Cover


হুগলি জেলার উত্তর–পশ্চিমাংশ যেখানে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলাদ্বয়ের সহিত মিলিত হইয়াছে, সেই সন্ধিস্থলের অনতিদূরে শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্য জন্মভূমি কামারপুকুর গ্রাম৷ পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর ও মুকুন্দপুর গ্রামদ্বয় কামারপুকুরের সহিত ঘনসন্নিবেশে পাশাপাশি সংস্থিত থাকার জন্য কালক্রমে তিনখানি গ্রাম একমাত্র কামারপুকুর নামেই প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে৷ স্থানীয় জমিদারদিগের বহুকাল ঐ গ্রামে বাস থাকাতেই বোধ হয় কামারপুকুরের এই সৌভাগ্যের উদয় হইয়াছিল৷ আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি সেইকালে কামারপুকুর বর্ধমান মহারাজের গুরুবংশীয়দিগের লাখেরাজ জমিদারিভুক্ত ছিল এবং তাঁহাদিগের বংশধর শ্রীযুক্ত গোপীলাল, সুখলাল প্রভৃতি গোস্বামিগণ ঐ গ্রামে বাস করিতেছিলেন৷
১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ম্যালেরিয়াপ্রসূত মহামারীর আবির্ভাবের পূর্বে কৃষিপ্রধান বঙ্গের পল্লিগ্রামসকলে অপূর্ব শান্তি বিরাজ করিত৷ হুগলি জেলার এই গ্রামসকলের বিস্তীর্ণ ধান্যপ্রান্তরসকলের্ মধ্যগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামগুলি বিশাল হরিৎসাগরে ভাসমান দ্বীপপুঞ্জের ন্যায় প্রতীত হইত৷ খাদ্যদ্রব্যের অভাব না থাকায় গ্রামবাসীদিগের দেহে স্বাস্থ্য ও সবলতা এবং মনে প্রীতি ও সন্তোষ সর্বদা পরিলক্ষিত হইত৷ বহু জনাকীর্ণ গ্রামসকলে আবার কৃষি ভিন্ন ছোটখাট নানাপ্রকার শিল্পব্যবসায়েও লোক নিযুক্ত থাকিত৷ কালের বিপুল পরিবর্তন সত্ত্বেও কামারপুকুর আজও পূর্বগৌরবচিহ্ণ বহুলাংশে ধারণ করিয়া রহিয়াছে৷ গ্রামে আনন্দোৎসবের অভাব এখনও লক্ষিত হয় না৷ চৈত্রমাসে মনসাপূজা ও শিবের গাজনে এবং বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠে চব্বিশ প্রহরীয় হরিবাসরে কামারপুকুর মুখরিত হইয়া উঠে৷ এখনও প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে গ্রামে হাট বসিয়া থাকে এবং চতুষ্পার্শ্বস্থ গ্রামসকল হইতে লোকে সূতা, বস্ত্র, গামছা, হাঁড়ি কলসি, কুলা, চেঙ্গারি, মাদুর চাটাই প্রভৃতি সংসারের নিত্যব্যবহার্য পণ্য ও ক্ষেত্রজ দ্রব্যসকল হাটবারে কামারপুকুরে আনয়নপূর্বক পরস্পরে ক্রয়বিক্রয় করিয়া থাকে৷ উৎকৃষ্ট জিলাপি, মিঠাই ও নবাত প্রস্তুত করিবার জন্য কামারপুকুর এই অঞ্চলে চিরপ্রসিদ্ধ৷ অধিকন্তু আবলুস–কাষ্ঠনির্মিত হুঁকার নল নির্মাণপূর্বক ঐ গ্রাম কলকাতার সহিত কারবারে এখনও বেশ দু–পয়সা অর্জন করিয়া থাকে৷
কামারপুকুরে উচ্চনীচ সকল প্রকার জাতিরই বসতি রহিয়াছে৷ গ্রামে ক্ষুদ্র, বৃহৎ অনেক পুষ্করিণীও বিদ্যমান৷ তন্মধ্যে হালদার পুকুরই সর্বাপেক্ষা বড়৷ দীর্ঘিকাসকলের কোন কোনটি আবার শতদল কমল, কুমুদ ও কহ্লারশ্রেণী বক্ষে ধারণ করিয়া অপূর্ব শোভা বিস্তার করিয়া থাকে৷ ইষ্টকনির্মিত বাটির ও সমাধিরও অসদ্ভাব নাই৷ গ্রামের ঈশান ও বায়ুকোণে ‘বুধুই মোড়ল’ ও ‘ভূতির খাল’ নামক দুইটি শ্মশান বর্তমান৷ অগ্ণিকোণে গড়মান্দারণের ভগ্ণ তোরণ ও স্তূপাদি এবং উহার অনতিদূরে শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির মানবজীবনের ক্ষণভঙ্গুরত্ব ও পাঠানরাজত্বকালে ঐ সকল স্থানের প্রসিদ্ধি সম্বন্ধে পরিচয় প্রদান করিতেছে৷ কামারপুকুর গ্রামখানি ঘনপল্লবসমাচ্ছন্ন্ ও স্নিগ্ধছায়ানিবিড়৷ ইহার উত্তর ও পশ্চিম প্রান্ত বাহিয়া ‘ভূতির খাল’ নামক ক্ষুদ্র পয়োধারা আঁকিয়া বাঁকিয়া দূরে আমোদর নদে মিলিত হইয়াছে৷ ভূতির খালের অঙ্কশায়িত বলিয়া উল্লিখিত শ্মশানও ‘ভূতির খাল’ নামে অভিহিত৷ এই শ্মশানের পশ্চিমভাগে শ্যামলশষ্পাস্তীর্ণ গোচরপ্রান্তর ও মানিকরাজা প্রতিষ্ঠিত সর্বসাধারণের উপভোগ্য আম্রকানন৷ ভূরসুবো নিবাসী ধনাঢ়্য ও দানশীল মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের (তিনি মানিকরাজা নামে পরিচিত ছিলেন) অধুনালুপ্ত উক্ত আম্রকাননের অস্তিত্বের সাক্ষিরূপে দুই–চারিটি বৃক্ষ অদ্যাপি বিদ্যমান৷
কামারপুকুরের পশ্চিমে প্রায় একক্রোশ দূরে সাতবেড়ে, নারায়ণপুর ও দেরে নামক তিনখানি গ্রাম পাশাপাশি অবস্থিত৷ এই গ্রামসকল এককালে সমৃদ্ধিসম্পন্ন ছিল৷ আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি সেই সময় রামানন্দ রায় সাতবেড়ে নামক গ্রামে বাস করিতেছিলেন৷ এই জমিদার বিশেষ ধানাঢ়্য না হইলেও বিষম প্রজাপীড়ক ছিলেন৷ প্রায় দেড়শত বৎসর পূর্বে মধ্যবিত্ত অবস্থাপন্ন, ধর্মনিষ্ঠ এক ব্রাহ্মণ পরিবার দেরে গ্রামে বাস করিতেন৷ ইঁহারা সদাচারী, কুলীন এবং শ্রীরামচন্দ্রের উপাসক ছিলেন৷ উক্তবংশীয় শ্রীযুক্ত মানিকরাম চট্টোপাধ্যায়ের তিন পুত্র ও এক কন্যা হইয়াছিল৷ তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠ ক্ষুদিরাম সম্ভবতঃ ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন৷ তৎপর রামশীলা নাম্নী কন্যার এবং নিধিরাম ও কানাইরাম নামক পুত্রদ্বয়ের জন্ম হয়৷
শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা, সন্তোষ, ক্ষমা এবং ত্যাগ প্রভৃতি সদ্ব্রাহ্মণের স্বভাবসিদ্ধ গুণসমূহে ভূষিত হইয়া উঠিলেন৷ তিনি দীর্ঘ, সবল, গৌরবর্ণ ও প্রিয়দর্শন ছিলেন৷ গৃহদেবতা নরঘুবীরের পূজা না করিয়া তিনি জলগ্রহণ করিতেন না৷ ঐরূপ নিষ্ঠা ও সদাচারের জন্য গ্রামবাসিগণ তাঁহাকে বিশেষ ভক্তি ও সম্মানের চক্ষে দর্শন করিত৷ পিতার মৃত্যুর পরে সংসার ও বিষয়সম্পত্তির তত্ত্বাবধান শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের স্কন্ধেই পতিত হয় এবং ধর্মপথে অবিচলিত থাকিয়া তিনি ঐ সকল কার্য যথাসাধ্য সম্পন্ন করিতে লাগিলেন৷ ইতঃপূর্বে বিবাহ করিয়া সংসারে প্রবেশ করিলেও তাঁহার পত্নী অল্পবয়সেই মৃত্যুমুখে পতিত হন৷ সুতরাং আন্দাজ পঁচিশ বৎসর বয়ঃক্রম কালে তিনি পুনরায় দ্বিতীয়বার দ্বারপরিগ্রহ করেন৷ তাঁহার এই পত্নীর নাম শ্রীমতী চন্দ্রমণি দেবী৷ কিন্তু বাটিতে ইঁহাকে সকলে ‘চন্দ্রা’ বলিয়াই সম্বোধন করিত৷ শ্রীমতী চন্দ্রাদেবীর পিত্রালয় সরাটিমায়াপুর নামক গ্রামে অবস্থিত ছিল৷ তিনি সুরূপা, সরলা এবং দেবদ্বিজপরায়ণা ছিলেন৷ কিন্তু হূদয়ের অসীম শ্রদ্ধা, স্নেহ ও ভালবাসাই তাঁহাকে সকলের নিকট প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল৷ সম্ভবত ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার জন্ম হয় এবং বিবাহকালে তাঁহার বয়ঃক্রম আট বৎসর মাত্র ছিল৷ ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার পুত্র রামকুমার জন্মগ্রহণ করে এবং উহার পাঁচ বৎসর পরে শ্রীমতী কাত্যায়নী নাম্নী কন্যার জন্ম হয়৷
ধর্মপথে থাকিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করা যে কতদূর কঠিন কার্য তাহা শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের হূদয়ঙ্গম করিতে বিলম্ব হইল না৷ গ্রামের জমিদার
রামানন্দ রায়ের প্রজাপীড়নের কথা আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি৷ দেরেপুরের জনৈক ব্যক্তির প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া তিনি তাহার বিরুদ্ধে মিথ্যা মকদ্দমা সূচনা করিয়া ক্ষুদিরামকে নিজ পক্ষে সাক্ষ্য দিবার জন্য অনুরোধ করেন৷ সত্যনিষ্ঠ ক্ষুদিরাম জমিদারের এই অসঙ্গত অনুরোধ রক্ষা করিতে অস্বীকার করিলে, জমিদার তাঁহারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ প্রদানপূর্বক নালিশ রুজু করিলেন এবং মকদ্দমায় জয়ী হইয়া তাঁহার পৈতৃক সম্পত্তি নিলাম করিয়া লইলেন৷ এইরূপে প্রায় চল্লিশ বৎসর বয়ঃক্রমকালে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম এককালে নিঃস্ব হইলেন৷ কিন্তু এই ঘটনা তাঁহাকে ধর্মপথ হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত করিতে সক্ষম হইল না৷ নরঘুবীরের অনুগ্রহে তিনি অচিরে অকূলে কূল পাইলেন৷ কামারপুকুর নিবাসী শ্রীযুক্ত সুখলাল গোস্বামী তাঁহার বন্ধু শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের ঐরূপ বিপদের কথা শুনিয়া নিজ বাটির একাংশে কয়েকখানি চালাঘর চিরকালের জন্য ছাড়িয়া দিয়া তাঁহাকে কামারপুকুরে আসিয়া বাস করিবার জন্য অনুরোধ করিলেন৷ শ্রীভগবানের অচিন্ত্যলীলাতেই পূর্বোক্ত অনুরোধ উপস্থিত হইয়াছে ভাবিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম দশ বৎসরের পুত্র রামকুমার ও চার বৎসরের কন্যা কাত্যায়নীকে সঙ্গে লইয়া পৈতৃক ভিটা ও গ্রাম হইতে চিরকালের নিমিত্ত বিদায় গ্রহণ করিলেন এবং কৃতজ্ঞহূদয়ে কামারপুকুরে আগমন করিয়া তদবধি ঐ স্থানে বাস করিতে লাগিলেন৷ বন্ধুপ্রদত্ত লক্ষ্মীজলা নামক এক বিঘা দশ ছটাক ধান্য জমিতে নরঘুবীরের প্রসাদে এত ধান্য হইতে লাগিল যে, উহাতে তাঁহার ক্ষুদ্র সংসারের অভাব সংবৎসরের জন্য নিবারিত হওয়া ভিন্ন কিছু কিছু উদ্বৃত্ত হইয়া অতিথি–ভ্যাগতের সেবাও স্বচ্ছন্দে চলিয়া যাইতে লাগিল৷
পুত্র রামকুমার ও কন্যা কাত্যায়নীকে সঙ্গে লইয়া ঊনচল্লিশ বর্ষ বয়সে সস্ত্রীক ক্ষুদিরাম যেদিন কামারপুকুরে আসিয়া পর্ণকুটিরে বাস করিলেন, তাঁহাদিগের সেদিনকার মনোভাব বলিবার নহে৷ ঈর্ষাদ্বেষপূর্ণ সংসার সেদিন তাঁহাদিগের নিকট অন্ধতমসাবৃত বিকট শ্মশানতুল্য৷ দুঃখদুর্দিনে পড়িয়াই মানব সংসারের অসারতা ও অনিত্যতা সম্যক উপলব্ধি করে৷ অতএব শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের প্রাণে এখন যে বৈরাগ্যের উদয় হইবে ইহাতে বিচিত্র কিছুই নাই৷ এখন হইতে তিনি নরঘুবীরের হস্তে পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণপূর্বক সংসারের পুনরায় উন্নতিসাধনে উদাসীন হইয়া শ্রীভগবানের সেবাপূজাতেই দিন কাটাইতে লাগিলেন৷ এই সময়ে একটি ঘটনায় শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের ধর্মবিশ্বাস অধিকতর গভীরভাব ধারণ করিয়াছিল৷ কার্যবশত একদিন তাঁহাকে গ্রামান্তরে যাইতে হইয়াছিল৷ তথা হইতে ফিরিবার কালে তিনি শ্রান্ত হইয়া পথিমধ্যে বৃক্ষতলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিতে লাগিলেন এবং অচিরে নিদ্রায় অভিভূত হইলেন৷ অল্পকাল পরে তিনি স্বপ্ণাবেশে দেখিতে লাগিলেন, তাঁহার অভীষ্টদেব নবদূর্বাদলশ্যামত ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যেন দিব্য বালকবেশে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছেন এবং স্থানবিশেষ নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন, ‘‘আমি এখানে অনেকদিন অযত্নে অনাহারে আছি, আমাকে তোমার বাটিতে লইয়া চল, তোমার সেবা গ্রহণ করিতে আমার একান্ত অভিলাষ হইয়াছে৷’’ তিনি গাত্রোত্থান করিয়া সবিস্ময়ে যে স্থানটি তিনি স্বপ্ণে দর্শন করিয়াছিলেন সেখানে পৌঁছিবামাত্র দেখিতে পাইলেন, একটি সুন্দর শালগ্রামশিলার উপর এক ভুজঙ্গ ফণা বিস্তার করিয়া রহিয়াছে৷ ক্ষুদিরামকে দেখিয়াই ভুজঙ্গ অন্তর্হিত হইল এবং ক্ষুদিরাম আপনাকে দেবাদিষ্টজ্ঞানে ‘জয় রঘুবীর’ বলিয়া চিৎকারপূর্বক শিলা গ্রহণ করিলেন৷ আনন্দে বিস্ময়ে অধীর হইয়া তিনি স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং যথাশাস্ত্র সংস্কারকার্য সম্পন্ন করিয়া উহাকে নিজ গৃহদেবতারূপে প্রতিষ্ঠাপূর্বক নিত্যপূজা করিতে লাগিলেন৷
দিন মাস অতীত হইয়া ক্রমে দুই–তিন বৎসর কাটিয়া গেল৷ ঐ দুই–তিন বৎসরের কঠোর শিক্ষা প্রভাবে ক্ষুদিরামের হূদয়ে যে শান্তি, সন্তোষ ও ঈশ্বরনির্ভরতা নিরন্তর প্রবাহিত থাকিত, তাহা স্বল্পলোকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে৷ অন্তর্মুখ অবস্থায় থাকা তাঁহার মনের স্বভাব হইয়া উঠিল৷ প্রতূ্যষে যখন তিনি সাজিহস্তে ফুল তুলিতে যাইতেন তখন দেখিতেন তাঁহার আরাধ্যা নশীতলা দেবী যেন অষ্টমবর্ষীয়া কন্যারূপিণী হইয়া রক্তবস্ত্র ও নানা অলঙ্কার ধারণপূর্বক হাসিতে হাসিতে তাঁহার সঙ্গে যাইতেছেন এবং পুষ্পিত বৃক্ষের শাখাসকল নত করিয়া ধরিয়া তাঁহাকে ফুল তুলিতে সহায়তা করিতেছেন৷ ঐ সকল দিব্যদর্শনে তাঁহার অন্তর এখন সর্বদা উল্লাসে পূর্ণ থাকিত এবং তাঁহার সৌম্যমুখমণ্ডল দর্শনে গ্রামবাসিগণ তাঁহাকে ক্রমে ঋষির ন্যায় ভক্তিশ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে লাগিল৷ স্নেহ ও সরলতার প্রতিমূর্তি শ্রীমতী চন্দ্রাদেবীও তাঁহার দয়া ও ভালবাসায় গ্রামবাসীদের হূদয়ে মাতৃরূপে প্রতিষ্ঠিতা হইলেন৷
আমরা ইতঃপূর্বে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের রামশীলা নাম্নী এক ভগিনী এবং নিধিরাম ও কানাইরাম (বা রামাকানাই) নামক দুই কনিষ্ঠ ভ্রাতার উল্লেখ করিয়াছি৷ দেরেপুরে অবস্থান কালেই তাঁহারা সকলে বিবাহ করিয়া সংসারে প্রবেশ করিয়াছিলেন৷ কামারপুকুরের প্রায় ছয়ক্রোশ পশ্চিমে অবস্থিত ছিলিমপুরের ভাগবত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত রামশীলার বিবাহ হইয়াছিল এবং রামচাঁদ নামক এক পুত্র ও হেমাঙ্গিনী নাম্নী এক কন্যা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল৷ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম হেমাঙ্গিনীকে কন্যানির্বিশেষে স্নেহ করিতেন এবং বিবাহকাল উপস্থিত হইলেন কামারপুকুরের প্রায় আড়াই ক্রোশ উত্তর–পশ্চিমে অবস্থিত সিহড় গ্রামে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্রমুখোপাধ্যা স্বয়ং সম্প্রদান করিয়াছিলেন৷ যৌবনে পদার্পণ করিয়া ইনি ক্রমে রাঘব, রামরতন, হূদয়রাম ও রাজারাম নামে চারি পুত্রের জননী হইয়াছিলেন৷ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের নিধিরাম নামক ভ্রাতার কোন সন্তান হইয়াছিল কি না তাহা আমরা জানিতে পারি নাই কিন্তু সর্বকনিষ্ঠ কানাইরামের রামতারক ওরফে হলধারী ও কালিদাস নামে দুই পুত্র হইয়াছিল৷
রামশীলার পুত্র রামচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুরে মোক্তারি করিয়া বেশ দু–পয়সা উপার্জন করিতেন এবং শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম, নিধিরাম ও কানাইরামকে মাসিক কিছু অর্থসাহায্যও করিতেন৷ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম মধ্যে মধ্যে ভাগিনেয়কে দেখিবার জন্য মেদিনীপুরে উপস্থিত হইতেন৷ একবার তিনি মেদিনীপুর যাইবার জন্য প্রায় দশ ঘটিকা পর্যন্ত অবিশ্রান্ত পথ চলিয়া একটি গ্রামে পঁৌছিলেন এবং তথাকার বিল্ববৃক্ষসকল নবীন পত্রাভরণে ভূষিত দেখিয়া মেদিনীপুর যাইবার কথা এককালে বিস্মৃত হইলেন৷ তিনি গ্রাম হইতে একটি নূতন ঝুড়ি ও একখানি গামছা ক্রয় করিয়া নবীন বিল্বপত্রে ঝুড়িটি পূর্ণ করিয়া ভিজা গামছাখানি উহার উপর চাপা দিয়া অপরাহ্ণ প্রায় তিন ঘটিকার সময় কামারপুকুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ বাটি পঁৌছিয়াই শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম স্নান সমাপনপূর্বক ঐ পত্রসকল লইয়া মহানন্দে নমহাদেব ও নশীতলামাতার বহুক্ষণ পর্যন্ত পূজা করিলেন৷ পরদিন প্রতূ্যষে তিনি পুনরায় মেদিনীপুর যাত্রা করিলেন৷
এক দুই করিয়া ক্রমে কামারপুকুরে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের ছয় বৎসর অতিবাহিত হইল৷ তাঁহার পুত্র রামকুমার ষোড়শবর্ষে এবং কন্যা কাত্যায়নী একাদশবর্ষে পদার্পণ করিল৷ কন্যা বিবাহযোগ্যা হইয়াছে দেখিয়া তিনি এখন পাত্রের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন এবং কামারপুকুরের উত্তর–পশ্চিমে একক্রোশ দূরে অবস্থিত আনুড় গ্রামের কেনারাম বন্দ্যোপাধ্যায়কে কন্যা সম্প্রদানপূর্বক কেনারামের ভগিনীর সহিত নিজ পুত্র রামকুমারের উদ্বাহকার্য সম্পন্ন করিলেন৷ রামকুমার নিকটবর্তী গ্রামের চতুষ্পাঠীতে ইতঃপূর্বে ব্যাকরণ ও সাহিত্যপাঠ সমাপ্ত করিয়া এখন স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেছিলেন৷ ক্রমে আরও তিন–চার বৎসর অতিক্রান্ত হইল এবং এই সময়ের মধ্যে রামকুমার স্মৃতি অধ্যয়ন সমাপন করিয়া সংসারের আর্থিক উন্নতিকল্পে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে প্রবৃত্ত হইলেন৷ অনন্তর ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম পদব্রজে সেতুবন্ধ রামেশ্বর দর্শনে গমন করিলেন এবং দাক্ষিণাত্য প্রদেশের তীর্থসকল পর্যটন করিয়া প্রায় এক বৎসর পরে বাটিতে প্রত্যাগমন করিলেন৷ নসেতুবন্ধ হইতে এই সময় তিনি একটি বাণলিঙ্গ কামারপুকুরে আনয়নপূর্বক নিত্যপূজা করিতে থাকেন৷ শ্রীমতী চন্দ্রাদেবী বহুকাল পরে পুনরায় এই সময়ে গর্ভধারণ করিয়া ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে এক পুত্র প্রসব করেন৷ নরামেশ্বরতীর্থ হইতে প্রত্যাগমন করিয়া এই পুত্রলাভ করিয়াছিলেন বলিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম পুত্রের নাম রাখিলেন রামেশ্বর৷
এই ঘটনার প্রায় আট বৎসরকাল পর্যন্ত কামারপুকুরের এই দরিদ্র সংসারের জীবনপ্রবাহ প্রায় সমভাবেই বহিয়াছিল৷ রামকুমার স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান দিয়া এবং শান্তি–স্বস্ত্যয়নাদি কর্মে এখন কিছু উপার্জন করিতেছিলেন৷ সুতরাং এখন সংসারে আর পূর্বের ন্যায় কষ্ট ছিল না৷ শুনা যায়, শান্তি–স্বস্ত্যয়নাদি বিষয়ে রামকুমার দৈবীশক্তি লাভ করিয়াছিলেন এবং ভবিষ্যদ্বক্তা বলিয়াও তাঁহার এইকালে এতদঞ্চলে সামান্য প্রসিদ্ধিলাভ হইয়াছিল৷
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের অন্তরে তীর্থদর্শনের প্রবল ইচ্ছা পুনঃ জাগিয়া উঠিল৷ ষাট বৎসরে পদার্পণ করিলেও তিনি পদব্রজে নগয়াধামে যাইতে সঙ্কল্প করিলেন৷ উক্ত সালের প্রথম ভাগে তীর্থদর্শনে বহির্গত হইয়া প্রথমে নবারাণসী ও তৎপর নগয়াধাম দর্শন করিলেন৷ প্রথমোক্ত স্থানে নবিশ্বনাথকে দর্শনান্তর যখন তিনি নগয়াধাম পৌঁছিলেন তখন চৈত্রমাস পড়িয়াছে৷ প্রায় একমাসকাল তথায় অবস্থানপূর্বক তিনি যথাবিহিত ক্ষেত্রকার্যসকলের অনুষ্ঠান করিয়া পরিশেষে নগদাধরের শ্রীপাদপদ্মে পিণ্ডপ্রদান করিলেন৷ পিতৃঋণ যথাসাধ্য পরিশোধ করিয়া তিনি আজ নিশ্চিন্ত৷ রাত্রিকালে নিদ্রায় স্বপ্ণাবেশে দেখিতে লাগিলেন তিনি যেন শ্রীমন্দিরে নগদাধরের শ্রীপাদপদ্মসম্মুখে পুনরায় পিতৃ–পুরুষসকলের উদ্দেশে পিণ্ডপ্রদান করিতেছেন এবং তাঁহারা যেন দিব্য জ্যোতির্ময় শরীরে উহা সানন্দে গ্রহণপূর্বক তাঁহাকে আশীর্বাদ করিতেছেন৷ বহুকাল পরে তাঁহাদিগকে দর্শনলাভ করিয়া ভক্তিগদগদচিত্তে রোদন করিতে করিতে তিনি তাঁহাদিগের পাদস্পর্শ করিয়া প্রণাম করিতে লাগিলেন৷ পরক্ষণেই আবার দেখিতে পাইলেন যেন অদৃষ্টপূর্ব দিব্য–জ্যোতিতে মন্দির পূর্ণ হইয়াছে এবং পিতৃপুরুষগণ সসম্ভ্রমে সংযতভাবে দুই পার্শ্বে করজোড়ে দণ্ডায়মান থাকিয়া মন্দিরমধ্যে বিচিত্র সিংহাসনে সুখাসীন এক অদ্ভুতপুরুষের উপাসনা করিতেছেন৷ দেখিলেন, নবদূর্বাদলশ্যাম জ্যোতির্মণ্ডিততনু ঐ পুরুষ স্নিগ্ধ প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে অবলোকনপূর্বক হাস্যমুখে তাঁহাকে নিকটে যাইবার ইঙ্গিত করিতেছেন৷ যন্ত্রের ন্যায় পরিচালিত হইয়া তিনি যেন তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন এবং ভক্তিবিহ্বলচিত্তে দণ্ডবৎ প্রণামপূর্বক হূদয়ের আবেগে কতপ্রকার স্তুতি ও বন্দনা করিতে লাগিলেন৷ দেখিলেন, ঐ দিব্যপুরুষ যেন তাহাতে পরিতুষ্ট হইয়া বীণানিস্যন্দী মধুর স্বরে তাঁহাকে বলিতে লাগিলেন, ‘‘ক্ষুদিরাম, তোমার ভক্তিতে পরম প্রসন্ন হইয়াছি, পুত্ররূপে তোমার গৃহে অবতীর্ণ হইয়া আমি তোমার সেবা গ্রহণ করিব৷’’ স্বপ্ণেরও অতীত ঐ কথা শুনিয়া তাঁহার যেন আনন্দের অবধি রহিল না, কিন্তু পরক্ষণেই, চির দরিদ্র তিনি তাঁহাকে কি খাইতে দিবেন, কোথায় তাঁহাকে রাখিবেন ইত্যাদি ভাবিয়া গভীর বিষাদে পূর্ণ হইয়া রোদন করিতে করিতে তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘না, না প্রভু, আমার ঐরূপ সৌভাগ্যের প্রয়োজন নাই কৃপা করিয়া আপনি যে আমাকে দর্শন দানে কৃতার্থ করিলেন এবং ঐরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন, ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট সত্য সত্য পুত্র হইলে দরিদ্র আমি আপনার কি সেবা করিতে পারিব?’’ ঐ অমানুষ পুরুষ যেন তখন তাঁহার ঐরূপ করুণ বচন শুনিয়া অধিকতর প্রসন্ন হইলেন এবং বলিলেন, ‘‘ভয় নাই, ক্ষুদিরাম, তুমি যাহা প্রদান করিবে তাহাই আমি তৃপ্তির সহিত গ্রহণ করিব৷ আমার অভিলাষ পূরণ করিতে আপত্তি করিও না৷’’ বিস্মিত, স্তম্ভিত, পুলকিত ক্ষুদিরাম সহসা জাগিয়া উঠিলেন৷ তখন তাঁহার সর্বাঙ্গ স্বেদাক্ত হইয়াছে এবং এক অনির্বচনীয় উল্লাসে দেহ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে৷ মনে হইল, এখনও যেন সেই দিব্যালোকে এবং স্বর্গীয় সৌরভে মন্দিরকক্ষ পূর্ণ৷ ধীরে ধীরে তাঁহার যখন স্থূল জগতের জ্ঞান উপস্থিত হইল, তখন তিনি ভাবিতে লাগিলেন, দেবস্বপ্ণ কখনও বৃথা হয় না–নিশ্চয় কোন মহাপুরুষ তাঁহার গৃহে শীঘ্র জন্মপরিগ্রহণ করিবেন৷ অনন্তর ঐ অদ্ভুত স্বপ্ণের সাফল্য পরীক্ষা না করিয়া কাহারও নিকট তদ্বিবরণ প্রকাশ করিবেন না, এইরূপ সঙ্কল্প তিনি মনে মনে স্থির করিলেন এবং কয়েকদিন পরে নগয়াধাম হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া বৈশাখ মাসে কামারপুকুরে উপস্থিত হইলেন৷
গয়াধাম হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম শ্রীমতী চন্দ্রাদেবীর স্বভাবের অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করিলেন৷ তিনি দেখিলেন, মানবী চন্দ্রা যেন সত্য সত্যই দেবীত্ব–পদবীতে আরূঢ়া হইয়াছে৷ কোথা হইতে এক সর্বজনীন প্রেম আসিয়া তাঁহার হূদয় অধিকার করিয়া সংসারের বাসনাময় কোলাহল হইতে তাঁহাকে যেন অনেক উচ্চে রাখিয়াছে৷ সরলপ্রাণা চন্দ্রা স্বামীর নিকটে নিজ চিন্তাটি পর্যন্ত কখনও গোপন করিতে পারিতেন না৷ নগয়াধাম দর্শন করিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম বাটি ফিরিলে কয়েকদিন ধরিয়া চন্দ্রাদেবী তাঁহাকে তাঁহার অনুপস্থিতিকালে যাহা কিছু ঘটিয়াছিল এবং যে–সকল অলৌকিক দর্শন ও অনুভূতি হইয়াছিল, সে সমস্ত কথাই সুযোগমত বলিতে লাগিলেন৷ কথাপ্রসঙ্গে বলিলেন, ‘‘একদিন যুগীদের শিব–মন্দিরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ধনীর সহিত কথা কহিতেছি, এমন সময় দেখিলাম, নমহাদেবের শ্রীঙ্গ হইতে দিব্যজ্যোতি নির্গত হইয়া মন্দির পূর্ণ করিয়াছে এবং বায়ুর ন্যায় তরঙ্গাকারে উহা আমার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে৷ সহসা উহা নিকটে আসিয়া আমাকে যেন ছাইয়া ফেলিল এবং আমার ভিতরে প্রবলবেগে প্রবেশ করিতে লাগিল৷ ভয়ে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া এককালে মূর্ছিতা হইয়া পড়িয়া গেলাম৷ পরে, ধনীর শুশ্রূষায় চৈতন্য হইলে তাহাকে সকল কথা বলিলাম৷ আমার কিন্তু তদবধি মনে হইতেছে ঐ জ্যোতি যেন আমার উদরে প্রবিষ্ট হইয়াছে এবং আমার যেন গর্ভসঞ্চারের উপক্রম হইয়াছে৷’’ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম নগয়ায় নিজ স্বপ্ণের কথা স্মরণ করিয়া উহা রোগজনিত নাও হইতে পারে, এই কথা বলিয়া তাঁহাকে নানাভাবে বুঝাইলেন এবং বলিলেন, ‘‘এখন হইতে ঐরূপ দর্শন ও অনুভবের কথা আমাকে ভিন্ন আর কাহাকেও বলিও না৷ নগয়াধামে অবস্থানকালে শ্রীগদাধর আমাকেও অলৌকিক উপায়ে জানাইয়াছেন আমাদিগকে পুনরায় পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিতে হইবে৷’’ শ্রীমতী চন্দ্রাদেবী দেবপ্রতিম স্বামীর ঐরূপ কথা শুনিয়া আশ্বস্তা হইলেন এবং তাঁহার আজ্ঞানুবর্তিনী হইয়া এখন হইতে পূর্ণভাবে শ্রীশ্রীরঘুবীরের মুখাপেক্ষিণী হইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন৷ গর্ভবতী হইয়া শ্রীমতী চন্দ্রার দিব্যদর্শন ও অনুভবসকল দিন দিন বর্ধিত হইতে লাগিল৷ তিনি ঐ সময়ে প্রায় নিত্যই দেবদেবীসকলের দর্শনলাভ করিতেন৷ ঐরূপে দিনের পর দিন যাইতে লাগিল এবং শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম ও তাঁহার পূতস্বভাবা গৃহিণী শ্রীশ্রীরঘুবীরের একান্ত শরাণাগত থাকিয়া মহাপুরুষ–পুত্রের মুখ নিরীক্ষণের আশায় কাল কাটাইতে লাগিলেন৷
শরৎ, হেমন্ত ও শীত অতীত হইয়া ক্রমে ঋতুরাজ বসন্ত সমাগত৷ শীত ও গ্রীষ্মের সুখসম্মিলনে মধুময় ফাল্গুন স্থাবর–জঙ্গমের ভিতর নবীন প্রাণ সঞ্চারিত করিয়া আজ ষষ্ঠ দিবস সংসারে সমাগত৷ জীবজগতে একটা বিশেষ উৎসাহ, আনন্দ ও প্রেমের প্রেরণা সর্বত্র লক্ষিত হইতেছে৷ ক্রমে শুভ ফাল্গুনী শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি উপস্থিত হইল৷ আসন্ন–প্রসবা চন্দ্রাদেবী গর্ভস্থ সন্তানভারে নিরতিশয় কাতরা হইলেও প্রাণে আজ এক দিব্য উল্লাস অনুভব করিতে লাগিলেন৷ নরঘুবীরের মধ্যাহ্ণভোগ এবং সান্ধ্যশীতলাদি কর্ম পর্যন্ত সেদিন নির্বিঘ্ণে সম্পাদিত হইয়া গেল৷ রাত্রে আহারাদি সমাপন করিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম ও রামকুমার শয়নকক্ষে প্রবেশ করিলেন এবং ধনী আসিয়া চন্দ্রাদেবীর সহিত এক কক্ষে শয়ন করিয়া রহিল৷ রাত্রি অবসান হইতে প্রায় অর্ধদণ্ড অবশিষ্ট আছে, এমন সময়ে চন্দ্রাদেবীর প্রসবপীড়া উপস্থিত হইল৷ ধনীর সাহায্যে তিনি ঢেঁকিশালে গিয়া শয়ন করিলেন এবং অবিলম্বে এক দিব্যকান্তি পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন৷ শ্রীমতী চন্দ্রার জন্য ধনী তৎকালোপযোগী ব্যবস্থাদি করিয়া জাতককে সাহায্য করিতে অগ্রসর হইয়া দেখিল, রক্তক্লেদময় পিচ্ছিল ভূমিতে ধীরে ধীরে হড়কাইয়া ধান্য সিদ্ধ করিবার চুল্লির ভিতর প্রবেশপূর্বক সে বিভূতিভূষিতাঙ্গ হইয়া নিঃশব্দে পড়িয়া রহিয়াছে৷ ধনী তাহাকে সযত্নে উঠাইয়া পরিষ্কৃত করিয়া দীপালোকে দেখিল অদ্ভুত প্রিয়দর্শন বালক–যেন ছয় মাসের ছেলের মতো বড়৷ পূতগম্ভীর ব্রাহ্মমুহূর্তে তপস্বী ক্ষুদিরামের দরিদ্র কুটির শুভ শঙ্খারাবে পূর্ণ হইয়া মহাপুরুষের শুভাগমনবার্তা সংসারে ঘোষণা করিল৷
শাস্ত্রজ্ঞ ক্ষুদিরাম নবাগত বালকের জন্মলগ্ণ নিরূপণ করিতে যাইয়া দেখিলেন, জাতক বিশেষ শুভলগ্ণে সংসারে প্রবেশ করিয়াছে৷ ঐ দিন ১৭৫৭ শকাব্দের ৬ ফাল্গুন, ইং ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি, শুক্লপক্ষ, বুধবার৷ শুভ দ্বিতীয়া তিথি ঐ সময়ে পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্রের সহিত সংযুক্ত হইয়া সংসারে সিদ্ধিযোগ আনয়ন করিয়াছিল৷ বালকের জন্মলগ্ণে রবি, চন্দ্র ও বুধ একত্রে মিলিত রহিয়াছে এবং শুক্র, মঙ্গল ও শনি তুঙ্গস্থান অধিকার করিয়া তাহার অসাধারণ জীবনের পরিচায়ক হইয়া রহিয়াছে৷ অতঃপর বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ্গণ নবজাত বালকের জন্মক্ষণ পরীক্ষা করিয়া ক্ষুদিরামকে বলিলেন, জাতক যেরূপ উচ্চলগ্ণে জন্মগ্রহণ করিয়াছে তাহাতে ঐরূপ ব্যক্তি ধর্মবিৎ ও মাননীয় হইবেন এবং সর্বদা পুণ্যকর্মের অনুষ্ঠানে রত থাকিবেন৷ বহুশিষ্যপরিবৃত হইয়া ঐ ব্যক্তি দেবমন্দিরে বাস করিবেন এবং নবীন সম্প্রদায় প্রবর্তিত করিয়া নারায়ণাংশসম্ভূত মহাপুরুষ বলিয়া জগতে প্রসিদ্ধিলাভপূর্বক সর্বত্র লোকের পূজ্য হইবেন৷ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম কৃতজ্ঞহূদয়ে ভাবিতে লাগিলেন, নগয়াধামে তিনি যে দেবস্বপ্ণ সন্দর্শন করিয়াছিলেন, তাহা সত্য সত্যই পূর্ণ হইল৷ অনন্তর জাতকর্ম ও যথাকালে নিষ্ক্রমণাদি সম্পন্ন করিয়া জাতকের রাশ্যাশ্রিত নাম শম্ভুচন্দ্র বলিয়া নির্ধারণ করিলেন৷ কিন্তু নগয়াধামে অবস্থানকালে নিজ বিচিত্র স্বপ্ণের কথা স্মরণ করিয়া বালকের নাম রাখিলেন–গদাধর৷
পাঠকবর্গের সুবিধার জন্য আমরা ঠাকুরের বংশতালিকা
এখানে প্রদান করিতেছি৷

শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম ও তদীয় গৃহিণী শ্রীমতী চন্দ্রাদেবী প্রিয়দর্শন বালকের মুখকমল দর্শন করিয়া অপত্যস্নেহের বশবর্তী হইয়া নগয়াক্ষেত্রের দেবস্বপ্ণ, শিবমন্দিরের দিব্যদর্শন প্রভৃতির কথা এখন অনেকাংশে বিস্মৃত হইলেন৷ এদিকে নবজাত বালকের চিত্তাকর্ষণশক্তি দিন দিন বর্ধিত হইয়া জনক–জননীর উপরে স্বীয় প্রভাব বিস্তার করিয়াই ক্ষান্ত রহিল না, কিন্তু পরিবারস্থ সকলের এবং পল্লিবাসিনী রমণীগণের উপরেও নিজ আধিপত্য ধীরে ধীরে স্থাপন করিয়া বসিল৷ পল্লিরমণীগণ অবসরকালে শ্রীমতী চন্দ্রাকে এখন নিত্য দেখিতে আসিতেন এবং কারণ জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেন, ‘তোমার পুত্রটিকে নিত্য দেখিতে ইচ্ছা করে, তা কি করি বল, নিত্যই আসিতে হয়৷’ এইরূপে সকলের আদরযত্নে সুখপালিত হইয়া নবাগত ক্রমে পঞ্চ মাস অতিক্রম করিল এবং তাহার অন্নপ্রাশনের কাল উপস্থিত হইলে ক্ষুদিরামের পরমবন্ধু গ্রামের জমিদার শ্রীযুক্ত ধর্মদাস লাহা হূষ্টচিত্তে অনেকাংশে আপন ব্যয়ে সকল বিষয়ের বন্দোবস্ত করিয়া উক্ত কার্য সুসম্পন্ন করিয়া দিলেন৷
দিন যাইবার সঙ্গে সঙ্গে গদাধরের বালচেষ্টাসমূহ মধুরতর হইয়া উঠিয়া চন্দ্রাদেবীর হূদয়কে আনন্দ ও ভয়ের পুণ্যপ্রয়াগে পরিণত করিল৷ তিনি এখন প্রতিদিন তনয়ের কল্যাণকামনায় জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে তাঁহার মাতৃহূদয়ে সকরুণ নিবেদন শত–সহস্রবার দেবতাদিগের চরণে অর্পণ করিয়াও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেন না৷ ক্রমে চারি পাঁচ বৎসর অতীত হইল৷ বালক প্রথম হইতে জনক–জননীর ও অন্য সকলের মনে যে মধুর আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিল, তাহা দিন দিন দৃঢ় ও ঘনীভূত হইতে লাগিল৷ এই কালের মধ্যে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের সর্বমঙ্গলা নাম্নী কনিষ্ঠা কন্যা জন্মগ্রহণ করিল৷
বয়োবৃদ্ধির সহিত বালক গদাধরের অদ্ভুত মেধা ও প্রতিভার বিকাশ দেখিয়া শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম আনন্দ ও বিস্ময়ে অভিভূত হইতেন৷ গ্রামের জমিদার লাহাবাবুদের বাটির সম্মুখে বিস্তৃত নাটমন্দিরে পল্লির বালকগণের শিক্ষার্থে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল৷ যথাকালে বালক গদাধর উক্ত গ্রাম্য পাঠশালায় প্রেরিত হইলেও বিদ্যালয়ে তাহার শিক্ষা বেশিদূর অগ্রসর হইল না৷ দুরন্ত বালক কখনও কখনও পাঠশালায় না যাইয়া সঙ্গিগণকে লইয়া গ্রামের বহির্ভাগে ক্রীড়ায় রত থাকিত৷ বিদ্যাভ্যাসে অমনোযোগী হইলেও গদাধর তাহার অলৌকিক মেধা ও শ্রুতিধরত্বগুণে দেব–দেবীর স্তোত্রাদি এবং রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি হইতে বিবিধ উপাখ্যান শ্রবণ মাত্রেই স্বল্পকাল মধ্যে আয়ত্ত করিয়া ফেলিত৷ কিন্তু গণিতশাস্ত্রের নামতা প্রভৃতি তাহার মুখস্থ হইত না এবং শুভঙ্করী ধাঁধা লাগিত৷ অন্যদিকে বালকের অনুকরণ ও উদ্ভাবনী শক্তি দিন দিন নূতন দিকে এমনভাবে প্রসারিত হইতে লাগিল যে, শৈশবের মাধুর্য ক্রমে ঘনীভূত হইয়া বালককে সকলের অধিকতর প্রিয় করিয়া তুলিল৷ ভূরসুবো গ্রামের বিশিষ্ট দাতা ও ভক্ত জমিদার মানিকরাম বন্দ্যোপাধ্যায় (মানিকরাজা) ক্ষুদিরামের ধর্মপরায়ণতায় আকৃষ্ট হইয়া তাঁহার সহিত বিশেষ সৌহূদ্যসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিলেন৷ ছয়বৎসর বয়স্ক গদাধর পিতার সহিত একদিন মানিকরাজার বাটিতে যাইয়া সকলের সহিত এমন চিরপরিচিতের ন্যায় নিঃসঙ্কোচ মধুর ব্যবহার করিয়াছিল যে, সেইদিন হইতেই সে তাহাদিগের অত্যন্ত প্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল৷
স্বাস্থ্যবান বালক গগনচারী বিহঙ্গের ন্যায় অপূর্ব স্বাধীনতা ও চিত্তপ্রসাদে দিনযাপন করিত৷ কখনও কখন তাহার স্বাভাবিক একাগ্রচিত্ত বিষয় বিশেষে এত নিবিষ্ট হইত যে তখন তাহার শরীরবুদ্ধির হ্রাস হইয়া তাহাকে এককালে ভাবময় করিয়া তুলিত৷ সপ্তমবর্ষীয় বালক গদাধর একদিন সঙ্গিগণ সহ প্রান্তর মধ্যে যদৃচ্ছা পরিভ্রমণ করিতেছিল৷ সহসা একখণ্ড ঘন কাল মেঘ আকাশ ছাইয়া ফেলিল৷ সেই মেঘের কোলে আবার এক ঝাঁক বক দেখা দিল৷ নবজলধর ক্রোড়ে বলাকাশ্রেণীর শ্বেতপক্ষ বিস্তারপূর্বক এই সুন্দর স্বাচ্ছন্দ পরিভ্রমণদর্শনে বালকের ভাবপ্রবণচিত্ত উধাও হইয়া একেবারে অনন্তরাজ্যে চলিয়া গেল৷ ভাবাবেশে বালক মূর্ছিত হইয়া পড়িল৷ বয়স্যগণ ঐরূপ অবস্থাদর্শনে ভীত ও বিপন্ন হইয়া তাহার জনক–জননীকে সংবাদ প্রদান করিল এবং তাহাকে ধরাধরি করিয়া প্রান্তর হইতে বাটিতে তুলিয়া লইয়া যাওয়া হইল৷ চেতনালাভের কিছুক্ষণ পরেই কিন্তু সে আপনাকে পূর্বের ন্যায় সুস্থবোধ করিতে লাগিল৷ এই ভাব–তন্ময়তার অপর নামই ভাব–সমাধি৷ সাধনভজন ব্যতীত যে এইরূপ অবস্থা ঘটিতে পারে, বিশেষ বালক বয়সে, শাস্ত্রজ্ঞ ও সাধক ক্ষুদিরামও তাহা ধারণা করিতে না পারিয়া গদাধরের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ণ হইয়া উঠিলেন এবং যাহাতে তাহার ঐরূপ অবস্থা না হয় সেজন্য নানা উপায় উদ্ভাবন করিলেন৷ যাহা হউক, বালকের স্বাস্থ্যের কোনরূপ ব্যাতিক্রম হইল না দেখিয়া সকলে নিশ্চিন্ত হইলেন৷
গদাধরের বয়ঃক্রম যখন আট বৎসর সেই সময় আর একবার তাহার ঐরূপ গভীর ভাবাবেশ হইয়াছিল৷ কামারপুকুরের একক্রোশ আন্দাজ উত্তরে আনুড় গ্রামের দেবী বিশালাক্ষী ঐ অঞ্চলে বিশেষ প্রসিদ্ধ৷ প্রান্তর মধ্যে শূন্য অম্বরতলেই দেবীর অবস্থান, বর্ষাতপাদি হইতে রক্ষার জন্য কৃষকেরা সামান্য পর্ণাচ্ছাদন মাত্র বৎসর বৎসর করিয়া দেয়৷ গ্রামের অনেকগুলি স্ত্রীলোক একদিন দলবদ্ধ হইয়া নবিশালাক্ষী দেবীর মানত শোধ করিতে আনুড় যাইতে প্রস্তুত হইলেন৷ বালক গদাধরও তাঁহাদের সঙ্গী হইল এবং ঠাকুর–দেবতার গল্প গান করিতে করিতে হূষ্টচিত্তে চলিতে লাগিল৷ কিন্তু প্রান্তর পার হইবার পূর্বেই এক অভাবনীয় ঘটনা উপস্থিত হইল৷ সহসা সুধাকণ্ঠে বালকের গান থামিয়া গেল, তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি অবশ আড়ষ্ট হইয়া গেল, চক্ষে অবিরল জলধারা বহিতে লাগিল৷ বালকের অবস্থাদর্শনে স্ত্রীলোকেরা বিশেষ বিপন্না হইলেন এবং সকলে বালককে ঘিরিয়া বসিয়া কখনও ব্যজন, কখনও জলসেক করিতে লাগিলেন৷ অবশেষে, বালকের উপর দেবীর ভর হইয়াছে এইরূপ দৃঢ় নিশ্চয় করিয়া রমণীগণ দেবীজ্ঞানে বালককেই সম্বোধন করিয়া বারংবার বলিতে লাগিলেন, ‘‘মা, বিশালাক্ষি, প্রসন্না হও মা রক্ষা কর মা বিশালাক্ষি, মুখ তুলে চাও অকূলে কূল দাও৷’’ আশ্চর্য রমণীগণ কয়েকবার ঐরূপে দেবীর নাম গ্রহণ করিতে না করিতেই গদাধরের মুখমণ্ডল মধুর হাস্যে রঞ্জিত হইয়া উঠিল এবং অচিরে বালক প্রকৃতিস্থ হইল৷ বালক কিন্তু এবারও বলিয়াছিল যে, নদেবীর চিন্তা করিতে করিতে তাঁহার শ্রীপাদপদ্মে মন লয় হইয়াই তাহার ঐরূপ অবস্থার উদয় হইয়াছিল৷
বাল্যকালে গদাধরের উচ্চ ভাবভূমিতে আরূঢ় হওয়ার বিষয়ে আরও একটি ঘটনা সাক্ষ্য প্রদান করে৷ শিবরাত্রি ব্রতকালে গ্রামস্থ সীতানাথ পাইনের বাটিতে শিবমন্দিরের সম্মুখে একবার শিবমহিমাসূচক যাত্রাভিনয়ের বন্দোবস্ত হইয়াছে৷ সন্ধ্যার সময় সংবাদ পাওয়া গেল যাত্রার দলে যে বালক শিব সাজিয়া থাকে, তাহার সহসা কঠিন পীড়া হইয়াছে৷ দলের অধিকারী বলিয়া পাঠাইলেন শিব সাজিবার লোক মিলিলে সে রাত্রে অভিনয় হইতে পারে, নতুবা উহা বন্ধ থাকিবে৷ স্থির হইল, গদাইয়ের বয়স অল্প হইলেও সে অনেক শিবের গান জানে এবং শিব সাজিলে তাহাকে দেখাইবেও ভাল৷ সকলের আগ্রহে গদাই সেই ভূমিকা গ্রহণে সম্মত হইল৷ গদাধর শিব সাজিয়া সাজঘরে বসিয়া শিবের কথা ভাবিতেছিল এমন সময় তাহার আসরে ডাক পড়িল৷ বন্ধুর আহ্বানে বালক কেমন উন্মনাভাবে কোনদিকে লক্ষ্য না করিয়া ধীর মন্থরগতিতে সভাস্থলে উপস্থিত হইয়া স্থিরভাবে দণ্ডায়মান রহিল৷ তখন গদাধরের সেই জটাজটিল বিভূতিমণ্ডিত বেশ, সেই ধীরস্থির পাদক্ষেপ ও পরে অটল অচল অবস্থিতি, বিশেষত সেই অপার্থিব অন্তর্মুখী নির্নিমেষ দৃষ্টি ও অধরকোণে ঈষৎ হাস্যরেখা দেখিয়া লোকে আনন্দে ও বিস্ময়ে মোহিত হইয়া পল্লিগ্রামের প্রথামত সহসা উচ্চরবে হরিধ্বনি করিয়া উঠিল এবং রমণীগণের কেহ কেহ উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিল৷ গদাধর কিন্তু সেই একইভাবে দণ্ডায়মান, অধিকন্তু তাহার বক্ষ বহিয়া অবিরত নয়নাশ্রু পতিত হইতেছে৷ এইরূপ কিছুক্ষণ অতীত হইলেও বালক স্থান পরিবর্তন করিতে বা কথা বলিতে সমর্থ হইল না৷ তাহার কিছুতেই সংজ্ঞা হইতেছে না দেখিয়া যাত্রা ভাঙিয়া গেল এবং তাহাকে স্কন্ধে লইয়া কয়েকজন কোনরূপে বাটিতে পঁৌছাইয়া দিল৷ সে–রাত্রে গদাধরের সে–ভাব বহু প্রযত্নেও ভঙ্গ হইল না৷ পরে সূর্যোদয় হইলে বালক আবার প্রকৃতিস্থ হইল৷
ক্রমে ইং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের শারদীয়া মহাপূজার সময় উপস্থিত হইল৷ ক্ষুদিরামের কৃতী ভাগিনেয় রামচাঁদ তাঁহার পৈতৃক বাসভূমি ছিলিমপুর নামক গ্রামে প্রতিবৎসর শারদীয়া মহাপূজার অনুষ্ঠান করিয়া অনেক টাকা ব্যয় করিতেন৷ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম এখন অষ্টষষ্টিতম বর্ষ প্রায় অতিক্রম করিতে বসিয়াছেন এবং কিছুকাল পূর্ব হইতে মধ্যে মধ্যে অজীর্ণ ও গ্রহণী রোগে আক্রান্ত হইয়া তাঁহার সুদৃঢ় শরীর এখন বলহীন হইয়াছিল৷ তথাপি প্রিয় ভাগিনেয় রামচাঁদের সাদর–আহ্বানে পূর্ব পূর্ব বৎসরের ন্যায় এবারও তিনি পূজার কিছুদিন পূর্বে রামকুমারকে সঙ্গে লইয়া ছিলিমপুর যাত্রা করিলেন৷ রামচাঁদও পূজায় মাতুল ও ভ্রাতা রামকুমারকে নিকটে পাইয়া বিশেষ আনন্দলাভ করিলেন৷ ছিলিমপুর পঁৌছিবার পরে ক্ষুদিরামের গ্রহণীরোগ পুনরায় দেখা দিল এবং উহা প্রবলভাব ধারণ করিল৷ নবমীর দিন ও রাত্রি কোনরূপে কাটিয়া যাইয়া বিজয়া দশমী সমাগত হইল৷ ক্ষুদিরাম অদ্য এত দুর্বল হইয়া পড়িলেন যে বাঙ্নিষ্পত্তি করা তাঁহার পক্ষে কষ্টকর হইয়া উঠিল৷ ক্রমে অপরাহ্ণ সমাগত হইলে রামচাঁদ প্রতিমা বিসর্জনপূর্বক সত্বর মাতুলের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন তাঁহার অন্তিমকাল উপস্থিতপ্রায়৷ রামচাঁদ, হেমাঙ্গিনী ও রামকুমার তাঁহারই নির্দেশক্রমে তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া অতি সন্তর্পণে শয্যায় উপবেশন করাইয়া দিলেন৷ তিনি গম্ভীর স্বরে তিনবার নরঘুবীরের নামোচ্চারণপূর্বক দেহত্যাগ করিলেন৷ বিন্দু সিন্ধুর সহিত মিলিত হইল৷ অনন্তর অশৌচান্তে রামকুমার রামচাঁদের অর্থসাহায্যে শাস্ত্রবিধানে বৃষোৎসর্গ ও বহু ব্রাহ্মণভোজন করাইয়া পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ করিলেন৷
শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের দেহাবসানে তাঁহার পরিবারবর্গের জীবনে বিশেষ পরিবর্তন উপস্থিত হইল৷ দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বৎসর সুখে দুঃখে যাঁহাকে জীবনের নিত্য সহচররূপে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাঁহাকে হারাইয়া শ্রীমতী চন্দ্রা যে এখন জগৎ শূন্যময় দেখিবেন এবং প্রাণে একটা চিরস্থায়ী অভাব প্রতিক্ষণ অনুভব করিবেন তাহা বলিতে হইবে না৷ সাত বৎসরের পুত্র গদাধর এবং চারি বৎরের কন্যা সর্বমঙ্গলাকে বক্ষে ধরিয়া চন্দ্রাদেবী শ্রীশ্রীরঘুবীরকে অবলম্বন করিয়া তাঁহার দুঃখের দিনগুলি কোনরূপে কাটাইতে লাগিলেন৷ বালক গদাধর কিন্তু এখন হইতে চিন্তাশীল ও নির্জনতাপ্রিয় হইয়া উঠিল৷ সকলে দেখিত, বালক পূর্বের ন্যায় সদানন্দে হাস্য কৌতুকাদিতে কাল যাপন করিলেও কি যেন কেন কখনও কখনও ভূতির খালের শ্মশান, মানিকরাজার আম্রকানন প্রভৃতি গ্রামের জনশূন্য স্থানসকলে একাকী উদাসভাবে বিচরণ করিতেছে৷
পিতার অভাববোধ এখন গদাধরকে এক অভিনব বিষয়ে প্রবৃত্ত করিল৷ গ্রামের অগ্ণিকোণে নপুরীধামে যাইবার পথের উপর জমিদার লাহাবাবুরা যাত্রীদিগের সুবিধার জন্য একটি পান্থনিবাস প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন৷ নজগন্নাথ দর্শনে যাইবার ও তথা হইতে আসিবার কালে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধু, সন্ন্যাসী উক্ত পান্থশালায় কিছুকাল আশ্রয় গ্রহণপূর্বক ভিক্ষাদি সংগ্রহ করিতেন৷ বালক গদাধর সাধুদিগের সহিত পরিচিত হইবার আশায় এখন হইতে সেখানে যাতায়াত করিতে লাগিল এবং তাঁহাদের রন্ধনাদির জন্য কাষ্ঠসংগ্রহ, পানীয়জল আনয়ন প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কার্যে সহায়তা করিয়া তাঁহাদিগের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মিশিতে লাগিল৷ বালক পূর্বোক্তভাবে মিলিত হইয়া শীঘ্রই তাঁহাদিগের প্রিয় হইয়া উঠিল৷ বালকের প্রতি সাধুগণের প্রসন্নতা আশীর্বাদস্বরূপে গ্রহণ করিয়া চন্দ্রাদেবী গদাধরের সাধুসঙ্গ এতদিন প্রীতির চক্ষেই দেখিতেছিলেন৷ কিন্তু বালক যখন পরে কোনদিন বিভূতিভূষিতাঙ্গ হইয়া, কোনদিন তিলক ধারণ, আবার কোনদিন বা সাধুদিগের ন্যায় কৌপীন ও বহির্বাস পরিধান করিয়া মাতার সম্মুখে উপস্থিত হইতে লাগিল, তখন তাঁহার মন বিষম উদ্বিগ্ণ হইল৷ তিনি ভাবিলেন, সাধুরা তাঁহার পুত্রকে কোন দিন ভুলাইয়া সঙ্গে লইয়া যাইবে না তো? উক্ত আশঙ্কার কথা গদাধরকে বলিয়া তিনি একদিন নয়নাশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন৷ তখন সে সাধুদিগের নিকট আর কখনও যাইবে না বলিয়া মনে মনে সঙ্কল্প করিল এবং জননীকে ঐ কথা বলিয়া নিশ্চিন্ত করিল৷ অনন্তর সাধুগণের নিকট হইতে শেষ বিদায় গ্রহণ করিবার জন্য একদিন তাঁহাদের সমীপে উপস্থিত হইয়া জননীর আশঙ্কার কথা নিবেদন করিল৷ তাহাতে তাঁহারা বালকের সহিত শ্রীমতী চন্দ্রাদেবীর নিকটে আগমনপূর্বক তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিলেন যে গদাধরকে সঙ্গে লইবার সঙ্কল্প তাঁহাদিগের মনে কখনও উদিত হয় নাই এবং মাতাপিতার অনুমতি ব্যতিরেকে ঐরূপ অল্পবয়স্ক বালককে সঙ্গে লওয়া তাঁহারা অপহরণরূপ সাধুবিগর্হিত বিষম অপরাধ বলিয়া জ্ঞান করিয়া থাকেন৷ চন্দ্রাদেবীর মনে তাহাতে পূর্বাশঙ্কার ছায়ামাত্র রহিল না এবং সাধুদিগের প্রার্থনায় তিনি বালককে তাঁহাদিগের নিকট পূর্বের ন্যায় যাইতে অনুমতি প্রদান করিলেন৷
গদাধরের নবমবর্ষ উত্তীর্ণ হইতে চলিয়াছে দেখিয়া রামকুমার এখন তাহার উপনয়নের বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন৷ কামারকন্যা ধনী ইতঃপূর্বে একসময়ে বালকের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিল, সে যেন উপনয়নকালে তাহার নিকট হইতে প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাহাকে মাতৃসম্বোধনে কৃতার্থ করে৷ বালকও তাহাতে তাহার অকৃত্রিম স্নেহে মুগ্ধ হইয়া তাহার অভিলাষ পূর্ণ করিতে অঙ্গীকার করিয়াছিল৷ দরিদ্রা ধনী বালকের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিয়া তদবধি যথাসাধ্য অর্থাদি সংগ্রহ ও সঞ্চয় করিয়া সাগ্রহে ঐ কালের প্রতীক্ষা করিতেছিল৷ ঐ কাল উপস্থিত দেখিয়া গদাধর এখন নিজ অগ্রজকে তাহার প্রতিশ্রুতির কথা নিবেদন করিল৷ কিন্তু বংশে কখনও ঐরূপ প্রথার অনুষ্ঠান না হওয়ায় রামকুমার উহাতে আপত্তি করিয়া বসিলেন৷ বালকও নিজ অঙ্গীকার স্মরণ করিয়া ঐ বিষয়ে বিষম জেদ করিতে লাগিল৷ সে বলিল, ঐরূপ না করিলে তাহাকে সত্যভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হইতে হইবে এবং মিথ্যাবাদী ব্যক্তি ব্রাহ্মণোচিত যজ্ঞসূত্রধারণে কখনও অধিকারী হইতে পারে না৷ শ্রীযুক্ত ধর্মদাস লাহা ঐ কথা শুনিয়া রামকুমারকে বুঝাইলেন, ঐরূপ অনুষ্ঠান তাঁহাদিগের বংশে ইতঃপূর্বে না হইলেও উহা অন্যত্র বহু সদ্ব্রাহ্মণ–পরিবারে দেখা গিয়া থাকে৷ প্রবীণ পিতৃসুহূৎ ধর্মদাসের কথায় রামকুমার প্রভৃতি ঐ বিষয়ে আর আপত্তি করিলেন না৷ এবং গদাধর হূষ্টচিত্তে যথাবিধানে উপবীত ধারণ করিয়া সন্ধ্যাপূজাদি ব্রাহ্মণোচিত কার্যে মনোনিবেশ করিল৷
এই সময়ে একটি ঘটনায় গদাধরের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাইয়া পল্লিবাসী সকলে যারপরনাই বিস্মিত হইয়াছিল৷ গ্রামের জমিদার লাহাবাবুদের বাটিতে শ্রাদ্ধোপলক্ষে তদঞ্চলের খ্যাতনামা পণ্ডিতবর্গের নিমন্ত্রণ হয় এবং খুব তর্কের ছড়াছড়ি পড়িয়া যায়৷ অনেক তর্কের শাস্ত্রীয় প্রশ্ণবিশেষের কোনরূপ মীমাংসা হইতেছিল না, এমন সময় বালক গদাধর পরিচিত জনৈক পণ্ডিতকে বলিল, ‘‘কথাটার এইভাবে মীমাংসা হয় না কি?’’ তচ্ছ্রবণে ঐ প্রশ্ণের উহাই যে একমাত্র সমাধান তাহা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিলেন৷ কেহ বা আনন্দ পরিপূরিত হইয়া বালককে ক্রোড়ে তুলিয়া আশীর্বাদ করিতে লাগিলেন কেহ বা স্তম্ভিতপ্রায় হইয়া বালককে দৈবশক্তিসম্পন্ন ভাবিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন৷
সে যাহা হউক, উপনয়ন হইবার পরে গদাধরের ভাবপ্রবণ হূদয়ে নিজ প্রকৃতির অনুকূল পূজা ও ধ্যানে একাগ্র হইয়া তাহাকে ভাবসমাধি বা সবিকল্প সমাধির অধিকারী করিল এবং ঐ সমাধিসহায়ে তাহার জীবনে নানা দিব্যদর্শনও সময়ে সময়ে উপস্থিত হইতে লাগিল৷ বলা বাহুল্য, বালকের ধর্মপ্রকৃতি তাহাকে বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসকদের প্রতি বিদ্বেষশূন্য করিয়া তাঁহাদিগকে এখন হইতে আপনার করিয়া লইল৷ ঐরূপে ধর্মপ্রবৃত্তির পরিণতি হইলেও গদাধরের বিদ্যাভ্যাসে অনুরাগ দিন দিন হ্রাস পাইতে লাগিল৷ কারণ বালকের সূক্ষ্মদৃষ্টি তাহাকে এখন সকল ব্যক্তির কার্যে উদ্দেশ্যনিরূপণে প্রথমেই অগ্রসর করিত এবং তাহার পিতার বৈরাগ্য, ঈশ্বরভক্তি, সত্য, সদাচার ও ধর্মপরায়ণতাদি গুণসকলকে আদর্শরূপে সম্মুখে রাখিয়া তাঁহাদিগের আচরণের মূল্যনির্দেশে প্রবৃত্ত করিত৷ ঐরূপে দুই বৎসর কাল অতীত হইল এবং গদাধর ক্রমে দ্বাদশ বর্ষে উপনীত হইল৷ এখন রামকুমার রামেশ্বরকে বয়ঃপ্রাপ্ত হইতে দেখিয়া কামারপুকুরের নিকটবর্তী গৌরহাটি নামক গ্রামের রামসদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভগিনীর সহিত তাহার বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিলেন এবং রামসদয়কে নিজ ভগিনী সর্বমঙ্গলার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করিলেন৷
রামকুমারের পারিবারিক জীবনে এই সময়ে অন্য একটি বিশেষ ঘটনাও উপস্থিত হইয়াছিল৷ তাঁহার সহধর্মিণীকে এখন গর্ভবতী হইতে দেখিয়া পরিবারবর্গের মনে যুগপৎ আনন্দ ও শঙ্কার উদয় হইল৷ কারণ, গর্ভধারণ করিলেই তাঁহার পত্নীর মৃত্যু হইবে, একথা তাঁহাদিগের কেহ কেহ ইতঃপূর্বে রামকুমারের নিকটে শ্রবণ করিয়াছিলেন৷ এখন তাঁহার পত্নীর প্রসবকাল নিকটবর্তী হইতে দেখিয়া তিনি নিজ পূর্বদর্শন স্মরণপূর্বক অধিকতর বিষণ্ণ হইতে লাগিলেন৷ ক্রমে ঐ কাল সত্য সত্যই উপস্থিত হইল এবং রামকুমারের সহধর্মিণী এক পরম রূপবান তনয় প্রসবান্তে তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিতে করিতে সূতিকাগৃহেই স্বর্গারোহণ করিলেন৷ রামকুমারের দরিদ্র সংসারে ঐ ঘটনায় শোকের নিবিড় যবনিকা পুনরায় নিপতিত হইল৷
পত্নী পরলোকগমন করিলেন, কিন্তু রামকুমারের দুঃখ–দুর্দিনের অবসান হইল না৷ লক্ষ্মীজলার ভূমিখণ্ডে পর্যাপ্ত ধান্য এখনও উৎপন্ন হইলেও বস্ত্রাদি অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পদার্থসকলের অভাব সংসারে প্রতিদিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল৷ ক্রমে রামকুমার ঋণজালে জড়িত হইয়া পড়িলেন৷ তখন বন্ধুবর্গের পরামর্শে অন্যত্র গমন করিলে আয়বৃদ্ধির সম্ভাবনা বুঝিয়া তাহার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন৷ পত্নীবিয়োগের স্বল্পকাল পরেই রামকুমার রামেশ্বরের উপর সংসারের ভারার্পণ করিয়া কলকাতায় আগমন করিলেন এবং ঝামাপুকুর নামক পল্লির ভিতর টোল খুলিয়া ছাত্রগণকে অধ্যয়ন করাইতে নিযুক্ত হইলেন৷
এখন হইতে গৃহকর্মের সমস্ত ভার এবং রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের লালন–পালনের ভারও চন্দ্রাদেবীর স্কন্ধে নিপতিত হইল৷ তাঁহার মধ্যমপুত্র রামেশ্বরের পত্নী তখনও নিতান্ত বালিকা তাহার নিকট হইতে বিশেষ সাহায্য পাইবার সম্ভাবনা ছিল না৷ আটান্ন বৎসর বয়ঃক্রমকালে সংসারের সমস্ত ভার স্কন্ধে লওয়া সুখসাধ্য না হইলেও শ্রীরঘুবীরের ঐরূপ ইচ্ছা বুঝিয়া চন্দ্রাদেবী উহা বিনা অভিযোগে বহন করিতে লাগিলেন৷ রামেশ্বর কৃতবিদ্য হইলেও উপার্জনক্ষম হইতে পারিলেন না৷ সাধুসঙ্গপ্রিয় রামেশ্বর দানে মুক্তহস্ত ছিলেন এবং সময় সময় আয়ের অধিক ব্যয় করিয়া ‘যা করে নরঘুবীর’ ভাবিয়া দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন৷ শুধু ইহাই নহে, কনিষ্ঠ ভ্রাতা গদাধরের শিক্ষাদি অগ্রসর হইতেছে কি না তদ্বিষয়েও উদাসীন রহিলেন৷ বালক গদাধর পাঠশালায় প্রতিদিন কোন না কোন সময় যাইলেও নরঘুবীরের সেবা–পূজায় এবং গৃহকর্মে সাহায্যদানপূর্বক মাতার পরিশ্রমের লাঘব করিয়া এখন হইতে তাহার অধিককাল অতিবাহিত হইতে লাগিল৷ ইহাতে পল্লিরমণিগণের তাহার সহিত মিলিত হইবার বিশেষ সুযোগ উপস্থিত হইল৷ কারণ গৃহকর্ম সমাপন করিয়া তাঁহাদিগের অনেকে অবসরকালে চন্দ্রাদেবীর নিকট উপস্থিত হইতেন এবং বালককে তথায় দেখিতে পাইয়া কখনও গান করিতে এবং কখনও ধর্মোপাখ্যান সকল পাঠ করিতে অনুরোধ করিতেন৷ ঐরূপে তাঁহাদিগের নিকটে কিছুক্ষণ পাঠ ও সঙ্গীত করা গদাধরের নিত্যকর্মের মধ্যে অন্যতম হইয়া উঠিল৷ বালকের জ্বলন্ত দেবভক্তি, তন্ময় হইয়া পুরাণপাঠ, মধুর কণ্ঠে সঙ্গীত এবং তাঁহাদিগের প্রতি আত্মীয়ের ন্যায় সরল উদার আচরণ যে তাঁহাদিগের কোমল হূদয়ে অপূর্ব ভক্তি ভালবাসার উদয় করিবে ইহা বিচিত্র নহে৷
কিন্তু গদাধরের সহিত রমণীমণ্ডলীর এইরূপ সরল, অসঙ্কোচ, স্নেহপূর্ণ ব্যবহার এবং বালক গদাইয়ের স্বেচ্ছামত সকলের অন্তঃপুরে গমন সম্বন্ধে বণিক পল্লির দুর্গাদাস পাইন নামক এক ব্যক্তি আপত্তি করিতেন এবং গদাধরকে স্বয়ং শ্রদ্ধা ভক্তি করিলেও অন্দরের কঠোর অবরোধ প্রথা কাহারও জন্য কোন কালে শিথিল হইতে দিতেন না৷ দুর্গাদাস একদিন তাঁহার কোন আত্মীয়ের নিকটে অহঙ্কার করিয়া বলিতেছিলেন, তাঁহার অন্তঃপুরের কথা কেহ জানিতে সক্ষম নহে এবং তাঁহার বাটির রমণীগণকে কেহ কখনও অবলোকন করে নাই৷ এমন সময় গদাধর তথায় উপস্থিত হইয়া ঐ বিষয় শ্রবণপূর্বক বলিল, ‘‘অবরোধ প্রথা দ্বারা রমণীগণকে কখনও কি রক্ষা করা যায়? সৎশিক্ষা ও দেবভক্তি প্রভাবেই তাঁহারা সুরক্ষিতা হন ইচ্ছা করিলে আমি তোমার অন্দরের সকলকে দেখিতে ও সমস্ত কথা জানিতে পারি৷’’ দুর্গাদাস তাহাতে অধিকতর অহঙ্কৃত হইয়া বলিলেন, ‘‘কেমন জানিতে পার, জান দেখি?’’ গদাধরও তাহাতে ‘আচ্ছা দেখা যাইবে’ বলিয়া সেদিন চলিয়া আসিল৷ পরে একদিন অপরাহ্ণে বালক মোটা মলিন একখানি শাড়ি ও রূপার পঁইছা প্রভৃতি পরিয়া দরিদ্রা তন্তুবায় রমণীর সাজে সজ্জিত হইয়া একটি চুবড়ি কক্ষে লইয়া ও অবগুণ্ঠনে মুখ আবৃত করিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে হাটের দিক হইতে দুর্গাদাসের ভবন সম্মুখে উপস্থিত হইল৷ দুর্গাদাস বন্ধুবর্গের সহিত বহির্বাটিতে বসিয়া বিশ্রম্ভালাপ করিতেছিলেন৷ রমণীবেশধারী গদাধর তাঁহাকে তন্তুবায় রমণী গ্রামান্তর হইতে হাটে সূতা বেচিতে আসিয়া সঙ্গিনীগণ ফেলিয়া যাওয়ায় বিপন্ন বলিয়া নিজ পরিচয় প্রদান করিল এবং রাত্রির জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করিল৷ দুর্গাদাসও রমণীর বিপদের কথা জানিয়া তাহাকে অন্দরে পাঠাইয়া দিলেন৷ অন্তঃপুরের মহিলাবৃন্দ এই অসহায় রমণীকে দেখিয়া করুণায় বিগলিত হইলেন এবং তাহার বিশ্রামের স্থান নিরূপণ করিয়া দিয়া জলযোগ করিবার জন্য মুড়িমুড়কি প্রভৃতি প্রদান করিলেন৷ গদাধর তখন নির্দিষ্টস্থানে বসিয়া উহা ভক্ষণ করিতে করিতে অন্দর মহলের সকল ঘর ও প্রত্যেক রমণীর গতিবিধি, আচার ব্যবহার তন্ন তন্ন করিয়া লক্ষ্য করিতে ও তাহাদের বাক্যালাপ শ্রবণ করিতে লাগিল৷ ঐরূপে প্রায় এক প্রহর রাত্রি অতীত হইল৷ এদিকে এত রাত্রি হইলেও সে গৃহে ফিরিল না দেখিয়া চন্দ্রাদেবী রামেশ্বরকে তাহার অনুসন্ধানে প্রেরণ করিলেন৷ রামেশ্বর দুর্গাদাসের ভবনের নিকটে উপস্থিত হইয়া তাহার নাম ধরিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিলেন৷ তাঁহার স্বর শুনিতে পাইয়া গদাধর ‘‘দাদা যাচ্ছি গো’ বলিয়া উত্তর দিয়া দ্রুতপদে তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল৷ দুর্গাদাস প্রথমে অপ্রতিভ ও কিছু রুষ্ট হইলেও পরক্ষণেই বালকের দরিদ্রা তন্তুবায় রমণীর বেশ ও চালচলনের অনুকরণ কতদূর স্বাভাবিক হইয়াছে ভাবিয়া হাসিতে লাগিলেন৷ এখন হইতে সীতানাথের ভবনে বালক উপস্থিত হইলে দুর্গাদাসের অন্তঃপুর–চারিণীরাও তাহার নিকট বিনা বাধায় আসিতে লাগিলেন৷
চতুর্দশ বর্ষে পদার্পণ করিবার পর হইতে বালকের ভক্তি ও ভাবুকতা এত অধিক প্রবৃদ্ধ হইয়া উঠিল যে পাঠশালার অর্থকরী শিক্ষা তাহার পক্ষে এককালে নিষ্প্রয়োজন বলিয়া বোধ হইতে লাগিল৷ সে যেন এখন হইতেই অনুভব করিল তাহার জীবন অন্য কার্যের জন্য সৃষ্ট হইয়াছে এবং ধর্মসাক্ষাৎকার করিতে তাহাকে তাহার সর্বশক্তি নিয়োজিত করিতে হইবে৷ নিজ জীবন ভবিষ্যতে কিভাবে পরিচালিত করিতে হইবে একথা তাহার মনে যখনই উদিত হইত তাহার বিচারশীল বুদ্ধি তাহাকে তখনই ঈশ্বরের প্রতি একান্ত–নির্ভরের দিকে ইঙ্গিত করিয়া তাহার কল্পনাপটে গৈরিক বসন, পবিত্র অগ্ণি, ভিক্ষালব্ধ ভোজন এবং নিঃসঙ্গ বিচরণের ছবি উজ্জ্বলবর্ণে অঙ্কিত করিত৷
এই সময়ের একটি ঘটনায় বালক অর্থকরী বিদ্যাভ্যাস পরিত্যাগ করিবার সুযোগলাভ করিয়াছিল৷ গদাধরের অভিনয় করিবার শক্তি দেখিয়া তাহার কয়েকজন বয়স্য এখন একটি যাত্রার দল খুলিবার প্রস্তাব উত্থাপন করিল৷ গদাধরও ঐ বিষয়ে সম্মত হইল৷ গদাধরের শিক্ষায় বালকগণ স্বল্প সময়ের ভিতরেই আপন আপন ভূমিকা ও গানসকল কণ্ঠস্থ করিয়া লইয়া শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ক যাত্রাভিনয়ে মানিকরাজার আম্রকানন মুখরিত করিয়া তুলিল৷ শুনা যায়, এই আম্রকাননে অভিনয়কালেও গদাধরের সময়ে সময়ে ভাবসমাধি উপস্থিত হইয়াছিল৷ এইভাবে সঙ্কীর্তন ও যাত্রাভিনয়ে গদাধরের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হওয়ায় বালক পাঠশালা যাওয়া একেবারে বন্ধ করিয়া দিল এবং চন্দ্রাদেবীকে গৃহকার্যে সাহায্য করিয়া কাল কাটাইতে লাগিল৷ ঐরূপে তিন বৎসরের অধিকাল অতীত হইয়া গদাধর ক্রমে সপ্তদশ বর্ষে পদার্পণ করিল৷ তিন বৎসরের পরিশ্রমে রামকুমারের কলকাতার চতুষ্পাঠীতে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া তাঁহার উপার্জনের পূর্বাপেক্ষা সুবিধা হইয়াছিল৷ রামকুমার গদাধরের বিদ্যার্জনে উদাসীনতা লক্ষ্য করিয়া মাতা ও মধ্যমভ্রাতা রামেশ্বরের সহিত পরামর্শ করিয়া তাহাকে কলকাতায় নিজ সমীপে রাখাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া নিরূপণ করিলেন৷ গদাধরের নিকট ঐ প্রস্তাব উপস্থিত হইলে পিতৃতুল্য অগ্রজকে সাহায্য করিতে হইবে জানিয়া সে কলকাতা গমনে কিছুমাত্র আপত্তি করিল না৷ অনন্তর শুভদিনে শুভক্ষণে রামকুমার ও গদাধর নরঘুবীরকে প্রমাণপূর্বক চন্দ্রাদেবীর পদধূলি মস্তকে ধারণ করিয়া কলকাতায় যাত্রা করিলেন৷
গদাধর কলকাতায় আসিয়া নিজ মনোমতো পূজাদি কার্য পাইয়া উহা সানন্দে সমাপন করিয়া অগ্রজের সেবা ও তাঁহার নিকটে কিছু কিছু পাঠাভ্যাস করিতে লাগিলেন৷ অশেষগুণসম্পন্ন প্রিয়দর্শন বালক অল্পকালেই যজমান পরিবারবর্গের সকলের প্রিয় হইয়া উঠিলেন৷ কামারপুকুরের ন্যায় এখানেও ঐসকল সম্ভ্রান্ত পরিবারের রমণীগণ তাঁহার কর্মদক্ষতা, সরল ব্যবহার, মিষ্টালাপ এবং দেবভক্তি দর্শনে তাঁহার নিকট নিঃসঙ্কোচে আগমন করিতেন এবং তাঁহার মধুর কণ্ঠে ভজন শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিতেন৷ বালকও অবসর পাইলেই ঐসকল স্ত্রীপুরুষদিগের সহিত মিলিত হইয়া আনন্দে দিন কাটাইতেন৷ সুতরাং এখানে আসিয়াও বালকের বিদ্যাশিক্ষার বড় একটা উন্নতি হইল না৷ পরিশেষে কর্তব্যজ্ঞানের প্রেরণায় রামকুমার একদিন বালককে পাঠে মনোযোগী হইবার জন্য মৃদু তিরস্কার করিলেন৷ অগ্রজের তিরস্কার ও অনুযোগের উত্তরে বালক দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর করিল, ‘‘চালকলা–বাঁধা বিদ্যা আমি শিখিতে চাহি না আমি এমন বিদ্যা শিখিতে চাহি যাহাতে জ্ঞানের উদয় হইয়া মানুষ বাস্তবিক কৃতার্থ হয়৷’’ রামকুমার বালকের ঐসকল কথা সেদিন বুঝিলেন না৷ ভাবিলেন, মাতাপিতার বহু আদরের বালক জীবনে এই প্রথম তিরস্কৃত হইয়া অভিমান বা বিরক্তিতে এইরূপ উত্তর প্রদান করিতেছে৷ ভগবানে নির্ভরশীল রামকুমার নিরুপায় হইয়া পূর্বোক্ত চিন্তা হইতে মনকে ফিরাইয়া যাহা এতকাল করিয়া আসিতেছেন তাহাই ভগ্ণহূদয়ে করিয়া যাইতে লাগিলেন৷ এই সময়ে এক অচিন্তনীয় ঘটনা উজ্জ্বল আলোক–রেখার মতো তাঁহাকে পথ দেখাইয়া নিশ্চিন্ত করিয়া তুলিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বালক গদাধরের আধ্যাত্মিক জীবন বিকাশের পথও সহসা উন্মুক্ত করিয়া দিল৷ আমরা এখন সেই ঘটনার অনুসরণ করিব৷
কলকাতার দক্ষিণাংশে জানবাজার নামক পল্লিতে মাহিষ্যকুলসম্ভূতা প্রথিতকীর্তি রানী রাসমণির নিবাস ছিল৷ ক্রমশ চারিটি কন্যার জননী হইয়া রানী চুয়াল্লিশ বৎসর বয়সে বিধবা হইয়াছিলেন এবং তদবধি স্বামী নরাজচন্দ্র দাসের প্রভূত সম্পত্তির তত্ত্বাবধানে স্বয়ং নিযুক্তা থাকিয়া উহার সমধিক শ্রীবৃদ্ধিসাধনপূর্বক্ তিনি স্বল্পকালমধ্যেই কলকাতাবাসিবৃন্দের নিকট সুপরিচিতা হইয়া উঠিয়াছিলেন৷ কেবলমাত্র বিষয়কর্ম পরিচালনায় দক্ষতা দেখাইয়া তিনি যশস্বিনী হন নাই কিন্তু তাঁহার ঈশ্বরবিশ্বাস, ওজস্বিতা এবং দরিদ্রদিগের প্রতি নিরন্তর সহানুভূতি তাঁহার অজস্র দান, অকাতর অন্নব্যয় প্রভৃতি অনুষ্ঠানসমূহ তাঁহাকে সকলের বিশেষ প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল৷ একটিমাত্র পুত্র রাখিয়া রানীর তৃতীয় কন্যার মৃত্যু হওয়ায় প্রিয়দর্শন বিচক্ষণ বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন তৃতীয় জামাতা শ্রীযুক্ত মথুরানাথ বিশ্বাসের সহিত রানী তাঁহার চতুর্থা কন্যা শ্রীমতী জগদম্বা দাসীর বিবাহ সম্পন্ন করেন এবং তাঁহার উপর অধিকতর ভার অর্পণ করিয়া স্বয়ং বিষয়কর্ম হইতে ধীরে ধীরে অপসৃত হইতে লাগিলেন ও জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব অনুভব করিয়া পূজা ধ্যানে অধিকসময় অতিবাহিত করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন৷
অশেষগুণশালিনী রানী রাসমণির শ্রীশ্রীকালিকাদেবীর পাদপদ্মে চিরকাল বিশেষ ভক্তি ছিল৷ নকাশীধামে গমনপূর্বক শ্রীশ্রীবিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণামাতাকে দর্শন ও ষোড়শোপচারে পূজা করিবার বাসনা তাঁহার হূদয়ে বহুকাল হইতে বলবতী ছিল৷ কিন্তু যাত্রা করিবার অব্যবহিত পূর্ব রাত্রে তিনি স্বপ্ণে নদেবীর দর্শনলাভ এবং প্রত্যাদেশ পাইলেন–‘কাশী যাইবার আবশ্যক নাই, ভাগীরথীতীরে মনোরম প্রদেশে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়া পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা কর, আমি মূর্ত্যাশ্রয়ে আবির্ভূত হইয়া তোমার নিকট হইতে নিত্য পূজা গ্রহণ করিব৷’ ভক্তিপরায়ণা রানী ঐরূপ আদেশলাভে বিশেষ পরিতৃপ্তা হইলেন এবং কাশীযাত্রা স্থগিত রাখিয়া সঞ্চিত ধনরাশি ঐ কার্যে নিয়োজিত করিতে সঙ্কল্প করিলেন৷ ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভাগীরথীর পূর্বতীরে দক্ষিণেশ্বর নামক স্থানে বিস্তীর্ণ ভূমিখণ্ড ক্রয় করিয়া রানী বহু অর্থব্যয়ে তদুপরি নবরত্নশোভিত সুবৃহৎ মন্দির ও তৎসংলগ্ণ উদ্যান নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিলেন৷ মন্দির ও দেবমূর্তি নির্মিত হইলে রানী মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যস্ত হইয়া দিন দেখাইতে লাগিলেন এবং ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে বৃহস্পতিবার (১২৬২ সালের ১৮ জ্যৈষ্ঠ) স্নানযাত্রা দিবসে মন্দিরে দেবী প্রতিষ্ঠার
দিন ধার্য করিলেন৷ কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁহার অভীষ্ট কার্যে এক বিঘ্ণ উপস্থিত হইল৷ দেবীকে অন্নভোগ প্রদান করিবার পথে প্রধান অন্তরায় তাঁহার জাতি ও সামাজিক প্রথা৷ তিনি অন্নভোগ প্রদানের নিমিত্ত নানাস্থান হইতে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদিগের ব্যবস্থাসকল আনাইতে লাগিলেন–কিন্তু তাঁহারা কেহই তাঁহাকে ঐ বিষয়ে উৎসাহিত করিলেন না৷ পণ্ডিতগণের নিকট বারংবার প্রত্যাখ্যাতা হইয়া তাঁহার আশা যখন ঐ বিষয়ে প্রায় নির্মূলিত হইয়াছিল, তখন ঝামাপুকরের চতুষ্পাঠী হইতে একদিবস ব্যবস্থা আসিল–প্রতিষ্ঠার পূর্বে রানী যদি উক্ত সম্পত্তি কোন ব্রাহ্মণকে দান করেন এবং সেই ব্রাহ্মণ ঐ মন্দিরে দেবীপ্রতিষ্ঠা করিয়া অন্নভোগের ব্যবস্থা করেন তাহা হইলে শাস্ত্রনিয়ম যথাযথ রক্ষিত হইবে এবং উচ্চবর্ণ উক্ত দেবালয়ে প্রসাদ গ্রহণ করিলেও দোষভাগী হইবেন না৷ ঐরূপ ব্যবস্থা পাইয়া রানীর হূদয়ে আশা আবার মুকুলিত হইয়া উঠিল৷ বুদ্ধিমতী রানী দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার টাকার দেবত্র সম্পত্তিসহ দেবালয় গুরুবংশীয়গণকে দান করিয়া বংশানুক্রমে দেবসেবার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র হইয়া রহিলেন৷ কিন্তু যজন–যাজনক্ষম সদাচারী কোন ব্রাহ্মণই রানীর দেবালয়ে পূজক পদে ব্রতী হইতে সহসা স্বীকৃত হইলেন না৷ উপায়বিহীনা রানী তখন পুনরায় ঝামাপুকুর টোলে পত্র প্রেরণ করিয়া শ্রীযুক্ত রামকুমারের শরণাপন্ন হইলেন৷ উদারহূদয় দেবীভক্ত রামকুমার নিঃসঙ্কোচে মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠাকার্যে সকল ভার স্বয়ং গ্রহণ করিলেন এবং সিহড়গ্রাম নিবাসী শ্রীযুক্ত ক্ষেত্রনাথ চট্টোপাধ্যায় শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দজীর্ পূজকপদে মনোনীত হইলেন৷
নির্দিষ্ট দিনে মহাসমারোহে মন্দির ও দেবী প্রতিষ্ঠা সুসম্পন্ন হইল৷ শুনা যায়, ‘দীয়তাং ভুজ্যতাং’ শব্দে সেদিন ঐ স্থান দিবারাত্র সমভাবে কোলাহলপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল এবং রানী অকাতরে অজস্র অর্থ ব্যয় করিয়া অতিথি অভ্যাগত সকলকে আনন্দিত করিয়া তুলিতে চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই৷ সুদূর কান্যকুব্জ, বারাণসী, শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম, উড়িষ্যা এবং নবদ্বীপ প্রভৃতি পণ্ডিতপ্রধান স্থানসমূহ হইতে বহু অধ্যাপক ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ ঐ উপলক্ষে সমাগত হইয়া ঐদিনে প্রত্যেকে রেশমিবস্ত্র, উত্তরীয় ও বিদায়রূপে এক একটি স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন৷ এই দেবালয় নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে রানী নয় লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিয়াছিলেন৷ অবশেষে রামকুমারই শ্রীশ্রীভবতারিণীর পূজকের পদে স্থায়ীভাবে নিযুক্ত হইলেন এবং গদাধরও সানন্দচিত্তে উদ্যান সমন্বিত এই মনোরম দেবালয়ে আসিয়া অগ্রজের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণ জীবনে এক নূতন অধ্যায়ের সূত্রপাত হইল৷
মন্দির–প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহ পরে ঠাকুরের সৌম্যদর্শন, কোমল প্রকৃতি, ধর্মনিষ্ঠা ও অল্পবয়স রানী রাসমণির জামাতা শ্রীযুক্ত মথুরবাবুর নয়নাকর্ষণ করিল৷ তিনি তাঁহাকে দেবীর বেশকারীর কার্যে নিযুক্ত করিবার সঙ্কল্প মনে মনে স্থির করিয়া শ্রীযুক্ত রামকুমারের নিকট ঐ বিষয়ক প্রস্তাব উত্থাপন করেন৷ রামকুমার তাহাতে ভ্রাতার মানসিক অবস্থার কথা আনুপূর্বিক নিবেদন করিয়া তাঁহাকে ঐ বিষয়ে নিরুৎসাহ করিলেন৷ কিন্তু মথুর সহজে নিরস্ত হইবার পাত্র ছিলেন না৷ ঐ সময় ঠাকুরের পিতৃস্বস্রীয়া ভগিনী শ্রীমতী হেমাঙ্গিনী দেবীর পুত্র শ্রীহূদয়রাম মুখোপাধ্যায় কর্মের অনুসন্ধানে দক্ষিণেশ্বর আসিয়া উপস্থিত হয় এবং বাল্যকাল হইতে সুপরিচিত, প্রায় সমবয়স্ক মাতুল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সহিত মিলিত হইয়া তথায় আনন্দে কালযাপন করিতে থাকে৷ হূদয়ের দক্ষিণেশ্বরে আসিবার কালে ঠাকুর বিংশতি বর্ষে কয়েকমাস মাত্র পদার্পণ করিয়াছিলেন৷ সহচররূপে তাহাকে পাইয়া তাঁহার দক্ষিণেশ্বরে বাস যে এখন হইতে অনেকটা সহজ হইয়াছিল, তাহা বলাই বাহুল্য৷ চিরকাল বালস্বভাবাপন্ন শ্রীরামকৃষ্ণদেবের, সাধারণ নয়নে নিষ্কারণ চেষ্টাসকলের প্রতিবাদ না করিয়া সর্বদা অন্তঃকরণে অনুমোদন ও সহানুভূতি করায়, হূদয় এখন হইতে তাঁহার বিশেষ প্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল৷
এই সময় একদিন মূর্তিগঠন করিয়া ঠাকুরের শিবপূজা করিতে ইচ্ছা হয়৷ তিনি গঙ্গাগর্ভ হইতে মৃত্তিকা আহরণ করিয়া বৃষ, ডমরু ও ত্রিশূল সহিত একটি শিবমূর্তি স্বহস্তে গঠন করিয়া উহার পূজা করিতে লাগিলেন৷ মথুরবাবু ঐ সময় ইতস্তত বেড়াইতে বেড়াইতে মূর্তিটি দেখিয়া বিস্মিত হইলেন এবং কৌতূহল পরবশ হইয়া তিনি হূদয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘এ মূর্তি কোথায় পাইলে, কে গড়িয়াছে?’’ হূদয়ের উত্তরে ঠাকুরই উহা স্বহস্তে গড়িয়াছেন জানিতে পারিয়া তিনি চমৎকৃত হইলেন এবং পূজান্তে মূর্তিটি তাঁহাকে দিবার জন্য অনুরোধ করিলেন৷ মূর্তিটি হস্তে পাইয়া মথুর স্বয়ং মুগ্ধ হইয়া রানীকে উহা দেখাইতে পাঠাইলেন৷ ঠাকুর উহা গড়িয়াছেন জানিয়া মথুরের ন্যায় রানীও বিস্ময় প্রকাশ করিলেন৷ ঠাকুরের এই নূতন গুণপনার পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে দেবালয়ের কার্যে নিযুক্ত করিতে মথুরের যে ইচ্ছা হইয়াছিল তাহা অধিকতর বলবতী হইল৷
অগ্রজের নিকট হইতে মথুরবাবুর অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া ঠাকুর যতটা পারেন তাঁহার চক্ষুর অন্তরালে থাকিবার চেষ্টা করিতেন৷ একদিন মথুরবাবু কালীমন্দিরে দর্শনাদি করিতে আসিয়া কিছু দূরে ঠাকুরকে দেখিতে পাইয়া তাঁহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন৷ ঠাকুর মথুরের নিকট যাইতে ইতস্তত করিতেছেন দেখিয়া হূদয় কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, ‘‘যাইলেই আমাকে এখানে থাকিতে বলিবে, চাকুরি স্বীকার করিতে বলিবে৷’’ হূদয় বলিল, ‘‘তাহাতে দোষ কি? এমন স্থানে, মহতের আশ্রয়ে কার্যে নিযুক্ত হওয়া তো ভাল বই মন্দ নয়, তবে কেন ইতস্তত করিতেছ?’’ তদুত্তরে ঠাকুর বলিলেন, ‘‘আমার চাকুরিতে চিরকাল আবদ্ধ হইয়া থাকিতে ইচ্ছা নাই৷ বিশেষত এখানে পূজা করিতে স্বীকার করিলে দেবীর অঙ্গে যে সমস্ত অলঙ্কারাদি আছে তাহার জন্য দায়ী থাকিতে হইবে, সে বড় হাঙ্গামার কথা আমার দ্বারা উহা সম্ভব হইবে না, তবে যদি তুমি ঐ কার্যের ভার লইয়া এখানে থাক তাহা হইলে আমার পূজা করিতে আপত্তি নাই৷’’ হূদয় এখানে চাকুরির অন্বেষণেই আসিয়াছিল৷ সুতরাং ঠাকুরের ঐ কথায় আনন্দে স্বীকৃত হইল৷ ঠাকুর তখন মথুরবাবুর নিকট উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার দ্বারা দেবালয়ে কর্ম স্বীকার করিতে অনুরুদ্ধ হইয়া পূর্বোক্ত অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন৷ মথুর ঐ দিন হইতেই তাঁহাকে কালীমন্দিরে বেশকারীর পদে এবং হূদয়কে রামকুমার ও ঠাকুরকে সাহায্য করিতে নিযুক্ত করিলেন৷ মথুরবাবুর অনুরোধে ভ্রাতাকে ঐরূপ কার্যে নিযুক্ত হইতে দেখিয়া রামকুমার নিশ্চিন্ত হইলেন৷
সন ১২৬২ সালের ভাদ্র মাস উপস্থিত৷ আজ নন্দোৎসব৷ মধ্যাহ্ণে নরাধাগোবিন্দজীর বিশেষ পূজা ও ভোগরাগাদি হইয়া গেলে পূজক ক্ষেত্রনাথ চট্টোপাধ্যায় নরাধারানীকে কক্ষান্তরে শয়ন করাইয়া আসিয়া নগোবিন্দজীকে শয়ন করাইতে লইয়া যাইবার সময় সহসা পড়িয়া গেলেন বিগ্রহের একটি পদ ভাঙিয়া যাইল৷ বাবুদের নিকট সংবাদ পঁৌছিল৷ ভাঙা বিগ্রহে তো পূজা চলে না–এখন উপায়? রানী রাসমণি ও মথুরবাবু উপায় নির্ধারণের জন্য শহরের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের আহ্বান করিয়া সভা করিলেন৷ পণ্ডিতেরা পাঁজি–পুঁথি খুলিয়া বিধান দিলেন–‘ভগ্ণ মূর্তিটি গঙ্গার জলে ফেলিয়া দেওয়া হউক এবং তৎস্থলে অন্য নূতন মূর্তি স্থাপিত হউক৷’ সভাভঙ্গকালে মথুরবাবু রানীমাতার সঙ্গে পরামর্শ করিয়া ঠাকুরকে ঐ বিষয়ে মতামত জিজ্ঞাসা করিলেন৷ ঠাকুর ভাবমুখে বলিতে লাগিলেন, ‘‘রানীর জামাইদের কেউ যদি পড়ে পা ভেঙে ফেলত, তবে কি তাকে ত্যাগ করে আর একজনকে তার জায়গায় এনে বসান হতো–না তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো? এখানেও সেইরকম করা হোক–মূর্তিটি জুড়ে যেমন পূজা হচ্ছে তেমনি পূজা করা হোক৷ ত্যাগ করতে হবে কিসের জন্য?’’ সকলে ব্যবস্থা শুনিয়া অবাক৷ অভিমানী পণ্ডিতবর্গের কাহারও কাহারও এই মীমাংসায় মতভেদ হইলেও যাঁহারা পাণ্ডিত্যের সহায়ে যথার্থ জ্ঞান–ভক্তি লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাঁহারা ঐ মীমাংসা শুনিয়া ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন৷ পরে ঠাকুর স্বহস্তে মূর্তিটি জুড়িয়া দিলেন ও তাঁহার পূজাদি পূর্ববৎ চলিতে লাগিল৷ ক্ষেত্রনাথ অসাবধানতার অপরাধে কর্মচ্যুত হইলেন এবং নরাধাগোবিন্দজীর পূজার ভার তদবধি ঠাকুরের উপর ন্যস্ত হইল৷ হূদয়ও এখন হইতে পূজাকালে শ্রীশ্রীকালীমাতার বেশ করিয়া রামকুমারকে সাহায্য করিতে লাগিল৷
ঠাকুরের পূজা একটা দেখিবার বিষয় ছিল৷ যে দেখিত সে–ই মুগ্ধ হইত৷ এইকালে গীত গাহিতে গাহিতে দুই চক্ষের জলে তাঁহার বক্ষ ভাসিয়া যাইত৷ পূজার সময় ঠাকুরের তেজঃপুঞ্জ শরীর ও তন্মনস্ক ভাব দেখিয়া অপর ব্রাহ্মণগণ বলাবলি করিতেন–সাক্ষাৎ ব্রহ্মণ্যদেব যেন নরশরীর পরিগ্রহ করিয়া পূজা করিতে বসিয়াছেন৷ ঠাকুর দশকর্মান্বিত ব্রাহ্মণগণের যাহা শিক্ষণীয় তাহা অচিরে শিখিয়া লইলেন এবং দীক্ষা না লইয়া দেবীপূজা প্রশস্ত নহে শুনিয়া কলকাতা নিবাসী প্রবীণ শক্তিসাধক শ্রীযুক্ত কেনারাম ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকট হইতে শক্তিমন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ করিলেন এবং রামকুমারের শরীর অপটু হওয়াতে এখন হইতে কালীঘরে ঠাকুরই পূজকরূপে নিযুক্ত থাকিলেন৷ রামকুমার স্বল্পায়াসসাধ্য নরাধাগোবিন্দজীর সেবা স্বয়ং সম্পন্ন করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু ইহার কিছুকাল পরে তিনি মধুরবাবুকে বলিয়া হূদয়কে নরাধাগোবিন্দজীর পূজায় নিযুক্ত করিলেন এবং কিছুদিনের জন্য স্বগৃহে ফিরিবার বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু রামকুমারকে আর গৃহে ফিরিতে হয় নাই৷ কার্যোপলক্ষে কলকাতার উত্তরে শ্যামনগর–মূলাজোড় নামক স্থানে গমন করিলে তিনি তথায় সহসা মৃত্যুমুখে পতিত হন৷ সম্ভবত সন ১২৬৩ সালের প্রারম্ভে (১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে) তাঁহার শরীর ত্যাগ হইয়াছিল৷
পিতৃতুল্য অগ্রজের সহসা মৃত্যু হওয়ায় ঠাকুর নিতান্ত ব্যথিত হইলেন৷ ঐ ঘটনা তাঁহার শুদ্ধমনে সংসারের অনিত্যতা সম্বন্ধীয় ধারণা দৃঢ় করিয়া বৈরাগ্যানল প্রজ্বলিত করিয়া দিল এবং এই সময় হইতে তিনি জগন্মাতার পূজায় সমধিক মনোনিবেশপূর্বক তাঁহার দর্শনলাভার্থে ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন৷ বৃথা বাক্যালাপ করিয়া তিনি এখন তিলমাত্র সময় অপব্যয় করিতেন না এবং রাত্রে মন্দির দ্বার রুদ্ধ হইলে লোকসঙ্গ পরিহারপূর্বক পঞ্চবটীর পার্শ্বস্থ জঙ্গলমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া জগন্মাতার ধ্যানে কালযাপন করিতেন৷ একদিন ঠাকুর বৃক্ষতলে যাইবার কিছুক্ষণ পরে হূদয় নিঃশব্দে তথায় প্রবেশ করিয়া দূর হইতে দেখিল, তিনি পরিধেয় বস্ত্র ও যজ্ঞসূত্র ত্যাগ করিয়া সুখাসীন হইয়া ধ্যানে নিমগ্ণ রহিয়াছেন দেখিয়া ভাবিল, ‘মামা কি পাগল হইল নাকি?’ পরে সহসা নিকটে উপস্থিত হইয়া মাতুলকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিল, ‘‘একি হচ্ছে? পৈতে কাপড় ফেলে দিয়ে উলঙ্গ হয়ে বসেছ যে?’’ কয়েকবার ডাকাকাকির পর ঠাকুরের চৈতন্য হইল এবং হূদয়কে নিকটে দাঁড়াইয়া ঐরূপ প্রশ্ণ করিতে শুনিয়া বলিলেন, ‘‘তুই কি জানিস? এইরূপ পাশমুক্ত হয়ে ধ্যান করতে হয় জন্মাবধি মানুষ ঘৃণা, লজ্জা, কুল, শীল, ভয়, মান, জাতি ও অভিমান এই অষ্টপাশে বদ্ধ হয়ে রয়েছে পৈতেগাছটাও ‘আমি ব্রাহ্মণ, সকলের চেয়ে বড়’–এই অভিমানের চিহ্ণ এবং একটা পাশ মাকে ডাকতে হলে ঐ সব পাশ ফেলে দিয়ে এক মনে ডাকতে হয়, তাই ঐ সব খুলে রেখেছি ধ্যান করা শেষ হলে ফিরবার সময় আবার পরব৷’’ হূদয় উত্তরে কিছু বলিতে না পারিয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল৷
এইভাবে ঠাকুরের ধ্যানের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল৷ তিনি কখনও কখনও ব্যাকুল হূদয়ে মার নিকট প্রার্থনা করিতেন, ‘‘মা, তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন তবে দেখা দিবি না? আমি ধন, জন, ভোগসুখ কিছুই চাহি না, আমায় দেখা দে’’ ভগবচ্চিন্তার প্রাবল্যে ও একাগ্রতায় ক্রমে ঠাকুরের আহার এবং নিদ্রা কমিয়া গেল এবং ধ্যান পূজাদির কাল ভিন্ন অন্য সময়ে তাঁহার শরীরে একটা অশান্তি ও চাঞ্চল্যের ভাব লক্ষিত হইতে লাগিল৷ একদিন অত্যধিক মানসিক যন্ত্রণায় অধীর হইয়া ঠাকুর ভাবিলেন, ‘‘তবে আর এ জীবনে আবশ্যক নাই৷’’ আত্মবলি দিবার উদ্দেশ্যে মন্দির গাত্রে লম্বমান অসি গ্রহণ করিবার জন্য ঠাকুর উন্মত্তের ন্যায় ছুটিলেন৷ সহসা জগন্মাতার অপূর্ব দর্শনলাভ করিয়া সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলেন৷ তিনি দেখিলেন–ঘর, দ্বার, মন্দির সব যেন কোথায় লুপ্ত হইল–কোথাও যেন আর কিছুই নাই এক অসীম অনন্ত চেতনজ্যোতি সমুদ্রের উজ্জ্বল ঊর্মিমালা চারিদিক হইতে তর্জন গর্জন করিয়া তাঁহাকে গ্রাস করিবার জন্য মহাবেগে অগ্রসর হইতেছে৷ দেখিতে দেখিতে উত্তাল তরঙ্গসমূহ তাঁহার উপর নিপতিত হইয়া তাঁহাকে এককালে কোথায় ডুবাইয়া দিল৷ হাবুডুবু খাইয়া তিনি সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলেন৷
এই দিব্য দর্শনের বিরাম হইলে শ্রীশ্রীজগদম্বার চিন্ময়ী মূর্তির অবাধ অবিরাম দর্শনলাভের জন্য ঠাকুরের প্রাণে একটা অবিশ্রান্ত আকুল ক্রন্দনের রোল জাগিয়া উঠিল৷ উহা কখনও কখনও এত বৃদ্ধি পাইত যে, আর চাপিতে না পারিয়া তিনি ভূমিতে লুটাইয়া যন্ত্রণায় ছটফট করিতেন এবং সময়ে সময়ে বাহ্যসংজ্ঞাশূন্য হইয়া মায়ের বরাভয়করা চিন্ময়ী মূর্তি দর্শন করিতেন–দেখিতেন, ঐ মূর্তি হাসিতেছে, কথা কহিতেছে, অশেষপ্রকারে সাত্ব্ন্না ও শিক্ষা দিতেছে৷ ঠাকুরের পূজাধ্যান্যাদি এই সময়ে এক অভিনব আকার ধারণ করিল৷ প্রবীণের গাম্ভীর্য, পুরুষকার অবলম্বনে দেশকালপাত্র ভেদে বিধি নিষেধ মানিয়া চলা অথবা ভবিষ্যৎ ভাবিয়া সকল দিক বজায় রাখিয়া ব্যবহার করা ইত্যাদির কিছুই উহাতে লক্ষিত হইত না৷ সর্বান্তঃকরণে শরণাগত বালকের ভাব আশ্রয়পূর্বক ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছার ভিতর আপনার ক্ষুদ্র ইচ্ছা ও অভিমানকে ডুবাইয়া দিয়া এককালে যন্ত্রস্বরূপ হইয়াই যেন তিনি যত কিছু কার্য এখন করিতেছেন৷ মাকে অন্নাদি নিবেদন করিয়া এখন দেখিতে পাইতেন মা শ্রীঙ্গের প্রভায় মন্দির আলো করিয়া সাক্ষাৎ খাইতে বসিয়াছেন৷ পূর্বে ধ্যান পূজাদিকালে দেখিতেন, সম্মুখস্থ পাষাণময়ী মূর্তিতে এক জীবন্ত জাগ্রত অধিষ্ঠান আবির্ভূত হইয়াছে–এখন মন্দিরে প্রবিষ্ট হইয়া পাষাণময়ীকে আর দেখিতেই পাইতেন না৷ দেখিতেন, যাঁহার চৈতন্যে সমগ্র জগৎ সচেতন হইয়া রহিয়াছে তিনিই চিদ্ঘন মূর্তি পরিগ্রহপূর্বক বরাভয়করসুশোভিতা হইয়া তথায় সর্বদা বিরাজিতা ঠাকুর বলিতেন, ‘‘নাসিকায় হাত দিয়া দেখিয়াছি, মা সত্য সত্যই নিঃশ্বাস ফেলিতেছেন৷ তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়াও রাত্রিকালে দীপালোকে মন্দিরে মায়ের দিব্যাঙ্গের ছায়া কখনও পতিত হইতে দেখি নাই৷ আপন কক্ষে বলিয়া শুনিয়াছি, মা পাঁইজর পরিয়া বালিকার মতো আনন্দিতা হইয়া ঝমঝম শব্দ করিতে করিতে মন্দিরের উপর তলায় উঠিতেছেন৷ দ্রুতপদে কক্ষের বাহিরে আসিয়া দেখিতেছি, সত্য সত্যই মা মন্দিরে দ্বিতলের বারাণ্ডায় আলুলায়িত কেশে দাঁড়াইয়া কখনও কলকাতা এবং কখনও গঙ্গা দর্শন করিতেছেন৷’’
হূদয় বলিত, ‘‘ঠাকুর যখন শ্রীমন্দিরে থাকিতেন তখন তো কথাই নাই, অন্য সময়েও এখন কালীঘরে প্রবিষ্ট হইলে এক অনির্বচনীয় দিব্যাবেশ
অনুভূত হইয়া গা ‘ছমছম’ করিত৷ পূজাকালে দেখিতাম, জবাবিল্বার্ঘ সাজাইয়া মামা প্রথমত উহা দ্বারা নিজ মস্তক, বক্ষ, সর্বাঙ্গ, এমন–কি নিজ পদ পর্যন্ত স্পর্শ করিয়া পরে উহা জগদম্বার পাদপদ্মে অর্পণ করিলেন, কখনও সিংহাসনের উপর উঠিয়া সস্নেহে জগদম্বার চিবুক ধরিয়া আদর, গান, পরিহাস বা কথোপকথন করিতে লাগিলেন, অথবা শ্রীমূর্তির হাত ধরিয়া নৃত্য করিতেই আরম্ভ করিলেন৷ একদিন দেখি ভোগ নিবেদন করিবার সময় একটা বিড়ালকে কালীঘরে ঢুকিয়া ম্যাও ম্যাও করিয়া ডাকিতে দেখিয়া মামা ‘খাবি মা’ ‘খাবি মা’ বলিয়া ভোগের অন্ন তাহাকেই খাওয়াইতে লাগিলেন৷’’ ঠাকুরকে ঐরূপ করিতে দেখিয়া মনে আশঙ্কা হইলেও অপরের নিকট প্রকাশ করিয়া কি করা কর্তব্য তদ্বিষয়ে পরামর্শ লইবার তাহার উপায় ছিল না৷ কিন্তু প্রতিদিন যখন ঐরূপ হইতে লাগিল তখন ঐ কথা আর কেমনে চাপা যাইবে? অন্য কেহ কেহ তাহার ন্যায় পূজাকালে কালীঘরে আসিয়া ঠাকুরের ঐরূপ আচরণ স্বচক্ষে দেখিয়া যাইয়া খাজাঞ্চিপ্রমুখ কর্মচারীদিগের নিকট অভিযোগ উপস্থিত করিল৷ তাহারাও স্বচক্ষে উহা প্রত্যক্ষ করিয়া স্থির করিল–হয় ভট্টাচার্য পাগল হইয়াছেন, না হয় তো তাঁহাতে উপদেবতার আবেশ হইয়াছে৷ বাবুদের এ বিষয়ে সংবাদ প্রেরণ কর্তব্য৷ যথাসময়ে মথুরবাবুর নিকট সংবাদ প্রেরিত হইল৷ মথুরবাবু কাহাকেও কিছু না জানাইয়া একদিন পূজাকালে সহসা আসিয়া কালীঘরে প্রবিষ্ট হইলেন এবং অনেকক্ষণ ধরিয়া ঠাকুরের কার্যকলাপ দেখিতে লাগিলেন৷ পূজা করিতে করিতে ভট্টাচার্যের কখনও গলদশ্রুধারা, কখনও অকপট উদ্দাম উল্লাস এবং কখনও বা জড়ের ন্যায় সংজ্ঞাশূন্যতা, অবিচলিতা ও বাহ্যবিষয়ে সম্পূর্ণ লক্ষ্যরাহিত্য দেখিয়া তাঁহার চিত্ত একটা অপূর্ব আনন্দে পূর্ণ হইল৷ তিনি অনুভব করিতে লাগিলেন, শ্রীমন্দির দেবপ্রকাশে যথার্থই জমজম করিতেছে৷ তাঁহার স্থির বিশ্বাস হইল, ভট্টাচার্য জগন্মাতার কৃপালাভে ধন্য হইয়াছেন৷ এতদিন পর সত্য সত্যই মা এখানে আবির্ভূতা হইয়াছেন এবং মার পূজা ঠিক ঠিক সম্পন্ন হইয়াছে৷ কর্মচারীদিগের কাহাকেও কিছু না বলিয়া মথুর সেদিন বাটিতে ফিরিলেন৷ পরদিন মন্দিবের প্রধান কর্মচারীর উপর তাঁহার আদেশ আসিল, ‘‘ভট্টাচার্য মহাশয় যেভাবেই পূজা করুন না কেন, তাঁহাকে বাধা দিবে না৷’’ আদেশ শুনিয়া কর্মচারিবৃন্দ নিষ্ফ ল আক্রোশে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতে লাগিল এবং পাগলকে সমুচিত শিক্ষা দিবার সুযোগ অন্বেষণ করিতে লাগিল৷ ঠাকুরের ঐরূপ অদ্ভুত পূজা দেখিয়া জানবাজারে ফিরিয়া মথুরামোহন উহা রানীমাতাকে শুনাইলেন৷ ভক্তিমতী রানী উহা শুনিয়া বিশেষ পুলকিতা হইলেন৷
আজ রানী রাসমণি স্বয়ং ঠাকুরবাড়িতে আসিয়াছেন৷ কর্মচারীরা সকলে শশব্যস্ত৷ তখন নকালীর পূজা ও বেশ হইয়া গিয়াছে৷ জগন্মাতাকে প্রণাম করিয়া রানী মন্দির মধ্যে শ্রীমূর্তির নিকট আসনে আহ্ণিক পূজা করিতে বসিলেন এবং ঠাকুরকে নিকটে দেখিয়া মা–র নাম গান করিতে অনুরোধ করিলেন৷ ঠাকুরও রানীর নিকটে বসিয়া ভাবে বিভোর হইয়া রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত প্রভৃতি সাধকদিগের পদাবলি গাইতে লাগিলেন রানী পূজাজপাদি করিতে করিতে ঐ সকল শুনিতে লাগিলেন৷ কিছুক্ষণ এইভাবে কাটিলে ঠাকুর হঠাৎ গান থামাইয়া বিরক্ত হইয়া উগ্রভাবে রুক্ষস্বরে বলিয়া উঠিলেন, ‘‘কেবল ঐ ভাবনা, এখানেও ঐ চিন্তা?’’–বলিয়াই রানীর কোমল অঙ্গে করতল দ্বারা আঘাত করিলেন৷ মন্দিরের কর্মচারী ও রানীর পরিচারিকারা সকলে হইচই করিয়া উঠিল৷ দ্বারপাল শশব্যস্তে ঠাকুরকে ধরিতে ছুটিল৷ কিন্তু ঠাকুর ও রানী রাসমণি–উভয়েই এখন স্থির, গম্ভীর৷ ঠাকুরের মুখে মৃদু মৃদু হাসি৷ শ্রীশ্রীজগদম্বার ধ্যান না করিয়া আজ কেবলই একটি বিশেষ মকদ্দমার ফলাফলের বিষয় চিন্তা করিতেছিলেন–রানী রাসমণি নিজের অন্তর পরীক্ষা দ্বারা উহা দেখিতে পাইয়া ঈষৎ অপ্রতিভ ও অনুতপ্ত৷ আবার ঠাকুর ঐ কথা কি করিয়া জানিতে পারিলেন ভাবিয়া রানীর বিস্ময়েরও অবধি রহিল না৷ নিরপরাধ ঠাকুরের প্রতি এই ঘটনায় হীনবুদ্ধি লোকদিগের বিশেষ অত্যাচার হইবার সম্ভাবনা বুঝিয়া সকলকে গম্ভীরভাবে আজ্ঞা করিলেন, ‘‘ভট্টাচার্য মহাশয়ের কোন দোষ নাই৷ তোমরা উহাকে কেহ কিছু বলিও না৷’’ রানীর রোষকষায়িত নেত্র দেখিয়া সকলে ত্রস্তপদে সেখান হইতে সরিয়া পড়িল৷
শ্রীশ্রীজগন্মাতাকে লইয়া ঠাকুরের ভাবাবেশ ও আনন্দোল্লাস উহার অল্পদিন পরে এত বর্ধিত হইয়া উঠিল যে, দেবীসেবার নিত্যনৈমিত্তিক কার্যকলাপ কোনরূপে নির্বাহ করাও তাঁহার পক্ষে অসম্ভব হইল৷ পূজা ও সেবার কালাকাল বিচার তাঁহার এখন লোপ পাইল৷ তিনি এখন শ্রীশ্রীজগন্মাতার যখন যেরূপে সেবা করিবার ইচ্ছা হইত তখন সেইরূপই করিতেন৷ ঠাকুরের ঐরূপ অবস্থালাভের পূর্ব পর্যন্ত মথুরবাবু তাঁহার দ্বারা পূজাকার্য কোনরূপে চালাইয়া লইতেছিলেন৷ কিন্তু এখন আর তদ্রূপ করা অসম্ভব বুঝিয়া পূজাকার্যের অন্যরূপ বন্দোবস্ত করিলেন ৷ রানী রাসমণির অঙ্গে আঘাত করিয়া ঠাকুর যেদিন তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছিলেন, সেই দিন হইতে মথুর সন্দিগ্ধ হইয়া তাঁহার বায়ুরোগ হইয়াছে বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন এবং এই সময় কলকাতার সুপ্রসিদ্ধ কবিরাজ শ্রীযুক্ত গঙ্গাপ্রসাদ সেনের দ্বারা তাঁহার চিকিৎসার ব্যবস্থাও করিয়া দিয়াছিলেন৷ ঐরূপে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াই মথুর ক্ষান্ত হন নাই৷ কিন্তু নিজ মনকে সুসংযত রাখিয়া যাহাতে ঠাকুর সাধনায় অগ্রসর হন, তর্কযুক্তিসহায়ে তাঁহাকে তদ্বিষয় বুঝাইতে তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন৷
পাশ্চাত্যশিক্ষাভিমানী তার্কিক মথুর কিভাবে ঠাকুরের সংস্পর্শে আসিয়া তাঁহার অলৌকিক ত্যাগ, প্রেম ও ঐশীশক্তি প্রভাবে মুগ্ধ হইয়া তাঁহার রাতুল চরণে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন এস্থলে তাহারই কিঞ্চিৎ আভাস দিতে চেষ্টা করিব৷ ঠাকুরের ব্যাকুল অনুরাগ ও আচরণাদি প্রথম প্রথম মথুরের নয়নে ভক্তির আতিশয্য বলিয়া বোধ হইত এবং ঠাকুরের জীবনে দিন দিন ঐ সকলের যতই বৃদ্ধি হইতে লাগিল, অমনি মথুরানাথের মনে সন্দেহের উদয় হইত–‘ইঁহার তো বুদ্ধিভ্রংশ হইতেছে না?’ কিন্তু এ সন্দেহে তাঁহার মনে দয়া ভাবেরই উদয় হইত এবং সুচিকিৎসকের সহায়ে ঠাকুরের শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হইয়া যাহাতে ঐ সকল মানসিক বিকার প্রশমিত হয়, মথুর সেই বিষয়েই মনোনিবেশ করিতেন৷
একদিন শিবমন্দিরে ঠাকুর ভক্তিভরে শিবমহিম্নঃ স্তোত্র পাঠ করিতে ছিলেন ঃ
‘‘অসিতগিরিসমং স্যাৎ কজ্জলং সিন্ধুপাত্রে
সুরতরুবরশাখা লেখনী পত্রমূর্বী৷
লিখতি যদি গৃহীত্বা সারদা সর্বকালং
তদপি তব গুণানামীশ পারং ন যাতি ’’
–হে মহাদেব, সমুদ্রগভীর পাত্রে নীলগিরি সদৃশ পুঞ্জ পুঞ্জ কালি রাখিয়া কল্পতরুশাখাসম লেখনী ও পৃথিবীপৃষ্ঠতুল্য বিস্তৃত কাগজ লইয়া, স্বয়ং
বাগ্দেবী সরস্বতী যদি তোমার অনন্ত মহিমার কথা লিখিয়া শেষ করিবার প্রয়াস পান, তাহা হইলেও তিনি কখনও তাহা করিতে সমর্থ হন না৷ শ্লোকটি পড়িতে পড়িতে ঠাকুর কৈলাসপতি শিবের মহিমা হূদয়ে জ্বলন্ত অনুভব করিয়া একেবারে বিহ্বল হইয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে লাগিলেন৷ সে ক্রন্দনের রোল, পাগলের ন্যায় গদগদ বাক্য ও অদৃষ্টপূর্ব আচরণে ঠাকুরবাটির ভৃত্য ও কর্মচারীরা চতুর্দিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া উপস্থিত হইল৷ মথুরবাবু সেদিন ঠাকুরবাটিতে তিনিও ঐ গোলমাল শুনিতে পাইয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন৷ কর্মচারীরা সসম্ভ্রমে পথ ছাড়িয়া দিল৷ মথুরবাবু আসিয়াই ঠাকুরকে বিশেষভাবে তন্ময় দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন এবং কর্মচারিবৃন্দের আচরণে বিশেষ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, ‘‘সাবধান যাহার মাথার উপর দশটা মাথা আছে সে–ই যেন এখন ভট্টাচার্যমহাশয়কে স্পর্শ করিতে যায়৷’’ কর্মচারীরা ভীত হইয়া আর কিছু বলিতে বা করিতে সাহসী হইল না৷ পরে কতক্ষণ বাদে ঠাকুরের বাহ্যজগতে হুঁশ আসিল এবং মথুরবাবুকে সেখানে দণ্ডায়মান দেখিয়া বালকের ন্যায় ভীত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, ‘‘আমি বে–সামাল হয়ে কিছু করে ফেলেছি কি?’’ মথুর তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বলিলেন, ‘‘না, বাবা, তুমি স্তব পাঠ করছিলে পাছে কেহ না বুঝে তোমায় বিরক্ত করে, তাই আমি এখানে দাঁড়িয়েছিলাম৷’’
ঠাকুরের দিব্যসঙ্গে মথুরবাবুর হূদয়ে এক সময়ে একটা অদ্ভুত অবস্থার উদয় হইয়া তাঁহার বিশ্বাস ভক্তি সহস্রগুণে বর্ধিত হইয়া উঠে৷ একদিন ঠাকুর তাঁহার ঘরের উত্তরপূর্ব কোণে যে লম্বা বারাণ্ডাটি পূর্বপশ্চিমে বিস্তৃত আছে, তথায় আপন মনে গোঁ–ভরে পদ–চারণ করিতেছিলেন৷ ‘‘বাবুদের কুঠি’’ বলিয়া পঞ্চবটীর সন্নিকটে যে পৃথক বাড়ি আছে, তাহারই একটি প্রকোষ্ঠে মথুরবাবু তখন একাকী আপন মনে বসিয়া আছেন৷ সেখান হইতে ঠাকুর যেখানে বেড়াইতেছিলেন সে স্থানটির ব্যবধান বড় বেশি না হওয়ায় বেশ নজর হইতেছিল৷ ঠাকুর কিন্তু ইহা আদৌ জ্ঞাত ছিলেন না৷ কিছুক্ষণ পর মথুরবাবু হঠাৎ ব্যস্ত–সমস্ত হইয়া দৌড়াইয়া ঠাকুরের নিকট আগমন করিলেন এবং প্রণত হইয়া তাঁহার পদদ্বয় জড়াইয়া ধরিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন৷ মথুরের এই আকস্মিক আচরণে ঠাকুর স্তম্ভিত হইয়া বলিলন, ‘‘তুমি একি করচ? তুমি রানীর জামাই, লোকে তোমাকে এমন করতে দেখলে কি বলবে? স্থির হও উঠ৷’’ তারপর কিঞ্চিৎ শান্ত হইয়া মথুরবাবু বলিতে লাগিলেন, ‘‘আমার আজ এক অদ্ভুত দর্শন হয়েছে৷ বাবা, তুমি বেড়াচ্ছ, আর আমি স্পষ্ট দেখলুম যখন এদিকে আসছ, দেখছি তুমি নও, আমার ঐ মন্দিরের আনন্দময়ী মা আর যেমনি পেছন ফিরে ওদিকে যাচ্ছ, দেখি জটাজটিল ব্যাঘ্রাম্বরপরিহিত সাক্ষাৎ দেবাদিদেব মহাদেব প্রথম ভাবলুম চোখের ভ্রম হয়েছে, চোখ ভাল করে পুঁছে ফের দেখলুম, দেখি তাই৷ এইরূপ যতবার করলুম, দেখলুম, তাই’’ বলিতে বলিতে মথুরানাথ অশ্রুজলে ভাসিতে লাগিলেন৷ ঠাকুর অনেক করিয়া বুঝাইয়া তাঁহাকে কোন প্রকারে শান্ত করিলেন৷ এখন হইতে ঠাকুরের সহিত মথুরবাবুর ঘনিষ্ঠতা বিশেষরূপে বৃদ্ধি পাইল এবং মথুরের বিশ্বাস অনেকটা পাকা হইয়া দাঁড়াইল৷ কারণ তিনি বুঝিতে পারিয়াছেন যে ঠাকুর সামান্য নহেন জগদম্বা তাঁহারই প্রতি কৃপা করিয়া ঠাকুরের শরীরের ভিতরে সাক্ষাৎ বর্তমান রহিয়াছেন৷
মথুরের ভক্তি–বিশ্বাস আমাদের চক্ষে অদ্ভুত বলিয়া প্রতীত হইলেও উহা যে নানারূপে ঠাকুরকে যাচাইবার ফলেই উপস্থিত হইয়াছিল সে–বিষয়ে আর সন্দেহ নাই৷ মথুর ধন দিয়া, সুন্দরী রমণী দিয়া, নিজের ও বাটির সকলের উপর অকুণ্ঠ প্রভুত্ব দিয়া, ঠাকুরের আত্মীয়বর্গ যথা হূদয় প্রভৃতির জন্য অকাতরে অর্থব্যয় করিয়া সকলভাবে ঠাকুরকে যাচাইয়া দেখিয়াছিলেন–ইনি অপর সাধারণের ন্যায় বাহ্যিক কিছুতেই ভুলেন না৷ আর নরহত্যাদি দুষ্কর্ম করিয়াও যথার্থ সরলভাবে যদি কেহ ইঁহার শরণ গ্রহণ করে, তবে তাহার সাত খুন মাপ করিয়া তাহাকে সাদরে গ্রহণ করেন, দিন দিন উচ্চ লক্ষ্য চিনিবার ও ধরিবার সামার্থ্য দেন এবং কি এক বিচিত্র শক্তিবলে তাহার জন্য অসম্ভবও সম্ভব হইয়া দাঁড়ায়৷ ঠাকুরের সঙ্গে থাকিয়া এবং ভাবসমাধিতে তাঁহার অসীম আনন্দানুভব দেখিয়া বিষয়ী মথুরেরও এক সময়ে ইচ্ছা হইয়াছিল, ব্যাপারটা কি একবার দেখিবে ও বুঝিবে৷ মথুরের মনে ঐরূপ ভাবের উদয় হইবামাত্র ঠাকুরকে যাইয়া ধরিলেন৷ বলিলেন, ‘‘বাবা, আমার যাহাতে ভাব–সমাধি হয়, তাহা তোমায় করিয়া দিতে হইবে৷’’ ঠাকুর বলিলেন, ‘‘কালে হবে, কালে হবে৷ কেন, তুমি তো বেশ আছ, এদিক ওদিক –দুদিক চলছে৷ ওসব হলে সংসার থেকে মন উঠে যাবে, তখন তোমার বিষয় আশয় সব রক্ষা করবে কে?’’ মথুর আজ নাছোড়বান্দা৷ তাহাকে ভাব–সমাধি করিয়া দিতেই হইবে৷ তখন ঠাকুর বলিলেন, ‘‘তা কি জানি বাপু? মাকে বলব, তিনি যা হয় করবেন৷’’ তাহার কয়েকদিন পরেই মথুরের একদিন ভাব–সমাধি৷ ঠাকুরকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছেন৷ মথুরের নিকট গিয়া ঠাকুর দেখিলেন, ‘মথুর যেন সে মানুষই নয়৷ চক্ষু লাল, চক্ষে অবিরল অশ্রু ঝরিতেছে৷ ঈশ্বরীয় কথা বলিতে বলিতে কাঁদিয়া আকুল৷ বুক থর থর করিয়া কাঁপিতেছে৷’ ঠাকুরকে দেখিয়াই মথুর তাঁহার পা দুইটি জড়াইয়া ধরিয়া কাতরস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘বাবা, ঘাট হয়েছে আজ তিন দিন ধরে এই রকম, বিষয় কর্মের দিকে চেষ্টা করলেও কিছুতেই মন যায় না৷ তোমার ভাব তুমি ফিরিয়ে নাও, ও আমার চাই নে৷’ ঠাকুর তখন হাসিয়া বলিলেন, ‘‘তোমাকে তো একথা আগেই বলেছি৷’’ তখন তাঁহার বুকে আবার হাত বুলাইয়া দিয়া তাঁহার ভাব প্রশমিত করিলেন৷ বাস্তবিক ভাব বা সমাধি হইলেই হয় না৷ উহার বেগ সহ্য করিতে–উহাকে রক্ষা করিতে পারে কয়টা লোক? একটুকু বাসনার পশ্চাৎ টান থাকিতে উহা পারা অসম্ভব৷ এইরূপে কি একটা মধুর সম্বন্ধই না ঠাকুর মথুরের সহিত পাতাইয়াছিলেন৷ মথুরের ভালবাসা ঘনীভূত হইয়া শেষে বাবা–ন্ত–প্রাণ হইয়া উঠিয়াছিল৷ একদিকে মথুর যেমন ঠাকুরের দৈবশক্তির উপরে নির্ভর করিতেন, অপরদিকে তেমনি আবার তিনি ‘বাবা’কে অনভিজ্ঞ বালক জানিয়া সর্বদা রক্ষা করিতে প্রস্তুত থাকিতেন৷ দৈবনির্দিষ্ট সম্বন্ধ না হইলে কি দীর্ঘ ১৪ (চৌদ্দ) বৎসরকাল এ সম্বন্ধ এরূপ অক্ষুণ্ণভাবে কখনও থাকিতে পারিত? হায় পৃথিবী, এরূপ বিশুদ্ধ মধুর সম্বন্ধ এতকাল কয়টাই বা তুমি নয়নগোচর করিয়াছ?
ঠাকুরের এই সাধকজীবন আলোচনা করিলে দেখিতে পাই বাহ্য কোন বিষয়ে সহায়তা না পাইলেও একমাত্র ব্যাকুলতা থাকিলেই সাধকের ঈশ্বরলাভ হইতে পারে৷ কিন্তু কেবলমাত্র উহার সহায়ে সিদ্ধকাম হইতে হইলে ঐ ব্যাকুলাগ্রহের পরিমাণ যে কত অধিক, ঠাকুরের জীবনালোচনা করিলে ঐ কথা আমাদিগের স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়৷ তীব্র ব্যাকুলতার প্রেরণায় তাঁহার আহার, নিদ্রা, লজ্জা, ভয় প্রভৃতি শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়বদ্ধ সংস্কার ও অভ্যাসসকল যেন কোথায় লুপ্ত হইয়াছিল এবং শারীরিক স্বাস্থ্যরক্ষা দূরে থাকুক, জীবনরক্ষার দিকেও কিছুমাত্র লক্ষ্য ছিল না৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘শরীর সংস্কারের দিকে আদৌ মন না থাকায়, ঐকালে মস্তকের কেশ বড় হইয়া ধুলামাটি লাগিয়া আপনি আপনি জটা পাকাইয়া গিয়াছিল৷ ধ্যান করিতে বসিলে মনের একাগ্রতায় শরীরটা এমন স্থাণুবৎ স্থির হইয়া থাকিত যে পক্ষিসকল জড়পদার্থজ্ঞানে নিঃসঙ্কোচে মাথার উপর আসিয়া বসিয়া থাকিত এবং কেশমধ্যগত ধূলিরাশি চঞ্চুদ্বারা নাড়িয়া চাড়িয়া তন্মধ্যে তণ্ডুলকণার অন্বেষণ করিত৷ আবার সময়ে সময়ে ভগবদ্বিরহে অধীর হইয়া ভূমিতে এমন মুখঘর্ষণ করিতাম যে কাটিয়া যাইয়া স্থানে স্থানে রক্ত বাহির হইত৷ ঐরূপে ধ্যান, ভজন, প্রার্থনা, আত্মনিবেদনাদিতে সমস্ত দিন যে কোথা দিয়া এ সময় চলিয়া যাইত তাহার হুঁশই থাকিত না পরে সন্ধ্যাসমাগমে যখন চারিদিকে শঙ্খঘণ্টার ধ্বনি হইতে থাকিত তখন মনে পড়িত–দিবা অবসান হইল, আর একটা দিন বৃথা চলিয়া গেল, মা–র দেখা পাইলাম না৷ তখন তীব্র আক্ষেপ আসিয়া প্রাণ এমন ব্যাকুল করিয়া তুলিত যে, আর স্থির থাকিতে পারিতাম না আছাড় খাইয়া মাটিতে পড়িয়া ‘মা, এখনও দেখা দিলি না’ বলিয়া চিৎকার ও ক্রন্দনে দিক পূর্ণ করিতাম ও যন্ত্রণায় ছটফট করিতাম৷’’ সময়ে সময়ে ঈশ্বরের জন্য প্রাণে তীব্র ব্যাকুলতার প্রয়োজন বুঝাইতে সাধনকালের পূর্বোক্ত কথাসকল শুনাইয়া আক্ষেপ করিয়া বলিতেন, ‘‘লোকে পত্নীপুত্রাদির মৃত্যুতে বা বিষয়–সম্পত্তি হারাইয়া ঘটি ঘটি চোখের জল ফেলে কিন্তু ঈশ্বরলাভ হইল না বলিয়া কে আর ঐরূপ করে বল? অথচ বলে, ‘তাঁহাকে এত ডাকিলাম, তত্রাচ তিনি দর্শন দিলেন না৷’ ঈশ্বরের জন্য ঐরূপ ব্যাকুলভাবে একবার ক্রন্দন করুক দেখি, কেমন না তিনি দর্শন দেন৷’’ ঠাকুরের ঐসব কথা শুনিলেই বুঝা যাইত, নিজ জীবনে ঐ কথা সত্য বলিয়া প্রত্যক্ষ করিয়াছেন বলিয়াই অত নিঃসংশয়ে উহা বলিতে পারিতেন৷
সাধনকালের প্রথম চারি বৎসরে ঠাকুর নজগদম্বার দর্শনমাত্র করিয়াই নিশ্চিন্ত ছিলেন না৷ ভাবমুখে শ্রীশ্রীজগন্মাতার দর্শনলাভের পর নিজ কুলদেবতা নরঘুবীরের দর্শনলাভ সম্ভবপর বুঝিয়া দাস্যভক্তিতে সিদ্ধ হইবার জন্য তিনি এখন আপনাতে মহাবীরের ভাবারোপ করিয়া কিছুদিনের জন্য সাধনায় প্রবৃত্ত হইলেন৷ নিরন্তর মহাবীরের চিন্তা করিতে করিতে এই সময়ে তিনি ঐ আদর্শে এতদূর তন্ময় হইয়া পড়িলেন যে, আপনার পৃথগস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের কথা কিছুকালের জন্য একেবারে বিস্মৃত হইলেন৷ এই দাস্যভক্তি সাধনকালে ঠাকুরের জীবনে এক অভূতপূর্ব দর্শন ও অনুভব আসিয়া উপস্থিত হয়৷ তিনি বলিতেন, ‘‘এইকালে এই পঞ্চবটীতলে একদিন বসিয়া আছি–ধ্যানচিন্তা যে কিছু করিতেছিলাম তাহা নহে, অমনি বসিয়াছিলাম–এমন সময়ে এক নিরুপমা জ্যোতির্ময়ী স্ত্রীমূর্তি অদূরে আবির্ভূতা হইয়া স্থানটিকে আলোকিত করিয়া তুলিল৷ প্রসন্ন দৃষ্টিপাতে মোহিত করিয়া ঐ দেবী–মানবী উত্তরদিক হইতে দক্ষিণে আমার দিকে অগ্রসর হইতেছেন৷ স্তম্ভিত হইয়া ভাবিতেছি, ‘কে ইনি?’–এমন সময় একটা হনুমান কোথা হইতে সহসা উ–উপ শব্দ করিয়া আসিয়া তাঁহার পদপ্রান্তে লুটাইয়া পড়িল এবং ভিতর হইতে মন বলিয়া উঠিল, ‘সীতা, জনম–দুঃখিনী সীতা, জনকরাজনন্দিনী সীতা, রামময়জীবিতা সীতা৷’ তখন মা, মা বলিয়া অধীর হইয়া পদে নিপতিত হইতে যাইতেছি এমন সময় তিনি চকিতের ন্যায় আসিয়া (নিজ শরীর দেখাইয়া) ইহার ভিতর প্রবিষ্ট হইলেন৷ আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া বাহ্যজ্ঞান হারাইয়া পড়িয়া গেলাম৷ ধ্যান চিন্তাদি কিছু না করিয়া এমনভাবে কোন দর্শন ইতঃপূর্বে আর হয় নাই৷’’
তপস্যার উপযুক্ত পবিত্র ভূমির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়া ঠাকুর এই সময়ে হূদয়ের নিকট নূতন একটি পঞ্চবটী স্থাপনের বাসনা প্রকাশ করেন৷ অনন্তর এখন যেখানে সাধন–কুটির আছে তাহারই পশ্চিমে ঠাকুর স্বহস্তে একটি অশ্বত্থ বৃক্ষ রোপণ করিয়া হূদয়কে দিয়া বট, অশোক, বেল ও আমলকী বৃক্ষের চারা রোপণ করাইলেন এবং তুলসী ও অপরাজিতার অনেকগুলি চারা পুঁতিয়া সমগ্র স্থানটিকে বেষ্টন করাইয়া লইলেন৷ পরে মথুরানাথের সাহায্যে বিভিন্ন তীর্থ হইতে পবিত্র ধুলি আনাইয়া ঠাকুর স্বহস্তে পঞ্চবটীমূলে উহা ছড়াইয়াছিলেন৷
কালীবাটি প্রতিষ্ঠার কথা জানাজানি হইবার পরে গঙ্গাসাগর ও জগন্নাথ দর্শনপ্রার্থী পথিক সাধুকুল ঐ তীর্থদ্বয়ে যাইবার কালে কয়েকদিনের জন্য, শ্রদ্ধাসম্পন্না রানীর আতিথ্যগ্রহণ করিয়া দক্ষিণেশ্বর ঠাকুরবাটিতে বিশ্রাম করিয়া যাইতে আরম্ভ করেন৷ ইঁহাদের কাহারও নিকট হইতে উপদিষ্ট হইয়া ঠাকুর এইকালে প্রাণায়ামাদি হঠযোগের ক্রিয়াসকল অভ্যাস করিয়াছিলেন৷ এই হঠযোগোক্ত ক্রিয়াসকল স্বয়ং অভ্যাসপূর্বক উহাদিগের ফলাফল প্রত্যক্ষ করিয়াই তিনি পরজীবনে সকলকে ঐসকল অভ্যাস করিতে নিষেধ করিতেন৷ হঠযোগক্রিয়ার ফলে ঠাকুরকেও কিরূপ বিপদাপন্ন হইতে হইয়াছিল নিম্নোক্ত ঘটনায় তাহা বুঝা যাইবে৷ ঠাকুরের খুল্লতাত পুত্র বয়োজ্যেষ্ঠ হলধারীর নরাধাগোবিন্দজীর পূজায় নিযুক্ত হওয়ার কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি৷ তিনি বৈষ্ণবতন্ত্রোক্ত পরকীয়া প্রেমসাধনরূপ পথে ধাবিত হওয়ায় নানা জনে নানা কথা বলাবলি করিত৷ হলধারী বাক্সিদ্ধ এইরূপ একটা প্রসিদ্ধি থাকায় কোপে পড়িবার আশঙ্কায় তাঁহার সম্মুখে ঐ কথা আলোচনা বা হাস্য–পরিহাসাদি করিতে সহসা কেহ সাহসী হইত না৷ অগ্রজের সম্বন্ধে ঐ কথা জানিতে পারিয়া ঠাকুর তাঁহাকে সকল কথা খুলিয়া বলিলেন৷ হলধারী তাহাতে সাতিশয় রুষ্ট হইয়া বলিলেন, ‘‘কনিষ্ঠ হইয়া তুই আমাকে অবজ্ঞা করিলি? তোর মুখ দিয়া রক্ত উঠিবে৷’’ এই ঘটনার কিছুকাল পরে একদিন রাত্রে ৮৷৯টা আন্দাজ সময়ে ঠাকুরের মুখ দিয়া সত্য সত্য রক্ত বাহির হইতে লাগিল৷ শিমপাতার রসের মতো তার মিশকাল রং৷ সংবাদ পাইয়া হলধারীও শশব্যস্তে আসিয়া পড়িল৷ ঠাকুরবাড়িতে সেদিন একজন প্রাচীন বিজ্ঞ সাধু আসিয়াছিলেন৷ তিনি রক্তের রং ও মুখের ভিতরে যে স্থানটা হইতে উহা নির্গত হইতেছে তাহা পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, ‘‘দেখিতেছি তুমি যোগসাধনা করিতে৷ হঠযোগের চরমে জড়সমাধি হয়৷ তোমারও ঐরূপ হইতেছিল৷ সুষুম্নাদ্বার খুলিয়া যাইয়া শরীরের রক্ত মাথায় উঠিতেছিল৷ মাথায় না উঠিয়া উহা যে এইরূপে মুখের ভিতরে একটা নির্গত হইবার পথ আপনা আপনি করিয়া লইয়া বাহির হইয়া গেল, ইহাতে বড়ই ভাল হইল কারণ জড়সমাধি হইলে উহা কিছুতেই ভাঙিত না৷ তোমার শরীর দ্বারা নজগন্মাতার বিশেষ কোন কার্য আছে৷ তাই তিনি তোমাকে এইরূপে রক্ষা করিলেন৷’’ সাধুর ঐ কথা শুনিয়া ঠাকুর আশ্বস্ত হইলেন৷ হলধারীর শাপ কাকতালীয়ের ন্যায় সফল হইয়া বরে পরিণত হইল৷
বালকস্বভাব ঠাকুর আবার কখনও কখনও হলধারীর পাণ্ডিত্যে ভুলিয়া ইতিকর্তব্যতা বিষয়ে জগন্মাতার মতামত গ্রহণ করিতে ছুটিতেন৷ একদিন, ভাবসহায়ে ঐশ্বরিক স্বরূপ সম্বন্ধে যে–সকল অনুভূতি হয় সে–সকলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়া এবং ঈশ্বরকে ভাবাভাবের অতীত বলিয়া শাস্ত্রসহায়ে নির্দেশ করিয়া হলধারী ঠাকুরের মনে বিষম সন্দেহের উদয় করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘ভাবিলাম, তবে তো ভাবাবেশে যত কিছু ঈশ্বরীয় রূপ দেখিয়াছি, আদেশ পাইয়াছি সে সমস্তই ভুল মা তবে আমায় ফাঁকি দিয়াছে৷ মন বড়ই ব্যাকুল হইল এবং অভিমানে কাঁদিতে কাঁদিতে মাকে বলিতে লাগিলেন, ‘মা, নিরক্ষর মুখ্খু বলে আমাকে কি এমনি করে ফাঁকি দিতে হয়?’ সে কান্নার তোড় (বেগ) আর থামে না কুঠির ঘরে বসিয়া কাঁদিতেছিলাম৷ কিছুক্ষণ পরে দেখি কি, সহসা মেজে হইতে কুয়াশার মতো ধোঁয়া উঠিয়া সামনের কতকটা স্থান পূর্ণ হইয়া গেল৷ তারপর দেখি তাহার ভিতরে আবক্ষলম্বিতশ্মশ্রু একখানি জীবন্ত সৌম্যমুখ ঐ মূর্তি আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে দেখিতে দেখিতে গম্ভীর স্বরে বলিলেন, ‘ওরে, তুই ভাবমুখে থাক, ভাবমুখে থাক, ভাবমুখে থাক৷’ তিনবার মাত্র ঐ কথাগুলি বলিয়াই ঐ মূর্তি ধীরে ধীরে আবার ঐ কুয়াশায় গলিয়া গেল এবং ঐ কুয়াশার মতো ধূমও কোথায় অন্তর্হিত হইল ঐরূপ দেখিয়া সেবার শান্ত হইলাম৷’’
এই চারি বৎসরের ভিতরেই ঠাকুর মন হইতে কাঞ্চনাসক্তি দূর করিবার জন্য এক হস্তে মৃত্তিকা, অপর হস্তে মুদ্রা ধারণপূর্বক ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’ বলিতে বলিতে কাঞ্চনলাভ করিবার বাসনাসহ হস্তস্থিত মৃত্তিকা ও মুদ্রাখণ্ডসকল গঙ্গাবক্ষে বিসর্জন দিয়াছিলেন৷ ঐরূপে আব্রহ্মস্তম্ব পর্যন্ত বস্তু ও ব্যক্তিসকলকে শ্রীশ্রীজগদম্বার প্রকাশ ও অংশরূপে ধারণার জন্য কাঙালিদের ভোজনাবশিষ্ট গ্রহণপূর্বক ভোজনস্থান পরিষ্কার করা, সকলের ঘৃণার পাত্র মেথর অপেক্ষাও তিনি কোন অংশে বড় নহেন একথা ধারণাপূর্বক মন হইতে অভিমান অহংকার পরিহারের জন্য অশুচিস্থান ধৌত করা, চন্দন হইতে বিষ্ঠা পর্যন্ত সকল পদার্থ পঞ্চভূতের বিকারপ্রসূত জানিয়া হেয়োপাদেয় জ্ঞান দূর করিবার জন্য জিহ্বা দ্বারা অপরের বিষ্ঠা নির্বিকারচিত্তে স্পর্শ করা প্রভৃতি যে সকল অশ্রুতপূর্ব সাধনকথা ঠাকুরের সম্বন্ধে শুনিতে পাওয়া যায় তাহাও এইকালে সাধিত হইয়াছিল৷
সাধনার প্রথম চারি বৎসরের শেষভাগে ঠাকুর যখন কামারপুকুরে অবস্থান করিতেছিলেন তখন একটি অপূর্ব দর্শন তাঁহার জীবনে উপস্থিত হইয়াছিল৷ একদিন শিবিকারোহণে কামারপুকুর হইতে শিহড় গ্রামে হূদয়ের বাড়িতে যাইতেছিলেন৷ সুনীল অম্বরতলে বিস্তীর্ণ প্রান্তর, শ্যামল ধান্যক্ষেত্র, বিহগকুজিত শীতল ছায়াময় অশ্বত্থ বট বৃক্ষরাজি এবং মধুরগন্ধ–কুসুমভূ তরুলতা প্রভৃতি অবলোকনপূর্বক প্রফুল্ল মনে যাইতে যাইতে ঠাকুর দেখিলেন, তাঁহার দেহমধ্য হইতে দুইটি কিশোর বয়স্ক সুন্দর বালক সহসা বহির্গত হইয়া বনপুষ্পাদির অন্বেষণে কখনও প্রান্তর মধ্যে বহুদূরে গমন, আবার কখনও বা শিবিকার সন্নিকটে আগমনপূর্বক হাস্য, পরিহাস, কথোপকথনাদি নানা চেষ্টা করিতে করিতে অগ্রসর হইতে লাগিল৷ অনেকক্ষণ পর্যন্ত এইরূপে আনন্দে বিহার করিয়া তাহারা পুনরায় তাঁহার দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হইল৷ ঐ দর্শনের প্রায় দেড় বৎসর পরে ব্রাহ্মণী দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হন৷ কথাপ্রসঙ্গে একদিবস ঠাকুরের নিকটে ঐ দর্শনের বিবরণ শুনিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, ‘‘বাবা, তুমি ঠিক দেখিয়াছ এবার নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব–শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীচৈতন্য এবার একসঙ্গে একাধারে আসিয়া তোমার ভিতরে রহিয়াছেন সেইজন্য তোমার ঐরূপ দর্শন হইয়াছিল৷’’ এইরূপে নিজ ব্যক্তিত্বের সম্বন্ধে যে অলৌকিক আভাস তিনি পাইতেছিলেন তাহাই কালে সুস্পষ্ট হইয়া তাঁহাকে বুঝাইয়া দিয়াছিল–যিনি পূর্ব পূর্ব যুগে ধর্মসংস্থাপনের জন্য অযোধ্যা ও শ্রীবৃন্দাবনে জানকীবল্লভ শ্রীরামচন্দ্র ও রাধাবল্লভ শ্রীকৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনিই এখন পুনরায় ভারত ও জগৎকে নবীন ধর্মাদর্শদানের জন্য নূতন শরীর পরিগ্রহপূর্বক শ্রীরামকৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন৷ ঠাকুর স্বমুখে বারংবার বলিয়াছেন, ‘‘যে রাম, যে কৃষ্ণ হইয়াছিল সে–ই ইদানীং (নিজ শরীর দেখাইয়া) এই খোলটার ভিতরে আসিয়াছে–রাজা যেমন কখনও কখনও ছদ্মবেশে নগরভ্রমণে বহির্গত হয়, এইরূপ গুপ্তভাবে সে এইবার পৃথিবীতে আগমন করিয়াছে৷’’
এদিকে ঠাকুর পূজাকার্য ছাড়িয়া দিয়াছেন এই সংবাদ কামারপুকুরে তাঁহার মাতা ও ভ্রাতার কর্ণে পঁৌছিয়া তাঁহাদিগকে বিশেষ চিন্তান্বিত করিয়া তুলিল৷ গদাধর চন্দ্রাদেবীর পরিণত বয়সে প্রাপ্ত আদরের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন৷ শোকে দুঃখে অধীরা হইয়া তিনি পুত্রকে বাটিতে ফিরাইয়া আনিলেন এবং তাঁহার উদাসীন, চঞ্চল ভাব ও মা, মা রবে কাতর ক্রন্দনে নিতান্ত ব্যাকুলা হইয়া প্রতিকারের নানারূপ চেষ্টা পাইতে লাগিলেন৷ তখন ইং ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের (সন ১২৬৫ সালের) আশ্বিন কিংবা কার্তিক মাস হইবে৷ ঠাকুরের বয়স এখন ত্রয়োবিংশতিবর্ষ পূর্ণ হইতে চলিয়াছে৷ কামারপুকুরের পশ্চিম ও উত্তর–পূর্ব প্রান্তদ্বয়ে অবস্থিত ‘ভূতির খাল’ এবং ‘বুধুই মোড়ল’ নামক শ্মশানদ্বয়ে এখন হইতে দিবা ও রাত্রির অনেকভাগ তিনি একাকী অতিবাহিত করিতেন এবং শ্মশানদ্বয়ে অবস্থিত শিবা ও উপদেবতাদিগকে এই সময়ে মধ্যে মধ্যে বলি প্রদান করিতেন৷ নিবেদিত আহার্যপূর্ণ হাঁড়িসকল বায়ুভরে ঊর্ধ্বে উঠিয়া শূন্যে লীন হইয়া যাইত৷ দেখিতে পাওয়া যায়, নজগদম্বার দর্শন লালসায় তিনি ইতঃপূর্বে যে বিষম অভাব প্রাণে অনুভব করিয়াছিলেন, তাহা এই সময়ে কতকগুলি অপূর্ব দর্শন ও উপলব্ধিদ্বারা প্রশমিত হইয়াছিল৷ সাংসারিক সকল বিষয়ে তাঁহার পূর্ণমাত্রায় উদাসীনতা এবং নিরন্তর উন্মনা ভাব দূর করিবার জন্য, ঠাকুরের স্নেহময়ী মাতা ও অগ্রজ এখন উপযুক্ত পাত্রী দেখিয়া তাঁহার বিবাহ দিবার পরামর্শ স্থির করিলেন৷ কারণ, সদ্বংশীয়া সুশীলা স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা পড়িলে তাঁহার মন নানা বিষয়ে সঞ্চরণ না করিয়া নিজ সাংসারিক অবস্থার উন্নতিসাধনেই রত থাকিবে৷
গদাধর জানিতে পারিলে পাছে ওজর আপত্তি করে এজন্য মাতা ও পুত্রের পূর্বোক্ত পরামর্শ অন্তরালে হইয়াছিল৷ চতুর গদাধরের কিন্তু ঐ বিষয় জানিতে অধিক বিলম্ব হয় নাই৷ জানিতে পারিয়াও তিনি উহাতে কোনরূপ আপত্তি করেন নাই৷ বাটিতে কোন একটা অভিনব ব্যাপার উপস্থিত হইলে বালক–বালিকারা যেরূপ আনন্দ করিয়া থাকে তদ্রূপ আচরণ করিয়াছিলেন৷ চারিদিকের গ্রামসকলে লোক প্রেরিত হইল, কিন্তু মনোমত পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল না৷ বহু অনুসন্ধানেও পাত্রী মিলিতেছে না দেখিয়া চন্দ্রাদেবী ও রামেশ্বর যখন নিতান্ত বিরস ও চিন্তামগ্ণ হইয়াছেন, তখন ভাবাবিষ্ট হইয়া গদাধর একদিব তাঁহাদিগকে বলিয়াছিলেন, ‘‘অন্যত্র অনুসন্ধান বৃথা, জয়রামবাটী গ্রামের শ্রীরামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাটিতে বিবাহের পাত্রী কুটাবাঁধা হইয়া রক্ষিতা আছে৷’’ কন্যার বয়স পঞ্চমবর্ষ উত্তীর্ণ হইয়াছে৷ ঐরূপ অপ্রত্যাশিতভাবে সন্ধানলাভে চন্দ্রাদেবী ঐ স্থানেই পুত্রের বিবাহ দিতে স্বীকৃতা হইলেন এবং অল্পদিনেই সকল বিষয়ের কথাবার্তা স্থির হইয়া গেল৷ অনন্তর শুভদিনে শুভমুহূর্তে শ্রীযুক্ত রামেশ্বর কামারপুকুরের দুই ক্রোশ পশ্চিমে অবস্থিত জয়রামবাটী গ্রামে ভ্রাতাকে লইয়া যাইয়া শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র কন্যার সহিত শুভ পরিণয়ক্রিয়া সম্পন্ন করাইয়া আসিলেন৷ বিবাহে তিনশত টাকা পণ লাগিল৷ তখন সন ১২৬৬ সালের বৈশাখ মাসের শেষভাগ এবং ঠাকুর চতুর্বিংশতিবর্ষে পদার্পণ করিয়াছেন৷
গদাধরের বিবাহ দিয়া শ্রীমতী চন্দ্রামণি অনেকটা নিশ্চিত হইয়াছিলেন৷ উন্মনা পুত্র গৃহে ফিরিল, সদ্বংশীয়া পাত্রী জুটিল, অর্থের অনটনও অচিন্তনীয়ভাবে পূর্ণ হইল৷ সরল–হূদয়া ধর্মপরায়ণা চন্দ্রাদেবী যে এখন কথঞ্চিৎ সুখী হইয়াছিলেন ইহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে৷ কিন্তু বৈবাহিকের মনস্তুষ্টি ও বাহিরের সম্ভ্রমরক্ষা করিবার জন্য জমিদার বন্ধু লাহাবাবুদের বাটি হইতে যে গহনাগুলি চাহিয়া বধূকে বিবাহের দিনে সাজাইয়া আনিয়াছিলেন৷ কয়েকদিন পরে ঐগুলি ফিরাইয়া দিবার সময় যখন উপস্থিত হইল তখন বালিকার অঙ্গ হইতে অলঙ্কারগুলি তিনি কোন্ প্রাণে খুলিয়া লইবেন, এই চিন্তায় বৃদ্ধার চক্ষু এখন জলপূর্ণ হইয়া উঠিল৷ অন্তরের কথা তিনি কাহাকেও না বলিলেও গদাধরের উহা বুঝিতে বিলম্ব হইল না৷ তিনি মাতাকে শান্ত করিয়া নিদ্রিতা বধূর অঙ্গ হইতে গহনাগুলি এমন কৌশলে খুলিয়া লইলেন যে বালিকা উহা কিছুই জানিতে পারিল না৷ বুদ্ধিমতী বালিকা কিন্তু নিদ্রাভঙ্গে বলিয়াছিল, ‘‘আমার গায়ে যেসব গহনা ছিল তাহা কোথায় গেল৷’’ চন্দ্রাদেবী তাহাতে সজল নয়নে তাহাকে ক্রোড়ে লইয়া সাত্ব্ন্না প্রদানের জন্য বলিলেন, ‘‘মা, গদাধর তোমাকে ঐসকলের অপেক্ষাও উত্তম অলঙ্কারসকল ইহার পর কত দিবে৷’’ এইখানেই কিন্তু ঐ বিষয়ের পরিসমাপ্তি হইল না৷ কন্যার খুল্লতাত তাহাকে ঐ দিন দেখিতে আসিয়া সকল কথা জানিতে পারিয়া অসন্তোষ প্রকাশপূর্বক ঐ দিনেই কন্যাকে তাহার পিত্রালয়ে স্থানান্তরিত করিলেন৷ মাতার মনে ঐ ঘটনায় বিশেষ বেদনা উপস্থিত হইয়াছে দেখিয়া গদাধর তাঁহার ঐ দুঃখ দূর করিবার জন্য পরিহাসচ্ছলে বলিয়াছিলেন, ‘‘উহারা এখন যাহাই বলুক ও করুক না, বিবাহ তো আর ফিরিবে না৷’’ বিবাহের পর ঠাকুর প্রায় এক বৎসর সাত মাস কাল কামারপুকুরেই অতিবাহিত করিয়াছিলেন৷ ১২৬৭ সালের অগ্রহায়ণ মাসে বধূ সপ্তমবর্ষে পদার্পণ করিলে কুল–প্রথানুসারে তাঁহাকে কয়েকদিনের জন্য শ্বশুরালয়ে গমনপূর্বক শুভদিন দেখিয়া পত্নীর সহিত একত্রে কামারপুকুরে আগমন করিতে হইয়াছিল৷ তাঁহাকে মাতা ও ভ্রাতা কামারপুকুরে আরও কিছুকাল অবস্থান করিতে বলিলেও সংসারের অভাব–নটনের কথা তাঁহার অবিদিত ছিল না৷ ঐ কারণে তাঁহাদের কথা না শুনিয়া তিনি ইং ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণেশ্বর কালীবাটিতে ফিরিয়া পুনরায় পূর্ববৎ শ্রীশ্রীজগদম্বার সেবাকার্যে ব্রতী হইলেন৷
কলকাতায় ফিরিয়া কয়েকদিন পূজা করিতে নান করিতেই ঠাকুরের মন ঐ কার্যে এত তন্ময়তাপ্রাপ্ত হইল যে, মাতা, ভ্রাতা, স্ত্রী, সংসার, অনটন প্রভৃতি কামারপুকুরের সকল কথা তাঁহার মনের এক নিভৃত কোণে চাপা পড়িয়া গেল এবং জগন্মাতাকে সকল সময়ে সকলের মধ্যে কিরূপে দেখিতে পাইবেন–এই বিষয়ই উহার সকল স্থল অধিকার করিয়া বসিল৷ দিবারাত্র স্মরণ, মনন, জপ, ধ্যানে তাঁহার বক্ষ পুনরায় সর্বক্ষণ আরক্তিম ভাব ধারণ করিল৷ ঠাকুর তাঁহার এই কালের দিব্যোন্মাদ অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া সকলকে বলিতেন, ‘‘আধ্যাত্মিক ভাবের প্রাবল্যে সাধারণ জীবরে শরীর–মনে ঐরূপ হওয়া দূরে থাকুক উহার এক চতুর্থাং বিকার উপস্থিত হইলে শরীর ত্যাগ হয়৷ দিবারাত্রের অধিংকাংশ ভাগ মা–র কোন না কোনরূপ দর্শনাদি পাইয়া ভুলিয়া থাকিতাম তাই রক্ষা, নতুবা (নিজ শরীর দেখাইয়া) এ খোলটা থাকা অসম্ভব হইত৷ এখন হইতে আরম্ভ করিয়া দীর্ঘ ছয় বৎসর কাল তিলমাত্র নিদ্রা হয় নাই৷ চক্ষু পলকশূন্য হইয়া গিয়াছিল, সময়ে সময়ে চেষ্টা করিয়াও পলক ফেলিতে পারিতাম না৷... মাকে কাঁদিয়া বলিতাম, ‘মা তা যা হবার হক্গে, শরীর যাক, তুই কিন্তু আমায় ছাড়িসনি, আমায় দেখা দে, কৃপা কর৷’ এইরূপে কাঁদিতে কাঁদিতে মন আবার অদ্ভুত উৎসাহে উত্তেজিত হইয়া উঠিত, শরীরটাকে অতি তুচ্ছ হেয় বলিয়া মনে হইত এবং মা–র দর্শন ও অভয়বাণী শুনিয়া আশ্বস্ত হইতাম৷’’
এই সময়ে দক্ষিণেশ্বর দেবালয় সম্বন্ধে এক আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিল৷ ইং ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে রানী রাসমণি হঠাৎ গ্রহণীরোগে আক্রান্তা হন৷ ব্যাধি স্বল্পকালমধ্যে সাংঘাতিকভাব ধারণ করিল৷ শরীর ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে রানী কালীঘাটে আদিগঙ্গাতীরস্থ বাটিতে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন৷ দেহরক্ষার অব্যবহিত পূর্বে তাঁহাকে গঙ্গাগর্ভে আনয়ন করা হইলে সম্মুখে অনেকগুলি আলোক জ্বালা রহিয়াছে দেখিয়া তিনি সহসা বলিয়া উঠিলেন, ‘‘সরিয়ে দে সরিয়ে দে, ওসব রোশনাই আর ভাল লাগছে না৷ এখন আমার মা (শ্রীশ্রীজগন্মাতা) আসছেন, তাঁর শ্রীঙ্গের প্রভায় চারিদিক আলোকময় হয়ে উঠেছে৷’’–কথাগুলি বলিয়াই পুণ্যবতী রানী শান্তভাবে–মাতৃক্রোড়ে মহাসমাধিতে শয়ন করিলেন৷
রানীর কনিষ্ঠ জামাতা শ্রীযুক্ত মথুরানাথ বিশ্বাস বিষয়সংক্রান্ত সকল কার্য পরিচালনায় তাঁহার দক্ষিণহস্তস্বরূপ ছিলেন৷ সুতরাং রানীর মৃত্যুর পরে তিনিই দেবসেবাসংক্রান্ত সকল কার্য পূর্বের ন্যায় পরিচালনা করিতে থাকিলেন৷ এখন হইতে দীর্ঘ একাদশ বৎসর কাল মথুরানাথ ঠাকুরের সেবায় আপনাকে সমভাবে নিযুক্ত করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন–ইহা যে তাহার পরম ভাগ্যের কথা ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই৷
রানী রাসমণির মৃত্যুর স্বল্পকাল পরে ঠাকুরের জীবনে ঐ বৎসর আর একটি বিশেষ ঘটনা সমুপস্থিত হয়৷ দক্ষিণেশ্বর কালীবাটির পশ্চিমভাগে গঙ্গাতীরে সুবৃহৎ পোস্তার উপর ঐকালে বিচিত্র পুষ্পকানন ছিল৷ ঠাকুর এইসময়ে নিত্য ঐ কাননে পুষ্পচয়ন করিতেন এবং মাল্যরচনা করিয়া শ্রীশ্রীজগদম্বাকে স্বহস্তে সাজাইতেন৷ ঐ কাননের মধ্যভাগে গঙ্গাগর্ভ হইতে মন্দিরে যাইবার চাঁদনীশোভিত বিস্তৃত সোপানাবলি এবং উত্তরে পোস্তার শেষে স্ত্রীলোকদিগের ব্যবহারের জন্য একটি বাঁধা ঘাট ও নহবৎখানা অদ্যাপি বর্তমান৷ ঠাকুর একদিন প্রাতে পুষ্পচয়ন করিতেছেন, এমন সময়ে একখানি নৌকা শেষোক্ত (বকুলতলার) ঘাটে আসিয়া লাগিল এবং গৈরিকবস্ত্রপরিহিতা আলুলায়িতা দীর্ঘকেশা ভৈরবী–বেশধারিণী এক সুন্দরী রমণী উহা হইতে অবতরণপূর্বক দক্ষিণেশ্বর ঘাটে চাঁদনীর দিকে অগ্রসর হইলেন৷ ঠাকুর গৃহে ফিরিয়া তাঁহাকে ডাকিয়া আনিতে ভাগিনেয় হূদয়কে বলিলেন৷ মাতুলের বাক্য অন্যথা করিবার উপায় নাই বুঝিয়া হূদয় চাঁদনীতে যাইয়া তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল–তাহার ঈশ্বরভক্ত মাতুল তাঁহার দর্শনলাভের জন্য প্রার্থনা করিতেছেন৷ ঐ কথা শুনিয়া ভৈরবী কোনরূপ প্রশ্ণ না করিয়া তাহার সহিত আগমনের জন্য উঠিলেন এবং ঠাকুরের ঘরে প্রবেশপূর্বক তাঁহাকে দেখিয়াই আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূতা হইলেন৷ সজলনয়নে ভৈরবী বলিয়া উঠিলেন, ‘‘বাবা, তুমি এখানে রহিয়াছ তুমি গঙ্গাতীরে আছ জানিয়া তোমায় খুঁজিয়া বেড়াইতেছিলাম, এতদিনে দেখা পাইলাম৷’’ ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন,‘‘আমার কথা কেমন করিয়া জানিতে পারিলে, মা?’’ ভৈরবী বলিলেন, ‘‘তোমাদের তিনজনের সঙ্গে দেখা করিতে হইবে, একথা নজগদম্বার কৃপায় পূর্বে জানিতে পারিয়াছিলাম৷ দুই জনের দেখা পূর্ব (বঙ্গ) দেশে পাইয়াছি, আজ এখানে তোমার দেখা পাইলাম৷’’ শ্রীরামকৃষ্ণ ভৈরবী ব্রাহ্মণীর নিকট উপদিষ্ট হইয়া বালক যেমন অন্তরের কথা জননীর নিকট সানন্দে প্রকাশ করে সেইরূপ নিজ অলৌকিক দর্শন, ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হওয়া, গাত্রদাহ, নিদ্রাশূন্যতা, শারীরিক বিকার প্রভৃতি জীবনে নিত্য অনুভূত বিষয়সকল তাঁহাকে বলিতে বলিতে পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, ‘‘হ্যাঁগা, আমার এ–সকল কি হয়? আমি কি সত্যই পাগল হইলাম? নজগদম্বাকে মনে প্রাণে ডাকিয়া সত্যই কি আমার কঠিন ব্যাধি হইল?’’ ভৈরবী তাঁহার ঐ সকল কথা শুনিতে শুনিতে জননীর ন্যায় কখনও উত্তেজিতা, কখনও উল্লসিতা এবং কখনও করুণার্দ্র–হূদয়া হইয়া তাঁহাকে সাত্ব্ন্নাদানের জন্য বারংবার বলিতে লাগিলেন, ‘‘তোমায় কে পাগল বলে বাবা? তোমার মহাভাব হইয়াছে৷ ঐ প্রকার অবস্থা হইয়াছিল শ্রীমতী রাধারানীর ঐ প্রকার হইয়াছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর৷ এই কথা ভক্তিশাস্ত্রে আছে৷ আমার নিকটে যে–সকল পুঁথি আছে তাহা হইতে আমি পড়িয়া দেখাইব ঈশ্বরকে যাঁহারা এক মনে ডাকিয়াছেন তাঁহাদের সকলেরই ঐরূপ অবস্থাসকল হইয়াছে ও হয়৷’’ ভৈরবী ব্রাহ্মণী ও নিজ মাতুলকে ঐরূপ পরমাত্মীয়ের ন্যায় বাক্যালাপ করিতে দেখিয়া হূদয়ের বিস্ময়ের অবধি রহিল না৷
ঠাকুরের প্রতি অপত্যপ্রেমে মুগ্ধহূদয়া সন্ন্যাসিনী দক্ষিণেশ্বরেই রহিয়া গেলেন৷ পঞ্চবটীতে কয়েকদিবস দিব্যানন্দের প্রবাহ ছুটিল৷ ছয় সাতদিন ঐরূপে কাটিবার পর কালীবাটির উত্তরে ভাগীরথীতীরে দক্ষিণেশ্বর গ্রামস্থ দেবমণ্ডলের ঘাটে আসিয়া ব্রাহ্মণী বাস করিতে লাগিলেন এবং প্রতিদিন কিয়ৎকালের জন্য কালীবাটিতে আসিয়া ঠাকুরের সহিত কথাবার্তায় কাল কাটাইতে লাগিলেন৷ ঠাকুরের কথা শুনিয়া ব্রাহ্মণীর ইতঃপূর্বে মনে হইয়াছিল, অসাধারণ ঈশ্বরপ্রেমেই তাঁহার অলৌকিক দর্শন ও অবস্থাসকল উপস্থিত হইয়াছে৷ এখন ভগবদালাপে তাঁহার ভাবসমাধিতে মুহুর্মুহু বাহ্যচৈতন্যলোপ ও কীর্তনে পরমানন্দ দেখিয়া তাঁহার দৃঢ় ধারণা হইল–ইনি কখনই সামান্য সাধক নহেন৷ ব্রাহ্মণী চৈতন্যচরিতামৃত ভাগবতাদিগ্রন্থে শ্রীচৈতন্য ও শ্রীনিত্যানন্দ সম্বন্ধে যে–সকল কথা লিপিবদ্ধ দেখিয়াছেন, সেই সকলের সহিত ঠাকুরের আচার–ব্যবহার ও অলৌকিক প্রত্যাক্ষাদি মিলাইয়া সৌসাদৃশ্য দেখিতে পাইলেন৷ শ্রীচৈতন্যদেবের ন্যায় ভাবাবেশে স্পর্শ করিয়া অপরের মনে ধর্মভাব উদ্দীপিত করিবার শক্তি ঠাকুরে প্রকাশিত দেখিলেন৷ ইতঃপূর্বে শিহড় গ্রামে যাইবার কালে ঠাকুর নিজ দেহাভ্যন্তর হইতে কিশোরবয়স্ক দুইজনকে যেরূপে বাহিরে আবির্ভূত হইতে দেখিয়াছিলেন–ঐ সকল দর্শনের কথা ঠাকুরের মুখে শ্রবণপূর্বক শ্রীরামকৃষ্ণদেব–সম্ নিজ মীমাংসায় দৃঢ়তর বিশ্বাসবতী হইয়া বলিলেন, ‘‘এবার নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব৷’’ ব্রাহ্মণী মথুরকে বলিলেন, ‘‘শাস্ত্রজ্ঞ সুপণ্ডিতসকলকে আন, আমি তাঁহাদের নিকট আমার কথা প্রমাণিত করিতে প্রস্তুত৷’’ বালকবৎ ঠাকুর মথুরবাবুকে ধরিয়া বসিলেন, ‘‘ভাল ভাল পণ্ডিত আনাইয়া ব্রাহ্মণী যাহা বলিতেছে, তাহা যাচাইতে হইবে৷’’ মথুরানাথ কতক কৌতূহলে, কতক ঠাকুরের প্রতি ভালবাসায় ঠাকুরের অনুরোধে পণ্ডিতদিগকে আনাইতে সম্মত হইলেন৷
কলকাতার পণ্ডিতমহলে তখন বৈষ্ণবচরণের বেশ প্রতিপত্তি৷ কিছুদিন পরে বৈষ্ণবচরণ নিমন্ত্রিত হইয়া দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইলেন৷ তাঁহার সঙ্গে কতকগুলি ভক্তসাধক ও পণ্ডিতও আসিয়াছিলেন৷ বিদুষী ব্রাহ্মণী ও মথুরবাবুর দলবলও তথায় মিলিত হওয়ায় এক ক্ষুদ্র আলোচনা–সভার অধিবেশন হইল৷ ব্রাহ্মণী পূর্ব পূর্ব প্রসিদ্ধ আচার্যসকলের জীবনে যে–সকল অনুভব আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল, শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ ঐ সকল কথার সহিত ঠাকুরের বর্তমান অবস্থা মিলাইয়া, মাতা যেমন নিজ সন্তানকে রক্ষা করিতে বীরদর্পে দণ্ডায়মানা হন, আজ সেইরূপ কোন দৈববলে বলশালিনী হইয়া ঠাকুরের পক্ষ সমর্থনে অগ্রসর হইলেন৷ বৈষ্ণবচরণ সাধনপ্রসূত সূক্ষ্মদৃষ্টিসহায়ে ঠাকুরকে দেখিবামাত্রই মহাপুরুষ বলিয়া চিনিতে পারিয়াছিলেন৷ তাই তিনি ঠাকুর সম্বন্ধে ব্রাহ্মণীর সকল কথাই হূদয়ের সহিত অনুমোদন করিয়া বলিলেন–প্রধান প্রধান যে ঊনবিংশ প্রকার ভাব বা অবস্থার সম্মিলনকে ভক্তিশাস্ত্র ‘মহাভাব’ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন এবং যাহা কেবল একমাত্র ভাবময়ী শ্রীরাধিকা ও ভগবান শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনেই এ পর্যন্ত লক্ষিত হইয়াছে, কি আশ্চর্য, তাহার সকল লক্ষণগুলিই ইঁহাতে প্রকাশিত বোধ হইতেছে৷ জীবের শরীর এই উনিশ প্রকার ভাবের উদ্দাম বেগ কখনই ধারণ করিতে সমর্থ হয় নাই এবং শাস্ত্র বলেন পরেও ধারণে সমর্থ হইবে না৷ মথুর প্রভৃতি উপস্থিত সকলে বৈষ্ণবচরণের কথা শুনিয়া একেবারে অবাক৷ ঠাকুরও স্বয়ং বালকের ন্যায় বিস্ময় ও আনন্দে মথুরকে বলিলেন, ‘‘ওগো, বলে কি? যা হোক বাপু, রোগ নয় শুনে মনটায় আনন্দ হচ্ছে৷’’
বৈষ্ণবচরণ ঠাকুরের নিকট কিছুদিন যাতায়াত করিতে না করিতেই ইঁদেশের গৌরী পণ্ডিত দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ গৌরী একজন বিশিষ্ট তান্ত্রিক সাধক ছিলেন৷ গৌরীর একটি সিদ্ধাই বা তপস্যালব্ধ ক্ষমতাও ছিল৷ গৌরীর দক্ষিণেশ্বরে আগমনের কয়েকদিন পরেই মথুরবাবু বৈষ্ণবচরণ প্রমুখ কয়েকজন সাধক–পণ্ডিতদের আহ্বান করিয়া একটি সভার অধিবেশন করিলেন৷ প্রাতেই সভা আহূত হয়৷ স্থান–শ্রীশ্রীকালীমাতার মন্দিরের সম্মুখে নাটমন্দির৷ বৈষ্ণবচরণ কলকাতা হইতে আসিয়া ঠাকুরের পদপ্রান্তে প্রণত হইবামাত্র ঠাকুর ভাবে প্রেমে সমাধিস্থ হইয়া বৈষ্ণবচরণের স্কন্ধদেশে বসিয়া পড়িলেন৷ বৈষ্ণবচরণও আনন্দে উল্লসিত হইয়া তদ্দণ্ডেই রচনা করিয়া সংস্কৃত ভাষায় ঠাকুরের স্তব করিতে লাগিলেন৷ সভার কার্য আরম্ভ হইতেই গৌরী প্রথমে বলিয়া উঠিলেন, (ঠাকুরকে দেখাইয়া) ‘‘উনি যখন পণ্ডিতজীকে এরূপ কৃপা করিলেন, তখন আজ আর আমি উঁহার (বৈষ্ণবচরণের) সহিত বাদে প্রবৃত্ত হইব না৷ বিশেষত উনি তো দেখিতেছি আমারই মতের লোক–ঠাকুরের সম্বন্ধে উঁহারও যাহা ধারণা, আমারও তাহাই৷ অতএব এস্থলে তর্ক নিষ্প্রয়োজন৷’’ অতঃপর শাস্ত্রীয় অন্যান্য কথাবার্তায় কিছুক্ষণ সময় কাটাইয়া সভাভঙ্গ হইল৷ ইহার কিছুদিন পরেই ঠাকুর একদিন গৌরীর মন পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘আচ্ছা বৈষ্ণবচরণ (নিজ শরীর দেখাইয়া) একে অবতার বলে এটা কি হতে পারে? তোমার কি বোধ হয় বল দেখি?’’ গৌরী তাহাতে গম্ভীরভাবে উত্তর করিলেন, ‘‘বৈষ্ণবচরণ আপনাকে অবতার বলে? তবে তো ছোট কথা বলে৷ আমার ধারণা, যাঁহার অংশ হইতে যুগে যুগে অবতারেরা লোককল্যাণসাধনে জগতে অবতীর্ণ হইয়া থাকেন, যাঁহার শক্তিতে তাঁহারা ঐ কার্য সাধন করেন, আপনি তনিই৷’’ ঠাকুর শুনিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘‘ও বাবা তুমি যে আবার তাকেও ছাড়িয়ে যাও কেন বল দেখি? আমাতে কি দেখেছ, বল দেখি?’’ গৌরী বলিলেন, ‘‘শাস্ত্রপ্রমাণে এবং নিজের প্রাণের অনুভব হইতেই বলিতেছি৷ এ বিষয়ে যদি কেহ বিরুদ্ধ পক্ষাবলম্বনে আমার সহিত বাদে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে আমি আমার ধারণা প্রমাণ করিতেও প্রস্তুত আছি৷’’ ঠাকুর বালকের ন্যায় বলিলেন, ‘‘তোমরা সব এতকথা বল, কে জানে বাপু, আমি তো কিছু জানি না৷’’
দিন দিন গৌরী ঠাকুরের প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন৷ এবং তাঁহার মন পাণ্ডিত্য, লোকমান্য, সিদ্ধাই প্রভৃতি সকল বস্তুর প্রতি বীতরাগ হইয়া ঈশ্বরের শ্রীপাদপদ্মে গুটাইয়া আসিতে লাগিল৷ তাঁহার মনে এখন সঙ্কল্প স্থির–সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া ব্যাকুল অন্তরে তাঁহাকে ডাকিয়া দিন কয়টা কাটাইয়া দিবেন৷ শুভমুহূর্তের উদয় জানিয়া ঠাকুরের শ্রীপদে প্রণাম করিয়া সজল–নয়নে বিদায় প্রার্থনা করিলেন৷ ঠাকুর বলিলেন, ‘‘সে কি গৌরি, সহসা বিদায় কেন? কোথায় যাবে?’’ গৌরী করজোড়ে উত্তর করিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করুন যেন অভীষ্ট সিদ্ধ হয়৷ ঈশ্বরবস্তু লাভ না করিয়া আর সংসারে ফিরিব না৷’’ তদবধি সংসারে আর কখনও কেহ বহু অনুসন্ধানেও গৌরী পণ্ডিতের দেখা পান নাই৷
তন্ত্রের নিগূঢ়তত্ত্ব উদ্ঘাটনের জন্য এবং তন্ত্রের মর্যাদা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যেই ভোগমদিরামত্ত ঊনবিংশ শতাব্দীতে শ্রীরামকৃষ্ণ তন্ত্রোক্ত সাধনায় নিমগ্ণ হইয়াছিলেন৷ রূপ–রসাদি যে–সকল পদার্থ মানবসাধারণকে প্রলোভিত করিয়া পুনঃপুনঃ জন্মমরণাদি অনুভব করাইতেছে এবং ঈশ্বরলাভ ও আত্মজ্ঞানের অধিকারী হইতে দিতেছে না, সংযম সহায়ে বারংবার উদ্যম ও চেষ্টার দ্বারা সেই সকলকে ঈশ্বরের মূর্তি বলিয়া অবধারণ করিতে সাধককে অভ্যস্ত করানই তান্ত্রিকী ক্রিয়াসকলের উদ্দেশ্য৷ সাধকের সংযম এবং সর্বভূতে ঈশ্বর ধারণার তারতম্য বিচার করিয়াই তন্ত্র পশু, বীর ও দিব্যভাবের অবতারণা করিয়াছেন৷১ বেদান্তোক্ত উত্তম অধিকারীই তন্ত্রোক্ত দিব্যভাবের ভাবুক, মধ্যম অধিকারী বীরভাবের এবং অধমাধিকারী পশুভাবের সাধক৷ কঠোর সংযমকে ভিত্তিস্বরূপে অবলম্বনপূর্বক তন্ত্রোক্ত সাধনসমূহে প্রবৃত্ত হইলে ফল প্রত্যক্ষ হইবে নতুবা নহে, একথা লোকে কালধর্মে প্রায় বিস্মৃত হইয়াছিল এবং তাহাদিগের অনুষ্ঠিত কুক্রিয়াসকলের জন্য তন্ত্রশাস্ত্রই দায়ী স্থির করিয়া সাধারণে তাহার নিন্দাবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিল৷ অতএব রমণীমাত্রে মাতৃভাবে পূর্ণহূদয় ঠাকুরের এই সকল অনুষ্ঠানের সাফল্য দেখিয়া যথার্থ সাধককুল কোন্ লক্ষ্যে চলিতে হইবে তাহার নির্দেশলাভপূর্বক যেমন উপকৃত হইয়াছে, তন্ত্রশাস্ত্রের প্রামাণ্যও তেমনি সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া ঐ শাস্ত্র মহিমান্বিত হইয়াছে৷
ঠাকুরের ন্যায় উত্তমাধিকারীকে শিক্ষাদানের অবসর পাইয়া ব্রাহ্মণীর হূদয় আনন্দে পূর্ণ হইয়া উঠিল৷ কিন্তু কেবলমাত্র ব্রাহ্মণীর আগ্রহ ও উত্তেজনা তাঁহাকে ঐ বিষয়ে (তন্ত্রসাধনায়) নিযুক্ত করে নাই৷ সাধনপ্রসূত যোগদৃষ্টিপ্রভাবে তিনি এখন প্রাণে প্রাণে বুঝিতে পারিলেন–শাস্ত্রীয় প্রণালী অবলম্বনে শ্রীশ্রীজগন্মাতাকে প্রত্যক্ষ করিবার অবসর উপস্থিত হইয়াছে৷ শ্রীশ্রীজগন্মাতার ইঙ্গিতে ঠাকুর এখন সর্বস্ব ভুলিয়া সাধনায় মগ্ণ হইলেন এবং প্রজ্ঞাসম্পন্না কর্মকুশলা ব্রাহ্মণী তান্ত্রিক ক্রিয়োপযোগী পদার্থসকল সংগ্রহপূর্বক উহাদিগের প্রয়োগ সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করিয়া তাঁহাকে সহায়তা করিতে অশেষ প্রয়াস করিতে লাগিলেন৷ মনুষ্য প্রভৃতি পঞ্চপ্রাণীর (শিবা–সর্প–সারমেয়–) মস্তককঙ্কাল গঙ্গাহীন প্রদেশ হইতে সযত্নে সমাহূত হইয়া ঠাকুরবাটির উদ্যানে উত্তর সীমান্তে অবস্থিত বিল্বতরুমূলে এবং ঠাকুরের স্বহস্তপ্রোথিত পঞ্চবটীতলে সাধকানুকূল দুইটি বেদিকা নির্মিত হইল এবং প্রয়োজনমত ঐ মুণ্ডাসনদ্বয়ের অন্যতরের উপরে উপবিষ্ট হইয়া জপ, পুরশ্চরণ ও ধ্যানাদিতে ঠাকুরের কাল কাটিতে লাগিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘এইকালে দর্শনের পর দর্শন, অনুভবের পর অনুভব অদ্ভুত অদ্ভুত সব কতই যে প্রত্যক্ষ করিয়াছি তাহার ইয়ত্তা নাই৷ বিষ্ণুক্রান্তায় প্রচলিত চৌষট্টিখানা তন্ত্রে যত কিছু সাধনার কথা আছে, সকলগুলিই ব্রাহ্মণী একে একে অনুষ্ঠান করাইয়াছিল৷ কঠিন কঠিন সাধন–যাহা করিতে যাইয়া অধিকাংশ সাধক পথভ্রষ্ট হয়, শ্রীশ্রীজগদম্বার কৃপায় সে–সকলে উত্তীর্ণ হইয়াছি৷’’ ঠাকুর আরও বলিতেন, সাধনসকলের কোনটিতে সাফল্যলাভ করিতে তাঁহার তিন দিনের অধিক সময় লাগে নাই৷
তন্ত্রোক্তসাধনকাল হইতে ঠাকুরের সুষুম্নাদ্বার পূর্ণভাবে উন্মোচিত হইয়া, তাঁহাকে বালকবৎ অবস্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিয়াছিল৷ এই কালের শেষভাগ হইতে তিনি পরিহিত বস্ত্র ও যজ্ঞসূত্রাদি চেষ্টা করিলেও অঙ্গে ধারণ করিয়া রাখিতে পারিতেন না৷ শ্রীশ্রীজগদম্বার শ্রীপাদপদ্মে মন সতত নিবিষ্ট থাকাবশত তাঁহার শরীরবোধ না থাকাই যে উহারহেতু, তাহা আর বলিতে হইবে না৷ ঠাকুর বলিতেন, ঐ সকল সাধনশেষে তাঁহার সকল পদার্থে অদ্বৈতবুদ্ধি এত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছিল যে, বাল্যাবধি তিনি যাহাকে হেয় নগণ্য বস্তু বলিয়া পরিগণনা করিতেন, তাহাকেও মহাপবিত্র বস্তুসকলের সহিত তুল্য দেখিতেন বলিতেন–তুলসী ও সজিনা গাছের পত্র সমভাবে পবিত্র বোধ হইত৷ তন্ত্রসাধন প্রভাবে দিব্যশক্তিলাভ করিয়া ঠাকুরের অন্য এক বিষয়ে উপলব্ধি হইয়াছিল৷ শ্রীশ্রীজগদম্বার প্রসাদে তিনি জানিতে পারিয়াছিলেন, উত্তর কালে বহু ব্যক্তি তাঁহার নিকটে ধর্মলাভের জন্য উপস্থিত হইয়া কৃতার্থ হইবে৷ পরম অনুগত শ্রীযুত মথুর ও হূদয় প্রভৃতিকে তিনি ঐ উপলব্ধির কথা বলিয়াছিলেন৷ মথুর তাহাতে বলিয়াছিলেন, ‘‘বেশ তো, বাবা, সকলে মিলিয়া তোমাকে লইয়া আনন্দ করিব৷’’
১ পশুভাবের সাধকে কামক্রোধাদি পশুভাবের আধিক্য থাকে৷ তজ্জন্য সর্বপ্রকার প্রলোভনের বস্তু হইতে দূরে থাকিয়া বাহ্যিক শৌচাচার প্রভৃতির প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়া উক্ত সাধক ভগবানের নাম জপ পুরশ্চরণাদিতে প্রবৃত্ত থাকিবেন৷
বীরভাবের সাধকে ঈশ্বরানুরাগ প্রবল থাকে৷ কাম–রূপ–রসাদির আকর্ষণ তাঁহার ভিতর ঈশ্বরানুরাগকেই প্রবলতর করিয়া দেয়৷ সেইজন্য নানা প্রলোভনের মধ্যে বাস করিয়াও অবিচলিত থাকিয়া তিনি ঈশ্বরে সমগ্র মন–প্রাণ অর্পণ করিতে চেষ্টা করিবেন৷
দিব্যভাবের সাধক কেবলমাত্র তিনিই হইতে পারেন যাঁহাতে ঈশ্বরানুরাগের প্রবল প্রবাহে কামক্রোধাদি একেবারে চিরকালের মতো ভাসিয়া গিয়াছে এবং ক্ষমা–দয়া–সত্যাদি সদ্গুণসমূহের অনুষ্ঠান স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে৷
আমরা ইতঃপূর্বে বলিয়াছি রানী রাসমণির মৃত্যুর পর হইতে মথুরবাবু ঠাকুরের সেবাধিকার পূর্ণভাবে লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছিলেন এবং দক্ষিণেশ্বর কালীবাটিতে শ্রীশ্রীজগদম্বার সেবার কিছুমাত্র ত্রুটি পরিলক্ষিত হইত না৷ শ্রীরামকৃষ্ণগতপ্রাণ্ মথুরামোহন ঐ সেবার জন্য নিয়মিত ব্যয় করিতে কুণ্ঠিত হওয়া দূরে থাকুক, অনেক সময় ঠাকুরের নির্দেশে ঐ বিষয়ে তদপেক্ষা অধিক ব্যয় করিতেন৷ রানী রাসমণির কালীবাটির অদ্ভুত আতিথেয়তার কথা সাধুভক্তগণ মধ্যে সর্বত্র প্রচারিত হইয়াছিল এবং তাঁহার জীবৎকাল হইতেই কালীবাটি তীর্থপর্যটনশীল সাধু পরিব্রাজকগণের নিকটে পথিমধ্যে কয়েকদিন বিশ্রামলাভের স্থানবিশেষ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকিলেও, এখন উহার সুনাম চারিদিকে সমধিক প্রসারিত হইয়া পড়ে এবং সর্বসম্প্রদায়ভুক্ত সাধকাগ্রণী সকলে ঐ স্থানে উপস্থিত ও আতিথ্যগ্রহণে পরিতৃপ্ত হইয়া উহার সেবা–পরিচালককে আশীর্বাদপূর্বক গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘এক এক সময়ে এক এক রকমের সাধুর ভিড় লেগে যেত৷ এক সময়ে সন্ন্যাসী পরমহংসই যত আসতে লাগল৷ পেট বৈরাগীর দল নয়–সব ভাল ভাল লোক৷ (নিজের ঘর দেখাইয়া) ঘরে দিনরাত্তির তাদের ভিড় লেগেই থাকত৷ আর দিবারাত্রির ব্রহ্ম ও মায়ার স্বরূপ, অস্তি, ভাতি, প্রিয়–এইসব বেদান্তের কথাই চলত৷’’ তিনি যুবক ভক্তগণকে আরও বলিতেন, ‘‘কেশব সেনের আসবার পর থেকে তোদের মতো ‘ইয়ং বেঙ্গলের’ দলই সব এখানে আসতে সুরু করেছেন৷ আগে আগে এখানে কত যে সাধু সন্ত, ত্যাগী, সন্ন্যাসী, বৈরাগী বাবাজি সব আসত, তা তোরা কি জানবি? রেল হবার পর থেকে তারা সব আর এদিকে আসে না৷’’ ঠাকুরের নিকটে একই সম্প্রদায়ের সাধককুল না আসিয়া যে সকল সম্প্রদায়ের সাধকেরাই দলে দলে আসিয়াছিলেন, তাহার কারণ, তিনি তত্তৎ সকল পথ দিয়াই অগ্রসর হইয়া তত্ত্বৎ ঈশ্বরীয় ভাবের সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিলেন এবং ঐ ঐ পথের সংবাদ বিশেষরূপে বলিতে পারিতেন৷ প্রত্যেকেই ঠাকুরের দিব্য সঙ্গগুণে নিজ নিজ পথে অধিকতর অগ্রসর হইয়াছিলেন এবং ঐ পথ দিয়া চলিলে যে কালে ঈশ্বরকে নিশ্চয় লাভ করিবেন, ইহাও ধ্রুবসত্যরূপে বুঝিতে পারিয়াছিলেন৷
দক্ষিণেশ্বরে তখন যে–সকল সাধক পণ্ডিত ঠাকুরের নিকটে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের ভিতর কেহ কেহ আবার ভক্তির আতিশয্যে ঠাকুরের নিকট হইতে দীক্ষা এবং সন্ন্যাস পর্যন্ত লইয়া চলিয়া গিয়াছিলেন৷ পণ্ডিত নারায়ণ শাস্ত্রী উঁহাদেরই অন্যতম৷ নারায়ণ শাস্ত্রী প্রাচীন যুগের নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারীদিগের ন্যায় গুরুগৃহে অবস্থান করিয়া একাদিক্রমে পঁচিশ বৎসর স্বাধ্যায় বা নানা শাস্ত্র পাঠ করিয়াছিলেন৷ সাত বৎসরকাল নবদ্বীপে থাকিয়া ন্যায়ের পাঠ সাঙ্গ করেন এবং দক্ষিণেশ্বর দর্শনে আসিয়া ঠাকুরের দর্শন লাভ করেন৷ শাস্ত্রীজী এখানে কিছুকাল কাটাইয়া যাবেন স্থির করিলেন৷ ঠাকুরের সহিত যতই পরিচয় হইতে লাগিল, ততই তাঁহার প্রতি কেমন একটা ভক্তি ভালবাসার উদয় হইয়া তাঁহাকে আরও বিশেষভাবে দেখিতে জানিতে ইচ্ছা শাস্ত্রীর দিন দিন প্রবল হইতে লাগিল৷ দিনের পর দিন যতই যাইতে লাগিল, শাস্ত্রীর বৈরাগ্য ব্যাকুলতাও ততই ঠাকুরের দিব্যসঙ্গে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল৷ পাণ্ডিত্যাভিমান, প্রতিষ্ঠা–যশ–লিপ্সা–এ–সকল বাসনা তাঁহার মন হইতে একেবারে অন্তর্হিত হইয়া গেল৷ শাস্ত্রী যথার্থ দীনভাবে শিষ্যের ন্যায় ঠাকুরের নিকট থাকেন এবং তাঁহার অমৃতময়ী বাক্যাবলি একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করিয়া ভাবেন, ‘‘উপনিষদ্কার তো বলিয়াছেন এরূপ মহাপুরুষ সিদ্ধসঙ্কল্প হন ইঁহাদের ঠিক ঠিক কৃপালাভ করিতে পারিলে মানবের সংসার–বাসনা মিটিয়া যাইয়া ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হয়৷ ইঁহারই কেন শরণ গ্রহণ করি না?’’ সুযোগ বুঝিয়া শাস্ত্রীজী একদিন ঠাকুরকে নির্জনে পাইয়া নিজ মনোভাব প্রকাশ করিলেন এবং ‘নাছোড়বান্দা’ হইয়া ধরিয়া বসিলেন তাঁহাকে সন্ন্যাসদীক্ষা দিতে হইবে৷ ঠাকুরও তাঁহার আগ্রহাতিশয্যে সম্মত হইয়া শুভদিনে তাঁহাকে ঐ দীক্ষা প্রদান করিলেন৷ সন্ন্যাসগ্রহণ করিয়াই শাস্ত্রী আর কালীবাটিতে রহিলেন না৷ বশিষ্ঠাশ্রমে বসিয়া সিদ্ধকাম না হওয়া পর্যন্ত ব্রহ্মোপলব্ধির চেষ্টায় প্রাণপাত করিবেন বলিয়া ঠাকুরের নিকট মনোগত অভিপ্রায় জানাইলেন এবং সজলনয়নে তাঁহার আশীর্বাদ ভক্ষা ও শ্রীচরণবন্দনান্তে চিরদিনের মতো দক্ষিণেশ্বর পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন৷ ইহার পর নারায়ণ শাস্ত্রীর কোন সংবাদ পাওয়া যায় নাই৷
যথার্থ সাধক, সাধু বা ভগবদ্ভক্ত, যে–কোন সম্প্রদায়ের হউক না কেন, কোন স্থানে বাস করিতেছেন শুনিলেই ঠাকুর তাঁহাকে দর্শন করিতে যাইতেন এবং অযাচিত হইয়াও তাঁহার সহিত ভগবৎপ্রসঙ্গে কিছুকাল কাটাইয়া আসিতেন৷ শাস্ত্রজ্ঞ সাধক পণ্ডিতদিগের কথা শুনিলেও তিনি অনেক সময় ঐরূপ ব্যবহার করিতেন৷ বর্ধমান–রাজসভা–প্ পদ্মলোচন, আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রভৃতি অনেককে ঠাকুর ঐভাবে দর্শন করিতে গিয়াছিলেন৷ তন্ত্র ও ন্যায়ের রঙ্গভূমি বঙ্গে ঠাকুরের আবির্ভাবের পূর্বে বেদান্তচর্চা বিরল থাকিলেও কেহ কেহ যে উহার উদার মীমাংসাসকলের অনুশীলনে আকৃষ্ট হইতেন না, তাহা নহে৷ পণ্ডিত পদ্মলোচন ঐ ব্যক্তিগণের মধ্যে অন্যতম৷ ন্যায়ে ব্যুৎপত্তিলাভ করিবার পর নকাশীধামে গুরুগৃহে বাস করিয়া তিনি দীর্ঘকাল বেদান্তচর্চায় কালাতিপাত করেন৷ দেশে আগমনের পর বর্ধমান রাজাধিপের দ্বারা আহূত হইয়া তদীয় সভাপণ্ডিতের পদ গ্রহণ করেন এবং তাঁহার সুযশ বঙ্গের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়৷ হূদয় বলেন, প্রথম মিলন হইতেই পণ্ডিতজী ঠাকুরকে অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অবস্থায় উপনীত মহাপুরুষ বলিয়া ধারণা করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘পদ্মলোচন অত বড় পণ্ডিত হয়েও এখানে (আমাতে) এতটা বিশ্বাস ভক্তি করত বলেছিল–‘আমি সব পণ্ডিতদের ডাকিয়ে সভা করে সকলকে বলব, তুমি ঈশ্বরাবতার আমার কথা কে কাটতে পারে দেখব’৷’’ মথুরবাবু (এক সময় অন্য কারণে) যত পণ্ডিতদের ডাকিয়া দক্ষিণেশ্বরে এক সভার আয়োজন করিয়াছিলেন, মথুরবাবুর আহূত সভায় কিন্তু পণ্ডিতজীকে যাইতে হয় নাই৷ সভা আহূত হইবার পূর্বেই তাঁহার শারীরিক অসুস্থতা বিশেষ বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সজলনয়নে ঠাকুরের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া নকাশীধামে গমন করেন৷ শুনা যায়, সেখানে অল্পকাল পরেই তাঁহার শরীরত্যাগ হয়৷
পদ্মলোচন ভিন্ন আরও অনেক খ্যাতনামা পণ্ডিতদিগের সহিত ঠাকুরের সময়ে সময়ে সাক্ষাৎ হইয়াছিল৷ আর্যমত প্রবর্তক স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী যখন বঙ্গদেশে বেড়াইতে আসিয়া কলকাতার উত্তরে বরাহনগরে সিঁথি নামক পল্লিতে জনৈক ভদ্রলোকের উদ্যানে বাস করিতেছিলেন, তখন ঠাকুর একদিন ঐস্থানে তাঁহাকে দেখিতে গিয়াছিলেন৷ জয়নারায়ণ পণ্ডিতের সম্বন্ধে ঠাকুর বলিতেন, অত বড় পণ্ডিত, কিন্তু অহংকার ছিল না৷ আড়িয়াদহ নিবাসী কৃষ্ণকিশোর ভট্টাচার্যের শ্রীরামচন্দ্রের পরম ভক্তির কথা ঠাকুর অনেক সময় উল্লেখ করিতেন৷ পূর্বোক্ত সাধকগণ ভিন্ন, ঠাকুর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কালনায় ভগবানদাস বাবাজি প্রভৃতিকেও দেখিতে গিয়াছিলেন এবং মহর্ষির উদার ভক্তি, ঈশ্বরচন্দ্রের কর্মযোগপরায়ণতা ও ভগবানদাস বাবাজির আধ্যাত্মিকতা দর্শনে মুগ্ধ হইয়াছিলেন৷
১৮৬৪–১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময়ে জটাধারী নামক জনৈক রামভক্ত বাবাজি দক্ষিণেশ্বরে আগমন করেন৷ বালক রামচন্দ্রের মূর্তিই তাঁহার সমধিক প্রিয় ছিল৷ ঐ মূর্তির বহুকাল সেবায় তাঁহার মন ভাবরাজ্যে আরূঢ় হইয়া এতদূর অন্তর্মুখ ও তন্ময়াবস্থাপ্রাপ্ত হইয়াছিল যে, দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকটে আসিবার পূর্বেই তিনি দেখিতে পাইতেন, শ্রীরামচন্দ্রের জ্যোতিঃঘন বালবিগ্রহ সত্যসত্যই তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইয়া তাঁহার ভক্তিপূত সেবা গ্রহণ করিতেছেন৷ ভাবরাজ্যের অদ্বিতীয় অধীশ্বর ঠাকুরের দৃষ্টি কিন্তু তাঁহার সহিত প্রথম সাক্ষাতেই স্থূল যবনিকার অন্তরাল ভেদ করিয়া অন্তরের গূঢ় রহস্য অবধারণ করিয়াছিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘সে বাবাজি ঐ ঠাকুরটির চিরকাল সেবা করত৷ যেখানে যেত, সঙ্গে করে নিয়ে যেত৷ যা ভিক্ষা পেত, রেঁধে বেড়ে তাকে ভোগ দিত৷ শুধু তাই নয়–সে দেখতে পেত রামলালা সত্যসত্যই খাচ্ছে বা কোন একটা জিনিস খেতে চাচ্ছে, বেড়াতে যেতে চাচ্ছে, আবদার করছে ইত্যাদি৷ আর ঐ ঠাকুরটি নিয়েই সে আনন্দে বিভোর, ‘মত্ত’ হয়ে থাকত৷ আমিও দেখতে পেতুম, রামলালা ঐরকম সব কচ্ছে৷ আর রোজ সেই বাবাজির কাছে চব্বিশ ঘণ্টা বসে থাকতুম–আর রামলালাকে দেখতুম৷’’ ‘‘ দিনের পর দিন যত যেতে লাগল, রামলালারও তত আমার উপর পিরিত বাড়তে লাগল৷ আমি যতক্ষণ বাবাজির কাছে থাকি, ততক্ষণ সেখানে সে বেশ থাকে–খেলাধূলা করে আর আমি যেই সেখান থেকে নিজের ঘরে চলে আসি, তখন সেও আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে৷ ... দেখতুম, সত্য সত্য দেখতুম–এই যেমন তোদের সব দেখছি, এই রকম দেখতুম–রামলালা সঙ্গে সঙ্গে কখনও আগে কখনও পিছনে নাচতে নাচতে আসছে৷ কখনও বা কোলে উঠবার জন্য আবদার কচ্ছে৷ আবার হয়তো কখনও বা কোলে করে রয়েছি–কিছুতেই কোলে থাকবে না, কোল থেকে নেমে রোদে দৌড়াদৌড়ি করতে যাবে, কাঁটা বনে গিয়ে ফুল তুলবে বা গঙ্গার জলে নেমে ঝাঁপাই ঝুড়বে৷’’ রামলালার অদ্ভুত আচরণের কথা বলিতে বলিতে ঠাকুর বলিতেন, ‘‘এক একদিন রেঁধে বেড়ে ভোগ দিতে বসে বাবাজি রামলালাকে দেখতেই পেত না৷ তখন মনে ব্যথা পেয়ে এখানে (ঠাকুরের ঘরে) ছুটে আসত এসে দেখত, রামলালা ঘরে খেলা করচে... এই রকমে দিন যেতে লাগল৷ সাধু এখানে অনেকদিন ছিল–কারণ রামলালা এখান (ঠাকুরকে) ছেড়ে যেতে চায় না–আর সেও চিরকালের আদরের রামলালাকে ফেলে যেতে পারে না৷ তারপর একদিন বাবাজি হঠাৎ এসে সজলনয়নে বললে, ‘রামলালা আমাকে কৃপা করে প্রাণের পিপাসা মিটিয়ে যেমনভাবে দেখতে চাইতাম তেমনি করে দর্শন দিয়েছে ও বলেছে, এখান থেকে যাব না তোমাকে ছেড়ে কিছুতেই যেতে চায় না৷ আমার আর এখন মনে দুঃখ–কষ্ট নাই৷ তোমার কাছে ও সুখে থাকে, আনন্দে খেলাধুলো করে, তাই দেখেই আমি আনন্দে ভরপুর হয়ে যাই৷ এখন আমার এমনটা হয়েছে যে ওর যাতে সুখ, তাতেই আমার সুখ সেজন্য আমি এখন একে তোমার কাছে রেখে অন্যত্র যেতে পারব৷ তোমার কাছে সুখে আছে ভেবে ধ্যান করেই আমার আনন্দ হবে৷’ এই বলে রামলালাকে আমায় দিয়ে বিদায় গ্রহণ করলে৷ সেই অবধি রামলালা এখানে রয়েছে৷’’১
১ [কুলদেবতা ‘রঘুবীরের পূজা ও সেবাদি যথারীতি সম্পন্ন করিবার জন্য ঠাকুর রামমন্ত্রে দীক্ষিত হইলেও, জটাধারীর আগমনকালে অন্তরের ভাবপ্রেরণায় গুরুমুখে যথাশাস্ত্র বাৎসল্যভাবসাধনোচ্ মন্ত্র গ্রহণপূর্বক উহার চরমোপলব্ধির জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন৷ গোপালমন্ত্রে সিদ্ধকাম জটাধারী তাঁহার ঐরূপ আগ্রহ জানিতে পারিয়া তাঁহাকে সাহ্লাদে নিজ ইষ্টমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়াছিলেন এবং ঠাকুর ঐ মন্ত্রসহায়ে তৎপ্রদর্শিত পথে সাধনায় নিমগ্ণ হইয়া কয়েকদিনের মধ্যেই যে শ্রীরামচন্দ্রের বালগোপালমূর্তির অনুক্ষণ দিব্যদর্শন লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন তাহাই সংক্ষেপে এস্থলে বর্ণিত হইয়াছে]
ঠাকুরের একাগ্রমনে যখন যে ভাবের উদয় হইত, তাহাতে তিনি কিছুকালের জন্য তন্ময় হইয়া যাইতেন৷ ঐ ভাব তখন তাঁহার মনে পূর্ণাধিকার স্থাপনপূর্বক অন্য সকল ভাবের লোপ করিয়া দিত এবং তাঁহার শরীরকে পরিবর্তিত করিয়া উহার প্রকাশানুরূপ যন্ত্র করিয়া তুলিত৷ শান্ত–দাস্যাদি ভাব–চতুষ্টয়–সাধন্ পর তিনি ভাবরাজ্যের সর্বোচ্চ ভূমি মধুরভাবসাধনের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন৷ এই ভাবসাধনে প্রবৃত্ত হইয়া ঠাকুর স্ত্রীজনোচিত বেশভূষা ধারণ করিলেন এবং ঐরূপ বেশভূষায় সজ্জিত হইয়া শ্রীহরির প্রেমৈকলোলুপা ব্রজরমণীর ভাবে ক্রমে এতদূর মগ্ণ হইলেন যে তাঁহার আপনাতে পুরুষবোধ এককালে অন্তর্হিত হইয়া প্রতি চিন্তা ও বাক্য রমণীর ন্যায় হইয়া উঠিল৷ মধুরভাব সাধনকালে তিনি ছয়মাসকাল রমণীর বেশ ধারণপূর্বক অবস্থান করিয়াছিলেন৷ শ্রীকৃষ্ণ দর্শন ও তাঁহাকে স্বীয় বল্লভরূপে প্রাপ্ত হইবার মানসে ঠাকুর এখন অনন্যচিত্তে শ্রীশ্রীযুগলপাদপদ্ম্ সেবায় রত হইলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ বিরহের প্রবল প্রভাবে এইকালে তাঁহার শরীরে লোমকূপ দিয়া সময়ে সময়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত নির্গমন হইত, দেহের প্রতি গ্রন্থি ভগ্ণপ্রায়, শিথিল লক্ষিত হইত এবং হূদয়ের অসীম যন্ত্রণায় ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব কার্য হইতে এককালে বিরত হওয়ায় দেহ কখনও কখনও মৃতের ন্যায় নিশ্চেষ্ট ও সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া থাকিত৷
মহাভাবস্বরূপিণী শ্রীমতী রাধারানীর কৃপা ভিন্ন শ্রীকৃষ্ণ দর্শন অসম্ভব জানিয়া ঠাকুর এখন তৎতচিত্তে তাঁহার উপাসনায় প্রবৃত্ত হইলেন এবং তাঁহার প্রেমঘনমূর্তির স্মরণ–মনন ও ধ্যানে নিরন্তর মগ্ণ হইয়া, তাঁহার শ্রীপাদপদ্মে হূদয়ের আকুল আবেগ অবিরাম নিবেদন করিতে লাগিলেন৷ ফলে, অচিরেই তিনি শ্রীমতী রাধারানীর দর্শলাভে কৃতার্থ হইলেন৷ অন্যান্য দেবদেবীসকলের দর্শনকালে ঠাকুর ইতঃপূর্বে যেরূপ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন, এই দর্শনকালেও সেইরূপে ঐ মূর্তি নিজাঙ্গে সম্মিলিত হইয়া গেল–এইরূপ অনুভব করিলেন৷ উক্ত দর্শনের পর হইতে ঠাকুর কিছুকালের জন্য আপনাকে শ্রীমতী বলিয়া নিরন্তর উপলব্ধি করিতে লাগিলেন৷ প্রকৃতি ভাবিতে ভাবিতে তিনি এইকালে এতদূর তন্ময় হইয়া গিয়াছিলেন যে স্বপ্ণে বা ভ্রমেও কখনও আপনাকে পুরুষ বলিয়া ভাবিতে পারিতেন না৷ ঠাকুরের পতিভাবে ঈশ্বরপ্রেম এখন পরিশুদ্ধ ও ঘনীভূত হওয়াতেই, তিনি পূর্বোক্ত প্রকারে ব্রজেশ্বরী শ্রীমতী রাধারানীর কৃপা অনুভব করিয়াছিলেন এবং ঐ প্রেমের প্রভাবে স্বল্পকাল পরেই সচ্চিদানন্দঘন বিগ্রহ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুণ্যদর্শনলাভ করিয়াছিলেন৷ দৃষ্ট মূর্তি অন্য সকলের ন্যায় তাঁহার শ্রীঙ্গে মিলিত হইয়াছিল৷ ঠাকুর বলিতেন–ঐকালে শ্রীকৃষ্ণ চিন্তায় সম্পূর্ণ তন্ময় হইয়া তিনি নিজ পৃথক অস্তিত্ববোধ হারাইয়া কখনও আপনাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিয়া বোধ করিয়াছিলেন, আবার কখনও বা আব্রহ্মস্তম্ব পর্যন্ত সকলকে শ্রীকৃষ্ণবিগ্রহ বলিয়া দর্শন করিয়াছিলেন৷
মধুরভাবে অবস্থানকালে ঠাকুরের আর একটি দর্শনের কথা এখানে উল্লেখ করিয়া আমরা বর্তমান প্রসঙ্গের উপসংহার করিব৷ ঐকালে বিষ্ণুমন্দিরের সম্মুখস্থ দালানে বসিয়া তিনি একদিন শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ শুনিতেছিলেন৷ শুনিতে শুনিতে ভাবাবিষ্ট হইয়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় মূর্তির সন্দর্শনলাভ করিলেন৷ পরে দেখিতে পাইলেন, ঐ মূর্তির পাদপদ্ম হইতে দড়ার মতো একটা জ্যোতি বহির্গত হইয়া প্রথমে ভাগবত গ্রন্থকে স্পর্শ করিল এবং পরে তাঁহার নিজ বক্ষঃস্থলে সংলগ্ণ হইয়া ঐ তিন বস্তুকে একত্র কিছুকাল সংযুক্ত করিয়া রাখিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘ঐরূপ দর্শন করিয়া তাঁহার মনে দৃঢ় ধারণা হইয়াছিল, ভাগবত, ভক্ত ও ভগবান–তিন প্রকার ভিন্নরূপে প্রকাশিত হইয়া থাকিলেও এক পদার্থ বা এক পদার্থের প্রকাশসম্ভূত৷ ভাগবত, ভক্ত ও ভগবান–তিনে এক, একে তিন৷’’
মধুরভাবে সিদ্ধ হইয়া ঠাকুর ভাবসাধনের চরমভূমিতে উপনীত হইয়াছিলেন৷ উহার পরে ঠাকুরের মনে সর্বভাবাতীত বেদান্ত–প্রসিদ্ধ অদ্বৈতভাবসাধনের প্রবল প্রেরণা আসিয়া উপস্থিত হয়৷ সে সম্বন্ধে ঠাকুর বলিতেন, ‘‘সমুদ্রের তীরে যে ব্যক্তি সর্বদা বাস করে, তাহার মনে যেমন কখনও কখনও বাসনার উদয় হয়, রত্নাকরের গর্ভে কত প্রকার রত্ন আছে তাহা দেখি, তেমনি মাকে পাইয়াও মার কাছে সর্বদা থাকিয়াও আমার তখন মনে হইত, অনন্তভাবময়ী অনন্তরূপিণী তাঁহাকে নানাভাবে ও নানারূপে দেখিব’’ শ্রীশ্রীজগদম্বার ইঙ্গিতেই যে ঠাকুর এখন অদ্বৈতসাধনে অগ্রসর হইয়াছিলেন ইহা পরিব্রাজকাচার্য শ্রীমৎ তোতাপুরীর দক্ষিণেশ্বর আগমন হইতেই সম্যক বুঝিতে পারা যায়৷ তোতাপুরী পুণ্যতোয়া নর্মদাতীরে বহুকাল একান্তবাসপূর্বক সাধন ভজনে নিমগ্ণ থাকিয়া নির্বিকল্প সমাধিপথে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করিয়াছিলেন৷ তাঁহার গুরুস্থান কুরুক্ষেত্রের নিকট লুধিয়ানা নামক স্থানে ছিল৷ তাঁহার গুরুও একজন বিখ্যাত যোগী পুরুষ ছিলেন এবং ঐস্থানে একটি মঠ স্থাপন করিয়াছিলেন৷ গুরুর দেহান্তে শ্রীমৎ তোতাপুরীই ঐ মঠের মোহন্ত পদে প্রতিষ্ঠিত হন৷ ব্রহ্মজ্ঞ হইবার পরে তাঁহার মনে কিছুকাল যদৃচ্ছা পরিভ্রমনের সঙ্কল্প উদিত হয় এবং উহার প্রেরণায় তিনি পূর্বভারতে আগমনপূর্বক তীর্থ হইতে তীর্থান্তরে ভ্রমণ করিতে থাকেন৷ তিনি সাগরসঙ্গমে স্নান ও পুরুষোত্তমক্ষেত্রে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের্ দর্শনান্তে ভারতের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে ফিরিবার কালে (ইং ১৮৬৪-১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে) দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হন৷ তিন দিবসের অধিক কাল একস্থানে যাপন করা তাঁহার নিয়ম ছিল না, ঐজন্য কালীবাটিতে তিনি দিবসত্রয় মাত্র অতিবাহিত করিবেন স্থির করিলেন৷ কালীবাটিতে আগমন করিয়া তোতাপুরী প্রথমেই ঘাটের সুবৃহৎ চাঁদনিতে আসিয়া উপস্থিত হন৷ ঠাকুর তখন তথায় অন্যমনে একপার্শ্বে বসিয়াছিলেন৷ তাঁহার তপোদীপ্ত ভাবোজ্জ্বল বদনের প্রতি দৃষ্টি পড়িবামাত্র শ্রীমৎ তো তা প্রাণে অনুভব করিলেন, ইনি সামান্য পুরুষ নহেন–বেদান্তসাধনের এরূপ উত্তমাধিকারী বিরল দেখিতে পাওয়া যায়৷ তন্ত্রপ্রাণ বঙ্গে বেদান্তের এরূপ অধিকারী আছে ভাবিয়া তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হইলেন এবং ঠাকুরকে বিশেষভাবে নিরীক্ষণপূর্বক স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘তোমাকে উত্তম অধিকারী বলিয়া বোধ হইতেছে, তুমি বেদান্ত সাধন করিবে?’’ জটাজূটধারী দীর্ঘবপু উলঙ্গ সন্ন্যাসীর ঐ প্রশ্ণে ঠাকুর উত্তর করিলেন, ‘‘কি করিব না করিব, আমি কিছুই জানি না–আমার মা সব জানেন, তিনি আদেশ করিলে করিব৷’’ শ্রীমৎ তোতা বলিলেন, ‘‘তবে যাও তোমার মাকে ঐ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়া আইস৷ কারণ আমি এখানে দীর্ঘকাল থাকিব না৷’’ ঠাকুর ঐ কথায় আর কোন উত্তর না করিয়া ধীরে ধীরে নজগদম্বার মন্দিরে উপস্থিত হইলেন এবং ভাবাবিষ্ট হইয়া শ্রীশ্রীজগন্মাতার বাণী শুনিতে পাইলেন, ‘‘যাও শক্ষা কর, তোমাকে শিখাইবার জন্যই সন্ন্যাসীর এখানে আগমন হইয়াছে৷’’ অর্ধবাহ্যভাবাবিষ্ট ঠাকুর তখন হর্ষোৎফুল্ল বদনে তোতাপুরী গোস্বামীর সমীপে আসিয়া তাঁহার মাতার ঐরূপ প্রত্যাদেশ নিবেদন করিলেন৷ মন্দিরাভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠাতা নদেবীকেই ঠাকুর প্রেমে ঐরূপে মাতৃসম্বোধনে করিতেছেন বুঝিয়া শ্রীমৎ তোতা তাঁহার বালকের ন্যায় সরলভাবে মুগ্ধ হইলেও তাঁহার ঐ প্রকার আচরণ অজ্ঞতা ও কুসংস্কার নিবন্ধন বলিয়া ধারণা করিলেন৷ সে যাহা হউক, তাঁহার নিকট দীক্ষিত হইয়া জ্ঞানমার্গের সাধনে প্রবৃত্ত হইলে ঠাকুরের মনের পূর্বোক্ত সংস্কার দূর হইবে ভাবিয়া তোতা তাঁহাকে ঐ সম্বন্ধে আর কিছু এখন না বলিয়া অন্য কথার অবতারণা করিলেন এবং বলিলেন–বেদান্তসাধনে উপদিষ্ট ও প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে তাঁহাকে শিখাসূত্র পরিত্যাগপূর্বক যথাশাস্ত্র সন্ন্যাস গ্রহণ করিতে হইবে৷ ঠাকুর উহাতে বলিলেন, নগোপনে করিলে যদি হয় তাহা হইলে সন্ন্যাস গ্রহণ করিতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই৷ কিন্তু প্রকাশ্যে ঐরূপ করিয়া তাঁহার শোকসন্তপ্তা বৃদ্ধা জননীর প্রাণে আঘাত প্রদান করিতে তিনি কিছুতেই সমর্থ হইবেন না৷’’ পুরী গোস্বামীজী ঠাকুরের ঐরূপ অভিপ্রায়ের কারণ বুঝিতে পারিলেন এবং ‘‘উত্তম কথা, শুভ মুহূর্ত উপস্থিত হইলে তোমাকে গোপনেই দীক্ষিত করিব’’ বলিয়া পঞ্চবটীতলে আগমনপূর্বক আসন বিস্তীর্ণ করিলেন৷
অনন্তর শুভদিনের উদয় জানিয়া শ্রীমৎ তোতা ঠাকুরকে পিতৃপুরুষগণের তৃপ্তির জন্য শ্রাদ্ধাদিক্রিয়া সম্পন্ন করিতে আদেশ করিলেন এবং ঐ কার্য সমাধা হইলে শিষ্যের নিজ আত্মার তৃপ্তির জন্য যথাবিধানে পিণ্ডদান করাইলেন৷ শ্রাদ্ধাদি সমাপনান্তে তিনি পঞ্চবটীস্থ নিজ সাধনকুটিরে গুরুনির্দিষ্ট দ্রব্যসকল আহরণ করিয়া সানন্দে শুভ মুহূর্তের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন৷ অনন্তর রাত্রি অবসানে শুভ ব্রাহ্মমুহূর্তের উদয় হইলে, গুরু ও শিষ্য উভয়ে কুটিরে সমাগত হইলেন৷ পূর্বকৃত্য সমাপ্ত হইল, হোমাগ্ণি প্রজ্বলিত হইল এবং ঈশ্বরার্থে সর্বস্ব ত্যাগরূপ যে ব্রত সনাতন কাল হইতে গুরুপরম্পরাগত হইয়া ভারতকে এখনও ব্রহ্মজ্ঞ পদবীতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখিয়াছে, সেই ত্যাগব্রতাবলম্বনে পূর্বোচ্চার্য মন্ত্রসকলের পূতগম্ভীর ধ্বনিতে পঞ্চবটী উপবন মুখরিত হইয়া উঠিল৷ গুরু মন্ত্রপাঠে প্রবৃত্ত হইলেন শিষ্য অবহিত চিত্তে তাঁহাকে অনুসরণপূর্বক সেই সকল কথা উচ্চারণ করিয়া সমিদ্ধ হূতাশনে আহূতি প্রদান করিতে লাগিলেন৷ বহু আহুতি প্রদত্ত হইবার পর ‘ভূরাদি লোক লাভের প্রত্যাশা আমি এইক্ষণ হইতে ত্যাগ করিলাম’ এবং ‘জগতের সর্বভূতকে অভয় প্রদান করিতেছি’–বলিয়া হোম পরিসমাপ্ত হইল৷ অনন্তর শিখাসূত্র যথাবিধানে আহুতি দিয়া আবহমান কাল হইতে সাধকপরম্পরানিষেব্ গুরুপ্রদত্ত কৌপীন, কাষায় ও নামে ভূষিত হইয়া ঠাকুর শ্রীমৎ তোতার নিকট উপদেশ গ্রহণের জন্য উপবিষ্ট হইলেন৷
অনন্তর ব্রহ্মজ্ঞ তোতা ঠাকুরকে বেদান্তপ্রসিদ্ধ ‘নেতি নেতি’ উপায়াবলম্বনপূর্বক্ ব্রহ্মস্বরূপে অবস্থানের জন্য উৎসাহিত করিতে লাগিলেন৷ বলিলেন, ‘‘নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত স্বভাব, দেশকালাদি দ্বারা অপরিচ্ছিন্ন একমাত্র ব্রহ্মবস্তুই নিত্য সত্য৷ অঘটন–ঘটন–পটীয়্ মায়া নিজ প্রভাবে তাহাকে নামরূপের দ্বারা খণ্ডিতবৎ প্রতীত করাইলেও তিনি বাস্তবিক ঐরূপ নহেন৷ কারণ সমাধিকালে মায়াজনিত দেশকাল বা নামরূপের বিন্দুমাত্র উপলব্ধি হয় না৷ অতএব নামরূপের সীমার মধ্যে যাহা কিছু অবস্থিত তাহা কখনও নিত্যবস্তু হইতে পারে না৷ নামরূপের দৃঢ়পিঞ্জর সিংহবিক্রমে ভেদ করিয়া নির্গত হও৷ আপনাতে অবস্থিত আত্মতত্ত্বের অন্বেষণে ডুবিয়া যাও৷ সমাধিসহায়ে তাঁহাতে অবস্থান কর দেখিবে, নামরূপাত্মক জগৎ তখন কোথায় লুপ্ত হইবে ক্ষুদ্র আমি–জ্ঞান বিরাটে লীন ও স্তব্ধীভূত হইবে এবং অখণ্ড সচ্চিদানন্দকে নিজস্বরূপ বলিয়া সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করিবে৷’’ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘দীক্ষাপ্রদান করিয়া ন্যাংটা নানা সিদ্ধান্তবাক্যের উপদেশ করিতে লাগিল এবং মনকে সর্বতোভাবে নির্বিকল্প করিয়া আত্মধ্যানে নিমগ্ণ হইয়া যাইতে লাগিল৷ আমার কিন্তু এমনি হইল যে ধ্যান করিতে বসিয়া চেষ্টা করিয়াও মনকে নির্বিকল্প করিতে বা নামরূপের গণ্ডি ছাড়াইতে পারিলাম না৷ অন্যসকল বিষয় হইতে মন সহজেই গুটাইয়া আসিতে লাগিল, কিন্তু ঐরূপে গুটাইবামাত্র তাহাতে শ্রীশ্রীজগদম্বার চিরপরিচিত চিদ্ঘনোজ্জ্বল মূর্তি জ্বলন্তভাবে সমুদিত হইয়া সর্বপ্রকার নামরূপ ত্যাগের কথা একেবারে ভুলাইয়া দিতে লাগিল৷ সিদ্ধান্তবাক্যসকল শ্রবণপূর্বক ধ্যানে বসিয়া যখন উপর্যুপরি ঐরূপ হইতে লাগিল তখন নির্বিকল্প সমাধি সম্বন্ধে একপ্রকার নিরাশ হইলাম এবং চক্ষুরুন্মীলন করিয়া ন্যাংটাকে বলিলাম, ‘হইল না, মনকে সম্পূর্ণ নির্বিকল্প করিয়া আত্মধ্যানে মগ্ণ হইতে পারিলাম না৷’ ন্যাংটা তখন বিষম উত্তেজিত হইয়া তীব্র তিরস্কার করিয়া বলিল, ‘কেঁও হোগা নেহি’–কি, হইবে না, এত বড় কথা–বলিয়া কুটিরের মধ্যে ইতস্তত নিরীক্ষণ করিয়া ভগ্ণ কাচখণ্ড দেখিতে পাইয়া উহা গ্রহণ করিল এবং সূচীর ন্যায় উহার তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ ভ্রূমধ্যে সজোরে বিদ্ধ করিয়া বলিল, ‘এই বিন্দুতে মন গুটাইয়া আন৷’ তখন পুনরায় দৃঢ়সঙ্কল্প করিয়া ধ্যানে বসিলাম এবং নজগদম্বার শ্রীমূর্তি পূর্বের ন্যায় মনে উদিত হইবামাত্র জ্ঞানকে অসি কল্পনা করিয়া উহাদ্বারা ঐ মূর্তিকে মনে মনে দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলিলাম৷ তখন আর মনে কোনরূপ বিকল্প রহিল না একেবারে হু হু করিয়া উহা সমগ্র নামরূপ–রাজ্যের উপরে উঠিয়া গেল এবং সমাধিনিমগ্ণ হইলাম৷’’
ঠাকুর পূর্বোক্ত প্রকারে সমাধিস্থ হইলে শ্রীমৎ তোতা অনেকক্ষণ তাঁহার নিকটে উপবিষ্ট রহিলেন৷ পরে নিঃশব্দে কুটিরের বাহিরে আগমনপূর্বক তাঁহার অজ্ঞাতসারে পাছে কেহ কুটিরে প্রবেশপূর্বক ঠাকুরকে বিরক্ত করে এজন্য দ্বারে তালা লাগাইয়া দিলেন৷ অনন্তর কুটিরের অনতিদূরে পঞ্চবটীতলে নিজ আসনে উপবিষ্ট থাকিয়া দ্বার খুলিয়া দিবার জন্য ঠাকুরের আহ্বান প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন৷ দিন যাইল, রাত্রি আসিল৷ দিনের পর দিন আসিয়া দিবসত্রয় অতিবাহিত হইল৷ তথাপি ঠাকুর শ্রীমৎ তোতাকে দ্বার খুলিয়া দিবার জন্য আহ্বান করিলেন না৷ তখন বিস্ময়–কৌতূহলে তোতা আপনিই আসন ত্যাগ করিয়া উঠিলেন এবং শিষ্যের অবস্থা পরিজ্ঞাত হইবেন বলিয়া দ্বার খুলিয়া কুটিরে প্রবেশ করিলেন৷ দেখিলেন–যেমন বসাইয়া গিয়াছিলেন ঠাকুর সেইভাবেই বসিয়া আছেন, দেহে প্রাণের প্রকাশমাত্র নাই, কিন্তু মুখ প্রশান্ত গম্ভীর, জ্যোতিঃপূর্ণ৷ বুঝিলেন–বহির্জগৎ সম্বন্ধে এখনও সম্পূর্ণ মৃতকল্প–নিবাতনিষ্কম্প প্রদীপবৎ তাঁহার চিত্ত ব্রহ্মে লীন হইয়া অবস্থান করিতেছে৷
সমাধিরহস্যজ্ঞ তোতা স্তম্ভিত হূদয়ে ভাবিতে লাগিলেন–যাহা দেখিতেছি তাহা কি বাস্তবিক সত্য চল্লিশ বৎসর ব্যাপী কঠোর সাধনায় যাহা জীবনে উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইয়াছি, তাহা কি এই মহাপুরুষ সত্য সত্যই একদিবসে আয়ত্ত করিলেন সন্দেহাবেগে তোতা পুনরায় পরীক্ষায় মনোনিবেশ করিলেন৷ তন্ন তন্ন করিয়া শিষ্যদেহে প্রকাশিত লক্ষণসকল অনুধাবন করিতে লাগিলেন৷ হূদয় স্পন্দিত হইতেছে কি না নাসিকাদ্বারে বিন্দুমাত্র বায়ু নির্গত হইতেছে কি না বিশেষ করিয়া পরীক্ষা করিলেন৷ ধীর স্থির কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় অচলভাবে অবস্থিত শিষ্যশরীর বারংবার স্পর্শ করিলেন৷ কিছুমাত্র বিকার, বৈলক্ষণ্য বা চেতনার উদয় হইল না তখন বিস্ময়ানন্দে অভিভূত হইয়া তোতা চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘য়হ ক্যা দৈবী মায়া’–সত্য সত্যই সমাধি বেদান্তোক্ত জ্ঞানমার্গের চরম ফল–নির্বিকল্প সমাধি একদিনে হইয়াছে দেবতার এ কি অদ্ভুত মায়া অনন্তর সমাধি হইতে শিষ্যকে ব্যুত্থিত করিবেন বলিয়া তো তা প্রক্রিয়া আরম্ভ করিলন এবং ‘হরি ওম্’ মন্ত্রের সুগভীর আরাবে পঞ্চবটীর স্থলজলব্যোম পূর্ণ হইয়া উঠিল৷ ধীরে ধীরে নির্বিকল্প সমাধিমগ্ণ শিষ্যের মন অদ্বৈতভূমি হইতে ভাবরাজ্যের চেতনভূমিতে নামিয়া আসিল৷ আনন্দোদ্বেলিত অন্তরে শিষ্য ব্রহ্মজ্ঞ গুরুর পাদবন্দনা করিলেন৷
বেদান্তশাস্ত্রে আছে–ব্রহ্মজ্ঞান হইলেই মানুষ একেবারে ভয়শূন্য হয়৷ যিনি, এক ভিন্ন দ্বিতীয় বস্তু বা ব্যক্তি জগতে নাই–ইহা সত্য সত্যই দেখিতে পান, তাঁহার ভয় কি করিয়াই বা হইবে? ঠাকুর বলিতেন–এই প্রকার জ্ঞানে অবস্থান সম্পূর্ণরূপে হইলে জীবের শরীর একুশদিন মাত্র থাকিয়া শুষ্ক পত্রের ন্যায় পড়িয়া যায় এবং আর সে এ–সংসারের ভিতর অহং–জ্ঞান লইয়া ফিরিয়া আসে না৷ ‘জীবন্মুক্ত’ পুরুষদিগের মধ্যে মধ্যে স্বল্পকালের নিমিত্ত এই জ্ঞানে অবস্থান ও আত্মার দর্শন হইতে হইতে পরিশেষে পূর্ণ অবস্থান ও দর্শন আসিয়া উপস্থিত হয়৷ আর, নিত্যমুক্ত ‘ঈশ্বরকোটি’ পুরুষ, যাঁহারা কোন বিশেষ সত্যের প্রতিষ্ঠা করিয়া বহুজনের কল্যাণসাধন করিতেই জগতে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহারাও বাল্যাবধি মধ্যে মধ্যে স্বল্পকালের জন্য এই জ্ঞানে অবস্থান করেন এবং যে কর্মের জন্য আসিয়াছেন, সেই কর্ম শেষ হইলে পরিশেষে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানস্বরূপে অবস্থান করেন৷ আবার যাঁহারা স্বয়ং ঈশ্বর এবং মানবকল্যাণের নিমিত্ত মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া আসিয়াছেন, সেই ‘অবতার পুরুষেরা’ এই পূর্ণ জ্ঞানাবস্থায় বাল্যাবধি ইচ্ছামাত্র উঠিতে, যতকাল ইচ্ছা থাকিতে এবং পুনরায় ইচ্ছামত লোক–কল্যাণের নিমিত্ত জন্ম– জরা–শোক–হর্ষাদির মিলনভূমি সংসারে আসিতে পারেন৷ ঠাকুরের শিক্ষাগুরু শ্রীমৎ তোতাপুরী গোস্বামী চল্লিশ বৎসর কঠোর সাধনার ফলে পূর্বোক্ত ‘জীবন্মুক্তাবস্থা’ লাভ করিয়াছিলেন এবং নিত্যমুক্ত বায়ুর ন্যায় তিনি বাধাশূন্য হইয়া যত্র তত্র বিচরণ করিয়া বেড়াইতেন বায়ুর ন্যায়ই তাঁহাকে সংসারের দোষগুণ কখনও স্পর্শ করিতে পারিত না এবং তিনি তিনদিনের অধিক কোথাও অবস্থান করিতে পারিতেন না৷ কিন্তু ঠাকুরের অদ্ভুতাকর্ষণে তোতা দক্ষিণেশ্বরে একাদিক্রমে এগার মাস অবস্থান করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন৷ ঠাকুরের কি অদ্ভুত মোহিনী শক্তি ছিল।
দক্ষিণেশ্বরে অবস্থানকালে ‘ল্যাংটা’ পঞ্চবটীর বৃক্ষতলে আসন করিয়া অবস্থান করিতেন এবং পার্শ্বে ধুনি জ্বালাইয়া রাখিতেন৷ নাগা–সাধুরা অগ্ণিকে মহা পবিত্রভাবে দর্শন করে৷ রৌদ্র হউক, বর্ষা হউক ল্যাংটার ধুনি সমভাবেই জ্বলিত৷ একদিন সন্ধ্যার পর ঠাকুর পুরীজীর ধুনির ধারে বসিয়া আছেন৷ এমন সময় বাগানের চাকর–বাকরদিগের একজনের তামাক খাইবার বিশেষ ইচ্ছা হওয়ায় কল্কেতে তামাক সাজিয়া অগ্ণির জন্য সেখানে উপস্থিত হইল এবং ধুনির কাঠ টানিয়া অগ্ণি লইতে লাগিল৷ হঠাৎ সেদিকে লক্ষ্য পড়ায় ল্যাংটা বিষম বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে গালিগালাজ করিতে লাগিলেন–এমনকি চিমটা তুলিয়া তাহাকে দুই এক ঘা দিবার মতো ভয়ও দেখাইতে লাগিলেন৷ ঠাকুর পুরীজীর ঐরূপ ব্যবহারে অর্ধবাহ্যদশায় হাস্যের রোল তুলিলেন৷ তোতা এই ভাব দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, ‘‘তুমি অমন করছ যে?’’ ঠাকুর হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘‘তোমার ব্রহ্মজ্ঞানের দৌড়টা দেখছি৷ এই মুখে বলছিলে–ব্রহ্ম ভিন্ন দ্বিতীয় সত্তাই নেই, জগতে সকল বস্তু ও ব্যক্তি তাঁরই প্রকাশ, আর পরক্ষণেই সব কথা ভুলে মানুষকে মারতে উঠেছ৷ তাই হাসছি যে, মায়ার কি প্রভাব৷’’ তোতা ঐ কথা শুনিয়াই গম্ভীর হইয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন পরে ঠাকুরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘‘ঠিকই বলেছ, ক্রোধে সকল কথা বাস্তবিকই ভুলিয়া গিয়াছিলাম৷ ক্রোধ বড় পাজি জিনিস৷ আজ থেকে আর ক্রোধ করব না৷ ক্রোধ পরিত্যাগ করলুম৷’’ বাস্তবিকই স্বামীজীকে সেদিন হইতে আর ক্রুদ্ধ হইতে দেখা যায় নাই৷
ল্যাংটা নিকটে একটি জলপাত্র (লোটা), একটি সুদীর্ঘ চিমটা এবং আসন করিয়া বসিবার জন্য একখণ্ড চর্মমাত্র রাখিতেন এবং একখানি মোটা চাদরে সর্বদা স্বীয় দেহ আবৃত করিয়া থাকিতেন৷ লোটা ও চিমটাটি ল্যাংটা নিত্য মাজিয়া ঝকঝকে রাখিতেন৷ ল্যাংটার নিত্যধ্যানানুষ্ঠান দেখিয়া ঠাকুর একদিন তাঁহাকে জিজ্ঞাসাই করিয়া বসিলেন, ‘‘তোমার তো ব্রহ্মলাভ হয়েছে, সিদ্ধ হয়েছ, তবে কেন আবার নিত্যধ্যানাভ্যাস কর?’’ ল্যাংটা ইহাতে ধীরভাবে ঠাকুরের দিকে চাহিয়া অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া লোটাটি দেখাইয়া বলিলেন, ‘‘কেমন উজ্জ্বল দেখছ? আর যদি নিত্য না মাজি?–মলিন হয়ে যাবে না? মনও সেইরূপ জানবে৷ ধ্যানাভ্যাস করে মনকেও ঐরূপে নিত্য না মেজে ঘষে রাখলে মলিন হয়ে পড়ে৷’’ তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন ঠাকুর গুরুর কথা মানিয়া লইয়া বলিলেন, ‘‘কিন্তু যদি সোনার লোটা হয়? তাহলে তো আর নিত্য না মাজলেও ময়লা ধরে না৷’’ ল্যাংটা হাসিয়া স্বীকার করিলেন, ‘‘হাঁ, তা বটে৷’’ ল্যাংটা বুঝিয়াছিলেন, ঠাকুরের মন বাস্তবিকই সোনার লোটার মতো উজ্জ্বল৷ গুরু–শিষ্য এইরূপ আদান–প্রদান ইঁহাদের ভিতরে প্রথমাবধিই চলিত৷
ঠাকুর বাল্যাবধি সকাল–সন্ধ্যায় করতালি দিতে দিতে এবং সময়ে সময়ে ভাবে নৃত্য করিতে করিতে ‘হরিবোল হরিবোল’, ‘হরিগুরু, গুরুহরি ইত্যাদি উচ্চৈঃস্বরে বারবার কিছুকাল বলিতেন৷ বেদান্তজ্ঞানে অদ্বৈতভাবে নির্বিকল্প–সমাধিলাভ্ পরও নিত্য ঐরূপ করিতেন৷ একদিন পঞ্চবটীতে পুরীজীর নিকট অপরাহ্ণে বসিয়া নানা ধর্মকথাপ্রসঙ্গে সন্ধ্যা হইল৷ সন্ধ্যা সমাগতা দেখিয়া ঠাকুর বাক্যালাপ বন্ধ করিয়া, করতালি দিয়া ঐরূপে ভগবানের স্মরণ মনন করিতে লাগিলেন৷ তাঁহাকে ঐরূপ করিতে দেখিয়া পুরীজী অবাক হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, যিনি বেদান্তপথের এত উত্তম অধিকারী যে, তিনদিনেই নির্বিকল্পসমাধিলাভ করিলেন, তাঁহার হীনাধিকারীর মতো এসব অনুষ্ঠান কেন? প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করিয়া বলিয়াও ফেলিলেন, ‘‘আরে কেঁও রোটি ঠোক্তে হো?’’ ঠাকুর শুনিয়া হাসিয়া বলিলেন, ‘‘আমি ঈশ্বরের নাম করছি, আর তুমি কি না বলছ–আমি রুটি ঠুকছি?’’ পুরীজীও ঠাকুরের বালকের ন্যায় কথায় হাসিতে লাগিলেন এবং বুঝিলেন, ঠাকুরের ঐরূপ অনুষ্ঠান অর্থশূন্য নহে৷
পুরীজীর পশ্চিমী শরীর রোগ, অজীর্ণ, শরীরের শতপ্রকার অসুস্থতা কাহাকে বলে তিনি তাহা কখনও জানিতেন না৷ কিন্তু বাংলার জল, বাংলার বায়ুতে কয়েকমাস বাস করিতে না করিতেই সে বলিষ্ঠ দৃঢ় শরীরে রোগ প্রবেশ করিল৷ পুরীজী কঠিন রক্তামাশয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন৷ দিবারাত্র পেটের মোচড়ে ও টনটাননিতে পুরীজীর ধীর স্থির সমাধিস্থ মনও অনেক সময়ে ব্রহ্মসদ্ভাব হইতে বিচ্যুত হইয়া শরীরের দিকে আসিয়া পড়িতে লাগিল৷ স্বামীজী ক্রমে এই হাড়মাসের খাঁচাটার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিলেন৷ ভাবিলেন, জানিয়াছি তো শরীরটা কোন মতেই আমি নই, তবে এ পচা শরীরটার সঙ্গে আর কেন থাকিয়া যন্ত্রণা অনুভব করি? এই গভীর রাত্রিকালে গঙ্গায় এটা বিসর্জন দিয়া এখনই সকল যন্ত্রণার অবসান করিব৷ এই ভাবিয়া ল্যাংটা বিশেষ যত্নে মনকে ব্রহ্মচিন্তায় স্থির রাখিয়া ধীরে ধীরে জলে অবতরণ করিলেন এবং ক্রমে ক্রমে গভীর জলে অগ্রসর হইতে লাগিলেন৷ কিন্তু গভীর ভাগীরথী কি আজ সত্য সত্যই শুষ্কা হইয়াছেন৷ তোতা অবাক হইয়া ভাবিলেন, ‘‘একি দৈবী মায়া ডুবিয়া মরিবার পর্যন্ত জলও আজ নদীতে নাই৷ একি ঈশ্বরের অপূর্ব লীলা’’ অমনি তোতার মন উজ্জ্বল আলোকে ধাঁধিয়া যাইয়া দেখিল–মা, মা, মা, বিশ্বজননী মা, অচিন্ত্য শক্তিরূপিণী মা, জলে মা, স্থলে মা, শরীর মা, মন মা, যন্ত্রণা মা, সুস্থতা মা, জ্ঞান মা, অজ্ঞান মা, জীবন মা, মৃত্যু মা যাহা কিছু দেখিতেছি, শুনিতেছি, ভাবিতেছি, কল্পনা করিতেছি–সব মা আবার শরীর–মন–বুদ্ধির পারেও সেই মা–তুরীয়া, নির্গুণা মা এতদিন যাঁহাকে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করিয়া তোতা প্রাণের ভক্তি ভালবাসা দিয়া আসিয়াছেন, সেই মা শিব–শক্তি একাধারে হর–গৌরী মূর্তিতে অবস্থিত৷–ব্রহ্ম ও ব্রহ্মশক্তি অভেদ তোতা জল ভাঙিয়া ফিরিয়া চলিলেন৷ শরীরে যন্ত্রণা হইলেও এখন আর তাহার অনুভব নাই৷ প্রাণ সমাধিস্মৃতির অপূর্ব উল্লাসে উল্লসিত৷ ধীরে ধীরে পঞ্চবটীতলে ধুনির ধারে আসিয়া বসিয়া সমস্ত রাত্রি নজগদম্বার নামে ও ধ্যানে কাটাইলেন৷
প্রভাত হইলেই ঠাকুর স্বামীজীর শারীরিক কুশল সংবাদ জানিতে আসিয়া দেখেন, যেন সে মানুষই নয়৷ মুখমণ্ডল আনন্দে উৎফুল্ল, হাস্যপ্রস্ফুটিত অধর, শরীরে যেন কোন রোগ নাই৷ তোতা ঠাকুরকে ইঙ্গিতে পার্শ্বে বসিতে বলিয়া ধীরে ধীরে রাত্রের সকল ঘটনা বলিলেন৷ বলিলেন, রোগই আমার বন্ধুর কাজ করিয়াছে, কাল নজগদম্বার দর্শন পাইয়াছি এবং তাঁহার কৃপায় রোগমুক্তও হইয়াছি৷ এতদিন আমি কি অজ্ঞই ছিলাম ঠাকুর শুনিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন ‘‘মাকে যে আগে মানতে না, আমার সঙ্গে যে শক্তি মিথ্যা ‘ঝুট’ বলে তর্ক করতে? এখন দেখলে, চক্ষু কর্ণের বিবাদ ঘুচে গেল৷ আমাকে তিনি পূর্বেই বুঝিয়েছেন, ‘ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ, অগ্ণি ও তার দাহিকাশক্তি যেমন পৃথক নয়, তেমনি’৷’’ অনন্তর প্রভাতি সুরে নহবত ধ্বনি হইতেছে শুনিয়া শিব–রামের ন্যায় গুরু–শিষ্য–সম্বন্ধে আবদ্ধ উভয় মহাপুরুষ উঠিয়া নজগদম্বার মন্দিরে দর্শনার্থ গমন করিলেন এবং শ্রীমূর্তির সম্মুখে প্রণত হইলেন৷
ইহার কয়েকদিবস পরেই তোতা ঠাকুরের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া দক্ষিণেশ্বর কালীবাটি পরিত্যাগ করিয়া পশ্চিমে রওনা হইলেন৷ এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই ঠাকুরের মনে দৃঢ় সঙ্কল্প উপস্থিত হইল–তিনি এখন হইতে নিরন্তর নির্বিকল্প অদ্বৈতভূমিতে অবস্থান করিবেন এবং তদ্রূপ আচরণও করিতে লাগিলেন৷ সে বড় অপূর্ব কথা–তখন ঠাকুরের শরীরটা যে আছে, সে বিষয়ে আদৌ হুঁশ ছিল না৷ সে অবস্থায় ‘আমি আমার’ও নাই–আর ‘তুমি তোমার’ও নাই ‘দুই’ নাই ‘এক’ ও নাই৷ কারণ ‘দুই’–এর স্মৃতি থাকিলে তবে তো ‘এক’–এর উপলব্ধি হইবে? সেখানে মনের সব বৃত্তি স্থির–শান্ত৷ কেবল আনন্দ, আনন্দ৷ কেবল অশরীরী আত্মা আপনার অনির্বচনীয় আনন্দময় অবস্থায় মনবুদ্ধির গোচরে অবস্থিত যত প্রকার ভাবরাশি আছে সে সকলের অতীত এক প্রকার ভাবাতীত ভাবে অবস্থিত৷ এই নির্বিকল্প অবস্থায় প্রায় নিরন্তর থাকা ঠাকুরের ছয় মাস কাল ব্যাপিয়া হইয়াছিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘যে অবস্থায় সাধারণ জীবেরা পৌঁছুলে আর ফিরতে পারে না, একুশ দিন মাত্র শরীরটে থেকে শুক্নো পাতা যেমন গাছ থেকে ঝরে পড়ে তেমনি পড়ে যায়, সেইখানে ছ–মাস ছিলুম শরীরটে কি আর থাকত?–এই সময়েই যেত৷ তবে এই সময়ে একজন সাধু এসেছিল৷ সে অবস্থা দেখেই চিনেছিল আর বুঝেছিল–এশরীরটে দিয়ে মায়ের অনেক কাজ এখনও বাকি আছে, এটাকে রাখতে পারলে অনেক লোকের কল্যাণ হবে৷ তাই খাবার সময় খাবার এনে মেরে মেরে হুঁশ আনবার চেষ্টা করত৷ একটু হুঁশ হচ্ছে দেখেই মুখে খাবার গুঁজে দিত৷ তারপর এই অবস্থায় কতদিন পরে শুনতে পেলুম মায়ের কথা–‘ভাবমুখে১ থাক লোকশিক্ষার জন্য ভাবমুখে থাক৷’ তারপর অসুখ হলো–রক্ত আমাশয় পেটে খুব মোচড়, খুবই যন্ত্রণা৷ সেই যন্ত্রণায় প্রায় ছ–মাস ভুগে ভুগে তবে শরীরে একটু একটু করে মন নাবলো–সাধারণ মানুষের মতো হুঁশ এলো৷’’ মনোরাজ্যে ঠাকুরের যে কি প্রবল প্রতাপ ছিল তাহা বলা অসম্ভব৷ স্বামী বিবেকানন্দ বলিতেন, ‘‘মনের বাহিরের জড়–শক্তিসকলকে কোন উপায়ে আয়ত্ত করে কোন একটা অদ্ভুত ব্যাপার miracle) দেখান বড় বেশি কথা নয়৷ কিন্তু এই যে পাগলা বামুন লোকের মনগুলোকে কাদার তালের মতো হাতে নিয়ে ভাঙত, পিটত, গড়ত, স্পর্শমাত্রেই নূতন ছাঁচে ফেলে নূতন ভাবে পূর্ণ করত, এর বাড়া আশ্চর্য ব্যাপার miracle) আমি আর কিছুই দেখি না৷’’
১ নির্গুণ ও সগুণের মধ্যস্থলে যে বিরাট আমিত্বটা বর্তমান তাহাই ভাবমুখ৷ উহা থাকাতেই বিরাট মনে অখণ্ডভাবের স্ফুরণ হইতেছে৷ অর্থাৎ যাহা হইতে যতপ্রকার বিশ্বভাবের উৎপত্তি হইতেছে সেই বিরাট আমিই তুমি, তাঁহার ইচ্ছাই তোমার ইচ্ছা–এই ভাবটি সর্বদা অনুভব করিয়া জীবন যাপন করা ও লোককল্যাণ করা–ভাবমুখে থাকার ইহাই তাৎপর্য৷হইয়া উহার মীমাংসা করিয়া দিতে হইত৷ জাতিস্মরত্ব সহায়ে ঠাকুর এই কালেই সম্যক বুঝিয়াছিলেন যে, তিনি নিত্য–শুদ্ধ–বুদ্ধ–মু স্বভাববান আধিকারিক অবতারপুরুষ বর্তমান যুগের ধর্মগ্লানি দূর করিয়া লোককল্যাণসাধনের জন্যই তাঁহাকে দেহধারণ ও তপস্যাদি করিতে হইয়াছে৷ তিনি ইহা বুঝিয়াছিলেন, পূর্ব পূর্ব যুগে যিনি ‘শ্রীরাম’ এবং ‘শ্রীকৃষ্ণ’রূপে আবির্ভূত হইয়া লোককল্যাণসাধন করিয়াছিলেন তিনিই বর্তমানকালে পুনরায় শরীর পরিগ্রহপূর্বক ‘শ্রীরামকৃষ্ণ’–রূপে আবির্ভূত হইয়াছেন৷ অদ্বৈতভাবের কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, ‘‘উহা শেষ কথা রে, শেষ কথা ঈশ্বরপ্রেমের চরম পরিণতিতে সর্বশেষে উহা সাধকজীবনে স্বতঃ আসিয়া উপস্থিত হয় জানবি, সকল মতেরই উহা শেষ কথা এবং যত মত তত পথ৷’’
এইকালে ঠাকুরের সহায়ে মথুরবাবুর জীবনে যে বিশেষ ঘটনা উপস্থিত হইয়াছিল, তাহার উল্লেখ করিয়া আমরা এই অধ্যায়ের উপসংহার করিব৷ মথুরানাথের দ্বিতীয়া পত্নী শ্রীমতী জগদম্বা দাসী এই সময়ে গ্রহণীরোগে আক্রান্ত হয়েন৷ রোগ ক্রমশ এত বাড়িয়া উঠে যে কলকাতার সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার–বৈদ্যসকল তাঁহার জীবন–রক্ষা সম্বন্ধে প্রথমে সংশয়াপন্ন এবং পরে হতাশ হয়েন৷ জগদম্বা দাসীর এই সাংঘাতিক পীড়ায় মথুরামোহন এখন যে কেবল প্রিয়তমা পত্নীকে হারাইতে বসিয়াছিলেন তাহা নহে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজ শ্বশ্রূঠাকুরানীর বিষয়ের উপর আধিপত্যও হারাইতে বসিলেন৷ রোগীর অবস্থা দেখিয়া যখন ডাক্তার–বৈদ্যেরা জবাব দিয়া গেলেন, মথুর তখন কাতর হইয়া দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং ঠাকুরের পদপ্রান্তে পতিত হইয়া সজলনয়নে গদগদবাক্যে সকল কথা নিবেদন করিয়া দীনভাবে বারংবার বলিতে লাগিলেন, ‘‘আমার যাহা হইবার তাহা তো হইতে চলিল বাবা, তোমার সেবাধিকার হইতেও এইবার বঞ্চিত হইলাম, তোমার সেবা আর করিতে পাইব না৷’’ মথুরের এইরূপ দৈন্য দেখিয়া ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হইয়া তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘ভয় নাই, তোমার পত্নী আরোগ্যলাভ করিবে৷’’ অনন্তর জানবাজারে প্রত্যাগমন করিয়া বিশ্বাসী মথুর দেখিলেন, সহসা জগদম্বা দাসীর সাংঘাতিক অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘সেই দিন হইতেই জগদম্বা দাসী ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করিতে লাগিল এবং তাহার ঐ রোগটার ভোগ (নিজ শরীর দেখাইয়া) এই শরীরের উপর দিয়া হইতে থাকিল জগদম্বা দাসীকে ভাল করিয়া ছয় মাসকাল পেটের পীড়া ও অন্যান্য যন্ত্রণায় ভুগিতে হইয়াছিল৷’’ শ্রীযুক্ত মথুরের ঠাকুরের প্রতি অদ্ভুত প্রেমপূর্ণ সেবার কথা আলোচনা করিবার সময় ঠাকুর একদিন বলিয়াছিলেন, ‘‘মথুর যে চৌদ্দ বৎসর সেবা করিয়াছিল, তাহা কি অমনি করিয়াছিল? মা তাহাকে (নিজের শরীর দেখাইয়া) ইহার ভিতর দিয়া নানাপ্রকার অদ্ভুত অদ্ভুত সব দেখাইয়াছিলেন, সেইজন্যই সে অত সেবা করিয়াছিল৷’’
ঠাকুরের শরীর পূর্বোক্ত কারণে ব্যাধিগ্রস্ত হইলেও তাঁহার দেহবোধবিবর্জিত মন এখন যে কি অপূর্ব শান্তি ও নিরবচ্ছিন্ন আনন্দে অবস্থান করিত তাহা বলিবার নহে৷ ঠাকুর বলিতেন, এই কালে তাঁহার নিকট বেদান্তমার্গবিচরণ সাধকশ্রেণী পরমহংসসকলের আগমন হইয়াছিল এবং ‘নেতি নেতি’, ‘অস্তি ভাতি প্রিয়’, ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ প্রভৃতি বেদান্ত প্রসিদ্ধ তত্ত্ব সমূহের বিচার–ধ্বনিতে তাঁহারা বাসগৃহ নিরন্তর মুখরিত হইয়া থাকিত৷ এই সকল তত্ত্বসমূহের বিচারকালে তাঁহার যখন কোন বিষয়ে সুমীমাংসায় উপনীত হইতে পারিতেন না, ঠাকুরকেই তখন মধ্যস্থ হইয়া উহার মীমাংসা করিয়া দিতে হইত৷ জাতিস্মরত্ব১ সহায়ে ঠাকুর এই কালেই সম্যক বুঝিয়াছিলেন যে, তিনি নিত্য–শুদ্ধ–বুদ্ধ–মু স্বভাববান আধিকারিক অবতারপুরুষ বর্তমান যুগের ধর্মগ্লানি দূর করিয়া লোককল্যাণসাধনের জন্যই তাঁহাকে দেহধারণ ও তপস্যাদি করিতে হইয়াছে৷ তিনি ইহা বুঝিয়াছিলেন, পূর্ব পূর্ব যুগে যিনি ‘শ্রীরাম’ এবং ‘শ্রীকৃষ্ণ’রূপে আবির্ভূত হইয়া লোককল্যাণসাধন করিয়াছিলেন তিনিই বর্তমানকালে পুনরায় শরীর পরিগ্রহপূর্বক ‘শ্রীরামকৃষ্ণ’–রূপে আবির্ভূত হইয়াছেন৷ অদ্বৈতভাবের কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, ‘‘উহা শেষ কথা রে, শেষ কথা ঈশ্বরপ্রেমের চরম পরিণতিতে সর্বশেষে উহা সাধকজীবনে স্বতঃ আসিয়া উপস্থিত হয় জানবি, সকল মতেরই উহা শেষ কথা এবং যত মত তত পথ৷’’
১ ‘সংস্কারসাক্ষাৎকরণ্ পূর্বজাতিজ্ঞানম্’–পাতঞ্জলসূত্র, বিভূতিপাদ, ১৮শ সূত্র৷–শান্ত বলেন, অদ্বৈতভাব সহায়ে জ্ঞানস্বরূপে পূর্ণরূপে অবস্থান করিবার পূর্বে সাধক জাতিস্মরত্বলাভ করিয়া থাকেন অর্থাৎ, ঐ ভাবের পরিপাকে তাঁহার স্মৃতি এতদূর পরিণত অবস্থায় উপস্থিত হয় যে, ইতঃপূর্বে তিনি যেভাবে যথায়, যতবার শরীর পরিগ্রহপূর্বক যাহা কিছু করিয়াছিলেন, সেসকল কথা তাঁহার স্মরণপথে উদিত হইয়া থাকে৷
অদ্বৈতবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হইয়া ঠাকুরের মন এখন কিরূপ উদারভাবাপন্ন হইয়াছিল তাহা এই কালের একটি ঘটনায় স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়৷ গোবিন্দ রায় নামক জনৈক সুফি–ধর্মাবলম্বী নিষ্ঠাবান মুসলমানসাধক এই সময় (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে) দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে উপস্থিত হয়েন এবং সাধনানুকূল স্থান বুঝিয়া পঞ্চবটীর শান্তিপ্রদ ছায়ায় আসন বিস্তীর্ণ করিয়া কিছুকাল কাটাইতে লাগিলেন৷ প্রেমিক গোবিন্দকে দেখিয়া ঠাকুর তৎপ্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন এবং অচিরে গোবিন্দের নিকট দীক্ষা গ্রহণপূর্বক ইসলামধর্ম সাধনে নিযুক্ত হইলেন৷ ঠাকুর উক্ত সাধনকালে মথুরানাথের কুঠিতেই বাস করিতেন৷ মথুরানাথ এক মুসলমান পাচক আনাইয়া তাহার নির্দেশে এক ব্রাহ্মণের দ্বারা মুসলমানদিগের প্রণালীতে খাদ্যসকল রন্ধন করাইয়া ঠাকুরকে খাইতে দিতেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘ঐ সময়ে ‘আল্লা’–মন্ত্র জপ করিতাম এবং হিন্দুভাব মন হইতে একেবারে লুপ্ত হওয়ায় হিন্দুর দেব–দেবীকে প্রণাম করা দূরে থাকুক, দর্শন পর্যন্ত করিতে প্রবৃত্তি হইত না৷ ঐ ভাবে তিন দিবস অতিবাহিত হইবার পর ঐ মতের সাধনফল সম্যক হস্তগত হইয়াছিল৷’’ ইসলামধর্ম সাধনকালে ঠাকুর প্রথমে এক দীর্ঘ শ্মশ্রুবিশিষ্ট সুগম্ভীর জ্যোতির্ময় পুরুষপ্রবরের দিব্যদর্শনলাভও করিয়াছিলেন৷ পরে সগুণ বিরাট ব্রহ্মের উপলব্ধিপূর্বক তুরীয় নির্গুণব্রহ্মে তাঁহার মন লীন হইয়া গিয়াছিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যেন একটা বিরাট পর্বতপ্রমাণ ব্যবধান রহিয়াছে–পরস্পরের চিন্তাপ্রণালী, ধর্মবিশ্বাস ও কার্যকলাপ পরস্পরের নিকট সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য হইয়া রহিয়াছে৷’’ ঐ ব্যবধান যে একদিন অন্তর্হিত হইবে এবং উভয়ে প্রেমে পরস্পরকে আলিঙ্গন করিবে, যুগবতার ঠাকুরের মুসলমানধর্ম সাধন কি তাহারই সূচনা করিয়া দিল১
অদ্বৈতভাব যে তাঁহার কতদূর অন্তরের পদার্থ ছিল তাহা একটি ঘটনার উল্লেখ করিলেই পাঠক বুঝিতে পারিবেন৷ কালীবাটির চাঁদনি–সমাযুক্ত বৃহৎ ঘাটে দণ্ডায়মান হইয়া ঠাকুর একদিন ভাবাবেশে গঙ্গাদর্শন করিতেছিলেন৷ ঘাটে তখন দুইখানি নৌকা লাগিয়াছিল এবং মাঝিরা কোন বিষয় লইয়া পরস্পর কলহ করিতেছিল৷ কলহ ক্রমে বাড়িয়া উঠিয়া সবল ব্যক্তি দুর্বলের পৃষ্ঠদেশে বিষম চপেটাঘাত করিল৷ ঠাকুর উহাতে চিৎকার করিয়া ক্রন্দন করিয়া উঠিলেন৷ তাঁহার ঐরূপ কাতর ক্রন্দন কালীঘরে হূদয়ের কর্ণে সহসা প্রবেশ করায় সে দ্রুতপদে তথায় আগমনপূর্বক দেখিল, তাঁহার পৃষ্ঠদেশ আরক্তিম হইয়াছে এবং ফুলিয়া উঠিয়াছে৷ ক্রোধে অধীর হইয়া হূদয় বারংবার বলিতে লাগিল, ‘‘মামা, কে তোমায় মারিয়াছে দেখাইয়া দাও, আমি তার মাথাটা ছিঁড়িয়া লই’’ হূদয়ের রুদ্রমূর্তি দেখিয়া দাঁড়ি–মাঝিরা ইতঃপূর্বেই নৌকা দুইখানি লইয়া মাঝ–গঙ্গায় সরিয়া পড়িয়াছে৷ মাঝিদিগের বিবাদ হইতে তাঁহার পৃষ্ঠে আঘাতজনিত বেদনাচিহ্ণ উপস্থিত হইয়াছে শুনিয়া হূদয় স্তম্ভিত হইয়া ভাবিতে লাগিল, ইহাও কি কখনও সম্ভবপর বিংশ শতাব্দীর এই বৈজ্ঞানিক যুগে অশিক্ষিত এই পাগলের কথায় কে প্রত্যয় করিবে?
বর্ষাগমে গঙ্গার জল ঘোলা হইলে বিশুদ্ধ পানীয়ের অভাবে তাঁহার পেটের পীড়া পুনরায় দেখা দিবার সম্ভাবনা ভাবিয়া মথুরবাবুপ্রমুখ সকলে স্থির করিলেন, তাঁহার কয়েক মাসের জন্য জন্মভূমি কামারপুকুরে গমন করাই শ্রেয়ঃ৷ অনন্তর ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে শুভ মুহূর্তের উদয় হইলে ঠাকুর জন্মভূমি সন্দর্শনে যাত্রা করিলেন৷ হূদয় ও ভৈরবী ব্রাহ্মণী তাঁহার সঙ্গে যাইলেন৷ তাঁহার বৃদ্ধা জননী দক্ষিণেশ্বরেই বাস করিতে লাগিলেন৷ ইতঃপূর্বে প্রায় আটবৎসরকাল ঠাকুর কামারপুকুরে আগমন করেন নাই৷ বহুকাল পরে তাঁহাকে পাইয়া এই দরিদ্রসংসারে এখন আনন্দের হাট বাজার বসিল এবং নববধূকে আনাইয়া সুখের মাত্রা পূর্ণ করিবার জন্য রমণীগণের নির্দেশে ঠাকুরের শ্বশুরালয় জয়রামবাটী গ্রামে লোক প্রেরিত হইল৷ বিবাহের পর নববধূর ভাগ্যে একবার মাত্র স্বামীসন্দর্শন লাভ হইয়াছিল৷ কারণ তাঁহার সপ্তমবর্ষ বয়সকালে কুলপ্রথানুসারে ঠাকুরকে একদিন জয়রামবাটীতে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল৷ ঐ ঘটনার প্রায় ছয়বৎসর পরে তাঁহার ত্রয়োদশবর্ষ বয়ঃক্রম কালে তাঁহাকে কামারপুকুরে প্রথম লইয়া যাওয়া হয়৷ কিন্তু ঠাকুর ও ঠাকুরের জননী তখন দক্ষিণেশ্বরে থাকায় উভয়ের কাহাকেও দেখা তাঁহার ভাগ্যে হইয়া উঠে নাই৷ উহার ছয় মাস আন্দাজ পরে পুনরায় শ্বশুরালয়ে আগমনপূর্বক দেড়মাসকাল থাকিয়াও পূর্বোক্ত কারণে তিনি তাঁহাদের কাহাকেও দেখিতে পান নাই৷ তিনি এখন চতুর্দশ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছেন৷ বলিতে গেলে বিবাহের পর ইহাই তাঁহার প্রথম স্বামীদর্শন৷
১ [বৈদান্তিক যেরূপ জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল নরনারীকে একই ব্রহ্ম বা আত্মস্বরূপ বলিয়া জ্ঞান করেন, ইসলাম–ধর্মিগণ সমাজের দিক দিয়া তাঁহাদের ধর্মাবলম্বিগণকে সেইরূপ ভ্রাতৃভাবে দেখিয়া থাকেন এবং তদনুরূপ ব্যবহার করেন৷ বলা বাহুল্য বেদান্তের এই আত্মিক ঐক্য ও অভেদত্বমূলক সাম্য–মৈত্রী ও সমদর্শন এবং ইসলামের সামাজিক সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও
সমদর্শিতা মিলিত হইয়া এক পূর্ণাঙ্গ ভারত গড়িয়া তুলিবে৷ সমন্বয়াচার্য শ্রীরামকৃষ্ণেব ইসলামধর্ম সাধনার পূর্ণ সার্থকতা ইহারই মধ্যে সুস্পষ্ট সূচিত হইতেছে৷ (‘‘রামকৃষ্ণ–স৯–আদর্শ ও ইতিহাস’’–পৃঃ ৩৪–৩৫]৷
কামারপুকুরে ঠাকুর এবার ছয়–সাত মাস ছিলেন৷ শ্রীযুক্ত ধর্মদাস লাহার সরলহূদয়া ভক্তিমতী বিধবা কন্যা প্রসন্ন ও ঠাকুরের বাল্যসখা গয়াবিষ্ণু লাহা, সরলবিশ্বাসী শ্রীনিবাস শাঁখারি, পাইনদের বাটির ভক্তিপরায়ণা রমণীগণ, ঠাকুরের ভিক্ষামাতা কামারকন্যা ধনী প্রভৃতি প্রায় সর্বক্ষণ তাঁহার নিকটে উপস্থিত থাকিতেন৷ বিষয় বা গৃহকর্মের অনুরোধে যাঁহারা ঐরূপ করিতে পারিতেন না, তাঁহারা সকাল, সন্ধ্যা বা মধ্যাহ্ণে অবসর পাইলেই আসিয়া উপস্থিত হইতেন এবং ঠাকুরও কৌতুক, হাস্য পরিহাসের ভিতর দিয়া সকলকে ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল হইতে শিক্ষা দিতেন৷
কামারপুকুরে আসিয়া ঠাকুর এই সময়ে একটি সুমহৎ কর্তব্য পালনে যত্নপরায়ণ হইলেন৷ নিজ পত্নীর তাঁহার নিকট আসা না আসা সম্বন্ধে উদাসীন থাকিলেও, যখন তিনি তাঁহার সেবা করিতে কামারপুকুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, ঠাকুর তখন তাঁহাকে শিক্ষাদীক্ষাদি প্রদানপূর্বক তাঁহার কল্যাণসাধনে তৎপর হইলেন৷ ঠাকুরকে বিবাহিত জানিয়া শ্রীমদাচার্য তোতাপুরী তাঁহাকে এক সময়ে বলিয়াছিলেন, ‘‘স্ত্রী নিকটে থাকিলেও যাহার ত্যাগ, বৈরাগ্য, বিবেক, বিজ্ঞান সর্বতোভাবে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই ব্যক্তিই ব্রহ্মে যথার্থ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কেই যিনি সমভাবে আত্মা বলিয়া সর্বক্ষণ দৃষ্টি ও তদনুরূপ ব্যবহার করিতে পারেন, তাঁহারই যথার্থ ব্রহ্মবিজ্ঞান লাভ হইয়াছে’’ শ্রীমৎ তোতার পূর্বোক্ত কথা ঠাকুরের স্মরণপথে উদিত হইয়া তাঁহাকে বহুকালব্যাপী সাধনলব্ধ নিজ বিজ্ঞানের পরীক্ষায় এবং নিজ পত্নীর কল্যাণসাধনে নিযুক্ত করিয়াছিল৷
পত্নীর প্রতি কর্তব্য পালনে অগ্রসর ঠাকুরকে ভৈরবী ব্রাহ্মণী এখন অনেক সময় বুঝিতে পারেন নাই৷ তাঁহার মনে হইয়াছিল, ঠাকুর নিজ পত্নীর সহিত ঐরূপ ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হইলে তাঁহার ব্রহ্মচর্যের হানি হইবে৷ ঠাকুর কিন্তু ব্রাহ্মণীর উপদেশ রক্ষা করিয়া চলিতে পারেন নাই৷ ঐ ঘটনায় তাঁহার অভিমান প্রতিহত হইয়া ক্রমে অহঙ্কারে পরিণত হইয়াছিল এবং কিছুকালের জন্য উহা তাঁহাকে ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধাবিহীনা করিয়াছিল৷ সামান্য কারণে এবং সময়ে সময়ে বিনা কারণে তিনি বাটির স্ত্রীলোকদিগের উপর অসন্তুষ্ট হইয়া তিরস্কার করিয়া বসিতেন৷ ঠাকুর কিন্তু তাঁহার ঐরূপ কথা বা অন্যায় অত্যাচারে অবিচলিত থাকিয়া তাঁহাকে পূর্বের ন্যায় ভক্তিশ্রদ্ধা করিতে বিরত হয়েন নাই৷ তাঁহার নির্দেশে শ্রীমতী মাতাঠাকুরানী শ্বশ্রূতুল্য জানিয়া ভক্তিপ্রীতির সহিত সর্বদা ব্রাহ্মণীর সেবাদিতে নিযুক্ত থাকিতেন এবং তাঁহার কোন কথা বা কার্যের কখনও প্রতিবাদ করিতেন না৷
অভিমান অহঙ্কার বৃদ্ধি পাইলে বুদ্ধিমান মনুষ্যেরও মতিভ্রম উপস্থিত হয়৷ অহঙ্কারের বশবর্তিনী হইয়া ব্রাহ্মণী এই সময়ে একদিন বিষম অনর্থ উপস্থিত করিয়াছিলেন৷ শ্রীনিবাস শাঁখারির কথা আমরা ইতঃপূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি৷ উচ্চজাতিতে জন্ম পরিগ্রহ না করিলেও শ্রীনিবাস ভগবদ্ভক্তিতে অনেক ব্রাহ্মণের অপেক্ষা বড় ছিলেন৷ শ্রীশ্রীরঘুবীরের প্রসাদ পাইবার জন্য ইনি একদিন এই সময়ে ঠাকুরের সমীপে আগমন করেন৷ মধ্যাহ্ণকাল পর্যন্ত নানা ভক্তিপ্রসঙ্গে অতিবাহিত হইল এবং শ্রীশ্রীরঘুবীরের ভোগরাগাদি সম্পূর্ণ হইলে শ্রীনিবাস প্রসাদ পাইতে বসিলেন৷ ভোজনান্তে প্রচলিত প্রথামত তিনি আপন উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করিতে প্রবৃত্ত হইলে ব্রাহ্মণী তাঁহাকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, ‘‘আমরাই উহা করিব এখন৷’’ শ্রীনিবাস অগত্যা নিরস্ত হইয়া নিজ বাটিতে গমন করিলেন৷ ব্রাহ্মণকন্যা ভৈরবী শ্রীনিবাসের উচ্ছিষ্ট মোচন করিবেন–ইহাতে সমাগতা পল্লিবাসিনী ব্রাহ্মণকন্যাগণ বিশেষ আপত্তি করিতে লাগিলেন৷ হূদয় ব্রাহ্মণীকে ঐ কার্যে বিরত হইতে বলিলেও তিনি তাঁহার কথা গ্রহণ করিলেন না ফলে, ব্রাহ্মণী ও হূদয়ের মধ্যে তুমুল বিবাদ উপস্থিত হইল৷ তখন বাটির অন্য সকলে মধ্যস্থ হইয়া নানা অনুনয় বিনয়ে ব্রাহ্মণীকে ঐ কার্য হইতে নিরস্ত করিয়া বিবাদ শান্তি করিলেন৷
অভিমানিনী ব্রাহ্মণী সেদিন নিরস্তা হইলেও অন্তরে বিষম আঘাত পাইলেন৷ ক্রোধের উপশম হইলে তিনি শান্তভাবে চিন্তা করিয়া আপন ভ্রম বুঝিতে পারিলেন এবং ভাবিলেন, এখানে যখন ঐরূপ মতিভ্রম উপস্থিত হইতেছে তখন অতঃপর এইখানে তাঁহার আর অবস্থান করা শ্রেয়ঃ নহে৷ অনন্তর কয়েকদিন গত হইলে এক দিবস তিনি ভক্তিসহকারে বিবিধ পুষ্পমাল্য স্বহস্তে রচনা ও চন্দনচর্চিত করিয়া শ্রীগৌরাঙ্গজ্ঞানে ঠাকুরকে মনোহর বেশে ভূষিত করিলেন এবং সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন৷ পরে সংযতা হইয়া মনপ্রাণ ঈশ্বরে অর্পণপূর্বক কামারপুকুর পশ্চাতে রাখিয়া নকাশীধামের পথ অবলম্বন করিলেন৷ প্রায় সাতমাসকাল নানাভাবে কামারপুকুরে অতিবাহিত করিয়া ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর কিংবা নভেম্বর মাসে ঠাকুর পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে প্রত্যাগমন করিলেন৷
মথুরানাথ এই সময়ে ভারতের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের পুণ্যতীর্থসকল দর্শন করিতে অভিলাষী হইলেন৷ সস্ত্রীক মথুরবাবু ঠাকুরকে সঙ্গে যাইবার জন্য বিশেষরূপে অনুরোধ করিতে লাগিলেন৷ ফলে, ভাগিনেয় হূদয়কে সঙ্গে লইয়া ঠাকুর তাঁহাদিগের সহিত যাইতে সম্মত হইলেন৷ শুভদিন আগত দেখিয়া মথুরবাবু ঠাকুরপ্রমুখ সকলকে সঙ্গে লইয়া যাত্রা করিলেন৷ তখন ইং ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি তারিখ৷ দেওঘরে পঁৌছিয়া নবৈদ্যনাথজীকে দর্শন ও পূজাদি করিবার জন্য মথুরবাবু কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করেন৷ এই স্থানের এক দরিদ্র পল্লির স্ত্রীপুরুষদিগের দুর্দশা দেখিয়া ঠাকুরের হূদয় করুণায় বিগলিত হইল এবং মথুরবাবুকে জোর করিয়া বলিয়া তিনি তাহাদিগকে একদিবস ভোজন ও প্রত্যেককে একখানি বস্ত্র প্রদান করাইলেন৷ নবৈদ্যনাথ হইতে শ্রীযুক্ত মথুর একেবারে নকাশীধামে উপস্থিত হইলেন এবং কেদারঘাটের উপরে পাশাপাশি দুইখানি বাটি ভাড়া করিলেন৷
নৌকাযোগে বারাণসী প্রবেশকাল হইতে ঠাকুর ভাবনয়নে দেখিতে থাকেন শিবপুরী বাস্তবিক সুবর্ণে নির্মিত বাস্তবিকই ইহাতে মৃত্তিকা, প্রস্তরাদির একান্ত অভাব–যুগযুগান্তর ধরিয়া সাধুভক্তগণের কাঞ্চনতুল্য সমুজ্জ্বল, অমূল্য হূদয়ের ভাবরাশি স্তরে স্তরে পুঞ্জীকৃত ও ঘনীভূত হইয়া ইহার বর্তমান আকারে প্রকাশ সেই জ্যোতির্ময় ভাবঘন মূর্তিই ইহার নিত্যস্বরূপ–আর বাহিরে যাহা দেখা যায় সেটা তাহারই ছায়ামাত্র৷ নকাশীতে আর একটি বিশেষ দর্শনের কথা ঠাকুর শ্রীমুখে বলিতেন৷ একদিন মথুর ঠাকুরকে সঙ্গে লইয়া বারাণসীর মণিকর্ণিকাদি পঞ্চতীর্থ দর্শন করিতে গঙ্গাবক্ষে নৌকাযোগে গমন করেন৷ মণিকর্ণিকার পাশেই নকাশীর প্রধান শ্মশানভূমি৷ মথুরের নৌকা যখন মণিকর্ণিকা ঘাটের সম্মুখে আসিল তখন ভাবময় ঠাকুর সহসা সেইদিকে দেখিয়াই একেবারে আনন্দে উৎফুল্ল ও রোমাঞ্চিতকলেবর হইয়া নৌকার বাহিরে ছুটিয়া আসিলেন এবং একেবারে নৌকার কিনারায় দাঁড়াইয়া সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ কতক্ষণ পরে ঠাকুরের সে দিব্যভাবের বিরাম হইলে, তিনি সেই অদ্ভুত দর্শনের কথা মথুর প্রভৃতিকে বলিতে লাগিলেন৷ বলিলেন, ‘‘দেখিলাম পিঙ্গলবর্ণ জটাধারী দীর্ঘাকার এক শ্বেতকায় পুরুষ গম্ভীর পাদবিক্ষেপে শ্মশানে প্রত্যেক চিতার পার্শ্বে আগমন করিতেছেন এবং প্রত্যেক দেহীকে সযত্নে উত্তোলন করিয়া তাহার কর্ণে তারকব্রহ্ম মন্ত্র প্রদান করিতেছেন–সর্বশক্তিময়ী শ্রীজগদম্বাও স্বয়ং মহাকালীরূপে জীবের অপর পার্শ্বে সেই চিতার উপর বসিয়া তাহার স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ প্রভৃতি সকল প্রকার সংস্কারবন্ধন খুলিয়া দিতেছেন এবং নির্বাণের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া স্বহস্তে তাহাকে অখণ্ডের ঘরে প্রেরণ করিতেছেন৷ এইরূপে বহুকল্পের যোগ–তপস্যায় যে অদ্বৈতানুভবের ভূমানন্দ জীবের আসিয়া উপস্থিত হয় তাহা তাহাকে শ্রীবিশ্বনাথ সদ্য সদ্য প্রদান করিয়া কৃতার্থ করিতেছেন৷’’
এখানে থাকিবার কালে শ্রীরামকৃষ্ণদেব পালকিতে চাপিয়া প্রায় প্রত্যহ নবিশ্বনাথের দর্শনে যাইতেন৷ হূদয় তাঁহার সঙ্গে যাইত৷ যাইতে যাইতে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িতেন, দেবদর্শনকালের তো কথাই নাই৷ ঐরূপে সকল দেবস্থানে তাঁহার ভাবাবেশ হইলেও নকেদারনাথের মন্দিরে তাঁহার বিশেষ ভাবাবেশ হইত৷ নকাশীতে অবস্থানকালে ঠাকুর এখানকার খ্যাতনামা সাধুদেরও দর্শন করিতে গিয়াছিলেন৷ তন্মধ্যে ত্রৈলঙ্গস্বামীজীকে দেখিয়াই তাঁহার বিশেষ প্রীতি হইয়াছিল৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘দেখলাম, সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ তাঁহার শরীরটা আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়ে রয়েছেন তাঁর থাকায় নকাশী উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে৷ উচ্চ জ্ঞানের অবস্থা৷ ইশারায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঈশ্বর এক না অনেক? তাতে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন–সমাধিস্থ হয়ে দেখ তো এক নইলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদি নানা জ্ঞান রয়েছে ততক্ষণ অনেক৷ তাঁকে দেখিয়ে হূদয়কে বলেছিলাম, ‘একেই ঠিক ঠিক পরমহংস অবস্থা বলে’৷’’ পাঁচ–সাত দিন নকাশীতে থাকিয়া ঠাকুর মথুরের সহিত প্রয়াগে গমনপূর্বক পুণ্যসঙ্গমে স্নান ও ত্রিরাত্রিবাস করিয়াছিলেন৷ প্রয়াগ হইতে কাশীতে ফিরিয়া পুনরায় তথায় একপক্ষকাল বাস করিয়া শ্রীবৃন্দাবন দর্শনে গমন করেন৷ তথায় বাঁকাবিহারী মূর্তি দর্শন করিয়া তাঁহার অদ্ভুত ভাবাবেশ হইয়াছিল–আত্মহারা হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন করিতে ছুটিয়া গিয়াছিলেন আবার সন্ধ্যাকালে রাখাল বালকগণ গরুর পাল লইয়া যমুনা পার হইয়া গোষ্ঠ হইতে ফিরিতেছে দেখিতে দেখিতে তাহাদের ভিতর শিখিপুচ্ছধারী নবনীরদ–শ্যাম গোপালকৃষ্ণের দর্শনলাভ করিয়া তিনি প্রেমে বিভোর হইয়াছিলেন৷ ব্রজের নানাস্থানে ঠাকুর সংসারবিরাগী অনেক সাধককে জপধ্যানে নিমগ্ণ থাকিতে দেখিয়াছিলেন৷ নিধুবনে সিদ্ধপ্রেমিকা বর্ষীয়সী তপস্বিনী গঙ্গামাতার দর্শন ও মধুর সঙ্গলাভ করিয়া ঠাকুর এতই মোহিত হইয়াছিলেন যে, তাঁহার মনে হইয়াছিল ব্রজ ছাড়িয়া তিনি আর কোথাও যাইবেন না৷ ইনি ঠাকুরকে শ্রীমতী রাধিকাই স্বয়ং অবতীর্ণা ভাবিয়া ‘দুলালী’ বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘ব্রজে গিয়ে সব ভুল হয়ে গিয়েছিল৷ মনে হয়েছিল আর ফিরব না কিন্তু কিছুদিন বাদে মায়ের কথা মনে পড়ল মনে হলো তাঁর কত কষ্ট হবে, কে তাঁকে বুড়োবয়সে দেখবে, সেবা করবে৷ ঐ কথা মনে ওঠায় আর সেখানে থাকতে পারলুম না৷’’ মাতৃঋণ সম্বন্ধে ঠাকুর বলতেন, ‘‘ওরে, সংসারে বাপ–মা পরম গুরু যতদিন বেঁচে থাকেন যথাশক্তি উঁহাদের সেবা করতে হয়৷ ... কেবলমাত্র ঈশ্বরের জন্য বাপ–মায়ের আজ্ঞা ল৯ন করা চলে, তাতে দোষ হয় না যেমন প্রহ্লাদ বাপ বললেও কৃষ্ণনাম নিতে ছাড়েনি এমন–কি, ধ্রুব মা বারণ করলেও তপস্যা করতে বনে গিয়েছিল তাতে দোষের হয়নি৷’’
একপক্ষকাল আন্দাজ শ্রীবৃন্দাবনে থাকিয়া গঙ্গামাতার নিকট হইতে কষ্টে বিদায় গ্রহণ করিয়া ঠাকুর মথুরের সহিত পুনরায় নকাশীতে প্রত্যাগমন করেন৷ কয়েকদিন সেখানে থাকিবার পরে দীপান্বিতা অমাবস্যার দিনে শ্রীশ্রীন্নপূর্ণা–দেবী সুবর্ণপ্রতিমা দর্শন করিয়া ঠাকুর ভাবে প্রেমে মোহিত হইয়াছিলেন৷ নকাশী হইতে গয়াধামে যাইবার মথুরের ইচ্ছা হইয়াছিল৷ কিন্তু ঠাকুর সেখানে যাইতে অমত করায় মথুর সে সঙ্কল্প পরিত্যাগ করেন৷–পিতৃস্বপ্ণ স্মরণ করিয়া ঠাকুর বলিতেন, ঐ সকল স্থানে যাইলে তাঁহার শরীর থাকিবে না এমন গভীর সমাধিস্থ হইবেন যে, তাহা হইতে তাঁহার মন আর নিম্নে মনুষ্যলোকে ফিরিয়া আসিবে না৷ শ্রীগৌরাঙ্গদেবের লীলাসংবরণস্থল নীলাচল বা নপুরীধামে যাইবার কথাতেও ঠাকুর ঐরূপ ভাব অন্য সময়ে প্রকাশ করিয়াছিলেন৷
নকাশীধামে যোগেশ্বরী নাম্নী ভৈরবী ব্রাহ্মণীর সহিত ঠাকুরের পুনরায় দেখা হইয়াছিল এবং চৌষট্টিযোগিনী নামক পল্লিস্থ তাঁহার আবাসে তিনি কয়েকবার গমন করিয়াছিলেন৷ ব্রাহ্মণীকে ঠাকুর এখন হইতে শ্রীবৃন্দাবনে অবস্থান করিতে বলিয়াছিলেন৷ হূদয় বলিত, ঠাকুর তথা হইতে ফিরিবার স্বল্পকাল পরে ব্রাহ্মণী শ্রীবৃন্দাবনে দেহরক্ষা করিয়াছিলেন৷
শ্রীবৃন্দাবনে অবস্থানকালে ঠাকুরের বীণা শুনিতে ইচ্ছা হইয়াছিল৷ নকাশীতে ফিরিয়া তাঁহার মনে পুনরায় ঐ ইচ্ছার উদয় হওয়ায় মদনপুরাপল্লিস্থ শ্রীযুক্ত মহেশচন্দ্র সরকার নামক একজন অভিজ্ঞ বীণ্কারের ভবনে হূদয়ের সহিত উপস্থিত হইয়া তিনি তাঁহাকে বীণা শুনাইবার জন্য অনুরোধ করেন৷ ঠাকুরের অনুরোধে তিনি সেদিন পরম আহ্লাদে অনেকক্ষণ পর্যন্ত বীণা বাজাইয়াছিলেন৷ অপরাহ্ণ পাঁচটা হইতে রাত্রি আটটা পর্যন্ত ঐরূপে আনন্দে অতিবাহিত হইলে মহেশবাবুর অনুরোধে তিনি ঐস্থানে কিঞ্চিৎ জলযোগ করিয়া মথুরের নিকট উপস্থিত হইলেন৷
এইভাবে চারিমাসকাল তীর্থভ্রমণ করিয়া ঠাকুর মথুরবাবুর সহিত পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিলেন৷ শ্রীবৃন্দাবন হইতে ঠাকুর রাধাকুণ্ড ও শ্যামকুণ্ডের রজঃ আনয়ন করিয়াছিলেন৷ দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া তিনি উহার কিয়দংশ পঞ্চবটীর চতুর্দিকে ছড়াইয়া দিলেন এবং অবিশিষ্টাংশ নিজ সাধনকুটির মধ্যে স্বহস্তে প্রোথিত করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘আজ হইতে এই স্থল শ্রীবৃন্দাবনতুল্য দেবভূমি হইল৷’’ শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, এই তীর্থভ্রমণোপলক্ষে মথুর লক্ষ মুদ্রার অধিক ব্যয় করিয়াছিলেন৷
কাশীবৃন্দাবনাদি তীর্থ ভিন্ন ঠাকুর একবার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান নবদ্বীপ দর্শন করিতেও গমন করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘মথুরের সঙ্গে নবদ্বীপে গেলুম৷ ভাবলুম, যদি অবতারই হয় তো সেখানে কিছু না কিছু প্রকাশ থাকবে, দেখলে বুঝতে পারব৷ ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে বেড়ালুম–কোথাও কিছু দেখতে পেলুম না৷ ভাবলুম, কেনই বা এখানে এলুম৷ তারপর ফিরে আসব বলে নৌকায় উঠচি এমন সময় দেখতে পেলুম অদ্ভুত দর্শন দুটি সুন্দর ছেলে–এমন রূপ কখনো দেখিনি, তপ্ত কাঞ্চনের মতো রং, কিশোর বয়স, মাথায় একটা করে জ্যোতির মণ্ডল, হাত তুলে আমার দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে আকাশ–পথ দিয়ে ছুটে আসছে৷ অমনি ‘ঐ এলোরে’, ‘এলোরে’ বলে চেঁচিয়ে উঠলুম৷ ঐ কথাগুলি বলতে না বলতে তারা নিকটে এসে (নিজের শরীর দেখাইয়া) এর ভেতর ঢুকে গেল, আর বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলুম জলেই পড়তুম, হূদে নিকটে ছিল, ধরে ফেললে৷ এই রকম এই রকম ঢ়ের সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলে–বাস্তবিকই অবতার, ঐশ্বরিক শক্তির বিকাশ’’
এই সময়ে একদিন কলকাতার কলুটোলা নামক পল্লিতে প্রতিষ্ঠিত একটি হরিসভায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিমন্ত্রিত হইয়া ভাগবতের অমৃতোপম কথা শুনিতে শুনিতে আত্মহারা হইয়া পড়িলেন এবং ‘শ্রীচৈতন্যাসনের’ সম্মুখে সহসা ছুটিয়া যাইয়া তাহার উপর দাঁড়াইয়া এমন গভীর সমাধিমগ্ণ হইলেন যে, তাঁহাতে আর কিছুমাত্র প্রাণসঞ্চার লক্ষিত হইল না৷ তাঁহার জ্যোতির্ময় মুখের সেই অদৃষ্টপূর্ব প্রেমপূর্ণ হাসি এবং ঊর্ধ্বোত্তোলিত হস্তে অঙ্গুলি নির্দেশ দেখিয়া বিশিষ্ট ভক্তেরা প্রাণে প্রাণে বুঝিলেন ঠাকুর ভাবমুখে শ্রীশ্রীমহাপ্রভুর সহিত একেবারে তন্ময় হইয়া গিয়াছেন৷ ঠাকুরের প্রবল ভাবপ্রবাহে একটা অনির্বচনীয় আনন্দের উপলব্ধি করিয়া সকলে মিলিয়া উচ্চরবে হরিধ্বনি করিয়া নাম সঙ্কীর্তন আরম্ভ করিলেন৷ এইরূপে উদ্দাম তাণ্ডবে বহুক্ষণ শ্রীহরির ও শ্রীমহাপ্রভুর গুণাবলীকীর্তনের পর সকলে জয়ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া সেদিনকার দিব্য অভিনয় সাঙ্গ করিলেন এবং ঠাকুরও অল্পক্ষণ পরেই সেখান হইতে দক্ষিণেশ্বরে প্রত্যাগমন করিলেন৷ ঠাকুরের প্রস্থানের পর একদল ঠাকুরের ভাবমুখে ‘শ্রীচৈতন্যাসন’ ঐরূপে গ্রহণ করার পক্ষ সমর্থন করিতে এবং অন্যদল ঐ কার্যের তীব্র প্রতিবাদে নিযুক্ত হইলেন৷ কিন্তু কিছুরই মীমাংসা হইল না৷ ক্রমে ঐ কথা লোকমুখে শ্রীচৈতন্যপদাশ্রিত কালনার সিদ্ধ বাবাজি ভগবানদাসও শুনিতে পাইলেন এবং ক্রোধান্ধ হইয়া তাঁহার উদ্দেশ্যে কটুবাক্য বলিতে এবং তাঁহাকে ভণ্ড বলিয়া নির্দেশ করিতেও কুণ্ঠিত হইলেন না৷
ঐ ঘটনায় কয়েকদিন পরেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া ভাগিনেয় হূদয় ও মথুরবাবুকে সঙ্গে লইয়া কালনায় উপস্থিত হইলেন৷ ভগবানাদাসের নিকটে আসিয়াই ঠাকুর প্রথম শুনিলেন তিনি কণ্ঠি ছিঁড়িয়া লইয়া একজনকে তাড়াইয়া দিবেন বলিতেছেন৷ আবার অল্পক্ষণ পরেই শুনিলেন তিনি লোকশিক্ষা দিবার জন্য এখনও মালা তিলকাদি ব্যবহার ত্যাগ করেন নাই৷ বাবাজির ঐরূপে বারংবার ‘আমি তাড়াইব, আমি লোকশিক্ষা দিব, আমি মালা তিলকাদি ত্যাগ করি নাই’–ইত্যাদি বলায় সরলস্বভাব ঠাকুর আর মনের বিরক্তি চাপিয়া সভ্যভব্য হইয়া উপবিষ্ট হইয়া থাকিতে পারিলেন না৷ একেবারে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বাবাজিকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ‘‘কি? তুমি এখনও এত অহঙ্কার রাখ? তুমি লোকশিক্ষা দিবে? তুমি তাড়াইবে? তুমি ত্যাগ ও গ্রহণ করিবে? তুমি লোকশিক্ষা দিবার কে? যাঁহার জগৎ তিনি না শিখাইলে তুমি শিখাইবে?’’–ঠাকুরের তখন অঙ্গাবরণ পড়িয়া গিয়াছে কটিদেশ হইতে বস্ত্রও শিথিল হইয়া খসিয়া পড়িয়াছে এবং মুখমণ্ডল এক অপূর্ব দিব্য তেজে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে৷ ঠাকুরের ঐরূপ অবস্থা দেখিয়া বাবাজি প্রথম বিস্মিত হইলেন৷ পরে বুঝিলেন, বাস্তবিকই এ জগতে ঈশ্বর ভিন্ন আর দ্বিতীয় কর্তা নাই৷ এইরূপে ঠাকুরের শক্তিপূর্ণ কথাগুলিতে বাবাজির অন্তর্দৃষ্টি অধিকতর প্রস্ফুটিত হইয়া তাঁহাকে নিজের দোষ দেখাইয়া বিনীত ও নম্র করিল৷ বাবাজি যখন শুনিলেন ইনিই সেই দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস যিনি কলুটোলার হরিসভায় ভাবাবেশে আত্মহারা হইয়া ‘শ্রীচৈতন্যাসন’ অধিকার করিয়া বসিয়াছিলেন, তখন ইঁহাকে আমি অযথা কটুবাক্য বলিয়াছি–ভাবিয়া তাঁহার মনে ক্ষোভ ও পরিতাপের অবধি রহিল না৷ তিনি বিনীতভাবে শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে প্রণাম করিয়া তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন৷ এইরূপে ঠাকুর ও বাবাজির সেদিনকার প্রেমাভিনয় সাঙ্গ হইল এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবও হূদয়কে সঙ্গে লইয়া কিছুক্ষণ পরে মথুরের সন্নিধানে আগমন করিয়া ঐ ঘটনার আদ্যোপান্ত তাঁহাকে শুনাইয়া বাবাজির উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থার অনেক প্রশংসা করিলেন৷ মথুরবাবুও উহা শুনিয়া বাবাজিকে দর্শন করিতে যাইলেন এবং আশ্রমস্থ দেববিগ্রহের সেবা ও একদিন মহোৎসবাদির জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন৷
তীর্থ হইতে ফিরিবার অল্পকাল পরে হূদয়ের স্ত্রীর মৃত্যু হয়৷ ঐ ঘটনায় তাঁহার মন সংসারের প্রতি কিছুকালের জন্য বিরাগসম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছিল৷ পত্নীবিয়োগবিধুর হূদয় ঠাকুরকে ধরিয়া বলিল, তাহার যাহাতে তাঁহার ন্যায় আধ্যাত্মিক উপলব্ধিসকল উপস্থিত হয় তাহা করিয়া দিতে হইবে৷ পুনঃপুনঃ অনুরুদ্ধ হইয়া ঠাকুর অগত্যা বলিলেন, ‘‘মায়ের যাহা ইচ্ছা তাহাই হউক মায়ের ইচ্ছা হয় যদি তোরও হইবে৷’’ এইরূপ কথাবার্তার কয়েকদিন পরে তাহার এক অপূর্ব দর্শন উপস্থিত হইল৷ তাহার মনে হইল, সে দিব্যদেহধারী জ্যোতির্ময় দেবানুচর, সাক্ষাৎ দেবতার সঙ্গে থাকিয়া চিরকাল তাঁহার সেবা করিতেছে৷ অর্ধবাহ্য ভাবাবেশে উন্মত্তের ন্যায় চিৎকার করিয়া বারংবার বলিতে লাগিল, ‘‘ও রামকৃষ্ণ ও রামকৃষ্ণ আমরা তো মানুষ নহি, আমরা এখানে কেন? চল দেশে দেশে যাই, জীবোদ্ধার করি৷ তুমি যাহা আমিও তাহাই’’ মথুরবাবু একদিন হূদয়কে ভাবাবিষ্ট দেখিয়া ঠাকুরকে বলিয়াছিলেন, ‘‘হূদুর আবার এ কি অবস্থা হইল, বাবা?’’ ঠাকুর তাহাতে তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘হূদয় ঢ়ং করিয়া ঐরূপ করিতেছে না–একটু আধটু দর্শনের জন্য সে মাকে ব্যাকুল হইয়া ধরিয়াছিল তাই ঐরূপ হইতেছে৷ ঐরূপ দেখাইয়া বুঝাইয়া মা আবার তাহাকে ঠাণ্ডা করিয়া দিবেন৷’’
সন ১২৭৫ সালের (ইং ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের) আশ্বিন মাস আগত দেখিয়া হূদয় নিজ বাটিতে শারদীয়া পূজা করিতে মনস্থ করিল৷ কর্মী হূদয়ের ঐ কার্যে শান্তিলাভের সম্ভাবনা বুঝিয়া ঠাকুর তাহাতে সম্মত হইলেন এবং মথুরবাবু হূদয়ের ঐরূপ অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া তাহাকে আর্থিক সাহায্য করিলেন৷ শ্রীযুক্ত মথুর ঐরূপে অর্থসাহায্য করিলেন বটে, কিন্তু পূজাকালে ঠাকুরকে নিজ বাটিতে রাখিবার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন৷ তজ্জন্য হূদয়কে ক্ষুণ্ণ দেখিয়া ঠাকুর বলিলেন, ‘‘তুই দুঃখ করিতেছিস কেন? আমি নিত্য সূক্ষ্ম শরীরে তোর পূজা দেখিতে যাইব, আমাকে অপর কেহ দেখিতে পাইবে না কিন্তু তুই পাইবি৷’’
ঠাকুরের কথায় আশ্বস্ত হইয়া সে মহানন্দে পূজা করিতে যাত্রা করিল৷ বাটিতে আসিয়া হূদয় ঠাকুরের কথামত সকল কার্যের অনুষ্ঠান করিল৷ সপ্তমী– বিহিত পূজা সাঙ্গ করিয়া রাত্রে নীরাজন করিবার কালে হূদয় দেখিতে পাইল, ঠাকুর জ্যোতির্ময় শরীরে প্রতিমার পার্শ্বে ভাবাবিষ্ট হইয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছেন৷ ঐরূপে প্রতিদিন ঐ সময়ে এবং সন্ধিপূজাকালে সে দেবীপ্রতিমা–পার্শ্বে ঠাকুরের দিব্যদর্শন লাভ করিয়া মহোৎসাহে পূর্ণ হইল৷ শারদীয়া পূজান্তে হূদয় দক্ষিণেশ্বরে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার ঐ বিষয়ক দর্শনের কথা ঠাকুরকে নিবেদন করিলে ঠাকুর বলিলেন, ‘‘আরতি ও সন্ধিপূজার সময় তোর পূজা দেখিবার জন্য বাস্তবিকই প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিয়া আমার ভাব হইয়া গিয়াছিল এবং অনুভব করিয়াছিলাম যেন জ্যোতির্ময় শরীরে জ্যোতির্ময় পথ দিয়া তোর চণ্ডীমণ্ডপে উপস্থিত হইয়াছি৷’’
ঠাকুরের পবিত্রসঙ্গে দীর্ঘকাল থাকা সত্ত্বেও হূদয়ের অহঙ্কার ও দাম্ভিকতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্তই হইতেছিল৷ তদ্দর্শনে ঠাকুরও ভাবিলেন, হূদয় যদি অন্যত্র চলিয়া যায় তো যাক৷ সিদ্ধসঙ্কল্প ঠাকুরের ইচ্ছা ব্যর্থ হইবার নহে৷ ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের কোন এক উৎসব উপলক্ষে মথুরামোহনের পুত্র শ্রীযুক্ত ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস আত্মীয়বর্গ সমভিব্যাহারে দক্ষিণেশ্বরে আগমন করেন৷ উক্ত দিবস হূদয় প্রাতে দেবীপূজা করিবার উদ্দেশ্যে কালীমন্দিরে প্রবেশ করিয়া মন্দিরে ত্রৈলোক্যনাথের দশমবর্ষীয়া পরমাসুন্দরী কন্যাকে দণ্ডায়মানা দেখিয়া ফুলচন্দন দ্বারা বালিকার চরণপূজা করিয়া ফেলিল৷ এই সংবাদ ত্রৈলোক্যনাথের কর্ণগোচর হওয়ায় তিনি বালিকার ও স্বপরিবারের অমঙ্গল আশঙ্কা করিয়া অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন৷ তিনি তৎক্ষণাৎ নিজ ভৃত্যদ্বারা হূদয়কে মন্দির হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন এবং কালীবাড়িতে তাহাকে ভবিষ্যতে প্রবেশ করিতে নিষেধ করিলেন৷ ক্ষুণ্ণমনে হূদয়কে কালীবাটি হইতে চিরকালের জন্য বিদায় গ্রহণ করিতে হইল৷ ঠাকুরের জীবদ্দশায় তিনি হূদয়কে নানাভাবে সাহায্য করিয়াছিলেন৷ ঠাকুরের দেহাবসানের পর হূদয় অনন্যোপায় হইয়া বস্ত্র বিক্রয় করিয়া পরিবারবর্গের ভরণপোষণ করিতে লাগিল৷ ঠাকুরের মহাসমাধিলাভের তের বৎসর পর প্রায় ৬৩ বর্ষ বয়ঃক্রমকালে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে হূদয় স্বীয় জন্মভূমি সিওড় গ্রামে দেহরক্ষা করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণপদে বিলীন হইয়াছিলেন৷
ঠাকুরের অগ্রজ শ্রীযুক্ত রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের সহিত পাঠককে ইতঃপূর্বেই সামান্যভাবে পরিচিত করাইয়াছি৷ বাল্যকাল হইতেই অক্ষয়ের মন শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিল৷ কুলদেবতা নরঘুবীরের সেবায় সে প্রতিদিন অনেক কাল যাপন করিত৷ অক্ষয়ের ঐরূপ ভক্তি ও ঈশ্বরানুরাগ তাহাকে ঠাকুরের বিশেষ প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল৷ ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে কামারপুকুরের অনতিদূরে কুচেকোল নামক গ্রামে এক কন্যার সহিত অক্ষয়ের বিবাহ হয়৷ কিন্তু বিবাহের কয়েক মাস পরেই শ্বশুরালয়ে যাইয়া অক্ষয়ের কঠিন পীড়া হইল৷ শ্রীযুক্ত রামেশ্বর সংবাদ পাইয়া তাহাকে কামারপুকুরে আনাইলেন, এবং চিকিৎসাদি দ্বারা আরোগ্য করাইয়া পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে পাঠাইয়া দিলেন৷ এখানে আসিয়া তাহার স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি হইতেছে বলিয়া বোধ হইতে লাগিল৷ এমন সময় সহসা একদিন অক্ষয়ের জ্বর হইল৷ তিন–চার দিনেও অক্ষয়ের জ্বরের উপশম হইল না দেখিয়া ঠাকুর এখন হূদয়কে ডাকিয়া বলিলেন, ‘‘হূদু, ডাক্তারেরা বুঝিতে পারিতেছে না, অক্ষয়ের বিকার হইয়াছে, ভাল চিকিৎসক আনাইয়া আশ মিটাইয়া চিকিৎসা কর, ছোঁড়া কিন্তু বাঁচিবে না৷’’ ঠাকুরের ঐ কথা শুনিয়া হূদয় বিশেষ উদ্বিগ্ণ হইল এবং সুচিকিৎসকগণকে আনাইয়া অক্ষয়ের পীড়া আরোগ্যের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করিতে লাগিল৷ অনন্তর প্রায় মাসাবধি ভুগিবার পরে অক্ষয়ের অন্তিমকাল আগত দেখিয়া ঠাকুর তাহার শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, ‘‘অক্ষয়, বল, গঙ্গানারায়ণ ওঁ রাম৷’’ অক্ষয় এক দুই করিয়া তিনবার ঐ মন্ত্র আবৃত্তি করিবার পরক্ষণেই তাঁহার প্রাণবায়ু দেহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল৷
সাতক্ষীরার নিকট সোনাবেড়ে নামক গ্রামে মথুরের পৈতৃক ভিটা ছিল৷ ঐ গ্রামের সন্নিহিত গ্রামসকল তখন মথুরের জমিদারিভুক্ত৷ অক্ষয়ের মৃত্যুর স্বল্পকাল পরে শ্রীযুক্ত মথুর ঠাকুরকে সঙ্গে লইয়া উক্ত নিজ জমিদারিমহলে এবং গুরুগৃহে গমন করিয়াছিলেন৷ মথুরের জমিদারিমহল পরিদর্শন করিতে যাইয়া ঠাকুর এক স্থানের পল্লিবাসী স্ত্রীপুরুষগণের দুর্দশা ও অভাব দেখিয়া তাহাদের দুঃখে কাতর হন এবং মথুরের দ্বারা নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাদিগকে এক মাথা করিয়া তেল, এক একখানি নূতন কাপড় এবং উদর পূরিয়া একদিনের ভোজন দান করাইয়াছিলেন৷ হূদয় বলিত, রানাঘাটের সন্নিকট কলাইঘাট নামক স্থানে পূর্বোক্ত ঘটনা উপস্থিত হইয়াছিল৷
সম্পদ, বিপদ, সুখ, দুঃখ, মিলন, বিয়োগ, জীবন, মৃত্যুরূপ তরঙ্গ–সমাকুল কালের অনন্ত প্রবাহ ক্রমে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দকে ধরাধামে উপস্থিত করিল৷ ঠাকুরের সহিত মথুরের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠতর হইয়া ঐ বৎসর পঞ্চদশ বর্ষে পদার্পণ করিল৷ বৈশাখ যাইল, জ্যৈষ্ঠ যাইল, আষাঢ়েরও অর্ধেক দিন অতীতের গর্ভে লীন হইল, এমন সময় শ্রীযুক্ত মথুর জ্বররোগে শয্যাগত হইলেন৷ ক্রমশ উহা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া সাত আট দিনেই বিকারে পরিণত হইল এবং মথুরের বাক্রোধ হইল৷ ঠাকুর পূর্ব হইতেই বুঝিয়াছিলেন–মা তাঁহার ভক্তকে নিজ স্নেহময় অঙ্কে গ্রহণ করিতেছেন–মথুরের ভক্তিব্রতের উদ্যাপন হইয়াছে৷ সেজন্য হূদয়কে প্রতিদিন দেখিতে পাঠাইলেও, স্বয়ং মথুরকে দর্শন করিতে একদিনও যাইলেন না৷ ক্রমে শেষ দিন উপস্থিত হইল–অন্তিমকাল আগত দেখিয়া মথুরকে কালীঘাটে লইয়া যাওয়া হইল৷ সেই দিন ঠাকুর হূদয়কেও দেখিতে পাঠাইলেন না কিন্তু অপরাহ্ণ উপস্থিত হইলে দুই তিন ঘণ্টা গভীর ভাবে নিমগ্ণ রহিলেন এবং জ্যোতির্ময় বর্ত্মে দিব্য শরীরে ভক্তের পার্শ্বে উপনীত হইয়া তাঁহাকে কৃতার্থ করিলেন–বহু পুণ্যার্জিত লোকে তাঁহাকে স্বয়ং আরূঢ় করাইলেন৷
মথুর দিব্যধামে চলিয়া যাইলেন–দক্ষিণেশ্বর কালীবাটিতে মানবের জীবন–প্রবাহ কিন্তু সমভাবেই বহিতে লাগিল৷ দিন মাস অতীত হইয়া ক্রমে ছয় মাস কাটিয়া গেল৷ এই সময়ে ঠাকুরের জীবনে একটি বিশেষ ঘটনা উপস্থিত হইল৷ চতুর্দশ বৎসরে প্রথবার স্বামিসন্দর্শনকালে শ্রীমতী মাতাঠাকুরানী নিতান্ত বালিকাস্বভাবসম্পন্ন্ ছিলেন৷ দাম্পত্যজীবনে গভীর উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব বোধ করিবার শক্তি তাঁহাতে তখন বিকাশোন্মুখ হইয়াছিল মাত্র৷ পবিত্রা বালিকা দেহবুদ্ধিবিরহিত ঠাকুরের দিব্য সঙ্গ ও নিঃস্বার্থ আদরযত্ন লাভে ঐকালে অনির্বচনীয় আনন্দে উল্লসিত হইয়াছিলেন৷ ঠাকুরের স্ত্রীভক্তদের নিকটে তিনি ঐ উল্লাসের কথা অনেক সময় এইরূপে প্রকাশ করিয়াছেন, ‘‘হূদয় মধ্যে আনন্দের পূর্ণঘট যেন স্থাপিত রহিয়াছে, ঐ কাল হইতে সর্বদা এইরূপ অনুভব করিতাম–সেই ধীর স্থির দিব্য উল্লাসে অন্তর কতদূর কিরূপ পূর্ণ থাকিত তাহা বলিয়া বুঝাইবার নহে৷’’ এখন হইতে ঠাকুরকে দেখিবার এবং তাঁহার নিকট উপস্থিত হইবার প্রবল বাসনা তাঁহার মনকে সর্বদা ঠাকুরের চিন্তায় ডুবাইয়া রাখিত৷ দিনের পর দিন যাইতে লাগিল এবং হূদয়ে বিশ্বাস স্থির রাখিয়া তিনি ঐ শুভদিনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন৷
চারিটি দীর্ঘ বৎসর একে একে কাটিয়া গেল৷ আশা প্রতীক্ষার প্রবল প্রবাহ বালিকার মনে সমভাবেই বহিতে লাগিল৷ তাঁহার শরীর কিন্তু মনের ন্যায় সমভাবে থাকিল না ক্রমে তিনি অষ্টাদশবর্ষে পদার্পণ করিলেন৷ দেবতুল্য স্বামীর প্রথম সন্দর্শনজনিত আনন্দ তাঁহাকে জীবনের দৈনন্দিন সুখদুঃখ হইতে উচ্চে উঠাইয়া রাখিলেও সংসারে নিরাবিল আনন্দের অবসর কোথায়? গ্রামের পুরুষেরা জল্পনা করিতে বসিয়া যখন তাঁহার স্বামীকে উন্মত্ত বলিয়া নির্দেশ করিত, ‘পরিধানের কাপড় পর্যন্ত ত্যাগ করিয়া হরি হরি করিয়া বেড়ায়’– ইত্যাদি নানা কথা বলিত, অথবা সমবয়স্কা রমণীগণ যখন তাঁহাকে ‘পাগলের স্ত্রী’ বলিয়া করুণা বা উপেক্ষার পাত্রী বিবেচনা করিত, তখন মুখে কিছু না বলিলেও তাঁহার অন্তরে দারুণ ব্যথা উপস্থিত হইত৷ উন্মনা হইয়া তিনি তখন চিন্তা করিতেন–তবে কি পূর্বে যেমন দেখিয়াছিলাম তিনি সেরূপ নাই? লোকে যেমন বলিতেছে, তাঁহার কি ঐরূপ অবস্থান্তর হইয়াছে? অশেষ চিন্তার পর স্থির করিলেন, তিনি দক্ষিণেশ্বরে স্বয়ং গমনপূর্বক চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করিবেন৷
ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমায় পুণ্যতোয়া জাহ্ণবীতে স্নান করিবার জন্য শ্রীমতী মাতাঠাকুরানীর দূরসম্পর্কীয়া কয়েকজন আত্মীয়া ঐ বৎসর আগমন করিবেন বলিয়া ইতঃপূর্বেই স্থির করিয়াছিলেন৷ তিনি তখন তাঁহাদিগের সহিত গঙ্গাস্নানে যাইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন৷ তাঁহার বুদ্ধিমান পিতা শুনিয়াই বুঝিলেন, কন্যা কেন এখন কলকাতায় যাইতে অভিলাষিণী হইয়াছেন৷ তিনি তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া স্বয়ং কলকাতা আসিবার জন্য সকল বিষয়ের বন্দোবস্ত করিলেন৷ তখন বিষ্ণুপুর বা তারকেশ্বর কোন স্থানেই রেলপথ প্রস্তুত হয় নাই৷ অতএব কন্যা ও সঙ্গিগণ সমভিব্যাহারে শ্রীরামচন্দ্র দূরপথ পদব্রজে অতিবাহিত করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু পথশ্রমে অনভ্যস্তা কন্যা পথিমধ্যে একস্থলে দারুণ জ্বরে আক্রান্ত হইয়া পিতাকে বিশেষ চিন্তান্বিত করিয়া তুলিলেন৷ কন্যার ঐরূপ অবস্থায় অগ্রসর হওয়া অসম্ভব বুঝিয়া তিনি চটিতে আশ্রয় লইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন৷ পথিমধ্যে এরূপে পীড়িতা হওয়ায় শ্রীমতী মাতাঠাকুরানীর অন্তঃকরণে কতদূর বেদনা উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা বলিবার নহে৷ কিন্তু এক অদ্ভুত দর্শন উপস্থিত হইয়া ঐ সময়ে তাঁহাকে আশ্বস্তা করিয়াছিল৷ উক্ত দর্শনের কথা তিনি পরে স্ত্রীভক্তদিগকে কখনও কখনও নিম্নলিখিত ভাবে বলিয়াছেন, ‘‘জ্বরে যখন একেবারে বেহুঁশ, লজ্জা–সমরহিত হইয়া পড়িয়া আছি, তখন দেখিলাম, পার্শ্বে একজন রমণী আসিয়া বসিল–মেয়েটির রং কাল, কিন্তু এমন সুন্দর রূপ কখনও দেখি নাই৷–বসিয়া আমার গায়ে মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল৷–এমন নরম ঠাণ্ডা হাত গায়ের জ্বালা জুড়াইয়া যাইতে লাগিল৷ জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘তুমি কোথা থেকে আসচ গা?’ রমণী বলিল, ‘আমি দক্ষিণেশ্বর থেকে আসচি৷’–শুনিয়া অবাক হইয়া বলিলাম, ‘দক্ষিণেশ্বর থেকে? আমি মনে করেছিলাম দক্ষিণেশ্বরে যাব, তাঁকে (ঠাকুরকে) দেখব, তাঁর সেবা করব৷ কিন্তু পথে জ্বর হওয়ায় আমার ভাগ্যে ঐ সব আর হলো না৷’ রমণী বলিল, ‘সে কি তুমি দক্ষিণেশ্বরে যাবে বই কি, ভাল হয়ে–সেখানে যাবে, তাঁকে দেখবে৷ তোমার জন্যই তো তাঁকে সেখানে আটকে রেখেছি৷’ আমি বলিলাম, ‘বটে তুমি আমাদের কে হও গা?’ মেয়েটি বলিল, ‘আমি তোমার বোন হই৷’ আমি বলিলাম, ‘বটে তাই তুমি এসেছ?’–এইরূপ কথাবার্তার পরেই ঘুমাইয়া পড়িলাম৷’’
প্রাতঃকালে উঠিয়াই শ্রীরামচন্দ্র দেখিলেন, কন্যার জ্বর ছাড়িয়া গিয়াছে৷ পথিমধ্যে নিরুপায় হইয়া বসিয়া থাকা অপেক্ষা তিনি তাঁহাকে লইয়া ধীরে ধীরে পথ অতিবাহন করাই শ্রেয়ঃ বিবেচনা করিলেন৷ কিছুদূর যাইতে না যাইতে একখানি শিবিকাও পাওয়া গেল৷ ক্রমে পথের শেষ হইল এবং রাত্রি নয়টার সময় শ্রীশ্রীমা দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সমীপে উপস্থিত হইলেন৷ ঠাকুর তাঁহাকে সহসা ঐরূপ রোগাক্রান্ত হইয়া আসিতে দেখিয়া বিশেষ উদ্বিগ্ণ হইলেন৷ ঠাণ্ডা লাগিয়া জ্বর বাড়িবে বলিয়া নিজ গৃহে ভিন্ন শয্যায় তাঁহার শয়নের বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন এবং দুঃখ করিয়া বারংবার বলিতে লাগিলেন, ‘‘তুমি এতদিনে আসিলে? আর কি আমার সেজবাবু (মথুরবাবু) আছে যে তোমার যত্ন হবে?’’ ঔষধ পথ্যাদির বিশেষ বন্দোবস্তে তিন–চার দিনেই শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী আরোগ্যলাভ করিলেন৷ ঐ তিন–চার দিন ঠাকুর তাঁহাকে দিবারাত্র নিজ গৃহে রাখিয়া ঔষধ পথ্যাদির সকল বিষয়ের স্বয়ং তত্ত্বাবধান করিলেন, পরে নহবত ঘরে নিজ জননীর নিকটে তাঁহার থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন৷
চক্ষু কর্ণের বিবাদ মিটিল৷ শ্রীমতী মাতাঠাকুরানী প্রাণে প্রাণে বুঝিলেন, ঠাকুর পূর্বে যেমন ছিলেন এখনো তদ্রূপ আছেন–সংসারী মানব না বুঝিয়া তাঁহার সম্বন্ধে নানা রটনা করিয়াছে৷ প্রাণের উল্লাসে তিনি নহবতে থাকিয়া দেবতার ও দেবজননীর সেবায় নিযুক্তা হইলেন৷
কামারপুকুরে অবস্থানকালে শ্রীমতী মাতাঠাকুরানীর আগমনে ঠাকুরের মনে যে চিন্তা–পারম্পর্যের উদয় হইয়াছিল তাহা আমরা পাঠককে পূর্বেই বলিয়াছি৷ ব্রহ্মবিজ্ঞানে দৃঢ়প্রতিষ্ঠালাভ সম্বন্ধীয় আচার্য শ্রীমৎ তোতাপুরীর কথা আলোচনাপূর্বক ঐকালে নিজ সাধনলব্ধ–বিজ্ঞানে পরীক্ষা করিতে এবং পত্নীর প্রতি নিজ কর্তব্য প্রতিপালনে অগ্রসর হইয়াছিলেন৷ কিন্তু ঐ সময়ে তদুভয় অনুষ্ঠানের আরম্ভমাত্র করিয়াই তাঁহাকে কলকাতায় ফিরিতে হইয়াছিল৷ শ্রীমতী মাতাঠাকুরানীকে নিকটে পাইয়া তিনি এখন পুনরায় ঐ দুই বিষয়ে মনোনিবেশ করিলেন এবং অবসর পাইলেই মাতাঠাকুরানীকে মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও কর্তব্য সম্বন্ধে সর্বপ্রকার শিক্ষাপ্রদান করিতে লাগিলেন৷ শ্রীমতী মাতাঠাকুরানী একদিন এই সময়ে ঠাকুরের পদসংবাহন করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘‘আমাকে তোমার কি বলিয়া বোধ হয়?’’ ঠাকুর তদুত্তরে বলিয়াছিলেন, ‘‘যে মা মন্দিরে আছেন তিনিই এই শরীরের জন্ম দিয়াছেন ও সম্প্রতি নহবতে বাস করিতেছেন এবং তিনিই এখন আমার পদসেবা করিতেছেন৷ সাক্ষাৎ আনন্দময়ীরূপ বলিয়া তোমাকে সর্বদা সত্য সত্য দেখিতে পাই৷’’
অতঃপর শ্রীশ্রীজগন্মাতার নিয়োগে তাঁহার প্রাণে এক অদ্ভুত বাসনার উদয় হইল এবং কিছুমাত্র দ্বিধা না করিয়া তিনি উহা কার্যে পরিণত করিলেন৷ তাহাই এখন পাঠককে উপহার দিব৷ ইং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ৷ জ্যৈষ্ঠমাসের অর্ধেকের উপর গত হইয়াছে৷ আজ অমাবস্যা ফলহারিণী কালিকাপূজার পুণ্য দিবস৷ ঠাকুর শ্রীশ্রীজগদম্বাকে পূজা করিবার মানসে আজ বিশেষ আয়োজন করিয়াছেন৷ ঐ আয়োজন কিন্তু মন্দিরে না হইয়া তাঁহার ইচ্ছানুসারে গুপ্তভাবে তাঁহার গৃহেই হইয়াছে৷ পূজাকালে নদেবীকে বসিতে দিবার জন্য আলিম্পনভূষিত একখানি পীঠ পূজকের আসনের দক্ষিণপার্শ্বে স্থাপিত হইয়াছে৷ নদেবীর রহস্য–পূজার সকল আয়োজন সম্পূর্ণ হইতে রাত্রি নয়টা বাজিয়া গেল৷ শ্রীমতী মাতাঠাকুরানীরকে পূজাকালে উপস্থিত থাকিতে ঠাকুর ইতঃপূর্বে বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন৷ তিনিও ঐ গৃহে এখন আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ ঠাকুর পূজায় বসিলেন৷ ঠাকুর এইবার আলিম্পনভূষিত পীঠে শ্রীশ্রীমাকে উপবেশনের জন্য ইঙ্গিত করিলেন৷ মন্ত্রমুগ্ধার ন্যায় তিনি এখন পূর্বমুখে উপবিষ্ট ঠাকুরের দক্ষিণভাগে উত্তরাস্যা হইয়া উপবিষ্টা হইলেন৷ সম্মুখস্থ কলসের মন্ত্রপূত বারি দ্বারা ঠাকুর বারংবার শ্রীশ্রীমাকে যথাবিধানে অভিষিক্তা করিলেন৷ অতঃপর মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া তিনি এখন প্রার্থনা মন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, ‘‘হে বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইঁহার শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইঁহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণসাধন কর৷’’ অতঃপর শ্রীমায়ের অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধানে ন্যাসপূর্বক ঠাকুর সাক্ষাৎ নদেবী জ্ঞানে তাঁহাকে ষোড়শোপচারে পূজা করিলেন এবং ভোগ নিবেদন করিয়া নিবেদিত বস্তুসকলের কিয়দংশ স্বহস্তে তাঁহার মুখে প্রদান করিলেন৷ বাহ্যজ্ঞানতিরোহিতা হইয়া শ্রীশ্রীমা সমাধিস্থা হইলেন৷ ঠাকুরও অর্ধবাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সম্পূর্ণ সমাধিমগ্ণ হইলেন৷ সমাধিস্থ পূজক সমাধিস্থা দেবীর সহিত আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হইলেন৷ নিশার দ্বিতীয় প্রহর বহুক্ষণ অতীত হইয়াছে৷ আত্মারাম ঠাকুরের এইবার বাহ্যসংজ্ঞার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা গেল৷ পূর্বের ন্যায় অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া তিনি এখন নদেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন৷ অনন্তর আপনার সহিত সাধনার ফল এবং আপনার জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব শ্রীশ্রীদেবীপাদপদ্মে চিরকালের নিমিত্ত বিসর্জনপূর্বক মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে তাঁহাকে প্রণাম করিলেন ঃ
‘‘হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকা, হে শরণদায়িনি ত্রিনয়নি শিবগেহিনি গৌরি, হে নারায়ণি, তোমাকে প্রণাম, তোমাকে প্রণাম করি৷’’
পূজা শেষ হইল–মূর্তিমতী বিদ্যারূপিণী মানবীর দেহাবলম্বনে ঈশ্বরীয় উপাসনাপূর্বক ঠাকুরের সাধনার পরিসমাপ্তি হইল–তাঁহার দেব–মানবত্ব সর্বতোভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করিল৷ এইরূপে এক বৎসর চারি মাসকাল ঠাকুরের নিকটে দক্ষিণেশ্বরে অতিবাহিত করিয়া শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী কামারপুকুরে প্রত্যাগমন করিলেন৷
এই কালের এক বৎসর পরে ঠাকুরের মন আবার অন্য এক সাধনপথে শ্রীশ্রীজগদম্বাকে দর্শন করিবার জন্য উন্মুক্ত হইয়াছিল৷ তখন তিনি কলকাতার সিঁদুরিয়াপটি পল্লিনিবাসী ব্রাহ্মধর্মানুরাগী দানশীল শ্রীযুক্ত শম্ভুচরণ মল্লিকের সহিত পরিচিত হইয়াছেন এবং তাঁহার নিকটে বাইবেল শ্রবণপূর্বক শ্রীশ্রীঈশার পবিত্র জীবনের এবং সম্প্রদায় প্রবর্তনের কথা জানিতে পারিয়াছিলেন৷ খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব প্রত্যক্ষ করিবার বাসনা মনে ঈষন্মাত্র উদয় হইতে না হইতেই শ্রীশ্রীজগদম্বা উহা এক অদ্ভুত উপায়ে পূর্ণ করিয়া দিলেন৷ ঘটনা এইরূপ হইয়াছিল–দক্ষিণেশ্বর কালীবাটির দক্ষিণপার্শ্বে যদুলাল মল্লিকের উদ্যানবাটি ঠাকুর ঐ স্থানে মধ্যে মধ্যে বেড়াইতে যাইতেন৷ যদুলাল ও তাঁহার মাতা তাঁহাকে বিশেষ ভক্তিশ্রদ্ধা করিতেন৷ সুতরাং উদ্যানে তাঁহারা উপস্থিত না থাকিলেও ঠাকুর তথায় বেড়াইতে যাইলে কর্মচারিগণ বাবুদের বৈঠকখানা উন্মুক্ত করিয়া তাঁহাকে কিছুকাল বসিবার ও বিশ্রাম করিবার জন্য অনুরোধ করিত৷ উক্ত গৃহের দেয়ালে অনেকগুলি উত্তম চিত্র বিলম্বিত ছিল৷ তন্মধ্যে মাতৃক্রোড়ে অবস্থিত শ্রীশ্রীঈশার বাল–গোপাল মূর্তিও একখানি ছিল৷ ঠাকুর বলিতেন, একদিন উক্ত ঘরে বসিয়া তিনি ঐ ছবিখানি তন্ময় হইয়া দেখিতেছিলেন এবং শ্রীশ্রীঈশার জীবনকথা ভাবিতেছিলেন এমন সময় দেখিলেন ছবিখানি যেন জীবন্ত জ্যোতির্ময় হইয়া উঠিয়াছে এবং ঐ অদ্ভুত দেব–জননী ও দেব–শিশুর অঙ্গ হইতে জ্যোতিরশ্মিসমূহ তাঁহার অন্তরে প্রবিষ্ট হইয়া তাঁহার মানসিক ভাবসকল আমূল পরিবর্তন করিয়া দিতেছে৷ জন্মগত হিন্দু–সংস্কারসমূহ অন্তরে নিভৃতকোণে লীন হইয়া ভিন্ন সংস্কারসকল উহাতে উদয় হইতেছে দেখিয়া ঠাকুর তখন নানাভাবে আপনাকে সামলাইতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন, শ্রীশ্রীজগদম্বাকে কাতর হইয়া বলিতে লাগিলেন, ‘‘মা আমাকে এ কি করিতেছিস?’’ কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না৷ ঐ সংস্কার–তরঙ্গ প্রবলবেগে উত্থিত হইয়া তাঁহার মনে হিন্দুসংস্কারসমূহক্ এককালে তলাইয়া দিল৷ তখন দেব–দেবীসকলের প্রতি ঠাকুরের অনুরাগ, ভালবাসা কোথায় বিলীন হইল এবং শ্রীশ্রীঈশার ও তৎপ্রবর্তিত সম্প্রদায়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আসিয়া হূদয় অধিকার করিল৷ তিন দিন পর্যন্ত ঐ ভাবতরঙ্গ তাঁহার উপর প্রভুত্ব করিয়া বর্তমান রহিল৷ পরে তৃতীয় দিবসের অবসানে ঠাকুর পঞ্চবটীতলে বেড়াইতে বেড়াইতে দেখিলেন, এক অদৃষ্টপূর্ব দেবমানব, সুন্দর গৌরবর্ণ, স্থির দৃষ্টিতে তাঁহাকে অবলোকন করিতে করিতে তাঁহার দিকে অগ্রসর হইতেছেন৷ দেখিতে দেখিতে ঐ মূর্তির নিকটে আগমন করিল এবং ঠাকুরের পূত হূদয়ের অন্তস্তল হইতে ধ্বনিত হইতে লাগিল, ‘ঈশামসি’৷ তখন দেব–মানব ঈশা ঠাকুরকে আলিঙ্গন করিয়া তাঁহার শরীরে লীন হইলেন এবং ভাবাবিষ্ট হইয়া বাহ্যজ্ঞান হারাইয়া ঠাকুরের মন সগুণ বিরাট ব্রহ্মের সহিত কতক্ষণ পর্যন্ত একীভূত হইয়া রহিল৷ এইরূপে শ্রীশ্রীঈশার দর্শনলাভ করিয়া ঠাকুর তাঁহার অবতারত্বসম্বন্ধে নিঃসন্দিগ্ধ হইয়াছিলেন৷
ভগবান শ্রীবুদ্ধদেব সম্বন্ধে ঠাকুর হিন্দুসাধারণ যেমন বিশ্বাস করিয়া থাকে, সেইরূপ বিশ্বাস করিতেন বুদ্ধদেবকে তিনি ঈশ্বরাবতার বলিয়া শ্রদ্ধা ও পূজা করিতেন এবং নপুরীধামস্থ শ্রীশ্রীজগন্নাথ–সুভ ত্রিরত্নমূর্তিতে শ্রীভগবান বুদ্ধাবতারের প্রকাশ অদ্যাপি বর্তমান বলিয়া বিশ্বাস করিতেন৷ জৈনধর্মপ্রবর্তক তীর্থঙ্করসকলের এবং শিখধর্মপ্রবর্তক গুরু নানক হইতে গুরু গোবিন্দ পর্যন্ত সকলের প্রতি ঠাকুরের বিশেষ ভক্তিশ্রদ্ধা ছিল কিন্তু ইঁহাদের কাহাকেও ঠাকুর ঈশ্বরাবতার বলিয়া নির্দেশ করেন নাই৷ শিখদিগের দশগুরু সম্বন্ধে ঠাকুর বলিতেন, ‘‘তাঁহারা সকলে জনক ঋষির অবতার–শিখদিগের নিকট শুনিয়াছি, রাজর্ষি জনকের মনে মুক্তিলাভ করিবার পূর্বে লোককল্যাণসাধন করিবার কামনা উদয় হইয়াছিল এবং সেজন্য তিনি নানকাদি গোবিন্দ পর্যন্ত দশগুরুরূপে দশবার জন্মগ্রহণ করিয়া শিখজাতির মধ্যে ধর্মসংস্থাপনপূর্ব পরব্রহ্মের সহিত চিরকালের নিমিত্ত মিলিত হইয়াছিলেন৷’’
নষোড়শীপূজার পরে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্ঢেম্বর মাসে কামারপুকুরে প্রত্যাগমন করেন এবং শ্রীশ্রীমায়ের ঐ স্থানে পঁৌছিবার স্বল্পকাল পরেই ঠাকুরের মধ্যমাগ্রজ শ্রীযুক্ত রামেশ্বর ভট্টাচার্য জ্বরাতিসার রোগে মৃত্যুমুখে পতিত হন৷ রামেশ্বরের মৃত্যুর পর তৎপুত্র রামলাল দক্ষিণেশ্বরে পূজার ভার গ্রহণ করেন৷ ইং ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী পদব্রজে দ্বিতীয়বার দক্ষিণেশ্বরে আগমন করেন৷ তৎকালে জাহানাবাদ (আরামবাগ) পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া পথিকগণকে চারি–পাঁচ ক্রোশব্যাপী তেলো–ভেলো ও কৈকলার মাঠ উত্তীর্ণ হইয়া নতারকেশ্বর এবং তথা হইতে বৈদ্যবাটিতে আসিয়া গঙ্গা পার হইতে হইত৷ ঐ বিস্তীর্ণ প্রান্তরদ্বয়ে তখন ডাকাতগণের ঘাঁটি ছিল৷ তেলো–ভেলো নামক ক্ষুদ্র গ্রামদ্বয়ের এক ক্রোশ আন্দাজ দূরে প্রান্তরের মধ্যভাগে করালবদনা, সুভীষণা এক নকালীমূতির এখনও দর্শন মিলিয়া থাকে৷ লোকে বলে, ইঁহাকে পূজা করিয়া ডাকাতেরা নরহত্যারূপ নৃশংস কার্যে অগ্রসর হইত৷ ঠাকুরের মধ্যমাগ্রজ রামেশ্বরের কন্যা ও কনিষ্ঠ পুত্র এবং অপর কয়েকটি স্ত্রীপুরুষের সহিত শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী কামারপুকুর হইতে দক্ষিণেশ্বরে যাত্রা করিলেন৷ আরামবাগে পঁৌছিয়া তেলো–ভেলো এবং কৈকলার প্রান্তর সন্ধ্যার পূর্বে পার হইবার যথেষ্ট সময় আছে ভাবিয়া তাঁহার সঙ্গিগণ ঐ স্থানে অবস্থান ও রাত্রিযাপনে অনিচ্ছা প্রকাশ করিতে লাগিল৷ পথশ্রমে ক্লান্তি অনুভব করিলেও শ্রীশ্রীমা তজ্জন্য ঐ বিষয়ে কাহাকেও না বলিয়া তাহাদিগের সহিত অগ্রসর হইলেন৷ কিন্তু দুই ক্রোশ পথ যাইতে না যাইতে দেখা গেল, তিনি সঙ্গীদিগের সহিত সমভাবে চলিতে না পারিয়া পিছাইয়া পড়িতেছেন৷ তখন তাঁহার নিমিত্ত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া এবং তিনি নিকটে আসিলে তাঁহাকে দ্রুত চলিতে বলিয়া তাহারা পুনরায় গন্তব্য পথে চলিতে লাগিল৷ পুনঃপুনঃ এইরূপ হইতেছে দেখিয়া সঙ্গিগণ নিকটে আসিয়া বলিল, এইভাবে চলিলে একপ্রহর রাত্রির মধ্যেও প্রান্তর পার হইতে পারা যাইবে না ও সকলকে ডাকাতের হস্তে পড়িতে হইবে৷ এতগুলি লোকের অসুবিধা ও আশঙ্কার কারণ হইয়াছেন দেখিয়া শ্রীশ্রীমা তখন তাহাদিগকে তাঁহার নিমিত্ত পথিমধ্যে অপেক্ষা করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন, ‘‘তোমরা একেবারে নতারকেশ্বরের চটিতে পঁৌছিয়া বিশ্রাম করগে, আমি যত শীঘ্র পারি তোমাদিগের সহিত মিলিত হইতেছি৷’’ বেলা অধিক নাই দেখিয়া এবং তাঁহার কথার উপর নির্ভর করিয়া সঙ্গিগণ আর কালবিলম্ব না করিয়া অধিকতর বেগে পথ অতিক্রমপূর্বক শীঘ্রই দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া পড়িল৷
শ্রীশ্রীমা তখন যথাসাধ্য দ্রুতপদে চলিতে লাগিলেন কিন্তু শরীর নিতান্ত অবসন্ন হওয়ায় প্রান্তরমধ্যে পঁৌছিবার কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা উপস্থিত হইল৷ বিষম চিন্তিতা হইয়া তিনি কি করিবেন ভাবিতেছেন এমন সময় দেখিলেন দীর্ঘাকার ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ এক পুরুষ যষ্টি স্কন্ধে লইয়া তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া দ্রুতপদে অগ্রসর হইতেছে৷ তাহার পশ্চাতে দূরে তাহার সঙ্গীর ন্যায় এক ব্যক্তিও আসিতেছে বলিয়া বোধ হইল৷ পলায়ন বা চিৎকার করা বৃথা বুঝিয়া শ্রীশ্রীমা তখন স্থিরভাবে দণ্ডায়মান থাকিয়া উহাদিগের আগমন সশঙ্কচিত্তে প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন৷ কয়েক মুহূর্ত মধ্যে যমদূত–সদৃশ ঐ বিকটাকার পুরুষ নিকটে আসিয়া তাঁহাকে কর্কশ স্বরে প্রশ্ণ করিল, ‘‘কে গা এ সময়ে এখানে দাঁড়াইয়া আছ?’’ শ্রীশ্রীমা তখন তাহাকে প্রশ্ণ করিবার আশায় পিতৃসম্বোধনপূর্বক একেবারে তাহার শরণাপন্ন হইয়া বলিলেন, ‘‘বাবা, আমার সঙ্গিগণ আমাকে ফেলিয়া গিয়াছে, বোধ হয় আমি পথও ভুলিয়া গিয়াছি তুমি আমাকে সঙ্গে করিয়া যদি তাহাদিগের নিকটে পঁৌছাইয়া দাও৷ তোমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে রানী রাসমণির কালীবাড়িতে থাকেন, আমি তাঁহার নিকটেই যাইতেছি, তুমি যদি সেখান পর্যন্ত আমাকে লইয়া যাও তাহা হইলে তিনি তোমাকে বিশেষ সমাদর করিবেন৷’’ ঐ কথাগুলি বলিতে না বলিতে পূর্বোক্ত দ্বিতীয় ব্যক্তিও তথায় উপস্থিত হইল এবং শ্রীশ্রীমা দেখিলেন সে পুরুষ নহে, রমণী, প্রথমাগত পুরুষের পত্নী৷ ঐ রমণীকে দেখিয়া বিশেষ আশ্বস্তা হইয়া শ্রীশ্রীমা তখন তাহার হস্তধারণ ও মাতৃসম্বোধনপূর্বক বলিলেন, ‘‘মা, আমি তোমার মেয়ে সারদা, সঙ্গীরা ফেলিয়া যাওয়ায় বিষম বিপদে পড়িয়াছিলাম, ভাগ্যে বাবা ও তুমি আসিয়া পড়িলে, নতুবা কি করিতাম বলিতে পারি না৷’’
শ্রীশ্রীমায়ের ঐরূপ নিঃসঙ্কোচ সরল ব্যবহার, একান্ত বিশ্বাস ও মিষ্ট কথায় বাগদি পাইক ও তাহার পত্নীর প্রাণ এককালে বিগলিত হইল৷ সামাজিক আচার ও জাতির কথা ভুলিয়া তাহারা সত্য সত্যই আপনাদিগের কন্যার ন্যায় দেখিয়া তাঁহাকে অশেষ সাত্ব্ন্না প্রদান করিতে লাগিল৷ পরে তাঁহার শারীরিক অবসন্নতার কথা আলোচনা করিয়া তাহারা তাঁহাকে গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে না দিয়া, সমীপবর্তী তেলো–ভেলো গ্রামের এক ক্ষুদ্র দোকানে লইয়া যাইয়া রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত করিল৷ রমণী নিজ বস্ত্রাদি বিছাইয়া তাঁহার নিমিত্ত শয্যা প্রস্তুত করিল এবং বাগদি–বাবা দোকান হইতে মুড়ি–মুড়কি কিনিয়া তাঁহাকে ভোজন করিতে দিল৷ ঐরূপে মাতাপিতার ন্যায় আদর ও স্নেহে তাঁহাকে ঘুম পাড়াইয়া ও রক্ষা করিয়া তাহারা সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত করিল এবং প্রতূ্যষে উঠাইয়া সঙ্গে লইয়া দুই চার দণ্ড বেলা হইলে তারকেশ্বরে উপস্থিত হইয়া এক দোকানে আশ্রয়গ্রহণপূর্বক তাঁহাকে বিশ্রাম করিতে বলিল৷ অনন্তর রমণী তাহার স্বামীকে সম্বোধন করিয়া বলিল, ‘‘আমার মেয়ে কাল কিছুই খাইতে পায় নাই, বাবার (নতারকনাথের) পূজাদি শীঘ্র সারিয়া বাজার হইতে মাছ, তরি–তরকারি লইয়া আইস, আজ তাহাকে ভাল করিয়া খাওয়াইতে হইবে৷’’
পুরুষ এসকল কর্ম করিতে চলিয়া যাইলে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর সঙ্গী ও সঙ্গিনীগণ তাঁহাকে অন্বেষণ করিতে করিতে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল এবং তিনি নিরাপদে পঁৌছিয়াছেন দেখিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিল৷ তখন শ্রীশ্রীমা তাঁহার রাত্রে আশ্রয়দাতা মাতাপিতার সহিত তাহাদিগকে পরিচিত করাইয়া বলিলেন, ‘‘ইহারা আসিয়া আমাকে রক্ষা না করিলে কাল রাত্রে কি যে করিতাম তাহা বলিতে পারি না৷’’ অনন্তর পূজা, রন্ধন ও ভোজনাদি শেষ করিয়া কিছুক্ষণ ঐ স্থানে বিশ্রামপূর্বক সকলে বৈদ্যবাটি অভিমুখে যাত্রা করিবার জন্য প্রস্তুত হইলে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ঐ পুরুষ ও রমণীকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া বিদায় প্রার্থনা করিলেন৷ শ্রীশ্রীমা বলেন, ‘‘এক রাত্রের মধ্যে আমরা পরস্পরকে এতদূর আপনার করিয়া লইয়াছিলাম যে, বিদায়কালে ব্যাকুল হইয়া অজস্র ক্রন্দন করিতে লাগিলাম৷ অবশেষে সুবিধামতো দক্ষিণেশ্বরে আমাকে দেখিতে আসিতে পুনঃপুনঃ অনুরোধপূর্বক ঐ কথা স্বীকার করাইয়া লইয়া অতি কষ্টে তাহাদিগকে ছাড়িয়া আসিলাম৷ আসিবার কালে তাহারা অনেকদূর পর্যন্ত আমাদিগের সঙ্গে আসিয়াছিল এবং রমণী পার্শ্ববর্তী ক্ষেত্র হইতে কতকগুলি কলাইশুঁটি তুলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অঞ্চলে বাঁধিয়া কাতরকণ্ঠে বলিতে লাগিল, ‘মা, সারদা, রাত্রে যখন মুড়ি খাইবি, তখন এইগুলি দিয়া খাস৷’ আমার ডাকাতবাবা ও মা পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিষ্টান্ন প্রভৃতি দ্রব্য লইয়া আমাকে দেখিতে মধ্যে মধ্যে কয়েকবার দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল৷ তিনিও (ঠাকুর) আমার নিকট সকল কথা শুনিয়া ঐ সময়ে তাহাদিগের সহিত জামাতার ন্যায় ব্যবহারে ও আদর আপ্যায়নে তাহাদিগকে পরিতৃপ্ত করিয়াছিলেন৷ এমন সরল ও সচ্চরিত্র হইলেও আমার ডাকাত বাবা পূর্বে কখনও কখনও ডাকাতি যে করিয়াছিল একথা কিন্তু আমার মনে হয়৷’’
এক বৎসরাধিকাল দক্ষিণেশ্বরে বাস করিবার পর শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী আমাশয় রোগে কঠিনভাবে আক্রান্তা হইলেন৷ শম্ভুবাবু তাঁহাকে আরোগ্য করিবার জন্য বিশেষ যত্ন করিতে লাগিলেন৷ একটু আরোগ্য হইলে ইং ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্ঢেম্বর মাসে শ্রীশ্রীমা পিত্রালয় জয়রামবাটী গ্রামে গমন করিলেন, কিন্তু তথায় যাইবার স্বল্পকাল পরে পুনরায় তিনি ঐ রোগে শয্যাশায়িনী হইলেন৷ ক্রমে উহার এত বৃদ্ধি হইল যে, তাঁহার শরীর রক্ষা সংশয়ের বিষয় হইয়া উঠিল৷ রোগের যখন কিছুতেই উপশম হইল না, তখন শ্রীশ্রীমার প্রাণে নদেবীর নিকট হত্যাপ্রদানের কথা উদিত হইল এবং তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া গ্রাম্য দেবী নসিংহবাহিনীর মাড়ে (মন্দির) যাইয়া ঐ উদ্দেশ্যে প্রায়োপবেশন করিয়া পড়িয়া রহিলেন৷ কয়েক ঘণ্টাকাল ঐরূপে থাকিবার পরেই নদেবী প্রসন্না হইয়া তাঁহাকে আরোগ্যের জন্য ঔষধ নির্দেশ করিয়া দিলেন৷ নদেবীর আদেশে উক্ত ঔষধ সেবন মাত্রেই তাঁহার রোগের শান্তি হইল এবং ক্রমে তাঁহার শরীর পূর্বের ন্যায় সবল হইয়া উঠিল৷ শ্রীশ্রীমায়ের হত্যাপ্রদানপূর্বক ঔষধপ্রাপ্তিকাল হইতে ঐ দেবী বিশেষ জাগ্রতা বলিয়া চতুষ্পার্শ্বের গ্রামসমূহে প্রতিপত্তিলাভ করিয়াছিলেন৷
পীড়িতা হইয়া শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী পিত্রালয়ে যাইবার কয়েকমাস পরেই ঠাকুরের জীবনে একটি বিশেষ ঘটনা উপস্থিত হইয়াছিল৷ ইং ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের সম্ভবত মার্চমাসে ঠাকুরের জননী শ্রীমতী চন্দ্রমণি দেবী ৮৫ বৎসর বয়ঃক্রমকালে ইহলোক পরিত্যাগ করিলেন৷ বৃদ্ধার অন্তিমকাল উপস্থিত দেখিয়া তাঁহাকে অন্তর্জলি করা হইল এবং ঠাকুর ফুল, চন্দন ও তুলসী লইয়া তাঁহার পাদপদ্মে অঞ্জলি প্রদান করিলেন৷ পরে সন্ন্যাসীকে মুখাগ্ণি করিতে নাই বলিয়া ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র রামলাল তাঁহার নিয়োগে বৃদ্ধার দেহের সৎকার করিল৷ অনন্তর অশৌচ উত্তীর্ণ হইলে ঠাকুরের নির্দেশে রামলালই বৃষোৎসর্গ করিয়া ঠাকুরের জননীর শ্রাদ্ধক্রিয়া যথারীতি সম্পাদন করিলেন৷
এইসময় শম্ভুচরণ মল্লিকও মৃত্যুমুখে পতিত হন৷ পীড়িতাবস্থায় ঠাকুর তাঁহাকে একদিন দেখিতে গিয়াছিলেন এবং ফিরিয়া আসিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘শম্ভুর প্রদীপে তৈল নাই৷’’ মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে তিনি (শম্ভুচরণ) হূদয়কে হূষ্টচিত্তে বলিয়াছিলেন, ‘‘মরণের নিমিত্ত আমার কিছুমাত্র চিন্তা নাই, আমি পুঁটলি পাঁটলা বেঁধে প্রস্তুত হয়ে বসে আছি৷’’ শম্ভুবাবুর সহিত পরিচয় হইবার বহু পূর্বে ঠাকুর যোগারূঢ় অবস্থায় দেখিয়াছিলেন শ্রীশ্রীজগদম্বা শম্ভুকে তাঁহার দ্বতীয় রসদ্দাররূপে মনোনীত করিয়াছেন এবং দেখিবামাত্র তিনি তাঁহাকে সেই ব্যক্তি বলিয়া চিনিয়া লইয়াছিলেন৷
কাপ্তেন বিশ্বনাথ উপাধ্যায় নেপালের রাজার উকিল–রাজপ্রতিনিধি৷ ঠাকুর তাঁহাকে কাপ্তেন বলিয়া সম্বোধন করিতেন৷ বিশ্বনাথ যেমনি বিদ্বান তেমনি ভক্তিমান ছিলেন৷ বেদ, বেদান্ত, শ্রীমদ্ভাগবত, গীতা, অধ্যাত্মরামায়ণ এ–সকল ধর্মগ্রন্থ তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল৷ প্রতিদিন ভক্তিভরে ও তন্ময়চিত্তে তিনি তাঁহার ইষ্টদেবতার অর্চনা করিতেন৷ একদিন তিনি স্বপ্ণে দেখিলেন, কোন জ্যোতির্মণ্ডিত দিব্যপুরুষ তাঁকে আধ্যাত্মিক রাজ্যের শ্রেষ্ঠজ্ঞানসম্পদ গ্রহণ করিবার জন্য আহ্বান করিতেছেন৷ তারপর তিনি যখন দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আগমন করিয়া ঠাকুরের দর্শনলাভ করিলেন, তিনি দেখিলেন যে, সেই স্বপ্ণদৃষ্ট দিব্যপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং৷ তাঁহার বিষ্ময় ও পুলকের অবধি রহিল না৷ তদবধিই তিনি ঠাকুরের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হইয়া পড়েন এবং প্রায়ই ঠাকুরকে দক্ষিণেশ্বরে দর্শন করিতে আসিতেন৷ কখন কখনও ঠাকুরকে স্বগৃহে লইয়া অতিশয় শ্রদ্ধাভক্তির সহিত নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য তৈরি করিয়া খাওয়াইতেন৷ বিশ্বানাথ ঠাকুরকে কখনও কখনও তিন দিন পর্যন্ত নিরন্তর অত্যুচ্চ ভাবভূমিতে অবস্থান করিতে দেখিয়াছেন৷ তিনি ঠাকুরের এই আধ্যাত্মিক অবস্থা বেশ বুঝিতে পারিতেন এবং সর্বান্তঃকরণে তাঁহাকেই গুরুরূপে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন৷ এক সময়ে বিশ্বনাথ তাঁহার এক বন্ধুকে বলিয়াছিলেন, ‘‘আমি বেদ, বেদান্তাদি অনেক ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিয়াছি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সাধু ও ভক্তের সঙ্গে মিলিত হইয়াছি৷ কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসিয়া আমার অন্তরের সকল বাসনা চরিতার্থতালাভ করিয়াছে৷ দেবমূর্তি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে সত্যসত্যই শাস্ত্রের সকল মর্ম মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন তুমিও আমার এই কথার সত্যতা উপলব্ধি করিতে পারিবে৷’’
ঠাকুরের মনে এখন এক অভিনব বাসনা প্রবলভাবে উদিত হইল৷ তিনি যোগারূঢ়াবস্থায় দিব্যদৃষ্টিতে দেখিয়াছিলেন যে, তাঁহার কার্যের সাহায্যের জন্য অন্তরঙ্গ ভক্তসকল আগমন করিবে৷ সেই সকল ভক্তগণকে দেখিবার জন্য এবং তাহাদিগের অন্তরে নিজ ধর্মশক্তি সঞ্চার করিবার জন্য তিনি এখন বিশেষ ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন৷ ঠাকুর বলিতেন, ‘‘সেই ব্যাকুলতার সীমা ছিল না৷ দিবাবসানে যখন সন্ধ্যার সমাগম হইত তখন ধৈর্যের বাঁধ দিয়া ঐ ব্যাকুলতা আর রাখিতে পারিতাম না মনে হইত আমার একটা দিন চলিয়া গেল, তাহাদিগের কেহই আসিল না৷ যখন দেবালয় আরাত্রিকের শঙ্খঘণ্টারোলে মুখরিত হইয়া উঠিত তখন বাবুদিগের কুঠির উপরে ছাদে যাইয়া যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া ক্রন্দন করিতে করিতে উচ্চৈঃস্বরে ‘তোরা সব কে কোথায় আছিস আয়রে–তোদের না দেখে আর থাকতে পারচি না’ বলিয়া চিৎকারে গগন পূর্ণ করিতাম৷ মাতা তাহার বালককে দেখিবার জন্য ঐরূপ ব্যাকুলতা অনুভব করে কি না সন্দেহ সখা সখার সহিত এবং প্রণয়িযুগল পরস্পরের সহিত মিলনের জন্য কখনও ঐরূপ করে বলিয়া শুনি নাই–এত ব্যাকুলতায় প্রাণ চঞ্চল হইয়াছিল ঐরূপ হইবার কয়েকদিন পরেই ভক্তসকল একে একে উপস্থিত হইতে লাগিল’’
ঠাকুরের মাতৃবিয়োগের একবৎসর পূর্বে শ্রীশ্রীজগদম্বার ইচ্ছায় তাঁহার জীবনে একটি বিশেষ ঘটনা উপস্থিত হইয়াছিল৷ সন ১২৮১ সালের চৈত্র মাসের মধ্যভাগে (ইংরেজি ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে) ঠাকুরের প্রাণে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের নেতা শ্রীযুক্ত কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়কে দেখিবার বাসনা উদিত হইয়াছিল৷ শ্রীযুক্ত কেশব তখন কলকাতার কয়েক মাইল উত্তরে বেলঘরিয়া নামক স্থানে শ্রীযুক্ত জয়গোপাল সেন মহাশয়ের উদ্যান বাটিকায় সশিষ্য সাধনভজনে নিযুক্ত আছেন জানিতে পারিয়া হূদয়কে সঙ্গে করিয়া ঠাকুর ঐ উদ্যানে উপস্থিত হইলেন৷ গাড়ি হইতে নামিয়া হূদয় দেখিলেন, শ্রীযুক্ত কেশব অনুচরবর্গের সহিত উদ্যানমধ্যস্থ পুষ্করিণীর বাঁধা ঘাটে বসিয়া আছেন৷ অগ্রসর হইয়া হূদয় তাঁহাকে নিবেদন করিলেন, ‘‘আমার মাতুল হরিকথা ও হরিগুণগান শুনিতে বড় ভালবাসেন৷ আপনার নাম শুনিয়া আপনার মুখে ঈশ্বর–গুণানুকীর্তন শুনিতে তিনি এখানে আগমন করিয়াছেন, আদেশ পাইলে এখানে লইয়া আসিব৷’’ শ্রীযুক্ত কেশব সম্মতি প্রকাশ করিলে, হূদয় গাড়ি হইতে ঠাকুরকে নামাইয়া সঙ্গে লইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন৷ ঠাকুর বলিলেন, ‘‘বাবু, তোমরা নাকি ঈশ্বরকে দর্শন করিয়া থাক৷ ঐ দর্শন কিরূপ তাহা জানিতে বাসনা, সেজন্য তোমাদের নিকট আসিয়াছি৷’’ ঐরূপে সৎপ্রসঙ্গ আরম্ভ হইল৷ কিছুক্ষণ পর ঠাকুর ‘কে জানে মন কালী কেমন’–এই রামপ্রসাদী সঙ্গীতটি গাহিতে গাহিতে সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ হূদয় ঠাকুরের বাহ্যচৈতন্য আনয়নের জন্য তাঁহার কর্ণে প্রণব শুনাইতে লাগিলেন এবং উহা শুনিতে শুনিতে তাঁহার মুখমণ্ডল মধুরহাস্যে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল৷ ঐরূপে অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া ঠাকুর গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়সকল সামান্য সামান্য দৃষ্টান্ত সহায়ে এমন সরল ভাষায় বুঝাইতে লাগিলেন যে, সকলে মুগ্ধ হইয়া তাঁহার মুখপানে চাহিয়া বসিয়া রহিলেন৷ ঠাকুর তাঁহাদিগের ঐ প্রকার ভাব দেখিয়া বলিলেন, ‘‘গরুর পালে অন্য কোন পশু আসিলে তাহারা তাহাকে গুঁতাইতে যায়, কিন্তু গরু আসিলে গা চাটাচাটি করে–আমাদের আজ সেইরূপ হইয়াছে৷’’ অনন্তর কেশবকে সম্বোধন করিয়া ঠাকুর বলিলেন, ‘‘তোমার ল্যাজ খসিয়াছে৷’’ ঠাকুর ইহার অর্থ বুঝাইয়া সকলকে মোহিত করিলেন৷ তিনি বলিলেন, ‘‘দেখ, ব্যাঙ্গাচির যতদিন ল্যাজ থাকে ততদিন সে জলেই থাকে, স্থলে উঠিতে পারে না৷ কিন্তু ল্যাজ যখন খসিয়া পড়ে তখন জলেও থাকিতে পারে, ডাঙ্গাতেও বিচরণ করিতে পারে–সেইরূপ মানুষের যতদিন অবিদ্যারূপ ল্যাজ থাকে, ততদিন সে সংসার–জলেই কেবল থাকিতে পারে৷ ল্যাজ খসিয়া পড়িলে, সংসার ও সচ্চিদানন্দ উভয় বিষয়েই ইচ্ছামত বিচরণ করিতে পারে৷ কেশব তোমার এখন ঐরূপ হইয়াছে, উহা সংসারেও থাকিতে পারে এবং সচ্চিদানন্দেও যাইতে পারে৷’’ ঐরূপে নানা প্রসঙ্গে অনেকক্ষণ অতিবাহিত করিয়া ঠাকুর সেদিন দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসিলেন৷
ঠাকুরের দর্শন পাইবার পরে শ্রীযুক্ত কেশবের মন তাঁহার প্রতি এতদূর আকৃষ্ট হইয়াছিল যে, তখন হইতে তিনি প্রায়ই ঠাকুরের পুণ্যদর্শন লাভ করিয়া কৃতার্থ হইবার জন্য দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিতেন এবং মধ্যে মধ্যে ঠাকুরকে তাঁহার কলকাতার ‘কমল কুটির’ নামক বাটিতে লইয়া যাইয়া তাঁহার দিব্য সঙ্গলাভে আপনাকে সৌভাগ্যবান বিবেচনা করিতেন৷ ঠাকুর ও কেশবের সম্বন্ধ ক্রমে এত গভীর ভাব ধারণ করিল যে, পরস্পর পরস্পরকে কয়েকদিন দেখিতে না পাইলে উভয়েই বিশেষ অভাববোধ করিতেন৷ তখন ঠাকুর কলকাতায় তাঁহার নিকট উপস্থিত হইতেন, অথবা শ্রীযুক্ত কেশব দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিতেন৷ তদ্ভিন্ন ব্রাহ্মসমাজের উৎসবের সময় প্রতিবৎসর ঠাকুরের নিকট আগমন করিয়া অথবা ঠাকুরকে লইয়া যাইয়া তাঁহার সহিত ঈশ্বর প্রসঙ্গে একদিন অতিবাহিত করাকে শ্রীযুক্ত কেশব ঐ উৎসবের অঙ্গ মধ্যে পরিগণিত করিতেন৷ এইরূপে কখনও কেশব জাহাজে করিয়া কীর্তন করিতে করিতে সদলবলে দক্ষিণেশ্বরে আগমনপূর্বক ঠাকুরের সঙ্গে মিলিত হইতেন কখনও বা ঠাকুরকে জাহাজে উঠাইয়া লইয়া তাঁহার অমৃতময় উপদেশ শুনিতে শুনিতে গঙ্গাবক্ষে বিচরণ করিতেন৷
বলা বাহুল্য, শ্রীযুক্ত কেশবচন্দ্রের সহিত ঠাকুরের মিলন হইবার পরে কলকাতার জনসাধারণ ঠাকুরের কথা বিশেষভাবে জানিতে পারিয়াছিল৷ ঠাকুরের পুণ্যদর্শন ও অমৃতনিস্যন্দিনী বাণীতে কেশব জীবনপথে যতই নূতন আলোক দেখিতে লাগিলেন, ততই ঐ কথা মুক্তকণ্ঠে জনসাধারণকে জানাইয়া তাহারা সকলেও যাহাতে তাঁহার ন্যায় তৃপ্তি ও আনন্দলাভ করিতে পারে, তজ্জন্য সোৎসাহে আহ্বান করিতে লাগিলেন৷ সেইজন্য তখন হইতে ব্রাহ্মসমাজের ইংরেজি ও বাংলা যাবতীয় পত্রিকা যথা ‘সুলভ সমাচার’, ‘সানডে মিরর’, ‘থিস্টিক কোয়ার্টারলি রিভিউ’–ঠাকুরের পূতচরিত, সারগর্ভবাণী ও ধর্মবিষয়ক মতামতের আলোচনায় পূর্ণ৷ বত্তৃণতা এবং একত্র উপাসনার পরে বেদি হইতে ব্রাহ্মস৯কে সম্বোধনপূর্বক উপদেশ প্রদানকালেও কেশবপ্রমুখ ব্রাহ্মনেতাগণ অনেক সময়ে ঠাকুরের বাণীসকল আবৃত্তি করিতেন৷ ব্রাহ্মনেতাগণের ধর্মপিপাসা ও ঈশ্বরানুরাগ দর্শনে আনন্দিত হইয়া যাহাতে তাঁহারা সাধনসমুদ্রে এককালে ডুবিয়া যাইয়া ঈশ্বরের প্রত্যক্ষদর্শনরূপ রত্নলাভে কৃতার্থ হইতে পারে, তদ্বিষয়ে পথ দেখাইতে ঠাকুর এখন বিশেষভাবে যত্নপর হইলেন৷
এতদ্ব্যতীত ঠাকুরের সংস্পর্শে আসিয়া কেশবপ্রমুখ ব্রাহ্মগণ আরও একটি বিষয় জানিতে পারিয়াছিলেন৷ পাশ্চাত্যের ধর্মপ্রচারকগণের মুখে এবং ইংরেজি পুস্তকাদি হইতে তাঁহারা শিক্ষা করিয়াছিলেন, ঈশ্বর কখনও সাকার হইতে পারেন না অতএব কোন সাকার মূর্তিতে তাঁহার অধিষ্ঠান স্বীকার করিয়া পূজোপাসনাদি করায় মহাপাপ হয়৷ কিন্তু ‘নিরাকার জল জমিয়া সাকার হওয়া’, ‘শোলার আতা দেখিয়া যথার্থ আতা মনে পড়ার ন্যায় সাকার মূর্তি অবলম্বনে ঈশ্বরের যথার্থ স্বরূপের প্রত্যক্ষজ্ঞানে পঁৌছান’ ইত্যাদি প্রতীকোপাসনার কথা ঠাকুরের শ্রীমুখে শুনিয়া তাঁহারা বুঝিয়াছিলেন, ‘পৌত্তলিকতা’ নামে নির্দেশ করিয়া তাহারা যে কার্যটিকে এতদিন নিতান্ত যুক্তিহীন ও হেয় ভাবিয়া আসিয়াছেন, তৎসম্বন্ধে বলিবার ও চিন্তা করিবার অনেক বিষয় আছে৷ তদুপরি যেদিন ঠাকুর ‘অগ্ণি ও তাহার দাহিকাশক্তির ন্যায় ব্রহ্ম ও ব্রহ্মশক্তির প্রকাশ বিরাট জগতের অভিন্নতা’ কেশবপ্রমুখ ব্রাহ্মগণের নিকট প্রতিপাদন করিলেন, সেদিন যে তাঁহারা সাকারোপাসনাকে নূতন আলোকে দেখিতে পাইয়াছিলেন, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই৷ তাঁহারা সেদিন নিঃসংশয়ে বুঝিয়াছিলেন যে, কেবলমাত্র নিরাকার সগুণব্রহ্মরূপে নির্দেশ করিলে ঈশ্বরের যথার্থ স্বরূপের একাংশ মাত্র নির্দিষ্ট হইয়া থাকে৷ তাঁহারা বুঝিয়াছিলেন ঈশ্বর–স্বরূপকে কেবলমাত্র সাকার বলিয়া নির্দিষ্ট করায় যে দোষ
হয়, কেবলমাত্র নিরাকার সগুণ বলিয়া উহাকে নির্দেশ করিলেও তদ্রূপ দোষ হয়৷ কারণ, ঈশ্বর সাকার–জগৎরূপে ব্যক্ত হইয়া রহিয়াছেন, নিরাকার সগুণ ব্রাহ্মস্বরূপে জগতের নিয়ামক হইয়া রহিয়াছেন, আবার সর্বগুণের অতীত থাকিয়া ঈশ্বর জীব–জগৎ প্রভৃতি যাবতীয় ব্যক্তি ও বস্তুর নামরূপযুক্তপ্রকাশে ভিত্তিস্বরূপ হইয়া সতত অবস্থান করিতেছেন৷ ‘ঈশ্বর–স্বরূপের ইতি করিতে নাই, তিনি সাকার, তিনি নিরাকার (সগুণ) এবং তাহা ছাড়া তিনি আরও যে কি, তাহা কে জানিতে পারে?’–ঠাকুরের এই সামান্য উক্তির ভিতর ঐরূপ গভীর অর্থ দেখিতে পাইয়া কেশবপ্রমুখ সকলে সেদিন স্তম্ভিত হইয়াছিলেন৷
আচার্য প্রতাপচন্দ্র মজুমদার এক সময়ে দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিয়া ঠাকুরের সঙ্গলাভের পর, সমাজে আধ্যাত্মিক ভাব–পরিণতি কিরূপ ও কতদূর হইয়াছে তদ্বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হইয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘ইঁহাকে দেখিবার আগে আমরা ধর্ম কাহাকে বলে, কি বুঝিতাম? ইঁহার দর্শনলাভের পরে বুঝিয়াছি যথার্থ ধর্মজীবন কাহাকে বলে?’’ শ্রীযুক্ত প্রতাপের সঙ্গে সেদিন নববিধান সমাজের চিরঞ্জীব শর্মা (ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল) উপস্থিত ছিলেন৷ তিনি যে ব্রহ্মসঙ্গীতের বিশেষ পুষ্টিসাধন করিয়াছেন, একথা বলিতে হইবে না৷ কিন্তু অনুসন্ধানে জ্ঞাত হওয়া যায়, ঠাকুরের নানাপ্রকার দর্শন, ভাব ও সমাধি প্রভৃতির সহিত পরিচিত হইয়াই তিনি তাঁহার শ্রেষ্ঠ ভাবোদ্দীপক পদগুলি রচনায় সমর্থ হইয়াছিলেন৷ ‘নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে অরূপ রাশি’, ‘গভীর সমাধি–সিন্ধু অনন্ত অপার’, ‘চিদাকাশে হলো পূর্ণ প্রেমচন্দ্রোদয় রে’, চিদানন্দ–সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী’, ‘আমায় দে মা পাগল করে’–সুকবি আচার্য চিরঞ্জীব শর্মা এইরূপ পদসকল রচনা–দ্বারা সমগ্র বঙ্গবাসীর এবং দেশের সাধককুলের কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন৷ কিন্তু ঠাকুরের ভাব–সমাধি দেখিয়াই যে তিনি ঐ সকল পদসৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, ইহাতে সংশয় নাই৷ এইভাবে ব্রাহ্মসমাজ এই কালে ঠাকুরের অদৃষ্টপূর্ব আধ্যাত্মিক প্রভাবে অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন৷
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বাল্যকাল হইতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দয়ার কথা শুনিয়া আসিতেছিলেন৷ তাঁহাকে দেখিবার জন্য প্রবল ইচ্ছা হওয়ায় মাস্টার, ভবনাথ, হাজরা প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়া ঠাকুর ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট শনিবার বেলা ৪ টার সময় বাদুড়বাগানে বিদ্যাসাগরের গৃহে আগমন করিলেন এবং নানাবিধ উচ্চ আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরকে মুগ্ধ করিলেন৷ কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে বলিতেছেন, ‘‘এই জগতে বিদ্যামায়া ও অবিদ্যামায়া দুই–ই আছে জ্ঞান ভক্তি আছে, আবার কামিনী কাঞ্চনও আছে সৎও আছে, অসৎও আছে ভালও আছে, আবার মন্দও আছে৷ কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত৷ ভাল মন্দ জীবের পক্ষে, সৎ অসৎ জীবের পক্ষে, তাঁর (ব্রহ্মের) ওতে কিছু হয় না৷ যেমন প্রদীপের সম্মুখে কেহ বা ভাগবত পড়ছে, আর কেউ বা জাল করছে৷ প্রদীপ নির্লিপ্ত৷ সূর্য শিষ্টের উপর আলো দিচ্ছে, আবার দুষ্টের উপরও দিচ্ছে৷ যদি বল দুঃখ, পাপ, অশান্তি এ–সকল তবে কি? তার উত্তর এই যে, ওসব জীবের পক্ষে৷ ব্রহ্ম নির্লিপ্ত৷ সাপের ভিতর বিষ আছে, অন্যকে কামড়ালে মরে যায়৷ কিন্তু সাপের কিছু হয় না৷ ব্রহ্ম যে কি, মুখে বলা যায় না৷ সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, ষড়্দর্শন, সব এঁটো হয়ে গেছে৷ মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে–তাই এঁটো হয়েছে৷ কিন্তু একটা জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয় নাই–সে জিনিসটি ব্রহ্ম৷ ব্রহ্ম যে কি, আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারে নাই৷’’
সকলে অবাক ও নিস্তব্ধ হইয়া এই সকল কথা শুনিতেছেন৷ যেন সাক্ষাৎ বাগ্বাদিনী শ্রীরামকৃষ্ণের জিহ্বাতে অবতীর্ণ হইয়া বিদ্যাসগারকে উপলক্ষ করিয়া জীবের মঙ্গলের জন্য কথা বলিতেছেন৷
এইভাবে কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর ঠাকুর গাত্রোত্থান করিলেন৷ রাত্রি ৯টা বাজিয়াছে৷ ঠাকুরকে গাড়িতে তুলিয়া দিবার জন্য বিদ্যাসাগর আত্মীয়গণ সঙ্গে দাঁড়াইলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের আধ্যাত্মিক মঙ্গলের জন্য মূলমন্ত্র জপ করিতেছেন৷ বিদ্যাসাগর ও অন্যান্য সকেলে একে একে ঠাকুরকে প্রণাম করিলেন৷ তৎপরে শ্রীরামকৃষ্ণ বিদায় গ্রহণ করিয়া দক্ষিণেশ্বরে চলিয়া আসিলেন৷ অহেতুককৃপাসিন্ধু ঠাকুর এইভাবে জীবের কল্যাণে ঘরে ঘরে ঈশ্বরের নাম বিতরণ করিয়া বেড়াইতেছেন আর সকলকে বলিতেছেন–ঈশ্বরকে ভালবাসাই জীবনের উদ্দেশ্য৷
এখানে ঠাকুরের জীবনের অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়া আমরা বর্তমান অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি করিব৷ শ্রীযুক্ত কেশবের সহিত প্রথম পরিচয়ের পর ঠাকুরের শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের সর্বজনমনোহর নগর–কীর্তন দেখিতে বাসনা হইয়াছিল৷ নিজগৃহের বাহিরে দাঁড়াইয়া ঠাকুর (সহসা একদিন দিব্যচক্ষে) দেখিলেন নবদ্বীপচন্দ্র শ্রীগৌরাঙ্গদেব শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীদ্বৈত প্রভুকে সঙ্গে লইয়া ঈশ্বরপ্রেমে তন্ময় হইয়া জনতরঙ্গের মধ্যভাগে ধীরপদে আগমন করিতেছেন এবং চতুষ্পার্শ্বস্থ সকলে তাঁহার প্রেমে তন্ময় হইয়া কেহ বা অবশভাবে এবং কেহ বা উদ্দ্যাম তাণ্ডবে আপনাপন অন্তরের উল্লাস প্রকাশ করিতেছেন৷ ঐ অদ্ভুত সঙ্কীর্তনদলের ভিতর কয়েকখানি মুখ ঠাকুরের স্মৃতিপটে উজ্জ্বলবর্ণে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছিল এবং ঐ দর্শনের কিছুকাল পরে তাহাদিগকে নিজ ভক্তরূপে আগমন করিতে দেখিয়া ঠাকুর তাহাদিগের সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, পূর্বজীবনে তাহারা শ্রীচৈতন্যদেবের সাঙ্গোপাঙ্গ ছিল৷
ঐ দর্শনের কিছুকাল পরে ঠাকুর কামারপুকুরে এবং হূদয়ের বাটি সিহড় গ্রামে গমন করেন৷ শেষোক্তস্থানের কয়েক ক্রোশ দূরে ফুলুই শ্যামবাজার নামক স্থান৷ ঐ গ্রামের নটবর গোস্বামী ঠাকুরকে তাঁহার বাটিতে পদধূলি দিবার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর তখন হূদয়কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার বাটিতে যাইয়া সাতদিন অবস্থানপূর্বক শ্যামবাজারের বৈষ্ণবসকলের কীর্তনানন্দ দর্শন করিয়াছিলেন৷ উক্তস্থানের শ্রীযুক্ত ঈশানচন্দ্র মল্লিক তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়া তাঁহাকে নিজ বাটিতে কীর্তনানন্দে সাদরে আহ্বান করেন৷ কীর্তনকালে তাঁহার (ঠাকুরের) অপূর্ব ভাব দেখিয়া বৈষ্ণবেরা বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করে৷ তিন দিবারাত্র তথায় আনন্দের বন্যা প্রবাহিত হইয়া লোকে ঠাকুরকে দেখিবার ও তাঁহার পাদস্পর্শ করিবার জন্য যেন উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছিল এবং ঠাকুর স্নানাহারের অবকাশ পর্যন্ত প্রাপ্ত হন নাই৷ পরে হূদয় তাঁহাকে লইয়া লুকাইয়া সিহড়ে পলাইয়া আসিলে ঐ আনন্দমেলার অবসান হয়৷
ব্রাহ্মমণ্ডলীর পরিচালিত সংবাদপত্রসকলে ঠাকুরের আধ্যাত্মিক মতের অলৌকিকত্ব এবং তাঁহার অমৃতময়ী বাণীসকলের কিছু কিছু প্রকাশিত হওয়ার ফলে কলকাতার জনসাধারণ তাঁহার প্রতি সমধিক আকৃষ্ট হইয়া তাঁহার পুণ্যদর্শন লাভের জন্য দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইতে লাগিল৷ সন ১২৮৫ সালের শেষভাগে (ইং ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে) শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র দত্ত ও শ্রীযুক্ত মনোমোহন মিত্র নামক ঠাকুরের গৃহস্থ ভক্তদ্বয় কেশব পরিচালিত সংবাদপত্রে তাঁহার কথা পাঠ করিয়া তাঁহার সমীপে আগমন করেন৷ ঈশ্বরার্থে কাম–কাঞ্চন ত্যাগরূপ ঠাকুরের জীবনাদর্শ সম্যক গ্রহণ করিতে না পারিলেও, ইঁহারা তাঁহার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রভাবে ত্যাগের পথে অনেকদূর অগ্রসর হইয়া কৃতার্থ হইয়াছিলেন৷ ইং ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ হইতে ঠাকুরের লীলাসহচর ত্যাগী ভক্তবৃন্দেরাও একে একে তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইয়াছিলেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণ সে৯ সুপরিচিত স্বামী ব্রহ্মানন্দই ঠাকুরের নিকটে প্রথম উপস্থিত হইয়াছিলেন৷ পূর্বজীবনে ইঁহার নাম শ্রীরাখালচন্দ্র ঘোষ ছিল, শ্রীযুক্ত মনোমোহনের ভগ্ণীর সহিত ইনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিলেন এবং উক্ত বিবাহের স্বল্পকাল পরেই ঠাকুরের নাম শুনিয়া তাঁহার নিকটে আগমন করেন৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিতেন, ‘‘রাখাল আসিবার কয়েকদিন পূর্বে দেখিতেছি, মা (শ্রীশ্রীজগদম্বা) একটি বালককে আনিয়া সহসা আমার ক্রোড়ে বসাইয়া দিয়া বলিতেছেন, ‘এইটি তোমার পুত্র’–শুনিয়া আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিয়া বলিলাম, ‘সে কি? আমার আবার ছেলে কি?’ তিনি তাহাতে হাসিয়া বুঝাইয়া দিলেন, ‘সাধারণ’ সাংসারিকভাবে ছেলে নহে, ‘ত্যাগী মানস–পুত্র৷’ তখন আশ্বস্ত হই৷ ঐ দর্শনের পরেই রাখাল আসিয়া উপস্থিত হইল এবং বুঝিলাম এই সেই বালক’’ শ্রীযুক্ত রাখাল সম্বন্ধে অন্য এক সময়ে ঠাকুর বলিয়াছিলেন, ‘‘তখন তখন রাখালের এমন ভাব ছিল–ঠিক যেন চারি
বৎসরের ছেলে আমাকে ঠিক মাতার ন্যায় দেখিত৷ থাকিত, থাকিত, সহসা দৌড়িয়া আসিয়া ক্রোড়ে বসিয়া পড়িত এবং মনের আনন্দে নিঃসঙ্কোচে স্তনপান করিত আমাকে পাইলে আত্মহারা হইয়া রাখালের ভিতর যে কিরূপ বালকভাবের আবেশ হইত, তাহা বলিয়া বুঝাইবার নহে৷ আমিও ভাবাবিষ্ট হইয়া তাহাকে ক্ষীর ননী খাওয়াইতাম, খেলা দিতাম৷ কত সময়ে কাঁধে উঠাইয়াছি৷ তাহাতেও তাহার মনে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচের ভাব আসিত না৷ ইতঃপূর্বে মা দেখাইয়াছিলেন রাখাল সত্যসত্যই ব্রজের রাখাল৷’’ বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বালক ধীর গম্ভীর সাধকশ্রেণীভুক্ত হইয়া ক্রমে ঈশ্বরার্থে সংসারের সর্বস্ব ত্যাগপূর্বক শ্রীরামকৃষ্ণ সে৯র শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া বসিয়াছিল৷ তাহার দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আগমনের তিন–চার মাস পরেই পূজ্যপাদ স্বামী বিবেকানন্দ ঠাকুরের নিকটে আগমন করেন৷ তাঁহার কথাই এখন আমরা পাঠককে বলিতে প্রবৃত্ত হইব৷
নিজ চিহ্ণিত ভক্তসকলের আগমনকাল সন্নিকট জানিয়া দিব্যভাবারূঢ় ঠাকুর এইকালে তাহাদিগের জন্য কিরূপ আগ্রহে প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তাহা শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দের প্রথমাগমনের কথা অনুধাবন করিয়া বিলক্ষণ বুঝিতে পারা যায়৷ স্বামী ব্রহ্মানন্দ বলেন, ঠাকুরের নিকট তাঁহার আগমনের প্রায় সমসমানকালে কলকাতার সিমলা নামক পল্লিনিবাসী শ্রীসুরেন্দ্রনাথ মিত্র দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া ঠাকুরের পুণ্যদর্শনলাভে ধন্য হইয়াছিলেন৷ প্রথম দর্শনের দিন হইতেই শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র ঠাকুরের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং স্বল্পকালেই তাঁহাকে নিজালয়ে লইয়া যাইয়া আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠান করেন৷ সুকণ্ঠ গায়কের অভাব হওয়ায় সুরেন্দ্রনাথ ঐ দিবসে নিজ প্রতিবেশী শ্রীযুক্ত বিশ্বনাথ দত্তের পুত্র শ্রীমান নরেন্দ্রনাথকে ঠাকুরের নিকটে ভজন গাহিবার জন্য নিজালয়ে সাদরে আহ্বান করিয়াছিলেন৷ ঠাকুর ও তাঁহার প্রধান লীলাসহায়ক স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম মিলন ঐরূপে সংঘটিত হইয়াছিল৷ তখন সন ১২৮৮ সালের হেমন্তের শেষ ভাগ–ইংরেজি ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর হইবে৷ অষ্টাদশবর্ষ বয়স্ক নরেন্দ্রনাথ ঐ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ–এ পরীক্ষা দিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন৷ ভজন সাঙ্গ হইলে ঠাকুর স্বয়ং যুবকের নিকট আগমনপূর্বক তাহার অঙ্গলক্ষণসকল বিশেষভাবে নিরীক্ষণ করিতে করিতে তাহার সহিত দুই একটি কথা কহিয়া অবিলম্বে একদিন দক্ষিণেশ্বরে যাইবার জন্য তাহাকে আমন্ত্রণ করিলেন৷
শ্রীশ্রীঠাকুরের অন্যতম গৃহস্থভক্ত রামচন্দ্রদত্ত নরেন্দ্রনাথের দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় ছিলেন৷ ধর্মভাবের প্রেরণা হইতেই নরেন্দ্র বিবাহ করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় তিনি একদিবস তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘যদি ধর্মলাভ করিতেই তোমার যথার্থ বাসনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে ব্রাহ্মসমাজ প্রভৃতি স্থলে ঘুরিয়া না বেড়াইয়া দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের নিকট চল৷’’ প্রতিবেশী সুরেন্দ্রনাথও তাঁহাকে ঐ সময়ে একদিবস তাঁহার সহিত গাড়ি করিয়া দক্ষিণেশ্বরে যাইতে নিমন্ত্রণ করেন৷ নরেন্দ্রনাথ উহাতে সম্মত হইয়া দুই–তিন জন বয়স্য–সমভিব্যাহার্ সুরেন্দ্রনাথের সহিত দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ নরেন্দ্রনাথকে দেখিয়া ঐ দিবস ঠাকুরের যাহা মনে হইয়াছিল কথাপ্রসঙ্গে তাহা তিনি একদিন সংক্ষেপে অন্তরঙ্গ ভক্তগণকে এইরূপ বলিয়াছিলেন, ‘‘পশ্চিমের দরজা দিয়া নরেন্দ্র প্রথম দিন এই ঘরে ঢুকিয়াছিল৷ দেখিলাম, নিজের শরীরের দিকে লক্ষ্য নাই, মাথার চুল ও বেশভূষার কোনরূপ পারিপাট্য নাই, বাহিরের কোন পদার্থেই ইতর সাধারণের মতো একটা আঁট নাই, সবই যেন তার আলগা এবং চক্ষু দেখিয়া মনে হইল তাহার মনের অনেকটা ভিতরের দিকে কে যেন জোর করিয়া টানিয়া রাখিয়াছে৷ মেজেতে মাদুর পাতা ছিল, বসিতে বলিলাম৷ গান গাহিবার কথা জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, বাংলা গান সে দুই চারিটি মাত্র তখন শিখিয়াছে৷ তাহাই গাহিতে বলিলাম৷ তাহাতে সে ব্রাহ্মসমাজের ‘মন চল নিজ নিকেতনে’ গানটি ষোল আনা মনপ্রাণ ঢ়ালিয়া ধ্যানস্থ হইয়া যেন উহা গাহিতে লাগিল–শুনিয়া আর সামলাইতে পারিলাম না, ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িলাম৷’’ পরবর্তী কালে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ একদিন উক্তদিবসের ঘটনা সম্বন্ধে কথা প্রসঙ্গে গুরুভাইদিগকে বলিয়াছিলেন, ‘‘গান তো গাহিলাম, তাহার পরেই ঠাকুর সহসা উঠিয়া আমার হাত ধরিয়া তাঁহার ঘরের উত্তরে যে বারাণ্ডা আছে, তথায় লইয়া যাইলেন৷ ...সহাসা আমার হাত ধরিয়া দরদরিত ধারে আনন্দাশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন এবং পূর্বপরিচিতের ন্যায় আমাকে পরম স্নেহে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘এতদিন পরে আসিতে হয়? আমি তোমার জন্য কিরূপে প্রতীক্ষা করিয়া রহিয়াছি তাহা একবার ভাবিতে নাই?’ ...ইত্যাদি কত কথা বলেন ও রোদন করেন৷ পরক্ষণেই আবার আমার সম্মুখে করজোড়ে দণ্ডায়মান হইয়া দেবতার মতো আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বলিতে লাগিলেন, ‘জানি আমি, প্রভু, তুমি সেই পুরাতন ঋষি, নররূপী নারায়ণ,
জীবের দুর্গতি নিবারণ করিতে পুনরায় শরীর ধারণ করিয়াছ৷’ .... পরক্ষণে আমাকে তথায় থাকিতে বলিয়া তিনি গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন এবং মাখন, মিছরি ও কতকগুলি সন্দেশ আনিয়া আমাকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া দিতে লাগিলেন৷... পরে হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘বল, তুমি শীঘ্র একদিন এখানে আমার নিকটে একাকী আসিবে?’ তাঁহার এরূপ একান্ত অনুরোধ এড়াইতে না পারিয়া অগত্যা ‘আসিব’ বলিলাম এবং তাঁহার সহিত গৃহমধ্যে প্রবেশপূর্বক সঙ্গীদের নিকট উপবিষ্ট হইলাম৷
‘‘বসিয়া তাঁহাকে লক্ষ্য করিতে লাগিলাম ও ভাবিতে লাগিলাম৷ দেখিলাম তাঁহার চালচলনে, কথাবার্তায়, অপর সকলের সহিত আচরণে উন্মাদের মতো কিছুই নাই৷ তাঁহার সদালাপ ও ভাবসমাধি দেখিয়া মনে হইল সত্যসত্যই ইনি ঈশ্বরার্থে সর্বস্বত্যাগী এবং যাহা বলিতেছেন তাহা স্বয়ং অনুষ্ঠান করিতেছেন৷ ‘তোমাদিগকে যেমন দেখিতেছি, তোমাদিগের সহিত যেমন কথা কহিতেছি, এইরূপে ঈশ্বরকে দেখা যায় এবং তাঁহার সহিত কথা কহা যায়, কিন্তু ঐরূপ করিতে চাহে কে? লোকে স্ত্রীপুত্রের শোকে ঘটি ঘটি চক্ষের জল ফেলে, বিষয় বা টাকার জন্য ঐরূপ করে, কিন্তু ঈশ্বরকে পাইলাম না বলিয়া ঐরূপ কে করে বল? তাঁহাকে পাইলাম না বলিয়া যদি ঐরূপ ব্যাকুল হইয়া কেহ তাঁহাকে ডাকে তাহা হইলে তিনি নিশ্চয় তাহাকে দেখা দেন’–তাঁহার মুখে ঐ সকল কথা শুনিয়া মনে হইল তিনি অপর ধর্মপ্রচারক সকলের ন্যায় কল্পনা বা রূপকের সহায়তা লইয়া ঐরূপ বলিতেছেন না, সত্যসত্যই সর্বস্বত্যাগ করিয়া এবং সম্পূর্ণ মনে ঈশ্বরকে ডাকিয়া যাহা প্রত্যক্ষ দেখিয়াছেন তাহাই বলিতেছেন৷ নির্বাক হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, উন্মাদ হইলেও ঈশ্বরের জন্য ঐরূপ ত্যাগ জগতে বিরল ব্যক্তিই করিতে সক্ষম উন্মাদ হইলেও এ–ব্যক্তি মহাপবিত্র, মহাত্যাগী এবং ঐজন্য মানবহূদয়ের শ্রদ্ধা, পূজা ও সম্মান পাইবার যথার্থ অধিকারী ঐরূপ ভাবিতে ভাবিতে সেদিন তাঁহার চরণবন্দনা ও তাঁহার নিকটে বিদায় গ্রহণপূর্বক কলকাতায় ফিরিয়া আসিলাম৷’’
সহস্র কর্মে রত নরেন্দ্রনাথের মনে দক্ষিণেশ্বরে যাইবার কথা কয়েক পক্ষ চাপা পড়িয়া রহিল৷ কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষা ও দৈনন্দিন কর্ম তাঁহাকে ঐরূপে ভুলাইয়া রাখিলেও তাঁহার স্মৃতি ও সত্যনিষ্ঠা অবসর পাইলেই তাঁহাকে দক্ষিণেশ্বরে একাকী গমনপূর্বক নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে উত্তেজিত করিতেছিল৷ সেইজন্যই প্রথম দর্শনের প্রায় মাসাধিককাল পরে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রকে একদিবস একাকী পদব্রজে পুনরায় দক্ষিণেশ্বরাভিমুখে গমন করিতে দেখিতে পাই৷ উক্ত দিবসের কথা তিনি পরে এক সময়ে যেভাবে বলিয়াছিলেন আমরা সেইভাবেই উহা এখানে পাঠককে বলিতেছি, ‘‘দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি যে কলকাতা হইতে এত অধিক দূরে তাহা একবার মাত্র যাইয়া বুঝিতে পারি নাই৷... জিজ্ঞাসা করিতে করিতে কোনরূপে দক্ষিণেশ্বরে পঁৌছিলাম এবং একেবারে ঠাকুরের গৃহে উপস্থিত হইলাম৷ ...আমাকে দেখিবামাত্র সাহ্লাদে নিকটে ডাকিয়া একপ্রান্তে বসাইলেন৷ বসিবার পরেই কিন্তু দেখিতে পাইলাম তিনি যেন কেমন একপ্রকার ভাবে আবিষ্ট হইয়া পড়িলেন এবং অস্পষ্টস্বরে আপনা–আপনি কি বলিতে বলিতে স্থির দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ্য করিয়া ধীরে ধীরে সরিয়া সরিয়া আসিতেছেন৷ ভাবিলাম, পাগল বুঝি পূর্বদিনের ন্যায় আবার কোনরূপ পাগলামি করিবে৷ ঐরূপ ভাবিতে না ভাবিতে তিনি সহসা নিকটে আসিয়া নিজ দক্ষিণ পদ আমার অঙ্গে সংস্থাপন করিলেন এবং উহার স্পর্শে মুহূর্তমধ্যে আমার এক অপূর্ব উপলব্ধি হইল৷ চক্ষু চাহিয়া দেখিতে লাগিলাম, দেওয়ালগুলির সহিত গৃহের সমস্ত বস্তু বেগে ঘুরিতে ঘুরিতে কোথায় লীন হইয়া যাইতেছে এবং সমগ্র বিশ্বের সহিত আমার আমিত্ব যেন এক সর্বগ্রাসী মহাশূন্যে একাকার হইতে ছুটিয়া চলিয়াছে তখন দরুণ আতঙ্কে অভিভূত হইয়া পড়িলাম, মনে হইল–আমিত্বের নাশেই মরণ, সেই মরণ সম্মুখে–অতি নিকটে সামালাইতে না পারিয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলাম, ‘ওগো তুমি আমায় একি করলে, আমার যে বাপ মা আছেন৷’ অদ্ভুত পাগল আমার ঐ কথা শুনিয়া খলখল করিয়া হাসিয়া উঠিলেন এবং হস্তদ্বারা আমার বক্ষ স্পর্শ করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন, ‘তবে এখন থাক, একেবারে কাজ নেই, কালে হবে৷’ আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ঐরূপে স্পর্শ করিয়া ঐকথা বলিবামাত্র আমার সেই অপূর্ব প্রত্যক্ষ এককালে অপনীত হইল প্রকৃতিস্থ হইলাম এবং ঘরের ভিতরের ও বাহিরের পদার্থসকলকে পূর্বের ন্যায় অবস্থিত দেখিতে পাইলাম৷’’
এই ঘটনার কিছুদিন পরে নরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকটে পুনরায় আগমন করিলেন৷ দক্ষিণেশ্বরে সেদিন জনতা ছিল বলিয়াই হউক বা অন্য কোন কারণেই হউক, ঠাকুর ঐদিন নরেন্দ্রনাথকে তাঁহার সহিত শ্রীযুক্ত যদুনাথ মল্লিকের পার্শ্ববর্তী উদ্যানে বেড়াইতে যাইতে আহ্বান করিলেন৷ ঠাকুর নরেন্দ্রের সহিত কথা কহিতে কহিতে ঐ ঘরে আসিয়া উপবেশন করিলেন এবং কিছুক্ষণ পরে সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ নরেন্দ্র অনতিদূরে বসিয়া ঠাকুরের উক্ত অবস্থা স্থিরভাবে লক্ষ্য করিতেছিলেন, এমন সময় ঠাকুর পূর্বদিনের ন্যায় সহসা আসিয়া তাঁহাকে স্পর্শ করিলেন৷ নরেন্দ্র পূর্ব হইতে সতর্ক থাকিয়াও ঐ শক্তিপূর্ণ স্পর্শে এককালে অভিভূত হইয়া পড়িলেন৷ পূর্বদিনের মতো না হইয়া উহাতে তাঁহার বাহ্যসংজ্ঞা এককালে লুপ্ত হইল৷ কিছুক্ষণ পরে যখন তাঁহার পুনরায় চৈতন্য হইল তখন দেখিলেন, ঠাকুর তাঁহার বক্ষে হাত বুলাইয়া দিতেছেন এবং তাঁহাকে প্রকৃতিস্থ দেখিয়া মৃদুমধুর হাস্য করিতেছেন৷ কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর একদিবস ঐ ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘বাহ্যসংজ্ঞার লোপ হইলে নরেন্দ্রকে সেদিন নানাকথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম–কে সে, কোথা হইতে আসিয়াছে, কেন আসিয়াছে, কতদিন এখানে (পৃথিবীতে) থাকিবে, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সে–ও তদবস্থায় নিজের অন্তরে প্রবিষ্ট হইয়া ঐ সকল প্রশ্ণের যথাযথ উত্তর দিয়াছিল৷ তাহার সম্বন্ধে যাহা দেখিয়াছিলাম ও ভাবিয়াছিলাম তাহার ঐ কালের উত্তরসকল তাহাই সপ্রমাণ করিয়াছিল৷ সে–সকল কথা বলিতে নিষেধ আছে৷ উহা হইতেই কিন্তু জানিয়াছি, সে যেদিন জানিতে পারিবে সে কে, সেদিন আর ইহলোকে থাকিবে না, দৃঢ়সঙ্কল্পসহায়ে যোগমার্গে তৎক্ষণাৎ শরীর পরিত্যাগ করিবে নরেন্দ্র ধ্যানসিদ্ধ মহাপুরুষ৷’’
পূর্বোক্ত দুই দিবসের ঘটনার ফলে নরেন্দ্রনাথের ধারণা হইয়াছিল, বিরল হইলেও সত্য সত্যই এমন মহাপুরুষসকল সংসারে জন্মপরিগ্রহ করেন যাঁহাদিগের অলৌকিক ত্যাগ, তপস্যা, প্রেম ও পবিত্রতা সাধারণ মানবের ক্ষুদ্র মনবুদ্ধিপ্রসূত ঈশ্বর সম্বন্ধীয় ধারণাকে বহুদূরে অতিক্রম করিয়া থাকে সুতরাং ইঁহাদিগকে গুরুরূপে গ্রহণ করিলে তাহাদিগের পরম মঙ্গল সাধিত হয়৷ যাহা হউক, তিনি এখন হইতে আধ্যাত্মিক জগতের অভিনব অদৃষ্টপূর্ব তত্ত্বসকল গ্রহণ করিবার জন্য মনকে সর্বদা প্রস্তুত রাখিতে একদিকে যেমন যত্নশীল হইলেন, অপরদিকে তেমনি আবার ঠাকুরের প্রত্যেক অদ্ভুত দর্শন ও ব্যবহারের কঠোর বিচারে আপনাকে নিযুক্ত করিলেন৷
প্রথম দর্শনের দিন হইতে ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে কতদূর নিকট আত্মীয় জ্ঞান করিয়াছিলেন এবং কিরূপ তন্ময়ভাবে ভালবাসিয়াছিলেন তাহার আভাস প্রদান করা একপ্রকার সাধ্যাতীত৷ নিষ্কারণে একজন অপরজনকে যে এতদূর ভালবাসিতে পারে, ইহা আমাদিগের ইতঃপূর্বে জ্ঞান ছিল না৷ কালে সংসারে এমন দিন আসিবে যখন মানব মানবের মধ্যে ঈশ্বর–প্রকাশ উপলব্ধি করিয়া সত্যসত্যই ঐরূপ নিষ্কারণে ভালবাসিয়া কৃতকৃতার্থ হইবে৷
ঠাকুরের নিকটে নরেন্দ্রের আগমনের কিছুকাল পরে স্বামী প্রেমানন্দ দক্ষিণেশ্বরে প্রথম উপস্থিত হইয়াছিলেন৷ নরেন্দ্রনাথ ইতঃপূর্বে সপ্তাহ বা কিঞ্চিদধিক কাল দক্ষিণেশ্বরে আসিতে না পারায় ঠাকুর তাঁহার জন্য কিরূপ উৎকণ্ঠিতচিত্তে তখন অবস্থান করিতেছিলেন, তদ্দর্শনে তিনি মোহিত হইয়া ঐ বিষয়ে অনেকবার কীর্তন করিয়াছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘স্বামী ব্রহ্মানন্দের সহিত হাটখোলার ঘাটে নৌকায় উঠিতে যাইয়া ঐ দিন রামদয়ালবাবুকে তথায় দেখিতে পাইলাম৷ তিনিও দক্ষিণেশ্বরে যাইতেছেন জানিয়া আমরা একত্রে এক নৌকায় উঠিলাম এবং প্রায় সন্ধ্যার সময় রানী রাসমণির কালীবাটিতে পঁৌছিলাম৷ ঠাকুরের ঘরে আসিয়া শুনিলাম তিনি মন্দিরে নজগদম্বাকে দর্শন করিতে গিয়াছেন৷ স্বামী ব্রহ্মানন্দ ঐ স্থানে অপেক্ষা করিতে বলিয়া তাঁহাকে আনয়ন করিবার জন্য মন্দিরাভিমুখে চলিয়া গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই তাঁহাকে অতি সন্তর্পণে ধারণ করিয়া ‘এখানটায় সিঁড়ি উঠিতে হইবে–এখানটায় নামিতে হইবে’ ইত্যাদি বলিতে বলিতে লইয়া আসিতেছেন, দেখিতে পাইলাম৷ ইতঃপূর্বে তাঁহার ভাববিভোর হইয়া বাহ্যসংজ্ঞা হারাইবার কথা শ্রবণ করিয়াছিলাম৷ এজন্য ঠাকুরকে এখন ঐরূপে মাতালের ন্যায় টলিতে টলিতে আসিতে দেখিয়া বুঝিলাম তিনি ভাবাবেশে রহিয়াছেন৷ ঐরূপে গৃহে প্রবেশ করিয়া তিনি ছোট তক্তাপোশখানির উপর উপবেশন করিলেন এবং অল্পক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হইয়া পরিচয় জিজ্ঞাসাপূর্বক আমার মুখ ও হস্তপদাদির লক্ষণ পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হইলেন৷ কনুই হইতে অঙ্গুলি পর্যন্ত আমার হাতখানির ওজন পরীক্ষা করিবার জন্য কিছুক্ষণ নিজহস্তে ধারণ করিয়া বলিলেন, ‘বেশ’৷ ঐরূপে কি বুঝিলেন, তাহা তিনিই জানেন৷ ইহার পরে রামদয়ালবাবুকে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রের শারীরিক কল্যাণের বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন এবং তিনি ভালো আছেন জানিয়া বলিলেন, ‘সে অনেকদিন এখানে আসে নাই, তাহাকে দেখিতে বড় ইচ্ছা হইয়াছে, একবার আসিতে বলিও৷’ ধর্মবিষয়ক নানা কথাবার্তায় কয়েক ঘণ্টা বিশেষ আনন্দে কাটিল৷ ক্রমে দশটা বাজিবার পরে আমরা আহার করিলাম এবং ঠাকুরের ঘরের পূর্বদিকে–উঠানের উত্তরে যে বারাণ্ডা আছে তথায় শয়ন করিলাম৷ ঠাকুর এবং স্বামী ব্রহ্মানন্দের জন্য ঘরের ভিতরেই শয্যা প্রস্তুত হইল৷ শয়ন করিবার পরে এক ঘণ্টাকাল অতীত হইতে না হইতে ঠাকুর পরিধেয় বস্ত্রখানি বালকের ন্যায় বগলে ধারণ করিয়া ঘরের বাহিরে আমাদিগের শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত হইয়া রামদয়ালবাবুকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘ওগো, ঘুমুলে?’ আমরা উভয়ে শশব্যস্তে শয্যায় উঠিয়া বসিয়া বলিলাম, ‘আজ্ঞে না৷’ উহা শুনিয়া ঠাকুর বলিলেন, ‘দেখ, নরেন্দ্রের জন্য প্রাণের ভিতরটা যেন গামছা নিংড়াবার মতো জোরে মোচড় দিচ্চে, তাকে একবার দেখা করে যেতে বলো, সে শুদ্ধ সত্ত্বগুণের আধার, সাক্ষাৎ নারায়ণ তাকে মাঝে মাঝে না দেখলে থাকতে পারি না৷’ রামদয়ালবাবু কিছুকাল পূর্ব হইতেই দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতেছিলেন, সেজন্য ঠাকুরের বালকের ন্যায় স্বভাবের কথা তাঁহার অবিদিত ছিল না৷ তিনি ঠাকুরের ঐরূপ বালকের ন্যায় আচরণ দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন, ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হইয়াছেন এবং রাত্রি পোহাইলেই নরেন্দ্রের সহিত দেখা করিয়া তাঁহাকে আসিতে বলিবেন, ইত্যাদি নানা কথা কহিয়া ঠাকুরকে শান্ত করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু সে রাত্রে ঠাকুরের সেই ভাবের কিছুমাত্র প্রশমন হইল না৷... তাঁহার ঐরূপ কাতরতা দেখিয়া বিস্মিত হইয়া আমি ভাবিতে লাগিলাম, ইঁহার কি অদ্ভুত ভালবাসা এবং যাহার জন্য ইনি এইরূপ করিতেছেন সে ব্যক্তি কি কঠোর সেই রাত্রি ঐরূপে আমাদিগের অতিবাহিত হইয়াছিল৷ পরে রজনী প্রভাত হইলে মন্দিরে যাইয়া নজগদম্বাকে দর্শন করিয়া ঠাকুরের চরণে প্রণত হইয়া বিদায় গ্রহণপূর্বক আমরা কলকাতায় ফিরিয়া আসিয়াছিলাম৷’’
১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের কোন সময়ে শ্রীযুক্ত বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, নরেন্দ্রনাথ অনেকদিন আসেন নাই বলিয়া ঠাকুর বিশেষ উৎকণ্ঠিত হইয়া রহিয়াছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘সেদিন ঠাকুরের মন যেন নরেন্দ্রময় হইয়া রহিয়াছে, মুখে নরেন্দ্রের গুণানুবাদ ভিন্ন অন্য কথা নাই৷ আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘দেখ, নরেন্দ্র শুদ্ধসত্ত্বগুণী আমি দেখিয়াছি সে অখণ্ডের ঘরে চারিজনের একজন এবং সপ্তর্ষির একজন তাহার কত গুণ তাহার ইয়ত্তা হয় না৷’–বলিতে বলিতে ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে দেখিবার জন্য এককালে অস্থির হইয়া উঠিলেন এবং পুত্রবিরহে মাতা যেরূপ কাতরা হন সেইরূপ অজস্র অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন৷ ‘এই ঘটনার কিছুকাল পরে অন্য একদিবসে ঠাকুর নরেন্দ্রের সহিত আমাকে পরিচিত করিয়া দিয়াছিলেন৷’’ ঠাকুরের নিকটে উপস্থিত হইয়া শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র যে দেবদুর্লভ প্রেমের অধিকারী হইয়াছিলেন, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়৷ উহাতে অবিচলিত থাকিয়া তিনি যে যথার্থ সত্যলাভের আশায় ঠাকুরকে পরীক্ষা করিয়া লইতে অগ্রসর হইয়াছিলেন ইহাতে বুঝিতে পারা যায়, সত্যানুরাগ তাঁহার ভিতরে কতদূর প্রবল ছিল৷
নরেন্দ্র দক্ষিণেশ্বরে আসিলে ঠাকুর অনেক সময় তাঁহাকে দেখিবামাত্র ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িতেন৷ ঐরূপ সময়ে তাঁহার গান (ভজন) শুনিবার ইচ্ছা হইত এবং নরেন্দ্রের সুমধুর কণ্ঠ শুনিবামাত্র পুনরায় সমাধিস্থ হইয়া পড়িতেন৷সর্বশেষে নরেন্দ্রের মুখ হইতে ‘যো কুছ হ্যায় সো তুহি হ্যায়’–সঙ্গীতটি না শুনিলে তাঁহার পূর্ণ পরিতৃপ্তি হইত না৷ ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে একদিবস অদ্বৈতবিজ্ঞানের জীব–ব্রহ্মের ঐক্যসূচক অনেক কথা বলিয়াছিলেন৷ নরেন্দ্র ঐ সকল কথা মনোনিবেশপূর্বক শ্রবণ করিয়াও হূদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন না এবং ঠাকুরের কথা সমাপ্ত হইলে হাজরা মহাশয়ের নিকটে উপবিষ্ট হইয়া তামাকু সেবন করিতে করিতে পুনরায় ঐ সকল কথার আলোচনাপূর্বক বলিতেন লাগিলেন, ‘‘উহা কি কখনও হইতে পারে? ঘটিটা ঈশ্বর, বাটিটা ঈশ্বর, যাহা কিছু দেখিতেছি এবং আমরা সকলেই ঈশ্বর?’’ হাজরা মহাশয়ও নরেন্দ্রনাথের সহিত যোগদান করিয়া ঐরূপ ব্যঙ্গ করায় উভয়ের মধ্যে হাস্যের রোল উঠিল৷ ঠাকুর তখনও অর্ধবাহ্যদশায় ছিলেন৷ নরেন্দ্রকে হাসিতে শুনিয়া বালকের ন্যায় পরিধানের কাপড়খানি বগলে লইয়া বাহিরে আসিলেন এবং ‘তোরা কি বল্ছিস রে’ বলিয়া হাসিতে হাসিতে নিকটে আসিয়া নরেন্দ্রকে স্পর্শ করিয়া সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ নরেন্দ্র বলিতেন, ‘‘ঠাকুরের ঐদিনকার অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তমধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইল৷ স্তম্ভিত হইয়া সত্যসত্যই দেখিতে লাগিলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর নাই৷ ঐরূপ দেখিয়াও কিন্তু নীরব রহিলাম, ভাবিলাম–দেখি, কতক্ষণ পর্যন্ত ঐভাব থাকে৷ কিন্তু সেই ঘোর সেদিন কিছুমাত্র কমিল না৷ বাটিতে ফিরিলাম, সেখানেও তাহাই–যাহা কিছু দেখিতে লাগিলাম সে সকলই তিনি, এরূপ বোধ হইতে লাগিল৷ খাইতে বসিলাম, দেখি অন্ন, থালা, যিনি পরিবেশন করিতেছেন, সে সকলই এবং আমি নিজেও তিনি ভিন্ন অন্য কেহ নহে দুই এক গ্রাস খাইয়াই স্থির হইয়া বসিয়া রহিলাম৷... সর্বদা কেমন একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হইয়া রহিলাম৷ রাস্তায় চলিয়াছি, গাড়ি আসিতেছে দেখিতেছি, কিন্তু অন্য সময়ের ন্যায় উহা ঘাড়ে আসিয়া পড়িবার ভয়ে সরিবার প্রবৃত্তি হইত না–মনে হইত উহাও যাহা আমিও তাহাই... ঐরূপে কিছুকাল পর্যন্ত ঐ বিষমভাবের ঘোর ও আচ্ছন্নতার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাই নাই৷ যখন প্রকৃতিস্থ হইলাম তখন ভাবিলাম উহাই অদ্বৈবিজ্ঞানের আভাস৷ তবে তো শাস্ত্রে ঐ বিষয়ে যাহা লেখা আছে, তাহা মিথ্যা নহে৷ তদবধি অদ্বৈততত্ত্বের উপরে আর কখনও সন্দিহান হইতে পারি নাই৷’’
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ভাগে বি. এ. পরীক্ষার ফলাফল জানিতে পারিবার কিছু পূর্বে সহসা একদিন, রাত্রি আন্দাজ দশটার সময় নরেন্দ্রনাথের পিতা বিশ্বনাথ হূদ্রোগে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন৷ নরেন্দ্রনাথ অনুসন্ধানে বুঝিতে পারিলেন তাঁহাদিগের সাংসারিক অবস্থা অতীব শোচনীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে৷ পিতা কিছু রাখিয়া যাওয়া দূরে থাকুক, আয়ের অপেক্ষা নিত্য অধিক ব্যয় করিয়া কিছু ঋণ করিয়া গিয়াছেন৷ আত্মীয়বর্গ তাঁহার পিতার সহায়তায় নিজ নিজ অবস্থার উন্নতিসাধন করিয়া লইয়া এখন সময় বুঝিয়া শত্রুতাসাধনে এবং বসতবাটি হইতে পর্যন্ত তাঁহাদিগকে উচ্ছেদ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন৷ তিনি দেখিলেন দুইদিন পূর্বে যাহারা তাঁহাকে কোন বিষয়ে কিছুমাত্র সহায়তা করিবার অবসর পাইলে আপনাদিগকে ধন্যজ্ঞান করিয়াছে, তাহারাই এখন তাঁহাকে দেখিয়া মুখ বাঁকাইতেছে এবং ক্ষমতা থাকিলেও সাহায্য করিতে পশ্চাৎপদ হইতেছে৷ নরেন্দ্রনাথ বলিতেন, ‘‘এত দুঃখকষ্টেও এতদিন আস্তিক্যবুদ্ধির বিলোপ অথবা ‘ঈশ্বর মঙ্গলময়’–এ কথায় সন্দিহান হই নাই৷ প্রাতে নিদ্রাভঙ্গে তাঁহাকে স্মরণমননপূর্বক তাঁহার নাম করিতে করিতে শয্যাত্যাগ করিতাম এবং আশায় বুক বাঁধিয়া উপার্জনের উপায় অন্বেষণে ঘুরিয়া বেড়াইতাম৷ একদিন ঐরূপে শয্যাত্যাগ করিতেছি এমন সময় পার্শ্বের ঘর হইতে মাতা (ভুবনেশ্বরী দেবী) শুনিতে পাইয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘চুপ কর্ ছোঁড়া, ছেলেবেলা থেকে কেবল ভগবান ভগবান ভগবান তো সব কল্লেন’ কথাগুলিতে মনে বিষম আঘাতপ্রাপ্ত হইলাম৷ স্তম্ভিত হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, ভগবান কি বাস্তবিক আছেন এবং থাকিলেও মানবের সকরুণ প্রার্থনা কি শুনিয়া থাকেন?... ভগবান যদি দয়াময় ও মঙ্গলময়, তবে দুর্ভিক্ষের করাল কবলে পতিত হইয়া লাখ লাখ লোক দুটি অন্ন না পাইয়া মরে কেন?... ঈশ্বরের প্রতি প্রচণ্ড অভিমানে হূদয় পূর্ণ হইল, অবসর বুঝিয়া সন্দেহ আসিয়া অন্তর অধিকার করিল৷...ঐরূপে দিনের পর দিন যাইতে লাগিল এবং সংশয়ে চিত্ত নিরন্তর দোলায়মান হইয়া শান্তি সুদূরপরাহত হইয়া রহিল–সাংসারিক অভাবেরও হ্রাস হইল না৷
‘‘গ্রীষ্মের পর বর্ষা আসিল৷ এখনও পূর্বের ন্যায় কর্মের অনুসন্ধানে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি৷ একদিন সমস্ত দিবস উপবাসে ও বৃষ্টিতে ভিজিয়া রাত্রে অবসন্নপদে এবং ততোধিক অবসন্ন মনে বাটিতে ফিরিতেছি, এমন সময় শরীরে এত ক্লান্তি অনুভব করিলাম যে, আর এক পদও অগ্রসর হইতে না পারিয়া পার্শ্বস্থ বাটির রকে জড় পদার্থের ন্যায় পড়িয়া রহিলাম৷... সহসা উপলব্ধি করিলাম, কোন এক দৈবশক্তি প্রভাবে একের পর অন্য এইরূপে ভিতরে অনেকগুলি পর্দা যেন উত্তোলিত হইল এবং শিবের সংসারে অ–শিব কেন, ঈশ্বরের কঠোর ন্যায়পরতা ও অপার করুণার সামঞ্জস্য প্রভৃতি যে–সকল বিষয় নির্ণয় করিতে না পারিয়া মন এতদিন নানা সন্দেহে আকুল হইয়াছিল, সেই সকল বিষয়ে স্থির মীমাংসা অন্তরে নিবিড়তম প্রদেশে দেখিতে পাইলাম৷ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলাম৷... সংসারের প্রশংসা ও নিন্দায় এখন হইতে এককালে উদাসীন হইলাম এবং ইতরসাধারণের ন্যায় অর্থোপার্জন করিয়া পরিবারবর্গের সেবা ও ভোগসুখে কালযাপন করিবার জন্য আমার জন্ম হয় নাই–এ কথায় দৃঢ় বিশ্বাসী হইয়া পিতামহের ন্যায় সংসারত্যাগের জন্য গোপনে প্রস্তুত হইতে লাগিলাম৷ যাইবার দিন স্থির হইলে সংবাদ পাইলাম, ঠাকুর ঐদিন কলকাতার জনৈক ভক্তের বাটিতে আসিতেছেন৷ ভাবিলাম, ভালই হইল–গুরুদর্শন করিয়া চিরকালের মতো গৃহত্যাগ করিব৷ ঠাকুরের সহিত সাক্ষাৎ হইবামাত্র তিনি ধরিয়া বসিলেন, ‘তোকে আজ আমার সহিত দক্ষিণেশ্বরে যাইতে হইবে৷’ অগত্যা তাঁহার সঙ্গে চলিলাম৷ গাড়িতে তাঁহার সহিত বিশেষ কোন কথা হইল না৷ দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছিয়া অন্য সকলের সহিত কিছুক্ষণ তাঁহার গৃহমধ্যে উপবিষ্ট রহিয়াছি এমন সময়ে ঠাকুরের ভাবাবেশ হইল৷ দেখিতে দেখিতে তিনি সহসা নিকটে আসিয়া আমাকে সস্নেহে ধারণপূর্বক সজল নয়নে গাহিতে লাগিলেন ঃ
কথা কহিতে ডরাই,
না কহিতেও ডরাই,
(আমার) মনে সন্দ হয়,
বুঝি তোমায় হারাই, হা–রাই
‘‘অন্তরের প্রবল ভাবরাশি এতক্ষণ সযত্নে রুদ্ধ রাখিয়াছিলাম, আর বেগ সংবরণ করিতে পারিলাম না–ঠাকুরের ন্যায় আমারও বক্ষ নয়নধারায় প্লাবিত হইতে লাগিল৷ নিশ্চয় বুঝিলাম, ঠাকুর সকল কথা জানিতে পারিয়াছেন৷... পরে রাত্রে অপর সকলকে সরাইয়া আমাকে নিকটে ডাকিয়া বলিলেন, ‘জানি আমি, তুমি মার কাজের জন্য আসিয়াছ, সংসারে কখনই থাকিতে পারিবে না, কিন্তু আমি যতদিন আছি ততদিন আমার জন্য থাক৷’ ইহা বুলিয়াই ঠাকুর হূদয়ের আবেগে রুদ্ধ কণ্ঠে পুনরায় অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন৷
‘‘ঠাকুরের নিকটে বিদায় গ্রহণ করিয়া পরদিন বাটিতে ফিরিলাম, সঙ্গে সঙ্গে সংসারের শতচিন্তা আসিয়া অন্তর অধিকার করিল৷... কিছুকাল পরে মনে হইল, ঠাকুরের কথা তো ঈশ্বর শুনেন–তাঁহাকে অনুরোধ করিয়া মাতা ভ্রাতাদিগের খাওয়া–পরার কষ্ট যাহাতে দূর হয় এরূপ প্রার্থনা করাইয়া লইব আমার জন্য ঐরূপ করিতে তিনি কখনই অস্বীকার করিবেন না৷ দক্ষিণেশ্বরে ছুটিলাম এবং নাছোড়বান্দা হইয়া ঠাকুরকে ধরিয়া বসিলাম, ‘মা–ভাইদের আর্থিক কষ্ট নিবারণের জন্য আপনাকে মাকে জানাইতে হইবে৷’ ঠাকুর বলিলেন, ‘ওরে, আমি যে ওসব কথা বলতে পারি না৷ তুই যা না কেন? মাকে মানিস না–সেইজন্যই তোর এত কষ্ট’ বলিলাম, ‘আমি তো মাকে জানি না, আপনি আমার জন্য মাকে বলুন–বলতেই হবে, আমি কিছুতেই আপনাকে ছাড়ব না৷’ ঠাকুর সস্নেহে বলিলেন, ‘ওরে, আমি যে কতবার বলেছি–মা, নরেন্দ্রের দুঃখ–কষ্ট দূর কর৷ তুই মাকে মানিস না–সেইজন্যই তো মা শুনেন না৷ আচ্ছা আজ মঙ্গলবার, আমি বলছি আজ রাত্রে নকালীঘরে গিয়ে মাকে প্রণাম করে তুই যা চাইবি, মা তোকে তাই দিবেন৷ মা আমার চিন্ময়ী ব্রহ্মশক্তি, ইচ্ছায় জগৎ প্রসব করিয়াছেন–তিনি ইচ্ছা করিলে কি না করিতে পারেন’
‘‘দৃঢ় বিশ্বাস হইল, ঠাকুর যখন ঐরূপ বলিলেন, তখন নিশ্চয় প্রার্থনামাত্র সকল দুঃখের অবসান হইবে৷ প্রবল উৎকণ্ঠায় রাত্রির প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম৷ ক্রমে রাত্রি হইল৷ এক প্রহর গত হইবার পরে ঠাকুর আমাকে শ্রীমন্দিরে যাইতে বলিলেন৷ যাইতে যাইতে একটা গাঢ় নেশায় সমাচ্ছন্ন হইয়া পড়িলাম, পা টলিতে লাগিল এবং মাকে সত্য সত্য দেখিতে ও তাঁহার শ্রীমুখের বাণী শুনিতে পাইব, এইরূপ স্থির বিশ্বাসে মন অন্য সকল বিষয় ভুলিয়া বিষম একাগ্র ও তন্ময় হইয়া ঐ কথাই ভাবিতে লাগিল৷ মন্দিরে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, সত্য সত্যই মা চিন্ময়ী, সত্য সত্যই জীবিতা এবং অনন্ত প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রস্রবণস্বরূপিণী৷ ভক্তিপ্রেমে হূদয় উচ্ছ্বসিত হইল, বিহ্বল হইয়া বারংবার প্রণাম করিতে করিতে বলিতে লাগিলাম, ‘মা বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও, জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, যাহাতে তোমার অবাধ দর্শন নিত্য লাভ করি এরূপ করিয়া দাও৷’ শান্তিতে প্রাণ আপ্লুত হইল, জগৎ–সংসার নিঃশেষে অন্তর্হিত হইয়া একমাত্র মা–ই হূদয় পূর্ণ করিয়া রহিলেন৷
‘‘ঠাকুরের নিকট ফিরিবামাত্র তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কি রে, মায়ের নিকটে সাংসারিক অভাব দূর করিবার প্রার্থনা করিয়াছিস তো?’ তাঁহার প্রশ্ণে চমকিত হইয়া বলিলাম, ‘না মহাশয়, ভুলিয়া গিয়াছি৷ তাই তো, এখন কি করি?’ তিনি বলিলেন, ‘যা যা, ফের যা, গিয়ে ঐ কথা জানিয়ে আয়৷’ পুনরায় মন্দিরে চলিলাম এবং মায়ের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া পুনরায় মোহিত হইয়া সকল কথা ভুলিয়া পুনঃপুনঃ প্রণামপূর্বক জ্ঞান–ভক্তিলাভের জন্য প্রার্থনা করিয়া ফিরিলাম৷ ঠাকুর হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘কিরে, এবার বলিয়াছিস তো?’ আবার চমকিত হইয়া বলিলাম, ‘না মহাশয়, মাকে দেখিবামাত্র কি এক দৈবশক্তি প্রভাবে সব কথা ভুলিয়া কেবল জ্ঞানভক্তি লাভের কথাই বলিয়াছি৷ কি হবে?’ ঠাকুর বলিলেন, ‘দূর ছোঁড়া, আপনাকে একটু সামলাইয়া ঐ প্রার্থনাটা করিতে পারিলি না? পারিস তো আর একবার গিয়ে ঐ কথাগুলো জানিয়ে আয়, শীঘ্র যা৷’ পুনরায় চলিলাম, কিন্তু মন্দিরে প্রবেশমাত্র দারুণ লজ্জা আসিয়া হূদয় অধিকার করিল৷ ভাবিলাম, এ কি তুচ্ছ কথা আমি মাকে বলিতে আসিয়াছি ঠাকুর যে বলেন, রাজার প্রসন্নতা লাভ করিয়া তাঁহার নিকটে ‘লাউ কুমড়া ভিক্ষা করা’–এ যে সেইরূপ নির্বুদ্ধিতা৷ এমন হীনবুদ্ধি আমার লজ্জায় ঘৃণায় পুনঃপুনঃ প্রণাম করিতে করিতে বলিতে লাগিলাম, ‘অন্য কিছু চাহি না মা, কেবল জ্ঞান ভক্তি দাও৷’ মন্দিরের বাহিরে আসিয়া মনে হইল ইহা নিশ্চয়ই ঠাকুরের খেলা, নতুবা তিন তিনবার মায়ের নিকটে আসিয়াও বলা হইল না৷ অতঃপর তাঁহাকে ধরিয়া বসিলাম, আপনি নিশ্চিত আমাকে ঐরূপে ভুলাইয়া দিয়াছেন, এখন আপনাকে বলিতে হইবে–আমার মা–ভাইদের গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব থাকিবে না৷ তিনি বলিলেন, ‘ওরে আমি যে কাহারও জন্য ঐরূপ প্রার্থনা কখনও করিতে পারি নাই, আমার মুখ দিয়া যে উহা বাহির হয় না৷ তোকে বললুম মায়ের কাছে যাহা চাহিবি তাহাই পাইবি তুই চাহিতে পারিলি না, তোর অদৃষ্টে সংসারসুখ নাই, তা আমি কি করিব’ বলিলাম, ‘তাহা হইবে না, মহাশয়, আপনাকে আমার জন্য ঐ কথা বলিতেই হইবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস–আপনি বলিলেই তাহাদের আর কষ্ট থাকিবে না৷’ ঐরূপে যখন তাঁহাকে কিছুতেই ছাড়িলাম না, তখন তিনি বলিলেন, ‘আচ্ছা যা, তাঁদের মোটাভাত কাপড়ের কখনও অভাব হবে না’৷’’
নরেন্দ্রের জীবনে উহা যে একটি বিশেষ ঘটনা, তাহা বলিতে হইবে না৷ ঈশ্বরের মাতৃভাবের এবং প্রতীক ও প্রতিমায় তাঁহাকে উপাসনা করিবার গূঢ়মর্ম এতদিন তাঁহার হূদয়ঙ্গম হয় নাই৷ মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত দেবদেবী–মূর্তিসকল তিনি ইতঃপূর্বে অবজ্ঞা ভিন্ন কখনও ভক্তিভরে দর্শন করিতে পারিতেন না৷ এখন হইতে ঐরূপ উপাসনার সম্যক রহস্য তাঁহার হূদয়ে প্রতিভাসিত হইয়া তাঁহার আধ্যাত্মিক জীবনে অধিকতর পূর্ণতা ও প্রসারতা আনয়ন করিল৷
ঠাকুর যোগদৃষ্টিসহায়ে যে–সকল ভক্তের দক্ষিণেশ্বরে আসিবার কথা বহুপূর্বে জানিতে পারিয়াছিলেন, তাহারা সকলেই ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ অতীত হইবার পূর্বে তাঁহার নিকটে আগমন করিয়াছিলেন৷ পূর্বোক্ত শ্রেণীর ভক্তদিগের মধ্যে অনেকেই আবার ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ হইতে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগের ভিতরে ঠাকুরের নিকট উপস্থিত হইয়াছিলেন৷ নরেন্দ্র তখন সাংসারিক অভাব অনটনের সহিত সংগ্রামে ব্যস্ত এবং রাখাল কিছুকালের জন্য শ্রীবৃন্দাবনদর্শনে গমন করিয়াছিলেন৷ পূর্বপরিদৃষ্ট ভক্তগণের মধ্যে বালক ও বৃদ্ধ, সংসারী ও অসংসারী, সাকার ও নিরাকারোপাসক, শাক্ত, বৈষ্ণব অথবা অন্য ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত অশেষ ভাবের লোক বিদ্যামান ছিল৷ ঐরূপ প্রভেদ বিদ্যমান থাকিলেও এক বিষয়ে তাহারা সকলে সমভাবাপন্ন ছিল৷ প্রত্যেকেই নিজ নিজ মত ও পথের আন্তরিক শ্রদ্ধাসম্পন্ন ও নিষ্ঠাবান থাকিয়া ঈশ্বরলাভের নিমিত্ত অশেষ ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত ছিল৷ ঠাকুরের সঙ্গগুণে এবং শিক্ষাদীক্ষা–প্রভাবে সঙ্কীর্ণতার গণ্ডিসমূহ একে একে অতিক্রমপূর্বক উদারভাবসম্পন্ন হইবামাত্র তাঁহাতেও ঐ ভাবের পূর্ণতা দেখিতে পাইয়া তাহারা প্রত্যেকে বিস্মিত ও মুগ্ধ হইত৷ কলকাতা বাগবাজার নিবাসী শ্রীযুক্ত বলরাম বসু বৈষ্ণব বংশে জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছিলেন এবং পরম বৈষ্ণব ছিলেন৷ ঠাকুর ইঁহাকে দেখিয়াই পূর্বপরিচিতের ন্যায় সাদরে গ্রহণপূর্বক বলিয়াছিলেন, ‘‘ইনি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের সাঙ্গোপাঙ্গের অন্যতম–এখানকার লোক৷’’ ঠাকুরের পুণ্যদর্শনলাভে বলরামের মন নানারূপে পরিবর্তিত হইয়া আধ্যাত্মিকরাজ্যে দ্রুতপদে অগ্রসর হইয়াছিল৷
পূর্বপরিদৃষ্ট ভক্তগণের ভিতরে ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে কত উচ্চাসন প্রদান করিতেন তাহা বলা যায় না৷ এক সময়ে ঠাকুর বলিয়াছিলেন, ‘‘এত সব লোক এখানে আসিল, নরেন্দ্রের মতো একজনও কিন্তু আর আসিল না৷’’ দেখাও যাইত, ঠাকুরের অদ্ভুত জীবনের অলৌকিক কার্যাবলীর এবং প্রত্যেক কথার যথাযথ মর্ম গ্রহণ ও প্রকাশ করিতে তিনি যতদূর সমর্থ ছিলেন, অন্য কেহই তদ্রূপ ছিল না৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি কথার এখানে উল্লেখ করিতেছি– ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের কোন সময়ে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র সেখানে (দক্ষিণেশ্বরে) উপস্থিত৷ নানা সদালাপ এবং মাঝে মাঝে নির্দোষ রঙ্গরসের কথাবার্তাও চলিয়াছে৷ কথাপ্রসঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের কথা উঠিল এবং ঐ মতের সারমর্ম সমবেত সকলকে সংক্ষেপে বুঝাইয়া তিনি বলিলেন, ‘‘তিনটি বিষয় পালন করিতে নিরন্তর যত্নবান থাকিতে ঐ মতে উপদেশ করে–নামে রুচি, জীবে দয়া, বৈষ্ণবপূজা৷ যেই নাম সেই ঈশ্বর–নাম–নামী অভেদ জানিয়া সর্বদা অনুরাগের সহিত নাম করিবে–এবং কৃষ্ণেরই জগৎসংসার–একথা হূদয়ে ধারণ করিয়া ‘সর্বজীবে দয়া’ (প্রকাশ করিবে)৷ ‘সর্বজীবে দয়া’ পর্যন্ত বলিয়াই তিনি সহসা সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ কতক্ষণ পরে অর্ধবাহ্যদশায় উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, ‘‘জীবে দয়া–জীবে দয়া?... কীটাণুকীট তুই জীবকে দয়া করবি? দয়া করবার তুই কে? না না, জীবে দয়া নয়–শিবজ্ঞানে জীবের সেবা৷’’ ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের ঐ কথা সকলে শুনিল বটে, কিন্তু উহার গূঢ়মর্ম কেহই তখন বুঝিতে ও ধারণা করিতে পারিল না৷ একমাত্র নরেন্দ্রনাথই সেদিন ঠাকুরের ভাবভঙ্গের পরে বাহিরে আসিয়া বলিলেন, ‘‘কি অদ্ভুত আলোকই আজ ঠাকুরের কথায় দেখিতে পাইলাম শুষ্ক, কঠোর ও নির্মম বলিয়া প্রসিদ্ধ বেদান্তজ্ঞানকে ভক্তির সহিত সম্মিলিত করিয়া কি সহজ সরল ও মধুর আলোকই প্রদর্শন করিলেন অদ্বৈতজ্ঞান লাভ করিতে হইলে সংসার ও লোকসঙ্গ সর্বতোভাবে বর্জন করিয়া বনে যাইতে হইবে এবং ভক্তি ভালবাসা প্রভৃতি কোমল ভাবসমূহকে হূদয় হইতে সবলে উৎপাটিত করিয়া চিরকালের মতো দূরে নিক্ষেপ করিতে হইবে–এই কথাই এতকাল শুনিয়া আসিয়াছি৷ কিন্তু ঠাকুর আজ ভাবাবেশে যাহা বলিলেন, তাহাতে বুঝা গেল–বনের বেদান্তকে ঘরে আনা যায়, সংসারের সকল কাজে উহাকে অবলম্বন করিতে পারা যায়৷ মানব যাহা করিতেছে সে সকলই করুক তাহাতে ক্ষতি নাই, কেবল প্রাণের সহিত এই কথা সর্বাগ্রে বিশ্বাস ও ধারণা করিলেই হইল–ঈশ্বর জীব ও জগৎরূপে তাহার সম্মুখে প্রকাশিত রহিয়াছেন৷ জীবনের প্রতিমুহূর্তে সে যাহাদিগের সম্পর্কে আসিতেছে, যাহাদিগকে ভালবাসিতেছে, যাহাদিগকে শ্রদ্ধা, সম্মান অথবা দয়া করিতেছে, তাহারা সকলেই তাঁহার অংশ–তিনি৷ সংসারের সকল ব্যক্তিকে যদি সে ঐরূপে শিবজ্ঞান করিতে পারে, তাহা হইলে আপনাকে বড় ভাবিয়া তাহাদিগের প্রতি রাগ, দ্বেষ, দম্ভ অথবা দয়া করিবার তাহার অবসর কোথায়? ঐরূপে ‘শিবজ্ঞানে জীবের সেবা’ করিতে করিতে চিত্ত–শুদ্ধ হইয়া সে স্বল্পকালের মধ্যে আপনাকে চিদানন্দময় ঈশ্বরের অংশ, শুদ্ধবুদ্ধমুক্ত স্বভাব বলিয়া ধারণা করিতে পারিবে৷
‘‘ঠাকুরের ঐ কথায় ভক্তিপথেও বিশেষ আলোক দেখিতে পাওয়া যায়৷ সর্বভূতে ঈশ্বরকে যতদিন না দেখিতে পাওয়া যায়, ততদিন যথার্থ ভক্তি বা পরাভক্তিলাভ সাধকের পক্ষে সুদূরপরাহত থাকে৷ শিব বা নারায়ণ–জ্ঞানে জীবের সেবা করিলে ঈশ্বরকে সকলের ভিতর দর্শনপূর্বক যথার্থ ভক্তিলাভে ভক্তসাধক স্বল্পকালেই কৃতকৃতার্থ হইবে, একথা বলা বাহুল্য৷ কর্ম ও রাজযোগ অবলম্বনে যে–সকল সাধক অগ্রসর হইতেছে তাহারাও ঐ কথায় বিশেষ আলোক পাইবে৷... যাহা হউক, ভগবান যদি কখনও দিন দেন তো আজি যাহা শুনিলাম এই অদ্ভুত সত্য সংসারে সর্বত্র প্রচার করিব–পণ্ডিত–মূর্খ, ধনী–দরিদ্র, ব্রাহ্মণ–চণ্ডাল সকলকে শুনাইয়া মোহিত করিব৷’’ লোকোত্তর ঠাকুর জ্ঞান, প্রেম, যোগ ও কর্ম সম্বন্ধে অদৃষ্টপূর্ব আলোক প্রতিনিয়ত আনয়নপূর্বক মানবের জীবনপথ সমুজ্জ্বল করিতেন৷ মনস্বী নরেন্দ্রনাথই কেবল ঐ সকল দেববাণী যথাসাধ্য হূদয়ঙ্গম করিয়া সময়ে সময়ে প্রকাশপূর্বক সকলকে স্তম্ভিত করিতেন৷
[১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর শনিবার শ্রীরামকৃষ্ণ শোভাবাজারে ভক্তপ্রবর শ্রীধর সেনের গৃহে পদার্পণ করিয়াছেন৷ অধর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট৷ বয়ঃক্রম ২৯৷৩০ বৎসর হইবে৷ ঠাকুরের আগমনে অধরের আনন্দের সীমা নাই৷ অধর তাঁহার কয়েকটি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছেন৷ ইঁহাদের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন৷ ইনিও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট৷ ঠাকুরের সঙ্গে ইঁহার পরিচয় করিয়া দিলে উভয়ের মধ্যে নানাভাবে কথা হইতে লাগিল৷
ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রকে অনেক সদুপদেশ প্রদান করিয়া অবশেষে কর্মযোগের মর্মার্থ বিশ্লেষণপূর্বক বলিলেন, ‘‘সংসারী ব্যক্তি নিষ্কামভাবে যদি কাউকে দান করে, সে নিজের উপকারের জন্য, ‘পরোপকারের’ জন্য নয়৷ সর্বভূতে হরি আছেন তাঁরই সেবা করা হয়৷ হরিসেবা হলে নিজেরই উপকার হলো, পরোপকার নয়৷ এই সর্বভূতে হরির সেবা–শুধু মানুষের নয় জীবজন্তুর মধ্যেও হরির সেবা যদি কেউ করে, আর যদি সে মান চায় না, যশ চায় না, মরবার পর স্বর্গ চায় না, যাদের সেবা করছে, তাদের কাছ থেকে উলটে কোন উপকার চায় না, এরূপ ভাবে যদি সেবা করে, তাহলে তার যথার্থ নিষ্কামকর্ম –অনাসক্ত কর্ম করা হয়৷ এইরূপ নিষ্কামকর্ম করলে তার নিজের কল্যাণ হয়৷ এরই নাম কর্মযোগ৷ এই কর্মযোগও ঈশ্বরলাভের একটি পথ৷–তাই বলছি, যে অনাসক্ত হয়ে এরূপ কর্ম করে, দয়া দান করে, সে নিজেরই মঙ্গল করে...বাপ–মায়ের ভিতর যে স্নেহ দেখ, সে তাঁরই স্নেহ, জীবের রক্ষার জন্যই দিয়েছেন৷ দয়ালুর ভিতর যে দয়া দেখ, সে তাঁরই দয়া, নিঃসহায়ে জীবের রক্ষার জন্য দিয়েছেন৷ তুমি দয়া কর আর না কর, তিনি কোন না কোন সূত্রে তাঁর কাজ করবেন৷ তাঁর কাজ আটকে থাকে না৷ তাই জীবের কর্তব্য কি?... তাঁর শরণাগত হওয়া আর তাঁকে যাতে লাভ হয়, দর্শন হয়, সেইজন্য ব্যাকুল হয়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করা৷’’ আরও কিছুকাল এই প্রকার ধর্মপ্রসঙ্গের পর বঙ্কিমচন্দ্র বিদায় গ্রহণ করিলেন৷ কিছুদিন পরে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীযুক্ত গিরিশ ও মাস্টারকে তাঁহার (বঙ্কিমের) সানকীভাঙার বাসায় পাঠাইয়াছিলেন৷ তাহাদের সহিত শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে অনেক কথা হয়৷ ঠাকুরকে আবার দর্শন করিতে আসিবার ইচ্ছা বঙ্কিম প্রকাশ করেন৷ কিন্তু কার্যগতিকে আর আসা হয় নাই৷ অতঃপর ২৭ ডিসেম্বর শনিবার ঠাকুর পঞ্চবটীমূলে দক্ষিণেশ্বরে ভক্তসঙ্গে বঙ্কিম–প্রণীত দেবী চৌধুরানীর কতক অংশ পাঠ শুনিয়াছিলেন এবং গীতোক্ত নিষ্কামকর্মের বিষয়ে অনেক কথা বলিয়াছিলেন৷ ]
নব–বিধান ব্রাহ্মসমাজে ঠাকুরের সঙ্গলাভ করিয়া যখন খুব জমজমাট চলিয়াছে, সেই সময়েই পণ্ডিত শশধরের হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যা করিতে কলকাতা আগমন হয়৷ সর্বত্র তখন এক আলোচনা–শশধর পণ্ডিতের ধর্মব্যাখ্যা৷ ঠাকুরও পণ্ডিতকে দেখিবার ইচ্ছা ভক্তগণের নিকট প্রকাশ করেন৷ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে রথযাত্রা উপলক্ষে ঠাকুর যে–দিন ঠন্ঠনিয়ায় শ্রীযুক্ত ঈশানচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাটিতে নিমন্ত্রণ রক্ষায় গমন করেন, সেইদিন সেখান হইতে তিনি কলেজ স্ট্রিটস্থ বাসভবনে অপরাহ্ণে পণ্ডিত শশধরকে দেখিতে যান৷ ইহার কয়েকদিন পরেই আবার পণ্ডিত শশধর আলমবাজার বা উত্তর বরানগরের এক স্থলে ধর্মসম্বন্ধিনী বত্তৃণতা করিতে আসিয়া সেখান হইতে ঠাকুরকে দর্শন করিতে দক্ষিণেশ্বর কালীবাটিতে আগমন করেন৷ পণ্ডিত শশধরকে দেখিতে দেখিতে ঠাকুরের অর্ধবাহ্যদশার মতো অবস্থা হইল এবং পণ্ডিতকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘‘ওগো, তুমি পণ্ডিত, তুমি কিছু বল৷’’
শশধর৷ মহাশয়, দর্শনশাস্ত্র পড়িয়া আমার হূদয় শুষ্ক হইয়া গিয়াছে তাই আপনার নিকটে আসিয়াছি ভক্তিরস পাইব বলিয়া৷ অতএব আমি শুনি আপনি কিছু বলুন৷
ঠাকুর৷ আমি আর কি বলব, বাবু সচ্চিদানন্দ যে কি (পদার্থ) তা কেউ বলতে পারে না৷ তাই তিনি প্রথম হলেন অর্ধনারীশ্বর৷ কেন?–না, দেখাবেন বলে যে পুরুষ প্রকৃতি দুই–ই আমি৷ তারপর তা থেকে আরও এক থাক নেবে আলাদা আলাদা পুরুষ ও আলাদা আলাদা প্রকৃতি হলেন৷ সচ্চিদানন্দে যতদিন মন না লীন হয় ততদিন তাঁকে ডাকা ও সংসারের কাজ করা দুই–ই থাকে৷ তারপর তাঁতে মন লীন হলে আর কোন কাজ করবার প্রয়োজন থাকে না৷
এই সকল কথা বলিতে বলিতে ঠাকুর ভাবাবেশে একেবারে নির্বাক নিষ্পন্দ হইয়া গেলেন৷ ভাবাবসানে আবার শশধরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন ঃ
‘‘ওগো পণ্ডিত, তোমাকে দেখলুম৷ তুমি বেশ লোক৷ গিন্নি যেমন রেঁধে বেড়ে সকলকে খাইয়ে দাইয়ে গামছাখানা কাঁধে ফেলে পুকুরঘাটে গা ধুতে, কাপড় কাচতে যায়, আর হেঁসেলের ঘরে ফেরে না–তুমিও তেমনি সকলকে তাঁর কথা বোলে কোয়ে যে যাবে, আর ফিরবে না’’
পণ্ডিত শশধর ঠাকুরের ঐ কথা শুনিয়া, ‘সে আপনাদের অনুগ্রহ’ বলিয়া ঠাকুরের পদধূলি বারংবার গ্রহণ করিতে লাগিলেন এবং তাঁহার ঐসকল কথা শুনিতে শুনিতে স্তম্ভিত ও আর্দ্রহূদয়ে ভগবদ্বস্তু জীবনে লাভ হইল না ভাবিয়া অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন৷
তৎপর উলটা–রথের দিন ঠাকুর যখন বাগবাজারে বলরামবাবুর বাটিতে আগমন করেন তখন পণ্ডিত শশধরও ঠাকুরকে দর্শন করিতে বলরামবাবুর বাটিতে স্বয়ং আগমন করেন এবং সজল নয়নে করজোড়ে ঠাকুরকে পুনরায় নিবেদন করেন, ‘‘দর্শন–চর্চা করিয়া আমার হূদয় শুষ্ক হইয়া গিয়াছে আমায় একবিন্দু ভক্তি দান করুন৷’’ ঠাকুরও ভাবাবিষ্ট হইয়া ঐদিন পণ্ডিতজীর হূদয় স্পর্শ করিয়াছিলেন৷ ঠাকুরের জ্বলন্ত শক্তিপূর্ণ মহাবাক্যের ফলেই যে পণ্ডিতজী কিছুকাল পরে প্রচারকার্য ছাড়িয়া নকামাখ্যাপীঠে তপস্যায় গমন করেন, ইহা আর বলিতে হইবে না৷
জাপক ঈশান ঠাকুরের বিশেষ প্রিয় ও অনুগ্রহপাত্র ছিলেন৷ জপ সমাধান করিয়া ঈশান যখন ঠাকুরের চরণে একদিন সন্ধ্যাকালে প্রণাম করিতে আসিলেন, তখন ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হইয়া তাঁহার শ্রীচরণ ঈশানের মস্তকে প্রদান করিলেন৷ পরে বাহ্যদশাপ্রাপ্ত হইয়া জোর করিয়া ঈশানকে বলিতে লাগিলেন, ‘‘ওরে বামুন, ডুবে যা (অর্থাৎ কেবল ভাসা ভাসা জপ না করিয়া শ্রীভগবানের নামে তন্ময় হইয়া যা)৷’’ ঠাকুর ঈশানের বাটিতে মধ্যে মধ্যে শুভাগমন করিতেন এবং ঈশানও কলকাতায় থাকিলে প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে তাঁহাকে দর্শন করিতে আগমন করিতেন৷ নতুবা পবিত্র দেবস্থান ও তীর্থাদি দর্শনে যাইয়া তপস্যায় কাল কাটাইতেন৷ শ্রীযুক্ত ঈশানের মতো দয়ালু, দানশীল ও ভগবদ্বিশ্বাসী ভক্তের দর্শন সংসারে দুর্লভ৷ ঈশানবাবুর দয়ার বিষয় উল্লেখ করিয়া স্বামী বিবেকানন্দ একদিন গুরুভ্রাতাগণকে বলেন যে, উহা পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের অপেক্ষা কিছুতেই কম ছিল না৷
[পূর্বোক্ত তদানীন্তন মনীষী ও ভক্তগণ ভিন্ন যে–সকল ভক্তিমতী নারী এইকালে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের দর্শন ও কৃপা লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছিলেন, তন্মধ্যে গোপালের মা (শ্রীমতী অঘোরমণি দেবী), যোগীন–মা, (শ্রীমতী যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস), গোলাপ–মা (শ্রীমতী গোলাপসুন্দরী দেবী), গৌরী–মা (শ্রীমতী মৃড়ানী দেবী), লক্ষ্মী দিদি (শ্রীমতী লক্ষ্মীমণি দেবী) প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য৷ দিব্যভাবমুখে অবস্থিত ঠাকুর বিশিষ্ট সাধক–ভক্তগণের সহিত কিরূপ লীলা করিয়াছেন তাহারই অন্যতম দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা গোপালের মায়ের অদ্ভুত দর্শনাদির কথা পাঠক–পাঠিকাকে এখানে সংক্ষেপে উপহার দিতেছি]
পটলডাঙার নগোবিন্দচন্দ্র দত্ত কলকাতায় কোন এক বিখ্যাত সওদাগরী অফিসে মুৎসুদ্দী ছিলেন৷ কামারহাটীতে গঙ্গাতীরে তাঁহার যে ঠাকুরবাড়ি ও বাগান আছে, গোবিন্দবাবুর তিরোধানের পর তাঁহার বিধবা পত্নী উক্ত উদ্যান– বাটিতে শ্রীবিগ্রহের সেবা, জপ, ধ্যান, দান ইত্যাদি লইয়াই থাকিতেন৷ কামার–হাটীর ঠাকুরবাড়ির অতি নিকটেই গোবিন্দবাবুর পুরোহিতবংশের বাস৷ পুরোহিত নীলমাধব বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন৷ ‘গোপালের মাতা’ ইঁহারই ভগ্ণী–পূর্বনাম অঘোরমণি দেবী৷ বালিকাবয়সে বিধবা হওয়ায় তিনি পিত্রালয়েই বাস করিতেন৷ গোবিন্দবাবুর পত্নীর সহিত বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হওয়া অবধি উক্ত উদ্যানবাটিতে ঠাকুর–সেবাতে অঘোরমণির কাল কাটিতে থাকে৷ ক্রমে অনুরাগের আধিক্যে গঙ্গাতীরে ঠাকুরবাড়িতেই বাস করিবার ইচ্ছা প্রবল হওয়ায় তিনি গিন্নির অনুমতি লইয়া মেয়েমহলের একটি ঘরে আসিয়াই বসবাস করিলেন৷ গিন্নির যেমন কঠোর ব্রহ্মচর্য ও তপানুষ্ঠানে অনুরাগ, অঘোরমণিরও তদ্রূপ সেইজন্য উভয়ের মধ্যে মানসিক চিন্তা ও ভাবের অনেক বিষয়ে সাদৃশ্য ছিল৷ অঘোরমণির সম্বলের মধ্যে অলঙ্কারাদি স্ত্রীধন বিক্রয়লব্ধ পাঁচ–সাত শত টাকা৷ তাহাও কোম্পানির কাগজ করিয়া গিন্নির নিকট গচ্ছিত ছিল৷ উহার সুদ লইয়া এবং সময়ে সময়ে বিশেষ অভাবগ্রস্ত হইলে মূলধনে যতদূর সম্ভব অল্পস্বল্প হস্তক্ষেপ করিয়াই অঘোরমণির দিন কাটিত৷
অঘোরমণি কড়ে রাঁড়ী (বালবিধবা)৷ কোনদিনই স্বামীর সুখ জীবনে জানেন নাই৷ গিন্নি যে ঘরখানিতে তাঁহাকে থাকিতে দিয়াছিলেন, তাহা একেবারে বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে৷ ঘরের দক্ষিণের তিনটি জানালা দিয়া গঙ্গাদর্শন হইত এবং উত্তরে ও পশ্চিমে দুইটি দরজা ছিল৷ ব্রাহ্মণী ঐ ঘরে বসিয়া গঙ্গাদর্শন করিতেন ও দিবারাত্র জপ করিতেন৷ তাঁহার বরাবর বৈষ্ণবপদানুগা ভক্তি ছিল ও গুরুর নিকট হইতে গোপালমন্ত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং বাৎসল্যরতিতে অত্যধিক নিষ্ঠাবশত শ্রীভগবানকে পুত্রস্থানীয় করিয়া গোপালভাবে ভজনা করিতেন৷
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের অগ্রহায়ণ মাস৷ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নাম তখন কলকাতায় অনেকের নিকটেই পরিচিত৷ এই অলৌকিক ভক্তসাধুর কথা শুনিয়া কামারহাটীর গিন্নি কামিনী নাম্নী তাঁহার একটি দূরসম্পর্কীয়া আত্মীয়ার সহিত গোপালের মায়ের সঙ্গে এই সময়ে একদিন ঠাকুরকে দর্শন করিতে রানী রাসমণির কালীবাটিতে উপস্থিত হন৷ ঠাকুর সেদিন ইহাদিগকে সাদরে স্বগৃহে বসাইয়া ভক্তিতত্ত্বের অনেক উপদেশ দেন ও ভজন গাহিয়া শুনান এবং পুনরায় আসিতে বলিয়া বিদায় দেন৷ এই প্রথম দর্শনের দিন হইতেই কামারহাটীর ব্রাহ্মণী শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দ্বারা বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন৷ দুই–চারি মাস ঘন ঘন দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত হইতে লাগিল৷ ইতোমধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণদেবও একবার কামারহাটীতে গোবিন্দবাবুর বাগানে গমন করেন এবং তথায় শ্রীবিগ্রহের সম্মুখে কীর্তনাদি করিয়া প্রসাদ পাইবার পর পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসেন৷
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ৷ শীতঋতু অপগত হইয়া কুসুমাকর সরস বসন্ত আসিয়া উপস্থিত৷ পত্রপুষ্পগীতিপূর্ণ বসুন্ধরা এক অপূর্ব উন্মত্ততায় জাগরিতা৷ এই সময় ‘কামারহাটীর ব্রাহ্মণী’ একদিন রাত্রি তিনটার সময় জপে বসিয়াছেন৷ জপ সাঙ্গ হইলে প্রাণায়াম করিতে আরম্ভ করিয়াছেন এমন সময় দেখেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার নিকটে বামদিকে বসিয়া রহিয়াছেন ভাবিলেন, ‘‘এ কি? এমন সময়ে ইনি কোথা থেকে কেমন করে হেথায় এলেন’’ গোপালের মা বলেন, ‘‘...সাহসে ভর করে বাঁ হাত দিয়ে যেমন গোপালের (শ্রীরামকৃষ্ণদেবের) বাঁ হাতখানি ধরেছি, অমনি সে মূর্তি কোথায় গেল, আর তার ভিতর থেকে দশ মাসের সত্যকার গোপাল, (হাত দিয়া দেখাইয়া) এত বড় ছেলে, বেরিয়ে হামা দিয়ে এক হাত তুলে আমার মুখপানে চেয়ে (সে কি রূপ, আর কি চাউনি) বললে, ‘মা ননী দাও৷’... চিৎকার করে কেঁদে উঠলুম–...কেঁদে বল্লুম, ‘বাবা আমি দুঃখিনী কাঙালিনী, আমি তোমায় কি খাওয়াব, ননী ক্ষীর কোথা পাব, বাবা?’ কিন্তু সে অদ্ভুত গোপাল কি তা শোনে–কেবল ‘খেতে দাও’ বলে৷ কি করি, কাঁদতে কাঁদতে উঠে শিকে থেকে শুকনো নারকেল–লা, পেড়ে হাতে দিলুম ও বললুম, ‘বাবা গোপাল, আমি তোমাকে এই কদর্য জিনিস খেতে দিলুম বলে আমাকে যেন ঐরূপ খেতে দিও না৷’ তারপর জপ সেদিন আর কে করে? গোপাল এসে কোলে বসে, মালা কেড়ে নেয়, কাঁধে চড়ে ঘরময় ঘুরে বেড়ায় যেমন সকাল হলো অমনি পাগলিনীর মতো ছুটে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে পড়লুম৷ গোপালও কোলে উঠে চললো–কাঁধে মাথা রেখে৷ এক হাত গোপালের পাছায়–এক হাত পিঠে দিয়ে বুকে ধরে সমস্ত পথ চললুম স্পষ্ট দেখতে লাগলুম গোপালের লাল টুকটুকে পা দুখানি আমার বুকের উপর ঝুলছে৷’’
অঘোরমণি ঐরূপভাবে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইয়া ভাবের আধিক্যে অশ্রুজল ফেলিতে ফেলিতে শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে সেদিন কত কি কথাই না বলিলেন৷ ‘‘এই যে গোপাল আমার কোলে’’, ‘‘ঐ তোমার (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের্) ভেতর ঢুকে গেল’’, ‘‘ঐ আবার বেরিয়ে এলো’’, ‘‘আয় বাবা, দুঃখিনী মায়ের কাছে আয়’’–ইত্যাদি বলিতে বলিতে দেখিলেন চপল গোপাল কখনও বা ঠাকুরের অঙ্গে মিশাইয়া গেল, আবার কখনও বা উজ্জ্বল বালক–মূর্তিতে তাঁহার নিকটে আসিয়া অদৃষ্টপূর্ব বাল্যলীলাতরঙ্গতুফা তুলিয়া তাঁহাকে একেবারে আত্মহারা করিয়া ফেলিল৷ সে প্রবল ভাবতরঙ্গে পড়িয়া কে–ই বা আপনাকে সামলাতেই পারে
সমস্ত দিন কাছে রাখিয়া স্নানাহার করাইয়া কথঞ্চিৎ শান্ত করিয়া সন্ধ্যার কিছু পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণদেব গোপালের মাকে কামারহাটী পাঠাইয়া দিলেন৷ ফিরিবার সময় ভাবদৃষ্ট বালক গোপালও পূর্বের ন্যায় ব্রাহ্মণীর কোলে চাপিয়া চলিল৷ ঘরে ফিরিয়া গোপালের মা পূর্বাভ্যাসে জপ করিতে বসিলেন, কিন্তু সেদিন আর কি জপ করা যায়? যাঁহার জন্য জপ, যাঁহাকে এতকাল ধরিয়া ভাবা–সে যে সম্মুখে নানা রঙ্গ, নানা আবদার করিতেছে৷ ব্রাহ্মণী শেষে উঠিয়া গোপালকে কাছে লইয়া তক্তাপোশের উপর বিছানায় শয়ন করিল৷ পূর্বোক্ত ঘটনার পরদিন, সকাল সকাল রন্ধন করিয়া সাক্ষাৎ গোপালকে খাওয়াইবার জন্য বাগান হইতে শুষ্ক কাঠ কুড়াইতে গেলেন৷ দেখেন, গোপালও সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া কাঠ কুড়াইতেছে ও রান্না ঘরে আনিয়া জমা করিয়া রাখিতেছে৷ এইরূপে মায়ে পোয়ে কাঠ কুড়ান হইল–তারপর রান্না৷ রান্নার সময়ও দুরন্ত গোপাল কখন কাছে বসিয়া, কখনও পিঠের উপর পড়িয়া সব দেখিতে লাগিল, কত কি বলিতে লাগিল, কত কি আবদার করিতে লাগিল
কিছুদিন পরে গোপালের মা একদিন দক্ষিণেশ্বরে আসিয়াছেন৷ ঠাকুর গোপালের মাকে দেখিতে পাইয়া বলিলেন, ‘‘তুমি এখনও অত জপ কর কেন? তোমার তো খুব হয়েছে (দর্শনাদি)৷
গোপালের মা–জপ করব না? আমার কি সব হয়েছে?
ঠাকুর–সব হয়েছে৷
গোপালের মা–সব হয়েছে?
ঠাকুর–হ্যাঁ, সব হয়েছে৷
গোপালের মা–বল কি, সব হয়েছে?
ঠাকুর–হ্যাঁ, তোমার আপনার জন্য জপতপ সব করা হয়ে গেছে, তবে (নিজের শরীর দেখাইয়া) এই শরীরটা ভাল থাকবে বলে ইচ্ছা হয় তো করতে পার৷
গোপালের মা–তবে এখন থেকে যা কিছু করব সব তোমার, তোমার, তোমার৷
শ্রীরামকৃষ্ণদেবে ইষ্টবুদ্ধি দৃঢ় হইবার পর হইতে আর তাঁহার বড় একটা গোপালমূর্তি দর্শন হইত না৷ তবে যখনই দেখিবার নিমিত্ত প্রাণ ব্যাকুল হইত তখনই দেখিতে পাইতেন৷ এই সময় একদিন গোপালের মা ও শ্রীনরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ) উভয়ে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত৷ উভয়কে একত্র পাইয়া ঠাকুর এক মজা বাধাইয়া দিলেন৷ গোপাল যে–ভাবে তাঁহার সহিত লীলাবিলাস করিতেছেন, সে–সমস্ত কথা শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রের নিকট গোপালের মাকে বলিতে বলিলেন৷ ঠাকুর কর্তৃক আদিষ্ট হইয়া গোপালের মা অশ্রুজল ফেলিতে ফেলিতে গদগদস্বরে গোপালরূপী শ্রীভগবানের সহিত তাঁহার লীলাবিলাসের কথা আদ্যোপান্ত বলিতে লাগিলেন৷ নরেন্দ্রনাথের বাহিরে কঠোর জ্ঞানবিচারের আবরণ থাকিলেও ভিতরটা চিরকালই ভক্তিপ্রেমে ভরা ছিল–তিনি বুড়ির ঐরূপ ভাবাবস্থা ও দর্শনাদির কথা শুনিয়া অশ্রুজল সংবরণ করিতে পারিলেন না৷
গোপালের মা দক্ষিণেশ্বরে আসিলেই ঠাকুর তাঁহাকে খুব ভাল ভাল জিনিস খাওয়াইতেন৷ তাহাতে একদিন গোপালের মা বলিলেন, ‘‘গোপাল, তুমি আমায় অত খাওয়াতে ভালবাস কেন?’’
শ্রীরামকৃষ্ণ–‘‘তুমি যে আমায় আগে কত খাইয়েছ৷’’
গোপালের মা–‘‘আগে কবে খাইয়েছি?’’
শ্রীরামকৃষ্ণ–‘‘জন্মান্তরে৷’’
ঠাকুরের অদর্শন হইলে গোপালের মায়ের আর অশান্তির সীমা রহিল না৷ এখন হইতে তিনি বরানগর মঠে ঠাকুরের সন্ন্যাসী ভক্তদের নিকট আসিতেন এবং আসিলেই শান্তি পাইতেন৷ গোপালের মায়ের অদ্ভুত জীবন–কথা শুনিয়া সিস্টার নিবেদিতা এতই মোহিত হন যে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে যখন গোপালের মায়ের শরীর অসুস্থ ও বিশেষ অপটু হওয়ায় তাঁহাকে বাগবাজারের বলরামবাবুর বাটিতে আনা হয়, তখন তাঁহাকে বাগবাজারস্থ নিজভবনে (১৭ নং বসুপাড়া লেন) লইয়া রাখিবার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন৷ গোপালের মা–ও তাঁহার আগ্রহে স্বীকৃতা হইয়া তথায় গমন করেন৷ এখন হইতে গোপালের মা সিস্টার নিবেদিতার ভবনে বাস করিতে লাগিলেন৷ এইরূপে প্রায় দুই বৎসর বাস করিয়া ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই গোপালের মা ভাগীরথী তীরে অর্ধনিমজ্জিতাবস্থায় শ্রীভগবানের অভয়পদে মিলিত হইলেন৷
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মাতিশয়ে ঠাকুরকে কষ্ট পাইতে দেখিয়া ভক্তগণ তাঁহাকে বরফ ব্যবহার করিতে অনুরোধ করায় শরবত পানীয়াদির সহিত উহা সর্বদা ব্যবহার করিয়া তিনি বালকের ন্যায় আনন্দ করিতে লাগিলেন৷ কিন্তু দুই–এক মাস ঐরূপ করিবার পরে তাঁহার গলদেশে বেদনা উপস্থিত হইল৷ ঠাণ্ডা লাগিয়া তাঁহার কণ্ঠতালুদেশ ঈষৎ স্ফীত হইয়াছে ভাবিয়া প্রথমে সামান্য প্রলেপের ব্যবস্থা হইল৷ কিন্তু কয়েকদিবস ঔষধ প্রয়োগেও ফল পাওয়া গেল না দেখিয়া জনৈক ভক্ত বহুবাজারের রাখাল ডাক্তারের ঐরূপ ব্যাধি আরোগ্য করিবার দক্ষতার কথা শুনিয়া তাঁহাকে ডাকিয়া আনিল৷ ডাক্তার রোগ নির্ণয় করিয়া গলার ভিতরে ও বাহিরে লাগাইবার জন্য ঔষধ ও মালিশের বন্দোবস্ত করিলেন এবং ঠাকুর যাহাতে কয়েকদিন কথা না বলেন ও বারংবার সমাধিস্থ না হয়েন, তদ্বিষয়ে সকলকে যথাসম্ভব লক্ষ্য রাখিতে বলিলেন৷
ক্রমে জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্লাত্রয়োদশী আগতপ্রায় হইল৷ কলকাতার কয়েক মাইল উত্তরে গঙ্গাতীরবর্তী পানিহাটি গ্রামে প্রতি বৎসর ঐ দিবস
বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বিশেষ মেলা হইয়া থাকে৷ শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া যখন নীলাচলে বাস করিতে থাকেন, তখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুপাদ বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের ভারপ্রাপ্ত হইয়া গঙ্গাতীরবর্তী খড়দহ গ্রামকে প্রধান কেন্দ্রস্বরূপ করিয়া বঙ্গের নানা স্থানে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন৷ সাঙ্গোপাঙ্গ পরিবৃত শ্রীনিত্যানন্দ এক সময়ে পানিহাটি গ্রামে অবস্থান করিবার কালে ভক্তপ্রবর রঘুনাথদাস গোস্বামী চিঁড়া, দধি, দুগ্ধ, শর্করা, কদলী প্রভৃতি দেবতাকে নিবেদনপূর্বক ভক্তমণ্ডলীসহ তাঁহাকে ও সমাগত শত শত ব্যক্তিকে সেইদিন ভাগীরথীতীরে ভোজনদানে পরিতৃপ্ত করেন৷ নিত্যানন্দ প্রভুপাদের আদেশে অনতিকাল পরে তিনি চিরকালের মতো সংসার ত্যাগ করিয়া নীলাচলে গমন করিলেন৷ বৈষ্ণব ভক্তগণ তাঁহার কথা চিরকাল স্মরণ রাখিয়া তদবধি প্রতি বৎসর ঐ দিবস পানিহাটি গ্রামে গঙ্গাতীরে সমাগত হইয়া তাঁহার ন্যায় ভগবৎ–প্রসন্নতাল্ জন্য শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুপাদের উদ্দেশে ঐরূপ উৎসব সম্পন্ন করিতে লাগিলেন৷ কালে উহা পানিহাটির ‘চিঁড়ার মহোৎসব’ নামে ভক্তসমাজে খ্যাতি লাভ করিল৷
ঠাকুর ইতঃপূর্বে পানিহাটির মহোৎসবে অনেকবার যোগদান করিয়াছিলেন৷ কিন্তু তাঁহার ইংরেজিশিক্ষিত ভক্তগণের আগমনের কাল হইতে নানা কারণে তিনি কয়েক বৎসর উহা করিতে পারেন নাই৷ ঠাকুর এই বৎসরে ঐ উৎসব দর্শনে যাইতে অভিলাষ প্রকাশ করায় রামচন্দ্র প্রমুখ প্রায় পঁচিশজন ভক্ত দুইখানি নৌকা ভাড়া করিয়া প্রাতে নয় ঘটিকার ভিতরে দক্ষিণেশ্বরে সমাগত হইলেন৷ বেলা দশটার ভিতরে সকলে ভোজন করিয়া যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন৷ বুদ্ধিমতী শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী কিন্তু নানা দিক চিন্তা করিয়া যাইবার সঙ্কল্প ত্যাগ করিলেন৷
বেলা দ্বিতীয় প্রহর আন্দাজ সকলে পানিহাটিতে পঁৌছিলেন৷ নৌকা হইতে নামিয়া ঠাকুর ভক্তসঙ্গে বরাবর শ্রীযুক্ত মণি সেনের বাটিতে যাইয়া উঠিলেন৷ বাটির সকলে তাঁহাকে প্রণামপুরঃসর বৈঠকখানায় লইয়া যাইয়া বসাইলেন৷ বৈঠকখানাগৃহের পার্শ্বেই ঠাকুরবাটি৷ মন্দির সংলগ্ণ নাটমন্দিরের উপরে উপস্থিত হইয়া ঠাকুর ও ভক্তগণ যুগলবিগ্রহ মূর্তি দর্শন করিলেন৷ ঠাকুর যখন প্রণাম করিতেছিলেন তখন একদল কীর্তনিয়া উঠানে প্রবেশ করিয়া গান আরম্ভ করিল৷ ঠাকুর নাটমন্দিরের একপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইয়া কীর্তন শুনিতেছিলেন৷ তিনি চক্ষের নিমেষে এক লম্ফে কীর্তনদলের মধ্যভাগে সহসা অবতীর্ণ হইয়া অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া সিংহবিক্রমে নৃত্য করিতে লাগিলেন৷ প্রায় অর্ধঘণ্টাকাল এইরূপে অতীত হইলে ঠাকুরকে কিঞ্চিৎ প্রকৃতিস্থ দেখিয়া ভক্তগণ তাঁহাকে কীর্তন সম্প্রদায়ের মধ্য হইতে সরাইয়া লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন৷ স্থির হইল অল্পদূরে অবস্থিত মহাপ্রভুর পার্ষদ রাঘব পণ্ডিতের বাটিতে যাইয়া যুগলবিগ্রহ ও শালগ্রামশিলা দর্শনপূর্বক সকলে নৌকায় ফিরিয়া যাইবেন৷ কীর্তন সম্প্রদায় কিন্তু তাঁহার সঙ্গ ছাড়িল না, মহোৎসাহে নাম গান করিতে করিতে পশ্চাতে আসিতে লাগিল৷
ঠাকুর উহাতে দুই চারি পদ অগ্রসর হইয়াই ভাবাবেশে স্থির হইয়া রহিলেন৷ পুনঃপুনঃ ঐরূপ হওয়াতে ভক্তগণ অতি ধীরে অগ্রসর হইতে বাধ্য হইলেন৷ ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের দেবদেহে সেদিন যে অপূর্ব শ্রীফুটিয়া উঠিয়াছিল তাহা যথাযথ বর্ণনা করা মনুষ্যশক্তির পক্ষে অসম্ভব৷ তাঁহার উন্নত বপু আরও দীর্ঘ এবং স্বপ্ণদৃষ্ট শরীরের ন্যায় লঘু বলিয়া প্রতীত হইতেছিল, শ্যামবর্ণ উজ্জ্বল গৌরবর্ণে পরিণত হইয়াছিল ভাবপ্রদীপ্ত মুখমণ্ডল দিব্যজ্যোতি বিকীর্ণ করিয়া চতুষ্পার্শ্ব আলোকিত করিয়াছিল এবং শান্তি ও আনন্দপূর্ণ মুখের সেই অনুপম হাসি দৃষ্টিপথে পতিত হইবামাত্র মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় জনসাধারণকে কিছুক্ষণের জন্য সকল কথা ভুলাইয়া তাঁহার পদানুসরণ করাইয়াছিল৷ উজ্জ্বল গৈরিকবর্ণের পরিধেয় গরদখানি ঐ অপূর্ব অঙ্গকান্তির সহিত পূর্ণ সামঞ্জস্যে মিলিত হইয়া তাঁহাকে অগ্ণিশিখা পরিব্যাপ্ত বলিয়া ভ্রম জন্মাইতেছিল৷
এক বিরাট জনস৯ ভাবাবিষ্ট ঠাকুরকে বেষ্টন করিয়া রাঘব পণ্ডিতের কুটিরাভিমুখে ধীর পদে অগ্রসর হইতে লাগিল৷ সেখানে পঁৌছিতে প্রায় তিনঘণ্টাকাল লাগিল৷ এখানে আসিয়া মন্দির মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া দর্শন স্পর্শন ও বিশ্রামাদি করিতে ঠাকুরের অর্ধঘণ্টাকাল অতীত হইল এবং সঙ্গের সেই বিরাট জনস৯ ধীরে ধীরে ইতস্তত ছড়াইয়া পড়িল৷ ভিড় কমিয়াছে দেখিয়া ভক্তগণ তাঁহাকে নৌকায় লইয়া আসিলেন৷ নৌকা ছাড়িয়া দিল৷ রাত্রি সাড়ে আটটা আন্দাজ সকলে দক্ষিণেশ্বর কালীবাটিতে পৌঁছিলেন৷
পানিহাটি মহোৎসবে যোগদান করিয়া ঠাকুরের গলায় বেদনা বৃদ্ধি হইল৷ ডাক্তারেরা পরীক্ষাপূর্ব স্থির করিলেন, তাঁহার clergyman’s sore-throat’ হইয়াছে৷ ধর্মপ্রচারকদিগের ঐরূপ ব্যাধি হইবার কথা চিকিৎসাশাস্ত্রে লিপিবদ্ধ আছে৷ রোগনির্ণয় করিয়া ডাক্তারেরা ঔষধপথ্যাদির ব্যবস্থা করিলেন৷ কিন্তু প্রগাঢ় ঈশ্বরপ্রেম এবং সংসারতপ্ত জনগণের প্রতি অপার করুণায় অবশ হইয়া নিষেধ সত্ত্বেও তিনি সমাধি ও বাক্যসংযমের দিকে যথাযথ লক্ষ্য রাখিতে সমর্থ হইলেন না৷ শ্রাবণ যাইয়া ভাদ্রেরও কিছুদিন গত হইল, কিন্তু ঠাকুরের গলার বেদনা ক্রমে বৃদ্ধি ভিন্ন হ্রাস দেখা গেল না৷ ঠাকুরের কণ্ঠতালুদেশ হইতে রুধির নির্গত হইবার সংবাদ পাইয়া নরেন্দ্রনাথ, রাম, গিরিশ, দেবেন্দ্র, মাস্টার (মহেন্দ্র) প্রভৃতি সকলে স্থির করিলেন কলকাতায় একখানি বাটি ভাড়া লইয়া অচিরে ঠাকুরকে আনয়নপূর্বক চিকিৎসা করাইতে হইবে৷ নরেন্দ্রনাথ জনৈক যুবককে বলিলেন, ‘‘যাঁহাকে লইয়া এত আনন্দ তিনি বুঝি এইবার সরিয়া যান–আমি ডাক্তারি গ্রন্থ পড়িয়া এবং ডাক্তার বন্ধুগণকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছি, ঐরূপ কণ্ঠরোগ ক্রমে ‘ক্যান্সারে’ Cancer) পরিণত হয় অদ্য রক্ত পড়ার কথা শুনিয়া রোগ উহাই বলিয়া সন্দেহ হইতেছে ঐ রোগের ঔষধ এখনও আবিষ্কার হয় নাই৷’’
পরদিন ভক্তদিগের মধ্যে প্রবীণ কয়েকজন দক্ষিণেশ্বরে যাইয়া ঠাকুরকে কলকাতায় থাকিয়া চিকিৎসা করাইবার জন্য অনুরোধ করিলে তিনি সম্মত হইলেন৷ বাগবাজার দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের ক্ষুদ্র একখানি বাটির ছাদ হইতে গঙ্গাদর্শন হয় দেখিয়া ভক্তগণ উহা ভারা লইয়া অনতিকাল পরে অর্থাৎ (ইং ১১৮৫ খ্রিস্টাব্দের) অক্টোবরের প্রথমার্ধে তাঁহাকে কলকাতায় লইয়া আসিলেন৷ কিন্তু ভাগীরথীতীরে কালীবাটির প্রশস্ত উদ্যানের মুক্ত বায়ুতে থাকিয়া অভ্যস্ত ঠাকুর ঐ স্বল্পপরিসর বাটিতে প্রবেশ করিয়াই ঐ স্থানে বাস করিতে পারিবেন না বলিয়া তৎক্ষণাৎ পদব্রজে রামকান্ত বসু স্ট্রিটে বলরাম বসুর ভবনে চলিয়া আসিলেন৷ আবার বাটির অনুসন্ধান হইতে লাগিল৷
বৃথা সময় নষ্ট করা বিধেয় নহে ভাবিয়া ভক্তগণ ইতোমধ্যে একদিবস কলকাতার সুপ্রসিদ্ধ বৈদ্যগণকে আনয়ন করিয়া ঠাকুরের ব্যাধিসম্বন্ধে মতামত গ্রহণ করিলেন৷ গঙ্গাপ্রসাদ, গোপীমোহন, দ্বারিকানাথ, নবগোপাল প্রভৃতি অনেক কবিরাজ সেদিন আহূত হইয়া ঠাকুরকে পরীক্ষা করিলেন এবং তাঁহার রোহিণী নামক দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধি হইয়াছে বলিয়া স্থির করিলেন৷ ভক্তগণ তাঁহার হ্যোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা করানোই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিলেন এবং কলকাতার সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের চিকিৎসাধীনে কিছুদিন তাঁহাকে রাখা সর্ববাদিসম্মত হইল৷ এদিকে চিকিৎসার্থ ঠাকুরের কলকাতা আগমন শহরে সর্বত্র লোকমুখে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল এবং পরিচিত অপরিচিত বহু ব্যক্তি তাঁহার দর্শন মানসে যখন–তখন দলে দলে উপস্থিত হইয়া বলরামের ভবনকে উৎসবস্থলের ন্যায় আনন্দময় করিয়া তুলিল৷ প্রাতঃকাল হইতে ভোজনকাল পর্যন্ত এবং ভোজনান্তে ঘণ্টা দুই আন্দাজ বিশ্রামের পরেই রাত্রির আহার এবং শয়নকাল পর্যন্ত প্রতিদিন তিনি ঐ সপ্তাহকাল মধ্যে বহুলোকের ব্যক্তিগত জীবনের জটিল প্রশ্ণসকল সমাধান করিয়া দিয়াছিলেন নানাভাবে ঈশ্বরীয় কথার আলোচনায় বহু ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক পথে আকৃষ্ট করিয়াছিলেন এবং ভজন সঙ্গীতাদি শ্রবণে গভীর সমাধিরাজ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বহু পিপাসুর প্রাণ শান্তি ও আনন্দের প্লাবনে পূর্ণ ও উচ্ছলিত করিয়াছিলেন৷
ঠাকুরের জন্য যে বাটিখানি এখন ভাড়া লওয়া হইল, উহা পূর্ব–পশ্চিমে বিস্তৃত শ্যামপুকুর স্ট্রিটের উত্তরপার্শ্বে অবস্থিত৷ উত্তরমুখে বাটিতে প্রবেশ করিয়াই বামে ও দক্ষিণে বসিবার চাতাল ও স্বল্পপরিসর ‘রক’ দেখা যাইত৷ উহা ছাড়াইয়া কয়েক পদ অগ্রসর হইলেই ডাহিনে দ্বিতলে উঠিবার সিঁড়ি ও সম্মুখে উঠান৷ উঠানের পূর্বদিকে দুই–তিনখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘর৷ সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়াই দক্ষিণভাগে উত্তর–দক্ষিণে বিস্তৃত একখানি লম্বা ঘর, উহাই সর্বসাধারণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল এবং বামে পূর্ব–পশ্চিমে বিস্তৃত ঘরগুলিতে যাইবার পথ৷ উক্ত পথ দিয়া প্রথমেই ‘বৈঠকখানা’ ঘর নামে অভিহিত সুপ্রশস্ত ঘরখানিতে ঢুকিবার দ্বার–এই ঘরে ঠাকুর থাকিতেন৷ উহার উত্তরে ও দক্ষিণে বারাণ্ডা, তন্মধ্যে উত্তরের বারাণ্ডা প্রশস্ততর ছিল এবং পশ্চিমে ছোট ছোট দুইখানি ঘর–তাহার একখানিতে ভক্তদিগের কেহ কেহ রাত্রিতে শয়ন করিতেন এবং অপরখানি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর রাত্রিবাসের জন্য নির্দিষ্ট ছিল৷ ঠাকুরের ঘরে যাইবার পথে পূর্বপার্শ্বে ছাদে উঠিবার সিঁড়ি এবং ছাদে যাইবার দরজার পার্শ্বে চারি হাত আন্দাজ লম্বা ও এরূপ প্রশস্ত একটি আচ্ছাদনযুক্ত চাতাল ছিল৷ শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ঐ চাতালটিতে সমস্ত দিবস অতিবাহিত করিতেন এবং ঐ স্থানেই ঠাকুরের জন্য প্রয়োজনীয় পথ্যাদি রন্ধন করিতেন৷ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরের মাঝামাঝি ঠাকুর বলরামের বাটি হইতে এখানে আসিয়া কিঞ্চিদধিক তিন মাস কাল অতিবাহিত করিয়াছিলেন এবং অগ্রহায়ণ শেষ হইবার দুই দিবস থাকিতে কাশীপুরের বাগানবাটিতে উঠিয়া গিয়াছিলেন৷
শ্যামপুকুরের বাটিতে আসিবার কয়েকদিন পরেই ভক্তগণ পূর্বপরামর্শমতো ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারকে ঠাকুরের চিকিৎসার্থ আনয়ন করিল৷ তিনি যখন কথায় কথায় জানিতে পারিলেন, ভক্তগণই তাঁহাকে চিকিৎসার্থ কলকাতায় আনয়নপূর্বক ব্যয় নির্বাহ করিতেছে, তখন তিনি পারিশ্রমিক গ্রহণ না করিয়া বলিলেন, ‘‘আমি বিনা পারিশ্রমিকে যথাসাধ্য চিকিৎসা করিয়া তোমাদিগের সৎকার্যে সহায়তা করিব৷’’
ডাক্তারের উপদেশমতো সুপথ্য প্রস্তুত করিবার লোকাভাবে ঠাকুরের রোগবৃদ্ধির সম্ভাবনা হইয়াছে শুনিবামাত্র শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী আপনার থাকিবার সুবিধা–সুবিধার কথা কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া শ্যামপুকরের বাটিতে আসিয়া ঐ ভার সানন্দে গ্রহণ করিলেন৷ পথ্যের বিষয়ে ঐরূপে মীমাংসিত হইলে রাত্রিকালে ঠাকুরের সেবা করিবার ভার শ্রীযুত নরেন্দ্র স্বয়ং গ্রহণপূর্বক রাত্রিকালে এখানে অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং নিজ দৃষ্টান্তে উৎসাহিত করিয়া ছোট গোপাল, কালী, শশী প্রভৃতি কয়েকজন কর্মঠ যুবক–ভক্তকে ঐরূপ করিতে আকৃষ্ট করিলেন৷ নরেন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত, উত্তেজনা এবং উৎসাহ ভিন্ন তাহারা বাধা বিঘ্ণ অতিক্রম করিয়া সর্বোচ্চ কর্তব্য পথে কখনই যে অচল অটল হইয়া থাকিতে পারিত না, একথা বলা বাহল্য৷ ঐরূপে শ্যামপুকুরের বাটিতে চারি–পাঁচ জন মাত্র জীবনোৎসর্গ করিয়া এই সেবাব্রত আরম্ভ করিলেও কাশীপুরের উদ্যানে উহার পূর্ণানুষ্ঠানকালে ব্রতধারিগণের সংখ্যা প্রায় চতুর্গুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছিল৷ শ্রীরামকৃষ্ণ–ভক্তস৯রূপ মহীরুহ দক্ষিণেশ্বরে অঙ্কুরিত হইয়াছিল বলিয়া নির্দিষ্ট হইলেও, শ্যামপুকুরে ও কাশীপুর উদ্যানে উহা নিজ আকার ধারণপূর্বক এত দ্রুত বর্ধিত হইয়া উঠিয়াছিল যে, ভক্তগণের অনেকে তখন স্থির করিয়াছিলেন, ঐ বিষয়ের সাফল্য আনয়নই ঠাকুরের শারীরিক ব্যাধির অন্যতম কারণ৷
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার ঠাকুরের উদার আধ্যাত্মিকতায় বিশেষরূপে আকৃষ্ট হইয়া অবসর পাইলেই এখন হইতে তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইতে এবং দুই–চারি ঘণ্টা অতিবাহিত করিয়া যাইতে লাগিলেন৷ তাঁহার মূল্যবান সময়ের এত অধিক ভাগ এখানে কাটাইবার জন্য ঠাকুর একদিন তাঁহাকে কৃতজ্ঞতা জানাইবার উপক্রম করিলে তিনি ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘‘ওহে, তুমি কি ভাব কেবল তোমারই জন্য আমি এখানে এতটা সময় কাটাইয়া যাই? ইহাতে আমারও স্বার্থ রহিয়াছে৷... কি জান, তোমার সত্যানুরাগের জন্যই তোমায় এত ভাল লাগে তুমি যেটা সত্য বলিয়া বুঝ তার একচুল এদিক–ওদিক করিয়া চলিতে–বলিতে পার না অন্যস্থানে দেখি তারা বলে এক, করে এক–ঐটি আমি আদৌ সহ্য করতে পারি না৷’’
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল ঐরূপে দিন দিন ঠাকুরের প্রতি যেমন শ্রদ্ধা ও প্রীতিসম্পন্ন হইয়া উঠিতেছিলেন, ঠাকুরও তেমনি তাঁহাকে ধর্মপথে অগ্রসর করিয়া দিবার জন্য যত্নপর হইলেন৷ তদ্ভিন্ন শিষ্যবর্গের মধ্যে মহেন্দ্রনাথ, গিরিশচন্দ্র, নরেন্দ্রনাথ প্রমুখ বাছা বাছা লোকসকলকে মধ্যে মধ্যে সুবিদ্বান ডাক্তারের সহিত আলাপ করিতে পাঠাইতেন৷ নরেন্দ্রনাথের সহিত আলাপে মুগ্ধ হইয়া তিনি তাঁহাকে একদিন নিমন্ত্রণ করিয়া ভোজন করাইয়াছিলেন এবং সঙ্গীত বিদ্যাতেও তাঁহার অধিকার আছে জানিয়া একদিন ভজন শুনাইবার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন৷ উহার কয়েকদিন পরে ডাক্তার একদিবস অপরাহ্ণে ঠাকুরকে দেখিতে আসিলে নরেন্দ্রনাথ তাঁহার প্রতিশ্রুতি রক্ষাপূর্বক দুই–তিন ঘণ্টাকাল তাঁহাকে ভজন শুনাইয়াছিলেন৷ ডাক্তার সেদিন আনন্দিত হইয়া ঠাকুরকে বলিয়াছিলেন, ‘‘এর মতো ছেলে ধর্মলাভ করিতে আসিয়াছে দেখিয়া আমি বিশেষ আনন্দিত এ একটি রত্ন, যাতে হাত দিবে সেই বিষয়েই উন্নতি সাধন করিবে৷’’
ঠাকুরের ভালবাসা, সরল ব্যবহার ও আধ্যাত্মিকতায় ডাক্তারের মন তাঁহার প্রতি ক্রমে শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া উঠিতেছিল৷ কিন্তু ঠাকুরকে তাঁহার ভক্তগণ যেরূপ প্রগাঢ় ভক্তি–বিশ্বাস করিত তাহা কি ভাবে দেখিতেন, তাহা বলা যায় না৷ বোধ হয় তাঁহার নিকটে উহা কিছু বাড়াবাড়ি বলিয়া মনে হইত৷ একদিবস অবতারবাদ প্রসঙ্গে ডাক্তার ঠাকুরের সম্মুখে স্পষ্ট বলিয়াছিলেন, ‘‘ঈশ্বরকে ভক্তি–পূজাদি যাহা বল তাহা বুঝিতে পারি, কিন্তু সেই অনন্ত ভগবান মানুষ হইয়া আসিয়াছেন–এই কথা বলিলেই গোল বাধে৷ তিনি যশোদানন্দন, মেরিনন্দন, শচীনন্দন হইয়া আসিয়াছেন, এই কথা বুঝা কঠিন–ঐ নন্দনের দলই দেশটাকে উচ্ছন্ন দিয়াছে৷’’ অবতার সম্বন্ধীয় পূর্বোক্ত মত প্রকাশের জন্য ডাক্তারের সঙ্গে গিরিশচন্দ্র ও নরেন্দ্রনাথের তুমুল বাদানুবাদ হইল৷ কিন্তু তর্কে যাহা হয় নাই, ঠাকুরের মনের অলৌকিক মাধুর্য ও প্রেম এবং তাঁহার ভিতর হইতে যে অদৃষ্টপূর্ব আধ্যাত্মিক প্রকাশ ডাক্তারের সময় সময় নয়নগোচর হইতেছিল তাহা দ্বারা সেই বিষয় সংসিদ্ধ হইয়াছিল৷ তাঁহার ঐরূপ মত ধীরে ধীরে অনেকটা পরিবর্তিত হইয়াছিল৷ ঐ বৎসর নদুর্গাপূজার সন্ধিক্ষণে যে অলৌকিক বিভূতি প্রকাশ ঠাকুরের ভিতরে সহসা উপস্থিত হইয়াছিল, ডাক্তার সরকারও উহা দেখিবার অবসর পাইয়াছিলেন৷ ভাবাবেশকালে ঠাকুরের হূদয়ের স্পন্দনাদি যন্ত্রসাহায্যে পরীক্ষা করিয়া তাঁহাকে স্বীকার করিতে হইয়াছিল, বাহিরে দেখিতে সম্পূর্ণ মৃতের ন্যায় প্রতীয়মান ঠাকুরের এই সমাধি–বস্থা সম্বন্ধে বিজ্ঞান কোনরূপ আলোক এখনো প্রদান করিতে পারে নাই৷ বস্তুতও ঈশ্বরের সংসারে এমন অনেক বিষয় বিদ্যমান, যাহাদের রহস্যভেদ দর্শন–বিজ্ঞান কিছুমাত্র করিতে সক্ষম হয় নাই–কোন কালে পারিবে বলিয়াও বোধ হয় না৷
শ্রীশ্রীকালীপূজার দিন ক্রমে নিকটবর্তী হইল৷ নদুর্গাপূজার ন্যায় নকালীপূজার সময়েও ঠাকুরের ভিতরে অদ্ভুত আধ্যাত্মিক প্রকাশ ভক্তগণের নয়নগোচর হইয়াছিল৷ পূজার পূর্ব দিবসে ঠাকুর কয়েকজন ভক্তকে সহসা বলিয়া বসিলেন, ‘‘পূজার উপকরণসকল সংক্ষেপে সংগ্রহ করিয়া রাখিস–কাল নকালীপূজা করিতে হইবে৷’’ পূজা ষোড়শোপচারে অথবা পঞ্চোপচারে হইবে, উহাতে অন্নভোগ দেওয়া হইবে কি না, পূজকের পদ কে গ্রহণ করিবে ইত্যাদি বিষয়ে কোন মীমাংসা না করিতে পারিয়া অবশেষে স্থির হইল, গন্ধ–পুষ্প, ধূপ–দীপ, ফল–মূল এবং মিষ্টান্নমাত্র সংগ্রহ করিয়া রাখা হউক, পরে ঠাকুর যেরূপ বলেন, করা যাইবে৷ কিন্তু সেই দিবস এবং পূজার দিনের অর্ধেক অতীত হইলেও ঠাকুর ঐ সম্বন্ধে আর কোন কথা তাহাদিগকে বলিলেন না৷ ক্রমে সূর্যাস্ত হইয়া রাত্রি প্রায় ৭ টা বাজিয়া গেল৷ ক্রমে সকল উপকরণ আনয়ন করা হইল এবং ধূপ–দীপসকল প্রজ্বলিত হওয়ায় গৃহ আলোকময় ও সৌরভে আমোদিত হইল৷ যুবকভক্তগণের সহিত মহেন্দ্রনাথ, রামচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ, গিরিশচন্দ্র প্রভৃতি প্রবীণ ব্যক্তিসকল উপস্থিত হইলেন৷ গিরিশচন্দ্রের মনে হইল, আপনার জন্য ঠাকুরের নকালীপূজা করিবার কোন প্রয়োজন নাই৷ তবে কি তাঁহার শরীররূপ জীবন্ত প্রতিমায় জগদম্বার পূজা করিয়া ভক্তগণ ধন্য হইবে বলিয়া এই পূজায়োজন?–নিশ্চয় তাহাই৷ এইরূপ ভাবিয়া তিনি উল্লাসে অধীর হইলেন এবং সম্মুখস্থ পুষ্পচন্দন সহসা গ্রহণপূর্বক ‘জয় মা’ বলিয়া ঠাকুরের পাদপদ্মে অঞ্জলি প্রদান করিলেন৷ ঠাকুরের সমস্ত শরীর উহাতে শিহরিয়া উঠিল এবং তিনি গভীর সমাধিমগ্ণ হইলেন৷ তাঁহার মুখমণ্ডল জ্যোতির্ময় এবং দিব্য হাস্যে বিকশিত হইয়া উঠিল এবং হস্তদ্বয় বরাভয়মুদ্রা ধারণপূর্বক তাঁহাতে নজগদম্বার আবেশের পরিচয় প্রদান করিতে লাগিল৷ এত অল্পকালের মধ্যে এই সকল ঘটনা উপস্থিত হইল যে, পার্শ্ববর্তী ভক্তগণের অনেকে ভাবিল ঠাকুরকে ঐরূপ ভাবাবিষ্ট হইতে দেখিয়াই গিরিশ তাঁহার শ্রীপদে বারংবার অঞ্জলি প্রদান করিতেছেন এবং যাহারা কিঞ্চিদ্দূরে ছল তাহারা দেখিল যেন ঠাকুরের শরীরাবলম্বনে জ্যোতির্ময়ী দেবীপ্রতিমা সহসা তাহাদিগের সম্মুখে আবির্ভূতা হইয়াছেন৷ বলা বাহুল্য, ভক্তগণের প্রাণে এখন উল্লাসের অবধি রহিল না৷ তাহারা প্রত্যেকে কোনরূপে পুষ্পপাত্র হইতে পুষ্পচন্দন গ্রহণ করিয়া যাহার যেরূপ ইচ্ছা মন্ত্র উচ্চারণ ও ঠাকুরের শ্রীপাদপদ্ম পূজাপূর্বক ‘জয় জয়’ রবে গৃহ মুখরিত করিয়া তুলিল৷ শ্যামপুকুরে অবস্থানকালে ঠাকুরের ভিতরে দিব্যশক্তি ও দেবভাবের পরিচয় ভক্তগণ পূর্বোক্তরূপে কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ পর্বকালেই যে পাইয়াছিল তাহা নহে, কিন্তু সহসা যখন–তখন তাঁহাতে ঐরূপ ভাবের বিকাশ দেখিবার অবসর লাভ করিয়া তাঁহার প্রতি তাহাদের দেব–মানব বলিয়া বিশ্বাস দিন দিন দৃঢ়ীভূত হইয়াছিল৷
শ্যামপুকুরে অবস্থানকালে ঠাকুরের শারীরিক ব্যাধি যেমন বৃদ্ধি পাইয়াছিল, তাঁহার পুণ্যদর্শন ও কৃপালাভে সমাগত জনগণের সংখ্যাও তেমনি দিন দিন বাড়িয়া গিয়াছিল৷ শ্রীযুক্ত হরিশচন্দ্র মুস্তাফি, মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত প্রভৃতি অনেক যুবক–ভক্তও এখানে ঠাকুরের প্রথম দর্শনলাভ করিয়াছিলেন৷ নবাগত এই সকল ব্যক্তিদিগের প্রকৃতি ও সংস্কার লক্ষ্য করিয়া ঠাকুর ইহাদিগের প্রত্যেককে ভক্তি–প্রধান অথবা জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি–প্রধান সাধনমার্গ নির্দেশ করিয়া দিতেন এবং সুযোগ পাইলেই নিভৃতে নানারূপ উপদেশ দিয়া ঐ পথে অগ্রসর করাইতেন৷
এই সময়ে এক দিবস ঠাকুরের এক অদ্ভুত দর্শন উপস্থিত হইয়াছিল৷ তিনি দেখিয়াছিলেন, তাঁহার সূক্ষ্ম শরীর স্থূলদেহের অভ্যন্তর হইতে নির্গত হইয়া গৃহমধ্যে ইতস্তত বিচরণ করিতেছে এবং তাঁহার গলার সংযোগস্থলে পৃষ্ঠদেশে কতকগুলি ক্ষত হইয়াছে৷ বিস্মিত হইয়া তিনি ঐরূপ ক্ষত হইবার কারণ কি ভাবিতেছেন, এমন সময়ে শ্রীশ্রীজগদম্বা তাঁহাকে বুঝাইয়া দিলেন, নানারূপ দুষ্কর্ম করিয়া আসিয়া লোকে তাঁহাকে স্পর্শপূর্বক পবিত্র হইয়াছে, তাহাদের পাপভার ঐরূপে তাঁহাতে সংক্রমিত হওয়ায় তাঁহার শরীরে ক্ষতরোগ হইয়াছে৷ জীবের কল্যাণসাধনে, যিনি লক্ষ লক্ষবার জন্ম পরিগ্রহপূর্বক দুঃখভোগ করিতে কাতর নহেন, তিনি পূর্বোক্ত দর্শনে কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া আনন্দের সহিত তাঁহার অন্তরঙ্গ ভক্তগণকে ঐ বিষয়ে বলিতে লাগিলেন৷ নরেন্দ্র প্রমুখ বিরল কোন কোন ব্যক্তি উক্ত দর্শনের কথা শুনিয়া অন্যকৃত কর্মের জন্য অন্যের স্বেচ্ছায় ফলভোগ করারূপ যে মতবাদ খ্রিস্টান, বৈষ্ণব প্রভৃতি কোন কোন ধর্মের মূলভিত্তিস্বরূপ হইয়া রহিয়াছে, উহাতে তাহারই সত্যতার ইঙ্গিত প্রাপ্ত হইয়া, ঐ বিষয়ের চিন্তা ও গবেষণায় নিযুক্ত হইলেন৷ যাহা হউক, ভক্তগণ যাহাতে ঠাকুরের চরণস্পর্শ না করেন, তদ্বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ অপরিচিত কাহারও কাহারও ব্যাকুলতা দেখিয়া মধ্যে মধ্যে উক্ত নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে লাগিল৷
ঐরূপ নিয়ম লইয়া একদিন এক রঙ্গ উপস্থিত হইয়াছিল৷ গিরিশচন্দ্র পরিচালিত নাট্যশালায় ধর্মমূলক নাটকবিশেষের অভিনয় দর্শন করিতে ঠাকুর একদিবস দক্ষিণেশ্বরে থাকিবার কালে গমন করিয়াছিলেন এবং নাটকের প্রধান ভূমিকা যে অভিনেত্রী গ্রহণ করিয়াছিল, তাহার অভিনয়–দক্ষতার প্রশংসা করিয়াছিলেন৷ অভিনয়ান্তে ঐদিন উক্ত অভিনেত্রী ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের পাদবন্দনা করিবার সৌভাগ্যের অধিকারিণী হইয়াছিল৷ তদবধি সে ঠাকুরকে দেবতা বলিয়া মনে মনে বিশেষ শ্রদ্ধাভক্তি করিত এবং আর এক দিবস তাঁহার পুণ্যদর্শন লাভ করিবার সুযোগ খুঁজিতেছিল৷ ঠাকুরের নিদারুণ পীড়ার কথা শুনিয়া সে এখন তাঁহাকে একবার দেখিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল এবং শ্রীযুক্ত কালীপদ ঘোষের সহিত পরিচিত থাকায় বিশেষ অনুনয়বিনয়পূর্বক ঐ বিষয়ের জন্য তাঁহার শরণাপন্ন হইল৷ গোপনে পরামর্শ স্থির করিয়া একদিবস সন্ধ্যার প্রাক্কালে তিনি তাহাকে পুরুষের ন্যায় ‘হ্যাট–কোটে’ সজ্জিত করিয়া শ্যামপুকুরের বাসায় উপস্থিত হইলেন এবং ঠাকুরের সমীপে লইয়া যাইয়া তাহার যথার্থ পরিচয় প্রদান করিলেন৷ রঙ্গপ্রিয় ঠাকুর হাসিতে লাগিলেন এবং তাহার সাহস ও দক্ষতার প্রশংসাপূর্বক তাহার ভক্তিশ্রদ্ধা দেখিয়া সন্তুষ্ট হইলেন৷ অনন্তর ঈশ্বরে বিশ্বাসবতী ও তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া থাকিবার জন্য তাহাকে দুই–চারিটি তত্ত্ব–কথা বলিয়া অল্পক্ষণ পরে বিদায় দিলেন৷ সেও অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে শ্রীচরণে মস্তক স্পর্শপূর্বক কালীপদর সহিত চলিয়া গেল৷
ঠাকুরের সঙ্গগুণে এবং তাঁহার সেবা করিবার ফলে ভক্তগণের হূদয়ে ভক্তি–বিশ্বাস দিন দিন বর্ধিত হইতে থাকিলেও কঠোর ত্যাগ এবং কষ্টসাধ্য সংযমের আদর্শ অপেক্ষা সাময়িক ভাবের উচ্ছ্বাসই তাহাদিগের নিকটে এক্ষণে অধিকতর প্রিয় হইতেছিল৷ ঐরূপে ভাবুকতার বৃদ্ধিই যখন ধর্মের চূড়ান্ত বলিয়া ভক্তগণের মধ্যে পরিগণিত হইতেছিল তখন ত্যাগ, সংযম ও নিষ্ঠাদির তুলনায় উহা যে অতি অকিঞ্চিৎকর বস্তু এবং উহার নির্বাধ প্রশয়ে ভবিষ্যতে বিষম বিপদের সম্ভাবনা আছে–একথা সূক্ষ্মদর্শী নরেন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়াইতে পারিল না৷ তিনি ঐ বিষয়ে বুঝাইয়া উহার হস্ত হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিতে বিশেষ প্রয়াস পাইলেন৷ নরেন্দ্রনাথ বলিতে লাগিলেন, ‘‘যে ভাবোচ্ছ্বাস মানবজীবনে স্থায়ী পরিবর্তন উপস্থিত না করে, যাহার প্রভাব মানবকে এইক্ষণে ঈশ্বরলাভের জন্য ব্যাকুল করিয়া তুলিয়া পরক্ষণে কাম–কাঞ্চনের অনুসরণ হইতে নিবৃত্ত করিতে পারে না, তাহার গভীরতা নাই, সুতরাং তাহার মূল্যও অতি অল্প৷’’ যুক্তিতর্ক–বলম্বন্ ঐ বিষয় প্রচার করিয়াই নরেন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হন নাই, কিন্তু কাহারও ভাবুকতায় কিছুমাত্র কৃত্রিমতার সন্ধান পাইলে ঐ বিষয়ে লইয়া সকলের সমক্ষে ব্যঙ্গ পরিহাসে তাহাকে সময়ে সময়ে বিশেষ অপ্রতিভও করিতেন৷ অবসরকালে যুবকভক্তসকলকে দলবন্ধ করিয়া তিনি সংসারের অনিত্যতা, বৈরাগ্য এবং ঈশ্বরভক্তিমূলক সঙ্গীতসকল তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া গাহিয়া তাহাদিগের প্রাণে ত্যাগ, বৈরাগ্য এবং ভক্তিভাব অনুক্ষণ প্রদীপ্ত রাখিতেন৷ ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিয়া অনেকে তাঁহার মধুর স্বরলহরী–উৎক্ষিপ্ত্ সঙ্গীত ও স্তবাদি শ্রবণে বৈরাগ্য ও ঈশ্বরপ্রেমের উত্তেজনায় অশ্রুবিসর্জন করিতে করিতে প্রত্যাবর্তন করিতেন৷
ভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত যাথার্থ সাধকসকলে যাহাতে ঠাকুরের ভক্তদিগের নিকটে বিশেষ সম্মান পায়, তদ্বিষয়েও নরেন্দ্রনাথের বিশেষ দৃষ্টি ছিল৷ এই সময়ে প্রভুদয়াল মিশ্র নামক জনৈক খ্রিস্টান ধর্মযাজক ঠাকুরকে দর্শন করিবার জন্য একদিন উপস্থিত হইলেন৷ তাঁহাকে প্রশ্ণ করা হইল–তিনি খ্রিস্টান হইয়া গৈরিক বস্ত্র ব্যবহার করেন কেন? তাহাতে তিনি উত্তর করিলেন, ‘‘ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, ভাগ্যক্রমে ঈশামসির উপর বিশ্বাস স্থাপনপূর্বক তাঁহাকে নিজ ইষ্টদেবতারূপে গ্রহণ করিয়াছি বলিয়াই কি আমাকে আমার পিতৃপিতামহাগত চালচলনাদি ছাড়িয়া দিতে হইবে?...ভারতের ঈশ্বরপ্রেমিক যোগীরা সনাতন কাল হইতে গৈরিক পরিধান করিয়া আসিতেছেন, সুতরাং উহাপেক্ষা আমার নিকট অন্য কোন প্রকার বসন কি প্রিয়তর হইতে পারে?’’ নরেন্দ্রনাথ তাঁহাকে সাধু ও যোগী জানিয়া বিশেষ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক গুরুভ্রাতাগণকেও ঐরূপ করিতে শিক্ষা প্রদান করিয়াছিলেন৷ ঠাকুরকে ইনি (প্রভুদয়াল) সাক্ষাৎ ঈশা বলিয়া সেদিন নিজ মত প্রকাশ করিয়াছিলেন৷
এইরূপে নরেন্দ্রনাথ যখন ঠাকুরের ভক্তগণকে সুপথে পরিচালিত করিতে নিযুক্ত ছিলেন, তখন ঠাকুরের শারীরিক ব্যাধি দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছিল৷ ডাক্তার সরকারও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন এবং কলকাতার রুদ্ধ দূষিত বায়ুর জন্য ঐরূপ হইতেছে স্থির করিয়া শহরের বাহিরে কোন বাগানবাটিতে ঠাকুরকে রাখিবার জন্য পরামর্শ প্রদান করিলেন৷ অনতিকাল মধ্যেই কাশীপুরস্থ মতিঝিলের উত্তরাংশ যেখানে বরাহনগর বাজারে যাইবার বড় রাস্তার সহিত সংযুক্ত হইয়াছে, তাহারই সম্মুখে রাস্তার অপর (পূর্ব) পার্শ্বে অবস্থিত (প্রসিদ্ধ লালাবাবুর পত্নী) নরানী কাত্যায়নীর জামাতা নগোপালচন্দ্র ঘোষের উদ্যানবাটি ভক্তগণ ৮০.০০ টাকা মাসিক ভাড়ায় ঠাকুরের বাসের জন্য ভাড়া করিয়া লইলেন৷ ঠাকুরের পরম ভক্ত কলকাতার সিমুলিয়া পল্লিনিবাসী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র মহাশয় উক্ত বাড়িভাড়ার সমস্ত ব্যয়বহনে অঙ্গীকার করিলেন৷ বাটি স্থির হইলে শুভদিন দেখিয়া শ্যামপুকুর হইতে দ্রব্যাদি লইয়া যাইয়া উক্ত বাটিতে থাকিবার বন্দোবস্ত হইতে লাগিল৷ পরিশেষে অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির দুইদিবস পূর্বে ১১ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে ভক্তগণ ঠাকুরকে শ্যামপুকুরের বাসা হইতে কাশীপুরের উদ্যানবাটিতে আনয়ন করিলেন এবং ফলপুষ্পসমন্বিত বৃক্ষরাজিশোভিত ঐ স্থানে মুক্তবায়ু, নির্জনতা প্রভৃতি দর্শনে ঠাকুরকে আনন্দিত দেখিয়া পরম চিত্তপ্রসাদ লাভ করিলেন৷
বৃহৎ না হইলেও কাশীপুরের উদ্যানবাটিটি বেশ রমণীয়৷ পরিমাণে উহা চৌদ্দ বিঘা আন্দাজ হইবে৷ উদ্যানের উত্তর সীমার প্রায় মধ্যভাগে প্রাচীরসংলগ্ণ পাশাপাশি তিন–চারিখানি ছোট ছোট কুঠরি রন্ধন ও ভাঁড়ারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল৷ ঐ ঘরগুলির সম্মুখে উদ্যানপথের অপর পার্শ্বে একখানি দ্বিতলবাটি উহার নিচে চারিখানি এবং উপরে দুইখানি ঘর৷ নিম্নের ঘরগুলির ভিতর মধ্যভাগের ঘরখানিই প্রশস্ত হলঘরের ন্যায়৷ উহার উত্তরে পাশাপাশি দুইখানি ছোট ঘর, তন্মধ্যে পশ্চিমের ঘরখানি হইতে সোপান পরম্পরায় দ্বিতলে উঠা যাইত এবং পূর্বের ঘরখানি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর জন্য নির্দিষ্ট ছিল৷ পূর্ব–পশ্চিমে বিস্তৃত পূর্বোক্ত প্রশস্ত হলঘর ও তাহার দক্ষিণের ঘরখানি–যাহার পূর্বদিকে একটি ক্ষুদ্র বারাণ্ডা–সেবক–ভক্তগণের শয়ন–উপবেশনাদির নিমিত্ত ব্যবহূত হইত৷ নিম্নের হলঘরখানির উপরে দ্বিতলে সমপরিসর একখানি ঘর, উহাতেই ঠাকুর থাকিতেন৷ উহার দক্ষিণে প্রাচীরবেষ্টিত স্বল্পপরিসর ছাদ, উহাতে ঠাকুর কখনও কখনও পাদচারণ ও উপবেশন করিতেন এবং উত্তরে সিঁড়ির ঘরের উপরের ছাদ এবং শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর নিমিত্ত নির্দিষ্ট ঘরখানির উপরে অবস্থিত সমপরিসর একখানি ক্ষুদ্র ঘর, উহা ঠাকুরের স্নানাদির এবং দুই একজন সেবকের রাত্রিবাসের জন্য ব্যবহূত হইত৷ বসতবাটির পূর্বে ও পশ্চিমে কয়েকটি সোপান বাহিয়া নিম্নের হলঘরে প্রবেশ করা যাইত এবং উহার চতুর্দিকে ইষ্টকনির্মিত সুন্দর উদ্যানপথ প্রায় গোলাকারে প্রসারিত ছিল৷ উদ্যানের দক্ষিণ–পশ্চিম কোণে উহার পশ্চিমদিকের প্রাচীর সংলগ্ণ দ্বারবানের নিমিত্ত নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র ঘর এবং তদুত্তরে লৌহময় ফটক৷ ঐ ফটক হইতে আরম্ভ হইয়া গাড়ি যাইবার প্রশস্ত উদ্যানপথ পূর্বোত্তরে অর্ধচন্দ্রাকারে অগ্রসর হইয়া বসতবাটির চতুর্দিকে গোলাকার পথের সহিত সংযুক্ত হইয়াছিল৷ বসতবাটির পশ্চিমে একটি ক্ষুদ্র ডোবা ছিল৷ হলঘরে প্রবেশ করিবার পশ্চিমের সোপান–শ্রেণির বিপরীত উদ্যানপথের অপর পারে উক্ত ডোবাতে নামিবার সোপানাবলি বিদ্যমান ছিল৷ উদ্যানের উত্তর–পূর্ব কোণে উক্ত ডোবা অপেক্ষা একটি চারি–পাঁচ গুণ বড় পুষ্করিণী ও তাহার উত্তর–পশ্চিম কোণে দুই–তিনখানি একতলা ঘর ছিল৷ উদ্যানের অন্য সর্বত্র আম্র, পনস, লিচু প্রভৃতি ফলবৃক্ষসমূহ ও উদ্যানপথসকলের উভয়পার্শ্বে পুষ্পবৃক্ষরাজিতে শোভিত ছিল এবং ডোবা ও পুষ্করিণীর পার্শ্বের ভূমির অনেক স্থল নিত্য আবশ্যকীয় শাক–সবজি–উৎপাদন্ নিমিত্ত, ব্যবহূত হইত৷ আবার বৃহৎ বৃক্ষসকলের অন্তরালে মধ্যে মধ্যে শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত ভূমিখণ্ড বিদ্যমান থাকিয়া উদ্যানের রমণীয়ত্ব অধিকতর বর্ধিত করিয়াছিল৷
এই উদ্যানেই ঠাকুর অগ্রহায়ণের শেষে আগমনপূর্বক সন ১২৯২ সালের শীত ও বসন্তকাল এবং সন ১২৯৩ সালে গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু অতিবাহিত করিয়াছিলেন৷ ঐ আটমাস কাল ব্যাধি যেমন প্রতিনিয়ত প্রবৃদ্ধ হইয়া তাঁহার দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীরকে জীর্ণ ভগ্ণ করিয়া শুষ্ক কঙ্কালে পরিণত করিয়াছিল, তাঁহার সংযমসিদ্ধ মনও তেমনি উহার প্রকোপ ও যন্ত্রণা এককালে অগ্রাহ্য করিয়া, তিনি ব্যক্তিগত ও মণ্ডলীগতভাবে ভক্তসে৯র মধ্যে যে কার্য ইতঃপূর্বে আরম্ভ করিয়াছিলেন, তাহার পরিসমাপ্তির জন্য নিযুক্ত হইয়াছিল৷ শুধু তাহাই নহে, ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে অবস্থানকালে নিজ–সম্বন্ধে যে–সকল ভবিষ্যৎ কথা ভক্তগণকে অনেক সময় বলিয়াছিলেন, যথা–‘‘যাইবার (সংসার ত্যাগ করিবার) আগে হাটে হাঁড়ি ভাঙিয়া দিব (অর্থাৎ নিজ দেব–মানবত্ব সকলের সমক্ষে প্রকাশিত করিব)’’ ‘‘যখন অধিক লোকে (তাঁহার দিব্য মহিমার বিষয়) জানিতে পারিবে, কানাকানি করিবে তখন (নিজ শরীর দেখাইয়া) এই খোলটা আর থাকিবে না, মায়ের (জগন্মাতার) ইচ্ছায় ভাঙিয়া যাইবে’’ ‘‘(ভক্তগণের মধ্যে) কাহারা অন্তরঙ্গ ও কাহারা বহিরঙ্গ তাহা এই সময়ে (তাঁহার শারীরিক অসুস্থতার সময়ে) নিরূপিত হইবে’’ ইত্যাদি–সেই সকল ভবিষ্যৎ বাণী–সকলের সফলতা নরেন্দ্রনাথপ্রমুখ ভক্তগণ প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করিতেছিলেন৷ ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে বলিয়াছিলেন, ‘‘মা তোকে তাঁর কাজ করিবার জন্য সংসারে টানিয়া আনিয়াছেন’’, ‘‘আমার পশ্চাতে তোকে ফিরিতেই হইবে, তুই যাইবি কোথায়’’, ‘‘এরা সব (বালক ভক্তগণ) যেন হোমাপাখির শাবকের ন্যায় হোমাপাখি আকাশে বহু উচ্চে উঠিয়া অণ্ড প্রসব করে, সুতরাং প্রসবের পর উহার অণ্ডসকল প্রবল বেগে পৃথিবীর দিকে নামিতে থাকে–ভয় হয় মাটিতে পড়িয়া চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া যাইবে কিন্তু তাহা হয় না, ভূমি স্পর্শ করিবার পূর্বেই অণ্ড বিদীর্ণ করিয়া শাবক নির্গত হয় এবং পক্ষ প্রসারিত করিয়া পুনরায় ঊর্ধ্বে আকাশে উড়িয়া যায় ইহারাও সেইরূপ সংসারে আবদ্ধ হইবার পূর্বেই সংসার ছাড়িয়া ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হইবে৷’’ তদ্ভিন্ন নরেন্দ্রনাথের জীবনগঠনপূর্বক তাঁহার উপরে নিজ ভক্তমণ্ডলীর, বিশেষত বালক ভক্তসকলের ভারার্পণ করা ও তাহাদিগকে কিরূপে পরিচালনা করিতে হইবে তদ্বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া ঠাকুর এই স্থানেই করিয়াছিলেন৷
নরেন্দ্রনাথ সহজেই বুঝিতে পারিলেন, ঠাকুরের সেবার দায়িত্ব যাঁহারা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহাদিগকেও চিকিৎসকগণের আবাস হইতে দূরে অবস্থিত এই উদ্যানবাটিতে থাকিতে হইলে লোকবল এবং অর্থবল উভয়েরই পূর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন৷ বলরাম, সুরেন্দ্র, রাম, গিরিশ, মহেন্দ্র প্রভৃতি যাঁহারা অর্থবলের কথা এ–পর্যন্ত চিন্তা করিয়া আসিয়াছেন তাঁহারা ঐ বিষয় ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন এক উপায় নিশ্চয় স্থির করিবেন৷ কিন্তু লোকবল সংগ্রহে তাঁহাকেই ইতঃপূর্বে চেষ্টা করিতে হইয়াছে এবং এখনও হইবে৷ ঐজন্য কাশীপুর উদ্যানে এখন হইতে তাঁহাকে অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করিতে হইবে৷
আইন (বি–এল) পরীক্ষা দিবার নিমিত্ত নরেন্দ্র ঐ বৎসর প্রস্তুত হইতেছিলেন৷ তিনি স্থির করিলেন আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কয়েকটা বৎসরের পরিশ্রমে মাতা ও ভ্রাতাগণের জন্য মোটামুটি গ্রাসাচ্ছাদনের একটা সংস্থান করিয়া দিয়াই সংসার হইতে অবসর গ্রহণপূর্বক ঈশ্বরারাধনায় ডুবিয়া যাইবেন৷ উত্তমাধিকারিগণের অগ্রণী হইয়া ঠাকুরের অশেষ কৃপালাভে সমর্থ হইলেও নরেন্দ্রনাথের ঐ সঙ্কল্প সংসারসংঘর্ষে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হইয়া কালে যেভাবে অন্য আকার ধারণ করিয়াছিল তাহা আমরা শীঘ্র দেখিতে পাইব৷
পূর্বেই উক্ত হইয়াছে ভক্তগণ চাঁদা করিয়া ঠাকুরের আহার ও চিকিৎসাদির বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন৷ ঠাকুরের উহা মনঃপূত না হওয়ায় চিকিৎসার্থ কলকাতায় (শ্যামপুকুরে) আসিবার কালে বলরামকে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, ‘‘দেখ, দশজনে চাঁদা করিয়া আমার দৈনন্দিন ভোজনের বন্দোবস্ত করিবে এটা আমার নিতান্ত রুচিবিরুদ্ধ৷...চিকিৎসার জন্য যতদিন দক্ষিণেশ্বরের বাহিরে থাকিব ততদিন আমার খাবারের খরচটা তুমিই দিও৷’’ ঐরূপে কাশীপুরের উদ্যানবাটি যখন তাঁহার নিমিত্ত ভাড়া লওয়া হইল, তখন উহার মাসিক ভাড়া ৮০.০০ টাকা জানিতে পারিয়া তাঁহার ‘ছা–পোষা’ ভক্তগণ উহা কেমন করিয়া বহন করিবে এই কথা ভাবিতে লাগিলেন পরিশেষে ডস্ট কোম্পানির মুৎসুদ্দী পরম ভক্ত সুরেন্দ্রনাথকে নিকটে ডাকিয়া বলিলেন, ‘‘দেখ সুরেন্দর, এরা সব কেরানি–মেরানি ছা–পোষা লোক, এরা অত টাকা চাঁদায় তুলিতে কেমন করিয়া পারিবে অতএব ভাড়ার টাকাটা সব তুমিই দিও৷’’ সুরেন্দ্রনাথও করজোড়ে ‘যাহা আজ্ঞা’ বলিয়া ঐরূপ করিতে সানন্দে স্বীকৃত হইলেন৷ ঐরূপে পরে আবার একদিন তিনি দুর্বলতার জন্য গৃহের বাহিরে শৌচাদি করিতে যাওয়া শীঘ্র অসম্ভব হইবে এইরূপ ভাব প্রকাশ করায়, যুবকভক্ত লাটু ঐদিন তাঁহার কথায় ব্যথিত হইয়া সহসা করজোড়ে সরল গম্ভীরভাবে বলিল, ‘‘যে আজ্ঞা মশায়, হামি তো আপনকার মেস্তর (মেথর) হাজির আছে৷’’ এইরূপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বিষয়ে ঠাকুর নিজ বন্দোবস্ত যথাযোগ্যভাবে নিজেই করিয়া লইয়া ভক্তগণের সুবিধা করিয়া দিতেন৷
ক্রমে সকল বিষয়ে সুবন্দোবস্ত হইতে লাগিল এবং যুবক ভক্তেরা সকলেই এখানে একে একে উপস্থিত হইল৷ ঠাকুরের সেবাকাল ভিন্ন অন্য সময়ে নরেন্দ্র তাহাদিগকে ধ্যান, ভজন, পাঠ, সদালাপ, শাস্ত্রচর্চা ইত্যাদিতে এমনভাবে নিযুক্ত রাখিতে লাগিলেন যে, পরম আনন্দে কোথা দিয়া দিনের পর দিন যাইতে লাগিল তাহা তাহাদিগের বোধগম্য হইল না৷ একদিকে ঠাকুরের শুদ্ধ নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রবল আকর্ষণ, অন্যদিকে নরেন্দ্রনাথের অপূর্ব সখ্যভাব ও উন্নত সঙ্গ একত্র মিলিত হইয়া তাহাদিগকে এক মধুর বন্ধনে আবদ্ধ করিল এবং তাহারা পরস্পরকে আপনার বলিয়া সত্য সত্য জ্ঞান করিতে লাগিল৷ নিত্যান্ত আবশ্যকে কেহ কোনদিন বাটিতে ফিরিলেও ঐদিন সন্ধ্যায় অথবা পরদিন প্রাতে তাহার এখানে আসা এককালে অনিবার্য হইয়া উঠিল৷ ঐরূপে শেষ পর্যন্ত এখানে থাকিয়া যাহারা সংসারত্যাগে সেবাব্রতের উদ্যাপন করিয়াছিল সংখ্যায় তাহারা দ্বাদশ জনের অধিক না হইলেও প্রত্যেকে গুরুগতপ্রাণ ও অসামান্য কর্মকুশল ছিল৷ পাঠকবর্গের কৌতূহল নিবারণের জন্য ঐ দ্বাদশ জনের নাম দেওয়া গেল৷ যথা–নরেন্দ্র, রাখাল, বাবুরাম, নিরঞ্জন, যোগীন্দ্র, লাটু, তারক, গোপাল দাদা (বুড়ো গোপাল), কালী, শশী, শরৎ এবং (হুটকো) গোপাল৷ হরি, তুলসী ও গঙ্গাধর বাটিতে থাকিয়া তপস্যা ও মধ্যে মধ্যে আসা যাওয়া করিত৷ দিবাভাগে ও রাত্রে ঠাকুরের নিকটে থাকিয়া তাঁহার আবশ্যকীয় সকল বিষয় করিয়া দেওয়া প্রভৃতি সকল কার্য পালাক্রমে যুবক ভক্তেরা সম্পাদন করিতে লাগিল এবং নরেন্দ্রনাথ তাহাদিগের প্রত্যেকের কার্যের তত্ত্বাবধান এবং সহসা উপস্থিত বিষয়সকলের বন্দোবস্ত করিতে নিযুক্ত রহিলেন৷ ঠাকুরের পথ্য প্রস্তুত করিবার ভার কিন্তু পূর্বের ন্যায় শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর হস্তেই রহিল৷ পথ্য প্রস্তুত করা ভিন্ন তিনি মধ্যাহ্ণের কিছু পূর্বে এবং সন্ধ্যার কিছু পরে ঠাকুর যাহা আহার করিতেন তাহা স্বয়ং লইয়া যাইয়া তাঁহাকে ভোজন করাইয়া আসিতেন৷ রন্ধনাদি সকল কার্যে তাঁহাকে সহায়তা করিতে এবং তাঁহার সঙ্গিনীর অভাব দূর করিবার জন্য ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীমতী লক্ষ্মীদেবীকে এই সময়ে আনাইয়া শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর নিকট রাখা হইয়াছিল৷
গৃহী ভক্তেরাও ঐকালে নিশ্চিন্ত ছিলেন না৷ তাঁহারা রামচন্দ্র অথবা গিরিশচন্দ্রের বাটিতে সুবিধামতো সম্মিলিত হইয়া ঠাকুরের সেবায় কে কোন্ বিষয়ে কতটা অবসরকাল কাটাইতে এবং অর্থসাহায্য প্রদান করিতে পারিবেন তাহা স্থির করিয়া তদনুসারে কার্য করিতে লাগিলেন৷ এইরূপে গৃহী এবং ব্রহ্মচারী ঠাকুরের উভয় প্রকারের ভক্ত–সকলেই যখন একযোগে দৃঢ়নিষ্ঠায় সেবাব্রতে যোগদান করিল এবং সুবন্দোবস্ত হইয়া সকল কার্য যখন সুশৃঙ্খলার সহিত যন্ত্রপরিচালিতের ন্যায় নিত্য সম্পাদিত হইতে লাগিল, তখন নরেন্দ্রনাথ অনেকটা নিশ্চিন্ত হইয়া নিজের বিষয়ে চিন্তা করিবার অবসর পাইলেন এবং শীঘ্রই দুই একদিনের জন্য নিজ বাটিতে যাইবার সঙ্কল্প করিলেন, কিন্তু নিদ্রা হইল না৷ কিছুক্ষণ পরেই উঠিয়া পড়িলেন এবং গোপাল, শরৎ প্রভৃতিকে জাগ্রত দেখিয়া বলিলেন, ‘‘চল, বাহিরে উদ্যানপথে পাদচারণা ও তামাকু সেবন করি৷’’ বেড়াইতে বেড়াইতে বলিলেন লাগিলেন, ‘‘ঠাকুরের যে ভীষণ ব্যাধি, তিনি দেহরক্ষার সঙ্কল্প করিয়াছেন কি না কে বলিতে পারে? সময় থাকিতে তাঁহার সেবা ও ধ্যান–ভজন করিয়া যে যতটা পারিস আধ্যাত্মিক উন্নতি করিয়া নে, নতুবা তিনি সরিয়া যাইলে পশ্চাত্তাপের অবধি থাকিবে না৷ এটা করিবার পর ভগবানকে ডাকিব, ওটা করা হইয়া যাইলে সাধন–ভজনে লাগিব, এইরূপেই তো দিনগুলা যাইতেছে এবং বাসনা–জালে জড়াইয়া পড়িতেছি৷ ঐ বাসনাতেই সর্বনাশ–মৃত্যু বাসনা ত্যাগ কর্, ত্যাগ কর্৷’’
পৌষের শীতের রাত্রি নীরবতায় ঝিমঝিম করিতেছে৷ ঊর্ধ্বে অনন্ত নীলিমা শত সহস্র নক্ষত্রচক্ষে ধরার দিকে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া রহিয়াছে৷ নিম্নে সূর্যের প্রখর কিরণ–সম্পাতে উদ্যানের বৃক্ষতলসকল শুষ্ক এবং সম্প্রতি সুসংস্কৃত হওয়ায় উপবেশনযোগ্য হইয়া রহিয়াছে৷ নরেন্দ্রের বৈরাগ্যপ্রবণ, ধ্যানপরায়ণ মন বাহিরে ঐ নীরবতা অন্তরে উপলব্ধি করিয়া আপনাতে আপনি ডুবিয়া যাইতে লাগিল৷ আর পাদচারণ না করিয়া তিনি এক বৃক্ষতলে উপবিষ্ট হইলেন এবং কিছুক্ষণ পরে তৃণপল্লব ও ভগ্ণ বৃক্ষশাখাসমূহের একটি শুষ্ক স্তূপ নিকটেই রহিয়াছে দেখিয়া বলিলেন, ‘‘দে উহাতে অগ্ণি লাগাইয়া, সাধুরা এই সময়ে বৃক্ষতলে ধুনি জ্বালাইয়া থাকে, আয় আমরা ঐরূপে ধুনি জ্বালাইয়া অন্তরের নিভৃত বাসনাসকল দগ্ধ করি৷’’ অগ্ণি প্রজ্বলিত হইল এবং চতুর্দিকে অবস্থিত পূর্বোক্ত শুষ্ক ইন্ধনস্তূপসমূহ টানিয়া আনিয়া সকলে উহাতে আহূতি প্রদান করিতে লাগিল৷ সকলেরই মনে হইতে লাগিল যেন সত্যসত্যই পার্থিব বাসনাসমূহ ভস্মীভূত হইয়া মন প্রসন্ন নির্মল হইতেছে এবং সকলে শ্রীভগবানের নিকটবর্তী হইতেছে৷ ঐরূপে দুই তিন ঘণ্টাকাল কাটিবার পর যখন আর ইন্ধন পাওয়া গেল না তখন অগ্ণিকে শান্ত করিয়া সকলে গৃহে ফিরিয়া পুনরায় শয়ন করিল৷ রাত্রি তখন ৪টা বাজিয়াগিয়াছে৷ যাহারা এই কার্যে যোগদান করিতে না পারিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিল, নরেন্দ্রনাথ তাহাদিগকে সাত্ব্ন্না প্রদান করিবার জন্য বলিলেন, ‘‘আমরা তো পূর্ব হইতে অভিপ্রায় করিয়া ঐ কার্য করি নাই এবং অত আনন্দ পাইব তাহাও জানিতাম না, এখন হইতে অবসর পাইলেই সকলে মিলিয়া ধুনি জ্বালাইব, ভাবনা কি?’’ পূর্ব কথামতো প্রাতেই নরেন্দ্রনাথ কলকাতায় চলিয়া গেলেন এবং একদিন পরেই কয়েকখানি আইনপুস্তক লইয়া পুনরায় কাশীপুরে ফিরিয়া আসিলেন৷
ক্রমে পৌষমাসের অর্ধেক অতীত হইয়া ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি উপস্থিত হইল৷ ঠাকুর ঐদিন বিশেষ সুস্থবোধ করায় কিছুক্ষণ উদ্যানে বেড়াইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন৷ অবকাশের দিন বলিয়া সেদিন গৃহস্থ ভক্তগণ মধ্যাহ্ণ অতীত হইবার কিছু পরেই একে একে অথবা দলবদ্ধ হইয়া উদ্যানে আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল৷
ঐরূপে অপরাহ্ণ ৩টার সময় ঠাকুর যখন উদ্যানে বেড়াইবার জন্য উপর হইতে নিচে নামিলেন তখন ত্রিশজনেরও অধিক ব্যক্তি গৃহমধ্যে অথবা উদ্যানস্থ বৃক্ষসকলের তলে বসিয়া পরস্পরের সহিত বাক্যালাপে নিযুক্ত ছিল৷ তাঁহাকে দেখিয়াই সকলে সসম্ভ্রমে উত্থিত হইয়া প্রণাম করিল এবং তিনি নিম্নের হলঘরে পশ্চিমের দ্বার দিয়া উদ্যানপথে নামিয়া দক্ষিণমুখে ফটকের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলে পশ্চাতে কিঞ্চিৎ দূরে থাকিয়া তাঁহার অনুসরণ করিতে লাগিল৷ ঐরূপে বসতবাটি ও ফটকের মধ্যস্থলে উপস্থিত হইয়া ঠাকুর গিরিশ, রাম, অতুল প্রভৃতি কয়েকজনকে পশ্চিমের বৃক্ষতলে দেখিতে পাইলেন৷ তাহারাও তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া তথা হইতে প্রণাম করিয়া সানন্দে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল৷ কেহ কোন কথা কহিবার পূর্বেই ঠাকুর সহসা গিরিশচন্দ্রকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘‘গিরিশ, তুমি যে সকলকে এত কথা (আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে) বলিয়া বেড়াও, তুমি (আমার সম্বন্ধে) কি দেখিয়াছ ও বুঝিয়াছ?’’ গিরিশ উহাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে ভূমিতে জানু সংলগ্ণ করিয়া উপবিষ্ট হইয়া ঊর্ধ্বমুখে করজোড়ে গদগদ স্বরে বলিয়া উঠিল, ‘‘ব্যাস বাল্মীকি যাঁহার ইয়ত্তা করিতে পারেন নাই, আমি তাঁহার সম্বন্ধে অধিক কি আর বলিতে পারি’’ গিরিশের অন্তরে সরল বিশ্বাস প্রতি কথায় ব্যক্ত হওয়ায় ঠাকুর মুগ্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে উপলক্ষ করিয়া সমবেত ভক্তগণকে বলিলেন, ‘‘তোমাদের কি আর বলিব, আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হউক’’ ভক্তগণের প্রতি প্রেম ও করুণায় আত্মহারা হইয়া তিনি ঐ কথাগুলি মাত্র বলিয়াই ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িলেন৷ ভক্তগণ জয়রবে দিক মুখরিত করিয়া একে একে আসিয়া প্রণাম করিতে আরম্ভ করিল৷ ঠাকুরের করুণাব্ধি আজি বেলাভূমি অতিক্রম করিয়া এক অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার উপস্থিত করিল৷ অদ্য অর্ধবাহ্যদশায় তিনি সমবেত প্রত্যেক ভক্তকে দিব্যশক্তিপূত স্পর্শে কৃতার্থ করিতে লাগিলেন৷ ঐ অপূর্ব স্পর্শে কেহ বা বাঙ্নিষ্পত্তি করিতে অক্ষম হইয়া মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাঁহাকে কেবলমাত্র নিরীক্ষণ করিতে লাগিল৷ কেহ বা গৃহমধ্যস্থ সকলকে ঠাকুরের কৃপালাভে ধন্য হইবার জন্য চিৎকার করিয়া আহ্বান করিতে লাগিল, আবার কেহ বা পুষ্পচয়নপূর্বক মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে ঠাকুরের অঙ্গে উহা নিক্ষেপ করিয়া তাঁহাকে পূজা করিতে লাগিল৷ কিছুক্ষণ ঐরূপ হইবার পরে ঠাকুরের ভাব শান্ত হইতে দেখিয়া ভক্তগণও পূর্বের ন্যায় প্রকৃতিস্থ হইল এবং অদ্যকার উদ্যান–ভ্রমণ এইরূপে পরিসমাপ্ত করিয়া তিনি বাটির মধ্যে নিজে কক্ষে যাইয়া উপবিষ্ট হইলেন৷
[রামচন্দ্র প্রমুখ কোন কোন ভক্ত অদ্যকার এই ঘটনাটিকে ঠাকুরের ‘কল্পতরু’ হওয়া বলিয়া নির্দেশ করিয়াছিলেন৷ ঠাকুরের সন্ন্যাসী ভক্তদের কেহ কেহ উহাকে ঠাকুরের ‘অভয়প্রকাশ’ বা ‘অভয়প্রদান’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন কেন না দেব–মানবত্বের এবং জনসাধারণকে নির্বিচারে অভয়াশ্রয় প্রদানের পরিচয়ই ঐ ঘটনায় সুব্যক্ত হইয়াছিল৷ অদ্যকার ঘটনাস্থলে যাঁহারা উপস্থিত ছিলেন তাঁহাদিগের আট–দশ জনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য–গিরিশ, অতুল, রাম, নবগোপাল, হরমোহন, বৈকুণ্ঠ, কিশোরী (রায়), হারাণ, রামলাল, অক্ষয়৷ কিন্তু ঠাকুরের সন্ন্যাসী ভক্তগণের একজনও ঐদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না৷ ঠাকুর উদ্যানে পাদচারণ করিতে নিচে নামিবামাত্র তাহারা ঐ অবকাশে তাঁহার শয্যাদি রৌদ্রে দিয়া ঘরখানি সংস্কারে নিযুক্ত হইয়া ছিল এবং কর্তব্য কার্য অর্ধনিষ্পন্ন করিয়া ফেলিয়া যাইলে ঠাকুরের অসুবিধা হইতে পারে ভাবিয়া তাহাদিগের ঘটনাস্থলে যাইতে প্রবৃত্তি হয় নাই৷
ঠাকুরের দুরারোগ্য কণ্ঠরোগের নানাপ্রকার চিকিৎসা সত্ত্বেও যখন আরোগ্যের কোন লক্ষণই দেখা গেল না তখন শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী দৈবশক্তির সাহায্য লইবার আকা্যায় তারকেশ্বরে গমন করিলেন এবং অনশনে থাকিয়া মন্দিরে নতারকেশ্বর মহাদেবের নিকট দুইদিন হত্যা দিয়া পড়িয়া রহিলেন৷ দ্বিতীয় রাত্রিতে একটা প্রচণ্ড শব্দে তাঁহার তন্দ্রাভঙ্গ হওয়ায় তিনি অনুভব করিলেন–এই পার্থিব সম্বন্ধের মূল্য কি? ইহা তো সম্পূর্ণ অলীক শ্রীশ্রীমা একটা প্রবল বৈরাগ্যের ভাব লইয়া কাশীপুরে ফিরিয়া আসিলে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘কি গো ওখানে যাবার ফল কি হলো?’’ মাতাঠাকুরানী সব ঘটনা ঠাকুরের নিকট নিবেদন করিলেন৷ ফল যে ঐরূপই হইবে সর্বজ্ঞ ঠাকুর তাহা পূর্বেই জানিতেন৷
নরেন্দ্রের মতো কালীও (পরবর্তী কালে স্বামী অভেদানন্দ) চরম তত্ত্বজ্ঞান–লাভের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছেন৷ কিন্তু তাঁহার মনে সন্দেহের এক গভীর ছায়াপাত হইয়াছে৷ ঠাকুরকে তাঁহার মনোগতভাব ব্যক্ত করিলে তিনি কালীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘‘তুই ঈশ্বরে বিশ্বাস করিস্?’’ কালী–‘না’৷ শ্রীরামকৃষ্ণ–‘‘ধর্মে আস্থা আছে কি?’’ কালী–‘‘না আমি বেদাদি কোন শাস্ত্র মানি না৷ আধ্যাত্মিক কোন বিষয়ে আমার আস্থা নাই৷’’ ঠাকুর ধীরভাবে এই সব কথা শুনিয়া তাহাকে বলিলেন, ‘‘সাধারণ কোন গুরুর নিকট এইরূপ কথা বলিলে, সে হয়তো মারত৷ দেখ দেখি নরেনকে? তার মনেও ঐরূপ সন্দেহ জেগেছিল৷ কিন্তু সে এখন সব বিশ্বাস করে৷ সে এখন রাধাকৃষ্ণের নাম উচ্চারণ করতে করতে অশ্রু বিসর্জন করে৷ তোর সন্দেহও সত্বর চলে যাবে তুইও সব বিশ্বাস করবি৷’’
একদিন বুড়ো গোপাল সাধুসন্ন্যাসীদিগকে কিছু গেরুয়া বস্ত্র ও রুদ্রাক্ষের মালা দিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন৷ ঠাকুর তাঁহার যুবক ভক্তগণকে দেখাইয়া গোপালকে বলিলেন, ‘‘তুমি এদের চেয়ে ভাল ত্যাগী সন্ন্যাসী আর কোথায় পাবে? তোমার গেরুয়া ও রুদ্রাক্ষের মালা এদের দাও৷’’ ঠাকুরের নির্দেশমতো তিনি উক্ত দ্রব্য নরেন্দ্রাদি ভক্তগণকে প্রদান করিয়া ধন্য হইলেন৷ একখানি বস্ত্র গিরিশের জন্য ঠাকুর পৃথক করিয়া রাখিয়া দিলেন৷
এক সায়াহ্ণে ঠাকুর তাহাদের জন্য এক বিশেষ ক্রিয়া অনুষ্ঠান করিলেন এবং তাহাদিগকে জাতিবর্ণনির্বিশেষে সকলের গৃহ হইতে অন্ন ভিক্ষা করিতে বলিলেন৷ ঠাকুর এই ভাবে কাশীপুর উদ্যানেই নিজ হস্তে রামকৃষ্ণ সে৯র প্রতিষ্ঠা করেন৷
নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিলাভেরজন্য অধীর হইয়া পড়িয়াছেন৷ এতদিন এত কৃচ্ছ্রসাধন, ধ্যানজপ করিয়াও সেই চরম জ্ঞানের সন্ধান তিনি পান নাই৷ একদিন সন্ধ্যায় তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ণ হইয়াছেন৷ হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে সেই দিব্যানুভূতি তাঁহার অন্তরে জাগিয়া উঠিল৷ তিনি অনুভব করিলেন, একটা বিরাট জ্যোতি তাঁহার শিরের পশ্চাদ্দেশে ফুটিয়া উঠিয়াছে৷ অচিরে তাঁহার মন দ্বৈতভূমি অতিক্রম করিয়া নাম–রূপ–বিহীন অখণ্ড অনন্ত সত্তায় বিলীন হইয়া গেল৷ পরে যখন সেই নির্বিকল্প অবস্থা হইতে ব্যুত্থিত হইলেন, তখন তাঁহার বোধ হইল যেন মাথাটাই শুধু আছে, শরীরটা আর নাই৷ তিনি চিৎকার করিয়া উঠিলেন, ‘‘আমার শরীর গেল কোথায়?’’ তাঁহার চিৎকার শুনিয়া বুড়ো গোপাল ছুটিয়া আসিলেন এবং বলিলেন, ‘‘কেন, নরেন, এই যে তোমার শরীর৷’’ নরেনকে তাঁহার শরীর সম্বন্ধে সচেতন করিয়া তুলিতে ব্যর্থ–প্রয়াস হইয়া বুড়ো গোপাল শঙ্কিতচিত্তে ঠাকুরের নিকট সব নিবেদন করিলেন৷ ঠাকুর সব শুনিয়া বলিলেন, ‘‘কিছুক্ষণ তাকে ঐভাবেই থাকতে দাও৷ এই অবস্থার জন্য সে আমাকে কতবার পীড়াপীড়ি করেছে৷’’ অনেক্ষণ পর নরেন্দ্রনাথ স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হইলে দেখিলেন তাঁহার গুরুভ্রাতাগণ চারিপার্শ্বে বসিয়া আছে৷ তাঁহার প্রাণে আজ এক গভীর প্রশান্তি বিরাজ করিতেছে৷ তিনি যখন ঠাকুরের সন্নিধানে আসিলেন তখন ঠাকুর তাঁহাকে বলিলেন, ‘‘মা তোকে সব দেখালেন৷ কিন্তু তোর এই উপলব্ধি এখন চাবি দেওয়া থাকবে৷ চাবি আমার কাছে রইল৷ তুই মায়ের যে কাজের জন্য এসেছিস, তা শেষ হয়ে গেলে ইহা আবার পাবি৷’’
সিন্ধুদেশবাসী হীরানন্দ ঠাকুরের অসুখের সংবাদ পাইয়া তাঁহাকে এই সময়ে দেখিতে আসেন৷ তিনি কলকাতায় অধ্যয়নকালে মধ্যে মধ্যে ঠাকুরকে দক্ষিণেশ্বরে দেখিতে আসিতেন৷ হীরানন্দকে পাইয়া ঠাকুরের আনন্দের অবধি রহিল না৷ ঠাকুর নরেন্দ্রের সঙ্গে হীরানন্দের শাস্ত্রালোচনা ও বেদান্তবিচার শুনিয়া হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন৷ বিদায়ের পূর্বে হীরানন্দ ঠাকুরকে তাঁহাদের দেশে লইয়া যাইবার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন৷
এইভাবে ভক্তদের সঙ্গে ভগবৎপ্রসঙ্গে ও দিব্য আনন্দে রোগশয্যায় অলক্ষিতে ঠাকুরের মে, জুন ও জুলাই মাস কাটিয়া গেল৷ তাঁহার অসুখ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল৷ ভক্তগণের বুঝিতে বিলম্ব রহিল না যে, ঠাকুরের এই ভগ্ণ জীর্ণ দেহ আর বেশিদিন টিকিবে না৷ কিন্তু এত দুর্বলতা সত্ত্বেও ভক্তগণের আধ্যাত্মিক কল্যাণসাধনে ঠাকুরের বিন্দুমাত্র বিরক্তি বা বিরতি নাই৷ একদিন নরেন্দ্রনাথকে শ্রীরাম মন্ত্রে দীক্ষিত করিলেন৷ ইহার ফলও হইল অদ্ভুত৷ নরেন্দ্রনাথ আনন্দে আত্মহারা হইয়া রামনাম উচ্চারণ করিতে করিতে উদ্যানবাটির চারিদিকে উন্মত্তের ন্যায় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন৷ কেহই তাঁহার সম্মুখীন হইতে সাহসী হইলেন না৷ এইরূপে কয়েকঘণ্টা অতিবাহিত হইবার পর অপর শিষ্যগণ শঙ্কিত হইয়া ঠাকুরের নিকট নরেন্দ্রনাথের অবস্থা নিবেদন করিলেন৷ ঠাকুর সব শুনিয়া বলিলেন, ‘‘থাক্ ঐ ভাবেই সময়মতো আবার প্রকৃতিস্থ হবে৷’’ নরেন্দ্রনাথ পুনঃ স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হইলেন৷
কাশীপুরে অবস্থানকালেই পূর্ববঙ্গের দেওভোগ নিবাসী গৃহিভক্ত দুর্গাচরণ নাগমহাশয় ঠাকুরকে কয়েকবার দর্শন করিতে আসেন৷ একদিন ঠাকুর তাঁহাকে তাঁহার ঘরে প্রবেশ করিতে দেখিয়াই বলিলেন, ‘‘এস আমার কাছে বস৷’’ এই কথা বলিয়া তিনি নাগমহাশয়কে নিবিড় আলিঙ্গন পাশে আবদ্ধ করিলেন৷ অপর একদিন নাগমহাশয়কে নিকটে উপবিষ্ট দেখিয়া বলিলেন, ‘‘দেখ দুর্গাচরণ, ডাক্তারেরা আমার এই ব্যাধি আরোগ্য করিতে পারে নাই৷ তুমি এই অসুখ সারাইতে পার কি?’’ নাগমহাশয় কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া স্বশরীরে ঠাকুরের ব্যাধি গ্রহণ করিবার জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প করিলেন এবং উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ‘‘হাঁ মহাশয়, কেমন করিয়া ব্যাধি সারাইতে হয় তাহা আমি জানি৷ আপনার আশীর্বাদে আমি এই ব্যাধি আরোগ্য করিয়া দিব৷’’– এই বলিয়া তিনি ঠাকুরের দিকে অগ্রসর হইলেন৷ অন্তর্যামী ঠাকুর নাগমহাশয়ের মনোগত ভাব অবগত হইয়া তাঁহাকে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, ‘‘হাঁ, আমি জানি তুমি ইচ্ছা করিলে আমার অসুখ সারাইতে পার৷’’
ঠাকুরের লীলাসংবরণের কয়েকদিন পূর্বে নাগমহাশয় ঠাকুরের ঘরে প্রবেশ করিবার কালে শুনিতে পাইলেন, তিনি একটি আমলকী চাহিতেছেন৷জনৈক ভক্ত ঠাকুরকে জানাইয়া দিলেন যে, এই অসময়ে উক্ত ফল পাওয়া সম্ভব নহে৷ দুর্গাচরণ বাক্যব্যয় না করিয়া কলকাতার সকল বাগান তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলেন এবং তৃতীয় দিন দুই তিনটি আমলকী হস্তে ঠাকুরের নিকটে উপস্থিত হইলেন৷ ঠাকুর তাঁহাকে তদবস্থায় দেখিতে পাইয়া বিশেষ আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহার উপযোগী পূর্ববঙ্গীয় অন্ন, ব্যঞ্জনাদি প্রস্তুত করিবার জন্য শ্রীশ্রীমাকে নির্দেশ দিলেন৷ নাগমহাশয়ও ঠাকুর কর্তৃক প্রসাদিকৃত অন্ন অতিশয় তৃপ্তি ও আনন্দের সহিত আহার করিলেন৷
মহাপ্রস্থানের ৮৷ ৯ দিন পূর্বে শ্রীশ্রীঠাকুর একখানি বাংলা পঞ্জিকা যোগীনকে (পরবর্তী কালে স্বামী যোগানন্দ) ২৫ শ্রাবণ (৯ আগস্ট ) হইতে পড়িতে বলিলেন৷ উক্ত মাসের শেষ তারিখ পর্যন্ত পঁৌছিবামাত্র ঠাকুর ইশারায় তাঁহাকে আর পড়িতে নিষেধ করিলেন৷ ইহার ৪/৫ দিন পর তিনি নরেন্দ্রনাথকে তাঁহার সমীপে ডাকাইয়া পাঠাইলেন৷ তখন ঠাকুরের শয়নকক্ষে আর দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ছিল না৷ তিনি নরেন্দ্রনাথকে তাঁহার সম্মুখভাগে বসাইয়া তাঁহার দিকে অপলকনেত্রে কিছুক্ষণ তাকাইয়া সমাধিস্থ হইয়া পড়িলেন৷ নরেন্দ্রনাথ অনুভব করিলেন যেন এক প্রবল তড়িৎ প্রবাহ তাঁহার দেহের মধ্যে প্রবেশ করিতেছে৷ ক্ষণকাল মধ্যেই তাঁহার বাহ্যচেতনা বিলুপ্ত হইল৷ কতক্ষণ তিনি ঐ অবস্থায় ছিলেন সে সম্বন্ধে তাঁহার জ্ঞান ছিল না৷ যখন প্রকৃতিস্থ হইলেন তখন দেখিলেন ঠাকুর অশ্রুবিসর্জন করিতেছেন৷ রোদনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে ঠাকুর নরেনকে বলিলেন, ‘‘আজ তোকে যথাসর্বস্ব দিয়ে ফকির হয়েছি৷ এই শক্তির সাহায্যে তুই জগতের অশেষ কল্যাণ করতে পারবি৷ কাজ শেষ হলে আবার স্বস্থানে ফিরে যাবি৷’’
এইভাবে অহেতুক কৃপাসিন্ধু ঠাকুর নরেন্দ্রনাথের ভিতরে শক্তিসঞ্চার করিয়া উভয়ে অভিন্নাত্মা হইলেন৷ বলা বাহুল্য, এই শক্তির সাহায্যেই নরেন্দ্রনাথ উত্তরকালে সমগ্র জগতের চিন্তারাজ্যে এক বিপুল বিপ্লবের সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন৷
এই ঘটনার দুই দিন পরে ঠাকুর সত্যই ঈশ্বরাবতার কি না সে সম্বন্ধে পুনঃ পরীক্ষা করিবার জন্য নরেনের অন্তরে তীব্র ইচ্ছা জাগিল৷ তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন–‘এই ভীষণ দুরারোগ্য ব্যাধির মধ্যেও ঠাকুর যদি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারেন যে, তিনি শ্রীশ্রীভগবানের অবতার, তাহা হইলেই আমি তাঁহাকে অবতার বলিয়া বিশ্বাস করিব, নতুবা নহে৷’ আশ্চর্যের বিষয়, এই চিন্তা নরেন্দ্রনাথের অন্তরে উদিত হইবামাত্র ঠাকুর দৃঢ়কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ‘‘এখনও অবিশ্বাস যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে–ই রামকৃষ্ণ–তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়৷’’ ঠাকুরের উক্তি শুনিয়া নরেন্দ্রনাথ লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন এবং এত দেখা–শুনার পরও পুনঃ ঠাকুরের অবতারত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান হওয়ার জন্য তিনি মনে খুবই অনুতাপ বোধ করিতে লাগিলেন৷
ক্রমে সেই চরম দুঃখের দিন আসন্ন হইল৷ ১২৯৩ বঙ্গাব্দ রবিবার শ্রাবণ–সংক্রান্তি৷ ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট৷ ঠাকুরের ব্যাধির যন্ত্রণা আজ চরমে উঠিয়াছে৷ তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছেন৷ গিরিশচন্দ্রের ভ্রাতা অতুলকৃষ্ণ নাড়ী পরীক্ষা করিয়া প্রমাদ গণিলেন৷ অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক বলিয়া ঘোষণা করিয়া সকলকে প্রস্তুত থাকিতে বলিলেন৷ সন্ধ্যার প্রাক্কালে ঠাকুরের শ্বাসকষ্ট উপস্থিত হইল৷ সেবকবৃন্দ কাঁদিয়া উঠিলেন৷ যে আলোকে তাঁহাদের জীবন আলোকিত তাহা আজ নির্বাণোন্মুখ৷ সজলনয়নে সকলে তাঁহার শয্যার চারিপার্শ্বে ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন৷ সন্ধ্যার সময় ঠাকুর কিঞ্চিৎ ক্ষুধা বোধ করিলে সেবকগণ তাঁহাকে কিছু তরলপথ্য প্রদান করিলেন৷ তিনি উহার খুব সামান্যই গ্রহণ করিলেন৷ তাঁহার হাতমুখ ধোয়াইয়া দিয়া সেবকগণ তাঁহাকে শয্যায় শয়ন করাইলেন৷ সহসা ঠাকুর সমাধিস্থ হইলেন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাষ্ঠবৎ নিশ্চল ও কঠিন হইয়া গেল৷ এই সমাধি–বস্থার অসাধারণত্ব লক্ষ্য করিয়া শশী (পরবর্তী কালে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) কাঁদিতে লাগিলেন৷ তৎক্ষণাৎ গিরিশ ও রামচন্দ্রকে ডাকিয়া পাঠানো হইল৷ রাত্রি দ্বিপ্রহরের পর ঠাকুর বাহ্যচেতনালাভ করিয়া বলিলেন, তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত৷ সেবকেরা তাঁহাকে বালিশ ঠেসান দিয়া বসাইয়া দিলে পর তিনি একবাটি মণ্ড অক্লেশে পান করিলেন৷ ইদানীং এরূপ স্বচ্ছন্দভাবে এই পরিমাণ আহার্য আর কখনও গ্রহণ করেন নাই৷ ঠাকুর বলিলেন তিনি এখন বেশ ভাল বোধ করিতেছেন৷ নরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিদ্রা যাইতে বলিলেন৷ এই কথার পরই তিনি স্পষ্টভাবে তিনবার কালীনাম উচ্চারণ করিয়া ধীরে ধীরে বিছানায় শয়ন করিলেন৷ ঠাকুরকে কিঞ্চিৎ সুস্থ দেখিয়া নরেন্দ্রনাথ বিশ্রামার্থ নিচে চলিয়া গেলেন৷
রাত্রি ১টা ২ মিনিট৷ সহসা বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো পুলকে ঠাকুরের সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল৷ চক্ষুদ্বয় স্থির নাসিকাগ্রে নিবদ্ধদৃষ্টি অভূতপূর্ব এক দিব্যকান্তি ঠাকুরের সর্বদেহে ফুটিয়া উঠিল৷ কাহারও বুঝিতে বাকি রহিল না ঠাকুর এই গভীর মহাসমাধি হইতে আর ব্যুত্থিত হইবেন না৷ আজ ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট, সোমবার৷ রজনী প্রভাত হইবার কিঞ্চিৎ পূর্বেই ভক্তবৃন্দকে অকূল শোকসাগরে ভাসাইয়া আনন্দঘন বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণ এই মায়িক দেহ পরিত্যাগ করিয়া মহাসমাধিযোগে স্ব–স্বরূপে বিলীন হইলেন৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠপুরুষ মর্তধামের খেলাধূলা সাঙ্গ করিয়া মাতৃক্রোড়ে পুনঃ চিরবিশ্রাম গ্রহণ করিলেন৷
ঠাকুরের মহানির্বাণের নিদারুণ সংবাদ তড়িৎবেগে কলকাতার সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িল৷ গিরিশ ও রাম সত্বর আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ ঠাকুরের নশ্বরদেহ শেষবার দেখিবার জন্য চারিদিক হইতে লোক সমবেত হইতে লাগিল৷ কর্ণেল বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার এবং ব্রাহ্মভক্ত অমৃতলাল বসু, ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, গিরিশচন্দ্র সেন প্রভৃতি অনেকে একে একে আসিয়া উপস্থিত হইলেন৷ ডাক্তার সরকার দ্বিপ্রহরে ঠাকুরের দেহ পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন মহাবায়ুর উৎক্রমণ হইয়াছে৷ তচ্ছ্রবণে গৈরিক বস্ত্র, মাল্যচন্দন ও পুষ্পাভরণে সজ্জিত করিয়া ঠাকুরের পূতদেহ নিচে নামাইয়া আনা হইল এবং একখানি নূতন খাটের উপর সুকোমল শয্যায় রক্ষিত হইল৷ ডাক্তার সরকারের নির্দেশমতো ভক্তপরিবৃত শ্রীশ্রীঠাকুরের দেহের একখানি আলোকচিত্র গৃহীত হইল৷ অতঃপর সমবেত শিষ্যভক্তবৃন্দ খোল–করতাল সংযোগে উচ্চরোলে হরিনাম কীর্তন করিতে করিতে ঠাকুরের দেহ স্কন্ধে বহন করিয়া বরাহনগর শ্মশানস্থলীতে আসিয়া উপনীত হইলেন৷ রাস্তার উভয়পার্শ্বে ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের শেষ দৃশ্য দেখিয়া অগণিত নরনারী অশ্রুজলে ভাসিতে লাগিল৷ ব্রাহ্মভক্ত ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল সকলের অনুরোধে ঠাকুরের চিতাপার্শ্বে বসিয়া ঠাকুরের অতিপ্রিয় কয়েকটি গান আকুলকণ্ঠে গাহিয়া পুণ্যতোয়া ভাগীরথীতীরে তাঁহার হূদয়ের শেষ ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদন করিলেন৷ তাঁহার মধুর কণ্ঠের সেই সঙ্গীত শ্রবণে উপস্থিত কেহই অশ্রুসংবরণ করিতে পারিলেন না৷ অতঃপর ঠাকুরের অন্তরঙ্গ শিষ্যগণ চিতায় অগ্ণিসংযোগ করিলেন৷ কিয়ৎকালের মধ্যেই ঠাকুরের নশ্বরদেহ অগ্ণিতে ভস্মসাৎ হইয়া গেল৷ শ্মশান–বান্ধববৃন্দ শোকসন্তপ্তচিত্তে সাশ্রুনয়নে স্ব স্ব গৃহে ফিরিয়া গেলেন]
[ঠাকুরের মহাপ্রস্থানে তাঁহার মন্ত্রশিষ্যবর্গ অতিশয় বিহ্বল ও ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন৷ কিন্তু স্বল্পকাল মধ্যেই তাঁহাদের হূদয় এক নূতন আশা ও উদ্দীপনায় ভরিয়া উঠিল৷ তাঁহারা এই সঙ্কটমুহূর্তে ঠাকুরকে আরও ব্যাপক ও ঘনিষ্ঠভাবে অনুভব করিতে লাগিলেন৷ ঠাকুর জীবদ্দশায় তাঁহাদিগকে বহুবার বলিয়াছিলেন–মৃত্যু শুধু দেহের, আত্মার জন্ম মৃত্যু নাই৷ ঠাকুরের পার্থিব দেহের অবসান ঘটিয়াছে বটে কিন্তু তাঁহারা অন্তর্দৃষ্টি সহায়ে বুঝিতে পারিলেন তিনি তাঁহাদের প্রত্যেকের হূদয়ে উজ্জ্বলভাবে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছেন৷ তাঁহারা অচিরে তাঁহার দিব্য স্পর্শ অনুভব করিয়া প্রাণে অতুল শান্তি ও সাত্ব্ন্না পাইতে লাগিলেন৷ দাহকার্য সমাপনান্তে তাঁহারা ঠাকুরের ভস্মাবশেষ ও পূতাস্থি একটি পাত্রে সংগ্রহ করিলেন এবং উহা মস্তকোপরি রাখিয়া ‘জয় ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণজীকী জয়’–ধ্বনি করিতে করিতে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে ফিরিয়া আসিলেন৷
উদ্যানে পৌঁছিয়াই তাঁহাদের প্রধান চিন্তা হইল কেমন করিয়া ঠাকুরের পবিত্র চিতাভস্ম ও অস্থি সংরক্ষিত করা হইবে৷ অনেক চিন্তার পর গঙ্গাতীরে একখণ্ড জমি ক্রয় করিয়া উহা সেখানে প্রোথিত করিয়া রাখাই অধিকাংশের সিদ্ধান্ত হইল৷ কিন্তু অর্থাভাবে তখনই তাহা কার্যে পরিণত করা সম্ভব হইল না৷ কাঁকুড়গাছিতে ভক্ত রামচন্দ্র দত্তের যে উদ্যানবাটিতে ঠাকুর একবার পদার্পণ করিয়া আনন্দোৎসব করিয়াছিলেন, গৃহিভক্তগণ সেই বাগানবাটিতে ঠাকুরের ভস্মাবশেষ রাখাই স্থির করিলেন৷ কিন্তু ঠাকুরের যুবক শিষ্যবৃন্দের তাহা মনঃপূত হইল না৷ তাঁহারা ‘ভস্ম ও অস্থি’র অধিকাংশ কলকাতা বাগবাজার পল্লির বলরাম বসুর গৃহে পাঠাইয়া দিলেন এবং স্থির করিলেন সুযোগ উপস্থিত হইলে অদূর ভবিষ্যতে এই পবিত্র ভস্ম ও অস্থি গঙ্গাতীরে প্রোথিত করিয়া নিত্য–পূজাদির স্থায়ী ব্যবস্থা করিবেন৷ ভস্মের অবশিষ্টাংশ শুভ জন্মাষ্টমীদিবসে গৃহী ও যুবক ভক্তগণ মিলিত হইয়া কাঁকুড়গাছি উদ্যানে বহিতোপচারে সংস্থাপিত করিলেন এবং ভক্তপ্রবর রামচন্দ্র সেইদিন হইতেই এই পবিত্র প্রতীক অবলম্বনে ঠাকুরের নিয়মিত পূজার্চনার সুব্যবস্থা করিলেন৷
যুবক ভক্তবৃন্দের মধ্যে যাঁহারা কাশীপুর উদ্যাবাটিতে অবস্থান করিয়া ঠাকুরকে অহর্নিশ সেবা করিয়াছিলেন, তাঁহার অন্তর্ধানের পর তাঁহাদের অনেকেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্রমে ক্রমে স্ব স্ব গৃহে ফিরিয়া গেলেন৷ কিন্তু ঠাকুর তাঁহাদের অন্তরে যে ঈশ্বরলাভের আকা্যা প্রজ্বালিত করিয়া গিয়াছেন তাহা সহজে নির্বাপিত হইবার নহে৷ তাঁহারা উপযুক্ত কালের প্রতীক্ষায় জীবন কাটাইতে লাগিলেন৷
বুড়ো গোপাল, তারক, লাটু প্রভৃতি কয়েকজনের ফিরিয়া যাইবার স্থান ছিল না৷ ঠাকুরের পরম গৃহিভক্ত সুরেন্দ্রনাথ ত্যাগী ভক্তগণকে একটি নির্দিষ্ট স্থান সংগ্রহরে জন্য দিনের পর দিন প্রোৎসাহিত করিতে লাগিলেন, যাহাতে তাঁহারা ঠাকুরের পূজা, ধ্যান, জপ, তপস্যাদি সহায়ে সেখানে নিয়মিত জীবন যাপন করিতে পারেন এবং গৃহী ভক্তগণও অবসর সময়ে তাঁহাদের পবিত্র সঙ্গলাভ করিয়া প্রাণের জ্বালা জুড়াইতে পারেন৷ সুরেন্দ্রনাথ ইহার সমগ্র ব্যয়ভার বহন করিতেও প্রস্তুত হইলেন৷ অসহায় যুবক ভক্তগণ অকূলে কূল পাইলেন৷ অনেক অনুসন্ধানের পর কলকাতার উত্তরাংশে বরাহনগর অঞ্চলে একটি অতি পুরাতন বাড়ি তদুদ্দেশ্যে ভাড়া লওয়া হইল এবং সুরেন্দ্রনাথ প্রথমে ৩০.০০ টাকা, পরে ১০০.০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি মাসে অর্থসাহায্য করিয়া ঠাকুরের ত্যাগী ভক্তগণের থাকিবার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করিয়া দিলেন৷ ছোট গোপাল কাশীপুর উদ্যানবাটি হইতে ঠাকুরের ব্যবহূত গদি ও অন্যান্য জিনিসপত্র লইয়া বরাহনগরে বাসা–বাড়িতে চলিয়া আসিলেন৷ তারকও বৃন্দাবন হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া ঐ স্থানেই উপস্থিত হইলেন৷ কিয়ৎকালের মধ্যেই নরেন্দ্র, রাখাল, নিরঞ্জন, শরৎ, শশী, বাবুরাম, যোগীন, কালী ও লাটু নবপ্রতিষ্ঠিত এই মঠে সমবেত হইয়া অদম্য উৎসাহে কঠোর তপস্যায় আত্মনিয়োগ করিলেন৷ ক্রমে হরিপ্রসন্ন, সুবোধ, গঙ্গাধর এবং হরিনাথ আসিয়া গুরুভ্রাতাগণের সঙ্গে মিলিত হইয়া মহাব্রত উদ্যাপনে তৎপর হইলেন৷
পূর্ব সিদ্ধান্তানুযায়ী ঠাকুরের পূতাস্থি বলরামবাবুর বাটি হইতে অচিরে আনয়নপূর্বক বরাহনগর মঠে যথোপচারে প্রতিষ্ঠিত করা হইল এবং শশী শ্রীশ্রীঠাকুরের নিত্যপূজার ভার গ্রহণ করিলেন৷ অন্যান্য গুরুভ্রাতৃগণ নরেন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে আশ্রমের সকল কার্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করিয়া স৯বদ্ধভাবে মঠ পরিচালনা করিতে লাগিলেন৷
শ্রীশ্রীঠাকুরের জ্বলন্ত ত্যাগাদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া তাঁহারা অনতিবিলম্বে বিরজাহোম সম্পাদন করিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিলেন এবং পূর্বাশ্রমের নাম পরিবর্তন করিয়া সন্ন্যাসি–সম্প্রদায় বিহিত চিহ্ণ ও নামাদি ধারণপূর্বক হিন্দুধর্মের অত্যুচ্চ আদর্শের বেদিমূলে স্ব স্ব জীবন উৎসর্গ করিলেন৷ সদ্য প্রতিষ্ঠিত বরাহনগর মঠ অচিরে তপস্যার পূণ্যপীঠ হইয়া দাঁড়াইল৷ এই পবিত্র পরিবেশের মধ্যে নবীন সন্ন্যাসিগোষ্ঠী যেভাবে কৃচ্ছ্রসাধনে ডুবিয়া গেলেন তাহা বাস্তবিকই অতুলনীয়৷ একদিকে অর্থাভাব, কৌপীনমাত্র সম্বল অপরদিকে আত্মীয়স্বজনের গঞ্জনা–সুদুর্লভ ভিক্ষা৷ কতদিন তাঁহাদের অনাহারে অনিদ্রায় কাটিয়াছে–কেবলমাত্র বিল্বপত্রাদি সিদ্ধ করিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা হইয়াছে৷ তীব্র বৈরাগ্যপূর্ণ অন্তরে ভগবদ্ধ্যান, কীর্তন ও পূজাপাঠে দিবারাত্র কেমন করিয়া কাটিয়া যাইত তাহা তাঁহারা অনেক সময় বুঝিতেই পারিতেন না৷ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি গভীর অনুরাগে তাঁহাদের ঐহিক সুখভোগেচ্ছা কোথায় ভাসিয়া গেল৷ ‘‘মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পাতন’’–এই মহামন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসিবৃন্দের তপস্যাসম্ভূত সমগ্র শক্তি অচিরে তাঁহাদিগকে অতুল প্রেম ও শান্তির অধিকারী করিয়া তুলিল৷ বস্তুত এই নবীন সন্ন্যাসীদের প্রত্যেকের জীবন ঠাকুরের এক বা একাধিক ভাবের প্রকৃষ্ট রূপায়ণ৷ সত্যোপলব্ধির উন্মাদনায় তাঁহারা দিকে দিকে ছড়াইয়া পড়িলেন৷ স৯নায়ক স্বামী বিবেকানন্দ (নরেন্দ্রনাথ) ঠাকুরের তথা ভারতের আধ্যাত্মিক সম্পদ বিশ্বদরবারে পরিবশেন করিয়া শিকাগো ধর্মমহাসভাকে মহিমান্বিত করিয়া তুলিলেন৷ গৈরিক উষ্ণীষধারী সন্ন্যাসিকণ্ঠে ভারতের মর্মবাণী যেদিন শিকাগো মহাসভায় মেঘমন্দ্রে ধ্বনিত হইল, সে স্মরণীয় দিনে প্রতীচ্যজগৎ ভারতের সর্বজনীন উদার আদর্শ সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাইল বিশ্বসভায় ভারতের গৌরবাসন প্রতিষ্ঠিত হইল৷ ত্যাগ ও সেবাই ভারতের মূলমন্ত্র– আধ্যাত্মিকতাই মানবের স্থায়ী কল্যাণের নিদান৷ তাই আজ ভারত বহুবিধ বিপ্লব এবং বিপর্যয়ের মধ্যেও সঞ্জীবিত ও উন্নতশির৷ তাই ভারতমাতার সন্ন্যাসী সন্তানগণ ভারতের গৈরিক পতাকা চিরকাল দূরদূরান্তরে বহন করিয়া মানবকে প্রকৃত শান্তির পথ প্রদর্শন করিয়া আসিতেছে]
সমাপ্ত