Cover


শ্রীশ্রীমা সারদা
স্বামী নিরাময়ানন্দ
শ্রীশ্রীমাতৃমন্দির, জয়রামবাটী
বাঁকুড়া জেলার পূর্ব প্রান্তে জয়রামবাটী গ্রাম, আর হুগলী জেলার পশ্চিম প্রান্তে কামারপুকুর; মাত্র সাড়ে তিন মাইল ব্যবধান, মধ্যে একটি খালের মতো আঁকাবাঁকা আমোদর নদ।
গত শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রকৃতির লীলানিকেতন এই দুইটি পুণ্যভূমি যে দিব্য জন্ম ও জীবনের আধার হইয়া এ যুগের যুগলতীর্থে পরিণত হইয়াছে, আমরা তাহারই আলোচনায় অগ্রসর হইতেছি।
জয়রামবাটী গ্রামখানি খুবই ছোট; তাহার তিনদিকে মাঠ, আর একদিকে ঐ ছোট নদী। উর্বর জমিতে নানাবিধ চাষ-আবাদে গ্রামটি বেশ সচ্ছল ও সমৃদ্ধ। ম্যালেরিয়া-আক্রমণের পূর্বে গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যও বেশ ভাল ছিল।
গ্রামে বেশীর ভাগই পরিশ্রমী চাষী, কয়েক ঘর শিল্পী, আর দু-চার ঘর ব্রাহ্মণ। মুখোপাধ্যায়-বংশ এই গ্রামেরই বাসিন্দা, বন্দ্যোপাধ্যায়েরা তাঁহাদের দৌহিত্র।
মুখুজ্যেরা চার ভাই; রামচন্দ্র সকলের বড়। স্বধর্মনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, তদুপরি ঈশ্বরভক্ত, অমায়িক ও দয়ার আধার এই দরিদ্র ব্রাহ্মণ সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্র ছিলেন। তাঁহার সহধর্মিণী—পার্শ্ববর্তী শিহড় গ্রামের মেয়ে শ্যামাসুন্দরী—সর্বতোভাবে স্বামীর অনুগতা। স্বহস্তে রান্না করিয়া অভুক্ত অনাথ অতিথিকে পেট ভরিয়া খাওয়াইতে তাঁহার খুব আনন্দ।
অল্প জমিজমার উৎপন্ন ফসলই তাঁহাদের জীবিকার প্রধান সংস্থান; ঐ সঙ্গে যজন-যাজন করিয়া ও পৈতার সুতা কাটিয়া এই দরিদ্র দম্পতির দিন কাটিতেছিল।
অভাব-অনটনের কথা ভাবিতে ভাবিতে একদা নিদ্রার আবেশে রামচন্দ্র দেখিলেন, একটি সর্বসুলক্ষণা সালঙ্কারা বালিকা তাঁহার গলা জড়াইয়া কাছে বসিল। তিনি মনে করিলেন, তবে বুঝি এতদিনে মা লক্ষ্মী মুখ তুলিয়া চাহিলেন। ভাগ্যান্বেষণে তিনি শহরের অভিমুখে যাত্রা করেন।
এদিকে শ্যামাসুন্দরী একদিন পিত্রালয় শিহড়ে দেবদর্শনে গিয়াছেন। ফিরিবার পথে দেবালয়ের কাছে এক বিল্ববৃক্ষতলে বসিয়া অনুভব করিলেন, একটা বায়ু যেন তাঁহার উদরে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে দেখেন, লালচেলি-পরা অতি সুন্দরী একটি ছোট মেয়ে গাছ হইতে তাঁহার দিকে ঝাঁপাইয়া পড়িল; কোমল বাহু দুটি দিয়া পিঠের দিক হইতে তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, ‘আমি তোমার ঘরে এলাম, মা’।
শ্যামাসুন্দরী অচৈতন্য হইয়া পড়িয়া যান, সঙ্গিনীরা সকলে তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া বাড়িতে লইয়া আসেন।
ধীরে ধীরে দশটি মাস কাটিয়া গেল অধীর প্রতীক্ষায়। হেমন্তের ধানকাটা শেষ করিয়া চাষীরা মা লক্ষ্মীকে ঘরে তুলিতেছে। কুটিরে কুটিরে আনন্দের হিল্লোল।
১২৬০ সালের ৮ই পৌষ, বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা। সাঁঝের আলো জ্বালা হইয়াছে, কৃষ্ণাসপ্তমীর চাঁদ এখনও উঠে নাই; পশ্চিম দিগন্তে সন্ধ্যাতারাটি তখনও মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছে, যেন কাহাকে বরণ করিবার অপেক্ষায়। শঙ্খধ্বনির সহিত উলুধ্বনি উঠিয়া শীতের কুহেলিমাখা নিস্তব্ধ পল্লীটি মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে; এমনই শুভু মুহূর্তে—পৃথিবীর বুকে তাঁহার শুভাগমন। সংবাদ পাইয়া প্রতিবেশী মেয়েরা ছুটিয়া আসিল শ্যামাসুন্দরীর সদ্যোজাতা কন্যা দেখিতে।
পূর্ব স্বপ্নকথা স্মরণ করিয়া রামচন্দ্র ভাবিতে লাগিলেন, ‘লক্ষ্মীবারের পুণ্য সন্ধ্যায়—এ কে এল আমার কুটিরে?’
মেয়ের নাম রাখা হইল সারদামণি। সারদা দরিদ্র মা-বাপের বড় মেয়ে, মায়ের আদরে বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাজকর্মও দেখিয়া দেখিয়া শিখিতে লাগিল। ছোট ভাইবোন কয়টি আসার পর মা আর একা সব পারিয়া উঠেন না, সারদাও সংসারের অনেকখানি দেখে। দিদি হইলে কি হয়, মায়েরই মতো সে ছোট ভাইবোনদের যত্ন লয়- তাহাদিগকে স্নান করায়, খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়।
বয়সের তুলনায় সারদা একটু গম্ভীরই ছিল। খেলার সময় কখনও কাহারও সহিত তাহার ঝগড়া হইত না, বরং সমবয়সীদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হইলে সে মধ্যস্থ হইয়া মিটাইয়া দিত। খেলার মধ্যেও সকলের খবরাখবর লওয়া, তাহাদিগকে যত্নাদি করা এই কাজই তাহার ভাল লাগিত। মাতৃভাব যেন তাহার জন্মগত। কখনও পুতুল খেলা, কখনও বা দেবদেবীর মূর্তি গড়িয়া ফুল দিয়া সাজানো—ইহাও ছিল তাহার খেলার অঙ্গ।
একবার জগদ্ধাত্রী প্রতিমার সম্মুখে সারদা এমন তন্ময়ভাবে ধ্যানস্থ হইয়া যায় যে, তাহার মুখমণ্ডলে দেবীর মতো সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য ফুটিয়া উঠিয়াছিল। তখন তাহাকে দেখিয়া তাহার পরিচিত লোকেরাও চিনিতে পারে নাই, কে এই মেয়েটি।
সারদার কিন্তু লেখাপড়া বিশেষ কিছুই হয় নাই। একে পল্লীগ্রাম, তাছাড়া তখন ধারণা ছিল মেয়েরা লেখাপড়া শিখিলে শুধু নাটকাদি পড়িবে, সংসারের কাজকর্ম করিবে না। বাড়ির কাছেই পাঠশালা, ভাইয়েরা পড়িতে যাইত। সারদা কাজকর্ম সারিয়া সময় পাইলেই তাহাদের বই লইয়া নাড়াচাড়া করিত, কোনদিন বা ফাঁক পাইলে তাহাদের সঙ্গে পাঠশালায় চলিয়া যাইত। লেখাপড়া শিখিবার প্রবল আগ্রহ তাহার বহুদিন পর্যন্ত ছিল, এবং সুযোগ পাইলে যতটুকু পারিত সে শিখিয়া লইত। এইভাবে শেষ পর্যন্ত সে বেশ পড়িতে শিখিয়াছিল, কিন্তু লিখিতে পারিত না।
বই পড়াই শিক্ষার একমাত্র উপায় নয়। কথকঠাকুরের কথা, দোল-দুর্গোৎসবে যাত্রা ও কীর্তন শুনিয়া সারদা কত সুন্দর সুন্দর কথা শিখিয়া লইত। দু-একবার শুনিলেই তাহার সব মনে থাকিত।
তখন কে জানিত যে—এই মেয়ে একদিন এমন একজনের হাতে পড়িবে, যিনি তাহাকে লৌকিক, আধ্যাত্মিক—সকল শিক্ষাদীক্ষা দিয়া সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ করিয়া দিবেন এবং পরবর্তিকালে তাহার সম্বন্ধে বলিবেন, ‘ও সারদা সরস্বতী, জ্ঞানদায়িনী।
বেলবৃক্ষ, এল্লাপুকুর
যাঁহার সাহচর্যে আসিয়া, যাঁহার জীবনসঙ্গিনী হইয়া আমাদের সারদার এই রূপান্তর হইল, তিনি কে?
কামারপুকুরের উত্তর প্রান্তে ছোট্ট একটি কুটির। তাহাতে অতি দরিদ্র এক ব্রাহ্মণ-পরিবারের বাস; ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়—তেজস্বী, সত্যবাদী, দেবদ্বিজে ভক্তিপরায়ণ।
জমিদারের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজী না হওয়ায় চল্লিশ বৎসর বয়সে পিতৃপুরুষের ভিটা হইতে বহিষ্কৃত হইয়া গ্রামান্তরে বন্ধু সুখলালের আহ্বানে তাঁহারই প্রদত্ত লাহাবাবুদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী জমিটুকুর উপর—ইষ্টদেবতা রঘুবীরকে কেন্দ্র করিয়া ক্ষুদিরাম নূতনভাবে সংসারযাত্রা শুরু করেন।
কয়েক বৎসর পরে তীর্থদর্শনে গিয়া গয়াধামে ক্ষুদিরাম স্বপ্ন দেখিলেন, স্বয়ং নারায়ণ তাঁহার পুত্ররূপে আসিবেন বলিতেছেন। স্বীয় দারিদ্র স্মরণ করিয়া তিনি নিজেকে ইহাতে অত্যন্ত বিপন্ন বোধ করিলেন। এদিকে গৃহে পত্নী চন্দ্রমণি দেবীরও নানা বিচিত্র দিব্য অনুভূতি হইতে লাগিল।
১২৪২ সালের ফাল্গুনের শুক্লা দ্বিতীয়ায় চন্দ্রমণি দেবী যে শিশুটি প্রসব করিলেন, স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়া ক্ষুদিরাম তাহার নাম রাখিলেন গদাধর।
শৈশবেই পিতৃহীন গদাধর চন্দ্রমণির নয়নের মণি হইয়া পড়িল। লেখাপড়া বেশী দূর অগ্রসর হইল না, কিন্তু যাত্রায় ও গানে তাহার খুব উৎসাহ। স্মরণশক্তি এত প্রখর যে, একবার শুনিলেই গোটা গানটি মুখস্থ হইয়া যায়। সকলে আগ্রহ করিয়া তাহার
গান শোনে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঈশ্বরের মহিমা অনুভব করিয়া, কখনও বা ভগবৎ-সঙ্গীতের দিব্যভাবে বিভোর হইয়া বাল্যেই গদাধর একাধিকবার বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়ে। ছেলের অসুখ ভাবিয়া চন্দ্রমণি চিকিৎসা করাইলেন, পড়াশুনা একেবারে বন্ধ করিয়া দিয়া তাহাকে নিজের চোখে চোখে রাখিলেন।
এইভাবেই চলিতেছিল; এমন সময় জ্যেষ্ঠভ্রাতা রামকুমার গদাধরকে কলিকাতায় লইয়া আসিলেন—ঝামাপুকুরে তাঁহার টোলে কাজকর্মে সাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে একটু লেখাপড়া ও যজন-যাজন শিখিয়া যাহাতে সে জীবিকা অর্জনের উপযুক্ত হয়।
ঘটনাচক্রে এখান হইতে উভয়কেই দক্ষিণেশ্বরে রানী রাসমণির কালীবাড়িতে আসিতে হয় এবং রামকুমার কালীমাতার পূজক নিযুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিন পরে গদাধরের উপরে মায়ের পূজার ভার দিয়া তিনি লোকান্তরে গমন করেন। পূজা করিতে করিতে গদাধরের মনে প্রশ্ন জাগিল—‘এ কাহার পূজা করিতেছি? কেন করিতেছি? মা মৃন্ময়ী, না চিন্ময়ী? এত ডাকিতেছি, কিন্তু সাড়া কই?’
ক্রমশ ভাবে বিভোর হইয়া গদাধরের বাহ্যপূজা মানসরাজ্যে প্রবেশ করিল, তাঁহার সাধনা ও ব্যাকুলতা চরমে পৌঁছিল। একদিন অন্ধকার রাত্রিতে মায়ের মন্দিরে ঢুকিয়া দেখেন, প্রতিমা যেমন তেমনই দাড়াইয়া আছে! মাতৃদৰ্শন-পিপাসাকাতর গদাধর বলিয়া উঠিলেন, ‘মা, দেখা দিবি তো দে, নতুবা এই খড়্গ দ্বারা আজ এখানেই এ জীবন বলি দিব!’ সহসা মূর্তি জ্যোতির্ময়ী ও জীবন্ত হইয়া উঠিল—নিখিল ভুবন বিলুপ্ত করিয়া, উজ্জ্বল ঊর্মিমালায় অন্তর-বাহির ব্যাপ্ত করিয়া, মায়ের মুখখানি হাসিতে লাগিল! গদাধর সংজ্ঞাশূন্য; একটু সংজ্ঞা ফিরিলেই কাতরকণ্ঠে ‘মা, মা’ বলিয়া ডাকিতেছেন, কাহাকে যেন খুঁজিতেছেন—এই তো ছিল, কোথায় গেল!—আবার সংজ্ঞাশূন্য; দেখিতেছেন বরাভয়দায়িনী চিন্ময়ী মূর্তি হাসিতেছেন, কথা কহিতেছেন!
এই প্রথম দর্শনের পর গদাধরের ব্যাকুলতা বাড়িয়া গেল। এখন তিনি গঙ্গাতীরে বালুকার উপর মুখ রগড়াইয়া কাঁদেন। অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকাইয়া বলেন, ‘মা আরও একটা দিন যে বৃথা কেটে গেল, আজ তো দেখা দিলি না!’ অতঃপর জগজ্জনী তাঁহাকে বারংবার দেখা দিয়া শান্ত করিলেন। কিন্তু সাধক আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া অহোরাত্র আবার কিসের সাধনায় যেন নিমগ্ন! জগৎ-সংসার ও শরীরের প্রতি একান্ত উদাসীন!
কামারপুকুরে জননী চন্দ্রমণির কানে এই সংবাদ অতিরঞ্জিত হইয়া পৌঁছিল। তিনি বুঝিলেন, গদাধরের বাল্যের সেই বায়ুরোগ আবার প্রবল হইয়াছে। তাই চিকিৎসার জন্য তাহাকে যথাসম্ভব শীঘ্র নিজের কাছে লইয়া আসিলেন। প্রতিবেশীদের পরামর্শে বিবাহের চেষ্টাও চলিতে লাগিল।
কোথাও মনের মতো কন্যা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না দেখিয়া গদাধরই একদিন সানন্দে পাত্রীর সন্ধান বলিয়া দিলেন, ‘জয়রামবাটীতে রামচন্দ্র মুখুজ্যের মেয়েটি কুটো বেঁধে রাখা আছে, দেখগে যাও।’
তখনই লোক পাঠাইয়া যথাস্থানে পঞ্চমবর্ষীয়া সারদার সন্ধান পাওয়া গেল। কন্যার পিতারও আগ্রহ দেখিয়া চন্দ্রমণি ঐ মেয়েটিকেই বধূরূপে বরণ করিবার জন্য উতলা হইলেন। লোকেরা বলিতে লাগিল, মেয়েটি বড্ড ছোট।
পরবর্তী বৈশাখেই বিবাহ হইয়া গেল। গদাধরের বয়স তেইশ পূর্ণ হইয়াছে, সারদা ছয়ে পড়িয়াছে। বছর তিনেক আগে শিহড়ে গান শুনিতে গিয়া জনৈক আত্মীয়া সারদাকে কোলে তুলিয়া আদর করিয়া জিজ্ঞাসা করেন, ‘ঐ ছেলেগুলির মধ্যে কাকে বিয়ে করবি?’ সারদা তাহার ছোট্ট আঙুল দিয়া যাহাকে দেখাইয়াছিল, সেই নাকি আজ সারদার বর গদাধর! এই কথা শুনিয়া জয়রামবাটীর নারীদের আনন্দ আর ধরে না! তবু কেহ কেহ বলিতে লাগিল, ‘আহা, মেয়েটার কপাল খারাপ, বরটির নাকি পাগলের ছিট আছে; ‘মা, মা’ ক’রে কাঁদে, অর্ধেক দিন খায় না, ঘুমোয় না, শ্মশানে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।’
সে যাহা হউক, সারদা এ-সব কিছু বুঝিল না, নূতন গহনা-কাপড়ে আর কোলে চড়িয়া শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথাই তাহার মনে রহিল। কয়েকদিন পরে তাহাকে কামারপুকুরে খেজুর গাছের তলায় কোঁচড় ভরিয়া খেজুর কুড়াইতে দেখিয়া লাহাবাবু বলিয়াছিলেন, ‘ওমা, এইটিই বুঝি নতুন বউ!’
বিবাহ-উৎসবের পরে ধনী প্রতিবেশীর নিকট চাহিয়া আনা সোনার গহনাগুলি ফিরাইয়া দিবার সময় আসিলে চন্দ্রমণি তো ভাবিয়াই অস্থির—কি করিয়া নূতন বউ-এর গা হইতে অলঙ্কার খুলিবেন। মায়ের চিন্তা দেখিয়া গদাধর বলিয়া উঠিলেন, ‘তুমি কিছু ভেবো না মা, ও আমি ঠিক খুলে দেব।’
নিদ্রিতা বধূর গাত্র হইতে অতি সন্তর্পণে গদাধর অলঙ্কারগুলি খুলিয়া লইলেন। পরদিন সকালে সারদামণি গায়ের গহনা নাই দেখিয়া খুব কাঁদিতেছে। চন্দ্রমণি তাহাকে বুঝাইলেন, ‘গদাই বড় হ’য়ে তোমাকে এর চেয়ে ভাল ভাল গয়না গড়িয়ে দেবে।’ তবে সারদামণি শান্ত হইল।
বিবাহের পর সারদামণি তাহার পিত্রালয়ে চলিয়া গেল। দুই বৎসর পরে গদাধর দ্বিতীয়বার শ্বশুরালয় জয়রামবাটীতে আসেন। তখন কেহ না বলিয়া দিলেও সারদামণি গদাধরের পা ধুইয়া মুছাইয়া দেয় ও তাঁহাকে পাখার বাতাস করে। উহা দেখিয়া বয়স্কা মেয়েরা হাসিয়াছিল।
এবার বর-বধূ পালকিতে যাতায়াত করে। পাছে সারদামণি মনে করে এইবারের আসাই বুঝি বিবাহ, তাই গদাধর তাহাকে বুঝাইয়া বলিতেছেন, ‘তোমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, ক-বছরে বিয়ে হয়েছেতো—পাঁচ বছর বোলো, সাত বছর বোলো না। আর যদি জিজ্ঞেস করে, তোমাকে আমি ভালবেসেছি কি না, তো বলবে খুব ভালবেসেছি।’ সাত বছরের বধূ সারদামণি সব বুঝিয়া ঘাড় নাড়িল।
এই ক্ষণিক মিলনের পরে গদাধর ফিরিয়া গেলেন তাঁহার সাধনা-মন্দির দক্ষিণেশ্বরে, আর সারদামণি পিত্রালয়ে গিয়া তাহার মায়ের কাজে সাধ্যমত সাহায্য করিতে লাগিল; সে-ই সংসারের গিন্নী—ভাইগুলি ক্রমশ বড় হইতেছে, তাহাদের বহু ঝামেলা তাহারই উপর।
ছোটবেলা হইতেই সারদার গঙ্গার উপর একটা টান; ঐ আমোদরকেই গঙ্গা মনে করিয়া রোজ সেইখানে যাওয়া চাই। ছোট নদী, অল্প জল টল-টল করিতেছে, ডুবিবার কোনও ভয় নাই। ছোট ভাই-বোনদের স্নান করাইয়া গাছতলায় বসাইয়া, দুটি মুড়ি খাওয়াইবার পর তাহাদিগকে বাড়ি লইয়া আসিত।
মা যেদিন রাঁধিতে পারিতেন না, সেদিন সারদাই ভাতের হাঁড়ি চড়াইয়া দিত, নামাইবার সময় বাবাকে ডাকিত। কোন দিন মজুররা ক্ষেতে কাজ করিতেছে, সারদাই তাহাদের জলখাবার মুড়ি-গুড় পৌঁছাইয়া দিয়া আসিত। অবসর-মত গাছ হইতে তুলা তুলিয়া মায়ের কাছে পৈতার সূতা কাটিতে শিখিয়াছে। সকল কাজেই তাহার উৎসাহ, কিছুতেই ক্লান্তি বা বিরক্তি নাই। সে এক-গলা জলে নামিয়া গরুর জন্য দলঘাস কাটিয়াছে; পঙ্গপাল যে-বার ধান নষ্ট করে, সে-বার সে সকলের সঙ্গে মাঠে মাঠে সেই ধান কুড়াইয়াছে।
সারদার যখন এগার বৎসর বয়স তখন ঐ অঞ্চলে ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয়। দরিদ্র রামচন্দ্রের অল্প ধান সঞ্চিত ছিল; নিজের ছেলেমেয়েদের কথা কিছুমাত্র না ভাবিয়া তিনি অন্নসত্ৰ খুলিয়া দিলেন। কড়ায়ের ডালের খিচুড়ি হাঁড়ি হাঁড়ি রাঁধিয়া কয়েকটি ডাবায় ঢালিয়া রাখিতেন; যখন যে আসিত তাহাকে দেওয়া হইত। গরম খিচুড়ি খাইতে লোকদের কষ্ট হয় দেখিয়া সারদা দুই হাতে পাখার বাতাস দিয়া উহা ঠাণ্ডা করিত।
এই সময় বেশীর ভাগই পিত্রালয়ে থাকা সত্ত্বেও মধ্যে দুইবার সারদামণি কয়েকদিনের জন্য কামারপুকুরে গিয়া শ্বশ্রুঠাকুরানির কাছে ছিল। একাকী স্নানে যাইতে সঙ্কোচ বোধ করিলে সে দেখিতে পাইত, তাহার আগে পাছে সঙ্গিনী সখীর মতো কাহারা যেন চলিয়াছে; স্নানের পর বাড়ির কাছে আসিলে তাহাদের আর দেখা যাইত না, মনে হইত বুঝি এরা পাড়ারই মেয়ে, স্নানে গিয়াছিল।
বাল্যকালেও সারদা তাহার অনুরূপা একটি বালিকাকে তাহার সঙ্গে কাজ-কর্মে, খেলায়-ধুলায় যোগ দিতে দেখিত; লোকজন আসিয়া পড়িলে তাহাকে আর দেখা যাইত না।
দেখিতে দেখিতে সারদামণি সুষমামণ্ডিতা হইয়া চতুৰ্দশ বর্ষে উপনীত হইয়াছেন; এমন সময় প্রায় সাত বৎসর পরে গদাধর জন্মভূমি সন্দর্শনে আসিলেন। এই কয় বৎসরে তন্ত্র ও বেদান্তের কী কঠোর সাধনাই না তিনি করিয়াছেন! সাধন-সমুদ্রের পারে আজ তিনি সহজাবস্থা লাভ করিয়া সদানন্দে নিমগ্ন; শ্রীরামকৃষ্ণ নামেই এখন তিনি সমধিক পরিচিত।
সঙ্গে আসিয়াছেন তাঁহার তন্ত্রসাধনার গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণী এবং ভাগিনেয় হৃদয়। প্রতিবেশীরা বহুদিন পরে তাহাদের গদাধরকে পাইয়া আনন্দিত; তিনিও সকলের সঙ্গে প্রাণ খুলিয়া মেলামেশা ও হাসিখুশি করিয়া সৎপ্রসঙ্গ দ্বারা তাহাদের মন ঈশ্বরের দিকে টানিতে লাগিলেন।
এই আনন্দের হাট পূর্ণ করিবার জন্য জয়রামবাটী হইতে সারদামণিকে কামারপুকুরে আনা হইল। এই সময়েই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে সহধর্মিণীরূপে গড়িয়া তুলিবার দিকে মন দিলেন। কি করিয়া প্রদীপের সলতে পাকাইতে হয়, কিভাবে কখন কাহার সহিত কেমন ব্যবহার করিতে হয়, কিভাবে ভগবানের ধ্যান-ধারণা করিতে হয়—সব তাঁহাকে শিখাইতে লাগিলেন। সারদামণিও নীরবে শিষ্যার মতো সব শিখিতে লাগিলেন।
একদিন জীবনের উদ্দেশ্য ও আধ্যাত্মিক সাধনা সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিলেন, ‘চাঁদমামা সকলেরই মামা, তেমনি ঈশ্বরও সকলের অতি আপনার, যে তাঁকে মনে প্রাণে ভালবাসে, ডাকে, সে-ই তাঁর দেখা পায়; তুমি যদি ডাকো, তুমিও তাঁর দেখা পাবে; আর তাঁর দেখা পাওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য,—নতুবা জীবন বৃথা।
শ্রীরামকৃষ্ণের এই প্রেমপূর্ণ কথাগুলি সারদামণির অন্তরে প্রবেশ করিল এবং তাঁহার জীবনের পরতে পরতে মিশিয়া গেল। তিনি তাঁহার পরমগুরু পতিকে জীবনের ধ্রুবতারা করিয়া এবং তাঁহার বাক্য মন্ত্রের মতো মনে করিয়া সাধনার পথে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
এই সময়ের কথা বলিতে গিয়া পরবর্তিকালে তিনি বলিয়াছেন, ‘তখন মনে হ’ত কে যেন হৃদয়ে একটি আনন্দের ঘট স্থাপন ক’রে রেখেছে!’ বুকের ভিতর আনন্দ, চোখে মুখে আনন্দ যেন উপচিয়া পড়িতেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের ভালবাসা পাইয়া, নিজেও তাঁহাকে ভালবাসিয়া সারদাদেবী আনন্দে ভরপুর হইয়া গেলেন।
সুখের সাতটি মাস সাতটি দিনের মতো কাটিয়া গেল। শ্রীরামকৃষ্ণ ফিরিয়া গেলেন দক্ষিণেশ্বরে, আর সারদাদেবী চলিয়া আসিলেন জয়রামবাটীতে। শয়নে-স্বপনে, ধ্যানে-জাগরণে তাঁহার সমগ্র সত্তা পরিপ্লুত করিয়া রহিল ঐ কয়মাসের সুখস্মৃতি। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, কে এই অপূর্ব মধুর পরমপুরুষ—লোকে যাঁহাকে পাগল বলে, যাঁহার স্ত্রী বলিয়া তাঁহাকে করুণার চোখে দেখে? কই, আমি তো পাগলের মতো কিছু দেখিলাম না, বেশ সহজ স্বাভাবিক, তবে ঈশ্বরীয় কথায় মত্ত, ভগবদ্ভাবে বিভোর! কে এই দেবমানব, মহাসাধক আমার স্বামী! শ্রদ্ধা, ভক্তি ও প্রীতিতে তাঁহার মন-প্রাণ ভরিয়া উঠিল! একটা সার্থক গর্ব ও গৌরব সর্বদা ঘিরিয়া থাকিত, যাহার বলে সংসারী লোকের উপহাস তিনি নীরবে উপেক্ষা করিতে পারিতেন।
দিনের পর দিন আবার কাটিতে লাগিল, কিন্তু এবার যেন দিন কাটে বছরের মতো। আবার করে তিনি আসিবেন, আবার করে কাছে ডাকিবেন—এই এক চিন্তাই সারদাদেবীর মনকে আচ্ছন্ন করিয়া রহিল। মনে দৃঢ় বিশ্বাস—যিনি এত ভালবাসিয়াছেন, তিনি নিশ্চয় সময় হইলেই আবার কাছে ডাকিয়া লইবেন। কিন্তু কই? এক, দুই, তিন করিয়া চারিটি বছর কাটিয়া গেল, তিনি তো ডাকিলেন না, আহ্বান তো আসিল না। তবে কি তিনি ভুলিয়া গেলেন? না, লোকে যাহা বলে তাহাই ঠিক? যদি ঠিক হয়, তবে তো তাঁহার কর্তব্য এখনই সেখানে যাইয়া স্বামীর সেবা করা। গ্রাম্য লোকেরা তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলে, ‘আহা মেয়েটার কি কপাল, কি দুর্গতি?’ সারদা আর সহ্য করিতে পারেন না, ধৈর্যের বাঁধ এবার বুঝি ভাঙিয়া যায়!
দোলপূর্ণিমা সমাগত। গ্রামের মেয়েরা অনেকে কলিকাতা যাইবে গঙ্গাস্নান করিতে। সারদারও তাহাদের সহিত যাইবার ইচ্ছা শুনিয়া স্নেহময় পিতা সংসার-সৌভাগ্যহীনা কন্যার মনোগত অভিলাষ বুঝিলেন, এবং পথের বাধা-বিপদ চিন্তা করিয়া নিজেও সঙ্গে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন।
দীর্ঘ পথ চলিবার অভ্যাস নাই; সারদার কোমল পদতলে কঠিন মাটি কাঁটার মতো বিঁধিতেছে। সকল বিঘ্ন তুচ্ছ করিয়া তরঙ্গিণী চলিয়াছে সাগর-সঙ্গমে!
ক্রমাগত দুই দিন চলিবার পর মনের আবেগ সত্ত্বেও সারদার শরীর বড় কাতর হইয়া পড়িল, আর খুব জ্বর আসিল। উপায়ান্তর না দেখিয়া পিতা তাহাকে লইয়া নিকটবর্তী চটিতে উঠিলেন। জ্বরের ঝোঁকে ও মনের দুঃখে সারদা বেহুঁশ হইয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন।
সেই অবস্থায় অনুভব করিলেন, কে একটি কালো মেয়ে তাঁহার শিয়রে বসিয়া গায়ে মাথায় হাত বুলাইয়া দিতেছে—কি ঠাণ্ডা হাত দুটি! তাঁহার সব জ্বালা জুড়াইয়া গেল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কে গা তুমি? কোথা থেকে এলে?’
মেয়েটি বলিল, ‘আমি তোমার বোন, দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছি।” সারদা বলিলেন, ‘আহা! দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছ? তিনি কেমন আছেন? আমার আর সেখানে যাওয়া হ’ল না, তাঁকে দেখা হ’ল না, তাঁর সেবা করা হ’ল না।’
কালো মেয়েটি বলিল, ‘সে কি, তুমি ভাল হ’য়ে দক্ষিণেশ্বরে যাবে, তাঁকে দেখবে; তাঁকে তো আমি তোমারই জন্যে আটকে রেখেছি।’
‘ও, তাই নাকি?’—একটা আবেশে এই কথা বলিতে বলিতে সারদা আবার ঘুমাইয়া পড়িলেন। সকালে দেখা গেল জ্বর ছাড়িয়া গিয়াছে।
পিতাপুত্রী ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলেন, কিছু দূর যাইতেই একখানা শিবিকা পাওয়া গেল। উহাতে উঠিয়া সারদার আবার জ্বর আসিল; পাছে বিলম্ব হয়, এই ভয়ে পিতাকে কিছু না বলিয়া সারদা চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। সারাদিন চলিয়া রাত্রি প্রায় নয়টার সময় তাঁহারা দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছিলেন।
সহসা সারদামণিকে জ্বর-গায়ে এইভাবে আসিতে দেখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ উদ্বিগ্ন হইলেন, নিজের ঘরেই তাঁহার থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। পথ্যাদি গ্রহণের পর তাঁহার পথক্লান্তি দূর হইলে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতে লাগিলেন, ‘আহা! এত দিন পর তুমি এলে! আর কি আমার সেজবাবু আছে, যে তোমার যত্ন নেবে?’
সেজবাবু মথুরামোহন বিশ্বাস—রানী রাসমণির সেজ জামাই; মন্দিরের দেখাশুনা করিতেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণকে দেবতাজ্ঞানে সেবা করিতেন। কিছুদিন পূর্বে তাঁহার দেহান্ত হইয়াছে।
যাহা হউক, শ্রীরামকৃষ্ণই সারদামণির ঔষধপথ্যের বিশেষ বন্দোবস্ত করিয়া দেখাশুনা করিতে লাগিলেন; জ্বর তিন-চার দিনের মধ্যেই সারিয়া গেল।
সারদামণি স্বামীর এই যত্ন ও ভালবাসা পাইয়া বুঝিলেন, তাঁহার প্রাণের দেবতা আগের মতোই আছেন; বাহিরের খোঁজখবর লওয়া না থাকিলেও অন্তরের যোগাযোগ ঠিকই আছে।
একদিন একান্তে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি গো, আমাকে সংসারের পথে টেনে নিতে এসেছ?’ সারদামণি উত্তর দিলেন, ‘তোমাকে সংসারের ভেতর টানব কেন? তোমার জীবনের ব্রতে সহায় হতে এসেছি।’
শ্রীরামকৃষ্ণ নিশ্চিন্ত হইলেন; অনতিদূরে নহবতে স্বীয় জননী চন্দ্রমণি দেবীর কাছে সারদাদেবীরও থাকিবার ব্যবস্থা করিলেন। সেইস্থানে থাকিয়া সারদামণি মনের আনন্দে শ্বশ্রূমাতা ও স্বামীর সেবায় মগ্ন হইলেন।
রামচন্দ্রও কন্যার এই পরম সুখ দেখিয়া শ্যামাসুন্দরীকে সংবাদটি দিবার জন্য জয়রামবাটীতে ফিরিলেন।
শান্তিনাথ মন্দির,
শিহড়
সর্বসাধনার শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ এই সময় সর্বদা ভাবমুখে থাকিতেন। দিনরাত্রির অধিকাংশই ঈশ্বরীয় ভাব ও প্রসঙ্গে কাটিয়া যাইত; উচ্চ অনুভূতির সামান্য একটু ইঙ্গিত, সঙ্গীতের মাত্র একটি কলি তাঁহার মনকে সমাধির স্তরে লইয়া যাইত। সেই অবস্থাই যেন তাঁহার সহজ অবস্থা, জোর করিয়া মনকে বাহ্য জগতে নামাইয়া রাখিতে হইত। সেই সময় তাঁহার আচার-ব্যবহার পাঁচ বছরের বালকের মতো, খাওয়াইয়া দিলে খান, কাপড় পরাইয়া দিলে পরেন, কোন কিছু প্রশ্ন জাগিলে মন্দিরে মাকে গিয়া জিজ্ঞাসা করেন। ভাগিনেয় হৃদয় কালীঘরে পূজার সহিত মামারও দেখাশুনা করিত।
সারদামণি দক্ষিণেশ্বরে আসিলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে সাদরে বরণ করিয়া লইলেন, আর সারদামণিও মন-প্রাণ দিয়া স্বামীর সেবা করিতে লাগিলেন। সারাদিন নহবতে থাকিয়া কাজকর্ম শেষ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছানুযায়ী তাঁহার শয্যাতেই তিনি শয়ন করিতে আসিতেন।
এক চন্দ্রালোকিত রজনীতে পার্শ্বে সুপ্তা ধর্মপত্নীর প্রতি চাহিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার সাধন-মার্জিত মনকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, ‘মন, ইহারই নাম স্ত্রী-শরীর, উহা গ্রহণ করিলে দেহের আনন্দেই আবদ্ধ থাকিতে হয়, সচ্চিদানন্দ লাভ করা যায় না। ভাবের ঘরে চুরি করিও না; সত্য বল, কোন্টি চাও?’
‘সচ্চিদানন্দ’ চিন্তা মাত্র তাঁহার মন সেই আনন্দে বিলীন হইয়া গেল। দেহ স্থির, নিস্পন্দ! কিছুক্ষণ পরে সারদামণির ঘুম ভাঙিলে শ্রীরামকৃষ্ণের ঐ অবস্থা দেখিয়া ভীত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া হৃদয়কে ডাকিলেন, হৃদয় জানিত কিভাবে এরূপ ভাবাবস্থা ভাঙাইতে হয়।
এই ঘটনার পর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই সারদামণিকে শিখাইয়া দিলেন, ঈশ্বরের যে-ভাব লইয়া ভাবসমাধি হয়, তদনুযায়ী নাম ধীরে ধীরে শুনাইলে ভাবসংবরণ হয়। অতঃপর সারদামণি নিজেই শ্রীরামকৃষ্ণকে ভাবাবস্থা হইতে সহজাবস্থায় ফিরাইয়া আনিতেন।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এইভাবে কাটিয়া গেল, কাহারও মন দেহের স্তরে নামিল না। এই প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছেন, ‘বিবাহের পর জগন্মাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম : ‘মা, ওর কামভাব এককালে দূর ক’রে দে; এই সময়ে একত্র বাস ক’রে বুঝেছিলাম—মা আমার প্রার্থনা পূরণ করেছেন।’
একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের পা টিপিতে টিপিতে সারদামণি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আচ্ছা, আমি তোমার কে?’ শ্রীরামকৃষ্ণ যেন প্রস্তুত ছিলেন, সুধামাখা ভাষায় উত্তর দিলেন, ‘যে মা মন্দিরে, যে মা এই শরীরের জন্ম দিয়েছেন—সম্প্রতি নহবতে, তুমি আমার সেই মা আনন্দময়ী!’
শ্রীরামকৃষ্ণের কখনও ইচ্ছা হইত প্রকৃতিবেশে সাজিবেন,—সারদামণি তাঁহাকে বস্ত্রালঙ্কারে মনের মতো সাজাইয়া দিতেন ও দুইজনে সখীভাবে ভাবিত হইয়া আপনাদিগকে জগন্মাতার দাসী জ্ঞান করিতেন।
সাধনার প্রথম অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণ সীতা-রূপ দর্শন করেন; তাঁহার হাতে ডায়মণ্ডকাটা বালা দেখিয়াছিলেন। হৃদয়ের বাক্সে তাঁহার কিছু টাকা ছিল, সেই টাকায় ঐরূপ বালা গড়াইয়া সারদামণিকে পরিতে দিয়া হৃদয়কে বলিলেন, ‘ওরে হৃদু, ওর সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক।’ বালা পরিয়া সারদামণির খুব আনন্দ হইল।
জ্যৈষ্ঠের অমাবস্যা। শ্রীমন্দিরে আজ ফলহারিণী কালীপূজার সমারোহ। শ্রীরামকৃষ্ণের মনে জাগিয়াছে এক নূতন পূজার সঙ্কল্প। হৃদয়কে ডাকিয়া ষোড়শোপচারে দেবীপূজার সকল আয়োজন প্রস্তুত রাখিতে বলিলেন। পূজা হইবে তাঁহার নিজের ঘরে। সারদামণিও যাহাতে পূজাকালে উপস্থিত থাকেন, তাহার নির্দেশ দিলেন।
অমানিশার প্রথম প্রহর অতীত হইয়াছে; শ্রীরামকৃষ্ণ সারদামণি দেবীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তিনি আসিয়া দেখেন পূজার আয়োজন সম্পূর্ণ। পূর্বাস্য পূজকের সম্মুখে দেবীর আলপনা দেওয়া পিঁড়ি৷ শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে সেইখানে বসিতে ইঙ্গিত করিলেন। মন্ত্রমুগ্ধার মতো তিনি পশ্চিমাস্যা হইয়া দেবীর আসনে উপবেশন করিলেন; তিনি কি করিতেছেন, কেন করিতেছেন, কিছুই বুঝিতেছেন না।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে মন্ত্রপূত-বারি দ্বারা অভিষিক্ত করিয়া তাঁহার অন্তর্নিহিত দিব্যশক্তি উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য প্রার্থনা করিতে লাগিলেন, ‘অয়ি সর্বশক্তির অধীশ্বরি মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরী! সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর। ইহার শরীর মন পবিত্র করিয়া, ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্ব কল্যাণ সাধন কর।’
সারদাদেবী বাহ্যজ্ঞানশূন্যা হইয়া চিত্রার্পিতাবৎ রহিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে ষোড়শোপচারে সেই মাতৃমূর্তির পূজা করিলেন; ভোগ নিবেদন করিয়া কিয়দংশ দেবীর মুখে দিলেন। সারদাদেবী সমাধিস্থা। শ্রীরামকৃষ্ণও অর্ধবাহ্যদশায় মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে সমাধিমগ্ন। উভয়ে আত্মস্বরূপে একীভূত!
কতক্ষণ কাটিয়া গেল। নিশার দ্বিতীয় প্রহর বহুক্ষণ অতীত। শ্রীরামকৃষ্ণের বাহ্যসংজ্ঞার লক্ষণ প্রকাশ পাইতেছে। অর্ধবাহ্যদশায় তিনি দেবীর চরণে আত্মনিবেদন করিলেন, এবং সুদীর্ঘ সাধনার ফলরাশির সহিত জপের মালাও তাঁহার পাদপদ্মে চিরকালের জন্য বিসর্জন করিয়া প্রণাম করিলেন—
“সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে॥”
মূর্তিমতী বিদ্যারূপিণী মানবীর দেহাবলম্বনে দেবী উপাসনায় শ্রীরামকৃষ্ণের সকল সাধনা শেষ, আর সারদাদেবীর শুদ্ধ দেহ ও মনের আধারে যুগধর্মপালনী মহাশক্তি শ্রীশ্রীমায়ের জীবন আরম্ভ!
শ্রীশ্রীমায়ের বাহ্যজ্ঞান ফিরিয়া আসিলে তিনি মনে মনে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করিয়া বাহিরে আসিলেন। আজ তাঁহার মনের কী ভাব, কী অনুভূতি, কে তাহা নির্ণয় করিবে?
এই মহাপূজার পরও পাঁচ-ছয় মাস শ্রীশ্রীমা সারাদিন নহবতে থাকিয়া কাজকর্ম সমাপনান্তে রাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের শয্যাপার্শ্বে শয়ন করিতে আসিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার কাছে আধ্যাত্মিক রাজ্যের সাধন-ভজনের কত কথা বলিতেন। শ্রীশ্রীমাও উহা তন্ময় হইয়া শুনিতেন!
ঐ সকল প্রসঙ্গ করিতে করিতে শ্রীরামকৃষ্ণের মন তদনুযায়ী উচ্চভূমিতে চলিয়া গিয়া সমাধিমগ্ন হইলে শ্রীশ্রীমা পূর্বশিক্ষা অনুযায়ী দেবদেবীর নাম শুনাইয়া তাঁহার সমাধি ভাঙাইতেন। এই ভাবেই চলিয়াছে। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ লক্ষ্য করিলেন, রাত্রে প্রায় সারাক্ষণই শ্রীশ্রীমাকে সচকিত থাকিতে হয়, তিনি মোটেই ঘুমাইতে পারেন না। অতঃপর শ্রীরামকৃষ্ণেরই নির্দেশে শ্রীশ্রীমা নহবতে বিশ্রাম করিতে যাইতেন।
নহবতে নীচের তলায় ছোট ঘরখানিতে সারাদিন কাটাইতে শ্রীশ্রীমায়ের খুবই কষ্ট হইত, শরীরও ভাল থাকিত না। লজ্জাশীলা দেবী দিনের আলোয় বাহির হইতেন না। বহুদিন পর্যন্ত মন্দিরের কর্মচারীরাও জানিত না যে চন্দ্রমণি দেবী ছাড়া ওখানে আর কেহ থাকেন। একদিন পূর্ণিমার আলোয় দশ দিক উদ্ভাসিত দেখিয়া শ্ৰীশ্ৰীমা শ্রীভগবানের নিকট করজোড়ে প্রার্থনা করিলেন, ‘আমার মনটি ঐ জোছনার মতো নির্মল ক’রে দাও।’ আবার গঙ্গাজলে চন্দ্র-প্রতিবিম্ব দেখিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলিতেন, ‘চাঁদেও কলঙ্ক আছে, আমার মনে যেন কোনও দাগ না থাকে!’
প্রায় দেড় বৎসর দক্ষিণেশ্বরে শ্বশ্রুঠাকুরানি ও পতিদেবতার সেবায় নূতন করে জীবনের আস্বাদ লাভ করিয়া পূজার পর শ্রীশ্রীমা কামারপুকুর হইয়া জয়রামবাটী পৌঁছিলেন ও জনকজননীর সেবায় আত্মনিয়োগ করিলেন।
বহুদিন পরে স্বামীর নিকট হইতে প্রত্যাগতা কন্যাকে কাছে পাইয়া শ্যামাসুন্দরী খুবই আনন্দিতা হইলেন, কিন্তু মাঝে মাঝে দুঃখ করিয়া বলিতেন, ‘আহা, মেয়েটার কি কপাল—এত বড়টি হল, এখনও “মা” ডাক শুনল নি।’ শ্রীরামকৃষ্ণ এই কথা শুনিয়া পরে বলিয়াছিলেন, ‘ও এত “মা” ডাক শুনবে যে তার জ্বালায় অস্থির হ’য়ে উঠবে।’
সুখে দুঃখে আরও কয়েক মাস কাটিয়া গেল। শ্যামাসুন্দরীর সংসারে এক বিষম বিপৎপাত হইল। দরিদ্র পরিবারটিকে অকূল সাগরে ভাসাইয়া রামচন্দ্র পরলোক গমন করিলেন। মাতা ও কন্যা একযোগে কত কাঁদিলেন, কিন্তু নিষ্ঠুর সংসারে শোক করিবার অবসর নাই! এতগুলি ছেলেমেয়ে—কে ইহাদের দেখিবে, কে তাহাদের মুখে অন্ন যোগাইবে?
দারিদ্র তাহার করালমূর্তিতে শান্তির কুটিরখানি ছাইয়া ফেলিল। শ্যামাসুন্দরীর শরীর বেশ সবল ছিল; তিনি সংসারে সকল দায়িত্ব মাথা পাতিয়া লইলেন। শ্রীশ্রীমাও এই চরম বিপদের দিনে শান্ত সাহসে তাঁহার পাশে দাঁড়াইয়া জননীর পরিশ্রম যথাসম্ভব লাঘব করিবার চেষ্টা করিতেন।
জমিজমা হইতে যে সামান্য আয় হইত, দেখাশুনার অভাবে তাহাও হ্রাস পাইতে লাগিল। ছেলেগুলি ছোট, তাহাদের কিছু করিবার বয়স হয় নাই। উপায়ান্তর না দেখিয়া শ্যামাসুন্দরী প্রতিবেশীদের ধান ভানার কাজ লইলেন। শ্রীশ্রীমাও তাঁহাকে সাহায্য করিতেন। তদুপরি ভাইবোনগুলির দেখাশুনা করিয়া এবং সরলা বিপন্না জননীকে সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়া তিনি এই বিপদ কাটাইয়া উঠিতে তাঁহাকে যথেষ্ট সহায়তা করেন।
পিতৃবিয়োগের পর কিছুদিন মায়ের কাছে কাটাইয়া শ্ৰীশ্ৰীমা দক্ষিণেশ্বরে ফিরিলেন। নহবতে শাশুড়ী-বধূর একত্র বাস বড় কষ্টকর দেখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত শ্রীযুক্ত শম্ভু মল্লিক কালীবাড়ির বাগানের অতি নিকটে শ্রীশ্রীমায়ের জন্য একটি কুটির করিয়া দেন। এইবার আসিয়া তিনি সেখানেই উঠিলেন; একটি পরিচারিকাও তাঁহার সঙ্গে থাকিত। নিজ হাতে নানা দ্রব্য রন্ধন করিয়া থালায় সাজাইয়া শ্ৰীশ্ৰীমা কালীবাড়িতে লইয়া যাইতেন ও পাশে বসিয়া থাকিয়া স্বামীকে খাওয়াইতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণও মাঝে মাঝে বিকালের দিকে ঐ কুটিরে আসিয়া সদালাপে কিছুক্ষণ কাটাইয়া যাইতেন; এইভাবে শ্রীশ্রীমায়ের নিঃসঙ্গতা দূর করিয়া তাঁহার প্রীতিসাধন করিতেন। শুধু একদিন ঝড়বৃষ্টির জন্য তিনি রাত্রে ঐ কুটিরেই থাকিয়া যান এবং রঙ্গ করিয়া শ্রীশ্রীমাকে বলেন, ‘কালীবাড়ির বামুনেরা রাত্রে বাড়ি যায় না? এ যেন আমি তাই এসেছি।’
এক বৎসর কাল এইভাবে কাটিয়া গেল। শ্রীরামকৃষ্ণ আমাশয় রোগে পীড়িত হইলে তাঁহার সেবার জন্য শ্রীশ্রীমা আবার নহবতে আসিলেন; কিন্তু কিছুদিন সেবার পর তিনি নিজেই ঐ রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর রোগ একটু কমিলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটী চলিয়া আসেন।
সেখানে আসিয়া রোগ আবার বাড়িয়া উঠে এবং তাঁহার জীবন-সংশয় হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমায়ের এই সংকট-অবস্থার কথা শুনিয়া বলিয়াছিলেন, ‘আহা, যে জন্য আসা তা না করেই কি চলে যাবে?’
একদিন পুষ্করিণীর স্থির জলে স্বীয় অস্থিচর্মসার শরীরের প্রতিবিম্ব দেখিয়া শ্রীশ্রীমায়ের মনে দেহত্যাগ বাসনা উদিত হয়। কিন্তু তাহার পূর্বে গ্রামের দেবতা ‘সিংহবাহিনী’ দুর্গার মাড়োয় (মণ্ডপে) হত্যা দিবার সংকল্প গ্রহণ করিয়া শ্রীশ্রীমা তাহারই জন্য প্রস্তুত হইলেন; ভাবিলেন, ব্যাধির ঔষধ না মিলিলে ঐখানেই অনশনে প্রাণত্যাগ করিব।
এই সংকল্প করিয়া মাড়োয় শুইবার কিছুক্ষণ পরেই দেবীর নির্দেশ পাইলেন, ‘মন্দিরের ছাঁচতলার মাটি খাও, রোগ সেরে যাবে।’ এই ভাবে অসাধ্য ব্যাধি দৈবসহায়ে সারিয়া গেল, আর চারিদিকে রব উঠিল সিংহবাহিনী জাগ্রতা হইয়াছেন। দেবীর মাহাত্ম্য দিকে দিকে প্রচারিত হইল এবং সিংহবাহিনীর মাটি বহুলোকে দৈব-ঔষধরূপে ব্যবহার করিয়া সুস্থ হইতে লাগিল।
মাতা শ্যামাসুন্দরীর সংসারে অবস্থা তখনও খুব খারাপ। ছেলেগুলি এখনও চাষবাসের কাজ দেখিতে শিখে নাই, যজন যাজন করিবার বয়সও তাহাদের হয় নাই; প্রৌঢ়া শ্যামাসুন্দরীই কায়িক পরিশ্রম করিয়া তাহাদের মানুষ করিতেছিলেন। শ্ৰীশ্ৰীমা সুস্থ হইয়া গাছ হইতে তুলা তুলিয়া, পৈতার সূতা কাটিয়া ও অন্য নানাভাবে তাঁহাকে সাহায্য করিতে লাগিলেন।
জয়রামবাটী গ্রামে প্রতি বৎসর সকলে মিলিয়া কালীপূজা করিত। সে-বার পূজার সময় জনৈক গ্রামবাসী আড়াআড়ি করিয়া শ্যামাসুন্দরীর প্রেরিত চাল না লইয়া ফিরাইয়া দেয়। শ্যামাসুন্দরী সারারাত কাঁদিলেন ও ভাবিতে লাগিলেন, ‘কালীর জন্য চাল করেছি, এ চাল কে খাবে? এ তো আর কেউ খেতে পারবে না।’
রাত্রে স্বপ্নযোগে তিনি দেখিলেন, এক রক্তবর্ণা দেবী সুমধুর স্বরে তাঁহাকে বলিতেছেন, ‘ও চাল আমি খাব, তোমার ভাবনা কি!’
শ্যামা জিজ্ঞাস করিলেন, ‘তুমি কে?’ দেবী ইঙ্গিতে বলিলেন, ‘এর পরেই যাঁর পুজো।’
পরদিন সকালে উঠিয়াই মা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘ওরে সারদা, লাল রঙ—পায়ের ওপর পা দিয়ে, ও কি ঠাকুর—এর পরে যাঁর পুজো?’ শ্রীশ্রীমা জগদ্ধাত্রীর কথা বলিলে শ্যামাসুন্দরী দেহের শক্তি ও মনের ভক্তি দিয়া ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই পূজার সমস্ত আয়োজন করিয়া ফেলিলেন।
প্রতিমায় দেবীর পূজা করিয়া এবং গ্রামসুদ্ধ লোককে পেট ভরিয়া খাওয়াইয়া এতদিনে শ্যামাসুন্দরীর মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। বিসর্জনের সময় প্রতিমার কানে কানে বলিয়া দিলেন, ‘মা জগাই, আবার এসো।’
পর বৎসর পূজার পূর্বেই কন্যাকে বলিলেন, ‘পূজার জন্য তুমি কিছু দিও।’ কন্যা সারদা বলিলেন, ‘অত ল্যাঠা পারব না। হ’ল একবার, বেশ হ’ল; আবার বছর বছর কেন?’
রাত্রে শ্রীশ্রীমা স্বপ্নে দেখিলেন, দুই সখীসহ এক দেবী বলিতেছেন, ‘আমরা তবে যাব?’ শ্রীশ্রীমা বলিতেছেন, ‘কে তোমরা?’ দেবী বলিলেন, ‘আমি জগদ্ধাত্রী।’ শ্ৰীশ্ৰীমা ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, ‘না মা, তোমরা কোথায় যাবে? তোমরা থাক, পুজো ক’রব। তোমাদের যেতে বলি নাই।’
তদবধি প্রতি বৎসর পূজা হইতে লাগিল এবং শ্রীশ্রীমা আসিয়া সাধ্যমত ব্যবস্থা করিতেন। জগদ্ধাত্রী পূজা করিবার পর হইতে শ্যামাসুন্দরীর সংসারের অভাব অনেকটা কাটিয়া যায়।
গঙ্গার জল লোনা হইয়া গেলে শ্রীরামকৃষ্ণ বায়ু পরিবর্তন এবং জন্মভূমি দর্শনের জন্য সুদীর্ঘ সাধন-জীবনের শেষে যতদিন পারিতেন, প্রতি বৎসর কামারপুকুরে আসিয়া তিন-চারি মাস থাকিয়া যাইতেন।
তখন তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়া গ্রামে কীর্তন-উৎসবের ঢেউ খেলিয়া যাইত; সে সময় জয়রামবাটীতেও কয়েকদিন আনন্দে কাটাইয়া তিনি দক্ষিণেশ্বরে ফিরিতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বালকস্বভাব; কাছে দেখিবার কেহ না থাকিলে তাঁহার খাওয়া-দাওয়ার খুব কষ্ট হইত। সম্প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের ঐরূপ কষ্ট হইতেছে জানিয়া শ্রীশ্রীমা দক্ষিণেশ্বরে যাইবার জন্য বিশেষ উতলা হইলেন। কিন্তু কে লইয়া যাইবে?
কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ গঙ্গাস্নানে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল, শ্রীশ্রীমা তাহাদের সঙ্গ লইলেন। আরামবাগ পর্যন্ত সকলেই বেশ আসিলেন। কথা ছিল ওখানেই রাত্রিবাস হইবে; কিন্তু বেলা আছে দেখিয়া সঙ্গীরা আরও আগাইয়া তারকেশ্বর পর্যন্ত যাইতে চাহিল। সামনে পাঁচ ক্রোশব্যাপী তেলো-ভেলোর মাঠ—সন্ধ্যার পর সেখানে ডাকাতের ভয়ও আছে।
সকলে তাড়াতাড়ি পথ চলিতেছে, যাহাতে সন্ধ্যার পূর্বেই তারকেশ্বরে পৌঁছানো যায়। শ্রীশ্রীমা তাহাদের সঙ্গে প্রায় দুই ক্রোশ চলিয়া ক্লান্তদেহে ক্রমশ পিছাইয়া পড়িতে লাগিলেন। সঙ্গীরা দু-একবার তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিল; শেষে তাহাদের বিরক্তি ও ডাকাতের ভয় দেখিয়া শ্ৰীশ্ৰীমা তাহাদিগকে একেবারে তারকেশ্বর পৌঁছিয়া চটিতে তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতে বলিলেন, এবং নিজেও সাধ্যমত তাড়াতাড়ি চলিতে লাগিলেন।
সন্ধ্যার অন্ধকার মাঠটিকে ঘিরিয়া ফেলিতেছে, পথও আর ভাল দেখা যায় না। সহসা দেখিলেন লম্বা কালো ছায়ার মতো কে যেন লাঠি হাতে তাঁহারই দিকে আসিতেছে! শ্রীশ্রীমা গতি রুদ্ধ করিয়া সেই নির্জন প্রান্তরে নিশ্চল প্রতিমার ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিলেন।
ঝাঁকড়া-চুলওয়ালা সেই ভয়ঙ্কর পুরুষ কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘দাঁড়িয়ে কে?? শ্রীশ্রীমা কোমল স্বরে বলিলেন, ‘বাবা, আমি তোমার মেয়ে, সঙ্গীরা ফেলে গিয়েছে, পথ হারিয়ে ফেলেছি দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়িতে তোমার জামাইয়ের কাছে যাচ্ছি।’
পিছনে একটি নারীকে আসিতে দেখিয়া শ্ৰীশ্ৰীমা বুঝিলেন, ইহারই স্ত্রী। আগাইয়া গিয়া তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘মা, আমি তোমার মেয়ে সারদা, কি বিপদেই পড়েছিলাম! ভাগ্যি তোমরা এসে পড়লে, তাই রক্ষে।’
শ্রীশ্রীমায়ের স্পর্শে ও কথায় তাহাদের হৃদয়ে বাৎসল্যরসের সঞ্চার হইল; তাহারা দুইজনে তাঁহাকে আগলাইয়া লইয়া চলিল। নিকটে তেলো-ভেলো গ্রামের একটি দোকানেই রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হইল। মুড়ি-মুড়কি কিনিয়া খাওয়াইয়া বাগদিনি আঁচল বিছাইয়া কন্যাকে কোলের কাছে লইয়া শুইল, আর বাগদি লাঠি হাতে দ্বারে পাহারা দিতে লাগিল।
পরদিন সকালেই তাঁহারা যাত্রা করিলেন। পথে বাগদিনি মাঠ হইতে কড়াইশুঁটি তুলিয়া কন্যার হাতে দিতেছে, শ্রীশ্রীমাও তাহা খাইতেছেন। তারকেশ্বর পৌঁছিয়া সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা হইল। আহারাদির পর বিদায়কালে বাগদি-দম্পতি আকুলভাবে কাঁদিতে লাগিল। শ্ৰীশ্ৰীমা তাহাদিগকে দক্ষিণেশ্বরে গিয়া একবার জামাতাকে দেখিয়া আসিতে বলিলেন। কিছুকাল পরে তাহারা সত্যই আসিয়াছিল এবং শ্রীরামকৃষ্ণও তাহাদের সহিত জামাতার মতোই ব্যবহার করেন।
দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া শ্রীশ্রীমা পূর্বের সেই চালাঘরে উঠিলেও শ্রীরামকৃষ্ণের কঠিন আমাশয়-রোগের জন্য আরও কাছে থাকিয়া সেবার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি নহবতে চলিয়া আসেন। শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটীতে থাকাকালেই চন্দ্রমণি দেবী গঙ্গালাভ করিয়াছিলেন।
সহসা এক প্রাচীনা কাশীবাসিনী নারী এই সময় আসিয়া শ্রীশ্রীমায়ের কাছে থাকিতেন, এবং সর্বতোভাবে তাঁহাকে সাহায্য করিতেন; উপরন্তু এই দিব্যদম্পতির মাঝে থাকিয়া উভয়ের সম্বন্ধ মধুর হইতে মধুরতর করিয়া তুলিতেন।
শ্রীশ্রীমা স্বভাবসুলভ লজ্জাবশত বরাবর অবগুণ্ঠিতা হইয়াই শ্রীরামকৃষ্ণ-সকাশে যাইতেন। একদিন ঐ ভাবে বসিয়া কাশীবাসিনীসহ শ্রীরামকৃষ্ণ-কথামৃত পান করিতেছেন, এমন সময় ঐ নারী শ্রীশ্রীমায়ের অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করিয়া দেন। তখন হইতে শ্রীশ্রীমায়ের সলজ্জ বধূর ভাব প্রশমিত হইয়া সেবাধিকারিণী সুগৃহিণীর ভাব ফুটিয়া উঠিতে থাকে। স্বামীই যে তাঁহার ইষ্ট, সেব্য, সর্বস্ব; তাঁহার নিকট এত লজ্জা কিসের?
তথাপি তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকিতেই ভালবাসিতেন। ভোরবেলা শৌচ-স্নানাদি সারিয়া নহবতের ঘরটিতে ঢুকিতেন, সারাদিন আর বাহির হইতেন না। মাঝে মাঝে আলো-বাতাসের জন্য প্রাণটা ছটফট করিত; তখন বলিতেন, ‘হরি হরি, কখন সন্ধ্যা হবে!’
যাহাতে একটু চলাফেরা করিয়া তাঁহার শরীর ভাল থাকে, শ্রীরামকৃষ্ণ তাহার চেষ্টা করিতেন। দুপুরে যখন সকলে বিশ্রাম করিত, তখন তিনি দেখিয়া আসিতেন পঞ্চবটীর দিকে লোকজন আছে কি না। কেহ না থাকিলে তিনি আসিয়া শ্রীশ্রীমাকে বলিতেন, ‘এই সময় যাও, কেউ নেই, পাড়ায় একটু বেড়িয়ে এস; বুনো পাখি দিনরাত খাঁচায় থাকলে বেতে যায়।’
শ্রীশ্রীমা পাড়ায় পরিচিত মেয়েদের সঙ্গে আলাপাদি করিয়া সন্ধ্যারতির সময় ফিরিতেন। শ্রীশ্রীমার সহিত কাহারা মেশে এবং কাহারা নহবতে তাঁহার নিকট আসে যায়—এ বিষয়েও দৃষ্টি রাখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ সরলা পল্লীনারী শ্রীশ্রীমাকে কুসঙ্গ হইতে সতর্ক করিয়া দিতেন।
জয়রামবাটীতে মাতার দরিদ্র সংসারে শ্রীশ্রীমাকে খুব কঠিন জীবন যাপন করিতে হইত। দক্ষিণেশ্বরের জীবন কঠিনতর ছিল। এখানে মুক্ত বাতাস ও স্বচ্ছন্দ গতির জন্য তাঁহার মন ছটফট করিত, আর ওখানে গিয়া তিনি গঙ্গাতীর ও স্বামী-সেবার জন্য ব্যাকুল হইতেন। এই দোটানার মধ্যেই তাঁহার জীবন অগ্রসর হইতে লাগিল।
এবার দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া নহবতের ঐ স্বল্পপরিসর ঘরটিতে শ্রীশ্রীমায়ের কঠোর সাধনার জীবন শুরু হয়। ইতঃপূর্বেই একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার জিহ্বায় বীজমন্ত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন। তদবধি তিনি লক্ষ জপ করিতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ যত দেব-দেবীর সাধনা করিয়াছিলেন, শ্রীশ্রীমাকে এখন সেই-সব শিখাইতে লাগিলেন। শ্রীশ্রীমাও নিশীথের নিস্তব্ধতায় নহবতের ঘরে গভীর ধ্যানে ডুবিয়া যাইতে লাগিলেন এবং বিবিধ অনুভূতির অধিকারিণী হইলেন।
নিয়মিত সাধন-ভজনের সহিত শ্রীশ্রীমা অনলসভাবে শ্রীরামকৃষ্ণের সেবা করিয়া যাইতে লাগিলেন। ছোট ঘরটিতেই তাঁহার শোয়া-বসা; উহাই তাঁহার ভাণ্ডার ও পূজার ঘর। পাশেই সিঁড়ির তলায় একটু রান্নার জায়গা; ঘরের দরজা এত নীচু যে, প্রথম প্রথম ঢুকিতে ও বাহির হইতে গেলে মাথায় লাগিত, শেষে অভ্যাস হইয়া যায়। ঐ ঘরেই ভাশুর-ঝি লক্ষ্মী এবং দক্ষিণেশ্বরে রাত্রিবাস করিলে কখনও কখনও ভক্ত-মেয়েরা থাকিত।
রান্নার পাট প্রথমে অল্পই ছিল— শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য ঝোলভাত ও নিজেদের জন্য সামান্য কিছু। কিন্তু ভক্তসমাগমের সহিত রান্নার বহর ও পরিমাণ বাড়িতে লাগিল। একবার শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মোৎসবে ঐ ঘরেই শ্রীশ্রীমা চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের রান্না করিয়াছিলেন।
তারপর হয়তো ভক্ত রামবাবু আসিয়াছেন, বলিয়া পাঠাইলেন। যে ছোলার ডাল ও রুটি খাইবেন; নরেন্দ্রর আবার ঘন ডাল পছন্দ ছিল, রাখাল অনেক সময় খিচুড়ি খাইতেন। রকমারি রান্নার উপর আবার অসময়ে কেহ আসিয়া পড়িলে তাহার জন্য নূতন করিয়া রান্না চড়াইতে হইত। পানই যে সারাদিনে শ্রীশ্রীমাকে কত সাজিতে হই, তাহার কোনও হিসাব নাই। সত্যই এইকালে কাজের ভিড়ে তিনি যেন নিঃশ্বাস ফেলিবারও সময় পাইতেন না।
এই সকলের উপর সন্ধ্যাবেলা যখন তিনি সাড়ে তিন সের আটার রুটি বেলিতে বসিতেন, তখন যেন হাত আর চলে না, তথাপি তাঁহার মাতৃহৃদয়ে কোথা হইতে এমন শক্তি আসিত যে, দিনের পর দিন এইসব করিয়াও তিনি ক্লান্তি অনুভব করিতেন না।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার এই শারীরিক পরিশ্রমের কথা সবই জানিতেন। তাই রামবাবুর বাড়ি হইতে লাটু দক্ষিণেশ্বরে তাঁহার কাছে থাকিতে আসিলে একদিন সন্ধ্যাবেলা তাহাকে ধ্যান করিতে দেখিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ তাহার নিকটে গিয়া বলিলেন, ‘ওরে, তুই যার ধ্যান করছিস, সে যে ওখানে আটা ঠেসছে। তারপর হইতে লাটু শ্রীশ্রীমায়ের কাজে কর্মে, বিশেষত রুটিবেলায় যথেষ্ট সাহায্য করিত।
এত কাজকর্ম ও কষ্টের মধ্যেও শ্রীশ্রীমা খুব আনন্দে ছিলেন। এই সময় দিনের মধ্যে যদি একবার হৃদয়-দেবতার দেখা পাইতেন, তাহাতেই তাঁহার প্রাণ ভরিয়া যাইত। শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে সারাদিন ভক্তদের ভিড়, কত কথা, কীর্তন, নৃত্যগীতে বিমল আনন্দের জোয়ার বহিয়া যাইতেছে—এত কাছে থাকিয়াও শ্রীশ্রীমা এ-সকল কিছুই দেখিতে পাইতেন না। মাঝে মাঝে হয়তো সুমধুর সঙ্গীতের স্বর ভাসিয়া আসিত, কখনও বা উচ্চ সংকীর্তনের রোল আসিয়া তাঁহার প্রাণে আঘাত করিত; তখন তিনি কিছুক্ষণের জন্য কাজ ছাড়িয়া নহবতের বারান্দায় আসিতেন এবং দরমার বেড়ার ফুটা দিয়া ঐ দিব্য ছবির অংশমাত্র দেখিতে পাইতেন; সেইটুকুই অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিতেন।
দু’জনে এত কাছে, তবু কত দূরে! আবার বাহ্যত দূরে, তথাপি অন্তরের কত কাছে! দিনে ঘরে কেহ না থাকিলে শ্রীশ্রীমা কাহারও সঙ্গে আসিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের খাবার দিয়া যাইতেন, রাত্রে কাছে বসিয়া তাঁহাকে খাওয়াইতেন। ছোটছেলে খাইতে না চাহিলে মা যেমন ভুলাইয়া বেশী খাওয়াইবার চেষ্টা করেন, শ্রীশ্রীমা শ্রীরামকৃষ্ণকে দুটি বেশী ভাত খাওয়াইবার জন্য চাপিয়া চাপিয়া ভাত বাড়িতেন, দুধ একটু বেশী খাওয়াইবার জন্য ঘন করিয়া জ্বাল দিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝিতে পারিলে খাইতে গোলমাল করিতেন। শ্রীশ্রীমাও স্তোকবাক্যে তাঁহাকে ভুলাইতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরিহাস করিয়া বলিতেন, ‘রামলালের খুড়ী না থাকলে কে এমন ক’রে রেঁধে খাওয়াত?’ একদিন শ্রীশ্রীমায়ের মাথা ধরিয়াছে শুনিয়া তিনি বালকের মতো বার বার বলিতেছেন, ‘ওরে রামলাল, মাথা ধরল কেন রে?’
শ্রীশ্রীমাকে শ্রীরামকৃষ্ণ যে সম্মানের চক্ষে দেখিতেন, সাধারণ ব্যবহারকালেও তাহার ব্যত্যয় ঘটিত না। শ্রীশ্রীমা খাবার লইয়া ঘরে আসিলে তিনি ‘মা ব্রহ্মময়ী, মা ব্রহ্মময়ী’ বলিয়া উঠিয়া পড়িতেন। একদা শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে আসিয়া শ্রীশ্রীমা বাহিরে যাইতেছেন—শ্রীরামকৃষ্ণ বিশ্রাম করিতেছিলেন, চক্ষু মুদিত করিয়াই বলিলেন, ‘দোরটা ভেজিয়ে দিয়ে যাস্।’ উত্তরে শ্রীশ্রীমায়ের কণ্ঠস্বর শুনিয়াই তিনি ব্যাকুলভাবে বলিতে লাগিলেন, ‘তুমি কিছু মনে কোরোনি, আমি ভেবেছিলুম লক্ষ্মী, তাই বলেছি—ভেজিয়ে দিয়ে যাস্, তুমি কিছু মনে কোরোনি!’ পরদিনও নহবতে গিয়া বলিতেছেন, ‘দ্যাখ গো, সারা রাত ভেবে ভেবে আমার ঘুম হয়নি, কেন এমন রুক্ষু কথা ব’লে ফেললুম!
এদিকে আবার শ্রীশ্রীমা ভোরবেলা ধ্যানে বসিয়াছেন কি না, শ্রীরামকৃষ্ণ তদ্বিষয়ে লক্ষ্য রাখিতেন। একদিন ভোরের দিকে নহবতের কাছে আসিয়া দেখেন সময় উত্তীর্ণ, শ্রীশ্রীমা তখনও উঠেন নাই, পার্শ্বে লক্ষ্মীও নিদ্রিতা। শ্রীরামকৃষ্ণ কাহাকেও না ডাকিয়া পঞ্চবটী যাইবার পথে নহবতের ঘরের দরজার গোড়ায় জল ঢালিয়া দিয়া গেলেন। অতঃপর শ্রীশ্রীমা শত আলস্য ত্যাগ করিয়া ভোরবেলা ধ্যানে বসিতেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত, এমন কি অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এই অভ্যাস রক্ষা করিয়াছিলেন।
জ্যোৎস্নাবিধৌত রজনীতে নহবতের দ্বিতলে আলুলায়িতকুন্তলা, অনবগুণ্ঠিতা ধ্যানমগ্না-মাতৃমূর্তি দূর হইতে কখনও কখনও কাহারও দৃষ্টিগোচর হইয়াছে।
একদিন সকালের দিকে, ‘কি গো তোমাদের কি হচ্ছে?’ বলিয়া নহবতের ঘরে প্রবেশ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ দেখিলেন, তাঁহার একখানি ফটো রহিয়াছে, এবং পূজার জোগাড় হইতেছে। সহসা তিনি ভাবস্থ হইয়া পড়িলেন, ও দু-একটি ফুল সেই ফটোর উপর দিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘কালে এই ছবি ঘরে ঘরে পূজা হবে।’
শ্রীশ্রীমায়ের ভাব গোপন রাখিবার সহজাত ক্ষমতা ছিল। তথাপি শ্রীরামকৃষ্ণের মুহুর্মুহুঃ ভাবসমাধি দেখিয়া মাঝে মাঝে তাঁহারও মনে ঐরূপ অবস্থালাভের বাসনা হইত। একদিন সঙ্গিনীর মুখে শ্রীরামকৃষ্ণকে ঐ কথা জানাইলে তিনি গম্ভীর হইয়া যান। সঙ্গিনী আর কিছু না বলিয়া ঘরে ফিরিয়া আসিয়া দেখেন, শ্রীশ্রীমা ভাবে হাসিতেছেন, কাঁদিতেছেন। সঙ্গিনী বলিলেন, ‘তবে মা, তোমার নাকি ভাব হয় না?’ শ্রীশ্রীমায়ের ভাবের এরূপ বহির্বিকাশ কদাচিৎ কাহারও চোখে পড়িত।
অন্য সকল ভাবকে অতিক্রম করিয়া মাতৃভাবটিই তাঁহার জীবনের সকল কাজে ও কথায় ফুটিয়া উঠিয়াছে। সেই ভাবে আরূঢ়া হইয়াই কখনও কখনও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছা বা আদেশ অনুযায়ী কাজ না করিয়া নিজের ভাবানুরূপ কাজই করিয়াছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের খাওয়ার ব্যাপার লইয়া এরূপ প্রায়ই ঘটিত। দু-একটি ভক্তমেয়ে জ্বালা জুড়াইতে শ্রীশ্রীমায়ের কাছেই আসিত; শ্রীরামকৃষ্ণের নিষেধ সত্ত্বেও মা তাঁহাদের ফিরাইতে পারিতেন না, সস্নেহে কথা বলিতেন। বাবুরামকে দু-একখানা রুটি বেশী খাইতে দেওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে বলেন, ‘ওরা ধ্যান-ধারণা তপস্যা করতে এসেছে, ওদের অত খেতে দিও না।’ শ্রীশ্রীমা মাতৃগর্বে বলিয়া ওঠেন, ‘ছেলেদের আমি খেতে দিয়েছি, তা নিয়ে তুমি কথা বোলো না।’
শ্রীশ্রীমায়ের ভাব বুঝিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ এ-বিষয়ে আর কিছু বলিতেন না। মায়ের আধ্যাত্মিক শক্তি সম্বন্ধেও তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কখনও শিষ্যার মতো তাঁহাকে উপদেশ দিয়াছেন, কখনও তাঁহার নিজেরই শক্তি, তাঁহারই উত্তরসাধিকা জ্ঞান করিয়া তাঁহাকে সম্মান করিয়াছেন, আবার কখনও মনে করিতেন, যে মহাশক্তির লীলাতরঙ্গে তাঁহার জন্ম, জীবন ও সাধনা ভাসিয়া চলিয়াছে, শ্ৰীশ্ৰীমা সেই লীলাময়ীরই জীবন্ত জাগ্রত প্রতিমা!
দীক্ষা-ব্যাপারে কোন কোন ভক্তকে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমায়ের কাছে পাঠাইয়া দিতেন। সারদাপ্রসন্নকে ঐরূপে পাঠাইবার কালে মায়ের দ্বিধা ও সঙ্কোচ দূর করিবার জন্য তিনি একটি শ্লোক বলিয়া পাঠান, যাহার অর্থ—কৃষ্ণের অপেক্ষা রাধার শক্তি অনন্তগুণ অধিক, রাধার শক্তিতেই কৃষ্ণ শক্তিমান।
আবার শ্রীশ্রীমা শ্রীরামকৃষ্ণকে কিভাবে দেখিতেন, কতখানি ভালবাসিতেন ও ভক্তি করিতেন, তাহা সাধারণ মানব-মনের কল্পনার বাহিরে! কখনও গুরু, ইষ্ট বা পতিরূপে, কখনও সন্তানভাবে, আবার কখনও দেখিতেন—শ্রীরামকৃষ্ণ মা ভবতারিণীরই সচল বিগ্রহ! নিজের সম্বন্ধে বলিতেন, ‘আমি আর কি? উনি চরণে স্থান দিয়েছিলেন, তাই। আমি ওঁর দাসীর দাসী।’
সাধারণত লোকে শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্মমত-সাধন সর্বভাব-সমন্বয়েই বেশী মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়। শ্রীশ্রীমা মনে করিতেন
শ্রীরামকৃষ্ণের কাম-কাঞ্চন ত্যাগের তুলনায় উহা অতি সামান্য ত্যাগিশ্রেষ্ঠ স্বামীর সহধর্মিণী হইবার জন্য তাঁহাকেও কম ত্যাগ স্বীকার করিতে হয় নাই। সে কাহিনী তাঁহার জীবনের প্রতি পৃষ্ঠায় অঙ্কিত হইয়া আছে।
লছমীনারায়ণ মারোয়াড়ী শ্রীরামকৃষ্ণের কথাবার্তায় ও চরিত্রে মুগ্ধ হইয়া একবার তাঁহার সেবার জন্য দশ হাজার টাকা দিতে চান। তিনি ঐ অর্থ প্রত্যাখ্যান করিলে মারোয়াড়ী উহা শ্রীশ্রীমায়ের নামে লিখিয়া দিবার প্রস্তাব করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমাকে ডাকাইয়া ঐ প্রস্তাবটি বলিয়া তাঁহার মতামত জানিতে চাহিলে শ্রীশ্রীমা বলিলেন, ‘তা কেমন ক’রে হবে? আমি নিলে ঐ টাকা তোমারই নেওয়া হবে। আমার কাছে থাকলে তোমার সেবায় ব্যয় না ক’রে থাকতে পারব না। এ টাকা কিছুতেই নেওয়া হবে না।’ তাঁহার কথা শুনিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ নিশ্চিত হইলেন।
দক্ষিণেশ্বরের ঘরটিতে ভক্তের মেলা বাড়িয়া চলিয়াছে। অবিরাম ঈশ্বর-প্রসঙ্গ, অকাতরে জ্ঞান-ভক্তি-প্রেম বিতরণ চারিদিক হইতে যথার্থ শান্তিকামী নরনারীকে আকর্ষণ করিয়া আনিতেছে। শ্রীরামকৃষ্ণও সর্বদা ভাবে মাতোয়ারা; দিন নাই, রাত্রি নাই, ভক্তপিপাসুর পিপাসা মিটাইতেছেন। তাঁহাকেই যাহারা জীবনের আদর্শ ও আশ্রয় বলিয়া চিনিয়াছে, সাধন-ভজনের ভিতর দিয়া তিনি তাহাদের জীবন গঠনে সহায়তা করিতেছেন, কারণ তাহারাই তাঁহার উদার ধর্মমতের ও ত্যাগের আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী, তাহাদের ভিতর দিয়াই এই নূতন ভাব জগতে প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হইবে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাহাদের আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে নিঃশেষে নিজের দেহ-প্রাণ অর্পণ করিলেন।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সহসা ঠাণ্ডা লাগিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের গলা ফুলিয়া ব্যথা হয়। পানিহাটিতে কীর্তনানন্দের পর উহা বাড়িয়া যায়। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও আহারাদির অনিয়মে উহা ক্রমেই বাড়িতে থাকে। কিছুদিন পরে গলক্ষত দেখা দিল। গলা দিয়া রক্ত পড়ে, বেশী কথা বলিলেই রোগ বাড়ে, তবু কথা বলিবার বিরাম নাই; কাহাকেও সাধনার নির্দেশ দিতেছেন, কাহাকেও জ্ঞানভক্তির উপদেশ দিতেছেন—অহোরাত্র এক দিব্যভাবের স্রোতে কাটিয়া চলিয়াছে।
ভক্ত ও শিষ্যেরা চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে কলিকাতার শ্যামপুকুরে একটি ভাড়াটিয়া বাটীতে লইয়া আসিলেন। পথ্যাদি প্রস্তুত করিবার জন্য শ্রীশ্রীমাকেও শীঘ্রই এখানে আনা হইল। কিন্তু তাঁহার থাকিবার একান্ত স্থানাভাব, অন্দরমহল বলিয়া কিছু নাই। লজ্জাশীলা শ্রীশ্রীমা রাত্রি এক প্রহর থাকিতে উঠিতেন, সবার অজ্ঞাতসারে স্নানাদি সারিয়া ছাদের চাতালে চলিয়া যাইতেন; সেইখানেই সারাদিন কাজকর্ ও দ্বিপ্রহরের বিশ্রাম। পথ্যাদি প্রস্তুত করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণকে খাওয়াইয়া যাওয়া তাঁহার কাজ ছিল। রাত্রে সেবকেরা বিশ্রাম করিতে গেলে তিনি শয্যা গ্রহণ করিতেন। নিদ্রা বিশেষ হইত না; অহরহ চিন্তা কিভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ রোগমুক্ত হইয়া পূর্ববৎ আনন্দে বিরাজ করিবেন।
আড়াই মাস এইভাবে কাটিয়া গেল, কিন্তু রোগের উপশম হইবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। অবশেষে শীতের প্রারম্ভে কলিকাতার উপকণ্ঠে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে শ্রীরামকৃষ্ণকে স্থানান্তরিত করা হইল। শ্রীশ্রীমাও আসিয়া পূর্ববৎ সেবায় আত্মনিয়োগ করিলেন। যে-সকল ত্যাগী যুবক-ভক্ত শ্যামপুকুরে নিজ নিজ বাটী হইতে আসিয়া পালা করিয়া তাঁহার সেবাশুশ্রূষা করিত, তাহাদের অনেকে সংসার-মায়া বিসর্জন দিয়া পরমারাধ্য গুরুদেবের সেবায় সমবেত হইল। এইখানেই শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘরূপ বিরাট মহীরুহের বীজ বপন হয়। ত্যাগী সন্তানেরা শ্রীশ্রীমাকে তাহাদের জননীরূপে দেখিতে শিখিল এবং ‘মা’ বলিয়া ডাকিতে লাগিল।
এখানেও লোক-সমাগমের বিরাম নাই, আর অমৃতময়ী কথারও অন্ত নাই। ১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬, বহু গৃহী-ভক্তকে স্পর্শ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাদের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত করিয়া দেন এবং আশীর্বাদ করেন, ‘তোমাদের চৈতন্য হোক!’ অনেকের ঐ দিন নানাবিধ দিব্য দর্শনের সৌভাগ্য হয়।
তারপর হইতে কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যাধি বাড়িয়া চলিল। চিকিৎসায় আর কিছু হয় না দেখিয়া শ্রীশ্রীমা তারকেশ্বরে গেলেন।
সেখানে তিন দিন হত্যা দিয়া থাকিবার পর আবিষ্ট অবস্থায় এক শব্দ শুনিয়া চমকিত হইলেন; তাঁহার মনে হইল, কে যেন লাঠি দিয়া কুমারের দোকানে সাজানো হাঁড়ি কলসী ভাঙিতেছে; বুঝিলেন, মৃত্তিকার দেহ চিরদিন থাকিবে না। এক অপূর্ব অনুভূতি লইয়া তিনি ফিরিয়া আসিলেন—’কে কার স্বামী, কে কার স্ত্রী!’
শ্রীশ্রীমা ফিরিয়া আসিলে শ্রীরামকৃষ্ণ হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কি গো কিছু হ’ল?’ এবং নিজেই আঙুল নাড়িয়া উহার উত্তর দিলেন, ‘কিছুই না।’ ইহারই পর একদিন এক বাটি-ভরতি দুধ লইয়া যাইবার সময় শ্রীশ্রীমা মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া যান এবং গোড়ালিতে আঘাত লাগায় কয়েকদিন শয্যাগত থাকেন। ঐ সময় শ্রীরামকৃষ্ণকে অপরের হাতে খাইতে হইল। ‘শেষে যার তার হাতে খাব’—শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথা মনে পড়ায় এবং নানা দুর্লক্ষণ দেখিয়া শ্ৰীশ্ৰীমা বুঝিলেন—শেষের আর বেশী দেরি নাই।
পাছে তাঁহার লীলাসংবরণের পর শ্রীশ্রীমায়েরও ঐরূপ অভিলাষ হয়, তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে পূর্বেই একদিন বলিয়াছিলেন,
‘আমার শরীরটা চলে গেলে তুমিও যেন শরীর ছেড়ে চলে যেও না; শুধু কি আমারই দায়? তোমারও দায়। ঈশ্বরকে ভুলে, অন্যায় কাজ ক’রে লোকগুলো সব পোকার মতো কিলবিল করছে, কত দুঃখ ভোগ করছে! তুমি তাদের দেখবে, কেমন ক’রে ঈশ্বরকে ডাকতে হয় শেখাবে, শক্তি দেবে, ভক্তি দেবে। দুজনে এক কাজই করতে এসেছিলাম;—আমি কি করেছি? তার অনেক বেশী তোমাকে করতে হবে, তুমি আমার বাকী কাজ পূর্ণ কোরো।’
দেখিতে দেখিতে কাশীপুরে আট মাস কাটিয়া গেল। শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন পঞ্জিকা আনাইয়া পাঠ করাইলেন; শ্রাবণ-সংক্রান্তি পর্যন্ত শুনিয়া পাঠ বন্ধ করিতে বলিলেন। সকলেরই মনে একটা আসন্ন বিপদের ছায়া পড়িল।
১২৯৩ সালের ৩১শে শ্রবণ, রবিবার রাত্রি প্রায় একটার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ ইষ্টনাম করিতে করিতে সমাধি মগ্ন হন। উহাই যে কখন মহাসমাধিতে পরিণত হইয়াছে, কেহ বুঝিতে পারে নাই। সকালেও দেখা গেল শরীরে উত্তাপ এবং মুখে মৃদু হাসিটি লাগিয়া রহিয়াছে। কেহ কেহ সমাধি ভঙ্গের চেষ্টা করিতেছে, আর সকলে সমাধিস্থ দেহ ঘিরিয়া নামকীর্তন করিতেছে। শ্রীশ্রীমা সকালে ঘরে আসিয়া সব দেখিয়া শুনিয়া স্থির হইয়া গেলেন! ‘আমার মা কালী, কোথা গেলে গো?’—শুধু একবার চীৎকার করিয়া এই কথা বলিয়া উন্মলিত তরুর ন্যায় পড়িয়া গেলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের নশ্বর দেহ যথারীতি সৎকারের পর প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী শ্রীশ্রীমা হাতের অন্যান্য অলংকার খুলিয়া শেষে যখন বালা খুলিতেছেন, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইয়া হাত দুটি ধরিয়া তাঁহাকে বালা খুলিতে নিষেধ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি কোথাও গেছি গা? এই যেমন এ ঘর আর ও ঘর।’ অতঃপর মা চিরসীমন্তিনী হইয়া রহিলেন; শুধু শাড়ির চওড়া পাড় ছিঁড়িয়া সরু করিয়া লইলেন। পরে সরু লালপেড়ে কাপড়ই পরিতেন। গলায় হারটি ও হাতে শ্রীরামকৃষ্ণের স্বর্ণকবচটি ধারণ করিয়া রহিলেন। অবোধ সন্তানের কল্যাণার্থে মাতৃমূর্তি যে নিরাভরণা রাখিতে নাই।
নহবত, দক্ষিণেশ্বর
এক সপ্তাহ পরে কাশীপুর হইতে শ্রীশ্রীঠাকুরের পূত অস্থি’র কৌটার সঙ্গে শ্রীশ্রীমাকেও ভক্ত বলরাম বসুর বাটীতে আনা হইল। জন্মাষ্টমীর দিন ঐ অস্থি’র কিয়দংশ ভক্ত রামবাবুর কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যানে সমাধিস্থ করা হয়।
এই ব্যাপার লইয়া গৃহস্থ ও ত্যাগী ভক্তদের মধ্যে মত-বিরোধের কথা শুনিয়া শ্ৰীশ্ৰীমা বলিয়াছিলেন, ‘এমন সোনার মানুষই চলে গেলেন, দেখেছ গোলাপ, এখন ছাই নিয়ে ঝগড়া!’
শ্রীশ্রীঠাকুরের অদর্শনে তাঁহার সাক্ষাৎ সেবাধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়া শ্রীশ্রীমার জীবন এ-সময় দুর্বহ হইয়াছিল। মাঝে মাঝে তাঁহার মনে হইত, “কি হবে এ কষ্ট সহ্য ক’রে? চলে যাই তাঁর কাছে।’ একদিন ঠাকুর দেখা দিয়া বলিলেন, ‘না, তুমি থাকো, অনেক কাজ বাকি আছে।’
পনেরই ভাদ্র মাকে লইয়া ভক্তেরা বৃন্দাবনের উদ্দেশে যাত্রা করিলেন—সেখানে যদি তাঁহার বিয়োগ-বেদনার উপশম হয়! সঙ্গে যোগীন্দ্র, গোলাপ-মা ও লক্ষ্মী-দিদি চলিলেন। পথে দেওঘর, কাশী ও অযোধ্যায় দর্শনাদি করিয়া তাঁহারা বৃন্দাবনে পৌঁছাইলেন।
ব্রজধামে আসিয়া মায়ের মনে শ্রীরাধিকার মহাবিরহের ভাব জাগিয়া উঠিল; অজস্র ধারায় মা কাঁদিতে লাগিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কৃপাধন্যা যোগীন-মা কিছুদিন পূর্বে তপস্যার্থে এখানে আসিয়াছিলেন; তিনিও মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া কান্নায় যোগ দিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ আর থাকিতে পারিলেন না; দেখা দিয়া বলিলেন, ‘এত কান্না কেন?’ তারপর হইতে ঘন ঘন দর্শনলাভ করিয়া মায়ের মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। বালিকার মতো স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে তিনি মন্দিরে মন্দিরে দেবতা দর্শন করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন এবং পায়ে বাতের ব্যথা লইয়াও শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি পরিক্রমা করিলেন।
একদিন রজনীতে বংশীধ্বনি-শ্রবণে রাধারানীর ভাবে আকুল হইয়া মা ছুটিয়া চলিয়াছেন! সুদীর্ঘ সৈকত অতিক্রম করিয়া যমুনা তীরে পৌঁছিয়া ভাবের আবেশে পড়িয়া যান। সঙ্গিনীরা অনুসন্ধান করিতে করিতে সেখানে আসিয়া তাঁহাকে ফিরাইয়া লইয়া যায়।
কালাবাবুর কুঞ্জে থাকাকালে মা এত গভীর ধ্যানে মগ্ন হইয়া যাইতেন যে, তাঁহার কানের কাছে জোরে জোরে বারংবার নাম শুনাইলে তবে সে ধ্যান ভাঙিত। মুখে মাছি বসিয়া যাইত, তিনি কিছু টের পাইতেন না।
এই সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে দর্শন দিয়া যোগীন্দ্রকে দীক্ষা দিতে বললেন। দ্বিধাবশত মা প্রথমে ইহা পালন করেন নাই। কিন্তু বারবার তাঁহার ঐরূপ দর্শন হইতে লাগিল। শেষে যখন জানিলেন যে, যোগীন্দ্রের পূর্বে দীক্ষা হয় নাই, উপরন্তু ঠাকুর তাঁহাকেও দর্শন দিয়া মায়ের কাছে দীক্ষা লইতে বলিয়াছেন, তখন আর তাঁহার দ্বিধা রহিল না।
বৃন্দাবন হইতে একবার হরিদ্বারে গিয়া মা ব্রহ্মকুণ্ডে শ্রীরামকৃষ্ণের কেশ-নখাদি বিসর্জন দিয়া আসেন। ফিরিবার পথে জয়পুর, আজমীর হইয়া প্রয়াগ-সঙ্গমে স্নান করিয়া মা কলিকাতায় আসিলেন। বলরামবাবুর বাটীতে পক্ষাধিককাল থাকার পর গোলাপ-মাকে সঙ্গে লইয়া তিনি কামারপুকুর যাত্রা করেন। মাসখানেক পরে গোলাপ মা চলিয়া আসিলে শ্বশুরের শূন্য ভিটায় মায়ের জীবনের এক নূতন অধ্যায় শুরু হইল।
শ্রীরামকৃষ্ণ এক সময় তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, ‘কামারপুকুরের ভিটাটি একেবারে ছেড়ো না। সেইখানে থাকবে, শাক বুনবে, শাকভাত খাবে, আর ভগবানের নাম করবে।’ সত্যই এ সময় তাঁহাকে ঐ ভাবেই জীবনযাপন করিতে হইয়াছিল। কতদিন লবণের অভাবে শুধু ভাতই খাইয়াছেন।
এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কাহাকেও নিজের অবস্থার কথা জানান নাই। একান্তভাবে ঈশ্বরের উপর নির্ভর করিয়া তিনি এই সময় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্যস্মৃতিই তখন তাঁহার একমাত্র অবলম্বন ছিল।
পল্লীবাসীদের সমালোচনায় এই সময় মা আবার অলঙ্কারাদি খুলিতে গিয়াছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ অমনি দেখা দিয়া বলিলেন, ‘খুলো না; বৈষ্ণবতন্ত্র জানো?’ শ্ৰীশ্ৰীমা ‘না’ বলায় তিনি বলিলেন, “আজ গৌরদাসী আসবে, তার কাছে শুনে নিও।’ সত্যই সেদিন সন্ন্যাসিনী গৌরীমাতা আসিলেন। মা তাঁহাকে সব কথা বলিলে আনন্দে বিস্ময়ে তিনি বৈষ্ণবতন্ত্রের কথা প্রসঙ্গে চিন্ময় স্বামীর গল্পটি বলিলেন—
এক সতী সাধ্বী স্বামীর জীবৎকালে কাঁচের চুড়ি পরিতেন। পতির দেহত্যাগ হইলে সৎকারাদির পর তিনি কাঁচের চুড়ি ভাঙিয়া ফেলিয়া সোনার বালা পরিলেন। সকলে জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, ‘আমার স্বামীর দেহ এতদিন এই কাঁচের মতো ক্ষণভঙ্গুর ছিল। সেই অনিত্য ভঙ্গুর দেহ চলে গিয়েছে, এখন তিনি নিত্য অখণ্ডস্বরূপ। তাই আমি কাঁচের চুড়ি ছেড়ে সোনার গহনা পরেছি!’
এই সব শুনিয়া ও গৌরীমাকে কাছে পাইয়া মায়ের মনে সাহস ও বিশ্বাস বাড়িয়া গেল। বিরহব্যথা অসহ্য হইয়া উঠিলে শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শন দিয়া তাঁহার সকল দুঃখ দূর করিতেন। বাহিরের শূন্যতা সত্ত্বেও ভিতরের মাধুর্যে তাঁহার হৃদয় দিনে দিনে পূর্ণ হইয়া উঠিতেছিল।
জননী শ্যামাসুন্দরী কন্যাকে জয়রামবাটী লইয়া গিয়া কাছে রাখিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু মা কয়েকদিন মাত্র থাকিয়া চলিয়া আসেন। ত্যাগী সন্তানেরাও তখন শ্রীরামকৃষ্ণের অদর্শনে ও বৈরাগ্যবশত নানা তীর্থে তপস্যায় রত। তাঁহারাও কেহ জানিতেন না—মায়ের কিভাবে দিন কাটিতেছে। গৃহস্থ ভক্তেরা তাঁহাকে শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী বলিয়া ভক্তি করিলেও তাঁহার সেবাভার গ্রহণ করিবার কথা কাহারও মনে উদিত হয় নাই। তাঁহাদের অনেকে তখনও তাঁহাকে মা বলিয়া চিনেন না।
ত্যাগী সন্তানেরা লোকমুখে যখন মায়ের অবস্থার কথা শুনিলেন, তখনই তাঁহারা তাঁহাকে কলিকাতায় বা উহার কাছাকাছি কোথাও আনিয়া রাখিবার জন্য তৎপর হইলেন। যোগীন বা যোগানন্দ স্বামী প্রধান উদ্যোগী হইয়া মায়ের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
কালীমন্দির, তেলোভেলো
অল্পদিনের জন্য কলিকাতায় থাকিলে এই সময়ে মা বলরাম বসুর অথবা ‘কথামৃত’-প্রণেতা মাস্টার মহাশয়ের বাটীতে থাকিতেন। বেশীদিন থাকিলে কলিকাতায় বা নিকটে কোথাও গঙ্গাতীরে বাটী ভাড়া করা হইত। সঙ্গে স্বামী যোগানন্দ, যোগীন-মা বা গোলাপ-মা কেহ না কেহ থাকিতেন।
প্রায় আট মাস কামারপুকুরে কাটাইয়া মা বলরামবাবুর বাটীতে আসিয়া উঠিলেন। এইখানে ছাদে ধ্যানকালে একদিন তাঁহার যে আনন্দময় অনুভূতি হয়, তাহা সখীস্বরূপা যোগীন-মার কাছে ব্যক্ত করেন।
‘দেখলাম যেন কতদূরে চলে গেছি, সকলেই আমাকে ভালবাসছে, কি রূপ আমার! ঠাকুরও রয়েছেন। সকলে কি যত্নে
আমাকে তাঁর পাশে বসিয়ে দিলে! কি আনন্দ হচ্ছিল, সে আর ভাষায় বলতে পারি না। যখন মন নেমে এল—দেখলাম শরীরটা পড়ে রয়েছে। ভাবছি কি করে ওটার ভেতর ঢুকব? খানিক পরে শরীরে চেতনা ফিরে এল।’
শ্রীরামকৃষ্ণের আজ্ঞানুযায়ী শ্রীশ্রীমা এই সময় গয়াধামে শ্বশ্রুঠাকুরানি চন্দ্রমণি দেবীর পিণ্ডদান করিতে যান। গয়ায় অনতিদূরবর্তী বোধগয়ায় একটি সুন্দর মঠ ও সেখানকার ভাল অবস্থা দেখিয়া তিনি ঠাকুরের কাছে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলেন, ‘আমার ছেলেদের জন্যে অমনি একটি স্থান ক’রে দাও; তাহলে অন্নাভাবে, আশ্রয়াভাবে তাদের কষ্ট পেতে হবে না।’
গয়া হইতে ফিরিয়া মা কলিকাতার অপর পার বেলুড়ে গঙ্গার ধারে নীলাম্বরবাবুর বাটীতে প্রায় ছয় মাস কঠোর তপস্যায় কাটান।
এইখানে একদিন দুইজন সঙ্গিনীসহ তিনি ধ্যানে বসিয়াছেন। ধ্যান ভঙ্গ হইলে সঙ্গিনীরা দেখেন, মা গভীর ধ্যানে নিমগ্না—পাষাণ-প্রতিমার মতো নিশ্চল। বহুক্ষণ পরে ধ্যানশেষে মা বলিতেছেন, ‘ও যোগীন, আমার হাত কই, আমার পা কই?’—সম্পূর্ণ দেহ-জ্ঞান-রহিত এই উচ্চতম সমাধির পরেও দিন কতক নানা বর্ণের জ্যোতির মধ্যে তাঁহার চিত্ত লীন হইয়া যাইত এবং মনও সর্বদা অন্তর্মুখ থাকিত।
কিছুদিন পরে মা গোলাপ-মা, যোগীন-মা, লক্ষ্মীদিদি ও কয়েকজন অন্তরঙ্গ ত্যাগিভক্তসহ পুরীধামে যান। পুরী-মন্দিরের পাণ্ডা গোবিন্দ সিঙ্গারী মায়ের কথা পূর্বেই শুনিয়াছিলেন; তিনি মাকে পালকিতে করিয়া মন্দিরে লইয়া যাইতে চাহিলে মা বলিলেন, ‘না, বাবা, আমি দীন-হীন-কাঙালিনীর মতো তাঁকে দর্শন করতে যাব।’
শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও জগন্নাথ-দর্শনে আসেন নাই—এই কথা স্মরণ করিয়া মা তাঁহার ফটো আঁচল-ঢাকা দিয়া মন্দিরে লইয়া যান এবং পরম প্রীতিভরে তাঁহাকে জগন্নাথ দর্শন করান। মা বলিতেন, ‘ছায়া কায়া সমান।’ সকালে ও সন্ধ্যায় প্রভুকে দর্শন করিয়া লক্ষ্মীর মন্দিরে মা অনেকক্ষণ ধ্যানমগ্না থাকিতেন।
এইভাবে পুরীতে চার মাস কাটাইয়া কলিকাতা ফিরিয়া মা আঁটপুর, তারকেশ্বর হইয়া কামারপুকুরে যান। প্রায় এক বৎসর পরে কলিকাতায় আসিয়া তিনি মাস্টার মহাশয়ের ভবনে উঠেন। তখন ভক্ত বলরাম বসুর খুব অসুখ চলিতেছে। শেষ সময়ে নিকটে থাকিবার জন্য মা তাঁহার ভবনে আসিলেন। কয়েকদিন পরেই শ্রীশ্রীমায়ের চরণপদ্ম দেখিতে দেখিতে বলরাম পুণ্যলোকে চলিয়া গেলেন।
শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে কিছুকাল কাটাইয়া মা আবার বেলুড়ের নিকট ঘুসুড়ীতে তপস্যায় মগ্ন হন। এই স্থান হইতেই
নরেন্দ্রনাথ তাঁহার আশীর্বাদ লইয়া পরিব্রাজকবেশে বাহির হইয়া যান।
শ্রীরামকৃষ্ণের বার্তা বহন করিয়া আমেরিকা যাইবার প্রাক্কালেও স্বামীজী মাদ্রাজ হইতে মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করিয়া পত্র দেন।
বেলুড়ে নীলাম্বরবাবুর বাড়িতে থাকাকালেই একদিন মায়ের দর্শন হয়—শ্রীরামকৃষ্ণ ঘাটের সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে গঙ্গায় মিশিয়া
গেলেন, আর নরেন্দ্র সেই জল ‘জয় রামকৃষ্ণ, জয় রামকৃষ্ণ’ বলিয়া চারিদিকে ছিটাইয়া দিতেছেন; অমনি অগণিত নরনারী জ্ঞান-ভক্তি মুক্তি লাভ করিয়া ধন্য হইয়া যাইতেছে!
মা নরেন্দ্রের জীবনের মহৎ ব্রত বুঝিলেন, আর দেখিলেন ঠাকুর তাঁহার হাত ধরিয়া রহিয়াছেন। স্নেহশীলা জননী প্রিয়তম পুত্রকে বিপদসঙ্কুল বিদেশ যাত্রায় অনুমতি দিলেন ও অজস্র আশীর্বাদসহ তাঁহার বিজয় কামনা করিলেন। স্বামীজীও পরবর্তিকালে বলিয়াছেন, ‘মায়ের আশীর্বাদেই এক লাফে হনুমানের মতো সাগর ডিঙিয়েছি। মায়ের কৃপা আমার উপর বাপের কৃপার চেয়ে লক্ষগুণের অধিক।’ শ্রীরামকৃষ্ণ-শক্তিস্বরূপা সঙ্ঘ-জননী সকলের অলক্ষ্যে সর্বদা সন্তানদের কল্যাণ-ধ্যানে নিমগ্ন থাকিতেন।
এত তপস্যা ও দর্শনাদির পরও মায়ের বিরহ বেদনা দূর হইল না, মাঝে মাঝে যেন কিসের অভাবে মনটা হু হু করিয়া উঠিত। এই সময় মা একটি সৌম্য সন্ন্যাসী-মূর্তিকে তাঁহার কাছে কাছে ছায়ার মতো ঘুরিতে দেখিতেন। একদিন সন্ন্যাসী বলেন, ‘পঞ্চতপা কর, শান্তি পাইবে।’ বৈশাখের প্রখর সূর্য মাথার উপর রাখিয়া ও চারিদিকে চারিটি অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়া যোগীন-মার সঙ্গে মা উদয়াস্ত জপ করিতে থাকেন। পাঁচদিন এইরূপ করার পর মহাব্রত পূর্ণ হইলে মায়ের হৃদয় শান্তিতে ভরিয়া উঠিল, শরীরের রঙ কিন্তু তামার মতো হইয়া যায়। পঞ্চতপা কেন করিয়াছিলেন, কেহ এই প্রশ্ন করিলে মা বলিতেন, ‘পার্বতীও পঞ্চতপা করেছিলেন শিবের জন্য।
বলরাম বসুজায়া কৃষ্ণভাবিনী রোগে শোকে জর্জরিত হইয়া স্থান পরিবর্তনের জন্য বিহারের কৈলোয়ারে যান। মা-ও এই দুঃসময়ে তাঁহার সঙ্গে দুই মাস থাকিয়া তাঁহার মনে শান্তি দেন। কৃষ্ণভাবিনী বাবুরামের ভগিনী। তাঁহাদের মাতা হুগলী জেলার অন্তঃপাতী স্বগ্রাম আঁটপুরে দুর্গোৎসবে নিমন্ত্রণ করায় গোলাপ-মা ও যোগীন-মাকে লইয়া মা তথায় গমন করেন।
পূজার পর জননী ও ভ্রাতাদের লইয়া মা কাশী হইয়া আবার বৃন্দাবনে যান এবং তিন মাস খুব আনন্দে কাটান। ফিরিবার কালে একটি বালগোপাল মূর্তি কিনিয়া আনেন। কয়েকদিন পরে মা স্বপ্নে দেখেন—গোপাল বলিতেছে, ‘তুমি আমায় এনে ফেলে রেখেছ, খেতে দাওনি, পুজো করনি। তুমি পুজো না করলে আমাকে কেউ পুজো করবে না।’ পরদিনই মা সযত্নে গোপালকে পূজা করিয়া ও খাওয়াইয়া ঠাকুরের পাশে রাখিয়া দিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ অপ্রকট হইবার পর বারো বছর কাটিয়া গিয়াছে। বরাহনগর হইতে মঠ এখন আলমবাজারে স্থানান্তরিত। নরেন্দ্র বা স্বামী বিবেকানন্দ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের মহাবাণী-ঘোষণান্তে দেশে ফিরিয়া বেলুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের পত্তন করিলেন। শ্যামাপূজার দিন মাকে মঠে আনিয়া স্বামীজী ও তাঁহার গুরু-ভ্রাতৃগণ মঠের নূতন জমির চারিদিকে মাকে লইয়া ঘুরিয়া তাঁহার পাদস্পর্শে উহা পবিত্র করিয়া লইলেন। সঙ্ঘের ও মঠের কল্যাণার্থে ঐ দিন সঙ্ঘ-জননী নিজে শ্রীশ্রীঠাকুরের পূজা করেন। ঐ দিনই অপরাহ্ণে মাকে লইয়া গিয়া সিস্টার নিবেদিতা বাগবাজারের বসুপাড়ায় তাঁহার বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
এই সময় মা উত্তর কলকাতায় বসুপাড়াতেই একটি ভাড়াটিয়া বাটীতে থাকিতেন। স্বামী যোগানন্দ সঙ্গে থাকিয়া তাঁহার সেবাশুশ্রূষা
করিতেন। মায়ের তৃপ্তিসাধন করাই ছিল তাঁহার সাধন-ভজন; সর্বত্র যাতায়াতের পথে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকিতেন। কিছু পয়সা পাইলে
সঞ্চয় করিয়া রাখিতেন, বলিতেন—‘মায়ের তীর্থদর্শনে লাগবে।’
কাশীধামে একবার কিছুদিনের জন্য কৃচ্ছ্বসাধন করিয়া তাঁহার শরীর ভাঙিয়া যায়। কলিকাতায় ফিরিবার পর বসুপাড়ার বাড়িতে
যখন তাঁহার অসুখ বাড়িত, মা বসিয়া কাঁদিতেন; বলিতেন,‘যোগীনের মতো আমায় কেউ ভালবাসে না।’ সেই যোগীন মায়ের
চরণে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া সাধনোচিত ধামে চলিয়া গেলেন।
যোগানন্দের পর শরৎ বা স্বামী সারদানন্দ মায়ের সেবাভার গ্রহণ করিলেন। মধ্যে কিছুদিন ত্রিগুণাতীতানন্দ মায়ের দেখাশুনা করেন।
স্বামীজী মঠে প্রতিমা আনিয়া দুর্গোৎসবের উদ্যোগ করিতেছেন। মঠ আনন্দে ভরিয়া উঠিতেছে। সেই আনন্দ কানায় কানায় পূর্ণ করিবার জন্য সাক্ষাৎ আনন্দময়ীকে আহ্বান করিয়া আনা হইল। মঠের পাশেই একটি উদ্যানভবনে মা আসিয়া উঠিলেন। তাঁহারই নামে জগৎ-কল্যাণে এই মহাপূজার সঙ্কল্প হইল।
স্বামীজী-প্রমুখ শ্রীরামকৃষ্ণ-সন্তানেরা মাকে কি চক্ষে দেখিতেন, কতখানি ভক্তি করিতেন, তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। নূতন কিছু করিতে গেলে মায়ের অনুমতি আগে প্রয়োজন। কাজকর্মে, এমন কি আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও সাধন সম্বন্ধে সংশয় উপস্থিত হইলে মায়ের সিদ্ধান্তই শেষকথা বলিয়া সকলে মাথা পাতিয়া লইতেন। সেই পবিত্রতা-স্বরূপিণীর কাছে আসিবার সময় তাঁহারা করজোড়ে গম্ভীরভাবে আসিতেন, সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া যাইতেন।
শ্রীশ্রীমাকে স্বামীজী জীবন্ত জগজ্জননী বলিয়াই মনে করিতেন এবং কলিকাতায় মায়ের একটি স্থায়ী আবাসের জন্য তিনি বড় ব্যাকুল ছিলেন। গুরুভ্রাতাদের লিখিতেন, ‘জ্যান্ত দুর্গা-মাকে যেদিন বসিয়ে দেবে, সেইদিন আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচব।’ ঘটনাচক্রে স্বামীজীর জীবৎকালে ইহা সম্ভব হয় নাই। স্বামী সারদানন্দ মায়ের সেবাভার গ্রহণ করিয়া আপ্রাণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন, যাহাতে কলিকাতায় মায়ের একটু নিজস্ব থাকিবার স্থান হয়।
কাশীপুর উদ্যানবাটী
মা যখন কলিকাতায় থাকিতেন, তখন এক প্রবল আধ্যাত্মিক আকর্ষণের কেন্দ্র রূপেই বিরাজ করিতেন। সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ শিষ্য এবং ভক্ত নরনারীর চোখে তিনি গুরু, ইষ্ট, সাক্ষাৎ দেবী—শ্ৰীশ্ৰীমা। আবার যখন তিনি জয়রামবাটী আসিতেন, সেখানে তিনি দিদি, মাসী, পিসী, কাহারও বা কাছে শুধু সারদা!
যাহারা মাকে দুই জায়গাতেই দেখিয়াছে, তাহাদের কাছে ইহা বড় অদ্ভুত ও মধুর লাগিত। সাধারণ পল্লীনারীর ন্যায় মা ধানভানা, পুকুরে যাইয়া বাসন মাজা, সব কিছু করিতেছেন, গ্রাম্য ধরনে কথা বলিতেছেন, সকলের সঙ্গে হাস্য-পরিহাসে যোগ দিতেছেন। এতটুকু ঐশ্বর্য নাই, মাধুর্য যেন উপচিয়া পড়িতেছে! জয়রামবাটীতেই মায়ের অনবগুণ্ঠিত মধুর মাতৃরূপটি পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়া উঠিত।
কিন্তু সেখানে তাঁহাকে কে বুঝিত, বা বুঝিবার চেষ্টা করিত? মায়ের যে ভাইগুলি যৌবন অতিক্রম করিয়াছিল, তাহারা লেখাপড়া শিখিতে পায় নাই। তাহাদের দৃষ্টিও ছিল স্বার্থপর সংসারের সীমাতেই আবদ্ধ। মহানুভবা দিদিটিকে দিয়া তাহারা সাধ্যমত নিজেদের কাজ হাসিল করিবার চেষ্টাই করিত। মাও দুঃখ করিয়া বলিতেন, ‘এত লোক যে এখানে কত কষ্ট স্বীকার ক’রে কি জন্যে আসে, তা কি ওরা একটুও বোঝে না? সর্বদা টাকা-কড়ি চায়, কখনও তো ভুলেও জ্ঞান-ভক্তি চাইল না।’ রাগ করিয়া কখনও বা বলিতেন, “ওদের মা-বাপের পুণ্যেই ওদের দিদি হ’য়ে জন্মেছি।’
স্নেহের কনিষ্ঠ ভ্রাতা অভয়কে মা কলিকাতায় মেডিকেল স্কুলে পড়াইতেছিলেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় যোগানন্দের দেহত্যাগের অল্পকাল পরেই অভয় সহসা কলেরায় আক্রান্ত হইয়া ভবলীলা সাঙ্গ করে। মৃত্যুকালে মা তাহার মাথাটি কোলে তুলিয়া লইলেন, সেও দিদির চোখে চোখ রাখিয়া বলিল, ‘এরা রইল, তুমি দেখো।’ অভয়ের পত্নী সুরবালা সন্তান-সম্ভবা ছিলেন। স্বামী-শোকে তিনি পাগলের মতো হইয়া যান।
এদিকে মা যখন একের পর এক বিয়োগ-ব্যথা পাইয়া সংসারের সকল আকর্ষণ হইতে মনকে মুক্ত করিয়া নিরবলম্বন হইতে চান, তখন শ্রীশ্রীঠাকুর একটি ছোট মেয়েকে সঙ্গে আনিয়া মাকে দর্শন দিয়া বলেন, ‘এ যোগমায়ার অংশে জন্মগ্রহণ করছে, তোমার মন সংসারে বেঁধে রাখবে।’
যথাসময়ে সুরবালার একটি কন্যা হইল, কিন্তু তাহার উন্মাদিনী-ভাব সারিল না। একদিন শিশুকন্যা রাধারানী বা রাধু কোলে উঠিবার জন্য হামাগুড়ি দিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে পাগলিনি জননীর পিছু পিছু যাইতেছে; অথচ সুরবালার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই। ইহা দেখিয়া মা তাড়াতাড়ি উঠিয়া গিয়া মেয়েটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন, এমন সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ দেখা দিয়া বলিলেন, ‘এই সেই মায়া, একে অবলম্বন ক’রে তুমি আরও কিছুকাল পৃথিবীতে থাকো।’ সেই দিন হইতে মা তাহার লালন-পালনের সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করিলেন ও সর্বতোভাবে তাহাকে যত্ন করিতে লাগিলেন। রাধু তাঁহার মাতৃস্নেহের অনেকখানি অধিকার করিয়া বসিল।
রাধুর ব্যবহারে সরলতার সহিত একগুঁয়েমির অদ্ভুত সংমিশ্রণ সকলের চোখে পড়িত। তাহার স্বাস্থ্য বিশেষ ভাল থাকিত না; বড় হইবার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক দুর্বলতাও দেখা দিল। রাধুর চিন্তা মাকে সর্বদা সংসার-ব্যাপারে নিযুক্ত রাখিত। ভক্তেরা অনেকে ভাবিত, রাধু মায়ের অতখানি ভালবাসার যোগ্য কি না! একদিন জনৈক ত্যাগিভক্ত বলিয়াই ফেলিল, ‘রাধুর ওপর তোমার বড় আসক্তি।’ মাও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘কি ক’রব বাবা, আমরা মেয়ে-মানুষ, আমাদের এই রকমই।’
শেষের দিকে রাধুর কথা উঠিলে মা বলিতেন, ‘শুদ্ধ মন যখন যেটা ধরে, ষোল আনা ধরে। বিদ্যুৎ যখন চমকায়, শার্শিতেই চমকায়, কিন্তু খড়খড়িতে কিছু হয় না।’ সেবকেরা জানিত, রাধুকে অবলম্বন করিয়া মায়ের মন সংসারে আছে। তাই এ প্রসঙ্গ লইয়া তাহারা নাড়াচাড়া করিত না, কেহ করিলে সাবধান করিয়া দিত। তাহারা জানিত—রাধু হইতে যেদিন মায়ের মন উঠিয়া যাইবে, সেদিন তাহাদের সুখের দিন ফুরাইবে।
মা অনেকদিন দেশে গিয়াছেন; কলিকাতার ভক্তেরা তাঁহাকে কত কাল যেন দেখে নাই। স্বামী সারদানন্দ নিজে গিয়া মাকে লইয়া আসিলেন; সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন অনেকে আসিল। বাগবাজারে একটি ভাড়াটিয়া বাটীতে থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া সারদানন্দ দেখাশুনা করিতে লাগিলেন। মার্কিন মহিলা শ্রীমতী ওলি বুল এই সময় মায়ের খরচ যোগাইতেন। তাঁহারই চেষ্টায় মায়ের কয়েকখানি বিভিন্ন ভাবের সুন্দর সুন্দর ছবি তোলা হয়।
প্রায় এক বছর এইভাবে কাটাইয়া মা সকলকে লইয়া পুরী যান। ‘কথামৃত’ প্রণেতা মাস্টার মহাশয়, প্রেমানন্দ, লক্ষ্মীদিদি এবং গোলাপ-মাও সঙ্গে গেলেন। মা দেশ হইতে জননী ও ভ্রাতৃজায়াদের পুরীতে আনিলেন। সেখানে একদিন মন্দির প্রাঙ্গণে সকলকে তাঁহার মুখে প্রসাদ দিতে বলিলেন, নিজেও সকলের মুখে প্রসাদ দিলেন।
পুরী হইতে ফিরিবার এক বৎসর পরে, জননী শ্যামাসুন্দরী শীতের সকালবেলা কাজ করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া ঘরের দাওয়ায় শুইয়া পড়িলেন এবং কন্যা সারদার মুখ দেখিতে দেখিতে, তাঁহারই হাতে গঙ্গাজল পান করিয়া পুণ্যবতী দিব্যলোকে চলিয়া গেলেন।
জননী-বিয়োগে মা ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন। শিশুকাল হইতে সুখ-দুঃখের কত কথাই তাঁহার মনে পড়িতে লাগিল। এখন ভাই ও ভাজদের কি হইবে, তাহারা কিভাবে চলিবে, ইহাই ভাবিয়া আকুল হইলেন। শরীরের প্রতি ঔদাসীন্যবশত এবং ম্যালেরিয়ার প্রকোপে মায়ের শরীর খুব কাহিল হইয়া পড়ে। ওদিকে কলিকাতায় গিরিশচন্দ্র ঘোষের ভবনে দুর্গাপূজা—মায়ের নিমন্ত্রণ।
পূজার কয়দিন জ্বর লইয়াই মা বলরাম-ভবন হইতে যাতায়াত করিলেন। মহানিশায় সন্ধিপূজা। মা তখন আর আসিতে পারিবেন না শুনিয়া গিরিশচন্দ্র মনে প্রাণে দুঃখিত; পূজামণ্ডপে না গিয়া বৈঠকখানা ঘরে বসিয়াই ভাবিতেছেন, ‘মা যদি না আসেন তো কার পূজা হবে?
গভীর রজনী; সন্ধিপূজা শুরু হয় হয়। এমন সময় অমিয়মাখা-কণ্ঠে মা ডাকিতেছেন, ‘আমি এসেছি, দরজা খোলো।’ ছুটিয়া গিয়া দরজা খুলিয়া সকলে মাকে পূজামণ্ডপে লইয়া আসিল। বাড়িতে সাড়া পড়িয়া গেল, মা আসিয়াছেন। গিরিশের আনন্দ দেখে কে? মা-ও দেবী প্রতিমার নয়নে নয়ন রাখিয়া সমাধিস্থ হইলেন। ভক্তেরা মৃন্ময়ী ও চিন্ময়ী উভয় প্রতিমার চরণে সচন্দন পত্রপুষ্পের অঞ্জলি দিতে লাগিল।
একদা গিরিশ মাকে একান্তে পাইয়া জিজ্ঞাসা করেন,—তুমি কি রকম মা?’ অমনি মা উত্তর দিলেন,—‘এ শুধু গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, সত্যিকারের মা।’
জয়রামবাটীতে মাতৃবিয়োগের পর ভাইদের পৃথক্ হওয়ার পালা পড়িল। অল্প সম্পত্তি, ঘরবাড়ি—তাহাও বিভাগ করিতে শেষ পর্যন্ত স্বামী সারদানন্দকে তথায় যাইতে হয়। বিভাগের পর মা কোথায় থাকিবেন—প্রশ্ন উঠিল মা বলিলেন, ‘দু-দিন এর ঘরে, দু-দিন ওর ঘরে—এই ভাবেই আমার দিন কেটে যাবে।’ কামারপুকুরে মায়ের একটু স্থান ছিল বটে, কিন্তু সেখানে যাতায়াত উঠিয়া না গেলেও কমিয়া গিয়াছিল।
কলিকাতায় ফিরিয়া স্বামী সারদানন্দ মায়ের থাকিবার কষ্ট দূর করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বহু বাধা অতিক্রম করিয়া নিজের দায়িত্বে ব্যয় স্বীকার করিয়া, বাগবাজারের উত্তর প্রান্তে ‘খড়ো’ কেদারের প্রদত্ত জমির উপর একটি সুন্দর ভবন নির্মাণ করিলেন। ভক্তদের নিকট ইহাই ‘শ্রীশ্রীমায়ের বাড়ি।’ মায়ের সেবক স্বামী সারদানন্দের তত্ত্বাবধানে ‘উদ্বোধন’ পত্রিকা ও গ্রন্থাবলীর প্রকাশন চলিত বলিয়া ঐ কার্যালয়ও এখানে উঠিয়া আসিল। সাধারণের কাছে তাই এই বাড়িটি সংক্ষেপে ‘উদ্বোধন’ নামেও পরিচিত।
মা দ্বিতলে ঠাকুরঘরের একপার্শ্বেই অবস্থান করিতেন। স্বামী সারদানন্দ তাঁহার আরাধ্য দেবতাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করিয়া প্রাণ ভরিয়া তাঁহার সেবাপূজা করিতে লাগিলেন। সদর দরজার পাশে ছোট ঘরটিতে থাকিয়া মঠ-মিশনের পরিচালনা তদুপরি উদ্বোধন কার্যালয়ের দেখাশুনা করিতেন। কেহ জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, ‘আমি মায়ের দারোয়ান।’ মাও বলিতেন, ‘শরৎ আমার ভারী, শরৎ না হ’লে আমার বোঝা আর কে নিতে পারে?’ সত্যই সে সময় স্ত্রী ও পুরুষ ভক্তের মেলা এবং তৎসহ রাধু ও জয়রামবাটীর নিত্য-নূতন ঝামেলা সহ্য করা কম শক্তিমান পুরুষের কাজ ছিল না।
উদ্বোধনে মাস ছয়-সাত বাস করিয়া মা জয়রামবাটী যান। পর বৎসর ভক্ত-পরিবারের আহ্বানে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত বলরাম বসুদের জমিদারি কোঠারে গিয়া মা খুব আনন্দে মাস দুই কাটাইলেন। এখানে মায়ের মনে সেতুবন্ধ—রামেশ্বর দেখিবার ইচ্ছা হইল। স্বজন-পরিজনসহ তিনি মাদ্রাজে আসিয়া এক মাস রহিলেন। সেখান হইতে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ মায়ের দক্ষিণ-ভারত ভ্রমণের সকল ব্যবস্থা করিয়া দেন।
মাদ্রাজই সর্বপ্রথম বিবেকানন্দ-প্রচারিত শ্রীরামকৃষ্ণ বাণী শ্রবণ করিয়াছিল এবং স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের প্রাণপাত পরিশ্রমে রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের ভাবধারা সেখানে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাই সঙ্ঘের জননীকে দেখিবার জন্য দলে দলে লোক আসিতে লাগিল। কেহ আসে মন্ত্র লইতে, কেহ আসে উপদেশ শুনিতে, ভাষার বিভেদ, ভাবের আদান-প্রদানে বাধা দিতে পারিল না। মহিলা ও বালিকারা মাকে ঘিরিয়া ভজন শুনায়, যন্ত্রসঙ্গীত শুনায়।
মাদ্রাজ ও মাদুরার মন্দির ও দেবতা দর্শন করিয়া মা সমুদ্রকূলে রামেশ্বর পৌঁছিলেন। সেখানকার রাজা স্বামীজীর শিষ্য। তিনি পূজারী ও পাণ্ডাদের নির্দেশ দিয়াছেন, ‘আমাদের গুরুর গুরু আসিয়াছেন; সর্বপ্রকারে তাঁহার পূজাকার্যে সাহায্য করিবে।’
প্রভাতে সমুদ্রস্নানের পর মা গঙ্গোত্রীর জলে শিবলিঙ্গকে স্নান করাইয়া ১০৮টি স্বর্ণ-বিল্বপত্র দ্বারা স্বহস্তে পূজা করিলেন। ফিরিবার কালে বলিতেছেন, ‘আহা, যেমনকার তেমনটি আছে গো।’ সঙ্গিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বললে, মা?’ অনবধানতাবশত বলিয়া ফেলিয়া মা প্রসঙ্গ চাপা দিলেন। কোন্ যুগান্তরের—জন্মান্তরের স্মৃতি মায়ের মনে জাগিয়া উঠিয়াছিল?
রামেশ্বর হইতে মাদ্রাজে ফিরিয়া মা দেখিলেন তাঁহাকে বাঙ্গালোরে লইয়া যাইবার জন্য ভক্তগণ প্রতীক্ষা করিতেছে। তাহাদের আকুল আহ্বানে মা সেখানে চলিলেন। তাহাদের ভাষা বুঝেন না, মায়ের ভাষা তাহারা বুঝে না; তবু সে কি হৃদয়ের আকর্ষণ, শুধু দর্শনেই পরিতৃপ্তি! রাশি রাশি ফুল দিয়া তাহারা শ্রীচরণপূজা করিতে লাগিল। মা-ও শ্রীরামকৃষ্ণের অপূর্ব মহিমা নীরবে অনুভব করিতে লাগিলেন।
ফিরিবার পথে পুণ্যতোয়া গোদাবরীতে স্নান করিয়া পুরীধামে কয়েকদিন কাটাইয়া মা কলকাতা পৌঁছিলেন। রাধু বারো বছরে পড়িয়াছে, আর বিবাহ না দিলে নয়; কাছাকাছি তাজপুরে একটি ভাল পাত্রও পাওয়া গিয়াছে। তাই মা সকলকে সঙ্গে লইয়া জয়রামবাটী আসিলেন; ভাল দিন দেখিয়া শুভকার্য সম্পন্ন করিলেন। রাধু কিন্তু বিবাহের পরও মায়ের কাছেই রহিয়া গেল, কদাচিৎ শ্বশুরালয়ে যাইত। পরবর্তিকালে জামাইও অধিকাংশ সময় মায়ের কাছেই থাকিত।
জয়রামবাটী হইতে মায়ের বিষ্ণুপুর স্টেশনে যাতায়াতের সুবিধার জন্য কোয়ালপাড়ায় একটি আশ্রম হয়। একবার সেখানে উঠিয়া মা ঠাকুরের ছবির পাশে নিজের ছবিও বসান এবং পূজা করেন। মায়ার জগতে মহামায়ার লীলা দেখিয়া সেবক ও ভক্তেরা একাধারে আনন্দিত ও বিস্মিত হইল।
যোগাশ্রমের ভেতরের
দৃশ্য কোয়ালপাড়া
শ্রীশ্রীমায়ের জীবনে কাজে-কর্মে, কথায়-বার্তায় দেবী ও মানবীর ভাব সুন্দর ও মধুরভাবে মিশিয়া থাকিত, আর সব কিছু ছাপাইয়া
উঠিত একটি সহজ সরল মাতৃভাব। অগণিত ভক্ত নরনারীর মনে—‘মা কে? মা কি?’ এরূপ কোন প্রশ্ন জাগিত না। ‘মা আমাদের, আমরা মায়ের’ এইটুকু জানিয়া বুঝিয়াই তাহারা তৃপ্ত থাকিত; তাহাতেই তাহারা সব পাইত! জ্ঞান, ভক্তি, মুক্তি—সকলের মূলে যে প্রীতি ও বিশ্বাস, মায়ের স্নেহদৃষ্টিতে তাহারা সেই দুর্লভ জিনিসটি লাভ করিত। মাতৃশক্তিই যে সকল শক্তির আধারভূতা; মাতৃভাবেই যে সকল ভাবের সমন্বয়।
‘আপনাকে রেখে ঠাকুর আগেই চলে গেলেন কেন?’—এ প্রশ্নের উত্তরে মা একবার ধীরভাবে বলিয়াছিলেন, ‘মাতৃভাব জগতে বিকাশের জন্য এবার আমাকে রেখে গেছেন।’ এই মাতৃভাব উভয়েরই ভাব; ইহার বিকাশ দু-জনেরই দায়। শ্রীরামকৃষ্ণ যে-ব্রত প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, মা প্রতি নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে তাহাই পালন করিতেন। মায়ের এই মাতৃভাব যে কত সুদূরপ্রসারী ছিল তাহা আমাদের কল্পনার অতীত!
ক্বচিৎ কখন কোন সেবক বা সন্তানের মন সংশয়াক্রান্ত হইলে মা গম্ভীরভাবে আত্মপ্রকাশ করিতেন। একদিন জনৈক অল্পবুদ্ধি সেবক উদ্বোধনে মায়ের ঘরে ঝাঁট দিতে দিতে ভাবিতেছে, ‘এ কার সেবা করছি, কেন করছি? ইনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বিধবা স্ত্রী বই আর কিছু তো নন!’ পক্ষী যেমন তাহার শাবককে শ্যেনের কবল হইতে রক্ষা করিবার জন্য ছুটিয়া আসে, সহসা মা যেন সেইভাবে আসিলেন এবং সযত্নে তাহার হাত ধরিয়া ও মুখের দিকে তাকাইয়া, নিজের হৃদয় স্পর্শ করিয়া বলিলেন, ‘আমি মা, জগতের মা, সকলের মা—বুঝবি, বুঝবি কালে বুঝবি।’
সেবকটি স্তম্ভিত আনন্দে শুনিল বটে, কিন্তু কিছুদিন পরে মাকে আবার প্রশ্ন করিল, ‘তুমি না হয় আমাদের মা, কিন্তু সকলের মা কি ক’রে? তুমি কি এই সব পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ—এদেরও মা?’ এবারও মা স্থিরকণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘ওদের মায়ের ভিতর দিয়ে আমি ওদেরও মা; এ জন্মে ওরা এইভাবেই আমার স্নেহ-যত্ন পেয়েছে।’
প্রকৃতপক্ষে দেখা গিয়াছে, পশু-পাখিরাও মায়ের ভালবাসা বুঝিত। বাড়িতে একটি বিড়াল নানাভাবে বড় উৎপাত করিত। তাহার জন্য সকলেই মাকে দায়ী করে দেখিয়া একদিন তিনি লাঠি লইয়া তাহাকে মারিতে গেলেন; সেও মায়ের দু’টি পায়ের মধ্যে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজিয়া রহিল। মা লাঠি উঁচাইয়া হাসিমুখে বলিলেন, ‘কি ক’রে মারি বল দেখি—যেভাবে ও আশ্রয় নিয়েছে!’ সঙ্গিনী ও সেবকেরা হাসিতে হাসিতে বলিল, “তোমাকে আর মারতে হবে না; ও-ও তোমায় বুঝে নিয়েছে।
জয়রামবাটীতে একটি টিয়াপাখি ছিল, সেও সকলের মুখে শুনিয়া শুনিয়া মা-বুলি শিখিয়াছিল। মাকে কিছুক্ষণ দেখিতে না
পাইলে, বিশেষত মা পূজায় বসিলেই সে ‘মা, ওমা’ বলিয়া ডাকিতে শুরু করিত। মা বলিতেন, ‘কি জ্বালা! একটু ধীরে সুস্থে পূজাও করতে দিবি না?’ পূজা সারিয়া তিনি সকলের আগে তাহাকে প্রসাদ খাওয়াইতেন, তবে সে শান্ত হইত! হৃদয়ের ভালবাসা যে ভাষার অপেক্ষা রাখে না, তাহার কত দৃষ্টান্ত মায়ের জীবনের প্রতি পদে ছড়ানো রহিয়াছে।
দক্ষিণ-ভারত হইতে একটি ছেলে দীক্ষার জন্য জয়রামবাটী আসিয়াছে। সে ইংরাজিতে তাহার বক্তব্য বলিতেছে; দোভাষীর মতো একজন উহা মাকে বাংলায় বুঝাইয়া দিতেছে। একটু পরে মা বলিলেন, ‘ওকে ওর মাতৃভাষায় যা বলবার বলতে দাও।’ সে তাই বলিতে লাগিল; মাও বাংলায় তাঁহার বক্তব্য বলিয়া গেলেন; উভয়ের ভাবের আদান-প্রদান হইয়া গেল।
সিস্টার নিবেদিতা যখন প্রথম এদেশে আসেন, তখন তিনি কোথায়, কিভাবে থাকিবেন—ইহা লইয়া স্বামী বিবেকানন্দ একটু
চিন্তিত হইয়া পড়েন। মা নিবেদিতাকে নিজের কোলের কাছে টানিয়া লইলেন। নিবেদিতাও নিজেকে মায়ের ‘খুকী’ বলিয়া মনে করিতেন!
মায়ের এই মাতৃত্ব জাতি-ধর্ম-ভাষার বাধা লঙ্ঘন করিয়া আজ দেশ-কালকেও অতিক্রম করিতে চলিয়াছে। যে-কোন দেশের, যে-কোন কালের যত ছেলে ও মেয়ে—শ্রীশ্রীমা সকলেরই মা!
এই মাতৃত্বে ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ, সন্ন্যাসী-গৃহস্থ, এমন কি সজ্জন-দুর্জনও ছিল না। যে একবার মা বলিয়া ডাকিয়াছে, শ্রীশ্রীমা তাহারই মা হইয়াছেন! মায়ের এই ভালবাসা যে কত উদার, কত গভীর, কতখানি অন্তরের, তাহা যাহারা একদিনের জন্যও তাঁহার সস্নেহ সেবা-যত্ন লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছে, তাহারাই প্রাণে প্রাণে বুঝিয়াছে।
রৌদ্রে ঘর্মসিক্ত হইয়া কোন ছেলে আসিয়াছে। মা বিশ্রাম হইতে উঠিয়া তাহাকে বাতাস করিতে বসিলেন, তাহাকে জলখাবার দিয়া তাহার জন্য রান্না চড়াইতে গেলেন। একটি ছেলে কাজে গিয়াছিল। মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়াছে। মা ঘর-বাহির করিতেছেন। সে ফিরিলে স্নেহের শতধারে তাহাকে অভিষিক্ত করিয়া অন্য শুষ্ক বস্ত্রের অভাবে হয়তো নিজেরই কাপড় তাহাকে পরিতে দিতেছেন।
দীক্ষাদানের পর একটি ছেলেকে লইয়া মা খাইতে বসিয়াছেন। খাওয়ার পর ছেলেটি উচ্ছিষ্ট বাসন উঠাইতেছে। মা বাম হাত দিয়া তাহার হাত চাপিয়া বলিলেন, “থাক ও আমিই নেব।’ ছেলেটি বলে, ‘তা কি হয়? আপনি নিলে আমার অকল্যাণ হবে।’ মা বলিলেন, ‘সে কি বাছা! আমি মা, আমার কাছ থেকে কখনও অকল্যাণ হয় না। মা এঁটো পরিষ্কার করবে না, তো কে করবে? মা ছেলের কত করে! আমি কি তোমার কিছু করতে পেরেছি?’—এরূপ দৃশ্য এক-আধ দিন নয় প্রায়ই ঘটিত।
শ্রীশ্রীমায়ের মধ্যে গুরুভাবের সহিত মাতৃভাব অবিচ্ছিন্নভাবে মিশিয়া থাকিত। যিনি মা, তিনিই গুরু। ‘নাস্তি মাতৃসমো গুরুঃ’—এই বাণী তাঁহার মধ্যে অতি সুন্দর ও মধুরভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছিল।
জয়রামবাটীতে একটি মুসলমান মজুর খাইতে বসিয়াছে। মায়ের ভাইঝি দূর হইতে ছুঁড়িয়া ছুঁড়িয়া পরিবেশন করিতেছে দেখিয়া মা বলিলেন, ‘অমন ক’রে পরিবেশন করলে কেউ খেতে পারে না কি? বলিয়াই নিজে পরিবেশন করিতে গেলেন। খাওয়ার শেষে যখন এঁটো জায়গায় জল ঢালিয়া দিতেছেন, তখন অপর সকলের সমালোচনা থামাইয়া বলিলেন, ‘শরৎ আমার যেমন ছেলে, আমজাদও তাই।’
শ্রীশ্রীমায়ের মাতৃভাব এত স্বাভাবিক ছিল যে, অনেক ভক্ত নরনারী দেখিত, তাঁহার চাল-চলনে, কথা বলার ভঙ্গিতে, এমন কি মুখাকৃতিতে পর্যন্ত স্বীয় জননীর ছায়া ও ছবি ফুটিয়া উঠিয়াছে। মাতৃহারা তাঁহাকে পাইয়া মাতৃশোক ভুলিত; কেহ বা অনুভব করিত গর্ভধারিণীর স্নেহের টান অপেক্ষা শ্রীশ্রীমায়ের আকর্ষণ বেশী।
দীক্ষার পর একটি মেয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছে, ‘কি সাধন-ভজন ক’রব মা?’ মা শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলিতেছেন, ‘জন্ম জন্ম সাধন-তপস্যা করেই তো আজ আমার কাছে এলে মা, আর কি সাধন ভজন করবে?’ আবার কোন ছেলে যদি বলিত, ‘মা, তোমার কাছে আশ্রয় পেয়েছি, আর কি জপ-তপ ক’রব!’—অমনি মা বলিতেন, ‘সে কি বাবা, ভগবান কেমন আঙুলগুলি দিয়েছেন, জপ করবে না তো কি করবে? জপাৎ সিদ্ধি।
সারাদিন শত কাজের পর রাত্রিতে শয়ন করিয়াও মা কেন জপ করিতেছেন—জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, ‘কত জায়গায় আমার কত ছেলে মেয়ে, তারা আজ ঠিকমত জপ ক’রে উঠতে পেরেছে কি না। কে জানে, তাই তাদের জন্যে করছি।’
দুই-তিন দিন থাকিয়া যখন ভক্ত ছেলেরা জয়রামবাটী হইতে চলিয়া যাইত, মা পথে খাইবার জন্য তাহাদিগকে খাবার দিতেন, পান সাজিয়া দিতেন, আবার আসিতে বলিতেন। বিদায়কালে কখনও কখনও কাহারও চিবুক ধরিয়া চুমু খাইতেন। তাহারা কিছু দূর অগ্রসর হইয়া গেলে তিনি যতদূর দেখা যায় পথপানে চাহিয়া থাকিতেন অনেকদিন যাবৎ সন্তানেরা কেহ না আসিলে মা আপন মনে বলিতেন, ‘ওরে ছেলেরা, তোরা আয়।’ দেখা যাইত দু-এক দিনের মধ্যেই একজন না একজন আসিয়া পড়িয়াছে।
মাঝে মাঝে মা সংবাদপত্র-পাঠ শুনিতেন; দুর্ভিক্ষ, বন্যা প্রভৃতির বর্ণনায় বিচলিত হইতেন, আবার শরৎ মহারাজ সাহায্যদানের ব্যবস্থা করিয়াছেন শুনিয়া আশ্বস্ত হইতেন। রাজনৈতিক নির্যাতনের সংবাদে, বিশেষত নারীদের উপর অত্যাচারের কাহিনী শুনিয়া ঠাকুরের ছবির কাছে গিয়া বলিতেন, ‘এ-সব কি হচ্ছে!’ অথচ ইংরেজের প্রতি কেহ ঘৃণা প্রদর্শন করিলে বলিতেন, ‘না গো, ওরাও আমার ছেলে।’ মহাযুদ্ধে বহু লোকক্ষয়ের সংবাদ শুনিতে শুনিতে একদিন অতর্কিতে তাঁহার মৃদুহাসি বিকট অট্টহাসিতে পরিণত হইয়া সমগ্র ভবনটি প্রকম্পিত করে। ভয়ে ভীত সঙ্গিনীরা গলবস্ত্র হইয়া করজোড়ে প্রার্থনা করিতে থাকে, ‘মা, এ ভাব সংবরণ করুন।’ ক্রমশ মা প্রকৃতিস্থ হইলেন।
মায়ের করাল মূর্তি কদাচিৎ কখনও ব্যক্ত হইয়াছে। একবার উন্মাদ হরিশ মাকে একা দেখিয়া ধরিতে আসিলে তিনি নিরুপায় হইয়া মরাই-এর চারিদিকে ছয়-সাতবার ঘুরিলেন, অবশেষে ক্লান্ত হইয়া স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া গেলেন। উন্মাদ কাছে আসিতেই তাহাকে চপেটাঘাতে ধরাশায়ী করিলেন এবং বুকে হাঁটু দিয়া জিহ্বা টানিয়া ধরিয়া তাহাকে বারংবার চড় মারিতে লাগিলেন। এইরূপে তাহার কুভাব দূর করিয়া তাহাকে সুস্থ করেন। যথাকালে সেও মায়ের মহিমা বুঝিতে পারে। তবে সন্তানদের জন্য মায়ের শান্ত সহনশীল মূর্তিই সমধিক প্রকাশিত ছিল।
কে এই নারী, রেল স্টেশনের পশ্চিমা কুলি যাঁহার ভিতর তাহার হারানো মা জানকীকে খুঁজিয়া পায় এবং বনজাত পুষ্পের অঞ্জলি তাঁহার চরণে ঢালিয়া দেয়?—আবার পাশ্চাত্য খ্রিস্টান মহিলা যাঁহাকে চিঠিতে লেখে, ‘কে তুমি আমার প্রার্থনাকালে মেরীর স্থানে আবির্ভূতা হও?’
নিবেদিতা যথার্থই বলিয়াছেন, ‘নারীর আদর্শ সম্বন্ধে সারদাদেবীই শ্রীরামকৃষ্ণের শেষকথা।’ শ্রীশ্রীমা ছিলেন পুরাতনের শেষ প্রতীক ও এক নূতনের সার্থক সূচনা! শ্রীশ্রীমায়ের জীবনে ও চরিত্রে উমা, সীতা, সাবিত্রী, শ্রীরাধার ছবি স্পষ্টই ভাসিয়া উঠে আবার তাঁহার প্রসঙ্গে—গোপা, মীরা ও বিষ্ণুপ্রিয়ার কথাও মনে পড়িয়া যায়! পুরাতনের সকল মাধুর্য লইয়া এবং নূতনের অপূর্ব ঐশ্বর্যে বিমণ্ডিত হইয়া শ্রীশ্রীমায়ের অনুপম মাতৃত্ব পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়াই নূতনতর গার্গী-মৈত্রেয়ীর সম্ভাবনা—ইহাই স্বামীজীর ভবিষ্যদ্বাণী।
১৯১২ খ্রিস্টাব্দে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার পর মা আত্মীয়স্বজন, সাধু ও গৃহস্থ ভক্ত-পরিবৃত হইয়া কাশী যান। সেবাশ্রমের সন্নিকটে লক্ষ্মীনিবাসে সকলের সঙ্গে মা খুব আনন্দে আড়াই মাস কাটান। সে-বার মায়ের আগমনে আনন্দের হাট বসিয়াছিল। স্বামী ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ প্রভৃতি সেবাশ্রমে আসিয়া উঠিলেন। চারিদিক হইতে ভক্ত-ভ্রমরেরা আসিয়া জুটিল। কালীপূজা ও জগদ্ধাত্রী পূজার পর মায়ের জন্মতিথিও সেখানে কাটিল।
এবার কাশী হইতে ফিরিবার পর মা আর দূরদেশে কোথাও যান নাই। কখনও জয়রামবাটীতে, কখনও কলিকাতায় থাকিয়া ঠাকুরের সেবাপূজা করিতেন ও ভক্ত ছেলে-মেয়েদের অভয় আশ্রয় দিয়া নূতন জীবনের অধিকারী করিতেন।
ভাইদের সংসার পৃথক্ হইয়া গেলে জয়রামবাটীতে মায়ের থাকিবার অসুবিধা দেখিয়া সারদানন্দ তাঁহার জন্য সেখানেও চারিটি-কুটিরযুক্ত নূতন একটি বাসস্থান করিয়া দেন। মা দেশে যাইলে সঙ্গিনী ও সেবকগণ সহ সেখানেই থাকিতেন। ম্যালেরিয়ায় ভুগিতে থাকিলে স্বামী সারদানন্দ তাঁহাকে কলিকাতায় লইয়া আসিতেন। উদ্বোধনের মন্দির শূন্য থাকিবে, মায়ের বাড়িতে ‘মা’ নাই—ইহা কাহারও ভাল লাগিত না।
১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে স্বামী প্রেমানন্দের দেহত্যাগ সংবাদে মা খুব বিচলিত হইয়া উঠিলেন। ডুকরিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে ঠাকুরঘরে গেলেন ও উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘ঠাকুর ওকেও নিলে!’ বাবুরাম মায়ের বড় আদরের ছিলেন। শোকাবেগ কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইলে বাহিরে আসিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘কার জন্যে আর শোক? অমন সোনার মানুষ ঠাকুরই চলে গেলেন, নরেনও চলে গেল!’ তাঁহার শান্তভাব দেখিয়া মনে হইল, বুঝিবা তিনিও প্রস্তুত হইতেছেন।
এদিকে রাধু সন্তানসম্ভবা; তাহার অসুখও মাকে বিশেষ বিব্রত করিয়া তুলিল। সে গোলমাল সহ্য করিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তাহাকে লইয়া মা কোয়ালপাড়ার নিরালা আশ্রমটিতে গিয়া উঠিলেন এবং গ্রাম্য ডাক্তার ও দৈব ঔষধের উপর নির্ভর করিয়া দিন গুণিতে লাগিলেন। যথাসময়ে রাধু একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিল বটে, কিন্তু তাহার স্নায়ুরোগ বাড়িয়া গেল—সর্বদা বিরক্ত ভাব। মায়েরও মন। ধীরে ধীরে অন্তর্মুখ হইতে লাগিল।
শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটীতে; দেখিতে দেখিতে তাঁহার পুণ্য জন্মতিথি আসিয়া পড়িল। স্ত্রীভক্তেরা তাঁহাকে স্নান করাইয়া নূতন বস্ত্র পরাইয়া মালা-চন্দনে সাজাইয়া দিল। কপালে সিন্দূরবিন্দু দিতেই মায়ের মধুর দিব্যমূর্তি ফুটিয়া উঠিল। নীরবে তিনি স্ত্রী ও পুরুষ ভক্তদের প্রাণের পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করিলেন, নীরবে অজস্রধারে তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিতে লাগিলেন।
উজ্জ্বল আকাশের কোণে এক খণ্ড ঘন কালো মেঘের মতো সেই দিনই মায়ের অল্প জ্বর দেখা দিল। দু-দিন অন্তর জ্বর আসে এবং তাহার প্রকোপ বাড়িতে থাকে। সেই অবস্থাতেও মা দীক্ষার্থী ভক্তদের বিমুখ করিতে পারিতেন না। দীক্ষার্থী কেহ আসিলে সেবকেরা মাকে জানাইত না। মাও তাহাদের লুকাইয়া এক সময় সেই দূরদেশাগত সন্তানটিকে দীক্ষা দিয়া তাঁহার মাতৃনাম সার্থক করিতেন। কখনও কখনও জ্বর ছাড়িতেই—অন্নপথ্য পাইবার পূর্বেই মা এইরূপে আগত ভক্তদের কৃপা করিয়াছেন।
স্বামী সারদানন্দ মাকে কলিকাতায় আনিবার জন্য ব্যস্ত হইলেন। জয়রামবাটী ছাড়িবার দু-এক দিন পূর্বে মা সিংহবাহিনীকে প্রণাম করিতে গেলেন, কিন্তু অত্যধিক দুর্বলতাবশত ঐটুকু যাতায়াতই তাঁহার পক্ষে দুর্বিষহ হয়।
ফাল্গুনের মধ্যভাগে মা শীর্ণ ও দুর্বল শরীর লইয়া কলিকাতা আসিলেন। কবিরাজী চিকিৎসায় জ্বর কিছুদিন বন্ধ থাকে, কিন্তু মা তিক্ত পাচন খাইতে চাহিতেন না বলিয়া ডাক্তারি চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তাররা বলিলেন, কালাজ্বর; জীবনের আশা খুব কম।
রোগ দিন দিন বাড়িয়া চলিল। যখন জ্বর বাড়ে তখন আর হুঁশ থাকে না, গায়ে অসহ্য জ্বালা। কিন্তু জ্বর যখন থাকে না, তখন মা প্রত্যেকের খবর নেন। দেশে বৃষ্টি হইয়াছে কি না, তাহাও জিজ্ঞাসা করিতে ভুলিতেন না।
সেবক ও সেবিকারা প্রাণপণে মায়ের সেবা করিতেছে। কিন্তু একটু বেশীক্ষণ বাতাস করিলেই মা বলিতেছেন, ‘এবার পাখাটা রাখো। তোমার হাত ব্যথা করছে, তাই ভেবে আমার ঘুম আসছে না। নিবেদিতা স্কুলের মেয়েরা পালা করিয়া সর্বদা মায়ের পরিচর্যা করিতে লাগিল।
এই সময়েই মা রাধুর মায়াও ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন; বলিতেন, ‘ঠাকুর যখন নিয়ে যাবেন, যাব।’ ক্রমে রক্তহীনতায় শোথ দেখা দিল, মা উত্থানশক্তিরহিত হইলেন। মায়ের সহিত আসন্ন বিচ্ছেদ অনুভব করিয়া একটি ভক্ত মেয়ে সজলনেত্রে বলিলেন, ‘মা, আমাদের কি হবে?’ চিরকরুণাময়ী অভয় দিয়া বলিতেছেন, ‘ভয় কি?’ থামিয়া থামিয়া ক্ষীণকণ্ঠে মা বলিতে লাগিলেন, ‘তবে একটি কথা বলি। যদি শান্তি চাও, মা, কারও দোষ দেখো না, দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার ক’রে নিতে শেখ। কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার।’
ইহাই তাঁহার শেষ উপদেশ। এই শেষ বাণীর মধ্যেই শ্রীশ্রীমায়ের সমগ্র জীবন ও সাধনা যেন মূর্ত হইয়া রহিয়াছে। সত্যই তিনি ছিলেন অদোষদর্শিনী, ক্ষমারূপা তপস্বিনী। মাতা সন্তানের দোষ দেখিতে পান না, তাহার সহস্র সহস্র অপরাধ তিনি ক্ষমা করেন। মাতৃত্বের এই মহাসাধনাবলেই মা সকলকে আপনার করিয়াছিলেন; আর তিনিও ছিলেন সকলের আপনার হইতে আপনার।
মা শেষশয্যায় শায়িত। একবার সারদানন্দকে ডাকিলেন। তিনি আসিয়া পদতলে বসিতেই মা তাঁহার ডান হাতে নিজের বাম হাতখানি রাখিয়া বলিলেন, ‘শরৎ, এরা রইল।’ মাতৃসাধক শরচ্চন্দ্র সকলই বুঝিলেন, কিন্তু আর দেখিতে পারিলেন না; সজল নয়নে। ধীরে ধীরে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তর্ধানের পর চৌত্রিশ বৎসরকাল অনলসভাবে তাঁহারই আদিষ্ট কার্য সাধন করিয়া উদ্বোধন-মন্দিরেই ৪ঠা শ্রাবণ রাত্রি দেড় ঘটিকার সময় মহাসমাধিযোগে শ্রীশ্রীমা শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত মিলিতা হইলেন।
বেলুড় মঠে তাঁহার দিব্যদেহের সমাধিস্থানে উঠিয়াছে একটি সুন্দর ছোট মন্দির। গঙ্গাতীরে সেই মন্দিরে শ্রীশ্রীমা কোল পাতিয়া বসিয়া আছেন—তাঁহার দেশ-দেশান্তরের, যুগ-যুগান্তরের সন্তানদের পথ চাহিয়া।
শতবর্ষ অতীত হইয়া গিয়াছে, মা এই ধরাধামে আসিয়াছিলেন। তাঁহার দেহ বিসর্জনের পরও কত বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। কালস্রোতে কত তরঙ্গ আসিয়া চলিয়া যায়। পৃথিবীর কত ভাঙন-গড়ন হইয়া গেল। কত জাতির উত্থান, কত জাতির পতন হইল। এই ভারতেই কত কী না পরিবর্তন ঘটিয়া গেল! কিন্তু মনে হয় যে-যুগান্তর আসিতেছে, তাহার তুলনায় এ-সকলই বাললীলাবৎ। মাতৃভাবের প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠার জন্যই শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীসারদাদেবীকে রাখিয়া গিয়াছিলেন। উহার পূর্ণ বিকাশে হিংসা, দ্বেষ ও দ্বন্দ্ব চিরদিনের মতো বিদূরিত হইয়া শান্তি ও প্রেম পৃথিবীর সকল দেশে ছড়াইয়া পড়ুক মাতৃভাবের স্নেহাঞ্চলে মানবের ভ্রাতৃভাব প্রতিষ্ঠিত হউক—শতবর্ষ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে শ্রীশ্রীমায়ের কাছে ইহাই আমাদের আকুল প্রার্থনা।
ভগবান লাভ হ’লে কি আর হয়, দুটো শিং বেরোয়? না, মন শুদ্ধ হয়! শুদ্ধ মনে জ্ঞান, চৈতন্য, আনন্দ লাভ হয়। ভগবানে ভক্তি, ভালবাসা, অনুরাগ বাড়ে। সর্বদা একটা টান থাকে।
মন মত্তকরী—হাওয়ার সঙ্গে ছোটে। তাই সর্বদা বিচার করতে হয়। ঈশ্বরলাভের জন্য চেষ্টা দরকার।
মনের গোলযোগ—ওটা প্রকৃতির নিয়ম। যেমন অমাবস্যা পূর্ণিমা আছে, তেমনি মন কখন ভাল, আবার কখন মন্দ থাকে।
যখনই যা কিছু খাবে, তাঁকে নিবেদন করে প্রসাদরূপে খাবে তা হ’লে রক্ত শুদ্ধ হবে, মন শুদ্ধ হবে।
মনেতেই সব; মনেতেই শুদ্ধ, মনেতেই অশুদ্ধ।
মানুষের নিজের মনটি আগে দোষ করে, তবে সে পরের দোষ দেখে। পরের দোষ দেখলে কার কি হয়? নিজেরই ক্ষতি। আমার এটি ছেলেবেলা থেকে অভ্যাস ছিল—কারুর দোষ দেখতে পারতুম না, ওটি শিখি নাই। ক্ষমারূপ তপস্যা।
মন্ত্রের দ্বারা দেহশুদ্ধি হয়, মন্ত্র জপ ক’রে মানুষ পবিত্র হয়। জপাৎ সিদ্ধি। জপাৎ সিদ্ধি।
যার (অর্থ) আছে সে মাপো (দান কর), যার নেই সে জপো।
রোজ ১৫/২০ হাজার জপ করতে পারে তা হ’লে হয়, আমি দেখেছি বাস্তবিক হয়। আগে করুক, তারপর না হয়, তখন বলবে। তবে একটু মন দিয়ে করতে হয়। কেউ কিছু করবে না, কেবল বলবে—কেন হয় না?
পবিত্র ধ্যান-জপের একটা নিয়মিত সময় থাকা খুব দরকার। সন্ধির সময় তাঁকে ডাকা উচিত। রাত যাচ্ছে, দিন আসছে, আবার দিন যাচ্ছে, রাত আসছে—এই হ’ল সন্ধি। এমন সময় মন শান্ত, থাকে। অসুখ হ’লে বা কাজে ঝঞ্ঝাটে স্মরণ, প্রণাম করলেও হয়।
জপ-তপের দ্বারা কর্মপাশ কেটে যায়, কিন্তু ভগবানকে প্রেম-ভক্তি ছাড়া পাওয়া যায় না। জপ-তপ কি জানো? ওর দ্বারা ইন্দ্রিয়-টিন্দ্রিয়গুলো কেটে যায়। রাখালেরা কি কৃষ্ণকে জপ-ধ্যান ক’রে পেয়েছিল? না, তারা ‘আয় রে, খা রে, নে রে’—এই ক’রে পেয়েছিল?
ভগবানকে কে বাঁধতে পেরেছে বল না? তিনি নিজে ধরা দিয়েছিলেন বলেই তো যশোদা তাঁকে বাঁধতে পেরেছিল।
মানুষকে ভালবাসলে দুঃখ-কষ্ট, মনের বাজে খরচ হয়। ভগবানকে ভালবাসতে পারলে তবেই শান্তি।
কাজ করতেই হয়। কর্মেই কর্মপাশ কাটে। কাজ ছাড়া থাকা ঠিক নয়।
কর্মফল কেউ এড়াতে পারে না। তবে যদি সাধন-ভজন থাকে, তো যেখানে খাঁড়ার ঘা লাগার কথা, সেখানে কাঁটাটি ফোটে।
বাসনা থেকেই শরীর। যখন বাসনা থাকে না তখন শরীর পড়ে যায়। সম্পূর্ণ বাসনাক্ষয়ই মুক্তি। নির্বাসনা হবার বাসনা কর।
শরীর ধারণে কিছুমাত্র সুখ নাই। দুঃখপূর্ণই জগৎ, কেবল সুখ একটি—তাঁর নামে। তাঁর কৃপা যার ওপর হয়েছে, সেই কেবল তাঁকে জানতে পেরেছে এবং সেইটুকুই তার সুখ।
দুঃখ-বিপদ আসবে না, মনে করা অন্যায়। তারা আসবেই। তবে ভক্তের কি হয় জানো? পায়ের তলা দিয়ে জলের মতো বেরিয়ে যায়।
সাধন বল, ভজন বল, প্রথম বয়সেই ক’রে নেবে। শেষে কি আর হয়? যা করতে পার, এখন।
সাধু হয়েছে, ভগবানকে ডাকবে না তো কি করবে? তাঁর যখন ইচ্ছা তিনি দেখা দেবেন।
ঠাকুর বলতেন, ‘যারা আমাকে ডাকবে তাদের জন্য আমাকে অন্তিমে দাঁড়াতে হবে।’ এটি তাঁর নিজের মুখের কথা।
যারা একধারে স্বামী, অন্যধারে ছেলে নিয়ে সংসারে তাদের সেবা করেও তাঁকে ডাকতে পারে, তারা নিশ্চয়ই তাঁর দেখা পাবে।
সর্বদা ইষ্টচিন্তা থাকলে অনিষ্ট আসবে কোথা দিয়ে?
আমার ছেলে যদি ধুলোকাদা মাখে, আমাকেই তো তা ধুয়ে মুছে তাকে কোলে তুলে নিতে হবে।