স্বামী বিবেকানন্দ


একটি দীপ যদি জ্বলিয়া উঠে, তাহাতে যে শুধু চারিদিকের অন্ধকার কাটিয়া যায় তাহাই নহে, উহার শিখার স্পর্শে আরও অসংখ্য দীপ প্রদীপ্ত হয়৷ সেইরূপ কোন মহামানব যখন নিজ জীবনে সত্য প্রত্যক্ষ করিয়া তাহা প্রচার করেন, তখন তাঁহার কথায় ও আচরণে মানুষের মনের সন্দেহ–সংশয়ের সব অন্ধকার কাটিয়া যায়, বিশ্বাসের শুভ্র আলোকে চলার পথ উদ্ভাসিত হইয়া উঠে আর যুগে যুগে একজীবন হইতে অন্যজীবনে সঞ্চারিত হইয়া সেই সত্যের আলোক অনির্বাণ হইয়া থাকে৷ শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, খ্রিস্ট প্রভৃতির জীবনে অনুভূত সত্য আজিও অগণিত জীবনে অনির্বাণ হইয়া রহিয়াছে৷
ভারতের এক ঘোর অমানিশার নিবিড় অন্ধকার কাটাইবার জন্য দক্ষিণেশ্বরের নিভৃত উদ্যানে ভগবদ্–উপলব্ধির অদৃষ্টপূর্ব ভাস্বরতা লইয়া শ্রীরামকৃষ্ণ–জীবনের্ আবির্ভাব ঘটিয়াছিল৷ সেই জীবনের স্পর্শে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনও অনুরূপ বিমল বিভায় উজ্জ্বল হইয়া উঠে৷ উহা ভারতের অমানিশার অবসান ঘটাইয়াছে, আবার বিশ্বমানবের আধুনিক যুগের সংশয়–তমসাচ্ছন্ন প্রগতির পথেও অফুরন্ত নবালোক–সম্পাত করিয়াছে৷
রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দ্ যখন আবির্ভাব ঘটিল, ভারত তখন সর্ববিষয়ে অবনত৷ তাহার ললাট তখন পরাধীনতার কলঙ্ক–কালিমালিপ্ত৷ জনসাধারণের ভবিষ্যৎ তখন অন্ধকারময়৷ প্রেম, পবিত্রতা, নিঃস্বার্থপরতা প্রভৃতি ধর্মের উচ্চ আদর্শগুলি তখন জীবনে রূপায়িত না হইয়া কতকগুলি প্রাণহীন আচার–নুষ্ঠানমাত্রে পর্যবসিত৷ বিজেতা–জাতির সভ্যতার চাকচিক্যে মুগ্ধ নবভারত তখন বলিতেছে, ‘‘পাশ্চাত্য ভাব, ভাষা, আহার, পরিচ্ছদ ও আচার অবলম্বন করিলেই আমরা পাশ্চাত্য জাতিদের ন্যায় বলবীর্যসম্পন্ন হইব৷’’ সে তখন বিস্মৃত যে নিজ অন্তর্নিহিত শক্তিকে বিকশিত না করিয়া, সিংহের মতো তেজবীর্য অন্তরে না আনিয়া শুধু সিংহ–চর্মাবৃত হইলেই সিংহ হওয়া যায় না তখন নবভারত বলিতেছে, ‘‘পাশ্চাত্য জাতিরা যাহা করে তাহাই ভাল৷ না হইলে উহারা এত প্রবল কি প্রকারে হইল?’’ পাশ্চাত্য–নুকরণ–ম্ তখন এত প্রবল হইয়া উঠিয়াছে যে ভালমন্দ–নির্ণয় তখন আর নিজের বিচার–বিবেক দ্বারা হয় না পাশ্চাত্যবাসীরা যাহা ভাল বলে তাহাই ভাল বলিয়া এবং যাহা মন্দ বলে তাহাই মন্দ বলিয়া বিবেচিত হয়৷ জাতীয় জীবনের এই দারুণ দুঃসময়ে স্বামী বিবেকানন্দ সিংহের মতো গর্জন করিয়া জাতির আত্ম–সম্বিৎ ফিরাইয়া আনিলেন–‘‘হে ভারত এই পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা, এই দাস–সুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা–এইমাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে? এই লজ্জাকর কাপুরুষতা সহায়ে তুমি বীরভোগ্যা স্বাধীনতা লাভ করিবে?’’ ভারত তখন জগতের সভ্যজাতির সভায় অপাঙ্ক্তেয়, তাহার সনাতন ধর্ম কুসংস্কারমাত্র বলিয়া বিবেচিত৷ সেই সময় স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যে উদাত্ত কণ্ঠে ভারতীয় ধর্মের, ভারতীয় সংস্কৃতির মহিমা ঘোষণা করিয়া জগৎসভায় তাঁহার প্রিয় জন্মভূমিকে উচ্চাসনে বসাইয়াছিলেন এবং এভাবে নিজ প্রাচীন সংস্কৃতির উপর ভারতবাসীর লুপ্তপ্রায় শ্রদ্ধা আবার ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন৷ ভারতীয় জাতিকে জাগাইয়া, তাহাকে ‘অভীঃ’ মন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া তিনি জাতির প্রাণে আত্মবিশ্বাসের, দেশপ্রেমের, মানবপ্রেমের, ত্যাগ ও সেবার প্রেরণার আগুন জ্বালাইয়াছিলেন, জাতিকে প্রাণবন্ত করিয়া নবযুগের জয়যাত্রার পথে তাহার রথচক্রে গতিবেগ আনিয়া দিয়াছিলেন৷ স্বদেশপ্রেমের, আত্মবিশ্বাসের যে আগুন তিনি জ্বালাইয়া দিয়া গিয়াছিলেন, দিনে দিনে তাহা ক্রমবর্ধিত ও ক্রমবিস্তৃতই হইয়াছে৷ দুইজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার ও ডঃ আর.সি.প্রধান যথার্থই বলিয়াছেন ঃ ‘‘স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও ক্রিয়াকলাপ হইতে ভারতের জায়মান জাতীয়তা প্রচণ্ড গতিবেগ লাভ করিয়াছে৷’’ ‘‘যথার্থই তাঁহাকে আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তার জনক বলা যায় এই জাতীয়তার বিপুলাংশই তিনি সৃষ্টি করিয়াছিলেন এবং ইহার উচ্চতম ও মহত্তম মৌল ভাবগুলিকে নিজ জীবনে মূর্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন৷’’
স্বামীজীর স্বদেশপ্রেম, পৌরুষ প্রভৃতি যেমন জড়তা কাটাইয়া ভারতবাসীর জীবনে তৎকালে অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষাত্রবীর্যের উদ্বোধন করিয়াছে, ভারতবাসীকে সবল হইয়া মানুষের মতো জীবনসংগ্রামে নামিতে শিখাইয়াছে, তাঁহার ব্রহ্মতেজ–আধ্যাত্মিকতা–তেমনি পাশ্চাত্য জগৎকে জড়বাদ–ভিত্তিক দেহসর্বস্বতার মৃত্যুকবল হইতে মুক্ত হইয়া সর্বমানবের চিরবাঞ্ছিত শান্তিরাজ্যে পঁৌছাইবার পথের নির্ভুল নির্দেশ দিয়া গিয়াছে৷ ধর্মের গ্লানি তখন শুধু ভারতে নয়, জগৎ জুড়িয়া৷ একদিকে তখন যথার্থ ধর্মজীবন প্রায় সর্বত্রই দুর্লভ, ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মের অপপ্রয়োগও হইতেছে৷ অপরদিকে পাশ্চাত্য–গগনে তখন নাস্তিকতার ঘনমেঘ জমিতেছে, অবিশ্বাসের ঝড় উঠিয়াছে ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে ভারতে সেই দুর্যোগেরই কিয়দংশ আসিয়াছিল৷ ‘‘যখন আধুনিক বিজ্ঞানের সত্য–আবিষ্কারের মুহুর্মুহু প্রবল আঘাতে প্রাচীন আপাতদৃঢ় ও অভেদ্য ধর্মবিশ্বাসগুলির ভিত্তি পর্যন্ত চূর্ণবিচূর্ণ হইতেছে, যখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতগুলি শূন্যমাত্রে পর্যবসিত হইয়া হাওয়ায় উড়িয়া যাইতেছে, যখন বিভিন্ন আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব–নুসন্ধ্ প্রবল মুষলাঘাত প্রাচীন বদ্ধমূল সংস্কারসমূহকে ভঙ্গুর কাচপাত্রের ন্যায় গুঁড়াইয়া ফেলিতেছে, যখন পাশ্চাত্য জগতে জ্ঞানিগণ... ধর্মসম্পর্কিত সমুদয় বিষয়কে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিয়াছেন’’–সেই সময় স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে প্রতিফলিত ও নিজ অনুভূতির কষ্টিপাথরে সুপরীক্ষিত ভারতের উচ্চ আধ্যাত্মিকতার বাণীগুলি আধুনিক মনের গ্রহণোপযোগী ভাবে ও ভাষায় প্রচার করিয়া পাশ্চাত্যজগতের বিচারপ্রবণ মনে ধর্মবিশ্বাস আবার ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন৷ ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা সর্ববিধ যুক্তির সম্মুখে বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইতে পারে৷
এই বিশ্বপ্রেমিক সন্ন্যাসী দেবদূতের মতো বিশ্বজনীনতার, বিশ্বপ্রেমের অমৃতসলিল সিঞ্চন করিয়া গিয়াছেন সারা জগতে সর্বজাতির, সর্বধর্মের মানুষকে নিজের ভাই বলিয়া ভাবিয়াছেন ও ভাবিতে শিখাইয়াছেন৷ অমিত আশার বাণী শুনাইয়াছেন সর্বদেশের হতাশ মানুষকে যে, সকলেরই অন্তরে অনন্ত শক্তি, অসীম জ্ঞান, অগাধ প্রেম বিদ্যমান চেষ্টা করিলে সকলেই উহার বিকাশসাধন করিয়া অভয়, আনন্দময় ও অমৃত–স্বরূপ হইয়া যাইতে পারে৷ নিরন্নকে বলিয়াছেন যে, অন্নবস্ত্রের সংস্থানের জন্যও এই আত্মশক্তিতে বিশ্বাস ও ইহার উদ্বোধন প্রয়োজন এ–বিষয়ে সামান্য প্রচেষ্টাও বিপুল ফলপ্রসূ হয়৷
স্বদেশপ্রেমিক বিবেকানন্দের, বিশ্বপ্রেমিক বিবেকানন্দের, কর্মবীর নির্ভীক বিবেকানন্দের, জ্ঞানঘনমূর্তি আচার্য বিবেকানন্দের সবকিছু প্রেরণার, সবকিছু শক্তির মূল উৎস আত্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা৷ আবাল্য স্বতঃস্ফূর্ত ঈশ্বর–বিশ্বাস ও বজ্রদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি সহায়ে বহু ঝড়ঝঞ্ঝাময় দুর্গম পথের উপর দিয়া অটল পদক্ষেপে চলিয়া তিনি সর্বাগ্রে বিশ্বের চরম সত্যকে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন, লক্ষ্যাভিমুখে চলার সময় অন্য কোনও দিকে ফিরিয়া চান নাই৷ আধ্যাত্মিকতা মানুষের মধ্যে কি প্রচণ্ড শক্তির বিকাশ ঘটাইতে পারে, নিজ জীবনে তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া এবং বুদ্ধির তীব্র আলোকে মানবজাতির ইতিহাস তন্নতন্ন করিয়া লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিয়া গিয়াছেন যে, বাহ্যপ্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতি–এই উভয় প্রকৃতির সহিত সংগ্রাম করিয়া উভয়কে জয় করিয়া চলাই মানবজাতির যথার্থ প্রগতির, যথার্থ কল্যাণের পথ কোনটিকে বাদ দিয়া নহে৷
দুর্গত মানবের দুঃখে তাঁহার হূদয় আকুল হইয়া কাঁদিয়াছে৷ সে বেদনার পরিমাপ করা যায় না৷ তিনি বলিয়াছিলেন, ‘‘দেশের কল্যাণের জন্য যদি নরকে যাইতে হয়, তাহাও আমার পক্ষে শ্রেয়ঃ৷’’ সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অনুভূতিলাভের পর শ্রীরামকৃষ্ণের আদেশে জগৎকল্যাণ সাধন করিয়া তিনি দিব্যধামে তাঁহার কাছে ফিরিয়া গিয়াছেন৷ আমাদের মনের সন্দেহ–সংশয় নিরসনের জন্য এবং জীবনপথে চলিবার সময় নির্ভুল নির্দেশলাভের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন নিজ জীবনের আদর্শ ও অমর বাণী৷
বারে বারে তিনি আমাদের ‘মানুষ’ হইতে বলিয়া গিয়াছেন৷ বলিয়াছেন, ‘‘একটা মানুষ যদি তৈরি হয় তো লাখ বত্তৃণতার কাজ হবে৷’’ ‘‘মানুষ চাই, মানুষ চাই, আর সব হইয়া যাইবে৷ বীর্যবান, সম্পূর্ণ অকপট, তেজস্বী, বিশ্বাসী যুবকগণের আবশ্যক৷’’ ‘‘চালাকি দ্বারা জগতে কোনও মহৎ কার্য হয় না৷’’
স্বামী বিবেকানন্দের সমুদ্রের মতো গভীর ও সীমাহীন জীবন ও বাণীর অতি অল্প অংশ মাত্র পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে আলোচিত হইয়াছে৷ তাহাও সীমায়িত স্বল্পশক্তি–দৃষ্টিতে যেভাবে দেখা গিয়াছে, সেভাবে৷ জিজ্ঞাসুকে নিজ স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া সেই রত্নাকরের অসীম বিস্তারের দিকে চাহিবার এবং উহার অমৃতসলিল হইতে শ্রদ্ধা, তেজ, বীর্য, জ্ঞান, প্রেম প্রভৃতি রত্ন আহরণ করিয়া তাঁহার আশীর্বাদে ‘মানুষ’ হইবার প্রেরণা যোগাইতে যদি ইহা কিছুমাত্রও সহায়ক হয়, তাহা হইলে পূজার এ অর্ঘ্যটি তাঁহার চরণে পঁৌছিয়াছে জানিয়া পূজারি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করিবে৷
স্বামী বিবেকানন্দের পূর্বনাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত৷ কলকাতার শিমুলিয়া পল্লির এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ–পরিবারে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি প্রতূ্যষে তিনি ভূমিষ্ঠ হন৷ পিতা বিশ্বনাথ দত্ত হাইকোর্টের এটর্নি ছিলেন৷ এই কার্যে তিনি প্রচুর অর্থোপার্জন করিতেন ব্যয়ও করিতেন অকাতরে৷ বহু দুঃস্থ আত্মীয় তাঁহার অর্থে প্রতিপালিত হইত৷ গাড়ি–ঘোড়া, দাস–দাসী লইয়া থাকিতেনও খুব জাঁকজমক করিয়া৷ নিত্য পলান্নভোজন এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য ছিল৷ সংসারে তখনকার দিনে মাসে প্রায় একহাজার টাকা ব্যয় হইত৷ হিন্দুধর্ম অপেক্ষা খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাঁহার অনুরাগ বেশি ছিল যিশুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছিল, নিত্য বাইবেল পাঠ করিতেন৷ হাফেজের বয়েতগুলিও পড়িতেন৷ তাছাড়া ধর্মসংক্রান্ত আর কোন কিছু লইয়া বিশেষ মাথা ঘামাইতেন না৷
নরেন্দ্রনাথের পিতামহ দুর্গাচরণ দত্ত কিন্তু খুব হিন্দু–ধর্মানুরাগী ছিলেন৷ একমাত্র পুত্র বিশ্বনাথ দত্তের জন্মের পর পঁচিশ বছর বয়সে তিনি ভগবানলাভের জন্য চিরতরে গৃহত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসী হইয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথের মাতা ভুবনেশ্বরীও দেবদেবী–ভক্তিপরায় ছিলেন৷ লেখাপড়া কিছু জানিতেন, রামায়ণ–মহাভারতা পাঠ করিতে পারিতেন৷ খুবই বুদ্ধিমতী ছিলেন তিনি৷ নরেন্দ্রনাথের পিতামাতা উভয়েই সঙ্গীতে অনুরাগী ছিলেন, নিজেরাও কিছু কিছু গাইতে পারিতেন৷
নরেন্দ্রনাথের জন্মের পূর্বে ভুবনেশ্বরী একটি পুত্র এবং চারিটি কন্যা লাভ করিলেও তাহাদের ভিতর দুইটি কন্যা মাত্র জীবিত ছিল৷ তাই সে সময় ভুবনেশ্বরী পুত্রকামনায় প্রত্যহ শিবের আরাধনা করিতেন৷ কাশীতে একজন আত্মীয়াকে নিত্য বীরেশ্বর শিবের পূজা দিতে বলিয়াছিলেন৷ ইহার পরই নরেন্দ্রনাথের জন্ম হয়৷ বীরেশ্বর শিবের প্রসাদে পুত্রলাভ করিয়াছেন, এই বিশ্বাসে ভুবনেশ্বরী পুত্রের নাম রাখিলেন বীরেশ্বর পরে অন্নপ্রাশনের সময় তাহার নামকরণ হয় নরেন্দ্রনাথ৷ তবে বাড়িতে বীরেশ্বরের অপভ্রংশ ‘বিলে’ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন৷
নরেন্দ্রনাথের জন্মের পর ভুবনেশ্বরী আরো চারটি সন্তানকে–দুইটি পুত্র ও দুইটি কন্যাকে কোলে পাইয়াছিলেন৷
ছেলেবেলায় নরেন্দ্রনাথ খুবই দুরন্ত ছিলেন৷ যখন রাগিয়া যাইতেন, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙিয়া চুরমার করিয়া ফেলিতেন৷ ভয় দেখাইয়া বা শাসন করিয়া কিছুতেই তাঁহাকে থামানো যাইত না৷ মাতা ভুবনেশ্বরী তাঁহাকে শান্ত করিবার একটি অদ্ভুত উপায় আবিষ্কার করিয়াছিলেন৷ যখন দুরন্তপনা খুবই বাড়িয়া যাইত, তখন কয়েক কলস জল ‘শিব’ ‘শিব’ বলিতে বলিতে তাঁহার মাথায় ঢ়ালিয়া দিতেন৷ ইহাতে অদ্ভুত ফল হইত, বালক একেবারে শান্তমূর্তি ধারণ করিত৷ কখনও বা ভয় দেখাইতেন, ‘‘যদি এরূপ দুরন্তপনা কর, তবে শিব আর তোমাকে কৈলাসে যাইতে দিবেন না৷’’ তাহাতেও ফল হইত৷ দুরন্তপনার বাড়াবাড়ি দেখিয়া হাসিয়া ভুবনেশ্বরী বলিতেন, ‘‘শিবের কাছে পুত্র বর চাহিয়াছিলাম, তা শিব নিজে না আসিয়া তাঁহার একটি ভূতকে পাঠাইয়া দিয়াছেন৷’’
বাল্যকালের বহু ঘটনায় নরেন্দ্রনাথের সাহস, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, বন্ধু–প্রীতি ও হূদয়বত্তার পরিচয় পাওয়া যায়৷ ভয় কাহাকে বলে তাহা তিনি জানিতেনই না৷ একজন প্রতিবেশীর প্রাঙ্গণস্থ চাঁপাগাছের ডালে বন্ধুদের লইয়া লম্ফ ঝম্ফ করা তাঁহার একটি প্রিয় খেলা ছিল৷ গাছের ডালে পা আটকাইয়া হাত ছাড়িয়া দিয়া মাথা নিচের দিকে করিয়া ঝুলিয়া থাকিতে তিনি ভালবাসিতেন৷ প্রতিবেশীটি দেখিলেন, বেশিদিন এভাবে খেলা চলিলে গাছটির অবস্থা কাহিল হইবে৷ ধমকানি দিয়া যে নরেন্দ্রনাথকে নিরস্ত করা যাইবে না, তাহা তিনি জানিতেন৷ তাই একদিন ভয় দেখাইলেন যে, ঐ গাছে ব্রহ্মদৈত্য আছে, গাছে কেহ উঠিলে তাহার ঘাড় মটকাইয়া রক্ত খাইবে৷ ইহাতেই খেলা বন্ধ হইবে ভাবিয়া নিশ্চিত হইয়া তিনি চলিয়া গেলেন৷ পরক্ষণেই নরেন্দ্রনাথ আবার গাছে উঠিলেন৷ সঙ্গীরা ভীষণ ভয় পাইলে বলিলেন, ‘‘কেহ কিছু বলিলেই তাহা বিশ্বাস করিতে হইবে নাকি? ব্রহ্মদৈত্য যদি সত্যই থাকিত, তাহা হইলে অনেক আগেই তো আমার ঘাড় মটকাইয়া দিত৷’’
সাত–আট বছর বয়সের সময় বন্ধুদের সঙ্গে নৌকা করিয়া একবার তিনি মেটিয়াবুরুজে পশুশালা দর্শন করিতে গিয়াছিলেন৷ ফিরিবার সময় একজন বালক নৌকায় বমি করিয়া ফেলে৷ তাহা লইয়া মাঝিদের সহিত বচসা বাধিয়া ক্রমে অবস্থা এতদূর গড়ায় যে মাঝিরা দল বাঁধিয়া বালকদের প্রহার করিতে উদ্যত হয়৷ চাঁদপাল ঘাটে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল৷ পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হইতেছে দেখিয়া বালক নরেন্দ্রনাথ এক ফাঁকে নৌকা হইতে নামিয়া পড়িলেন দুজন ইংরেজ–সৈনিক ভ্রমণে বাহির হইয়া সেদিকে যাইতেছিলেন তাঁহাদের একজনের হাত ধরিয়া ঘটনাস্থলে লইয়া আসিয়া সে–যাত্রা তিনি বন্ধুদের রক্ষা করিয়াছিলেন৷ তখনকার দিনে বালক তো দূরের কথা, বয়স্ক লোকেরাও ইংরেজ–সৈনিকের কাছে যাইতে ভরসা পাইত না৷
নরেন্দ্রনাথের বয়স যখন দশ–বার বছর, তখন কলকাতার গঙ্গায় ‘সিরাপিস্’ নামে একখানি রণতরী আসিয়াছিল এবং অনুমতি লইয়া সাধারণকে উহা দেখিতে দেওয়া হইতেছিল৷ দলবল লইয়া নরেন্দ্রনাথ আবেদনপত্র মঞ্জুর করাইয়া আনিতে গেলেন, কিন্তু বালক বলিয়া দরোয়ান অফিসে ঢুকিতে দিল না৷ ধরা পড়িলে দুর্ভোগ আছে জানিয়াও নরেন্দ্রনাথ পিছনের সিঁড়ি দিয়া তেতলায় উঠিয়া সাহেবের ঘরে প্রবেশ করিলেন এবং ঘরের ভিতর দিয়া বারান্দায় আসিয়া তাঁহার নিকট হইতে অনুমতিপত্র সই করাইয়া লইলেন৷ বুক ফুলাইয়া সদর ফটক দিয়া বাহির হইবার সময় বিস্মিত দরোয়ান জিজ্ঞাসা করিল, ‘‘তুমি উপরে যাইলে কেমন করিয়া?’’ নরেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, ‘‘আমি যাদু জানি৷’’
একবার পাড়ার খেলার মাঠে নরেন্দ্রনাথ বন্ধুদের লইয়া একটি দোলনার কাঠ উঠাইতেছেন৷ খুব ভারী বলিয়া সকলে মিলিয়াও কাঠটি উঠাইতে পারিতেছেন না দেখিয়া একজন পথচারী ইংরেজ নাবিক বালকদের সাহায্য করিতে অগ্রসর হইলেন৷ উঠাইবার সময় কাঠখানি হঠাৎ পড়িয়া যাওয়ায় নাবিকের মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে৷ নাবিকটি অজ্ঞান হইয়া যান, ক্ষতস্থান হইতে প্রচুর রক্তপাত হইতে থাকে৷ দেখিয়া বালকের দল এবং রাস্তায় দাঁড়াইয়া যেসব বয়স্ক লোক মজা দেখিতেছিলেন, সকলেই সরিয়া পড়িলেন৷ নরেন্দ্রনাথ ও তাঁহার দু–একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ভয় পান নাই, কর্তব্যে অবহেলা করিয়া পালাইয়া যান নাই৷ নরেন্দ্রনাথ নাবিকটির মাথায় পটি বাঁধিয়া মুখে জল দিয়া, হাওয়া করিয়া তাঁহার জ্ঞান ফিরাইয়া আনেন এবং বন্ধুদের সহায়তায় তাঁহাকে নিকটবর্তী ‘মেট্রোপলিটন’ স্কুলে লইয়া যাইয়া ডাক্তার ডাকিয়া চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন৷ সুচিকিৎসায় ও নরেন্দ্রনাথের সেবায় কয়েকদিনের মধ্যে নাবিকটি সুস্থ হইয়া উঠিলেন৷
বাল্যকালে নরেন্দ্রনাথ একবার নিজের জীবনাশঙ্কার প্রতি ভ্রূক্ষেপহীন হইয়া একজন বন্ধুকে ঘোড়ার গাড়ি চাপা পড়ার বিপদ হইতে বাঁচাইয়াছিলেন৷
শিশুকাল হইতেই পরের দুঃখে তাঁহার হূদয় উদ্বেল হইয়া উঠিত৷ প্রার্থী হইয়া কেহ আসিলে যাহা সম্মুখে পাইতেন তাহাই দিয়া দিতেন৷ টের পাইলে পরে পয়সা দিয়া সেগুলি তাহাদের নিকট হইতে ছাড়াইয়া আনা হইত৷ এরূপ ছেলেকে লইয়া সংসার করা দায়৷ মা একদিন বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে দোতলার একটি ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন৷ কিন্তু তাহাতেও নিস্তার পান নাই৷ নরেন্দ্রনাথ সেখান হইতে রাস্তায় একজন প্রার্থীকে দেখিয়া আলমারি খুলিয়া মায়ের একখানি মূল্যবান বস্ত্র বাহির করিলেন এবং জানালা গলাইয়া তাহার নিকট ফেলিয়া দিলেন৷ দীনদুঃখীর প্রতি এই সমবেদনার বীজই অঙ্কুরিত ও বর্ধিত হইয়া পরজীবনে তাঁহাকে নির্যাতিত, অবহেলিত, দুঃস্থ জনগণের জন্য কাঁদাইয়া তুলিয়াছিল, মানবকল্যাণ–যজ্ঞের্ বেদিতলে জীবনের সর্বস্ব আহুতি দিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল৷
তিনি নেতা হইয়াই জন্মিয়াছিলেন৷ খেলাধূলা প্রভৃতি সর্ববিষয়েই তিনি বন্ধুদের মধ্যে নেতার আসন গ্রহণ করিতেন বন্ধুরা সানন্দে তাঁহার নেতৃত্ব মানিয়া লইত৷ তাঁহার একটি প্রিয় খেলা ছিল রাজদরবার বসানো৷ এই খেলায় সব সময় তিনি রাজা সাজিতেন৷
বাল্যকাল হইতেই তাঁহার মনের তেজস্বিতার ও স্বাধীন চিন্তার পরিচয় পাওয়া যাইত৷ স্কুলে একবার একজন শিক্ষক ভুল বুঝিয়া বিনা দোষে নির্মমভাবে তাঁহার কান মলিয়া দিতে থাকিলে শেষে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন, ‘‘আপনার কি অধিকার আছে এরূপ করিবার?’’ প্রথম কিছুদিন ইংরেজি ভাষা শিখিতেই চান নাই–বাড়িতে আসিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিয়াছিলেন, ‘‘বিদেশীর ভাষা শিখিব কেন?’’ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি জাতির জন্য বৈঠকখানায় বিভিন্ন হুঁকা দেখিয়া প্রশ্ণ করিয়া যখন জানিতে পারেন যে একজাতির লোকের খাওয়া হুঁকায় অন্যজাতির কেহ তামাক খাইলে তাহার জাতি নষ্ট হয়, তখন একদিন লুকাইয়া প্রত্যেকটি হুঁকা পরপর টানিয়া পরীক্ষা করিয়াছিলেন জাতি যায় কিনা এবং যাইলে কিভাবে যায়৷ পিতা বিশ্বনাথ দত্তও স্বাধীন প্রকৃতির ছিলেন৷ সেজন্য ধমকাইয়া বা ভয় দেখাইয়া পুত্রের স্বাধীন চিন্তার পথে কখনও বাধা দিতেন না, সস্নেহে কারণ দেখাইয়া সব জিনিসের দোষগুণ বুঝাইয়া দিতে চেষ্টা করিতেন৷
নরেন্দ্রনাথ দৈবীসম্পদ লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন৷ যে বয়সে শিশুরা হালকা খেলাধূলা ছাড়া অন্য কিছু বুঝে না, সে সময় তিনি ‘ধ্যানকরা’ খেলিতে ভালবাসিতেন সঙ্গীদের লইয়া নিমীলিতনেত্রে একস্থানে দীর্ঘকাল স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতেন৷ কখনও কখনও কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলিয়া দেখিতেন, মাথা হইতে জটা নামিয়া মাটিতে প্রবেশ করিতেছে কিনা৷ কারণ শুনিয়াছিলেন যে ধ্যানকালে প্রাচীনযুগের মুনিঋষিদের এরূপ হইত৷ রামসীতার পুণ্যচরিত শুনিয়া শ্রদ্ধান্বিত হইয়া রামসীতার একটি ছোট মূর্তি আনিয়া চিলেকোঠার কুলুঙ্গিতে রাখিয়া দিয়াছিলেন৷ এইটাই তাঁহার ছেলেবেলার ‘ঠাকুরঘর’ বা ‘ধ্যানঘর’ ছিল৷ পরে একদিন শুনিলেন যে বিবাহ করা খুব খারাপ কাজ৷ শুনিয়া রামসীতার মূর্তিটি সরাইয়া সেখানে ধ্যানমগ্ণ শিবের মূর্তি স্থাপন করিলেন৷ খেলা হইলেও ‘ধ্যানকরা’ খেলিবার সময় মাঝে মাঝে তাঁহার মন সত্যসত্যই তন্ময় হইয়া যাইত, বাহিরের কোন বিষয়ে তাঁহার হুঁশ থাকিত না৷ একবার সঙ্গীদের লইয়া এভাবে ‘ধ্যান’ করিতেছেন, এমন সময় একটি বিষধর সর্প সেখানে আসিয়া পড়ে৷ বন্ধুরা ভয়ে স্থান ত্যাগ করিয়া পলাইয়া যায় এবং চলিয়া আসিবার জন্য নরেন্দ্রনাথকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে থাকে৷ নিমীলিতনেত্র নিশ্চল বালক কিন্তু কিছুই শুনিতে পায় নাই, এই ঘটনার কিছুই জানিতে পারে নাই৷ অবশ্য সৌভাগ্যক্রমে সর্পটি বালকের কোন অনিষ্ট না করিয়া চলিয়া যায়৷ আর একবার একটি বন্ধ ঘরে তাঁহার এই ‘ধ্যানকরা’ খেলা এত দীর্ঘকাল স্থায়ী হইয়াছিল যে, বাড়িতে দেখিতে না পাইয়া পাড়ায় তাঁহার অনুসন্ধান চলে শেষে সেই ঘরের দরজা ভাঙিয়া দেখা গেল, তখনো তিনি ‘ধ্যানস্থ’ রহিয়াছেন৷
তাঁহার একটি বাল্যকল্পনা ছিল, বড় হইয়া নিজহস্তে ঘোড়ার গাড়ি চালাইবেন৷ সেজন্য বহুদিন বাড়ির কোচোয়ানই ছিল তাঁহার অন্তরঙ্গ উপদেষ্টা৷ নিজের হাতে বল্গা ধরিয়া নিজের বাঞ্ছিত পথে রথ চালাইয়া যাওয়ার এ বাল্যকল্পনা পৌরুষ ও ‘অভীঃ’ মন্ত্রের মূর্তবিগ্রহ নরেন্দ্রনাথের পক্ষে স্বাভাবিক৷ অসীম ইচ্ছাশক্তির অধিকারী নরেন্দ্রনাথ জীবনে কখনও কোন মানসিক দুর্বলতার কাছে নতিস্বীকার করেন নাই, লোকে কি বলিবে না বলিবে তাহা লইয়া কখনও মাথা ঘামান নাই জীবনে যখন যে পথ সত্য বলিয়া নিঃসংশয়ে বুঝিয়াছেন, পারিপার্শ্বিক সবকিছু অগ্রাহ্য করিয়া ‘রশ্মি পাকড়ি আপনার করে, বিঘ্ণবিপদ ল৯ন করে’ সেই পথের উপর দিয়াই জীবনের রথ দুর্দমবেগে চালাইয়া গিয়াছেন এবং লক্ষ্যে পঁৌছিবার আগে কখনও থামেন নাই৷ একটি উচ্চ আদর্শে লক্ষ্য স্থির রাখিয়া বীরের মতো সেদিকে অগ্রসর হইবার কথা পরজীবনে তিনি বারে বারে আমাদের স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন ঃ ‘‘ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যলাভ করিবার পূর্বে থামিও না৷’’
ছয় বছর বয়সে গৃহশিক্ষকের নিকট নরেন্দ্রনাথের পাঠ শুরু হয়৷ সাত বছর বয়সে তিনি ‘মেট্রোপলিটন’ স্কুলে ভর্তি হন৷
তীক্ষ্ণ মেধা ও বহুমুখী প্রতিভা ছিল তাঁহার৷ একজন বৃদ্ধ আত্মীয় সন্ধ্যাবেলা তাঁহাকে কোলে বসাইয়া গল্প শুনাইতেন৷ সেইসময়ে তিনি পিতৃপুরুষদের নাম, দেবদেবীর স্তোত্র এবং মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের সূত্রগুলি তাঁহাকে শিখাইতেন৷ অসামান্য শ্রুতিধরের মতো স্মৃতিশক্তি লইয়া জন্মিয়াছিলেন বলিয়া নরেন্দ্রনাথ এগুলি শুনিয়াই আয়ত্ত করিয়া লইতেন৷ পাঁচ বছর বয়সের পূর্বেই মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের সব সূত্রগুলি তিনি আবৃত্তি করিতে পারিতেন ছয় বছর বয়সেই রামায়ণের সমগ্র পালা তাঁহার কণ্ঠস্থ হইয়াছিল৷ এই অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও প্রতিভার জন্য তাঁহার পাঠাভ্যাসের পদ্ধতিও ছিল অভিনব৷ গৃহশিক্ষক আসিলে নরেন্দ্রনাথ পাঠ্যপুস্তকগুলি তাঁহার হাতে দিয়া সেদিন কোন অংশ পড়িতে হইবে তাহা দেখাইয়া দিতেন৷ শিক্ষক যেন নিজে পাঠ আয়ত্ত করিতেছেন, এভাবে বানান করিয়া অর্থ করিয়া সেগুলি পড়িয়া যাইতেন, আর নরেন্দ্রনাথ বসিয়া বা শুইয়া তাহা শুনিতে থাকিতেন৷ ইহাতেই তাঁহার পড়া হইয়া যাইত৷ সহজে ও অতি অল্প সময়ে পাঠ আয়ত্ত করিতে পারিতেন বলিয়া বিদ্যালয় বা কলেজের পাঠাভ্যাসের জন্য তাঁহার বেশি সময়ের প্রয়োজন হইত না, পরীক্ষার পূর্বে দুই–তিন মাস সময়ই যথেষ্ট হইত৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘প্রবেশিকা পরীক্ষা আরম্ভের দুই–তিন দিন মাত্র থাকিতে দেখি জ্যামিতি কিছুমাত্র আয়ত্ত হয় নাই তখন সমস্ত রাত্রি জাগিয়া পাঠ করিতে লাগিলাম এবং চব্বিশ ঘণ্টায় উহার চারিখানি পুস্তক আয়ত্ত করিয়া পরীক্ষা দিয়া আসিলাম৷’’ সেজন্য অন্যবিষয়ে মনোনিবেশ করিবার মতো প্রচুর সময় তাঁহার হাতে থাকিত৷ গীতবাদ্য, ব্যায়াম, অশ্বারোহণ, লাঠিখেলা, অসিচালনা প্রভৃতি শিক্ষায় তিনি বহু সময় ব্যয় করিতেন৷ বিশ্বনাথ দত্ত এসব শিক্ষার জন্য প্রয়োজনমতো উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন৷ তাঁহাকে একটি ঘোড়াও কিনিয়া দিয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ ছাত্রজীবনেই এসব বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার অধিকারী হইয়া উঠেন৷ সঙ্গীদের সঙ্গে নির্দোষ রঙ্গপরিহাসেও তিনি বহু সময় ব্যয় করিতেন৷ এইসব দেখিয়া শুনিয়া প্রতিবেশীদের ধারণা জন্মিয়াছিল যে তিনি একটি ‘ত্রিপণ্ড’ ছেলে৷ তাছাড়া পাঠ্যপুস্তক ব্যতীত অন্য গ্রন্থ পাঠেও তিনি প্রচুর সময় দিতেন৷ তবে বাজে বই পড়িয়া সময় নষ্ট করিতেন না৷ যাহা ছাত্রদের জ্ঞান ও সদ্বুদ্ধি বাড়াইয়া তোলে, যাহা দেহ–মন বলিষ্ঠ করিয়া ছাত্রদের সংযত তেজবীর্যবান ও বিমল চরিত্রের অধিকারী করিয়া তুলিতে সহায়ক হয়, সেরূপ গ্রন্থই পাঠ করিতেন আচরণও করিতেন তদনুরূপ৷ বি.এ. পাস করিবার অল্পকাল পরে সৎসাহিত্যের প্রসঙ্গক্রমে তাঁহার একজন বন্ধুকে বলিয়াছিলেন, ‘‘সু বা কু যেকোন প্রকার ভাব যথাযথ প্রকাশ করিলেও রচনাবিশেষ যদি সুরুচিসম্পন্ন এবং কোনপ্রকার উচ্চাদর্শের প্রতিষ্ঠাপক না হয়, তাহা হইলে কখনও উহাকে উচ্চাঙ্গের সাহিত্য শ্রেণিতে পরিগণিত করা যাইতে পারে না৷’’ বন্ধুটি তখন একটি পত্রিকার সম্পাদনা করিতেন৷
এক এক সময় এক এক জাতীয় গ্রন্থ পাঠে তাঁহার আগ্রহ দেখা যাইত৷ প্রবেশিকা পরীক্ষা দিবার পূর্বে তিনি ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলি সবই পড়িয়া ফেলিয়াছিলেন৷ এফ.এ. পড়িবার সময় ন্যায়শাস্ত্রের যতরকম ইংরেজি পুস্তক ছিল, সবই আয়ত্ত করিয়াছিলেন৷ বি.এ. পড়িবার সময় ইংলন্ড এবং ইওরোপের অন্যান্য দেশের প্রাচীন ও বর্তমান ইতিহাস এবং সেইসঙ্গে ইংরেজি দর্শনগ্রন্থগুলি সবই পড়িয়া শেষ করিয়াছিলেন৷ তাছাড়া বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ক বহু গ্রন্থও তিনি ছাত্রজীবনেই পড়িয়াছিলেন৷ এই গ্রন্থপাঠের অভ্যাস তাঁহার বরাবরই ছিল৷ অন্যান্য সময়ের তো কথাই নাই, পরিব্রাজকবেশে ভারতময় ঘুরিয়া বেড়াইবার সময়ও তিনি বহু গ্রন্থ পাঠ করিয়াছেন৷
এভাবে বহু গ্রন্থ পাঠের জন্য এবং অখণ্ডব্রহ্মচর্য–পা, একাগ্রতার সাধনা ও অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তির ফলে তাঁহার মধ্যে অতিদ্রুতপঠন–শক্তি ও যাহা একবার পড়িতেন তাহা চিরদিন মনে রাখিবার ক্ষমতার অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটিয়াছিল৷ এবিষয়ে তাঁহার পরবর্তী জীবনের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করিতেছি৷
নরেন্দ্রনাথ তখন স্বামী বিবেকানন্দ৷ বেলুড় মঠে রহিয়াছেন৷ মঠের গ্রন্থাগারের জন্য এক প্রস্থ ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ অল্প কয়েকদিন পূর্বে কেনা হইয়াছে৷ বইগুলি তখনও স্বামীজীর ঘরেই ছিল৷ স্বামীজীর শিষ্য, ‘স্বামি–শিষ্য–সংবাদ’–প্রণেতা শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী, সে সময় একদিন ঘরে ঢুকিয়া বৃহদায়তন পুস্তকগুলি দেখিয়া বলিলেন, ‘‘এত বই একজীবনে পড়া দুর্ঘট৷’’ স্বামীজী ইতোমধ্যেই সেগুলির দশখণ্ড পড়িয়া ফেলিয়াছিলেন৷ তিনি বলিলেন, ‘‘কি বলছিস? এই দশখানি বই থেকে আমায় যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস কর, বলে দেবো৷’’ শিষ্য ঐ দশখণ্ড পুস্তকের প্রত্যেকটির বিভিন্ন স্থান হইতে বাছিয়া কঠিন কঠিন বিষয়ে প্রশ্ণ করিতে লাগিলেন৷ স্বামীজী সব প্রশ্ণগুলির সঠিক উত্তর তো দিলেনই, অনেক স্থলে পুস্তকের ভাষা পর্যন্ত উদ্ধৃত করিলেন৷ বিস্মিত শিষ্য বলিয়া উঠিলেন, ‘‘ইহা মানুষের শক্তিতে হয় না৷’’ স্বামীজী উত্তর দিয়াছিলেন, ‘‘ব্রহ্মচর্যপালন ঠিক ঠিক করতে পারলে সমস্ত বিদ্যা মুহূর্তে আয়ত্ত হয়ে যায়, ...এই ব্রহ্মচর্য অভাবেই আমাদের দেশের সব ধ্বংস হয়ে গেল৷’’
আর একবার পরিব্রাজকবেশে ভারতভ্রমণকালে মীরাটের কোন গ্রন্থাগার হইতে তাঁহাকে ঘন ঘন পুস্তক লইতে ও ফেরত দিতে দেখিয়া গ্রন্থাগারিকের সন্দেহ হইয়াছিল যে স্বামীজী লোক দেখাইবার জন্য এরূপ করিতেছেন৷ কিন্তু এত অল্পসময়েই তিনি গ্রন্থগুলি পড়িয়া ফেলিতেছেন ও মনে রাখিতেছেন, একথা পরে জানিতে পারিয়া তিনিও কম বিস্মিত হন নাই৷
ইওরোপ ভ্রমণ সময়ে জার্মানিতে বিখ্যাত দার্শনিক পল ডয়সন–এর গৃহে অতিথিরূপে বাসকালে ডয়সন একদিন স্বামীজীর ঘরে ঢুকিয়া দেখেন স্বামীজী একমনে একখানি গ্রন্থের পাতা উলটাইয়া যাইতেছেন৷ স্বামীজীকে তিনি কিছু বলিতে আসিয়াছিলেন৷ বারে বারে ডাকিয়াও সাড়া না পাইয়া তিনি একটু ক্ষুণ্ণ হন৷ কিছুক্ষণ পরে স্বামীজী বইখানি রাখিয়া দিলে ডয়সন বলিলেন, ‘‘স্বামীজী, এত ডাকিলাম, আপনি কোন সাড়া দিলেন না৷’’ স্বামীজী বলিলেন, ‘‘কিছু মনে করিবেন না, আমি মনোযোগ দিয়া বইখানি পড়িতেছিলাম৷’’ ডয়সন উত্তরে তৃপ্ত হইলেন না এমন–কি মনোযোগ যে কাছে দাঁড়াইয়া ডাকিলেও মানুষ শুনিতে পায় না আর পড়িবার ধরনও তো স্বচক্ষে দেখিলেন–শুধু পাতা উলটাইয়া যাওয়া৷ স্বামীজী তখন তাঁহাকে পুস্তকখানির যেকোন স্থান হইতে প্রশ্ণ জিজ্ঞাসা করিতে বলিলেন৷ ডয়সন তাহাই করিলেন এবং যথাযথ উত্তর পাইয়া পরম বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘স্বামীজী, কিরূপে ইহা সম্ভব হয়?’’ স্বামীজী সেবারে বলিয়াছিলেন যে ইহারই নাম ভারতীয় একাগ্রতা৷
এভাবে, যে সদ্গুণগুলিকে আমরা ‘মনুষ্যত্ব’ আখ্যা দিই, সেগুলিকে বিকশিত ও ক্রমবর্ধিত করিতে করিতে নরেন্দ্রনাথের ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়৷ ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করিলেও বিলাসিতার দিকে কখনো তিনি নজর দেন নাই৷ তাই বলিয়া তাঁহার মুখে কখনও বিষণ্ণ গাম্ভীর্যের ছায়াপাত হইত না, আনন্দ ও প্রাণের প্রাচুর্যে সব সময় তাহা ঝলমল করিত৷ চিরদিন তিনি সত্যের পূজারি ছিলেন৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘মিথ্যা কথা হইবে বলিয়া ছেলেদের কখনো জুজুর ভয় দেখাই নাই৷’’ সত্যে এরূপ নিষ্ঠা ছিল বলিয়া পরবর্তী কালে শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার কথায় খুব আস্থাবান ছিলেন৷ বালসুলভ অজ্ঞতাবশে নরেন্দ্রনাথ কখনও কখনও গোলমেলে কথা বলিয়া ফেলিলেও শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাহাতে বালকের মতো চিন্তিত হইয়া উঠিতেন৷ কারণ তিনি নিশ্চিত জানিতেন যে নরেন্দ্রনাথের মধ্যে ‘ভাবের ঘরে চুরি’ বিন্দুমাত্রও নাই৷ হয়তো ভুল হইতে পারে, কিন্তু নরেন্দ্রনাথ যাহা মনে–প্রাণে সত্য বলিয়া বুঝিতেন, অকপটে সকলের কাছে তাহা প্রকাশ করিতে ভয় পাইতেন না বা কখনো দ্বিধা করিতেন না৷ দক্ষিণেশ্বরের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করিতেছি৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব বহুস্থলে উদাহরণছলে বলিতেন যে, ‘‘চাতক যেমন মেঘের জল ছাড়া অন্য জল খায় না, তেমনি যথার্থ ভক্তেরা ভগবানের আনন্দ ছাড়া অন্য আনন্দ গ্রহণ করে না৷’’ নরেন্দ্রনাথ একদিন ইহা শুনিয়া বলিলেন, ‘‘মহাশয়, আমি চাতককে অন্যান্য পাখিদের ন্যায় জলাশয় হইতে জল খাইতে দেখিয়াছি৷’’ শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব চিন্তিত হইয়া পড়িলেন৷ ভাবিলেন, ‘‘নরেন্দ্রনাথ যখন বলিতেছে যে দেখিয়াছে, তখন নিশ্চয় দেখিয়াছে তাহা হইলে আমার ধারণা তো ভুল’’ ইহার দুই একদিন পরে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘‘ঐ দেখুন মহাশয়, চাতক গঙ্গায় জল খাইতেছে’’ শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া বাহিরে আসিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেখেন যে একটি চামচিকা জল খাইতেছে৷ দেখিয়া হাসিয়া বলিলেন, ‘‘তুই চামচিকাকে চাতক জ্ঞান করিয়া আমাকে এতটা ভাবাইয়াছিস’
স্কুলে পড়িবার সময় তাঁহাকে দুই বৎসর রায়পুরে কাটাইতে হয়৷ কর্মোপলক্ষে বিশ্বনাথ দত্ত এই দুই বছর সেখানে ছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ তখন থার্ড ক্লাস–এ (বর্তমান অষ্টমমান শ্রেণি) পড়েন, বয়স চতুর্দশ বৎসর৷ ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে মাতা প্রভৃতিকে সেখানে লইয়া যাইবার সময় নাগপুর হইতে নিবিড় অরণ্য ও পর্বত–রাজির মধ্য দিয়া কয়েকদিন যাইতে হয়৷ একদিন প্রকৃতির শোভা দেখিতে দেখিতে চলিয়াছেন, এমন সময় দেখেন পর্বতগাত্রে একটি প্রকাণ্ড ফাটল রহিয়াছে, উহার শীর্ষদেশে সারা ফাটল জুড়িয়া একটি প্রকাণ্ড মৌচাক৷ দেখিয়া উহার কথা ভাবিতে ভাবিতে তন্ময় হইয়া বাহ্যসংজ্ঞা হারাইয়া ফেলেন৷ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য ও রহস্যের চিন্তায় তন্ময় হইয়া একেবারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হওয়া তাঁহার জীবনে এই বোধ হয় প্রথম৷ দুই বৎসর পরে কলকাতা ফিরিয়া স্কুলের কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি লইয়া তিনি ফার্স্ট ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন৷ কলেজ–জীবনে এক বৎসর প্রেসিডেন্সি কলেজে এবং তিন বৎসর ‘জেনারেল–এ্যাসেমব্লি’–এ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) পড়িয়াছিলেন৷ ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এফ. এ. এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বি.এ. পাশ করেন৷ পরে বি.এল. পড়িয়াছিলেন, কিন্তু পরীক্ষা দেন নাই৷
শিশুকাল হইতে তাঁহার মনে যে সহজাত ধর্মানুরাগ ছিল, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উহা প্রবল হইতে প্রবলতর হইতে থাকে৷ জীবন ও বিশ্বের পশ্চাতে কি সত্য রহিয়াছে, তাহা জানিবার জন্য তিনি অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিলেন৷ অন্তরে সহজাত ধর্মবিশ্বাস থাকিলেও তিনি মনেপ্রাণে যুক্তিবাদী ছিলেন৷ নিজে যাচাই না করিয়া বা যুক্তিকে তৃপ্ত না করিয়া ঈশ্বর সম্বন্ধে কোন কথাই তিনি মানিয়া লইতে রাজি ছিলেন না–সে কথা যিনিই বলিয়া থাকুন, বা যে কোন শাস্ত্র গ্রন্থেই তাহা লিখিত থাকুক না কেন৷ তৎকালীন পাশ্চাত্য নাস্তিকতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইয়াও যুক্তির দিক হইতে ভগবানের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী হইবার কোন কারণ তিনি খুঁজিয়া পান নাই৷ তীক্ষ্ণ মেধা ও বহুবিধ গ্রন্থপাঠের ফলে তাঁহার তর্কশক্তিও খুব বাড়িয়া গিয়াছিল স্কুল–কলেজে তাঁহাকে তর্কে পরাস্ত করা অসাধ্য ছিল৷ তবে মনেপ্রাণে যখন যাহা সত্য বলিয়া বুঝিতেন, তাহার স্বপক্ষে তর্ক করিতেন তিনি৷ সত্যলাভেচ্ছার এই অতি প্রবল আগ্রহের বশে এফ.এ. পড়িবার সময় তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন৷ কিন্তু যাহা খুঁজিতেছিলেন, সেখানেও তাহা’ পাইলেন না৷ শুধু গ্রন্থপাঠ করিয়া ও ধর্মাচার্যদের নিকট হইতে প্রশ্ণ করিয়া জানিয়াই তিনি ক্ষান্ত ছিলেন না, ভগবানলাভের জন্য দেহ–মনের যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, সে বিষয়েও সজাগ এবং সচেষ্ট ছিলেন৷ সত্য ও ব্রহ্মচর্যে তাঁহার নিষ্ঠার কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে৷ এই সময় তিনি নিরামিষ ভোজন করিতেন, রাত্রে শুধু কম্বলের উপর শুইয়া থাকিতেন, কখনও কখনও মেঝের উপরেই শুইতেন৷ পৈতৃক বাড়ির নিকট তাঁহার মাতামহীর একটি ভাড়া লওয়া বাড়ি ছিল৷ প্রবেশিকা পরীক্ষার পর হইতে ঐ বাড়ির দোতলায় একটি ঘরে একাকী থাকিতেন এবং রাত্রে দীর্ঘকাল ধ্যান করিয়া কাটাইতেন৷ বাড়ির লোকে ভাবিত পড়াশুনার সুবিধার জন্য তিনি একাকী থাকেন৷ ধ্যানই ভগবানলাভের প্রশস্ত পথ, শিশুকাল হইতে এই ধারণা তাঁহার মনে দৃঢ়বদ্ধ ছিল৷ আমাদের মন সাধারণত বাহিরের বহুবিধ বিষয়ের চিন্তা লইয়া থাকিতে ভালবাসে৷ বাহির হইতে সব মন গুটাইয়া আনিয়া একটি মাত্র বিশেষ নাম বা রূপের চিন্তায় তাহাকে ধরিয়া রাখিবার এবং ক্রমে একেবারে চিন্তাশূন্য করিয়া তাহাকে নিস্তরঙ্গ সরোবরের মতো করিয়া ফেলিবার প্রচেষ্টার নামই ধ্যান৷ পবিত্র, নিস্তরঙ্গ চিত্তেই ভগবৎকৃপায় সত্য উদ্ভাসিত হয়৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিয়াছেন, ‘‘নরেন্দ্র ধ্যানসিদ্ধ মহাপুরুষ৷’’ আবাল্য প্রতিদিন নিদ্রার পূর্বে তাঁহার জ্যোতিঃদর্শন হইত৷ ধ্যানের উচ্চ অবস্থায় এরূপ দর্শন হয়৷ কিন্তু নরেন্দ্রনাথের দৈনন্দিন জীবনে উহা এত সহজভাবে ঘটিত যে তিনি ভাবিতেন সকলেই এভাবে নিদ্রা যায়৷
এভাবে তিনি তখন সত্য ধারণা করার উপযোগী দেহমন প্রস্তুত করিয়া, সত্যলাভের জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ বুকে পুরিয়া সত্যলাভের পথে আগাইয়া চলিয়াছেন৷ তাঁহার আধুনিক যুক্তিবাদী মনে যেসব সংশয় তখন মাথা তুলিত, সেগুলির নিরসনের জন্য তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ তৎকালীন ধর্মাচার্যগণের কাছে আকুল আগ্রহ লইয়া সোজাসুজি প্রশ্ণ করিতেন, ‘‘মহাশয়, আপনি ভগবানকে দেখিয়াছেন কি?’’ কোথাও সোজা, স্পষ্ট উত্তর পাইতেন না, প্রশ্ণের উত্তরে দার্শনিক প্রসঙ্গ বা অন্য কোন প্রসঙ্গ উত্থাপিত হইত৷ তাহাতে নরেন্দ্রনাথ তৃপ্ত হইতে পারিতেন না৷ মাত্র কতকগুলি মস্তিষ্কপ্রসূত কথায় তাঁহার মনের অন্ধকার কাটিবার নয়৷ বহুবিধ গ্রন্থ পাঠ করিয়া, যুক্তির নিক্তিতে সেগুলির কথা ওজন করিয়া দেখিয়া ভগবানের অস্তিত্বের সত্যাসত্য নির্ণয়ে তাঁহার মনের অন্ধকার কাটে নাই৷ সোজাসুজি প্রমাণ চাই৷ প্রত্যক্ষজ্ঞানের আলো চাই সূর্যালোকের ন্যায় উজ্জ্বল, অফুরন্ত জ্ঞানের আলো চাই, যাহার প্রকাশে সংশয়ের লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকিবে না, যুক্তি চিরতৃপ্ত হইবে৷ এই সত্য লাভ করিবার জন্য যাহা প্রয়োজন, তাহার সবকিছু করিতে প্রস্তুত তিনি এমন–কি প্রয়োজন হইলে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে৷ প্রবল জিজ্ঞাসা বুকে পুরিয়া, অথচ কোনও দিক হইতে নিশ্চিত আলোর সন্ধান না পাইয়া তাঁহার অস্বস্তি ক্রমে বাড়িয়াই চলিল৷ এ জিজ্ঞাসার সদুত্তর কোথায় মিলিবে? উপনিষদের সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের মতো জোর গলায় কে তাঁহাকে বলিবে, ‘‘বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্?’’ কে তাঁহাকে পথের নির্দেশ দিয়া সস্নেহে হাত ধরিয়া সে মহাতীর্থে লইয়া যাইবে, যেখানে পৌঁছিলে ‘‘ছিদ্যন্তে সর্বসংশয়াঃ’’–মনের সব সংশয় মিটিয়া যায়? অকপট জিজ্ঞাসা যখন প্রবলতম হইয়া উঠিয়াছে, তখনই একদিন এরূপ সত্যদ্রষ্টার সন্ধান পাইলেন তিনি, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে তাঁহার মিলন হইল৷ প্রথম ধর্মালাপেই শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে তিনি তাঁহার মনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ণটিই করিয়াছিলেন, ‘‘মহাশয়, আপনি ভগবানকে দেখিয়াছেন কি?’’ ভাবিয়াছিলেন পূর্বপূর্ববারের মতো এবারেও কোন জটিল দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা হইবে৷ কিন্তু স্তম্ভিত হইয়া শুনিলেন, অতি স্পষ্ট সোজা উত্তর আসিল ঃ ‘‘হাঁ দেখিয়াছি৷ তোমাকে যতটা স্পষ্টভাবে দেখিতেছি, তাহার চেয়েও স্পষ্টভাবে দেখিয়াছি৷ আর যদি চাও তোমাকেও দেখাইতে পারি৷’’
কথাগুলি নরেন্দ্রনাথের চিত্তে গভীর রেখাপাত করিল৷ যাঁহারা ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখিয়া তাঁহার কথা বলেন, তাঁহাদের কথায় একটা প্রচণ্ড শক্তি থাকে সেকথা সোজাসুজি লোকের মনে গাঁথিয়া যায়৷ নরেন্দ্রনাথ পরে বলিয়াছেন, ‘‘তাঁহার মুখে ঐ সকল কথা শুনিয়া মনে হইল তিনি অপর ধর্মপ্রচারকগণের ন্যায় কল্পনা বা রূপকের সহায়তা লইয়া ঐরূপ বলিতেছেন না, সত্যসত্যই সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া এবং সম্পূর্ণমনে ঈশ্বরকে ডাকিয়া যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাহাই বলিতেছেন৷’’
অকপট, তীক্ষ্ণধী, সত্য–ব্রহ্মচর্যনিষ্, সত্যান্বেষী শিষ্য যোগ্য সত্যদ্রষ্টা গুরুর সন্ধান পাইলেন, তাঁহাকে দেখিয়া, তাঁহার কথা শুনিয়া শ্রদ্ধাবনত হইলেন৷ বুঝিলেন এখানেই সত্যের সন্ধান মিলিবে৷ কিন্তু শান্ত, সুবোধ বালকের মতো তখনই তাঁহার পায়ে আত্মসমর্পণ করিলেন না, জীবনরথের অশ্ববল্গা তখনই তাঁহার হাতে ছাড়িয়া দিলেন না দৃঢ়তর হস্তে উহা চাপিয়া ধরিলেন, পাছে হূদয়ের উচ্ছ্বাসবশে, শ্রদ্ধায় অন্ধ হইয়া মন যাচাই না করিয়াই গুরুর সব কথা গ্রহণ করিয়া বসে, পাছে তাঁহার কোন যুক্তিবিরোধী কথা মানিয়া লয়৷
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে প্রথম দর্শন করেন৷ শিমুলিয়া পল্লিতে নরেন্দ্রনাথের বাটির নিকটেই শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্ত শ্রীসুরেন্দ্রনাথ মিত্র বাস করিতেন৷ সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আগমন–উপলক্ষে গান গাহিবার জন্য সুকণ্ঠ, সুগায়ক নরেন্দ্রনাথ আহূত হইয়াছিলেন৷ তাঁহার বয়স তখন আঠারো বৎসর, এফ.এ. পরীক্ষা দিবার জন্য তিনি প্রস্তুত হইতেছিলেন৷ এই প্রথম দর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং একদিন দক্ষিণেশ্বরে যাইবার জন্য তাঁহাকে সবিশেষ অনুরোধ করেন৷
নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের নাম ইতঃপূর্বেই শুনিয়াছিলেন৷ ‘জেনারেল–এ্যাসেমব্লি’ কলেজের অধ্যক্ষ হেস্টি সাহেব একদিন ইংরেজি ক্লাসে পড়াইতে আসিয়া প্রসঙ্গক্রমে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নাম উল্লেখ করিয়াছিলেন৷ ইংরেজ কবি ওয়ার্ডস–ওয়ার্থ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখিয়া মাঝে মাঝে এতদূর তন্ময় হইয়া যাইতেন যে তাঁহার বাহ্যসংজ্ঞা লোপ পাইত, সমাধি হইত৷ এই সমাধি কি তাহা বুঝাইতে যাইয়া হেস্টি সাহেব ছাত্রদের বলেন, ‘‘চিত্তের পবিত্রতা ও বিষয় বিশেষে একাগ্রতা হইতে এই সমাধি হইয়া থাকে৷ একমাত্র দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আজকাল ঐরূপ অবস্থা হইতে দেখিয়াছি৷’’ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে প্রথম দর্শনের কয়েক সপ্তাহ পরেই আরও একটি ঘটনা ঘটিল৷ এফ.এ. পরীক্ষা হইয়া গেলে বিশ্বনাথ পুত্রের বিবাহ দিবার জন্য পাত্রী স্থির করিলেন, কথাবার্তা প্রায় পাকা হইয়া উঠিল কিন্তু নরেন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি জানাইলেন বলিয়া উহা আর ঘটিয়া উঠিল না৷ তাঁহার জনৈক আত্মীয় রামচন্দ্র দত্ত শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট পূর্ব হইতে যাতায়াত করিতেন৷ তিনি আলাপ করিয়া যখন বুঝিলেন যে ধর্মলাভের জন্যই নরেন্দ্রনাথ বিবাহ করিতে চাহিতেছেন না, তখন তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘যদি ধর্মলাভ করিতেই তোমার যথার্থ বাসনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে ব্রাহ্মসমাজ প্রভৃতিস্থলে না ঘুরিয়া দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকট চল৷’’ প্রতিবেশী সুরেন্দ্রনাথ এই সময় একদিন দক্ষিণেশ্বরে যাইবার জন্য তাঁহাকে আমন্ত্রণ জানাইলে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে লইয়া তাঁহার সহিত নরেন্দ্রনাথ দক্ষিণেশ্বরে গিয়া উপস্থিত হইলেন৷ নরেন্দ্রনাথকে আসিতে দেখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া উঠিলেন অসীম স্নেহ ঢ়ালিয়া, আদর করিয়া, খাওয়াইয়া, কত কি কথা বলিয়াও তিনি যেন তৃপ্ত হইতে পারিতেছিলেন না৷
ইহার কারণ ছিল৷ উপযুক্ত শিষ্যকে দেখিয়া গুরুর হূদয়ে এ আনন্দ জাগা স্বাভাবিক৷ নরেন্দ্রনাথকে দেখিয়াই তিনি বুঝিয়াছিলেন যে আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চ সত্যগুলি ধারণা করিবার মতো যোগ্যতা তাঁহার রহিয়াছে৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘পশ্চিমের দরজা দিয়া নরেন্দ্র প্রথম দিন এই ঘরে ঢুকিয়াছিল৷ দেখিলাম, নিজের শরীরের দিকে লক্ষ্য নাই, মাথার চুল ও বেশভূষার কোন পারিপাট্য নাই, সবই যেন তার আলগা এবং চক্ষু দেখিয়া মনে হইল তাহার মনের অনেকটা কে যেন ভিতরের দিকে সর্বদা টানিয়া রাখিয়াছে৷ দেখিয়া মনে হইল, বিষয়ী লোকের আবাস কলকাতায় এতবড় সত্ত্বগুণী আধার থাকা সম্ভবে... গান গাহিতে বলিলাম, তাহাতে ব্রাহ্মসমাজের ‘মন চল নিজ নিকেতনে’ গানটি ধরিল ও ষোলআনা মনপ্রাণ ঢ়ালিয়া ধ্যানস্থ হইয়া যেন উহা গাহিতে লাগিল৷’’
আরও একটি কারণ ছিল৷ পবিত্রতা ও বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক শ্রীরামকৃষ্ণদেব দীর্ঘ সাধনার পর ভগবানলাভ করিয়াছিলেন৷ শুধু তাহাই নহে, পৃথিবীর বড় বড় ধর্মমতগুলিতে ভগবানলাভের জন্য যেসব পথের নির্দেশ আছে, তাহার সবগুলি দিয়া চলিয়া, সেই সব পথে যেভাবে ভগবানকে দেখা যায় বলিয়া বর্ণনা দেওয়া আছে, সেই সেই ভাবেই তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন৷ আর দেখিয়াছিলেন যে নানা ধর্মে নানাভাবে বর্ণিত হইলেও ভগবান বা বিশ্বের চরম সত্তা একটি–ই এবং তিনিই আমাদের সমস্ত জ্ঞান, শক্তি ও আনন্দের মূল উৎস৷ আন্তরিক হইয়া যে যেভাবে তাঁহাকে ডাকে, সে সেইভাবেই তাঁহাকে দেখিতে পায় ঃ ‘‘তিনি সাকার নিরাকার দুই–ই যেমন জল আর বরফ৷ বরফের আকার আছে, জলের নাই বস্তু কিন্তু একই৷’’ ‘নুনের পুতুল যেমন সমুদ্রে নামিলে গলিয়া তাহার সঙ্গে মিশিয়া এক হইয়া যায়’, সাধনশেষে শ্রীরামকৃষ্ণদেবও তেমনি বিশ্বের পরমানন্দময় চরম সত্তার সঙ্গে মিশিয়া এক হইয়া থাকিতে চাহিয়াছিলেন৷ কিন্তু বুঝিয়াছিলেন যে ভগবদিচ্ছা অন্যরূপ, এরূপ করা চলিবে না তিনি যে জাতি–ধর্ম–বর্ণ–নির্, মানবজাতির পক্ষে মহাকল্যাণকর সর্বজনীন সত্য নিজজীবনে উপলব্ধি করিয়াছেন, জগতের কল্যাণের জন্য আরও কিছুদিন দেহধারণ করিয়া থাকিয়া তাহা জগতে প্রচার করিতে হইবে৷ আরও বুঝিয়াছিলেন যে তাঁহার এই সর্বজাগতিক বিশাল উদার ভাবরাশি নিজ জীবনে যথাযথরূপে ধারণ ও উপলব্ধি করিয়া সারা জগতে ছড়াইয়া দিবার জন্য গৃহস্থ ভক্তদের সঙ্গে কয়েকজন ত্যাগী যুবকভক্তও আসিবে এবং তাহাদের মধ্যে একাজের প্রধান সহায়করূপে আসিবে নরেন্দ্রনাথ৷ নরেন্দ্রনাথ আসিবার বহুপূর্বে কোন্ উচ্চলোক হইতে তিনি আসিতেছেন, তাহাও শ্রীরামকৃষ্ণদেব জানিতে পারিয়াছিলেন৷ দেখিয়াছিলেন, নরেন্দ্রনাথ সপ্তর্ষিমণ্ডল হইতে আসিয়াছেন দেখিয়াছিলেন, যে নরঋষি মানব–কল্যাণের জন্য পূর্বে বহুবার নারায়ণের সঙ্গে মানবদেহ ধারণ করিয়াছেন, নরেন্দ্রনাথ সেই নরঋষি৷ তাই নিজের অতুলনীয় ভাবরাশি তাঁহার হূদয়ে সঞ্চারিত করিবার জন্য আকুল আগ্রহ বুকে পুরিয়া তাঁহার আগমনের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন৷ কলকাতায় প্রথম দর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথকে চিনিতে পারিয়াছিলেন৷
গান শেষ হইবার পর নরেন্দ্রনাথকে লইয়া তিনি ঘরের পাশে চারিদিক–ঘেরা একটি বারান্দায় ঢুকিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ ভাবিলেন, বোধ হয় নির্জনে কিছু উপদেশ দিবেন বলিয়াই এরূপ করিতেছেন৷ কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণদেব যাহা করিলেন, তাহা কল্পনাতীত–‘‘সহসা আমার হাত ধরিয়া দরদরিতধারে আনন্দাশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন এবং পূর্বপরিচিতের ন্যায় পরমস্নেহে আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘এতদিন পরে আসিতে হয়? আমি তোমার জন্য কিরূপ প্রতীক্ষা করিয়া আছি, তাহা ভাবিতে নাই?’ ... ইত্যাদি কত কথা বলেন ও রোদন করেন৷ পরক্ষণেই আমার সম্মুখে করজোড়ে দণ্ডায়মান হইয়া দেবতার মতো আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বলিতে লাগিলেন, ‘জানি প্রভু, তুমি সেই পুরাতন ঋষি, নররূপী নারায়ণ, জীবের দুর্গতি নিবারণ করিতে পুনরায় শরীরধারণ করিয়াছ’৷’’ এই সব কথা বলিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব ঘর হইতে কিছু সন্দেশ প্রভৃতি আনিয়া নিজহস্তে নরেন্দ্রনাথকে খাওয়াইলেন এবং আবার একদিন একাকী আসিবার জন্য অনুরোধ করিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ সম্মত হইলে তবে তিনি সুস্থির হন৷
নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনিয়া ও আচরণ দেখিয়া স্তম্ভিত হইলেন৷ ভাবিলেন, ‘‘এ কাহাকে দেখিতে আসিয়াছি, এ তো একেবারে উন্মাদ–না হইলে বিশ্বনাথ দত্তের পুত্র আমি, আমাকে এই সব কথা বলে?’’
বারান্দা হইতে ফিরিয়া আসিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব উপস্থিত অন্যান্য সকলের সঙ্গে আলাপ করিতে লাগিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন যে তখন তাঁহার আচরণ বা কথায় কোথাও পাগলের কোন লক্ষণ নাই৷ তাঁহার পবিত্রতা এবং ঈশ্বরের জন্য ত্যাগ দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন৷ কাজেই নরেন্দ্রনাথ সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণকে পাগল বলিয়া ভাবিলেও তাঁহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার ভাব লইয়াই গৃহে ফিরিয়াছিলেন–‘‘উন্মাদ হইলেও এই ব্যক্তি মহাপবিত্র, মহাত্যাগী এবং ঐজন্য মানবহূদয়ের শ্রদ্ধা, পূজা ও সম্মান পাইবার যথার্থ অধিকারী৷’’
প্রায় একমাস পরে পায়ে হাঁটিয়া নরেন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণসমীপে উপনীত হইলেন৷ যোগ্য আধার জানিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেদিন নিজের অসীমশক্তিময় স্পর্শসহায়ে নরেন্দ্রনাথকে একেবারেই চরম আধ্যাত্মিক অনুভূতির অধিকারী করিতে চাহিয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ দেখিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে স্পর্শ করা মাত্র এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটিল খালি চোখেই দেখিতে লাগিলেন যে ঘরের দেওয়াল, জিনিসপত্র, চারিদিকের গাছপালা সবই, সমগ্র বিশ্বই বেগে ঘুরিতে ঘুরিতে কোন এক সর্বগ্রাসী মহাশূন্যে একাকার হইতে ছুটিয়াছে, তাঁহার নিজের ‘আমি’–বোধও বাঁধন–হারা হইয়া ঐসঙ্গে ছুটিয়া চলিয়াছে৷ ইহা যে মহাশূন্যে লুপ্ত হওয়া নয়, মহাপূর্ণতার সহিত মিশিয়া এক হইয়া যাওয়া, নরেন্দ্রনাথ তখন তাহা বুঝিতে না পারিয়া ইহাকে ভুল করিয়া মৃত্যু বলিয়া ভাবিলেন দারুণ আতঙ্কে চিৎকার করিয়া উঠিলেন, ‘‘ওগো, তুমি আমার একি করলে, আমার যে বাপ–মা আছেন’’ শ্রীরামকৃষ্ণদেব ইহা শুনিয়া খল–খল করিয়া হাসিয়া উঠিলেন বলিলেন, ‘‘তবে থাক, একেবারে কাজ নাই, কালে হবে৷’’ এই বলিয়া তাঁহার বুকে হাত বুলাইয়া দিলেন৷ তৎক্ষণাৎ প্রকৃতিস্থ হইয়া নরেন্দ্রনাথ ঘরের ভিতরের ও বাহিরের সব জিনিসই পূর্বের ন্যায় দেখিতে লাগিলেন৷
এই ঘটনায় নরেন্দ্রনাথের চিন্তাজগতে তুফান উঠিল৷ এ কি হইল? ম্যাজিক দেখাইলেন নাকি শ্রীরামকৃষ্ণ, সম্মোহিনী শক্তির খেলা দেখাইলেন? ভাবিয়া দেখিলেন, তাহা নয়৷ কারণ দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিদেরই সম্মোহিত করা সম্ভবপর, তাঁহার মতো দৃঢ়–ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ যুবককে সম্মোহিত করিবার প্রশ্ণই উঠে না৷ তাছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দেখিয়াই তো তিনি মোহিত হইয়া যান নাই, বরং তাহাকে পাগল ভাবিয়াছেন৷ অথচ নিজে তো সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় খালি চোখেই দেখিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছা মাত্র তাঁহার এই উপলব্ধি আসিল এবং তাঁহার ইচ্ছায় আবার চলিয়া গেল৷ আবার ভাবিলেন, ইনি যদি এত শক্তির অধিকারী হন, ‘‘আমার ন্যায় প্রবল ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মনের গঠন ঐরূপ ভাঙিয়া–চুরিয়া কাদার তালের মতো করিয়া উহাকে আপনভাবে ভাবিত করিতে পারেন, তবে ইঁহাকে পাগলই বা বলি কিরূপে?’’ এদিকে প্রথম আগমনের দিন শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার সম্বন্ধে যেসব কথা বলিয়াছিলেন, তাহাতে তাঁহাকে পাগল ছাড়া আর কি ভাবা যাইতে পারে, তাহাও বুঝিতে পারিলেন না৷ যুক্তি ও বিচার সহায়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেব সম্বন্ধে এবং নিজের এই উপলব্ধি সম্বন্ধে কোন স্থিরসিদ্ধান্ত করিতে না পারিয়া নরেন্দ্রনাথ সেদিন মনে দারুণ আঘাত পাইলেন৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘বুদ্ধির উন্মেষ হওয়া পর্যন্ত দর্শন, অনুসন্ধান ও যুক্তিতর্ক সহায়ে প্রত্যেক বস্তু ও ব্যক্তি সম্বন্ধে একটা মতামত স্থির না করিয়া কখনো নিশ্চিন্ত হইতে পারি নাই–আজ সেই স্বভাবে দারুণ আঘাত প্রাপ্ত হইয়া প্রাণে একটা যন্ত্রণা উপস্থিত হইল৷’’ এই ঘটনায় শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে ভালভাবে পরীক্ষা করিয়া বুঝিবার সঙ্কল্প তাঁহার মনে দৃঢ়তর হইল৷
ইহার কিছুকাল পরে দক্ষিণেশ্বরে তৃতীয়বার আগমনের দিন পূর্বঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়৷ এই ‘অদ্ভুত পাগল’ আবার যাহাতে তাঁহার মনের উপর নিজশক্তির প্রভাব বিস্তার করিতে না পারেন, সেবিষয়ে সজাগ থাকা সত্ত্বেও শ্রীরামকৃষ্ণদেবের স্পর্শমাত্রে তিনি বাহ্যজ্ঞান হারাইয়া ফেলেন৷ এইদিন তিনি প্রাণেপ্রাণে বুঝিয়াছিলেন যে এই দুরতিক্রমণীয় অসীম দৈবশক্তির কাছে তাঁহার নিজের মনবুদ্ধির শক্তি কত অকিঞ্চিৎকর৷ পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণকে পাগল বলিয়া তাঁহার যে ধারণা জন্মিয়াছিল, এইদিন তাহা নিঃশেষে লুপ্ত হইল৷ বুঝিলেন, ইনি অসীম দৈবশক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ তাঁহার মতো মানবকে ইচ্ছামাত্রেই আধ্যাত্মিকরাজ্যের যেখানে খুশি সেখানে লইয়া যাইতে পারেন৷ বুঝিলেন, তিনি যেরূপ গুরু খুঁজিতেছিলেন, ভাগ্যবলে তাহা পাইয়াছেন৷ এইদিনই মনে মনে শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে গুরুরূপে বরণ করিলেও যুক্তির পূজারি নরেন্দ্রনাথ তাঁহার চরণে তখনও সর্বতোভাবে আত্মসমর্পণ করিলেন না সঙ্কল্প করিলেন, ভালরূপে যাচাই না করিয়া তাঁহার কোন কথা গ্রহণ করিবেন না বিশেষভাবে পরীক্ষা বা নিজে অনুভব না করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অদ্ভুত ঈশ্বরদর্শনাদি বিষয়ক কোন কথা শুধু তিনি বলিতেছেন বলিয়াই অবনতশিরে মানিয়া লইবেন না৷ ইহাতে যদি শ্রীরামকৃষ্ণদেব বিরক্তও হন, উপায় নাই৷
জড়প্রকৃতি যেমন কতকগুলি নিয়মের বশে চলে এবং বিজ্ঞানের সাধনা দ্বারা সেই জ্ঞান আয়ত্ত করিতে পারিলেই মানুষ তাহার উপর আধিপত্য বিস্তার করিতে পারে, সেইরূপ অন্তঃপ্রকৃতি, সূক্ষ্মতর প্রকৃতিও কতকগুলি নিয়মের বশে চলে এবং আধ্যাত্মিক সাধনা দ্বারা সেই নিয়মগুলি সম্বন্ধে জ্ঞান আসিলেই মানুষ তাহাকেও নিজের ইচ্ছামতো চালাইতে পারে৷ জগতে অলৌকিক ঘটনা বলিয়া কিছু নাই, সব ঘটনাই প্রকৃতির নিয়মাধীন৷ সেই নিয়মগুলি সম্বন্ধে যতক্ষণ না আমাদের জ্ঞান আসে, ততক্ষণ সেগুলিকে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক বলিয়া মনে হয় মাত্র৷ শব্দশক্তিকে সূক্ষ্মতর শক্তিতরঙ্গে রূপায়িত করিয়া বেতার–প্রেরক–যন্ত্র্ মাধ্যমে যেসব তরঙ্গ আজকাল বিভিন্ন কেন্দ্র হইতে সারা জগতে ছড়াইয়া দেওয়া হয়, সেগুলি সবসময়ই আমাদের চারিদিকে সর্বত্র তরঙ্গায়িত হইলেও নিখুঁত গ্রাহকযন্ত্র, রেডিও না থাকিলে এবং সেটিকে সেই তরঙ্গগুলির গ্রহণোপযোগী পর্দায় না বাঁধিলে আমরা সেগুলির অস্তিত্ব অনুভব করিতে পারি না ঠিক তেমনি পবিত্রতা, একাগ্রতা প্রভৃতি সহায়ে মনকে সূক্ষ্ম না করিলে আধ্যাত্মিক জগতের সত্যগুলির অস্তিত্বও আমরা অনুভব করিতে পারি না, সেগুলিকে ধরিতে পারি না৷ আধ্যাত্মিক জগতের তত্ত্বগুলি সত্য কিনা তাহা যাচাই করিয়া দেখিতে হইলে আগে অধ্যাত্মবিজ্ঞানীদের, সত্যদ্রষ্টাদের নির্দেশমতো মানস–যন্ত্রটিকে নিখুঁত করিয়া গড়িতে হইবে৷ সর্ববিধ জাগতিক জ্ঞানলাভের বেলা যেমন যোগ্য গুরুর সহায়তায় দীর্ঘদিনের সাধনায় উহা লাভ করা যায়, আধ্যাত্মিক সত্যের বেলাও তাই৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব সাধনসহায়ে সর্ববিধ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হইয়াছিলেন, অন্তর্জগতের রাজ–রাজেশ্বর ছিলেন তিনি৷ তাই ইচ্ছামাত্রেই মানুষের মনকে যেভাবে খুশি সেভাবে ভাঙিতে গড়িতে পারিতেন, স্থূলবিষয় গ্রহণ করার উপযোগী মানসযন্ত্রকে ইচ্ছামাত্র সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর যন্ত্রে রূপায়িত করিয়া উহাকে দিব্যদর্শনের উপযোগী করিয়া দিতে পারিতেন৷ এভাবে স্পর্শ করিয়া কত ভাগ্যবানকে যে তিনি দিব্যধামে পৌঁছাইয়া দিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই৷ সেই দিব্যধামের কত কথা, নিজের অনুভূতি ও ঈশ্বর–দর্শনের কথা তিনি নরেন্দ্রনাথকে শুনাইতেন৷
কিন্তু সে অন্তর্দৃষ্টি নরেন্দ্রনাথের তখনও আসে নাই৷ বুদ্ধি ও যুক্তির সহায়তা ছাড়া বিশ্বের কোন সত্যেরই দ্বার উৱাটন করা যায় না, বোধ হয় এ বিশ্বাস তখনো তাঁহার ছিল৷ তৎকালীন সর্ববিধ আস্তিক ও নাস্তিক ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত নরেন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ–পরায়ণ মন লইয়া যেন আধুনিক ধারায় চিন্তাশীল সব মানুষের প্রতিনিধিরূপে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নিকট গিয়া হাজির হইয়াছিলেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি লইয়াই তিনি যত রকমে পারেন যাচাই করিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হইয়া তবে তাঁহার কথা গ্রহণ করিয়াছিলেন৷ তাই তাঁহার পরবর্তী কালে কথাগুলির মধ্যে জিজ্ঞাসু হইয়া খুঁজিলে আধুনিক মনে যতরকম সন্দেহ–সংশয় উঠিতে পারে, তাহার সব কিছুরই উত্তর পাওয়া যায়৷
সেজন্য নরেন্দ্রনাথ এখন হইতে নিজের যুক্তিমার্জিত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির আলোকে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণ তন্ন তন্ন করিয়া লক্ষ্য করিতে লাগিলেন৷ বিমল পবিত্রতা, ত্যাগ ও ভগবৎপ্রেমের আকর শ্রীরামকৃষ্ণের চরণপ্রান্তে লুটাইয়া পড়িবার জন্য তাঁহার হূদয় ছুটিয়া যাইতে চাহিল, কিন্তু বুদ্ধি তাঁহাকে নির্মমভাবে টানিয়া ধরিল–‘এরূপ করা চলিবে না৷ যুক্তির অগ্ণি–পরীক্ষায় যাহা উত্তীর্ণ হয় না, এতদিন তাহার কিছুই মানি নাই এখন উতলা হইয়া ইহার ব্যতিক্রম করা চলিবে না৷’
পূর্বেই বলা হইয়াছে তৃতীয়বার দক্ষিণেশ্বরে আগমনের পর হইতেই নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আচরণ ও কথাগুলি বিশেষভাবে পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া লইতেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব জানিতেন যে নরেন্দ্রনাথ অকপট, সত্যনিষ্ঠ৷ তাই ভক্তদের মধ্যে কেহ কেহ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি নরেন্দ্রনাথের এই আচরণকে দাম্ভিকতা ভাবিয়া ভাল চোখে না দেখিলেও শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজে ইহাতে অধিকতর প্রসন্ন হইতেন৷ শুধু নরেন্দ্রনাথ নয়, পরে যাঁহারা ভগবানের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ–সন্ন্যাস্৯র ভিত্তি গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, সেই বালকভক্তগণের সকলকেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিতেন যে তিনি বলিতেছেন বলিয়াই তাঁহারা যেন কিছু মানিয়া না লন, নিজে বিচার করিয়া বুঝিয়া, নিজের জীবনে সেকথার সত্যতা উপলব্ধি করিয়া তবে যেন উহা গ্রহণ করেন৷ কাহারও চিন্তার উপর জোর করিয়া কিছু চাপাইয়া দিতেন না তিনি, কথা মানিল না বলিয়া কাহারও প্রতি বিরক্ত হইতেন না, চিন্তারাজ্যে অবাধ স্বাধীনতা দিতেন সকলকে৷ আর সর্বোপরি সীমাহীন ভালবাসায় সকলের হূদয় ভরপুর করিয়া রাখিতেন৷ এই ভালবাসার আকর্ষণই নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি বালকগণকে দক্ষিণেশ্বরে টানিয়া আনিত, তাঁহাকে একবার দেখিবার জন্য তাঁহাদের ব্যাকুল করিয়া তুলিত৷ ইঁহাদের উপর তাঁহার বিশ্বাসও ছিল অগাধ৷ এই বিশ্বাস ও ভালবাসার প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ একদা বলিয়াছিলেন, ‘‘একা ঠাকুরই কেবল আমাকে প্রথম দেখা হইতে সকল সময় সমভাবে বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছেন, আর কেহই নহে...৷ তাঁহার ঐরূপ বিশ্বাস–ভালবাসাই আমাকে চিরকালের মতো বাঁধিয়া ফেলিয়াছে একা তিনিই ভালবাসিতে জানিতেন ও পারিতেন–সংসারে অন্য সকলে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভালবাসার ভানমাত্র করিয়া থাকে৷’’ নিজের জন্য কোনও কিছু না চাহিয়া সকলকে প্রাণ ভরিয়া ভালবাসাই যে মনুষ্যত্ব–বিকাশের একটি রাজপথ, সে প্রসঙ্গে পরে তিনি লিখিয়াছেন :
‘‘ছাড় বিদ্যা জপ যজ্ঞ বল, স্বার্থহীন প্রেম যে সম্বল’’
‘‘হে প্রেমিক, স্বার্থমলিনতা অগ্ণিকুণ্ডে কর বিসর্জন৷
ভিক্ষুকের কবে বল সুখ? কৃপাপাত্র হয়ে কিবা ফল?
দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হূদয়ে সম্বল৷’’
নরেন্দ্রনাথও শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে ভালবাসিতেন প্রাণ ঢ়ালিয়া৷ একবার তাঁহাকে পরীক্ষা করিবার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রায় একমাসকাল তাঁহার সহিত বাক্যালাপ করেন নাই৷ নরেন্দ্রনাথ আসিলেই অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া অন্যলোকের সহিত কথা বলিতেন, তাঁহার দিকে ফিরিয়া চাহিতেনও না৷ ইহাতেও নরেন্দ্রনাথের যাওয়া–আসা বন্ধ হইল না দেখিয়া একমাস পরে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘আচ্ছা, তুই তো আসা–যাওয়া করিস, আমি তো তোর সঙ্গে একটা কথাও বলি না৷ তবু আসিস কেন?’’ উত্তরে নরেন্দ্রনাথ বলিয়াছিলেন, ‘‘আমি কি আপনার কথা শুনবার জন্য আসি? আপনাকে ভালবাসি, দেখতে ইচ্ছে হয়, তাই আসি৷’’ শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিয়াছিলেন, ‘‘তুই বলে এতটা অবহেলা সইতে পারলি৷ অন্য কেউ হলে কবে সরে পড়ত৷’’ গুরু–শিষ্যের পরস্পরের প্রতি এই অগাধ ভালবাসার মধ্যেই নরেন্দ্রনাথের শিক্ষালাভ ও লক্ষ্যলাভ৷ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পরস্পরের প্রতি ভালবাসা থাকিলেই শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ দুই–ই অতি সহজ ও সুচারু হয়, আন্তরিক হয়, আনন্দপ্রদ হয়৷
নরেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণের ধারণা অতি উচ্চ ছিল৷ এবিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে বহু কথা বলিয়াছেন ঃ
‘‘নরেন্দ্র সহস্রদল কমল এই কয়েকজনকে (অন্যান্যযুবক ভক্তগণকে) ঐ জাতীয় পুষ্প বলা যাইলেও, ইহাদের কেহ দশ, কেহ পনের, কেহ বা বড় জোর বিশদল বিশিষ্ট৷’’ ‘‘আর সব ছেলেদের দেখি যেন চোখকান টিপে কোনও রকমে দু–তিনটে পাশ করেছে, ব্যস্, এই পর্যন্ত–ঐ করতেই যেন তাদের সমস্ত শক্তি বেরিয়ে গেছে৷ নরেন্দ্রের কিন্তু তা নয়, হেসে খেলে সব কাজ করে, পাস করাটা যেন তার কাছে কিছুই নয়’’ ‘‘এত লোক এখানে আসিল, নরেন্দ্রের মতো একজনও কিন্তু আর আসিল না৷’’
শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে নরেন্দ্রনাথ কতভাবে যে পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন এবং তিনিও হাসিমুখে তাঁহার পুত্রাধিক প্রিয় নরেন্দ্রের সেসব প্রগলভতা সহ্য করিয়া গিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া গেল৷ এই অসীম, উদার, নিঃস্বার্থ প্রেমের কথা স্মরণ করিয়া নরেন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন, ‘‘পুত্র তব, অন্যে কে সহিবে প্রগলভতা?’’
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ত্যাগের ভাব এত প্রবল ছিল যে মুদ্রা তো দূরের কথা, কোন ধাতুদ্রব্যও তিনি স্পর্শ করিতে পারিতেন না স্পর্শ করিলেই হাত বাঁকিয়া যাইত, অসহ্য যন্ত্রণাবোধ হইত৷ দেহের মাংসপেশী, স্নায়ু প্রভৃতির উপর তাঁহার মনের প্রভাব এত বেশি ছিল৷ ইহা তিনি ঢ়ং করিয়া করেন, না সত্যই উহা হয়, তাহা পরীক্ষা করিবার জন্য নরেন্দ্রনাথ একবার তাঁহার অজ্ঞাতে তাঁহার বিছানার নিচে একটি রৌপ্যমুদ্রা রাখিয়া দিয়া পঞ্চবটীর দিকে চলিয়া যান৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেদিন দক্ষিণেশ্বরে ছিলেন না, কলকাতা গিয়াছিলেন৷ ফিরিয়া আসিয়া বসিতে যাইয়া বিছানা স্পর্শ করিবামাত্র যন্ত্রণায় তিনি কাতর হইয়া উঠিলেন৷ যাঁহারা সঙ্গে ছিলেন, বিছানা তুলিয়া মুদ্রাটি দেখিতে পাইলেন ও সরাইয়া লইলেন৷ নরেন্দ্রনাথ ততক্ষণে পঞ্চবটী হইতে ফিরিয়া দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন৷ সব দেখিয়া চুপিচুপি সেখান হইতে সরিয়া পড়িলেন৷ তাঁহাকে পরীক্ষা করিবার জন্য নরেন্দ্রনাথ এরূপ করিয়াছে জানিতে পারিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার উপর বিরক্ত হওয়া দূরের কথা, অধিকতর প্রসন্নই হইয়াছিলেন৷
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দর্শনাদির মধ্যে যেগুলিকে নরেন্দ্রনাথ তাঁহার তৎকালীন মনবুদ্ধির ধারণাশক্তির বিচারে ‘মাথার খেয়াল মাত্র’ বলিয়া ভাবিতেন, সেগুলি সম্বন্ধে তিনি যে শুধু অবিশ্বাস করিতেন তাহাই নহে, শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে নিজের ধারণা স্পষ্ট করিয়া জানাইয়া দিতেও ইতস্তত করিতেন না অনেক সময় একটু ব্যঙ্গ করিয়াও বলিতেন৷ এতখানি ‘মন মুখ এক’ এবং নির্ভীকতা ছিল তাঁহার৷ একদিন শ্রীরামকৃষ্ণসমীপে প্রখ্যাত কেশবচন্দ্র সেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভৃতি বহুলোক বসিয়া তাঁহার কথা শুনিতেছেন৷ নরেন্দ্রনাথও সেখানে ছিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রসন্নদৃষ্টিতে পর পর সকলকে লক্ষ্য করিতে লাগিলেন৷ পরে সভাভঙ্গে বলিলেন, ‘‘দেখিলাম কেশব যেরূপ একটি শক্তির বিশেষ উৎকর্ষে জগদ্বিখ্যাত হইয়াছে, নরেন্দ্রের ভিতর ঐরূপ আঠারোটি শক্তি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান৷ আবার দেখিলাম কেশব ও বিজয়ের অন্তর দীপশিখার ন্যায় জ্ঞানালোকে উজ্জ্বল রহিয়াছে পরে নরেন্দ্রের দিকে চাহিয়া দেখি তাহার ভিতরে জ্ঞানসূর্য উদিত হইয়া মায়ামোহের লেশ পর্যন্ত তথা হইতে দূরীভূত করিয়াছে৷’’ শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে এরূপ প্রশংসা শুনিয়া মন তৃপ্তিতে ভরিয়া উঠিবার কথা নরেন্দ্রনাথের চিত্তে কিন্তু ইহার প্রতিক্রিয়া হইল অন্যরূপ৷ সকলে চলিয়া গেলে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে বলিলেন, ‘‘মশায় করেন কি? লোকে একথা শুনলে আপনাকে পাগল বলে ভাববে৷ কোথায় জগদ্বিখ্যাত কেশব ও মহামনা বিজয় এবং কোথায় আমার মতো একটা নগণ্য স্কুলের ছোঁড়া’’ শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘‘কি করব রে, মা আমাকে ঐরূপ দেখালেন তাই বলেছি মা তো আমাকে সত্য ভিন্ন মিথ্যা কখনো দেখাননি, তাই বলেছি৷’’ ইহাতেও নিষ্কৃতি পাইলেন না৷ নরেন্দ্রনাথ তীব্র শ্লেষোক্তি করিলেন, ‘‘মা দেখালেন, না নিজের মাথার খেয়ালে দেখলেন, তা জানলেন কি করে? পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, চোখ কান প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গুলি পদে পদে আমাদের প্রতারিত করে৷ তার ওপর মনে যদি সব সময় কোন কিছু দেখার ইচ্ছা থাকে তো কথাই নাই৷ আমাকে ভালবাসেন, সকলের চেয়ে বড় দেখতে চান বলেই হয়তো এরকম দেখে থাকবেন৷’’
বালক ভাবিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথের এইসব কথা কখনও বা হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন, কখনও বা নিজেই বালকের মতো চিন্তিত হইয়া সেগুলির সত্যাসত্য নির্ণয়ের জন্য মন্দিরে মা–কালীর কাছে ছুটিতেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিরাকার ও বহুবিধ সাকার রূপে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করিলেও সাধারণ অবস্থায় থাকিবার সময় তাঁহাকে মা–কালীরূপেই দেখিতেন, তাঁহাকে ‘মা’ বলিতেন৷ মা তাঁহাকে রূপ ধরিয়া দেখা দিতেন, কথা বলিতেন, পরিহাস করিতেন, যখন যাহা করিতে হইবে তাহা দেখাইয়া দিতেন, বুঝাইয়া দিতেন৷ সাধারণ অবস্থায় যখন তিনি বালকের মতো থাকিতেন, তখন কেহ তাঁহার চিন্তাবিরোধী কোন কথা বলিলে মন্দিরে মায়ের কাছে ছুটিয়া যাইতেন, জীবন্ত মাকে প্রত্যক্ষ করিয়া, তাঁহার মুখে সেকথা সত্য কিনা তাহা শুনিয়া তবে আশ্বস্ত হইতেন৷ এই দিনও চিন্তিত হইয়া মা–কালীর নিকট যাইয়া সব জানাইয়া, নরেন্দ্রনাথ কেন তাঁহার দর্শনাদির কথা সহজভাবে মানিয়া লইতে পারেন না জিজ্ঞাসা করায় মা বলিলেন, ‘‘ওর কথা শুনিস কেন? কিছুদিন পরে ও সব কথা সত্য বলে মানবে৷’’
তাঁহার প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অপরিসীম ভালবাসা দেখিয়া নরেন্দ্রনাথ একদিন তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘মশায়, আমাকে এত ভালবাসেন কেন? এ ভাল নয়৷ ভরতরাজা হরিণ ভেবে ভেবে শেষে হরিণ হয়ে জন্মেছিলেন৷ সেকথা ভুলবেন না৷’’ শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিলেন, ‘‘তাই তো রে, তাহলে কি হবে–আমি যে তোকে না দেখে থাকতে পারি না?’’ পরে চিন্তিত হইয়া মায়ের কাছে চলিলেন৷ ফিরিয়া আসিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘‘তোর কথা আমি মানি না মা বলেছে তোর ভেতর নারায়ণকে দেখি বলেই তোর ওপর টান হয় যেদিন তা না দেখতে পাব, সেদিন থেকে তোর মুখও দেখব না৷’’ এভাবে শ্রীরামকৃষ্ণকে পরীক্ষা করিয়া লওয়া এবং যুক্তির আলোকে যাহা স্পষ্ট না দেখা যায় তাহা গ্রহণ না করার কাজ চলিতে লাগিল৷
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বি.এ. পরীক্ষার পর নরেন্দ্রনাথের পিতৃবিয়োগ হয়৷ পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ভাল উপার্জন করিয়াও আয়ের তুলনায় অত্যধিক ব্যয়ের জন্য কিছুই সঞ্চয় করিয়া যাইতে পারেন নাই, উপরন্তু প্রচুর ঋণ রাখিয়া গিয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ জ্যেষ্ঠপুত্র বলিয়া সংসারচালনার দায়িত্ব তাঁহাকেই স্কন্ধে তুলিয়া লইতে হইল৷ এই সময় তাঁহার শরীর ও মনের উপর দিয়া প্রচণ্ড দুর্যোগ বহিয়া যায়৷ সংসারে পাঁচ–সাতজন লোক অথচ কি করিয়া সংসার চলিবে, তাহার কোনওরূপ সংস্থান নাই৷ কি করা যায়, নরেন্দ্রনাথ তাহা ভাবিয়া পাইলেন না৷ চাকুরির জন্য বহুস্থানে চেষ্টা করিয়াও বিফলমনোরথ হইতে লাগিলেন৷ আত্মীয়েরাও সময় বুঝিয়া আঘাত হানিতে শুরু করিল পৈতৃক বাসভবন হইতে তাঁহাকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলিতে লাগিল৷ এত নিবিড় অন্ধকার তাঁহার জীবনাকাশকে আর কখনও ঢ়াকিয়াছিল কিনা বলা কঠিন৷ এই সময় সংসারের নগ্ণরূপ তাঁহার চোখের সামনে ফুটিয়া উঠে৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘বুঝিলাম স্বার্থশূন্য সহানুভূতি এখানে অতীব বিরল–দুর্বলের, দরিদ্রের স্থান এখানে নাই৷ দেখিতাম, দুইদিন পূর্বে যাহারা আমাকে বিন্দুমাত্র সহায়তা করিবার সুযোগ পাইলে ধন্য জ্ঞান করিয়াছে, সময় বুঝিয়া তাহারাই এখন আমাকে দেখিয়া মুখ বাঁকাইতেছে এবং ক্ষমতা থাকিলেও সাহায্য করিতে পশ্চাৎপদ হইতেছে৷ দেখিয়া শুনিয়া কখনও কখনও সংসারটা দানবের রচনা বলিয়া মনে হইত৷’’
এই সময় বহুদিন তাঁহাকে অনাহারে কাটাইতে হইয়াছে৷ বহুদিন তিনি অনাহারে, ক্লান্তদেহে চাকুরি–সংগ্রহের চেষ্টায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন৷ এই নিদারুণ দুঃখের সুযোগ লইয়া মাঝে মাঝে মঙ্গলময় ভগবানের অস্তিত্বে সন্দেহ তাঁহার হূদয় অধিকার কবিরার চেষ্টা করিত৷ মায়ের একটি কথায় অভিমানে একবার এই সন্দেহ প্রবল আকারে দেখা দিল৷ একদিন অভ্যাসমত ভগবানের নাম লইয়া শয্যাত্যাগ করিতেছেন, এমন সময় শুনিলেন মা বলিতেছেন, ‘‘চুপ কর ছোঁড়া ছেলেবেলা থেকে কেবল ভগবান, ভগবান–ভগবান তো সব কল্লেন’’ ছেলেমেয়েদের খাওয়ার কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া অতি–দুঃখে মায়ের মুখ দিয়া এই কথাগুলি বাহির হইয়াছিল৷ শুনিয়া নরেন্দ্রনাথের মনে প্রচণ্ড আঘাত লাগিল, ভগবানের উপর দারুণ অভিমানে হূদয় পূর্ণ হইল৷ স্তম্ভিত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, ‘ভগবান যদি সত্যই থাকেন, সত্যই যদি তিনি মানুষের প্রার্থনা শুনেন, তবে এত ডাকা সত্ত্বেও কোন সাড়া দিতেছেন না কেন?’ এই চিন্তা কিছুদিন মন অধিকার করিয়া রহিল, কিন্তু বহু ভাবিয়া–চিন্তিয়াও এ প্রশ্ণের কোন সদুত্তর পাইলেন না৷ গোপনে কিছু করার অভ্যাস তাঁহার কোনদিনই ছিল না৷ কাজেই এই সময় তিনি যাহা চিন্তা করিতেন, হাঁক–ডাক করিয়া বন্ধুবান্ধব সকলকেই তাহা শুনাইতে লাগিলেন৷ ফলে বন্ধুবান্ধব, এমনকি আত্মীয়–স্বজনেরাও ভুল বুঝিলেন সকলের ধারণা হইল নরেন্দ্রনাথ নাস্তিক হইয়া গিয়াছেন৷ এমন–কি তাঁহার চরিত্রদোষ ঘটিয়াছে বলিয়াও কেহ কেহ সন্দেহ করিলেন৷ তাঁহাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করিবার জন্য অবিদ্যারূপিণী মহামায়াও এই সময় প্রলোভন দেখাইতে ছাড়েন নাই৷ জনৈকা ধনী রমণীর পূর্ব হইতেই নরেন্দ্রনাথের উপর নজর পড়িয়াছিল৷ অবসর বুঝিয়া তিনি এই সময় প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন যে তাঁহার সহিত তাঁহার ধনসম্পত্তিও গ্রহণ করিয়া নরেন্দ্রনাথ দুঃখকষ্টের হাত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিতে পারেন৷ দারুণ অবজ্ঞায় কঠোর হইয়া সে প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন৷ আরও একজন রমণী প্রলোভিত করিতে আসিলে তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, ‘‘বাছা, এই ছাইভস্ম শরীরটার তৃপ্তির জন্য এতদিন কত কি তো করিলে মৃত্যু সম্মুখে, তখনকার সম্বল কিছু করিয়াছ কি? হীনবুদ্ধি ছাড়িয়া ভগবানকে ডাক৷’’
দুঃখকষ্ট, আর্থিক অনটন, প্রলোভন, লোকের অবিশ্বাস প্রভৃতির আঘাত যখন বাহিরের চারিদিক হইতে তাঁহাকে চূর্ণ করিয়া ফেলিতে চাহিতেছে, নিজের অন্তরেও যখন নাস্তিক্যবুদ্ধি বারবার ভীষণ আঘাত হানিতেছে, দেখা যায় সেই দারুণ দুঃসময়েও এই নির্ভীক, দুর্দমনীয়, বীর সত্যান্বেষী দৃষ্টি লক্ষ্যে স্থির রাখিয়া অটল পদক্ষেপে আগাইয়া চলিয়াছেন৷ ‘দ্বিধা হয়ে বাধা হতেছে ভিন্ন, পিছে পড়ে থাকে চরণচিহ্ণ’ তিনি বলিয়াছেন যে এই সময় নাস্তিকতার ভাব মনে জাগিলেই তাঁহার জীবনে ইতোমধ্যে যেসব অদ্ভুত অনুভূতিলাভ হইয়াছিল, সেগুলির স্মৃতি উজ্জ্বল হইয়া উঠিত ও ভাবিতেন, ‘‘ঈশ্বর নিশ্চয়ই আছেন এবং তাঁহাকে লাভ করিবার পথও নিশ্চয়ই আছে৷ ... দুঃখকষ্ট জীবনে যতই আসুক না কেন, সেই পথ খুঁজিয়া বাহির করিতেই হইবে৷’’ তাঁহার এই সময়কার জীবন–সংগ্রামের কথা ভাবিলে তাঁহার অগ্ণিগর্ভ উৎসাহ–বাণীগুলি হূদয়ে চিরমুদ্রিত হইয়া যায়–
‘‘আগুয়ান, সিন্ধুরোলে গান, অশ্রুজলপান, প্রাণপণ, যাক কায়া৷
জাগো বীর, ঘুচায়ে স্বপন, শিয়রে শমন, ভয় কি তোমার সাজে?’’
‘‘পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার, সদা পরাজয় তাহা না ডরাক তোমা৷
চূর্ণ হোক স্বার্থ সাধ মান, হূদয় শ্মশান, নাচুক তাহাতে শ্যামা৷’’
সংসারের দারিদ্র্য, দুঃখকষ্ট, হূদয়হীনতা প্রভৃতির সহিত এই ঘনিষ্ঠ পরিচয় তাঁহার হূদয়ে দুঃস্থ মানুষের প্রতি ভালবাসাকে গভীরতর করিয়া তুলিয়াছিল৷
সংসারে সকলে যখন তাঁহাকে অবিশ্বাস করিতেছে, সেই সময় একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার উপর বিশ্বাস ও ভালবাসা অটুট রাখিয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, ‘‘ভাবিলাম ঠাকুরও হয়তো ইঁহাদের মুখে শুনিয়া ঐরূপ বিশ্বাস করিবেন৷ ঐরূপ ভাবিবামাত্র আবার দারুণ অভিমানে অন্তর পূর্ণ হইল৷ স্থির করিলাম, তা করুন–মানুষের ভালমন্দ মতামতের যখন এতই অল্পমূল্য, তখন তাহাতে আসে যায় কি? পরে শুনিয়া স্তম্ভিত হইলাম, ঠাকুর তাঁহাদের মুখে ঐসকল কথা শুনিয়া প্রথমে হাঁ না কিছুই বলেন নাই পরে... যখন বলিয়াছিল, ‘মহাশয়, নরেন্দ্রের এমন হইবে, একথা স্বপ্ণেরও অগোচর’–তখন বিষম উত্তেজিত হইয়া তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন, ‘চুপ কর... মা বলিয়াছেন সে কখনও ঐরূপ হইতে পারে না আর কখনও আমাকে ঐসব কথা বলিলে তোদের মুখ দেখিতে পারিব না৷’
এইকালে আস্তিক্যবুদ্ধি একেবারে লুপ্ত না হইলেও নরেন্দ্রনাথের মনে অশান্তির ঝড় বহিয়াই চলিল৷ একদিন অনাহারে সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাকুরির সন্ধানে ঘুরিয়া ক্লান্ত দেহে, অবসন্ন মনে সন্ধ্যার দিকে রাস্তার ধারে একটি রোয়াকের উপর শুইয়া পড়িয়াছেন৷ এমন সময় দৈব কৃপায় তাঁহার একটি উপলব্ধি হয়৷ এই সময় যেসব প্রশ্ণের সমাধান বুদ্ধি দ্বারা করিতে না পারিয়া মন অশান্তিতে ভরিয়া উঠিয়াছিল, এই অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের উদ্ভাসে তাহার সবকিছুরই সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইলেন৷ মনের আকাশকে এতদিন যে সংশয়ের মেঘ বারে বারে ঢ়াকিতে চাহিতেছিল, তাহা চিরতরে অপসৃত হইল, অশান্তির ঝড় থামিয়া গেল, বিমল বিশ্বাসের স্থির স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না আবার অবাধে ঝরিয়া পড়িল৷ এই উপলব্ধির ফলে তিনি বুঝিলেন যে সাধারণের মতো জীবন–ধারণ করিতে তিনি আসেন নাই৷ স্থির করিলেন পিতামহের ন্যায় সন্ন্যাসী হইয়া চলিয়া যাইবেন৷ যাইবার দিনও শীঘ্রই স্থির করিয়া ফেলিলেন৷
কিন্তু ঈশ্বরেচ্ছা অন্যরূপ৷ সংসারত্যাগের জন্য যে দিনটি নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন, সংবাদ পাইলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেদিন কলকাতায় কোন ভক্তগৃহে আসিতেছেন৷ ভাবিলেন ঃ ‘‘ভালই হইল, গুরুদর্শন করিয়া চিরকালের মতো গৃহত্যাগ করিব৷’’ কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবামাত্র তিনি বলিলেন, ‘‘তোকে আজ আমার সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে যাইতে হইবে৷’’ নরেন্দ্রনাথ বহু ওজর–আপত্তি করিলেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণদেব কিছুতেই ছাড়িলেন না, ফিরিবার সময় তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেলেন৷ দক্ষিণেশ্বরে পঁৌছাইবার কিছুক্ষণ পরে ভাবাবিষ্ট শ্রীরামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথকে সস্নেহে ধরিয়া সজলনয়নে গাহিতে লাগিলেন, ‘‘কথা কহিতেও ডরাই, না কহিতেও ডরাই, (আমার) মনে সন্দ হয়, পাছে তোমারে হারাই, হা–রাই’’ নরেন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, ‘‘অন্তরের প্রবল ভাবরাশি এতক্ষণ সযত্নে রুদ্ধ রাখিয়াছিলাম, আর বেগ সংবরণ করিতে পারিলাম না–ঠাকুরের ন্যায় আমারও বক্ষ নয়নধারায় প্লাবিত হইতে লাগিল৷ নিশ্চয় বুঝিলাম, ঠাকুর সব কথা জানিতে পারিয়াছেন৷’’ পরে রাত্রে তাঁহাকে একাকী কাছে ডাকিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিলেন, ‘‘জানি আমি, তুমি মার কাজের জন্য আসিয়াছ, সংসারে কখনই থাকিতে পারিবে না৷ কিন্তু আমি যতদিন আছি, আমার জন্য থাক৷’’
ভালবাসার শক্তির কাছে অজেয় কিছুই নাই৷ নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় সম্মত না হইয়া পারিলেন না এবং ফিরিয়া আসিয়া পূর্ববৎ চাকুরির সন্ধান করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু সংসার–চালনার পক্ষে যথেষ্ট হয়, এরূপ কোন স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা হইল না৷ তখন মা ও ভাইদের খাওয়া–পরার কষ্ট আর সহ্য করিতে না পারিয়া এবং নিজের চেষ্টায় তাহার কোন প্রতিকারও করিতে পারিতেছেন না দেখিয়া একদিন দক্ষিণেশ্বরে যাইয়া শ্রীরামকৃষ্ণকে অনুরোধ করিলেন যে তাঁহার মা ও ভাইদের অন্নকষ্ট দূর করিয়া দিবার জন্য মা–কালীকে বলিতে হইবে৷ বারংবার অনুরোধের পর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিলেন, ‘‘আচ্ছা আজ মঙ্গলবার, আমি বলছি, আজ রাত্রে কালীঘরে গিয়ে মাকে প্রণাম করে তুই যা চাইবি, মা তোকে তাই দিবেন৷’’ শুনিয়া নরেন্দ্রনাথের দৃঢ় বিশ্বাস হইল, শ্রীরামকৃষ্ণদেব যখন বলিলেন, তখন মায়ের কাছে প্রার্থনা করিলেই সব দুঃখের অবসান হইবে৷
সন্ধ্যার কিছু পরে মায়ের চিন্তায় তন্ময় নরেন্দ্রনাথ মন্দিরে যাইয়া সত্যসত্যই চিন্ময়ী জীবন্ত মাকে দেখিতে পাইলেন৷ আর কোন কথা মনে জাগিল না, ভক্তিপ্রেমে বিহ্বল হইয়া বারবার মায়ের চরণে প্রণাম করিয়া প্রার্থনা করিলেন, ‘‘মা, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও, জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, যাহাতে তোমার অবাধ দর্শন নিত্য লাভ করিতে পারি এরূপ করিয়া দাও৷’’ আনন্দে ভরপুর হইয়া ফিরিয়া আসিলে শ্রীরামকৃষ্ণদেব জিজ্ঞাসা করিলেন, মাকে যাহা বলিবার তাহা বলা হইয়াছে কিনা৷ নরেন্দ্রনাথ চমকিত হইয়া বলিলেন, ‘‘না মহাশয়, ভুলিয়া গিয়াছি’’ শ্রীরামকৃষ্ণদেব আবার তাঁহাকে পাঠাইলেন৷ আবার ভুল হইল৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব তৃতীয়বার তাঁহাকে পাঠাইলেন এবং নিজেকে একটু সামলাইয়া কোনওরূপে মার কাছে দুঃখকষ্ট দূর করিবার জন্য প্রার্থনা করিতে বলিয়া দিলেন৷ এবারে নরেন্দ্রনাথ ঐরূপ করিবার সঙ্কল্প হূদয়ে জাগরূক রাখিয়া মন্দিরের দ্বার পর্যন্ত যাইলেন, কিন্তু মন্দিরে ঢুকিয়াই লজ্জায় মরিয়া গেলেন–‘‘একি তুচ্ছ কথা আমি মাকে বলিতে আসিয়াছি ঠাকুর যে বলেন, রাজার প্রসন্নতা লাভ করিয়া তাঁহার নিকট হইতে ‘লাউ–কুমড়া ভিক্ষা করা’–এ যে সেইরূপ নির্বুদ্ধিতা’’ বারে বারে মাকে প্রণাম করিয়া বলিলেন, ‘‘অন্য কিছু চাহি না মা, কেবল জ্ঞান–ভক্তি দাও’’
মন্দির হইতে ফিরিয়া আসিয়া ইহা শ্রীরামকৃষ্ণরই খেলা ভাবিয়া তাঁহাকে চাপিয়া ধরিলেন, ‘‘এখন আপনাকেই বলতে হবে যে আমার মা ভাইদের খাওয়া–পরার অভাব থাকবে না৷’’ বারংবার অনুরুদ্ধ হইয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব ঐ দিন বলিয়াছিলেন, ‘‘আচ্ছা যা, তাদের মোটা ভাত–কাপড়ের অভাব কখনও হবে না৷’’
এই ঘটনায় নরেন্দ্রনাথের চিন্তাজগতে যুগান্তর আসিল, জীবনে নূতন অধ্যায় শুরু হইল৷ এইদিনই তিনি স্থির বুঝিলেন, আধ্যাত্মিক সত্যলাভের পথে বুদ্ধির শক্তি কত সীমায়িত, কত অকিঞ্চিৎকর বুঝিলেন বুদ্ধির পারে যাইতে না পারিলে উহা লাভ করা যায় না হূদয়ের পথ ধরিয়া সেখানে পঁৌছিতে হয় পবিত্র শুদ্ধ হূদয়েই সে সত্য উদ্ভাসিত হয়৷ সেইদিন হইতে যুক্তির সঙ্গে তাঁহার হূদয়ের বিরোধ থামিয়া গেল৷ পরজীবনে তিনি বলিয়াছেন যে মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বের বিকাশের জন্য বুদ্ধিবৃত্তি ও হূদয়–উভয়েরই সমান উৎকর্ষ–সাধন প্রয়োজন৷ যুক্তি ও বুদ্ধি যতদূর যাইতে পারে, তাহাদের সঙ্গে ততদূর অবশ্যই যাইতে হইবে৷ তবে বুদ্ধি কিছুদূর যাইয়া আর যাইতে পারে না, তাহার একটা সীমা আছে৷ কিন্তু জ্ঞানালোক আসিবার জন্য বুদ্ধির দ্বার অপেক্ষা বহুগুণ বেশি প্রশস্ত আর একটি দ্বার পবিত্র একাগ্র হূদয়ে উন্মুক্ত হয় ইহার নাম স্বজ্ঞা৷ এই পথে যখন জ্ঞানের আলোক আসিতে আরম্ভ করে, মানুষ তখন বুদ্ধির সীমা ছাড়াইয়া সত্যের রাজ্যে আরও বহুদূর চলিয়া যায়৷ তিনি বলিয়াছেন যে, মস্তিষ্কের ভাষা সর্বত্র পঁৌছায় না, কিন্তু হূদয়ের ভাষা তৃণগুচ্ছ হইতে আরম্ভ করিয়া ভগবান পর্যন্ত সকলেই বুঝিতে পারে৷ সাধারণ দৃষ্টিতেই আমরা দেখিতে পাই, একজন আরেকজনকে ভালবাসিতেছে কি ঘৃণা করিতেছে, তাহা মানুষ তো দূরের কথা, পশুপক্ষীরাও বুঝিতে পারে৷ আচার্য শঙ্করের মতো জ্ঞান এবং বুদ্ধদেবের মতো হূদয়ের একত্র সমাবেশই পরবর্তিকালে তাঁহাকে নবযুগের পথনির্দেশক, দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক, বিশ্বজয়ী মহাজ্ঞানী স্বামী বিবেকানন্দে পরিণত করিয়াছিল৷ তাঁহার জীবৎকালেই একদিকে যেমন ম্যাক্সমূলর, টলস্টয় প্রভৃতি আস্তিক পণ্ডিতেরা, ইঙ্গারসোল প্রভৃতি নাস্তিকেরা এবং বহু বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরা তাঁহার জ্ঞানের গভীরতা ও প্রসারতা দেখিয়া বিস্ময়–বিমুগ্ধ হইয়াছেন, অপরদিকে তেমনি তাঁহার স্বদেশ–প্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া ভারতের দুর্দশা মোচনের জন্য জীবন বলি দিয়াছেন বহু ভারত–সন্তান, এমনকি দু–একজন পাশ্চাত্যবাসীও দুঃস্থ জনগণের প্রতি তাঁহার অসীম সহানুভূতি জনসেবার কাজে ‘মন–প্রাণ–শরীর অর্পণ’ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে বহু ভাগ্যবানকে৷
নরেন্দ্রনাথ মনে–প্রাণে সত্যনিষ্ঠ ও যুক্তিনিষ্ঠ ছিলেন৷ তাই যখনই বুদ্ধির সসীমতার কথা বুঝিতে পারিলেন এবং অতীন্দ্রিয় রাজ্যে প্রবেশ করিবার সিংহদ্বারের সন্ধান পাইলেন, তখনই তাঁহার মনে হইল যে শ্রীরামকৃষ্ণদেব আধ্যাত্মিক সত্য সম্বন্ধে যেসব কথা বলেন, যেসব ঈশ্বরীয় দর্শন তাঁহার হয়, বা শাস্ত্রে এবিষয়ে যাহা লিপিবদ্ধ আছে, বিনা পরীক্ষায় সেগুলিকে মিথ্যা বলিয়া উড়াইয়া দেওয়াটা যুক্তিবিরোধী৷ বিশুদ্ধ যুক্তির দিক হইতে দেখিলে শাস্ত্র বা সত্যদ্রষ্টা–নির্দিষ্ট পথ ধরিয়া চলিয়া সেগুলি সত্য কিনা তাহা দেখিয়া লইবার পূর্ব পর্যন্ত সেসব তত্ত্ব বা উপলব্ধি সম্বন্ধে কোন মতামত প্রকাশের অধিকারই আসে না কাহারও৷ আর তিনি নিজেই তো চিন্ময়ী জগজ্জননীকে প্রত্যক্ষ করিলেন প্রত্যক্ষই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা অতীন্দ্রিয় সর্ববিধ জ্ঞানের মূল ভিত্তি, প্রত্যক্ষ–জ্ঞানকে অবলম্বন করিয়াই যুক্তি, অনুমান প্রভৃতির উদ্ভব বুদ্ধি, যুক্তি, অনুমানাদি সবকিছু ভাসিয়া যায় প্রত্যক্ষ–জ্ঞানের কাছে৷ আমি যদি রাস্তায় আসিবার সময় সুস্থ দেহ–মন লইয়া নিজের চোখে স্পষ্ট দেখিয়া আসি যে সেখানে একটি লোক বসিয়া আছে, আর ফিরিয়া সেকথার উল্লেখ করিলে আমা অপেক্ষা অধিকতর বুদ্ধিমান কেহ যুক্তিতর্কসহায়ে ইহা নির্ভুলভাবে প্রমাণও করিয়া দেয় যে সেখানে ঐ সময় ঐ লোকটির থাকা একেবারে অসম্ভব, তথাপি আমার মন হইতে সে প্রত্যক্ষ–জ্ঞানকে সরাইয়া দেওয়া দুঃসাধ্য হয়৷
সেজন্য মা–কালীকে দর্শন করিবার পর শ্রীরামকৃষ্ণকে যাচাই করিয়া দেখিবার প্রয়োজন আর রহিল না৷ ঐ দিন হইতে নরেন্দ্রনাথ তাঁহার কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিয়া তাঁহার নির্দেশমতো সাধনপথ ধরিয়া ভগবানলাভের জন্য অক্লান্ত সাধনায় ব্রতী হইলেন এবং সাধনান্তে শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় পূর্ণকাম হইলেন৷
এভাবে শ্রীরামকৃষ্ণের কথাগুলি তিনি প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধি সহায়ে যাচাইয়া বাজাইয়া, ও পরে সাধনসহায়ে নিজজীবনে উহা উপলব্ধি করিয়া সবই সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন৷ প্রত্যক্ষ–নুভূতির কষ্টিপাথরে সুপরীক্ষিত যুক্তির অবিরোধী সেই অমূল্য বাণীগুলিই তিনি আধুনিক যুগের মানুষের বোধগম্য ভাষায় সারা জগতে প্রচার করিয়া গিয়াছেন৷
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি শ্রীরামকৃষ্ণদেব কর্কটরোগে আক্রান্ত হন৷ তাঁহার চিকিৎসাদির সুবিধার জন্য ভক্তেরা তাঁহাকে কলকাতার শ্যামপুকুরে একটি ভাড়াবাড়িতে আনিয়া রাখেন৷ সেখানে কিছুদিন থাকিবার পর একটি বাগানবাড়ি ভাড়া করিয়া কাশীপুরে তাঁহাকে লইয়া যাওয়া হয়৷ তখন হইতে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত, আটমাস কাল, শ্রীরামকৃষ্ণদেব এখানেই ছিলেন৷ গৃহস্থ ভক্তগণ তাঁহার চিকিৎসাদির ব্যয়ভার বহন করিতেন, আর নরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীনে থাকিয়া যুবভক্তগণ তাঁহার সেবা করিতেন৷
এই কাশীপুরে নরেন্দ্রনাথের জীবনের আর এক অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়৷ ঈশ্বরলাভের জন্য যে দুর্বার আকা্যা নরেন্দ্রনাথের হূদয়ে আবাল্য জাগ্রত থাকিয়া বহু ঘটনা, বহুজনের সঙ্গে পরিচয়, বহুগ্রন্থপাঠ, বহুবিধ সাধনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে দুর্গম, দুর্যোগময় দীর্ঘ পথের উপর দিয়া তাঁহাকে লইয়া চলিয়াছিল, এই কাশীপুর উদ্যানেই সে পথ লক্ষ্যে পৌঁছিয়া শেষ হইল আধ্যাত্মিক জগতের চরম লক্ষ্য নির্বিকল্প সমাধি লাভ করিয়া তিনি কৃতকৃতার্থ হইলেন৷ পাইবার আর কিছু রহিল না–‘‘যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ৷’’ যে পরমধন পাওয়া গিয়াছে তাহা লইয়া আনন্দ করা ছাড়া চাহিবারও আর কিছু থাকিল না৷ এই সীমাহীন আনন্দ–সাগরে নিজের পৃথক সত্তাকে মিশাইয়া দিয়া অবিরাম এক হইয়া থাকিতে চাহিলেন তিনি।
কিন্তু চাহিলে চলিবে কেন? শ্রীরামকৃষ্ণদেবও এরূপ করিতে চাহিয়াছিলেন, মা তাহা করিতে দেন নাই মায়ের কাজ আছে৷ মায়ের যে কাজের জন্য জগৎকল্যাণরূপ যে মহাব্রতসাধনের সহায়তার জন্য তিনি আসিয়াছেন, তিনি তখনও তাহা না জানিলেও শ্রীরামকৃষ্ণদেব তো তাহা জানেন৷ সে মহাকার্য সাধনের উপযোগী মহাশক্তির যন্ত্ররূপে শ্রীরামকৃষ্ণদেব তিলে তিলে তাঁহাকে গড়িয়া তুলিয়াছেন৷ গঠন আজ সম্পূর্ণ৷ নির্বিকল্প সমাধি লাভের ফলে নরেন্দ্রনাথ এখন অসীম জ্ঞানের, অসীম শক্তির অধিকারী, তাঁহার মন স্বার্থগন্ধশূন্য৷ এদিকে আবার বর্তমান যুগের মানুষের সর্ববিধ সন্দেহ–সংশয়ের সঙ্গেও তিনি পরিচিত, তাহার অসীম দুঃখকষ্টের সঙ্গেও৷ যেসব দুর্বল মুহূর্ত মানুষকে বিপথগামী করিতে পারে, সেগুলির সঙ্গেও তাঁহার পরিচয় ঘটিয়াছে৷ তিনি এখন জাগতিক ও অতীন্দ্রিয় উভয়বিধ জ্ঞানেরই অধিকারী৷ তাহার সর্ববাধাবিনির্মুক্ত সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণীকে নির্ভুল করিবার উপযোগী৷ এখন সমাধিতে লীন হইয়া থাকিতে চাহিলে চলিবে না, কাজে নামিতে হইবে৷ বর্তমান–যুগের মানুষের মনের সন্দেহ–সংশয় কাটাইয়া, সত্যের সন্ধান দিয়া তাহাকে যথার্থ প্রগতির পথ দেখাইতে হইবে মৃতপ্রায় ভারতকে বজ্রনির্ঘোষে জাগাইয়া আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হইবার জন্য উদ্বুদ্ধ করিতে হইবে৷ এই মহাকার্যসাধনের জন্যই মা দক্ষিণেশ্বরের অদৃষ্টপূর্ব সাধনপীঠে শ্রীরামকৃষ্ণরূপ মহাজ্ঞানের, মহাপ্রেমের মহাশক্তিময় গগনচুম্বী হোমানলশিখা জ্বালাইয়াছেন৷ তাঁহার স্পর্শে নরেন্দ্রনাথের জীবনও অনুরূপ শিখা বিস্তার করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়াছে৷ এখন জগতের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া নিজের জীবন–শিখার স্পর্শে, অমোঘ ইচ্ছার স্পর্শে, অগ্ণিময়ী বাণীর স্পর্শে হূদয়ে হূদয়ে জ্ঞানের দীপ, প্রেমের দীপ, প্রেরণার দীপ জ্বালিয়া দিতে হইবে৷ এইটিই মায়ের কাজ৷ ইহারই জন্য এত আয়োজন৷ এখন দৃষ্টিকে নির্বিকল্প সমাধির অত্যুচ্চ প্রদেশ হইতে নামাইয়া আনিয়া একবার শুধু ধরণীর ধূলিমলিন জনগণের দিকে ফিরাইতে হইবে৷ তাহা হইলে তাহাদের দুঃখকষ্ট দূর করিবার জন্য স্বার্থলেশহীন হূদয় সমবেদনায় স্বতই উদ্বেল হইয়া উঠিবে৷
শ্রীরামকৃষ্ণদেব ঠিক এই কাজটিই করিলেন, নির্বিকল্প সমাধি হইতে নরেন্দ্রনাথ ব্যুত্থিত হইবার পরই তাঁহার দৃষ্টি জগতের দিকে ফিরাইয়া আনিলেন–‘‘মা তো তোমাকে এখন সব দেখাইয়া দিলেন৷ এসব তালাবদ্ধ রহিল, চাবি রহিল আমার হাতে৷ এখন কাজ আছে৷ কাজ শেষ হইলে আবার উহা ফিরিয়া পাইবে৷’’
শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে বলিয়াছিলেন যে, পরে মায়ের কৃপায় তাঁহার জীবনে এই অনুভূতি অতি সহজ হইয়া যাইবে, সাধারণ অবস্থাতেই সব কিছুর ভিতর তিনি পরমানন্দময় চরম সত্তাকে দেখিতে পাইবেন৷
নরেন্দ্রনাথের প্রথম নির্বিকল্প সমাধি লাভের কিছুদিন পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘‘তুই কি চাস?’’ তাহাতে নরেন্দ্রনাথ বলিয়াছিলেন, ‘‘আমার ইচ্ছা হয়, শুকদেবের মতো একেবারে পাঁচ–ছয়দিন সমাধিতে লীন হইয়া থাকি, পরে একটু নিচে নামিয়া শুধু দেহরক্ষার জন্য কিছু খাইয়া আবার সমাধিতে ডুবিয়া যাই৷’’ ইহাতে শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিয়াছিলেন, ‘‘লজ্জা করে না তোর একথা বলতে তুই এতবড় আধার, তোর মুখে এই কথা ভেবেছিলাম কোথায় একটা বিশাল বটবৃক্ষের মতো হবি–তোর ছায়ায় হাজার হাজার লোক আশ্রয় পাবে–তা নয়, তুই শুধু নিজের মুক্তি চাস’’
পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণদেব যখন বলিতেন, ‘‘নরেন্দ্র লোকশিক্ষা দিবে’’, তখন নরেন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করিতেন, ‘‘আমি ওসব পারব না৷’’ শ্রীরামকৃষ্ণদেব হাসিয়া বলিতেন, ‘‘তুই কি পারবি, তোর ঘাড় পারবে৷ মা ঘাড়ে ধরে তোকে দিয়ে করিয়ে নেবেন৷’’
শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছামতো ‘মায়ের কাজে’ নরেন্দ্রনাথ কতখানি মন–প্রাণ ঢ়ালিয়া দিয়াছিলেন, তাহা বুঝা যায় তাঁহার পরবর্তিকালের দু–একটি কথা হইতেই :
‘‘আমার মুক্তির বাপ নির্বংশ হোক, মানুষের দুঃখকষ্ট নিবারণের জন্য প্রয়োজন হইলে আমি লাখবার নরকে যাইতে প্রস্তুত৷’’
‘‘দাস তব প্রস্তুত সতত সাধিতে তোমার কাজ’’
১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেহত্যাগ করেন৷ দেহত্যাগের পূর্বে ‘মায়ের কাজের’ গুরুদায়িত্ব তিনি নরেন্দ্রনাথের স্কন্ধে তুলিয়া দিয়া যান৷ ভারতকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়া তাহার দুর্গত সন্তানদের অশ্রু মুছাইয়া দিতে হইবে জগতে সর্বগ্লানি–বিনির্মুক্ত্ ধর্মের প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে৷ আর এ–কার্যের সহায়করূপে একটি প্রতিষ্ঠান গড়িয়া যাইতে হইবে– ত্যাগ ও সেবার ভাবকে, শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বমানবিক উদার বিশাল অধ্যাত্ম–ভাব–রাশিকে জীবনে অনির্বাণ রাখিবার জন্য ত্যাগী যুবক–ভক্তদের জীবনকে ভিত্তি করিয়া একটি নূতন ধরনের মানবসেবাব্রতী সন্ন্যাসিস৯ গড়িতে হইবে৷এইসব যুবক–ভক্তদের দেখাশুনার ভারও তিনি নরেন্দ্রনাথকে দিয়া গিয়াছিলেন৷ কাশীপুরে বাসকালে নরেন্দ্রনাথকে একাকী কাছে ডাকাইয়া ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া দিনের পর দিন শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে এসব বিষয়ে বহু উপদেশ দিয়াছিলেন৷ দেহত্যাগের দু–চার দিন পূর্বে নিজ সাধনলব্ধ সমস্ত শক্তি নরেন্দ্রনাথের মধ্যে সঞ্চারিত করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘আজ তোমায় আমার সর্বস্ব দিয়ে ফকির হয়ে গেলাম৷ এই শক্তি দিয়ে তুমি জগতের অশেষ কল্যাণসাধন করবে৷ এ কাজ শেষ হবার আগে তোমার ফিরে যাওয়া হবে না৷’’
যুবক–ভক্তদের পরস্পরকে অসীম ভালবাসার ডোরে বাঁধিয়া এবং ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া দেহত্যাগের পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণ–সন্ন্যাস্৯র ভিত্তি–পত্তন শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজেই করিয়া গিয়াছিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের অল্প কিছুদিন পরেই তাঁহার গৃহস্থ–ভক্ত শ্রীসুরেশচন্দ্র মিত্রের স্বেচ্ছাপ্রদত্ত অর্থে বরাহনগরে একটি অতি জীর্ণ ‘ভূতের বাড়ি’ ভাড়া লইয়া নরেন্দ্রনাথ সেখানে একে একে যুবক–ভক্তদের একত্র করিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব–স্থা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর বরাহনগরে এভাবে স৯রূপ সৌধের গঠন শুরু হইল৷ সকলের অতন্ত্র সাধনায় মঠটি অপূর্ব তপোভূমি হইয়া উঠিল৷ খুবই কষ্টে দিন কাটাইতে হইত তখন, সবদিন পেট ভরিয়া খাওয়াও হইত না৷ এমন সময় গয়াছে, যখন পরিয়া বাহির হইবার মতো কাপড় মঠে একখানির বেশি থাকিত না৷ মঠের ভিতর সকলেই কৌপীন পরিয়া থাকিতেন, যখন যাঁহাকে বাহির হইতে হইত, তিনি তখন ঐ বস্ত্রখানিই পরিয়া বাহির হইতেন৷ কিন্তু তাঁহাদের মনে তখন ত্যাগ ও ভগবৎপ্রেমের বান ডাকিয়া যাইতেছে অন্য কোন বিষয়ে ভ্রূক্ষেপও ছিল না কাহারও৷ এত কষ্টের মধ্যেও মাঝে মাঝে তাঁহাদের অন্তরের প্রসন্নতা ও আনন্দ হাসির তরঙ্গাকারে মঠের আকাশ–বাতাস ভরাইয়া তুলিত৷
১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে বড়দিনের সময় একজন গুরুভ্রাতার (স্বামী প্রেমানন্দ) মায়ের নিমন্ত্রণে অন্যান্য গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে লইয়া নরেন্দ্রনাথ আঁটপুরে যান এবং সেখানে কয়েকদিন পরমানন্দে কাটাইয়া আসেন৷ সেখানে প্রায় প্রতিদিনই রাত্রিবেলা ধুনি জ্বালিয়া সকলে উহার চারিপাশে বসিতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঈশ্বর–প্রসঙ্গ চলিত৷ একদিন রাত্রে সকলে এভাবে ধুনি জ্বালিয়া বসিয়াছেন, এমন সময় নরেন্দ্রনাথ সহসা ভাবস্থ হইয়া যিশুর অপূর্ব ত্যাগ, বৈরাগ্য, পবিত্রতা ও প্রেমের কথা অগ্ণিময়ী ভাষায় বলিতে লাগিলেন৷ কথাগুলি সকলের প্রাণে এত গভীরভাবে গাঁথিয়া গেল যে সেইদিনই তাঁহারা অবিলম্বে বাহ্য–সন্ন্যাস গ্রহণের সঙ্কল্প দৃঢ় করিলেন৷ পরে জানিয়াছিলেন, সেটি ‘খ্রিস্টমাস ইভ’–এর রাত্রি৷ আঁটপুর হইতে বরাহনগর মঠে ফিরিয়া ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ভারতের যুগযুগান্ত–প্রচলিত্ শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী বিরজা হোম করিয়া তাঁহারা বাহ্য–সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেন৷ প্রজ্বলিত হোমাগ্ণিতে ইহকাল–পরকালের সর্ববিধ বন্ধন, সর্ববিধ ভোগবাসনা আহুতি প্রদান করিয়া তাঁহারা গৈরিক বস্ত্র ও নূতন নামে ভূষিত হইলেন৷ নরেন্দ্রনাথের সন্ন্যাস নাম স্বামী বিবেকানন্দ৷১
শ্রীরামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথকে যে কার্যের গুরুভার দিয়া গিয়াছিলেন, সে কার্যসাধনের জন্য তখন তাঁহার সহায় তাঁহারই মতো অজ্ঞাত, অখ্যাত, সহায় সম্বলহীন, স্কুল–কলেজ হইতে সদ্য বহিরাগত এই কয়েকজন যুবক সন্ন্যাসী মাত্র৷ কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণদেব সঙ্গে রহিয়াছেন, এই বিশ্বাস অটুট রাখিয়া নিজের চির–পরাজেয় ইচ্ছাশক্তি ও চিরজাগ্রত আত্মবিশ্বাস সম্বল করিয়া আরব্ধকর্মের পথে এই বীর সন্ন্যাসী অগ্রসর হইলেন৷
নরেন্দ্রনাথের অধিকাংশ গুরুভ্রাতাই সন্ন্যাসগ্রহণের পর তীর্থভ্রমণে বাহির হন৷ নরেন্দ্রনাথ তখন প্রধানত স৯–গঠনের কাজে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন বলিয়া মঠ ছাড়িয়া কোথাও যান নাই অল্প কয়েক দিনের জন্য কাশী ও দেওঘর ঘুরিয়া আসিয়াছিলেন মাত্র৷ ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তীর্থভ্রমণে বাহির হন৷ বরাহনগর মঠ হইতে বাহির হইয়া কাশী, অযোধ্যা, আগ্রা, বৃন্দাবন প্রভৃতি স্থান হইয়া তিনি হরিদ্বারে পৌঁছান এবং বৎসরের শেষের দিকে বরাহনগর মঠে ফিরিয়া আসেন৷
১ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সন্ন্যাসী শিষ্য ষোল জন ঃ স্বামী বিবেকানন্দ (নরেন্দ্রনাথ), স্বামী ব্রহ্মানন্দ (রাখাল), স্বামী প্রেমানন্দ (বাবুরাম), স্বামী যোগানন্দ (যোগেন), স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (নিরঞ্জন), স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ (শশী), স্বামী শিবানন্দ (তারক), স্বামী তুরীয়ানন্দ (হরি), স্বামী অভেদানন্দ (কালী), স্বামী সারদানন্দ (শরৎ), স্বামী অদ্বৈতানন্দ (গোপাল), স্বামী অদ্ভুতানন্দ (লাটু), স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ (সারদা), স্বামী সুবোধানন্দ (সুবোধ), স্বামী অখণ্ডানন্দ (গঙ্গাধর) ও স্বামী বিজ্ঞানানন্দ (হরিপ্রসন্ন)৷ ইঁহাদের সকলে একদিনে উপস্থিত ছিলেন না, কেহ কেহ তীর্থ–ভ্রমণে গিয়াছিলেন, কেহ তখনো মঠে যোগদান করেন নাই৷ তাঁহারা পরে বিভিন্ন সময়ে বিরজা হোম করিয়া সন্ন্যাসগ্রহণ করিয়াছিলেন৷ কাশীপুরে বাসকালে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ইঁহাদের এগারো জনকে গৈরিক বস্ত্র দান করিয়াছিলেন৷
এই সময় হরিদ্বার যাওয়ার পথে হাতরাসে স্টেশনমাস্টার শ্রীশরচ্চন্দ্র গুপ্তের সহিত তাঁহার পরিচয় হয়৷ প্রথম দর্শনেই আকৃষ্ট হইয়া শরচ্চন্দ্র তাঁহাকে নিজগৃহে আনিয়া রাখেন৷ একদিন স্বামীজীকে চিন্তিত দেখিয়া শরচ্চন্দ্র উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে স্বামীজী বলিয়াছিলেন, ‘‘বাবা, আমাকে একটি মহৎকার্য সাধন করিতে হইবে৷ এই কাজের তুলনায় আমার শক্তির স্বল্পতা দেখিয়া মনে হতাশা জাগিতেছে৷ এই কার্যসাধন করিবার জন্য আমি গুরুকর্তৃক আদিষ্ট৷ কাজটি সফল করিতে হইলে আমার মাতৃভূমিকে ঢ়ালিয়া নূতন করিয়া সাজিতে হইবে, তাহার কমে হইবে না৷’’ শরচ্চন্দ্র স্বামীজীর এই হূদয়বত্তায় অভিভূত হইয়া বলিলেন, ‘‘আমার দ্বারা যদি এ কাজের কিছু সহায়তা হয়, আমি তাহা করিতে প্রস্তুত আছি৷’’ স্বামীজী বলিলেন, ‘‘তবে আমার মতো সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া কাজে নামিতে হইবে’’ শরচ্চন্দ্র তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানাইলেন৷ কয়েকদিন পরে হাতরাস হইতে স্বামীজী যখন হরিদ্বারের পথে বাহির হইলেন, সে সময় শরচ্চন্দ্রও সংসার ত্যাগ করিয়া তাঁহার সেবকরূপে সঙ্গে সঙ্গে গিয়াছিলেন এবং বরাহনগর মঠে ফিরিয়া আসা পর্যন্ত সঙ্গেই ছিলেন৷ স্বামীজীর নিকট হইতে সন্ন্যাসদীক্ষা গ্রহণের পর তাঁহার নাম হয় স্বামী সদানন্দ৷
বরাহনগর মঠে ফিরিয়া স্বামীজী আবার স৯গঠনের কাজে মনোনিবেশ করিলেন৷ ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বার তীর্থভ্রমণে বাহির হন৷ এবারে এলাহাবাদ, গাজীপুর প্রভৃতি স্থান হইয়া হরিদ্বারে গমন করেন এবং সেখান হইতে পুনরায় বরাহনগর মঠে ফিরিয়া আসেন৷
এই সময় গাজীপুরে সিদ্ধযোগী পওহারী বাবার সঙ্গে তাঁহার সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁহার নিকট যোগশিক্ষা করিবার জন্য স্বামীজীর মনে প্রবল আগ্রহ দেখা দেয়৷ মনে হয়, নির্বিকল্প সমাধির অবর্ণনীয় সীমাহীন আনন্দের স্মৃতিই এই আগ্রহের মূল উৎস৷ সে আনন্দলোক হইতে টানিয়া আনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে কাজে নামাইয়াছেন বলিয়া গিয়াছেন কাজ শেষ হইবার পূর্বে সেখানকার দ্বার খুলিয়া দিবেন না৷ শ্রীরামকৃষ্ণের আদেশ অবনতশিরে গ্রহণ করিয়া তিনি কাজ আরম্ভ করিয়াছেন৷ কিন্তু মনে হয়, সে আনন্দের কথা মনে জাগিলেই কোনও রূপে আবার তাহা লাভ করিবার ইচ্ছা তাঁহার অন্তরে প্রবল হইয়া উঠিত৷ নির্বিকল্প সমাধির আনন্দের এই স্মৃতিই বারে বারে তাঁহাকে হিমালয়ের বুকে দীর্ঘদিনব্যাপী তপস্যায় মগ্ণ থাকিবার উপযোগী একটি স্থান খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য প্রয়াসী করিয়াছে কিন্তু যতবারই তিনি এ চেষ্টা করিয়াছেন, ততবারই দৈববাধা আসিয়া সন্ন্যাসীর চিরকাম্য নির্জন নিঃসঙ্গতা হইতে তাঁহাকে মানুষের মাঝখানে টানিয়া আনিয়াছে, মানুষের দুঃখ–দুর্দশা দেখাইয়া, অসীম সমবেদনায় তাঁহার হূদয় ভরাইয়া দিয়া, উহা দূর করিবার কাজে নামাইয়াছে৷ তাঁহার গুরুভ্রাতা স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে একথা তিনি বহুবার বলিয়াছেন৷ এই দৈবই তাঁহাকে পওহারী বাবার কাছে যোগের দীক্ষাগ্রহণও করিতে দেয় নাই৷ যতবারই তিনি দীক্ষাগ্রহণ করিবেন বলিয়া স্থির–সঙ্কল্প হইয়াছেন, ততবারই শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে সম্মুখে দেখিতে পাওয়ায় সে সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিতে হইয়াছে–
‘‘ছেলেখেলা করি তব সনে,
কভু ক্রোধ করি তোমা ’পরে,
যেতে চাই দূরে পলাইয়ে
শিয়রে দাঁড়ায়ে তুমি রেতে,
নির্বাক আনন, ছলছল আঁখি,
চাহ মম মুখপানে৷
অমনি যে ফিরি৷’’
তৃতীয়বার ভ্রমণকালে হরিদ্বারে পঁৌছিয়া হিমালয়ের বুকে আবার দীর্ঘকাল সাধনার উপযোগী একটি স্থান খুঁজিতে যাওয়ার পথে নদীতীরে একটি বটবৃক্ষতলে বসিয়া তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ণ হন৷ এই সময় তাঁহার একটি অদ্ভুত উপলব্ধি হয়৷ আসন ছাড়িয়া উঠিয়া সমীপবর্তী গুরুভ্রাতাকে তিনি এই উপলব্ধির কথা বলিয়াছিলেন, দিনপঞ্জীতে কিছু লিখিয়াও রাখিয়াছিলেন৷ অধ্যাত্ম–নুভূতির চরমশিখরে, নির্বিকল্পভূমিতে উঠিয়া ভগবানের যে স্বরূপ তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন, এখন হইতে সাধারণ অবস্থায় জগতের সব কিছুর ভিতরেই তাহা প্রত্যক্ষ করিতে লাগিলেন৷ সর্বভূতে ঈশ্বরদর্শন তাঁহার সহজ জ্ঞানের বিষয় হইল, সাধারণ অবস্থাতেই ‘‘ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়’’–কে দেখিতে পাইলেন তিনি, ইহার জন্য আর সাধনার প্রয়োজন রহিল না৷ এরূপ অবস্থা যে শীঘ্রই আসিবে, নরেন্দ্রনাথকে কাজে নামাইবার সময়ই শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাহা বলিয়া গিয়াছিলেন৷ সাধনসহায়ে সর্বোচ্চ অনুভূতিভূমিতে স্থিত হইবার যে ইচ্ছা মাঝে মাঝে মানবসেবারূপ কর্মের পক্ষে ক্ষীণ বাধারূপে আসিয়া দেখা দিতেছিল, এই উপলব্ধির পর তাহা চির–পসৃত হইল, ‘শিবরূপী জীব’ –এর চরণে তিনি সর্বতোভাবে ‘‘মন–প্রাণ–শরীর অর্পণ’’ করিলেন৷ ধ্যান হইতে উঠিয়াই স্বামী অখণ্ডানন্দকে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘‘এখানে এই বটবৃক্ষতলে আমার জীবনের একটা বৃহত্তম সমস্যার সমাধান হয়ে গেল৷’’
দুইবার উত্তরভারত ভ্রমণ করিয়া ভারতের তৎকালীন সমাজ ও লোকের মানসিক অবস্থার সঙ্গে, জনগণের দুরবস্থার সঙ্গে তাঁহার যে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হইয়াছিল, তাহাতে তিনি বুঝিয়াছিলেন যে এই দারুণ অধঃপতন হইতে ভারতকে তুলিতে হইলে, তাহাকে ‘‘ঢ়ালিয়া আবার নূতন করিয়া সাজিতে’’ হইলে, তাহার ‘‘ধমনীতে ধমনীতে নব বিদ্যুৎ–প্রবাহ সঞ্চারিত করিতে হইবে৷’’ আর, সে কাজের জন্য বিশেষ শক্তির প্রয়োজন৷ নিজের মধ্যেই যে সে শক্তি রহিয়াছে, তাহা তিনি জানিতেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজ সাধনলব্ধ সমস্ত শক্তিই তাঁহার মধ্যে সঞ্চারিত করিয়া গিয়াছেন৷ এখন সে শক্তিকে প্রকাশিত করিয়া কাজে লাগাইতে হইবে৷ তাই তৃতীয়বার বরাহনগর মঠ হইতে পরিব্রাজকরূপে ভারতভ্রমণে বাহির হইবার পূর্বে তিনি গুরুভাইদের বলিয়াছিলেন, ‘‘আমার স্পর্শমাত্রে লোকের মধ্যে পরিবর্তন আসে, এরূপ শক্তির প্রকাশ উপলব্ধি না করিয়া ফিরিতেছি না৷’’ যাত্রার পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহধর্মিণী শ্রীশ্রীমায়ের চরণ বন্দনা করিয়া ও উদ্দেশ্যের সফলতার জন্য তাঁহার আশীর্বাদ চাহিয়া লইয়া তিনি যাত্রা করেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অদর্শনের পর জননী সারদাদেবীই তাঁহার প্রতিনিধিরূপে শ্রীরামকৃষ্ণভক্তগণ্ আশ্রয়স্থল হইয়া উঠিয়াছিলেন৷
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তৃতীয় ও শেষবার বরাহনগর মঠ পরিত্যাগ করিয়া স্বামীজী উত্তরভারতের কাশী প্রভৃতি স্থান হইয়া হরিদ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ সেখান হইতে হিমালয়ের বুকে একটি নির্জন স্থান খুঁজিবার জন্য যাত্রাপথে পূর্বোক্ত উপলব্ধি লাভের ফলে পূর্ব ইচ্ছা পরিত্যাগ করিয়া তিনি ফিরিয়া আসেন এবং দক্ষিণ–ভারতের পথে যাত্রা করেন৷ মীরাট, আলোয়ার, আজমীর, জয়পুর, খেতড়ি, জুনাগড়, পোরবন্দর, বোম্বাই, পুনা, মহীশূর, কোচিন, ত্রিবান্দ্রাম, রামেশ্বর প্রভৃতি স্থান হইয়া স্বামীজী ভারতের দক্ষিণপ্রান্তে আসিয়া পঁৌছিলেন৷
নিঃসম্বল পরিব্রাজকবেশে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকালে বহুবার তিনি বহু বিপদে পড়িয়াছেন, বহু দুঃখকষ্টের, এমনকি অনাহারে মৃত্যুরও সম্মুখীন হইয়াছেন৷ কিন্তু দৈবকৃপা পদে পদে তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছে৷ এই সময় হিন্দু–মুসলমান, ব্রাহ্মণ–পারিয়া প্রভৃতি সকলের গৃহেই তিনি অতিথি হইয়াছিলেন৷ অতি দরিদ্র ব্যক্তির গৃহেও থাকিয়াছেন, আবার রাজা–মহারাজাও মহাসমাদরে তাঁহাকে প্রাসাদে আনিয়া রাখিয়াছিলেন৷ কিন্তু সর্বাবস্থায় তাঁহার চিত্তের প্রসন্নতা ও সমদর্শিত্ব অটুট ছিল৷ লোকের কথায় কোনদিনই তিনি ভ্রূক্ষেপ করেন নাই, এ সময়ও তাহা উপেক্ষা করিয়া চলিতেন৷ কিন্তু কাহারও ধারণা পরিবর্তন করিবার প্রয়োজন বোধ করিলে এই সিংহবিক্রম সন্ন্যাসী তেজোদ্দীপ্ত ভাষায় স্পষ্টকথা বলিতে ইতস্তত করিতেন না৷ এখানে এরূপ দুটি ঘটনার উল্লেখ করা হইল৷
রাজপুতানা ভ্রমণকালে আলোয়ারের রাজার সহিত স্বামীজীর সাক্ষাৎ হয়৷ প্রথম আলাপেই রাজা জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘স্বামীজী, শুনিয়াছি আপনি খুব বিদ্বান আপনি তো ভাল রোজগার করিতে পারেন৷ তাহা না করিয়া ভিক্ষা করিয়া বেড়ান কেন?’’ উত্তরে স্বামীজী বলিলেন, ‘‘মহারাজ, আপনি রাজকার্যে অবহেলা করিয়া সবসময় সাহেবদের সঙ্গ আর শিকার করিয়া বেড়ান কেন?’’ স্বামীজীর এই দুঃসাহস দেখিয়া উপস্থিত সভাসদ প্রভৃতি চমকাইয়া উঠিলেন৷ রাজা কিন্তু শান্তভাবে চিন্তা করিয়া উত্তর দিলেন, ‘‘কেন, তাহা বলিতে পারি না তবে এরূপ করিতে আমার ভাল লাগে বলিয়াই যে করি, তাহাতে সন্দেহ নাই৷’’ স্বামীজী বলিলেন, ‘‘ঠিকই বলিয়াছেন৷ আমিও ভাল লাগে বলিয়াই ফকিরের মতো ঘুরিয়া বেড়াই৷’’
মহারাজ দ্বিতীয় প্রশ্ণ করিলেন, ‘‘আচ্ছা বাবাজী মহারাজ, আমার তো প্রতিমা পূজায় বিশ্বাস নাই৷ আমার অদৃষ্টে কি আছে?’’ স্বামীজী এ প্রশ্ণের উত্তর না দিয়া ঘরটির চারিদিকে চাহিলেন দেখিলেন মহারাজের একখানি প্রতিকৃতি দেওয়ালে ঝুলিতেছে৷ দেওয়ানকে বলিতে তিনি সেটি নামাইয়া আনিলেন৷ নামানো হইলে স্বামীজী আদেশ করিলেন, ‘‘ছবিটির উপর থুথু ফেলুন’’ একি কথা এই দুঃসাহসী সন্ন্যাসীর অদৃষ্টে কি আছে তাহা ভাবিয়া আবার সকলে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন৷ স্বামীজী বলিলেন, ‘‘থুথু ফেলিতে বাধা কোথায়? এটি তো একখানি কাগজ ও কালি ছাড়া আর কিছুই নয়’’ বারে বারে বলিবার পরও সকলকে বিস্ময়–নিষ্পন্দ দেখিয়া স্বামীজী মহারাজকে বলিলেন, ‘‘দেখুন মহারাজ, একদিক দিয়া দেখিলে ছবিটি মহারাজ নয়, আবার অন্যদিক দিয়া বটেও৷ ছবির ভিতর ইঁহারা আপনাকেই দেখিতেছেন বলিয়া আপনার অপমান হইবে ভাবিয়া উহাতে থুথু ফেলিতে পারিতেছেন না৷ মাটির বা পাথরের মূর্তি গড়িয়া যাহারা ঈশ্বরের উপাসনা করে, তাহাদের ক্ষেত্রেও তাই৷ প্রতিমার মাধ্যমে ভগবানকেই পূজা করে তাহারা৷ এতদিন তো ভারতের কত জায়গায় ঘুরিলাম, পূজাকালে কোথাও কাহাকেও একথা বলিতে শুনি নাই, ‘হে মাটি, হে পাথর, আমি তোমার পূজা করিতেছি’ মহারাজ, নিজ নিজ পছন্দমত মূর্তির মাধ্যমে সকলেই সেই একই ভগবানের, একই চরম সত্যের পূজা করিয়া থাকে৷’’ স্বামীজীর কথাগুলি রাজার মনে গাঁথিয়া যায়৷ পরে তিনি স্বামীজীর বিশেষ ভক্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন৷
রাজপুতানায় একবার দুজন ইংরেজ ভদ্রলোকের সঙ্গে স্বামীজী ট্রেনের একই কামরায় চলিয়াছেন৷ ইংরেজ স্বামীজীকে দেখিয়া বিদ্যাবুদ্ধিহীন সাধু
ভাবিয়া তাঁহাকে লইয়া নিজেদের মধ্যে পরিহাস করিতে করিতে চলিলেন৷ স্বামীজী চুপ করিয়া ছিলেন৷ পরের স্টেশনে গাড়ি থামিলে সম্মুখে
স্টেশনমাস্টারকে দেখিয়া স্বামীজী এক গ্লাস খাবার জল পাঠাইয়া দিতে বলিলেন৷ ইংরেজিতেই বলিলেন৷ সাধুর মুখে ইংরেজি কথা শুনিয়া ইংরেজ দুটির চমক ভাঙিল–‘তবে ইনি তো আমাদের পরিহাস সবই বুঝিয়াছেন’ স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘তুমি কোন প্রতিবাদ করিলে না কেন?’ উত্তরে স্বামীজী বলিলেন, ‘‘প্রয়োজনবোধ করি নাই আহাম্মক লোক পূর্বেও দেখিয়াছি, এই প্রথম নহে’’ শুনিয়া সাহেব দুটির মুখ লাল হইয়া উঠিল, প্রায় ঘুসি চালাইতে উদ্যত হইলেন তাঁহারা৷ কিন্তু স্বামীজীর বলিষ্ঠ দেহ ও ‘যুদ্ধং দেহি’ ভাব দেখিয়া নিরস্ত হইলেন, ক্ষমা চাহিলেন৷
দীর্ঘদিন ভারত ভ্রমণের ফলে স্বামীজী দেখিলেন, ‘‘ভারতের দরিদ্র, ভারতের পতিত, ভারতের পাপিগণের বন্ধু কেহ নাই, সাহায্য করিবার কেহ নাই৷’’ ‘‘রাক্ষসবৎ নৃশংস সমাজ তাহার উপর ক্রমাগত আঘাত করিতেছে৷’’ দীর্ঘকাল নির্যাতনের ফলে ‘‘তাহারাও যে মানুষ, ইহা তাহারা ভুলিয়া গিয়াছে৷’’ দারিদ্র্যে, অশিক্ষায় দেশ জর্জরিত৷ ক্ষমতাশালী যাঁহারা, তাঁহারা জনগণের এই দুঃখমোচনের জন্য সাহায্যও করিতে চান না৷ তাঁহারা ইহাদিগকে নিজেদের ভাই বলিয়া ভাবিতে, এমনকি, মানুষ বলিয়াও ভাবিতে ভুলিয়া গিয়াছেন৷ যে ভারত মানুষকে স্বরূপত ভগবান বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে, সেই ভারতসন্তানগণ আজ মানুষকে মানুষের সম্মান দিতেও কুণ্ঠিত কি শোচনীয় পরিণাম ভারতের ঘোর দুর্দিন তখন৷ আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, বৈষয়িক সব বিষয়েই ভারত তখন অতি অবনত৷ ভারত তখন পরাধীন৷ ধর্মের নামে কতকগুলি আচার–নুষ্ঠানমাত্রক্ সে তখন আঁকড়াইয়া আছে, ধর্মের অপব্যবহারও চলিতেছে৷ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মানসিক দৈন্যেরও সীমা নাই ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতিতে আস্থা হারাইয়া বিজেতা জাতির জড়বাদ–মূলক সভ্যতাকে গ্রহণ করিতে সে উদ্যত৷ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি ভারতবাসীর এই অত্যধিক মোহ দেখিয়া দ্বিতীয়বার ভারত ভ্রমণকালে ব্যথিতচিত্তে স্বামীজী একটি পত্রে লিখিয়াছিলেন, ‘‘বিদেশীরা কি তুচ্ছ একটা সভ্যতা সঙ্গে করে এনেছে জড়বাদের কি মোহই না তারা সৃষ্টি করেছে দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিগণকে বিশ্বনাথ যেন রক্ষা করেন৷ ...হায়, অদৃষ্টের কি পরিহাস ভগবান শুকের জন্মভূমিতে ত্যাগ পাগলামি ও পাপ বলিয়া ধিক্কৃত হইতেছে৷’’ এদিকে, যে শিক্ষাপদ্ধতি ইংরেজরা দেশে চালু করিয়াছে, তাহা পাশ্চাত্যের নাস্তিকতা ও ভোগসর্বস্বতার দিকেই লোকের দৃষ্টি আরও বেশি করিয়া আকৃষ্ট করিতেছে, নিজ সংস্কৃতিতে আস্থার ভিত্তিমূলে প্রবল বেগে আঘাত হানিতেছে ‘‘বালক বিদ্যালয়ে গিয়া প্রথমেই শিখে যে, তাহার বাপ একটি মূর্খ, তাহার পিতামহ একটি পাগল তারপর, প্রাচীন আর্যগণ সব ভণ্ড, এবং সব শেষে শিখে, ধর্মশাস্ত্র সব অলীক৷ ফলে ষোল বৎসরে পদার্পণ করিবার পূর্বেই সে একটা প্রাণহীন, মেরুদণ্ডহীন ‘না’–এর সমষ্টি হইয়া দাঁড়ায়৷’’ দেশবাসীর অন্তর হইতে তখন আত্মবিশ্বাস লোপ পাইয়াছে৷ এভাবে পথ চলা যদি অপ্রতিহত হয়, তবে অচিরেই জাতি হিসাবে ভারতের মৃত্যু অবধারিত৷
এই ভারতকে আবার তুলিতে হইবে একটা বিশালকায় অজগর ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, তাহার ঘুম ভাঙাইতে হইবে এই ভারতবাসীর মনে আত্মবিশ্বাস জাগাইতে হইবে, নিজ সংস্কৃতিতে তাহার শ্রদ্ধা ফিরাইয়া আনিতে হইবে৷ শিক্ষার প্রসার করিতে হইবে, নিরন্নের মুখে অন্ন জোগাইতে হইবে৷
ভারতবর্ষ ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেশবাসীর এই নিদারুণ দুঃখ যতই তাঁহার নজরে পড়িয়াছে, ততই তাঁহার হূদয় কাঁদিয়া উঠিয়াছে৷ হূদয়ের সে বেদনা যে কত গভীর, তাহার সামান্য আভাস পাওয়া যায় আমেরিকা যাত্রার প্রাক্কালে তাঁহার গুরুভ্রাতা স্বামী তুরীয়ানন্দকে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা হইতে, স্বামী তুরীয়ানন্দ পরবর্তিকালে বলিয়াছেন, ‘‘স্বামীজী বললেন, ‘হরিভাই, ...দেখছি আমার হূদয়টা খুব বেড়ে গেছে, অপরের জন্য ভাবতে শিখেছি৷ বিশ্বাস কর, খুব তীব্রভাবে এটা অনুভব করছি৷’ বলবার পরই তাঁর দুচোখে অশ্রু ঝরে পড়ল৷... তাঁর মুখে এই করুণামাখা কথা যখন শুনলাম, তাঁর এই মহান বেদনার রূপ যখন চোখে পড়ল, তখন আমার ভেতরটায় যে কি হচ্ছিল, একবার কল্পনা কর দেখি ভাবলাম এ তো বুদ্ধদেবেরই ভাষা, এ তো বুদ্ধেরই হূদয়... পরিষ্কার দেখলাম, মানবজাতির সমুদয় দুঃখকষ্ট এসে তাঁর হূদয় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল৷... এই সমবেদনায় তাঁর বুক ফেটে যেত, চোখ দিয়ে রক্ত–শ্রু ঝরে পড়ত৷ তোমরা কি ভাবছ, এই রক্ত–শ্রুপাত বিফল হয়েছে? দেশের জন্য ক্ষরিত সে অশ্রুর প্রতিটি বিন্দু থেকে, তাঁর অমিতশক্তি মর্মের প্রতিটি অগ্ণিময়ী বাণী থেকে দলে দলে মহাবীরেরা সব জন্মলাভ করবে, তাদের চিন্তা ও কার্যে গোটা জগৎটা কেঁপে উঠবে৷’’
একবার মাদ্রাজের সমুদ্রতীরে বেড়াইতে বেড়াইতে একটি অনশনক্লিষ্ট বালককে এক কোমর জলে দাঁড়াইয়া তাহার মায়ের সঙ্গে মাছ ধরিতে দেখিয়া স্বামীজী কাঁদিয়া ফেলিয়াছিলেন৷ বলিয়াছিলেন, ‘‘ভগবান, এত দুর্ভাগাদের সৃষ্টি করেছ কেন? এদৃশ্য যে অসহ্য কতদিন, প্রভু, আর কতদিন এ দৃশ্য দেখতে হবে’’ তেজবীর্যে, চরিত্রের দৃঢ়তায় তিনি যেমন বজ্রের চেয়েও কঠোর ছিলেন, দুর্বলতার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া যেমন সিংহের মতো গর্জন করিতেন, তেমনি আবার মানবপ্রেমে ছিলেন কুসুমের চেয়েও কোমল অপরের দুঃখকষ্ট দেখিলেই তাঁহার দুটি বিশাল নয়ন হইতে বাঁধনহারা অশ্রু ঝরিয়া পড়িত৷
এই অপার করুণা ও সমবেদনার অসহ্য ব্যথা বুকে পুরিয়া দেশময় ঘুরিতে ঘুরিতে তিনি দিনের পর দিন ভারতের দুর্দশার প্রতিকারের উপায় চিন্তা করিয়াছেন৷ এ চিন্তায় তাঁহার হূদয় এত আলোড়িত হইয়াছে যে বহুদিন রাত্রে ঘুমাইতে পর্যন্ত পারেন নাই৷ বহু শিক্ষিত–শিক্ষিত, ধনী–দরিদ্র, উচ্চ–নীচ সর্বস্তরের লোকের সঙ্গেই তাঁহার সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে৷ খেতড়ির রাজা, রামনাদের রাজা, মহীশূরের মহারাজা প্রভৃতি এবং বহু উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছেন৷ তাঁহার ভাবধারায় তখন অনেকেই অনুপ্রাণিত৷ তবু তিনি দেখিলেন, কাজের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ এদেশে পাওয়া দুর্ঘট৷ তবে বুঝিলেন, কাজ করিবার জন্য ত্যাগ ও সেবার অগ্ণিমন্ত্রে দীক্ষিত লোকের অভাব হইবে না শেষের দিকে অনেকেই তাঁহার প্রেরণার তড়িৎস্পর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া দেশমাতৃকার উদ্ধারের কাজে আত্মনিয়োগ করিতে প্রস্তুত হইয়াছিল, যে শক্তি সর্ব বিষয়ে ভারতকে মৃত্যুর পথে টানিয়া লইয়া চলিয়াছিল তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য এই বীর সেনাপতির পতাকাতলে আসিয়া সমবেত হইয়াছিল৷
বিলম্ব আর সহ্য হইতেছিল না৷ কিভাবে কাজ আরম্ভ করিবেন, কোন্ পথে প্রথম পদক্ষেপ করিবেন, তাহা ভাবিয়া তিনি কোন স্থির সিদ্ধান্ত করিতে পারিতেছিলেন না৷ হূদয়ের যন্ত্রণা শুধু বাড়িতেছিল, বুক ফাটিয়া যাইতেছিল৷
এভাবে অসহ যাতনা বুকে পুরিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে অবশেষে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে তিনি ভারতের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে কন্যাকুমারীর মন্দিরে গিয়া উপস্থিত হইলেন৷ মাকে দর্শন ও ভক্তিভরে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া সমুদ্রে অবতরণ করিলেন, সাঁতরাইয়া ভারতের মূল ভূভাগ হইতে বিচ্ছিন্ন সমুদ্রমধ্যস্থ ভারতের শেষ শিলাখণ্ডের উপর গিয়া উঠিয়া বসিলেন৷ সম্মুখে প্রসারিত ভারতের দিকে চাহিলেন তিনি৷ ভারতের অতীত মহিমা ও সমৃদ্ধির চিন্তা, তাহার বর্তমান হীনতা ও দারিদ্র্যের চিন্তা, তাহার ভবিষ্যতের চিন্তা একসঙ্গে মনে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিল৷ বাহিরে চারিদিকে শিলাতটে মূর্ছিত তরঙ্গমালায় সাগর বিক্ষুব্ধ, আর অন্তর বিক্ষুব্ধ সমবেদনার উত্তাল তরঙ্গে প্রতিকারের পথহারা হতাশার শিলাতটে মূর্ছিত হইয়া সে তরঙ্গমালা অশ্রূকণাকারে ভাঙিয়া পড়িতেছিল, তাঁহার পদ্ম–পলাশের মতো বিশাল নয়ন দুটিকে সজল করিয়া তুলিতেছিল৷
সহসা অন্তরের বিক্ষোভ থামিয়া গেল, মানস–সায়র নিস্তরঙ্গ হইল৷ গভীর ধ্যানে মগ্ণ হইলেন তিনি৷ ধ্যানলব্ধ অদ্ভুত আলোকে নিশ্চিত পথের সন্ধান পাইলেন৷ বুঝিলেন যে আধ্যাত্মিকতাই ভারতের প্রাণ এই প্রাণশক্তি স্তিমিত হইয়া পড়িয়াছে বলিয়াই তাহার এই অবনতি৷ তাহার জীবনকে আধ্যাত্মিকতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলেই সে সবল হইয়া আবার নিজের পায়ের উপর ভর দিয়া উঠিয়া বুক ফুলাইয়া দাঁড়াইতে পারিবে রাজনীতি, সমাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য প্রভৃতি সর্ববিষয়েই আবার উন্নত হইবে৷ জাতির এই প্রাণশক্তিকে সতেজ করিতে হইবে৷
বুঝিলেন, ভারতের সর্বাঙ্গীণ উন্নতিকল্পে আধ্যাত্মিকতায় তাহাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন তাহার আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধন, প্রয়োজন দেশের প্রাচীন সংস্কৃতিতে তাহার আস্থা ফিরাইয়া আনা, প্রয়োজন নিরন্নদের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করা৷ আর এ উদ্দেশ্য সফল হইবে, যদি তিনি আমেরিকার ধর্মমহাসভায় যোগদান করেন৷
আমেরিকার শিকাগো শহরে একটি বিশ্ব–মেলার আয়োজন চলিতেছিল, ধর্মমহাসভা তাহার একটি অঙ্গ৷ এই সভায় সব দেশের প্রধান ধর্মাচার্যেরা যাইয়া মিলিত হইবেন৷ ভারতের যুগ–যুগান্তর–সঞ্চি অমূল্য সম্পদ, আধ্যাত্মিকতার বাণী, সারা জগতে ছড়াইয়া দিবার ইহাই উপযুক্ত অবসর৷ ভারতের আধ্যাত্মিকতায়, ভারতের সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যবাসীদের সশ্রদ্ধ করিতে পারিলে একসঙ্গে দুই কাজ হইবে৷ পাশ্চাত্যসভ্যতার বাহ্য চাকচিক্যে মুগ্ধ ভারতবাসীরা পাশ্চাত্য জগৎকে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান দেখিলে নিজ সংস্কৃতির উপর সহজেই শ্রদ্ধা ফিরিয়া পাইবে তাহাদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়া উঠিবে৷ আর জড়বাদের পথ ধরিয়া চলিলে যে ধ্বংস আসন্ন, পাশ্চাত্যজগৎ আধ্যাত্মিকতার দিকে দৃষ্টি ফিরাইলে সে ধ্বংসের কবল হইতে বাঁচিবার পথের সন্ধান পাইবে৷ তাছাড়া, ভারতে কাজ আরম্ভ করিবার মতো কিছুূ অর্থও আমেরিকা হইতে সংগ্রহ করা যাইতে পারে৷
শিকাগো ধর্মমহাসভার কথা তিনি তিন–চার মাস পূর্বেই শুনিয়াছিলেন, মাঝে মাঝে তাঁহার মনে সেখানে যাইবার ইচ্ছাও জাগিয়াছিল৷ অনুরাগী ও ভক্তেরা প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করিয়া দিতেও চাহিয়াছিলেন কিন্তু তখনও সঙ্কল্প স্থির করেন নাই বলিয়া তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন৷ ভারতের এই শেষ প্রস্তরখণ্ডের উপর বসিয়া সঙ্কল্প স্থির করিয়া তিনি আসন ছাড়িয়া উঠিলেন৷ রামনাদ হইয়া মাদ্রাজে আসিয়া উৎসাহী যুবকদের কাছে নিজ সঙ্কল্প প্রকাশ করিলেন৷ আলাসিঙ্গা পেরুমল, জি.জি. নরসিংহচারিয়া, সিঙ্গারভেলু মুদালিয়ার, সুব্রহ্মণ্য আয়ার প্রভৃতি স্বামীজীর ভক্তেরা অর্থসংগ্রহে তৎপর হইলেন৷
নিজে স্থির–নিশ্চয় হইলেও শ্রীরামকৃষ্ণের স্পষ্ট নির্দেশ কিছু না পাইলে তিনি আমেরিকা যাত্রা করিতে চাহিলেন না, যাত্রার জন্য সংগৃহীত অর্থ দরিদ্রদের মধ্যে বিলাইয়া দেওয়াইলেন৷ পরে একদিন অর্ধজাগ্রত অবস্থায় দর্শনলাভ করিলেন যে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ভারতের উপকূল হইতে সমুদ্রে অবতরণ করিয়া তাহার উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিয়াছেন, আর সঙ্গে যাইবার জন্য তাঁহাকে হাতছানি দিয়া ডাকিতেছেন৷ জাগ্রত হইয়া দৈববাণীরূপে তাঁহার আদেশও পাইলেন৷ ইহাতে শ্রীশ্রীঠাকুরের ইচ্ছায় নিঃসংশয় হইয়া যাত্রার সফলতার জন্য শ্রীশ্রীমায়ের কাছে আশীর্বাদ ভিক্ষা করিয়া পত্র দিলেন৷ শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদ পাইয়া বোম্বাই বন্দরে জাহাজে উঠিয়া ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্বামীজী আমেরিকা যাত্রা করেন৷ খেতড়ির রাজা যাত্রার আয়োজন এবং স্বামীজীর পোশাক–পরিচ্ছদাদির সব ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন৷
বোম্বাই–এর বেলাভূমি পরিত্যাগ করিয়া জাহাজ আমেরিকার দিকে চলিল বোম্বাই হইতে কলম্বো হইয়া মালয়–উপদ্বীপের পিনাঙ শহরে পৌঁছিল৷ সেখান হইতে সিঙ্গাপুর হইয়া হংকং আসিল৷ হংকং বন্দরে জাহাজ তিনদিন ছিল৷ এই সময় স্বামী বিবেকানন্দ নদীপথে যাইয়া চীনের ক্যান্টন শহর দেখিয়া আসেন৷ হংকং হইতে নাগাসাকি হইয়া কোবি বন্দরে জাহাজ ভিড়িলে ভালভাবে জাপানদেশ দেখিবার জন্য স্বামীজী স্থলপথে যাইতে লাগিলেন এবং ওসাকা, কিয়াটো ও টোকিও শহর পরিদর্শন করিলেন৷ চীনদেশের দারিদ্র্য তাঁহার হূদয় স্পর্শ করিয়াছিল৷ জাপানের জাগরণ ও জাতীয় উন্নতি দেখিয়া তিনি মুগ্ধ হন৷ ভারতের দুরবস্থার কথা সব সময় তাঁহার মনে কাঁটার মতো বিঁধিয়াছিল৷ ভ্রমণকালে জাপান হইতে লেখা একটি পত্রে চীন সম্বন্ধে তিনি বলিয়াছেন, ‘‘সাধারণ হিন্দু বা চীনবাসীর পক্ষে তার প্রাত্যহিক অভাব এতই ভয়ানক যে তাকে আর কিছু ভাববার অবসর দেয় না৷’’ আর জাপান সম্বন্ধে লিখিয়াছিলেন, ‘‘জাপানীরাই বর্তমানকালে কি প্রয়োজন তা বুঝেছে, তারা সম্পূর্ণরূপে জাগরিত হয়েছে৷ ... আর তোমরা কি কচ্ছো? সারাজীবন কেবল বাজে বকছো৷ এস, এদের দেখে যাও–তারপর যাও–গিয়ে লজ্জায় মুখ লুকোওগে৷ ...শত শত যুগের অবিরাম সামাজিক অত্যাচারে তোমাদের সব মনুষ্যত্বটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে–তোমরা কি বল দেখি?...এস মানুষ হও৷ নিজেদের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী থেকে বেরিয়ে এসে দেখ, সব জাতি কেমন উন্নতির পথে চলেছে৷ তোমরা কি মানুষকে ভালবাসো? তোমরা কি দেশকে ভালবাসো? তাহলে এস, আমরা ভাল হবার জন্য, উন্নত হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি৷ ... ভারতমাতা অন্তত সহস্র যুবক বলি চান৷ মনে রেখো–মানুষ চাই, পশু নয়৷’’
জাপান ছাড়িয়া জাহাজ ২৫ জুলাই সন্ধ্যায় আমেরিকার ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে পঁৌছিল৷ সেখানে নামিয়া কানাডার ভিতর দিয়া স্বামীজী ৩০ জুলাই রাত্রে শিকাগো পঁৌছান৷ পঁৌছিয়া শুনিলেন ধর্মমহাসভা বসিবার অনেক দেরি থাকিলেও উহাতে যোগদানের জন্য নাম লিখাইবার সময় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে৷ তাছাড়া তিনি যে হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিরূপে যাইতেছেন, এরূপ কোন পরিচয়–পত্রও সঙ্গে লইয়া যান নাই৷ এদিকে দেখিলেন আমেরিকায় জীবনযাত্রার মান অতি উচ্চ৷ তাঁহাকে আর্থিক বিষয়ে অনভিজ্ঞ দেখিয়া রাস্তায় যে যেমন সুবিধা পাইয়াছে ঠকাইয়াছে যে টাকা সঙ্গে আনিয়াছিলেন তাহার অতি অল্পই তখন অবশিষ্ট আছে৷ তাহাতে শিকাগো শহরে বেশিদিন বাস করা সম্ভব নয়৷ এদেশের মতো সেখানে সন্ন্যাসীকে কেহ ভিক্ষাও দেয় না৷ সব দেখিয়া শুনিয়া মনে হইল, যে জন্য তিনি এত কাণ্ড করিয়া আসিয়াছেন, তাহা বুঝি ব্যর্থ হয়–ধর্মমহাসভায় যোগ দিবার পথ রুদ্ধ, আর আর্থিক দিক হইতে অনাহারে মরিয়া যাওয়া ছাড়া বোধ হয় গত্যন্তর নাই৷ একটি প্রসিদ্ধ সাহায্যকারী সংস্থার কাছে পরে কিছু সাহায্য চাহিয়া পত্র দিয়াছিলেন, কিন্তু কোন ফল হয় নাই বরং পরে স্বামীজীর শীতবস্ত্রের অভাবের কথা জানিতে পারিয়া তাঁহারা বলিয়াছিলেন, ‘‘যাক্, শয়তানটা এবার শীতেই মরে যাবে’’ তথাপি তাঁহার দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তি ও ভগবানের উপর নির্ভরতা তাঁহাকে দমিতে দিল না৷ এই অবস্থায় কয়েকদিন পরে একটি পত্রে তিনি লিখিয়াছেন, ‘‘এখানে আসিবার পূর্বে যেসব সোনার স্বপ্ণ দেখিতাম, তাহা ভাঙিয়াছে৷ এক্ষণে অসম্ভবের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে হইতেছে৷ শত শত বার মনে হইয়াছিল এদেশ হইতে চলিয়া যাই কিন্তু আবার মনে হয় আমি একগুঁয়ে দানা, আর আমি ভগবানের আদেশ পাইয়াছি৷ আমার দৃষ্টিতে কোন পথ লক্ষিত হইতেছে না, কিন্তু তাঁহার চক্ষু তো সব দেখিতেছে৷ মরি বাঁচি আমার উদ্দেশ্য ছাড়িতেছি না৷’’ এই অবস্থার ভিতরও ভারতের দুঃস্থ জনগণের জন্য তাঁহার হূদয় কাঁদিয়াছে, এই অন্ধকারময় মুহূর্তেও তিনি দেশসেবায় উৎসর্গীকৃতপ্রাণ মাদ্রাজের যুবকদের উৎসাহ দিয়া লিখিয়াছেন, ‘‘বৎস, সাহস অবলম্বন কর৷ ভগবানের ইচ্ছায় আমাদের দ্বারা মহৎকার্য সম্পন্ন হইবে৷ বিশ্বাস কর, আমরাই মহৎকার্য করিব, এই গরিব আমরা, যাহাদের লোকে ঘৃণা করে, কিন্তু যাহারা লোকের দুঃখ প্রাণে প্রাণে বুঝিয়াছে৷’’ ‘‘অমি দ্বাদশ বৎসর হূদয়ে এই ভার লইয়া এবং মাথায় এই চিন্তা লইয়া বেড়াইয়াছি৷ আমি তথাকথিত অনেক ধনী ও বড়লোকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়াছি, তাহারা আমাকে কেবল জুয়াচোর ভাবিয়াছে৷ হূদয়ের রক্ত মোক্ষণ করিতে করিতে আমি অর্ধেক পৃথিবী অতিক্রম করিয়া এই বিদেশে সাহায্যপ্রার্থী হইয়া উপস্থিত হইয়াছি৷ আমি এই দেশে অনাহারে বা শীতে মরিতে পারি কিন্তু হে আমার মাদ্রাজবাসী যুবকগণ, তোমাদের নিকট এই গরিব, অজ্ঞ, অত্যাচার–পীড়িতদের জন্য এই সহানুভূতি, এই প্রাণপণ চেষ্টা দায়স্বরূপ অর্পণ করিতেছি৷ ...তোমরা সারাজীবন এই ত্রিশকোটি ভারতবাসীর উদ্ধারের জন্য ব্রত গ্রহণ কর, যাহারা দিন দিন ডুবিতেছে৷ অগ্ণিময় বিশ্বাস, অগ্ণিময় সহানুভূতি৷ জয় প্রভু জয় তুচ্ছ জীবন, তুচ্ছ মরণ, তুচ্ছ ক্ষুধা, তুচ্ছ তৃষ্ণা ... অগ্রসর হও পশ্চাতে চাহিও না, কে পড়িল দেখিতে যাইও না৷’’
অপেক্ষাকৃত কম খরচে জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য স্বামীজী শিকাগো পরিত্যাগ করিয়া বোস্টন শহর অভিমুখে চলিলেন৷ পথে ট্রেনে একজন সহূদয়া মহিলার সহিত তাঁহার আলাপ হয়৷ মহিলাটি আলাপে আকৃষ্ট হইয়া স্বামীজীকে বোস্টনের নিকটবর্তী একটি গ্রামে নিজগৃহে আনিয়া অতিথিরূপে রাখিলেন৷ ইহাতে একটু সুরাহা হইল, স্বামীজীর খরচ অনেক কমিয়া গেল৷ এই সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিক ভাষার অধ্যাপক ডক্টর রাইট–এর সঙ্গে স্বামীজীর আলাপ হয়৷ মাত্র তিন ঘণ্টার আলাপে অধ্যাপক রাইট এত মুগ্ধ হন যে স্বামীজী পরিচয়পত্রের অভাবে ধর্মমহাসভায় যোগ দিতে পারিতেছেন না শুনিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘ধর্মমহাসভায় বত্তৃণতা দিবার অধিকারের জন্য আপনাকে পরিচয়পত্র দেখাইতে হইলে সূর্যকেও যে আলো দিবার অধিকারের জন্য পরিচয়পত্র দেখাইতে হইবে’’ ডক্টর রাইট–এর এক বন্ধু, ডক্টর জে. এইচ. ব্যারোজ ধর্মমহাসভার সদস্যনির্বাচনী–সং সভাপতি হইয়াছিলেন৷ ডক্টর রাইট তাঁহাকে পত্র লিখিয়া স্বামীজীর কথা জানাইলেন৷ এই পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘‘এই ব্যক্তির পাণ্ডিত্য আমাদের দেশের সমস্ত শিক্ষিত ব্যক্তির সমবেত পাণ্ডিত্যের চেয়েও বেশি৷’’ প্রতিনিধি–নির্বাচনীস্ সদস্যদের নামে কয়েকখানি পত্রও স্বামীজীর সঙ্গে দিয়া দিলেন৷ স্বামীজী শিকাগো শহরে ফিরিলেন৷ ট্রেন পঁৌছিতে দেরি করিল৷ সমিতির ঠিকানাও তিনি পথে কোথায় হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন৷ কোন হোটেলেও যাইতে পারিলেন না৷ ফলে সে রাত্রি স্টেশন–প্রাঙ্গণেই কাটাইতে হইল৷ প্রচণ্ড শীত, সে তুলনায় শীতবস্ত্র একরকম নাই বলিলেই চলে শীতে মৃত্যু অবধারিত দেখিয়া
স্বামীজী স্টেশন–প্রাঙ্গণে মাল পাঠাইবার একটি কাঠের বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়া কোনওরূপে প্রাণ বাঁচাইলেন৷ সারারাত্রি কিছুই খাওয়া হয় নাই৷
সকালে উঠিয়া হাঁটিয়া সমিতি খুঁজিতে বাহির হইলেন৷ খাদ্যের জন্য দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন৷ ভারতবর্ষের মতো সেখানে
সন্ন্যাসীকে কেহ ভিক্ষা দেয় না ফলে খাদ্যদ্রব্য তো মিলিলই না, উপরন্তু যথেষ্ট অপমানিত হইতে হইল৷ সমিতিরও কোন সন্ধান করিতে পারিলেন না৷ শেষে অতিমাত্রায় ক্লান্ত হইয়া রাস্তার একপাশে ফুটপাথের উপরেই বসিয়া পড়িলেন৷ ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বিপরীত দিকের একটি বাড়ির দরজা খুলিয়া গেল এবং মিসেস হেল নামক একজন সহূদয়া মহিলা দেবদূতের মতো বাহির হইয়া আসিয়া স্বামীজীকে নিজগৃহে লইয়া গেলেন৷ এইদিন হইতে স্বামীজী হেল–পরিবারে একজন পরমাত্মীয়ের মতো হইয়া যান৷ অতঃপর আমেরিকায় থাকা–খাওয়ার জন্য আর কখনো তাঁহাকে দুশ্চিন্তায় পড়িতে হয় নাই৷ মহিলাটির সহায়তায় ডক্টর ব্যারোজ–এর সঙ্গে দেখা করিয়া তিনি ধর্মমহাসভায় যোগদানের অনুমতিও পাইলেন এবং অন্যান্য সদস্যদের মতো সভার কর্মনির্বাহক–সমিত্ অতিথিরূপে বাস করিতে লাগিলেন৷
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ সেপ্ঢেম্বর শিকাগোর ‘কলম্বাস’ হলে ধর্মমহাসভার উদ্বোধন হয়৷ মঞ্চের উপর কর্মনির্বাহক–প্রধা সহিত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হইতে আগত বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা বসিয়া আছেন৷ খ্রিস্ট ধর্মের প্রতিনিধিরা তো ছিলেনই, আর ছিলেন ইহুদি, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, কন্ফিউশিয়ান, শিন্টো, ইসলাম প্রভৃতি ধর্মের প্রতিনিধিগণ৷ স্বামীজী ছাড়া ভারতবর্ষ হইতে থিওজফিক্যাল সোসাইটির প্রতিনিধি শ্রীজ্ঞানেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ব্রাহ্মসমাজের প্রতিনিধি শ্রীপ্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রভৃতিও গিয়াছিলেন৷ সম্মুখে প্রায় সাত হাজার বিশিষ্ট শ্রোতা বসিয়া আছেন আমেরিকার বাছা বাছা বড় বড় পণ্ডিতরা আসিয়াছেন৷ তাঁহাদের কাছে বত্তৃণতা করিতে হইবে এক একজন করিয়া প্রতিনিধিদের পরিচয় দেওয়া হইতে লাগিল, তাঁহারাও সেই সময় কিছু কিছু বলিলেন৷ আর স্বামীজী তিনি পরে পত্রে লিখিয়াছেন, ‘‘আর আমি, যে জীবনে কখনও সাধারণের সমক্ষে বত্তৃণতা করে নাই, সে এই সভায় বত্তৃণতা করিবে .... আমার বুক দুর্দুরও করিতেছিল ও জিহ্বা শুষ্কপ্রায় হইয়াছিল৷ আমি এতদূর ঘাবড়াইয়া গেলাম যে পূর্বাহ্ণে বত্তৃণতা করিতে ভরসা করিলাম না৷ ...সকলেই বত্তৃণতা প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছিলেন৷ আমি নির্বোধ, আমি কিছুই প্রস্তুত করি নাই৷ আমি দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করিয়া অগ্রসর হইলাম৷’’
ফল কিন্তু অন্যরূপ হইল৷ স্বামীজী উঠিলেন৷ এই ভারতীয় যুবক–
সন্ন্যাসীর তেজপুঞ্জ কলেবর ও গৈরিক বসন পূর্বেই শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল৷ তারপর তিনি যখন বত্তৃণতার প্রারম্ভে ‘‘আমেরিকাবাসী ভগ্ণী ও ভ্রাতাগণ’’ বলিয়া শ্রোতাদের সম্বোধন করিলেন, তখন সভাগৃহে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলিয়া গেল, করতালির ঝড় উঠিল৷ এতক্ষণ ধরিয়া শুষ্ক দার্শনিক কথা শুনিবার পর হূদয়ের এই স্পর্শ পাইয়া শ্রোতারা আনন্দে আত্মহারা হইল, দুই মিনিট ধরিয়া করতালির মাধ্যমে সে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের অভিব্যক্তি চলিল৷ স্বামীজীর প্রথম কথাতেই সকলের প্রাণে গাঁথিয়া গেল যে, বিশ্ব–ভ্রাতৃত্ব, বিশ্ব–প্রেমই ধর্মের একটি মূল কথা, আর সেই প্রেমের বাণী বহিয়া আনিলেন এই দেবদূত৷ করতালি থামিলে স্বামীজী একটি হূদয়গ্রাহী বত্তৃণতায় অন্যান্য কথার মধ্যে বলিয়াছিলেন, ‘‘যে ধর্ম জগৎকে পরধর্মের প্রতি ঔদার্য ও সর্ববিধ ধর্মমতকে স্বীকৃতি দান করিতে শিখাইয়াছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি৷ আমরা যে শুধু অন্য ধর্মাবলম্বীকে সমদৃষ্টিতে দেখি তাহা নহে, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি৷ ... এই ধর্মমহাসভা গীতা–প্রচারিত অপূর্ব সত্যেরই পোষকতা করিতেছে–‘যে–কোন লোক যে–কোন পথ ধরিয়াই আমার কাছে আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেইভাবেই গ্রহণ করিয়া থাকি৷ সব মানুষের চলার পথই পরিণামে আমাতে আসিয়া পৌঁছায়৷’ ... সাম্প্রদায়িকতা, সঙ্কীর্ণতা ও তাহার বিষময় ফল ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল ধরিয়া করকবলিত করিয়া রাখিয়াছে৷ এই দোষগুলি পৃথিবীকে অত্যাচারে পূর্ণ করিয়াছে, বারেবারে তাহার বুকে নররক্তস্রোত প্রবাহিত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে, সমগ্র জাতির প্রাণে হতাশা জাগাইয়াছে৷ এই ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, মানবসমাজ আজ আরও কত উন্নত হইত তবে এগুলির মৃত্যুকাল উপস্থিত আমার আকুল কামনা, ধর্মমহাসভার সম্মানার্থে আজ প্রভাতে যে ঘণ্টাধ্বনি হইল, তাহাই যেন সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততার নিধনবার্তা ঘোষণা করে ৷’’
এই প্রথম ভাষণেই তিনি আমেরিকাবাসীর হূদয় জয় করিয়া লইলেন এই ভাষণের পরই অজ্ঞাত, অখ্যাত সন্ন্যাসী বিশ্বজন–পরিচিত হইয়া গেলেন৷ পরদিন শহরের রাস্তায় রাস্তায় তাঁহার ছবি টাঙানো হইল, খবরের কাগজগুলি তাঁহার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া উঠিল৷ ইহার পর হইতে ধর্মমহাসভায় তিনিই ছিলেন প্রধান আকর্ষণকেন্দ্র৷ শ্রোতারা জটিল দার্শনিক তত্ত্ব শুনিতে শুনিতে যখন চঞ্চল হইয়া উঠিতেন, সভাগৃহ ছাড়িয়া চলিয়া যাওয়া শুরু করিতেন, তখন সভাপতি ঘোষণা করিতেন যে, শেষের দিকে স্বামী বিবেকানন্দ কিছু বলিবেন৷ ইহাই যথেষ্ট হইত শ্রোতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষ্ট সহ্য করিয়া বসিয়া থাকিতেন স্বামীজীর মুখের দুটি কথা শুনিবার জন্য৷ ধর্মমহাসভায় মোট সতেরটি অধিবেশন হয়৷ তাহাতে স্বামীজী মোট দশ–বারটি বত্তৃণতা দিয়াছিলেন একদিন হিন্দুধর্মবিষয়ে লিখিত প্রবন্ধও পাঠ করিয়াছিলেন৷
মহাসভার অধিবেশন শেষ হইলে স্বামীজী আধ্যাত্মিকতার বাণী শুনাইয়া, মানবজাতির যথার্থ প্রগতির পথের সন্ধান দিয়া সারা আমেরিকা ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন৷ জ্ঞানঘনতনু এই নির্ভীক সন্ন্যাসীর কণ্ঠনিঃসৃত উদাত্ত বাণী একটি ভাবময় পরিবেশ সৃষ্টি করিত, যেখানে তিনি যাইতেন সেখানকার চিন্তাজগতে যেন ঝড় উঠিত৷ সেজন্য আমেরিকাবাসীরা তাঁহার নাম দিয়াছিলেন ‘দি সাইক্লোনিক হিন্দু’৷
যেখানেই তিনি যাইতেন, সেখানে বিপুল জনসমাগম হইত তাঁহার কথা শুনিবার জন্য৷ ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের কথা, বিশেষ করিয়া বেদান্তের সর্বজনীন জ্ঞানের কথা বলিয়া বেড়াইতেন তিনি৷ শিক্ষিত, চিন্তাশীল আমেরিকাবাসীরা দলে দলে তাঁহার অনুরাগী হইয়া উঠিতে লাগিল৷ অনেকে তাঁহার শিষ্যত্বও গ্রহণ করিল৷ সেসময় স্বাধীন, শিল্পবিজ্ঞানাদি বিদ্যায় উন্নত, সমৃদ্ধ পাশ্চাত্যবাসীরা পরাধীন, অনুন্নত ভারতবাসীদের বিশেষ সুনজরে দেখিত না, ভারতীয় সংস্কৃতি সম্বন্ধেও বিশেষ কিছু জানিত না৷ তাহার উপর খ্রিস্টান মিশনারিরা ভারত সম্বন্ধে অদ্ভুত সব কথা রটাইতেন৷ স্বামীজীর আমেরিকা গমনের এবং সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভারতের অমৃত–নিস্যন্দী মর্মবাণী বেদান্ত–বিজ্ঞান প্রচারের ফলে ভারতের উপর জগতের শ্রদ্ধা ফিরিয়া আসিল৷ স্বামীজী তাঁহার প্রিয় জন্মভূমি ভারতকে সভ্যজগতের সভায় আবার উচ্চ আসনে বসাইলেন৷
ধর্মমহাসভার অধিবেশন শেষ হইলে স্বামীজী একটি বত্তৃণতাসংসদে যোগ দিয়া শিকাগো, সেন্ট লুই, ডেট্রয়েট, বোস্টন, ওয়াশিংটন প্রভৃতি আমেরিকার প্রধান শহরগুলিতে বত্তৃণতা দিয়া বেড়াইতে লাগিলেন৷ পরে এই সংসদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া তিনি স্বাধীনভাবে প্রচার করিতে থাকেন৷
স্বামীজী আমেরিকায় আধ্যাত্মিকতার উচ্চ তত্ত্বগুলিই প্রচার করিতে লাগিলেন৷ কারণ তিনি দেখিলেন, মানুষের দৈহিক সুখ–সুবিধার আয়োজন ও বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষসাধনের জন্য যাহা প্রয়োজন, আমেরিকায় তাহার অভাব নাই, এদুটি বিষয়ে সে বহুদূর উন্নত৷ রাজসিকতার সাধনা করিয়া তাহার প্রভাবে মনের তামসিকতাকে সে কাটাইয়া উঠিয়াছে৷ মানুষ হিসাবে সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য এখন তাহার প্রয়োজন শুধু মনের অধিকতর উৎকর্ষসাধন–আধ্যাত্মিকতার সাধনা৷
পাশ্চাত্যে তিনি বেদান্তের বাণীগুলি প্রচার করিয়াছিলেন৷ কারণ তিনি বুঝিয়াছিলেন, জড়বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সত্যগুলির সঙ্গে ধর্মের কথাগুলির সামঞ্জস্যবিধান করিতে না পারিয়া বর্তমান যুগের মানুষ উহাতে আস্থাহীন হইয়া পড়িতেছে কিছু মানিয়া লইবার আগে সে দেখিতে চায় উহা বিজ্ঞানসম্মত কিনা, যুক্তিযুক্ত কিনা৷ বেদান্তের সত্যগুলির সঙ্গে যুক্তির বা বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সত্যগুলির বিরোধ তো হয়ই না, বরং বিজ্ঞানের নব–আবিষ্কৃত সত্যগুলি বেদান্তের তত্ত্ব বুঝিবার সহায়তাই করে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘জগতে যত শাস্ত্র আছে, তন্মধ্যে কেবল ইহারই (বেদান্তের) উপদেশাবলির সহিত বহিঃপ্রকৃতির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে যে ফল লব্ধ হইয়াছে তাহার সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য আছে৷’’ ‘‘বর্তমান জড়বাদ নিজ সিদ্ধান্তসমূহ পরিত্যাগ না করিয়া কেবল বেদান্তের সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করিলেই আধ্যাত্মিকতার দিকে অগ্রসর হইতে পারে৷’’ এইজন্যই জাতি–ধর্ম–নির্বিশেষ এবং সর্বযুগের সর্ববিধ চিন্তাধারার আঘাত সহিবার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী বেদান্তের সর্বজনীন সত্যগুলিই তিনি পাশ্চাত্যে প্রচার করিয়াছিলেন৷ আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর–বিরোধী বলিয়া মনে হইলেও বেদান্তের দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া দেখিলে সব ধর্মের কথাগুলিরই সত্যতা সহজে হূদয়ঙ্গম হয়৷
স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘আদর্শ জীবন যাপন কর, উহাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচার৷’’ নিজ জীবনে কোন আদর্শ রূপায়িত করিতে না পারিলে শুধু কথা বলিয়া অপরকে সে আদর্শ অনুযায়ী জীবনগঠন করিতে অনুপ্রাণিত করা কঠিন হয়৷ কেহ যদি উচ্চ আদর্শগুলি নিজ জীবনে রূপায়িত করিতে পারে, তাহা হইলে তাহার ভাবধারা স্বাভাবিকভাবেই অপরের হূদয়ে সংক্রমিত হইয়া যায়, তাহার কথায় অপরের হূদয় স্পর্শ করিবার মতো যথেষ্ট শক্তি আসে৷ তাই আমেরিকায় তাঁহার ভাবধারাকে অব্যাহত রাখিবার জন্য তিনি কয়েকজন পাশ্চাত্যবাসী ভক্তের জীবনগঠনে ব্রতী হইলেন৷ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে নিউইয়র্ক–এ নিয়মিতভাবে ক্লাস লইতে আরম্ভ করিলেন এবং ঐ বৎসর গ্রীষ্মকালে ‘থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড পার্ক’ নামক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা একটি বাগান–বাড়িতে কয়েকজন অনুরাগীকে সঙ্গে রাখিয়া তাঁহাদের আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে বিশেষ মনোযোগী হইলেন৷ এই স্থানটির কথা মনে জাগিলেই প্রাচীন ভারতের গুরুগৃহের কথা মনে পড়ে, সেখানে লোকালয়ের কোলাহল হইতে বহুদূরে শান্তিময় পরিবেশে সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের সঙ্গে বাস করিয়া শিক্ষাশেষে ছাত্রগণ বিমল আনন্দময় ভাব–সলিলে জীবনের পাত্র পূর্ণ করিয়া আনিত, নিজ পরিবার ও সমাজে সে সলিল সিঞ্চন করিত৷ এই সময় স্বামীজীর অন্তরের অতি গভীর প্রদেশ হইতে কত উচ্চ তত্ত্ব বাহির হইয়া শিষ্যদের হূদয়ে চিরমুদ্রিত হইয়া গিয়াছে৷ এই সময় স্বামীজীর সঙ্গে যাঁহারা ছিলেন তাঁহাদের একজন, মিস এস. ই. ওয়াল্ডো, স্মৃতিকথায় লিখিয়াছেন, ‘‘আমরা নির্বাক হইয়া বসিয়া পরম আগ্রহভরে তাঁহার অপূর্ব জ্ঞানগর্ভ কথামৃত পান করিতাম৷ স্থানটি যেন সত্যই পুণ্যনিকেতন ছিল৷ ... ঐ সময় স্বামীজী তাঁহার হূদয়ের দ্বার খুলিয়া দিতেন৷ ... মনে হইত সূক্ষ্ম–শরীরে তাঁহার গুরুদেবই যেন তাঁহার মুখ দিয়া আমাদের সঙ্গে কথা কহিতেছেন৷ ...আমাদের মধ্যে দুইজন সেখানেই সন্ন্যাস–দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন৷ দ্বিতীয় ব্যক্তির সন্ন্যাসের সময় স্বামীজী আমাদের পাঁচজনকে ব্রহ্মচর্যব্রতে দীক্ষিত করেন৷’’ এসময় যাঁহারা স্থায়িভাবে তাঁহার ভাবধারা জীবনে গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন মিস গ্রীনস্টাইডেল (ভগিনী ক্রিস্টিন), মিস এস. ই. ওয়াল্ডো (ভগিনী হরিদাসী), লেগেট দম্পতি, মিসেস ওলি বুল, মিস ম্যাকলাউড প্রভৃতি৷ ইহারই কাছাকাছি সময়ে স্বামীজী তাঁহার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাজযোগ’ রচনা করেন৷ তৎকালীন যেসব বিখ্যাত পণ্ডিতদের কাছে গ্রন্থটি অতি–সমাদৃত হয়, তাঁহাদের মধ্যে আমেরিকার দার্শনিক উইলিয়াম জেম্স এবং রাশিয়ার ঋষি টলস্টয়ের নাম উল্লেখযোগ্য৷
এভাবে আমেরিকার কাজ কিছুটা গুছাইয়া ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্ঢেম্বর মাসে বিশ্রামের জন্য তিনি প্যারিস হইয়া লন্ডনে যান৷ আমেরিকায় কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি খুবই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন৷ কিন্তু ইংলন্ডে পৌঁছাইয়া বিশ্রাম আর হইল না সেখানেও ক্লাস, বত্তৃণতা, কথোপকথনাদির মাধ্যমে প্রচারকার্য চলিতে লাগিল৷ তাঁহার ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও জ্ঞানগর্ভ ভাষণ বহু শিক্ষিত ও অভিজাত ব্যক্তির হূদয়ে গভীর রেখাপাত করিল৷ ইংলন্ডের সংবাদপত্রগুলি তাঁহাকে বুদ্ধ ও খ্রিস্টের সমপর্যায়ের আচার্য বলিয়া ঘোষণা করিল৷
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে তিনি আমেরিকায় ফিরিয়া আসেন এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংসদ কর্তৃক আহূত হইয়া বহুস্থানে বত্তৃণতা প্রদান করেন৷ তাঁহার বত্তৃণতাদি লিখিয়া রাখিবার জন্য এই সময় মিঃ জে. জে. গুডউইন নামক জনৈক ইংরেজ সাংকেতিক–লেখককে নিযুক্ত করা হয়৷ স্বামীজীর প্রতি আকৃষ্ট হইয়া অল্প কিছুদিন পরেই তিনি তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ সব সময় তিনি স্বামীজীর সঙ্গে সঙ্গে থাকিতেন৷ স্বামীজীর কথাগুলি লিপিবদ্ধ করিয়া ইনি জগতের পরম কল্যাণ সাধন করিয়া গিয়াছেন৷ এই সময় স্বামীজী নিউইয়র্কে ‘বেদান্ত সোসাইটি’ স্থাপন করেন এবং কর্মপরিচালনার জন্য মিঃ ফ্রান্সিস লেগেট–কে উহার সভাপতি করিয়া দেন৷ এভাবে আমেরিকায় তাঁহার প্রচারকার্যকে স্থায়ী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করিয়া ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে আবার তিনি ইংলন্ডে ফিরিয়া যান৷ নিউইয়র্ক কেন্দ্রে কাজের ভার গ্রহণের জন্য তাঁহার গুরুভাই স্বামী সারদানন্দকে তিনি আসিতে লিখিয়াছিলেন৷ ইংলন্ডে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হয়৷ কাজের কথা বুঝাইয়া স্বামীজী তাঁহাকে জুন মাসে নিউইয়র্ক কেন্দ্রে পাঠাইয়া দেন৷
ইংলন্ডে স্বামীজীর প্রচারকার্য চলিতে লাগিল৷ মাঝখানে স্বামীজী একবার ইওরোপ ভ্রমণ করিয়া আসেন৷ এই সময় জার্মানীর বিখ্যাত দার্শনিক পল ডয়সন–এর আমন্ত্রণে তাঁহার গৃহে অতিথি হইয়াছিলেন৷ পরে হল্যান্ড হইয়া ইংলন্ডে ফিরিয়া আসেন৷
ইংলন্ডে থাকাকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাক্সমূলার, সেভিয়ার দম্পতি, মিস মার্গারেট নোবেল (ভগিনী নিবেদিতা), মিস হেনরিয়েটা মূলর প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তির সহিত তাঁহার অন্তরঙ্গতা ঘটে৷ সেভিয়ার দম্পতি ও নিবেদিতা তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া ভারতে তাঁহার কাজে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন৷ পরে স্বামীজীর নিকট ভারতীয় প্রথায় ব্রহ্মচর্যব্রতে দীক্ষিতা হইয়া ভগিনী নিবেদিতা সন্ন্যাসজীবনের সব কঠোরতা হাসিমুখে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন৷ স্বামীজীর আদেশে ভারতকে নিজের স্বদেশ বলিয়া মনে প্রাণে গ্রহণ করিয়া ভারতের সেবায় তিনি তিলে তিলে জীবনপাত করিয়াছিলেন৷ দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্য–ভ্রমণকালে আমেরিকায় স্বামীজী তাঁহাকে গেরুয়া–বস্ত্রও দান করেন৷
সেভিয়ার দম্পতি ও গুডউইনকে সঙ্গে লইয়া ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে স্বামীজী ইটালি হইয়া ভারতে ফিরিবার জন্য ইংলন্ড হইতে যাত্রা করেন৷
পাশ্চাত্যের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা স্বামীজীর কথায় এত মুগ্ধ হইয়াছিলেন, তাহার কারণ স্বামীজী তাঁহাদের বৈজ্ঞানিক ধারায় চিন্তাশীল ও বিচারপরায়ণ মনের গ্রহণোপযোগী ভাষায় ধর্মের মূল কথাগুলি বিবৃত করিয়াছিলেন এবং বিশ্বমানবের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির পথের, মানবতার যথার্থ প্রগতির পথের সন্ধান দিয়াছিলেন৷ যৌবনের প্রারম্ভে এক সময় পাশ্চাত্যের বিপুলশক্তিময় স্বাধীন চিন্তাগুলি স্বামীজীর মনে প্রশ্ণাকারে আলোড়ন তুলিয়াছিল এবং শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় তিনি সেগুলির সদুত্তরও খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন৷ তাই নিজ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিসঞ্জাত তাঁর বিপুলতর শক্তিময় বাণীগুলি জিজ্ঞাসু আধুনিক মনে সহজগ্রাহ্য হইয়া সেখানকার সব সংশয় নিঃশেষে মুছিয়া দিত৷
মানবের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য একদিকে যেমন শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি জাগতিক বিদ্যালাভের ব্যবস্থার প্রয়োজন অনিবার্য, অপরদিকে তেমনি তাহার মনে যাহাতে সকল মানুষের জন্য যথার্থ ভালবাসা, যথার্থ কল্যাণেচ্ছা জাগে, যাহাতে সে যথার্থ মানবপ্রেমিক হয়, তাহারও ব্যবস্থার প্রয়োজন৷ নতুবা অন্যান্য বিষয়ে যথেষ্ট উন্নত হইলে বিশ্বমানব–কল্যাণক্ দেবতা না হইয়া সে অমিতশক্তিধর দানবেও পরিণত হইতে পারে৷ জড়বাদকে, ভোগসর্বস্বতাকে ভিত্তি করিয়া সভ্যতা গড়িয়া উঠিলে মানুষের মনে কালে স্বার্থপরতাই বাড়িয়া যায়৷ ফলে ব্যক্তিগত বা জাতিগত স্বার্থে বিরোধ বাধিয়া একদিন সংঘর্ষ ও ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে৷ জগতের ইতিহাস তাহার সাক্ষ্য বহন করিতেছে৷ সেজন্য বিশ্বমানবের কল্যাণার্থে আধ্যাত্মিকতাকে আমাদের সভ্যতার ভিত্তি করিতেই হইবে৷ আধ্যাত্মিকতাই বাহিরের বিষয় নিরপেক্ষ অফুরন্ত আনন্দের সন্ধান দিয়া মানুষকে নিঃস্বার্থপর করে৷ বিচ্ছেদহীন আনন্দ লাভ করাই যে জীবনের উদ্দেশ্য–ইহাতে দ্বিমত নাই কোনও মানুষের জীবনের সব প্রচেষ্টা এই আনন্দলাভের জন্যই৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ধর্মাচরণ মানে পরজন্মে আনন্দ পাইবার আশায় ইহজন্মে কেবল দুঃখভোগ করা নহে যথার্থ আধ্যাত্মিকতার পথে পা বাড়াইবার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মন আনন্দ–ভিষিক্ত হইতে শুরু করে৷ এ পথে চলিবার সামান্য প্রচেষ্টাও প্রচুর সার্থকতা আনে–‘‘স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ৷’’ খাওয়া প্রভৃতি দেহজ ভোগ হইতে মানুষ যে আনন্দ পায়, অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে সে আনন্দ সাধারণ প্রত্যেক দেহধারী প্রাণীই কমবেশি সে আনন্দের অধিকারী৷ মানুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তি ও আধ্যাত্মিকতার বিকাশই উচ্চতর আনন্দের সন্ধান ও আস্বাদ আনিয়া দিয়া মানুষকে অন্যান্য প্রাণীর স্তর হইতে অতি উচ্চে টানিয়া আনিয়াছে, মানবতার যথার্থ প্রগতির পথ আবিষ্কার করিয়াছে৷ দেহ–ইন্দ্রিয়জ আনন্দ সবচেয়ে নিম্নস্তরের আনন্দ৷ তাহার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চস্তরের আনন্দ হইল বুদ্ধিজ আনন্দ জ্ঞান আহরণ করিয়া, জ্ঞানের চর্চা করিয়া মানুষ যে আনন্দ পায়, অন্যান্য প্রাণীর কাছে সে আনন্দের দ্বার রুদ্ধ৷ আধ্যাত্মিক আনন্দ তাহারও ঊর্ধ্বে ইহাই সর্বোচ্চ আনন্দ– বিরামহীন, বিচ্ছেদহীন, প্রতিক্রিয়াহীন, অফুরন্ত আনন্দ৷ এই আনন্দলাভের জন্য মানুষকে বাহিরের কোন কিছুর উপর নির্ভর করিতে হয় না, কাহারও নিকট কিছু প্রত্যাশা করিতে বা কাড়িয়া লইতে হয় না, অপরের স্বার্থে বিন্দুমাত্র আঘাত করিতে হয় না৷ এ আনন্দের আস্বাদ একবার পাইলে জীবনের আর সব পাওয়া তাহার কাছে তুচ্ছ হইয়া যায়, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভাষায় ‘আলুনি লাগে’৷ এই আধ্যাত্মিক আনন্দের আস্বাদ ও তাহা লাভ করিবার প্রচেষ্টাই সর্ববিধ মানসিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে তুলিয়া মানুষকে ‘মানুষ’ করিয়াছে৷ এই আধ্যাত্মিকতাসঞ্জাত অসীম প্রেমের প্রেরণায় যিশু মানবকল্যাণের জন্য প্রাণ দিয়াছেন, বুদ্ধদেব মানুষ তো দূরের কথা একটি পশুর জন্যও প্রাণ দিতে উদ্যত হইয়াছেন৷ নিঃস্বার্থপরতাই আধ্যাত্মিকতা৷ যে মানুষ নিজের জন্য কোনও কিছু, নাম–যশ পর্যন্ত না চাহিয়া, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হইয়া অপরের কল্যাণ–সাধনে ব্রতী হয়, সে অন্য কোন ধর্মানুষ্ঠান করুক বা না করুক, ঈশ্বরে বিশ্বাসী হউক বা না হউক, নিঃসন্দেহে সে আধ্যাত্মিকতার পথে, ধর্মের পথেই অগ্রসর হয়৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘কিছু চাহিও না, উহাই ভগবান৷’’
যথাসাধ্য সংযম অভ্যাস করিয়া মানুষ যাহাতে ক্রমশ নিঃস্বার্থপর হইতে পারে, একাগ্রতার সাধনা করিয়া এই আধ্যাত্মিক আনন্দের আস্বাদ যাহাতে সমাজের সকলেই কিছু না কিছু পাইতে পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখিয়া সেরূপ ব্যবস্থায় গঠিত সভ্যতার নামই আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক সভ্যতা৷ কারণ জীবনের প্রারম্ভে এই আধ্যাত্মিক–আনন্দের সন্ধান ও আস্বাদ একটুখানি না পাইলে কেবল উপদেশ শুনিয়া মানুষ কখনও তৎপ্রতি আকৃষ্ট হইবে না৷ অপরদিকে, উহার অতি সামান্য আস্বাদও কোনরূপে একবার পাইলে, উহার বাস্তবতায় একবার বিশ্বাস আসিলে উহা আবার লাভ করিবার চেষ্টা সে নিজের গরজেই সারাজীবন করিয়া চলিবে যেমন অন্যান্য আনন্দলাভের বেলা আমরা করিয়া থাকি৷ এরূপ হইলে তাহার জীবন স্বতই আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক হইবে৷ স্বামীজী দেখিলেন অন্যান্য বিষয়ে খুবই উন্নত হইলেও পাশ্চাত্যে সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য অবশ্য–প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিকতার একান্ত অভাব ঘটিয়াছে৷ শুধু উন্নত হইবার জন্যই নয়, পাশ্চাত্য–সভ্যতার স্থায়িত্বের জন্যও ইহার প্রয়োজন৷ ইওরোপকে তাই স্বামীজী সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন যে, তাহাদের সভ্যতাকে জড়বাদের ভিত্তি হইতে সরাইয়া আনিয়া আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক না করিলে আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই উহা চূর্ণ–বিচূর্ণ হইয়া যাইতে পারে৷ তিনি বলিয়াছেন, ‘‘জড়বাদের ভিত্তি বালির ভিত্তি উহার উপর সভ্যতার সৌধ বেশিদিন টিকে না৷ আর যখন ভাঙে, তখন ভাঙিয়া একেবারে গুঁড়া হইয়া যায়, সংস্কার করিবার মতোও কিছু অবশেষ থাকে না৷’’ বলিয়াছেন, আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক না হইলে নিছক যুক্তির উপর ভর করিয়া কোন নীতি দাঁড়াইতে পারে না৷ দেহ–সীমায়িত আনন্দ ছাড়া উচ্চতর আনন্দ যদি কিছু না থাকে, মানুষের যদি দেহাতীত কোন সত্তা না থাকে, জন্মমৃত্যুর স্বল্পপরিসরে ঘেরা কয়েকটি দিনই যদি তাহার সর্বস্ব হয়, তাহা হইলে মানুষ সমাজকে ফাঁকি দিয়া, রাজশাসনকে ফাঁকি দিয়া সকলের অজ্ঞাতে বা সকলকে উপেক্ষা করিবার মতো শক্তিশালী হইয়া নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অপরের সর্বনাশ সাধন যে করিবে না, তাহার নিশ্চয়তা কি? নিছক যুক্তির দিক হইতে ইহার কোন সদুত্তর নাই৷ স্বার্থহীনতা, সমবেদনা, দয়া প্রভৃতি মানুষের উচ্চতর মনোবৃত্তিগুলিই, আধ্যাত্মিকতাই, নীতির এবং বিশ্বমানবের নিরাপত্তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভিত্তি৷
স্বামীজী আধ্যাত্মিকতার প্রতি পাশ্চাত্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, নির্ভীকচিত্তে তাহার রাজনীতি ও সমাজনীতির দোষগুলিও সুস্পষ্টভাবে দেখাইয়া দিয়াছিলেন৷ সেজন্য এবং তাঁহার লোকপ্রিয়তায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া, একদল স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি তাঁহার প্রতি বিরূপ হইয়া উঠেন এবং সমবেতভাবে তাঁহার নামে কুৎসা রটাইতে থাকেন৷ একবার তাঁহার প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করা হইয়াছিল৷ ইহার জন্য কিছুদিন স্বামীজীকে একটু অসুবিধায় পড়িতে হইলেও এই অপ–প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়৷ স্বামীজীর জনৈকা হিতৈষিণী, মিস মেরি হেল, শঙ্কান্বিতা হইয়া স্বামীজীকে একটু সাবধানে কথা বলিবার জন্য এই সময় অনুরোধ জানান৷ উত্তরে স্বামীজী লিখিয়াছিলেন, ‘‘লোকমতের উপাসকেরা নিমেষে বিনাশপ্রাপ্ত হয়, আর সত্যের তনয়েরা চিরজীবী৷ ...ভগিনি, আমি ঘোর মিথ্যার সঙ্গে আপস করিতে পারি না, তজ্জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত৷ ...আমার ধনের কামনা নাই, নামযশের কামনা নাই, ভোগের কামনা নাই, এসব আমার কাছে খড়কুটা ... আমি আমার ভ্রাতাদের সাহায্য করিতে চাই৷ ...আমার কিছু বলিবার আছে, আমি উহা বলিব৷... ভগিনি সন্ন্যাসী কি জিনিস, তা তুমি জান না৷’’
যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বামীজী পাশ্চাত্যে গিয়াছিলেন, সে উদ্দেশ্য সফল হইয়াছিল৷ পাশ্চাত্য জগতের বহু মনীষী ভারতের আধ্যাত্মিক ভাবগুলির প্রতি শ্রদ্ধাবান হইয়া তাঁহার বাণী সাদরে গ্রহণ করিয়াছিলেন৷ আর তাহার প্রবল প্রতিক্রিয়া হইয়াছিল ভারতে–‘নিদ্রিত অজগর’ চোখ মেলিয়া চাহিয়াছিল৷ পাশ্চাত্য জগতে যাইয়া একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতির বাণী প্রচার করিয়াছেন এবং পাশ্চাত্যজগৎ উহাতে শ্রদ্ধান্বিত হইয়াছে–এই সংবাদ ভারতে পঁৌছিবামাত্র গোটা ভারতবর্ষের লোকের মনে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলিয়া গিয়াছিল, নিজ প্রাচীন সংস্কৃতির উপর তাহাদের ক্ষীয়মাণ শ্রদ্ধা আবার গভীর হইয়া উঠিয়াছিল৷ আর, ভারতে কাজ আরম্ভ করিবার মতো অর্থসাহায্যও তিনি পাইয়াছিলেন৷
পাশ্চাত্যে যাইয়া সেখানে আধ্যাত্মিক ভাব সঞ্চারের কাজে, বিশ্বকল্যাণের কাজে মনোনিবেশ করিলেও স্বামীজী ভারতের কথা কখনও ভুলেন নাই, ভারতবাসীর দুরবস্থা তাঁহার হূদয়কে বেদনাতুর করিয়াই রাখিত৷ আমেরিকা হইতে মাদ্রাজের অনুগত যুবকদের ও কলকাতার মঠের গুরুভাইদের তিনি দেশসেবার কাজে মনেপ্রাণে ব্রতী হইবার জন্য পত্র লিখিয়া বহুভাবে উৎসাহিত করিতেন এবং কাজের পরিকল্পনা ও বিস্তারিত খুঁটিনাটিও পাঠাইতেন৷ কখন কখনও প্রয়োজনমত অর্থসাহায্যও করিতেন৷ পাশ্চাত্য হইতে লেখা তাঁহার পত্রগুলি পাঠ করিলেই বোঝা যায় ভারতবাসীর জন্য কি বেদনার পাষাণ তাঁহার বুকে সর্বক্ষণ চাপিয়াছিল, ভারতের উদ্ধারের জন্য কি কাজ তিনি করিয়া গিয়াছেন৷ মাদ্রাজের যুবকগণকে উৎসাহিত করিবার জন্য একটি পত্রে লিখিয়াছিলেন, ‘‘ভারতের চিরপতিত বিশ–কোটি নরনারীর জন্য কার হূদয় কাঁদছে? তাহাদের উদ্ধারের উপায় কি? ... এরাই তোমাদের ঈশ্বর, এরাই তোমাদের দেবতা হোক–এরাই তোমাদের ইষ্ট হোক৷ ...তাঁদেরই আমি মহাত্মা বলি, যাঁদের হূদয় থেকে গরিবদের জন্য রক্তমোক্ষণ হয়, তা না হলে সে দুরাত্মা৷ ...যতদিন ভারতের কোটি কোটি লোক দারিদ্র্য ও অজ্ঞানান্ধকারে ডুবে রয়েছে, ততদিন তাদের পয়সায় শিক্ষিত অথচ যারা তাদের দিকে চেয়েও দেখছে না, এরূপ প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমি দেশদ্রোহী বলে মনে করি৷ যতদিন ভারতের বিশকোটি লোক ক্ষুধার্ত পশুর তুল্য থাকবে, ততদিন যেসব বড়লোক তাদের পিষে টাকা রোজগার করে জাঁকজমক করে বেড়াচ্ছে অথচ তাদের জন্য কিছু করছে না, আমিতাদের হতভাগা বলি৷’’ বরানগর মঠের গুরুভাইদের একযোগে জনসেবার কাজে নামাইবার জন্য লিখিয়াছিলেন, ‘‘যদি ভাল চাও তো সাক্ষাৎ ভগবান নারায়ণের, মানবদেহধারী হরেকরকম মানুষের পূজা করগে... তাদের পুজো মানে তাঁর সেবা–এর নাম কর্ম৷ ...গাঁয়ে গাঁয়ে যা, ঘরে ঘরে যা, লোকহিত, জগতের কল্যাণ কর–নিজে নরকে যাও, পরের মুক্তি হোক–আমার মুক্তির বাপ নির্বংশ৷ ... তোমার শান্তির দরকার কি বাবাজী? সব ত্যাগ করেছ, এখন শান্তির ইচ্ছা, মুক্তির ইচ্ছাটাকেও ত্যাগ করে দাও তো বাবা৷ ...ঠাকুর যেমন আমায় ভালবাসতেন, আমি যেমন তোমাদের ভালবাসি, তোমরা তেমনি জগৎকে ভালবাস দেখি৷’’
স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্যবাসকালেই তাঁহার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ মাদ্রাজের কয়েকজন যুবক এবং কলকাতার সন্ন্যাসী গুরুভাইরা কিছু কাজ আরম্ভ করিয়াছিলেন৷ মাদ্রাজ হইতে ‘প্রবুদ্ধ–ভারত’ এবং ‘ব্রহ্মবাদিন্’ নামক দুখানি পত্রিকার প্রকাশন শুরু হইয়াছিল৷ স্বামী অখণ্ডানন্দ রাজপুতানায় খেতড়ির রাজার সহায়তায় রাজার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে নিম্নশ্রেণির ছেলেদের পড়াইবার সুযোগ করাইয়া দিয়াছিলেন এবং খেতড়ির সংস্কৃত বিদ্যালয়ে বেদাধ্যয়ন প্রবর্তিত করাইয়াছিলেন৷ রাজপুতানার নাথাঙওয়ারাতে তিনি একটি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন৷
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দ কলম্বো বন্দরে পদার্পণ করিলেন৷ তাঁহার স্বদেশ–প্রত্যাগমনে জন্য নিদ্রোত্থিত ভারত সাগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছিল৷
ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকেই ভারতে নবজাগরণের প্রথম স্পন্দন লক্ষিত হয়৷ সুদীর্ঘ অমানিশার অবসানে ভারতের ভাগ্যাকাশে রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দ্ সূর্যোদয়ের পূর্বে যে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কটি ঊষাকালের সূচনা করিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন রাজা রামমোহন রায়৷ জাগরণের সেই সুপ্রভাতে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে একদল মহামনীষী স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবির্ভূত হইয়া জাগরণের বিভিন্নক্ষেত্রে আলোক বিকিরণ করিয়া গিয়াছেন৷ তাঁহাদের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়–ই পাশ্চাত্য সভ্যতা–গ্রহণোদ্যত ভারতবাসীদের মোহ কাটাইয়া নিজ সংস্কৃতিতে তাহাদের আস্থা ফিরাইয়া আনিবার জন্য এবং অপরাপর জাতির সদ্গুণগুলি গ্রহণ করিবার জন্য সর্বপ্রথম সচেষ্ট হইয়াছিলেন৷ বিদেশ–ভ্রমণ প্রসঙ্গে স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘আমাদের পতনের অন্যতম কারণ এই যে আমরা বাহিরে যাইয়া অন্যজাতির সহিত আমাদের তুলনা করি নাই আর তোমরা সকলেই জান, যেদিন হইতে রাজা রামমোহন রায় এই সঙ্কীর্ণতার বেড়া ভাঙিলেন, সেদিন হইতে আজ পর্যন্ত ভারতের সর্বত্র যেটুকু স্পন্দন, যেটুকু জীবন অনুভূত হইতেছে, তাহার প্রারম্ভ হইয়াছে৷’’ কিন্তু জাগরণের সে স্পন্দন ছিল মৃদু, সীমায়িত ও দ্বিধাজড়িত৷ হিন্দুধর্মের সর্বাঙ্গে প্রাণসঞ্চার করিয়া ভারতের সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সমগ্রভাবে পুনরুজ্জীবিত করিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ আর পাশ্চাত্যে তাঁহারই অভিনব বাণী বজ্রনির্ঘোষে ঘোষণা করিয়া স্বামী বিবেকানন্দ যেদিন বিষাণ–বাদন করিলেন, সেইদিনই সমগ্র ভারতের তন্দ্রা টুটিয়া গেল, জাগরিত ভারতীয় জাতি নিজস্ব সংস্কৃতিতে নিঃসংশয় আস্থা ফিরিয়া পাইল৷ স্বদেশবাসীর প্রতি তাঁহার নির্দেশ শুনিবার জন্য সমগ্র ভারত উদ্গ্রীব হইয়া অপেক্ষা করিতেছিল৷
ভারতে পদার্পণ করিতেই সহস্র সহস্র নরনারী হূদয়ের অকৃত্রিম ভক্তি–ভালবাসার অর্ঘ্য দান করিয়া এই স্বদেশ–প্রেমিক সন্ন্যাসীকে, এই বিজয়ী বীরকে বরণ করিয়া লইল৷ কলম্বো হইতে আলমোড়া পর্যন্ত গোটা ভারত আবার তিনি ঘুরিয়া বেড়াইলেন৷ পূর্বে পরিব্রাজক বেশে ঘুরিবার সময় তিনি বলিয়াছিলেন, ‘‘ভারতের পক্ষে প্রয়োজন তাহার ধমনীতে ধমনীতে নব বিদ্যুৎ–প্রবাহ সঞ্চার৷’’ এবারে সেই কাজ করিয়া চলিলেন তিনি–আত্মবিশ্বাসের, পৌরুষের, কর্মপ্রেরণার নবভাবের আগুন জ্বালাইয়া চলিলেন হূদয়ে হূদয়ে৷ ভারতের সর্বত্র জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই প্রেরণার আগুন ক্রমবিস্তৃত হইয়া ছড়াইয়া পড়িল৷ নির্ভুল–লক্ষ্যাভিমুখী করিয়া দিয়া তিনি ভারতের নবযুগ–রথচক্রে গতিবেগ সঞ্চারের কাজে লাগিয়া পড়িলেন৷ যেখানেই যাইলেন, সেখানেই জনসাধারণ তাঁহাকে বিপুল সংবর্ধনা জানাইল৷ কলম্বোতে তাঁহার অভ্যর্থনার জন্য সহস্র সহস্র নরনারী জাহাজঘাটে সমবেত হইয়াছিল৷ পথশ্রমক্লান্ত স্বামীজী পত্র–পুষ্প–তোরণাদি পথের উপর দিয়া তাঁহার বাসের জন্য নির্দিষ্ট বাংলোতে পঁৌছিলেন এবং সমবেত জনগণকে দুচার কথায় সম্ভাষণ জানাইয়া সেদিন বিশ্রাম করিলেন৷ পরদিন স্থানীয় ‘ফ্লোরাল হল’–এ তাঁহার অভিনন্দনের জন্য সভা আহূত হয়৷ এই সভায় অভিনন্দনের উত্তরই প্রাচ্যভূমে ফিরিবার পর স্বামীজীর প্রথম বত্তৃণতা৷ এইদিন তিনি প্রথমেই দেশবাসীকে ভারতের পূর্বগৌরবের কথা স্মরণ করাইয়া দেন৷ তিনি জানিতেন উন্নতির পথে চলিতে হইলে ইহার প্রয়োজন অনিবার্য ঃ ‘‘লোকে আমাকে বলিয়াছে, পূর্বগৌরব–স্মরণে মনের অবনতি হয় মাত্র, উহাতে কোন ফলোদয় হয় না সুতরাং আমাদিগকে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া কার্য করিতে হইবে৷ সত্য কথা৷ কিন্তু ইহাও বুঝিতে হইবে অতীতের গর্ভেই ভবিষ্যতের জন্ম৷ অতএব যতদূর পার পশ্চাদ্দৃষ্টি কর, পশ্চাতে যে অনন্ত নির্ঝরিণী প্রবাহিত, প্রাণ ভরিয়া আকণ্ঠ তাহার সলিল পান কর তারপর সম্মুখপ্রসারিত দৃষ্টি লইয়া অগ্রসর হও এবং ভারত প্রাচীনকালে যতদূর উচ্চ গৌরবশিখরে আরূঢ় হইয়াছিল, তাহাকে তদপেক্ষা উচ্চতর, উজ্জ্বলতর, মহত্তর মহিমাশালী করিবার চেষ্টা কর৷’’ ভারতের মহিমা–প্রসঙ্গে স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘যদি পৃথিবীর মধ্যে এমন কোন দেশ থাকে, যাহাকে পুণ্যভূমি নামে অভিহিত করা যাইতে পারে, ... যদি এমন কোন দেশ থাকে যেখানে মনুষ্যজাতির ভিতর সর্বাপেক্ষা অধিক ক্ষান্তি, ধৃতি, দয়া, শৌচ প্রভৃতি সদ্গুণের বিকাশ হইয়াছে, ...তবে নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি তাহা আমাদের মাতৃভূমি–এই ভারতবর্ষ৷ ...অপর–দেশীয় লক্ষ লক্ষ নরনারীর হূদয়–দগ্ধকারী জড়বাদরূপ অনল নির্বাণ করিতে যে অমৃতসলিলের প্রয়োজন, তাহা এখানেই বর্তমান৷’’
সমগ্র মানবজাতির উন্নতির জন্য প্রত্যেক জাতিকেই কিছু না কিছু দিতে হয়৷ এবিষয়ে ভারতের নিজস্ব অবদান আধ্যাত্মিকতা৷ ‘‘জগতের ইতিহাস পর্যালোচনা কর, যেখানেই কোন সুমহান আদর্শের সন্ধান মিলিবে, দেখিতে পাইবে উহার জন্ম ভারতবর্ষে৷’’
‘‘প্রাচীন ও আধুনিককালে বহু শক্তিশালী খ্যাতনামা জাতি অনেক উচ্চ উচ্চভাব প্রচার করিয়াছে সত্য৷’’ কিন্তু উহা জগতের অপরাপর জাতির
নিকট ছড়াইয়াছে ‘‘যুদ্ধের তূর্যধ্বনির সঙ্গে, রণোন্মত্ত সেনাবাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে৷’’ ‘‘প্রত্যেকটি ভাব যেন রক্তের বন্যার মধ্য দিয়া–লক্ষ লক্ষ মানুষের শোণিত ঠেলিয়া অগ্রসর হইয়াছে৷ শক্তিশালী বিজেতার এক একটি আদেশের ফলে উঠিয়াছে লক্ষ লক্ষ আর্তের চিৎকার, অনাথ শিশুর ক্রন্দন এবং নিরাশ্রয় বিধবার আকুল অশ্রুপাত৷’’ কিন্তু ভারতের ভাবরাশি জগতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে শান্তি ও শুভেচ্ছার পথ ধরিয়া ঃ ‘‘প্রভাতের কোমল শিশিরকণা যেমন লোকচক্ষুর অন্তরালে মনোরম গোলাপের কুঁড়িগুলিকে ফুটাইয়া তোলে, বিশ্বচিন্তায় ভারতের অবদান ঠিক সেইরূপ৷’’ ‘‘ধীরপ্রকৃতি হিন্দুর কাছে জগৎ যত উপকৃত হইয়াছে, তেমন অপর কোন জাতির কাছে নহে৷’’
অতি প্রাচীনকাল হইতে ভারত জগতে এই অমৃতসলিল সিঞ্চন করিয়া আসিতেছে৷ ‘‘বুদ্ধদেব জন্মিবার অনেক পূর্ব হইতেই উহা ঘটিতেছে৷ চীন, এশিয়া–মাইনর ও মালয় দ্বীপপুঞ্জের মধ্যভাগে এখনও তাহার চিহ্ণ বর্তমান৷ যখন সেই প্রবল দিগ্বিজয়ী গ্রিকজাতি তদানীন্তন পরিচিত জগতের সমগ্র অংশ একত্র গ্রথিত করিয়াছিল, তখনও এই ব্যাপার ঘটিয়াছিল৷ আর পাশ্চাত্যদেশ যে সভ্যতা লইয়া এখন গর্ব করিয়া থাকে, তাহা সেই মহাবন্যার অবশিষ্ট চিহ্ণমাত্র৷’’ তাহারও পূর্বে, ‘‘যখন গ্রিসের জন্ম হয় নাই, রোমের কথা কেহ ভাবে নাই, বর্তমান ইওরোপীয়দের পূর্বপুরুষগণ বিচিত্র অঙ্গরাগে রঞ্জিত অসভ্য অরণ্যবাসীমাত্র ছিল, সেই সুদূর যুগেও ভারত তাহার সংস্কৃতির সাধনায় কর্মমুখর৷ তাহারও পূর্বে, যে দূর অতীতের সংবাদ ইতিহাসে পাওয়া যায় না, যাহার কুয়াশা ভেদ করিতে কিংবদন্তীও সঙ্কুচিত, সেই সময় হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত কত উচ্চ উচ্চ ভাব শান্তি ও শুভেচ্ছার বাণী বহন করিয়া ভারত হইতে জগতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে৷’’
যখনই অন্যান্য জাতিগুলির সহিত ভারতের যোগাযোগ স্থাপিত হইয়াছে, তখনই, ‘‘সমগ্র জগতে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার তরঙ্গ ছুটিয়াছে৷’’ বর্তমান যুগে জগতের জাতিগুলির মধ্যে বিস্তৃত যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় ‘‘এক্ষণে সেই সুযোগ আবার উপস্থিত৷’’ ভারতের ভাগ্যবিধাতার ইচ্ছায় আবার শক্তিমান ও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হইয়া জগতে শান্তির বাণী ছড়াইবার সময় ভারতের আসিয়াছে৷ সে শক্তিতরঙ্গ উঠিয়াছেও যত দিন যাইবে, উহা ততই বর্ধিত ও বিস্তৃত হইতে থাকিবে ঃ ‘‘এই সুযোগে ভারত জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে কালবিলম্ব না করিয়া উঠিয়া জগৎকে তাহার আধ্যাত্মিক উপহার দান করিয়াছে৷ এখন... এই ভারতীয় ভাবরাশি সমগ্র জগতে বিস্তৃত হইতে থাকিবে৷ আমি যে আমেরিকায় গিয়েছিলাম, তাহা আমার ইচ্ছায় বা তোমার ইচ্ছায় হয় নাই, ভারতের ঈশ্বর, যিনি ইহার অদৃষ্ট নিয়মিত করিতেছেন, তিনিই আমায় পাঠাইয়াছেন এবং এরূপ শতশত ব্যক্তিকে জগতের সকল জাতির নিকট প্রেরণ করিবেন৷’’
কলম্বো হইতে যাত্রা করিয়া স্বামীজী সিংহলের কান্ডি, অনুরাধাপুর, জাফানা প্রভৃতি স্থান হইয়া জলপথে পাম্বানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ পাম্বানেই স্বামীজী ভারতের মূল ভূভাগ প্রথম স্পর্শ করিয়াছিলেন বলিয়া জাহাজ হইতে যেখানে তিনি নামিয়াছিলেন, রামনাদের রাজা সেখানে একটি চল্লিশ ফুট উচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাইয়া দেন এবং উহার গাত্রে উৎকীর্ণ করিয়া দেন, ‘সত্যমেব জয়তে’৷ পাম্বান হইতে রামনাদ এবং সেখান হইতে মাদুরা, কুম্ভকোনম্ প্রভৃতি স্থান হইয়া স্বামীজী মাদ্রাজ শহরে আসিয়া উপস্থিত হন৷ কলম্বো হইতে মাদ্রাজ পর্যন্ত যাইবার পথে সর্বত্রই অভিনন্দন সভায় তিনি বত্তৃণতা করিয়াছেন৷ এইসব বত্তৃণতায় দেশকে বর্তমান দুর্দশার কবল হইতে উদ্ধার করিবার জন্য, উন্নতশীল পরাক্রান্ত জাতি হিসাবে আবার গৌরবমণ্ডিতশিরে উঠিয়া দাঁড়াইবার জন্য, জগতে আবার জাতি হিসাবে আদর্শ স্থাপন করিবার জন্য আমাদের কোন পথে চলিতে হইবে, স্বামীজী সবিস্তারে তাহার নির্দেশ দিয়া গিয়াছেন৷ কলম্বো হইতে আলমোড়া পর্যন্ত ঘুরিয়া যে সব কথা তিনি বলিয়াছেন, তাহা লইয়াই–‘ভারতে বিবেকানন্দ’ নামক পুস্তকখানি রচিত হইয়াছে৷
দেশবাসীর হূদয়ে শ্রদ্ধার উদ্বোধনের জন্য প্রাচীন ভারতের গৌরবের কথা বলিয়া, তাহার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলেখ্য দেখাইয়া স্বামী বিবেকানন্দ
দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন ভারতের বর্তমান দুরবস্থা, তাহার কারণ ও তাহার প্রতিকারের উপায়ের প্রতি৷ বলিলেন, প্রাচীনভারত খুবই গৌরবোজ্জ্বল ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু বর্তমানে ‘‘আমরা দুর্বল, অতি দুর্বল৷ আমরা অলস, আমরা কর্ম করিতে পারি না৷ আমরা অতিশয় বিশৃঙ্খল–ভাবাপন্ন, ঘোর স্বার্থপর হইয়া পড়িয়াছি৷’’ মহা তামসিকতায়, মহা জড়তায় দেশ আচ্ছন্ন রাজসিকতার, তেজবীর্যের প্রকাশ নাই কোথাও৷
যুগ যুগ ধরিয়া ধর্মই ভারতবাসীর জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্ববিধ প্রেরণার মূল উৎস বলিয়া জীবনে ধর্মের যথাযথ রূপায়ণের অভাব ঘটিলেই ভারত সর্ববিষয়ে অবনত হইয়া পড়ে, আর ধর্মের যথার্থ প্রয়োগই জাতির প্রাণশক্তিকে সবল করিয়া সর্ববিষয়ে তাহাকে উন্নত করিয়া তোলে৷ ধর্মসম্বন্ধে বিকৃত ধারণা, জীবনে ধর্মের উচ্চাদর্শগুলির প্রতিফলনের চেষ্টার অভাব, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের ধর্মকে স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগাইবার অপপ্রয়াস এবং নিজেদের প্রসারিত ও যুগোপযোগী না করিয়া সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখাই আমাদের বর্তমান অধঃপতনের মূল কারণ৷
বিগত কয়েক শতাব্দী ধরিয়া আমরা সর্বসাধারণে মিলিয়া সাত্ত্বিক ভাবের অনুকরণ করিতে যাইয়া রাজসিকতাকে, তেজবীর্যকে হূদয় হইতে নির্বাসিত করিয়াছি, মহা তামসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়াছি, ‘‘কোমলতার সাধন করিতে করিতে আমরা জীবন্মৃত হইয়া পড়িয়াছি৷’’
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ–এই তিনটি গুণই কমবেশি থাকে ইহাদের মাত্রার তারতম্য মনুষ্যত্ব–বিকাশের তারতম্য ঘটায়৷ তামসিকতা মানে জড়ত্ব, কর্মশক্তিহীনতা বিজ্ঞানের ভাষায় জড় পদার্থের সংজ্ঞা হইল, যাহাকে কেহ ঠেলিয়া না দিলে নিজে নড়িতে পারে না৷ রাজসিকতা শক্তির বিকাশ, ইহা মানুষকে কর্মচঞ্চল করে, তাহার মধ্যে প্রাণের প্রাচুর্য আনে৷ সত্ত্বের ধর্ম প্রকাশ, জ্ঞান৷ সাত্ত্বিক ভাবের প্রকাশ হইলে তবেই জীবনে ধর্মের উচ্চতম ভাবগুলির বিকাশ হয় সাত্ত্বিক ভাবই শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ৷ কিন্তু আলস্য, জড়তা কাটাইয়া জীবনে সাত্ত্বিকভাব আনিতে হইলে আগে প্রচণ্ড কর্মশক্তির স্ফুরণ ব্যতীত উহা করিবার উপায় নাই৷ জড়তা কাটিয়া যাইবার পর উদ্দাম কর্মপ্রেরণাকে সংযত করিয়া উহাকে উচ্চতর শক্তিতে রূপায়িত করিতে পারিলে তবেই যথার্থ অহিংসা, চিত্তের প্রসন্নতা, বৈরাগ্য প্রভৃতি সাত্ত্বিক ভাবগুলির উদয় হয়, তাহার পূর্বে নহে৷ যাহাদের মধ্যে রাজসিকতার বিকাশ হয় নাই, তাহারা যদি উহার উদ্বোধন না করিয়া একেবারে সাত্ত্বিকভাবের সাধনা করিতে যায়, তাহা হইলে তামসিকতাতেই বেশি করিয়া আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে ‘‘বৈরাগ্যে আর কুঁড়েমিতে আকাশ–পাতাল তফাত৷’’ মহা তামসিক ও মহা সাত্ত্বিকভাবাপন্ন ব্যক্তি বাহ্যদৃষ্টিতে অনেক সময় একইরূপ দেখায়৷ কিন্তু কি বিপুল পার্থক্য তাহাদের মধ্যে একজনের মধ্যে শক্তির একান্ত অভাব, অপরজনের মধ্যে প্রচণ্ড শক্তি সংযত হইয়া স্থির রহিয়াছে৷ একজনকে অপমান করিলে, পদাঘাত করিলে শক্তিহীনতার জন্য উহার প্রতিকার করিতে না পারিয়া হয়তো দয়া, অহিংসা প্রভৃতি উচ্চ মনোবৃত্তিগুলির দোহাই দেয় হয়তো মনের এত হীন অবস্থা যে অপমানবোধও জাগে না সেখানে৷‘‘কাপুরুষ দয়ার আধার... মর্মকথা বলি কাকে?’’ আর একজন প্রতিকারের যথেষ্ট শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাঘাতের ইচ্ছাকে দমন করিয়া আঘাতকারীর কল্যাণকামনা করে, প্রাণহন্তাকেও হাসিমুখে আশীর্বাদ করে৷ সাত্ত্বিক ভাবের বিকাশই যে মনুষ্যত্বের, মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির উচ্চতম বিকাশ, তাহাতে সন্দেহ নাই কিন্তু বিভিন্ন স্তরের লোকের সামর্থ্যের প্রতি দৃষ্টি না রাখিয়া আপামর–সাধারণকে বৈরাগ্যের সাধনা করিতে বলিলে ফল বিপরীত হয়, বৈরাগ্যের পরিবর্তে আলস্যের সাধনাই হয় তাহা৷ বিদ্যালয়ের নিম্নতম শ্রেণির ছাত্র হইতে শুরু করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শ্রেণির ছাত্রদের সকলের জন্য একই প্রকার পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা দেওয়া কখনও চলে না তাহাদের লব্ধবিদ্য করিতে হইলে শ্রেণিবিভাগ করিয়া ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে ধারণাশক্তি বাড়াইয়া তাহাদিগকে উচ্চ হইতে উচ্চতর জ্ঞানের রাজ্যে লইয়া যাইতে হয়৷ ধারণাশক্তির উপযোগী জ্ঞানের বিষয় না দিয়া প্রথমশ্রেণির ছাত্রকে জোর করিয়া রবীন্দ্রকাব্যের সূক্ষ্ম ভাবগুলি বা আইনস্টাইনের ‘রিলেটিভিটি’ বুঝাইবার চেষ্টা করিলে তাহা হাস্যকর বিফলতাতেই পর্যবসিত হয়৷ উপরন্তু, বুদ্ধিতে সব তালগোল পাকাইয়া স্বাভাবিক ক্রমোন্নতির পথে জ্ঞানের রাজ্যে যতটুকু সে অগ্রসর হইতে পারিত, তাহারও পথ রুদ্ধ হয়৷ জীবনে সর্ববিধ উন্নতির পথে চলিবার সময়ই একথা প্রযোজ্য দৃষ্টি উচ্চতম লক্ষ্যে নিশ্চয়ই নিবদ্ধ থাকিবে, কিন্তু চলিবার পথ সামর্থ্য অনুযায়ী বাছিয়া লইয়া আমাদিগকে ধীরে ধীরে সেদিকে অগ্রসর হইতে হইবে৷
বিগত কয়েক শতাব্দী ধরিয়া আমরা সর্বসাধারণে মিলিয়া ধাপে ধাপে না উঠিয়া একেবারেই সন্ন্যাসীর ধর্মের, সর্বোচ্চ সাত্ত্বিকভাবের অনুসরণ করিতে চাহিয়াছিলাম অধিকারী–নধিকারী–নি সকলে মিলিয়া নিরামিষভোজী ও সন্ন্যাসীর মতো সম্পূর্ণ অহিংস না হইলে ধর্মের পথে, মনুষ্যত্ব–বিকাশের পথে অগ্রসর হইতে পারিব না, এই ধারণা বদ্ধমূল করিয়াছিলাম৷ আমাদের প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থ গীতায় আছে, শান্তির সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া যখন যুদ্ধ অনিবার্য হইল, তখন কুরুক্ষেত্র–যুদ্ধের প্রারম্ভে মহাবীর অর্জুন ‘যুদ্ধ করা অপেক্ষা, শিক্ষাগুরু আত্মীয় প্রভৃতির রক্তমাখা অন্ন গ্রহণ করা অপেক্ষা, ভিক্ষান্নে দিন যাপন করা বরং ভাল’, বলিয়া বাষ্পাকুল লোচনে শ্রীকৃষ্ণের দিকে চাহিয়াছিলেন দেশের জনগণের অভিভাবক রাজশক্তির অঙ্গ হইয়াও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য উপস্থিত কর্তব্য হইতে, তাঁহার পরিস্থিতি ও সময়োপযোগী ধর্ম হইতে, বিরত হইতে চাহিয়াছিলেন৷ শ্রীকৃষ্ণ যে তখন তাঁহাকে অনার্য বলিয়া, ক্লীবভাবাপন্ন বলিয়া তিরস্কার করিয়াছিলেন, অর্জুনের মনের এই ভাব যে উচ্চধর্মভাবপ্রসূত নয়, অনাসক্ত হইয়া করিতে পারিলে কোন কর্তব্য কর্মই যে ধর্মলাভের পথে বাধাস্বরূপ হয় না, তাহা বুঝাইয়া দিয়াছিলেন, সেকথা আমরা সহস্রবর্ষ ধরিয়া ভুলিয়া গিয়াছিলাম৷ ফলে আমাদের ধর্মজীবন তো অবনত হইয়াই ছিল, আমরা তেজবীর্যও হারাইয়াছিলাম৷ ‘‘সহস্র বৎসর ধরিয়া আমরা ক্ষাত্রবীর্যহীন, কর্মক্ষমতাহীন, মেরুদণ্ডহীন হইয়া পড়িয়াছি–মুসলমান, খ্রিস্টান যেই আসিয়াছে, সেই আমাদিগকে পদাঘাত করিয়াছে৷’’
স্বামীজী তাই বারে বারে বহুভাবে বলিলেন, আমাদের সর্বাগ্রে এই তামসিকতা, দুর্বলতা কাটাইয়া উঠিতে হইবে, তেজবীর্যবান হইতে হইবে ঃ ‘‘আমাদের দেশের পক্ষে এখন প্রয়োজন লৌহবৎ দৃঢ় মাংসপেশী ও স্নায়ুসম্পন্ন হওয়া–এমন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন হওয়া যে, কেহই যেন উহার প্রতিরোধে সমর্থ না হয় ...সমুদ্রের তলদেশে যাইতে হইলেও, মৃত্যুর সম্মুখীন হইতে হইলেও যেন উহা দমিত না হয়৷’’
‘‘আমি তোমাদের বলিতেছি, আমাদের চাই এক্ষণে বল, চাই এক্ষণে বীর্য৷’’ শুধু অন্নবস্ত্রের সংস্থান বা অন্যায়–উৎপীড়নের প্রতিকার প্রভৃতির জন্যই যে তেজবীর্যের প্রয়োজন, তাহা নহে ধর্মলাভ করিতে হইলেও শক্তির উদ্বোধন অনিবার্য–‘‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ৷’’ ‘‘তোমাদের প্রথমত সবল হইতে হইবে, ধর্ম পরে আসিবে৷ হে আমার বন্ধুগণ, তোমরা সবল হও–ইহাই তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ৷ গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের অধিকতর নিকটবর্তী হইবে৷ শরীর শক্ত হইলে তোমরা গীতা অপেক্ষাকৃত ভাল বুঝিবে৷ তোমাদের রক্ত একটু তাজা হইলে তোমরা শ্রীকৃষ্ণের মহতী প্রতিভা ও মহাবীর্য ভাল করিয়া বুঝিতে পারিবে৷’’ শারীরিক ও মানসিক সবলতা লাভই যে আমাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন, একথা হূদয়ে দৃঢ়মুদ্রিত করিয়া দিবার জন্য বলিয়াছেন, ‘‘জীবহত্যা পাপ, সন্দেহ নাই৷ ...মহারাজ অশোক দশ–বিশ লক্ষ জানোয়ারের প্রাণ বাঁচাইলেন বটে, কিন্তু হাজার বছরের দাসত্ব কি তদপেক্ষা আরও ভয়াবহ নহে? দু–দশটা ছাগলের প্রাণনাশ, বা আমার স্ত্রী–কন্যার মর্যাদা রাখিতে অক্ষমতা ও আমার বালক–বালিকার মুখের গ্রাস অপরের হাত হইতে রক্ষা করিবার অক্ষমতা, এ কয়েকটির মধ্যে কোন্টি অধিকতর পাপ?’’ ‘‘যদি জগতে কিছু পাপ থাকে, দুর্বলতাই সেই পাপ৷’’ ‘‘যে কোন কার্য শরীর–মনকে দুর্বল করে, তাহাই পাপ৷’’
মাতৃভূমির সেবকগণকে তিনি সর্ববিধ দুর্বলতার মোহজাল সিংহবিক্রমে ছিন্ন করিয়া পরিপূর্ণবলে বাহির হইয়া স্বদেশ–সেবায়, দেশবাসিগণকে অশিক্ষা, দারিদ্র্য, নিপীড়ন প্রভৃতি সর্ববিধ দুর্দশার, সর্ববিধ বন্ধনের কবল হইতে মুক্ত করিবার কাজে মনেপ্রাণে ব্রতী হইতে বলিলেন ঃ ‘‘আগামী পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া সেই পরমজননী মাতৃভূমিই যেন তোমাদের একমাত্র আরাধ্যা দেবী হন৷... তোমাদের চারিদিকে যাঁহারা রহিয়াছেন, তাঁহাদের পূজা করিতে হইবে৷... ইঁহারাই তোমার ঈশ্বর, তোমার স্বদেশবাসিগণই তোমার প্রথম উপাস্য৷... পরস্পরের প্রতি হিংসাদ্বেষ পরিত্যাগ করিয়া, পরস্পর বিবাদ না করিয়া প্রথমেই এই স্বদেশবাসিগণের পূজা করিতে হইবে৷’’
সকলকে নারায়ণ ভাবিয়া, পূজার ভাব লইয়া স্বদেশ সেবা করিতে বলিলেন স্বামীজী, আধ্যাত্মিকতাকে ভিত্তি করিয়া ক্ষাত্রবীর্যের উদ্বোধন করিতে বলিলেন৷ বলিলেন, ‘‘ক্ষাত্রবীর্য ও ব্রহ্মতেজের সমন্বয় চাই৷’’ আমাদের এখন ক্ষাত্রবীর্য প্রয়োজন, কর্মকুশলতা প্রয়োজন, পাশ্চাত্যের উন্নত জাতিগুলির নিকট হইতে বিজ্ঞান–শিল্পাদি জাগতিক বিদ্যা গ্রহণ করিয়া উহাতে পারদর্শী হওয়া প্রয়োজন৷ তবে প্রয়োজন বলিয়া পাশ্চাত্য–সভ্যতার এই দিকটি গ্রহণ করিতে যাইয়া আমরা যেন তাহার জড়বাদকে, ভোগসর্বস্বতাকেও গ্রহণ না করিয়া বসি আমরা যেন জাতির বৈশিষ্ট্য ব্রহ্মতেজকে, সহজাত দেবভাবগুলিকে হারাইয়া না ফেলি৷ শক্তির বিকাশ ঘটিলে আমরা যেন মহাশক্তিশালী স্বার্থপর অসুরতুল্য না হইয়া যাই শ্রীরামচন্দ্রের মতো, শ্রীকৃষ্ণের মতো, অর্জুনের মতো, রামদাস মহাবীরের মতো, মহাশক্তিমান দেবতার মতো হইতে পারি৷ সেজন্য স্বামীজী বারে বারে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন যে ধর্মকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া এসব করিতে হইবে, ধর্মকে বাদ দিয়া নহে৷ তাছাড়া ধর্মই ভারতবাসীর সর্ববিধ উন্নতিলাভের প্রেরণার মূল উৎস বলিয়া ধর্ম অবলম্বন করিয়া এসব করিলে সহজে সফলতা আসিবে রাজনীতি সমাজনীতি প্রভৃতি যে কোন বিষয়ে ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করিবার ইহাই স্বল্পতম বাধার পথ৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘সকল জাতিরই এক একটি আদর্শ আছে, তাহাই সেই জাতির মেরুদণ্ডস্বরূপ৷ ...আমাদের মাতৃভূমির জাতীয় জীবনের মূলভিত্তি ধর্ম–একমাত্র ধর্ম৷... ভালই হউক মন্দই হউক সহস্র সহস্র বৎসর ধরিয়া ভারতে ধর্মই জীবনের চরমাদর্শরূপে পরিগণিত হইয়াছে৷ ...এক্ষণে উহা আমাদের প্রকৃতিগত হইয়া পড়িয়াছে, আমাদের জীবনীশক্তিরূপে দাঁড়াইয়াছে৷... ধর্মই ভারতের পক্ষে স্বল্পতম বাধার পথ৷ এই ধর্মপথের অনুসরণ করাই ভারতের জীবন, ভারতের উন্নতি ও ভারতের কল্যাণের একমাত্র উপায়৷’’ ‘‘ভারতকে সামাজিক বা রাজনৈতিক ভাবের বন্যায় ভাসাইতে গেলে প্রথমে এদেশকে আধ্যাত্মিক ভাবের বন্যায় ভাসাইতে হইবে৷’’ ‘‘স্বার্থত্যাগ ও সেবা–ই আমাদের জাতীয় আদর্শ৷ এই আদর্শ অনুযায়ী ভারতের সাধনা তীব্রতর করিয়া চল, তাহা হইলেই বাকি যাহা কিছু আপনা হইতে আসিবে৷’’
তবে ধর্ম বলিতে স্বামীজী ধর্মের মূল ভাবগুলির, অমিত–শক্তিপ্রদ কল্যাণময় ভাবগুলির কথাই বলিয়াছেন প্রাণহীন আচার–নুষ্ঠান বা
কুসংস্কারকে আঁকড়াইয়া থাকিবার কথা বলেন নাই৷ বলিয়াছেন, ‘‘আমরা শত শত বৎসর ধরিয়া বিবাদ করিতেছি, তিলকধারণ এইভাবে করিতে হইবে, কি ঐভাবে অমুক ব্যক্তিকে দেখিলে আমার খাওয়া নষ্ট হইবে কিনা৷ ...আমাদের লজ্জাও হয় না হ্যাঁ, কখনও কখনও হয় বটে, কিন্তু আমরা যাহা ভাবি তাহা করিতে পারি না৷’’ ‘‘তীর্থ বা মন্দিরাদিতে গেলে, তিলক ধারণ করিলে অথবা বস্ত্রবিশেষ পরিধান করিলেই ধর্ম হয় না৷ যতদিন পর্যন্ত না তোমার হূদয় খুলিতেছে, যতদিন পর্যন্ত না ভগবানকে উপলব্ধি করিতেছ, ততদিন সব বৃথা৷ হূদয় যদি রাঙিয়া উঠে, তবে আর বাহিরে রঙ–এর আবশ্যক করে না৷... বাহিরের রঙ–আড়ম্বরাদি অনেক সময় শুধু অনুষ্ঠানমাত্রে পর্যবসিত হয় তখন সেগুলি ধর্মজীবনে সাহায্য না করিয়া বরং বিঘ্ণ সৃষ্টি করে৷ ...আত্মার মধ্যে প্রথম হইতেই মহিমা, তেজ ও পবিত্রতা রহিয়াছে৷ যত শীঘ্র উহাতে বিশ্বাস আসে ততই তোমাদের কল্যাণ৷ সব শক্তি তোমাদের ভিতরে রহিয়াছে, তোমরা সব করিতে পার৷ ভাবিও না তোমরা দুর্বল৷... উঠিয়া দাঁড়াও এবং তোমাদের ভিতর যে অধীশ্বরত্ব রহিয়াছে, তাহাকে প্রকাশ কর৷’’ ‘‘অন্তর্নিহিত দেবত্বের বিকাশের নামই ধর্ম৷’’ মতবাদ, অনুষ্ঠান–পদ্ধতি, শাস্ত্র, মন্দির প্রভৃতি এই দেবত্ব–বিকাশের সহায়ক মাত্র৷
স্বামীজী বলিয়াছেন, বেদান্তে বিশ্বাস ও বেদান্তের আলোচনাই আমাদের আত্মবিশ্বাস জাগাইবার ও অন্তরে প্রচ্ছন্ন শক্তির বিকাশের বিশেষ সহায়ক৷ বলিয়াছেন, ‘‘বীর্যলাভের প্রধান উপায়... উপনিষদে বিশ্বাসী হওয়া ও বিশ্বাস করা যে ‘আমি আত্মা, তরবারি আমায় ছেদন করিতে পারে না... আমি সর্বশক্তিমান, আমি সর্বজ্ঞ’৷’’ ‘‘নচিকেতার মতো বিশ্বাসী হও... তোমাদের প্রত্যেকের ভিতর সেই শ্রদ্ধা আবির্ভূত হউক৷’’ ‘‘আপনার উপর বিশ্বাস, ঈশ্বরে বিশ্বাস, ইহাই উন্নতিলাভের একমাত্র উপায়৷ যদি তোমাদের পুরাতন তেত্রিশ কোটি দেবতার এবং বৈদেশিকেরা মধ্যে মধ্যে যে সকল দেবতার আমদানি করিয়াছে তাহার সকলগুলিতেই বিশ্বাস থাকে, অথচ যদি তোমার আত্মবিশ্বাস না থাকে, তবে তোমার কখনই মুক্তি হইবে না৷... সেই বিশ্বাসবলে নিজের পায়ের উপর দাঁড়াও... নিজের উপর বিশ্বাস রাখ, যেমন বাল্যাবস্থায় আমার ছিল৷... বিশ্বাস কর যে অনন্তশক্তি আমাদের আত্মার মধ্যে বর্তমান৷ তোমরা সমগ্র ভারতকে পুনরুজ্জীবিত করিবে৷’’
‘‘তুমি যে কর্মই কর না কেন, তোমার জন্য বেদান্তের প্রয়োজন৷ বেদান্তের এই সকল মহান তত্ত্ব অরণ্যে বা গিরিগুহায় আবদ্ধ থাকিবে না বিচারালয়ে, ভজনালয়ে, দরিদ্রের কুটিরে, মৎস্যজীবীর গৃহে, ছাত্রের অধ্যয়নাগারে, সর্বত্র এই সকল তত্ত্ব আলোচিত ও কার্যে পরিণত হইবে৷ প্রত্যেক নরনারী, প্রত্যেক বালকবালিকা, যে যে কার্য করুক না কেন, যে যে অবস্থায় থাকুক না কেন, সর্বত্র বেদান্তের প্রভাব বিস্তৃত হওয়া আবশ্যক৷ অতি অল্প কর্মও যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হইলে অদ্ভুত ফললাভ হয় অতএব যে যতটুকু পারে করুক৷ মৎস্যজীবী যদি আপনাকে আত্মা বলিয়া চিন্তা করে, তবে সে একজন ভাল মৎস্যজীবী হইবে বিদ্যার্থী যদি আপনাকে আত্মা বলিয়া চিন্তা করে, তবে সে একজন শ্রেষ্ঠ বিদ্যার্থী হইবে৷’’
এভাবে চারিদিকে প্রেরণার আগুন ছড়াইয়া স্বামীজী মাদ্রাজ হইতে জাহাজে করিয়া কলকাতা যাত্রা করিলেন৷ অভ্যর্থনা–সমিতির ব্যবস্থামতো বজবজে আসিয়া জাহাজ ভিড়িল৷ সেখান হইতে একটি ‘স্পেশাল ট্রেন’– যোগে... ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি শিয়ালদহ স্টেশনে আসিয়া পৌঁছিলেন৷ বিপুল জনতা তাঁহার অভ্যর্থনার জন্য উদ্গ্রীব হইয়া অপেক্ষা করিতেছিল৷ এই কলকাতা স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভূমি এই কলকাতা তাঁহার বাল্য ও যৌবনের কত স্মৃতি বুকে ধরিয়া আছে৷ আজ স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করিয়া এই বিজয়ী বীর আবার সেখানে ফিরিয়া আসিয়াছেন৷ কাজেই তাঁহার সংবর্ধনায় কলকাতাবাসীর উৎসাহের বিপুলতা সহজেই অনুমেয়৷ গাড়ি থামিলেই স্বামীজী দরজায় দাঁড়াইয়া সমবেত জনতাকে করজোড়ে প্রণাম করিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ও বিবেকানন্দের জয়ধ্বনিতে স্টেশন–প্রাঙ্গণ মুখরিত হইয়া উঠিল৷ স্বামীজী গাড়িতে উঠিলে ঘোড়া খুলিয়া দিয়া উৎসাহী যুবকেরাই গাড়ি টানিয়া চলিল–তাঁহার নিষেধ শুনিল না৷ স্টেশন হইতে রিপন কলেজ পর্যন্ত রাস্তা তোরণ–পুষ্প–পতাকায়্ সুশোভিত করা হইয়াছিল৷ রিপন কলেজে নামিয়া অল্প কিছুক্ষণ থাকিবার পর স্বামীজী বাগবাজারে পশুপতিনাথ বসুর ভবনে আসিয়া পৌঁছিলেন৷ এখানেই বিশ্রামাদি করিয়া পরে আলমবাজার মঠে গিয়া উঠিলেন৷ গুরুভ্রাতাদের লইয়া তিনি বরাহনগরে যে মঠ গড়িয়া গিয়াছিলেন, উহা তখন আলমবাজারে স্থানান্তরিত হইয়াছে৷
প্রায় এক সপ্তাহ পরে রাধাকান্ত দেবের বাটীর প্রাঙ্গণে স্বামীজীর অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়৷ সভাপতি বিনয়কৃষ্ণ দেব অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন৷ পাশ্চাত্যে স্বামীজীর প্রচারের ফলে ভারতের মুখোজ্জ্বল হইয়াছে, তাঁহার স্বদেশ তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে প্রভৃতি বলিবার পর অভিনন্দনপত্রে বলা হয়, ‘‘আপনার পরম পূজ্যপাদ গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পুণ্য স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন আমাদের অবশ্য–কর্তব্য৷ আমরা যে আপনাকে পাইয়াছি, তাহার জন্যও আমরা তাঁহার নিকট ঋণী৷ আপনার ভিতর যে স্বর্গীয় বহ্ণি–স্ফুলিঙ্গ ছিল, অপূর্ব দৈবশক্তিবলে তিনি তাহা পূর্বেই আবিষ্কার করেন এবং আপনার জীবন সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেন৷ সুখের বিষয় তাহা এক্ষণে সফল হইতে চলিয়াছে৷’’
অভিনন্দনের উত্তরে স্বামীজী বলেন, ‘‘আমি আপনাদের নিকট সন্ন্যাসিরূপে উপস্থিত হই নাই, কিন্তু পূর্বের সেই কলকাতাবাসী বালকরূপে আলাপ করিতে আসিয়াছি৷ ভ্রাতৃগণ আমার ইচ্ছা হয় এই নগরীর রাজপথের ধূলির উপর বসিয়া বালকের ন্যায় সরল প্রাণে আপনাদের কাছে মনের সব কথা খুলিয়া বলি৷’’
‘‘আপনারা আমার হূদয়ের আর এক তন্ত্রীতে–গভীরতম তন্ত্রীতে আঘাত করিয়াছেন–আমার গুরুদেব, আমার আচার্য, আমার জীবনের আদর্শ,
আমার ইষ্ট, প্রাণের দেবতা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নাম গ্রহণ করিয়া৷ যদি কায়মনোবাক্যদ্বারা আমি কোন সৎকার্য করিয়া থাকি, যদি আমার মুখ দিয়া এমন কোন কথা বাহির হইয়া থাকে যাহাতে জগতে কোন ব্যক্তি বিন্দুমাত্র উপকৃত হইয়াছে, তাহাতে আমার কোন গৌরব নাই, তাহা তাঁহার৷... দেখিতেছেন না, দরিদ্র ব্রাহ্মণ পিতামাতার সুদূর–গ্রামজাত এই সন্তান এক্ষণে সেই সকল দেশে সত্য সত্যই পূজিত হইতেছেন, যেসব দেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া সাকার উপাসনার বিরুদ্ধে চিৎকার করিয়া আসিতেছে৷ ইহা কাহার শক্তি? ভারতবর্ষের পুনরুত্থানের জন্য এই শক্তির বিকাশ যথাসময়েই হইয়াছে৷... কয়েক শতাব্দী যাবৎ ভারতে এরূপ মহাশক্তির বিকাশ আর কখনও হয় নাই৷ জগতের কোন দেশে সার্বভৌম ধর্ম এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃভাবের কথা উত্থাপন ও আন্দোলন হইবার বহু পূর্বেই এই নগরীর সন্নিকটে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যাঁহার সমগ্র জীবনটিই একটি ধর্মমহাসভাস্বরূপ ছিল৷ আমি আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি, সেই রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আমাদের জাতির কল্যাণের জন্য, আমাদের দেশের উন্নতির জন্য, সমগ্র মানবজাতির হিতের জন্য আপনাদের হূদয় খুলিয়া দিন... যে মহাযুগান্তর অবশ্যম্ভাবী, তাহার সহায়তার জন্য আপনাদিগকে অকপট ও দৃঢ়তর করুন৷’’
স্বামীজী দেশের সংহতির সূত্র দেখাইয়া দিলেন–আমাদের গৃহবিবাদ আছে, কিন্তু উহা থামাইবার কোন বৈদেশিক নীতি নাই৷ জগতের জাতিগুলির মধ্যে আমাদের শাস্ত্রে সত্যপ্রচারই আমাদের সনাতন বৈদেশিক নীতি হউক৷ ইহা যে আমাদিগকে এক অখণ্ড জাতিরূপে মিলিত করিবে, তাহার কি আর প্রমাণান্তর চান?’’
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মতো স্বামীজীও যুবকদের নিকট হইতে অনেক কিছু প্রত্যাশা করিতেন৷ যৌবনে মনের সমস্ত শক্তি সতেজ থাকে, মন নমনীয় থাকে৷ আন্তরিক হইয়া চেষ্টা করিলে এ সময় পূর্বগঠন ভাঙিয়া মনকে যেমন খুশি নূতন ভাবে গড়িয়া তোলা সহজ হয়৷ কোন উচ্চভাব গ্রহণ করিয়া জীবনে স্থায়িভাবে তাহা ধরিয়া রাখিবার ইহাই উপযুক্ত সময়৷ মাদ্রাজ ও কলকাতাকে কেন্দ্র করিয়া ভারতে স্বামীজীর কার্যারম্ভ হয়৷ মাদ্রাজে যুবকদের তিনি বলিয়াছেন, ‘‘আমি চাই কয়েকটি যুবক৷ বেদ বলিয়াছেন, আশিষ্ঠ, বলিষ্ঠ, দ্রঢ়িষ্ঠ, মেধাবী যুবকগণই ঈশ্বরলাভ করিবে৷ এই–ই সময় তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনগতি স্থির করিবার–যতদিন যৌবনের তেজ রহিয়াছে, যতদিন না তোমরা কর্মশ্রান্ত হইতেছ, যতদিন তোমাদের ভিতর যৌবনের নবীনতা ও সতেজ ভাব রহিয়াছে কাজে লাগো, এই–ই সময়৷ কারণ নবপ্রস্ফুটিত, অস্পৃষ্ট, অনাঘ্রাত পুষ্পই কেবল প্রভুর পাদপদ্মে অর্পণের যোগ্য–তিনি উহা গ্রহণ করেন৷ ...তোমাদের জাতির কল্যাণের জন্য, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য, আত্মবলিদানই শ্রেষ্ঠ কর্ম৷’’ কলকাতার যুবকগণকে বলিলেন, ‘‘যুবকগণ, ওঠো, জাগো, শুভ মুহূর্ত সমাগত৷ ...সাহস অবলম্বন কর, ভয় পাইও না৷ নির্ভীক হইতে হইবে, তবেই আমরা কার্যে সফলতা লাভ করিব৷ ...ওঠো, জাগো, কারণ তোমাদের মাতৃভূমি মহাবলি প্রার্থনা করিতেছেন৷ যুবকগণের দ্বারা এই কার্য সাধিত হইবে৷... হূদয়ে উৎসাহাগ্ণি জ্বালিয়া জাগরিত হও’’
‘‘ভাবিও না তোমরা দরিদ্র৷ ...কে কোথায় দেখিয়াছ টাকায় মানুষ করিয়াছে? মানুষেই চিরকাল টাকা করিয়া থাকে৷ জগতে যাহা কিছু উন্নতি, সব মানুষের শক্তিতে হইয়াছে, বিশ্বাসের শক্তিতে হইয়াছে৷’’
‘‘শ্রদ্ধার তারতম্যেই কেহ বড় হয়, কেহ ছোট হয়৷ ...এই শ্রদ্ধা তোমাদের ভিতর প্রবেশ করুক৷ পাশ্চাত্য জাতি জড়জগতে যে আধিপত্য লাভ করিয়াছে, তাহা এই শ্রদ্ধার ফলে৷ তাহারা তাহাদের শারীরিক বলে বিশ্বাসী৷ আর তোমরা যদি তোমাদের আত্মায় বিশ্বাসসম্পন্ন হও, তাহা হইলে তাহার ফল আরও অদ্ভুত হইবে৷’’
‘‘আমাদের জাতীয় জীবনের শরীরে এক ভয়ানক রোগের বীজ প্রবেশ করিতেছে–সবকিছু হাসিয়া উড়াইয়া দেওয়া–গাম্ভীর্যের অভাব–এই দোষ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করিতে হইবে৷ বীর হও, শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও–আর যাহা কিছু অবশ্যই আসিবে৷’’
‘‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে বাঙলার যুবকগণের মধ্যেই সেই শক্তি প্রকাশ পাইবে, যাহা ভারতকে তাহার উপযুক্ত আধ্যাত্মিক অধিকারে পুনঃ–প্রতিষ্ঠা করিবে৷... কিছুতেই ভয় পাইও না৷ যে মুহূর্তে তোমার মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হইবে, সেই মুহূর্তেই তুমি শক্তিহীন৷ ভয়ই জগতের সমুদয় দুঃখের মূল কারণ, ভয়ই সবচেয়ে বড় কুসংস্কার৷’’
সমাজ–সংস্কার, শিক্ষার প্রসার প্রভৃতির মাধ্যমে দেশবাসীর সেবা কিভাবে করিতে হইবে, সে সম্বন্ধে স্বামীজী বহু কথা বলিয়াছেন৷ বলিয়াছেন, যথার্থ দেশসেবক হইতে হইলে প্রথমত দেশবাসীকে মনেপ্রাণে ভালবাসা চাই৷ দ্বিতীয়ত গভীরভাবে চিন্তা করিয়া তাহাদের দুঃখমোচনের জন্য কার্যকরী কোন পন্থা নির্ণয় করা চাই৷ শুধু দোষ দেখাইয়া বা গালি দিয়া কোন ফল নাই৷ ‘‘দোষ সকল সমাজেই আছে৷ সকলেই তাহা জানে৷ আজকালকার ছোট ছেলে পর্যন্ত তাহা জানে৷ সে মঞ্চে দাঁড়াইয়া হিন্দুসমাজের গুরুতর দোষগুলি সম্বন্ধে আমাদের রীতিমত বত্তৃণতা শুনাইয়া দিতে পারে৷ উহাতে লাভ কি? তিনিই মানবজাতির যথার্থ বন্ধু, যিনি এই সমস্যা হইতে উত্তীর্ণ হইবার পথ দেখাইয়া দিতে পারেন৷’’ তৃতীয়ত, নিজের দিকে একেবারে না তাকাইয়া ঐ কার্যসাধনের জন্য মনেপ্রাণে ব্রতী হওয়া চাই৷ তাহা হইলে সেবা সফল হইবেই৷ স্বামীজী নিজ জীবনে এই দেশসেবার আদর্শ দেখাইয়া গিয়াছেন৷ দেশবাসীর প্রতি তাঁহার ভালবাসার পরিমাপ করা যায় না৷ পাশ্চাত্য দেশ হইতে ভারতে ফিরিয়া আসিয়া তিনি বলিয়াছেন, ‘‘যদি এই জাতীয় অর্ণবপোতে–আমাদের এই সমাজে–ছিদ্র হইয়া থাকে, আমরা তো এই সমাজেরই সন্তান, আমাদিগকেই উহা বন্ধ করিতে হইবে৷ আমি তোমাদের নিকট আমার সমুদয় উদ্দেশ্য বলিতে আসিয়াছি৷ যদি তোমরা শুন, আমি তোমাদের সহিত কার্য করিতে প্রস্তুত৷ যদি না শুন, এমনকি আমাকে পদাঘাত করিয়া ভারতভূমি হইতে তাড়াইয়া দাও, তথাপি আমি তোমাদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিব–আমরা ডুবিতেছি৷... যদি ডুবিতে হয়, তবে আমরা যেন সকলে একসঙ্গে ডুবি, কিন্তু কাহারও প্রতি যেন কটূক্তি প্রয়োগ না করি৷’’ স্বামীজীর সংস্কারপ্রণালী ধ্বংসাত্মক নয়–‘‘আমার প্রণালী সংগঠন৷’’
সমাজ–সংস্কার সম্বন্ধে স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘সামাজিক ব্যাধির প্রতিকার বাহিরের চেষ্টা দ্বারা হইবে না, মনের উপর কার্য করিবার চেষ্টা করিতে হইবে৷’’ কিভাবে চলিলে কল্যাণ হইবে, সে ধারণা লোকের মনে আনিয়া দিতে হইবে৷ তাহা হইলেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া সে নিজ কল্যাণসাধনে ব্রতী হইবে৷ ‘‘সমাজের পুষ্টির জন্য যাহা আবশ্যক, তাহা উহাকে দিয়া যাও সে আপনার প্রকৃতি অনুযায়ী আপনার দেহ গঠন করিয়া লইবে৷’’ ‘‘মূলদেশে অগ্ণিসংযোগ কর, অগ্ণি ক্রমশ ঊর্ধ্বদেশে উঠিতে থাকুক, একটি অখণ্ড ভারতীয় জাতি গঠন করুক৷’’
জোর করিয়া কাহারও উপর কোন সংস্কার চাপাইয়া দিবার পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি মোটেই৷ বিধবাবিবাহ–প্রবর্ত্ উচিত কিনা, সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হইয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘আমি কি বিধবা যে আমাকে এই বাজে প্রশ্ণ করিতেছ? তুমি কে হে, গায়ে পড়িয়া নারীজাতির সমস্যা সমাধানে আগুয়ান হইয়াছ? তুমি প্রত্যেক বিধবা ও প্রত্যেক রমণীর ভাগ্যবিধাতা সাক্ষাৎ ভগবান নাকি? তফাত উহারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করিবে৷’’
ধর্মের সনাতন সত্যগুলির পরিবর্তন হয় না, কিন্তু সমাজ–প্রথা প্রয়োজন মতো যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়৷ আমাদের সমাজকেও যুগোপযোগী করিয়া গড়িতে হইবে৷ পাশ্চাত্য সমাজের সদ্গুণগুলি গ্রহণ করিয়া নিজেদের ভাবে সেগুলিকে সমাজে ঢুকাইতে হইবে৷ ‘‘আমি চাই গোঁড়ার নিষ্ঠা ও তাঁর সঙ্গে জড়বাদীর উদার ভাবের সমন্বয়৷’’ ‘‘হূদয় সমুদ্রের মতো গভীর ও আকাশের মতো প্রশস্ত হওয়া চাই৷ জগতের সর্বাপেক্ষা উন্নতিশীল জাতিগুলির মতো আমাদের উন্নত হইতে হইবে, আবার সেই সঙ্গে আবহমানকাল হইতে সঞ্চিত সংস্কারগুলির প্রতি শ্রদ্ধাবান হইতে হইবে৷’’
সমাজের বিবিধ বৈষম্য–জনিত সমস্যাগুলির সমাধান সম্বন্ধে স্বামীজী বলিয়াছেন যে যাঁহারা উন্নত, তাঁহারা যেন অবনতদের উপরে তুলিবার জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধি ও ধনসম্পদ নিয়োজিত করেন৷ জাতিভেদ প্রথা, আর্থিক বৈষম্য প্রভৃতি সর্ব বিষয়ে সমস্যা সমাধানে স্বামীজীর ইহাই নির্দেশ৷ অনুন্নতদের উন্নত করিয়া সাম্য আনিতে হইবে, উন্নতদের অবনত করিয়া নহে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন যে একচেটিয়া অধিকারের দিন গিয়াছে, সকলের জন্য সমান ভোগ, সমান অধিকারের ব্যবস্থা করিতে হইবে৷ শিক্ষিত ব্যক্তিগণ তাঁহাদের শিক্ষা এবং ধনিগণ তাঁহাদের ধনসম্পদ যতশীঘ্র অনুন্নতদের সেবায় নিয়োজিত করেন, ততই মঙ্গল৷ স্বেচ্ছায় এরূপ করিলে জনগণ যখন জাগিবে, তখন তাঁহাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিবে৷ নতুবা, ‘‘মারামারি লাঠালাঠি করে সব ধ্বংস হয়ে যাবি এইMass (জনসাধারণ) যখন জেগে উঠবে, তাদের ওপর তোদের অত্যাচার বুঝতে পারবে, তখন তাদের ফুৎকারে তোরা (ভদ্রলোকেরা) কোথায় উড়ে যাবি তারাই তোদের ভেতরে সভ্যতা এনে দিয়েছে, তারাই আবার তখন সব ভেঙে দেবে৷ ...এইজন্য বলি, ‘এই সব নীচ জাতদের ভেতর বিদ্যাদান, জ্ঞানদান করে এদের ঘুম ভাঙাতে যত্নশীল হ’৷ এরা যখন জাগবে–আর একদিন জাগবে নিশ্চয়ই–তখন তারাও তোদের কৃত উপকার বিস্মৃত হবে না, তোদের ওপর কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে৷’’ অনুন্নতদের বলিয়াছেন যে শুধু উচ্চশ্রেণির লোকেদের দোষ দিলেই চলিবে না, উন্নতির জন্য নিজেদেরও চেষ্টা করিতে হইবে৷ শুধু দাবি করিলেই চলে না, নিজেদের কর্তব্যবোধকেও সজাগ রাখিতে হয়৷
জাতিভেদপ্রথা সম্বন্ধে বলিয়াছেন, ‘‘লোকে আপনাদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ করিবেই ইহা অতিক্রম করিবার উপায় নাই৷’’ ‘‘জাতিবিভাগ স্বাভাবিক নিয়ম৷’’ সমাজ জীবনের বিভিন্ন কর্তব্যগুলি বিভিন্ন শ্রেণির লোককে করিতেই হইবে৷ ‘‘কিন্তু তাহার অর্থ এই নয় যে অধিকার–তারতম্যগুলিও থাকিবে এগুলিকে সমূলে বিনাশ করিতে হইবে৷’’ ‘‘তুমি না হয় একটা দেশ শাসন করিতে পার, আমি এক জোড়া ছেঁড়া জুতা সারাইতে পারি৷ কিন্তু তাই বলিয়া তুমি আমা অপেক্ষা বড় হইতে পার না৷... আমি জুতা সেলাই করিতে পটু, তুমি বেদপাঠে পটু৷ তাই বলিয়া তুমি আমার মাথায় পা দিতে পার না তুমি খুন করিলে তোমার প্রশংসা করিতে হইবে, আর আমি একটা আম চুরি করিলে আমায় ফাঁসি দিতে হইবে, এরূপ হইতে পারে না৷’’
স্বামীজী বলিয়াছেন, স্ত্রী–পুরুষ উভয়ের মধ্যেই ব্যাপকভাবে শিক্ষার প্রসার সর্ববিধ উন্নতির ও সর্ববিধ সমস্যা–সমাধানের প্রশস্ততম উপায়৷ ‘‘ভারতে এমন কোন সমস্যা নাই, শিক্ষার যাদুকাটির স্পর্শে যাহার সমাধান হয় না৷’’ দেশবাসীরা খাঁটি মানুষ হইয়া উঠুক, নিজেদের ভালমন্দ নিজেরা বুঝিতে শিখুক যাহা ভাল বলিয়া বুঝিবে, তাহা জীবনে রূপায়িত করিবার মতো যথেষ্ট মানসিক শক্তিসম্পন্ন হইয়া উঠুক তাহা হইলেই দেশের যথার্থ কল্যাণ সাধিত হইবে৷ ‘‘প্রত্যক্ষ দেখিতেছি, যে জাতির মধ্যে জনসাধারণের ভিতর বিদ্যা–বুদ্ধির যত বেশি প্রসার, সে জাতি তত বেশি উন্নত৷’’ সর্বসাধারণের মধ্যে শিক্ষার অভাবেই বিগত কয়েক শতাব্দী যাবৎ ভারতের এই দুর্দশা৷ ‘‘মুসলমান কয়জন সিপাহি আনিয়াছিল? ইংরেজ কয়জন আছে? ছ–টাকার জন্য নিজের বাপ–ভাই–এর গলা কাটিতে পারে, এমন লক্ষ লক্ষ লোক ভারত ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যায়?’’ ‘‘ইওরোপের বহু নগর পর্যটন করিয়া তাহাদের দরিদ্রদের সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য ও বিদ্যা দেখিয়া আমাদের গরিবদের কথা ভাবিয়া অশ্রু বিসর্জন করিতাম৷ কেন এ পার্থক্য হইল–উত্তর পাইলাম, শিক্ষা৷’’
পুরুষদের মতো স্ত্রীলোকদের ভিতরও শিক্ষার প্রসারের কথা স্বামীজী বারে বারে বলিয়াছেন৷ ‘‘এক পক্ষে পক্ষী উড়িতে পারে না৷’’ ‘‘সাধারণের মধ্যে আর মেয়েদের ভেতর শিক্ষাবিস্তার না হলে কিছু হবার জো নাই৷’’ ‘‘যাদের মা শিক্ষিতা ও নীতিপরায়ণা হন, তাদের ঘরেই মহৎ লোক জন্মায়৷ ...মেয়েদের আগে তুলতে হবে, আপামর–সাধারণকে জাগাতে হবে, তবে তো দেশের কল্যাণ’’ ‘‘জননীগণ উন্নত হইলে তাঁহাদের কৃতী সন্তানবর্গের মহৎ কীর্তি দেশের মুখ উজ্জ্বল করিতে পারিবে এবং তখনই ঘটিবে দেশে সংস্কৃতি, পরাক্রম, জ্ঞান ও ভক্তির পুনরুজ্জীবন৷’’ ‘‘যথার্থ সুশিক্ষা পাইলে আমাদের মেয়েরা জগতের আদর্শ নারী হইয়া উঠিতে পারিবে৷’’
এদেশের স্ত্রীলোকদের জাগাইবার জন্য ভগিনী নিবেদিতাকে স্বামীজী বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন৷ পদধূলি দিয়া আশিস–ধন্য করিবার জন্য যেদিন তিনি বেলুড় মঠের জমিতে জননী সারদাদেবীকে লইয়া গিয়াছিলেন, তাহার পরদিনই একই উদ্দেশ্যে তাঁহাকে লইয়া যান বাগবাজারে ভগিনী নিবেদিতার বালিকা–বিদ্যালয় ভবনে৷ কলকাতায় দু–একটি ছাড়া মেয়েদের জন্য কোন বিদ্যালয়ই তখন ছিল না৷ ভগিনী নিবেদিতা বাড়িতে বাড়িতে যাইয়া অনেক বুঝাইয়া তবে বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংগ্রহ করিতে পারিতেন৷
স্ত্রী–পুরুষ–নির্বিশেষ্ শিক্ষাপ্রসঙ্গে স্বামীজী বলিয়াছেন যে ধর্মকে বাদ দিলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না৷ তবে ধর্ম বলিতে ‘অন্তর্নিহিত দেবত্বের বিকাশ’–এর কথাই বলিয়াছেন তিনি ঃ ‘‘উপায় শিক্ষার প্রচার৷ প্রথম আত্মবিদ্যা–ঐকথা বললেই যে জটাজূট, দণ্ড, কমণ্ডলু ও গিরিগুহা মনে আসে, আমার বক্তব্য তা নয়৷ তবে কি? যে জ্ঞানে ভববন্ধন হতে মুক্তি পর্যন্ত পাওয়া যায়, তাতে আর সামান্য বৈষয়িক উন্নতি হয় না? অবশ্যই হয়৷ মুক্তি, বৈরাগ্য, ত্যাগ এসকল তো মহাশ্রেষ্ঠ আদর্শ কিন্তু ‘স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ’৷ এই আত্মবিদ্যার সামান্য অনুষ্ঠানেও মানুষ মহাভয়ের হাত হইতে বাঁচিয়া যায়৷ মানুষের অন্তরে যে শক্তি রহিয়াছে, তাহা উদ্বুদ্ধ হইলে মানুষ অন্নবস্ত্রের
সংস্থান হইতে আরম্ভ করিয়া সব কিছুই অনায়াসে করিতে পারে৷’’ ‘‘এই শক্তির উদ্বোধন করিতে হইবে দ্বারে দ্বারে যাইয়া৷ দ্বিতীয়ত সেই সঙ্গে
বিদ্যাশিক্ষা দিতে হইবে৷’’
বুদ্ধিতে যাহা গ্রহণ করিলাম, জীবনে তাহা কাজে লাগাইবার নামই শিক্ষা ঃ ‘‘মাথায় কতকগুলি ভাব ঢুকাইয়া সারাজীবন হজম হইল না, অসম্বদ্ধভাবে মাথায় ঘুরিতে লাগিল, ইহাকে শিক্ষা বলে না৷... বিভিন্ন ভাবগুলিকে এমনভাবে হজম করিয়া লইতে হইবে, যাহাতে আমাদের জীবন গঠিত হয়, যাহাতে মানুষ তৈয়ারি হয়, চরিত্র গঠিত হয়৷ যদি তোমরা পাঁচটি ভাব হজম করিয়া জীবন ও চরিত্র গঠন করিতে পার, তবে যে ব্যক্তি একখানা গোটা লাইব্রেরি মুখস্থ করিয়াছে, তাহার অপেক্ষাও তোমার অধিক শিক্ষা হইয়াছে বলিতে হইবে৷’’ ‘‘সকল শিক্ষা–প্রণালীর লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষ তৈয়ারি করা৷’’ ‘‘যাহা জনসাধারণকে জীবনসংগ্রামের উপকরণ জোগাইতে সহায়তা করে না, তাহাদের মধ্যে চরিত্রবল, লোকহিতৈষণা এবং সিংহের মতো সাহস উদ্বুদ্ধ করিতে সহায়তা করে না, তাহা কি শিক্ষা নামের যোগ্য?’’
স্বামীজী বলিয়াছেন, শিক্ষাকে সফল করিবার জন্য কয়েকটি গুণ বিশেষ সহায়ক, সে বিষয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই সজাগ থাকা একান্ত প্রয়োজন–শ্রদ্ধা বা আত্মবিশ্বাস, একাগ্রতা ও ইচ্ছাশক্তির বর্ধন এবং ব্রহ্মচর্যনিষ্ঠা৷
শ্রদ্ধার কথা পূর্বেও বলা হইয়াছে৷ ‘‘মানুষে মানুষে শক্তির তারতম্য নির্ভর করে তাহার শ্রদ্ধার তারতম্যের উপরই৷... যেদিন ভারতবাসী এই আত্মশ্রদ্ধা হারাইয়াছে, সেইদিন হইতে শুরু হইয়াছে ভারতের জাতীয় জীবনে অবনতির পালা৷ তাই, ব্যষ্টির জ্বলন্ত আত্মবিশ্বাসের উপর যে জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে, এই সুমহান, প্রাণপ্রদ, চমৎকার তত্ত্বটি তোমাদের সন্তানসন্ততিকে আশৈশব শিখাইতে হইবে৷’’ নিজের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিলে যেমন হূদয়ে মহাতেজের বিকাশ হয়, অপরের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনেও তেমনি তাহার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়া উঠে, প্রাণোচ্ছল হইয়া, মহাবীর্যবান হইয়া সে মাথা তুলিয়া দাঁড়ায়৷ সেজন্য ‘ইহার দ্বারা কিছু হইবে না’, ‘ও একেবারে অপদার্থ’–এই জাতীয় কথাগুলি উচ্চারণও করিতে নাই সশ্রদ্ধভাবে অপরকে নিজশক্তিতে বিশ্বাসী হইতে বলিতে হয়, মানুষ যে ইচ্ছা করিলে সবকিছুই করিতে পারে, এই সত্যটি শিক্ষার্থীর মনে গাঁথিয়া দিতে হয়৷ শিক্ষাকে সফল করিবার মহামন্ত্র এটি৷ ‘‘নিউইয়র্কে দেখতাম, আইরিশ উপনিবেশপ্রার্থী আসছে–ইংরেজ–পদদলিত, বিগতশ্রী, হূতসর্বস্ব, মহাদরিদ্র, মহামূর্খ–সম্বল একটি লাঠি ও তার অগ্রবিলম্বিত একটি ছেঁড়া কাপড়ের পুঁটলি৷ তার চলন সভয়, তার চাউনি সভয়৷ ছ–মাস পরে আর এক দৃশ্য–সে সোজা হয়ে চলেছে, তার বেশভূষা বদলে গেছে তার চাউনিতে, তার চলনে সে ভয়–ভয় ভাব নাই৷ কেন এমন হলো? আমার বেদান্ত বলেছেন যে, ঐ ‘আইরিশ ম্যান’–কে তার স্বদেশে চারিদিকে ঘৃণার মধ্যে রাখা হয়েছিল– সমস্ত প্রকৃতি একবাক্যে বলছিল, ‘প্যাট, তোর আর আশা নাই, তুই জন্মেছিস গোলাম, থাকবি গোলাম৷’ আজন্ম শুনতে শুনতে প্যাটের তাই বিশ্বাস হলো, নিজেকে প্যাট হিপনোটাইজ করলে যে, সে অতি নীচ তার ব্রহ্ম সঙ্কুচিত হয়ে গেল৷ আর আমেরিকায় নামিবামাত্র চারিদিক থেকে ধ্বনি উঠল–‘প্যাট, তুইও মানুষ, আমরাও মানুষ, মানুষেই তো সব করেছে, তোর আমার মতো মানুষ সব করতে পারে, বুকে সাহস বাঁধ৷’ প্যাট ঘাড় তুললে, দেখলে ঠিক কথাই তো ভিতরের ব্রহ্ম জেগে উঠলেন, স্বয়ং প্রকৃতি যেন বললেন, ‘উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত’৷’’
দ্বিতীয়ত, একাগ্রতা৷ ‘‘জ্ঞান আহরণের একটি মাত্র উপায় আছে নিম্নতম প্রাকৃত ব্যক্তি হইতে উচ্চতম যোগী পর্যন্ত সকলকেই ঐ একই উপায় অবলম্বন করিতে হয়৷ একাগ্রতাই সেই উপায়৷’’ সাধারণত আমাদের মন বহুবিষয়ে ছড়াইয়া থাকে৷ যে কোন একটি বিষয়ে সমস্ত মন একাগ্র করিতে পারিলে অসীম শক্তির বিকাশ হয় যেমন, লেন্স অথবা প্রতিফলক সহায়ে বিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মিগুলিকে একবিন্দুতে একত্র করিতে পারিলে বিপুল উজ্জ্বলতা আসে সেখানে৷ মন যত একাগ্র হয়, ততই অল্পসময়ে ও অল্প পরিশ্রমে বিদ্যা আয়ত্ত হয় শক্তি ও সময়ের অপচয় কম হয়৷ ‘‘আমার মতে শিক্ষার সারাংশ মনঃসংযোগ, ঘটনাসংগ্রহ নহে৷’’
তৃতীয়ত, ইচ্ছাশক্তি৷ ‘‘পুনঃ পুনঃ ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিলেই জীবনের ঊর্ধ্বায়ন ঘটে৷ ইচ্ছাশক্তির প্রভাব অপরিসীম৷’’ কিসে আমাদের ভাল হইবে, সেকথা আমরা সকলেই কমবেশি জানি৷ কিন্তু দেখা যায়, যাহা ভাল বলিয়া বুঝি, সব সময় তাহা কার্যে পরিণত করিতে পারি না৷ ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতাই ইহার কারণ৷ এই ইচ্ছাশক্তির তারতম্যই মানুষে মানুষে ব্যক্তিত্বের তারতম্যের প্রধান কারণ, ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা মূল কারণ নহে৷ আমাদের বুদ্ধি একটি সন্ধানী আলোর মতো৷ উহার আলোক যতই তীব্র হইবে, কোন্ পথটি আমাদের পক্ষে কল্যাণকর, কোন্টি অকল্যাণকর, তাহা আমাদের কাছে ততই বেশি স্পষ্ট হইবে৷ কিন্তু দেখা যায়, বুদ্ধিবৃত্তি খুব মার্জিত হওয়া সত্ত্বেও সব সময় আমাদের জীবন সুনিয়ন্ত্রিত হয় না, বিমল চরিত্র গঠিত হয় না৷ অকল্যাণ হইবে ইহা নিশ্চিত জানিয়াও আমরা অনেক সময় অশুভ বা অন্যায় কর্ম হইতে নিজেদের বিরত রাখিতে পারি না মনের যে পথ ভাল লাগে, সেই পথেই সে আমাদের টানিয়া লইয়া যায়, বিবেকের নিষেধ কানেও তুলে না৷ এইখানেই ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ প্রয়োজন৷ চেষ্টা করিলে পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের দ্বারা ইচ্ছাশক্তিকে বাড়াইয়া তোলা যায়৷ মন যখনই বিপথে চলিতে চাহিবে, তখনই জোর করিয়া তাহাকে টানিয়া রাখিতে হয়৷ ছোটখাট ঘটনাকে উপেক্ষা না করিয়া ইহা করিতে হয়৷ যতবার এরূপ করা যায়, ততবারই আত্মবিশ্বাস পূর্বাপেক্ষা বাড়িয়া যায়, ইচ্ছাশক্তি ততই সবলতর হয়৷ সেজন্য আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হইলেও যে কোন নিয়ম পালন করার এটি একটি মহা কল্যাণকর দিক৷ এভাবে চলিতে চলিতে দেখা যায়, ইচ্ছাশক্তি এত বেশি বাড়িয়াছে, নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস এত বেশি আসিয়াছে যে যাহা করা একসময় অসাধ্য বলিয়া মনে হইত, তাহা অতি সহজে আমরা করিতে পারিতেছি৷ তখন, নিজেকে পূর্বে দুর্বল ভাবিতাম একথা মনে জাগিলেও হাসি পায়৷ চরিত্র গঠনের ইহাই একমাত্র উপায়–পুনঃ পুনঃ অভ্যাস৷ হাজার বার অকৃতকার্য হইলেও চেষ্টা ছাড়িতে নাই, উদ্যম হারাইতে নাই তাহা হইলে সফলতা আসিবেই আসিবে৷ নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগাইয়া তোলার চেষ্টার নামই মনুষ্যত্বের সাধনা৷
চতুর্থত, ব্রহ্মচর্য৷ ছাত্রজীবন ভোগের জীবন নহে, প্রস্তুতির জীবন৷ বিলাসিতা প্রভৃতি অভ্যাসগুলি জীবনের যে কোন পর্যায়ে সহজেই আয়ত্ত
করা যায় মানুষের মনের স্বাভাবিক গতিই হইল নিচের দিকে–নিচে নামিবার জন্য কোন শিক্ষা বা প্রয়াসের প্রয়োজন হয় না৷ কিন্তু সর্ব বিষয়ে সংযম, কঠোরতা প্রভৃতি সদ্গুণগুলি ছাত্রজীবনে আয়ত্ত করিতে না পারিলে পরে উহা করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়৷ কায়মনোবাক্যে ব্রহ্মচর্য পালন করিতে পারিলে স্নায়ু ও মস্তিষ্ক খুব সবল হয়, অসীম শক্তির বিকাশ ঘটে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘প্রত্যেক বালককে পূর্ণ ব্রহ্মচর্য পালন করিতে শিক্ষা দেওয়া উচিত তবেই তাহার অন্তরের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জাগ্রত হইবে৷ পূর্ণ ব্রহ্মচর্যের অর্থ চিন্তায়, বাক্যে ও কর্মে সর্বদা সর্বাবস্থায় শুচিতা রক্ষা করা৷ সংযমের অভাবে আমাদের দেশের যাহা কিছু বরণীয় সবই লোপ পাইতে বসিয়াছে৷ কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের ফলে যাবতীয় শিক্ষা স্বল্প সময়ে আয়ত্ত করা যায়, ...ধৃতরেতা ব্যক্তির মস্তিষ্ক অমিত তেজ ও বিপুল ইচ্ছাশক্তির আধার৷ ভোগবাসনা–সংযমের ফল অতি শুভ৷ যৌনশক্তিকে আত্মিকশক্তিতে রূপায়িত করিতে হইবে৷ শক্তি যত প্রবল হইবে তাহা দ্বারা তত বেশি কাজ সাধিত হইতে পারে৷ খরস্রোত জলধারাকে সংযত করিবার ফলেই হয় প্রচণ্ড হাইড্রলিক শক্তির উদ্ভব৷’’
সচ্চিন্তা মনকে শুচি–শুভ্র করিয়া রাখে, সেখানে মলিনতার স্পর্শ লাগিতে দেয় না৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, আমাদের শুভাশুভ প্রত্যেকটি চিন্তা, সুখ দুঃখের প্রত্যেকটি অনুভূতি সূক্ষ্মাবস্থায় মনে সঞ্চিত থাকে৷ মন সূক্ষ্মশরীরের অংশবিশেষ৷ উহা দেহনাশের সঙ্গে সঙ্গে বিনষ্ট হয় না৷ পুনর্বার দেহধারণের সময় আমাদের সূক্ষ্মশরীর এই অনুভূতির পোঁটলাটি সঙ্গে লইয়া আসে৷ ইহারই নাম সংস্কার৷ আমাদের মনের বর্তমান গঠন, আমাদের বর্তমান চরিত্র হইল, আমরা পূর্বজন্মে ও এইজন্মে যাহা কিছু চিন্তা করিয়াছি, অনুভব করিয়াছি, তাহারই সমষ্টি মাত্র৷ আমরাই উহা গড়িয়াছি, ইচ্ছা করিলে আমরা উহাকে ভাঙিয়া আবার অন্যভাবে গড়িতে পারি৷ পর পর কয়েকটি চিন্তা ও অনুভূতির ছাপই অভ্যাসে পরিণত হয়৷ সেজন্য কদভ্যাসের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার একমাত্র উপায় মনের উপর উহার বিপরীত চিন্তার ছাপ দেওয়া–সদভ্যাস গড়িয়া তোলা৷ সৎসঙ্গ, সৎকর্ম ও সচ্চিন্তা করিতে করিতে সদভ্যাস গড়িয়া উঠে৷
যাহাতে ছাত্রদের মনে পূর্বোক্ত গুণগুলি বিকাশলাভের সুযোগ ও সহায়তা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখিয়া আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তন করিতে হইবে৷ যেভাবেই হউক, ছাত্রজীবনেই যাহাতে যুবক–যুবতীরা জীবনের উচ্চতর আনন্দের, আধ্যাত্মিক আনন্দের সন্ধান ও আস্বাদ কিছুটা পায়, তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে তাহা হইলেই তাহারা উচ্চ আদর্শে আকৃষ্ট হইবে এবং পরজীবনে জীবনপথের বহুবিধ প্রলোভন ও ঝড়–ঝঞ্ঝায় অবিচল থাকিয়া ঐ আদর্শ আঁকড়াইয়া থাকিবার মতো যথেষ্ট শক্তির অধিকারী হইয়া উঠিবে৷
আমাদের বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে বুদ্ধিকে উন্নত ও প্রসারিত করিবার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে মানসিক উন্নতিবিধানের কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থা নাই৷ প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় তাহা ছিল৷ স্বামীজী বর্তমান যুগের উপযোগী করিয়া সেই ব্যবস্থার পুনঃ–প্রবর্তন চাহিয়াছেন৷ অপরকে উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত করিবার প্রকৃষ্ট উপায় নিজে আদর্শ জীবন যাপন করা৷ ‘‘জীবন যাপন করিয়া দেখাও, উহাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচার৷’’ জ্বলন্ত জীবনের সান্নিধ্যে বাস করিলে মনে উচ্চভাব স্বতই প্রবেশ করে৷ সেজন্য স্বামীজীর ইচ্ছা ছিল যাহাতে আমাদের দেশে আবার প্রাচীন গুরুকুলপ্রথার আদর্শে শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানগুলি গড়িয়া উঠে৷ সেখানে সংযমী, সেবাপরায়ণ, স্নেহশীল ঋষিদের সান্নিধ্য ও শিক্ষাগুণে ছাত্রেরা পরা ও অপরা উভয় বিদ্যায় পারদর্শী হইত বিভিন্ন জাগতিক বিষয়ে জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা অর্জন করিয়া অর্থোপার্জনের যোগ্যতা লাভ করিত, আবার সেইসঙ্গে লোককল্যাণেচ্ছাসমুজ্জ্, বজ্রদৃঢ়, দেবোপম চরিত্রেরও অধিকারী হইয়া উঠিত৷ আদর্শ শিক্ষকদের এইরূপ ঋষিতুল্য হইতে হইবে৷ তাহা হইলেই তাঁহাদের শিক্ষায় ও জীবনের স্পর্শে ছাত্রেরা নিজেদের, সমাজের, দেশের ও জগতের যথার্থ কল্যাণকারী মানুষ হইয়া উঠিতে পারিবে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, এরূপ খাঁটি মানুষই দেশের সব চেয়ে বড় সম্পদ৷ স্বামীজী সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণদেব যেমন বলিয়াছিলেন, ‘আমার নরেনের ভিতর এতটুকু মেকি নাই কোথাও বাজিয়ে দেখ, টং টং করছে,’ আমাদের দেশের যুবকদেরও সেইরূপ হইতে হইবে সুদৃঢ় দেহ–মন ও বজ্রদৃঢ় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন, পবিত্র–হূদয় এবং প্রসন্নচিত্ত হইতে হইবে৷ সর্ববিধ মালিন্য–রহিত নবপ্রস্ফুটিত কুসুমের মতো বিকশিত হইয়া চারিদিকে, শুধু এদেশে নয় বিদেশেও কল্যাণের, প্রেমের, চরিত্র–মাধুর্যের পরিমল ছড়াইতে হইবে৷ অন্তঃসারশূন্য বাহ্যচাকচিক্যময়, জড়বাদাত্মক জীবনাদর্শের দিকে চাহিয়া আমাদের চক্ষু যেন ঝলসাইয়া না যায়৷ অমৃতের সন্তান আমরা, রাজরাজেশ্বরের সন্তান আমরা, কোন্ দুঃখে আমরা ভারতীয় সংস্কৃতির মণিকোঠায় রক্ষিত, জীবনের কষ্টিপাথরে যুগযুগান্ত ধরিয়া বারে বারে সুপরীক্ষিত মহামূল্য রত্নহার ফেলিয়া ভোগসর্বস্ব জীবনাদর্শের গিলটিকরা মূল্যহীন ভিক্ষাভূষণ গলায় পরিতে যাইব? জীবনের হাটে উহার বিনিময়ে যথার্থ শান্তি ও আনন্দ মিলে না, আশায় আশায় এক বিপণী হইতে অন্য বিপণীতে ঘুরিয়া বেড়ানই সার হয়৷ উচ্ছৃঙ্খল ভোগ মনের বুভুক্ষা আরও বাড়াইয়া দিয়া অশান্তিকে বাড়াইয়া তোলে৷ বাহিরের চাকচিক্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তরটিকেও অমল ধবল করিয়া তোলাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘অন্তর বলিয়া যদি কিছু না রহিল, তবে শুধু বহির্দেশটিকে পালিশ করিয়া লাভ কি?’’ পাশ্চাত্য জগতের বহু বিদ্যাকে আমাদের শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করিতেই হইবে কিন্তু তাহাদের শিক্ষাপদ্ধতির সব কিছুরই অনুকরণ করিতে যাইয়া আমরা যেন জাতীয় আদর্শের মূলে কুঠারাঘাত না করিয়া বসি, সেবা ও সংযমের আদর্শকে চূর্ণবিচূর্ণ না করিয়া ফেলি৷
ছাত্রজীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তরে–বাহিরে সর্ববিষয়ে নিজেকে নরনারায়ণের সেবকরূপে গড়িয়া তোলা ৷ ইহাতে নিজেরও জীবন মধুময় হইবে, অপরেরও৷
কলকাতার অভিনন্দন–সভায় উত্তর–প্রদানের পর স্বামী বিবেকানন্দ স্টার থিয়েটারে আরও কয়েকটি বত্তৃণতা করেন৷ কলকাতায় থাকাকালীন তিনি প্রধানত আলমবাজার মঠে থাকিতেন৷ দীর্ঘদিন পরে স্বামীজীকে নিজেদের মধ্যে পাইয়া গুরুভাইদের আর আনন্দের সীমা রহিল না৷ নিষ্কামভাবে ঈশ্বরজ্ঞানে মানবসেবাকেও জপ, ধ্যান প্রভৃতির মতোই ধর্ম–সাধনার একটি অঙ্গরূপে গ্রহণ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের অভিপ্রেত যে সন্ন্যাসি–স৯ গড়িয়া উঠিয়াছিল, অতি উচ্চ আধ্যাত্মিকতার অধিকারী গুরুভাইদের প্রেরণা দিয়া কাজে নামাইয়া স্বামীজী যাহা গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, এখন সেই স৯কে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত করিবার কাজে তিনি মনোনিবেশ করিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ ভক্তদের লইয়া ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মে স্বামীজী ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ নামে একটি সাধারণ সমিতি গঠন করিলেন৷ তিনি নিজেই ইহার প্রেসিডেন্ট হইলেন৷ এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য হইল ঃ যে বেদান্তধর্ম শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত, তদনুযায়ী জীবনগঠন ও তাহার প্রচার করা বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপন করা জাতি–ধর্ম–বর্ণ–নির্ দুঃস্থ মানবের সেবা করা৷
ইহার ঠিক পূর্বেই শারীরিক অসুস্থতার জন্য স্বামীজী দার্জিলিং–এ দুইমাস কাটাইয়া আসিয়াছিলেন৷ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের মধ্যেই তিনি আবার ভারত–ভ্রমণে বাহির হন৷ এবারে উত্তর ভারতের দিকে গেলেন৷ আলমোড়ায় যাইয়া সেখান হইতে তিনি পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের বহুস্থানে ভ্রমণ করেন৷ এই সময় তিনি হিন্দিতেও বত্তৃণতা দিয়াছিলেন৷ বেরিলি, আম্বালা, অমৃতসর, শ্রীনগর, রাওলপিণ্ডি, জম্মু প্রভৃতি স্থান হইয়া তিনি দিল্লিতে আসেন৷ দিল্লি হইতে রাজপুতানার আলোয়ার, জয়পুর, খেতড়ি, যোধপুর, আজমীর, খান্ডোয়া প্রভৃতি স্থান ঘুরিয়া কলকাতায় ফিরিয়া আসিলেন৷
ভারতের বিভিন্নস্থানে প্রচার এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাকার্যের বিস্তারও শুরু হইল৷ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মে স্বামী অখণ্ডানন্দ মুর্শিদাবাদ জেলার মহুলা গ্রামে দুর্ভিক্ষ–পীড়িতদের সেবায় ব্রতী হন৷ দুর্ভিক্ষ থামিয়া গেলে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে কয়েকজন অনাথ বালককে লইয়া তিনি সারগাছিতে একটি আশ্রম স্থাপন করেন৷ ইহাই রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম স্থায়ী সেবাকেন্দ্র৷ এই বৎসরেই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য মাদ্রাজ গমন করেন৷ স্বামী শিবানন্দ বেদান্ত প্রচারের জন্য সিংহলে যান৷ স্বামীজীর শিষ্য স্বামী বিরজানন্দ দুর্ভিক্ষ–পীড়িতদের সেবার জন্য দেওঘরে প্রেরিত হন৷ দিনাজপুরেও সেবাকার্য শুরু করা হয় দক্ষিণেশ্বর গ্রামেও কিছুদিন সেবাকার্য চলিয়াছিল৷
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি স্বামীজীর অনুগত ভক্ত ইংলন্ডবাসী মিস হেনরিয়েটা এফ. মূলার ও আমেরিকাবাসী মিসেস ওলি বুল–এর অর্থ সাহায্যে কলকাতার নিকটবর্তী বেলুড়ে গঙ্গাতীরে মঠবাড়ি নির্মাণের জন্য জমি কেনার বায়না–নামা নিষ্পন্ন হয়৷ দলিল প্রভৃতি হইয়া যাইবার পর সেখানে গৃহ–নির্মাণাদি কার্যপরিচালনার সুবিধার জন্য ঐ বৎসর ১৩ ফেব্রুয়ারি জমির নিকটস্থ নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়িতে আলমবাজার হইতে মঠ স্থানান্তরিত হয়৷ কিছুদিন পূর্বে ২৮ জানুয়ারি ভগিনী নিবেদিতা ভারতে আসিয়া পৌঁছিয়াছিলেন৷ নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়িতে ২৫ মার্চ তারিখে স্বামীজী তাঁহাকে ব্রহ্মচর্য–দীক্ষা প্রদান করেন৷ স্বামী অভেদানন্দকে নিউইয়র্ক কেন্দ্রের ভার অর্পণ করিয়া স্বামী সারদানন্দও ইতোমধ্যে ভারতে ফিরিয়াছিলেন৷
এই বৎসর এপ্রিল মাসে কলকাতায় প্লেগ মহামারীরূপে দেখা দিল৷ স্বামীজী তখন দার্জিলিং–এ ছিলেন৷ সংবাদ পাইয়া কলকাতায় ফিরিয়া তিনি পীড়িতদের সেবাকার্য আরম্ভ করাইলেন৷ সেবাকার্যে অর্থ কোথা হইতে আসিবে প্রশ্ণ উঠিলে স্বামীজী বলিয়াছিলেন, ‘‘প্রয়োজন হইলে মঠের জমি বিক্রয় করিয়া দিব৷’’ অবশ্য তাহা আর করিতে হয় নাই, জনসাধারণের নিকট হইতেই যথেষ্ট অর্থসাহায্য পাওয়া গিয়াছিল৷
স্বামীজীর শরীর খারাপের দিকেই চলিয়াছিল৷ ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মে স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য তিনি পুনরায় আলমোড়া গমন করেন৷ সেখানে প্রায় একমাস থাকিবার পর কাশ্মীর হইয়া ১৮ অক্টোবর তারিখ নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়িতে ফিরিয়া আসেন৷ ইতোমধ্যে বেলুড় মঠের গৃহনির্মাণাদির কার্য অনেকদূর অগ্রসর হইয়াছিল৷ ১২ নভেম্বর তারিখ স্বামীজীর ইচ্ছায় বেলুড় মঠের জমি শ্রীশ্রীমায়ের চরণস্পর্শে পবিত্র হয়৷ প্রায় একমাস পরে, ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবশেষ কিছু ভস্ম ও অস্থি একটি কৌটায় রক্ষিত হইয়া তাঁহার দেহত্যাগের পর হইতেই তাঁহার সন্ন্যাসী শিষ্যগণ কর্তৃক নিত্য পূজিত হইত৷ মঠ স্থানান্তরিত হইবার সময় উহা বরাহনগর হইতে আলমবাজার মঠে এবং পরে নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়িতে আনীত হইয়াছিল৷ স্বামীজী সেই কৌটাটি স্কন্ধে বহন করিয়া আনিয়া ঐদিন বেলুড় মঠে বসাইয়া পূজা করেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, ‘‘তুই আমাকে কাঁধে করে যেখানে নিয়ে বসাবি, আমি সেখানেই থাকব–সে গাছতলাই হোক, আর কুটিরই হোক৷’’ এতদিনে শ্রীরামকৃষ্ণসে৯র একটি স্থায়ী নিজস্ব আবাস হইল৷ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কেন্দ্র হইল এটি৷
ভগিনী নিবেদিতার প্রচেষ্টায় ও পরিচালনাধীনে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর হইতে বালিকাদের শিক্ষার জন্য কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলে ভগিনী নিবেদিতার বিদ্যালয়টির কার্য আরম্ভ হয়৷ স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দের প্রচেষ্টায় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি হইতে রামকৃষ্ণসে৯র বাংলা মুখপত্র ‘উদ্বোধন’ পত্রিকা প্রকাশিত হইতে থাকে৷
১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতায় আবার প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং রামকৃষ্ণ মিশন পুনরায় সেবাকার্য আরম্ভ করে৷ এই সময় ভগিনী নিবেদিতা যে নির্ভীকতার ও স্নেহশীলা জননীর মতো সেবার নিদর্শন দেখাইয়াছিলেন, তাহার তুলনা নাই৷ নিজহস্তে বাগবাজার অঞ্চলের রাস্তা পর্যন্ত তিনি ঝাঁট দিয়াছেন৷
এভাবে ভারতীয় জাতির প্রাণে নবপ্রেরণার আগুন জ্বালাইয়া এবং সর্বজাগতিক উদার আধ্যাত্মিক ভাবধারা জীবনে ধরিয়া রাখিবার জন্য ও জাতি ধর্ম–বর্ণ–নির্বিশেষ্ ঈশ্বরজ্ঞানে মানবসেবার আদর্শ স্থাপনের জন্য রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া স্বামীজী দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্য দেশে গমন করেন৷
স্বামী বিবেকানন্দ প্রথমবার প্রশান্ত মহাসাগরের পথে আমেরিকা গিয়াছিলেন৷ এবারে চলিলেন ইউরোপ হইয়া৷ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন স্বামী তুরীয়ানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়া কলকাতা বন্দর হইতে জাহাজে করিয়া রওনা হইলেন এবং মাদ্রাজ, কলম্বো, এডেন, সুয়েজ হইয়া ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করিলেন৷ ৩১ জুলাই জাহাজ লন্ডনে পৌঁছিল৷
পথে, জাহাজে, স্বামীজী ‘পরিব্রাজক’ গ্রন্থখানি রচনা করেন৷ চলতি ভাষায় লিখিত এই পুস্তকটি বঙ্গ–সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ৷ ইহার ভাষার সাবলীল গতি ও অমিত শক্তি ভাষা সম্বন্ধে স্বামীজীর নিজের এই উক্তিরই নিদর্শন, ‘‘ভাষা ভাবের বাহক৷ ভাবই প্রধান ভাষা পরে৷ ...যখন মানুষ বেঁচে থাকে তখন জ্যান্ত–কথা কয়, মরে গেলে, মরা–ভাষা কয়৷ ...ভাষাকে করতে হবে যেন সাফ্ ইস্পাত, মুচ্ড়ে মুচ্ড়ে যা ইচ্ছে কর–, আবার যে–কে–সেই–এক চোটে পাথর কেটে দেয়–দাঁত পড়ে না৷’’ ‘‘হিন্দু বিদেশে যায়–রেঙ্গুন, জাভা, হংকং, জাঞ্জীবর, মাডাগাস্কর, সুয়েজ, এডেন, মাল্টা–সঙ্গে গঙ্গাজল, সঙ্গে গীতা৷ গীতা গঙ্গা–হিঁদুর হিঁদুয়ানি৷ গেলবারে আমিও একটু নিয়ে গিয়েছিলুম–কি জানি বাগে পেলেই এক আধ বিন্দু পান করতাম৷ পান কল্লেই কিন্তু সে পাশ্চাত্যজনস্রোতের মধ্যে, সভ্যতার কল্লোলের মধ্যে, সে কোটি কোটি মানবের উন্মত্তপ্রায় দ্রুত পদসঞ্চারের মধ্যে, মন যেন স্থির হয়ে যেত৷ সে জনস্রোত, সে রজোগুণের আস্ফালন, সে পদে পদে প্রতিদ্বন্দ্বিসংঘর্ষ, সে বিলাসক্ষেত্র, অমরাবতীসম প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্ক, বার্লিন, রোম, সব লোপ হয়ে যেত, আর শুনতাম–সেই ‘হর্ হর্ হর্’ দেখতাম–সেই হিমালয়ক্রোড়স্থ বিজন বিপিন, আর কল্লোলিনী সুরতরঙ্গিনী যেন হূদয়ে মস্তকে শিরায় শিরায় সঞ্চার করছেন, আর গর্জে গর্জে ডাকছেন–‘হর্ হর্ হব্’’’ ‘‘আর্যবাবাগণের জাঁকই কর, প্রাচীন ভারতের গৌরব ঘোষণা দিনরাতই কর, আর যতই কেন তোমরা ‘ডম্ম্ম্’ বলে ডম্ফই কর, তোমরা উচ্চবর্ণেরা কি বেঁচে আছ?... যাদের ‘চলমান শ্মশান’ বলে তোমাদের পূর্বপুরুষেরা ঘৃণা করেছেন, ভারতে যা কিছু বর্তমান জীবন আছে, তা তাদেরই মধ্যে৷ আর ‘চলমান শ্মশান’ হচ্ছ তোমরা৷ তোমাদের বাড়ি ঘর দুয়ার মিউজিয়ম, তোমাদের আচার, ব্যবহার, চাল, চলন দেখলেও বোধ হয়, যেন ঠান্দিদির মুখে গল্প শুনছি তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ আলাপ করেও, ঘরে এসে মনে হয়, যেন চিত্রশালিকায় ছবি দেখে এলুম ...তোমরা ভূত কাল, লঙ্ লুঙ্ লিট্ সব একসঙ্গে৷ বর্তমানকালে, তোমাদের দেখছি বলে যে বোধ হচ্ছে ওটা অজীর্ণতাজনিত দুঃস্বপ্ণ৷ ভবিষ্যতের তোমরা শূন্য, তোমরা ইৎ লোপ লুপ্৷... তোমরা শূন্যে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক৷ বেরুক লাঙল ধরে, চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে, মালা, মুচি, মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে৷ বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে৷ বেরুক কারখানা থেকে হাট থেকে, বাজার থেকে৷ বেরুক ঝোড়, জঙ্গল, পাহাড়, পর্বত থেকে৷ এরা সহস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে–তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা৷ সনাতন দুঃখ ভোগ করেছে–তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি৷... অতীতের কঙ্কালচয়–এই সামনে তোমার উত্তরাধিকারী ভবিষ্যৎ ভারত৷’’
স্বামীজী লন্ডনে অল্প কয়েকদিন মাত্র ছিলেন৷ লন্ডন হইতে ১৬ আগস্ট যাত্রা করিয়া তিনি নিউইয়র্কে গমন করেন৷ প্রথমবার আমেরিকা আসিয়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব, মধ্য এবং মধ্য–পশ্চিম অঞ্চলে কাজ করিয়াছিলেন৷ এবারে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল অঞ্চলে ভ্রমণ করিলেন৷ এই অঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে তিনি কয়েকটি বেদান্তকেন্দ্র স্থাপন করেন৷ তন্মধ্যে সানফ্রানসিস্কো এবং তাহার নিকটবর্তী কয়েকটি কেন্দ্রের ভার স্বামী তুরীয়ানন্দের হস্তে ন্যস্ত করিয়া তাঁকে আমেরিকায় রাখিয়া আসেন৷ স্বামী অভেদানন্দের তত্ত্বাবধানে নিউইয়র্ক কেন্দ্রের কাজ ভালই চলিতেছিল৷
প্যারিসে ধর্মেতিহাস মহাসভায় যোগ দিবার জন্য আমন্ত্রিত হইয়া ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই স্বামীজী আমেরিকা পরিত্যাগ করেন৷ ফ্রান্সে তিনি মাস তিনেক ছিলেন৷ প্যারিসে বিজ্ঞানবিদ্দের সম্মেলনে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুকে ভাষণ দিতে দেখিয়া ভারতসন্তানের কৃতিত্বে তিনি বিশেষ আনন্দলাভ করেন৷ প্যারিসে কিছুদিন থাকিয়া স্বামীজী দেশভ্রমণে বাহির হইলেন৷ প্যারিস হইতে বুলগেরিয়া, গ্রিস, তুরস্ক প্রভৃতি হইয়া তিনি মিশরের রাজধানী কাইরো শহরে উপস্থিত হন, সেখান হইতে ভারতে ফিরিয়া আসেন৷ বোম্বাই বন্দরে জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া ট্রেনযোগে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাইলেন৷ তিনি যে ভারতে ফিরিতেছেন, সে কথা পূর্বে কাহাকেও জানান নাই৷ একটি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করিয়া হাওড়া স্টেশন হইতে বেলুড় মঠে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ তখন রাত্রি হইয়াছে, মঠের অধিবাসীরা সকলেই খাইতে গিয়াছেন, মঠের গেট বন্ধ স্বামীজী হ্যাট কোট পরিয়াই আসিয়াছিলেন–দারোয়ান এই অসময়ে একজন সাহেব আসিয়াছেন দেখিয়া তাঁহাদের কাছে খবর দিতে ছুটিল৷ স্বামীজী ইত্যবসরে ভিতরে ঢুকিয়া একেবারে খাবার ঘরে গিয়া উপস্থিত৷ ‘‘আরে এ যে আমাদের সাহেব’’ বলিয়া হাস্যের রোল উঠিল সেখানে, স্বামীজীর এই অপ্রত্যাশিত আগমনে আনন্দের তুফান ছুটিল৷
মঠে ফিরিবার স্বল্পকাল পরেই, ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি স্বামীজী মঠের ‘ট্রাস্ট ডীড’ করাইয়া স৯কে আইনত বলবৎ করিয়া দিলেন৷ নিজে কাজকর্মের ব্যাপার হইতে একেবারে সরিয়া দাঁড়াইলেন৷ স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রেসিডেন্ট হইলেন৷
শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহাকে যে কাজের ভার দিয়া গিয়াছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দ এখন সে ভার হইতে প্রায় মুক্ত৷ পাশ্চাত্যে ও ভারতে তাঁহার কাজ সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপিত হইয়াছে৷ সেজন্য সব ভুলিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কাছে ফিরিয়া যাইবার ইচ্ছা তাঁহার কথায় ও পত্রে মাঝে মাঝে প্রকট হইতে লাগিল দক্ষিণেশ্বরের মধুময় স্মৃতিগুলি বারে বারে মনে জাগিতে লাগিল৷ দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্য দেশে গমনের পূর্ব হইতেই ইহা আরম্ভ হইয়াছিল৷
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আলমোড়া হইতে তিনি লিখিয়াছেন, ‘‘আমি বুঝতে পারছি, আমার কাজ শেষ হয়েছে৷ জোর তিন–চার বছর জীবন অবশিষ্ট আছে৷... এটা যখন নিশ্চিত বুঝতে পারব যে, লোককল্যাণকল্পে অন্তত ভারতে এমন একটা যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে গেলাম, যাকে কোন শক্তি দাবাতে পারবে না, তখন ভবিষ্যতের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে আমি ঘুমবো৷’’
১৮৯৯ ও ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের কয়েকখানি পত্রে এ ভাব আরও বেশি প্রকট ঃ ‘‘আমার কাজ শেষ হয়েছে৷’’ ‘‘আমার তরণী ক্রমশ সেই শান্তির বন্দরের নিকটবর্তী হচ্ছে–যেখান থেকে তাকে আর ফিরিয়ে দেওয়া হবে না৷’’
‘‘মায়ের কাজ মা–ই করছেন, সেজন্য এখন আর বেশি মাথা ঘামাই না৷... মায়ের প্রতি আকর্ষণ ক্রমশ বর্ধিত হচ্ছে৷ দক্ষিণেশ্বরের অশ্বত্থপাদমূলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত সেই যে আমরা অনিদ্রায় দীর্ঘরাত্রি যাপন করতাম, তারই স্মৃতি পুনরায় অন্তরে জাগছে৷’’
‘‘আমি এখন সেই পূর্বের বালক বই আর কেউ নই, যে দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীর তলায় শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী অবাক হয়ে শুনত, আর বিভোর হয়ে যেত... আহা, আবার তাঁর সেই মধুর বাণী শুনতে পাচ্ছি–সেই চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর যাতে আমার প্রাণের ভেতরটা পর্যন্ত কণ্টকিত করে তুলছে৷... যাই প্রভু, যাই’’
‘‘সামনে অপার নির্বাণসমুদ্র দেখতে পাচ্ছি৷... যাই মা, যাই... আহা, কি স্থির প্রশান্তি চিন্তাগুলো পর্যন্ত বোধ হচ্ছে যেন হূদয়ের কোন এক দূর অতিদূর অভ্যন্তর প্রদেশ থেকে মৃদু বাক্যালাপের মতো ধীর অস্পষ্টভাবে আমার কাছে এসে পঁৌছুচ্ছে৷ আর শান্তি–মধুর শান্তি, যেন যা কিছু দেখছি শুনছি সকলকে ছেয়ে রেখেছে৷ ঐ আবার সে আহ্বান... যাই প্রভু, যাই’’
বেলুড় মঠে ফিরিবার স্বল্পকাল পরেই স্বামীজী মায়াবতী গমন করেন৷ সেভিয়ার–দম্পতির অর্থে ও প্রচেষ্টায় তখন মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং মাদ্রাজ হইতে যে ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকার প্রকাশন শুরু হইয়াছিল, তাহা তখন মায়াবতী হইতেই প্রকাশিত হইতেছে৷ সেভিয়ার–দম্পতি আশ্রমেই বাস করিতেন৷ স্বামীজী যখন পাশ্চাত্যে ছিলেন, সেই সময় ক্যাপ্ঢেন সেভিয়ার–এর দেহত্যাগ হয়৷ স্বামীজী মঠে ফিরিয়াই সে সংবাদ পাইয়া মিসেস সেভিয়ারকে সাত্ব্ন্না দিবার জন্যই মায়াবতী গিয়াছিলেন৷ সেখানে অল্প কয়েকদিন বাস করিয়া তিনি বেলুড় মঠে ফিরিয়া আসেন৷
১৯০১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে স্বামীজী পূর্ববঙ্গের ঢ়াকা শহরে গমন করেন৷ সেখান হইতে লাঙ্গলবন্ধ, দেওভোগে নাগমহাশয়ের বাড়ি প্রভৃতি হইয়া কামাখ্যাদেবীর দর্শন মানসে গৌহাটী যান৷ স্বামীজী বহুদিন যাবৎ বহুমূত্র ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়াছিলেন৷ তখনকার দিনে এই ব্যাধির কোন উন্নত চিকিৎসা ছিল না৷ ঢ়াকায় থাকাকালীন তাঁহার শরীর খুবই অসুস্থ হইয়া পড়ে৷ স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য গৌহাটী হইতে শিলং আসিয়া কিছুদিন থাকিয়া তিনি বেলুড়ে ফিরিয়া আসেন৷
ইহার পর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বেলুড় মঠেই ছিলেন৷ মাঝে একবার শুধু বুদ্ধগয়া ও কাশী ঘুরিয়া আসিয়াছিলেন৷ জাপানের ধর্মসম্মেলনে স্বামীজীকে লইয়া যাইবার জন্য জাপানের একটি বৌদ্ধ মঠের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড ওডা মিঃ ওকাকুরাকে সঙ্গে লইয়া বেলুড় মঠে আসিয়া উপস্থিত হন৷ স্বামীজী তখন খুবই অসুস্থ শয্যাশায়ী ছিলেন৷ তথাপি তাঁহাদের আন্তরিকতা দেখিয়া জাপানে যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন কিন্তু যাওয়া আর ঘটিয়া উঠে নাই৷ অসুস্থতা সত্ত্বেও ইহাদের সঙ্গে লইয়া তিনি ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকেই বুদ্ধগয়া ও কাশী ঘুরিয়া আসেন৷ কাশীতে কয়েকজন উৎসাহী যুবক অসহায় রোগীদের সেবাকার্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন৷ স্বামীজী তাঁহাদের মনোবল ও উৎসাহ দেখিয়া পরম আনন্দিত হন৷ স্বামীজী নিজেই এই কার্যে অর্থ–সংগ্রহের জন্য আবেদনপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন৷ প্রতিষ্ঠানটি ক্রমবর্ধিত হইয়া বর্তমান কাশী সেবাশ্রমের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে৷ কাশী অদ্বৈত আশ্রমেরও সূত্রপাত এই সময়ে৷ কাশী হইতে বেলুড় মঠে ফিরিবার পর স্বামীজী আর কোথাও বাহির হন নাই৷
এই সময় দর্শনার্থীরা ও মঠের সাধু–ব্রহ্মচারিগণ স্বামীজীর সহিত সদালাপ করিবার প্রচুর অবকাশ পাইতেন৷ বহু ভাগ্যবান ব্যক্তি এইকালে তাঁহার দুর্লভ সঙ্গলাভের সুযোগ পাইয়া ধন্য হইয়াছিলেন৷ মঠে স্বামীজী কয়েকটি পশু পক্ষী পুষিয়াছিলেন৷ তাঁহার পালিত ছাগলটির নাম ছিল ‘মটরু’, একটি কুকুরের নাম ‘বাঘা’৷ কয়েকটি রাজহাঁস ও একটি কোকিল ছিল৷ এইসব লইয়া অবসর–যাপন করিয়া তিনি বেশ আনন্দ লাভ করিতেন৷ কখনও বা বাগানে যাইয়া কাজকর্ম দেখিতেন৷ যেসব সাঁওতাল কুলিরা বাগানে কাজ করিত, তিনি তাহাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া গিয়াছিলেন তাহাদের দেশের, সংসারের সব খুঁটিনাটি খবর জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইতেন৷ একদিন ভাল ভাল খাবার প্রস্তুত করাইয়া পরিপাটি করিয়া তাহাদের খাওয়াইলেন৷ গভীর পরিতৃপ্তিতে একজন সাঁওতাল বলিল, ‘‘হাঁরে স্বামী বাপ, তোরা এমন জিনিস সব কোথায় পেলি? হামরা এমনটা কখনও খাইনি৷’’ স্বামীজী তাহাদের তৃপ্তি দেখিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘তোরা যে নারায়ণ, আজ আমার নারায়ণের ভোগ দেওয়া হলো৷’’
এভাবে শরীরের অসুস্থতা সত্ত্বেও সব সময় মঠের পরিবেশ আনন্দময় করিয়া রাখিয়া ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই রাত্রি নয়টার সময় স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যানযোগে দেহত্যাগ করেন৷
দেহত্যাগের দুইদিন পূর্বে তাঁহার শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতাকে নিজে পরিবেশন করিয়া খাওয়াইলেন৷ খাওয়া হইলে হাত ধুইবার সময় নিজেই তাঁহার হাতে জল ঢ়ালিয়া দিলেন, হাত মুছাইয়া দিলেন৷ নিবেদিতা প্রবল আপত্তি জানাইলে বলিলেন, ‘‘কেন, যিশু কি তাঁহার শিষ্যদের পা ধুইয়া দেন নাই?’’ নিবেদিতা জানিতেন, যিশু ইহা শেষদিন করিয়াছিলেন তাই, শুনিয়া চমকাইয়া স্বামীজীর মুখের দিকে চাহিলেন, বাক্য রুদ্ধ হইল৷
দেহত্যাগের দিন সকালে চা পানের পর ঠাকুরঘরে প্রবেশ করিলেন৷ ঘরের সব জানলা–দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া ৮টা হইতে ১১টা পর্যন্ত ধ্যানে মগ্ণ রহিলেন৷ ধ্যানান্তে একখানি শ্যামাসঙ্গীত গাহিয়া নিচে নামিয়া আসিলেন মঠের ঠাকুরঘর তখন একটি দোতলা বাড়ির উপর–তলায় ছিল৷ নিচে নামিয়া মঠের প্রাঙ্গণে পায়চারি করিবার সময় আপন মনে নিম্নস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘‘আর একটা বিবেকানন্দ থাকলে বুঝতে পারত, এই বিবেকানন্দ কি করে গেল’’ স্বামী প্রেমানন্দ নিকটেই ছিলেন তিনি কথাগুলি শুনিতে পান৷ এইদিন তাঁহাকে অন্যদিন অপেক্ষা অনেক বেশি সুস্থ দেখাইতেছিল৷
দুপুরে আহারের পর বিশ্রামান্তে মঠের ব্রহ্মচারীদের লইয়া সংস্কৃত ব্যাকরণের ক্লাস করিলেন৷ বিকালে মঠ হইতে বাহির হইয়া স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে অনেকখানি বেড়াইয়া আসিলেন৷ সন্ধ্যা সাতটার সময় নিজের ঘরে যাইয়া গভীর ধ্যানে ডুবিয়া গেলেন৷ সে সময় তাঁহার নির্দেশে ঘরে কেহই ছিল না৷ আটটার সময় সেবককে ডাকিয়া মাথায় হাওয়া করিতে বলিলেন এবং জপের মালা হাতে লইয়া শুইয়া পড়িলেন৷ নয়টার সময় তাঁহার হাত একটু কাঁপিয়া উঠিল, দুইবার গভীর শ্বাসের পর শরীর স্থির হইল–মহাসমাধিতে মগ্ণ হইলেন তিনি৷ আনন্দধামের দ্বার চিরতরে খুলিয়া দিয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব কর্মক্লান্ত প্রিয় সন্তানকে আবার নিজক্রোড়ে তুলিয়া লইলেন৷
স্বামী ব্রহ্মানন্দ সেদিন কলকাতায় ছিলেন৷ খবর পাইয়া তিনি ও স্বামী সারদানন্দ রাত্রি সাড়ে দশটার সময় মঠে আসিয়া পঁৌছিলেন৷ ভগিনী নিবেদিতা পরদিন সকালে সংবাদ পাইয়া মঠে চলিয়া আসিলেন৷ তিনি স্বপ্ণ দেখিয়াছিলেন যে শ্রীরামকৃষ্ণদেব দ্বিতীয়বার দেহত্যাগ করিলেন৷ পরদিন বেলা দুইটার সময় শেষকৃত্য আরম্ভ হয়৷ দেহত্যাগের তিন দিন পূর্বে স্বামীজী গঙ্গাতীরে পায়চারি করিবার সময় স্বামী প্রেমানন্দকে একটি বিশেষ স্থান দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘আমার শরীর গেলে এখানে দাহ করবে৷’’ সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতেই, যেখানে বর্তমানে স্বামীজীর মন্দির রহিয়াছে, শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়৷
সেখানে আজ মন্দিরাভ্যন্তরে স্থাপিত স্বামী বিবেকানন্দের মর্মর প্রতিকৃতির দিকে চাহিলেই মনে হয়,
‘যোগাসনে মহাধ্যানে মগ্ণ যোগিবর৷’
জগৎকল্যাণের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ–জীবনে যে বিপুল শক্তির স্ফুরণ হইয়াছিল, তাহাই স্বামী বিবেকানন্দের ভিতরে প্রবেশ করিয়া তাঁহার দেহমনরূপ অভূতপূর্ব যন্ত্রের মাধ্যমে সব কাজ করিয়াছে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন, ‘‘যে শক্তি আমার পশ্চাতে থেকে কাজ করেছে, তা বিবেকানন্দ নয়, তা স্বয়ং প্রভু৷’’ অলক্ষ্যে থাকিয়া সে শক্তি এখনও ক্রিয়াশীল৷ বর্তমান জগতের বিপরীত ভাবধারার প্রচণ্ড বাধা সত্ত্বেও বিশ্বমনের উপর তাহার প্রভাবের প্রসার অতি ধীর হইলেও অনস্বীকার্য৷
বাহ্যপ্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতি–উভয়কে বশীভূত করিয়া যথার্থ কল্যাণের পথে অগ্রসর হইবার কথা স্বামীজী জগৎকে বলিয়া গিয়াছেন৷ কেবল বাহ্যপ্রকৃতির উপর আধিপত্যলাভে নিবদ্ধদৃষ্টি পাশ্চাত্য জগৎকে তিনি বলিয়াছিলেন যে, এ বিষয়ে সাবধান না হইলে, অন্তঃপ্রকৃতির দিকেও দৃষ্টি না ফিরাইলে, তাহার সভ্যতা আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে চূর্ণ–বিচূর্ণ হইয়া যাইতে পারে৷ পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই দুটি মহাযুদ্ধ তাহার বুকে প্রচণ্ড আঘাত হানিয়াছে, আঘাতে মানব–সভ্যতাকে একেবারে গুঁড়া করিয়া দিবার মতো শক্তিশালী আণবিক বোমার আবিষ্কার এবং প্রয়োগও হইয়া গিয়াছে৷ আজও মানুষ বাহ্যপ্রকৃতির উপর আধিপত্যলাভের জন্য যতখানি প্রয়াসী, অন্তঃপ্রকৃতিকে বশ করিবার জন্য ততখানি নয়৷ আজ মানুষের অন্তঃপ্রকৃতি বীভৎস মূর্তি ধারণ করিয়া বাহ্যপ্রকৃতির বিজয়লব্ধ প্রচণ্ড বিধ্বংসী শক্তিকে বিশ্বমানব–সভ্যতার্ শিরের উপর উদ্যত করিয়া রাখিয়াছে৷ এই ভীষণ দুঃসময়ে মানুষ প্রতিকারের উপায় খুঁজিয়া দিশেহারা৷ ‘শান্তির ললিত বাণী’ বারে বারে ‘ব্যর্থ পরিহাসে’ পরিণত হইতেছে৷ মানুষের অন্তঃপ্রকৃতিকে বশীভূত করিয়া বিশ্বমানবের জন্য তাহার অন্তরে যথার্থ প্রেম, যথার্থ কল্যাণেচ্ছার উদয় না করাইলে, তাহার জীবনকে আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক না রাইলে যে ইহার নির্ভরযোগ্য প্রতিকার ব্যবস্থা করা যাইবে না, ইহা ক্রমশ আমরা বুঝিতেছি৷ স্বামীজীর জীবিতকালে জগতের মহামনীষীরা অনেকে তাঁহার বাণীর যাথার্থ্য হূদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন যত দিন যাইতেছে, তত অধিক সংখ্যক চিন্তাশীল ব্যক্তির দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হইতেছে৷ প্রয়োজনের তুলনায় তাঁহাদের সংখ্যা এখনও খুবই অল্প সন্দেহ নাই৷ তথাপি আমাদের বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে সারা জগতে জনসাধারণের দৃষ্টি স্বামীজী–প্রদর্শিত কল্যাণের পথে আকৃষ্ট হইবেই৷ যত শীঘ্র তাহা হয়, ততই মঙ্গল৷
আধ্যাত্মিকতাকে ভিত্তি করিয়া অগ্রসর হইলে ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সর্বক্ষেত্রেই যে অসীম শক্তির বিকাশ হয়, ভারত তাহা নিজ জাতীয় জীবনে অতি প্রাচীনকাল হইতে দেখাইয়া মানবজাতির পক্ষে মহা কল্যাণকর ভাবগুলি জগতে ছড়াইয়াছে৷ মাঝখানে ধর্মকে জীবনে ঠিকমতো প্রয়োগ করিতে না পারার ফলে প্রাণশক্তিহীন হইয়া যেখানে সে নামিয়া গিয়াছিল, শ্রীরামকৃষ্ণ–বিবেকান্ আবির্ভাবের পর সবলতা লাভ করিয়া সেখান হইতে বহু উচ্চে সে উঠিয়া আসিয়াছে৷ আবার সে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হইতে চলিয়াছে৷ আবার সর্ব বিষয়ে গৌরবের শীর্ষদেশে নিজেকে উন্নীত করিয়া জগৎকে বিশ্বমানবের যথার্থ মঙ্গলময় আদর্শ সে দেখাইবে৷ স্বামীজী বলিয়াছেন এইজন্যই এত বিপরীত পরিবেশের মধ্যে এতদিনের এত আঘাত সহ্য করিয়াও ভারতীয় সভ্যতা এখনও বাঁচিয়া আছে৷ পুণ্যভূমি বলিয়া কি অগাধ শ্রদ্ধা ছিল স্বামীজীর ভারতের প্রতি প্রথমবার পাশ্চাত্যদেশ হইতে প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে একজন ইংরেজ বন্ধু তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘‘স্বামীজী, চার বৎসর বিলাসের লীলাভূমি, গৌরব–মুকুটধারী, মহাশক্তিশালী পাশ্চাত্যভূমিতে ভ্রমণের পর আপনার মাতৃভূমি কেমন লাগিবে?’’ উত্তরে স্বামীজী বলিয়াছিলেন, ‘‘পাশ্চাত্যভূমিতে আসিবার পূর্বে ভারতকে আমি ভালবাসিতাম৷ এখন ভারতের ধূলিকণা পর্যন্ত আমার নিকট পবিত্র, ভারতের বাতাস আমার নিকট এখন পবিত্রতামাখা, ভারত এখন আমার নিকট তীর্থ–স্বরূপ৷’’ স্বামীজী ভারতকে জাগাইয়া যথার্থ উন্নতির পথে অগ্রসর করাইয়া দিয়া গিয়াছেন–‘‘এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আবির্ভাব সূচিত হইতেছে৷ এখনই এক বিশাল বৃক্ষের পূর্বাভাস প্রতীয়মান–তাহার অঙ্কুরোদ্গম হইয়াছে, এমন–কি নবপল্লব উৎত হইয়াছে৷’’ ‘‘যে অন্ধ সে–ই কেবল দেখিতে পাইতেছে না৷ আর যে বিকৃতরুচি, সে তো দেখিয়াও দেখিবে না যে আমাদের দেশমাতৃকা তাঁহার সুদীর্ঘ গভীর প্রসুপ্তি হইতে জাগ্রত হইতেছেন৷ কাহারও সাধ্য নাই জাগরণ রোধ করে৷ জাগ্রত ভারত আর নিদ্রাভিভূত হইবে না... বাহিরের কোন শক্তিই আর ভারতকে দাবাইয়া রাখিতে পারিবে না’’ ‘‘ওঠো জাগো, দীর্ঘ রজনীর অবসান হইতেছে, অরুণোদয় সমাসন্ন৷ প্রাণে প্রাণে বিশ্বাস কর, শ্রীভগবানের অল৯ আদেশে এবার ভারতের অভ্যুদয় অবশ্যম্ভাবী দেশের দুর্গত জনগণের সুখ–সমৃদ্ধির দিন সমাগত৷’’ ‘‘আধ্যাত্মিকতার এক মহাবন্যা আসিতেছে৷ স্পষ্ট দেখিতেছি, এই উদ্দাম, বন্ধনহীন, সর্বগ্রাসী প্লাবন সমগ্র পৃথিবীকে ভাসাইয়া লইয়া যাইবে৷’’ স্বামীজীর দেহত্যাগের পরবর্তিকালীন ভারতের ইতিহাস রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন, ললিতকলা, বিজ্ঞান প্রভৃতি সর্ববিষয়েই বিপুল জাগরণের কাহিনিতে ভরপুর৷
স্বামীজীর আহ্বানে দেশের অগণিত সুসন্তান জাগিয়াছে, আমাদের মাতৃভূমির দুঃখের অবসান ঘটাইবার জন্য তাঁহার সেবায় আত্মোৎসর্গ করিয়াছে৷ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে স্বামীজী বলিয়াছিলেন যে, ‘‘আগামী পঞ্চাশ বৎসর মাতৃভূমিই যেন আমাদের একমাত্র উপাস্যা দেবতা হন৷’’ তাহার ঠিক পঞ্চাশ বৎসর পরেই ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে আমরা মাতৃভূমির ললাট হইতে পরাধীনতার কলঙ্ক কালিমা মুছিয়া দিতে সমর্থ হইয়াছি৷ আর এই মহাকার্য সাধনের জন্য দেশবাসীর জড়তার প্রাচীর ভাঙিয়া তাহাদের প্রাণে দেশাত্মবোধ জাগাইতে যেসব শক্তির তরঙ্গ উঠিয়াছিল, দেখা যায় সেগুলির মধ্যে কয়েকটি মহাশক্তিশালী তরঙ্গ উঠিয়াছে স্বামীজীর আকাি্যত পথ ধরিয়া, ভারতের নিজস্ব আদর্শ আধ্যাত্মিকতাকে কেন্দ্র করিয়া৷ আধ্যাত্মিকতার মূর্ত বিগ্রহ স্বামীজী নিজেই প্রচণ্ড আঘাত হানিয়া ‘বিরাটকায় অজগরের’ ঘুম ভাঙাইলেন৷ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল, রাজনীতি ক্ষেত্রে মৃদুভাবে জাতীয়তাবোধের জাগরণ শুরু হইয়াছিল অগ্ণিযুগে যে মহাশক্তি এই দেশাত্মবোধকে সমগ্র জাতির প্রাণে দাবাগ্ণির মতো ছড়াইয়া দিল, আধ্যাত্মিকতাকে ভিত্তি করিয়াই তাহার উদ্ভব৷ যে সব ‘অভীঃ’ মন্ত্রের পূজারিরা সে মহাযজ্ঞশিখায় হাসিমুখে জীবন আহুতি দিয়াছিলেন, তাঁহাদের প্রেরণার মূল উৎস ছিল স্বামীজীর অগ্ণিগর্ভ বাণী ও গীতা৷ স্বামীজীর মানস–কন্যা ভগিনী নিবেদিতা এই হোমানলের শিখা প্রজ্বলিত রাখিবার জন্য যথেষ্ট প্রেরণার হবি সংগ্রহ করিয়া দিয়াছিলেন৷ দেশাত্মবোধকে যিনি জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করিলেন, সেই মহাত্মাজীর জীবনও আধ্যাত্মিকতা–ভিত্তিক স্বামীজীর এই বাণীর–ই যেন মূর্ত বিগ্রহ তিনি–‘‘বল–মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া সদর্পে ডাকিয়া বল–ভারতবাসী আমার ভাই৷’’ পরে যে অমিত শক্তির তরঙ্গাঘাতে জাতির দুর্বলতার ভিত্তিমূল পর্যন্ত কাঁপিয়া উঠিয়াছিল, সমগ্র জাতির প্রাণে আত্মবিশ্বাসের শিহরণ খেলিয়া গিয়াছিল, তাহাও উঠিয়াছিল নেতাজীর আধ্যাত্মিকতাভিত্তিক ক্ষাত্রবীর্যকে কেন্দ্র করিয়া৷
জাগরণের অন্যান্য বহু ক্ষেত্রেও ভারতের মর্মবাণীর উদাত্ত স্বরই সুস্পষ্ট শোনা যায়৷ রবীন্দ্রনাথের নৈবেদ্য ও গীতাঞ্জলির যে কবিতাগুলি বিশ্বসাহিত্য সভায় ভারতকে গৌরবের আসনে বসাইয়াছে, সেগুলিও ভারতের আধ্যাত্মিকতার বাণী বহন করিতেছে৷ শ্রীরবিন্দের দর্শনও তাই৷
আমাদের যাত্রা সবে শুরু হইয়াছে৷ সুদীর্ঘ বন্ধুর পথ সম্মুখে পড়িয়া৷ ভারতের ভগবানকে, ভারতের ‘চির সারথি’কে আমরা যেন বিস্মৃত না হই, বর্তমান জগতের বহুবিধ মতবাদের ঘূর্ণাবর্তে পড়িয়া আমরা যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হই, সাময়িকভাবেও আদর্শ–নির্ণয়ে ভুল না করি৷ আমরা যেন ভুলিয়া না যাই যে ক্ষাত্রবীর্য ও ব্রহ্মতেজের সমন্বয়েই আমাদের জাতির জীবন গঠন করিয়া জগতে জাতি হিসাবে আদর্শ স্থাপন করিতে হইবে, এ দুটির কোনটিকে বাদ দিয়া নহে জাগতিক উন্নতিতে আমাদের অন্যান্য উন্নতিশীল জাতিগুলির সমকক্ষ হইতে হইবে, আবার সেইসঙ্গে দেবোপম চরিত্রেরও অধিকারী হইতে হইবে৷ জীবনাদর্শ নির্ণয়কালে আমরা যেন স্বামীজীর সতর্কবাণী ভুলিয়া না যাই–‘‘হে ভারত, ভুলিও না–তোমার নারীজাতির আদর্শ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী ভুলিও না তোমার উপাস্য উমানাথ সর্বত্যাগী শঙ্কর ভুলিও না–তোমার বিবাহ, তোমার ধন, তোমার জীবন ইন্দ্রিয়সুখের, নিজের ব্যক্তিগত সুখের জন্য নহে ভুলিও না–তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত ভুলিও না–তোমার সমাজ সে বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র৷’’ তাঁহার স্বদেশ–প্রেমের স্পর্শ যেন চিরসংশ্লিষ্ট থাকে আমাদের জীবনের সঙ্গে–‘‘হে বীর, সাহস অবলম্বন কর, ...সদর্পে ডাকিয়া বল–ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী বল ভাই–ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ, আর বল দিনরাত, ‘হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে আমায় মনুষ্যত্ব দাও মা, আমার দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর’৷’’
‘‘মানুষ হও এবং অপরকে মানুষ হইতে সহায়তা কর৷’’ স্বামীজী এখনো সূক্ষ্ম শরীরে রহিয়াছেন৷ যে ‘মানুষ’ হইতে চাহিবে, মানবসেবায় ব্রতী হইতে চাহিবে, তাহার শিরে বিবেকানন্দের অমোঘ আশীর্বাদ শক্তিরূপে, জ্ঞানরূপে, প্রেমরূপে শতধারে ঝরিয়া পড়িবেই, যিনি বলিয়া গিয়াছেন, ‘‘নিখিল আত্মার সমষ্টিস্বরূপ যে একমাত্র ভগবান বিদ্যমান আছেন এবং যে একমাত্র ভগবানের অস্তিত্বে আমি বিশ্বাসী, সেই ভগবানের পূজার জন্য যেন আমি বারবার জন্মগ্রহণ করি এবং সহস্র যন্ত্রণা ভোগ করি, আর আমার সর্বাধিক উপাস্য দেবতা হবেন আমার পাপী নারায়ণ, আমার তাপী নারায়ণ, আমার সর্বজাতির সর্বজীবের দরিদ্র নারায়ণ৷’’