আমাদের গান

প্রকাশক স্বামী সৰ্বলােকানন্দ সম্পাদক রামকৃষ্ণ মিশন লােকশিক্ষা পরিষদ, রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম নরেন্দ্রপুর, কলকাতা-৭০০ ১০৩ রামকৃষ্ণ মিশন লােকশিক্ষা পরিষদ, নরেন্দ্রপুর কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ১৮তম পুনর্মুদ্রণ ২৬ জানুয়ারি, ২০১৫ ২০তম পুনর্মুদ্রণ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ December 2021 3M সংকলন স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ সম্পাদনা স্বামী সর্বগানন্দ মুদ্রণ রমা আর্ট প্রেস ৬/৩০ দমদম রােড কলকাতা-৭০০ ০৩০

বেদপাঠ

বেদপাঠ

(উচ্চারণ সংকেতসহ)


ওঁ সহ নাববতু । সহ নৌ ভুনক্তু।

সহ বীর্যং করবাবহৈ। তেজস্বিনাবধীতমস্তু।

মা বিদ্বিষাবহৈ॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥
(কৃষ্ণযজুর্বেদীয়শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

ঈশ্বর (ব্রহ্ম) আমাদিগকে (আচার্য ও শিষ্যকে) সমভাবে রক্ষা করুন। আমাদের উভয়কে তুল্যভাবে বিদ্যাফল দান করুন। আমরা যেন সমভাবে সামর্থ্য অর্জন করিতে পারি। অধীত বিদ্যার ফলভোগে সমর্থ করুন। অধীত বিদ্যা যেন আমাদের উভয়ের জীবনে তেজস্কর (কার্যকরী) হয়। পরস্পরের প্রতি আমরা যেন বিদ্বেষভাব পোষণ না করি। শান্তি-শান্তি-শান্তি (আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক সর্বপ্রকার বিঘ্ন উপশান্ত হইয়া পরিপূর্ণ শান্তি বিরাজ করুক।)



ওঁ শং নো মিত্রঃ শং বরুণঃ । শং নো ভবত্বর্যমা ।

শং ন ইন্দ্রো বৃহস্পতিঃ। শং নো বিষ্ণুরুরুক্ৰমঃ ।

নমো ব্ৰহ্মণে । নমস্তে বায়ো। ত্বমেব প্রত্যক্ষং ব্রহ্মাসি ।

ত্বমেব প্রত্যক্ষং ব্রহ্ম বদিষ্যামি। ঋতং বদিষ্যামি ।

সত্যং বদিয্যামি। তন্মামবতু। তদ্বক্তারমবতু।

অবতু মাম্ । অবতু বক্তারম্।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

(কৃষ্ণযজুর্বেদীয়শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

আমাদের প্রতি সূর্যদেব সুখপ্রদ হউন; বরুণদেব সুখ প্রদান করুন। অর্যমাদেব (রাত্রির দেবতা) সুখপ্রদায়ী হউন। ইন্দ্র ও বৃহস্পতি দেবদ্বয় আমাদের আনন্দপ্রদ হউন। বিস্তীর্ণ পদক্ষেপণকারী ভগবান বিষ্ণু আমাদের সুখ সম্পাদন করুন।


ব্রহ্মরূপ (পরোক্ষ) বায়ুকে নমস্কার। হে (প্রত্যক্ষ) বায়ু তোমাকে নমস্কার। তুমিই প্রত্যক্ষ ব্রহ্মস্বরূপ। তোমাকেই প্রত্যক্ষ ব্রহ্মরূপে বলিব। ঋত স্বরূপ বলিব, সত্যস্বরূপ বলিব। সেই ব্রহ্ম আমাকে রক্ষা করুন, আমার আচার্যদেবকে রক্ষা করুন। রক্ষা করুন আমাকে, রক্ষা করুন আমার আচার্যদেবকে। ত্রিবিধ বিঘ্নের উপশম হইয়া মধুময় শান্তি বিকীর্ণ হউক।



ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ ।

         ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ ।

স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টুবাগং সস্তনূভিঃ

       ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ।

স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ ।

         স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্ববেদাঃ ।

স্বস্তি নস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ।

          স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু ॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

(অথর্ববেদীয় শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

হে দেবগণ, আমরা কর্ণদ্বারা যেন কল্যাণময়ী বাণী শ্রবণ করি; হে যজনীয় দেবগণ, আমরা চক্ষুদ্বারা যেন সুশোভন দর্শন করিতে সমর্থ হই; সুস্থ হস্তপদাদি অবয়ববিশিষ্ট হইয়া আমরা যেন তোমাদের স্তুতিগান করিতে পারি এবং প্রজাপতি দ্বারা নির্দিষ্ট-জীবনকাল (আয়ু) প্রাপ্ত হই। বৃদ্ধশ্রবা (প্রভূত হবিরূপ অন্ন যাঁহার আছে সেই) ইন্দ্রদেব আমাদের মঙ্গল করুন; সর্বজ্ঞানাধার পূষা (জগৎ পোষণকারী দেবতা) আমাদের কল্যাণ করুন; সর্পাদিকৃত-হিংসা-নিবারণকারী তার্ক্ষ (গরুড়) আমাদের মঙ্গল করুন; দেবগুরু বৃহস্পতি আমাদের মঙ্গল বিধান করুন। আমাদের আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক শান্তি হউক। 



8

ওঁ ঋতগ্ং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্ ।

উর্দ্ধরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥


বঙ্গানুবাদ

যিনি পরব্রহ্ম তিনিই পারমার্থিক সত্যস্বরূপ, তিনি পুরুষাকার, কৃষ্ণবর্ণ ও পিঙ্গলবর্ণ, ঊর্ধরেতা এবং ত্রিনেত্র; সেই সর্বজগদাত্মাকে নমস্কার। শান্তি হউক, শান্তি হউক, শান্তি হউক।



ওঁ অসতো মা সদ্গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়

মৃত্যোর্মাঽমৃতং গময়। আবিরাবীৰ্ম এধি ।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥


বঙ্গানুবাদ

অসৎ হইতে আমাকে সতে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে আলোকে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও; হে স্বপ্রকাশ ব্রহ্ম আমার নিকট প্রকাশিত হও। শান্তি হউক, শান্তি হউক, শান্তি হউক।



ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ।

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

   (শুক্লযজুর্বেদীয়শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

উহা [পরব্রহ্ম] পূর্ণ, ইহাও [নামরূপস্থ ব্ৰহ্ম] পূর্ণ; পূর্ণ হইতে পূর্ণ উদ্গত হন; পূর্ণের [কার্যব্রহ্মেব] পূর্ণত্ব গ্রহণ করিলে পূর্ণ [পরব্রহ্মই] অবশিষ্ট থাকেন। শান্তি, শান্তি, শান্তি।



ওঁ বাঙ্ মে মনসি প্রতিষ্ঠিত মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্

আবিরাবীর্ম এধি । বেদস্য ম আণীস্থঃ । শ্রুতং মে মা প্রহসীঃ

অনেনাধীতেনাহোরাত্ৰান্ সংদধামি। ঋতং বদিষ্যামি ।

সত্যং বদিয্যামি। তন্মামতু । তদ্বক্তারমবত্ববতু মাম্।

অবতু বক্তারমতু বক্তারম্

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

(ঋগ্বেদীয় শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

আমার বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত হউক, আমার মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হউক। হে স্বপ্রকাশ ব্রহ্ম, আমার নিকট প্রকাশিত হও। [হে বাক্য ও মন, তোমরা] আমার নিকট বেদার্থের আনয়নে সমর্থ হও। শ্রুত বিষয় যেন আমাকে ত্যাগ না করে। এই অধ্যয়নের দ্বারা আমি দিবা রাত্র সংযোজিত করিব। আমি মানসিক সত্য বলিব, বাচনিক সত্য বলিব। ব্রহ্ম আমাকে রক্ষা করুন; ব্রহ্ম আচার্যকে রক্ষা করুন, আমায় রক্ষা করুন আচার্যকে রক্ষা করুন। ত্রিবিধ বিঘ্নের শান্তি হউক, শান্তি হউক, শান্তি হউক।



ওঁ যচ্ছন্দসামৃষভো বিশ্বরূপঃ । ছন্দোভ্যোঽধ্যমৃতাত্সংবভূব।

স মেন্দ্রো মেধয়া স্পৃণোতু। অমৃতস্য দেবধারণো ভূয়াসম।

শরীরং মে বিচর্ষণম্। জিহ্বা মে মধুমত্তমা। কর্ণাভ্যাং

ভূরিবিশ্রুবম্। ব্ৰহ্মণঃ কোশোঽসি মেধয়া পিহিতঃ। 

শ্রুতং মে গোপায় । আবহন্তী বিতন্বানা

কুর্বাণা চীরমাত্মনঃ। বাসাগংসি মম গাবশ্চ।

অন্নপানে চ সর্বদা। ততো মে শ্রিয়-মাবহ।

লোমশাং প্রশুভিঃ সহ স্বাহা। আমায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা।

বিমাঽয়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা। প্রমাঽয়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা।

দমায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা। শমায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা ।

যশো জনেহসানি স্বাহা। শ্রেয়ান্ বস্যসোঽসাঽসানি স্বাহা।

তং ত্বা ভগ প্রবিশানি স্বাহা। স মা ভগ প্রবিশ স্বাহা।

তস্মিন্ সহস্রশাখে। নিভগাঽহং ত্বয়ি মৃজে স্বাহা। 

যথাঽপঃ প্ৰবতায়ন্তি। যথা মাসা অহর্জরম্।

এবং মাং ব্রহ্মচারিণঃ। ধাতরায়ন্তু সর্বতঃ স্বাহা।

প্রতিবেশোঽসি প্রমাভাহি প্রমাপদ্যস্ব।

ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

তৈত্তিরীয়াপনিষৎ(শিক্ষাবল্লী, চতুর্থোনুবাকঃ)


বঙ্গানুবাদ

যিনি সমস্ত বেদের মধ্যে প্রধান, যিনি সমস্ত শব্দে অনুব্যাপ্ত, অমৃতস্বরূপ বেদে যাঁহার উদ্ভব সেই ওঙ্কার আমাকে মেধাসম্পন্ন করুন। হে দেব, আমি যেন অমৃত (অমৃতসাধন জ্ঞান) ধারণের যোগ্য আধার হইতে পারি। শরীর আমার উপযুক্ত হউক, জিহ্বা মধুক্ষরণ করুক, কর্ণদ্বয় বহু পরিমাণে (বিদ্যা) শ্রবণ করুক। (হে ওঙ্কার) তুমিই ব্রহ্মোপলব্ধির কোশস্বরূপ (ব্রহ্ম উপলব্ধির আশ্রয়স্থল—তোমাতে ব্রহ্ম উপলব্ধ হইয়া থাকেন)। কিন্তু সাধারণ লৌকিক বুদ্ধির নিকট তাহা অজ্ঞাত। আমার শ্রবণলব্ধ জ্ঞানকে তুমি রক্ষা করো।


(হে ওঙ্কার), (সম্পদকামী) আমার জন্য তুমি লোমশ পশু ও অন্যান্য বহু পশু সমাযুক্ত সেই ‘শ্রী’-কে আনয়ন করো যাহা মন্নিমিত্ত বস্ত্র, গো, অন্ন ও পানীয় বস্তুসকল ক্ষিপ্র সংগৃহীত ও বর্ষিত করিবে (স্বাহা’ সমাপ্তিসূচক)।


(হে ওঙ্কার), ব্রহ্মচারীগণ আমার নিকট আগমন করুক। ব্রহ্মচারীগণ চতুর্দিক হইতে আমার নিকট আগমন করুক, শাস্ত্রবিধি অনুসারে আমার নিকট আগমন করুক। ব্রহ্মচারীগণ ‘দম’ গুণযুক্ত হউক। তাহারা শম’ গুণযুক্ত হউক।


লোকসমাজে আমি যেন যশস্বী হই। ধনী সমাজে আমি যেন অধিকতর ধনবান হই। হে ভগবান, ব্রহ্মোপলব্ধির কোশস্বরূপ তোমাতে যেন আমি প্রবেশ করি। হে ভগবান, ওইরূপ স্বরূপবিশিষ্ট তুমিও আমাতে প্রবেশ করো। হে ভগবান, তুমি সহস্রশাখা স্রোতস্বতী তুল্য। তোমাতে আমার পাপকর্মরাশি নিঃশেষে শোধন করিতেছি। বারিধারা যেমন নিম্ন নিম্ন প্রদেশ অভিমুখে গমন করে, মাস সমূহ যেমন সংবৎসর মধ্যে ধাবিত হয়, ব্রহ্মচারীগণ, হে বিধাতা, সেইভাবে মৎ-সকাশে আগমন করুক।


তুমি চরাচর ব্রহ্মাণ্ডের বিশ্রামনিকেতন স্বরূপ। (শরণাগত আমি) আমার নিকট তোমার স্বরূপ প্রকাশ করো। আমাকে তুমি গ্রহণ করো (তোমার সহিত আমাকে অভিন্ন করিয়া লও)।


সর্বপ্রকার বিঘ্ন উপশান্ত হইয়া অখণ্ড শান্তি বিরাজ করুক।



বেদমনূচ্যাচাৰ্যোঽন্তেবাসিনমনুশাস্তি। সত্যং বদ । ধর্মং চর।

স্বাধ্যায়ান্মা প্রমদঃ । আচার্যায় প্রিয়ং ধনমাহৃত্য প্রজাতন্তুং মা

ব্যবচ্ছেৎসীঃ। সত্যান্ন প্রমদিতব্যম্। ধর্মান্ন প্রমদিতব্যম্। কুশলান্ন

প্রমদিতব্যম্। ভূত্যৈ ন প্রমদিতব্যম্। স্বাধ্যায়-প্রবচনাভ্যাং ন

প্রমদিতব্যম্ ।

দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম ॥ মাতৃদেবো ভব ।

পিতৃদেবো ভব। আচার্যদেবো ভব। অতিথিদেবো ভব।

যান্যনবদ্যানি কর্মাণি। তানি সেবিতব্যানি। নো ইতরাণি ।

যান্যস্মাকং সুচরিতানি। তানি ত্বয়োপাস্যানি।

নো ইতরাণি। যে কে চাস্মচ্ছেয়াংসো ব্রাহ্মণাঃ। তেষাং

ত্বয়াঽসনেন প্রশ্বসিতব্যম্। শ্রদ্ধয়া দেয়। অশ্রদ্ধয়াঽদেয়।

শ্রিয়া দেয়ম্। হ্রিয়া দেয়ম্। ভিয়া দেয়ম্‌। সংবিদা দেয়ম্।

অথ যদি তে কর্মবিচিকিৎসা বা বৃত্তবিচিকিৎসা বা স্যাৎ ।

যে ত্র ব্রাহ্মণাঃ সম্মর্শিনঃ। যুক্তা আযুক্তাঃ । অলুক্ষা ধর্মকামাঃ 

স্যুঃ । যথা তে তত্র বর্তেরন্। তথা তত্র বর্তেথাঃ ।

অথাভ্যাখ্যাতেষু। যে তত্র ব্রাহ্মণাঃ সম্মর্শিনঃ। যুক্তা আযুক্তাঃ ।

অলুক্ষা ধর্মকামাঃ স্যুঃ। যথা তে তেষু বর্তেরন্। তথা তেষু

বর্তেথাঃ । এষ আদেশঃ। এষ উপদেশঃ। এষা বেদোপনিষৎ ।

এতদনুশাসনম্। এবমুপাসিতব্যম্। এবমুচৈতদুপাস্যম্।

ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

তৈত্তিরীয়োপনিষৎ (শিক্ষাবল্লী, একাদশোহনুবাকঃ)


বঙ্গানুবাদ

বেদাধ্যাপনানন্তর আচার্য শিষ্যকে এইরূপ উপদেশ দিয়া থাকেন:

সত্য বলিবে। ধর্ম আচরণ করিবে। প্রমাদবশত অধ্যয়ন হইতে বিরত হইবে না। আচার্যকে উত্তম ধন প্রদান করিয়া গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশপূর্বক সন্তানধারা অবিচ্ছিন্ন রাখিবে। সত্যরক্ষা বিষয়ে কখনো প্রমাদগ্রস্ত হইয়ো না। ধর্মাচরণ হইতে কখনো বিচ্যুত হইয়ো না। আত্মরক্ষাৰ্থ কর্মে কখনো বিরত হইয়ো না। মাঙ্গলিক কর্মানুষ্ঠানে কখনো অবহেলা করিয়ো না। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনাকার্যে ভ্রমেও বিরত হইয়ো না। দেবকার্যে ও পিতৃকার্যে কখনো ভ্ৰমগ্রস্ত হইয়ো না। মাতাকে দেবীজ্ঞান করিবে। পিতাকে দেবজ্ঞান করিবে। আচার্যকে দেবতাজ্ঞানে ব্যবহার করিবে। যে সমস্ত কর্ম অনিন্দিত সেইগুলিরই অনুষ্ঠান করিবে—অন্যগুলির নহে। আমাদের শোভন আচরণ যেইগুলি সেইগুলি তুমি অনুষ্ঠান করিবে—অন্যগুলির অনুষ্ঠান করিবে না। আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর যাহারা, আসনাদি প্রদান করিয়া তাহাদের শ্রম অপনোদন করিবে। শ্রদ্ধার সহিত দান করিবে, অশ্রদ্ধার সহিত করিয়ো না। শ্ৰী’ মণ্ডিত দান করিবে। সলজ্জভাবে দান করিবে, ভীতির সহিত (বিনম্র চিত্তে) দান করিবে। পরমপ্রীতি সহকারে দান করিবে।


ভবিষ্যতে যদি কখনো কর্ম (কর্তব্য) বিষয়ে বা আচার বিষয়ে তোমার কোনো সংশয় উপস্থিত হয় তাহা হইলে বিচার-কুশল, কর্মাদিতে (কর্তব্যাদির) স্বতঃপ্রবৃত্ত, অরুক্ষস্বভাব ধর্মপরায়ণ যে সকল ব্রাহ্মণ তত্কালে বিদ্যমান থাকিবেন, তাঁহারা যেরূপ আচরণ করিবেন তুমিও সেইরূপ করিবে। আবার পূর্বোক্ত ব্যক্তিগণের কাহারও আচরণে যদি কেহ সংশয় উপস্থিত করে, তবে ওই কালে বা স্থানে যেসকল বিচারক্ষম, কর্মনিষ্ঠ, কর্মাদিতে স্বতঃপ্রবৃত্ত, অক্রমতি ও নিষ্কাম ব্রাহ্মণ থাকিবেন, তাঁহারা ওই সকল বিষয়ে যেরূপ নিরত থাকেন, তুমিও সেইরূপ থাকিবে।


ইহাই আদেশ, ইহাই উপদেশ, ইহাই বেদের গূঢ় রহস্য, ইহাই ঈশ্বরের অনুশাসন। এইভাবেই উপাসনা করিবে—এইভাবেই সর্বপ্রকার আচরণ করিবে।


আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, সর্বপ্রকার বিঘ্ন উপশান্ত হইয়া অমৃতময় পরম অখণ্ড শান্তি সর্বত্র বর্ষিত হউক।



১০

ও মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ

মাধ্বীর্নঃ সন্তোষধীঃ ॥

মধু নক্তমুতোষসি মধুমৎ পার্থিবগ্ং রজঃ।

মধুদৌরস্তু নঃ পিতা ॥

মধুমান্নো বনস্পতির্মধুমাগ্ং অস্তু সূৰ্য্যঃ।

মাধ্বীৰ্গাবো ভবন্তু নঃ ॥

ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

          (ঋগ্বেদীয় শান্তিবচন)


বঙ্গানুবাদ

সত্যপথ যাত্রী আমাদের নিকট বায়ু মধুর হউক, নদীসমূহ মধুময় রসক্ষরণ করুক, আর ওষধিসমূহ হউক মধুময়। 

রাত্রি এবং দিন শান্তিময় হউক, বিশ্বচরাচরে বিরাজ করুক শান্তি, পিতৃস্বরূপ দ্যুলোক আমাদের নিকট শান্তিপূর্ণ হউক।

বনানী আমাদিগকে প্রদান করুক মিষ্ট ফল, সূর্য হউক আনন্দবর্ষী আর গাভীরাও আমাদের নিকট সুখপ্রদ হউক। মধুময় হউক ত্রিভুবন।

ভৈরবী

শৃন্বন্তু বিশ্বেঽমৃতস্য পুত্ৰা আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূঃ

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবৰ্ণং তমসঃ পরস্তাৎ

তমেব বিদিত্বাঽতিমৃত্যুমেতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায় ॥

এতজ্ জ্ঞেয়ং নিত্যমেবাত্মসংস্থম্ নাতঃ পরং বেদিতব্যং হি কিঞ্চিৎ ।

সংপ্রাপ্যৈনমৃষয়ো জ্ঞানতৃপ্তাঃ কৃতাত্মানো বীতরাগাঃ প্রশান্তাঃ ।

তমেব বিদিত্বাঽতিমৃত্যুমেতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায় ॥

যশ্চায়মস্মিন্নাকাশে তেজোময়োঽমৃতময়ঃ পুরুষঃ সর্বানুভূঃ,

যশ্চায়মস্মিন্নাত্মনি তেজোময়োঽমৃতময়ঃ পুরুষঃ সর্বানুভূঃ,

তমেব বিদিত্বাঽতিমৃত্যুমেতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায় ॥

-উপনিষদ

শ্রীশ্রীগুরুস্তবাষ্টক

ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে

গৌড় সারঙ্গ-ঠুংরি


ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে, রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে,

শরণাগত কিঙ্কর ভীত মনে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

হৃদিকন্দর-তামস-ভাস্কর হে, তুমি বিষ্ণু প্রজাপতি শঙ্কর হে,

পরব্রহ্ম পরাৎপর বেদ ভণে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে, নরত্রাণ তরে হরি চাক্ষুষ হে,

গুণগান-পরায়ণ দেবগণে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

কুলকুণ্ডলিনী-ঘুম-ভঞ্জক হে, হৃদিগ্রন্থি-বিদারণ-কারক হে,

মম মানস চঞ্চল রাত্রদিনে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

রিপুসূদন মঙ্গল-নায়ক হে, সুখ-শান্তি-বরাভয়-দায়ক হে,

ত্রয়তাপ হরে তব নামগুণে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

অভিমান-প্রভাব-বিমর্দক হে, গতিহীনজনে তুমি রক্ষক হে,

চিত শঙ্কিত বঞ্চিত ভক্তিধনে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

তব নাম সদা শুভ-সাধক হে, পতিতাধম-মানব-পাবক হে,

মহিমা তব গোচর শুদ্ধমনে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

জয় সদ্গুরু ঈশ্বর-প্রাপক হে, ভব-রোগ-বিকার-বিনাশক হে,

মন যেন রহে তব শ্রীচরণে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে ॥

দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

শ্রীশ্রীশিব সংগীত

শিবাষ্টক স্তোত্রম্

গৌর সারঙ্গ-কাহারবা


প্রভুমীশমনীশমশেষগুণং গুণহীনমহেশগরাভরণম্।

রণনির্জিতদুর্জয়দৈত্যপুরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্॥১


গিরিরাজ-সুতান্বিত-বামতনুং, তনুনিন্দিতরাজিত-কোটিবিধুম্ ।

বিধিবিষ্ণু-শিরোধৃতপাদযুগংপ্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্॥২


শশলাঞ্ছিত-রঞ্জিত-সন্মুকুটং, কটিলম্বিতসুন্দর-কৃত্তিপটম্।

সুর-শৈবলিনীকৃত-পূতজটং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্॥৩


নয়নত্রয়-ভূষিতচারুমুখং, মুখপদ্মপরাজিত-কোটিবিধুম্।

বিধুখণ্ডবিমণ্ডিত-ভালতটং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্॥৪


বৃষরাজনিকেতনমাদিগুরুং, গরলাশনমাজিবিষাণধরম্।

প্রমথাধিপসেবকরঞ্জনকং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৫


মকরধ্বজ-মত্তমাতঙ্গহরং, করিচর্মগনাগ-বিবোধকরম্।

বরমার্গণ-শূলবিষাণধরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৬


জগদুদ্ভব-পালন-নাশকরং, ত্রিদিবেশশিরোমণি-ঘৃষ্টপদম্।

প্রিয়মানব-সাধুজনৈকগতিং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৭


অনাথং সুদীনং বিভো বিশ্বনাথ, পুনর্জন্মদুঃখাৎ পরিত্রাহি শম্ভো।

ভজতোঽখিল-দুঃখ-সমূহহরং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ॥৮

-শ্ৰীশঙ্করাচার্য


বঙ্গানুবাদ

যিনি সকলের প্রভু ও ঈশ্বর, যাঁহার আর কেহ ঈশ্বর নাই, অশেষগুণশালী অথচ নির্গুণ; নাগরাজ বাসুকির গরল যাঁহার আভরণ, যিনি রণে দুর্জয় দৈত্যপুরী জয় করিয়াছেন সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষস্বরূপ শিবকে প্রণাম করি। ১।


যাঁহার বাম অঙ্গে পার্বতী বিরাজিতা, যাঁহার অঙ্গকান্তিতে কোটি শরচ্চন্দ্রের আভা নিন্দিত হয়, যাঁহার পাদদ্বয় ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মস্তকে ধৃত হয়, সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ২।


শশধরের দ্বারা যাঁহার সুন্দর মুকুট রঞ্জিত, যাঁহার কটিতটে সুন্দর চর্মবসন লম্বিত এবং সুরধুনী যাঁহার জটাজুট পবিত্র করিয়াছেন, সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ৩।


যাঁহার সুন্দর মুখ নয়নত্রয়ের দ্বারা ভূষিত, যাঁহার মুখপদ্মের দ্বারা কোটি চন্দ্র বিনিন্দিত এবং যাঁহার কপালতট চন্দ্রকলাদ্বারা অলংকৃত, সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ৪।


যিনি ধর্মরাজের আশ্রয়, যিনি আদিগুরু, যিনি গরল পান করিয়াছিলেন এবং যুদ্ধে গজরাজের দন্ত ধারণ করিয়াছিলেন, যিনি প্রমথদিগের প্রভু এবং সেবকদিগের রক্ষক, সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ৫।


যিনি কামরূপ মত্ত হস্তীর নাশক; যিনি করিচর্ম পরিধান করেন; এবং গজরাজকে জ্ঞান প্রদান করেন; যিনি বর, বাণ, শূল ও বিষাণ ধারণ করেন; সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ৬।


যিনি জগতের সৃষ্টি, পালন ও নাশ করেন, যাঁহার পাদপদ্ম (প্ৰণত) দেবরাজের শিরোমণির দ্বারা ঘর্ষিত হয়, যিনি প্রিয় ব্যক্তির ও সাধুজনের একমাত্র গতি, সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে প্রণাম করি। ৭।


হে বিভু, হে বিশ্বনাথ, হে শম্ভু এই অনাথ এবং অতি দীনকে পুনর্জন্মরূপ দুঃখ হইতে পরিত্রাণ করো। ভজনকারীর অখিল দুঃখের নাশকারী এবং মঙ্গলের কল্পবৃক্ষরূপী শিবকে আমি প্রণাম করি। ৮।

গৌরাঙ্গ অরধাঙ্গ গঙ্গা তরঙ্গে

আড়ানাআঁপতাল


গৌরাঙ্গ অরধাঙ্গ গঙ্গা তরঙ্গে, যোগী মহাযোগ কা রূপ রাজে।

বাঘছাল মুণ্ডমাল শশীভাল করতাল,

তা ডেক্ ডিমি ডিমিক ডিমি ডমরু বাজে।

অম্বর বাঘাম্বর দিগম্বর জটাজুট,

ফণিধর ভূজঙ্গেশ অঙ্গ বিভূতি ছাজে ।

বাণী বিলাস তুয়া ধাতা বিধাতা,

জাতা সকল দুখ সদাশিব বিরাজে।
 —অজ্ঞাত

জয় শিব শঙ্কর হর ত্রিপুরারি

কেদারা—কাওয়ালি


জয় শিব শঙ্কর হর ত্রিপুরারি, পাশী পশুপতি পিনাকধারী ।

শিরে জটাজুট, কণ্ঠে কালকূট, সাধক-জন-গণ-মানস-বিহারী ।

ত্রিলোকপালক ত্রিলোকনাশক, পরাৎপর প্রভু মোক্ষবিধায়ক ।

করুণা নয়নে হেরো ভকত জনে, লয়েছি শরণ চরণে তোমারি ॥

    —গিরিশচন্দ্র ঘোষ

ডমরু হর করে বাজে বাজে

বসন্ত-তেওড়া


ডমরু হর করে বাজে বাজে।

ত্রিশূল-ধর-অঙ্গ ভসম ভূষণ, ব্যালমালা গলে বিরাজে।

পঞ্চবদন পিনাকধর শিব, বৃষভবাহন ভূতনাথ,

রুণ্ড মুণ্ড গলে বিরাজিত অজর অমর দিগম্বর রে ॥
           —বিহারীলাল দুবে

তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা

কর্ণাটি—একতাল


তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা, বম্ বব বাজে গাল।

ডিমি ডিমি ডিমি ডমরু বাজে, দুলিছে কপাল মাল ॥

গরজে গঙ্গা জটামাঝে, উগরে অনল ত্রিশূল রাজে,

ধক্ ধক্ ধক্ মৌলিবন্ধ, জ্বলে শশাঙ্কভাল ॥
      —স্বামী বিবেকানন্দ

নাচে পাগলা ভোলা

ভৈরবী-দাদরা


নাচে পাগলা ভোলা বাজে বম্ বম্ বম্;

শিঙ্গা বাজিছে ভোঁ ভোঁ ভম্ ভম্ ভম্ ॥

শিরে করিছে গঙ্গা কল্ কল্ কল্,

চরণ চাপেতে ধরা টল্ টল্ টল্,

মৃদঙ্গ ধরে তাল তাথম্ তাথম্ ॥

ডিমি ডিমি ডিমি ডিমি ডমরু বাজে,

ফন্ ফন্ ফন্ ফন্ ফণী গরজে,

নাদ উঠিছে সোঽহং সোঽহং ॥
           —স্বামী তপানন্দ

প্রলয়-নাচন নাচলে যখন

মিশ্ৰ একতাল


প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে

হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে॥

জাহ্নবী তাই মুক্তধারায়, উন্মাদিনী দিশা হারায়,

সঙ্গীতে তার তরঙ্গদল উঠলো দুলে॥

রবির আলো সাড়া দিল আকাশ পারে,

শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে।

আপন স্রোতে আপনি মাতে,

সাথী হোল আপন সাথে,

সব-হারা সে সব পেল তার কূলে কূলে।
              —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বেশ্বর বিশ্বপাবন

ভীমপলশ্রী—একতাল


বিশ্বেশ্বর বিশ্বপাবন ভব ভব-ভয়-ভঞ্জন,

মৃত্যুঞ্জয় মদন-দমন, মরণ-জনম-নিবারণ ॥

চরণ সরোজে নবারুণ ছটা, তাহে বিল্বদল চন্দনের ছিটা,

শার্দূল ছালে কটিতট আঁটা, যোগীজন-মনোমোহন ৷

গলে হাড়মালা দল দল দোলে, বব বব বম্ বাজে ঘন গালে,

বাজায়ে ডমরু নাচে তালে তালে, নাচে সাথে ভূত অগণন ॥

পন্নগভূষা পিনাকপাণি, ঝলমল ভালে জ্বলে নিশামণি,

কুলু কুলু শিরে বহে মন্দাকিনী, ঢুলু ঢুলু প্রেমে দুনয়ন ॥

সৃষ্টিলয়কারী জগৎ পিতা, জ্ঞানময় প্রেম ভকতিদাতা,

এ দীন সন্তানে ভুলে আছ কোথা, নিজ গুণে দাও দরশন।
                 —স্বামী তপানন্দ

বেলপাতা নেয় মাথা পেতে

ছায়ানট মিশ্র-কাওয়ালি


বেলপাতা নেয় মাথা পেতে, গাল বাজালে হয় খুশি।

মান অপমান সমান তো তার, তার কাছে নয় কেউ দোষী ৷

এত তো ভুলে থাকে, নেচে আসে যে তায় ডাকে,

‘বম্ ভোলা’ বোল বলে কেন লও না যেচে যা খুশি;

যা ফেলে দেছে, নেয় সে বেছে, ভালোমন্দ নাই হুঁশ্ই ॥
                —গিরিশচন্দ্র ঘোষ

ভাঙ্গ খেয়ে বিভোর ভোলানাথ

ঝিঝিট—একতাল


ভাঙ্গ খেয়ে বিভোর ভোলানাথ ভূতগণ সঙ্গে নাচিছে।

(সদা) কালী কালী কালী বলে মধুর ডমরু বাজিছে ॥

শিরেতে শোভিছে জটাজুটফণী, ললাটে শোভিছে দেবী মন্দাকিনী;

চরণ প্লাবিয়া ভূধর ধরণী, কুলুকুলু ধ্বনি করিছে ॥

বামেতে শোভিছে ভুবন মাতা, কী কব রূপ, কী কব কথা,

চারিপাশে হেমলতা তড়িত জড়িত রয়েছে ॥

কর্ণেতে শোভিছে ধুতুরার ফুল, ধুতুরা পানে আঁখি ঢুলু-ঢুল,

কালী ধ্যানে ব্যাঘ্রচর্ম খসিয়া খসিয়া পড়িছে ॥
              —প্যারিমোহন কবিরত্ন

যোগী হে

আলাহিয়া—একতাল


যোগী হে, যোগী হে, কে তুমি হৃদি আসনে ।

বিভূতি-ভূষিত শুভ্র দেহ, নাচিছ দিক্-বসনে ॥

মহা-আনন্দে পুলক কায়, গঙ্গা উথলি উছলি ধায়,

ভালে শিশু-শশী হাসিয়া চায়, জটাজুট ছায় গগনে ॥
           —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যোগাসনে মহাধ্যানে মগ্ন যোগীবর

ভৈরব—ঝাঁপতাল


যোগাসনে মহাধ্যানে মগ্ন যোগীবর,

অনন্ত তুষারে যেন অনন্ত শেখর॥

প্রলয়-নীরব মাঝে, একাকী পুরুষ রাজে,

ভয়ে অগ্নি ভস্ম মাঝে ঢাকে কলেবর॥

শিশু শশী নাহি আর, অন্ধকার নিরাকার,

এক, নাই দুই আর, প্রকৃতি নিথর।

কালবদ্ধ বর্তমানে, ব্যোমকেশ ব্যোম পানে,

নিত্য সত্য পূর্ণ জ্ঞানে, পূর্ণ মহেশ্বর॥
            —গিরিশচন্দ্র ঘোষ

শশধর-তিলক-ভাল গঙ্গা জটাপর

ভৈরব-ঝাঁপতাল


শশধর-তিলক-ভাল গঙ্গা জটাপর,

করে লিয়ে ত্রিশূল রুদ্র বিরাজে।

ভস্ম অঙ্গ ছায়ি, গলে রুণ্ডমালা,

ভৈরব ত্রিলোচন হর যোগী সাজে॥

আসন-বাহন-বৃষ বসন মৃগছালে,

কালকূট কণ্ঠে ভরা, তিমির লাজে;

গাবত হরিগুণ শ্রবণে অতি মধুর,

ধ্যাবত তান রাগে সদা হৃদি মাঝে।
      —যদুনাথ ভট্টাচার্য (যদু ভট্ট)

শিব ঘুচাও আমার মনের ভ্ৰম

বাউল—আড়খেমটা


শিব ঘুচাও আমার মনের ভ্ৰম, বম্ বম্ বম্, ববম্ বম্ ।

(আমি) তোমা বিনে হয়ে আছি বাঁশ-বাগানের কানা ডোম ॥

শিরে ঢালি গঙ্গাবারি,        খুশি হবেন ত্রিপুরারি,

ঘুচিবে ভববারি, ঘোড়ার ডিম করবে যম ॥
                   —গিরিশচন্দ্র ঘোষ

ধ্যান

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজত-গিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং

রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশু-মৃগ-বরাভীতি-হস্তং প্রসন্নম্।

পদ্মাসীনং সমন্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্ৰ-কৃত্তিং বসানং

বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিল-ভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।

প্রণাম

নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়-হেতবে।

নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্ত্বং পরমেশ্বর॥

শ্রীশ্রীসরস্বতী সংগীত

ঊরমা অমল ধবল বরণী

ইমনকল্যাণকাওয়ালি


(অয়ি) ঊরমা অমল ধবল বরণী

হৃদয় কমল কাননে।

(মম) মানসতামস নাশ মা ভারতী

চরণ নখর কিরণে॥

মৃন্ময়মূরতি হেরিয়া নয়নে

কুসুম চন্দন অর্পিয়া চরণে;

চিন্ময়চরণ পরশ লালসা

জাগিছে সতত পরাণে॥

বিদ্যাবিতরি’ অমৃত করো

মরণ শঙ্কা হরো মাগো হরো;

সংশয় যত, আজ (হোক) তিরোহিত

হৃদয় গ্রন্থিচ্ছেদনে ॥
           -স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

আবার ভারতে ভারতীর বীণা

ইমন-কল্যাণ—মিশ্ৰ একতাল


আবার ভারতে ভারতীর বীণা ঐ শুনো গাহে মধুর তান।

মরণ-সুপ্তি-মগন-পরাণে আবার করিছে চেতনা দান॥

এসো মা ভারতী বরষের পরে, নিরানন্দ এই আঁধার কুটীরে,

অশ্রু-সলিল-সিক্ত, রিক্ত, দুরিত-পূরিত শোকেতে ম্লান;

দৈন্য-বেদনা আছে শুধু মাগো পূজা-উপহার করিতে দান॥

শুভ্র আলোকে পুলকিত করি নিরাশা জড়তা লহ লহ হরি,

এসো মা হৃদয়-কমল আসনে সঁপিনু চরণে এ মনপ্রাণ,

হুঙ্কার রবে ঝঙ্কারি বীণা শঙ্কিতে করো অভয় দান॥

       —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

এসো মা এসো মা বীণাপাণি

মালকোষ-কাওয়ালি


এসো মা এসো মা বীণাপাণি,

এসো মাগো এসো, হৃদাসনে বসো, জগজন-মনোমোহ-নিবারিণী।

যুগ-যুগান্ত-সঞ্চিত তামস, চরণ-পরশে নাশো গো মা নাশো।

হৃদি শতদলে আবার প্রকাশ, শারদে শুভদে মা সিতবরণী॥
             —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

বাজাও বাজাও আবার বাজাও

আড়ানা বাহার—তেওড়া


বাজাও বাজাও—

বাজাও বাজাও আবার বাজাও, বাজাও বীণা এই ভারতে;

নাদিত করো আকাশ বাতাস আবার তোমার সেই সুরেতে॥

যে সুরেতে ঋষি শত সদা সমাহিত চিত;

সাম-গানেতে হতেন রত, ধরার আঁধার ঘুচাইতে।

তুমিই তো মা কোন ঊষাতে, জ্বালিয়ে ছিলে জ্ঞানের দীপ;

ছড়িয়ে দিলে জ্ঞানের আলো, বিশ্বমাঝে দিক্‌বিদিক্‌।

আজ কেন মা ঘুমিয়ে তবে, বীণা কেন আজ নীরবে,

উঠো মা গো, মুখ তুলে চাও ভাসুক জগৎ তোর আভাতে৷

           —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ভারত কাব্য নিকুঞ্জে

ভৈরবী কাওয়ালি


ভারত কাব্য নিকুঞ্জে,—জাগো সুমঙ্গলময়ী মা !

মুঞ্জরি তরু, পিক গাহি, করুক প্রচারিত মহিমা।

তুলে লহো নীরব বীণা, গীত-হীনা, অতি দীনা;

হে ভারত, চির-দুখ-শয়ন-বিলীনা;

নীতি-ধর্ম-ময় দীপক-মন্দ্রে জীবিত করো সঞ্জীবনমন্ত্রে,

জাগিবে রাতুল চরণ-তলে,—যত লুপ্ত পুরাতন গরিমা।

           —রজনীকান্ত সেন

পীযূষ-সিঞ্চিত-সমীর-চঞ্চল

বসন্তকাওয়ালি


পীযূষ-সিঞ্চিত-সমীর-চঞ্চল কাঞ্চন-অঞ্চল দোলে রে ।

সংশয় নিরসন, ধীস্মৃতি-বিতরণ চরণে, জন-মন ভোলে রে ॥

চম্পক-অঙ্গুলী করুণ-পরশে বীণা পঞ্চমে বোলে রে ।

জ্যোতিষ-গণিত-বেদ-দরশন শোভে কোমল কোলে রে ॥

শুভ্র রজত-গিরি কিরণ-বিকীরণে অন্ধ নয়নযুগ খোলে রে ।

মাতিল ত্রিভুবন, বাক্য-বিধায়িনী, বাণীর জয়-রব বোলে রে ॥

       —রজনীকান্ত সেন

বাণীচরণারবিন্দে

ভৈরবী—একতাল


বাণীচরণারবিন্দে মজো মজো মজো মজো রে মন ।

জ্বালা জুড়াইবে অমৃতত্ব পাবে, হইবে সমূহ বাসনা পূরণ ॥

ঢলঢল সুধাসিন্ধু সলিলে, হেলিছে দুলিছে আনন্দ-হিল্লোলে,

(মায়ের) রাঙা শতদল চরণযুগল, আহা মরি মরি ভুবনমোহন ॥

অন্ধ মানস দেখিতে না পাও, কী সুখ-লালসে ইতি উতি ধাও,

করো পদ ধ্যান, গাও মায়ের গান, করো মধুপান হইয়ে মগন ।

গরগর ভাবে হয়ে মাতোয়ারা, হেরো হে অদূরে বাণী বেদধরা,

সৌম্য হতে কিবা ছবি সৌম্যতরা আহা মরি মরি দেখিনি এমন ॥

                   —স্বামী তপানন্দ

শ্বেত শতদলে

বসন্ত—তেওড়া


শ্বেত শতদলে সারদা রাজে।

অতি সুশীতল কান্তি বিমল, নেহারি নয়ন মোহিল রে ॥

শ্রবণে কুণ্ডল গলে গজমতি, অচলা দামিনী জিনিয়া মূরতি;

বীণারঞ্জিত পুস্তক করে, জয় জয় দেবি প্রণমামি তে ॥

অয়ী মা! ভারতী, বেদমূরতি, পরমা শকতি, শিবের কন্যা,

ঋষি-আরাধিতা, অমর-পূজিতা, বিশ্ববন্দিতা, ত্রিলোকধন্যা;

অজ্ঞাননাশিনী বিজ্ঞানদায়িনী, তুমি নারায়ণী বাগ্বাদিনী;

যেন) বীণার ঝঙ্কার গুঞ্জে নিরন্তর মোদের অন্তর মাঝে ॥

         —অজ্ঞাত

মধুর মধুর ধ্বনি বাজে

ইমন-কল্যাণ—কাহারবা


মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে ॥

নিভৃতবাসিনী বীণাপাণি অমৃতমূরতি মতি বাণী

হিরণকিরণ ছবিখানি পরাণের কোথা সে বিরাজে ৷

মধুঋতু জাগে দিবানিশি পিককুহরিত দিশি দিশি ।

মানসমধুপ পদতলে মুরছি পড়িছে পরিমলে ।

এসো দেবী, এসো এ আলোকে, একবার তোরে হেরি চোখে—

গোপনে থেকো না মনোলোকে ছায়াময় সাজে॥

                   —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধ্যান

যা কুন্দেন্দু-তুষার-হার-ধবলা যা শুভ্র-বস্ত্রাবৃতা ।

যা বীণা-বরদণ্ড-মণ্ডিতকরা যা শ্বেত-পদ্মাসনা ॥

যা ব্রহ্মচ্যুত-শঙ্কর-প্রভৃতিভির্দেবৈঃ সদা বন্দিতা ।

সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ-জাড্যাপহা ॥

প্রণাম

সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তুতে ।

শ্ৰীশ্ৰীমহিষাসুরমর্দিনি স্তোত্রম্

অয়ি গিরিনন্দিনি

ভূপালী—ত্রিতাল


অয়ি গিরিনন্দিনি নন্দিতমেদিনি বিশ্ববিনোদিনি নন্দনুতে

গিরিবরবিন্ধ্যশিরোঽধিনিবাসিনি বিষ্ণুবিলাসিনি জিষ্ণুনুতে।

ভগবতি হে শিতিকণ্ঠকুটুম্বিনি ভূরিকুটুম্বিনি ভূরিকৃতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১॥

সুরবরবর্ষিণি দুর্ধরধর্ষিণি দুর্মুখমর্ষিণি হর্ষরতে

ত্রিভুবনপোষিণি শঙ্করতোষিণি কিল্বিষমোষিণি ঘোষরতে।

দনুজনিরোষিণি দিতিসুতরোষিণি দুর্মদশোষিণি সিন্ধুসুতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥২॥

অয়ি জগদম্ব মদম্ব কদম্ব-বনপ্রিয়বাসিনি হাসরতে

শিখরি শিরোমণি তুঙ্গহিমালয় শৃঙ্গনিজালয় মধ্যগতে ।

মধুমধুরে মধুকৈটভগঞ্জিনি কৈটভভঞ্জিনি বাসরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৩॥

অয়ি শতখণ্ড বিখণ্ডিতরুণ্ড বিতুণ্ডিতশুণ্ড গজাধিপতে

রিপুগজগণ্ড বিদারণচণ্ড পরাক্রমশুণ্ড মৃগাধিপতে।

নিজভুজদণ্ড নিপাতিতখণ্ড বিপাতিতমুণ্ড ভটাধিপতে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৪॥

অয়ি রণদুর্মদ শত্রুবধোদিত দুর্ধরনির্জর শক্তিভৃতে

চতুরবিচার ধুরীণ মহাশিব দূতকৃত প্রমথাধিপতে ।

দুরিতদুরীহ দুরাশয়দুর্মতি দানবদূতকৃতান্তমতে।

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৫॥

অয়ি শরণাগত বৈরিবধূবর বীরবরাভয়দায়করে

ত্রিভুবন মস্তক শূলবিরোধি শিরোঽধিকৃতামল শূলকরে ।

দুমিদুমিতামর দুন্দুভিনাদ মহোর্মুখরীকৃত দিঙ্মকরে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৬॥

অয়ি নিজহুংকৃতিমাত্র নিরাকৃত ধূম্রবিলোচন ধূম্ৰশতে

সমরবিশোষিত শোণিতবীজ সমুদ্ভবশোণিত বীজলতে।

শিবশিবশুম্ভ নিশুম্ভমহাহব তর্পিতভূত পিশাচরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৭॥

ধনুরণুষঙ্গ রণক্ষণসঙ্গ পরিস্ফুরদঙ্গ নটৎকটকে

কনকপিশঙ্গপৃষৎকনিষঙ্গরসদ্ভটশৃঙ্গ হতাবটুকে।

কৃতচতুরঙ্গ বলক্ষিতিরঙ্গ ঘটদ্বহুরঙ্গ রটদ্বটুকে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৮

জয় জয় জপ্যজয়ে জয় শব্দপরস্তুতি তৎপর বিশ্বনুতে

ঝণঝণঝিঞ্ঝিমি ঝিঙ্কৃতনূপুর সিঞ্জিতমোহিত ভূতপতে।

নটিতনটার্ধ নটীনটনায়ক নাটিতনাট্য সুগানরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥৯॥

অয়ি সুমনঃ সুমনঃ সুমনঃ সুমনঃ সুমনোহর কান্তিযুতে

শ্রিতরজনী রজনী রজনী রজনী রজনীকর বক্তবৃতে।

সুনয়ন বিভ্রমর ভ্রমর ভ্রমর ভ্রমর ভ্রমরাধিপতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১০॥

সহিতমহাহব মল্লমতল্লিক মল্লিতরল্লক মল্লরতে

বিরচিত বল্লিক পল্লিক মল্লিক ঝিল্লিক ভিল্লিক বর্গবৃতে।

সিতকৃতফুল্ল সমুল্লসিতারুণতল্লজ পল্লব সল্ললিতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১১॥

অবিরলগণ্ডগলন্মদমেদুর মত্তমতঙ্গজরাজপতে

ত্রিভুবনভূষণ ভূতকলানিধি রূপপয়োনিধি রাজসুতে।

অয়ি সুদতীজন লালসমানস মোহনমন্মথ রাজসুতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১২॥

কমলদলামল কোমলকান্তি কলাকলিতামল ভাললতে

সকলবিলাস কলানিলয়ক্রম কেলিচলৎকল হংসকুলে।

অলিকুলসঙ্কুল কুবলয়মণ্ডল মৌলিমিলদ্বকুলালিকুলে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৩॥

করমুরলীরববীজিতকূজিত লজ্জিতকোকিল মঞ্জুমতে

মিলিতপুলিন্দ মনোহরগুঞ্জিত রঞ্জিতশৈল নিকুঞ্জগতে ।

নিজগুণভূত মহাশবরীগণ সদ্গুণসংভৃত কেলিলতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৪॥

কটিতটপীত দুকূলবিচিত্র ময়ূখতিরস্কৃত চন্দ্ররুচে

প্রণতসুরাসুর মৌলিমণিস্ফুরদংশুলসন্নখ চন্দ্ররুচে।

জিতকনকাচল মৌলিমদোর্জিত নির্ভরকুঞ্জর কুম্ভকুচে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৫॥

বিজিতসহস্ৰকরৈক সহস্ৰকরৈক সহস্ৰকরৈকনুতে

কৃতসুরতারক সঙ্গরতারক সঙ্গরতারক সূনুসুতে।

সুরথসমাধি সমানসমাধি সমাধিসমাধি সুজাতরতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৬॥

পদকমলং করুণানিলয়ে বরিবস্যতি যোঽনুদিনং সুশিবে

অয়ি কমলে কমলানিলয়ে কমলানিলয়ঃ স কথং ন ভবেৎ।

তবপদমেব পরংপদমিত্যনুশীলয়তো মম কিং ন শিবে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৭॥

কনকলসৎকল সিন্ধুজলৈরনুষিঞ্চতি তে গুণরঙ্গভুবং

ভজতি স কিং ন শচীকুচকুম্ভ তটীপরিরম্ভ সুখানুভবম্ ।

তব চরণং শরণং করবাণি নতামরবাণি নিবাসি শিবম্

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৮॥

তব বিমলেন্দুকুলং বদনেন্দুমলং সকলং ননু কূলয়তে

কিমু পুরুহূতপুরীন্দুমুখী সুমুখীভিরসৌ বিমুখী ক্রিয়তে।

মম তু মতং শিবনামধনে ভবতী কৃপয়া কিমুত ক্রিয়তে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥১৯॥

অয়ি ময়ি দীনদয়ালুতয়া কৃপয়ৈব ত্বয়া ভবিতব্যমুমে

অয়ি জগতো জননী কৃপয়াসি যথাসি তথানুমিতাসিরতে।

যদুচিতমত্র ভবত্যুররী কুরুতাদুরুতাপমপাকুরুতে

জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনি রম্যকপর্দিনি শৈলসুতে ॥২০॥


আগমনী সংগীত

আজ আগমনীর আবাহনে

বাঙালি-একতাল


আজ আগমনীর আবাহনে কী সুর উঠেছে বেজে ।

দোয়েল শ্যামা ডাক দিল তাই বরণের এয়ো সেজে ॥

ভরা ভাদরের ভরা নদী কুলুকুলু ছোটে নিরবধি ।

সে সুর গীতালি দেয় করতালি, নাচে তরঙ্গ দোলনে যে ॥

পূরব দীপক আরতির দীপ শত ছটা মেঘ জালে,

দিক্বালা তায় আলতা গুলেছে রক্ত আকাশ থালে ।

ঘাসের বুকেতে শিশির নীর ধোয়াবে ও-রাঙ্গা চরণ ধীর,

সবুজ আঁচলে মুছে নেবে বলে ধরণী শ্যামলা সেজেছে যে ॥

                —হীরেন্দ্রকুমার বসু

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও

আশাবরী-একতাল


(আজি) শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে ।

সপ্তসিন্ধু কল্লোল রোল বেজেছে সপ্ত তারে ॥

সুর সপ্তক তুলেছে তান সপ্ত ঋষির গানে,

সপ্ত স্বর্গে দুন্দুভি ঘোষে সপ্ত গ্রহের টানে;

অন্তরে আজ সপ্ত সুরের নব জাগরণ সুরে ॥

সাতরাঙ্গা রবি রামধনু হাতে মরণের বাণ হানে,

সপ্তকোটি সুসন্তান বিজয়মাল্য আনে;

সপ্ততীর্থ একসাথ হয় হৃদি মন্দির দ্বারে,

জননী এসেছে দ্বারে তুলে নাও বুকে তারে ॥

     —হীরেন্দ্রকুমার বসু

আজু মন্দিরে ও মা

বেহাগ-জলদ ত্রিতাল


আজু মন্দিরে ও মা! শঙ্করী-শঙ্কর পেয়ে ।

পূজয়ে ভকতবৃন্দ, জবা সচন্দন দিয়ে ॥

আনন্দিত নর-নারী, সবে পুলকিত হিয়ে ।

মগন ভকতগণ, সদা ডাকে মা বলিয়ে ॥

সুরাসুর নাগ নর, নাচে উল্লসিত হয়ে ।

দিবানিশি নাহি জ্ঞান, তব মুখ নিরখিয়ে ॥

মহাপাপী দুরাচারী, নিস্তারিল নাম ল’য়ে ।

পতিত কমলাকান্ত, রহিল চরণ চেয়ে ॥

      —কমলাকান্ত চক্রবর্তী

মা এসেছে

মিশ্র রাগ—দাদরা


মা এসেছে, মা এসেছে রে!

(ওরে মা এসেছে, মা এসেছে, মা এসেছে রে)

ওরে আয় রে তোরা, শঙ্খ বাজা, ‘আগমনী’ গা-রে ।

আজ সবার সাথে আনন্দেতে মায়ের চরণ ধূলি নে-রে ॥

(মায়ের চরণ-ধূলি নে-রে)

                     —অজ্ঞাত

গিরি এবার আমার উমা এলে

পিলুবাহার—যৎ


(গিরি) এবার আমার উমা এলে, আর উমায় পাঠাব না ।

বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না ৷

যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়, উমা নেবার কথা কয়,

মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া, (তারে) জামাই বলে মানব না ॥

দ্বিজ রামপ্রসাদ কয়, এ দুঃখ কি প্রাণে সয়,

(জামাই-শিব) শ্মশানে মশানে ফিরে, ঘরের ভাবনা ভাবে না ॥

-রামপ্রসাদ

কেমন করে হরের ঘরে

সাহানা-ঝপতাল


কেমন করে হরের ঘরে ছিলি উমা বল মা তাই,

কত লোকে কতই বলে, শুনে প্রাণে মরে যাই ।

মা’র প্রাণে কি ধৈর্য ধরে, জামাই নাকি ভিক্ষা করে,

এবার নিতে এলে পরে, (বলব) উমা আমার ঘরে নাই ।

চিতাভস্ম মাখি অঙ্গে, জামাই ফিরে নানা রঙ্গে,

তুই নাকি মা, তারি সঙ্গে তোর সোনার অঙ্গে মাখিস ছাই ॥

                 -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

কে গো আমার মা কি এলি

প্রসাদী, লুম-ঝিঝিট—একতাল


কে গো আমার মা কি এলি।

আয় মা মনের কথা বলি (ও মা শোন মা, দুটি কথা)।

এত দুঃখ দিয়ে শ্যামা যদি দয়া প্রকাশিলি,

তবে মা হয়ে মায়ের মতো ছেলের কথা শোন মা কালী

দাঁড়া গো মা হৃৎকমলে, পূজি মানসকুসুম তুলি,

ভক্তিচন্দন মাখাইয়ে পদে দিব পুস্পাঞ্জলি॥

করিব সুমহৎ হোম চিত্কুণ্ডে অনল জ্বালি,

পূর্ণাহুতি দিব তাহে ‘জয় কালী, জয় কালী’ বলি।

প্রাণান্ত এ দক্ষিণান্ত, কর্মফল মা তুই সকলি,

মায়ের ছেলে প্রেমিক এখন, যার কাছে কাল কৃতাঞ্জলি॥

                     -প্রেমিক

গিরি গণেশ আমার শুভকারী

মনোহরসাহী—একতাল


গিরি, গণেশ আমার শুভকারী ।

পূজে গণপতি পেলাম হৈমবতী,

চাদের মালা যেন চাঁদ সারি সারি ॥

বিল্ববৃক্ষমূলে পাতিয়া বোধন,

গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন,

ঘরে আনব চণ্ডী, কর্ণে শুনব চণ্ডী,

আসবে কত দণ্ডী জটাজুটধারী ॥

মেয়ের কোলে মেয়ে দুটি রূপসী,

লক্ষ্মী সরস্বতী শরতের শশী,

সুরেশ কুমার গণেশ আমার,

তাদের না হেরিলে ঝরে নয়নবারি ।

-দাশরথি রায

তুমি তো মা ছিলে ভুলে

সাহানা-ঝাপতাল


তুমি তো মা ছিলে ভুলে, আমি পাগল নিয়ে সারা হই।

হাসে কাঁদে সদাই ভোলা, জানে না সে আমা বই ।

ভাঙ্গ খেয়ে মা সদাই আছে, থাকতে হয় মা কাছে কাছে;

ভালো মন্দ হয় গো পাছে, সদাই মনে ভাবি ওই ॥

দিতে হয় মা মুখে তুলে, নয় তো খেতে যায় গো ভুলে,

ক্ষেপার দশা ভাবতে গেলে, আমাতে আর আমি নই ৷

ভুলিয়ে যখন এলাম চলে, (ওমা) ভেসে গেল নয়নজলে;

একলা পাছে যায় গো চলে, আপন হারা এমন কই ।

         -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী

গুণকিরি—একতাল


যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে

দেখেছি স্বপন, নারদ বচন, উমা মা মা বলে কেঁদেছে ৷

সোনার বরণী গৌরী আমার, ভাঙড় ভিখারী জামাই তোমার,

মায়ের বসন ভূষণ সব আভরণ তাও বেচে নাকি ভাঙ্গ খেয়েছে ।

                      -অজ্ঞাত

বহুদিন পরে আসিবে ঘরে উমা আমার

দুর্গা–তেওড়া


বহুদিন পরে আসিবে ঘরে উমা আমার।

উমা বিহনে না হেরি নয়নে ত্রিলোক হয়েছে আঁধার।

শরৎ-আকাশে মেঘ ভাসে, উমারে হেরিতে ধায় উল্লাসে,

নদী কুলুকুলু রবে নেচে নেচে চলে চরণ ধোয়াবে তার॥

যে ছিল মোর নয়নের মণি, সে আজি হয়েছে শিবের ঘরণি,

উমারাণী আমার শ্মশানবাসিনী এই কি ছিল কপালে আমার।

                             —অজ্ঞাত

আজি শরৎ শান্ত ঊষার তিলকে

ভৈরব—একতাল


(আজি) শরৎ শান্ত ঊষার তিলকে শূন্য কুটীর দ্বারে ।

(ঐ) এলো গো জননী মুক্ত আলোকে ফুল্ল কুসুম ভারে ॥

সম্ভার শত নাহি মা পূজার ভকত শরণে লহ উপহার,

অশিব-নাশিনী শিব কর মা মঞ্জুল ফুল হারে ॥

                     —অজ্ঞাত

শ্রীশ্রীমাতৃ সংগীত

অন্তরে জাগিছ গো মা

সুরট মল্লার ঝাঁপতাল


অন্তরে জাগিছ গো মা, অন্তর্যামিনী,

কোলে ক’রে আছ মোরে, দিবস-যামিনী॥

অধম সূতের প্রতি, কেন এত স্নেহ প্রীতি,

প্রেমে আহা! একেবারে যেন পাগলিনী॥

কখনো আদর করি, কখনো সবলে ধরি,

পিয়াও অমৃত, শুনাও মধুর কাহিনী;

নিরবধি অবিকারে, কত ভালোবাসো মোরে,

উদ্ধারিছ বারে বারে পতিতোদ্ধারিণী॥

বুঝেছি এবার সার, মা আমার আমি মা’র,

চলিব সুপথে সদা শুনি তব বাণী;

করি মাতৃস্তন্য পান, হব বীর বলবান্,

আনন্দে গাহিব জয় ব্রহ্মসনাতনী॥

          -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

অভয়ার অভয়পদ

গৌড় সারঙ্গ-ঝাঁপতাল


অভয়ার অভয়পদ করো মন সার,

ভবভয় সব দূরে যাবে রে তোমার ॥

অকর্মজনিত ভয়, যদি ভোগাধীন হয়,

ভয়হরা তারা নামে পাইবে নিস্তার ॥

ভ্রান্তিযুক্ত শ্রান্তিহীন, হেলায় হারালে দিন,

এখনো করো বিধান মন রে আমার;

আদিভূতা-সনাতনী-চরণ করো রে ধ্যান,

হইও অকিঞ্চন আকিঞ্চনে বদ্ধ আর ॥

            -রঘুনাথ রায় (দেওয়ান)

নিবিড় আঁধারে মা

বাগেশ্রী—আড়াঠেকা


নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে ও রূপরাশি।

তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরি-গুহাবাসী॥

অনন্ত আঁধার কোলে মহানির্বাণ-হিল্লোলে,

চিরশান্তি-পরিমল অবিরল যায় ভাসি॥

মহাকাল রূপ ধরি, আঁধার বসন পরি,

সমাধি মন্দিরে ওমা কে তুমি গো একা বসি॥

অভয়-পদ-কমলে, প্রেমের বিজলী খেলে,

চিন্ময় মুখমণ্ডলে শোভে অট্ট অট্টহাসি॥

             -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করো

ইমনকল্যাণ—একতাল


অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করো সন্তানে তব আজ।

আশীর্বাদের বর্ম পরাও ঘুচায়ে দৈন্য সাজ॥

তপ্ত করো মা হৃদয়-রুধির, দূর করে দাও ভীতি অশ্রুনীর,

দাঁড়াই আমরা মা তোরে ঘিরিয়া বিশ্ব-সভার মাঝ॥

মানুষ আমরা, নহি তো মা হীন, তুই যার মা সে কি কভু দীন?

তবে কেন মিছে, পড়ে থাকা পিছে, কেন এ অলীক লাজ?

এসো এসো এসো, এসো মা আমার, দশপ্রহরণধারিণী,

হাসো মা অট্ট অট্ট হাস্য ভূলোক-দ্যুলোক-নাদিনী,

(মোরা) করি বিদূরিত স্বার্থ দ্বন্দ্ব সাধিয়া তোমার কাজ॥

               -স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আমার মনের কালি

মিশ্র-রাগ


আমার মনের কালি অঙ্গে মেখে হলি মা তুই কালী ।

তাই বুঝি মা মলিন হ’লো অমন রূপের ডালি ।

অশান্ত এই ছেলের তরে শান্তি বুঝি নেই মা ঘরে,

ওমা কেশ এলিয়ে শ্মশানে তুই বেড়াস রাজ-দুলালী ।

কালো ছেলের মা বলে তুই আপনি হলি কালো বরণ,

আমার অনুরাগের রং লেগে মা রাঙ্গা হল যুগল চরণ।

এবার মোর অশ্রুজলে মা তোর কালি যাক মা গলে

তোর রূপের দেউল করবো উজল ভক্তি-প্রদীপ জ্বালি ॥

                     -প্রণব রায়

আমায় দে মা পাগল করে

বাউল-জলদ একতাল


আমায় দে মা পাগল করে (ব্রহ্মময়ী)।

আর কাজ নাই মা জ্ঞানবিচারে॥

তোমার প্রেমের সুরা পানে করো মাতোয়ারা,

ওমা ভক্তচিত্তহরা ডুবাও প্রেমসাগরে॥

তোমার এ পাগলাগারদে, কেহ হাসে কেহ কাঁদে,

কেহ নাচে আনন্দভরে।

ঈশা মুসা শ্রীচৈতন্য, ওমা প্রেমের ভরে অচৈতন্য,

হায় কবে হব মা ধন্য, (ওমা) মিশে তার ভিতরে ॥

স্বর্গেতে পাগলের মেলা, যেমন গুরু তেমনি চেলা,

প্রেমের খেলা কে বুঝতে পারে ।

তুমি প্রেমে উন্মাদিনী, ওমা পাগলের শিরোমণি,

প্রেমধনে করো মা ধনী, কাঙ্গাল প্রেমদাসেরে ॥
             -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

আ মরি আ মরি

পিলু খাম্বাজ-কাওয়ালি


আ মরি আ মরি বামা কে এলো রে রণে।

নাচিয়া নাচিয়া চলে চঞ্চল চরণে॥

নবজলধর কায়, এলো চুল দোলে তায়।

দামিনী খেলিছে হায় লোহিত লোচনে৷

হাসিয়া হাসিয়া নাচে তাথিয়া থিয়া।

হিয়ায় লুকায়ে রাখি সাধ হতেছে মনে॥

            -স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আমার নাই আঁধারের ভয়

মিশ্র রাগ


আমার নাই আঁধারের ভয়—

কালো মায়ের রূপে আলোর ঝরণাধারা বয় 

সকল জ্ঞানের অতীত যে মা, তাই তো কালো আমার শ্যামা,

জ্ঞানরূপী শিব চরণে তার লুটিয়ে পড়ে রয়॥

তোর কালো রূপের পদাখানার আড়াল দিয়ে কালী,

নিভিয়ে দে মা ত্রিতাপ জ্বালা দহনে জুলি॥

আলোর জ্বালায় জ্বলি যত, আঁধার কালী স্নিগ্ধ তত—

ঐ শীতলে নে মা তুলে আলোর করি ক্ষয়॥

           -কাজী নজরুল ইসলাম

আশাবাসা ঘোর-তমোনাশা

বেহাগ-কাওয়ালি


আশাবাসা ঘোর-তমোনাশা, বামা কে (মোহিনী) ।

ঘোর ঘটা কান্তিছটা, ব্রহ্মকটা ঠেকেছে।

রূপসী শিরসি শশী, হরোরসি এলোকেশী,

মুখজ্বালা সুধাঢালা কুলবালা নাচিছে৷

দ্রুত চলে আস্য টলে, বাহুবলে দৈত্য দলে;

ডাকে শিবা কব কিবা, নিশি দিবা ক’রেছে।

ক্ষীণ-দীন ভাগ্যহীন, দুষ্টচিত্ত সুকঠিন;

রামপ্রসাদে কালীর বাদে কী প্রমাদে ঠেকেছে॥

                  -রামপ্রসাদ

এসো ভীমা ভবানী ভৈরবভামিনী

কেদারা-কাওয়ালি


এসো ভীমা ভবানী ভৈরবভামিনী, এসো মা, আজি এ শ্মশানে।

এসো শোণিতসিক্ত শাণিত অসি নিয়ে, এসো মা লোহিত লোচনে॥

এসো অয়ি জননী প্রলয়রূপিণী হয়ে,

দৈত্য-দম্ভনাশী বিকট হাসি লয়ে,

খর্পর করে, নরশির ধ’রে, দামিনী জ্বালিয়া দশনে॥

নাচো শব পরে, বাজুক দামামা, নাশো গো অসুরে, মৃত্যুরূপিণী মা।

আমি যাব সঙ্গে, মরিতে রঙ্গে, গাহিয়া জয় মা সঘনে ॥

                   —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আহা মরি মরি রে

জয়জয়ন্তী-ধামার


আহা মরি মরি রে, কীরূপ মাধুরী, ও বামা কে আসে

হাসিতে হাসিতে ঘনবরণী

বিবসনা নবীনা রমণী, এলায়ে পড়েছে বেণী,

চরণে নূপুর কটিতে কিঙ্কিণী, আসব-আবেশে লোহিত-লোচনী॥

(বামার) ভালে শিশুশশী, সীমন্তে সিন্দুর,

পীযূষপূর্ণ পীন পয়োধর,

অসিমুণ্ডধরা বরাভয়া মুণ্ডমালিনী;

সাধক হৃদয় ভাবেতে ধন্য, নিরূপমা নারী নহে সামান্য,

ত্রিতাপহারিণী শিবের কামিনী বিশ্বপ্রসবিনী ভুবনমোহিনী।

                           -সাধক

কখন কী রঙ্গে থাকো মা

ছায়া-খাম্বাজ-একতাল


কখন কী রঙ্গে থাকো মা, শ্যামা, সুধা তরঙ্গিণী।

তুমি রঙ্গে ভঙ্গে অপাঙ্গে অনঙ্গে ভঙ্গ দাও জননী॥

লম্ফে ঝম্ফে কম্পে ধরা, অসি ধরা করালিনী।

(তুমি) ত্রিগুণা ত্রিপুরা তারা ভয়ঙ্করা কালকামিনী॥

সাধকের বাঞ্ছা পূর্ণ করো নানা-রূপ-ধারিণী।

(কভু) কমলের কমলে নাচো মা পূর্ণব্রহ্ম-সনাতনী॥

            -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

আর কিছু নাই সংসারের মাঝে

ছায়ানট-কাওয়ালি


আর কিছু নাই সংসারের মাঝে, কেবল শ্যামা সার রে।

ধ্যান কালী জ্ঞান কালী প্রাণ কালী আমার রে॥

আসিয়ে ভুবনে এ তনু ধারণে যাতনা না হয় কার রে।

(একবার) হেরিলে ও কায়, সব দুঃখ যায়, এই গুণ শ্যামা মা’র রে॥

এ ভবে এসেছে, কেহ সুখে আছে, পেয়ে শিরে রাজ্যভার রে।

(আমার) দরিদ্রের ধন, ও রাঙ্গা চরণ, গলায় করেছি হার রে।

কমলাকান্ত, হইয়ে ভ্রান্ত, যাওয়া আসা বারম্বার রে।

(মায়ের) অভয় চরণ, লহো রে শরণ, অনায়াসে পাবি পার রে॥

                -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

গয়া-গঙ্গা-প্রভাসাদি

পরজবাহার-ঝাঁপতাল


গয়া-গঙ্গা-প্রভাসাদি কাশী-কাঞ্চী কেবা চায়,

কালী কালী কালী বলে, অজপা যদি ফুরায়॥

ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়,

সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে, কভু সন্ধি নাহি পায়।

কালীনামের এত গুণ কেবা জানতে পারে তায়,

দেবাদিদেব মহাদেব যার পঞ্চমুখে গুণ গায়।

*জপ যজ্ঞ পূজা হোম আর কিছু না মনে লয়

মদনের যাগ যজ্ঞ ব্রহ্মময়ীর রাঙ্গা পায়।

                     -মদন


*পাঠান্তর -> দান ব্রত যজ্ঞ আদি, আর কিছু না মনে লয়

শতকোটি শশী হাসে

ভৈরবী-ঝাঁপতাল বা পূরবী—একতাল


শতকোটি শশী হাসে (মায়ের) চরণ নখরে।

আলো করে কালোরূপ (মায়ের), হৃদয় কন্দরে॥

প্রীতির সাগর উছলে নয়নে,

উজ্জ্বল কপোল প্রসন্নবয়ানে;

মনে হয় রাখি নয়নে নয়নে।

(বাঁধি) হৃদি কারাগারে,

তারে চিরদিন তরে॥

বাঞ্ছা বাধা পড়ে হৃদয় মাঝারে,

কটি মনোহর হর মনোহরে,

উরু চারু অতি চরণ যুগল

হৃদি বিয়াকুল করে

(তাহে) চাহে মিশিবারে॥

এসো এসো অয়ি ভুবন মোহিনী

সর্বস্ব আমার, আমার জননী।

(মাগো) ফিরে চাও যদি

কৃপা করো যদি পড়ুক অশনি শিরে

(আমি) ল’ব সাধ করে॥

       —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

আমার মাকে কি দেখেছিস তোরা

জংলা-দাদরা


আমার মাকে কি দেখেছিস তোরা বল সত্যি করে।

মায়ের নব নব নবরূপে ভুবন-মন হরে।

মা তো আমার নয় রে কল্পনা, ঐ দেখ চিন্ময়ী হাস্যবদনা,

মায়ের স্নেহচক্ষে প্রেমবক্ষে অমিয় ঝরে॥

হাসিমুখে করে ভুবন আলো, মায়ের কোলে শোভে ভক্তদল,

মায়ের প্রসারিত প্রেমবাহু আমাদের তরে॥

আয় রে আয় ও জগৎবাসী, তোরা দেখে যা একবার আসি,

আমাদের জননীর ও রূপরাশি পরাণ ভরে।

(ও রূপ) যে দেখেছে সে-ই মজেছে জনমের তরে॥

        -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

কার বামা রণে নাচিছে

কানাড়া-ঠুংরি


কার বামা রণে নাচিছে।

সুধা পানে ঢলঢল ঢ’লে পড়িছে।

একে তো নীরদকায় ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা তায়,

কালিন্দী-সলিলে যেন জবা ভাসিছে৷

       -রঘুনাথ রায় (দেওয়ান)

আহা তাই শিবের নয়ন ভুলেছে

কালেংড়া—একতাল


(আহা) তাই শিবের নয়ন ভুলেছে;

অনুপম রূপ চিকণ কালো হেরিয়ে॥

তা না হলে ত্রিলোচন পরম যতনে কেন,

শ্রীচরণ হৃদে ধ’রেছে।

চাঁদ-ভ্রমে চকোরিণী ঘন-ভ্রমে চাতকিনী,

নলিনী-ভরমে ভ্ৰমরিণী এসেছে;

হারাইয়া নিজমণি, ব্যাকুলা হইয়ে ফণী,

ওরূপ নেহারি রয়েছে।

হারাইয়ে ফুলধণু, অভিমানে ত্যাজি তনু

বিরহিণী হৃদয়ে শরণ লয়েছে;

ও রূপ-আনন্দ-নিধি, কমলাকান্তের হৃদি

সরোজে প্রকাশ করেছে।

              -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

উঠো গো করুণাময়ি

পিলু-যৎ


উঠো গো করুণাময়ি, খোলো গো কুটীর দ্বার,

আঁধারে হেরিতে নারি, হৃদি কাপে অনিবার॥

তারস্বরে ডাকিতেছি তারা তোমায় কতই বার,

দয়াময়ী হয়ে আজি এ কী হেরি ব্যবহার॥

সন্তানে রাখি বাহিরে, আছ শুয়ে অন্তঃপুরে,

‘মা’ ‘মা’ বলে ডেকে মোর অস্থি চর্ম হ’ল সার॥

ধ্বনি-বর্ণ-তাল-লয়ে তিন গ্রাম বসাইয়ে,

এত ডাকি তবু নিদ্রা ভাঙ্গে না কি মা তোমার॥

খেলায় মত্ত ছিলেম বলে, বুঝি মুখ বাঁকাইলে,

একবার চাও মা বদন তুলে, খেলিতে যাব না আর।

দীন রাম বলে ওমা, কার কাছে যাব আর,

মা বিনে, কে লবে আর অকৃতি অধমের ভার॥

                  -রামলাল দাসদত্ত

একবার বিরাজ গো মা

কীর্তন—একতাল


একবার বিরাজ গো মা হৃদিকমলাসনে।

তোমার ভুবনভরা রূপটি একবার দেখে লই মা নয়নে॥

তুমি অন্নপূর্ণা মা, শ্মশানে শ্যামা,কৈলাসেতে উমা তুমি, বৈকুণ্ঠে রমা,

ধর বিরিঞ্চি-শিব-বিষ্ণুরূপ সৃজন-লয় পালনে॥

তুমি পুরুষ কি নারী, বুঝিতে নারি।

স্বয়ং না বুঝলে তা কি বুঝিতে পারি;

তুমি আধা রাধা আধা কৃষ্ণ সাজিলে বৃন্দাবনে॥

তুমি জগতের মাতা, যোগী জনানুগতা,অনুগত জনে কৃপা কল্পলতা,

তোমায় মা বলে ডাকিলে নাকি কোলে নাও ভক্তজনে॥

দুঃখ-দৈন্যহারিণী, চৈতন্যকারিণী,অন্য কিছুই চাই না বিনা চরণ দুখানি

আমি প্রেম-সরোজে সাজাব পদ বাসনা মনে মনে॥

পরিব্রাজক ভিখারী সাধ মনেতে ভারী,মধুহাসিমাখা মার মুখখানি হেরি,

বসে মায়ের কোলে ‘মা’ ‘মা’ বলে মাতিব যোগধ্যানে॥

                 —স্বামী কৃষ্ণানন্দ

কাজ কী মা সামান্য ধনে

প্রসাদী—একতাল


কাজ কী মা সামান্য ধনে।

(ও কে) কাঁদছে গো তোর ধন বিহনে॥

সামান্য ধন দিলে তারা, পড়ে রবে ঘরের কোণে।

যদি দাও মা আমায় অভয় চরণ, রাখি হৃদিপদ্মাসনে॥

গুরু আমায় কৃপা করে মা, যে ধন দিলেন কানে কানে।

এমন গুরু-আরাধিত মন্ত্র, তাও হারালেম সাধন বিনে॥

প্রসাদ বলে কৃপা যদি মা, হবে তোমার নিজ গুণে।

আমি অন্তিমকালে ‘জয় দুর্গা’ বলে, স্থান পাই যেন ঐ চরণে॥

                    -রামপ্রসাদ

কালো মেয়ের পায়ের তলায়

জৌনপুরী-দাদরা


কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।

মায়ের রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব,

যার হাতে মরণ-বাঁচন॥

কালো মায়ের আঁধার কোলে শিশু রবি শশী দোলে,

(মায়ের) একটুখানি রূপের ঝলক স্নিগ্ধ বিরাট নীল গগন॥

পাগলী মেয়ে এলোকেশী নিশীথিনীর দুলিয়ে কেশ,

নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার যে তার নাইকো শেষ॥

সিন্ধুতে মা’র বিন্দু খানিক ঠিকরে পড়ে রূপের মাণিক,

বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না, মা আমার তাই দিগবসন॥

                 -নজরুল ইসলাম

জয় জয় জগবন্দিনী

ভৈরবী—একতাল


জয় জয় জগবন্দিনী।

দেবী, দুঃখহারিণী তারিণী মহেশ-হৃদয়বাসিনী।

সুরাসুরনর সবার পূজিতা আগম-নিগমে সৃজনকারিণী,

জ্ঞানদা বরদা সুখদা মোক্ষদা তুমি মা অন্নদা জয়পরায়ণী॥

ভৈরবী ভবানী নগেন্দ্ৰনন্দিনী, নাগ-নাগ-পাশা ঘোরনিনাদিনী,

জ্ঞানেন্দ্র-উপেন্দ্র-যোগেন্দ্রাদি কত চরণে পড়িয়া দিবস-রজনী।

গুরু মুখে শুনি তুমি মা ভবানী, আদ্যাশক্তি শিবে সবার জননী,

মা মা বলে ডাকে মা তোমারে,

তাই মা তোমারে মা বলিয়ে জানি॥

                   -রামলাল দাসদও

ডুব দে রে মন কালী বলে

প্রসাদী—একতাল


ডুব দে রে মন ‘কালী’ ব’লে, হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে।

রত্নাকর নয় শূন্য কখন, দু’চার ডুবে ধন না পেলে।

তুমি দমসামর্থ্যে এক ডুবে যাও, কুলকুণ্ডলিনীর কূলে॥

জ্ঞান-সমুদ্রের মাঝে রে মন, শান্তিরূপা মুক্তা ফলে।

তুমি ভক্তি ক’রে কুড়ায়ে পাবে, শিবযুক্তি মতে চাইলে॥

কামাদি ছয় কুম্ভীর আছে, আহার-লোভে সদাই চলে।

তুমি বিবেক-হলদি গায় মেখে যাও, ছোঁবে না তার গন্ধ পেলে।

রতন মাণিক্য কত, প’ড়ে আছে সেই জলে।

রামপ্রসাদ বলে, ঝম্প দিলে, মিলবে রতন ফলে ফলে॥

                  -রামপ্রসাদ

জগৎ-জননী জাগিয়াছে আজি

খাম্বাজ-তালফের চৌতাল; সঞ্চারী-ধামার


জগৎ-জননী জাগিয়াছে আজি জয় মা তারিণী গাও রে,

বাজাও ডঙ্কা নাহিকো শঙ্কা ঘুচে গেছে ভবভয় রে॥

নেহারি দানব-নিপীড়িত ধরা, দানব-দলনী পাগলের পারা,

মুখে অট্টহাস ত্রিভুবন-ত্রাস বুঝি বা সৃষ্টি যায় রে॥

ডাকিনী যোগিনী নাচিছে সঙ্গে, গ্রাসিছে দানব কত না রঙ্গে

রুধির লেগেছে সকল অঙ্গে পদভরে ধরা টলে রে॥

দানব নাশিতে অসিমুণ্ডধরা, ভকতের তরে বরাভয়করা,

রুদ্র মধুরে অপরূপ তারা, হেরিলে প্রাণ জুড়ায় রে॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ত্বং অপারা

জয়জয়ন্তী—চৌতাল


ত্বং অপারা, বিশ্বসারা, বিশ্বাধারা বিশ্বরঞ্জিনী;

সর্বভূত-আত্মভূত, সর্ববিভূতি-প্রবিধায়িনী।

ত্বং অনল-ক্ষিতি-অনিল, ব্যোম-সলিলসংরূপিণী;

তুমি অমেয়া মহেশজায়া, ভো অভয়া ভয়বারিণী॥

বিরাজিতা শব আসনে, কভু প্রমত্তা আসব পানে,

কভু যুক্তা শিব-সনে, শিবে গো শিবানী॥

ওমা ত্রিগুণধারিণী, গুণাতীতা ত্রিনয়নী,

প্রেমিকের ত্রিতাপের তাপ সংহর, হরমোহিনী।

              -মহেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য্য (প্রেমিক)

দুর্গে দলনী দুঃখ দারিদ্রদহনী

আড়ানাঝাপতাল


দুর্গে দলনী দুঃখ দারিদ্র্যদহনী,

দুষ্ট-বিদারিণী হর-শম্ভ-জায়া ॥

অসুর-সংহারিণী,    রক্তবীজ নাশিনী,

দীন-অভয়বরা সুর-নর পায়া ॥

সংসার-তারিণী        তারা তরণীতে,

উদ্ধারে কৃপালী, যো পরমা মায়া;

সপ্তদ্বীপ নব খণ্ড     ত্রৈলোক্য-ব্যাপিত

যাচে সুযশ চারু আনন্দ দায়া ॥

               —অজ্ঞাত

মাকে দেখব বলে ভাবনা কেউ কোরো না আর

ভীমপলশ্রী-কাওয়ালি


মাকে দেখব বলে ভাবনা কেউ কোরো না আর।

সে যে তোমার আমার মা শুধু নয়, জগতের মা সবাকার॥

মা যদি নিদয়া হত, তবে কি আর প্রসবিত,

পৃথিবী শুকায়ে যেত, অন্ন বিনা হাহাকার ॥

অস্পৃশ্য চণ্ডাল হতে, ব্রাহ্মণাদি সকল জেতে,

মা বলে ডাকিলে কভু হয় না নিষ্ফল তার ॥

অঙ্গে দরদর ধারে, যবে স্বেদবিন্দু ঝরে,

বায়ুরূপে কে তোমারে বাতাস করে অনিবার ॥

ছেলের মুখে ‘মা’, ‘মা’ বাণী শুনবেন বলে ভবরাণী,

আড়াল থেকে শুনেন পাছে দেখিলে না ডাকে আর ॥

                 -রামলাল দাসদও

ঢলিয়ে ঢলিয়ে কে আসে

বাগেশ্রী-ধামার


ঢলিয়ে ঢলিয়ে কে আসে, গলিত চিকুর আসব-আবেশে,

বামা রণে দ্রুতগতি চলে, দলে দানবদলে,

ধরে করতলে, গজ গরাসে।

কালীর শরীরে রুধির শোভিছে,

কালিন্দীর জলে কিংশুক ভাসে,

নীলকমল শ্রীমুখমণ্ডল, অর্ধচন্দ্র ভালে প্রকাশে॥

নীলকান্ত মণি নিতান্ত, নখরনিকর তিমির নাশে,

রূপের ছটায় তড়িত ঘটায়, ঘন ঘোর রব উঠে আকাশে,

দিতিসুতচয়, সবার হৃদয়, থর থর থর কাঁপে হুতাশে।

(মাগো) কোপ করো দূর, চলো নিজপুর, নিবেদে শ্রীরামপ্রসাদ দাসে৷

                       -রামপ্রসাদ

দুরিতবারিণী ও মা হররানি

আড়ানা—তাল ফেরতা (চৌতাল, সঞ্চারী-ধামার)


দুরিতবারিণী ও মা হররানি, ডাকিছে কাতরে এ দীন সন্তান,

করিয়া যতন কমল-আসন পেতেছি হৃদয়ে কর অধিষ্ঠান॥

শিখাইয়া দাও তুমি মা ভবানী, কেমনে পূজিব চরণ দুখানি,

ভজন পূজন কিছুই না জানি, তাই ভাবি কিসে পাব পদে স্থান॥

ভরসা কেবল করুণা তোমার,

তাই এ সন্তান ডাকে বারেবার,

নাশো মা তাহার অজ্ঞান-আঁধার

তনয়ে তোমার দাও দিব্য জ্ঞান;

যেন নাহি ভুলি চরণ দুখানি এই মতি দাও তনয়ে জননী,

অকূল পাথার কিসে হই পার, ভবদুঃখ যেন হয় অবসান।

                     —অজ্ঞাত

দেহি পদতরণী, জননী

কাফিসিন্ধু-কাওয়ালি


দেহি পদতরণী, জননী।

দিন দিন যায় দিন, আসে মাগো সেই দিন

দিনে রেতে তাই তোরে ডাকি দীনতারিণী॥

জানি না কী বলে আমি ডাকিব গো মা তোমায়,

শিখায়েছ মা বলিতে মা বলিয়ে ডাকি তাই,

কুপুত্র যদিও হয়, কুমাতা কখনো নয়,

চরণে শরণ তাই লয়েছি নিস্তারিণী॥

সংসার-প্রান্তরে শ্মশান-বাহিনী কূলে,

এ দীন পথিক বসে বিষয়-পাদপ মূলে,

আসে ঐ কাল-ফণী, দংশিতে মোরে জননী,

ত্রাসিত পরাণে তাই ডাকি মা ত্রিনয়নী॥

মায়া মায়াবিনী মোরে কুপথেতে লয়ে যায়,

দেখাও সুপথ মোরে সদা জ্বলি সে জ্বালায়,

যায় যায় প্রাণ যায়, তাই ডাকি মা তোমায়,

অকূলে করো মা কোলে ও মা কুলদায়িনী॥

                 -রামলাল দাসদত্ত


পাবি না ক্ষেপা মায়েরে

পরজবাহার-ঝাপতাল


পাবি না ক্ষেপা মায়েরে ক্ষেপার মতো না ক্ষেপিলে,

সেয়ান পাগল বুঁচকিবগল, কাজ হবে না ওরূপ হলে॥

শুনিসনে তুই ভবের কথা, ও যে বন্ধ্যার প্রসবব্যাথা,

সার করে শ্রীনাথের কথা, চোখের ঠুলি দে না খুলে।

মায়া মোহ ভোগ তৃষ্ণা দেবে তোরে যতই তাড়া;

বোবার মতো থাকবি বসে, সে কথায় না দিয়ে সাড়া॥

নিবৃত্তিরে লয়ে সাথে ভ্রমণ করো তত্ত্বপথে,

নৃত্য করো প্রেমে মেতে, সদা কালী কালী বলে৷

মজা আছে এ পাগলে, জানবি আসল পাগল হলে,

‘আয় রে পাগল ছেলে’ বলে, ঐ পাগলী মায়ে নেবে কোলে।

ফুরাবে পাগলের মেলা ঘুচিবে ত্রিতাপের জ্বালা,

শান্তিধামে করবি লীলা এ যুক্তি প্রেমিক বলে॥

                   -প্রেমিক

এমা কালভয়বারিণী কপালিনী

দেশ-তেওড়া


(এমা) কালভয়বারিণী কপালিনী, কালরূপিণী,

শম্ভুভামিনী, নিশুম্ভঘাতিনী, সমরবাসিনী, সুরবন্দিনী॥

পুর-হর-মনোমোহকারিণী, সত্যবাদিনী;

তত্ত্বদায়িনী, ত্ৰাসনাশিনী, ত্রাণকারিণী; তিমিরবরণী॥

ত্রিগুণধারিণী, ত্রিদেবজননী, ত্রিলোকেশী, তেজরূপিণী,

অন্নদায়িনী, অমরপালিনী, অসুরদলনী, আদিকারিণী,

আশুতোষ-হৃদিবিলাসিনী, আত্মরূপিণী॥

               —আশুতোষ দেব

বড় ধূম লেগেছে হৃদিকমলে

সুরট মল্লার—তেওড়া


বড় ধূম লেগেছে, হৃদিকমলে।

মজা দেখিছে আমার মন-পাগলে॥

হতেছে পাগলের মেলা ক্ষেপাতে-ক্ষেপিতে মিলে,

আনন্দেতে সদানন্দে আনন্দময়ী পড়ছে ঢলে॥

দেখে অবাক লেগেছে তাক্ ইন্দ্রিয় আর রিপুদলে,

পেয়ে সুযোগ এই গোলযোগ জ্ঞানের কপাট গেছে খুলে॥

প্রেমিক পাগল বলে সকল, তা বলে আমার মন কি টলে,

(যার) পিতামাতা বদ্ধ পাগল, ভাল হয় কি তাদের ছেলে॥

শোন্ মা তারা ভূভারহরা এই বেলা মা রাখছি বলে

(যখন) ভাসব জলে অন্তকালে তনয় বলে করিস কোলে॥

                     -প্রেমিক

ভজো রে শ্যামা পদ পঙ্কজরাজ

কেদারা-ঢিমে-ত্রিতাল


ভজো রে শ্যামা পদ পঙ্কজরাজ,

পিও, পিও, পিও মধু হয়ে মাতোয়ারা॥

মা, মা, মা ঝঙ্কার মন-মধুকর,

ঝরুক অবিরল অখণ্ড অমৃতধার;

অহর্নিশি অনিমেষে মার মুখ নেহারো,

‘তারা’, ‘তারা’, ‘তারা’, বলে হয়ে যাও হারা॥

           -স্বামী তপানন্দ

ভবে সেই সে পরমানন্দ

গৌরী—একতাল


ভবে সেই সে পরমানন্দ।

যে জন পরমানন্দময়ীরে জানে॥

যে জন না যায় তীর্থপর্যটনে কালী ছাড়া কথা না শুনে কানে,

সন্ধ্যা পূজা কিছু না মানে, যা করেন কালী সেই সে জানে॥

কালীর চরণ যে করেছে স্থূল, সহজে হয়েছে বিষয়েতে ভুল,

ভবার্ণবে পাবে সে কূল, মূল হারাবে সে কেমনে।

রামকৃষ্ণ কয় এমন জনে, লোকের নিন্দা না শুনে কানে,

আঁখি ঢুলু ঢুলু রজনী দিনে কালীনামামৃত-পীযূষ পানে॥

                -মহারাজ রামকৃষ্ণ

মজলো আমার মন-ভ্রমরা

সিন্ধু খাম্বাজ-যৎ


মজলো আমার মন-ভ্রমরা শ্যামাপদ-নীলকমলে।

(শ্যামাপদ-নীলকমলে, কালীপদ-নীলকমলে)

যত বিষয়মধু তুচ্ছ হ’ল কামাদি কুসুম-সকলে।

চরণ কালো, ভ্রমর কালো, কালোয় কালো মিশে গেল,

পঞ্চতত্ত্ব, প্রধান মত্ত, রঙ্গ দেখে ভঙ্গ দিলে॥

কমলাকান্তের মনে, আশা পূর্ণ এত দিনে

(তার) সুখ দুখ সমান হ’ল আনন্দ-সাগর উথলে॥

             -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

ভবানী দয়ানী মহাবাণী

ভৈরবী-ঝাঁপতাল


ভবানী দয়ানী মহাবাণী

সুরনর-মুনি-জন মানি সকল বুধজ্ঞানী।

জগজননী জগজানি মহিষাসুরমর্দিনী,

জ্বালামুখী চণ্ডী অমরপদ-দানী॥

             -অজ্ঞাত

মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ’ল মহাকালী

দুর্গা–তেওড়া


মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ’ল মহাকালী ।

শ্মশান চিতার ভস্ম মেখে ম্লান হ’ল মার রূপের ডালি ।

তবু মায়ের রূপ কি হারায়,

সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্রতারায় ।

মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূৰ্য্য-প্রদীপ জ্বালি ॥

উমা হ’ল ভৈরবী, হায়, বরণ করে ভৈরবেরে,

হেরি শিবের শিরে জাহ্নবীরে শ্মশানে মশানে ফেরে;

অন্ন দিতে ত্রিজগতে,

অন্নদা মোর বেড়ায় পথে,

ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজদুলালী ॥

                -নজরুল ইসলাম

মন রে কৃষিকাজ জানাে না

প্রসাদী—একতাল


মন রে কৃষিকাজ জানো না।

এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ কল্লে ফলতো সোনা।

কালীনামে দাও রে বেড়া, ফসলে তছরূপ হবে না।

সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁসে না।

অদ্য কিংবা শতাব্দান্তে, বাজাপ্ত হবে জানো না।

এখন আপন একতারে, (মন রে,) চুটিয়ে ফসল কেটে নে না॥

গুরুদত্ত বীজ রোপণ করে ভক্তিবারি সেঁচে দে না।

ওরে একা যদি না পারিস মন, রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না॥

                        -রামপ্রসাদ

মা আছেন আর আমি আছি

লক্ষ্মী-খাম্বাজ-কাহারবা


মা আছেন আর আমি আছি ভাবনা কী আছে আমার।

মায়ের হাতে খাই পরি, মা নিয়েছেন আমার ভার॥

সংসার পাকে ঘোর বিপাকে যখন দেখি অন্ধকার।

সেই ঘোর আঁধারে মা আমারে (মাভৈ) বাণী শুনায় বারে বার ॥

এসে ছয় জনাতে একই সাথে পথ ভুলায় যে কত বার ।

সেই বিপদ হতে ধরে হাতে মা যে করিছেন উদ্ধার ॥

এত ভুলে থাকি তবুও দেখি ভুলে না মা একটি বার ।

এমন স্নেহের আধার মা যে আমার, আমি যে মা’র, মা আমার ।

            -মনোমোহন চক্রবর্তী

মা ত্বং হি তারা

ভৈরবী—একতাল


মা ত্বং হি তারা, তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা।

আমি জানি গো ও দীনদয়াময়ী, তুমি দুর্গমেতে দুঃখহরা॥

তুমি জলে, তুমি স্থলে, তুমি আদ্যমূলে গো মা,

আছ সর্বঘটে অর্ঘপুটে সাকার-আকার নিরাকারা॥

তুমি সন্ধ্যা, তুমি গায়ত্রী, তুমি জগদ্ধাত্রী গো মা,

অকূলের ত্রাণকর্তী, সদাশিবের মনোহরা॥

                —অজ্ঞাত


  1. শ্রীশ্রীঠাকুর স্বামিজীকে প্রথম এই মাতৃসংগীত শিখিয়েছিলেন।

মায়ের ভাব কি ভেবে পরাণ গেল

প্রসাদী—একতাল


(মায়ের) ভাব কি ভেবে পরাণ গেল;

(যাঁর) নাম হরে কাল, পদে মহাকাল,

তার কেন কালো রূপ হ’ল॥

কালো রূপ অনেক আছে, এ বড় আশ্চর্য কালো,

(যাঁরে) হৃদ্মাঝারে রাখলে পরে, হৃদয়পদ্ম করে আলো

নামে কালী রূপে কালী কালো হতেও অধিক কালো,

(ও রূপ) যে দেখেছে সেই মজেছে, অন্য রূপ লাগে না ভালো

প্রসাদ বলে কুতূহলে, এমন মেয়ে কোথায় ছিল,

(যাঁরে) না দেখে নাম শুনে কানে, মন গিয়ে তায় লিপ্ত হ’ল॥

                        -রামপ্রসাদ

যতনে হৃদয়ে রেখো

কালেংড়া-ঝাঁপতাল


যতনে হৃদয়ে রেখো, আদরিণী শ্যামা মাকে।

মন তুই দ্যাখ আর আমি দেখি,

আর যেন কেউ নাহি দেখে॥

কামাদিরে দিয়ে ফাঁকি, আয় মন বিরলে দেখি,

রসনারে সঙ্গে রাখি—সে যেন মা বলে ডাকে।

কুরুচি কুমন্ত্রী যত, নিকট হতে দিও নাকো,

জ্ঞান-নয়নে প্রহরী রেখো, সে যেন সাবধানে থাকে৷

কমলাকান্তের মন, ভাই আমার এই নিবেদন,

দরিদ্রে পাইলে ধন, সে কি অযতনে রাখে।

         -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

রাঙ্গা জবা দিতে গিয়ে

মিশ্র রাগ-ঝাঁপতাল


রাঙ্গা জবা দিতে গিয়ে

মরি আমি লজ্জা পেয়ে,

তোর চরণ যে মা আরও রাঙ্গা

বনের জবাফুলের চেয়ে।

এমন রাঙ্গা জবার ডালি

কোন বনে পাব মা, কালী,

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি শুধু

ধারা বহে নয়ন বেয়ে৷

নৃত্যকালীর রূপে, মা গো,

নৃত্যে যখন উঠিস মেতে

পাছে তোর চরণে ব্যথা বাজে

শিব দিল তাই হৃদয় পেতে।

ওই চরণে, ও মা শ্যামা,

সন্তানে তোর ঠাই দে না মা,

মায়ার বাঁধন মুক্ত করে

মুক্তকেশী কালো মেয়ে॥

 -বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

রণবেশে হেসে হেসে ঐ বামা এসেছে

বেহাগ-ঠুংরি


রণবেশে হেসে হেসে ঐ বামা এসেছে।

করে অসি পদে শশী কী রূপসী সেজেছে৷

নয়নে অনল জ্বলে, নরশির শোভে গলে,

দলিতে দনুজদলে ঢলে ঢলে চলেছে৷

রুধির লেগেছে গায়, নীল জলে জবা প্রায়,

আঁখি না ফিরিতে চায়, কী সুখেতে মজেছে।

আ মরি কি রূপ হায়, অরূপ উথলে তায়,

সাধে কী রে ঐ পায় পশুপতি পড়েছে৷

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আর লুকাবি কোথায়, মা কালী

বাগেশ্রী—দাদরা


(আর) লুকাবি কোথায়, মা কালী ।

বিশ্বভুবন আঁধার করে তোর রূপে মা সব ডুবালি ৷

সুখের গৃহ শ্মশান করে বেড়াস মা তুই আগুন জ্বালি।

(আমায়) দুঃখ দেওয়ার ছলে মা, তোর ভুবন ভরা রূপ দেখালি ॥

পূজা করে পাইনে তোরে, (মা গো) এবার চোখের জলে এলি ।

বুকের ব্যাথায় আসন পাতা, বস মা সেথা দুখ-দুলালী ॥

             -নজরুল ইসলাম

শ্যামা মন-ছাঁচে তোমাকে ফেলে

সুরট মল্লার-তেওড়া


শ্যামা, মন-ছাঁচে তোমাকে ফেলে,

মনোময়ী মূর্তি আজ ল’ব তুলে॥

মন যে আমার খাদে ভরা, তোমার ভাবে কৈ মা গলে,

ভাবরূপিণী হও তারিণী, গলে আমার ভাব-অনলে৷

দেখিব রূপ তোমার স্বরূপ, যে রূপেতে ভোলা ভোলে,

পূরাও আশা, কৃত্তিবাসা, দিয়ে দেখা হৃদিকমলে৷

গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা, কী হবে মা বনফুলে,

কী দিয়ে পূজিব তোমায় ভাবছি বসে তাই বিরলে৷

আমি আমার নই জননী, আমার নাই কিছুই ভূতলে,

এ ব্রহ্মাণ্ড তোমার সৃষ্টি, দৃষ্টিহীনে আমার বলে।

প্রেমিক বলে শোন রে যুক্তি যথাশক্তি ভক্তিজলে,

ধুয়ে দে মা’র রাঙ্গা চরণ, মনফুল দে পদতলে ৷

                    -প্রেমিক

শ্যামা মা কি আমার কালো রে

মল্লার-একতাল


শ্যামা মা কি আমার কালো রে।

কালোরূপে দিগম্বরী হৃদিপদ্ম করে আলো রে।

লোকে বলে কালী কালো, আমার মন তো বলে না কালো রে॥

কখনো শ্বেত, কখনো পীত, কখনো নীল, লোহিত রে,

(আমি) আগে নাহি জানি কেমন জননী,

ভাবিয়ে জনম গেল রে॥

কখনো পুরুষ, কখনো প্রকৃতি, কখনো শূন্যরূপা রে,

(মায়ের) এ ভাব ভাবিয়ে কমলাকান্ত সহজে পাগল হ’ল রে॥

               -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

শ্যামা-ধন কি সবাই পায়

ভৈরব-একতাল


শ্যামা-ধন কি সবাই পায়, কালী-ধন কি সবাই পায়,

অবোধ মন বুঝে না এ কী দায়

শিবেরও অসাধ্য সাধন, মন মজানো রাঙ্গা পায়॥

ইন্দ্রাদিসম্পদসুখ তুচ্ছ হয় যে ভাবে মায়।

সদানন্দ সুখে ভাসে, শ্যামা যদি ফিরে চায়॥

যোগীন্দ্র মুনীন্দ্র ইন্দ্র, যে চরণ ধ্যানে না পায়।

নির্গুণ কমলাকান্ত তবু সে চরণ চায়॥

            -কমলাকান্ত চক্রবর্তী

শ্রীদুর্গানাম ভুলো না

কানাড়া—একতাল


শ্রীদুর্গানাম ভুলো না, ভুলো না ভুলো না।

শ্রীদুর্গা স্মরণে সমুদ্রমন্থনে, বিষপানে বিশ্বনাথ ম’ল না৷

যদ্যপি কখনো বিপদ ঘটে, শ্রীদুর্গা স্মরণ করিও সঙ্কটে,

তারায় দিয়ে ভার সুরথ রাজার, লক্ষ অসিঘাতে প্রাণ গেল না৷

বিভু নামে এক রাজার ছেলে, যাত্রা করেছিল শ্রীদুর্গা বলে,

আসিবার কালে সমুদ্রের জলে ডুবেছিল তবু মরণ হ’ল না৷

                   -রামপ্রসাদ

সমরে নাচে রে

খাম্বাজ-আদ্ধা-কাওয়ালি


সমরে নাচে রে কার এ রমণী,

নাশিছে তিমিরে তিমিরবরণী॥

হুহুঙ্কার রবে মগনা তাণ্ডবে,

চমকে দমকে যেন রে দামিনী।

অট্ট অট্ট হাসি সমর উল্লাসি,

দিতিসুত নাশে দনুজদলনী॥

অসুরে সংহারে অসির প্রহারে,

বরাভয় করে সৃজন-পালিনী॥

বামা ভয়ঙ্করা ভীষণা মধুরা,

হরমনোহরা মানসমোহিনী।

সংসার-অরণ্যে অনন্যশরণ্যে,

শ্রীরামপ্রসন্নে শরণদায়িনী॥

-রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

সকলি তোমার ইচ্ছা

মনোহরসাহী-ঝাপতাল


সকলি তোমার ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী তারা তুমি।

তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি॥

পঙ্কে বদ্ধ করো করী পঙ্গুরে লম্বাও গিরি।

কারে দাও মা ব্রহ্মপদ কারে করো অধোগামী॥

আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী, আমি ঘর তুমি ঘরণী।

আমি রথ তুমি রথী, যেমন চালাও তেমনি চলি॥

                 -রামপ্রসাদ

সদানন্দময়ী কালী

মনোহরসাহী—ঝাপতাল


সদানন্দময়ী কালী, মহাকালের মনমননাহিনী (গো মা)।

তুমি আপনি নাচো, আপনি গাও মা, আপনি দাও মা করতালি॥

আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশী-ভালী।

ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি॥

*সবে মাত্র তুমি যন্ত্রী, আমরা তোমার তন্ত্রে চলি।

তুমি যেমন নাচাও তেমনি নাচি, যেমন বলাও তেমনি বলি।

অশান্ত কমলাকান্ত দিয়ে বলে, মা, গালাগালি।

এবার সর্বনাশী ধরে অসি ধর্মাধর্ম দুটো খেলি॥

      -কমলাকান্ত চক্রবর্তী


পাঠান্তর > সবে মাত্র তুমি যন্ত্রী যন্ত্র আমরা তন্ত্রে চলি।

             তুমি যেমন রাখ তেমনি থাকি (মা), যেমনি বলাও তেমনি বলি।

হেরো হর-মনোমোহিনী

শঙ্করা-একতাল


হেরো হর-মনোমোহিনী কে বলে রে কালো মেয়ে।

(আমার) মায়ের রূপে ভুবন আলো,

চোখ থাকে তো দেখ না চেয়ে॥

বিমল হাসি ক্ষরে শশী, অরুণ পড়ে নখে খসি,

এলোকেশী শ্যামা ষোড়শী;

কমলভ্রমে ভ্রমর ভ্রমে, বিভোর ভোলা চরণ পেয়ে॥

                  -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

মোরে দেহি দেবী দরশন

কাফি-সিন্ধু—কাওয়ালি


মোরে দেহি দেবী দরশন।

আর দুঃখ দিও না দীনে দীন-দয়াময়ী।

দনুজদলনী দেবী, দেব-আরাধ্য ধন॥

জানি মা তব চরণ অপারের সুখতরী,

কী জানি শেষের দিনে পাছে ও পদ পাসরি,

তাই মা আকুল প্রাণে তোমার তরে নেহারি,

লুকায়ে থেকো না করো দ্রুত পদে আগমন॥

দীন-তারিণী, মম দিন আগত দেখি,

দিনে রাতে তাই তোরে এত পরিত্রাহি ডাকি,

জানি না জননী আর ক’দিন বা আছে বাকি,

এই বেলা করো আসি দীনের দুঃখমোচন॥

সভয়ে ডাকি অভয়ে করো মা অভয় দান,

ভব ভয় হ’তে দীন রামে করো পরিত্রাণ,

তুমি না করিলে দুঃখ কে করিবে অবসান,

কুপুত্র হয় মা যদি কুমাতা নহে কখন॥

            -রামলাল দাসদত্ত

রূপ যদি তোর এতই ভালো

বেহাগ—মিশ্র—তেওড়া


রূপ যদি তোর এতই ভালো মুণ্ডমালা কেন গলে।

দয়াময়ী নাম যদি মা, শিব কেন তোর চরণতলে॥

যার রূপে হয় ভুবন আলো তার কেন হায় বরণ কালো।

যার করুণায় বিশ্ব মাতায় খড়ঙ্গ তাহার করতলে॥

যোগী ঋষি তোমার লীলা পায় না আজও ধ্যানের মাঝে।

অভয়া তোর চরণছায়া রাখিস আমার হৃদয়-মাঝে।

কাদলো তোরই ছেলে মেয়ে, শ্যামা-মা, তোর পথ চেয়ে।

পূজার ডালা সাজিয়েছি মা ব্যথায় ভরা নয়নজলে৷

        -ফটিকচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়

লম্বিত গলে মুণ্ডমাল

কানাড়া—একতাল

লম্বিত গলে মুণ্ডমাল দম্ভিতা ধনি-মুখ-করাল,

স্তম্ভিত পদে মহাকাল, কম্পিতা ভয়ে মেদিনী॥

দিগ্বসনা চন্দ্র-ভাল, এলায়ে পড়েছে কেশজাল,

শোভিত অসি করে কপাল প্রখরা শিখরি-নন্দিনী॥

চারিদিকে কত দিক্পাল, ভৈরবী শিবা তাল বেতাল,

অতি অপরূপ রূপ বিশাল কালী কলুষনাশিনী।

                -দাশরথি রায়

দেবী-প্রণাম

বেহাগ


ও সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥১॥

সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।

গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তুতে॥ ২॥

শরণাগত-দীনার্ত-পরিত্রাণ-পরায়ণে।

সর্বস্যার্তিহরে দেবি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥ ৩॥

জয় নারায়ণি নমোহস্তুতে,

জয় নারায়ণি নমোহস্তুতে

জয় নারায়ণি নমোহস্তুতে,

জয় নারায়ণি নমোহস্তুতে॥


বঙ্গানুবাদ

সর্ব মঙ্গল বিধাতার মঙ্গলবিধানকারিণী সর্বাভীষ্টসাধিকা, আশ্রয়দায়িনী ত্রিনয়না (সূর্যচন্দ্রাগ্নিলোচনা), ও গৌরবর্ণা হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম।১।

সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারের শক্তিরূপিণী, সনাতনী, ত্রিগুণের আধারভূতা ও ত্রিগুণময়ী, হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম। ২।

শরণাগত, দীন ও আর্তগণের পরিত্রাণ-পরায়ণা এবং সকলের ক্লেশনাশিনী, হে দেবী, হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম। ৩।


দশাবতারস্তোত্রম্

দশাবতারস্তোত্রম্

কাওয়ালি


প্রলয়-পয়ধি-জলে ধৃতবানসি বেদং,

বিহিত-বহিত্ৰ-চরিত্রমখেদম্।

কেশব ধৃতমীনশরীর, জয় জগদীশ হরে॥১


ক্ষিতিরতি-বিপুলতরে তব তিষ্ঠতি পৃষ্ঠে,

ধরণি-ধরণ-কিণ-চক্র-গরিষ্ঠে।

কেশব ধৃতকচ্ছপরূপ, জয় জগদীশ হরে


বসতি দশন-শিখরে ধরণী তব লগ্না,

শশিনী কলঙ্ক-কলেব নিমগ্না।

কেশব ধৃতশূকররূপ, জয় জগদীশ হরে


তব কর-কমল-বরে নখমদ্ভূত-শৃঙ্গং,

দলিত-হিরণ্যকশিপুতনুভৃঙ্গম্।

কেশব ধৃতনরহরিরূপ, জয় জগদীশ হরে


ছলয়সি বিক্রমণে বলিমদ্ভূত-বামন,

পদনখনীরজনিতজন পাবন।

কেশব ধৃতবামনরূপ, জয় জগদীশ হরে॥৫


ক্ষত্রিয়রুধিরময়ে জগদপগতপাপং,-

স্নপয়সি পয়সি শমিতভবতাপম্।

কেশব ধৃতভৃগুপতিরূপ,জয় জগদীশ হরে


বিতরসি দিক্ষু রণে দিক্পতি কমনীয়ং,

দশমুখমৌলিবলিং রমণীয়ম্।

কেশব ধৃতরঘুপতিরূপ, জয় জগদীশ হরে


বহসি বপুষি বিশদে বসনং জলদাভং,

হলহতিভীতিমিলিতযমুনাভম্।

কেশব ধৃতহলধররূপ, জয় জগদীশ হরে


নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্রুতিজাতং,

সদয়-হৃদয়-দর্শিত-পশুঘাতম্ ।

কেশব ধৃতবুদ্ধশরীর, জয় জগদীশ হরে ॥৯


স্লেচ্ছ-নিবহ-নিধনে কলয়সি করবালং,

ধূমকেতুমিব কিমপি করালম্।

কেশব ধৃতকল্কিশরীর, —জয় জগদীশ হরে১০


শ্রীজয়দেবকবেরিদমুদিতমুদারং,

শৃণু সুখদং শুভদং ভবসারম্।

কেশব ধৃতদশবিধরূপ,—জয় জগদীশ হরে১১


             —শ্রীজয়দেব


বঙ্গানুবাদ

যে বেদে তোমার চরিত্র ভবসাগরের তরণীরূপে উপদিষ্ট হইয়াছে, সেই বেদকে তুমি প্রলয়ের জলরাশি মধ্যে অনায়াসে ধারণ করিয়াছিলে; হে কেশব, হে মৎস্যরূপী, হে জগদীশ্বর, হে হরি, তোমার জয় হউক। 


পৃথিবী-ধারণবশতঃ তোমার সুবিশাল পৃষ্ঠে দৃঢ় চক্রাকার যে চিহ্ন হইয়াছে, তাহাকে পৃথিবী অবস্থান করে; হে কেশব হে কচ্ছপরূপী ইত্যাদি। ২


চন্দ্রে কলঙ্করেখা যেরূপ (তাহার সৌন্দর্যবর্ধকরূপে) অবস্থিত, তোমার দন্তাগ্রে সংলগ্ন হইয়া পৃথিবীও সেইরূপ অবস্থিতি করে, হে কেশব, হে বরাহরূপী ইত্যাদি। ৩


তোমার শ্রেষ্ঠ করকমলের সূতীক্ষনখে হিরণ্যকশিপুর তনুরূপ ভ্রমর বিদলিত হয়; হে কেশব, হে নৃসিংহরূপধারী ইত্যাদি। ৪


হে অপূর্ব বামন, তোমার পদনখজলে ত্রিলোক পবিত্র হয়; তুমি পদক্ষেপ দ্বারা বলিকে ছলনা করো; হে কেশব, হে বামনরূপধারী ইত্যাদি। ৫


তুমি ক্ষত্রিয়ের রুধিররূপ জলে জগৎকে স্নান করাইয়া তাহার পাপ ক্ষালন করো এবং সংসারে তাপ শান্ত করো; হে কেশব, হে পরশুরামরূপী ইত্যাদি। ৬


তুমি যুদ্ধে দশদিপালের বাঞ্ছনীয় রাবণের মস্তক রূপ রমণীয় বলি দশদিকে বিতরণ করো; হে কেশব, হে রামরূপধারী ইত্যাদি। ৭


তুমি তোমার বিশাল দেহে লাঙ্গলের আঘাতে সন্ত্রস্তা যমুনার আভায় রঞ্জিত, নীলবর্ণ বস্ত্র ধারণ করো; হে কেশব, হে বলরামরূপী ইত্যাদি। ৮


হে কৃপাময়, অহো! যজ্ঞপ্রতিপাদক যে সকল বেদবাক্যে পশুহিংসা বিহিত হইয়াছে, তাহা তুমি নিন্দা করো; হে কেশব, হে বুদ্ধরূপধারী ইত্যাদি। ৯


তুমি ম্লেচ্ছসমুহের নিধনকালে ধূমকেতুসদৃশ অতি ভয়ঙ্কর খড়গ ধারণ করো; হে কেশব, হে কল্কিরূপধারী ইত্যাদি। ১০


তুমি শ্রীজয়দেব কবির রচিত এই উদার, সুখদ, শুভদ ও ভবসার স্তব শ্রবণ করো; হে কেশব, হে দশরূপধারী ইত্যাদি। ১১

শ্রীশ্রীরামচন্দ্র সংগীত

শ্রীরামনাম সংকীর্তনম্



শ্রীনাথে জানকীনাথে অভেদঃ পরমাত্মানি।

তথাপি মম সর্বস্বঃ রামঃ কমললোচনঃ॥

ও শ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ

স্তবঃ

(ইমন কল্যাণ)


বর্ণানামর্থসঙ্ঘানাং রসানাং ছন্দসামপি

মঙ্গলানাঞ্চ কর্তারৌ বন্দে বাণীবিনায়কৌ॥১॥


ভবানীশঙ্করৌ বন্দে শ্রদ্ধাবিশ্বাসরূপিণৌ।

যাভ্যাং বিনা ন পশ্যন্তি সিদ্ধাঃ স্বান্তঃস্থমীশ্বরম্॥২॥


বন্দে বোধময়ং নিত্যং গুরুং শঙ্কররূপিণম্।

যমাশ্রিতো হি বক্ৰোঽপি চন্দ্রঃ সর্বত্র বন্দ্যতে॥৩॥


সীতারামগুণগ্রাম—পুণ্যারণ্যবিহারিণৌ।

বন্দে বিশুদ্ধবিজ্ঞানৌ কবীশ্বরকপীশ্বরৌ॥৪॥


উদ্ভবস্থিতি—সংহারকারিণীং ক্লেশহারিণীম্।

সর্বশ্রেয়স্করীং সীতাং নতোঽহং রামবল্লভাম্॥৫॥


যন্মায়াবশবর্তি বিশ্বমখিলং ব্রহ্মাদিদেবাসুরাঃ

যৎসত্ত্বামৃষৈব ভাতি সকলং রজ্জৌ যথাহের্ভ্রমঃ।


যৎপাদপ্লব এক এব হি ভবাম্ভোধেস্তিতীর্ষাবতাম্

বন্দেঽহং তমশেষকারণপরং রামাখ্যমীশং হরিম্॥৬॥


প্রসন্নতাং যা ন গতাভিষেকতস্তথা ন মস্লৌ বনবাসদুঃখতঃ।

মুখাম্বুজশ্রী রঘুনন্দনস্য মে সদাস্তু সা মঞ্জুলমঙ্গলপ্রদা॥৭॥


নীলাম্বুজশ্যামলকোমলাঙ্গং সীতাসমারোপিতবামভাগম্।

পাণৌ মহাসায়কচারুচাপং নমামি রামং রঘুবংশনাথম্॥৮॥


মূলং ধর্মতরোর্বিবেকজলধেঃ পূর্ণেন্দুমানন্দং

বৈরাগ্যাম্বুজভাস্করং ত্বঘহরং ধ্বান্তাপহং তাপহম্।

মোহাম্ভোধরপুঞ্জপাটনবিধৌ খেসম্ভবং শঙ্করং

বন্দে ব্রহ্মকূলং কলঙ্কশমনং শ্রীরামভূপপ্রিয়ম্॥৯॥


সান্দ্রানন্দপয়োদসৌভগতনুং পীতাম্বরং সুন্দরং

পাণৌ বাণশরাসনং কটিলসত্তুণীরভারং বরম্।

রাজীবায়তলোচনং ধৃতজটাজুটেন সংশোভিতং

সীতালক্ষ্মণসংযুতং পথিগতং রামাভিরামং ভজে॥১০


কুন্দেীবরসুন্দরাবতিবলৌ বিজ্ঞানধামাবুভৌ

শোভাঢ্যৌ বরধন্বিনৌ শ্রুতিনুতৌ গো-বিপ্রবৃন্দপ্রিয়ৌ।

মায়ামানুষরূপিণৌ রঘুবরৌ সদ্ধর্মবমৌহিতৌ

সীতান্বেষণতৎপরৌ পথিগতৌ ভক্তিপ্রদৌ তৌ হি নঃ॥১১॥


ব্রহ্মাম্ভোধিসমুদ্ভবং কলিমলপ্ৰধ্বংসনং চাব্যয়ং

শ্ৰীমচ্ছ্যুমুখেন্দুসুন্দরবরে সংশোভিতং সর্বদা।

সংসারাময়ভেষজং সুমধুরং শ্রীজানকীজীবনং

ধন্যাস্তে কৃতিনঃ পিবন্তি সততং শ্রীরামনামামৃতম্॥১২


শান্তং শাশ্বতমপ্রমেয়মনঘং নির্বাণশান্তিপ্রদং

ব্রহ্মাশম্ভুফণীন্দ্রসেব্যমনিশং বেদান্তবেদ্যং বিভুম্।

রামাখ্যং জগদীশ্বরং সুরগুরুং মায়ামনুষ্যং হরিং

বন্দেঽহং করুণাকরং রঘুবরং ভূপালচূড়ামণিম্॥১৩


কেকিকণ্ঠাভনীলং সুরবরবিলসদ্‌ বিপ্রপাদাজচিহ্নং

শোভ্যাঢ্যং পীতবস্ত্রং সরসিজনয়নং সর্বদা সুপ্রসন্নম্।

পাণৌ নারাচচাপং কপিনিকরযুতং বন্ধুনা সেব্যমানম্

নৌমীড্যং জানকীশং রঘুবরমনীশং পুষ্পকারূঢ়রামম্॥১৪॥


আর্তনামাৰ্তিহন্তারং ভীতানাং ভয়নাশনম্।

দ্বিষতাং কালদণ্ডং তং রামচন্দ্রং নমাম্যহম্॥১৫॥


শ্রীরাঘবং দশরথাত্মজমপ্রমেয়ং

সীতাপতিং রঘুকুলান্বয়রত্নদীপম্।

আজানুবাহুমরবিন্দ-দলায়তাক্ষং

রামং নিশাচরবিনাশকরং নমামি॥১৬॥


বৈদেহীসহিতং সুরদ্রুমতলে হৈমে মহামণ্ডপে

মধ্যে পুষ্পকাসনে মণিময়ে বীরাসনে সংস্থিতম্।

অগ্রে বাচয়তি প্রভঞ্জনসুতে তত্ত্বং মুনীন্দ্রৈঃ পরম্

ব্যাখ্যাতং ভরতাদিভিঃ পরিবৃতং রামং ভজে শ্যামলম্॥১৭॥

প্রার্থনা

ইমনকল্যাণ


নান্যা স্পৃহা রঘুপতে হৃদয়েঽস্মদীয়ে,

সত্যং বদামি চ ভবানখিলান্তরাত্মা।

ভক্তিং প্রযচ্ছ রঘুপুঙ্গব নির্ভরাং মে

কামাদিদোষরহিতং কুরু মানসঞ্চ॥

সংকীর্তন

ওঁ শ্রীসীতা-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ-হনুমৎ-সমেত

শ্রীরামচন্দ্র-পরব্রহ্মণে নমঃ।

তিলোক কামোদ, ত্রিতাল


বালকাণ্ডঃ

১। শুদ্ধব্রহ্মপরাৎপর        রাম

২। কালাত্মকপরমেশ্বর        রাম

৩। শেষতল্পসুখনিদ্রিত        রাম

৪। ব্রহ্মাদ্যমরপ্রার্থিত        রাম

৫। চণ্ডকিরণকুলমণ্ডন        রাম

৬। শ্রীমদ্দশরথনন্দন        রাম

৭। কৌশল্যাসুখবর্ধন        রাম

৮। বিশ্বামিত্রপ্রিয়ধন        রাম

৯। ঘোরতাটকাঘাতক        রাম

১০। মারীচাদিনিপাতক    রাম

১১। কৌশিকমখসংরক্ষক        রাম

১২। শ্রীমদহল্যোদ্ধারক            রাম

১৩। গৌতমমুনিসংপূজিত        রাম

১৪। সুরমুনিবরগণসংস্তুত        রাম

১৫। নাবিকধাবিতমৃদুপদ        রাম

১৬। মিথিলাপুরজনমোহক        রাম

১৭। বিদেহমানসরঞ্জক            রাম

১৮। ত্র্যম্বককার্মুকভঞ্জক        রাম

১৯। সীতাৰ্পিতবরমালিক        রাম

২০। কৃতবৈবাহিককৌতুক        রাম

২১। ভার্গবদর্পবিনাশক            রাম

২২। শ্রীমদযোধ্যাপালক        রাম


অযোধ্যাকাণ্ডঃ

২৩। অগণিতগুণগণভূষিত        রাম

২৪। অবনীতনয়াকামিত        রাম

২৫। রাকাচন্দ্ৰসমানন            রাম

২৬। পিতৃবাক্যাশ্রিতকানন        রাম

২৭। প্রিয়গুহবিনিবেদিতপদ        রাম

২৮। তৎক্ষালিতনিজমৃদুপদ        রাম

২৯। ভরদ্বাজমুখনন্দক            রাম

৩০। চিত্রকূটাদ্রিনিকেতন        রাম

৩১। দশরথসন্ততচিন্তিত        রাম

৩২। কৈকেয়ীতনয়ার্থিত        রাম

৩৩। বিরচিতনিজপিতৃকর্মক        রাম

৩৪। ভরতাৰ্পিতনিজপাদুক        রাম


অরণ্যকাণ্ডঃ

৩৫। দণ্ডকবনজনপাবন        রাম

৩৬। দুষ্টবিরাধবিনাশন            রাম

৩৭। শরভঙ্গসুতীক্ষ্ণার্চিত        রাম

৩৮। অগস্ত্যানুগ্রহবর্ধিত        রাম

৩৯। গৃভ্রাধিপসংসেবিত        রাম

৪০। পঞ্চবটীতটসুস্থিত        রাম

৪১। শূর্পনখার্তিবিধায়ক        রাম

৪২। খরদূষণমুখসূদক            রাম

৪৩। সীতাপ্রিয়হরিণানুগ        রাম

৪৪। মারীচার্তিকৃদাশুগ            রাম

৪৫। বিনষ্টসীতান্বেষক            রাম

৪৬। গৃভ্রাধিপগতিদায়ক        রাম

৪৭। শবরীদত্তফলাশন            রাম

৪৮। কবন্ধবাহুচ্ছেদন            রাম


কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড

৪৯। হনুমৎসেবিতনিজপদ        রাম

৫০। নতসুগ্রীবাভীষ্টদ            রাম

৫১। গর্বিতবালিসংহারক        রাম

৫২। বানরদূতপ্ৰেষক            রাম

৫৩। হিতকরলক্ষ্মণসংযুত        রাম


সুন্দরকাণ্ডঃ

৫৪। কপিবরসন্ততসংস্মৃত        রাম

৫৫। তদ্গতিবিঘ্নধ্বংসক        রাম

৫৬। সীতাপ্রাণাধারক            রাম

৫৭। দুষ্টদশাননদূষিত            রাম

৫৮। শিষ্টহনুমদ্ভূষিত            রাম

৫৯। সীতাবেদিতকাকাবন        রাম

৬০। কৃতচূড়ামণিদর্শন            রাম

৬১। কপিবরবচনাশ্বাসিত        রাম


লঙ্কাকাণ্ডঃ

৬২। রাবণনিধনপ্রস্থিত        রাম    

৬৩। বানরসৈন্যসমাবৃত        রাম

৬৪। শোষিতসরিদীশার্থিত        রাম

৬৫। বিভীষণাভয়দায়ক        রাম

৬৬। পর্বতসেতুনিবন্ধক        রাম

৬৭। কুম্ভকর্ণশিরচ্ছেদক        রাম

৬৮। রাক্ষসসংঘবিমর্দক        রাম

৬৯। অহিমহিরাবণচারণ        রাম

৭০। সংহৃতদশমুখরাবণ        রাম

৭১। বিধিভবমুখসুরসংস্তুত        রাম

৭২। খস্থিতদশরথবীক্ষিত        রাম

৭৩। সীতাদর্শনমোদিত        রাম

৭৪। অভিষিক্তবিভীষণনত        রাম

৭৫। পুষ্পকযানারোহণ        রাম

৭৬। ভরদ্বাজাভিনিষেবণ        রাম

৭৭। ভরতপ্রাণপ্রিয়কর        রাম

৭৮। সাকেতপুরীভূষণ            রাম

৭৯। সকলস্বীয়সমানত            রাম

৮০। রত্নলসৎপীঠাস্থিত        রাম

৮১। পট্টাভিষেকালঙ্কৃত            রাম

৮২। পার্থিবকুলসম্মানিত        রাম

৮৩। বিভীষণার্পিতরঙ্গক        রাম

৮৪। কীশকুলানুগ্রহকর        রাম

৮৫। সকলজীবসংরক্ষক        রাম

৮৬। সমস্তলোকাধারক        রাম


উত্তরকাণ্ডঃ

৮৭। আগতমুনিগণসংস্তুত        রাম

৮৮। বিশ্রুতদশকণ্ঠোদ্ভব        রাম

৮৯। সীতালিঙ্গননির্বৃত            রাম

৯০। নীতিসুরক্ষিতজনপদ        রাম

৯১। বিপিনত্যজিতজনকজ        রাম

৯২। কারিতলবণাসুরবধ        রাম

৯৩। স্বৰ্গতশম্বুকসংস্তুত        রাম

৯৪। স্বতনয়কুশলবনন্দিত        রাম

৯৫। অশ্বমেধক্রতুদীক্ষিত        রাম

৯৬। কালাবেদিতসুরপদ        রাম

৯৭। আযোধ্যকজনমুক্তি        রাম

৯৮। বিধিমুখবিবুধানন্দক        রাম

৯৯। তেজোময়নিজরূপক        রাম

১০০। সংসৃতিবন্ধবিমোচক        রাম

১০১। ধর্মস্থাপনতৎপর            রাম

১০২। ভক্তিপরায়ণমুক্তিদ        রাম

১০৩। সর্বচরাচরপালক        রাম

১০৪। সর্বভবাময়বারক        রাম

১০৫। বৈকুণ্ঠালয়সংস্থিত        রাম

১০৬। নিত্যানন্দপদস্থিত        রাম

১০৭। রাম রাম জয় রাজা        রাম

১০৮। রাম রাম জয় সীতা        রাম


প্রার্থনা

ভয়হর মঙ্গল দশরথ            রাম

জয় জয় মঙ্গল সীতা            রাম

মঙ্গলকর জয় মঙ্গল            রাম

সঙ্গতশুভবিভবোদয়            রাম

আনন্দামৃতবর্ষক            রাম

আশ্রিতবৎসল জয় জয়        রাম

রঘুপতি রাঘব রাজা            রাম

পতিতপাবন সীতা            রাম


স্তবঃ 

(ভীমপলশ্রী—একতাল)

কনকাম্বর কমলাসন-জনকাখিল    ধাম

সনকাদিক-মুনি-মানস-সদনানঘ    ভূম

শরণাগত-সুরনায়ক চিরকামিত    কাম

ধরণী-তল-তরণ দশরথ-নন্দন        রাম

পিশিতাশন-বনিতাবধ-জগদানন্দ    রাম

কুশিকাত্মজ-মখ-রক্ষণ-চরিতাদ্ভুত    রাম

ধনী-গৌতম-গৃহিণী-স্বজদঘ-মোচন    রাম

মুনিমণ্ডল-বহুমানিত পদপাবন        রাম

স্মরশাসন-সুশরাসন লঘুভঞ্জন        রাম

নর-নির্জর জন-রঞ্জন সীতাপতি    রাম

কুসুমায়ুধ-তনু-সুন্দর কমলানন    রাম

বসুমানিত-ভৃগুসম্ভব-মদমর্দন        রাম

করুণারস-বরুণালয় নতবৎসল    রাম

শরণং তব চরণং ভবহরণং মম    রাম

শ্রীরামচন্দ্রপ্রণামঃ

(ইমনকল্যাণ)


আপদামপহর্তারং দাতারং সর্বসম্পদাম্।

লোকাভিরামং শ্রীরামং ভূয়ো ভূয়ো নমাম্যহম্॥১॥

রামায় রামচন্দ্রায় রামভদ্রায় বেধসে।

রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ॥২॥

শ্রীহনুমত্প্রণামঃ

অতুলিতবলধামং স্বর্ণ-শৈলাভদেহং

দনুজবনকৃশানুং জ্ঞানিনামগ্রগণ্যম্।

সকলগুণনিধানং বানরাণামধীশং

রঘুপতিবরদূতং বাতজাতং নমামি॥১॥


গোষ্পদীকৃতবারীশং মশকীকৃতরাক্ষসম্।

রামায়ণমহামালারত্নং বন্দেঽনিলাত্মজম্॥২॥


অঞ্জনানন্দনং বীরং জানকীশোকনাশনম্।

কপীশমক্ষহন্তারং বন্দে লঙ্কাভয়ঙ্করম্॥৩


উল্লঙ্ঘ্য সিন্ধোঃ সলিলং সলীলং

যঃ শোকবহ্নিং জনকাত্মজায়াঃ।

আদায় তেনৈব দদাহ লঙ্কা

নমামি তং প্রাঞ্জলিরাঞ্জনেয়ম্॥৪॥


মনোজবং মারুততুল্যবেগং

জিতেন্দ্রিয়ং বুদ্ধিমতাং বরিষ্ঠম্।

বাতাত্মজং বানরযূথমুখ্যং

শ্রীরামদূতং শিরসা নমামি॥৫॥


আঞ্জনেয়মতিপাটলাননং

কাঞ্চনাদ্রিকমনীয়বিগ্রহম্।

পারিজাতরুমূলবাসিনং

ভাবয়ামি পবমাননন্দনম্ ॥৬ ॥


যত্র যত্র রঘুনাথকীর্তনং

তত্র তত্র কৃতমস্তকাঞ্জলিম্।

বাষ্পবারিপরিপূর্ণলোচনং

মারুতিং নমত রাক্ষসান্তকম্॥৭॥


ইতি অষ্টোত্তরশতনাম রামায়ণং সমাপ্তম্

ইতনী বিনতি রঘুনন্দনসে

সিন্ধু-খাম্বাজ-কাওয়ালি


ইতনী বিনতি রঘুনন্দনসে, দুঃখ-দ্বন্দ্ব হামারা মিটাও জী॥

আপনে পদ-পঙ্কজ-পিঞ্জর মে চিত-হংস হামারা বৈঠাও জী॥

তুলসীদাস কহে কর জোড়ি ভব-সাগর পার উতারো জী॥

                -তুলসীদাস

রামনাম মনি দীপক পেয়ারা

মিশ্র রাগ—কাওয়ালি


রামনাম মনি দীপক পেয়ারা,

ঘট ঘট মে আসি কৌজিওয়ারা,

রামনাম জপ কাম ত্যজপি

হরকে হরকে যশ পাও৷

(হরকে হরকে যশ পাও)

কাম ক্রোধ লোভ মদ ছোড়ি মন,

দিবানিশি পূজ ওহি চরণ,

তুলসীদাস কহে ও চরণ ছোড়কে,

নহি হোগা নির্বাণ॥

      -তুলসীদাস

ঠুমকি চলত রামচন্দ্র

পিলু-একতাল


ঠুমকি চলত রামচন্দ্র বাজত পৈঁজনিয়াঁ।

কিলকিলাই উঠত ধায়, গিরত ভূমি লটপটায়;

ধায়ী মাতু গোদ লেত দশরথকী রাণীয়াঁ॥

অঙ্গরজঃ, অঙ্গলাই, বিবিধ ভাঁতি সোঁ দুলার;

তন মন ধন বার বার কহত মৃদু বাণিয়া॥

তুলসীদাস অতি আনন্দ, হেরত মুখারবিন্দ;

রঘুবরকী ছবি সমান রঘুবর ছবি বাণিয়াঁ॥

    -তুলসীদাস

জিনকে হাদিমে শিরি রাম বসে

দরবারী কানাড়া-ঢিমা ত্রিতাল


জিনকে হাদিমে শিরি রাম বসে—

উন সাধন ঔর কিয়ে ন কিয়ে।

জিন সন্ত-চরণ-রজকো পরসা,

উন তীরথ-নীর পিয়ে ন পিয়ে॥

সব-ভূত-দয়া জিনকে চিতমে

উন কোটন দান দিয়ে ন দিয়ে।

জিন রামরূপকে ধ্যান ধরে

উন রামনাম লিয়ে ন লিয়ে॥

     -কবীর

মনবাঁ ভজ লে সীতারাম

ভৈরবী—কাওয়ালি


মনবাঁ ভজ লে সীতারাম।

ভজ লে সীতারাম মনবাঁ, কাহে ন জপতে নাম।

দিন দিয়া জী হরিগুণ গাবে গুরু দিয়া জো নাম॥

রাম গড়কে বৈঠে রামজী, সবকা মুজরা লীজে।

জো জ্যায়সা নৌকরী করেগা, উনকো ত্যায়সা দীজে॥

লেড়কা বালা লালন পালন তনকো দুধ পিলাবে।

মরণকালমে শরণ লেকে বাবা কর বোলাবে॥

এক নর ভুলে, দু নর ভুলে, ভুলে জগৎ-সংসার।

জান্ সুনকে জো নর ভুলে, উনকি নহি পার॥

            -তুলসীদাস


সীতাপতি রামচন্দ্র

ঝিঝিট—একতাল


সীতাপতি রামচন্দ্র, রঘুপতি রঘুরাঈ।

ভজলে অযোধ্যানাথ, দুস্ রা ন কোঈ।

রসনা রস নাম লেত, সন্তনকো দরশ দেত।

বিহসিত মুখ চন্দ্রবিন্দু, সুন্দর সুখ-দাঈ।

হসন বোলন চতুর চাল, অয়ন-বয়ান দৃগ্-বিশাল।

ভ্রূকুটি-কুটিল তিলক-ভাল, নাসিকা সুহাঈ॥

কেশরকো তিলক-ভাল, মানো রবি প্রাতঃকাল।

মানো গিরিশিখর ফোড়ি, সুরসরি বহিরাঈ৷

মোতিনকো কণ্ঠমাল, তারাগণ উর বিশাল।

শ্রবণ-কুণ্ডল ঝলমলাত, রতি-পতি ছবি ছাঈ।

সখা-সহিত সরযূতীর, বিহরে রঘুবংশ-বীর।

তুলসীদাস হরষ নিরখি চরণরজ পাঈ॥

             -তুলসীদাস

রামচন্দ্র গুণধাম আমারি

দেশ মিশ—ত্রিতাল


রামচন্দ্র গুণধাম আমারি ।

নব-দুর্বাদল-কান্তি উজল হৃদিমন্দিরমঙ্গলকারী বিহারী॥

সৰ্বারাধ্য হে দেব-দেব শ্রীঅযোধ্যা-পূরজন-তাপ-নিবারী;

কৌশল্যাসুত দশরথ-নন্দন নট সুন্দর সরযূতটচারী॥

কমলনেত্র বিমল মুখমণ্ডল, তরুণারুণ ভাতি গণ্ডে,

বক্ষ পীন, কটি ক্ষীণ, অসীম শক্তি সুবলিতভুজদণ্ডে॥

রম্ভা-তরু-ঊরু, চরণে উদিত চারু চন্দ্র নখর দ্বৌ সারি

শীর্ষে প্রখর-কোটি-ভানুকরোজ্জ্বল ঝলমল মুকুট, করে ধনুধারী ॥

                  -বিশ্বরূপ গোস্বামী

ভজ মন রাম নাম

গৌড় সারঙ্গ—ত্রিতাল


ভজ মন রাম নাম সুখ দাঈ;

ঘড়ি ঘড়ি পল পল অওধ বিতত সব

ফির পাছে স্তাঈ;

ভাই বন্ধু সব কুটুম কবীলা,

দেখতে জীয়া ললচাঈ;

অন্ত সমে কোঈ কাম ন আত্তয়ত,

চক্র কহে সমঝঈ॥

       —চক্রদাস

ইক নীর হ্যায় গঙ্গাজী

পিলু-কাহারবা


ইক নীর হ্যায়্ গঙ্গাজী, ইক নাম হ্যায়্ রাম।

ইক চন্দ্র হ্যায়্ ইক সুরজ, নির্বলকে বল রাম॥

জগতমে কোই নহি সজন আপনা।

সদা রাম নাম জপনা রসনা॥

কহত নানক ঝুঠ হ্যায়্ জগ সব,

সচ্চা দশরথ নন্দন রাম॥

           —নানক

শ্রীশ্রীকৃষ্ণ সংগীত

আঁখিয়া হরি-দরশন কী প্যাসী

ভজন—কাওয়ালি


আঁখিয়া হরি-দরশন কী প্যাসী।

দেখ্যো চাহত কমলনয়নকো নিশিদিন রহত উদাসী॥

কেশব তিলক মোতিনকি মালা, বৃন্দাবনকে বাসী।

নেহ লগায় ত্যাগী তৃণসম, ডারি গয়ে গল ফাঁসি॥

কাহুকে মনকী-কে জানত, লোগনকে মন হাঁসি।

সুরদাস প্রভু তুম্হর দরশ বিন লৈহোঁ করবত কাসী।

                   -সূরদাস

কেশব কুরু করুণা দীনে

দেশ মিশ্র—একতাল


কেশব কুরু করুণা দীনে, কুঞ্জকাননচারী।

মাধব, মনোমোহন, মোহন-মুরলীধারী॥

(হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল, মন আমার)

ব্রজকিশোর, কালীয়হর, কাতর-ভয়-ভঞ্জন,

নয়ন বাঁকা, বাঁকা শিখীপাখা, রাধিকা-হৃদি-রঞ্জন,

গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী॥

শ্যাম, রস-রাসবিহারী (হরিবোল, ইত্যাদি)॥

              -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

চিন্তয় মম মানস

কীর্তন—একতাল


চিন্তয় মম মানস হরি চিঘন নিরঞ্জন।

কিবা অনুপম ভাতি, মোহন মূরতি, ভকত-হৃদয়-রঞ্জন॥

নবরাগে রঞ্জিত, কোটি-শশী-বিনিন্দিত,

কিবা বিজলী চমকে, অরূপ আলোকে, পুলকে শিহরে জীবন॥

হৃদি-কমলাসনে, ভাবো তাঁর শ্রীচরণ,

দেখো শান্ত মনে, প্রেম নয়নে, অপরূপ প্রিয়দর্শন।

চিদানন্দরসে ভক্তিযোগাবেশে হও রে চির মগন॥

         -ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল

মম মন-মন্দিরে রহ নিশিদিন

ভজন—কাওয়ালি


মম মন-মন্দিরে রহ নিশিদিন—

কৃষ্ণ মুরারি শ্রীকৃষ্ণ মুরারি

বন্দনা-গানে তব বাজুক জীবন-বীণ॥

ভক্তি-প্রীতি-মালা-চন্দন তুমি নিও হে নিও চিত নন্দন।

জীবন মরণ তব পূজা নিবেদন সুন্দর হে মনোহারী।

এসো নন্দকুমার আর নন্দকুমার হবে প্রেম-প্রদীপে আরতি তোমার

নয়ন-যমুনা ঝরে অনিবার তোমারি বিরহে গিরিধারী॥

                     —অজ্ঞাত

রাখো মিনতি রাখো

ভজন-কাওয়ালি


(রাখো) মিনতি রাখো হে গিরিধারীলাল।

(মম) আঁখির আগে রহ শ্যাম-গোপাল॥

(তব) চরণ-তলে মোর এই তনু-মন—

প্রণামী-ফুলের মতো লহ নিবেদন,

(আমি) জনমে জনমে প্রেমের কাঙ্গাল॥

(শুধু) তোমার বিরহ ছাড়া সকল ব্যথা

সহিব তোমারি লাগি হে দেবতা!

(মোর) হৃদয়-বাসরে মিলন-রাতে

আঁখি মিলাও প্রভু আঁখির সাথে,

মীরার প্রীতম হয়ে রহ চিরকাল।

            -প্রণব রায়

শ্যামল বংশীবালা

সিন্ধু মিশ্র-ঠুংরি


শ্যামল বংশীবালা, নন্দলালা মাতোয়ালা,

গোকুল কে উজিয়ালা॥

কৃষ্ণ কৃষ্ণ কহুঁ সাঁঝ সবেরে, কৃষ্ণ নাম সব দুঃখ হরে,

কৃষ্ণহী ভবসাগর পারে পার লগানেবালা॥

কোই কহত হ্যায় কৃষ্ণ মুরারী, কোই কহত হ্যায় রাসবিহারী,

কোই কহত হ্যায় হরে মুরারী জপে তুলসী মালা॥

                -অজ্ঞাত

মেরে তো গিরিধর গোপাল

ঝিঝিট—একতাল


মেরে তো গিরিধর গোপাল দুস্রো ন কোঈ।

যাকে সিরে মোর-মুকুট, মেরো পতি সোঈ;

শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম কণ্ঠমাল হোঙ্গ

তাত মাত ভ্রাত বন্ধু আপনো নহি কোঈ।

দাঁড় দই কুল-কান ক্যা করিহে কোঈ॥

সন্তান সঙ্গ বৈঠ বৈঠ লোকলাজ খোই।

চুনরীকে কিয়ে টুক টুক, ওঢ় লীহ্ন লোঈ॥

মোতী মুঙ্গে উতাব, বনমালা পোঈ।

অঁসুবন জল সীঁচ সীঁচ প্রেম বেলি বোঈ॥

অবতো বাত ফৈল গই আনন্দ ফাল হোঈ।

দুধকী মথনিয়া বড়ে প্রেমে সে বিলোঈ॥

মাখন জব কাড়ি এলিয়ো দাদৃ পিয়ে কোঈ।

মীরা প্রভু লগন লাগী, জো হোয় সো হোঙ্গ ।

              -মীরাবাঈ

সাধন করনা চাহিয়ে

ভৈরবী-কাহারবা


সাধন করনা চাহিয়ে মনবাঁ ভজন করনা চাই।

প্ৰেম লগানা চাহিয়ে রে মনবাঁ প্রীত করনা চাই॥

নিত নহান্সে হরি মিলে তো জলজন্তু হোই।

ফল মূল খাকে হরি মিলে তো বাদুর বাঁদরায়॥

তুলসী পূজন্সে হরি মিলে তো ম্যাঁয় পূঁজু তুলসীঝাড়।

পাথ্থর পূজন্সে হরি মিলে তো ম্যাঁয় পূঁজু পহাড়॥

তিরণ ভখন্সে হরি মিলে তো বহুৎ মৃগী অজা।

স্ত্রী ছোড়ন্সে হরি মিলে তো বহুৎ রহে খোজা॥

দুধ পিনেসে হরি মিলে তো বহুৎ বৎস বালা।

মীরা কহে বিনা প্রেম্সে নহী মিলে নন্দলালা॥

              -মীরাবাঈ

সাজে নওল কিশোর

ভজন-কাহারবা


সাজে নওল কিশোর চাঁদের তিলকে,

তার বনফুল মালা দোলে।

সে যে বংশীওয়ালা মোহিল ভুবন,

তার মোহন-মুরলী-বোলে;

বনফুল মালা দোলে।

মোর আনন্দ সে যে নন্দদুলাল,

সে যে ছন্দ দুলাল মোর নন্দদুলাল,

রহে কদম্বমূলে যমুনার কূলে,

বাঁশীতে উজান তোলে।

নিধুবনে সখা লয়ে খেলে হরি শিশু হয়ে,

অধরে মধুর হাসি জাগে।

যেথা চলে শ্যামরায় ফুল জাগে পায় পায়,

ধূলিকণা পদছায়া মাগে।

যবে আমার জীবনে আসি ডাকিবে বাজায়ে বাঁশী,

যেন অন্ধ নয়নে জাগে, প্রেমের মলয় লাগে,

হৃদয় দুয়ার যেন খোলে॥

         -অজয়কুমার ভট্টাচার্য

সুন্দর লালা নন্দ দুলালা

ভজন—কাওয়ালি


সুন্দর লালা নন্দ দুলালা নাচত শ্রীবৃন্দাবন মে।

ভালে চন্দন তিলক মনোহর অলকা শোভে কপোলন মে॥

শিরে চূড়া নয়ন বিশালা কুন্দমালা হিয়া পর দোলে।

পহিরণ পীত পটাম্বর বোলে রুণু ঝুনু নূপুর চরণ মে॥

কোঈ গাওয়ত পঞ্চম তান, বংশী পুকারো রাধা নাম,

মঙ্গল তাল মৃদঙ্গ রসাল বাজাওয়ত কোঈ রঙ্গন মে॥

রাধা-কৃষ্ণ একতনু হোয়, নিধুবন মে যো রঙ্গ মচাঈ,

বিশ্বরূপ যো ভগবান সোহি লীলা করত বৃন্দাবন মে॥

             —বিশ্বরূপ গোস্বামী

হে গোবিন্দ রাখু শরণ

ভজন—ত্রিতাল


হে গোবিন্দ রাখু শরণ, অবতো জীবন হারে॥

নীর পীবন হেতু গয়ো সিন্ধুকে কিনারে।

সিন্ধু বীচ বসত গ্রাহ চরণ ধরি পছারে॥

চার প্রহর যুধ ভয়ো, লে গয়ো মাঝাধারে।

নাক কান যুগল লাগে কৃষ্ণকে পুকারে৷

দ্বারকামে শব্দ ভয়ে, গরুড় ত্যাজি সিধারে॥

গ্রাহকে মারকে গজরাজকো উধারে॥

সুর কহে শ্যামসে আস হ্যায় তুম্হারে।

মেরা তেরা ন্যাব হোই যমরাজকো ডুবারে॥

               -সুরদাস

ধ্যান

কালিন্দীজলকল্লোলাসঙ্গিমারুতসেবিতং।

চিন্তয়ংশ্চেতসা কৃষ্ণং মুক্তো ভবতি সংসৃতেঃ॥

প্রণাম

কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মনে।

প্রণত-ক্লেশনাশায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥

শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গ সংগীত

শ্রীগৌরাঙ্গ সুন্দর নবনটবর

কীর্তন—একতাল


শ্রীগৌরাঙ্গ সুন্দর নবনটবর তপতকাঞ্চন কায়।

করে স্বরূপ বিভিন্ন, লুকাইয়ে চিহ্ন, অবতীর্ণ নদীয়ায়॥

কলিঘোর অন্ধকার বিনাশিতে, উন্নত উজ্জ্বল রস প্রকাশিতে,

তিন বাঞ্ছ তিন বস্তু আস্বাদিতে, এসেছ তিনেরি দায়;

সে তিন পরশে, বিরস-হরষে দরশে জগৎ মাতায়॥

নীলাব্জ হেমাজে করিয়ে আবৃত, হ্লাদিনীর পূরাও দেহ ভেদগত;

অধিরূঢ় মহাভাবে বিভাবিত, সাত্ত্বিকাদি মিলে যায়।

নবীন সন্ন্যাসী, সুতীর্থ-অন্বেষী, কভু নীলাচলে কভু যান কাশী;

অযাচকে দেন প্রেম রাশি রাশি, নাহি জাতিভেদ তায়।

দ্বিজ নীলকণ্ঠ ভণে, এই বাঞ্ছা মনে, কবে বিকাব গৌরের পায়॥

               -নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়

কী দেখিলাম রে

কীর্তন—একতাল


কী দেখিলাম রে, কেশব ভারতীর কুটীরে

অপরূপ জ্যোতি, শ্রীগৌরাঙ্গ মূরতি, দুনয়নে প্রেম বহে শতধারে।

গৌর মত্ত মাতঙ্গের প্রায় প্রেমাবেশে নাচে গায়,

কভু ধূলাতে লুটায়, নয়নজলে ভাসে রে,

কঁদে আর বলে হরি, স্বর্গ মর্ত্য ভেদ করি, সিংহরবে রে;

আবার দন্তে তৃণ লয়ে কৃতাঞ্জলি হয়ে,

দাস্য মুক্তি যাচেন বারে বারে॥

মুড়ায়ে চাঁচরকেশ, ধরেছেন যোগীর বেশ,

দেখে ভক্তিপ্রেমাবেশ, প্রাণ কেঁদে উঠে রে;

জীবের দুঃখে কাতর হয়ে, এলেন সর্বস্ব ত্যজিয়ে,

প্রেম বিলাতে রে;

প্রেমদাসের বাঞ্ছা মনে, শ্রীচৈতন্য চরণে দাস হয়ে

বেড়াই দ্বারে দ্বারে॥

               —চিরঞ্জীব শর্মা

কার ভাবে গৌর বেশে

ভৈরবী—একতাল


কার ভাবে গৌর বেশে, জুড়ালে হে প্রাণ,

প্রেম সাগরে উঠলো তুফান, থাকবে না আর কুল মান॥

(মন মজালে গৌর হে)॥

ব্রজ মাঝে, রাখাল সাজে, চরালে গোধন,

ধরলে করে মোহন বাঁশী, মজল গোপীর মন,

ধরে গোবর্ধন, রাখলে বৃন্দাবন,

মানের দায়ে ধরে গোপীর পায়, ভেসে গেল চাঁদ বয়ান।

(মন মজালে গৌর হে)।

               -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

তোরা কে দেখবি চলে আয়

কীর্তন—আড়খেষ্টা


তোরা কে দেখবি চলে আয়,

অপূর্ব গৌরাঙ্গ শশী উদয় নদীয়ায়॥

দুটি শিশু বাহু তুলে, নাচে প্রেম ভরে দুলে দুলে,

বিধু মুখে মধুর বোলে হরি গুণ গায়॥

ধন্য রে সব নদেবাসী, তোদের কী নাম শুনাল আসি,

ঘুচল তোদের ভবের ফাঁসী, খসল যম দায়॥

চলরে ভাই সবাই মিলে, ঐ গোরাচাঁদের সঙ্গে মিলে,

নাচব হরি হরি বোলে, লুটবো রাঙ্গা পায়।

                  -বিশ্বরূপ গোস্বামী

ঐ যে ঐ সুরধুনী তীরে

কীর্তন সুহই—দোলন


(ঐ যে ঐ) সুরধুনী তীরে ও কে হরি বলে নেচে যায়।

যায় রে কাঁচা-সোনার বরণ, চাঁদের কিরণ মাখা গায়॥

শিরে চূড়া শিখি পাখা, রাধানাম সর্বাঙ্গে লেখা,

(ও তার) নয়ন বাঁকা, ভঙ্গি বাঁকা, বাঁকা নূপুর রাঙ্গা পায়॥

একি নয় দেখেছি যারে, বিমল যমুনার তীরে,

(সে তো) এমনি করে বাঁশী ধরে মজাইত গোপিকায়॥

‘বিশ্বরূপ’ কহে ফুকারি, (তারে) চিনি চিনি মনে করি,

বরণ দেখে চিনতে নারি, স্বভাবে পাই পরিচয়৷

                    -বিশ্বরূপ গোস্বামী

ও কে গান গেয়ে গেয়ে চলে যায়

কীর্তন-একতাল


ও কে, গান গেয়ে গেয়ে চলে যায়

(দেখ) পথে পথে ঐ নদীয়ায়।

ও কে, নেচে নেচে চলে, মুখে হরি বলে,

ঢলে ঢলে পাগলেরই প্রায়।

ও কে, যায় নেচে নেচে আপনায় বেচে,

পথে পথে শুধু প্রেম যেচে যেচে,

ও কে, দেবতা-ভিখারী মানব-দুয়ারে,

দেখে যারে, তোরা দেখে যা।

(ও সে,) বলে “কৈ তো কেউ পর নাই”

(ও সে,) বলে “সবাই যে নিজ ভাই”,

(ও সে,) বলে “শুধু হেসে, শুধু ভালোবেসে,

(আমি) ভ্রমি দেশে দেশে এই চাই”।

ও কে, প্রেমে মাতোয়ারা, চোখে বহে ধারা,

কেঁদে কেঁদে সারা কেন ভাই?

সব দ্বেষ হিংসা ছুটি আসি পড়ে লুটি

(ও তার) ধূলি মাখা দুটি রাঙ্গা পায়,

বলে, ছেড়ে দাও মোদের, মোরা চলে যাই

নইলে প্রভু তোমার প্রেমে গলে যাই!

এ যে, নূতন মধুর প্রণয়েরই পুর,

হেথা আমাদের কোথা ঠাই? (প্রভু)

(ঐ যে) নরনারী সব পিছে ধায়,

(ঐ) জয়ধ্বনি ওঠে নীলিমায়,

(তোরা) আয় সবে চলে, মুখে হরি বলে,

(তোদের) ছেড়া পুঁথি ফেলে চলে আয়!

            —দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

ভজ রাধাকৃষ্ণ গোপাল কৃষ্ণ

ভজন—ত্রিতাল


ভজ রাধাকৃষ্ণ, গোপাল কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলো মুখে।

নামে বুক ভরে যায় অভাব মিটায়, স্বভাব জাগায় মহাসুখে॥

হরি দীনবন্ধু, চিরদিন বন্ধু, জীবের চির সুখে দুখে,

ভজোরে অন্ধ, চরণারবিন্দ, দুস্তর এ মায়া বিপাকে৷

ভজো মূঢ়মতি, তব চিরসাথী, যাঁহার করুণা লোকে লোকে।

লীলাময় হরি এসেছে নদীয়াপুরী, রাধার পিরীতি ল’য়ে বুকে ৷

           -ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

চম্পক শোণ-কুসুম কনকাচল

কীর্তন


চম্পক শোণ-কুসুম কনকাচল, জিতল গৌর তনু লাবণি রে॥

উন্নত গীম, সীম নাহি অনুভব, জগ-মনমোহন ভাঙনি রে॥

জয় শচীনন্দন রে

ত্রিভুবনমণ্ডন, কলিযুগ-কাল-ভুজগ-ভয়-খণ্ডন রে॥

বিপুল পুলককুল-আকুল কলেবর, গর গর, অন্তর প্রেম-ভরে।

লহু লহু হাসনি, গদগদ ভাষণী, কত মন্দাকিনী নয়নে ঝরে

নিজ রসে নাচত, নয়ন ঢুলায়ত, গাও কত কত ভকতহি মেলি।

যো রসে ভাসি অবশ মহিমণ্ডল,

গোবিন্দদাস তহি পরশ না ভেলি

         -গোবিন্দ দাস

প্রণাম

‘রাধাকৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতহ্লাদিনী-শক্তিরস্মা-

দেহাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।

চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং

রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্॥’

            -শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ সংগীত

খণ্ডন-ভব-বন্ধন

আরাত্রিক ভজন

রাগ : কল্যাণ, তালফেরতা

(চৌতাল, ত্রিতাল, একতাল)


খণ্ডন-ভব-বন্ধন, জগ-বন্দন, বন্দি তোমায়।

নিরঞ্জন, নর-রূপ-ধরো, নির্গুণ, গুণময়॥ ১॥


মোচন অঘদূষণ, জগভূষণ, চিদ্ঘনকায়।

জ্ঞানাঞ্জন-বিমল-নয়ন, বীক্ষণে মোহ যায়॥২॥


ভাস্বর ভাব-সাগর, চির-উন্মদ-প্রেম-পাথার।

ভক্তার্জন-যুগলচরণ, তারণ-ভব-পার॥৩॥


জৃম্ভিত-যুগ-ঈশ্বর, জগদীশ্বর, যোগসহায়।

নিরোধন, সমাহিত-মন নিরখি তব কৃপায়॥৪॥


ভঞ্জন-দুঃখগঞ্জন, করুণাঘন, কর্ম কঠোর।

প্রাণাৰ্পণ, জগত-তারণ, কৃন্তন-কলিডোর॥৫


বঞ্চন-কামকাঞ্চন, অতিনিন্দিত-ইন্দ্রিয় রাগ।

ত্যাগীশ্বর, হে নরবর, দেহ পদে অনুরাগ॥৬॥


নির্ভয়, গতসংশয়, দৃঢ়নিশ্চয়-মানসবান্ ।

নিষ্কারণ-ভকত-শরণ, ত্যজি জাতি-কুল-মান॥৭॥


সম্পদ তব শ্রীপদ ভব-গোষ্পদ-বারি যথায়।

প্রেমার্পণ, সমদরশন, জগজন-দুঃখ যায়॥৮॥


নমো নমো প্রভু! বাক্য-মনাতীত, মনোবচনৈকাধার।

জ্যোতির জ্যোতি উজল-হৃদিকন্দর, তুমি তমো-ভঞ্জন-হার॥৯॥


ধে ধে ধে লঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গ, বাজে অঙ্গ সঙ্গ মৃদঙ্গ,

গাইছে ছন্দ ভকতবৃন্দ, আরতি তোমার॥১০


জয় জয় আরতি তোমার, হর হর আরতি তোমার,

শিব শিব আরতি তোমার।

            -স্বামী বিবেকানন্দ


সরলার্থ

তুমি সংসারবন্ধনহারী ও জগদ্বন্দ্য; তোমায় বন্দনা করি। তুমি নিষ্কলঙ্ক হইয়াও নররূপ ধারণ করিয়াছ; তুমি নির্গুণ হইয়াও সগুণ৷১।


তুমি পাপরূপ মলিনতাকে দূর করিয়া থাকো; তুমি জগতের ভূষণস্বরূপ; তুমি চিন্ময়দেহধারী; জ্ঞানরূপ অঞ্জনে তোমার চক্ষু নির্মল; উহার দৃষ্টিপাতে জীবের মোহ দূরীভূত হয়। ২।


তুমি উজ্জ্বল ভাবসমুদ্র, সদা-উচ্ছ্বসিত প্রেমসিন্ধু; তোমার চরণযুগল ভক্তগণের লভ্য; তুমি (তাহাদিগকে) ভবপারে লইয়া যাও।৩।


তুমি জগদীশ্বর, যোগাবলম্বনে যুগাবতাররূপে প্রকাশিত হইয়াছ; (বৃত্তি) নিরোধের দ্বারা তোমার মন সমাধিস্থ; তোমার পায় এই সকল (লীলা) আমরা দেখিতে পাই। ৪।


তুমি (জীবের) দুঃখ-যাতনা দূর করিয়া থাকো; তুমি করুণার মূর্তি অথচ দুষ্কর কর্মানুষ্ঠাতা; তুমি জগতের উদ্ধারের জন্য প্রাণ অর্পণ করিয়াছ; তুমি কলির বন্ধন ছেদন করো। ৫।


তুমি কাম-কাঞ্চন পরিহার করিয়াছ; ইন্দ্রিয়াসক্তি তোমার নিকট অত্যন্ত ঘৃণিত। হে নরশ্রেষ্ঠ ত্যাগীরাজ, তোমার শ্রীপদে অনুরাগ দাও। ৬।


তুমি নির্ভীক; (তত্ত্ববিষয়ে) তোমার মন সংশয়হীন ও দৃঢ় ধারণাযুক্ত; জাতি, কুল ও মান বর্জন করিয়া তুমি অহেতুক-ভাবে ভক্তদিগকে আশ্রয় দান করো। ৭।


তোমার পাদপদ্ম আমাদের সম্পদস্বরূপ; ইহার নিকট সংসার গোষ্পদ-জলতুল্য; সমদর্শী তুমি (সকলকেই) প্রেম দান করিয়াছ; উহাতে জগদ্বাসীর দুঃখ দূর হইয়াছে। ৮।


হে প্রভু, তোমাকে বারবার প্রণাম করি, তুমি বাক্যমনের অতীত অথচ উহাদের একমাত্র আধার; তুমি জ্যোতিরও জ্যোতিস্বরূপ—তুমি হৃদয়গুহাকে উদ্ভাসিত করিয়া রাখিয়াছ; তুমি জীবের অজ্ঞানান্ধকার নাশকারী। ৯।


আরতিকালে ভক্তবৃন্দ তোমার স্তুতিগান করিতেছে; “ধে ধে ধে লঙ্গ” শব্দে নানা রঙ্গভঙ্গে মৃদঙ্গ বাজিতেছে; তৎসহ করতাল ইত্যাদিও বাজিতেছে। ১০।

শ্রীরামকৃষ্ণ-স্তোত্রম্

ও-হ্রীং ঋতং ত্বমচলো গুণজিৎ গুণেড্যঃ

ন-ক্তন্দিবং সকরুণং তব পাদপদ্মম্।

মো-হঙ্কষং বহুকৃতং ন ভজে যতোঽহং

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো॥১॥


ভ-ক্তিৰ্ভগশ্চ ভজনং ভবভেদকারি

গচ্ছন্ত্যলং সুবিপুলং গমনায় তত্ত্বম্।

ব-ক্ত্রোদ্ধৃতন্তু হৃদি মে ন চ ভাতি কিঞ্চিৎ

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো॥২॥


তে-জস্তরন্তি তরসা ত্বয়ি তৃপ্ততৃষ্ণাঃ।

রা-গে কৃতে ঋতপথে ত্বয়ি রামকৃষ্ণে।

মর্ত্যামৃতং তব পদং মরণোর্মিনাশং

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো॥৩॥


কৃ-ত্যং করোতি কলুষং কুহকান্তকারি

ষা-ন্তং শিবং সুবিমলং তব নাম নাথ ।

য-স্মাহং ত্বশরণো জগদেকগম্য

তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো ॥ ৪ ॥

স্বামী বিবেকানন্দ


বঙ্গানুবাদ ও শব্দার্থ

ও হ্রীং৷ তুমি সত্য (ঋতং), স্থির (অচলঃ) ত্রিগুণজয়ী (গুণজিৎ) অথচ অগণন মনোহর গুণসমূহের দ্বারা বন্দনীয় (গুণেড্যঃ)। যেহেতু (যতঃ) আমি তোমার মোহনাশক (মোহঙ্কষং) পূজনীয় (বহুকৃতং) পাদপদ্ম ব্যাকুল ভাবে (সকরুণং) দিবারাত্রি (নক্তবিং) ভজনা করি , সেইজন্য, হে দীনবন্ধো, তুমিই আমার আশ্রয়। ১।


ভববন্ধনছেদনকারী (ভবভেদকারী) ভক্তি, বৈরাগ্য প্রভৃতি দৈবগুণ (ভগঃ) এবং ভজন—এইগুলি সহায়ে মানব অতিমহান্ ব্রহ্মতত্ত্বে উপনীত হইতে সমর্থ হয়। কিন্তু (এইরূপ কথা) আমার মুখে উচ্চারিত হইলেও হৃদয়ে কিছুমাত্র প্রতিভাত হয় না। অতএব, হে দীনবন্ধো, তুমিই আমার আশ্রয়। ২।


হে রামকৃষ্ণ, সত্যের পথস্বরূপ তোমাতে (ঋতপথে ত্বয়ি) অনুরাগ সঞ্জাত হইলে (রাগে কৃতে) মানুষ তোমাকে পাইয়াই তৃপ্তকাম (তৃপ্ততৃষ্ণাঃ) হয় এবং শীঘ্রই (তরসা) রজোগুণকে অতিক্রম করে (তেজস্তরন্তি)। মৃত্যুরূপ তরঙ্গবিনাশকারী (মরণোর্মিনাশং) তোমার শ্রীচরণ মর্তজগতে অমৃতস্বরূপ (মত্তামৃতং)। অতএব, হে দীনবন্ধো, তুমিই আমার আশ্রয়। ৩।


হে নাথ, তোমার মায়াসংহারক (কুহকান্তকারী), মঙ্গলময় (শিবং), অতি পবিত্র (সুবিমলং), ষ্ণ এই অক্ষরান্ত (ঝান্তং) (রামকৃষ্ণ) নাম পাপকেও (কলুষং) পুণ্যে পরিণত করে (কৃত্যং করোতি)। তুমি জগতের একমাত্র আশ্রয়; যেহেতু আমি নিরাশ্রয়, অতএব, হে দীনবন্ধো, তুমিই আমার আশ্রয়। ৪।

শ্রীরামকৃষ্ণস্তোত্রম্

আচণ্ডালাপ্রতিহতরয়ো যস্য প্রেমপ্রবাহঃ

লোকাতীতোঽপ্যহঃ ন জহৌ লোককল্যাণমার্গম্।

ত্রৈলোকেঽপ্যপ্রতিমমহিমা জানকীপ্রাণবন্ধো

ভক্ত্যা জ্ঞানং বৃতবরবপুঃ সীতয়া যো হি রামঃ॥১


স্তব্ধীকৃত্য প্রলয়কলিতং বাহবোস্থং মহান্তং

হিত্বা রাত্রিং প্রকৃতিসহজামন্ধতামিশ্রমিশ্রাম্।

গীতং শান্তং মধুরমপি যঃ সিংহনাদং জগর্জ

সোঽয়ং জাতঃ প্রথিতপুরুষো রামকৃষ্ণস্ত্ত্বিদানীম্॥২


        নরদেব দেব        জয় জয় নরদেব।

 শক্তিসমুদ্রসমুথ্থতরঙ্গং    দর্শিতপ্রেমবিজৃম্ভিতরঙ্গম্।

সংশয়রাক্ষসনাশমহাস্ত্রং    যামি গুরুং শরণং ভববৈদ্যম্।

        নরদেব দেব        জয় জয় নরদেব।

অদ্বয়তত্ত্বসমাহিতচিত্তং     প্রোজ্জ্বলভক্তিপটাবৃতবৃত্ত

  কর্মকলেবরমদ্ভূতচেষ্টং     যামি গুরুং শরণং ভববৈদ্যম্।

        নরদেব দেব     জয় জয় নরদেব।

             -স্বামী বিবেকানন্দ

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-প্রণাম মন্ত্র


ও স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্ব-ধর্ম-স্বরূপিণে,

অবতার-বরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নমঃ॥

ও নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ।

ও নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ।

ও নমঃ শ্রীভগবতে রামকৃষ্ণায় নমো নমঃ॥


বঙ্গানুবাদ ও শব্দার্থ

ধর্মের সংস্থাপক, সর্বধর্মস্বরূপ, অবতারশ্রেষ্ঠ হে রামকৃষ্ণ তোমাকে নমস্কার। ভগবান রামকৃষ্ণকে নমস্কার। ভগবান রামকৃষ্ণকে নমস্কার। ভগবান রামকৃষ্ণকে নমস্কার।

শ্রীরামকৃষ্ণ-সুপ্রভাত

শ্রীরামকৃষ্ণ-সুপ্রভাত


ধর্মস্য হানিমভিতঃ পরিদৃশ্য শীঘ্রং

কামারপুষ্কর ইতি প্রথিতে সমৃদ্ধে।

গ্রামে সুবিপ্রসদনে হ্যভিজাত দেব

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ১ ॥


বাল্যে সমাধ্যনুভবঃ সিতপক্ষিপংক্তিং

সন্দৃশ্য মেঘপটলে সমবাপি যেন।

ঈশৈক্যবেদনসুখং শিবরাত্রিকালে

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ২॥


নানাবিধানয়ি সনাতনধর্মমার্গান্

ক্রৈস্তাদিচিত্রনিয়মান্ পরদেশধর্মান্ ।

আস্থায় চৈক্যমনয়োরনুভূতবাংস্ত্বং

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৩॥


হে কালিকাপদসরোরুহকৃষ্ণাভৃঙ্গ

মাতুঃ সমস্তজগতামপি সারদায়াঃ ।

ঐক্যং হ্যদর্শি তরসা পরমং ত্বয়ৈব

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৪ ॥


রাখালতারকহরীংশ্চ নরেন্দ্রনাথম্

অন্যান্ বিশুদ্ধমনসঃ শশিভূষণাদীন্।

সর্বজ্ঞ আত্মবয়ুনং ত্বমিহানুশাস্সি

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৫॥


নিত্যং সমাধিজসুখং নিজবোধরূপম্

আস্বাদয়ন্ তব পদে শরণাগতাংশ্চ।

আনন্দয় প্রশময়ন্নুপতিষ্ঠসে ত্বং

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৬ ॥


স্বীকৃত্য পাপমখিলং শরণাগতৈর্যদ্

আজীবনং বহুকৃতং দয়য়া স্বদেহে।

তজ্জাতখেদনিবহং সহসে স্ম নাথ

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥৭॥


প্রাতঃ প্রণামকরণং তব পাদপদ্মে

সংসারদুঃখহরণং সুলভং করোতি।

মত্বেতি ভক্তিভরিতাঃ প্রতিপালয়ন্তি

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৮ ॥


গাতুং স্তুতীস্তব জনা অমৃতায়মানাঃ

সম্প্রাপ্য দর্শনমিদং তব পাদয়োশ্চ

ধন্যা নরেশ ভবিতুং মিলিতাঃ সমীপং

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ৯ ॥


সন্দায় দর্শনসুখং শরণাগতেভ্যো

মোহান্ধকারমখিলং ত্বমপাকুরুস্ব ।

জ্ঞানার্ক ভক্তিজলধে সকলার্তিহন্তঃ

শ্রীরামকৃষ্ণভগবন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ১০ ॥


আহৈতুকীতি করুণা কিল তে স্বভাবো

দুষ্টাঃ কঠোরহৃদয়া অপি তে ভজন্তে ।

ত্বমেব সর্বজগতং জননি প্রপাত্রি

শ্ৰীসারদেশ্বরি রমে তব সুপ্রভাতম্ ॥ ১১।


সুপ্তাংস্তু ভারতজনান্ স্ববচঃপ্রহারৈ-

রুদ্বোধয়ন্ বিবশয়ন্ নিজধৰ্মমার্গে ।

প্রোৎসাহয়ন্ পরমতাং প্রকটীকরোষি

বীরেশদত্তমহিমন্ তব সুপ্রভাতম্ ॥ ১২ ৷৷


প্রাতরুথায় যো দেবং রামকৃষ্ণং স্মরণ্ স্মরণ্।

স্তোত্রমেতৎ পঠেৎ ভক্ত্যা সোঽমৃতত্বায় কল্পতে।

           -স্বামী হর্ষানন্দ পুরী


বঙ্গানুবাদ

চারিদিকে ধর্মের গ্লানি দেখে, কামারপুকুর নামক সমৃদ্ধিশালী গ্রামের সদ্ব্রাহ্মণের ঘরে, হে দেব, তুমি শীঘ্র জন্মগ্রহণ করেছিলে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ১।


বাল্যকালে মেঘপটলের মধ্যে উড্ডীয়মান শুভ্র বলাকাদল দেখে তুমি সমাধিস্থ হয়েছিলে; (পুনরায়) শিবরাত্রিতে শিবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আনন্দানুভব করেছিলে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাতবন্দনা করি। ২।


সনাতন ধর্মের বিভিন্ন পথে এবং পরদেশের খ্রিস্টানাদি ধর্মসমূহ অনুসরণ করে তুমি নিজে থেকে উপলব্ধি করলে যে এ সকল একই লক্ষ্যে নিয়ে যায়। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ৩।


হে কালিকাপাদপদ্মাশ্রিত কৃষ্ণভ্রমর, তুমি অতি সহজেই (নিজপত্নী) সারদাদেবী ও বিশ্বজননীর অভেদত্ব উপলব্ধি করলে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ৪।


হে সর্বজ্ঞ, এখানেই (অর্থাৎ পাহাড়ে নয়, জনারণ্যের মধ্যেই) তুমি রাখাল, তারক, হরি, নরেন্দ্রনাথ, শশিভূষণ প্রভৃতি শুদ্ধচিত্ত (যুবকদের) আত্মবিদ্যা শেখালে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমার প্রভাত-বন্দনা করি। ৫।


সমাধিজ আত্মজ্ঞানরূপ আনন্দ নিত্য উপলব্ধি করে তুমি নিজপদে শরণাগতদের আনন্দ ও শান্তি দিলে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ৬।


হে প্রভু, শরণাগতদের বহু জন্মের নানা প্রকার পাপ করুণাবশত নিজদেহে গ্রহণ করে তজ্জনিত কষ্ট তুমি নীরবে সহ্য করেছ। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি।৭।


প্রভাতে তব পাদপদ্মে প্রণাম সংসার-দুঃখনাশের অনুকূল জেনে ভক্তি বিনম্রচিত্তে (ভক্তেরা) তোমার দর্শনাকাঙক্ষায় অপেক্ষা করছে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ৮।


তোমার অমৃত-নিঃসারী স্তব গাইতে ও চরণ-দর্শনের দ্বারা ধন্য হতে বহু লোক, হে লোকপ্রভু, এখানে সমবেত হয়েছে। হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ৯।


হে জ্ঞানভাস্কর, দর্শনানন্দ প্রদান করে তুমি শরণাগতদের নিখিল অজ্ঞানান্ধকার দূর করো। হে ভক্তিবারিধি, হে সর্বদুঃখনাশক, হে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ১০।


হে মা সারদেশ্বরী, তুমি কল্যাণীরূপা, অহৈতুকী করুণাই তোমার স্বভাব জেনে কঠোর-হৃদয় দুষ্টেরাও তোমার পূজা করে। তুমি সর্ব জগতের রক্ষাকর্ত্তী, হে মা, তোমায় প্রভাত-বন্দনা করি। ১১।


শিব-প্রসাদিত (মহিমায়) যিনি মহিমময়, যিনি স্বীয় বাগাঙ্কুশের সাহায্যে সুপ্ত ভারতবাসীদের নিজধর্মপথে জাগ্রত ও উৎসাহিত করে তুলে নিজ মহিমা সর্বদা প্রকাশ করেছেন, সেই তোমাকে (স্বামী বিবেকানন্দকে) প্রভাত-বন্দনা করি। ১২।


যে কেউ প্রাতঃকালে উঠে (প্রভু) শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে স্মরণ করেন এবং ভক্তিসহকারে এই স্তোত্র আবৃত্তি করেন, তিনি অমৃতত্ত্ব লাভের যোগ্য হয়ে ওঠেন।

অযুত কণ্ঠে বন্দনা-গীতি

ছায়ানট—একতাল


অযুত কণ্ঠে বন্দনা-গীতি ভুবন ভরিয়া উঠিছে।

(তব) অমিয় বারতা দেশ-দেশান্তরে, হৃদয়ে হৃদয়ে পশিছে৷

বঙ্গ-হৃদয়-সরসী-সলিলে চারু শতদল ফুটেছে।

বিশ্ব-মানব বিস্ময়ে হেরি রূপে সৌরভে মাতিছে।

প্রেমের ভূপতি! পতাকা তোমার বিজয়-গরবে ভাতিছে।

ভেদ-বিবাদের চির অবসান, হেন আশা মনে জাগিছে ৷

ক্ষীণ কণ্ঠ তুলি হীন এ বীণায় ‘রামকৃষ্ণ নাম গাহিছে ।

প্রেমরাজ্যে তব দিও তারে স্থান, হেন চিরদাস মাগিছে ৷

               —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

তুমি এলে ফাল্গুনে

ভীমপলশ্রী—একতাল


তুমি এলে ফাল্গুনে।

ফুল্ল কানন মলয়ানিল—কম্পনে,

কোকিল-কুল-কূজিত মুখরিত অলিগুঞ্জনে॥

হেরি ধরণী রঞ্জিতা, উৎসব উল্লসিতা,

চন্দ্রা-উদর সিন্ধু-মথন-উদিত-চন্দ্র-কিরণে॥

(তব) কুসুম কোমল অঙ্গ, (তাহে) উথলে রূপ-তরঙ্গ,

মন্মথ-শত নিমেষে নিহত বঙ্কিমায়ত নয়নে।

সাকেতপুরীভূষণ, কৃষ্ণ নন্দনন্দন,

বিধিহরিহর সদাই বিভোর চরণপদ্ম ধেয়ানে॥

         -স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

অরূপ সায়রে লীলা-লহরী

খাম্বাজ—চৌতাল


অরূপ সায়রে লীলা-লহরী, উঠিল মৃদুল করুণাবায়,

আদিঅন্তহীন, অখণ্ডে বিলীন, মায়ায় ধরিলে মানবকায়॥

মনের ওপারে কোথা কোন্ দেশ, শশী-তপনের নাহি পরবেশ,

তব হাসিরাশি, কিরণ বরষি, উজলে সেথাও চারু বিভায়॥

প্রেমের এ তনু অতনু-গঞ্জন, কী মধুর বিভা বিকাশে নয়ন,

যে হেরে সে জন তনু-প্রাণ-মন, চরণে অৰ্পণ করিতে চায়;

তোমারি আশায় কত যুগ গত, সংশয় যত আজি তিরোহিত,

যা আছে আমার লহ উপহার, সঁপিনু জীবন তব সেবায় ॥

          —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

আপনি করিলে আপনার পূজা

নায়েকী কানাড়া—একতাল


আপনি করিলে আপনার পূজা আপনার স্তুতি গান।

ভবতারিণীর পূজারী ঠাকুর তুমি হে আমার প্রাণ॥

কেহ বলে তুমি সাধক-প্রধান, কেহ দেয় তোমা দেবতারি মান,

(আমি) গৌরব সব ত্যজিয়ে দিয়েছি হৃদয়ে আসন দান॥

যবে মনে পড়ে করুণার ছবি, পর দুখে ম্রিয়মাণ,

পর পাপ বহি’ রোগ-জ্বালা সহি’, তাপিতে করিলে ত্রাণ।

দেব কি মানব পরিচয়ে আজ, হেন প্রেমিকের বলো কী বা কাজ,

শুধু মনে হয় রাতুল চরণে করিতে জীবন দান॥

         -স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

আবার যদি এলে হরি

বসন্ত—ঝাঁপতাল


আবার যদি এলে হরি, আবার দিলে দরশন।

আবার জীবে দিলে অভয়, ওহে শ্রীমধুসূদন ॥

জ্বালাও তবে প্রাণের আগুন, জুলুক শিখা দ্বিগুণ দ্বিগুণ।

বজ্র-বীণায় ঝঙ্কৃত করো, স্পন্দিত হোক ত্রিভুবন৷

পাঞ্চজন্য বাজাও আবার, দ্বাপরের সেই রুদ্র-তান—

যে গান শুনে সব্যসাচীর ক্লৈব্য ছাড়ি আত্মদান।

‘অভী’র মন্ত্রে উঠুক ভারত, মুগ্ধ নেত্রে দেখুক জগৎ,

কর্ম যাদের ধর্মেরি তরে, সেই জাতির আর নাই মরণ॥

            —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

এসেছে নূতন মানুষ দেখবি যদি আয় চলে

বাউল—একতাল


এসেছে নূতন মানুষ দেখবি যদি আয় চলে,

(তার) বিবেক-বৈরাগ্য ঝুলি দুই কাঁধে সদা ঝুলে।

শ্ৰীবদনে ‘মা’ ‘মা’ বাণী পড়ি গঙ্গা-সলিলে,

(বলে) “ব্রহ্মময়ী, গেল মা দিন দেখা তো নাহি দিলে”।

নাস্তিক অজ্ঞানী নরে সরল কথায় শিখালে,

যেই কালী সেই কৃষ্ণ, নাম ভেদ একমূলে॥

‘একোয়া’, ‘ওয়াটার’, ‘পানি’, ‘বারি’, নাম দেয় জলে,

‘আল্লা’, ‘গড’, ঈশা’, ‘মুশা’, ‘কালী’ নাম ভেদে বলে॥

দীন, ধনী, মানী, জ্ঞানী বিচার নাই জাতি কুলে,

আপন-হারা, পাগল-পারা সরলে নেহারিলে॥

দু’বাহু তুলিয়ে ডাকে, আয় রে তোরা আয় চলে,

তোদের তরে কৃপা করে বসে আছি বিরলে;

যতন করি পারের তরী বেঁধেছি ভবের কূলে॥

          -দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

আমার ‘আমির’ মূরতি ধরিয়া

মালকোষ-একতাল


আমার ‘আমির’ মূরতি ধরিয়া তুমি কী গো আজি এসেছ।

অন্ধ নয়ন পায় না হেরিতে তাই বুঝি দেখা দিয়েছ

অন্তর মাঝে অন্তরযামী রয়েছ জাগিয়া তুমি দিবাযামী,

বুঝিতে পারি না তুমি যে আমি, কী আঁধারে আঁখি ঢেকেছ

তুমি মম তনু, তুমি মম প্রাণ, তুমিই তো নাথ মোর ধ্যান জ্ঞান,

তুমিই তো ইষ্ট, হে রামকৃষ্ণ! কৃপাতে সাকার হয়েছ।

এলে যদি ওহে করুণানিধান! ‘নাশি’ ভেদাভেদ দাও আত্মজ্ঞান,

তোমাতে আমার আমির নির্বাণ হোক, যদি ধরা দিয়েছ

          —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে তুমি আবার করুণাপাথার

ভৈরবী—একতাল


কে তুমি আবার করুণাপাথার সেই সুরধুনী তীরে।

কেন সদা আহা আকুল পরাণে ভাসিছ নয়ন নীরে॥

সদানন্দময়ী আছে কোলে করে, তবু কেন বলো দু’নয়ন ঝরে।

তাপিত ধরায় তারিতে কি হায়, সুধাইছ জননীরে॥

কেন আসিয়া হৃদয়-দুয়ারে, মোরে ডাকিতেছ বারে বারে।

(আমি) এমনি মগন মোহের কুহকে, দেখেও দেখি না তোমারে॥

এসো দেব এসো পতিতপাবন, এসো আজি মম হৃদয়ের ধন।

সফল করো হে বিফল জীবন, দুখ নাশ চিরতরে ॥

          —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে তুমি তাপস কাঁদিছ কাতরে

কাফি-সিন্ধু-তেওড়া


কে তুমি তাপস কাঁদিছ কাতরে নীরবে সুরধনী তীরে।

দু’নয়নে তব করুণার ধারা অবিরত বহে শতধারে॥

দলিছে মানবে শত অবিচার, কোটী নারায়ণ করে হাহাকার;

তাই কি ইষ্টে পূজিলে এবার বেদীতে বসায়ে নরে॥

তোমার মহান দুঃখ আমার জীবনে প্রভো করো সঞ্চার,

মানবের দুঃখে কাঁদিতে শিখুক ক্ষুদ্র আমার এ অন্তর।

তুচ্ছ স্বার্থ-সুখ-আশে ভুলি আর থাকিব না, চাহ মুখ তুলি।

লহ দেব লহ এ জীবন ডালি, তব নরদেব পূজা উপচারে॥

              —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আজি কী পুলকে নাচে প্রাণ

ইমন-ভূপালী—কাওয়ালি


আজি কী পুলকে নাচে প্রাণ-আহা মরি রে।

দুঃখ নাশিতে এলো দুখহারী ভগবান্॥

জনমিলা ভগবান্ কামারপুকুরে

হরষে নাচিছে সবে ক্ষুদিরাম ঘরে

চন্দ্রমণি কোলে কোটি চন্দ্র খেলে

হেরে সবে ও চাঁদ বয়ান॥

আশায় ভরিল প্রাণ ভয় গেল দূরে

গগনে উঠিল গান নব নব সুরে

ধন্য হইল ধরা, ধন্য হইনু মোরা

চরণে জীবন করি দান॥

     -স্বামী চণ্ডিকানন্দ

এসো নয়নাভিরাম

ভজন-কাওয়ালি


এসো নয়নাভিরাম মোর নয়নাভিরাম,

এসো রামকৃষ্ণ মোর নয়নাভিরাম।

এসো যশোদাদুলাল তুমি রঘুপতি রাম॥

দক্ষিণেশ্বরে তব লীলা কিবা মনোহর;

কভু শ্যামারূপ ধরো, কভু সাজো শঙ্কর।

শ্রীরাধার ভাবে কভু কাঁদে তব অন্তর;

ধূলায় লুটায়ে বলো কোথা নবঘনশ্যাম॥

পঞ্চবটী মূলে জাহ্নবী-কিনারায়

যেচে প্রেম বিলাইতে ডাকো ‘ওরে আয় আয়।

ভকত কুসুম যত আনিলে আপন সাথ

নন্দন কাননের সুন্দর পারিজাত

সে কুসুমে ভরি সাজি, আপনি পূজারী সাজি’,

করিলে আপন পূজা ধরি মুখে নিজ নাম।

           -প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

শিশুর মতো ‘মা’ ‘মা’ বলে

বাউল—খেমটা


শিশুর মতো ‘মা’ ‘মা’ বলে কঁদিয়ে ঘুরে বেড়ায়,

ঠাকুরের কী ভাব হইল হায়।

উলঙ্গ পাগল পারা, দু'নয়নে বহে ধারা

দিবানিশি ‘মা’ নাম ছাড়া অন্য নাহি রসনায়॥

পশু-পাখী তরুলতা, সবকে শুধায় মায়ের কথা,

“বলরে আমার মা পাই কোথা, কে দেখেছে আমার মায়॥”

মায়ের মন্দিরে গিয়ে,     পড়ে থাকে হত্যা দিয়ে,

বলে মাগো না খাইয়ে প্রাণ ত্যজিব রাঙ্গা পায়।

‘দেখা দেমা ওমা আমার’ এই বলিয়া ছাড়ে হুঙ্কার।

কত মতো ভাবের বিকার, সর্ব অঙ্গে বিকাশ পায়।

গৌর কিরে নদে ছেড়ে, আইল দক্ষিণেশ্বরে,

রামকৃষ্ণ রূপ ধরে জীবে কিরে প্রেম শিখায়।

            -বৃন্দাবনচন্দ্র গোপ

কে ঐ আসিল রে কামারপুকুরে

মিশ্র—কাওয়ালি


কে ঐ আসিল রে কামারপুকুরে

পুলকে নাচিয়া উঠে প্রাণ।

দুঃখ-নিশা কাটিল সুখ-রবি হাসিল

গগনে উঠিল নব গান॥

মানিক রাজার আম্রকাননে,

কে ঐ শিশু খেলে ফুল্ল আননে,

লীলা অভিনয় নব নব গানে,

হিয়া শিহরিয়া উঠে তান্॥

কত গানে গানে অমিয় কথায়,

পলকেতে পরাণ মাতায়।

মন প্রাণারাম লীলা অভিরাম,

আঁখি সদা নিরখিতে চায়॥

আমারেও নাও তোমার খেলায়,

ভাই রে গদাই ধরি দুটি পায়,

যুগে যুগে হরি তোমার এ লীলায়

লহ মম তনু মন প্রাণ॥

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আজি কামারপুকুরে চলো মন

বেহাগ-ত্রিতাল


(আজি) কামারপুকুরে চলো মন।

সুখের নেশায় ঘুরি’ জনম জনম ধরি’,

কত রবে বিষাদ মগন,

(বলো) কত রবে বিষাদ মগন॥

কামারপুকুরে আসি নিত্য লীলায়

অরূপ ধরিয়া রূপ ভুবন ভুলায়॥

(সে যে) কত না আদরে তোরে ডাকে আয় আয়,

ওরে আয় ওরে চলে আয়,

চলে আয় জুড়াবি জীবন,

(তুই) চলে আয় জুড়াবি জীবন॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে তুমি এলে এবার

বাউল—একতাল


কে তুমি এলে এবার, প্রেমিক উদাসীর ভানে,

তোমার যমুনা সরযূ কোথা, লীলা গঙ্গা-পুলিনে।

গঙ্গাতীরে কাতর স্বরে মা মা বলা বদনে,

(এমন) ব্যাকুলতা মায়ের তরে, কেউ কখনও দেখিনে॥

‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’, নূতন সাধন গোপনে,

(তোমার) অপূর্ব সন্ন্যাস লীলা নরদেহ ধারণে॥

দীনের বেশে আশেপাশে, খুঁজছ যত দীন জনে,

জীবের তরে ঝরছে নয়ন, বসে আছ আনমনে॥

তুমি কি চরাতে ধেনু রাখালদল সনে,

যমুনা নাচিত কি হে, তোমার বেণু-রব শুনে?

তুমি কি হে বুদ্ধরূপী পশুবধ-দমনে,

(ছেড়ে) সুখের বাসা সকল আশা নিয়েছ ডোর-কৌপীনে।

তুমি কি সন্ন্যাসী গোরা, মাতোয়ারা নাম গানে,

ডুবালে তরালে নদে, রাধা-প্রেম-বিতরণে?

যে হও তুমি দয়ার খনি, স্থান দিও ঐ চরণে,

(তব) পদ-ভেলা ভাসিয়ে ভবে, পার হয়ে যাই তুফানে॥

(জয় রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ বলে)

            —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

জয় ‘রামকৃষ্ণ’

ইমন-মশ্র—তেওড়া


জয় ‘রামকৃষ্ণ’, ‘রামকৃষ্ণ বলো আমার মন (জয়)

চাহে তোমারে সকল কাজে সকল যুগে তৃষিত ভুবন৷

যুগ যুগ ধরি অপেক্ষারত ছিল ধরণী নীরবে চাহি;

তোমারি অমৃতপরশ লাগি ব্যাকুলা অবনী করে রোদন॥

তিমিরসাগরে ডুবিলে মেদিনী মৃত্যু ঘেরিলে জীবনে হায়।

হাহারবে কাঁদে যত জীবগণ, ঊর্ধ্বে কাতরে ডাকে তোমায়

তখনি তোমার জ্যোতির আলোকে নাশিলে ধরার তিমিরজ্বালা

মৃত্যুরে মার অমৃত আনিয়া, জীবন দেখায়ে জাগালে জীবন॥

              -নিশিকান্ত চক্রবর্তী

জয় রামকৃষ্ণ ভবভয়হারী

কেদারকাওয়ালি


জয় রামকৃষ্ণ ভবভয়হারী।

ভকত বিমোহন পাপীতাপী তারী।

সুধামাখা মা নাম শিখাতে মোদেরে,

মা মা বলিয়া কাঁদো সুরধুনী তীরে।

অভিনব লীলা তব নরদেহ ধরে,

যে হেরেছে, সে মজেছে, আপনা পাসরি॥

স্বার্থ-কলহে ভরা কলুষিত এ ধরায়,

প্রেমের পীযূষ তুমি অযাচিতে দিলে হায়।

শুনে মিলনের গান, ভরিয়া উঠিছে প্রাণ,

নমো নমো ভগবান চরণে তোমারি।

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় জয় রামকৃষ্ণ

ললিত ত্রিতাল (প্রভাতী সুর)


জয় জয় রামকৃষ্ণ ভুবন-মঙ্গল,

জয় মাতা শ্যামাসুতা অতি নিরমল।

জয় বিবেক-আনন্দ পরম দয়াল,

প্রভুর মানস-সুত জয় শ্রীরাখাল॥

জয় প্রেমানন্দ প্রেমময় কলেবর,

জয় শিবানন্দ জয় লীলা-সহচর।

যোগী যোগানন্দ জয় নিত্য নিরঞ্জন,

জয় শশী গুরুপদে গততনুমন॥

সেবাপর যোগীবর অদ্ভুত-আনন্দ,

অভেদ-আনন্দ জয় গতমোহবন্ধ।

যোগরত ত্যাগ-ব্রত তুরীয় আখ্যাত,

শরত-সুধীর শান্ত যেন গণনাথ॥

জীবে শিব-সেবাব্রত গঙ্গাধর বীর,

জয় শ্রীবিজ্ঞানানন্দ প্রশান্ত গম্ভীর।

প্রবীণ গোপাল মাতৃসেবাপরায়ণ,

সারদা সারদাপদে গত-প্রাণ-মন॥

বালক-চরিত্র জয় সুবোধ সরল,

নাগবর ত্যাগ-বীর বিবেক সম্বল।

কথামৃত-বরিষণ গৌর জলধর,

গিরীশ ভৈরব জয় বিশ্বাস-আকর ৷

রামকৃষ্ণ-দাস-দাস জয় সবাকার,

রামকৃষ্ণ-লীলাস্থান জয় বার বার।

রামকৃষ্ণ-নাম জয় শ্রবণ-মঙ্গল,

ভকত-বাঞ্ছিত জয় চরণ-কমল॥

-স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

জীবনপ্রভাতে মরমের সাথে

প্রভাতী-ভজন-কাহারবা


জীবনপ্রভাতে মরমের সাথে

বলো জয় রামকৃষ্ণ রে।

বলো রামকৃষ্ণ, জপো রামকৃষ্ণ,

ভজো মন রামকৃষ্ণ রে॥

জয়গুরু ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর

সহস্রারে প্রভু তুঁহু পরমেশ্বর।

‘জয় গুরুজীকে জয়’ বলোরে মন নিরাশ্রয়

শান্ত হবে গো মন প্রাণ রে॥

লজ্জাপটাবৃতা দেবী কৃপাময়ী

স্নেহময়ী জননীকি জয়।

জয় জ্ঞানদায়িকে দেবী সারদে

বরাভয়দায়িকে জয়।

মূর্ত মহেশ্বর উজ্বল ভাস্কর

বিবেকানন্দ কি জয়।

জয় রামকৃষ্ণ ভক্তগণ জয়

আনন্দে জয়গান গাহ মন রে॥

    —প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

তুমি কাঙাল বেশে এসেছ হরি

ইমন-পূরবী—একতাল


তুমি কাঙাল বেশে এসেছ হরি, কাঙালে করুণা করিতে হে,

প্রেম বিতরিতে মরুসম চিতে, পতিত জনে তারিতে হে॥

রামকৃষ্ণ নামে অমিয় ঢালা, হেরিলে ও রূপ জুড়ায় জ্বালা,

(তব) চরণতলে পরাণ সঁপিলে, ভাবনা পলায় দূরেতে হে॥

করি তব কথা-অমৃত পান, জাগিয়া উঠিছে অবশ পরাণ,

হতাশ হৃদয়ে শত আশা জাগে, তোমার মধুর নামেতে হে॥

            —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

তোরা দেখবি যদি চলে আয়

ভাটিয়ালি-কাহারবা


(তোরা) দেখবি যদি চলে আয়

গৌর আমার এলো আবার এ ধরায়।

(তার) নামেতে নয়ন ঝরে রে, গোরার

প্রেমে ভুবন ভেসে যায়৷

(আগে)‘রা’ ‘রা’ বলে কান্দিত গোরা,

‘মা’ বলিয়া কান্দে রে এবার পাগলের পারা,

ক্ষণে হাসে ক্ষণে কান্দে রে গোরা,

‘মা’ বলে ধূলায় লুটায়॥

কভু মত্ত মাতঙ্গেরী প্রায়

হুঙ্কারিয়া হরি বলে নাচে গোরা রায়

(আবার) শিব রাম আল্লা বলে রে, গোরা

নয়নজলে ভেসে যায়।

(গোরা) নাহি মানে জাতের বিচার

সব ধর্মই ধর্ম রে তার, সকল জাতই তাঁর।

(এবার) সকল ধর্ম স্থাপন তরে রে, গোরা

অবতীর্ণ করুণায়।

(গোরা) উড়ায়েছে প্রেমের নিশান

লেখা তাতে ‘ত্যাগ’ ও ‘সেবা’—‘আত্মবলিদান’

(আবার) সকল জীবে শিবকে পূজে রে, গোরা

যুগের সাধন শিখায়। (নব)

(তোরা দেখে যা রে—তাঁরে দেখে যারে)

        -স্বামী চণ্ডিকানন্দ

তুমি ব্রহ্ম

জয়জয়ন্তী—ঝাঁপতাল


তুমি ব্রহ্ম, ‘রামকৃষ্ণ’ তুমি কৃষ্ণ, তুমি রাম,

তুমি বিষ্ণু, তুমি জিষ্ণু, প্রভবিষ্ণু প্রাণারাম।

তুমি আধেয়-আধার, তুমি ব্ৰহ্ম নিরাকার,

তুমি নর রূপধর, বিজিত-কনক-কাম॥

অপার-করুণা-সিন্ধু, তুমি দেব দীনবন্ধু,

যাচে ইন্দু কৃপাবিন্দু, চরণে করি প্রণাম॥

          -শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী

নমো নমো দেব

আশাবরী—একতাল


নমো নমো দেব, নমো নরদেব, নমো ভবভয়হারী।

ভুবনপাবন নমো নারায়ণ রামকৃষ্ণ-রূপধারী॥

মদ-গর্বিত-দুষ্ট-দলনে, সাধু-সজ্জন-পালনে,

ধরম-স্থাপনে আসিলে ভুবনে যুগে যুগে অবতারি॥

দখিন সহরে কত মা সাধনা, জীবে তরাইতে কত না ভাবনা,

দীন দুখী তরে দু’নয়ন ঝরে, জগজন-দুখ-হারী।

সকল জীবেতে এক নারায়ণ, মন্দিরে যাঁরে করে আরাধন—

শিখালে মানবে এ নব সাধন, বিতরিলে প্রেমবারি।

            —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

দুঃখিনী ব্রাহ্মণী-কোলে

সাহানা ঝাপতাল


দুঃখিনী ব্রাহ্মণী-কোলে, কে শুয়েছ আলো করে,

কে রে ওরে দিগম্বর এসেছ কুটীর দ্বারে॥

ভূতলে অতুল-মণি, কে এলিরে যাদুমণি,

তাপিতা হেরে অবনী, এসেছ কি সকাতরে॥

ব্যথিতে কি দিতে দেখা, গোপনে এসেছ একা,

বদনে করুণা মাখা, হাসো কাঁদো কার তরে।

মরি মরি, রূপ হেরি, নয়ন ফিরাতে নারি,

হৃদয়-সন্তাপ-হারী সাধ ধরি হৃদি-পরে॥

            -গিরিশচন্দ্র ঘোষ

একি সুরধুনী হল

কীর্তন—দাদরা


একি সুরধুনী হল

আজি উত্তরোলে

কাহার চরণ পরশে এত

কল-কল্লোল॥

আজি পবনে পবনে কুসুম সনে

কিসের কানাকানি।

আজি প্রভাতে-তপনে চাঁদের কিরণে

কাহার পরশখানি॥

এতেক হেরিয়া যতেক ভকত আইল পঞ্চবটীতলে।

নাচিয়া গাহিয়া আনন্দে মাতিয়া ভাসিল নয়নজলে॥

আ মরি কী রূপের মাধুরী!

দিবানিশি এ কী হেরি!!

ওকে দেবতা মূরতি প্রেম ও ভকতি

যাচিয়া যাচিয়া বিলায়॥

         —স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

নমাে রামকৃষ্ণ

দেশ-একতাল


নমো রামকৃষ্ণ-রূপ-ধারণ মোহন মনোহারী,

জগৎ-তারণ-কারণ-নাম শমন-শাসন-কারী,

বল রামকৃষ্ণ-নাম, প্রাণে পাবিরে আরাম॥

সত্য সনাতন, প্রেম-রূপ-ঘন, ভকত-চিত-শোভন,

তাপিত তরে নররূপ ধরে যুগে যুগে অবতরণ;

স্বগণ-সনে মিলন লীলা-সাধন-কারণ,

মহাভাব-প্রকটন-কারী; দীন শ্রীচরণ-ভিখারী,

দেখা দাও, প্রাণ জুড়াও, আমায় কোলে তুলে লও॥

              -নীরদরঞ্জন মজুমদার

আজি উথলিল রামকৃষ্ণ

কাফি-সিন্ধু-তেওড়া


আজি উথলিল রামকৃষ্ণ-সিন্ধু ভুবনে ভুবনে রে।

আদি ও অন্তে, বেদ-বেদান্তে, দিগন্তে দিগন্তে রে॥

সকল ধর্মে উঠিল যে সুর, তোমার বীণায় হ’ল তা মধুর,

অবসান আজি যত সংশয় ধর্ম-দ্বন্দ্বে রে॥

যে ছিল নীচে সবার পিছে (তুমি) ডাকিলে তারে আপন কাছে

কালিমা যত নিমেষে মিলাল তব নাম-গুণে হে॥

তুমি বিরাজ হৃদয় মাঝে, সকল জীবের মঙ্গল কাজে,

ঝংকৃত যা বীরের হৃদয় বিবেক-আনন্দে হে।

         -স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

নমো রামকৃষ্ণরূপ ধারী

পিলু—কাওয়ালি


(নমো) রামকৃষ্ণরূপ ধারী।

সর্ব-ধর্ম-মূর্ত-বিগ্রহ প্রভু ধরম স্থাপনকারী॥

নমো জগতারণ, জীব-দুখ-বারণ, জনম-মরণ-নিবারী।

নমো মোহমোচন সংসার-বন্ধন কটাক্ষে ছেদনকারী॥

কত না জনম জনম খুঁজিয়া এ জীবনে পেয়েছি তোমায়।

তব ভাবনায় যেন দিন যায়, মিনতি রাখোগো রাঙ্গাপায়॥

নমো দীনবন্ধু, করুণা-সিন্ধু, পূর্ণ ইন্দু তমোহারী।

সর্ব-দেবদেবী-স্বরূপিনে নমো নমো সারদা-মানস-বিহারী॥

                 —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

রামকৃষ্ণ গুণধাম

মিশ্র—একতাল


রামকৃষ্ণ গুণধাম (আমারি)।

ভব-সন্তাপিত-দগ্ধহৃদয়-মরু-সিঞ্চিত মঙ্গলবারি বিসারী॥

পূৰ্ণানন্দ শ্রীরাম-শ্যাম যুগ-মূরতি এক অবতার বিহারী।

নিখিল-চরাচর-ধর্ম-সমন্বয়-সাম্য-সনাতন-স্থাপনকারী॥

শারদ চন্দ্র নিন্দিত মুখ উজ্জ্বল শান্তি নিঝর মৃদু হাস্যে।

তৃপ্ত প্রাণ মন দীন ভকত নিত্যামৃত প্রেমমধু দাস্যে।

পঞ্চবটী-তট ধ্যান ধারণ রত রম্য মূরতি রূপ ধারী।

ভক্তে অভয় তব দেহ পদ-পঙ্কজ, জয় জয় দয়াল ভবাময়-বারী॥

           -হৃষিকেশ চক্রবর্তী

পরমগুরু সিদ্ধ-যোগী

দুর্গা-মিশ্র—একতাল


পরমগুরু সিদ্ধ-যোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার।

পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ লহ প্রণাম নমস্কার।

জাগালে ভারত-শ্মশানতীরে, অশিব-নাশিনী মহাকালীরে;

মাতৃনামের অমৃতনীরে ভাসালে নিজ ভারত আবার॥

সত্যযুগের পুণ্যস্মৃতি, আসিলে কলিতে তুমি তাপস,

পাঠালে ধরার দেশে দেশে ঋষি-পূৰ্ণ-তীর্থ-বারি-কলস।

মন্দিরে মসজিদে গীর্জায়, পূজিলে ব্রহ্মে সমশ্রদ্ধায়

তব নাম-মাখা প্রেমনিকেতনে ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসার॥

                     -নজরুল ইসলাম

বঙ্গ-হৃদয়-গোমুখী হইতে

কালেংড়া—একতাল


বঙ্গ-হৃদয়-গোমুখী হইতে করুণা-গঙ্গা বহিয়া যায়,

এসো ছুটে এসো কে আছ মানব শুষ্ক কণ্ঠ পিপাসায়॥

ব্যর্থ-বাসনা-অনল দহন, সহিলে কত না জনম-মরণ,

আলেয়ার সাথে ছুটিতে ছুটিতে শ্রমজ সলিল-সিক্ত-কায়;

স্নিগ্ধ সলিলে বারেক ডুবিলে সকল জ্বালা জুড়াবে তায়॥

জাহ্নবী-তীরে তৃষ্ণাকাতর অন্ধ যে জন খোঁজে সরোবর,

রামকৃষ্ণ-পূত-গঙ্গা ব্রহ্মানন্দ-সাগরে ধায়;

হ’ক অবসান, ব্যর্থ-প্রয়াণ, এসো ছুটে এসে ধরি গো পায়॥

                  -স্বামী প্রেমেশানন্দ

প্রেম ভরে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম

ভজনকাহরবা


প্রেম ভরে মন রে গাহ রামকৃষ্ণ নাম

শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম।

আনন্দ বৰ্ষক নাম মম প্রাণারাম

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

অন্তরে যতনে রাখো মন রে অবিরাম

দীন কাঙ্গালের ধন রামকৃষ্ণ নাম

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

একই বৃন্তে ফুটিল রে রাধা, কৃষ্ণ, শ্যাম,

শিব, কালী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শ্যামা, সীতারাম।

নাম ব্রহ্ম একই জেনে মন রে গাহো নাম,

জনম মরণ সাথী রামকৃষ্ণ নাম,

রামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম, শ্রীরামকৃষ্ণ নাম॥

          —প্রমথনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

আবার যদি আসি ধরায় আসব আমি তোমার কাছে

বাউল—একতাল


আবার যদি আসি ধরায় আসব আমি তোমার কাছে

চাইনে গো রাজার আসন, থাকি যেন সবার পিছে॥

কাম-কামনা সুখ দেবে না, কী হবে ছাই ওসব যেচে,

ম’লে পুড়বে দেহ, উড়বে ছাই, ভোগ-বাসনা সবই মিছে॥

রামকৃষ্ণ-নাম সার করেছি, এত সুখ কোথায় আছে—

তোমার অভয়-চরণ করছি স্মরণ, নইলে আর প্রাণ কি বাঁচে॥

কাম-কাঞ্চনে মজলে পরে পাওয়া তোমার যাবে না যে-

ত্যাগ-ভক্তি-প্রেম হলে আসবে তুমি হৃদয়-মাঝে॥

             —স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

বলো বলো সুরধুনী

দেশ—দাদরা


বলো বলো সুরধুনী,

তোমার বেলায় কী লীলা ঘটিল অবাক হইয়া শুনি॥

কোথা কোন দেশ কামারপুকুর,

জয়রামবাটী সে বা কতদূর

কে বা ক্ষুদিরাম, কে বা গদাধর, কে বা দেবী চন্দ্ৰামণি,

কোন্ দেবতার ভিক্ষাজননী কামারকন্যা ধনী॥

বিশালাক্ষীর পথ কোন্ দিকে কোথায় ভূতির খাল,

কৃষ্ণ মেঘের কোলে কোথা চলে শ্বেতবলাকার পাল?

কে সে উন্মাদ সাধক মহান সঞ্চার করে পাষাণে পরাণ

তন্ত্রে দীক্ষা কারে করে দান ভৈরবী ব্রাহ্মণী—

শিশু রামলালা খেলে কার সনে কে বা সে পরমগুণী॥

কহো জাহ্নবী তোতার কাহিনী কহো কেশবের কথা,

মথুর কেমনে অর্ঘ্য রচিলা রাসমণি সেবারতা।

সেদিন কাহারা গেয়েছিল গান

কারা এসেছিল সঁপিয়া পরাণ—

জ্বেলেছিল কারা পাগলের পারা মহাসাধনার ধুনি,

কারে ঘেরি’ এই লীলা অভিনয়

কেবা সে মধ্যমণি॥

           -জিতেন্দ্রনাথ সরকার

এ কী আনন্দ-হাটে পঞ্চবটী হ’ল মুখরিত

ভৈরবী-কাহারবা


এ কী আনন্দ-হাটে পঞ্চবটী হ’ল মুখরিত।

লীলা-রঙ্গে সুরধুনী তরঙ্গে উঠিল নব নব গীত৷

(ঐ) শিহরণ জাগে দ্যুলোকে ভূলোকে,

দেবালয় ভরিল পুলকে পুলকে,

হেরো হেরো এল রাখাল-শরত-নরেন্দ্র বিমোহিত॥

স্বরূপ ছাড়িয়া অপরূপ প্রকাশ, কীর্তন-গীতে আহা কী আবেশ,

সে রূপ হেরি’ যত মায়া-মোহ নিমেষে তিরোহিত॥

(কভু) মোহন-মূরতি রঘুপতি রাম,

কভু শ্যামা, কভু বনমালী শ্যাম,

একই আধারে কতরূপ হেরি এমনি কত শত॥

শ্রীরামকৃষ্ণ নীরঞ্জন গীতি

জয় ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ প্রভু

জয় পাপার্নিহারী (জয়)

আদি শক্তি তুম প্ৰকটে (2)

ভক্তনহিতকারী

জয় পাপার্নিহারী (জয়)

জয় রামকৃষ্ণ হরি (ওঁ)॥

দীনবন্ধু দুঃখহর্তা তুম মঙ্গলকর্তা (প্রভু)

লজ্জা দূর করো প্রভু (2) অনাথোঁকে ভর্তা

সব মঙ্গলকর্তা (তুম)॥

শুদ্ধ হৃদয়সে মহিমা

জানে সব তেরী (প্রভু জানে)

কৃপা করো মা সারদে (২)

পরমাশ্রয় মেরী

(ম্যায়) শরণাগত তেরী॥

হৃদয় কমল পে পরে, তেরে অভয় চরণ।

(প্রভু) নিশিদিন হো সুখদায়ী (২)

হটাও কাম কাঞ্চন।

হে প্রভু আদিশরণ॥

নরঋষি বিবেকান্দ কো লায়ে তুম আজ (উন)

জগ হিত লায়ে জগ মে (২)

জ্ঞানপ্রেম কে রাজ।

বড়িয়া গরীবকে নিবাজ (সো)

সুন্দর নাম তুমাহারা গুঞ্জিত হো রহা আজ (চারোদিশি)

অমৃতময়ী বাণী তব (২)

পরম দিব্য মহারাজ

ওঁ জয় শ্রী গুরুমহারাজ।

      —স্বামী সৰ্বর্গানন্দ

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণজয়াষ্টক

গৌড় সারঙ্গ—ত্রিতাল


ভব-ভয়-ভঞ্জন, পুরুষ নিরঞ্জন,

রতি-পতি-গঞ্জন-কারী।

যতি-জন-রঞ্জন, মনোমদ-খণ্ডন,

জয় ভববন্ধন-হারী॥

জয় জন-পালক, সুরদলনায়ক,

জয় জয় বিশ্ববিধাতা।

চির-শুভ-সাধক, মতিমল-পাবক,

জয় চিত-সংশয় ত্রাতা॥

সুর-নর বন্দন, বিজর বিবন্ধন,

চিত-মন-নন্দন-কারী ।

রিপু-চয়-মন্থন, জয় ভব-তারণ,

স্থল-জল-ভূধর-ধারী॥

শম-দম-মণ্ডন, অভয়-নিকেতন,

জয় জয় মঙ্গল-দাতা।

জয় সুখ-সাগর, নটবর নাগর,

জয় শরণাগত-পাতা॥

ভ্ৰম-তম-ভাস্কর, জয় পরমেশ্বর,

সুখকর-সুন্দর-ভাষী।

অচল সনাতন, জয় ভব-পাবন,

জয় বিজয়ী অবিনাশী॥

ভকত-বিমোহন, বর-তনু-ধারণ,

জয় হরিকীর্তন-ভোলা।

গদ-গদ-ভাষণ,     চিত-মন-তোষণ,

ঢলঢল-নর্তনলীলা॥

মতি-গতি-বর্ধন, কলি-মল-মর্দন,

বিষয়-বিরাগ প্রসারী।

জড়-চিত-চেতক, ভব-জল ভেলক,

জয় নর-মানস-চারী॥

জয় পুরুষোত্তম, অনুপম-সংযম,

জয় জয় অন্তরযামী।

খরতর-সাধন, নর-দুঃখ-বারণ,

জয় রামকৃষ্ণ নমামি॥

                —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

মলয়-সমীরে ভেসে আসে

ভৈরবী—একতাল


মলয়-সমীরে ভেসে আসে কী মধুর গীতি-লহরী।

চলো দেখে আসি উজলিছে দিশি কোটী-শশী-রূপ-মাধুরী॥

তপক্ষীণ-কায় ক্ষুদিরাম হায়, সাধনা করি কঠোর,

কোন্ দেবতায় আনিলা ধরায় নন্দন-বন-বিহারী॥

পাপ-তাপ-ভরা, এ মলিন ধরা স্বার্থ-কলুষময়,

এই মরুভূমে বুঝি এলে নেমে সিঞ্চিতে প্রেম-বারি॥

কে আছ অলস, হৃদয় নীরস, স্বার্থ মোহেতে ভুলিয়া,

(আজি) প্রেমের দীক্ষা, ত্যাগের শিক্ষা, লহ আপনা পাসরি॥

              —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

নমো হে রামকৃষ্ণ দুখহারী

ইমন-ভূপালী—কাওয়ালি


(নমো হে) রামকৃষ্ণ দুখহারী,

নমো করুণাময়, সর্বলোকাশ্রয়,

সদা সিঞ্চন কৃপাবারি।

পিতামাতা রূপে তুমি পালিছ যতনে,

গুরু হয়ে শুভ মতি দিতেছ পরাণে,

এমন আপন আর কে আছে ভুবনে,

জীবনে মরণে হিতকারী।

জনমে জনমে তুমি পিতা, তুমি মা আমার,

আমি তো তোমারি ছেলে বলো আর হ’ব কার,

সংসার-বন্ধন দিও না দিও না আর

বন্ধনমোচনকারী॥

            —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

রামকৃষ্ণ-নামের জোয়ার এলো

ভৈরবী-কাহারবা


রামকৃষ্ণ-নামের জোয়ার এলো ভাসিয়ে দে না তরী।

ভাব-ভক্তি উথলে ওঠে আহা মরি মরি৷

কাম-কাঞ্চন ডুবে মল অথৈ জলেতে।

হৃদয়-পদ্ম উঠল ফুটে ভক্তি-প্রেমেতে৷

তুমি ভয় পেয়ো না মাঝ-দরিয়ায় যদি ঝড় ওঠে।

যদি ইন্দ্রিয় আর রিপুদল বিষয় পানে ছোটে।

নামের হালটি ধরে শক্ত করে বেয়ে যাও তরী।

শেষে ভবের পারে নিয়ে যাবে রামকৃষ্ণ কাণ্ডারী॥

            —স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

রামকৃষ্ণ-চরণ-সরোজে

কৌমুদী খাম্বাজ-একতাল


রামকৃষ্ণ-চরণ-সরোজে, মজোরে মন-মধুপ মোর।

কণ্টকে আবৃত বিষয়-কেতকী, থেকো না থেকো না তাহে বিভোর॥

জনম-মরণ-বিষম-ব্যাধি, নিরবধি কত সহিবে আর।

প্রেম-পীযূষ পিয়রে শ্রীপদে, ভবেরি যাতনা রবে না তোর॥

ধর্মাধর্ম-সুখ-দুঃখ-শান্তিজ্বালা-দ্বন্দ্ব-খেলা মাঝে নাহি নিস্তার।

জ্ঞান-কৃপাণে পরম যতনে কাটোরে কাটোরে করম-ডোর॥

রামকৃষ্ণ নাম বল রে বদনে, মোহেরি যামিনী হইবে ভোর।

দুঃস্বপন-জ্বালা রবে না রবে না ছুটে যাবে তোর ঘুমের ঘোর॥

            —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

এসো তৃষ্ণার পরপারে

সাহানা—ঝাঁপতাল


এসো তৃষ্ণার পরপারে, এসো হিংসার পরপারে,

ঐ হেরো হেরো এসেছে রামকৃষ্ণ কুটীর দ্বারে॥

লক্ষ বাসনায় হ’য়ে হত কেঁদেছে জীব অবিরত,

(তাই) মোহন বেশে এলে কি ঠাকুর ধরায় বারে বারে॥

কে আছ কোথায় এসো ত্বরা করি’, ডাকে যে ঠাকুর দু’বাহু প্রসারি’,

মোছ আঁখিজল, এসো গো এসো, এসো শান্তির পারাবারে॥

এ কী হেরি লীলাখেলা, নিমেষে জুড়ায় জ্বালা,

বারেক হইলে মগন অমৃত-কথা-সাগরে॥

       —স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

জয় রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ বলো আমার মন

কীর্তন-একতাল

    

জয় ‘রামকৃষ্ণ’, ‘রামকৃষ্ণ’, বলো আমার মন।

যুগ-অবতার যিনি পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ॥

জীব-দুঃখেতে কাতর,     ধরি নর-কলেবর,

বারংবার অবতার জগত-ঈশ্বর;

(এবার) মাধুৰ্য্য-ঘন-মূরতি জিত-কামিনী-কাঞ্চন;

(ঐশ্বৰ্য্য বিহীন লীলা)॥

পূর্ব পূর্ব অবতার, এলো কলাংশে যাঁহার,

স্বয়ং সে দক্ষিণেশ্বরে এসেছে এবার,

ওরে চক্ষু মেলে চেয়ে দেখো, পাবেরে, নব জীবন;

(কত আর ঘুমাবে জীব, কাম-কাঞ্চন-আবেশে)।

রামকৃষ্ণের কৃপায়, বিবেকানন্দ বিলায়,

ভক্তিমুক্তি বিনামূল্যে কে নিবিরে আয়।

‘রামকৃষ্ণ’ বলে, নেও রে তুলে, যার যত হয় প্রয়োজন;

(ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ)।

          —শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী

রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে ভাই

কীর্তন ঝিঝিট—একতাল


রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে ভাই।

কোথা পাপী তাপী আয় রে ছুটে, সুখে নাম-তরঙ্গে ভেসে যাই

(রামকৃষ্ণ বলে)॥

‘রামকৃষ্ণ’ মধুর নাম,     মুখে বল রে অবিরাম,

ভবের কষ্ট নষ্ট হবে পূরবে মনস্কাম।

ঐ দেখ নাম শুনে এসেছে ধেয়ে, ওরে এমন দয়াল আর তো নাই

(রামকৃষ্ণের মতো)॥

যোগে যাগে কিবা ফল, রামকৃষ্ণ মুখে বল,

অনায়াসে করে পাবি চতুর্বর্গ ফল,

ধ’রে নামের ভেলা পারে যাবি (হেসে) যমের মুখে দিয়ে ছাই

(রামকৃষ্ণ বলে)॥

ও ভাই নামের এমনি বল, প্রাণ করে শীতল,

হয় কি না হয় ডেকে দেখ সত্য কিবা ছল,

ওরে নামের বলে তরে গেছে, কত মহাপাপী শুনতে পাই

(আমাদের মতো)॥

রামকৃষ্ণ গুণ-ধাম, তোমার পতিতপাবন নাম,

মোরা ভজনবিহীন, দীন অভাজন, হ’য়ো নাকো বাম,

দাও নামে রতি, পদে মতি, অন্য ধনরত্ন নাহি চাই ।

(নাথ তোমা বিনে)॥

         —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

দিবা বিভাবরী ডাকো প্রাণভরি, ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলে

ঝিঝিট—একতাল


দিবা বিভাবরী ডাকো প্রাণভরি, ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলে।

পাপ তাপ যাবে, প্রাণ জুড়াইবে, নামেরি মহিমা বলে॥

তরু-পত্র-প্রান্তে লম্বিত নীহার, জানো কি পতনে কী বিলম্ব তার,

পদ্ম পত্রে জল, জীবন চঞ্চল, কেমনে র’য়েছ ভুলে॥

উঠো উঠো ভাই থেক না অলসে, দেখো নাম রসে ধরা যায় ভেসে,

গায় দেশ-বিদেশে ‘রামকৃষ্ণ’ নাম প্রেমের লহরী তুলে॥

সে নামে থাকে না ভবেরি বন্ধন, ঘুচে যায় মায়া কামিনী-কাঞ্চন,

হয় মৃত্যুঞ্জয়, সদানন্দে রয়, প্রেমানন্দে পড়ে ঢলে॥

আহা মরি হেন, ‘রামকৃষ্ণ’ নাম, নাহি তাহে রুচি বিধি মোর বাম,

তুমি গুণধাম হ’য়ো নাকো বাম, স্থান দাও পদতলে॥

           —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

পাখী তুই ঠিক বসে থাক রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুলে

বাউল—দাদরা


পাখী তুই ঠিক বসে থাক রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুলে।

ও তোর, বৃথা উড়া নড়া চড়া কূল পাবি’নে অকূলে॥

(ও) তুই যেদিক যাবি দেখতে পাবি জলে জলাকার,

(ও তার) নাহি অন্ত দিগদিগন্ত অপার পাথার।

(ও তোর) ধরবে ডানা ঘোর যাতনা পড়বি মহা মুস্কিলে॥

(ও সে) অনন্ত অনন্ত ভাবে অন্ত কে করে,

প্রধান গ্রন্থ বেদ বেদান্ত গেল চুপ মেরে;

পুরাণেরা দিশেহারা সার কৈল নাম শেষকালে॥

এদিকে অবিদ্যা মায়া পিশাচী করাল,

পাতিয়াছে মন মোহিনী রূপ রসাদির জাল।

পাখী তুই পড়বি ফাঁদে মরবি কেঁদে প্রাণ হারাবি-বেহালে॥

(ঐ মাস্তুল ছেড়ে চলে এলে)॥

      —অক্ষয়কুমার সেন

ত্রেতাতারী রাম, দ্বাপরের শ্যাম, রামকৃষ্ণ দোঁহে একাধারে

ইমন-কল্যাণ—একতাল


ত্রেতাতারী রাম, দ্বাপরের শ্যাম, রামকৃষ্ণ দোঁহে একাধারে,

গৌতমের প্রাণ, শঙ্করের জ্ঞান, অবতীর্ণ লয়ে ধরা পরে॥

রামানুজ, গোরা, এক প্রেমে জোড়া, কবীর, নানক এক ডোরে,

যত অবতার সমষ্টি সবার, রামকৃষ্ণ রূপে এইবারে॥

‘যত মত পথ’ সব একমত, রামকৃষ্ণ কয় ভাবভরে,

ইষ্ট আপনার, ইষ্ট সবাকার, ভিন্ন রূপে ভক্ত এক হেরে॥

মহা অবতার রামকৃষ্ণ রায়, নরদেহ ধরি মধুর লীলায়,

জগতের সব ধরম মাতায়, দেখে বুঝো ভারত অন্তরে॥

      —স্বামী সুন্দরানন্দ

কাঠুরে তুই দূর বনে যা

বাউল—দাদরা


কাঠুরে তুই দূর বনে যা, দূর বনে যা এই বেলা।

কেঠো বনে কাল কাটালি ঘুচলো না (তোর) জঠর জ্বালা॥

রামকৃষ্ণ দিলেন বলে, মিলে ধন দূর বনে গেলে (ও কাঠুরে)।

ও তুই এবার যা দূর বনে চলে, পাবি চন্দনের চেলা॥

আরও যদি যাস এগিয়ে, রজত খনি দেখবি গিয়ে (ও কাঠুরে)

ওরে তার ওধারে সোনা হীরে মণি মাণিক রতন মালা।

দেহের মাঝে আছে সে বন যদি না পাস তার অন্বেষণ (ও কাঠুরে)

ওরে ধর রামকৃষ্ণ চরণ, সেবন যাঁর করেন কমলা॥

            —অক্ষয়কুমার সেন

আজি কোকিল-কূজনে, মলয় পবনে, শিহরি’ উঠিছে প্রাণ

বেহাগ-খাম্বাজ-একতাল


(আজি) কোকিল-কূজনে, মলয় পবনে, শিহরি’ উঠিছে প্রাণ।

যেন বিস্মৃত কত স্বপনেতে শ্রুত, মনে জাগে শত তান॥

দেববালা যত হাত ধরাধরি, নাচিছে গাহিছে ধরা আলো করি,

ঘেরিয়া শিশুরে ক্ষুদিরাম ঘরে নিরখি চাঁদ বয়ান॥

চাঁদে গড়া তনু প্রেমেরি নয়ন, চন্দ্রমণি কোলে কে শিশু-রতন,

বারেকের তরে এসো হৃদি পরে, জুড়াই তাপিত প্রাণ॥

হেরি হাসি রাশি ব্যাকুল হৃদয়, বুক চিরে রাখি মনে সাধ হয়,

(পাছে) মর-জগতের মলা-মাটি লাগি’ ও হাসি হইবে ম্লান॥

কোটি জনমের যত অশ্রুপাত, সফল করিতে এসেছে কি নাথ?

ভেদ ভুলাইতে প্রেম বিলাইতে জগতে করিতে ত্রাণ,

(যত) দ্বেষ দ্বন্দ্ব মোহবন্ধ হোক চির অবসান।

       —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

হরি ওঁ রামকৃষ্ণ বলো মন আমার

জয় জয়ন্তী—ত্রিতাল


হরি ওঁ রামকৃষ্ণ বলো মন আমার

সারদা রামকৃষ্ণ বলো একবার॥

সুধামাখা হরি ওঁ রামকৃষ্ণ নাম

অন্তকালে হরি ওঁ রামকৃষ্ণ নাম

তারকব্রহ্মে হরি ওঁ রামকৃষ্ণ নাম।

নিবে তোরে শ্রীসারদা-রামকৃষ্ণ ধাম

হয়ে যাবি পূর্ণকাম পুলকে অপার॥

       —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্রীশ্রীসারদেশ্বরী সংগীত

প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং

স্তব

গৌড়-সারঙ্গ মিশ্র—তিনতাল


প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং,

নররূপধরাং জনতাপহরাম্।

শরণাগত-সেবক তোষকরীং,

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্॥১

গুণহীন-সুতানপরাধ-যুতান্,

কৃপয়াহদ্য সমুদ্ধর মোহগতান্।

তরণীং ভবসাগর-পারকরীং,

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্॥২

বিষয়ং কুসুমং পরিহৃত্য সদা,

চরণাম্বুরুহামৃত-শান্তি-সুধাম্।

পিব ভৃঙ্গমনো ভবরোগহরাং

প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্॥৩

কৃপাং কুরু মহাদেবি সুতেষু প্রণতেষু চ।

চরণাশ্রয়দানেন কৃপাময়ি নমোঽস্তু তে ॥৪

লজ্জাপটাবৃতে নিত্যং সারদে জ্ঞানদায়িকে।

পাপেভ্যো নঃ সদা রক্ষ কৃপাময়ি নমোঽস্তু তে॥৫

রামকৃষ্ণগতপ্রাণাং তন্নামশ্রবণপ্রিয়াম্।

তদ্ভাবরঞ্জিতাকারাং প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ॥৬

পবিত্রং চরিতং যস্যাঃ পবিত্রং জীবনং তথা।

পবিত্রতাস্বরূপিণ্যৈ তস্যৈ দেব্যৈ নমো নমঃ॥৭

দেবীং প্রসন্নাং প্রণতার্তিহন্ত্রীং,

যোগীন্দ্রপূজ্যাং যুগধর্মপাত্রীম্।

তাং সারদাং ভক্তি-বিজ্ঞান-দাত্রীং,

দয়াস্বরূপাং প্রণমামি নিত্যম্ ॥৮

স্নেহেন বধ্নাসি মনোঽম্মদীয়ং,

দোষানশেষান্ সগুণীকরোষি।

অহেতুনা নো দয়সে সদোষান্,

স্বাঙ্কে গৃহীত্ব যদিদং বিচিত্রম্॥৯

প্রসীদ মাতর্বিনয়েন যাচে,

নিত্যং ভব স্নেহবতী সুতেষু।

প্রেমৈকবিন্দুং চিরদগ্ধচিত্তে,

বিষিঞ্চ চিত্তং কুরু নঃ সুশান্তম্॥১০

জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম্ ।

পাদপদ্মে তয়োঃ শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ॥১১

          —স্বামী অভেদানন্দ

আজি কী আনন্দে আকুলা ধরণী

নট-ভৈরব-ত্রিতাল


আজি কী আনন্দে আকুলা ধরণী।

আনন্দ দ্যুলোকে, আনন্দ ভূলোকে, আনন্দ দশদিশিব্যাপিনী।

তামস রাত্রি বুঝি হল গত, ধর্ম আবার খুঁজে পেল পথ,

দেব ও মানব মঙ্গল শঙ্খে জানায় কার আগমনী।

স্বর্গের সুরভি নিয়ে এল এই কন্যা,

তারে পেয়ে ধরণী আজি তাই ধন্যা,

আদ্যা শকতি, ধ্যান মূরতি, কৈলাসবাসিনী।

        –স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী

বেহাগ-খাম্বাজ-ঝাপতাল


জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী

শ্যামাসুতা হয়ে মাগো সেজেছে সারদামণি॥

সরস্বতী মহাভাগা বিদ্যাকমলনয়নী

তুমি সীতা রাধা তুমি শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্গিনী॥

সৃষ্টিস্থিতিবিনাশিনী সর্বজীবাৰ্ত্তিহারিণী

অজ্ঞ অশরণজনে অভয়পদদায়িনী।

তুমি আদ্যাশক্তি শিবা হরহৃদি-বিহারিণী

রামকৃষ্ণ-আরাধিতা নমামি বিশ্বজননী॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মহামাঈ কী জয় গাও

ভৈরব—ত্রিতাল


মহামাঈ কী জয় গাও।

যুগের প্রভাতে মা এল ধরাতে

বরণ করিয়া মাকে নাও॥

জ্যোতির্ময়ী ঐ মা এল এ ধরায়

হাসিল রে দশদিক করুণা-বিভায়,

আশার সঙ্গীত ভুবন ভাসায়,

ভকতি-অর্ঘ্য মাকে দাও॥

—জয় গাও জয় গাও-

–জয় গাও জয় গাও-

    —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

সারদা-রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে রে ভাই

জয় জয়ন্তী—কাহারবা

সারদা-রামকৃষ্ণ নামের বান ডেকেছে রে ভাই।

বিশ্বভুবন ভেসে গেল, আহা বলিহারি যাই॥

যুগের হাওয়া লাগলো পালে,

জীবন-তরী দে না খুলে,

‘সারদা-রামকৃষ্ণ’ বলে হেসে খেলে চলে যাই।

(মা, মা, মা বলে মায়ের কোলে চলে যাই)॥

       —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

এল তোর দুষ্ট ছেলে

খাম্বাজ-দাদরা

এল তোর দুষ্ট ছেলে, তুষ্ট করে নে মা কোলে।

যাব আর কার কাছে মা, বাবা নিদয় গেছেন ফেলে॥

শুনিনি তোমার কথা, বেড়াই খেলে হেথা সেথা,

তাই কি গো মা কও না কথা, পেয়ে ব্যথা হৃমলে॥

তুমি যদি এমন হবে, ছেলের কী উপায় তবে,

নামে কলঙ্ক রবে, মরব কেঁদে মা মা বলে॥

সুপুত্রে কুপুত্রে মাতা, প্রসবে পায় সমান ব্যথা,

এ কী মা দারুণ কথা—নাই ব্যথা কুপুত্র বলে॥

যা হবার হবে রে ভাই, মা বলে ডাকি সবাই,

দেখি মা কেমন করে থাকতে পারে ছেলে ভুলে॥

            –দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার


করুণা-পাথার জননী আমার

ভৈরবী—একতাল

করুণা-পাথার জননী আমার এলে মা করুণা করিতে।

তাপিতের তরে নরদেহ ধরে অশেষ যাতনা সহিতে॥

ত্রিদিব ত্যজিয়া এ ধরায় আসা, সন্তান-তরে কত কাদাহাসা।

অহেতুক তব এই ভালোবাসা, পারি কি গো মোরা বুঝিতে॥

শত জনমের যত পাপ হায়, দিয়াছি ঢালিয়া ঐ রাঙ্গা পায়,

সকলি তো তুমি সহিলে হেলায়, কোল দিতে কত তাপিতে॥

ভকতি বিহীন হৃদয় আমার, কেমনে পূজিব শ্রীপদ তোমার,

নয়ন ভরিয়া দাও প্রেমধার-পদপঙ্কজ ধোয়াতে॥

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে তুমি করুণাময়ী

সাহানা ঝাপতাল

কে তুমি করুণাময়ী! নারীরূপ ধরি এলে

কাঙ্গালিনী বেশে মাগো কাঙ্গালেরে করো কোলে॥

শ্রীমুখেতে দেবহাসি ঝরিতেছে সুধারাশি,

হেরি যত মুনিঋষি নিমিষে আপনা ভুলে॥

চরণে শরণ নিলে তরে জীব অবহেলে,

সমাধি সুখেতে ভাসি’ ডুবে নির্বাণ-সলিলে।

তাই কি ভূভার-হারী রামকৃষ্ণ রূপে হরি

বোঝাতে মহিমা তব পূজিলা পদকমলে॥

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

করুণা করিতে গো মা

মিশ্র বিলাবল - ঝাপতাল

করুণা করিতে গো মা নেমে এলে করুণায়।

সহিলে কত না জ্বালা মোদেরে তারিতে হায়॥

রাজরাজেশ্বরী তুমি সাজিয়াছ কাঙ্গালিনী,

কেমনে জানিব মা গো তুমি না জানালে তোমায়॥

অনাথ জনে তারিতে কাঙ্গালেরে কোলে নিতে

আঁখিবারি মুছাইতে আঁখি তব ভেসে যায়।

কাতরে দিতে অভয় নিয়ে এলে বরাভয়

আর্ত এ ধরা যেন নিত্য অভয় পায়॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জাগো জাগো জাগো

ভৈরব—ত্রিতাল

জাগো জাগো জাগো, কত আর ঘুমাইবে মাগো।

জ্যোতির্ময়ী জাগো জীবনে

নিবার আঁধার তব পুণ্য কিরণে

প্রকাশো প্রকাশো মা হৃদয়-গগনে

জনমে জনমে জেগে থাকো॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

ধরণীর ভার হরিতে আবার এলে মা আদ্যাশকতি

ভৈরবী-তেওড়া

ধরণীর ভার হরিতে আবার এলে মা আদ্যাশকতি।

নিখিল-মাতৃ-হৃদয়-সাগর-মন্থন-সুধা মূরতি॥

নিবিড় কাননে বন-ফলাশনে ভূশয়নে নিশি যাপনা,

নিশাচর-দেশে বসি কারাবাসে সহিলে মরণ-বেদনা।

অমল চরিতা নির্বাসিতা তুমি মা জনক-দুহিতা,

সন্তান তরে মায়া-তনু ধরে আসিলে বিশ্ব-প্রসূতি॥

গোপনন্দিনী শ্রীরাধারূপিণী কুলমান-তেয়াগিনী,

সঁপি প্রাণমন জীবন-যৌবন কৃষ্ণপ্রেমে পাগলিনী।

বিরহ-অনলে আপনা দহিলে ভূতলে জীব-মঙ্গলে,

মানব-হৃদয় করি মধুময় বিতরি শুদ্ধা-ভকতি॥

ব্রাহ্মণ-সুতা জপে তপে রতা রামকৃষ্ণ-পূজিতা,

পাপীতাপী জনে কৃপা বিতরণে সারদা সদা সম্মতা।

লাজ-কুণ্ঠিতা অবগুণ্ঠিতা করুণা-রস-মণ্ডিতা,

(তব) সন্তান কোটি হেরো ভূমে লুটি জানায় চরণে প্রণতি॥

       —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

বৈকুণ্ঠ হতে লক্ষ্মী এলো

মিশ্র ঝিঝিট—দ্রুত একতাল

বৈকুণ্ঠ হতে লক্ষ্মী এলো পৃথিবীর এই মাটিতে।

জয়রামবাটীতে, জয়রামবাটীতে॥

গ্রামখানি যে ধন্য হলো, মায়ের চরণ ধূলিতে।

জয়রামবাটীতে, জয়রামবাটীতে॥

বারোশো ষাট আটই পৌষ মায়ের আবির্ভাব।

মা এলো রে দূর করিতে ত্রিতাপ শোকতাপ;

দুঃখীর ঘরে জন্ম নিল ভক্তজনে তরাতে।

জয়রামবাটীতে, জয়রামবাটীতে॥

পতি পেল জগদ্গুরু রামকৃষ্ণ নাম

চরণে শরণে যাঁর মেলে পরমধাম

গো মেলে পরমধাম॥

রামচন্দ্র পিতা মায়ের, শ্যামাদেবী মাতা।

আমোদরের তীরে এলো জগতের মাতা;

মহামায়া জন্ম নিল, ভক্তি প্রেম বিলাতে॥

জয়রামবাটীতে, জয়রামবাটীতে॥

      —অভয়পদ বন্দ্যোপাধ্যায়



বিশ্ব-জননী সেজে ভিখারিণী

ভৈরবী—একতাল

বিশ্ব-জননী সেজে ভিখারিণী জগতে তারিতে এলে আবার।

আদ্যা শকতি, দৈন্য-মূরতি, হেরিয়ে চিনিবে হেন সাধ্য কার॥

করুণায় গড়া চিন্ময়ী তনু পদনখে পড়ে শত শশী ভানু।

আঁখি-পঙ্কজে সতত বিরাজে মুনি-মন-লোভা স্নেহের পাথার॥

ভকতের তরে দেহে মন রাখা, দিবানিশি তাই শত কাজে থাকা।

নাহিকো বিরাম, ভাবো অবিরাম, কেমনে করিবে তাপিতে উদ্ধার॥

এত যদি মাগো করুণা এবার, এ দীন সন্তানে কাঁদায়ো না আর।

খুলে দাও দ্বার ভব কারাগার, মিশে যাক প্রাণ শ্রীপদে তোমার॥

             -স্বামী চণ্ডিকানন্দ

মা এসেছে মোদের কী আর ভাবনা ভাই

বাউল—আড়খেষ্টা

মা এসেছে মোদের কী আর ভাবনা ভাই।

ভবের বোঝা দূরে ফেলে আয় সকলে নাচি গাই॥

মা যে জগত্তারিণী, ভব-ভয়-হারিণী,

ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ সর্বদায়িনী।

(আবার) না চাহিতে সকল দিয়ে সন্তানের মন ভুলায়॥

ওরে কে আছিস কোথায়, সবে আয় রে ছুটে আয়,

এমন সুদিন পেয়ে রে ভাই হারাস নে হেলায়।

(শুধু) জয় মা ব’লে দাঁড়ারে তুই, দেখবি দুখের নামটি নাই॥

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

সবারি মা হয়ে আজি, কে তুমি ধরাতে এলে

দরবারী কানাড়া-ঝাপতাল

সবারি মা হয়ে আজি, কে তুমি ধরাতে এলে।

সবারি দুঃখেতে সদা, ভাসিছ নয়ন জলে॥

দেশ-জাতি-ভেদ নাই, শ্রীপদে সবারি ঠাই,

পাপী তাপী সবে তুমি, ‘বাছা’ বলে করো কোলে॥

সব দেশ সব জাতি ‘মা’ নামে উঠিছে মাতি,

তোমারে করি’ প্রণতি, সব দুখ যায় ভুলে।

‘মা’ নাম শিখাতে সবে, ‘মা’ হয়ে এসেছ ভবে,

মোরেও শিখাও তবে, আমি যে তোমারি ছেলে॥

          –স্বামী চণ্ডিকানন্দ

পতিত পাবনী সারদা দেবী

মালকোষ-তেওড়া

পতিত পাবনী সারদা দেবী!

শোক নাশিনী, তাপহারিণী;

শান্তিদায়িনী, ভবানী॥

নাহি যে তোমার ভেদাভেদ জ্ঞান,

সন্তান তোমার হিন্দু মুসলমান,

পূজিছে তোমায় মার্কিনবাসী,

নহ কি তুমি তাদের জননী॥

নিজেরে তুমি করিয়া গোপন,

সাধিলে মাগো কঠোর সাধন।

ত্রিগুণধারিণী, বিশ্বজননী

মুক্তিদায়িনী শঙ্করী॥

  –স্বামী দিব্যাত্মানন্দ

মঙ্গলমূরতি মঙ্গলা আসিল ভুবন ভরিল সুখে

ভৈরব—ত্রিতাল

মঙ্গলমূরতি মঙ্গলা আসিল ভুবন ভরিল সুখে।

দুখনিশা কাটিল সুখরবি হাসিল উৎসব ধরণীবুকে॥

অমঙ্গল যত হ’ল আজি অবসান, মঙ্গলমন্ত্রে জাগিল অবশ প্রাণ,

মঙ্গল শঙ্খ মঙ্গল করে গান, অন্তর নাচে পুলকে॥

মঙ্গল বরষিল মঙ্গলা মা আমার,

হৃদি শতদলে আসন করোরে তার,

পাদ্য অর্ঘ্য দাও পদে উপহার, বন্দনা করোরে মাকে॥

       –স্বামী চণ্ডিকানন্দ

জয় জয় জননী মাত সরস্বতী

শুদ্ধকল্যাণ-কাহারবা

জয় জয় জননী মাত সরস্বতী

বিদ্যাপ্রদায়িনী তারিণী মা॥

জয় জয় জননী দূর্গে ভগবতী

ভববয়হারিণী তারিনী মা॥

জয় জয় জননী নমঃ শ্রী চণ্ডিকে

মুক্তিবিধায়িনী তারিণী মা॥

জয় জয় জননী সারদা অম্বিকে

ভক্তিপ্রদায়িনী তারিণী মা॥

  —স্বামী সর্বগানন্দ

শ্রীমদ্বিবেকানন্দ সংগীত

শ্রীবিবেকানন্দ-বন্দনা

বিবেকানন্দপঞ্চকম্

অনিত্যদৃশ্যেষু বিবিচ্য নিত্যং তস্মিন্ সমাধত্ত ইহ স্ম লীলয়া ।

বিবেকবৈরাগ্যবিশুদ্ধচিত্তং যৌঽসৌ বিবেকী তমহং নমামি॥ ১

বিবেকজানন্দনিমগ্নচিত্তং বিবেকদানৈকবিনোদশীল।

বিবেকভাসা কমনীয়কান্তিং বিবেকিনং তং সততং নমামি॥ ২

ঋতং চ বিজ্ঞানমধিশ্রয়দ্যন্নিরন্তরং চাদিমধ্যান্তহীনম্।

সুখং সুরূপং প্রকরোতি যস্য আনন্দমূর্তিং তমহং নমামি॥ ৩

সূর্যো যথান্ধং হি তমো নিহন্তি বিষ্ণুর্থ দুষ্টজনাংচ্ছিনত্তি।

তথৈব যস্যাখিলনেত্রলোভং রূপং ত্রিতাপং বিমুখীকরোতি॥ ৪

তং দেশিকেন্দ্রং পরমং পবিত্রং বিশ্বস্য পালং মধুরং যতীন্দ্রম্।

হিতায় নৃণাং নরমূর্তিমন্তং বিবেক-আনন্দমহং নমামি॥ ৫



প্রণাম মন্ত্র

নমঃ শ্ৰীতিরাজায় বিবেকানন্দসূরয়ে।

সচ্চিৎ সুখস্বরূপায় স্বামিনে তাপহারিণে॥

স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ


বঙ্গানুবাদ

এই জগতে অনিত্য বস্তুরাজি হইতে নিত্যবস্তুতে পৃথক করিয়া যে বিবেকী লীলাচ্ছলে সেই নিত্যবস্তুতে বিবেক ও বৈরাগ্যপ্রভাবে পবিত্র চিত্তকে সমাহিত করিয়াছিলেন, আমি তাহাকে নমষ্কার করি।


বিবেকসম্ভুত আনন্দে যাঁহার চিত্ত নিমগ্ন, যিনি বিবেকদানেই আনন্দিত, বিবেকজ্যোতিতে যিনি রমণীয়রূপশালী, সেই বিবেকীকে আমি সর্বদা নমষ্কার করি।


যাঁহার স্বরূপ সত্য ও বিজ্ঞানকে আশ্রয় করিয়া নিরবকাশ নিত্য সুখ প্রদান করে, সেই আনন্দস্বরূপ মূর্তিধারীকে আমি নমষ্কার করি।


সূর্য যেরূপ গভীর অন্ধকার নিঃশেষে নাশ করেন, বিষ্ণু যেরূপ দুবৃত্তদিগকে বিনাশ করেন, সেইরূপ যাঁহার নয়নাভিরাম রূপ বিশ্বজনের ত্রিতাপ বিদূরিত করে।


নরহিতার্থ অবতীর্ণ সেই আচার্যপ্রবর, পরম পবিত্র, জগৎপালক, আনন্দময়, যোগীশ্রেষ্ঠ বিবেকানন্দকে আমি নমষ্কার করি।


শ্রীমান্, সন্ন্যাসীরাজ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ, ত্রিতাপহারী, সর্বজ্ঞ স্বামী বিবেকানন্দকে নমষ্কার।

মূর্তমহেশ্বরমুজ্জ্বল-ভাস্করমিষ্টমমর-নরবন্দ্যম্

খাম্বাজ—কাওয়ালি

মূর্তমহেশ্বরমুজ্জ্বল-ভাস্করমিষ্টমমর-নরবন্দ্যম্।

বন্দে বেদতনুমুজ্জ্বিত গর্হিত কাঞ্চন-কামিনী বন্ধম্॥১

কোটীভানুকরদীপ্তসিংহমহো! কটিতটকৌপীনবন্তম্।

অভীরভীঃ-হুঙ্কার-নাদিত-দিমুখ-প্রচণ্ড-তাণ্ডব-নৃত্যম্॥২

ভুক্তি-মুক্তি কৃপা কটাক্ষ-প্রেক্ষণমঘদল-বিদলন-দক্ষম্।

বালচন্দ্রধরমিন্দু-বন্দ্যমিহ নৌমি গুরু-বিবেকানন্দম্॥৩

                –শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী


তারা উজ্জ্বল পশিল ধরাপর

মালকোষ—ত্রিতাল

তারা উজ্জ্বল পশিল ধরাপর, নির্মল গগন বিকাশি।

রত্নগর্ভা নারী রত্ন প্রসবিল, বিভোর বাল সন্ন্যাসী॥

রবিকর-কর্ষিত কুজ্বটিকা-ঘন, আবরে দিনকর কান্তি,

মায়াবলম্বন কায়া প্রকটন, লীলা আবরণ ভ্রান্তি॥

গুরুপদ ধারণ, আত্মসমর্পণ, মহাদে নদ মহাসম্মিলন,

দয়া উচ্ছ্বসিত স্রোত মহান, দূরিত অশান্তি বিধৌত মেদিনী,

জনমন-মার্জিত শান্তি প্রদান; সশিষ্য গুরুপদ হৃদে সাধে ধরি,

গায় অকিঞ্চন গান, কৃপাকণা অভিলাষী॥

      –গিরিশচন্দ্র ঘোষ

এসো ভুবনপাবন নারায়ণ

ভৈরবী-ঠুংরি

(অয়ি ভুবন মনোমমাহিনী—সুর)

এসো ভুবনপাবন নারায়ণ।

এস আর্ত-পতিত-চিতে, শান্তি বিতরিতে, ত্রিভুবন-তারণ-কারণ।

দ্বেষ হিংসা হেরি ঝরিত নয়নবারি

সাম্য প্রচারিলে দেশে দেশে ঘুরি,

লাঞ্ছনা সহিলে, সাধি’ শিখাইলে জীবহিতে জীবনধারণ॥

হের ঘোর তম, স্বার্থ সে নির্মম ছাইছে ভুবন কালমেঘ-সম,

শোণিতে রঞ্জিত, রোদনে পূরিত, কলুষিত ধরণী গগন।

(এসো) হৃদয়ে হৃদয়ে, অন্তরযামী হয়ে,

স্বার্থবন্ধ কাটো প্রেম অসি দিয়ে,

খুলিয়ে দাও ঠুলি, হেরি নয়ন মেলি, ঘটে ঘটে সেই নিরঞ্জন॥

বিজ্ঞান-ভাস্কর ‘এস হে শঙ্কর’, ভৈরব ‘অভীঃ’ রবে মোহধ্বান্ত হর,

বিবেক আনন্দ দেহ বিবেকানন্দ! নন্দিত কর ত্রিভুবন॥

            –স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

কে রে নরেন্দ্রবর বীরেশ্বর দেহধারী

বাগেশ্রী—একতাল

কে রে নরেন্দ্রবর বীরেশ্বর দেহধারী।

সিদ্ধ মহাবিদ্যাবলে অবিদ্যা বিনাশকারী॥

তমাচ্ছন্ন বসুমতী, হেরি কি ব্যথিত যতি,

বিলাইতে জ্ঞান-জ্যোতি কে এনেছে সহকারী॥

রহি পরহিতে রত, শিখাবে কী মহাব্রত,

এসেছ আশ্রিত-রত জন-মন-তাপহারী।

গুরুপদে বলিদান, জীবন-যৌবন মান

হয়েছ কি অধিষ্ঠান, সাজিতে দীন-ভিখারী॥

     –গিরিশচন্দ্র ঘোষ

স্তিমিত-চিৎ সিন্ধু ভেদি উঠিল কি জ্যোতি-ঘন

বাগেশ্রী—আড়া

স্তিমিত-চিৎ সিন্ধু ভেদি উঠিল কি জ্যোতি-ঘন,

কোটি সূর্য গলাইয়ে, ছাঁচে ঢালা কান্তি যেন।

মায়া-খণ্ডিত অখণ্ড বারি, বুঝে লীলা কেবা হেন॥

উজল বালক বেশে, অখণ্ড ঘর প্রবেশে,

প্রেমঘন বাহু পাশে কাহারে করে ধারণ॥

উঠো বীর আঁখি মেলি, ছাড়ো ধ্যান চলো চলি,

ধরণী ডুবাল বুঝি অবিদ্যা কাম কাঞ্চন॥

সুধীর ধীর পরশে, যোগী চায় সহরষে,

কণ্টকিত তনুমন, নীরবে ভাসে বয়ান;

তারা জ্বলি’ ছায়া পথে স্পর্শে ধরা আচম্বিতে,

পুণ্যভূমে উদে আজি পুনঃ নর নারায়ণ॥

    —স্বামী সারদানন্দ

ভুবন ভ্রমণ করো যোগীবর যাঁর ধ্যানে

সাহানা-ধামার


ভুবন ভ্রমণ করো যোগীবর যাঁর ধ্যানে।

তাহারি সন্তানগণ চেয়ে আছে পথপানে॥

উচ্চব্রতে আত্মহারা, ভ্রমি সসাগরা ধরা,

মোহিলে মানব-চিত, প্রভুর গৌরব-গানে।

নানাদেশে নানাভাবে জয়ধ্বনি একতানে॥

রামকৃষ্ণ হৃদে ধরো, হৃদয় আকৃষ্ট করো,

ইষ্টপূজা পূর্ণ তব, পুলক-আলোক দানে।

জনমন পুলকিত, মোহনিশা অবসানে॥ 

    –গিরিশচন্দ্র ঘোষ

স্বদেশ বিদেশ উছলি উঠিছে তোমার নবীন তন্ত্র

ইমনকল্যাণ—একতাল

(যখন সঘন’ সুর)


স্বদেশ বিদেশ উছলি উঠিছে তোমার নবীন তন্ত্র,

আকাশ বাতাস ধ্বনিয়া তুলিছে তোমার মোহন মন্ত্র;

নন্দিত-ধরা-মন্দির মাঝে ধর্মের স্রক্ গন্ধ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো—বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

অরুণ কিরণ উছলি উঠিল উদিলে যে দিন বঙ্গে,

স্বরগ করিল সুরভি বৃষ্টি বরষি আশীষ সঙ্গে,

প্রেমের পুণ্য-প্রবাহে সাজিল গৌর-নিত্যানন্দ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

দ্যুলোকের ছবি হেরিলে পুলকে গুরুর চরণ তলে,

আর্তের সেবা মর্ত্যে আনিলে ভাসিয়া নয়ন জলে;

বিশ্বপ্রেমের বিকশিত খনি—চিত্তে হরষানন্দ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো—বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

ভূধরে সাগরে গহনে কাননে যাপিলে কত না নিশি,

তুষার হিমানি গিরিন্দর ভ্ৰমিলে কত না দিশি,

অঙ্কুর পুনঃ শঙ্কর-জ্ঞান শাক্যের ত্যাগানন্দ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো—বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

জ্ঞানের গরিমা গৌরব গান ভারত-মর্মবাণী,

পাশ্চাত্য সেথা বেদান্ত গাথা শুনি বিস্ময় মানি।

স্নিগ্ধ ভাবের শক্তি মাধুরী মুগ্ধ নূতন ছন্দ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

শিকাগো সঙেঘ সঙ্গীত তব শীর্ষে উঠিল ভাসি,

শুনিল বিশ্ব, শুনিল নিঃস্ব, শুনিল প্রাসাদবাসী;

সৃজিলে “শ্রীমঠ” কঞ্জকুটীর তীর্থ মুখরানন্দ,

মোদের বিবেকানন্দ তুমি গো—বিশ্ব বিবেকানন্দ॥

        —স্বামী অভেদানন্দ

জয় বীরেশ্বর বিবেক-ভাস্কর

শিবরঞ্জনী—ত্রিতাল


জয় বীরেশ্বর বিবেক-ভাস্কর জয় জয় শ্রীবিবেকানন্দ।

ইন্দু নিভানন সুন্দর লোচন বিশ্বমানব-চিরবন্দ্য৷

প্রেম টলটল কান্তি সুবিমলঅধিগত বেদবেদান্ত।

ত্যাগ-তিতিক্ষা তপস্যা-উজ্জ্বল চিত্ত নিরমল শান্ত॥

কর্ম-ভক্তি-জ্ঞান ত্রিশূল ধারণ ছেদন জীব মোহবন্ধ।

ব্রহ্মপরায়ণ নমো নারায়ণ! দেহি দেহি চরণারবিন্দ।

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কন্যাকুমারী মন্দিরতলে হে যতি, কে তুমি শিলাসনে

ভীমপলশ্রী—একতাল


কন্যাকুমারী মন্দিরতলে হে যতি, কে তুমি শিলাসনে।

ঝর ঝর ঝরে করুণার ধারা যুগল কমল নয়নে॥

নীরব সাধনে ভারত ভ্রমিয়া, কাঁদিল কি হিয়া দৈন্য হেরিয়া,

বিরাম বিহীন ভাবে নিশিদিন তাপিতে তারিবে কেমনে॥

বিবেকোজ্জ্বল বিবেকানন্দ গতসংশয় মোহবন্ধ,

চিত্তে তোমার তবু কী দ্বন্দ্ব ভাবিতেছ বসি নিরজনে॥

দেবতা! তুমি কী জীব-দুখে গলে ব্রহ্মানন্দ হেলায় ত্যাজিলে

জীব-দুখানলে আপনা দহিলে, সেবা শিখাইলে ভুবনে॥

           —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কে রে পদ্ম-পলাশ লোচন

সিন্ধু—একতাল

কে রে পদ্ম-পলাশ লোচন।

কে রে শারদ-ইন্দু-নিন্দিত চারু-ভুবন-মোহন-আনন॥

শ্মশান-আলয় সন্ন্যাসী বেশ, নাহিকো অন্তরে বাসনার লেশ,

নির্ভীক চিতে ভ্রম ধরণীতে, মরণ ভীতি বারণ॥

জ্ঞান-ঘন-তনু শুক হেন বাসি, অখণ্ড-বিলাসী তুমি ব্রহ্মঋষি;

প্রেমরসপানে হরিগুণ গানে নারদ বীণা-বাদন॥

জড়-বিজ্ঞান-কৌরব-রণে, পার্থ কি এলে বাসুদেব সনে,

রাম-গত-প্রাণ বীর হনুমান, লবণাম্বুধি-লঙ্ঘন॥

জ্ঞান-প্রেম-কর্ম-ত্রিশূলধারী, নররূপ ধরি এলে ত্রিপুরারি,

বিষাণ বাদনে অভীরভীঃ স্বনে মোহ-বন্ধন-খণ্ডন॥

শরণাগত চরণে তোমার, বিবেকানন্দ’ বীর-অবতার,

কিবা পরিচয়, রামকৃষ্ণ-ময় মম মানস-রঞ্জন॥

          –স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

কে তুমি বাজালে নবীন রাগেতে ভারতের প্রাণ-বীণা

খাম্বাজ-একতাল


কে তুমি বাজালে নবীন রাগেতে ভারতের প্রাণ-বীণা।

মধুর ঝঙ্কারে মুগ্ধ জগৎ চকিতে গাহে বন্দনা॥

ললিত ছন্দে গভীর মন্দ্রে, পশিল সে তান রন্ধ্রে রন্ধ্রে,

জাগিল সুপ্ত লুপ্ত-গৌরব ভারতবর্ষ দীনা॥

হিমাদ্রি-শিখরে, জলনিধি-তীরে, প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে, দিগ্‌-দিগন্তরে,

বেদান্ত-মহিমা কে বলো প্রচারে, বর্ণিতে নারি সীমা॥

(করি) গুরুপদে মন-প্রাণ সমর্পণ, মহাযোগী বেশ করিলে ধারণ,

জ্ঞান-ভক্তি-যোগ-জীব-সেবাব্রত করিলে উদ্দীপনা॥

             –নীরদরঞ্জন মজুমদার

জয় বিবেকানন্দ বীর সন্ন্যাসী চির-গৈরিক-ধারী

আড়ানা মিশ্র - তেওড়া


জয় বিবেকানন্দ বীর সন্ন্যাসী চির-গৈরিক-ধারী।

জয় তরুণযোগী শ্রীরামকৃষ্ণ-ব্ৰত সহায়কারী॥

যজ্ঞাহুতির হোম-শিখাসম,

তুমি তেজস্বী তাপস পরম

ভারত অরিন্দম নমো নমো নমো, বিশ্ব-মঠ-বিহারী॥

(মদ) গর্বিত বল-দর্পীর দেশে মহাভারতের বাণী

শুনায়ে বিজয়ী, ঘুচালে স্বদেশের অপযশ-গ্লানি।

(নব) ভারতে আনিলে তুমি নব বেদ

মুছে দিলে জাতি ধর্মের ভেদ

জীবে ঈশ্বরে অভেদ আত্মা জানাইলে হুঙ্কারি॥

        –নজরুল ইসলাম

জয় যতীশ্বর, জয় তমোহারী

কেদারা—কাওয়ালি


জয় যতীশ্বর, জয় তমোহারী, জয় শিব শম্ভু নর-রূপ-ধারী।

জয় বেদ-বাণী জ্ঞান-গঙ্গাধর, পতিত-পালক জয় বিষধর,

জয় ভয়-বারণ বিজয়-কেতন, জয় বীরেশ্বর, জয় দণ্ডধারী॥

ত্রিলোক-বাসী শ্রীচরণ বন্দে, মহিমা তব গাহে গীতি-ছন্দে,

(জয়) ভূভার হরণ, বিমোহনাশন, নমো মহেশ্বর নর-লোক-চারী॥

          –বিনোদেশ্বর দাশগুপ্ত

নমি নমি বিবেকানন্দ স্বামী

ভজন - কাহারবা


নমি নমি বিবেকানন্দ স্বামী জনগণমন উদ্বোধক হে,

জ্ঞান-পথ বাহিয়া এলে নামি অজ্ঞান-মন জ্ঞান-দ্যোতক হে॥

ভক্তে দিলে তুমি ভক্তির প্রাণ,

অজ্ঞানে দিলে জ্ঞান-আলোক দান,

যোগী জনে দিলে তুমি যোগ অনুধ্যান,

অন্তর-মলিনতা-শোধক হে।

আর্তের সেবা তব ছিল মহাধর্ম,

ব্যথিতের ব্যথা দূর ছিল মহাকর্ম,

দরদে ভরা ছিল সদা' তব মর্ম, দীনদুঃখী জন সেবক হে।

সবার পরে মানুষই সত্য

দেখিলে ঈশ্বর প্রেমেতে মূর্ত

মিথ্যা জগতে প্রেমই যে সত্য শাশ্বত মন্ত্র প্রচারক হে॥

            —অজ্ঞাত

বীর সেনাপতি বিবেকানন্দ ঐ যে ডাকিছে ‘আয়রে আয়’

আড়ানা — তেওঁড়া


বীর সেনাপতি বিবেকানন্দ ঐ যে ডাকিছে ‘আয়রে আয়’।

আহ্বানে তাঁর আপনা ভুলিয়া কত মহারথী ছুটিয়া যায়॥

আত্মত্যাগের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নবীন তন্ত্রে,

ভোগবাদ-জাত-দৈত্য দলিতে, আপনা সঁপিতে কে যাবি আয়॥

স্বার্থ-দ্বন্দ্ব-ভোগ-কোলাহল এনেছে জগতে শুধু হলাহল,

নিভাতে আজিকে এই দাবানল প্রেম বারি সে যে এনেছে হায়॥

এসো দেব এসো করুণা-নিধান, লহ আজি মম তনু-মন-প্রাণ,

কৃপা করি করো এ আশিস দান, তব কাজে যেন জীবন যায়॥

             —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আবার জাগিবে ভারত-হৃদয় তব করুণার স্পর্শে

ভৈরবী-দাদরা


আবার জাগিবে ভারত-হৃদয় তব করুণার স্পর্শে।

ধর্মে জাগিবে কর্মে মাতিবে এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষে॥

ভারত এবার কেন্দ্র আবার, দিকে দিগন্তে জয় জয়কার,

মাভৈঃ-মন্ত্র উঠে বারবার কত না বিজয়-হর্ষে॥

জাগিছে ভারত জ্ঞান-বিজ্ঞানে, জাগিছে সে রাজ্য-শাসনে,

জিনিয়া লবে সে আপন ভাগ্য হটিবে না কারও পরামর্শে।

নমো নমো বিবেকানন্দ, জাগালে ভারতে প্রাণের স্পন্দ,

উড়িল আবার আগের পতাকা এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষে॥

            —স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ

বিবেকানন্দ বিবেক-ভাস্কর উদিল ভারতে নিবারি’ আঁধার

আশাবরী-তেওড়া


বিবেকানন্দ বিবেক-ভাস্কর উদিল ভারতে নিবারি’ আঁধার।

ঐ হের নব অরুণকিরণে হরষে ধরণী হাসে আবার॥

কমললোচন মূরতি মোহন,

রতিপতি জিনি’ রূপ অনুপম,

বারেক হেরিলে হরে চিত মন,

নয়ন ফিরিতে চাহে না আর॥

সন্ন্যাসী তুমি বিষয়-বিরাগী,

তব চোখে জল বলো কার লাগি?

আপনা মুকতি-সাধনা তেয়াগি’

জীব-দুখে ঢালো নয়নধার।

মাভৈঃ মাভৈঃ গরজি’ সঘনে

জাগালে সুপ্ত শঙ্কিত জনে,

নরের মাঝারে পূজি’ নারায়ণে

যুগের সাধনা করিলে প্রচার।

     —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

বীরদর্পে বিজয় গাও হে, নিখিল ভারত পদে লুটাও হে

ইমনকল্যাণ—তেওড়া


বীরদর্পে বিজয় গাও হে, নিখিল ভারত পদে লুটাও হে।

দীর্ঘ সুপ্তি স্বার্থ তৃপ্তি দূরে ঘুচাও হে॥

ভিক্ষাবৃত্তি কৌপীন-বাস, বেদ গৌরব করি প্রকাশ,

ভ্রমিলা ধরণী ত্যজি আবাস,

মাথে তুমি তারে লও হে॥

যুগ-যুগান্ত নিদ্রাতুর, শুনো হে ভারত ভৈরব সুর,

অগৌরব সে করেছে দূর, শির তুলি দাঁড়াও হে।

পূজিছে পশ্চিম, পূজিছে পূরব, জয় জয় রব উঠিছে,

নব নব কীর্তিগাথা গাও হে॥

       —স্বামী প্ৰেমেশানন্দ

বলো গো ঠাকুর! বলো না আমারে, আনিলে এ কারে সাথে তোমার

ছায়ানট—একতাল


বলোগো ঠাকুর! বলোনা আমারে, আনিলে এ কারে সাথে তোমার।

ব্রহ্মতেজদীপ্ত আনন পুরুষসিংহ কে এ কুমার॥

বীরেশ্বর অমিতবীর্য, সুর-সেনাপতি জিনিয়া শৌর্য।

জ্ঞানে গরীয়ান, তাপস-প্রধান, প্রেমে ভাসমান নয়ন তার॥

ত্যাগে শুকদেব, প্রেমেতে নারদ, বুদ্ধের মতো হৃদয় যাঁর।

জ্ঞানে শিবগুরু-শঙ্কর-সম, সে কেন লুটায় পদে তোমার ?

হুঙ্কারে যাঁর কাপে ত্রিভুবন সে কেন মাগিছে তোমার শরণ ?

তোমারি আশিস করিয়া ধারণ সে কি গো হরিবে ধরার ভার॥

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

হে আনন্দ, বিবেকানন্দ

কল্যাণ—একতাল


হে আনন্দ, বিবেকানন্দ

হে মহা যোগীরাজ।

পরম প্ৰেম-মূর্তি তুম

হে গরীব নিবাজ॥

রামকৃষ্ণ তনয় তুম

সারদা প্রাণারাম।

ভারতকী আত্মা তুম

অন্দর কী আওয়াজ।

স্বামী সৰ্বর্গানন্দ

প্রণাম


নমঃ শ্ৰীতিরাজায় বিবেকানন্দসূরয়ে।

সচ্চিত্সুখস্বরূপায় স্বামিনে তাপহারিণে॥

          —স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ

নিরাকার ও বিবিধ ভজন

পরব্রহ্মস্তোত্রম্

পরব্রহ্ম — স্তোত্রম্


ও নমস্তে সতে সর্বলোকায়ায়

নমস্তে চিতে বিশ্বরূপাত্মকায়।

নমোঽদ্বৈততত্ত্বায় মুক্তিপ্রদায়

নমো ব্ৰহ্মণে ব্যাপিনে নির্গুণায়॥

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে

ইমনকল্যাণ–তেওড়া


আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥

নিজেরে করিতে গৌরব দান

নিজেরে কেবলই করি অপমান,

আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥

আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,

তোমারি ইচ্ছা কর হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।

যাচি হে তোমার চরমশান্তি

পরাণে তোমার পরমকান্তি—

আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও হৃদয়পদ্মদলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥

         —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে, তুমি অভাগারে চেয়েছ

মিশ্র-কানাড়া—একতাল


আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে, তুমি অভাগারে চেয়েছ;

আমি না ডাকিতে, হৃদয়মাঝারে নিজে এসে দেখা দিয়েছ।

চির আদরের বিনিময়ে, সখা, চির অবহেলা পেয়েছ;

(আমি) দূরে ছুটে যেতে, দু’হাত পসারি’

ধরে টেনে কোলে নিয়েছ॥

‘ও পথে যেও না, ফিরে এসো ব’লে কানে কানে কত কয়েছ;

(আমি) তবু চলে গেছি,

ফিরায়ে আনিতে পাছে পাছে ছুটে গিয়েছ।

(এই) চির-অপরাধী পাতকীর বোঝা হাসিমুখে তুমি ব’য়েছ;

(আমার) নিজহাতে গড়া বিপদের মাঝে,

বুকে করে নিয়ে রয়েছ।

       —রজনীকান্ত সেন

এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর

দেশ  ঝম্পক


এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর!

পুণ্য হল অঙ্গ মম, ধন্য হল অন্তর, সুন্দর হে সুন্দর॥

আলোকে মোর চক্ষুদুটি, মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি,

হৃদ্গগনে পবন হল সৌরভেতে মন্থর, সুন্দর, হে সুন্দর॥

এই তোমারি পরশ-রাগে চিত্ত হল রঞ্জিত,

এই তোমারি মিলন-সুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।

তোমার মাঝে এমনি করে নবীন করি লও যে মোরে,

এই জনমে ঘটালে মোর জন্ম-জন্মান্তর, সুন্দর হে সুন্দর॥

            —রবীন্দ্রনাথ ঠাকু

ঐ যে দেখা যায় আনন্দধাম

সিন্ধু বিজয়-তেওড়া


ঐ যে দেখা যায় আনন্দধাম,

অপূর্ব শোভন ভব-জলধির পারে, জ্যোতির্ময়॥

শোক-তাপিত জন সবে চল, সকল দুঃখ হবে মোচন;

শান্তি পাইবে হৃদয় মাঝে, প্রেম জাগিবে অন্তরে।

কত যোগীন্দ্র ঋষি মুনিগণ, না জানি কী ধ্যানে মগন,

স্তিমিত-লোচন কী অমৃত-রস পানে ভুলিল চরাচর;

কী সুধাময় গান গাহিছে সুরগণ, বিমল বিভুগুণ বন্দন,

কোটি চন্দ্র তারা উলসিত, নৃত্য করিছে অবিরাম।

       —জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

কে তোমারে জানতে পারে, তুমি না জানালে পরে

প্রসাদী লুম-ঝিঝিট — দাদরা


কে তোমারে জানতে পারে, তুমি না জানালে পরে।

বেদ-বেদান্ত পায় না অন্ত, খুঁজে বেড়ায় অন্ধকারে॥

যাগ-যজ্ঞ তপযোগ, সকলি হয় কর্মভোগ;

কর্ম তোমার মর্ম কি পায়, তুমি সর্ব কর্ম পারে॥

সৃষ্টি-জোড়া তোমার মায়া, কায়া নাই কেবলি ছায়া,

মাঠের মাঝে আকাশ ধরা, ঘুরে সারা চারি ধারে

তুমি প্রভু ইচ্ছাময়, যদি তোমার ইচ্ছা হয়,

অসাধ্য সুসাধ্য তার, তুমি কৃপা করো যারে॥

তব কৃপা আশা করি, রয়েছি জীবন ধরি,

কৃপানাথ কৃপা করি, এসো বসো হৃদমাঝারে॥

         —দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে

ভৈরবী—ত্রিতাল


খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।

প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল খেলা, নিরজনে প্রভু নিরজনে॥

শূন্যে মহা আকাশে, (তুমি) মগ্ন লীলা বিলাসে;

ভাঙ্গিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু নিরজনে॥

তারকা রবি-শশী খেলনা তব হে উদাসী!

পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে, রাশি রাশি;

নিত্য তুমি হে উদার সুখে দুখে অ-বিকার;

হাসিছ খেলিছ তুমি আপন সনে, নিরজনে প্রভু, নিরজনে॥

           —নজরুল ইসলাম

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই

বেহাগ - কাহারবা


তােমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই—

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই॥

মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ,

তােমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই॥

হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে,

যাহা কিছু সব আছে আছে আছে—

নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারি, নিশিদিন কাঁদি তাই।

অন্তর-গ্লানি সংসার-ভার, পলক ফেলিতে কোথা একাকার,

জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই॥

         —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জাগো সকল অমৃতের অধিকারী

আশাবরী - ঝাঁপতাল


জাগো সকল অমৃতের অধিকারী।

নয়ন খুলিয়ে দেখ করুণানিধান, পাপতাপহারী॥

পূরব অরুণ জ্যোতি মহিমা প্রচারে, বিহগ যশ গায় তাহারি॥

হৃদয়-কপাট খুলি দেখরে যতনে, প্রেমময় মূরতি জনচিত্তহারী;

ডাকরে নাথে, বিমল প্রভাতে, পাইবে হৃদয়ে শান্তির বারি॥

          —দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমারি নাম বলব, আমি বলব নানা ছলে

বেহাগ-কাহারবা


তোমারি নাম বলব, আমি বলব নানা ছলে,

(আমি) ব’লব একা বসে আপন মনের ছায়াতলে॥

ব’লব বিনা ভাষায়, ব’লব বিনা আশায়,

ব’লব মুখের হাসি দিয়ে, ব’লব চোখের জলে॥

বিনা-প্রয়োজনের ডাকে ডাকব তোমার নাম,

সেই ডাকে মোর শুধু-শুধুই পূরবে মনস্কাম।

শিশু যেমন মাকে, নামের নেশায় ডাকে,

বলতে পারে এই সুখেতেই মায়ের নাম সে বলে॥

          —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তােমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে

খাম্বাজ-একতাল


তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

আমার প্রাণ তোমারি দান, তুমিই ধন্য ধন্য হে॥

পিতার বক্ষে রেখেছ মোরে, জনম দিয়েছ জননী-ক্রোড়ে,

বেঁধেছ সখার প্রণয়-ডোরে, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

তোমার বিশাল বিপুল ভুবন করেছ আমার নয়নলোভন

নদী গিরি বন সরসশোভন, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

হৃদয়ে-বাহিরে স্বদেশে-বিদেশে যুগে-যুগান্তে, নিমেষে-নিমেষে

জনমে-মরণে শোকে-আনন্দে, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

          —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দাও তেজ তেজোময় চিত্তে আমার

আড়ানা-ঝাপতাল


দাও তেজ তেজোময় চিত্তে আমার

বীর্য অমৃত দাও, অমৃত পাথার॥

দাও দেহে নব শক্তি, হৃদয়ে অচলা ভক্তি,

দূর কর মোহ-সুপ্তি, ওহে সারাৎসার॥

দাও আলো, দাও আশা, দাও সঞ্জীবনী ভাষা,

দাও জ্ঞান, দাও প্রাণ, হে প্রাণ-আধার,

দাও খুলে প্রেম-আঁখি, সবই শিবময় দেখি,

চরণে শরণ দাও তনয়ে তোমার॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

(তুই) পূজার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখিস হৃদয়-দেউল মাঝে

কাফি-সিন্ধু-তেওড়া


(তুই) পূজার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখিস হৃদয়-দেউল মাঝে।

ভক্তি-প্রেমের ধূপটি জ্বালাস নিত্য সকাল-সাঁঝে।

পাবি যেদিন দুঃখ-ব্যথা, দেবতারই পায় নোয়াস্ মাথা,

বলিস “তোমার ইচ্ছা ফলুক, আমার জীবন মাঝে”॥

আপনাকে তাঁর ভৃত্য রাখিস, তাঁকে করিস রাজা,

তাঁর তরে তুই আসন পাতিস ফুলের মালা সাজা।

তবু যদি দেখা না পাস, চোখের জলে বেদনা জানাস;

বলিস “প্রিয়! তোমার তরে এ দেহে প্রাণ আছে”॥

        —রজনীকান্ত সেন

নাহি সূর্য নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর

বাগেশ্রী — আড়া


নাহি সূর্য নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর,

ভাসে ব্যোমে ছায়াসম, ছবি বিশ্ব-চরাচর।

অস্ফুট মন-আকাশে, জগৎ সংসার ভাসে,

ওঠে ভাসে ডুবে পুনঃ, অহং-স্রোতে নিরন্তর॥

ধীরে ধীরে ছায়াদল, মহালয়ে প্রবেশিল,

বহে মাত্র “আমি আমি”—এই ধারা অনুক্ষণ।

সে ধারাও বদ্ধ হ’ল, শূন্যে শূন্য মিলাইল,

অবা মনসোগোচর’ বোঝে প্রাণ বোঝে যার॥

          —স্বামী বিবেকানন্দ

যাবে কি হে দিন আমার বিফলে চলিয়ে

মূলতান — একতাল


যাবে কি হে দিন আমার বিফলে চলিয়ে।

আছি নাথ, দিবানিশি আশা-পথ নিরখিয়ে॥

তুমি ত্রিভুবন-নাথ আমি ভিখারী অনাথ,

কেমনে বলিব তোমায়, ‘এসো হে মম হৃদয়ে’।

হৃদয়-কুটীর-দ্বার, খুলে রাখি অনিবার,

কৃপা করে একবার এসে কি জুড়াবে হিয়ে॥

       বেচারাম চট্টোপাধ্যায়

মন চলাে নিজ নিকেতনে

সুরট-মল্লার — একতাল


মন চলো নিজ নিকেতনে।

সংসার বিদেশে, বিদেশীর বেশে, ভ্রম কেন অকারণে?

বিষয় পঞ্চক আর ভূতগণ, সব তোর পর কেহ নয় আপন,

পর-প্রেমে কেন হয়ে অচেতন, ভুলিছ আপন জনে?

সত্য-পথে মন করো আরোহণ,

প্রেমের আলো জ্বালি চলো অনুক্ষণ,

সঙ্গেতে সম্বল রাখো পুণ্যধন, গোপনে অতি যতনে।

লোভ-মোহ-আদি পথে দস্যুগণ, পথিকের করে সর্বস্ব মোষন,

পরম যতনে রাখো রে প্রহরী শম দম দুইজনে॥

সাধুসঙ্গ নামে আছে পান্থধাম, শ্রান্ত হলে তথা করিবে বিশ্রাম,

পথভ্রান্ত হলে শুধাইবে পথ সে পান্থনিবাসগণে;

যদি দেখো পথে ভয়েরি আকার, প্রাণপণে দিও দোহাই রাজার,

সে পথে রাজার প্রবল প্রতাপ, শমন ডরে যাঁর শাসনে॥

অযোধ্যানাথ পাকড়াশী

রাখো মোরে তব বাহিনীতে, প্রভু! রাখো মোরে তোমারি সাথে

ভৈরবী — কাহারবা


রাখো মোরে তব বাহিনীতে, প্রভু! রাখো মোরে তোমারি সাথে।

যতদিন এ দেহে প্রাণ রহিবে চলি যেন তোমারি পথে।

যত কাজ করি এ জীবনে, যাহা কিছু ভাবি এই মনে,

সবই যেন ধায় তোমা পানে, লাগে যেন তব সেবাতে॥

অগ্নিমন্ত্র মোরে দিয়া সঞ্জীবিত করো হিয়া,

(প্রভু) তোমারি কার্য সাধিয়া প্রাণ যেন মিশে তোমাতে॥

      —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

কী মধু তোমার নামে, কী মধু তোমার গানে

ভাটিয়ালি


কী মধু তোমার নামে, কী মধু তোমার গানে,

যে জেনেছে সেই বুঝেছে তার প্রাণে॥

আপন-ভাবে সবার মাঝে,     সদাই রয় সকল কাজে,

বিশ্বমাঝে তোমার খেলা এই কথাটি সেই তো জানে॥

সংসারের এই কোলাহলে,     শান্তি তাহার নাহি টলে,

দুঃখ-সুখের মালা গেঁথে সাজায় তোমায় যতনে॥

          —অজ্ঞাত

(ওহে) রাজা রাজেশ্বর দেখা দাও

কানাড়া - কাওয়ালি


(ওহে) রাজা রাজেশ্বর দেখা দাও।

করুণা-ভিখারী আমি, করুণ-নয়নে চাও॥

চরণে উৎসর্গ দান, করিয়াছি এই প্রাণ,

সংসার-অনলকুণ্ডে ঝলসি গিয়াছে তাও॥

কলুষ-কলঙ্কে ভরা আবরিত এ হৃদয়

মোহে মুগ্ধ মৃতপ্রায় হয়ে আছি দয়াময়,

মৃতসঞ্জীবনী দানে শোধন করিয়া লও॥

      —স্বর্ণকুমারী ঘোষাল

শৌর্য দাও, বীর্য দাও, নবীন জীবন দাও

ভৈরবী — দাদরা (জলদ)


শৌর্য দাও—

শৌর্য দাও, বীর্য দাও, নবীন জীবন দাও,

পরা অপরা বিদ্যা দাও, দিব্য চেতন দাও॥

কর্মে শক্তি দাও, হৃদয়ে ভকতি দাও,

নির্মল শুভ বুদ্ধি দাও, জ্ঞান-গরিমা দাও॥

ত্যাগেতে মতি দাও, সেবাতে প্রীতি দাও,

স্বার্থদ্বন্দ্ব ভেদবুদ্ধি চিরতরে মুছে দাও॥

এ নব যুগের নবীন তন্ত্রে দীক্ষিত কর মিলন-মন্ত্রে,

সার্থক করো জীবন মোদের চরণে শরণ দাও॥

       —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে

ইমন-কল্যাণ — তেওড়া


সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।

তুমি সদা যার হৃদে বিরাজ দুখজ্বালা সেই পাশরে-

সব দুখজ্বালা সেই পাশরে॥

তোমার জ্ঞানে, তোমার ধ্যানে, তব নামে কত মাধুরী

যেই ভকত সেই জানে, তুমি জানাও যারে সেই জানে।

ওহে, তুমি জানাও যারে সেই জানে॥

         —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সকল দেশের ভগবান নমি তোমার পায়

ভৈরবী - দাদরা


সকল দেশের ভগবান নমি তোমার পায়।

তোমার কাজে তোমার ধ্যানে যেন জীবন যায়॥

সকল জাতের ঋষি যত সবার পায়ে হই গো নত,

ধন্য করো জীবন মোদের দিয়ে পদ-ছায়॥

আমরা সবাই একটি জাত, একই ভগবান

একই সুরে থাকুক বাঁধা মোদের সকল প্রাণ॥

‘সত্য’ মোদের ধ্রুবতারা, আর হবো না লক্ষ্যহারা

সফল হবে সকল জীবন সত্যেরি সেবায়॥

         —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু

সিন্ধু-ভৈরবী — একতাল


যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু

দ্বার ভেঙে তুমি এসো মোর প্রাণে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু॥

যদি কোনো দিন এ বীণার তারে তব প্রিয়নাম নাহি ঝঙ্কারে

দয়া করে তবু রহিয়ো দাঁড়ায়ে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু॥

যদি কোনো দিন তোমার আহ্বানে সুপ্তি আমার চেতনা না মানে

বজ্ৰ-বেদনে জাগায়ো আমারে, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু॥

যদি কোনো দিন তোমার আসনে আর কাহারেও বসাই যতনে,

চিরদিবসের হে রাজা আমার, ফিরিয়া যেয়ো না প্রভু॥

        —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মোরা বিদ্য-বাধা-ভরা পথ দলি

ভীমপলশ্রী — ত্রিতাল


মোরা বিঘ্ন-বাধা-ভরা পথ দলি,

আলো তীর্থ লাগি দূর পানে চলি।

মোরা স্বর্গ সুধা আমি ধূলিতটে, দিব ফল ফুলে ঢাকি মরুস্থলী।

মোরা দিব বাণী কোটি মূকজনে, দিব দীপ জ্বালি তমোলীন মনে।

নব-সুখ হাসি আনি ম্লানমুখে, দিব বিশ্বসেবাব্রতে আত্মবলি।

মোরা ভীম বলে যুঝি বিঘ্ন সাথে, রামকৃষ্ণ কৃপাশিস ধরি মাথে।

যাব তুচ্ছ করি জরা, মৃত্যু, ব্যধি, যথা প্রেম-পারাবার ছলছলি।

        —ব্রহ্মচারী জ্যোতির্ময়চৈতন্য

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা

আলাইয়া — ঝাপতাল


তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,

এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা॥

যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো।

আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা ।

তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সঙ্গোপনে,

তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা॥

কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি

অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা॥

       —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুমি নাহি দিলে দেখা, কে তোমায় দেখিতে পায়?

জয়জয়ন্তী – ঝাপতাল


তুমি নাহি দিলে দেখা, কে তোমায় দেখিতে পায়?

তুমি না ডাকিলে কাছে, সহজে কি চিত ধায়?

তুমি পূর্ণ পরাৎপর, তুমি অগম্য অপার,

ওহে নাথ, সাধ্য কার, ধ্যানেতে ধরে তোমায়॥

মনেরে বুঝাই এত, তুমি বাক্যমনাতীত,

তবু প্রাণ ব্যাকুলিত, তোমারে দেখিতে চায়॥

দিয়ে দীনে দরশন, কর হে দুঃখ মোচন,

ওহে লজ্জানিবারণ শীতল করো হৃদয়॥

    –বেচারাম চট্টোপাধ্যায়

প্রভু মেরে অবগুণ চিত ন ধরো

ভৈরবী — ঠুংরি


প্রভু মেরে অবগুণ চিত ন ধরো।

সমদরশী হৈ নাম তিহারো, চাহে তো পার করো॥

ইক লোহা পূজা মে রাখত, ইক রহত ব্যাধ-ঘর পরো,

পারশ কে মন দ্বিধা নাহী হ্যায়, দুহঁ এক কাঞ্চন করো॥

ইক নদিয়া ইক নার কহাবত মৈলো নীর ভরো;

জব্ মিলি দোনো এক বরণ ভয়ে সুর সুরি নাম পরো॥

ইক জীব ইক ব্রহ্ম কহাবত সুরদাস ঝগরো,

অজ্ঞানোসে ভেদ হোবে, জ্ঞানী কাহে ভেদ করো॥

          —সুরদাস

নীচুর কাছে নীচু হ’তে শিখলি না রে মন

বাউল—একতাল


নীচুর কাছে নীচু হ’তে শিখলি না রে মন!

(ও) তুই সুখী জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন—মূঢ় মন!

লাগেনি যার পায়ে ধূলি, কী নিবি তার চরণ-ধূলি ?

নয় রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন—মূঢ় মন!

প্রেম-ধন মায়ের মতন, দুঃখী সুতেই অধিক যতন;

এই ধনেতে ধনী যে জন সেই তো মহাজন—মূঢ় মন!

বৃথা রে তোর কৃচ্ছসাধন; সেবাই নরের শ্রেষ্ঠ সাধন।

মানবের পরম তীর্থ দীনের শ্রীচরণ—মূঢ় মন!

মতামতের তর্কে মত্ত, আছিস ভুলে সরল সত্য;

সকল ঘরে সকল নরে আছেন নারায়ণ—মূঢ় মন!

       —অতুলপ্রসাদ সেন

এবার আমার ভাঙ্গল ঘুম, স্বপ্ন দেখা শেষ হ’ল

মিশ্র — একতাল


এবার আমার ভাঙ্গল ঘুম, স্বপ্ন দেখা শেষ হ’ল।

এবার আমায় ভেঙ্গে-গড়ে তোমার মতো করে তোল॥

মায়ার পিছে ছুটে ছুটে, তৃষ্ণা আমার গেছে মিটে,

তোমায় ছাড়া যা পেলাম সবই আমার কাল হ’ল।

নেশার ঘোরে পথ ভুলে, তোমায় ছেড়ে গেলাম চলে,

এবার নেশা গেল ছুটে প্রভু তোমার দ্বার খোলো।

       —অজ্ঞাত

সুন্দর তোমারি নাম দীনশরণ হে

কাফি — ঝাপতাল


সুন্দর তোমারি নাম দীনশরণ হে।

বরষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ, ও প্রাণরমণ হে॥

এক তব নাম ধন, অমৃত-ভবন হে

অমর হয় সেইজন, যে করে কীর্তন হে॥

গভীর বিষাদরাশি নিমেষে বিনাশে,

যখনি তব নামসুধা শ্রবণে পরশে;

হৃদয় মধুময় তব নাম গানে,

হয় হে হৃদয়নাথ চিদানন্দঘন হে॥

    —পুণ্ডরীকাক্ষ মুখোপাধ্যায়

তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে

ভৈরবী — একতাল


তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে;

তব, পুণ্যকিরণ দিয়ে যাক, মোর মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।

লক্ষ্য-শূন্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে,

জানি না কখন ডুবে যাবে কোন্ অকূল-গরল-পাথারে

প্রভু, বিশ্ব বিপদ হন্তা, তুমি দাঁড়াও রুধিয়া পন্থা,

তব শ্রীচরণতলে নিয়ে এসো, মোর, মত্ত-বাসনা গুছায়ে।

আছ, অনল-অনিলে, চিরনভোনীলে, ভূধরসলিলে গহনে,

আছ, বিটপিলতায়, জলদের গায়, শশীতারকায় তপনে,

আমি নয়নে বসন বাঁধিয়া, বসে, আঁধারে মরি গো কাঁদিয়া;

আমি, দেখি নাই কিছু, বুঝি নাই কিছু,

দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে॥

    —রজনীকান্ত সেন

ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে, আমার মন

বাউল — আড়খেম্টা


ডুব্ ডুব্ ডুব্ রূপসাগরে, আমার মন।

তলাতল পাতাল খুঁজলে, পাবিরে প্রেম রত্নধন॥

খুঁজ্ খুঁজ্ খুঁজ্ খুঁজলে পাবি হৃদয় মাঝে বৃন্দাবন।

দীপ্ দীপ্ দীপ্ জ্ঞানের বাতি, জ্বলবে হৃদে অনুক্ষণ।

ড্যাং ড্যাং ড্যাং ডাঙ্গায় ডিঙে চালায়, আবার সে কোন জন,

কুবীর বলে শোন্ শোন্ শোন্ ভাবো গুরুর শ্রীচরণ॥

         —কুবীর

সবারে বাসরে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে

ভৈরবী — একতাল


সবারে বাসরে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে।

আছে তোর যাহা ভালো, ফুলের মতো দে সবারে।

করি তুই আপন আপন হারালি যা ছিল আপন;

এবার তোর ভরা আপণ, বিলিয়ে দে তুই যারে তারে।

যারে তুই ভাবিস ফণী, তারো মাথায় আছে মণি;

বাজা তোর প্রেমের বাঁশী—ভবের বনে ভয় বা কারে?

সবাই যে তোর মায়ের ছেলে, রাখবি কারে, কারে ফেলে?

একই নায়ে সকল ভায়ে যেতে হবে রে ওপারে॥

        —অতুলপ্রসাদ সেন

শ্ৰীশ্ৰীযিশুখ্রিষ্ট সংগীত

পান্থনিবাস মাঝে কে হাসে শিশু শশী

কেদারা — কাওয়ালি


পান্থনিবাস মাঝে কে হাসে শিশু শশী।

গগন ছাড়িয়া চাঁদ ভূতলে উদয় আসি॥

চাঁদ ও তো নয় হায়, চাঁদ পড়ে তারই পায়,

ত্রিভুবন আলো করে শ্রীমুখেতে দেব হাসি॥

সেই হাসি নিরখিয়া পুলকে পূরিল হিয়া

গগনে উঠিল গান জয় জয় ঈশামসি॥

     —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

শ্রীশ্রীমহম্মদ সংগীত

সে যে, ঈশ্বরেরই দূত, এসেছে ধরাতলে

যোগীয়া — তেওড়া


সে যে, ঈশ্বরেরই দূত, এসেছে ধরাতলে।

সে যে লভিল দিব্যজ্ঞান কঠোর সাধনবলে॥

(সে যে) মহান মানব-প্রেমিক,     হারায় দিক্বিদিক্

ভালোবেসে দেশে দেশে সবে করে কোলে॥

এসো সবে এসো,     ভাই-বলে সবে ভালোবেসো

দুঃখ ভুলি, স্বার্থ ভুলি প্রীতির-মালা পরাও গলে॥

শোনো তার অভয়বাণী,—দূর হোক যত গ্লানি,

কে আছ অন্ধ ঘুচাও দ্বন্দ্ব দাঁড়াও প্রেমের পতাকাতলে॥

শ্ৰীশ্ৰীবুদ্ধদেব সংগীত

জুড়াইতে চাই—কোথায় জুড়াই

ধানি-মিশ্র — একতাল


জুড়াইতে চাই—কোথায় জুড়াই?

কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই!

ফিরে ফিরে আসি, কত কাঁদি হাসি,

কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই।

কে খেলায়,—আমি খেলি বা কেন?

জাগিয়ে ঘুমাই কুহকে যেন,

এ কেমন ঘোর, হবে নাকি ভোর,

অধীর—অধীর যেমতি সমীর,

অবিরাম গতি নিয়ত ধাই!

জানি না কে বা এসেছি কোথায়,

কেন বা এসেছি, কে বা নিয়ে যায়।

যাই ভেসে ভেসে, কত কত দেশে,

চারিদিকে গোল, উঠে নানা রোল,

কত আসে যায়, হাসে কঁাদে গায়,

এই আছে আর তখনি নাই ৷

কী কাজে এসেছি কী কাজে গেল,

কে জানে কেমন, কী খেলা হ’ল;

প্রবাহের বারি-রহিতে কি পারি?

যাই,—যাই কোথা? কূল কি নাই?

কর হে চেতন,—কে আছ চেতন,

কতদিনে আর ভাঙ্গিবে স্বপন?—

যে আছ চেতন, ঘুমাও না আর,

দারুণ এ ঘোর নিবিড় আঁধার,—

কত তম নাশ, হও হে প্রকাশ,—

তোমা বিনা আর নাহিকো উপায়,

তব পদে তাই শরণ চাই।

   —গিরিশচন্দ্র ঘোষ

ধ্যানস্তিমিতলোচন যোগী কে তুমি বসি’ তরুতলে


ভীমপলশ্রী — একতাল


ধ্যানস্তিমিতলোচন যোগী কে তুমি বসি’ তরুতলে।

তপের তাপেতে শীর্ণ শরীর, শ্রীমুখেতে তবু জ্যোতি খেলে॥

হেরি রাজটীকা ভালেতে তোমার, মনে লয় বুঝি রাজার কুমার,

প্রাসাদ কাহার করি অন্ধকার, যৌবনে যোগী সাজিলে॥

তুমি কি হে আজি করিয়াছ পণ, “জ্ঞান লাভ কিংবা শরীর-পাতন,”

নেহারিয়া তব ত্যাগ অতুলন, পাষাণ-হৃদয় যায় গলে॥

ত্রিতাপ-তাপিত জীবের উদ্ধার,

করিতে তুমি কি আসিলে আবার,

‘প্রেম-মৈত্রী’ করিতে প্রচার সব সুখআশ তেয়াগিলে।

          —স্বামী চণ্ডিকানন্দ

চাই মৈত্রী আর প্রেম আর করুণা

মিশ্র রাগ


চাই মৈত্রী আর প্রেম আর করুণা।

শোনো বন্ধু শোনো তার এই ঘোষণা॥

শোনো বন্ধু বুদ্ধের এই বাণী

শোন বন্ধু দীন-ধনী আর অভিমানী

তৃষ্ণা তব শান্ত করো, অন্তরে বহে যেন নির্মল প্রেম-ঝরণা॥

চলো ভাই যাই তার কাছে

যেথা তৃষ্ণা-হরণ শান্তি বারি আছে।

দুঃখ ঘোচায়, শান্তি জাগায় দূর করি ছলনা॥

      —অজ্ঞাত

স্বদেশ সংগীত

জাতীয় সংগীত

জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ

বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ

তব শুভ নামে জাগে,     তব শুভ আশিস মাগে,

গাহে তব জয়গাথা৷

জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥১

অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী

হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খ্রীষ্টানী

পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে,

প্রেমহার হয় গাঁথা৷

জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥২

পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা, যুগ-যুগ ধাবিত যাত্রী

তুমি চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি৷

দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে

সঙ্কটদুঃখত্রাতা।

জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥৩

ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে

জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে৷

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে

স্নেহময়ী তুমি মাতা।

জনগণদুঃখত্ৰায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥৪

রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে—

গাহে বিহঙ্গম, পূণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।

তব করুণারুণরাগে    নিদ্রিত ভারত জাগে 

তব চরণে নত মাথা।

জয় জয় জয় হে, জয় রাজেশ্বর ভারতভাগ্যবিধাতা!

জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥৫

     —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বলো বলো বলো সবে

মিশ্র-খাম্বাজ—দাদরা


বলো বলো বলো সবে,     শত-বীণা-বেণু-রবে,

ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।

ধর্মে মহান হবে,     কর্মে মহান হবে,

নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পূরবে।

আজও গিরিরাজ রয়েছে প্রহরী,

ঘিরি তিন দিক নাচিছে লহরী;

যায়নি শুকায়ে গঙ্গা গোদাবরী, —এখনও অমৃতবাহিনী।

প্রতি প্রান্তর, প্রতি গুহা বন,

প্রতিজনপদ, তীর্থ অগণন, কহিছে গৌরব-কাহিনী॥

বিদুষী মৈত্রেয়ী খনা লীলাবতী, সতী সাবিত্রী সীতা অরুন্ধতী,

বহু বীরবালা বীরেন্দ্র-প্রসূতি, আমরা তাঁদেরই সন্ততি।

অনলে দহিয়া রাখে যারা মান,

পতিপুত্র তরে সুখে ত্যজে প্রাণ, —আমরা তাঁদেরই সন্ততি॥

ভোলেনি ভারত ভোলেনি সেকথা, অহিংসার বাণী উঠেছিল হেথা,

নানক নিমাই করেছিল ভাই সকল ভারত-নন্দনে।

ভুলি ধর্ম-দ্বেষ জাতি অভিমান,

ত্রিশ কোটি দেহ হবে এক প্রাণ, একজাতি প্রেম-বন্ধনে॥

মোদের এদেশ নাহি রবে পিছে,

ঋষি-রাজকুল জন্মেনি মিছে,

দু’দিনের তরে হীনতা সহিছে, জাগিবে আবার জাগিবে।

আসিবে শিল্প ধন বাণিজ্য,

আসিবে বিদ্যা বিনয় বীর্য, আসিবে আবার আসিবে॥

এসো হে কৃষক কুটির—নিবাসী,

এসো অনার্য গিরি—বনবাসী,

এসো হে সংসারী, এসো হে সন্ন্যাসী, —মিলো’ হে মায়ের চরণে॥

এসো অবনত, এসো হে শিক্ষিত,

পরহিত-ব্রতে হইয়া দীক্ষিত, —মিলো’ হে মায়ের চরণে।

এসো হে হিন্দু, এসো মুসলমান,

এসো হে পারসী, বৌদ্ধ, খ্রিস্টিয়ান্,—মিল হে মায়ের চরণে॥

অতুলপ্রসাদ সেন

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে

বাউল—দাদরা


যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।

একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে॥

যদি কেউ কথা না কয় (ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়—

তবে পরাণ খুলে’,

ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা, একলা বলো রে;

যদি সবাই ফিরে’ যায় —(ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়

তবে পথের কাঁটা

ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা দলো রে॥

যদি আলো না ধরে (ওরে ওরে ও অভাগা!)

যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে—

তবে বজ্রানলে

আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে॥

রবীন্দ্রনাথ ঠাকু

ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

মিশ্র-কেদারা—একতাল


ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,

তাহার মাঝে আছে দেশ এক—সকল দেশের সেরা;—

ও সে, স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা;

(কোরাস)—এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,

সকল দেশের রাণী সে যে—আমার জন্মভূমি।

চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা, কোথায় উজল এমনধারা!

কোথায় এমন খেলে তড়িৎ এমন কালো মেঘে!

(ও তার) পাখীর ডাকে ঘুমিয়ে উঠি, পাখীর ডাকে জেগে;

(কোরাস)—এমন দেশটি কোথাও... ইত্যাদি॥

এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধুম্র পাহাড়!

কোথায় এমন হরিৎ-ক্ষেত্র আকাশতলে মিশে!

এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে!

(কোরাস)—এমন দেশটি কোথাও... ইত্যাদি

পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী; কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখী;

গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে

তারা, ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে;

(কোরাস)—এমন দেশটি কোথাও... ইত্যাদি

ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ!

ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি,

আমার এই দেশেতে জন্ম — যেন এই দেশেতে মরি—

(কোরাস)—এমন দেশটি কোথাও... ইত্যাদি

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

১ পাঠান্তর > দেশেতেই


যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী

ইমন-ভূপালী—দাদরা


যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী! ভারতবর্ষ!

উঠিল বিশ্বে সে কী কলরব, সে কী মা ভক্তি, সে কী মা হর্ষ!

সেদিন তোমার প্রভায় ধরার প্রভাত হইল গভীর রাত্রি;

বন্দিল সবে, “জয় মা জননী! জগত্তারিনী! জগদ্ধাত্রী!”

(কোরাস) — ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ;

গাইল, “জয় মা জগন্মোহিনী! জগজ্জননী! ভারতবর্ষ!”

সদ্যঃস্নান-সিক্ত-বসনা চিকুর সিন্ধু-শীকরলিপ্ত।

ললাটে গরিমা, বিমল হাস্যে অমল-কমল-আনন দীপ্ত;

উপরে গগন ঘেরিয়া নৃত্য করিছে তপন তারকা, চন্দ্র;

মন্ত্র-মুগ্ধ, চরণে ফেনিল জলধি গরজে জলদ মন্দ্ৰ৷৷

(কোরাস) — ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ;

শীর্ষে শুভ্র তুষার কিরীট, সাগর-ঊর্মি ঘেরিয়া জঙ্ঘা,

বক্ষে দুলিছে মুক্তার হার  পঞ্চসিন্ধু যমুনা গঙ্গা।

কখন মা তুমি ভীষণ দীপ্ত তপ্ত মরুর ঊষর দৃশ্যে;

হাসিয়া কখনো শ্যামল শস্যে, ছড়ায়ে পড়িছ নিখিল বিশ্বে॥

(কোরাস) — ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ;

উপরে, পবন প্রবল স্বননে শূন্যে গরজি অবিশ্রান্ত,

লুটায়ে পড়িছে পিক-কলরবে চুম্বি তোমার চরণ-প্রান্ত,

উপরে, জলদ হানিয়া বজ্র, করিয়া প্রলয়-সলিল-বৃষ্টি—

চরণে তোমার কুঞ্জকানন কুসুমগন্ধ করিছে সৃষ্টি॥

(কোরাস)—ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ;

জননী; তোমার বক্ষে শান্তি, কণ্ঠে তোমার অভয়-উক্তি,

হস্তে তোমার বিতর অন্ন, চরণে তোমার বিতর মুক্তি।

জননী! তোমার সন্তান তরে কত না বেদনা কত না হর্ষ;

জগৎপালিনী! জগত্তাবিণী! জগজ্জননী! ভারতবর্ষ!

(কোরাস)—ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ;

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

উঠোগো ভারতলক্ষ্মী

মিশ্র—ত্রিতাল


উঠোগো ভারতলক্ষ্মী! উঠো আদি জগত-জন-পূজ্যা,

দুঃখ দৈন্য সব নাশি, করো দূরিত ভারত-লজ্জা।

ছাড়োগো ছাড়ো শোক-শয্যা, করো সজ্জা

পুনঃ কমল কনক ধন-ধান্যে।

জননী গো লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কাঁদিছে তব চরণতলে ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো।

কাণ্ডারী নাহিকো কমলা দুঃখ-লাঞ্ছিত ভারতবর্ষে,

শঙ্কিত মোরা সব যাত্রী, কাল-সাগর-কম্পন দর্শে,

তোমার অভয় পদ-স্পর্শে, নব হর্ষে,

পুনঃ চলিবে তরণী শুভ লক্ষ্যে

জননী গো, লহ তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কাঁদিছে তব চরণতলে ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো।

ভারত-শ্মশান করো পূর্ণ পুনঃ কোকিল-কূজিত কুঞ্জে,

দ্বেষ-হিংসা করি’ চূর্ণ, করো পূরিত প্রেম-অলি-গুঞ্জে,

দূরিত করি পাপ-পুঞ্জে, তপঃ-তুঞ্জে,

পুনঃ বিমল করো ভারত পুণ্যে৷

জননী গো, লহো তুলে বক্ষে, সান্ত্বন-বাস দেহ তুলে চক্ষে;

কাঁদিছে তব চরণতলে ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো॥

অতুলপ্রসাদ সেন

মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা

বাউল—দাদরা


মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা!

তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা।

কী যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,

(এমন কোথা আর আছে গো!)

গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা॥

ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা,

(মরি হায়, হায়রে!)

আছে কৈ এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা॥

বিদ্যাপতি, চণ্ডি, গোবিন্, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন;

(আরও কত মধুপ গো!)

ঐ ফুলেরই মধুর রসে বাঁধলো সুখে মধুর বাসা

বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আন্‌লো মালা জগৎ জিনে!-

(গরব কোথায় রাখি গো!)

তোমার চরণ-তীর্থে আজি জগৎ করে যাওয়া আসা॥

ঐ ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাক্‌নু মায়ে “মা, মা,” বলে;

ঐ ভাষাতেই ব’লবো ‘হরি’, সাঙ্গ হ’লে কাঁদা হাসা॥

অতুলপ্রসাদ সেন

ভারত আমার, ভারত আমার, যেখানে মানব মেলিল নেত্র

ইমন-ভূপালী—একতাল


ভারত আমার, ভারত আমার, যেখানে মানব মেলিল নেত্র;

মহিমার তুমি জন্মভূমি মা, এশিয়ার তুমি তীর্থক্ষেত্র

দিয়াছ মানবে জগজ্জননী, দর্শন-উপনিষদে দীক্ষা;

দিয়াছ মানবে জ্ঞান ও শিল্প, কর্ম-ভক্তি ধর্ম-শিক্ষা৷

(কোরাস)—ভারত আমার, ভারত আমার,

কে বলে মা তুমি কৃপার পাত্রী?

কর্ম-জ্ঞানের তুমি মা জননী, ধর্ম-ধ্যানের তুমি মা ধাত্রী।

ভগবদগীতা গায়িল স্বয়ং ভগবান সেই জাতির সঙ্গে;

ভগবৎ প্রেমে নাচিল গৌর যে দেশের ধূলি মাখিয়া অঙ্গে৷

সন্ন্যাসী সেই রাজার পুত্র প্রচার করিল নীতির মর্ম;

যাদের মধ্যে তরুণ তাপস প্রচার করিল ‘সোহহং’ ধর্ম।

(কোরাস)—ভারত আমার ইত্যাদি—

আর্য ঋষির অনাদি গভীর, উঠিল যেখানে বেদের স্তোত্র;

নহ কি মা তুমি সে ভারতভূমি নহি কি আমরা তাঁদের গোত্র!

তোমার গরিমা-স্মৃতির বর্মে, চলে যাব শির করিয়া উচ্চ,—

যাদের গরিমাময় এ অতীত, তারা কখনই নহে মা তুচ্ছ।

(কোরাস)—ভারত আমার ইত্যাদি—

ভারত আমার, ভারত আমার, সকল মহিমা হউক খর্ব;

দুঃখ কী, যদি পাই মা তোমার পুত্র বলিয়া করিতে গর্ব;

যদি বা বিলয় পায় এ জগৎ, লুপ্ত হয় এ মানব-বংশ।

যাদের মহিমাময় এ অতীত, তাদের কখনও হবে না ধ্বংস।

(কোরাস)—ভারত আমার ইত্যাদি—

চোখের সামনে ধরিয়া রাখিয়া অতীতের সেই মহা আদর্শ,

জাগিব নূতন ভাবের রাজ্যে, রচিব প্রেমের ভারতবর্ষ।

এ দেবভূমির প্রতি তৃণ পরে, আছে বিধাতার করুণা-দৃষ্টি,

এ মহাজাতির মাথার উপর করে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি।

(কোরাস) — ভারত আমার ইত্যাদি—

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

বাংলা মা তোর সোনার ক্ষেতে দেখা যায় কার আঁচলখানি

মিশ্র—একতাল


বাংলা মা তোর সোনার ক্ষেতে দেখা যায় কার আঁচলখানি।

কার রূপের আভায় আকাশ বাতাস ভরে গেল শ্যাম বনানী॥

নিবিড় মেঘের অন্ত হ’ল ফুটলো বনে শেফালিকা,

কাশ কুসুমের শুভ্রশিরে শরৎ লেখে বিজয়টীকা,

বুঝি বর্ষ পরে হর্ষ-ভরে আসছে মাতা শিবরাণী,

তার রূপের আভায়, কনক প্রভায় দেখা যায় মা’র চরণখানি॥

নজরুল

আদর্শ তব শঙ্কর সীতা, ভুলিও না তুমি ভুলিও না

শংকরা-বেহাগ—একতাল


আদর্শ তব শঙ্কর সীতা, ভুলিও না তুমি ভুলিও না।

ভুলিও না তুমি মহা পবিত্র এই ভারতের ধূলিকণা॥

ভারত-সন্তান দেবতা তোমার, খুঁজিতে ঈশ্বর কোথা যাবে আর?

মহা উপচারে ত্যাগ ও সেবায়, করো করো তাঁর আরাধনা

উচ্চ কণ্ঠে বলো বলো তুমি, ‘ভারত-সন্তান আমার ভাই,

মূখ কাঙ্গাল দ্বিজ চণ্ডাল, দেবতা আমার এঁরা সবাই।’

প্রাণপণে তুমি বলাে দিনরাত, ওমা জগদম্বা, ওগাে উমানাথ,

মানুষ করিয়া দাও গাে আমায়, আর কিছু আমি চাহিব না।’

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

বন্দে মাতরম্

খাম্বাজ-কাহারবা


বন্দে মাতরম্।

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্ শস্য শ্যামলাং মাতরম্।

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্

ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশােভিনীম্,

সুহাসিনীং সুমধুর ভাষিণী সুখদাং বরদাং মাতরম্।

সপ্তকোটীকণ্ঠ-কলকল-নিনাদকরালে,

দ্বিসপ্তকোটীভূজৈধৃতখরকরবালে,

অবলা কেন মা এত বলে।

বহুবল ধারিণীং নমামি তারিণীং

রিপুদলবারিণীং মাতরম্।

তুমি বিদ্যা তুমি ধৰ্ম্ম, তুমি হৃদি তুমি মৰ্ম্ম,

ত্বং হি প্রাণাঃ শরীর।

বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি,

তােমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী, কমলা কমল-দল বিহারিণী

বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং।

নমামি কমলাম্ অমলাং অতুলাম্, সুজলাং সুফলাং মাতরম্

বন্দে মাতরম্

শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাম্ ধরণীং ভরণী মাতরম্।”

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর

মিশ্র-কাহরবা

হও ধরমেতে ধীর,         হও করমেতে বীর,

হও উন্নতশির—নাহি ভয়।

ভুলি ভেদাভেদ-জ্ঞান,         হও সবে আগুয়ান,

সাথে আছে ভগবান—হবে জয়।

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,

বিবিধের মাঝে দেখাে মিলন মহান;

দেখিয়া ভারতে মহাজাতির উত্থানজগজন মানিবে বিস্ময়!

জগজন মানিবে বিস্ময়॥

তেত্রিশ কোটি মােরা নহি কভু ক্ষীণ,

হতে পারি দীন, তবু নহি মােরা হীন;

ভারতে জনম, পুনঃ আসিবে সুদিন—ঐ দেখাে প্রভাত-উদয়!

ঐ দেখাে প্রভাত-উদয়॥

ন্যায় বিরাজিত যাদের করে, বিঘ্ন পরাজিত তাদের শরে;

সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে—সত্যের নাহি পরাজয়!

সত্যের নাহি পরাজয়

অতুলপ্রসাদ সেন

চল্ চল্ চল্

কোরাস


চল্ চল্ চল্।

ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল

নিম্নে উতলা ধরণী-তল,

অরুণ প্রাতের তরুণ দল

চল রে চল রে চল্

চল্ চল্ চল্৷৷

ঊষার দুয়ারে হানি’ আঘাত

আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,

আমরা টুটাব তিমির রাত,

বাধার বিন্ধ্যাচল।

নব নবীনের গাহিয়া গান

সজীব করিব মহাশ্মশান,

আমরা দানিব নূতন প্রাণ

বাহুতে নবীন বল।

চল্‌ রে নও-জোয়ান,

শােনরে পাতিয়া কান—

মৃত্যু-তােরণ-দুয়ারে-দুয়ারে

জীবনের আহ্বান।

ভাঙ্ রে ভাঙ্ আগল,

ল্ রে চল্ রে চল্

চল্ চল্ চল্॥

নজরুল ইসলাম

হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগাে রে ধীরে


হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগাে রে ধীরে

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।

হেথায় দাঁড়ায়ে দুবাহু বাড়ায়ে নমি নরদেবতারে,

উদার ছন্দে, পরমানন্দে বন্দন করি তারে।

ধ্যান-গম্ভীর এই-যে ভূধর,     নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর,

হেথায় নিত্য হেরাে পবিত্র ধরিত্রীরে—

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা।

হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়, চীন—

শক-হূন-দল, পাঠান-মােগল এক দেহে হল লীন।

পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার,         সেথা হতে সবে আনে উপহার,

দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।

এস হে আর্য, এস অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।

এস এস আজ তুমি ইংরাজ, এস এস খৃষ্টান।

এস ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধর হাত সবাকার।

এস হে পতিত, তােক অপনীত সব অপমানভার।

মা’র অভিষেকে এসাে এসাে ত্বরা,         মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা

সবার-পরশে পবিত্র-করা তীর্থনীরে—

আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকু

মেরা সােনেকী হিন্দুস্থান

ভৈরবী—ত্রিতাল


মেরা সােনেকী হিন্দুস্থান

হুঁ হামারা দিল্কী রােশনী, হুঁ হামারা জান্॥

চারু চন্দা, তপন, তারা, উজল আসমান্;

তেরি ছাতি পর ডােরত ক্যায়সে হাওয়াসে সােনেকী ধান॥

তেরী কুঞ্জমে ফুটত ফুলুয়া, পক্ষী গাওত গান;

তেরী ক্ষেত্ৰপর শ্যামল তরুয়া ছায়া করত দান॥

যুগযুগান্তে তেরী তপােবন পর কতহুঁ ধরম বাখান।

বিমান কম্পই উঠত গীতিহুঁ গভীর ওঁকার তান॥

অবহি ভারত পর হস্তগত বিহীন বীর্য যশমান।

সেহি দরশ কিয়া দিনহু রাতিয়া ঝুরত মেরা নয়ান

অজ্ঞাত

স্বাধীন করেছ মােদের এবার মানুষ করিয়া দাও মা

মিশ্র-কেদারা—দাদরা


স্বাধীন করেছ মােদের এবার মানুষ করিয়া দাও মা।

চিরকল্যাণ-পথে আমাদেরে হাতে ধরে তুমি নাও মা॥

ধ্রুব, নচিকেতা, মদালসা, সীতা তােমারি কৃপায় জনমিলা যেথা,

শত মহাবীর জনমিবে সেথা তুমি যদি ফিরে চাও মা॥

ঊর্ধ্ব গগনে উড়াল যাঁহারা নব ভারতের জয় নিশান।

তাদের মহান ত্যাগের কণিকা জীবনে মােদের করাে মা দান।

নাহি জাগে যদি মােদের জীবন, স্বাধীনতা শুধু হবে বিড়ম্বন,

দাও মা মােদের মানুষের মন, চরণে শরণ দাও মা৷৷

স্বামী চণ্ডিকানন্দ

আশ্রম সংগীত

(মােদের) সােনার নরেন্দ্রপুর

ভৈরবী-দাদরা


(মােদের) সােনার নরেন্দ্রপুর,

তার আকাশ-ভরা পাখীর গান কতই সুমধুর॥

মাঠ-ভরা তার সােনার ফসল, দীঘি-ভরা তার জল,

মধুর হেথায় সকল প্রাণী, মধুর ফুল ও ফল।

হেথা সবার তরে সবাই মােরা এক প্রাণ, এক সুর॥

হেথা নাহি কোলাহল, নাহি তাে দ্বন্দ্ব,

হের আনন্দ-উচ্ছল, জ্ঞান-সমুজ্জ্বল মােহন-ছন্দ।

মােরা সদা দুর্জয়, করি না তাে ভয় নদী-গিরি-পথ-বন্ধুর॥

হেথা নাহি ভেদ খ্রীষ্টান শিখ হিন্দু মুসলমানে—

নাই কোন ভেদ উচ্চ-নীচে, ধনী আর নির্ধনে॥

মােদের সেবায়, মােদের প্রেমে, মােদের কর্মে, মােদের গানে,

(হেথা) সবার মাঝে সদাই রাজে প্রেমময় ঠাকুর।

এই তাে মােদের পরম-তীর্থ, সােনার নরেন্দ্রপুর॥

অঙ্গন-প্রাঙ্গন-শােভন, সুন্দর-কুসুম-হিন্দোল-মন্দম্

ভৈরবী-কাহারবা


অঙ্গন-প্রাঙ্গন-শােভন, সুন্দর-কুসুম-হিন্দোল-মন্দম্।

সুনীল-অম্বর-অঙ্গ-বিহঙ্গ-সঙ্গমনন্ত-আনন্দ-ছন্দম্।

বহু-ভাষা-বর্ণমিহাগতম্ মুখরিত-বিবিধ-ছাত্র-ভৃঙ্গম্।

ফুল্ল-চিত্তমহাে সৌভাগ্যমাগত-নরেন্দ্রপুর-বিদ্যাতীর্থম॥

ঈসিতং সত্যং মন্ত্রং সত্যং বন্দে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দম্॥

কুরু সদা যােগ্যং দেহি মে বীর্যং

নৌমি নিত্যং তয়ােঃ পাদ পদ্মম॥

অজ্ঞাত

TBD <Need to change Name and Place>


ঈশ্বরকে স্মৃতিপথে রাখিবার সর্বোৎকৃষ্ট সহায়ক সম্ভবতঃ — সঙ্গীত। মনুষ্য-মনের উপর সঙ্গীতের প্রচণ্ড প্রভাব — উহা মুহূর্তে মনকে একাগ্র করিয়া দেয়। অতিশয় তামসিক জড়প্রকৃতি ব্যক্তিগণ — যাহারা এক মুহূর্তও মন স্থির করিতে পারে না, তাহারাও উত্তম সঙ্গীত শ্রবণ করিয়া মুগ্ধ হইয়া যায়, একাগ্র হইয়া যায়। এমন কি কুকুর, বিড়াল, সর্প, সিংহ প্রভৃতি জন্তুগণও সঙ্গীত শ্রবণে মােহিত হইয়া থাকে।

স্বামী বিবেকানন্দ