টবিরাধবিনাশন         রাম

৩৭। শরভঙ্গসুতীক্ষ্ণাৰ্চিত     রাম

৩৮। অগ্যস্ত্যানুগ্রহবর্ধিত     রাম

৩৯। গৃধ্রাধিপসংসেবিত     রাম

৪০। পঞ্চবটীতটসুস্থিত         রাম

৪১। শূর্পণখার্তিবিধায়ক     রাম

৪২। খরদূষণমুখসূদক         রাম

৪৩। সীতাপ্রিয়হরিণানুগ     রাম

৪৪। মারীচার্তিকৃদাশুগ         রাম

৪৫। বিনষ্টসীতান্বেষক         রাম

৪৬। গৃধ্রাধিপগতিদায়ক     রাম

৪৭। শবরীদত্তফলাশন         রাম

৪৮। কবন্ধবাহুচ্ছেদন         রাম


কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডঃ

৪৯। হনুমৎসেবিতনিজপদ     রাম

৫০। নতসুগ্রীবাভীষ্টদ         রাম

৫১। গর্বিতবালিসংহারক     রাম

৫২। বানরদূতপ্রেষক         রাম

৫৩। হিতকরলক্ষ্মণসংযুত     রাম


সুন্দরকাণ্ডঃ

৫৪। কপিবরসন্ততসংস্মৃত     রাম

৫৫। তদ্‌গতিবিঘ্নধ্বংসক     রাম

৫৬। সীতাপ্রাণাধারক         রাম

৫৭। দুষ্টদশাননদূষিত         রাম

৫৮। শিষ্টহনুমভূষিত         রাম

৫৯। সীতাবেদিতকাকাবন     রাম

৬০। কৃতচূড়ামণিদর্শন         রাম

৬১। কপিবরবচনাশ্বাসিত     রাম


লঙ্কাকাণ্ডঃ

৬২। রাবণনিধনপ্রস্থিত         রাম

৬৩। বানরসৈন্যসমাবৃত     রাম

৬৪। শোষিতসরিদীশার্থিত     রাম

৬৫। বিভীষণাভয়দায়ক     রাম

৬৬। পর্বতসেতুনিবন্ধক     রাম

৬৭। কুম্ভকর্ণশিরশ্ছেদক     রাম

৬৮। রাক্ষসসংঘবিমর্দক     রাম

৬৯। অহিমহিরাবণচারণ     রাম

৭০। সংহৃতদশমুখরাবণ     রাম

৭১। বিধিভবমুখসুরসংস্তুত     রাম

৭২। খস্তিতদশরথবীক্ষিত     রাম

৭৩। সীতাদর্শনমোদিত     রাম

৭৪। অভিষিক্তবিভীষণনত    রাম

৭৫। পুষ্পক্যানারোহণ         রাম

৭৬। ভরদ্বাজাভিনিষেবন     রাম

৭৭। ভরতপ্রাণপ্রিয়কর         রাম

৭৮। সাকেতপুরীভূষণ         রাম

৭৯। সকলস্বীয়সমানত         রাম

৮০। রত্নলসৎপীঠাস্থিত     রাম

৮১। পট্টাভিষেকালঙ্কৃত         রাম

৮২। পার্থিবকুলসম্মানিত     রাম

৮৩। বিভীষণার্পিতরঙ্গক     রাম

৮৪। কীশকুলানুগ্রহকর     রাম

৮৫। সকলজীবসংরক্ষক    রাম

৮৬। সমস্তলোকাধারক        রাম


উত্তরকাণ্ডঃ

৮৭। আগতমুনিগণসংস্তুত     রাম

৮৮। বিশ্রুতদশকণ্ঠোদ্ভব     রাম

৮৯। সীতালিঙ্গননিবৃত         রাম

৯০। নীতিসুরক্ষিতজনপদ     রাম

৯১। বিপিনত্যাজিতজনকজ     রাম

৯২। কারিতলবণাসুরবধ     রাম

৯৩। স্বর্গতশম্বুকসংস্তুত     রাম

৯৪। স্বতনয়কুশলবনন্দিত     রাম

৯৫। অশ্বমেধক্রতুদীক্ষিত     রাম

৯৬। কালাবেদিতসুরপদ     রাম

৯৭। আযোধ্যকজনমুক্তিদ     রাম

৯৮। বিধিমুখবিবুধানন্দক     রাম

৯৯। তেজোময়নিজরূপক     রাম

১০০। সংস্কৃতিবন্ধবিমোচক     রাম

১০১। ধর্মস্থাপনতৎপর         রাম

১০২। ভক্তিপরায়ণমুক্তিদ     রাম

১০৩। সর্বচরাচরপালক     রাম

১০৪। সর্বভবাময়বারক     রাম

১০৫। বৈকুণ্ঠালয়সংস্থিত     রাম

১০৬। নিত্যানন্দপদস্থিত     রাম

১০৭। রাম রাম জয় রাজা     রাম

১০৮। রাম রাম জয় সীতা     রাম

প্রার্থনা-ভয়হর মঙ্গল দশরথ

প্রার্থনা


ভয়হর মঙ্গল দশরথ     রাম

জয় জয় মঙ্গল সীতা     রাম

মঙ্গলকর জয় মঙ্গল     রাম

সঙ্গতশুভবিবােদয়     রাম

আনন্দামৃতবৰ্ষক         রাম

আশ্রিতবৎসল জয় জয়     রাম

রঘুপতি রাঘব রাজা     রাম

পতিতপাবন সীতা     রাম

স্তবঃ-কনকাম্বর

স্তবঃ


কনকাম্বর কমলাসনজনকাখিল     ধাম

সনকাদিকমুনিমানসসদনানঘ         ভূম

শরণাগতসুরনায়কচিরকামিত         কাম

ধরণীতলতরণদশরথনন্দন         রাম

পিশিতাশনবনিতাবধজগদানন্দ     রাম

কুশিকাত্মজমখরক্ষণচরিতাদ্ভুত     রাম

ধনীগৌতমগৃহিণীস্বজদঘমােচন     রাম

মুনিমণ্ডলবহুমানিতপদপাবন         রাম

স্মরশাসনসুশরাসনলঘুভঞ্জন         রাম

নরনির্জরজনরঞ্জন সীতাপতি         রাম

কুসুমায়ুধতনুসুন্দর কমলানন         রাম

বসুমানিতভূসম্ভব মদমর্দন         রাম

করুণারসবরুণালয় নতবৎসল     রাম

শরণং তব চরণং ভবহরণং মম     রাম

প্রণামঃ-আপদামপহর্তারং

প্রণামঃ


আপদামপহর্তারং দাতারং সর্বসম্পদাম্।

লােকাভিরামং শ্রীরামং ভূয়াে ভূয়াে নমাম্যহম্ ॥১৷৷

রামায় রামচন্দ্রায় রামভদ্রায় বেধসে।

রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ ॥২৷৷

অতুলিতবলধামং স্বর্ণশৈলাভদেহং

দনুজবনকৃশানুং জ্ঞানিনামগ্রগণ্য।

সকলগুণনিধানং বানরাণামধীশং

রঘুপতিবরদূতং বাতজাতং নমামি ॥১৷৷

গােষ্পদীকৃতবারীশং মশকীকৃতরাক্ষস।

রামায়ণমহামালারত্নং বন্দেইনিলাত্মজম্ ॥২॥

অঞ্জনাননং বীরং জানকীশােকনাশনম্।

কপীশমহন্তারং বন্দে লঙ্কাভয়ঙ্করম্ ॥৩||

উল্লঙ্ঘ্য সিন্ধোঃ সলিলং সলীল যঃ শােকবহ্নি জনকাত্মজায়াঃ ।

আদায় তেনৈব দদাহ লঙ্কান্ নমামি তং প্রাঞ্জলিরাঞ্জনেয়ম্ ॥৪৷৷

মনােজবং মারুততুল্যবেগং জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠ।

বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং শ্রীরামদূতং শিরসা নমামি ॥৫৷৷

আঞ্জনেয়মতিপাটলাননং কাঞ্চনাদ্রিকমনীয়বিগ্রহ।

পারিজাততরুমূলবাসিনং ভাবয়ামি পবমাননন্দনম্ ॥৬৷৷

যত্র যত্র রঘুনাথকীর্তনং তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলি।

বাষ্পবারিপরিপূর্ণলােচনং মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্ ॥৭॥


ইতি অষ্টোত্তরশতনামরামায়ণং সমাপ্তম্ ॥

শ্ৰীশ্ৰীকৃষ্ণ সঙ্গীত

ধ্যান

ধ্যান


ওঁ ফুল্লেন্দীবরকান্তিমিন্দুবদনং বাবতংসপ্রিয়ং

শ্রীবৎসাঙ্কমুদারকৌস্তুভধরং পীতাম্বরং সুন্দর।

গােপীনাং নয়নােৎপলার্চিততনুং গােগােলসংঘাবৃতং,

গােবিন্দং কমবেণুবাদনপরং দিব্যাঙ্গভূষং ভজে॥

প্রণাম

প্রণাম


কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মনে।

প্রণত-ক্লেশনাশায় গােবিন্দায় নমাে নমঃ ॥

শ্রীকৃষ্ণ-বন্দনা

শ্রীকৃষ্ণ-বন্দনা*


নবীন-মেঘ সন্নিভং সুনীল-কমলচ্ছবি।

সুহাসরঞ্জিতাধরং নমামি কৃষ্ণ-সুন্দরম্ ॥১

যশোদানন্দনন্দনং সুরেন্দ্রপাবন্দন।

সুবৰ্ণরত্নমণ্ডনং নমামি কৃষ্ণ-সুন্দরম্ ॥২

ভবাক্কিকর্ণধারকং ভয়ার্তিনাশকারক।

মুমুক্ষু-মুক্তি-দায়কং নমামি কৃষ্ণ-সুন্দরম্ ॥৩





* স্বরলিপি  ঃ সুরবিতান

মধুরাষ্টকম্

মধুরাষ্টকম্


অধরং মধুরং বদনং মধুরং নয়নং মধুরং হসিতং মধুর।

হৃদয়ং মধুরং গমনং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥১

বচনং মধুরং চরিতং মধুরং বসনং মধুরং বলিতং মধুর।

চলিতং মধুরং ভ্ৰমিতং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥২

বেণুমধুরাে রেণুমধুরঃ পাণির্মধুরঃ পাদৌ মধুরৌ।

নৃত্যং মধুরং সখ্যং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥৩

গীতং মধুরং পীতং মধুরং ভুক্তং মধুরং সুপ্তং মধুর।

রূপং মধুরং তিলকং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥৪

করণং মধুরং তরণং মধুর হরণং মধুরং রমণং মধুর।

বমিতং মধুরং শমিতং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥৫

গুঞ্জা মধুরা মালা মধুরা যমুনা মধুরা বীচি মধুরা।

সলিলং মধুরং কমলং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুর ॥৬

গােপী মধুরা লীলা মধুরা যুক্তং মধুরং ভুক্তং মধুর।

হৃষ্টং মধুরং শিষ্টং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥৭

গােপা মধুরা গাবাে মধুরা যষ্টিমধুরা সৃষ্টিমধুরা।

দলিতং মধুরং ফলিতং মধুরং মধুরাধিপতেরখিলং মধুরম্ ॥৮


ইতি শ্রীবল্পভাচার্যবিরচিতং মধুরাষ্টকং সমাপ্ত।

রিণি ঝিণি রিণি ঝিণি মঞ্জীর বাজে

ভজন


রিণি ঝিণি রিণি ঝিণি মঞ্জীর বাজে,

বাজে, বাজে, বাজে মন-মাঝে।

বহে যমুনা উজান, গাহে কল কল গান

‘মীরাকে’ চিত-চোর গিরিধারী নাগর

নাচত অঙ্গন-মাঝে।

শুনি মূরলী-ধ্বনি মধু মাধবী রাতে

ঝরে প্রেমের সলিল মম নয়ন পাতে,

মম চিত্তের বান গাহে আনন্দ গান

হৃদি-যমুনা-তীরে শুনি কল কল তান।

এস কৃষ্ণ-মুরারি, সুন্দর গিরিধারী,

(এস) মীরাকে হৃদয় মাঝে।

—মীরাবাঈ

কিবা ঘাের নিশায়

বেহাগ-একতাল


“কিবা ঘাের নিশায়।”

নিখিল জগত ঝিল্লিরবাবৃত জীবগণ যত অলসে ঘুমায়।

এমন সময় পতিত-পাবন, জগত-জীবন ব্রহ্ম সনাতন,

ত্যজিয়া সাধের বৈকুণ্ঠ ভুবন অবতীর্ণ হ’তে আইলেন ধরায় ।

রােহিণী নক্ষত্র অষ্টমী তিথিতে, দেবকী-জঠর-সাগর হইতে,

শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রমা উদিল ভারতে নাশিতে জীবের ভার।

বসুদেব অতি কাতর অন্তরে, তিমিরে-তিমির-মণি কোলে করে,

বাসুকী মাথায় ফণীছত্র ধরে হাঁটিয়া যমুনা পার হয়ে যায়।


—অজ্ঞাত

সুখ বৃন্দাবনে বহে প্রেমলহরী

রামকেলী—কাওয়ালী


সুখ বৃন্দাবনে বহে প্রেমলহরী।

লীলাছলে আসি, লয়ে ব্রজবাসী আপনা পাসরি আছেন শ্রীহরি।

নবজলধর বরণ সুন্দর,

কিবা নটবর বেশ মনােহর,

চাদের নিছনি জিনিয়া লাবণী, প্রেমপীযূষখনি বদনে বাঁশরী ॥

দিবসে রাখাল চরান গােপাল, নিশি আগমনে ব্রজগােপীসনে;

প্রেমের মিলনে লীলা-নিধুবনে, স্থির-বিজলী বামে রাধা রাসেশ্বরী।

নানা ছাঁদে বাজে মূরলী মধুর, আকুল গােকুল শ্রবণে সে সুর

তরুশাখে নাচে ময়ূরী ময়ূর, গােপী চলে জলে ফেলিয়া গাগরী ।


—অজ্ঞাত

তুমি কি গাে শুধু খেয়েছিলে ননী

মালকোষ—তেওরা


তুমি কি গাে শুধু খেয়েছিলে ননী, তুমি কি শুধুই বংশীধারী?

তুমি কি শুধুই শ্যাম নটবর, মােহেছিলে শুধু ব্ৰজেরি নারী?

নহ কি গাে তুমি অসুরবিনাশী, কংস-পূতনা-কৌরব-ত্রাসি,

ধরম স্থাপনে স্বজন-বিনাশী কৃষ্ণ সুদর্শন-ধারী ?

তুমি কিগাে শুধু সুখবনমালী, নহ তুমি শ্যামা করালিনী কালী,

ভৈরবী, ভীমা, নরমুণ্ডমালী, জনগণ-ভয়-হারী ?

শিখাইতে জ্ঞান করম ভকতি, এস হে আবার পার্থসারথি,

দূর কর নাথ মম দুরমতি, মােহতিমির নিবারি’ ॥


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ঢল ঢল কাচা অঙ্গের লাবণি

শ্রীরাগ-খয়রা


ঢল ঢল কাচা অঙ্গের লাবণি, অবনী বহিয়া যায়।

ঈষৎ হাসির তরঙ্গ হিলােলে মদন মূরছা পায়।

কিবা সে নাগর, কিখনে দেখিনু, ধৈরজ রহল দূরে।

নিরবধি মাের চিত বেয়াকুল, কেনবা সদাই ঝুরে ।

হাসিয়া হাসিয়া অঙ্গ দোলাইয়া, নাচিয়া নাচিয়া যায়।

নয়ন কটাখে, বিষম বিশিখে, পরাণ বিধিতে চায় ।

মালতী ফুলের, মালাটি গলে, হিয়ার মাঝারে দোলে।

উড়িয়া পড়িয়া, মাতল ভ্রমর, ঘুরিয়া ঘুরিয়া বােলে ৷

কপালে চন্দন, ফেঁাটার ছটা লাগিল হিয়ার মাঝে।

জানি কি ব্যাধি, মরমে বাঁধল, না কহি লােকের লাজে ।

এমন কঠিন, নারীর পরাণ, বাহির নাহিক হয়।

জানি কি জানি, হয় পরিণামে, দাস গােবিন্দ কয়।


—গােবিন্দ দাস

নব জলধর পীতাম্বর শ্যাম

দরবারী—একতালা


নব জলধর পীতাম্বর শ্যাম বিপিনচারী।

বঙ্কিম ঠাম কুসুম ভূষণ গােপনারী-মনােহারী।

অতুল রাতুল চরণ রাজে, ধীর মধুর নূপুর বাজে।

মােহন সাজে মােহে ফুলধনু, নটবর বনােয়ারী।

সুধাকর কিবা শ্রীমুখকমল প্রেমপীযুষ-ঢলঢলঢল,

বিমল ফুল্ল অধরযুগল মধুরমুরলীধারী।


—অজ্ঞাত

বাজে শ্যামের মােহন বেণু

পূরবী—একতাল


বাজে শ্যামের মােহন বেণু বেণু-রব শুনে জুড়াল তনু।

যে বনে বাজিছে সেই বনে যাই, এ ছার জীবনে আর কাজ নাই,

পুরাইব আশ মন অভিলাষ, হয়ে থাকি শ্যামের চরণ-রেণু ৷৷

পঞ্চমেতে পাখী ধরিয়াছে গান, পবন দাঁড়ায়ে শুনিতেছে তান,

যাঁহার নামেতে যমুনা উজান, হাম্বা হাম্বা রবে ডাকিত ধেনু ।


গিরিশচন্দ্র ঘােষ

শ্যাম কলেবরধারী বনবারী

পিলু বারোয়া—কাওয়ালী


শ্যাম কলেবরধারী বনবারী।

ব্রহ্মা জিনকে পার ন জানে, জিনকী মহিমা বেদ বাখানে

সন্তানকে হিতকারী বনবারী ।

ত্যজি গােলক নবরূপ ভয়াে হায় গােয়াল বাল সব সাথ মিলে হ্যায়

কিয়ে মাখন কী চোরি বলিহারি বনবারী ।

শুনি ধ্বনি মুরলী বৃন্দাবন মে,

সুধ ন রহত কছু গােপী তনমে,

ভই সকলবনচারী কুলনারী বনবারী ।

কংসাসুর অরূ কালীয়মর্দন,

ভক্তবছল কেশব মধুসূদন,

ধ্রুব প্রহ্লাদ উধারী শুভকারী বনবারী ।


—অজ্ঞাত

লটকি লটকি চলত মােহন আবে

খাম্বাজ-একতাল


লটকি লটকি চলত মােহন আবে।

আবে মােহন অধরে মুরলী মধুর মধুর বাজে।

চঞ্চল কুণ্ডল চপল দোলনী মৌর মকুট চন্দ্র কলনী,

মন্দ হসনী জিয়কী রহনি মােহন মূরতি রাজে৷৷

ভ্রকুটি-কুটিল কজ্জল নয়ন, অধর অরুণ মধুর বয়ান,

গতি গয়ন্দ চারু তিলক ভাল পর বিরাজে।

লছমনদাস শ্যামরূপ নখশিখ শােভা অনুপ,

রসিক ভূপ বদন নিরখি কোটি মদন লাগে ।


—লছমনদাস

চন্দ্রকিরণ অঙ্গ নমাে বামনরূপধারী

সুরট মিশ্র-একতাল


চন্দ্রকিরণ অঙ্গ নমাে বামনরূপধারী।

গােপীগণ-মনােমােহন, মঞ্জুকুঞ্জ-চারী

ব্রজবালক সঙ্গ, মদন-মান-ভঙ্গ, উন্মাদিনী ব্রজকামিনী উন্মাদ তরঙ্গ,

দৈত্য-ছলন নারায়ণ, জয় জয় গিরিধারী;

ব্রজবিহারী, গােপনারী-মান-ভিখারী, জয় রাধে শ্রীরাধে।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

কেশব কুরু করুণা দীনে

দেশ মিশ্র-একতাল*


কেশব কুরু করুণা দীনে, কুঞ্জকাননচারী।

মাধব মনােমােহন, মােহন মুরলীধারী ॥

(হরিবােল, হরিবােল, হরিবােল, মন আমার)

ব্রজকিশাের, কালীয়হর, কাতর-ভয়-ভঞ্জন,

নয়ন বাঁকা, বাঁকা শিখপাখা, রাধিকা-হৃদি-রঞ্জন,

গােবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামােদর কংসদর্পহারী।

শ্যাম রসরাসবিহারী, (হরিবােল, ইত্যাদি)।


- গিরিশচন্দ্র ঘােষ


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গী

মাধব বহুত মিনতি করি তােয়

কীর্তন-খয়রা


মাধব, বহুত মিনতি করি তােয়।

দেই তুলসী তিল, দেহ সমর্পিল, দয়া জনু ন ছােড়বি মােয় ।

গণইতে দোষ, গুণলেশ না পাওবি, যব তুহু করবি বিচার।

তু জগন্নাথ জগতে কয়সি, জগ বাহির নহি মুঞি ছার।

কিয়ে মানুষ পশু পাখী কিয়ে জনমিয়ে, অথবা কীট পতঙ্গ।

করম-বিপাকে গতাগতি পুনপুন, মতি রুহু তুয়া পুরসঙ্গ ।

ভনয়ে বিদ্যাপতি অতিশয় কাতর, তরইতে ইহ ভবসিন্ধু।

তুয়া পদপল্লব করি অবলম্বন, তিল এক দেহ দীনবন্ধু ।


—বিদ্যাপতি

(আমার) আঁখিতে রহগাে নন্দদুলাল

ভজন—তিনতাল


(আমার) আঁখিতে রহগাে নন্দদুলাল।

মােহন মূরতি সুন্দর জ্যোতি নয়ন অতি বিশাল।

অধরে অমৃত মুরলী বােলে গলেতে বিজয়মাল।

কটীদেশে শােভে ঘণ্টি মেখলা, মঞ্জিলে মধুঢ়াল ।

রুণু-ঝুনু রুণু-ঝুনু নূপুর বােলে, চরণে চরণে চলে তাল।

চিত নন্দন মাের শ্যামল মনের গােপন পুরে ভাঙ্গিল আগল।

মীরা চিতচারী শ্যাম গিরিধারী, ভকত হৃদয় গােপাল ৷


—মীরাবাঈ

কঁহা জীবন ধন বৃন্দাবন প্রাণ

বেহাগ—কাওয়ালী


কঁহা জীবন-ধন বৃন্দাবন-প্রাণ কঁহা মেরী হৃদয়কী রাজা।

শূন্য হৃদয়পুরী আও আও মুরারি মােহন বাঁশরী বাজা ।

নয়ন সলিলে বসন তিতাওল, সাধ কি সায়র হিয়া’পর শুকাল;

শিরতাজ মেরী শিরােপরি আজা।

নয়না কা রােসনি নয়না ছােড়াকে, ঘুরত ফিরত কঁহা ফাকে ফাকে

হা হা পিয়াবঁধু এ কোন সাজা ।


—অমরেন্দ্রনাথ দত্ত

হেরী মৈঁ তাে প্রেম দিবাণী

কাফি সিন্ধু —ঢিমে তিনতাল


হেরী মৈঁ তাে প্রেম দিবাণী। (মেরাে) দরদ ন জানে কোয়।

সূলী উপর সেজ হমারী, সােনা কিস্ বিধ হােয়।

গগন মণ্ডল পর সেজ পিয়াকী কিস্ বিধ মিলনাে হােয়।

ঘায়লকী গতি ঘায়ল জানৈ জো কোই ঘায়ল হােয়।

জৌহরিকী গতি জৌহরি জানৈ দূজা ন জানৈ কোয় ॥

দরদকী মারী বন বন ডাে বৈদ মিল্যৌ নহি কোয়।

মীরাকী প্রভু পীর মিটে জব বৈদ সাঁবলিয়াে হােয় ।


—মীরাবাঈ

হরে মুরারে মধুকৈটভারে

ইমন-কল্যাণ—টিমে কাওয়ালী


হরে মুরারে মধুকৈটভারে, গােপাল গােবিন্দ মুকুন্দ শৌরে।

কলির পীড়নে ব্যথিত জীবগণে পরম ঔষধি এ ঘাের সংসারে।

যেভাবে যেই ভাবে, সে সেভাবে তারে,

তার হে কৃপাময় এ ঘাের সংসারে,

প্রেমনবঘন তুমি হে শ্ৰীমাধব উজলিছ সদা আনন্দ নীরে ।

উচ্চ পুচ্ছচূড়া শিরে শিখিপাখা,

পরাৎপর গুরু পরম সখা,

অন্তে শুনি যেন গঙ্গা নারায়ণ রাম নাম পরাণ ভরে ॥


—অজ্ঞাত

সাধন করনা চাহিয়ে মনবা

ভৈরবী—কার্যা


সাধন করনা চাহিয়ে মনবাঁ ভজন করনা চাই।

প্ৰেম লগানা চাহিয়ে মনবাঁ প্রীত করনা চাই।

নিত নাহসে হরি মিলে তাে জলজন্তু হােই।

ফল মূল খাকে হরি মিলে তাে বাদুর বাঁদরায়।

তুলসী পূজনসে হরি মিলে তাে ম‍্যঁয় পূঁজু তুলসী ঝাড়।

পাথর পূজসে হরি মিলে তাে ম্যয় পূঁজু পহাড়।

তিরণ ভখসে হরি মিলে তাে বহুৎ মৃগী অজা।

স্ত্রী ছােড়সে হরি মিলে তাে বহুৎ রহে খােজা ।

দুধ পিনেসে হরি মিলে তাে বহুৎ বৎস বালা।

মীরা কহে বিনা প্রেসে নহীঁ মিলে নন্দলালা ।


—মীরাবাঈ

শ্যামল বংশীওয়ালা নন্দলালা

সিন্ধু-মিশ্র—টুংরী


শ্যামল বংশীওয়ালা, নন্দলালা, মাতােয়ালা, গােকুল কে উজিয়ালা।

কৃষ্ণ কৃষ্ণ ক সাঁজ সবেরে, কৃষ্ণ নাম সব দুঃখ হারে

কৃষ্ণহী ভবসাগর পারে পার লগানেওয়ালা'।

কোই কহত হ্যয় কৃষ্ণ মুরারী, কোই কহত হয় রাসবিহারী,

কোই কহত হ্যয় হরে মুরারি জপে তুলসী মালা।


—অজ্ঞাত

গাওরে সঘনে বীণা হরিগুণ গাওরে

বৃন্দাবনী সারঙ্গ—কাওয়ালী


গাওরে সঘনে বীণা হরিগুণ গাওরে

সুরাগে সুতানে ভরা,

ললিত পীযূষপরা

উদারা মুদারা তারা তাহাতে মিশাও রে ॥

গলে দোলে মৃদু হিল্লোলে বনমালা,

অধরে ধরেছে হাসি হিল্লোলে লাল বিজলি খেলা

গােপকুলতারণ পতিতপাবন ভজ হরি শ্রীচরণ নাম বিলাও রে ।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

আও রে কানাইয়া বংশী বাজাইয়া

খাম্বাজ-কাওয়ালী


আও রে কানাইয়া বংশী বাজাইয়া নিকুঞ্জ-কাননে।

আবীর কুঙ্কুম কুসুম চন্দন লাগাব রাঙ্গা চরণে।

শােন হে কেশব, তব শ্যাম অঙ্গে

মােরা সখি সবে ফাগ দিব রঙ্গে;

লালে লাল নন্দলাল, লাল কাল তমাল, রঞ্জিব পীত বসনে ॥

ও নিঠুর হরি, ক’র না চাতুরি,

ছলনা জানিনা মােরা ব্রজনারী

চল ত্বরা করি, রাঙ্গাপায়ে পড়ি, দিয়াে না ব্যথা পরাণে।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মেরে তাে গিরিধর গােপাল দুসরাে ন কোঈ

ঝিঝিট—একতাল


মেরে তাে গিরিধর গােপাল দুসরাে ন কোঈ।

যাকে সিরে মাের-মুকুট, মেরাে পতি সােঙ্গ;

শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম কণ্ঠমাল হােই ৷৷

তাত-মাত-ভ্রাত-বন্ধু আপনাে নহি কোর্স।

দাঁড় দই কুল-কান ক্যা করিহে কঈ ||

সন্তান সঙ্গ বৈঠ বৈঠ লােকলাজ খােই।

চুনরীকে কিয়ে টুক টুক, ওঢ় লীহ্ন লােঈ ।

মােতী মুঙ্গে উব, বনমালা পােঙ্গ।

আঁসুবন হল সীৰ্চ সীৰ্চ প্রেম বেলি বঙ্গ ।

অবতাে বাত ফৈল গই আনন্দ ফাল হােঙ্গ।

দুধকী মথনিয়া বড়ে প্রেমে সে বিলােঙ্গ ।

মাখন জব কাড়ি এলিয়ে দাদৃ পিয়ে কেঈ।

মীরা প্রভু লগন লাগি, জো হােয় সাে হােই ৷


—মীরাবাঈ

মুঝে বারি বনবারী সেঁইয়া যানেকো দে

মূলতান—কাওয়ালী* 


মুঝে বারি বনবারী সেঁইয়া যানেকো দে।

যানেকো দেরে সেঁইয়া যানেকো দে (আজু ভলা)

মেরা বনবারী বাদি তুহারি, ছােড় চতুরাই সেঁইয়া যানেকো দে।

(আজু ভলা, যানেকো দে মেরে সৈঁইয়া যানেকে দে)

যমুনা কিনারে ভরে গাগরিয়া

(কর) জোড়ে কহত সেঁইয়া যানেকো দে ।


—স্বামী বিবেকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

শ্যাম মৈনে চাকর রাখােজী গিরিধারীলাল

ভজন—কাহরবা

শ্যাম মৈঁনে চাকর রাখােজী, গিরিধারীলাল! চাকর রাখােজী।

চাকর রহস্যুঁ বাগ লগাসুঁ, নিত উঠ দরশন পাসুঁ।

বৃন্দাবনকী কুঞ্জ গলিনমেঁ তেরী লীলা গাসুঁ ।

চাকরীমেঁ দরশন পাউ, সুমিরণ পাউঁ খরচী।

ভাব ভগতি জাগীরী পাউঁ, তিনু, বাতাঁ সরসী ।

মৌর মুকুট পীতাম্বর সােহে, গল বৈজন্তী মালা।

বৃন্দাবনমেঁ ধেনু চরাওয়ে, মােহন মুরলীবালা ।

হরে হরে নিত বাগ লগাউঁ বিচ বিচ রাখুঁ ক্যায়ারী।

শাঁওরিয়াকে দরশন পাউ, পহর কুসম সারী ॥

যােগী আয়া যােগ করনুকুঁ তপ করনে সন্ন্যাসী।

হরি ভজনকুঁ সাধু আয়া, বৃন্দাবনকে বাসী।

মীরাকে প্রভু গহির গম্ভীরা সদা রহাে জী ধীরা।

আধিরাত প্রভু দরশন দীন্‌হেঁ প্রেমনদীকে তীরা।

—মীরাবাঈ                   

আঁখিয়া হরি দরশন কি প্যাসী

ভজন—কার্ফা


আঁখিয়া হরি দরশন কি প্যাসী।

দেখ্যো চাহত কমলনয়নকো নিশিদিন রহত উদাসী।

কেশব তিলক মােতিনকি মালা, বৃন্দাবনকে বাসী।

নেহ লগায় ত্যাগী তৃণসম, ডারি গয়ে গল ফঁাসি ।

কাহুকে মনকী কো জানত, লােগনকে মন হাঁসি।

সুরদাস প্রভু তুম্হর দরশ বিনা লৈহোঁ করবত কাসী।


—সুরদাস

রে মন কৃষ্ণ নাম কহি লীজে

ভৈরবী—তিনতাল


রে মন কৃষ্ণ নাম কহি লীজে

গুরুকে বচন অটল করি মানহি, সাধু সমাগম কীজে ।

পঢ়িয়ে গুনিয়ে ভগতি ভাগবত, আউর কহা কথি কীজে।

কৃষ্ণনাম বিনু জনমু বাদিহী, বিরথা কাহে জীয়ে।

কৃষ্ণনাম রস বহো জাত হ্যয়, তৃষাবন্ত হৈ পীজে।

সুরদাস হরি শরণ তাকিয়ে জনম সফল করি লীজে ॥


—সুরদাস

অব মন কৃষ্ণ কৃষ্ণ কহি লীজে

মালশ্রী—তিনতাল


অব মন কৃষ্ণ কৃষ্ণ কহি লীজে।

কৃষ্ণ নামকী মালা লেকে কৃষ্ণ নাম চিত দীজে।

কৃষ্ণ নাম অমৃত রসনা, তৃষাবন্ত হাে পীজে।

কৃষ্ণ নাম হ্যয় সার জগতমে, কৃষ্ণ হেতু তন ছীজে।

রূপ কুবীর ধরি ধ্যান কৃষ্ণকো, কৃষ্ণ কৃষ্ণ কহী লীজে ।


—কুবীর

মেরে জনম মরণকে সাথী থাঁনে নহি বিসরু দিনরাতী

প্রভাবতী—তিনতাল


মেরে জনম-মরণকে সাথী থাঁনে নহি বিসরু দিনরাতী।

থাঁ দেখো বিন ফল ন পড়ত হয় জারত মেরী ছাতী।

উঁচী চঢ় চঢ় পন্থ নিহারু রােয় রােয় আঁখিয়া রাতী ।

যাে সংসার সকল জগ ঝুটো, ঝুঠা কুলরা ন্যাতী।

দৌ কর জোঊ্যা আরজ করুষ্টু শুন লীজ্যো মেরী বাতী।

যাে মন মেরাে বড়াে হরামী জো মদমাতাে হাতী।

সদ্গুরু হাথ ধরো শির উপর অঙ্কুশ দৈ সমঝতী।

পল-পল পিকো রূপ নিহারু নিরখ নিরখ সুখপাতী।

মীরাকে প্রভু গিরিধর নাগর, হরিচরণা চিতরাতী ।


—মীরাবাঈ

শুনি হাে ম্য়ঁয় হরি আওয়নকী আওয়াজ

দেবগান্ধার—ত্রিতাল (কানাড়া—একতাল)


শুনি হাে ময় হরি আওয়নকী আওয়াজ।

মহল চড় চড় জাউ মেরী সজনী! কব আওয়ে মহারাজ ।

দাদর মৌর পপইয়া বােলৈ, কোয়ল মধুরে সাজ।

উগ্যো ইন্দ্র চন্দ্র দিশি বরষৈ* দামনি ছছাড়ি লাজ ।

ধরতি রূপ নবা নবা ধরয় কান্ত মিলনকৈ কাজ।

মীরাকে প্রভু হরি অবিনাশী বেগ মিলাে সিররাজ ।


—মীরাবাঈ 


পাঠান্তর ঃ গরজে বদরা মেঘা বােল 

শ্যামল কদম্ব মূলে মুরলী বাজাওয়ত

দরবারী-কানাড়াঝাঁপতাল


শ্যামল কদম্ব মূলে মুরলী বাজাওয়ত

খেলত মােহন শ্যাম।

(নব) নীরদ নেত্রে য্যায়সে খেলত বিজুরিয়া নয়ন মােহে ।

প্রভু হাে কৃপালু অতুল গুণকো

দেখকে জীয়ারা হােত সুমধুর হাস জীয়রা উদাস।

ভজু বনবিহারী বনমালী বংশীধারী।


—অজ্ঞাত

তুম্হারে কারণ সব সুখ ছােড়া

ভজন—কাহারবা


তুম্হারে কারণ সব সুখ ছােড়া, অবমােহি কেঁউ তরসাও।

বিরহ বিথা লাগী উর অন্তর সাে তুম আয় বুঝাও 

অব ছােড়ত নহি বনে প্রভুজী চরণকো পাশ বুলাও।

বিরহ-বিথা লাগী উর-অন্দর, সাে তুম আয় বুঝাও 

মীরা দাসী জনম-জনমকী অঙ্গ অঙ্গ লাগাও।


—মীরাবাঈ

সুন্দর লালা নন্দ দুলালা

ভজন—কাওয়ালী


সুন্দর লালা নন্দ দুলালা নাচত শ্ৰীবৃন্দাবন মে

ভালে চন্দন তিলক মনােহর অলকা শােভে কপােলন মে ।

শিরে চূড়া নয়ন বিশালা কুন্দমালা হিয়া পর দোলে।

পহিরণ পীত পটাম্বর বােলে রুণু ঝুনু নূপুর চরণ মে ॥

কোই গাওয়ত পঞ্চম তান, বংশী পুকারাে রাধা নাম,

মঙ্গল তাল মৃদঙ্গ রসাল বাজাওয়ত কোই রঙ্গন মে।

রাধা কৃষ্ণ একতনু হােয়, নিধুবন মে যাে রঙ্গ মচাই

বিশ্বরূপ যাে ভগবান সােহি লীলা করত বৃন্দাবন মে ।


—বিশ্বরূপ গােস্বামী

রাধারমণ মদন-মােহন

দরবারী কানাড়া—ঝাঁপতাল


রাধারমণ মদন-মােহন মাধব মুকুন্দ মুরারে।

মধুসূদন মনােহর ময়ূরপুচ্ছধারি!

কৃষ্ণ কেশব কানু কালীয়-মর্দন

কলুষহারী কংসারী কালা কমলাপতি

শ্রীকান্ত দনুজারি হরি ।

ব্রজমে গিরিধর লাল ব্রজরাজ গােপাল

ব্রজপাল ব্রজবাল বাঁকে বিহারী।

নীল-নীরদ-শ্যাম নবল-কিশাের

জয়তি যদুনাথ শ্রীগােপীনাথ হরি ।


—নজরুল ইসলাম

নব নীরদ বরণ কিসে গণ্য শ্যামচাদ রূপ হেরে

মনােহরসাহী—ঝাঁপতাল


নব নীরদ বরণ কিসে গণ্য শ্যামচাদ রূপ হেরে।

করেতে বাঁশি, অধরে হাসি, রূপে ভুবন আলাে করে ৷

জড়িত পীত বসন জিনি তড়িত করে ঝলমল।

আন্দোলিত চরণবিধি হাদিসরােজে বনমাল,

নিতে গােপিনী জাতি কুল আলাে করে যমুনা কূল,

নন্দকুলচন্দ্র, কোটি চন্দ্র জিনি বিহরে ।

শ্যাম গুণধাম পশি, হাম হৃদি-মন্দিরে,

প্রাণ মন জ্ঞান সখি, হরে নিল বাঁশীর স্বরে।

গঙ্গানারায়ণের দুঃখ বলে কি জানাব তােরে,

জানতে যদি যেতে সখি, যমুনায় জল-আনিবারে।


—গঙ্গানারায়ণ

জগজন মোহন সঙ্কট-হারী কৃষ্ণ মুরারি

মিশ্র—তিনতাল


জগজন মোহন সঙ্কট-হারী কৃষ্ণ মুরারি শ্রীকৃষ্ণ মুরারি।

রাস রচাওত শ্যামবিহারী পরম যোগী প্রভু ভবভয় হারী ৷৷

গোপীজন-রঞ্জন ব্রজ-ভয়হারী, পুরুষোত্তম প্রভু গোলক-চারী ৷৷

বন্‌শী বাজাওত বন-বন-চারী ত্রিভুবন-পালক, ভক্ত-ভিখারী ॥

রাধাকান্ত হরি শিখি-পাখাধারী কমলা-পতি, জয় গোপী-মনোহারী ॥


—নজরুল ইসলাম

দিনবা যাতে হো বীত হ্যায়

ইমন-ভূপালী—কাওয়ালী


দিনবা যাতে হো বীত হ্যায়, মন তেরী হো,

ক্যা কিয়ো মুরখ মন, আকে দুনিয়া মে ৷৷

পরম আত্মা পরমেশ্বর ঈশ্বর, শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম পীতাম্বর,

দীনবন্ধু দয়াল দামোদর, ভজলে মুরখ মন কৃষ্ণবাসুদেবায় ৷৷

জনম লিয়া জব জননী গরভমে, বার বার জোরি আরজ করত হায়।

আকে দুনিয়া মে বিসর গয়ো সব কহত তানসেন শুনত হায় ৷৷


—মিঞা তানসেন

সংসারে মায়া ছাড়িয়ে কৃষ্ণ নাম ভজ মন

ভজন—তিনতাল


সংসারে মায়া ছাড়িয়ে কৃষ্ণ নাম ভজ মন।

কৃষ্ণ নাম জপরে জপরে পাবে অমূল্য ধন ৷৷

বিষয় বাসনা, মায়ার ছলনা সকলি ঘুচিয়া যাবে।

রূপের পিয়াসা পলকে মিটিবে নয়নে হেরিবে অরূপ রতন ॥

সুন্দর বরণ রূপের চেতনা সুন্দরে দশদিশি মগন।

অপরূপ বিভবে পরাণ ভরিবে রাজীব চরণে পরশ দান ॥


—হীরেন বসু

হে গোবিন্দ রাখু শরণ

ভজন—(তিনতাল) একতাল*


হে গোবিন্দ রাখু শরণ, অবতো জীবন হারে ॥

নীর পীবন হেত গয়ো, সিন্ধুকে কিনারে।

সিন্ধু বীচ বসত গ্রাহ চরণ ধরি পছারে ॥

চার প্রহর যুধ ভয়ো, লে গয়ো মাঝাধারে।

নাক কান যুগল লাগে কৃষ্ণকে পুকারে ॥

দ্বারকামে শব্দ ভয়ো, গরুড় ত্যাজি সিধারে।

গ্রাহকে মারকে গজরাজকো উধারে ৷৷

সুর কহে শ্যামসে আস হ্যায় তুম্হারে।

মেরা তেরা ন্যাব হোই জমরাজ-কো ডুবারে ॥


—সুরদাস


* স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত

সাজে নওল কিশোর চাঁদের তিলকে

ভজন—কাহারবা


সাজে নওল কিশোর চাঁদের তিলকে,

তার বনফুল মালা দোলে।

সে যে বংশীওয়ালা মোহিল ভুবন,

তার মোহন মুরলী বোলে;

বনফুল মালা দোলে।

মোর আনন্দ সে যে নন্দদুলাল,

সে যে ছন্দ দুলাল মোর নন্দদুলাল

রহে কদম্বমূলে যমুনার কূলে

বাঁশীতে উজান তোলে।

নিধুবনে সখা লয়ে খেলে হরি শিশু হয়ে,

অধরে মধুর হাসি জাগো

যেথা চলে শ্যামরায় ফুল জাগে পায় পায়,

ধূলিকণা পদছায়া মাগে।

যবে আমার জীবনে আসি ডাকিবে বাজায়ে বাঁশি—

যেন অন্ধ নয়নে জাগে প্রেমের মলয় লাগে,

হৃদয় দুয়ার যেন খোলে ৷


—অজয়কুমার ভট্টাচার্য

হরি তুম্ হরো জন কি ভীর

ভজন—কাহারবা


হরি তুম্ হরো জন কি ভীর

দ্রোপদী কি লাজ রাখি, তুরৎ বঢ়ায়ো চীর ॥

ভকত কারণ রূপ নরহরি ধজ্যো আপ শরীর।

হিরণ-কশ্যপ মারি লীন্‌হো ধজ্যো নহীন্ ধীর ॥

বুঢতে গজরাজ রাখ্যো, কিয়ো বাহার নীর,

দাসী মীরা লাল গিরিধারী চরণকমলপর শির* ॥


—মীরাবাঈ


*পাঠান্তর ঃ দাসা মীরা লাল গিরিধারী দুঃখ জহাঁ তহাঁ পী

ভেইয়ারে কানাইয়ারে নেক্ দরশ দিখায়ে যা রে

মিশ্র—কাহারবা


ভেইয়ারে কানাইয়ারে নেক্ দরশ দিখায়ে যা রে।

শ্যামলিয়া প্যারে বনশীওয়ারে মেরে ছাতিয়াপে আযা রে ॥

মেরো ভেইয়াবরজলালা ব্রজবাল সেঁইয়া নন্দদুলালা ৷৷

যমুনা কিনারে ধীর সমীরে (নেক) বাঁশরী বাজায়ে যা রে।

প্রাণ কি প্রাণ ভেইয়া মেরো ভিক্যা মাঁগি দরশন তেরো।

নয়নমে ঠারো পিয়াস নিবারো মেরে রাজন কি রাজা রে ॥


—ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

যদি গোকুলচন্দ্ৰ ব্ৰজে না এল

কীর্তন—খয়রা


যদি গোকুলচন্দ্ৰ ব্ৰজে না এল

(আমার) এহেন জীবন পরশ রতন কাঁচের সমান ভেল ৷৷

(আমি) গেরুয়া বসন অঙ্গেতে ধরিব শঙ্খের কুণ্ডল পরি।

(আমি) যোগিনীর বেশে যাব সেই দেশে যেথায় নিঠুর হরি ॥

(আমি) মথুরা নগরে প্রতি ঘরে ঘরে খুঁজিব যোগিনী হয়ে।

(আমায়) যদি মিলায় বিধি মম গুণনিধি বাঁধিব অঞ্চল দিয়ে ৷৷

(আমি) আপন বঁধুয়া আপনি বাঁধিব কেবা রাখিবারে পারে।

(আর) যদি রোধে কেউ ত্যজিব এ জীউ নারী বধ দিব তারে ৷৷

(আমি) পুনঃ ভাবি মনে বাঁধি বা কেমনে সে শ্যাম বঁধুয়া করে।

(হায়) বাঁধিয়া কেমনে ধরিব পরাণে তাই ভাবিতেছি চিতে ৷৷

জ্ঞানদাসে কয় বিনয় বচনে শুন বিনোদিনী রাধা ।

মথুরা নগরে যেতে মানা করে দারুণ কুলের বাধা ॥


—জ্ঞানদাস

অনেক সাধের পরাণ বঁধুয়া

কীর্তন—খয়রা


অনেক সাধের পরাণ বঁধুয়া আর না ছাড়িব তোরে!

পরাণ যেখানে রাখিব সেখানে যেতে তো দিব না ফিরে ॥

হিয়ায় হিয়ায় রাখিব তোমায়, রহিব পড়িয়া ও কমল পায়,

তুমি যে আমার হৃদয়ের হার পরশ চরণ শিরে ॥

কত আরাধনা জীবনে মরণে,

পেয়েছি তোমায় বলিব কেমনে,

দিবস রজনী কিছু নাহি জানি ভেসেছি ভেসেছি নীরে ॥


—অজ্ঞাত

আজু সই কুদিন সুদিন ভেল

কীর্তন—খয়রা


আজু সই কুদিন সুদিন ভেল।

মাধব মন্দিরে তরিতে আওব কপাল কহিয়া গেল

চিকুর ফুরিছে বসন খসিছে পুলক যৌবন ভার,

বাম অঙ্গ আঁখি সঘনে নাচিছে দুলিছে হৃদয় হার।

(অজু) বিধি অনুকূল ভেল ॥


—বিদ্যাপতি

মরিব মরিব সখি নিশ্চয় মরিব

কীর্তন—একতাল


মরিব মরিব সখি, নিশ্চয় মরিব,

কানু হেন গুণনিধি কারে দিয়ে যাব ।

তোমরা যতেক সখী থেক মঝু সঙ্গে,

মরণ কালে কৃষ্ণ নামটি লিখ মঝু অঙ্গে

ললিতা প্রাণের সখি মন্ত্র দও কানে,

মরা দেহ পড়ে যেন কৃষ্ণনাম শুনে।

না পোড়াইয়ো রাধা অঙ্গ না ভাসাইয়ো জলে,

মরিলে তুলিয়া রেখ তমালেরি ডালে ॥

সেই তো তমাল তরু কৃষ্ণ বরণ হয়,

অবিরত তনু মোর তাহে যেন রয় ৷৷

কবহুঁ সে পিয়া যদি আসে বৃন্দাবনে,

পরাণ পয়াব হাম পিয়া দরশনে ৷

ভনয়ে বিদ্যাপতি শুন বরনারী,

ধৈর্য ধরয় চিতে মিলব মুরারি ॥


—বিদ্যাপতি

মাধব তুঁহু রহল মধুপুর

কীর্তন—খয়রা


মাধব তুঁহু রহল মধুপুর

ব্রজকুল আকূল দুকুল কলরব, কানু কানু বলি ঝুর।

যশোমতীনন্দ অন্ধ সম বৈঠত, সাহসে চলই না পার ৷৷

সখাগণ ধেনু, বেনুরব বিছুরলু, তরুগণ মলিন সমান।

পিক শুক-সারী ময়ূরী ন নাচত, কোকিল ন করত হি গান ৷৷

বিরহিণী বিরহ কি কহব মাধব, দশ দিকে বিরহ হুতাশ।

সোই যমুনা জল কূল অধিক ভেল, কহত হি গোবিন্দদাস ৷৷


–গোবিন্দ দাস

আজু রজনী হম ভাগে পোহায়নু পেখনু পিয়া মুখচন্দা

বেহাগ—কাওয়ালী


আজু রজনী হম ভাগে পোহায়নু, পেখনু পিয়া মুখচন্দা।

জীবন যৌবন সফল করি মাননু, দশদিক ফেল নিরদ্বন্দ্বা ৷৷

আজু মঝু গেহ গেহ করি মাননু, আজু মঝু দেহ ভেল দেহা।

আজু বিহি মোরে অনুকূল হোয়ল, টুটুল সবহু সন্দেহা ॥

সোঈ কোকিল অব লাখ ডাকউ লাখ উদয় করু চন্দা।

পাঁচ বান অব লাখ বান হউ মলয় পবন বহুঁ মন্দা।

আজু মঝু যবহু পিয়া সঙ্গ হোয়ল, তবহি মানব নিজ দেহা।

বিদ্যাপতি কহ অল্পভাগী নহ, ধনি ধনি তুয়া নব লেহা ৷৷


—বিদ্যাপতি

নিঠুর হরি বংশীধারী খেলব হোরি তোমার সনে

খাম্বাজ—দাদরা


নিঠুর হরি বংশীধারী, খেলব হোরি তোমার সনে,

লাজ-মান পরিহরি এসেছি তাই কুঞ্জবনে ॥

আবীর-কুঙ্কুম, সাজাইব তব অঙ্গে

ভাসিয়ে প্রেমতরঙ্গে দাসী হব ঐ চরণে ॥


—অজ্ঞাত

জাগো মোহন প্যারে

ভৈরবী—তিনতাল


জাগো মোহন প্যারে;

সাঁবরি সূরত মোরে মন ভাওঁরে, সুন্দর লাল হামারে।

প্রাত সমে উঠ ভানু উদয় ভয়ো,

গোয়াল বাল সব ভূপত ঠাড়ে;

দরশনকে সব ভুখে প্যাসে উঠিয়ো নন্দ-কিশোরে।


—অজ্ঞাত

জাগ ওঠে সব জন তুম জাগো

বিলাবল—তিনতাল


জাগ ওঠে সব জন তুম জাগো;

গৌওনকে চরবাল চরৈয়া।

গোয়াল বাল সব গৌয়া চাওয়ত,

তুমরে কারণ আওয়ত ধাওয়ত,

সদারঙ্গ মন তুমসোঁ লাগা!


—সদারঙ্গ

লাগরহ্যো মন রাদা বরসে

খাম্বাজ—তিনতাল


লাগরহ্যো মন রাদা বরসে;

অউর কহে কছু অউর উপরসে।

দিন রাতিয়াঁ আখিয়াঁ আগে মেরী,

ঠাড় রহে কছু রূপ সুঘরসে।

আনন্দ ঘন প্রভু লায়ে নেহা,

প্রেম রঙ্গোগী মায় গিরিধরবরসে |


—অজ্ঞাত

মম মন মন্দিরে রহ নিশিদিন

মিশ্র বেহাগ—কাহারবা


মম মন মন্দিরে রহ নিশিদিন

কৃষ্ণ মুরারি শ্রীকৃষ্ণ মুরারি

বন্দনা গানে তব বাজুক জীবন বীণ ৷৷

ভক্তি প্রীতি মালা চন্দন

তুমি নিওহে নিও চিতনন্দন

জীবন মরণ তব পূজা নিবেদন

সুন্দর হে মনোহারী।

এস নন্দকুমার আর নন্দকুমার

হবে প্রেম প্রদীপে আরতি তোমার,

নয়ন যমুনা ঝরে অনিবার

তোমারি বিরহে গিরিধারী ॥


—অজ্ঞাত

মোরি ইতনি বিনতি অব সুনিয়ে

জৌনপুরী—তিনতাল


মোরি ইতনি বিনতি অব সুনিয়ে;

বনোয়ারী কৃষ্ণমুরারি শরণাগতকে, তুম হিতকারী।

ম্যয় হুঁ দীন অনাথ নাথ তুম,

ভক্তনকে অঘ সঙ্কটহারী;

তুম্হরে চরণ শরণ অব আয়ো,

কাট দ্বন্দ্ব ফন্দ অতভারী ॥


—অজ্ঞাত

তাতল সৈকত বারিবিন্দুসম সুতমিত রমণী সমাজে

ধানসী (কীর্তন)


তাতল সৈকত বারিবিন্দুসম-সুতমিত-রমণী-সমাজে।

তাহে বিসরি মন, তাহে সমর্পিলু, অব মঝু হব কোন কাজে ॥

মাধব, হাম পরিণাম-নিরাশা।

তুঁহু জগতারণ দীন-দয়াময় অত লে তুঁহারি বিশোয়াসা।

আধ জনম হাম নিঁদ গোঙায়লু, জরা শিশু কতদিন গেলা।

নিধুবনে রমণী-রসরঙ্গে মাতলু, তোহে ভজব কোন বেলা ৷

কত চতুরানন মরি মরি যাবত, ন তুয়া আদি অবসানা।

তোহে জনমি, পুনঃ, তোহে সমাওত, সাগর লহরী সমানা ৷৷

ভনয়ে বিদ্যাপতি শেষ শমন-ভয়, তুয়া বিনু গতি নাহি আরা।

আদি-অনাদিক-নাথ কহায়সি, অব তারণ-ভার তুঁহারা ॥


—বিদ্যাপতি

সজনিয়াঁ পানিয়া ভরনে কৈসে জাউঁ

কাফী—কাওয়ালী


সজনিয়াঁ পানিয়া ভরনে কৈসে জাউঁ?

নাগর লচকি আই করত ঢিঠাই, তট বংশী বট যমুনাকে তট মে ৷৷

উচকি উচকি তান লেত বংশীয়া কী,

ডাগর চলত করত ঢিঠাই তট বংশীবট যমুনাকে তট মে ৷৷


—অজ্ঞাত

অব মথুরাপুর মাধব গেল

মনোহরসাহী—খয়রা


অব মথুরাপুর মাধব গেল, গোকুল মানিক সখি, কো হরি নেল।

(ওকে হরি নিল গো— প্রাণের হরি, ব্রজপুরী আঁধার করি,

হিয়ার মানিক, প্রাণ মন শূন্য করি ইত্যাদি)।

গোকুলে উছলল করুণার রোল নয়নের জলে হের বহয়ে হিল্লোল,

(আজি উছলিল, যমুনা জল, ব্রজ গোপিনীর নয়ন জলে,

শুন ভেল মন্দির, শুন ভেল নগরী, শুন ভেল দশদিশ, শুন ভেল সগরী,

(সব শূন্য হল, একবিনে সব, এক ভানুকানু বিনে

কৈছনে যাওব যমুনাকী তীর, কৈছে নেহারব কুঞ্জকুটীর,

সহচর সজ্ঞে যাহা কয়ল ফুলখেরি, কৈছনে জীয়ব তাহি নেহারি,

(আমি বাঁচি কেমনে–হেরে যমুনে, কুঞ্জ হেরে)

যমুনা পুলিন বিহারী ছাড়ি, কুঞ্জকাননচারী ছাড়ি, কুঞ্জ হেরে।

ভনয়ে বিদ্যাপতি করি অবধান, কৌতুকে ছাপি তঁহি রহু কান্ ॥


—বিদ্যাপতি

প্রভুজী তুঁহু হামারি প্রাণ তুঁহু জগৎ তুঁহু আশমান্

ভজন


প্রভুজী! তুঁহু হামারি প্রাণ তুঁহু জগৎ তুঁহু আশমান্।

তুঁ হামারি আঁখ কি শশী, তুঁহু হামারি সুরকি বংশী,

তুঁহু হামারি প্রেম কি প্রীতম্, তুহু হামারি গান।

তুঁহু হামারি জ্ঞান কি বাতি, তুঁ হামারি হিয়াকি ছাতি,

তুঁ হামারি দুখ্‌কি শান্তি, ‘দাসী মীরা’কে ধ্যান ॥


—মীরাবাঈ

তুম বিন মৌরী কৌন খবর লৈ গোবর্ধন গিরিধারী

পিলু—তিনতাল


তুম বিন মৌরী কৌন খবর লৈ গোবর্ধন গিরিধারী।

মৌর মুকুট পীতাম্বর শোহে, কুণ্ডলকী ছর ন্যারী ৷

ভরীসভা মে দ্রৌপদি ঠাড়ে রাখো লাজ হমারী।

মীরা কে প্রভু গিরধর-নাগর চরণ কমল বলিহারী ॥


—মীরাবাঈ

চলো মন গঙ্গা যমুনাতীর

পাহাড়ী—তিনতাল


চলো মন গঙ্গা যমুনাতীর,

গংগাযমুনা নিরমল পানী শীতল হোত শরীর ॥

বন্‌শী বজাওত গাওত কান্হা, সংগ লিয়ে বল-বীর।

মৌর মুকুট পীতাম্বর সোহে, কুণ্ডল ঝলকত হীর।

মীরাকে প্রভু গিরিধর-নাগর চরণ কমল পর সির।


—মীরাবাঈ

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর

মল্লার—যৎ


এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।

এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর ॥

ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া।

কান্ত পাহুন বিরহ দারুণ সঘনে খর শর হন্তিয়া ৷৷

কুলিশ শত শত পাত মোদিত ময়ূর নাচত মাতিয়া।

মত্ত দাদুরি ডাকে ডাহুকী ফাটী যাওত ছাতিয়া ॥

তিমিরদিগ ভরি ঘোর যামিনী অথির বিজুরি পাঁতিয়া।

বিদ্যাপতি কহ কৈসে গোঙায়বি হরি বিনে দিন রাতিয়া ৷৷


—বিদ্যাপতি

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু

কীর্তন—একতাল


সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল।

অমিয়া-সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল ৷৷

সখি, কি মোর কপালে লেখি।

শীতল বলিয়া চাঁদ সেবিনু, ভানুর কিরণ দেখি ৷

উচল বলিয়া অচলে চড়িনু পড়িনু অগাধ জলে।

লমী চাহিতে দারিদ্র্য বেঢ়ল, মানিক হারানু হেলে।

নগর বসালাম সাগর বাঁধিলাম মানিক পাবার আশে

সাগর শুকাল মাণিক লুকাল অভাগীর করম-দোষে ॥

পিয়াস লাগিয়া জলদ সেবিনু বজর পড়িয়া গেল।

জ্ঞানদাসকহে কানুর পিরীতি মরমে রহিল শেল ॥


—জ্ঞানদাস

গোবিন্দ-মুখারবিন্দ নিরখি মন বিচারে

খাম্বাজ-—যৎ*


গোবিন্দ-মুখারবিন্দ নিরখি মন বিচারে।

চন্দ্ৰ কোটি, ভানু কোটি, কোটি মদন হারে ॥

সুন্দর কপাল সোহে পঙ্কজদলনয়না,

অধরবিম্ব মধুর হাস, কুন্দকলিকাদশনা ॥

মণিকুণ্ডল মকরাকৃতি অলকাবলী পুঞ্জা।

কেশরকো তিলক গোয়ি সোনেমরি মুঞ্জা

নবজলধর পীতাম্বর বনমালা গলে সোহে

লীলানট সূরকে প্রভু জগজনমন মোহে ৷৷


—সুরদাস


* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

একবার ব্রজে চল ব্রজেশ্বর

ঢপ-কীর্তনের সুর


একবার ব্রজে চল ব্রজেশ্বর

দিনেক দুয়ের মতো—

(ও তোর) মন মানে তো থাকবি সেথা,

নইলে আসবি দ্রুত।

আগে ছিল একহেটো জল,

নৈলে যমুনার তীরে বসে ব্রজ নিরখিবে।

যদি বল ব্ৰজে যেতে চরণেতে

ধুলা লাগিবে—

(বললে বলতেও পার, আগে রাখাল ছিলে

এখন রাজা হয়েছ)।

—না হয় ব্রজনারীর নয়ন নীরে

চরণ পাখালিবে ৷৷


—অজ্ঞাত

(ওরে) নীল যমুনার জল

কীর্তন—দাদরা


(ওরে) নীল যমুনার জল

বল রে মোরে বল,

কোথায় ঘনশ্যাম, আমার কৃষ্ণ ঘনশ্যাম,

আমি বহু আশায় বুক বেঁধে যে এলাম

এলাম ব্রজধাম ৷৷

তোর কোন কূলে কোন বনের মাঝে

আমার কানুর বেণু বাজে

আমি কোথায় গেলে শুনতে পাব

রাধা-রাধা-রাধা-রাধা নাম?

আমি শুধাই ব্রজের ঘরে ঘরে

কৃষ্ণ কোথায় বল।

কেন কেউ কহে না কথা

হেরি সবার চোখে জল।

বলরে আমার শ্যামল কোথায়

কোন মথুরায় কোন দ্বারকায় (বল যমুনা বল)

বাজে বৃন্দাবনের কোন পথে তার

নূপুর অবিরাম ৷৷


—কাজী নজরুল ইসলাম

ননদিন তুই বলগে নগরে

ঝিঁঝিট-খাম্বাজ—যৎ্


ননদিন তুই বলগে নগরে

ডুবেছে রাই রাজ নন্দিনী কৃষ্ণ কলঙ্ক সাগরে।

কাজ কি গোকুল কাজকি গোকুল

ব্রজ কুল সব হোল প্রতিকূল

আমি যে সঁপেছি গো কুল সেই অকূল কাণ্ডারী করে।

আমার কাজ কি বাসে

কেবল কাজ কি বাসে

কাজ কেবল কি সেই পীত বাসে

যে যাঁরে তাঁহারে ভালবেসে

হৃদয় বাসে সে কি বাসে বাস করে


—অজ্ঞাত

মাধব মধুসূদন মুকুন্দ মুরারে

আড়ানা—সুরফাঁক্তা*


মাধব মধুসূদন মুকুন্দ মুরারে,

কেশব কমললোচন ব্রজবনোয়ারী।

জনাদন জগত-গর্ব-খর্বকারী,

অসুরনাশন কংসাসুরহারী ॥

--বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ বিরাট বামন

বিরিঞ্চিবন্দন বিশ্ববিহারী।

কহে মিঞা তানসেন তুম হো ত্রিগুণগুণী,

গোপাল গিরিবর গোবর্ধনধারী ॥


—মিঞা তানসেন



*স্বরলিপি : সাধন সঙ্গীত

পোহাল শর্বরী

ভৈরবী—ধামার


পোহাল শর্বরী।

বৃন্দাবন-কেলিকুঞ্জে সব সখী রঙ্গে ভঙ্গে,

ফাগুন মাসে খেলে হোলি, সঙ্গে শ্রীহরি।

মধুর মৃদঙ্গ বাজে আনন্দসঙ্গীত-মাঝে,

মুরলী বাজায় শ্যাম বংশীধারী ॥

ঝুলনে আবীর খেলা, খেলে আজি নন্দলালা,

হেরি সে অপূর্ব লীলা বিমোহিত ব্রজনারী,

নাচে ময়ূর-ময়ূরী কিবা, কুঞ্জবনে কি নবশোভা,

গুঞ্জে গুঞ্জে নাচে অলিদল, শুক-সারী ॥


—স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ

শ্রীশ্রী বুদ্ধদেব সঙ্গীত

কপিলাবস্তু নগরে শাক্য বুদ্ধ তনু ধরিলে নারায়ণ

ভৈরবী—একতাল


কপিলাবস্তু নগরে শাক্য বুদ্ধ তনু ধরিলে নারায়ণ।

যজ্ঞ পশুর কাতর স্বর পশিল শ্রবণে টলিল আসন ৷৷

“মা হিংস্যাঃ সর্বভূতানি”

সর্বভূতে বিভু এক জানি,

বেদ মর্ম বুঝালে, প্ৰদানি পশু বিনিময়ে নিজের জীবন ৷

জরা, মৃত্যু, ব্যাধি করিতে নিরাস,

ত্যজি ভার্যা, পুত্র, রাজ্য গৃহবাস,

সুতীব্র বৈরাগ্যে লইয়া সন্ন্যাস কত ঘোর তপ করি আচরণ-;

স্বস্থ সুজাতার পায়স ভোজনে,

বৈশাখী শুভ পূর্ণিমা দিনে,

ল’ভি বোধিসুধা সম সর্বজনে সমগ্র ভুবনে করিলে বণ্টন ৷৷


—স্বামী তপানন্দ

ধ্যান স্তিমিতলোচন যোগী কে তুমি বসি তরুতলে

ভীমপলশ্ৰী—একতাল


ধ্যান স্তিমিতলোচন যোগী কে তুমি বসি তরুতলে।

তপের তাপেতে শীর্ণ শরীর, শ্রীমুখেতে তবু জ্যোতি খেলে

হেরি রাজটীকা ভালেতে তোমার, মনে লয় বুঝি রাজার কুমার।

প্রাসাদ কাহার করি অন্ধকার, যৌবনে যোগী সাজিলে।

তুমি কি হে আজি করিয়াছ পণ, “জ্ঞান লাভ কিংবা শরীর পাতন”

নেহারিয়া তব ত্যাগ অতুলন, পাষাণ হৃদয় যায় গলে।

ত্রিতাপ তাপিত জীবের উদ্ধার, করিতে তুমি কি আসিলে আবার,

“প্রেম-মৈত্রী” করিতে প্রচার সব সুখ আশ তেয়াগিলে ॥


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জুড়াইতে চাই—কোথায় জুড়াই

ধানিমিশ্র—একতাল


জুড়াইতে চাই—কোথায় জুড়াই?

কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই!

ফিরে ফিরে আসি, কত কাঁদি হাসি,

কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই!

কে খেলায়, আমি খেলি বা কেন?

জাগিয়ে ঘুমাই কুহকে যেন!

এ কেমন ঘোর, হবে নাকি ভোর,

অধীর-অধীর-যেমতি সমীর, অবিরাম গতি, নিয়ত ধাই!

জানি না কেবা, এসেছি কোথায়,

কেন বা এসেছি, কে বা নিয়ে যায়।

যাই ভেসে ভেসে, কত কত দেশে,

চারিদিকে গোল, ওঠে নানা রোল,

কত আসে যায়, হাঁসে কাঁদে গায়, এই আছে আর তখনি নাই ॥

কি কাজে এসেছি— কি কাজে গেল,

কে জানে কেমন, কি খেলা হল;—

প্রবাহের বারি, রহিতে কি পারি?

যাই—যাই কোথা?—কূল কি নাই?

কর হে চেতন,—কে আছ চেতন,

কত দিনে আর ভাঙ্গিবে স্বপন?—

যে আছ চেতন, ঘুমা’ওনা আর,

দারুণ এ ঘোর নিবিড় আঁধার,

কর তম নাশ, হও হে প্রকাশ,—

তোমা বিনা আর নাহিক উপায়, তব পদে তাই শরণ চাই ৷৷


—গিরিশচন্দ্র ঘোষ

শ্রীশ্রী যিশুখ্রিষ্ট সঙ্গীত

পান্থনিবাস মাঝে কে হাসে শিশু শশী

কেদারা—কাওয়ালী


পান্থনিবাস মাঝে কে হাসে শিশু শশী।

গগন ছাড়িয়া চাঁদ ভূতলে উদয় আসি ৷

চাঁদ ওতো নয় হায়,

চাঁদ পড়ে তারই পায়

ত্রিভুবন আলো করে শ্রীমুখেতে দেব হাসি ৷৷

সেই হাসি নিরখিয়া,

পুলকে পূরিল হিয়া,

গগনে উঠিল গান জয় জয় ঈশামসি।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

পুরুষোত্তম হে প্রিয়তম বেথেলহামে গোশালায়

ছায়ানট—একতাল


পুরুষোত্তম হে প্রিয়তম

বেথেলহামে গোশালায়

হ’য়ে দীন শিশু, নাম ল’য়ে যিশু আলো কর এ ধরায় ॥

বিশ্বের পাপ করিতে ক্ষালন,

ক্রুশে পূততনু দাও বিসর্জন,

হৃদয় রুধিরে করহে তর্পণ অবিচারে মরি হায় ॥

অপাপ-বিদ্ধ মেরীর নন্দন,

প্রেমসিন্ধু মনো বিনোদন,

নিজগুণে দেহ চরণে শরণ অশরণে করুণায় ॥


—স্বামী তপানন্দ

ক্রুশ যাহার সুপরিচয় সত্য সাধন সার

ভৈরবী—দাদরা


ক্রুশ যাহার সুপরিচয় সত্য সাধন সার,

প্রেমের যিশু, ত্যাগের গুরু বন্ধু এই যাত্রার।

অঙ্গে যাহার রিক্ত পথিক চির-দৈন্য বেশ,

দীনের সেবায় বিলাল তাই ভুলে দুঃখ ক্লেশ,

সদাই সে যে ব্যাকুল রে ভাই লইতে বোঝার ভার।

অন্তর যাহার পূর্ণ সুধায় পুণ্য পরশ গন্ধ,

সুন্দর তার শ্রীমুখ খানি ধেয়ানের আনন্দ,

জীবন মরণ সার্থক ভাই সঙ্গ লভি তার ॥


—সন্তোষকুমার পাত্র

হে মেরী নন্দন ভুবন পুণ্যা ধরণী পদ পরশে

ছায়া খাম্বাজ—কাওয়ালী


(মূর্তমহেশ্বরমুজ্জ্বলভাস্করম্ ... ইত্যাদি সুর)

হে মেরী নন্দন ভুবন পুণ্যা ধরণী পদ পরশে।

প্রেম পীযূষ দানে অভয় বিতরি প্রাণে পূর্ণ করিলে মহী হরষে ৷৷

চিত্ত বিমোহন মানসরঞ্জন প্রীতি করুণা বরষে

পূত করিলে ধরা স্বার্থ কলুষ ভরা রচিলে স্বরগ মরতে ॥

অনুপম শোভন নরদেহ ধারণ মুগধ জগত প্রেম আবেশে।

জীব দুখ লাগিয়া তনুমন সঁপিয়া ক্রুশ যাতনা সহ হরষে ॥

করি প্রভো নিবেদন যেন রহে প্রাণমন চরণকমলে সদা হরিষে।

নিত্য নিরন্তর যেন চিত্ত চকোর প্রেম সুধা পিয়ে রয় বিলাসে ৷


—ব্রহ্মচারী সৎ চৈতন্য

শ্রীশ্রী শঙ্করাচার্য্য সঙ্গীত

প্রণাম মন্ত্ৰ

প্রণাম মন্ত্ৰ


যদ্বাণীদ্যমণিধ্বস্তা মন্মোহধ্বান্তসন্ততিঃ।

শঙ্করং শঙ্করং বন্দে ত্রয্যম্তাম্বুজভাস্করম্ ৷৷

শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণানাং আলয়ং করুণালয়ম্।

নমামি ভগবৎ-পাদং শঙ্করং লোকশঙ্করম্ ৷৷

কে তুমি হে বাল-যতি

ভূপালি—তেওরা


কে তুমি হে বাল-যতি

কৈলাসে ত্যজি হায় এলে কি করুণায় ধরি কায়া পশুপতি ॥

ষোড়শ বর্ষ না হইতে অতীত,

বেদাদি-সর্বশাস্ত্র করি অধিগত,

রচ প্রস্থানত্রয় ভাষ্য সুচিন্তিত, সুললিত কত স্তুতি ॥

অদ্বৈত শ্রুতিমত করিতে প্রবর্তন,

কর্ম সমুচ্চয় করিলে খণ্ডন,

যাচে পরাজিত মিশ্র মণ্ডন চরণে শরণাগতি;

সমগ্র ভারতে আসিন্ধুহিমাচলে,

তর্কে জিনি যত নাস্তিক-সকলে,

জনহিতে মঠ-চতুষ্ক স্থাপিলে, লহ দীনের প্রণতি ॥


—স্বামী তপানন্দ

নমামি শঙ্কর আচার্য প্রবর পদযুগে তব কোটি নমস্কার

ইমন-কল্যাণ—তেওরা


নমামি শঙ্কর, আচার্য প্রবর, পদযুগে তব কোটি নমস্কার।

বেদান্ত বিজ্ঞান অজ্ঞে শিখাইতে করুণার বশে হ’লে অবতার ॥

শিবগুরু-পুত্র রূপে নরাকারে, মায়াবশে জন্মি বিশিষ্টা-উদরে;

বিশ্বেশ্বর ফিরি যতি-বেশ ধ'রে, বেদান্ত মহিমা করিলে প্রচার ॥

বদরিকাশ্রমে সমাধি প্রজ্ঞায়, তিনটি প্রস্থান শ্রুতি, স্মৃতি, ন্যায়,

.ভাষ্যে বুঝাইলে প্রাঞ্জল ভাষায়, যুক্তিবলে ছেদি সংশয় সবার;

শিখালে সংসার মরীচিকাকার, আত্মা নহে মন, বুদ্ধি অহঙ্কার,

ভ্রান্ত এ বহুত্ব-প্রতীতি মায়ার, জীবব্রহ্মাভিন্ন নিত্য নির্বিকার ॥


—স্বামী গৌরীশ্বরানন্দ

ভারতগগনে জ্ঞান-ভাস্কর কে তুমি হে চীর-ধারী

গান্ধার—একতাল


ভারতগগনে জ্ঞান-ভাস্কর কে তুমি হে চীর-ধারী।

ফুল্ল আনন রাজীবলোচন মুনি-গণ-মনোহারী।

বিবেক-উজ্জ্বল প্রেম-ঢল-ঢল বিষয়-বিরাগী চিত্ত কোমল।

বিগতসংশয় হত রিপুছয় তুমি কি গো ত্রিপুরারি ॥

ধর্মের যবে বন্ধন-দশা কর্মের নাগপাশে।

অমিতবীর্য! জ্ঞান-অসি নিয়া মুক্ত করিলে এসে ॥

শুনি তব মুখে বেদ-হুঙ্কার জনম-মরণ ঘুচে সবাকার।

শঙ্কর! মম শঙ্কা হরণ কর মোহ অপসারি ॥


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ সঙ্গীত

রাধাকৃষ্ণ প্রণয়বিকৃতহ্লাদিনী শক্তিরস্মা

“রাধাকৃষ্ণ প্রণয়বিকৃতহ্লাদিনী শক্তিরস্মা-

দেহাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।

চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং

রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ ৷৷


—শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত

শ্রীগৌরাঙ্গ সুন্দর নবনটবর তপতকাঞ্চন কায়

কীর্তন—একতাল*


শ্রীগৌরাঙ্গ সুন্দর নবনটবর তপতকাঞ্চন কায়।

ক’রে স্বরূপ বিভিন্ন, লুকাইয়ে চিহ্ন, অবতীর্ণ নদীয়ায় ॥

কলিঘোর অন্ধকার বিনাশিতে, উন্নত উজ্জ্বল রস প্রকাশিতে,

তিন বাঞ্ছা তিন বস্তু আস্বাদিতে, এসেছ তিনেরি দায়;

সে তিন পরশে, বিরস-হরষে, দরশে জগৎ মাতায় ॥

নীলাব্জ হেমাজে করিয়ে আবৃত, হ্লাদিনীর পুরাও দেহভেদগত;

অধিরূঢ়মহাভাবে বিভাবিত, সাত্ত্বিকাদি মিলে যায়।

সে ভাব আস্বাদনের জন্য, কাদেন অরণ্যে,

প্রেমের বন্যে ভেসে ভেসে যায় ॥

নবীন সন্ন্যাসী, সুতীর্থ-অন্বেষী,

কভু নীলাচলে কভু যান কাশী;

অযাচকে দেন প্রেম রাশি রাশি, নাহি জাতিভেদ তায়।

দ্বিজ নীলকণ্ঠ ভণে, এই বাঞ্ছা মনে, কবে বিকাব গৌরের পায় ৷


—নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়



* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

গুণাতীত সর্ব গুণাধার রূপরহিত নিত্য সাকার

খাম্বাজ—চৌতাল


গুণাতীত সর্ব গুণাধার রূপরহিত নিত্য সাকার,

চেতন-ঘন নিরঞ্জন পুরুষোত্তম গৌর অবতার ॥

করুণাময় নর শরীর ধারণ, মিলিত-শ্রীরাধা নন্দনন্দন।

সহ নিজজন ত্যজি বৃন্দাবন সুরধুনী তীরে লীলাবিস্তার ॥

নিত্য নিরত নাম কীর্তনে, কলি কল্মষ হরণ কারণে।

কম কলেবর ধূলায় ধূসর লুণ্ঠিত ভূমে অনিবার

জীবের দুঃখে সতত অধীর, কৌপীনবাস মুণ্ডিত শির।

ব্রজ প্রেমরস আস্বাদনে কামকাঞ্চন পরিহার ॥


—স্বামী প্রেমেশানন্দ

কার ভাবে গৌর বেশে জুড়ালে হে প্রাণ

ভৈরবী—একতাল


কার ভাবে গৌর বেশে, জুড়ালে হে প্রাণ,

প্রেম সাগরে উঠলো তুফান, থাকবে না আর কুল মান।

(মন মজালে গৌর হে) ॥

ব্রজ মাঝে, রাখাল সাজে, চরালে গোধন,

ধরলে করে মোহন বাঁশী, মজল গোপীর মন,

ধরে গোবর্ধন, রাখলে বৃন্দাবন,

মানের দায়ে ধ’রে গোপীর পায়, ভেসে গেল চাঁদ বয়ান।

(মন মজালে গৌর হে) |


—গিরিশচন্দ্র ঘোষ

জয় শচীনন্দন গৌর গুণাকর প্রেমপরশমণি ভাব রসসাগর

ঝিঁঝিট-খাম্বাজ—ঠুংরী


জয় শচী-নন্দন, গৌর গুণাকর, প্রেম-পরশমণি ভাব রস-সাগর।

কিবা সুন্দর মূরতি মোহন আঁখি রঞ্জন কনকবরণ;

কিবা মৃণালনিন্দিত, আজানুলম্বিত, প্রেমপ্রসারিত, কোমল যুগল কর;

কিবা রুচির বদন-কমল, প্রেম রসে ঢল ঢল,

চিকুর কুন্তল, চারু গণ্ডস্থল, হরিপ্রেমে বিহ্বল, অপরূপ মনোহর ॥

মহাভাবে মণ্ডিত, হরি রসে রঞ্জিত, আনন্দে পুলকিত অঙ্গ;

প্রমত্ত মাতঙ্গ,    সোনার গৌরাঙ্গ,

আবেশে বিভোর অঙ্গ, অনুরাগে গর গর ॥

প্রেমরস নায়ক,    হরিগুণগায়ক,

সাধু-হৃদি রঞ্জক, অলোকসামান্য, ভক্তিসিন্ধু শ্রীচৈতন্য,

আহা, ‘ভাই’ বলি চণ্ডালে,    প্রেম-ভরে লন কোলে,

নাচেন দু বাহু তুলে, হরি বোল হরি বলে;

অবিরল ঝরে জল, নয়নে নিরন্তর।

‘কোথা হরি প্রাণধন’ বলে করে রোদন,

মহাস্বেদ কম্পন, হুঙ্কার গর্জন;

পুলকে রোমাঞ্চিত,    শরীর কদম্বিত,

ধূলায় বিলুণ্ঠিত সুন্দর কলেবর

হরি লীলারস-নিকেতন, ভক্তিরস-প্রস্রবণ;

দীনজনবান্ধব, বঙ্গের গৌরব, ধন্য ধন্য শ্রীচৈতন্য প্রেম-শশধর ॥


—ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

কি দেখিলাম রে কেশব ভারতীর কুটীরে

কীর্তন—লোফা


কি দেখিলাম রে, কেশব ভারতীর কুটীরে,

অপরূপ জ্যোতি, শ্রীগৌরাঙ্গমূরতি, দু'নয়নে প্রেম বহে শতধারে।

গৌর মত্ত-মাতঙ্গের প্রায়, প্রেমাবেশে নাচে গায়,

কভু ধূলাতে লুটায়, নয়ন জলে ভাসে রে,

কাঁদে আর বলে হরি, স্বর্গ-মর্ত্য ভেদ করি, সিংহরবে রে;

আবার দত্তে তৃণ লয়ে, কৃতাঞ্জলি হয়ে,

দাস্য মুক্তি যাচেন বারে বারে ॥

মুড়ায়ে চাঁচরকেশ, ধরেছেন যোগীর বেশ,

দেখে ভক্তি প্রেমাবেশ, প্রাণ কেঁদে উঠে রে,

জীবের দুঃখে কাতর হয়ে,এলেন সর্বস্ব ত্যজিয়ে,

প্রেম বিলাতে রে,

প্রেমদাসের বাঞ্ছা মনে,শ্রীচৈতন্য চরণে 

দাস হয়ে বেড়াই দ্বারে দ্বারে ॥


—চিরঞ্জীব শর্মা*


*ত্রৈলোক্যনাথ সান্যালের ছদ্মনাম

তোরা কে দেখবি চলে আয়

কীর্তন—আড়খেম্‌টা


তোরা কে দেখবি চলে আয়,

অপূর্ব গৌরাঙ্গ শশী উদয় নদীয়ায় ৷৷

দুটি শিশু বাহু তুলে,

নাচে প্রেম-ভরে দুলে দুলে,

বিধু মুখে মধুর বোলে হরি গুণ-গায় ৷৷

ধন্য রে সব নদেবাসী,

তোদের কি নাম শুনাল আসি

ঘুচল তোদের ভবের ফাঁসি, খসল যম-দায় ৷৷

চলরে ভাই সবাই মিলে, ঐ গোরা চাঁদের সঙ্গে মিলে

নাচব হরি হরি বোলে, লুটবো রাঙ্গা পায় ৷


—বিশ্বরূপ গোস্বামী

গৌরসুন্দর প্রেম জলধর তপত-কাঞ্চন কায়

কীর্তন—একতাল


গৌরসুন্দর প্রেম জলধর তপত-কাঞ্চন-কায়,

নদীয়া নগরে হরি-প্রেম ভরে নাচিয়া নাচিয়া যায় ॥

রক্ত কমল কর পদতল, শতদল মুখশশী,

নখরে নখরে সতত বিহরে নিশাকর রাশি রাশি।

বেণু বীণারব মানে পরাভব কণ্ঠে মধুর ভাষা,

তাহে অবিরাম গাহে হরিনাম জাগায়ে প্রেম পিপাসা ৷

শ্রীবাস অঙ্গনে নিতাইয়ের সনে নাম কীর্তনে নাচে

ভিখারী সাজিয়া ঘরে ঘরে গিয়া যারে তারে প্রেম যাচে।

ভারত ভ্রমিয়া পদ পরশিয়া পূত করিল ধূলি,

যে চরণ রজ হর কমলজ সদা শিরে লয় তুলি ॥

লীলার তুলনা মিলে না মিলে না—তুমি লীলাময় হরি,

হরি নাম দিলে জীব নিস্তারিলে ধরাতলে অবতরি ৷


—স্বামী প্রেমেশানন্দ

(ঐ যে ঐ) সুরধুনী তীরে ও কে হরি ব’লে নেচে যায়

কীর্তন সুহই—দোলন


(ঐ যে ঐ) সুরধুনী তীরে ও কে হরি ব’লে নেচে যায়।

যায় রে কাঁচা-সোনার বরণ, চাঁদের কিরণ মাখা গায় ॥

শিরে চূড়া শিখি পাখা, রাধানাম সর্বাঙ্গে লেখা,

(ও তাঁর) নয়ন বাঁকা, ভঙ্গি বাঁকা, বাঁকা নূপুর রাঙ্গা পায় ৷৷

একি নয় দেখেছি যারে, বিমল যমুনার তীরে ॥

(সে তো) এমন ক'রে বাঁশী ধ’রে মজাইত গোপিকায় ॥

‘বিশ্বরূপ’ কহে ফুকারি, (তাঁরে) চিনি চিনি মনে করি,

বরণ দেখে চিনতে নারি, স্বভাবে পাই পরিচয় ৷


—বিশ্বরূপ গোস্বামী

মুড়ায়ে চাঁচর কেশ ধরেছেন সন্ন্যাসী বেশ

কীর্তন—একতাল


মুড়ায়ে চাঁচর কেশ,    ধরেছেন সন্ন্যাসী বেশ,

আঁধার করিয়া নদীয়ায়।

রাধাভাবে অনুরাগী    ব্যাকুল শ্যামের লাগি,

সদা ঝ’রে আঁখি মরি হায় ৷৷

কত ভাব তরঙ্গ উঠে    ক্ষণে বসে ক্ষণে উঠে

কৃষ্ণ বলে ক্ষণে ছুটে যায়।

কোথা প্রাণকান্ত বলে,    ক্ষণে লুটে ধরাতলে,

বলে রাখ রাখ প্ৰাণ যায় ॥

কোথা গেলে কি করিলে    বল প্রাণ কৃষ্ণ-মিলে

বিরহ সহনে নাহি যায়।

অন্তরঙ্গের নিকটে    কাঁদি কহে করপুটে

শ্যাম ধনে মিলাও আমায় ৷৷

বিষ্ণুপ্রিয়া হেথা পরি,    ধূলিতলে গড়াগড়ি,

নিমাই-শোকে শচী মৃতপ্রায়।

হেরি শ্রীবাসাদি যত,    গোরা-প্রেম-অনুগত,

শ্রীমতী বিরহ গাথা গায় ॥


—স্বামী তপানন্দ

ভজ রাধাকৃষ্ণ গোপাল কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বল মুখে

ভজন—তিনতাল*


ভজ রাধাকৃষ্ণ, গোপাল কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বল মুখে।

নামে বুক ভরে যায় অভাব মিটায়, স্বভাব জাগায় মহাসুখে ৷

হরি দীনবন্ধু, চিরদিন বন্ধু, জীবের চির সুখে দুখে,

ভজরে অন্ধ, চরণারবিন্দ, দুস্তর এ মায়া বিপাকে

ভজ মূঢ়মতি, তব চিরসাথী, যাঁহার করুণা লোকে লোকে।

লীলাময় হরি এসেছে নদীয়াপুরী, রাধার পিরীতি ল’য়ে বুকে ৷৷


—ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়



* স্বরলিপি ঃ সুরবিতা

নদে টলমল টলমল টলমল করে গৌর প্রেমের হিল্লোলেরে

কীর্তন—আড়াঠেকা


নদে টলমল টলমল টলমল করে, গৌর প্রেমের হিল্লোলেরে।

গৌর চাহে বৃন্দাবন পানে, আর ধারা বহে দু-নয়নে ॥

(ভাব হবে বৈ কিরে)।

(ভাব নিধি শ্রীগৌরাঙ্গের) ॥

(ভাবে হাসে কাঁদে নাচে গায়)।

(বন দেখে বৃন্দাবন ভাবে) ৷

(সমুদ্র দেখে শ্রীযমুনা ভাবে)।

(যার অন্তঃ কৃষ্ণ বহিঃ গৌর) ॥

(গৌর আপনার পায় আপনি ধরে)।

(গৌর ফুকারি ফুকারি কাঁদে),

(বলে কোথা রাই প্ৰেমময়ী) ॥


—অজ্ঞাত


ধরা ধন্য পদ পরশে

কানাড়া—ঝাঁপতাল


ধরা ধন্য পদ পরশে।

নীলাচলে গৌরচন্দ্র নাচে প্ৰেমাবেশে ৷৷

হেমগিরি সমকায়, পুলক বৈবর্ণতায়

রাধা রাধা জপে সদা, অস্ফুট ভাষে ৷

ভাবে মত্ত নৃত্যপর, সহ নিজ পরিকর

ঢাকি কর্ম কলেবর, সন্ন্যাসী বেশে ৷

ভূমে গড়াগড়ি যায়, যোগী ঋষি যারে চায়

জপে তপে ক্ষীণকায় চরণ আশে।


—স্বামী প্রেমেশানন্দ

চম্পক সোণকুসুম কনকাচল জিতল গৌর তনু লাবণি রে

কীর্তন


চম্পক সোণ-কুসুম কনকাচল, জিতল গৌর তনু লাবণি রে ॥

উন্নত গীম, সীম নাহি অনুভব, জগ মনোমোহন ভাঙনি রে ৷৷

জয় শচীনন্দন রে

ত্রিভুবনমণ্ডন, কলিযুগ-কাল-ভুজগ-ভয় খণ্ডন রে ॥

বিপুল পুলককুল-আকুল কলেবর, গর গর, অন্তর প্রেম-ভরে।

লহু লহু হাসনি, গদগদ ভাষণী, কত মন্দাকিনী নয়নে ঝরে।

নিজ রসে নাচত নয়ন ঢুলায়ত, গাওত কত কত ভকতহি মেলি।

যো রসে ভাসি অবশ মহিমণ্ডল, গোবিন্দদাস তর্হি পরশ না ভেলি।


—গোবিন্দদাস

ওকে পাগলের পারা হ’য়ে দিশেহারা সুরধুনী কূল দিয়ে যায়

কীর্তন—একতাল


ওকে পাগলের পারা, হ’য়ে দিশেহারা, সুরধুনী কূল দিয়ে যায়।

ওকে আয় তোরা বলি, দেয় করতালি

বলে ‘যত বোঝা আছে নিয়ে আয়’ ॥

ডেকে ডেকে তার গলা ভাঙ্গা ভাঙ্গা

কেঁদে কেঁদে তার আঁখি রাঙ্গা রাঙ্গা

হরি হরি বলিতে হারায় গো সংজ্ঞা বুঝি প্ৰাণবিহঙ্গ পালায়।

ধুলা মাখা গায়, ধেই ধেই নাচে, কভু হাসে কভু কেঁদে প্রেম যাচে

বলে, ভয় নাই, এলোরে কানাই তোদেরি কারণে নদীয়ায় ৷৷

আপনহারা বলে “কেনা হয়ে রব, একবার কর হরি হরি রব,

হেলায় তরিবি দুস্তর এ ভব” বলিতে আবার লুটে ধূলায়।

বলে সুধাব না তোদের জাতি, নাম, ধাম,

লব পাপ, আর দিব হরিনাম,

এ যে গোপনের ধন, তোদেরি কারণ এনেছি রে আজ ব’য়ে মাথায় ৷


—অক্ষয়কুমার সেন

যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে তারা তারা দুভাই এসেছে রে

কীর্তন


যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে, তারা, তারা দুভাই এসেছে রে।

যারা মার খেয়ে প্রেম যাচে, তারা, তারা দুভাই এসেছে রে।

যারা আপনি কেঁদে জগৎ কাঁদায়, তারা, তারা দুভাই এসেছে রে ॥

যারা আপনি মেতে জগৎ মাতায়, তারা, তারা দুভাই এসেছে রে

যারা আচণ্ডালে কোল দেয়, তারা, তারা দুভাই এসেছে রে ৷৷

যারা ব্রজের কানাই বলাই, যারা ব্রজের মাখনচোর

যারা জাতির বিচার নাহি করে, যারা আপামরে কোল দেয়

যারা হরি হয়ে হরি বলে, যারা জগাই মাধাই উদ্ধারিল

যারা আপন পর নাহি বাছে। জীব তরাতে গৌর নিতাই, তারা, তারা

দুভাই ৷৷


—অজ্ঞাত

উদিলে করুণাশশী বিমল ভারতাকাশে

বসন্ত বাহার—ঝাঁপতাল


উদিলে করুণাশশী,    বিমল ভারতাকাশে,

উজল শীতল তব,    কিরণ তিমির নাশে।

হেরি কান্তি লাজবাসি,    কম্পিত এ জড় শশী;

জ্যোতিহত অস্তমিত,    চিরতরে রাহু গ্রাসে ॥

ধরা ধন্য হৃদে ধরে,    চরণ-কমল বরে;

ভাব-নিধি নিরবধি,    যোগে রত যাঁর আশে ॥

শচীসুত গৌরকায়,    প্রেমে ভাসালে ধরায়;

‘হরি হরি’ ধ্বনি করি,    অমিয় মধুর ভাষে ॥

তুচ্ছ মম প্ৰাণ মন,    পদে করি সমর্পণ;

করোনা বঞ্চিত চিত,    অযাচিত প্রেম-রসে ॥


—স্বামী প্রেমেশানন্দ

গৌর প্রেমের ঢেউ লেগেছে গায়

বাউল—একতাল


গৌর প্রেমের ঢেউ লেগেছে গায়।

ও তার হিল্লোলে পাষণ্ড দলন, এ ব্রাহ্মাণ্ড তলিয়ে যায় ৷৷

আমি ডুবে দেখি মিলে না কোথায়

ও ভাই সাঁতার ভুলে হেঁটো জলে হাবুডুবু খায়।

আমার হাত ধরে টেনে তোলায়

ওভাই গৌরচাদের প্রেমকুমীরে গিলে যে গো সই

গোঁসাই কবি বলে শোন শোন শোন

(থাকরে চরণের আশায়) (আমরা থাকব চরণের আশায়

এমন ব্যথার ব্যথী আর কে আছে, হাত ধরে টেনে তোলায় ॥


—গোঁসাই কবি

ওকে গান গেয়ে গেয়ে চ'লে যায়

কীর্তন—একতালা


ওকে, গান গেয়ে গেয়ে চ'লে যায়

(দেখ) পথে পথে ঐ নদীয়ায়,

ওকে, নেচে নেচে চলে, মুখে হরি বলে,

ঢলে ঢলে পাগলেরি প্রায়।

ওকে, যায় নেচে নেচে আপনায় বেচে,

পথে পথে শুধু প্রেম যেচে যেচে,

ওকে, দেবতা-ভিখারী মানব-দুয়ারে

দেখে যারে, তোরা দেখে যা।

ও সে, বলে “কৈ ত কেউ পর নাই”

ও সে বলে “সবাই যে নিজ ভাই”,

ও সে, বলে “শুধু হেসে, শুধু ভালবেসে

(আমি) ভ্ৰমি দেশে দেশে এই চাই।”

ওকে, প্রেমে মাতোয়ারা, চোখে বহে ধারা,

কেঁদে কেঁদে সারা কেন ভাই,

সব, দ্বেষ হিংসা ছুটি, আসি পড়ে লুটি,

(তার) ধূলি মাখা দুটি রাঙা পায়,

বলে, ছেড়ে দাও মোদের, মোরা চলে যাই,

নইলে প্রভু তোমার প্রেমে গলে যাই!

এযে, নূতন মধুর প্রণয়ের পুর,

হেথা আমাদের কোথা ঠাঁই? (প্রভু)

ঐ, নরনারী সব পিছে ধায়,

(ওই) জয় ধ্বনি ওঠে নীলিমায়,

তোরা, আয় সবে চলে মুখে হরি ব’লে,

(তোদের) ছেঁড়া পুঁথি ফেলে চলে আয় ||


—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্গীত

খণ্ডন ভব-বন্ধন, জগ-বন্দন বন্দি তোমায়

মিশ্র বাহার—চৌতাল


খণ্ডন ভব-বন্ধন, জগ-বন্দন বন্দি তোমায়।

নিরঞ্জন, নর-রূপ ধর, নিৰ্গুণ গুণময়

মোচন অঘদূষণ, জগভূষণ, চিদ্‌ঘনকায়।

জ্ঞানাঞ্জন-বিমল-নয়ন, বীক্ষণে মোহ যায়॥

ভাস্বর ভাব-সাগর, চির-উন্মদ-প্রেম-পাথার।

ভক্তার্জন-যুগল চরণ, তারণ-ভব-পার॥

জম্ভিত-যুগ-ঈশ্বর, জগদীশ্বর, যোগসহায়।

নিরোধন, সমাহিতমন নিরখি তব কৃপায়॥

ভঞ্জন-দুঃখগঞ্জন, করুণাঘন, কর্ম-কঠোর।

প্রাণার্পণ, জগত-তারণ, কৃন্তন-কলিডোর॥

বঞ্চন-কামকাঞ্চন, অতিনিন্দিত-ইন্দ্রিয়রাগ।

ত্যাগীশ্বর, হে নরবর! দেহপদে অনুরাগ॥

নির্ভয়, গতসংশয়, দৃঢ়নিশ্চয়-মানসবান্।

নিষ্কারণ-ভকত-শরণ, ত্যজি জাতি-কুল-মান

সম্পদ তব শ্রীপদ ভব-গোষ্পদ-বারি যথায়।

প্রেমার্পণ, সমদরশন, জগজন-দুঃখ যায়॥

নমো নমো প্রভু! বাক্য-মনাতীত, মনোবচনৈকাধার।

জ্যোতির জ্যোতি উজল-হৃদিকন্দর তুমি তমো-ভঞ্জন হার॥

ধে ধে ধে লঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গ, বাজে অঙ্গ সঙ্গ মৃদঙ্গ,

গাহিছে ছন্দ ভকতবৃন্দ, আরতি তোমার॥

(জয় জয় আরতি তোমার, হর হর আরতি তোমার,

শিব শিব আরতি তোমার)

স্বামী বিবেকানন্দ


ওঁ হ্রীং-ঋতং ত্বমচলো গুণজিৎ গুণেড্যঃ

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ স্তোত্রম*


ওঁ হ্রীং-ঋতং ত্বমচলো গুণজিৎ গুণেড্যঃ

ন-ক্তন্দিবং সকরুণং তব পাদপদ্মম্।

মো-হঙ্কষং বহুকৃতং ন ভজে যতোঽহং

তস্মাত্ত্বমেবশরণং মম দীনবন্ধো!

ভ-ক্তির্ভগশ্চ ভজনং ভবভেদকারি

গ-চ্ছন্ত্যলং সুবিপুলং গমনায় তত্ত্বম্।

ব-ক্রোধৃতন্তু হৃদি মে ন চ ভাতি কিঞ্চিৎ

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!

তে-জস্তরত্তি তরসা ত্বয়ি তৃপ্ততৃষ্ণাঃ।

রা-গে কৃতে ঋতপথে ত্বয়ি রামকৃষ্ণে।

ম-র্ত্যামৃতং তব পদং মরণোর্মিনাশং

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!

কৃ-ত্যং করোতি কলুষং কুহকান্তকারি

ষ্ণা-ন্তং শিবং সুবিমলং তব নাম নাথ!

য-স্মাদহং ত্বশরণো জগদেকগম্য

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো!

স্বামী বিবেকানন্দ


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্ব-ধর্ম-স্বরূপিণে

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-প্রণাম-মন্ত্রম্


ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্ব-ধর্ম-স্বরূপিণে,

অবতার-বরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ॥

ওঁ নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ

ওঁ নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ

ওঁ নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ॥

স্বামী বিবেকানন্দ


বিশ্বস্য ধাতা পুরুষস্ত্বমাদ্যোঽব্যক্তেন রূপেণ ততং ত্বয়েদম্

কেদার — ঝাঁপতাল


বিশ্বস্য ধাতা পুরুষস্ত্বমাদ্যোঽব্যক্তেন রূপেণ ততং ত্বয়েদম্।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে, কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্

ত্বং পাসি বিশ্বং সৃজসি ত্বমেব, ত্বমাদিদেবো বিনিহংসি সর্বম্।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে, কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥২

মায়াং সমাশ্রিত্যকরোষি লীলাং, ভক্তান্ সমুদ্ধতুমনন্ত-মূর্তিঃ।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৩

বিধৃত্য রূপং নরবক্তৃয়াবৈ বিজ্ঞাপিতো ধর্ম ইহাতি গুহাঃ।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৪

তপোঽথ তে ত্যাগমদৃষ্টপূর্বং দৃষ্টা নমস্যন্তি কথং ন বিজ্ঞাঃ।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৫

শ্ৰুত্বাত্র তে নাম ভবন্তি ভক্তাঃ দৃষ্টা বয়ং তন্নতু ভক্তিযুক্তাঃ।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৬

সত্যং বিভুং শান্তমনাদিরূপং প্রসাদয়ে ত্বামজমন্তশূন্যম্।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৭

জানামি তত্ত্বং নহি দেশিকেন্দ্রং কিম্বা স্বরূপং কথমেব ভাবম্।

হে রামকৃষ্ণ ত্বয়ি ভক্তিহীনে কৃপা-কটাক্ষং কুরু দেব নিত্যম্॥৮

নিরঞ্জনং নিত্যমনন্তরূপং ভক্তানুকম্পাধৃতবিগ্রহং বৈ।

ঈশাবতারং পরমেশমীড্যং তং রামকৃষ্ণং শিরসা নমামঃ

স্বামী অভেদানন্দ

ওঁ-কার বাচ্যং স্ববিকাশমাদ্যং নিত্যং বিশুদ্ধং ত্ৰিগুণৈৰ্বিমুক্তম্

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ স্তোত্রম্


ওঁ-কার বাচ্যং স্ববিকাশমাদ্যং নিত্যং বিশুদ্ধং ত্ৰিগুণৈৰ্বিমুক্তম্

সাক্ষিস্বরূপং জগতাং জনেশং শ্রীরামকৃষ্ণং সততং নমামি

রা-গাদিশূন্যং করুণাধিবাসং জ্ঞানপ্রকাশং ভবপাশনাশম্।

আনন্দরূপং মৃদুমঞ্জুহাসং শ্রীরামকৃষ্ণং সততং স্মরামি

ম-গ্নং ভবান্ধাবভিতারয়ন্তং স্বাঙ্কং নয়ন্তং দুরিতং চরন্তম্।

ভক্তার্তিভারং কৃপয়া হরন্তং শ্রীরামকৃষ্ণং শরণং ব্রজামি

কৃ-চ্ছং তপোযজ্ঞমহং ন জানে মন্ত্ৰং ন যন্ত্রং স্তবনঞ্চ কিঞ্চিৎ।

জানে সদাহং শরণং বরেণ্যং হে দীনবন্ধো তব পাদযুগ্মম্॥

ষ-ড়বৈরিণো মে প্রসভং প্রমত্ত-মাতঙ্গবন্মাং নিয়তং তুদন্তি।

হা দেব দেবেশ জগন্নিবাস দাসোঽস্মি তে মাং পরিপশ্য রক্ষ॥

না-হং প্রযাচে মণিরত্বপূর্ণং হর্ম্যং মনোজ্ঞ-সুরবৃন্দসেব্যম্।

মেরোঃসমানং রজতং সুবর্ণং কান্তাং সুরম্যাং ভুবি সর্বরাজ্যম্॥

য-দ্ যোগিবৃন্দা জনহীনদেশে মগ্নাঃ সমাধৌ পরিচিন্তয়ন্তি।

যাচে ত্বহং তে ভুবনৈকনাথ ব্রহ্মাদিবন্দ্যং চরণারবিন্দম্

ন-ন্বেব জানাসি মহেশ্বরোঽসি দীনাতি দীনশ্চ পদাশ্রিতোঽহম্।

সংযচ্ছ তন্মে স্বকৃপা গুণেন ভক্তিং ত্বদীয়ামচলাং বিশুদ্ধাম্॥

মন্দ প্ৰমত্তোঽপি গুণবিত্তিহীনঃ কথং নু বেদ্মি স্তবনং তবাহম্।

স্তত্ত্বা যথা ত্বাং করুণৈক সিন্ধো প্রাপ্স্যামি তন্মাং প্ৰবিধেহি শিক্ষাম্

নমামি নিত্যং তব পাদযুগ্মং ধ্যায়ামি নিত্যং তব পূর্ণরূপম্।

করোমি নিত্যং কমলাঘি পূজাং নাথ ত্বদন্যচ্ছরণং ন জানে

স্বামী যোগেশ্বরানন্দ

ব্রহ্ম-রূপমাদি-মধ্য-শেষ-সর্ব-ভাষকম্

শ্রীরামকৃষ্ণ-স্তোত্র-দশকম্


(কেদার-একতাল)

ব্রহ্ম-রূপমাদি-মধ্য-শেষ-সর্ব-ভাষকম্,

ভাব-ষট্‌ক-হীন-রূপ-নিত্য-সত্যমদ্বয়ম্।

বাঙ্মনোহতি-গোচরঞ্চ নেতি-নেতি-ভাবিতম,

ত্বং নমামি দেব-দেব রামকৃষ্ণমীশ্বরম্ ॥১

আদিতেয়-ভী-হরং সুরারি-দৈত্য-নাশকম্

সাধু-শিষ্ট-কামদং মহী-সুভার-হারকম্।

স্বাত্মরূপ-তত্ত্বকং যুগে যুগে চ দর্শিতম্, তং নমামি... ॥২

সর্বভূত-স্বর্গ-কর্ম-সূত্র-বন্ধ-কারণম্

জ্ঞান-কর্ম-পাপ-পুণ্য-তারতম্যসাধনম্।

বুদ্ধি-বাস-সাক্ষি-রূপ-সর্ব-কর্ম-ভাসনম্, তং নমামি ....॥৩

সর্ব-জীব-পাপ-নাশ কারণং ভবেশ্বরম্

স্বীকৃতঞ্চ গর্ভবাস দেহ-ধানমীদৃশম্। 

যাপিতং স্ব-লীলয়া চ যেন দিব্য জীবনম্, তং নমামি.... ॥8

তুল্য-লোষ্ট্র-কাঞ্চনঞ্চ হেয়-নেয়-ধীগতম্,

স্ত্ৰীষু নিত্য-মাতৃভাব-শক্তিরূপ ভাবুকম্।

জ্ঞান-ভক্তি-ভুক্তি-মুক্তি-শুদ্ধ-বুদ্ধি-দায়কম্, তং নমামি.... ॥৫

সর্ব-ধর্ম-গম্য-মূল-সত্য-তত্ত্ব-দেশকম্,

সিদ্ধ-সর্ব-সম্প্রদায়-সম্প্রদায়-বর্জিতম্।

সর্ব-শাস্ত্র-মর্ম-দর্শি-সর্ববিন্নিরক্ষরম্, তং নমামি..... ॥৬

চারুদর্শ-কালিকা-সুগীত-চারু-গায়কম্

কীৰ্ত্তনেষু মত্তবচ্চ নিত্য-ভাববিহ্বলম্ ।

সৃপদেশ-দায়কং হি শোক-তাপ-বারকম্, তং নমামি, ....॥৭

পাদপদ্ম-তত্ত্ব-বোধ-শান্তি-সৌখ্য-দায়কম্

সক্ত-চিত্ত ভক্ত-সূনু নিত্য-বিত্ত-বর্ধকম্।

দত্তি-দর্প-দারণস্তু নির্ভরঞ্জগদ্গুরুম্, তং নমামি....৷৷৮

পঞ্চবর্ষ-বাল-ভাব-যুক্ত-হংস-রূপিনম্,

সর্ব লোকরঞ্জনং ভবান্ধি সঙ্গ ভঞ্জনম্।

শান্তি-সৌখ্যসদ্ম-জীব-জন্মভীতিনাশনম্, তং নমামি..... ॥৯

ধর্ম-হান-হারকং ত্বধর্ম-কর্ম-বারকম্,

লোক-ধর্ম-চারণঞ্চ সর্ব-ধর্ম-কোবিদম্ ৷

ত্যাগি-গেহি-সেব্য-নিত্য-পাবনাঘ্ৰি-পঙ্কজম্, তং নমামি..... ॥১০

স্তোত্রশূন্য-সোমকং সদীশ-ভাব-ব্যঞ্জকম্,

নিত্য-পাঠকস্য বৈ বিপত্তি-পুঞ্জ-নাশকম্,

স্যাৎ কদাপি জাপ-যাগ-যোগ-ভোগ-সৌলভম্,

দুর্লভন্তু রামকৃষ্ণ-রাগ-ভক্তি-ভাবনম্ ॥১১

ইতি শ্রীবিরজানন্দ-রচিতং ভক্তি-সাধকম্।

স্তব-সারং সমাপ্তং বৈ শ্রীরামকৃষ্ণ-তূণকম্ ॥১২


—স্বামী বিরজানন্দ

ভব-ভয়-ভঞ্জন পুরুষ নিরঞ্জন

গৌড় সারঙ্গ—তিনতাল


ভব-ভয়-ভঞ্জন,         পুরুষ নিরঞ্জন,

রতি-পতি-গঞ্জন-কারী।

যতি-জন-রঞ্জন,         মনোমদ-খণ্ডন,

জয় ভব-বন্ধন-হারী॥

জয় জন-পালক,         সুরদল-নায়ক,

জয় জয় বিশ্ব-বিধাতা।

চির-শুভ-সাধক,         মতি-মল-পাবক

জয় চিত সংশয়-ত্ৰাতা॥

সুর-নর-বন্দন,         বিজর বিবন্ধন,

চিত-মন-নন্দন-কারী।

রিপু-চয়-মন্থন,         জয় ভব তারণ

স্থল-জল-ভূধর-ধারী॥

শম-দম-মণ্ডন,         অভয় নিকেতন,

জয় জয় মঙ্গল-দাতা।

জয় সুখ-সাগর,         নটবর নাগর,

জয় শরণাগত-পাতা॥

ভ্রম-তম-ভাস্কর,         জয় পরমেশ্বর,

সুখকর-সুন্দর-ভাষী।

অচল সনাতন,         জয় ভব-পাবন,

জয় বিজয়ী অবিনাশী॥

ভকত-বিমোহন,         বর-তনু-ধারণ,

জয় হরিকীর্তন-ভোলা।

গদ-গদ-ভাষণ,         চিত-মন-তোষণ,

ঢল-ঢল-নৰ্তনলীলা॥

মতি-গতি-বর্ধন,  কলি-মল-মর্দন

বিষয়-বিরাগ-প্রসারী।

জড়-চিত চেতক,     ভব-জল ভেলক

জয় নর-মানস-চারী।

জয় পুরুষােত্তম,         অনুপম-সংযম,

জয় জয় অন্তরযামী।

খরতর-সাধন,         নর-দুখ-বারণ,

জয় রামকৃষ্ণ নমামি

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

দুখিনী ব্রাহ্মণী কোলে, কে শুয়েছ আলাে করে

সাহানা ঝাপতাল*


দুখিনী ব্রাহ্মণী কোলে, কে শুয়েছ আলাে করে,

কেরে ওরে দিগম্বর এসেছ কুটীর দ্বারে॥

ভূতলে অতুল-মণি, কে এলিরে যাদুমণি,

তাপিতা হেরে অবনী, এসেছ কি সকাতরে॥

ব্যথিতে কি দিতে দেখা, গােপনে এসেছ একা,

বদনে করুণা মাখা, হাস কাঁ কার তরে।

মরি মরি রূপ হেরি, নয়ন ফিরাতে নারি,

হৃদয়-সন্তাপ-হারী, সাধ ধরি হৃদি পরে॥

গিরিশচন্দ্র ঘােষ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

অরূপ-সায়রে লীলা-লহরী, উঠিল মৃদুল করুণাবায়

খাম্বাজ-চৌতাল*


অরূপ-সায়রে লীলা-লহরী, উঠিল মৃদুল করুণাবায়,

আদিঅন্তহীন, অখণ্ডে বিলীন, মায়ায় ধরিলে মানবকায়॥

মনের ওপারে কোথা কোন দেশ, শশী তপনের নাহি পরবেশ,

তব হাসিরাশি কিরণ বরষি, উজলে সেথাও চারু বিভায়॥

প্রেমের এ তনু অতনু-গঞ্জন, কি মধুর বিভা বিকাশে নয়ন,

যে হেরে সে জন তনু-প্রাণ মন, চরণে অৰ্পণ করিতে চায়;

তােমারি আশায় কত যুগ গত, সংশয় যত আজি তিরােহিত,

যা আছে আমার লহ উপহার সঁপিনু জীবন তব সেবায়॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ


*স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত। মহাপুরুষ স্বামী শিবানন্দ প্রশংসিত এই গানখানি একতালেও গাওয়া হয়ে থাকে।

বঙ্গ-হৃদয়-গােমুখী হইতে, করুণা-গঙ্গা বহিয়া যায়

পিলু বারোয়া—একতাল*


বঙ্গ-হৃদয়-গােমুখী হইতে, করুণা-গঙ্গা বহিয়া যায়,

এস ছুটে এস কে আছ মানব, শুষ্ক-কণ্ঠ পিপাসায়॥

ব্যর্থ-বাসনা-অনল-দহন, সহিলে কত না জনম মরণ,

আলেয়ার সাথে ছুটিতে ছুটিতে শ্রমজ-সলিল-সিক্ত-কায়;

স্নিগ্ধ সলিলে বারেক ডুবিলে সকল জ্বালা জুড়াবে তায়॥

জাহ্নবী-তীরে তৃষ্ণা-কাতর, অন্ধ যে জন খোঁজে সরােবর,

রামকৃষ্ণ-পূত-গঙ্গা ব্রহ্মানন্দ সাগরে ধায়;

হােক অবসান ব্যর্থ-প্রয়াণ, এস ছুটে এস ধরি গাে পায়॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

মলয় সমীরে ভেসে আসে কি মধুর গীতি-লহরী

ভৈরবী—একতাল*


মলয় সমীরে ভেসে আসে কি মধুর গীতি-লহরী।

চল দেখে আসি উজলিছে দিশি কোটি-শশী-রূপ মাধুরী॥

তপ-ক্ষীণ কায়, ক্ষুদিরাম হায়, সাধনা করি কঠোর,

কোন্ দেবতায় আনিলা ধরায় নন্দন-বন-বিহারী॥

পাপ-তাপ ভরা, এ মলিন ধরা স্বার্থ কলুষময়,

এই মরূভূমে বুঝি এল নেমে সিঞ্চিতে প্রেম-বারি॥

কে আছ অলস, হৃদয় নীরস, স্বার্থ-মােহেতে ভুলিয়া,

(আজি) প্রেমের দীক্ষা, ত্যাগের শিক্ষা, লহ আপনা পাসরি॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

(আজি) কোকিল-কূজনে, মলয় পবনে, শিহরি’ উঠিছে প্রাণ

বেহাগ-খাম্বাজ-একতাল*


(আজি) কোকিল-কূজনে, মলয় পবনে, শিহরি’ উঠিছে প্রাণ।

(যেন) বিস্মৃত কত স্বপনেতে শ্রুত, মনে জাগে শত তান॥

দেববালা যত হাত ধরাধরি, নাচিছে গাহিছে ধরা আলাে করি,

ঘেরিয়া শিশুরে ক্ষুদিরাম ঘরে-নিরখি চাঁদ বয়ান

চাঁদে গড়া তনু প্রেমেরি নয়ন, চন্দ্রামণি কোলে কে শিশু-রতন,

বারেকের তরে এস হৃদি পরে, জুড়াই তাপিত প্রাণ

হেরি হাসি রাশি ব্যাকুল হৃদয়, বুক চিরে রাখি মনে সাধ হয়,

(পাছে) মর-জগতের মলা-মাটি লাগি ও হাসি হইবে ম্লান

কোটি জনমের যত অশ্রুপাত, সফল করিতে এসেছে কি নাথ?

ভেদ ভুলাইতে প্রেম বিলাইতে জগতে করিতে ত্রাণ,

(যত) দ্বেষ দ্বন্দ্ব মােহবন্ধ হােক চির-অবসান

স্বামী প্ৰেমেশানন্দ


* শ্রী ইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য মহাশয়ের কণ্ঠে শ্রীশ্রীমা এ গানখানি শুনে ভাবে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি গানখানি তার কাছ থেকে লিখিয়ে রেখেছিলেন। ইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য মহাশয় সন্ন্যাসের পরে স্বামী প্রেমেশানন্দ নাম গ্রহণ করেন।

কে এসে মােহন বেশে মজালে হে মন

ভৈরবী—একতাল


কে এসে মােহন বেশে মজালে হে মন,

মন-ভুলান রূপটি তােমার যােগিজন-উচাটন

তুমি বুঝি বৃন্দাবনে, খেলেছিলে রাখাল সনে,

সেই যমুনা-পুলিনে, ব্রজগােপীর প্রাণধন,

সে কথা কি নাই হে মনে,         যশােদা-জীবন-ধন,

যমুনা বইত উজান বাঁশীর তানে মােহন॥

মাতালে নদে এসে গৌরবেশে,

(তােমার) দুনয়নে প্রেমধারা মজে কার রসে,

(আবার) জগাই মাধাই তরায়ে দু’ভাই রাখলে নাম পতিতপাবন

(আমার মন মজালে রামকৃষ্ণ হে)

রামকৃষ্ণ রূপ ধরে এসেছে জগতের তরে

(বুঝি) জীবের দশা মলিন হেরে গলেছে তােমারি মন;

এসেছ বেশ করেছ করুণা করে,

আমার মত কাঙ্গাল কত আছে হে পড়ে,

(সবে) টেনে নিয়ে কোল দিয়ে জানাও নাম জগত-তারণ

নীররঞ্জন মজুমদার

(আজি গাওরে) জয় জয় রামকৃষ্ণ নাম

কীর্তন—একতাল


(আজি গাওরে) জয় জয় রামকৃষ্ণ নাম।

জয় কামারপুকুর জয় জয় রঘুবীর

চিন্ময় চেতন শালগ্রাম (গাওরে)

(বল জয় জয় রঘুবীর...রামকৃষ্ণ শ্রীবিগ্রহ...চিন্ময়)

বন্দি ক্ষুদিরাম কুল         ত্রিকাল বিশুদ্ধ মূল

প্রভু যথা লইয়া জনম।         (দীন কাঙ্গালের ঘরে)

(মহারাজ রাজেশ্বর প্রভু.......)

কামারপুকুর মাটি         বন্দি দন্তে তৃণকাটি

বাল্যলীলা যথা সমাপন। (শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাবেশে.....)

বন্দি শ্রীদক্ষিণেশ্বর         যথা প্রভু গদাধর

নরলীলা বিস্তারের তরে;

দ্বাদশ বৎসর ধরি         কঠোর সাধনা করি

জাগাইলে ভবতারিণী রে। (মুখে জাগ মা জাগ মা বলে......)

(তােমায় যুগে যুগে জাগাইনু)॥

বন্দি পঞ্চবটীমূল,         বিল্বতরু গঙ্গাকূল

প্রভু যথা করিলা সাধনা।

(সাধনার ধন হয়ে—পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ।)

আচরি সকল ধর্ম,         বুঝাইল গৃঢ় মর্ম

এক ব্রহ্ম, কহে জীবে নানা।

(শিব রাম কৃষ্ণ কালী, ঈশা মুসা ভিন্ন বলি)॥

রামকৃষ্ণ ভক্তগণে লীলার সহায় জেনে

(আমি) ধূলি হয়ে রহি তাদের পায়॥

(জনমে জনমে যেন.......)

সবে এক এক অবতার, দেহ মাত্র নরাকার।

আমি বুঝিয়াছি শ্রীগুরু কৃপায়।

(কেহ ব্রহ্মা কেহ বিষ্ণু...যুগে যুগে সঙ্গী এঁরা)

(জয় রামকৃষ্ণ বলে, প্রেমানন্দে বাহু তুলে।)


শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী

যুগে যুগে হরি নরদেহ ধরি করিলে প্রেমের লীলা

ঝিঝিট-খাম্বাজ-একতাল


যুগে যুগে হরি নরদেহ ধরি করিলে প্রেমের লীলা।

জীব-মঙ্গলে ভূতলে এসে সহিলে দুঃখ জ্বালা॥

স্বরূপ লুকায়ে কাঙ্গাল বেশ, ছলিতে মানবে ধরেছ বেশ।

সরল বালক মুখে ‘মা’ ‘মা’ বুলি, খেলিলে নূতন খেলা

কে পারে চিনিতে তুমি না চিনালে, জানিব কেমনে তুমি না জানালে

শরণ নিয়েছি চরণকমলে ঘুচাও ত্রিতাপ-জ্বালা

দূর করাে প্রভাে মায়া আবরণ, স্বরূপ তােমার হােক প্রকটন।

‘যে রাম যে কৃষ্ণ সেই রামকৃষ্ণ, নব অবতার-লীলা

স্বামী প্রেমেশানন্দ

কে তুমি আবার করুণাপাথার সেই সুরধুনী তীরে

ভৈরবী—একতাল*


কে তুমি আবার করুণাপাথার সেই সুরধুনী তীরে।

কেন সদা আহা আকুলপরাণে ভাসিছ নয়ন নীরে॥

সদানন্দময়ী আছে কোলে করে, তবু কেন বল দু’নয়ন ঝরে;

তাপিত ধরায় তারিতে কি হায়, সুধাইছ জননীরে

কেন আসিয়া হৃদয়-দুয়ারে, মােরে ডাকিতেছ বারে বারে;

আমি এমনি মগন মােহের কুহকে, দেখেও দেখি না তােমারে।

এস দেব এস পতিতপাবন, এস আজি মম হৃদয়ের ধন;

সফল কর হে বিফল জীবন, দুখ নাশ চির তরে

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


*স্বরলিপিঃ দিব্যগীতি

জয় জয় রামকৃষ্ণ ভুবন-মঙ্গল

ললিত—তিনতাল (প্রভাতী সুর)*


জয় জয় রামকৃষ্ণ ভুবন-মঙ্গল,

জয় মাতা শ্যামাসুতা অতি নিরমল।

জয় বিবেক-আনন্দ পরম দয়াল

প্রভুর মানস-সুত জয় শ্রীরাখাল॥

জয় প্রেমানন্দ প্রেমময় কলেবর,

জয় শিবানন্দ জয় লীলা-সহচর।

যােগী, যােগানন্দ জয় নিত্য নিরঞ্জন,

জয় শশী গুরুপদে গততনুমন॥

সেবাপর যােগিবর, অদ্ভুত-আনন্দ,

অভেদ-আনন্দ জয় গত-মােহবন্ধ।

যােগ-রত ত্যাগ-ব্রত তুরীয় আখ্যাত,

শরত সুধীর শান্ত যেন গণনাথ॥

জীবে শিব-সেবাব্রত গঙ্গাধর বীর

জয় শ্রীবিজ্ঞানানন্দ প্রশান্ত গম্ভীর।

প্রবীণ গােপাল মাতৃ-সেবাপরায়ণ,

সারদা সারদাপদে গত প্রাণমন॥

বালক-চরিত্র জয় সুবােধ সরল,

নাগবর ত্যাগ-বীর বিবেক-সম্বল।

কথামৃত-বরিষণ গৌর জলধর,

গিরিশ ভৈরব জয় বিশ্বাস-আকর॥

রামকৃষ্ণ-দাস-দাস জয় সবাকার,

রামকৃষ্ণ-লীলাস্থান জয় বার বার।

রামকৃষ্ণ নাম জয় শ্রবণ-মঙ্গল,

ভকত-বাঞ্ছিত জয় চরণ-কমল॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

ভারত গগনে কোন্ রবি আজ উদিল বিশ্ব উজলি

রামকেলিতেওরা


ভারত গগনে কোন্ রবি আজ উদিল বিশ্ব উজলি।

কিরণে কাহার হৃদয় সবার ভরিয়া পড়িছে উছলি

দিশি দিশি শুনি মঙ্গল গান, ভেদ বিবাদের বুঝি অবসান।

লালসা-অনলে কোন্ সে দেবতা দিলা প্রেমবারি ঢালি॥

মােহের তিমির ঢেকেছে ভুবন, পাপ তাপে জীব করিছে রােদন,

হেরি বুঝি পুনঃ নরনারায়ণ এসেছেন প্রেমে গলি।

খােল তবে আজি হৃদয়-দুয়ার, আসন রচনা কররে তাঁহার;

‘জয় গুরু’ বলি করিয়া হুঙ্কার উঠ আজি শির তুলি

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মায়ার মরত ধামে নব রূপ ধরে এলে

সাহানা—ঝাপতাল


মায়ার মরত ধামে             নব রূপ ধরে এলে,

অতুল রাতুল তনু,             ভ্রূভঙ্গে ভুবন ভুলে॥

নেহারি জীবে তাপিত,             কে তুমি ব্যথিত চিত,

ভকত সনে মিলিত,             তারিতে তনয় কুলে॥

কাম-কাঞ্চন মােহিত,             মানবে হেরি তৃষিত,

শিখালে এ মহীতলে,             ত্যাগে শুধু শান্তি মিলে॥

সাধন করিয়া ছলে,             ভেদ-বাদ ঘুচাইলে,

“যত মত তত পথ”             সত্য তত্ত্ব বিকাশিলে॥

যেই রাম সেই কৃষ্ণ,             এক তনু রামকৃষ্ণ,

অখিল-জগত ইষ্ট,             ভেদ নহে কোন কালে॥

অন্তরে আছে হে সাধ             লভিয়ে তব শ্রীপদ,

অকূল ভব গােষ্পদ,             বিচারি তরিব হেলে।

অজ্ঞাত

ভারত-ভাগ্য-গগনে রাজে নবীন তপন-ভাতিমা

ভৈরবী—তিনতাল


ভারত-ভাগ্য-গগনে রাজে নবীন তপন-ভাতিমা।

নবারুণ রাগে দশদিশি ভাতিল, জাগিল পরাণে চেতনা॥

সুপ্ত জনার খুলিল নয়ন, রিক্ত হিয়ায় মৃদু স্পন্দন,

হেরি নিখিল জন-মন আনন্দে মগন।

কোটি কণ্ঠ তুলি গাহিছে জয়, রামকৃষ্ণ জয়’, ‘রামকৃষ্ণ জয়,

(শুনি) আসিছে সকল ভকত দল পায়ে ঢালিতে সঞ্চিত বেদনা॥

স্বামী পুরুষাত্মানন্দ

তুমি হে সাধের ঠাকুর আমি সাধ-বিহীন

নিশাসাগ—একতাল


তুমি হে সাধের ঠাকুর আমি সাধ-বিহীন।

(তুমি) সাধের তরে বলির দ্বারে বাঁধা চিরদিন॥

সাধের পণে কিন্তে তােমায় সাধ হলাে না হায়,

(আমার) সাধ বিনে বিষাদে প্রভু সাধের জীবন যায়,

সাধ মাগি রাঙ্গা পায়;

(ওহে) সাধ দিয়ে সাধ পুরাও প্রভু আমি কৃপাধীন॥

রথের মাঝে কেমন সাজে দেখতে বড় সাধ,

(তুমি) দীনের সখা দিয়ে দেখা ঘুচাও অবসাদ,

মিনতি করি হৃদয়-চাঁদ,

দীনবন্ধু নামটি তােমার আমি অতি দীন॥

প্রেমের পথে হৃদয়-রথ করে বিচরণ,

রথযাত্রা হেরে ভবের যাত্রা দিব বিসর্জন, হবে না গমনাগমন;

রামকৃষ্ণ ব’লে প্রেম সলিলে ভাসবো নিশিদিন॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে ভাই

কীর্তন ঝিঝিট—একতাল


রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে ভাই।

কোথা পাপী তাপী আয় রে ছুটে, সুখে নাম-তরঙ্গে ভেসে যাই।

(রামকৃষ্ণ বলে)॥

‘রামকৃষ্ণ’ মধুর নাম,                মুখে বল রে অবিরাম,

ভবের কষ্ট নষ্ট হবে পূরবে মনস্কাম।

ঐ দেখ নাম শুনে এসেছে ধেয়ে, ওরে এমন দয়াল আর তাে নাই

(রামকৃষ্ণের মত)

যােগে যুগে কিবা ফল,                    রামকৃষ্ণ মুখে বল,

অনায়াসে করে পাবি চতুর্বর্গ ফল,

ধ’রে নামের ভেলা পারে যাবি (হেসে) যমের মুখে দিয়ে ছাই

(রামকৃষ্ণ ব’লে)

ও ভাই নামের এমনি বল, প্রাণ করে শীতল,

হয় কি না হয় ডেকে দেখ সত্য কিবা ছল,

ওরে নামের বলে তরে গেছে, কত মহাপাপী শুনতে পাই

(আমাদের মত)

রামকৃষ্ণ গুণ-ধাম, তােমার পতিতপাবন নাম,

মােরা ভজনবিহীন, দীন অভাজন, হ’য়াে নাকো বাম,

দাও নামে রতি, পদে মতি, অন্য ধনরত্ন নাহি চাই

(নাথ তােমা বিনে)

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

ভয় কি রে ভাই, ডাক রে সবাই, প্রাণ খুলে রামকৃষ্ণ বলে

বাউল সুর—একতাল


ভয় কি রে ভাই, ডাক রে সবাই, প্রাণ খুলে রামকৃষ্ণ বলে,

সে যে দুর্বলের বল, টলায় অটল, পাষাণ প্রাণে প্রেম উথলে॥

(রামকৃষ্ণ নামে)

কি কব তার দয়ার কথা, পতিত জনে বড়ই ব্যথা,

যেথায় পতিত সে যায় তথা, প্রাণ জুড়ায়ে করে কোলে॥

(রামকৃষ্ণ আমার)

বাছে না সে সুজন কুজন, চায় না ভজন, চায় না পূজন,

ব্যাকুল হয়ে ডাকে যে জন, কূলে যায় সে অবহেলে॥

(রামকৃষ্ণ বলে)

আকাশে রামধনুর মেলা, ভঙ্গুর এ জীবনের খেলা,

এই বেলা ডাক থাকতে বেলা, ভবের খেলা যাবে চলে॥

(রামকৃষ্ণ নামে)

আপনার কে আছে ভবে, মুখ চেয়ে কার আছ তবে,

‘রামকৃষ্ণ’ ‘রামকৃষ্ণ’ রবে, ভাসাও হৃদি নয়ন-জলে॥

(রামকৃষ্ণ বলে)

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

নদীয়ার পথে পথে কাঙ্গালের বেশে হরি

খাম্বাজ—তিনতাল


নদীয়ার পথে পথে             কাঙ্গালের বেশে হরি,

নাম প্রেম বিলাইলে             ধরাতলে অবতরি।

সেধে ফিরে ঘরে ঘরে,             প্রেম নিবি আয় কে রে,

ভাসিয়া নয়ন-নীরে,             যারে তারে পায়ে ধরি॥

হেলায় দিলে না কান,             হলি নিষ্ঠুর পাষাণ,

বড় ব্যথা পেয়ে প্রাণে,             অভিমানে গেছে ফিরি।

ধরি পুনঃ করুণায়,             রামকৃষ্ণ নবকায়

বহে জীব-পাপরাশি,             কঠোর সাধনা করি॥

নিরক্ষর দীন হীন,             রােগে দেহ বিমলিন,

উন্মত্ত পাগল যেন,             সাজিয়া দীন ভিখারী।

সবারে আপন বলি,             নিতে চাহে কোলে তুলি,

আর ফিরায়ে না তারে,             রাখ গাে হৃদয় চিরি॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ

বাঞ্ছা পূর্ণ হল, আজি ধরাতে রামকৃষ্ণ এল

খট-মিশ্রযৎ


বাঞ্ছা পূর্ণ হল, আজি ধরাতে রামকৃষ্ণ এল।

তত্ত্ব লাভের বিড়ম্বনা, দ্বৈতভাবের বিবাদ গেল॥

রামকৃষ্ণ একাকার, এ নব ভাবে প্রচার,

এক অনন্ত সবার মূলাধার;

যে যা বলে তাতেই মিলে একজনার খেলা সকল॥

যে কালী সে বনমালী, হরি বলি ঈশাই বলি,

আল্লা বলে মােল্লা ভজায় কর্তাভজায় সেই কেবল,

স্বভাবে সহজে পাবে অভাবে হবে বিফল॥

কালীপদ ঘােষ

ভকত-বিলাসী, দীন ভক্তে দেখা দাও হে আসি

কীর্তন—একতাল

(‘এই কর শ্রীহরি তােমার নাম নিয়ে যাই’—সুর)


ভকত-বিলাসী, দীন ভক্তে দেখা দাও হে আসি,

আমি ধন চাই না মুক্তি চাই না হে, শুধু পদ-অভিলাষী,

(আমার রাজপদে কাজ নাই)॥

তুমি যে আমার সর্বমূলাধার, ধর্ম-অর্থ-মােক্ষ-কাম।

(ঠাকুর) তুমি মম প্রিয়,         পরম আত্মীয়

(তাই) গেয়ে বেড়াই তােমার নাম।

প্রভু হে, প্রিয় হে, রামকৃষ্ণ গুণধাম, বড় আপন জেনে তােমায় ডাকি।

বড় ভালবাসার ধন জেনে হে, আমি তােমায় ভালবাসি।

(আমার চিরসাথী জেনে—ব্যথার ব্যথী জেনেইত্যাদি)।

এস অনাথ-শরণ, ত্রিতাপ-হরণ, জনম মরণ নাশি,

এস যুগপ্রবর্তক, ধর্ম-সংস্থাপক, ভকত-হৃদয়বাসী,

প্রভু হে, প্রিয় হে, দেখা দাও হে আসি,

এস সর্বত্যাগি-যােগি-বেশে,

এস সন্ন্যাসীর সাজ সঙ্গে নিয়ে হে, আমায় সাজাতে সন্ন্যাসী

(এস বিবেক বৈরাগ্য নিয়ে—এস ত্যাগের মন্ত্র কর্ণে দিয়ে

মধুর রামকৃষ্ণ নাম কর্ণে দিয়ে)

বৃন্দাবনচন্দ্র গােপ

তুমি কাঙ্গাল বেশে এসেছ হরি, কাঙ্গালে করুণা করিতে হে

ইমন-পূরবী—একতাল*


তুমি কাঙ্গাল বেশে এসেছ হরি, কাঙ্গালে করুণা করিতে হে,

প্রেম বিতরিতে মরুসম চিতে, পতিত জনে তারিতে হে

রামকৃষ্ণ নামে অমিয় ঢালা, হেরিলে ও রূপ জুড়ায় জ্বালা,

(তব) চরণ তলে পরাণ সঁপিলে, ভাবনা পলায় দূরেতে হে॥

করি তব কথা অমৃত পান, জাগিয়া উঠিছে অবশ প্রাণ।

হতাশ হৃদয়ে শত আশা জাগে, তােমার মধুর নামেতে হে॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

বন্দি কামারপুকুর পুণ্যলীলাভূমি

মনােহরসাহী-খয়রা


বন্দি কামারপুকুর পুণ্য-লীলাভূমি।

যেথা নলীলা তরে জনমিলা তুমি

দুঃখিনী-ব্রাহ্মণী নমি লুটায়ে অবনী।

পাইল যে তােমা হেন সুত গুণমণি

রূপ-লাবণ্য-খনি গদাধর চাঁদ

অনিমিষ নিরখিয়ে না পূরিল সাধ॥

জগতের নাথ তুমি জগত-আশ্রয় হে।

ধরাভার নিবারিতে ভূতলে উদয় হে॥

রামকৃষ্ণ দাসে কয়,         কি দিব হে পরিচয়

ব্যক্ত তুমি ত্রিভুবন-স্বামী;

কি দিব তব উপমা,         পিনাকী না পায় সীমা,

তােমারি তুলনা নাথ তুমি

নীরদরঞ্জন মজুমদার

তুমি আসিলে তুমি আসিলে হে নাথ, পতিত কাঙ্গালে তারিতে

বাহার—কাওয়ালী


তুমি আসিলে তুমি আসিলে হে নাথ, পতিত কাঙ্গালে তারিতে,

শত অপমানে ম্রিয়মান জনে আশার বারতা শুনাতে॥

বিগত-শান্তি-বেদনাদগ্ধ, হেরি জীবকুল দুরাশা মুগ্ধ;

মধুর চরিতে মােহিলে এ চিতে, যেচে দিলে প্রেম-অমৃতে॥

প্রেমের সাগর তুমি প্রভু মাের, মানবের দুঃখ হেরিয়া,

কঠোর সাধনে শীর্ণ শরীর, সুরধুনী-তীরে বসিয়া;

জীব-পাপ-ভার বহি প্রাণপণে, কত রােগ-জ্বালা সহিলে আপনে?

হায়! প্রভু তবু এখনাে গেল না দ্বেষ, ভেদ, পাপ জগতে॥

স্বামী প্ৰেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

ত্রেতাতারী রাম, দ্বাপরের শ্যাম, রামকৃষ্ণ দোঁহে একাধারে

ইমন-কল্যাণ—একতাল


ত্রেতাতারী রাম, দ্বাপরের শ্যাম, রামকৃষ্ণ দোঁহে একাধারে,

গৌতমের প্রাণ শঙ্করের জ্ঞান, লয়ে অবতীর্ণ ধরা পরে।

রামানুজ, গােরা, এক প্রেমে জোড়া, কবীর, নানক এক ডােরে,

যত অবতার সমষ্টি সবার, রামকৃষ্ণ রূপে এইবারে

যত মত পথ’, সব একমত, রামকৃষ্ণ কয় ভাবভরে,

ইষ্ট আপনার, ইষ্ট সবাকার, ভিন্ন রূপে ভক্ত এক হেরে

মহা অবতার রামকৃষ্ণ রায়, নরদেহ ধরি মধুর লীলায়,

জগতের সব ধরম মাতায়, দেখে বুঝ ভারত অন্তরে॥

স্বামী সুন্দরানন্দ

এসেছে নূতন মানুষ দেখবি যদি আয় চলে

বাউল—একতাল*


এসেছে নূতন মানুষ দেখবি যদি আয় চলে,

(তার) বিবেক-বৈরাগ্য ঝুলি দুই কাঁধে সদা ঝুলে।

শ্রীবদনে মা মা বাণী পড়ি গঙ্গা সলিলে,

(বলে) “ব্রহ্মময়ী, গেল মা দিন দেখা তাে নাহি দিলে”

নাস্তিক অজ্ঞানী নরে সরল কথায় শিখালে,

যেই কালী সেই কৃষ্ণ, নাম ভেদ এক মূলে

‘একোয়া’ ‘ওয়াটার’ ‘পানি’ ‘বারি’ নাম দেয় জলে,

‘আল্লা’ ‘গড’ ‘ঈশা মুশা’ কালী’ নাম ভেদে বলে

দীন, ধনী, মানী, জ্ঞানী বিচার নাই জাতি কুলে,

আপন-হারা পাগল-পারা সরলে নেহারিলে॥

দু বাহু তুলিয়ে ডাকে, আয়রে তােরা আয় চলে,

তােদের তরে কৃপা করে বসে আছি বিরলে;

যতন করি পারের তরী বেঁধেছি ভবের কূলে

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

রামকৃষ্ণ নাম-অমিয় পিওরে মন আমার

মূলতান—একতাল*


‘রামকৃষ্ণ নাম-অমিয় পিওরে মন আমার,

(নামে) জুড়াবে তাপিত তনু ঘুচিবে মােহ-আঁধার॥

(আজি) প্রকৃতির সনে মিশাইয়ে তান,

গাওহে তাঁহার মহিমার গান,

(হৃদে) রামকৃষ্ণ’ রামকৃষ্ণ’ জপরে অনিবার॥

অজ্ঞাত


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

কে তুমি এলে এবার, প্রেমিক উদাসীর ভানে

বাউল—একতাল


কে তুমি এলে এবার, প্রেমিক উদাসীর ভানে,

তােমার যমুনা সরযূ কোথা, লীলা গঙ্গা-পুলিনে।

গঙ্গাতীরে কাতর স্বরে মা মা বলা বদনে,

এমন ব্যাকুলতা মায়ের তরে, কেউ কখনাে দেখিনে॥

‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’ নূতন সাধন গােপনে,

(তােমার) অপূর্ব সন্ন্যাস-লীলা নরদেহ ধারণে॥

দীনের বেশে আশে পাশে, খুঁজছ যত দীন জনে,

জীবের তরে ঝছে নয়ন, বসে আছ আনমনে

তুমি কি চরাতে ধেনু রাখাল দল সনে,

যমুনা নাচিত কি হে, তােমার বেণু-রব শুনে।

তুমি কি হে বুদ্ধিরূপী, পশুবধ-দমনে,

ছেড়ে সুখের বাসা সকল আশা নিয়েছ ডাের-কৌপীনে।

তুমি কি সন্ন্যাসী-গােরা, মাতােয়ারা নাম গানে,

ডুবালে তরালে নদে, রাধা-প্রেম-বিতরণে?

যে হও তুমি দয়ার খনি, স্থান দিও ঐ চরণে,

(তব) পদ-ভেলা ভাসিয়ে ভবে, পার হয়ে যাই তুফানে

(জয় রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ বলে)

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


অযুত কণ্ঠে বন্দনা-গীতি, ভুবন ভরিয়া উঠিছে

ছায়ানট—একতাল*


অযুত কণ্ঠে বন্দনা-গীতি, ভুবন ভরিয়া উঠিছে।

(তব) অমিয় বারতা, দেশ দেশান্তরে হৃদয়ে হৃদয়ে পশিছে॥

বঙ্গ-হৃদয়-সরসী-সলিলে চারু শতদল ফুটিছে

বিশ্ব-মানব বিস্ময়ে হেরি রূপে সৌরভে মাতিছে।

প্রেমের ভূপতি! পতাকা তােমার বিজয়-গরবে ভাতিছে,

ভেদ বিবাদের চির অবসান, হেন আশা মনে জাগিছে॥

ক্ষীণ কণ্ঠ তুলি হীন এ বীণায়, ‘রামকৃষ্ণ নাম গাহিছে,

প্রেমরাজ্যে তব দিও তারে স্থান, হেন চিরদাস মাগিছে।

স্বামী প্ৰেমেশানন্দ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

ফুলসাজে রসরাজে হেরিয়ে জুড়াল মন

সাহানা—ঝাপতাল


ফুলসাজে রসরাজে হেরিয়ে জুড়াল মন,

মরি কি সুন্দর শােভা, চিত-আঁখি-বিনোদন

ফুল্ল-ফুল-হার গলে, সুধীর সমীর দোলে,

কোমল পদ-কমলে, প্রফুল্ল ভকত মন,

বিভাের চিত-ভ্রমর, রূপরসে নিমগন॥

দেখরে নয়ন ভরি, গােলক-বিহারী হরি,

রামকৃষ্ণ রূপে আজি করেন কৃপা বিতরণ,

ফুল-সাজে ভক্তমাঝে ভকত-হৃদি-রঞ্জন॥

এমন মােহন সাজে, কে সাজালে রসরাজে,

ধন্য সে ধরণীমাঝে, সফল তার জীবন,

দেখরে মােহন ছবি জগজন-বিমােহন॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

রামকৃষ্ণ-চরণ-সরােজে, মজরে মন-মধুপ মাের

কৌমুদী-খাম্বাজএকতাল*


রামকৃষ্ণ-চরণ-সরােজে, মজরে মন-মধুপ মাের,

কণ্টকে আবৃত বিষয়-কেতকী, থেকো না থেকো না তাহে বিভাের॥

জনম-মরণ-বিষম-ব্যাধি, নিরবধি কত সহিবে আর।

প্রেম-পীযুষ পিয়রে শ্রীপদে, ভবেরি যাতনা রবে না তাের॥

ধর্মাধর্ম-সুখ-দুঃখ-শান্তি-জ্বালা-দ্বন্দ্ব-খেলা মাঝে নাহি নিস্তার;

জ্ঞান কৃপাণে পরম যতনে কাটরে কাটরে করম ডাের,

‘রামকৃষ্ণ’ নাম বলরে বদনে, মােহেরি যামিনী হইবে ভোর    

দুঃস্বপন-জ্বালা রবে না রবে না ছুটে যাবে তাের ঘুমেরি ঘাের॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

আয় রে ভাই, মিলে সবাই ‘রামকৃষ্ণ’ বলে ডাকি

কামােদ-মিশ্র—একতাল


আয় রে ভাই, মিলে সবাই ‘রামকৃষ্ণ’ বলে ডাকি।

দেখি কেমন করে থাকে দূরে, পরাণ ভরে ডেকে দেখি॥

মুখে তাঁর নামটি নিলে, প্রাণটি যায় অম্নি গলে,

নামের গুণে দেখা মিলে সে কথাটি জান না কি॥

নামের তুলনা নাই রে, প্রেমে জগত মাতিল রে,

সাধ হয় যুগল চরণ ধরে সযতনে হৃদে রাখি॥

‘রামকৃষ্ণ’ নামটি নে রে, নাম বিনে আর গতি নাই রে,

নামেতে যাব তরে আমরা কি ভাই রইব বাকি॥

‘রামকৃষ্ণ’ রূপটি ধরে, এসেছেন জগতের তরে,

এমন দয়াল অবতারে, পাপীতাপীর ভয় ভাবনা কি॥

নীরদরঞ্জন মজুমদার

কেমনে তােমা বিনে, বাঁচি প্রাণে জগত-জীবন

বারোয়া—একতাল


কেমনে তােমা বিনে, বাঁচি প্রাণে জগত-জীবন,

বল কি আছে আমার, বিনে দুটি অভয় চরণ॥

তুমি হে অনন্ত অপার, ভক্তের তরে তুমি সাকার,

আরাে কত আছে আকার লীলা তােমার বঝে ক’জন

তুমি হে প্রেমিকের সখা নামটি তােমার অমিয় মাখা,

প্রেমহীনে দাও হে দেখা, (নইলে) কেমন তুমি অনাথ-শরণ॥

নীরদরঞ্জন মজুমদার


ছেড়ে আজ ধূলা খেলা নূতন খেলায় মেতেছে মন

গৌড়-সারঙ্গ—একতাল


ছেড়ে আজ ধূলা খেলা নূতন খেলায় মেতেছে মন,

শিখাও রামকৃষ্ণ নিধি, খেলার বিধি যেমন যেমন।

তুমি হে গুণমণি, খেলুড়ের শিরােমণি,

খেলা বৈ নাই কিছু কাজ, ক’রছ সৃজন পালন নিধন॥

রাখাল সনে বৃন্দাবনে, কল্লে খেলা বনে বনে,

খেলছ নিয়ে জগজ্জনে, ইচ্ছা তােমার হয় যা যখন॥

খেলতে বড় ভালবাসি, ছুটে ছুটে তাই তাে আসি,

শিখাও হে এমন খেলা, ভবের খেলা হয় হে মােচন।

কোন খেলায় নাহি ডরি, শুন হে হৃদবিহারী,

যদি হে কৃপা করি, দাও তােমার ঐ অভয় চরণ॥

চোর-খেলাতে বুড়ী ছুঁলে, চোর হতে আর হয় না মূলে,

খেল রামকৃষ্ণ বলে, বুড়ী ছোঁয়ার এই তাে সাধন॥

জয় ‘রামকৃষ্ণ জয়, জয় ‘রামকৃষ্ণ জয়,

জয় ‘রামকৃষ্ণ জয়, বালক-সখা পতিত-পাবন

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

নমো ‘রামকৃষ্ণ’ রূপ-ধারণ, মোহন মনোহারী

দেশ—একতাল


নমো ‘রামকৃষ্ণ’ রূপ-ধারণ, মোহন মনোহারী,

জগ-তারণ-কারণ নাম, শমন-শাসন-কারী,

বল ‘রামকৃষ্ণ’ নাম, প্রাণে পাবিরে আরাম॥

সত্য সনাতন, প্রেম-রূপ-ঘন, ভকত-চিত-শোভন,

তাপিত তরে নররূপ ধ’রে, যুগে যুগে অবতরণ;

স্বগণ সনে মিলন, লীলা সাধন কারণ,

মহাভাব প্রকটন-কারী; দীন শ্রীচরণ ভিখারী,

দেখা দাও, প্রাণ জুড়াও, আমায় কোলে তুলে লও।

নীরদরঞ্জন মজুমদার

(মধুর) ‘রামকৃষ্ণ’ নাম বল মন আমার

ভৈরবী—একতাল


(মধুর) ‘রামকৃষ্ণ’ নাম বল মন আমার।

দূরে যাবে তোর মোহ আঁধার

কাতরে ডাকলে তাঁরে         সে কি দূরে রইতে পারে,

অমনি এসে ভালবেসে মুছাবে রে তোর অশ্রুধার॥

নামটি আবার বল,         যদি না লাগে ভাল,

পরাণ খুলে নামটি নিলে, বইবে প্রাণে শান্তি-ধার;

অবহেলে পরশ-রতন,         নিয়ে রইলি কাম-কাঞ্চন,

‘রামকৃষ্ণ’ নামে হও না মগন নূতন খেলায় মজ এবার

নীরদরঞ্জন মজুমদার


দিবা বিভাবরী ডাক প্রাণভরি, ‘জয় রামকৃষ্ণ’ ব’লে

ঝিঁঝিট—একতাল*


দিবা বিভাবরী ডাক প্রাণভরি, ‘জয় রামকৃষ্ণ’ ব’লে।

পাপ তাপ যাবে, প্রাণ জুড়াইবে, নামেরি মহিমা বলে

তরু-পত্র-প্রান্তে লম্বিত নীহার,     জান কি পতনে কি বিলম্ব তার,

পদ্মপত্রে জল, জীবন চঞ্চল, কেমনে র’য়েছ ভুলে॥

উঠ উঠ ভাই থেক না অলসে,     দেখ নাম রসে ধরা যায় ভেসে,

গায় দেশ-বিদেশে ‘রামকৃষ্ণ’ নাম, প্রেমের লহরী তুলে।

সে নামে থাকে না ভবেরি বন্ধন,         ঘুচে যায় মায়া কামিনী-কাঞ্চন,

হয় মৃত্যুঞ্জয়, সদানন্দে রয়, প্রেমানন্দে পড়ে ঢলে

আহা মরি হেন ‘রামকৃষ্ণ’ নাম,     নাহি তাতে রুচি বিধি মোরে বাম,

তুমি গুণধাম হ’য়ো নাকো বাম, স্থান দাও পদতলে

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


* স্বরলিপি: সুরবিতান

পরম পুরুষ সিদ্ধ যোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার

দুর্গা, মিশ্র—একতাল


পরম পুরুষ সিদ্ধ যোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার।

পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ লহ প্রণাম নমস্কার॥

জাগালে ভারত শ্মশান তীরে,         অশিব-নাশিনী মহাকালীরে;

মাতৃনামের অমৃতনীরে ভাসালে মৃত ভারত আবার

সত্যযুগের পুণ্যস্মৃতি,         আনিলে কলিতে তুমি তাপস,

পাঠালে ভারত দেশে দেশে ঋষি পুণ্য-তীর্থ-বারি-কলস।

মন্দিরে মসজিদে গীর্জায়,         পূজিলে ব্রহ্মে সমশ্রদ্ধায়,

তব নাম মাখা প্রেম নিকেতনে ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসার

নজরুল

জয় ‘রামকৃষ্ণ’, ‘রামকৃষ্ণ’ বল আমার মন

বাউল—দাদরা (কীর্তন—একতাল)*


জয় ‘রামকৃষ্ণ’, ‘রামকৃষ্ণ’ বল আমার মন।

যুগ-অবতার যিনি পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ

জীব-দুঃখেতে কাতর,         ধরি নর-কলেবর,

বারংবার অবতার জগত ঈশ্বর;

(এবার) মাধুর্য-ঘন-মূরতি জিত-কামিনী-কাঞ্চন;

(ঐশ্বর্য বিহীন লীলা)॥

পূর্ব পূর্ব অবতার,         এলো কলাংশে যাঁহার,

স্বয়ং সে দক্ষিণেশ্বরে এসেছে এবার,

ওরে চক্ষু মেলে চেয়ে দেখ, পাবেরে নব জীবন;

(কত আর ঘুমাবে জীব, কাম-কাঞ্চন-আবেশে)॥

রামকৃষ্ণের কৃপায়         বিবেকানন্দ বিলায়,

ভক্তি মুক্তি বিনামূল্যে কে নিবি রে আয়।

‘রামকৃষ্ণ’ বলে নেও রে তুলে, যার যত হয় প্রয়োজন।

(ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ)

শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী


তুমি ব্রহ্ম, ‘রামকৃষ্ণ, তুমি কৃষ্ণ, তুমি রাম

জয়জয়ন্তী—ঝাঁপতাল*


তুমি ব্রহ্ম, ‘রামকৃষ্ণ, তুমি কৃষ্ণ, তুমি রাম,

তুমি বিষ্ণু, তুমি জিষ্ণু, প্রভবিষ্ণু প্রাণারাম।

তুমি আধেয় আধার, তুমি ব্রহ্ম নিরাকার,

তুমি নর-রূপ-ধর, বিজিত-কনক-কাম॥

অপার-করুণা-সিন্ধু, তুমি দেব দীনবন্ধু,

যাচে ইন্দু কৃপাবিন্দু, চরণে করি প্রণাম॥

শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী


* স্বরলিপি: দিব্যগীতি

দিব্যগীতি গ্রন্থে রচয়িতা ‘ইন্দ্রভূষণ’ বলা আছে।

‘রামকৃষ্ণ’, শ্যাম, শ্যামা, শিবে ভেদ ভেব না আমার মন

লগ্নী-খাম্বাজ—কারফা


‘রামকৃষ্ণ’, শ্যাম, শ্যামা, শিবে ভেদ ভেব না আমার মন।

নামরূপের গেলাপে ঢাকা আছেন সেই এক নিরঞ্জন॥

চিনির ছাঁচে উট হাতী ঘোড়া, পুতুল পাখী রথ হয় যেমন,

যার যেমন মন লয় সে তেমন, এক চিনিতে সব গঠন॥

ভেদ ভাবনা মন ছাড় না, সুখ পাবে না তায় কখন,

বহুতে এক দেখলে তবে, পারিরে সেই মোক্ষধন॥

অস্থি মাংস মেদ শোণিতে সকল শরীর হয় সৃজন,

এক আত্মারাম বিহরেন তায়, কে হিন্দু ভাই কে যবন॥

সাধ যদি তোর থাকে রে মন, পেতে সত্য সনাতন,

(তবে) ভাসিয়ে দে না দ্বেষাদ্বেষী, পর না চোখে প্ৰেমাঞ্জন॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

নীলকমল নয়নযুগল কি যেন কি বিষাদে বিমলিন

বেহাগ-খাম্বাজ—ঠুংরী


নীলকমল নয়নযুগল কি যেন কি বিষাদে বিমলিন,

কোমল হৃদয়েতে কেন গো ব্যথা পেতে সাজিলে ধরাতে দীনহীন

পঞ্চবটী মূলে বিল্বতরু তলে সাধিলে সাধনা সুকঠিন,

দ্বাদশ বৎসর নাহি অবসর, করিলে সুন্দর তনু ক্ষীণ॥

কোন সে প্রেমলোকে ছিল গো চিরসুখে, ভেদ-বিবাদ বেদনা-বিহীন;

মলিন ভূতলে প্রেমে নেমে এলে, দীনহীনজনে কোলে তুলে নিলে,

মানব-মঙ্গলে তনু তেয়াগিলে, সহিলে যাতনা নিশিদিন

স্বামী প্রেমেশানন্দ

বড় আশা করে এসেছি ঠাকুর করুণা নয়নে চাও হে

ইমন-কল্যাণ—কাওয়ালী


বড় আশা করে এসেছি ঠাকুর করুণা নয়নে চাও হে।

দিয়ে রাঙ্গা চরণ রাজীবলোচন, কামনা মোদের পুরাও হে॥

হৃদয় কমল বিকাশ করিয়া, প্রকাশ আসিয়া তায়—

ভকতি-হিল্লোলে প্রেমে-পরিমলে, পুলকে পূরিবে কায়;

মাতিয়া যাইবে মন মধুকর,

পিবে বসি শুধু শ্রীচরণের মধু বিভোর হইয়া তায়—

তৃষিত এ চিত হবে তিরপিত, একবার দেখা দাও হে॥

দয়ার আধার প্রেম-সুধাকর রামকৃষ্ণ গুণমণি

আসি বারে বারে নানারূপ ধরে, তারিলে তাপিত প্ৰাণী

মোদের তারিতে হবে (ঠাকুর)

আর বল কেবা আছে, যাব কার কাছে, লইবে মোদের ভার।

মোরা অতি দীন ভজন-বিহীন, নিজ গুণে কৃপা কর হে॥

অজ্ঞাত

কাঠুরে তুই দূর বনে যা, দূর বনে যা এই বেলা

বাউল—দাদরা


কাঠুরে তুই দূর বনে যা, দূর বনে যা এই বেলা।

কেঠো বনে কাল কাটালি ঘুচলো না (তোর) জঠর জ্বালা॥

রামকৃষ্ণ দিলেন বলে, মিলে ধন দূর বনে গেলে (ও কাঠুরে)।

ও তুই এবার যা দূর বনে চলে, পাবি চন্দনের চেলা॥

আরও যদি যাস এগিয়ে, রজত খনি দেখবি গিয়ে (ও কাঠুরে)।

ওরে তার ওধারে সোনা হীরে মণি মানিক রতন মালা

দেহের মাঝে আছে সে বন, যদি না পাস তার অন্বেষণ (ও কাঠুরে)।

ওরে ধর রামকৃষ্ণ চরণ, সেবন যার করেন কমলা॥

অক্ষয়কুমার সেন

আপনি করিলে আপনার পূজা আপনার স্তুতি গান

নায়েকী-কানাড়া—একতাল


আপনি করিলে আপনার পূজা আপনার স্তুতি গান

ভবতারিণীর পূজারী ঠাকুর তুমি হে আমার প্রাণ॥

কেহ বলে তুমি সাধক-প্রধান, কেহ দেয় তোমায় দেবতারি মান,

(আমি) গৌরব সব ত্যজিয়ে দিয়েছি হৃদয়ে আসন দান॥

যবে মনে পড়ে করুণার ছবি, পর দুখে ম্রিয়মান,

পর পাপ বহি রোগ-জ্বালা সহি’ তাপিতে করিলে ত্রাণ।

দেব কি মানব পরিচয়ে আজ, হেন প্রেমিকের বল কিবা কাজ,

শুধু লয় মনে রাতুল চরণে করিতে জীবন দান॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ

তুমি এলে ফাল্গুনে

ভীমপলশ্ৰী—একতাল


তুমি এলে ফাল্গুনে।

ফুল্ল কানন মলয়ানিল কম্পনে

কোকিল-কুল-কূজিত মুখরিত অলি গুঞ্জনে॥

হেরি ধরণী রঞ্জিতা, উৎসব উল্লসিতা,

চন্দ্রা-উদর-সিন্ধু-মথন উদিত চন্দ্রকিরণে॥

(তব) কুসুমকোমল অঙ্গ, (তাহে) উথলে রূপ তরঙ্গ,

মন্মথ শত নিমেষে নিহত বঙ্কিমায়ত নয়নে।

সাকেতপুরীভূষণ, কৃষ্ণ নন্দনন্দন

বিধি হরিহর সদাই বিভোর চরণপদ্ম ধেয়ানে

স্বামী প্রেমেশানন্দ

‘হরি ওঁ রামকৃষ্ণ’ বল মন আমার

মিশ্র জয়জয়ন্তী—কাহারবা*


‘হরি ওঁ রামকৃষ্ণ’ বল মন আমার।

‘সারদা-রামকৃষ্ণ’ নাম বল একবার

সুধামাখা হরি ওঁ রামকৃষ্ণ নাম।

অন্তকালে ‘হরি ওঁ রামকৃষ্ণ’ নাম

তারকব্রহ্ম হরি ওঁ রামকৃষ্ণ নাম

নিবে তোরে ‘শ্রীসারদা-রামকৃষ্ণ ধাম’।

হয়ে যাবি পূর্ণকাম পুলকে অপার॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপিঃ জয়রামবাটী মাতৃমন্দির প্রকাশিত ভজন সঙ্গীত গ্রন্থে রয়েছে।

পাখী তুই ঠিক বসে থাক রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুলে

বাউল


পাখী তুই ঠিক বসে থাক রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুলে।

ও তোর, বৃথা উড়া নড়া চড়া কূল পাবি’নে অকূলে॥

(ও) তুই যেদিক যাবি দেখতে পাবি জলে জলাকার।

(ও তার) নাহি অস্ত দিগ্‌দিগন্ত অপার পাথার।

(ও তোর) ধরবে ডানা ঘোর যাতনা পড়বি মহা মুস্কিলে

(ও সে) অনন্ত অনন্ত ভাবে অন্ত কে করে,

প্রধান গ্রন্থ বেদ বেদান্ত গেল চুপ মেরে;

পুরাণেরা দিশেহারা সার কৈল নাম শেষকালে॥

এদিকে অবিদ্যা মায়া পিশাচী করাল,

পাতিয়াছে মন মোহিনী রূপ রসাদির জাল।

পাখী তুই পড়বি ফাঁদে মরবি কেঁদে প্রাণ হারাবি বেহালে॥

(ঐ মাস্তুল ছেড়ে চলে এলে)

অক্ষয়কুমার সেন

উথলেছে প্রেম-পারাবার

(বাউল) ঝিঁঝিট-বাহার—একতাল


উথলেছে প্রেম-পারাবার।

(তোরা) আয় না ছুটে ভবের মুটে, ভাসিয়ে দে না মাথার ভার॥

যার লেগেছে বোঝা, তার হ’য়েছে সোজা,

বোঝাবুঝির বুঁচকি ফেলে মারছে সে মজা,

(তুই) রইলি বসে বোঝার আশে, করবি শেষে হাহাকার॥

প্রেম-সাগরে ভাসিয়ে দে না গা,—

যাবি ভেসে এমন দেশে যার পাশে নাই গাঁ—

(ওরে) চন্দ্র সূর্য ধ্বংস হলেও হয় না সেথা অন্ধকার (বোকা)॥

সেথায় সবই উল্টা ঢং, সেথায় সবই উল্টা ঢং,

হেথায় কালো সেথায় সাদা বুঝবি কি ভাই রং,

(ও তোর) কার্য-কারণ, সব অকারণ, নাই তথায় তার অধিকার॥

মানবের দুঃখে নয়ন তাঁহার ঝরিতেছে অনিবার৷

গুরুদাস কেঁদে বলে ভাই, আর বিচারে কাজ নাই,

বোঝাবুঝি অনেক হ’ল (এখন) সোজায় চল ভাই,

‘রামকৃষ্ণ’ আমার প্রেমের পাথার, ডুবলে হবি ভবপার (বোকা)

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

আজি এ জীর্ণ বীণায় আমার, গাব নব সমাচার

সুরট মিশ্র—একতাল


আজি এ জীর্ণ বীণায় আমার, গাব নব সমাচার।

মুছ আঁখিজল চাহ মুখ তুলি, ক্ষুদ্র ভাবিয়া আছ যেবা ভুলি,

দীনের তরে দীনের সুহৃদ্ ধরাতে এল আবার;

মানবের দুঃখে নয়ন তাঁহার ঝরিতেছে অনিবার

হে ভীরু, ভয় ভাবনা যত কর কর পরিহার;

শুন কান পাতি অমৃত-গীতি, ভুলে যাও আজি মরণ-ভীতি,

ঐ ডাকে হায় লইতে হেলায় জনম মরণ পার॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ

ফাগুন হাওয়ায় পরশ রসে শুক্‌নো তরু মুঞ্জরে

ভৈরবী—একতাল


ফাগুন হাওয়ায় পরশ রসে শুক্‌নো তরু মুঞ্জরে,

পায়ে দলা লতায় কুসুম ফুটে মরু-প্রান্তরে॥

শীতের মেঘে গগন ছাওয়া, উড়িয়ে নে যায় পাগলা হাওয়া,

রবি শশীর হাসি রাশি ভাসে দিগদিগন্তরে॥

রামকৃষ্ণ মলয় বায়, লাগল কি সবারই গায়!

(তাই) নিখিল চিতে প্রেমের কুসুম ফুটল আজি ফুটল রে।

কে আছে রে অন্ধ কালা, কালের ডাকে করি’ হেলা,

দে খুলে দে বুকের বাঁধন লাগুক হাওয়া অন্তরে॥

হেলায় কোণে ধূলায় শয়ন, বিশ্ব সভায় তার প্রয়োজন,

সকল জীবন সফল হ’ল এবার যুগযুগান্তরে।

জ্যোতির খেলা গগনতলে দাঁড়া এসে মাথা তুলে,

ভাসবে নয়ন জলে হ’লে বসন্তের অন্ত রে॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ

আবার যদি এলে হরি আবার দিলে দরশন

বসন্ত—ঝাঁপতাল


আবার যদি এলে হরি আবার দিলে দরশন।

আবার জীবে দিলে অভয় ওহে শ্রীমধুসূদন

জ্বালাও তবে প্রাণের আগুন, জ্বলুক শিখা দ্বিগুণ দ্বিগুণ;

বজ্র-বীণায় ঝঙ্কৃত কর স্পন্দিত হোক ত্রিভুবন

পাঞ্চজন্য বাজাও আবার দ্বাপরের সেই রুদ্র-তান,

যে গান শুনে সব্যসাচীর ক্লৈব্য ছাড়ি আত্মদান।

অভী’র মন্ত্রে উঠুক ভারত মুগ্ধ নেত্রে দেখুক জগৎ,

কর্ম যাদের ধর্মেরি তরে সেই জাতির আর নাই মরণ ॥

—স্বামী চণ্ডিকানন্দ                       

জয়তু জয়তু রামকৃষ্ণ, জয় ভবভয়হারি হে

কীর্তন—একতাল*

(“চিন্তয় মম মানস হরি'— সুর)


জয়তু জয়তু রামকৃষ্ণ, জয় ভবভয়হারি হে।

জয়তু জয়তু পরমব্রহ্ম, জয় নর-রূপ ধারী হে

কাম-কাঞ্চন-আঁধারে, ধরণী ডুবিল হেরে,

(তুমি) উদিলে সূর্য অমিতবীর্য, যুগে যুগে অবতরি হে॥

(এবার) মহা সমন্বয়ের তরে, রামকৃষ্ণ একাধারে;

ডাক্‌ছ কেন সকাতরে, জগতের নরনারী হে॥

(আমি) শুনেছি অভয়বাণী, তুমি জগৎচিন্তামণি;

(তাই) তোমারি দ্বারে অতি কাতরে, এসেছি দীন ভিখারী হে

বিনোদেশ্বর দাশগুপ্ত


* স্বরলিপি: সাধন সঙ্গীত

হাতে হাতে তালি দিয়ে বল রামকৃষ্ণ নাম

নামালি—খেমটা*


হাতে হাতে তালি দিয়ে বল রামকৃষ্ণ নাম,

রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ একাধারে কৃষ্ণ রাম।

রামকৃষ্ণ নাম বল অবিরাম, তারকব্রহ্ম রামকৃষ্ণ নাম

এ যুগেতে সারদা রামকৃষ্ণ নামের ভেলা,

পারে যেতে চারে যদি কর্ ত্বরা এই বেলা।

এ যুগেতে সারদা রামকৃষ্ণ মধুর নাম,

যুগের হাওয়া লাগিয়ে পালে হরিগুণগান (কর রামকৃষ্ণ নাম)

শরণাগতির কোনো বিকল্প যে নাই,

সংসারাগ্নিতে কেন পুড়ে মর ভাই।

মরি মরি রামকৃষ্ণ মধুর নাম গান,

সারদা নামের সাথে কর সুধাপান (কর রামকৃষ্ণ নাম)

মোদের [জীবের] দুখে কাতর হয়ে পরব্রহ্ম এসেছে,

কলসে কলসে অপার কৃপাবারি এনেছে।

আয় ত্বরা আয় ত্বরা ওরে করি আত্মনিবেদন,

জীবনে মরণে রাখি’ অভয় [যুগল] চরণ॥

স্বামী সর্বগানন্দ


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

ঘরে আমার চাঁদ উঠেছে ঘুচে গেছে অন্ধকার

বাউল


ঘরে আমার চাঁদ উঠেছে ঘুচে গেছে অন্ধকার।

(ও সে) চাঁদের ছটায় বেশ দেখা যায় যেই নিরাকার সেই সাকার,

অপরূপ চাঁদের বাতি রাতি নাই দিন দিবা রাতি (অচঞ্চল জ্যোতিঃ)

ঘরে নাই চুরি ডাকাতি অরাতির অত্যাচার॥

অহঙ্কার বুদ্ধি দুজন ধরা পড়ে গেছে এখন (চোরের মতন),

আমার মনের নাই সেই মলিন বরণ, জ্ঞানসিংহ চৌকিদার।

আবাস বাটীর পাঁচটা রন্ধ্র হয়ে গেছে কপাট বন্ধ (মরি কি আনন্দ),

রূপ রসাদির আবিল গন্ধ প্রবেশে পথ পায় না আর।

চির কেলে আঁধার ঘরে চাঁদের খেলা তার ভিতরে (হয় কি রে)

ও তার সাধ যদি হয় দেখিবারে রামকৃষ্ণ নাম কর সার॥

অক্ষয়কুমার সেন

কে উদিল ঐ ভারত-গগনে, নেহার নেহার মনরে আমার

ভৈরবী—একতাল


কে উদিল ঐ ভারত-গগনে, নেহার নেহার মনরে আমার।

উজল স্নিগ্ধ কিরণে কাহার, দূরে গেল আজি ধরার আঁধার॥

তরুণ অরুণ অপরূপ ভাতি, রূপ অনুপম জিনি নিশাপতি;

ভকত-বিহগ গায় প্রেম-গীতি, ধায় দিশি দিশি আনন্দে অপার॥

বিভেদ-বিবাদ-তপত-পবন, ভব-মরু-মাঝে বহে অনুক্ষণ;

সুখ-মরীচিকা-মুগধ-নয়ন, জীবগণ তাহে করে হাহাকার।

মরু-কান্তারে নন্দনবন, সৃজন কারণ তব আগমন

মিলন-মলয় ধীরি ধীরি বয়, মনে লয় দুখ ঘুচিল ধরার ॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মগন-হৃদয়-ভকত জাগে দয়াল নামগানে

খাম্বাজএকতাল


মগন-হৃদয়-ভকত জাগে দয়াল নামগানে।

জয় রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ নাম-সুধা পানে ॥

রজত-আসন ধরণী-শাসন না চাহি মণিকাঞ্চনে।

তুলসী-মাল মৃগ-ছাল, রামকৃষ্ণ বদনে।

ভুবন-মোহন রমণী-রতন না চাহি আলিঙ্গনে।

চাহে মন রামকৃষ্ণ-স্থান অভয় চরণে

নাহিক সাধ মধুর স্বাদ রসনা পরিতোষণে॥

চাহে মন রামকৃষ্ণ-চরণামৃত সেবনে।

(রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ ধ্যানে)

কালীপদ ঘোষ

কে তুমি তাপস কাঁদিছ কাতরে নীরবে সুরধুনী তীরে

কাফি-সিন্ধু—তেওরা


কে তুমি তাপস কাঁদিছ কাতরে নীরবে সুরধুনী তীরে।

দু’নয়নে তব করুণার ধারা অবিরত বহে শতধারে॥

দলিছে মানবে শত অবিচার, কোটি নারায়ণ করে হাহাকার।

(তাই) জীবন দেবতা পূজিলে এবার বেদীতে বসায়ে নরে?

তোমার মহান দুঃখ আমার জীবনে প্রভো করো সঞ্চার।

মানবের দুঃখে কাঁদিতে শিখুক ক্ষুদ্র আমার এ অন্তর।

তুচ্ছ স্বাৰ্থ-সুখ-আশে ভুলি আর থাকিব না, চাহ মুখ তুলি।

লহ দেব লহ এ জীবন ডালি, তব নরদেব পূজা উপচারে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে তুমি তমোনাশন নাথ, জগত-তারণ রাজিত রামকৃষ্ণ নামে সুধাময়

সিন্ধু-বিজয়—তেওরা


কে তুমি তমোনাশন নাথ, জগত-তারণ রাজিত রামকৃষ্ণ নামে সুধাময়৷

যুগে যুগে তব শুভ আগমন, বিদিত আগমপুরাণে,

দুরিত-দলন, ভকত-পালন, উদ্ধারণ জন মায়া ঘোরে॥

নিত্য চিন্ময় আনন্দময়, স্বরূপ তোমারি সনাতন,

ভকত-প্রাণ-তাপ-হরণ, দেহ ধারণ লীলাতরে॥

জ্যোতি-বিমল বিকাশ-কারণ, চির-মোহ-ঘন-বারণ,

চকিত ভুবন তব দরশনে, প্রণত জগজন করজোড়ে

সর্ব-ধরম-সমান-কারণ, নানা-মত-যোগ-সাধন,

কাম-কাঞ্চন-লেশ-বিহীন, নিরঞ্জন! নমি ভকতি ভরে॥

নীরদরঞ্জন মজুমদার

রামকৃষ্ণ গুণধাম (আমারি)

মিশ্র-দেশ—তিনতাল


রামকৃষ্ণ গুণধাম (আমারি)

ভব-সন্তাপিত-দগ্ধহৃদয়-মরু-সিঞ্চিত মঙ্গল বারি-বিসারী

পূর্ণানন্দ শ্রীরাম-শ্যাম যুগ-মুরতি এক অবতার বিহারী।

নিখিল-চরাচর-ধর্ম-সমন্বয়-সাম্য-সনাতন-স্থাপন-কারী ॥

শারদ-চন্দ্র-নিন্দিত-মুখ উজ্জ্বল শান্তি নির্ঝর মৃদু হাস্যে।

তপ্ত প্রাণ-মন দীন ভকত নিত্যামৃত প্রেমমধু দাস্যে।

পঞ্চবটীতট-ধ্যান-ধারণ-রত রম্য-মূরতি-রূপ-ধারী।

ভক্তে অভয় তব দেহ পদ-পঙ্কজ জয় জয় দয়াল ভরাময়-বারী॥

হৃষীকেশ চক্রবর্তী

রামকৃষ্ণের বেদীতলে মোরা মিলিয়াছি একপ্রাণ

ইমন-কল্যাণ—দাদরা*

[“অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত কর সন্তানে তব আজ”—সুর]


রামকৃষ্ণের বেদীতলে মোরা মিলিয়াছি একপ্রাণ।

পরা অপরা বিদ্যা সাধিয়া লভিব দিব্য জ্ঞান॥

শৌর্যে করিয়া অঙ্গ-ভূষণ সত্যের তরে ধরিব জীবন।

সর্বশক্তি আছে অন্তরে, জানিয়াছি সন্ধান॥

‘ত্যাগ ও সেবা’র সাধনা সহায়ে মানুষ হইব মোরা,

তাই যে মোদের জাতির সাধনা, সেই সনাতন ধারা।

‘বিবেকে’র সেনা আমরা সবাই, উন্নত শির মোদের সদাই,

উচ্চ কণ্ঠে মোরা গেয়ে যাই মহামিলনের গান, ‘বিবেকে’র জয় গান;

গাহি আনন্দে “জয় মহামায়ী” জয় জয় ভগবান।

জয় জয় ভগবান, জয় জয় ভগবান

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

অনুরাগ বিহনে সাধনায় ফলে না ফল

বাউল


অনুরাগ বিহনে সাধনায় ফলে না ফল।

দিনকরে শূন্যভরে তুলছে সাত সাগরের জল॥

ক্ষুদ্র বীজ বালির মতন মাটির ভিতর করে রোপণ (আশ্চর্য কেমন)

গোপনে রসের আকর্ষণ তুলে দেহে আঁকুর কল॥

রাগে স্রোতস্বতীর রীতি একটানা বয় দিবারাতি (অবিরাম গতি)।

সাগরে সঙ্গম পিরীতি হ’লে তবে প্রাণ শীতল॥

রাগের খেলা চাঁদের দেশে যেথা কৃষ্ণ ছুটে আসে (মিলিবে কিসে)

পাবে তুমি অনায়াসে রামকৃষ্ণ পদ কর সম্বল

অক্ষয়কুমার সেন

কেন দেখা দিলে, কি করিতে এলে, কবে দুঃখনিশা হবে অবসান

ইমন-কল্যাণ—একতাল


কেন দেখা দিলে, কি করিতে এলে, কবে দুঃখনিশা হবে অবসান।

কত সহি আর দিবসে আঁধার, সোনার ভারত হয়েছে শ্মশান॥

মৎস্য-কূর্মবেশে জীবদুঃখ নাশে তারিলে ভারতে বারে বারে এসে,

(এবার) জীবে দয়া হেরি, মনে লয় হরি,

জগতে তারিতে হ’লে মূর্তিমান

সাগর-সলিলে ভাসিল পাষাণ, যজ্ঞ-বিঘ্ন-রক্ষ-বংশ অবসান,

রাম-রাজ্য স্মরি ঝরে অশ্রুবারি,

(এবে) অনাহারে সহি শত অপমান

দণ্ডিতে দম্ভীরে আসিলে দ্বাপরে, নাচি রণরঙ্গে শোণিত-সায়রে

নাশি বাহুবলে কংস-শিশুপালে, এবে কংস-শত হের দহে প্রাণ

জ্ঞান মূর্তিমান্ নরদেহ ধরি, জীবের কল্যাণে গেহ পরিহরি,

সাজিয়া ভিখারী দ্বারে দ্বারে ঘুরি, বিতরিলে জ্ঞান ব্রহ্ম-নিরবাণ॥

হের প্রেতভূমি-সম ধরাতল, পাপভারে যেন করে টলমল।

কর তমোনাশ, হও হে প্রকাশ, ‘এস রামকৃষ্ণ’, কর জীবে ত্রাণ॥

স্বামী প্রেমেশানন্দ

রামকৃষ্ণ নাম গাও মন অবিরাম

মালকোষ—সুরফাঁক্তা


রামকৃষ্ণ নাম গাও মন অবিরাম।

জুড়াবে তাপিত প্রাণ দুঃখ হবে অবসান,

হিয়ায় হেরিবে সদা সুখে প্রাণারাম॥

আহা কি মোহন রূপ যাই বলিহারি,

নয়ন ফিরে না হায়, বারেক নেহারি।

চিত-মনোহারী জগজন-তারি

করুণা বিতরি হরি এলো ধরাধাম॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় রামকৃষ্ণ জয় নররূপধারী

প্রভাতী—ত্রিতাল


জয় রামকৃষ্ণ জয় নররূপধারী

ধরার যতেক ধর্ম সমন্বয়কারী।

শুদ্ধা ভকতি বিগ্রহ জয় গৌরহরি,

আচণ্ডালে প্রেম দিলে বলি হরি হরি

জয় রামানুজাচার্য জীব হিতকারী

শঙ্কর শিবাবতার জ্ঞান মূর্তিধারী,

জীব উদ্ধারিলে বুদ্ধ নির্বাণ প্রচারি

পূর্ণ মনুষ্যত্ব রূপ শ্রীকৃষ্ণ মুরারি

রাজধর্ম সংস্থাপিলে রামরূপে হরি॥

জীবে দয়া প্রচারিলে যিশুরূপ ধরি

মোহম্মদ মানব-সাম্য প্রবর্তনকারী

শিখ ধর্ম সংস্থাপক শ্রীগুরু নানক

লাওসে কনফুসিয়াস জীব উদ্ধারক॥

জরথুস্ট্র পারস্যেতে এসে অবতরি

শিখালে নতুন ধর্ম আপনি আচরি॥

যুগে যুগে যত ঋষি আসিলে ভুবনে

দয়া করে পদরেণু, দাও অভাজনে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

নমো নমো দেব, নমো নর দেব, নমো ভবভয়হারী

আশাবরী—একতাল


নমো নমো দেব, নমো নর দেব, নমো ভবভয়হারী।

ভুবন পাবন নমো নারায়ণ, রামকৃষ্ণ-রূপধারী॥

মদ-গর্বিত দুষ্ট-দলনে, সাধু-সজ্জন পালনে,

ধরম স্থাপনে আসিলে ভুবনে যুগে যুগে অবতরি॥

দখিন সহরে কত না সাধনা; জীবে তরাইতে কত না ভাবনা,

দীন দুখী তরে দু’নয়ন ঝরে, জগজন-দুখ-হারী।

সকল জীবেতে এক নারায়ণ, মন্দিরে যাঁরে করে আরাধন,

শিখালে মানবে এ নব সাধন, বিতরিলে প্রেমবারি

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

এসেছে আজ প্রাণের ঠাকুর, দেখবি যদি চলে আয়

বাউলাঙ্গ—কাওয়ালী*


এসেছে আজ প্রাণের ঠাকুর, দেখবি যদি চলে আয়।

পাষাণ গলে তাঁর নামেতে, প্রেমে ভুবন ভেসে যায়॥

মরি কি রূপ মাধুরী, মেটে না সাধ যতই হেরি (গো)।

মনে লয় তায় হৃদে ধরি, পরাণ সঁপি রাঙ্গা পায়॥

সদাই যেন আপন হারা, মা নামেতে মাতোয়ারা (রে)

হাসে কাঁদে পাগল পারা, ক্ষণে নাচে ক্ষণে গায়।

মোদের তরে মায়ের কাছে কাতরে করুণা যাচে গো।

এমন আপন আর কে আছে—আপামরে প্রেম বিলায়।

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

সীমাকে বীচ অসীম দেশকা কৌন অতিথি আয়া রে

গজল—কাহারবা


সীমাকে বীচ অসীম দেশকা কৌন অতিথি আয়া রে।

জান পহচান ন হ্যয় তথাপি দিলমে অচ্ছা ভায়া রে॥

ক্যা য়হ হায় অওধ বিহারী বৃন্দাবন কা ক্যা বনচারী।

জড় বিজ্ঞান কা দর্পহারী কৌন অতিথি আয়া রে॥

বেদ, বাইবেল, পুরাণ, কুরাণ, তন্ত্র ইস্‌মে হ্যয় মূর্তিমান্।

বান্ধা প্রেমসে সভী কে প্রাণ, কৌন যাদুগর আয়া রে॥

সভী মতকা সাধন কিয়া ভেদ ঔর দ্বন্দ্ব দূর কর দিয়া।

বিশ্ব জনকো আপনা লিয়া কৌন দিলারা আয়া রে॥

জো হো সো হো হম্ ন জানে অগুন্কা গুণ কৌন বাখানে?

কেবল য়হী দিল্‌মে মানে হমার প্যারা আয়া রে॥

স্বামী মেঘেশ্বরানন্দ

জয়-নিখিল-জন-মনোহারী; নরোত্তমরূপ-ধারী রে

পিলু-বারোঁয়া—তিনতাল


জয়-নিখিল-জন-মনোহারী; নরোত্তমরূপ-ধারী রে।

রতি-পতি-গঞ্জন, রূপ-অতুলন, দীনেশ দীন-বেশ-ধারী রে।

সদা নিজ ভাবে ভোলা, শ্রীমুখে মা মা বলা, ভকত মনপ্রাণহারী।

জয় ভবেশ্বর, নবযুগ ঈশ্বর, সর্ব ধর্ম সমকারী রে॥

জয় নর-দুঃখ-বারণ, ত্যাগী-কাম-কাঞ্চন, কলিমল-মর্দনকারী।

জয় ভক্তেশ্বর ভকত বিমোহন, ভকত মনোতমোহারী রে॥

রাধাকান্ত মল্লিক

ভব পারাবারে হে রামকৃষ্ণ তুমি যে তরণীসম

ভৈরবী—একতাল


ভব পারাবারে হে রামকৃষ্ণ তুমি যে তরণীসম।

তুমি দীননাথ তুমি মোর প্রিয় তুমি যে দেবতা মম॥

যুগে যুগে এই ঘোর সংসারে, তুমি যে ঠাকুর আস বারে বারে,

ধরণীর দুঃখ যন্ত্রণা সহি’ লয়েছ জনম মরণ॥

মোহ বন্ধন যত সংস্কার, অজ্ঞান রূপী যতই আঁধার,

আনো তুমি সেথা আলো পারাবার, হে প্রভু বিশ্বপালন॥

এস এই দীন হৃদয় মাঝারে তব জয় ধ্বনি উঠে বারে বারে,

সবাকার প্রাণে সব ঘরে ঘরে, ভরিয়া সকল ভুবন

নিতাইদাস সান্যাল

রামকৃষ্ণ শরণং রামকৃষ্ণ শরণম্

শুক্ল-বিলাবল—কাওয়ালী*


রামকৃষ্ণ শরণং রামকৃষ্ণ শরণম্

রামকৃষ্ণ শরণং শরণ্যে।**

(প্রভু) কৃপাহি কেবলং কৃপাহি কেবলং

কৃপাহি কেবলং শরণ্যে॥

শরণাগতোঽহং শরণাগতোঽহং

শরণাগতোঽহং শরণ্যে

নমো শ্রীগুরবে নমো শ্রীগুরবে

নমো শ্রীগুরবে নমো নমঃ

রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ জয় জয় রামকৃষ্ণ।

রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ জয় জয় রামকৃষ্ণ

অরুণ চট্টোপাধ্যায়


* স্বরলিপি : আনন্দলহরী

** রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের দশম অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী মহারাজের প্রিয়গান। গানটিতে ব্যাকরণগত ভুল আছে। ‘শরণ্যে’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ বলে ঠাকুরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতে পারে না, তবু, পূজ্যপাদ সঙ্ঘাধ্যক্ষ মহারাজের স্বীকৃতি থাকায় এই ভাবেই বেলুড় মঠে গানটি গীত হয়।

তুমি নয়নাভিরাম, তুমি চন্দ্রাভিরাম

ভৈরবী—একতাল


তুমি নয়নাভিরাম, তুমি চন্দ্রাভিরাম

(তুমি) ক্ষুদিরামনন্দন, বিবেকানন্দ-ধন,

তুমি নবঘনশ্যাম।

(তুমি) মুনিগণ জীবন, পতিত পাবন,

তুমি সীতাপতি রাম।

(তুমি) বেদ তুমি বিদ্যা, তুমি ভগবান,

(তুমি) অকুলেতে কূল, তুমি সর্বকর্মমূল তুমি

(তুমি) যােগীজন দুর্লভসারদাবল্লভ

তুমি নয়নাভিরাম।

অহিভূষণ নন্দ

আজি কি আনন্দ অপার (হলাে), রামকৃষ্ণ এল এবার

কামােদ মিশ্র—একতাল


আজি কি আনন্দ অপার (হলাে), রামকৃষ্ণ এল এবার॥

কিবা রূপ বলিহারি, নয়ন ফিরাতে নারি।

(এল) নিত্যরূপ পরিহরি’ ঘুচাইতে ধরারি ভার

মায়ার তিমির বিনাশি’ মহা ঘাের, বিকাশি’ করুণার রাশি,

যুগে যুগে অবতর, বহু নামরূপ ধর তােষিতে ভকত পিপাসী।

নানা ভাবে মহালীলা, ভূতলে আনন্দ মেলা,

ধুলাে খেলা ছেড়ে এই বেলা, (তার) অভয়চরণ কররে সার

নীরদরঞ্জন মজুমদার

জীবন প্রভাতে মরমের সাথে বল জয় রামকৃষ্ণ রে

প্রভাতী-ভজনকাহারবা


জীবন প্রভাতে মরমের সাথে বল জয় রামকৃষ্ণ রে।

বল রামকৃষ্ণ, জপ রামকৃষ্ণ, ভজ মন রামকৃষ্ণ রে॥

জয় গুরু ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর সহস্রারে প্রভু উঁহু পরমেশ্বর।

‘জয় গুরুজীকি জয়’ বলরে মন নিরাশ্রয় শান্ত হবে গাে মন প্রাণ রে

লজ্জাপটাবৃতা দেবী কৃপাময়ী স্নেহময়ী জননীকি জয়।

জয় জ্ঞানদায়িকে দেবী সারদে বরাভয়দায়িকে জয়

মূর্ত মহেশ্বর উজ্জ্বল ভাস্কর বিবেকানন্দ কি জয়

জয় রামকৃষ্ণ ভক্তগণ জয় আনন্দে জয়গান গাহ মন রে

প্রমথনাথ গাঙ্গুলী

কে ঐ আসিলরে কামারপুকুরে পুলকে নাচিয়া উঠে প্রাণ

পিলু-বারােয়াকাহারবা*


কে ঐ আসিলরে কামারপুকুরে পুলকে নাচিয়া উঠে প্রাণ।

দুঃখ নিশা কাটিল সুখ রবি হাসিল গগনে উঠিল নব গান

মানিক রাজার আম্রকাননে, কে ঐ শিশু খেলে ফুল্ল আননে।

লীলা অভিনয় নবনব গানে, হিয়া শিহরিয়া উঠে তান

কত গানে গানে অমিয় কথায় পলকেতে পরান মাতায়।

মন প্রাণারাম লীলা অভিরাম আঁখি সদা নিরখিতে চায়

আমারেও নাও তােমার এ খেলায়, ভাইরে গদাই ধরি দু’টি পায়।

যুগে যুগে হরি তােমার এ লীলায়, লহ মম তনু মনপ্রাণ॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

আজি প্রেমানন্দে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম

ভৈরবী—একতাল*


আজি প্রেমানন্দে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম।

গাহ রামকৃষ্ণ নাম জপ রামকৃষ্ণ নাম,

নাম সুধা পানে রহ মত্ত অবিরাম॥

কামারপুকুর হ’ল পুণ্য ব্রজধাম,

সখাগণ লয়ে খেলে লীলা অভিরাম;

(যেন), মানস মুকুরে ভাসে সে ছবি সুঠাম।

নমাে নমাে চন্দ্রাদেবী নমাে ক্ষুদিরাম,

কৃপাময়ী মা জননী লহ গাে প্রণাম।

জয়রামবাটীর মাটি চন্দন সমান,

আমার মা জননীর জন্মভূমি মহাতীর্থস্থান,

মায়ের চরণে শরণ নিলে পুরে মনস্কাম।

প্রমথনাথ গাঙ্গুলী


* স্বরলিপি: আনন্দলহরী

শ্রীরাম তুঁহি, কৃষ্ণ তুঁহি, পরব্রহ্ম নারায়ণ, তুঁহি আদি শকতি

মালকোষঝাপতাল*


শ্রীরাম তুঁহি, কৃষ্ণ তুঁহি, পরব্রহ্ম নারায়ণ, তুঁহি আদি শকতি।

তুঁহি সৃজন-পালন-সংহরণ-কর, শান্তি-বিধারণ তুঁহি ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ।

জগন্নাথ প্রকট হাে, য়হ পুণ্যভূমিমে,

শিখাবত সব-ধরম-সমজ্ঞান-প্রতীতি।

ধন্য রামকৃষ্ণ তুম দয়াল ভগবান,

দেহুঁ প্রভু জ্ঞানধন অউর শুধ ভকতি॥

স্বামী অপূর্বানন্দ


* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

নয়নাভিরাম মাের নয়নাভিরাম

ভজনকাহারবা


নয়নাভিরাম মাের নয়নাভিরাম

এস রামকৃষ্ণ মাের নয়নাভিরাম।

এস যশােদা দুলাল তুমি রঘুপতি রাম॥

দক্ষিণেশ্বর তব লীলা কিবা মনােহর

কভু শ্যামা রূপ ধর কভু সাজ শঙ্কর

শ্রীরাধার ভাবে কভু কাঁদে তব অন্তর

ধূলায় লুটায়ে বল কোথা নব ঘনশ্যাম।

পঞ্চবটীর মূলে জাহ্নবী কিনারায়

যেচে প্রেম বিলাইতে ডাক ‘ওরে আয় আয়

ভকত কুসুম যত আনিলে আপন সাথ

নন্দন কাননের সুন্দর পারিজাত

সে কুসুমে ভরি সাজি আপনি পূজারী সাজি’

করিলে আপন পূজা ধরি মুখে নিজ নাম॥

প্রমথনাথ গাঙ্গুলী

(আজি) কামারপুকুরে চল মন

বেহাগ—তিনতাল


(আজি) কামারপুকুরে চল মন।

সুখের নেশায় ঘুরি’ জনম জনম ধরি,

কত রবে বিষাদ-মগন,

(বলাে), কত রবে বিষাদ মগন॥

কামারপুকুরে আসি নিত্য লীলায়

অরূপ ধরিয়া রূপ ভুবন ভুলায়,

(সে যে) কত না আদরে তােরে ডাকে আয় আয়,

ওরে আয় ওরে চলে আয়,

চলে আয় জুড়াবি জীবন,

(তুই) চলে আয় জুড়াবি জীবন॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

বাণীরূপে রহিয়াছ মূরতি ধরি

মিশ্র-খাম্বাজ—কাহারবা


বাণীরূপে রহিয়াছ মূরতি ধরি’

রামকৃষ্ণ তােমায় প্রণাম করি॥

অন্তর বিহারী ছিল তব সঙ্গে,

দেখাইলে তুমি তারে নানা রূপ ভঙ্গে

ধ্রুবতারা রহাে হৃদি-গগন ভরি’॥

মুক্তি-দেউলে ফোটালে যে ফুল

প্রেমের সুগন্ধে দুলিল দোদুল,

ভব-পারাবারে তুমি পারের তরী॥

মায়াপাশ বন্ধন শােক-তাপ ক্রন্দন,

তব বাণী দিল চির শান্তিবারি,

জগতের বেদনায় দিলে নব চেতনা,

পরমানন্দ তুমি দিশারী॥

অজ্ঞাত

প্রেমভরে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম

ভজন—কাহারবা

(সুর—প্রেম মুদিত মনসে কহ রাম রাম রাম)


প্রেমভরে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম,

শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম।

আনন্দ বৰ্ষক নাম মম প্রাণারাম

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

অন্তরে যতনে রাখ মনরে অবিরাম

দীন কাঙ্গালের ধন রামকৃষ্ণ নাম

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

একই বৃন্তে ফুটিলরে রাধা, কৃষ্ণ, শ্যাম,

শিব, কালী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শ্যামা সীতারাম।

নাম ব্ৰহ্ম একই জেনে মনরে গাহ নাম,

জনম মরণ সাথী রামকৃষ্ণ নাম,

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

প্রমথনাথ গাঙ্গুলী

হরি আমার প্রেম-মধুর, ভকত-হৃদয়-রঞ্জন

মিশ্র খাম্বাজএকতালা

(বন্দি তােমায় ভারত-জননী’সুর)


হরি আমার প্রেম-মধুর, ভকত-হৃদয়-রঞ্জন

তব লীলা-ছলে ত্রিভুবন-সৃজন-পালন-নাশন।

পাতকী তরিতে ভূভার হরিতে যুগে যুগে অবতরণ

নর-শরীর ধারণ

সিংহলে লীলা ভাসাইলে শিলা, অযাচিতে হরি প্রেম দিলে,

ভূচরে খেচরে দিলে বানরে অমর-বাঞ্ছিত চরণ,

নব-দূর্বাদল-শ্যামল-সুন্দর পবন-নন্দন-বন্দন,

যােগিজন-মনােমােহন

অধর-অমৃত করিয়া পূরিত বাজালে মােহন বাঁশরী

নিখিলের মন করিলে হরণ কমল-নয়নে নেহারি,

ও রূপ হেরিলে যােগী যােগ ভুলে, কুল-মান ত্যজে কুল-নারী

ব্রজ-বিপিন-বিহারী॥

(বসি) সুরধুনী-তীরে পতিতের তরে কে তুমি কাঁদিছ, কাতরে,

পাপভারে ভরা ধরণী হেরিয়ে ব্যথা পেলে বুঝি অন্তরে,

এসেছ আবার হরি কি আমার দেখা দিতে চিরকিঙ্করে—

রামকৃষ্ণ রূপ ধরে

স্বামী প্রেমেশানন্দ

সংঘমূরতি শ্রীরামকৃষ্ণ প্রণমি তােমারে বারংবার

ভৈরবী—একতাল*


সংঘমূরতি শ্রীরামকৃষ্ণ প্রণমি তােমারে বারংবার।

তুমিই সংঘ, তুমিই ধর্ম, প্রণমি প্রণমি পদে তােমার॥

সকল জাতির শান্তির তরে সর্ব ধর্ম বিগ্রহ ধরে,

সংঘরূপেতে যুগের ধর্ম নিখিল বিশ্বে কর প্রচার॥

বিতরিতে তব অমিয়বারতা বিবেকানন্দে দিয়েছ ভার,

সংঘগুরুর অন্তরে বসি’ করিতেছ তুমি জীব-উদ্ধার।

হে যুগদেবতা, মঙ্গলময়, চরণে তােমার দাও আশ্রয়

মোদের জীবনে হােক্ তব জয় শুভ মতি দাও তব সেবার॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপিঃ সুরবিতান

পাল তুলে দাও, হাল তুলে নাও, কৃপা-পবন বয়ে যায়

বাউল—কারফা


পাল তুলে দাও, হাল তুলে নাও, কৃপা-পবন বয়ে যায়,

রামকৃষ্ণ-প্রেমের তরঙ্গেতে ছুটবে তরী দরিয়ায়কৃপা-পবন বয়ে যায়॥

আয়রে তােরা আয়, (মিছে) বসে কেন কিনারায়,

সাগর পানে যাবার তরী ভাসতেছে ঐ দেখা যায়, কৃপা-পবন বয়ে যায়॥

অচিন আলাে হােথা জ্বলে অমর সুর-তরুর তলে,

পরম ধনে লয়ে কোলে প্রাণের ঠাকুর ডাকে আয়,

(রামকৃষ্ণ-ঠাকুর ডাকে আয়) কৃপা-পবন বয়ে যায়॥

শান্তি হােথায়, নেইকো জ্বালা, প’রে আমার দুখের মালা,

হাসে ঠাকুর নাচে ঠাকুর, কেবল সুধা দিতে চায়,

(রামকৃষ্ণ-ঠাকুর ডাকে আয়) কৃপা-পবন বয়ে যায়॥

শ্ৰীশঙ্করীপ্রসাদ বসু

(আমি) শরণাগত চরণে

বেহাগ—দাদরা


(আমি) শরণাগত চরণে

নাহং নাহং তুঁহু তুঁহু তুঁহু, সদা যেন রয় স্মরণে॥

(তুমি) অনন্ত করুণাপাথার, কৃপা বিতরিতে হয়েছ সাকার

শ্রীরামকৃষ্ণ যুগ অবতার কলি-কল্মষ হরণে॥

যদিও বহিছে কৃপা সমীরণ, পাল তুলে দিতে করিনে যতন

মায়ামোহে সদা বিজড়িত মন মজে না ও দুটি চরণে॥

ভরসা কেবল হে মহাশরণ, রামকৃষ্ণ নাম শঙ্কাহরণ

সম্পদ তব অভয়চরণ ভব গােষ্পদ তরণে॥

মাধুর্যময় মিত্র

ধিয়া তা ধিয়া ধিয়া নাচরে গদাই

কাফি—তিনতাল


ধিয়া তা ধিয়া ধিয়া নাচরে গদাই।

যে নাচে ভুলায়ে ছিলে যশােমতী মাঈ॥

চন্দ্রমণি মাকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া,

হেলিয়া দুলিয়া নাচ আঁচল ধরিয়া।

চন্দ্রবদনে তাের হাসিটি হেরিয়া,

নিমিষে সকল দুখ পাসরিয়া যাই॥

অপরূপ লীলা তােমার কামারপুকুরে,

স্বরগ নামিল কিরে ক্ষুদিরাম ঘরে।

ভাসে যত নরনারী নয়নের নীরে,

পুলকে শিহরে ধনী কামারিণী আই॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

(তুমি) অনাদি অনন্ত পুরুষ প্রশান্ত রামকৃষ্ণ প্রাণকান্ত হে

বসন্ত-বাহার—তেওরা


(তুমি) অনাদি অনন্ত পুরুষ প্রশান্ত রামকৃষ্ণ প্রাণকান্ত হে।

(সদা) ব্যাকুল প্রাণে তব-মহিমা-গানে বেদ-বেদান্ত শ্রান্ত হে।

(কিবা) তপত কাঞ্চন-আভা সুশােভন ঢল ঢল খেলে অঙ্গে হে।

(ঐ) ভব চরণ প্রভু অজয়-শাসন যাহে ভবে প্রাণান্ত কৃতান্ত হে

কিবা সুন্দর মৃদুহাসি বিলাসে, হেরে মােহধ্বান্ত হে।

বিগত-শােক-সন্তাপ পাপ, রহে মন শান্ত হে।

(তুমি) যােগেশ-জীবন ভকত-শরণ, ত্রিলােক-পাবন একান্ত হে।

(তব) কৃপা কেমনে পাইব নাথ, আমি নিতান্ত ভ্রান্ত হে॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

তুমি বন্ধু তুমি নাথ বিপদহারী পরমপুরুষ

ইমন—চৌতাল


তুমি বন্ধু তুমি নাথ বিপদহারী পরমপুরুষ

প্রপন্নে অভয় দান কর হে, প্রেমনিলয় তাপবিনাশ

অরূপ বিভায় জ্যোতিরপুঞ্জে নিত্য আসীন ভাবের কুঞ্জে,

অনাদি সৃষ্টি তােমার ইচ্ছা, শ্রীরামকৃষ্ণ মদনত্রাস

ত্রিগুণেশ্বর কালাতীত তুমি প্রকৃতি-পূরণ ত্রিভুবন-স্বামী

কোটি কল্প কোটি সূর্য, কোটি চন্দ্র-ধরা দেবদেবী-দাস

গাইছে সাম-গানেতে মহিমা তুমি গাে তােমার নিত্য উপমা।

শরণাগত দীনাকিঞ্চন স্থান পাবে পদে করিছে আশ

স্বামী সর্বগানন্দ


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

বল বল সুরধুনী

দেশ—দাদরা


বল বল সুরধুনী,

তােমার বেলায় কী লীলা ঘটিল অবাক হইয়া শুনি॥

কোথা কোন দেশ কামারপুকুর,

জয়রামবাটী সে বা কতদূর

কে বা ক্ষুদিরাম, কে বা গদাধর, কে বা দেবী চন্দ্রামণি,

কোন্ দেবতার ভিক্ষাজননী কামারকন্যা ধনী॥

বিশালাক্ষীর পথ কোন্ দিকে কোথায় ভূতির খাল,

কৃষ্ণ মেঘের কোলে কোথা চলে শ্বেতবলাকার পাল?

কে সে উন্মাদ সাধক মহান সঞ্চার করে পাষাণে পরাণ

তন্ত্রে দীক্ষা কারে করে দান ভৈরবী ব্রাহ্মণী

শিশু রামলালা খেলে কার সনে কে বা সে পরমগুণী॥

কহ জাহ্নবী তােতার কাহিনী কহ কেশবের কথা,

মথুর কেমনে অর্ঘ্য রচিলা রাসমণি সেবারতা।

সেদিন কাহারা গেয়েছিল গান

কারা এসেছিল সঁপিয়া পরাণ

জ্বেলেছিল কারা পাগলের পারা মহাসাধনার ধুনি,

কারে ঘেরি’ এই লীলা অভিনয়

কেবা সে মধ্যমণি॥

জিতেন্দ্রনাথ সরকার

জয় ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রভু, জয় পার্তিহারী

প্রচলিত-কাহারবা*

(গঙ্গা-আরতি সুর)


জয় ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রভু, জয় পার্তিহারী। (জয়)

আদি শক্তি তুমি এলে যে,

আদি শক্তি তুমি এসেছ, মানব হিতকারী।

(জয়) জয় পাপার্তিহারী। (জয়) জয় রামকৃষ্ণ হরি

শুদ্ধ মনে তব মহিমা গােচর হয় ক্ষণিকে। (প্রভু গােচর)

বরিষ কৃপা মাগাে সারদা,

বরিষ কৃপা ওমা সারদা, পরম জ্ঞানদায়িকে।

(ওমা) হর মনােহারি কালিকে

দীন জনে দয়া করাে দুখ-হরণ কুশল স্বামী। (দুখ-হরণ)

লজ্জা নিবৃত করাে মম ()

অনাথ নাথ তুমি।

(প্রভু) মম অন্তরযামী

হৃদি-কন্দরে হােক বিকশিত তব শ্রীঅভয়চরণ

(প্রভু তব শ্রী...)

মম মানস চঞ্চল হে (২)

দূর করাে কাম-কাঞ্চন।

হে প্রভু আদি শরণ

বিবেকানন্দ নরঋষি করি তুমি আকর্ষণ। (প্রভু করি)

নিয়ে এলে জগতের কল্যাণে,

নিয়ে এলে আমাদের কল্যাণে

প্রেম ও জ্ঞানের মিশ্রণ।

পেয়েছি যে মােরা মহাধন॥ (প্রভু)

জানকী হৃদয়নাথ ত্রেতাযুগে শ্রীরাম

দ্বাপরেতে রাধিকা মােহন। (তুমি দ্বাপরেতে)

ইদানীং তুমি রামকৃষ্ণ,

কলিযুগে সেই রামকৃষ্ণ, সারদার তনুপ্রাণমন। (প্রভু)

ভকতের বাঞ্ছিত ধন

সুন্দর নামামৃত তব, ধ্বনিছে তুরীভেরি আজ। (কত ধ্বনিছে)

কেমনে বসিয়া রব বলাে (২)

সমরাঙ্গনে পরি’ সাজ,

তব জয়-গান শুনি’ আজ।

ওঁ জয় শ্রীগুরুমহারাজ (ওঁ...)

স্বামী সর্বগানন্দ


* স্বরলিপিঃ আনন্দলহরী

প্রসীদ প্রসীদ শিব শঙ্কর হে

কেদার—আদ্ধা


প্রসীদ প্রসীদ শিব শঙ্কর হে,

করি প্রণিপাত, ত্রাহি অনাথনাথ

আমরাও অনাথ কিঙ্কর হে॥

আমরা যে সতৃষ্ণ ত্রাহি রামকৃষ্ণ, তুমি প্রেম সুধা সাগর হে।

কণিকা বিতরি পিপাসা লও হরি, আমরা যে তােমারি যা কর হে॥

চরণে পরশি, করুণা বরষি হৃদয়-সরসী পূর্ণ কর-হে।

হয়ে মােরা পূর্ণকাম, গাহিক তােমার নাম, কঁপাইবে সেই তান অম্বর হে।

এসে মহারাজ, হৃদাসনে রাজ, পরি যােগী সাজ সুন্দর হে।

তবাদেশ মত, চলিব নিয়ত হইয়ে প্ৰণত অন্তর হে॥

বৃন্দাবনচন্দ্র গােপ

শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী সঙ্গীত

স্তব--প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং

স্তব

গৌড়-সারঙ্গ মিশ্র--তিনতাল*


প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং

নররূপধরাং জনতাপহরাম্।

শরণাগত-সেবক তােষকরীং

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ |

গুণহীন-সুতানপরাধ-যুতা

কৃপয়াহদ্য সমুদ্ধর মােহগতান।

তরণীং ভবসাগর-পারকরীম

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ॥

বিষয়ং কুসুমং পরিহৃত্য সদা,

চরণাম্বুরুহামৃত-শান্তি-সুধাম

পিব-ভৃঙ্গমনাে ভবরােগহরাং

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ॥


কৃপাং কুরু মহাদেবি সুতেষু প্ৰণতেষু চ,

চরণাশ্রয়দানেন কৃপাময়ি নমােহস্তু তে । ৪||

লজ্জাপটাবৃতে নিত্যং সারদে জ্ঞানদায়িকে,

পাপেভ্যো নঃ সদা রক্ষ কৃপাময়ি নমােহস্তু তে || ৫||


রামকৃষ্ণ-গতপ্রাণাং তন্নাম-শ্রবণপ্রিয়া

তদ্ভাবরঞ্জিতাকারাং প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ | ৬ |

পবিত্রং চরিতং যস্যাঃ পবিত্রং জীবনং তথা,

পবিত্রতাস্বরূপিণ্যৈ তস্যৈ দেব্যৈ নমাে নমঃ || ৭ |

দেবীং প্রসন্নাং প্রণতার্তিহন্ত্রী

যােগীন্দ্রপূজ্যাং যুগধর্মপাত্রী।

তাং সারদাং ভক্তি-বিজ্ঞান-দাত্রীম

দয়া স্বরূপাং প্রণমামি নিত্যম।

স্নেহেন বাসি মনােহম্মদীয়ম

দোষানশেষান সগুণী করােষি।

অহেতুনা নাে দয়সে সদোষান্

স্বাঙ্কে গৃহীত্বা যদিদং বিচিত্রম্ ৷

১০

প্রসীদ মাতর্বিনয়েন যাচে

নিত্যং ভব স্নেহবতী সুতেষু।

প্রেমৈকবিন্দুং চিরদগ্ধচিত্তে,

বিষিঞ্চ চিত্তং কুরু নঃ সুশান্তম্ ৷৷

১১

জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম্।

পাদপদ্মে তয়াে শিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ ॥


—স্বামী অভেদানন্দ

 


* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত; বেলুড় মঠে যে সুরে গাওয়া হয়, তা “শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ক্যাসেটে আছে।

দে গাে মা দেখা দে সারদে শুভদে

দেশ—কাওয়ালী


দে গাে মা দেখা দে সারদে শুভদে।

জ্ঞান ভকতি দে, জ্ঞান দে মা জ্ঞানদে।

তাপিত তারণ তরে এলে যদি করুণায়,

আমারে কেন মা তবে রাখিবে না রাঙ্গা পায়।

দিন যায় আয়ু যায় দেখিতে দেখিতে হায়,

আর কবে দিবি দেখা বলগাে মা বরদে ৷


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ধরণীর ভার হরিতে আবার এলে মা আদ্যাশকতি

ভৈরবী-তেওরা*


ধরণীর ভার হরিতে আবার এলে মা আদ্যাশকতি।

নিখিল মাতৃ-হৃদয়-সাগর-মন্থন-সুধা-মূরতি ॥

নিবিড় কাননে বন-ফলাশনে ভূশয়নে নিশি যাপনা,

নিশাচর দেশে বসি কারাবাসে সহিলে মরণ-বেদনা।

অমল চরিতা নির্বাসিতা তুমি মা জনক-দুহিতা,

সন্তান তরে মায়া-তনু ধরে আসিলে বিশ্ব-প্রসূতি ।

গােপনন্দিনী-শ্রীরাধারূপিণী কুলমানতেয়াগিনী,

সঁপি-প্রাণমন জীবন-যৌবন কৃষ্ণ প্রেমে পাগলিনী।

বিরহ-অনলে আপনা দহিলে ভূতলে জীব-মঙ্গলে,

মানব-হৃদয় করি মধুময় বিতরি শুদ্ধা-ভকতি ।

ব্রাহ্মণ-সুতা জপে তপে রতা রামকৃষ্ণ-পূজিতা,

পাপীতাপী জনে কৃপা বিতরণে সারদে সদা সম্মতা।

লাজ-কুণ্ঠিতা অবগুণ্ঠিতা করুণা রস-মণ্ডিত

(তব) সন্তান কোটি হের ভূমে লুটি জানায় চরণে প্রণতি ।


—স্বামী প্ৰেমেশানন্দ



* স্বরলিপি : আনন্দলহরী

কে তুমি মা যােড়শী বালা ভাবে বিভােলা

বেহাগ-খাম্বাজ—যৎ


কে তুমি মা যােড়শী বালা ভাবে বিভােলা।

(তােমার) পদতলে পরমেশ সঁপিছেন জপমালা ॥

অনুপম তনুখানি রূপে শশধর জিনি

বারেক হেরিলে যায় জীবনের যত জ্বালা ॥

তুমি কি কৈলাস ছাড়ি এলে গাে মা দেহ ধরি।

তাই কি পূজিল শ্রীপদ রামকৃষ্ণ রূপে ভােলা ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জগবন্দিনী বিশ্বজননী জগদীশ লীলা সঙ্গিনী

ভৈরব—একতালা


জগবন্দিনী, বিশ্বজননী, জগদীশ-লীলা-সঙ্গিনী।

গুণাতীতা তুমি, ত্রিগুণ-ধারিণী, দেবী, ত্রিতাপ-হারিণী ।

কটাক্ষেতে কর সৃজন-পালন, পলকে প্রলয় কর সংঘটন।

কে বুঝিবে তব লীলা অগণন, নব-নব-লীলা-রঙ্গিণী ॥

ভকতের তরে মা তুমি সাকার, তুমি পুনঃ পরব্রহ্ম নিরাকার,

কভু নারী কভু পুরুষ আকার, ও মা অনন্তরূপিণী।

হেরিয়া এ ধরা পাপে নিমগন, প্রেমে নর-তনু করিলে ধারণ,

শত দুঃখ-তাপ সহি অকারণ সুতে দিলে পদতরণী ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় মা সারদা শুভদা বরদা জয় শ্যামা রাম নন্দিনী

ভৈরব-একতালা


জয় মা সারদা শুভদা বরদা জয় শ্যামা রাম নন্দিনী

সরম জড়িতা স্নেহেতে গঠিতা জয় জয় জগপাবনী

রাতুল চরণ ফেলি ধীরে ধীরে, আসিলে যেদিন এই ধরা পরে,

ভয়ে বিস্ময়ে পরমানন্দে কঁপিয়া উঠিল মেদিনী ।

জয়রামবাটী কামারপুকুর, পদে রেনু পেয়ে সুখে ভরপুর,

চরণ কমল যুগল ধরিল বক্ষে দিবস যামিনী ।

পতি পদযুগে পরাণ সঁপিয়া, সেবা তপস্যায় রহিলে ডুবিয়া

রামকৃষ্ণ চরণ ধিয়ানে সাজিলে তাপসী যােগিনী ।

তােমার বুকের স্নেহ সুধা ধারা পিয়ে ধন্য হল মাগাে ধরা,

সকল জীবের পাপ-তাপ হরা পতিত তাপিত তারিণী ॥

নিরক্ষরা মাতা জ্ঞানের প্রতিমা, ত্রিভুবনে তব নাহিক উপমা,

মা মা বলে ডাকিছে সকলে, কোটি সন্তান, জননী।

আজি এ প্রভাতে হে দেব বন্দিতা

নিজ কৃপাগুণে হও আবির্ভূত

শকতি ভকতি দেহ মা সারদা

ওমা ক্ষমারূপা তপস্বিনী ।


—অজ্ঞাত

শ্রীরামকৃষ্ণ আরাধিতা দেবী যুগ অবতার সঙ্গিনী

শিবরঞ্জনী—একতালা


শ্রীরামকৃষ্ণ আরাধিতা দেবী     যুগ অবতার সঙ্গিনী।

যুগদেব তব জীবন দেবতা     সারদেশ্বরী রূপিণী ।

কভু হও উমা, কখনাে বা শ্যামা, কভু সীতা, কভু শ্যামমনােরমা।

কখনাে বা গােপা, কভু মেরী রূপা, বিষ্ণুপ্রিয়া তপস্বিনী ।

শ্রীরামকৃষ্ণ পূজিলা তােমারে সর্বমঙ্গলা জানি,

মা তুমি আবার শ্রীপদ তাঁহার     হৃদে পূজ দিবাযামী।

শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবিতা মা তুমি,         জীব কল্যাণকারিণী,

এক হয়ে দুই রূপে দেখা দিলে নানা লীলারূপধারিণী ৷৷


—অজ্ঞাত

এল তাের দুষ্ট ছেলে তুষ্ট করে নে মা কোলে

ইমন-খাম্বাজ-দাদরা


এল তাের দুষ্ট ছেলে, তুষ্ট করে নে মা কোলে

যাব আর কার কাছে মা, বাবা নিদয় গেছেন ফেলে ।

শুনিনি তােমার কথা, বেড়াই খেলে হেথা সেথা,

তাই কি গাে মা কওনা কথা পেয়ে ব্যথা হৃমলে।

তুমি যদি এমন হবে, ছেলের কি উপায় তবে,

নামে কলঙ্ক রবে, মরব কেঁদে মা মা বলে ।

সুপুত্রে কুপুত্রে মাতা, প্রসবে পায় সমান ব্যথা,

একি মা দারুণ কথা—নাই ব্যথা কুপুত্র বলে ।

যা হবার হবে রে ভাই, মা বলে ডাকি সবাই,

দেখি মা কেমন করে থাকতে পারে ছেলে ভুলে


—দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

ধরা দিতে এসে লুকাও পুনঃ হেসে একি লীলা মা তােমার

ছায়ানট-একতাল


ধরা দিতে এসে লুকাও পুনঃ হেসে একি লীলা মা তােমার।

হলেও কঠিনা ঢাল মা করুণা সুরধুনী-সুধা-ধার ॥

আঁধারে আলােকে নিদ্রা-জাগরণে,

সম্পদে বিপদে জীবনে মরণে,

আছ কাছে কাছে সদা সঙ্গোপনে রাখিতেছ বারম্বার ।

জ্যোতির্ময়ী তুমি অন্তরে বাহিরে,

ডাকিছ সস্নেহে দাঁড়ায়ে অদূরে,

কত কাল হতে প্রসারি’ দুকরে কোলে নিতে মা আমার ।

মােহে অন্ধ মােরা বধির শ্রবণ,

শক্তি সঞ্চারিতে কর পরশন,

পাদপদ্মে মন কর নিমগন সারদে মা! দে গাে সার ।


—স্বামী তপানন্দ



১ পাঠান্তর ঃ অন্ধ মােরা হের বধির শ্রবণ; এই কথা শুনে এক দৃষ্টিহীন গায়ক অন্তরে দুঃখ

পেয়েছিলেন বলে ‘মােহে অন্ধ মােরা বধির শ্রবণ’ রচয়িতার অনুমতিক্রমে গাওয়া হয়ে থাকে।

মঙ্গলমূরতি মঙ্গলা আসিল ভুবন ভরিল সুখে

কালেংড়া—তিনতাল


মঙ্গলমূরতি মঙ্গলা আসিল ভুবন ভরিল সুখে।

দুখনিশা কাটিল সুখবি হাসিল উৎসব ধরণীবুকে।

অমঙ্গল যত হলাে আজি অবসান, মঙ্গলমন্ত্রে জাগিল অবশ প্রাণ,

মঙ্গলশঙ্খ মঙ্গল করে গান, অন্তর নাচে পুলকে।

মঙ্গল বরফিল মঙ্গলা মা আমার, হৃদি শতদলে আসন কররে তার,

পাদ্য-অর্ঘ্য দাও পদে উপহার, বন্দনা কররে মাকে ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আমার মাকে দেখে যারে

বাউল-দাদরা


আমার মাকে দেখে যারে।

দীনতারিণী ধরায় এল আনন্দ ধরে না রে

বিশ্বরানী ধরায় এসে দুখিনী ব্রাহ্মণী বেশে।

নিচ্চে কোলে হেসে হেসে কত কাঙ্গালেরে ॥

করে না সে গুণের বিচার অহেতুক দয়া রে তার,

স্নেহের কথা কী বলব আর বইছে শতধারে ৷

মায়ের পায় নিলে শরণ ঘুচে যায় জন্ম-মরণ,

হৃদ-মাঝারে পায় দরশন ডাকে যে জন তারে।

শােন বলি মা মনের কথা ঘুরব না আর হেথা সেথা,

তাের পায়েতে রেখে মাথা দিবানিশি থাকি পড়ে।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমগগনে সারদা চন্দ্রিমা হাসিল রে

দরবারী-কানাড়া-একতাল (সঞ্চারী তেওরা)


শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমগগনে সারদা চন্দ্রিমা হাসিল রে।

রূপের আভায় স্নেহ-জোছনায় পুলকে ভুবন ভাসিল রে ।

নেহারি গগনে সারদা ইন্দু, উথলে সাধক-হৃদয়-সিন্ধু,

করুণা পরশে বহে মৃদু মধু, সুখের লহরী উঠিল রে ॥

বিমল আকাশে সারদা-শশী-পাশে ভকত-তারাদল সতত সুখে ভাসে,

‘ঋষি ধাম’ ছাড়ি নরঋষি’ এসে, উজল বিভায় ভাতিল রে।

‘রামকৃষ্ণ-লােকে’ আনন্দের মেলা, চল মন চল যাই এই বেলা,

এ হেন-সুদিনে করিও না হেলা, আনন্দময়ী আসিল রে ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শিশুর মত ‘মা’ ‘মা’ বলে কাদিয়ে ঘুরে বেড়ায়

বাউল—একতালা


শিশুর মত ‘মা’ ‘মা’ বলে কাদিয়ে ঘুরে বেড়ায়

ঠাকুরের কি ভাব হইল হায়!

উলঙ্গ পাগল-পারা,    দু'নয়নে বহে ধারা,

দিবানিশি মা-নাম ছাড়া অন্য নাহি রসনায়।

পশু পাখী তরু লতা,         সবকে শুধায় মায়ের কথা,

“বল রে আমার মা পাই কোথা, কে দেখেছ আমার মায় ॥”

মায়ের মন্দিরে গিয়ে       পড়ে থাকে হত্যা দিয়ে,

বলে “মাগাে না খাইয়ে প্রাণ ত্যজিব রাঙ্গা পায়।

‘দেখা দে মা ও মা আমার’     এই বলিয়া ছাড়ে হুঙ্কার।

কত মত ভাবের বিকার     সর্ব অঙ্গে বিকাশ পায়।

গৌর কি রে নদে ছেড়ে     আইল দক্ষিণেশ্বরে,

রামকৃষ্ণ রূপ ধরে জীবে কি রে প্রেম শিখায় ?


—বৃন্দাবনচন্দ্র গােপ

জয় জয় জননী জয় শ্রীসারদামণি করুণারূপিণী জয় মা

গৌড় সারঙ্গ—কাহারবা*


জয় জয় জননী জয় শ্রীসারদামণি করুণারূপিণী জয় মা।

আদ্যা শকতি মা প্রকৃতি অশরণ-গতি তুমি মা ।

জয় জগতারিণী ভবভয়হারিণী দুর্গতি নিবারিণী মা।

সিদ্ধি-প্রদায়িনী মুক্তি-বিধায়িনী, জীব-গতিদায়িনী মা |

নিখিল জগতমাতা জীবকল্যাণরতা, লজ্জাপটাবৃতা মা।

দুজ্জন সজ্জন সন্তান অগণন পালনকারিণী মা ।

জয় সারদেশ্বরী সীতা রাধা মাতা মেরী যশােধরা বিষ্ণুপ্রিয়া মা।

যুগদেব বন্দিতা সুরনর-সেবিতা নমাে নারায়ণী মা ।

নমাে নারায়ণী মা, নমাে নারায়ণী মা, নমাে নারায়ণী মা ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

* স্বরলিপি ঃ সুরবিতান

করুণা পাথার জননী আমার এলে মা করুণা করিতে

ভৈরবী—একতাল*


করুণা-পাথার জননী আমার এলে মা করুণা করিতে।

তাপিতের তরে নারীদেহ ধরে অশেষ যাতনা সহিতে ॥

ত্রিদিব ত্যজিয়া এ ধরায় আসা, সন্তান তরে কত কাদা হাসা।

অহেতুক তব এই ভালবাসা, পারি কি গাে মােরা বুঝিতে ৷

শত জনমের যত পাপ হায়, নিতেছ টানিয়া  ঐ রাঙ্গা পায়,

সকলি তাে তুমি সহিলে হেলায়, কোল দিতে কত তাপিতে।

ভকতি-বিহীন হৃদয় আমার, কেমনে পূজিব শ্রীপদ তােমার,

নয়ন ভরিয়া দাও প্রেমধার—পদপঙ্কজ ধােওয়াতে ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ


*স্বরলিপি ঃ আনন্দলহর

১ পূর্বসংস্করণে ‘দিয়াছি ঢালিয়া পাঠান্তর ছিল। এই কথায় অহংকারের ভাব থাকায় পরে গীতিকার স্বয়ং ঐদুটি শব্দ পরিবর্তন করেন।

মা এসেছে মােদের কি আর ভাবনা ভাই

বাউল-(আড়খেমটা) দাদরা**


মা এসেছে মােদের কি আর ভাবনা ভাই।

ভবের (দুঃখের) বােঝা দূরে ফেলে আয় সকলে নাচি গাই ।

(মা যে) জগত্তারিণী, ভব-ভয়-হারিণী, ধর্ম অর্থ কাম মােক্ষ সর্বদায়িনী;

(আবার) না চাহিতে সকল দিয়ে সন্তানের মন ভুলায় ।

পড়ে কে আছিস কোথায়, সবে আয়রে ছুটে আয়;

এমন সুদিন পেয়ে রে ভাই হারাস নে হেলায়।

(শুধু ‘জয় মা’ বলে দাঁড়ারে তুই, দেখবি দুখের, নামটি নাই।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



** স্বরলিপি ঃ আনন্দলহরী

আসিলে জননী আসিলে আবার হরিতে ধরার পাপের ভার

কেদারা—একতাল


আসিলে জননী আসিলে আবার, হরিতে ধরার পাপের ভার।

জুড়াতে দগ্ধ হৃদয়ের জ্বালা, মুছাতে সবার নয়ন ধার ।

যুগে যুগে মাগাে আসিয়া ধরায়, কত না যাতনা সহিতেছ হায়।

পরাণ মােদের পাষাণের প্রায়, পাসরি ধরম তবু বারে বার ।

সহন-মূরতিরূপে রামসনে, অচলা ভকতি শিখালে ভুবনে।

রাধারূপে পুনঃ দিলে দরশন, প্রেমের মহিমা করিতে প্রচার ।

রামকৃষ্ণ লীলা করিতে পূরণ, মা হ’য়ে সবার তব আগমন।

পাপী তাপী কত লভিল শরণ, কোল দিলে সবে না করি’ বিচার ।

দিশেহারা হয়ে ভ্ৰমিতাম ভয়ে, দিলে মা অভয় আপনি আসিয়ে।

মায়া মরীচিকা দাও মা ঘুচায়ে, প্রকাশ অবশ হৃদয়ে সবার ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মায়ের শ্রীপদ ভুলাে না ভুলাে না

পূরবী মিশ্র—একতাল


মায়ের শ্রীপদ ভুলাে না ভুলাে না!

ওরে মূঢ় মন পেয়ে এ রতন হেলায় খেলায় ছেড়াে না ছেড়াে না ।

জান না কি মন মায়ের করুণা, পঙ্গু লঘে গিরি পেয়ে কৃপা-কণা;

তাহারি ইচ্ছায় মূক বেদ গায়, ব্রহ্মজ্ঞান পায় আশ্রিত যে জনা ।

মায়ের চরণ যে করেরে ধ্যান, ভব পারাবার গােস্পদ সমান;

হয় মােহ নাশ, কাটে কর্মপাশ, কাল-ভয় আর থাকে না থাকে না।

হেলায় খেলায় হারালি সুদিন, এখনও সে পদ ভাব অনুদিন;

আর কত দিন রবি দীনহীন মার নাম কেন জপ না জপ না ॥


—বিনােদেশ্বর দাশগুপ্ত

বিশ্ব জননী সেজে ভিখারিণী জগতে তারিতে এলে আবার

ভৈরবী—একতাল*


বিশ্ব জননী সেজে ভিখারিণী জগতে তারিতে এলে আবার।

আদ্যা শকতি, দৈন্য-মূরতি, হেরিয়ে চিনিবে হেন সাধ্য কার ।

করুণায় গড়া চিন্ময়ী তনু পদনখে পড়ে শত শশী ভানু।

আঁখি পঙ্কজে সতত বিরাজে মুনি-মন-লােভা স্নেহের পাথার ৷

ভকতের তরে দেহে মন রাখা, দিবানিশি তাই শত কাজে থাকা।

নাহিক বিরাম ভাব অবিরাম কেমনে করিবে তাপিতে উদ্ধার ||

এত যদি মাগাে করুণা এবার, এ দীন সন্তানে কাদায়াে না আর।

খুলে দাও দ্বার ভব-কারাগার, মিশে যাক প্রাণ শ্রীপদে তােমার।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি ঃ সুরবিতান

সবারি মা হয়ে আজি কে তুমি ধরাতে এলে

দরবারী-কানাড়া-ঝাপতাল**


সবারি মা হয়ে আজি, কে তুমি ধরাতে এলে।

সবারি দুঃখেতে সদা, ভাসিছ নয়ন জলে ।

দেশ জাতি ভেদ নাই, শ্রীপদে সবারি ঠাই,

পাপী তাপী সবে তুমি, ‘বাছা’ বলে কর কোলে।

সব দেশ সব জাতি, ‘মা’ নামে উঠিছে মাতি,

তােমারে করি’ প্রণতি, সব দুখ যায় ভুলে।

‘মা’ নাম শিখাতে সবে, মা হয়ে এসেছ ভবে,

মােরেও শিখাও তবে, আমি যে তােমারি ছেলে।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



** স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

পােহাল দুখ রজনী

বেহাগ—একতাল*


পােহাল দুখ রজনী।

গেছে “আমি আমি” ঘাের কুস্বপন, নাহি আর ভ্রম জীবন মরণ,

হের জ্ঞান-অরুণ বদন বিকাশে, হাসে জননী ।

বরাভয়-করা দিতেছে অভয়, তােল উচ্চতান গাও জয় জয়,

বাজাও দুন্দুভি, শমন-বিজয়, মার নামে পূর্ণ অবনী ॥

কহিছে জননী “কেঁদো না, রামকৃষ্ণ পদ দেখ না;

নাহিক ভাবনা রবে না যাতনা”।

হের মম পাশে, করুণায় দুটি আঁখি ভাসে, ভুবন-তারণ গুণমণি ।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ



*পূজ্যপাদ স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ দেহত্যাগের পূর্বে কলকাতায় অবস্থানকালে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর দর্শন প্রার্থনা করেন। মাতাঠাকুরানী সে সময় জয়রামবাটীতে ছিলেন। কিন্তু স্বশরীরে না গিয়েও তিনি তাহাকে দর্শন দিয়েছিলেন। দর্শনের পর স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ মহাভক্ত গিরিশচন্দ্র ঘােষকে ডেকে গানের প্রথম ছত্র ও গানের ভাবটি স্বয়ং বলে দিয়ে গানটি রচনা করতে বলেন। তার আদেশানুসারে গীত রচিত হলে শ্রীযুক্ত পুলিনবিহারী মিত্র কর্তৃক তাকে সুর সংযােগে শুনান হয়। এই গান শুনতে শুনতে বা শ্রবণের পরেই তিনি দেহরক্ষা করেন।

পতিত পাবনী সারদা দেবী

মালকোষ-তেওরা


পতিত পাবনী সারদা দেবী!        শােক নাশিনী, তাপহারিণী;

শান্তিদায়িনী, ভবানী ।

নাহি যে তােমার ভেদাভেদ জ্ঞান,     সন্তান তােমার হিন্দু মুসলমান,

পূজিছে তােমায় মার্কিনবাসী,        নহ কি তুমি তাদের জননী।

নিজেরে তুমি করিয়া গােপন,     সাধিলে মাগাে কঠোর সাধন।

ত্রিগুণধারিণী, বিশ্বজননী        মুক্তিদায়িনী শঙ্করী।


—স্বামী দিব্যাত্মানন্দ

(অয়ি) ঊরমা অমল ধবল বরণী হৃদয় কমল কাননে

ইমন-কল্যাণ—কাওয়ালী


(অয়ি) ঊরমা অমল ধবল বরণী হৃদয় কমল কাননে।

(মম) মানসতামস নাশ মা ভারতী চরণ নখর কিরণে ॥

মৃন্ময়মূরতি হেরিয়া নয়নে কুসুম চন্দন অর্পিয়া চরণে;

চিন্ময় চরণ পরশ লালসা জাগিছে সতত পরাণে ॥

বিদ্যাবিতরি’ অমৃত কর মরণ শঙ্কা হর মাগাে হর;

সংশয় যত, আজ (হােক) তিরােহিত হৃদয় গ্রন্থিচ্ছেদনে ॥


—স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

বিদ্যা বিতরিতে এলােরে সারদা জ্ঞানদায়িনী

ভৈরবী—কাহারবা*

(“ভারত কাব্য নিকুঞ্জে জাগে সুমঙ্গলময়ী” সুর)


বিদ্যা বিতরিতে এলােরে সারদা জ্ঞানদায়িনী।

রূপ আবরি’ নারীদেহ ধরি’ এলােরে করুণারূপিণী ।

ধরে না বীণা শ্ৰীকরে এবার, বীণাবিনিন্দিত বাণী তাহার।

বেদ-বেদান্ত শীবদনে তার,

বিশ্বজনের জীবনবীণা বাজাল এবার বিরামহীনা।

ঝংকারে নিখিলে জয় জয় মা’ মানস শতদল বাসিনী।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি ঃ আনন্দ লহরী

অকাতরে দিতে কাতরে অভয় করুণারূপিণী এলে মা ধরায়

গৌরী—একতাল *


অকাতরে দিতে কাতরে অভয়, করুণারূপিণী এলে মা ধরায়।

অহেতু কৃপায় জীবদুখনাশে, অশেষ যাতনা সহিলে হেলায় ।

প্রাণ, মন, কায়, রামকৃষ্ণ পায়, তনয়ের প্রতি পূর্ণ করুণায়।

অযাচিতে কৃপা, বিতরিলে সদা, পাপী, তাপী, সাধু, অসাধু সবায় ৷

অদ্বৈত বিজ্ঞান বেঁধেছ অঞ্চলে, ইষ্টের দরশন ইচ্ছামাত্র মিলে,

তবু লক্ষ মন্ত্র দিনান্তে জপিলে, নহবতে বসি’ সন্তান মঙ্গলে।

অকাম প্রার্থনা ‘ভক্তি-নির্বাসনা’ শিখালে মা তুমি অবােধে কৃপায়,

তাই শুধু চাই নাশ গাে বাসনা, অচলা ভকতি দাও রাঙ্গা পায় ।


—স্বামী গৌরীশ্বরানন্দ



* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

মা আমাদের মানুষ কর এ মিনতি তােমার পায়

ভৈরবী-দাদরা


মা আমাদের মানুষ কর, এ মিনতি তােমার পায়।

তােমার ছেলে হয়ে যেন দিন কাটে না ধুলাে খেলায় ।

মিথ্যা যতই মােহন বেশে, মন ভুলাতে আসুক হেসে।

আমরা যেন অচল থাকি তােমারি চরণ সেবায় ৷

তুমি মােদের প্রাণের প্রাণ তুমি মােদের ধ্যান জ্ঞান।

তােমার তরে গেয়ে গান যেন মােদের জীবন যায় ৷


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ভজ ভজ মায়ী সারদা দেবী জনমন তাপ হারিণী

ভৈরবী—একতাল


ভজ ভজ মায়ী সারদা দেবী, জনমন-তাপ-হারিণী।

যুগে যুগে যিনি করুণা বিতরি অধম-তনয় তারিণী ॥

জয়রামবাটী আসিয়ে এবার কত মতে কর পতিতে উদ্ধার।

প্রভু-রামকৃষ্ণ-লীলার আধার, লীলা-বিগ্রহ-রূপিণী ।

আসিলে গৌরী পঞ্চম বরষে, অপরূপ-রূপ-ধারিণী।

সে তাে নহে ত্যাগ, সে যে অঙ্গীকার,

তােমারি মহিমা করিতে প্রচার,

তব ভক্তি ল’য়ে জগত উদ্ধার, চিন্ময়ী চীর-ধারিণী

চন্দ্রিকার মত ঘেরিয়া তাহারে, রেখেছিলে দেবী পরম আদরে,

রামকৃষ্ণ চঁাদে কলঙ্ক না ধরে, তুমি গাে অবিদ্যানাশিনী

(আজ) সে চঁাদ-সুধায় জগৎ মাতায়, দ্বেষ দ্বন্দ্ব সব দূরে চলে যায়,

ধর্ম সমন্বয়ে অঘটন ঘটায়—এ লীলা বিশ্ব-প্লাবিনী ॥

শ্রীচরণ তলে রাখি শির মাের, তব অনুরাগে হই যেন ভাের,

কেটে দাও মাগাে করমের ডাের, জগদানন্দ-দায়িনী।


—কিরণচন্দ্র দত্ত

জয় সারদেশ্বরী বরদে শুভঙ্করী জ্ঞানদে ক্ষেমঙ্করী মা

শিবরঞ্জনী—ত্রিতাল*


জয় সারদেশ্বরী বরদে শুভঙ্করী, জ্ঞানদে ক্ষেমঙ্করী মা।

সুর-নর-সেবিতা, যুগদেব-বন্দিতা, লজ্জাপটাবৃতা মা ।

জয় ভব-গেহিনী ভবভয়-হারিণী, অশরণতারিণী মা।

যুগাবতার জননী বিশ্বপ্রসবিনী স্থিতিলয়-কারিণী মা ।

ক্ষমারূপধারিণী মরণ নিবারিণী, জীবমােহহারিণী মা।

জয় শ্রীসারদামণি জয় শ্যামা-নন্দিনী জয় জয়দায়িনী মা |

জয় মা (৪বার), নমাে মা (৪ বার)


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ আনন্দ লহর

বঙ্গে যেদিন করুণা-প্লাবনে ভাসালে দেবী সারদামণি

ইমন-ভূপালী— দাদরা


বঙ্গে যেদিন করুণা-প্লাবনে ভাসালে দেবী সারদামণি,

গাইল সবে সেকি আনন্দে আনন্দময়ীর প্রেম আগমনী

ঘােষিল জগতে নবীন আলােতে সারদারূপে বেদমূরতি,

তাপ-দগ্ধ অভয়-চিত্তে লভিল শরণ শকতি-ভকতি 

মুছে গেল যত হিংসার বাণী, মুছে গেল মনে গরিমা-গ্লানি

প্রণাম লহ রামকৃষ্ণ-ঘরণী, দাও হে স্মরণে মরম-বাণী ॥

পঞ্চতপায় বিজয়িনী তুমি সুপ্ত মনে দিলে নব শিক্ষা,

নিখিল মানবে করিয়া কৃপা, দিয়াছ জগতে ত্যাগের দীক্ষা 

তােমার দিব্য জ্যোতির ধারায় মলিন যত গ্রহ-তারা-শশী

বিশ্বজননী শ্যামা-নন্দিনী প্রচারিলে মাতৃভাব দিবানিশি 

মুছে গেল যত হিংসার বাণী, মুছে গেল মনে গরিমা-গ্লানি

প্রণাম লহ রামকৃষ্ণ-ঘরণী, দাও হে স্মরণে মরম-বাণী


—স্বামী নিত্যাত্মানন্দ

উদিলে স্নিগ্ধ জ্যোতিরূপে তুমি গাে জননি ভারত গগনে

বাগীশ্বরী—কাওয়ালী


উদিলে স্নিগ্ধ জ্যোতিরূপে, তুমি গাে জননি ভারত গগনে।

বিতরিতে প্রেম করুণা দীপ্তি, চির মােহ তামস পরাণে ॥

আসিলে মা তুমি কল্যাণীরূপে, অশিব পীড়িত ধরণীর বুকে।

শত প্রাণে ফুটে ভকতি কুসুম, মঙ্গল পরশনে ||

নহ তাে সিদ্ধা কিংবা সাধিকা; সকল সিদ্ধি বিভূতি তােমারি,

ভুক্তি-মুক্তিদায়িনী সারদা, নরদেহে দেবী পরমেশ্বরী ॥

এসেছ গাে মাতা ব্রাহ্মণ গৃহে, সহজ লীলায় অতি দীন ভাবে।

সঁপিনু জীবন চরণ কমলে, রহ মা সতত ধ্যানে জ্ঞানে ।


—স্বামী অপূর্বানন্দ

শ্রীমদ্বিবেকানন্দ সঙ্গীত

মূর্তমহেশ্বরমুজ্জ্বল ভাস্করমিষ্টমমর নরবন্দ্যম্

ছায়া-খাম্বাজ—কাওয়ালী *


মূর্তমহেশ্বরমুজ্জ্বল-ভাস্করমিষ্টমমর-নরবন্দ্যম্।

বন্দে বেদতনুমুত্ত্বিত-গহিত-কাঞ্চন-কামিনী-বন্ধম্ ।

কোটিভানুকরদীপ্তসিংহমহাে! কটিতটকৌপীনবন্ত।

অভীরভীঃ-হুঙ্কার-নাদিত-দিমুখ-প্রচণ্ড-তাণ্ডব-নৃত্যম্ ॥

ভুক্তি-মুক্তি-কৃপা-কটাক্ষ-প্রেক্ষণমঘদল-বিদালন-দক্ষ।

বাল-চন্দ্ৰধরমিন্দু-বন্দ্যমিহ নৌমি গুরু-বিবেকানন্দম্ ॥


—শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী



* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

তারা উজ্জ্বল পশিল ধরা’পর নির্মল গগন বিকাশি

মালকোষ—তিনতাল **


তারা উজ্জ্বল পশিল ধরা’পর, নির্মল গগন বিকাশি।

রত্নগর্ভা নারী রত্ন প্রসবিল, বিভাের বালসন্ন্যাসী।

রবিকর-কর্ষিত কুজ্বাটিকা-ঘন, আবরে দিনকর কান্তি,

মায়াবলম্বন-কায়া-প্রকটন, লীলা-আবরণ-ভ্রান্তি ।

গুরুপদধারণ, আত্মসমর্পণ, মহাহুদে নদ মহাসম্মিলন,

দয়া উচ্ছ্বসিত স্রোত মহান, দুরিত অশান্তি বিধৌত মেদিনী,

জনমন-মার্জিত শান্তি প্রদান; সশিষ্য গুরুপদ হৃদে সাধে ধরি,

গায় অকিঞ্চন গান, কৃপাকণা অভিলাষী ।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ


** স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

স্তিমিত চিৎ সিন্ধু ভেদি উঠিল কি জ্যোতি ঘন

বাগেশ্রী-আড়া*


স্তিমিত-চিৎ সিন্ধু ভেদি উঠিল কি জ্যোতি-ঘন,

কোটি সূর্য গলাইয়ে, ছাঁচে ঢালা কান্তি যেন।

মায়া-খণ্ডিত অখণ্ড বারি, বুঝে লীলা কেবা হেন।

উজল বালক বেশে, অখণ্ড ঘর প্রবেশে,

প্রেমঘন বাহু পাশে কাহারে করে ধারণ ।

উঠ বীর আঁখি মেলি, ছাড় ধ্যান চল চলি,

ধরণী ডুবাল বুঝি অবিদ্যা কাম কাঞ্চন ।

সুধীর ধীর পরশে, যােগী চায় সহরষে,

কণ্টকিত তনুমন, নীরবে ভাসে বয়ান;

তারা জুলি’ ছায়া পথে স্পর্শে ধরা আচম্বিতে,

পুণ্যভূমে উদে আজি পুনঃনর-নারায়ণ ॥


—স্বামী সারদানন্দ



* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

কে রে নরেন্দ্রবর বীরেশ্বর দেহধারী

বাগেশ্রী—একতাল


কে রে নরেন্দ্রবর বীরেশ্বর দেহধারী।

সিদ্ধ মহাবিদ্যাবলে অবিদ্যা বিনাশকারী ।

তমাচ্ছন্ন বসুমতী,     হেরি কি ব্যথিত যতি,

বিলাইতে জ্ঞান-জ্যোতি কে এনেছে সহকারী ।

রহি পরহিতে রত,     শিখাবে কি মহাব্রত,

এসেছ আশ্রিত-রত-জন-মন-তাপহারী ।

গুরুপদে বলিদান,     জীবন-যৌবন মান

হয়েছ কি অধিষ্ঠান, সাজিতে দীন-ভিখারী ॥


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

মহাসিংহ পরাক্রমে কে তুমি সন্ন্যাসী বর

জয়জয়ন্তী—একতাল


মহাসিংহ পরাক্রমে কে তুমি সন্ন্যাসী বর ?

আক্রমিলে জ্ঞান গুরু গিরি গরিষ্ঠ শেখর।

ভালে দীপ্ত দিনমণি হৃদয়ে ভক্তির খনি,

কণ্ঠে বাঁধা বীণাপাণি অদ্ভুত করম বীর।

অভীরভীঃ হুহুঙ্কারে দিক দেশ ভেঙ্গে পড়ে,

বিবেক কৃপাণ করে বীরদর্পে অগ্রসর।

রামকৃষ্ণ গতপ্রাণ জীবন যৌবন দান,

অখণ্ডে তব আসন পরার্থে নর শরীর।

তব সঙ্গ কৃপাগুণে নিত্য মুক্ত অভিমানে,

ইন্দু তৃণ তুল্য গণে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ।


—শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী

কে তুমি যতি মােহন মুরতি রতিপতি ভাতি নয়ন রঞ্জন

খাম্বাজ—একতাল


কে তুমি যতি মােহন মুরতি রতিপতি-ভাতি নয়ন-রঞ্জন।

বদনমণ্ডল প্রেমে ঢল ঢল অমল কোমল প্রিয় দরশন ॥

অন্তরে বিরাজে করুণা ঘন, বাহিরে নেহারি জ্ঞান-আবরণ;

উছল তপন আবরে যেমন স্নিগ্ধ বিমল ইন্দু-কিরণ।

বীর্যবান কর্মী কঠোর, হেলায় ছিন্ন হীন মায়াডাের;

সমাহিত-চিত কামমােহাতীত করুণা-নিধান দীনশরণ ||

নিষ্কাম-সেবা-ধরম-সাধন, সর্বভূতে ভগবান-জ্ঞান;

সত্য মহান্ তত্ত্ব উন্মেষণ, দীন-দাস-আশ রাতুল চরণ ॥


—নীরদরঞ্জন মজুমদার

কে রে পদ্ম-পলাশ লােচন

সিন্ধু—একতাল*


কে রে পদ্ম-পলাশ লােচন।

কে রে শারদ-ইন্দু-নিন্দিত চারু-ভুবন-মােহন-আনন।

শ্মশান-আলয় সন্ন্যাসী বেশ, নাহিক অন্তরে বাসনার লেশ,

নির্ভীক চিতে ভ্রম ধরণীতে, মরণ ভীতি-বারণ ।

জ্ঞান-ঘন-তনু শুক হেন বাসি, অখণ্ড-বিলাসী তুমি ব্ৰহ্মঋষি,

প্রেমরসপানে হরিগুণ গানে, নারদ বীণা-বাদন ৷

জড়বিজ্ঞান-কৌরব-রণে, পার্থ কি এলে বাসুদেব সনে,

রাম-গত-প্রাণ বীর হনুমান, লবণাম্বুধি-লঙ্ঘন ।

জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-ত্রিশূল-ধারী, নররূপ ধরি এলে ত্রিপুরারি,

বিষাণ বাদনে, অভিরভীঃ স্বনে, মােহ-বন্ধন-খণ্ডন।

শরণাগত চরণে তােমার, ‘বিবেকানন্দ’ বীর-অবতার,

কিবা পরিচয়, রামকৃষ্ণ-ময় মন মানস-রঞ্জন ।


—স্বামী প্রেমেশানন্দ



* স্বরলিপিঃ সাধন সঙ্গীত

ভুবন ভ্রমণ কর যােগিবর যাঁর ধ্যানে

সাহানা—ধামার


ভুবন ভ্রমণ কর যােগিবর যাঁর ধ্যানে।

তাহারি সন্তানগণ চেয়ে আছে পথপানে ।

উচ্চব্রতে আত্মহারা,    ভ্রমি সসাগরাধরা,

মােহিলে মানব-চিত, প্রভুর গৌরব-গানে।

নানাদেশে নানাভাবে জয়ধ্বনি একতানে ॥

রামকৃষ্ণ হৃদে ধর,    হৃদয় আকৃষ্ট কর,

ইষ্টপূজা পূর্ণ তব, পুলক-আলােক দানে।

জনমন পুলকিত, মােহনিশা অবসানে।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

কে তুমি বাজালে নবীন রাগেতে ভারতের প্রাণ বীণা

খাম্বাজ-একতাল*


কে তুমি বাজালে নবীন রাগেতে ভারতের প্রাণ-বীণা।

মধুর ঝঙ্কারে মুগ্ধ জগত চকিত গাহে বন্দনা ।

ললিত ছন্দে গভীর মন্দ্রে, পশিল সে তান রন্ধ্রে রন্ধ্রে ;

জাগিল সুপ্ত লুপ্ত-গৌরব ভারতবর্ষ দীনা।

হিমাত্রি-শিখরে জলনিধি-তীরে, প্রাচ্যে প্রতীচ্যে দিগ দিগন্তরে;

বেদান্ত মহিমা কে বল প্রচারে, বর্ণিতে নারি সীমা ৷৷

(করি) গুরুপদে মন-প্রাণ সমর্পণ, মহাযােগী-বেশ করিলে ধারণ;

জ্ঞান-ভক্তি-যােগ-জীব-সেবাব্রত করিলে উদ্দীপনা ॥


—নীরদরঞ্জন মজুমদার



* স্বরলিপি ঃ সুরবিতান

এস ভুবনপাবন নারায়ণ

ভৈরবী—ত্রিতাল

(“অয়ি ভুবন মনােমােহিনী’—সুর)


এস ভুবনপাবন-নারায়ণ।

এস আর্ত-পতিত-চিতে, শান্তি বিতরিতে, ত্রিভুবন-তারণ-কারণ।

দ্বেষ হিংসা হেরি ঝরিত নয়নবারি, সাম্য প্রচারিলে দেশে দেশে ঘুরি;

লাঞ্ছনা সহিলে, সাধি’ শিখাইলে জীবহিতে জীবনধারণ ॥

হের ঘাের তম, স্বার্থ সে নির্মম ছাইছে ভুবন কালমেঘ-সম,

শােণিতে রঞ্জিত, রােদনে পূরিত, কলুষিত ধরণী গগন ।

(এস) হৃদয়ে হৃদয়ে; অন্তরযামী হয়ে স্বার্থবন্ধ কাট প্রেম-অসি দিয়ে;

খুলিয়া দাও ঠুলি, হেরি নয়ন মেলি, ঘটে ঘটে সেই নিরঞ্জন ॥

বিজ্ঞান-ভাস্কর এস হে শঙ্কর, ভৈরব ‘অভীঃ রবে মােহধ্বান্ত হর,

বিবেক-আনন্দ দেহ বিবেকানন্দ! নন্দিত কর ত্রিভুবন ।


—স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

জয় বীরেশ্বর বিবেক ভাস্কর জয় জয় শ্রীবিবেকানন্দ

শিবরঞ্জনী—তিনতাল*


জয় বীরেশ্বর    বিবেক ভাস্কর    জয় জয় শ্রীবিবেকানন্দ।

ইন্দু নিভানন    সুন্দর লােচন    বিশ্বমানব-চিরবন্দ্য ।

প্রেম ঢল ঢল     কান্তি সুবিমল     অধিগত বেদবেদান্ত

ত্যাগ-তিতিক্ষা    তপস্যা-উজ্জ্বল    চিত্ত নিরমল শান্ত।

কর্ম-ভক্তি-জ্ঞান    ত্রিশূল ধারণ    ছেদন জীব-মােহবন্ধ।

ব্রহ্ম পরায়ণ    নমাে নারায়ণ!    দেহি দেহি চরণারবিন্দ 


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

এত প্রেম নিয়ে হায় এলে বিলাইতে

ভৈরবী-ঝাঁপতাল


এত প্রেম নিয়ে হায় এলে বিলাইতে,

অন্ধ বিমূঢ় জীব নারিল চিনিতে ।

অন্নবিনে শীর্ণকায়, জীর্ণ বাসে ঢাকি কায়,

বিবসনে বনে বনে ফের পথে পথে।

হেরি ধরা জ্ঞানহীন, তপে দেহ করি ক্ষীণ,

কত ব্যথা পেলে প্রভাে এসে ধরণীতে।

শুনি নব লীলা-গাথা, প্রাণে বড় বাজে ব্যথা,

পাষাণ পরাণ গলে তব অশ্রুপাতে ৷


—স্বামী প্রেমেশানন্দ

ধরমভেদ-ভঞ্জন বন্দি জগত-বন্দন

ভৈরবী—একতাল*


ধরমভেদ-ভঞ্জন বন্দি জগত-বন্দন।

জ্ঞান ভকতি বিতরণে নর-শরীর-ধারণ।

বিগত-গেহ-বন্ধন, বিজিত-মীন-কেতন,

রূপে কাম-গঞ্জন, বাণী বীণা-নিন্দন ।

প্রেমমত্ত-নর্তন, অভীরভীঃ গর্জন,

ভূধর-সাগর-লঙ্ঘন, জীব-তারণ-কারণ ॥

কূট-কপটী-মর্দন, সজ্জন-মনােমােহন,

বিশ্বমানব বন্দে তােমায় রামকৃষ্ণ-নন্দন ।


—স্বামী প্রেমেশানন্দ




* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

কে তুমি স্বামি জ্ঞানি শিরােমণি জগজীবে সমদরশন

ইমন-কল্যাণ—তেওরা


কে তুমি স্বামি, জ্ঞানি-শিরােমণি জগজীবে সমদরশন।

পরম ত্যাগী, করমযােগী, গুরুধ্যানে মন-মগন ।

বদনে ক্ষরিছে বেদের ব্যাখ্যান,     করমে দিতেছে ত্যাগের প্রমাণ।

মরমে বহিছে প্রেমের উজান,         অপরূপ জ্ঞান প্রেমের মিলন ৷

ধরম-রতন জীবে বিতরণ,         জীব-দুঃখ-দল-মােচন-সাধন।

অনাথ-আশ্রম; যােগীনিকেতন,     সাধুজনগণ-ভবন-স্থাপন।

প্রমত্ত প্রচারে বেদান্ত-দর্শন,         মহাজ্ঞান-গুণে মােহিত ভুবন।

কল্যাণ সাধনে অবনী ভ্রমণ,         ত্যাগীবর চীর-কৌপীন-বসন ।

নমি কর্মীপ্রবর জ্ঞান-আকর,        ভক্তি-নিঝর সত্য-শরণ ।


—অজ্ঞাত

কে তুমি নবীন যােগী গুরুচরণ ধ্যানে

সাহানা—ঝাঁপতাল


কে তুমি নবীন যােগী গুরুচরণ-ধ্যানে,

নিমগন মহাযােগে ভকতি-পূরিত প্রাণে ॥

উজলিয়া জ্যোতির্ময় সপ্তঋষি গ্রহচয়,

কিরণ রাশি বিকাশি’ ছিলে কি অমরধামে ?

নাশিতে মােহ তামসে উদিত ভারতাকাশে,

জ্ঞান-অরুণ প্রকাশে পূরিত ধরা সামগানে।

হৃদয় করুণাখনি, প্রেমিকের শিরােমণি,

সতত প্রমত্ত চিত দীনদুঃখ বিমােচনে।

কঠোর করম-যােগী স্বীয় বিলাসে বিরাগী,

মােহন মূরতি যতি প্রণমি তব চরণে।


—নীরদরঞ্জন মজুমদার

কে তুমি সন্ন্যাসী বেশে প্রেমিকের শিরােমণি

আলাইয়া—একতাল*

(দেহজ্ঞান দিব্যজ্ঞান—সুর)


কে তুমি সন্ন্যাসী বেশে, প্রেমিকের শিরােমণি।

কষিত-কাঞ্চন-জিনি প্রেমে গড়া তনুখানি ।

মুড়ায়ে চঁচর কেশ, ধরেছ যােগীর বেশ,

নেহারিলে প্রেমাবেশ, এ জীবন ধন্য মানি।

সবারেই বাস ভাল, কাঙ্গালেরে কোলে তােল,

যারে তারে দাও প্রেম, কুলমান নাহি গণি।

হে নরেন্দ্র বীরেশ্বর হৃদয়রঞ্জন মাের,

চরণে শরণ চাহি, রাখ পদে দাস জানি ।


—স্বামী প্রেমেশানন্দ



* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

বীর সেনাপতি বিবেকানন্দ ঐ যে ডাকিছে আয়রে আয়

আড়ানা—তেওড়া*


বীর সেনাপতি বিবেকানন্দ ঐ যে ডাকিছে ‘আয়রে আয

আহ্বানে তার আপনা ভুলিয়া কত মহারথী ছুটিয়া যায় ।

আত্মত্যাগের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নবীন তন্ত্রে,

ভােগবাদ-জাত-দৈত্য দলিতে, আপনা সঁপিতে কে যাবি আয়।

স্বার্থদ্বন্দ্ব ভােগ-কোলাহল এনেছে জগতে শুধু হলাহল,

নিভাতে আজিকে এই দাবানল প্রেমবারি সে যে এনেছে হায়।

এস দেব এস করুণা-নিধান, লহ আজি মম তনু মন প্রাণ,

কৃপা করি কর এ আশিস দান তব কাজে যেন জীবন যায় ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ


* স্বরলিপি ঃ আনন্দলহরী



যােগাসনে জ্যোতির্ময় কে তুমি সন্ন্যাসিবর

ভৈরব—ঝাঁপতাল


যােগাসনে জ্যোতির্ময়, কে তুমি সন্ন্যাসিবর।

সদানন্দ, যতিরাজ, জয় যােগীশ্বর ॥

সমাধিতে সদা রত, গুরুবাক্যে অনুগত।

শিবজ্ঞান জীবে কর, শিব অবতার ।

আচণ্ডালে দিলে স্থান, নাহি গণি কুলমান,

প্রেমের মূরতি, বুদ্ধ অবতার।

ধরাধামে কপিলমুনি, জগতের গুরু তুমি,

তেয়াগীর শিরােমণি, পূর্ণ মহেশ্বর ।

অখণ্ডের ঘর হতে, উদিলে ভারতে।

বিশ্বে বাজাও বেদভেরী, ধেয়ানী ঋষিবর।

যাচি ভিক্ষা দাও শিক্ষা, ধৈর্য বীর্য তিতিক্ষা,

বিবেক বৈরাগ্য দেহ, জয় বীরেশ্বর ।


—অজ্ঞাত

স্বদেশ বিদেশ উছলি উঠিছে তােমার নবীন তন্ত্র

ইমন-কল্যাণ—একতাল*

(“যখন সঘন”—সুর)


স্বদেশ বিদেশ উছলি উঠিছে তােমার নবীন তন্ত্র,

আকাশ বাতাস ধ্বনিয়া তুলিছে তােমার মােহন মন্ত্র;

নন্দিত-ধরা-মন্দির মাঝে ধর্মের স্র গন্ধ,

মােদের বিবেকানন্দ তুমি গাে—বিশ্ব বিবেকানন্দ ।

অরুণ কিরণ উছলি উঠিল উদিলে যে দিন বঙ্গে,

স্বরগ করিল সুরভি বৃষ্টি বরষি আশীষ সঙ্গে,

প্রেমের পুণ্যপ্রবাহে সাজিল গৌর নিত্যানন্দ,

মােদের বিবেকানন্দ তুমি গাে—বিশ্ব বিবেকানন্দ ।

দুলােকের ছবি হেরিলে পুলকে গুরুর চরণ তলে,

আর্তের সেবা মর্ত্যে আনিলে ভাসিয়া নয়ন জলে;

বিশ্বপ্রেমের বিকশিত খনি—চিত্তে হরষানন্দ,

মােদের বিবেকানন্দ তুমি গাে—বিশ্ব বিবেকানন্দ।

ভূধরে সাগরে গহনে কাননে যাপিলে কত না নিশি,

তুষার হিমানি গিরিন্দর ভ্ৰমিলে কত না দিশি;

অঙ্কুর পুনঃ শঙ্কর-জ্ঞান শাক্যের ত্যাগানন্দ,

মমাদের বিবেকানন্দ তুমি গাে—বিশ্ব বিবেকানন্দ |

জ্ঞানের গরিমা গৌরব গান ভারত-মর্মবাণী,

পাশ্চাত্য সেথা বেদান্ত গাথা শুনি বিস্ময় মানি।

স্নিগ্ধ ভাবের শক্তি মাধুরী মুগ্ধ নূতন ছন্দ,

মােদের বিবেকানন্দ তুমি গাে—বিশ্ব বিবেকানন্দ ।

শিকাগাে সঙ্ঘে সঙ্গীত তব শীর্ষে উঠিল ভাসি,

শুনিল বিশ্ব, শুনিল নিঃস্ব, শুনিল প্রাসাদবাসী,

সৃজিলে “শ্রীমঠ” কুঞ্জকুটীর তীর্থ মুখরানন্দ,

মােদের বিবেকানন্দ তুমি গাে-বিশ্ব বিবেকানন্দ।


—স্বামী অভেদানন্দ



* স্বরলিপি ঃ সুরবিতান

রাজ রাজেশ ভিখারীর বেশে কেন গাে ভ্ৰমিছ ভুবনে

কাফি—তেওরা*


রাজ রাজেশ ভিখারীর বেশে, কেন গাে ভ্ৰমিছ ভুবনে।

প্রতিভা অনল ভালে ঝলমল, বিজলী খেলিছে নয়নে ৷

সম্পদ শত দলিছ হেলায়, রাজশির কত নত তব পায়,

ধন মান যত গৌরব হত, যুগল রাজীব চরণে ।

হেম সিংহাসন, রতন ভূষণ, তাই কি তােমারে সাজে,

লালসা-কলুষ কলহ-কালিমা ধরণীর ধন মাঝে;

প্রেম ফুলে গড়ি মুকুট ভূষণ, প্রেমফুল দলে সাজাব চরণ,

এস মহারাজ এ মাের হৃদয়ে, এস তব চির আসনে।


—স্বামী প্ৰেমেশানন্দ



* স্বরলিপি ঃ  দিব্যগীতি

জয় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসিবীর চীর গৈরিক ধারী

আড়ানা মিশ্র—তেওরা


জয় বিবেকানন্দ সন্ন্যাসিবীর চীর-গৈরিক-ধারী।

জয় তরুণযােগী শ্রীরামকৃষ্ণ-ব্রত-সহায়কারী ।

যজ্ঞাহুতির হােম-শিখাসম, তুমি তেজস্বী তাপস পরম।

ভারত-অরিন্দম, নমাে নমঃ বিশ্ব-মঠ-বিহারী ।

মদগর্বিত বল দর্পীর দেশে মহাভারতের বাণী

শুনায়ে বিজয়ী ঘুচালে স্বদেশের অপযশ গ্লানি।

নব ভারতে আনিলে তুমি নব বেদ,

মুছে দিলে জাতি ধর্মের ভেদ;

জীবে ঈশ্বরে অভেদ আত্মা জানাইলে উচ্চারি ।


—কাজী নজরুল ইসলাম

বীরদর্পে বিজয় গাও হে নিখিল ভারত পদে লুটাও হে

ইমন কল্যাণ—তেওরা


বীরদর্পে বিজয় গাও হে, নিখিল ভারত পদে লুটাও হে।

দীর্ঘ সুপ্তি স্বার্থতৃপ্তি দূরে ঘুচাও হে ৷৷

ভিক্ষাবৃত্তি কৌপীন-বাস, বেদ-গৌরব করি প্রকাশ,

ভ্রমিলা ধরণী ত্যজি আবাস, মাথে তুমি তারে লও হে।

যুগ যুগান্ত নিদ্রাতুর, শুন হে ভারত ভৈরব সুর,

অগৌরব সে করেছে দূর, শির তুলি দাঁড়াও হে।

পূজিছে পশ্চিম, পূজিছে পূরব, জয় জয় রব উঠিছে

নব নব কীর্তি-গাথা গাও হে।


—স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

বিবেকানন্দ এলাে রে এবার ঐ শােন তার বিজয়-হুঙ্কার

সুরট-মল্লার—তেওরা


বিবেকানন্দ এলাে রে এবার। ঐ শােন তার বিজয়-হুঙ্কার ॥

“নর ঋষি” আজি ধরা ধামে এলাে, ছাড়িয়া সপ্ত-ঋষি মণ্ডল,

বরাভয় কর কমল যুগল; মুছাবে সকল কালিমা ধরার ॥

ক্ষাত্ৰ-বীর্য ব্রহ্মজ্ঞান, ধরিল নব রূপ নয়নাভিরাম।

ভারত-আত্মা মূর্তিমান, শ্রীরামকৃষ্ণে নিবেদিত প্রাণ।

ঘােষিল ধরাতে বারতা মহান, ‘মানুষই দেবতা’ নব সমাচার ৷


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় যতীশ্বর জয় তমােহারী জয় শিব শম্ভু নর-রূপ-ধারী

কেদারা—কাওয়ালী


জয় যতীশ্বর, জয় তমােহারী, জয় শিব শম্ভু নর-রূপ-ধারী ।

জয় বেদ-বাণী জ্ঞান-গঙ্গাধর, পতিত-পালক জয় বিষধর,

জয় ভয়-বারণ বিজয়-কেতন, জয় বীরেশ্বর, জয় দণ্ডধারী ।

ত্রিলােক-বাসী শ্ৰীচরণ বন্দে, মহিমা তব গাহে গীতি-ছন্দে,

(জয়) ভূভার-হরণ, বিমােহনাশন, নমাে মহেশ্বর নর-লােক-চারী ।


—বিনােদেশ্বর দাশগুপ্ত

ক্ষাত্রবীর্য ব্রহ্মতেজ মূরতি ধরিয়া এলাে এবার

মালকোষ—তেওড়া*


ক্ষাত্রবীর্য ব্রহ্মতেজ মূরতি ধরিয়া এলাে এবার।

গগনে পবনে উঠিল রে ঐ! “মাভৈঃ” “মাভৈঃ” হুহুঙ্কার ।

আশ্বাস দিল শঙ্কিত জনে, পুলক জাগালাে হতাশ জীবনে।

“উত্তিষ্ঠত” গরজি’ সঘনে, সুপ্তি নাশিল এ বসুধার ।

“অমৃতস্য পুত্ৰা” আমরা, মৃত্যু মােদের নাহি রে আর,

কার ভয়ে তবু কেঁদে দিশেহারা, উঠে দাঁড়া! মিছে স্বপন ছাড়।

ত্যাগ ও সেবার বিজয় কেতন, নির্ভয়ে তােল বিদরি’ গগন।

ধন্য হইবে বিশ্বভুবন, সাথে আছে সদা আশীষ তার ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ আনন্দ লহরী

বলগাে ঠাকুর বল না আমারে আনিলে এ কারে সাথে তােমার

ছায়ানট—একতাল**


বলগাে ঠাকুর! বল না আমারে আনিলে এ কারে সাথে তােমার।

ব্রহ্মতেজোদীপ্ত আনন পুরুষ-সিংহ কে এ কুমার ।

বীরেশ্বর অমিতবীর্য, সুর-সেনাপতি জিনিয়া শৌর্য,

জ্ঞানে গরীয়ান, তাপস প্রধান, প্রেমে ভাসমান নয়ন তার ।

ত্যাগে শুকদেব, প্রেমেতে নারদ, বুদ্ধের মত হৃদয় যাঁর,

জ্ঞানে শিবগুরু শঙ্কর সম, সে কেন লুটায় পদে তােমার ?

হুঙ্কারে যাঁর কাপে ত্রিভুবন, সে কেন মাগিছে তােমার শরণ?

তােমারি আশিস করিয়া ধারণ সে কি গাে হরিবে ধরার ভার ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্



** আভােগ—“তেওড়া তালে হবে বলা আছে"।

স্বামীজীর মন্ত্র মােরা ভুলব না

প্রচলিত সুর—দাদরা


স্বামীজীর মন্ত্র মােরা ভুলব না।

স্বামীজীর স্বপ্ন মােরা ভুলব না |

ভারতভূমি পুণ্যভূমি ভুলব না-

ত্যাগ ও সেবা মন্ত্র মােদের ভুলব না।

বাঁচব কভু নিজের তরে বাঁচব না

ভালবাসা মন্ত্র মােদের ভুলব না ।

(স্বামীজীর মন্ত্র ... ...)

তােমার আমার সবার এ দেশ ভুলব না-

নতুন ভারত গড়ব মােরা থামব না |

(স্বামীজীর মন্ত্র ... ...) )

দুঃখ আসুক ঝঞ্ঝা আসুক টলব না,

আমার মাঝেই শক্তি অসীম ভুলব না ।

(স্বামীজীর মন্ত্র ... ...)

সবার সুখে সুখ যে আমার ভুলব না,

বিশ্বভুবন আমার আসন ভুলব না।

(স্বামীজীর মন্ত্র ... ...)


—স্বামী বলভদ্রানন্দ

স্বামীজী প্রণমামি তােমারই চরণে

বিলাবল—কাহারবা


স্বামীজী, প্রণমামি তােমারই চরণে,

পদ-ধূলি যদি পাই, যাবাে আলােতে

কবে হবে সেইদিন বলনা... 

কত কাল যে চলে যায়,

তবু আমি পথ চেয়ে বসে থাকি

তােমারই প্রতীক্ষায়।

জানি তুমি একদিন আসবেই যুগল ধূলিপদে,

তখন আমি ধুয়ে মুছে চলেই যাব সেই আলােতে।

প্রণমামি, স্বামীজী তােমারই চরণে,

পদধূলি যদি পাই যাবাে আলােতে ।


—অমিতাভ চট্টোপাধ্যায

যে দিন বিশ্বমানবসভায় দাঁড়ালে হে বীর বিবেকানন্দ

“যেদিন সুনীল জলধি হইতে”

সুর—একতালা


যে দিন বিশ্বমানবসভায় দাঁড়ালে হে বীর বিবেকানন্দ,

ঘােষিলে নবীন যুগের বার্তা, উঠিল জগতে উদার ছন্দ।

ত্যাগের গৈরিক প্রভায় সেদিন, ফুটিল কি এক মহান্ দৃশ্য,

মন্ত্রমুগ্ধ, চরণে তােমার ঢালিছে অর্ঘ্য নিখিল বিশ্ব।

মুছে গেল আজি ধরার কালিমা, ঘুচে গেল সব ধরম-দ্বন্দ্ব,

ভুবনে ভুবনে বন্দিল সবে—ভুবন-পাবন বিবেকানন্দ।

শীর্ষে ভাতিছে বেদান্ত-কিরীট, শােভিছে অদ্বৈত-হীরক দীপ্ত,

তপােদ্ভাসিত অমল অঙ্গে, যােগের দিব্য বিভূতি লিপ্ত।

কর্ম জ্ঞেয়ান ভক্তির হার, দুলিছে অতুল বিশাল বক্ষে,

প্রেম পীযূষে পূরিত হৃদয়, করুণা পদ্মপলাশ চক্ষে।

মুছে গেল আজি ধরার কালিমা, ঘুচে গেল সব ধরম দ্বন্দ্ব;

ভুবনে ভুবনে বন্দিল সবে—ভুবন-পাবন বিবেকানন্দ ।

ভুবন বিজয়ী প্রতিভা আননে, কণ্ঠে মাভৈঃ মাভৈঃ উক্তি,

হস্তে তােমার বিবেক-কৃপাণ, চরণে তােমার বিহরে মুক্তি।

ধর্মে বিজ্ঞানে বাঁধি একতানে, দিয়াছ খুলিয়া মানব নেত্র,

পুণ্য পরশে রচিয়া দিয়াছ, প্রাচী প্রতীচীর মিলন ক্ষেত্র।

মুছে গেল আজি ধরার কালিমা, ঘুচে গেল সব ধরম দ্বন্দ্ব;

ভুবনে ভুবনে বন্দিল সবে—ভুবন-পাবন বিবেকানন্দ |

সুপ্ত ভারতে জাগায়ে চেতনা, দিয়াছ বীরের ধর্ম শিক্ষা,

ত্যাগের মন্ত্রে হে জগদ্গুরু, নবীন ভারতে দিয়াছ দীক্ষা,

সৃজিলে তুমি হে মূর্ত ভারত, ত্যাগীর নব আদর্শ উচ্চ,

নারায়ণ জ্ঞানে জীব সেবা লাগি, আপন মুক্তি করিতে তুচ্ছ।

মুছে গেল আজি ধরার কালিমা, ঘুচে গেল সব ধরম দ্বন্দ্ব;

ভুবনে ভুবনে বন্দিল সবে—ভুবন-পাবন বিবেকানন্দ।

তিমির-মুক্ত সুনীল গগনে, হাসিছে আবার ধরম চন্দ্র।

নিখিল মানস-জলধি আবার, পুলকে করিছে প্রণব মন্ত্র।

স্বামীজী, তােমার মহাবীরবাণী, ভাবের গরিমা উজ্জ্বলকান্তি,

তাপক্লিষ্টা বসুধা-পরাণে, বর্ষিবে সদা পরমা শান্তি।

মুছে গেল আজি ধরার কালিমা, ঘুচে গেল সব ধরম দ্বন্দ্ব,

ভুবনে ভুবনে বন্দিল সবে---ভুবন-পাবন বিবেকানন্দ |


—কর্ণাটকুমার চৌধুরী


* স্বরলিপি : সুরবিতান

শৌর্য দাও শক্তি দাও হৃদয়ে ভক্তি দাও

ইমন-কল্যাণ—তেওরা


শৌর্য দাও

শৌর্য দাও, শক্তি দাও হৃদয়ে ভক্তি দাও

মানুষ করিয়া দাও, মানুষ করিয়া দাও |

অমৃতস্য পুত্র আমরা একথা বুঝিয়ে দাও।

মানুষ করিয়া দাও, মানুষ করিয়া দাও |

ক্ষত্রবীর্য দাও ব্রহ্মতেজ দাও।

তােমার আশিসে জীবন মােদের পূর্ণ করিয়া দাও।

মানুষ করিয়া দাও, মানুষ করিয়া দাও |


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

নিরাকার ভজন

একরূপ অরূপ নাম বরণ অতীত আগামীকালহীন

বড়হংস-সারঙ্গচৌতাল*


একরূপ, অরূপ-নাম-বরণ,        অতীত-আগামীকালহীন,

দেশহীন, সর্বহীন, “নেতি নেতি” বিরাম যথায়।

সেথা হ’তে বহে কারণ-ধারা,        ধরিয়ে বাসনা বেশ উজলা

গরজি গরজি উঠে তার বারি,“অহমহমিতি” সর্বক্ষণ।

সে অপার ইচ্ছা-সাগরমাঝে,        অযুত অনন্ত তরঙ্গ রাজে,

কতই রূপ কতই শকতি, কত গতি-স্থিতি কে করে গণন ।

কোটি চন্দ্র, কোটি তপন,        লভিয়ে সেই সাগরে জনম,

মহাঘাের রােলে ছাইল গগন,     করি দশদিক জ্যোতিঃ মগন।

তাহে বসে কত জড় জীব প্রাণী,        সুখ দুঃখ জরা জনম মরণ,

সেই সূর্য, তারি কিরণ, যেই সূর্য সেই কিরণ 


—স্বামী বিবেকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

নাহি সূর্য নাহি জ্যোতিঃ নাহি শশাঙ্ক সুন্দর

বাগেশ্রী—আড়া


নাহি সূর্য নাহি জ্যোতিঃ,    নাহি শশাঙ্ক সুন্দর।

ভাসে ব্যোমে ছায়াসম,    ছবি-বিশ্ব-চরাচর।

অস্ফুট মন-আকাশে,    জগত সংসার ভাসে;

ওঠে ভাসে ডুবে পুনঃ,    অহংস্রোতে নিরন্তর ।

ধীরে ধীরে ছায়াদল,    মহালয়ে প্রবেশিল,

বহে মাত্র “আমি আমি    এই ধারা অনুক্ষণ।

সে ধারাও বদ্ধ হ’ল,    শূন্যে শূন্য মিলাইল,

‘অবা-মনসােগােচর    বােঝে-প্রাণ বােঝে যার ॥


—স্বামী বিবেকানন্দ

এক পুরাতন পুরুষ নিরঞ্জনে চিত্ত সমাধান কর রে

ঝিঝিট-খাম্বাজ—ঠুংরি*


এক পুরাতন পুরুষ নিরঞ্জনে, চিত্ত সমাধান কর রে।

আদি সত্য তিনি কারণ-কারণ, প্রাণরূপে ব্যাপ্ত চরাচরে,

জীবন্ত জ্যোতির্ময়, সকলের আশ্রয়, দেখে সেই যে জন বিশ্বাস করে।

অতীন্দ্রিয় নিত্য চৈতন্যস্বরূপ, বিরাজিত হৃদিকন্দরে;

জ্ঞান প্রেম পুণ্যে ভূষিত নানাগুণে, যাঁহার চিন্তনে সন্তাপ হরে।

অনন্ত গুণাধার প্রশান্ত-মূরতি, ধারণা করিতে কেহ নাহি পারে,

পদাশ্রিত জনে, দেখা দেন নিজ গুণে, দীন হীন বলে দয়া করে।

চির ক্ষমাশীল কল্যাণদাতা, নিকট সহায় দুঃখসাগরে;

পরম ন্যায়বান, করেন ফলদান, পাপপুণ্য কর্ম অনুসারে।

প্রেমময় দয়াসিন্ধু, কৃপানিধি, শ্রবণে যাঁর গুণ আঁখি ঝরে,

তার মুখ দেখি, সবে হও রে সুখী, তৃষিত মন প্রাণ যাঁর তরে।

বিচিত্র শােভাময় নির্মল প্রকৃতি, বর্ণিতে সে অপরূপ বচন হারে;

ভজন সাধন তার, কর হে নিরন্তর, চির ভিখারী হয়ে তার দ্বারে।


—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল



* স্বরলিপি ঃ  দিব্যগীতি

অনুপম মহিম পূর্ণব্রহ্ম কর ধ্যান নিরমল পবিত্র ঊষাকালে

ভৈরব—ফঁাপতাল


অনুপম-মহিম পূর্ণব্রহ্ম কর ধ্যান, নিরমল পবিত্র ঊষাকালে।

ভানু নব তার সেই প্রেম-মুখচ্ছায়া, দেখ ঐ উদয়গিরি শুভ্র ভালে।

মধু সমীরণ বহিছে এই যে শুভদিনে, তার গুণ গান করি অমৃত ঢালে;

মিলিয়ে সবে যাই চল ভগবত-নিকেতনে, প্রেম-উপহার লয়ে হৃদয়-থালে।


—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাঁহারে আরতি করে চন্দ্রতপন দেব মানব বন্দে চরণ

বড়হংস-সারঙ্গ-চৌতাল*


তাঁহারে আরতি করে চন্দ্র-তপন, দেব মানব বন্দে চরণ,

আসীন সেই বিশ্ব-শরণ, তার জগত-মন্দিরে। '

অনাদিকাল অনন্তগগন,

সেই অসীম মহিমা মগন,

তাহে তরঙ্গ উঠে সঘন আনন্দ নন্দ নন্দ রে ॥

হাতে লয়ে ছয় ঋতুর ডালি, পায়ে দেয় ধরা কুসুম ঢালি,

কতই বরণ কতই গন্ধ, কত গীতি, কত ছন্দরে ।

বিহগ গীত গগন ছায়,

জলদ গায়, জলধি গায়,

মহাপবন হরষে ধায়, গাহে গিরি-কন্দরে।

কত কত শত ভকত-প্রাণ, হেরিছে পুলকে গাহিছে গান,

পুণ্য কিরণে ফুটিছে প্রেম, টুটিছে মােহবন্ধ রে।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান—২২

আদি নাদ প্রণবরূপ সম্পূরণ দাও হে তব প্রসাদ

ইমন-কল্যাণ—সুরফাঁক্তা**


আদি নাদ প্রণবরূপ সম্পূরণ, দাও হে তব প্রসাদ,

শান্তিসিন্ধু, মহেশ, সকল গুণনিধান।

অযুত লােক, অকথিত বাণী তােমারি হে, মােহন রব অনুপম,

পুরে মহাগগন ভাবে মােহি জগজন।

অনুপম, অবিনাশী,

অনন্ত, অগম্য, অপার,

সুন্দর, অতি অপূর্ব ভাতি, নিরঞ্জন;

সকল-সুখ-কারণ, সকল-দুঃখ-নিবারণ,

তারণ, ভয়ভঞ্জন সুরনরমুনি-বন্দন ।


—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর



** ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-২

চিদানন্দ সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী

কীর্তন—(খয়রা)*


চিদানন্দ সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী।

মহাভাব রসলীলা কি মাধুরী মরি মরি।

বিবিধ বিলাস রঙ্গ প্রসঙ্গ, কত অভিনব ভাব-তরঙ্গ,

ডুবিছে উঠিছে করিছে রঙ্গ, নবীন নবীন রূপ ধরি।

(হরি হরি হরি বলে)

মহাযােগে সমুদায় একাকার হইল,

দেশ কাল ব্যবধান ভেদাভেদ ঘুচিল,

(আশা পূরিল রে,—আমার সকল সাধ মিটে গেল)

এখন আনন্দে মাতিয়া, দুবাহু তুলিয়া,

বল রে মন হরি হরি।


—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল



* স্বরলিপি ঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

টুটল ভরম ভীতি ধরম করম নীতি

(ঝাঁপতাল)


টুটল ভরম ভীতি    ধরম করম নীতি

দূর ভেল জাতি কুলমান;

কঁহা হাম, কঁহা হরি,    প্রাণমন চুরি করি,

বঁধূয়া করিলা পয়ান;

(আমি কেনই বা এলাম গাে, প্রেমসিন্ধুতটে)

ভাবেতে হওল ভাের,    অবহি হৃদয় মাের

নাহি যাও আপনা পসান,

প্রেমদাস কহে হাসি,    শুন সাধু জগবাসী,

এয়সাহি নূতন বিধান।

কিছু ভয় নাই! ভয় নাই!


—প্রেমদাস

ঐ যে দেখা যায় আনন্দধাম

সিন্ধু-বিজয়—তেওরা


ঐ যে দেখা যায় আনন্দধাম

অপূর্ব শােভন ভব-জলধির পারে, জ্যোতির্ময় ।

শােক-তাপিত জন সবে চল, সকল দুঃখ হবে মােচন;

শান্তি পাইবে হৃদয় মাঝে, প্রেম জাগিবে অন্তরে।

কত যােগীন্দ্র ঋষি মুনিগণ, না জানি কি ধ্যানে মগন,

স্তিমিত-লােচন-কি অমৃত-রস-পানে ভুলিল চরাচর;

কি সুধাময় গান গাইছে সুরগণ, বিমল বিভুগুণ-বন্দন,

কোটি চন্দ্র তারা উলসিত, নৃত্য করিছে অবিরাম ॥


—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিবিড় আঁধারে মা তাের চমকে অরূপরাশি

বাগেশ্রী—আড়াঠেকা


নিবিড় আঁধারে মা তাের চমকে অরূপরাশি।

তাই যােগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরি-গুহাবাসী ।

অনন্ত আঁধার কোলে মহানির্বাণ-হিল্লোলে,

চিরশান্তি-পরিমল অবিরল যায় ভাসি ॥

মহাকাল রূপ ধরি,     আঁধার বসন পরি,

সমাধি মন্দিরে ও মা, কে তুমি গাে একা বসি?

অভয়-পদ-কমলে,     প্রেমের বিজলী খেলে

চিন্ময়-মুখ মণ্ডলে শােভে অট্ট অট্টহাসি ॥


—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল



১ পাঠান্তর ঃ জ্বলে

প্রতিমা দিয়ে কি পূজিব তােমারে এ বিশ্ব নিখিল তােমারি প্রতিমা

জয়জয়ন্তী—একতাল (মধ্যলয়)*


প্রতিমা দিয়ে কি পূজিব তােমারে, এ বিশ্ব নিখিল তােমারি প্রতিমা।

মন্দির তােমার কি গড়িব মাগাে! মন্দির যাঁহার দিগন্ত নীলিমা!

তােমার প্রতিমা শশী, তারা, রবি, সাগর, নিঝর, ভূধর, অটবী,

নিকুঞ্জভবন, বসন্তপবন, তরু, লতা, ফল, ফুলমধুরিমা।

সতীর পবিত্র প্রণয় মধু—মা! শিশুর হাসিটি, জননীর চুমা,

সাধুর ভকতি, প্রতিভা, শকতি,—তােমারি মাধুরী তােমারি মহিমা।

যেই দিকে চাই এ নিখিলভূমি,—শতরূপে মাগাে বিরাজিছ তুমি,

বসন্তে, কি শীতে, দিবসে, নিশীথে, বিকশিত তব বিভব গরিমা ।

তথাপি মাটির এ প্রতিমা গড়ি, তােমারে পূজিতে চাই মা ঈশ্বরী!

অমর কবির হৃদয় গভীর ভাষায় যাহার দিতে নারে সীমা,

খুঁজিয়ে বেড়াই অবােধ আমরা, দেখিয়া আপনি দিয়েছ মা ধরা,

দুয়ারে দাঁড়ায়ে হাতটি বাড়ায়ে, ডাকিছু নিয়ত করুণাময়ী মা।


—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়



* স্বরলিপি ঃ শ্রেষ্ঠ দ্বিজেন্দ্র স্বরলিপি

সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে

ইমন-কল্যাণ—তেওড়া**


সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।

তুমি সদা যার হৃদে বিরাজ দুখ জ্বালা সেই পাশরে ।

সব দুখ জ্বালা সেই পাশরে ।

তােমার জ্ঞানে, তােমার ধ্যানে, তব নামে কত মাধুরী

যেই ভকত সেই জানে, তুমি জানাও যারে সেই জানে।

ওহে, তুমি জানাও যারে সেই জানে ৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



** স্বরবিতান—২৩ 

প্রথম আদি তব শক্তি

বসন্ত—সুর ফাঁকতাল*


প্রথম আদি তব শক্তি

আদি পরমােজ্জ্বল জ্যোতি তােমারি হে

গগনে গগনে ॥

তােমার আদি বাণী বহিছে তব আনন্দ,

জাগিছে নব নব রসে হৃদয়ে মনে ।

তােমার চিদাকাশে ভাতে সূরয চন্দ্র তারা,

প্রাণ-তরঙ্গ উঠে পবনে।

তুমি আদি কবি, কবিগুরু তুমি হে,

মন্ত্র তােমার মন্দ্রিত সব ভুবনে ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান—৩৬ 

ওরে আমার প্রাণপিঞ্জরের পাখি গাও না রে

বাউল—একতাল


ওরে আমার প্রাণপিঞ্জরের পাখি, গাও না রে।

সদা সত্যং শিব সুন্দরং, ও নাম প্রাণভরে গাও না রে।

পড় পড় আত্মারাম, ডাক ডাক প্রাণারাম,

আমার হৃদয়মাঝে প্রাণবিহঙ্গ ডাক অবিরাম;

ডাক তৃষিত চাতকের মতাে, পাখি অলস থেকো না রে।

ব্ৰহ্মকল্পতরুশাখে বসে রে পাখি,

বিভুগুণ গাও দেখি, গাও গাও;

আবার ধর্ম অর্থ কাম মােক্ষ, সুপক্ক ফল খাও না রে,

ওকি বলরে পাখি বল, তাের নয়নে কেন জল,

বুঝি হরিনামামৃত-পানে হয়েছ বিহুল;

আহা! কি সুন্দর দেখাচ্ছে তােমায়, পাখি নীরব হয়াে নারে।

অসার বিহঙ্গজনম কর রে সফল,

করি নাম কোলাহল, সুবিমল,

গেয়ে অবিরাম আত্মারাম, মােক্ষধামে উড়ে যাও না রে ।


—পুণ্ডরীকাক্ষ মুখােপাধ্যায়

কে তােমারে জানতে পারে তুমি না জানালে পরে

প্রসাদী, লুম-ঝিঝিট—দাদরা


কে তােমারে জানতে পারে, তুমি না জানালে পরে।

বেদ বেদান্ত পায় না অন্ত, খুঁজে বেড়ায় অন্ধকারে ॥

যাগ যজ্ঞ তপােযােগ,

সকলই হয় কর্মভােগ,

কর্ম তােমার মর্ম কি পায় তুমি সর্বকর্মপারে।

সৃষ্টি জোড়া তােমার মায়া, কায়া নাই কেবলি ছায়া,

মাঠের মাঝে আকাশ ধরা, ঘুরে সারা চারি ধারে ৷

তুমি প্রভু ইচ্ছাময়,

যদি তােমার ইচ্ছা হয়,

অসাধ্য সুসাধ্য তার, তুমি কৃপা কর যারে ॥

তব কৃপা আশা করি, রয়েছি জীবন ধরি,

কৃপানাথ কৃপা করি, এস ব’স হৃদমাঝারে ।


—দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

অচল ঘন-গহন-গুণ গাও তাহারি

বাহার—ঝাঁপতাল*


অচল ঘন-গহন-গুণ গাও তাহারি;

গাও আনন্দে সবে রবি চন্দ্র তারা।

সকল তরুরাজি সাজি ফুল ফলে গাও রে;

বিহঙ্গ-কুল গাও আজি মধুরতর তানে।

গাও জীব জন্তু আজি যে আছ যেখানে,

জগতপুরবাসী সবে গাও অনুরাগে;

মম হৃদয় গাও আজি মিলিয়ে সব সাথে,

ডাক নাথ ডাক নাথ বলি, প্রাণ আমারি ।


—বিষ্ণুরাম চট্টোপাধ্যায

* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

যাবে কিহে দিন আমার বিফলে চলিয়ে

মূলতান—একতাল*


যাবে কিহে দিন আমার বিফলে চলিয়ে।

আছি নাথ, দিবানিশি আশা-পথ নিরখিয়ে।

তুমি ত্রিভুবন-নাথ, আমি ভিখারি অনাথ,

কেমনে বলিব তােমায় ‘এস হে মম হৃদয়ে।

হৃদয় কুটীর দ্বার, খুলে রাখি অনিবার,

কৃপা করে একবার এসে কি জুড়াবে হিয়ে ।


—বেচারাম চট্টোপাধ্যায়



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

সত্যং শিব সুন্দর রূপ ভাতি হৃদিমন্দিরে

কীর্তন—একতাল**


সত্যং শিব সুন্দর রূপ-ভাতি হৃদিমন্দিরে।

নিরখি নিরখি অনুদিন মােরা ডুবিব রূপসাগরে ।

(সে দিন কবে বা হবে; দীনজনের ভাগ্যে নাথ)

জ্ঞান-অনন্তরূপে পশিবে, নাথ, মম হৃদে,

অবাক হইয়ে অধীর মন শরণ লইবে শ্রীপদে।

আনন্দ-অমৃত রূপে উদিবে হৃদয়-আকাশে

চন্দ্র উদিলে জকার যেমন ক্রীড়ায় মন হরষে;

আমরাও নাথ তেমনি করে, মাতিব তব প্রকাশে।

শান্তং শিব অদ্বিতীয় রাজ-রাজ-চরণে,

বিকাইব ওহে প্রাণসখা, সফল করিব জীবনে।

এমন অধিকার কোথা পাব আর স্বর্গভােগ জীবনে ॥ (সশরীরে)

শুদ্ধমপাপবিদ্ধং রূপ হেরিয়া নাথ তােমার,

আলােক দেখিলে আঁধার যেমন যায় পলাইয়া সত্ত্বর,

তেমনি নাথ, তােমার প্রকাশে পলাইবে পাপ আঁধার।

ওহে ধ্রুবতারাসম হৃদে জ্বলন্ত বিশ্বাস হে,

জ্বালি দিয়ে দীনবন্ধু পুরাও মনের আশ;

নিশিদিন প্রেমানন্দে মগন হইয়ে হে,

আপনারে ভুলে যাব, তােমারে পাইয়ে হে ॥

(সে দিন কবে হবে হে)


—পুণ্ডরীকাক্ষ মুখােপাধ্যায়



** স্বরলিপি ঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

প্রভু ম্যয় গােলাম ম্যয় গােলাম ম্যয় গােলাম তেরা

আশবরী—একতাল*


প্রভু ম্যয় গােলাম, ম্যয় গােলাম, ম্যয় গােলাম তেরা।

তু দেওয়ান তু দেওয়ান, তু দেওয়ান মেরা।

দো রােটি, এক লঙ্গোটি তেরে পাস ম্যয় পায়া।

ভগতি ভাব দে আউর, নাম তেরা গাঁবা ।

তু দেওয়ান মেহেরবান নাম তেরা মীরা;

অক্ কি বার দে দীদার মেহর কর ফকীর ।

তু দেওয়ান মেহেরবান নাম তেরা বারেয়া

দাস কবীর শরণ মে আয়া, চরণ লাগে তারেয়া ৷৷


—কবীর



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

গগনময় থাল রবিচন্দ্র দীপক বনে তারকামণ্ডল চমকে মােতি রে

জয়জয়ন্তী—ঝাঁপতাল *


গগনময় থাল রবিচন্দ্র দীপক বনে, তারকামণ্ডল চমকে মােতি রে।

ধূপ মলয়ানিল, পবন চৌরি করে, সকল বন রাই ফুলন্ত জ্যোতি রে ।

ক্যায়সে আরতি হােবে, ভবখণ্ডন তেরি আরতি,

অনাহত শব্দ বাজন্ত ভেরী রে ।

হরি-চরণ-কমল-মকরন্দ লােভিত মন, অনুদিন মােহেয়া পিয়াসা,

কৃপাজল দেও নানক-সারঙ্গ কো হাে যায়ে তেরে নাম বাসা ।


—গুরু নানক



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

দয়াঘন তােমা হেন কে হিতকারী

আশা—কাওয়ালী**


দয়াঘন, তােমা হেন কে হিতকারী?

দুঃখ সুখে সম বন্ধু এমন কে, শােক তাপ ভয়হারী?

সঙ্কটপূরিত ঘাের ভবার্ণব তারে কোন্ কাণ্ডারি;

কার প্রসাদে দূরপরাহত রিপুদল বিপ্লবকারী?

পাপদহন-পরিতাপ নিবারি, কে দেয় শান্তির বারি;

ত্যজিলে সকলে অন্তিমকালে কে লয় ক্রোড় প্রসারি।


—সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর



** ব্রহ্মসঙ্গীত / দিব্যগীতি 

প্রভু মেরে অবগুণ চিত ন ধরাে

ভৈরবী*—যৎ


প্রভু মেরে অবগুণ চিত ন ধরাে।

সমদরশী হৈ নাম তিহারা, চাহে তাে পার করাে ।

ইক লােহা পূজা মে রাখত, ইক রহত ব্যাধঘর পরাে।

পারশ কে মন দ্বিধা নাহী হ্যায়

দুহু এক কাঞ্চন করাে ৷

ইক নদিয়া ইক নার মৈলাে নীর ভরাে;

জ মিলি দোনাে এক বরণ ভয়ে সুরসরি নাম ভয়াে ॥

ইক জীব ইক ব্রহ্ম কহাবত সুরদাস ঝগরাে,

অজ্ঞানাে সে ভেদ হােবে, জ্ঞানী কাহে ভেদ করাে।


—সুরদাস



* খেতড়ি রাজবাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দের অবস্থান কালে, জনৈকা বাঈজী স্বামীজীকে গান শােনাতে আগ্রহ প্রকাশ করায় তিনি গণিকার সঙ্গীত শুনতে অস্বীকার করেন। অনেক পীড়াপীড়ির পর স্বামীজী স্বীকৃত হলে পর বাঈজী এই গানটি শুনিয়ে স্বামীজীকে মােহিত করেন। 

তুঝসে হামনে দিলকো লগায়া, যো কুছ হৈ সাে তুহী হৈ

গজল—ঠুংরী**


তুঝসে হামনে দিলকো লগায়া, যো কুছ হৈ সাে তুহী হৈ।

এক তুকো অপনা পায়, যাে কুছ হৈ সাে তুহী হৈ ।

সবকে মকান দিলকা মকী তু, কৌন সা দিল হৈ জিসমে নহী তু।

হর একদিলমে হৈ তু সমায়া, যাে কুছ হৈ সাে তুহী হৈ ।

ক্যা মলায় ক্যা ইত্সা, ক্যা হিন্দু ক্যা মােসলমান।

জৈসে চাহা তুনে বনায়া, যাে কুছ হৈ সাে তুহী হৈ।

কাবা মে ক্যা, ঔর দেবল মে ক্যা, তেরী পরস্তিশ হােগী সবজা।

সবনে তুঝকো সির হ্যায় ঝুকায়া, যাে কুছ হৈ সাে তুহী হৈ।

অর্শ সে লেকর ফর্শ জমীন্ তক্‌, ঔর জমীন সে অর্শ বরী তক্‌।

যহাঁ র্মৈ দেখা তুহী নজর আয়া, যাে কুছ হৈ সাে তুহী হৈ।

সােচা সমঝা দেখা ভালা তু জ্যাসা ন কোঈ উঁঢ় নিকালা।

অব অহ্ সমঝ মে জাফর কী আয়া, যযা কুছ হৈ সাে তুহী হৈ ৷


জাফর আলী



** স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

পীলে রে অবধূত হাে মালা প্যালা প্রেম হরিরস কা রে

খাম্বাজ-যৎ*


পীলে রে অবধূত হাে মালা, প্যালা প্রেম হরিরস কা রে।

পাপ পুণ্য দো ভুগতন আয়ে, কোন্ তেরা হ্যায় তু কিসকা রে

জো দম জীবে হরি কা গুন গায়েল, ধন যৌবন স্বপন নিশিকা রে ।

বাল অবস্থা খেল গবাই, তরুণ ভয়া নারী বশ কা রে।

বৃদ্ধ ভয়া কফ বায়ুনে ঘেরা, ঘাট পড়া জামন কা রে, .

নাভ কমলমে হ্যায় কস্তুরী, ক্যায়সে ভরম মিটে পশুকা রে।

বিনা সদগুরু নর য়া্সাহি ঢ়ুঁঢ়ে় জ্যায়সা মৃগ ফিরে বকা রে।


—অজ্ঞাত।



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

মন চল নিজ নিকেতনে

সুরট-মল্লার—একতাল*


মন চল নিজ নিকেতনে।

সংসার-বিদেশে, বিদেশীর বেশে, ভ্রম কেন অকারণে?

বিষয় পঞ্চক আর ভূতগণ, সব তাের পর কেহ নয় আপন,

পর-প্রেমে কেন হয়ে অচেতন, ভুলিছ আপন জনে?

সত্য পথে মন কর আরােহণ, প্রেমের আলাে জ্বালি চল অনুক্ষণ,

সঙ্গেতে সম্বল রাখ পুণ্যধন, গােপনে অতি যতনে।

লােভ মােহ আদি পথে দস্যুগণ, পথিকের করে সর্বস্ব মােষণ

পরম যতনে রাখরে প্রহরী শম দম দুই জনে ।

সাধুসঙ্গ নামে আছে পান্থধাম, শ্রান্ত হলে তথা করিবে বিশ্রাম,

পথভ্রান্ত হলে শুধাইবে পথ সে পান্থনিবাসিগণে;

যদি দেখ পথে ভয়েরি আকার, প্রাণপণে দিও দোহাই রাজার,

সে পথে রাজার প্রবল প্রতাপ, শমন ভরে যাঁর শাসনে।


—অযােধ্যানাথ পাকড়াশী


* দক্ষিণেশ্বরে প্রথম মিলনের দিনে স্বামী বিবেকানন্দের মুখে এই গানটি শুনে শ্রীশ্রীঠাকুর মােহিত হয়েছিলেন।

১ পাঠান্তর ঃ হরণ

তুঁহী পরম তীর্থ তুঁহী পরম অর্থ

ইমন-কল্যাণঝাঁপতাল


তুঁহী পরম তীর্থ, তুঁহী পরম অর্থ,

তুঁহী এক অব্যর্থ, যােগীজন গাবে ।

তুঁহী পরশমণি, তুঁহী অনন্তখনি,

সুর নর ঋষি মুনি, সদানন্দ পাবে ।

তুঁহী মহত যশ তুঁহী আদিপুরুষ,

তুঁয়া আদেশ ঈশ পঞ্চভূত ধাবে;

তেরােহী জ্ঞানমে তেরােহী ধ্যানমে,

বিজয়-প্রাণমে সুখ-শান্তি আবে ।


—অজ্ঞাত

তুমি বন্ধু তুমি নাথ নিশিদিন তুমি আমার

মিশ্র জয়জয়ন্তী—একতাল*


তুমি বন্ধু, তুমি নাথ, নিশিদিন তুমি আমার।

তুমি সুখ, তুমি শান্তি, তুমি হে অমৃত পাথার।

তুমি তাে আনন্দ লােক, জুড়াও প্রাণ, নাশ শােক।

তাপ-হরণ, তােমার চরণ, অসীম শরণ দীন জনার।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৪ 

সুন্দর তােমারি নাম দীনশরণ হে

কাফি—ঝাঁপতাল**


সুন্দর তােমারি নাম, দীনশরণ হে;

বরিষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ, ও প্রাণরমণ হে ॥

এক তব নাম ধন, অমৃত-ভবন হে,

অমর হয় সেইজন, যে করে কীর্তন হে ।

গভীর বিষাদরাশি নিমেষে বিনাশে,

যখনি তব নামসুধা শ্রবণে পরশে,

হৃদয় মধুময় তব নাম গানে, হয় যে হৃদয়নাথ চিদানন্দ ঘন হে ॥


—পুণ্ডরীকাক্ষ মুখােপাধ্যায়



** স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

তুমি হে ভরসা মম অকূল পাথারে

কাফিসিন্ধু—ঝাঁপতাল*


তুমি হে ভরসা মম অকূল পাথারে।

আর কেহ নাই যে বিপদভয় বারে, এ আঁধারে যে তারে ॥

এক তুমি অভয়পদ জগত-সংসারে,

কেমনে বল দীনজন ছাড়ে তােমারে ॥

করিয়ে দুঃখ অন্ত সুবসন্ত হৃদে জাগে,

যখনি মম আঁখি তব জ্যোতিঃ নেহারে;

জীবন-সখা তুমি, বাঁচি না তােমা বিনে,

তৃষিত মন প্রাণ মম, ডাকে তােমারে ॥


—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরলিপি ঃ সাধন সঙ্গীত

কে হে তুমি সুন্দর অতি সুন্দর অতি সুন্দর

ভৈরবএকতাল


কে হে তুমি সুন্দর,—অতি সুন্দর, অতি সুন্দর!

কভু নবীন ভানু ভালে, কভু ভূষিত নীরদ-মালে,

কভু বিহগ-কূজিত-কুহক-কণ্ঠে গাহিছ অতি সুন্দর!

কভু নির্মল নীল প্রাতে, কনক-কিরীট মাথে,

অভ্রভেদী অচলাসনে রাজিছ অতি সুন্দর!

কভু পুষ্পিত নভ-কুঞ্জে তব নৈশ বংশী গুঞ্জে;

কভু পীত-জ্যোৎস্না-বসন শ্যাম মূরতি অতি সুন্দর!


—অতুলপ্রসাদ সেন

আর কেন মন এ সংসারে যাই চল সেই নগরে

বাউল—দাদরা


আর কেন মন-এ সংসারে, যাই চল সেই নগরে।

সেথা দিবানিশি পূর্ণশশী আনন্দে বিরাজ করে।

পক্ষ ভেদে ক্ষয় উদয়—নাইকো চঁাদের সে পুরে।

নাই ক্ষুধা তৃষ্ণা ভােগ পিপাসা, পূৰ্ণানন্দ বিহরে ।

সুধাকরে সুধা ক্ষরে, রবি বিষ বিতরে।

মনের মতন চকোর বিনা চাদের সুধা চঁাদ হরে ।

(ও মন) তােমার মতন হয় যে জনা, সেই তাে গরল পান করে।

(আবার) জ্ঞান হারায়ে বিষের জ্বালায় কেবল গতায়াত করে ।

সেই নগরে বাস করে যে প্রেমিক ধন্য কয় তারে।

(তারা) সাকারকে করে নিরাকার, নিরাকার সাকার করে ৷


—প্রেমিক

তােমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা

আলাইয়া—ঝাঁপতাল*


তােমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,

এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা ।

যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো,

আকুল নয়ন জলে ঢালাে গাে কিরণধারা ॥

তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সঙ্গোপনে,

তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল কিনারা।

কখনও বিপথে যদি, ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি

অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

* স্বরবিতান-২৩

আমরা যে শিশু অতি অতিক্ষুদ্র মন

কানাড়া—কাওয়ালী


আমরা যে শিশু অতি, অতিক্ষুদ্র মন—

পদে পদে হয়, পিতা চরণস্থলন ||

রুদ্রমুখ কেন তবে দেখাও মােদের সবে।

কেন হেরি মাঝে মাঝে ভ্রকুটি ভীষণ ॥

ক্ষুদ্র আমাদের 'পরে করিয়াে না রােষ

স্নেহবাক্যে বলাে, পিতা, কী করেছি দোষ।

শতবার লও তুলে, শতবার পড়ি ভুলে

কী আর করিতে পারে দুর্বল যে জন |

পৃথ্বীর ধূলিতে দেব, মােদের ভবন

পৃথ্বির ধূলিতে অন্ধ মােদের নয়ন।

জন্মিয়াছি শিশু হয়ে, খেলা করি ধূলি লয়ে

মােদের অভয় দাও দুর্বলশরণ |

একবার ভ্রম হলে আর কি লবে না কোলে,

অমনি কি দূরে তুমি করিবে গমন।

তা হলে যে আর কভু উঠিতে নারিব প্রভু,

ভূমিতলে চিরদিন রব অচেতন ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(একতাল) চিদাকাশে হল পূর্ণ প্রেমচন্দ্রোদয় হে

কীর্তন—তাল ফেরতা *


(একতাল) চিদাকাশে হল পূর্ণ প্রেমচন্দ্রোদয় হে।

উথলিল প্রেমসিন্ধু কি আনন্দময় হে।

(জয় দয়াময়, জয় দয়াময়, বল জয় দয়াময়)

চারিদিকে ঝলমল করে ভক্ত গ্রহদল,

ভক্তসঙ্গে ভক্তসখা লীলারসময় হে।

(বল জয় দয়াময়, হরি দয়াময়, আনন্দময়ীর জয়)।

স্বর্গের দুয়ার খুলি, আনন্দ-লহরী তুলি;

নববিধান বসন্ত সমীরণ বয়,

(কিবা) তাহে মন্দ মন্দ, ছুটে লীলারস প্রেমগন্ধ,

ঘ্রাণে যােগিবৃন্দ যােগানন্দে মত্ত হয় হে।

(বল জয় দয়াময়, হরি দয়াময়, নববিধানের জয়)

(ঝাঁপতাল) ভবসিন্ধুজলে, বিধান-কমলে, আনন্দময়ী বিরাজে

(কিবা) আবেশে আকুল, ভক্ত অলিকুল, পিয়ে সুধা তার মাঝে।

(খয়রা) দেখ দেখ মায়ের প্রসন্ন বদন, ভুবনমােহন চিত্ত বিনােদন।

পদতলে দলে দলে সাধুগণ, নাচে গায় প্রেমে হইয়ে মগন;

কিবা অপরূপ আহা মরি মরি, জুড়াইল প্রাণ দরশন করি,

প্রেমদাসে বলে সবে পায়ে ধরি, গাও ভাই মায়ের জয় ॥


—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল




* স্বরলিপি ঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত

ভজন পরমাত্মাকে করলেরে

কল্যাণ—কাওয়ালী


ভজন পরমাত্মাকে করলেরে।

আদি অনাদিকো মন মে সুমর লেরে ॥

ব্রহ্মাকো ভুল করকে, ভ্রম মে ভুল রহত,

ঈশ জগদীশ কো ধ্যান ধরে পাপ গরে ॥


—অজ্ঞাত

অসীম রহস্য মাঝে কে তুমি মহিমাময়

সারঙ্গ—ঝাঁপতাল*


অসীম রহস্য মাঝে কে তুমি মহিমাময়।

জগত শিশুর মত চরণে ঘুমা’য়ে রয় ।

অভিমান অহঙ্কার মুছে গেছে নাহি আর,

ঘুচে গেছে শােক তাপ, নাহি দুঃখ নাহি ভয়

কোটি রবি শশী তারা, তােমাতে হয়েছে হারা,

অযুত কিরণ-ধারা তােমাতে পাইছে লয় ।


—বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৪ 

মন্দিরে মম কে আসিল হে! সকল গগন অমৃতমগন

আড়ানা—একতাল


মন্দিরে মম কে আসিল হে! সকল গগন অমৃতমগন,

দিশি দিশি গেল মিশি, অমানিশি দূরে-দূরে ॥

সকল দুয়ার আপনি খুলিল, সকল প্রদীপ আপনি জ্বলিল,

সব বীণা বাজিল নব নব সুরে সুরে ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অখিল ব্রহ্মাণ্ড পতি প্রণমি চরণে তব

মিশ্র ঝিঁঝিট—ঝাঁপতাল*


অখিল ব্রহ্মাণ্ড পতি, প্রণমি চরণে তব,

প্রেম-ভক্তিভরে শরণ লাগি।

দুর্মতি দূর করি শুভ মতি দাও হে,

এই বরদান ভগবান মাগি ।

ঘাের নিষ্ঠুর রিপু অন্তরে বাহিরে

ভীত অতি আমি এ অন্ধকারে।

দীন-বৎসল তুমি তার নিজ সেবকে,

তব অভয় মূরতি ভয় নিবারে ।

বিষয়-মােহাৰ্ণবে মগন হয়ে ডাকি হে,

দীনহীনে প্রভু রাখাে রাখাে।

তব কৃপা যে লভে,

কি ভয় ভব-সঙ্কটে,

কাটি যাবে বিপদ লাখাে লাখাে ৷৷


—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* গানখানি অন্যভাবেও গাওয়া হয়।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না

কাফি-সিন্ধু—যৎ**


মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না? ॥

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে,     তােমারে দেখিতে দেয় না।

(মােহ মেঘে তােমাদের দেখিতে দেয় না।

অন্ধ করে রাখে, তােমারে দেখিতে দেয় না।)

ক্ষণিক আলােকে     আঁখির পলকে     তােমায় যবে পাই দেখিতে,

ওহে ‘হারাই হারাই’    সদা হয় ভয়,        হারাইয়া ফেলি চকিতে ৷

(আশ না মিটিতে হারাইয়া—পলক না পড়িতে হারাইয়া

হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া ফেলি চকিতে)

কি করিলে বল        পাইব তােমারে,     রাখিব আঁখিতে আঁখিতে

ওহে এত প্রেম আমি     কোথা পাব নাথ,     তােমারে হৃদয়ে রাখিতে?

(আমার সাধ্য কি তােমারে দয়া না করিলে কে পারে—-

তুমি আপনি না এলে কে পারে হৃদয়ে রাখিতে।)

আর কারাে পানে    চাহিব না আর,     করিব হে আমি প্রাণপণ।

তুমি যদি বল         এখনি করিব         বিষয়-বাসনা বিসর্জন ॥

(দিব শ্রীচরণে বিষয়—দিব অকাতরে বিষয়

দিব তােমার লাগি বিষয় বাসনা বিসর্জন।)


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



** স্বরবিতান-২৩ 

প্রেমানন্দে রাখ পূর্ণ আমারে দিবস রাত

সিন্ধু—একতাল*


প্রেমানন্দে রাখ পূর্ণ আমারে দিবস রাত,

বিশ্বভুবনে নিরখি সতত সুন্দর তােমারে;

চন্দ্রসূর্য-কিরণে তােমার করুণ-নয়নপাত ।

সুখ-সম্পদে করি হে পান তব প্রসাদবারি।

দুঃখ-সঙ্কটে পরশ পাই তব মঙ্গল হাত।

জীবনে জ্বাল অমর দীপ তব অনন্ত আশা।

মরণ অন্তে হউক তােমারি চরণে সুপ্রভাত।

লহাে লহাে মাের সব আনন্দ, সকল প্রীতি গীতি।

হৃদয়ে বাহিরে একমাত্র তুমি আমার নাথ |


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান-২৩ 

দেখিলে তােমার সেই অতুল প্রেম আননে

বাহার—একতাল*


দেখিলে তােমার সেই অতুল প্রেম-আননে,

কি ভয় সংসার-শােক, ঘাের বিপদ-শাসনে ॥

অরুণ উদয়ে আঁধার যেমন যায় জগত ছাড়িয়ে,

তেমনি দেব, তােমার জ্যোতি মঙ্গলময় বিরাজিলে;

ভকত-হৃদয় বীতশােক তােমার মধুর সান্ত্বনে।

তােমার করুণা, তােমার প্রেম, হৃদয়ে প্রভু ভাবিলে,

উথলে হৃদয়, নয়ন-বারি রাখে কে নিবারিয়ে;

জয় করুণাময়, জয় করুণাময়, তােমার প্রেমে গাইয়ে,

যায় যদি যাক্ প্রাণ তােমার কর্ম সাধনে ॥


-গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরলিপি : দিব্যগীতি 

(ওহে) রাজারাজেশ্বর দেখা দাও

কানাড়া—কাওয়ালী


(ওহে) রাজারাজেশ্বর দেখা দাও।

করুণা ভিখারী আমি, করুণ-নয়নে চাও।

চরণে উৎসর্গ দান,

করিয়াছি এই প্রাণ,

সংসার-অনলকুণ্ডে ঝলসি গিয়াছে তাও।

কলুষ কলঙ্কে ভরা অবারিত এ হৃদয়

মােহে মুগ্ধ-মৃতপ্রায় হয়ে আছি দয়াময়,

মৃতসঞ্জীবনী দানে শােধন করিয়া লেও।


—স্বর্ণকুমারী ঘােষাল

দেহ জ্ঞান দিব্য জ্ঞান দেহ প্রীতি শুদ্ধা প্রীতি

আলাহিয়া—একতাল*


দেহ জ্ঞান, দিব্য জ্ঞান, দেহ প্রীতি, শুদ্ধা প্রীতি,

তুমি মঙ্গল-আলয়, (ওহে) তুমি মঙ্গল-আলয়।

ধৈর্য দেহ, বীর্য দেহ, তিতিক্ষা সন্তোষ দেহ,

বিবেক বৈরাগ্য দেহ, দেহ ও পদে আশ্রয়।

ওহে, দেহ ও পদে আশ্রয় ।


—মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ



* স্বরলিপি : দিব্যগীতি 

বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা

লচ্ছাসার—ঝাঁপতাল **


বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা।

বাজে অসীম নভেমাঝে অনাদি রব, জাগে অগণ্য রবি-চন্দ্র-তারা ।

একক অখণ্ড-ব্রহ্মাণ্ড-রাজ্যে পরম এক সেই রাজ-রাজেন্দ্র-রাজে।

বিস্মিত-নিমেষহত বিশ্ব চরণে বিনত, লক্ষশত ভক্তচিত বাক্যহারা ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



** স্বরবিতান-২২ 

বিশ্ব ব্যাপিয়া বিরাজিছ যদি পাই না কেন হে ডাকিয়া

কালেংড়া—একতাল


বিশ্ব ব্যাপিয়া বিরাজিছ যদি, পাই না কেন হে ডাকিয়া,

অন্ধ নয়ন হেরে না তােমারে, কে রেখেছে আঁখি ঢাকিয়া ॥

খুলে দাও আঁখি মায়ার বন্ধন, ঢালিতে ভকতি-কুসুম-চন্দন,

যেন শান্তি-সুধা লভে এ জীবন, তােমার চরণ পূজিয়া ॥

ডুবে যায় রবি নাহি আর বেলা, পারি না খেলিতে মিছে ধূলা খেলা,

লভিতে চরণ আকুল এ মন, দেখা দাও হৃদে আসিয়া।


—অজ্ঞাত

নাথ তুমি সর্বস্ব আমার প্ৰাণাধার সারাৎসার

আলাহিয়া—একতাল*


নাথ তুমি সর্বস্ব আমার, প্ৰাণাধার সারাৎসার।

নাহি তােমা বিনে কেহ ত্রিভুবনে, বলিবার আপনার ।

তুমি সুখ শান্তি সহায় সম্বল, সম্পদ ঐশ্বর্য জ্ঞান বুদ্ধিবল,

তুমি বাসগৃহ, আরামের স্থল, আত্মীয় বন্ধু পরিবার ।

তুমি ইহকাল, তুমি পরিত্রাণ, তুমি পরকাল, তুমি স্বর্গধাম,

তুমি শাস্ত্রবিধি, গুরু কল্পতরু, অনন্ত সুখের আধার।

তুমি হে উপায়, তুমি হে উদ্দেশ্য, তুমি স্রষ্টা পাতা, তুমি হে উপাস্য,

দণ্ডদাতা পিতা, স্নেহময়ী মাতা, ভবার্ণবে কর্ণধার ।


—গগনচন্দ্র হােম



*স্বরলিপি : দিব্যগীতি 

আমার মাথা নত করে দাও হে তােমার চরণ ধূলার তলে

ইমন কল্যাণ—তেওড়া


আমার মাথা নত করে দাও হে তােমার চরণ-ধূলার-তলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে ।

নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান,

আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে ৷

আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,

তােমারই ইচ্ছা করহে পূর্ণ আমার জীবন মাঝে।

যাচি হে তােমার চরম শান্তি পরাণে তােমার পরম কান্তি,

আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও হৃদয় পদ্ম-দলে ৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুমি নাহি দিলে দেখা কে তােমায় দেখিতে পায়

জয়জয়ন্তী—ঝাঁপতাল


তুমি নাহি দিলে দেখা, কে তােমায় দেখিতে পায় ?

তুমি না ডাকিলে কাছে, সহজে কি চিত ধায় ?

তুমি পূর্ণ পরাৎপর, তুমি অগম্য অপার,

ওহে নাথ, সাধ্য কার, ধ্যানেতে ধরে তােমায় ॥

মনেরে বুঝাই এত তুমি বাক্যমনাতীত,

তবু প্রাণ ব্যাকুলিত, তােমারে দেখিতে চায়।

দিয়ে দীনে দরশন, কর হে দুঃখ মােচন,

ওহে লজ্জানিবারণ, শীতল কর হৃদয়।


—বেচারাম চট্টোপাধ্যায়

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে

ভৈরবী—তিনতাল


খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।

প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা, নিরজনে প্রভু নিরজনে।

শূন্যে মহা আকাশে, (তুমি) মগ্ন লীলা বিলাসে,

ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু নিরজনে।

তারকা রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী!

পড়িয়া আছে, রাঙা পায়ের কাছে, রাশি রাশি;

নিত্য তুমি হে উদার, সুখে দুখে অবিকার,

হাসিছ খেলিছ তুমি আপন মনে নিরজনে প্রভু, নিরজনে।


—কাজী নজরুল ইসলাম

ব্যাকুল অন্তর মম দরশন চাহে (তােমারি)

ভৈরব—ঝাঁপতাল


ব্যাকুল অন্তর মম দরশন চাহে (তােমারি)।

বিহনে তােমারে নাথ প্রাণ যে দহে ॥

দিবস-রজনী, নাথ, সহিতেছে যাতনা।

তুমি নাকি দিলে দেখা সব দুঃখ যায় হে ।

তাই, প্রভু, বড় আশে এসেছি তব দুয়ারে;

পরশে শীতল কর নিরমল কর হে ॥

অভিষিক্ত কর মােরে তব জ্যোতি প্রকাশিয়ে

শূন্য হৃদয়ে মম তুমি, দেব, এস হে।


—অজ্ঞাত

অন্তর মম বিকশিত করাে অন্তরতর হে

ভৈরবী—একতাল*


অন্তর মম বিকশিত করাে অন্তরতর হে—

নির্মল করাে উজ্জ্বল করাে, সুন্দর করাে হে ॥

জাগ্রত করাে, উদ্যত করাে, নির্ভয় করাে হে।

মঙ্গল করাে, নিরলস নিঃসংশয় করাে হে ।

যুক্ত করাে হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করাে হে বন্ধ,

সঞ্চার করাে সকল কর্মে, শান্ত তােমার ছন্দ ৷৷

চরণ-পদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত কর হে।

নন্দিত করাে, নন্দিত করাে, নন্দিত করাে হে ৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-২৪ 

তােমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ করুণাময় স্বামী

ভৈরবী—একতাল*


অন্তর মম বিকশিত করাে অন্তরতর হে—

নির্মল করাে উজ্জ্বল করাে, সুন্দর করাে হে ॥

জাগ্রত করাে, উদ্যত করাে, নির্ভয় করাে হে।

মঙ্গল করাে, নিরলস নিঃসংশয় করাে হে ।

যুক্ত করাে হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করাে হে বন্ধ,

সঞ্চার করাে সকল কর্মে, শান্ত তােমার ছন্দ ৷৷

চরণ-পদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত কর হে।

নন্দিত করাে, নন্দিত করাে, নন্দিত করাে হে ৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-২৫ 


তােমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে বাজে যেন সদা বাজে গাে

ইমন-কল্যাণ—তেওরা**


তােমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে বাজে যেন সদা বাজে গাে।

তােমারি আসন হৃদয়পদ্মে রাজে যেন সদা রাজে গাে ॥

তব নন্দন-গন্ধ-মােদিত ফিরি সুন্দর ভুবনে;

তব পদ-রেণু মাখি লয়ে তনু, সাজে যেন সদা সাজে গাে ॥

সব বিদ্বেষ দূরে যায় যেন তব মঙ্গল মন্ত্রে,

বিকাশে মাধুরী হৃদয়ে বাহিরে তব সঙ্গীত-ছন্দে

তব নির্মল নীরব হাস্য হেরি অম্বর ব্যাপিয়া,

তর গৌরবে সকল গর্ব লাজে যেন সদা লাজে গাে ॥

    

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* * স্বরবিতান-৪ 

নিশীথ-শয়নে ভেবে রাখি মনে, ওগাে অন্তরযামী

বাগেশ্রী—তেওড়া*


নিশীথ-শয়নে ভেবে রাখি মনে, ওগাে অন্তরযামী,

প্রভাতে প্রথম নয়ন মেলিয়া তােমারে হেরিব আমি

ওগাে অন্তরযামী ।

জাগিয়া বসিয়া শুভ্র আলােকে তােমার চরণে নমিয়া পুলকে

মনে ভেবে রাখি দিনের কর্ম তােমারে সঁপিব স্বামী

ওগাে অন্তরযামী ।

দিনের কর্ম সাধিতে সাধিতে, ভেবে রাখি মনে মনে,

কর্ম-অন্তে সন্ধ্যাবেলায় বসিব তােমারই সনে।

দিবা অবসানে ভাবি বসে ঘরে, তােমার নিশীথ-বিরাম-সাগরে,

শ্রান্ত প্রাণের ভাবনা বেদনা নীরবে যাইবে নামি।

ওগাে অন্তরযামী।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-২২

প্রাণারাম প্রাণারাম প্রাণারাম

জয়জয়ন্তী মিশ্র—ঝাঁপতাল**


প্রাণারাম, প্রাণারাম, প্রাণারাম!

কি যেন লুকানাে নামে, (তাই) মিষ্ট এত তব নাম।

নাম-রসে ডুবে থাকি, ব্রহ্মাণ্ড সুন্দর দেখি,

বিশ্বে বহে প্রেম-নদী, সুধার-ধারা অবিরাম।

(তুমি) নামে ভুলায়েছ যারে, সে কি যেতে পারে দূরে,

নাম-রসে যে মজেছে, সে বুঝেছে কি আরাম।

আমারে ভুলায়ে রাখ, হৃদি আলাে করে থাক,

জীবনে মরণে মম তুমি চির সুখ-ধাম।


—মনােমােহন চক্রবর্তী




** স্বরলিপি  ঃ দিব্যগীতি

আলাের দেশের যাত্রী মােরা মহা ভাগ্যবান

ভৈরবী-দাদরা


আলাের দেশের যাত্রী মােরা মহা ভাগ্যবান।

আলাের তরে অবহেলে সঁপি আপন প্রাণ।

অন্ধকারে পাছে রেখে চলছি মােরা আলাের দিকে,

মানি নাকো কোন বাধা আনতে নব জ্ঞান ।

সত্য মােদের নিত্য সাথী,

প্রাণটা সবার ব্যথার ব্যথী;

ভয়ের মাথায় মারি লাথি রাখতে আপন মান।

সত্য রাজার সৈন্য মােরা, রাজ্য যাঁহার বিশ্বজোড়া,

শাসন যাঁহার প্রেমে ভরা, নামটি ভগবান ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত সচ্চিদানন্দরূপ

মুলতান—চৌতাল


নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত সচ্চিদানন্দরূপ;

জাকো না কছু উপাধি পার ব্রহ্ম অত অনুপ।

সকল জগত উপাদান, মূল প্রকৃতি হ্যায় নিদান;

জাকো সংযােগ জনিত, ব্যক্ত হােত নামরূপ।

মায়া সঙ্গত ঈশ্বর, একহু অনেক হােত;

ভােগত অদৃষ্টজফল, জাকো জ্যায়সে হি করম।

স্বপ্নাবস্থিত রহে জীব, হেম পূর্ব হােত গর্ভ;

জাগ্রত বৈশ্বানর নীত হররঙ্গ বৰ্ণত স্বরূপ।


—অজ্ঞাত

যদি এ আমার হৃদয় দুয়ার বন্ধ রহে গাে কভু

সিন্ধুভৈরবী—একতাল *


যদি এ আমার হৃদয়-দুয়ার বন্ধ রহে গাে কভু

দ্বার ভেঙ্গে তুমি এস মাের প্রাণে, ফিরিয়া যেয়াে না প্রভু।

যদি কোন দিন এ বীণার তারে তব প্রিয় নাম নাহি ঝঙ্কারে,

দয়া করে তবু রহিও দাঁড়ায়ে, ফিরিয়া যেয়াে না প্রভু।

যদি কোন দিন তােমার আহ্বানে সুপ্তি আমার চেতনা না মানে

বজ্ৰ-বেদনে জাগায়াে আমারে, ফিরিয়া যেয়াে না প্রভু।

যদি কোন দিন তােমার আসনে আর কাহারেও বসাই যতনে,

চিরদিবসের হে রাজা আমার, ফিরিয়া যেয়াে না প্রভু।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান-২৭ 

আজি কি পুলকে নাচে হিয়া

আসােয়ারী—একতাল


আজি কি পুলকে নাচে হিয়া।

মহা মিলনের মােহন বাঁশরী নিখিলে উঠিল বাজিয়া |

দূরে গেল যত ধরম দ্বন্দ্ব, টুটিল সন্দ স্বার্থ-বন্ধ,

আজি আনন্দ, আজি আনন্দ, কার প্রেম-মুখ হেরিয়া ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জানি তুমি মঙ্গলময় প্রতি পলকে পাই পরিচয়

কাফি—কাওয়ালী**


জানি তুমি মঙ্গলময়, প্রতি পলকে পাই পরিচয়।

সুখে রাখ দুখে রাখ, যে বিধান হয়, কিছুতেই নাহি ভয়।

আর যাই কর প্রভু, মােরে ত্যজিবে না কভু,

এই মাের ভরসা; এস প্রভু, এস প্রভু, হৃদয় মাঝে

শুভ হবে নিশ্চয় ॥


—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর




** ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৪  

এ কী এ সুন্দর শােভা! কী মুখ হেরি এ

ইমন-ভূপালী—তিনতাল*


এ কী এ সুন্দর শােভা! কী মুখ হেরি এ!

আজি মাের ঘরে আইল হৃদয়নাথ, প্রেম উৎস উথলিল আজি ।

বলাে হে প্রেমময় হৃদয়ের স্বামী, কি ধন তােমারে দিব উপহার?

হৃদয় প্রাণ লহাে লহাে তুমি, কী বলিব;

যাহা কিছু আছে মম সকলি লও হে নাথ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর




* স্বরবিতান-২৩

(তুই) পূজার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখিস্ হৃদয় দেউল মাঝে

কাফি-সিন্ধু—তেওরা


(তুই) পূজার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখিস্ হৃদয়-দেউল মাঝে।

ভক্তি-প্রেমের ধূপটী জ্বালাস, নিত্য সকাল সাঁঝে।

পাবি যেদিন দুঃখ ব্যথা, দেবতারি পায় নােয়াস্ মাথা,

বলিস্ “তােমার ইচ্ছা ফলুক, আমার জীবন মাঝে।

আপনাকে তার ভৃত্য রাখিস, তঁাকে করিস্ রাজা,

তার তরে তুই আসন পাতিস, ফুলের মালা সাজা।

তবু যদি দেখা না পাস্ চোখের জলে বেদন জানাস

বলিস্ “প্রিয়! তােমার তরে এ দেহে প্রাণ আছে ৷”


—নির্মল কুমার বড়াল

তুমি নির্মল কর মঙ্গলকরে মলিন মর্ম মুছায়ে

ভৈরবী—একতাল *


তুমি, নির্মল কর, মঙ্গলকরে মলিন মর্ম মুছায়ে;

তব, পুণ্য কিরণ দিয়ে যাক্, মাের মােহ-কালিমা ঘুচায়ে।

লক্ষ্য শূন্য লক্ষ্য বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে,

জানি না কখন ডুবে যাবে কোন্ অকূল গরল পাথারে।

প্রভু, বিশ্ব-বিপদহন্তা, তুমি দাঁড়াও রুধিয়া পন্থা,

তব শ্রীচরণতলে নিয়ে এস মাের মত্ত-বাসনা গুছায়ে ।

আছ, অনল অনিলে, চির নভােনীলে, ভূধরসলিলে, গহনে,

আছ, বিটপিলতায়, জলদের গায়, শশীতারকায় তপনে;

আমি, নয়নে বসন বাঁধিয়া, বসে, আঁধারে মরিগাে কঁদিয়া;

আমি, দেখি নাই কিছু বুঝি নাই কিছু, দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে ।


—রজনীকান্ত সেন



*ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-২

আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করেছ গর্ব করিতে চূর

মিশ্র ইমন-কল্যাণ—একতাল**


আমায়, সকল রকমে কাঙ্গাল করেছ—গর্ব করিতে চূর;

(তাই) যশঃ ও অর্থ, মান ও স্বাস্থ্য, সকলি করেছে দূর।

ঐগুলি সব মায়াময় রূপে, ফেলেছিল মােরে অহমিকা কূপে;

তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল করেছ দীন আতুর;

আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করিয়া গর্ব করিতে চুর ॥

যায়নি এখনাে দেহাত্মিকা-মতি, এখনও কি মায়া দেহটার প্রতি,

এই, দেহটা যে ‘আমি’, এই ধারণায় হয়ে আছি ভরপুর;

তাই সকল রকমে কাঙ্গাল করিয়া গর্ব করিছে চুর

ভাবিতাম, “আমি লিখি বুঝি বেশ, আমার সঙ্গীত ভালবাসে দেশ,

তাই, বুঝিয়া দয়াল ব্যাধি দিলে মােরে, বেদনা দিলে প্রচুর,

আমায়, কত না যতনে শিক্ষা দিতেছে গর্ব করিতে চুর ॥


—রজনীকান্ত সেন




** রজনীকান্তের গানের স্বরলিপি দ্রষ্টব্য। 

আমি তাে তােমারে চাহিনি জীবনে তুমি অভাগারে চেয়েছ

মিশ্র-কানাড়া—একতাল*


আমি তাে তােমারে চাহিনি জীবনে, তুমি অভাগারে চেয়েছ;

আমি না ডাকিতে, হৃদয় মাঝারে নিজে এসে দেখা দিয়েছ।

চির আদরের বিনিময়ে, সখা, চির অবহেলা পেয়েছ;

(আমি) দূরে ছুটে যেতে, দু’হাত পসারি’, ধরে টেনে কোলে নিয়েছ!

“ও পথে যেও না, ফিরে এস,” বলে কানে কানে কত কয়েছ;

(আমি) তবু চলে গেছি; ফিরায়ে আনিতে পাছে পাছে ছুটে গিয়েছ।

(এই) চির অপরাধী পাতকীর বােঝা হাসিমুখে তুমি ব’য়েছ;

(আমার) নিজ হাতে গড়া বিপদের মাঝে, বুকে করে নিয়ে রয়েছ।


—রজনীকান্ত সেন



* রজনীকান্তের গানের স্বরলিপি দ্রষ্টব্য। 

আনন্দ বদনে বল মধুর ব্রহ্মনাম


কীর্তন-খেমটা


আনন্দ বদনে বল মধুর ব্রহ্মনাম।

নামে উথলিবে সুধাসিন্ধু, পিয়ে অবিরাম।

(পান কর আর দান কর হে)।

যদি হয় কখন শুষ্ক হদয়, করাে নাম গান।

(বিষয়-মরীচিকায় পড়ে হে) (প্রেমে হৃদয় সরস হবে হে)

(দেখ যেন ভুল না রে, সেই মহামন্ত্র)।

(বিপদকালে ডেকো তারে দয়াল পিতা ব’লে)।

সবে হুঙ্কারিয়ে ছিন্ন কর পাপের বন্ধন।

(“জয় ব্রহ্ম জয়’ বলে হে)।

এস ব্রহ্মানন্দে মাতি সবে হই পূর্ণকাম।

(প্রেমযােগে যােগী হয়ে হে)।


—পুণ্ডরীকাক্ষ মুখােপাধ্যায়

কবে আমি বাহির হলেম তােমারি গান গেয়ে

ইমন-কল্যাণ—তেওরা*


কবে আমি বাহির হলেম তােমারি গান গেয়ে

সে তাে আজকে নয়, সে আজকে নয়।

ভুলে গেছি কবে থেকে আসছি তােমায় চেয়ে

সে তাে আজকে নয়, সে আজকে নয় ॥

ঝরনা যেমন বাহিরে যায়, জানে না সে কাহারে চায়,

তেমনি করে ধেয়ে এলেম জীবন-ধারা বেয়ে

সে তাে আজকে নয়, সে আজকে নয় ।

কতই নামে ডেকেছি যে, কতই ছবি এঁকেছি যে,

কোন আনন্দে চলেছি তার ঠিকানা না পেয়ে

সে তাে আজকে নয়, সে আজকে নয়।

পুষ্প যেমন আলাের লাগি, না জেনে রাত কাটায় জাগি,

তেমনি তােমার আশায় আমার হৃদয় আছে ছেয়ে-

সে তাে আজকে নয়, সে আজকে নয় ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৩৭

কবে জীবন কুঞ্জে আনিয়া বিছাবে তােমারি আসনখানি

দেশ—একতাল


কবে জীবন-কুঞ্জে আনিয়া বিছাবে তােমারি আসনখানি।

হৃদি-মন-তারে বাজিয়া উঠিবে তােমার অমৃত বাণী ॥

কবে সবার মাঝারে তােমারে দেখিব,

তােমারে পূজিতে সবারে পূজিব,

ব্যথিত-বেদনা জাগাব পরাণে তােমারি বেদনা জানি।

কবে তােমারি পরশে জড়তা ঘুচিবে,

তােমারি আলােকে চেতনা ডুবিবে,

আমার আমিরে তুলিয়া লইবে তােমার চরণে টানি ॥


—রমেশ রায়

য়হ্ জগমে আয়া নরধারী মানুষী তন্ কেঁউ শুধ্ ভজনা

ইমন-কল্যাণ—তিনতাল।


য়হ্ জগমে আয়া নরধারী, মানুষী তন্ কেঁউ শুধ্  ভজনা।

মূঢ় ভঁয়াে যাচে বিষয়াদি জৈ হােবে অপযশ রটনা।

অবতাে কাহেকো দিন গোয়াবে জগদীশ্বর কো কেঁউ নহি রটনা।

মমে ইয়াদ করকে দেখাে ঈশ্বর বিন নেহি কোই অপনা।


অজ্ঞাত

বিপদ ভয় বারণ যে করে ওরে মন

ছায়ানট—ঝাঁপতাল*


বিপদ-ভয়-বারণ যে করে ওরে মন

তারে কেন ডাকো না।

মিছা ভ্রমে ভুলে সদা রয়েছ ভব-ঘােরে মজি,

এ কি বিড়ম্বনা।

এ ধন জন না রবে হেন,

হে যেন ভুলাে না,

ছাড়ি অসার ভজহ সার, যাবে ভব যাতনা।

এখন হিত-বচন শােন যতনে করি ধারণা,

বদন ভরি নাম হরি কর সতত ঘােষণা;

যদি এ ভবে পার হবে, ছাড় বিষয়-কামনা

সঁপিয়ে তনু হৃদয় মন, তার কর সাধনা।


—যদু ভট্ট


* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৪

আর ঘুমাইওনা মন মায়াঘােরে কতদিন রবে অচেতন

টোড়ি-ভৈরবী—একতাল


আর ঘুমাইওনা মন। মায়াঘােরে কতদিন রবে অচেতন।

কে তুমি কি হেতু এলে, আপনারে ভুলে গেলে,

চাহরে নয়ন মেলে, ত্যজ কুস্বপন ॥

রয়েছাে অনিত্য ধ্যানে, নিত্যানন্দে হের প্রাণে,

তমাে পরিহরি হেরাে তরুণ তপন।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

সব দুঃখ দূর করিলে দরশন দিয়ে মােহিলে প্রাণ

আশাবরী-ঝাঁপতাল*


সব দুঃখ দূর করিলে

দরশন দিয়ে মােহিলে প্রাণ।

সপ্তলােক ভুলে শােক,

তােমারে পাইয়ে-

কোথায় আমি অতি দীন হীন।


—অজ্ঞাত


*স্বামী বিবেকানন্দ গীত

ওগাে কে তুমি আমারে বল

ভূপালী মিশ্র—একতাল


ওগাে কে তুমি আমারে বল ?

কেন অযাচিতভাবে ফের পাছে পাছে বিপদেতে আগে চল ।

ডাকি না তােমারে তবু তুমি আস, চাই না তােমারে তবু ভালবাস,

জেনেছি আমার হৃদয় আকাশ তােমারি আভায় আলাে।

কভু স্বামী কভু সখারূপ ধরে, মা হয়ে কখন আস স্নেহভরে,

তােমাধনে ধনী নয় গাে যে জন (তার) জনম বিফলে গেল ।


—অজ্ঞাত

গাওরে আনন্দময়ীর নাম দিবানিশি অবিরাম

লুম্ ঝিঝিট—ঠুংরি


গাওরে আনন্দময়ীর নাম দিবানিশি অবিরাম।

ওরে আমার একতন্ত্রী, প্রাণের আরাম।

একাকী বিরলে ব’সে, ডুবে যােগানন্দরসে,

দেখ সে রূপ অনিমেষে হৃদে স্বর্গধাম।

অভয়ার অভয়চরণ, হৃদয়ে করিয়ে ধারণ,

পরিহর চতুর্বর্গ ধর্ম অর্থ কাম ।


—ত্রৈলােক্যনাথ সান্যাল

দিবানিশি করিয়া যতন হৃদয়েতে রচেছি আসন

ধুনকাওয়ালি*


দিবানিশি করিয়া যতন

হৃদয়েতে রচেছি আসন—

জগতপতি হে, কৃপা করি হেথা কি করিবে আগমন।

অতিশয় বিজন এ ঠাই, কোলাহল কিছু হেথা নাই-

হৃদয়ের নিভৃত নিলয় করেছি যতনে প্রক্ষালন।

বাহিরের দীপ রবি তারা ঢালে না সেথায় করধারা—

তুমিই করিবে শুধু, দেব, সেথায় কিরণবরিষণ।

দূরে বাসনা চপল, দূরে প্রমােদ-কোলাহল

বিষয়ের মান অভিমান করেছে সুদূরে পলায়ন।

কেবল আনন্দ বসি সেথা, মুখে নাই একটিও কথা—

তােমারি সে পুরােহিত, প্রভু, করিবে তােমারি আরাধন—

নীরবে বসিয়া অবিরল চরণে দিবে সে অশ্রুজল,

দুয়ারে জাগিয়া রবে একা মুদিয়া সজল দুনয়ন |


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৪৫

অনন্ত হয়েছ ভালই করেছ থাক চিরদিন অনন্ত অপার

ভৈরবীু-পিল —[একতাল] চৌতাল*


অনন্ত হয়েছ ভালই করেছ, থাক চিরদিন অনন্ত অপার।

ধরা যদি দিতে ফুরাইয়া যেতে, তােমারে ধরিতে কে চাহিত আর ।

ভুলায়েছ যারে তব প্রলােভনে, সে কি ক্ষান্ত হবে তব অন্বেষণে ?

না পায় না পাবে, যায় প্রাণ যাবে, কভু কি ফুরাবে অন্বেষণ তার?

যত পাছে পাছে ছুটে যাব আমি,

তত আরাে আরাে দূরে রবে তুমি,

যতই না পাব, তত পেতে চাব, ততই বাড়িবে পিপাসা আমার ।

আদর্শ তােমারে দেখিব যত,

তােমার স্বভাব পেয়ে হব তােমার মতাে;

ফুরাবে না তুমি, ফুরাব না আমি, তােমাতে আমাতে হব একাকার।


—কালীনাথ ঘােষ


*ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৫

সকল গর্ব দূর করি দিব তােমার গর্ব ছাড়িব না

আড়ানা-একতাল**


সকল গর্ব দূর করি দিব, তােমার গর্ব ছাড়িব না।

সবারে ডাকিয়া কহিব যেদিন পাব তব পদরেণুকণা।

তব আহ্বান আসিবে যখন সে কথা কেমনে করিব গােপন!

সকল বাক্যে সকল কর্মে প্রকাশিবে তব আরাধনা ।

যত মান আমি পেয়েছি যে কাজে সে দিন সকলি যাবে দূরে;

শুধু তব মান দেহে মনে মাের বাজিয়া উঠিবে এক সুরে।

পথের পথিক সে-ও দেখে যাবে, তােমার বারতা মাের মুখভাবে,

ভব-সংসার-বাতায়ন-তলে বসে রব যবে আনমনা ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



** স্বরবিতান—২৩

তােমারি নাম বলব আমি বলব নানা ছলে

বেহাগ—কাহারবা*


তােমারি নাম বলব, আমি বলব নানা ছলে

(আমি) ব’লব একা বসে আপন মনের ছায়া তলে ।

ব’লবাে বিনা ভাষায়, বলবাে বিনা আশায়,

বলবাে মুখের হাসি দিয়ে, ব’লবাে চোখের জলে ।

বিনা-প্রয়ােজনের ডাকে ডাকবাে তােমার নাম,

সেই ডাকে মাের শুধু শুধুই পূরবে মনস্কাম।

শিশু যেমন মাকে,

নামের নেশায় ডাকে,

বলতে পারে এই সুখেতেই মায়ের নাম সে বলে ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান—৪০

তােমারি গেহে পালিছ স্নেহে তুমিই ধন্য ধন্য হে

খাম্বাজ—একতাল**


তােমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমিই ধন্য ধন্য হে।

আমার প্রাণ তােমারি দান, তুমিই ধন্য ধন্য হে ॥

পিতার বক্ষে রেখেছ মােরে, জনম দিয়েছ জননী-ক্রোড়ে,

বেঁধেছ সখার প্রণয়-ডােরে, তুমিই ধন্য ধন্য হে ৷৷

তােমার বিশাল বিপুল ভুবন করেছ আমার নয়ন লােভন,

নদী গিরি বন সরসশােভন, তুমিই ধন্য ধন্য হে ৷৷

হৃদয়ে বাহিরে স্বদেশে বিদেশে যুগে যুগান্তে নিমেষে নিমেষে,

জনমে মরণে শােকে আনন্দে তুমিই ধন্য ধন্য হে ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর




** স্বরবিতান-৪

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে আমি পাইনি

গৌড়সারঙ্গ—একতাল*


আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে আমি পাইনি।

তােমায় দেখতে আমি পাইনি।

বাহির পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানেই চাইনি।

আমার সকল ভালবাসায় সকল আঘাত সকল আশায়

তুমি ছিলে আমার কাছে, তােমার কাছে যাইনি।

তুমি মাের আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায়

আনন্দে তাই ভুলেছিলেম, কেটেছে দিন হেলায়।

গােপনে রহি গভীর প্রাণে আমার দুঃখ সুখের গানে

সুর দিয়েছ তুমি, আমি তােমার গান তাে গাই নি ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৪১

এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর

দেশ—ঝম্পক**


এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর।

পুণ্য হ’ল অঙ্গ মম, ধন্য হ’ল অন্তর; সুন্দর হে সুন্দর ।

আলােকে মাের চক্ষু দু’টি মুগ্ধ হয়ে উঠিল ফুটি,

হৃদ-গগনে পবন হ’ল সৌরভেতে মন্থর; সুন্দর, হে সুন্দর ।

এই তােমারি পরশ-রাগে চিত্ত হ’ল রঞ্জিত;

এই তােমারি মিলন-সুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।

তােমার মাঝে এমনি করে নবীন করি লও হে মােরে,

এই জনমে ঘটালে মাের জন্ম-জনমান্তর; সুন্দর, হে সুন্দর ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর




** স্বরবিতান-৪০

বিমল প্রভাতে মিলি এক সাথে বিশ্বনাথে কর প্রণাম

ভায়রাে—ত্রিতাল*


বিমল প্রভাতে, মিলি এক সাথে, বিশ্বনাথে কর প্রণাম ।

উদিল কনক-রবি রক্তিম রাগে,

বিহঙ্গকুল সবে হরষে জাগে,

তুমি হে মানব, নব অনুরাগে, পবিত্র নাম তার কররে গান ।


—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর



*ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৫ 

তােমারি দেওয়া প্রাণে তােমারি দেওয়া দুঃখ

মিশ্র-অলেয়া—তেওরা**


তােমারি দেওয়া প্রাণে, তােমারি দেওয়া দুঃখ,

তােমারি দেওয়া বুকে, তােমারি অনুভব।

তােমারি দু'নয়নে, তােমারি শােকবারি,

তােমারি ব্যাকুলতা, তােমারি হা হা রব ॥

তােমারি দেওয়া নিধি, তােমারি কেড়ে নেওয়া,

তােমারি শঙ্কিত আকুল পথ-চাওয়া;

তােমারি নিরজনে ভাবনা আনমনে,

তােমারি সান্ত্বনা, শীতল সৌরভ |

আমিও তােমারি গাে, তােমারি সকলি তাে,

জানিয়ে জানে না, এ মােহ-হত চিত,

আমারি বলে কেন, ভ্রান্তি হ’ল হেন,

ভাঙ্গ এ অহমিকা, মিথ্যা গৌরব ॥


—রজনীকান্ত সেন



** রজনী কান্তের গানের স্বরলিপি

তুমি যত ভার দিয়েছ সে ভার করিয়া দিয়েছ সােজা

বাউল—একতাল*


তুমি যত ভার দিয়েছ সে ভার করিয়া দিয়েছ সােজা।

আমি যত ভার জমিয়ে তুলেছি সকলি হয়েছে বােঝা।

এ বােঝা আমার নামাও বন্ধু, নামাও--

ভারের বেগেতে চলেছি কোথায়, এ যাত্রা তুমি থামাও |

আপনি যে-দুখ ডেকে আনি সে-যে জ্বালায় বজ্ৰানলে—

অঙ্গার করে রেখে যায়, সেথা কোন ফল নাহি ফলে।

তুমি যাহা দাও সে-যে দুখের দান

শ্রাবণধারায় বেদনার রসে সার্থক করে প্রাণ ॥

যেখানে যা কিছু পেয়েছি কেবলি সকলি করেছি জমা--

যে দেখে সে আজ মাগে যে হিসাব, কেহ নাহি করে ক্ষমা ।

এ বােঝা আমার নামাও বন্ধু, নামাও

ভারের বেগেতে ঠেলিয়া চলেছি, এ যাত্রা মাের থামাও।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-২৬

তােমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই

বেহাগ-কাওয়ালী**


তােমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই—

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ,

তােমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই ৷

হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে-

নাই-নাই-ভয়, সে শুধু আমারই, নিশিদিন কাঁদি তাই।

অন্তর-গ্লানি সংসার-ভার পলক ফেলিতে কোথা একাকার

জীবনের মাঝে স্বরূপ তােমার রাখিবারে যদি পাই ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর




** স্বরবিতান-৪

মােকো কঁহা ঢ়্যুঁঢ়ে বন্দে ময় তাে তেরে পাস ম‍্যেঁ

সিন্ধু খাম্বাজ—তিনতাল*


মােকো কঁহা ঢ়্যুঁঢ়ে বন্দে, ম‍্যঁয় তো তেরে পাস ম‍্যেঁ।

হােয়ে ম্যয় ঝগড়ি, বিগড়ি না ছুরি গঢ়াস ম‍্যেঁ,

না হােয়ে নাে খাল রােমে, না হড্‌ডি না মা ম‍্যেঁ।

দেবল মে না মজিদ মে না কাশী কৈলাস ম‍্যেঁ।

না হােয়ে ম্যয় অউধ দ্বারকা মেরা ভেট বিশ্বাস ম‍্যেঁ ৷

হােয়ে ম্যয় ক্রিয়া করমূমে, না যােগ বৈরাগ সন্ন্যাস ম‍্যেঁ।

খুঁজেগা তাে অব মিলুঙ্গা, পলভরকী তলাস ম‍্যেঁ ।

সহরুসে বাহার ডেরা হমারি, কুঠিয়া মেরী মৌয়াস ম‍্যেঁ ।

কহত কবীর শুন ভাই সাধু, সব সন্তী সাথ ম‍্যেঁ 


—কবীর




* স্বরলিপি : দিব্যগীতি

ওহি দেশকো হামে জানা

পিলু-বারােয়া—ঠুংরী


ওহি দেশকো হামে জানা।

যহা নেহি অপনা আউর বেগানা ।

(জহাঁ) চন্দ্র সূরয নেহি ভাওয়ে, শােক তাপ নেহি পাওয়ে;

(হা) নেহি জমী আউর আসমানা ॥

(জহ) মিট গয়ী সব ধন্দা, রাম রহিম এক বন্দা;

(যহা) নহি বেদ আউর কোরাণা ।

(জহ) আগম নিগম নহি বাণী, জীয়ত মরত নহি জানি;

(জহাঁ) যাকে ফিন্ নহি আনা।


—গিরিশচন্দ্র ঘােষ

জাগাে সকল অমৃতের অধিকারী

মিশ্র আশাবরী—ঝাঁপতাল*


জাগাে সকল অমৃতের অধিকারী,

নয়ন খুলিয়ে দেখ করুণানিধান, পাপতাপহারী।

পূরব অরুণ-জ্যোতি মহিমা প্রচারে, বিহগ যশ গায় তাহারি ।

হৃদয় কপাট খুলি দেখরে যতনে, প্রেমময় মূরতি জন-চিত্তহারী;

ডাক রে নাথে, বিমল প্রভাতে পাইবে শান্তির বারি ।


—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-১

মহারাজ এ কি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে

বেহাগ-ঝাপতাল**


মহারাজ, এ কি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে।

চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে ।

গর্ব সব টুটিয়া মূৰ্ছি পড়ে লুটিয়া,

সকল মম দেহ মন বীণা সব বাজে।

এ কি পুলক-বেদনা বহিছে মধুবায়ে!

কাননে যত পুষ্প ছিল মিলিল তব পায়ে।

পলক নাহি নয়নে, হেরি না কিছু ভুবনে

নিরখি শুধু অন্তরে সুন্দর বিরাজে।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



** স্বরবিতান-৩৬

প্রভু দাঁড়াও তােমায় দেখি

মিশ্র-জৌনপুরি—একতাল


প্রভু, দাঁড়াও তােমায় দেখি।

নিয়ে সকল দাবি দাওয়া, চিরজীবন হয় নি চাওয়া,

আজকে যদি চোখ তুলেছি, তুমিই পলাবে কি?

দুই চোখে যে কুলায় না মাের তােমার রূপের আলাে,

লক্ষ কোটি নয়ন দিলে হ’ত সে মাের ভাল,

নােঙর-ছেড়া মত্ত হিয়া, চলেছিল পথ ভুলিয়া,

থামুক সে মাের যাত্রা আজি, চরণ-তলে ঠেকি ৷৷


—নিরুপমা দেবী

বিশ্ব ভুবন রঞ্জন ব্রহ্মা পরমজ্যোতি

মেঘমল্লার—সুরফাঁকতাল*


বিশ্ব-ভুবন-রঞ্জন, ব্রহ্মা পরমজ্যোতি,

অনাদি দেব জগ-পতি, প্রাণের প্রাণ।

কতই কৃপা বরষিছ, প্রাণ জুড়ায় সুমধুর প্রেম-সমীরে,

দুখ-তাপ সকলি হয় অবসান ৷৷

সবাকার তুমি হে পিতা বন্ধু মাতা,

অনন্ত লােক করে তব প্রেমামৃত পান।

অনাথ-শরণ এমন আর কেবা তােমা হেন,

ডাকি তােমারে, দেখা দাও প্রভু হে কৃপা নিধান ॥


—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-৩

চমৎকার অপার জগত রচনা তােমার

কানাড়া—ঝাঁপতাল*


চমৎকার অপার জগত রচনা তােমার।

শােভার আগার বিশ্ব-সংসার ||

অযুত তারক চমকে রতন কাঞ্চন-হার।

কত চন্দ্র কত সূর্য নাহি অন্ত তার ।

শােভে বসুন্ধরা ধনধান্যময়

(হায়) পূর্ণ তােমার ভাণ্ডার ॥

হে মহেশ, অগণন লােক গায়,

‘ধন্য তুমি ধন্য এই গীতি অনিবার ।


—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরলিপি ঃ দিব্যগীতি

জাতীয় সঙ্গীত

বন্দে মাতরম্

দেশ *

বন্দে মাতরম্।

সুজলাং সুফলাং মলয়জ-শীতলাং শস্য-শ্যামলাং মাতরম্।

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীং

ফুল্ল-কুসুমিত-দ্রুমদল-শােভিনীং

সুহাসিনীং সুমধুর-ভাষিণীং, সুখদাং বরদাং মাতরম্।

ত্রিংশ-কোটি-কণ্ঠ-কলকল-নিনাদ-করালে,

দ্বিত্রিংশ-কোটি-ভূজৈধৃত-খর-করবালে,

অবলা কেন মা এত বলে।

বহুবল-ধারিণীং, নমামি তারিণীং রিপুদল-বারিণীং মাতরম্ ।

তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি, তুমি মর্ম,

ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।

বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি,

তােমারি প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

ত্বং হি দুর্গা দশ-প্রহরণ-ধারিণী, কমলা কমলদল-বিহারিণী,

বাণী বিদ্যাদায়িনী, নমামি ত্বা।

নমামি কমলাং অমলাং অতুলাং, সুজলাং সুফলাং মাতরম্।

শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাং ধরণীং ভরণীং মাতরম্ ।


—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


* গানটি মুক্তছন্দে গাওয়া হয়

জনগনমন অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা

তাল—কাহারবা*


জনগনমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা।

পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ

বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছল জলধিতরঙ্গ

তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশীষ মাগে,

গাহে তব জয় গাথা।

জনগণ-মঙ্গলদায়ক জয় হে ভারত-ভাগ্য বিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে ॥

অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী

হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী

পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন পাশে,

প্রেমহার হয় গাঁথা।

জনগণ ঐক্যবিধায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে,

পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা, যুগ-যুগ-ধাবিত যাত্রী

তুমি চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।

দারুণ বিপ্লব মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে

সঙ্কট-দুঃখত্রাতা।

জনগণ-পথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা।

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে,

ঘাের তিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূৰ্ছিত দেশে

জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নত-নয়নে অনিমেষে।

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে

স্নেহময়ী তুমি মাতা।

জনগণ-দুঃখত্ৰায়ক জয় হে ভারত-ভাগ্য-বিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে,

রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব উদয়গিরি-ভালে—

গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।

তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে।

তব চরণে নত মাথা।

জয় জয় জয় হে, জয় রাজেশ্বর ভারত-ভাগ্যবিধাতা।

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরলিপিকার দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্বঃ বিঃ ৪৭) ভারতের জাতীয় সঙ্গীত

হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর হও উন্নত শির নাহি ভয়

মিশ্র—কাহারবা


হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর,

হও উন্নত-শির, নাহি ভয়।

ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান হও সবে আগুয়ান,

সাথে আছে ভগবান,হবে জয়।

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,

বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান;

দেখিয়া ভারতে মহা-জাতির উত্থান-জগজন মানিবে বিস্ময়!

জগজন মানিবে বিস্ময় ॥

তেত্রিশ কোটি মােরা নহি কভু ক্ষীণ,

হতে পারি দীন, তবু নহি মােরা হীন!

ভারতে জনম, পুনঃ আসিবে সুদিন—ঐ দেখ প্রভাত উদয়!

ঐ দেখ প্রভাত উদয় ।

ন্যায় বিরাজিত যাদের করে বিঘ্ন পরাজিত তাদের শরে;

সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে—সত্যের নাহি পরাজয় ৷

সত্যের নাহি পরাজয় ৷৷


—অতুলপ্রসাদ সেন

ধন ধান্য পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

মিশ্র কেদারা—একতাল


ধন-ধান্য-পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,

তাহার মাঝে আছে দেশ এক-সকল দেশের সেরা;

(ও যে) স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা;

—এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি;

সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি ।

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা কোথায় উজল এমন ধারা।

কোথায় এমন খেলে তড়িৎ, এমন কালাে মেঘে।

(তার) পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখির ডাকে জেগে।

এমন দেশটি কোথাও.....ইত্যাদি।

এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়,

কোথায় এমন হরিৎ-ক্ষেত্ৰ আকাশতলে মিশে।

এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস: কাহার দেশে।

এমন দেশটি কোথাও.....ইত্যাদি।

পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী, কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি,

গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে;

তারা ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে।

এমন দেশটি কোথাও....ইত্যাদি ।

ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ?

ওমা, তােমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি;

আমার এই দেশেতে জন্ম,—যেন এই দেশেতেই মরি।

এমন দেশটি কোথাও...ইত্যাদি।


দ্বিজেন্দ্রলাল রায়


মােদের গরব মােদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা

বাউল-দাদরা


মােদের গরব, মােদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।

তােমার কোলে তােমার বােলে কতই শান্তি ভালবাসা।

কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,

(এমন কোথা আর আছে গাে!)

গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা ।

ঐ ভাষাতেই নিতাই গােরা আনল দেশে ভক্তি-ধারা---

(মরি হায়, হায়রে!)

আছে কৈ এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শান্তি-নাশা ।

বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গােবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন;

(আরও কত মধুপ গাে!)

ঐ ফুলেরই মধুর রসে বাঁধলাে সুখে মধুর বাসা ।

বাজিয়ে রবি তােমার বীণে আনলাে মালা জগৎ জিনে!

(গরব কোথায় রাখি গাে)

তােমার চরণ-তীর্থে আজি জগৎ করে যাওয়া আসা ।

ঐ ভাষাতেই প্রথম বােলে, ডাকনু মায়ে “মা”, “মা”, বলে;

ঐ ভাষাতেই বলবাে হরি, সাঙ্গ হলে কঁদা হাসা ।


—অতুলপ্রসাদ সেন

যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ

    ইমন-ভূপালী—দাদরা


যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ।

উঠিল বিশ্বে সে কি কলরব সে কি মা ভক্তি, সে কি মা হর্ষ!

সে দিন তােমার প্রভায় ধরায় প্রভাত হইল গভীর রাত্রি;

বন্দিল সবে “জয় মা জননি! জগত্তারিণি! জগদ্ধাত্রী!”

ধন্য হইল ধরণী তােমার চরণ কমল করিয়া স্পর্শ;

গাইল, “জয় মা জগন্মােহিনী! জগজ্জননী! ভারতবর্ষ!”

সদ্য স্নান-সিক্ত-বসনা চিকুর সিন্ধু-শীকরলিপ্ত;

ললাটে গরিমা, বিমল হাস্যে অমল-কমল-আনন দীপ্ত;

উপরে গগন ঘেরিয়া নৃত্য করিছে তপন তারকা, চন্দ্র;

মন্ত্রমুগ্ধ চরণে ফেনিল জলধি গরজে জলদ মন্দ্র ॥

ধন্য হইল ধরণী তােমার চরণ কমল করিয়া স্পর্শ;

শীর্ষে শুভ্র তুষার কিরীট, সাগর ঊর্মি ঘেরিয়া জঘা;

বক্ষে দুলিছে মুক্তার হার,—পঞ্চসিন্ধু যমুনা গঙ্গা।

কখনাে মা তুমি ভীষণ দীপ্ত তপ্ত মরুর ঊষর দৃশ্যে,

হাসিয়া কখনাে শ্যামল শস্যে ছড়ায়ে পড়িছ নিখিল বিশ্বে।

ধন্য হইল ধরণী তােমার চরণ কমল করিয়া স্পর্শ;

উপরে পবন প্রবল স্বননে শূন্যে গরজি’ অবিশ্রান্ত।

লুটায়ে পড়িছে পিক কলরবে চুম্বি’ তােমার চরণ-প্রান্ত;

উপরে জলদ হানিয়া বজ্র, করিয়া প্রলয় সলিল বৃষ্টি,

চরণে তােমার কুঞ্জকানন কুসুমগন্ধ করিছে সৃষ্টি ।

ধন্য হইল ধরণী তােমার চরণ কমল করিয়া স্পর্শ;

জননি! তােমার বক্ষে শান্তি, কণ্ঠে তােমার অভয় উক্তি,

হস্তে তােমার বিতর অন্ন, চরণে তােমার বিতর মুক্তি।

জননী! তােমার সন্তান তরে কত না বেদনা, কত না হর্ষ;

জগৎপালিনি! জগত্তারিণি জগজ্জননি! জগন্মােহিনি! ভারতবর্ষ।


—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

উঠগাে ভারতলক্ষ্মী উঠ আদি জগত জন পূজ্যা

মিশ্র—তিনতাল


উঠগাে ভারতলক্ষ্মী! উঠ আদি জগত-জন-পূজ্যা,

দুঃখ দৈন্য সব নাশি কর দূরিত ভারত-লজ্জা।

ছাড়াে গাে ছাড়াে শােকশয্যা, করাে সজ্জা

পুনঃ কমল-কনক-ধন-ধান্যে।

জননী গাে, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কঁদিছে তব চরণ তলে ত্রিংশতি কোটি নর-নারী গাে ||

কাণ্ডারী নাহিক কমলা, দুঃখ-লাঞ্ছিত ভারতবর্ষে,

শঙ্কিত মােরা সব যাত্রী কাল সাগর-কম্পন দর্শে,

তােমার অভয় পদ-স্পর্শে, নব হর্ষে,

পুনঃ চলিব তরণী শুভ লক্ষ্যে।

জননী গাে, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কাদিছে তব চরণতলে ত্রিংশতি কোটি নর-নারী গাে ||

ভারত-শ্মশান কর পূর্ণ পুনঃ কোকিল-কূজিত কুঞ্জে,

দ্বেষ-হিংসা করি’ চূর্ণ, কর পুরিত প্রেম-অলি-গুঞ্জে,

দূরিত করি পাপ-পুঞ্জে, তপঃ-তুঞ্জে,

পুনঃ বিমল কর ভারত পুণ্যে।

জননী গাে, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কাঁদিছে তব চরণ-তলে ত্রিংশতি কোটি নর-নারী গাে ||


—অতুলপ্রসাদ সেন।

সারে জহাঁ সে আচ্ছা হিন্দোস্তাঁ হমারা

দেশভক্তি-গীত—কাহারবা


সারে জহাঁ সে আচ্ছা হিন্দোস্তাঁ হমারা।

হম বুলবুলে হ‍্যঁয় ইসকী য়হ গুলসিতাঁ হমারা ।

গুরবত মেঁ হাে অগর হম রহতা হ্যয় দিল বর্তন মেঁ।

সমঝাে ওহী হমেঁ ভী দিল হাে জহাঁ হমারা ॥

পরবত ওঅহ সবসে উঁচা হমসায়া আসমাঁকা।

ওঅহ সন্তরী হমারা ওঅহ পাসবাঁ হমারা ।

গােদী মেঁ খেলতী হ‍্যঁয় জিসকী হজারাে নদীয়াঁ

গুলশন হ্যয় জিনকে দম সে রশ্কেজিনাঁ হমারা ॥

অ্যায় আবেরােদ গঙ্গা! ওঅহ দিন হ্যয় য়াদ তুঝকো ।

উত্রা তেরে কিনারে জব কারওয়াঁ হমারা ॥

মজ্হব নহী সিখাতা আপস মেঁ বৈরখনা।

হিন্দবী হ্যয় হম ওঅতন হ্যয় হিন্দোস্তাঁ হমারা ।


—মঃ ইকবাল

লক্ষ প্রাণের দুঃখ যদি বক্ষেরে তাের বাজে

ইমন-তেওড়া*


লক্ষ প্রাণের দুঃখ যদি বক্ষেরে তাের বাজে।

মূর্ত করে তােরে তারে সকল কাজের মাঝে ৷৷

যা ছুটে যা ওরে পাগল, বজ্র-রােলে সবারে বল্।

ওঠরে তােরা, মােছ আঁখিজল, ভােরে অলীক লাজে।

প্রাণ দিয়ে তাের জ্বেলে আগুন জ্বালা সকল ঘরে;

স্বার্থ দ্বন্দ্ব-মৃত্যুভীতি ছাই হয়ে যাক্ পুড়ে।

আবার চেয়ে দেখুক জগৎ, তােরাও মানুষ, তােরাও মহৎ,

আজও তােদের শিরায় শিরায় তপ্ত শােণিত আছে ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



* স্বরলিপি ঃ আনন্দ লহরী

বলাে বলাে বলাে সবে শত বীণা বেণু রবে

মিশ্র-খাম্বাজ—তিনতাল


বলাে, বলাে, বলাে সবে, শত-বীণা- বেণু-রবে,

ভারত আবার জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।

ধর্মে মহান্ হবে, কর্মে মহান হবে,

নবদিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পূরবে ।

আজও গিরিরাজ রয়েছে প্রহরী, ঘিরি তিন দিক নাচিছে লহরী,

যায়নি শুকায়ে গঙ্গা গােদাবরী, এখনও অমৃতবাহিনী।

প্রতি প্রান্তর, প্রতি গুহা বন,

প্রতি জন-পদ, তীর্থ অগণন, কহিছে গৌরব-কাহিনী।

বিদুষী মৈত্রেয়ী খনা লীলাবতী, সতী সাবিত্রী সীতা অরুন্ধতী,

বহু বীরবালা বীরেন্দ্র-প্রসুতি, আমরা তাদেরই সন্ততি।

অনলে দহিয়া রাখে যারা মান,

পতিপুত্র তরে সুখে ত্যজে প্রাণ,—আমরা তাদেরই সন্ততি ॥

ভােলে নি ভারত, ভােলে নি সে কথা, অহিংসার বাণী উঠেছিল হেথা,

নানক নিমাই করেছিল ভাই সকল ভারত-নন্দনে।

ভুলি ধর্ম-দ্বেষ জাতি অভিমান,

ত্রিশ কোটি দেহ হবে এক প্রাণ, একজাতি প্রেম-বন্ধনে।

মমাদের এ দেশ নাহি রবে পিছে, ঋষি-রাজকুল জন্মে নি মিছে,

দুদিনের তরে হীনতা সহিছে, জাগিবে আবার জাগিবে।

আসিবে শিল্প-ধন-বাণিজ্য,

আসিবে বিদ্যা-বিনয়-বীর্য, আসিবে আবার আসিবে ।

এসাে হে কৃষক কুটির-নিবাসী, এস অনার্য গিরি-বনবাসী,

এসাে হে সংসারী, এসাে হে সন্ন্যাসী,মিল’ হে মায়ের চরণে।

এসাে অবনত, এসাে হে শিক্ষিত,

পরহিতব্রতে হইয়া দীক্ষিত,—মিল হে মায়ের চরণে।

এসাে হে হিন্দু, এসাে মুসলমান,

এসাে হে পারসী, বৌদ্ধ, খৃস্টীয়ান্মিল হে মায়ের চরণে ॥


—অতুলপ্রসাদ সেন

মরতে হবে পরের তরে করতে হবে আত্মদান

দুর্গা—তেওরা


মরতে হবে পরের তরে করতে হবে আত্মদান।

ভুলতে হবে নিজের সুখ পরের দুঃখে কাঁদুক প্ৰাণ ৷৷

ঘুরছে যে জন সুখের পাছে সে কি ওরে বেঁচে আছে?

জীবনটা যাঁর পরের তরে, রাখেন তাঁরে ভগবান ॥


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মেরা সোনেকী হিন্দুস্থান

ভৈরবী—ত্রিতাল


মেরা সোনেকী হিন্দুস্থান।

তুঁ হামারা দিল্কী রোশনী, তুঁ হামারা জান্ ॥

চারু চন্দা, তপন, তারা, উজল আসমান্;

তেরি ছাতি’পর ডোরত ক্যায়সে হাওয়াসে সোনেকি ধান ৷৷

তেরি কুঞ্জমে ফুটত ফুলুয়া, পক্ষী গাওত গান;

তেরি ক্ষেত্রপর শ্যামল তরুয়া ছায়া করত দান;

যুগযুগান্তে তেরী তপোবন পর কতহু ধরম বাখান।

বিমান কম্পই উঠত গীতিহু গভীর ওঁকার তান ॥

অবহি ভারত পর হস্তগত বিহীন বীর্য যশমান।

সোহি দরশ কিয়া দিনহু রাতিয়া ঝুরত মেরা নয়ান ৷৷


—অজ্ঞাত

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি

বাউল ভাঙ্গাগান


আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস,

ওগো আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ৷৷

জাতীয় সঙ্গীত

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কি দেখেছি মধুর হাসি ৷৷

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ কি মায়া গো—

কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,

মরি হায়, হায় রে—

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ॥

তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,

তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।

তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,

মরি হায়, হায় রে—

তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি ৷৷

ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,

সারাদিন পাখী-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,

তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই,

ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি ॥

ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে—

দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।

ওমা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণ তলে,

মরি হায় হায় রে—

আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ বলে গলার ফাঁসি ৷৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আদর্শ তব শঙ্কর সীতা ভুলিও না তুমি ভুলিও না

শংকরা-বেহাগ—দাদরা*


আদর্শ তব শঙ্কর সীতা, ভুলিও না তুমি ভুলিও না।

ভুলিও না তুমি, মহা পবিত্র এই ভারতের ধূলিকণা ॥

ভারত-সন্তান দেবতা তোমার, খুঁজিতে ঈশ্বর কোথা যাবে আর?

মহা উপচারে ত্যাগ ও সেবায়, কর কর তার আরাধনা ৷

উচ্চ কণ্ঠে বল বল তুমি, ‘ভারত-সন্তান আমার ভাই,

মূর্খ কাঙ্গাল দ্বিজ ও চণ্ডাল, দেবতা আমার এঁরা সবাই’।

প্রাণপণে তুমি বলো দিনরাত, ওমা জগদম্বা, ওগো উমানাথ,

মানুষ করিয়া দাও গো আমায়, আর কিছু আমি চাহিব না’।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



* স্বরলিপি—আনন্দলহরী 

তব চরণ নিম্নে উৎসবময়ী শ্যামধরণী সরসা

ভৈরবী—একতাল*


তব চরণ নিম্নে উৎসবময়ী শ্যামধরণী সরসা।

ঊর্ধ্বে চাহ অগণিত মণি-রঞ্জিত নভো নীলাঞ্জনা,

সৌম্য মধুর দিব্যাঙ্গনা শান্তকুশল দরশা ৷৷

দূরে হের চন্দ্র-কিরণ-উদ্ভাসিত গঙ্গা,

নৃত্য-পুলক-গীতিমুখর কলুষহর-তরঙ্গা।

ধায় মত্ত-হরষে সাগরপদ পরশে,

কূলে কূলে করি’ পরিবেশন মঙ্গলময় বরষা |

ফিরে দিশি দিশি মলয় ছন্দ কুসুম গন্ধ বহিয়া,

আর্য-গরিমা কীর্তি-কাহিনী মুগ্ধ জগতে কহিয়া।

হাসিছে দিগ্বালিকা, কণ্ঠে বিজয় মালিকা

নব জীবন-পুষ্পবৃষ্টি করিছে পুণ্য-হরষা ৷৷

ওই হের স্নিগ্ধ সবিতা উদিছে পূর্ব গগনে,

কান্তোজ্জ্বল কিরণ বিতরি’ ডাকিছে সুপ্তি মগনে।

নিদ্রালস নয়নে এখনো রবে কি শয়নে?

জাগাও বিশ্বে পুলক পরশে বক্ষে তরুণ ভরসা।


—রজনীকান্ত সেন




*নেতাজীর প্রিয় সঙ্গীত

বিবিধ সঙ্গীত

ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে আমার মন

বাউল—আড়খেমটা*


ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে, আমার মন।

তলাতল পাতাল খুঁজলে, পাবিরে প্রেম রত্নধন ॥†

ডুব্‌ ডুব্ ডুব্‌ ডুবলে পাবি হৃদয় মাঝে বৃন্দাবন।

দীপ দীপ দীপ্ জ্ঞানের বাতি, হৃদে জ্বলবে অনুক্ষণ

ড্যাং ড্যাং ড্যাং ডাঙ্গায় ডিঙে চালায় আবার সে কোন জন,

কুবীর বলে শোন্ শোন্ শোন্ ভাব গুরুর শ্রীচরণ।


—কুবীর গোঁসাই




*স্বরলিপি ঃ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত।

† পাঠান্তর ঃ “তলাতল পাতাল খুঁজে পাবিনাকো রত্নধন


    

কত গান তো হ’ল গাওয়া আর মিছে কেন গাওয়াও

গজল—ঠুংরী


কত গান তো হ’ল গাওয়া    আর মিছে কেন গাওয়াও?

যদি দেখা নাহি দিবে,    তবে মিছে কেন চাওয়াও?

যদি যতই মরি ঘুরে,    তুমি ততই রবে দূরে,

তবে কেন বাঁশীর সুরে    তব তরে শুধু ধাওয়াও?

যদি সন্ধ্যা হ’লে বেলা    নাহি মিলে তব বেলা,

পথ-ভোলা মোর ভেলা    এ অকূলে কেন বাওয়াও?

যদি আমার দিবা রাতি    কাটি যাবে বিনা সাথি,

তবে কেন বঁধুর লাগি    পথ পানে শুধু চাওয়াও?

বড় ব্যথা তোমায় চাওয়া    আরও ব্যথা ভুলে যাওয়া;

যদি ব্যথী না আসিবে    এত ব্যথা কেন পাওয়াও?


—অতুলপ্রসাদ সেন

সাধু সজ্জনকো সৎসঙ্গ মিল

খাম্বাজ—লুম্—কাওয়ালী


সাধু-সজ্জনকো সৎসঙ্গ মিল

জব সচ্চিদানন্দকী কৃপা ভাওএ।

জোহি খবর নহী গ্রন্থমে

সাধু বিন রাহু কওন বতাওএ,

সাধু সম হিতকারী ন কোঈ,

মাতার পিতর মিতরকী ভাঈ।

অন্ধাকো সূঝ চোর সমঝ

প্রভু চরণাম্বুজেকো মিলাও এ ৷


—দয়াসখী

হরিসে লাগি রহ রে ভাই

ভজন (শ্রীরামকৃষ্ণ গীত)*


হরিসে লাগি রহ রে ভাই।

তেরা বনত বনত বনি যাই ৷৷

তেরী বিগড়ী বাত বনি যাই ॥

রাকা তরে বাঁকা তরে, তরে সদন কসাই।

সুগা পঢ়ায়কে গণিকা তরী, তরী হ্যায় মীরাবাঈ ৷৷

দৌলত দুনিয়া মাল খাজানা বধিয়া বৈল চরাই।

জবহী কালকা ডঙ্কা বাজী খোঁজ খবর না পাই ॥

য়্যায়সী ভক্তি কর ঘট ভিতর ছোড় কপট চতুরাই।

সেবা বন্দগী আউর ন্যূনতা, সহজ মিলে রঘুরাই ॥

কহত কবীর শুন ভাই সাধু সদ্গুরু বাত বাতাই।

ইয়া দুনিয়া দিন চার দিহাড়ে রহো রাম লব লাই ॥


—কবীর




*স্বরলিপি : দিব্যগীতি 

এই বেলা নে ঘর ছেয়ে

বাউল


এই বেলা নে ঘর ছেয়ে।

এবারে বর্ষা ভারি, হও হুঁশারী, লাগো আদা-জল খেয়ে।

যখন আসবে শ্রাবণা, দেখতে দেবে না।

বাঁশ বাখারি পচে যাবে, ঘর ছাওয়া হবে না।

যেমন আসবে ঝটকা, উড়বে মটকা, মটকা যাবে ফাঁক হয়ে।

(তুমিও যাবে হাঁ হয়ে)।


—অজ্ঞাত

প্রেমে জল হয়ে যাও গলে

বাউল—আড়খেমটা *


প্রেমে জল হয়ে যাও গলে।

কঠিনে মেশে না সে, মেশে রে সে তরল হলে ৷

অবিরাম হ’য়ে নত,

চলে যাও নদীর মত,

কলকলে অবিরত, ‘জয় জগদীশ’ বলে ৷

বিশ্বাসের তরঙ্গ তুলে,

মোহপাড়ি ভাঙ্গ সমূলে,

চেও না কোনও কূলে শুধু নেচে গেয়ে যাওরে চলে ৷

সে জলে নাইবে যা’রা

থাকবে না মৃত্যু-জরা,

পানে পিপাসা যাবে, ময়লা যাবে ধুলে;

যারা সাঁতার ভুলে নামতে পারে, (তাদের) টেনে নে’ যাও একেবারে,

ভেসে যাও ভাসিয়ে নে’ যাও, সেই পরিণাম-সিন্ধু-জলে ৷


—রজনীকান্ত সেন




* স্বরলিপি : কান্ত-গীতি-মাল্য; কেউ কেউ বলেন যে, গানখানি নাকি শ্রীরামকৃষ্ণদেব গাইতেন। এই তথ্যটি আদৌ সত্য নয়।

যমুনে এই কি তুমি সেই যমুনা প্ৰবাহিণী

কীর্তন—লোফা


যমুনে, এই কি তুমি সেই যমুনা প্ৰবাহিণী।

ও যার বিমল তটে, রূপের হাটে, বিকাত নীলকান্ত মণি ৷৷

কোথা সে ব্রজের শোভা,

গোলোক হ’তেও মনোলোভা,

কোথা শ্রীদাম বলরাম, সুবল সুদাম,

কোথা সে সুনীল তনু, ধেনু বেণু মা যশোদা রোহিণী।

কোথা নন্দ উপানন্দ,

মা যশোদার প্রাণগোবিন্দ,

ধড়া-চূড়া-পরা কোথা ননী-চোরা।

কোথা সে বসন চুরি, ব্রজনারীর পূজিতা মা কাত্যায়নী ॥

কোথা চারু চন্দ্রাবলী কোথা বা সে জলকেলি,

কোথা ললিতা সখী সুহাসিনী;

কোথা সে বংশীধারী রাসবিহারী

কোথা সে নূপুরধ্বনি,

বামেতে রাই বিনোদিনী

না বাজ়ে কিঙ্কিণী,

মধুর হাসি মধুর বাঁশি নাহি শুনি;

ও যার, মোহন সুরে উজান ভরে বইতে তুমি আপনি ৷

তোমারি তটে তটে, তোমারি বাটে বাটে,

তোমারি সন্নিকটে কই সে ধরনি,

ও যার নামের লাগি, মোহন চূড়া লুটাইত ধরণী ৷

দেখাইয়া দাও আমারে, যমুনে সেই বামারে,

অনাথের নাথ-হৃদ-মাঝারে, পা দুখানি;

পরিব্রাজক বলে, চরণ তলে লুটাই শির দিনযামিনী ৷৷


—কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন

তারে কৈ পেলুম সই হলাম যার জন্য পাগল

বাউল—লোফা


তারে কৈ পেলুম সই, হলাম যার জন্য পাগল।

ব্রহ্মা পাগল, বিষ্ণু পাগল, আর পাগল শিব ৷৷

তিন পাগলে যুক্তি ক’রে ভাঙ্গল নবদ্বীপ।

আর এক পাগল দেখে এলাম বৃন্দাবন মাঝে।

রাইকে রাজা সাজাইয়া আপনি কোটাল সাজে ৷

আর এক পাগল দেখে এলাম নবদ্বীপের পথে।

রাধা-প্রেম সুধা ব’লে করোয়া কিস্তি হাতে।


—অজ্ঞাত

সবারে বাস্রে ভাল, নইলে মনের কালো ঘুচ্‌বে না রে

ভৈরবী—একতাল


সবারে বাস্রে ভাল, নইলে মনের কালো ঘুচ্‌বে না রে।

আছে তোর যাহা ভাল, ফুলের মত দে সবারে ॥

করি তুই আপন আপন হারালি যা ছিল আপন;

এবার তোর ভরা আপণ, বিলিয়ে দে তুই যারে তারে ॥

যারে তুই ভাবিস্ ফণী, তারো মাথায় আছে মণি;

বাজা তোর প্রেমের বাঁশী—ভবের বনে ভয় বা কারে?

সবাই যে তোর মায়ের ছেলে; রাখবি কারে কারে ফেলে?

একই নায়ে সকল ভায়ে যেতে হবে রে ওপারে ॥


—অতুলপ্রসাদ সেন

প্রেমিক লোকের স্বভাব স্বতন্তর

বাউল—একতাল


প্রেমিক লোকের স্বভাব স্বতন্তর।

ও তার থাকে না, ভাই আত্ম পর ৷

প্রেমিক এম্নি রত্ন ধন, কিছু নাইক তার মতন

বিবিধ সঙ্গীত

ইন্দ্রপদকে তুচ্ছ করে, প্রেমিক হয় যে জন,

ও সে হাস্য মুখে সদাই থাকে, হৃদয় জুড়ে সুধাকর ॥

প্রেমিক চায় না কো জাতি, চায় না সুখ্যাতি,

(ভাবে) হৃদয় পূর্ণ, হয় না ক্ষুন্ন, রটলে অখ্যাতি,

ও তার হস্তগত সুখের চাবি থাকবে কেন অন্য ডর?

প্রেমিকের চালটা বেয়াড়া,

বেদবিধি ছাড়া,

আঁধার কোলে চাঁদ গেলে তার মুখে নাই সাড়া,

ও সে চৌদ্দ ভুবন ধ্বংস হলেও আমানেতে বানায় ঘর ৷


—ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

কত ঢেউ উঠেছে রে দিল দরিয়ায়

বাউল—একতাল


কত ঢেউ উঠেছে রে দিল-দরিয়ায়।

ঢেউ দেখে বুক শুকিয়ে উঠে, না হেরি কোন উপায় ॥

(একে) মন মাঝি আনাড়ি, (তায়) রিপু ছয় জনা দাঁড়ি,

তারা কেউ শুনে না আমার কথা দায় হল ভারি,

এরা ইচ্ছামত কর্ম করে, (বুঝি) মাঝ গাঙ্গে তরী ডুবায় ॥

তরী পাঁচ কাঠে আঁটা, আছে নয় দিকে ফুটা

তায় জন্মাবধি নাই মেরামত, বুজান তার নটা।

পাপ চাপনের ভাবনা ভারি, (বুঝি) ঢেউয়ের চোটে ফেটে যায় ৷৷

(ঐ) হরিনামের ভেলা,

প্রেমিক বলে এই বেলা

রাখ না কাছে ভয় কি তুফান হলই বা মেলা,

যখন ডুববে তরী ভেলায় চড়ি, (ও ভাই) কূল পাবি হরির কৃপায় ॥


—প্রেমিক

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে

বাউল—দাদরা *


যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে ॥

যদি কেউ কথা না কয়—(ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে, সবাই করে ভয়-

তবে পরাণ খুলে’,

ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা, একলা বল রে;

যদি সবাই ফিরে’ যায় —–(ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়—

তবে পথের কাঁটা

ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা চলো রে ॥

যদি আলো না ধরে—(ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি ঝড় বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে-

তবে বজ্রানলে

আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৪৬; ভাঙ্গাগান : মূলগান-‘হরি নাম দিয়ে জগৎ মাতালে আমার একলা নিতাই


(হরি) আপনি নাচ আপনি গাও আপনি বাজাও তালে তালে

সিন্ধুখাম্বাজ—পোস্তা


(হরি) আপনি নাচ; আপনি গাও, আপনি বাজাও তালে তালে,

মানুষ তো সাক্ষিগোপাল মিছে আমার আমার বলে।

ছায়াবাজীর পুতুল যেমন, জীবের জীবন তেমন,

দেবতা হ’তে পারে, যদি তোমার পথে চলে।

দেহ যন্ত্রে তুমি যন্ত্রী, আত্মরথে তুমি রথী,

জীব কেবল পাপের ভাগী, নিজ স্বাধীনতার ফলে।

সর্বমূলাধার তুমি, প্রাণের প্রাণ হৃদয়-স্বামী,

অসাধুকে সাধু কর, তুমি নিজ পুণ্যবলে।


—ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

সে দিন কবে বা হবে

কীর্তন


সে দিন কবে বা হবে?

হরি বলিতে ধারা বেয়ে পড়বে (সে দিন কবে বা হবে?)

সংসার বাসনা যাবে (সে দিন কবে বা হবে?)

অঙ্গে পুলক হবে (সে দিন কবে বা হবে?)।


—অজ্ঞাত

রহ শিক জান মান কহ্যো হ্যায় পুরাণ মো ভগবান আপ করতার

ধ্রুপদাঙ্গ সঙ্গীত


রহ শিক জান মান কহ্যো হ্যায় পুরাণ, মো ভগবান আপ করতার ॥

দীনবন্ধু দয়াসিন্ধু, পতিতপাবন, আনন্দকন্দতোসে-কহত হুঁ পুকার;

তানসেন কহে নিরমল সদা রহিয়ে, নর দেহ ন হো বার বার ৷


—তানসেন

আমার এ সাধের বীণা

বেহাগ—যত্


আমার এ সাধের বীণা—

যত্নে গাঁথা তারের হার।

যে যত্ন জানে, বাজায় বীণে,

উঠে সুধা অনিবার ৷৷

তানে মানে বাঁধলে ডুরি,

তারে শতধারে বয় মাধুরী,

বাজে না আলগা তারে,

টানে ছিঁড়ে কোমল তার।

সাধের বীণার মরম যে জানে,

সে তো তার বাঁধে না টানে,

দীনের কথা মধুর গাঁথা শুনে সে প্রাণে;

যে জোর ক’রে ডোর বাঁধবে টেনে,

বীণা নীরব রবে তার।


—গিরিশচন্দ্র ঘোষ

প্রেমগিরি-কন্দরে যোগী হয়ে রহিব

মুলতানী—আড়া


প্রেমগিরি-কন্দরে যোগী হয়ে রহিব।

আনন্দনির্ঝরপাশে যোগধ্যানে বসিব |

সে আনন্দপ্রস্রবণে, পুণ্যচন্দ্রমা কিরণে,

মোহন মাধুরী খেলা প্রাণভরে হেরিব।

মিটাতে বিরহ তৃষ্ণা কৃপজলে আর যাব না,

হৃদয় করঙ্গ পূরি, শান্তিবারি তুলিব ৷

তত্ত্বফল আহরিয়ে, জ্ঞানক্ষুধা নিবারিয়ে,

বৈরাগ্য-বন-কুসুমে, শ্রীপাদপদ্ম পূজিব।

(কভু) বসি ভাবশৃঙ্গ পরে’ পদামৃত পান করে,

হাসিব কাঁদিব আবার নাচিব আর গাইব ॥


—অশ্বিনীকুমার দত্ত

নিচুর কাছে হ’তে নিচু হতে শিলি না রে মন

বাউল—দাদরা*


নিচুর কাছে হ’তে নিচু হতে শিলি না রে মন।

(ও) তুই সুখী জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন মূঢ় মন ৷৷

লাগে নি যার পায়ে ধূলি, কি নিবি তার চরণ-ধূলি?

নয় রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন মূঢ় মন ৷৷

প্রেম-ধন মায়ের মতন, দুঃখী সুতেই অধিক যতন;

এই ধনেতে ধনী যে জন সেই তো মহাজন মূঢ় মন ৷৷

বৃথা তোর কৃচ্ছ্ব-সাধন; সেবাই নরের শ্রেষ্ঠ সাধন।

মানবের পরম তীর্থ দীনের শ্রীচরণ মূঢ় মন।

মতামতের তর্কে মত্ত, আছিস্ ভুলে সরল সত্য;

সকল ঘরে সকল নরে আছেন নারায়ণ মূঢ় মন ৷৷


—অতুলপ্রসাদ সেন



* কাকলি-৫

মনের কথা কইব কি সই কইতে মানা

বাউল—আড়খেমটা


মনের কথা কইব কি সই কইতে মানা।

দরদী নইলে প্রাণ বাঁচে না ৷

মনের মানুষ হয় যে জনা, ও তার নয়নেতে যায় গো চেনা,

সে দুই একজনা।

ভাবে ভাসে, রসে ডুবে ও সে উজান পথে করে আনাগোনা ॥

(ভাবের মানুষ উজান পথে)

মনের মানুষ মিলবে কোথা বগলে তাঁর ছেঁড়া কাঁথা ।

ও সে কারু সনে কয়না কথা,

ভাবের মানুষ উজান পথে করে আনাগোনা ॥


—অজ্ঞাত

পাগলা ! মনটারে তুই বাঁধ

ভৈরবী—যত্


পাগলা ! মনটারে তুই বাঁধ;

কেনরে তুই যেথা সেথা পরিস্ প্রাণে ফাঁদ?

শীতল বায়ে আসলে নিশি, তুই কেনরে হোস্ উদাসী?

(ওরে) নীলাকাশে অমন ক’রে হেসেই থাকে চাঁদ ॥

শৈল-শিরে সোনার খেলা দেখিস যবে প্রভাত-বেলা,

তুই কেনরে হোস্ উতলা দেখে মোহন ছাঁদ?

করুণ সুরে গাইলে পাখি তোর কেন রে ঝরে আঁখি।

কবে তুই মুছবি নয়ন, ঘুচরে মনের ধাঁদ?

সংসারেতে উঠলে হাসি, তুই শুনিস্ রে ব্রজের বাঁশী!

(ওরে) ভাবিস্ কিরে সবই গোকুল, সবাই কালাচাঁদ?

কতই পেলি ভালবাসা, তবু না তোর মেটে আশা!

এবার তুই একলা ঘরে নয়ন ভ’রে কাঁদ!


—অতুলপ্রসাদ সেন

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ’ সত্যসুন্দর

রাগ মহীশুর—তাল দাদরা *


আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ’, সত্যসুন্দর ॥

মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগনমাঝে,

বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে ॥

গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে

করিছে পান, করিছে স্নান, অক্ষয় কিরণে ॥

ধরণী’পর ঝরে নির্ঝর, মোহন মধু শোভা

ফুলপল্লব-গীতগন্ধ-সুন্দর-বরণে ৷

বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতনধারা;

করুণা তব অবিশ্রাম জনমে মরণে ॥

স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,

কত সান্ত্বন করে বর্ষণ সন্তাপহরণে ॥

জগতে তব কী মহোৎসব, বন্দন করে বিশ্ব

শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-৪ (ভজন ভাঙ্গা সুর)

হরিগুণ গাওয়ে, তব্ সুখ পালয়ে কেঁও নহি মন হরি নাম রটনা

ভূপালী—ঢিমা তিনতাল


হরিগুণ গাওয়ে, তব্ সুখ পালয়ে, কেঁও নহি মন হরি নাম রটনা।

দৃষ্টিমে বিচার করকে দেখো জগমে কোই নহি আপনা ॥


—অজ্ঞাত

যদি তোর হৃদ্-যমুনা হ’লরে উছল রে ভোলা

বাউল-কীৰ্তন—একতাল


যদি তোর হৃদ্-যমুনা হ’লরে উছল, রে ভোলা!

-তবে তুই একূল ওকূল ভাসিয়ে দিয়ে চল, রে ভোলা ॥

আজি তুই ভরা প্রাণে ছুটে যা নৃত্যে গানে,

যে আসে প্রেম-প্লাবনে ভাসিয়ে দিয়ে চল্, রে ভোলা!

যে আসে মনের দুখে, যে আসে ফুল্ল মুখে,

টেনে নে সবায় বুকে, তোর থাক্‌না চোখে জল, রে ভোলা ॥

চলে যা মন জুড়িয়ে;    দু ধারের ফুল কুড়িয়ে,

মালা তোর হলে বিফল করবি কি তুই বল্, রে ভোলা!

মিছে তোর সুখের ডালি,    মিছে তোর দুখের কালি,

দুদিনের কান্না হাসি, ছল্ ছল্ ছল্, রে ভোলা ॥

জীবনের হাটে আসি,    বাজা তুই বাজা বাঁশি,

থাক্ সেথা বেচা-কেনার দারুণ কোলাহল, রে ভোলা!

অরূপের রূপের খেলা    চুপ্ করে তুই দেখ দু'বেলা;

কাছে তোর এলে কুরূপ, তুই মুখ ফিরিয়ে চল, রে ভোলা!


—অতুলপ্রসাদ সেন

যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে

কানাড়া—ঝাঁপতাল*


যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে,

মিলাব তাই জীবনগানে ॥

গগনে তব বিমল নীল, হৃদয়ে লব তাহারি মিল,

শান্তিময়ী গভীর বাণী নীরব প্রাণে ॥

বাজায় ঊষা নিশীথকূলে যে গীতভাষা,

সে ধ্বনি নিয়ে জাগিবে মোর নবীন আশা,

ফুলের মতো সহজ সুরে প্রভাত মম উঠিবে পুরে,

সন্ধ্যা মম সে সুরে যেন মরিতে জানে ৷


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



*স্বরবিতান-৩০

সারদা মাতার আদরের ধন সারদানন্দ তুমি মহান্

কেদারা—কাওয়ালী**


সারদা মাতার আদরের ধন সারদানন্দ তুমি মহান্।

রামকৃষ্ণ-চরণ সেবক, যীশু অন্তরঙ্গ শান্ত ধীমান ৷৷

প্রশান্ত গম্ভীর সুবিপুল কায়, হিয়া কাঁপে ডরে ভাষা না জুগায়।

অন্তরে বিমল প্রেমমন্দাকিনী অবিরল বহে জননীর প্রায় ॥

রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ তোমার অনন্ত অপূর্ব জ্ঞানের ভাণ্ডার।

চণ্ডালে বেদ বিতরিতে ভবে এলে বেদব্যাস কলিতে আবার ॥

রামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ-জননীর দ্বারে দ্বারী হ’য়ে মহা সৌভাগ্য মানিলে।

বাসুকীর মত যত ভার শিরে মহানন্দে মার কৃপায় বহিলে ॥

গুরু কৃপা বলে তাপসপ্রধান, সর্বভূতে করি ব্রহ্ম দরশন;

শিব-জ্ঞানে জীব-সেবায় সঁপিলে, অবহেলে নিজ তনু প্রাণ মন।

অচল অটল সুমেরু সমান, নায়ক আদেশ করিলে পালন;

গুরু সংঘভার করি সঞ্চালন, অকাতরে সয়তনে আজীবন ৷৷


—স্বামী গৌরীশ্বরানন্দ

** শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দজী সম্বন্ধে।

লম্বোদর সুন্দর তনু কে তুমি যতিজ্ঞানী শিরোমণি

খাম্বাজ—একতাল*


লম্বোদর সুন্দর তনু কে তুমি যতিজ্ঞানী শিরোমণি,

ভকত-প্রধান, সেবা মূর্তিমান, বেদের বাখান করিছে লেখনি।

সর্বংসহ সৌম্য মূরতি, জ্ঞান আবরণে পূর্ণ ভকতি,

যোগ-কৰ্ম কুশল অতি সমাহিত-চিত থাক দিবাযামী।

শিবানীর কোলে গণেশের প্রায়, হে মহাতাপস কে তুমি ধরায়,

অর্পিত চিত মায়ের সেবায়, তুচ্ছং ব্রহ্মপদমপি গণি ৷


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ




* শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দজী সম্বন্ধে।

রামকৃষ্ণ মানসতনয় ব্রহ্মানন্দ ব্রজ রাখাল

গৌড়-সারঙ্গ—একতাল**


রামকৃষ্ণ মানসতনয় ব্রহ্মানন্দ ব্রজ রাখাল ৷

নিত্যসিদ্ধ ঈশকোটি করুণা মুরতি অতি দয়াল ॥

জ্ঞানী শিরোমণি, রসিক নাগর, বিবেক বৈরাগ্য প্রেমের আকর।

জীব-দুখে বিগলিত করুণায় এলে কৃষ্ণ-সখা ধরায় আবার ॥

কভু বৃন্দাবনে, যমুনাপুলিনে, নর্মদা কূলে বিজন বনে;

ধ্যান-গমন তাপস মহান, দিবা বিভাবরী ব্রহ্মানন্দে লীন।

রামকৃষ্ণ-সংঘ নায়ক, কর্ম-জ্ঞান-ভক্তি-দেশিক;

পতিত তাপিতে কৃপা বিতরিতে সদা শিবময় শান্ত সরল ৷


—স্বামী গৌরীশ্বরানন্দ




** শ্রীমৎ স্বামী ব্রহ্মানন্দজী বিষয়ক

ফিরে চল ফিরে চল ফিরে চল আপন ঘরে

মালকোষ—তেওরা


ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল আপন ঘরে।

চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিছে, আনন্দ আজ আনন্দ রে ৷৷

আকাশ-ভরা জোছনা ধারা বাতাস বহে বাঁধন হারা,

প্রেমের সুরে ভরা ভুবন, ব্যথার বেদন ঘুচিল রে ॥

মরণ-নীলা সাগর হ’তে জীবন বহে সুধা-স্রোতে,

জীবনে মরণ মরণে জীবন, ভয় কিবা কি-বা দুঃখ রে ॥

আকাশ-পাখী কহিছে গাহি? ‘মরণ নাহি, মরণ নাহি',

রজনী দিন জীবন ধারা, ঐ যে ঝরে, ঐ যে ঝরে ॥


—সৌরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

সেই বৃন্দাবনের লীলা অভিরাম সবি

কীর্তন


সেই বৃন্দাবনের লীলা অভিরাম সবি,

আজো পড়ে মনে মোর—পড়ে যে কেবলি মনে!

সেই আলোর দুলাল শ্যামলের প্রেম ছবি,

আজো পড়ে মনে মোর—পড়ে যে কেবলি মনে।

সেই সখা সখী মিলি’ কুতূহলে ঘাটে যাওয়া :

সেই নির্মল নীল যমুনার জলে নাওয়া

সেথা সমস্বনে সবে গুণমণি-গুণ-গাওয়া

আর কখনো বা প্রিয়তম-দরশন পাওয়া

আজো পড়ে মনে মোর—পড়ে যে কেবলি মনে।

সেই ফুল-ফুল-খেলা কত অরণ্যে বনে

কত তারার দেয়ালি আকাশের আল্পনে

কত মুরলীধ্বনি শুনিয়া পিয়াসী মনে,

খোঁজা কুঞ্জে কুঞ্জে মিলন-মনোমোহনে

আজো পড়ে মনে মোর–পড়ে যে কেবলি মনে।

কত চাঁদিনি-রাতে সে—অপরূপ রূপরাস

কত রূপের মন্ত্রে জাগানো প্রেমবিলাস

চির রঙিনের রঙে রঙানো হৃদি-উছাস

কত আপনা হারায়ে বঁধুর বরণ আশ

আজো পড়ে মনে মোর–পড়ে যে কেবলি মনে।

ওরা হাসে আজ, বলে, “হায় রে মধুর স্বপন!”

বলে “কৃষ্ণকাহিনী”—কল্পনা—কবি কথন!”

(ওরা হাসে—ওরা জানে না—তাই হাসে—

ওরা জানে না—তাই মানে না—আমি জানি—তাই মানি—

আমি অন্তরে তোমার বাঁশরি শুনেছি, তাই বঁধু আমি জানি)

তাই এসব কথা তো শোনে না আমার স্বপন,

ব্রজ রমণীর কথা— আর সে রমণী-রমণ—

আজো পড়ে মনে মোর—পড়ে যে কেবলি মনে।


—দিলীপকুমার রায়

দেখেছি রূপ-সাগরে মনের মানুষ কঁাচা সােনা

বাউল—লোফা *


দেখেছি রূপ-সাগরে মনের মানুষ কঁাচা সােনা।

তারে ধরি ধরি মনে করি,

ধরতে গেলে ধরা দেয় না ।

বহুদিন ভাব তরঙ্গে, ভেসেছি কতই রঙ্গে,

সুজনের সঙ্গে হবে দেখা-শােনা;

তারে আমার আমার মনে করি,

আমার হয়ে আর হল না ||

সে মানুষ চেয়ে চেয়ে,

ফিরতেছি পাগল হয়ে,

মরমে জ্বলছে আগুন আর নিভে না।

(আমায়) বলে বলুক লােকে মন্দ

বিরহে তার প্রাণ বাঁচে না |

পথিক কয়, ভেব না রে ডুবে যাও রূপ-সাগরে,

বিরলে বাস কর যােগসাধনা;

একবার ধরতে পেলে মনের মানুষ,

ছেড়ে যেতে আর দিও না ।


—অজ্ঞাত




* এই সুর অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান : ভেঙে মাের ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে

মহাপুরুষের বাণী

সিন্ধু-মিশ্র


মহাপুরুষের বাণী

যুগে যুগে বিধাতার বারতা বহিয়া শান্তি দেয় গাে আনি।

তাই ভকতগণ একসাথে মিলি জনম উৎসবে প্রাণ দেয় ঢালি।

তারই পূজা ওগাে দেবতারি পূজা অন্তর মাঝে জানি।

যবে ধর্মের গ্লানি এ ধরা মাঝে দেবতা নামেন মানুষের সাজে

দুর্গত জনে মুকতিদানে নরনারায়ণ তারে নত হয়ে মানি।

ব্রজের কিশাের বুদ্ধ নিমাই পরমহংস অবতার ভাই

একি লীলা ওগাে দেবতা মানবে চিরদিন কানাকানি ॥


—অমূল্যভূষণ সেন

শুধু দুদিনেরই খেলা

ভৈরবী—কাওয়ালী


শুধু দুদিনেরই খেলা।

ঘুম না ভাঙ্গিতে আঁখি না মেলিতে

দেখিতে দেখিতে ফুরায় বেলা ।

আশার ছলনে কত উঠি পড়ি,

কত কঁাদি হাসি কত ভাঙ্গি গড়ি;

বাঁধিতে ঘর, হাটেরই ভিতর

ভেঙ্গে যায় এই সাধের খেলা।

আমাদেরও এই দেহপ্রাণমন,

সুখ-দুঃখ এই জীবন-মরণ—

এও বিধাতার পুতুল খেলা;

শুধু গড়া আর ভাঙ্গিয়া ফেলা।


—অজ্ঞাত

সমুখে শান্তি পারাবার ভাসাও তরণী হে কর্ণধার

পূরবী—একতাল*


সমুখে শান্তি পারাবার ভাসাও তরণী হে কর্ণধার,

তুমি হবে চিরসাথি, লও লও হে ক্রোড় পাতি,

অসীমের পথে জলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার ।

মুক্তিদাতা, তােমার ক্ষমা তােমার দয়া হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার,

হয় যেন মর্তের বন্ধন-ক্ষয়, বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়—

পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয় মহা অজানার।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান-৫৫

বিদ্যাপীঠের তরুলতা মুগ্ধ করে মন

বিদ্যাপীঠ গীতি

মিশ্র-ইমন—ভূপালী


বিদ্যাপীঠের তরুলতা মুগ্ধ করে মন,

হৃদয় মাঝে রচে সে যে সােনারি স্বপন

ও তার তুলনা ভাই দেখতে নাহি পাই ভ্ৰমি ত্রিভুবন

সাধের বিদ্যাপীঠ যে মােদের, শােভার নিকেতন

বিদ্যাপীঠের উদার মাঠে বিস্তারিত স্নেহ

মন ভরে দেয় প্রাণ ভরে দেয় সবল করে দেহ

ঘর ছাড়া পায় ঘর, আপন হল পর, দেখেছ কি কেহ

বিদ্যাপীঠের প্রাঙ্গণেতে মিটিবে সন্দেহ।

বিদ্যাপীঠের গগনতলে দীপ্ত আলাে জ্বলেরে

সেই আলােকের শিক্ষা বয়ে ছাত্রদল চলে রে

চব দেশ দেশান্তরে ঘুরব মরু প্রান্তরে

অভীঃ হাওয়ার বাণী সাধি নূতন জগৎ গড়বাে রে ॥


—স্বামী হিরন্ময়ানন্দ

প্রভু তেরী দয়া হয় অপার তুঁ অগম অগােচর অবিকল

কাফি

নিরাকার


প্রভু তেরী দয়া হয় অপার, তুঁ অগম, অগােচর, অবিকল;

চর-অচর, সকল কো কুঁ আধার, পতিতনকে উদ্ধার।

দীননাথ পতিতরু, দূরবল, মহৎ-অপরাধী,

শরণাগত হুঁ চতুর তেহার, মােহে পার উতার।


—অজ্ঞাত

মহা সিংহাসনে বসি শুনিছ হে বিশ্বপিত

ভৈরবীঝাপতাল*


মহা সিংহাসনে বসি শুনিছ, হে বিশ্বপিত,

তােমারি রচিত ছন্দে মহান্ বিশ্বের গীত।

মর্তের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কণ্ঠ লয়ে

আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপনীত।

কিছু নাহি চাহি দেব, কেবল দর্শন মাগি।

তােমারে শােনাব গীত, এসেছি তাহারি লাগি।

গায় যেথা রবি শশী সেই সভামাঝে বসি

একান্তে গাইতে চাহে এই ভকতের চিত।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান-৮

পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে

ঝিঁঝিট—একতালা*


পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে,

শান্তি-সদন সাধন-ধন দেব-দেব হে ॥

সর্বলােক-পরম-শরণ, সকল মােহ-কলুষ-হরণ,

দুঃখ-তাপ-বিঘ্ন-তরণ, শােক-শান্ত-স্নিগ্ধ-চরণ,

সত্যরূপ প্রেমরূপ হে,

দেব-মনুজ-বন্দিত-পদ বিশ্বরূপ হে ॥

হৃদয়ানন্দ পূর্ণ ইন্দু তুমি অপার প্রেমসিন্ধু।

যাচে তৃষিত অমিয়বিন্দু, করুণালয় ভক্তবন্ধু

প্রেমনেত্রে চাহ’ সেবকে,

বিকশিতদল চিত্তকমল হৃদয়-দেব হে ॥

পুণ্যজ্যোতি-পূর্ণ গগন, মধুর হেরি সকল ভুবন,

সুগন্ধ-মুদিত পবন, ধ্বনিত-গীত হৃদয়-ভবন।

এস এস’ শূন্য জীবনে,

মিটাও আশ সব তিয়াস অমৃত-প্লাবনে ॥

দেহ জ্ঞান, প্রেম দেহ, শুদ্ধ চিত্তে বরিষ স্নেহ,

ধন্য হােক হৃদয় দেহ, পুণ্য হােক্ সকল গেহ।

পাদপ্রান্তে রাখ’ সেবকে

শান্তিসদন সাধনধন দেব দেব হে ॥


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



* স্বরবিতান-২৬

শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান

মিশ্র—কাহারবা*


শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান।

সব দুর্বল সংশয় হােক অবসান ।

চির-শক্তির নিঝর নিত্য ঝরে লহ সে অভিষেক ললাট’পরে।

তব জাগ্রত নির্মল নূতন প্রাণ

ত্যাগব্রতে নিক দীক্ষা, বিঘ্ন হতে নিক শিক্ষা

নিষ্ঠুর সঙ্কট দিক সম্মান।

দুঃখই হােক তব বিত্ত মহান।

চল’ যাত্রী, চল’ দিনরাত্রি

কর অমৃতলােকপথ অনুসন্ধান।

জড়তাতামস হও উত্তীর্ণ, ক্লান্তিজাল কর’ দীৰ্ণ বিদীর্ণ-

দিন-অন্তে অপরাজিত চিত্তে মৃত্যুতরণ তীর্থে কর’ স্নান ।


—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


* স্বরবিতান—৪৭

শৌর্য দাও বীর্য দাও নবীন জীবন দাও

ভৈরবী-দাদরা**


শৌর্য দাও, বীর্য দাও, নবীন জীবন দাও,

পরা অপরা বিদ্যা দাও, দিব্য চেতন দাও ।

কর্মে শক্তি দাও, হৃদয়ে ভকতি দাও,

নির্মল শুভ বুদ্ধি দাও, জ্ঞান গরিমা দাও ।

ত্যাগেতে মতি দাও, সেবাতে প্রীতি দাও,

স্বার্থ দ্বন্দ্ব ভেদবুদ্ধি চিরতরে মুছে দাও।

এ নবযুগের নবীনতন্ত্রে দীক্ষিত কর মিলন মন্ত্রে,

সার্থক কর জীবন মােদের চরণে শরণ দাও ।


—স্বামী চণ্ডিকানন্দ



** স্বরলিপি ঃ আনন্দ লহরী

কে তুমি রাখাল রাজা সাজিয়ে নরের সাজে

দরবারী কানাড়া—ঝাঁপতাল


কে তুমি রাখাল রাজা সাজিয়ে নরের সাজে।

গােলকে আসন ছাড়ি এসেছ গুরুর কাজে।

সরল বালক অতি মায়া মুক্ত মহামতি

বালগােপাল মূরতি অন্তরে সদা বিরাজে ।

বাহিরে বালক হাস ভিতরে ব্রহ্মবিকাশ

কে চিনিতে পারে তােমায় চেনা নাহি দিলে নিজে ||

তব পদে করি নতি জাগিছে গুরু ভকতি

গুরুদত্ত মন্ত্র যেন নিয়ত অন্তরে বাজে ।


—শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী

মহিষাসুরমর্দিনী-স্তোত্রম্

মহিষাসুরমর্দিনী-স্তোত্রম্*


অয়ি গিরিনন্দিনি নন্দিতমেদিনি বিশ্ববিননাদিনি নন্দিনুতে

গিরিবরবিন্ধ্যশিরােহধিনিবাসিনি বিষ্ণুবিলাসিনি জিষ্ণুনুতে।

ভগবতি হে শিতিকণ্ঠকুটুম্বিনি ভূরিকুটুম্বিনি ভূরিকৃতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১॥

সুরবরবর্ষিণ দুর্ধধর্ষিীণ দুর্মুখমর্ষিীণ হর্ষরতে

ত্রিভুবনপােষিণি শঙ্করতােষিণি কিন্বিষমমাষিণি ঘােষরতে।

দনুজনিরােষিণি দিতিসুতররাষিণি দুর্মদশাষিণি সিন্ধুসুতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে | ২||

অয়ি জগদম্ব মদম্ব কদম্ব বনপ্রিয়বাসিনি হাসরতে

শিখরি শিরােমণি তুঙ্গহিমালয় শৃঙ্গনিজালয় মধ্যগতে।

মধুমধুরে মধুকৈটভগঞ্জিনি কৈটভঞ্জিনি হাসরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে | ৩ ||

অয়ি শতখণ্ড বিখণ্ডিতরুণ্ড বিতুণ্ডিতশুণ্ড গজাধিপতে

রিপুগজগৎ বিদারণচণ্ড পরাক্রমশুণ্ড মৃগাধিপতে।

নিজভুজদণ্ড নিপাতিতখণ্ড বিপাতিতমুণ্ড ভটাধিপতে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৪॥

8 11

অয়ি রণদুর্মদ শত্রুবধােদিতদুর্ধরনির্জর শক্তিতে

চতুরবিচার ধুরীণমহাশিব দূতকৃত প্রমথাধিপতে।

দুরিতদুরীহ দুরাশয়দুর্মতি দানবদূত কৃতান্তমতে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে | ৫||

অয়ি শরণাগত বৈরিবধূবর বীরবরাভয় দায়করে

ত্রিভুবনমস্তক শূলবিরােধি শিরােইধিকৃতামল শূলকরে।

দুমিদুমিতামর দুন্দুভিনাদমহােমুখরীকৃত দিগ্মকরে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ৬ ||

অয়ি নিজহুংকৃতিমাত্র নিরাকৃত ধূম্রবিলােচন ধূম্ৰশতে

সমরবিশােষিত শােণিতবীজ সমুদ্ভবশশাণিত বীজলতে।

শিবশিবশুম্ভ নিশুম্ভমহাহব তর্পিতভূত পিশাচরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ৭||

ধনুরনুষঙ্গ রণক্ষণসঙ্গ পরিস্ফুরদঙ্গ নটকটকে

কনকপিশঙ্গ পৃষৎকনিষঙ্গ রসঙটশৃঙ্গ হতাবটুকে।

কৃতচতুরঙ্গ বলক্ষিতিরঙ্গ ঘটদ্বহুরঙ্গ রটদ্বটুকে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে।। ৮ ||

জয় জয় জপ্য জয়েজয়শব্দ পরস্তুতি তৎপর বিশ্বনুতে

ঝণঝণ ঝিংঝিমি ঝিংকৃতনূপুর শিঞ্জিতমােহিত ভূতপতে।

নটিত নটার্ধ নটী নট নায়ক নাটিতনাট্য সুগানরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে। ৯।

অয়ি সুমনঃ সুমনঃ সুমনঃ সুমনঃ সুমনােহর কান্তিযুতে

শ্রিতরজনী রজনী রজনী রজনী রজনীকর ববৃতে।

সুনয়ন বিভ্রমর ভ্রমর ভ্রমর ভ্রমর ভ্রমরাধিপতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ১০ |

সহিতমহাহব মল্লমতল্লিক মল্পিতরল্লক মল্লরতে

বিরচিত বল্লিক পল্লিক মল্লিক ঝিল্লিক ভিল্লিক বর্গবৃতে।

সিতকৃতফুল্ল সমুল্লসিতারুণতল্লজ পল্লব সল্ললিতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ১১ ॥

অবিরল গণ্ডগলন্মদমেদুর মত্তমতঙ্গজরাজপতে

ত্রিভুবনভূষণ ভূতকলানিধি রূপপয়ােনিধি রাজসুতে।

অয়ি সুদতীজন লালসমানস মােহনমন্মথ রাজপুতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ১২

কমলদলামল কোমলকান্তি কলাকলিমল ভাললতে

সকলবিলাস কলানিলয়ম কেলিচলকল হংসকুলে।

অলিকুলসঙ্কুল কুবলয়মণ্ডল মৌলিমিলদ্বকুলালিকুলে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ১৩ |

করমুরলীরব বীজিতকৃজিত লজ্জিতকোকিল মঞ্জুমতে

মিলিতপুলিন্দ মনােহরগুঞ্জিত রঞ্জিতশৈল নিকুঞ্জগতে।

নিজগণভূত মহাশবরীগণ সদ্গুণসংভৃত কেলিতলে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে। ১৪ |

কটিতটপীত দুকুলবিচিত্র ময়ুখতিরস্কৃত চন্দ্ররুচে

প্রণতসুরাসুর মৌলিমণিস্ফুরদংশুলসন্নখ চন্দ্ররুচে।

জিতকনকাচল মৌলিমদোর্জিত নির্ভরকুঞ্জর কুম্ভকুচে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ১৫ |

বিজিতসহস্ৰকরৈক সহস্ৰকরৈক সহস্ৰকরৈকনুতে

কৃতসুরতারক সঙ্গরতারক সঙ্গরতারক সূনুসুতে।

সুরথসমাধি সমানসমাধি সমাধিসমাধি সুজাতরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে।১৬ ||

পদকমলং করুণানিলয়ে বরিবস্যতি যােইনুদিনং সুশিবে

অয়ি কমলে কমলানিলয়ে কমলানিলয়ঃ স কথং ন ভবেৎ।

তবপদমেব পরং পদমিত্যনুশীলয়তাে মম কিং ন শিবে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে। ১৭ |

কনকলসকল সিন্ধুজলৈরনুষিঞ্চতি তে গুণরঙ্গভুবং

ভজতি স কিং ন শচীকুচকুম্ভ তটীপরিরম্ভ সুখানুভবম্।

তব চরণং শরণং করবাণি নতামরবাণি নিবাসি শিবম্

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে।। ১৮ |

তব বিমলেন্দুকুলং বদনেন্দুমলং সকলং ননু কূলয়তে

কিমু পুরুহুতপুরীমুখী সুমুখীভিরসৌ বিমুখী ক্রিয়তে।

মম তু মতং শিবনামধনে ভবতী কৃপয়া কিমুত ক্রিয়তে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে। ১৯।

অয়ি ময়ি দীনদয়ালুতয়া কৃপয়ৈব ত্বয়া ভবিতব্যমুমে

অয়ি জগত জননী কৃপয়াসি যথাসি তথানুমিতাসিরতে ।

যদুচিতমত্র ভবত্যুররী কুরুদুরুতাপমপাকুরুতে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে || ২০ ||



*স্বরলিপি ঃ সুরবিতান