Cover


১৷ মানুষ আপনাকে চিনতে পারলে ভগবানকে চিনতে পারে৷ ‘আমি কে’ ভালরূপ বিচার করলে দেখতে পাওয়া যায়, ‘আমি’ বলে কোনো জিনিস নেই৷ হাত, পা, রক্ত, মাংস ইত্যাদি—এর কোনটা ‘আমি’? যেমন প্যাঁজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে কেবল খোসাই বেরোয়, সার কিছু থাকে না, সেইরূপ বিচার কল্লে ‘আমি’ বলে কিছুই পাইনে! শেষে যা থাকে, তাই আত্মা—চৈতন্য৷ ‘আমার’ ‘আমিত্ব’ দূর হলে ভগবান দেখা দেন৷
২৷ দুই রকম ‘আমি’ আছে—একটা পাকা ‘আমি’ আর একটা কাঁচা৷ আমার বাড়ি, আমার ঘর, আমার ছেলে—এগুলো কাঁচা ‘আমি’; আর পাকা ‘আমি হচ্ছে—আমি তাঁর দাস, আমি তাঁর সন্তান, আর আমি সেই নিত্য–মুক্ত–জ্ঞানস্বরূপ৷
৩৷ এক ব্যক্তি তাঁকে বলেছিলেন, “আমার এক কথায় জ্ঞান হয়, এমত উপদেশ দিন৷” তিনি বললেন, “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা—এইটি ধারণা কর৷” ইহা বলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন৷
৪৷ শরীর থাকতে আমার ‘আমিত্ব’ একেবারে যায় না, একটু–না–একটু থাকেই; যেমন নারিকেল গাছের বালদো খসে যায়, কিন্তু দাগ থাকে৷ কিন্তু এই সামান্য ‘আমিত্ব’ মুক্ত পুরুষকে আবদ্ধ করতে পারে না৷
৫৷ নেংটা তোতাপুরীকে পরমহংসদেব জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তোমার যে অবস্থা তাতে রোজ ধ্যান করার আবশ্যক কি?” তোতাপুরী উত্তরে বলেছিলেন, “ঘটি যদি রোজ রোজ না মাজা যায়, তা হলে কলঙ্ক পড়ে৷ নিত্য ধ্যান না করলে চিত্ত অশুদ্ধ হয়৷” পরমহংসদেব উত্তরে বল্লেন, “যনি সোনার ঘটি হয়, তা হলে পড়ে না৷” অর্থাৎ সচ্চিদানন্দ লাভ করলে আর সাধনের দরকার নেই ৷
৬৷ বিচার দুই প্রকার জানবে—অনুলোম ও বিলোম৷ যেমন খোলেরই মাঝ ও মাঝেরই খোল৷
৭৷ ‘আমি’–বোধ থাকলে ‘তুমি’–বোধও থাকবে৷ যেমন যার আলো জ্ঞানও আছে; তার অন্ধকার জ্ঞানও আছে; যার পাপ জ্ঞান আছে, তার পুণ্য–জ্ঞানও আছে; যার ভালো–বোধ আছে, তার মন্দ–বোধও আছে৷
৮৷ যেমন পায়ে জুতা পরা থাকলে লোকে স্বচ্ছন্দে কাঁটার ওপর দিয়ে চলে যায়, তেমনি তত্ত্বজ্ঞানরূপ আবরণ করে মন এই কন্টকময় সংসারে বিচরণ করতে পারে৷
৯৷ একজন সাধু সর্বদা জ্ঞানোন্মাদ–অবস্থায় থাকতেন, কারও সহিত বাক্যালাপ করতেন না, লোকেরা তাঁকে পাগল বলে জানত৷ একদিন লোকালয়ে এসে ভিক্ষা করে এনে একটা কুকুরের উপর বসে সেই ভিক্ষান্ন নিজে খেতে লাগলেন ও কুকুরকে খাওয়াতে লাগলেন৷ তাই দেখে অনেক লোক সেখানে এসে উপস্থিত হলো এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে পাগল বলে উপহাস করতে লাগল৷ এই দেখে সেই সাধু লোকদিগকে বলতে লাগলেন, “তোমরা হাসছ কেন?
বিষ্ণুপরি স্থিতো বিষ্ণুঃ
বিষ্ণুঃ খাদতি বিষ্ণবে৷
কথং হসসি রে বিষ্ণো
সর্বং বিষ্ণুময়ং জগৎ৷”
১০৷ যতক্ষণ সেথা সেথা (অর্থাৎ বাহিরে), ততক্ষণ অজ্ঞান; যখন হেথা হেথা (অন্তরের দিকে), তখন জ্ঞান৷ যার হেথায় আছে (অর্থাৎ অন্তরে ভাব আছে), তার সেথায়ও আছে (অর্থাৎ ভগবৎপদে স্থান আছে)৷
১৷ ভগবান সকলকার ভেতর কীরূপে বিরাজ করেন জান? যেমন চিকের ভেতর বড়লোকের মেয়েরা থাকে৷ তারা সকলকে দেখতে পায়, কিন্তু তাদের কেউ দেখতে পায় না; ভগবান ঠিক সেইরূপে বিরাজ করছেন৷
২৷ প্রদীপের স্বভাব আলো দেওয়া; কেউ বা তাতে ভাত রাঁধছে, কেউ জাল করছে, কেউ তাতে ভাগবতপাঠ করছে; সে কি আলোর দোষ? অর্থাৎ কেউ ভগবানের নামে মুক্তিচেষ্টা করছে, কেউ চুরি করতে চেষ্টা করছে; সে কি ভগবানের দোষ?
৩৷ যার যেমন ভাব তার তেমনি লাভ; ভগবান কল্পতরু৷ তাঁর কাছে যে যা চায়, সে তা–ই পায়৷ গরিবের ছেলে লেখাপড়া শিখে হাইকোর্টের জজ হয়ে মনে করে “আমি বেশ আছি৷” ভগবানও তখন বলেন, “তুমি বেশ থাকো৷” তারপর যখন সে পেনশন নিয়ে ঘরে বসে, তখন সে বুঝতে পারে এ–জীবনে কল্লুম কি? ভগবানও তখন বলেন, “তাই তো, তুমি কল্লে কি?”
৪৷ ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ; ব্রহ্ম যখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকেন, তখন তাঁকে শুদ্ধ ব্রহ্ম বলে; আর যখন সৃষ্টি–স্থিতি–প্রলয় ইত্যাদি করেন, তখন তাঁর শক্তির কাজ বলে৷
৫৷ একদিন ঈশ্বরীয় কথাপ্রসঙ্গে মথুরবাবু ঠাকুরকে বলেছিলেন, “ভগবানকেও জগতের নিয়ম মেনে চলতে হয়; তিনি ইচ্ছা করলেই সব করতে পারেন না৷” ঠাকুর বললেন, “তা কেন হবে গো? তিনি ইচ্ছাময়, তিনি ইচ্ছা করলে সব করতে পারেন৷” মথুরবাবু বললেন, “তিনি ইচ্ছা করলে এই লাল জবা ফুলের গাছে কি সাদা জবা করতে পারেন? ঠাকুর বললেন, “তা পারেন বই কি? তাঁর ইচ্ছা হলে এই লাল জবার গাছেই সাদা ফুল ফুটতে পারে৷” কিন্তু মথুরবাবু সে কথায় ততটা যেন বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেননি৷ বাস্তবিকই কয়েকদিন পরে দিখা গেল, দক্ষিণেশ্বরের বাগানে একটা জবা ফুলের গাছে এক ডালে সাদা ও অপর ডালে লাল জবা ফুটে আছে৷ ঠাকুর ডালের গোড়াসুদ্ধ ফুল দুটো এনে মথুরবাবুকে দেখালেন৷ মথুরবাবু মহা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, “বাবা, আর তোমার সঙ্গে তর্ক করব না৷”
৬৷ সাকার এবং নিরাকার কিরূপ জান? যেমন জল আর বরফ৷ যখন জল জমাট বেঁধে থাকে তখনই সাকার; আর যখন গলে জল হয় তখনই নিরাকার৷
৭৷ ভীষ্মদেব দেহত্যাগ করবার সময় শরশয্যায় শয়ন করেছিলেন, তাঁর চক্ষু হতে জল পড়েছিল৷ অর্জুন তা দেখে শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “ভাই, কি আশ্চর্য! পিতামহ, যিনি সত্যবাদী, জিতেন্দ্রীয়, জ্ঞানী ও অষ্টবসুর এক বসু, তিনিও দেহত্যাগের সময় মায়াতে কাঁদছেন!” শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মদেবকে একথা বলাতে তিনি বললেন, “কৃষ্ণ, তুমি বেশ জান আমি সেজন্য কাঁদছি না; এইজন্য কাঁদছি যে, ভগবানের লীলা কিছুই বুঝতে পারি না৷ যে মধুসূদন–নাম জপ করে লোকে বিপদ থেকে উদ্ধার পায়, সেই মধুসূদন স্বয়ং পাণ্ডবদের সারথি সখারূপে রয়েছেন, তবুও পাণ্ডবদের বিপদের শেষ নেই৷”
৮৷ মথুরবাবুর সহিত ৺কাশীধাম দর্শনকালে পরমহংসদেব একদিন ত্রৈলঙ্গস্বামীকে দর্শন করতে যান৷ ঠাকুর স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করেন, “ঈশ্বর তো এক, তবে লোকে বহু বলে কেন?” ত্রৈলঙ্গস্বামী মৌনাবলম্বী ছিলেন, তিনি একটি অঙ্গুলি উপরে তুলে একটু ধ্যানস্থ ভাবের মতো হয়ে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন যে, তাঁকে ধ্যান করে দেখলে বুঝতে পারা যায় যে তিনি একই আর বিচার করতে গেলেই বহু বুদ্ধি এসে পড়ে৷
৯৷ যিনিই হয়েছেন সাকার, তিনিই নিরাকার৷ ভক্তের কাছে তিনিই সাকাররূপে আবির্ভূত হয়ে দর্শন দেন৷ যেমন মহাসমুদ্র—কেবল অনন্ত জলরাশি, কুলকিনারা কিছুই নেই, কেবল কোথাও কোথাও বেশী ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে বরফ হয়েছে দেখা যায়৷ সেইরূপ ভক্তের ভক্তিহিমে সাকাররূপ দর্শন হয়৷ আবার সূর্য উঠলে যেমন বরফ গলে যায় ও পূর্বের ন্যায় যেমন জল তেমনি হয়ে থাকে, তেমনি জ্ঞানসূর্য উদিত হলে সেই সাকাররূপ বরফ গলে জল হয়ে যায় ও সব নিরাকার হয়৷
১৷ মায়ার স্বভাব কেমন জান? যেমন জলের পানা৷ ঢেইয়ে দিলে, সব পানা সরে গেল৷ আবার একটু পরেই আপনাআপনি পুরে এল৷ তেমনি যতক্ষণ বিচার কর, সাধুসঙ্গ কর, যেন কিছুই নেই৷ একটু পরেই বিষয়বাসনা আবরণ করে৷
২৷ সাপের মুখে বিষ আছে; সে যখন আপনি খায় তখন তার বিষ লাগে না, কিন্তু যখন অন্যকে খায়, তখন বিষ লাগে৷ তেমনি ভগবানের মায়া আছে বটে, কিন্তু তাঁকে মুগ্ধ করতে পারে না; অন্যকে সে মায়ায় মুগ্ধ করে৷
৩৷ মায়া কাকে বলে জান?—বাপ, মা, ভাই, ভগ্নী, স্ত্রী, পুত্র, ভাগনে, ভাইপো, ভাইঝি—এই সব আত্মীয়দের প্রতি টান ও ভালবাসা; আর দয়া মানে—সর্বভূতে আমার হরি আছেন এই জেনে সকলকে সমান ভালবাসা৷
৪৷ যাকে ভূতে পায় সে যদি জানতে পারে যে তাকে ভূতে পেয়েছে, তা হলে ভূত পালিয়ে যায়৷ মায়াচ্ছন্ন জীব যদি একবার ঠিক জানতে পারে যে, তাকে মায়ায় আচ্ছন্ন করেছে তা হলে মায়া তার নিকট থেকে তখনই পালায়৷
৫৷ জীবাত্মা–পরমাত্মার মধ্যে এক মায়া–আবরণ আছে৷ এই মায়া–আবরণ না সরে গেলে পরস্পরের সাক্ষাৎ হয় না৷ যেমন অগ্রে রাম, মধ্যে সীতা এবং পশ্চাতে লক্ষ্মণ৷ এস্থলে রাম পরমাত্মা ও লক্ষ্মণ জীবাত্মস্বরূপ, মধ্যে জানকী মায়া–আবরণ হয়ে রয়েছেন৷ যতক্ষণ মা জানকী মধ্যে থাকেন, ততক্ষণ লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান না৷ জানকী একটু সরে পাশ কাটালে তখন লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান৷
৬৷ মায়া দুই প্রকার—বিদ্যা এবং অবিদ্যা৷ তার মধ্যে বিদ্যা এবং অবিদ্যা মায়া দুই প্রকার—বিবেক এবং বৈরাগ্য৷ এই বিদ্যা মায়া আশ্রয় করে জীব ভগবানের শরণাপন্ন হয়৷ আর অবিদ্যা মায়া ছয় প্রকার—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাৎসর্য৷ অবিদ্যা মায়া ‘আমি’ ও ‘আমার’ জ্ঞানে মনুষ্যদিগকে বদ্ধ করে রাখে৷ কিন্তু বিদ্যা মায়ার প্রকাশে জীবের অবিদ্যা একেবারে নাশ হয়ে যায়৷
৭৷ যেমন যতক্ষণ জল ঘোলা থাকে, ততক্ষণ চন্দ্রসূর্যের প্রতিবিম্ব তাতে ঠিক ঠিক দেখা যায় না, তেমনি মায়া অর্থাৎ ‘আমি’ এবং ‘আমার এই জ্ঞান যতক্ষণ না যায়, ততক্ষণ আত্মার সাক্ষাৎকার ঠিক ঠিক হয় না৷
৮৷ যেমন সূর্য পৃথিবীকে আলো করে রেখেছেন, কিন্তু সামান্য এক খণ্ড মেঘ সম্মুখে এসে যদি আবরণ করে ফেলে তা হলে আর সূর্য দৃষ্টিগোচর হন না; সেইরূপ সর্বব্যাপী ও সর্বসাক্ষিস্বরূপ সচ্চিদানন্দকে আমরা সামান্য মায়া–আবরণবশতঃ দেখতে পাচ্ছি না৷
৯৷ পানাপুকুরে নেবে যদি পানাকে সরিয়ে দাও আবার তখন এসে জোটে; সেই রকম মায়াকে ঠেলে দিলেও আবার মায়া এসে জোটে৷ তবে যদি পানাকে সরিয়ে বাঁশ বেঁধে দেওয়া যায়, তা হলে আর বঁাশ ঠেলে আসতে পারে না৷ সেই রকম মায়াকে সরিয়ে দিয়ে জ্ঞান ভক্তি বেড়া দিতে পারলে আর মায়া তার ভেতর আসতে পারে না৷সচ্চিদানন্দই কেবল মাত্র প্রকাশ থাকেন৷
১০৷ দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুরবাড়ির নহবতখানার ওপর একটি সাধু এসে কিছুদিন বাস করেছিলেন৷ সাধু সেই ঘরে কারও সহিত বাক্যালাপ ইত্যাদি কিছু না করে সর্বদা ধ্যানধারণা করতেন৷ একদিন হঠাৎ মেঘ উঠে চারিদিক অন্ধকার করে ফেললে৷ কিছুক্ষণ পরে একটা ঝড়ের মতো খুব বাতাস এসে মেঘগুলিকে আবার সরিয়ে দিলে৷ সাধু তাই দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উক্ত নহবতখানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুব হাসি ও নৃত্য করতে লাগলেন৷ তাই দেখে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি তো ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে থাক—আজ এত আনন্দ নৃত্যাদি করছ কেন?” সাধু বললেন, “সংসারকা মায়া এয়সা হী হ্যায়” প্রথমে পরিষ্কার আকাশ, হঠাৎ মেঘ এসে অন্ধকার করে ফেললে, আবার কিছুক্ষণ পরেই যা ছিল তাই রইল৷
১। বড় বড় বাহাদুরী কাঠ যখন ভেসে আসে, তখন কত লোক তার ওপরে চড়ে চলে যায়৷ তাতে সে ডোবে না৷ সামান্য একখানা কাঠে একটা কাক বসলে অমনি ডুবে যায়৷ তেমনি যখন অবতারাদি আসেন কত শত লোক তাঁকে আশ্রয় করে তরে যায়৷ সিদ্ধ লোক নিজে কষ্টেসৃষ্টে যায় মাত্র৷
২৷ রেলের ইঞ্জিন আপনি চলে যায় ও কত মালবোঝাই গাড়ি টেনে নিয়ে যায়; অবতারেরাও সেই রকম সহ স্র সহ স্র লোকদের ঈশ্বরের নিকট নিয়ে যান৷
১৷ মানুষ—যেমন বালিশের খোল; বালিশের ওপর দেখতে কোনোটা লাল, কোনোটা কাল; কিন্তু সকলের ভেতরে সেই একই তুলো৷ মানুষ দেখতে কেউ সুন্দর; কেউ কালো; কেউ সাধু, কেউ অসাধু; কিন্তু সকলের ভেতর সেই এক ঈশ্বরই বিরাজ করছেন৷
২৷ সংসারে দুরকম স্বভাবের লোক দেখতে পাওয়া যায়—কতকগুলো কুলোর ন্যায় স্বভাববিশিষ্ট আর কতকগুলো চালুনির ন্যায়৷ কুলো যেমন ভূষি প্রভৃতি অসার বস্তু সব পরিত্যাগ করে সার বস্তু যে শস্য সেইগুলি আপনার ভেতরে রাখে, সেইরকম কতকগুলি লোক সংসারের অসার বস্তু (কামকাঞ্চনাদি) পরিত্যাগ করে সার বস্তু ভগবানকে গ্রহণ করে৷ চালুনি যেমন তার বস্তুসকল পরিত্যাগ করে অসার বস্তুগুলি নিজে ভেতর রাখে, সেইরূপ সংসারে কতকগুলি লোক সার বস্তু ঈশ্বরকে পরিত্যাগ করে অসার বস্তু কামকাঞ্চনাদি গ্রহণ করে৷
৩৷ বিষয়ী লোকদের মন গুবরে পোকার মতো৷ গোবরের পোকা গোবরের ভেতর থাকতে ভালবাসে৷ যদি গোবর ছাড়া তাদের কিছু দাও, তাহলে ভাল লাগে না৷ জোর করে যদি পদ্মের ভেতর বসিয়ে দাও তা হলে তারা ছটফঠ করে মরে৷ বিষয়ী লোকেদের মনে সেইরকম বিষয়কথা ছাড়া অন্য কিছু ভাল লাগে না৷ যদি ইশ্বরীয় কথা–প্রসঙ্গ হয় তারা সে স্থান ত্যাগ করে যেখানে বাজে কথা হয় সেখানে গিয়ে বসে৷
৪৷ যেমন কতকগুলো মাছ জলে অটাকালে আদপে পালাতে চেষ্টা করে না, অমনি পড়ে থাকে; আবার কতকগুলি মাছ পালাবার জন্য লম্ফঝম্ফ করে, কিন্তু পালাতে পারে না; আবার একজাতীয় মাছ আছে, যারা জাল ছিঁড়ে পালিয়ে যায়৷ এ সংসারে জীবও সেইরূপ তিন রকমের আছে; যথা—বদ্ধ, মুমুক্ষু ও মুক্ত৷
৫৷ পথে যেতে যেতে রাত হয়ে পড়ায় ও আকাশে মেঘঝড়ের মতো হওয়ায় এক মেছুনী এক মালির বাড়িতে আশ্রয় নেয়৷ মালী ফুলের ঘরের দাওয়ায় তাকে আশ্রয় দিয়ে যথাসাধ্য তার সেবা করলে, কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম হলো না৷ শেষে সে বুঝতে পারলে বাগানে নানা ফুল ফুটেছে ও সেই ফুলের গন্ধে তার ঘুম হচ্ছে না৷ সে তখনি আঁশচুপড়িতে জল ছিটিয়ে মাথার কাছে রেখে ঘুমুল৷ বিষয়ীবদ্ধ জীবেরও মেছুনীর মতো সংসারে পচাগন্ধ ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগে না৷
৬৷ পায়রার ছানার গলায় হাত দিলে যেমন মটর গজ গজ করে, সেইরকম বদ্ধ জীবের সঙ্গে কথা কইলে টের পাওয়া যায়, বিষয়বাসনা তাদের ভেতর গজ গজ করছে৷ বিষয়ই তাদের ভাল লাগে, ধর্মকথা ভাল লাগে না৷
৭৷ যে মুলো খেয়েছে, তার ঢেঁকুরেতেই টের পাওয়া যায়, তেমনি যে ধার্মিক তার সঙ্গে আলাপ কল্লে সে কেবল ধর্মপ্রসঙ্গই করে থাকে; আর যে বিষয়ী, সে বিষয়ের কথাই বলে থাকে৷
৮৷ দুরকমে মাছি আছে—একরকম মধুমাছি, তারা মধু ভিন্ন আর কিছুই খায় না৷ আর একরকম মাছি মধুতেও বসে, আর যদি পচা ঘা পায় তখনি মধু ফেলে পচা ঘায়ে গিয়ে বসে৷ সেই রকম দুই প্রকৃতির লোক আছে—যারা ঈশ্বরানুূরাগী, তারা ভগবানের কথা ছাড়া অন্য প্রসঙ্গ করতেই পারে না; আর যারা সংসারাসক্ত জীব, তারা ঈশ্বরীয় কথা শুনতে শুনতে যদি কেহ কাম–কাঞ্চনের কথা কয়, তা হলে ঈশ্বরীয় কথা ফেলে তখনই তাতে মত্ত হয়৷
৯৷ বদ্ধ জীব হরিনাম আপনিও শোনে না, পরকেও শুনতে দেয় না, ধর্ম ও ধার্মিকদের নিন্দা করতে থাকে, কেহ ধ্যান–ধারণা করলে তাকে নানা প্রকার ঠাট্টা করে৷
১০৷ যেমন কুমীরের গায়ে অস্ত্র মারলে অস্ত্র ঠিকরে পড়ে যায়—তার গায়ে কিছুতেই লাগে না, তেমনি বদ্ধ জীবের কাছে ধর্মকথা যতই বল না কেন, কিছুতেই তাদের প্রাণে লাগাতে পারবে না৷
১১৷ সূর্যের কিরণ সব জায়গায় সমান পড়লেও জলের ভেতর—আরশিতে ও সকল স্বচ্ছ জিনিসের ভেতর বেশী প্রকাশ দেখায়৷ ভগবানের বিকাশ সকল হূদয়ে সমান হলেও সাধুদের হূদয়ে বেশী প্রকাশ পওেযা যায়৷
১২৷ সকল পিঠের এঁটেল একপ্রকার হলেও পুরের যেমন প্রভেদ থাকে—কারও ভেতর নারকেলের পুর, কারও ভেতর ক্ষীরের পুর ইত্যাদি, সেইরূপ মানুষ সব একজাতীয় হলেও গুণে স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে৷
১৩৷ জল সব নারাযণ বটে, কিন্তু সকল জল পান করা যায় না৷ সকল স্থানে ঈশ্বর আছেন বটে, কিন্তু সকল জায়গায় যাওয়া যায় না৷ যেমন কোনো জলে পা ধোয় যায়, কোনো জলে মুখ ধোয়া যায়, কোনো জল বা খাওয়া যায়, আবার কোনো কোনো জল ছোঁওয়া পর্যন্ত যায় না, তেমনি কোনো কোনো জয়গায় যাওয়া যায় ও কোনো জায়গায় দূরে থেকে গড় করে পালাতে হয়৷
১৪৷ বাঘের ভেতরেও ঈশ্বর আছেন সত্য বটে, কিন্তু বাঘের সুমুখে যাওয়া উচিত নয়৷ কুলোকের মধ্যেও ঈশ্বর আছেন সত্য, কিন্তু কুলোকের সঙ্গ করা উচিত নয়৷
১৫৷ গুরু এক শিষ্যকে উপদেশ দিয়ে বল্লেন, “সকল পদার্থই নারায়ণ” শিষ্যও তাই বুঝলেন৷ একদিন পথের মধ্যে একটি হাতী আসছিল, ওপর হতে মাহুত বললে “সরে যাও৷” শিষ্য ভাবলে, “আমি সরে যাব কেন? আমিও নারায়ণ, হাতীও নারায়ণ, নারায়ণের কাছে নারায়ণের ভয় কি?” সে সরল না৷ শেষে হাতী শুঁড়ে করে তাকে দূরে ফেলে দিলে, তাতে তার বড় ব্যাথা লাগল৷ পরে সে গুরুর কাছে সে সমস্ত ঘটনা জানালে গুরু বললেন, “ভাল বলেছ—তুমি নারায়ণ, হাতীও নারায়ণ, কিন্তূ ওপর থেকে মাহুতরূপী নারায়ণ তোমাকে সাবধান হতে বলেছিলেন, তুূমি মাহুত নারায়ণের কথা শুনলে না কেন?
১৬৷ সতের রাগ কি রকম জান? যেমন জলের দাগ৷ জলে একটা দাগ দিলে তখনই যেমন আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি সতের রাগ হয় আর তখনি থেমে যায়৷
১৭৷ ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মালে সব ব্রাহ্মণ হয় বটে, কিন্তু কেউ খুব পণ্ডিত হয়, কেউ ঠাকুরপূজো করে, কেউ বা ভাত রাঁধে এবং কেউ বা বেশ্যার দ্বারে গড়াগড়ি যায়৷
১৮৷ যেমন কষ্টিপাথরে সোনা কি পিতল দাগ দেওয়া মাত্র ধরা যায়, তেমনি ভগবানের নিকট সরল কিংবা কপট পরীক্ষা হয়ে থাকে৷
১৯৷ মানুষ দুরকম—মানুষ ও মানহুঁশ৷ যাঁরা ভগবানের জন্য ব্যাকুল তাঁদের মানহুঁশ বলে; আর যারা কামিনী–কাঞ্চনরূপ বিষয় নিয়ে মত্ত, তারা সব সাধারণ মানুষ।
২০৷ বদ্ধ সংসারী লোকের কিছুতেই আর হুঁশ হয় না৷ সংসারে নানা দুঃখকষ্ট ও বিপদে পড়েও তবু তাদের চৈতন্য হয় না৷ যেমন উট কাঁটা ঘাস খেতে ভালবাসে, খেতে খেতে মুখ দিয়ে রক্ত দর দর করে পড়ে, তবুও সে কাঁটা ঘাস খেতে ছাড়বে না; তেমনি সংসারী লোকেরা কত যে শোক–তাপ পায়, কিছু দিনের পরই আবার যেমন তেমনি৷
২১। মুখহলসা ভেতরবুঁদে, কানতুলসে,
দীঘল–ঘোমটা নারী৷
আর পানাপুকুরের শীতল জল
বড় মন্দকারী৷৷
—এইরকম লক্ষণ যাদের আছে, সেই সব লোকের কাছ থেকে সাবধান থাকবে৷
১৷ গুরু এক কিন্তু উপগুরু অনেক হতে পারে৷ যাঁর কাছে কিছু শিক্ষা পাওয়া যায়, তাঁকেই উপগুরু বলা যেতে পারে৷ ভাগবতে আছে, অবধূত এইরূপ ২৪ টি উপগুরু করেছিল৷
২৷ একদিন মাঠের ওপর দিয়ে যেতে যেতে অবধূত দেখতে পেলে সামনে ঢাক ঢোল বাজাতে বাজাতে খুব জাঁকজমক করে একটি বর আসছে, আর এক দিকে এক ব্যাধ একমনে আপনার লক্ষ্যের দিকে চেয়ে আছে, এত জাঁক করে যে বর আসছে, সেদিকে একবারও চেয়ে দেখছে না! অবধূত সেই ব্যাধকে নমস্কার করে বললে, “তুমি আমার গুরু৷ যখন আমি ভগবানের ধ্যানে বসব তখন যেন তাঁর প্রতি ঐরূপ লক্ষ্য থাকে৷”
৩৷ একজন মাছ ধরছে, অবধূত তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, “ভাই, অমুক জায়গা কোন পথ দিয়ে যাব?” সে ব্যাক্তির ফাতনায় তখন মাছ খাচ্ছে; সে তার কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে একমনে ফাতনার দিকে তাকিয়ে রইল৷ মাছ গেঁথে তখন পেছন ফিরে বললে, “আপনি কি বলছেন?” অবধূত প্রণাম করে বললে, “আপনি আমার গুরু, আমি যখন আপনার ইষ্টের ধ্যানে বসব, তখন যেন এরূপ কাজ শেষ না করে অন্যদিকে মন না দিই৷”
৪৷ একটা চিল একটা মাছ মুখে করে আসছে, তাই দেখে শত শত কাক–চিল তার পেছনে লাগল৷ তাকে ঠুকরে কামড়ে বিরক্ত করে কেড়ে নেবার চেষ্টা করলে৷ সে যেখানে যায় সব কাক–চিলগুলো চেঁচাতে চেঁচাতে তার পেছনে যেতে আরম্ভ করলে৷ শেষে সে বিরক্ত হয়ে মাছটা ফেলে দিলে, আর একটা চিল এসে যেমন নিলে, সব কাক–চিলগুলো প্রথম চিলটাকে ছেড়ে তার পেছনে যেতে লাগল৷ প্রথম চিলটি নিশ্চিন্ত হয়ে এক গাছের ডালে চুপ করে বসে রইল৷ অবধূত সেই চিলের নিরপদ অবস্থা দেখে প্রণাম করে বললে, “এ সংসারে উপাধি ফেলে দিতে পারলেই শান্তি, নতুবা মহা বিপদ৷”
৫৷ একটি জলাশয়ে এক বক আস্তে আস্তে একটা মাছের দিকে লক্ষ্য করে ধরতে যাচ্ছে, পেছনে এক ব্যাধ সেই বকটিকে লক্ষ্য করছে, কিন্তু, বক সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না৷ অবধূত সেই বককে নমস্কার করে বললে, “আমি যখন ধ্যান করতে বসব, তখন যেন ঐরকম চেয়ে না দেখি৷”
৬৷ অবধূতের আর একটি ছিল মৌমাছি৷ মৌমাছি অনেক দিন ধরে কষ্ট করে মধু সঞ্চয় করতে লাগল৷ কোথা থেকে একজন মানুষ এসে চাক ভেঙ্গে মধু খেয়ে গেল৷ তার অনেক দিন ধরে সঞ্চয়ের ধন সে উপভোগ করতে পারলে না৷ অবধূত তা দেখে মধুকরকে নমষ্কার করে বললে, “ঠাকুর, তুমি আমার গুরু, সঞ্চয় করলে পরিণামে কি হয় আমি তা তোমার নিকট হতে শিখলাম৷”
৭৷ “গুরু মিলে লাখ লাখ, চেলা না মিলে এক৷” উপদেষ্টা অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু উপদেশমত কার্য করে, এইরূপ লোক অত অল্প মেলে৷
৮৷ যদি কারও ঠিক ঠিক অনুরাগ আসে ও সে সাধন–ভজনের প্রয়োজন মনে করে তা হলে নিশ্চয়ই তিনি তার সদগুরু জুটিয়ে দেন; গুরুর জন্য সাধকের চিন্তা করবার দরকার নেই৷
৯৷ বৈদ্য তিন প্রকার—উত্তম, মধ্যম ও অধম৷ যে বৈদ্য এসে কেবল নাড়ী টিপে ‘ঔষধ খেও’ বলে চলে যায় রোগী ঔষধ খেলে কি ন খেলে তার কোনো খোঁজ–খবর না নেয়, সে অধম বৈদ্য৷ আর যে বৈদ্য রোগী ঔষধ খাচ্ছে না দেখে অনেক মিষ্টি কথায় বুঝায় ও ‘ঔষধ খেলে ভাল হবে’ ইত্যাদি বলে, সে মধ্যম বৈদ্য৷ আর যে বৈদ্য রোগী কিছুতেই খাচ্ছে না দেখে বুকে হাঁটু দিয়ে জোর করে ঔষধ খাওয়ায়, সে–ই উত্তম বৈদ্য৷ সেইরূপ যে গুরু বা আচার্য ধর্ম শিক্ষা দিয়ে শিষ্যের কোনো খোঁজ–খবর না নেন সে গুরু বা আচার্য অধম; আর যিনি শিষ্যদের মঙ্গলের জন্য বারবার বুঝাতে থকেন যাতে তাঁর উপদেশ সব ধারণা করতে পারে এবং ভালবাসা দেখান, তিনি মধ্যম গুরু৷ আর শিষ্যেরা ঠিক ঠিক শুনছে না বা পালন করছে না দেখে যে আচার্য খুব জোর–জবরদস্তি পর্যন্ত করেন, তিনি উত্তম আচার্য৷
১৷ শাস্ত্র বিচার কতদিন দরকার, জান? যতদিন না সচ্চিদানন্দ সাক্ষাৎকার হন৷ যেমন ভ্রমর যতক্ষণ না ফুলে বসে, ততক্ষণ গুন গুন করতে থাকে, আর যখন ফুলের উপর বসে মধুপান করতে থাকে, তখন একেবারে চুপ—কোনও শব্দ করে না৷
২৷ একদিন স্বর্গীয় মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেন দক্ষিণেশ্বরে পরমহংসরদবের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “অনেক পণ্ডিত লোক বিস্তর শাস্ত্রাদি পাঠ করেন, কিন্তু তাঁদের জ্ঞানলাভ হয় না কেন?” পরমহংসদেব উত্তরে বললেন, “যেমন চিল, শকুনি অনেক উঁচুতে ওড়ে কিন্তু তাদের দৃষ্টি থাকে গো–ভাগাড়ে, তেমনি অনেক শাস্ত্র পাঠ করলে কি হবে? তাদের মন সর্বদা কাম–কাঞ্চনে আসক্ত থাকার দরুণ জ্ঞানলাভ করতে পারে না৷”
৩৷ ঠাকুর বলতেন—গ্রন্থ নয়, গ্রন্থি—গাঁট৷ বিবেক–বৈরাগ্যর সহিত বই না পড়লে পুস্তকপাঠে দাম্ভিকতা, অহঙ্কারের গাঁট বেড়ে যায় মাত্র৷
৪৷ পরমহংসদেব কোনো এক তার্কিক লোককে বলেছিলেন, “যদি এক কথায় বুঝতে পার তো আমার কাছে এস, আর খুব তর্ক–যুক্তি করে যদি বুঝত চাও তো কেশবের (কেশবচন্দ্র সেন) কাছে যেও৷”
৫৷ যেমন খালি গাড়ুতে জল ভরতে গেলে ভক্ ভক্ করে শব্দ হয়, কিন্তুু ভরে গেলে আর শব্দ হয় না, তেমনি যার ভগবান লাভ হয়নি সে–ই ভগবান সম্বন্ধে নানা গোল করে, আর যে তাঁর দর্শন লাভ করেছে সে স্থির হয়ে ঈশ্বরানন্দ উপভোগ করে৷
৬৷ বিবেক–বৈরাগ্য না থাকলে শাস্ত্র পড়া মিছে৷ বিবেক–বরাগ্য ছাড়া ধর্মলাভও হয় না৷ এইটি সৎ আর এইটি অসৎ বিচার করে সদ্বস্তু গ্রহণ করা, আর দেহ অলোদা আর আত্মা অলোদা—এইরূপ বিচার–বুদ্ধির নাম বিবেক; বিষয়ে বিতৃষ্ণার নাম বৈরাগ্য৷
৭৷ পাঁজিতে বিশ আড়া জল লেখা আছে, কিন্তু পাঁজি নেংড়ালে এক ফোঁটাও জল বেরোয় না, তেমনি পুঁথিতে অনেক ধর্মকথা লেখা আছে—শুধু পড়লে ধর্ম হয় না—সাধন চাই৷
৮৷ এক বাগানে দুজন লোক বেড়াতে গিছল; তার ভেতর যার বিষয়–বুদ্ধি বেশী সে বাগানে ঢুকেই কটা আম গাছ, কোন গাছে কত আম হয়েছে, বাগানটির দাম কত হতে পারে ইত্যাদি নানা রকম বিচার করতে লাগল৷ আর একজন বাগানের মালিকের সঙ্গে আলাপ করে গাছতলায় বসে একটি একটি করে আম পাড়তে লাগল৷ বল দেখি কে বুদ্ধিমান? আম খাও পেট ভরবে, কেবল পাতা গুণে অত হিসাব–কিতাব করে লাভ কি? যাঁরা জ্ঞানাভিমানী, তাঁরা শাস্ত্র–মীমাংসা, তর্কর্–যুক্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন; বুদ্ধিমান ভক্তেরা ভগবানের কৃপা লাভ করে এ সংসারে পরমানন্দ ভোগ করেন৷
৯৷ যেমন হাটের বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে কেবল একটা হো হো শব্দ শোনা যায়, কিন্তু যতক্ষণ লোক ভেতরে প্রবেশ না করে সেই হো হো শব্দ স্পষ্টরূপে বোঝা যায় না; ভেতরে প্রবেশ করে দেখে—কেউ বা দরদস্তুর করছে, কেউ বা পয়সা দিচ্ছে আর জিনিস কিনছে, ইত্যাদি৷ তেমনি ধর্মজগতের বাইরে থেকে ধর্মের ভাব কিছু বুঝতে পারা যায় না৷
১০ সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়েছে, কেবল এক ব্রহ্ম আজ পর্যন্ত উচ্ছিষ্ট হননি৷ বেদ পুরাণ ইত্যাদি সব মানুষের মুখ দিয়ে বের হয়ে উচ্ছিষ্ট হয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত ব্রহ্ম যে কি বস্তু তা কেউ মুখে বলতে পারেনি৷
১১৷ যেমন বালককে রমণসুখ বোঝানো যায় না, সেই রকম বিষয়সক্ত মায়ামুগ্ধ সংসারী জীবকে ব্রহ্মানন্দ বোঝানো যায় না৷
১২৷ “নাক তেরে কেটে তাক” বোল মুখে বলা সহজ, হাতে বাজানো কঠিন৷ সেই রকম ধর্মকথা বলা সোজা, কাজে করা বড় কঠিন৷
১৩৷ রামচন্দ্র নামক এক জটাজূটধারী ব্রহ্মচারী একদিন ঠকুরকে দক্ষিণেশ্বরে দর্শন করতে এসেছিলেন৷ তিনি বসে অন্য কোন কথাবার্তা না বলে কেবল ‘শিবোহহম’ ‘শিবোহহম’ করতে লাগলেন৷ ঠাকুর খানিক্ষণ চুপ করে থকে অবশেষে বল্লেন, “কেবল ‘শিবোহহম’ ‘শিবোহহম’ করলে কি হবে? যখন সেই সচ্চিদানন্দ শিবকে হূদয়ে ধ্যান করে তন্ময় হয়ে গিয়ে বোধে বোধ হয়, সেই অবস্থায় বলা চলে৷ তা ছাড়া শুধু মুখে ‘শিবোহহম’ বল্লে কি হবে? যতক্ষণ তা না হয়, ততক্ষণ সেব্য–সেবক–ভাবে থাকাই ভাল৷” ঠাকুরের এইরূপ নানা উপদেশে ব্রহ্মচারীর চৈতন্য হলো এবং তিনি নিজের ভ্রম বুঝতে পারলেন৷ যাবার সময় দেওয়ালের গায়ে লিখে রেখে গেলেন, “স্বামি–বাক্যে আজ হতে রামচন্দ্র ব্রহ্মচারী সেব্য–সেবক–ভাব প্রাপ্ত হলো৷”
১৷ লুকোচুরি খেলায় যেমন বুড়ী ছুঁলে চোর হয় না, সেই রকম ভগবানের পাদপদ্ম ছুঁলে আর সংসারে বদ্ধ হয় না৷ যে বুড়ী ছুঁয়েছে তাকে আর চোর করবার যো নেই৷ সংসারে সেই রকম যিনি ঈশ্বরকে আশ্রয় করেছেন, তাঁকে আর কোনো বিষয়ে আবদ্ধ করতে পারে না৷
২৷ পাড়াগাঁয়ে মাছ ধরবার জন্য বিলের ধারে এবং মাঠে ঘুনি পাতে৷ ঘুনির ভেতর চিক্ চিক্ করে জল যায় দেখে ছোট ছোট মাছগুলি আনন্দে তার ভেতরে চলে যায়, তারা আর বার হতে পারে না, সেইখানে আটকে যায়, পরে একবারে প্রাণে মরে৷ দুটো একটা মাছ ঘুনির নিকটে গিয়ে ঐ দেখে একেবারে লাফিয়ে অন্যদিকে চলে যায়৷ সংসারেও বাহ্য চাকচিক্য দেখে লোকে সাধ করে প্রবেশ করে, পরে মায়ামোহে জড়িয়ে দুঃখকষ্ট পেয়ে নাশ পায়; আর যাঁরা এই সব দেখে কামকাঞ্চনে আসক্ত না হয়ে ভগবানের পাদপদ্ম আশ্রয় করেন তাঁরাই যথার্থ সুখ ও আনন্দ পান৷
৩৷ রামপ্রসাদ বলেছিলেন, এ সংসার ধোঁকার টাটি৷ কিন্তু হরিপাদপদ্মে ভক্তি লাভ করতে পারলে এই সংসারই আবার হয়
“—মজার কুটী৷
আমি খাই দাই আর মজা লুটি৷৷
জনক রাজা মহাতেজা তার কিসে ছিল ত্রুটি৷
সে এদিক ওদিক দুদিক রেখে খেয়েছিল
দুধের বাটি৷৷”
৪৷ এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, “সংসারে থেকে ঈশ্বর–উপাসনা কি সম্ভব?” পরমহংসদেব একটু হেসে বললেন, “ও দেশে দেখেছি, সব চিড়ে কোটে; একজন স্ত্রীলোক এক হাতে ঢেঁকির গড়ের ভেতর হাত দিয়ে নাড়ছে, আর এক হাতে ছেলে কোলে নিয়ে মাই খাওয়াচ্ছে, ওর ভেতর আবার খদ্দের আসছে, তার সঙ্গে হিসাব করছে—‘তোমার কাছে ওদিনের এত পাওনা আছে, আজকের এত দাম হলো৷’ এই রকম সে সব কাজ করছে বটে, কিন্তু তার মন সর্বক্ষণ ঢেঁকির মুষলের দিকে আছে: সে জানে যে ঢেঁকিটি হাতে পড়ে গেলে হাতটি জন্মের মতো যাবে৷ সেইরূপ সংসারে থেকে সকল কাজ কর; কিন্তু মন রেখো তাঁর প্রতি৷ তাঁকে ছাড়লে সব অনর্থ ঘটবে৷
৫৷ সংসারের মধ্যে বাস করে যিনি সাধনা করতে পারেন, তিনিই ঠিক বীর সাধক৷ বীরপুরুষ যেমন মাথায় বোঝা নিয়ে আবার অন্য দিকে তাকাতে পারে, বীর সাধক তেমনি এ সংসারের বোঝা ঘাড়ে করে ভগবানের পানে চেয়ে থাকে৷
৬৷ হিন্দুস্থানী মেয়েরা মাথায় করে ৪৷৫ টি জলভরা কলসী নিয়ে যায়৷ পথে আত্মীয় লোকদের সঙ্গে গল্প করে, সুখ–দুঃখের কথা কয়, কিন্তু তাদের মন থাকে মাথার কলসীর ওপর, যেন সেটি পড়ে না যায়৷ ধর্মপথের পথিকদেরও সকল অবস্থার ভেতরে ঐ রকম দৃষ্টি রাখতে হবে, মন যেন তাঁর পথ থেকে পড়ে না যায়৷
৭৷ বাউল যেমন দুহাতে দরকম বাজনা বাজায় ও মুখে গান করে, হে সংসারী জীব! তোমরাও তেমনি হাতে সমস্ত কাজকর্ম কর, কিন্তু মুখে সর্বদা ঈশ্বরের নাম জপ করতে ভুলো না৷
৮৷ নষ্ট স্ত্রীলোক যেমন আাত্মীয়–স্বজনের মধ্যে থেকে সংসারের সব কাজ করে কিন্তু মন পড়ে থাকে উপপতির ওপর—সে কাজ করতে করতে সর্বদা ভাবে যে কখন তার সঙ্গে দেখা হবে; তোমাদেরও সংসারের কাজ করতে করতে মন সর্বদা যেন সর্বদা ভগবানের দিকে পড়ে থাকে৷
৯৷ নির্লিপ্তভাবে সংসার করা কি রকম জান? পাঁকাল মাছের মতন৷ পাঁকাল মাছ যেমন পাঁকের মধ্যে থাকে কিন্তু তার গায়ে পাঁক লাগে না৷
১০৷ দাঁড়িপাল্লার যে দিক্ ভারী হয় সেই দিক্ ঝুঁকে পড়ে, আর যে দিক্ হাল্কা হয় সেই দিক্ ওপরে উঠে যায়৷ মানুষের মন দঁাড়িপাল্লার ন্যায়—তার এক দিকে সংসার, আর এক দিকে ভগবান৷ যার সংসার, মান–সম্ভ্রম, ইত্যাদির ভার বেশী হয়, তার মন ভগবান থেকে উঠে গিয়ে সংসারের দিকে ঝুঁকে পড়ে; আর যার বিবেক–বৈরাগ্য ও ভগবদ্ভক্তির ভার বেশী হয়, তার মন সংসার থেকে উঠে গিয়ে ভগবানের দিকে ঝুঁকে পড়ে৷
১১৷ একজন সমস্ত দিন ধরে আখের ক্ষেতে জল ছেঁচে শেষে ক্ষেতে গিয়ে দেখল যে এক ফোঁটা জলও ক্ষেতে যায়নি, দুরে কতকগুলি গর্ত ছিল তা দিয়ে সমস্ত জল অন্যদিকে বেরিয়ে গেছে৷ সেই রকম যিনি বিষয় বাসনা, সাংসারিক মান–সম্ভ্রম ইত্যাদির দিকে মন রেখে সাধন করেন, শেষে দেখতে পাবেন যে ঐ সকল বাসনারূপ ছেঁদা দিয়ে তাঁর সমুদয় বেরিয়ে গেছে৷
১২৷ বালক যেমন এক হাত দিয়ে খোঁটা ধরে বন বন করে ঘুরতে থাকে, একবারও ভয় করে না, কিন্তু তার মন সেই খেঁাটার দিকে সর্বদা পড়ে আছে—সে মনে জানে যে, খোঁটাটি ছাড়লেই আমি পড়ে যাব; সংসারেও সেই রকম ভগবানের দিকে মন রেখে সকল কাজ কর, কিন্তু মন যেন তাঁর প্রতি সর্বদা থাকে; তা হলে নিরাপদে থাকবে৷
১৩৷ সংসারে সুখের লোভে অনেকে ধর্মকর্ম করে থাকে, একটু দুঃখকষ্ট পেলে কিংবা মরবার সময় তারা সব ভুলে যায়; যেমন টিয়া পাখি এমনে সমস্ত দিন রাধাকৃষ্ণ বলে, কিন্তু বেড়ালে যখন ধরে, তখন রাধাকৃষ্ণ ভুুলে গিয়ে নিজের বোল ‘ক্যাঁ ক্যাঁ’ করতে থাকে৷
১৪৷ জলে নৌকা থাকে ক্ষতি নেই, কিন্তু নৌকার ভেতর যেন জল না ঢোকে, তা হলে ডুবে যাবে৷ সাধক সংসারে থাকুক ক্ষতি নেই কিন্তু সাধকের মনের ভেতর যেন সংসারভাব না থাকে৷
১৫৷ সংসার কেমন? যেমন আমড়া—শাঁসের সঙ্গে খোঁজ নেই, কেবল আঁটি আর চামড়া; খেলে হয় অম্লশূল৷
১৬৷ যেমন কাঁঠাল ভাঙতে গেলে লোকে আগে বেশ করে হাতে তেল মেখে নেয় তা হলে আর হাতে কাঁঠালের আঠা লাগে না; তেমনি এই সংসাররূপ কাঁঠালকে যদি জ্ঞানরূপ তেল হাতে মেখে সম্ভোগ করা যায়, তা হলে কামিনীকাঞ্চনরূপ আঠার দাগ আর মনে লাগতে পারবে না৷
১৭৷ সাপকে ধরতে গেলে তখনই তাকে দংশন করে দেবে, কিন্তু যে ব্যক্তি ধুলোপড়া জানে, সে সাতটা সাপকে ধরে গলায় জড়িয়ে বেশ খেলা দেখাতে পারে; তেমনি বিবেকবরাগ্যরূপ ধুলোপড়া শিখে কেউ যদি সংসার করে, তাকে আর সাংসারিক মায়া–মমতায় অবদ্ধ করতে পারে না৷
১৮৷ ভেতরে যার যে ভাব থাকে, তার কথবার্তায় তা বেরিয়ে পড়ে; যেমন মূলো খেলে তার ঢেকুরে মূলোর গন্ধ বেরোয়৷ তেমনি সংসারী লোকেরা সাধুসঙ্গ করতে এসে বিষয়ের কথাই বেশি কয়ে থাকে৷
১৯৷ মন সব জানবে৷ জ্ঞানই বলো আর অজ্ঞানই বলো, সবই মনের অবস্থা৷ মানুষ মনেই বদ্ধ ও মনেই মুক্ত, মনেই সাধু এবং মনেই অসাধু, মনেই পাপী ও মনেই পুণ্যবান৷ সংসারী জীব মনেতে সর্বদা ভগবানকে স্মরণ–মনন করতে পারলে তাদের আর অন্য কোনো সাধনের দরকার হয় না৷
২০৷ জ্ঞানলাভ হলে তারা সংসারে কীরকম ভাবে থাকে জান? যেমন সার্সির ঘরে বসে থাকলে ভেতরের ও বাহিরের—দুই দেখতে পায়৷
২১৷ গীতা পড়লে যা হয় আর দ্বাদশবার ‘গীতা’ উচ্চারণ করলে তাই বোঝায়, যেমন—‘গী তাগী তাগী তাগী’৷ কি না হে জীব! সব ত্যাগ করে ভগবানের পাদপদ্ম আশ্রয় করো৷
১৷ যেমন আম, পেয়ারা ইত্যাদি আস্ত ফল ঠাকুরের সেবায় ও সকল কাজে লাগতে পারে কিন্তু একবার কাকে ঠুক্রে দাগী করলে আর দেবসেবায় সে ফল দেওয়া যায় না, ব্রাহ্মণকে দান করা যেতে পারে না, আপনিও খাওয়া উচিত নয়; সেইরূপ পবিত্রহূদয় বালক ও যুবাদের ধর্মপথে লয়ে যাবার চেষ্টা করা উচিত৷ কেন না তাদের ভেতর বিষয়–বুদ্ধি একেবারে প্রবেশ করেনি৷ একবার বিষয়–বুদ্ধি ঢুকলে পরমার্থ পথে লয়ে যাওয়া ভার৷
২৷ আমি ছেলেদের এত ভালবাসি কেন জান? ছেলেবেলা তাদের মন ষোল আনা নিজের কাছে থাকে, ক্রমে ভাগ হয়ে পড়ে৷ বে’ হলে আট আনা স্ত্রীর উপর যায়, ছেলে হলে আবার চার আনা তাদের প্রতি যায়, বাকি চার আনা ম–বাপ, মান–সম্ভ্রম, বেশভূষা ইত্যাদিতে চলে যায়; এইজন্য ছেলেবেলায় যারা ঈশ্বরলাভের চেষ্টা করে তারা সহজে তাঁকে লাভ করতে পারবে৷ বুড়োদর হওয়া বড় কঠিন৷
৩৷ যেমন টিয়া পাখীর গলায় কাঁটি উঠলে আর পড়ে না, ছেলেবেলায় শেখালে শীঘ্র পড়ে, তেমনি বুড়ো হলে সহজে ঈশ্বরে মন যায় না, ছেলেবেলায় তাদের মন অল্পতেই স্থির হয়৷
৪৷ একসের দুধে এক ছটাক জল থাকলে সহজে অল্প জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করা যায়৷ কিন্তু এক সের দুধে তিন পোয়া জল থাকলে সহজে ক্ষীর হয় না, অনেক কাঠ–খড় পুড়িয়ে জ্বাল দিতে হয়, তবে হয়; সেই রকম বালকের মনে বিষয়–বাসনা খুব কম, এইরূপ যে একটুতে ইশ্বরের দিকে যায়, কিন্তু বুড়োদের মনে বিষয়–বাসনা গজ গজ করে; তাইতে তাদের মন সহজে তাঁর দিকে যায় না৷
৫৷ যেমন কচি বাঁশ অতি সহজে নোয়ানো যায়, পাকা বাঁশ নোয়াতে গেলে ভেঙ্গে যায়, তেমনি ছেলেদের মন সহজে ঈশ্বরে নিয়ে যাওয়া যায়; কিন্তু বুড়োদের মন সহজে ঈশ্বরের দিকে টানতে গেলে ছেড়ে পালায়৷
৬৷ মানুষের মন যেন সরষের পাঁটলী৷ সরষের পাঁটলী একবার ছড়িয়ে গেলে যেমন কুড়ানো ভার হয়ে উঠে, তেমনি মানুষের মন একবার সংসারে ছড়িয়ে গেলে তখন স্থির করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে৷
৭৷ সূর্যোদয়ের পূর্বে দধি মন্থন করলে যেমন উত্তম মাখন উঠে থাক, বেলা হলে কিন্তু আর ভাল মাখন তোলা যায় ন৷; সেইরূপ বাল্যকালে যারা ঈশ্বরানুরাগী হয় ও সাধন–ভজন করে, তাদের ঈশ্বরলাভ হয়ে থাকে৷
৮৷ বাসনাহীন মন কেমন জান? যেন শুকনো দেশলাই—একবার ঘষলে দপ করে জ্বলে উঠে৷ আর ভিজে হলে ঘষতে ঘষতে কাঠি ভেঙ্গে গেলেও জ্বলে না৷ সেই মত সরল, সত্যনিষ্ঠ, নির্মল–স্বভাব লোককে একবার উপদেশ দিলেই ঈশ্বরানুরাগের উদয় হয়৷ বিষয়াসক্ত ব্যক্তিকে শত শতবার উপদেশ করলেও কিছু হয় না৷
১৷ দুই রকমের সাধক দেখা যায়—যেমন, বাঁদরের ছানা এবং বিল্লীর ছানা৷ বাঁদরের ছানা আগে তার মাকে ধরে, পরে তার মা তাকে সঙ্গে করে যেখানে সেখানে নিয়ে বেড়ায়৷ বেড়ালের ছানা কেবল এক জায়গায় বসে মিউ মিউ করতে থাকে, তার মা যখন যেখানে ইচ্ছা হয় ঘাড়ে ধরে নিয়ে যায়৷ তেমনি জ্ঞানী বা কর্মী সাধক বাঁদরের ছানার ন্যায় পুরুষকার দ্বারা ঈশ্বরলাভ করতে চেষ্টা করে থাকে৷ আর ভক্ত সাধকেরা ঈশ্বরকে সকলের কর্তা জ্ঞান করে, তাঁর চরণে বিড়াল–ছানার ন্যায় নির্ভর করে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে৷
২৷ এক ব্যক্তি যেমন কারও পিতা কারও জ্যাঠা, কারো খুড়া, কারো মেসো, কারো ভগ্নিপতি, কারো শ্বশুর ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এস্থলে ব্যক্তি এক হলেও কিন্তু সম্বন্ধ ভেদে অনেক প্রকার প্রভেদ রয়েছে, তেমনি সেই এক সচ্চিদানন্দকে ভক্তেরা শান্ত, দাস্য, সখা, বাৎসল্য, মধুর প্রভৃতি নানাভাবে উপাসনা করে৷
৩৷ যার যেমন ভাব, তার তেমনি লাভ হয় অর্থাৎ যে তাঁকেই চায়, সে তাঁকেই পায়৷ আর যে তার ঐশ্বর্য কামনা করে, সে তাই পেয়ে থাকে৷
৪৷ রাজবাড়িতে ভিক্ষা করতে গিয়ে যে লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি সামান্য বস্তু প্রার্থনা করে, সে অতি নিবোর্ধ৷ রাজাধিরাজ ভগবানের দ্বারস্থ হয়ে জ্ঞান ভক্তি ইত্যাদি রত্ন প্রার্থনা না করে অষ্টসদ্ধিাই প্রভৃতি তুচ্ছ বস্তুর নিমিত্ত যে প্রার্থনা করে সে বড়ই নির্বোধ৷
৫৷ ভক্ত কিংবা জ্ঞানীর ভাব বাইরে থেকে বোঝা বড় কঠিন হয়ে থাকে৷ যেমন হাতীর দুরকম দাঁত দেখা যায়—বাইরের দাঁত কেবল দেখাবার, তার দ্বারা খাওয়া চলে না; আর এক রকম দাঁত মুখের ভেতরে আছে, তার দ্বারা খেয়ে থাকে৷ তেমনি অনেক সময় সাধকেরা আপনার ভাব গোপন রেখে অন্য রকম দেখান৷
৬৷ যোগী দুই প্রকার—গুপ্ত যোগী ও ব্যক্ত যোগী৷ গুপ্ত যোগী যাঁরা, তাঁরা গোপনে গোপনে ভগবানের সাধন ভজন করে থাকেন, লোককে আদপেও জানতে দেন না৷ আর ব্যক্ত যোগী যাঁরা, তাঁরা বাহ্যিক যোগদণ্ড ইত্যাদি ধারণ করে লোকের সঙ্গে ঐ সব প্রসঙ্গই করে থাকেন৷
১৷ পাথর হাজা বৎসর জলের মধ্যে পড়ে থাকলেও তার ভেতর জল কখনও ঢোকে না, কিন্তু মাটিতে জল লাগলে তখনি গলে যায়৷ যারা বিশ্বাসী ও ভক্ত, তারা হাজার হাজার আপদ–বিপদের মধ্যে পড়লেও হতাশ হয় না, কিন্তু অবিশ্বাসী মানুষের মন সামান্য কারণে টলে যায়৷
২৷ প্রহ্লাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে ভগবান বল্লেন, “তুমি কি বর চাও?” প্রহ্লাদ বল্লে, “ঠাকুর, যারা অমাকে কষ্ট–যন্ত্রণা দিয়েছে, তাদের তুমি ক্ষমা কর৷ তাদের শাস্তি দিলে তোমাকেই কষ্ট সহ্য করতে হবে; কারণ তুমি তো সর্বভূতেই অবস্থান কচ্ছ৷”
৩৷ ভক্ত কেশবচন্দ্রকে দেখবার ঠাকুরের বড় সাধ হয়েছিল৷ তখন কেশববাবু ব্রাহ্মভক্তদের সঙ্গে ৺জয়গোপাল সেনের বেলঘরের বাগানে অবস্থান করছিলেন৷ ঠাকুর হূদয় মুখুজ্যেকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি করে বেলঘরের বাগানে উপস্থিত হলেন৷ কেশববাবু তখন ব্রাহ্মভক্তদের সঙ্গে পুকুরে স্নান করবার উদ্যোগ করছেন৷ ঠাকুর তাঁকে দেখে বল্লেন, “এরই ল্যাজ খসেছে৷” এই শুনে ব্রহ্মভক্তেরা সবাই হেসে উঠলেন৷ কেশববাবু তাদের বল্লেন, “তোমরা হেসো না ইনি যা বলছেন তার মানে আছে৷” ঠাকুর তখন বল্লেন, “ব্যাঙাচির যতদিন ল্যাজ থাকে ততদিন জলে থাকে; ল্যাজ খসে গেলে জলেও থাকতে পারে ডাঙ্গাতেও থাকতে পারে৷ তেমনি ভগবানকে চিন্তা করে যার অবিদ্যা দূর হয়ে গেছে, সে সচ্চিদানন্দ–সাগরে ডুবে থাকতেও পারে আবার সংসারেও থাকতে পারে৷
১৷ যেমন জালার ভেতর কোনখানে একটি ছোট ছিদ্র থাকলে ক্রমে ক্রমে সব জল বেরিয়ে যায়, তেমনি সাধকের ভেরতেও একটু সংসারাসক্তি থাকলে সব সাধনা বিফল হয়ে থাকে৷
২৷ কাঁচা মাটিতে গড়ন হয়, পোড়া মাটিতে আর গড়ন চলে না৷ যার হূদয় একেবারে বিষয়বুদ্ধিতে পুড়ে গেছে, তাতে আর পারমার্থিক ভাব ধরে না৷
৩৷ চিনিতে বালিতে মিশে থাকলে পিঁপড়ে যেমন বালি ফেলে চিনি খায়, তেমনি সাধু ও পরমহংসেরা এ সংসারে সদ্বস্তু যে সচ্চিদানন্দ তাঁকেই গ্রহণ করে, আর অসদ্বস্তু যে কাম–কাঞ্চন, সে সমস্ত ত্যাগ করে৷
৪৷ কাগজে তেল লাগলে তাতে আর লেখা চলে না, তেমনি জীবে কাম–কাঞ্চনরূপ তেল লাগলে তাতে আর সাধন চলে না৷ সে তেলমাখা কাগজ খড়ি দিয়ে ঘষে নিলে তাতে লেখা যায়, তেমনি জীকে কাম–কাঞ্চনরূপ তেল লাগলে ত্যাগরূপ খড়ি দিয়ে ঘষে নিলে তবে সাধন চলে৷
৫৷ যে সকল লোক নিজে কখন ধর্মচর্চা করে না, অন্যকেও ধ্যান পূজা করতে দেখলে ঠাট্ট–বিদ্রূপ করে, ধর্ম ও ধার্মিদের নিন্দা করে, সাধন–অবস্থায় কখনও এরূপ লোকদের সঙ্গ করবে না৷ তাদের কাছ থেকে একেবারে দূরে থাকবে৷
৬৷ গরুর পালে যদি অন্য কোন জন্তু এসে ঢোক তা হলে সব গরুগুলো তাকে গুঁতিয়ে তাড়িয়ে দেয়, কিন্তুু গরু এলে তার সঙ্গে গা চাটাচাটি করে৷ সেই রকম যখন ভক্তের সঙ্গে ভক্তের দেখা হয় তখন তারা উভয়ে ধর্মকথা কয়, বড় আনন্দ করে আর হঠাৎ সে সঙ্গ ত্যাগ করতে ইচ্ছা করে না৷ কিন্তু বিজাতীয় লোক এলে তার সঙ্গে মেশামেশি করে না৷
৭৷ যে পুকুরে অল্প জল, তার যেমন জল পান করতে গেলে ওপর থেকে আস্তে আস্তে নেড়ে জল খেতে হয়, বেশী নাড়তে নেই, নাড়লে তার ভেতর হতে ময়লা উঠে জল ঘোলা হয়ে যায়, তেমনি যদি সচ্চিদানন্দলাভ করতে চাও তাহলে তুমি গুরুবাক্যে বিশ্বাস করে ধীরে ধীরে সাধন কর৷ মিছে কেবল শাস্ত্র বিচার তর্ক কোরো না, ক্ষুদ্র মন অল্পতেই গুলিয়ে যায়৷
৮৷ ভূত ছাড়বে কেমন করে বল? যে সরষে দিয়ে ভূত ছাড়াবে তারই মধ্যে ভূত ঢুকে বসে আছে: যে মন দিয়ে সাধন–ভজন করবে তাই যদি বিষয়াসক্ত হয়ে পড়ে, তা হলে সাধন–ভজন কি করে হবে?
৯৷ মন–মুখ এক করাই হচ্ছে প্রকৃত সাধন৷ নতুবা মুখে বলছি, ‘হে ভগবান! তুমি আমার সর্বস্ব ধন’ এবং মনে বিষয়কেই সর্বস্ব জেনে বসে রয়েছি—এইরূপ লোকের সকল সাধনাই বিফল হয়৷
১০৷ বাসনার লেশমাত্র থাকতে ভগবানলাভ হয় না৷ যেমন সুতোতে একটু ফেঁসো বেরিয়ে থাকতে ছুঁচের ভেতর যায় না৷ মন যখন বাসনারহিত হয়ে শুদ্ধ হয়, তখনই সচ্চিদানন্দ লাভ হয়৷
১১৷ যারা ঈশ্বরলাভের জন্য সাধন–ভজন করতে চায় তারা যেন কোন রকমে কামিনী–কাঞ্চনে আসক্ত না হয়ে পড়ে, কামিনী–কাঞ্চনের সং স্রব থাকলে কোনো কালেও তাদের সিদ্ধাবস্থালাভের উপায় নেই৷ যেমন খই ভাজবার সময় যে খইটি খোলার উপর থেকে ঠিকরে বাইরে পড়ে, তাতে কোনো দাগ লাগে না, কিন্তু গরম বালির খোলায় থাকলে কোনো কোনো স্থানে কাল দাগ লাগে৷
১২৷ বিষয়, ছেলে, কিংবা মান–সম্ভ্রমের জন্য কেহ যেন কামনা করে ঈশ্বরের সাধনা না করে, যে শুধু সচ্চিদানন্দ–লাভের জন্য তাঁর নিকট প্রার্থনা করে, তার নিশ্চয়ই ঈশ্বর–লাভ হয়৷
১৩৷ যেমন বাতাসে জল নড়লে ঠিক প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, তেমনি মন স্থির না হলে তাতে ভগবানের প্রকাশ হয় না৷ নিঃশ্বাস–প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে মন চঞ্চল হয়৷ এইজন্য যোগীরা আগে কুম্ভক দ্বারা মন স্থির করে ভগবানের ধ্যান–ধারণা করেন৷
১৪৷ ভাবের ঘরে যার চুরি না থাকে, তারই সচ্চিদানন্দ লাভ হয়৷ অর্থাৎ কেবল সরলভাবে ও বিশ্বাসেই তাঁকে পাওয়া যায়৷
১৫৷ যেমন সাপ দেখলে লোকে বলে থাকে, “মা মনসা, মুখটি লুকিয়ে রেখো, আর ল্যাজটি দেখিয়ো”, তেমনি যুবতী স্ত্রীলোক দেখলে মা বলে নমস্কার করা উচিত ও তাদের মুখের দিকে না চেয়ে পায়ের দিকে চাইবে৷ তা হলে আর প্রলেভনের আর পতনের আশঙ্কা থাকবে ন৷
১৬৷ বিদ্যাশক্তিই হউক বা অবিদ্যাশক্তিই হউক, সাধু–সন্ন্যাসী ও ভক্তমাত্রেই সব স্ত্রীলোককে মা আনন্দময়ীর রূপ বলে জানবে৷
১৭৷ খুব জনশূন্য স্থানে যুবতী স্ত্রীলোককে দেখে যে মা বলে চলে যেতে পারে, তাকেই ঠিক ঠিক ত্যাগ বলা যায়, আর, যে লোক সভার মাঝখানে ত্যাগী সেজে থাকে, তাকে প্রকৃত ত্যাগী বলা যায় না৷
১৮৷ অভিমানের জড় মরেও মরে না, যেমন ছাগলটাকে কেটে ফেলে তার ধড় মুণ্ডু হতে পৃথক করলেও কিছুক্ষণ নড়তে থাকে৷
১৯৷ অভিমানশূন্য হওয়া বড় কঠিন৷ পঁ্যাজ রসুনকে ছেঁচে কোন পাত্রে রেখে, তার পর পাত্রটিকে শতবার ধুয়ে ফেললেও তার গন্ধ যেমন কিছুতেই যায় না, সেই প্রকার অভিমানের লেশ কিছু না কিছু থেকে যায়৷
২০৷ ঠিক ঠিক সন্ন্যাসী বা ত্যাগীর লক্ষণ কিরূপ জান? তারা কামিনী–কাঞ্চনের কোনরূপ সংস্পর্শে থাকবে না৷ এমনকী, স্বপ্নেও যদি কামিনী–সহবাস হচ্ছে বলে জ্ঞান হয় এবং তদ্দ্বারা রেতঃস্খলন হয়, কিংবা অর্থের ওপর আসক্তি জন্মায়, তা হলে এত দিনের সাধন–ভজন সব নষ্ট হয়ে যায়৷
২১৷ ভগবান কল্পতরু৷ কল্পতরুর নিকট বসে যে যা–কিছু প্রার্থনা করে, তাই তার লাভ হয়৷ এই নিমিত্ত সাধন–ভজনের দ্বারা যখন মন শুদ্ধ হয়, তখন খুব সাবধানে কামনা ত্যাগ করতে হয়৷ কেমন জান?—এক ব্যক্তি কোনো সময় ভ্রমণ করতে করতে অতি বিস্তীর্ণ প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হয়৷ পথে রৌদ্রের তাপে এবং পথ ভ্রমণের ক্লেশে অতিশয় ক্লান্ত ও ঘর্মাক্তকলেবর হয়ে কোনো একটি বৃক্ষের নিম্নে উপবেশন করে শ্রান্তি দূর করতে করতে মনে মনে ভাবলে যে, এই সময়ে যদি একটি উত্তম শয্যা মেলে, তা হলে তাতে অতি সুখে নিদ্রা যাই৷ পথিক যে কল্পতরুর নিম্নে বসে ছিল, তা সে জানত না৷ মনে মনে যেমন এই বাসনা উঠল তৎক্ষণাৎ সেইখানে উত্তম শয্যা এসে পড়ল৷ পথিক অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে তাহাতেই শয়ন করলে ও মনে মনে ভাবতে লাগল, এই সময় যদি একটি স্ত্রীলোক এসে আমার পদসেবা করে, তা হলে অতি সুখে শয়ন করতে পারি৷ এই হতে না হতেই তখনই এক যুবতী পথিকের পদতলে এসে উপবেশনপূর্বক তার সেবা করতে লাগল৷ পথিকের এই দেখে আহ্লাদের আর সীমা রইল না৷ তারপর তার খুব ক্ষুধা পেতে লাগল ও সে মনে করলে যা ইচ্ছা করেছিলুম তা পেলুম, তবে কি খাবার কিছু জিনিস পাব না? বলতে না বলতে তার নিকট অমনি নানাপ্রকার খাদ্যদ্রব্য এসে জুটল৷ পথিক সেগুলি দিয়ে তখনই উদর পূর্ণ করে সেই শয্যায় শয়নপূর্বক সেদিনকার সব ঘটনা ভাবছে; এমন সময় তার মনে হলো যে এ সময় যদি হঠাৎ একটা বাঘ এসে পড়ে, তাহলেই বা কি করা যায়৷ যেমন এইটি মনে হওয়া অমনি এক প্রকাণ্ড বাঘ লাফ দিয়ে এসে তাকে ধরলে এবং তার ঘাড় থেকে রক্ত পান করতে লাগল৷ অবশেষে পথিকের জীবন শেষ হলো৷ এই সংসারে জীবেরও ঠিক এইরূপ দশা ঘটে থাকে৷ ঈশ্বরসাধন করতে গিয়ে বিষয়, ধন, জন অথবা মান, যশ ইত্যাদির কামনা করলে তা কিছু কিছু লাভ হয় বটে কিন্তু শেষে ব্যাঘ্রেরও ভয় থাকে৷ অর্থাৎ রোগ, শোক, তাপ, মান, অপমান ও বিষয়নাশরূপ ব্যাঘ্র স্বভাবিক ব্যাঘ্র হতেও লক্ষগুণে যন্ত্রণাদায়ক৷
২২৷ এক ব্যক্তির মনে হঠাৎ বৈরাগ্যভাব উদয় হতে আত্মীয় ভাইদের নিকট বলল,“সংসার আমার ভাল লাগছে না৷ এখনি আমি কোনো নির্জন স্থানে গিয়ে ঈশ্বর আরাধনা করব৷” তার আত্মীয়েরা এই শুভ সঙ্কল্পে সম্মতি দিল৷ উক্ত ব্যক্তি বাড়ি হতে বাহির হয়ে ক্রমে এক নির্জন স্থানে উপস্থিত হয়ে ঘোরতর তপস্যা করতে আরম্ভ করলে৷ ক্রমান্বয়ে বার বৎসর কাল তপস্যা করে ও কিছু কিছু সিদ্ধাই লাভ করে পুনরায় বাড়িতে ফিরল৷ তার আত্মীয়–স্বজনেরা অনেকদিন পরে তাকে দেখে সকলেই আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল ও কথাবার্তা–প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে, “এতদিন তপস্যা করে কি জ্ঞানলাভ করলে?” তখন সেই ব্যক্তি ঈষৎ হাস্য করে সম্মুখে একটি হাতী চেলে যাচ্ছে দেখে, হাতীর নিকট গিয়ে তার গা তিনবার স্পর্শ করে যেমন বললে, ‘হাতী তুই মরে যা”, অমনি হাতীটা তার স্পর্শে মৃৎবৎ হয়ে গেল; কিছুক্ষণ পরে আবার গায়ে হাত দিয়ে যেমন বললে, ‘হাতী বাঁচ্’ অমনি হাতী বেঁচে উঠল৷
তারপর বাড়ির সম্মুখে নদীর ধারে গিয়ে মন্ত্রবলে এপার হতে পরপারে চলে গেল, আবার ঐভাবে নদী পার হয়ে এল৷ তার ভাইয়েরা এই সব দেখে খুব আশ্চর্য হলো বটে, কিন্তু তপস্বী–ভাইকে বলতে লাগল—“ভাই, এতদিন কেবল বৃথা তপস্যা করেছ; হাতী মরল ও বঁাচল তাতে তোমার কি লাভ হলো? আর তুমি বার বছর ধরে কঠোর তপস্যা করে নদী পারাপার করতে শিখেছ; আমরা এক পয়সা খরচ করে থাকি৷ অতএব তুমি কেবল বৃথা সময় নষ্ট করেছ৷” ভাইদের নিকট এইরূপ শ্লেষপূর্ণ কথা শুনে তরা যথার্থই হুঁশ হলো ও সে বলতে লাগল, “যথার্থই আমার নিজের কি হলো?” এই বলে তৎক্ষণাৎ ভগবানের দর্শন লাভের জন্য পুনরায় ঘোরতর তপস্যা করতে চলে গেল৷
২৩৷ নিজেকে বেশী চতুর মনে করা উচিত নয়—যেমন কাক খুব চতুর, কিন্তু বিষ্ঠা খেয়ে মরে, তেমনি সংসারক্ষেত্রে যারা বেশী চালাকি করতে যায়, তারাই কেবল ঠকে থাকে৷
২৪৷ একদিন গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে এক হাতে এশকটা টাকা নিয়ে আর এক হাতে মাটি নিয়ে ‘মাটিই টাকা, টাকাই মাটি’, এইরূপ বিচার করে উভয়কে যখন গঙ্গার জলে ফেলে দিলুম, তখন মনে একটু ভয় ও ভাবনা এল৷ ভাবলুম—মা লক্ষ্মী যদি রাগ করেন ও তিনি যদি খেতে না দেন৷ তার পরে মনে বললুম, “মা লক্ষ্মী, তুমিই আমার হূদয়ে থাক, তোমার ঐশ্বর্য আমি চাই না৷”
২৫৷ ঈশ্বর দুবার হাসেন৷ যখন ভায়ে ভায়ে দড়ি ধরে জমি বখরা করে নেয় আর বলে, “এ দিকটা আমার, ও ঐ দিকটা তোমার”, তখন একবার হাসেন৷ আর একবার হাসেন যখন লোকের অসুুখ কঠিন হয়ে পড়েছে, আত্মীয়স্বজনেরা সকলে কান্নাকাটি কচ্ছে, বৈদ্য এসে বলছে, “ভয় কি? আমি ভাল করে দেব৷” বৈদ্য জানে না যে, ঈশ্বর যদি মারেন, তবে কার সাধ্য তাকে রক্ষা করে৷
২৬৷ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, “হে অর্জুন, অষ্ট সিদ্ধির মধ্যে একটি সিদ্ধিও থাকলে পরে আমার যে সেই পরম ভাব, তা তুমি লাভ করতে পারবে না৷ অতএব যারা ঠিক ঠিক ভক্ত ও জ্ঞানী, তারা যেন কোনোরূপ সিদ্ধি কামনা না করে৷
২৭৷ লক্ষ্মীনারায়ণ নামক একজন মাড়োয়ারী সৎসঙ্গী ও ধনাঢ্য ব্যাক্তি দক্ষিণেশ্বরে একদিন ঠাকুরের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে বেদান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়৷ ঠাকুরের সহিত ধর্মপ্রসঙ্গ করে ও তঁার বেদান্ত সম্বন্ধে আলোচনা শুনে তিনি বড়ই প্রীত হন৷ পরিশেষে ঠাকুরের নিকট হতে বিদায় নেবার সময় বলেন, “আমি দশ হাজার টাকা আপনার সেবার নিমিত্ত দিকে চাই৷ ঠাকুর এই কথা শোনবামাত্র, মাথায় দারুণ আঘাত লাগলে যেরূপ হয়, মূর্চ্ছাগতপ্রায় হলেন৷ কিছুক্ষণ পরে মহাবিরক্তি প্রকাশ করে বালকের ন্যায় তাকে সম্বোধন করে বললেন, “শালা, তুম হিঁয়াসে আবি উঠ যাও৷ তুম হামকো মায়াকা প্রলোভন দেখাতা হ্যায়৷” উক্ত মাড়োয়ারী ভক্ত একটু অপ্রতিভ হয়ে ঠাকুরকে বললেন, “আপ্ আভি থোড়া কাঁচা হ্যায়৷” ইহার উত্তরে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, “ক্যায়সা হ্যায়৷” মাড়োয়ারী ভক্ত বললেন, “মহাপুরুষ লোগোকেঁা খুব উচ্চ অবস্থা হোনেসে ত্যাজ্য গ্রাহ্য কে সমান বরাবর হো যাতা হ্যায়, কোই কুছ দিয়া অথবা লিয়া উসমে উনকা চিত্তমে সন্তোষ বা ক্ষোভ কুছ্ নেহি হোতা৷” ঠাকুর ঐ কথা শুনে ঈষৎ হেসে তাকে বুঝাতে লাগলেন, “দেখ, আর্শিতে কিছু অপরিষ্কার দাগ থাকলে যেমন ঠিক ঠিক মুখ দেখা যায় না, তেমনি যার মন নির্মল হয়েছে, সেই নির্মল মনে কামিনী–কাঞ্চন–দাগ পড়া ঠিক নয়৷” ভক্ত মাড়োয়ারী বললেন, “বেশ কথা, তবে হূদয়, যে আপনার সেবা করে, না হয় তার নামে আপনার সেবার জন্য টাকা থাক৷” তদুত্তরে ঠাকুর বললেন, “না, তাও হবে না৷ কারণ, তার নিকট থাকলে যদি কোনো সময় আমি বলি যে অমূককে কিছু দাও বা অন্য কোনো বিষয়ে আমার খরচ করতে ইচ্ছা হয়, তাতে যদি সে দিতে না চায় তার মনে সহজেই এই অভিমান আসতে পারে যে, ও টাকা তো তোর নয়, ও আমার জন্য দিয়েছে৷ এও ভাল নয়৷” মাড়োয়ারী ভক্ত ঠাকুরের এই কথা শুনে আশ্চর্য হলেন এবং ঠাকুরের এই অদৃষ্টপূর্ব ত্যাগভাব দেখে নিরতিশয় প্রীত হয়ে স্বস্থানে প্রস্থান করলেন
২৮৷ টাকার অহঙ্কার করতে নেই৷ যদি বল আমি ধনী, ধনীর আবার তারে বাড়া তারে বাড়া আছে৷ সন্ধ্যার পর যখন জোনাকী পোকা ওঠে, সে মান করে, আমি এই জগৎকে আলো দিচ্ছি; কিন্তু যেই নক্ষত্র উঠল, অমনি তার অভিমান চলে গেল৷ তখন নক্ষত্রেরা মনে করে, আমরা জগৎকে আলো দিচ্ছি৷ কিন্তু পরে যখন চন্দ্র উঠল, তখন নক্ষত্রেরা লজ্জায় মলিন হয়ে গেল৷ চন্দ্র মনে করলে, আমার আলোয় জগৎ হাসছে৷ দেখতে দেখতে অরুণোদয় হলো, তখন চন্দ্র মলিন হয়ে গেল৷ খানিক পরে আর দেখা গেল না৷ধনীরা যদি এগুলি ভাবে, তাহলে আর তাদের ধনের অহঙ্কার থাকে না৷
২৯৷ “এক কৌপীন কা ওয়াস্তে৷” একজন সাধু গুরূপদেশ নিয়ে ভগবানের সাধন–ভজন করবার উদ্দেশ্যে কোনো গ্রামের কাছে একটি নির্জন প্রান্তরের মধ্যে সামান্য একটি পর্ণকুটীর করে তার মধ্যে বাস করতে লাগলেন ও সাধন–ভজন করতে লাগলেন৷ তিনি প্রত্যহ প্রতূ্যষে উঠে স্নান ইত্যাদি করে তঁার ভিজে কাপড় ও কৌপীন কুটীরের কাছে একটি গাছে শুকোবার জন্য রেখে দিতেন৷ সাধু যখন ভিক্ষার জন্য বেরিয়ে যেতেন, সেই সময় ইঁদুর এসে তঁার সেই কৌপীন কেটে দিত৷ সাধু পরদিন গ্রামে গিয়ে আবার নূতন কৌপীন ভিক্ষা করে আনতেন৷ অল্পদিন পরে সাধু স্নানান্তে আবার ঐ ভিজে কৌপীন কুটীরের ওপর শুকোবার জন্য রেখে দিলেন এবং ভিক্ষান্নের জন্য গ্রামে গেলেন৷ ভিক্ষান্তে কুটীরে ফিরে এসে দেখলেন, ইঁদুর আবার তাঁর কৌপীন টুকরো করে কেটে ফেলেছে৷ তিনি তাই দেখে মনে মনে বড় বিরক্ত হলেন এবং ভাবতে লাগলেন, “আবার কোথায় কার কাছে কৌপীন ভিক্ষা করব?” পরদিন আবার ভিক্ষায় বেরিয়ে গ্রামবাসীদের কাছে ইঁদুরের উপদ্রবের কথা জানালেন৷ গ্রামবাসীরা সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে বল্লে, “আপনাকে রোজ রোজ কে কৌপীন দেবে? আপনি এক কাজ করন—একটা বেড়াল পুষুন, তাহলে আর বেড়ালের ভয়ে ইঁদুর আসবে না৷” সাধু তৎক্ষণাৎ গ্রাম থেকে একটা বেড়ালের বাচ্চা নিয়ে এলেন৷ সেই দিন থেকেই বেড়ালের ভয়ে ইঁদূরের উপদ্রব বন্ধ হলো৷ তা দেখে সাধুর আনন্দের সীমা রইল না৷ ক্রমে সাধু সেই বেড়ালটাকে বেশ আদর–যত্নে লালন–পালন করতে লাগলেন এবং গ্রামে গিয়ে বেড়ালের জন্য দুধ ভিক্ষা করে এনে খাওয়াতে লাগলেন৷ কিছুদিন পর কোনো ব্যক্তি তাঁকে বললে “সাধুজী, আপনার রোজ দুধের দরকার; দু–চার দিন ভিক্ষা করে চলতে পারে৷ বার মাস কে আপনাকে দুধ দেবে? আপনি এক কাজ করুন, একটি গরু পুষুন, তা হলে তার দুধ খেয়ে আপনি নিজেও পরিতৃপ্ত হবেন, বেড়ালকেও খড়ওয়াতে পারবেন৷” অল্পদিনের মধ্যেই সাধু একটি দুগ্ধবতী গাভী সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন, সাধুকে আর দুধের জন্য ভিক্ষা করতে হলো না৷ ক্রমে সাধু সেই গরুর খড়–বিচিলী ইত্যাদির জন্য গ্রামে ভিক্ষা করতে লাগলেন৷ তখন গ্রামের লোকেরা তাঁকে বলতে লাগল, “আপনার কুটীরের নিকট পতিত জমিতে চাষ বাস করুন, তা হলে আর খড়–বিচিলীর জন্য ভিক্ষা করতে হবে না৷” তখন সাধু সকলের পরামর্শে নিকটস্থ পতিত জমিতে চাষ আরম্ভ করলেন৷ চাষের জন্য তাঁকে ক্রমে লোক ইত্যাদি নিযুক্ত করতে হলো৷ যখন শস্যাদি সঞ্চিত হতে লাগল, তা রাখবার জন্য গোলাবাড়ি ইত্যাদি প্রস্তুত করে তিনি ঠিক গৃহস্থের মতো মহাব্যস্ত হয়ে দিন কাটাতে লাগলেন৷ কিছুদিন পরে সাধুটির গুরু এসে সেখানে উপস্থিত হলেন৷ তিনি ঐ সকল বিষয়–বৈভব দেখে একটি চাকরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এইখানে একটি ত্যাগী কুটীর মধ্যে থাকতেন, তিনি কোথায় গেছেন বলতে পার?” চাকরটি কোনো উত্ত দিতে পারলে না৷ পরে তিনিই ঐ সাধুর বাড়ির মধ্যে ঢুকে সামনে তাঁর শিষ্যকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “বৎস এসব কি?” শিষ্য অপ্রতিভ হয়ে অমনি গুরুর পায়ে পড়ল এবং বলতে লাগল, “প্রভুজী, এসব এক কৌপীনকা ওয়াস্তে৷ সাধুটি একে একে সব বৃত্তান্ত গুরুর নিকট বলতে লাগলেন৷ গুরুর দর্শনে তাঁর সকল আসক্তি কেটে গেল ও তিনি তৎক্ষণাৎ সেই সব বিষয়–সম্পত্তি পরিত্যাগ করে গুরুর পশ্চাদগামী হলেন৷
৩০৷ হূদয় মুখুজ্যে একদিন ঠাকুরকে বলেছিলেন, “মামা, তোমার প্রতি মার যখন এত দয়া, তুমি মার কাছ থেকে কিছু সিদ্ধাই চেয়ে নাও না কেন? “ঠাকুরের তখন বালকের ন্যায় অবস্থা৷ হূদুর এই কথা শুনে তিনি একদিন চাঁপাতলার পুষ্করিণীর ঘাটে বসে বালকের ন্যায় মাকে বলতে লাগলেন, “মা, হূদু বলে, তুমি মার কাছ থেকে সিদ্ধাই চেয়ে নাও না কেন? এই বলে তিনি মাকে চিন্তা করতে লাগলেন৷ অল্পক্ষণ পরেই তিনি সম্মুখে দেখলেন, একটি কালপেড়ে কাপড় পরা মোটা স্ত্রীলোক শৌচে বসেছে৷ তার পরক্ষণেই চলে এসে হূদয়কে বললেন, “শালা, তুই আমাকে কি বুদ্ধি দিয়েছিস? আমি আর তোর কোনো বুদ্ধিই নেব না৷ তোর কথা শুনে মাকে যেমন বললুম, ‘মা, হূদু আমাকে বলে, তুমি মার কাছ থেকে সিদ্ধাই চেয়ে নাও না কেন?’ মা তৎক্ষণাৎ আমাকে ঐরূপ দেখিয়ে দিলেন৷”
১৷ প্রথম অবস্থায় একটু নির্জনে বসে মন স্থির করতে হয়৷ তা না হলে অনেক দেখে শুনে মন চঞ্চল হয়৷ যেমন দুধে জলে এক সঙ্গে রাখলে মিশে যায়, কিন্তু দুধকে মন্থন করে মাখন করতে পারলে জলের সঙ্গে মেশে না, সে জলের ওপর ভাসে; তেমনি যাদের মন স্থির হয়েছে, তারা যেখানে সেখানে বসে সর্বদা ভগবানকে চিন্তা করতে পারে৷
২৷ নিষ্ঠা ভক্তি না হলে সচ্চিদানন্দলাভ হয় না৷ যেমন এক পতিতে নিষ্ঠা থাকলে সতী হয়, তেমনি আপনার ইষ্টের প্রতি নিষ্ঠা হলে ইষ্টদর্শন হয়৷
৩৷ হনুমানকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিল, “আজ কি তিথি?” হনুমান বললে, “আমি বার, তিথি, নক্ষত্র ও–সব কিছু জানি না৷ আমি কেবল এক রাম–পাদপদ্ম জানি৷”
৪৷ ধ্যান করবে মনে, মনে আর কোণে৷
৫৷ নির্জনে না গেলে শক্ত রোগ সারবে কেমন করে? রোগটি হয়েছে বিকার, আর যে ঘরে বিকার–রোগী সেই ঘরেই তেঁতুলের আচার ও জলের জালা৷ মেয়েমানুষ পুরুষের পক্ষে তেঁতুলের আচার, আর ভোগ–বাসনা জলের জালা৷ তাতে কি রোগ সারে? দিনকতক ঠাঁইনাড়া হয়ে নির্জনে গিয়ে সাধন–ভজন করতে হয়৷ তার পর নীরোগ হয়ে আবার সেই ঘরে থাকলে আর ভয় নেই৷
৬৷ প্রথম অবস্থায় একটু নির্জনে বসে ধ্যান অভ্যাস করতে হয়৷ তার পর যখন ঠিক অভ্যাস হয়, তখন যেখানে সেখানে ধ্যান করতে পার৷ যেমন গাছ, যখন ছোট থাকে তখন তাকে যত্ন করে বেড়া দিয়ে রাখতে হয়, তা না হলে গরু–ছাগলে খেয়ে নষ্ট করে ফেলে৷ পরে যখন গুঁড়ি মোটা হয় তাতে দশটা গরু–ছাগল বাঁধলেও কিছুই করতে পারে না৷
৭৷ একদিন একটি ছোকরা ভক্ত পরমহংসদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ঠাকুর, কাম কি করে দমন করা যায়?” ঠাকুর একটু হেসে বললেন, “সব স্ত্রীলোককে মাতৃবৎ দেখবি, আর স্ত্রীলোকের মুখের দিকে কখনও চাইবিনি, সর্বদা পায়ের দিকে চাইবি, তাহলেই সকল দুশ্চিন্তা দূরে পালিয়ে যাবে৷”
৮৷ সহ্যগুণের চেয়ে আর গুণ নেই৷ যে সয়, সে–ই রয়৷ যে না সয়, সে নাশ হয়৷ সকল বর্ণের মধ্যে ‘স’ তিনটে—শ, ষ, স৷
৯৷ সহ্যগুণের চেয়ে আর গুণ নেই৷ সকলেরই সহ্যগুণ থাকা চাই৷ যেমন কামার–বাড়ির নাইয়ের ওপর কত জোর করে বড় বড় হাতুড়ি পেটে, তথাপি কিছুমাত্র বিচলিত হয় না; সেইরূপ কূটস্থবৎ বুদ্ধি থাকা চাই; যে যাই বলুক ও যে যাই করুক না কেন, সমুদয় সহ্য করে লবে৷
১০৷ মাছ যত দূরে থাক না, ভাল ভাল চার ফেলবামাত্র যেমন তারা ছুটে আসে, ভগবান হরিও সেইরূপ বিশ্বাসী ভক্তের হূদয়ে শীঘ্র এসে উদিত হন৷
১১৷ এক রকম বাদলেপোকা আছে, তারা আলো দেখলে ছুটে যায়, তারা তাতে প্রাণ দেয়, তবু অন্ধকারে আর যায় না; তেমনি যারা ভগবানের ভক্ত, তারা যেখানে সাধু থাকে ও ঈশ্বরীয় কথা হয়, সেখানে ছুটে যায়, সাধন–ভজন ছাড়া সংসারের অসার পদার্থে আর বদ্ধ হয় না৷
১২৷ পার্বতী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইশ্বরলাভের খেই কোথায়? মহাদেব বললেন, বিশ্বাসই এর খেই৷ গুরুবাক্যে অচল ও অটল বিশ্বাস ব্যতীত সচ্চিদানন্দ–লাভ করা যায় না৷
১৩৷ এই দুর্লভ মনুষ্যদেহ ধারণ করে যে সচ্চিদানন্দকে লাভ করতে না পারে তার জন্মধারণ করাই বৃথা৷
১৪৷ মন কেমন জান? যেমন স্প্রিং–এর গদি৷ যতক্ষণ গদির উপরে বসে থাকা যায় ততক্ষণই নীচু হয়ে থাকে, আর ছেড়ে দিলেই তৎক্ষণাৎ উঠে পড়ে৷ তেমনি সৎ ও সাধুসঙ্গে ভগবানের ভাব যা কিছু ৃলাভ করে, আবার সাধুসঙ্গ পরিত্যাগ করবামাত্র যে–কে–সেই—আপনার পূর্বভাব ধারণ করে৷
১৫৷ নামেতে রুচি ও বিশ্বাস করতে পারলে তার আর কোনো প্রকার বিচার বা সাধন করতে হয় না৷ নামের প্রভাবে সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়; নামেতেই চিত্ত শুদ্ধ হয় এবং নামেতেই সচ্চিদনন্দ–লাভ হয়ে থাকে৷
১৬৷ সরল বিশ্বাস ও অকপটতা থাকলে ভগবানলাভ হয়৷ একটি লোকের একটি সাধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷ লোকটি সাধুকে বিনীতভাবে উপদেশ জিজ্ঞাসা করলে৷ সাধুটি বললেন, “ভগবানকে প্রাণ–মন দিয়ে ভালবাস৷” লোকটি বললে, “ভগবানকে কখনও দেখিনি, তাঁর বিষয় কিছুই জানিনি, কি করে তাঁকে ভালবাসব?” সাধুটি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কাকে ভালবাস?” লোকটি বললে, “আমার কেউ নেই৷ শুধু একটি মেড়া আছে, ঐটিকেই ভালবাসি৷” সাধুটি বললেন, “তবে, ঐ মেড়ার ভেতর নারায়ণ আছে জেনে প্রাণ–মন দিয়ে সেবা করবে ও ভালবাসবে৷” এই বলেই সাধুটি চলে গেলেন৷ লোকটিও ঐ মেড়ার ভেতর নারায়ণ আছেন বিশ্বাস করে তার প্রাণপণ সেবা করতে আরম্ভ করলে৷ সাধুটি বহুদিন পরে সে রাস্তায় ফিরে যাবার সময় লোকটির সন্ধান করে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন কেমন আছ? লোককটি প্রণাম করে বললে, “গুরো, আপনার কৃপায় বেশ আছি; আপনি যেমন বলেছিলেন, সেইরূপ ভাবনা করে আমার খুব উপকার হয়েছে৷ মেড়ার ভিতরে মধ্যে মধ্যে এক অপরূপ মূর্তি দেখতে পাই—তাঁর চার হাত৷ তাঁকে দর্শন করে আমি বেশ পরমানন্দেই আছি৷”
১৭৷ সাধুসঙ্গ কেমন জান?—যেমন চালধোয়ানি জল৷ যার অত্যন্ত নেশা হয়েছে তাকে যদি চালের জল খাওয়ানো যায় তা হলে তার নেশা কেটে যায়৷ সেইরূপ এই সংসার–মদে যারা মত্ত হয়েছে, তাদের নেশা কাটাবার—একমাত্র উপায় সাধুসঙ্গ৷
১৮৷ ঠাকুর সাপ এবং সাধুর কথা বলতেন৷ সাপ যেমন নিজে গর্ত না করে ইঁদুরের গর্তে বাস করে, সাধুও তেমনি নিজের জন্য বাড়ি প্রস্তুর করে না, আবশ্যক হলে অন্য লোকের বাড়িতে বাস করে থাকে৷
১৯৷ যেমন উকিল দেখলে মামলা ও কাছারির কথা মনে আসে, আর ডাক্তার–কবিরাজ দেখলে রোগ ও ঔষধের কথা মনে পড়ে, তেমনি সাধু ও ভক্ত দেখলে ভগবানের ভাব–উদ্দীপন হয়৷
১৷ রত্নাকরে অনেক রত্ন আছে; তুমি এক ডুবে পেলে না বলে রত্নাকরকে রত্নহীন মনে করো না৷ সেইরূপ একটু সাধনা করে ঈশ্বরদর্শন হলো না বলে হতাশ হয়ো না৷ ধৈর্য ধরে সাধন করতে থাক, যথাসময়ে ইশ্বরের কৃপা তোমার ওপর হবে৷
২৷ সমুদ্রে একরকম ঝিনুক আছে, তারা সদা–সর্বদা হাঁ করে জলের ওপর ভাসে, কিন্তু স্বাতী নক্ষত্রের এক ফেঁাটা জল তাদের মুখে পড়লে তারা মুখ বন্ধ করে একবারে জলের নিচে চলে যায়৷ আর ওপরে আসে না৷ তত্ত্বপিপাসু বিশ্বাসী সাধকও সেইরকম গুরুমন্ত্ররূপ এক ফেঁাটা জল পেয়ে সাধনের অগাধ জলে একেবারে ডুবে যায়, আর অন্য দিকে চেয়ে দেখে না৷
৩৷ যেমন কোন ধনী লোকর কাছে যেতে হলে সেপাই–সান্ত্রীকে অনেক খোসমোদ করতে হয়, তেমনি ঈশ্বরের কাছে যেতে হলে অনেক সাধন–ভজন ও সৎসঙ্গ আদি নানা উপায়ের দ্বারা যেতে হয়৷
৪৷ এক কাঠুরে বন থেকে কাঠ এনে কোনো রকমে দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত৷ একদিন জঙ্গল থেকে সরু সরু কাঠ কেটে মাথায় করে আনছে, হঠাৎ একন লোক সেই পথ দিয়ে যেতে যেতে তাকে ডেকে বললে, “বাপু এগিয়ে যাও৷” পরদিন কাঠুরে সেই লোকের কথা শুনে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে মোটা মোটা কাঠের জঙ্গল দেখতে পেলে; সেদিন যতদূর পারলে কেটে এনে বাজারে বেচে অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশী পয়সা পেলে৷ পরদিন আবার সে মনে মনে ভাবতে লাগল, তিনি আমায় এগিয়ে যেতে বলেছেন; ভাল, আজ আর একটু এগিয়ে দেখি না কেন৷ সে এগিয়ে গিয়ে চন্দন কাঠের বন দেখতে পেলে৷ সেই চন্দন কাঠ মাথায় করে নিয়ে বাজারে বেচে অনেক বেশী টাকা পেলে৷ পরদিন আবার মনে কলে, আমায় এগিয়ে যেতে বলেছেন৷ সে সেদিন আরও খানিক দূর এগিয়ে গিয়ে তামার খনি দেখতে পেলে৷ সে তাতেও না ভুলে দিন দিন আরও যত এগিয়ে যেতে লাগল—ক্রমে ক্রমে রূপা, সোনা, হীরার খনি পেয়ে মহা ধনী হয়ে পড়ল৷ ধর্মপথেরও ঐরূপ৷ কেবল এগিয়ে যাও৷ একটু আধটু রূপ, জ্যোতি দেখে বা সিদ্ধাই লাভ করে আহ্লাদে মনে করো না যে, আমার সব হয়ে গেছে ৷
৫৷ যে মাছ ধরতে ভলবাসে, সে যদি শোনে যে অমূক পুকুরে বড় বড় মাছ আছে, সে কি করে? যারা সেই পুকুরে মাছ ধরেছে, সে যদি তাদের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করে বেড়ায়—সত্যি সত্যি সে পুকুরে বড় বড় মাছ আছে কিনা, যদি থাকে তবে কিসের চার ফেলতে হয়, কি টোপ খায়—এ–সব বিষয় ভাল করে জেনে নিয়ে যদি তাকে মাছ ধরতে যেতে হয়, তাহলে তার মাছ তো একেবাইে ধরা হয় না৷ সেখানে গিয়ে ছিপ ফেলে ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হয়, তারপর সে মাছের ঘাই ও ফুট দেখতে পায় এবং তারপর সে মাছ ধরতে পারে৷ ধর্মরাজ্যেরও সেই রূপ; সাধক ও মহাজনদের কথায় বিশ্বাস করে, ভক্তি–চার ছড়িয়ে, ধৈর্যরূপ ছিপ ফেলে বসে থাকতে হয়৷
৬৷ একটি লোক পরমহংসদেবের নিকট এসে বললে, “মহাশয়, অনেকদিন সাধন–ভজন করলুম, কিছুই তো বুঝতে সুঝতে পারলুম না, আমাদের সাধন–ভজন করা মিছে৷” পরমহংসদেব ঈষৎ হাস্য করে বললেন, “দেখ, যারা খানদানী চাষা, তারা বার বৎসর অনাবৃষ্টি হলেও চাষ দিতে ছাড়ে না; আর যারা ঠিক চাষা নয়, চাষের কাজে বড় লাভ শুনে কারবার করতে আসে, তারাই এক বৎসর বৃষ্টি না হলে চাষ ছেড়ে দিয়ে পালায়; তেমনি যারা ঠিক ঠিক ভক্ত ও বিশ্বাসী, তারা সমস্ত জীবন তাঁর দর্শন না পেলেও তাঁর নাম–গুণকীর্তন করতে ছাড়ে না৷”
৭৷ যেমন সাঁতার দিতে হলে আগে অনেক দিন ধরে জলে হাত–পা ছুঁড়তে হয়, একবারেই সাঁতার দেওয়া যায় না; সেইরূপ ব্রহ্মরূপ সমুদ্রে সাঁতার দিতে গেলে অনেকবার উঠতে পড়তে হয়, একবারে হয় না৷
১৷ তাঁর প্রতি কিরূপ মন চাই? যেমন সতীর পতিতে, কৃপণের ধনেতে, বিষযীর বিষয়েতে—এইরূপ টান যখন ভগবানের প্রতি হয়, তখন ভগবানলাভ হয়৷
২৷ মার পাঁচটি ছেলে আছে৷ তিনি কাকেও খেলনা, কাকেও পুতুল, কাকেও বা খাবার দিয়ে ভুলিয়ে রেখে দিয়েছেন৷ তার মধ্যে যে ছেলেটি খেলনা ফেলে দিয়ে ‘মা কোথা’ বলে কাঁদে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঠাণ্ডা করেন৷ হে জীব! তুমি কাম–কাঞ্চন নিয়ে ভুলে আছ৷ এসব ফেলে দিয়ে যখন ঈশ্বরের জন্য কাঁদবে, তখন তিনি এসে তোমায় কোলে করে নেবেন৷
৩৷ বিষয়লাভ হলো না, ছেলে হলো না বলে লোকে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়, কিন্তু ভগবানলাভ হলো না, ভগবানের পাদপদ্মে ভক্তি হলো না বলে এক ফোঁটা চোখের জল কজন লোকে ফেলে?
৪৷ ঋষিকৃষ্ণ (যীশুখ্রীস্ট) একদিন সমুদ্রের ধারে বেড়াচ্ছিলেন৷ একটি ভক্ত এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে, “প্রভো, কি করলে ঈশ্বরকে পাওয়া যায়?” তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে জলের ভেতর নিয়ে ডুবিয়ে রাখলেন৷ খানিকক্ষণ পরে হাত ধরে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কিরূপ অবস্থা হচ্ছিল?” ভক্তটি উত্তরে বললেন, “প্রাণ যায় যায়—অটুপাটু কচ্ছিল৷” প্রভু যীশু তখন তাকে বললেন, “যখন তোমার ভগবানের জন্য প্রাণ এমনি আটুপাটু করবে তখন তাঁর দর্শনলাভ হবে৷”
৫। ছেলে যেমন পয়সার জন্য মার কাছে আব্দার করে, কখনও কাঁদে, কখনও মারে, সেইরূপ আনন্দময়ী মাকে আপনার হতে আপনার জেনে তাঁকে দেখবার জন্য যিনি সরল শিশুর ন্যায় ব্যাকুল হয়ে ক্রন্দন করেন, তাঁকে সচ্চিদনন্দময়ী মা দেখা না দিয়ে থাকতে পারেন না৷
৬৷ ভগবানলাভের জন্য ব্যাকুলতার কথায় পরমহংসদেব বলতেন, যখন দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুরবাড়িতে সন্ধ্যা–আরতির কাঁসর–ঘন্টা বেজে উঠত তখন আমি গঙ্গার ধারে গিয়ে মাকে কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলতুম, “মা, দিন তো গেল, কই এখনও তোমার দেখা পেলুম ন৷”
৭৷ যার তৃষ্ণা পায়, সে কি গঙ্গার জল ঘোলা বলে তখনি একটি পুকুর কেটে জল পান করতে যায়? তেমনি যার ধর্মতৃষ্ণা পায়নি, সে এ–ধর্ম ঠিক নয়, ও–ধর্ম ঠিক নয়—এইরূপ বলে গোলমাল করে বেড়ায়৷ তৃষ্ণা থাকলে অত বিচার করা চলে না৷
১৷ হীরে মতি বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকার পাওয়া যায়, কিন্তু কৃষ্ণে মতি কটা মেলে৷
২৷ সাদা কাঁচের ওপর কোন বস্তুর দাগ পড়ে না, কিন্তু তাতে যদি মশলা মাখান থাকে তবেই দাগ পড়ে, যেমন ফটোগ্রাফ; তেমনি শুদ্ধ মনে যদি ভক্তি–মশলা লাগান থাকে, তা হলে ভগবানের রূপ প্রত্যক্ষ হয়৷ কেবলমাত্র শুদ্ধ মনে ভক্তি ব্যতীত রূপ দেখা যায় না৷
৩৷ প্রেম কাকে বলে জান? যখন হরি বলতে বলতে জগৎ তো ভুল হয়ে যাবেই, এমন যে নিজের দেহ এত প্রিয় জিনিস, তার ওপর পর্যন্ত সংজ্ঞা থাকবে না৷
৪৷ আগে ভাব তারপর প্রেম, শেষে ভাব–সমাধি; যেমন সঙ্কীর্তন করতে করতে প্রথমে বলে, “নিতাই আমার মাতা হাতী—নিতাই আমার মাতা হাতী”; ক্রমে ভাবে মগ্ন হয়ে শুধু বলে, “হাতী, হাতী”৷ তারপর কেবল “হাতী” এই কথাটি মুখে থাকে৷ শেষে কেবল “হা” বলতে বলতে ভাব–সমাধিতে মগ্ন হয়ে যায়৷ এইরূপে যে ব্যক্তি এতক্ষণ কীর্তন কচ্ছিল, সে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে চুপ হয়ে যায়৷
৫৷ যেমন কুঁড়ে ঘরে হাতী প্রবেশ করলে ঘরকে তোলপাড় করে ফেলে, সেই রকম ভাব–রূপ হস্তী দেহ–ঘরে প্রবেশ করলে দেহকে তোলপাড় করে ফেলে৷
৬৷ যার ভগবানে ভক্তিলাভ হয়েছে, তার কিরূপ ভাব হয় জান? আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী; আমি ঘর তুমি ঘরণী; আমি রথ, তুমি রথী; যেমন বলাও তেমনি বলি, যেমন করাও তেমনি করি, যেমন চালাও তেমনি চলি৷
৭৷ ভগবানের পাদপদ্মে ভক্তি হলেই বিষয়–কর্ম আাপনা আপনি ত্যাগ হয়ে আসে৷ তার আর বিষয়–কর্ম ভাল লাগে না৷ যেমন ওলা মিছরির পানা খেলে চিটে গুড়ের পানা আর কেউ খেতে চায় না৷
৮৷ সন্ধ্যা–আহ্নিক ততদিন দরকার যতদিন না তাঁর পাদপদ্মে ভক্তিপ্রেম হয় ও তাঁর নাম করতে করতে চক্ষে জল পড়ে, আর শরীরে রোমাঞ্চ হয়৷
৯৷ যাত্রার দল দেখেছ, যতক্ষণ বাজনা খচ্ মচ্ করতে থাকে, “কৃষ্ণ এস হে, কৃষ্ণ এস হে” বলে চিৎকার করে গান করচে, কৃষ্ণের তখনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ সে আপন মনে সাজ পরে তামাক খাচ্ছে, গল্প করচে৷ যখন সে–সকল থামল, নারদ ঋষি মৃদুস্বরে প্রেমভরে গান ধরলেন, “হরি প্রাণ হে গোবিন্দ, মম জীবন”, তখন কৃষ্ণ আর থাকতে পারলেন না৷ অমনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি আসরে নেমে পড়লেন৷ সাধকের ভেতরেও সেইরূপ৷ যতক্ষণ সাধক, “প্রভো এস হে, প্রভো এস হে” বলে চেঁচাচ্চে, ততক্ষণ জেনো, প্রভু সেখানে আসেননি৷ প্রভু যখন আসবেন, সাধক তখন ভাবে গদগদ হবেন, আর চেঁচাবেন না৷ সাধক যখন ভাবে গদগদ হয়ে ডাকে, তখন প্রভু আর দেরি করতে পারেন না৷
১০৷ অহল্যা বলেছিলেন, “হে রাম, যদি শূকরযোনিতেও জন্ম হয়, সেও স্বীকার; কিন্তু যেন তোমার শ্রীপাদপদ্মে আমার অচলা শ্রদ্ধা–ভক্তি থাকে, আর আমি কিছুই চাই না৷”
১৷ সত্ত্বগুণীর ধ্যান কিরূপ জান? তারা রাত্রে মশারি খাটিয়ে তার ভেররে বসে ধ্যান করে৷ লোকে মনে করে, সে ঘুমুচ্ছে৷ তাদের বাহ্যিক লোক–দেখান ভাব একেবারে নেই৷
২৷ (সাধকের) ধ্যানের সময় মধ্যে মধ্যে একপ্রকার নিদ্রার মতন আসে, তাকে যোগনিদ্রা বলে৷ সে অবস্থায় অনেক সাধক ভগবানের রূপ–দর্শন পায়৷
৩৷ ধ্যান এমন করবে যে তাতে একেবারে তন্ময় হয়ে যাবে—ডাইলিউট (dilute) হয়ে যাবে; যখন ঠিক ধ্যান হয়, পাখীরা তার গায়ে বসে, কিন্তু সে টের পায় না৷ ম–কালীর মন্দিরের নাটমন্দিরে আমি যখন ধ্যান করতুম, তখন সেখানকার লোকেরা বলতো, “আপনার গায়ে চড়াই ও শালিক পাখী বসে খেলা করে৷”
১৷ যে হবিষ্যান্ন ভক্ষণ করে, কিন্তু ঈশ্বর লাভ করতে চায় না, তার হবিষ্যান্ন গোমাংসতুল্য হয়৷ আর যে গোমাংস ভক্ষণ করে কিন্তু ভগবানকে লাভ করবার চেষ্টা করে, তার পক্ষে গোমাংস হবিষ্যান্নের তুল্য হয়৷
২৷ স্বর্গীয় মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয়ের শাশুড়ি একদিন পরমহংসদেবকে দর্শন করতে এসেছিলেন৷ ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, “তোমরা বেশ আছ, সংসারে থেকে ভগবানেতে মন রেখেছ৷” তিনি বললেন, “কই, আমাদের আর কিছুই হলো না; এখনও আমি যার–তার এঁটো খেতে পারি না৷” ঠাকুর বললেন, “সে কি গো? যার তার এঁটো খেলেই কি সব হলো? কুকুর, শেয়াল সবারই এঁটো খায়, তা বলেই কি তাদের ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়েছে?
১৷ হাজার বছরের অন্ধকার ঘর যেমন একবার একটা দেশলাইয়ের কাটি জ্বাললে তখনি আলো হয়, তেমনি জীবের জন্ম–জন্মান্তরের পাপও তাঁর একবার কৃপাদৃষ্টিতে দূর হয়৷
২৷ মলয়ের হাওয়া লাগলে যেসব গাছের সার আছে, সেই সব গাছে চন্দন হয়, কিন্তু অসার—যেমন বাঁশ, কলা ইত্যাদি গাছে কিছু হয় না৷ ভগবৎ–কৃপা পেলে যাঁদের সার আছে, তাঁরাই মুহূর্তের মধ্যে মহা সাধুভাবে পূর্ণ হন, কিন্তু বিষয়াসক্ত অসার মানুষের সহজে কিছু হয় না৷
৩৷ ছোট ছোট ছেলেরা একলা ঘরের ভেতরে বসে আপনমনে পুতুল খেলে, কোনো ভয়–ভাবনা নেই৷ কিন্তু যেই মা এল, অমনি সকলে পুতুল ফেলে ‘মা’ ‘মা’ বলে কাছে দৌড়ে গেল৷ তোমরাও এখন ধন–মান যশের পুতুল লয়ে সংসারে নিশ্চিন্ত হয়ে সুখে খেলা করছ, কোনো ভয়–ভাবনা নেই৷ যদি মা আনন্দময়ীকে তোমরা একবার দেখতে পাও, তা হলে আর তোমাদের ধন–মান–যশ ভাল লাগবে না, সব ফেলে তাঁর কাছে দৌড়ে যাবে৷
৪৷ কাদা ঘাঁটাই ছেলেদের স্বভাবসিদ্ধ; কিন্তু মা–বাপ তাদের অপরিষ্কার থাকতে দেন না; সেরূপ জীব এই মায়ার সংসারে পড়ে যতই মলিন হোক না কেন, ভগবান তাদের শুদ্ধ হবার উপায় করে দেন৷
১৷ লোহা যদি একবার স্পর্শমণি ছুঁয়ে সোনা হয়, তাকে মাটির ভেতর চাপা রাখ আর আস্তাকুঁড়ে ফেলে রাখ, সে সোনা৷ যিনি মচ্চিদানন্দ লাভ করেছেন, তাঁর অবস্থাও সেই রকম৷ তিনি সংসারেই থাকুন, আর বনেই থাকুন, তাতে তাঁর দোষস্পর্শ হয় না৷
২৷ যেমন লোহার তলোয়ার স্পর্শমণি ছোঁয়ালে সোনার তলোয়ার হয়, আকার–প্রকার সেই রকমই থাকে, কিন্তু তাতে আর হিংসার কাজ চলে না; সেই রকম ভগমানের পাদপত্ম স্পর্শ করলে তার দ্বারা আর কোনো অন্যায় কাজ হয় না৷
৩৷ কোনো ব্যাক্তি পরমহংসদেবের নিকট জিজ্ঞাসা করলেন—সিদ্ধপুরুষ হলে কিরূপ অবস্থা হয়?
উত্তরে তিনি বললেন— যেমন আলু–বেগুন সিদ্ধ হলে নরম হয়, তেমনি সিদ্ধপুরুষের স্বভাব নরম হয়ে থাকে৷ তাঁর সব অভিমান চলে যায়৷
৪৷ পরমহংসদেব নিজের শরীরের দিকে দেখিয়ে বলতেন, “এ একটা খোলমাত্র, মা ব্রহ্মময়ী একে আশ্রয় করে খেলছেন৷”
৫৷ রামপ্রসাদী গান যখনই শোনো, তখনই নূতন বলে বোধ হয়৷ তার কারণ জান? রামপ্রসাদ যখন গান বাঁধতেন, মা ব্রহ্মময়ী তঁার হূদয় মধ্যে বিরাজ করতেন৷
৬৷ সংসারে অনেক প্রকারে সিদ্ধ অবস্থা লাভ হয়, যেমন—স্বপ্ন–সিদ্ধ, মন্ত্র–সিদ্ধ, হঠাৎ–সিদ্ধ ও নিত্য–সিদ্ধ৷
৭৷ স্বপ্নেতে কেহ কেহ ইষ্টমন্ত্র পেয়ে তাই জপ করে সিদ্ধ হয়৷ মন্ত্র–সিদ্ধ—সদগুরুর নিকট মন্ত্রগ্রহণ করে সাধনার দ্বারা সিদ্ধ হয়৷ হঠাৎ সিদ্ধ—দৈবযোগে কোনো মহাপুরুষের কৃপালাভ করে যে সিদ্ধ হয়, তাকে হঠাৎ–সিদ্ধ বলে৷ নিত্য–সিদ্ধ—তাদের বালককাল থেকেই ধর্মে মতি থাকে৷ যেমন লাউ,কুমড়ো গাছে আগে ফল হয়, পরে ফুল ফোটে৷
৮৷ সাঁকোর নিচে জল সহজে বেরিয়ে যায়, জমে না; তেমনি মুক্ত–পুরুষদিগের হাতে যে টাকা–পয়সা আসে তা থাকে না, অমনি খরচ হয়ে যায়৷ তাঁদের বিষয়–বুদ্ধি একেবারেই নেই৷
৯৷ “ধ্যান–সিদ্ধ যেই জন, মুক্তি তার ঠাঁই৷” ধ্যান–সিদ্ধ কাদের বলে জান? যঁারা ধ্যান করতে বসলেই ভগবানের ভাবে বিভোর হয়ে যায়৷ক
১০৷ মুক্ত–পুরুষ সংসারে কি রকম থাকেন জান? যেমন পানকৌড়ি জলে থাকে, কিন্তু তাদের গায়ে জল লাগে না; যদিও গায়ে একটু জল লাগে, তা হলে একবার গা ঝেড়ে ফেললে তখনই সব চলে যায়৷
১১৷ জাহাজ যে দিকে যাক না কেন কম্পাসের কাঁটা উত্তর দিকেই থাকে, তাই জাহাজের দিক ভুল হয় না; মানুষের মন যদি শ্বরের দিকে থাকে, তা হলে আর তার কোনো ভয় থাকে না৷
১২৷ চকমকি পাথর শত বৎসর জলের ভেতর পড়ে থাকলেও তার আগুন নষ্ট হয় না, তুলে লোহার ঘা মারবামাত্রই আগুন বেরোয়৷ ঠিক বিশ্বাসী ভক্ত হাজার হাজার কুসঙ্গের মধ্যে পড়ে থাকলেও তার বিশ্বাস–ভক্তি কিছুতেই নষ্ট হয় না, ভগবৎ কথা হলে তখনি আবার সে ঈশ্বর–প্রেমে উন্মত্ত হয়৷
১৩৷ যে যেরূপ ভাবনা করে থাকে, তার সিদ্ধিও সেইরকম হয়ে থাকে৷ যেমন দৃষ্টান্ততে বলে, আরশোলা কাঁচপোকাকে ভেবে ভেবে কাঁচপোকা হয়ে যায়৷ তেমনি যে সচ্চিদানন্দকে ভাবনা করে, সেও আনন্দময় হয়ে যায়৷
১৪৷ মাতালেরা যেমন নেশার ঝোঁকে পরনের কাপড় কখনও মাথায় বাঁধে এবং কখনও বগলে নিয়ে বেড়ায়, তেমনি সিদ্ধ মহাপুরুষদেরও বাহ্য অবস্থা প্রায় সেইরূপই হয়ে থাকে৷
১৫৷ অহঙ্কার কি রকম জান? যেমন পদ্মের পাঁপড়ি ও নারকেল সুপারির বালদো, খসে গেলেও সেস্থানে একটা দাগ থাকে; তেমনি অহঙ্কার গেলে তাতে একটু দাগের চিহ্ন থাকেই থাকে৷ তবে সে অহঙ্কারে কারও কিছু অনিষ্ট করতে পারে না৷ তার দ্বারা খাওয়াা-দাওয়া, শোয়া ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোনো কর্ম চলে না৷
১৬৷ যেমন আম পাকলে বোঁটা থেকে আপনি খসে পড়ে, তেমনি জ্ঞানলাভ হলে আত্মাভিমান প্রভৃতি আপনি চলে যায়৷ জোর করে জাতি ত্যাগ করা ঠিক নয়৷
১৭৷ গুণ তিন রকমের—স্বত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ৷ এই তিন গুণের কেউ তাঁর নিকট পর্যন্ত পেঁৗছুতে পারে না৷ যেমন একজন লোক বনের পথ দিয়ে চলে যাচ্ছিল, এমন সময় তিনজন ডাকাত এসে তাকে ধরলে ও তার যা–কিছু ছিল সর্বস্ব কেড়ে–কুড়ে নিলে; তার ভেতর একজন ডাকাত বললে, “এ লোকটাকে রেখে আর কি হবে?” এই কথা বলেই, খাঁড়া উঁচিয়ে তাকে কাটতে এল৷ আর একজন ডাকাত এসে বললে, “না হে, একে কেটো না, কেটে কি হবে? এর হাত পা বেঁধে এইখানেই ফেলে রেখে যাও৷” পরে সকলে মিলে তার হাত–পা বেঁধে সেখানে রেখে চলে গেল৷ কিছুক্ষণ পরে তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বললে, “আহা, তোমার কত লেগেছে, এস আমি এখন তোমার বন্ধন খুলে দিই৷” ডাকাতটি তখন বন্ধন খুলে দিয়ে বললে, “আমার সঙ্গে সঙ্গে এস তোমায় রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি৷” পরে রাস্তার নিকটবর্তী হয়ে বললে, “ঐ রাস্তা ধরে চলে গেলে তুমি বাড়ি পৌঁছুবে৷” লোকটি তখন তাকে বলতে লাগল, “আপনি আমার প্রাণদান করলেন, অপনি আমার বাড়ি পর্যন্ত আসুন৷” ডাকাত তখন বললে, “আমি সেখানে যেতে পারব না, লোকে টের পাবে—আমি কেবল তোমাকে রাস্তা দেখিয়ে চললুম৷”
১৮৷ মুক্ত–পুরুষ সংসারে কিরূপ অবস্থায় থাকে জান? যেমন ঝড়ের এঁটো পাতা৷ নিজের কোনো ইচ্ছা বা অভিমান থাকে না৷ বাতাসে তাকে উড়িয়ে যে দিকে নিয়ে যায়, সেই দিকে যায়—কখনও বা আঁস্তাকুড়ে, কখনও বা ভাল জায়গায়৷
১৯৷ পরমহংসদেব বলতেন, “গুরু, কর্তা, বাবা— এই তিন কথায় আমার গায়ে কাঁটা বেঁধে৷ ঈশ্বর কর্তা, আমি অকর্তা, তিনি যন্ত্রী, আমি যন্ত্র;”
২০৷ যতদিন শুধু ধান থাকে, পুঁতে দিলেই গাছ হয়৷ কিন্তু সেই ধানকে সিদ্ধ করে পুঁতলে আর গাছ হয় না; তেমনি যাঁরা সিদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের আর এ সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হয় না৷
২১৷ পরমহংস অবস্থা কাকে বলে জান? যেমন হাঁসকে দুধে–জলে এক সঙ্গে দিলে, দুধ খেয়ে জলটি ফেলে রাখে৷ তাঁরা তেমনি সংসারে সার যে সচ্চিদানন্দ, তাঁকে গ্রহণ করেন, আর অসার যে সংসারে, তাকে ত্যাগ করেন৷
২২৷ প্রথমতঃ অজ্ঞান, তার পরে জ্ঞান৷ পরিশেষে যখন সচ্চিদানন্দ লাভ হয়, তখন জ্ঞান ও অজ্ঞানের পারে চলে যায়৷ যেমন কাঁটা ফুটলে বাইরে থকে যত্ন করে আর একটি কাঁটা এনে কাঁটাটিকে তুলে ফেলে তাপর দুটি কঁাটাই ফেলে দেয়৷
২৩৷ যে ব্যক্তি সিদ্ধিলাভ করেছেন অর্থাৎ যাঁর ঈশ্বর–সাক্ষাৎকার হয়েছে, তাঁর দ্বারা আর কোনোরূপ অন্যায় কার্য হতে পারে না; যেমন যে নাচতে জানে তার পা কখনো বেতালে পড়ে না৷
২৪৷ বৃহস্পতির পুত্র কচের সমাধিভঙ্গের পর যখন মন বহির্জগতে নেমে আসছিল, তখন ঋষিরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এখন তোমার কিরূপ অনুভূতি হচ্ছে?” তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘সর্বং ব্রহ্মময়ং—তিনি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না৷”
১৷ যেমন গ্যাসের আলো এক স্থান হতে এসে শহরে নানা স্থানে নানা ভাবে জ্বলছে, তেমনি নানা দেশের নানা জাতের ধার্মিক লোক সেই এক ভগবান হতে আসছে৷
২৷ ছাতের উপর উঠতে হলে মই, বাঁশ, সিঁড়ি ইত্যাদি নানা উপায়ে যেমন ওঠা যায়, তেমনি এক ঈশ্বরের কাছে যাবার অনেক উপায় আছে৷ প্রত্যেক ধর্মই এক–একটি উপায়৷
৩৷ ঈশ্বর এক, তাঁর অনন্ত নাম ও অনন্ত ভাব৷ যার যে নামে ও যে ভাবে ডাকতে ভাল লাগে, সে সেই নামে ও সেই ভাবে ডাকলে দেখা পায়৷
৪৷ কোনো ব্যাক্তি যে ভাবে, যে নামে ও যে রূপেই হোক না কেন সেই এক অদ্বিতীয় সচ্চিদানন্দ–জ্ঞানে যদি সাধন–ভজন করে, তবে তার ভগবানলাভ নিশ্চয়ই হবে৷
৫৷ যত মত, তত পথ৷ যেমন এই কালীবাড়িতে আসতে হলে কেউ নৌকায়, কেউ গাড়ীতে, কেউ বা হেঁটে আসে, সেইরূপ ভিন্ন ভিন্ন মতের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন লোকের সচ্চিদানন্দ লাভ হয়ে থাকে
৬৷ মার ভালবাসা সব ছেলের প্রতি সমান, কিন্তু কোনো ছেলের জন্য লুচি, কারও জন্য খই–বাতাসা প্রভৃতি যার যেমন আবশ্যক বোঝেন, সেই রকমেরই ব্যবস্থা করে থাকেন৷ সেইরূপ ভগবানও বিভিন্ন সাধকের শক্তি ও অবস্থানুযায়ী সাধনের ব্যবস্থা করেন৷
৭৷ মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভগবান এক, তবে ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর এত বাদ–বিসংবাদ দেখা যায় কেন?” উত্তরে পরমহংসদেব বললেন, “যেমন এই পৃথিবীতে এটা আমার জমি ও এই আমার বাড়ি বলে ঘিরে বসে থাকে; কিন্তু ওপরে সেই এক অনন্ত আকাশ, সেখানে যেমন কেউ ঘিরতে পারে না, তেমনি মানুষ অজ্ঞানে আপনার আপনার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে বৃথা গোলমাল করে৷ যখন ঠিক ঠিক জ্ঞানলাভ হয়, তখন আর পরস্পরের মধ্যে বিবাদ থাকে না৷
৮৷ হিন্দুদের মধ্যে যখন নানা মতের কথা শুনতে পাওয়া যায়, তখন আমাদের পক্ষে কোন মত শ্রেয়? আমরা কোন মত গ্রহণ করব? পার্বতী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ঠাকুর, সচ্চিদানন্দরূপের খেই কোথায়? মহাদেব বললেন, “বিশ্বাস”৷ মতে কিছু আসে যায় না৷ যিনি যে মন্ত্রে দীক্ষিত হন না কেন, বিশ্বাসের সহিত তিনি তারই সাধন করুন৷
৯৷ যাদের সঙ্কীর্ণ ভাব, তারাই অন্যের ধর্মকে নিন্দা করে ও আপনার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে দল পাকায়; আর যারা শ্বরানুরাগী—কেবল সাধন–ভজন করতে থাকে, তাদের ভেতর কোনরূপ দলাদলি থাকে না; যেমন পুষ্করিণী বা গেড়ে ডোবায় দল জন্মায়, নদীতে কখনও জন্মায় না৷
১০৷ ভগবান এক, সাধক ও ভক্তেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ও রুচি অনুসারে তাঁর উপাসনা করে থাকে৷ যেমন গৃহস্থেরা একটা বড় মাছ বাড়িতে এলে কেউ ঝোল করে, কেউ ভাজে, কেউ তেল–হলুদে চচ্চড়ি করে, কেউ ভাতে দিয়ে, কেউ কেউ বা অম্বল করে খেয়ে থাকে৷ সেইরূপ যাদের যেমন রুচি, তারা সেই রকম ভাবে ভগবানের সাধন–ভজন উপাসনা করে থাকে৷
১১৷ যেমন জল এক পদার্থ—দেশ, কাল, পাত্র–ভেদে তার ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়৷ বাঙ্গালা দেশে জল বলে, হিন্দিতে পানি বলে, ইংরাজীতে ওয়াটার বা একোয়া বলে৷ পরস্পরের ভাষা না জানা থাকলে কারুর কথা কেউ বুঝতে পারে না, কিন্তু জানলে আর ভাবের কোনরূপ ব্যতিক্রম হয় না৷
১২৷ ভগবানের নাম ও চিন্তা যে রকম করেই কর না কেন, তাইে কল্যাণ হবে৷ যেমন মিছরির রুটি সিধে করে খাও বা আড় করেই খাও খেলে মিষ্টি লাগবেই লাগবে৷
১৷ পাপ আর পারা কেউ হজম করতে পারে না৷ যদি কেউ লুকিয়ে পারা খায়, তা হলে কোনো দিন না কোনো দিন গায়ে ফুটে বেরোবে৷ পাপ করলেও তেমনি তার ফল একদিন না একদিন নিশ্চয় ভোগ করতে হবে৷
২৷ গুটিপোকা যেমন অপনারই নালে ঘর করে আপনি বদ্ধ হয়, তেমনি সংসারী জীব আপনার কর্মে আপনি বদ্ধ হয়৷ যখন প্রজাপতি হয়, তখন কিন্তু ঘর কেটে বেরোয়, তেমনি বিবেক–বৈরাগ্য হলে বদ্ধজীব মুক্ত হয়ে যায়৷
১৷ পরমহংসদেব সর্বদা বলতেন—“হাততালি দিয়ে সকালে ও সন্ধ্যাকালে হরিনাম করো, তা হলে সব পাপতাপ চলে যাবে৷ যেমন গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হাততালি দিলে গাছের সব পাখী উড়ে যায়, তেমনি হাততালি দিয়ে হরিনাম করলে দেহ–গাছ থেকে সব অবিদ্যারূপ পাখী উড়ে পালায়৷”
২৷ আগে সাদাসিধে জ্বর হোত, সামান্য পাঁচন ইত্যাদিতে সেরে যেত; এখন যেমন ম্যালেরিয়া জ্বর, তেমনি ডিঃ গুপ্ত ঔষধ৷ আগে লোকে যোগাযোগ, তপস্যা করত; এখন কলির জীব অন্নগত প্রাণ, দুর্বল মন, এক হরিনামই একাগ্র হয়ে করলে সব সংসারব্যাধি নাশ পায়৷
৩৷ জান্তে, অজান্তে বা ভ্রান্তে যে কোনো ভাবেই হোক না কেন, তাঁর নাম করলেই ফল হবে৷ কেউ তেল মেখে নাইতে যায়, তারও যেমন স্নান হয়, আর যদি কাউকে জলে ঠেলে দেওয়া যায়, তারও তেমনি স্নান হয়—আর কেউ ঘরে শুয়ে আছে, তার গায়ে জল ঢেলে দিলে তারও স্নানের কাজ হয়ে যায়৷
৪৷ অমৃতকুণ্ডে যে কোনো প্রকারে হোক, একবার পড়তে পারলেই অমর হওয়া যায়; কেউ যদি স্তবস্তুতি করে পড়ে, সেও অমর হয়, আর কাউকে যদি কোনো রকমে ঠেলে সেই অমৃতকুণ্ডে ফেলে দেওয়া, সেও অমর হয়; তেমনি ভগবানের নাম জান্তে অজান্তে বা ভ্রান্তে যে প্রকারে হোক, নিলে তার ফল হবেই হবে৷ক
৫৷ এই কলিযুগে নারদীয় ভক্তি মতই প্রশস্ত৷ অন্য অন্য৷ যুগে নানা রকমের কঠোর সাধনের নিয়ম ছিল; সে সকল সাধনে এ যুূগে সিদ্ধিলাভ করা বড় কঠিন৷ একে জীবের অল্প পরমায়ু, তাতে মালোয়ারী (ম্যালেরিয়া) রোগে কাবু করে ফেলে, কঠোর তপস্যা কেমন করে করবে?
১৷ সাধু–মহাপুরুষদিগকে নিকটস্থ আত্মীয় লোকেরা অগ্রাহ্য করে, দূরের লোকদিগের দিকট তঁাদের আদর হয়, এর কারণ কি?—যেমন বাজিকরেরর বাজি, তাদের কাছের আত্মীয় লোকেরা দেখে না, দূরের লোকেরা দেখে অবাক হয়ে যায়৷
২৷ বজ্রবাঁটুলের বীচি গাছের তলায় পড়ে না, উড়ে গিয়ে দূরে পড়ে ও সেখানে গাছ হয়৷ সেই রকম ধর্মপ্রচারকদিগের ভাব দূরেতেই প্রকাশ হয় ও লোকে আদর করে৷
৩৷ লন্ঠনের নীচে অন্ধকার থাকে, দূরে আলো পড়ে৷ সেই রকম সাধু মহাপুরুষদের নিকটের লোকেরা বুঝতে পারে না, দূরের লোকেরা তাঁদের ভাবে মুগ্ধ হয়৷
৪৷ আপনাকে মারতে হলে একটি নরুন দিয়ে হয়; কিন্তু অপরকে মারতে গেলে, ঢাল–তরবারের দরকার হয়৷ তেমনি লোকশিক্ষা দিতে হলে অনেক শাস্ত্র পড়তে হয় ও অনেক তর্ক–যুক্তি করে বোঝাতে হয়, কিন্তু আপনার ধর্মলাভ কেবল একটি কথায় বিশ্বাস করলেই হয়৷
৫৷ ও দেশেতে লোকে যখন ধান মাপে, একজন মাপতে থাকে আর একজন পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে; যেই কম পড়ে আসে, পেছনে যে গাদা করা থাকে, তা থেকে ঠেলে দিয়ে তার সামনে যুগিয়ে দেয়৷ তেমনি যারা ঠিক ঠিক সাধু ভক্ত, ঈশ্বরীয় কথা বলা ফুরাতে না ফুরাতে তাদের ভেতর থেকে ভাব যুগিয়ে আসে৷ তাদের ভাব আর ফুরোয় না৷
৬৷ যেমন একজন কাঠ ইত্যাদি সংগহ করে আগুন জ্বেলে বসে থাকে, আর পাঁচজনেও এসে বসে পোহায়; তেমনি সাধু–সন্ন্যাসীরা কঠোর তপস্যা করে ভগবানকে জানেন, আর পাঁচজন এসে তাঁদের সঙ্গ করে, তাঁদের উপদেশ শুনে ভগবানে চিত্ত স্থির করে৷
৭৷ প্রকৃত প্রচার কি রকম জান? লোককে না ভজিয়ে আপনি ভজলে যথেষ্ট প্রচার হয়৷ যে আপনি মুক্ত হতে চেষ্টা করে, সে যথার্থ প্রচার করে৷ যে আপনি মুক্ত, শত শত লোক কোথা হতে আপনি এসে তার কাছে শিক্ষা লয়৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ ঠাকুর বলতেন, “ফুল ফুটলে ভ্রমর আপনি এসে জোটে৷”
১৷ কলিকাতার কোনো বিখ্যাত ধনী ঠাকুরকে দর্শন করতে এসে নানা প্রকার কূট তর্ক উত্থাপন করতে আরম্ভ করলেন৷ ঠাকুর তাঁকে বললেন, “বৃথা তর্কে লাভ কি? সরলতার সঙ্গে ভগবানকে ডেকে যাও, তা হলে তোমার নিজের কাজ হবে৷” কথাগুলি সেই দাম্ভিক ব্যক্তির মনোমত না হওয়ায় তিনি বলে উঠলেন, “আপন কি সব জানতে পেরেছেন? ঠাকুর অতি বিনীতভাবে হাতজোড় করে তাঁকে বললেন, “আমি কিছু জানতে পারিনি সত্য, কিন্তু ঝাঁটা নিজে অপবিত্র হলেও যে স্থান ঝাঁট দেয়, সে স্থানকে পবিত্র করে৷”
২৷ বনে ভ্রমণ করতে করতে রাম পম্পা সরোবরে জল পান করতে নেমেছিলেন, ধারে তীর ধনুক মাটিতে পুঁতে জলে নেমেছিলেন৷ উঠে সে দেখেন ধনুকে বিদ্ধ হয়ে একটি ভ্যাঙ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে৷ রাম মহা দুঃখিত হয়ে তাকে বললেন, “তুমি শব্দ করলে না কেন? শব্দ করলে, আমরা জানতে পাতাম, তা হলে আর তোমার এদশা হতো না৷” ব্যাঙটা বললে, “রাম, যখন বিপদে পড়ি, তখন ‘রাম রক্ষা কর’ বলে ডাকি; এখন রামই যখন মারছেন তখন আর কাকে ডাকব?
৩৷ একটি সাধ্বী ভগবৎপরায়ণা স্ত্রীলোক সংসারে থেকে পতি–পুত্রের সেবা করতেন আর ভগবানের চিন্তা করতেন৷ একদিন রোগাক্রান্ত হয়ে তাঁর পতি প্রাণত্যাগ করেন৷ পতির সৎকারাদি শেষ করে তিনি হাতের কাচের চুড়ি ভেঙ্গে ফেলে সোনার বালা পরলেন৷ সবাই জিজ্ঞাসা করায় বললেন, “আমার স্বামীর দেহ এতদিন এই কাচের চুড়ির মতো ক্ষণভঙ্গুর ছিল৷ তাঁর অনিত্য দেহ চলে গিয়েছে৷ এখন আর তিনি ক্ষণভঙ্গুর নন, তিনি নিত্য অখণ্ডস্বরূপ৷ তাই আমি কাচের চুড়ি ছেড়ে পাকা গয়না পরেছি৷”
৪৷ গঙ্গাজল জলের মধ্যে নয়, শ্রীবৃন্দাবনের রজঃ ধুলোর মধ্যে নয়, আর শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ অন্নের মধ্যে নয়৷ এই তিন ব্রহ্ম